Wednesday, October 13, 2010

গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ

দুপুরবেলা তিন তলা বাড়িটা একদম ফাঁকা হয়ে যেতো। কাজের লোকেরা নিচের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে। দোতলায় দুজন বাসিন্দা প্রতিদিনের মতো ঘুমের কাছে সমর্পিত। আর আমি তখন গাছপালায় ঘেরা বিশাল বাড়িতে একমাত্র জীবন্ত প্রাণী। ফাঁকা বাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে নিজেকে মাঝে মাঝে একটা কাচের বোতলে আটকে পড়া মাছির মতো মনে হতো। এখানে ওখানে উড়ে বেড়াচ্ছি, কোথাও ঝিম মেরে বসে থাকছি কিন্তু বের হওয়ার কোন পথ নেই। আমার কখনোই বইপত্র পড়ার অভ্যাস ছিলোনা। কোন কাজও করার ছিলো না। ফলে সেইসব নির্জন দুপুরে তিনতলায় নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে বাইরে আকাশ অথবা গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকাটা ছিলো আমার একমাত্র কাজ। তখনই আমি বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম। এ বাড়িতে আসার প্রথম বছরে ভাবনাটা চেতনার স্রোতের ভেতরে পাল তুলে দেয়নি। তখন অনেক কাজ ছিলো আমার। অধিকাংশ দিন বিকেল বা সন্ধ্যায় কোন না কোন অনুষ্ঠান থাকতো। সকালবেলা ব্যস্ত থাকতাম ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার কাজ তদারকি নিয়ে। ভেবেছিলাম দাঁতে দাঁত কামড়ে সবকিছু ভুলে থাকবো। কিন্তু তা আর হলো কই? এখন ভাবি, কী রকম বোকা ছিলাম আমি। আমার নিজেরই এখন সেই সরল মনটার জন্য খুব মায়া হয়।
এখন আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে দুপুর বা বিকেলের আকাশ দেখার কোন প্রশ্নই নেই। অনেকগুলো লম্বা-লম্বা বাড়ির মাঝখানে এই বামন একতলা বাড়িটার আকাশের কাছে মুখ দেখানোর কোন সুযোগ নেই। তবে যেদিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরি সেদিন আকাশ দেখি। রিকশায় বসে চলন্ত আকাশ। আগের দিনের কথা মনে পড়ে যায়। সেই তিনতলা বাড়িটার কথা, মানুষগুলোর কথা, একজন লোকের কথা। কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম মানুষের মনের গতি ঘাসের চেয়েও দ্রুত সঞ্চরণশীল। আসলে কথাটা একশ ভাগ ঠিক। মন যে কোথায় কখন থাকে, কোথা থেকে কোথায় যে ভেসে চলে যায় তার হিসাব মানুষের কাছে নেই। মানুষ ইচ্ছা করলেই মনকে থামাতে পারে না। সে গড়াতেই থাকে। বিয়ের এক বছর পরেই আমার মন তারেকের কথায় ভেসে গিয়েছিলো।

আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো হঠাৎ করেই। তখনও আমার প্রেমে-ট্রেমে পড়া হয়ে ওঠেনি। কলেজে পড়া সাধারণ একটা মেয়ে ছিলাম। বাড়িতে সারাদিন লাফ ঝাঁপ, কলেজে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে সিনেমায় যাওয়া, পিকনিক এসব নিয়েই আমার দিন কাটতো। এক বিয়ে বাড়িতে ছেলে পক্ষ আমাকে দেখে বাবার সঙ্গে কথা বলে সবকিছু ঠিক করে ফেললো। তারপর সানাই বাজলো, বাজি পুড়লো, গেট সাজলো, আলো জ্বললো। আর আমি যেন রাজকন্যা সেজে সাতদিন সাতরাত জাহাজে করে সমুদ্রে ভেসে আরেক রাজ্যে গিয়ে উঠলাম। সেই বিশাল রাজ্যের মালিক ছিলো প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ ফরিদ রেজা আর তার মা জাহান বেগম। ফরিদ রেজা আবার রাজমাতার সাংঘাতিক অনুগত ছিলো। আসলে সেই বিশাল রাজ্যের আসল মালিক ছিলো জাহান বেগম, মানে আমার শাশুড়ী। রেজার এসব ব্যাপারগুলো দেখে প্রথম প্রথম আমি বিস্মিত হতাম। রেজা যখন দিনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে বসে ঢক ঢক করে এক গ্লাস দুধ খেতো তখন দেখে আমার হাসি পেতো। আমাদের পরিবার আবার রেজাদের মতো ইন্টেলেকচুয়াল ছিলো না। বাবা সরকারি চাকুরে ছিলেন। মা কলেজে পড়াতেন। নিয়ম কানুন আমাদের ভাইবোনদের ঘিরে থাকতো সর্বক্ষণ। কিন্তু সেখানে রেজার মতো এ বয়সে মায়ের পাশে বসে দুধ খাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। রেজার বাবা ছিলেন ডাকসাইটে বিচারপতি। ভদ্রলোক আমাদের বিয়ের দুবছর আগে মারা যান। অনেক সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তিনি জাহান বেগমের নামে। রেজা লন্ডন থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট করে দেশে ফিরে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করতে একটা বিশাল এনজিও দিয়েছিলো। একটা বড় বিদেশী ব্যাংকের উপদেষ্টাও রেজা। সমাজের সুশীল অংশের গুরুত্বপূর্ণ পার্ট ছিলো লোকটা। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বের হতে হতো মানুষটাকে। মায়ের নির্দেশে রাত এগারোটায় বিছানায় চলে যেতে হতো। ওদের বাড়িটাকে আমার সুকুমার রায়ের ছড়ার ধমক দিয়ে ঠাসা একটা বাড়ির মতো মনে হতো। প্রথম দিকে আমি রেজাকে এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন করেছি। ও দেখতাম ভয় পেতো কথা বলতে। বলতো, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার দরকার কী? কোন সমস্যা তো হচ্ছে না। এগুলো আমাদের বাড়ির অনেক কালের নিয়ম। বাবার আমল থেকে শুরু হয়েছে। মা চায় না নিয়মগুলো ভেঙে যাক।

এখানে বলে রাখি, আমার নাম প্রীতি। আমি ছিলাম বাবার একমাত্র মেয়ে। আমার আরও দুই ভাই আছে। বিয়ের পর রাতের বেলা বাধ্যতামুলক লোডশেডিংয়ের মাঝে বসে অনেক কথা হতো আমার আর রেজার। টাকা আর খ্যাতি রোজগার ছাড়া সংসারে কোন ধরনের ভূমিকাহীন এই মানুষটার নরম একটা মন ছিলো। আমাকে পৃথিবীর নানা দেশের মজার মজার গল্প শোনাতো। মানুষের কথা বলতো। অল্প বয়সে অনেক দেশ দেখা হয়েছিলো তার। বলার ভঙ্গীটা এতো সুন্দর ছিলো যে আমার শুধু শুনতে ইচ্ছা করতো সে সব গল্প। সকালে রেজা কাজে চলে যাবার পর আমি সারাদিন অপেক্ষায় থাকতাম রাতের জন্য। ওই নিয়ন্ত্রিত অন্ধকারই ছিলো আমাদের দুজনের ক্ষণস্থায়ী যৌথ জীবনের একমাত্র আলোকিত সময়। তখন মনে হতো লোকটা নিয়ম ভাঙতে চায় কিন্তু সাহসের অভাবে পারে না। আমি অনেক সাহস যোগানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। পরে দেখলাম একেবারেই নির্বিষ। মানুষটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে ভয় আর নিয়ম। আমার খারাপ লাগার শুরুটা সেখান থেকেই। তবে রেজা মায়ের সম্পত্তির লোভের দাস ছিলো না, ছিলো অভ্যাসের দাস।

কথা বলতে বলতে বোধহয় মানুষের মন আর তারেকের প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে সরে এলাম? আসলে মানুষের এরকমই হয়। স্মৃতির ভূত মাথায় চেপে বসলে শুধু কথাই বলতে ইচ্ছা করে। একটা পুরনো বই পৃষ্ঠা উল্টে পেছনে, অনেক পেছনে নিয়ে যায় তাকে। আসলে পুরনো কথা না বলে দুম করে এসব প্রসঙ্গে আসাও যায় না। ঘটনাগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব বেশি করে জড়িয়ে আছে। আমি এখন একটা ব্যাংকে ছোট চাকরি করি। অফিসের কাছেই এক বন্ধুর সঙ্গে একটা বাসা ভাড়া করে থাকি। বাবা-মায়ের সঙ্গে একটা ক্ষীণ যোগাযোগ আছে। এই বিষয়গুলো আগের ঘটনার ওপর নির্ভরশীল। ফরিদ রেজা আর জাহান বেগমের সংসারে না গেলে আমার জীবনে এই অংশটা তৈরিই হতো না। অনেকেরই মনে হতে পারে এরপর হয়তো আমি অবৈধ প্রণয়ের গৎবাঁধা গল্প শুরু করবো। এক রাজকন্যা সোনার তৈরি কোন কারাগারে বন্দি ছিলো। একদিন এক রাজপুত্র তার জীবনে এলো ঝড়ের মতো। সবকিছু তছনছ করে দিয়ে সে রাজকন্যাকে উদ্ধার করলো বন্দীদশা থেকে। আসলে কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ছিলো না। তারেক নামের ছেলেটি আমাকে দ্বিতীয় আরেকটি জীবনের লোভ দেখিয়েছিলো। স্বামীর ব্যস্ত আর ভয়ে ভয়ে থাকা জীবন আর শাশুড়ীর কঠোর নিয়মকানুনের বাইরে সে জীবন উচ্ছ্বল, আনন্দময় আর উজ্জ্বল। আমি একসময় ভেবেছিলাম সে জীবনটা আমারও হতে পারে।

তারেক ছিলো অর্থনীতির ছাত্র। রেজার সঙ্গে এনজিওতে কাজ করতো। রেজার অনুপস্থিতিতে কাজকর্ম সামাল দেয়া আর বিভিন্ন দেশে ঘোরা ছিলো তারেকের কাজ। বাসায় ছেলেটাকে আমি কয়েকদিন দেখেছি একতলায় রেজার লাইব্রেরী ঘরে বসে কাজ করতে। অবশ্য ছেলেটার সঙ্গে আমার কথা হয় বাসার বাইরে। একটা দোকানে। একদিন দুপুরবেলা হাতিরপুলে বাজার করছি, হঠাৎ তারেকের সঙ্গে দেখা। বাজারে দোকান থেকে দোকানে ঘুরে ঘুরে অনেক কথা বললো ছেলেটা আমার সঙ্গে। ওকে এর আগে বাসায় দেখে মনে হয়নি এত কথা বলতে পারে। আমার অবশ্য তারেকের সঙ্গে কথা বলতে খারাপ লাগছিলো না। বেশ মজা করে কথা বলে। আসার সময় তারেককে রেজার অফিসের সামনে নামিয়ে দিয়ে ফিরলাম। বিকেল-সন্ধ্যা তারেক আমার সঙ্গে থাকলো। আসলে তারেক না, থাকলো ওর মজার কথাগুলো। মনে হচ্ছিলো, অনেকদিন পর আমি হাসলাম। সাধারণ মানুষের মতো কথা বললাম। এরপর বাসায় এলে তারেক আমার সঙ্গে কাজের ফাঁক ফোকড় গলে কথা বলতো। কথা বলার জন্য তারেকের উৎসাহটা শুধু টের পেতাম কিন্তু অন্যকিছু বুঝিনি। আসলে এখন টের পাই আমি মুক্তি চেয়েছিলাম। মনের অবচেতনে আকাক্সক্ষা তৈরি হওয়াতেই ফাঁক গলে হাওয়ার মতো তারেক এসে ঢুকেছিলো। একদিন দুপুরবেলা বাসায় ফোন করলো তারেক। লাইব্রেরী রুমে ফোনটা বাজছিলো। আমি সামনের উঠানে পায়চারি করছিলাম। এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে, রিসিভার তুলতেই তারেক প্রশ্ন করেছিলো, কী, বন্যায় আটকে পড়া পিঁপড়ার মতো ঘরের ভেতরে পায়চারি করছেন তো? আজকের বিকেলটা খুব সুন্দর হবে। বেরিয়ে পড়ুন। ভালো লাগবে আপনার। তারেকের এসব কথা আপনাদের জন্য আহামরি কিছু নয় হয়তো। এরকম কথা গল্পে আর বাস্তবে আপনাদের অনেকেই অনেকবার শুনেছেন। কিন্তু আমার জন্য এরকম কথা নতুন। এরপর তারেক অনেক কথা বলেছিলো। কিন্তু আমার ভেতরে বার বার গুনগুন করছিলো ওর প্রথম বাক্যটা। এরকম ভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য কখনো কোনকালে কেউ বলেনি। আমার বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছিলো। চৈত্র মাসে ঝড়ের বাতাসে পাতা যেভাবে ঘর ছাড়ে তেমনি ভাবে।

তারেকের সঙ্গে এরপর আমার অনেক কথা হয়েছে টেলিফোনে। কিন্তু সেই বৃষ্টির বিকেলের কথা আমি কখনো ভুলবো না। আমি যখন বাসা থেকে বের হই তখন আকাশে মেঘের ছিটে ফোঁটাও ছিলো না। জাহান বেগম যাবেন তার এক বোনের বাসায়। আমাকে যেতে হবে দোকানে কয়েকটা জিনিশ কিনতে। সে সময়টাতে জাহান বেগম আমার সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। ছেলেমেয়ে না হওয়ায় আমার ওপর তার বিরক্তি ক্রমেই বাড়ছিলো। আমি কখনো মুখ খুলে তাকে বলতে পারিনি যে সমস্যাটা ছিলো তার ছেলের। বিয়ের পর থেকেই দেখেছি আমাদের যৌথ জীবনে শরীরের বিষয়টা রেজার কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করতো না। দু একবারের পর প্রক্রিয়াটি তাকে তেমনভাবে আর আলোড়িত করতো না। রাতে স্ত্রীর শরীরের রহস্য অনুসন্ধানের চাইতে বইয়ের মধ্যে বেশি গোসল করতে চাইতো রেজা। ফলে আমাদের মিলনের কোন ফলাফল ছিলো না। জাহান বেগম বিষয়টাকে আমার ব্যার্থতা বলে ধরে নিয়েছিলেন।

সেদিনও গাড়িতে বসে আমার সঙ্গে তিনি তেমন কথা বললেন না। তাকে মালিবাগে একটা বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে কিছুদূর এগুতেই সূর্যের আলোকে ঘিরে ধরলো কালচে বর্ণের মেঘ। গাড়ির কাচ তোলার আগেই ধুলোমাখা বাতাস ঝাঁপ দিলো ভেতরে। আমি যখন দোকানের সামনে পৌঁছলাম তখনও বাতাসের একতরফা দাপট চারপাশে। বৃষ্টি শুরু হয়নি। গাড়ি থেকে নেমে ভিড় ঠেলে শপিং সেন্টারের ভেতরে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেলো তারেকের সঙ্গে। দেখা হওয়ার পর আমি কী করেছিলাম, কী কথা হয়েছিলো আমাদের মধ্যে এখন আর মনে নেই। কিন্তু সেদিন তারেকের সঙ্গে গোটা শহরের মতো আমিও বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম মনে আছে। খামোখাই ঘটেছিলো ঘটনাটা। ড্রাইভারের চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা শপিং সেন্টার ছেড়ে বের হয়ে পড়েছিলাম রাস্তায়। কিন্তু আমার মনে আছে সেদিন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমার শরীরে যেন গান হয়ে বেজেছিলো। মেঘ গম্ভীর স্বরে ডাকতে ডাকতে আমার ভেতরে ছেলেবেলা হয়ে ঢুকে পড়েছিলো। শেষ চৈত্রে ভেজা মাটির গন্ধ আমার ভেতরে ওলটপালট করে দিয়েছিলো। সেদিনই বৃষ্টি শেষে একটা দোকানে বসে কফি খেতে খেতে তারেক দ্বিতীয় জীবনের কথা বলেছিলো। তারেকের কথা শুনতে শুনতে আমার যেন নেশা ধরে গিয়েছিলো। আমি ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে কোন দ্বীপের কথা, নারকেল গাছের সারির কথা, বালির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার কথা, আশ্চর্য নীল আকাশের কথা। সেখানে মানুষের আরেকটা জীবন আছে। সংসারের প্রতিদিনের মালিন্য থেকে মুক্তি আছে। সেখানে ভয়ার্ত রেজা নেই, জাহান বেগম নেই, নেই একটা তিনতলা বাড়ি, নেই কোন স্বজন। তারেক সেই দোকানের ভিড়ের মধ্যে বসে আমার হাত ধরেছিলো। আমি চমকে উঠিনি, অন্য পুরুষের স্পর্শ আমার পিপাসায় রুক্ষ হয়ে যাওয়া শরীরে আলাদা করে কোন বৃষ্টি নামায়নি। আমি খুব শান্তভাবে ভেজা কাপড়ে গাড়িতে উঠে আবার বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় জীবনের স্বপ্ন আমাকে এরপর অনেকদিন ভাবিয়েছে। সেদিন এক বিকেলে বৃষ্টি আর ঝড়ের ধাক্কায় সংসার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলাম। যে সামান্য সুতার সংযোগ সেখানে আমার ছিলো তা যেন এক ঝটকায় ছিঁড়ে গিয়েছিলো। আমি একা একা বসে এসব কথাই ভাবতাম। মাঝে মাঝে রেজাও জানতে চাইতো কী হয়েছে আমার। জাহান বেগমকে কখনো বলতে শুনেছি বউয়ের নতুন ঢং হয়েছে। কারো সঙ্গে কথা বলে না। আমি এখন ভাবি সেই দ্বিতীয় জীবনের স্বপ্ন কি আসলেই আমাকে স্পর্শ করতে পেরেছিলো? সেটা সম্ভব হলে এখন আমি যেভাবে জীবন যাপন করছি তা সম্ভব হতো কি? তারেক আমাকে ঠিক কোথায় নিয়ে দাঁড় করাতে চেয়েছিলো তা এখনো আমার বোঝার বাইরের বিষয়। কারণ ও আমাকে একভাবে দেখতে চেয়েছিলো আর আমি জীবনকে অন্যভাবে। ফলে আমার আর রেজাদের বাড়িতেও থাকা সম্ভব হয়নি। কারণ আমার মনের বন্ধ দরজাটা সেদিন বিকেলে খুলে গিয়েছিলো। তারেকও ব্যাপারটা বোধহয় বুঝতে পারেনি। পারলে পরে ওরকম একটা ঘটনা সে ঘটাতো না।

