Friday, May 28, 2021

চীনা পর্যটক মা হার চোখে: পনেরো শতকের মক্কা-মদিনা by সৈয়দ আশফাক হাসান

আপডেট- ২৪ আগস্ট, ২০১৯: পৃিথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় ‘সামুদ্রিক’ অভিযানের মধ্যে চীনা পর্যটক জ্যাং হার (মা হা) অভিযানগুলো অন্যতম। তিনি মোট সাতটি দুঃসাহসিক সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন, যার বিস্তৃতি ছিল চীন থেকে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশ পর্যন্ত। ইতিহাসের বিবরণ অনুসারে বিখ্যাত কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার নব্বই বছর আগে (১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে) অ্যাডমিরাল জ্যাং হা তাঁর বিশ্বভ্রমণ শুরু করেন।
পনেরো শতকের গোড়ার দিকে মিং সম্রাট ডাইনেস্টি ‘বিশ্বভ্রমণ’-এর লক্ষ্যে এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মিং সাম্রাজ্যের শাসকদের প্রচারণা, ব্যবসার প্রসার ও অন্যান্য সভ্যতার জ্ঞান ও সম্পদ আহরণ করা। এই অভিযানের নেতা নির্বাচন করা হয় অ্যাডমিরাল জ্যাং হাকে। ধর্মবিশ্বাসে তিনি ছিলেন মুসলিম। অ্যাডমিরাল জ্যাং হা মোট সাতটি অভিযান পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিক সেই অভিযানে লোকবল ও জাহাজ সংখ্যার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। বলা হয়ে থাকে, ৬২টি বড় জাহাজ ও ১০০টি ছোট জাহাজের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় নৌবহরটি। আর নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা লাভের জন্য তাঁর বহরের সঙ্গে সংযুক্ত হয় আরো কিছু জাহাজ। সব মিলিয়ে যার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন শ। লোকবল ছিল প্রায় ৩০ হাজার। যাদের ভেতরে ছিল সৈনিক, কারিগর, গবেষক, চিকিৎসক, সেবক ও সাধারণ মানুষ।
অ্যাডমিরাল জ্যা হা চীন থেকে শুরু করে ইন্দো-মালয় দ্বীপপুঞ্জ, ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর হয়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। ৩০ বছরে তিনি সর্বমোট এক লাখ ৬০ হাজার নটিক্যাল মাইল (প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার) পথ পাড়ি দেন। ৫০টিরও বেশি বন্দরে তিনি যাত্রাবিরতি দেন। এই যাত্রায় জ্যাং হা ৪১টিরও বেশি ‘আন্তর্জাতিক নৌপথ’ আবিষ্কার করেন।

অ্যাডমিরাল জ্যাং হা কে ছিলেন?
মূল নাম ‘মা হা’ বা ‘মা সান পাও’। ১৩৭১ খ্রিস্টাব্দে চীনের হুই মুসলিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা চীনের পশ্চিমাংশ (সম্ভবত মোঙ্গল) থেকে ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ে এসে বসবাস শুরু করেন। ধারণা করা হয়, তিনি ইউয়ান সাম্রাজ্যের জিয়ান ইয়াংয়ের প্রভাবশালী রাজপুত্র জায়েদুদ্দিন শাহ শামসুদ্দিনের উত্তরসূরি ছিলেন। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মপরায়ণ। তাঁর প্রপিতা, দাদা ও বাবা সবাই ছিলেন হাজি।
মা হা ছিলেন যুবরাজ ইয়ানের একনিষ্ঠ ভক্ত, যিনি পরবর্তী সময়ে সম্রাট ইয়াংল নামেই পরিচিত হন। মা হাকেও তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং আস্থাশীল মনে করতেন। আস্থার প্রতিদান হিসেবে প্রথমে সেনানায়ক এবং পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। মা হা সেনাধিনায়ক হিসেবে একাধিক যুদ্ধে অংশ নেন এবং সব যুদ্ধে জয় লাভ করেন। বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য সম্রাট ইয়াংল ও তাঁর পরবর্তী আরো দুই সম্রাটের প্রিয়ভাজন ছিলেন। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে সম্রাট ইয়াংল তাঁকে ‘জ্যাং হা’ নামে ভূষিত করেন।

জ্যাং হার বিবরণে পবিত্র মক্কা নগরী
মা হুয়ানের বিবরণীতে অ্যাডমিরাল জ্যাং হার অভিযানের পথপ্রণালি ও এলাকাভিত্তিক বিবরণ পাওয়া যায়। সেই বিবরণে পবিত্র মক্কা নগরীর চিত্রও উঠে এসেছে। তিনি লেখেন, এই দেশটি হলো সেই দেশ, যেখানে ‘স্বর্গের বর্গক্ষেত্র’ বা ‘ম-খেই-খ্যা’ (চৈনিক উচ্চারণ অনুসারে) রয়েছে। কু-লি (কালিকাট, কেরালা) থেকে যদি তুমি পশ্চিম দিকে ২৪০ ডিগ্রি বরাবর যাত্রা শুরু করো, তবে তিনটি চাঁদের সময়কাল পর তাদের শহরের জেটিতে (সম্ভবত এডেন) পৌঁছানো যায়। এর বৈদেশিক নাম ‘চিহতা’। চিহতা থেকে আরো পশ্চিম-উত্তরে এক দিনের পথ পেরোলে এমন শহর পাওয়া যায়, যেখানে এদের রাজা থাকেন। এর নামই ম-খেই-খ্যার রাজধানী (সম্ভবত তিনি জেদ্দা শহর বোঝাতে চেয়েছেন)।
এরা মুসলিম ধর্মের অনুসারী। এখানেই প্রথম একজন ‘মানুষ’ আসেন, যিনি একটি মতবাদ প্রবর্তন করেন, যা এখন পর্যন্ত তাঁরা একে নিখুঁতভাবে পালন করেন। এখানকার লোকেরা বেশ সুদর্শন ও সাহসী। তাঁদের গায়ের রং গাঢ়, অনেকটা বেগুনি! (সম্ভবত রোদে বা গরমে পুড়ে যাওয়ায় চামড়ার রং অতি বাদামি দেখিয়ে থাকবে)। এরা মাথায় কাপড় বাঁধেন এবং অনেক লম্বা জামা পরেন। পায়ে চামড়ার জুতা পরেন। মহিলারা পুরো মাথা ঢেকে রাখেন। তাঁদের চেহারাও দেখা যায় না। তাঁরা আল-লা-ফি (আরবি) ভাষায় কথা বলেন। এ দেশে মদ নিষিদ্ধ। এদের পোশাক ও আচরণ সুন্দর, শান্ত ও প্রশংসনীয়। এখানে কোনো দুস্থ বা গরিব পরিবার নেই। এরা সবাই তাঁদের ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলেন আর নিয়ম ভঙ্গ করেন এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। সত্যি বলতে, সবচেয়ে ‘সুখী মানুষদের’ দেশ এটি। বিয়ে ও মরদেহ সৎকারে এঁরা ধর্মীয় প্রথা অনুসরণ করেন।

যেমন দেখেছিলেন কাবা
এখান থেকে অর্ধদিনের বেশি যাত্রা করলে একটি ‘উন্মুক্ত’ জায়গায় পৌঁছানো যায়, যাকে এরা কাই-পাই (কাবা) বলে ডাকে। এর চারপাশ দেয়ালঘেরা। এই দেয়ালে ৪৬৬টি দরজা আছে। দরজার দুই পাশের থামগুলো সাদা জেড পাথরের। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৬৭টি খিলান রয়েছে। সামনে ৯৯টি, পেছনে ১০১টি, বাঁয়ে ১৩২টি এবং ডানে ১৩৫টি। উন্মুক্ত জায়গায় রয়েছে একটি ঘর, যা পাঁচ রঙের পাথর দিয়ে তৈরি। দেখতে বর্গাকার এবং ওপরের দিক সমতল। ভেতরে পাঁচটি আড়াআড়ি স্তম্ভ রয়েছে, যা সুগন্ধিযুক্ত। আর আছে স্বর্ণ নির্মিত তাক। এর সাজসজ্জাও বেশ সুন্দর। দেয়ালগুলো কাদা দিয়ে লেপন করা। তবে তার সঙ্গে সুগন্ধি মিশ্রণ রয়েছে, যা জায়গাটিকে ঘ্রাণে আবেশিত করে রাখে।
ঘরটি শণ-রেশমের তৈরি কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত। প্রতিবছর ১২তম চাঁদের দশম দিনে বিভিন্ন জায়গা (বিভিন্ন দেশ) থেকে মুসলিমরা এখানে আসেন। তাঁদের অনেককেই এক-দুই বছরের দূরের যাত্রা পথ পেরোতে হয়। অনেকেই এখান থেকে ফিরে যাওয়ার সময় গিলাফের কাপড়ের অংশ ‘ছিঁড়ে’ নিয়ে যায়। যখন ‘ছেঁড়া’ শেষ হয়, রাজা তখন আরেকটি নতুন গিলাফ দিয়ে তা ঢেকে দেন। এমনটাই হয়ে আসছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। এর বাঁ পাশে সু-মা-ই (ইসমাঈল আ.), একজন পবিত্র মানুষের কবর। কবরের দেয়াল সবুজ-পাথরের তৈরি। এটির দৈর্ঘ্য ১২ ফুট, উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট ও প্রস্থ তিন ফুট। যে দেয়াল কবর ঘিরে রেখেছে তা বেগুনি রঙের টোপাজ দ্বারা সজ্জিত।

