Thursday, October 8, 2009

এবারে গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক

মোবাইল ফোনে ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন পেয়েছে আরও একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, তা হলো মার্কেন্টাইল ব্যাংক। তারা গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করে মোবাইল ফোনে ব্যাংকিংয়ের সেবা দেবে গ্রাহককে।
এর আগে তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক মোবাইল ফোনে ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন পায়। এর মধ্যে দুটি ব্যাংক শুধু বিদেশ থেকে প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (অপারেটর সার্ভিস) বাংলালিংকের বিক্রয়কেন্দ্রগুলো (আউটলেট) ব্যবহার করবে। এ দুটি হলো ইস্টার্ন ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর দি ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড দেশের মধ্যে স্থানীয়ভাবে ও প্রবাসী-আয় স্থানান্তরসহ সব ধরনের লেনদেনে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে। এই ব্যাংক সব কটি মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সেবা ব্যবহারের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড ডিজিটাল টেকনোলজিস লিমিটেড ও ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্ট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদের মাধ্যমেও লেনদেন করতে পারবে।
সর্বশেষ ১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক মার্কেন্টাইল ব্যাংককে যে অনুমোদনপত্র দিয়েছে, তাতে এই ব্যাংকটিও ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রায় কাছাকাছি বিভিন্ন ধরনের লেনদেনে মোবাইল ফোনে ব্যাংকিংয়ের সেবা গ্রাহককে দিতে পারবে।
এর আগে অনুমোদন পাওয়া ঢাকা ব্যাংক বিদেশ থেকে প্রবাসী-আয় গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে বাংলালিংকের বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। ইস্টার্ন ব্যাংক প্রবাসী-আয় বাংলালিংকের বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রাহককে নগদে পরিশোধ এবং একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক প্রি-পেইড কার্ডে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে।
অন্যদিকে ট্রাস্ট ব্যাংককে কার্যত অধিক পরিমাণ মোবাইল ফোনে ব্যাংকিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ব্যাংক এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, এ ক্ষেত্রে একই ব্যাংকের আওতাভুক্ত বা এক ব্যাংকের হিসাব থেকে অন্য ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করতে পারবে। আবার প্রি-পেইড কার্ডে টাকা স্থানান্তর ও বিভিন্ন দোকানের কেনাকাটায় এই কার্ড ব্যবহার, গ্যাস-বিদ্যুত্ ও পানির বিল পরিশোধ এবং সরকারের দেওয়া কৃষিতে ভর্তুকি, বিধবা ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কার্ডের মাধ্যমে তোলার সুযোগ থাকবে। প্রায় একই রকম সুবিধা দিতে পারবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক।
প্রবাসী-আয়ের টাকা তুলতে হলে বিক্রয়কেন্দ্রে প্রাপকের একটা পরিচয়সহ হিসাব থাকতে হবে। অর্থ প্রেরক মোবাইলে এসএমএসের (সংক্ষিপ্ত তথ্য প্রেরণ) মাধ্যমে টাকার পরিমাণ ও একটি পিন কোড (ব্যক্তি শনাক্তকরণ সংখ্যা) পাঠাবেন। বিক্রয়কেন্দ্রে প্রাপক গিয়ে পিন কোডসহ এসএমএস দেখালে তাঁর অর্থ পরিশোধ করা হবে। অন্যদিকে মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি থাকতে হবে।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের হিসাবে টাকা পাঠাতে হলে ট্রাস্ট ব্যাংকের সঙ্গে বাকি দুই ব্যাংকের নিবন্ধন থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রেরকেরও ট্রাস্ট ব্যাংকের মোবাইল হিসাব বা নিবন্ধন থাকতে হবে।
প্রেরক প্রথমে তাঁর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিজ ব্যাংকে এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য পাঠাবেন ট্রাস্ট ব্যাংকের মোবাইল হিসাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠাতে। ব্যাংক পাল্টা এসএমএসে টাকা স্থানান্তরের তথ্য পাঠালে মোবাইল হিসাবের টাকা তখন ট্রাস্ট ব্যাংক প্রাপকের ইচ্ছানুসারে অন্য ব্যাংকের যেকোনো হিসাবে পাঠিয়ে দেবে।
এই মোবাইল হিসাবে স্থিতি থাকলে সেই অর্থ দিয়ে উপযোগ সেবার মূল্য পরিশোধ এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের নিবন্ধিত দোকানগুলোতে কেনাকাটা করা যাবে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনুমোদনপত্রে আন্তব্যাংক বা এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে টাকা পাঠানোর কোনো ধারা নেই। বাকি প্রায় সব অনুমোদন রয়েছে।

‘টারজান’ ওয়াটসন

অস্ট্রেলিয়ার প্রথিতযশা এক ক্রিকেট লেখক একবার লিখেছিলেন, শেন ওয়াটসন দেখতে ‘টারজান’-এর মতো, কিন্তু খেলেন ‘জেন’-এর মতো। একটা কারণ তো অবশ্যই ছিল ইনজুরি-প্রবণতা। মাঠে যতটা থেকেছেন, ওয়াটসনকে তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে মাঠে ফেরার লড়াইয়ে। তার চেয়েও বড় কারণ, বড় ম্যাচগুলোতে ভেঙে পড়া। তবে সেই কথাটার যৌক্তিকতা নিয়ে ওয়াটসন এখন প্রশ্ন তুলতেই পারেন। টানা দুই অপরাজিত সেঞ্চুরিতে হয়েছেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের ম্যাচ-সেরা, সেমিফাইনালে উইকেটও পেয়েছেন দুটি। এর সঙ্গে গত চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালেও ম্যাচ-সেরা ছিলেন তিনিই, তথ্যটি মনে করিয়ে দিয়ে ওয়াটসন দাবি করতেই পারেন, শুধু চেহারায় নয়, তিনি এখন সত্যিকারের টারজান।
২০০২ সালে অভিষেকের পর থেকে পারফরম্যান্সের কারণে তাঁর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন কমই উঠেছে। তার পরও সাত বছরে তাঁর খেলা ওয়ানডের সংখ্যা যে মাত্র ৯০, এর আসল কারণ নাছোড়বান্দা ইনজুরি। একের পর এক ইনজুরিতে ত্যক্তবিরক্ত নির্বাচকেরা বছর দুয়েক আগে ঘোষণা করে দিলেন, পুরোপুরি ফিট হয়ে দীর্ঘ সময় ঘরোয়া ক্রিকেট খেললেই কেবল জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা করা হবে তাঁকে। এর পরই নাটকীয়ভাবে ওয়াটসনের ক্যারিয়ারটা নতুন জীবন পেল দুটো ঘটনায়—আইপিএল এবং ওপেনিংয়ে ব্যাট করা।
ইনজুরির সঙ্গে সখ্যের পরও সামর্থ্য সম্পর্কে জানা আছে বলেই রাজস্থান রয়্যালসে তাঁকে নিয়েছিলেন শেন ওয়ার্ন। এরপর অসাধারণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে কীভাবে রাজস্থানকে শিরোপা পাইয়ে দিয়েছেন, সেই ইতিহাস তো সবারই জানা। ক্যারিয়ারের মোড় পাল্টে দেওয়ার জন্য আইপিএল এবং ওয়ার্নের প্রতি তাই কৃতজ্ঞতার শেষ নেই এই অলরাউন্ডারের। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ফাইনালের নায়ক হওয়ার পরও যে কৃতজ্ঞতার কথা আবারও জানিয়েছেন তিনি, ‘আইপিএলই আমার ক্যারিয়ারের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে। আমার আত্মবিশ্বাসও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়া দলে ফিরতে সাহায্য করেছে। ওয়ার্নির কোচিং ও অধিনায়কত্ব থেকেও আমি অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি বড় ম্যাচে কীভাবে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।’
ক্যারিয়ার পাল্টে দিয়েছে ওপেনিংয়ে ব্যাট করাটাও। ক্যারিয়ার-গড় ৪০.৪০, কিন্তু ওপেনিংয়ে নামা ৩০ ইনিংসে ৪৯.৬৮। চার সেঞ্চুরির সব কটিই ওপেনার হিসেবে। গত কিছুদিনের ধারাবাহিকতায় হেইডেন-গিলক্রিস্ট উত্তর যুগে ওপেনিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান ভরসা এখন তিনিই। তুলনাটা হেইডেনের সঙ্গেই বেশি হচ্ছে। একই রাজ্য কুইন্সল্যান্ডের বলেই নয়, খেলার ধরনটাও একই রকম। নিখুঁত টেকনিক নেই, দেখতেও দৃষ্টিনন্দন নয়; কিন্তু আগ্রাসী, প্রভাববিস্তারী আর শক্তির প্রদর্শনী। ব্যাপারটা উপভোগ করছেন ওয়াটসনও, ‘হেইডেন-গিলির জায়গা পূরণ করাটা আমার জন্য বিশাল এক সুযোগ। ওরা দুজনেই বড় উপলক্ষে জ্বলে উঠত।’ তথ্যসূত্র: এএফপি ও ওয়েবসাইট।
ক্যারিয়ার-জুড়েই যুদ্ধ করতে হয়েছে, যুদ্ধ করতে করতে শিখেছেনও অনেক। প্রতিটি লড়াই তাঁকে দিয়েছে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ, ‘এগুলো আমাকে আরও শক্ত করেছে। আর বুঝতে পেরেছি সবকিছু খুব দ্রুতই পাল্টে যেতে পারে।’
টানা দুই শূন্য দিয়ে শুরুর পর টানা দুই সেঞ্চুরি দিয়ে শেষ, টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (২৬৫) রান—সবচেয়ে বেশি বুঝতে পেরেছেন এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তীব্র সমালোচনায় পাকিস্তানি কোচ

পাকিস্তান ক্রিকেট দলের কোচ ইন্তিখাব আলম ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে অভিযুক্ত করায় ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ভারতীয় গণমাধ্যম অহেতুকভাবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল থেকে পাকিস্তানের বিদায়ের সঙ্গে ‘ম্যাচপতানো’কে টেনে নিয়ে আসছে। তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট সম্পর্ক পূণর্স্থাপনের ব্যাপারটিও আরেকবার ভেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ক্ষুব্ধ ইন্তিখাব সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভারতীয় গণমাধ্যম পাকিস্তান ক্রিকেটদলের বিরুদ্ধে চ্রাম্পিয়নস ট্রফিতে ম্যাচ পাতানোর ভিত্তিহীন ও গালগল্প ফাঁদছে।’ তিনি আরও বলেন ‘আমাদের পুরোদলের বিরুদ্ধে ম্যাচ পাতানোর ভিত্তিহীন খবর একটি ভারতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই ভারতীয় গণমাধ্যম আমাদের বিরুদ্ধে ম্যাচ পাতানোর ক্লান্তিহীন অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।’ তিনি পাকিস্তান-ভারত ক্রিকেট সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের ব্যাপারে বলেন, ‘পাকিস্তানের এখন ভেবে নতুন করে বিবেচনার সময় এসেছে ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট সম্পর্ক আদৌ আমাদের প্রয়োজন রয়েছে কি না।’
ভারতীয় গণমাধ্যমের পাশাপাশি ইন্তিখাব আলমকে ক্ষুব্ধ করেছে পাকিস্তানের ক্রীড়াবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি জামশেদ দোস্তির আচরন। জামশেদ দোস্তি জাতীয় পরিষদে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে বিতর্ক তুলেছিলেন।
ইন্তিখাব আলম বলেন, ‘আসল কথা হলো এ বছর অনুষ্ঠিত ক্রিকেটের দু-দুটি বিশ্ব আসরে ‘ফেভারিট’ ভারতীয় দলের ব্যর্থতা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ভারতীয়রা। অথচ পাকিস্তান জুন মাসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। এটা ভারতীয়রা কিভাবে মেনে নেবে?’
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোকে কল্প-কাহিনীর সঙ্গে তুলনা করে ইন্তিখাব আলম বলেন, ‘আইসিসির দুর্নীতি-দমন কর্তৃপক্ষ যেখানে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ খুঁজে পায়নি সেখানে ভারতীয় গণমাধ্যম কল্প-কাহিনী বানিয়ে চলেছে। এমনকি আমি দেখলাম কয়েকটি পত্রিকা ছাপিয়েছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড আমাকে আর ইউনুস খানকে বরখাস্ত করেছে। এটাকে হাস্যকর ছাড়া আর কিভাবে অভিহিত করা যায়? অথচ বোর্ডের আমাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
ইন্তিখাব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ নিয়ে ওঠা বিতর্কের সমালোচনা করছেন তিনি। কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এধরনের অভিযোগ কিভাবে জাতীয় পরিষদে আলোচিত হয় তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে ক্রীড়া বিষয়ক সংসদীয় কমিটি যদি এ ব্যাপারে কোনো শুনানির আয়োজন করে তবে তিনি নিঃসংকোচে সেখানে যাবেন বলে উল্লেখ করেন।

