Showing posts with label কাক ছোট গল্প. Show all posts
Showing posts with label কাক ছোট গল্প. Show all posts

Monday, June 15, 2026

গল্প- ফুলি

ফজলুর শুধু মনে আছে বাসটা চলছিল একটা বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে, ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বাঁশঝাড়ে ভূত থাকে বলে দাদি ভয় দেখাতেন, ভয়টা সে পেতও, তবে সন্ধ্যার আঁধার নামলে। কিন্তু সেদিন বাসটা চলছিল ভরদুপুরে, তাছাড়া সে বসেছিল মার হাত ধরে। মা অনেক হাসতেন, তার হাসি ফজলুর সব ভয় দূর করে দিত। ভয় ছিল না বলে ফজলু বাঁশঝাড়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। একসময় নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসের ড্রাইভার, অথবা সেরকমই আমাদের ধারণা। একটা শব্দে তার ঘুমটা ভেঙেও গেল। শব্দটা ছিল তার ছয় বছরের জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার।

পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ  ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?

দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।

তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের  মতো।

ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।

পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।

একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।

গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?

ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?

তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।

একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।

ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।

ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।

গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?

দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?

বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।

হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।

হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।

বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।

পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।

ঠিকাসে, ফজলু বলল।

শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।

খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।

না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।

খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?

ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।

মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।

সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।

বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?

ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।

বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।

তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।

ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।

পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।

খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।

বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।

জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।

সগির শোনেনি।

পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।

তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।

অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।

হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।

আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।

দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।

টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?

হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।

দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।

আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।

দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।

দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।

খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?

ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।

ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।

-----দুই-----

হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।

যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।

ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।

বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।

বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।

চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।

জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।

ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?

অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?

এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?

আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।

দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।

-----তিন-----

সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?

খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।

ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।

তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।

ফজলু হাঁটা দিলো।

কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।

কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।

-----চার-----

বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।

খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?

ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।

কী কাজ?

পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।

ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।

তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।

থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।

উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।

কেন?

সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।

উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।

এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।

তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।

খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।

ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।

কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড়  দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।

চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।

ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?

সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।

পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।

মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।

পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?

চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।

এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।

বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।

-----পাঁচ----

বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।

গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে  কবে শুনেছে?

মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।

দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।

ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।

Monday, September 15, 2025

গল্প- ঠান্ডা রক্ত বা এনআরসির দিনে প্রেম by মিথিলেশ ভট্টাচার্য

ওই যে লালমাটির ছোট্ট গলিপথ, পুরোটা না, শুধু মুখটুকু, কোনো কোনোদিন বেশ রঙিন, ফুরফুরে আর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সিক্তার উপস্থিতিতে। সিক্তা ঝলমলে সালোয়ার-কামিজে, নির্ভার মেজাজে, ছাতা মাথায় এসে দুদ- দাঁড়ায় গলিমুখে একটা অটোরিকশা ধরার আশায়। তবে রোজই এখানে দাঁড়িয়ে তার ভাগ্যে রিকশা জোটে না। খানিকটা পথ উজিয়ে মেইন রোডে গিয়ে রিকশা ধরতে হয়। মাঝেমধ্যে লালমাটি-গলিপথের বিপরীত গলির যতীনের গাড়িতে কখনো লিফট পেয়ে যায় সে; দুজনের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যদি মিলে যায় তবে। যেমন আজ -।

যতীনের লাল রঙের সেকেন্ডহ্যান্ড ফিয়াট গলিমুখে পড়ে রোজকার মতো ক-মুহূর্ত স্থির ও সতর্ক, রাস্তার দুপাশের পথচারী ও ছোট-বড় গাড়ির সম্ভাব্য আনাগোনার ব্যস্ততায়, আর সে-সময় ওর দৃষ্টি পড়ে সিক্তার ওপর বা গলিমুখে সিক্তার খানিক ফুটে ওঠা তার চাতকদৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে নেয়। আর ওদিকেও, সিক্তার লম্বাটে ফেসিয়াল করা মসৃণ চেহারায়, রক্তরাঙা ঠোঁটে স্মিত হাসির ঝিলিক -।

গাড়িটা রাস্তার ওপাশে নিয়ে গিয়ে চালক সাজু সিক্তার সামনে দাঁড় করায়। ওকে নিতে হবে বিলক্ষণ জানে সে। যতীন দরজা খুলে যথারীতি সিক্তাকে আহ্বান করে : এসো! আজ আবার ওর সঙ্গে একটু জরুরি দরকারও আছে তার। তবে এক্ষুনি কথাটা বলে আবহাওয়াকে ভারী করতে চায় না সে।

এই যে সিক্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, তা কিন্তু রোজ রোজ ঘটে না। মাঝেমধ্যে সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় সিক্তার সঙ্গে গলিমুখে বা রাস্তার পাশে দেখা হলে যতীন অবশ্যই তাকে তুলে নেয় গাড়িতে। যে-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে সিক্তা, তা বড়জোর দুই কিলোমিটার দূর এবং এটুকু পথ তাকে প্রায়ই দশ টাকা অটোভাড়া খরচ করে পাড়ি দিতে হয়। মাসের মধ্যে দু-চারদিন যতীন গাড়িতে লিফট দেয় তাকে।

ওদের দুজনের পরিচয় দেখতে দেখতে বেশ কবছর হয়ে গেল। মুখোমুখি গলির বাসিন্দা হলেও দুজনের মধ্যে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা কিছুই হয়তো হতো না। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই তো বছরের পর বছর পরিচিত মুখ হয়েও অপরিচিত থেকে যায়। যতীন আর সিক্তার মধ্যেও ওরকম সম্পর্কই হতো যদি না এক নেমন্তন্নবাড়িতে সিক্তার তার প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠা, পাশে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ আচরণভঙ্গি, স্মিত হাসির বাক্সময় দৃষ্টি ওসব চোখে না পড়ত। এখন যতীনের মনে হয়, হঠাৎ করে তার প্রতি ওরকম মনোযোগী হয়ে ওঠেনি সিক্তা। ব্যাপারটি নিশ্চয় বহুদিন থেকেই ওর মনের কোনো অতল কোণে জন্মেছিল, যার প্রকাশ ঘটে নেমন্তন্নবাড়ির খোলা পরিবেশে।

নেমন্তন্নবাড়িতে খাবার পর মুখ ধোয়ার জায়গা করা হয়েছিল মেইন রোডের পাশে। দু-তিনটি বালতিতে জল ও কয়েকটি মগ রাখা ছিল। যতীন যখন মগ নিয়ে হাতে জল ঢালতে যাবে, তখন একটু চমকে দেখতে পেয়েছিল পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো সিক্তাও তার সুডৌল হাতটি ধারার নিচে পেতে দিয়েছে। ওর শ্যামলা চেহারায় স্মিত হাসির ঝিলিক।

তারপর থেকে পথে কোথাও দেখা হলে বা হঠাৎ করে দুজন মুখোমুখি পড়ে গেলে সিক্তার হাসিমাখা ঝলমলে চেহারা ও কৌতূহলী দৃষ্টি যতীনকে সবিশেষ আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে দিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পথচলতি অন্যমনস্ক তার দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টির সিক্তাকে হঠাৎ লক্ষ করে অবাক যতীন খুব উৎফুল্লও বোধ করেছে।

এবং তারপরের ঘটনাক্রম দিয়েই আজকের এই কাহিনির শরীর তৈরি হয়েছে।

গলিপথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে এসে তেল নেওয়ার জন্য সাজু গাড়ি ঢোকাল সত্যম পেট্রল পাম্পের প্রশস্ত চত্বরে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পাম্পের এপাশ-ওপাশ একপলক চেয়ে দেখে সিক্তা যতীনকে বলে, এনআরসির ফরম ফিলাপ করেছেন?

না। করিনি এখনো। অবহেলা-মেশানো উদাস সুরে বলে যতীন।

আমাদেরটা হয়ে গেছে -। ভারমুক্ত কণ্ঠে বলে সিক্তা।

তাই, কে করেছে? এবার একটু আগ্রহের গলায় জানতে চায় যতীন।

কে আবার, বাবা নিজেই করেছে।

তোমার বাবা ওসব জানেন?

জানে তো। পাড়ার বেশকজনকে হেল্পও করেছে।

কিন্তু ফরমের অনেক কলম তো আমার কাছে বেশ কনফিউজিং লেগেছে, – দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে যতীন।

তাহলে বাবার কাছে চলে আসুন!