এখানে বলে রাখা ভালো, এরপর আমার সঙ্গে তারেকের অনেক কথা হয়েছে। আমাকে ছেলেটা অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছে। সেগুলো শুধু আমি যা বুঝতে চেয়েছিলাম তা বাদে আরও অনেক কিছু। একসময় তারেকের কথায় আমি একটা সুটকেস হাতে নিয়ে সেই তিনতলা বাড়িটা ছেড়ে এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছিলাম। তারেক বলেছিলো আমাকে সে নিয়ে যাবে সেই এক দ্বীপে। বাংলাদেশ থেকে প্লেনে দুবাই। তারপর দূরে আরও দূরে। বোকার মতো কাজ, তবু করে ফেলেছিলাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে সেদিন বিমান বন্দরে তারেকই আর আসেনি। অথবা বলা যায় আসার সাহস তার হয়নি। আসলে সে যা চেয়েছিলো ঘটনাটা ঠিক সেভাবে ঘটেনি। বলা যায় ঘটনাটা আমি সেভাবে ঘটাতে পারিনি। ফলে সেই সুটকেস হাতে আমি হাঁটতে হাঁটতে এই গলির ভেতরে আকাশকে মুখ দেখাতে ব্যর্থ বাড়িটা পর্যন্ত এসে পৌঁছে গেছি। কে জানে, এটাই হয়তো আমার দ্বিতীয় জীবনের শুরু।
=======================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ ইরাজ আহমেদ


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী

অপঘাতে মৃত্যু
‘অপঘাতে মৃত্যু’ কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সিঁথির। রিকশার হুড খোলা, গরম বাতাস চোখে মুখে লাগছে। উঠবার সময় কেন যে হুডটা টেনে দিতে বললো না! ধ্যাৎ এখন কামিজের নিচে ঘাম চিড়িবিড় করছে। রিকশা ট্রাফিক লাইটে এসে দাঁড়ালো, অবস্থা বেগতিক, রিকশায় রিকশায় ছয়লাপ যাকে বলে।  পাশের রিকশাটা এতো গায়ের উপর হুমড়ি খাওয়া যে মনে হচ্ছে ওরা কোনো বাড়ির উঠানে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। মানে পাশের রিকশার দু’জন যাত্রী আর সে নিজে। গল্প শুরু করে দিলে মন্দ হয় না। পাশেরজনটি তো আবার বেশ ঠারে ঠোরে তাকাচ্ছেন। কেন ভাই এইদিকে কেন, আপনার বান্ধবী তো খারাপ না দেখতে, কথাও নিশ্চয়ই বলতে পারেন, তাহলে আর এদিকে তাকানো কেন ভাই আমার।

‘এই যে রিকশাওয়ালা ভাই, হুডটা টেনে দেন তো।’

রিকশাওয়ালা কোমর থেকে আয়েশ করে গামছার গিঁঠ খুলে ঘাড় আর কপালের ঘাম মুছলো, থুক করে থুতু ফেললো রাস্তায়। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে, থুতুটা পড়লো নিজের পায়ের উপরেই–আর বিড়বিড় করে গালি দিলো। সিঁথির কেন যেন মনে হলো ওকেই গাল দিচ্ছে।

‘দেন না ভাই হুডটা তুলে।’

‘দিতাছি। একটু সবুর করন লাগে।’

হুডটা তো মাথার উপর উঠলো, কিন্তু এখন আবার বমি বমি লাগছে। জ্বর আসবো, আসি করছে গতকাল থেকে।

‘আসলে আয়, না আসলে বাড়িত যা।’

মনে মনে কথাটা বলে ফিক করে হেসে ফেললো সিঁথি। যাক লাল বাতি সবুজ হয়েছেন। রিকশা চলতে শুরু করেছে, এখন আবার চলতি হাওয়ায় ঠাণ্ডা লাগছে। কী বিপদ! ‘অপঘাতে মৃত্যু’ কথাটা আবার মাথার ভিতরে উঁকি দিচ্ছে। আসলে ব্যাপার কিছুই না। অতো আটঘাট বেঁধে চিন্তা করার মতোও না। আজ ক্লাসের ফাঁকে ভার্সিটির মাঠে বন্ধুরা সবাই মিলে যখন আড্ডা দিচ্ছিলো তখন বাউল লুকিং এক লোক এসে হাজির। হাফিজ সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, নাম বললো মিথুন। সে নাকি অচিরেই মহাজাতকের ভাত মারবে। বলা মাত্র আর যায় কোথায়, সিঁথিরা সবাই কই মাছের মতো খলবল করে উঠলো।
শেষমেশ তার ভাগ্যে কি না লেখা আছে অপঘাতে মৃত্যু। আচ্ছা অপঘাতে মৃত্যু মানে কি তাকে কেউ খুন করবে? না না, সে নিজেও তো আত্মহত্যা করতে পারে। অথবা এই রিকশাটা এখনই যদি উল্টে যায় আর সে যদি ছিটকে পড়ে আর একটা গাড়ি যদি তখন তাকে চিড়াচেপ্টা করে পালিয়ে যায়–তাকেও অপঘাতে মৃত্যু বলা যাবে। তাহলে তিনটা সম্ভাবনা–খুন, আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনায় মৃত্যু। এই সবগুলোকেই অপঘাতে মৃত্যু বলা যায়। সিঁথি এখন পারমুটেশন কম্বিনেশনে এগুবে কি না ভাবছে। মানে একে একে সম্ভাবনাগুলো বিবেচনা করে খারিজ করে দেয়া। কিন্তু রিকশাযাত্রী হিসেবে এতোটা সময় কি তার আছে?

‘এই যে রিকশাওয়ালাভাই গাড়ি ঘুরান। আবার ভার্সিটির সামনে যান, তারপর আবার এখানে আসেন। এইভাবে তিনবার, তারপরে যেখানে যেতে বলছি সেখানে যাবেন। বুঝছেন?’

সিঁথি নিশ্চিত আবারও রিকাশাওয়ালা তাকে গালি দিচ্ছে, যদিও মাথা নেড়ে বলেছে বুঝেছে।

‘চিন্তা কইরেন না, টাকা বেশি পাবেন।’

‘টেকা নিয়া এই বান্দা চিন্তা করে না।’

বললো বটে কিন্তু তাকে যথেষ্ট চিন্তিত দেখাচ্ছে। রিকশার প্যাডেল ঘুরাচ্ছে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। তারও মাথার ভিতরে কোনো বিষয় নিয়ে পারমুটেশন কম্বিনেশন চলছে বোধহয়।

আচ্ছা, যদি সে খুনই হয় তাহলে তাকে কে খুন করতে পারে?…

বহু চিন্তা করেও সিঁথির মাথায় কোনো নাম এলো না।

কিন্তু বীথির বর? সে কি সিঁথিকে খুন করবে? হাজার হোক সিঁথি তাকে নিজের দুটো জ্যান্ত চোখে কাজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে দেখেছে–আর এই কথাটা সে নিজের কাছেও দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করেনি। কিন্তু সে কথা তো আর সেই গুণধর পুরুষটি জানেন না।

হুম…বীথির বরের যথেষ্ট কারণ আছে তাকে খুন করার। ইচ্ছা করলেই তো সে তাদের সুখের সংসারে (বালের সংসার) লাঙ্গল চষতে পারে।

আচ্ছা, ক্লাস নাইনের সেই দেওয়ানা প্রেমিক কি তাকে খুন করতে পারে। হাজার হোক কাঁপা কাঁপা গলায় তো একবার বলেছিলো, আমি ছাড়া তোমার ওই চোখে কেউ চাইতে পারবে না, ওই ঠোঁট কেউ ছুঁতে পারবে না…।
 
তোমার দিকে অন্য কেউ তাকালেও আমি তাকে ধ্বংস করে দিতে পারি। অবশ্য অন্য কারও তাকাবার দরকার হয়নি সিঁথি নিজেই অন্যের দিকে তাকিয়েছে। সুতরাং ধ্বংস হবার পথঘাট তো সে নিজেই তৈরি করেছে। এই ভাবতে ভাবতে সিঁথি দেখলো ওর রকশা আর্ট কলেজ পার হচ্ছে। আল্লায় জানে রিকশাওয়ালা কতোবার চক্কর দিয়েছে। হঠাৎই সিঁথি দেখতে পায় শাহবাগের ঠিক গোল চত্বরের সামনে দিয়ে মানুষে বোঝাই লোকাল ট্রেন তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে। ‘আরে ভাই দাঁড়ান, দাঁড়ান, মারতে চান নাকি? ট্রেনটাকে যেতে দেন।’

‘কী কন?’

চোখের ধান্দা! এখানে ট্রেন আসবে কোত্থকে। কিন্তু সিঁথি যে স্পষ্ট দেখতে পেলো ট্রেনটাকে ছুটে যেতে। এই ট্রেনের নিচেই কি তার মৃত্যু লেখা ছিলো। ধ্যাৎ, এই ট্রেন তো আর সত্যি না, জ্বরের ঘোরে দেখা।

‘আফা, জুত কইরা বসেন, পড়লে তো ছাতু হয়া যাবেন।’

‘আপনেরে থামতে বলছে কে? চালান! আর গালি দিবেন না।’

‘ইয়া আল্লাহ, এইডা আফনে কী কন, গালি দিমু কেন?’

সিঁথি তার ভাবনায় ফিরলো। একটু হাঁসফাঁস লাগছে। জ্বরের কারণে না কি খুনীর লিস্টি ক্রমশই বাড়ছে সেই কারণে কে বলতে পারে।

ইস্ আর একটু হলেই ট্রেনের নিচে পড়ে ইহকাল সাঙ্গ হতো।

তাহলে সে খুনই হচ্ছে। সিঁথি নিজের জন্য দুঃখিত বোধ করে। আচ্ছা, খুনীর লিস্টি থেকে অনেক ছোট বেলার নিমাইয়ের মাকে সে বাদ দিলো কী মনে করে? ঈদের আগের দিনের কথা, বয়স খুব বেশি হলে সিঁথির তখন দশ কি এগারো। নানুর ব্যাগ খুলে দশ টাকা সে বেমালুম হাপিশ করে দিয়েছিলো। যখন খোঁজ পড়লো তখন শুরু হলো তুলকালাম কাণ্ড। একটা দশ টাকার জন্য বাড়িঘর মাথায় উঠলো। সিঁথি ভয়ে চোখ বন্ধ করে বলে দিলো, সে নিমাইয়ের মাকে টাকাটা নিতে দেখেছে। নিমাইয়ের মা পত্রপাঠ বিদায় হলো আর তার বেতন থেকে দশ টাকা কেটে রাখা হলো। শুধু ঈদের দাক্ষিণ্য হিসেবে মার খাওয়া থেকে সেই যাত্রা বেঁচে গেলো সে। এখনও সিঁথি নিমাইয়ের মা’র চোখ দুটো ভুলতে পারে না। চোখ দিয়ে যদি শেষ করা যেতো তাহলে সেদিনই সে খুন হতো। অপঘাতে মৃত্যু!  আত্মহত্যার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা দরকার, সিঁথি মনে মনে ভাবলো। কিন্তু সিঁথি ভেবে পেলো না কোন দুঃখে সে আত্মহত্যা করতে যাবে। যদিও নিজের ভোট নিজে দিবো, যাকে খুশি তাকে দিবো টাইপ একটা ব্যাপার আছে। মানে, নিজের জীবন নিজেই নিবো যখন খুশি তখন নিবো, এই আর কি! আত্মহত্যা করার মতো দুঃখ তার একেবারেই যে নেই তাও তো না। প্রেমে কঠিন ছ্যাক খাওয়ার জন্য সে আত্মহত্যা করতে পারে। অবশ্য ছ্যাক খেয়েছিলো দুই বছর আগে, সেই দুঃখে এখন আত্মহত্যা করাটা ঠিক হবে কি না সিঁথি বুঝতে পারছে না।
বড় হয়েছে মামার বাড়িতে, মামির পাখার বাড়ি খেয়ে খেয়ে। সেই দুঃখটাও তো কম না। মুশকিল হচ্ছে সেইজন্য মামির উপর সিঁথির কোনো রাগ বা আক্রোশ নেই। মামি বেচারাই বা কী করবে, মনের ঝাল কারও উপর তো ঝাড়তে হবে। কিংবা যেদিন বাবা মারা গেলেন। খুব ছোট হলেও তার স্পষ্ট মনে পড়ে বুকের কোথাও কী একটা বন্ধ হয়ে গেলো। সেটা কি শ্বাস না স্পন্দন এতোদিন পরে আর তা মনে পড়ছে না। সেই বেদনায় কি সে আত্মহত্যা করতে পারে না? অবশ্য কেন আত্মহত্যা করবে এই নিয়ে এতো মাথা ঘামাতে রাজি না সিঁথি। সেই গল্পের মতো–ওই যে, বাঘে ঘাস খায় না, কিন্তু যদি খায় তাহলে ঠেকায় কে।

অথবা ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় উজ্জীবিত হয়ে সে এমনি এমনিও আত্মহত্যা করতে পারে, কারণের ধার কে ধারে?

আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে ক্লান্ত–ক্লান্ত করে; লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই…।  কারণটা যে খুব বেশি জরুরি এখন আর তা মনে হচ্ছে না সিঁথির। আজকে রাতেও করা যায়। সিঁথি হালকা বোধ করে।

শালা, অন্তত মৃত্যুটা তো আমার হাতে!

ভিতরে একটা জোর পায় সিঁথি।

অবশ্য একটুক্ষণ আগে ট্রেনের নিচে কাটা পড়লেও ল্যাঠা চুকে যেতো।

পত্রিকার প্রথম পাতার কোণার দিকে একটা ছোট্ট নিউজ ‘ট্রেনের নীচে কাটা পড়া যুবতীর লাশ উদ্ধার’ বিস্তারিত খবরের জন্য আটের পাতার ২ নম্বর কলাম দ্রষ্টব্য।

লন্ডন, সেপ্টেম্বর ২০০৭
--------------------------------
সাদামাটা

সোহানার জীবনে একটা রহস্য আছে। এই নিয়ে আমরা কখনও কোনো কথা বলি না।   দু’দিন পর সোহানার বিয়ে। আজ ওর গায়ে হলুদ ছিলো। বরপক্ষ বিদায় হয়েছে। উফ্ বাঁচা গেছে। বত্রিশ পাটির দাঁত দেখিয়ে কথা বলতে বলতে আমাদের গাল ব্যথা হয়ে যাচ্ছিলো। অবশ্য সারাক্ষণই যে হাসাহাসি চলছিলো তা না, হাতাহাতিও প্রায় হবার যো হয়েছিলো। কিছুই না, বরপক্ষের মান্যগণ্য জঘন্য কোন খালাকে নাকি আমরা অপমান করেছি। হ্যাঁ, আমাদের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নাই। আরে বাবা, হলুদ দিতে আসছো সুন্দর মতো দিয়ে উঠে পড়। তা না উনি যেন ঘর লেপতে বসলেন। কপালে, দুই গালে তো দিলেনই–পারলে মিষ্টির বদলে মুখের ভিতরেও হলুদ ঠুসে দেন। এই যখন চলছিলো তখন আমরা বন্ধুরা শুধু চাওয়াচাওয়ি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু সেই বিশালদেহী মহিলা যখন একটা পুরো চমচম সোহানার গালের ভিতর ঢোকাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন তখন আর নাজনিন চুপ করে থাকতে পারলো না। ওর স্বভাবের বাইরে গিয়ে নরম করে বললো, ‘আন্টি এতো বড়টা ও খেতে পারবে না।’
তো সেই কথায় আমাদের আন্টি ভ্রুক্ষেপও করলেন না। তিনি যথারীতি তার কসরত চালিয়ে যেতে লাগলেন। তখনই শুধু নাজনিন ওর স্বভাব মতো বললো, ‘আন্টি ওর মুখের সাইজ দেখেন আর চমচমটার সাইজ দেখেন, এই চমচম কি ওর মুখের ভিতর ঢোকানো ঠিক হবে?’

