Friday, January 8, 2010

আলু আমদানিতে দুই মন্ত্রণালয়ের পৃথক অনুমতি নিয়ে জটিলতা by জাহিদুল ইসলাম, হাকিমপুর (দিনাজপুর) |

আলু আমদানিতে দুই মন্ত্রণালয় থেকে দুই ধরনের অনুমতি জারি করায় বিপাকে পড়েছেন দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের শুল্ক কর্তৃপক্ষ ও আলু আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা।
অনুমতির বিষয়টি সুস্পষ্ট না হওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গত রোববার আমদানি করা ২০০ মেট্রিক টন আলুর একটি চালান আটকে দিয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতি ও শনিবার দুই দিনে ২০০ মেট্রিক টন আলু এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পাওয়ার পর হিলি বন্দরের কয়েকজন ব্যবসায়ী আলু আমদানি করেন। কিন্তু গত রোববার (৩ জানুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আলু আমদানির জন্য ১৪ জন ব্যবসায়ীকে অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা দূর করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে দুই মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত আমদানি করা আলু খালাসের অনুমতি দেওয়া যাবে না বলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে বন্দরে ১৬টি ভারতীয় ট্রাকে ২০০ মেট্রিক টন আলু খালাসের অপেক্ষায় আছে।
বন্দরের আলু আমদানিকারকেরা জানান, গত ১৫ নভেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২০ জন আমদানিকারক ভারত থেকে আলু আমদানির জন্য বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন খামারবাড়ি ঢাকার পরিচালক খোরশেদ আলম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত অনুমতি পান।
এর জের ধরে গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আলু আমদানি শুরু হয়। গত রোববার বিকেলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্রাইম ইন্টারন্যাশনাল ও মেসার্স নিশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল আলু আমদানি করে হিলি স্থলবন্দরে আনে। কিন্তু এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৪ জন ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করে অনুরূপ আরেকটি অনুমতিপত্র কাস্টমস কার্যালয়ে পাঠানো হলে হিলি স্থলবন্দরের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। এতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব বেবী রানী কর্মকারের স্বাক্ষর রয়েছে।
জানা গেছে, দুই মন্ত্রণালয়ের অনুমতির সঠিকতা যাচাইয়ের বিষয়ে গত সোমবার হিলি স্থলবন্দরের সহকারী কমিশনার হাসান মাহমুদ তারেক একটি পত্র দিয়ে রাজশাহী কাস্টমস কমিশনারকে অবহিত করেন। গতকাল বুধবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত সেখান থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় আমদানি করা আলু খালাসের অনুমতি দেয়নি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এর ফলে পচনশীল পণ্য আলু নিয়ে বিপাকে পড়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা। ট্রাকে লোড অবস্থায় থাকার কারণে আমদানি করা ওই সব আলুতে পচন ধরতে শুরু করেছে।

উত্সব -খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌষপার্বণ উদ্যাপন by উম্মে উমামা

