Showing posts with label রাজশাহী. Show all posts
Showing posts with label রাজশাহী. Show all posts

Sunday, February 22, 2026

শিশুদের নিয়ে একজন কৃষকের অন্য রকম একুশে ফেব্রুয়ারি by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

প্রকাশ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ শিশুদের হাতে ফুলের ঝুড়ি। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তাদের ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনাতে শোনাতে হেঁটে যাচ্ছেন কৃষক মনিরুজ্জামান। চৈতন্যপুর থেকে গ্রামের শিশুদের নিয়ে তিনি যাচ্ছেন কান্তপাশা গ্রামে। তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে যেতে তিনি গল্পে গল্পে বলে যান ইতিহাস। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তিনি এভাবে শিশুদের মুখে মুখে ইতিহাস শেখান।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিভৃত একটি গ্রাম চৈতন্যপুর। শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই, শহীদ মিনারও নেই। পাশের কান্তপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছে শহীদ মিনার। কৃষক মনিরুজ্জামানের বাসা রাজশাহী নগরের মহিষবাথান মহল্লায়। তিনি চৈতন্যপুরে জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করেন। তিনি গোদাগাড়ীর এক ফসলি জমিতে নতুন নতুন ফসলের চাষাবাদ করেন। এ জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি জমিতে ফুলের চাষও করেন।

কৃষক মনিরুজ্জামান বরাবরই গ্রামের শিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী সব আয়োজন করেন। শনিবার সকাল সাতটা থেকেই শিশুরা তাঁর জমির গাঁদাফুল তুলতে শুরু করে। এবার জমি থেকে তিন ঝুড়ি ফুল তুলেছে শিশুরা। এসব ফুল নিয়ে তাদের তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। যেতেই যেতেই মনিরুজ্জামান তাদের গল্পে গল্পে একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস বলেন। তারপর শহীদ মিনারে গিয়ে উপস্থিত অন্যান্য গ্রাম থেকে আসা সব শিশুর হাতে একটি করে গাঁদাফুল দেওয়া হয়। সেই ফুল দিয়ে তারা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। মাঠ থেকে ফুল তোলা, হেঁটে কান্তপাশা বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নেতৃত্ব দেয় চৈতন্যপুর গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার, লক্ষ্মী রানী, নবম শ্রেণির লিপি সরকার, রিত্তিকা রানী, আদুরি রানী, দীপালি রানী ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী উর্মি রানী।

মনিরুজ্জামানের নির্দেশনায় শিশুরা ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে বাংলায় ‘২১’ তৈরি করে। বেদির চারদিকে ও সিঁড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর মতো করে ফুল দিয়ে সাজায়। ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় শহীদ মিনারে। মিনারের স্তম্ভের ওপরেও প্রদীপের মতো করে ফুল সাজিয়ে দেওয়া হয়।

কান্তপাশা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম শিশুদের উদ্দেশে বলেন, আজ মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটি কেবল স্মরণীয় দিন নয়, একটি আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। ভাষার অধিকারের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের উজ্জ্বল ইতিহাস। সালটি ছিল ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি। এক জনসভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। তার প্রতিবাদেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী মানুষ, যা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি...।

কী উদ্দেশ্যে নিজের জমিতে চাষ করা ফুল দিয়ে শিশুদের নিয়ে এই আয়োজন করেন, জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ভাষার কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি সামনে এগিয়ে গেছে। যাদের ভাষা যত জনপ্রিয়, যে ভাষায় যত বেশি মানুষ কথা বলে, সেই ভাষার মানুষ তত বেশি এগিয়ে গেছে। যেমন জাপানে গবেষণা করতে গেলে প্রথম দেড় বছর সেই দেশের ভাষা শিখতে হয়। গবেষণাটি তাদের ভাষাতেই করতে হয়। এর মাধ্যমে আসলে তারা তাদের ভাষাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়। আর মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। সেই জায়গা থেকে ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে শিশুদের ভাষাজ্ঞান ও ভাষাশিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি শিশুদের গল্পের ছলে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহান ইতিহাসটা বলেন, যাতে তারা সহজেই এই বয়সে ইতিহাস জানতে পারে। পরে যখন বইপুস্তকে পড়বে, তখন ইতিহাসটা পরিচিত মনে হবে, ভালো লাগবে। ভেতরে শ্রদ্ধাবোধ জাগবে।

অনুভূতি জানতে চাইলে শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার বলে, ‘আমরা নিজের হাতে ফুল তুলেছি। মনির (মনিরুজ্জামান) কাকুর মুখে একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে কখন কান্তপাশায় আইসি পড়ছি, বুঝতেই পারিনি। জীবনে কোনো দিন এই স্মৃতি ভুলব না।’

একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা যাচ্ছে পাশের গ্রাম কান্তপাশায়। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামে
একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা যাচ্ছে পাশের গ্রাম কান্তপাশায়। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, January 28, 2026

ডিএনএ পরীক্ষায় সামনে এল শৈশবে মা হওয়া কিশোরীর জীবনের নির্মম বাস্তবতা

যেখানে শৈশব নিরাপদ ও যত্নে কাটার কথা, সেখানে ভয় ও নীরবতায় দিন পার করেছে রাজশাহীর এক কিশোরী। ১২ বছর বয়সেই ধর্ষণের শিকার হয়ে তাকে মাতৃত্বের ভার বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘ তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, শিশুটি মামা ও সৎবাবার—দুজনের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

অভিযুক্ত সৎবাবার নাম মেহেদী হাসান ওরফে হৃদয় (২৫)। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার একটি গ্রামে হলেও রাজশাহী শহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। আর মেয়েটির মামার বাড়িও বাঘা উপজেলার একটি গ্রামে।

ভুক্তভোগী ওই কিশোরীর জন্ম দেওয়া শিশুটির বয়স এখন ১ বছর ৯ মাস। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন আসার পর অভিযুক্ত মেহেদী হাসান ২১ জানুয়ারি নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পিবিআই বলছে, সৎবাবার কাছে ধর্ষণের শিকার হয়ে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হলেও সে তার মামার হাতেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাই দুজনের বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রোববার রাজশাহী পিবিআইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২১-২২ সালে ওই কিশোরী রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় তার নানার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। সেখানে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরে সে জানায়, ২০২১-২২ সাল পর্যন্ত নানার বাড়িতে থাকার সময় প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তার মামা দিনের পর দিন ধর্ষণ করেন।

ঘটনা জানাজানি হলে ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর এলাকার লোকজন ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্র্যাম্পে সাত লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে মামার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দেন। এ বিয়ে মানতে না পেরে তার মামা আত্মগোপন করেন। পরবর্তী সময় মেয়েটির মা তাকে রাজশাহী শহরের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর ২০২৩ সালের ৩ মার্চ মেয়েটি একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে।

এরপর ভুক্তভোগী মেয়েটির মা বাদী হয়ে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল আদালতে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তারা আসামিকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আদালতের আদেশে ওই কিশোরী, তার সন্তান ও আসামির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, আসামির সঙ্গে নবজাতকের ডিএনএ মিলছে না।

পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এরপর তারা জানতে পারে, মেয়েটির মা ২০২০ সালে তার দ্বিতীয় স্বামী মেহেদী হাসানের সঙ্গে রাজশাহী শহরে ভাড়া থাকতেন। ২০২২ সালে মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে এসে প্রায় দুই মাস সেই বাসায় থাকে ওই কিশোরী। ওই সময় মেহেদী তাকে ধর্ষণ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, মামার সঙ্গে ডিএনএ না মেলায় মেয়েটির সঙ্গে তিনি আবার কথা বলেন। সে কোথায় কোথায় ছিল, তা জানার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী জানায়, সে মায়ের বাড়ি এসে দুই মাস থেকেছে। তখন তিনি সৎবাবাকে সন্দেহ করেন। কিন্তু মেয়েটি জানায়, ঘুমের মধ্যে কিছু হয়েছে কি না, তা তার মনে নেই। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হন।

মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, ২১ জানুয়ারি অভিযুক্ত মেহেদীকে রাজশাহী নগরের মুক্তমঞ্চ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি সব স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মেয়েটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে যে তার মামা তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছেন। আবার মেহেদীও অপরাধ স্বীকার করেছেন। মেহেদীর ধর্ষণের কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হলেও তার মামাও তার সঙ্গে একই কাজ করেছেন। বর্তমানে তার মামা জামিনে আছেন। আর মেহেদী কারাগারে। এখন বিষয়টির তদন্ত চলছে। মেয়েটিকে দুজন ধর্ষণ করে থাকলে দুজনকেই অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হবে।

ধর্ষণ
ধর্ষণ। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, January 14, 2026

শিয়াল কি প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে নিল by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

পদ্মা নদীর চরের বাথানে একদল শিয়াল গরু-মহিষের ওপরে হামলা করেছে। হামলায় ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। শিয়ালের দল শুধু গরু-মহিষকে জখম করেই ক্ষান্ত হয়নি, দুই কৃষকের ওপরও হামলা করেছে। এ ছাড়া চারজনকে তাড়া করে নদীতে নামিয়েছে।

এ ঘটনা শুনে শৈশবে পড়া শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতি নামের একটি চটি বইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ওই বইতে পড়েছিলাম, বাঘের ওপর প্রতিশোধ নিতে শিয়াল একবার বাঘের সঙ্গে সন্ধি করেছিল। শর্ত ছিল, তারা কেউ আর মুরগি খাবে না। এ কথা সব মুরগিকে জানিয়ে দেওয়া হলো। মুরগিরাও খুশি। রাতে শিয়ালের দল গৃহস্থের বাড়িতে গিয়ে স্লোগান দেয়, ‘শিয়াল-মুরগা ভাই ভাই, খোপ খোলো মুরগা ভাই।’

মুরগিরা আনন্দের সঙ্গে খোপ খুলে বের হলো, অমনি শিয়ালের দল খপাখপ মুরগি ধরতে লাগল। আর বলতে লাগল আমরা বাঘ। রাতে শিয়ালেরা তাদের ডেরায় মুরগির হাড় চিবোতে লাগল। তখন শব্দ পেয়ে পাশের গুহা থেকে বাঘ জানতে চাইল, কী চিবাচ্ছ তোমরা? শিয়ালেরা বলল, নিজের পা চিবাচ্ছি, মামা। আপনিও চিবাতে পারেন। কাল সকালে আবার নতুন পা গজাবে।

শিয়ালের রাজনীতি বুঝতে না পেরে বাঘ নিজের পা চিবিয়ে খেল আর সারা রাত যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। সকালে বাঘ বলল, কই আমার পা তো গজায়নি। শিয়ালেরা গিয়ে বলল, কী বলো মামা? আমাদের তো গজিয়েছে। এই তো দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছি!’