মক্কার আবহাওয়া ও  কৃষিব্যবস্থার বর্ণনা
আবহাওয়ার বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন যে বছরের বেশির ভাগ সময় এখানে বেশ গরম। এখানে কোনো বৃষ্টি, বজ্রপাত, বরফ বা ঠাণ্ডা নেই। রাতে যে শিশির পড়ে তা বেশ ভারী। এখানকার ফল-ফসলাদি এই শিশিরের ওপর নির্ভরশীল। যদি রাতে একটি খালি পাত্র বাইরে রাখা হয়, তবে সূর্যোদয় পর্যন্ত এতে প্রায় চার ইঞ্চি পরিমাণ পানি জমা হয়।
এখানে চাল ও শস্য খুবই অপ্রতুল। যা-ও অল্প কিছু হয় তার মধ্যে রয়েছে আকাড়া চাল, গম, কালো বাজড়া, লাউ আর কিছু সবজি। কিছু কিছু তরমুজ ও বাঙ্গি হয়। মাঝেমধ্যে একটি তরমুজ ওঠাতে দুজনের প্রয়োজন হয়। এখানে একপ্রকার গাছ হয়, দেখতে অনেকটা তুতগাছের মতো, যাতে পেঁচালো ফুল ফোটে। বছরে দুবার ফোটে। ফলের ভেতর শালগম, পার্সিয়ান খেজুর, ডালিম, আপেল আর পিচ ফল পাওয়া যায়, যার ওজন চার থেকে পাঁচ পাউন্ড পর্যন্ত হয়।
গবাদি পশুর ভেতরে উট, ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, ষাঁড়, ছাগল, বিড়াল, কুকুর, হাঁস, কবুতরসহ নানা জাতের পাখির দেখা পাওয়া যায়। কিছু পাখি আর হাঁস ওজনে প্রায় ১৪-১৫ পাউন্ড বা সাত-আট কেজি হয়।
এ দেশে সুগন্ধি পানি (সম্ভবত আতর) তৈরি হয়। পশুর ভেতরে জিরাফ, সিংহ, উট পাখি, অস্ট্রিচ, লিনাক্স দেখা যায়। মূল্যবান সম্পদের মাঝে নানা রকম দামি পাথর মণি-মুক্তা, আম্বর ও কোরাল পাওয়া যায়।

মদিনায়ও গিয়েছিলেন জ্যাং হা
মদিনার বর্ণনায় লেখা হয়েছে, ‘এ শহর থেকে পশ্চিমে আরো এক দিনের পথ এগোলে যে শহর পাওয়া যায় তার নাম ম-তি-না (মদিনা)। যেখানে পবিত্র পুরুষ ‘মা-হা-মা’ (মুহাম্মদ সা.)-এর কবর রয়েছে। এখানে একটি আলোক-নির্দেশক কবরের মাথার কাছ থেকে বের হয়ে সোজা আকাশের দিকে মেঘের ভেতরে ছুটে গেছে।

Tuesday, May 25, 2021

শিশুর জন্ডিস ও চিকিৎসা by ডা: এম এ রাজ্জাক

জন্ডিস ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা শব্দ হলো ন্যাবা কমলা। কামেলা হলুদ রোগও বলা হয়। এটি একটি বহুল প্রচলিত রোগ যা ছোট বড় সবাই অন্তত নাম শুনে থাকে কম বেশি। যা যকৃতের পিত্ত নিঃসরণ ক্রিয়ার স্বল্পতা অথবা অবরুদ্ধতাবশত রক্তের পিত্ত মিশ্রিত হয়ে শারীরিক রক্তের মধ্যে সঞ্চালিত হয়ে শরীরস্থ চর্মে, চোখের শ্বেত বর্ণ স্থান, মূত্র, পীত বর্ণ ও হলদে বা কমলা রঙের হলে ন্যাবা বা জন্ডিস বলে। নারী, পুরুষ, শিশু সবারই জন্ডিস হতে পারে। শতকরা ৬০ ভাগ শিশুর জন্মের পর জন্ডিস হয়ে থাকে।
আপনি যেভাবে বুঝবেন জন্ডিস হয়েছে : ১. রোগীর মুখে তিক্ত স্বাদ অনুভব করে ২. ক্ষুধাহীনতা থাকে ৩. খাদ্যে অরুচি বিরাজ করে ৪. বমি ভাব হয় ৫. বমি হয় ৬. পিত্তবমি হয় ৭. গায়ে জ্বর ভাব থাকে ৮. পেটের ডান দিকে বা বাম দিকে বেদনার অনুভব হয় ৯. চোখের সাদা অংশ হলুদ ভাব হয় ১০. গায়ের রঙ হলুদ বর্ণ ১১. জামা-কাপড় অথবা বিছানায় এই ঘাম লাগলে তাও হলুদ দেখায় ১২. রক্তস্বল্পতার ভাব থাকে, রক্তে বিলোরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায় ১৩. প্রস্রাব হলুদ হয়, কখনো কখনো সরিষার তেলের মতো প্রস্রাব হয় ১৪. শিশু বুকের দুধ পান ছেড়ে দেয় ১৫. শরীর দিন দিন দুর্বল হতে থাকে, অন্যান্য লক্ষণের সাথে শিশুর কপালে আঙুল দিয়ে আলত ভাবে চাপ দিয়ে উঠিয়ে নিন। যদি আঙুল উঠানোর পরে স্কিন হলদে দেখায় তবে বুঝতে হবে জন্ডিস হয়েছে।
সাধারণত যে কারণে জন্ডিস হয় : ১. রক্তের লোহিত কণিকাগুলো ধ্বংস অর্থাৎ হ্যামোলাইসিস হেতু ২. লিভারের ওপর থেকে অন্ত্রের মধ্যে প্রবাহিত হওয়ার যে পিত্ত পথ থাকে সেই বাইল ডাক্ট-এর কোনো অংশে বা কোনো স্থানে বাধা হলে ৩. হেপাটাইটিস হলে, ভাইরাল হেপাটাইটিস হলে- হেপাটো সিলোলার জন্ডিস হতে পারে ৪. ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং সর্পদংশনের জন্য হেমোলাইটিক জন্ডিস হতে পারে ৫. গলস্টোন বা পিত্ত পাথরের ফলে পিত্ত নিঃসরণ বাধাপ্রাপ্ত হেমোলাইটিক জন্ডিস হতে পারে ৭. বিষাক্ত ও সংক্রামক জীবাণুঘটিত কারণে হতে পারে ৮. গর্ভাবস্থায় মায়ের জন্ডিস থাকলে ৯. মা ও সন্তানের রক্তের বিষণ্নতা কারণে শিশুর জন্ডিস হতে পারে।
সাধারণত উপরোক্ত লক্ষণ নিয়েই হোমিওপ্যাথিতে জন্ডিসের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নিতে চাইলে রক্তের- টিসিডিসি, এইচবিএস এজি%, আরবিসি, ব্লাড কালচার, বিলোরুবিন/ এসজিপিটি/এসজিওটি/ টোটাল প্রুটিন এজি, ইউরিন-এর আরই, স্টোল-এর আরই, লিভার ফাংশন টেস্ট, লিভার বায়োপসি করা যেতে পারে।
চিকিৎসা : হোমিওপ্যাথিতে রোগীর চিকিৎসা করা হয়। তাই সম্পূর্ণভাবে লক্ষণ সংগ্রহ করে ওষুধের লক্ষণ মিলিয়ে সঠিক ওষুধ, শক্তি, মাত্রা নির্ধারণ করে রোগীকে দিতে হয়, যা একজন আদর্শ চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব। আর এতে জন্ডিস সম্পূর্ণভাবে আরোগ্য হয়।
সচরাচর যেসব ওষুধ হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত হয় সেগুলো হলো : একোনাইট, ব্রায়ুনিয়া, চায়না, চেলিডুনিয়াম, কার্ডোয়াস ম্যাজ, কারিকা পেপায়া, লাইকোপুড়িয়াম, মাইরিকা, সালফার, নেট্রাস সালফ, নাক্স ইত্যাদি।
পথ্য ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা : যা করবেন না- কঠোর পরিশ্রম, স্বাস্থ্য বিধির লঙ্ঘন, কঠিন রোদে, অত্যধিক তাপে থাকবেন না, উগ্রমশলাযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত খাবার, বাসি-পচা খাবার, ঝাল-কঠিন টক একদম খাবেন না।
যা করবেন : বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম, সুপেয় পানি পান করা। ঢাকা শহরবাসীর একমাত্র সুপেয় বা বিশুদ্ধ পানি হলো ঘরে ফোটানো পানি। এছাড়া কোনো পানিই জীবাণুমুক্ত নয়। আমার ধারণা যেদিন থেকে বোতল জাত পানি পান শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে পানিবাহিত রোগগুলো বহুগুণে বেড়েছে। যেমন জন্ডিস, আমাশায়, ডাইরিয়া, হেপাইটাইটিস ইত্যাদি। তাজা ফল, বেল, আখের রস, ডাবের পানি, গ্লুকোজের পানি (ডাইবেটিসহীনদের)।
জটিলতা : জন্ডিস হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এ ব্যাপারে সামান্যতম সময় ব্যয় করা আপনার জন্য সমীচীন নয়। ১. জন্ডিসের ফলে লিভার ফোড়া হতে পারে, ২. জন্ডিস থেকে লিভার সিরোসিস হতে পারে ৩. দীর্ঘদিন ভুগলে লিভার ক্যান্সার হতে পারে ৪. শেষ পরিণতি মৃত্যুও হতে পারে।

>>>লেখক : সহকারী অধ্যাপক, তানজিম হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ।
>>>চেম্বার : সিটি হোমিও ইন্টারন্যাশনাল ২৩, জয়কালী মন্দির, ঢাকা। ফোন : ০১৯১২৮৪২৫৮৮