৫ জানুয়ারি। সকালের কুয়াশা আর শীত উপেক্ষা করে বেরিয়েছে মেয়ের দল। আটপৌরে শাড়িতে সেজেছে তারা, মুখে যেন লজ্জারাঙা খুশির ঝিলিক। হাতে নকশা করা মাটির হাঁড়িতে বাহারি পিঠা। চঞ্চল দৃষ্টিতে খুঁজে ফিরছে যেন কাকে। জিজ্ঞাসা করতেই একজন খুশিভরা কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘জানো না, আজ যে আমাদের নাইওরযাত্রা।’ তাই তো! কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল মিষ্টি হাতে পাঞ্জাবি পরা ভাইদের। বোনদের সঙ্গে নিয়ে এবার ভাইয়েরাও ধীরপায়ে হাঁটা শুরু করল। তবে তা কোনো বাড়িতে নয়, যাত্রা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে। শহীদ মিনারে এসে যার যার ভাইয়ের মুখে পিঠা তুলে দিল তাদের বোনেরা। ‘ক্যামেরা কোথায়?...’ ‘ছবি তোল...’ ‘এই, কৌশিক কোথায়? তাড়াতাড়ি আয়’ ইত্যাদি কথার কলধ্বনিতে মুখর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। মহা আনন্দে আর উত্সাহে চলল ছবি তোলার কাজ। কোথায় ক্লাস আর ক্লাস টেস্ট! পৌষ পিঠা উত্সবে মেতে উঠেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, মুহূর্তের জন্য সব ভুলে গেছে তারা।
বাঙালির ঐতিহ্যে পৌষপার্বণে ঠিক কবে থেকে এবং কীভাবে এই নাইওরযাত্রা আর পিঠা উত্সব, তার সঠিক কোনো হিসাব বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ না থাকলেও এটা এখন আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারা বছর শ্বশুরবাড়ির শত কাজের মধ্যেও বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা ভোলে না গ্রাম্য বধূটি। অপেক্ষা করতে থাকে কবে আসবে পৌষ মাস! পৌষে মা কত বাহারি পিঠাই না বানাত। বারবার ফিরে যায় সেই শৈশবে—‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশীতে বিষম খেয়ে,/আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি খেয়ে।’ (পল্লী স্মৃতি, সুফিয়া কামাল) আজও মনে মনে ভাবে, কবে খাবে মায়ের হাতের পিঠা। দেখতে দেখতে চলে আসে পৌষ মাস, কিন্তু পথ চাওয়া শেষ হয় না। ভাইটি তার কবে আসবে নাইওর নিতে। অবশেষে ভাই এলে খুশি আর ধরে না যেন। বাপের বাড়ি যাওয়ার আগের রাতটা যেন শেষই হয় না। সূর্য ওঠার আগে থেকেই শুরু হয় গোছানো। যাওয়ার বেলায় স্বামীকে বলে সে, ‘আমাকে আনতে যাইও কিন্তু...।’ হাসিমুখে ভাইয়ের সঙ্গে যাত্রা করে সে। ঠিক এই দৃশ্যই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মায়েরা তো নেই এখানে, তাই নিজ হাতে তৈরি হয়েছে এসব পিঠা। বাহারি নকশা ও বাহারি নামের এই পিঠা—ঝাল কুলি, মিষ্টি কুলি, নকশি পিঠা, পান্তুয়া, তেজপাতা পিঠা, গোলাপ, রস নকশা, পাকান পিঠা, পায়েস, তেল পিঠা আরও কত পিঠা! ভাইয়েরাও বোনদের তাড়াতাড়ি নেওয়ার জন্য ব্যস্ত। তাই তো আগে থেকেই গেটের সামনে ভ্যান ঠিক করে বসে আছে। বোনদের ভ্যানে তুলে দিয়ে নিজেরা ভ্যানের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। আর মুখে ছিল গান। বোনেরাও কম যায়নি, ভাইদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও ধরল পৌষের গান। তবে পিঠার হাঁড়ি কিন্তু সযত্নে আগলে রেখেছে বোনেরা। কারণ, ভাইদের সব লোভ তো ওই পিঠার হাঁড়ির ওপর। কিন্তু এখনই হাঁড়ি শেষ করলে পরের অনুষ্ঠান হবে কী করে। বাপের বাড়ি যেতেও কম সময় লাগে না, তাই তো ভ্যানে করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় চক্কর দিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে থামল তারা। নাইওর যাত্রা শেষে চাদর বিছিয়ে পিঠার হাঁড়ি সামনে রেখে বসে পড়লেন রশ্মি, হূদিতা, রীতি, লিন্ডা, রাহাত, সুমি, ইভা, সুস্মিতা, বন্যা, প্রিয়াঙ্কা, অমি, কেয়া, রিমি, রিয়া, বাঁধনরা। এরপর ভাইদের পিঠা দিয়ে বিক্রির কাজে লেগে গেল মেয়েরা আর ছেলেরা পাশে হারমোনিয়াম আর তবলার তালে ধরল গান, সেই সঙ্গে পিঠার প্রতি আকুলতা দেখিয়ে চলল তারা, ‘দে না আর একটা...ওই যে ওই রস নকশিটা’। কিন্তু কিছুতেই পিঠা হাতছাড়া করা যাবে না। তবু হঠাত্ কে যেন পিঠার হাঁড়ি নিয়ে লাগাল দৌড়, পেছনে আরও ছেলের দল; সেই সঙ্গে নারীকণ্ঠের চিত্কার চেঁচামেচি, ‘পিঠার হাঁড়ি নিয়ে গেল যে...!’ আনন্দ আর খুশির হল্লায় সারা দিন চলে পিঠা বিক্রির কাজ। সঙ্গে ছবি তোলা তো আছেই। পিঠা বিক্রির প্রধান ক্রেতা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে পিঠা, সেই সঙ্গে শীতের বেলাও। শেষ হয় পিঠা উত্সব। সারা দিনের ক্লান্তি তবু যেন হার মেনে যায় এই ছেলেমেয়েদের কাছে। শুরু হয় আড্ডা। আজকের দিনের আড্ডা।