গত ২০ ডিসেম্বর রাতে রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা একটি চর ষাটবিঘায় অবিশ্বাস্য এ ঘটনা ঘটেছে। এই চরে পাশের খানপুরের লোকজন গরুর বাথান করেছেন। সেখানে সারা দিন চরের মাঠে গরু চরে বেড়ায়। রাতের বেলায় বাথানে রেখে গৃহস্থরা বাড়িতে যান। ২১ ডিসেম্বর ভোরে লোকজনের মাধ্যমে তাঁরা খবর পান, তাঁদের গরু বাথানের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে চরের মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা এসে দেখেন, গরুর নাক-মুখ কান ছিঁড়ে ফেলা। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। বাথানে ছয় শতাধিক গরু ছিল।

কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা দেখেই বুঝতে পেরেছেন, এটা শিয়ালের কাজ। রাতে হামলার পর সকালেও ছয়টি শিয়াল বাথানের পাশে মহড়া দিচ্ছিল। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এসেও সেই শিয়াল দেখতে পেয়েছেন।

শুধু তা–ই নয়, একটি শিয়াল চরের ফেরিওয়ালা আফসার আলী ও তাঁর চাচাশ্বশুর আক্কাস আলীর ওপরে হামলা চালিয়েছে। আফসার আলীর ঠোঁট ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর আক্কাস আলীর হাতের এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে গেছে।

কৃষক আবুল কালামের কাছে গিয়ে মাটিতে রক্তাক্ত মুখ মুছেছে। আবুল কালাম বললেন, তাকে দেখে শিয়াল কিছুই মনে করছে না। মাটিতে মুখ মুছে চলে গেল। তারপরই চারজন চাষিকে তাড়া করেছে। তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচেছেন।

চাষি মাহমুদ সুজন আলী বলেছেন, গরুর ওপরে হামলার ঘটনার তিন দিন আগে মাঠে তাঁর একটি গরুর বাছুর হয়েছিল, সেই গরুকে তিনটি শিয়াল ঘিরে রেখেছিল। পরে তিনি গিয়ে গরু ও বাছুর উদ্ধার করেন। এখন লাঠি ছাড়া কেউ শিয়ালের ভয়ে মাঠে নামতে পারছেন না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খবর নিয়ে জানলাম, এ বছর হাসপাতালে শিয়ালের কামড়ে আহত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর শিয়ালের কামড়ে আহত ১৭৬ জন রোগী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

সবাই যখন ভাবছেন, শিয়াল কেন বাঘের মতো আচরণ করছে, তখন চর মাঝারদিয়াড় এলাকার কৃষক আবদুল হান্নান বলেন, শিয়ালের তো কোনো দোষ নেই। হামলার ঘটনার আগের দিন চরখানপুরে দুই রাখাল একটি শিয়াল মেরে ফেলে। চারটি শিয়াল দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে। ওই দিন রাতেই শিয়ালের দল এসে বাথানে হামলা করেছে। শিয়ালের তো দোষ নেই।

পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, ‘ঘটনা সত্য কি না, জানি না। শিয়ালের হামলার ঘটনার আগের দিন লোকজন বন মহিষ মারতে এসেছিল। তারা নাকি একটি শিয়ালের বাচ্চাও মেরে নিয়ে গেছে। এই ক্ষোভে শিয়াল হামলা চালাতে পারে।’

এসব কাণ্ড দেখে ভাবছি, শিয়াল কি মানুষকে দেখে দেখে প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে নিল? কেননা, শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতির বইয়ে গল্পকে আমরা রূপকথাই বলব; কিন্তু গরুর বাথানে ঢুকে ২০০ গরুর ওপরে হামলা চালানোর ঘটনাকেও কি আমরা রূপকথা বলব? এ ঘটনা বোধ হয় রূপকথাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কারণ, প্রকৃতিতে সবকিছুই যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। শিয়ালও তো প্রকৃতির সন্তান। সে তার বাইরে যেতে পারবে কেন।

রাজশাহী বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবিরের কথা আমাদের একটি বার্তা দেয়,‘শিয়ালের খাবারের অভাব হলে শিয়াল এ রকম করতে পারে। আবার কেউ বিরক্ত করলে বা তাদের প্রজনন মৌসুমে ওরা এ রকম আচরণ করে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি তাদের প্রজনন মৌসুম।

ভাবলাম, খাবার তো দূরের কথা,আমরা তো শিয়ালের আবাস্থলই ধ্বংস করে ফেলেছি। শিয়াল এখন কী করবে। শিয়াল পণ্ডিতের গল্পে মুরগি ধরতে গিয়ে শিয়াল নিজেদের বাঘ বলে পরিচয় দিয়েছে। এখানে ‘ঠোঁট ছেঁড়া আফসার আলী’ বলেন, শিয়াল একেবারে বাঘের মতন, কোনো ভয় করছে না। আমাদের বোধ হয় সতর্ক হওয়ার সময় এসে গেছে। তা ছাড়া প্রকৃতি হয়তো এমন অনেক ঘটনা ঘটাবে, যা রূপকথাকে হার মানাবে। অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের ভাষায় তখন হয়তো আমরা বলব, ‘এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ।’

* আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
- নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

পদ্মা নদীর চরে শিয়ালের হামলায়  ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে।
পদ্মা নদীর চরে শিয়ালের হামলায় ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। গ্রাফিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

রাজশাহীতে আলু বেচে হিমাগার ভাড়াও উঠছে না, কমেছে আবাদ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

মৌসুমে আলুর দাম এতটাই কম ছিল যে অনেক চাষির উৎপাদন খরচ উঠছিল না। তাই লোকসান এড়ানোর আশায় অনেক চাষি আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পরে সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর কেজি ২২ টাকা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করেও বিপাকে পড়ছেন চাষিরা। হিমাগার ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে তাঁদের এখন ঘর থেকে টাকা এনে দিতে হচ্ছে।

এদিকে গত মৌসুমের আলু বিক্রিতে লোকসানের কারণে এবার রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এই জেলায় যেখানে ৩৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল, সেখানে এবার তা কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে নেমেছে। জেলার সবচেয়ে বেশি ও ভালো জাতের আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। সেখানকার চাষিরাও এবার আলু চাষ কমিয়েছেন। গত বছর তানোরে ১৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এবার হয়েছে ১২ হাজার ২৬৫ হেক্টরে।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে আলু নিয়ে শুধু হতাশার গল্পই শোনা গেল। তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের চাষি মো. মইদুল ইসলাম জানান, তিনি হিমাগারে ১২১ বস্তা আলু রেখেছিলেন। সেই আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ঘর থেকে ১৬ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে।

একই উপজেলার তালন্দ গ্রামের আলুচাষি সাফায়েত হোসেন জানান, তিনি হিমাগারে দেড় হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ায় তিনি আশা করেছিলেন ডিসেম্বরের শেষে আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এতে হিমাগারের ঋণ শোধ করতে ঘর থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে। গত বছর তিনি ২৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন, এবার সর্বস্বান্ত হওয়ায় মাত্র আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।

তালন্দ গ্রামের আরেক চাষি আসাদুজ্জামান সুমন জানান, গত বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আলু বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। হিমাগারে রাখা তিন হাজার বস্তা আলু থেকে তিনি একটি টাকাও পাননি। আলু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার কারণে এবার তিনি মাত্র পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।

একই গ্রামের সৈকত কুমার দাস নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি করে তাঁর লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তিনি এজেন্টের মাধ্যমে হিমাগারে ২৭৮ বস্তা আলু রেখেছিলেন। আলু বিক্রির পরও এজেন্টের কাছে তাঁর প্রায় ১৬ হাজার টাকা দেনা রয়েছে।

তানোরের চাষি মাহবুব আলম জানান, গত বছর তিনি ৩২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি শেষে তাঁর লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ টাকা। হিমাগারে রাখা ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু বিক্রি করার পরও হিমাগারের মালিকের কাছে তাঁর ৩৫ হাজার টাকা দেনা রয়েছে। এবার তিনি অর্ধেক জমিতে অর্থাৎ ১৭ বিঘায় আলু চাষ করেছেন।

তালন্দ গ্রামের চাষি কলিমুদ্দিন জানান, গত বছর ২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর ৯ লাখ টাকা লোকসান হয়। হিমাগারে রাখা এক হাজার বস্তা আলু বিক্রি করেও হিমাগারের কাছে তাঁর দেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা। নিজের ঘর থেকেই এই টাকা পরিশোধ করেছেন।

এই হতাশার মধ্যেও ব্যতিক্রমী এক চাষির দেখা মিলেছে। তিনি চোরখৈর গ্রামের রানা চৌধুরী, যিনি গত বছর ২৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। হিমাগারে ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু রেখে তাঁকে ঘর থেকে ২২ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। তবু তিনি এবার ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ভাষায়, যেখানে টাকা হারিয়েছে সেখানেই খুঁজতে হবে—এই ভাবনা থেকেই তিনি এবার বেশি করে আলু চাষ করেছেন।

রহমান কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক আবদুল হালিম জানান, তাঁদের পাঁচটি হিমাগারে এখনো প্রায় ৪২ হাজার বস্তা আলু রয়ে গেছে। সরকারি দামে আলু বিক্রি না হওয়ায় ক্ষোভে তিনি ২২ টাকা কেজির ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত আলু চাষের কারণে চাষিরা লোকসানে পড়েছেন। তাই সরকার ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতিতে চাষের একটি লক্ষ্য নির্ধারণের চেষ্টা করছে। পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন হলে চাষিরা এ ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

প্রসঙ্গত, যে এলাকায় যে মাটিতে যে ফসল ভালো হয়, সেখানে সেটির আবাদ করাকেই ক্রপ জোনিং।

রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে এবার চাষিরা আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। শুধু তানোরেই এক হাজার হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গতকাল উপজেলার চোরখৈর গ্রামে একজন চাষি আলুখেতে সেচ দিচ্ছেন
রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে এবার চাষিরা আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। শুধু তানোরেই এক হাজার হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি ২০২৬ উপজেলার চোরখৈর গ্রামে একজন চাষি আলুখেতে সেচ দিচ্ছেন। ছবি: প্রথম আলো

Friday, January 9, 2026

আসুন, কোলদের প্রতি মানবিক হই by সঞ্জীব দ্রং

প্রকাশ ০৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ মানুষের নাকি রাষ্ট্রের নির্মম ঔদাসীন্য ও হিংস্র বিদ্বেষের শিকার হলো অতি সংখ্যালঘু কোল জাতির পাঁচ পরিবার। ঘটনা এ রকম: প্রায় আড়াই দশক ধরে রুমালী হাসদাসহ পাঁচ কোল পরিবার এই ভূমিতে বসবাস করছিল। তারা জানত, জমিটা খাস এবং তাদের জাতভাই তিলক মাঝি, দিনু মাঝি, ভাদু মাঝিসহ কয়েকজনের নামে জমির রেকর্ড আছে।

রাজশাহী থেকে স্টিফেন সরেন আমাকে কাগজ পাঠিয়েছেন। আমি দেখলাম, এসএ রেকর্ডে এই কোলদের নাম আছে। তাদের অভিযোগ, জাতিতে হিন্দু সাজিয়ে এবরিজিনালদের জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন মকবুল হোসেন। তাঁর ওয়ারিশরা পরে আদালতে মামলা করেন। কোল পরিবারগুলো অভাব–অনটন ও নানা কারণে মামলার খোঁজ নিতে পারেনি। আদালত একতরফা রায় দেন।

২৭ অক্টোবর কোলদের মাটির বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তারা আশ্রয় নেয় বাঁশঝাড়ে। পত্রিকায় দেখলাম, গোদাগাড়ী উপজেলার ইউএনও কোলদের দেখতে গিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রশাসনের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, এই কোলদের পুনর্বাসনসহ জমির মামলার বিষয়ে সহায়তা করুন। বাদীর কাগজপত্র সঠিক কি না, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমি হস্তান্তরে প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা লঙ্ঘন হয়েছে কি না, এসব দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কেন কোল সম্প্রদায় মামলার আপিল করেনি, সেটি দেখা। তারা কি আদৌ উকিল নিয়োগ করেছিল? আপিলের সুযোগ থাকলে আপিলের ব্যবস্থা করা জরুরি। আর মানবিক কারণে হলেও ওদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

অনেক সময় বলা হয়, রাষ্ট্র এই অবহেলিত প্রান্তিক মানুষদের থেকে অনেক দূরে থাকে। এই দূরত্ব বাস রুটের বা সড়কপথের দূরত্ব নয়। অন্য এক দূরত্ব। দৃষ্টিভঙ্গির, অবহেলার, উপেক্ষার, না দেখার। সর্বোপরি অমর্যাদার। কেউ কি আমাকে বলবেন, কোনো কোল জাতির মানুষ কোনো দিন ডিসি অফিসে গেছেন কি না? ইউএনও অফিসে কোনো তথ্য কি আছে, কোনো কোল জাতির মানুষ দেখা করতে গেছেন? যদি গিয়ে থাকেন, কেমন রিসেপশন তিনি পেয়েছিলেন? নাকি গভীর এক হতাশা ও দুঃখ নিয়ে তাঁকে ফিরতে হয়েছে চিরচেনা তাঁর গ্রামে, যেখানে তাঁর থাকার ঘরের নিশ্চয়তা নেই? আমাদের সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা লেখা আছে।

ভারতের সংবিধানে ট্রাইবালদের জন্য সমতা শুধু নয়, অগ্রাধিকারের কথা লেখা আছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, ‘কার্যকালে দশকের পর দশক ধরে শব্দগুলো সংবিধানে শোভা হয়ে থাকে এবং আদিবাসীদের দুঃখ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার দপ্তর থেকে হতাশা নিয়ে ফিরে এসে আদিবাসীরা স্টেশনে উবু হয়ে বসে থাকে, ট্রেন ধরে, সাঁইত্রিশ মাইল হেঁটে গ্রামে ফেরে এবং
অপরিচিত, হিংস্র আলোকোজ্জ্বল নয়া ভারত থেকে স্বীয় পরিবেশের অপরিমেয় অন্ধকারে ফিরে স্বস্তি পায় (জগমোহনের মৃত্যু)।’