এক ধর্মীয় নেতাকে বহিষ্কার করলেন সৌদি বাদশা

দেশের কট্টরপন্থী এক প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাকে গতকাল সোমবার ওলেমা কাউন্সিল থেকে বহিষ্কার করেছেন সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ। সৌদি বাদশা সম্প্রতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের পদক্ষেপ হিসেবে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়ের একসঙ্গে পড়ালেখার অনুমোদন দেন।
এ ব্যাপারে ধর্মীয় ওই নেতা তীব্র সমালোচনা করে টেলিভিশনে একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন। এর পরই তাঁকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ গতকাল এ কথা জানায়। এএফপি।
সৌদি আরবে ওলেমা কাউন্সিল ধর্মীয় বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পরামর্শ দিয়ে থাকে। ওই কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ছিলেন সা’দ আল-সেদরি। সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ছেলে-মেয়ের একত্রে পড়ালেখার সুযোগ করে দেওয়ার ব্যাপারে সা’দ তীব্র সমালোচনা করেন।
কয়েক সপ্তাহ আগে সা’দ এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘এভাবে ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে পড়ালেখার সুযোগ দেওয়ার অর্থ হলো এক ধরনের শয়তানি এবং মহা পাপের কাজ।’ অনেকের ধারণা, ওই মন্তব্যের কারণেই বাদশা তাঁকে বরখাস্ত করতে পারেন। যদিও সা’দের বরখাস্তের নির্দেশের মধ্যে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঘটা করে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়। জেদ্দার উত্তরে লোহিত সাগরের তীরবর্তী এলাকায় নয়নাভিরাম পরিবেশে ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি তৈরি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৭০০ কোটি ডলার। এমন একটি অত্যাধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি বাদশা আবদুল্লাহর বহুদিনের স্বপ্ন ছিল।

১০০ কোটি মানুষ এখন অভিবাসী

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রতি সাতজনের একজন অভিবাসী। জনগোষ্ঠীর এ ক্রমাগত অভিবাসন ঘটছে কখনো নিজের দেশে, কখনো দেশান্তরি হয়ে। অভিবাসন-প্রক্রিয়ায় উেসর দেশ যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনি উপকৃত হচ্ছে গৃহীতা-দেশগুলোও।
জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার অভিবাসনবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। গত রোববার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১০০ কোটি লোক এখন অভিবাসী। এর মধ্যে ৭৪ কোটি লোকের অভিবাসন ঘটেছে নিজ দেশেই। প্রতি ১০ জন অভিবাসীর তিনজনের অভিবাসন ঘটেছে উন্নয়নশীল দেশ থেকে শিল্পোন্নত দেশে। অভিবাসনের প্রভাবে জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রতিবেদনের অন্যতম প্রণেতা জেনি ক্লাগম্যান বলেছেন, অভিবাসীরা নিজের উত্স-দেশে ও অভিবাসন-দেশে উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁরা নতুন দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করছেন। সৃষ্টি করছেন বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন ক্ষেত্র। অভিবাসীদের কারণেই শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ব্যাপক মিশ্র জনগোষ্ঠীর সমাগম ঘটছে। সামাজিক ক্ষমতায়ন ও সৃষ্টিশীলতায় এই অভিবাসীরা নতুন সমাজে যুগান্তকারী অবদান রাখছেন।
সদ্য প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিবাসীদের কারণে উত্স-দেশেরও পরিবর্তন ঘটছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা নিজ দেশে অর্থ প্রেরণ করছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে অভিবাসীদের এ অর্থপ্রবাহ এখন একটি নিয়ামক উপাদান হয়ে উঠেছে। অভিবাসনের ফলে দেশে দেশে সাংস্কৃতিক সংযোগ বাড়ছে। উন্নত দেশে আসা এই অভিবাসীরা উত্স-দেশের সামাজিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা অবদান রাখছেন উত্স-দেশের নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার, শিক্ষার প্রসারসহ সামাজিক পশ্চাত্পদতা দূরীকরণে।

পাকিস্তানে আধুনিক দাসপ্রথা

শাহ মোহাম্মদ প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখেন, ঋণ শোধ করে মালিকের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। মুক্তির স্বপ্ন ধরা দেয় না তাঁকে। দিন কেটে যায় তাঁর ঋণের বেড়াজালে।
মোহাম্মদের বয়স ৬৮ বছর। পাকিস্তানের হাজারো চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের একজন। অনেক বড় একটি পরিবারে ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর ঘাড়ে। পাঞ্জাবের ধূলিধূসর একটি ইটের কারখানা। মাথায় আগুন ঢালছে সুর্য। ঘেমে-নেয়ে একাকার। কোনো ফুরসত নেই। কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এত মেহনত করেও খাবার, ওষুধ ও পরিবারের বাকি খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
মোহাম্মদ বলেন, ‘সূর্যোদয়ের আগেই কাজ শুরু হয়ে যায় আমার, চলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত; এরপর অপেক্ষা পরের দিনের জন্য—ইট তৈরির।’ দুই বছর আগে এক ইটভাটার মালিকের কাছ থেকে দুই লাখ রুপি নিয়েছিলেন তিনি।
পাকিস্তানের কয়েক লাখ চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের একজন মোহাম্মদ। কঠোর শর্তে ভূস্বামীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন তাঁরা। বিনিময়ে নামমাত্র বেতনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভূস্বামীদের কাজ করতে হয়।
মানবসন্তানকে এখানে পণ্যের মতো ব্যবহার করা হয়। চুক্তিবদ্ধ শ্রমিককে অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন তাঁর মালিক। এ পদ্ধতিকে আধুনিক যুগের দাসপ্রথা হিসেবে অভিহিত করেছেন পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মীরা।
হাড্ডিসার দেহ অনাবৃত, কোমরে পেঁচানো এক টুকরো কাপড়। এ অবস্থায় দ্রুত একমনে ইট তৈরি করে যাচ্ছেন মোহাম্মদ। কাদামাটি লেপ্টানো শরীরে হাড়ের রেখা সুস্পষ্ট। কিন্তু হাড্ডিসার শরীরে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হচ্ছে।
মোহাম্মদ জানান, ঋণের প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ী প্রতি হাজার ইট তৈরির জন্য তাঁকে ৪৫০ রুপি করে দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রাথমিক চুক্তি থেকে সরে যান তাঁর মালিক। এখন তাঁকে প্রতি হাজার ইটের জন্য দেওয়া হচ্ছে ৩৫০ রুপি। ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাওয়া ঋণের ভার কমাতে গিয়ে আয় থেকে উধাও হয় ১০০ রুপি। চিকিত্সা খরচ, পরিবারের সদস্যদের বিয়ে ও শেষকৃত্যের ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে তাঁকে আরও ঋণ নিতে হয়েছে।
মোহাম্মদ বলেন, ‘কাজ, কাজ এবং কাজ—এটাই আমার জীবন। আমি মারা গেলে ঋণ শোধের জন্য আমার সন্তানদেরও আজীবন কাজ করে যেতে হবে।’
ঋণচুক্তির ফাঁদে আটকে যায় ঋণ গ্রহীতার পুরো পরিবার। পরিবারের নারী-পুরুষেরা কাদামাটি থেকে তৈরি করে ইট। আর জিনিসপত্র এগিয়ে দেয় শিশুরা।
শ্রমিকদের সহায়তায় কাজ করে বন্ডেড লেবারার লিবারেশন ফ্রন্ট পাকিস্তান (বিএলএলএফপি) নামের একটি সংগঠন। সংগঠনের এক জরিপে দেখা গেছে, অবৈধ এ প্রথার শিকার আনুমানিক ৪৫ লাখ শ্রমিক।
এ বিষয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গবেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ।
চুক্তিবদ্ধ শ্রমপ্রথা নিষিদ্ধ করে ১৯৯২ সালে একটি আইন পাস করে পাকিস্তান সরকার। তবে এ আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর লক্ষণ সামান্যই। পাকিস্তানের সামন্তবাদী গ্রামাঞ্চলে ভূস্বামীরা বিপুল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা উপভোগ করেন।
বিএলএলএফপির চেয়ারপারসন সৈয়দা গুলাম ফাতিমা বলেন, কোনো ইটভাটার মালিক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিয়োগ করলে তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড কিংবা ৫০ হাজার রুপি জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু কোনো আইনভঙ্গকারীর ওপর কখনই এ আইন প্রয়োগ করা হয়নি। সরকার বলেছে, আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা হবে।
মানবাধিকার কর্মী ও পুলিশের সহায়তায় বেশ কয়েকজন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক পালাতে সক্ষম হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় সিন্ু্ল প্রদেশের একটি জায়গায় বসবাস করছে এ রকম একদল মুক্ত শ্রমিক। জায়গাটি হিম্মতাবাদ নামে পরিচিত। হিম্মতাবাদের অর্থ সাহসের শহর।
এক সময় চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক ছিলেন লালি। তিনি এখন মানবাধিকার কর্মী। লালি বলেন, ‘আমরা এ জায়গার নাম দিয়েছি হিম্মতাবাদ। কারণ, প্রভাবশালী কোনো ভূস্বামী থেকে নিজেকে মুক্ত করতে অনেক সাহসের প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, নতুন জীবন শুরু করা অনেক বিশাল কাজ।
১৯৮৭ সালে ভূস্বামীর কবল থেকে পালিয়েছিলেন লালি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৪ বছর। এরপর থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

হনুমানদের ট্রেন অবরোধ!

বিভিন্ন দাবিতে মানুষ কর্তৃক ট্রেন অবরোধের ঘটনা ঘটছে হরহামেশা। কিন্তু জীবজন্তুর ট্রেন অবরোধ! সত্যি, অবাক করা কাণ্ড! হ্যাঁ, এমনই ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে গত রোববার দুপুরে।
এদিন হুগলির কুন্তিঘাট রেলস্টেশনের এক নম্বর প্লাটফর্মে সকাল নয়টার দিকে ট্রেনের ধাক্কায় এক হনুমানের লেজ কাটা যায়। ফলে হনুমানটি আহত অবস্থায় পড়ে থাকে রেললাইনের পাশে।
পরে রেলপুলিশ হনুমানের আহত হওয়ার খবর পাঠায় বন দপ্তরকে। সেখান থেকে চিকিত্সক এনে এর চিকিত্সা করানো হয়।
দুপুরের দিকে পাল্টে যায় স্টেশনের চেহারা। দলে দলে এখানে এসে উপস্থিত হয় হনুমানেরা। তারা অসুস্থ হনুমানটি ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে তারা বসে পড়ে রেললাইনজুড়ে। শুরু করে কিচিরমিচির। ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রেলের চলাচল। আটকে যায় কাটোয়া লোকাল।
পুলিশ এসে রেললাইন থেকে হনুমানগুলোকে তাড়ানোর পর স্বাভাবিক হয় ট্রেনের চলাচল।

ব্রিটেন আইআরএকে সহযোগিতা বন্ধে অর্থ সেধেছিল

উত্তর আয়ারল্যান্ডের আধাসামরিক বাহিনী আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিকে (আইআরএ) সহায়তা বন্ধের বিনিময়ে লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে এক কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। ১৯৭০-এর দশকে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের নেতৃত্বাধীন সরকার গোপনে এ প্রস্তাব দেয়। গতকাল সোমবার ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়। বর্তমানে আইআরএ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাদ্দাফিকে দেওয়া ওই প্যাকেজ প্রস্তাবে লিবিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্য বাড়ানোর প্রস্তাবও যুক্ত ছিল। হ্যারল্ড উইলসনকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, আইআরএকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে লিবিয়াকে অর্থ দিতে রাজি ছিল তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার। ১৯৭৫ সালে গাদ্দাফিকে লেখা এক ব্যক্তিগত চিঠিতে এ প্রস্তাব দেন উইলসন। সম্প্রতি ব্রিটেনের জাতীয় আর্কাইভের প্রকাশ করা নথিগুলোর মধ্যে এ চিঠিও রয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়। কারণ ব্রিটেনের প্রস্তাবের বিপরীতে গাদ্দাফির দাবি ছিল পাঁচ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, গাদ্দাফিকে দেওয়া ওই এক কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের প্রস্তাব সম্পর্কে তারা অবহিত নয়।
আইআরএর সশস্ত্র সংগ্রামের সময় সংগঠনটির হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। নিহতদের পরিবার লিবিয়ার কাছে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে লিবিয়া জানিয়েছে, তারা যেকোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দাবির বিরোধিতা করবে।

পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু কর্মসূচির ১০০ স্থাপনা রয়েছে