জলবায়ু সংলাপ -দীর্ঘ পথের যাত্রা by মুশফিকুর রহমান

বিশ্বপরিসরে ২০০৯ সালের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর অন্যতম বছর শেষে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। ইউরোপের বাড়াবাড়ি শীতে এবারের অতি উত্সাহের কোপেনহেগেনের ব্যর্থ শীর্ষ সম্মেলনের উত্তাপ দ্রুতই মিলিয়ে গেল।
উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় অসহায়ত্বে পড়া দেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রচেষ্টায় বিশ্বসভায় বাংলাদেশের বিপন্নতা ভালোভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ জলবায়ুর দুর্যোগে সবচেয়ে বিপন্ন শিকার হিসেবে বিশ্বসভায় স্বীকৃতি পেলেও তা শুকনো সহানুভূতির মালা ছাড়া সামান্যই পেয়েছে। দেশের ভেতর বৈরী রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরস্পরকে জলবায়ু সম্মেলনের অর্জন-ব্যর্থতা নিয়ে দোষারোপ থেমে নেই। কিন্তু এতে জলবায়ুর ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন ও এর ক্ষতিকর ফলাফল কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, এর সমাধান সামান্যই এগিয়েছে।
বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যু প্রধানত রাজনীতির উপাদান হয়েই সামনে এসেছে। এখানে পরস্পর সংঘাতমুখর বিভিন্ন স্বার্থ ও গোষ্ঠী এত সহজে সবার জন্য গ্রহণীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারাকে বিস্ময়ের সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কোপেনহেগেনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা কীভাবে তাদের জন্য তৈরি হওয়া সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে হাসিমুখে ঘরে ফিরল, তা মনোযোগ দিয়ে দেখা দরকার।
সম্মেলনের ঘোষণার অন্যতম ও বহুল আলোচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ৩০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ুর উষ্ণায়ন ক্ষতি মোকাবিলায় তহবিল (২০১২ পর্যন্ত ৩০ বিলিয়ন ডলারের ‘ক্লাইমেট এইড ফান্ড’ ও ২০২০ সাল থেকে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠিত হবে বলে কোপেনহেগেন ঘোষণায় বলা হয়েছে) সুনির্দিষ্টভাবে জলবায়ুর পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কতটুকু কার্যকর সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে তা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জলবায়ু নিয়ে বিশ্বসভায় সংলাপে যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই বলছেন যে পরিবর্তিত জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কাঙ্ক্ষিত সহায়তা উল্লিখিত তহবিল থেকে পাওয়া যাবে না। তদুপরি ওই তহবিল গঠন এবং তা পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অনুপস্থিতিতে পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক ঘোষণাতেই পর্যবসিত হয় কি না, তাও লক্ষ করার বিষয়।
মাথাপ্রতি দূষণের বিবেচনায় শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে অনেক পিছিয়ে থাকলেও মোট দূষণ নিঃসরণে চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এখন পৃথিবীর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অর্ধেকের দায়ভার বইছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ শিল্পোন্নত বিশ্বের অর্থনীতি আবার চীন, ভারত, ব্রাজিলের বাজারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। স্বভাবতই সম্মেলনের ঘোষণায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেষ্টা ছিল এদের খুশি করা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘ক্লাইমেন্ট এইড ফান্ডের’ সিংহভাগ এই দেশগুলোর দিকে ধাবিত হবে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম (বন উজাড়ের পরিবেশগত ক্ষতি হিসেবে নিলে) গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী ইন্দোনেশিয়াও এর একটি বড় ভাগ পাবে বলে আশা করা যায়। সুতরাং ‘ক্লাইমেট ভিকটিম’ বা জলবায়ুর উষ্ণায়নের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক শিকার হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের আনন্দ আমাদের যত কম সময় পুলকিত রাখবে, বাস্তবতা বিশ্লেষণে ও করণীয় নির্ধারণে তত বেশি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া আমরা পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বিপন্ন শিকার, দেশের ১৮ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি দ্রুত ফুঁসে ওঠা সমুদ্রজলে তলিয়ে যাবে বলে হাহুতাশ, পরিবেশ-শরণার্থীর চাপ সামাজিক সংকট অস্থিরতা বাড়াবে বলে আতঙ্কিত আলাপ বেশি করার ক্ষতির দিকটিও ভাবা দরকার।
বহু কষ্টে আমরা সাহায্য ও অনুদান-নির্ভরতার অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পথ ধরেছি। এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ ও সম্ভাবনা দক্ষভাবে তুলে ধরা অতিপ্রয়োজনীয়। অর্থনীতি যদি বহুমুখী হয়, বিনিয়োগের ঝুঁকি সওয়ার মতো সামর্থ্য হয়, তাহলে দেশের মুখ উজ্জ্বলতর হবে, সামাজিক অস্থিরতা হ্রাস পাবে, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বৈরী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের বাস্তবতায় প্রয়োগযোগ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও এর প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা যদি আমাদের অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনাকে ধারাবাহিক উন্নতির উদাহরণ হিসেবে সামনে আনতে পারি, তাহলে বিশ্বপরিসরে আমাদের মর্যাদা দিয়েই সংলাপ-বৈঠকে সমাদর করা হবে। আমাদের যৌক্তিক কথাগুলো মনোযোগ দিয়েই শোনার আগ্রহ সৃষ্টি হবে।