আমি দেখলাম ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোল জাতির সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৮২২। আর ২০১১ সালে ছিল ২ হাজার ৮৪৩ জন। তার আগে যেমন ২০০১ বা ১৯৯১ শুমারিতে তাদের নামই ছিল না। সরকারি রেকর্ডে তারা ছিল পরিচয়হীন। আমি ঢাকা শহরে কোল জাতির কোনো মানুষ খুঁজে পাইনি। অনেক বছর আগে প্রথম এক কোচ ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল। ভর্তির আগে আমার কাছে এসেছিল একটু সাহায্যের জন্য। আমি তাকে বলেছিলাম, অর্থের অভাবে কোচ ছেলের পড়া হবে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেটি হওয়া উচিত হবে না। ছেলেটি বিসিএস ক্যাডারে চাকরি করছে এখন। কোলদের এখানে আসতে অনেক সময় লাগবে। আসুন, সবাই ওদের পাশে দাঁড়াই।

পাঁচ কোল পরিবার উচ্ছেদ নিয়ে খুব বেশি রিপোর্ট হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তেমন হইচই হয়নি। প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সম্পাদকীয় লিখেছে। বাড়িঘর ভাঙার ছবি, ধ্বংসস্তূপের ছবি ছাপা হয়েছে। এসবের কোনোটিই আমাদের রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। আমরা ইনক্লুসিভ, মানবিক ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রের কথা বলি। এর জন্য রাষ্ট্রকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

বাঙালি অনেক বড় জাতি। সংখ্যায় পৃথিবীতে অষ্টম আর বাংলাভাষীর বিচারে বিশ্বে পঞ্চম। এত বড় জাতি ৩ হাজার ৮২২ জনের কোলদের সহজেই এগিয়ে নিতে পাশে দাঁড়াতে পারে।

সঞ্জীব দ্রং, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

উচ্ছেদের পর কোল পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে বাঁশঝাড়ের নিচে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং এলাকায়
উচ্ছেদের পর কোল পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে বাঁশঝাড়ের নিচে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

Monday, January 5, 2026

ধাপে ধাপে চাষ করেন জাহাঙ্গীর, ১৩ বিঘা জমিতে লেটুস, থাইপাতা, চেরি টমেটো by শফিকুল ইসলাম

চাকরির বেতনে সংসার চলত কোনোরকমে। ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকার বেতনে প্রতিটি খরচ হিসাব করে করতে হতো। অনেক সময় ৫০ টাকা খরচ করতেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হয়েছে। সেই সময় পেছনে ফেলে চাকরি ছেড়ে কৃষি উদ্যোগে বদলে গেছে ৩৩ বছরের যুবক জাহাঙ্গীর হোসেনের জীবন।

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। একসময় তিনি বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে চাকরি করতেন। রাজশাহী বিমানবন্দরে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৯ বছর। ২০২১ সালে সেই চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নামেন কৃষিকাজে। শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১০ কাঠা জমিতে পুদিনাপাতা চাষ দিয়ে। পাঁচ বছরের মাথায় এখন তাঁর চাষ করা জমির পরিমাণ ১২ থেকে ১৩ বিঘা। এসব জমিতে চাষ করেছেন বিটরুট, পুদিনাপাতা, লেটুস, আইস লেটুস, থাইপাতা, চেরি টমেটো, রেড ক্যাবেজ, ক্যাপসিকাম ও বালচিং অনিয়ন।

চেনা পথ ছেড়ে ভিন্ন কিছু

জাহাঙ্গীর চাকরি ছেড়ে প্রচলিত ফসল চাষের পথে হাঁটেননি। তিনি বেছে নিয়েছেন চায়নিজ বিভিন্ন সবজি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জমিতে আছে বিটরুট। তিনি ১০ বিঘায় চাষ করেছেন বিটরুট। জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ধান-গম কেজিতে দাম বাড়ে না, কিন্তু সবজিতে কেজিতেই দাম বাড়ে। এই চিন্তা থেকেই ভিন্নপথে হাঁটলাম।’ তিনি জানান, এই উদ্যোগে শুরু থেকেই পাশে ছিল পবা উপজেলা কৃষি অফিস। ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন দেওয়ান নিয়মিত মাঠে এসে পরামর্শ দিচ্ছেন। জানতে চাইলে জালাল উদ্দিন দেওয়ান বলেন, জাহাঙ্গীর খুব বিচক্ষণ কৃষক। তিনি বাজার বুঝে চাষ করেন, নিজেই বাজারজাত করেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।

ধাপে ধাপে চাষ

সব ফসল একসঙ্গে চাষ না করে ধাপে ধাপে চাষ করে ফলন বাজারে আনেন জাহাঙ্গীর। আগাম চাষ করা কয়েক বিঘার বিটরুট ইতিমধ্যে তুলে বিক্রি করেছেন। মাঠে কোথাও বিটরুট তোলার শেষ পর্যায়, কোথাও গাছ বড় হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য বীজ বপন করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সব একসঙ্গে বাজারে আনলে দাম পাওয়া যায় না। তাই পর্যায়ক্রমে চাষ করি, যেন সব সময় কিছু না কিছু বাজারে থাকে। বর্তমানে বিটরুটের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা। ভালো বাজার পেলে এক বিঘা জমি থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব। এতে জমি ভাড়াসহ খরচ পড়ে ৭০-৭৫ হাজার টাকা।’

পুদিনাপাতায় আলাদা বাজার

তিন বিঘা জমিতে পুদিনাপাতা চাষ করছেন জাহাঙ্গীর। বর্ষাকালে পুদিনাপাতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বগুড়া, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বাসের মাধ্যমে পুদিনাপাতা পাঠান তিনি। জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, পুদিনাপাতা রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয়। রাজশাহী ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় পুদিনাপাতা পাঠান। এই পাতা চাষে খরচ কম, আয় বেশি।

বর্তমানে তাঁর খামারে প্রতিদিন পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। প্রয়োজনে আরও লোক নেন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘একসময় আমি পরাধীন ছিলাম। অন্যের চাকরি করতাম। আজ আমার কাজ দিয়ে পাঁচটা পরিবার চলছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।’

সরেজমিনে মাঠে

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, শীতের সকালের রোদে থালতা গ্রামের মাঠজুড়ে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততা। কয়েকজন শ্রমিক মাটির নিচ থেকে তুলে আনছেন লালচে বিটরুট। পাশে বস্তায় ভরে রাখা হচ্ছে সবজি। একটু দূরে কাঁচা সবুজের সারি পুদিনাপাতা। বাতাসে ভেসে আসছে তাজা সবজির গন্ধ। পাশাপাশি সারি সারি লেটুসপাতা নজর কাড়ছে। কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন মাঠে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছেন। কখনো বিটরুট তোলা দেখছেন, কখনো বস্তায় ভরছেন। আবার পুদিনাপাতার বস্তা ঠিকঠাক করছেন। স্থানীয় কৃষক তবুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের ফসল আগে এলাকায় কেউ করতেন না। জাহাঙ্গীরই শুরু করেছেন। এখন তিনি একাই ১০ বিঘায় বিটরুট চাষ করছেন। এলাকায় এ উদাহরণ হয়ে গেছে।’

ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ ও কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন জাহাঙ্গীরের। তিনি বলেন, ‘কষ্টের কোনো বিকল্প নেই। মাটি ধরলে মাটি আপনাকে ফিরিয়ে দেবে—এই বিশ্বাসেই সামনে এগোচ্ছি। চাকরির অনিশ্চয়তার জীবন ছেড়ে মাটির ওপর ভরসা রেখেছি।’

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘জাহাঙ্গীর একজন শিক্ষিত উদ্যোক্তা। তিনি যে ফসলগুলো চাষ করছেন, সেগুলো লাভজনক ও ব্যতিক্রমী। আমরা নিয়মিত তাঁকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছি। জাহাঙ্গীরের মতো উদ্যোক্তা যদি আরও বাড়ে, তাহলে কৃষি আরও আধুনিক হবে।’

বিটরুট বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামে
বিটরুট বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, January 3, 2026

রাজশাহীর সড়কে ড্রেনের কাদা, ধুলায় মিশছে ভয়ংকর জীবাণু by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রাজশাহী নগরে ড্রেনের কাদা তুলে রাস্তার ওপরে শুকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়। সেই কাদা শুকিয়ে যখন প্রায় ধুলা-ধুলা হয়ে যায়, তখন তুলে নিয়ে নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসা হয়। এটা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দীর্ঘদিনের চর্চা।

এবার এই ধুলা শুকানোর আগেই নগরের ঘোড়ামারা এলাকায় রাস্তার ওপরে তুলে রাখা কাদার ওপরে দুটি কলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছেন কেউ। যিনি কলাগাছ দুটি লাগিয়েছেন, তিনিও জানেন ময়লা তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলাগাছও উঠে যাবে। তারপরও কী মনে করে এমন করলেন, রসিকতা নাকি প্রতিবাদ, জানার জন্য ওই ব্যক্তিকে কল করলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী এম মঞ্জুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ড্রেনের পানিতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য ফেলা হয়, যা পুড়িয়ে ফেলার কথা। সেই সঙ্গে মনুষ্য বর্জ্যও গিয়ে মিশছে। এতে কোলিফরম, সালমোনেলা, ইকোলি ও সিগেলা জাতীয় ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়া থাকে, যার ভেতরে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সব রোগ-জীবাণু থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়া ডায়রিয়া, আমাশয়, ক্রিমিসহ যাবতীয় পেটের পীড়ার জীবাণু বহন করে।

এই উদ্ভিদবিজ্ঞানী বলেন, ব্যাকটেরিয়া সালমোনেলার হাত থেকে বাঁচার জন্য সারা পৃথিবীতে সুয়ারেজ ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে। রাজশাহীতে যেভাবে এই বর্জ্য শুকিয়ে তারপর সরানো হচ্ছে, তাতে নগরবাসীর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ট্রাকে পলিথিন ব্যবহার করে সঙ্গে সঙ্গে এই বর্জ্য ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। দেশের অনেক মানুষই ৭০–৭৫ বছর পর্যন্ত বাঁচছেন, কিন্তু তাঁরা কর্মক্ষম থাকতে পারছেন না। এটা হচ্ছে খাদ্যের জন্য। আমাদের নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা—এই সব কারণে ধ্বংস হচ্ছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ফয়সল আলম বলেন, বর্জ্য সরাসরি অপসারণ করা উচিত। এতে রাস্তায় চলাচল করতে গিয়েও বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। আবার শুকিয়ে ধুলা হয়ে বাতাসে মিশছে, যা শ্বাসকষ্টের বা অ্যাজমা রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।

সিটি করপোরেশন বলছে, নগরে ১০০ কিলোমিটারের বেশি ছোট ড্রেন আছে। এই ড্রেনের কাদা এভাবেই তুলতে হবে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন এর আগে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমাদের তো আর কোনো বিকল্প নেই। এগুলো ছোট ড্রেন, এগুলোতে এক্সকাভেটর ব্যবহার করা যায় না।’

২০১৬ সালের ১৭ জুন দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বায়ুদূষণ কমানোয় রাজশাহীকে বিশ্বের সেরা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে রাজশাহীর বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে নগরের তালাইমারী মোড়, এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর (রেলগেট), সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, লক্ষ্মীপুর মোড়, বিসিক মঠপুকুর ও বন্ধ গেট এলাকায় বায়ুর পরীক্ষা চালানো হয়। এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে নগরের পাঁচটি জায়গায় বায়ুর মানের পরীক্ষা চালায় সংগঠনটি। তাদের পরীক্ষার ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, শহরটিতে ক্রমেই বায়ুদূষণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহীর সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল বলেন, নির্মল বাতাসের জন্য রাজশাহী বিশ্বের সেরা শহর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই শহরের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নির্বিঘ্নে চলাচল ও সৌন্দর্য সুরক্ষার জন্য ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ সরাসরি কাভার্ড ট্রাকের মাধ্যমে করা উচিত।

রাজশাহী নগরের নর্দমার কাদা তুলে এভাবেই সড়কের পাশে শুকিয়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে নগরের ঘোড়ামারা এলাকায় একজন কাদার ওপরে কলাগাছ লাগিয়ে দেন
রাজশাহী নগরের নর্দমার কাদা তুলে এভাবেই সড়কের পাশে শুকিয়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে নগরের ঘোড়ামারা এলাকায় একজন কাদার ওপরে কলাগাছ লাগিয়ে দেন। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, December 17, 2025

শিশু সাজিদের করুণ মৃত্যু ও রুষ্ট কৃষকদের বিপদ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

