Showing posts with label বাংলাদেশ প্রতিদিন. Show all posts
Showing posts with label বাংলাদেশ প্রতিদিন. Show all posts

Thursday, October 31, 2019

যেভাবে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী

ভারতের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে ১৯৬৬-র জানুয়ারি থেকে ১৯৭৭-এর মার্চ পর্যন্ত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালের ১৪ জানুয়ারি আবার প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন।
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তারই দুই দেহরক্ষীর গুলিতে প্রাণ হারান।

কেমন ছিল সেই দিনটি, কীভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল- বিভিন্ন বই পড়ে তারই একটি বিবরণ তুলে ধরেছেন বিবিসির হিন্দি বিভাগের রেহান ফজল।
ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর শহরের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর বেশ কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে বেশিরভাগ স্মৃতিই আনন্দের নয়। এই শহরেই তার বাবা জওহরলাল নেহরু প্রথমবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তারপরেই ১৯৬৪ সালের মে মাসে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯৬৭ সালের নির্বাচনী প্রচারে এই শহরেই ইন্দিরা গান্ধীর দিকে একটা পাথর ছোঁড়া হয়েছিল, যাতে তার নাক ফেটে গিয়েছিল। সেই ভুবনেশ্বর শহরেই ১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর জীবনের শেষ ভাষণটা দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। প্রতিটা ভাষণের মতোই ওই ভাষণও লিখে দিয়েছিলেন মিসেস গান্ধীর মিডিয়া উপদেষ্টা এইচ ওয়াই শারদা প্রসাদ। কিন্তু ভাষণ দিতে দিতে হঠাৎই লেখা ভাষণ থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো বলতে শুরু করেন ইন্দিরা। তার বলার ধরনও পাল্টে গিয়েছিল সেদিন।

তিনি বলেছিলেন, আমি আজ এখানে রয়েছি। কাল নাও থাকতে পারি। এটা নিয়ে ভাবি না যে আমি থাকলাম কী না। অনেকদিন বেঁচেছি। আর আমার গর্ব আছে যে আমি পুরো জীবনটাই দেশের মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে পেরেছি বলে। আর শেষ নিশ্বাসটা নেওয়া পর্যন্ত আমি সেটাই করে যাব। আর যেদিন মরে যাব, আমার রক্তের প্রতিটা ফোঁটা ভারতকে আরও মজবুত করার কাজে লাগবে।

কখনও কখনও বোধহয় শব্দের মাধ্যমেই নিয়তি ভবিষ্যতের একটা ইশারা দিয়ে দেয়। ভাষণের শেষে যখন মিসেস গান্ধী রাজ্যপালের আবাস রাজভবনে ফিরেছেন, তখন রাজ্যপাল বিশ্বম্ভরনাথ পান্ডে তাকে বলেছিলেন, একটা রক্তাক্ত মৃত্যুর কথা বলে আপনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন।

আমি যা বলেছি, তা নিজের মনের কথা। এটা আমি বিশ্বাস করি, জবাব দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।

সেই রাতেই দিল্লি ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। খুব ক্লান্ত ছিলেন। সারা রাত প্রায় ঘুমাননি। পাশের ঘরে সোনিয়া গান্ধী ঘুমাচ্ছিলেন। ভোর প্রায় চারটে নাগাদ শরীরটা খারাপ লাগছিল সোনিয়ার। বাথরুমের দিকে যাচ্ছিলেন। সেখানে ওষুধও রাখা থাকত।

সোনিয়া গান্ধী নিজের বই 'রাজীব'-এ লিখেছেন, "উনিও আমার পেছন পেছন বাথরুমে চলে এসেছিলেন। ওষুধটা খুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, শরীর বেশী খারাপ লাগলে যেন একটা আওয়াজ দিই। উনি জেগেই আছেন।"

সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কালো পাড় দেওয়া একটা গেরুয়া রঙের শাড়ি পড়েছিলেন মিসেস গান্ধী সেদিন। দিনের প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ছিল পিটার উস্তিনভের সঙ্গে। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর ওপরে একটা তথ্যচিত্র বানাচ্ছিলেন সেই সময়ে। আগের দিন ওড়িশা সফরের সময়েও তিনি শুটিং করেছিলেন।

দুপুরে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেমস ক্যালিঘান আর মিজোরামের এক নেতার সঙ্গে। সন্ধায় ব্রিটেনের রাজকুমারী অ্যানের সম্মানে একটা ডিনার দেওয়ার কথা ছিল মিসেস গান্ধীর। তৈরি হয়েই ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসেছিলেন তিনি। দুটি পাউরুটি টোস্ট, কিছুটা সিরিয়াল, মুসাম্বির জুস আর ডিম ছিল সেদিনের ব্রেকফাস্টে। সকালের খাবারের পরে মেকআপ ম্যান তার মুখে সামান্য পাউডার আর ব্লাশার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তখনই হাজির হন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাক্তার কে পি মাথুর।

রোজ ওই সময়েই মিসেস গান্ধীকে পরীক্ষা করতে যেতেন তিনি। ভেতরে ডেকে নিয়েছিলেন ডাক্তার মাথুরকে। হাসতে হাসতে বলেছিলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান কী রকম অতিরিক্ত মেকআপ করেন, যখন ৮০ বছর বয়সেও তার মাথার বেশির ভাগ চুল কালোই রয়েছে।

ঘড়িতে যখন ন'টা বেজে দশ মিনিট, ইন্দিরা গান্ধী বাইরে বের হলেন। বেশ রোদ ঝলমলে দিনটা। তবুও রোদ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আড়াল করতে সেপাই নারায়ণ সিং একটা কালো ছাতা নিয়ে পাশে পাশে হাঁটছিলেন। কয়েক পা পেছনেই ছিলেন ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান আর তারও পেছনে ছিলেন ব্যক্তিগত পরিচারক নাথু রাম। সকলের পেছনে আসছিলেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার, সাব ইন্সপেক্টর রামেশ্বর দয়াল।

ঠিক সেই সময়েই সামনে দিয়ে এক কর্মচারী হাতে একটা চায়ের সেট নিয়ে পেরিয়ে গিয়েছিলেন। ওই চায়ের সেটে তথ্যচিত্র নির্মাতা পিটার উস্তিনভকে চা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মচারীকে ডেকে ইন্দিরা বলেছিলেন মি. উস্তিনভের জন্য যেন অন্য আরেকটা চায়ের সেট বার করা হয়। বাসভবনের লাগোয়া দপ্তর ছিল আকবর রোডে। দুটি ভবনের মধ্যে যাতায়াতের একটা রাস্তা ছিল। সেই গেটের সামনে পৌঁছে ইন্দিরা গান্ধী তার সচিব আর কে ধাওয়ানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মি. ধাওয়ান তাকে বলছিলেন যে, ইন্দিরার নির্দেশমতো ইয়েমেন সফররত রাষ্ট্রপতি গিয়ানী জৈল সিংকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই দিল্লি চলে আসেন। পালাম বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করে সময়মতো যাতে রাজকুমারী অ্যানের নৈশভোজ সভায় পৌঁছাতে পারেন ইন্দিরা, সেই জন্যই ওই নির্দেশ।

হঠাৎই পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তাকর্মী বিয়ন্ত সিং রিভলবার বের করে ইন্দিরা গান্ধীর দিকে গুলি চালায়। প্রথম গুলিটা পেটে লেগেছিল। ইন্দিরা গান্ধী ডান হাতটা ওপরে তুলেছিলেন গুলি থেকে বাঁচতে। তখন একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে বিয়ন্ত সিং আরও দুবার গুলি চালায়। সে-দুটো গুলি তার বুকে আর কোমরে লাগে। ওই জায়গার ঠিক পাঁচ ফুট দূরে নিজের টমসন অটোমেটিক কার্বাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সতবন্ত সিং।

ইন্দিরা গান্ধীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে সতবন্ত বোধহয় কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিল। স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তখনই বিয়ন্ত চিৎকার করে সতবন্তকে বলে 'গুলি চালাও।' সতবন্ত সঙ্গে সঙ্গে নিজের কার্বাইন থেকে চেম্বারে থাকা ২৫টা গুলিই ইন্দিরা গান্ধীর শরীরে গেঁথে দিয়েছিল।

বিয়ন্ত সিং প্রথম গুলিটা চালানোর পরে প্রায় ২৫ সেকেন্ড কেটে গিয়েছিল ততক্ষণে। নিরাপত্তা কর্মীরা ওই সময়টায় কোনও প্রতিক্রিয়া দেখান নি, এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। তারপরে সতবন্ত সিং গুলি চালাতে শুরু করতেই একদম পিছনে থাকা নিরাপত্তা অফিসার রামেশ্বর দয়াল দৌড়ে এগিয়ে আসেন।

সতবন্ত তখন একনাগাড়ে গুলি চালিয়ে যাচ্ছেন। মি. দয়ালের উরু আর পায়েও গুলি লাগে। সেখানেই পড়ে যান তিনি। ইন্দিরা গান্ধীর আশপাশে থাকা অন্য কর্মচারীরা ততক্ষণে একে অন্যকে চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছেন।

ওদিকে এক নম্বর আকবর রোডের ভবন থেকে পুলিশ অফিসার দিনেশ কুমার ভাট এগিয়ে আসছিলেন শোরগোল শুনে। বিয়ন্ত সিং আর সতবন্ত সিং তখনই নিজেদের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়েছে। বিয়ন্ত বলেছিল, আমাদের যা করার ছিল, সেটা করেছি। এবার তোমাদের যা করার করো।

ইন্দিরার আরেক কর্মচারী নারায়ণ সিং সামনে লাফিয়ে পড়ে বিয়ন্ত সিংকে মাটিতে ফেলে দেন। পাশের গার্ডরুম থেকে বেরিয়ে আসা ভারত- তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আই টি বি পির কয়েকজন সদস্য দৌড়ে এগিয়ে এসে সতবন্ত সিংকেও ঘিরে ফেলে।

সবসময়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স রাখা থাকত ওখানে। ঘটনাচক্রে সেদিনই অ্যাম্বুলেন্সের চালক কাজে আসেন নি।ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাখনলাল ফোতেদার চিৎকার করে গাড়ি বার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। মাটিতে পড়ে থাকা ইন্দিরাকে ধরাধরি করে সাদা অ্যাম্বাসেডর গাড়ির পিছনের আসনে রাখেন আর কে ধাওয়ান আর নিরাপত্তা কর্মী দিনেশ ভাট। সামনের আসনে, ড্রাইভারের পাশে চেপে বসে পড়েন মি. ধাওয়ান আর মি. ফোতেদার।

গাড়ি যেই চলতে শুরু করেছে, সোনিয়া গান্ধী খালি পায়ে, ড্রেসিং গাউন পরে 'মাম্মি, মাম্মি' বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসেন। ইন্দিরা গান্ধীকে ওই অবস্থায় দেখে সোনিয়া গান্ধীও গাড়ির পিছনের আসনে চেপে পড়েন। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ইন্দিরা গান্ধীর শরীর। সোনিয়া তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেন। খুব জোরে গাড়িটা 'এইমস' বা অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট ফর মেডিক্যাল সায়েন্সের দিকে এগোতে থাকে। চার কিলোমিটার রাস্তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই পেরিয়ে যায়।

সোনিয়া গান্ধীর ড্রেসিং গাউনটা ততক্ষণে ইন্দিরা গান্ধীর রক্তে পুরো ভিজে গেছে।

ওই গাড়িটা 'এইমস'এ ঢুকেছিল ন'টা ৩২ মিনিটে। ইন্দিরা গান্ধীর রক্তের গ্রুপ ছিল ও নেগেটিভ। ওই গ্রুপের যথেষ্ট রক্ত মজুত ছিল হাসপাতালে। কিন্তু সফদরজং রোডের বাসভবন থেকে কেউ ফোন করে হাসপাতালে খবরও দেয় নি যে ইন্দিরা গান্ধীকে গুরুতর আহত অবস্থায় এইমস-এ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জরুরী বিভাগের দরজা খুলে গাড়ি থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে নামাতে মিনিট তিনেক সময় লেগেছিল। কিন্তু সেখানে তখন কোনও স্ট্রেচার নেই। কোনওরকমে একটা স্ট্রেচার যোগাড় করা গিয়েছিল।

গাড়ি থেকে তাকে নামানোর সময়ে ওই অবস্থা দেখে সেখানে উপস্থিত ডাক্তাররা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তার ব্যক্তিগত সচিব আর কে ধাওয়ান। ফোন করে সিনিয়র কার্ডিয়োলজিস্টদের খবর দেওয়া হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার গুলেরিয়া, ডাক্তার এম এম কাপুর আর ডাক্তার এস বালারাম ওখানে পৌঁছে যান।

ইসিজি করা হয়েছিল, কিন্তু তার নাড়ীর স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছিল না। চোখ স্থির হয়ে গিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল যে মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছে। একজন চিকিৎসক মুখের ভেতর দিয়ে একটা নল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যাতে ফুসফুস পর্যন্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে। মস্তিষ্কটা চালু রাখা সবথেকে প্রয়োজন ছিল তখন। ৮০ বোতল রক্ত দেওয়া হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীকে। শরীরে যে পরিমাণ রক্ত থাকে, এটা ছিল তার প্রায় ৫ গুণ।

ডাক্তার গুলেরিয়া বলছেন, "আমি তো দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম যে উনি আর নেই। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইসিজি করতে হয়েছিল। তারপরে আমি ওখানে হাজির স্বাস্থ্যমন্ত্রী শঙ্করানন্দকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখন কী করণীয়? ঘোষণা করে দেব আমরা যে উনি মৃত? তিনি না বলেছিলেন। তখন আমরা মিসেস গান্ধীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাই।"

চিকিৎসকরা 'হার্ট এন্ড লাং মেশিন' লাগিয়েছিলেন ইন্দিরার শরীরে। ধীরে ধীরে তার শরীরে রক্তের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি থেকে কমে ৩১ ডিগ্রি হয়ে গেল। তিনি যে আর নেই, সেটা সকলেই বুঝতে পারছিল, কিন্তু তবুও 'এইমস'এর আটতলার অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। চিকিৎসকেরা দেখেছিলেন যে যকৃতের ডানদিকের অংশটা গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বৃহদান্ত্রের বাইরের অংশটা ফুটো হয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে ক্ষুদ্রান্ত্রেরও। ফুসফুসের একদিকে গুলি লেগেছিল আর পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল গুলির আঘাতে। তবে হৃৎপিণ্ডতে কোনও ক্ষতি হয় নি।

দেহরক্ষীদের গুলিতে ছিন্নভিন্ন হওয়ার প্রায় চার ঘণ্টা পর, দুপুর দুটো ২৩ মিনিটে ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি প্রচারমাধ্যমে সেই ঘোষণা করা হয়েছিল সন্ধ্যা ছ'টার সময়ে।

ইন্দিরা গান্ধীর জীবনীকার ইন্দর মালহোত্রা বলছেন, গোয়েন্দা এজেন্সিগুলো আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে মিসেস গান্ধীর ওপরে এরকম একটা হামলা হতে পারে। তারা সুপারিশ পাঠিয়েছিল যে প্রধানমন্ত্রীর আবাস থেকে সব শিখ নিরাপত্তা-কর্মীদের যেন সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেই ফাইল যখন ইন্দিরা গান্ধীর টেবিলে পৌঁছায়, তখন ভীষণ রেগে গিয়ে তিনি নোট লিখেছিলেন, "আরন্ট উই সেকুলার?" অর্থাৎ, "আমরা না ধর্মনিরপেক্ষ দেশ?"