Thursday, May 20, 2021

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য by ড. ইউসুফ আলকারযাভি

ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত প্রবৃত্তি হলো তা ব্যবসায়ীকে মূলধন ও লাভের অংশের ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত করে ফেলে। এমনকি আমরা মহানবী (সা.) এর যুগের একটি কাফেলাকে দেখতে পাই যারা ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হয়েছিল। ওই সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন শ্রবণকারীদের অনেকেই খুতবা না শুনে অমনোযোগী হয়ে সেদিকে চলে যান। তাই তাদের তিরস্কার করে আল্লাহ তায়ালার এ বাণী উচ্চারিত হয়, ‘তারা যখন কোনো ব্যবসায়ের সুযোগ অথবা ক্রীড়া-কৌতুক দেখে তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তারা সেদিকে ছুটে যায়। বলুন : আল্লাহর কাছে যা আছে, তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা জুমুআ : ১১)
ইসলাম কোরআনের স্পষ্ট ভাষ্য এবং মহানবী (সা.) এর বাণীর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য করার প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছে এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে পর্যটন ও ভ্রমণ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। কোরআন ব্যবসাকে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং যারা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করে, তাদের আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও সংগ্রামকারীদের সমান্তরালে উল্লেখ করেছে। মহাগ্রন্থ কোরআনের এ বাণীর প্রতি লক্ষ্য করুন, ‘কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত হবে।’ (সূরা মুয্যাম্মিল : ২০)।
মহাগ্রন্থ কোরআনে এসেছে, সবসময় বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম উপায় সামুুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বারগুলো উন্মুক্ত করে মানুষের ওপর  অনুগ্রহ করেছেন। সমুদ্রকে মানুষের অনুগত করা এবং তাতে নৌযান চলাচল করার বিষয়টি সহজ করে দেওয়া আল্লাহ তায়ালার অপার অনুগ্রহ। কোরআন শরিফের ভাষ্য হলো, ‘তুমি তাতে তার বুক চিরে জাহাজ চলতে দেখ, যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সূরা ফাতির : ১২)। এর সঙ্গে কখনও কখনও বাতাস প্রবাহিত করার বিষয়টিকে এভাবে উল্লেখ করেছে, ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি এই যে, তিনি সুসংবাদবাহী বায়ু প্রেরণ করেন, যাতে তিনি তার অনুগ্রহ তোমাদের আস্বাদন করান এবং যাতে তার নির্দেশে জাহাজগুলো বিচরণ করে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ তালাশ করো এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সূরা রোম : ৪৬)।
কোরআন শরিফ এ বিষয়টির নেয়ামত স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং এর উপকারিতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বারবার আলোচনা করেছে। এমনকি মহাগ্রন্থ কোরআন নৌযানকে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, শক্তিমত্তা ও প্রজ্ঞার প্রতি ইঙ্গিতবাহী নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘এবং নদীতে নৌকাগুলোর চলাচলে মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে।’ (সূরা বাকারা : ১৬৪)।  আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘সমুদ্রে ভাসমান পর্বতসম জাহাজগুলো তার অন্যতম নিদর্শন।’ (সূরা শূরা : ৩২)।
আল্লাহ তায়ালা মক্কাবাসীর ওপর  অনুগ্রহ করেছেন। কেননা তিনি তাদের জন্য এমন সব উপায়-উপকরণ সৃষ্টি করেছেন যে, মক্কা শহরকে আরব উপদ্বীপে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ শহর-হরম প্রতিষ্ঠিত করিনি? এখানে সব ধরনের ফলমূল আমদানি হয় আমার দেওয়া রিজিকস্বরূপ।’ (সূরা কাসাস : ৫৭)। এর মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম (আ.) এর দোয়া সত্যে পরিণত হয়েছে। তিনি এই বলে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি; হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা নামাজ কায়েম রাখে। এরপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদের ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন, সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৭)।
প্রতি বছর ব্যবসাসংক্রান্ত দুটি ভ্রমণ সহজ করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা কোরাইশদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তারা শীতকালে ইয়ামান অভিমুখে একটি ভ্রমণ করত এবং গ্রীষ্মকালে শাম অভিমুখে একটি সফর করত। তারা বাইতুল্লাহর তত্ত্বাবধান ও দেখাশোনা করার ফলে এ দুই ঋতুতে নিরাপদে সফর করত। সুতরাং তাদের জন্য উচিত হলো তারা যেন এ ঘরের মালিক ও প্রতিপালক এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করার মাধ্যমে এ মহা নেয়ামতের শোকর আদায় করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যেহেতু কোরাইশের আসক্তি আছে, আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরেরÑ অতএব, তারা যেন ইবাদত করে এই ঘরের মালিকের, যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন।’ (সূরা কোরাইশ : ১, ২, ৩, ৪)।
ইসলাম মুসলমানদের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে হজের মৌসুমে পারস্পরিক ব্যবসা-বিনিময় করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কেননা হজের মৌসুমে বিশ্বের আনাচে-কানাচে ও দিগ-দিগন্ত থেকে অনেক মানুষ বাইতুল্লাহয় সমবেত হয়ে থাকেন। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা তোমার কাছে আসবে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।’ (সূরা হজ : ২৭, ২৮)।
আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আয়াতের মধ্যকার উপকারিতা ও কল্যাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা-বাণিজ্য। ইমাম বোখারি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, মুসলমানরা হজের মৌসুমে ব্যবসা করা থেকে দূরে থাকতেন। তারা ভাবতেন, এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা তাদের নির্ভেজাল নিয়তকে কলঙ্কিত করবে এবং তাদের ইবাদত-বন্দেগির স্বচ্ছতাকে মলিন করে দেবে। মহাগ্রন্থ কোরআন তাদের এ চিন্তাধারার অপনোদন করে বলেছে, ‘তোমাদের ওপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোনো পাপ নেই।’ (সূরা বাকারা : ১৯৮)। 
সপ্রশংস তসবিহ পাঠ করে যারা সকাল-সন্ধ্যায়  মসজিদে আগমন করে তাদের প্রশংসা করে কোরআন শরিফ বলেছে, ‘এমন লোকেরা যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ কায়েম করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না।’ (সূরা নুর : ৩৭)।  
সুতরাং কোরআনের আলোকে তারাই শুধু মোমিন নয় যারা মোটা কাপড় পরে মসজিদে বসে থাকে কিংবা গদিতে হেলান দিয়ে দরবেশি ভাব ধরে অথবা খানকায় বসে সন্ন্যাসী-জীবন অবলম্বন করে, বরং ইসলাম তাদেরই মোমিন বলে অভিহিত করেছে, যাদের পার্থিব কাজকর্ম সম্পাদন পরকালীন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এতক্ষণ আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে মহাগ্রন্থ কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলাম।
অনুরূপভাবে মহানবী (সা.) এর বাণী সুন্নাহতেও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এর মূলনীতিগুলোকে তার উক্তি, কর্ম ও সমর্থনের মাধ্যমে সুদৃঢ় করেছেন। তার প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী থেকে শুনতে পাই, ‘সত্যবাদী, বিশ্বস্ত মুসলিম ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৩৯)। মহানবী (সা.) আর বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী ব্যক্তি নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ১২০৯)।
আপনি এ কারণে আশ্চর্য হবেন না যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীকে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামকারী মুজাহিদ ও এ পথে শাহাদাত বরণকারী ব্যক্তির মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। কেননা আমাদের এমন কতক অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, জিহাদ শুধু যুদ্ধের ময়দানেই হয় না, বরং অর্থনীতির ময়দানেও সংগ্রাম এবং জিহাদ অব্যাহত রয়েছে। সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীর জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ মহা মর্যাদা ও প্রচুর সওয়াব দানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্য সাধারণত লোভ-লালসার সৃষ্টি করে এবং যে কোনো পন্থায় লাভ উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করে। সম্পদ সম্পদের জন্ম দেয় এবং লাভ আরও প্রচুর লাভের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। সুতরাং এতসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করে সে এমন এক মুজাহিদ, যে অনৈতিক লালসার ময়দানে বিজয়ী হয়েছে; ফলে তার জন্য মুজাহিদদের মর্যাদা অর্জিত হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের সহজাত প্রবৃত্তি হলো তা ব্যবসায়ীকে মূলধন ও লাভের অংশের ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত করে ফেলে। এমনকি আমরা মহানবী (সা.) এর যুগের একটি কাফেলাকে দেখতে পাই যারা ব্যবসায়ী পণ্য নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হয়েছিল। ওই সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন শ্রবণকারীদের অনেকেই খুতবা না শুনে অমনোযোগী হয়ে সেদিকে চলে যান। তাই তাদের তিরস্কার করে আল্লাহ তায়ালার এ বাণী উচ্চারিত হয়, ‘তারা যখন কোনো ব্যবসায়ের সুযোগ অথবা ক্রীড়া-কৌতুক দেখে তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তারা সেদিকে ছুটে যায়। বলুন : আল্লাহর কাছে যা আছে, তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সূরা জুমুআ : ১১)।
সুতরাং বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের এ ঘূর্ণাবর্তে যে ব্যক্তি শক্তিশালী বিশ্বাসের অধিকারী হয় এবং আল্লাহর ভয়ে অন্তরকে পূর্ণ এবং আল্লাহর স্মরণ দ্বারা তার জিহ্বাকে সতেজ রাখে; সে এর যোগ্য বলে বিবেচিত হয় যে, পরকালে নবী, সিদ্দিক এবং শহীদদের সঙ্গে থাকবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এ কর্মই আমাদের জন্য যথেষ্ট যে, তিনি যেভাবে মানুষের আত্মার প্রতি লক্ষ্য করে তাকওয়া ও খোদাভীরুতার ওপর মসজিদে নববি নির্মাণ করেছেন; যাতে সেটা ইবাদত-বন্দেগির সমাবেশস্থল, ইলম ও জ্ঞানের বিদ্যালয়, দাওয়াতের আবাস এবং  রাষ্ট্রের কেন্দ্র হতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে তিনি অর্থনীতির প্রতি লক্ষ্য করে নিরেট ইসলামি বাজার প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং ইহুদিদের ক্ষমতা নিঃশেষ করেছেন; এর আগে বনি কাইনুকার বাজারে যেমন তাদের ক্ষমতা ছিল। মহানবী (সা.) তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাজারের মূলনীতি নিজে নির্ধারণ করেন এবং আপন শিক্ষামালা ও দিকনির্দেশনা দ্বারা সবসময় এর তত্ত্বাবধান করেন। এর ফল এই দাঁড়ায় যে, তার বাজারে ধোঁকা, প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া ও বেশি নেওয়া, গুদামজাতকরণ এবং অন্যকে প্রতারিত করার মতো কোনো দুর্নীতি ছিল না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবিদের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তাদের অনেকেই কালের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী, দক্ষ কারিগর ও কৃষক এবং সব ধরনের শিল্প ও বৃত্তিতে নৈপুণ্যের অধিকারী ছিলেন। মহানবী (সা.) তাদের মাঝে ছিলেন। তার ওপর আল্লাহ তায়ালার বাণী অবতীর্ণ হচ্ছিল; আর তিনি সাহাবিদের আসমানের আহ্বান শোনাচ্ছিলেন। হজরত জিবরাইল (আ.) আল্লাহর ওহি ও প্রত্যাদেশ নিয়ে সকাল-সন্ধ্যায় আগমন করতেন। সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যেকেই অত্যধিক ভালোবাসার দরুন এক মুহূর্তের জন্যও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছ থেকে পৃথক হতে চাইতেন না। এতদসত্ত্বেও তাদের প্রত্যেককেই দেখতে পাই, তারা কাজে মশগুল এবং কর্মে ব্যস্ত ছিলেন। একজন ব্যবসার উদ্দেশ্যে জমিনে ভ্রমণ করছেন তো অন্যজন তার বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন। একজন চাষবাস করছেন তো অন্যজন কারিগরি শিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন। যদি কেউ উপস্থিত থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী ও শিক্ষা শুনতে না পারতেন, তাহলে যথাসম্ভব অন্যদের কাছে তা জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতেন। কেননা তাদের আদেশ করা হয়েছিল, তাদের উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়।
আনসারদের অধিকাংশ ব্যক্তি কৃষক ছিলেন, আর মুহাজিরদের অধিকাংশ ব্যক্তি ব্যবসায়ী ছিলেন। মুহাজির আবদুর রহমান ইবনে আওফের কাছে তার আনসারি মুসলিম ভাই সাদ ইবনে রবি এ দরখাস্ত পেশ করেন, যেন আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) তার সম্পদ দুটি ঘর সমানভাগে ভাগাভাগি করে অর্ধেক নিয়ে নেন এবং তার দুই স্ত্রীর কোনো একজনকে পছন্দ করেন; তাহলে তিনি তাকে তালাক দিয়ে দেবেন! আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বলেন : আমি তার অসাধারণ এ পরার্থপরায়ণতাকে অত্যন্ত সংযম ও মহত্ত্বের সঙ্গে এ কথা বলে ফিরিয়ে দিই যে, আল্লাহ আপনার সম্পদ ও পরিজনের মধ্যে বরকত দান করুন। এসবে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। ব্যবসা করা যায় এমন কোনো বাজার থাকলে বলুন। তখন সাদ (রা.) বললেন, হ্যাঁ! বনি কাইনুকার বাজার রয়েছে, যেখানে ব্যবসা করা যায়। এর পরদিন আবদুর রহমান ইবনে আওফ ঘি ও পনির নিয়ে বাজারে যান এবং এগুলো ক্রয়-বিক্রয় করেন। এরপর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে বাজারে যেতে থাকেন। এক সময় তিনি মুসলমানদের মধ্যে একজন বড় সম্পদশালী হয়ে যান! মৃত্যুবরণ করার সময় তিনি প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে যান।
হজরত আবু বকর (রা.) সবসময় ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি যেদিন তিনি খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেদিনও তার পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহের জন্য বাজারে যেতে চেয়েছিলেন। হজরত ওমর (রা.) বলেন, বাজার আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী শোনা থেকে বিরত রেখেছে। হজরত উসমান (রা.) সহ অনেকেই বিভিন্ন পেশায় অভ্যস্ত ছিলেন।
অনুবাদ : আবদুল কাইয়ুম শেখ