মনে রাখা ভালো, বিশ্বে উষ্ণায়নের কারণগুলো আমাদের সৃষ্ট নয় এবং প্রশমনেও আমরা সামান্যই ভূমিকা রাখতে পারব। আবহাওয়ামণ্ডলীতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ৩৫০ পিপিএমের বেশি হলে মেরুসাগর ও পর্বতশৃঙ্গের বরফ গলানোকে অবধারিত করে। এর অনুষঙ্গ হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, সাইক্লোন, উষ্ণমণ্ডলীয় বিভিন্ন রোগবালাই (যেমন ম্যালেরিয়া, পানিবাহিত রোগ) ইত্যাদির প্রকোপ বাড়ায়। সমুদ্র-উপকূলবর্তী ও বিশাল নদ-নদীর অববাহিকা অঞ্চলে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আবহাওয়ামণ্ডলীর উষ্ণায়নের সব নেতিবাচক প্রভাবই অমাদের ওপর দ্রুত স্পষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যে আবহাওয়ামণ্ডলীতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ৩৯০ পিপিএমে পৌঁছেছে। সুতরাং বিশ্বের উষ্ণায়ন অবধারিত। এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো সব ঠেকানো সম্ভব নয়। যা সম্ভব, তা হলো উষ্ণায়নের মাত্রা আরও যাতে না বাড়ে তার চেষ্টা ও জলবায়ুর উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাবগুলোর মধ্যে কীভাবে মানিয়ে চলা যায় তার টেকসই ব্যবস্থা করা।
আবহাওয়ামণ্ডলীর উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন গ্যাসসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের উদিগরণ দৃশ্যমান ভবিষ্যতে সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর আয়োজনে (যেমন—বিদ্যুত্ উত্পাদন, যানবাহনসহ বিভিন্ন ইঞ্জিন চালানো), বন উজাড়সহ সবুজ নিধনের সঙ্গে।
২০৩০ সাল নাগাদ বর্তমানের তুলনায় এনার্জির চাহিদা বাড়বে ৪৫ শতাংশ। এর অর্থ অন্তত আরও দুটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকৃতির জ্বালানি ব্যবহারকারীর ভার বহন। দুঃসংবাদ হলো, ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত জ্বালানি চাহিদার ৮০ শতাংশ আসবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। সবচেয়ে আশাবাদী অনুমান বলছে, ২০৩০ পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৫ শতাংশের বেশি হবে না। এ কেবল ইচ্ছের বিষয় নয়, এনার্জির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার সঙ্গে শক্তি উেসর জোগানের ভৌতিক সামর্থ্য, প্রকৌশলগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতারও সম্পর্ক নিবিড়। সুতরাং জীবাশ্ম জ্বালানির বর্ধিত ব্যবহার আবহাওয়ামণ্ডলীতে বাড়তি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের কারণ হবে।
তাহলে আমরা কি সবকিছু নিয়তির ওপর ছেড়ে দেব? নিশ্চয়ই নয়। শক্তির জোগান পেতে ও সীমিত জ্বালানি উত্স থেকে কার্যকরভাবে বাড়তি শক্তি পেতে এনার্জি ব্যবহারে দক্ষ প্রযুক্তির সন্ধান যেমন চলবে, একইভাবে পরিবর্তিত জলবায়ুর বিশ্বে মানিয়ে চলার নিরলস চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে। বস্তুত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের টেবিলে জলবায়ুর বৈরী পরিবেশে মানিয়ে চলার কৌশল ও তহবিলের জোগান নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তখন লোনা জলে টেকসই ধান, বৃষ্টি-খরার পরিবর্তিত চক্রে চাষোপযোগী ফসল, প্লাবনভূমিতে বসবাস উপযোগী বাসস্থান তৈরির স্থানীয় কৌশল উদ্ভাবনে আমাদের ভুক্তভোগী মানুষ অনেকটুকুই এগিয়েছে। এ প্রক্রিয়া আরও বেগবান ও টেকসই করতে, উন্নতর প্রযুক্তি গবেষণা ও এর বাস্তবায়নে আরও সম্পদ দরকার। সম্পদ দরকার নতুন বনায়নে, কম দূষণ করে কিন্তু আর্থকারিগরিভাবে কার্যকর উত্পাদন প্রযুক্তি সন্ধানে। আমাদের জনসংখ্যাপীড়িত দেশে সম্পদের জোগান ও প্রযুক্তির সহায়তা পেতে আন্তর্জাতিক পরিসরে সংলাপ-কূটনীতি অব্যাহত রাখতে হবে। জলবায়ু উষ্ণায়নে আমাদের দায় নগণ্য হলেও শিল্পোন্নত দেশগুলোর সৃষ্ট দূষণে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছি। সুতরাং বিশ্বসভাকে এ ক্ষতির দায় বহনে কেবল নৈতিকভাবে বাধ্য করা নয়, কার্যকর সহায়তা দিতেও শাণিত যুক্তির সংলাপ দরকার।
ব্যর্থ কোপেনহেগেন সম্মেলনের পর বিশ্বসভায় মানুষ হাল ছেড়ে দেয়নি। বরং নতুন উদ্যমে সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে ছয় মাসের মধ্যে জার্মানির বন ও ২০১০ সালের শেষে মেক্সিকো সিটিতে জলবায়ু সম্মেলনে মিলিত হতে। কোপেনহেগেনে যা অর্জন সম্ভব হয়নি, তা অর্জন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশের আরও ক্ষতি সামলে ওঠার কার্যকর পন্থা খুঁজবে সবাই। আমাদের এখনই সময় দীর্ঘ ও জটিল জলবায়ু-কূটনীতির সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত সংলাপের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনে মানিয়ে চলার কর্মকৌশল ও করণীয় নিয়ে ইতিমধ্যে একাধিক দলিল তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলন সভায় সেখানকার সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা আদায় তাই তুলনামূলক সহজ হওয়া উচিত। বিশ্ববাস্তবতা এবং আমাদের জন্য প্রকৃত অর্জনের বাস্তব টার্গেট নির্ধারণ করে দরকার পরিবেশ ও অর্থনৈতিক কূটনীতির সংলাপের জন্য চৌকস সংলাপ কুশলী দল।
ড. মুশফিকুর রহমান: পরিবেশবিষয়ক লেখক।

