Sunday, March 22, 2015

তালা ভেঙে খুলে দেয়া হলো রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

দুর্নীতির দায়ে অপসারিত সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়ার অনুসারীদের আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করলেন না রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি। টানা চার মাস ২৭ দিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগনালে অবশেষে আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং এএসপির নেতৃত্বে তালা ভেঙে ক্যাম্পাসের একাডেমিক, প্রশাসনিক ভবন ও মূল ফটক আন্দোলকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেন ভিসি। বিশ্ববিদ্যালয় চালুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই শিক্ষক শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের পদচারণায় মুখ হয়ে উঠে ক্যাম্পাস। অন্যদিকে পদত্যাগকারীরা তাদের পদত্যাগপত্র উঠিয়ে না নিলে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে সেখানে অন্য শিক্ষকদের দায়িত্ব দিয়ে আগামী সপ্তাহেই বহুল কাঙ্খিত ২০১৪-১৫ সেশনের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র। এছাড়া ক্লাস ও কাজে যোগ না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী আন্দোলনকারী শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গত বছর ২৭ অক্টোবর থেকে ‘পদোন্নতির’ দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন যৌক্তিকতা হারালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসিকে একগুয়ে দাবি করে তার পদত্যাগের দাবিতে গত ৩ ডিসেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের গেট ও পরবর্তীতে একাডেমিক ভবনের গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে আন্দোলন করে আসছিলেন কতিপয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ২৭টি পদ থেকেও পদত্যাগ পত্র জমা দেন।
ভিসি অফিস থেকে তাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছিল এই আন্দোলনকারীরা সবাই দুর্নীতির দায়ে অপসারিত সাবেক ভিসি ড. আব্দুল জলিল মিয়ার অনুসারী এবং তারা অবৈধ সুবিধা আদায়ে চাপ প্রয়োগ করছিলেন বর্তমান প্রশাসনের ওপর। কিন্তু ভিসি আন্দোলনকে অনৈতিক দাবি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন কঠিন ব্যবস্থা নেননি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় ২০১৪-১৫ শেসনের ঘোষিত ৪, ৫, ৬ ডিসেম্বরের ভর্তি পরীক্ষাও। মহাসঙ্কটে পড়েন আবেদনকারী ৯০ হাজার ৪০২ জন পরীক্ষার্থী। বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে সমাধানের চেষ্টা করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমান এমপি, রংপুর সিটি মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার দিলোয়ার বখত, জাতীয় পার্টির রংপুর মহানগর কমিটির আহবায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ রংপুরের বিশিষ্টজনেরা।
বিষয়টি নিয়ে ভিসি আন্দোলকারীদের সাথে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আন্দোলকারীরা বিষয়টি ভিসির দুর্বলতা মনে করে আন্দোলনে অনড় থাকেন। আর তা বাঁচিয়ে রাখেন সাবেক ভিসি ড. জলিল মিয়াসহ ভিসি হতে ইচ্ছুক ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী একাধিক শিক্ষক।
সূত্র জানায়, এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দফতর এবং শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে ভিসিকে গ্রিন সিগনাল দেয়া হয়, যেসব শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ না করে পদত্যাগ করেন, ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে, ক্লাস পরীক্ষা না নিয়ে আন্দোলন করে বেতনভাতা তুলছেন তারা কখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো চান না। এজন্য সেখান থেকে ভিসিকে ক্যাম্পাস চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই নির্দেশ পেয়েই ভিসি ড. প্রফেসর নুর উন নবী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, সরকারের নীতি নির্ধারণী কর্তা ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করে ক্যাম্পাস খোলার সিদ্ধান্ত নেন।
সরকারের সেই গ্রিন সিগনাল পেয়েই আজ বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোরশেদুল আলম রনি, সহকারী প্রক্টর শাহীনুর রহমানের উপস্থিতিতে রংপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান এবং সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অশোক কুমার পালের নেতৃত্বে বিপুল পুলিশ প্রথমে প্রশাসিনক ভবন, পরে একাডেমিক ভবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের তালা ভেঙে ক্লাস পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কাজের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়। এসময় শিক্ষার্থী কর্মকর্তা কর্মচারীরা করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। এরপর তাদের নিয়ে ভিসি প্রশাসন ভবন ও একাডেমিক ভবনের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন। ক্লাস খোলার খুশিতে ক্যাম্পাসে প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়। করা হয় আনন্দ মিছিল। ক্যাম্পাস খোলার খবর পেয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আসেন ক্যাম্পাসে। তবে নীল দলের ৬০ থেকে ৬৫ জন শিক্ষক ক্লাস নিলেও আন্দোলনকারী শিক্ষকরা আজ রোববার ক্লাস নেননি।

সালাহ উদ্দিনকে ফেরত না দিলে কঠিন পরিণতি : খালেদা জিয়া

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ফিরিয়ে না দিলে সরকারকে কঠিন পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ রোববার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি একথা বলেন।
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে অনতিবিলম্বে তার পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া কিংবা আদালতে হাজির করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এর জন্য সরকারকে কঠিন পরিণতির সন্মুখীন হতে হবে। তিনি বলেন, দলের অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ১২ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এখনো তাকে মুক্তি দেয়া, আদালতে হাজির করা, এমনকি গ্রেফতারের কথা স্বীকার পর্যন্ত করা হচ্ছে না। এতে তার পরিবারের সদস্য, স্বজন, শুভানুধ্যায়ী, সহকর্মী ও দেশবাসীর মতো আমার উৎকণ্ঠাও সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের নিখোঁজ ও গুম করে ফেলা আওয়ামী সরকারের আমলে এক নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, গ্রেফতারের কথা অস্বীকারের পর বিভিন্ন জায়গায় নেতা-কর্মীদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনাও প্রায়শই ঘটছে। অনেকের পরিবার লাশটি পর্যন্ত ফেরত পায়নি। বিএনপি নেতা সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী, লাকসামের সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু, ঢাকার নির্বাচিত কমিশনার চৌধুরী আলম এবং লাকসাম পৌর বিএনপি সভাপতি হুমায়ুন কবীর পারভেজের মতো অনেককে গ্রেফতারের পর তাদেরকে গুম করা হয়েছে। দীর্ঘদিনেও তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
বেগম জিয়া অভিযোগ করেন, একটি সভ্য দেশে ক্ষমতার দখলদারী টিকিয়ে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এমন গেস্টোপো বাহিনীর মত ব্যবহার করাকে কোনো মতেই মেনে নেয়া যায় না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সালাহ উদ্দিনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবার আগে পরে স্থানীয় তরুণ ও নিরাপত্তা কর্মী এবং বাসার দারোয়ানের সাথে তাদের কথা হয়েছে। তাদের পরিচালিত অভিযানের অনেক প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছে। কাজেই তাকে গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করে দায় এড়াবার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার বিষয়টাও সরকারের মনে রাখা উচিত।
খালেদা জিয়া বলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদের মত একজন রাজনীতিবিদ এভাবে উধাও হয়ে যাবে আর ক্ষমতাসীনরা সেটা নিয়ে উৎকট রসিকতা করে পার পেয়ে যাবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। আমি রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন সমাজশক্তি ও সচেতন নাগরিকদের এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। কেননা দেশে এখন কেউ-ই নিরাপদ নয় যে কেউ যে কোন সময় গুম কিংবা খুন হয়ে যেতে পারেন।

শক্তিশালী অবস্থান থেকে আপসরফা by রেহমান সোবহান

গেল শতকের ষাটের দশকে ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’র প্রবক্তা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান খুব কাছ থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচনাপর্বের ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বহির্বিশ্বে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন রেহমান সোবহান। ১৯৭১ সালের মার্চের ঘটনাবলি তাঁর পর্যবেক্ষেণ উঠে এসেছে, যা প্রথম ছাপা হয়েছিল তাঁর সম্পাদিত ফোরাম–এ। তিন কিস্তিতে তাঁর এই ধারাবাহিক রচনাটি প্রকাশিত হচ্ছে....
বাংলাদেশের দাবিতে আন্দোলন তৃতীয় সপ্তাহে পা দিল। এর মধ্যে বাংলাদেশের ভেতরে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। মুদ্রার আরেক পিঠে ছিল ইসলামাবাদের সঙ্গে অসহযোগিতা, সেটাও চলতে থাকে। এমনকি প্রেসিডেন্টকে বরণ করার জন্য কোনো বেসামরিক কর্মকর্তা বিমানবন্দরে যাননি। সামরিক বাহিনীর বেসামরিক কর্মকর্তাদের ১৫ মার্চের মধ্যে কাজে যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা সেটা উপেক্ষা করেন। কর্মীরা তঁাদের এক দিনের বেতন আওয়ামী লীগের ত্রাণ তহবিলে দান করেন। জয়দেবপুরের অর্ডন্যান্স কারখানার ১১ হাজার বেসামরিক কর্মী কাজ বাদ দিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন।
ওদিকে জনগণ সেনাবাহিনীতে রসদ সরবরাহ করবে না—এ সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি দেখভাল করার জন্য সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেলকে ঢাকায় চলে আসতে হয়। তথ্যমতে, বিশাল আকৃতির সি-১৩০ পরিবহন বিমানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে টিনজাত রসদ আনা হয়।
অন্যদিকে সেনাবাহিনী তার শক্তি বাড়াতে থাকে। যদিও চট্টগ্রাম বন্দরে সাড়ে সাত হাজার অতিরিক্ত সেনার দলটি
জাহাজ থেকে নামতে পারেনি। কুমিল্লা থেকে এসএসজি কমান্ডো ইউনিট ও রংপুরে সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত ট্যাংকগুলো ঢাকায় আনা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ বেলা আড়াইটায় ঢাকায় পৌঁছান। পাকিস্তান রেডিওর আগে অল ইন্ডিয়া রেডিও তাঁর আগমনের খবর দেয়। তবে তাঁর নিরাপত্তাবহরের কারণে খবরটি আর চাপা ছিল না। বিমানবন্দর থেকে তাঁর বাসভবন পর্যন্ত পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনী রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তখনো ঢাকার আকাশে কালো পতাকা ছিল আর বাতাসে ছিল সহানুভূতিহীন নীরবতা। এর মধ্যেই তাঁর আগমন ঘটে।
তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে অনেক কানাঘুষা ছিল। অনেকে বলেন, তিনি পুরো যুদ্ধ ক্যাবিনেট নিয়েই ঢাকায় আসেন।
এটা নিশ্চিত যে প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল পীরজাদা ও বাহিনীর নিরাপত্তাপ্রধান ওমর তাঁর সঙ্গে ছিলেন। আর সাবেক আইনমন্ত্রী বিচারপতি কর্নেলিয়াস প্রেসিডেন্টের আইনি উপদেষ্টা হয়ে ১৭ মার্চ ঢাকায় আসেন। আন্তবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী সংবাদকর্মীদের এটা বোঝাতে গলদঘর্ম হন যে প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী জেনারেলরা বিশেষ কোনো কাজে আসেননি, তবু মানুষের সন্দেহ দূর হয়নি।
পরের দিন সকালে মুজিবের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বৈঠক শুরু হয়। দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি সিংহের গুহায় প্রবেশ করেন। প্রথম বৈঠক আড়াই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। পরের দিনের বৈঠক স্থায়ী হয় এক ঘণ্টা। বৈঠকে কী হয়েছে, তা তখনো জানা না গেলেও একজন আইনবিশেষজ্ঞকে ডেকে আনায় মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। আবার উদ্বেগমিশ্রিত সন্দেহও ছিল। শোনা যায়, মুজিব প্রথম বৈঠক থেকে রাগে গজরাতে গজরাতে বেরিয়ে গেছেন।
হ্যাঁ, ঢাকার উত্তেজনার ব্যারোমিটারের পারদ ওঠা–নামা করেছে। মধ্যবিত্তরা গুলির নিশানা না হতে গ্রামে পালাতে থাকে। আর রণমুখীরা নানা প্রস্তুতির মাধ্যমে উত্তেজনা জিইয়ে রাখে।
সে সময় অর্থনীতির অবস্থা চিল তথৈবচ। অর্থনীতি সে সময় স্থবিরতা ও পুনর্জাগরণের মাঝে খুবই বিপজ্জনকভাবে দোল খাচ্ছিল। ১৫ মার্চ আওয়ামী লীগ যে ডিক্রি জারি করে, তাতে প্রশাসন আংশিক ও অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গ রূপে কার্যকর হয়। কর না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে যখন ‘বাংলাদেশ সরকারের’ জন্য কর প্রদানের ঘোষণা আসে, তখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আরও পোক্ত হয়। দুটি ব্যাংকে বিশেষ হিসাবের মাধ্যমে এ কর প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। সে দুটি ব্যাংকের সদর দপ্তর ছিল বাংলাদেশে।
স্টেট ব্যাংক ও অন্য সব বাণিিজ্যক ব্যাংক আওয়ামী লীগের নির্দেশনায় চলছিল। কিন্তু ব্যাংকের কার্যক্রমে আরও কিছুটা শিথিলতা দেওয়া হলে পরিস্থিতি উন্নয়নের আভাস পাওয়া যায়।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে অসহযোগ থেকে জনগণের রাজ কায়েম হওয়ার পরও এর কোনো প্রভাব ছিল না। ব্যাংকিং খাত ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল। কারণ, স্থানীয় ব্যাংকগুলো বাইরের ব্যাংকগুলোকে হটিয়ে নিজেরাই আমানত সংগ্রহ করছিল। করাচিতে ব্যাংকের প্রধান শাখা স্থানীয় শাখার তহবিল স্থানান্তরের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। যাতে বাইরের ব্যাংকগুলো শেষমেশ স্থানীয় স্টেট ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে শিল্প খাতে অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন কমে যায়, আর দক্ষতাও নিম্নগামী হয়। এটা আবারও অসহযোগ ও জনগণের রাজের মধ্যকার পার্থক্যটা দেখিয়ে দেয়। পার্টি যে বাংলাদেশের জন্য নব উদ্যমে কাজের অনুপ্রেরণা দিচ্ছিল, সেটা শেষ পর্যন্ত কারখানার কর্মীদের কানে পৌঁছাতে পারেনি। পার্টির নির্দেশনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা না থাকায় কর্মীরা কিছুটা সন্দিহান ছিল। কারণ, বাংলাদেশের সমৃদ্ধির সঙ্গে তাদের কারখানার সমৃদ্ধি সম্পর্কিত ছিল।
প্রতিদিনের এই অনিশ্চয়তার মধ্যে একটা ব্যাপার নিশ্চিত ছিল, সেটা হচ্ছে ইসলামাবাদের কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল। সেটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা অনেকটা ব্রিটিশদের উপমহাদেশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টার শামিল। সে অবস্থায় ইসলামাবাদের ক্ষমতার ক্ষেত্র ছিল একটাই: মানুষ হত্যা করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে পারত তারা। খাদ্যভর্তি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে করাচি নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সে অভিপ্রায় পরিষ্কার। তাহলে এ প্রশ্ন উঠতে পারে, তারা কেন এমন অচিন্তনীয় পর্যায়ে চলে গেল। শেখ মুজিবের দাবির সঙ্গে সমঝোতা না করলে তাদের হাতে উপায় ছিল শুধু একটি, গণহত্যা শুরু করা।
যেকোনো আগ্রাসী যুদ্ধের মতো এর উত্তর নিহিত রয়েছে ভুল হিসাবের মধ্যে। যারা অধিবেশন স্থগিত করে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করেছে; তারা ভেবেছে এর প্রতিক্রিয়া তেমন জোরালো হবে না, আর তার পরিসরও হবে ক্ষুদ্র। কিছু মারপিট আর খুনখারাবি করে তা বাগে আনা যাবে। ভুট্টো নাকি এ কথাও বলেছেন যে আন্দোলনের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিলেই আওয়ামী লীগের বোধোদয় ঘটবে। সাত দিনের মধ্যেই যে এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে, সেটা কেউই ভাবেননি। সম্ভবত আওয়ামী লীগের নেতারাও না।
দ্বিতীয় ভুল হিসাবটি হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে এ ধারণা ছিল যে মুজিব এত তাড়াতাড়ি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন না। কিন্তু সেটা তিনি করে ফেলায় এর সুযোগে গণহত্যা চালানোর অজুহাত আর থাকল না। লুটপাট ও খুনখারাবির অজুহাত দিয়ে হত্যাকাণ্ডের সাফাই গাওয়ার যে চেষ্টা ইয়াহিয়া করলেন, সেটা আর হালে পানি পায়নি। ইয়াহিয়া ঢাকায় আসার পর পরিস্থিতি যে শান্ত হয়ে গেল, সেটা থেকেই বোঝা যায় মুজিবের কর্তৃত্ব কতটা ব্যাপ্ত।
এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে থাকে। চেয়ারম্যান ভুট্টোকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জনতাকে খেপিয়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ঢাক পিটিয়ে মিথ্যাচার শুরু করেন, ছয় দফার মধ্য দিয়ে বাঙালিরা চিরকালের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায়। অথচ এই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেই বাঙালিরা ছয় দফা দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে তারা আশা করেছিল, ভুট্টো জনগণের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য দলগুলোকে সংসদ বয়কট করতে ভয় দেখাতে পারবেন। আর এতে করে সংঘর্ষ সামগ্রিক আকার লাভ করবে।
ভুট্টো শুরুর দিকে সফল হলেও ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে তাঁর প্রচেষ্টা বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়ায়। একমাত্র কাইয়ুম মুসলিম লীগ এই বর্জনে অংশ নেয়। এই দলটি প্রশাসনের কাছ থেকে নানা সুবিধা পেয়ে এসেছে। প্রশাসনই তাদের চাপ দিয়ে সংসদ বর্জনে বাধ্য করে। এমনকি ভুট্টো তাঁর দলের মধ্যেও বিরোধিতার সম্মুখীন হন। আর সময়ক্ষেপণ করা হয়েছিল ভুট্টোর পেছনে ভঙ্গুর পশ্চিম পাকিস্তানকে এককাট্টা করার জন্য। যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সংঘর্ষটা সার্বিক হয়। অথবা তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ঘাত করতে চেয়েছে।
বাংলাদেশে স্থগিতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে নজিরবিহীন প্রতিরোধ হয়, তাতে পশ্চিম পাকিস্তানে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা অনিবার্য ছিল। অনেক পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিক স্থগিতের ব্যাপারটা সমর্থন করলেও জনগণের রাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর তারা দাবি করে বসে, ইয়াহিয়া খান যেন মুজিবের চার দফা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নেন। ভুট্টো ১ মার্চের পর থেকে রক্ষণাত্মক ও দুঃখজ্ঞাপক ছিলেন। এর ফলে তিনিও তাঁর উচ্চাশা খোলাসা করতে বাধ্য হন। তিনি করাচিতে ১৪ মার্চ প্রথমবারের মতো পশ্চিম পাকিস্তানকে দ্বিজাতিতত্ত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পিপলস পার্টির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। এতে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, এটা ভুট্টোর মাধ্যমে তাদের ওপর নতুন পাঞ্জাবি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। এমনকি খোদ পিপিপির মধ্যেও ভুট্টোর অভিসন্ধি নিয়ে সন্দেহ ছিল। কারণ, পিপিপি পশ্চিম পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী নয়, তারা এর মাধ্যমে সামরিক জান্তার বেসামরিক ফ্রন্টে পর্যবসিত হতে পারে।
কিন্তু জেনারেল ও নেতা তাদের ভুল না শুধরে পরিস্থিতি আরও জটিল করে ফেলায় সাধারণ ভুল থেকে এক চরম বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
সূত্র: ফোরাম, ২০ মার্চ, ১৯৭১
রেহমান সোবহান: অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের চেয়ারম্যান।

