Sunday, October 4, 2026

এআই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিযুক্ত একটি মধ্যম পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া।

পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি কম উচ্চতায় উড়তে পারে এবং আকাশেই নিজের গতিপথ বদলাতে সক্ষম।

গতকাল শনিবার ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে।

দুই দেশের সীমান্তের অসামরিকীকরণ অঞ্চলে (ডিএমজেড) সম্প্রতি একটি বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনাসদস্য আহত হন। এ ঘটনার জন্য পিয়ংইয়ংকে দায়ী করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিল সিউল। এর কয়েক দিন পরই নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটল।

তবে গত মাসের ওই বিস্ফোরণের দায় অস্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘নিন্দনীয়’ বলেও মন্তব্য করেছে পিয়ংইয়ং। এতে দুই দেশের বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ধাক্কা খেয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে তথ্য আদান-প্রদান করছে তারা। তিন দেশই এ পরিস্থিতিতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই তথ্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের বোন কিম ইয়ো-জং ক্ষেপণাস্ত্রটির বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, সকালে উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল ‘মধ্যম পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র’।

ক্ষেপণাস্ত্রটিতে এআই কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি কিম ইয়ো-জং। তবে তিনি দাবি করেন, কম উচ্চতায় ওড়ার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটি নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং এতে এআই প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।

কিম ইয়ো-জংয়ের দাবি, এ সক্ষমতার কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা থেকে ‘বাঁচার কোনো উপায় নেই’।

তার ভাষ্য, কিম জং-উন বিশ্বাস করেন, বিশ্বের অন্য কোনো দেশ আগামী অন্তত কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তির নাগাল পাবে না।

গত মাসে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ব্যবস্থায় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তর’ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন কিম জং-উন। এর পরই কিম ইয়ো-জং নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতার কথা জানালেন।

কিম ইয়ো-জং আরো দাবি করেন, উত্তর কোরিয়া যখন ক্ষেপণাস্ত্রে ‘ঢেউয়ের মতো আঁকাবাঁকা গতিপথের মোড’ ব্যবহার করেছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথের প্রথম পরিবর্তন শনাক্ত করার পর সেটিকে আর ট্র্যাক বা নজরদারিতে রাখতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার বিনিময়ে মস্কোর কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। এর ফলে দেশটি দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নতি করতে পারছে।

সিউলভিত্তিক কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং সুং-পিও এএফপিকে বলেন, বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও এর বাইরে নয়।

তার মতে, এআই লক্ষ্যবস্তুর তথ্য বিশ্লেষণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ দেখিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে এআই যুক্ত করলে সেগুলোর কার্যকারিতা বাড়তে পারে।

তবে উত্তর কোরিয়া যে সক্ষমতার দাবি করছে, তা কতটা সত্য, এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন হং সুং-পিও।

তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ সামরিক শক্তিগুলোর তুলনায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এখনো খুব উন্নত নয়। লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে—এমন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

এআই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া
ছবি: রয়টার্স

চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি বসাতে মরিয়া তিন পরাশক্তি

চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মহাকাশযাত্রা সহ্য করতে সক্ষম এবং দীর্ঘ সময় মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই চলতে পারবে—এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির জন্য ঠিকাদারদের প্রস্তুতি নিতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেটি উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই তৎপরতার পেছনে রয়েছে মহাকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। রাশিয়া চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি চালু করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে এগিয়ে থাকতে নিজেদের পরিকল্পনাও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে নাসা।

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন, বরফ হিসেবে জমে থাকা পানি ও অন্যান্য সম্পদের সন্ধান এবং সেখান থেকে সৌরজগতের আরো গভীরে অভিযান পরিচালনা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। চাঁদের সম্পদ ও সেখানে প্রবেশের সুযোগ নিয়ন্ত্রণকে এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর দুই দেশই মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্রঘাঁটির জন্য পারমাণবিক চুল্লিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস।

তবে এই প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার একাধিক রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়ার একটি চন্দ্রযানও চাঁদের পৃষ্ঠে বিধ্বস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক প্রযুক্তিকে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্ত করা ঝুঁকি আরো বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক এডউইন লাইম্যান বলেন, মহাকাশে সবসময়ই প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে এর সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

কেন চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি?

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলতে হলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। সৌরশক্তির বিপরীতে পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলো ছাড়াই কাজ করতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে কম জায়গায় স্থাপন করা সম্ভব। সঠিক নকশা হলে এগুলোতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপও খুব কম প্রয়োজন হবে।

চাঁদের প্রাথমিক পর্যায়ের ঘাঁটিতে যন্ত্রপাতি সচল রাখা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রোভার বা যানবাহনে শক্তি সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি ও রেডিওআইসোটোপ শক্তি ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন ইতোমধ্যেই মহাকাশে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।

কিন্তু বড় আকারের চন্দ্রঘাঁটি গড়ে উঠলে আরো বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। চাঁদের রাত পৃথিবীর হিসাবে প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়, ফলে ওই সময় সৌর প্যানেল কার্যকর থাকবে না। আবার দক্ষিণ মেরু এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ১৩০ থেকে মাইনাস ৩৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে। এমন পরিবেশে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক চুল্লি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়া-চীনের পরিকল্পনা

রাশিয়া ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘সেলেনা’ নামে একটি চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। চীনের নেতৃত্বাধীন চন্দ্র স্টেশনগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি ব্যবহার করা হবে। চুল্লিটি সর্বোচ্চ ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং কোনো ধরনের মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রায় এক দশক কাজ করার লক্ষ্য রয়েছে।