এরপরে ঠিক করা হয়েছিল যে একসঙ্গে দু'জন শিখ নিরাপত্তা-কর্মীকে প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি ডিউটি দেওয়া হবে না। ৩১ অক্টোবর সতবন্ত সিং বলেছিল যে তার পেট খারাপ। তাই তাকে শৌচালয়ের কাছাকাছি যেন ডিউটি দেওয়া হয়।

এইভাবেই বিয়ন্ত আর সতবন্ত সিংকে একই জায়গায় ডিউটি দেওয়া হয়েছিল। যার পরিণতিতে স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশন - 'অপারেশন ব্লুস্টার'এর বদলা নিয়েছিল তারা প্রধানমন্ত্রীকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে।

Monday, September 16, 2019

পাকিস্তানেই রশীদ ডালিম ও মোসলেহউদ্দিন: মেহনাজ রশীদও যান ঢাকা থেকে

শেখ ফজলে নূর তাপসের ওপর বোমা হামলা মামলায় গ্রেফতারের সাত মাস পর জামিনে ছাড়া পান মেহনাজ রশীদ। মেহনাজ রশীদ হলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার ফাঁসির পলাতক আসামি খন্দকার আবদুর রশীদের মেয়ে। জামিন পেয়েই মেহনাজ রশীদ গা ঢাকা দেন। গোপনে তিনি দেশত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি পাকিস্তান রয়েছেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে খবর আছে। পাকিস্তানে বসেই তিনি ফ্রীডম পার্টির জন্য কাজ করছেন। অর্থনৈতিকসহ নানা সহযোগিতা করে যাচ্ছেন ফ্রীডম পার্টির জন্য। তার বাবা খুনি রশীদও রয়েছেন পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্য দুই পলাতক আসামি ডালিম আর মোসলেহউদ্দিনও সেখানেই আছেন বলে খবর রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। কিন্তু পাকিস্তানের কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য শেখ তাপসের ওপর বোমা হামলা মামলায় মেহনাজ রশীদকে ২০০৯ সালের ২৪ অক্টোবর গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালের ১০ মে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান বলে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর আগে ২ মে তাপসের মামলায় ছয় মাস বা পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত হাই কোর্ট মেহনাজকে জামিন দেয়। কাশিমপুরের কারা সূত্র জানান, হাই কোর্ট জামিন দিলেও এরপর ওই আদেশ ১৭ মে পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। ৬ মে এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র কারাগারে আসে। কিন্তু মেহনাজের পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে ওই আদেশের বিপরীতে আপিল করার আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হয়। ১৮ মে তার জামিন স্থগিতের আর কোনো আদেশ না থাকায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, বলেন কারা কর্মকর্তারা। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আপিল শুনানি শুরু হওয়ার পর ২০০৯ সালের ২১ অক্টোবর রাতে মতিঝিলে ঢাকা-১২ আসনের এমপি তাপসের গাড়িতে বোমা হামলা হয়। তিনি বেঁচে গেলেও আহত হন ১৩ জন। পরদিন তাপস মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। তাতে তিনি অভিযোগ করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের স্বজন ও তাদের সহযোগীরা ওই হামলা চালিয়েছে। এরপর মেহনাজকে তার গুলশানের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ফাঁসির পলাতক আসামি খন্দকার আবদুর রশীদ পাকিস্তানেই রয়েছেন বলে জানা গেছে। লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর রশীদের সাম্রাজ্যও তছনছ হয়ে যায়। তখন তিনি নিরাপদ মনে করে পাকিস্তানেই অবস্থান নেন। বাবা-মেয়ে বর্তমানে পাকিস্তানেই রয়েছেন বলে খবর আছে গোয়েন্দাদের কাছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বহুল আলোচিত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্যাডার বাহিনী নিয়ে অনেকটা কেন্দ্র দখল করেই এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন খন্দকার আবদুর রশীদ। ওই বিতর্কিত নির্বাচনের সময় বিভিন্ন পথসভায় হাসতে হাসতেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে খুনের কথা স্বীকার করতেন। ভোটের দিন উপজেলার ৫১টি কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে তার ফ্রীডম পার্টি। ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নামে মাত্র থাকলেও রশীদের ‘তারা’ মার্কায় প্রকাশ্যেই সিল মারে তার ক্যাডাররা। তখন প্রশাসন ছিল নীরব দর্শকমাত্র। ফলাফলে ৬০ হাজার ৯৩৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন রশীদ। নির্বাচনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য, বর্তমানে এলডিপি মহাসচিব অ্যাডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ পান মাত্র ৩ হাজার ৩৪১ ভোট। অন্যদিকে আবদুল কাদের জিলানী ৪৮৩ ও সহিদ উল্লাহ সরকার ৪৯৪ ভোট পান।
তবে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে অবস্থা বেগতিক দেখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান রশীদ। তবে মেয়ে মেহনাজের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। রশীদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ছয়গড়িয়ায়। বর্তমানে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে ওই পরিবারের গোপনে কিছু যোগাযোগ থাকলেও এলাকার কেউই এ নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। গ্রামবাসীরা জানান, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের সময় কর্নেল রশীদ জমির বিনিময়ে এবং লিবিয়া পাঠানোর নামে লোকজনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা লোপাট করে নির্বাচনের দিন রাতেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। বিতর্কিত ওই নির্বাচন বাতিল হওয়ার পর ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আলী আশরাফ বিজয়ী হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের সময় রশীদের মেয়ে মেহনাজ এলাকায় এলে স্থানীয় প্রতারিত লোকজনের তোপের মুখে পড়েন। সে সময় মোবাইল ফোনে মেহনাজ অজ্ঞাত স্থানে অবস্থানরত কর্নেল রশীদের সঙ্গে প্রতারিত লোকদের আলাপ করিয়ে দিয়ে নির্বাচনের পর টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। বাবার নির্দেশে সেই নির্বাচনে হাতি মার্কা নিয়ে মেহনাজ দাঁড়ালে ১৩৫ ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর একই গ্রামের রুকু মিয়া ভূঁইয়া নামে এক ব্যক্তির ১৬ লাখ টাকা ফেরত না দেওয়ায় ২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল মেহনাজ গ্রামের বাড়িতে এসে লাঞ্ছিত হন। এরপর তাকে আর সেখানে দেখা যায়নি।
পাকিস্তানে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে অবস্থান করছেন ডালিম আর মোসলেহউদ্দিনও। ডালিমের ব্যবসা কেনিয়ার নাইরোবিতে রয়েছে। ডালিম কেনিয়া আর পাকিস্তানে যাতায়াত করছেন। ডালিমের সঙ্গে পাকিস্তানি আইএসআইর রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তবে মোসলেহউদ্দিনের বিষয়ে আরেকটি সূত্র বলেছে, তিনি রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের প্রত্যেকেই পাকিস্তানি পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। পাকিস্তানি পাসপোর্ট ব্যবহার করেই তারা বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন। পাকিস্তানকে নিরাপদ দেশ মনে করেই তারা সেখানে অবস্থান করছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই পাকিস্তান থেকে ফারুক-রশীদ ৫০০ কোটি টাকার একটি বিরাট বাজেট পেয়েছিলেন বলেও জানা গেছে। আর এই বিরাট অঙ্কের টাকা নিয়েও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল একটি পর্যায়ে।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন : মির্জা মেহেদী তমাল, সাখাওয়াত কাওসার, গোলাম রাব্বানী ও মাহবুব মমতাজী।)

Sunday, September 8, 2019

রোহিঙ্গা এখন গলার কাঁটা: বাড়ছে অপরাধ, বহির্বিশ্বের নানামুখী রাজনীতি by জুলকার নাইন ও আইয়ুবুল ইসলাম

ক্যাম্পে নতুন নতুন ঘর বানাচ্ছেন রোহিঙ্গারা
প্রায় দুই বছরে গলার কাঁটা হয়ে গেল মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। একদিকে রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ কর্মকা- সীমা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে সর্বনাশা মাদকের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে ক্যাম্পগুলো। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে থাকা একেকটি ক্যাম্প হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে সমূলে বিনষ্ট হয়েছে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাহারঘেরা নয়নাভিরাম পরিবেশ-বৈচিত্র্য। এখন নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্প্রীতি। স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সহিংস আচরণই যেন সেখানে ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের প্রতি সবার আগে হাত বাড়ানো স্থানীয়রাই এখন কোণঠাসা। গত কয়েক দিন কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বছর আগে মানবতার জন্য নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেই সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। সেই দিন থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কোষাগার থেকে রোহিঙ্গাদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আসা রোহিঙ্গাদের আরও ভালো থাকার সুযোগ সৃষ্টির জন্য শত শত বিদেশি সংস্থাকেও কাজ করার অবারিত স্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘রোহিঙ্গা কূটনীতি’ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল শুরু করেছে নানা ধরনের খেলা। অস্থায়ী ক্যাম্প চিরস্থায়ী করার এই খেলা রোহিঙ্গাদের দিন দিন বাংলাদেশের গলার কাঁটায় পরিণত করছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায় সব ‘এক্সিট রুট’- বলছেন কূটনীতিকরা।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা আছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে তারা এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। তাদের ফেরত পাঠাতে ২২ আগস্ট সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু তারা যেতে না চাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত বছর ১৫ নভেম্বরও আরেক দফা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভ-সমাবেশের কারণে সে দফায়ও প্রত্যাবাসন ভ-ুল হয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায়ও শুধু নিজ মুখে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে দেশে ফেরা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং সে জন্য কোনো ধরনের চাপ অনুভব না করা রোহিঙ্গারা যারপরনাই খুশি। কক্সবাজারে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা অধ্যাপক আতাউর রহমান চৌধুরী মনে করেন, প্রত্যাবাসনের বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েও পরপর দুবারের ব্যর্থতা রোহিঙ্গাদের সহিংস স্বেচ্ছাচারী আচরণে প্রভাব রেখেছে। এ কারণেই বাজার থেকে তুলে নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যার মতো রোমহর্ষক ঘটনা তারা ঘটিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শুধু তা-ই নয়, একসময় রোহিঙ্গাদের খাবার আর আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হওয়া কক্সবাজারের মানুষ এখন উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব ছড়াচ্ছে দাবানলের মতো। প্রত্যাবাসন স্থগিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ভিড়ে এলাকার শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। হাট-বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। মানুষ এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকে ভুল পরিচয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

গবেষণায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের নেতিবাচক প্রভাব : বিভিন্ন স্বীকৃত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকটের বিভিন্ন রকম বিরূপ প্রভাবের তথ্য উঠে এসেছে। ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া টেকনাফের শতভাগ এবং উখিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় ৫ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু চলতি বছর এপ্রিলের জরিপে তা বেড়ে ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াকে বড় ভুল বলছেন। ইউএনডিপি এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) গবেষণায় দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের জন্য টেকনাফ ও উখিয়ার দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের সময়ের ৫০ শতাংশই ব্যয় করেন রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ফলে স্থানীয়রা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন।

বনভূমি ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্য উজাড় : কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উখিয়া ও টেকনাফের সবুজ পাহাড়ে রোহিঙ্গারা ঝুপড়িঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে। তাদের এই ঘর তৈরিতে কেটে ফেলা হয়েছে পাহাড়ি ছোট-বড় অসংখ্য গাছপালা। একসময়ের সবুজ পাহাড় পরিণত হয় বৃক্ষশূন্যে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য। পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ান হাতির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্রও। এ ছাড়া প্রতি মাসে রোহিঙ্গাদের রান্নাবান্নার কাজে ছয় হাজার ৮০০ টন জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা এই জ¦ালানি কাঠগুলো পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে।

গত মাসের ৩ জুলাই কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক দফতরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গার ঢল নামে। ওই সময় আসা এবং পুরনো ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, বালুখালী ঢালা, ময়নারঘোনা, থাইংখালী তাজনিমার খোলা, হাকিমপাড়া, জামতলি বাঘঘোনা, শফিউল্লাহ কাটা এবং টেকনাফের চাকমারকুল, উনচিপ্রাং, লেদা, মৌচনী, জাদিমুরা ও কেরানতলী এলাকাসহ বন বিভাগের গেজেটভুক্ত প্রায় ৬ হাজার ১৬০ একর বনভূমিতে বসতি স্থাপন করে। বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের এভাবে বসতি স্থাপনের কারণে টাকার হিসাবে সৃজিত এবং প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি হয়েছে ৪৫৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। একইভাবে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে বনজ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসাবে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। দৃশ্যমান কুপ্রভাব রাস্তাঘাটে : শুধু বনভূমি বা জীববৈচিত্র্যে নয়, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা বসতি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কেও। ৭৯ কিলোমিটারের এই সড়কে স্থানীয়দের বহন করা গাড়ি চলছে। পাশাপাশি চলছে টেকনাফ স্থলবন্দরের পণ্যবাহী নিয়মিত পরিবহন। একই সঙ্গে এ সড়কে যাতায়াত করছে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও মালামাল বহনকারী শত শত ভারী যানবাহন। ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার অন্তত আড়াইশ গাড়িও এ সড়কে চলাচল করে। তাই সড়কে যানজট যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে সড়ক ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে যান চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
>>ছবিঃ -রোহেত রাজীব

Sunday, August 25, 2019

দোকানে চা বানালেন মমতা by দীপক দেবনাথ

রাস্তার ধারে থাকা চা’য়ের দোকানে ঢুকে নিজের হাতেই চা বানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শিশুদের চকলেট ও নারীদের শাড়ি উপহার দিলেন। গত ২১ আগস্ট বুধবার বিকালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দীঘায় এভাবেই জনসংযোগ সারলেন মমতা।

দীঘায় প্রশাসনিক বৈঠক শেষে এদিন নিউ-দীঘার দত্তপুর পল্লীতে একটি চায়ের দোকানে ঢুকে যান মমতা। দোকানদারকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই চা বানান মমতা। এরপর কাগজের কাপে করে নিজে খান এবং তার সাথে থাকা পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, পরিবহন ও সেচ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, দলের সাংসদ শিশির অধিকারী সহ সরকারি কর্মকর্তা সহ অন্যদের মধ্যে পরিবেশন করেন।
মুখ্যমন্ত্রীকে দেখতে দোকানে তখন উৎসাহী মানুষের ভিড়। মোবাইল হাতে কাউকে দেখা গেল তার চা বানানোর ছবি তুলতে, কেউ আবার সেলফিতে মগ্ন হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, আবার পাঁচ মাসের একটি শিশুকে কোলে তুলে আদরও করেন তিনি। আর মুখ্যমন্ত্রীকে হাতের কাছে পেয়ে সাধারণ মানুষ তাদের অভাব-অভিযোগও তুলে ধরেন। একসময় দত্তপুর পল্লীর বাসিন্দাদের মধ্যে নারীদের শাড়ি বিতরণ করেন এবং শিশুদের হাতে চকলেট বিতরণ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী জানান ‘আমি সাধারণ পরিবারের মানুষ, আমরা সবকিছুই করতে পারি। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। ছোটবেলা থেকে আমি অনেক কাজ করে এসেছি। আমি যে কোন সময় কাজ করতে খুব ভালবাসি। আর রান্না করাটা আমার একটা নেশা, আমার খুব শখ। আমি হয়তো এখন রান্না করার সময় পাই না। কিন্তু আমি যখন, যেখানে যখন সুযোগ পাই রান্না করি। আমার ভীষণ ভাল লাগে। আমি সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে ভালবাসি। তারা কেমন আছেন-তা জানার জন্য এই সমস্ত চায়ের দোকানে আমি আগেও বসেছি, এখনও বসি।’

তাঁর অভিমত, ‘আমরা যাই করি না কেন, দিনের শেষে আমরা সাধারণ মানুষ। এটাই আমাদের বড় পরিচয়।’

উল্লেখ্য তিন দিনের সফরে সোমবার বিকালে দীঘায় পৌঁছন মমতা।

Wednesday, August 7, 2019

এডিস মশা সম্পর্কে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য by ফারজানা ইসলাম

স্ত্রী এডিস বা ডেঙ্গু মশার adaptation ক্ষমতা অসাধারণ। এরা যদিও দিনে কামড়ায় তবে ক্ষুধার্ত বা unfed অবস্থায় থাকলে রাতেও কামড়াতে পারে। স্ত্রী মশা সাধারণত anthropophilic (মানুষের রক্ত খেতে যারা পছন্দ করে) বা zoophilic (মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর রক্ত খেতে পছন্দ করে) এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকলে এরা এই behaviour change করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ মানুষ বা প্রাণী উভয়ের কাছ থেকেই রক্ত সংগ্রহ করতে পারে, যাকে বলে opportunistic feeder.
আমার আশংকা, আসন্ন কোরবানি ঈদ উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু শহরে নিয়ে আসা হবে। আর এরাই তখন Aedes মশার রক্ত সংগ্রহের উৎসে পরিণত হবে। Aedes তার জীবদ্দশায় গড়ে ৩০০-৪০০ টি ডিম পাড়ে। তাই এদের population boom হতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবেনা।
আমার অনুরোধ থাকবে আপনার কোরবানির পশুটিকে কোনমতেই যেনো মশা কামড়াতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। মশার কয়েল বা প্রয়োজনে মশারী টাঙানোর ব্যাবস্থা করুন। কোরবানির পর কোথাও যেনো রক্ত জমে না থাকে। যদি রক্ত অপসারণ না করা যায় সেক্ষেত্রে সেই রক্তের উপর এক/দুই মুঠো লবণ ছিটিয়ে দিন।

>>>লেখক: সহকারী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং (সাবেক) জাতীয় পরামর্শদাতা (কীটতত্ত্ববিদ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বস্তির ঘরে ঘরে ডেঙ্গুজ্বর by শামীম আহমেদ

ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর বস্তিগুলোতেও। মহাখালীর ঘনবসতিপূর্ণ সাততলা বস্তির ঘরে ঘরে এখন জ্বরে আক্রান্ত রোগী। কেউ স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাচ্ছেন, কেউ আবার চিকিৎসক দেখিয়ে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন। তবে দারিদ্র্য ও অসচেতনতার কারণে জ্বরে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী হাসপাতালমুখী না হওয়ায় কতজন ডেঙ্গু আক্রান্ত সেই হিসাব উঠে আসছে না কোনো পরিসংখ্যানে। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এখানে ডেঙ্গু মহামারী আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা বাসিন্দাদের। তাদের অভিযোগ, সারা দেশে ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও বস্তিতে মশার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেছে কবরস্থান সড়কে জমে থাকা পানিতে গিজ গিজ করা মশার লার্ভা দেখে। গতকাল সরেজমিন বস্তি ঘুরে ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বস্তিতে সাড়ে ৮ হাজার ঘরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বাস। এক-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবারে কেউ না কেউ জ্বরে আক্রান্ত। তবে সবার ডেঙ্গু কিনা  তা নিশ্চিত নয়। টাকার অভাবে অধিকাংশই পরীক্ষা করান না। বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, এখানে মশার ওষুধও দেওয়া হয় না। এক সপ্তাহ আগে একজন এসে দুই-তিনটা সড়কে ধোঁয়া দিয়ে চলে গেছে। অন্য জায়গায় দেওয়ার কথা বললে জানায়, ওষুধ শেষ। এরপর আর কেউ আসেনি। এ সময় তারা বিভিন্ন নালায় কিলবিল করা মশার লার্ভা দেখান। জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করায় ডেঙ্গুবাহী এডিস মশাকে অনেকে ‘ধনীপাড়ার মশা’ বললেও ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে এ মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে ধারণা বস্তিবাসীর। সেখানে সবার মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভ দেখা গেছে। এমনকি এসব সংবাদ লিখে কোনো লাভ হবে না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. নাসির বলেন, এখানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনেক বড় একটা পুকুরে হাজার হাজার টন কচুরিপানা জমে আছে। এটা মশার বড় প্রজননস্থল। পরিষ্কার করার জন্য অনেকবার চিঠি দিয়েছি। করে না।

পাকিস্তানকে ব্যঙ্গ করে নগ্ন হলেন পুনম পান্ডে, ভাইরাল

 নগ্নতা, যৌনতা, এই শব্দগুলো মডেল পুনম পান্ডের ক্ষেত্রে বহু পুরোনো। প্রায়ই অশালীন ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এবার পাকিস্তানকে অপমান করতে নিজের অন্তর্বাস খোলার ভিডিও প্রকাশ করেছেন বলিউড অভিনেত্রী পুনম পান্ডে।
পাকিস্তানের নির্মিত একটি বিজ্ঞাপনকে ব্যঙ্গ করে নিজের অন্তর্বাস খোলার দৃশ্য ধারণ করেন পুনম। যা ইনস্টাগ্রামের নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করার পর দ্রুত ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞাপনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর সমালোচনার মধ্যে পড়েছেন পুনমও।

Thursday, June 13, 2019

চাঞ্চল্যকর তথ্য, সমুদ্রে ফ্রান্সের তুলনায় প্লাস্টিকের আয়তন তিনগুণ!