সরকার বেশি দিন টিকতে পারবে না : এমাজউদ্দীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, অতীতে কোনো স্বৈরাচারী সরকার বেশি দিন টিকতে পারেনি, এই সরকারও পারবে না। আজ হোক কাল হোক এ সরকারের পতন হবেই।
আজ রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জিয়া পরিষদের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র : জিয়াউর রহমান ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। জিয়া পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আবদুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন, অধ্যাপক লুৎফর রহমান, এম জহির আলী, আব্দুল্লাহিল মাসুদ, বাহাউদ্দিন বাহার, প্রকৌশলী রুহুল আলম প্রমুখ। এমাজউদ্দীন আহমদ আরো বলেন, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যেমেই ক্ষমতায় গিয়েছিলো। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের মন্ত্রী পরিষদ শপথ নিয়েছিলেন। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন দেয়ার আগে সরকার প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য নির্বাচন করছি। কিন্তু তিনি এখন একথা স্বীকারই করতে চাচ্ছেন না।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সর্ম্পকে তিনি বলেন, সিটি নির্বাচন করছেন ভালো কথা, তবে যারা প্রার্থী হবেন, তাদের শর্তসাপেক্ষ মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করাসহ রাজবন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে নিশ্চয়তা দিতে হবে। দেশে গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতেই বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া জরুরি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন বলেন, একাধিক রাজনৈতিক দল না থাকলে, কখনো বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর এটির প্রচলন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
রুহুল আমিন গাজী বলেন, আজ গণতন্ত্রের আন্দোলনের জন্য একজন জিয়াউর রহমানের প্রয়োজন ছিলো। কারণ জিয়াউর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও সততা নিয়ে কারও কোন সন্দেহ ছিল না। তিনি বেঁচে থাকলে আজ হয়তবা দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগযাত্রা এতো ব্যহত হত না। সরকারের সমলোচনা করে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েছেন ভালো কথা, তাহলে একমাসের জন্য হলেও ২০ দলীয় জোটের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করুন।

সবকিছুর আগে সহিংসতা বন্ধ হতে হবে -সাক্ষাৎকারে: সাবের হোসেন চৌধুরী by সোহরাব হাসান ও জাহাঙ্গীর আলম

সাবের হোসেন চৌধুরী। আন্তপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশসংক্রান্ত সর্বদলীয় গ্রুপের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। প্রথম আলোর সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতায় এসেছে নির্যাতনবিরোধী আইন, সাংসদদের আচরণবিধি, আইপিইউর ভূমিকা এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
প্রথম আলো : ২০০৯ সালে ‘নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতা প্রদান’ শিরোনামে একটি বেসরকারি বিল আনেন এবং তা সংসদে পাসও হয়। এখন পুলিশ বিভাগ থেকে সেই আইন সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আপনার মন্তব্য কী?
সাবের হোসেন চৌধুরী : এই বিলের একটি প্রেক্ষাপট হলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আমার সামনে দুটো পথ ছিল। প্রথমত, বিরোধী দলে থাকাকালীন আমি পুলিশি হেফাজতে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, সুযোগ পেলে কাউকে তার চেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করা। দ্বিতীয়টি হলো পুরো পদ্ধতিতে এমন পরিবর্তন আনা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার না হন।
আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বাংলাদেশ সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে আছে। সেখানে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্র কী ধরনের আচরণ করবে, কীভাবে তাদের মর্যাদা সুরক্ষিত হবে, তাও লেখা আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সরকার জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনে সই করে, যার ১৪ নম্বর ধারার ভিত্তিতে দেশের আইন তৈরির কথা বলা হয়েছে। বিলটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে ব্যাপক আলোচনা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা উপস্থিত হয়ে কমিটিকে পরামর্শ দেন। তাই আলোচনা ছাড়া বিলটি পাস হওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়।
প্রথম আলো : পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির অনেক কিছুর সঙ্গে ওই আইনটি সংগতিপূর্ণ নয়?
সাবের হোসেন চৌধুরী : প্রথমত, কোনো আইন ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের এবং কমিটি পর্যায়ে আইন মন্ত্রণালয় সেই প্রশ্ন তুলতে পারত। দ্বিতীয়ত, পুলিশের প্রস্তাবে দায় থেকে র্যাব, গোয়েন্দা বিভাগ, বিশেষ তদন্ত দল, বিশেষ শাখা ইত্যাদিকে বাদ দিতে বলা হয়েছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা। আপনি এমন সংশোধনী আনতে পারেন না, যা সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।
প্রথম আলো : জাতীয় সংসদে গৃহীত কোনো আইনকে নির্বাহী বিভাগ কিংবা এর কোনো শাখা এভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে কি?
সাবের হোসেন চৌধুরী : আইনের যেকোনো বিধান নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে তার একটি প্রক্রিয়া থাকতে হবে। তারা সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আলোচনা করতে পারত। তাদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে, মামলাটি সত্য হলে যে শাস্তি বিবাদী পেত, তার অর্ধেক শাস্তি বাদীকে ভোগ করতে হবে। এই প্রস্তাব বিচার পাওয়ার অধিকারের পরিপন্থী। মামলার গুণাগুণ বিচার করবেন আদালত। এমন কিছু হওয়া উচিত নয়, যা সংসদের জন্য অবমাননাকর।
প্রথম আলো : গত সংসদে আপনি সাংসদদের আচরণ সম্পর্কিত আরেকটি বিল এনেছিলেন। সেটি পাস হয়নি কি সাংসদদের অসহযোগিতার কারণে?
সাবের হোসেন চৌধুরী : অনেকেই নীতিগতভাবে একমত ছিলেন। সাংসদদের অন্যতম দায়িত্ব সরকার ও নির্বাহী বিভাগের কাজ তদারকি করা। তবে নিজেদের কাজের তদারক করার ব্যবস্থা নেই। এই বিলের মূল চেতনা ছিল সেলফ ইভালিউশন (Self-evaluation) ও সেলফ সেন্সরশিপ (Self-censorship)। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সাংসদদের সচেতন করা।
আরেকটি বিষয় হলো স্বার্থের দ্বন্দ্ব। একজন সাংসদের অন্য পেশা ও পরিচয় থাকতেই পারে। কিন্তু সাংসদ হিসেবে যাতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে সংঘাত না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে হাউস অব কমন্সে একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি আছে। সেখানে একটি রেজিস্টার বই থাকে, যাতে লেখা থাকে কোন কোন বিষয়ে সাংসদদের স্বার্থ জড়িত। এই স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে রাষ্ট্র, সরকার বা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না।
আবার কয়েকজন সাংসদ মনে করেছেন, তাঁদের জন্য কেন জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকবে? এই বিল তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে। তবে আমার ধারণা, এ ধরনের কোড অব কন্ডাক্ট থাকলে জনগণের মাঝে সাংসদদের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হতো। আমরা যে ব্রিটিশ সংসদীয় পদ্ধতি অনুসরণ করছি, সেখানেও সাংসদদের আচরণবিধি আছে। এটাও একধরনের জবাবদিহি।
প্রথম আলো : সংসদীয় কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো সাংসদ সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন না। কিন্তু গত সংসদে বেশ কয়েকজন সরকারদলীয় সদস্য সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করেছেন।
সাবের হোসেন চৌধুরী : বর্তমান ব্যবস্থায় কেউ কার্যপ্রণালি বিধি ভঙ্গ করলে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় এবং স্পিকার রুলিং দিলে সেটি কার্যকর হয়। কিন্তু সাংসদদের আচরণবিধি আইন থাকলে সেটি নৈতিকতা কমিটির কাছে চলে যেত। আমার বিলের উদ্দেশ্যই ছিল সাংসদদের আচরণের জন্য এমন একটি মানদণ্ড তৈরি করা।
প্রথম আলো : আপনি সাংসদদের আচরণবিধি সম্পর্কিত যে বিল এনেছিলেন তার লক্ষ্য ছিল সংসদীয় ব্যবস্থাকে উন্নত করা। কিন্তু গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেখানে সেটি সম্ভব কি?
সাবের হোসেন চৌধুরী : যাঁরা সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য কাজ করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই চাইবেন তাঁদের কাজের মূল্যায়ন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে হোক। আর সেটি সম্ভব প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটটিও আমাদের মনে রাখতে হবে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে, যদিও তাদের নির্বাচনে আনার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। কোনো দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেমে থাকতে পারে না। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র বলতে আমরা শুধু নির্বাচনকেই বোঝাই। দুটো নির্বাচনের যে মধ্যবর্তী সময়, সেখানেই গণতন্ত্রের মূল পরীক্ষা এবং নির্বাচনের পাশাপাশি এটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দল নির্বাচনে গেল না, আবার কোনো দল নির্বাচনের পর সংসদে গরহাজির থাকল—দুইয়ের ফলাফল তো একই।
প্রথম আলো : কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তো হতে হবে?
সাবের হোসেন চৌধুরী : হ্যাঁ, হতে হবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে নির্বাচন হলো, সেটি যদি পূরণ না হয়, তাহলে গণতন্ত্র পূর্ণতা লাভ করে না। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দল সংসদকে কার্যকর রাখার কথা বলেছে। একটি দলের ইশতেহারে ৩০ দিন অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ বাতিল করার কথাও ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা সেই অঙ্গীকার ভুলে গেল। তাই গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে সার্বিকভাবে ভাবতে হবে। সাংবিধানিক ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই শক্তিশালী করতে হবে।
প্রথম আলো : আপনি আন্তপার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি হয়েছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের। কিন্তু যে সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে আপনি বিশ্ব সংস্থার সভাপতি হলেন, সেটি তো প্রশ্নবিদ্ধ।
সাবের হোসেন চৌধুরী : আইপিইউর সভাপতি নির্বাচনের আগে কিছু সদস্যের মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা বলেছি, নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকাকে কেউ কেউ দুর্বলতা হিসেবে দেখতে পারেন, কিন্তু এই সংসদের বৈধতা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। আর গত নির্বাচনে কোনো দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল না যে তারা অংশ নিতে পারবে না। যারা নির্বাচন বর্জন করেছে, তারা তাদের নিজ সিদ্ধান্তেই করেছে। কোনো দল নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এমনকি জনগণকে তা শান্তিপূর্ণভাবে বর্জনের আহ্বানও জানাতে পারে। কিন্তু সহিংসতার মাধ্যমে যদি কেউ নির্বাচন বানচাল করতে চায়, সেটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়। আমরা এই বিষয়গুলো তুলে ধরেছি।
প্রথম আলো : গণতন্ত্র বিকাশে আইপিইউর ভূমিকা কী?
সাবের হোসেন চৌধুরী : আইপিইউ হচ্ছে সদস্যরাষ্ট্রের জাতীয় সংসদগুলো নিয়ে গঠিত বিশ্বের একমাত্র সংস্থা, যার যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৯ সালে, জাতিসংঘ ও লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠার অনেক আগে। ১৬৬টি দেশের জাতীয় সংসদের সদস্য, যার মধ্যে ৪৭ হাজার জন সাংসদ রয়েছেন এবং যাঁরা বিশ্বের ৬৫০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ১২৫ বছর ধরে শক্তিশালী ও কার্যকর সংসদের মাধ্যমে গণতন্ত্রের টেকসই ভিত রচনার লক্ষ্যে আইপিইউ কাজ করে যাচ্ছে। কোনো সদস্যদেশে গণতান্ত্রিক ধারা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে সেই সংসদের সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। যেমনটি হয়েছিল তিনবার (দুই দফা সামরিক শাসন এবং ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে) বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও।
আইপিইউর বর্তমানে চারটি স্থায়ী কমিটি আছে—১. আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ২. গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ৩. টেকসই উন্নয়ন, অর্থ ও বাণিজ্য এবং ৪. জাতিসংঘ বিষয়সংক্রান্ত। ২০১৫ সালটি আইপিইউর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরে তিনটি বড় সম্মেলন হওয়ার কথা। চলতি মাসেই দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস-সংক্রান্ত সম্মেলনটি হলো জাপানের সেন্দাইতে। অন্য দুটি হচ্ছে যথাক্রমে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ডিসেম্বরে প্যারিসে। এসব সম্মেলনে যে চুক্তিগুলো হবে সদস্যদেশগুলোর পার্লামেন্ট তা অনুমোদন করবে এবং বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে ও তদারকি করবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) বা এসডিজি কর্মসূচিতে আনুমানিক ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রতিবছর ব্যয় হবে। এই ব্যয়ের তদারকির ক্ষেত্রে আইপিইউর ১৬৬টি সদস্যদেশের সাংসদেরা কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রথম আলো : আন্তর্জাতিক পরিসরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আইপিইউ কীভাবে কাজ করে?
সাবের হোসেন চৌধুরী : আইপিইউর একটি বিশেষ কমিটি মধ্যপ্রাচ্যে সংলাপের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। যেমন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে কোনো যোগাযোগ নেই। তবে আইপিইউ সদস্য হিসেবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পার্লামেন্টের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। তাদের সদস্যরা একসঙ্গে বসছেনও। আইপিইউ সিরীয় সরকার ও বিরোধী পক্ষের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের নতুন পার্লামেন্ট হয়েছে। তারা তাদের সংসদ পরিচালনা, কমিটি ইত্যাদির ব্যাপারে আমাদের সহায়তা চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা মধ্যস্থতা করেছি।
প্রতিবছর আইপিইউ ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে সংসদীয় শুনানি হয়ে থাকে। জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানেরা সেই শুনানিতে থাকেন। এ বছরের আগস্ট মাসে আইপিইউ ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে স্পিকারদের চতুর্থ বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এটির মূল বিষয় হচ্ছে শান্তি ও টেকসই উন্নয়ন।
প্রথম আলো : আইপিইউর সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সাবের হোসেন চৌধুরী : সহিংসতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় না। আইপিইউ সব সময় সহিংসতার নিন্দা করে আসছে এবং সংলাপ ও গণতন্ত্রচর্চার ওপর জোর দিয়ে থাকে। কোনো দেশে যদি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দ্বারা গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়, সেখানে আমরা আরও গণতন্ত্রের মাধ্যমে তা মোকাবিলার কথা বলি।
প্রথম আলো : কিন্তু সংলাপহীনতাই কি এখানে মূল সমস্যা নয়?
সাবের হোসেন চৌধুরী : সংলাপের বিষয়টি দেখতে হবে সার্বিকভাবে। কার সঙ্গে সংলাপ করবেন, কীভাবে করবেন। আর সংলাপ তো কেবল দুটি দলের বিষয় নয়, অনেকের সঙ্গে অনেকেরই হতে পারে। অতীতের বিষয়গুলো যদি অনেক বেশি সাংঘর্ষিক মনে হয় এবং বর্তমান বিষয়ও যদি স্বস্তিদায়ক না হয়, তাহলে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ ও তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ও সংলাপ হতেই পারে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ভারতের থেকে এগিয়ে আছে। কিন্তু আমরা আরও বেশি এগোতে পারতাম। সেটি কী করে সম্ভব, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। সংলাপ মানে শুধু কবে নির্বাচন হবে, নির্বাচনকালীন কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি নয়। কখন নয়, কীভাবে নির্বাচন হবে তা নিয়ে যথাসময়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রথম আলো : ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে বাধা কী?
সাবের হোসেন চৌধুরী : সবাই যদি ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, কোনো বাধা দেখছি না। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন মত ও চিন্তার চর্চা। সুতরাং আমাদের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। তবে কেউ যদি সহিংসতার মাধ্যমে কিছু আদায় করতে চান, তার অর্থ হবে, ভবিষ্যতেও এই সহিংসতা জিইয়ে রাখা। আপনি যদি ধরেই নেন যে সহিংসতার মাধ্যমে সংকট সমাধান হবে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
প্রথম আলো : তাহলে সমাধান কী? সরকারেরই কি উচিত নয় উদ্যোগী ভূমিকা নেওয়া?
সাবের হোসেন চৌধুরী : সাধারণত, সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয় এবং উদ্যোগ নিতে হয়। তবে এখন যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা তো সরকারকেই মানেন না। তাঁরা একদিকে বলছেন অবৈধ সরকার, অন্যদিকে সংলাপ চাইছেন, এটি কতটা যুক্তিসংগত? একদিকে সহিংস তৎপরতা চলবে, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চলবে, আরেক দিকে আলোচনা চাইবেন, তা কি হয়? সবকিছুর আগে সহিংসতা বন্ধ হতে হবে। ক্ষতি রোধ করতে হবে। পারস্পরিক আস্থা স্থাপনের মাধ্যমে সংলাপের পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সচল ও কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। সহিংসতা যখন বন্ধ হবে তখন বল স্বাভাবিকভাবে সরকারের কোর্টে ফিরে যাবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
সাবের হোসেন চৌধুরী : ধন্যবাদ।