প্রকাশ ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ কয়েক বছর আগের কথা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে পানি খেতে চেয়েছিলাম। তিনি আলমারি থেকে একটা পানির বোতল বের করলেন। তারপর পিয়নকে ডেকে বললেন, ‘ওনাকে হাফ গ্লাসের একটু বেশি পানি দাও। লাগলে উনি আবার নেবেন।’ সেই প্রথম পানি মেপে দেওয়ার ঘটনায় আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলাম। আর ওই চিকিৎসককে মনে মনে কঞ্জুস ভেবেছিলাম।

এর কয়েক বছর পরের কথা। ২০২২ সালের মার্চ মাসে সেচের পানি না পেয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দুই সাঁওতাল কৃষক অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি বিষ পান করে আত্মহত্যা করলেন। এরপর আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওই চিকিৎসক কতটা দূরদর্শী ছিলেন। আবার বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটা গবেষণা তথ্য দেখে চমকে উঠলাম, ‘এক কেজি ধান উৎপাদনে নাকি বরেন্দ্র অঞ্চলে তিন হাজার লিটার পানি খরচ হয়।’

এদিকে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে তুলতে মাটির নিচের জলধারক স্তর (অ্যাকুইফার) মারা যাচ্ছে। যে স্তরে পানি থাকে, সেই স্তরে মোটা বালু থাকে। তাকে অ্যাকুইফার বলা হয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অ্যাকুইফারের মোটা বালু যখন ধুলা হয়ে যায়, তখন ওই অ্যাকুইফারকে মৃত বলা হয়। তারপর ওপর থেকে যতই বৃষ্টি হোক, ওই স্তরে আর পানি জমে না। রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও গোমস্তাপুর উপজেলা এবং নওগাঁর পোরসা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের মাটির নিচের অবস্থা এখন সেই রকম।

সুইজারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন ও সুইস রেডক্রস যৌথভাবে ‘সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ আওতায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একটি জরিপ সম্পন্ন করেছে। এই জরিপ থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এই তথ্য জানা গেছে। তার আলোকে গত ২৫ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ নির্বাহী কমিটি এলাকাটিকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। গত ৬ নভেম্বর সরকার এই এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। তার আগে ওয়ারপো ২০১৮ সালে পানি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এখন এই বিধিমালা অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হবে। এতে অগ্রাধিকার পানি খাওয়ার পানি।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার শুরু করে। তারা মাটির নিচের পানি শূন্যতার অবস্থা আন্দাজ করে ২০১৫ সাল থেকে বরেন্দ্র এলাকায় সেচের জন্য আর নতুন নলকূপ না বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই ঘোষণা ষোলো আনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা যেখানে–সেখানে সেচপাম্প বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বোরিং করে দেখছেন মাটির নিচে কোথায় অ্যাকুইফার পাওয়া যায়। গবেষকেরা বলছেন, কোথাও কোথাও পকেট অ্যাকুইফার রয়েছে। তাতে কিছু পানি অবশিষ্ট রয়েছে। তা যেকোনো সময় ফুরিয়ে যেতে পারে। আর ফুরিয়ে গেলেই সেই এলাকার মানুষকে পানি কিনে খেতে হবে। কিন্তু কার কথা কে শোনে! ওই এলাকার কৃষকেরা এতে রুষ্ট হচ্ছেন। আমি যেমন ওই চিকিৎসককে কঞ্জুস ভেবে মনে মনে রুষ্ট হয়েছিলাম।

কৃষকেরাও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ জারি করায় সরকারের ওপর মনে মনে রুষ্ট। তাঁরা উপজেলা সেচ কমিটির অনুমতি ছাড়াই পানির সন্ধানে জমিতে ‘বোরিং’ করেই যাচ্ছেন। কেউ কেউ বোরিংয়ের মুখটাও বন্ধ করার কথা ভাবছেন না। গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) সেই রকম একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়। সাজিদের মা রুনা খাতুন দোষী ব্যক্তির বিচার দাবি করেছেন। তাঁর আহাজারি দেখে হাজার হাজার মানুষ চোখের পানি ফেলেছেন। শিশুটি উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখতেও অনলাইনে চোখ রেখেছিলেন সারা দেশের মানুষ। শিশুটি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছে না–ফেরার দেশে।

এখন কার কথা বলবেন—সেচের পানি না পেয়ে আত্মহত্যাকারী কৃষক অভিনাথ মারান্ডি, রবি মারান্ডি, তাঁদের মামলার আসামি গভীর নলকূপের অপারেটর সাখাওয়াত হোসেন আর তানোরের পানির খোঁজে সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করে বোরিং করা কৃষক কছির উদ্দিন—কাকে কী বলবেন? আসামি সাখাওয়াত হোসেন ৪ মাস ৯ দিন হাজত খেটে বেরিয়েছেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। সাজিদের মা শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুর পর্যন্ত মামলা করেননি। করেন আর না করেন, দায়িত্ব অবহেলার দায় কিছুতেই কৃষক কছির উদ্দিন এড়াতে পারেন না। এই সবকিছু ঘটছে পানির জন্য। পানি দিয়ে ধান চাষের জন্য।

বাংলাদেশ সরকারের একজন উপসচিব রাজ্জাকুল ইসলাম ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি শাসনব্যবস্থা’ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এতে তিনি দেখিয়েছেন, ‘এই এলাকায় ধান চাষের চেয়ে অন্য ফসল করা কৃষকের জন্য লাভজনক। কিন্তু কৃষক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ধান ছাড়তে চান না। অন্য ফসল চাষের ঝুঁকি নিতে চান না। তা ছাড়া তিনি ধান চাষের টেকনোলজি ঐতিহ্যগতভাবেই জানে। গোলাভরা ধান থাকবে—এটা তাঁর মানসিক শান্তি ও সামাজিক মর্যাদা।’

তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে তাঁরা গাছের ডালে বসে গোড়া কাটছেন। মানে ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন। এভাবে পানির স্তর নেমে যেতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে তাঁদের ধান চাষ ছাড়তে হবে, তা–ই নয়, বোতলজাত পানিও কিনে খেতে হবে।

এবার শিশু সাজিদের মায়ের কান্না সারা দেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে। সরকার পানিনীতি বাস্তবায়ন করুক। বিএমডিএ পানি রেশনিং করুক। আমাদের চোখের পানি আর সেচের পানি মিলেমিশে যেন একাকার না হয়।

* আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

গত বুধবার এক কৃষকের খোঁড়া একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়
গত ১০ ডিসেম্বর বুধবার এক কৃষকের খোঁড়া একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়

Wednesday, December 3, 2025

ভাঙতে ভাঙতে রাজবাড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এল সুড়ঙ্গ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

বাড়িটি বানিয়েছিলেন দিঘাপতিয়ার রাজা হেমেন্দ্র কুমার রায়ের ছেলে সন্দীপ কুমার রায়। বাড়ির দুই পাশে দুটি একতলা ভবন। সামনে একটি নাগলিঙ্গম ফুলের গাছ। পেছনে একটি দোতলা ভবন। সরকারি কাগজে এটি এখন অর্পিত সম্পত্তি। স্থাপনাটি জরাজীর্ণ হওয়ায় নিলামে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয় প্রশাসন। সেই বাড়ি ভাঙতে গিয়ে নিচতলা থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি সুড়ঙ্গ। সেখান থেকে বের হচ্ছে পানি।

‘ঐতিহাসিক’ এই বাড়িটির অবস্থান রাজশাহী নগরের দরগাপাড়া মৌজায়। ভবনটির প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য ছিল কি না, যাচাই না করেই ভাঙার জন্য নিলামে তুলে বিক্রি করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় ইতিহাসবিদেরা। তাঁরা বলছেন, এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল।

বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দরগাপাড়া মৌজায় ৫২৪ খতিয়ানের এই জমির দাগ নম্বর ৪৭। শ্রেণি হিসেবে লেখা আছে, ‘সিভিল ডিভিশন অফিস’। মালিকের ঠিকানায় ‘দিঘাপতিয়া স্টেট, বলিহার, থানা– নাটোর’ লেখা আছে। ১৯৮১ সালে বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা করা হয়। যদিও সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের পর কোনো সম্পত্তিকে অর্পিত ঘোষণা করা যাবে না। এরপর কীভাবে ১৯৮১ সালে বাড়িটিকে অর্পিত ঘোষণা করা হয়েছে, তা রহস্যজনক।

কবি ও গবেষক তসিকুল ইসলাম জানান, রাজপরিবার চলে যাওয়ার পর বাড়িটি পড়ে ছিল। স্বাধীনতার পর ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমানকে বাড়িটি ইজারা দেয় সরকার। তিনি বাড়িতে ‘মহিলা কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি সংগঠন চালাতেন। ২০০৯ সালে মনোয়ারা রহমান মারা যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, মহারানি হেমন্তকুমারী (১৮৬৯-১৯৪২) পুঠিয়া থেকে রাজশাহী শহরে এলে এই বাড়িতে থাকতেন। রাজশাহীর একটি কলেজের শিক্ষক আখতার বানু ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে যাতায়াত করেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়িতে ঢুকতেই সামনে পড়ে একটি নাগলিঙ্গম ফুলের গাছ। সেটি এখনো আছে। ডান ও বাঁ পাশে দুটি একতলা ভবন। তার ঠিক উত্তর পাশে দোতলা ভবন। একটি থেকে আরেকটিতে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কাঠের সিঁড়ি ছিল। আর পূর্ব পাশ দিয়ে চুন–সুরকির সরু একটি সিঁড়ি ছিল। এ ছাড়া দোতলা ভবনের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গপথে একতলা ভবনে যাওয়ার রাস্তা ছিল। ওই একতলা ভবন ভাঙতে গিয়েই সুড়ঙ্গটা উন্মুক্ত হয়ে যায়।

বোয়ালিয়া ভূমি কার্যালয় বলছে, মাসখানেক আগে স্থাপনাটি নিলামে বিক্রি করে দেয় জেলা প্রশাসন। নগরের দরগাপাড়া এলাকার এক ব্যক্তি ১ লাখ ৫২ হাজার টাকায় সেটি কিনে নেন। ১০–১৫ দিন ধরে তিনি সেটা ভাঙতে শুরু করেন।

আজ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, পাঁচজন শ্রমিক বাড়িটি ভাঙার কাজ করছেন। ক্রেতার ব্যবস্থাপক অপু বলেন, বাড়িটি ভাঙার পর সুড়ঙ্গ বেরিয়ে আসে। ভাঙার পর সেখান থেকে পানি বের হচ্ছে। এক সুড়ঙ্গের সঙ্গে আরেকটির সংযোগ আছে। সুড়ঙ্গের পানি শুকাতে সেচযন্ত্র বসানো হয়েছে। এক দিক থেকে পানি বের হচ্ছে, আরেক দিক থেকে সেচযন্ত্রের মাধ্যমে টেনে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে আস্তে আস্তে শুকনা জায়গা বের করে তারা ভাঙার কাজ করছেন।

হেরিটেজ রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা মাহাবুব সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, এমন স্থাপনা ভাঙার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, রাজশাহীর পরতে পরতে দিঘাপতিয়ার জমিদারদের অবদান আছে। বরেন্দ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজকুমার শরৎ কুমার রায়। রাজশাহী কলেজ ও পিএন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন তাঁর ভাই প্রমদানাথ রায়। আরেক ভাই বসন্ত কুমার রাজশাহী হাসপাতালের জন্য ৮০ বিঘা জমি দান করেছিলেন। নগরের মিয়াপাড়ায় ডিজিএফআইয়ের বর্তমান কার্যালয়টি হেমেন্দ্র কুমার রায়ের বাড়ি। মাহাবুব সিদ্দিকী বলেন, বাড়ি ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাঁরা রাজশাহীতে ইতিহাস চর্চা করেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহিনুল ইসলাম বলেন, স্থাপনাটি খসে পড়ে যাচ্ছিল। এ জন্য ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জায়গাটি নিয়ে তাঁদের একটা পরিকল্পনা আছে। সুড়ঙ্গ বের হওয়ার কথা শুনে বলেন, তিনি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সেখানে পাঠাচ্ছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পেলে সেটা রক্ষা করা হবে।

রাজশাহীতে একটি রাজবাড়ি ভাঙার সময় মেঝের নিচে পাওয়া গেল সুড়ঙ্গ। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের দরগাপাড়া মহল্লায়
রাজশাহীতে একটি রাজবাড়ি ভাঙার সময় মেঝের নিচে পাওয়া গেল সুড়ঙ্গ। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের দরগাপাড়া মহল্লায়। ছবি : প্রথম আলো