চন্দ্র প্রকল্পে পারমাণবিক শক্তির বিষয়টি মূলত রাশিয়ার ওপর ন্যস্ত করেছে চীন। মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় দেশটি ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি কক্ষপথে পাঠিয়েছিল। পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও দেশটির বড় অভিজ্ঞতা রয়েছে।

কুরচাটভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মিখাইল কোভালচুক বলেছেন, মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এই প্রতিষ্ঠানই চন্দ্র চুল্লির নকশায় কাজ করছে।

অন্যদিকে, নাসা ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ নামে একটি চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। এটি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, যা প্রায় ১৬টি মার্কিন বাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পাঁচ বছর চালানোর লক্ষ্য রয়েছে এর।

নাসা ২০২৮ সালের ডিসেম্বরেই পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে একটি মহাকাশযানকে মঙ্গলগ্রহের দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এমন প্রযুক্তির ব্যবহার আগে কখনো করা হয়নি। পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও কক্ষপথ ও চাঁদে ব্যবহারের জন্য নিজস্ব মহাকাশ পারমাণবিক চুল্লি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

উৎক্ষেপণেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

তবে পরিকল্পনার সময়সীমা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা খুব একটা আশাবাদী নন। কারণ এখনো এমন কোনো প্রমাণিত অবতরণযান নেই, যা ভারী ও সম্ভাব্য তেজস্ক্রিয় উপাদান নিরাপদে চাঁদের অসমতল পৃষ্ঠে নামাতে পারে। কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে কেউ এখনো পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জানিয়েছে, তাদের চুল্লিগুলো চাঁদে পৌঁছানোর আগে সক্রিয় করা হবে না। অর্থাৎ উৎক্ষেপণের সময় জ্বালানি ‘ঠান্ডা’ বা অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে। এতে দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে উৎক্ষেপণের সময় রকেট বিস্ফোরিত হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। জাতিসংঘের মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ক একটি কর্মদলের প্রধান লিওপোল্ড সামারার বলেন, উৎক্ষেপণের সময়ই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। অতীতে অসংখ্য উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে, তার অনেক উদাহরণও রয়েছে।

সমুদ্রের ওপর কোনো পারমাণবিক চুল্লি পড়ে গেলেও বিপদ তৈরি হতে পারে। পানির উপস্থিতিতে নিউট্রন ধীর হয়ে গেলে পরমাণু বিভাজনের শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ২০১৯ সালে রাশিয়ার একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যর্থ হয়ে হোয়াইট সিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এমন একটি পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটেছিল বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ওই ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। তবে রাশিয়া এ দাবি অস্বীকার করে বলেছিল, ক্ষেপণাস্ত্রটি পারমাণবিক চুল্লিচালিত ছিল না।

চাঁদে দুর্ঘটনা হলে কী হবে?

মহাকাশে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো দুর্ঘটনার পর তেজস্ক্রিয় পদার্থ পৃথিবীতে ফিরে আসা। ১৯৭৮ সালে রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত ‘কসমস ৯৫৪’ উপগ্রহ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কানাডার উত্তরাঞ্চলে আছড়ে পড়ে। এতে প্রায় ৪৮ হাজার বর্গমাইল এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। এক বছর ধরে পরিষ্কার অভিযান চালানোর পরও উপগ্রহটির শক্তির উৎসের মাত্র ০.১ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

চাঁদে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো ভিন্ন হতে পারে। পৃথিবীতে পারমাণবিক চুল্লিগুলোকে সুরক্ষা কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু চাঁদে এমন অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন। নাসা জানিয়েছে, তাদের চুল্লিতে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে। তবে সেটি কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চন্দ্র চুল্লিগুলোর চারপাশে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকা তৈরি করতে হতে পারে। কারণ চাঁদে বাতাস না থাকলেও কম মাধ্যাকর্ষণের কারণে বিস্ফোরণের পর ধ্বংসাবশেষ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আর পৃথিবীর মতো চাঁদে কোনো চুল্লির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা সরিয়ে ফেলা বা নিষ্ক্রিয় করার জটিল প্রক্রিয়া চালানোর পরিকল্পনাও নেই। নাসা ও রাশিয়ার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মেয়াদ শেষ হলে তেজস্ক্রিয় উপাদান চাঁদেই রেখে দেওয়া হবে।

জ্বালানি নিয়েও জটিলতা

চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লির জন্য কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। নাসার নথিতে বলা হয়েছে, তারা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ নয় এমন জ্বালানি ব্যবহার করতে চায়। এর মধ্যে ‘হাই-অ্যাসে লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম’ বা হেলু (এইচএএলইউ) অন্যতম।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই জ্বালানির সরবরাহ সীমিত। রাশিয়া এ ধরনের জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎপাদক হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি নিষিদ্ধ করেছে।

এর আগে নাসার ২০১৮ সালের পরীক্ষামূলক মহাকাশ চুল্লিতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল। এই জ্বালানি তুলনামূলক হালকা ও উৎক্ষেপণ খরচ কমাতে সহায়ক হলেও এর অপব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

রাশিয়া-চীন যৌথ প্রকল্পে কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। রাশিয়ার পুরোনো মহাকাশ চুল্লিগুলোতে অবশ্য উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছিল।