রাজনীতি -আ.লীগ-বিএনপি দ্বন্দ্বের অবসান জরুরি by বদিউল আলম মজুমদার

গত ৫ ডিসেম্বর ২০০৯ প্রথম আলোতে প্রকাশিত নিবন্ধে অধ্যাপক এম এম আকাশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্বের স্বরূপ তুলে ধরেছেন এবং এর সম্ভাব্য পরিণতির ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে ‘ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া মৌলিক কোনো দ্বন্দ্ব নেই’। উপরিকাঠামোর কিছু ইস্যুতে যেটুকু পার্থক্য আছে, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার চরম প্রতিযোগিতার কারণে তাও ধীরে ধীরে দূরীভূত হয়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক আকাশের এ বক্তব্যের সঙ্গে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কারণ বৃক্ষের পরিচয় ফলে—দুটি দলের কার্যক্রমের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে তাদের মধ্যে তেমন মৌলিক কোনো তফাত নেই।
তবে অধ্যাপক আকাশ এ দ্বন্দ্বের একটি ‘পপুলিস্ট’ বা লোকরঞ্জনকারী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা অসম্পূর্ণ বলে আমার ধারণা। তিনি বলেছেন, মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার উচ্চাভিলাষী জেনারেলরাই তথাকথিত বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু। এটি আংশিক সত্য। আমি মনে করি, এ দুটোর সঙ্গে গণতন্ত্রের আরও ভয়াবহ শত্রু হলো ‘নির্বাচনসর্বস্ব’ গণতন্ত্র নিজেই; এবং আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল নিজেরা, তাদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বিরোধ ও গোত্রতন্ত্রের চর্চা।
পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে লক্ষ করা যায়, গত শতাব্দীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তিনটি ‘ওয়েভ’ বা ঢেউ উঠেছিল—প্রথম দুটি ছিল দুটি বিশ্বযুদ্ধ, তৃতীয়টি ছিল বার্লিন ওয়াল ভাঙার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। এসব অনেক দেশেই নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্র টিকে থাকেনি। সত্যিকারের উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সম্মতির শাসন কায়েম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন তাদের জন্য সমতা ও সমসুযোগের অধিকার প্রতিষ্ঠার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি; বরং হয়েছে নাগরিকদের অধিকার পদদলিত। স্লোগানসর্বস্ব সমাজতন্ত্র ও লাগামহীন পুঁজিবাদের চর্চার কারণে সাধারণ মানুষ চরমভাবে বঞ্চিত হয়েছে এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েছে। গণতন্ত্রের এ মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো অপূর্ণ থাকার কারণে এসব দেশের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার রদবদল হলেও এগুলোকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিকই বলা যায় না। তাই অভিজ্ঞতা বলে, সত্যিকারের গণতন্ত্রের একটি বড় শত্রু আংশিক বা ‘এক দিনের’ গণতন্ত্র।
সত্যিকারের গণতন্ত্রচর্চার অনুপস্থিতি ছাড়াও গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার উদ্যোগ সামান্যই এসব দেশে পরিলক্ষিত হয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিকেন্দ্রীকরণ ও তৃণমূলের গণতন্ত্রচর্চার মাধ্যমে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করা, যাতে সংসদভিত্তিক গণতান্ত্রিক উপরিকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘খুঁটি’ সৃষ্টি হয়।
গণতন্ত্রের ভিতকে সুদৃঢ় করার জন্য একই সঙ্গে প্রয়োজন কতগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান। যেমন জাতীয় সংসদ, আদালত, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ইত্যাদি—যেগুলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। যেমন, সাংসদেরা (নিজেদের শপথ ভঙ্গ করে) ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত হলে, সংসদ ‘রাবার স্ট্যাম্পিং’ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্বাধীনভাবে কাজ করলে এবং সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি পরিহার করলে, এককথায় সংসদ কার্যকর হলে, সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সত্যিকারের গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দল—গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল। বস্তুত রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতায়িত হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের প্রাপ্ত ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
বাংলাদেশেও অতীতে দুই-দুইবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছিল, যা স্থায়ী হয়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকেনি। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, পরবর্তী দুটি মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর ক্ষমতার বদল ঘটানো সত্ত্বেও, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাতিলের মাধ্যমে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই দুটি ব্যর্থতার কারণও মূলত আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করাতে ব্যর্থতা। বহুতলবিশিষ্ট একটি ইমারতের ভিত গভীরে প্রোথিত না হলে সেটি যেমন একটু ঝড়-ঝাপটাতেই ধূলিসাত্ হতে পারে, তেমনি দৃঢ় ভিতের অনুপস্থিতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে পারে। প্রসঙ্গত, আরেকটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় এক বছর আগে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনঃপ্রবর্তন ঘটলেও এটিকে সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করানোর তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ আজও লক্ষ করা যাচ্ছে না। ফলে আমরা আবারও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছি বলেই অনেকের আশঙ্কা।
গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষত সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। কারণ, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন দলের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার—নির্বাচনী ইশতেহার দলের, সরকারের নয়—পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দলের।
রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হয় কোনো আদর্শ বা সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভিন্ন সময়ে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। আওয়ামী লীগের একটি বিরাট ঐতিহ্য ও স্বাধীনতা-সংগ্রামে অসামান্য অবদানও ছিল, কিন্তু একটি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের যখন সুযোগ আসে, বিশেষত গত দেড় দশকে, তখন দলটির সঙ্গে বিএনপির তেমন কোনো পার্থক্যই লক্ষ করা যায়নি। সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে উভয় দলই প্রায় একই নীতি অনুসরণ করেছে। এ ছাড়া দল দুটির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দুর্নীতির ‘রাজনৈতিকীকরণ’ এবং রাজনীতির ‘দুর্নীতিকরণ’ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য থাকলেও, গত দেড় দশকে দলটি সে চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে বলেই মনে হয়। দলটি মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মেলাতেও দ্বিধা করেনি। এমনকি খেলাফত মজলিসের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তুলতেও কুণ্ঠা বোধ করেনি, যদিও প্রবল সমালোচনার মুখে দল তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান থাকা সত্ত্বেও এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্লোগান বারবার উচ্চারণ করলেও, সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো সততা, সমতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহমর্মিতা, একতা ইত্যাদি।