ডিবি পরিচয়ে অপহরণের অপসংস্কৃতি by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

এ এক বড় প্রশ্ন। একটি ফ্যাসিবাদী সরকারশাসিত সমাজে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। জার্মানির ফ্যাসিস্ট হিটলার সরকারের আমলে আধুনিককালে গুমের ঘটনা সারা পৃথিবীর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এডলফ হিটলার তার বিরোধীদের দমনে ও দলনে গঠন করেন গেস্টাপো বাহিনী। সে বাহিনী যখন যেখান থেকে যাকে খুশি তুলে নিয়ে গুম করে দিত। এর কোনো জবাবদিহিতা হিটলারের আমলে ছিল না। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল এই, সে সময় হিটলারের ইহুদিবিরোধী নীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জনসমর্থনও কম ছিল না। আর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারেরও তেমন নীতি আছে বটে, তবে তাদের জনসসমর্থন নেমে গেছে একেবারে নিচের কোঠায়।
ফলে ফ্যাসিবাদী হিটলার সরকারেরও যেটুকু জনসমর্থন ছিল বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সেটুকুও নেই। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার হিটলারের চেয়ে আরো অনেক বেশি বেপরোয়া। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম অপশাসকের আবির্ভাবের ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। একটি সমাজের বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষণ, যখন সেখানকার শাসকেরা মিথ্যা কথা বলতে থাকে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পদে পদে মিথ্যা কথা বলেই যাচ্ছে। কিন্তু মিথ্যার ওপর একটি সমাজ কখনো দাঁড়াতে পারে না।
দেশে গুম, হত্যা, নির্বিচার খুন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অবাধে চলছে। আর কোনো ক্ষেত্রেই সরকার এর দায় নিতে চাইছে না। খুনের ক্ষেত্রে চালু করেছে দু’ধরনের বক্তব্য। প্রথমত, ব্যাপক নিন্দিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’। এর প্রকৃতি অবিকল একই রকম। সরকার ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতকর্মীদের গভীর রাতে গিয়ে পোশাকে বা সাদা পোশাকে আটক করে নিয়ে আসে। এরপর থানায় যোগাযোগ করতে বলে। কখনো আটককৃতদের দেখা মেলে। কখনো মেলে না। তারপর সকালে বা দু-একদিন পর আশপাশে কোথায়ও, পুকুরে ডোবায় ধানক্ষেতে তাদের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। কখনোবা পাওয়া যায় দূরবর্তী কোনো জেলায় গুলিতে ঝাঁঝরা লাশ।
এ ক্ষেত্রে সরকারের কাহিনী সবক্ষেত্রে প্রায় একই রকম। বলা যায়, যে ব্যক্তিকে ধরা হয়েছিল সে এক ভয়াবহ বন্দুকবাজ সন্ত্রাসী। তার আছে আরো অনেক বন্দুকবাজ সন্ত্রাসী সহযোগী। যুবকটিকে আটক করার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে নিয়ে যাচ্ছিল আটক ব্যক্তির অস্ত্রাগারের সন্ধানে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ধারিত স্থানে যাওয়া আটককৃত ব্যক্তির সহযোগীরা নাকি ওই ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাতে আটক ব্যক্তি নিহত হয় এবং বুলেটে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। এরা পুলিশের ওপর হামলা চালাতে এসেছিল কোনো দিন তাদের একজনও আহত হয়নি। পুলিশের গাড়িতেও কোনো গুলি লাগেনি। কিংবা আহত হয় না কোনো পুলিশ সদস্যও। সরকার বছরের পর বছর ধরে একই কল্পকাহিনী ধারাবাহিকভাবে প্রচার করে যাচ্ছে। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় সামান্য একটি অভিযোগও নেই।
আবার অভিযোগ থাক বা না থাক, অভিযোগ সাজানোর পথও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বড় বেশি সহজ করে রেখেছে। ধরা যাক, কোথায়ও একটি বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে পুলিশের মামলা দায়েরের ঘটনাও বড় অদ্ভুত। দুই-চার-পাঁচজন লোকের নাম উল্লেখ করে পুলিশ নাম পরিচয়হীন আরো চার-পাঁচ হাজার লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে রাখে। সেভাবে এ পর্যন্ত হয়তো কোটি লোকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এরপর প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মীকে সেই মামলায় আটক করে খুব সহজেই ক্রসফায়ারের নামে খুন করে ফেলা যাচ্ছে। আবার এসব খুনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়মুক্তি দিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাদের এই বলে লেলিয়ে দিয়েছেন, তারা যা খুশি করতে পারে। সে দায়-দায়িত্ব নেবেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। সে-ও এক বিপজ্জনক প্রশ্ন। ভবিষ্যতে যদি কোনো দিন এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়, তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুকুমের আসামি হবেন কিনা জানি না।
সরকারের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের বিদ্বৎসমাজ থেকে শুরু করে সারা পৃথিবী সোচ্চার। কিন্তু থোড়াই পরোয়া করছে সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেই যাচ্ছে। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ অব্যাহত আছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেহেতু এ ধরনের কর্মকাণ্ডের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সুতরাং নরহত্যা এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিপণ দাবি করে নরহত্যা ও শিশুহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।
এর সর্বশেষ উদাহরণ সিলেটের শিশু সাঈদ (৯) হত্যা। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়–য়া সিলেট বিমানবন্দর থানার পুলিশ কনস্টেবল এবাদুর রহমান, আওয়ামী ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক এন ইসলাম তালুকদার ওরফে রাকিব ও র‌্যাবের সোর্স গেদা মিঞা মিলে শিশুটিকে গলাটিপে হত্যা করে সাত-পরত বস্তায় পেঁচিয়ে পুলিশের বাসভবনেরই চিলেকোঠায় লুকিয়ে রাখে। ছেলেটির জন্য দুই লাখ টাকা মুক্তিপণও নিয়েছিল তারা। সাঈদ পরিবারের পূর্ব পরিচিত ছিল ওই পুলিশ কনস্টেবল। শেষ পর্যন্ত তারা ধরা পড়েছে। এই ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি হবে, এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না। প্রধানমন্ত্রীর দায়মুক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এই পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গ গুম। সরকার বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ধারাবাহিকভাবে গুম করে যাচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসও তাই। এই গুমের ঘটনাগুলোর প্রকৃতি প্রায় একই রকম। রাতে কিংবা দিনে প্রধানত ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দিব্যি অস্বীকার করে পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর এসব রাজনৈতিক কর্মীর আর কোনো হদিস পাওয়া যায় না। তবে গুম হওয়ার পর কখনো কখনো এদের লাশ পাওয়া যায় নিজ এলাকায় কিংবা দূরবর্তী কোনো স্থানে। বাকিদের কোনো খোঁজই মেলে না। যেভাবে খোঁজ মেলেনি বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী, যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের। খোঁজ মেলেনি ২০ দলীয় জোটের আরো অনেক নেতাকর্মীর।
এদের অপহরণের প্রকৃতিও এক। মধ্যরাতে র‌্যাব পুলিশের গাড়ি এসে হাজির হয়। বাড়ির ফটকে নিজেদের পরিচয় দেয়। হল্লাচিল্লার আশঙ্কা দেখা দিলে পরিচয়পত্র পর্যন্ত দেখায়। তারপর বাড়িতে ঢুকে সংশ্লিষ্টকে আটক করে, হ্যান্ডকাফ পরায়, চোখ বাঁধে আবার গাড়িতে করে নিয়ে চলে যায়। পরিবারের সদস্যদের সাথে তাদের কথাবার্তাও হয়। কখনো ভদ্রভাবে বলে যায়, কালকে থানায় খোঁজ করবেন। কখনো বাড়িঘর ভাঙ্চুর করে। কিন্তু যাকে নিতে এসেছে তাকে নিয়েই যায়।
অথচ পরদিন থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই অস্বীকার করে, এরা এর কিছুই জানে না। এরা রাতে ও বাসায় যায়ওনি, কাউকে গ্রেফতারও করেনি। অথচ কোনো মানুষ যদি নিখোঁজ বা গুম হয়ে যায়, তবে তাকে উদ্ধারের দায়িত্ব সরকারেরই। এখন সরকারও সে দায়িত্ব অস্বীকার করছে। আর সরকারের লোকেরা যা বলছে তা বোধ করি কেবল ঠাণ্ডা মাথার খুনিরাই বলতে পারে। সেসব কথার ভেতরে মানবিকতার লেশমাত্র নেই।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী অপহৃত হয়েছিলেন তার বাসার কাছ থেকেই। পেছন থেকে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি তার গাড়িটিকে ধাক্কা দেয়। তারপর তাকে ও তার গাড়ি চালককে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে র‌্যাব লেখা গাড়িতে করে নিয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখেছিলেন স্থানীয় ডাব বিক্রেতা, তারও কোনো হদিস নেই। দেখেছিলেন পাশের নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের এক দারোয়ান এবং তিনি সে দৃশ্য ভিডিও করেছিলেন। তারও কোনো হদিস নেই। রাস্তায় হল্লা দেখে কাছাকাছি রেস্টুরেন্টে চা পান করছিলেন যে পুলিশ কর্মকর্তা, তিনি ডাকাতি ভেবে হামলাকারীদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তখন হামলাকারীরা তাকে তারা যে র‌্যাবের লোক ছিলেন সেটি পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিশ্চিত করেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা সে স্থান ত্যাগ করে চলে যান। তিনিও এখন আর কর্মরত নেই।
এরপর ইলিয়াস আলী উদ্ধার নিয়ে অনেক নাটক করেছিল সরকার। এই ইলিয়াস আলী গাজীপুর আছেন। এই ইলিয়াস আলী টঙ্গি আছেন। অমুক জায়গায় আছেন। তমুক জায়গায় আছেন। তারপর ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে নিয়ে সেসব জায়গায় তথাকথিত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইলিয়াস আলীকে পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী টিপ্পনি কেটে বলেছিলেন, ইলিয়াস আলী নিজেই আত্মগোপন করেছেন; তাকে লুকিয়ে রেখেছেন খালেদা জিয়াই। কিন্তু গত তিন বছরেও ইলিয়াস আলীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি নিখোঁজই রয়ে গেছেন।
গত ১০ এপ্রিল উত্তরার একটি বাসা থেকে অপহৃত হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডিবি পুলিশ এবং র‌্যাবের গাড়ি ওই রাস্তায় ঢোকে। এরা আশপাশের বাড়ির দারোয়ানদের কাছে যে বাড়িতে সালাহউদ্দিন থাকতেন সেই নম্বরের বাড়ি কোনটি জানতে চায়। সাদা পোশাকের সশস্ত্র পুলিশ ওই বাড়ির সামনে আসে। গেটের দারোয়ান তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে এরা ডিবি পুলিশের সদস্য হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় এবং ব্যাজ দেখায়। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের আধাঘণ্টা পর তারা নেমে আসে। তাদের সাথে হাতকড়া পরা অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমেদও ছিলেন। তারা তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সেখানে একটি র‌্যাবের গাড়িও দাঁড়িয়ে ছিল।
অথচ সেই থেকে সরকার, র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি সবাই অস্বীকার করছে যে, এরা ওই রাতে সেখানে যাননি এবং সালাহউদ্দিনকে ধরে আনেননি। পুলিশের আইজিও একই কথা বলেছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আরো এক দফা এগিয়ে। এর আগের দিন গুলশানের নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে দুই বস্তা ময়লা নিয়ে যায় ঢাকা সিটি করপোরেশন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ওই ময়লার বস্তায় করে খালেদা জিয়া সালাহউদ্দিনকে পাচার করে দিয়েছেন। ওহ্! কী নিষ্ঠুর উক্তি! অথচ পুলিশ ওই ময়লার বস্তা রাস্তার ওপর ঢেলে দিয়ে তাতে কী ময়লা ছিল তার একটা সিজারলিস্টও করে। সেখানে সালাহউদ্দিন ছিলেন না।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০০৭ সাল থেকে অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের সাথে বাংলাদেশের বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেছে। বেশির ভাগ গুমের ঘটনা ঘটিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এমন অভিযোগ থাকলেও ঘটনাগুলো সম্পর্কে সরকার কোনো তদন্ত করেছে, তার কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্যকে তাদের ভূমিকার জন্য জবাবদিহি করতে হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলে নিরাপত্তা বাহিনীর এসব দায়মুক্তি মহামারী আকার ধারণ করেছে।
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
ডিবি বা পুলিশ বা র‌্যাব সদস্যদের কেউ কাউকে ধরতে এলে সাধারণ মানুষের কর্তব্য কী হবে, মানুষ কি ঢেরা পিটিয়ে ঘোষণা দেবে যে ডিবি পুলিশের গাড়ি নিয়ে ও পরিচয়ে কিছু লোক কাউকে অপহরণ করতে এসেছে। অতএব যে যেখানে আছেন ছুটে আসেন। এ অপহরণ চেষ্টা প্রতিহত করুন। এ চেষ্টা যে একেবারে হয়নি তেমন নয়। বিভিন্ন স্থানে জনগণ সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে এদের প্রতিহত করতে চেয়েছে। কিন্তু তার পরিবর্তে সরকার ওই গোটা জনপদ র‌্যাব-পুলিশ-ডিবি-বিজিবি দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মিসমার করে দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে সরকারের বিজয় হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসব কোনো সুফল বয়ে আনে না।
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