মার্কিন আইনপ্রণেতা ও পদার্থবিদ বিল ফস্টার সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের জ্বালানি সামান্য কিছু প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেই বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার আহ্বান

মহাকাশে ব্যবহারের জন্য ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটি মার্কিন কোম্পানিও যুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘অ্যান্টারেস’ নামের একটি কোম্পানিকে মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী ক্ষুদ্র চুল্লি তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নাসা ও পেন্টাগনের চন্দ্র চুল্লি প্রকল্পেও অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে ব্যবহারের জন্য কোনো ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লিই এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত ও প্রস্তুত নয়। কীভাবে তাপ অপসারণ করা হবে, কীভাবে তেজস্ক্রিয়তা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং কীভাবে চুল্লির কাঠামোগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হবে—এসব মৌলিক প্রশ্নের পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি।

উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ক্যাটি হাফ মনে করেন, চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। তবে যত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন হবে, চুল্লি তৈরি তত কঠিন হবে।

তার মতে, মহাকাশে প্রতিযোগিতার বদলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরো বেশি অগ্রগতি সম্ভব। মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতামূলক বৈজ্ঞানিক উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি বসাতে মরিয়া তিন পরাশক্তি
ছবি: সংগৃহীত

হুথিদের হামলায় পুড়ছে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনা

আল-জাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সিঃ ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে তারা। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোট এই দাবি ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

শনিবার হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, রিয়াদে আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো অভিযান ‘সফলভাবে লক্ষ্য অর্জন করেছে’। হামলার পর লক্ষ্যবস্তু এলাকায় আগুন লাগার কথাও দাবি করেন তিনি।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও অন্যান্য প্রদেশে সৌদি হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সানা ও অন্যান্য প্রদেশে ৬০টি বিমান হামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন ইয়াহিয়া সারি।

তার দাবি, এসব হামলা নিয়ে মোট হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৪২০-এ দাঁড়িয়েছে।

হুথি মুখপাত্র আরো বলেন, ‘অবরোধের জবাব অবরোধ দিয়ে, উত্তেজনার জবাব উত্তেজনা দিয়ে’ দেওয়া হবে।

তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি হুথিদের দাবি নাকচ করেছেন। সৌদি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শনিবার রিয়াদে হামলার বিষয়ে হুথিদের দাবি ‘বিভ্রান্তিকর’।

আল-মালিকির ভাষ্য, নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি এবং হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাড়তে থাকা জনঅসন্তোষ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই দাবি করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার রিয়াদে আরামকোর একটি স্থাপনার কাছে আগুন ও ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডুলি দেখা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি রয়টার্সকে বলেন, আরামকোর একটি স্থাপনার আশপাশে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আরামকোর কাছেও মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

তাই রিয়াদের ওই আগুনের সঙ্গে হুথিদের দাবি করা হামলার সরাসরি সম্পর্ক এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।

এর আগে গত সপ্তাহে হুথিরা দাবি করেছিল, সৌদি আরবের ইয়ানবুতে আরামকোর স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে তারা। সে সময় সৌদি আরব জানিয়েছিল, তায়েফ ও ইয়ানবু এলাকার দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। তবে আরামকোর স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কথা জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

রিয়াদে নতুন করে এই হামলার দাবি এমন সময় এল, যখন সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুথিদের হামলায় দেশটির বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আসির প্রদেশে এক এশীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। এতে একটি মসজিদ ও কয়েকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া শুক্রবার নাজরান শহরের একটি স্কুল ভবনে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে জানিয়েছে সৌদি সিভিল ডিফেন্স। এতে ভবনটি ও আশপাশে থাকা কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশটির কয়েকটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

হুথিদের হামলায় পুড়ছে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনা
ছবি: এএফপি

গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা

ফিলিস্তিনের আসন্ন আইনসভা নির্বাচন গাজার তরুণ আহমাদ মোহসেনের জন্য প্রথম জাতীয় ভোট। ২৪ বছর বয়সি এই তরুণের কাছে নির্বাচনের গুরুত্ব একটাই—নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন বেকারত্ব, নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান করেন।

দেইর আল-বালাহর একটি দোকানে প্রিপেইড ইন্টারনেটের কার্ড বিক্রি করেন মোহসেন। তিন বছর আগে ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর আগে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে পেশাগত লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল হাসপাতালে কাজ করবেন, স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করবেন অথবা বিশেষায়িত কোনো কোর্স করবেন।

কিন্তু যুদ্ধ তার সেই পরিকল্পনা বদলে দেয়।

যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাস দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন মোহসেন। হাসপাতালে তখন আহত ও নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক। পরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় অন্য কাজ খুঁজতে বাধ্য হন তিনি।

মোহসেন বলেন, ‘আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিকও পাচ্ছিলাম না। তাই অন্তত সামান্য আয় হবে—এমন অন্য কাজ খুঁজতে শুরু করি।’

আগামী ২৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনের আইনসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০০৬ সালের পর এটিই হবে প্রথম ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচন। মোহসেনের জন্যও এটি প্রথম জাতীয় ভোট।

এই নির্বাচনে তার প্রত্যাশা স্পষ্ট। তিনি চান, প্রার্থীরা তার প্রজন্মের বেকারত্ব, নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা নিয়ে কথা বলুন।

তিনি বলেন, ‘প্রথম চাওয়া হলো, যেন ভালো বেতনসহ একটি স্থায়ী চাকরি পাই। যাতে নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতে পারি। দ্বিতীয় চাওয়া নিরাপত্তা।’