Saturday, August 16, 2025

রাজশাহীতে ৪ জনের লাশ উদ্ধার: ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে’

রাজশাহীতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যা করেছেন এক যুবক। লাশের পাশে পাওয়া চিরকুটে এমনটাই লিখে গেছেন তিনি। গতকাল সকালে একই ঘর থেকে তাদের চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের কোনো একসময় তাদের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন- মিনারুল ইসলাম (৩৫), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (২৮), ছেলে মাহিম (১৪) ও মেয়ে মিথিলা (৪)। তাদের বাড়ি পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামে। এলাকাটি রাজশাহী  মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মতিহার থানার আওতায়। মতিহার থানা-পুলিশ লাশগুলো উদ্ধার করেছে। এর আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলামত সংগ্রহ করে। তদন্তকালে তাদের বাড়ি থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মিনারুলের লেখা। চিরকুটে ঋণের দায়ে ও খাওয়ার অভাবে স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পর আত্মহত্যার কথা লেখা আছে।

চিরকুটের এক পাতায় লেখা আছে, ‘আমি মিনারুল নিচের  যেসব লেখা লিখবো সব আমার নিজের কথা লিখে যাচ্ছি। কারণ, আমরা চারজন আজ রাতে মারা যাবো। এই মৃত্যুর জন্য কারও কোনো  দোষ নেই। আমি মিনারুল প্রথমে আমার স্ত্রীকে মেরেছি। তারপর আমার মাহিমকে ( ছেলে) মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে (মেয়ে)  মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছি।’ আরও লেখা আছে, ‘আমাদের চারজনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার স্ত্রী-সন্তান না  দেখে এবং বাপের বড় ছেলে  যেন জানাজায় না আসে। আমাদের চারজনকে কাফন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা যেন টাকা না দেয়। এটা আমার কসম।’

চিরকুটের অপর পাতায় লেখা আছে, ‘আমি নিজ হাতে সবাইকে মারলাম। কারণ আমি একা যদি মরে যাই তাহলে, আমার স্ত্রী-সন্তানরা কার আশায় বেঁচে থাকবে? কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমরা বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম সেই ভালো হলো। কারও কাছে কিছু চাইতে হবে না। আমার জন্যে কাউকে মানুষের কাছে  ছোট হতে হবে না। আমার বাবা আমার জন্য অনেক মানুষের কাছে ছোট হয়েছে। আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম। আমি চাই সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।’

সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান রাজশাহী নগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, স্ত্রী এবং মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে।  ছেলেকেও শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো মনে হচ্ছে। মিনারুল আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে। কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে সেটা ময়নাতদন্তের পরই নিশ্চিত করে বলা যাবে। আত্মীয়-স্বজনরা পুলিশকে বলেছেন, চিরকুটের লেখাটা মিনারুলেরই। সেখানে আর্থিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে। আমরা বিষয়গুলো তদন্ত করবো। মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মালেক জানান, ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রাথমিভাবে মনে হচ্ছে মিনারুলের চিরকুটে লিখে যাওয়া ঘটনাগুলোই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সঠিক ঘটনা তদন্তের পরই জানা যাবে।

mzamin
রাজশাহীর পবায় একই পরিবারের ৪ জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজনদের আহাজারি

Saturday, June 14, 2025

যে আমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপূর্ব সুন্দরী নারীর গল্প by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

আমপ্রেমীদের কাছে অতিপ্রিয় একটি আম আম্রপালি। আঁশহীন সুমিষ্ট ও রসালো—এর মূল বৈশিষ্ট্য। এই আমের নামকরণের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের অপূর্ব সুন্দরী এক নারীর নাম জড়িয়ে আছে। সেই নারীর নাম আম্রপালি।

সেই গল্প জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতিস্বী চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। ভারতের বৈশালী নগরের (এখনকার বিহারে নগরটি ছিল) আমবাগানে এক মেয়েশিশুর জন্ম হয়। তাকে লালন-পালন করেন সেই নগরের উদ্যানপালক। আমের বাগানে জন্ম এবং উদ্যানপালকের ঘরে লালিত-পালিত বলে শিশুটির নাম হয় আম্রপালি। আম্রপালি দেখতে যেমন সুন্দর ছিলেন, তাঁর নানা গুণও ছিল। তিনি ভালো গাইতে ও নাচতে পারতেন, বীণা বাজাতেন, পালি ভাষায় কবিতা লিখতেন। সভানর্তকী ছিলেন তিনি। রূপে-গুণে অনন্য আম্রপালি শেষজীবনে তাঁর সব ধনসম্পদ বিলিয়ে দিয়ে গৌতম বুদ্ধের শিষ্য হয়ে যান।

আম্রপালি নামকরণের পর এই জাতের আমের চারা প্রথম লাগানো হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলায়। আম–গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, উত্তর ভারতের বিখ্যাত আমের জাত দোসেরির ফুলের পুরুষ পরাগ এবং দক্ষিণ ভারতের নীলমের স্ত্রী পরাগের সংকরায়ণের মাধ্যমে হয়েছে আম্রপালি।

ভারত থেকে আম্রপালি জাতের আমের চারা বাংলাদেশে আনা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (১৯৯৬-২০০১) এম এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একজন কর্মকর্তা ভারতে গিয়ে আম্রপালির কিছু চারা নিয়ে আসেন। তিনি নিজে সেখান থেকে কয়েকটি চারা নিয়ে খামারবাড়িতে রোপণ করেন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৬ সালে আম্রপালি জাতকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করে। কৃষিবিদেরা জানিয়েছেন, বিদেশি জাতের দেশি সংস্করণের এই রীতিকে বলা হয় পরিচিতি বা ইন্ট্রোডাকশন। আম্রপালি অবমুক্তের পেছনে ছিলেন কৃষিবিদ কাজী বদরুদ্দোজা।

ইন্ট্রোডাকশন পদ্ধতি হলো বিদেশি কোনো উন্নত জাতের গাছ নিয়ে এসে এ দেশে কয়েক বছর পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করা হয়। আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলে সেটি আমের জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে আম্রপালির ক্ষেত্রে তা–ই করা হয়েছে।

বারির ফল বিভাগের ‘আমের জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি’–বিষয়ক প্রকাশনা ২০২১-এ এ অঞ্চলের আমের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আম পৃথিবীর প্রাচীনতম ফলগুলোর একটি। প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে এই উপমহাদেশে আমের চাষ হয়। এশিয়ার দেশগুলোতেও ফল হিসেবে আমের গ্রহণযোগ্যতা আছে।

এখন থেকে আড়াই হাজার আগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ভারতের মালয় থেকে পূর্ব এশিয়ায় আমের চাষাবাদ ছড়িয়ে দেন। চীনের পর্যটক হিউয়েন সাং প্রথম পর্যটক হিসেবে ৬৩২ থেকে ৬৪৫ সালের মধ্যে চীন তথা দূরপ্রাচ্যে আমের পরিচিত তুলে ধরেন। এ ছাড়া আরব বণিক ও পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা আম ছড়িয়ে দেন বিশ্বের নানা জায়গায়।

বাংলাদেশের আনাচকানাচে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রায় ৮০০ জাতের আম। আমের উন্নত ও উচ্চফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনে চলে গবেষণা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জমির উদ্দিন জানিয়েছেন, বারি এখন পর্যন্ত আমের ৩টি হাইব্রিড জাতসহ মোট ১৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ১৪টি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা থেকে, বাকি চারটি রাজশাহীসহ অন্যান্য ফল গবেষণাকেন্দ্র থেকে হয়েছে।

আম্রপালি আম
আম্রপালি আম। ছবি: প্রথম আলো

Thursday, October 24, 2024

দু’দিন অফিস করেও পুরো মাসের বেতন পেতেন লিটন কন্যা by মারুফ হোসেন মিশন

গত ৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বামীকে নিয়ে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) চিকিৎসা কেন্দ্রের সাধারণ চিকিৎসক আনিকা ফারিহা জামান অর্ণা। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ মাস অফিস করতে দেখা যায়নি অর্ণাকে। তবে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন এ চিকিৎসক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অর্ণা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনের বড় কন্যা। তিনি আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। এছাড়াও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক।

রাবি চিকিৎসা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখ অফিস করেছিলেন অর্ণা। এদিকে গত ৯ মাসে আর অফিস করতে দেখা যায়নি তাকে। অফিস না করেও গত ৯ মাসে সরকারি বেতন-ভাতা পেয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অষ্টম গ্রেডের বেতন পেতেন এ নেত্রী।

আরও জানা যায়, ২০১৯ সালে ১লা জুলাই রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহানের সময়ে বাবার রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে রাবির মেডিকেল সেন্টারে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পান আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এ নেত্রী। অস্থায়ী নিয়োগ পাওয়ায় ৬ মাস পরপর নবায়ন করে গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে রাবির মেডিকেল সেন্টারে কর্মরত তিনি। তার সর্বশেষ ছয় মাসের জন্য নবায়নকৃত চাকরির মেয়াদ ৩১শে ডিসেম্বর ২০২৪ সাল পর্যন্ত। যদি নতুন করে চাকরি নবায়ন করা না হয়, তাহলে অটোমেটিক চাকরি হারাবেন তিনি। এদিকে চাকরিতে প্রবেশের সাড়ে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও তাকে রাবির চিকিৎসক হিসেবে চিনেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী। মাসে দু-একদিন অফিস করেই পুরো মাসের বেতন হাতিয়ে নিতেন।

মেডিকেলের অন্যান্য চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত কখনোই অফিস করতে দেখা যায়নি অর্ণা জামানকে। মাসে দু-একদিন অফিস করতেন তিনি। সকাল ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত তার ডিউটি থাকলেও তিনি অফিস করতেন ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত। অফিস চলাকালে তার সাথে থাকতেন একাধিক অস্ত্রধারী বডিগার্ড। ফলে মেডিকেলের অন্যান্য চিকিৎসকরা এ নিয়ে খুব আতঙ্কে থাকতেন। এছাড়াও তার অফিস টাইমের পুরো সময়জুড়ে চেম্বারের সামনে ভিড় করে রাবি থেকে শুরু করে রুয়েট ও রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতেন। এতে রোগ নির্ণয়ের জন্য আসা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা সেবা না নিয়েই ফিরে যেতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেডিকেল সেন্টারের এক ডাক্তার বলেন, ডা. আনিকা তেমন একটা ডিউটি করতেন না। মাসে দুএকদিন হঠাৎ তাকে দেখা যেত। যেদিন অফিসে আসতেন সেদিন তার সাথে অস্ত্রধারী দুজন বডিগার্ড থাকতেন। ফলে আমিসহ আমার সহকর্মীরা খুব আতঙ্কে থাকতাম। ভয়ে তার চেম্বারে যেতাম না। এদিকে, যতটুকু সময় অফিস করতেন তিনি সেই সময়টাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সবসময় তার চ্যাম্বারের সামনে উপস্থিত থাকতেন এবং মাঝেমধ্যে স্লোগান দিতেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে অর্ণার ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল-মেসেজ দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক ডা. মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি বলেন, আমরা অনেক চেষ্টা করেও রিচ করতে পারিনি। আমরা বিষয়টি অভিযোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে অবগত করেছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যা ভালো মনে করেন তাই করবেন।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সালেহ্‌ হাসান নকীব বলেন, ৫ই আগস্টের পর যেসকল শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিজ দপ্তরে উপস্থিত নেই আমরা তাদের কাছে নোটিশ পাঠিয়েছি। তবে অর্ণা যেহেতু ৯ মাস ধরে অফিস করছেন না তার বিষয়টি অবশ্যই ভিন্নভাবে দেখতে হবে। তার বিষয়টি বিস্তারিত জেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

mzamin

Sunday, October 20, 2024

আওয়ামী লীগকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস: ১০ বছরের সাজা খাটছে কিশোর

‘আওয়ামী লীগ’ শব্দ নিয়ে ‘তিরিশ বছরের পরের গল্প শিরোনামে’ বাবা-ছেলের কথোপকথনের কৌতুক ফেসবুকে পোস্ট করার অভিযোগ করেন দলটির এক স্থানীয় নেতা। ২০১৭ সালের ২৭শে মে। তখন আব্দুল মুকিত রাজু ১৭ বছর বয়সের কিশোর। এ অভিযোগের পরদিন আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় রাজশাহীর পবা থানায় মামলা হয়। এ মামলায় ২০২২ সালের ২৪শে জানুয়ারি তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. জিয়াউর রহমান। স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সাইদুর রহমান বাদল আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় ২০১৭ সালের ২৮মে রাজশাহীর পবা থানায় মুকিতের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন। বাদীর অভিযোগ ছিল, আসামি নিজের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ব্যঙ্গ করেছেন। মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান মুকিত। পরে জামিনে মুক্ত হন। তবে ২০২২ সালে রায় হওয়ার পর থেকে এখনো তিনি কারাগারে আছেন।