বর্তমানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অধিকাংশই প্লাস্টিকের তৈরি। প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ছাড়া এখন জীবন কল্পনাই করা যায় না।
প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, একুশ শতকের সভ্য সমাজের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি!  হাজার চেষ্টা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই মারণ জিনিসের ব্যবহার। মানবজাতির মধ্যে সচেতনতা বাড়ার বদলে বরং দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। আর সেটা এতটাই মাত্রা ছাড়া যে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’।
গবেষণা বলছে, প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক জমা হয় বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রে। নদীর জলের সঙ্গে ভেসে আসে এই সমস্ত প্লাস্টিক। আর সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক জমা হয়েছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মাঝের বিস্তৃত অংশে। এই প্লাস্টিকের স্তূপের নামই বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’। যা আয়তনে টেক্সাসের দ্বিগুণ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকার তিনটি বৃহত্তম শহরের মধ্যে অন্যতম হলো টেক্সাস। তবে এখানেই শেষ নয়। ফ্রান্সের তুলনায় এই গারবেজ প্যাচ আয়তন তিনগুণ বড়। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আঁতকে উঠছেন বিশ্ববাসী।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর নদী থেকে সাগরে এসে জমা হয় ১.১৫ থেকে ২.৪১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ প্লাস্টিকের ঘনত্ব জলের তুলনায় বেশি। ফলে সমুদ্রের বুকে জমা হলেও তা ডোবে না। গবেষকরা জানাচ্ছেন, যেহেতু এ জাতীয় প্লাস্টিক জলে ডুবে বা মিশে যায় না, ফলে খোলা জায়গায় সূর্যের তাপে নানা বিক্রিয়ার মাধ্যমে এরা মাইক্রোপ্লাস্টিক জাতীয় জিনিসে ভেঙে যায়। আর প্লাস্টিকে থাকা অণু-পরমাণু একবার ভাঙতে শুরু করলে পরিবেশের জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় আরও ক্ষতিকর। সমগ্র সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্য ত্রাস হয়ে যায় এই মাইক্রোপ্লাস্টিক।
সম্প্রতি একটি রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচের উপর যত প্লাস্টিক ভেসে থাকে তার পরিমাণ প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন। ওজনে এই বর্জ্য প্রায় ৮০ হাজার টন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ওজন প্রায় ৫০০টি জাম্বো জেটের সমান। আর দিনদিন এই নন-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের পরিমাণ প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচে বেড়েই চলেছে।
সামুদ্রিক জীবনেও এর প্রভাব মারাত্মক। বিভিন্ন জলজ প্রাণী এবং মাছেরা হামেশাই এইসব প্লাস্টিককে নিজেদের খাবার ভেবে ভুল করে। আর দিনের পর দিন খাবার ভেবে প্লাস্টিক খাওয়ার ফলে কার্যত মড়ক লাগে জলজীবনে। কারণ জমা জঞ্জালের মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ আবর্জনাই থাকে মারাত্মক বিষাক্ত। আর এই বিষ শরীরে প্রবেশ করলে মৃত্যু অবধারিত। ফলে বেঘোরে মারা যায় বহু মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণী। এমনকী এই প্লাস্টিকের দৌলতেই বিলুপ্তির পথেও পৌঁছে যায় সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের বেশ কিছু প্রাণী। বহু বছর ধরে চলা অসংখ্য গবেষণার ফলে দেখা গিয়েছে, প্রায় ৭০০ ধরণের সামুদ্রিক প্রজাতি প্রতিনিয়ত মেরিন ডেবরিস (সামুদ্রিক ধ্বংসাবশেষ)-এর সংস্পর্শে আসে। যার মধ্যে ৯২ শতাংশ প্রাণীই এই ক্ষতিকর প্লাস্টিকের সংস্পর্শেই থাকে।
ভয়ঙ্কর দাবানল যেমন যত দিন যায় ততই বাড়তে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গলের ভিতর। পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় অরণ্যের জীবন। ঠিক ততটাই মর্মান্তিক পরিণতি ঘটাবে এই ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ’। তেমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: দ্য ওয়াল

Friday, May 24, 2019

কবরের জায়গা খুঁজছেন এরশাদ by শফিকুল ইসলাম সোহাগ

চিরস্থায়ীভাবে শায়িত হওয়ার জন্য জায়গা খুঁজছেন এক সময়ের প্রতাপশালী সেনাশাসক নব্বই বছর বয়সী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পরিবারের পক্ষ থেকে রংপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত করার প্রস্তাব করলে তাতে সায় দেননি সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। রাজধানীতে শায়িত হওয়ার বাসনা জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় এই নেতার। এজন্য রাজধানীতে একবিঘা জায়গা কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেখানে থাকবে মসজিদ, মাদ্রাসাসহ স্থায়ী কমপ্লেক্স। এরকম একটি জায়গা পছন্দ করার জন্য পূর্বাচলে এইচ এম এরশাদ অতি সম্প্রতি দুইবার জমি দেখেছেন। কিন্তু জায়গা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ ছাড়াও বনানী কবরস্থান, সামরিক কবরস্থান ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় শায়িত হওয়ার কথা রয়েছে আলোচিত এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের। জানতে চাইলে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে রংপুরে সমাহিত করার ইচ্ছা থাকলেও রাজধানী ঢাকাতেই সমাহিত হওয়ার বাসনা এইচ এম এরশাদের। প্রাইভেট জমি কিনে বড় পরিসরে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে এইচ এম এরশাদের। এর জন্য একবিঘা জায়গার প্রয়োজন। কবরের পাশে থাকবে মসজিদ, মাদ্রাসাসহ কমপ্লেক্স। ভাই এইচ এম এরশাদসহ আমি রাজধানীর পূর্বাচলে দুটি জায়গা দেখেছি। কিন্তু এমন একটি কবরস্থান ভবিষ্যতে মেনটেইন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টি  ভাইকে অবহিত করলে তিনিও এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেননি। এ ছাড়াও আমাদের বনানী কবরস্থানে জায়গা কিনে সমাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে সামরিক কবরস্থানে এইচ এম এরশাদ চাইলেই সমাহিত হতে পারেন। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় আটজনের কবরস্থান রয়েছে। আমরাও স্পিকারের কাছে অনুমতি চাইব। অনুমতি পেলে সংসদ ভবন এলাকাতেও কবর হতে পারে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির। এই অপশনগুলো রয়েছে। তবে কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জানা যায়, জাতীয় সংসদ ভবনের চত্বর থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ আটজনের কবর সরিয়ে  নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন করে আর সংসদ ভবন এলাকায় কবর দেওয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন এরশাদ ঘনিষ্ঠরা। ভবিষ্যতে বিভিন্ন দিবসে এইচ এম এরশাদের কবরে ভিড় জমানো যাবে না এম আশঙ্কায় সামরিক কবরস্থানেও যেতে চান না। এরশাদের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, এইচ এম এরশাদের দীর্ঘদিনের বাসনা রাজধানীতে একটু নিরিবিলি জায়গায় শায়িত হবেন। যেখানে কবরের পাশেই থাকবে মসজিদ। মাদ্রাসায় নিয়মিত আল কোরআনের বাণী উচ্চারিত হবে। প্রচুর গাছ-পালা থাকবে। পার্টির নেতা-কর্মীরা যেন নিয়মিত যেতে পারেন সেজন্য নির্মাণ করা হবে একটি কমপ্লেক্স। এরকম জায়গা রাজধানীতে দেখেছেন এইচ এম এরশাদ। যার মূল্য ১০ কোটি টাকা। এমন একটি প্রকল্পের পরবর্তী ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হবে সেজন্য এমন সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসা হচ্ছে। রংপুরেও যেতে চান না এরশাদ। সবমিলিয়ে প্রভাবশালী প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের শেষ ঠিকানা কোথায় হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জানা যায়, আগামী সপ্তাহে আবারও উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন তিনি। ছোটভাই জিএম কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় সঙ্গে যাবেন। দলের এই শীর্ষ নেতারা সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে ৩০ মে রাজধানীর ওয়েস্টিনে কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতারে অংশ নেবেন। এর আগে ২৭ তারিখে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে ইফতারে অংশ নেবেন। এইচ এম এরশাদ অসুস্থ থাকায় ইফতার পার্টিতে নেতৃত্ব দেবেন পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান জিএম কাদের। অন্য বছরগুলোতে রমজানের প্রথম রোজা থেকে ইফতার পার্টিতে ব্যস্ত থাকতেন এইচ এম এরশাদ। এরশাদের অসুস্থতার কারণে রহমতের দশ রোজায় এবার দলের কোনো ইফতার পার্টি নেই জাতীয় পার্টির। তবে, বরাবরের মতো প্রথম রোজা এতিমদের সঙ্গে করেছেন এরশাদ। গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, এইচ এম এরশাদের প্রায় সারা দিনই বাসায় কাটে। শরীরটা খারাপ বোধ করলে ডাক্তারের কাছে যান। কাজের লোকেরা  পরিচর্যা করেন। আমরা প্রায়ই দেখা করতে যাই।

Thursday, May 23, 2019

নিঃসঙ্গ এরশাদ দিন কাটছে যেভাবে by শফিকুল ইসলাম সোহাগ

৯ বছরের প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন অনেকটা নিঃসঙ্গ। পরিজন বলতে পাশে থাকার মতো কেউই নেই। পরিচর্চা করেন স্টাফরা। অধিকাংশ সময় কাটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। দলের নেতা-কর্মীরা এখন আর ভিড় করেন না বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে। দলের কোনো কর্মসূচিতে তিনি আর অংশ নেন না। ৯০ বছরের শরীর আর সায় দেয় না। সব মিলিয়ে জীবনসায়াহ্নে এসে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। দীর্ঘদিনের কর্মচারী আবদুল ওহাব, আবদুস সাত্তার, বাদশা, নিপা ও রুবির তত্ত্বাবধানে কাটছে এরশাদের দিনকাল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এইচ এম এরশাদের ছোট ভাই পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের প্রায় সারা দিনই বাসায় কাটে। শরীরটা খারাপ বোধ করলে ডাক্তারের কাছে যান। শারীরিক পরিচর্যা কারা করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজের লোক আছে। তারাই পরিচর্চা করেন। আমরা প্রায়ই দেখা করতে যাই।’
এইচ এম এরশাদ, যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পরও নব্বইয়ের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করে চলেছেন, সেই প্রতাপশালী সাবেক সেনাশাসক এইচ এম এরশাদ আজ জীবনসায়াহ্নে একা। স্ত্রীসহ নিকটাত্মীয় কেউ থাকেন না পাশে। মৃত্যু ভয়ে প্রায়ই রাত-বিরাতে ছুটে যান সিএমএইচে। আধা কিলোমিটারের মধ্যে গুলশানে স্ত্রী ও পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ বসবাস করলেও তিনি বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে এইচ এম এরশাদের খোঁজ নিতে সশরীরে আসেন না। গত পাঁচ বছরে ১৭ বার এইচ এম এরশাদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে গেলেও স্ত্রী রওশন এরশাদ একবারও সঙ্গে যাননি। এরশাদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সর্বক্ষণ তার সঙ্গে ছিলেন আমেরিকা প্রবাসী এরশাদের আরেক ভাই মঞ্জুর মুর্শেদ ও তার সহধর্মিণী রোকসানা মুর্শেদ। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে এরশাদের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হলে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশে সুস্থতা কামনায় জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে একাধিক মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হলেও কোনো দোয়া মাহফিলে অংশ নেননি রওশন এরশাদ। ছোট ভাই জি এম কাদের প্রায়ই আসেন বারিধারার বাসায়। কথা বলেন, ভাইয়ের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।  জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক বিষয় নিয়েও আলাপ করেন। রওশন এরশাদ জাপা চেয়ারম্যান এরশাদকে দেখতে প্রেসিডেন্ট পার্কে আসেন কি না জানতে চাইলে এরশাদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিগত সহকারী আবদুল ওহাব প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের পিতার মতো। অসুস্থ পিতাকে সন্তান যেমন সেবা-যত্ন করে, আমরা আমাদের পিতার সেবা করে যাচ্ছি।’ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। মনোনয়নপত্র জমাদানের পরপরই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে তখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। সিঙ্গাপুর থেকে এসেই পুনরায় তিনি ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি হন। নির্বাচনের পর তিনি আবার সিঙ্গাপুরে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এরশাদের ব্যক্তিগত সচিব মেজর খালেদ আখতার বলেন, ‘চিকিৎসার বিষয়টি আমি নিজে দেখাশোনা করি। আর স্টাফরা তার পরিচর্যা ও দেখাশোনা করেন।’ সারা দিন শুয়ে-বসেই এরশাদের দিন কাটে বলে তিনি জানান।