উত্তর কোরিয়ায় সে দেশের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১০০টি স্থাপনার খবর জানে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তারা সেখানে হামলা করতেও সক্ষম। গতকাল সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম তায়ে-ইয়াংকে উদ্ধৃত করে এ খবর জানিয়েছে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ১৩ ধরনের জীবাণু অস্ত্র রয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম তায়ে-ইয়াং গতকাল বার্তা সংস্থাটিকে বলেন, ‘পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০টি স্থানের তালিকা রয়েছে আমাদের কাছে। পিয়ংইয়ং আক্রমণ করলে ওই স্থাপনাগুলোয় হামলা চালানোর ক্ষমতা রয়েছে সিউলের।’ গত মাসে কিমের একই ধরনের একটি মন্তব্যের সমালোচনা করেছিল উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা মিনজু জোসান।
এদিকে গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার আইনসভায় উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ১৩ ধরনের জীবাণু রয়েছে, যা জীবাণু অস্ত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ হাজার টন রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদও রয়েছে তাদের। একে বিশ্বের অন্যতম বড় রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের মজুদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
উত্তর কোরিয়ার জীবাণু অস্ত্রের হামলায় কলেরা, টাইফয়েড, গুটিবসন্ত, কালাজ্বরের মতো কঠিন রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর আগেও দক্ষিণ কোরিয়া উত্তরের পরমাণু অস্ত্র ও রাসায়নিক অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছে। গতকালের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
এর আগে জুনে ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, কোরীয় উপদ্বীপের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু অস্ত্র সবচেয়ে বড় হুমকি। তবে দেশটির রাসায়নিক অস্ত্রের বড় মজুদ রয়েছে এবং সম্ভবত জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচিও পরিচালনা করছে তারা। সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, পিয়ংইয়ংয়ের আড়াই থেকে পাঁচ হাজার টনের রাসায়নিক অস্ত্রাগারে মাস্টার্ড গ্যাস, ফসজেন ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ রয়েছে।
১৯৫০-৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে দুই পক্ষই যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের শান্তি চুক্তি হয়নি। এ পর্যন্ত পিয়ংইয়ং দুটি পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। পরমাণু কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উত্তর কোরিয়াকে প্রায় একঘরে করে রেখেছে। তবে এই সংকট নিয়ে সম্প্রতি পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।

হামলা চালাতে আল-কায়েদার নতুন বিস্ফোরক উদ্ভাবন

আত্মঘাতী হামলা চালানোর জন্য নতুন একটি বিস্ফোরক উদ্ভাবন করেছে আল-কায়েদা। নতুন এই বোমা পেটের ভেতরে বহন করা যায়।
বোমাটি পেটের ভেতরে নিয়ে হামলাকারী কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপ পেরিয়ে পৌঁছে যেতে পারে লক্ষ্যবস্তুর কাছে। গত রোববার ব্রিটিশ পত্রিকা সানডে টেলিগ্রাফ এ খবর জানিয়েছে। এ ব্যাপারে পত্রিকাটি সৌদি আরবে আল-কায়েদার সাম্প্রতিক একটি হামলার কথা উল্লেখ করেছে।
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে গত ২৮ আগস্ট সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফের ওপর আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলার বর্ণনা তুলে ধরা হয়। সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় পলাতক জঙ্গি ও আল-কায়েদার সদস্য আবদুল্লাহ হাসান তালি আল-আসিরি ওই হামলায় অংশ নেন।
সৌদি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, দুটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঘেরাটোপ পেরিয়ে আল-আসিরি পৌঁছে যান নায়েফের কাছে। যুবরাজ নায়েফ সৌদি আরবে জঙ্গি পুনর্বাসন কর্মসূচির দেখভাল করেন।
এর আগে আল-আসিরি সৌদি নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের জানান, তিনি আত্মসমর্পণ করতে চান এবং অন্য জঙ্গিরাও যাতে আত্মসমর্পণ করে, সে ব্যাপারেও সাহায্য করতে চান। এ সময় প্রায় ৩০ ঘণ্টা যুবরাজের দেহরক্ষীদের নজরদারিতে ছিলেন আল-আসিরি।
এরপর আল-আসিরিকে নিয়ে যুবরাজ নায়েফ তাঁর জেদ্দার প্রাসাদে কথা বলার সময় ১৪ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি বিকট শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। আল-আসিরির দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
ওই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে আল-কায়েদা। তারা হুমকি দিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা আরও চালানো হবে। এদিকে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরক ও বিস্ফোরণ ঘটানোর যন্ত্র (ডেটোনেটর) আল-আসিরি পাকস্থলীতে বহন করছিলেন। বোমাটির ওজন ১০০ গ্রামের মতো হতে পারে এবং তা এমন বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি, যা বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থানে ব্যবহূত তল্লাশি যন্ত্রের চোখকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। পিটিআই, দ্য হিন্দু, আনন্দবাজার পত্রিকা।

নেহরু ও এডুইনার সম্পর্ক ছিল একান্তই বন্ধুত্বের

বিখ্যাত লেখিকা ও ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ভাগ্নি নয়নতারা সেহগাল তাঁর মামার সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের স্ত্রী লেডি এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের সম্পর্ককে ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা’র বলে মন্তব্য করেছেন। নেহরু ও এডুইনার মধ্যে কোনোরকম যৌনসম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, যাঁরা এই ধরনের চিন্তাভাবনা নিয়ে আছেন, তাঁরা সবাই দূষিত মানসিকতার অধিকারী।
সম্প্রতি বিখ্যাত লেখক অ্যালেক্স ভন তুজলমানের বইয়ের ওপর ভিত্তি করে ‘ইন্ডিয়ান সামার’ নামে একটি চলচিত্র নির্মিত হচ্ছে। জওহররাল নেহরু ও লেডি এডুইনার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে এই ছবিতে তাঁদের মধ্যে একটি অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য থাকায় ভারতের তথ্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় চলচ্চিত্রটির দৃশ্য ভারতে ধারণে আপত্তি জানায়। তবে পরিচালক তুজেলমানকে তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, তিনি যদি চিত্রনাট্য থেকে এই দৃশ্য বাদ দিয়ে দেন তবে তাঁকে এই চলচ্চিত্রের দৃশ্য ভারতে ধারনের অনুমতি দেওয়া হবে।
নযনতারা সেহগাল বলেন, ‘কেউ যদি মনে করেন নেহরু ও এডুইনার মধ্যে যৌন সম্পর্ক ছিল, তবে তা হবে অনুমান নির্ভর ও অসত্য। তবে এটা সত্যি যে তাঁদের মধ্যে সুন্দর একটা সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, যা ছিল বন্ধুত্বের ও সম্মানের। এটা এমন একটা সম্পর্ক ছিল, যাতে শারীরিক অন্তরঙ্গতার চেয়ে মনের অন্তরঙ্গতা অনেক বেশি ছিল। তাঁরা একে অন্যকে সম্মান করতেন।’ তিনি আরও বলেন নেহরু ও এডুইনা দুজনেরই ভারতের জাতীয় ইতিহাসে বিরাট স্থান রয়েছে। তাঁরা আমাদের ইতিহাসের অংশ। ’ নেহরু ও এডুনার যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে নয়নতারা সেহগাল বলেন, ‘যৌনতা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ব্যাপারটি তো তৃতীয় কোনো ব্যক্তির জানার কথা না।’ নেহরু ও এডউইনার মধ্যকার সম্পর্কটিকে তিনি পারিবারিক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘দুই পরিবারের মধ্যে সুন্দর অন্তরঙ্গতা ছিল। আমার মা ও মাউন্টব্যাটেন ছিলেন বন্ধু। এমনকি মাউন্টব্যাটেনের কন্যা পামেলাও আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এমনকি আমরা তুজেলমানের এই ছবিটি নিয়ে আলোচনা করেছি।’

বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের নতুন সিইও জিম ম্যাককেইব

বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন জিম ম্যাককেইব। এর আগে তিনি সিঙ্গাপুরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্রুপ হেড অব অপারেশনসের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি চলতি মাসের শেষ দিকে ওসমান মোরাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন।
জিম ম্যাককেইব এশিয়া ও আমেরিকায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন ম্যানেজমেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০০ সালের ডিসেম্বরে হোলসেল ব্যাংকিংয়ের উত্তর-পূর্ব এশিয়ার রিস্ক হেড হিসেবে যোগ দিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে চাকরি শুরু করেন। ২০০২ সালে তিনি আমেরিকার নিউইয়র্কে ব্যাংকের সিইও হিসেবে যোগ দেন। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, তাইওয়ানের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ম্যাক্সিকোর ব্যাংক অব আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। আমেরিকার অ্যারিজোনার থান্ডারবার্ড স্কুল অব গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট থেকে তিনি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) সম্পন্ন করেন।
জিম ম্যাককেইব বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যাংকের সিইওর দায়িত্ব পেয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত। গ্রুপের জন্য বাংলাদেশ অপারেশনস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের অবস্থানের জন্য আমরা গর্বিত।’ বিজ্ঞপ্তি।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের সুযোগ-সুবিধায় ভুটানি অর্থমন্ত্রীর সন্তোষ প্রকাশ

ভুটানের অর্থমন্ত্রী লিয়ানপো খান্ড ওয়াংচুকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর পরিদর্শনকালে এটির সুযোগ-সুবিধা ও সম্ভাবনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
খান্ড ওয়াংচুক বলেন, যেহেতু ভুটান থেকে আপেল ও কমলা ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি হয়, সেহেতু এসব পণ্য আমদানির জন্য তিনি বাংলাদেশের সহযোগিতা চান।
খান্ড ওয়াংচুক বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস গোডাউন ও ইমিগ্রেশন অফিস ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বুড়িমারী স্থলবন্দরের চেকপোস্ট দিয়ে ভারত হয়ে নিজ দেশ ভুটানে চলে যান।
এ সময় লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক আলাউদ্দিন ফকির, পুলিশ সুপার ইসরাইল হাওলাদার ও পাটগ্রাম উপজেলার নির্বাহী অফিসার হারুন-অর-রশীদ উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক আলাউদ্দিন ফকির বলেন, সীমান্ত এলাকায় এমন ধরনের শিল্প-কারখানা স্থাপন করা দরকার যেন এসব কারখানায় উত্পাদিত পণ্য ভুটানে রপ্তানি করা যায়।
বাংলাদেশ স্থলবন্দরের কর্তৃপক্ষ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পরিচালক আবু তাহের বলেন, বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে রাস্তার সংস্কার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার ব্যাপারে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রুগ্ণ শিল্পের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি

কালবিলম্ব না করে রুগ্ণ শিল্পের মালিকদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সিক ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে সমিতি যেসব রুগ্ণ শিল্পের মালিক নতুন করে কারখানা চালাতে আগ্রহী, তাঁদের পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কারখানার পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশ অর্থ প্রণোদনা সহায়তা প্যাকেজ থেকে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা এসব দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সমিতির সভাপতি চৌধুরী মুহাম্মদ ইসহাক। এ সময় সমিতির উপদেষ্টা মো. আব্দুল হাই, রহিম উল্লাহ, সহসভাপতি রশিদা আক্তার চৌধুরী, এ কে এম গোলাম কবীর শিকদার, মো. সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
চৌধুরী মুহাম্মদ ইসহাক বলেন, অর্থঋণ আদালতে এক লাখ ১০ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার মালমা রুগ্ণ শিল্পের মালিকদের বিরুদ্ধে। তিনি এসব মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করা ছাড়াও নদীভাঙনের কারণে যেসব শিল্প বিলীন হয়ে গেছে, সেগুলোর সব ঋণ মওকুফ করার দাবি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া মামলার কারণে যাঁরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ থেকে তাঁদের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সমিতির সভাপতি রুগ্ণ শিল্পের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব এবং জনমত যাচাই করে অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করে সমিতির সভাপতি বলেন, আর্থিক বিষয়ে প্রভিশন হিসাবের গরমিল ও তথ্য গোপন করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জুডিশিয়াল প্রতারণার মাধ্যমে সরকারের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করছে। এ ছাড়া ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিরীহ রুগ্ণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের হিসাব সমন্বয়কৃত ও অবলিখনকৃত (রাইট অফ) তামাদি ঋণের জন্য ভিন্ন আইনে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে। অথচ রুগ্ণ শিল্পের জন্য সরকারের দেওয়া ভর্তুকি ১০০ কোটি টাকার বিপরীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ১৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সরকার থেকে চিহ্নিত, সুপারিশকৃত ও নিবন্ধনকৃত রুগ্ণ শিল্পগুলোকে খেলাপি ঋণের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বিনিয়োগ বোর্ড একটি সার্কুলার দিলেও তা মানা হচ্ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক রুগ্ণ শিল্পের সমস্যা সমাধানে দুই বছরের বেশি সময় আগে একটি সালিসি বোর্ড গঠনের সুপারিশ করলেও তা এখনো করা হয়নি।