চাকুরী থেকে ছাঁটাই ও বরখাস্ত: কি বলা আছে শ্রম আইনে? by শাহনাজ পারভীন

বাংলাদেশে পোশাক খাতে গত দুই মাসে অন্তত সাড়ে সাত হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে দাবি করছে ট্রেড ইউনিয়নগুলো।
বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে চাকুরী হারানো কোন ব্যাপারই নয়, এমন একটি অভিযোগ রয়েছে।
বলা হয় সামান্য একটু দোষে অথবা মালিকের পছন্দ অপছন্দের কারণে আপনার জীবিকা নাই হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী হিসেবেও নানা কারণে আপনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।
জেনে নিন শ্রমিক ও কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করা প্রসঙ্গে কি বলা আছে বাংলাদেশের আইনে, বাস্তবতা কি আর বিচারে কোথায় যাবেন।
বরখাস্ত, ছাঁটাই, চাকুরীর অবসান
শ্রম আদালতের বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট একেএম নাসিম বলছিলেন পৃথিবীর সব দেশেই ছাঁটাই, বরখাস্ত, চাকুরিচ্যুতি সম্পর্কে নানা ধরনের নিয়ম আছে। বাংলাদেশে এই সবগুলোর আলাদা ব্যাখ্যা আছে।
বাংলাদেশে শ্রম আইন ২০০৬-এর চ্যাপ্টার দুইতে এ সম্পর্কিত পদক্ষেপ নিয়ে আলাদা আলাদা নিয়মের উল্লেখ রয়েছে। এর সবগুলোর মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম তফাৎ।
অ্যাডভোকেট নাসিম বলছেন, "চাকুরী হারানোর সবচাইতে বড় শাস্তি ধরা হয় বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টিকে। কোন শ্রমিক যদি কোন ধরনের অন্যায়, অপরাধ, অসদাচরণ করে তাহলে এটা করা হয়ে থাকে। সে অন্যায় নানা রকম হতে পারে।"
"আরেকটি হল টার্মিনেশান বা চাকুরীর অবসান। সেটি হল কোনও মালিকের আপনাকে পছন্দ হচ্ছে না কিন্তু সে আপনাকে বরখাস্ত করার কোন কারণ দিতে পারছে না। সেটিকে বলা হয় টার্মিনেশান।"
ছাঁটাই সম্পর্কে অ্যাডভোকেট নাসিম ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, "ছাঁটাই হল যেমন ধরুন কোন মালিকের একশ জন শ্রমিক আছে। তিনি যদি মনে করছেন তার একশ জন শ্রমিকের মধ্যে দশজনকে দরকার নেই। অথবা তিনি তাদের বেতন দিয়ে কর্মী হিসেবে রাখার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। তাহলে তিনি সবচাইতে পরের দিকে নিয়োগ দেয়া দশজন কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারেন। এটিকে বলে রিডানডেনসি"
প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সুরক্ষা কম?
অ্যাডভোকেট নাসিম বলছেন শ্রমিক কারা হবেন আর কর্মী কারা হবেন তারও ব্যাখ্যা দেয়া আছে।
কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে শ্রমিক ও কর্মী নির্ধারিত হয়।
কর্মীরা সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক খাতে অফিস আদালতে কাজ করেন বলে মনে করা হয়।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়েও শ্রমিক থাকতে পারেন। শ্রম আইন শুধু শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই কাজে আসবে।
তিনি বলছেন, চাকুরী হারানোর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের যারা কর্মী তাদের সুরক্ষা সবচাইতে কম।
চাকুরীতে নিয়োগের সময় চাকুরী-দাতার সাথে চুক্তিতে কতটা দর-কষাকষি আপনি করতে পেরেছেন তার উপর নির্ভর করবে চাকুরী চলে গেলে আপনি কতটা সুবিধা পাবেন বা চাকুরী যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন গুলো কি হবে।
সাধারণত এসব ক্ষেত্রে নানা অফিসে নিয়ম আলাদা।
শ্রম আইনে চাকুরিচ্যুতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নিয়ম করা আছে।
মি. মোল্লা বলছেন, বাংলাদেশে এমন কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন আইন করা হয়নি।
তাদের সুরক্ষাও কম। সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কিছু নিয়ম আছে।
তবে বিশ্বব্যাপী একটি নিয়ম হল এক মাসের নোটিশ দিতে। সেটি মানেন প্রায় সবাই।
বরখাস্ত, ছাঁটাই, চাকুরীর অবসানের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী কি ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবেন সেটিও নির্ভর করে চাকুরী-দাতার সাথে চুক্তির উপর।
এই ব্যাপারেও বাংলাদেশে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই।
চাকুরী হারানো শ্রমিকে যেসব সুবিধা প্রাপ্য
আইনে শ্রমিকদের জন্যেও বলা রয়েছে অনেক কিছু। ছাঁটাই হলে শ্রমিককে এক মাস আগে জানাতে হবে।
ঐ প্রতিষ্ঠানে প্রতি এক বছর চাকুরীর জন্য এক মাসের বেসিক বেতন পাবেন শ্রমিক।
যেমন দশ বছর চাকুরী করলে সে দশ মাসের বেসিক বেতন পাবে। ক্ষেত্র বিশেষে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক ক্ষতিপূরণও পেতে পারেন।
তবে বরখাস্ত হওয়া শ্রমিক কোন ধরনের বেতন ভাতা ছাড়াই চাকুরী হারাবেন।
কিন্তু তাকে বরখাস্তের আগে কারণ দর্শাও নোটিস করতে হবে, অন্যায়ের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, তদন্তে শুধু মালিকের পছন্দের ব্যক্তি নয় শ্রমিক পক্ষের ব্যক্তিও থাকতে হবে।
সেই সাথে শ্রমিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরপর যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তবেই তাকে বরখাস্ত করা যাবে।
চাকুরীর অবসান বা টার্মিনেশান হলে শ্রমিককে অন্তত চার মাস আগে জানাতে হবে।
অথবা মালিক কোন নোটিশ ছাড়াই যদি তাকে চলে যেতে বলেন তাহলে তাকে চারমাসের বেতন দিতে হবে।
বাস্তবতা কেমন?
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের পরামর্শক আবু ইউসুফ মোল্লা বলছেন, "যেমন পোশাক খাতে বরখাস্ত না করে ছাঁটাই করা হয় বেশি। টার্মিনেশান ক্লজটাও তারা ব্যবহার করেন। তবে ছাঁটাই করার প্রবণতাই বেশি। এতে কম বেনিফিট দিতে হয়। আবার শ্রমিক এটিকে আইনত কোন চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। আর এসব তারা আইনজীবীদের পরামর্শেই করে থাকেন।"
তিনি বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্রের বালাই নেই সেখানে মৌখিক কথাতেই চাকুরিচ্যুতি হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সকল প্রতিষ্ঠানই আইনি বিষয়ে পরামর্শক নিয়োগ করে থাকে।
মি. মোল্লা বলছেন, "পোশাক খাতে আজকাল তারা বরখাস্ত করার দরকার পরলে তদন্ত করে। আগের মতো এক পাক্ষিক তদন্তও হয়না। কমপ্লায়ান্সের কারণে তাদের এটা করতে হয়।"
অন্যায় হলে কোথায় যাবেন?
বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে সাতটি শ্রম আদালত রয়েছে।
আপনি যদি মনে করেন আপনার সাথে অন্যায় হয়েছে তাহলে সেখানে আপনি মামলা করতে পারেন।
তবে বাংলাদেশে এই আদালতগুলোতে অভিযোগ মীমাংসা হতে এতটাই সময় লাগে এবং যে পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে হয় তাতে শ্রমিক পর্যায়ের একজন ব্যক্তি সেখানে যাননা।
অথবা তারা এমন আদালত বিষয়ে কিছু জানেনই না। তবে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য সরকারি একটি সেল রয়েছে।
কিন্তু তার কার্যক্রম বাস্তবে খুবই সীমিত।
আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মী পর্যায়ে যারা আছেন তাদের জন্য বিচার পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশে সীমিত।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রচুর শ্রমিক ছাঁটাই করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