মুকিত কোরআনের হাফেজ। জেলে অবস্থানকালে সেখান থেকে ফাজিল (স্নাতক) ও কামিল (স্নাতকোত্তর) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন। গত ৩রা অক্টোবর তার কামিল পরীক্ষার ফল বের হয়েছে। তিনি জিপিএ-৩.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। মুকিত রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর গ্রামের মো. রিয়াজুল ইসলামের ছেলে। তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তার আইনজীবী এডভোকেট হাসানুল বান্না সোহাগ জানান, ফেসবুকে আওয়ামী লীগ নিয়ে একটি গল্প লেখা স্ক্রিনশটের অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। হাইকোর্ট জামিন দিলেও চেম্বার আদালত তা স্থগিত করে। যা নজিরবিহীন। হাফেজ মুকিত একজন ফ্যাসিবাদ পতনের স্বপ্নদ্রষ্টা। ফ্যাসিবাদের পতনের পরও কেনো তাকে কারাগারে থাকতে হবে। তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে।

মুকিতের দিনমজুর বাবা আক্ষেপ করে বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পরে অনেকের মুক্তি হলেও আমার ছেলের মুক্তি হচ্ছে না।
মুকিতের আরেক আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘মুকিতের ১০ বছরের সাজা হওয়ার পর এটি নিয়ে ওই সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এই রায়ের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০২৩ সালের ১২ই জানুয়ারি তিনি জামিনও পান। কিন্তু ওই বছরের ২০শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মামলা স্টে করে দেন। চলতি বছরের ৩ই জানুয়ারি আপিল বিভাগ সেই স্টে বহাল রাখেন এবং আপিল নিষ্পত্তি করতে বলেন। কিন্তু পরে আপিল নিষ্পত্তি না করেই গত ২রা সেপ্টেম্বর ফের তার জামিন দেয়া হয়। তবে আপিল বিভাগ ফের তার সেই জামিন বাতিল করেন। ফলে এখনো তিনি কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
তার মা আশরাফুন্নেছা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের মিথ্যা মামলায় ছেলের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ফ্যাসিবাদী সরকার পালিয়েছে। তবে আমার ছেলে এখনো জেলে। মিথ্যা মামলা থেকে আমার ছেলে যেন দ্রুত মুক্তি পায়, তার জন্য এই সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি সিফাত আলম বলেন, তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যখন মামলা দেয়া হয় তখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী তার বয়স বিবেচনায় মামলা শিশুকোর্টের হলেও তাকে সাইবার ট্রাইব্যুনালে নেয়া হয়। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারকে খুশি করতে এ রায় দেয়া হয়।

mzamin

Wednesday, October 9, 2024

কমিউনিটি ক্লিনিকে মিলছে উচ্চ রক্তচাপের বিনামূল্যে ওষুধ উপজেলায় যেতে অনীহা by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে ডায়াবেটিসের ওষুধ পেয়ে ভীষণ খুশি ৪৫ বছর বয়সী চানমুন খাতুন। সাত বছর ধরে তিনি এই রোগে ভুগছেন। দেহে আছে উচ্চ রক্তচাপও। রাজশাহীর পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে সরজমিন কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বাড়ির কাজ ফেলে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) যাওয়া আমাদের জন্য একটু কঠিন। অনেক সময় ওষুধ শেষ হলেও হাসপাতালে যাওয়া হয় না। পরে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরাসরি এই ওষুধ দেয়ার ব্যবস্থা করলে আমার জন্য ভালো হয়।

৩রা অক্টোবর সকালে পবা উপজেলার কুমড়াপুকুর কমিউনিটি ক্লিনিক ও হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে অন্তত ২০ জন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে এসেছেন। দুই ক্লিনিকেই ডায়াবেটিসের ওষুধ দেয়া হলেও এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেয়ার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। সেন্টারে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পৌঁছালেও উপজেলার ব্যবস্থাপত্র ছাড়া রোগীদের দিচ্ছে না ক্লিনিকগুলো।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সরকারিভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পায় সাধারণ মানুষ। এসব ক্লিনিকে বিভিন্ন রোগের মোট ২২ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ। কিন্তু ওষুধ পেতে হলে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে লিখে দিলেই মেলে ওষুধ। এতেই চরম অনীহা মানুষের।
পবা উপজেলার নওহাটা ইউনিয়নের কুমড়া পুকুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে এসেছেন আরিফা বেগম। বয়স ৩৭ বছর। ১৬ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আক্রান্ত তিনি। প্রতি মাসে ওষুধের পেছনেই ব্যয় হতো ছয় হাজার টাকা। কৃষক পরিবারের স্বল্প আয়ে সে ব্যয় মেটানো কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। তবে সরকারি উদ্যোগে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বিনামূল্যে ওষুধ ও পরামর্শের পর তার কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে। এজন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হলেও তার খরচ কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। জুরিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মফিজুল ইসলাম বলেন, ক্লিনিকটিতে প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ জন মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কৈশোরকালীন সেবা, নবজাতক ও গর্ভবতী নারীরা সেবা নিতে আসেন। এর বাইরে অসংক্রামক রোগাক্রান্ত (উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস) মানুষ ওষুধ ও পরামর্শের জন্য আসেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রোগীদের লিখে দিলে আমরা তাদের দেই। াজশাহী জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নেয়া ৫৬ ভাগ রোগীর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের একটি যৌথ উদ্যোগের ফলে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের শনাক্ত করে তাদের চিকিৎসার আওতায় এনে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন দিতে সহায়তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপের রোগী বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ৩০-৭৯ বছর বয়সী ৫৫ শতাংশ মানুষ জানে না তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৮ শতাংশ। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৫ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে একজন।

এমন পরিস্থিতিতে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালে এই প্রকল্প নেয় সরকার। এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে রাজশাহীর ১১টি উপজেলার ২৩৬ কমিউনিটি ক্লিনিক এবং দেশের ১৮২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে। রাজশাহীতে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০২৩ সালে। দেশব্যাপী এই কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচআই) সহায়তায় গবেষণা এবং অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা’র (প্রগতির জন্য জ্ঞান) মাধ্যমে মিডিয়া অ্যাডভোকেসির কাজ চলছে। এর উদ্দেশ্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত করা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান এবং ফলোআপ করা। গত প্রায় দুই বছরে রাজশাহীতে ২২ হাজার ৫০৩ জন মানুষকে সেবা দেয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত ওষুধ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা পরামর্শ পাচ্ছেন। এর মধ্যে শুধু উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৮০০ জন এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস উভয় রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৭০৩ জন। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ জেলায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ছিল শতকরা ৫৬ ভাগ। তবে উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের মধ্যে ৪৫ ভাগ রোগী নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন না। তাদের সচেতন করতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিভাগীয় প্রোগ্রাম অফিসার এহসানুল আমিন ইমন মানবজমিনকে বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ বিনামূল্যে দিচ্ছে সরকার। তবে দূরত্ব, সময় ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে ৫ হাজারের অধিক উচ্চ রক্তচাপের রোগী ফলোআপে প্রতি মাসে নিয়মিত আসেন না। বিশেষ করে পুরুষ রোগীদের মধ্যে অনীহা বেশি। কারণ তাদের মধ্যে অনেক রোগী আছেন যারা ফসলের ক্ষেত্রে মৌসুমি কাজ করেন। তিনি জানান, অনিয়মিত রোগী বাড়ানোর জন্য কাউন্সেলিং হচ্ছে। সেবাকে কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। কমিউনিটিতে নানা গ্রুপকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ দেশের ২৩ জেলার ১৮২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং চারটি সদর হাসপাতালের এনসিডি কর্নারে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যার উদ্দেশ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা, চিকিৎসা ও ফলোআপ কার্যক্রম শক্তিশালী করা। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তৃণমূল পর্যায়ে প্রকল্পটি আরও সফল করতে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেট জেলার চারটি উপজেলার (গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজার) ৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরকারিভাবে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেয়া শুরু হয়। গত বছর ১৪ই মে ওই সভায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের জন্য অ্যামলোডিপিন ৫ মিলি গ্রাম ও ডায়াবেটিসের জন্য মেটফরমিন ৫০০ মিলি গ্রাম সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে দেশে অকাল মৃত্যুও কমে আসবে। কারণ মৃত্যুর প্রধান তিন কারণের অন্যতম উচ্চ রক্তচাপ। যদি অকাল মৃত্যু কমাতে হয় তাহলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের তো একটা টার্গেট আছে অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা। এজন্য ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে ওষুধ কিনে খেতে না পারলে ওষুধ সরবরাহ করা সরকারের দায়িত্ব। কিছু রোগী অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে তাদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে ডা. সোহেল রেজা বলেন, এটা একটা চ্যালেঞ্জ। তবে ওষুধ শেষ হলে এখন তাদেরকে মোবাইলে মেজেস দেয়া হচ্ছে। এতে বেশ সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।

mzamin


Sunday, September 22, 2024

রাসিক কর্মচারী ডালিমের এত সম্পদের উৎস কি?

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উচ্চমান সহকারী আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ওরফে ডালিম। বর্তমানে তিনি রাসিকের ভারপ্রাপ্ত স্টেট অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেতন ছাড়াও উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী নগরীতে কিনেছেন একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি। ফ্ল্যাটগুলোতে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন করেছেন লাখ লাখ টাকায়। উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি করে এমন বিলাসী জীবনযাপন করেন তিনি। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালকের কাছে আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ওরফে ডালিমের সম্পদের উৎসের সন্ধান ও তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে লিখিত অভিযোগ করেছেন মনিরুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি। রাসিকের প্রশাসক বরাবর একই অভিযোগ দেয়া হয়েছে। তিনি উপশহর এলাকার বাসিন্দা। অভিযোগের অনুলিপি রাসিকের প্রশাসক, রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, দুদকের চেয়ারম্যান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপদেষ্টা বরাবর দেয়া হয়েছে। দুদকে দেয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের স্টেট অফিসার পদে (ভারপ্রাপ্ত) কর্মরত আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ওরফে ডালিম আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাব খাটিয়ে করপোরেশনের বেতন ছাড়াও উৎকোচ গ্রহণ করে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। সিটি করপোরেশনে স্টেট অফিসার পদে চাকরির সুবাদে তিনি নগরের বিভিন্ন স্থানের জায়গা-জমি দখল ও সুযোগ বুঝে বিক্রেতাকে জিম্মি করে কম দামে কিনে নেন। নিজের নাম ছাড়াও স্বজনদের নামে অর্থ-সম্পদ গড়েছেন বলে শোনা যায়। আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ওরফে ডালিমের উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগরের শাহমখদুম থানার মোড়ে মেট্রোপলিটন কলেজের সামনে ৪০ কাঠা জমি। ওই জমির আনুমানিক মূল্য ৪০ কোটি টাকা। জমি কেনার সময় রাজস্ব ফাঁকি দিতে নামমাত্র মূল্যে জমিটি রেজিস্ট্রি করেছেন। তবে ওই জমিতে আঞ্জুমান নেসা নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এটি আঞ্জুমানের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া উল্লেখ করা হয়েছে। জমিটি আঞ্জুমানের সন্তানেরা দাবি করছেন। আবার একই জমিতে স্টেট অফিসার আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ওরফে ডালিম নিজ নামে সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাসিকের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সাথে যোগসাজোশ করে বিভিন্ন জমি হাতিয়েছেন। সেগুলো নামমাত্র মূল্য দিয়ে কেনার নামে দখল করেছেন। স্টেট অফিসার হিসেবে তার বেতন দিয়ে এত টাকার মালিক হওয়া সম্ভব নয়। বনলতা আবাসিকে তার ৪ কাঠা জমি রয়েছে। রাজশাহীর উপশহরে আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ও তার স্ত্রীর নামে কোটি টাকার উপরে মূল্যমানের ৩টি ফ্ল্যাটের বায়নামা করা হয়েছে। যদিও সেই ফ্ল্যাটের টাকা পরিশোধ না করেই দখলের চেষ্টা করেছিলেন। ১টিতে তিনি ইতিমধ্যেই বসবাস করেন। শহরে আরও কয়েকটি দামি ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে লোকমুখে শোনা যায়। উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি করে সেই অর্থ দিয়ে এত অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। ডালিমের বিষয়ে তদন্ত করলে সত্যতা বের হয়ে আসবে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। এ বিষয়ে রাসিকের উচ্চমান সহকারী আবু নূর মোহাম্মদ মতিউর রহমান ওরফে ডালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম শরীফ উদ্দিন বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
mzamin