প্রথম প্রান্তিকে প্রবাসী-আয়ের প্রবাহ বেড়েছে ১৬ শতাংশ

চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে প্রবাসী-আয়প্রবাহ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অবশ্য এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী-আয়প্রবাহ আগস্ট মাসের তুলনায় প্রায় পাঁচ কোটি ডলার কমে গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির বাইরে ঈদ ও পূজার জন্য চার দিন ব্যাংক বন্ধ থাকা এবং ঈদের পর তেমন একটা অর্থ না আসায় সেপ্টেম্বরে মোট প্রবাসী-আয়প্রবাহ কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিরা মোট ২৭১ কোটি ১১ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছেন। আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরের একই সময়ে তাঁরা পাঠিয়েছিলেন ২৩৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
এর মধ্যে চলতি বছরের আগস্ট মাসে ৯৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাসী-আয় হিসেবে এলেও সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে হয়েছে ৮৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
তবে সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে অর্থাত্ ঈদের ঠিক আগের সপ্তাহে দেশে ৩০ কোটি সাত লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
প্রবাসী-আয়ের উচ্চপ্রবাহ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে চলতি হিসাবে বাংলাদেশে এখন উচ্চহারে উদ্বৃত্তাবস্থা বজায় রয়েছে।
প্রবাসী-আয়ের উচ্চপ্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও নিরাপদ পর্যায়ে ধরে রাখতে সহায়তা দিচ্ছে।
গতকাল সোমবার দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৯৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান গত রোববার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আয়োজিত এক সেমিনারে উচ্চ প্রবাসী-আয়ের কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন।
গভর্নর বলেছেন, প্রবাসী-আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণসঞ্চারী হলেও উত্পাদনশীল খাতে এর সীমিত ব্যবহার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আতিউর রহমান আরও বলেন, এর ফলে আর্থিক বাজারে বাড়তি তারল্য তৈরি হয়েছে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের মতে, বাড়তি তারল্য থেকে রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ফটকা বিনিয়োগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গভর্নর আরও বলেন, উচ্চহারে প্রবাসী-আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি করেছে এবং স্থানীয় মুদ্রার মানকে ক্রমশ শক্তিশালী করছে, যা আবার আয় গ্রহীতা ও রপ্তানিকারকদের জন্য সহায়ক হচ্ছে না।

কার্যালয় না থাকলেও কম্পিউটারসহ আনুষঙ্গিক সামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগ



দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) তার অধিভুক্ত সব ব্যবসায়ী সমিতির দক্ষতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে সমিতিগুলোর কার্যালয়ে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইউপিএস, ফটোকপিয়ার, ফ্যাক্স মেশিন ও আইপিএস দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
এ কাজে অর্থায়নের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে অর্থের পরিমাণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। এতে অধিভুক্ত সমিতিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশের নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় অর্থ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এফবিসিসিআইয়ের অধিভুক্ত ২৬৩টি ব্যবসায়ী সমিতি রয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ সমিতির নিজস্ব কার্যালয় নেই। এগুলো পরিচালিত হয় সংশ্লিষ্ট সমিতির সভাপতির নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থেকে। আবার অনেক সমিতির ঠিকানায় গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। অর্থাত্ ভুয়া ঠিকানা ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে অনেকে এফবিসিসিআইয়ের ভোটার হয়েছে।
ফলে এ ধরনের সমিতিকে এসব সামগ্রী দিলে সমিতির দক্ষতা কীভাবে বাড়বে, তা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এসব সামগ্রী সভাপতি নিজের কার্যালয়ের কাজে লাগাবেন, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সমিতির সদস্যদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে গত ২৫ আগস্ট এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি আবু আলম চৌধুরী ফেডারেশনের প্যাড ব্যবহার করে বিভিন্ন সমিতিকে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইউপিএস, ফটোকপিয়ার, ফ্যাক্স মেশিন ও আইপিএস দেওয়ার ব্যাপারে চিঠি লিখেছেন। এ ক্ষেত্রে ‘কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ইউপিএস’ অথবা ‘ফটোকপিয়ার’ অথবা ‘ফ্যাক্স মেশিন ও আইপিএস’—যেকোনো একটি প্যাকেজ বাছাই করে এফবিসিসিআইকে জানানোর জন্য বলা হয়েছে।
তবে এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের চিঠি দেওয়ায় পরিচালনা পর্ষদের অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য বলেছেন, পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়া এ ধরনের চিঠি দেওয়া ঠিক হয়নি।
তবে সংগঠনের সভাপতি বলেছেন অন্য কথা। তাঁর মতে, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন না নিয়েও সভাপতি যে কাউকে যেকোনো দায়িত্ব দিতে পারেন।
যোগাযোগ করা হলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমিতির কার্যালয় আছে কি না, এটা দেখার দায়িত্ব এফবিসিসিআইয়ের নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সমিতিগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃত সংগঠনের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এফবিসিসিআই উদ্যোগ নিয়েছে।’
আনিসুল হক আরও বলেন, সভাপতি হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছাড়াও কিছু দায়িত্ব যে কাউকে দেওয়া যায়। কাজ শেষে পরিচালনা পর্ষদের চূড়ান্ত অনুমোদন নিলেই চলে।
অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি আবু আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সভাপতি দায়িত্ব দিয়েছেন বলেই তিনি সমিতিগুলোর কাছে চিঠি দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘অনেক সমিতি পকেট সমিতি বা প্যাডসর্বস্ব হলেও তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃত ও এফবিসিসিআইয়ের সদস্য। ফলে কার্যালয় রয়েছে এমন সমিতিগুলোকে কোনো সামগ্রী দেওয়া হলে সংগঠনের সদস্য হিসেবে অন্য সমিতিগুলোকেও তা দিতে হবে। তারাও বার্ষিক চাঁদা পরিশোধ করে এফবিসিসিআইয়ের সদস্য হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, দেশের বিভিন্ন জেলা চেম্বারগুলোর নিজস্ব ভবন তৈরি করার জন্য ২০০৮-০৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এফবিসিসিআইকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ অর্থ দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলা চেম্বারের উন্নয়নে ব্যয় করা হলেও গত রমজানে দ্রব্যমূল্য কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওপর এফবিসিসিআইয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

রোনালদো-মেসিদের ছাপিয়ে মুনিয়েইন

স্প্যানিশ লিগ হলো তারার মেলা। বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখানে। আছেন আর্জেন্টাইন ‘জাদুকর’ লিওনেল মেসি, ব্রাজিলীয় মহাতারকা কাকা। তবে একটা জায়গায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন ইকার মুনিয়েইন। স্প্যানিশ লিগের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে পাদপ্রদীপের আলো কেড়ে নিয়েছেন অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের টিনএজ ফরোয়ার্ড।
পরশু ভ্যালাদোলিদের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে গোল করে বিলবাওকে এনে দিয়েছেন ড্র (২-২)। এদিন মুনিয়েইনের বয়স ছিল ১৬ বছর ২৮৯ দিন। এর আগে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ডটি ছিল জিসকো নাদালের। লেভান্তের ফরোয়ার্ড নাদাল ২০০২-০৩ মৌসুমে ভিলারিয়ালের হয়ে গোল করেছিলেন ১৬ বছর ৩৫৩ দিন বয়সে।

বাফুফেকে জমি দিতে এলেন নজমুল

এমন মানুষও এখন পাওয়া যায়! নাম নজমুল আলম জোনা। নীলফামারীর ডোমার থানার বাসিন্দা। বয়স ৪৫। খুবই সাধারণ একজন লোক, কিন্তু তিনি তাঁর কাজ দিয়ে অসাধারণ হয়ে উঠতে যাচ্ছেন। আজকাল যখন দখলবাজদের দৌরাত্ম্য দেশজুড়ে, তখন কিনা এই ভদ্রলোক জমি দান করতে এগিয়ে এসেছেন!
একসময় জেলায় ফুটবল খেলতেন। এখন ধান-চাল-পাটের ব্যবসা করেন। একজন ফুটবলপ্রেমিক হিসেবে ভাবলেন, ফুটবলের জন্য কিছু করা দরকার। তাঁর তো অনেক জমি। শুধু তাঁর নয়, তাঁর গোটা পরিবারই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার জন্য জমি দান করেছে এলাকায়। তিনি চিন্তা করলেন ফুটবল ফেডারেশনকে ১০ একর (৩০ বিঘা) জায়গা দেবেন, সেখানে একটা একাডেমি করা যায়। এটা নীলফামারী জেলা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে, চিলাহাটীর কাছে।
বাফুফে ভবনে এসে কাল নবনির্বাচিত সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনকে নিজের ইচ্ছাটা জানিয়েছেন নজমুল। বাফুফে সভাপতি সব শুনে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং বাফুফের টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর সাহিদুর রহমান সান্টুকে বলেছেন, একাডেমি করা যাবে কি না সেটা দেখে আসতে। নজমুল আলম বললেন, ‘জমির দাম ১০-১৫ লাখ টাকা হতে পারে। তবে আমি টাকা নেব না। আমার এলাকায় কিশোর-তরুণেরা ফুটবলের দিকে যাতে ঝোঁকে, সে জন্যই চাই একাডেমি হোক। বাফুফে জায়গাটা নিলে আমি খুবই খুশি হব।’

ম্যারাডোনার জন্য মিলিতো-আঘাত

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা আর কাকে বলে! এমনিতেই ডিয়েগো ম্যারাডোনার দুশ্চিন্তার সীমা নেই। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে তাঁর দল। এর মধ্যে আরেক দুশ্চিন্তা হয়ে এসেছে ইন্টার মিলান স্ট্রাইকার দিয়েগো মিলিতোর ইনজুরি। পেরু ও উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আগামী শনি ও বুধবারের আর্জেন্টিনার শেষ দুটি ম্যাচ খেলতে পারবেন না মিলিতো।
মিলিতো চোট পেয়েছেন গত শনিবার। উদিনেসের বিপক্ষে ইন্টারের ২-১ গোলের জয়ের দিন পেশিতে টান পড়েছিল তাঁর। তখন অবশ্য কেউই বুঝতে পারেনি, এটা গুরুতর কিছু। ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে ইন্টার মিলান এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের পেশিতে টান পড়েছে। ক্লাবের মেডিক্যাল স্টাফরা আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে।’
এই গ্রীষ্মের দলবদলের সময়েই জেনোয়া থেকে ইন্টার মিলানে যোগ দিয়েছেন মিলিতো। ইন্টারের হয়ে ৫ গোল করে এখন পর্যন্ত সিরি ‘আ’র সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনিই। তাই পরের দু ম্যাচে তাঁকে না পাওয়াটা হবে আর্জেন্টিনার জন্য বড় আঘাত।

মুক্তিযোদ্ধাকে বিদায় দিল আবাহনী

সমানুপাতিক হারে আবাহনীর গোলসংখ্যা বাড়ছে। পুলিশ দলকে ১-০, চট্টগ্রাম আবাহনীকে ২-০ গোলে হারানো আবাহনী কাল তৃতীয় ও শেষ গ্রুপ ম্যাচে মুক্তিযোদ্ধার বিপক্ষে জিতল ৩-০ গোলে।
প্রথম দুই ম্যাচ জিতেই ‘ডি’ গ্রুপ থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করেছিল আবাহনী। তৃতীয় ম্যাচেও পুরো পয়েন্ট পেয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়নই হলো তারা। সমান ৪ পয়েন্ট নিয়েও গোল-গড়ে মুক্তিযোদ্ধাকে পেছনে ফেলে গ্রুপ রানার্সআপ চট্টগ্রাম আবাহনী। দলটির কৃতজ্ঞ থাকা উচিত বড় আবাহনীর কাছে। বড় আবাহনীর কাছে এক গোলের ব্যবধানে হারলে গোল-গড়ে মুক্তিযোদ্ধাই চলে যেত শেষ আটে। কিন্তু কাল মুক্তিযোদ্ধা দেখল নিষ্ঠুর এক আবাহনীকে!
দিনের প্রথম ম্যাচে পুলিশকে ২-১ গোলে হারিয়ে চট্টগ্রাম আবাহনী চোখ রেখেছিল ঢাকা আবাহনী-মুক্তিযোদ্ধা ম্যাচে। তিন ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ৪, ৩টি গোল করে, খেয়েছে ৪টি। তখন পর্যন্ত দুই ম্যাচে মুক্তিযোদ্ধার পয়েন্ট ৪, গোল দিয়েছে ২টি, খেয়েছে একটি। আবাহনীর কাছে ১-০ বা ২-১ ব্যবধানে হারলেও মুক্তিযোদ্ধাকে হতাশা নিয়ে মাঠে ছাড়তে হয় না। কিন্তু আগের ম্যাচের চেয়েও এদিন ভালো খেলে আবাহনীর পেশাদারির কাছে স্বপ্ন ভেঙে গেল মুক্তিযোদ্ধার।
তবে যে মাঠে খেলা হলো কাল তাকে মাঠ না বলে রোপা আমন ধানের এক খণ্ড জমি বলাই ভালো। একটা সময় হাঁটুসমান কাদা মাঠেও খেলা হতো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। কয়েক বছর ধরে মাঠ সংস্কারের নামে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হলেও মাঠের সেই দুরবস্থাই থেকে গেছে। দিনে দুটি খেলা হওয়ায় এই মাঠের এমন অবস্থা হয়েছে যে তাকে ফুটবল মাঠ বলাটাই অন্যায় হয়ে যায়। থিকথিকে কাদায় কোনো রকমে বল ঠেলেঠুলে সামনে নেওয়ার লড়াই করেছেন খেলোয়াড়েরা। কাদা মাঠেই দ্বিতীয়ার্ধে নামে মুষলধারে বৃষ্টি। আরেকটু হলে হয়তো এই ম্যাচ শেষই করা যেত না!
যাই হোক, কাদা মাঠে বৃষ্টির পর খেলা শেষ হলো। প্রথমার্ধটা ছিল নিষ্প্রাণ, তবে তিনটি গোল দ্বিতীয়ার্ধকেও দিয়েছে প্রাণ। ৪৯ মিনিটে ইব্রাহিমের ক্রস থেকে প্রাণতোষ, ৬৯ মিনিটে প্রাণতোষের ক্রসে ইব্রাহিমের বদলি হিসেবে নামা এনামুল গোল করেন। দুটিই ছোট ডি-এর ভেতর থেকে হেডে। মুক্তিযোদ্ধার গোলরক্ষক তারেকের পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে না আসার সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন দুই গোলদাতা।
৭৮ মিনিটে রবিনের পা থেকে বল কেড়ে নিতে গিয়ে ফাউল করেন গোলরক্ষক তারেক, প্রাপ্ত পেনাল্টি থেকে গোল করেন এদিনই আবাহনীর জার্সি গায়ে প্রথম খেলতে নামা দীন মোহাম্মদ। গোল পেলেও নজর কাড়তে পারেননি ঘানাইয়ান স্ট্রাইকার। তবে জয়, মতিউর মুন্নাকে বাইরে রেখে একাদশে সুযোগ দেওয়া তরুণ শাহেদের প্রশংসা ছিল সবার মুখেই।
এর আগে, দিনের প্রথম ম্যাচে চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়ে গোল দুটি করেন মাসুদ ও শাহেদ। তিনটি ম্যাচেই পরাজিত পুলিশের এ ম্যাচের একমাত্র গোলটি বিশ্বেশ্বরের।