Thursday, May 13, 2021

‘সীমান্ত টেনে মানুষকে শ্রেণীবিভক্ত করা যায় না’

শাহবানু বিলগ্রামির কখনো বন্ধু ছিলো না, এমনটা ভাবাই যায় না। হাবভাবে যেন ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’। হাসি মাখা মুখ, নম্র ব্যবহার – মন কেড়ে নেবে যে কোন মানুষের। ‘স্বপ্নহীন’ নামে বই লিখে এক দশক আগে যখন আন্তর্জাতিক সাহিত্যঅঙ্গনে পা রেখেছিলেন তখনই তার বইটি ‘ম্যান এশিয়া লিটারারি প্রাইজ’-এর তালিকায় যুক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তান আবারো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে সাহিত্যবিশ্ব। মহসিন হামিদ, কামিলা শামসি, মোহাম্মদ হানিফ, উজমা আসলাম খান ও দানিয়েল মঈনুদ্দিন খানের মতো লেখকদের বই তখন বেস্ট সেলিং তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বুকস্টলগুলোতে সবেমাত্র ভারতীয় সাহিত্যগুলো থেকে আলাদা করে পাকিস্তানী সাহিত্যের জন্য সেল্ফ বসানো শুরু হয়েছে। শাহবানু এসেই স্থান করে নিলেন ওই পাকিস্তানী বুকসেল্ফে।
তবুও একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিলেন শাহবানু। শৈশব কাটানো মনট্রিল শহরে তিনি ফিরে যাবেন বলে কেউ কেউ ভেবেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রেও চলে যেতে পারতেন। পাকিস্তানী-কানাডিয়ান বা পাকিস্তানী-আমেরিকান লেখকদের মূল্যায়ন হয় না বলেও তিনি ভাবতে পারতেন। না এর কোনটিই তিনি করেননি। তিনি পাকিস্তান ফিরে যান। প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতির কারণে একসময় পাঠকের মন থেকেও হারিয়ে যেতে বসেছিলেন শাহবানু। এরপরই প্রবল বিক্রমে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তার প্রথম বইয়ের মতো সর্বশেষ কাজ – ওইসব শিশুরা – এটিও একটি ফিকশন। কোনরকম ঢাকঢোল পেটানো ছাড়াই ভারতের বাজারে তা বিক্রি শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই মানুষ এই বইয়ের কেন্দ্রিয় চরিত্র ১০ বছরের বালিকা ফেরজানা’কে নিয়ে কথা বলা শুরু করে। মায়ের মৃত্যুর পর শিকাগো শহর থেকে করাচি ফিরে এসেছিলো যে মেয়ে। অনেক পাঠকের মতে শাহবানু’র কাজগুলো হবে বাইরে থেকে উঁকি দেয়া কোন দর্শকের মতো। আবার কেউ কেউ বলছেন, না, এগুলো শেকড়ে ফেরার আকুতি। যা-ই বলা হোক না তা শাহবানুর ওষ্ঠে হাসির আরেকটি পরত বুলায়। সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত জয়পুর সাহিত্য উৎসবে যোগ দেন এই পাকিস্তানী লেখিকা। সেখানে তার সঙ্গে ফ্রন্টলাইন পত্রিকার কথা হয়। সেই কথোপকথনের কিছুটা সাক্ষাতকার আকারে নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আপনি মন্ট্রিলে বেড়ে উঠলেও কিশোরী বয়সে করাচী ফিরে আসেন। আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ওইসব শিশুরা’-এর নায়িকা ১০ বছর বয়সী কিশোরী ফেরজানা শিকাগো থেকে করাচি ফিরে এসে এক নতুন জগতের মুখোমুখি হয়েছিলো। উপন্যাসের চরিত্র কি আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন?
উত্তর: আমার গল্পে এক শিশুর কথা বলা হয়েছে যে পশ্চিমা জগতে বেড়ে উঠেছে, তার মাকে হারিয়েছে, এরপর পাকিস্তানে ফিরে এসে দেখে অন্যরকম জগত। হ্যাঁ, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রায় অনুরূপ। কিন্তু এর বাইরে গল্পের গঠন, চরিত্র ও ধারণা পুরোপুরি ভিন্ন এবং একেবারেই কাল্পনিক। এরপরও আমার কিছু কিছু আত্মীয় কিছু চরিত্রে তাদেরকে খুঁজে পাবেন।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম উপন্যাস ‘স্বপ্নহীন’-এ মূল চরিত্রের শৈশবকালের কথা বলা হয়। ‘ওইসব শিশুরা’তেও মূল চরিত্র এক ১০ বছরের কিশোরী। এই শৈশব থেকে আপনার গল্পগুলোকে বের করে আনার কোন পরিকল্পনা নেই।
উত্তর: শৈশব সবসময়ই আমাকে বিমুগ্ধ করে। এমনকি এখন আমি মা হওয়ার পরও। শিশুকাল নিয়ে লেখা বইগুলো আমাকে টানে। শিশুদের সান্নিধ্যেই আমার বেশির ভাগ সময় কাটে। তাদের সান্নিধ্য আমার বিষণœতা কাটায়। ‘ওইসব শিশুরা’ বইয়ে ফেরজানার বয়স ১০ হলেও মাহমুদের পরিবারের টানাপোড়েনের ব্যাপারে তার অন্ত:দৃষ্টি অনেক গভীর। কারণ পাকিস্তানে গোষ্ঠীদ্ব›দ্ব, রাজনীতি, চরমপন্থার মতো গুরুতর সমস্যাগুলোর ব্যাপারে তার প্রাথমিক অনুভুতি ছিলো একেবারে তরতাজা, কখনো বা হাস্যকর।
প্রশ্ন: আপনার দুটি উপন্যাসেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। একজন পাকিস্তানীর জন্য তা একটি ক্ষত। আপনার সাহিত্য কর্মের মধ্য দিয়ে এমন অনুভুতি’র প্রকাশ ঘটেছে?
উত্তর: কোনভাবে হয়তো আমি ১৯৭১ সালকে টেনে এনেছি। তবে যুদ্ধের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোন সংযোগ ছিলো না। এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আমার জানাশোনা বইপত্র থেকে। তবে, মানবিক অনুভুতি থেকে এই যুদ্ধের ফলাফল, আবেগের সঙ্গে জড়িত প্রতিক্রিয়াগুলোর ব্যাপারে আসলেই আমি কৌতূহলী। এই যুদ্ধ সম্পর্ক ও পরিবারগুলোর ওপর কি ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে তা আমি জানতে চাই।
১৯৭১ সালকে উপজীব্য করে সম্প্রতি বেশ কিছু পাকিস্তানী উপন্যাস রচিত হয়েছে। তবে এটি এখনো আমাদের জন্য ক্ষত কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। আপনি যদি আমাদের দেশগুলো – ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাস দেখেন তাহলে দেখবেন ‘১৯৭১’ প্রতিটি দেশকেই ব্যাপক প্রভাবিত করেছে। তাই আমাদের সবার সাহিত্যে তার উল্লেখ কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়।

Tuesday, May 11, 2021

গণতন্ত্র: যেসব লক্ষণ দেখে বুঝবেন একটি দেশ গণতান্ত্রিক নয় by আকবর হোসেন

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকরী ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সে চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর অনেকে দেশে গণতন্ত্র নামেমাত্র কার্যকর রয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর মতো অনেক দেশে সরাসরি সামরিক শাসন না থাকলেও, অনেক দেশে গণতান্ত্রিক-ভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো সামরিক একনায়কদের মতোই আচরণ করছে বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে।
অনেক দেশে পরিপূর্ণ বেসামরিক সরকার থাকলেও সেখানে গণতন্ত্র কতটা কার্যকরী আছে সেটি নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
একটি দেশে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সে দেশে গণতন্ত্র নাও থাকতে পারে। কিভাবে বুঝবেন একটি দেশে গণতন্ত্র নেই?

১. প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন:

গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে নির্বাচন হলো 'গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা' । সে নির্বাচন হতে হবে এবং অবাধ ও স্বচ্ছ।
যে দেশে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এবং জবরদখল হয় সেটিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে নারাজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।

২. একনায়করাও নির্বাচন করে:

যেসব দেশে বেসামরিক একনায়কতন্ত্র আছে সেখানেও নিয়মিত নির্বাচন হয়।
কারণ তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
এখন নির্বাচনে কারচুপি শুধু জাল ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়না, এর নানা দিক আছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের গবেষক ব্রায়ান ক্লাস বলেন, নির্বাচনের সময় অধিকাংশ একনায়ক শাসক তাদের প্রতিন্দ্বন্দ্বিকে নানা কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনে অযোগ্য করে দেন।

৩. জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা:

গণতন্ত্রে জনগণের মতামতের প্রাধান্য একটি বড় বিষয়। একটি সরকার নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক হয়না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র না থাকলে এবং একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব হলে জনগণের মতামতকে সহিংসভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়।
কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে নির্মিত বিদ্রুপাত্মক চলচ্চিত্র 'দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর'-এ অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন। চলচ্চিত্রটি ১৯৪০ সালে মুক্তি পায়
এর ফলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়াহিয়া আখতার বলেন, 'সিভিলিয়ান অটোক্র্যাট' বা 'বেসামরিক স্বৈরশাসক' বলে একটি কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চালু আছে। তিনি বলেন, "অনেক সময় গণতান্ত্রিক সরকারের চরিত্র দেখে অনেক সামরিক শাসকও লজ্জা পেতে পারে।"

৪. ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাবে:

যে দেশে গণতন্ত্র থাকেনা সেখানে শাসকগোষ্ঠী নিয়মিত নানা ধরণের নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেও সেসব নির্বাচনের প্রতি মানুষের কোন আস্থা থাকেনা।
ভোটাররা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তারা ভোট দেবার জন্য ভোট কেন্দ্রে যেতে চায়না।

৫. সংসদ হবে একদলীয়:

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে একটি দেশে যখন গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হবার দিকে ধাবিত হয় তখন সংসদে ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে।
সংসদে কার্যত কোন বিরোধী দল থাকেনা।

৬. নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব:

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র না থাকলে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নানা ধরণের আইন-বহির্ভূত কাজ জড়িয়ে পরে।
কারণ, শাসক গষ্ঠী তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিরাপত্তাবাহিনীকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সাধারণ মানুষকে দাবিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করে।