জুমল্যান্ড গঠনের স্বপ্ন by এবনে গোলাম সামাদ

জুম চাষ বলতে বোঝায় সাধারণত টিলার গায়ে গর্ত করে বীজ বপন করে চাষ করাকে। টিলার গায়ের গাছপালাকে কেটে আগুন ধরিয়ে প্রথমে বন পরিষ্কার করা হয়। কাঠ পোড়া ছাইয়ের স্তরের মধ্যে গর্ত করে বীজ বপন করা হয়। জুম শব্দটা হতে পারে কোলভাষা পরিবার থেকে আগত। কিন্তু শব্দটা ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেন ইংরেজরা। সর্বত্র যে জুম কথাটা এই উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল, তা নয়। যেমন উত্তর ভারতে এই চাষপ্রথাকে বলা হতো ‘দাহি’। যেহেতু বন পুড়িয়ে বা দাহ করে করা হতো এরকম চাষ; তাই একে বলা হয় দাহি। কিন্তু জুম কথাটাই হতে পেরেছে বিশেষভাবে প্রচলিত। জুম নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। কারণ চাকমা নেতা সন্তু লারমা (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা) বলছেন, জুমল্যান্ড গড়ার কথা। কিন্তু জুম চাষ যে কেবল চাকমারাই করেন, তা নয়। ভারতে এখন জুম চাষ করা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু একসময় দক্ষিণ ভারতের উরালী উপজাতিরাও জুম চাষ করতেন। মানবধারার দিক থেকে উরালীরা চাকমাদের মতো মঙ্গলীয় মানবধারাভুক্ত নন। তাদের বলতে হয় ইন্দো-অস্ট্রালয়েড। এদের গায়ের রং সাঁওতালদের মতো কালো। চুল মসৃণ তরঙ্গাকৃতি। চোখ আয়ত। নাকের অগ্রভাগ মাংশল। কপালের মধ্যভাগ একটু চাপা। এদের চেহারার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে আস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের। তাই নৃতাত্ত্বিকরা এদের বলতে চান ইন্দো-অস্ট্রালয়েড। পক্ষান্তরে চাকমাদের মাথার চুল খরখরে। মুখে থাকতে দেখা যায় দাড়িগোঁফের অভাব। চোখের ওপর পাতার কোণে থাকতে দেখা যায় বিশেষ রকমের ভাঁজ। যে কারণে এদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট। এদের গণ্ডের হাড় অনেক উঁচু। তাই মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। কেন, কী কারণে চাকমারা জুম চাষ করেন উরালীদের মতো, তার ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। কিন্তু সন্তু লারমা বলছেন যেহেতু চাকমা, মারমা, গারো, খাসিয়ারা সবাই মঙ্গলীয় মানবধারাভুক্ত, আর তারা সবাই করেন জুম চাষ, তাই এদের সবাইকে নিয়ে গড়তে হবে একটি দেশ, জুমল্যান্ড। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, খাসিয়ারা যেমন জুম চাষ করেন, তেমনি আবার লাঙল দিয়ে চাষাবাদও করেন। কেবলই যে জুম চাষ করেন, তা কিন্তু নয়।
সন্তু লারমা ২০০১ সালের ৩১ মার্চ গড়েন ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’। এই ফোরামে তিনি গ্রহণ করেছেন সাঁওতালদের। কিন্তু সাঁওতালরা কখনো জুম চাষ করেন না। সাঁওতালরা একসময় ছোট নাগপুরের বনজঙ্গলে শিকার করে এবং ফলমূল আহরণ করে জীবন যাপন করতেন। পরে এরা আরম্ভ করেন লাঙল দিয়ে চাষাবাদ। তবে সাঁওতালদের লাঙল হয় কিছুটা ছোট। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এখন অনেক সাঁওতালের বাস। ছোট নাগপুর অঞ্চল থেকে এসব সাঁওতালকে প্রথম নিয়ে আসেন নীলকর ইংরেজ সাহেবরা, নীলচাষ করার জন্য। সেখান থেকে এরা রাজশাহী অঞ্চলে আসেন ১৯০০ সালে, তার আগে নয়। রাজশাহী জেলার মোট জনসংখ্যার শতকরা দুই ভাগ হলো সাঁওতাল। এরা বাস করেন রাজশাহী জেলার তিনটি উপজেলায়- গোদাগাড়ী, তানোর ও পবা। এদের নিয়ে বিশেষ ধরনের রাজনীতি করছেন ওয়ার্কার্স পার্টি। সন্তু লারমার কথা যে সব সাঁওতাল শুনছেন, এমন নয়। সাঁওতালরা হলেন বাংলাদেশের উপজাতিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সাঁওতালরা যদি রাজশাহী ছেড়ে রাঙ্গামাটিতে যেতে চান এবং সেখানে বসতি করতে চান, সন্তু লারমা কি তাতে রাজি হবেন? অনেক অতীতে সাঁওতালরা পার্বত্য অঞ্চলে যেতে চায়নি যে, তা নয়। কিন্তু সেখানে তাদের স্থান হয়নি। বাংলাদেশের চা বাগানে শ্রীহট্ট অঞ্চলে অনেক সাঁওতাল কাজ করেন। চট্টগ্রামের চা বাগানেও তারা যেতে পারতেন; কিন্তু যাননি। সব উপজাতি, চাকমা উপজাতি নন। চাকমাদের সাথে মানবধারাগত মিল আছে মারমাদের। কিন্তু বান্দরবানের মারমাদের সাথে চলেছে রাঙ্গামাটির চাকমাদের বিবাদ। মারমারা বান্দরবানে জুম চাষ করলেও তাদের সাথে চাকমা জুমচাষিদের কোনো আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে উঠতে পারেনি। চাকমা এবং মারমারা উভয়ই এসেছেন আরাকান অঞ্চল থেকে। চাকমারা এসেছিলেন আগে, মারমারা এসেছিলেন পরে। কিন্তু মারমারা এসে তাদের ঠেলে দিয়েছেন রাঙ্গামাটি অঞ্চলে। চাকমারা আগে ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের দক্ষিণ অঞ্চলে। কিন্তু সেখানে এখন চাকমাদের কোন বসতি নেই। বাংলাভাষী মানুষ চাকমাদের রাঙ্গামাটির গভীর অরণ্যে যেতে বাধ্য করেনি, তাদের রাঙ্গামাটির গভীর অরণ্যে সরে যেতে বাধ্য করেছেন মারমারা। যাদের সাধারণত বলা হয় মগ। অর্থাৎ যারা এই জুম চাষ করেন, সন্তু লারমা যে তাদেরই একমাত্র প্রতিনিধি, তাও নয়। ১৯৪৭ সালে চাকমারা রাঙ্গামাটিতে উড়িয়েছিলেন ভারতের পতাকা। রাঙ্গামাটি দখল করতে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সরকারকে পাঠাতে হয়েছিল সৈন্য। বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা গিয়ে দখল করেন রাঙ্গামাটি, নামান ভারতীয় পতাকা এবং উড়ান পাকিস্তানের পতাকা। এটা হলো ইতিহাস।
খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান আগে ছিল একটি মাত্র জেলা। যাকে সাধারণভাবে বলা হতো চট্টগ্রামের পার্বত্য মহাল। ইতিহাস বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহাল সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। তার আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহাল বলে কোনো কিছু ছিল না। কিন্তু সন্তু লারমার কথা শুনে মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল একটি স্বাধীন অঞ্চল। আর পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ববাংলা সরকার জোর করে সেটা দখল করেছে। যেটা ঘটনা নয়। ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ববাংলার সাথে যুক্ত হয়েছে র‌্যাডক্লিফরয়েদাদ অনুসারে। বাংলাভাষী মুসলমান গায়ের জোরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে দখল করেননি। ইংরেজ আমলে একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে যুক্ত করার কথা হয় তখনকার আসাম প্রদেশের সাথে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী এর বিরোধিতা করেন এবং থাকতে চান চট্টগ্রাম বিভাগেরই অংশ হয়ে। এটাও ইতিহাস।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, অর্থাৎ খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানকে পৃথক করে নিয়ে সন্তু লারমা গড়তে চাচ্ছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। যেটা গড়তে দিলে বাংলাদেশ হারাবে তার দশ ভাগের এক ভাগ ভূমি। জানি না কেন আওয়ামী লীগ সরকার সন্তু লারমার সাথে একটা চুক্তি করতে গিয়েছিল। তারা কি ভেবে দেখার সুযোগ পাননি যে, এর ফলে বাংলাদেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়বে খুবই অনিশ্চিত। চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়েও আওয়ামী লীগ সরকার কিছু ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না। অথচ ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব রাঙ্গামাটিতে গিয়ে এক সভায় ঘোষণা করেন, ‘দেশের সকল লোক বাঙালি বলে বিবেচিত হবে।’ আওয়ামী লীগ দাবি করে যে, তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন। শেখ মুজিব হলেন বাঙালি জাতির জনক। কিন্তু শেখ মুজিবের বাঙালিত্বকে বাদ দিয়ে তারা করে বসেন সন্তু লারমার সাথে বিশেষ চুক্তি। যা হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আওয়ামী লীগ অবশ্য তাদের ভুল ধরতে পারে। আর তাই চায় না পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে। সন্তু লারমা যতদূর জানা যায়, একসময় করতেন বাম রাজনীতি। তিনি ছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের সাথে।
বর্তমান আওয়ামী লীগের মধ্যে বিশেষভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, দীলিপ বড়ুয়া, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আ ফ ম রুহুল হক, নুরুল ইসলাম নাহিদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, শাহজাহান খান, অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান, ইয়াফেস ওসমান, নূহ-উল আলম লেনিন। এই তালিকাটি দেয়া হয়েছিল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ -এর ২০১৩ সালের ২৭ জুন সংখ্যায়। মনে করার কারণ আছে যে, এদের প্ররোচনায় আওয়ামী লীগকে ভ্রান্তপথে পরিচালিত হতে হয়েছিল এবং গ্রহণ করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল সম্পর্কে বাংলাদেশবিরোধী নীতি।
দেশের রাজনীতি এখন কোন পথে যাচ্ছে আমরা জানি না। খালেদা জিয়া শান্তিচুক্তির পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, শান্তিচুক্তি হলে সাঁওতালরাও দাবি করবেন স্বাধীনতা। বাংলার উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে যেমন অনেক সাঁওতালের বাস, তেমনি ভারতের বরেন্দ্র অঞ্চলেও বহু সাঁওতালের বাস। এদের অনেকেই এখন খ্রিষ্টান হয়েছেন। যদি বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের খ্রিষ্টান সাঁওতালরা এবং ভারতের বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতালরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে চান, তবে পরিস্থিতি অবশ্যই জটিল হয়ে উঠবে। সাঁওতালরা দাবি করছেন তাদের ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে মেনে নিতে হবে। ভারতে এখন প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে ঝাড়খ নামে একটি নতুন প্রদেশ। সেখানে সাঁওতালরা হলেন সংখ্যাগুরু। কিন্তু ঝাড়খণ্ড প্রদেশের সরকারি ভাষা সাঁওতালি করা হয়নি। ঝাড়খণ্ড প্রদেশের সরকারি ভাষা করা হয়েছে নাগরি অক্ষরে লেখা হিন্দি। অথচ বাংলাদেশে সাঁওতালরা দাবি করছেন তাদের ভাষার স্বাতন্ত্র্য। একসময় সাঁওতালি ভাষা লেখা হতো বাংলা অক্ষরে। কিন্তু এখন তা লেখা হচ্ছে রোমান অক্ষরে। এ দেশের অনেক বাম রাজনীতিক করছেন সাঁওতালদের সমর্থন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী বাম রাজনীতিকেরা অনেকে পড়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। কেননা, ঝাড়খণ্ডে বাংলাভাষী হিন্দুরা পড়তে চলেছেন উপজাতিদের, বিশেষ করে সাঁওতালদের কোপে। ঝাড়খণ্ডের মধ্যে পড়ে জামসেদপুর। যেটা হলো টাটা কোম্পানির ইস্পাত ও লোহা নিষ্কাশনের কারখানা। জামশেদপুরে বহু হিন্দু বাংলাভাষীর বাস। সেখানেও তারা হতে পারেন উপজাতিদের কোপের শিকার। তাদের ঝাড়খণ্ড ছেড়ে ভবিষ্যতে সরে আসতে হতে পারে পশ্চিমবঙ্গে।
উপজাতি মানেই যে অসহায় নিরীহ মানুষ, তা নয়। একদিন মগদের অত্যাচারে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে পড়েছিল জনশূন্য। মেজর জেমস রেনেলের মতে, এখন যেখানে সুন্দরবন, সেখানে একসময় ছিল বর্ধিষ্ণু জনপদ। মগদের অত্যাচারে পালিয়ে যাওয়ার কারণে অঞ্চলটি হয়ে পড়ে জনশূন্য। গড়ে ওঠে গভীর বন। যাকে এখন বলে সুন্দরবন। জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালে তখনকার বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল জরিপ করে প্রস্তুত করেন বাংলার নির্ভরযোগ্য মানচিত্র। তিনি সুন্দরবনের মানচিত্র অঙ্কনের জন্য সুন্দরবন অঞ্চলে যান। সুন্দরবন অঞ্চলের কাছে অবস্থিত বরিশাল জেলার অনেক প্রাচীন ব্যক্তির মুখে তিনি শুনতে পান যে, তারা তাদের প্রাচীনদের মুখ থেকে শুনেছেন, সুন্দরবন অঞ্চলে একসময় কোনো বন ছিল না। ছিল জনবসতি। মগদের অত্যাচারে মানুষ পালাবার ফলে সেখানে গড়ে ওঠে বন। ইংরেজ আমলে মণিপুর অঞ্চল থেকে কুকিরা এসে চট্টগ্রামে লুটপাট করত। খুন করত মানুষকে। ইংরেজরা কুকিদের দমন করে। উপজাতিদের নিয়ে রাজনীতি করা তাই হয়ে উঠতে পারে যথেষ্ট বিপজ্জনক। বাংলাদেশে যাদের বলা হচ্ছে উপজাতি, তাদের সবাইকে গণনা করলে তাদের মোট জনসংখ্যা হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা এক ভাগের কাছাকাছি। এই এক ভাগ লোককে নিয়ে কেন বামপন্থীরা রাজনীতি করতে চাচ্ছেন, সেটা বোঝা বেশ কঠিন। ভারতে নকশালপন্থীরা এখন উপজাতিদের নিয়ে রাজনীতি করছেন। হতে পারে আমাদের দেশের বামপন্থীরা এদের চিন্তা চেতনার দ্বারাও হতে চাচ্ছেন কিছুটা প্রভাবিত।
উপজাতিদের অনেকে বলতে চাচ্ছেন, আদিবাসী। আদিবাসী শব্দটার করা হচ্ছে অপব্যবহার। কেননা, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, এ দেশে যারা সংখ্যাগুরু তাদেরই বলতে হয় আদিবাসী। তারা বাইরে থেকে আসেননি। আমাদের জনসংখ্যার অনেকের পূর্বপুরুষই একসময় ছিলেন তাম্র-প্রস্তর যুগের মানুষ। পরে তারা হয়ে উঠেছেন আরো সভ্য। একসময় সব মানুষই ছিলেন অরণ্যবাসী। অনেকে থেকে গেছেন অরণ্যবাসী হয়েই। তাদের জোর করে কেউ অরণ্যবাসী করে তোলেননি।
সন্তু লারমা তার বক্তৃতায় এমন অনেক কথাই বলছেন যে, আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের সাথে তা মোটেও খাপ খেতে পারছে না। সন্তু লারমা যদি মনে করেন, জোর করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে তিনি বাংলাভাষী মুসলমানদের তাড়িয়ে দিতে পারবেন, তবে তারাও যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খাবেন, এমন নয়। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তারাও বাধ্য হবেন পাল্টা বল প্রয়োগ করতে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এখন উপজাতি ও বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা প্রায় দাঁড়িয়েছে সমান সমান। উপজাতিরা কম করে ১০-১২টি বিভিন্ন উপজাতিতে বিভক্ত। কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমানেরা তা নন। শক্তির মহড়া দেখিয়ে তাই লাভ হবে না। যেমন লাভ হয়নি ১৯৪৭ সালে রাঙ্গামাটিতে ভারতের পতাকা উড়িয়ে।
এবনে গোলাম সামাদ
চাকমাদের এখন আর কোনো নিজস্ব ভাষা নেই। তারা যে ভাষায় কথা বলেন, তা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলা ভাষারই একটি রূপ মাত্র। তাদের কোনো নিজস্ব বর্ণমালাও নেই। মারমাদের একটা নিজস্ব ভাষা আছে এবং তারা সেটা লেখেন প্রাচীন বর্মী অক্ষরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি উপজাতির মধ্যে ভাষার পার্থক্য বিদ্যমান। তারা যখন একে অন্য উপজাতির মানুষের সাথে কথা বলতে চান, তখন তাদের গ্রহণ করতে হয় বাংলাভাষারই সাহায্য। কেবল জুম চাষ করেই জুমল্যান্ড গঠন করার স্বপ্ন দেখা ভুল।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

