Wednesday, December 25, 2013

খ্রিস্ট জন্মোৎসবের আহ্বান by ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা

বড়দিনের তাৎপর্য উপলব্ধি ও প্রকাশ করার জন্য বিচিত্র ভাব-ভাবনা, ভাষা, প্রতীক ও ভঙ্গিমা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে আনন্দ, শান্তি, আলো, জীবন, ভালোবাসা, সত্য, সুখ, ঈশ্বরের সঙ্গে মিলন, ক্ষমা, নিরাময়, অলৌকিক কাজ বা আশ্চর্যকাজ, স্বর্গসুখ ইত্যাদি। সংক্ষেপে এগুলোকে বলা যায় মানবমনের গভীরতম আকাক্সক্ষা। মানুষের চেষ্টার ত্র“টি নেই। স্বজ্ঞানে-অজ্ঞানে, জেনে-না-জেনে মানুষ এগুলোর সন্ধান করছে। পূজা-পার্বণের মধ্য দিয়ে মানুষ আসলে সেই সত্যটাই প্রকাশ করছে। প্রকৃতপক্ষে এগুলোর জন্যই জীবনভর মানুষের সব পরিশ্রম ও সাধনা। কেননা এ জগতে মানুষের জীবন নানাবিধ বাধা-বন্ধনে আবদ্ধ। এই বন্ধন থেকে সে মুক্ত হতে চায়, আর সেই মুক্তির পথ সন্ধান করেই মানুষ জীবনের পথপরিক্রমায় অগ্রসর হয়। বাইবেলের দর্শন হচ্ছে : মানুষকে ঈশ্বর অসীম মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু শয়তানের প্রলোভনে পড়ে মানুষ তার মানবীয় অবস্থাকে গ্রহণ না করে বরং অহংকারী হয়ে ওঠে। শয়তানেরই প্ররোচনায় সে ঈশ্বরের সমকক্ষ হতে চায়। এই অহংকার ও অবাধ্যতার কারণেই তার পতন ঘটেছে। ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করার ফলে শুধু ঈশ্বরের সঙ্গেই নয় বরং মানুষের পরস্পরের মধ্যেও সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে; ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে মানুষ পরস্পরের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তার নিজের অন্তরের পরিবেশও কলুষিত হয়ে পড়েছে। সেই কলুষ-কালিমা বা পাপময়তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সর্বত্র : মানুষের মাঝে ঘৃণা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অমিল, দলাদলি, কলহ-বিবাদ, মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি এর প্রমাণ। গোটা পৃথিবীই হয়ে পড়েছে অশান্ত। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তিলাভের জন্য মানুষ চিরদিনই ব্যাকুল। মানুষ চায় শান্তি- তার অন্তরের গভীরতম আকাক্সক্ষাই হচ্ছে শান্তির জন্য। কিন্তু এই শান্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে ন্যায্যতা, লোভ-লালসার বেড়াজাল থেকে মুক্তি, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমা দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে ভগ্ন সম্পর্কের নিরাময়, পুনর্মিলন ও সম্প্রীতি স্থাপন। এ জন্যই যুগে যুগে প্রবক্তা ও মহর্ষিগণ ভাবী ত্রাণকর্তাকে শান্তিরাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মানুষের মনে তাকে বরণ করার প্রত্যাশা জাগিয়েছেন।
যিশুর জন্ম হয়েছিল একটি গোশালায়, দীনবেশে। জীবনভর তিনি দরিদ্র জীবনযাপন করেছেন এবং দরিদ্রদের ধন্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার এই দীনতার জীবনটাই ছিল মানুষের কাছে সুখবর। ‘প্রভুর আত্মা আমার উপর অধিষ্ঠিত, কেননা তিনি দীনদুঃখীদের কাছে শুভসংবাদ দেয়ার জন্য আমাকে অভিষিক্ত করেছেন’ (লুক ৪:১৮)। দীনদরিদ্রদের সঙ্গেই তিনি একাত্ম হয়েছেন। এ কারণে তিনি বলেছেন : অন্তিম বিচারের দিনে মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে ক্ষুদ্রতম ভাইবোনদের প্রতি আমাদের আচরণ। তিনি নিজেই ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, আশ্রয়হীন প্রবাসী, বস্ত্রহীন, পীড়িত ও কারারুদ্ধ মানুষ- অর্থাৎ ক্ষুদ্রতমদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা এই ক্ষুদ্রতম মানুষদের একজনের প্রতি যা কিছু করেছ, তা আমারই প্রতি করেছ। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আত্মায় দীনহীন যারা, তারাই সুখী, কারণ স্বর্গরাজ্য তাদেরই’ (মথি ৫:৩)। তিনি গরিবের বন্ধু। দীনদুঃখীদের ভালোবাসা ছিল তার জীবনের ব্রত। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে ঈশ্বরকে জীবনের একমাত্র অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে জানার ও পাওয়ার সাধনা করার আহ্বান।
যিশু জন্ম নিয়েছিলেন ছোট্ট শিশু হয়ে। এটি নম্রতার প্রতীক। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের যদি মন পরিবর্তন না হয় ও তোমরা শিশুদের মতো না হয়ে ওঠো, তবে স্বর্গরাজ্যে কখনও প্রবেশ করতে পারবে না’ (মথি ১৮:৩)। ‘যে কেউ শিশুরই মতো ঈশ্বরের রাজ্য গ্রহণ না করে, সে তার মধ্যে কখনও প্রবেশ করতে পারবে না’ (মার্ক ১০:১৫)। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে শিশুর মতো হওয়ার আহ্বান। সেই শিশু যিশুরই প্রতীক হচ্ছে গোশালায় যাবপাত্রে শায়িত শিশুটি।
প্রবক্তা যিশাইয়া যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৭৪০ বছর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন: ‘‘একটি শিশু আমাদের জন্য আজ জন্ম নিয়েছেন, একটি পুত্রকে আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তার স্কন্ধের ওপর ন্যস্ত রয়েছে সবকিছুর আধিপত্যভার। তার নাম :‘অনন্য মন্ত্রণাদাতা, শক্তিমান ঈশ্বর, শাশ্বত পিতা, শান্তিরাজ!’ এবার শুরু হবে... অন্তবিহীন শান্তির যুগ!... ন্যায় ও ধর্মিষ্ঠতার ভিত্তিতে, আজ থেকে চিরকালের মতো” (যিশাইয়া ৯:৬-৭)। প্রবক্তা যিশাইয়া আরও বলেছিলেন, “শোন, কুমারী কন্যাটি হবে গর্ভবতী; সে এক পুত্র-সন্তানের জন্ম দেবে। একদিন সবাই তাকে ইম্মানুয়েল নামে ডাকবে (নামটির অর্থ হল : ‘ঈশ্বর আমাদের সঙ্গেই আছেন’।” (যিশাইয়া ৭:১৪)। যিশুখ্রিস্টের মধ্যে এই ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বলে খ্রিস্টানদের বিশ্বাস। যিশুর জন্মের আগে মহাদূত গাব্রিয়েল মারিয়ার কাছে দেখা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়ো না, মারিয়া! তুমি পরমেশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছ। শোনো, গর্ভধারণ করে তুমি একটি পুত্রের জন্ম দেবে। তার নাম রাখবে যিশু। তিনি মহান হয়ে উঠবেন, পরাৎপরের পুত্র বলে পরিচিত হবেন। প্রভু পরমেশ্বর তাকে দান করবেন তার পিতৃপুরুষ দাউদের সিংহাসন’ (লুক ১:৩০-৩২। যিশুর জন্মের পর স্বর্গদূত রাখালদের কাছে দেখা দিয়ে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না! আমি এক মহা আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি; এই আনন্দ জাতির সমস্ত মানুষের জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে। আজ দাউদ-নগরীতে তোমাদের ত্রাণকর্তা জন্মেছেন- তিনি সেই খ্রিস্ট, স্বয়ং প্রভু। এই চিহ্নে তোমরা তাকে চিনতে পারবে : দেখতে পাবে কাপড়ে জড়ানো, যাবপাত্রে শোয়ানো এক শিশুকে’ (লুক ২:১০-১২)। যিশুতে ঐশ-প্রতিশ্র“তির এই বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করেই বড়দিনের উৎসব পালিত হয়। প্রতীকী ভাষায় ঘটনার নাটকীয় বর্ণনার অন্তর্নিহিত এই ভাব ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করাই বড়দিন উৎসব পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। যিশু নিজেই আনন্দ। যিশুর জন্মলগ্নে স্বর্গদূত বললেন, ‘আমি এক আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি। এই আনন্দ জাতির সমস্ত মানুষের জন্যই সঞ্চিত হয়ে আছে’ (লুক ২:১০)। বড়দিনের আনন্দ তখনই সার্থক হয় যখন আমরা শুধু মৌখিক প্রচারের মাধ্যমে নয়, বরং অপরের সঙ্গে সহভাগিতার মাধ্যমে তা প্রচার করি। যিশু বলেন, ‘পিতা যেমন আমাকে ভালোবেসেছেন, আমিও তেমনি তোমাদের ভালোবেসেছি। তোমরা আমার ভালোবাসার আশ্রয়ে থেক। যদি আমার সমস্ত আদেশ পালন করো, তবেই তোমরা আমার ভালোবাসার আশ্রয়ে থাকবে, আমিও যেমন পিতার সমস্ত আদেশ পালন করেছি আর আছি তার ভালোবাসার আশ্রয়ে। এসব কথা তোমাদের বললাম, যাতে আমার আনন্দ তোমাদের অন্তরে থাকতে পারে এবং তোমাদের আনন্দ যেন পরিপূর্ণ হতে পারে’ (যোহন ১৫:৯-১১)। এ জগতে মানুষ মাত্রই সুখ ও আনন্দ পেতে চায়, কিন্তু প্রকৃত ও স্থায়ী আনন্দের উৎস একমাত্র ঈশ্বর। তিনি মানুষকে সুখ ও আনন্দের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু অপরকে কষ্ট দিয়ে, অপরকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আমার পক্ষে প্রকৃত আনন্দ লাভ করা সম্ভব নয়। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে প্রতিদিনের যাত্রায় জীবন-সহভাগিতার মাধ্যমে সেই অকৃত্রিম ও অকপট আনন্দ আস্বাদন করার।
যিশুই শান্তি। যিশু ঈশ্বরের প্রতিশ্র“তি ‘শান্তিরাজ’ (যিশাইয়া ৯:৬)। যিশুর জন্মের রাতে স্বর্গের দূতবাহিনী গেয়ে উঠেছিল : ‘জয় ঊর্ধ্বলোকে পরমেশ্বরের জয়! ইহলোকে নামুক শান্তি তার অনুগৃহীত মানবের অন্তরে’ (লুক ২:১৪)। ঈশ্বর প্রদত্ত এই শান্তি অন্তরে গ্রহণ করতে পারলেই মানুষের মন থেকে সব রকম ঘৃণা-বিদ্বেষ দূর হতে পারে। যে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ মানুষের একান্ত কাম্য, তা-ই বড়দিন উৎসবের অন্যতম প্রধান আশীর্বাদ। মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের পরে শিষ্যদের দেখা দিয়ে যিশু দু’বার বলেছিলেন, ‘তোমাদের শান্তি হোক’ (যোহন ২০:১৯-২১)। তবে যিশুর দেয়া শান্তি আর মানুষের দেয়া শান্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য। যিশু বলেন, ‘তোমাদের জন্য শান্তি রেখে যাচ্ছি, তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি আমারই শান্তি; অবশ্য এ সংসার যেভাবে শান্তি দেয়, সেভাবে আমি তোমাদের তা দিয়ে যাচ্ছি না’ (যোহন ১৪:২৭)। যিশুর দেয়া শান্তি হচ্ছে পবিত্র আত্মা বা পাক্ রুহের বশে চলার ফল (গালাতীয় ৫:২২)। এর বিপরীতে হচ্ছে রিপু বা পাপ-স্বভাবের বশে চলা। এর ফলে মানুষের ব্যক্তিজীবন ও সমাজে নেমে আসে অশান্তি ও অরাজকতা। বড়দিন উৎসবে শান্তি-শুভেচ্ছা বিনিময় যদি কেবল মৌখিক শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত শান্তি-আশীর্বাদ পেতে পারি না। বড়দিনের আহ্বান হচ্ছে সেই প্রকৃত ও স্থায়ী শান্তি লাভ করার আহ্বান।
মঙ্গলসমাচারে যিশুর জন্মকাহিনীর বর্ণনায় অনেক প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। বড়দিন উৎসবের সময় এই প্রতীকগুলোর অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আকাশে উদিত উজ্জ্বল তারকা প্রকাশ করে যে যিশু হচ্ছেন জগতের আলো। জগতের অন্ধকার দূর করতেই তিনি ইম্মানুয়েল বা আমাদের নিত্যসঙ্গী ঈশ্বর। পূর্বাদেশের তিন পণ্ডিত বলতে বোঝায় অযিহুদি। অর্থাৎ যিশু কেবল কোনো এক জাতি বা গোষ্ঠীর ত্রাণকর্তা নন, তিনি সব মানুষেরই মুক্তিদাতা। বেথলেহেমের গোশালায় দীনবেশে জন্মগ্রহণ করার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, ‘তিনি তো স্বরূপে ঈশ্বর হয়েও ঈশ্বরের সঙ্গে তার সমতুল্যতাকে আঁকড়ে থাকতে চাইলেন না; বরং নিজেকে তিনি রিক্ত করলেন; দাসের স্বরূপ গ্রহণ করে তিনি মানুষের মতো হয়েই জন্ম নিলেন’ (ফিলিপ্পীয় ২:৬-৭)। কোনো রাজনৈতিক কূটচাল, তরবারি, অস্ত্রবল, সৈন্যবল বা অশ্বারোহী সেনাবাহিনী দিয়ে প্রকৃত শান্তির রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা কখনও সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে কষ্টভোগী সেবক যিশুর মতো পরার্থে সম্পূর্ণ আÍদানের মাধ্যমেই প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। প্রেম-প্রসূত এই নম্রতা বা দীনতার মধ্য দিয়েই ঈশ্বরের সর্বময় ঐশ-ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে। খ্রিস্ট জন্মোৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সবার মাঝে প্রতিষ্ঠিত হোক সেই অক্ষয় ও প্রকৃত শান্তি, সুখ ও আনন্দ।
ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা সিএসসি : উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত), নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

