Saturday, June 6, 2026

বেন-গভির ইহুদি উগ্রবাদীদের প্রতিনিধি নাকি গোটা ইসরায়েলেরই আসল রূপ

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বিশ্বকে ‘আধুনিক ইসরায়েলের’ এক নতুন রূপ দেখিয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহে তাঁর কর্মকাণ্ডে এমন এক ইসরায়েল ফুটে উঠেছে, যা বিশ্ববাসী দেখতে চায়নি।

বেন-গভির গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ইসরায়েলের স্বার্থের পরিপন্থী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি তিনি ‘হতে দেবেন না’। পাশাপাশি তিনি ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র আন্দোলনকর্মীদেরও হয়রানি করেছেন। সেই দৃশ্য টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। বেন-গভিরের এসব কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ইতামার বেন-গভির চরম উগ্র ডানপন্থী দল ‘জিউইশ পাওয়ার পার্টি’র নেতা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটে তাঁকে এত দিন একজন ‘বিচ্ছিন্ন’ রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। এতে একধরনের সুবিধাও ছিল। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের অভ্যন্তরীণ সমালোচকেরাও এর ফলে সরকারকে সমর্থন দিয়ে যেতে পেরেছেন।

এ ছাড়া ইসরায়েল সরকারের ওপর বৈশ্বিক নিন্দা বাড়লেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও কোম্পানি তাদের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

উগ্র ইহুদিবাদী বেন-গভির মূলত ইউরোপীয় আন্দোলনকর্মীদের উপহাস ও বিদ্রূপ করেছিলেন। এর কড়া সমালোচনা করেছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও কানাডা। এমনকি ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এর নিন্দা জানিয়েছে।

এসব ঘটনার পর নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছেন, বিষয়টি বহির্বিশ্বে ইসরায়েলের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি করছে। নেতানিয়াহু এই পুরো ঘটনাকে ইসরায়েলের ‘মূল্যবোধ ও রীতিনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়’ বলে দাবি করেছেন।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার আরও এক ধাপ এগিয়েছেন। তিনি নিজ মন্ত্রিসভার এই সদস্যের বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, বেন-গভির জেনেশুনেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের ক্ষতি করছেন। গিডিয়ন সার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বেন-গভির ‘ইসরায়েলের প্রতিচ্ছবি নন’।

ইসরায়েলের অনেক গণমাধ্যমও একই সুরে কথা বলছে। তারা এই মন্ত্রীকে রাষ্ট্র ও সরকার থেকে আলাদা করে দেখাতে আগ্রহী। তবে বাস্তবতা সম্ভবত ভিন্ন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ইসরায়েলি সমাজের একটি ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী অংশ এখন বর্বর মানসিকতার বেন-গভিরকেই নিজেদের প্রতিনিধি মনে করে।

বামপন্থী ‘হাদাশ’ পার্টির নেসেট (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) সদস্য আয়দা তৌমা-স্লিমান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘তিনি নির্বোধ। আর এটিই আমাদের বলে দিচ্ছেন, তিনি একা এসব করছেন না। তিনি যা করছেন, তা অন্য রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সাহায্যেই করছেন। যাঁরা তাঁর মতো একই বিশ্বাস লালন করেন। অন্যদের সাহায্য না পেলে তিনি এসব করতে পারতেন না।’

কট্টর ডানপন্থী এই নেতা একজন উসকানিদাতা হিসেবে পরিচিত। অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ২০২২ সালে নবগঠিত ‘জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী’-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি পুলিশ ও কারাগারের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

আয়দা তৌমা-স্লিমান আরও বলেন, ‘যদি একজন পুলিশ সদস্যও বলতেন—না, আপনি পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারেন না, তাহলে সেখানেই সব থেমে যেত। যদি কারাপ্রধান বলতেন—না, আপনি বন্দীদের অনাহারে রাখা, নির্যাতন বা যৌন হেনস্তা করতে পারেন না, তবে তাঁরা সেটা করতেন না। আর সেখানেই সব শেষ হয়ে যেত।’

ঘৃণাভিত্তিক রাজনীতি

২০২২ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের জোটের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের মধ্যে একটি জোট গঠনে সহায়তা করেন। স্মোট্রিচ হলেন কট্টর ডানপন্থী দল ‘রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি’-এর নেতা।

২০২১ ও ২০১৯ সালের পর এই দুই চরম উগ্রবাদী ইহুদি নেতা আবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ফেরেন। তাঁদের জোটটি পার্লামেন্টের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে তাঁরা নেতানিয়াহুর জোট সরকারকে টিকিয়ে রাখেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সরকারের চরমপন্থী আদর্শের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তাঁরাই।

বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি পুলিশ বাহিনীকে নিজের কট্টর ডানপন্থী আদর্শ অনুযায়ী ঢেলে সাজিয়েছেন বেন-গভির।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের অনেককেই কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। বর্বর বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দম্ভ করে বলেছেন, তিনি এই বন্দীদের শোচনীয় অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছেন। এমনকি বন্দীদের অনাহারে রাখা ও যৌন নির্যাতনের মতো নিষ্ঠুর ঘটনার পক্ষেও তিনি সাফাই গেয়েছেন।

গাজায় গণহত্যার তীব্রতা কমানোর কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই বেন-গভির ক্ষমতাসীন জোট সরকার পতনের হুমকি দেন। সরকারের নীতি অমান্য করে তিনি বারবার মুসলমানদের পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে উসকানিমূলকভাবে প্রবেশ করেছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর বেন-গভিরের তদারকিতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ঢালাওভাবে বন্দুকের লাইসেন্স তুলে দেওয়া হয়। এতে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে একটি মৃত্যুদণ্ড বিল পাস হয়েছিল। গত এপ্রিলে শ্যাম্পেনের বোতল হাতে সেই বিল পাসের আনন্দ উদ্‌যাপন করেন ইতামার বেন-গভির। সেই ভিডিওটি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।

ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, গত মে মাসে ‘সুমুদ’ আন্দোলনকর্মীদের হেনস্তা করার ঘটনায় যে সমালোচনা হয়েছে, তা ছিল মূলত বেন-গভিরের আচরণের বিরুদ্ধে। কিন্তু ওই কর্মীরা ইসরায়েলি হেফাজতে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি।

লেভি আরও বলেন, ‘আমার মতে, তাঁকে (বেন-গভির) নিশানা করা খুব সহজ। এখন এমনভাবে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে সমস্যাটি কেবল বেন-গভিরের ভিডিও পোস্ট করা নিয়ে। ফ্লোটিলা সদস্য বা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে, তা যেন কোনো সমস্যাই নয়।’

লেভির মতে, ইসরায়েল তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনছে না। গাজা, পশ্চিম তীর বা লেবাননে তারা আসলে কী করছে, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছে না। সবাই শুধু একজন মন্ত্রীর কথা বলার ধরন নিয়ে ব্যস্ত।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও বেন-গভিরের জনসমর্থন বেশ শক্ত। অন্যদিকে তাঁর সহযোগী কট্টর ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোট্রিচের জনপ্রিয়তা কমছে। তবে ইসরায়েলি ভোট বিশ্লেষক ডালিয়া শিন্ডলিন ভিন্ন এক তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, বাস্তবিকভাবে বেন-গভিরের রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির অনেক নেতার চেয়ে খুব একটা বেশি চরমপন্থী নয়।

ডালিয়া শিন্ডলিন আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বেন-গভির এমন এক চরম ডানপন্থী ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, যা অনেকটা লোকদেখানো ও উসকানিমূলক সার্কাসের মতো। বিশ্বের অনেক জাতীয়তাবাদী-জনতাবাদী নেতাদের মধ্যে এমন ভঙ্গি দেখা যায়।’

শিন্ডলিন আরও বলেন, বেন-গভিরের সমর্থকেরা মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের হুমকি মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হলো শক্তি প্রয়োগ এবং তাঁদের অপমান-অপদস্থ করা।

এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলোর বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বেন-গভিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তিনি এখনো কোনো সাড়া দেননি।

ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গভির
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গভির। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরান ‘শক্তিশালী, একইসঙ্গে অহংকারী’ বলে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করছে না, বললেন ট্রাম্প

এনবিসি নিউজকে সাক্ষাৎকারঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নেতারা অত্যন্ত ‘শক্তিশালী’ ও ‘অহংকারী’। এ কারণেই চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে তারা এখনো সম্মত হয়নি।

তবে ট্রাম্প বলেছেন, শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তিতে আসা ছাড়া ইরানের সামনে ‘কোনো বিকল্প নেই’।

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের চিপেওয়া ফলসে গতকাল শুক্রবার দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকারকে এ কথা বলেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা শক্তিশালী, তারা অহংকারী। এমন কিছু বিষয় আছে, যা তারা কখনো করবে বলে ভাবেনি। কিন্তু এখন তাদের সেগুলো করতেই হবে। তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই, তবে এতে কিছুটা সময় লাগছে।’

চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতারা যখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এল। গত সপ্তাহে এ যুদ্ধ চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলে দুই দেশ একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় এবং পরে এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প যাঁরা এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরানের সঙ্গে দ্রুত একটি চুক্তি করার জন্য তাঁকে তাগিদ দিচ্ছেন, তাঁদের সমালোচনা করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘এসব বিষয়ে (চুক্তি করতে) বছরের পর বছর লেগে যায়।’

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের সময়কে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছি। আমি শুধু তিন মাসে পা দিয়েছি। আপনারা জানেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৯ বছর স্থায়ী হয়েছিল। আর আমি আমার তৃতীয় মাসে আছি, অথচ সবাই শুধু বলছে, “আচ্ছা, আপনি কবে জিতবেন?” আমি যদি ডেমোক্র্যাট হতাম, তবে কেউ এভাবে কথা বলতেন না। কিন্তু এটা আমার কাছে কোনো ব্যাপার না। আমি এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে’। তবে তিনি বলেন, ইরানের কাছে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়ে গেছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের বেশির ভাগ ড্রোন তৈরির কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বেশির ভাগ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র (লঞ্চিং প্যাড) ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এলাকাগুলোও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের এখনো কিছু সক্ষমতা আছে। তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। আমি বলব, শতকরা হিসাবে তাদের হয়তো ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র বাকি আছে। এটিও অনেক ক্ষেপণাস্ত্র, তবে আমরা যখন প্রথম হামলা চালিয়েছিলাম—তার তুলনায় এটি কিছুই না।’

চুক্তি না হলে ‘অন্য পথ’ বেছে নেওয়ার হুঁশিয়ারি

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পারস্য উপসাগরে উপর্যুপরি হামলা চালিয়ে ইরান দেখিয়েছে যে তাদের এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা কতটা। এমনকি তারা কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ধরেই ইরানের কড়া সমালোচক। তিনি এবং তাঁর প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। মূলত ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত বুধবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শ্রম দিবসের পরও বহাল থাকার আশঙ্কা কম।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর ট্রাম্প এই অবরোধ আরোপ করেছিলেন। নিউইয়র্ক পোস্টের ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে তিনি এ কথা বলেন।