গাজায় বেকারত্বের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। ইসরাইলের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে ভূখণ্ডটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

মোহসেনের পরিবারের গাজার সালাহ আল-দিন সড়কের পূর্বদিকে জমি রয়েছে। ওই এলাকায় ইসরাইলের প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেন না। তিনি আশা করেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইল শিগগির ওই এলাকা থেকে সরে যাবে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় পুনর্গঠন শুরু হবে।

তার কাছে মানুষের জীবনে পরিবর্তন না এলে নির্বাচন যথেষ্ট নয়।

মোহসেন বলেন, ‘একজন প্রার্থীকে মানুষের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতে হবে এবং মানুষের কণ্ঠে কথা বলতে হবে। অন্য কারো কণ্ঠে নয়। ২০ বছর ধরে যুদ্ধ ও ধ্বংসের কারণে যে তরুণেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হয়ে কথা বলতে হবে। এর অবসান দরকার।’

২০০৬ সালের ভোটের স্মৃতি

৫৩ বছর বয়সি গাসসান মারওয়ানের কাছে নির্বাচনের স্মৃতি আরো পুরোনো। ২০০৬ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে হামাস জয়ী হয়েছিল।

মারওয়ান আগে স্বর্ণকারের কাজ করতেন। পরে একটি কারখানা গড়ে তোলেন। সেটিই ছিল তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।

২০০৬ সালে ভোট দেওয়ার সময় তার আশা ছিল, নির্বাচন মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। সন্তানদের জন্য একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎও চেয়েছিলেন তিনি।

নুসেইরাতের একটি স্কুলে ভোট দিয়েছিলেন মারওয়ান। স্বাধীন রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘুতির নেতৃত্বাধীন একটি তালিকায় ভোট দিয়েছিলেন তিনি। তার স্মৃতিতে ওই নির্বাচন ছিল স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু।

মারওয়ান বলেন, ‘আমি অনেক স্বচ্ছতা ও সততা দেখেছি। মনে হয়েছিল, এটি একটি গণতান্ত্রিক উৎসব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ২০ বছরে সেই অভিজ্ঞতা আর ফিরে আসেনি।’

দুই দশক পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধের সময় তার বাড়ি ও কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। ৩০ বছরের বেশি সময়ের পরিশ্রমও এখন পরিবারকে সেই স্থিতিশীলতা দিতে পারছে না, যার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘বাড়ি ও আয়ের উৎস হারানোর পর আর কী চাইবেন? এখন শুধু পুনর্গঠন, শান্তি ও দেশে নিরাপত্তাই চান।’

মারওয়ান সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান সন্তানদের তাঁবুর মধ্যে বসবাস করতে দেখে। যে স্থিতিশীল বাড়ি সন্তানদের জন্য তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি আর নেই।

যুদ্ধ তাকে এমন কাজেও ফিরিয়ে এনেছে, যা দীর্ঘ কর্মজীবনের পর কখনো করার কথা ভাবেননি। দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে বহন করতে হচ্ছে তাঁকে।

মারওয়ান বলেন, ‘এত বছর পর আমাকে দূর থেকে পানি বহন করতে হচ্ছে। আমি কি এভাবেই থাকব? আজ আমার বয়স ৫৩। আর ১০ বছর পর ৬০-এর ঘরে থাকব। তখন এই বোঝা বহন করতে পারব না।’

তার মতে, এই পরিস্থিতি মানুষের রাজনীতির প্রতি আগ্রহও কমিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রাজনীতির প্রতি আমাদের আগ্রহ কমেছে। রাজনীতি আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে নয়, বরং হতাশা ও ক্ষোভ জমতে জমতে এমন হয়েছে। মানুষ এখন কীভাবে টিকে থাকবে এবং প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করবে, তা নিয়েই ব্যস্ত।’

তবু চারপাশের ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে নির্বাচন সামনে আসায় মারওয়ানের মধ্যে আশা ও সংশয় দুটোই কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো মনে হয়, নির্বাচন নিয়ে কথা বলাটাই প্রায় কৌতুক। কারণ নির্বাচন করার মতো স্পষ্ট কোনো পরিস্থিতি নেই।’

পুনর্গঠনই অগ্রাধিকার

অধিকৃত পশ্চিম তীর, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের হিসাবে, গাজায় প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি ভোট দেওয়ার যোগ্য।

কমিশনের গাজা অঞ্চলের পরিচালক জামিল আল-খালিদি বলেন, ভূখণ্ডজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও যুদ্ধের পর ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে নির্বাচন আয়োজন বড় ধরনের লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ইসরাইল গাজায় নির্বাচনী সামগ্রী প্রবেশে বাধা দিলে স্থানীয়ভাবে এসব সামগ্রী তৈরির বিকল্প পরিকল্পনাও করেছে কমিশন।

গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ইয়াদ আল-কুরার মতে, যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ শেষ করে দেয়নি। বরং রাজনীতির কাছে তাদের প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে।

প্রায় তিন বছর ধরে বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংস ও জীবিকা হারানোর পর গাজার মানুষের রাজনৈতিক চাহিদা এখন ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কতটা স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে মনে করেন তিনি। শুধু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা রাজনৈতিক স্লোগান এখন আর যথেষ্ট নয়।

আল-কুরার মতে, মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে—এমন নেতৃত্বই এখন প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি গাজার পুনর্গঠন, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সচল করা এবং মানুষকে আবার স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকায় ফেরার সুযোগ তৈরি করা।