৭. দুর্বল প্রতিষ্ঠান:

অধ্যাপক ইয়াহিয়া আখতারের মতে গণতন্ত্র কায়েম করতে হলে কিছু প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরী করতে হয়।
যেমন: নির্বাচন কমিশন, সংসদ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি।
অধ্যাপক আখতার বলেন একটি দেশে যদি এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে এবং সেগুলো ভঙ্গুর অবস্থার দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে বুঝতে হবে সে দেশে গণতন্ত্র নেই।

৮. মতপ্রকাশে ভয় পাওয়া:

গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়।
সেক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভয় পায়।
এমনকি শাসকগোষ্ঠী ইন্টারনেটও নিয়ন্ত্রণ করতে চায় যাতে করে মানুষ সেখানে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে না পারে।

৯. দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া:

একনায়কতন্ত্রে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্রয় করার জন্য এই দুর্নীতি ব্যবহার করা হয়।
এই ব্যবস্থায় দুর্নীতি এমন সুন্দরভাবে সাজানো হয় যে, সেটি অল্প কিছু ব্যক্তির উপর নির্ভর করে।
শাসকের অনুগত হবার বিনিময়ে তাদের দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়া হয়।
ফলে তারা আরো ধনী হয়।
যদি কোন কারণে সন্দেহ হয় যে তারা শাসকের অনুগত নয়,তখন তাদের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

১০. ক্ষমতা হারানোর ভয়:

একনায়ক শাসকরা অবসরের ভয়ে থাকেন।
তাদের মনে থাকে যে ক্ষমতা হারানোর পর একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির তৈরি হবে। ফলে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রতিশোধ নিতে পারে।
২০১২ সালে নির্মিত কমেডি চলচ্চিত্র 'দ্য ডিক্টেটর''। এই চলচ্চিত্রে কাল্পনিক দেশ ওয়াদিয়ার স্বৈরশাসকের চরিত্রে অভিনয় করেন সাচা ব্যারন কোহেন। একটি দেশে একজন স্বৈরশাসকের পক্ষে কী কী নৈরাজ্য চালানো সম্ভব তা ঠাট্টা এবং তামাশাচ্ছলে চলচ্চিত্রটিতে তুলে আনেন পরিচালক।

Sunday, May 9, 2021

প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স অ্যাট এমজিকে: শ্রীলঙ্কার ছু-মন্তরের চমক

ইংরেজিতে সৃষ্টিশীল লেখার স্বীকৃতি হিসেবে সেরা যে পুরস্কার দেয়া হয় সেটি হলো গ্রাটিয়েন প্রাইজ। ২০১২ সালে পেয়েছেন লাল মেদাওয়াত্তাগেদেরা তার উপন্যাস প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স অ্যাট এমজিকে-এর জন্য।
শ্রীলঙ্কায় ইংরেজি চর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় এই পুরস্কার দেয়া হয়। তবে অন্য কেউ নয়, পুরস্কার কেবল শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের জন্যই নির্ধারিত। আর এটি প্রবর্তন করেছিলেন শ্রীলঙ্কায় জন্মগ্রহণকারী কানাডিয়ান উপন্যাসিক মাইকেল অনদাতজি। দি ইংলিশ পেশেন্ট লেখার জন্য যৌথভাবে বুকার প্রাইজ জয়ের টাকা দিয়ে তিনি এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতিবছরই বেশ কিছু উপন্যাস, ছোট গল্প ও কবিতা জমা হয় এই পুরস্কারের জন্য। শ্রীলঙ্কায় প্রতি বছরই অনেক অনেক দারুণ সৃষ্টিশীল লেখালেখি হয়। তবে প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স বিরল ধরনের সৃষ্টি। স্থানীয় পরিভাষাই লেখক ইংরেজিতে ব্যবহার করে নতুনত্ব এনেছেন।
শ্রীলঙ্কা নামে বর্তমানে পরিচিত দেশটি ১৫০৫ সালে পর্তুগিজদের উপনিবেশে পরিণত হয়। তারপর একসময় তা হয়ে যায় ডাচদের উপনিবেশে। এরপর তা হাত ঘুরে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখনই ইংরেজি দেশটিতে শেকড় গাড়তে থাকে। ইংরেজিই হয়ে পড়ে দেশটির প্রধান ভাষা। তবে ইংরেজি শিক্ষিতরাই শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বিদেশী শিক্ষিতদের হাতেই থাকে দেশের নিয়ন্ত্রণ। তবে বিতর্কিত সিংহলি অনলি অ্যাক্ট পাস হওয়ার পর ইংরেজি শিক্ষা কেবল উচ্চশ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
ফলে যারা ইংরেজিতে লেখালেখি করেন, তাদের ইংরেজিতে উচ্চ শ্রেণির বিষয়গুলোই সামনে আসে। শ্রীলঙ্কার আসল লোকজন বাইরেই থেকে যান। একেবারে অল্প কিছু লোকের মধ্যেই থাকে তাদের বিচরণ। দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগও থাকে খুবই ক্ষীণ।
মেদাওয়াত্তাগেদেরা পেশায় শিক্ষাবিদ। তিনি একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা শেখানোর কাজ করেন। প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স তার প্রথম উপনাস। এছাড়া দুটি ছোট গল্প সঙ্কলনও আছে তার। এ দুটির নাম হলো ক্যান ইউ হেয়ার মে রানি এবং উইন্ডো ক্লিনার্স সোল। শ্রীলঙ্কার ইংরেজি ভাষাভাষিদের ছোট্ট দুনিয়ায় তিনি তা দিয়েই পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।
তবে তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানে কিন্তু ইংরেজিই প্রধান ভাষা ছিল না। তবে সাবলীলভাবেই সেটি করায়ত্ত করে নিয়েছেন।
শ্রীলঙ্কায় দ্বিতীয় মার্কস আন্দোলন ঘটেছিল ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে। তখন তিনি কিশোর। আর ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনা নিয়ই তার প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী দৃশ্যপটকে নিয়ে লিখলেও তিনি পর্যটন, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, জেভিপি আন্দোলনসহ অন্যান্য বিষয়ও সামনে নিয়ে এসেছেন।
শ্রীলঙ্কার রূপকথার ওপর এই লেখকের বেশ ভালো জ্ঞান রয়েছে। তিনি তার উপন্যাসে সেটিই বেশ ভালো মতোই ব্যবহার করেছেন। ফলে বাস্তবতা আর মিথ বেশ ভালোভাবেই মিশে গেছে তার লেখায়। পাঠকদের কাছেও তা উপভোগ্য হয়েছে। বিশ্বাস, অবিশ্বাস, অশুভ আত্মা, আস্তিক, নাস্তিক ইত্যাদি নানা দোলাচলে এগিয়েছে কাহিনী। রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামনে চলে এসেছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার কুখ্যাত ভ্যাট অপহরণ, সম্পাদকদের খুনের মতো ঘটনাও এতে ঠাঁই পেয়েছে। অতিপ্রাকৃত ঘটনা যখন নিরেট বাস্তবতার সাথে স্থান পায় এবং এই মেশানোর কাজে যদি দক্ষতার ছোঁয়া থাকে, তবে তা অনন্য হয়ে ওঠতে বাধ্য।
সিংহলি ভাষায় মহাগানিকান্দা দিয়ে কল্পকথার পর্বতকে বোঝানা হয়, যার অর্থ হলো বিপুলাকায় নারী। একেই সংক্ষেপে বলা হয় এমজিকে। তার গল্পে ওই নারীই উচ্ছেদের শিকার হয়ে ক্যাসিয়া প্যালেসে স্থান পান। এই পর্যায়ে অক্ষম বালকের ঈশ্বর হিসেবে উপাসনা, নাস্তিকের আগমন, শববাহক ইত্যাদি অনেক চরিত্র ভিড় করতে থাকে।
গল্পের প্রয়োজনেই তিন চাকার অটো চালক, ব্যবসায়ী ইত্যাদি নানা চরিত্র তাদের হাসি-কান্না নিয়ে সামনে হাজির হয়। তারা সবাই এমজিকের ভূমিতে অবৈধভাবে বাস করতে থাকে। এখানেও নানা চরিত্র নানা আবেদন নিয়ে সামনে আসে। নানা পেশায় থাকলেও তাদের ঠিকানা এই পর্বতকে ঘিরে থাকা এলাকা। ঈশ্বর-বালক বালিশে এমজিকেকে লুকিয়ে রাখে। এটি খুঁজে পেতে চলে নানা চেষ্টা। কত ধরনের চরিত্রই না এর সন্ধানে থাকে। একেক জনের অবস্থানও হয় একেক রকমের। একপর্যায়ে তো এমজিকের নিয়ন্ত্রণও চলে যায় অন্যদের হাতে। এমনকি এক বিদেশীর হাতেও পড়ে যায় সে।
তিনি তার চরিত্রগুলোর নামকরণও করেছেন অদ্ভূত ভাবে। এই যেমন প্লাস্টিক স্মাইল। এই নারীর হৃদপিণ্ডটি সত্যিকারের, কিন্তু তার হাসিটা কৃত্রিম। আবার যে ছেলেটাকে তার প্রতিবেশীরা ঈশ্বর মনে করে তার চাচির নাম তন্দুরি নন্দা। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। আবার নন্দার বৈরী সুজাতা মনিয়ো মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছেন। একটি পশ ক্লাবের স্টুয়ার্ডের নাম ভিক্টোরিয়া মালি। টয়োটা নন্দা হলো পার্কিং অ্যাটেনডেন্ট।
পাঠকদেরকে ক্যাসিয়া প্যালেসে ঈশ্বর বালকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। তার পরিচয় এতই ব্যাপক হয়ে পড়ে যে এমজিকের অধিবাসীরা তাকে পূজাও করতে থাকে।
শ্রীলঙ্কার অধিবাসী নন, এমন লোকদের জন্য এই গল্পে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো বুঝতে একটু কঠিনই হবে। তারপর আবার এগুলোই যখন ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে, তখন পাঠকদের কাছে তা আরো দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে। তারপরও মনে রাখতে হবে, এটি দ্বীপ রাষ্ট্রটির সেরা একটি উপন্যাস। যদি পরিভাষা আর শব্দের হেঁয়ালি আয়ত্বে আনা যায়, তবে বইটি খুবই উপভোগ্য মনে হবে। মনে রাখার মতো বই এটি। পাঠ করার পর পরিশ্রম স্বার্থকই মনে হবে। লেখকের মুন্সিয়ানায় বেশ পরিতৃপ্তিই পাওয়া যাবে।
‘প্লেয়িং পিলো পলিটিক্স’ উপন্যাসের জন্য লাল মেদাওয়াত্তাগেদেরা হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হচ্ছে