ওই সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের নেতাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে না পৌঁছানোর আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁকে একটি চূড়ান্ত ‘সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে।

ট্রাম্প প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘আমরা কি একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করব, নাকি অন্য পথে হাঁটব? আর সেই অন্য পথটি কিন্তু মোটেও ভালো কিছু হবে না।’

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতাদের গত বুধবার জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত সামরিক অভিযানটি ‘শেষ হয়েছে’।

রুবিও আরও বলেন, সপ্তাহের শুরুর দিকে চালানো হামলাগুলো ছিল মূলত ‘আত্মরক্ষামূলক’। কংগ্রেস সদস্যদের তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির কাছে বিভিন্ন জাহাজে ইরানের হামলার জবাবেই এ পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

রুবিও বলেন, ‘আমাদের নিজেদের বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য আমরা শুধু ড্রোনগুলোর ওপরই হামলা চালাই না, বরং যারা ওই ড্রোন উৎক্ষেপণ করে, তাদের ওপরও আঘাত হানি। এগুলো পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ। তবে তা চালানো হয়েছে ইরানের কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায়।’

চলমান এই সংঘাতের জেরে কয়েক মাস আগেই ইরান তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। ফলে মার্কিনদের ওপর তৈরি হওয়া এ অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। ছবিটি বন্দর আব্বাস সৈকতের কাছে
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি রাডার স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। ছবিটি বন্দর আব্বাস সৈকতের কাছে। ছবি: রয়টার্স

ভাসমান ‘শহর’: এক মাইল দীর্ঘ আর ৩০ তলা ভবনের সমান উঁচু জাহাজে কী কী থাকবে

বর্তমান সময়ের বিশালাকৃতির প্রমোদতরিগুলোকে ভবিষ্যতে খুবই ছোট বলে মনে হতে পারে। কারণ, এগুলোর চেয়ে ঢের বড় একটি ভাসমান শহর নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাহাজটি ৮০ হাজার মানুষকে নিয়ে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াবে।

ফ্রিডম শিপ নামের এই জাহাজের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১ মাইল, প্রস্থ ৮০০ ফুট ও উচ্চতা ৩০ তলা ভবনের সমান। এটি তৈরি করতে খরচ হবে ১ হাজার ২০০ কোটি পাউন্ড। এই জাহাজে একটি গবেষণামূলক হাসপাতাল থাকবে। এ ছাড়া এখানে স্কুল, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ থাকবে, যা যুক্তরাজ্যের কেন্টে অবস্থিত চ্যাথাম শহরের জনসংখ্যার সমসংখ্যক মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।

ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটি পারমাণবিক জ্বালানিতে চলবে। ২৩ লাখ গ্রস টনের এই বিশাল জাহাজে স্থায়ীভাবে ৫০ হাজার বাসিন্দার থাকার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি আরও ১০ হাজার ভ্রমণকারী যাত্রী ও স্বল্প সময়ের দর্শনার্থীর জন্য জায়গা থাকবে। তাঁদের সেবা দিতে ২০ হাজার কর্মী কাজ করবেন।

এতে আরও নানা ধরনের সুযোগ–সুবিধা থাকবে। এর মধ্যে আছে—বহুতল হোটেল, ১৫ হাজার আসনের একটি স্টেডিয়াম, একটি কনভেনশন সেন্টার, একটি ওয়াটার পার্ক, দুটি জাদুঘর ও একটি সিম্ফনি হল।

আগ্রহীরা একটি বিশাল অ্যাকুয়ারিয়ামে সাঁতার কাটতে পারবেন। আর যাঁরা বিনোদন পছন্দ করেন, তাঁরা একটি বিশেষ নৈশক্লাবে রাতভর নাচ-গান উপভোগ করতে পারবেন।

যেসব বাসিন্দা নির্ধারিত খাবারের জায়গার বাইরে ব্যতিক্রমী কিছু খেতে চাইবেন, তাঁদের জন্য দুই তলাবিশিষ্ট একটি ফুড হল থাকবে।

জাহাজটিতে শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া জাহাজের চারটি ডেক বাণিজ্যিক সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও খুচরা ব্যবসার জন্য বরাদ্দ থাকবে। জাহাজের সর্বোচ্চ অংশে থাকবে আটটি হেলিপ্যাড।

অনেকটা দ্বীপের মতো এই বিশাল জাহাজ, কিন্তু স্থির থাকবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি ঘণ্টায় প্রায় সাত নটিক্যাল মাইল গতিতে প্রতি দুই বছরে একবার পুরো পৃথিবী ঘুরবে। আকারে অনেক বড় হওয়ায় এটি কোনো বন্দরে ভিড়তে পারবে না। তাই জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করবে এবং যাত্রীদের আনা-নেওয়ার জন্য ফেরিবহর ব্যবহার করা হবে। অন্যান্য প্রমোদতরিও এর পাশে নোঙর করতে পারবে।

দর্শনার্থীদের জাহাজের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার জন্য ট্রাম ব্যবস্থার সুবিধা থাকবে। আর যাঁরা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে চান, তাঁদের জন্য থাকবে ১৫ মাইল হাঁটার পথ এবং তিন একরের পার্ক।

৩০ বছর ধরে লালিত স্বপ্ন

ফ্রিডম শিপ এখনো সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেনি। এমনকি এর নির্মাণকাজও শুরু হয়নি। তবে এ ধরনের ভাসমান শহর তৈরির ধারণাটি তিন দশক ধরে আলোচনায় আছে।

১৯৯০-এর দশকে মার্কিন প্রকৌশলী নরম্যান নিক্সন প্রথম এই প্রকল্পের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি ২০১২ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরের বছর প্রকল্পটির নকশা আবার প্রকাশ্যে আনা হয়েছিল, কিন্তু কিছুদিন পর সেটি আবার স্থগিত হয়ে যায়।

তাহলে এখন কেন প্রকল্পটি আবার সামনে এসেছে?