তিনি বলেন, ‘গাজা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—এমন নেতৃত্বের প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। কারণ এই ভূখণ্ডকে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।’

গাজার ভোটারদের প্রথম চাওয়া চাকরি ও নিরাপত্তা
ছবি: সংগৃহীত

পেডোফাইলরা কি চারপাশে কিলবিল করছে by গওহার নঈম ওয়ারা

সম্প্রতি উদ্বিগ্ন এক মা তাঁর পরিচিত অভিভাবকদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেটি ভাইরাল হয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়।

দেশ–বিদেশের অনেকে চমকে উঠেছেন ভিডিওটি দেখে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর জন্মদিনে কেক কাটা হয়েছে। সেই কেক শিক্ষার্থীর মুখে আগ্রহ নিয়ে লেপে দিচ্ছেন শিক্ষক।

শিক্ষক এখানে থেমে গেলে বিষয়টি ‘ফান’ হিসেবে গণ্য করে সেদিনের মতো ‘ফুলস্টপ’দেওয়া যেত; কিন্তু থলের মধ্যে বিড়াল থাকলে ‘ফুলস্টপ’ সহজ নয়।

এই শিক্ষকের অতি আগ্রহের বিড়াল টুপ করে থলে থেকে বেরিয়ে পড়ল তখন, যখন তিনি কিশোর ছাত্রটির কেক মাখনো গাল নিজের জিহ্বা দিয়ে পরিষ্কার করা শুরু করেন।

এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন শিশুটির মা জানান ওই শিক্ষক নাকি ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্মদিনে এ রকম আচরণ করেন হামেশাই।

একজন অভিভাবক শিক্ষকটির এই অগ্রহণযোগ্য আচরণকে পেডোফাইল–সুলভ আচরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে পেডোফাইল কী? পেডোফাইল বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি প্রাক্‌–কৈশোর শিশুদের (সাধারণত ১৩ বছরের কম) প্রতি যৌন আকর্ষণ, তাড়না বা লালসা অনুভব করেন।

তবে এখানে যে এরা থেমে থাকবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ রকম অগ্রহণযোগ্য যৌন আচরণ ১৩ –১৪ বছর পার হয়ে যাওয়া শিশু=কিশোরদের প্রতিও থাকতে পারে। যৌন অপরাধবিজ্ঞান সেই প্রবণতাকে ‘হেবেফিলিয়া’ বলে উল্লেখ করেছে।

হেবেফিলিয়া এমন একধরনের যৌন প্রবণতা, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্কের যৌন আকর্ষণ থাকে শুধু ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রতি। এটি পেডোফিলিয়া থেকে আলাদা; কারণ পেডোফিলিয়ায় আকর্ষণ থাকে কৈশোরে পৌঁছানোর আগের শিশুদের প্রতি, অর্থাৎ যারা এখনো বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেনি। তা ছাড়া ‘ইফেবোফিলিয়া’ বলেও আরেকটি গ্রুপের কথা গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

পেডোফিলিয়া, হেবেফিলিয়া বা ইফেবোফিলিয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণ এই লেখার মোক্ষ নয়।

তবে এটুকু বলা যায়, তাঁরা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি যৌন তাড়নায় তাড়িত থাকেন এবং সুযোগ পেলেই নানাভাবে সেটি মিটিয়ে নেন। গালে কেক লাগিয়ে সেটি জিহ্বা দিয়ে পরিষ্কার করা সেই যৌন তাড়নারই বহিঃপ্রকাশ।

মাত্র হাঁটতে শেখা ভাগনে-ভাগনি বা ভাতিজা-ভাতিজির পেছন থেকে প্যান্ট খুলে দিয়ে অথবা শিশুর নরম গাল বা শরীরে দাড়ি ঘষে পুরুষ আত্মীয় বা পরিচিতজনেরা যে আনন্দ পান, সেটিও মনের মধ্যে সুপ্ত বিকৃত যৌনাচারের প্রকাশ। সেটি নির্দোষ কোনো বিনোদন নয়।

উদ্বিগ্ন মায়ের পোস্টে অনেকেই আওয়াজ তুলেছেন ‘শিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়ন নির্মূল করুন।’

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বড়দের পেডোফিলিয়ার শিকার হলে শিশুর মন, শরীর, আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক সবকিছুই গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পেডোফিলিয়ার শিকার হওয়া শিশু ভয়, উদ্বেগ ও দুঃস্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অপরাধবোধ ও নিজেকে দোষী ভাবা, বিষণ্নতা ও পিটিএসডি বা আঘাত– পরবর্তী মানসিক আভিঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে।

সময়মতো পরিবারের সহযোগিতা, চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং না পেলে শিশুকে এর ভার সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

পাঠকদের মনে থাকার কথা, বছর তিনেক আগে (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২) এক বয়স্ক মানুষের যৌন লালসার শিকার হয়ে সাত বছরের এক শিশু এতটাই বিপর্যস্ত হয়েছিল যে সে বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আত্মহত্যা করার চেষ্টার পরেই জানা যায় ঘটনাটা।

ওই ঘটনায় শিশুটি প্রথমে ভয়ে সংকুচিত হলেও সে ব্যথায় অতিষ্ঠ হয়ে পরের দিন সন্ধ্যায় ফুফুকে ঘটনাটি বলে, ‘দোকানদার আঙ্কেল জোর করে ব্যথা দিয়েছে।’ এটা কোনো অভিযোগ ছিল না। স্রেফ আস্থায় থাকা একজনকে শিশুটি জানাতে চেয়েছিল গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতার কথা। হয়তো তার কষ্টের কথা বলে সে হালকা হতে চেয়েছিল।