বলছ – ? যতীন সিক্তার চোখে চোখ রাখে।

হ্যাঁ। বাবা বুঝিয়ে দেবে আপনাকে – উৎসাহের সুরে বলে সিক্তা।

ঠিক আছে যাব। তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও তো, – প্যান্টের পকেটে হাত ভরে নিজের মোবাইল বের করে আনে যতীন। অনেকদিন থেকেই একান্তে কথা বলার অভিপ্রায়ে সিক্তার মোবাইল নম্বরটা জানার সুতীব্র কৌতূহল তার। কিন্তু সেরকম সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হাতের কাছে সুযোগ এসেছে।  ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করে যতীন।

হাতের মুঠোয় ধরা নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সিক্তা বলে, আমারটা কেন, ঘরের ল্যান্ড নম্বর দিচ্ছি, পাশে আমার নামটা লিখে রাখবেন – !

এ-কথা শুনে একটু দমে যায় যতীন। ওর নম্বরটি দিতে চাইছে না কেন। ঠিক আছে, বলো, – মিয়ানো কণ্ঠে বলে যতীন।

আচ্ছা, সিক্তা নিজের মোবাইল নম্বরটি দিতে চায় না কেন, ওর কি যতীনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ইচ্ছা করে না? তবে তাকে দেখতে পেলে কেন হাসিমুখে সাড়া দেয়, নির্বিবাদে চড়ে বসে গাড়িতে? যত দুর্বলতা তো ও-ই দেখিয়েছিল প্রথমে। তবে কি যতীনের মতো মধ্যবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে সিক্তার ওরকম আচরণ? সুঠামদেহী, সুদর্শন যতীনের রূপই ওকে শুরু থেকে পতঙ্গের মতো আকর্ষণ করেছে, এখন হয়তো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হয়ে ক্রমে মোহভঙ্গ হচ্ছে ওর!

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীনের ঘন শিহরণ ফড়িঙের ডানার মতো চঞ্চল মনে সহসা কিম্ভূত সব শব্দ ও ভাষায় আকীর্ণ এনআরসি ফরমের কথা মনে পড়ে। কারো সঙ্গে ভাগ করতে ইচ্ছা করে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা সব চিন্তা ও প্রশ্নের আঘাতকে। পাশে বসে থাকা সিক্তার দিকে একপলক তাকায় যতীন। ও কি ওসব চিন্তা ও প্রশ্নের সুবিচার করতে পারবে?

পিতৃ-মাতৃ কেন, মুরব্বি কেন? কী ধরনের বাংলা শব্দ ওগুলো? পিতৃ-মাতৃর মতো তৎসম শব্দ তো বাংলায় ব্যবহার হয় না। আর আঞ্চলিক সিলেটি শব্দ ‘মুরব্বি’ তো শিষ্ট ভাষায় কেউ লেখে না। ‘প্রাতিষ্ঠানিক মুুরব্বি’, ‘আইনি অভিভাবক’, ওরকম ক্লিশে শব্দবন্ধ কেন? কথাগুলো ভেবে মনে মনে বেদনাবোধ করেছে যতীন। এনআরসি নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত যে, ওসব কথা নিয়ে ভাবনার, কথা বলার অবকাশ কারো নেই!

বলবে কি সে-কথাগুলো সিক্তাকে, ও কি বুঝতে পারবে তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও বেদনার গূঢ় কারণ? সিক্তা তো একশভাগ বাঙালি। ও কি খবরের কাগজ পড়ে, নিজের ভাষা নিয়ে ভাবে? ওকে দেখলে কিন্তু ওরকম মনে হয় না। দেখেছে সে বর্তমান প্রজন্মকে, সবাই জীবিকা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে তাকানোর মতো অবকাশ নেই যেন। আসন্ন অস্তিত্ব-সংকট যে কত গভীর ও ব্যাপক সে-সম্পর্কে সবাই কেমন অজ্ঞান, উদাসীন!

পাম্প ছেড়ে পথে বেরোতেই ওপারের একটি দোকানের শোকেস আড়াল বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ে যতীনের : এখানে এনআরসির জন্য ফটো তোলা হয়। শুধু এই দোকানটিই নয়, শহরের যত্রতত্র এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। যতীনের নিজের পাড়ায় নিজামের দোকানের একটি বিজ্ঞাপন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : এখানে বিনামূল্যে এনআরসির ফরম ফিলাপ করা হয়। সৌজন্যে, হরেকেষ্ট দাস। অতিপরিচিত রাজনৈতিক পার্টির সক্রিয় সদস্য!

এনআরসির ফরম সংগ্রহের দিনের একটি ঘটনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে যতীনের। সেদিন দুপুরবেলা সেও অন্যদের মতো পাড়ার ক্লাবঘরে গিয়েছিল ফরম আনতে। নানা বয়সের পরিচিত মহিলা ও পুরুষে ক্লাবঘর গমগম করছিল। ভিড়ের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, পাড়ার সম্মানিত বাসিন্দা উমাপদবাবুও লাঠিহাতে হাজির ছিলেন। সরকারি কর্মচারী যারা টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কাজ করছিল, তিনি সেখানে ফরম হাতে নিয়ে সহসা কাঁপা-গলায় আবেগভরা সুরে অতিবিখ্যাত কবিতার দুটি লাইনের একটি শব্দ বদল করে আবৃত্তি করে উঠেছিলেন :

কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে

কভু পার্টিশন-বিষে (আশী বিষে) দংশেনি যারে!

ভেতরের সুতীব্র মর্মবেদনার এমন মোক্ষম বহিঃপ্রকাশ যতীনকে আমর্ম কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি, সাপের বিষ যেমন লহমায় গোটা শরীরে ছড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়; পার্টিশন বিষও তো তেমনি লাখো কোটি লোকের এমনই দশা করেছে। যে ভয়ংকর কূটাঘাত ছিন্নমূল মানুষকে শুধু শুধু তাড়িয়ে মারছে – !

লক্ষ করেছে যতীন, এনআরসি নিয়ে শহর-গ্রামে তুমুল উথালপাথাল, হইহই কা-, আতঙ্ক, এমনকি আত্মহননের মতো চরম দুঃখজনক ঘটনা! জীবন-জীবিকা নির্বাহের রক্ত জল করা-বিবিধ কাজকামের ভেতরে, অবকাশ যাপনের স্বল্প অবসরে উচ্চ-নিচ সবার একমাত্র চর্চা এনআরসি। এই ভূম-লে লাখো মানুষের বর্তমান অস্তিত্বের অমোঘ নিয়ন্তা হয়ে যেন দেখা দিয়েছে এনআরসি। বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া সবাই আগপাশতলা তটস্থ ওই একটিমাত্র বজ্রনির্ঘোষের দোর্দ-প্রতাপে!

ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রি করা পাটভাঙা জামাকাপড় পরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটছে এনআরসির জন্য ফটো তোলার তাগিদে, ফরম ফিলাপের জন্য হন্যে হয়ে একে-তাকে অনুনয়-বিনয় করতে বা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বাংলায় ছাপা ফরম দেখে বিরক্ত। ইংরেজিতে হলেই যেন ভালো ছিল – এরকম মনোভাব। নিজের মাতৃভাষা যে-লোক ভালো জানে না, সে আবার ইংরেজিতে কেমন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, ভেবে পায় না যতীন!

এনআরসির জন্য ফটো উঠিয়েছেন যতীনদা? সিক্তা কৌতূহলী সুরে যতীনকে শুধায়।

না। এখনো উঠাইনি। তুমি – তোমরা?

আমি এখনো ফটো তুলিনি। বাবা আর মা একসঙ্গে গিয়ে ফটো উঠিয়ে এসেছে গতকাল।

সিক্তা এখনো ফটো তোলেনি জেনে হঠাৎ করে যতীনের মনে একঝলক রোমান্টিক হাওয়া ওঠে। সে সিক্তার দিকে তাকিয়ে ঝটিতি প্রস্তাব দেয়, এখন ফটো ওঠাবে নাকি?

এখন? একটু বিস্ময়ের কণ্ঠে বলে সিক্তা।

হ্যাঁ, এখন! উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে যতীন। তাদের যৌবন-বয়সে তো ওরকম ছিল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে যুগলে ফটো তোলা। সিনেমাহলের অন্ধকারে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখা, হাতে হাত রাখা, কখনো-বা প্রেমিকার উন্নত বুকে কনুই দিয়ে চকিত সুখস্পর্শ, – কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীন আড়চোখে সিক্তার সুডৌল স্তনের দিকে তাকায়। ক্লিভেজের আলো-আঁধারে মুখ গুঁজতে বড্ড সাধ হয় মুহূর্তে।

এখন তো অফিসে যাব, পরে ওঠাব। সিক্তা যতীনের প্রস্তাব এড়ানোর চেষ্টা করে।

এখন হলেই তো ভালো ছিল, দুজনে একসঙ্গে ফটো ওঠাতাম।

ফটো তো সিঙ্গল ওঠাতে হবে -। সিক্তা সামান্য হেসে বলে।

জানি। তবে তোমার সঙ্গে একটা ফটো ওঠানোর বড্ড ইচ্ছা। এরকম সুযোগ তো সবসময় হবে না।

কেউ যদি দেখে ফেলে?