আর এতেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। আমরা তার আঙুলের সমান হয়ে এতো বড় অপমান করলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষমেশ সোহানার মামার মধ্যস্থতায় ব্যাপারটার মীমাংসা হলো এবং আমাদের মাথা নত করে আন্টিমণির কাছে সরি বলতে হলো। এইসব নাটকের পর যখন এরা উঠলো–আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

আর এখন আমরা বন্ধুরা ওকে ঘিরে জমিয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে প্রথম দলছুট হবে একজন। কিন্তু তাতে কারও কোনো দুঃখ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

এমনকি সোহানাকেও দেখে মনে হচ্ছে না ওর কোনো দুঃখ হচ্ছে। দিব্যি সব বন্ধুদের সাথে সেও ক্যালাচ্ছে। তাই দেখে পিয়া ফোঁড়ন কাটলো, ‘এতো হাসিস না দাঁত পইড়া পা কাটবে।’

আমরা হাসতে হাসতে আরও পা কাটার ব্যবস্থা করলাম। আমাদের সাজের বহরও দেখার মতো হয়েছে। এর মধ্যে নীলারই একটু উসখুস আর মন খারাপ অবস্থা। শাড়ির সাথে ম্যাচ করে বহু খুঁজে-পেতে যাও বা একটা আংটি যোগাড় করেছিলো তাও ঠিক বের হবার মুহূর্তে পরে আসতে ভুলে গেছে। সেই খেদ ওর এখনো যায়নি। হলুদের অনুষ্ঠান প্রায় শেষ–তবুও না। একই প্যাঁচাল তখন থেকে পাড়ছে। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে নাজনিন বলেই ফেললো, ‘এই একটা আংটির জন্য মরাকান্না কাঁদিস না তো। আংটিটা পরলেও তোকে এখন যা লাগছে তাই লাগতো–শাকচুন্নি।’

এই কথায় কই আমরা একটু প্রতিবাদ করবো তা না সবাই নাজনিনের কথায় সায় দিয়ে উঠলাম। বেচারা নীলাটা এখন মুখ ভার করে আছে। অবশ্য বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না। একটু পরেই আবার মরাকান্না জুড়বে। সব সময়ই কিছু না কিছু নিয়ে তার কমপ্লেন করতেই হবে। অসহ্য।

আরে, সোহানাকে তো আজ শাড়িটায় খুব মিষ্টি লাগছে। যদিও আমরা ছেলের বাড়ির সব জিনিসের মধ্যেই খুঁত ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিছুই আমাদের পছন্দ হয়নি। বিশেষ করে শাড়িটা। হলুদের শাড়ি হলুদ তো হবেই তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই, কিন্তু এমন বাজে হলুদ এর আগে আমরা আর কখনও দেখি নাই। তানিয়া বললো, ‘নেহায়েত আমরা সুন্দরী নইলে এই শাড়িতে আজকে খবর ছিলো।’
 
এদিকে সোহানার এক কাজিন এসেছে বিদেশ থেকে। বেচারা এতোগুলো মেয়ে দেখে আর অন্য কোথাও যেতে পারছে না। এদিকেই কেমন আঠার মতো লেপ্টে আছে। তাকে নিয়ে আমরা বেশ মজা করছি। বেচারা আমাদের মাঝখানে পড়ে ভোদাই বনে গেছে।

তানিয়ার মতে, চোখ ট্যারা হয়ে গেছে। তাই শুনে নাজনিন বললো, ‘চোখ ট্যারা হবে না–একই সঙ্গে বাপধন এতোগুলা সুন্দরী এবং মুসলমান মেয়ে কই পাবে।’

আমরা সবাই আবার একচোট হাসলাম। সবচেয়ে জোরে হাসলো সোহানা নিজেই।

আমাদের মধ্যে নাজনিনের একটু মুরুব্বি মুরুব্বি ভাব। খুব বিরক্ত হলো সে।

‘তুই এতো খ্যাক খ্যাক করে হাসছিস কী মনে করে? তোর না আজকে বিয়ে। আজকে অন্তত একটু লজ্জা শরম রাখ।’

‘হ্যাঁ, দয়া করে দাঁতগুলা মুখের ভিতরেই রাখেন ম্যাডাম।’ আমি বললাম।

‘একি তোদের সামনেও হাসতে পারবো না? তোরা তো আমার বন্ধু।’

‘বন্ধু বলে কি আমরা মানুষ না।’

নীলা মন খারাপ ভাবটা আর বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না। ফিক করে হেসে দিয়ে বললো, ‘দ্যাখ দ্যাখ, আমাদের বিদেশী ভাইয়া নাজনিনের দিকে কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। চোখ দু’টা তো কোটর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।’

‘একটা বাটি হাতে দিয়ে আয়। পড়লেই যেন টুপ করে ধরতে পারে। এই বাজারে চোখ হারালে চোখ কই পাবে।’ খুব গম্ভীর হয়ে পিয়া বললো। আর নীলা বেশ সহজ ভাবে উঠে গেলো।   ‘এই, ও কি সত্যি সত্যি বাটি আনতে গেলো নাকি?’ আমি জিগ্যেস করেই বুঝলাম এই প্রশ্নের কোনো মানেই হয় না। অবশ্যই বাটি আনতে গেছে। খালা মানে সোহানার মা এসে আমাদের সবার সামনে বিশাল তেহেরির ডিশ ধরিয়ে দিয়ে গেলো; আমরা নাকি ঠিক মতো কেউ খাইনি আগে। সোহানা বললো, ‘এই আমাকে তোরা কেউ একটু খাইয়ে দে না। খুব খিদা লেগেছে।’ ‘এখন তো ছেলের পক্ষের কেউ নাই, এখন নিজে খা।’ নাজনিন বললো।
‘এখন নিজে খা মানে, ও তো সারাক্ষণ খাচ্ছিলোই।’ আমি বললাম।
‘হ্যাঁ, খাচ্ছিলাম, কিন্তু যা খেতে চাচ্ছিলাম সেটা কেউ দিচ্ছিলো না। আর তোরা এতো মিন কেন? আমার মনে হয় আমার তোদের আগে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে তোরা হিংসায় মরে যাচ্ছিস।’
ঠিক এই সময় আমাদের নীলাটা একটা বাটি হাতে ফিরে এলো আর আমরা মজা দেখার জন্য সবাই চুপ করে গেলাম। নীলা খুবই গোবেচারা ভঙ্গিতে বাটিটা বিদেশী ভাইয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
‘আমার বোল লাগবে না, থ্যাঙ্কস।’
‘না, না, বাটিটা হাতে ধরে থাকেন–কখন কাজে লাগে বলা তো যায় না।’
এই কথায় আমরা সবাই হাসতে হাসতে শেষ। এবার সোহানা আর ভাইয়ের পক্ষ না নিয়ে পারলো না। ‘তোরা থাম তো! শাহরিয়ার ভাইয়া আসো, আমার পাশে এসে বসো।’
‘ইটস অকে। আমি ইনজয় করছি।’
আমরা সবাই তখন বেশ মজা করে সেই বিশাল ডিশে হাত ডুবিয়েছি। নাজনিন সোহানাকে দাবড়ানি দিলেও এখন ঠিকই খাইয়ে দিচ্ছে।
‘এই পিয়া কই যাস?’ নাজনিন জিজ্ঞাসা করে।
‘পানি আনতে।’
‘কয়েকটা কাঁচামরিচ নিয়ে আয় না।’
‘আম্মা, সালাদ কি শেষ হয়ে গেছে? ইশ সালাদ হলে খুব জম্পেশ করে খাওয়া যেতো।’
‘বেশি জম্পেশ করে খাওয়ার দরকার নাই। ধুমসি তো হচ্ছেন দিনকে দিন।’ আমি বললাম, বলেই বুঝলাম কী ভুল করলাম। ভিমরুলের চাকে ঢিল মারলাম। ‘এই তুই আমাকে কথাটা বললি, তাই না? আচ্ছা, আমাকে কি আজকে বেশি মোটা লাগছে, বল না, বল না? এই শাড়িটা একটু ফোলা ফোলা তাই না?’
‘নীলা, আর একবার ঘ্যান ঘ্যান করবি তো সিরিয়াস মার খাবি।’ তানিয়ার কড়া ধমক খেয়ে নীলার গলার আওয়াজ মিন মিন হয়ে গেলো। আমাদের বিদেশী ভাইয়া দেখি বাটিটাকে এরই মধ্যে কাজে লাগিয়েছেন।  বাটিতে বেশ আরাম করে তেহারি খাচ্ছেন আর কায়দা করে এমনভাবে চেয়ার ঘুরিয়ে বসেছেন যেন নাজনিনকে ভালোভাবে গিলতে পারেন। ভদ্রলোকের দেখি কঠিন পছন্দ হয়েছে নাজনিনকে। সোহানাকে খাওয়ানো শেষ করুক তারপর ওকে নিয়ে পড়া যাবে।

‘কে কে বোরহানি খেতে চাও?’ এক হাতে বোরহানির জগ উঁচু করে ধরে খালা জানতে চাইলেন। আমরা সবাই সমস্বরে খেতে চাইলাম।

খাওয়া দাওয়া চুকলো। একে একে সবাই বিদায় নেয়ার জন্য তৈরি হলো। আগামীকাল অনেক কাজ। ছেলের বাড়িতে হলুদ। আমরা সবাই যাবো। আজ আমরা পরেছিলাম গঙ্গা যমুনা শাড়ি। কাল পরবো কাঁথা স্টিচ। বন্ধুদের মধ্যে শুধু আমি থেকে গেলাম সোহানার সাথে। ওরা চলে যেতেই ছোট্ট ফ্ল্যাটটার উপর ক্লান্তি নেমে এলো। বিদেশী ভাইয়া উঠে গেলেন, খালা আমাদের কাপড় বদলাতে তাড়া দিলেন। কিন্তু আমার আর সোহানার কিছুই করতে ইচ্ছা করছিলো না। তারপর এক সময় ওর বেণীবাঁধা চুল আলগা করতে শুরু করলাম। ফুলের গয়না খুললাম, কাঁচের চুড়ি, কানের দুল। এই নিষ্পাপ হুল্লোড় আর অযথা পচানো তাহলে শেষ হচ্ছে। এই দুই জীবন আর কখনও মুখোমুখি হবে না এই উপলব্ধি সোহানাকে কিছুক্ষণ ম্লান করে রাখলো।
 
আবারও এক চোট বকা খেয়ে আমরা বিছানা করতে উঠলাম। বকার অবশ্য সিংহভাগ আমিই খেলাম। বিয়ের দু’দিন আগে খালা মেয়েকে প্রাণেধরে আর বেশি কিছু বলতে পারলেন না। মেঝেতে বিছানা পাতলাম, মশারি টাঙ্গালাম তারপর সোহানাকে বললাম, ‘শুতে আয়।’

‘শীলা?’

‘হু?’

‘ঘুমিয়ে পড়েছিস?’

‘হুম।’

‘বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে কার মতো হতো দেখতে?’

এই প্রশ্নে রাত আরও গভীর হয়ে নামলো। জানালা গলে একফালি চাঁদ মশারি অগ্রাহ্য করে হুঁটোপুটি খেলো মেঝের বিছানায়। আমরা শুয়ে থাকলাম। সোহানার কথা জানি না। ওর পিঠ আমার দিকে ফেরানো। শুধু আমার চোখ থেকে পানি পড়ছিলো অকারণে।

লন্ডন, অক্টোবর ২০০৭
=========================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ লীসা গাজী


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান

শিয়রে পাহারায় হাজেরার উপস্থিতিতে কোনো সর্তক সংকেত ছাড়াই তার বাপ মারা গেছেন। সারারাত চোখ দুটোকে এতটুকু নিদ্রা-ছুটি না দিয়ে সার্চ লাইটের মতো জ্বালিয়ে রেখেছিল হাজেরা। কিন্তু তারপরও বাপের চলে যাওয়া টের পায়নি। কারণ শেষ রাতের দিকে উপোসী চোখে তন্দ্রা এসে সহজেই আসন পাতে। চোখের পাতা পরস্পরকে চুম্বনে জড়ায়। এসময় সুযোগ-সন্ধানী জান বাপের দেহ ছেড়ে চিরদিনের জন্যে পালায়।

তন্দ্রা যখন কাটে তখন ঘরের বাইরে আলো এসে দাঁড়িয়েছে। হাজেরা বাপের গায়ে হাত ছুঁইয়ে দেখে তা বরফ ঠাণ্ডার কবলে চলে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে মা মা চিৎকারে গলা ফাটায়। হাজেরার মা চাচের বেড়ার ওপাশ থেকে ছুটে এসে সোয়ামির নিথর দেহের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন ‘হায় আল্লা গো, তুমি কী করলা, মুই এহন হাজেরারে লইয়্যা কই যামু? তুমি মোরে গাংগে বাসাইয়্যা দিলা।’

কিছুক্ষণ আগে মুর্দা ঘর থেকে উঠানে নামানো হয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশিরা তার চারধারে চাক বাধা। পাশের বাড়ির আলিমুদ্দি, হাজেরার বাপের জ্ঞাতি ভাই, কোলার কাম মুলতবি রেখে মুর্দার কামে লেগে পড়েছেন ‘হাজেরা! তুই তোর মায়রে সামাল দে। হ্যায় তো চোহের পানিতে গাংগ বানাইয়্যা ফালাইতাছে। মুই দেহি, দাফনের কী করা যায়। রহমইত্যারে কাপুর আনতে হাডে পাডাইছি।’
কিন্তু হাজেরা বাপ মানে কফিল মিয়ার কাছে পাওনা টাকার মায়া করিম শেখকে উঠানে ছুটিয়ে আনে। দু’পায়ে তার কুলায় না, তিন পায়ে, বাঁকানো লাঠির গোছায় ভর করে তিনি উঠানে পা দিয়েই হাজেরাকে খোঁজেন ‘কফিলের মাইয়্যা কই? আহা! মাইয়্যাডা এতিম অইয়্যা গ্যালো।’ করিম শেখ ফজরের নামাজের তলানী, দোয়া-দরুদ অজিফা পাঠ, তাতে শেষ চুমুক দিয়ে স্বাস্থ্যোদ্ধারে বের হন। ঢাকাবাসী বড় ছেলে ও তার বউয়ের কাছ থেকে সবক নিয়ে আসার পর এ নতুন অভ্যসে তার হাতেখড়ি হয়েছে। ছেলে-বউ প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই বাসা থেকে বের হয়। দালান-কোটার রাজ্যে ফ্রেশ বাতাসের লোভ তাদেরকে তিন কিলো দূরের পার্কে নিয়ে যায়। ‘হাউস’-এর পাল্লায় পড়ে করিম শেখও একদিন তাদের সঙ্গ নেন। পার্কের দরজায় গাড়ি থেকে নেমে সাত-সকালে মাছের পোনার মতো মানুষে গিজগিজ করা পার্ক দেখে তার চোখ ছানাবড়া। ঢাকা শহরের সব মানুষ তাহলে অসুস্থ। সুস্থ হওয়ার জন্য সকালের ঘুম হারাম করে পার্কের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। তিনি ছেলে ও তার বউয়ের পিছে পিছে পার্কের বুকে আড়ে-দিঘে বিছানো কংক্রীটের ফিতা, সিমেন্ট-বাঁধানো রাস্তায় পা দেন। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই শ্বাস তাকে চেপে ধরে। ঘন ঘন শ্বাস ওঠে। শেষে অনভ্যসের কাছে হার মেনে কংক্রীটের চেয়ারে বসে রেস্ট নেন। আর জগিং পড়া না পারা ছাত্রের মতো ছেলে আর তার বউকে পার্কের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরায়।

এক মহিলা করিম শেখের সামনে এসে দুটোদিন বেশি বাঁচার জন্য হাজারো রকম কসরত শুরু করে। ডানে বামে শরীর বাঁকালে তার পেন্ডুলাম-বুক দোল খায় কয়েকবার। একবার ডান পা উঁচু করে একবার বাম পা। তখন পোশাক ভেদ করে দু’পায়ের সন্ধিস্থল যেন হা হয়ে করিম শেখের দিকে তাকাতে চায়। শেষে সামনের দিকে ঝুঁকলে ঢিলেঢালা জামা-কাপড়ের ভেতর ওলান দুটো অবাধ্য হয়ে পড়ে। করিম শেখের নাক ছুঁয়ে যায়। আহা! কী সুন্দর সুবাস, নামাজ পড়তে তো সকালে উঠতেই হয়, প্রত্যেক দিন আসতে অসুবিধা কী?

বাসায় ফেরার পথে ছেলেও সায় দেয় ‘বাবা! তুমি তো বাড়িতেও সকালে হাঁটাহাঁটি করতে পারো। গ্রামে সকালে কী ফাইন ক্লীন এয়ার। তোমার হার্ট ভালো থাকবে। দ’ুমাস পরপর ঢাকায় এসে ডাক্তারের পিছে গুচ্ছের টাকা ঢালতে হবে না।’

ছেলে তার দ্বিগুণ উপরিতে সাজানো মোটা মাইনের বড় অফিসার। দুই ছেলেমেয়ের জন্য এখনই আলাদা ফ্লাট কিনে রেখেছে। এ মাসে জাপান তো আগামী মাসে লন্ডনে তার কনফারেন্স-বক্তৃতা লাইন দিয়ে আছে। তার কথা কি হেলায় ফেলানো যায়। তাই এখন ফজরের নামাজের পর গ্রামের রাস্তা করিম শেখের নিয়মিত পদচারণায় ধন্য হয়। বৃষ্টি-বাদলার দিনে অবশ্য সে সুযোগ থাকে না। রাস্তা-ঘাট সব পানি-কাঁদার দখলে চলে যায়। তাই বাড়ি থেকে ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তা পর্যন্ত নিজের টাকায় ইট বিছিয়ে কাদা-পানির বসতি গড়ার সব সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্ষার দিনে তাতে কয়েকটা চক্কর মেরে দুধের স্বাদ তাকে ঘোলে মেটাতে হয়।

হাজেরার বাপের মৃত্যুর খবর আসে আজ প্রথম চক্করে। রহমতের মুখ থেকে। ফলে দ্বিতীয় চক্করের পাল্লায় না পড়ে হাতের বাঁকানো লাঠিটা একমাত্র সঙ্গী করে ছুটে এসেছেন। হাজেরা সামনে এলে তার মাথায় হাত বুলান করিম শেখ ‘আহা! খুব ভালা মানু আছিল তোর বাপ। ময়-মুরব্বিরে খুব মানছে। যহন যা কইছি মুক বুইয্যা হেয়া হুনছে। কোন দিন মুহের উফর কতা কয় নাই। আল্লা হেরে বেহসতো নসিব করবো।’ হাজেরাও বাপের মতো বোজামুখে মাথা নিচু করে করিম শেখের কথা হজম করে। এ সুযোগে করিম শেখের চোখ জোড়া একবার পুরো বাড়ি ঘুরে আসে। কফিল্যার কাছে পাওনা টাকাটার কী হবে? ওর বউ তো আধপাগলা। আবার পোলা তো ভাগ্যে জোটে নাই। যা বলার মেয়েটাকে বলতে হয় ‘শোন দুখ্খো পাইস না। আল্লায় তোর বাপরে ভালা করবে। তয় হুজুররা কয় দাইক-দেনা রাইখা গ্যালে গোর আজাব অয়। তোর বাপের নাহান ভালা মানসের গোর আজাব অইবো, হায়! আল্লা।’

করিম শেখের মুখের দিকে তাকায় হাজেরা। বাপে কার কাছে কী ধার-দেনা রেখে গেছে তার কিছুই তার জানা নেই ‘মুই তো কিছুই জানি না কাহা!’ করিম শেখ সঙ্গে সঙ্গে হাজেরার কথায় সায় দেন ‘তুই জানবি ক্যামনে ক’। খুইব ছবুরঅলা মানু আছিল তোর বাপ। নিজের কতা কাউরে কয় নাই। মোর কাছ থাইতা পাচশো টাহা নিছিল। কতো তকলিফ করছে কিনতুক দিয়া যাইতে পারে নাই। আহা!’ অসহায়তা হাজেরার হাত-পা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া তখন আর কিছু থাকে না ‘গরে তো এ্যাকটা পয়সাও নাই। এহন দিমু কোনহান থন, কাহা।’ করিম শেখ আরো এক পা আগান হাজেরার সহায়তায় ‘হেয়া কী মুই বুজি না বোজ্জো। ব্যারাম তো টাহাগুলা হগোল গিল্যা খাইছে। টাহা থাকপে কোত্থাইকা। তয় তোগো গরে দুইডা পিতলার কলসি আছে না?’