বড়রা জানেন না শিশুদের সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে কেমন ব্যবহার করতে হয়; এমন হলে শিশুকে তার শারীরিক আর মানসিক সুস্থতার জন্য কী পদক্ষেপ নিতে হয়।

শিশুকে দোষারোপ করে এবং জনে জনে বারবার একই প্রশ্ন করে বড়রা তাকে সেই গর্তে ফেলে দেন, যে গর্ত থেকে সে বেরিয়ে আসতে চায়।

যে ঘটনার পরিকল্পনা ফাঁদ পাতা ও বাস্তবায়ন—সবকিছুতে একজন বয়স্ক মানুষের হাত; তখন শিশুকে দোষারোপ করে তার মনের মধ্যে অপরাধবোধ চাগিয়ে তোলার কোনো যুক্তি নেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুটির ভোগান্তি বাড়ে।

ওই শিশুর ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছিল। বড়রা কেউ বিশ্বাস করেননি। উল্টো শিশুটিকেই তাঁরা বকাবকি করেন। নিরুপায় শিশু তাই বোধ হয় মৃত্যুকেই তার শেষ আশ্রয়ের জায়গা মনে করেছিল।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নির্যাতনের ঘটনা যদি ঘটে, তাহলে কখনো শিশুকে দায়ী করা যাবে না। তাকে মানসিকভাবে সমর্থন করতে হবে। তাঁর সামনে এ ঘটনা নিয়ে বারবার আলোচনা বা কান্নাকাটি করা যাবে না। এতে তার মানসিক সংকট চরমে পৌঁছে যায়।

এই সাত বছরের শিশুটির ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছিল। শেষমেশ সে ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভাগ্য ভালো, শিশুটি বেঁচে গিয়েছিল। পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল যৌন নির্যাতককে।

ছেলে শিশুরা যে সহজেই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে, সেটি অনেকের ধারণাতেই নেই। এই সুযোগটাই নেয় ছদ্মবেশী যৌন নির্যাতক বা পেডোফাইলরা।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২১ সালে আইন সালিশ কেন্দ্রের এক হিসাবে দেখা যায়, সে বছর (২০২১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত) মোট ৭৫ জন ছেলেশিশুকে ধর্ষণসহ যৌন হয়রানি করা হয়েছিল।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করে, সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। বছর পাঁচেক আগে একটি সংগঠনের সাতক্ষীরা আর ঢাকার ৯টি স্কুলে চালানো জরিপ থেকে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের একজন ছেলে যৌন নির্যাতন বা অশোভন আচরণের শিকার হয়।

এই জরিপে বিভিন্ন বয়সের ও ক্লাসের মোট ১ হাজার ২০০ ছাত্র অংশ নিয়েছিল। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রির সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে কমপক্ষে একজন যৌন হয়রানির শিকার। মেয়েশিশুদের মধ্যে এই হার প্রতি চারজনে একজন।

মেয়েশিশুরা যেমন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাছের লোকজন যেমন আত্মীয়, শিক্ষক, পারিবারিক বন্ধু, প্রতিবেশীর দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়; ছেলেদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটে।

চট্টগ্রামে সেই শিশুর কথা আমরা পত্রিকায় জেনেছিলাম, যাকে ধর্ষণ করেছিল, সে শিশুটির নিকটাত্মীয়। পুলিশ ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠায়।

অনেকে মনে করেন, দরিদ্র পরিবারের ছেলেশিশুরা একটু বেশি ঝুঁকিতে থাকে। অভিভাবকদের নজরদারির বাইরে থাকলেই শিশুরা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সেখানে ধনী–গরিবের বিষয়টি গৌণ।

শিশু নির্যাতনবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে একজন ভারতীয় বক্তার জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় জানতে পারি, মা–বাবার অর্থের অভাব না থাকায় দেশের অত্যন্ত সম্মানিত ও কাঙ্ক্ষিত বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।

স্কুলের ছুটিতে বাড়ি এলে ব্যস্ত মা–বাবা অধিকাংশ সময় তাকে গৃহভৃত্যের কাছে রেখে বাইরে যেতেন। গৃহভৃত্য সেই সুযোগে নিয়মিত এই অবোধ কিশোরকে ধর্ষণ করেছেন।

বোর্ডিং স্কুল ছুটির সময় আর সব ছেলে যখন আনন্দে মেতে উঠত, কিশোরটি মনেপ্রাণে চাইত ছুটি যেন না হয়, তাকে যেন বাড়িতে যেতে না হয়।

শিশুর সম্ভাব্য যৌন নির্যাতন ও যৌন হেনস্তার ক্ষেত্রে একজন মা তাঁর মেয়ে সন্তানকে নিয়ে যত উদ্বিগ্ন–উৎকণ্ঠায় থাকেন, ছেলেকে নিয়ে ততটাই নিরুদ্বেগ নিশ্চিন্তে থাকেন। একজন মা জানান, ‘ছেলেকে নিয়ে আমার অন্য ভয়; তাকে কেউ তুলে নিয়ে যাবে না তো! তাকে কেউ ফুসলিয়ে নিয়ে বা জোর করে যৌন নির্যাতন করবে, এটা কখনো হয় নাকি? আমরা শুনি, মেয়েরাই কেবল এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়।’