ফ্রিডম শিপ নির্মাণের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম ক্রুজ লাইন ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী রজার গুচের দাবি, এ প্রকল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা যথেষ্ট বেশি।

গুচ বলেন, ‘আমরা চাইলে প্রায় তিনটি জাহাজ নির্মাণের যৌক্তিকতাও দেখাতে পারি।’

তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক অর্থ সংগ্রহ করা।

ফ্লোরিডায় নিজের কার্যালয় থেকে জুমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রজার গুচ বলেন, ‘আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারব। তবে মূল বিষয় হলো, প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করা।’

নির্মাণ করলেই মানুষ আসবে

অর্থায়নের ব্যবস্থা হয়ে গেলে পরবর্তী ধাপে ইন্দোনেশিয়ায় জাহাজটির নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রথমে এর মূল কাঠামো তৈরি করা হবে। এটি বিভিন্ন অংশে নির্মাণ করে পরে সমুদ্রের বাইরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জোড়া লাগানো হবে।

রজার গুচের মতে, পুরো জাহাজ নির্মাণ শেষ হতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে। তবে নির্মাণকাজ চলাকালেই মানুষ সেখানে বসবাস শুরু করতে পারবে।

ফ্রিডম ক্রুজ লাইন ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘আমাদের জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলো প্রতিদিনই পানিতে ভাসমান অবস্থায় করা হবে। এমনকি যখন এটি উপকূলের বাইরে নোঙর করা থাকবে, তখনো। জাহাজটি সব সময় পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। এর কোনো স্থায়ী বন্দর থাকবে না।’

প্রকল্পের আয়ের একটি অংশ আসবে বিভিন্ন ব্যবসা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে।

গুচ বলেন, ‘আমরা চাই উদ্যোক্তারা আমাদের কাছ থেকে জায়গা ইজারা নিন বা কিনুন, ঠিক যেমন তারা স্থলভাগে কোনো শহর বা লোকালয়ে করে থাকেন।’

গুচ আরও বলেন, ‘আমরা প্রতিটি সেলুন বা প্রতিটি পিৎজা বিক্রির দোকানের মালিক হতে চাই না। কিছু ব্যবসায়িক উদ্যোগে অবশ্য হোল্ডিং কোম্পানির অংশীদারত্ব থাকবে। এর মধ্যে একটি অবশ্যই ক্যাসিনো হবে।’

প্রকল্পের আওতায় একটি অত্যাধুনিক হাসপাতালও গড়ে তোলা হবে। গুচ বলেন, ‘বিভিন্ন চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কারণ, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সরাসরি আওতার বাইরে থাকবে। ফলে গবেষণার জন্য ফ্রিডম শিপ একটি আদর্শ স্থান হতে পারে।’

পরিবেশবান্ধব ও পারমাণবিক শক্তিচালিত ভ্রমণ

গুচের দাবি, প্রকল্পটির একটি জনকল্যাণমূলক দিকও থাকবে। তাঁর মতে, জাহাজটি সমুদ্রপথে চলাচলের সময় মহাসাগরের বর্জ্য ও দূষণ পরিষ্কারে ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণও উল্লেখজনকভাবে কমানো সম্ভব হবে।

রজার গুচ বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে চাই, আমরা একটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছি এবং বিশ্বসমাজের জন্য ভালো কিছু করছি।’

ফ্রিডম শিপ ছোট ছোট বন্দরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে না। কারণ, এটি উপকূলের বাইরে অবস্থান করবে। বরং মানুষ সমুদ্রে গিয়ে এর বিভিন্ন সুবিধা উপভোগ করতে পারবে।

রজার গুচ বলেন, ‘আমরা চাই এই ভাসমান শহর যে এলাকার কাছে আসবে, সেই এলাকার মানুষ যেন সেখানে গিয়ে এর সুবিধাগুলো উপভোগ করেন। কারণ, এটি আবার একই জায়গায় ফিরতে আড়াই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’

এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের প্রধান পরিকল্পনাকারী হলেন কেভিন শপফার। তিনি আর্কোলজি নিয়ে কাজ করেন, যা স্থাপত্য ও পরিবেশবিদ্যার সমন্বয়।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলার জন্য শপফার আগেও ভাসমান উপকূলীয় আবাসন প্রকল্পের নকশা করেছেন। এর মধ্যে ছিল ৪০ হাজার মানুষের জন্য পরিকল্পিত নিউ অরলিন্স আর্কোলজি হ্যাবিট্যাট (এনওএএইচ) প্রকল্প।

শপফার দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম জাহাজটি যেন একটানা বিশাল ও ভারী কাঠামোর মতো না দেখায়, বরং দেখতে আরামদায়ক লাগে। তাই আমরা এর সব প্রান্তকে নরম ও মসৃণভাবে নকশা করেছি। আমরা এটাও চেয়েছি, এটিতে যেন প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া যায়। তাই সেখানে হাঁটার পথ ও সবুজ খোলা জায়গা রাখার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।’

জাহাজের নকশায় একটি ফুটবল মাঠও রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শপফার। তিনি বলেন, ‘এটি খুব বড় স্টেডিয়াম নয়, তবে সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কনসার্ট আয়োজন করা যাবে। একপর্যায়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাবনায় টেইলর সুইফটের নামও উঠে এসেছিল। কিন্তু আমি বলেছিলাম, এত বড় আয়োজন সামলাতে পারব কি না, তা জানি না।’