ইসির তড়িঘড়ি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে

দেশে বিরাজমান অশান্ত পরিবেশে তড়িঘড়ি করে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করছে বলে মনে করছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমানে সারা দেশে পেট্রলবোমা হামলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা ধরনের সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী মামলার কারণে কারারুদ্ধ বা পলাতক রয়েছেন। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতা অনেকটা প্রশমিত হতো এবং অপেক্ষাকৃতভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করতো। ফলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেতেন। ভোটাররাও নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন। তাই বিরাজমান অশান্ত পরিবেশে তড়িঘড়ি করে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি না করে পারে না। রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সেমিনার হলে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বানে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান, সহসভাপতি বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, সহ-সম্পাদক জাকির হোসেন ও সুজন নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন। সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে উল্লেখ করে ড. বদিউল আলম বলেন, ঢাকার দুই সিটিতে ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটার সংখ্যায় ব্যাপক তারতম্য। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানদণ্ড অনুসরণ হয়নি। মোট ভোটার সংখ্যা, ওয়ার্ড সংখ্যা ও ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটার সংখ্যার সঙ্গে প্রতিনিধিত্বশীলতার প্রশ্ন জড়িত। আর গণতন্ত্রের মূলকথাই হলো প্রতিনিধিত্বশীলতা। তাই কোন যুক্তিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা নির্ধারণ এবং ওয়ার্ডের সীমানা পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে ভোটারদের সমপ্রতিনিধিত্বের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। সম্ভাব্য অনেক প্রার্থীই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন- এমন অভিযোগ এনে সুজন সম্পাদক বলেন, আইন অনুযায়ী, কোন প্রার্থী বা তার পক্ষ থেকে অন্য কোন ব্যক্তি ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত তারিখের ২১ দিন আগে কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে পারবেন না। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, কয়েকজন প্রার্থীর পক্ষ থেকে তিন সিটিতেই অসংখ্য বিলবোর্ড স্থাপন ও দেয়ালে পোস্টার সাঁটার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ছিল সম্পূর্ণ নির্বাক। এ ধরনের প্রচারণার সুযোগে ধনাঢ্য প্রার্থীরা নির্ধারিত ব্যয়সীমার বাইরে ভোটারদের প্রভাবিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক পরিমাণের অর্থ ব্যয় করতে পারেন, যা নির্বাচনী ক্ষেত্রকে অসমতল করে তোলে। এমন অসমতল ক্ষেত্র কম বিত্তবান প্রার্থীদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক। তিনি আরও বলেন, যেহেতু সিটি করপোরেশন নির্বাচন নির্দলীয়। তাই বিএনপির কেউ যদি এ নির্বাচনে অংশ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে দলটির হাইকমান্ডের উচিত হবে এ ক্ষেত্রে কোন বাধা না দেয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে সুজন সম্পাদক বলেন, পক্ষপাতহীনভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা করুন। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে অবিলম্বে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করারও আহ্বান জানান তিনি।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, কয়েকজন প্রার্থীর পক্ষ থেকে তিন সিটিতেই অসংখ্য বিলবোর্ড স্থাপন ও দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে, যা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রচারণামূলক বিলবোর্ড ও পোস্টার অপসারণের নির্দেশ দেয়া হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা তা মান্য করছেন না। এতে করে নির্বাচন কমিশনকে ‘সাক্ষী গোপাল’ মনে করা ছাড়া উপায় থাকবে না। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তফসিল ঘোষিত হওয়া তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে। যার মধ্য দিয়ে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, গত আট বছর ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সংবিধান ও আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। এ নির্বাচন যেহেতু দলীয় নয় তাই কোন দলের ম্যান্ডেট কার্যকর হওয়া উচিত নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বহিষ্কার অনভিপ্রেত ও গণতন্ত্রের বরখেলাপ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনগতভাবে নির্দলীয় এ নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রার্থী সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থাকার এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলেন, সে ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা পালন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