Thursday, August 9, 2018

বিকল কিডনি নিয়ে বাঁচার উপায়

মানুষের শরীরে দুটি কিডনি থাকে। মেরুদণ্ডের দুই পাশে। কিডনিদ্বয়কে বলা হচ্ছে আপনার শরীরের অতন্দ্রপ্রহরী। এদের মূল কাজ প্রতিনিয়ত দেহে যে বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয়, এগুলোকে প্রস্রাবের আকারে শরীর থেকে বের করে দেওয়া। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার প্রস্রাব তৈরি করে এরা। যদিও কিডনির ওজন আমাদের দেহের ওজনের ২৫০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ, কিন্তু দেহের এক-চতুর্থাংশ রক্ত প্রবাহিত হয় এই দুই ক্ষুদ্র অঙ্গের মধ্য দিয়ে। দুটি কিডনি মিলে ২৪  ঘণ্টায় ২০০ লিটার রক্ত পরিশোধন করতে পারে। এ জন্য এদের বলা হয় ‘অ্যামেজিং কিডনি’ বা ‘বিস্ময়কর কিডনি’।
কিডনি বিকল : যে কোনো কারণে কিডনির কার্যকারিতা যদি লোপ পায় তাকে বলে কিডনি বিকল। কিডনি বিকল হয়ে গেলে ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ এবং অতিরিক্ত তরল দেহে জমা হতে শুরু করে, যার মাধ্যমেই কিডনি ফেইলুরের উপসর্গ দেখা দেয়। এই উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চরক্তচাপ, চরম ক্লান্তি, মাথাব্যথা, পায়ের গোড়ালি এবং মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, বমি, বিনা কারণে গা চুলকানো, রক্ত শূন্যতা দেখা দেওয়া  ইত্যাদি। বেঁচে থাকার জন্য তখন মাত্র দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি হাতে থাকে, একটি হলো কিডনি ডায়ালাইসিস অপরটি কিডনি সংযোজন। প্রয়োজনের তুলনায় কিডনি সংযোজনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই প্রধান উপায় হলো ডায়ালাইসিস।
কিডনি বিকল ও চিকিৎসা : আগেই বলেছি, কিডনি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেলে বা অ্যান্ডস্টেজ রেনাল ফেইলুর দেখা দিলে কিডনি সংযোজন অথবা ডায়ালাইসিস ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় দুই ধরনের ডায়ালাইসিস রয়েছে। এক. হেমো-ডায়ালাইসিস ও দুই. পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস।
হেমো-ডায়ালাইসিস : উভয় কিডনি বিকল হয়ে গেলে, যে যান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরীরের রক্ত পরিশোধন করা হয়, তাকে বলে ডায়ালাইসিস। ডায়ালাইসিস একটি জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা- কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি ত্বরিত এই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব না হলে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। ডায়ালাইসিস একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন করে বিষ মুক্ত করা হয় ও শরীরের অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া হয়। হেমো- ডায়ালাইসিস ব্যবস্থায় রক্তের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ছেঁকে পরিশোধিত করে বিষমুক্ত রক্ত আবার শরীরে প্রবেশ করানো হয়।
ফিস্টুলা কী?
ডায়ালাইসিস ব্যবস্থাতে শরীরের অভ্যন্তরে ঢোকার একটি পথ প্রয়োজন হয়। হেমো-ডায়ালাইসিসের জন্য রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থায় ঢোকার পথ বাঞ্ছনীয়। একে বলে ফিস্টুলা। একটি শিরা এবং একটি ধমনি চামড়ার নিচে সংযোগ ঘটিয়ে এই পথ তৈরি করা হয়। সাধারণত কব্জিতে বা কনুইয়ের উল্টো দিকে এই ফিস্টুলা তৈরি করা হয়ে থাকে। ছোট্ট অপারেশনের মাধ্যমে ফিস্টুলা তৈরির পর কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়, যাতে করে তা পুরোপুরি তৈরি হওয়ার সুযোগ পায়। এ জন্য প্রায় ১ থেকে ২ মাস সময় লাগে।
ক্যাথেটার কী?
আগেই বলা হয়েছে, হেমো-ডায়ালাইসিসের জন্য শরীরের রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থায় ঢোকার পথ প্রয়োজন। আগে থেকে যদি ফিস্টুলা তৈরি করা না থাকে তবে জরুরি ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিসের জন্য রক্তনালিতে ক্যাথেটার স্থাপন করতে হয়। ক্যাথেটার হলো এক ধরনের বিশেষ নল, যা গলা বা পায়ের কুচকিতে অবস্থিত প্রয়োজনীয় শিরার অভ্যন্তরে স্থাপন করে দ্রুত ডায়ালাইসিস করা হয়। এ ব্যবস্থার কিছু জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি থাকা ধমনি ছিদ্র হলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে। রক্ত নলের ভিতরে জমে গিয়ে পথ বন্ধ করে দিতে পারে, রক্তনালি জমাট রক্ত দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারে, রক্তনালি সরু হয়ে গিয়ে পরবর্তী সময়ের জন্য বিপত্তি ঘটাতে পারে। ক্যাথেটার জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হলে, ডায়ালাইসিসের সময় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। দক্ষ হাতে সতর্কতার সঙ্গে ক্যাথেটার লাগালে তাৎক্ষণিক জটিলতা অনেক কম হয়। এসব জটিলতার কারণে রোগীদের ভোগান্তি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর কারণ হলো আমাদের দেশের রোগীদের ডায়ালাইসিস সম্পর্কে অহেতুক ভীতি। সময়মতো ফিস্টুলা করতে রাজি না হওয়া।
সদ্য সমাপ্ত হলো হেমো-ডায়ালাইসিস ও সিএপিডি নিয়ে সপ্তাহব্যাপী দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কুয়ালালামপুর ও কোরিয়ায়। এতে ডায়ালাইসিসের উৎকর্ষ সাধনে টেকনোলজিক্যাল উন্নতি হয়েছে। ধীরে ধীরে কমে আসছে জটিলতা, বেড়ে যাচ্ছে ডায়ালাইসিস রোগীদের গড় আয়ু। এই সতর্কবাণী হলো, ডায়ালাইসিস ক্যাথেটারজনিত জটিলতা এড়াতে অবশ্যই আগে থেকে ফিস্টুলা করিয়ে রাখতে হবে। ডাক্তার, নার্স, ডায়ালাইসিস টেকনিশিয়ান ও ভুক্তভোগী রোগীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর, কর্মক্ষম দীর্ঘজীবন উপহার দেওয়া যায় একজন মৃত্যুপথযাত্রী কিডনি বিকল রোগীকে।
কত দিন ডায়ালাইসিস করা লাগতে পারে?
সাধারণত সপ্তাহে তিনবার করে, প্রতিবারে চার ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করানো হয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, ডায়ালাইসিসের শুরুতে কিছুটা কিডনি কার্যক্রম অক্ষুণ্ণ থাকে, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। এসব ক্ষেত্রে সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালাইসিস করলেও চলে। এর মধ্যে অনেকে কিডনি সংযোজন করে নিতে পারেন। সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর  লাইফস্টাইল, মানসম্মত ডায়ালাইসিস কিডনি বিকল রোগীদের দীর্ঘায়ু করতে পারে।
ডায়ালাইসিস রোগীর খাদ্য-খাবার : বেশির ভাগ ডায়ালাইসিস রোগীরই খাদ্য-খাবারে পরিবর্তন আনা দরকার। সাধারণত পটাশিয়াম, ফসফেট এবং সোডিয়াম (লবণ) সমৃদ্ধ খাবার যথাসম্ভব কম খেতে হবে। পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। ফল ও টাটকা সবজিসহ সুষম খাবার খেতে হবে।
সবচেয়ে বেশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হলো পানি বা তরল গ্রহণের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন। প্রত্যেক রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে ডাক্তার তার ২>  ঘণ্টায় পানি খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেবেন, যা এক লিটারের কিছু কম-বেশি হবে।
জীবনধারা : কিডনি বিকল রোগীদের মনে রাখতে হবে যে, ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ রোগের মতো কিডনি বিকল রোগীকেও তাদের কন্ট্রোল করে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে ও অহেতুক দুশ্চিন্তা পরিহার করে মানসিকভাবে সক্রিয় হয়ে স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি রোগীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যোগদান করে মানুষকে সচেতন করার জন্য ‘ভলান্টিয়ার’ হিসেবে কাজ করাতে পারেন। মনের তৃপ্তি তাদের বেঁচে থাকার সাহস জোগাবে।

Saturday, June 16, 2018

মুখ খুললেন জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার বারী

বহুল আলোচিত ২০০৭ সালের ‘এক/এগারো’র আবির্ভাব সংঘটনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে মুখ খুলেছেন তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ও ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী। দীর্ঘ নীরবতা অবলম্বনের পর ঘটনা সম্পর্কে তারা যা বলেছেন, তাতে জানা যায়, জেনারেল মইন উ আহমেদ কোনো অবস্থাতেই দেশে সামরিক শাসন জারির পক্ষে ছিলেন না। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বলেছেন, দেশের প্রতি প্রবল মমত্ববোধ থেকেই তিনি জরুরি অবস্থা জারির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় তাদের দুজনের সাক্ষাৎকার থেকে এসব তথ্য জানা যায়। ইমারজেন্সি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মইন উ আহমেদ বলেন, ‘আমরা না। প্রেসিডেন্ট এটা করলেন। উই আর নো অথরিটি। প্রেসিডেন্টকে বলেছি দিস ইজ দ্য সিচুয়েশন, দিস আর দ্য ওয়েস। ফর ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল ইলেকশন, হ্যাভ আ ফ্রেশ কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট, আপনি ইমারজেন্সি দেন। ট্রুপস তো অলরেডি ডেপ্লয়েড আছেই।’ মইন বলেন, ‘যেদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হ্যান্ডওভার করা হয়, সেদিনই ট্রাবল শুরু হয়ে গিয়েছিল। এমনকি এর আগে থেকেই। নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, বায়তুল মোকাররমের ওখানে মানুষকে কীভাবে পাড়িয়ে মেরেছিল? আমার কাছে এত খারাপ লেগেছে? ইট ওয়াজ সো ব্যাড। সন্ধ্যার সময় গিয়ে, আই হ্যাভ সিন দ্যাট সিন। পশু পশুকে যেভাবে মারে, মানুষ মানুষকে সেভাবে পাড়িয়ে মারছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, হোল ওয়ার্ল্ড এই সিন দেখেছে। দেশ একটা বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। ২২ জানুয়ারি যে ইলেকশনটা হওয়ার কথা ছিল, ওটা হলে তো সর্বনাশ হয়ে যেত। ওরা (আওয়ামী লীগ) তো বলেছিল পুরো দেশ বন্ধ করে দেবে। বাট লেট মি টেল ইউ, আই হ্যাভ নো ইনটেনশন টু ইন্টারভিন। বিলিভ মি। এটা আস্তে আস্তে গ্রো করা শুরু করল। ওয়ান অব মাই সিনিয়র অফিসার্স কেইম টু মি। বলল, এসব ঘটেছে, উই কান্ট সিট আইডল। আমি তাকে বললাম, ইউ হ্যাড নো রাইট টু স্পিক লাইক দ্যাট। তুমি এটা বলেছ এবং দ্যাটস দ্য অ্যান্ড অব ইট। ডোন্ট এভার ট্রাই অ্যাগেইন। বলেছি এ কথা। সে চলে গেছে। বেশ কিছুদিন পর আবার আসছে। বলে, স্যার অল অফিসার্স আর...। আমি অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছি, সিনিয়র অফিসার যারা ছিল। থার্ড টাইম হি টোল্ড...। তারপর তো সব দেখেশুনে...। তারপর, এরা ইলেকশন করবে না, প্রেসিডেন্টও বলল, আমি কী করব। এসব দেখে শুনে আস্তে আস্তে ইট স্টার্টেড বিল্ডিং আপ ইন মাই মাইন্ড।’
তিনি বলেন, ‘দুই পার্টি, দে ওয়ার নট কামিং টু অ্যানি শর্ট অব আন্ডারস্টান্ডিং। ইলেকশন হবেই। ইলেকশন হলেই তো বোঝেন, ওয়ানসাইডেড ইলেকশন হতো। অন গ্রাউন্ড আওয়ামী লীগ ওয়াজ ভেরি পাওয়ারফুল। অর্গানাইজেশন-ওয়াইজ গ্রাসরুট লেভেল থেকে স্ট্রং। ইউএন থেকে কিন্তু আরেকটা সাইড ছিল। ওরা বলল, তোমরা দেশের অবস্থা ঠিক কর। তোমাদের দেশে পিপল আর ইন ইন ট্রাবল। তোমরা কি পিসকিপিং করবা? সো উই উইল হ্যাভ টু টেক সাম অ্যাকশন অ্যাবাউট দ্য পিসকিপার্স হু আর নাউ ওয়ার্কিং অ্যাব্রড। দেখলাম, যদি এটা হয়, ট্রুপস উইল টেক ইট ভেরি নেগেটিভলি। একজন সৈনিক রিটায়ার্ড করলে যে টাকা পায়, তার চেয়ে বেশি টাকা পায় পিসকিপিংয়ে গেলে এক বছরে। এটা একটা লাইফটাইম সুযোগ। এসব দেখে ভাবলাম... লেটস হ্যাভ আ ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল ইলেকশন অ্যান্ড গেট আউট।’ তিনি বলেন, ‘২২ জানুয়ারি যে ইলেকশনটা হওয়ার কথা ছিল, ওটা হলে তো সর্বনাশ হয়ে যেত। ওটা হলে আফটার এফেক্টটা দেখেন কী হতো? ওরা (আওয়ামী লীগ) তো বলেছিল পুরো দেশ বন্ধ করে দেবে। বঙ্গভবনে গেলাম। সেখানে প্রেসিডেন্ট নিজেই বলেছেন, হু উইল বি দ্য চিফ অ্যাডভাইজার? সে সময় ডিসকাশনে ড. ইউনূসের নাম আসে। কিন্তু তিনি স্বল্পমেয়াদি সময়ের জন্য রাজি হলেন না। যদিও উনাকে বলা হয়েছিল দুই বছরের। এর পরও না। দ্বিতীয় নাম এলো ড. ফখরুদ্দীনের। পেসিডেন্ট বলেছেন, উনি ভালো। নামটি উনিই দিয়েছেন। আমি তো কাউকে চিনি না। আই ওয়াজ নেভার ইন্টারেস্টেড ইন দি আউটসাইড ওয়ার্ল্ড। রাত সাড়ে ১২টায় তাকে ফোন করা হলো। তিনি শুনে সময় নিলেন। বললেন, তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নেবেন। বললাম, আচ্ছা স্যার, উই আর অল ওয়েটিং হিয়ার। বললেন, আধা ঘণ্টা। ওকে, বললাম। আধা ঘণ্টা পর উনি ফোন করলেন, অ্যাকসেপ্ট করলেন।’ মইন উ আহমেদ বলেন, ‘১২ তারিখ ১০টায় উনি এসে আমাদের সঙ্গে মিটিং করলেন, ইন চিফ অ্যাডভাইজার্স অফিস। ওখানে এলাম, কথাবার্তা হলো। আই ক্লিয়ারলি সেইড, ইউ আর এভরিথিং। উই উইল নট বদার ইউ। এবং আমাদের ফার্স্ট কথা হলো, কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট উইল হ্যান্ডওভার পাওয়ার টু দি ইলেকটেড গভর্নমেন্ট, উইল টেক কেয়ার অব দ্য করাপশন ইন দ্য শর্টটাইম। পাঁচটা পয়েন্ট বলেছিলাম, নোবডি ইন ইয়োর ক্যাবিনেট উইল ইনডালজ ইন অ্যানি শর্ট অব করাপশন। ইফ হি ডাজ, হি উইল বি টেকেন টু টাস্ক ইমিডিয়েটলি। পাঁচটা পয়েন্ট আমার এখন স্মরণ নাই। হি মোর অর লেস অ্যাগ্রিড। বললাম, ভালো এবং এফিশিয়েন্ট এ রকম লোক আমাদের চাই, ১০ জন। তো খোঁজা শুরু হলো। এর মধ্যে শুরু হলো মানুষের টেলিফোন। এভরিবডি ওয়াজ সেয়িং, হি হ্যাজ কোয়ালিটি টু বিকাম অ্যাডভাইজার। যা হোক, অ্যাডভাইজাররা তো হ্যান্ডপিকড। যাদের সিলেক্ট করা হয়েছে, দে আর গুড পিপল। দোজ হু কুড নট শো দেয়ার এফিশয়েন্সি, আফটার ওয়ান ইয়ার উই ড্রপড দেম। যেমন একজন অ্যাগ্রিকালচার অ্যাডভাইজার ছিলেন। এ রকম ভালো লোক আমাদের দেশে আছে? বেশ বয়স হয়েছে। পায়ে একটা প্রবলেম ছিল। উনি ভোররাতে ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টে চলে যেতেন। গিয়ে ওই পয়েন্টে দাঁড়াইয়া থাকতেন। ইন ফ্রন্ট অব হিম, চুরিটুরি বন্ধ। হি ওয়াজ হার্ডওয়ার্কিং। মাই হ্যাটস অব টু হিম।’ এক/এগারোর সময় ক্ষমতার পালাবদলে ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারীর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে। দীর্ঘদিন পর সেদিনের প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনিও বলেছেন অজানা অনেক কথা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বলেছেন, তিনি নিজেই বিভিন্নভাবে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদকে ইমারজেন্সি দেওয়ার ব্যাপারে প্ররোচিত করেছেন। তবে এ ব্যাপারে সেনাপ্রধানেরও লুকানো ইচ্ছা ছিল। তিনিও সময়-সুযোগ খুঁজছিলেন। শুরুর দিকে তৎকালীন নাইন ডিভের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দীন আহমেদকে দিয়ে ইমারজেন্সির ব্যাপারে ইঙ্গিত দেওয়ানো হলেও তিনি ভালোভাবে সায় দেননি। মেজর জেনারেল মাসুদ বেগম খালেদা জিয়ার আত্মীয় হওয়ার কারণেই হয়তো সেনাপ্রধান শুরুতে তাকে ভরসা করতে পারেননি। যদিও পরে জেনারেল মাসুদকেই ভরসা করেছেন তিনি। ব্রিগেডিয়ার বারী বলেছেন, ততদিনে সিটুয়েশন ভোলাটাইল হয়ে গেছে। ইমারজেন্সি দেওয়ার জন্য আমি জেনারেল মাসুদকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনিও সায় দিলেন। বললেন, কিছু একটা করা দরকার। কয়েকদিন পরপরই আমি উনাকে বলি স্যার, চিফের কাছে যান। আলাপ-টালাপ করেন। এভাবে দেশ চলতে পারে না। কয়েকদিন পর তিনি বলেন, হ্যাঁ, চিফের কাছে গেছিলাম, ‘হালকা উঠাইছি, উনি তো এদিকে যায় না। মানে ডরায়, কথা বলতে চায় না।’ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বলেন, ‘কিছুদিন পর আমার ডিজি গেলেন ইউকে (ব্রিটেন)। সিচুয়েশন একদম পিকে। আমি অ্যাকটিং ডিজি। আমি গিয়ে উনাকে সিচুয়েশন ন্যারেট করলাম। তারপর উনি নিজে থেকেই বললেন যে, দেশের কী অবস্থা? বললাম স্যার দেশের অবস্থা এখন তো আর লুকানো নাই। মিডিয়া তো সবকিছু পাবলিশ করে। কোনো কিছু গোপন থাকে না। দেখছেন তো আপনি প্রতিদিন কী হচ্ছে না হচ্ছে। তোমার কী অভিমত— সেনাপ্রধানের এমন প্রশ্নের উত্তরে আমি বলছিলাম, এটা থেকে নরমালসি আনতে হলে প্রেসিডেন্টকে ইমারজেন্সির জন্য বলতে হবে। সেনাপ্রধান জানতে চাইলেন, অন্যরা কী বলে? আর্মির অ্যাটিচুড কী? আমি বললাম, সেনাপ্রধান যা করবে, তারা তো আর বাইরে থাকবে না। সেনাপ্রধানের চিন্তাটা তো আসবে সেখান থেকেই, দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা থেকে। তুমি আর্মির কাছে গিয়ে খোঁজ নাও। আই টকড টু অল কমান্ডারস, জিওসিস। দু-এক জন ছাড়া, যাদের সঙ্গে আমার ভালো ইয়ে নাই। সবাই ওপিনিয়ন দিয়েছিলেন, কিছু একটা করা দরকার। বাট নো মার্শাল ল। কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের চিফ হওয়ার জন্য আমরা ড. ইউনূসকে বললাম। তিনি সায় দেননি। ইমারজেন্সি প্রক্লেমেশনের জন্য বঙ্গবন্ধু আমলের এবং এরশাদ সাহেবের আমলের গেজেট একসঙ্গে করে মডারেট ভার্সন তৈরি করেছিলাম।’
ইমারজেন্সির আগের রাতে আর্মি চিফের ফোনের প্রসঙ্গ টেনে ব্রিগেডিয়ার বারী বলেছেন, ‘১০ তারিখ রাতে চিফের সঙ্গে আমার কথা হয়, অ্যাজ ইউজুয়াল, ডিজিএফআইর অ্যাকটিং চিফ হিসেবে। তিনি বললেন, বারী একটা জিনিস তো পাওয়া গেছে। ইমারজেন্সি ডিক্লেয়ার করার পক্ষে শক্ত একটা ডকুমেন্ট— ইউএন মিশনে বাংলাদেশ থেকে সৈনিকদের আর নেবে না। এটা তো একটা বড় প্লি আমাদের জন্য। এইমটা তো ইমারজেন্সি না, এইম হলো পিস রি-এস্টাবলিশ করা।
এর পরই আমি জেনারেল মাসুদকে চিফের ফোনের বিষয়টি অবগত করলাম। বললাম স্যার আপনি তাড়াতাড়ি আসেন। রাতেই তিনি আমার অফিসে এলেন। বললেন আমিনকে ডাকো (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন)।’ বারী বলেন, ‘আমিন-মইন— সাধারণ মানুষের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এরা পড়াশোনা করেছে আইসোলেটেড স্কুলে। আমিনের ফাদার সম্ভবত ফরেন মিনিস্ট্রিতে ছিল, বিদেশে ঘুইরা বেড়াইছে। সাধারণ ছেলেদের সঙ্গে বসে যে ক্লাস করা, পালস বোঝা, গ্রামে কাদার মধ্যে লুঙ্গি উঠাইয়া আসা এ রকম তো দেখে নাই। যার ফলে তারা ফুটপাথে বাড়ি দিয়া উঠায়া দাও, মার্শাল ল কইরা ফেলো, ভাইঙ্গা ফেলো এই টাইপের অ্যাটিচুড। টকশো বন্ধ করে দাও। আমি সেনাপ্রধানকে বললাম, স্যার এগুলো বন্ধ করবেন না। মানুষকে কথা বলতে দিতে হবে। ভালো করলে বলবে, খারাপ করলেও বলবে। আমাদের বক্তব্য আমরা দেব। মানুষ তো খারাপ বলে নাই প্রথম দিকে।’ এক/এগারোর দিন বঙ্গভবনের বিষয়টির অবতারণা করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বলেন, ‘ওইদিন বঙ্গভবনে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ের পর সেনাপ্রধানসহ বাহিনীর প্রধানরা এলেন। সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপতি বললেন, কী করা? উনি বললেন, ইমারজেন্সি দেওয়া। আমাকে পদত্যাগ করতে হবে নাকি? রাষ্ট্রপতির এমন প্রশ্নে সেনাপ্রধান বললেন, না আপনাকে প্রেসিডেন্টশিপ থেকে পদত্যাগ করতে হবে না। বাট অ্যাজ কেয়ারটেকার চিফ ইউ হ্যাভ টু রিজাইন।’ ড. ইউনূসের প্রসঙ্গে বারী বলেছেন, ‘কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের চিফের প্রস্তাব দিয়ে মেজর জেনারেল মাসুদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিনকে নিয়ে ড. ইউনূসের কাছে গিয়েছিলেন। উনার প্রথম কথা ছিল টাইমফ্রেম কতদিনের জন্য? উনি বললেন, কম সময় যদি হয় তাহলে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। এরপর এলো ফখরুদ্দীনের নাম। আমি নিজেই উনাকে ফোন করেছিলাম।’