বিশ্ব উপলব্ধি করছে এখানে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ নেই, আছে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ by মইনুল হোসেন

আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে যদি শান্তি ফিরে না আসে এবং জনজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা যদি এর লক্ষ্য না হয়, তাহলে কিসের জন্য এবং কাদের স্বার্থে এই নির্বাচন করা হচ্ছে- তা নিয়ে প্রতিটি নাগরিকের উদ্বেগ বোধ করার কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের নামে যেটা হচ্ছে তা আসলে এক ধরনের প্রতারণা। এ কথা যে শুধু আমরা বলছি তা নয়, সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে যে, এটা স্বচ্ছ নির্বাচন হচ্ছে। ইতিমধ্যে আসন বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে অবিশ্বাসের সর্বশেষ প্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি- নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কোনো দল পাঠানো হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রধান সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না হবে। এই সিদ্ধান্ত হচ্ছে সেই পরিকল্পনার বিপরীতে, যাকে লন্ডনের ইকোনমিস্টের ভাষায় ‘ক্যু বাই ইনস্টলমেন্টস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং যে পরিকল্পনায় সরকার অনেক সময় ব্যয় করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাইরের প্রভাবের অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মৃত্যু ঘটেছে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আর এখন সেই দল সংসদের আসন ভাগাভাগি করছে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করার জন্য। এটা আমাদের এবং সেই সঙ্গে প্রবীণ আওয়ামী লীগারদের বেদনাবিদ্ধ করছে। নির্বাচন কারসাজির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।
তার চেয়ে বেশি পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এ দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, সরকার তার পরিকল্পনায় সফল হলে যা আর সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের ওপর দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে আওয়ামী লীগ দলটির সাংগঠনিক শক্তি বাইরের অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। তা না হলে আওয়ামী লীগের মতো একটি দল স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর এবং বঙ্গবন্ধু যখন শুধু আওয়ামী লীগের নয়, গোটা জাতির অবিসংবাদিত নেতা তখন অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র ধ্বংস করতে যাবে কেন? এ প্রশ্ন আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতা-কর্মীদের করতে হবে। জানতে হবে এর উত্তর।
এখন এটা সবার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে যে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগ দখল করার একটা প্রক্রিয়া শুরু করে এবং তারপর থেকে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে আবেদন সৃষ্টি করার মতো কোনো কর্মসূচি বা ইস্যু হাজির করতে পারেনি, যেমনটি আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চরিত্র থাকার সময়ে করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনানো জনগণের কাছে নতুন কিছু নয়। এই অধিগ্রহণকে বামপন্থী অধিগ্রহণ না বলে তারা একে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত নেতৃত্ব হিসেবে চালিয়ে দিল। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে বামপন্থী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বড় হয়ে দেখা দিল এবং গণতান্ত্রিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেল।
রাতারাতি কিছু লোককে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হল। এটা আমরা বলছি না, তথ্যই উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করছে যে গত পাঁচ বছরে কিছু দলীয় অনুসারী চুনোপুঁটি থেকে রুই-কাতলা বনে গেছে। তাদের মধ্যে কিছু লোকের প্রত্যেকে কম করে হলেও ২০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছে এবং সেটাই পরিপূর্ণ সত্য নয়। এ রকম কাহিনী তথ্য-প্রমাণ দিয়েই সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে এবং টেলিভিশনের বিভিন্ন টকশোতেও বলা হচ্ছে। এ কারণে যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর জবাবদিহির সর্বনাশা ভীতি ঢুকেছে। তাই তারা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। দেশে যা হচ্ছে তা আসলে জনগণের বিরুদ্ধে কঠিন রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই, ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের কোনো লড়াই হচ্ছে না।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক শক্তির বিচারে জামায়াতে ইসলামীকে বড় শক্তি হিসেবে গণ্য করার কোনো কারণ নেই। প্রধান রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে দলটি প্রকাশ্য রাজনীতি করে আসছে, জামায়াতে ইসলামী গোপন কোনো দল নয়। যদি দলটির ৪২ বছর আগেকার অবিভক্ত পাকিস্তানের জন্য সহানুভূতি থেকে থাকে, তাহলে নতুন প্রজন্মের জামায়াতিদের কি বাংলাদেশবিরোধী বলা সমীচীন হবে, যতক্ষণ না তাদের কার্যক্রম দ্বারা তা প্রমাণিত হয়? এ প্রশ্নের একটা সদুত্তর থাকা দরকার।
জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীরা বরাবরই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসছে। গত নির্বাচনে দলটি সংসদে মাত্র ২টি আসন পায়। তারপরও বর্তমানে দলটিকে ইসলামী সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবে বড় করে দেখানো হচ্ছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে মৌলবাদী জঙ্গিত্বের অভিযোগ আনা হয়েছে, যাতে বিরোধী জোটের নেতৃত্বদানকারী প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ দুটি দলকেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে আওয়ামী লীগ সরকারের নিশ্চিত পরাজয় এড়ানো সম্ভব হয়।
এই কুটিল ধারণা ভেতর থেকে আসুক আর বাইরে থেকে সরবরাহ করা হোক, আওয়ামী লীগের ভেতরকার বামধারার লোকেরা একে লুফে নেয় এই আশায় যে, ইসলামী সন্ত্রাসের ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ বিশ্ব প্ল্যানটিকে সমর্থন করবে। কেবল ভারত ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে এ পরিকল্পনাটি বাজার পায়নি।
অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এই কূটকৌশল কেবল ভারতের দৃঢ় সমর্থন লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট এই সেদিনও এ বিষয়ে তার ভারতীয় সমর্থনের ধারণা পুনর্ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন লাভের ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা আওয়ামী লীগের জন্য বিরাট হতাশার কারণ। তারা জামায়াতকে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের (যেমন আল কায়দা) সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবে দেখাতে পারেনি। বরং জামায়াত পরিকল্পিত লবিং ও নানা তৎপরতায় বিশ্বের সহানুভূতি লাভে সক্ষম হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে পাশ কাটাতে গিয়ে দেশে যে গৃহযুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা থেকে বিশ্বের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে সরানোর জন্য সরকার এই বিভেদমূলক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বলেই সবাই ধারণা করছে। নানামুখী প্রচার-অপপ্রচার সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবেই দেখছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে সাহায্যদানের পরিবর্তে সন্ত্রাস আর জীবনহানির নিন্দা করে, তাহলে দেশের মানুষকে বাঁচানো যাবে না, দেশের অর্থনীতির ধ্বংসও ঠেকানো যাবে না। বাংলাদেশে ধর্মীয় সন্ত্রাস নেই, আছে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ। দেশে জনমতের রাজনীতি থাকলে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদ এ মাটিতে স্থান পাবে না। মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে বিশ্বে আমাদের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তাকে বিকৃত হতে দিলে তা হবে জাতির জন্য চরম বিপজ্জনক।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