হাজেরা অবাক হয়। বাপের অসুখের ক্ষুধা মেটাতে ঘরে কাসা-পিতলের যে কয়টা বাসন-কোসন ছিল তা অনেক আগেই ফজল মহাজনের দোকানে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। নিজেদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কষ্ট সীমা ছাড়ালেও কলসি দুটো মায় আগলে রেখেছে। আফালের কোণায় ছালার চটের ঘোমটায় আড়াল করা আছে। কিন্তু করিম কাহা তা দেখলেন কীভাবে? তার চোখ ঘরের আঁতিপাঁতির মধ্যে গেল কেমনে? হাজেরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেলেও করিম শেখের কাছে ঠিকই আছে ‘তোর বাপে কইছিল, মাতোব্বর সাব ভাইবেন না, মোর গরে দুইডা পিতলার কলসি আছে। টাহা দিতে না পারলে হেই দুইডা দিয়া উসুল কইর‌্যা দিমু। হোন, মুই বারি যাইয়্যা আজিজ্জারে পাডাইয়্যা দিতাছি। অর আতে কলসি দুইডা দিয়া দিস, বোজ্জো।’

করিম শেখের কথা শেষ হতেই ভটভট গলায় একটা মটর সাইকেল উঠোনের কোণে এসে দমবন্ধ করে। তার কালে জীন পরানো পিঠ থেকে নামেন খালেক চেয়ারম্যান। করিম শেখ তার বছর ঠিকা কামলা আজিজকে তাড়াতাড়ি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ির পথ ধরেন। দু’বছর আগে ইলেকশনে হারার পুরোনো লজ্জাকে আবার উঁকি মারার সুযোগ না দেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানের কাছে মুখ লুকাতে তার বাড়ি ফেরার তড়িঘড়ি ভাব হাজেরার চোখও এড়ায় না।

খালেক চেয়ারম্যান চরদখলের মামলায় হাজিরা দিতে সদরে যাচ্ছিলেন। দখলের সঙ্গে একটা খুন থাকায় ফেঁসে গেলে ফাঁসি মাফ করলেও যাবজ্জীবন তা এতটুকু করবে না। তখন জীবনভর জেলে পচতে হবে। তাই দ্বিতীয় বউয়ের নবীন অঙ্গের ওম ছেড়ে সাত-সকালেই সদরের উদ্দেশ্যে তার যাত্রা। কোর্ট বসার আগেই উকিলের সঙ্গে শলা-পরামর্শের ব্যাপার আছে। কিন্তু বাজারে উঠেই রহমতের হাতে সাদা থান দেখে জিজ্ঞেস করেন ‘মরল কেডা, কাফনের কাপুর কার লইগ্যা?’ রহমত হাজেরার বাপের কথা বলতেই চেয়ারম্যান বাকি কথাবার্তায় কোনো গোজামিল ঢোকার সুযোগ গলা টিপে বন্ধ করে দেন। থেমে যায় মটর সাইকেলের ভটভটানি। তখন স্পষ্ট করে জানতে চান, ‘তুই জানোস, কফিল কাহারে গোর দেবে কোনহানে? রহমত শোনা কথা জানায় ‘আলিম কাহায় কইল, বারির উত্তারদারে বাঁশঝাড়ের বগলে গোর দেবে। হেহানে গোর খোরতে কইল।’
 
রহমতের কথা চেয়ারম্যানের সদরে যাওয়া মাথায় ওঠায়। মামলা ভাগ্যে যা লেখে তাই হবে। উকিলকে একটা মোবাইল করে দিলে নতুন ডেট নেবে। কিন্তু কফিল কাহারে বাড়িতে গোর দিলে আর সরানো যাবে না। তা বাড়ির মাঝখানে একটা জঞ্জাল হয়ে থাকবে। বাড়িটাকে ডেভলপ করার পথে একটা ‘আউড়্যা’ বাঁশ হয়ে দাঁড়াবে শেষে। চেয়ারম্যানের ১০০ সিসির যন্ত্রযান মুখ ঘুরিয়ে হাজেরাদের বাড়ির পথ ধরে।

বছর দুই আগে বন্যা হাজেরাদের ঘর-দুয়ার সব হাতিয়ে নেয়। ইউনিয়ন পরিষদে ত্রাণ দেওয়ার খবর পেয়ে হাজেরার বাপ লাইনে দাঁড়ান। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পিড়পিড়ে বৃষ্টির অত্যাচার সহ্যের পর তার পালা এলে চেয়ারম্যান হাত গুটিয়ে নেন ‘কাহা! এ্যাই টিন অইলো গরীব-গুরাগো লাইগ্যা। তোমারে দেই ক্যামনে কও? আর দূরের অইলেও তুমি অইলা মোগো জ্ঞাতি। এহন তোমারে টিন দিলে মাইনসে কী কইবো। তোমার গরের টিন লাগলে কাইল বেয়ানে মোগো বারিতে আইও, মুই টিনের বেবস্তা কইর‌্যা দিমু আনে। এহন বারি যাও।’

পরদিন সকালে হাজেরার বাপ চেয়ারম্যানের বাড়িতে গেলে মুখের ওপর সান-বাঁধানো সিঁড়ি-চেয়ারে সাজানো কাচারি ঘরে তাকে বসতে দেওয়া হয়। বাড়ির ভেতর থেকে চেয়ারম্যান এসে নিজে হাজেরার বাপকে ডেকে তার টেবিলের সামনের চেয়ারে বসান। তারপর টিনের ব্যবস্থা করেন ‘কাহা এ্যাইহানে একটা সই দাও। হেরপর টিন কেনার লাইগ্যা টাহা যা লাগে লও। টাহা লইতে না চাইলে হায়দাইর‌্যার আড়ত থাইকা টিন লইয়্যা যাও, মুই কইয়্যা দিমু। দাও সই দাও। এহানে বেশি কিছু লিহি নাই। দ্যাহো, লিকছি, তিন খন্দের মইদ্যে ফেরত দেওনের কতা। হেরপর বারিগরের কতা আচে।’

কফিল কাহা বেঁচে থাকতেই দুই খন্দ পার হয়ে গেছে। আর এক খন্দ পর বাড়িটা হাতে চলে আসবে। ধানের কল বসানোর জন্য একেবারে পারফেক্ট জায়গা হবে তখন। সামনে ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তা, হোকনা কাঁচা, ভ্যান-রিক্সা চলে নিয়মিত। চেয়ারম্যান থাকতে থাকতে ইটের বাঁধাই করে দিতে হবে। আবার পেছনে খাল। চর তার দুইপার দখলে নিলেও এখনো গয়নার নৌকা ট্রলার চলে বারোমাস। যার ইচ্ছা ভ্যানের পিঠে চাপিয়ে ধান নিয়ে আসবে, যার ইচ্ছা নৌকা-ট্রলারের পেট পোয়াতি বানিয়ে আনবে। ধানে ধানে সয়লাব হয়ে যাবে পুরো কলবাড়ি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কল বস্তা বস্তা ধান গিলবে আর চাল ওগরাবে ঝুরঝুর করে। তারপরও তার খিদা মেটবে না। বড় মুখঅলা বড় পেটঅলা কলের ব্যবস্থা করতে হবে। দিনমান এতোসব তদারকি করা তো নিজের সম্ভব হবে না। আটটা ওয়ার্ড নিয়ে পেট মোটা ইউনিয়ন, একা একা সামাল দেওয়া চাট্টিখানি কথা। তারপর আবার কলে বসার সময় কোথায়। একজন ম্যানেজার পুষতে হবে। রাতদিন পাহারা দেবে, টালি খাতা আগলাবে। ব্যাটা হয়তো দু’চার টাকা হাতসাফাই করবে। করুক, কতো আর নেবে। তারপরও যা থাকবে বাড়ি ফেরার পথে প্রতিদিন তার হিসেব-নিকেশ বুঝে নিলেই চলবে। কিন্তু সব কিছুর আগে কফিল কাহার বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে হবে। দুবছর ধরে এতোগুলো টাকা হজম করে আছে। মরার পর এখনো যদি চিরদিনের জন্য বাড়িতে আসন গাড়ে, যুগ যুগ ধরে পৈত্রিক ভিটার মায়া না ছাড়ে, তাহলে তো টাকাও যাবে বাড়িও যাবে। ভাবতে ভাবতে চেয়ারম্যানের পথ ফুরিয়ে আসে। আম ও ছালা উভয়ই হারানোর লকলকে আশঙ্কায় হাজেরাদের উঠানে নেমেই তিনি আলিমুদ্দিরে খোঁজেন।

মুর্দার গোসল আধাবুধি রেখে আলিমুদ্দি ছুটে আসে ‘আছ্ছালামু আল্কাুম, চেহারমান সাব।’ সালামের উত্তরের পিছে না ছুটে খালেক চেয়ারম্যান মুর্দার বাড়িতে স্বর উঁচু না করার রেওয়াজটুকু মগজে থিতু থাকায় নিচু স্বরে আলিমুদ্দির ওপর ধমকে ওঠেন, ‘তোমরা কী আক্কেল ধুইয়্যা খাইছো অ্যাঁ, কাহায় মরছে কহন, মোরে একটা খবর দিলা না। বাজারে রহমইত্যা কইল, সদরে মামলায় যাওন থুইয়্যা ছুইট্যা আইলাম। হাজেরা কই, হাজেরারে বোলাও।’

হাজেরা সামনে এসে দাঁড়ালে চেয়ারম্যানের মুখে আশ্বাসের ধারা বয়, ‘ভাবিস না, মুই আইয়্যা পরছি। আহা! কী শান্তো আছিল কাহা, রাগ-ঝালের বালাই আছিল না মোডে। পরিষদের দরজায় দেকছি খাড়াইয়্যা রইছেন, মুই কতা কওনের সোময় পাই নাই। পরদিন দেহি আবার খাড়াইছেন। মুহে এ্যাকটু রাগ নাই।’ আলিমুদ্দির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, ‘কাহায় আছিল গাজীগুষ্টির মইদ্যে সেরা মানু। হ্যারে বাঁশবোনের তলে গোর দিলে হ্যার ইজ্জত থাহে কও। হ্যারে গোর দিমু গাজীগুষ্টির গোরসতানে। বাঁশঝারে গোর খোরতে মানা হরো।’

চেয়ারম্যান আদি গাজীবাড়ির লাগোয়া মজগুনি কবরখানার দিকে ছোটেন। গোরের ব্যবস্থা যত তাড়াতাড়ি করা যায় তত ভালো। কে আবার কোন ফ্যাকড়া খাড়া করে, গ্রামে তো হালি-হালি আবজা-গোবজা মাতুব্বার ঘুরে বেড়ায়। করিম শেখরে দেখলাম হাজেরার পিঠেপিঠে ঘুরঘুর করছে। কখন কোন কান ভাঙ্গানি দেয় বলা যায় না। ইলেকশনে নাস্তানাবুদ হয়ে এখন পাছদুয়ারে পাছদুয়ারে ঘাপটি মেরে থাকে। চান্স পেলেই ল্যাং মারার তালে আছে।

হাজেরা আবার বাড়ির ভেতরে ঢোকে। বার্ধক্য রোগের সূক্ষ্মশলায় বিদ্ধ হয়ে হাজেরার বাপ বেশ কিছুদিন আগে বিছানা নিয়েছিলেন। জীবন-মৃত্যুর দোলাচল চলেছে তখন, আজ যায় কাল যায় করে করগোনার শেষ দিনও পাড়ি দিয়েছিল। ফলে হাজেরার শোক-কান্না পানসে হতে হতে আমানিতে এসে ঠেকেছে। তাও সকালে মা মা চিৎকারে তার পাতে তুলে দেয়। তাই শোক-তাপে কাতর চাচী-ফুফুদের মুখে মুখে ফেরে, ‘দ্যাখছো! কী রহম শকতো ম্ইায়্যা, বাপ চইল্যা গ্যালো হ্যার পরও চোহে এ্যাক ফোডা পানি নাই।’

কিন্তু মার কান্নাকাটিতে ভাটির কোনো লক্ষণ নাই। একটানা গুনগুনের স্রোত চলছে তো চলছেই। বিছানা নেওয়ার পর হাজেরার মা-ই সোয়ামির শিয়রে থাকতেন। অনেকদিন ধরে ঘুমকে ফাঁকি দেওয়ায় গতরাতে সে ঝাপটে ধরে। চোখ ভেঙে ঘুম আসে। মেয়েকে ডেকে বলেন, ‘আইজ রাইতটা তুই তোর বাজানের লগে থাক। মোর শরীলডা ভালো ঠ্যাকতাছে না।’ মেয়েকে সোয়মির কাছে রেখে তিনি পাশের ঘরে হোগলাপাতার চাটাইয়ে শরীর এলিয়ে দিয়েছিলেন। সোয়মির চলে যাওয়ার সময় তার কাছে ছিলেন না। তাই কিছুক্ষণ পরপর তার বিলাপের পদ বদল হয়, ‘যাওনের সোমায় মুহে এ্যাক ফোডা পানি দিতে পারলাম না। মুই ক্যান মরনের গুম গুমাইতে গ্যালাম। হায় আল্লা! মোরে রহম হরো।’

এখনো তার বিলাপ চলছে। হাজেরা দু’একবার তা বন্ধ করার চেষ্টা করেছে, ‘মা তুমি কী শুরু হরলা? কানলে কি বাজান ফিইরা আইবো? থামো, কানলে বাজানের রুহু কষটো পাইবে।’ হাজেরার কথায় বিলাপ কিছু সময়ের জন্য ফোতফোত কিংবা গুনগুনে রূপান্তরিত হলেও এখন আবার যে-ইকে সে-ই। ঘরের কোণে বসে ঘোমটায় নাক-চোখ ঢেকে বিলাপ করে চলছেন।

তার কাছে বসে দুটো সান্ত্বনার কথা বলারও কেই নেই। সে দায়িত্ব হাজেরা নিজের কাছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আগায়। কিন্তু উঠান থেকে ভেতরে পা দিয়ে এনজিও আপাকে ওঁৎ পেতে থাকা দেখে মনে শঙ্কা ফাল দেয়। মহিলা ঝোলা সঙ্গী করে সপ্তাহে সপ্তাহে আসেন। তার ঝোলায় পোড়া থাকে সুন্দর সুন্দর কথা, আয়-উন্নতির ফুলঝুড়ি, একটা রুইলে দুইটা গজাবে। কিন্তু কিস্তিতে মাফ নাই। বাজান কোলায় থাকলে কিংবা দিতে দেরি হলে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষার পর কিস্তি নিয়ে তারপর বাড়ি ছাড়েন। আজ আবার কেন এসেছেন। বাজান বিছানা নেওয়ার পর কিস্তি দেওয়া হয় নাই। অনেকগুলো বকেয়ার খাতায় তোলা। আজ কি সবগুলো একত্রে নিতে এসেছেন? বাজানকে গোর দেওয়ার আগে তার সব ধার দেনা বকেয়া শোধ করতে হবে? হাজেরা এনজিও আপাকে না দেখার ভানের আশ্রয়ে ঘরে ঢোকার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু আপা এগিয়ে এসে হাজেরাকেই পাকড়াও করেন।
এসডব্লিউ সোসাইটির প্রোগ্রাম অর্গানাইজার সাদিয়া অনেকক্ষণ আগেই এসেছেন। শোকের বাড়ি, তার মতিগতির সঙ্গে তাল রেখে কোন পদ্ধতিতে কথা বলবেন তার কোন ট্রেনিং তার নেই। মৃত্যুসংবাদ শোনার পর তাই ম্যানেজার ভাইকে সঙ্গী করতে চেয়েছিলেন। ম্যানেজার ভাই ফাইল গোছাতে গোছাতে খ্যাক খ্যাক করে ওঠেন, ‘এ্যাইটুকু সামলাতে পারবেন না, আবার প্রোমোশন চাইবেন। যান একাই সামলে আসেন। আমার যাওয়ার সময় হবে না।’ তবে প্রতি সপ্তাহে আসেন টাকা নিতে, তখন শুকনো মাটি কোপানোর মতো কিস্তি আদায়ের কঠিন কাজটি করতে হয়। আজ তার বালাই নেই। এতটুকু ভার লাঘবের ওপর ভরসা করে তার একা একাই আসা।

পলাশপুর বাজারের ডান হাতায় দারিদ্র হটিয়ে সোনার চাদরে দেশ মোড়ার শ্লোগানে শ্লোগানে মুখে ফেনা তোলা এসডব্লিউ সোসাইটির শাখা অফিস। দেড় কিলো পথ হেঁটে তাতে ঢুকতেই কফিল মিয়ার মৃত্যু সংবাদ সাদিয়ার সঙ্গী হয়। সঙ্গে সঙ্গে কালেকশন, রিপোর্ট তৈরি, বিল-ভাউচারের কাজ শিকায় তুলে রেখে কফিল মিয়ার পাসবইয়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন। শুরু হয় আদায় কিস্তি, বাকি কিস্তি ও সঞ্চয়ের সঙ্গে বোঝাপড়া। সাত সকালেও সাদিয়ার কপালে ঘাম দানা বাঁধে। কফিল মিয়া তার মেম্বর, তার রেখে যাওয়া এতোগুলো কিস্তি আদায় হবে কীভাবে? মর্টগেজের বালাই তো নেই-ই, কোন ছেলেও নেই, যার ঘাড় ধরা যাবে। ভুই-কোলা যা আছে তা দিয়ে কিস্তি দেবে না আস্তো দুটো মুখ ভরাবে। অফিস তো তখন চোখ কান বুজে সাদিয়ার বেতনের দিকে হাত বাড়াবে। দরকার হলে পুরো মাসেরটাও হাতের মুঠোয় পুরে নিতে এতটুকু কার্পণ্য করবে না। ঘর-সংসার রেখে চাকরী করার সুফল নির্ঘাত পটল তুলবে।