নারী পোশাক শ্রমিকদের যৌন হয়রানি: বাংলাদেশের পোশাক কোম্পানিগুলো কি দায়িত্বপালন করছে? by শাহনাজ পারভীন

অনেক শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না
পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে বিশ্বের নামকরা পোশাক কোম্পানিগুলোর অবস্থান কী? - এমন প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
একটি বিশেষ নিবন্ধে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক সংস্থাটি ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং বাংলাদেশসহ পোশাক খাতে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর শ্রমিকদের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
বিশ্বব্যাপী পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির মাত্রা গুরুতর বলে উল্লেখ করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এই প্রতিবেদনে রয়েছে কিভাবে ভারত বা পাকিস্তানে নারী শ্রমিকেরা যৌননিগ্রহের শিকার হয়েও ভয়ে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
কম্বোডিয়ার উদাহরণ দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, দেশটিতে শুধু কারখানাতেই নয়, কর্মকর্তারা কারখানার বাইরেও নারী শ্রমিকদের হয়রানি করে থাকেন।
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, কর্মকর্তারা নারী শ্রমিকদের পার্টিতে যেতে আমন্ত্রণ জানান, আর তারা না গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এসব দেশে নারী শ্রমিকেরা কোন ভয়ভীতি ছাড়া কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ নিয়ে যাবেন এমন পরিবেশ নেই বলে সংস্থাটি মনে করছে।
এরকম বেশ কিছু উদাহরণও তুলে ধরেছে সংস্থাটি তাদের নিবন্ধে।
বাংলাদেশের অবস্থা কী?
বাংলাদেশে পোশাক কারখানার ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নি-নিরাপত্তা এবং বেতন ভাতা - এসব নিয়ে বেশ আলাপ-আলোচনা হয়। কাজের পরিবেশ নিয়ে নানা ধরনের শর্তও মানতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৈরি পোশাকের উৎস দেশগুলোতে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির বিষয়টি 'কমপ্লায়ান্স'-এর অংশ হিসেবে কি আরও গুরুত্ব পেতে পারে?
অন্যদিকে, বিশ্বের নামীদামী পোশাক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের মতো দেশের উপর অনেক অনেক শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু নিজেরা তাদের দায়িত্বটুকু কতটা পালন করছেন?
ঢাকার আশেপাশের কয়েকটি কারখানার কয়েকজন পোশাক শ্রমিকের সাথে কথা বলেছিলাম বিষয়টি বুঝতে। তারা খোলামেলা কথা বলেছেন, তবে স্বভাবতই কেউ-ই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
কয়েকজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতা
তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের বক্তব্যে বেশ অনেকটাই মিল পাওয়া গেলো - অর্থাৎ অভিযোগগুলো মোটামুটি একই ধরণের।
ঢাকার উত্তরা এলাকার একটি কারখানায় কাজ করতেন এমন একজন শ্রমিক বলেছেন, "আমাকে ম্যানেজমেন্টের একজন কু-প্রস্তাব দিছিলো। তার সাথে হোটেলে রাত্রে যাইতে হবে। আমারে বলছে যদি না যাও, তাইলে তোমার চাকরী থাকবে না। আমি নালিশ করছিলাম। আমারেই তারা ফ্যাক্টরি থেকে বের কইরা দিছে।"
এই নারী শ্রমিকেরা যে অভিযোগগুলো করেছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিবন্ধে একই ধরনের বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্য কোন সংস্থা, যেমন কোন কর্পোরেট অফিসে নারীকর্মীদের সাথে এমন শব্দ ব্যবহার বা আচরণ করার সাহস কেউ করবেন কি-না।
পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মূলত দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে আসেন। কাজ চলে গেলে মারাত্মক বিপদে পড়তে হয় - এবং একই সাথে শ্রমকাঠামোতে এসব নারীদের অবস্থানগত কারণেই এমন আচরণ করা হয় বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন।
কী ধরনের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে?
কারখানার মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই যৌন হয়রানি করার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তবে নারী শ্রমিকেরা পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মৌখিক নোংরা কথাবার্তার অভিযোগ আসে হরহামেশাই।
কয়েকটি এনজিও'র তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম 'সজাগ কোয়ালিশন' গেল বছর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো।
চারটি এলাকার আটটি কারখানার শ্রমিকের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২২ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন যে তারা কখনো-না-কখনো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
কমবেশী ৮৩ শতাংশ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না।
যৌন হয়রানি হিসেবে কারখানায় প্রবেশের সময় নিরাপত্তা কর্মীদের অস্বস্তিকরভাবে দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা, সম্পর্ক তৈরি না করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন - এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
শ্রমিকদের ৬৮ শতাংশ জানান, কর্মক্ষেত্রে তেমন কার্যকর কোন যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই।
এই গবেষণাটির প্রধান ছিলেন মাহিন সুলতান। তিনি বলছেন, "আমরা বলতে চাচ্ছি, একটা ফ্যাক্টরিতে কমপ্লেন আসলে তা যদি সুষ্ঠুভাবে ডিল করা হয়, তা কিন্তু ফ্যাক্টরির জন্য একটা ক্রেডিট, যে সেখানে শ্রমিকরা সাহস করে কমপ্লেন করার পরিবেশ পাচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "প্রশাসনের তদন্তের ভিত্তিতে যদি একটা অ্যাকশন নেয়া হয়, তাহলে সবাই বুঝবে যে এই ফ্যাক্টরিতে যে কাঠামো থাকা উচিৎ, যেভাবে কাজ করা উচিৎ, সেটা কাজ করছে।"
শ্রমিকদের নেতৃবৃন্দ কী ভুমিকা রাখে?
বাংলাদেশে ৪০ লক্ষের বেশি পোশাক শ্রমিক রয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী।
তাই তাদের প্রতি আচরণ কতটা সম্মানজনকে হওয়া উচিত, বা একজন শ্রমিক কতটা নিরাপদ বোধ করবেন - এসব কিছুই কি কাজের পরিবেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত?
শ্রমিক নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এটি নিশ্চিত করা গেলে তাদের কাজের দক্ষতা আরও বাড়বে।
পোশাক খাতের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর একটি প্ল্যাটফর্ম, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কার্যকরী সভাপতি কাজী রুহুল আমিন জানান, "আমাদের কাছে বিভিন্ন সময় নারী শ্রমিক বোনেরা আসে। কারখানায় নানাভাবে এটা ঘটে। ম্যানেজমেন্ট থেকে যেমন ঘটে তেমনি পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও ঘটে।"
তিনটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা ব্যাপারটা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র - এদের কাছে সাধারণত রেফার করি।"
কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠনগুলো যে কতটা সরাসরি শ্রমিকদের সহায়তা করে সেটি বোঝা মুশকিল, কেননা তারা হয়রানির ঘটনাগুলোর সমন্বিত কোন হিসেব রাখে না।
মি. আমিন বলছেন, "বায়াররা এমন কোন ঘটনা পেলেই সেটাকে ইস্যু করে বারগেইনিং শুরু করে দেয়। তারা অনেক বেশি লাভ করে কিন্তু কাপড়ের জন্য সেই পরিমাণ মূল্য আমাদের দেয় না।"
মালিকদের পক্ষ অবশ্য নিজেদের লাভ ছাড়া শ্রমিকের ভালোমন্দ নিয়ে কতটা ভাবেন, এমন প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই উঠছে।
মালিকরা কি বলছেন?
এনিয়ে কথা বলেছিলাম পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সাথে। তিনি বলেন, বিজিএমইএর অবস্থান এই ব্যাপারে একদম জিরো টলারেন্স।
"শুধু গুটিকয়েক ফ্যাক্টরির জন্য আমাদের পুরো সেক্টরের বদনাম হবে এবং যার কারণে আমাদের বিজনেসে একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট হবে, এটা বিজিএমইএ'র চেয়ারে বসে আমরা একেবারেই দেখতে চাই না।"
তিনি আরও বলেন, "আমরাও মেম্বারশীপের ক্ষেত্রে খুব চুজি হয়ে গেছি। রানা প্লাজার পরে আমরা শুধু সেফটি ইস্যুই দেখি না, আমরা সোশাল ইস্যুও দেখি।"
তিনি বলেন, ফ্যাক্টরিগুলোতে বিদেশি ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো শ্রমিকদের বেছে নিয়ে যায় কথা বলার জন্য। সেখানে ম্যানেজমেন্টের কেউ থাকে না। তারা নির্ভয়ে সেখানে সব বলতে পারে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রমিকদের উচিত মুখ খোলা।
কিন্তু যে পোশাক শ্রমিক চাকুরী চলে যাওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে পারে না, তার জন্য ন্যায়বিচার কিভাবে নিশ্চিত হবে? কিংবা সেজন্য একটি সঠিক ব্যবস্থা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়?
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে একটা মেকানিজম আছে। তবে সেটাকে আরও হেলদি করতে হবে।"
"যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তিনি যদি সামনে এগিয়ে না আসেন, তাহলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। আর চাকরীর কথা বলছেন? দক্ষ শ্রমিকের চাকরীর কোন সমস্যা নাই," বলছেন মাহমুদ হাসান খান।