রাষ্ট্র বনাম অনুগত প্রজা by এরশাদ মজুমদার

এ ধরনের শিরোনামের কারণ নিয়ে নিজে খুবই ভাবি। প্রায় প্রতিক্ষণই ভাবি, এ রাষ্ট্রটা কী এবং কেন? আমি এ রাষ্ট্রের কে? কী জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন? রাষ্ট্র আমার জন্য কী করে আর আমি রাষ্ট্রের জন্য কী করি? বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমার চিন্তার ধারা এ রকমই। মাতৃভূমি আর স্বাধীনতাকে ভালোবাসি বলেই ৭১ সালে আমি জীবন বাজি রেখেছিলাম। নিজের মৃত্যুর খবর নিজেই শুনেছি লোকমুখে। স্বাধীনতাই নাকি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। সে রাষ্ট্র মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে। না, আমার সে স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হবে বলে মনে হচ্ছে না। এ রাষ্ট্র আমার কাছে অচেনা।
আমি এমনিতেই খুবই আবেগী মানুষ। আবেগ আমার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। আমার জন্ম মার্চ বা ফাল্গুন মাসে। এ মাসের জাতকেরা নাকি সব কিছুই হৃদয় দিয়ে দেখে ও বিবেচনা করে, বুদ্ধি দিয়ে নয়। নিজের আবেগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সারা জীবন কষ্ট পেয়েছি। আমার পরিবার-পরিজন ও বন্ধুরা আমায় চিনতে পারে না। ভাবি, দুনিয়ার সব মানুষই কি আমার মতো ভাবে? আমাকে একটু সম্মান করে আদর করে কেউ কথা বললে- আমিই ধরে নিই যে, তিনি খুবই ভালো মানুষ। ৫০-এর দশকে ৬০ ভাগ ভালো মানুষ ছিলেন প্রায় সবখানে। তারও আগে বাবাদের আমলে ৮০ ভাগ মানুষ ভালো ছিলেন। দাদাদের আমলে বা তারও আগে ৯৫ ভাগ মানুষ ভালো ছিলেন। সে সময়ে জমিজমা বেচাকেনা হতো মৌখিকভাবে। দলিল ছিল না। কারণ, মানুষ সহজ-সরল ছিলেন আর একে অপরকে বিশ্বাস করতেন। আখেরাতের কথা ভেবেই মানুষ মন্দ কাজ করত না। ৫০ সাল ছিল আমার বাল্যকাল। এখন আমি বৃদ্ধ। চার দিকে ৯০ ভাগ মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে বলেই আমার মনে হয়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সবাই সবাইকে ঠকানোর কাজে ব্যস্ত। অন্যায়-অবিচারের পথে অর্থবিত্ত, সহায়-সম্পদ আহরণের কাজে সবাই ব্যস্ত। মানুষ সৎ আর অসৎ কাজের মাঝে কোনো ফারাক দেখতে পায় না। জন্মের মাসের কারণে আমি সীমাহীন আবেগী মানুষ, সে কথা আগেই বলেছি। ডাক্তার বলেন, বেশি আবেগ শরীর খারাপ করবে। বেশি আবেগে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আবেগের কারণে আমার পক্ষে কখনোই শাসক হওয়া সম্ভব ছিল না। এমনকি সংসারেও আমি কর্তা নই। আমার বিবিজানই সব কিছু করেন। এর কারণ, বুঝতে পারি না, এ জগত সংসারে কোন কাজটা আগে করা দরকার বা পরে করলেও চলবে। প্রায়োরিটি এক্সপেনডিচার বিষয়টি বুঝতে পারি না। আমি নিজের দেনা শোধ না করে কেউ চাইলে ধার দিয়ে দিই, অথবা গরিব কাউকে দান করে ফেলি। আমার বিবিজান বলেন, সংসারে আমি একজন মেহমান। আমি নাকি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই। নোয়াখালিতে বলে, ঘরের খেয়ে মসজিদে আজান দেয়।
এর মানে, জগৎ-সংসারে আমার মতো মানুষের কোনো প্রয়োজন নেই। এমন একজন অপ্রয়োজনীয় মানুষ কেমন করে আজো বেঁচে আছি, বুঝতে পারি না। আমার দ্বারা জগতের কী উপকার হয়েছে? আল্লাহ আমাকে কেনই বা সৃষ্টি করেছেন?
বঙ্গবন্ধুর জন্ম ১৭ মার্চ। তিনি তো জগদ্বিখ্যাত মানুষ। আমি খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখেছি। তিনিও আবেগপ্রবণ ছিলেন। তার সাহস ছিল। কোনো কিছুকেই ভয় পেতেন না। ফলে তিনি তার বন্ধু ও মুরুব্বীদের পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেছেন। ঠিক-বেঠিক চিন্তা করেননি সব সময়ে। যা ভালো মনে করতেন তাই করার জন্য এগিয়ে যেতেন। কিন্তু আমি পারিনি, কারণ তার মতো সাহস আমার ছিল না। তবে ব্যক্তিগত মানমর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিতে পারি। আমার সম্মানের কাছে জগৎ কিছুই না। তবুও বুঝতে পেরেছি, জগৎ-সংসার বা সমাজ কখনোই আমার মনের মতো হয়নি। রাষ্ট্র্র বা সমাজ কখনোই আমাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করেনি; বরং অবিরাম নির্যাতিত হয়েছি।
সমাজের নিয়ম-কানুন তৈরি হয়েছে ক্ষমতাবান শক্তিশালী মানুষের দ্বারা। আইন বা নিয়ম-কানুনের লক্ষ্য হলো, ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা রক্ষা করা আর প্রজা নামের মানুষদের দমন করে অনুগত রাখা। বাদশাহী যুগ থেকে হাল আমল পর্যন্ত আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি একই ধারায় চলে আসছে। তবে নিষ্পেষিত-নির্যাতিত মানুষের বিদ্রোহ ও বিপ্লবের কারণে আইন কিছুটা রূপ বদলিয়ে মানবিক হওয়ার মুখোশ পরেছে।
মোগল আমলে আমরা প্রজা ছিলাম, এখনো প্রজা আছি। আমাদের রাষ্ট্রের নাম ‘প্রজাতন্ত্রী’। জনগণতান্ত্রিক নয়। কারণ, এখনো যারা আইন প্রণয়ন করেন তারা একটি গোষ্ঠী। এদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য প্রজাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের অধীনে রাখা। সে জন্য শাসকেরা নানা বাহিনী তৈরি করেছেন প্রজা দমনের জন্য। প্রজাদের আবার আদর করে নাগরিক (সিটিজেন) নাম দেয়া হয়েছে। বাদশাহরা প্রজাকল্যাণের নামে আইন বানাতেন। ইংরেজরাও দখলদার হিসেবে প্রজা দমনের জন্য কোতোয়াল বা পুলিশ বাহিনী তৈরি করেছে। ফলে লাঠি-ডাণ্ডা-বেত আইনের প্রতীক হিসেবে গড়ে উঠেছে। যদিও এখন আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয় প্রজা নিপীড়নের জন্য।
সমাজ, রাজ্য ও রাষ্ট্রে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা সুপ্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। প্রজার ফসল বা আয়-রোজগার থেকেই কোতোয়ালদের বেতন দেয়া হয় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে প্রজাকে দমনের জন্য। প্রয়োজনে খাজনা আদায়ের জন্য সিপাহিরা প্রজাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করত। তাদের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, বাসনকোসন লুট করে নিতো। অনেক সময় অন্য প্রজাদের ভয় দেখানোর জন্য প্রকাশ্যে হত্যা করা হতো। ইংরেজ আমলে এ অত্যাচার সবচেয়ে বেশি ছিল।
আমাদের এ বাংলাদেশটি, মানে এই ভূমিটি হাজার বছর ধরে বিদ্যমান। বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে। উদ্দেশ্য ছিল আমরা অমানবিক অত্যচারী রাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তি পাবো।
  1. এখন আমরা স্বাধীন। পাকিস্তান নেই, বিদেশী কেউ নেই। কিন্তু অত্যাচারের সব আইন এখনো বলবৎ আছে। হাজার চেষ্টা করেও পুলিশি আইন ৫৪ ধারা বাতিল করা যায়নি। কারণ রাষ্ট্রকে নাকি বাধ্য হয়ে অত্যাচার করতে হয়। পুরনো সব অত্যাচারী আইন ও ব্যবস্থা এখনো জারি আছে। শুধু বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র হয়েছে। এ রাষ্ট্রের একটি ভূখণ্ড আছে, যা হাজার বছর আগেও ছিল। নতুন হয়েছে একটি গান, একটি পতাকা,জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ। শুধু ব্যতিক্রম, শাসকেরা বাংলায় কথা বলেন। শাসকেরা হলেন পরিচিতজনের পোলা বা নাতিরা।
বলুন তো দেখি, দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর সাথে ক’জন নাগরিক দেখা করতে পারেন? কারণ তারা প্রজা; কিন্তু শাসকগোষ্ঠী বা দলের কেউ নন। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি রাস্তায় নামলে রাস্তা খালি করে দিতে হয়। ফলে চার দিকে সব যানবাহন থেমে যায়। এসব বাদশাহী আমলেও ছিল। এর মানে, আধুনিক প্রজাতন্ত্র আর বাদশাহী বা সাম্রাজ্যের মধ্যে আমি কোনো ফারাক দেখতে পাই না।
বাদশাহী বা ইংরেজ আমলে একজন সিপাহি একজন প্রজার পাছায় যেকোনো সময়ে লাথি বা ডাণ্ডা মারতে পারত। হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে যেতে পারত। এখনো পারে। বলা হয়, প্রজা বা নাগরিকেরা নাকি রাষ্ট্রকে এসব ক্ষমতা দিয়েছে। এখন তো কোতোয়ালেরা দাবি করেছেন, তাদের হেফাজতে কেউ মারা গেলে তাদের বিরুদ্ধে যেন কোনো মামলা না হয়। তারা তো বাদশাহ নামদারের গদি রক্ষার জন্যই প্রজার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়, বেশি ‘আদরযত্নে’ যদি কাহিল হয়ে যায় তাহলে কবিরাজের কাছে নিয়ে যায়। সব কিছুই করে তারা আইনের ভেতর থেকে।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রজারা ভোটের নাটক করেন। এই নাটকেই নেতা (বাদশাহ বা প্রধানমন্ত্রী ) নির্বাচিত হন। আধুনিক ভাষায় ‘নেতা’ বলা হয়। বাদশাহের পারিষদকে এখন সংসদ বলা হয়। এ সংসদের প্রধান হলেন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি বাদশাহের ক্ষমতা ব্যবহার করেন। আর যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ বলে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। বাদশাহ দরবারে এলে পারিষদরা কোমর বাঁকিয়ে কুর্নিশ করতেন, এখনো তা করা হয়।
বাদশাহ হুজুরের বিরুদ্ধে কিছু বললে সাথে সাথে গ্রেফতার। এ দেশে আল্লাহ ও নবীজী সা:-এর বিরুদ্ধে কিছু বললে শাস্তির ব্যবস্থা নেই। মেজরিটি মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করলে রাষ্ট্র কিছু করে না। ফলে ‘মুক্তমনা’ যুবকদের জন্ম হয়েছে। এদের বাপদাদারা সবাই মুসলমান। এর মানে, রাষ্ট্র মেজরিটি মানুষের কথা শোনে না। অথচ এ দেশ নাকি গণতান্ত্রিক।
আমি বিশ্বাস করি, দুনিয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। তিনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আর তিনিই আমাকে ফিরিয়ে নেবেন। জন্ম থেকে ইন্তেকাল (স্থানান্তর) বা মরণ পর্যন্ত সময়টা আল্লাহ নির্দেশিত পথে চলার হুকুম রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান বলে মানুষ সার্বভৌম, আল্লাহ নন। শাসক আল্লাহর আনুগত্য না করলেও কিছু আসে-যায় না।
  1. সংবিধানে মানুষকে সার্বভৌম বলাটাও একধরনের চালাকি। বাস্তবে এ ধরনের কোনো ‘সার্বভৌমত্ব’ কোথাও নেই। কথায় বলা হয়, জনগণ সার্বভৌম, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনি কি কখনো অনুভব করেছেন, আপনি এ দেশের মালিক। আমি কখনো অনুভব করিনি। এমনকি কখনো ভাবিও না। আমি তো সবখানেই সব সময় লাঞ্ছিত, অবহেলিত, অপমানিত। তহসিল অফিসে খাজনা দিতে গেলে উমেদার অপমান করে। খাজনা ৫০ পয়সা হলে দাবি করে পাঁচ টাকা। হয়তো বলে দিলো, তোমার নামে খতিয়ান নেই। লেখাপড়া না জানা প্রজা তখনই তহসিলদারের পা ধরে কান্নাকাটি করেন। তখন দয়ার সাগর তহসিলদার সাহেব বলেন- যা, গরু বেচে টাকা নিয়ে আয়, সব ঠিক করে দেবো। বাদশাহের জামানায় তহসিলদার যেমন ছিলেন, এখনো তেমনি আছেন।
বিপদের সময় থানায় যান, দেখবেন থানাদার চোর-গুণ্ডাদের নিয়ে মশগুল। সেখানে আপনার কথা শোনার মতো কেউ নেই। আমাদের দেশে একটি গল্প আছে- ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’। তাই সত্য কথা বলার জন্যও কেউ থানায় যায় না। থানাদারের আইনগুলো তৈরি করেছেন ইংল্যান্ডের রানী বা রাজা। কারণ প্রজা বা স্বাধীনতাকামীদের দমনের জন্য এমন আইনই দরকার। সে আইন এখনো বলবৎ।
আপনি নাকি এ রাষ্ট্রের মালিক। কথাটা কি আসলেই সত্য? আপনিই বলুন, এ দেশে কোন সরকারি অফিসে আপনি সম্মানিত? কোন সরকারি অফিসের ওপর আপনার আস্থা আছে? কোন সরকারি অফিসে ঘুষ বা দুর্নীতি নেই?
 শুরুতেই বলেছি, আমি একজন সীমাহীন আবেগী মানুষ। নিজের জীবনেই অনুভব করেছি, রাষ্ট্রটা আমার দেহকে অত্যাচারের খাঁচায় বন্দী করে ফেলেছে। অন্তর-মন বা রূহের ভেতর খোদা, আর বাইরে সমাজ, রাষ্ট্র ও বাদশাহী আইন। রূহ বলে বিদ্রোহ করো অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে; কিন্তু দেহ বলে, দরকার কী, দেহটাকে রক্ষা করো। সবাই তো দেহ রক্ষা করেই চলছে। বাদশাহ যদি আল্লাহর কথা না শোনে তুমি হিজরত করো, না হয় আল্লাহ পাকের পানা চাও। আমি তো মোনাফেক হতে চলেছি। দেহকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র, মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন খোদা।
  1. কোথায় সত্য বলব? বাংলাদেশে এমন একটি জায়গা নেই যেখানে সত্যের কোনো স্থান আছে। এমন সব মানুষ দেখি যারা অবসরের পর দিনরাত আল্লাহ আল্লাহ করছেন। বাসা থেকে বেরিয়ে মসজিদে যান আর বাসায় ফিরে আসেন। সব কিছু থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বাইরের কোনো ঘটনাই তার মনে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। মেয়েটাকে গুণ্ডারা তুলে নিয়ে গেছে। তবুও তার ভাবের কোনো পরিবর্তন নেই। তিনি থানায়ও যাননি। কারণ, জানেন কোথাও কোনো বিচার নেই।
জানি না, এ দেশে কখনো মানব ও মানবতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে কি না। আইনগুলো মানবিক হবে কি না। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে চলেছি। শুধু প্রার্থনা করি- হে খোদা, আমি তোমার অনুগত বিশ্বস্ত গোলাম। আবেগে এতই কাতর হয়ে পড়েছি যে, জীবনটাকে আর টেনে নিয়ে যেতে পারছি না। রূহের বাহন জরাজীর্ণ এ দেহের আর কী প্রয়োজন বুঝতে পারি না। আমি তো রাজনীতি করি না। রাজনীতি বাদশাহের ধর্ম। কারণ, বাদশাহী রক্ষা করার জন্য মোনাফেকি বাদশাহের ধর্মে পরিণত হয়েছে। বাদশাহ ভাবেন, প্রজারা যেকোনো সময় তার গদি কেড়ে নিতে পারে। তাই সেনাপতি ও কোতোয়ালই তার একমাত্র ভরসা। তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক। তাই বাদশাহ বাহিনীদের মাসোয়ারা বাড়িয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বাইবেলে পড়েছি, রাজস্ব আদায়কারীরা খাজনা আদায়ের নামে প্রজাদের ওপর অত্যাচার করে।
এরশাদ মজুমদার
অত্যাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে কখনোই বিদ্রোহ করিনি। বাধ্য হয়েই আমি একজন অনুগত প্রজা। তবুও রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীরা আমার ক্লান্ত দেহ ও মনের ওপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। তারা বলে, রাজাকে রাজার পাওনা দাও আর আমাদের পাওনা আমাদের বুঝিয়ে দাও। আমরা তো মহান রাজার প্রেমিক কর্মচারী। আমরাই তো মহান রাজাকে রক্ষা করি। নিপীড়ক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সব উন্নয়নই শোষণের হাতিয়ার। একজন রাজকর্মচারী কখনোই দরিদ্র হন না। কারণ, তিনি ঢেউ গুনলেই প্রাসাদ তৈরি হয়ে যায়। কেউ যদি একবার রাজার পারিষদ হন, তিনি চৌদ্দ পুরুষ বসে খেতে পারবেন। আর আমি টুঁ শব্দও করি না।
লেখক : কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
ershadmz@gmail.com

নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এবার যা ঘটতে পারে by মীযানুল করীম