আজকের মেগা ক্রুজ শিপের তুলনায় এটি কেমন

৮০ হাজার যাত্রী ও ক্রুর ধারণক্ষমতার ফ্রিডম শিপ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ বহন করতে পারবে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজ হলো স্টার অব দ্য সিজ। ফ্রিডম শিপ তার চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি মানুষ বহন করতে পারবে।

অনেক বছর ধরে বিভিন্ন ভাসমান আবাসনের ধারণা সামনে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত শুধু ধনীদের জন্য নির্মিত দ্য ওয়ার্ল্ড এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ভিলা ভি ওডিসি সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছে।

তবে প্রকল্পের পরিসর বিশাল হলেও এর ব্যবস্থাপক শ্রীদেব মুখার্জি তাতে বিচলিত নন। তিনি সিঙ্গাপুরের ব্লসম গ্রুপের প্রকল্প ব্যবস্থাপক।

লন্ডনের সেন্ট ক্যাথারিন ডকসে টেলিগ্রাফের প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময় তিনি যাত্রীবাহী ও ক্যাসিনো জাহাজ ব্যবস্থাপনায় তাঁর ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন।

সেন্ট ক্যাথারিন বলেন, ‘অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্প মানুষকে জীবনে কিছু অর্জন করতে সাহায্য করে। আমি বিশ্বাস করি, রজারের প্রচেষ্টা, ধৈর্য এবং এই প্রকল্প সফল করার ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে এটি সফল হবে। এর কোনো সীমা নেই।’

ক্যাথারিন আরও বলেন, এটি একটি অসাধারণ ধারণা এবং এটি বাস্তবায়নে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। -দ্য টেলিগ্রাফ

ঘণ্টায় প্রায় সাত নটিক্যাল মাইল গতিতে প্রতি দুই বছর একবার পুরো পৃথিবী ঘুরবে
ঘণ্টায় প্রায় সাত নটিক্যাল মাইল গতিতে প্রতি দুই বছর একবার পুরো পৃথিবী ঘুরবে। ছবি: ফিড্রম শিপের ওয়েবসাইট

যে প্রাণীর রক্ত সবচেয়ে দামি by কবীর হোসাইন

প্রকৃতিতে বিদ্যমান একটি জলজ প্রাণীর রক্তের লিটারপ্রতি মূল্য ১৫ লাখ টাকার বেশি! ঠিকই শুনেছেন। ইংরেজিতে প্রাণীটি ‘হর্স-সু ক্র্যাব’। নামে কাঁকড়া হলেও আদলে এটি কাঁকড়াবিছা ও মাকড়সার নিকটাত্মীয়। গায়ের খোলস উপবৃত্তাকার। অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো। আমাদের দেশে এটি রাজকাঁকড়া নামে পরিচিত।

কেন এর রক্তের দাম এত বেশি? প্রশ্নের জবাবে যাওয়ার আগে প্রাণীটির বিবর্তনগত প্রেক্ষাপট বুঝে নেওয়া দরকার। নিরীহ এই জলজ প্রাণী বিজ্ঞানীদের কাছে এক অপার বিস্ময়। এর পর্যাপ্ত কারণও আছে।
প্রধান কারণ, পৃথিবীতে এর টিকে থাকার সুদীর্ঘ ইতিহাস। ‘সুদীর্ঘ’ বলতে ঠিক কতটা? হ্যাঁ, বিস্ময়ের শুরুটা এখানেই। কমপক্ষে ৩৬০ মিলিয়ন বছর, অর্থাৎ ৩৬ কোটি বছর ধরে এরা পৃথিবীতে একই রূপে টিকে আছে। কোথাও ৪৫ কোটি বছর, আবার কোথাও ৫৫ কোটি বছরের কথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ডাইনোসর যুগেরও মোটামুটি ১০-১৫ কোটি বছর আগে এরা পৃথিবীতে এসেছে।

কীভাবে এত দিন টিকে আছে

আদিম এই আর্থ্রোপোড বা সন্ধিপদী প্রাণীটি পৃথিবীর অন্যতম জীবন্ত জীবাশ্ম। কী করে এত দিন অবিকৃত অবস্থায় টিকে আছে এরা! বিবর্তনের নানাবিধ ভয়ংকর বিপর্যয় এবং প্রাণঘাতী রোগ থেকে কীভাবে নিজেদের অস্তিত্বকে সুসংহত রাখতে পেরেছে?
এর মূল কারণ এদের দেহের বিশেষ ‘নীল রক্ত’। সেই যে ‘ব্লু ব্লাড’ বলে একটি কথা আছে ইংরেজিতে, ঠিক যেন তা-ই। রাজকাঁকড়ার নীল রক্তের ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। সেই অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এরা যেকোনো ব্যাকটেরিয়া, বিষাক্ত পদার্থ বা প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিজেদের রক্ষা করে থাকে।

সাধারণত মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্তের হিমোগ্লোবিনে লৌহ থাকে। এই লৌহের সহায়তায় অক্সিজেন পরিবাহিত হয়। অন্য দিকে রাজকাঁকড়ার দেহে অক্সিজেন পরিবাহিত হয় এদের রক্তে থাকা হিমোসায়ানিনের সাহায্যে। এই হিমোসায়ানিনে লৌহ নয়, রয়েছে কপার বা তামার উপস্থিতি। ফলে রক্তের রং হয় নীল।
এদের রক্তে অ্যামিবোসাইট নামক একধরনের বিশেষ কোষ রয়েছে। এর দরুন সামান্য পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া এন্ডোটক্সিন বা ক্ষতিকর জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই রক্ত জমাট বেঁধে যায় বা জেলির মতো আকার ধারণ করে। এমনকি মাত্র এক লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগ ব্যাকটিরিয়ার উপস্থিতিতেই রক্ত জমাট বাঁধে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার জন্য সময় লাগে ৪৮ ঘণ্টা। এই অতি সংবেদনশীল রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জন্যই মূলত এরা আজও টিকে আছে।