যোগ-বিয়োগের কসরত শেষ হলে সাদিয়ার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। কফিল মিয়া পুরনো মেম্বর, তার সঞ্চয় সপ্তাহে সপ্তাহে একটু একটু করে মোটা হতে হতে বাকি-বকেয়া সবাইকে হারিয়ে দিয়েছে। ম্যানেজারের কাছে হিসাব দাখিল করেন ‘বকেয়া কিস্তিগুলো অ্যাডজাস্ট করার পরও সঞ্চয় কিছু থাকবে।’ ম্যানেজার হিসাবটার নাড়ী-নক্ষত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, ‘বকেয়া কিস্তিগুলো অ্যাডজাস্ট করার পর সঞ্চয়ের যে টাকা আছে তা প্রোফিট ফান্ডে তুলে দেন। আর নমিনির ফরমটা নিয়ে যান। একটা সই নিয়ে আসুন। শোক-টোকের মইদ্যে কিস্তি মাফের কথা বলে সইটা নিয়ে আসবেন। যান তাড়াতাড়ি যান। অফিসে বসে তা দিলে আপনার বেতন থেকে কিস্তি কাটা শুরু হবে।’

এখানে এসেই তাই সাদিয়া হাজেরাকে খোঁজেন। কফিল মিয়ার বউটা তো ঘরের মধ্যে গুনগুনিয়ে মরছে। লোকে বলে আধপাগলা গোছের। কিস্তি আদায় করতে এসে সাদিয়া নিজেও দেখেছে। দুপুরে একথাল শাক-ভাত গেলার পর একটা চক্কর দিয়ে এসেই ভুলে যায়। আবার খাওয়ার জন্য হাজেরার কাছে পীড়াপীড়ি করে, ‘হাজু, দুফুরের ভাত কই, ভাত দে খিদায় প্যাট জ্বইল্যা যাইতাছে।’ কিন্তু এখন দেখো সোয়ামীর জন্য শোকগাঁথায় তার তাল-লয়ে কোনো ভুল নাই। মেয়ে হাজেরাটা মায়ের একেবারে ওপিঠ। সাংঘাতিক টাডি। খাওয়া না-খাওয়ার অত্যাচার সত্ত্বেও মুখের লগইতটা ধরে রেখেছে, কালোর দিকে কান্নি খাওয়া শ্যামল দেহ, তবে তার আটোসাটো বাঁধন পুরুষদের মাথা খারাপ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বিয়ের নাম নাই, চার হাত পায়ে বাবার সংসার সামলাতে সামলাতে বিয়ের কথা ভুলেই গেছে। নাকি একমাত্র মেয়ে বলে বাবা হাতে তুলে বিদায় করতে পারছে না। নিজের শেষ সম্বল সঞ্চয়ের নমিনি করে রেখেছেন মেয়েকে। সাদিয়া তাই ভেতর বাড়ির এককোণে দাঁড়িয়ে হাজেরার জন্য ওঁৎ পেতে ছিল। উঠান থেকে হাজেরা ভেতরে পা দিতেই সাদিয়া এগিয়ে গিয়ে সান্ত্বনা ছাড়ে ‘আহা! তোমার বাজান খুব হিসাবি মানুষ আছিলেন। ব্যারামে পড়ার আগে এ্যাকটা কিস্তিও বাদ দ্যান নাই। হের বকেয়া কিস্তিগুলা আর দিতে অইবো না। তুমি এহানে এ্যাকটা সই দিয়া দ্যাও, তা অইলেই অইবো।’

এনজিও স্কুলে দুই বছর আসা-যাওয়ার সুফলে টিপসইয়ের শরনাপন্ন না হয়ে নিজের নাম সই দিয়ে বাপের ধার-দেনা-বকেয়ার ভার থেকে মুক্ত হয় হাজেরা। তারপর মায়ের কাছে গিয়ে বসে। সহজেই তখন তার ইনানো বিনানো কান্না মেয়ের ভেতর বংশ বিস্তার করে। তবে তা শব্দ তুলতে পারে না বরং অশ্র“র ধারা পর্যন্ত আগায়। কারণ বরফজমা শোক-কান্নাও সুযোগ পেয়ে গলে গলে স্রোত বইয়ে দেয়।

মুর্দার গোসল শেষ, এখন জানাজার পালা। কিন্তু আলফি হুজুর বাগড়া বাঁধিয়েছেন। আলিমুদ্দি উঠান থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন ‘হাজু! হোন, আলফি হুজুর জানাজা পড়াইতে চায় না। হাজেরা বিস্ময়ে ফেটে পড়ে, ‘ক্যান পড়াইবো না? বাজানে তো জুমাবারে মজজিদে গেছে। রোজার সোময় রোজা রাখছে। বাজানে তো হুজুরের লগে কহনো বেয়াদপি করে নাই। তয় ক্যান জানাজা পড়াইবো না?’ আলফি হুজুর জাদরেল আলেম। আমল-আখলাকে ছিঁটেফোটা কালিমা তিনি সহ্য করেন না। আলিমুদ্দি তার ফিরিস্তি দেন, ‘মুই গেছিলাম হেরে বোলইতে। হেয় কয়, কফিল মিয়া ভালা মানুষ আছিল, তয় হের আওলাদ-ফরজন্দ দেহি পরদা করে না। রাস্তা-ঘাডে ঘুইরা বেরায়। হের আওলাদের তোবা করতে অইবে। তোবা হইর‌্যা হের দেল ছাপ করতে অইব। হেরপর জানাজ দিলে মুরদার রহম অইব, গোরে আরাম পাইবে।’

হাজেরা বেঁকে বসে ‘হেয় না আইলে গেরামে আর মুন্সি নাই? হাতেম মুন্সিরে বোলাও।’

আলিমুদ্দি তার ভাতিজিকে বোঝান, ‘আলফি হুজুর মস্তো আলেম মানু। জীনগো লগে হের দেহা অয়। হেয় এ্যাকটু দোয়া কইর‌্যা দিলে কফিল কাহায় গোরে শান্তি পাইবে। তুই হুজুরের বারি যা, তোবা কইর‌্যা হেরে বোলাইয়্যা আন। হের কতা মাইন্য করিস, বেয়াদপি করিস না আবার। একটু পাক-ছাপ অইয়্যা যা। মুই গোর খোরার কদ্দুর অইলো দেইখা আহি।’
হাজেরা তোলা শাড়ি নামিয়ে গায়ে জড়ায়, পাছদুয়ারের পুকুরে অজু দিয়ে আলফি হুজুরের বাড়ির পথ ধরে। বাজান সারা জীবনে কত না কষ্ট করছে। নিজের হাতে হাল-হালুডি করে সংসার চালিয়েছে। কার্তিক মাসের অভাবের কালে একবেলা খাইছে তো আরেক বেলা জোটে নাই। তারপর বন্যা ক্ষরা তো বছর বছর জীবনভর তার পিছু পিছু ঘুরেছে। দুটো ছেলেমেয়ে বাজানকে চোখের জলে ভাসিয়ে অকালে চলে গেছে। সে তো জীবনে সুখের কোনো মুখ দেখতে পায় নাই। তওবা করলে, হুজুরের দোয়া নিলে ওপাড়ে গিয়ে যদি তার একটু ছোঁয়া পায়। একটু আরাম করতে পারে। এতটুকু করা মেয়ে হিসেবে হাজেরারই তো দায়িত্ব।

আরব বংশের লোক আলফি হুজুর। ইসলামের রাহে দূরদেশ থেকে এ গ্রামে এসে আসন পেতেছেন। উঁচা-লম্বা দেহ, আর লালচে চেহারায় সব সময় নূরানী জ্যোতি খেলা করে। হাজেরা অনেকবার দেখেছে। বাবার পেটব্যথার পানিপড়া আর মায়ের মাথা ধরার তাবিজ নিতে এসে অন্দর মহলেও ঘোরাফেরা করেছে। দুই বউয়ের কাছে হুজুরে পালা করে থাকেন। উপরে উপরে বউদের মধ্যে গলায় গলায় ভাব, চওড়া মিল খাতির। তবে পালার ছন্দে পতন হলে, একজনের পালায় আরেকজনের ঘরে ঢুকে পড়লে ভাব-মিল সব শিকায় ওঠে। দুজনই গাল ফুলায়, দরজায় খিল আঁটে। সপ্তাহ ধরে, কখনো কখনো নাকি মাসে গড়ায়। তখন হুজরা ঘরে বিনা বউয়ে হুজুরের উপোসী রাত কাটে।

গ্রামের মাতব্বর-মহাজনদের বাড়ির কাচারি এ বাড়িতে এসে ‘হুজরা’ নাম নিয়েছে। হাজেরা গিয়ে সে ঘরের বারান্দায় পা দেয়। কিন্তু এ রকম ফাঁকা কেন? বারান্দায় তো লোকজনের লাইন থাকে। হুজুরের পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ধন্বন্তরির মতো। একফোঁটা গলায় পড়লে পেট ব্যথা, বুক জ্বলা লেজ তুলে পালায়। তাগায় বাধা মাধুলি দ‘ুদিন ঝুলালে ভাঙা বিয়ে সপ্তাহ না ঘুরতে আবার গলাগলি ধরে। তাই চার গ্রামের লোকজনে হুজরার বারান্দা টইটুম্বুর থাকে বারোমাস। মনে হয় এতো সকাল দেখে কেউ এসে সারে নাই ।

‘তুমি কফিল মিয়ার আওলাদ, আও, গরের মইদ্যে আও।’ হুজুর যেন হাজেরার অপেক্ষাতেই ছিলেন। ডেকে নিয়ে একবারে তার খাস কামরায় বসান। একটা খাট আর দুটো চেয়ারে সাজানো কামরা জুড়ে পুত-পবিত্র ভাব আর আতর-লোবানের গন্ধ জড়াজড়ি ধরে মুখ বুজে পড়ে আছে। হাজেরা পা দিয়েই কেঁপে ওঠে। কিন্তু তওবা, বাজানের জন্য দোয়া যন্ত্র চালিতের মতো চালিয়ে নেয়। খাটের এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে। ঘোমটাটা টেনে মুখটা আরো আড়াল করে। তবে হুজুরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, ‘তোমার বাপজী ইমানদার মানুষ আছিলেন। জুমাগরে পহেলা কাতারে জাগা পাইতেন না। গেরামের ময়-মুরব্বিরা থাকতেন। তয় পরের কাতারে তোমার বাপজী নিয়ত বানতেন। আবার নমাজ শ্যাষ করে ওয়াজ-নসিহত শুনতে পছনদো করতেন। পরহেজগার আছিলেন। তোমারে লইয়্যা হের ফিকির আছিল। কইতেন, হুজুর, মাইয়্যাডা বেয়াংরা অইয়্যা গ্যাচে। অরে আফনার আতে তুইল্যা দিমু। অর ইমান-আমান কেতা দুরসতো কইর‌্যা দিবেন। আইজ হেয় নাই, আল্লা তুমি হেরে বেহেসতো নসিব কইরো। আসো তোমারে কেতা-দুরসতো কইর‌্যা লই।’

আলফি হুজুর চেয়ার ছেড়ে খাটে বিছানো ধবধবে সাদা চাদরের ওপর আসন পেতে বসেন। হাজেরাকেও পা তুলে মুখোমুখি বসতে বলেন। আলফি হুজুর তখন বলেন, ‘নিয়ামতপুর নিবাসী সৈয়দ মোহাম্মদ হায়াতউদ্দিনের কনিষ্ঠপুত্র সৈয়দ আলাফউদ্দিনের সঙ্গে একই গ্রামের কফিল মিয়ার কন্যা হাজেরা বেগমের … টাকা দেনমোহরে নিকাহ। বলো কবুল।’ হাজেরার মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে ওঠে। এটা কী তওবা? এ রকম তো হালিমাবু, আয়শা খালার বিয়ের সময় হয়েছিল। এখানে তা কেন? কিন্তু আলফি হুজুর বার দুয়েক বলেন, ‘বলো কবুল।’ হাজেরা তার হুকুমে ঘাড় কাত করল কিনা সেদিকে আর না তাকিয়ে আলফি হুজুর তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করেন, ‘এখন তুমি নয়াবিবি, আও, সহবত করি।’ তার দুহাতের বেষ্টনির মধ্যে প্রশস্ত বুকের ওপর খাঁচায় পোরা কবুতরের মতো ছটফট করতে করতে হাজেরা শুধু বলতে পারে ‘বাজানের জানাজা।’

হুজুর যেন তারও ব্যবস্থা করে রেখেছেন, ‘গোর খোড়া শ্যাষ অইলে আলিমুদ্দি খবর দিবো।’
=========================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ জিয়া হাশান


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম

ন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে পুবচড়া থেকে বাড়ি ফেরার সময় রফিক এ কথা জানতে পারে: রাশেদার বিয়ে হবে সামনের জুম্মাবারে। খবরটা তাকে দেয় রায়েকবন্দরের জমির আলী সরকার, সে সময় তার চোখ দুটো ঘন ঘন পিটপিটায়, ঠোঁটটায় ঢেউ ওঠে আলতো করে, আর কোনও সন্দেহজনক ঘ্রাণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে নিঃশ্বাস টানতে থাকা মানুষের ধৈর্যহীনতাসমেত দীর্ঘ অথচ ঘন নিঃশ্বাস টেনে নেয় নাকের ভেতর। তা ছাড়া নিজের বাম কাঁধের ওপর অনেক পুরানো মইষা দাউদ চুলকানোর জন্যে সবসময় সঙ্গে রাখা পুরনো ভোঁতা ব্লেডটা সে প্রতিস্থাপন করে ডান হাতের দু আঙুলের মধ্যে, ঘাড় ডিঙিয়ে কাঁধটাকে ব্লেডটার ঘর্ষণে ঘর্ষণে তছনছ করে চলে।