বাড়বে কন্যা নিরাপদে -চারদিক by তৌহিদা শিরোপা |

১. ‘বেটা হইলে নেইস, বুড়াকালে তোকে দেইখবে। বেটির মায়া করিস না।’ সন্তান জন্মের আগে স্ত্রী লক্ষ্মীকে এ কথাই বলেছিলেন গজেন। কিন্তু বিধি বাম। আবারও কন্যাসন্তানের জন্ম। বৈশাখী নামের চার মাসের শিশুটির জীবনে তাই নেমে এল ঘোর অমানিশা। তার অন্য দুই বোনের মতো তাকেও বিক্রি করে দেওয়া হলো। একটি শাড়ি ও চারশো টাকার বিনিময়ে । অপরাধ—তারা কন্যাশিশু। (৯ সেপ্টেম্বর, প্রথম আলো) এ চিত্র তো হতদরিদ্র, অশিক্ষিত এক পরিবারের।
কিন্তু উচ্চশিক্ষিত অনেক পরিবারেও এমনটা দেখা যায়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত না হলেও অজ্ঞ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন তারা। শম্পার পরিবারের কথাই ধরা যাক। বাবা উচ্চপদের সরকারি কর্মকর্তা। পর পর দুই সন্তানই মেয়ে হওয়ায় ভেবেছিলেন তৃতীয়টি হয়তো ছেলে হবে। কিন্তু শম্পার জন্মের পর বাড়ির দৃশ্যপট বদলে গেল। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে ওর মা প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হচ্ছেন। শম্পার অন্য দুই বোনের জীবনে নেমে এল কালো ছায়া। ওদের বাবা সারাক্ষণ কটূক্তি করেন। অবজ্ঞা আর অবহেলায় দিন কাটছে। এ বাড়িতে শম্পা যেন ভিনগ্রহের প্রাণী। সাত বছরের শম্পা জানে না, বাবার সঙ্গে কথা বলতে কেমন লাগে। তবে বুঝতে পারে, বাবা ওকে পছন্দ করে না। সে জন্যই হয়তো ওর সঙ্গে কথা বলে না। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে। অদৃশ্য দোষে শম্পা নিজেকেই যেন দায়ী করে। ভাবে, ইস, যদি ছেলে হতাম, তবে বাবা কতই না ভালোবাসত!
সেদিক থেকে অনু নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। ওর পরিবারে ছেলেমেয়েতে ভেদাভেদ নেই। বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি ওদের দুই বোনকে। বরং অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেদের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে ওর মা-বাবা। অনুর বাবা বলেন, ‘মেয়েরাই আমার সব। ওদের ঠিকভাবে মানুষ করতে পারাটাই আসল কথা। ছেলে হলেই যে ভালো হবে, মা-বাবাকে দেখভাল করবে, এমনটা নয়। ওদের কখনো বুঝতে দেইনি ছেলেমেয়ের ভেদাভেদ। মানুষ হিসেবে যেন তারা নিজেকে তৈরি করতে পারে, সে চেষ্টাই সব সময় করেছি।’
এমন বোধগম্যতা, বিচারবুদ্ধি আমাদের অনেকেরই নেই। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা। এমনটা কাম্য নয়। মেয়েকে মেয়ে হিসেবে না দেখে শুধু সন্তান হিসেবে বিবেচনা করুন। তাহলে ছেলে না হওয়ার কষ্টটা দূর হয়ে যাবে। কন্যাসন্তানটিকেই সঠিক মূল্যবোধ দিয়ে শিক্ষিত করে তুলুন, দেখবেন, ছেলের চেয়ে কোনো অংশেই সে কম নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই সে-ই আপনার পরম নির্ভরশীলতার জায়গা।
২. জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় - ‘বাড়বে কন্যা নিরাপদে, আনন্দঘন পরিবেশে’। শিশুসপ্তাহের দ্বিতীয় দিন ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০০০ সালে এটি কার্যকর করে। ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া শিশু সপ্তাহজুড়ে রয়েছে নানা আয়োজন।
৩. কখনো কি ভেবেছেন, আপনার মেয়েটি সঠিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে কিংবা তার প্রাপ্য নিরাপত্তাটুকু তাকে দিতে পেরেছেন?। সময়ের অভাবে, অজ্ঞতার কারণে মা-বাবারা তা জানেন না। আমরা সন্তানের কাছে প্রত্যাশা করি অনেক। কিন্তু তার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারি না। সঠিক পরিবেশ পেলে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে তারা। সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে মেয়েরা তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করছে। পুরুষের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছে। তারাও কারও মা, কারও বোন, কারও মেয়ে। আপনার মেয়েকে উত্সাহিত করুন। দেখা যাবে, সে-ই আপনার মুখ উজ্জ্বল করছে। মেয়ে বলে হেয় করা উচিত নয়। বরং ঘরে-বাইরে তার জন্য সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করুন। এর জন্য প্রত্যেককেই এগিয়ে আসতে হবে, যাতে কোনো মেয়েই নিরাপত্তাহীনতার না ভোগে। অনেক সময় কাছের মানুষের দ্বারা কিশোর মেয়েটি শারীরিকভাবে নিপীড়িত হয়। তাই মা-বাবাকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরি করুন। যেকোনো সমস্যার কথা সে যেন আপনাকে বলতে পারে। আনন্দময় ও নিরাপদ পরিবেশে কন্যাসন্তানটি যেন বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যের জন্য পরিবেশ তৈরি করে দিলে, তা একদিন নিজেরই কাজে লাগবে। বিশেষ দিনে, বিশেষ সপ্তাহে নয়, সারা বছরই আমাদের কাজে-কর্মে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সঙ্গে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি যখন খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি -খাদ্যসমস্যা by এ জেড এম আবদুল আলী

তখন তিনি মেক্সিকো সিটি শহরের কাছেই একটি গমক্ষেতে গমের ফলন পরীক্ষা করে দেখছিলেন। তাঁর স্ত্রী মার্গারেট গাড়ি চালিয়ে তাঁর কাছে এসে বললেন, তুমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছ। উনি স্ত্রীকে বললেন, কেউ তোমার সঙ্গে মশকরা করেছে, এসব গুজবে কান দিয়ো না। একটু পর তাঁর স্ত্রী আবার তাঁর কাছে এসে বললেন, না, খবরটি সত্যি। সত্যিই তোমাকে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। উনি সেই নোবেলজয়ী নরম্যান বোরল্যগ (Dr. Norman Borlaug), তখন বললেন, দাঁড়াও, উত্সব একটু পরে করা যাবে। এর আগে আমি এই গমের গুণগত মানটি পরীক্ষা করে ফেলি।
নরম্যানের বয়স তখন মাত্র ৫৬। এই বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া মানুষটি ষাটের দশকে তাঁর গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল গমের আবিষ্কার করে বিশ্বের জনগণকে আসন্ন দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। এখন যাকে আমরা ‘সবুজ বিপ্লব’ বলে থাকি, সেই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন এই মানুষটিই। জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালে দাদা-দাদির খামারে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্যে। তাঁর মা-বাবাও একই সঙ্গে থাকতেন। খুব অবস্থাপন্ন ছিলেন না। তাই লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে তাঁকেও ক্ষেতে গিয়ে বাবার সঙ্গে কাজ করতে হতো। তখনই তাঁর মনে প্রশ্নের উদয় হয়, কোনো কোনো ক্ষেতে গমের ফসল ভালো হয় কেন, আবার কোনো কোনো ক্ষেতে ফসল মোটেও ভালো হয় না? দাদা-দাদি, মা-বাবা এবং অন্য কৃষকদের প্রশ্ন করে তিনি কোনো সদুত্তর পাননি। এই সময়েই তাঁর লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়ার কথা। কেননা সেই সময়ে কৃষকের সন্তানের পক্ষে স্কুল-কলেজে পড়তে যাওয়াটা বিলাসিতা বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু তাঁর দাদা নিজে লেখাপড়া করতে পারেননি বলে তাঁর মনে একটা দুঃখ ছিল। তাই তিনি তাঁর এই মেধাবী নাতিকে লেখাপড়া ছাড়তে দেননি। তা ছাড়া বরাবর বৃত্তি পাওয়ায় তাঁর পরিবারের কোনো বাড়তি খরচ পড়েনি ওঁর পড়ালেখার কারণে। কাজেই তরতর করে সব পরীক্ষায় পাস করে ফেললেন তিনি। ওই সময় ত্রিশের দশকের সেই মহামন্দা চলছে। এরই মধ্যে তিনি মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। পথেঘাটে অজস্র ক্ষুধার্ত মানুষ দেখাটি তাঁর মনে এক চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। কেন ফসল হয় না, কেন মানুষ খেতে পায় না ইত্যাদি প্রশ্ন তাঁকে অস্থির করে তোলে।
প্রথমে তিনি পড়তে শুরু করেছিলেন ফরেস্ট্রি বা বনরক্ষণবিদ্যা। পরে তাঁর একজন অধ্যাপক তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন প্লান্ট প্যাথলজি পড়তে। তিনি সেই বিষয়ে পড়ে একটি ডক্টরেট উপাধি নিয়ে ফেলেন। পাস করে তিনি প্রথমে ১৯৪২ সালে যোগ দেন বিখ্যাত কোম্পানি ডু পন্টে (Du Pont)। সেই কোম্পানি তখন নানা ধরনের রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছিল। আবার তাঁর জীবনে উদয় হন তাঁর অধ্যাপক এলভিন সি স্ট্যাকম্যান (Elvin C. Stakman)। তিনি নরম্যানকে বলেন ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে রকফেলার ফাউন্ডেশনের মেক্সিকান হাঙ্গার প্রকল্পে যোগ দিতে। তিনি তা-ই করেন। তখন রাস্ট ফাঙ্গাস নামের এক ধরনের ছত্রাক মেক্সিকোয় গমের ক্ষেতগুলো নষ্ট করে দিচ্ছিল। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের গমের মধ্যে সংকরায়ণ ঘটিয়ে অবশেষে এক ধরনের গমের বীজ সৃষ্টি করলেন, যাতে রাস্ট ছত্রাক বাধাপ্রাপ্ত হয় না। তাঁর এই সাফল্যে মেক্সিকোর খাদ্যাভাব তখনকার মতো ঘুচে গেল। কিন্তু তখনো তাঁর সামনে অনেক সমস্যা। তিনি দেখলেন যে গমের চারাগুলো অনেক লম্বা হয়, ফলে গমের ভারে সেগুলো নুয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তখন নানা রকমে কীট এসে সেগুলো খেয়ে ফেলে।
এবার তাঁর প্রচেষ্টা শুরু হয় নানা রকমের রাসায়নিক ফার্টিলাইজার নিয়ে। বিভিন্ন ধরনের গমের সংকরের সঙ্গে রাসায়নিক সার যোগ করে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে দিনের পর দিন। ১৯৫৩ সালের দিকে তিনি এক ধরনের গমের চারা সৃষ্টি করলেন, যেগুলো বেশি লম্বা হয় না। খানিকটা বেঁটে-খাটো এই চারাগুলোতে অনেক গমের দানা ফলাতে সক্ষম হলেন তিনি। যেহেতু চারাগুলোর গোড়া বেশ মোটা ও শক্ত, সেই কারণে গমের দানা যত বেশিই হোক, চারাগুলো ঠিকই দাঁড়িয়ে থাকে। এরই ফলে দেখা গেল যে একই জমিতে এই বেঁটে গমের চাষ করে তিনি দ্বিগুণ, ত্রিগুণ এমনকি চার গুণ বেশি ফসল ফলাতে সক্ষম হলেন। চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশকের মধ্যে মেক্সিকোর খাদ্য উত্পাদন ছয় গুণ বেড়ে গেল। তাঁর এই সাফল্যই সবুজ বিপ্লবের সূচনা করল গোটা পৃথিবীতে। এই সময়ে রকফেলার ফাউন্ডেশন তাঁকে ফিলিপাইনের ধান গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বললেন। নরম্যানের প্রযুক্তি ফিলিপাইনের ধানেও অভাবনীয় ফলন ফলাতে সক্ষম হলো। একই প্রযুক্তি ভারতে ধানের ক্ষেতেও প্রয়োগ করে একই ফল পাওয়া গেল। দুটি দেশই অচিরে খাদ্যঘাটতি থেকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠল। ১৯৬৮ সালে ভারতে গমের ফসল এত বেশি হয়েছিল যে, সে বছর দেশের অনেক স্কুল বন্ধ করে দিয়ে সেই স্কুলঘরকে গমের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সারা বিশ্ব থেকে বোরল্যগের ডাক আসতে লাগল ধান, গম, ভুট্টা চাষে তাঁর পদ্ধতি কাজে লাগানোর জন্য। বোরল্যগও যতটা সম্ভব সেই ডাকে সাড়া দিতে লাগলেন। এক দুনিয়া-কাঁপানো বিপ্লবের সূচনা হলো সর্বত্র। মানুষের প্রাণে এক নতুন ভোরের উদয় হলো। অবশ্য ডক্টর বোরল্যগের কয়েকজন সমালোচকও দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন এই সময়। তাঁরা বলেছিলেন, নরম্যান এই নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করে শেষ পর্যন্ত মানুষের ক্ষতিই করলেন। কেননা কৃষকেরা সনাতন পদ্ধতির চাষবাস ভুলে গেলে শেষে ক্ষতিই হবে পৃথিবীর। তাঁর চাষের পদ্ধতি সমাজ ও পরিবেশের ক্ষতি করবে। কৃষকদের অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে। বামপন্থীরা বললেন, তিনি ছোট ছোট কৃষকের সর্বনাশ করে ফেলেছেন। কৃষিকর্মের ওপর বড় বড় করপোরেশনের প্রভাব সৃষ্টি করার ফলে ক্ষুদ্র কৃষকের কর্মসংস্থান বিপন্ন করেছেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালে তাঁকে দেওয়া হলো নোবেল শান্তি পুরস্কার। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের বক্তৃতায় তিনি এসব সমালোচনার জবাব দিলেন এই বলে যে, আসল সমস্যাটি হচ্ছে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যদি কমানো না যায়, তাহলে কোনো প্রযুক্তি বা কোনো পদ্ধতির চাষবাসই শেষ পর্যন্ত মানুষ ও পৃথিবীকে বাঁচাতে পারবে না। অনেক দেশেই আজ খাদ্য যা উত্পাদিত হচ্ছে, এর চেয়ে খাওয়ার লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে খাদ্যসংকট আবার হবে, আবার মানুষকে না খেয়ে থাকতে হবে। নরম্যান বোরল্যগ তাঁর জীবদ্দশাতেই নিজের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যেতে দেখলেন। ২০০৭ সালে সারা পৃথিবীতে যে খাদ্যসংকট সৃষ্টি হয়েছিল, এর হাত থেকে পৃথিবীর অনেক দেশই আজ মুক্তি পায়নি। চীন, ভারত, ব্রাজিল, মেক্সিকো—সব দেশেই আবার খাদ্যসংকট ফিরে এসেছিল সে বছর। প্রকৃতপক্ষে সেই মন্দাবস্থা থেকে পৃথিবী আজও মুক্তি পায়নি।
আমাদের বাংলাদেশেও সেই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই সামান্য ভূখণ্ডে এখনই প্রায় ১৬ কোটি মানুষ হয়েছে। এসব মানুষকে খাওয়াতে হলে যে পরিমাণ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন, কোনো প্রযুক্তিতেই আর তা উত্পাদন করা সম্ভব হবে না। অচিরে জনসংখ্যার গতি রোধ না করতে পারলে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সামনে সমূহ বিপদ উপস্থিত হতে বাধ্য। সৌভাগ্যক্রমে এ কথা এখন সবাই, বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার স্বীকার করছে। কাগজে দেখা গেল (প্রথম আলো, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯), সংসদের ডেপুটি স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল শওকত আলী বলেছেন, ‘জনসংখ্যাই এক নম্বর সমস্যা বাংলাদেশের।’ জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বঙ্গবন্ধু ও বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় সবাই একমত হয়েছেন যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জন সম্ভব এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণই আমাদের সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যা। সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয়, এ সমস্যা এখন বিশ্বব্যাপী। খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি অনুযায়ী এ মুহূর্তে পৃথিবীতে ১০০ কোটি নিরন্ন মানুষ রয়েছে।
ডক্টর নরম্যান বোরল্যগ তাঁর নোবেল বক্তৃতায় ঠিকই বলেছেন। এই মহান ব্যক্তিটি দিনকয়েক আগে গত শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ৯৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশ্বের মানুষকে জনসংখ্যা সম্পর্কে সচেতন করতে এই ব্যক্তির অবদান অতুলনীয়। অষ্টাদশ শতকে বিশপ ম্যালথাস জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিষয়ে একটি সাবধানবাণী করেছিলেন। তবে তিনি সমস্যাটি সমাধানের কোনো বিশেষ পথ দেখাননি। বিংশ শতকে মনীষী নরম্যান বোরল্যগ এ সমস্যার সমাধান হাতেনাতে করে দেখিয়েছেন। মানবজাতিকে গত শতকের ষাটের দশকে তিনি আসন্ন দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল খাদ্যশস্য মানুষকে সেদিন বাঁচালেও মানবজাতি সাবধান না হলে এ বিপদ আবার আসতে পারে—এই সাবধানবাণী তিনি সেই ১৯৭০ সালেই করেছিলেন। আমরা আজ এই প্রয়াত কৃষিবিজ্ঞানীর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
এ জেড এম আবদুল আলী: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।