দেখবে কেন, নিজের কাছে রেখে দিলেই হবে।

না না। মা সবসময় আমার ব্যাগ খুলে দেখে, আপনার সঙ্গে ফটো দেখতে পেলে হাজারটা প্রশ্ন করবে! একটু ভীতু সুরে বলে সিক্তা।

ঠিক আছে, ফটোটা না হয় আমার কাছেই থাকবে। যতীন নাছোড়বান্দা।

আপনার ঘরেও তো লোক আছে দেখার, তখন? সিক্তা যতীনের স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে কথাটা বলে।

তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব। যতীন প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে।

ঠিক আছে, তবে আজ না, আরেকদিন -।

আরেকদিন কবে হবে। যতীন ঈষৎ হতাশ গলায় বলে।

খুউব শিগগির – সিক্তা হালকা হাসে।

সত্যি বলছ তো? সন্দিগ্ধ সুরে যতীন প্রশ্ন করে।

আরে বাবা বললাম তো, – আচ্ছা, আপনি লিগ্যাসি ডাটা জোগাড় করেছেন – ? সিক্তা দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যায়।

ওসব জোগাড় হয়ে গেছে। লিগ্যাসি ডাটা, পুরনো ভোটার লিস্ট,  মাইগ্রেশন কার্ড – শেষের দুটি নথির কথা উচ্চারণ করেই বেশ ক-মুহূর্তের জন্য দূরমনস্ক হয়ে পড়ে যতীন।

ভোটার লিস্টে কত পুরনো পরিচিত সব নাম! নামগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে যতীনের স্মৃতিতে বহুকালের পুরনো পাড়ার শান্ত-সুন্দর ছবি ভেসে উঠেছিল। সে-সময়ের কত কত নামিদামি নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, খেলোয়াড়, সমাজসেবকের নাম পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল যতীন। সেই সোনার দিনকাল আর সহজ-সরল লোকেরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিল সে ‘উদ্বাস্তু তালিকাভুক্ত ফরম’ নামক সেই পোকায় কাটা কাগজখানা দেখে। কী যে মায়া হচ্ছিল তার! বাবার নাম, মায়ের নাম, দিদি ও দাদার নাম, ছোটভাইয়ের নাম – সব মৃত মানুষ মুহূর্তের তরে জেগে উঠেছিল যতীনের চোখের সামনে। পরম মমতায় নামগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছিল সে, যেন একদার ফেলে আসা দেশ-বাড়ির শরীর হাতড়াচ্ছিল। এক দেশের মাটিতেই এপার-ওপার – লাখো কোটি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল; আজো ওই ছোটা বিরামহীন – !

----দুই----

আর অল্পদূর এগোলেই সিক্তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওখানে সে নেমে যাবে। কিন্তু যতীন ওর সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। কেন জানি আজ ওর পাশে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। যদিও সিক্তার মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। যতীনের দেখা পেলে, সঙ্গ পেলে সিক্তা বেশ উৎফুল্ল হয়, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। তবে শুধু ওটুকুই, এর বেশি গণ্ডি পেরোতে চায় না সিক্তা। অথচ আগল ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই ছিল উপযুক্ত সময় – ভাবে যতীন। চারদিক এনআরসির ঝড়ে ল-ভ-। বিভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষ। কোনোদিকে দৃষ্টি স্থির করে তাকানোর অবসর নেই কারো। সে আর সিক্তা এই উথালপাথাল সময়েই তো ভেসে যেতে পারে উন্মাদ প্রেমের জোয়ারে। যদিও এ-মুহূর্তে ভাবনাটা খুবই স্বার্থপরের মতো, তবু ভেতরে জেগে ওঠা বিপুল প্রেমের আবেগকে কীভাবে বাগ মানাবে যতীন – !

আমি আজ তোমার ওখানে যাব ভাবছি – সহসা বলে ওঠে যতীন।

কেন – ? সিক্তা সপ্রশ্ন-দৃষ্টিতে তাকায় যতীনের মুখের দিকে।

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে যতীন সিক্তার দিকে দুদ- স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু সুরে বলে, জানো, ইদানীং আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছে – !

কী রকম?

কাউকে কথাটা বলিনি এখনো। একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে যতীন।

আমাকে বলতে পারেন, যদি আপত্তি না থাকে।

আপত্তি কেন হবে, আমার কাজটা যে তোমার ওখানেই, শুধু ভাবছি কথাটা তুমি বিশ্বাস করবে কি না – !

বলেই দেখুন, বিশ্বাস করা না করা তো পরের ব্যাপার -।

জানো, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি আমার শরীরের কোথাও কেটে গেলে যে-রক্ত বেরোয় তা বেশ ঠান্ডা – !

ঠান্ডা? প্রশ্নের ঢংয়ে ঈষৎ চমকের সঙ্গে শব্দটা উচ্চারণ করে সিক্তা।

ভাবছি শরীরের ভেতরে কোনো বড় রোগ বেঁধে গেল কি না! ভয় ও চিন্তা-মেশানো সুরে বলে যতীন।

এ-কথার পিঠে চট করে কোনো কথা না বলে সিক্তা যতীনের বিষণœ ও গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিছুদিন আগে নারকেল কাটতে বসে হঠাৎই দায়ের কোপ পড়ে যায় আমার বাঁহাতের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। আমি ডানহাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরি। আর তখনই টের পাই রক্তটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা – ! শুধু ওই হাতই নয়, আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা হোঁচট লেগে ফেটে যায়, তখনো লক্ষ করেছি রক্তটা বেশ ঠান্ডা – !

সিক্তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। সে নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে যতীনের দিকে।

এতদিন তো জানতাম ব্যাঙের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের শরীরের রক্ত তো সবসময়ই গরম আর এখন তো পরিস্থিতির চাপে আরো বেশি গরম, আমার শরীরের রক্তও তো বেশি গরম হওয়া উচিত, কী বলো – । জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে – !

থামে যতীন। গাড়ির জানালাপথে বাইরে তাকায়।

তারপর আবার সিক্তার দিকে ফিরে সামান্য উত্তেজিত গলায় বলে, মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয় জানো সিক্তা, ওই যে লোকগুলো সব এনআরসির জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে, ওদের রক্তও কি আমার মতো ঠান্ডা, সবাইকে ধরে ধরে পরীক্ষা করলে কেমন হয় – !

Sunday, June 15, 2025

গল্প- তুমি মরো আমি বাঁচি by মঞ্জু সরকার

জীবনের শেষ কথাটি বলার জন্য তিনবার দমফাটা হিক্কা তুলে, উড়ে যাওয়ার আগে প্রাণপাখি চোখে চরম সতর্কবার্তা পাঠালে বৃদ্ধা ঘরে উপস্থিত একমাত্র জীবিত প্রাণী ছোটবউয়ের দিকে কাতর-ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকায়, তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ড মাত্র। চোখের আলো নিভে গেলে দৃষ্টি স্থির ও শরীর যখন নিস্পন্দ, রহিমা জিজ্ঞেস করে, ‘ও আম্মাজান, কী হইল!’

এতো কাছে থেকে মানুষকে আগে মরতে দেখেনি রহিমা। শাশুড়ি সাড়া না দেওয়ায় গায়ে হাত দেয়, নাকের ওপর হাত রেখে নিশ্চিত হয়, বুড়ির প্রাণপাখি এইমাত্র তার চোখের সামনেই উড়ে গেল! আর এমন এক সময়ে শাশুড়ির অন্তরাত্মা দেহছাড়া হলো, বাড়িতে যখন সে ছাড়া উপস্থিত নেই কেউ। এখন তার কী করা উচিত? রহিমা মৃতার চোখদুটি বুজিয়ে দেয় আলতো স্পর্শে।

বড়বাড়ির মুরবিব মরবে, বয়স হয়েছে, রোগে-দুর্ভোগে বিছানায় পড়ে থাকার বদলে এখন মরলেই তার শান্তি। সবাই জানত এবং এরকম বলাবলি করত। কিন্তু আজ সকালেও তো লাঠি ঠুকঠাক করে উঠানে হেঁটে বেড়িয়েছে মানুষটা। বাথরুমেও গেছে একা। রহিমা যথারীতি তার ঘরে খাবার দিয়ে এসেছে। মিষ্টিকুমড়ার ঘ্যাঁটে স্বাদ বাড়াতে কয়েক টুকরা বাসি মাংস দিয়েছিল সে। বেছে বেছে বুড়ির জন্য এক টুকরা হাড় দিয়েছিল আজ । দাঁতে অসমর্থ মানুষটাকে শক্ত হাড্ডি দেওয়ার সময় ফোকলা মুখে-গলায় হাড় আটকে তার মরণ কামনাও মনে উঁকি দিয়েছিল হয়তো, কিন্তু রহিমার মনে শুধু হিংসের বিষ নয়, হাড্ডিটা পেঁচিয়ে এক পোঁচ মাংসও ছিল এবং দেখেশুনেই দিয়েছে রহিমা, বুড়ি যাতে খেতে পারে। জোহরের নামাজ পড়ে ভাতও খেয়েছে বুড়ি। খাওয়ার পর বিছানায় যেমন গড়ায়, আজো শুয়ে ছিল।