কট্টরপন্থী ইহুদি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবার নির্বাচিত হয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী। এমনিতেই ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া’ ইসরাইল বিশ্বের সর্বাধিক বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক অপরাষ্ট্রশক্তি। তার ওপর এবার পরাজয়ের সম্ভাবনা সত্ত্বেও পুনর্নির্বাচিত হলেন নেতানিয়াহু। তাই তার এই অবাঞ্ছিত বিজয় ফিলিস্তিনি জনগণসহ আরব বিশ্ব তো বটেই, দুনিয়ার তাবৎ শান্তিকামী মানুষ, এমন কি খোদ ইসরাইলের বিবেকবান ইহুদিদের জন্য ও দ্বিগুণ দুঃখের কারণ হয়ে এসেছে।
১৭ মার্চ ইসরাইলি পার্লামেন্ট বা নেসেট-এর বহুলালোচিত নির্বাচনটি হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব জরিপে নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী লিকুদ পার্টি মধ্য বাম জায়োনিস্ট ইউনিয়নের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও ভোটের ফলাফলে তা প্রমাণিত হয়নি। বেনজামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ৩০টি, জিপি লিভনি ও আইজ্যাক হার্জগের জায়োনিস্ট ইউনিয়ন ২৪টি এবং আরব দলগুলো যৌথভাবে ১৪টি আসন পেয়েছে। নেতানিয়াহু মোট আসনের অর্ধেকের কম আসন পেলেও তার দলই এককভাবে সর্বাধিক আসনে জিতেছে। তার আবার সরকার পরিচালনার সুযোগ পাওয়া নিশ্চিত।
নেতানিয়াহুর মতো একজন চরমপন্থী লোক ইসরাইলের নেতৃত্বে থাকা দেশটির মিত্রদের জন্যও অস্বস্তিকর। এবার আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, তার পরাজয়ের সম্ভাবনার মাঝেই জয়ের খবর এসেছে। অবশ্য এতে বিস্মিত হননি ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা। তারা স্মরণ করিয়ে দিলেন নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সূচনাকালীন ঘটনা।
সেটা নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়। এর কিছু দিন আগে ইহুদি চরমপন্থীরা হত্যা করেছে প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনকে। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাথে তিনিও ভূষিত হয়েছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারে। তার মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন হন পাকা ঘুঘু শিমন পেরেজ লেবাননে রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। তার আশা ছিল, এর মধ্য দিয়ে ভোটারদের কাছে নিজেকে ইসরাইলের নিরাপত্তার কাণ্ডারি রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন এবং এতে নির্বাচনী বাজিমাত সম্ভব হবে। কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতে নেতানিয়াহু হেঁয়ালি করে বললেন, The hour is still early and the night is long. পরদিনের নির্বাচনে পেরেস বাজিমাত নয়, একেবারে কুপোকাত। নেতানিয়াহু তখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
ইসরাইলের এবারকার নেসেট নির্বাচনে কোন কোন নেতা দাঁড়িয়েছিলেন প্রার্থী হিসেবে? প্রথমেই বলতে হয় নেতানিয়াহুর মতো মুসলিমবিদ্বেষীর কথা, নির্বাচনের দিনও যার মূল বক্তব্য ছিল, ইসরাইলে আরব বসবাসরত, নাগরিকেরা দেশটার দুশমন। এই ব্যক্তি পেয়েছেন ২৫ শতাংশের মতো ভোট। প্রার্থীদের মধ্যে আরো ছিলেন নেতানিয়াহুর ওই বক্তব্যের প্রতিধ্বনিকারী চরম ডানপন্থী নাফতালি বেনেট; ছিলেন বহুলালোচিত মন্ত্রী আভিগদর লিবেরমান যার প্রধান কাজ হলো আরবদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের উসকে দেয়া; আরো ছিলেন মোশে কাহলন যার সাফ কথা, আরবদের ভোটের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকারে যোগ দেবো না; সেই সাথে প্রার্থী হয়েছিলেন আরইয়ে দেরি, যিনি এমনই আরববিদ্বেষী যে, আরবেরা নিপীড়িতদের জোটে যোগ দেয়ার আহ্বান জানালে এই আদমি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এসব অত্যন্ত সঙ্কীর্ণমনা ও সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি সবাই মিলে ভোটের এক-চতুর্থাংশ বাগিয়েছেন। তবে তাদের বিপরীত মেরুতে আরবদের জোট Joint List-এর সাফল্য কম নয়। চার লাখ ভোটারের প্রতিনিধিত্বকারী এই মোর্চা ১৪টি আসন জিতে নেসেটে তৃতীয় বৃহত্তম শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। দেখা গেছে, গড়ে ইহুদিদের চেয়ে আরবরা এবার নির্বাচনে বেশি অংশ নিয়েছেন ভোটার হিসেবে।
নির্বাচন উপলক্ষে এই জোটটির চেয়ারম্যান আয়মান ওদেহকে ইসরাইলি টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র ও অনলাইন মিডিয়া গুরুত্ব না দিয়ে পারেনি। তিনি ইসরাইলের সব নাগরিকের জন্য মুক্ত পরিবেশ, অংশদারিত্ব, সমতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পুনর্মিলনের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা তার স্বপ্ন। এবার নির্বাচনের পরে সে রাতে যখন ফলাফল স্পষ্ট, তখন আয়মান ওদেহ এবং দোভ খেনিন আইজ্যাক হার্জগকে জানান, তাদের শরিক করা হলে তারা নতুন প্রধানমন্ত্রীরূপে হার্জগকে সমর্থন দেবেন। এটা বাস্তবে ঘটলে তা হতো এক ঐতিহাসিক নজির।
ইসরাইলের বিশিষ্ট সাংবাদিক গিডিওন লেভি প্রভাবশালী পত্রিকা হারেতজ-এর কলামিস্ট। তিনি নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, যদি ভীতি, উদ্বেগ, ঘৃণা ও নিরাশার বীজ ছয় বছর ধরে বপনের পরও এটাই হয়ে থাকে, তবে তা আসলেই নিদারুণ মন্দ ব্যাপার। সম্প্রতি কয়েক মাসে অনেক কিছুই হয়েছে উদঘাটিত। তবুও নেতানিয়াহু আরো চার বছরের জন্য নির্বাচিত হলেন। তাহলে বুঝতে হবে, ইসরাইলে কিছু একটা ভেঙে গেছে, যা আর মেরামত করা সম্ভব নয়।’
উল্লেখ্য, ইসরাইলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিন দীর্ঘ দিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির লোক হিসেবে রাজনীতি করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে যে সরকার গঠনের জন্য ডাকছেন, তা নিশ্চিত। নেতানিয়াহু মোট আসনের অর্ধেকও জিততে পারেনি। তাই দ্বিতীয় প্রধান দল, জায়োনিস্ট ইউনিয়ন নেতা আইজ্যাক হার্জগ পরাজয় মেনে নিতে বলেছিলেন নেতানিয়াহুকে। ইসরাইলি সংবিধান মোতাবেক, মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেয়েছে, এমন ১০টি দলের মধ্যে পার্লামেন্ট আসন বণ্টনের পর সরকার গঠনের জন্য একজন নেতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানানো হয়।
নেতানিয়াহু আগে থেকেই মেনাচেম বেগিনের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক ও কট্টর ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমালোচিত। তবে এবার যা সবাইকে বিস্মিত, মানবাধিকারকামীমাত্রকেই বিক্ষুব্ধ এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রকে বিব্রত করেছে, তা হলো নির্বাচনের প্রাক্কালে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে চরম অসহিষ্ণু ও উসকানিমূলক কিছু উক্তি। যেমন নেতানিয়াহু স্বদেশে উদারপন্থী ইহুদিদের কিংবা বিদেশে ইসরাইলের মিত্রদের কোনো তোয়াক্কা না করেই বললেন, আমরা জয়লাভ করলে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়তে দেবো না; ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হবে, ইত্যাদি।
গত শুক্রবার এসব বক্তব্য এবং এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নিন্দার খবর বিভিন্ন টিভি ট্যানেলে প্রচার করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশী কোনো কোনো চ্যানেলে নেতানিয়াহুর উক্তিকে রদবদল করে মোলায়েম রূপ দিয়ে তুলে ধরায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ রয়েছে।
একই দিন জানা যায়, নেতানিয়াহু বলেছেন, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) সন্ত্রাসীদের সাহচর্য না ছাড়লে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মেনে নেবো না। জবাবে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া নস্যাৎ করার চক্রান্তে লিপ্ত।
উগ্র সন্ত্রাসী ইহুদিবাদী চক্রের অন্যতম হোতা হয়ে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন সংগ্রামী যারা, তাদের যে সন্ত্রাসী বলে হেয় করতে চান, তা তার এ যাবৎ অনুসৃত নীতি ও কার্যকলাপ থেকে স্পষ্ট। বিভিন্ন দেশে একই কায়দায় জনগণের অধিকার, তথা গণতন্ত্রের জন্য জানবাজি রেখে যারা আন্দোলন করেন, স্বৈরাচারী শাসক ও সরকার তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করে নির্যাতন চালিয়ে থাকে।
নেতানিয়াহুকে স্বাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনি জনগণ মনে করে কোনো রাজনীতিক নন, বরং ঠাণ্ডামাথার একজন খুনি এবং গণহত্যায় তার আনন্দ। তাদের কাছে এই ব্যক্তি জাতিগত আগ্রাসন এবং নির্মূল অভিযানের প্রতীক, নির্বিচার ধ্বংসের উন্মত্ত তাণ্ডবই যার স্বপ্ন ও সুখের বিষয়।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের একজন সংগঠক আলী আবুনিমাহ বলেছেন, Netanyahu is a blood soaked killer. He should be put on trial for his many crimes, from the relentless theft of Palestinian land to last summers' massacre in Gaza and I yearn to see the day.'
নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হোন আর যত হুমকি-হুঙ্কার ছাড়ুন না কেন, দেশে তার বিরোধিতা দিন দিন বাড়ছে। তিনি উগ্র ইহুদিবাদ আর মুসলিমবিদ্বেষ পুঁজি করে ভেবেছিলেন, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠবেন এবং বহুকাল থাকবেন ইসরাইলের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু দেশটির রাজনৈতিক মহলে তার ওপর অনেক নেতাই ক্ষুব্ধ। আর মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী মহলে তার ভূমিকার সমালোচনাও কম নয়। এবার নির্বাচনের প্রাক্কালে তেলআবিবে তার বিরুদ্ধে নির্দলীয় সমাবেশে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ইসরাইলের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ঘটনা। এতে প্রমাণিত, সাধারণ ইসরাইলিদের একটা বড় অংশই সচেতন হয়ে উঠছেন বাস্তবতা সম্পর্কে। তাদের আকাঙ্ক্ষা Live and let live, অর্থাৎ নিজেদের রাষ্ট্রের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রও থাকুক। নেতানিয়াহুর মতো ফিলিস্তিন ধ্বংসের মিশন নিয়ে নামলে ইসরাইলকে চিরদিন মাশুল দিতে হবে, তা বুদ্ধিমান নাগরিকদের অজানা নয়। নেতানিয়াহু ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’ ফর্মুলায় বাস্তবে অবিশ্বাসী। অথচ এটাই জাতিসঙ্ঘ তথা বিশ্বসম্প্রদায়ের সর্বসম্মত অভিমত। ওআইসি কিংবা আরব লিগও কার্যত এর বিরোধী নয়। এমনকি, যে হামাসকে নেতানিয়াহুর মতো গোঁড়া ইহুদিবাদীরা ‘সন্ত্রাসী’ মনে করে এবং যাদের নির্মূল করার খায়েশে ইসরাইল বারবার গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে, সেই হামাস পর্যন্ত পরোক্ষভাবে বলেছে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সীমান্তে ফিরে গেলে ইসরাইলের অস্তিত্বের স্বীকৃতি বিবেচনাযোগ্য। এসব কিছু সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর মতো উগ্রবাদীরা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তরিকভাবে মেনে নিচ্ছেন না অসলো চুক্তির ২২ বছর পরও। আরাফাতের সাথে সম্পাদিত সে চুক্তিতে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিরা পরস্পরের কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করে নেয়ার উল্লেখ ছিল। নেতানিয়াহুর মতো অপরিণামদর্শী লোকদের নেতা বানালে অশান্তির আগুন কোনো দিন নিভবে না এবং তাতে ইসরাইলকেও জ্বলতে হবে- এই উপলব্ধি ইহুদিদের মধ্যে যত বেশি মানুষের হবে, ততই সেটা তাদের জন্য হবে মঙ্গলজনক।
নেতানিয়াহু দীর্ঘ দিন ধরে বিশ্বের সব চেয়ে কৃত্রিম, অস্বাভাবিক, বর্ণবাদী ও সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্রটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ সময়ে তার গৃহীত নীতি, কর্মসূচি ও কর্মপন্থা এবং এবার নির্বাচন উপলক্ষে প্রদত্ত তার বক্তব্য ও ঘোষণার ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে ইসরাইলের আচরণ ও পদক্ষেপ কেমন হতে পারে, সে ব্যাপারে একটা ধারণা তুলে ধরা যায়। ইসরাইলের শুধু বেআইনি বসতি বৃদ্ধি পাচ্ছে না, সেই সাথে বাড়ছে দম্ভ ও ঔদ্ধত্যও। সম্প্রতি নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসে বক্তৃতার নামে যে আগ্রাসী আস্ফালন করেছেন, তা এর একটি নগ্ন নজির।
১৯৪৮ সালে ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্সের চক্রান্তে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মতিতে ফিলিস্তিন ভূমিতে ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল আইন, মানবাধিকার, ন্যায়নীতি ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। ‘বেজন্মা রাষ্ট্রটির জন্ম দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্থায়ী ও স্বীকৃত সংজ্ঞাকে পাল্টে দিয়ে। ফলে ইসরাইলের সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড চিহ্নিত করা হয়নি। অর্থাৎ আরব ভূমি জবরদখল ও অবৈধ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এর সীমানা বর্ধনের পুরো সুযোগ রাখা হয় পরিকল্পিতভাবেই। এভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রথা লঙ্ঘন করে যে অপরাষ্ট্র জন্ম দেয়া হলো, তা যে পদে পদে আন্তর্জাতিক আইনকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখাবে, এটাই স্বাভাবিক। জাতিসঙ্ঘের কোনো প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত না মেনে ইসরাইল এর প্রমাণ রেখেছে। আর সে জানে, জনক ও মদদগার আমেরিকা ও তার দোসর বৃহৎ শক্তির কাছে হাজার খুনও মাফ পেয়ে যাবে। এ অবস্থায় সময় যত এগিয়েছে, ইসরাইলের স্পর্ধা ও অহঙ্কার তত বেড়েছে। এখন সে আর কারো পরোয়া করে না, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেরও। তা না হলে নেতানিয়াহু সে দেশে গিয়ে, ওই দেশের পার্লামেন্টে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে পারতেন না। কথায় বলে ‘কুকুর নেজ নাড়ে’। এখন দেখা যাচ্ছে, লেজই নাড়াচ্ছে প্রাণীটাকে। নেতানিয়াহুর হুমকি-হুঙ্কারের জবাবে প্রেসিডেন্ট ওবামার ‘মিউ মিউ’ প্রতিক্রিয়া থেকে প্রশ্ন জাগে, আমেরিকা চালায় কারা? সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটির প্রেসিডেন্টের এমন অসহায়ত্ব দেখে কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের পোষক (পৃষ্ঠপোষক) থেকে তোষক (তোষামোদকারী) হয়ে গেছে।
নেতানিয়াহুর বিজয়ে অদূরভবিষ্যতে যা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা হচ্ছে :
ক. স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বিশ্বসংস্থায় এবং ফিলিস্তিন ভূমিতে নানাভাবে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হবে।
খ. দখলকৃত ভূমিতে বেআইনি ইহুদি বসতি সম্প্রসারণে গতি বাড়ানো হবে।
গ. ইরানের সাথে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের পরমাণু চুক্তি হলেও তার বাস্তবায়নে বিঘ্নসহ ইরানকে চাপে রাখার সাধ্যমতো চেষ্টা চালানো হবে। এ ক্ষেত্রে কংগ্রেসে রিপাবলিকান গরিষ্ঠতা নেতানিয়াহুর সহায়ক । এর সাথে ইরানবিরোধী রণোন্মাদনা জাগানোর প্রয়াস চলবে।
ঘ. মার্কিন কংগ্রেসে, হোয়াইট হাউজে, প্রশাসনে ও পেন্টাগনে AIPAC-সহ বিভিন্ন ফোরাম ও কৌশলের মাধ্যমে ইহুদি লবির ‘চাপ ও তাপ’ বাড়ানো হবে। এবার বুশের পার্টির ‘নিউকন’ গোষ্ঠী কংগ্রেসে যে মদদ জুগিয়েছে, তা নেতানিয়াহুর জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। ধারণা করা যায়, আগামী বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটের হিসাব কষে ওবামার পার্টিও ইহুদি লবিকে ছাড় দিতে পারে।
ঙ. হামাসের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পদক্ষেপ হিসেবে আবারো কোনো ছুতায় গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে গাজাসংলগ্ন মিসরে হামাসের ঘোরবিরোধী স্বৈরাচারী সরকার থাকা নেতানিয়াহুর জন্য একধরনের প্রণোদনা।
চ. লেবানন-সিরিয়া-ইরাক-ইরান-আফগানিস্তান, অর্থাৎ ভূমধ্যসাগর থেকে হিন্দুকুশ অবধি ইসরাইলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্য সংগ্রহ-পাচার, বিভেদ চক্রান্ত, অন্তর্ঘাত প্রভৃতি বৃদ্ধি পেতে পারে।
ছ. নাশকতা, সন্ত্রাস, জঙ্গি দমনের নামে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে স্বেচ্ছাচারী শাসনাধীন কোনো কোনো দেশের সাথে ইসরাইলের গোপন যোগাযোগ ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিতে পারে।
এখন ফিলিস্তিনি জনগণ, আরব জাহান, ওআইসি তথা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোসহ শান্তিকামী বিশ্বসম্প্রদায়ের কী করণীয়?
১. এ প্রসঙ্গে ফিলিস্তিন মুক্তিআন্দোলনে সক্রিয় লেখক এবং ‘ইলেকট্রনিক ইনতিফাদার’ সহপ্রতিষ্ঠাতা আলী আবুনিমাহ বলেছেন, BDS জোরদার করতে। BDS সুপরিচিত পরিভাষা, যা Boycott, Divestment and Sanctions- এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর দ্বারা বুঝানো হয়, ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে বর্জন ও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং দখলকৃত ভূমি থেকে তাকে উচ্ছেদ করতে হবে।
২. ফিলিস্তিনিদের সব বিভেদ বিভাজন দূর করে ঐক্য সুদৃঢ় করতে হবে। তাহলে বিপদের মুহূর্তে পরস্পরের সাহায্য এবং সুসংহত শক্তির বলে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব হবে।
৩. অবরুদ্ধ গাজায় শুধু ত্রাণ ও পুনর্বাসন নয়, পর্যাপ্ত পুনর্গঠন ও উন্নয়ন এবং সর্বোপরি এই বিচ্ছিন্ন জনপদের পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা চাই।
৪. স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মর্যাদাপ্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রয়াস অব্যাহত রাখা জরুরি।
৫. কোনো আরব বা মুসলিম দেশ যাতে ইসরাইলি ফাঁদে পা না দেয়, কোনোভাবে তার অনুকূল ভূমিকা না রাখে, বরং সব মুসলিম রাষ্ট্র দৃঢ়তার সাথে ফিলিস্তিনকে সাহায্য-সমর্থন জোগায়, তা নিশ্চিত করা উচিত।
৬. যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য জগৎ এবং জাতিসঙ্ঘসমেত বিশ্বফোরামগুলোতে লবিং তথা কূটনৈতিক তৎপরতা অনেক বেশি জোরালো হতে হবে।
শেষ কথা হলো, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসঙ্ঘ, মুসলিম উম্মাহ, সর্বোপরি বিশ্ববিবেকের প্রতি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। এখনই তাকে সামলানো না গেলে মধ্যপ্রাচ্যের শুধু নয়, আশপাশেও অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়বে। দেখা যাক, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবতীর্ণ হওয়ার দাবিদার, স্বঘোষিত মোড়ল বিগ ব্রাদাররা এখন কোন ভূমিকা পালন করেন।

দুই রাষ্ট্র সমাধানের ইতি কী করবেন ফিলিস্তিনিরা?