সম্মান চেয়ে নেওয়ার জিনিস নয় -পদক by সুমনা শারমীন

১৯৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ভোরের কাগজ-এর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল ছবিটি। বহু বছর পর পুরোনো পত্রিকার ফাইল খুলে সাদা-কালো ছবিটি দেখলাম। নাকে এসে লাগল পুরোনো নিউজপ্রিন্টের নস্টালজিয়ার ঝাপটা। ছবির নিচের ক্যাপশনে লেখা ছিল—‘গতকাল বেগম রোকেয়া দিবসে রাষ্ট্রীয় রোকেয়া পদক ’৯৬ প্রদান করা হয়।...প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ কবি বেগম সুফিয়া কামালকে তাঁর বাসায় গিয়ে পদক পরিয়ে দেন।’
সাংবাদিকতার পাঠ্যপুস্তকে পড়ে এসেছি—‘আজকের সংবাদপত্র কালকের দলিল’। দলিলই বটে, একই দিনে ভোরের কাগজ-এর শেষ পৃষ্ঠার শেষ কলামের খবর—‘বাসায় গিয়ে সুফিয়া কামালকে পদক দিলেন প্রধানমন্ত্রী’; একেই বুঝি বলে শ্রদ্ধা, সম্মান। সংবাদপত্রের সংবাদ ও সুফিয়া কামালের মেয়ে সুলতানা কামালের কাছ থেকে জানলাম, সে বছর বেগম রোকেয়া পদক পান শিক্ষাবিদ নীলিমা ইব্রাহিম এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবি সুফিয়া কামাল। সকালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অসুস্থ কবির পক্ষ থেকে পদক নেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন কবির আরেক মেয়ে সাঈদা কামাল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবির মেয়ের হাতে পদক তুলে না দিয়ে সেই অনুষ্ঠানেই ঘোষণা দেন, তিনি নিজে কবির বাসায় গিয়ে পদক দিয়ে আসবেন। সেদিনই বিকেলবেলা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ‘সাঁঝের মায়া’য় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুফিয়া কামালের গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন পদক। খবরের এ পর্যায়ে লেখা আছে, “মায়ের মতন বয়োবৃদ্ধ কবিকে পরম উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরে শেখ হাসিনা বললেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন।’ মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাত প্রধানমন্ত্রীর মাথায় ছোঁয়ালেন কবি। বললেন—‘আল্লাহ তোমার ভালো করুন’।” রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে যদি সম্মান দিতে হয়, এর চেয়ে আন্তরিক শ্রদ্ধা আর সম্মানের চিত্র কী-ই বা হতে পারে!
অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় একুশে পদক ২০১০-এর পুরস্কার দেওয়ার জন্য যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে (২৭ সেপ্টেম্বর, দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত), তাতে বলা হয়েছে, একুশে পদকের জন্য ‘আবেদন’ করতে হবে! বিজ্ঞপ্তির তিন নম্বর নিয়মটি শুধু তুলে দিলাম, ‘আবেদনকারীকে নির্ধারিত ছক পূরণপূর্বক সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের বিষয়ে প্রমাণপত্র ও আলাদা জীবনবৃত্তান্তসহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে।’
একুশে পদক রাষ্ট্রীয় সম্মান। সম্মান কি চেয়ে নেওয়ার জিনিস? সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই চোখে পড়ে অমুক সংগঠন, তমুক শিল্পীগোষ্ঠী, তমুক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য গুণীজনকে সম্মাননা দিয়েছে। তবে যে ছবিটি ছাপা হয়, তাতে দেখা যায় আয়োজকেরা বসে আছেন চেয়ারে আর বয়োজ্যেষ্ঠ গুণীজনেরা পদক হাতে পেছনে দাঁড়িয়ে। হায় রে সম্মান! এর চেয়ে অসম্মান আর কী হতে পারে!
আমাদের আর আছে কী, আত্মসম্মান ছাড়া? এ ছোট্ট দুঃখী দেশটার যা কিছু অর্জন, এর পেছনে একটিই শক্তি—আত্মসম্মান। বাংলায় কথা বলতে দেবে না! স্বাধীনতা দেবে না! আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মসম্মানবোধে লাগল। গানের উক্তিতে-পঙিক্ততে বলি, ‘যদি ভাবো কিনছো আমায় ভুল ভেবেছ।’
আর আজ স্বাধীন দেশে আমরা ভাবছি, যান্ত্রিক উন্নয়ন ঘটাব? একটা পদক দেওয়া দরকার, তাই বিজ্ঞপ্তি আহ্বান করব? কাজটা সোজা হয়ে যাবে? কিন্তু সত্যিকার আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ নিজে সম্মান চেয়ে নিতে পারে? প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া আর কাউকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া কি একই কথা? অনেক বড় বড় আয়োজনের প্রতিযোগিতা হয় দেশে। শিল্পী, সাংবাদিকেরা এতে অংশগ্রহণও করেন। পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে পান সম্মান। সেটি ভিন্ন প্রক্রিয়া। কিন্তু রাষ্ট্র যখন কাউকে পদক দিয়ে সম্মানিত করবে, তখন তার প্রক্রিয়া নিশ্চয়ই আলাদা হবে। একটি বড় কাজ প্রদানের স্বচ্ছতার প্রক্রিয়া আর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের প্রক্রিয়াতেও নিশ্চয়ই ভিন্নতা কাম্য। অসুস্থ ছিলেন বলে ১৯৮৯ সালে সত্যজিত্ রায়কে কলকাতায় এসে তত্কালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে ‘লিজিয়ন অব অনার’ খেতাব দিয়ে গিয়েছিলেন। কাউকে সম্মান দিতে হলে ‘সম্মানই’ দিতে হয়।
এ বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদ জানিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ দেশের প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। রামেন্দু মজুমদার বলেছেন, ‘এটা বিস্ময়কর, আমাদের অবাক করেছে।’ নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেছেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের পাশাপাশি কুরুচি ও সৌজন্যবোধের অভাবই প্রকাশ পেয়েছে।’
মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল জানিয়েছেন, ‘বিগত বছরে পর পর দুইবার আমাকে রোকেয়া পদকের জন্য আবেদন করতে অনুরোধ করা হয়েছিল। আমি করিনি। আবেদন করে পুরস্কার নেব কেন?’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, আগে বিশিষ্টজনের কাছে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন চাওয়া হতো। এটা ভালো। মনে আছে, সিকান্দার আবু জাফরকে একবার একটি রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের জন্য মা (সুফিয়া কামাল) মনোনয়ন করে পাঠিয়েছিলেন।’
মনোনয়নের বিষয়টি অবশ্য এবারের বিজ্ঞপ্তিতেও আছে। বিজ্ঞপ্তির ৫ ও ৬ নম্বর নিয়মে আছে, ‘একুশে পদকপ্রাপ্ত সম্মানিত সুধীবৃন্দ এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা/শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করতে পারবেন।’ ঘুরেফিরে আসি আত্মসম্মানবোধের জায়গায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘একুশে পদক দেওয়া হবে একজন সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, ভাষাবিদ ও ভাষাসংগ্রামী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানকারী সামাজিক ব্যক্তিকে।’ এবার বলুন, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন কোন কবি নিজের জন্য নির্ধারিত তারিখের মধ্যে একুশে পদকের জন্য আবেদন করবেন? বলবেন, আমি যোগ্য, এ-ই প্রমাণ! আমাকে একুশে পদক দিন! নাকি এ বিজ্ঞপ্তি দেখে তাঁর মনে পড়বে, আরেক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন বাঙালি কবির কবিতার পঙিক্ত—‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ...’।
সুমনা শারমীন: সাংবাদিক।