Saturday, September 21, 2024

আন্দোলনে গুলিতে পা হারানো ইমরানের চিকিৎসা অর্থাভাবে বন্ধ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইমরান আলী। তিনি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের  সোহরাব আলীর ছেলে। ডান পা হারিয়ে নিজবাড়িতে অর্থাভাবে বন্ধ আছে তার চিকিৎসাসেবা। তিনি ঢাকায় ‘টপওয়ান’ নামে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।

জানা যায়, গত ১৯শে জুলাই সন্ধ্যা ৭টার সময় ছাত্র জনতার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা মিরপুর-১১ থেকে গাড়ি না পেয়ে  হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে মিরপুর ১০ নম্বরে পুলিশের ছোড়া গুলি লাগে ইমরানের ডান পায়ে। এ সময় আন্দোলনকারীদের মধ্য  থেকে কয়েকজন তাকে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।  সেখানে এক মাসের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাসেবা নিয়েও বাঁচানো যায়নি ইমরানের পা। অবশেষে কেটে ফেলতে হয়েছে। এদিকে গত প্রায় ২০ দিন আগে ইমরানকে হাসপাতাল থেকে  ছেড়ে দেয়ায় চলে আসেন নিজ বাসায়। বাসায় গিয়ে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ইমরানের এমন পরিস্থিতিতে চলছে না সংসার। বন্ধ আছে তার চিকিৎসাসেবাও। এতদিন ধারদেনা করে চিকিৎসা চালালেও এক পা হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ওই পরিবার।

ইমরানের বাবা সোহরাব আলী বলেন, আমার ছেলে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে পা হারিয়েছে। আমার সংসার শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলের জীবন বাঁচাতে আপনারা সবাই সহায়তা করে চিকিৎসা নিতে সহায়তা করেন। ইমরান হোসেন বলেন, ১৯শে জুলাই বাইরে আন্দোলন চলছিল বিষয়টা আমি বুঝতে পারিনি। অফিস  শেষ করে সন্ধ্যা ৭টায় মিরপুর-১১ থেকে গাড়ি না  পেয়ে হেঁটে মিরপুর-১০ নম্বরে  পৌঁছাতেই দেখি ছাত্ররা আন্দোলন করছে। এ সময় হঠাৎ মনে হলো আমার পায়ে কেউ  যেন ইটের টুকরা দিয়ে আঘাত করলো। কিছুক্ষণ পর দেখি রক্তে ভিজে গেছে। পরে বুঝতে পারলাম পায়ে গুলি লেগেছে এবং আমার সামনেও আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। তিনি বলেন, ঢাকায় চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন এখানে আমার সংসারও চলছে না আবার চিকিৎসাসেবাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এতদিন কাছে থাকা কিছু টাকা ও ধারদেনা করে চিকিৎসা চালিয়েছি এখন আর পারছি না। চিকিৎসা চালাতে পুঠিয়া ইউএনও স্যার বরাবর একটি সহায়তার জন্য আবেদনও দিয়েছি। আমি বাঁচতে চাই, আমাকে আপনারা বাঁচান।

ইমরান হোসেন বলেন, আমি ভাবতে পারি না যে আমার পা  নেই। মাঝে মধ্যে ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে উঠে বসি। আমার হাত যখনই ডান পায়ের দিকে যায় তখন আমার কষ্টে বুকটা  ফেটে যায়। এখন পর্যন্ত কেউ আমাকে দেখতেও আসেনি।  কোনো চিকিৎসা সেবাও দেয়নি। আমি চাই আমাকে সরকার সহযোগিতা করুক। তা না হলে আমার ভবিষ্যৎ জীবনে স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং অসহায় বাবাকে নিয়ে দিন পার করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার একেএম নূর হোসেন নির্ঝর বলেন, একটি মানবিক সাহায্যের আবেদন পেয়েছি। সেটি জেলা প্রশাসক অফিসে পাঠিয়েছি। সরকার বর্তমানে শহীদদের তালিকা করছেন। পরবর্তীতে আহতদের তালিকা করার সময় বিষয়টি দেখা যাবে।

mzamin

Thursday, August 15, 2024

ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়

প্রথম আলোঃ বরেণ্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের রাজশাহীর পৈতৃক বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে পাশে থাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রকর্মীরা বলছেন, বাড়ি ভাঙার ফুটেজ যাতে না দেখা যায়, এ কারণে কলেজে থাকা সিসিটিভি বন্ধ করে রাখা হয়। এ ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, সিসিটিভি তারা বন্ধ করেনি।

এর আগে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর পেয়ে গতকাল বুধবার দুপুরে জড়ো হন রাজশাহীর চলচ্চিত্রকর্মীরা। এ সময় কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চলচ্চিত্রকর্মীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে ঠিকাদার দাবি করেছেন। তবে কলেজের অধ্যক্ষ বলছেন, তাঁদের সাবেক শিক্ষার্থীরা এটা ভেঙে ফেলেছেন।

স্থানীয় সূত্র ও চলচ্চিত্রকর্মীরা বলেন, গতকাল ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি ভাঙার খবর পেয়ে তাঁরা নগরের মিয়াপাড়া এলাকায় জড়ো হন। সেখান থেকে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে তাঁরা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যান।

সেখানে দেখতে পান, গত ৬ আগস্ট দুপুর ১২টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত কলেজের সিসিটিভি চলছিল। এর পর থেকে সিসিটিভি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো ফুটেজ ধারণ হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, এই ভাঙচুরে কলেজ প্রশাসন রয়েছে।

সিসিটিভি বন্ধ হওয়ার বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ আনিসুর রহমান বলেন, ‘এর আগেও সিসিটিভি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা নতুন কিছু না। এটা আমরা বন্ধ করিনি। আমি এটা খুব বেশি বুঝিও না। ওই দিন থেকে বাইরের সাইটের তিনটি ক্যামেরা মিসিং আছে। ওই দিন যাঁরা (সাবেক শিক্ষার্থী) এসেছিলেন, তাঁরা এটা করেছেন কি না, তা–ও বলতে পারছি না।’

এদিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ গতকালই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মহিনুল হাসানকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তিনি আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ তিনিও ওই দিন পর্যন্তই পেয়েছেন। তিনি আজ ঋত্বিক ঘটকের বাড়িতে এসে চলচ্চিত্রকর্মী ও কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাড়ি পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, তিনি খুব দ্রুত এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন। এই কাজ করেছে যারা, সেই দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। খুব দ্রুতই এখানে সবাইকে নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের নামে দৃশ্যমান কিছু করবে জেলা প্রশাসন।

আজকেও ঋত্বিক ঘটকের বাড়িতে এসেছিলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম সাইক। তিনি বলেন, আগামী ৪ নভেম্বর ঋত্বিক ঘটকের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এখানে উৎসব করা হবে। সে ক্ষেত্রে এখানে দ্রুতই একটি উন্মুক্ত মঞ্চ, অফিস কাম লাইব্রেরি করে দেবে জেলা প্রশাসন। পরে এখানে ঋত্বিক ঘটক কমপ্লেক্স করা হবে। তাঁরা আজকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আশ্বাস পেয়েছেন। সিসিটিভি বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ হয়। উনি কিছু না করলে এটা কী করে সম্ভব যে বন্ধ হয়ে যাবে।’

ঋত্বিক ঘটক জীবনের শুরুর সময়টা কাটিয়েছেন পৈতৃক বাড়ি রাজশাহীতে। এই বাড়িতে থাকার সময় তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন। রাজশাহী কলেজ ও মিয়াপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার মাঠে প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে নাট্যচর্চা করেছেন। ওই সময় ‘অভিধারা’ নামে সাহিত্যের কাগজ সম্পাদনা করেছেন ঋত্বিক। তাঁকে ঘিরেই তখন রাজশাহীতে সাহিত্য ও নাট্য আন্দোলন বেগবান হয়। এই বাড়িতে থেকেছেন ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝি বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী।

এই বাড়ির পুরো ৩৪ শতাংশ জমি ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকার রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজকে ইজারা দেয়। কলেজটি বাড়ি ঘেঁষেই পশ্চিম পাশে রয়েছে। ২০১৯ সালে বাড়িটির একাংশ ভেঙে সাইকেল গ্যারেজ তৈরির অভিযোগ উঠেছিল কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। তখন রাজশাহীসহ সারা দেশে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়। পরে ২০২০ সালে বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় রাজশাহী জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন থেকে পরে ভূমি মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ঋত্বিক ঘটকের বাড়িটি ইজারা থেকে অবমুক্ত করে ঋত্বিক ঘটকের নামে দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল।

Tuesday, January 14, 2020

বাঁশের কলমে হাতে লেখা কোরআন শরিফ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

হামিদুজ্জামানের বাঁশের কলম
হামিদুজ্জামান পবিত্র কোরআন শরিফ লিখেছিলেন বাঁশের কলম দিয়ে। এর ওজন প্রায় ৬১ কেজি। পৃষ্ঠাসংখ্যা ১ হাজার ১০০। হামিদুজ্জামানের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পশ্চিম বামনাইল (ঝিকরাপাড়া) গ্রামে। কোরআন শরিফখানা বর্তমানে ঢাকার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
হামিদুজ্জামান তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও বিন্যাসকরণ বিভাগের এলডিসি (লোয়ার ডিভিশনাল ক্লার্ক) হিসেবে করাচিতে কর্মরত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশ সরকারের চাকরি পান। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে দুই বছর চাকরি করেছেন।
হামিদুজ্জামানের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১১ জানুয়ারি। মারা গেছেন ২০০৭ সালের ১৬ জানুয়ারি। তিনি ঢাকা বোর্ড থেকে এসএসসি, করাচি থেকে এইচএসসি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম পাস করেন। তাঁর দুই ছেলে এ কে এইচ এম মোফাসসিরুজ্জামান (৪৮) ও নওরিনুজ্জামান (৪৬) স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করে এখন গ্রামে কৃষিকাজ করেন। মেয়ে সাইকা শারমিনের (৩৫) বিয়ে হয়েছে। তাঁর স্ত্রী রাশিয়া বেগম (৬৫) সন্তানদের সঙ্গে থাকেন।
চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ১৯৮২ সালে তিনি এই কোরআন শরিফ লেখা শুরু করেন। আট বছরে তিনি ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার কোরআন শরিফ লিখে শেষ করেন। আর্ট পেপারে লিখতেন বাঁশের কড়ি কলম দিয়ে।
গত ২৭ মে সোমবার তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, হামিদুজ্জামানের পরিবারের লোকজন তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র যত্নসহকারে তুলে রেখেছেন। যে কলম দিয়ে তিনি লিখতেন, সেই কলমও পাওয়া গেল ১৬টি। কোরআন শরিফের কয়েকটি পাতা তিনি আলাদা করে লিখেছিলেন। ছেলেরা সেই পাতাগুলো অবিকল সেভাবেই রেখে দিয়েছেন। হামিদুজ্জামান এই কোরআন শরিফের বর্ণনা দিয়ে মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তার একটি করে ফটোকপিও রেখে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে যেসব চিঠি পাঠিয়েছেন, সব কটির অনুলিপি রেখে দেওয়া হয়েছে।
নওরিনুজ্জামান বললেন, বাবা লেখার জন্য ব্যবহার করতেন গুডলাক ও ক্যামেল ব্র্যান্ডের কালি। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে লিখতেন। লেখার আগে তাঁরা দুই ভাই মিলে দাগ টেনে দিতেন। একবারে ১০ পৃষ্ঠা করে লিখতেন। যখন লিখতে বসতেন, তখন ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতেন না। সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত লিখতেন। ১৯৯০ সালে ঢাকার গোপীবাগ লেনের একটি দোকানে ৩২ হাজার টাকা দিয়ে হাতে লেখা কোরআন শরিফ বাঁধাই করেন। এটি বাঁধাই করতে দুটি গরুর চামড়া ব্যবহার করা হয়েছে। বাঁধাই শেষে কোরআন শরিফের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ২৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ২৩ ইঞ্চি ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি। তিনি বলেন, এই কোরআন শরিফ বাঁধাই করতে গিয়ে তাঁরা অনেক কষ্ট করেছেন। বাবার সঙ্গে রাতের পর রাত ওই বাঁধাইয়ের দোকানেই ঘুমিয়েছেন।
১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে তিনি পবিত্র এই গ্রন্থখানি দেখাতে নিয়ে যান। সেই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আবেদনপত্রও দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে তিন অথবা চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে কোরআন শরিফখানার নির্ভুলতা নির্ণয় করা, ঢাকায় এর প্রদর্শনীর আয়োজন করা, যেখানে সব মুসলিম দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানান, মুসলিম দেশগুলোর প্রধান শহরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা এবং প্রদর্শনী শেষে সরকারের পক্ষ থেকে কোরআন শরিফখানা সৌদি আরব অথবা ব্রুনেইয়ের বাদশাহকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছিলেন।
হামিদুজ্জামানের ইচ্ছাগুলোর একটি শুধু পূরণ হয়েছে। গ্রন্থখানার নির্ভুলতা নির্ণয় করার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়। তাদের একটি কমিটি ২০০৭ সালে কিছু সংশোধনের জন্য হামিদুজ্জামানকে ডাকে। মাত্র তিন দিনেই হামিদুজ্জামান তা সংশোধন করে দেন। তারপর আর এই পবিত্র গ্রন্থখানা হামিদুজ্জামানের ইচ্ছা অনুযায়ী কাউকে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়নি। বাইরে প্রদর্শনীরও ব্যবস্থা করা হয়নি। তাঁকে ফেরতও দেওয়া হয়নি।
হামিদুজ্জামান স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রদর্শনী বা উপঢৌকন পাঠানো হলে সেখান থেকে অর্থ আসবে। তা দিয়ে তিনি কোরআন, হাদিস ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে একটি ইনস্টিটিউশন গড়ে তুলবেন। তাঁর এ স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে তাঁর হাতের লেখা কোরআন শরিফখানা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। প্রত্যুত্তরে ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালকের পক্ষে গ্রন্থাগারিক মুহাম্মাদ শামসুল হক লিখেছেন,
‘এখন এটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পত্তি।’
হামিদুজ্জামানের স্ত্রী রাশিয়া বেগম বলেন, ঢাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তিনি কোরআন শরিফখানা দেখতে গিয়ে মর্মাহত হয়েছেন। তাঁর দাবি, পবিত্র এই গ্রন্থখানা অনেকটা অযত্নে রাখা হয়েছে। যদিও পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে, তবু অনেক পৃষ্ঠাই জোড়া লেগে গেছে। পাতাগুলোর উজ্জ্বলতা কমে এসেছে। এভাবে রাখলে পাতাগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।
বাঁশের কলমে কোরআন শরিফ লিখছেন হামিদুজ্জামান। ছবি: হামিদুজ্জামানের পারিবারিক অ্যালবাম