দুটি দলের মধ্যে যে তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন নেই, এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যেমন, প্রশাসনে দলীয়করণ, সংসদ বর্জন, আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন (যেমন—নির্বাচনী দলে গণতন্ত্রের চর্চা, সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত না করা), দলীয় ব্যক্তিদের মামলা প্রত্যাহার, দলের সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অনিচ্ছা (বরং তাঁদের পুরস্কৃতকরণ), দুর্নীতি দমন কমিশনকে অকার্যকরীকরণ (অন্তত প্রভাবিতকরণ), উচ্চ আদালতে দলীয় সমর্থকদের নিয়োগ প্রদান, স্বৈরাচারের সঙ্গে দহরম-মহরম, স্থানীয় সরকারকে অকার্যকরীকরণ, বিকেন্দ্রীকরণে অনীহা, প্রতিবাদীদের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা, এমপিতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকরণ, এমপিদের সম্পদের হিসাব দিতে গড়িমসি, এমপিদের গাড়ি-বাণিজ্যে লিপ্ত হওয়া, পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকরণ (যেমন, নব্বইয়ের তিন জোটের অঙ্গীকার ভঙ্গকরণ), ক্রসফায়ার-রিমান্ডের মাধ্যমে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি ক্ষেত্রে দল দুটির মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব গর্হিত আচরণই গণতন্ত্রকে ‘কনসলিডেট’ করার বা সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করানোর পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলার ক্ষেত্রে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বিচারপতি কে এম হাসানের সরে দাঁড়ানোর পরও আওয়ামী লীগের ২২ জানুয়ারি ২০০৭-এ অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন বর্জনের একটি বড় কারণ ছিল গত সরকারের আমলে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণ। প্রশাসনে দলীয়করণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থেই একটি বড় বাধা। সফলভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় ১০ লাখ ব্যক্তির প্রয়োজন, যাঁদের অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তা নিরপেক্ষ না হলে, কারও পক্ষেই নিরপেক্ষভাবে ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সব ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও তা করা সম্ভব হবে না। তাই প্রশাসনের বর্তমানের ব্যাপক দলীয়করণ আমাদের পরবর্তী নির্বাচনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
নীতি ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে তেমন মৌলিক পার্থক্য না থাকা সত্ত্বেও, জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে দুটি দলই অত্যন্ত সক্রিয়। আর এ বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে ‘কৃত্রিমভাবে’, কতগুলো স্লোগান ও সিম্বল বা প্রতীকের মাধ্যমে। যেমন, বাঙালি বনাম বাংলাদেশি, জয় বাংলা বনাম বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, খোদা হাফেজ বনাম আল্লাহ হাফেজ, মুজিববাদ বনাম জিয়ার আদর্শ। দুর্ভাগ্যবশত এ বিভাজন সৃষ্টিতে দল দুটো ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধকেও সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যবহার করছে। এর ফলে ১৯৭১ সালের একটি একতাবদ্ধ জাতি আজ আমরা চরমভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এ ছাড়া আজ আমাদের জন্য দেশের থেকে দল, দলের থেকে গোত্র, গোত্রের থেকে ব্যক্তি বড় হয়ে গেছে।
সীমিতসংখ্যক আদিবাসী সম্প্রদায় ব্যতীত, যাদের পৃথক সত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আমরা চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছি—আমাদের মধ্যে জাতিগত কোনো বিভাজন নেই। আমরা মোটামুটি একই সত্তাসম্পন্ন জাতি—আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এক—যার জন্য আমরা অনেকেরই ঈর্ষার কারণ হতে পারি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালেই জাতিগত বিভাজনের ফলে কী চরম সমস্যা, এমনকি সহিংসতার সৃষ্টি হতে পারে, তা আমরা দেখতে পাই। দুর্ভাগ্যবশত আত্মঘাতী দলতন্ত্রের কারণে আমরা একই জাতিসত্তাসম্পন্ন জাতির বিশেষ সুবিধা হারিয়ে ফেলেছি; বরং আমরা অযথা অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত এক চরম বিভাজিত জাতিতে পরিণত হয়েছি। পুরো জাতিই যেন দুটি কৃত্রিম ‘ক্ল্যানে’ বা গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
সারা দেশেই আজ আমরা ‘গোত্রতন্ত্রের’ প্রতিফলন দেখতে পাই। অনেক এলাকায়ই আওয়ামী লীগ-বিএনপির জন্য ভিন্ন ভিন্ন চায়ের দোকান দেখা যায়। শুনেছি, কিছু কিছু জায়গায় এক দলের শ্যালো মেশিনের মালিক ভিন্ন দলভুক্ত মালিকের জমিতে পানি পর্যন্ত দেয় না। দলীয় নেতা-নেত্রীদের যুদ্ধংদেহী ও অর্বাচীন সিদ্ধান্তের (যেমন, নাম বদলানোর রাজনীতি) কারণে এ বিভাজন দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। এমনকি দলতন্ত্র ও গোত্রতন্ত্রের কারণে একে অপরের প্রতি ঘৃণাবোধও তৈরি হচ্ছে।
কেউ কি জানে, এর শেষ কোথায় এবং পরিণতি কী? আশা করি আমাদের সমাজবিজ্ঞানীরা ও অন্য বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে গবেষণা করে সমাধান বের করবেন। তবে পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, চরম বিভক্ত জাতি বেশি দূর এগোতে পারে না (যেমন শ্রীলঙ্কা, এমনকি আমরা নিজেরাও) এবং চরমভাবে বিভক্ত জাতি চরম সংকটে নিপতিত হয় (যেমন রুয়ান্ডা)। বলা বাহুল্য, চরম ঘৃণা থেকেই ক্ল্যান ওয়ার বা গোত্রীয় সংঘাতের সূচনা হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাককে হত্যার হুমকি দিয়েছে এক উগ্রপন্থী। সম্প্রতি পশ্চিমতীরে ইহুদি বসতি স্থাপনের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করায় ওই চরমপন্থী একটি চিঠিতে এ হুমকি দেয়। হুমকির পর বারাকের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। খবর দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
বারাকের কার্যালয়ের ঠিকানায় পাঠানো ওই চিঠির ভাষ্য ছিল এ রকম—‘জনাব এহুদ বারাক, আপনি যদি মনে করে থাকেন যে জুডেয়া ও সামারিয়া এলাকার বসতি ধ্বংস করবেন, তাহলে ভুল করবেন। ওই ঘটনা ঘটানোর আগেই আমি আপনাকে হত্যা করব।’ চিঠির আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘সাবধান থাকবেন, আমি আপনাকে কিংবা আপনার কোনো প্রিয়জনের ওপরও হামলা করব।’ ওই চিঠির একটি অংশ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