সরকারকে আলোকিত আত্মস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে by ড. মাহবুব উল্লাহ্

তিন-চার সপ্তাহ আগে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে টেলিভিশন টকশোতে জ্ঞানী-গুণীজনরা বলতেন, দেশ অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে এগিয়ে চলেছে। কী ঘটবে বা কী ঘটতে পারে সেই সম্পর্কে স্পষ্ট করে কেউ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেননি। অনেকে হতাশার সুরে বলেছেন, টানেলের শেষে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, তারা আশাবাদী। বাংলাদেশে এ ধরনের সংকট অতীতেও সৃষ্টি হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আমি নিজে প্রথম আলোতে কয়েক মাস আগে লিখেছিলাম, আমরা এক গভীর গিরিখাতের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। এখান থেকে কোনো রকমে পা ফসকালে গিরিখাতের গভীর তলদেশে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। কিন্তু তখন কেউই এতে কর্ণপাত করেনি। সংকট গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা বারবার সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি সমঝোতায় উপনীত হতে বিবদমান পক্ষগুলোকে উৎসাহিত করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। টেলিফোন করেছেন। তার বিশেষ দূত হিসেবে সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো দু’বার বাংলাদেশে এসেছেন। প্রথমবার তিনি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সংক্ষিপ্ত সফর শেষে নিউইয়র্কে ফেরত গেছেন। দ্বিতীয়বার তিনি অধিকতর প্রস্তুতি নিয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ যাত্রায় তিনি বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে বহুবার কথা বলেছেন। এক পক্ষের সঙ্গে মিটিং শেষ করে অন্য পক্ষের কাছে ছুটে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দু’পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হন। দুই দফা বৈঠকও হয়। দু’পক্ষের বৈঠকে গতিসঞ্চারের জন্য তিনি তার সফর একদিন বর্ধিত করেন। বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলন করে বৈঠকের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি কিছু কথা বলেন। বৈঠকে কী কথা হয়েছে সেটা স্পষ্ট না করলেও তিনি আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাতিসংঘ কী কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান চায়, সেটাও তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মিস্টার তারানকো দুটি প্রণিধানযোগ্য উক্তি করেন। সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, যদি আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে কী কী হবে বা হতে পারে? জবাবে তিনি বলেছিলেন, কী হতে পারে, সেটা আপনারা ভালো করেই বোঝেন। তার দ্বিতীয় মন্তব্যটি ছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যম সম্পর্কে। তিনি গণমাধ্যমকে ভারসাম্যপূর্ণ ও পক্ষপাতমুক্ত আচরণ করার আহ্বান জানান। তার এ শেষ মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারসাম্যপূর্ণ ও পক্ষপাতমুক্ত আচরণের প্রশ্নটি তখনই উঠতে পারে যখন আচরণ হয় ভারসাম্যহীন ও পক্ষপাতদুষ্ট। একজন ভিনদেশী বোদ্ধা ও বিশেষজ্ঞ যখন এরকম মন্তব্য করেন, তখন গণমাধ্যমের দায়িত্ব হয়ে পড়ে গভীর আÍজিজ্ঞাসা ও আÍবিক্ষণে নিয়োজিত হওয়া। কিন্তু সে কাজটি কতটুকু করা হয়েছে, সেটা গণমাধ্যমের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ ভালো করে বলতে পারবেন।
তারানকোর উপস্থিতিতে দুই দফা বৈঠকের পর তৃতীয় দফায় আরেকটি বৈঠক হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। তার কাছে দেয়া প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী তৃতীয় বৈঠকটি হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফলোদয় হয়নি। সরকার পক্ষ তার লক্ষ্য অনুযায়ী দশম সংসদ নির্বাচনের পক্ষে আছে। অপরদিকে ১৮ দলীয় জোট এই নির্বাচন প্রতিহত করার লক্ষ্যে রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধের আন্দোলনে আছে। এ মুহূর্তেও অবরোধ চলছে। অবরোধের ফলে এরই মধ্যে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা বড়ই মর্মান্তিক! এদেশে একটা সময় ছিল যখন একটি কিংবা দুটি মৃত্যু ক্ষমতাসীনদের ভিত কাঁপিয়ে দিত। এখন শত মৃত্যুতেও তেমন কিছু আসে যায় না। আমরা যেন অনুভূতিহীন হয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়েছি। একসময় বঙ্গদেশে একটি প্রবচন প্রচলিত ছিল। প্রবচনটি হল, মরা ছেলে নিয়ে কান্না করে লাভ নেই। আসলে তখন শিশু মৃত্যুহার এত বেশি ছিল যে, সন্তানের মৃত্যু নিয়ে শোক না করার পরামর্শ দেয়া হতো। মধ্যযুগের ইউরোপেও এমন একটি পরিস্থিতি ছিল। তখন সন্তানের মৃত্যুতে মায়েরা কদাচিতই শোকাশ্র“ বর্ষণ করত। কারণ একই, শিশু মৃত্যুর উচ্চহার। এমন মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ধরে নেয়া হতো। বাংলাদেশ-উত্তরকালে রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংঘাতে জীবননাশের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। কিন্তু সেই তুলনায় জনপ্রতিক্রিয়ার ধার ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। আমরা মর্মান্তিক কিংবা লোমহর্ষক ঘটনায় নির্বিকার থাকছি। নিজে বেঁচে থাকতে পারলেই স্বস্তিতে থাকি, অন্যদের যত বড় সর্বনাশই হোক না কেন। এ ধরনের জনমনস্তত্ত্ব অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ মানসিকতার সুযোগেই অত্যাচারী শাসকরা দুর্বিনীত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও সমাজে ফ্যাসিবাদ শেকড় গেড়ে বসে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী অবলোকন করে সে রকম কিছু মনে করা অযৌক্তিক নয়।
এবারকার অবরোধ আন্দোলনে যে বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেটি হল রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের পার্থক্য। যারা গ্রামাঞ্চল সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছ থেকে শুনেছি, এমনকি গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছেন এমন মানুষদের কাছ থেকেও শুনেছি যে, গ্রামাঞ্চলে বিরোধী দলের আন্দোলনে জনসম্পৃক্তি অত্যন্ত প্রবল। এ বিভাজনের ব্যাখ্যা কী? প্রথমত, রাষ্ট্রের নিপীড়ন যন্ত্র ঢাকায় অত্যন্ত প্রবল, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে ততটা নয়। দ্বিতীয়ত, ঢাকার নাগরিকরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক সুবিধা ভোগ করে, যা গ্রামের মানুষ করে না। অর্থনৈতিকভাবে অধিকতর সুবিধাপ্রাপ্ত ঢাকাবাসী কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। কারণ তাতে করে তাদের বিত্ত ও সম্পদহানির আশংকা থাকে। তৃতীয়ত, গ্রামাঞ্চলের মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে শাসক দলের অত্যাচার, অবিচার ও নিপীড়নের ভুক্তভোগী হয়েছে, সে রকম অভিজ্ঞতা ঢাকাবাসীর হয়নি। ছোটবেলায় জর্জ এলিয়টের লেখা উপন্যাস ‘Silas Marner’ পড়েছিলাম। সেই উপন্যাসে insect-like existence-এর কথা জেনেছিলাম। অর্থাৎ সুড়ঙ্গের মধ্যে কীট যেভাবে তার অস্তিত্ব বজায় রাখে। আমরা ঢাকাবাসী সে রকম বিচ্ছিন্ন জীবনে অভ্যস্ত। প্রতিবেশীর কী হল তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমাদের জীবনে যৌথভাবে বাঁচার চাহিদা বলতে গেলে অনুপস্থিত। আমরা দিনে দিনে আত্মসর্বস্ব হয়ে পড়ছি। এ অবস্থায় কোনো collective action-এ আমরা নামতে চাই না। এসব কারণে ঢাকা শাসকগোষ্ঠীর জন্য অনেকটাই নিরাপদ। তার মানে এই নয় যে, ঢাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শাসকগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে অনুমোদন করে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারাও শাসকগোষ্ঠীকে প্রত্যাখ্যান করবে।
তৃতীয় দফা সংলাপের পর আর কোনো সংলাপ হয়নি। হবে বলেও মনে হয় না। এরই মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এরকম ঘটনা অতীতে এদেশে বা অন্য কোনো দেশে ঘটেনি যাতে পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি ভোটার তাদের পছন্দ ব্যক্ত করতে পারেনি। বিরোধী দলের আন্দোলনে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছিলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন করার মুরোদ নেই। যেমন মুরোদ আমরা লক্ষ্য করেছি ’৯৬ সালে এবং ২০০৭ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলোর অসহযোগ ও লগি-বৈঠার আন্দোলনে। এখন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল সহিংসতার। বর্তমান আন্দোলনে সহিংসতা একটি বড় উপাদান। কিন্তু কেন এ অনাকাক্সিক্ষত সহিংসতা ঘটছে, সে কথা শাসক দল ও গণমাধ্যম বলছে না। নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের পথ রুদ্ধ করার ফলেই যে দুর্ভাগ্যজনক সহিংসতার উদ্ভব ঘটেছে সে কথাটি স্বীকার না করলে অর্ধসত্য বলা হয়।
যা হোক, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি ডামাডোলের মধ্য দিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু কত শতাংশ লোক সত্যিকার অর্থে ভোট দিতে যাবে সেটি বড় ধরনের প্রশ্ন। এরই মধ্যে বিদেশীরা তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রদূতরা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। সাভারের স্মৃতিসৌধে তারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেননি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিনিধি পাঠানো হবে না বলে তারা জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কবুল করেছেন এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বীকার করেছেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটি সুখকর নয়। এখন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যাপার নিয়ে কথা হতে পারে, তবে শর্ত হল বিএনপিকে সহিংসতা ত্যাগ করতে হবে এবং জামায়াতকে ছাড়তে হবে। বাস্তবতা হল, দশম সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার গঠিত হবে সেটি ভয়ানক বৈধতার সংকটে পড়বে। নির্বাচনে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রবলভাবে প্রশ্ন উঠবে। যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা ব্যাপারটি কত গভীরভাবে উপলব্ধি করেন সেটাই প্রশ্ন। তারা যদি সংকটের ভয়াবহতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা চিন্তা করে সুমতিতে আসেন তাহলে দেশটি বেঁচে যায়। শুধু একটি বিদেশী শক্তির সহায়তার ভরসায় তারা যদি একগুঁয়েমির পথ বেছে নেন, তাহলে দেশের মানুষের ক্ষতি যেমন আরও বাড়বে, তাদেরও অনেক ক্ষতি হবে। তাই তাদেরও আলোকিত আÍস্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা ভালো করেই জানেন সেই সিদ্ধান্তটি কী। তাদের একজন মন্ত্রী এরই মধ্যে আরও পাঁচ বছর চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু এরকম ভয়াবহ ইঙ্গিত কারও জন্যই মঙ্গলকর হবে না।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