সংবিধান সংশোধন ও সংসদে নারী আসন by বদিউল আলম মজুমদার

গত ২১ জুলাই আমাদের সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্যে ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল-সংক্রান্ত মামলার রায় বাস্তবায়ন এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল রোধে কঠোর বিধানের সুপারিশ করাই মনে হয় যেন কমিটির অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে সুপারিশ চূড়ান্ত করার আগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের পদ্ধতি হতে হবে যার অন্যতম।
আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে, ‘জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে।’ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধন করে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন (প্রথম আলো ১৫ ফেব্রুয়ারি-২০১০)। এখন সে প্রতিশ্রুতি রক্ষার লক্ষ্যে সংবিধানে যথাযথ সংশোধনী আনার সময় এসেছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই আমাদের জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব অপ্রতুল ও অনেকটা গুরুত্বহীন। আমাদের মূল ‘সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটি’র সদস্যদের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন নারী। তাই আমাদের ১৯৭২ সালের সংবিধানে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১০ বছরের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষণের বিধান করা হয়। ১৯৭৮ সালে সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৩০-এ উন্নীত এবং এর মেয়াদ ১৫ বছর করা হয়। ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৪৫ ও এর সময়সীমা ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়। আমাদের জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির এ-প্রক্রিয়াকে ‘কোটা’ পদ্ধতি বলা হয়।
কোটা তিন ধরনের হতে পারে: নির্বাচনবিহীন কোটা, নির্বাচনভিত্তিক কোটা ও ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি। তবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিও একটি নির্বাচনভিত্তিক পদ্ধতি। এসব পদ্ধতির সংমিশ্রণেও কোটা প্রথা প্রচলন করা যেতে পারে।
নির্বাচনবিহীন কোটা পদ্ধতিতে সংরক্ষিত আসনগুলো পূরণ হয় দলীয় ‘মনোনয়ন’-এর মাধ্যমে। এ পদ্ধতিই বর্তমানে আমাদের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন পূরণে ব্যবহূত হয়। এ ব্যবস্থাকে ‘পরোক্ষ’ নির্বাচন পদ্ধতিও বলা হয়ে থাকে, যদিও এর সঙ্গে ভোটাভুটির বিষয়টি একেবারেই যুক্ত নয়।
নির্বাচনবিহীন কোটা পদ্ধতিও দুই ধরনের হতে পারে, যার একটি হলো ‘উইনার-টেক-অল’ বা বিজয়ীদেরই সব সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার পদ্ধতি। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, সংসদে প্রতিনিধিত্বের হারের ভিত্তিতে দলগুলোর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনগুলো ভাগ করে দেওয়া। যেমন, ক্ষমতাসীন দলের যদি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব থাকে, তাহলে সরকারি দলের প্রাপ্য দুই-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত নারী আসন। বিরোধী দল-দলগুলোর প্রাপ্য অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ আসন। আমাদের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে দ্বিতীয় ধরনের পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়—এর আগে সাধারণ আসনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সব সংরক্ষিত আসন পূরণ করত।
নির্বাচনভিত্তিক কোটা পদ্ধতিতে সংরক্ষিত নারী আসন পূরণ করা হয় ‘প্রত্যক্ষ’ বা সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে। আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনগুলো পূরণ করা হয় এভাবেই। এ ক্ষেত্রে একাধিক সাধারণ আসন নিয়ে সংরক্ষিত আসন গঠিত হয়। যেমন, আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় তিনটি সাধারণ আসন নিয়ে একটি সংরক্ষিত মহিলা আসন গঠন করা হয়।
নির্বাচনবিহীন কোটা পদ্ধতির অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হয় না—সংরক্ষিত নারী আসনগুলো পূরণ করা হয় মনোনয়নের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন হয় না বলে এ ক্ষেত্রে নারীদের জন্য কোনো নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত থাকে না। ফলে যোগ্য নারীদের জন্য তাঁদের যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে সরাসরি নির্বাচনে, মূলত পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয় না। তৃতীয়ত, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে না বলে, এসব আসন পূরণে প্রার্থীদের যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং এ ক্ষেত্রে দলীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা সংরক্ষিত নারী আসনগুলোকে ফায়দা প্রদানের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করেন। অর্থাৎ সংরক্ষিত নারী আসনগুলো করুণা হিসেবেই বা লেনদেনের বিনিময়ে বিতরণ করা হয়। যোগ্যতার পরিবর্তে কানেকশনই এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব আসন হয়ে পড়ে অনেকটা অলংকারিক।
চতুর্থত, নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থাকে না বলে সংরক্ষিত আসন অলংকৃত করা প্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। বস্তুত, এসব নারী মূলত ‘দায়বদ্ধ’ থাকেন দলীয় কর্তাব্যক্তিদের কাছে। পঞ্চমত, সাধারণ আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তুলনায় সংরক্ষিত আসনে মনোনীত নারীদের ক্ষমতা ও দায়দায়িত্ব বহুলাংশে ভিন্ন। তাই এটি একটি অন্তর্ভুক্তিকরণমূলক (inclusive) পদ্ধতি নয়—সংরক্ষিত আসনে মনোনীত নারীরা ক্ষমতা-কাঠামোর বাইরেই থেকে যান। ষষ্ঠত, এটি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য স্বয়ংক্রিয় ও কার্যকর পদ্ধতি নয়। কারণ, সংরক্ষণ পদ্ধতি বিলুপ্ত হলে সংরক্ষিত আসনে মনোনীত প্রতিনিধিদের সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।
নির্বাচনভিত্তিক কোটা পদ্ধতিরও কতগুলো গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, সাধারণ আসনের তুলনায় এ ক্ষেত্রে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোর পরিধি বড় এবং ভোটারের সংখ্যাও বেশি হয়। তাই এটি একটি অসম পদ্ধতি। এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অনেক বেশি সময় ও শ্রম দিতে এবং অর্থ ব্যয় করতে হয়। বৃহত্তর আসনের প্রতিনিধিত্ব করাও অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। দ্বিতীয়ত, এ পদ্ধতিতে দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব বিরাজ করে। অর্থাৎ দুজন প্রতিনিধি—একজন সাধারণ আসন, আরেকজন সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি—প্রত্যেক আসনের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। ফলে তাঁদের মধ্যে দায়দায়িত্ব বিভাজন দুরূহ হয়ে পড়ে এবং তাঁদের মধ্যে সাধারণত সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্কই গড়ে ওঠে। তৃতীয়ত, প্রতিটি সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত (পুরুষ) সদস্যদের তুলনায় সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দায়দায়িত্ব কার্যত ভিন্ন। তাই এটিও একটি অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি নয়—এসব সংরক্ষিত আসনকে অনেকে ‘অতিরিক্ত’ ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। চতুর্থত, এ ধরনের কোটা সাধারণত শতাংশ (যেমন, ৩৩ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ) হিসাবে প্রকাশ করা হয় এবং এতে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি বিরাজমান। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের প্রতি তিনটি নির্বাচনী এলাকা নিয়ে একটি সংরক্ষিত নারী আসন গঠিত হয় বলে এটিকে এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ পদ্ধতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু বাস্তবে মোট ১২ জন (সাধারণ আসনের নয়জন+সংরক্ষিত আসনের তিনজন) সদস্যের মধ্যে তিনজন নারী—অর্থাৎ নারীর প্রতিনিধিত্ব এক-চতুর্থাংশ মাত্র।
কোটা-ব্যবস্থার মধ্যে উৎকৃষ্টতম পদ্ধতি হলো ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব আসন থেকে পর্যায়ক্রমে একজন নারী সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পান। যদি আমাদের জাতীয় সংসদের এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং এগুলো ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে পূরণের সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে প্রথম টার্মে লটারি কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ১০০ আসন চিহ্নিত করে এগুলো নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। এভাবে নির্ধারিত ১০০টি আসনে শুধু নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অন্য ২০০ আসন নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। পরবর্তী নির্বাচনে আগেরবারের ২০০টি উন্মুক্ত আসনের মধ্য থেকে লটারি কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ১০০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। অন্য ২০০ আসন, যার মধ্যে প্রথমবারের ১০০ সংরক্ষিত আসন অন্তর্ভুক্ত, নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তৃতীয় টার্মে অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত হবে এবং অন্য ২০০ আসন উন্মুক্ত হয়ে যাবে। লক্ষণীয় যে এ পদ্ধতিতে মোট সংসদীয় আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় না।
ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে প্রতিটি সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থাকে এবং এসব নির্বাচনী এলাকা আইনগতভাবে সাধারণ আসনের নির্বাচনী এলাকার সমতুল্য। বস্তুত এ পদ্ধতিতে সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের আয়তন ও ভোটারের সংখ্যার দিক থেকে সমতা বিরাজ করে। এসব আসন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দায়দায়িত্বের মধ্যেও কোনো পার্থক্য থাকে না—সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অতিরিক্ত নন। তাঁরা সবাই ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ। তাই এটি একটি অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি। এতে সংরক্ষিত আসন প্রতীকী হওয়ার কোনো অবকাশ থাকে না। এ পদ্ধতিতে তিন টার্মে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে অন্তত একজন নারী নির্বাচিত হয়ে আসেন।
ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য এটি একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি। দ্বৈত প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতিতে এ পদ্ধতিতে যোগ্য ও কর্মদক্ষ নারীরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকাকে ‘কালটিভেট’ বা গড়ে তোলার সুযোগ পান, যা পরবর্তী নির্বাচনে পুরুষদের সঙ্গে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে এ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত আসনের বাইরে থেকেও—অর্থাৎ উন্মুক্ত আসন থেকেও নারীদের নির্বাচিত হয়ে আসার সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়। তাই কোটার মাধ্যমে নির্ধারিত আসনের থেকে বেশি আসনে নারীরা নির্বাচিত হয়ে আসেন। সুতরাং, ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে একসময় নারীর সমপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য কোটার প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ভারতীয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোটা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত কার্যকর। পঞ্চায়েত পর্যায়ের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার আলোকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করার জন্য এ বছরের প্রথম দিকে ভারতীয় রাজ্যসভায় ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিভিত্তিক একটি বিল পাস হয়। দুর্ভাগ্যবশত ভারতীয় লোকসভায় বিলটি এখনো পাস হয়নি।
ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি যে নির্বাচনভিত্তিক পদ্ধতি থেকে উৎকৃষ্টতর, তা বাংলাদেশ ও ভারতের অভিজ্ঞতা থেকেই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তুলনায় ২০০৩ সালের নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ৪৩ হাজার ৯৬৯ থেকে কমে ৪৩ হাজার ৭৬৪-তে এসে দাঁড়িয়েছিল, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ছিল। পক্ষান্তরে, ভারতের পঞ্চায়েতে নির্বাচিত নারী সদস্যদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যেমন, ভারতীয় পঞ্চায়েতের তিন স্তরে—গ্রাম, মধ্য (পঞ্চায়েত সমিতি) এবং জেলা মোট নারী সদস্যের সংখ্যা ২০০২ সালে প্রায় পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার থেকে ২০০৮ সালে প্রায় ১০ লাখ ৪০ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৩৫১-তে।
কোটা পদ্ধতির কয়েকটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি সবচেয়ে উপযোগী সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণে। কারণ, তারা তাদের সংখ্যার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব অর্জন করতে পারে না। কিন্তু নারীরা সংখ্যালঘু নয় এবং এটি তাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী নয়। আরেকটি সমস্যা হলো, এ পদ্ধতিতে অর্থ-বিত্ত ও শিক্ষার দিক থেকে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর নারীরা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকেন। তবে সব নির্বাচনের ক্ষেত্রেই এ সমস্যা বিরাজমান। এ ছাড়া নিজেদের আসন হারানোর ভয়ে সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত পুরুষ সদস্যরা এর বিরোধিতা করতে পারেন, যা করছেন ভারতীয় লোকসভার সদস্যরা। কিন্তু কোনো সাংসদেরই কোনো আসনে জন্মগত অধিকার নেই কিংবা একটি দেশের নির্বাচন-পদ্ধতি তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একদল ব্যক্তির নির্বাচিত হওয়ার কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে না। আবার অনেক সময় অভিযোগ করা হয় যে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে পুরুষ আত্মীয়স্বজনেরা সংরক্ষিত আসনগুলো ‘গরম’ (warm) বা নিজেদের আয়ত্তে রাখার জন্য নারীদের ব্যবহার করেন, যাতে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা শেষ হলে সে আসনগুলো পুনরুদ্ধার করা সহজ হয়। কিন্তু এটি একটি ঢালাও অভিযোগ। উপরন্তু ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি হতে হবে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। সর্বোপরি কোনো পদ্ধতিই সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত নয়। ত্রুটি সত্ত্বেও সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এবং বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের সবচেয়ে কম ত্রুটিসম্পন্ন পদ্ধতি বেছে নিতে হবে।
পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ব্যবহূত তিন ধরনের বিকল্পের মধ্যে ঘূর্ণায়মান কোটা পদ্ধতি সর্বোত্তম। প্রতিবেশী ভারতের পঞ্চায়েতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সেখানে একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ক্রমাগতভাবে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি কার্যকারিতা প্রদর্শন করছে। এ অবস্থায় অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় স্থানীয় সরকার-ব্যবস্থায় যথাযথ সংখ্যক নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোটা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তাই ফুরিয়ে যাবে এবং তা বিলুপ্ত করা সম্ভব হবে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির জন্য ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিভিত্তিক কোটা প্রচলনের লক্ষ্যে ভারতীয় রাজ্যসভায় ইতিমধ্যেই একটি আইন পাস করা হয়েছে, যা বর্তমানে লোকসভার বিবেচনাধীন। আশা করি, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি আমাদের জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিভিত্তিক কোটা প্রথা প্রচলনের সুপারিশ করবে, যা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন-সম্পর্কিত নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও সহায়ক হবে। আরও আশা করি, সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে কমিটি ‘পিসিমল্’ (piecemeal) ও এডহক (adhoc) ভিত্তিতে অগ্রসর হবে না এবং তাড়াহুড়ো করবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ।

ইয়েন-ডলারের বিনিময় হার ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

দীর্ঘ ১৫ বছর পর জাপানি ইয়েনের বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম আবার কমেছে। বর্তমানে ইয়েনের বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮১.৩৭ ইয়েন। এর আগে ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে ডলারের বিনিময় হার কমে দাঁড়িয়েছিল সর্বোচ্চ ৭৯.৭৫ ইয়েন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ে কোনো ধরনের সমাধান ছাড়াই শেষ হওয়া আইএমএফের বৈঠকের পরই ইয়েনের বিপরীতে ডলারের হার কমে যাওয়ার এই ঘটনা ঘটল।
ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য কমতে শুরু করায় গত মাসে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইয়েন বিক্রি ও ডলার ক্রয়ের জরুরি পদক্ষেপ নেয়।
ইয়েন শক্তিশালী হওয়ায় জাপানের রপ্তানি মূল্য কমে গিয়ে রপ্তানিকারকদের মুনাফা অনেকটাই কমে গেছে।
গতকাল সোমবার সরকারি ছুটির কারণে মুদ্রা বাজার বন্ধ থাকার পরও এ ব্যাপারে ব্যাংক অব জাপান খোলা ছিল। তবে ইয়েন ও ডলারের বিনিময় হার নিয়ে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অবশ্য জানা যায়নি।

ডিএসই: মূল্যসূচক বেড়েছে ৭৬ পয়েন্টের বেশি

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আজ মঙ্গলবার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ায় সাধারণ মূল্যসূচকের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। আজ দুপুর ২টা পর্যন্ত সাধারণ সূচক ৭৬ দশমিক ৫০ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৪৭২ পয়েন্টে।
আজ বাজারে মোট ২৩৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এদের মধ্যে দাম বেড়েছে ১৫৭টির, কমেছে ৭০টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ১০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম।
শেয়ারবাজারে দুপুর পর্যন্ত মোট লেনদেনের পরিমাণ ১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার।
বেলা ২টা পর্যন্ত দাম বাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সামিট পাওয়ার, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড।

ডিএসই: সাধারণ মূল্যসূচক বেড়েছে ৬৬.৬২ পয়েন্ট

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আজ মঙ্গলবার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ায় সাধারণ মূল্যসূচকের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। আজ বিকেল তিনটায় লেনদেন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ মূল্যসূচক ৬৬ দশমিক ৬২ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৬৩ দশমিক ০৫ পয়েন্টে।
ডিএসইতে আজ ২৪৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৫৭টির, কমেছে ১০৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১১টির।
এদিকে ডিএসইতে আজ মোট দুই হাজার ১৮ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে, যা গতকালের চেয়ে ৪৫৪ কোটি টাকা বেশি।
লেনদেনে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—বেক্সিমকো, এবি ব্যাংক, বিডি ফিন্যান্স, বিজিআইসি ও বেক্সিমকো টেক্সটাইল।
আজ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারের দাম। আজ কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৭৯ টাকা বা ১১.২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রডস, কাশেম ড্রাইসেলস, আইসিবি ও ইমাম বাটন দাম বৃদ্ধিতে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে।
আজ সবচেয়ে বেশি কমেছে ঢাকা ফিশারিজের শেয়ারের দাম। আজ কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ২৮.৫০ টাকা বা ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে যায়। এ ছাড়া বিডি অটোকারস, জেমিনি সি ফুড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও গ্রামীণ মিউচুয়াল ফান্ড-১ দাম কমে যাওয়া শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে।
আজ ডিএসইর বাজারমূলধন ৩,২৪,১৬৮ কোটি টাকা।

কিম জং ইলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ

চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং ইলকে চীন সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া গতকাল সোমবার এ কথা জানিয়েছে।
ওই আমন্ত্রণের জবাবে জং ইলও প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওকে ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়া সফর করার জন্য আমন্ত্রণ জানান।

তালেবানের সঙ্গে আলোচনার কথা নিশ্চিত করলেন কারজাই

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই দীর্ঘ নয় বছরের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তালেবানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছেন। গত রোববার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকার থেকে এ কথা জানা যায়।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত উভয় পক্ষের উচ্চপর্যায়ের গোপন আলোচনা সম্পর্কে জানতে চাইলে হামিদ কারজাই সিএনএনের সাংবাদিক ল্যারি কিংকে বলেন, ‘আমরা তালেবানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানায় তালেবানের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ না হলেও কিছুদিন ধরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চলছে। এদিকে গতকাল সোমবার তাঁর পুরো সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আফগান ও আরব সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, আফগান সরকার এবং পাকিস্তানভিত্তিক আফগান তালেবান গোষ্ঠীর কোয়েটা শুরা মনোনীত প্রতিনিধিরা ও তালেবান নেতা মোল্লা ওমর গোপন এ আলোচনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গঠিত নতুন শান্তি পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট বোরহানউদ্দিন রাব্বানীকে নির্বাচিত করা হয়।
কারজাই ল্যারি কিংকে বলেন, ‘এখন শান্তি পরিষদ গঠিত হয়েছে। এ আলোচনা চলবে এবং সরকারিভাবেও আলোচনা চলবে।

লালগড়ে সিপিএমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

১৬ মাস পর পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী-অধ্যুষিত পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সিপিএম। গত রোববার নেতা-কর্মীসহ ১২ হাজার সমর্থক মিছিল করে এসে লালগড় তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেন। সিপিএমের লাল পতাকা তুলে দেন নেতা-কর্মীরা। একই সঙ্গে বন্ধ থাকা দলীয় কার্যালয় খুলে দেন তাঁরা।
২০০৯ সালের ১৬ জুন মাওবাদী নেতা-কর্মীরা লালগড়ে সিপিএমের দলীয় কার্যালয় পুড়িয়ে সমর্থকদের গ্রামছাড়া করে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে মাওবাদীদের হামলায় জঙ্গলমহলে সিপিএমের ৩০২ জন নেতা-কর্মী ও সমর্থক খুন হয়েছেন। কেবল লালগড়েই খুন হয়েছেন ৫৮ জন।

গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক

ছোকরাটা একটা ব্লেড নেয়। ধীরে ধীরে ব্লেডের কাভার খোলে। প্রথমে ওপরের রঙচঙা অংশটি ফেলে, পরে ভেতরের সাদা কাভারটিও খোলে। এরপর রুপালি রঙের ব্লেডটি নির্বিকারভাবে মাঝ বরাবর ভেঙে ফেলে। অর্ধেক ব্লেড সাদা কাভারের ভেতরে সযত্নে রেখে দেয়। আরেক অংশ ক্ষুরের ভেতরে প্রবিষ্ট। এবার ক্ষুরটি নিয়ে সে আমার দিকে এগিয়ে আসে। এখন সে আমার গলায় ক্ষুরটি আলতো করে ছোঁয়াবে - পাতলা ত্বকের নিচেই খাদ্যনালী, শ্বাসনালী - খ্যাচ্ করে কেটে ফেলতে বাড়তি কোনো আয়াস করতে হবে না। কারণ আমি মাথা-ঘাড় উঁচু করে গলাটা বাড়িয়ে রেখেছি। পশু কোরবানির সময় অসহায় জীবটির থুতনি চেপে ধরে গলাটাকে টানটান করা হয়, জবাইটা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য; ঠিক তেমনিভাবে আমি আমার গলাটাকে বাড়িয়ে রেখেছি। এজন্য কাউকে জোরাজুরি করতে হয়নি, আমি নিজেই যথাসম্ভব টানটান করে রেখেছি গলাটাকে। ছোকরাটা দেখতে প্যাকাটে-দুর্বল হলেও তার জিলেট ব্লেডটি তো অরিজিনাল। এখনি সাফল্যের সঙ্গে আমার গলাজবাই হয়ে যাবে। গলগল করে বেরিয়ে আসবে খাঁটি হিমোগ্লোবিনসমৃদ্ধ টকটকে রক্ত। কী বীভৎস ব্যাপার!

আমি স্বেচ্ছায় জবাই হতে এসেছি।
ছোকরাটি হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে ক্ষুর নিয়ে এগিয়ে আসে। তার মাথাটা গানের তালে তালে হালকাভাবে নড়ছে-চড়ছে। পাশেই ক্যাসেট প্লেয়ারে মমতাজের গান হচ্ছে, পোলা তো নয় সে যে আগুনের গোলা গো…। ছোকরাটিকে আমার এখন আস্ত ‘আগুনের গোলা’ মনে হচ্ছে - এক হলকায় আমাকে পুড়িয়ে কালো করে দেবে। গলা থেকে বেরিয়ে আসা গলগলে রক্ত আগুনের তাপে পুড়ে বাতাসে উবে যাবে। আমার কঙ্কাল জড়িয়ে কেবল অল্প কিছু কালো-পোড়া মাংস টিকে থেকে বোঁটকা গন্ধ ছড়াবে। উফ, কী ভয়ঙ্কর! আমি আগুনের গোলাকে সজোরে ধাক্কা দিই। সে মেঝেতে পড়ে যায়।

পাছায় লেগে থাকা অন্য মানুষের কেটে-ফেলা কালো কালো চুল হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে ছোকরা নাপিতটি উঠে দাঁড়ায়। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার ভাই? দাড়ি কামাবেন না?