শাশুড়ির এঁটো থালাবাটি আনার জন্য ঘরে ঢুকে রহিমা হিক্কার আওয়াজ শুনে তার বিছানার দিকে এগিয়ে এসেছে, শেষ কথাটি শোনার জন্য তার মুখের ওপর ঝুঁকেও ছিল, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আজগুবি মরে গেল মানুষটা! চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মরণ দেখে বুকের ভেতরে নিজের আত্মাটাও ধকধক করছে। এখন রহিমা কী করবে? নির্জন বাড়িতে শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুর একমাত্র সাক্ষী হতে চায় না সে। লোকে বলবে, ছোটবউ খোঁজখবর নেয়নি, যত্নআত্তি করেনি ঠিকমতো। খাবারে বিষ মিশিয়ে হাড়-জ্বালানি শাশুড়িকে মারার চিন্তা যেহেতু তার মনেও এসেছিল, সন্দেহটা জাগতে পারে বুড়ির সন্তানদের মনেও। শকুনিবুড়ির জান নিতে আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার ফরিয়াদ জানিয়েছিল রহিমা। তার নীরব প্রার্থনা আল্লাহ না শুনুক, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বুড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের কানে না যাক, মনের খবর বুড়ির ছোট ছেলে তথা রহিমার গুণধর স্বামী ঠিকই জানে এবং সমর্থনও করেছে অনেক সময়, বউয়ের ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের সুখ নিষ্কণ্টক রাখার গরজে। কিন্তু এখন মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেলে স্বামী আজ খুশি হওয়ার বদলে নির্ঘাৎ অভিযোগ করবে, মায়ের শরীর খারাপ তো আমাকে ফোন দাওনি কেন?

রহিমা এক ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে স্বামীর নম্বর টেপে। সাধারণত স্বামীকে প্রতিটি ফোনকলে কানে পাওয়ার সময় শহরে তার অবস্থান নিয়ে মনে নানারকম সন্দেহ জাগে; কিন্তু আজ ফোন ধরতে বিলম্বের মুহূর্তগুলোতে মোটরসাইকেলে স্বামীর কোমরজড়ানো সন্দেহজনক নারীকে দেখে ভূত দেখার মতো ভয় পায় এবং ভয়কাঁপা কণ্ঠে খবরটা জানায় সে, ‘আম্মাজান কেমন যেন করছে! একজন ডাক্তার নিয়া জলদি আসো বাড়িতে।’

‘মা কেমন মানে কী করছে? আমি তো সকালেও ভালো দেখে আসলাম। শবরি কলা আর গ্যাসের ঔষধ নিতে কইছে, রাতে নিয়া যাবখন।’

মায়ের কলা খাওয়ার দিন শেষ হওয়ার খবরটা চেপে রাখায়, অব্যক্ত সত্যের ভারে স্বামীকে দেওয়া ধমকটাও এবার ভারি হয়ে ওঠে, ‘যা বললাম তাই করো আগে, আমি দেখি এদিকে।’

বজ্রপাতের মতো খবরটা গোপন রেখে নির্জন বাড়িতে একা স্বাভাবিক থাকতে পারে না রহিমা। মৃত্যুর অসহ্য চাপ এড়াতে জীবন্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে বালকপুত্রকে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও রুম্মান, বাবা রুম্মান! খেলতে কোথায় মরতে গেছিস হারামজাদা?’ রুম্মানকে খুঁজতে খুঁজতে রহিমা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার দিকে যায়। ছেলের বদলে রাস্তায় বুড়ির সেবায় নিযুক্ত কাজের মেয়ে পড়শি জামেনাকে দেখতে পায়। জামেনা রোজ তিন-চার বেলা আসে এ-বাড়িতে। আজ সকালেও এসেছিল, বুড়ির গোসলের পানি রেডি করে দিয়েছে, কাপড় কেচে দিয়ে পানসুপারিও পিষে দিয়ে গেছে।

‘ও জামেনা, জলদি আয় তো বাড়িতে। আম্মাজানের কী হইল, দেখ তো আসি।’

‘খানিক আগেই না বুড়ির জন্য পানসুপারি পিষে দিয়া গেইনু চাচি!’

হামানদিস্তায় বুড়ির পানসুপারি বেটে দেওয়ার কাজটি করতে গিয়ে জামেনার নিজেরও পানটা খাওয়া চলে। কিন্তু আজ একটাও সুপারি অবশিষ্ট ছিল না বলে বুড়ির পেশা সুপারি একটু মুখে দিয়েছে। বুড়ো মানুষের পেশা সুপারি খেয়ে মোটেও তৃপ্তি হয় না। এখন সাবান কেনার পয়সার সঙ্গে একটা পান খাওয়ারও মতলব নিয়ে দোকানের দিকে যাচ্ছিল সে, বিরক্তি নিয়ে অনিচ্ছাতেও বড়বাড়িতে ঢোকে আবার।

বুড়ির ঘরে ঢোকার আগেই, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিতে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে জামেনা, ‘ও দাদি, গুয়াপান খায়া মন ভরে নাই? তোর লাঠির ঠুকঠকানি আর উড়ুনগাইনের ঢকঢকানি না শুনলে ছোটবউয়ের খালি মরার চিন্তা আইসে।’

অতঃপর ঘরে ঢুকে বিছানায় মৃতাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে পানের গন্ধও পায় জামেনা, মুখের কোণে রক্ত-পিত্তের মতো লোল গড়িয়েছে, ওই দুর্গন্ধ রসটুকু ছাড়া বুড়ির শরীরে প্রাণের কোনো সাড়া না পেয়ে জামেনাই প্রথম বিস্ময়কাঁপা গলায় ঘোষণা করে, ‘ও আল্লা রে, বুড়ি না মরি গেইছে! মুখ থাকি এলাও মোর পেশা গুয়ার গন্ধ বারায়! হায় আল্লা, কোনবেলা কেমনে মরল চাচি? ও আল্লা রে!’

টেবিলের ওপর ভাতের পেস্নটবাটি দেখে জামেনা আবারো মৃতার জ্যান্ত দশা সম্পর্কে আগ্রহ দেখায়, ‘ভাত খায় নাই এলাও?’

ছোটবউয়ের রান্না খাওয়ার পরই ভালো মানুষটা আজ মরে গেল কেন? এমন প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রহিমা দিশেহারা শোকের মাঝেও অনুভব করে জামেনার ওপর পালটা অভিযোগ চাপায়, ‘তোর জর্দা  দেওয়া পানসুপারি মুখে নিয়া আম্মাজান আইজ মরি গেল ক্যানে?’

শোকের আবেগে নিজের ঘরে দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো স্বামীর কানে খবরটা কোনোমতে ছুড়ে দেয় সে, ‘আম্মাজান আর নাই!’

স্বামীর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইলটা উঠানে ছুড়ে দেয় রহিমা, তারপর শাশুড়ির আত্মা যে আসমানে উড়ে গেছে সেদিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে, ‘ও আল্লাহ রে! বড়বাড়ি ধুয়া করিয়া হামার আম্মাজান মরি গেল রে!’

এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর এটাই রহিমার প্রত্যাশিত প্রথম মৃত্যুশোক যাপন। এখন তার অনেক কাঁদা উচিত, গলা ছেড়ে কাঁদতে না পারলেও শোকের আবেগে দাঁতকপাটি লেগে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত। স্বজনপড়শি সবাই দেখার জন্য ছুটে আসতে শুরু করবে। রহিমার আগে তার মোবাইল ফোনটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সেটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে মনে হয়, খবরটা অন্তত বড় ননদকে তারই জানানো উচিত। মায়ের খবর নিয়মিত নেওয়ার জন্য মোবাইল ফোনটা ননদই তাকে গিফট দিয়েছে। বুড়ি ফোন চালাতে পারত না, তার ওপর কানেও শোনে কম, এ-কারণে ফোনের সঙ্গে মায়ের পক্ষে মোবাইল-অপারেটরের চাকরিটাও দিয়েছিল ননদ। গরিব পড়শি জামেনাকেও টাকা দিয়ে মায়ের সেবায় নিযুক্ত করেছে সে-ই। জামেনা ননদকে ফোন করার আগে তারই ফোন করা উচিত। ফোনটা হাতে নিয়ে শরীর-উথলানো কান্নাসহ বড় ননদকে কোনোমতে জানায় শুধু, ‘ও আপা, আম্মাজান আর নাই।’ খবরটা দিয়েই সে ফোন হাতে নিয়েই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবার।