এই প্রাণীর রক্ত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে কেন

এবার আসা যাক রক্তের বহুমূল্য প্রসঙ্গে। আগেই বলা হয়েছে, যৎসামান্য ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর সংস্পর্শে এলেই এদের রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এই ধর্মকে কাজ লাগিয়ে ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেডরিক ব্যাং ও জ্যাক লেভিন নামের দুজন গবেষক ‘লিমুলাস অ্যামিবোসাইট লাইসেট’ নামক একটি পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
১৯৭০-এর দশক থেকে এই টেস্ট বা পরীক্ষাপদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। পদ্ধতিটি চিকিৎসাজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। মূলত মানবদেহে প্রবেশ করানো হয়, এমন প্রতিটি চিকিৎসা-সরঞ্জাম, যেমন ইনজেকশন, ভ্যাকসিন, শিরায় দেওয়া ওষুধ, অপারেশন থিয়েটারের সরঞ্জাম, কৃত্রিম হিপ জয়েন্ট বা হৃদ্‌যন্ত্রের যন্ত্রাংশ—সবকিছুতে জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণমুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য এই টেস্ট ব্যবহার করা হয়।
সহজ কথায়, মানবদেহের প্রতিটি অস্ত্রোপচার এবং ভ্যাকসিনের নিরাপত্তার জন্য এই প্রাণীর রক্ত অপরিহার্য। এর মাধ্যমে রোগীকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচানো যায় এবং নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো যায় অসংখ্য মানুষের জীবন। ফলে এই প্রাণীকে বলা যেতে পারে ‘জীবনদায়ী প্রাণী’।

বর্তমানে এর রক্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরঞ্জামের বিশুদ্ধতা পরীক্ষার জন্যও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং এই রক্তের দাম এমন অকল্পনীয় হবে এটাই স্বাভাবিক।

অস্তিত্বের হুমকি

তবে এত বছর ধরে টিকে থাকতে পারলেও প্রাণীটি এখন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। আটলান্টিক স্টেটস মেরিন ফিশারিজ কমিশনের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রকাশনা অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ অশ্বখুরাকৃতি কাঁকড়া ধরে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় এদের চরম চাহিদা থাকায় এমনটি হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার এটিকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। শিগগিরই এর বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার করা না গেলে এদের অস্তিত্ব তো হুমকির মুখে পড়বেই, চিকিৎসাবিজ্ঞানও পড়ে যাবে গভীর সংকটে। চূড়ান্ত বিবেচনায় মানবজাতিও পড়বে মহাবিপদে।

সূত্র: থটকো ডটকম, এএসএমএফসি

এভাবেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়
এভাবেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়। ছবি: আরিয়েন মুলার

নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের ধমক দেখে বিশ্ব এখন কী ভাবছে

ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের আবহে যখন বিশ্বরাজনীতি টালমাটাল, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপ ফাঁস নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে ওই ফোনালাপে ট্রাম্পের কঠোর ভাষা ও প্রকাশ্য ক্ষোভ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপের সময় লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্প তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি বলেন, ‘তুমি কী করছ এসব? তুমি একেবারে পাগল হয়ে গেছ। আমি না থাকলে তুমি এখন জেলে থাকতে।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য ভেঙে দেয়নি, বরং দুই নেতার সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনও স্পষ্ট করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

সবচেয়ে আলোচিত অংশ আসে এরপরই। ট্রাম্প আরও তীব্র ভাষায় বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে এই কারণে।’ এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কারণ, এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এটিকে ইসরায়েল সম্পর্কে বৈশ্বিক জনমতের পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প সাধারণত রাজনৈতিক সীমারেখা ভেঙে বক্তব্য দিতে অভ্যস্ত। তিনি প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে এবং আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নিতে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু এবার তাঁর মন্তব্যে কেবল কৌশল নয়, বরং ইসরায়েল ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে বাড়তে থাকা জনরোষের ছাপও স্পষ্ট।

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সমর্থক মহলে এই মন্তব্য গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, ‘সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে’ ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল এক বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করায়, যা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জটিলতা সৃষ্টি করে এসেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য এই পরিবর্তনের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র দেয়। তাদের জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ২৪টি দেশের মধ্যে ৬২ শতাংশ মানুষ গত বছর ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ ইতিবাচক মত দিয়েছেন।

এই প্রবণতা শুধু বৈশ্বিক পর্যায়েই সীমিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইসরায়েল সম্পর্কে মনোভাব দ্রুত বদলাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ১১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতি আরও কঠোর। অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। এই তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান একাকিত্বের ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই বাস্তবতা নিয়ে সচেতনতা থাকলেও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক মনে করেন, বিশ্বে তাঁদের দেশের প্রতি সম্মান কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো ইহুদিবিরোধিতা বা আন্তর্জাতিক অজ্ঞতা।

তবে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, বিষয়টি শুধু ধারণাগত নয়, বরং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ১০ হাজার সাধারণ মানুষের মৃত্যু বিশ্বজনমতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