সোনার পালঙ্ক নয় সোনার নৌকা -বাঘা তেঁতুল by সৈয়দ আবুল মকসুদ

হাততালি আর ঘুষ আদান-প্রদানের পদ্ধতি একই রকম। এক হাতে কপাল ও বুক চাপড়ানো যায়, কিন্তু তালি বাজে না। ঘুষও এক পক্ষের ব্যাপার নয়: এর জন্য একজন দাতা আর একজন গ্রহীতা দরকার। দুইয়ে দুইয়ে মিলে গেলে ঘুষকার্য সুচারুরূপে সম্পন্ন হতে পারে।
ইংরেজরা আসার আগে চুরি-ডাকাতি থাকলেও এ দেশে ঘুষ জিনিসটি ছিল না। মুঘল আমলে যে প্রশাসনিক পদ্ধতি ছিল তাতে ঘুষ আদান-প্রদানের প্রয়োজন হতো না। পলাশীর যুদ্ধে অবৈধভাবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জেতার জন্য কোম্পানির কর্তারা পরীক্ষামূলকভাবে ম্যাক্রো ঘুষ চালু করেন। কারণ তত দিনে এ দেশের মানুষের চরিত্র ইংরেজরা টের পেয়ে গিয়েছিল। তারপর পলাশীতে নবাবকে পরাজিত ও হত্যা করার পর থেকে মাইক্রো লেভেলে ঘুষ শুরু হয়ে যায়।
আরও পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে যখন ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ তৈরি হওয়া শুরু হয় তখন ঘুষপ্রথারও বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়। একপর্যায়ে তা পৌঁছে যায় ক্ষুদ্রঋণের মতো মাইক্রো বা তৃণমূল পর্যায়ে। অনেককাল থেকেই ঘুষ বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঘুষ দেওয়ার জন্য বাঙালির অন্তর আঁকুবাঁকু করে। দাতার হাত থেকে ঘুষ নেওয়ায় মধ্যে আছে এক ধরনের অহংকার। অন্যদিকে ঘুষ দেওয়ার মধ্যে আছে এক ধরনের গভীর তৃপ্তি। সেই পরম তৃপ্তি থেকে খুব কম বাঙালিই বঞ্চিত হতে চায়। শুধু সে থাকে সুযোগটির অপেক্ষায়। সে সুযোগ আসা মাত্র সে তার সদ্ব্যবহার করে।
ক্ষমতাবানকে অযাচিতভাবে উপহার বা উপঢৌকন দেওয়াও এক ধরনের ঘুষ—ঘুষের এক মার্জিত ও নির্দোষ সংস্করণ। ঘুষ-সংস্কৃতির এই নির্মল সংস্করণটি আগাগোড়াই ছিল। যেকোনো ধরনের ঘুষ দেওয়ার মধ্যে একটি আর্ট আছে। যেমন নিজের ছোট পুকুরে ১০ ইঞ্চির বেশি কাতলার পোনা নেই। সেটা কোনো সমস্যা নয়। বাজার থেকে ১০ কেজি ওজনের রুই কিনে বড় সাহেবের বাড়িতে পাঠানোতে সমস্যা কী? শুধু হাত কচলে বড় সাহবেকে বললেই হলো, ‘সকালবেলা জাল ফেইলা চাকর মাছটা ধরল। আমার ওয়াইভ কইল, স্যারেরে দিয়া আইস।’ নিজেকে একেবারে নির্দোষ প্রমাণের জন্য গিন্নিকেও পার্শ্বচরিত্রে এনে দাঁড় করাতে শুধু বাঙালিই পারে।
উপঢৌকন দেওয়ারও একটি উপলক্ষ দরকার। ধামরাইয়ে একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে সোনার নৌকা উপহার নিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক ও সরকারদলীয় স্থানীয় সাংসদ বেনজীর আহমদ। প্রতিমন্ত্রীকে ১০ ভরি এবং সাংসদকে এক ভরি সাত আনা ওজনের সোনার নৌকা উপহার দেওয়া হলে তাঁরা তা নেন। [বিডি নিউজ/সমকাল]।
খবরে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিমন্ত্রীর হাতে সোনার নৌকা তুলে দিলে প্রতিমন্ত্রী তা গ্রহণ করে ব্যক্তিগত কর্মকর্তার কাছে দেন। সাংসদের সঙ্গে ছিলেন তাঁর অধ্যক্ষা স্ত্রী। গৃহকর্তার ছেলে সাংসদের হাতে সোনার নৌকাটি তুলে দেন। তিনি সেটা কার হাতে তুলে দেন, তা জানা যায়নি। তবে পাশেই ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী।
উপঢৌকনদাতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বাড়ির পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে মন্ত্রী এসেছেন, এ আমার সৌভাগ্য। তাই খুশি হয়েই মন্ত্রী ও সাংসদকে সোনার নৌকা উপহার দিয়েছি।’ এই উপহার নিভৃতে গোপনে দেওয়া হয়নি। ‘মাইকে ঘোষণা দিয়ে এ সোনার নৌকা উপহার দেওয়া হয়।’ ১০ ভরি সোনার দাম আড়াই লাখ টাকার কম নয়। মজুরিসহ নৌকা নির্মাণে লাখ তিনেক টাকা পড়েছে। সাংসদের পেছনে গেছে ৭০-৮০ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রী-সাংসদকে খুশি করতে এবং নিজে খুশি হতে পৌনে চার লাখ টাকা খরচা বেশি কিছু নয়।
আমাদের মতো সন্দেহপ্রবণ ও পরশ্রীকাতর মানুষের মনে যে প্রশ্ন জাগতে পারে তা হলো: উপহারদাতার বাড়িতে প্রতিমন্ত্রী-সাংসদ যাবেনই এর কি কোনো নিশ্চয়তা ছিল? গৃহকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে অর্ডার দিয়ে সোনারুকে দিয়ে নৌকা বানাতে কয়েক দিন সময় লেগেছে। যদি মাননীয়রা তাঁর বাড়িতে না যেতেন তিনি ওই নৌকা দুটি কী করতেন? যে বাড়িতে সোনার নৌকা তৈরি হলো ঠিক সেই বাড়ির পূজামণ্ডপ দেখতেই ক্ষমতাসীনরা গেলেন। সবকিছু কেমন যেন খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে।
অতি ওপরের দিকে কী হয় না-হয় তা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর্তারা জানেন। মাইক্রো পর্যায়ে আজকাল ঈদে ও অন্যান্য পার্বণের আগে অনেকেই স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের জন্য কাপড়চোপড় কেনার আগে ওসি, ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, ডিসি, এসপি, বিভিন্ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও তাঁদের স্ত্রীদের জন্য শার্ট-পাঞ্জাবি ও শাড়ি-গয়না কেনে। টেন্ডার পাওয়ার ব্যাপার আছে, ঠিকাদারির বিল পাসের প্রশ্ন আছে, অর্পিত সম্পত্তি বরাদ্দ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, দুই বছর আগে নিজের প্রতিষ্ঠিত এক ছাত্রীবিহীন কলেজের ছাত্রসংসদের ভিপি নিজের সন্ত্রাসী ছেলেটির ফেঁসে যাওয়ার ব্যাপার আছে। সুতরাং ঈদ ও পূজার আগে কর্তাদের খুশি করতেই হয়। এসব ঘুষ, না উপহার! উেকাচ ও উপঢৌকন একটি সেক্যুলার ব্যাপার।
রূপকথার যুগে নায়ক-নায়িকারা ঘুমাত সোনার পালঙ্কে। আজ গণতন্ত্রের যুগ। এখনকার প্রভুরা চড়বেন সোনার নৌকায়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