ততক্ষণে জামেনাও গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে এবং প্রতিবেশীরাও সরব কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে সবাই জানে এবং জামেনাও সেদিন ঠাট্টার ভঙ্গিতে বলেছে, ‘বুড়ি মরলে বড়বাড়ির আসল রানি হইবে ছোটচাচি। মাথার উপরে খ্যাচম্যাচ করার জন্য কেউ থাকপে না, ছোটবউয়ের হুকুমেই চলবে সব।’ শোকের মাঝেও এসব কথা মনে করে রহিমার শোকের আবেগ দ্বিগুণ বেগে উথলে ওঠে।

-----দুই-----

মানুষের মরণ যতই নীরবে-নিভৃতে ঘটুক, টাটকা মৃত্যুকে নিয়ে জীবিতদের প্রতিক্রিয়া জীবন্ত হয় তৎক্ষণাৎ। জনবহুল এ-গ্রামটাতে সব বাড়ির নবজাতকের ক্ষীণকণ্ঠের কান্না সবার কানে যায় না, গর্ভবতী মেয়েরা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখে পেটের খবর, কিন্তু কোনো বাড়িতে কেউ মরে গেলে স্বজনদের মড়াকান্নায় ভারি হয়ে ওঠে গাঁয়ের বাতাস। দিশেহারা গ্রামবাসীও নিজেদের অন্তিম গন্তব্য স্মরণে এলে বিহবল হয়, পরিচিত একজন সেই গন্তব্যে যাত্রা করেছে শুনলেই ছুটে আসে দেখতে।

মড়াকান্না ছাড়াও গ্রামসমাজকে নাড়া দিয়ে ইদানীং ভিড় তৈরির দায়িত্ব পালন করে গাঁয়ের মসজিদের মাইকটি। ঘড়ির টাইম মেনে রোজ পাঁচবার আজান শুনেও শোনে না বে-নামাজিরা, বড়জোর বেলা সম্পর্কে সচেতন হয়; কিন্তু সময়-অসময়ের তোয়াক্কা না করে মাইকটি কারো মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করলেই কান খাড়া করে সবাই। চেনা মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে দেশি ভাষায় মৃতের পরিচয় জেনে মাইকের ইন্নালিল্লাহি রাজিউন দোয়ার সঙ্গেও কণ্ঠ মেলায়।

আজান ছাড়াও মাইকে গ্রামবাসীর ইমেত্মকাল-সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব পালন করে যে মুয়াজ্জিন হামিদুল, সে আসরের আজান দিতে মসজিদে যাওয়ার মুখে বড়বাড়িতে ক্রন্দনরোল শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। বড়বাড়ির বড় অভিভাবক ও গাঁয়ের মুরবিব বৃদ্ধার মৃত্যু-আশঙ্কাটি মনে আসতেই জীবিত বেশে সামনে দাঁড়ায় সে। আজ সকালেও হামিদুল এ-বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়ি হাতের লাঠি উঁচিয়ে তাকে ডেকেছিল, ‘আল্লাহর ঘরে আজান দিস, একটা সত্য কথা বল তো আমাকে। এ-বাড়ির সয়-সম্পত্তি উড়িয়া যায় কোথায় রে?’

বুড়ি আসলে মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া জায়গা-জমির বেহাল দশা ও বখাটে ছেলে কাফির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল, ‘শুনলাম, তোর বেটার কাছেও নাকি কাফি ভুঁই বন্ধক থুইয়া দুই লাখ টাকা নিছে, কথা কি সত্য?’

হামিদুল সত্যের মুখোমুখি হয়ে সমস্যায় পড়েছিল। কারণ টাকা নেওয়ার সময় কাফি সতর্ক করেছে খবরটা মাকে না জানাতে। অথচ গ্রামবাসী সবাই জানে, বড়ভাইদের অনুপস্থিতি এবং বুড়ি মায়ের পক্ষপাতের সুযোগ নিয়ে কাফি একাই পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি যাচ্ছেতাই ভোগ করছে। চাষাবাদ করে বড়বাড়ির গোলাঘর ভরলে কারো কিছু বলার ছিল না, কাফি একের পর এক জমি বন্ধক রেখে নিজের ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড় করেছে। মোটরসাইকেল দাবড়ে রোজ শহরে যায়। শহরে সে কি ব্যবসা করে, নাকি নেশাফুর্তি করে টাকা ওড়ায়, সঠিক কেউ জানে না। তবে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, টাউনে সম্প্রতি সে আরেকটা বিয়েও করেছে, তার মোটরসাইকেলের পেছনে সে-বউকে দেখেছে গাঁয়েরই দুজন শহরবাসী।

বাঁকা কোমর নিয়ে লাঠিভর মেয়েমানুষের পক্ষে বখাটে ছেলের কা-কীর্তি কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তবে কালা কানেও সব খবর বাজে। শাসন করার জন্য ছেলেকে হাতের নাগালে না পেয়ে বউয়ের সঙ্গেও গজগজ করে সারাদিন। হামিদুল সত্যি বললে কাফি রেগে যাবে, আবার মিথ্যে বললে তার বন্ধকের টাকা মার যাওয়ার ভয়। উভয় সংকটে পড়ে জবাব দিয়েছিল সে, ‘আম্মা, এই বয়সে জায়গাজমির খোঁজ নিয়া আর কী করেন। চোখ বুজলে তো বেটারাই খাইবে সব।’

‘হ্যাঁ, বুড়ি চোখ মুদলে ভূঁইয়ার জায়গাজমিও কাগজের মতো বাতাসে উড়ি যাবে রে। বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চোখে দেখবি তোরা, কয়া রাখলাম কথাটা, দেখিস।’

সকালে বুড়িকে দেখার জীবন্ত স্মৃতি মাথায় নিয়ে হামিদুল আজ বড়বাড়ির ভেতরে ঢোকে, আঙিনায় কাফির বউ ও জামেনাসহ পড়শি মেয়েদের কান্নার প্রতিযোগিতা দেখে বৃদ্ধার ঘরেও যায়। বিছানায় শায়িত কাঁথা-মোড়ানো লাশ দেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ইন্নালিল্লাহি দোয়া পড়ে হামিদুল, তারপর ছুটে যায় মসজিদে। আজ দেড় মিনিট বিলম্বে আসরের আজানটা দেয়, এবং আজান শেষ হলে মাইকের সুইচ অফ করার আগেই সে দুটি ফুঁ দিয়ে একটি শোকসংবাদ ঘোষণা করতে থাকে : ‘ভূঁইয়া বাড়ির মুরবিব, মরহুম নাসির ভূঁইয়ার স্ত্রী ও কাফি ভূঁইয়ার মাতা এইমাত্র ইমেত্মকাল ফরমাইলেন।’ ইন্নালিল্লাহি পড়ার পর মনে হয়, গ্রামের অনেকেই তার কণ্ঠে খবরটা জানছে ঠিক, কিন্তু বুড়ির প্রবাসী ও শহরবাসী ছেলেমেয়েরা খবর পায়নি এখনো। ছেলেরা সবাই বাড়িতে না এলে মৃতার জানাজা ও কুলখানি ইত্যাদি অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ জানানো সম্ভব নয়। শুধু শোকসংবাদটি আবারো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করে সে নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত ছয় মুসলিস্নর কাতারে শরিক হয়।

মুয়াজ্জিনের মৃত্যুঘোষণার রেশ এবং মৃতাকে ঘিরে বড়বাড়ির সাড়ম্বর স্মৃতি মাথায় নিয়ে গাঁয়ের নামাজি লোক কয়েকটি আজ আল্লাহর দরবারে হাজির হয়েছে। যেহেতু বড়বাড়ি মসজিদের নিটকবর্তী বাড়ি এবং মেয়েমানুষরা আল্লাহর আরশে পৌঁছানোর জন্য কান্নার আওয়াজ সপ্তমে তুলতে পারে বটে, নামাজে দাঁড়িয়েও বড়বাড়ির মড়াকান্নার আওয়াজ শুনতে পায় মুসলিস্নরা এবং হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও আজ আকুল ও একাগ্র করে তুলতে সচেষ্ট হয়।

মোনাজাতশেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মুসলিস্নরা সবাই আজ বড়বাড়ির দিকে হাঁটে। গাঁয়ের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই ছুটে আসছে বড়বাড়িতে। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম মুখর করে তুলেছে মূলত গাঁয়ের মেয়েরাই। উৎসবের আনন্দে পালাপার্বণে গীত গাওয়ার সুযোগ পায় না তারা, কিন্তু আত্মীয়স্বজনকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়ার সময় কেউ কারো চেয়ে কম কাঁদে না, কান্নাও সুরেলা গীত হয়ে ওঠে অনেকের কণ্ঠে। বাড়িতে মৃতার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনির অনুপস্থিতিও পড়শিদের শোক ও কান্নার দায়িত্ব খানিকটা বাড়িয়ে তোলে বটে।