সংবাদ সংস্থা অ্যাক্সিওস–এ উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপে ট্রাম্প স্বীকার করেন, তিনি জানেন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। কিন্তু তাঁর মতে, নেতানিয়াহু পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ‘অতিরিক্ত ও অসমানুপাতিকভাবে’ সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সমালোচনা করেন এমন কৌশলকে, যেখানে একজন হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে লক্ষ্য করতে গিয়ে পুরো ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে।

এই পর্যবেক্ষণগুলো এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়ে সমালোচনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জোরালো। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনছে। এটি ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে আরও চাপের মুখে ফেলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বহু মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন। তাঁরা প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন খুব কমই এসেছে।

এই ধারার ব্যতিক্রম হিসেবে অনেকে ট্রাম্পকে দেখছেন। কারণ, তিনি রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত, নিয়ম ভাঙতে অভ্যস্ত এবং তাঁর বক্তব্য প্রায়ই সরাসরি জনমতের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই কাজ করে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এখন ইসরায়েল সম্পর্কে জনমত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত। একই সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি মাগা শিবিরেও ইহুদিবিরোধী ধারণা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প এমন এক সময় ক্ষমতায় আছেন, যখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান চাপের মুখে। ইরান যুদ্ধের ব্যর্থতা তাঁর নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে তিনি নতুন করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের পথ খুঁজছেন।

এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য এবং ইসরায়েলকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা তাঁকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা সমর্থন এনে দিতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। সেই কারণে ভবিষ্যতে ইসরায়েল ইস্যুতে তাঁর অবস্থান আরও কঠোর বা অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে।

* পল নুকি, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তা বিভাগের সম্পাদক হিসেবে দ্য টেলিগ্রাফ–এ কর্মরত
- দ্য টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি : এএফপি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ‘বিশ্বের প্রথম’ টিকা তৈরি হতে যাচ্ছে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ‘নতুন’ ধরনের একটি টিকা তৈরি হতে যাচ্ছে। এটি অনেক ধরনের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেবে এবং মহামারি প্রতিরোধ করবে বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই প্রথম কোনো টিকার মূল উপাদানগুলো পুরোপুরি এআই দিয়ে নকশা করা হয়েছে। এরই মধ্যে মানুষের ওপর এটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগও করা হয়েছে।

টিকাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা সব ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে। এর মধ্যে করোনার সব ধরনের পাশাপাশি পশুপাখির শরীরে থাকা সেসব ভাইরাসও রয়েছে, যা মানুষের মধ্যে ভবিষ্যতে মহামারি ছড়াতে পারে।

গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে কেমব্রিজের গবেষক দলটি এআইয়ের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলার জন্য আলাদা টিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।

যেভাবে কাজ করে

টিকা মূলত আমাদের শরীরকে রোগজীবাণু চিনতে শেখায়। এর ফলে শরীর সহজে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, তবে কিছু ভাইরাস দ্রুত তাদের রূপ বদলাতে পারে। একে মিউটেশন বা রূপান্তর বলা হয়। রূপ বদলানোর কারণে আগে টিকা দেওয়া থাকলেও তা দ্রুত কার্যকারিতা হারায়। এ কারণে করোনা ও শীতকালীন ফ্লুর টিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় ভাইরাসের চেয়ে পিছিয়ে থাকি। আমাদের লক্ষ্য হলো ভাইরাসের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকা।’ তাঁরা এতটাই এগিয়ে থাকতে চান, যেন নতুন কোনো মহামারি আসার আগেই তা ঠেকানো যায়। সাধারণত প্রচলিত ভাইরাসের ধরন দেখে টিকা তৈরি করা হয়, কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন।

তাঁরা নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে সংগ্রহ করা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড বা বংশগতির সংকেত সংগ্রহ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে।

এরপর এআই একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ তৈরি করে। এই অ্যান্টিজেন বা প্রোটিন মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করে, যা সংশ্লিষ্ট সব ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। ভাইরাস রূপ বদলালেও এই টিকা কাজ করবে। এমনকি পশু থেকে মানুষের শরীরে নতুন কোনো ভাইরাস ছড়ালেও এটি সুরক্ষা দেবে।

টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অ্যান্টিজেন। কারণ, এটি দেখেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শত্রু বা ভাইরাসকে আক্রমণ করতে শেখে।

অধ্যাপক হিনি বলেন, এই প্রথম এআইয়ের নকশা করা কোনো অ্যান্টিজেন মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা হলো। এই প্রযুক্তি সবাইকে চমকে দিচ্ছে। মানবজাতির কল্যাণে এটি দারুণ কাজ করবে।

কেমব্রিজের এই অধ্যাপক বিবিসি নিউজকে বলেন, ‘এই টিকার লক্ষ্য শুধু আজকের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যতের মহামারি থেকে আমাদের বাঁচানো। মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এটি এক বড় পরিবর্তন।’

মানুষের ওপর পরীক্ষা

টিকাটি নিরাপদ কি না, তা ট্রায়াল বা পরীক্ষা করে দেখতে ৩৯ জনের ওপর প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এরপর প্রায় ২০০ জনের ওপর দ্বিতীয় আরেকটি পরীক্ষা চালানো হবে। এর মাধ্যমে এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করছে, তা বোঝা যাবে।

গবেষণাপত্রটি চিকিৎসাবিজ্ঞান–বিষয়ক নির্ভরযোগ্য সাময়িকী জার্নাল অব ইনফেকশনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব এখনো ‘মাঝারি’ মাত্রার, তবে গবেষকেরা এটি নিয়ে বেশ আশাবাদী।

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফস্ট এই ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, এআইয়ের এই নকশার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ নেই। এটি সত্যিই দারুণ বিষয়। ভাইরাস যখন দ্রুত রূপ বদলায়, তখন মহামারির টিকা তৈরিতে এই প্রযুক্তি অনেক ভালো কাজ করে।