Wednesday, December 13, 2017

ভাসানচর নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান by রুকনুজ্জামান অঞ্জন

দায়িত্বে নৌবাহিনী, অবকাঠামো উন্নয়ন নভেম্বরে, জুন-জুলাই থেকে রোহিঙ্গা স্থানান্তরঃ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) জন্য আশ্রয়স্থল হিসেবে ‘ভাসানচর’কেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। দ্বীপটির প্রায় ১৩ হাজার একর জমির অবকাঠামো উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছে নৌবাহিনী, যার মধ্য দিয়ে সেখানে ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানি, পয়ঃব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন, পুকুর খনন, স্কুল ও মসজিদ নির্মাণ, অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন, সাইক্লোন শেল্টার স্টেশন, দুটি হেলিপ্যাড নির্মাণসহ পুরো দ্বীপটিকে শরণার্থীদের বসবাসের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাসানচরের অবকাঠামো উন্নয়নে নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত জানিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন। এরপর ওই চরের ভূমির উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্যাডে নীতিগত অনুমোদনে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘ভাসানচর দ্বীপের (পূর্বের ঠেঙ্গারচর) নিরাপত্তা বিধান, বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বনায়নের লক্ষ্যে নৌবাহিনীকে দায়িত্ব প্রদানের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সম্মতির প্রস্তাব প্রেরণ করা যেতে পারে এবং সম্পূর্ণ চরটি বসবাসের উপযোগী সার্বিকভাবে উন্নয়নের পর নৌবাহিনীর নৌফরোয়ার্ড বেইস স্থাপনের জন্য সুবিধামতো যে কোনো এক পাশ থেকে উক্ত চরের প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ/বন্দোবস্ত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের প্রস্তাবের পর সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ভাসানচরের অবকাঠামো উন্নয়নে নৌবাহিনীকে এই দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানান। গত আগস্টে অনুষ্ঠিত সভায় মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন বিধায় সে মোতাবেক নৌবাহিনী দ্বীপটির উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সংস্থা নৌবাহিনীকে বিধিবলে সহায়তা প্রদান করবেন।’ তবে বাংলাদেশে জমির অপ্রতুলতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ না করে পরিকল্পিতভাবে রেস্টহাউস, খেলার মাঠ, স্কুল প্রশিক্ষণ মাঠ, জলাশয় ইত্যাদি নির্মাণ করতে হবে বলে মন্ত্রিসভায় অভিমত প্রকাশ করেন। ২৮ আগস্ট ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এই সভার কার্যবিবরণী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় যাতে ভূমিমন্ত্রীর স্বাক্ষর রয়েছে। জানা গেছে, নীতিগত অনুমোদনের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা, নৌবাহিনী প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার (বর্তমানে সচিব) এক কর্মকর্তাসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল ভাসানচর পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ভাসানচরে কোনো স্থায়ী জনবসতি নেই।
সেখানে আনুমানিক ৮ হাজার মহিষ প্রতিপালিত হচ্ছে। ১৫/২০ জন রাখাল অস্থায়ী সেন্টার নির্মাণ করে দ্বীপে বসবাস করছেন।
এ অবস্থায় ভাসানচর অবকাঠামো উন্নয়নে নৌবাহিনী প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর জন্য ৫০ কোটি টাকা চেয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ে। গত ২ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে থোক বরাদ্দ হিসেবে এই অর্থ চাওয়া হয়।
প্রস্তাবে নৌবাহিনী জানায়, ভাসানচরকে সম্পূর্ণ বসবাস উপযোগী করে গড়ে তুলতে তারা একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন’ করছে এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে ওই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে সেটিকে প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন নেওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ ছাড়া ওই পরিকল্পনা প্রণয়নে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে বিধায় তাতে প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ন্যূনতম ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগবে। এ প্রেক্ষিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে শুরু করার জন্য আসন্ন নভেম্বর মাস থেকেই তারা কাজটি শুরু করতে চাইছেন। আর এজন্য থোক বরাদ্দ হিসেবে ৫০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
নভেম্বর থেকেই কাজ শুরুর যৌক্তিকতা দেখিয়ে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘দ্বীপটি সমুদ্র তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল বিধায় ভরা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে এর অধিকাংশ এলাকা নিমজ্জিত থাকে। ফলে এ সময় ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায়, মৌসুমি বৃষ্টিপাত, সাইক্লোন সিগন্যাল ও সামগ্রিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে শুধু শীতকাল ব্যতীত বছরের অন্যান্য সময়ে বর্ণিত কার্যাদি বাস্তবায়ন সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে বছরের শুধু নভেম্বর হতে মার্চ পর্যন্ত ওই অঞ্চলে উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব হবে, যাতে জুন-জুলাই হতেই ওই এলাকায় শরণার্থী পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়। অন্যথায় পরবর্তী শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলে শরণার্থী পুনর্বাসন কার্যক্রম এক বছর বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
নৌবাহিনী আরও বলেছে, ‘দ্বীপটির ভূমি সুগঠিত হলেও সমুদ্র তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত বিধায় এপ্রিল হতে অক্টোবরের ভরা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে এর অধিকাংশ এলাকা নিমজ্জিত হয়। ইতিমধ্যে দ্বীপটিতে নৌবাহিনীর নিজস্ব তহবিল থেকে একটি হেলিপ্যাড নির্মাণসহ প্রাথমিক অবকাঠামো হিসেবে একটি কটেজ, ৪টি শেড ও বেশ কিছু টয়লেটসহ যাতায়াতের জন্য সীমিত পরিসরের ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। চরের পশ্চিম পাশ ভাঙনপ্রবণ এলাকা বিধায় ড্রামশিট, বাঁশ এবং বালুর বস্তা দিয়ে ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি পরীক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ, একটি পন্টুন, একটি মুরিং বয় স্থাপনসহ ছোটবড় বিভিন্ন প্রাথমিক কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
নৌবাহিনীর এই প্রস্তাবটিতে স্বাক্ষর রয়েছে এমন একজন কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে ওই কর্মকর্তা জানান, তিনি শুধু মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবটি পাঠানোর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত নন।

Friday, April 29, 2016

ওদের কান্নার শেষ নেই by সাখাওয়াত কাওসার

‘ভাই গত ১৭ এপ্রিল দয়াগঞ্জ মোড়ে ইবনেসিনায় ডা. ফেরদৌস কামাল ভূইয়াকে দেখাইছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ কিনতে পারি নাই। দেহেন শরীর ফুইল্যা গেছে। উঠলে বসতে পারি না। বসলে উঠতে পারি না। খুব যন্ত্রণা হয়। মাঝে মাঝেই এক-দুই বেলা না খাইয়া থাকি। কী করুম কন? চার বছর বয়সী মেয়েটার মুখের দিকে তাকাইলে নিজেরে ঠিক রাখতে পারি না।’ শনিবার ফারহানা আক্তারের (২৮) সঙ্গে তার যাত্রাবাড়ীর ভাড়া বাসায় গিয়ে এ প্রতিবেদক কথা বলার সময় একপর্যায়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন তিনি। এত গেল শুধু এক ফারহানার খবর। এরকম অসংখ্য ফারহানা কিছুটা সুখের আশায় বিদেশ গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফিরেছেন। ভয়ঙ্কর রোগ বাসা বেঁধেছে তাদের শরীরে। আবার কেউ কেউ যৌন নির্যাতনের পর গর্ভবতী হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে সহায় সম্বল হারানো এসব ভুক্তভোগীর কান্নাই এখন নিত্যসঙ্গী। তাদেরই একজন কুড়িগ্রামের কল্পনা বেগম (ছদ্মনাম)। তিন মাসের গর্ভবতী হয়ে তিনি চলতি মাসের শুরুর দিকে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে দেশে ফিরেছেন। এ ব্যাপারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি এ প্রতিবেদককে বলেন, ওদের জন্য আমরা ভাবছি। কারও অবস্থা খুবই গুরুতর হলে তাদের আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্যাতিত হয়ে ফেরত আসা অসুস্থ রোগীদের জন্য হাসপাতাল তৈরির ব্যাপারে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুক্তভোগীরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দেশে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান বিভাগে। তবে একেকটি অভিযোগ নিয়ে শুনানি হয় দিনের পর দিন। দুর্দশাগ্রস্ত, হতদরিদ্র মানুষজন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসেন শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য। কর্মসংস্থান থেকে শুনানি হয়। রায় আসে। তবে মন্ত্রণালয় নেয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তবে সেখানে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো পুনরায় শুনানির আবেদন জানালে হতদরিদ্র মানুষদের পুনরায় শুনানির জন্য ডাকা হয়। তবে আর্থিক কারণে অনেকেই শুনানিতে অংশ নিতে পারে না। অভিযোগ রয়েছে, এক্ষেত্রে রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষেই যায়। কান্না এবং হতাশাই সম্বল হয় ভুক্তভোগীদের। অনেক ক্ষেত্রে শুনানির রায়ের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে রিট করে তা স্থগিতের রায় নিয়ে আসে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। দীর্ঘদিনের মতো ঝুলে যায় হতভাগাদের ভাগ্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, নারী কর্মী পাঠানোর পর থেকেই এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। বেশির ভাগ নারী কর্মীই বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব বিষয় সরকারের নীতিনির্ধারক মহল অবগত রয়েছে। তবে সময় এসেছে, আমাদের সরকারের উচিত বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ওইসব দেশকে জানানো। নইলে নির্যাতনের মাত্রা বাড়বে বৈ কমবে না।
এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন ‘আইন ও সালিস কেন্দ্র’-আসক পরিচালক নূর খান লিটন। তিনি বলেন, যেখানে আমাদের শ্রমিকদের মানবাধিকার নিশ্চিত হবে না সেখানে শ্রমিক পাঠাতে হবে কেন? সরকারের উচিত হবে এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অফিসিয়ালি অবহিত করা। যারা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সরকারকেই যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। এ জন্য তাদের বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টির জন্য মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হয়েছে। এখন যদি ওই মন্ত্রণালয় থেকে প্রবাসীরা নিগ্রহ এবং অবহেলার শিকার হন, আর তা দুর্বৃত্তদের পক্ষে যায় সেটা খুবই লজ্জাজনক। মন্ত্রণালয়ের প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডের পরিচালক নূরুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নীতিমালায় আছে দুর্ঘটনা এবং মুমূর্ষু অবস্থায় ফিরে এলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার।
যাত্রাবাড়ীর ভুক্তভোগী ফারহানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদকাসক্ত স্বামীর দিনের পর দিন নির্যাতন ও আর্থিক যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে এবং সিকদার ট্রাভেলসের মালিক সিরাজ সিকদারের কথায় বিশ্বাস করে ৪০ হাজার টাকায় লেবাননে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মাসে ২০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন। আশা করেছিলেন হয়তো এর থেকেই অন্তত দুই বেলা সন্তানদের মুখে খাবার জুটবে। তবে সুখ তার কপালে সয়নি। ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পাসপোর্টে লেবাননের ভিসা থাকলেও প্রতারক চক্র কৌশলে তাকে পাঠিয়ে দেয় সিরিয়ায়। ঠাঁই হয় একটি ক্যাম্পে। দালালদের কথামতো কাজ করতে রাজি না হওয়ায় সেখানে টানা ছয় মাস চলে তার ওপর স্টিমরোলার। দুই দফা লুকিয়ে নির্যাতন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তবে প্রতিবারই সিরিয়ার পুলিশ তাকে তুলে দেয় দালালদের হাতে। ওই ক্যাম্পে ছিল প্রায় ২৮ জন বাংলাদেশি নারী। দালালদের প্রস্তাবে রাজি না হলেই দেওয়া হতো ইলেকট্রিক শক। নির্যাতনের একপর্যায়ে একদিন তার হাতও ভেঙে দেওয়া হয়। চিত্কার করলেই মুখে গুঁজে দেওয়া হতো কাপড়। কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ফেলে রাখা হতো তাকে। যৌন নির্যাতন ও বিভিন্ন মাত্রার শারীরিক নির্যাতনে একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ ফারহানাকে দিয়ে কোনো কাজ করানো সম্ভব না হওয়ায় গত বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে ফেরত পাঠায় দালাল চক্র। এরপর থেকে দফায় দফায় হতদরিদ্র মা ফারহানাকে চিকিৎসা করান। তবে এখন চিকিৎসা করতেও পারছেন না তিনি। পরবর্তীতে ফারহানার মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাব-৩ এর একটি দল পল্টন এলাকা থেকে দালাল চক্রের দুই হোতা আল হাসিব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জসীম আহমেদ, শিকদার ট্রাভেলসের মালিক সিরাজ শিকদারসহ ১৩ সদস্যকে গ্রেফতার করে। তবে কিছু দিনের মধ্যেই তারা কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসেন। সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা কুড়িগ্রামের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর স্বামী ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হামরা কোনঠে যামু ভাই? হামার কথা কাহো শুনে না। হামরা তো গরিব!...।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার শান ট্রাভেলসে গেছিনু। হামাক খেদাই দিছে। মন্ত্রণালয়ে গেছিলাম। তারাও কিছু করল না।’
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, ঘটনার মানবিকতা উপলব্ধি করে এ বিষয়ে বিশেষ তত্পরতা চালানো হয়। তবে রিক্রুটিং এজেন্সির বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ। হতাশার কথা হলো, অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিককে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে কিছু দিনের মধ্যেই তারা জামিনে বের হয়ে এসে পুনরায় বিদেশে শ্রমিক পাঠাচ্ছে। এখন বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অনেক নারী শ্রমিকের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