আমি সাধারণত সেলুনে চুল কাটাই, দাড়ি-গোঁফ কাটাই না। কারণ দাড়ি কামাতে গেলে আমার নিজেকে কোরবানির জন্য নির্বাচিত পশু বলে মনে হয়। ঐযে, মাথা পেছনে দিয়ে গলা টানটান করে রাখতে হয়। নাপিত ব্যাটা জুলফির নিচ থেকে দাড়ি কাটতে কাটতে নিচের দিকে আসতে থাকে, থুতনি পেরিয়ে গলার মাঝ বরাবর যখন আসতে থাকে, আমি ঘামতে থাকি। এখন তার হাতেই আমার জীবন, সে চাইলেই অনায়াসে আমার গলাটাকে খ্যাচ্ করে কাটতে পারে। কিন্তু সে তা করে না। এর আগে হাতে-গোনা যে-কয়েকবার দাড়ি কামাতে বাধ্য হয়েছি, প্রতিবারই নাপিত দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।

আজও বাধ্য হয়েই আমি নাপিতের কাছে এসেছি। কারণ নীলিমা আজ ফিরছে। প্রায় তিন মাসের সেপারেশন শেষে সে আমার কাছে আসছে। যদি ফিরে এসে আমার মুখভর্তি দাড়ি দেখে, তবে দরজা থেকেই আবার বাপের বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু তিন মাসে দাড়িটা বেশ বড়োই হয়ে গেছে, একা একা রেজর দিয়ে এই দাড়ি কামানো যাবে না। বাধ্য হয়ে, ভয়ে ভয়ে, সেলুনে আসা। এমনিতে মনে হয় কত লোকেই তো হররোজ দাড়ি কামাচ্ছে, সেলুনে গিয়ে। এ আর এমন কী! কিন্তু সেলুনের দরোজায় পা দিতেই ভয়টা আমাকে গ্রাস করে।

ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন যে:
১. আমার স্ত্রী নীলিমা তিন মাসের সেপারেশন শেষে স্বামীগৃহে ফিরছে। অর্থাৎ আমাদের দাম্পত্য জীবন নির্বিঘ্ন নয়।
২. আমি দাড়ি কামানোয় ভয় পাই।

প্রথম বিষয়টা বিস্তারিত বলার আগে দ্বিতীয় বিষয়টা আরেকটু ব্যাখ্যা করি। আমি বলেছি যে দাড়ি কামানোতে আমি ভয় পাই। আসলে কিন্তু একে কেবল ভয় বললে চলবে না, খানিকটা অন্যকিছুও। আরও কয়েকটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হতে পারে।

ধরুন, আমি ছাত্রজীবনে যখন উত্তরবঙ্গ-ঢাকা করতাম, আরিচা-নগরবাড়ি ফেরি পারাপারের সময় দুই বা তিন তলার ডেকে গিয়ে প্রকৃতি-প্রেমিক ভাব নিয়ে ফেরির রেলিং ধরে দাঁড়াতাম, যমুনার আদিগন্ত জলরাশি দেখতে দেখতে খুব কাছে ফেরির নিচে তাকাতাম, সাদা রঙের লৌহদানব কীভাবে পানি ঠেলে গজরাতে গজরাতে এগিয়ে যাচ্ছে দেখতাম। তখন কেটে যাওয়া জলতরঙ্গের দিকে তাকিয়ে থেকে এক পর্যায়ে সম্মোহিত হয়ে ভাবতাম দিই ঝাঁপ ঐ যমুনাজলে!

কিংবা ধরুন আজকালকার কথা। বাস করি তেত্রিশতলার ফ্ল্যাটে। বারান্দায় কাপড় নাড়তে বা ওঠাতে গিয়ে হঠাৎ করে হাতের ক্লিপটি পড়ে গেল, আমি দেখছি ক্লিপটি বত্রিশতলা-একত্রিশতলা-ত্রিশতলা পার হয়ে যাচ্ছে…ক্লিপটির যাত্রাপথ অনুসরণ করতে করতে ভাবি কিছুতেই ক্লিপটাকে পড়তে দেয়া যাবে না, দিই ঝাঁপ আমিও! মাটিতে পড়ার আগেই ওটাকে ধরতে হবে।

চট্টগ্রামের এক পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলাম। সঙ্গে এক বন্ধু ছিল। মাস্টার্স ফাইনাল উদযাপন উপলক্ষ্যে বেড়াতে যাওয়া। ঝোপ-জঙ্গল পেরিয়ে, ঘেমে-নেয়ে অবশেষে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারার আনন্দ কী, যারা ওঠেনি তারা বুঝবে না। তেমনি অপার্থিব আনন্দের ক্ষণ অতিবাহিত হবার এক পর্যায়ে পাহাড়ের নিচে তাকাই; ঝোপজঙ্গল কম, কেমন ঢালু হয়ে পাহাড়ের শরীর নেমে গেছে। আমার হঠাৎ ইচ্ছা হলো বন্ধুটিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিই। এমন একটা ঢালু পাহাড় বেয়ে একটা মানবসন্তান গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখার আর সুযোগ পাওয়া যাবে না।

আমি কেবল তখন গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের অফিসটা চালু করেছি। ধীরে ধীরে অফিসটা জমে উঠেছে। স্থায়ী কয়েকজন চাকুরে ছাড়াও চারুকলার কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আমার ওখানে পার্টটাইম কাজ করে। প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার সহজ ও সু-সম্পর্ক। রাগিণী নামের মেয়েটি কাজ ভালো বোঝে, দেখতে মোটমুটি। আপাতভাবে মনে হয়ে তার ফিগার সুন্দর হবে। কাজ বুঝে নিতে, জমা দিতে, পরামর্শ করতে প্রায়ই সহকর্মীরা আমার রুমে হুটহাট ঢুকে পড়ে। আমার পুলিশ অফিসার বন্ধু সোলায়মান বলে, অবিবাহিত পুরুষেরা মেয়েদের স্তন দেখার চেষ্টা করে, আর বিবাহিতের চোখ আটকাতে চায় নিতম্বে। সোলায়মানের তত্ত্ব অনুসারে, কাজ বুঝে নিয়ে ফিরে যাবার সময় আমার চোখ হঠাৎ হঠাৎ রাগিণীর নিতম্ব অনুসরণ করতো। একদিন হঠাৎ কী হলো, মনে হলো, এক্ষুনি চেয়ার থেকে উঠে রাগিণীকে জাপটে ধরি, ওর নিতম্বে হাত দিই।

উদাহরণ অনেকগুলো দেয়া হলো। এর কোনোটি ভয় সংক্রান্ত নয়, কিন্তু আজকের দাড়ি কামানোর ঘটনার সঙ্গে একটা সূক্ষ্ম-সাধারণ মিল কি প্রত্যেকটার মধ্যে নেই? আমার মনে হয় একটি শব্দ দিয়ে এই মিলের সুতোটিকে ধরা যাবে - অস্বস্তি। ফেরি থেকে যমুনাজলে শুধু শুধু ঝাঁপ দেয়া, সামান্য ক্লিপকে রক্ষা করতে তেত্রিশতলা থেকে লাফ দেয়া, পাহাড়চূড়ায় উঠে বন্ধুকে ধাক্কা দেয়া, সহকর্মীর নিতম্বে হাত দেয়া - প্রত্যেকটি ঘটনাই কীরকম অস্বস্তিকর! কোনোটাই কিন্তু ঘটে না। কারণ আমি প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই নিজেকে সংবরণ করেছি, করতে সমর্থ হয়েছি। ঘটনাগুলো ঘটে না, কিন্তু কিছু একটা তো ঘটে! অস্বস্তিটা আমার মধ্যে জায়মান থাকে। ডিজাইনিংয়ের ফাঁকে, শাহবাগের মোড় পার হতে হতে, স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম করতে করতে, অস্বস্তিকর প্রায়-ঘটতে-যাওয়া ঘটনাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে। কাজে মন বসে না, রাস্তা পার হতে গিয়ে ভুল করি, সঙ্গমটি মজাদার থাকে না। তাহলে কি আপনি এখন মানতে রাজি যে দাড়ি কামাতে গিয়ে জবাই-হয়ে-যাবার অনুভূতি গ্রাস করার ঘটনাটা, যতটা ভয়ের তার চাইতে অস্বস্তির!

আমার পুরো জীবনটাই বলতে গেলে অস্বস্তিতে ভরা। নীলিমার সঙ্গে পরিচয় হওয়া থেকে শুরু করে বিয়ে-দাম্পত্য পর্যন্ত, পুরো ঘটনাই নাটকীয়ভাবে অস্বস্তিকর।

সম্ভবত আমার দ্বিতীয় এক্সিবিশন ছিল সেটা, নতুনদের যা হয়, যৌথ প্রদর্শনী। সঙ্গে আরও চারজনের পেইন্টিং আছে। জয়নুল গ্যালারির পাশে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছি। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে উঁকি মারছি, আমার পেইন্টিংয়ের সামনে কেউ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় আটকে আছে কিনা। আমি তখন খুব উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করতাম পেইন্টিংয়ে। খেয়াল করেছি, সেকারণেই কিনা, আমার ছবির পাশে লোকজন একটু বেশি সময় দাঁড়াচ্ছে। কিউবিজম প্রভাবিত বিমূর্ত ছবিই বেশি দিয়েছিলাম সেই প্রদর্শনীতে। একসময় দেখলাম আমার একটি ছবির সামনে থেকে উল্টো ঘুরে একটি মেয়ে আমাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে। আসছে তো বটেই, এসে দাঁড়ালোও। এবং জানা গেল আমাকেই চায় সে। অর্থাৎ ‘কম্পোজিশন-৩’ ছবিটির শিল্পীকে চায় সে। ছবিটি কিনতে চায় ও শিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হতে চায় মেয়েটি। বুঝতেই পারছেন, ওটা কেবল শুরু ছিল। পরে সে আমার প্রেমিকা হয়েছে, স্ত্রী হয়েছে। কিন্তু আবারও বলছি, পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল নাটকীয়। আমার জন্য সবই ছিল অস্বস্তিকর।

ওর সঙ্গে পরিচয় হওয়াটাকে কি নাটকীয় বলবেন না? আবার বলছি আপনি যেটাকে নাটকীয় বলবেন, আমার জন্য তা অস্বস্তিকর। ধরুন আপনার কল্পনার সব রঙ মিশিয়ে যে-নারীমূর্তিকে আপনি কাক্সক্ষা করেন অতি-তরুণ বয়সে, সে হঠাৎ আপনার সামনে এসে বললো, চলো বেড়াতে যাই। অথবা ধরুন আপনার প্রিয়তম বলিউড-নায়িকা পর্দা ছেড়ে নেমে এসে বললো, চলো কফি খাই। আপনি কী করবেন? স্মার্টলি বলবেন, ও তুমি এসেছো, লেটস গো? নাকি প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে যাবেন? নীলিমা তেমনই সুন্দর-সুশ্রী মেয়ে। আপনার কাক্সিক্ষত নারীর ক্ষেত্রে কী হতো জানি না, আমি প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে যাই। কিন্তু আমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সাহস বা শক্তি আমার ছিলনা। নীলিমা আমার জীবনের ছক এঁকে ফেলে - গ্র্যাজুয়েশন শেষে আমি দিল্লি যাবো। উচ্চতর পড়াশুনা শেষ করে ফিরে আসলে আমাদের বিয়ে হবে। গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের ব্যবসা করবো আমি, অ্যাড বানাবো। বিয়ের পাঁচ বছর পরে একটিমাত্র সন্তান হবে। আর আমরা বাস করবো আকাশের কাছাকাছি, নগরের উচ্চতম ফ্ল্যাটে।

নীলিমাদের মতো মেয়েদের জন্য আমার মতো মফস্বল থেকে আগত সাদামাটা ছেলের জীবনের ছক এঁকে ফেলা সহজ। তার দৈহিক সৌন্দর্যের কথাই বলা হয়েছে কেবল, আর্থিক সঙ্গতির কথা বলা হয়নি। তার বাবা চট্টগ্রামের বিরাট ব্যবসায়ী। সে তাদের খুলশির বাড়িতে আমাকে নিয়েও গিয়েছে, বাবার সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছে। ওদের বাড়ির গেটের দশাসই দারোয়ানের সালাম নিয়ে, অ্যালসেশিয়ানের মৃদু ভর্ৎসনা খেয়ে, বিশাল লন ডিঙিয়ে, নিচের প্রকাণ্ড হলরুম পেরিয়ে ওপরের ভোমা সাইজের সোফায় আমি ক্ষুদ্রতর হয়ে বসি। আর নীলিমা তার বাবার সামনে গড়গড় করে আমার জীবনের ছক উপস্থাপন করে। সব শুনে বাবা মৃদু হেসে সমর্থন দেন। কেবল উচ্চশিক্ষার স্থল দিল্লি না প্যারিস তা নিয়ে দু’জনের মধ্যে খানিক বিতর্ক হয়। ঘনঘন দেখা-সাক্ষাতের সুবিধা - এই অকাট্য যুক্তির বলে মেয়ের কাছে বাবা হার মানেন। সেই বাড়িতে ঢোকাটা আমার জন্য অস্বস্তিকর ছিল। তার চাইতে অস্বস্তিকর ছিল, নীলিমা এসব আমার কাছে আগে থেকে কিছুই বলেনি, সরাসরি বাবার সামনে পেশ করেছে।

অথচ এই অস্বস্তিগুলো প্রকাশ করার সাহস আমার ছিল না। নীলিমার সৌন্দর্য, নীলিমার ব্যক্তিত্ব আমাকে বিকশিত হতে দেয় না। ওর বাবাই তেত্রিশতলার ফ্ল্যাটটি কিনে দেয়। গাড়ি-ড্রাইভার সরবরাহ করে। গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের অফিসটার ক্যাপিটাল নীলিমারই। অন্যদিকে, বিয়ের পরে হঠাৎ করে অনেকগুলো নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়, যেগুলো বিয়ের আগে থাকে না। দুই পরিবারের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা। নীলিমা একবার মাত্র আমার বগুড়ার বাড়িতে গিয়ে দায় সেরেছে। অথচ আমাকে প্রায়ই চট্টগ্রাম যেতে হয়, আর মাকে ব্যস্ততার কথা বলে বগুড়া যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখি। বিয়ের পরে ধীরে ধীরে আমার অনার্য রূপ নীলিমার কাছে ধরা পড়তে থাকে। আমি প্রতিদিন শেভ করতে চাই না। ঘরে খালি গা-লুঙ্গি আমার প্রিয়তম পোশাক, অথচ নীলিমার কাছে তা অসহ্য - পারলে বাসার মধ্যে স্যুট-টাই পরিয়ে রাখতে চায়। সে বলে, আমি আমার বাবা-চাচাকে স্মার্টলি চলাফেরা করতে দেখেছি, আমি নিজেও তাই চেষ্টা করি। তুমি কেন চেষ্টা করো না? আমি বলি, এটা ইউরোপ হলে আমি সবসময় জামা-জুতো পরে থাকতাম। গরমের দেশে স্যান্ডেল পরে অফিসে যাওয়া দোষের কিছু হতে পারে না।

নীলিমার কাছে আমি এভাবে ‘গাঁইয়া’ হয়ে যাই। আমি গাঁইয়া, আমার মা গাঁইয়া, ভার্সিটি-পড়–য়া আমার ভাইটা গাঁইয়া - ভাবীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় জানে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, চাল-চলনে, কথাবার্তায় নীলিমা অসম্ভব আর্য। এই ভয়াবহ আর্যরূপ আমার মধ্যে প্রচণ্ড অস্বস্তি তৈরি করে। সে যখন আমার অনার্যতা নিয়ে আমাকে আক্রমণ করে, তার মধ্যেও আর্যত্ব থাকে। শয্যাতেও সে আর্য। তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আর্যরূপ। আর আমার কালচে-অনার্য শরীর বেমানানভাবে একটি পরম আর্যশরীরের সঙ্গে লেপ্টালেপ্টি করে। কিন্তু বিষয়টিকে সমতায় নিয়ে আসার জন্য নীলিমার চেষ্টার কমতি থাকে না। প্রতিবার শুরু করার আগে আমাকে ব্রাশ করতে হয়, ডিওডোরেন্ট মাখতে হয়। সে এক অসহ্য ব্যাপার।

একটা বিষয়ে কেবল নীলিমা বরাবরই, এমনকি এই শেষের তিক্ত দিনগুলোতেও, আমার প্রশংসা করতো। সেটা হলো, আমার শিল্পীমেধার তুলনা নেই। অথচ নীলিমাই আমার সেই মেধাকে গ্রাফিক ডিজাইনার পদে নামিয়ে দিয়েছে। এটাই সম্ভবত, আমার কাছে সবচাইতে বেশি অস্বস্তির ব্যাপার। কতদিন পেইন্টিংয়ে বসা হয়নি। স্টুডিও রুমটাতে ধুলো পড়ে থেকেছে। ইলাস্ট্রেশন, বিজ্ঞাপন, নিয়ন সাইন - এইসব নিয়ে দিন কাবার হয়ে যায়। এই একটিমাত্র অস্বস্তির কথা, আমি মিনমিন করে হলেও নীলিমাকে জানিয়েছিলাম - তুমি আমার ক্যারিয়ারটাকে নষ্ট করে দিয়েছো। মেধার অপচয় হচ্ছে আমার। অবশ্য নীলিমার কথার তোড়ে তা দাঁড়াবার সুযোগ পায়নি।