কেমব্রিজের দলটি এখন সর্বজনীন ফ্লুর টিকার জন্য প্রাণীদের ওপর গবেষণা চালাচ্ছে। এই টিকা সফল হলে প্রতিবছর নতুন টিকা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া তাঁরা এইচফাইভএনওয়ান বার্ড ফ্লুর টিকা নিয়েও কাজ করছেন।

পাশাপাশি গবেষক দলটি ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী জ্বরের টিকা তৈরির চেষ্টা করছে, যার একটি রূপ হলো ইবোলা। আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে বর্তমানে এই জ্বরের যে বিশেষ ধরনটি ছড়িয়েছে, সেটার কোনো টিকা এখনো নেই।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক অ্যান্ডি পোলার্ড এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। এআই দিয়ে তৈরি এই টিকা সম্পর্কে তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, প্রাণীদের ওপর গবেষণায় এই প্রযুক্তির ভালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি চমৎকার একটি খবর।

তবে পোলার্ড মনে করেন, ‘মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ল্যাবরেটরির ইঁদুরের চেয়ে আলাদা। বছরের পর বছর নানা সংক্রমণের মধ্য দিয়ে আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হয়। তাই মানুষের ওপর ট্রায়ালে কী ঘটে, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা।’

পোলার্ড আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টিকা গবেষণার দৃশ্যপট বদলে দেবে। এর মাধ্যমে দ্রুত টিকা তৈরি করা যাবে এবং অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিচার্সের বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মারিয়ান নাইট বলেন, এআইয়ের নকশা করা এই ট্রায়ালের সাফল্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ।

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী লর্ড ভ্যালেন্স বলেন, ‘এটি ব্রিটিশ বিজ্ঞানের আরেকটি সাফল্যের গল্প। নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে আমরা কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করতে পারি, এটি তার বড় উদাহরণ। মানুষের ওপর প্রথম ট্রায়ালে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এই কাজ বিশ্বজুড়ে দ্রুত টিকা পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’ -বিবিসি

মহামারি ঠেকাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
মহামারি ঠেকাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ডায়াবেটিস হলে কি শর্করা খাবার বন্ধ করা উচিত by মো. ইকবাল হোসেন

ডায়াবেটিসের প্রধান চিকিৎসা হলো শৃঙ্খলিত জীবনযাপন। শৃঙ্খলার একটি অন্যতম অংশ হচ্ছে ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস। কিন্তু বেশির ভাগ রোগী ডায়াবেটিক ডায়েট সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করেন।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ দিচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা বাদ দিলে নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। শর্করা আমাদের শরীরের প্রধান জ্বালানি বা শক্তির উৎস। খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা বাদ দিলে প্রথমেই সুষম খাদ্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

শর্করা বাদ দিলে কী হতে পারে

শর্করা বন্ধ করলে শরীর দ্রুত হারে চর্বি ভাঙতে শুরু করে। ফলে প্রচুর কিটো অ্যাসিড তৈরি হয় এবং রক্তের পিএইচ কমে যায়। ফলে রোগী অজ্ঞান হয়ে কোমায় চলে যেতে পারেন। এ ছাড়া শর্করা না খেলে শরীর পেশি ভেঙে শক্তি উৎপন্ন করতে চেষ্টা করে। ফলে পেশি শুকিয়ে যেতে থাকে, অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেয় এবং স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়।

ডায়াবেটিস রোগীরা শর্করা একেবারেই না খেলে রক্তের শর্করা অতিরিক্ত কমে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। এতে মাথাব্যথা, শরীর কাঁপা, ক্লান্তি, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, কথা বলতে সমস্যা, খিঁচুনি, চেতনা হারানো, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

শর্করা বাদ দিলে শরীর থেকে পানি কমে পানিশূন্যতা দেখা দেবে। ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। ফলে বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, ত্বক শুষ্ক হয়ে দাগ পড়ে যায়। শর্করা কম খাওয়ায় শরীরে শক্তি কমে মাথাব্যথা, দুর্বলতা, অল্পতেই বিরক্তি, সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব থেকে পড়াশোনা বা কাজে কম মনোযোগ, পড়া মুখস্থ না থাকা, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য, কখনো ডায়রিয়াসহ অনেক কিছু হতে থাকে।

করণীয়

ডায়েট বা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে শর্করা বাদ দেওয়ার দরকার নেই। বরং দরকার উপযুক্ত শর্করা খাবার বাছাই করা। জটিল শর্করা রক্তের সুগার চট করে বাড়ায় না। ডায়াবেটিসের রোগীর উচ্চ আঁশযুক্ত, কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সসম্পন্ন খাবার বেছে নিতে হবে। সারা দিনের খাবারে ৪০ শতাংশের বেশি শর্করা রাখা যাবে না। শর্করার উৎস হিসেবে লাল চাল, লাল আটা, বার্লি আটা, রোল্ড ওটস, ডাল ও শাকসবজি বেছে নিতে হবে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে একবারে বেশি শর্করাজাতীয় খাবার না খেয়ে দুই-তিনবারে ভাগ করে খেতে হবে। স্ন্যাকস হিসেবে বাদাম, দুধ, টক দই, স্যুপ, চিবিয়ে খেতে হয় এমন ফল, সালাদ খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদ বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* মো. ইকবাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল

বেশির ভাগ রোগী ডায়াবেটিক ডায়েট সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করেন
বেশির ভাগ রোগী ডায়াবেটিক ডায়েট সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করেন। ছবি: জুয়েল শীল