প্রভাকরণের অস্ত্র ও বর্ম উদ্ধার

শ্রীলঙ্কার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) সাবেক নেতা প্রয়াত ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের ব্যবহূত আগ্নেয়াস্ত্র ও বর্ম পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সে দেশের সরকার। স্থানীয় গণমাধ্যম গত মঙ্গলবার এ কথা জানিয়েছে।
গত বছরের ১৮ মে দেশের উত্তর উপকূলে মুল্লাইতিভুর নানথাইকাদাল লেগুন এলাকায় সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত হন এলটিটিইর নেতা প্রভাকরণ।
মুল্লাইতিভুর ভেল্লামুল্লিওয়াইখাল এলাকায় ১৫ ফুট মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় প্রভাকরণের ব্যবহূত বর্ম ও অস্ত্রের সঙ্গে ৫০টি মর্টার বোমা, ২৫টি বন্দুক ও আত্মহত্যা করতে সহায়তা করে এমন ১২৫টি উপকরণ পাওয়া গেছে।
উদ্ধার হওয়া একটি এম১৬এ২-এর সঙ্গে একটি গ্রেনেড লঞ্চার প্রভাকরণ ব্যক্তিগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে জানিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
এলটিটিইর অস্ত্রাগারের সন্ধানে শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনী দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।

লাদেনের ছোট ছেলে ইরান ছেড়ে সিরিয়ায়

আল-কায়েদার শীর্ষনেতা ওসামা বিন লাদেনের ছোট ছেলে গত ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ইরান ছেড়ে সিরিয়ায় গেছে। সে এখন সে দেশের রাজধানী দামেস্কে অবস্থান করছে। সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদপত্র আশার্ক আল-আওসাত গতকাল বুধবার তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
লাদেনের ছেলে বকর বিন লাদেন তাঁর ১৬ বছরের মধ্যে সর্বশেষ আটটি বছরই ইরানে কাটায়। লন্ডনভিত্তিক সৌদি নিয়ন্ত্রণাধীন এই পত্রিকাটি লাদেনের আরেক ছেলে ওমর বিন লাদেনের বরাত দিয়ে এ কথা জানায়। ওমর বলেন, দামেস্কে গত ২৫ ডিসেম্বর তাঁদের সিরীয় মা নাজওয়া আল-ঘানিমের সঙ্গে বকরের ফের দেখা হয়েছে।
ওমরের উদ্ধৃতি দিয়ে আশার্ক আল-আওসাত জানায়, ‘আমার ভাই বকর বড়দিনে তেহরান থেকে দামেস্কে পৌঁছান। ছেলেকে কাছে পেয়ে মা খুবই খুশি হয়েছেন। পুরো পরিবারে আনন্দ বয়ে এসেছে।’ ওমর বলেন, ‘কিন্তু আমাদের আনন্দ সেদিনই পূর্ণ হবে, যেদিন পরিবারের অন্য সদস্যরা তেহরান থেকে নিরাপদে সিরিয়ায় চলে আসতে পারবে।’ ওমর বর্তমানে কাতারে বসবাস করছেন।
তেহরানে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকা লাদেনের পরিবারের অন্য সদস্যদের ভাগ্য সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছুই জানা যায়নি।

ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দূতাবাসও খুলেছে -ইয়েমেনে আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা গ্রেপ্তার

ইয়েমেনের নিরাপত্তা বাহিনী আল-কায়েদার একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর নাম মোহাম্মদ আল-হাঙ্ক। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদেশি দূতাবাসগুলোতে হামলার হুমকির পেছনে আল-কায়েদার এই নেতার হাত রয়েছে। গতকাল বুধবার দেশটির উত্তরাঞ্চলে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক দিন পর গতকাল বুধবার ব্রিটেন ও ফ্রান্সও ইয়েমেনে তাদের নিজ নিজ দূতাবাস খুলে দিয়েছে। খবর এপি ও এএফপির।
সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে গত সোমবার রাজধানী সানার ৪০ কিলোমিটার উত্তরে আরহাব অঞ্চলে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালায় ইয়েমেনের নিরাপত্তা বাহিনী। এতে দুই ব্যক্তি নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়। তবে ওই দিন আল-কায়েদার নেতা মোহাম্মদ আল-হাঙ্ককে পাকড়াও করতে পারেনি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। তবে গতকাল সানার উত্তরে আমরান প্রদেশে একটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ইয়েমেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করেছে, ইয়েমেনে সব বিদেশি মিশন এবং অন্যান্য স্থাপনা নিরাপদে রয়েছে। দূতাবাস এবং বিদেশিদের বাসভবনের আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সানার পার্শ্ববর্তী এলাকায় গত দুই দিনের নিরাপত্তা অভিযানে মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ব্রিটিশ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে ব্রিটিশ দূতাবাস পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে কনসুলার সার্ভিস এখনো বন্ধ রয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেন কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবাদ দমনে আরহাব অঞ্চলে সফল অভিযান চালানোর পরিপ্রেক্ষিতেই দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা হামলা চালাতে পারে, এমন সতর্কতা জারি করার পর গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স সানায় তাদের নিজ নিজ দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। জাপানও তার কনসুলার সার্ভিস স্থগিত করে দেয়।
গত ২৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান নাইজেরীয় চরমপন্থী যুবক ওমর ফারুক আবদুল মোতালেব। এই সন্ত্রাসী হামলার জন্য আল-কায়েদার ইয়েমেন শাখার কাছে ওমর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।