শোকের ঝড়ে সমবেত গাঁয়ের পুরুষরা মেয়েদের মতো কাঁদতে পারে না, ক্রন্দনরত মেয়েদের এড়িয়ে তারা আলাদা ভিড় তৈরি করে। পাথারের ক্ষেতের কাজ ফেলেও ছুটে এসেছে কয়েকজন কামলা। মৃত্যুকে ঘিরে গ্রামসমাজ ত্বরিত সংঘবদ্ধ হওয়ার মূলে মৃত্যুকে ঠেকানোর এবং শোক-সহানুভূতি প্রকাশের আদিম প্রবৃত্তি তো আছেই, সেইসঙ্গে বড়বাড়িতে চটজলদি গ্রামবাসীর ছুটে আসার মূলে তাদের কৌতূহলও কম দায়ী নয়। গ্রামবাসী জানে, নিজের এক ইঞ্চি আবাদি জমি নেই, এমন চাষিমজুরের সংখ্যা গ্রামদেশে নেহায়েত কম নয়। নিজেরা চাষবাস না করেও বড়বাড়ির ভূঁইয়াদের অন্তত পাঁচ হালের জমি এখনো। এমন নিয়ম আইনে টিকলেও আল্লাহর ন্যায়বিচারে টিকবে? স্বয়ং ভূঁইয়ার বিধবা স্ত্রীও বড়বাড়ির সম্পত্তি কাগজের মতো আসমানে উড়ে যাওয়ার কথা বলে গেছে। বুড়ি মরলেই বড়বাড়ি ভেঙে অন্তত বারো টুকরা হবে। নদীতে ভাঙবে না, বানে ডুববে না; কিন্তু এ-বাড়ির সমস্ত জমি গিলে খাবে ওয়ারিশরাই। ছোটছেলে কাফির কা-কীর্তিও যে গ্রামসমাজে নানা গল্প ও প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল, মৃতাকে ঘিরে নানারকম মন্তব্যের মধ্যেও তা ধরা পড়ে।

‘আহা রে, স্বামী মরি যাওয়ার পরও এতকাল লাঠি ঠুকঠুক করিয়া সবাইকে শাসন করছে। বুড়িমা ছিল বলিয়াই এই বাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা হইছে। কিন্তু এখন কে রক্ষা করবে? রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা বুড়িমায়ের সেবাযত্ন দূরে থাউক, খোঁজটাও নেয় নাই ঠিকমতো। আর একজন তো বাড়িতে থাকিয়াও মৃত্যুকালে মায়ের মুখ দেখতে পাইল না! মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়িতে আসতে কতক্ষণ লাগে?’

কাফি ও তার বড়ভাইদের সঙ্গে যাদের ফোন-যোগাযোগ হওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আছে, তারা আগাম সহানুভূতি জানাতে মোবাইল বের করে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। আর মুয়াজ্জিন হামিদুল সকালে বুড়ির সাক্ষাতের স্মৃতি স্মরণ করে তার শেষ কথাটি সবাইকে শোনায় – ‘আজ সকালেই লাঠি হাঁকে ডাকল মোকে, কানের মধ্যে এলাও বাজে তার গলা, হামদুরে আল্লাহর ঘরে আজান দিস, তোকেও কয়া গেনু শেষ কথাটা। মুই মরতে না মরতে বড়বাড়ির ফকিরি হাল নিজের চক্ষক্ষ দেখপেন সগাই।’

বৃদ্ধার শেষ কথার সমর্থনে উপস্থিত মানুষগুলো যুক্তি দেওয়ার আগে, মেয়েদের ভিড় থেকে ছুটে আসা এক বালক পুরুষ ভিড়ে উপস্থিত তার বাবাকে খবর জানায়, ‘রুম্মানের মা কাঁদতে কাঁদতে নিজেও মনে হয় মরি গেইছে।’

রুম্মানের মা তথা কাফির বউকে দেখতে পুরুষ ভিড়ের অনেকেই উঠানে কান্নাকুল মেয়েদের দিকে এগোয়।

আঙিনায় রহিমার কান্নায় ততক্ষণে শরিক হয়েছে অন্তত পনেরোজন মহিলা ও শিশু। কান্নার চেয়ে কিছু শিশুর কৌতূহলই প্রবল। তারা ঘরে ঢুকে মৃতাকে দেখে, মৃতাকে ঘিরে একটা মাছি উড়তে দেখেও ভয় পায়। আরেকটি বালক ক্রন্দসী ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে সহাস্য মন্তব্য করে, ‘কাঁদতে কাঁদতে কাঁয়বা পাদি ফেলাইছে রে।’

অন্যরা গলা ছেড়ে কাঁদছে বলে রহিমাকে চেঁচিয়ে কাঁদতে হয় না আর। নিজের কান্নাবিকৃত শরীর আঙিনায় লুটিয়ে পড়েছে, মাটিতে মুখ লুকিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা ভাবারও সুযোগ পায়। মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেলেই তাকে আবার কান্না শুরু করতে হবে, শোকের তীব্রতায় আবারো দাঁতকপাটি লেগে জ্ঞান হারাতে হবে। কান্না ছাড়া আগামী তিনদিন তার কাজ নেই। গাঁয়ের নিয়মে মৃতের বাড়িতে তিনদিন চুলা জ্বলবে না। আত্মীয়স্বজনই রান্না করা খাবার দিয়ে যাবে। বুড়ি কবরে ঢুকতে না ঢুকতে একে একে তার রক্তসম্পর্কের স্বজনরা বাড়িতে আসবে। বড় ননদ হয়তো ফোনে এতক্ষণে সবাইকে জানিয়েছে খবরটা। কিন্তু বুড়ি কবরে আড়াল হলেই কি বড়বাড়ির মাটির ওপরে খাড়া হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন সংসার ফিরে পাবে রহিমা?

বিধ্বস্ত দেহে চোখ বুজে চুপচাপ এসব কথাই ভাবছিল রহিমা। হঠাৎ চেনা মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এবং সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার জন্য মনকে ভাবনাশূন্য করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে সে।

------তিন-----

বুড়ির দাফন হওয়ার পরও তার কাঁচা কবর ঘিরে বড়বাড়িতে শোকপালন যেন অনেকটা উৎসবে রূপ নেয়। একে একে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে পাঁচ ছেলে এবং চার মেয়ে। ছোট কাফি ছাড়া বড় চার ভাইয়ের দুজন ঢাকায়, একজন নীলফামারীতে এবং অস্ট্রেলিয়াতেও আছে একজন। মেয়েরাও নানা ঠিকানায় নিজ নিজ স্বামী-সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সপরিবার এসেছে সবাই। দাফন হয়ে যাওয়ার পরও এসেছে এক মেয়ে এবং অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে একা এসেছে কুলখানির দিনে। বাড়িতে পৌঁছে যথারীতি মাকে না দেখে ‘মা মা’ বলে কেঁদেছে সবাই, অন্য ভাইবোনরাও শরিক হয়েছে সেই কান্নায়; কিন্তু কান্না ও শোকের পরিবেশ জমাট বাঁধতে দেয় না তাদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই। মৃত্যুশোকে শরিক হয়েও দাদুবাড়ি কি নানাবাড়িতে বেড়াতে আসার মজা লুটতে ছোটাছুটি, খেলাধুলা ও হাসিতামাশাও করে তারা। তিনদিন রান্নাঘর থেকে মুক্ত থাকার কথা ভাবলেও আতিথেয়তার দায় মেটাতে রহিমাকে শাশুড়ির দাফনের পরপরই চুলা জ্বেলে রান্নাঘরেই অনেকটা সময় কাটাতে হয়।

তিনদিন পর মায়ের কুলখানিতে একটি গরু ও চারটি খাসি জবাই করা হয়। পেশাদার মৌলবি-সংকটে বিশজন মাদ্রাসাছাত্র এসে কোরান খতম দেয়। মিলাদ, কবর জিয়ারত ও দোয়া-খায়েরে শরিক হয় গাঁয়ের বয়স্ক সব পুরুষ মানুষ। ভোজনপর্বে শরিক হয় আরো বেশি সংখ্যক। মড়ার বাড়ির মজলিসি খাওয়া-দাওয়ার ভিড় কোলাহল থেমে যাওয়ার পরও বাড়িটির দিকে গ্রামবাসীর মনোযোগ ও কৌতূহল কমে না। কারণ মরে গিয়ে বুড়ি তার ছেলেমেয়েদের বাড়িতে জড়ো করেছে, তার উদ্দেশ্যটা বেঁচে থাকতেই ছোটবউ-ছেলেকে ঝগড়া করে অনেকবার জানিয়ে রেখেছে, সবাই এলে এবার বিষয়-সম্পত্তির ভাগাভাগি হবে অবশ্যই।

মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে যে-ঝগড়াটা অনিবার্য ছিল, ভূসম্পত্তি ঘিরে স্বাভাবিক ঝগড়াঝাঁটি দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিল যারা, তাদের অনেকটা হতাশ করে দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঝগড়াটা শুরু হয় আসলে ভাইবোনের পুনর্মিলনীর আদলে। বড়ভাইয়ের আহবানে মায়ের ঘরে জড়ো হয় সব ভাইবোন। বিছানায় ও চেয়ার টেনে বসে সবাই। পরকালযাত্রার শোক ও মাথায় টুপি রেখেই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলে বড়ভাই, ‘মা নাই। কিন্তু আমরা রক্তসম্পর্কের ভাইবোনরা আছি, এই বাড়ি ও পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। স্বয়ং আল্লাহ এ-বিষয়ে কোরানে আইন করে দিয়েছে। কিন্তু বাবার মৃত্যুর এক যুগের মধ্যেও আমরা ভাগাভাগির ওপর জোর দেইনি। কারণ মা বেঁচে ছিল এবং ছোট কাফি তেমন লেখাপড়া শিখে চাকরিবাকরি করেনি। তাকে বিয়েও করানো হয়েছে গ্রামের ঘরগেরস্থালি দেখার উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে। আমরা চেয়েছি বড়বাড়ির সংসার ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করে কাফি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নিক। কিন্তু সে দশ বছরে কী করেছে, কমবেশি তোমরা সবাই শুনেছো, গ্রামবাসীও সবাই জানে।’ কাফিই প্রথম উত্তেজিত কণ্ঠে শোকসভায় প্রতিবাদ করে, ‘কী করেছি আমি? তোমাদের ভাগের জমি গিলে খেয়েছি, নাকি নিজের নামে করে নিয়েছি?’

বড়বোন শাসনের গলায় বলে, ‘মা বেঁচে থাকতে তুই আর তোর বউয়ের কীর্তিকলাপের খবর আমাদের জানিয়েছে। এত বছর বাড়ি থেকে যে আয়-উন্নতি হয়েছে, তার ভাগ কি তুই আমাদের দিয়েছিস?’

কাফির সব যুক্তি তো জমাট ক্ষোভ হয়ে ছিল, বিস্ফোরণ ঘটলে তা আর থামতে চায় না, ‘আমি চাকরের মতো তোমাদের বাড়িসম্পত্তি পাহারা দিয়েছি। বড়বাড়ির চাষাড়ি কাজ করাতে আমাকে গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করিয়েছো, আমার বউ দাসিবাঁদির মতো খেটেছে। মা আমার সংসারেই ছিল দশ বছর, কিন্তু তোমাদের সবার এতো সচ্ছল অবস্থা, আমার জন্য কি কেউ এক কানাকড়ি দিয়ে সাহায্য করেছো? বরং আমি যাতে মানুষ হতে না পারি, এজমালি জায়গাজমিতে সারাজীবন খেটে মরি, সেটাই চেয়েছো সবাই।’

এক ভাই জানতে চায়, ‘মানুষ হওয়া মানে কি মোটরসাইকেল দাবড়ে প্রতিদিন শহরে যাওয়া, ব্যবসায়ের নামে বদনেশা করে টাকা অপচয় করা? রোজ কী করিস তুই টাউনে গিয়ে?’

মেজোভাই জানতে চায়, ‘সংসারের কৃষিকাজ থেকে যে-আয় হয়েছে, তার ভাগ কেউ চায়নি, চাইবেও না। কিন্তু ভাগাভাগির আগে তুই বহু জমি বন্ধক রেখে কেউ বলে বিশ লাখ, কেউ বলে ত্রিশ লাখ, এতো টাকা নিয়ে টাউনে কী ব্যবসা ফেঁদেছিস? ব্যবসা করবি ভালো কথা, কিন্তু বন্ধক খুলবে কে?’

কাফি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, ‘সময়মতো আমি খুলে দেব। ভাগাভাগি করে দাও, আমার ভাগ বেচে দিয়ে বউ নিয়ে শহরে আলাদা বাসা করে স্থায়ীভাবে থাকব আমি। তোমাদের বারোয়ারি সম্পত্তি পাহারা দেওয়া আমার কাজ না। তোমরা যেভাবে ভাগাভাগি করো আমার আপত্তি নেই। আমি এখন চলি, চারদিন আমার ব্যবসা দেখিনি, জরুরি ফোন এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।’

বড়দের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কাফিই প্রথম সভাস্থল ত্যাগ করে। উঠানে নেমেই মোটরসাইকেল স্টার্ট দেয় সে, একাধিক ভাইবোনের ধমক ও স্নেহমেশানো হাঁকডাকও তাকে আর ফেরাতে পারে না। কাফির মোটরসাইকেলের গর্জন মিলিয়ে যাওয়ার পরও বড়বাড়ির পারিবারিক সভার উত্তাপ-উত্তেজনা থেমে যায় না। বড়ভাইদের অনুপস্থিতিতে কাফি রক্ষক হয়ে শুধু ভক্ষক নয়, দুর্বৃত্ত-দস্যুর মতো আচরণ করেছে, তার প্রমাণ দিতে থাকে। মাকে কীরকম মানসিক কষ্ট দিয়েছে, সে-কথাও জোর গলায় বলে কেউ কেউ। কিন্তু কাফির বউ রহিমা কী ভূমিকা রেখেছে?

কাফিকে না পেয়ে তার স্ত্রী তথা রুম্মানের মা তথা রহিমাকেই ডাকে সবাই।

শাশুড়ির দাফন হওয়ার পরও বাড়িতে মেহমান হয়ে আসা স্বামীর ভাইবোনদের সেবায় এতটা ব্যস্ত যে, রহিমা দম ফেলারও সময় পায় না। ঘরে সভা বসলে রান্নাঘরে সবার জন্য চা করছিল সে। জামেনার কাছে সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করে ভাসুর-ননদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরে আসে এবং দাঁড়িয়েই থাকে।

বড়ভাইয়েরা তার কাছে জানতে চায়, কত জমি বন্ধক রেখেছে কাফি? কীভাবে ল-ভ- করেছে সংসার? রহিমা কি জানত না? স্বামীকে শাসন করার চেষ্টা করেনি? শহরে কিসের দোকান দিয়েছে? কী ব্যবসা করে? অনেকে বলেছে টাউনে যায়, সেখানে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে সে?

ভাসুর-ননদের নানারকম প্রশ্নের মুখে রহিমা নতমুখে একই জবাব দেয়, ‘আমি কিছুই জানি না। আমাকে তো টাউনে নিয়ে গিয়ে কিছুই দেখায়নি।’

বড়ভাই এবার সিদ্ধান্ত জানায়, ‘আমি মাকেও কথা দিয়েছিলাম, রিটায়ার করার পর বাড়িতেই পাকাপোক্ত থাকব। আর মোটে বছরখানেক বাকি। রফিকও রিটায়ারমেন্টের পর বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকবে বলছে। এবারে তো সম্ভব হবে না, তোমরা একটা ডেট ঠিক করে আসো, যার যেটা পাওনা, শান্তিপূর্ণ এবং আইনসংগতভাবে বাটোয়ারা করে দেব আমি। এলাকার চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং উকিল সবাইকে ডাকব। ভাগের পর তোমরা যদি কেউ নিজেদের ভাগ কাফিলকে দিয়ে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।’

এক বোন প্রতিবাদ করে, ‘ওকে দেবো কেন? এ-বাড়িতে আমাদের অধিকার নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?’

রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘আমি আপনাদের জন্য চা করছি, নিয়ে আসি।’

-----চার-----

মায়ের পারলৌকিক শান্তি এবং নিজেদের ইহকালীন স্বার্থ রক্ষায় ভাগবাটোয়ারার বিষয়টা পাকা করে ওয়ারিশগণ একে একে চলে যায়। বড়বাড়ি হঠাৎ বেশ ফাঁকা এবং অচেনা লাগে রহিমার কাছে। আগে দিনভর শাশুড়ির খ্যানখ্যানে গলা ও লাঠি-ঠুকঠুক মাতবরি অসহ্য লাগত, এখন তার বদলে নানারকম ভুতুড়ে ভয়। শাশুড়ি মরলে রহিমা বড়বাড়ির মালিক হবে বলেছিল যারা, তারা এখন সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো রহিমাকে দেখে মজা পায়। ওয়ারিশরাই ব্যবস্থা করে গেছে, মৃতা মায়ের ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে জামেনাও। জামেনা তার মেয়েকে নিয়ে রাতে এখন বড়বাড়িতে থাকে। এছাড়া যে বাঁধা কামলা করমালি চাষাড়ি কাজকাম তত্ত্বাবধান করে, সেও যেন বড়বাড়ির মালিক হয়ে উঠেছে একজন। জোরগলায় হাসিমুখে রহিমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ও ছোটভাবি, বড়ভাই অর্ডার দিছে, ভাগাভাগির পর তার ভাগের জমি হামাকেই দেখাশুনা করা লাগবে। মেজোভাই তার ভাগ আধি দেবে মনে হয় হাকিমুদ্দিকে। আর তোমার জন তো টাউনে বাসা করার কথা ডিক্লেয়ার দিছে। আমি এখন কোন দিকে যাই, কন দেখি কী জ্বালা!’