Tuesday, April 28, 2015

মেয়রের হাতে কি আলাদিনের চেরাগ আছে? by মহিউদ্দিন আহমদ

অনেক বছর আগে একটি গান শুনেছিলাম—গণসংগীত। একটি লাইন এখনো মনে পড়ে: ‘জান দিয়ে ইলেকশন পেলাম লাগল দেশে ধুম’। জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলোর কথা না বলে ভোটের রাজনীতি নিয়ে মাতামাতিকে বিদ্রূপ করে ষাটের দশকে অনেক বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী এই গানটি গাইতেন। দুদিন পরই হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। চারদিকে হইহই-রইরই। দেশটা ভাসছে নির্বাচনের জোয়ারে।
দেশের আইন অনুযায়ী এই নির্বাচন হবে নির্দলীয় ভিত্তিতে। কিন্তু ঘটা করে যেভাবে দল থেকে মনোনয়ন কিংবা সমর্থন দেওয়া হচ্ছে এবং দলের রাঘববোয়ালেরা যেভাবে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাতে নির্বাচনটা আর নির্দলীয় থাকছে না। মসজিদেও শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচার। নির্বাচনের আচরণবিধিকে যেভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশন কি নখ-দন্তহীন, না মেরুদণ্ডহীন? নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা অসীম। কিন্তু এই ক্ষমতা বাস্তবে প্রয়োগ করার ইচ্ছা, সাহস ও যোগ্যতা কমিশনের আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
কয়েকটি বড় রাজনৈতিক দল রীতি পাল্টে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার প্রস্তাব করেছে। শিগগিরই হয়তো আইন করে এটা জায়েজ করা হবে। রাজনৈতিক দলের জন্য এটা খুবই দরকার। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি এবং শিখেছি যে মেয়রের কাজ প্রধানত দুটি। দলের জনসভায় লোক সাপ্লাই দেওয়া এবং দলের ক্যাডারদের ঠিকাদারি পাইয়ে দেওয়া। যে ওয়ার্ডে সরকারদলীয় কাউন্সিলর নেই, সেই ওয়ার্ডে কোনো ‘উন্নয়ন’ হয় না, অথবা উন্নয়নের তাবৎ কাজ তত্ত্বাবধান করেন সরকারি দলের পরাজিত প্রার্থী অথবা তাঁর কোনো কুটুম।
আয়তনের দিক থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঢাকা একটি ছোট শহর, কিন্তু জনসংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বড়। ঢাকার জনসংখ্যা কত? কেউ বলেন দেড় কোটি, কেউবা বলেন দুই কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ঢাকা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেট্রোপলিটন এরিয়া’র মধ্যে টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার এবং নারায়ণগঞ্জও আছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা এক কোটির মতো। আমাদের তো সবকিছু বাড়িয়ে বলার অভ্যাস। এই শহরে মানুষ গাদাগাদি করে বাস করে। পানীয় জল, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ-সুবিধা এবং ঘরের মান অনুযায়ী বলা চলে এই শহরের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ প্রকৃত অর্থেই বস্তিবাসী। এ রকম সমস্যা-কণ্টকিত একটি জনপদকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য নিয়ে আসাটা একটা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যার সমাধান জয় বাংলা কিংবা জিন্দাবাদ স্লোগানের মধ্যে নেই। সাধারণ মানুষের সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারলে নগরবাসী স্বস্তি পাবেন।
এবারের সিটি নির্বাচনে কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য নজরে পড়ছে। মেয়র প্রার্থীরা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। পেছনে তাঁদের রাজনৈতিক মুরব্বিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যতই খিস্তিখেউড় করুন না কেন, প্রার্থীরা কথা বলছেন ভদ্রলোকের মতো, ‘জিব ছিঁড়ে ফেলব’ বা ‘মাটির নিচে পুঁতে ফেলব’—এ-জাতীয় কথা মেয়র প্রার্থীদের মুখে এখনো শোনা যায়নি। এটা ভালো লক্ষণ।
মেয়র প্রার্থীরা তাঁদের ইশতেহারে দুনিয়ার যত সুন্দর শব্দ ছেঁকে তুলেছেন, তা নাগরিকদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় কোনো আবর্জনা দেখা যাবে না, সবাই গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি পাবেন, যানজট জাদুঘরে চলে যাবে। সবাই নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন, ইত্যাদি। প্রার্থীরা অনেকেই জানেন না, তাঁরা তাঁদের এখতিয়ারের বাইরে কথা বলছেন। নির্বাচিত হয়ে যখন এর কোনোটাই তাঁরা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, তখন তাঁরা যুক্তি দেখাতে পারবেন, ‘আমাকে সরকার এই ক্ষমতা দেয়নি, তাই আমি আন্তরিকতা সত্ত্বেও অঙ্গীকার পূরণ করতে পারিনি।’ নিজস্ব সীমার মধ্যে থেকে প্রার্থীরা যদি কর্মসূচি দেন, তাহলে তা মনিটর করা সহজ, সম্ভব তাঁদের জবাবদিহির মধ্যে আনা।
মেয়র সাহেবেরা অতীতে শুধু দোকান বানানো আর দোকান বেচাকেনার পেছনেই ছুটেছেন বেশি। কারণ, তাতে ‘নগদ নারায়ণ’ মেলে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ চলাচল করে। তাদের অনেককেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে থাকতে হয়। অথচ তাদের প্রয়োজনমতো ‘পাবলিক টয়লেট’ নেই। ‘পাবলিকের’ সুবিধা হয়, এমন কিছু নিয়ে মেয়র সাহেবেরা বেশি ভাবেন না। অথচ নির্বাচনী ইশতেহারে কেউ একজন বলতে পারতেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে আমি ৫০০ পাবলিক টয়লেট বানাব, ৫০০ একর জমি বনায়ন করব’—এই হচ্ছে তার ম্যাপ এবং লোকেশন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট করে সংখ্যা বা পরিমাণ উল্লেখ করে এবং কত দিনের মধ্যে তার কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে, এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। তাঁদের প্রতিশ্রুতিগুলো একেবারেই সাধারণ, বাগাড়ম্বরপূর্ণ এবং বায়বীয়। ‘সবুজ ঢাকা চাই’ কথাটি যথেষ্ট নয়। বলতে হবে নগরকে আবর্জনা ও দুর্গন্ধমুক্ত করার জন্য আমি এই জায়গায় এত টন ক্ষমতাসম্পন্ন বর্জ্য পরিশোধনাগার তৈরি করব তিন কিংবা চার বছরের মাথায়।
নিরাপদ নগরের কথা বলছেন প্রার্থীরা। নাগরিকেরা আতঙ্কিত। কারণ, অনেক কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও আছে। একজন মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা আছে। সব কি মিথ্যা মামলা? আমরা কাদের হাতে জিম্মি হব? মাস্তানদের হাতে?
নগরে সেবাদানকারী অনেক সংস্থা কাজ করে। এদের একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় নেই। ঢাকা শহর দুই টুকরা করা হলো। সমন্বয়টা হবে কীভাবে? তাঁদের হাতে কি আলাদিনের চেরাগ আছে?
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে’ তর্কযুদ্ধ করতে থাকুন, সাধারণ নাগরিকেরা অস্বস্তিতে আছেন। কারণ, তাঁদের জন্য সমতল জমি তৈরি করে দিচ্ছেন না কেউ। নগর সরকারের নামে মেয়ররা আরও ক্ষমতা চান। নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত ‘স্পেস’ তৈরি করার কথা কেউ ভাবেন না।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com
যে কারণে সিটি নির্বাচনের প্রার্থী নই by কাসাফাদ্দৌজা নোমান ->বাংলাদেশ প্রতিদিন
আমি আজকাল স্বপ্নও দেখি সিটি নির্বাচন নিয়ে। স্বপ্নেই শেষ পর্যন্ত সিটি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। হাজারখানেক ভোট হলেই আমার হবে। জেতার জন্য না, মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়ার জন্য নির্বাচন করছি। কিন্তু সকালে গলি থেকে বের হতেই অসাবধানতাবশত ধাক্কা খেলাম একজনের সঙ্গে। সরি বলব কি উল্টা লোকটা আমাকে সরি বলে বললেন, ঠিকই আছে, আপনার দোষ নেই। ফুটপাতগুলো এমন অবস্থা যে ধাক্কা খেতেই হয়। লোকটার চিন্তা ভাবনার প্রশংসা করব এমন সময় থলের বাঘ বেরিয়ে গেল। তিনিও এবার ঢাকার সিটি নির্বাচনে একজন প্রার্থী। ভদ্রলোককে নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাসে চড়ে বসলাম। এই ভিড়ের মধ্যে আমড়াওয়ালা। এসব দেখে খুব বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকানোর আগেই পাশে বসা ভদ্রলোক বললেন, কী করবেন বলুন, একজন দায়িত্বশীল কেউ থাকলে কিন্তু এমন হতো না। বাসে যাত্রীরা উঠবে, আমড়া থাকবে আমড়া গাছে। কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। সবাই ইদানীং ভালো মানুষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রহস্য ফাঁস হয়ে গেল একটু পরেই যখন ভদ্রলোক বলে উঠলেন, জী, মানে আমি আক্কাস আলী, এবার সিটি নির্বাচন করছি আলু মার্কায়। আমি নির্বাচিত হলে এ ঢাকার বাসে আমড়ায়ালা থাকবে না। তিনিও প্রার্থী? অকস্মাৎ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ায় নীরব হয়ে গেলাম। বাস আমার গন্তব্যে চলে এসেছে। চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে প্রায় পড়তে পড়তে সামলে নিলাম। এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন, বাবা তোমার দোষ নেই। বাসগুলো ভীষণ অনিয়ম করে। ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য মাত্র মুখ খুলব, খালাম্মা বলতেই তিনি যা বললেন তাতে আমার আরেকবার বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে যেতে ইচ্ছা করছে। তিনিও একজন প্রার্থী। তড়িঘড়ি করে উঠে দৌড় দিলাম। বৃষ্টি পড়ছে। চায়ের দোকানে খুব ভিড়। রাস্তায় থকথকে কাদা। সঙ্গে পানিও বেড়ে চলেছে। এক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত। একজন যোগ্য প্রার্থীর অভাববোধ করছেন। এগিয়ে গেলাম, আঙ্কেল, আপনি কি এবারের সিটি নির্বাচন প্রার্থী?
: না। তবে আমার দুই ভাই, এক বোন...
: না থাক। আপনার কয় ভাই বোন বলা লাগবে না।
: আমার দুই ভাই, এক বোন, এক চাচা আরেক মামা সিটি নির্বাচন করবে। তাদের জন্য দোয়া করবেন।
কথা বাড়ানোর প্রশ্নই আসে না। দ্রুত স্থান ত্যাগ করলাম ভিজতে ভিজতে। রিকশা ডাকলাম। কিন্তু কোনো রিকশা যাবে না। যারা যেতে চায় তারা আমেরিকা যাওয়ার ভাড়া চায়। শেষে উপায় না পেয়ে একজনের সঙ্গে শেয়ারে রিকশা নিলাম। আমার বয়সী। রিকশা চলছে। ধুপ করে গর্তে একটা চাকা পড়ে গেল। ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, এ শহরের কিছুই হবে না।
: কেন?
: রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় কীভাবে এত বড় গর্ত থাকে? আপনি ইউরোপ আমেরিকার রাস্তায় যান। দেখবেন সেখানকার রাস্তায় কোনো গর্ত নেই। কারণ সেখানে যোগ্য লোক রয়েছে দেখাশোনার জন্য।
: হ্যাঁ সত্য।
: চিন্তা করবেন না। আমি সাপলুডু মার্কায় ইলেকশন করছি। আপনি?
আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কিছুই মনে পড়ছে না। অনেক চেষ্টা করলাম। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে। কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু একটা লাইনই মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে- এবার আমি সিটি নির্বাচন করব না।

Saturday, March 28, 2015

নারীর ক্ষমতায়নে পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক শিক্ষা জরুরি by নাসরীন গীতি

শুরু করতে হচ্ছে নজরুলের কবিতার সেই জনপ্রিয় দু’টি পংক্তি দিয়েই- “কোন কালে একা হয়নিক’ জয়ী পুরুষের তরবারী, শক্তি দিয়াছে প্রেরণা দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী”। আমাদের জাতীয় কবির উপলব্ধিতে এত শক্তিধর যে নারী তার ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বারবার কেন আওয়াজ তুলতে হচ্ছে? অনেক ভাবনার পর, বিভিন্ন জনের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পর, খুঁজে পাওয়া গেল কারণ একটাই, যথার্থ শিক্ষার ঘাটতি। কেননা এই শিক্ষার সাথেই জড়িয়ে আছে তার বুদ্ধি-বৃত্তির বিকাশ। সেইসাথে নিজের অবস্থান দৃঢ় করা। তবে সোজাভাবে যা বলছি, বিষয়টি এত সহজে বুঝার নয়। এর গভীরতা খুঁজতে দ্বারস্থ হতে হবে ইতিহাসের এবং সভ্যতার শুরুর সেইক্ষণের।
বলছি মানব জাতির ইতিহাসের শুরুর দিকের কথা। সেই সময় একজন নারীই ছিলেন সবচেয়ে বেশি শক্তিধর। কারণ নারী শিশুপালন, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে শিকারও করতেন। এইজন্য সেইসময় নেতৃত্বে ছিলেন নারী। কিন্তু কালক্রমে পুরুষের মাথায় একটি বিষয়ে ত্বরিৎ বুদ্ধি খেলে গেল যে, নারী যখন সন্তান ধারণ করে ও জন্ম দেয় তখন অনেকটা সময় সে শিকারে যেতে পারে না। পুরুষ সঙ্গীটিই তার খাদ্যের যোগানদাতা হন সেইসময়টুকুর জন্য। তখন তারা একটি পরিকল্পনা করলো যে, পুরুষের যেহেতু এই ঝামেলা নেই, তাই তারাই শিকার করবে আর নারীরা গৃহস্থালীর কাজ ও সন্তান লালন-পালন করবে। এই ভাবনাতেই এগুতে থাকলো আমাদের পুরুষ সমাজ। আর প্রতিনিয়ত পশু শিকার করতে গিয়ে দিনকে দিন নানা কৌশল অবলম্বন করতে করতে, এক পর্যায়ে নারীদের করে দিল অন্দরমহলের বাসিন্দা। ধীরে ধীরে নারীরাও ভুলে যেতে থাকলেন নানা কৌশলে কাজ করা। আর তখনই গোত্রপতি বা সমাজপতি হয়ে উঠতে থাকলেন পুরুষরা। ভেঙ্গে পড়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। গড়ে উঠে পুরুষতন্ত্র। সেই থেকে তারা নারীদের করে রাখছেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। ধরেই নেয়া হয়, তার কোন বুদ্ধি নেই, বিবেচনা নেই।
অথচ, ইতিহাস ঘাটলে প্রায়শই দেখা যাবে নারী যখনই কোন শীর্ষ স্থানে ছিলেন, কিংবা নেতৃত্বে গেছেন- নিজ গুণেই তাতে তিনি সফল হয়ে উঠেন। আর তার বহি:প্রকাশ এখনও দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়। নারীরা যেখানেই সুযোগ পান সেখানেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখেন - কি ঘরে, কি বাইরে। উপমহাদেশের নারী নেত্রী ইলা মিত্র দেখিয়েছেন কী ভাবে পরাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার দেখিয়েছেন কী ভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। বর্তমান বাংলাদেশেও নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান। দেশে সরকার প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেত্রী এখন নারী। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রধান হিসেবেও বাংলাদেশে নারীদের স্থান লক্ষ্যণীয়।
আয়না- একজন উচ্চ শিক্ষিত নারী। ছোট বেলাতে বেড়েও উঠেছেন শিক্ষিত আর সচেতন মানুষের সংস্পর্শে। বর্তমানে সে একজন সফল পেশাজীবী। ঘরেও সুগৃহিণী। সবকিছুই ঠিকঠাক দেখতে চান তিনি। সেইভাবে কাজও করেন। তবে শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় তার এ উন্নতি হয়েছে তা নয়, শিখেছেন পরিবার, পরিজন আর সমাজ থেকেও। যখন বাইরের জগতে বেরিয়েছেন প্রতিটি মুহূর্তই আয়না শিখেছেন কিভাবে সবার মাঝে নিজের আসন তৈরি করতে হয়। সবার মতকে আমলে নিয়ে নিজের মতের প্রতিফলন ঘটানোর কায়দাও তিনি রপ্ত করেছেন বিভিন্ন ধাপে নানাজনের সাথে মিশে। নারীর নিজস্ব পরিচয় তথা স্বকীয়তার জন্য এই শিক্ষাটাই নিতে হবে সবার আগে।
এরকম একটা বোধ থেকেই আমাদের নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত  হোসেন বেরিয়ে এসেছিলেন পথে। চার দেয়ালের বেষ্টনি আর পর্দা প্রথার কড়া বিধি-নিষেধের সময় নিজের তাগিদ থেকেই শিক্ষা অর্জনে মনোনিবেশ করেন তিনি। বাবার কড়া নিষেধ উপেক্ষা করে বড় দু’ভাই, পরবর্তীতে স্বামীর সহযোগিতায় কিশোরী রোকেয়া নিজের মধ্যে জ্বেলেছেন জ্ঞানের আলো। স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে, নারীমুক্তি তথা নারীর উন্নতির জন্য প্রথমেই দরকার আদর্শ ও প্রকৃত শিক্ষা। কিন্তু কিভাবে এই বোধ জাগাবেন অন্দর মহলের রন্ধনশিল্পীদের মনে। শুরু করেন লড়াই। নিজে সফলও হন। কিন্তু প্রায় দুই শতাব্দী পেরিয়ে এলেও আমরা এখনও সেই রোকেয়ার শুরুর জগতেই আছি বলেই মনে হয়। 
সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিনের অনভ্যাসবশত মেয়েদের বেশিরভাগই এখন আর পরিশ্রম করতে চান না। এই আধুনিক সভ্যতায়ও অনেক নারীকে বলতে শোনা যায় যে, এত পড়ালেখা করে দরকার কি? আমি তো স্বামীর ঘাড়ে বসেই খাব। আবার কেউ কেউ পুঁথিগত শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মনের আসল শিক্ষাটি অর্জন করেননি। অথচ একজন নারীকে সংসার সামলিয়ে অফিস-আদালত করতে হচ্ছে। যাদের এইসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার উপযুক্ত শিক্ষাটা অর্জিত হয় নি, তারা ঘরকন্যার কাজ করেই হাঁপিয়ে উঠেন, আবার অনেকে শুধু বাইরের কর্মক্ষেত্র সামলিয়েই অস্থির হয়ে উঠেন। তবে এখন অনেকটাই এ ব্যাপারে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ এখন অনেকেই নিজের বিকাশে পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক জ্ঞানটা প্রথমেই পরিবার থেকে এবং পরে বন্ধু, প্রতিবেশি থেকে আহরণ করে নেন।    
উর্মি লোহানী, গুণীজন ফাউন্ডেশনের কর্ণধার। যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপশি জন্ম থেকেই পরিবেশটা পেয়েছেন জ্ঞান আহরণের। তারপরও কর্মক্ষেত্রে এসে অনেকের কাছে শুনতে হয়েছে এটা তুমি পারবে না, ওটা ওকে দিয়ে হবে না ইত্যাদি নানা কথা। অতঃপর নিজের যোগ্যতা আর শিক্ষা দিয়েই অর্জন করে চলেছেন সফলতার অভিজ্ঞতা। এই উদীয়মান সফল ব্যক্তিত্ব উর্মিও বিশ্বাস করেন নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক শিক্ষাটা দরকার সবার আগে। আর নারীর ক্ষমতায়ন কার্যকর করতে বাস্তবিক অর্থে পুরুষদেরও এ ব্যাপারে জ্ঞান থাকা জরুরি বলে মনে করেন ঊর্মি। কেননা শুধু সমাজে তো নারীর একা বিচরণ নয়!
অনেকে আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে বলেন যে, নারীশিক্ষা ও বাইরে কাজ করা নিষিদ্ধ। কিন্তু এমন কোন তথ্য পবিত্র কুরআন শরীফে তো না-ই, ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ আছে এটা কেউই বলতে পারবে না। কারণ কোরআন শরীফেই জ্ঞানচর্চার উপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেখানে কোথাও বলা হয়নি শিক্ষা শুধু পুরুষের জন্য। আবার ইসলামে নারীর ক্ষমতায়নেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোরআন শরীফেই বলা হয়েছে, মেয়েরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। আর তাতে যে আয় হবে, তা মেয়েদের নিজস্ব আয় হিসেবে গণ্য হবে। কোরআন শরীফের চার নম্বর সূরার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নারীর আয় নারীর, পুরুষের আয় পুরুষের। এতো গেল নারীর ক্ষমতায়নের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী।
এদিকে, সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বহুল প্রচলিত সেই উক্তিটিও কিন্তু অর্থবহ। তিনি বলেছিলেন-একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব। তাই যুগের সাথে দেশ ও জাতির উন্নয়নে নারী শিক্ষা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আর শুধু গ্রন্থগত বিদ্যা নয়, দরকার সামাজিক শিক্ষাও। আর এই দুইয়ের সমন্বয়েই সমাজ-দেশ হবে উন্নত। গঠিত হবে সুস্থ জাতি। কারণ প্রচলিত প্রবচনটি সবারই জানা- যে হাত দোলনা দোলায়, সে হাত বিশ্ব শাসন করে।     
লেখক: সিনিয়র নিউজরূম এডিটর, বাংলাভিশন