শুধু মা–বাবা কেন, দেশের মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোও ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। উদ্বিগ্ন হলে প্রকাশিত ভিডিও নিয়ে তাঁরা কথা বলতেন অথবা নিরপেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন তদন্তের ব্যবস্থার দাবি নিয়ে এগিয়ে আসতেন।

হতে পারে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামজাদা শিক্ষক বলেই সবাই চুপ আছেন। কেউ কেউ ফেসবুকে লিখেছেন এসব ‘এআই’–এর কীর্তি। সেটি হলেও তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।

* গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক ও গবেষক। ই–মেইল: wahragawher@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

পেডোফাইলরা কি চারপাশে কিলবিল করছে
Galib Mujahid

ছায়াযুদ্ধ: ইরান সংঘাতে ‘চীন ফ্যাক্টর’

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমিতে কেবল যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের বারুদ ঝরছে; কিন্তু ধোঁয়াশার কিছুটা গভীরে তাকালে দেখা যায়, সেখানে খেলা চলছে অন্য এক বড় দাবার চালের। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মুখোমুখি লড়াইয়ের আড়ালে নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে দুই পরাশক্তির ক্ষমতার দ্বিতীয় এক যুদ্ধক্ষেত্র, যার নাম ‘চীন ফ্যাক্টর’।

চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে না। তবে ইরানের পেছনে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক ছায়া ওয়াশিংটনের যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে না নেমেও চীনের এই উপস্থিতি এক বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে: ইরান সংঘাত কি তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন প্রক্সি বা পরোক্ষ ময়দান?

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হিসাবটা এখনো সরাসরি যুদ্ধের নয়। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-জি জিনপিং জমকালো সম্মেলনে দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতাই একে অপরের প্রতি করমর্দন করেছিলেন। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতায় এই ইরান যুদ্ধই আবার তাদের ঠেলে দিয়েছে জ্বালানি, নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা আর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের এক কঠিন প্রতিযোগিতায়।

আমেরিকান কঠোর নিষেধাজ্ঞার তোপ সামলেও তেহরান যে আজও টিকে আছে, তার পেছনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সচ্ছলতার উৎস বেইজিং। যুদ্ধের আগে চীনের মোট তেল আমদানির অন্তত ১৩-১৪ শতাংশ যোগাত ইরান। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা চীনা স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। জবাবে ওয়াশিংটন চীনা কোম্পানি ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে ব্যাকফুটে ঠেলার চেষ্টা করছে। তবে এটি হোয়াইট হাউসকে কঠিন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সহজ, কিন্তু চীনের শীর্ষ ব্যাংকগুলোকে কোণঠাসা করতে গেলে জল গড়াবে দুটি পরাশক্তির সরাসরি অর্থনৈতিক যুদ্ধে।

কেবল অর্থই নয়, রণক্ষেত্রে প্রযুক্তির খেলাতেও চীনের নাম উঠে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তিতে ব্যবহারযোগ্য চীনা দ্বিমুখী ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ পৌঁছচ্ছে তেহরানে। জর্ডানে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ইরানি হামলার পেছনে চীনা স্যাটেলাইট ছবির ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে মার্কিন গোয়েন্দারা। বেইজিং অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও এবং ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিষয়টি এড়াতে চাইলেও সত্যটা স্পষ্ট, আধুনিক যুদ্ধে জিততে সরাসরি সেনা পাঠানোর দরকার হয় না; প্রযুক্তি ও নেভিগেশন সুবিধা দিয়েও অন্য দেশের সামরিক শক্তিকে অপরাজেয় করে তোলা যায়।

তবে চীনের ভালোবাসাও নিখাদ বা সীমাহীন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রবাহ বিঘ্নিত হলে বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে খোদ বেইজিংয়ের অর্থনীতি। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থের এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হয়েছে। চীন চায় না, ইরান ধসে পড়ুক, আবার তারা এমন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধও চায় না। যা পুরো পারস্য উপসাগরকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তাছাড়া সৌদি আরব ও আমিরাতের মতো ধনী দেশগুলোর সঙ্গেও চীনের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেহরানকে বাঁচানোর তাগিদ থাকলেও তাদের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামার মতো বোকামি বেইজিং করবে না।

মূলত ইরান এখন এমন এক প্রক্সি ময়দান, যেখানে আমেরিকা তার নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তির পুরনো মহড়া দেখাচ্ছে, আর চীন দেখাচ্ছে কীভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাপ্লাই চেইন হাত করে সেই মার্কিন শক্তিকে অকার্যকর করে দেওয়া যায়। আমেরিকান প্রতিটি নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়ে কেনা ইরানি তেলের ব্যারেল প্রমাণ করছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে।

তাই আসল প্রশ্ন এটি নয় যে চীন সরাসরি ইরানের হয়ে যুদ্ধে নামবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, এই ইরান সংঘাত কি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বিদ্যমান বাণিজ্যযুদ্ধকে ছাপিয়ে একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের আসল মহড়ায় পরিণত হতে যাচ্ছে? আর সেটিই হতে চলেছে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কৌশলগত মোড়।

সূত্র: এশিয়া টাইমস

ছবি: এশিয়া টাইমস
ছবি: এশিয়া টাইমস

হরমুজ প্রণালিতে ট্র্যাকিং বন্ধের পর তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ

হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি তেলবাহী জাহাজের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি এর আগে কেশম দ্বীপের উপকূলের কাছে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর দেয়। নৌপথ ব্যবহারের নিয়ম ভেঙে ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর সঙ্গে বিস্ফোরণের ঘটনা জড়িত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে বিস্ফোরণের ঘটনায় জাহাজটির পরিচয় কী, কেউ হতাহত হয়েছেন কি না বা জাহাজটির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন নিরাপদ রাখতে মার্কিন বাহিনী কাজ করছে। তার দাবি, সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বেশি হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে ইরান। জুনে একটি সমঝোতার পর অল্প সময়ের জন্য নৌপথটি আবার খুলে দেওয়া হলেও পরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এর পর জুলাইয়ের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র আবারও প্রণালিটিতে অবরোধ কার্যকর করে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অবরোধ কার্যকর করতে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের বাহিনী ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহেই ১০টি জাহাজকে অন্য পথে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: শাফাক নিউজ 

ছবি: শাফাক নিউজ থেকে নেওয়া
ছবি: শাফাক নিউজ থেকে নেওয়া

ভাইরাল ভিডিও: শিশু শোষণের নতুন মাধ্যম নিয়ে ভাবতে হবে by জাহিদ হোসাইন খান

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর দৌরাত্ম্যে আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, অভিভাবকেরা নানাভাবে শিশুদের ব্যবহার করছেন কনটেন্ট তৈরির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। কখনো শিশুর কান্না, কখনো তার হাসি, কখনো অপ্রত্যাশিত কোনো মন্তব্য—এগুলো ভাইরাল কনটেন্টে রূপ নিচ্ছে। ভাইরাল ভিডিও যেন পরিণত হয়েছে মা-বাবার সফলতার মাপকাঠি হিসেবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ প্রবণতার পেছনে অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ কী? সমাজ ও আইন এ বিষয়কে কীভাবে দেখছে?

অনেক অভিভাবক নিজেরা হয়তো ক্যামেরার সামনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, কিন্তু শিশুরা সহজেই ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি হয় বলে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের সামনে আনেন। এই জনপ্রিয়তা কিংবা স্বীকৃতি অর্জনের বাসনা থেকেই অনেকেই না ভেবে শিশুদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন।

এ অবস্থাকে প্যারেন্টাল নার্সিসিজম বলে চিহ্নিত করছেন অনেক মনোবিজ্ঞানী। এ ধরনের অভিভাবকেরা সন্তানের জীবনের একেকটি দিক ব্যবহার করছেন নিজের সামাজিক পরিচিতি গড়তে। এখানে সন্তান নয়, বরং সন্তানের জনপ্রিয়তাই হয়ে উঠছে অভিভাবকের আত্মতৃপ্তির উৎস। আবার অন্য যেসব শিশুর ভিডিও দেখেন অভিভাবকেরা, তাঁদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। আরেকজনের সন্তান তারকা, আমার সন্তান তারকা নয়, এমন ভাবনা মনে আসে অনেক মা-বাবার।

শিশুর ব্যক্তিগত মুহূর্ত যেমন ঘুমানোর সময়, কান্নার সময়, গোসলের মুহূর্ত—এসব অনেক সময়ই ভিডিও আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। এটি শিশুর গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শামিল। শিশু বড় হয়ে যখন এসব ভিডিও দেখবে, তখন তার মধ্যে লজ্জা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি বা সামাজিক বঞ্চনার অনুভব তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব। শিশু আইন ২০১৩ এবং জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, কোনো শিশুর মানসম্মান, মর্যাদা বা গোপনীয়তা বিঘ্নিত হয়, এমন কিছু করা আইনসিদ্ধ নয়। বাংলাদেশে এখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে নির্দিষ্ট আইন খুব শক্তিশালী নয়, কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারা এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, যদি এতে শিশু শোষণের উপাদান থাকে।

বাস্তবে দেখা যায়, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির এ বিষয়ে আইন প্রয়োগ তুলনামূলক দুর্বল। কোনো ভিডিওতে শিশুর প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপন থাকলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলেও সাধারণ কনটেন্টের ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। তাই এ ক্ষেত্রে সরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিশুকেন্দ্রিক কনটেন্ট অনেক সময় ইউটিউব বা ফেসবুক থেকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শিশুদের কনটেন্ট অনেক বেশি দর্শকপ্রিয় হওয়ায় একশ্রেণির অভিভাবক এটিকে ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। অথচ এই আয়ের ভাগ শিশুর নামে রাখা হচ্ছে না, কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে না। শিশুশ্রমের একধরনের আধুনিক রূপ হয়ে উঠছে এই ডিজিটাল এক্সপ্লয়টেশন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা কিংবা গ্রামেও শিশুদের ভিডিও দিয়ে আয় করাটা এখন অনেক পরিবারে আয় বা পেশার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই অর্থে শিশুর কোনো অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এই জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশু-কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারে গাইডলাইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ইউটিউব বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত বয়সভিত্তিক কনটেন্টে নির্দিষ্ট ফিল্টার এবং মনিটরিং সিস্টেম চালু করা।

প্রেস কাউন্সিল, আইসিটি মন্ত্রণালয় ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিশনের সম্মিলিত উদ্যোগে শিশুর ডিজিটাল সুরক্ষা নিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। ডিজিটাল অভিভাবকতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এখনই গ্রহণ করা উচিত; নাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের হয়তো এর মূল্য দিতে হবে দীর্ঘ সময় ধরে।

● জাহিদ হোসাইন খান, গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচির সাবেক কর্মী
- zahid.pen@gmail.com

ভাইরাল ভিডিও: শিশু শোষণের নতুন মাধ্যম নিয়ে ভাবতে হবে