মন্ত্রী-সাংসদদের ব্যবসায় বেআইনি

জসেলিনো কুবিতচেক ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৫৬ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। ওই দেশে সেনাশাসন আসে ১৯৬৪-তে, বহাল থাকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। মাঝে ১৯৭০-এর দশকে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হয়। কুবিতচেক নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন ব্রাজিলে, রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হন। কিন্তু হঠাৎ ১৯৭৬ সালের ২২ আগস্ট গাড়িতে যাওয়ার সময় পেছন থেকে একটা বাস তাঁর গাড়িকে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান।
অর্ধশতাব্দী আগে ব্রাজিলের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৭৬-এর ‘দুর্ঘটনা’র পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৪০ বছর। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সন্দেহ হয়েছিল দুর্ঘটনা নয়, সেনাশাসকেরা তাঁকে হত্যা করেছিল। এখন তদন্ত হচ্ছে। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, সম্ভবত এটা ছিল হত্যা। তদন্ত শেষ হয়নি, বিচারও শুরু হয়নি। তবে অচিরেই সম্ভবত হবে। এর আগে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে, যেমন চিলি, আর্জেন্টিনাসহ অনেক দেশে বহু দশক আগের সেনাশাসন ও অন্যান্য অপরাধ-অপকর্মের বিচার শুরু হয়েছে। ওসব দেশে এখন গণতন্ত্র পাকাপোক্ত হচ্ছে। গণতন্ত্র পাকাপোক্ত হওয়া মানেই আইন-বিচার ইত্যাদি পাকাপোক্ত হওয়া। আমাদের এখনো হয়নি। তবে আজ হোক, কাল হোক গণতন্ত্র অর্থাৎ আইনের শাসন অবশ্যই পাকাপোক্ত হবে।
দুই তিন-চার দিন ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় মন্ত্রী-সাংসদদের গত পাঁচ বছরে ফুলে-ফেঁপে ওঠার অনেক রসাল খবর ছাপা হচ্ছে। এর আগে এক-এগারোর পর ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে অনেক রসাল খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। এখানে ভবন, ওখানে বাড়ি, খুঁটি-খাম্বা, হরিণ-সেতু, ভর্তি ভর্তি বাক্স বিমানে করে বিদেশে যাওয়া—এ রকম অনেক খবর ভাসা ভাসা মনে পড়ছে। সেযাত্রায় অনেকেই চলে গিয়েছিলেন বিদেশে। এখনো কেউ কেউ ফিরে আসেননি। কারও কারও হদিসই পাওয়া যাচ্ছে না, যেমন হারিছ চৌধুরী। মন্ত্রী-সাংসদদের ফুলে-ফেঁপে ওঠার প্রথম খবর নজরে পড়েছিল ১৯ ডিসেম্বরের দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রথম পাতায়। প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানের ধন বেড়েছে ১০৭ গুণ, অন্য এক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের সম্পদ বেড়েছে পাঁচ বছরে ৪০ গুণ। দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার এই তালিকায় ছিলেন আরও ছয়জন। পরের দিন ২০ ডিসেম্বরের প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম ছিল ‘ফুলে-ফেঁপে উঠেছে সম্পদ’। এখানে শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন সেই আব্দুল মান্নান খান, মন্ত্রীগোত্রীয় জাহাঙ্গীর কবির নানক, দীপংকর তালুকদার, অধমের এলাকার সাংসদ ফজলে নূর তাপস ও অন্যরা। প্রথম আলো বলছে, সাংসদ আবদুর রহমান বদির আয় বেড়েছে ৩৫১ গুণ। বাপের ব্যাটা! ২১ ডিসেম্বরের প্রথম আলো বলছে, মাহবুব উল আলম হানিফ মন্ত্রীও নন, সাংসদও নন, তবু পাঁচ বছরেই সম্পদের পাহাড়। ২১ ডিসেম্বর যুগান্তর পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার দ্বিতীয় প্রধান শিরোনাম ছিল ‘সেনা নামছে ২৬ ডিসেম্বর’। যুগান্তর-এর প্রতিবেদনের হিরো নয়জন, যাঁদের অনেকেই নামই জায়গা পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলোতেও। ২১ ডিসেম্বরের কালের কণ্ঠ দেখলাম ঝুঁকেছে আঞ্চলিকতার দিকে। পত্রিকাটির শিরোনাম ‘অর্থ-সম্পদ বেশ বেড়েছে চট্টগ্রামের মন্ত্রী-এমপিদের’। সম্পাদকীয়ও হয়েছে প্রত্যাশিত শিরোনামে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ (কালের কণ্ঠ ২১ ডিসেম্বর)। সব পত্রিকা তো আর পড়া হয় না, তবু ধরেই নিচ্ছি, অন্যান্য পত্রিকাও সম্পদের কেচ্ছায় আকৃষ্ট হবে, খবর ছাপিয়েছে বা ছাপাবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরাবরের মতো নির্বাচনের প্রার্থীদের সম্পদ, আয়-ব্যয় ইত্যাদির তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করে অচিরেই প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
তিন মন্ত্রী-সাংসদেরা কি ধনী হতে পারেন না? যদি বৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সম্পদ বাড়ান? আইন বলে, মন্ত্রীরা তাঁদের বেতন-ভাতাদি ছাড়া আর কোনো উপায়-অর্জন করতে পারবেন না। কোনো বৈধ ব্যবসাও করতে পারবেন না। এটা সংবিধান নিষেধ করে দিয়েছে। সবার পুরো সংবিধান পড়া জরুরি নয়। তবে যাঁরা সাংবিধানিক পদ পেয়ে যান, তাঁদের তো সংবিধানে লেখা শপথবাক্য পাঠ করতে হয়। সেই সঙ্গে সংবিধানে যে যেই পদ পেয়েছেন, সে পদ বা দায়িত্ব সম্পর্কে কী বলা আছে, অন্তত সেটুকু তো পড়া উচিত। এমনটিও না যে ওই পদগুলো সম্পর্কে সংবিধানে অনেক অনেক কথা বলা আছে। পড়তে পড়তে গুলিয়ে ফেলার ভয় নেই। যেমন অ্যাটর্নি জেনারেলের কথা বলা আছে, শুধু ৬৪ অনুচ্ছেদে। ৬৪ অনুচ্ছেদে সর্বসাকল্যে বাক্য আছে চারটি। কঠিন বা জটিল কিছুই নেই। ৬৪টি অনুচ্ছেদে বলা আছে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের কথা। দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল, সরকারের নয়; ঠিক যেমন প্রধান বিচারপতি। অন্য সব বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশের। অর্থাৎ শুধু সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নন, সংবিধানবলে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। যা হোক, মন্ত্রীদের বৈধ আয়-উপার্জনের কথায় ফিরে আসি। আট ধরনের সাংবিধানিক পদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত বড় একটা অনুচ্ছেদ আছে সংবিধানে।
১৪৭ অনুচ্ছেদ। অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেল বা সাংসদ এই ১৪৭ অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত নন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী, বিচারপতি, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি আট ধরনের পদ ১৪৭ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে। পাঠক যদি শপথ নিয়ে মন্ত্রী বনে যান, তাহলে ১৪৭ অনুচ্ছেদটি আপনাকে জানতে হবে। জানাই— মন্ত্রী ‘...কোন লাভজনক পদ কিংবা বেতন-ভাতাদিযুক্ত পদ বা মর্যাদায় বহাল হইবেন না কিংবা মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যযুক্ত কোন কোম্পানি, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনায় কোনরূপ অংশগ্রহণ করিবেন না।’ ১৪৭ অনুচ্ছেদে আরও একটু জটিল একটি বিধান আছে। আপাতত আমাদের দরকার নেই। তবে কোনো পাঠক যদি সত্যি সত্যি মন্ত্রী বনে যান, তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন, বিশদ বয়ান করা যাবে তখন। ১৪৭-এর ওপরে যতটুকু উদ্ধৃত করেছি, সেটাতেই ফিরে আসি। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিকেল পাঁচটায় আপনার সচিবালয়ের অফিস থেকে বেরিয়ে গুলিস্তান সিনেমা হলে গিয়ে সেখানে সন্ধ্যাকালীন পার্টটাইম ম্যানেজারের পদ গ্রহণ করতে পারবেন না। কারণ, ১৪৭ অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো লাভজনক বা বেতন-ভাতাযুক্ত পদে মন্ত্রী মশাই বহাল হতে পারবেন না। দিনের বেলা বিমানের মন্ত্রী আর রাতে বিমান চালিয়ে অর্থাৎ পাইলটগিরি করে টু পাইস বাড়তি কামাবেন, সেই রাস্তা বন্ধ। মন্ত্রীর পদের পাশাপাশি অন্য কোনো পার্টটাইম চাকরি (পদ বা মর্যাদা) না হলে না-ই করলেন, তাই বলে কি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো ব্যবসা থেকে লাভ বা আয় হতে পারবে না?
অধমের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু বাধা দিচ্ছে তো সংবিধান। সংবিধান ব্যাখ্যায় অগ্রসর হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। যদি দুর্ভাগ্যবশত অধমের ব্যাখ্যার সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা না মেলে, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা বাহুল্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যাই সঠিক ব্যাখ্যা। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আগেভাগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সংবিধান বলছে, ‘মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যযুক্ত’ কোনো কিছুর ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনায় কোনোরূপ অংশ নেওয়া যাবে না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শব্দ হলো, ‘কোনরূপ অংশগ্রহণ’। ইংরেজি অংশে আছে, Take any part whatsoever। গুরুত্ব দেব whatsoever শব্দটির ওপর। অনেক মন্ত্রীর সাফসুতরো আয়ের বিবরণে লেখা আছে, কৃষি থেকে আয় অত টাকা। অথবা মৎস্য চাষ থেকে আয় লাখ লাখ টাকা। অবশ্য কোনো কোনো মন্ত্রীর মাছগুলো এতই ভালো যে আয় দিয়েছে কোটি টাকার বেশি। কৃষিকাজ বা মৎস্য চাষ করা হয়েছে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে। হলফনামা অনুযায়ী মুনাফাও হয়েছে। পরিমাণ বেশি হোক আর কমই হোক। আর কৃষি বা মৎস্য থেকে মুনাফা অর্জনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর নিশ্চয় কোনো না কোনো ভূমিকা ছিল—সংবিধানের ভাষায়, ‘পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা’য় নিঃসন্দেহে ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ কোনো দুই নম্বরি হয়নি, সেটা ধরে নিলেও মন্ত্রী মশাইদের ব্যবসা করাটাই ছিল সংবিধানের পরিপন্থী। মন্ত্রী হলে অন্য কোনো চাকরি বা ব্যবসা করতে পারবেন না। একই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য বিচারপতি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য সাংবিধানিক পদের জন্য। কেন? এই নিষেধাজ্ঞা না থাকলে আমি, আপনি বা আমরা সবাই হয়ে যেতে পারতাম বিচারপতিদের ‘বিজনেস পার্টনার’। তখন হয়তো বিচার-আচারে কিছু বাড়তি সুবিধা হলেও হয়ে যেতে পারত!
অথবা যে এলাকা থেকে নির্বাচন করব, সে এলাকায় বিরাট মৎস্য খামার বা বিশাল আমবাগানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে করে নিতাম পার্টনার। ইত্যাদি, ইত্যাদি। অতএব সংবিধান কেন এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা বোঝা মোটেও দুষ্কর নয়। সাংসদদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা তুলনামূলকভাবে একটু হালকা। নির্বাচনসংক্রান্ত আমাদের মূল আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২ ধারায় বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার বস্তু বা সেবাদানের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন না। অর্থাৎ সাংসদের ঠিকাদারি ফার্ম বা কোম্পানি সরকারি রাস্তা বা ব্রিজ বানানোর কন্ট্রাক্ট বা কার্যাদেশ পেতে পারে না। অনেক অ্যাডভোকেট-সাংসদকে গত পাঁচ বছরে দেখেছি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে ওকালতি করতে। অর্থাৎ আইনি সেবার বিনিময়ে সরকারি অর্থ গ্রহণ করেছেন। আইনের চোখে সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তবে মন্ত্রীরা যেরূপ সংবিধান পড়েন না, স্পিকারও সেরূপ আইন পড়েন না। কারণ, সংসদ সদস্যরা যোগ্যতা হারিয়েছেন কি না, সে ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব স্পিকারের। অন্য কারও সেই ক্ষমতা নেই। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে সাহসও জরুরি। সম্পদের পাহাড় গড়তে কেউ দুর্নীতি করেছেন কি করেন না, সেটা বলতে পারবে দুদক। দুর্নীতি না করলেও ব্যবসা করে, বেতন-ভাতার বাইরে উপরি আয় করে মন্ত্রীরা স্পষ্টতই সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান লঙ্ঘনের সাজা মন্ত্রী-সাংসদেরাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। আপনাদের সংশোধিত সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদে। সাজার বিধানটা আছে ৭ক(৩)-এ, দয়া করে পড়ে নেবেন। শেষের কথা: ২৩ ডিসেম্বরের প্রথম আলোর প্রথম পাতায় আছে, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর পাঁচ বছরে ‘...ব্যাংকে টাকা বেড়েছে ৫৮৬ গুণ, জমি বেড়েছে ১৪৩ গুণ এবং বার্ষিক আয় বেড়েছে ৭৯ গুণ’। শাবাশ!