Friday, September 27, 2019

তানোরে কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া by সোহানুল হক পারভেজ

রাজশাহীর তানোরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়নের কারণে দ্রুত কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য কৃষি জমি। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার কৃষি ব্যবস্থার আগের চিত্র বদলে দিয়েছে। আধুনিক যন্ত্রাংশের ছোঁয়ায় কৃষি জমির পরিমাণ কমলেও বেড়েছে উৎপাদন। তানোর উপজেলার বরেন্দ্র এই অঞ্চলসহ রাজশাহী জেলাজুড়েই কৃষকরা বীজতলা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যোগ করছেন যান্ত্রিক প্রযুক্তি। মাত্র দু’দশক আগেও তা ছিল স্বপ্নের মতো।

বরেন্দ্র এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানেই আবাদি জমিতে কৃষকরা চাষ দেন ট্রাক্টর যন্ত্রে। বীজতলা তৈরি ও বীজ বোনাও চলছে যন্ত্রেই। সেচ পাম্প ব্যবহারে সেচ পদ্ধতিরও পরিবর্তন হয়েছে আরো আগেই। চাষ দেয়ার মতো ধান মাড়াইতেও এখন আর গরু বা মহিষের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
সকল কাজেই যন্ত্রেও ছোঁয়া। যন্ত্র যেমন শ্রমকে বাঁচিয়েছে, তেমনি সময়কেও। গ্রামাঞ্চল থেকে বছর বা মাস কাবারি কামলা প্রথা উঠেই গেছে। এখন কম জমিতে চাষাবাদ করে অনেক বেশি ফসল পাওয়া যাচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহারে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে।

উপজেলার ৩০-৫৫ জন প্রান্তিক কৃষক জানান, যন্ত্রের মাধ্যমে চাষাবাদসহ অন্য কাজ সারলেও এখনও ক্ষেতে মই দেয়ার কাজ গরু-মহিষ দিয়েই করছেন তারা। কারণ, যন্ত্রের মাধ্যমে চাষ করে যন্ত্র দিয়ে মই দিলে ক্ষেত উঁচু-নিচু হয়ে থাকে। এতে ধানের ক্ষেত্রে ঠিকমতো পানি থাকে না। তানোর উপজেলার আমশো গ্রামের কৃষক আলহাজ আক্তারুজ্জামান রুঞ্জু জানান, ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় দু’বছর আগে এক জোড়া গরু কিনেছেন তিনি। নিজের ১৬ বিঘা জমি বিগত বোরো মৌসুমে অন্যের কাছে ভাড়া নেয়া পাওয়ার টিলার দিয়ে একদিনেই হাল চাষ করেছেন তিনি। পরে শুধু নিজের গরু দিয়ে মই দিয়েই চারা রোপণ করেছেন।
উপজেলার গোল্লাপাড়া গ্রামের বঙ্গবন্ধু পদকপ্রাপ্ত কৃষক নূর মোহাম্মদ জানান, দিন দিন প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে বর্তমানে যন্ত্রের সাহায্যে (ট্রাক্টর) দিয়ে হা চাষ সহ কৃষি কাজ করা হচ্ছে। তবে গরু দিয়ে হাল চাষ না হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাটি জৈবিক ক্ষমতা হারাচ্ছে। তাই একদিকে যেমন ফলন কমে যাচ্ছে তেমনি রাসায়নিক সারের প্রভাব বেড়েছে। তবে উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ জানান, দিনে দিনে কৃষি কাজে বাড়ছে যন্ত্রের ব্যবহার। কৃষি কাজে যান্ত্রিক উপকরণ দিয়ে হালচাষ, ক্ষেত থেকে ধান কাটা, ধান উঠানো এবং মাড়াইয়ের কাজও করছেন কৃষকেরা যন্ত্রের মাধ্যমে। যন্ত্রের ব্যবহার আসাই অল্প সময়েই সব জমি চাষ ও চারা রোপণ করতে পারছে কৃষক। তাতেই কৃষি খাতে অনেক উন্নতি হয়েছে।
বর্তমানে কৃষি ক্ষেত্রে যে যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তার বিবরণ জানালেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সামপ্রতিক বছরগুলোয় কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম সংযোজনের একটি হচ্ছে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসল কাটা, খোসা থেকে দানা আলাদা করা যায়। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। ছোট আকৃতির ধানি জমি চাষেও রয়েছে এর ব্যবহার। এছাড়া বীজ বপন, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটানোর জন্যও রয়েছে ব্রডকাস্ট সিডার। নির্দিষ্ট অবস্থানে বীজ বপনের জন্য আছে সিডর্ডিল। জমির শক্ত মাটি কর্ষণের জন্য সাব সয়লার, ধান কিংবা অন্যান্য ফসলি বীজ শুকানোর জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রায়ার যন্ত্র। ধান, গম, ভুট্টা শুকাতেও ব্যাচ ড্রায়ার নামক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া শস্য কাটার জন্য রয়েছে পাওয়ার রিপার মেশিন। বীজ ঝেড়ে পরিষ্কারের জন্য আছে ইউনার যন্ত্র।
উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা আরো জানান, উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়ে গেছে। এক একর জমির ধান কাটতে কৃষকের খরচ হয় পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু যন্ত্রের মাধ্যমে কাটলে খরচ হবে মাত্র দেড় হাজার টাকা। বর্তমানে কৃষি কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আধুনিক উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহার হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লুৎফর হায়দার রশিদ ময়না বলেন, সরকার কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য বিনামূলে কৃষি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি, সার-বীজ বিতরণ করে যাচ্ছে। সরকারের আন্তরিকতায় বাংলাদেশে কৃষি সেক্টর বর্তমানে একটি মডেল। শ্রম, অর্থ, সময় বাঁচাতে, সবকিছুকে আরো বেশি প্রযুক্তি নির্ভর করতে হবে। একদিন উচ্চ শিক্ষিত মানুষেরাও কৃষি কাজে এগিয়ে আসবেন।

Thursday, September 12, 2019

পাঁচ নারী কনস্টেবলের নতুন জীবন by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রাজশাহীতে কনস্টেবল পদে এবার ৪৪ জন নারী নিয়োগ পেয়েছেন। গত ৮ জুলাই স্বাস্থ্য পরীক্ষা দিতে আসা পাঁচ নারী কনস্টেবলের সঙ্গে কথা হয়। এই নারীরা ঘুষ না দিয়েই পুলিশে চাকরি পেয়েছেন। তাই তাঁরা অভিভূত। যেহেতু ঘুষ না দিয়ে চাকরি পেয়েছেন, তাই তাঁরাও কখনো দুর্নীতি করবেন না এবং মানুষের উপকার করবেন বলে জানালেন।

কথার শুরুতেই কনস্টেবল ইভা বলেন, ‘চাকরি পাওয়ার পর প্রথম কাজ হবে মাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে আনা।’ জানালেন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর বাবা তাঁদের ফেলে চলে যান। তখন থেকে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে দুই ছেলেমেয়েকে মানুষ করছেন।

নিয়োগপ্রত্যাশী ৫ হাজার ১৪১ জন প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াই করে ইভাকে উত্তীর্ণ হতে হয়েছে। ইভার নামের সঙ্গে কোনো পদবি নেই। বাড়ি রাজশাহী নগরের রাজপাড়া থানার চণ্ডীপুর এলাকায়। ইভা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। পাড়ার এক আপুর কাছ থেকে পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষার কথা জানতে পেরে তিনি আবেদন করেছিলেন। বাবা চলে যাওয়ার পর ভাই আহসান আলীকে নৈশ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন মা। এই ভাই দুই বছর আগে এসএসসি পাস করে এখন একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন।

পুঠিয়া উপজেলার ধোপাপাড়া গ্রামের সুমি খাতুনের বাবা ধোপাপাড়া বাজারে চা বিক্রি করেন। ভাই সুজন আলীও বাবার সঙ্গে দোকানে কাজ করে। ছোট ভাইটিরও পড়াশোনা হয়নি। সুমির ভাষায়, কাউকে টাকা দিয়ে যদি চাকরি পেতে হতো, তাহলে জীবনে কোনো দিন চাকরি হতো না।

সুমনা খাতুনের বাড়ি চারঘাট উপজেলার বিলমেরামতপুর গ্রামে। তাঁর বাবা কুলির কাজ করেন। সুমনা জানান, একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে এই চাকরির সার্কুলারের খবর পেয়েছিলেন। তারপর নিজেই সবকিছু করেছেন।

রাজশাহী নগরের মতিহার থানার বামনশিকড় এলাকার বেদানা খাতুনের বাবা একজন ভ্যানচালক। মা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। মেয়ের এই চাকরি পাওয়াতে বাবা জামাল উদ্দিন বললেন, তিনি কিছুতেই হিসাব মিলাতে পারছেন না। এই জামানায় কোনো টাকাপয়সা ছাড়াই মেয়ের চাকরি হলো! তাঁর মন্তব্য, ‘কিসে কী হলো ভাই আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকার সমুনা ইসলামের বাবা বাসচালকের সহকারী। তাঁর পরিবারও সুমনার চাকরি পাওয়াতে বিস্মিত।

রাজশাহীর পুলিশ সুপার এম শহিদুল্লাহ বললেন, ‘ঘুষ না দিয়ে এবার যারা নিয়োগ পেল, তারা মানুষকে সত্যিকারের “সার্ভিস” দেবে বলেই প্রত্যাশা করছি। নির্বাচিতদের সবাই হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য না। অনার্স পড়া ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা কয়েকজনেরও চাকরি হয়েছে। এই হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় তাদের সঙ্গে “ফাইট” দিয়ে টিকেছে।’
ইভা, সুমি খাতুন, সুমনা খাতুন, বেদানা খাতুন, সমুনা ইসলাম