সাম্প্রতিক সেপারেশনের সিদ্ধান্তটি নীলিমারই নেয়া। আজকের ফিরে আসার সিদ্ধান্তটিও তার। মাঝের তিন মাস ছিল আমার স্বাধীন ও সুখকর কিছু দিন। অনেকগুলো ছবি এঁকেছি। বহুৎ মদ গিলেছি। যখন খুশি অফিসে গিয়েছি। সারা শুক্রবার একা ঘরে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, মাস্টারবেশন করেছি। কোনো কোনো রাত কেটে গেছে পেইন্টিং করতে করতে। আবার কোনো কোনো রাত ইন্টারনেটে কেটেছে পর্নোগ্রাফি দেখে। একদিনও শেভ করিনি। তিনমাস পরে আজ সকালে বাধ্য হয়েই সেলুনে গিয়েছিলাম।

আমি নীলিমাকে বলতে পারতাম সেপারেশনটা স্থায়ী হোক। বাচ্চাকাচ্চা নেই। অস্বস্তিতে ভরা, অসুস্থ দাম্পত্য আর চাই না। কিন্তু আমি বলতে পারিনি। আমার সেই ক্ষমতা নেই। নীলিমা যখন ফোনে বললো - তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। চট্টগ্রামে আর ভালো লাগছে না। তুমি বাসায় থেকো, কাল আসছি - আমিও প্রেমাস্পদ স্বামীর মতো বললাম, আমারও তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কথাটা খুব মিথ্যেও না। অমন সুন্দর মুখ তিনমাস না-দেখে থাকাও কষ্টের।

সকালে সেলুনে গিয়ে, নাপিতের দয়ায় জবাই থেকে বেঁচে যাবার পর, বাসায় ফিরে সবকিছু নিজহাতে পরিষ্কার করেছি। বিছানার চাদর পাল্টেছি, কিচেনে লেগে-থাকা ময়লা তুলেছি, মপার দিয়ে ফ্লোর মুছেছি, গুলশানে গিয়ে কেএফসি থেকে বার্গার এনেছি; আর এখন অস্বস্তিকর আগ্রহে অপেক্ষা করছি কখন নীলিমা আসে। বেশ কিছুক্ষণ আগেই ফোনে জানিয়েছে ঢাকায় ঢুকেছে গাড়ি। একাই আসছে, ওকে ড্রপ করেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রামে ফিরে যাবে।

ডোরবেল বাজে। আমি অস্বস্তি নিয়ে দরজার হাতল ঘুরাই।

পেনাং, ১৬ আগস্ট ২০০৭
===========================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প

bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ ফাহমিদুল হক


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

পরীক্ষামূলকভাবে উড়েছে প্রথম বাণিজ্যিক মহাকাশযান

পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবার ওড়ার পর পৃথিবীতে
নেমে আসছে বাণিজ্যিক মহাকাশযান ভিএসএস এন্টারপ্রাইজ
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গত রোববার বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক মহাকাশযানের প্রথম পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। ভিএসএস এন্টারপ্রাইজ নামের ওই মহাকাশযানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভার্জিন গ্যালাকটিক জানিয়েছে, স্থানীয় মোজাভে এয়ার অ্যান্ড স্পেস পোর্টে সফল অবতরণ করেছে নভোযানটি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইভ নামের চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট মাদারশিপ বা মূল উড়োজাহাজ থেকে ৪৫ হাজার ফুট উচ্চতায় নভোযানটি আকাশে ডানা মেলে। প্রথম ফ্লাইটে নভোযানটি পরিচালনা করেন পেট সিবোল্ড। তাঁর কো-পাইলট ছিলেন মাইক অ্যালসবারি।
এক বিবৃতিতে সিবোল্ড বলেন, ভিএসএস এন্টারপ্রাইজ উড়ানোর আনন্দই অন্য রকম। বিশেষ করে যখন আপনি জানছেন, এই যানটি একটি মহাকাশ যান।এই প্রকল্পের পিছনে রয়েছে ব্রিটিশ বিলিয়নার স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন। তিনি বলেন, ভার্জিন গ্যালাকটিকের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ একটি দিন। ভিএসএস এন্টাপ্রাইজের বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণের মুহূর্তটি সবচেয়ে আনন্দময় একটি মুহূর্ত।

নৌকাডুবিতে ভারতে ৩৭ জনের প্রাণহানি

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যে নৌকাডুবিতে কমপক্ষে ৩৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছে ১০ জন। গত রোববার রাতে রাজ্যের বুক্সার জেলার কাছে গঙ্গা নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশের মহাপরিচালক নীলমনি গতকাল সোমবার জানান, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের (এনডিআরএফ) উদ্ধারকর্মীরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় গতকাল ভোরে ১৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন। এর আগে রোববার রাতে ২৩টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা মৃতদেহগুলোর মধ্যে ২৫ জন নারী ও শিশু রয়েছে। এনডিআরএফের উদ্ধারকর্মীরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় এখনো উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কর্মকর্তারা জানান, নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দেড় লাখ রুপি দেওয়া হবে। গত রোববার উত্তর প্রদেশ থেকে ৩০ জনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন নৌকাটি প্রায় ৮০ জন যাত্রী নিয়ে বিহারে যাচ্ছিল। ঘূর্ণি স্রোতের কবলে পড়ে বুক্সার জেলার ব্রাহ্মণপুর থানার কাছে নৌকাটি ডুবে যায়।

নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকার তদন্ত শুরু হচ্ছে

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ২০০৫ সালের ৭ জুলাই বোমা হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীদের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা জানতে গতকাল সোমবার সরকারি পর্যায়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার এ ঘটনায় পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত করার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছে। তবে সরকারি এই অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা করা হবে, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ফাইভের সদস্যরা হামলা ঠেকাতে আরও বেশি কিছু করতে পারতেন কি না। তদন্তের নেতৃত্ব দেবেন একজন বিচারক।
আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী চার ব্যক্তি লন্ডনের তিনটি পাতালরেলস্টেশন ও একটি বাসে হামলা চালান। ওই হামলায় ৫২ জন নিহত হন। হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা অনেক দিন থেকেই জানতে চাইছেন, আগে থেকে নজরবন্দি রাখার পরও মোহাম্মদ সাদিক খান ও শেহজাদ তানভিরের মতো বোমা হামলাকারীদের ঠেকাতে কেন পদক্ষেপ নেননি নিরাপত্তাকর্মীরা।
কর্মকর্তারা জানান, মধ্য লন্ডনে রয়্যাল কোর্ট অব জাস্টিসে এই তদন্তের শুনানি চলবে। কমপক্ষে পাঁচ মাস চলতে পারে এই শুনানি। এতে বোমা হামলার সময়ের অপ্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ এবং হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্য নেওয়া হবে।

কিরগিজস্তানের নির্বাচনে বাকিয়েভ সমর্থিত দল এগিয়ে

কিরগিজস্তানের সাধারণ নির্বাচনের সর্বশেষ ফলাফলে সে দেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ-সমর্থিত জাতীয়তাবাদী দল আতা ঝুর্ট এগিয়ে আছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রোজা ওতুনবায়েভা-সমর্থিত সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। এ ছাড়া খুব কম ভোটের ব্যবধানে তাদের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে আরও তিনটি দল।
গত রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গতকাল সোমবার গণনা করা হয়। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হয়। সর্বশেষ ফলাফলে দেখা গেছে, আতা ঝুর্ট পার্টি পেয়েছে ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ ভোট। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফেলিক্স কুলোভের মস্কোপন্থী দল আর-মানিস পার্টি ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ ছাড়া রিপাবলিক পার্টি ৭ দশমিক ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে চতুর্থ এবং সরকারপন্থী আরেকটি দল আতা মাকেন ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টে আসন পেতে দলগুলোকে কমপক্ষে ৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে। সেদিক থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মোট ২৯টি দলের মধ্যে এ পাঁচটি দলেরই পার্লামেন্টে আসন গ্রহণের যোগ্যতা রয়েছে। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনের জন্য তাদের জোট গঠন করতে হবে।
নির্বাচন কমিশন বলেছে, ৫৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোটার এ নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় ওশ শহরে। কয়েক মাস আগে সেখানে জাতিগত দাঙ্গায় প্রায় ৪০০ লোক নিহত হয়।
ক্লারা সুরোমকুলোভা নামের একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম বা সহিংসতা হয়নি বলে জানিয়েছেন।
গত এপ্রিলে এক গণ-অভ্যুত্থানে কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ ক্ষমতাচ্যুত হন। আন্দোলনকারীদের নেত্রী রোজা ওতুনবায়েভা নিজেকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে ঘোষণা করে সরকারের দায়িত্ব নেন। গত জুন মাসে ওতুনবায়েভার সরকার সংবিধানে পরিবর্তন আনে। এতে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার থেকে মন্ত্রিপরিষদ-শাসিত সরকার চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত রোববার পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
রোজা-সমর্থিত ডেমোক্রেটিক পার্টি মন্ত্রিপরিষদ-শাসিত সরকার পদ্ধতিকে সমর্থন করলেও বাকিয়েভ-সমর্থিত আতা ঝুর্ট পার্টি পুনরায় সে দেশে প্রেসিডেন্ট শাসনব্যবস্থা চালুর পক্ষে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আতা ঝুর্ট সরকার গঠনে সমর্থ হলে তারা আবার রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করার চেষ্টা করবে।

জন্ডিস নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের অটিজমের ঝুঁকি বেশি

জন্ডিস নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে গত সোমবার প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সমীক্ষাটি যুক্তরাষ্ট্রের পেডিয়াট্রিকস সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়।
সমীক্ষায় বলা হয়, ১৯৯৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ডেনমার্কে জন্ডিস নিয়ে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের ৬৭ শতাংশ অটিজমে আক্রান্ত হয়েছে। জন্ডিসের ফলে নবজাতকের রক্তে বিলিরুবিন উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া শিশুরা অটিজমে আক্রান্ত হতে পারে। তবে জন্ডিস নিয়ে জন্ম নেওয়া ৬০ শতাংশ শিশুই সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যায়।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়, যেসব মায়ের আগে সন্তান রয়েছে, সেসব মায়ের নবজাতক শিশুর অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। মা-বাবার প্রথম সন্তান কিংবা এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবজাতকের জন্ম হয়েছে, এমন নবজাতকদের ক্ষেত্রে অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। ঋতুভেদে সূর্যের আলো কম-বেশি হওয়ায় এমনটা হতে পারে। কেননা সূর্যের আলো জন্ডিস নিরাময়ে সাহায্য করে।

প্রথমবারের মতো মানবভ্রূণের স্টেমসেল দিয়ে চিকিৎসা

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এক রোগীর চিকিৎসায় মানবভ্রূণের স্টেমসেল ব্যবহার করেছেন। ওই চিকিৎসার আয়োজক সংস্থা জেরোন করপোরেশন গত সোমবার বলেছে, সরকারের অনুমোদন পাওয়ার পরই তারা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত এক রোগীর ওপর ওই সেল প্রয়োগ করেন।
চিকিৎসায় মানবভ্রূণের স্টেমসেল ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন থেকেই বিতর্ক চলছে। রক্ষণশীলেরা এতে প্রকৃতির স্বাভাবিক জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করে। চিকিৎসাকেরা বলেছেন, যে রোগীর দেহে ওই স্টেমসেল প্রয়োগ করা হয়েছে, তার চিকিৎসার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

জড়িত কোম্পানির ১০ কোটি ডলার জরিমানা হতে পারে

হাঙ্গেরির পশ্চিমাঞ্চলে রাসায়নিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। গতকাল সোমবার দেশটির পরিবেশবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জোলতান ইলেস এ কথা জানান।
এক সপ্তাহ আগে রাজধানী বুদাপেস্টের ১০০ মাইল পশ্চিমে আজকা শহরে এম এ এল হাঙ্গেরিয়ান অ্যালুমিনিয়াম প্রোডাকশন অ্যান্ড ট্রেড কোম্পানির মালিকানাধীন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন কারখানার বর্জ্য সংরক্ষণাগারের বাঁধ ধসে আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে। ওই দুর্ঘটনায় কমপক্ষে সাতজন মারা যায়। অসুস্থ হয়ে পড়ে আরও ১৫০।
জোলতান ইলেস সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, কোম্পানিটি ওই সংরক্ষণাগারে ধারণক্ষমতার বেশি বর্জ্য রেখেছিল কি না। কিন্তু এমনটি ঘটে থাকলে এটা অবৈধ মজুদ এবং এই কাজ করায় অপরাধ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সরকার মনে করে, এই পরিবেশ বিপর্যয়ের সব ধরনের আর্থিক দায় এম এ এল কর্তৃপক্ষ এবং এর পরিচালকদের বহন করা উচিত।
প্রতিমন্ত্রী জানান, হাঙ্গেরির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ রাসায়নিক দুর্ঘটনা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এই ঘটনায় শুধু পানি ও পরিবেশদূষণজনিত ক্ষতির পরিমাণ সম্ভবত ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে।
ওই কোম্পানির তিন মালিক দীর্ঘদিন ধরেই হাঙ্গেরির শীর্ষ ১০০ ধনী ব্যক্তির তালিকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

এ বছর বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ ক্ষুধাপীড়িত হয়েছে

দারিদ্র্য, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এ বছর বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ক্ষুধাপীড়িত হয়েছে। এর মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক শিশু রয়েছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে ১২২টি দেশের ক্ষুধাপীড়িত মানুষের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি দেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আফ্রিকার চারটি দেশের পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। পরিস্থিতির বিচার করা হয় ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে যে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষ নেই, সে দেশের নম্বর শূন্য। যে দেশে সব মানুষই ক্ষুধার্ত, সে দেশ পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য বলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব দেশ ২০ নম্বরের বেশি পেয়েছে, সেসব দেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যেসব দেশ ৩০ নম্বরের বেশি পেয়েছে, সেসব দেশের পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী কঙ্গোর নম্বর ৪০। সে দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার। এখানে শিশুমৃত্যুর হারও অনেক বেশি। কঙ্গোর ক্ষুধাপীড়িত পরিস্থিতির করুণ চিত্র নিরূপণে তিনটি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে অপুষ্টি, শিশুর ওজনস্বল্পতা ও শিশুমৃত্যুর হার। নব্বইয়ের দশকের শেষ সময় থেকে চলমান দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ অর্থনীতিতে ধস নামিয়েছে। এতে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে খাদ্যপরিস্থিতি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কঙ্গোয় খাদ্য উৎপাদনের মাত্রা কমে যাওয়ায় খাবারের সরবরাহ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অতি দুর্বল অবকাঠামোর জন্য প্রত্যন্ত এলাকাগুলো আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
কঙ্গোর পাশাপাশি অবস্থানকারী অন্য তিনটি দেশ হচ্ছে বুরুন্ডি, ইরিত্রিয়া ও সাদ। তিনটি দেশেই অনেক দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। হাইতি ও ইয়েমেনসহ ২৫টি দেশে ক্ষুধাপরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। আফ্রিকার সাব-সাহারা ও এশিয়ায় রয়েছে এসব দেশ। বাকি দেশগুলো হচ্ছে নেপাল, তানজানিয়া, কম্বোডিয়া, সুদান, জাম্বিয়া, বুরকিনা ফাসো, টোগো, গিনি-বিসাউ, রুয়ান্ডা, জিবুতি, মোজাম্বিক, ভারত, বাংলাদেশ, লাইবেরিয়া, জাম্বিয়া, তিমুর-লেসতি, নাইজার, অ্যাঙ্গোলা, মাদাগাস্কার, কমোরস, সিয়েরা লিওন, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও ইথিওপিয়া।

কাশ্মীর থেকে নিরাপত্তা বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার দাবি আলেমদের

ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ শহরের আলেমদের প্রভাবশালী সংগঠন জামিয়াত-উলেমা-ই-হিন্দ (জেইউএইচ) জম্মু ও কাশ্মীরের বেসামরিক এলাকা থেকে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রত্যাহারের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ওই এলাকা থেকে নিরাপত্তা বাহিনী ও ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়ারও দাবি জানান সংগঠনটির আলেমরা। তাঁরা বলেছেন, ভারতের সঙ্গেই জন্মু ও কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ, পাকিস্তানের সঙ্গে নয়।
গত রোববার দেওবন্দে অনুষ্ঠিত কাশ্মীর সম্মেলনে এসব দাবি জানান সেখানকার আলেমরা। জেইউএইচ তাদের সম্মেলনে এবারই প্রথম কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছে। সম্মেলনে কাশ্মীর বিষয়ে ১১ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এতে জম্মু ও কাশ্মীরে বিক্ষোভ দমনে নেওয়া বিভিন্ন ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে সহিংসতা ভুলে সাংবিধানিক অধিকার আদায়ে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সম্মেলনে যোগ দেওয়া আলেমরা বলেন, ‘ভারতের অন্যান্য মুসলিম নাগরিকদের স্বার্থের সঙ্গে কাশ্মীরের মুসলিম নাগরিকদের স্বার্থ আমরা আলাদা করে দেখি না।’ কাশ্মীরে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে তাঁরা অন্যান্য সমমনা মুসলিম সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। যাঁরা কাশ্মীরের বিভেদ চায়, সেসব শত্রুদের প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেন তাঁরা।
জেইউএইচ একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্ত করবে এই কমিশন। হারিয়ে যাওয়া ও নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার কাশ্মীরি কিশোর-তরুণদের খুঁজে বের করবে তারা। আলেমদের এই সংগঠনের পক্ষ থেকে জননিরাপত্তা আইন বাতিল ও কাশ্মীরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ লাভ নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়।
কাশ্মীরের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ চালু রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান আলেমরা। সংবিধানের কাঠামোর ভেতর থেকে সমস্যা নিরসনে অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তাঁরা।
এত দিন তাঁরা নিশ্চুপ ছিলেন কেন—সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের কামাল ফারুকি বলেন, কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করা মুসলিমদের জন্য স্বস্তিকর নয়। এসব নিয়ে আলোচনা করলে বিশেষভাবে চিহ্নিত এবং পুলিশ ও গোয়েন্দাদের হাতে হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে।
ফারুকি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীর বা অযোধ্যার ব্যাপারে আপসকামী মনোভাব রয়েছে দেশের। কাজেই ভারতীয় সংবিধানে থাকা বিধিগুলো মীমাংসার উপায় বাতলাবে। কাশ্মীরের ব্যাপক জনগোষ্ঠীও তা-ই চায়। কোনো বোকা পাকিস্তানের সঙ্গে যেতে চায়?