আওয়ামী লীগ জিতলেও হারবে না দেশ

 চলতি সপ্তাহে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাপ্তাহিক দি ইকোনমিস্ট লিখেছে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও হারবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো একটা দেশ, যার রয়েছে গণতন্ত্রের দীর্ঘ ঐতিহ্য, সেই দেশটি এত সহজে হেরে যাবে? হারলে হারবে আওয়ামী লীগই, দেশ হারবে কেন? এটা তো পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগ জিতলেও রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে হারবে সেই দলটিই। জিতবে একতরফা নির্বাচনে কিন্তু হারবে নিজেদের বিবেকের কাছে। কারণ, তারা এমন একটি নির্বাচন করতে যাচ্ছে, যেখানে অন্য কোনো দল নেই। এমনকি জনধিক্কৃত যে এরশাদের ওপর ভরসা করে আওয়ামী লীগ অগ্রসর হচ্ছিল, বেগতিক দেখে তিনিও সময়মতো সটকে পড়েছেন। ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীনদের প্রার্থী জিতে গেছেন। বাদবাকি আসনেও তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী। সুতরাং ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ নিঃসঙ্গ। এখানেই তাদের পরাজয়। জিতেও হারবে সেই দলটিই, বাংলাদেশ নয়। আওয়ামী লীগ বলতে পারে, এ রকম তারা চায়নি। বিএনপির জন্যই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন করতে হচ্ছে। কারণ, যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য জামায়াত নির্বাচনে যাবে না, আর জামায়াত যাবে না বলে বিএনপিও নির্বাচনে যাবে না।
এই যুক্তি দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের পক্ষে সাফাই গাওয়া যাবে না। নিজেদের আশ্বস্ত করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের চোখে তা টিকবে না। মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচার চায়, বিচারের রায় কার্যকর হোক, সেটাও চায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রধান বিরোধী দলসহ অন্য সব দলকে বাদ দিয়ে একা নির্বাচন করতে হবে। এর পরিণাম তাদের দলের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। দেশের পরাজয়ের প্রশ্ন এখানে ওঠে না। একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে মহান বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। এরপর অনেক দুর্যোগ গিয়েছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর দীর্ঘ ১৬ বছর সামরিক ও আধাসামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা পার হতে হয়েছে। কিন্তু নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জানিয়ে দিয়েছে, সে অপরাজেয়। এখানে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়, ২০ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি ছোট্ট খবর বেরোয়। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা প্রেসক্লাবে এক যৌথ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেন যে রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয় সব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউ কাউকে বাধা দেবে না। সেই বৈঠকে জামায়াতের কোনো নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম বিএনপির বন্ধুদের অনুরোধ জানান, সহিংসতা রোধ ও শান্তি বজায় রাখার জন্য তাঁরা যেন জামায়াতের সঙ্গে মিলে কোনো কর্মসূচিতে না যান।
অন্যদিকে, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম জানান, দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘাত নেই, কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল হানাহানি লাগাতে চায়। তিনি এ ব্যাপারে নজর রাখা এবং একে অন্যের কর্মসূচির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান। এ খবরটি আরও দু-তিনটি পত্রিকায় এসেছে। প্রথম আলোর গাইবান্ধা প্রতিনিধির সঙ্গে গত সোমবার কথা বলে জানা গেছে, ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার খান ও বিএনপির নেতা স্বপন একসঙ্গে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। এ সময় জামালপুর ইউনিয়নের কাছে একদল দুর্বৃত্ত তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনার পরই পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকগুলো দুই পক্ষের আলোচনায় আসে। দুই দলের স্থানীয় নেতারা অন্তত সহিংসতা রোধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। যদি অবরোধের নামে নাশকতা, রেললাইন তুলে ফেলে সাধারণ যাত্রীদের জীবন বিপন্ন করা, বাসে-সিএনজিতে পেট্রলবোমা মেরে নিরীহ চালক-যাত্রীদের হত্যা করা চলতে থাকে, তাহলে দেশের আরও অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের পথ ধরবেন। এটাই বাংলাদেশের শক্তি। এ জন্যই প্রথম আলো বলছে, এত সহিংসতা-সংশয়ের মধ্যেও পথ হারাবে না বাংলাদেশ। জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা বিএনপির অবরোধ-আন্দোলনের সুযোগে কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ধ্বংসাত্মক আন্দোলন চালাচ্ছেন। রগকাটা, গলাকাটার পাশাপাশি এখন তাঁরা ‘জলবায়ু-দস্যু’ রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সাতক্ষীরা, রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়কের দুই ধারের অন্তত এক লাখ গাছ কেটে তাঁরা রাস্তা অবরোধ করছেন। স্থানীয় থানা-পুলিশ নাকি অসহায়। খবর জানলেও কিছু করতে পারে না।
কারণ, তাদের নাকি লোকবলের অভাব। এই গাছগুলো সামাজিক বনায়ন উদ্যোগের ফসল। বহু বছরের চেষ্টায় ও স্থানীয় জনসাধারণের যত্নে গাছগুলো বড় হয়ে উঠছিল। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া রোধের জন্য এসব কর্মসূচি বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছিল। সবুজ গাছ যারা ধ্বংস করে, তারা শুধু দেশের শত্রু নয়, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি কাজ, কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উদ্যোগেরও শত্রু। এটা বোঝার ক্ষমতাও জামায়াত-শিবির গোষ্ঠীর নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন থাইল্যান্ডেও হচ্ছে। কিন্তু সেখানে এভাবে মানুষ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে মারা হয় না। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা সংসদে বিল এনে তাঁর ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে অবস্থানরত থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে সব মামলা ও প্রদত্ত শাস্তি মাফ করে ‘ক্ষমা’ ঘোষণা করলে বিরোধীরা আন্দোলন শুরু করে। এমন আন্দোলন যে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। বিরোধী আন্দোলন সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় দখল করে তাদের দপ্তর বানায়! এ অবস্থায়ও প্রধানমন্ত্রী ইংলাক বিক্ষোভ দমনে বল প্রয়োগের পথে যাননি। পরে তিনি সংসদ বিলুপ্ত করে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি মধ্যবর্তী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। কিন্তু বিরোধীরা সে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা জানায়, প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের অধীনে নির্বাচনে যাবে না, তাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। একটি অনির্বাচিত ‘পিপলস কাউন্সিল’-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
অবস্থাটা অনেকটা আমাদের দেশের মতোই। এ সম্পর্কে পূর্বোক্ত দি ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকট: ডেডলক’। সেখানে বিরোধী ডেমোক্রেটিকের এক জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে’ তাঁরা নির্বাচন বাদ দিয়ে চলতে পারেন না (দি ইকোনমিস্ট, ১৪ ডিসেম্বর)! ওই একই সংখ্যায় চিঠিপত্র কলামে ব্যাংককের মনসন মারুকাতাতের একটি চিঠি ছাপা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করছেন, ক্ষমতাসীনেরা ‘ক্ষমা’ ঘোষণার বিল অনুমোদনে অনেক অনিয়ম করেছে, গণমাধ্যমের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ভোর চারটায় বিল পাস করিয়েছে। বিরোধী দলের কোনো কথা শুনতে রাজি হয়নি। এ জন্যই মানুষ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। সম্প্রতি বিরোধী আন্দোলনের নেতা সুথেপ তাঁর নেতৃত্বে কার্যত একটি বিকল্প সরকার গঠনের জন্য সব সরকারি কর্মকর্তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। হয়তো আগামী নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নেবে না। ২০০৬ সালেও এই দলটি নির্বাচন বর্জন করেছিল। কিন্তু এত সব কাণ্ডের জন্য কি এ কথা বলা যাবে যে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে ইংলাক জিতবে আর থাইল্যান্ড দেশটি হেরে যাবে? এ রকম কোনো কথা কিন্তু দি ইকোনমিস্টও বলেনি।
থাইল্যান্ডের আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অনেক কিছু শেখার আছে। সেখানে এত বড় আন্দোলনে ব্যক্তিগত খুনোখুনি, বাস-গাড়ি ভাঙচুর, আগুন-ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়নি। আবার বিরোধীরা সরকারি কার্যালয়ের ভবন দখল করে নিলেও সরকার কিন্তু পাইকারি হারে গুলি, রাবার বুলেট, জেল-জুলুম চালায়নি। পুলিশের গুলিতে দু-তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। এর বেশি কিছু নয়। অথচ আমাদের দেশে নির্বিচারে গুলি, বিরোধী দলের নেতা-কর্মী হাজারে হাজারে গ্রেপ্তার, তাঁদের কার্যালয় ঘেরাও করে কার্যত বন্ধ করে রাখার মতো ঘটনা চলছে। গণতন্ত্রের জন্য এগুলো মোটেও শুভ নয়। এখন আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে, নির্বাচনে জিতলেও, রাজনৈতিক ও নৈতিক পরাজয় তারা ঠেকাবে কীভাবে। এখানে বিকল্প খুব কমই অবশিষ্ট আছে। এখনো যদি দুই পক্ষের মধ্যে একধরনের সমঝোতা করে, নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে হয়তো শেষরক্ষা হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এখন একযোগে বলতে হবে, যা হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। এখন একসঙ্গে বসে সবাই মিলে নির্বাচনের একটা পথ বের করাই সবচেয়ে জরুরি।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

মাদুরো সামাল দিতে পারবেন?