স্বাধীনতা ও ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৯৪৭ সালে শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া গেল সেটাকে স্বাধীনতা বলার উপায় নেই, সেটা ছিল ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত অবস্থায় ১৯৩৫ সালের ভারতশাসন আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের মধ্য দিয়ে প্রদত্ত ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস লাভ, যার অর্থ দাঁড়ায় ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রাপ্তি। ব্রিটিশ শাসকরা স্বাধীনতা দেবে না এটাই ছিল স্বাভাবিক, না দেওয়ার জন্য যা যা দরকার তারা সেগুলোর কোনোটা করা থেকেই বিরত থাকেনি। তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেওয়া। দৃশ্যত কাজটা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগই করেছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ঔপনিবেশিক শাসকরা যে ছিল সেটা মোটেই মিথ্যা নয়। কংগ্রেস ও লীগের কলহ এবং সংঘর্ষের দরুনই দেশ ভাগ হয়েছিল এবং স্বাধীনতার বদলে দেশবাসীর ঘাড়ে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন চেপে বসেছিল, এটা দৃশ্যমান সত্য; নেপথ্য দুর্বৃত্ত ছিল শাসকরা। কিন্তু এটাও তো মানতেই হবে যে, ১৯৪৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিতে কংগ্রেস ও লীগ উভয় দলই ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে, দেশকে ভাগ করে দেওয়ায় মাউন্টব্যাটেনকে নানা মাত্রায় ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং বাইরে যা-ই বলুক না কেন সংঘর্ষে লিপ্ত দুই দলের কোনো দলই প্রকৃত স্বাধীনতা চায়নি। প্রয়োজনে দেশবাসীকে তারা গৃহযুদ্ধের দিকে পরিচালিত করতেও প্রস্তুত ছিল। সেই প্রয়োজনটা অন্য কিছুই নয়, নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া ছাড়া।
তাঁরা স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছেন ক্ষমতার হস্তান্তর। তাই ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনে তাদের অসুবিধা হয়নি, বরঞ্চ সুবিধাই হয়েছে, কারণ ভারতশাসন আইনের মাধ্যমে আগে যারা দেশ শাসন করত তাদের ছেড়ে-দেওয়া ও সাজানো-গোছানো আসনগুলোতে নতুন শাসক হিসেবে এঁরা বসে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেছেন। দেশভাগও মেনে নিয়েছেন, কেননা দেশভাগ না ঘটলে দুই দলের ভেতর ক্ষমতা নিয়ে যে বিরোধ তার কোনো মীমাংসা হচ্ছিল না এবং ব্রিটিশ শাসকরা কিছুটা কৌতুকের সঙ্গেই তাগাদা দিচ্ছিল দ্রুত মীমাংসায় পৌঁছার জন্য। ভাবটা এই রকমের যে তারা তো উড়োজাহাজ তৈরি রেখেছে প্রস্থান করবে বলে, কিন্তু হানাহানি না থামলে ক্ষমতা যে দিয়ে যাবে সেটা কার হাতে। অতএব, মীমাংসা প্রয়োজন। দেশভাগ সেই মীমাংসারই নাম। তাতে নেতাদের সুবিধাই হয়েছে, দাম যা দেওয়ার দিতে হয়েছে হতভাগা দেশবাসীকেই, নাকের বদলে নরুন পাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা যদি ঘটে থাকে তবে তা ঘটেছে সাধারণ মানুষের জীবনেই।
স্বাধীনতার প্রশ্নে অত্যন্ত পরিষ্কার ও দৃঢ় অবস্থান গান্ধী বা জিন্নাহ কারোই ছিল না, বরঞ্চ ছিল পরবর্তী প্রজন্মের দুই প্রতিনিধি সুভাষ চন্দ্র বসু এবং জওহরলাল নেহেরুর। অপরদিকে জিন্নাহ আগাগোড়াই ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা ভেবেছেন, নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল হতে আপত্তি করবেন কি অন্যদের ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না দিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের গোপন পরামর্শ সভা বসিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন যে ওই পদটিতে তাঁকেই কেবল মানাবে। লাহোর প্রস্তাবে independent states-এর কথা ছিল; কিন্তু সেই independence বলতে যে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা বোঝানো হয়েছে তা নয়, কি বোঝানো হয়েছে সেটা টের পাওয়া যায় ইংরেজরা চলে গেলে মুসলমানদের (অর্থাৎ জিন্নাহর নিজের) ভাগে কতটা পড়বে তা নিয়ে তাঁর ব্যস্ত থাকা দেখে। পরে independent states-এর বদলে যে তিনি একটি state-এর কথা বলা শুরু করেছিলেন তার পেছনে মনোভাবটা ছিল এই রকমের যে, ওই অখণ্ড রাষ্ট্রে ইংরেজরা থাকবে না ঠিকই, কিন্তু তাদের তৈরি করা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটা থাকবে। ইংরেজরা জিন্নাহকে কখনো কখনো বিরক্তিকর ব্যক্তি বলে হয়তো মনে করেছে, কিন্তু কখনোই শত্রু ভাবেনি, বরঞ্চ কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ হিসেবে জিন্নাহকে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য সুযোগ করে দিয়েছে। কংগ্রেসের নেতারা বারবার কারাবন্দী হয়েছেন, কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসকরা গান্ধীর পরেই যে নেতার নাম শোনা যেত সেই জিন্নাহকে এমনকি একদিনের জন্য বন্দী করাটাও আবশ্যক মনে করেনি।
সুভাষ বসু যে সরকারি চাকরির মোহ ত্যাগ করে রাজনীতিতে এসেছিলেন তার পেছনে অনুপ্রেরণা ছিল একটিই, ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা। দেশে ফিরে সুভাষ স্বাধীনতার কথাই ভাবতেন, ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসনের নয়। তাঁর নিজের ওপর গান্ধীর তুলনায় চিত্তরঞ্জনের প্রভাবই বরঞ্চ অধিক পরিমাণে পড়েছিল এবং চিত্তরঞ্জনের সঙ্গে তিনি এ-বিষয়ে একমত ছিলেন যে, একটি পরাধীন দেশে যে-সমস্যার কথাই ভাবা যাক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে সেটি একটি রাজনৈতিক সমস্যা হতে বাধ্য। স্বাধীনতার যে কোনো বিকল্প নেই এটি তাঁর কাছে অল্প সময়েই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এবং স্বাধীনতা না-পেলে যে ভারতের মুক্তি নেই এটি তাঁর জানা হয়ে গিয়েছিল, তবে অরবিন্দের মতো তিনি আধ্যাত্মিকতার পথ ধরেননি, গান্ধীর অহিংসার পথকেও কার্যকর বলে মনে করেননি। উভয় পন্থার বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ধারাবাহিক গণআন্দোলনে।
স্বাধীনতার প্রশ্নে জওহরলাল নেহেরুর অবস্থানও সুভাষ বসুর মতোই স্পষ্ট ছিল। তাত্তি্বক ও দার্শনিকভাবে নেহেরুর সঙ্গে তুলনীয় নেতা ভারতবর্ষে সেকালে কমই ছিলেন; কিছুটা কাছাকাছি ছিলেন এম এন রায়, কিন্তু রায় ভারতবর্ষকে তেমনভাবে জানেননি, বুঝতেও পারেননি, নেহেরু যে-ভাবে জেনেছেন ও বুঝেছেন। ১৯৩৪-৩৬-এ লেখা তাঁর আত্মজীবনীতে নেহেরু স্বাধীনতা বলতে কি বোঝেন সেটা সুন্দরভাবে বলেছেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল না, ছিল সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। ইংরেজ চলে যাবে, তার জায়গায় স্থানীয়রা ক্ষমতা পাবে, অথচ সমাজ ও রাষ্ট্র আগের মতোই রয়ে যাবে, ওই ব্যবস্থাকে তিনি স্বাধীনতা বলে মানতে আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। জমিদারি ও মহাজনী শোষণ অক্ষুণ্ন রেখে স্বাধীনতার লাভ যে অসম্ভব তা তিনি প্রত্যক্ষ জ্ঞান থেকে বুঝেছেন।
স্মরণীয় যে এসব নেতার অনেকেই ছিলেন আইনজীবী। স্বাধীনতা এঁদের জন্য ছিল ব্যক্তিগত লাভের প্রতিশ্রুতি। নেহেরুর আত্মজীবনীর প্রামাণ্য বাংলা অনুবাদ করেছেন সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার; স্বাধীনতার বিষয়ে উদারপন্থিদের মনোভাব সম্পর্কে নেহেরুর মন্তব্যকে বাংলায় উপস্থাপিত করতে গিয়ে তিনি যোগ করে দিয়েছেন 'রামের বদলে শ্যামে'র উপমা। অর্থাৎ উদারপন্থিরা চেয়েছে রামের বদলে শ্যামকে; এর বেশি কিছু নয়। এই বাংলা উপমা মূল বইতে নেই। দেশবাসীর অভিজ্ঞতা অবশ্য বলছে কিছুটা ভিন্ন কথা। সেটা এই যে, রাষ্ট্রীয় গদিতে রামের জায়গায় শ্যাম বসে পড়বে এমন সম্ভাবনা দেখে রহিমও এসে হাজির হয়েছে, সেও বলছে ওই আসনে তার জায়গা চাই। আর ওই যে রাম অর্থাৎ ইংরেজ, সে তখন করতালি দিয়ে রহিমকে বলেছে, হ্যাঁ, তাই তো, রহিম কেন বঞ্চিত হবে; আমি রাম তো তৈরি আছি ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাব বলে, তোমরা শ্যাম ও রহিম নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নাও কে কোন অংশ নেবে। শেষ পর্যন্ত ভাগাভাগিটা অবশ্য ইংরেজই করে দিয়েছে, ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর কলমের দাগ দিয়ে র্যাডক্লিফের যে সীমানা কেটে দেওয়া সেও তো এক ইংরেজ ব্যারিস্টারেরই ঔপনিবেশিক কর্তব্যপালন।
সুভাষ ও নেহেরু উভয়েই আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন, গান্ধী যা ছিলেন না; গান্ধী সারা বিশ্বে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু বিশ্বে, বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে, কি ঘটছে সে-বিষয়ে মোটেই অবহিত ছিলেন না। অপরদিকে সুভাষ ও নেহেরু উভয়েই ছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন না-করতে পারলে স্বাধীনতা যে কেবল কথার কথাই রয়ে যাবে, তার চেয়ে গভীর কিছু হবে না, এ বিষয়ে নেহেরু স্পষ্ট জানতেন। মার্কসের লেখা এবং লেনিনের কাজ সম্পর্কে তিনি কেবল অবহিত নন, তাঁদের দ্বারা প্রভাবিতও হয়েছিলেন। লেনিনকে তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ নেতা বলে মনে করতেন। এসব বক্তব্য তাঁর আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়। সমাজতন্ত্রে আস্থা সুভাষেরও ছিল।
অনেক ব্যাপারেই সুভাষকে গান্ধীর বিপরীত অবস্থানে দাঁড়াতে হয়েছিল, তবু গান্ধী যেমন স্বাধীনতাকে একটি ভারতীয় রূপ দিতে চেয়েছেন, সুভাষও তেমনি বলতেন যে সমাজতন্ত্রকেও ভারতীয় রূপ দেওয়া আবশ্যক হবে। কমিউনিজম সম্পর্কে সুভাষের আপত্তি ছিল দুটি। একটি হলো এই মতবাদ নাস্তিক্যবাদের প্রশ্রয় দেয়, অপরটি হলো কমিউনিজম জাতীয়তাবাদবিরোধী। উভয় আপত্তিই অবশ্য ছিল অপ্রাসঙ্গিক। ধর্মনিরপেক্ষ ও ইহজাগতিক নেহেরু কমিউনিজমের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক আছে, নাকি বিরোধ রয়েছে এ নিয়ে মোটেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন না; যদিও ভারতীয় কমিউনিস্টরা ভারতকে ঠিক বোঝেননি এমন অভিযোগ তাঁর সব সময়েই ছিল।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ব্যাপারে নেহেরুর ভূমিকার তুলনায় সুভাষের ভূমিকা অবশ্যই বড় ও আপোসহীন, আজাদ হিন্দ ফৌজের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে তিনি যে মাপের একটি ধাক্কা দিয়েছিলেন, নেহেরু তেমনটি দিতে পারেননি। তদুপরি গান্ধীর সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নেহেরু যেভাবে গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে আপোস করে ফেলেছিলেন, সুভাষ তেমনটি করেননি; এতে সুভাষ অনেক বেশি স্বাধীনচেতা ছিলেন। কিন্তু মতাদর্শগত দার্শনিক প্রশ্নে সুভাষ নেহেরুর তুলনায় যে পিছিয়ে ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই দুই নায়ক যদি একত্রে কাজ করতে পারতেন তাহলে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং দেশভাগের পরিবর্তে হয়তো এক প্রকারের স্বাধীনতাই পাওয়া যেত; কিন্তু তাঁদের পক্ষে কাছাকাছি এসেও একযোগে কাজ করা সম্ভব হয়নি, যার জন্য ক্ষতি হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এবং পরবর্তী ইতিহাসের। গান্ধী ধর্মীয় ভারত, নৈতিক ভারত, আধ্যাত্মিক ভারত, সনাতন ভারত ইত্যাদির কথা বলেছেন, কিন্তু তাঁর কালে মূল সত্য ছিল রাজনৈতিক ভারতই, যেখানে লড়াইটা চলছিল স্বাধীনতার জন্য, এবং যাতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা স্বয়ং গান্ধীরই। কিন্তু রাজনীতি থেকে গান্ধী মাঝে মধ্যেই সরে যেতেন, কাজ নিতেন সমাজ সংস্কারের। তবে সমস্যাটা তো রয়েই যায় যে, সমাজে মৌলিক সংস্কার আসবে কি করে রাষ্ট্র যদি সমাজকে শাসন করতে থাকে, এবং সমাজের যত দুর্বলতা সেগুলোর রক্ষক ও পরিপালক হয়ে দাঁড়ায়? এ ধরনের প্রশ্নের জবাব গান্ধীর লেখায় তো পাওয়া যায়ইনি, তাঁর কাজের মধ্যেও সন্ধান মেলেনি। স্বাধীনতাকে তিনি একটি ভারতীয় চেহারা দিতে চেয়েছেন, যেমনভাবে পরবর্তীতে পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে ক্ষমতা জবরদখলকারী স্বৈরশাসকদের সবাই গণতন্ত্রকে 'দেশীয়' সাজে, অর্থাৎ নিজেদের সুবিধামতো রূপে সজ্জিত করতে চেয়েছেন। স্বাধীনতাকে ভারতীয় রূপ দানের প্রসঙ্গে গান্ধী রামরাজ্যের কথা বলতেন। তাঁর মতে রামরাজ্যই হলো ভারতীয় গণতন্ত্র, যে রাজ্যে জনগণের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিটা রাজনৈতিক নয়, নৈতিক বটে (moral authorit)। গান্ধী রামের ভক্ত ছিলেন; আমরা স্মরণ করি যে, অাঁততায়ীর আঘাতে প্রাণ হারানোর চরম মুহূর্তে তিনি রাম নামই উচ্চারণ করেছিলেন, অন্য কিছু নয়।