মধুভর্তি বোতল নিয়ে আতঙ্ক -যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা বিমান চলাচল বন্ধ

নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিমানবন্দর গত মঙ্গলবার কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক যাত্রী পানীয়র বোতলে মধু বহন করছিলেন। আর ওই মধুর বোতলকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় গণমাধ্যমে এ কথা জানানো হয়।
লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রায় ১১০ মাইল উত্তরে বেকারসফিল্ডের মিডোফিল্ড বিমানবন্দরে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা সেখানে বিমান ওঠানামা বন্ধ থাকে।
শেষ পর্যন্ত কোনো বিপজ্জনক পদার্থ না পাওয়ায় বিমান চলাচল আবার শুরু হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, ৩১ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বহন করা একটি ব্যাগ নিয়ে আতঙ্ক শুরু হয়। ওই ব্যক্তি উইসকিনসনে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন।
কর্মকর্তারা জানান, মধুর বোতল খোলার পর তা থেকে নির্গত গন্ধে পরিবহন-নিরাপত্তা প্রশাসনের দুই কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, ওই দুই ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এখন ভালো আছেন।
কার্ন কাউন্টি শেরিফের বিভাগের মুখপাত্র মাইকেল হর্ফ স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁরা জানেন না যে, ওই দুই কর্মীর অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো সত্যিই কিছু হয়েছিল কি না, নাকি তাঁদের স্নায়ুদৌর্বল্যের কারণে এটা হয়েছে।

বিমানে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা -গোয়েন্দাদের আবারও দুষলেন ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রগামী বিমানে বোমা হামলার চেষ্টাকারী নাইজেরীয় চরমপন্থী ওমরের ব্যাপারে গোয়েন্দা ব্যর্থতায় চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওমরের ব্যাপারে আগাম তথ্য পেয়েও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক ডেনিস ব্লেয়ার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে বলেছেন, সন্ত্রাসী হামলার নতুন কৌশল মোকাবিলায় গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ওবামা গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। হাওয়াইয়ে ১১ দিনের অবকাশ থেকে ফিরেই নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বৈঠক করেন তিনি। দুই ঘণ্টাব্যাপী এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করে ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রগামী বিমানে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টার জন্য গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পদ্ধতিগত ব্যর্থতাই দায়ী। তিনি গোয়েন্দাব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে চলমান পদ্ধতির সংস্কারের ওপর জোর দেন।
গত ২৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি যাত্রীবাহী বিমানে সিরিঞ্জ বোমা দিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালানোর চেষ্টা করেন নাইজেরীয় চরমপন্থী যুবক ওমর ফারুক আবদুল মোতালেব। কিন্তু যাত্রীদের হস্তক্ষেপে এ হামলা চালাতে ব্যর্থ হন তিনি।
বৈঠক শেষে বারাক ওবামা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ওই হামলার চেষ্টার পর এটাই স্পষ্ট হয়েছে যে গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যগুলো পুরোপুরি বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করা হয় না। এটা কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা কখনোই সহ্য করা হবে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ওবামার ব্যাপক তোপের মুখে পড়েন। ওবামা জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা সংস্কারের আহ্বান জানান। এ সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, ‘বিমানে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা ব্যর্থ না হলে এটি একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপান্তরিত হতে পারত।’
নাইজেরীয় যুবকের হামলার চেষ্টা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের কানের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে। কিছু সাহসী মানুষের জন্য আমরা এ যাত্রায় বেঁচে গেছি। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনোই ভূমিকা ছিল না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আরব উপদ্বীপে সক্রিয় আল-কায়েদা সদস্যদের ব্যাপারে মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল। সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রে হামলার জন্য একজন চরমপন্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করছে এমন তথ্যও তাঁদের কাছে ছিল। কিন্তু গোয়েন্দা বিভাগগুলো এ তথ্য সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়েছে। হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ওবামা গোয়েন্দা ব্যর্থতার জন্য নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী জেনেথ নেপোলিটেনো ও এফবিআইয়ের পরিচালক রবার্ট ম্যুলার।
জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক ডেনিস ব্লেয়ার বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামার বার্তা পেয়েছি আমরা। সন্ত্রাসী হামলার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
ডেনিস ব্লেয়ার বলেন, সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অগ্রগতি অর্জন করেছেন। এ ছাড়া সেসব তথ্য আদান-প্রদানে গোয়েন্দা বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। তবে সন্ত্রাসীদের নতুন কৌশল মোকাবিলায় এসব প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যভান্ডারে সারা বিশ্বের সাড়ে পাঁচ লাখ সন্দেহভাজন লোকের তালিকা রয়েছে। বাড়তি তথ্য পাওয়া সাপেক্ষে এ তালিকার লোকজনের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি করার নির্দেশ রয়েছে। ওমরের নাম এ তালিকায় ছিল।