নিকোলাস মাদুরো
যেসব দেশের নেতা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাহ্য করে টিকেছিলেন, ভেনেজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে চাভেজ ছিলেন সব সময়ই উচ্চকিত। চাভেজ ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে। তাঁর কৃতিত্ব হলো ‘জিনি সূচক’-এর আয় বণ্টন অনুযায়ী ভেনেজুয়েলাকে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে সমতাভিত্তিক দেশে পরিণত করা।
দারিদ্র্য অনেক কমে আসে, নিরক্ষরতা দূরীভূত হয় উল্লেখযোগ্য হারে এবং রাষ্ট্রীয় খরচে গরিবদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বিনা মূল্যে সবার স্বাস্থ্যসেবাও দেওয়া হয়। চাভেজ বামপন্থী সামাজিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলিভ্যারিয়ান বিপ্লব শুরু করেন, যেখানে নিচ থেকে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ওপর থেকে পথ তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। বলিভারের নাম অনুকরণ করে চাভেজের বিপ্লব বলিভ্যারিয়ান বিপ্লব নাম দেওয়া সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ারই রূপক প্রচেষ্টা। চাভেজের মৃত্যুর পর গত ১৪ এপ্রিলের নির্বাচনে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তাঁরই আদর্শপুষ্ট নিকোলাস মাদুরো। মাদুরোর সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। ২ শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মেয়র নির্বাচন ভেনেজুয়েলার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন নির্দেশ করে। চাভেজের ক্যারিশমা মাদুরোর মধ্যে না থাকায় দলকে একীভূত রাখার চ্যালেঞ্জও তাঁকে নিতে হচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক নেতা, সেনাবাহিনী ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর মধ্যে স্বার্থ এবং বিভাজনকে মোকাবিলা করার মতো ক্যারিশমা পূর্বসূরির মতো মাদুরোর মধ্যে নেই। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় প্রায় পাঁচ লাখ চাভিসমো (চাভেজের নীতি) অনুসারী বিরোধী ডেমোক্রেটিক কোয়ালিশনের নেতা ক্যাপ্রিলেসের পক্ষে চলে যায়। মুদ্রাস্ফীতি ৩০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে।
যেখানে ২০১২ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষক আলবার্টো রামোসের মতে, এ বছর ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে এবং সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটতে পারে। এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ডটি এখন ভেনেজুয়েলার। এ ছাড়া দুধ, আদা, চিনি, ওষুধ, টয়লেট পেপার ইত্যাদি মৌলিক পণ্যের স্বল্পতাও দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাও প্রকট হয়ে পড়েছিল। ৮ ডিসেম্বর দেশটিতে মেয়র নির্বাচন হয়েছে এবং সেখানে মাদুরোর ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি ও মিত্ররা জয়লাভ করে। এই নির্বাচনকে বলা হচ্ছিল মাদুরোর জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বিরোধী দল ও এর মিত্ররা মিলেও কিন্তু ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পায়। চাভেজের নেতৃত্বে যে ঐক্য ভেনেজুয়েলায় ছিল, সেটির দ্বিধাবিভক্তি এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চাভেজ মারা যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অর্থনীতির করুণ দশা। মাদুরো একজন বাসচালক থেকে আজ দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। সেই পথটি যেমন তাঁর জন্য সহজ ছিল না, তেমনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনেক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ায় কঠিনত্বের পরীক্ষা তাঁকে ভালোভাবেই দিতে হবে।
ভেনেজুয়েলা হয়তো ১৯৭০-৭৩ সালে চিলির সালভাদর আয়েন্দের পপুলার ইউনিটি সরকার যে অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল, তেমন একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। সে সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও স্থানীয় ব্যবসায়ী শ্রেণী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করা এবং অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে অগাস্তো পিনোশের সামরিক স্বৈরাচার কায়েমের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। মধ্য আমেরিকা অঞ্চলে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন টাস্কফোর্স অন দি আমেরিকাসের প্রেসিডেন্ট রজার ডি হ্যারিস মন্তব্য করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বলিভ্যারিয়ান বিপ্লব একটি বড় হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র এই বিপ্লবকে ব্যাহত করতে তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করছে। তাদের ঘোষিত নীতিই হচ্ছে ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন করা। উদ্দেশ্য হলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে থাকে তেমন কোনো সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে বিরোধীরা কারচুপি হয়েছে দাবি তুলে সহিংসতা চালানোর একটা অনৈতিক কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু সত্যটি ভিন্ন। মাদুরো দুই লাখ ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হলেও যুক্তরাষ্ট্র স্বচ্ছ নির্বাচন বলে মানতে চাইছে না। কিন্তু জন এফ কেনেডি ১৯৬০ সালে ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে পরাজিত প্রার্থী রিচার্ড নিক্সন পান ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। এ ছাড়া ২০০০ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ৪৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী আল গোর ৪৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ পপুলার ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন।
এ বিষয়ে মার্কিন অধ্যাপক ড্যানিয়েল কোভালিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সহিংসতার মাধ্যমে হলেও তারা ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করতে চায়। দেখার বিষয় হলো, মাদুরো কত দিন এসব সামলাতে পারেন। জর্জ সিসেরিয়েলো মাহের তাঁর গ্রন্থ উই ক্রিয়েটেড চাভেজ: আ পিপলস হিস্ট্রি অব দ্য ভেনেজুয়েলান রেভল্যুশন-এ বলেন, ভেনেজুয়েলার বিপ্লব মানেই চাভেজ নন। তিনি ত্রিনিদাদের তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ সিএলআর জেমসকে অনুকরণ করে বলেন, চাভেজ বিপ্লব তৈরি করেননি, বিপ্লবই চাভেজকে তৈরি করেছে। এটি সব সমাজের ক্ষেত্রেই সমান সত্য। বিপ্লবী মরে গেলেই তো আর বিপ্লবী চেতনা মরে যেতে পারে না। সাফল্য নির্ভর করে পরবর্তী নেতৃত্ব কীভাবে সেটা চালিয়ে নেবেন, তার ওপর।
খলিলউল্লাহ্: সহকারী সম্পাদক, প্রতিচিন্তা।
khalil_irdu@yahoo.com