‘বিএনপিকে অবশ্যই জামায়াত ছাড়তে হবে’ -অরণ্যে রোদন by আনিসুল হক

মুহম্মদ জাফর ইকবাল আমার প্রিয় মানুষদের একজন। কথাটা বলাই বাহুল্য, কারণ তিনি বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের প্রিয়। কথা বলেন সোজাসাপ্টা, যা বোঝেন তা স্পষ্ট করে জোর দিয়ে বলেন, এক কথার মানুষ, কথা দিলে তার নড়চড় হয় না, তিনি বাংলাদেশে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীকে জনপ্রিয় করেছেন, ছোটদের জন্য খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে লিখে চলেছেন, পড়ান কম্পিউটার বিজ্ঞান, সুদর্শন, হাসিমুখ—এসব গুণ তাঁর জনপ্রিয়তাকে একটা বিশেষত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীদের ওপর তাঁর প্রভাব হ্যামিলিনের বংশীবাদকের মতো। ছোটদের মন বুঝে ফেলার ও পড়ে ফেলার একটা জাদুকরি ক্ষমতা তাঁর আছে।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল সেদিন একটা আনুষ্ঠানিক গোলটেবিল বৈঠকে একটা কথা বলেছেন। বৈঠকটা হয়েছে প্রথম আলোর ঢাকা কার্যালয়ে, ২ অক্টোবর ২০০৯। বিষয়টা ছিল, ‘বাংলাদেশকে বদলে দিতে হলে’। আগামী ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর একাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ওই দিন প্রকাশিতব্য বিশেষ সংখ্যায় গোলটেবিল বৈঠকটির পুরো বিবরণ ছাপা হবে। ৩ অক্টোবরের প্রথম আলোয় বৈঠকটার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল বললেন, জামায়াতে ইসলামী আমাদের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি, একাত্তর সালে তারা আলবদর গঠন করেছে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীরা নিহত হয়েছেন এই আলবদর বাহিনীর হাতে, সেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি জোট বেঁধেছে, সেই জামায়াতে ইসলামীকে সরকারে বসায়, তখন তাদের ব্যাপারে আমরা নিরপেক্ষতা দেখাই কী করে, এইটা যখন আমরা করি, তখন আমাদের লোকে ভাবে আমরা হয়তো একটা দলের হয়ে কথা বলছি। আসলে তা নয়, আমরা দলনিরপেক্ষই। কিন্তু যত দিন জামায়াত বিএনপির সঙ্গে আছে, তত দিন আমাদের পক্ষে বিএনপির পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, একটা তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠেছে, তারা সংখ্যায় অনেক, তারা শিক্ষা চায়, কাজের পরিবেশ চায়, তার সঙ্গে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী শক্তির সঙ্গে থাকতে চায়, যুদ্ধাপরাধীদের তারা মনে-প্রাণে ঘৃণা করে।
এ কথাটা আমরা বেশ কিছুদিন থেকেই উপলব্ধি করছি এবং বলারও চেষ্টা করে আসছি। নতুন প্রজন্ম অন্য রকম। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী আজ সারা দেশে নতুনের স্বপ্নে ও সম্ভাবনায় টগবগ করে ফুটছে। তারাই এ দেশটার ভবিষ্যত্ ঠিক করে দেবে। এরা আধুনিক, এরা দেশপ্রেমিক, এরা দলীয় রাজনীতির ব্যাপারে তেমন সক্রিয় নয়, সরবও নয়। এরাই ভোট দিয়ে সরকার বদলে দেয়। কিন্তু এদের একটা সাধারণ ঐকমত্য আছে, এরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। এরা রাজাকার-আলবদরদের অপছন্দ করে। এরা প্রতিক্রিয়াশীলদের ধারে-কাছেও থাকতে চায় না। এরা এগিয়ে যেতে চায়, এগিয়ে নিতে চায়। এরা নিজেরা ভালো থাকতে চায়, দেশটাকেও ভালো রাখতে চায়।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ব্যাচেলর ছবি বা চড়ুইভাতি জনপ্রিয় হয়েছিল এ ধরনের তরুণদের কাছেই। এরপর যখন তিনি একাত্তরের ঘাতক-দালালদের কুকর্ম উন্মোচিত করে বানালেন ভিডিও ছবি স্পার্টাকাস ৭১, তখন সেটা কি তরুণ প্রজন্মের দর্শক গ্রহণ করতে পারবে! বিস্ময়কর নয় মোটেও, তারা ওই নাটকটিকে গ্রহণ করেছে। দেশে এখন চার কোটি মোবাইল ফোনের গ্রাহক। মোবাইলে মোবাইলে ভোটের আগে এসএমএস চালাচালি হয়েছে, ইন্টারনেটে, ই-মেইলে, ফেইস বুুকে তরুণেরা নিজ দায়িত্বে বার্তা আদান-প্রদান করে জনমত তৈরি করেছে, রাজাকারদের বর্জন করুন। ওদের ভোট দেবেন না!
অর্থাত্ বিএনপি এই জামায়াত ও তার জোটসঙ্গীদের কারণে তরুণ ভোটারদের বিবেচনার বাইরে চলে গেছে।
অথচ বিএনপির ভোটব্যাংক ছিল এই তরুণেরা। আমরা বিভিন্ন ক্যাম্পাসে দেখেছি, জিনস-কেডস পরা তরুণেরা ছাত্রদলের মিছিলে যোগ দিত। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরপর তরুণদের খুবই প্রিয় ও পছন্দের দল হয়ে উঠেছিল বিএনপি।
কিন্তু ২৫ বছর পর বিএনপি হয়ে উঠেছে যেন বার্ধক্যের প্রতীক। আর তার কাঁধে জামায়াতে ইসলামীর সিন্দাবাদের ভূত চেপে বসে দলটাকে একটা পেছনপন্থী দলে ঠেলে দিয়েছে।
তরুণদের মনের কথাটা জাফর ইকবালের কথায়ই ফুটে উঠেছে, বিএনপিকে প্রথমে জামায়াতে ইসলামীকে পরিত্যাগ করতে হবে। যুদ্ধবিজয়ী বাংলাদেশের বিজয়ের গৌরবকে নিজের গৌরব হিসেবে আত্মস্থ করতে পারতে হবে।
বিএনপি দলটা জন্ম থেকেই একটা মহাসংকর দল। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে গড়ে উঠেছিল এ দলটি, ফলে চরম বামপন্থী থেকে শুরু করে চরম ডানপন্থীরা এসে জুটেছিল এই দলে। সূত্রটা ছিল আমরা চীনপন্থী, কাজেই ভারতবিরোধী, কাজেই পাকিস্তানপন্থী, কাজেই আমেরিকাপন্থী। সমপ্রতি প্রথম আলোয় মিজানুর রহমান খান আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিপত্র ঘেঁটে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর যে প্রতিবেদন রচনা করেছেন, তাতে দেখা যায়, জিয়াউর রহমান নিজে আমেরিকানদের এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে আমরা আমেরিকাপন্থী, আমরা পাকিস্তানপন্থী।
পাকিস্তানপন্থা এই দেশে চলবে না। বরং আমরা কোনো পন্থী নই, আমরা বাংলাদেশপন্থী, এই বার্তাটা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশপন্থী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করতে হলে প্রথমেই বাংলাদেশকে যারা স্বীকার করেনি, ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পরও যারা পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের জন্য তত্পরতা চালিয়েছিল, সেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপিকে সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে।
দল হিসেবে বিএনপি তার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কাদায় পড়েছে এবার। তবে বিএনপির একটা বিশাল ভোটব্যাংক আছে। এবার নির্বাচনে তারা আসন কম পেয়েছে বটে, কিন্তু তার শতকরা ভোট সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি মোটামুটি দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। দেশের মানুষও একবার বিএনপি একবার আওয়ামী লীগ এই দুই ধারার ওপরই ঘুরে-ফিরে আস্থা রেখে আসছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই দুই ধারার বাইরে তৃতীয় ধারা তৈরির চেষ্টা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে চেষ্টা সফল হয়নি। হওয়ার কোনো কারণও নেই।
ওই সময় আমি এই কলামে লিখেছিলাম, বাঙালিত্ব এমন একটা জিনিস, যেটা বদলানো যায় না। আমি চাইলেই আমার চামড়ার রং, আমার জন্মের ইতিহাস বদলাতে পারব না। আওয়ামী লীগ আমাদের বাঙালিত্বের প্রতীক। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে এই দল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কাজেই আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা যাবে না। তেমনিভাবে একটা আওয়ামী লীগ থাকলে একটা না-আওয়ামী লীগও থাকতে হবে। কাজেই বিএনপি ধারার রাজনীতিও এই দেশে থাকবে। সেটাকেও ধবংস করা যাবে না। এই দুই ধারার প্রতিনিধিত্বকারী দল দুটোর নাম যে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি রয়ে যাবে চিরকাল, তা নাও হতে পারে। তবে দুটো ধারা থাকবে।
আমাদের দেশে দুই প্রধান দলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। উভয় দলই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে। উভয় দলই বহু দলীয় গণতন্ত্রকে তাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে মোটেরও পরে আওয়ামী লীগ মধ্যবাম ও বিএনপি মধ্যডান হিসেবে গণ্য হতে পারে। আমেরিকা বা বিলেতেও এ রকমই পরিস্থিতি।
এখন বিএনপি খুবই খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলে ঐক্য নেই। আবদুল মান্নান ভূঁইয়ারা আগেই অপসৃত। নির্বাচনের ফল যারপরনাই খারাপ। বিএনপি নিজেই ভাসতে পারছে না, তার কাঁধে চেপে বসে আছে জামায়াতে ইসলামী। নিজের জলেই টলমল করে আঁখি, তোমার চোখের অশ্রু কোথায় রাখি।
কিন্তু গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার হবেই। এর কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি যদি তরুণসমাজের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে শুধু ভোটার ব্যাংক দিয়ে পরবর্তী নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। ২ অক্টোবরের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা ভোটের ফল নির্ধারণে দলীয় ছাউনির বাইরে থাকা স্বাধীন ভোটার ও এই ভোটারদের মধ্যে তরুণদের প্রাধান্যের কথা বারবার বলেছেন। তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে অবশ্যই বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাকে নিজের গৌরব হিসেবে নিতে পারতে হবে।
আর সংসদে ফিরে যেতে হবে বিএনপিকে। ওই বৈঠকে বিএনপির নেতা সাবেক সেনাপ্রধান মাহাবুবুর রহমান বলেছেন, সংসদে বিএনপির ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়নি, এখন তো নির্বাচন নিয়েই খোদ আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তারপর তিনি একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। আমি সাংসদ হলে সামনের সারিতে জায়গা না পেলে এমনকি বসতে না দিলে পেছনে দাঁড়িয়ে, মাইক্রোফোন না দেওয়া হলে খালি গলায় চিত্কার করে নিজের কথা বলতে থাকতাম।
একদিন এক টেলিভিশন কথাপ্রদর্শনীতে (টক শো) আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ বলছিলেন, বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগ চায় না যে বিরোধী দল সংসদে যাক। তা-ই যদি হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের চাওয়া বিএনপি পূর্ণ করছে কেন, তাদের তো তাহলে বেশি বেশি করে সংসদে যাওয়া উচিত।
তবে সংসদকে অর্থবহ করে তুলতে, আমাদের যাতবীয় বিতর্ক ও ঐকমত্যের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তুলতে সরকারি দলের দায়িত্ব বেশি। সরকারকে আন্তরিকভাবে চাইতে হবে বিরোধী দলকে সংসদে ফিরিয়ে নিতে।
গণতন্ত্র বাইসাইকেলের মতো। এর দুটো চাকা। সরকারি দল আর বিরোধী দল। দুটো চাকা চললেই গণতন্ত্র চলে। বিএনপিকেও চলতে পারতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার ১১ জানুয়ারির কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। গণতন্ত্র না চললে তার কুফল সরকারি দল বিরোধী দল উভয়কেই ভোগ করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হয় জনগণকে। এই দেশের মানুষ গণতন্ত্র চায়, গণতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই চায় না, ওই দিনের গোলটেবিলে এ কথাটা সবাই স্বীকার করেছিলেন। তবে গণতন্ত্রের সঙ্গে মানবাধিকার, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, দুর্নীতিমুক্তি, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, একলা চলার নীতি পরিহার করে স্বাভাবিক মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদিও যে অবিচ্ছেদ্য, সে কথাগুলোও বিভিন্ন বক্তারা তুলে ধরেছেন বিভিন্নভাবে।
মুহম্মদ জাফর ইকবালকে দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম, তাঁকে দিয়েই শেষ করি। ১৯৯৬-২০০১-এর আওয়ামী লীগের আমলে মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রথম আলোয় একটা লেখা লিখে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। সেটা হলো শূন্য দিয়ে গুণ করা। আমরা জানি, যত বড় সংখ্যাই হোক না কেন, শূন্য দিয়ে গুণ করলে সব শূন্য হয়ে যায়। তেমনি ওই আমলে আওয়ামী লীগের বহু ভালো কাজ শূন্যে পরিণত হয়ে গিয়েছিল কয়েকজন দৌর্দণ্ড প্রতাপ সন্ত্রাসীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে। এবারও বলি, যে যা-ই বলি না কেন, সরকারের ভালো-মন্দ, আদর্শ-গণতন্ত্র ইত্যাদি কথার মূল্যায়ন হবে আসলে সরকারের পারফরমেন্স দিয়ে। সরকার দেশটা যদি ভালোভাবে চালায়, তাহলে এক কথা। আর যদি খারাপভাবে চালায়, তাহলে ফলটা দাঁড়াবে শূন্য দিয়ে গুণ করার মতোই। দেশ ভালোভাবে চালানোর কয়েকটা মাপকাঠি আছে জনগণের কাছে। সরকারি দলের লোকেরা সংযত নাকি বেপরোয়া। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কি না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন। জিনিসপত্রের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে কি না ইত্যাদি। সাংবাদিকদের ওপর যখন হামলা হয়, তখন বুঝতে হবে সরকারি দলের ক্যাডাররা আর কিছুই মানছে না। এসব দিকে সরকার নিশ্চয়ই খেয়াল রাখবে।
অন্যদিকে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তেই হবে। কিন্তু আমি কম্বল ছাড়তে চাই বটে, কম্বল তো আমাকে ছাড়ে না। বন্যার জলে কম্বল ভেসে যাচ্ছে দেখে একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে। তারপর কম্বলসহ লোকটা ভেসে যেতে লাগল। সবাই বলতে লাগল, কম্বল ছেড়ে পাড়ে উঠে আয়। সে বলল, আমি তো কম্বল ছাড়তে চাই, কম্বল তো আমাকে ছাড়ে না। কারণ এটা কম্বল নয়, এটা ভালুক। বিএনপিকে বুঝতে হবে জামায়াত কোনো কম্বল নয়, জামায়াত ভালুক।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

প্রযুক্তি যেখানে সহজলভ্য, সেখানে ভোগান্তি বাড়ানো কেন -ভর্তি ফরম সংগ্রহে বিড়ম্বনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতাকে হার মানিয়েছে ভর্তি ফরম সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। একটি বা দুটি কেন্দ্র থেকে ভর্তি হতে ইচ্ছুক হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ফরম সংগ্রহ করার পদ্ধতি যেন অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলার খনি। এই অব্যবস্থাপনা থেকেই জন্ম হয় সহিংসতা আর অসাধুতার। ওয়েবসাইট থেকে ফরম সংগ্রহ করা যেখানে সহজসাধ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী, সেখানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এর প্রচলন করতে বাধা থাকার কথা নয়।
গতকাল সোমবারের প্রথম আলোর দুটি খবর ও একটি ছবি একই সঙ্গে সমস্যার প্রকটতা আর সমাধানের বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড়, নৈরাজ্য ও অবৈধভাবে ফরম সংগ্রহের চেষ্টা; অন্যদিকে ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ভর্তি ফরম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাওয়ার সুবন্দোবস্ত। এ যেন এক যাত্রায় ভিন্ন ফলের আদর্শ দৃষ্টান্ত।
প্রতিবছরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ফরম সংগ্রহের জন্য দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী কিংবা তাদের স্বজনদের অশেষ পেরেশানির মধ্যে পড়তে দেখা যায়। পাশাপাশি সশরীরে এসে ফরম সংগ্রহে সময় ও অর্থেরও কম অপচয় হয় না। অথচ খুবই সহজ ছিল ইন্টারনেট-সুবিধা কাজে লাগিয়ে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফরম পাওয়ার ব্যবস্থা করা। যে দেশে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষ পর্যন্ত ডিভি লটারি পূরণ করতে পারে, যে দেশে ইন্টারনেট-সুবিধা সহজলভ্য, সে দেশে ফরম সংগ্রহের বন্দোবস্তকে অনায়াস ও সাশ্রয়ী করতে অসুবিধা কোথায়? একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের ধ্বনি, অন্যদিকে সাবেকি জবরজং পদ্ধতি আঁকড়ে থাকা কি স্ববিরোধিতা নয়? ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এ ব্যাপারে এগিয়ে গিয়েছে।
অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট এখন একসময়কার টেলিগ্রাম পদ্ধতির মতোই জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। তরুণেরাও ক্রমশ আরও বেশি হারে আগ্রহভরে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার-প্রযুক্তিকে আপন করে নিচ্ছে, দক্ষ হয়ে উঠছে।
অচিরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ও অন্তর্জালিক (ইন্টারনেট) সুবিধার বিস্তারে প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

মিশেল ওবামাকে দেখা যাবে ‘সিসেম স্ট্রিটে’

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় শিক্ষামূলক শিশুতোষ অনুষ্ঠান সিসেম স্ট্রিট-এর ৪০তম বর্ষপূর্তির একটি পর্বে দেখা যাবে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে। আগামী ১০ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় ওই পর্বে মিশেল ওবামা শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে এবং নিজেদের খাদ্য নিজেদেরই উত্পাদনের ব্যাপারে উত্সাহিত করবেন। ওই অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে আরও উপস্থিত থাকবেন মার্কিন অভিনেত্রী ক্যামেরন ডায়াজ ও ইভা লঞ্জোরিয়া-পার্কার।
চলতি বছরের শুরুতে মিশেল ওবামা মার্কিনদের মোটা হওয়ার প্রবণতা ঠেকানোর জন্য একটি প্রচারণা শুরু করেন এবং এর অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসে একটি সবজিবাগান গড়ে তোলেন। সিসেম স্ট্রিট-এর ওই পর্বে ওবামা শিশুদের উদ্দেশে বলবেন, ‘এই বীজগুলোর বেড়ে ওঠার জন্য দরকার সূর্যালোক, পানি ও মাটি। তোমরা এসব স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে আমার মতো হতে পারবে।’