Thursday, May 6, 2021

পাকিস্তানে গোপন মানবাধিকার লঙ্ঘন by এম ইলিয়াস খান

নিউ ইয়র্কে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে সন্ত্রাসী হামলার পর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে পাকিস্তানে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। অনেক ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ অভিযানে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীরা যেসব হত্যা ও নির্যাতন করেছে তার প্রমাণ সবেমাত্র প্রকাশ পেয়েছে। এ বিষয়ে বিরল কিছু ডকুমেন্ট পেয়েছেন বিবিসির সাংবাদিক এম ইলিয়াস খান। এসব নিয়ে তিনি অনলাইন বিবিসিতে দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এর শিরোনাম ‘আনকাভারিং পাকিস্তানস সিক্রেট হিউম্যান রাইটস অ্যাবিউজেস’। অর্থাৎ পাকিস্তানে গোপনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উদঘাটন
এম ইলিয়াস খান লিখেছেন, সময়টা ২০১৪ সালের শুরুর দিকের।
সেনাবাহিনী ভুল প্রমাণ দিলেন আদনান রশিদ
ওই সময় টিভি নিউজ নেটওয়ার্কগুলো পাকিস্তানি তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় বিজয়ের খবর প্রচার করতে থাকে। বলা হয়, রাতে আকাশ পথে ঘেরাও দিয়ে এই গ্রুপটির সবচেয়ে সিনিয়র কমান্ডারদের একজনকে হত্যা করা হয়েছে। বলা হয়, আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের উপজাতি এলাকায় হামলায় আদনান রশিদ ও তার পরিবারের ৫ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। আদনান রশিদ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাবেক একজন টেকনিশিয়ান। তিনি সুপরিচিত ছিলেন। মালালা ইউসুফজাইকে তিনি একটি ব্যতিক্রমী চিঠি লিখেছিলেন। তাতে তিনি বলার চেষ্টা করেছিলেন, কেন মালালার ওপর হামলা হয়েছিল। এ ছাড়া পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাসক পারভেজ মোশাররফকে হত্যা চেষ্টার দায়ে তিনি জেলে ছিলেন। তবে সেখান থেকে পালিয়ে বেরিয়ে যান।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলগুলো রিপোর্ট করে যে, ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি হামজোনি এলাকায় আদনান রশিদের গোপন আস্তানা টার্গেট করা হয় দু’রাত আগে থেকে। ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তখন থেকেই ওয়াজিরিস্তান ও বিস্তৃত পাহাড়ি উপজাতি এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তারা ওই অঞ্চলকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। কারণ, মনে করা হয়েছিল তালেবান যোদ্ধা, আল কায়েদার যোদ্ধা ও অন্যান্য জঙ্গিরা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।
কিন্তু ওই এলাকায় বা অভিযানের সময় সেখানে সাংবাদিক বা বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি। তাই নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা যেসব দাবি করে বা করছে তা যাচাই করা চরম মাত্রায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এক বছর পরে সেনাবাহিনীর ওই দাবি ভুল প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ তারা ভুল নিশানায় টার্গেট করেছিল। কারণ, সেনাবাহিনীর এই ভুল নিশ্চিতভাবে ধরিয়ে দেন আদনান রশিদ। তিনি একটি ভিডিওতে প্রমাণ দেন যে, তিনি জীবিত আছেন। প্রকৃতপক্ষে শীর্ষ এই জঙ্গিকে হত্যার পরিবর্তে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে স্থানীয় এক ব্যক্তির পরিবারকে। সেনাদের ওই হামলায় তার বাড়িটি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যে ভুল করেছে, এ বিষয়টি তারা কখনো স্বীকার করেই নি। ঘটনাটি ঘটেছিল দেরা ইসমাইল খান এলাকায়। এ শহরটি ইন্দুস নদীর তীরে অবস্থিত। উপজাতি এলাকায় প্রবেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হয় এটাকে। ঘটনা তদন্তে বিবিসির সাংবাদিক ওই এলাকায় সফরে যান, যে ব্যক্তির বাড়িতে হামলা হয়েছিল তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে।
ওই সময় নাজিরুল্লাহর বয়স ছিল ২০ বছর। তিনি বলেন, হামলাটি হয়েছিল স্থানীয় রাত ১১টা বা এর আশপাশের সময়ে। তখন সম্প্রতি বিয়ে করেছেন তিনি। তারা একরুমের বাসায় বসবাস করতেন। পরিবারের বাকি সদস্যরা অন্য এক রুমে গাদাগাদি করে ঘুমান। তাদের গ্রামের নাম খাতেই কালে। নাজিরুল্লাহ বলেন, হামলায় পুরো বাড়িটি যেন বিস্ফোরিত হয়েছিল। আমরা ঘুমে ছিলাম। আমি ও আমার স্ত্রী কাঁপতে কাঁপতে ঘুম থেকে জেগে যাই। বাতাসে তখন কড়া গানপাউডারের গন্ধ। আমি ও আমার স্ত্রী দৌড়ে বাড়ির বাইরে এলাম। দেখলাম আমাদের রুমের পুরো ছাউনি বা ছাদ ধসে পড়েছে। বাকি শুধু আমরা যেখানে ঘুমিয়েছিলাম, তাই কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিল। দ্বিতীয় রুমটিও ধসে পড়েছে। চারদিকে শুধু আগুন জ্বলছে তখন। ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম। আগুনের ভিতর জ্বলছে এমন মানুষদের সাহায্য করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম আমি ও আমার স্ত্রী। আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছিলেন প্রতিবেশীরা। আমরা উদ্ধার করছিলাম আহত ও নিহতদের। ওই হামলায় মাত্র ৩ বছর বয়সী একটি মেয়ে শিশু সহ নাজিরুল্লাহর পরিবারের চার সদস্য নিহত হন।
নাজিরুল্লাহ বলেন তার ভাতিজি সুমাইয়ার তখন বয়স মাত্র এক বছর। তাকে রেখে তার মা নিহত হন। সুমাইয়ার কোমরে মারাত্মক ক্ষত হয়। পরিবারের বাকি চার সদস্যকে ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয়। তাদের সবার হাড় ভেঙে গেছে। বাকিরা আহত হয়েছে।
পাকিস্তানের এই অংশে বসবাসকারী বহু মানুষ বিদ্রোহী বা জঙ্গিদের কারণে বার বার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন।  কর্তৃপক্ষ ও নিরপেক্ষ গবেষণাকারী গ্রুপগুলো বলছে, ২০০২ সালে জঙ্গিদের সহিংসতার পর থেকে কমপক্ষে ৫০ লাখ মানুষ পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। তারা আশ্রয় নিয়েছে সরকার পরিচালিত শরণার্থী শিবিরে অথবা শান্তিপূর্ণ কোনো এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে পাকিস্তানে কি পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছেন তার কোনো সরকারি তথ্য নেই। তবে শিক্ষাবিদ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন অধিকারকর্মীরা মনে করেন বেসামরিক, জঙ্গি ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী মিলে কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
যেভাবে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটে পাকিস্তানে

পাকিস্তানে সিক্রেট বা গোপনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা, বিশেষত সেনাবাহিনী। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করে না। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে নিহত হয়েছেন বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ। এখন তারা এ দাবির পক্ষে ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ করছে। এমন অধিকারকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে নতুন একটি অধিকার বিষয়ক সংগঠন পশতুন তাহাফফুজ মুভমেন্টের (পিটিএম)। এ সংগঠনটি গত বছরই চালু হয়েছে। তারা উপজাতি এলাকাগুলোতে মানবাধিবার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রকাশ করে যাচ্ছে, যেখানে নির্যাতিত মানুষ আগে কথা বলতে ভয় পেতেন। অনলাইন বিবিসিতে দীর্ঘ এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন সাংবাদিক এম ইলিয়ান খান।
পিটিএমের শীর্ষ নেতা মানজুর পশতিন। তিনি বলেছেন, দুর্ভোগ ও অবমাননার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে আমাদের সময় লেগেছে প্রায় ১৫ বছর। এ সময়ে আমরা সচেতনতা সৃষ্টি করেছি, কিভাবে সরাসরি হামলা চালিয়ে এবং জঙ্গিদের সমর্থন দিয়ে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার নষ্ট করছে সেনাবাহিনী।
কিন্তু তার এ গ্রুপটি প্রচন্ড চাপে রয়েছে। তারা বলেছে, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন বিক্ষোভ করছিলেন, তখন তাদের ওপর ২৬ মে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় সেনাবাহিনী। এতে তাদের ১৩ জন অধিকারকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে সেনাবাহিনী বলেছে, চেকপয়েন্টে হামলা চালানোর পর তারা অভিযানে গেছে এবং এতে কমপক্ষে তিনজন অধিকারকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে পিটিএম। বর্তমানে এ গ্রুপের দু’জন এমপিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পিটিএম।
বিবিসি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছে এমন বেশকছিু ঘটনার উল্লেখ করেছে পিটিএম। এসব বিষয় পাকিস্তানি সেনা মুখপাত্রের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি। তিনি এসব অভিযোগকে উচ্চমাত্রায় বিচারিক বলে মত দেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরকারের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পায় নি বিবিসি।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে আল কায়েদার হামলার পর নতুন একটি সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে হামলা চালায়, তখন আল কায়েদার নেতা প্রয়াত ওসামা বিন লাদেনের ছত্রছায়ায় থাকা তালেবান বাহিনী আস্তে আস্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে তালেবানরা ক্ষমতা দখল করে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন যে তিনটি দেশ তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তার অন্যতম হলো পাকিস্তান। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের একটি স্বার্থ ছিল। তারা চাইছিল আফগানিস্তানে ভারত যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তা রোধ করতে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল পাকিস্তান। ফলে তখনকার সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এ থেকে যা দাঁড়িয়েছে তা হলো, তালেবানরা পাকিস্তানের আধা শায়ত্তশাসিত উপজাতি এলাকাগুলোতে আশ্রয় খুঁজে পায়। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে।
কিন্তু ঘটনা অন্য। আফগানিস্তানের তালেবানরা সীমান্ত অতিক্রম করার সময় শুধু নিজেরাই আসে নি। বিভিন্ন রকম গ্রুপের বিভিন্ন রকম জঙ্গি উপজাতি এলাকাগুলোতে প্রবেশ করে। এর মধ্যে এমন কিছু জঙ্গি ছিল, যারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের খুব বিরোধী নয়। ওয়াজিরিস্তান থেকে হামলা ষড়যন্ত্র শুরু করে বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষী জিহাদিরা। এ কারণে ওয়াশিংটন থেকে দাবি ওঠে। তারা ইসলামপন্থি জঙ্গিবাদ ভেঙেচুরে দেয়ার জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। পাকিস্তানের একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ‘মিলিটারি ইনকরপোরেশন: ইনসাইড পাকিস্তানস মিলিটারি ইকোনমি’ বইয়ের লেখক আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার ফলে পাকিস্তান একদিকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে অন্যদিকে ভবিষ্যত দরকষাকষিতে অংশীদারদের পাশে পাওয়ার চেষ্টা করে।
২০১৪ সালে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে নতুন করে অভিযান শুরু করে পাকিস্তান। এতে জঙ্গি গ্রুপ ও তাদের নিরাপদ আস্তানায় চাপ বৃদ্ধি পায়।