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চতুর্থ ও ইসরাইলের ৩৪তম সরকার গঠন গঠিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২৪ বছর আগে মার্কিন অর্থায়নে ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি ‘শান্তি প্রক্রিয়ায়’ শুরু করার পর এটা হবে ইসরাইলের ১১তম জোট সরকার। নতুন সরকার আরো একটি চরম জাতীয়তাবাদী সরকার হওয়ার অঙ্গীকার করেছেন এর নেতৃত্বদাতা। তিনি আগের চেয়ে আরো কট্টর নীতি অনুসরণ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইতোমধ্যে ‘মহান বিজয়’ ঘোষণাকারী নেতানিয়াহু নির্বাচনের ফলাফলকে ফিলিস্তিনকে ইসরাইলের উপনিবেশে পরিণত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন ম্যান্ডেট হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
গড়ে প্রতি দুই বছরে ইসরাইলের নতুন সরকার গঠিত হচ্ছে, তাই দেশটি ২০১৭ সালে আবারে নির্বাচনে যাবে এবং আরেকটি জোট প্রতিষ্ঠা হবে। পরে কে ক্ষমতায় আসবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের প্রতিক্রিয়া কী হবে তার ওপর নির্ভর করছে সেই সরকারের ধরন।
আরো চরম ডানপন্থা
ইসরাইলের অধিকতর পছন্দ নিয়ে দ্বিধা বা সংশয় ছিল না। যদিও নেতানিয়াহুর অধীনে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে ও অনিশ্চয়তা গভীরতর হচ্ছে, মনে হচ্ছে ইসরাইলিরা বিকল্প জয়েনিস্ট ইউনিয়নের চেয়ে তাকেই বেশি পছন্দ করেছে। নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা ‘র‌্যাক লো নেতানিয়াহু’ (নেতানিয়াহুই একমাত্র নয়) স্লোগানের অধীনে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু ইসরাইলিরা টানা তিনবারের মতো নেতানিয়াহুকেই তাদের নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে!
নির্বাচনের সময় তিনি তার কথা খণ্ড খণ্ড করে বলেননি। নেতানিয়াহু যে স্পষ্ট ও বর্ণবাদী ঘোষণা দেন তা তার এ নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের উত্থান মেনে নিবেন না। আর এভাবে তিনি ফিলিস্তিনিদের সাথে নতুন আলোচনার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
তিনি ইসরাইলের নাগরিক সংখ্যালঘু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধেও বর্ণবাদী উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং সতর্ক করে দেন যে, তাকে পদচ্যুত করার জন্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। একজন সাংবাদিক বলেছেন, ‘নির্বাচনে জেতার জন্য নেতানিয়াহু বর্ণবাদী প্রতারণা অবলম্বন করেন।’
যারা ইসরাইলের গত কয়েক দশকের রাজনীতির ক্রমোন্নতি অথবা অবক্ষয় পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের মতে, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের ইসরাইলি যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল ও উপনিবেশ সৃষ্টির পর ইসরাইল যে চরম ডানপন্থার দিকে মোড় নেয় নেতানিয়াহু হচ্ছেন তারই সম্প্রসারিত রূপ।
ক্ষমতায় লিকুদ পার্টির উত্থান ১৯৭৭ সালে। এটা ছিল ডানপন্থীর সাথে ডানপন্থীর জোটের নতুন যুগের সূচনা, যেটা ফিলিস্তিনে ইসরাইলের উপনিবেশ প্রকল্পকে সমর্থন ও গভীরতর করেছিল। এর ব্যতিক্রম ছিল তিনটি লেবার মধ্যস্ততাবাদী সরকার, যারা সবাই ঘটনাক্রমে তাদের পূর্ববর্তীদের তুলনায় কোনো অবৈধ উপনিবেশ নির্মাণ করেনি।
পরিষ্কারভাবে, ইরানের ব্যাপারে ওবামা প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কের ভাঙন এবং ইসরাইলের বেপরোয়া পদক্ষেপ শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। ১৯৯২ সালের নির্বাচনে ইসহাক শামির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নির্বাচনে পরাজয় লাভ করেন। এইবার যদিও পশ্চিমা অথবা ফিলিস্তিনিদের নিকট থেকে শক্তিশালী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছিল, তারপরও ইসরাইলিরা নেতানিয়াহুকেই সমর্থন করেছে।
কেমন হবে ওবামার প্রতিক্রিয়া?
যেহেতু নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু দুই রাষ্ট্র সমাধান বিষয়টি ধ্বংস করে এর মৃত্যু ও কবর রচনা করেছেন, সেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য কিছুর চেষ্টা করতে পারবে না। অথবা প্রক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতি এড়ানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু করার ইচ্ছা কি ওবামা প্রশাসনের আছে?
তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বের এই পরাশক্তি চাইলে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে আলোচনার বিষয়টির সাথে নিশ্চিতভাবে ফিলিস্তিনে এবং ওই অঞ্চলে ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধের ওপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। আমেরিকার সদিচ্ছা আছে কিনা তা দেখার বিষয়। তবে ফিলিস্তিনিরা এবং এই অঞ্চল ও এর বাইরে তাদের সমর্থকদের ওপর এ বিষয়টি নির্ভর করছে।
ফিলিস্তিনিরা এখন কী করবে?
দুই রাষ্ট্র সমাধানের ওপর ভিত্তি করে ইসরাইলের সাথে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন মাহমুদ আব্বাস। এ জন্য তার নেতৃত্বাধীন পিএলও সব ধরনের প্রতিরোধ আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা তাদের পক্ষে দরকষাকষি করেছে এবং ইসরাইলের সাথে করা সব অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে। এমনকি তারা ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সাহায্য করেছে। তারা আলোচনার মাধ্যমে সব কিছু নিষ্পত্তি করার ভিত্তিতেই এসব করেছে। কিন্তু এখন সেই অঙ্গীকার ভেঙে গেছে এবং এই প্রক্রিয়া বিলুপ্ত হয়েছে। দখলদারিত্বের বিষয়ে এখন ফিলিস্তিনিরা কী করবে? আব্বাস কি পদত্যাগ করবেন? অথবা ইসরাইলের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রেখে ফিলিস্তিনিদের অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্রীতদাসে পরিণত করবেন?
অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ফলাফল হিসেবে গঠিত হওয়া জাতীয় কর্তৃপক্ষ কি তিনি ভেঙে দেবেন? অথবা একটি জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির জন্য বিরোধীদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে তিনি কি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবেন? ফিলিস্তিনিরা কি তখন নতুন করে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করবে?
আলজাজিরা অবলম্বনে

এবার ৬২ লাখ ভোটারের সঙ্গে সংলাপ! by সোহরাব হাসান

জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের মাননীয় দূতেরা, নাগরিক সমাজের সম্মানিত প্রতিনিধিরা যখন হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে বলেন, তখন সেটি বিএনপি জোটের ভালো লাগে না। তারা মনে করে, সরকারের হয়েই তাঁরা কথা বলছেন। আবার এসব ব্যক্তি যখন বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দেন, তখন সেটিকে সরকার দেখে তাদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির বড় দুর্বলতা হলো: এখানে ন্যায়-অন্যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদির বিচার করা হয় নিজের সুবিধা-অসুবিধার ভিত্তিতে। এ কারণেই আজ ক্ষমতাসীনদের কাছে হরতাল-অবরোধ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং বিরোধী দলের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। বিএনপি-জামায়াত জোট এখন যেসব মৌলিক মানবাধিকার কিংবা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের জন্য লড়াই করছে, তাদের আমলে সেগুলো সমুন্নত ছিল, সেই দাবি কেউ করবে না। অন্যদিকে সরকার এখন দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালানোকে যেভাবে জায়েজ করতে চাইছে, তারা বিরোধী দলে থাকতে সেই সময়কার ক্ষমতাসীনেরা একই যুক্তি দেখাতেন। কে বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সবটাই অমিল? ঢের মিল আছে। আর সেই মিলটি হলো, একে অপরের কাছে থেকে মন্দ নজিরটা গ্রহণ করা। ‘তুমি অধম হইলে আমি উত্তম হইব না কেন’ বলে বাংলায় যে একটি নীতিকথা আছে, আমাদের রাজনীতিকেরা তার বিপরীতে চলতেই ভালোবাসেন। তাঁদের ভাবনা হলো ‘তুমি অধম হইলে আমি অধম হইব না কেন?’ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি যে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, সেটি শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলের সঙ্গে দ্বিতীয় কিংবা বর্তমান আমলকে মিলিয়ে নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
----২.
সরকারি দলের নেতারা পণ করেছেন, বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো সংলাপ করবেন না। তাদের সঙ্গে আলোচনা করলেই নাকি গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। অন্যদিকে বিএনপিও আন্দোলন ‘যৌক্তিক পরিণতি’ লাভ না করা পর্যন্ত হরতাল-অবরোধ তুলে নেবে না। পেট্রলবোমায় মানুষ মরুক, দেশের অর্থনীতি গোল্লায় যাক; আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। আবার দুই মাসের আন্দোলনে বাজেটের অর্ধেক পরিমাণ ক্ষতি হলেও সরকারের টনক নড়ে না।
কিন্তু এতে নেতা-নেত্রীদের গোঁয়ার্তুমি বজায় থাকলেও দেশের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। দুই পক্ষই যার যার অবস্থানে অনড়। পৃথিবীর এমন কোনো শক্তি নেই তাদের নড়াতে পারে। তাহলে সমাধান কী? বিদেশি দূতেরা হতাশ। দেশের নাগরিক সমাজ মানসম্মান নিয়ে চিন্তিত। কারও বক্তৃতা-বিবৃতি এ পক্ষের প্রতিকূলে গেলে যাবে, তিনি চিহ্নিত হবেন প্রতিপক্ষের দালাল হিসেবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নতজানু অবস্থানের প্রতিবাদ করে যে চার উপদেষ্টা পদত্যাগ করে বিএনপির সাজানো নির্বাচনটি নস্যাৎ করে দিলেন, তাঁরা এখন নির্বাচন নিয়ে হক কথা বললেও আওয়ামী লীগের নেতারা সহ্য করেন না, ব্যঙ্গবিদ্রূপ করেন। আবার যেই স্বৈরাচারের হাত ময়েজ উদ্দিন-নূর হোসেনসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীর রক্তে রঞ্জিত, সেই স্বৈরাচার এখন গণতন্ত্রের সাচ্চা সেবক বনে যান। এমনকি স্বৈরাচারের গালিও তাঁরা মুখ বুজে সহ্য করেন। ক্ষমতার রাজনীতির আশ্চর্য মাহাত্ম্য বটে।
বর্তমান বাস্তবতায় অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে সংলাপের সম্ভাবনা নেই, তা প্রায় নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে আমরা আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে একটি বিকল্প সংলাপের প্রস্তাব করছি। সংলাপটি হবে দলের সঙ্গে জনগণের। দলের সমর্থক প্রার্থীর সঙ্গে ভোটারদের। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ২৮ এপ্রিল ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তারিখ ২৯ মার্চ, বাছাই ১ ও ২ এপ্রিল ও প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৯ এপ্রিল। এরপরই শুরু হবে নির্বাচনী প্রচারণা। ভোটারদের কাছে প্রার্থীদের ধরনা।
এই সংলাপের প্রস্তাবটি এ কারণে আনছি যে প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও বিএনপি সিটি নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চাইছে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচনটি যাতে সুচারুভাবে হয়, সেই ব্যবস্থা করা। সরকার তথা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হবে তাদের সর্বতোভাবে সহায়তা করা। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য যেমন পরীক্ষা তেমনি সরকারের জন্যও। এই পরীক্ষায় হারজিতের ওপরই ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত হবে আশা করা যায়।
তিন সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে নির্বাচন হচ্ছে ১৩ বছর পর। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০০২ সালের এপ্রিলে। বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের কল্যাণে চার বছর বেশি মেয়রগিরি করেছেন। যে দেশে ক্ষমতা বদলের পর মধ্যরাতে উপাচার্যের চেয়ার দখল হয়ে যায়, সে দেশে এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা বটে। তবে সেই ব্যতিক্রম ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ঔদার্যের জন্য নয়; যোগ্য প্রার্থী না থাকার কারণে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালা করে প্রায় তিন দশক দেশ পরিচালনা করলেও তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেনি বা করার চেষ্টাও করেনি (ছাত্রসংসদ নির্বাচনে তাদের রয়েছে প্রচণ্ড অনীহা)। সবখানেই একধরনের নেতৃত্বশূন্যতা চলছে।
২০১১ সালে যোগ্য নেতৃত্ব না পেয়ে আওয়ামী লীগ ঢাকা সিটি করপোরেশনটি দ্বিখণ্ডিত করে ফেলল। নির্বাচন এলেই নতুন নতুন প্রার্থীর নাম শোনা যায়। কিন্তু তাতেও তারা আশ্বস্ত হতে পারছে বলে মনে হয় না। বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধের মুখে সিটি নির্বাচন দিয়ে সরকার সম্ভবত এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল। তবে বিএনপির সবাই নিশ্চয়ই তারেক রহমানের মতো মাথা গরম নন। তাঁরা বাস্তবতার নিরিখে চলতে চান। সিটি নির্বাচনকে তাঁরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চান। এ খবর চাউর হওয়ার পর ক্ষমতাসীন মহলে চাপান-উতর শুরু হয়ে গেছে। প্রার্থীর গুণাগুণ পরখ করা হচ্ছে।
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন বিলম্বিত হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন হচ্ছে মেয়াদ থাকতেই। সেখানে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র মোহাম্মদ মন্জুর আলম না শাহাদৎ হোসেন হবেন, সেটি নিয়ে জল্পনা চলছে। পুরোনো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আবদুচ ছালামকে বাদ দিয়ে আ জ ম নাছিরকে সমর্থন দেওয়ার কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ। ঢাকায় বিএনপির পক্ষে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁরা হলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু, আসাদুজ্জামান রিপন, আবদুস সালাম, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও বরকত উল্লা। আওয়ামী লীগ উত্তরে ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক ও দক্ষিণে সাঈদ খোকনকে সমর্থন দেওয়ার কথা বললেও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। বাম দলগুলো থেকে রুহিন হোসেন প্রিন্স, আবদুল্লাহ হেল কাফি ও জুনায়েদ সাকী প্রমুখ প্রার্থী হচ্ছেন। জাতীয় পার্টি থেকে সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলন।
-----৩.
এটা ঠিক যে এই নির্বাচনে সরকার পড়ে যাবে না। বিরোধী দল ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তবে জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হবে। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই সিটিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে চার সিটি করপোরেশন যথা বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনায় জিতেছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী। কিন্তু ২০১৩ সালে গাজীপুরসহ ওই পাঁচ সিটিতে জয়ী হন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা। এবার কারা জয়ী হবেন, তা ঠিক করবেন তিন সিটির ৬২ লাখ (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে ভোটার যথাক্রমে ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ও ১০ লাখ ৯ হাজার এবং চট্টগ্রামে সাড়ে ১৮ লাখ) ভোটার।
সরকার ও বিএনপি পরস্পর সংলাপ করতে না চাইলেও এই ভোটারদের সঙ্গে একটি সংলাপ তাদের করতে হবে। সম্ভাব্য এই সংলাপে ভোটাররা নিশ্চয়ই সরকারি দলের সমর্থক প্রার্থীর কাছে জানতে চাইবেন, সেবা দেওয়ার নাম করে ঢাকা সিটিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন; কিন্তু আমরা নাগরিক সেবা থেক কেন বঞ্চিত আছি? কেন এত দিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন হলো না। তাঁরা আরও জানতে চাইবেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে ঢাকাকে বসবাসের অনুপযোগী সিটিগুলোর মধ্যেও নিকৃষ্টতর বলে চিহ্নিত করার পরও কেন সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিল না? কেন এত দিনে ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে ট্যানারি কারখানা, রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে নেওয়া হলো না? কেন সরকারি জমি, খেলার মাঠ, খাল, জলাভূমি প্রভাবশালীদের দখলে আছে? কেন সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয় নেই? কেন সংস্কারের নামে যত্রতত্র রাস্তা কাটাকাটি করা হচ্ছে? তাঁরা জানতে চাইবেন, সরকারি দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা কেন পাড়ায় পাড়ায় ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন? কেন তাঁদের চাঁদা না দিয়ে এলাকায় কোনো ঘরবাড়ি নির্মাণ করা যায় না? কেন চট্টগ্রামে নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভারের নিচে চাপা পড়ে এতগুলো মানুষ মারা গেল?
আর বিরোধী দলের নেতা-নেত্রী তথা তাঁদের সমর্থক প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন হবে, হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির নামে কেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের জনজীবনকে প্রায় নিশ্চল করে রাখা হয়েছে? কেন দুই নগরের লাখ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না? কেন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মানসিক পীড়নের মধ্যে রাখা হয়েছে? তারা নিশ্চয়ই জানতে চাইবে কেন আন্দোলনের নামে পেট্রলবোমা ছুড়ে মানুষ মারা হলো? কেন বিভিন্ন স্থানে বোমা বানাতে গিয়ে যুবদল, ছাত্রদল ও শিবির কর্মীরা বমাল ধরা পড়ল? কেন হেফাজতের মহাসমাবেশে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তার প্রতি বিএনপির নেত্রী সমর্থন জানালেন? একদা সাজানো গোছানো চট্টগ্রামকে কেন নোংরা ও আবর্জনার নগরে পরিণত করা হলো? কেন পাঁচ বছরেও জলাবদ্ধতার অবসান হলো না?
আমরা কেবল সংলাপে জনগণের মনের কথাগুলো তুলে ধরলাম। সাধারণ মানুষের প্রশ্নগুলো এখানে উপস্থাপন করলাম। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা, তাঁদের সমর্থক প্রার্থীরা কী জবাব দেন এবং সেই জবাবে নাগরিকেরা সন্তুষ্ট হবেন কি হবেন না, সেটি জানার জন্য আমাদের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net