Friday, March 27, 2015

যে কারণে মোদির না আসাই ভালো by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

বাংলাদেশ প্রতিদিনের শুরু থেকে প্রিয় নঈম নিজাম যেমন জড়িত, ঠিক তেমনি আমিও শুরু থেকেই লিখে চলেছি। দু-একবার মনে হয়েছে এ পত্রিকায় আর না লেখাই উচিত। একবার কোনো লেখা না ছাপার কারণে কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রেখেছিলাম। নিয়মিত লিখলেই যে পত্রিকা কারও পক্ষে যাবে তা নয়, স্বার্থহানি হলে পক্ষে থাকে না- এটা পাঠকদের বোঝানো যায় না। রাজনীতি, মিটিং-মিছিল করি তাই কোনো কোনো পত্রিকায় প্রায়ই খবর ছাপা হয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনে সে খবর কেউ খুঁজে না পেলেই প্রশ্ন করে, কী ব্যাপার প্রতিদিনে খবর নেই কেন? সাপ্তাহিক লেখা আর আমাদের কর্মকাণ্ডের খবর এক জিনিস নয়- এটা অনেককে বোঝানো যায় না। মঙ্গলবারে দু-এক সপ্তাহ নিয়মিত না লিখলে দু-চারশ পাঠক তো কমবে। কিন্তু তারপরেও কেন তারা আমাদের খবর ছাপে না বা গুরুত্ব দেয় না তা আমি জানব কী করে? গত ৪২ দিন মতিঝিলের ফুটপাতে আছি। কোনো দিন নাই যে কোনো না কোনো পত্র-পত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর বের হয়নি। কেউ ছোট কেউ বড় কোনো না কোনো আকারে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনও করেছে, হয়তো অন্যদের চেয়ে কম করেছে। কিন্তু ৮ মার্চ অবস্থানের ৪০ দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মীরা বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যে অমূল্য মতামত দিয়েছে যা অনেক পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে। অথচ বাংলাদেশ প্রতিদিনে সে খবর স্থান পায়নি। কতজনের কত প্রশ্ন, কিন্তু জবাব দিতে পারি না।
দু-কথা লিখতে চেয়েছিলাম এক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও টকশো উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা মুন্নী সাহা সম্পর্কে। আমরা কুয়োর ব্যাঙ জাহাজের খবর রাখি না, কার খোটার জোর কত তাও জানি না। জীবনে কত সাংবাদিক দেখেছি, ভারতের প্রখ্যাত কলামিস্ট খুশবন্ত সিং, কুলদীপ নায়ার, সম্পাদক রাজেন্দ্র সারীন, হিরণ্ময় কার্লেকার, আনন্দ বাজারের বরুণ সেনগুপ্ত, অভীক সরকার, তার বাবা অশোক সরকার, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ওপর গবেষক প্রবীণ সাংবাদিক-সাহিত্যিক অমিতাভ চক্রবর্তী, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদা শংকর রায়, মনোজ বোস, প্রবোধ কুমার সান্যাল, সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত। আমাদের দেশের কত কত বিখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় উঠাবসা, কত উপস্থাপককে চিনি জানি। কিন্তু মুন্নী সাহার মতো কড়কড়ে কণ্ঠের রাগঢাক না করা কোনো উপস্থাপক দেখিনি। একদিন তিনি জনাব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে বলেছিলেন, আপনাকে তো লোকে বিশ্ব বেহায়া বলে। একটা রাজনৈতিক নেতাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষিপ্ত লোকজন কত কথাই তো বলে। শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের বলা আর কোনো অনুষ্ঠান উপস্থাপকের সরাসরি বিব্রতকর অশ্লীল কথা বলা এক কথা নয়। কিন্তু তাকে বুঝাবে কে? খেয়াল নেই, কয়েক মাস আগে সরাসরি প্রচারে তার এক ক্যামেরাম্যান আমার বাসায় গিয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন। তিনি বিএনপির এক ইফতার মাহফিলে যাওয়ায় মুন্নী সাহা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি তো তাদের ইফতার মাহফিলের শিরোমণি, মধ্যমণি ছিলেন। আপনি বিএনপি সম্পর্কে বলুন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কম করে আমার থেকে ১০-১২ বছরের বড়। আমরাও খুব সংযত হয়ে তার সঙ্গে কথা বলি। অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমাকে সংযুক্ত করলে বলেছিলাম, মুন্নী সাহা আপনি কি জানেন, শিরোমণি আর মধ্যমণির আভিধানিক পার্থক্য কি? দুষ্টের শিরোমণি আর ভালোবাসার অাঁধার মধ্যমণি জানি না তার বোধোদয় হবে কিনা। কিছু দিন আগে কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীককে প্রসঙ্গ ছাড়াই বলে বসেছিলেন, আপনি তো ওয়ানম্যান পার্টি। ক্ষুব্ধ জেনারেল ইবরাহিম প্রতিবাদ করেছিলেন, অনুষ্ঠান থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন। মুন্নী সাহা তার বক্তব্য প্রত্যাহার করায় সে যাত্রায় বেঁচে যান। জাতির শ্রেষ্ঠ গৌরব একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে কতখানি সম্মান করা উচিত সে বোধও খুব একটা নেই। শুনেছি, অনেককেই তিনি তাচ্ছিল্য করে এটা ওটা বলেন, কেন বলেন, কীভাবে বলেন- এসবের কোথায় অন্তর্নিহিত শক্তি কিছুই জানি না। যে চ্যানেলের তিনি সর্বেসর্বা, তার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান একটা ভালো পরিবারের সন্তান ও জনাব ফিরোজ কবির অসাধারণ সজ্জন ব্যক্তি। তার ভাই সরকার কবির উদ্দিন রেডিও পাকিস্তান এবং টিভিতে খবর পড়তেন। অমন নামকরা খবর পাঠক আমাদের দেশে খুব বেশি ছিল না। ঢাকা রেডিওতে ২৫ শে মার্চ রাতের শেষ খবর পড়তে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান রেডিওতে আমার জীবনের শেষ খবর পড়া হলো। যদিও এসব ত্যাগী মানুষের কোনো কোনো কথায় স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠার ঘটনাকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা হয় না। তবু তারা আছেন, তাদের এসব ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতির হৃদয়পটে থাকবে চিরদিন। রাজনীতি করা মানুষ তাই বর্তমান ঘটনা প্রবাহের চাপে অনেক কিছু করতে চাইলেও করতে পারি না, লিখতে চাইলেও লিখতে পারি না। আজ ভারতের বিস্ময় জাগানো রাজনীতিবিদ, প্রায় ৩২-৩৩ বছর পর একক দল নিয়ে ক্ষমতায় আসার প্রাণপুরুষ শ্রী নরেন্দ্র দামাদোর দাস মোদির বাংলাদেশ সফরের বিষয় দু-চার কথা আলোচনা করি।
প্রায় সবাই জানেন, মহান ভারতের অনেক নেতা-নেত্রীর সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। সেক্ষেত্রে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, জনতা পার্টি, ভারতীয় জনতা পার্টি ও আরও অনেক দলের সঙ্গে কমবেশি উঠাবসা ছিল, এখনো যতটা সম্ভব চিঠিপত্র এবং দূরালাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ আছে। গত বছর যখন ভারতের লোকসভার নির্বাচন হয়, নির্বাচনের আগে ভারতের অনেক পণ্ডিতের ধারণা ছিল অবশ্যই বিজেপি লোকসভায় বেশি সিট পাবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কারণ সরকার গঠন করতে যেহেতু অন্য দলের সমর্থন লাগবে, সেহেতু তারা গুজরাটের দাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন করবে না। তাই বিজেপির সরকার হলেও শ্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন না। তাদের যুক্তি খুব একটা ফেলনা ছিল না। এ নিয়ে ভারতীয় অনেক কূটনীতিকও আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। কিন্তু কেন যেন আমার সব সময় মনে হয়েছে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের দিন ১৫ আগেও বিজেপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ উচ্চ পর্যায়ের একজন ঢাকায় এসেছিলেন। তার ধারণাও তেমনই ছিল। যেহেতু আমার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল তাই তাকে আমি আমার মতো জানিয়েছিলাম। সেই কবে ভারতীয় একক দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রায় লুপ্তির পথে ছিল যেটা আবার ফিরে এসেছে। তবে ইলেকশনের আগে কথা উঠেছিল যে কোনো নারী নেতৃত্বে ভারতে মিলঝুল সরকার হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিল নাড়ুর জয়ললিতা, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতি এরা মিলে শতাধিক সিট পেলে তাদের মধ্যে কেউ একজন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু কেন যেন আমার তেমন মনে হয়নি। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেস খুবই ভালো করেছিল। ৪২ আসনের ৩৮ আসন পেয়েছিল তারা। ২টি কংগ্রেস, ১টি বিজেপি, ১টি সিপিএম। অন্যদিকে তামিলনাড়ুর ৩৯ সিটের মধ্যে ৩৭টি পেয়েছিলেন জয়ললিতা। কিন্তু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর দল লোকসভায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সোয়াশ বছরের প্রবীণ দল কংগ্রেসের সিট নেমেছে ৫০ এর নিচে। পৃথিবীর এক আশ্চর্য ঘটনা। শ্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম লোকসভায় প্রবেশ করে এক অসাধারণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। কারণ ওর আগে তিনি কখনো লোকসভার সদস্য ছিলেন না। লোকসভায় প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই নেতা হয়েছেন। তাই তিনি বলেছিলেন, আমি এখানে সম্পূর্ণ নতুন। কিছুই জানি না। ভুল হলে প্রবীণরা ক্ষমা করবেন। আপনাদের কাছ থেকে জেনেশুনে আস্তে আস্তে আমি শিখে নেব। সেই সময়টুকু আপনারা আমাকে দেবেন। গত সেপ্টেম্বরে ভারতের নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদি প্রথম জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে দেওয়া এক সম্বর্ধনায় প্রায় ২৪ হাজার লোকের মধ্যে এমন এক অসাধারণ বক্তব্য দিয়েছিলেন যা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। একপর্যায়ে তিনি এও বলেছিলেন, 'ম্যায়নে চা বেস্তা বেস্তা ইহাতক পৌঁছ গিয়া। হাম পিছে নেহি দেখ্তা, হাম সিধা দেখ্তা।' শ্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে প্রায় ১৮-২০ বছরের প্রবীণ আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী সেই আমেরিকাতেই ১৪-১৫ জনের সামনে এক বক্তৃতা করে জীবনের সব কিছু খুইয়েছেন। মুসলমান হিসেবে তাকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিলাম। তার জন্যও আমাকে নিদারুণ গালাগাল করেছেন। তা করুন, বড় ভাই হিসেবে জন্মেছেন, গালাগাল বা তিরস্কার করার তার জন্মগত অধিকার। তাই এসব নিয়ে কিছু ভাবি না। সারা জীবন আওয়ামী লীগ করেছেন। আওয়ামী লীগ তাকে ত্যাগ করেছে। মুসলমান হিসেবে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তার জন্য এখনো আমি আমার জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করব না।
গত আগস্টে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির এডিশনাল সেক্রেটারি প্রদ্যুৎ গুহের একমাত্র ছেলের বিয়ে ছিল। আমি যখন ভারতে নির্বাসনে তখন প্রদ্যুৎ গুহ পশ্চিমবঙ্গ যুব কংগ্রেসের জনপ্রিয় সভাপতি ছিলেন। অনেক বছর মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে আছেন। বাঘা দা বলতে অজ্ঞান। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কারণে আগস্ট মাসে কোনো অনুষ্ঠানে যাই নাই। ৩ বা ৪ আগস্ট ছিল প্রদ্যুৎ গুহের ছেলের বিয়ে। সেখানে থাকা-খাওয়া সব ব্যবস্থা তারাই করেছিলেন। কিন্তু তারপরও তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকতে পারিনি। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ মানুষের কতটা আপন হতে পারে তা শর্মিলা বকশী মিলুকে না দেখলে বোঝা যায় না। আগে দিলি্লর এয়ারপোর্ট পালামে ছিল। এখন হারিয়ানার গোরগাওয়ে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তার পাশেই মিলুর বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ি। মিলু বাপ-মায়ের এক সন্তান। একই ভবনের একতলা নিচে মিলুর মা ড. অরুণা চক্রবর্তী থাকেন। সেটাও ৪-৫ হাজার স্কয়ার ফুটের বাড়ি। আমার ছোট ভাইয়েরা কয়েকবার লটবহর নিয়ে মিলুর বাড়িতে থেকেছে। তাই এবার শক্ত করে ধরেছিল, দাদা তোমাকে এবার আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে। মেয়েটাকে না করতে পারিনি। তাই সরকারি গাড়িতেই ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে যে কি অসাধারণ যত্ন করেছে বলতে পারব না। শরীয়তপুরের ডিঙ্গামানিক মিলুর পূর্ব পুরুষের বাড়ি। ওর ইচ্ছে ওর বাপ-দাদার ভিটায় একবার সে যাবে। আজ ১৫-২০ বছর ধরে বলছি, যখন খুশি এসে ঘুরে যা। মাঝে একবার এসেছিল। কিন্তু সময় হয়নি। এক ছেলে এক মেয়ে স্বামী নিয়ে ছোট সংসার। কলেজে পড়িয়ে সময় পায় না। মজার ব্যাপার, যখন ওর বাড়িতে ছিলাম, আসার আগের দিন ছিল ভাইফোঁটা। ১৮ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা কমর মহসীনের গুজরাটে বিয়ে হয়। তাকে গুজরাটের গভর্নর শ্রী স্বরূপ সিং বিদায়ের সময় তার মেয়ে পরিচয় দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ভাই বানিয়ে এসেছিলেন।
সেই থেকে সে প্রতি বছর তাকে ভাইফোঁটা দেয়। সেবারও সে ফোঁটা দেবে কিনা বা দিতে পারবেন কিনা- এ নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা চলছিল। ৮ আগস্ট ছিল সেই শুভ দিন। আমি ছিলাম মিলুর গোরগাওয়ের বাড়িতে। হিসেব করে দেখলাম ১৮ বছর ধরে এক মুসলমান বোন হিন্দু ভাই নরেন্দ্র মোদিকে ভাইফোঁটা দিচ্ছে আর ৩৬ বছর ধরে এক হিন্দু বোন মিলু তার মুসলমান ভাই কাদের সিদ্দিকীকে ভাইফোঁটা দিয়ে চলেছে। কি আশ্চর্য মিল। আগের দিন নরেন্দ্র মোদি নেপাল সফরে ছিলেন। ঢাকায় ফিরে খবর পেয়েছিলাম শ্রী নরেন্দ্র মোদি তার মুসলমান বোনের ভাইফোঁটা ঠিকই নিয়েছেন। সত্যিই তিনি এক আশ্চর্য মানুষ। একেবারে নিজের দক্ষতা যোগ্যতায় এতদূর এসেছেন। তাই আমাদের দেশ সফরে এসে সাধারণ মানুষের কোনো ভালোবাসা পাবেন না। বরং বিনা ভোটে জবরদখলকারী সরকারের আহ্বানে এসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়লে তা হবে আমাদের জন্য মর্মবেদনার কারণ।
তার পূর্ববতী সরকারের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং অবৈধ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এ সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। এই অপ্রিয় সরকার দেশ চালাতে সম্পূর্ণই ব্যর্থ। তাদের আহ্বানে বা আমন্ত্রণে বিপুল ভোটে নির্বাচিত একজন মহান নেতার আমাদের দেশে আসা উচিত না। বিশেষ করে আমাদের স্বাধীনতার জন্যে যে দেশের ১৪ হাজার বীর সেনার রক্ত আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। আমরা সেই দেশের নেতাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ১৬ কোটি মানুষ দুই হাত প্রসারিত করে উন্মুখ হয়ে আছি। তাই আমরা আশা করি, আমাদের উষ্ণ বুক তার সানি্নধ্য থেকে বঞ্চিত হবে না। আমরা ১৬ কোটি জনগণ তাকে হৃদয়ের সমগ্র উত্তাপ দিয়ে গ্রহণ করতে চাই- এ জন্য একটি জনপ্রিয় নির্বাচিত সরকারের আমন্ত্রণের অপেক্ষায় তাকে থাকতেই হবে। এই সরকারের দেশের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই শ্রী মোদির সফরে কেউ যদি রাস্তায় নেমে নিন্দাবাদ জানায় আমরা মুখ দেখাতে পারব না, বড় লজ্জায় পড়ব। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আশা করব ভারতের একজন সফল নেতা আমার দেশবাসীকে তেমন লজ্জায় ফেলবেন না।
লেখক : রাজনীতিক।