দিল্লির গদিতে বসছেন আম আদমি-অরবিন্দ

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দিল্লিতে গঠিত হতে যাচ্ছে আম-আদমি পার্টির সরকার। রাজধানীর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরকার গঠনের জন্য ব্যাপক সমর্থন পায় দলটি। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থনে সরকার গঠন করতে চলেছে আম-আদমি পার্টি।সোমবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানিয়েছিলেন আম-আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। মুখ্যমন্ত্রীও যে তিনি হচ্ছেন জানানো হয়েছিল সে কথাও। এরপর দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জংয়ের সঙ্গে দেখা করে এএপির তরফে এক চিঠিতে অরবিন্দ জানান, বেশির ভাগ মানুষের রায় মেনে তারা দিল্লিতে সরকার গঠনে প্রস্তুত। পরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমার নয়, এ জয় আম-আদমির (সাধারণ মানুষ) জয়, আমি নই- ভারতের আম-আদমিই হবে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। এ দিন সকালে এএপির রাজনীতিবিষয়ক কমিটির বৈঠক বসে। আলোচনা শেষে আম-আদমি পার্টির নেতা মণীশ সিসোদিয়া সংবাদ বৈঠকে জানান, ইন্টারনেটের মাধ্যমে গোটা দেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৮৪ জন তাদের মতামত জানিয়েছেন।
এর মধ্যে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৬ জন দিল্লিবাসী। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ৭৪ শতাংশই মনে করেন এএপির সরকার গঠন করা উচিত। সংখ্যাটা প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার। এছাড়া দিল্লিতে রোববার রাত পর্যন্ত যে ২৮০টি সভা করেছে এএপি, তার মধ্যে ২৫৭টি সভাতেই মানুষের রায়, এএপির সরকার গঠনের পক্ষে। এরপর, এএপির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর দিল্লির উপ-রাজ্যপাল সরকার গঠন বিষয়ে পরামর্শ করতে তাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ১০ দিন সময় চেয়েছিলেন তারা। এর মধ্যে দিল্লির মানুষের কাছে এএপির তরফে এ বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষের মত, এএপির দিল্লিতে সরকার গঠন করুক। সেই রায়কে সম্মান জানাতেই এএপি সরকার গঠন করতে প্রস্তুত বলে জানান অরবিন্দ। এরপর, মণীশ সিসোদিয়া জানান, সর্বসম্মতিক্রমে এএপির ২৮ বিধায়কই অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দই হচ্ছেন বলে জানান মণীশ। উল্লেখ্য, ৪৫ বছর বয়সী অরবিন্দ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তিনিই হবেন দিল্লির সর্বকনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত এএপির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘কংগ্রেস এই সরকারকে শর্তহীনভাবে সমর্থন করছে না। তবুও অরবিন্দের জন্য আমার শুভকামনা রইল।
দিল্লিবাসীকে যে প্রতিশ্র“তি এএপি দিয়েছিল, সেগুলো অবশ্যই পূরণ করা উচিত।’ যদিও বিজেপি নেতা হর্ষবর্ধন মনে করেন, এএপি জনসাধারণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যে কংগ্রেসকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এএপি পেছনের দরজা দিয়ে সরকারে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে, নাজিব জংয়ের সঙ্গে দেখা করে অরবিন্দ কেজরিওয়াল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে চিঠি লিখে সরকার গঠনের কথা জানানো হয়েছে। এরপর তিনি বলেন, ‘লেফটেন্যান্ট গভর্নর ওই চিঠি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নির্দেশ এলেই শপথ গ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হবে। তবে প্রাথমিক আলোচনায় ঠিক হয়েছে, দুর্নীতি দমন বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে যেখান থেকে অরবিন্দর রাজনৈতিক জীবনের উত্থান সেই রামলীলা ময়দানেই জনগণের উপস্থিতিতে প্রাথমিকভাবে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। তবে ঠিক কোন দিন এই শপথ অনুষ্ঠিত হবে তা এখনও জানা যায়নি। দলীয় নেতাদের ধারণা আসছে শুক্রবারই হতে পারে সেই দিন।

শিশু কারখানা অভিযানে আটক ১৯ মা

এক বাড়িতেই ছিলেন ১৯ জন অন্তঃসত্ত্বা। প্রত্যেকেই চেয়েছিলেন জন্ম নেয়ার পরই সন্তানকে বিক্রি করে ফিরে যাবেন বাড়িতে। কিন্তু তার আগেই তাদের গ্রেফতার করেছে নাইজেরিয়ার পুলিশ। নাইজেরিয়ায় শিশু পাচার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আফ্রিকার এই দেশটিতে সবচেয়ে বেশি হয় প্রতারণা, তারপর মাদকের ব্যবসাসংক্রান্ত অপরাধ আর তারপরই রয়েছে শিশু পাচার। শিশু পাচার এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, পাচারকারীরা এখন আর শিশুর জন্মের অপেক্ষা করে না, তার আগেই চুক্তি করে ফেলে সন্তানের মা কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য কারও সঙ্গে।
এতে বিয়ের আগেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাওয়া কিছু মেয়ের খুব সুবিধা হয়েছে। অনাকাক্সিক্ষত সন্তানের কারণে সামাজিক হয়রানি এড়াতে তারা সময়মতো চলে যান দূরের কোনো মাতৃসেবা কেন্দ্রে। সেখানে নিরাপদে তারা সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পরপরই বিক্রি হয়ে যায় সদ্যোজাত শিশু। শিশু বিক্রির টাকার একটা অংশ পেয়ে খুশি মনেই তখন বাড়ি ফেরেন মায়েরা। শুক্রবার উমু আহিয়া শহরের এক ঘর থেকে সেরকম ১৯ তরুণীকে গ্রেফতার করেছে নাইজেরিয়ার পুলিশ। আর কয়েকদিন পর প্রত্যেকেই মা হতেন। তারপর সন্তান বিক্রি করে কিছু টাকাও পেতেন। কিন্তু তা আর হল না। গ্রেফতার হয়ে তারা এখন হাজতে। শিশু পাচারকারীকে ধরা যায়নি। পুলিশ আসার আগেই পাচারকারী পালিয়েছে। এএফপি।

মিসরে আরব বসন্তের ৩ আহ্বায়কের কারাদণ্ড

মিসরে ২০১১-র আরব-বসন্তের অন্যতম আহ্বায়ক, স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক-পতন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ৩ নেতাকে রোববার ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে সে দেশের বিচার বিভাগ। আহমেদ মাহের ছাড়াও আহমেদ দৌমা ও মোহাম্মাদ আদেল সর্বশেষ ‘অস্বীকৃত’ আন্দোলনের জন্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বর্তমান সরকার নভেম্বরে বিদ্রোহ দমনে একটি আইন পাস করে,
যে আইন অনুসারে কোনো প্রকার সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কোনো স্থানে অন্তত ১০ জনের অধিক একত্র হওয়া বেআইনি হয়ে পড়ে। দোষী সাব্যস্ত নেতাদের এ আইনের আওতায় আটক করে বিচারের আওতায় আনা হয় এবং ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৭০০০ মার্কিন ডলার অর্থদণ্ডও দেয়া হয়। এ তিন আন্দোলনকারী সে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। মাহের এবং আদেল ৬ এপ্রিল, ২০১১-এ তরুণদের অভ্যুত্থানের অন্যতম আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করেন, যা সফলভাবে হোসনি মোবারককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এ ৩ নেতা দেশটির সেক্যুলারপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আল আহরাম।

থাই নির্বাচনী নিবন্ধন কেন্দ্র ঘেরাও

থাইল্যান্ডে আসন্ন নির্বাচন ভণ্ডুল করতে বিরোধী বিক্ষোভকারীরা সোমবার তাদের আন্দোলন আরও জোরদার করেছে। থাইল্যান্ডের রাজনীতি থেকে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা ও তার পরিবারকে রাজনীতির বাইরে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিরোধী দল প্রার্থীদের নিবন্ধন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। সরকার ঘোষিত ফেব্র“য়ারির জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইচ্ছুক প্রার্থীদের রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্ধারিত একটি স্টেডিয়াম ঘেরাও করেছে থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। নির্বাচন হওয়ার আগে রাজনৈতিক সংস্কার করা দরকার বলে দাবি করেন তারা। সোমবার রাজধানী ব্যাংককে অবস্থিত থাই-জাপান স্টেডিয়াম অবরোধ করে তারা, জানিয়েছে বিবিসি। নির্বাচনে অংশগ্রহণেচ্ছু সম্ভাব্য প্রার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করার স্থান হিসেবে স্টেডিয়ামটি বেছে নেয়া হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা নির্বাচনে অংশ নিতে ২৭ ডিসেম্বর আগেই নিবন্ধনের চেষ্টা করছে। সোমবার থেকে রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে। রোববার এই স্টেডিয়ামটি অবরোধের জন্য অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে বিক্ষোভাকারীদের নেতা সুথেপ থাগসুবান। এরইমধ্যে দেশটির প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেট পার্টি ফেব্র“য়ারির সম্ভাব্য নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে।
পাশাপাশি, চলমান আন্দোলনের নেতা এবং ডেমোক্রেট পার্টির সাবেক জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ সুথেপ থাগসুবান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের সঙ্গে একমত নই, সংস্কার চাই। আমরা চাই, নির্বাচনের আগে যেন দেশের রাজনীতিতে সংস্কারমূলক পরিবর্তন আসে।’ সোমবার নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের নিবন্ধন কার্যক্রম ব্যাহত করার লক্ষ্যে সুথেপ থাগসুবান থাই-জাপানিজ স্টেডিয়ামকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য আন্দোলনকারীদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘প্রার্থিতার জন্য আবেদন করতে চাইলে তাদের অবশ্যই আমাদের পার হয়ে যেতে হবে।’ এদিকে প্রতিবেদকেরা জানিয়েছেন স্টেডিয়ামের পরিবর্তে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাংককের একটি থানায় তাদের প্রার্থীদের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মোতাবেক আসন্ন নির্বাচনে ৩৪ দলের অংশ গ্রহণ থাকবে। সোমবার প্রার্থী নিবন্ধনের প্রথম দিনে বিক্ষোভকারীদের বাধা সত্ত্বেও ৯টি দলের প্রার্থীদের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রধান বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রী ইংলাক ঘোষিত আগামী ২ ফেব্র“য়ারির নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। উল্লেখ্য, রাজপথে বিরোধী দলের ব্যাপক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ইংলাক বাধ্য হয়ে নির্বাচনের ওই তারিখ ঘোষণা করে। এএফপির খবরে বলা হয়, থাইল্যান্ডে প্রায় এক বছর ধরে চলা রাজনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে সর্বশেষ অধ্যায়। এই সংকটে সাধারণত ইংলাক ও তার ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যাংকক ভিত্তিক এলিট নাগরিকরা রাজপথে নেমে আসে। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ গরিব লোক ইংলাক ও থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থক।