এসব জ্বালার কথা বলার সময় করমালির মুখে হাসি ধরে না। শাশুড়ি মরতে না মরতেই শহরে রহিমার সতিনের সংসার কল্পনা করে কিংবা বড়বাড়িতে তার আসন্ন ফকিরনি দশা জানতেও সম্ভবত, লোকজন তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে। রহিমা কোনো জবাব দেয় না। বিয়ের আগে থেকেই জানত সে, ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে বড়বাড়ি একদিন ছিন্নভিন্ন হবেই। এ শুধু হিংসুক গ্রামবাসীর কামনা নয়, শাশুড়িও রহিমাকে প্রায় রোজই বোঝানোর চেষ্টা করে গেছে।

রহিমাও তো গাঁয়ের গেরস্তঘরের মেয়ে, জমির মায়া যে কী সাংঘাতিক জিনিস, নিজের বাপ-চাচার ঝগড়া দেখে ছোটবেলাতেই বুঝে গেছে। সেই বাবা মেয়েকে বড়বাড়ির বউ করে পাঠানোর সময় বেকার ও নেশাখোর জামাইকেও মেনে নিয়েছিল তাদের বিস্তর জায়গাজমি দেখেই। ভাইয়েরা সবাই দেশ-বিদেশে চাকরি করে, বাড়ির আবাদি ফসলের ভাগ নেওয়া দূরে থাক, নিজেদের জমিটাও পর্যন্ত চেনে না। বাড়ির কৃষি থেকে ম্যালা আয় হয় বলেই ছোটছেলে চাকরিতে ঢোকেনি। এই সুযোগে রহিমা যদি নিজের সংসার গুছিয়ে নিতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো অভাব থাকবে না তার। বিয়ের পর থেকে রহিমা সেই চেষ্টাই করে গেছে। শহরবাসী ভাসুর-ননদের মতো নিজেও শহরে ঝামেলামুক্ত সংসার গড়ে ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নপূরণের পথে শাশুড়ি ছিল বড় বাধা, শাশুড়ি মরে যেতে না যেতেই অচেনা সতিন মস্ত বাধা হয়ে উঠবে কল্পনাও করেনি সে।

বাড়ি ফাঁকা হওয়ার পরও কাফি ব্যবসায়ের কাজের দোহাই দিয়ে টানা তিনদিন বাড়িতে ফেরেনি। ফোনে রহিমাকে জানিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে ঢাকায় যাবে। ভাগ নিয়ে বড়ভাইয়ের সঙ্গেও প্রাইভেট কথা বলবে। মা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন রাতে বাড়িতে ফিরত না সে। মাত্র এক ঘণ্টায় মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে বাড়ি ফেরা যায়, কিন্তু তারপরও কী এমন কাজের ব্যস্ততা যে রাতেও স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার গরজ থাকে না। সন্দেহ অবশ্য আগেও জেগেছিল, রাতে বাড়িতে ফিরলেও স্বামীর ভালোবাসার উত্তাপ খুঁজে পায়নি। তারপরও শহরে নিজের সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নটা আঁকড়ে রেখেছিল রহিমা। কাফি ভাইদের কাছে শহরে বাসা নিয়ে থাকার ঘোষণা দিলে স্বপ্নপূরণের আশাও জেগেছিল।

তিনদিন পর রাতে বাড়িতে ফেরে কাফি। দমবন্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করে রহিমা। স্বামীকে রাতের খাবার দিয়ে সরাসরি কথা তোলে, ‘আম্মাজানের মৃত্যুর পর এ-বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। রুম্মানকে টাউনের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। তুমি এ-মাসেই আমাদের নিয়ে টাউনের বাসায় উঠবে।’

যুদ্ধ করার জন্য কাফির প্রস্ত্ততি তো দীর্ঘদিনের, জবাব দেয় সে, ‘আমার রক্তসম্পর্কের শত্র‍ুরা, গ্রামের হিংসুক শয়তানরা তোমাকে জানায় নাই, টাউনে আর একটা বিয়া করব আমি?’

‘আমি বিশ্বাস করি নাই।’

‘অবিশ্বাস করার কী আছে? আমার বাপ ও দাদারও ছিল দুই পরিবার। মুসলমানের ছেলে আমি, চারটা না হোক, প্রয়োজনে দুই বউ রাখা আমার আইনি অধিকার। বড়বাড়ির গেরস্থালি কাম সামলানোর জন্য তুমি এ-বাড়িতে এসেছ, তুমি সেই কাজই করবে।’

খাওয়ার পর সিগারেট ধরিয়ে কাফি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সান্তবনা দেয়, ‘ভাগাভাগির পর রুম্মানকে নিয়ে এ-বাড়িতেই থাকবে তুমি। এ-বাড়ির গেরস্তি কামকাজ করলে ভাতের অভাব হবে না তোমার।’

বুড়ি শাশুড়ি মরে যাওয়ার পর রহিমা কেঁদে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে গ্রামের মানুষ জড়ো করেছিল, কিন্তু নিজের জীবনের এমন সর্বনাশা ঘটনার মুখেও টুঁ-শব্দটি করতে পারে না আজ। মনে হয় স্বামী সর্বশক্তি দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেছে দমবন্ধ করে মারার জন্য।

বউকে সারারাত নির্ঘুম, পাথরের মতো স্তব্ধ এবং একা রেখে, সকালে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে কাফি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।

বাপের মতো ছেলে রুম্মানও যথারীতি খেলার নেশায় বাড়ির বাইরে ছুটে বেড়ায় দিনমান। বাড়িতে একা হয়েও কোনো কাজেই মন বসে না রহিমার। বিয়ের পর থেকে কাজই তো করে গেছে রহিমা। নিজের হবে না জেনেও বাড়ির উঠান ঘরদুয়ার ঝাঁট দিয়েছে। শাশুড়ির সেবাযত্ন ছাড়াও তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রান্নাবাড়া করে খাইয়েছে। গোলায় ধান তোলা, ধান উঠানো, রোদে শুকানো এবং ভিটায় মাচান বেঁধে এন্তার লাউ-শিম-কুমড়া ফলানো – এসব করে চাষিবাপের নাম ফাটিয়েছে। পোষা গাইটি ও মুরগিগুলোর তত্ত্বতালাশ করেছে। এতো কাজের পরও এ-সংসারে স্বামীর প্রাপ্য গালমন্দ মুখ বুজে হজম করেছে নিজের সুখের সংসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা মরলেই আলাদা হয়ে শহরের বাসায় ভালো চলবে তাদের, স্বামীও আশ্বাস দিয়েছিল এরকম।

শাশুড়ির মৃত্যুতে বাড়িতে লোকদেখানো এত কান্নাকাটির পরও, শাশুড়ির কথা ভেবে রহিমার সত্যি কান্না পায় আজ। বেঁচে থাকলে ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনলে বুড়ি আজ রহিমার পক্ষে থাকত অবশ্যই। ছেলেবউয়ের সঙ্গে যতই খ্যাচম্যাচ করুক, চোখের সামনে একমাত্র নাতি রুম্মান ছিল বলে তার ওপর টানটাও ছিল বেশি বুড়ির। রুম্মান দাদির হাতের লাঠি নিয়েও খেলত। মরার দুদিন আগেও খেলার জন্য দাদিকে কানা বুড়ি সাজিয়েছিল। অন্ধ সেজে বুড়ি লাঠি ধরলে, অন্য প্রান্ত ধরে রুম্মান উঠানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা চেয়েছিল, ‘কানা ফকিরকে ভিক্ষা দেন মা-সকল।’ এই দৃশ্য দেখে হাসি লুকাতে রান্নাঘরে ছুটে গিয়েছিল রহিমা। সেই হাসির কথা স্মরণ করেও আজ চোখের জল ফেলে। শহরে ব্যবসা করার নামে কাফি পিরিতের সংসার ফেঁদেছে জানলে লম্পট ছেলেকে বাড়িছাড়া করে, বুড়ি নিশ্চয় ছোটছেলের প্রাপ্য ভাগের জমি ছোটবউ ও নাতির নামে দেওয়ার সুপারিশ করত বড়ছেলেদের কাছে। করত নাকি?

রহিমা এখন শাশুড়ির ফোনটা থেকে ভাসুর-ননদকে কল দিয়ে জরুরি কথা বলতে চাইলে, শুনবে তারা। কিন্তু তাতে লাভ কী হবে? প্রতারক ভাইয়ের বদমায়েশি ও শহরে ব্যবসায়ের নামে দ্বিতীয় সংসার ফাঁদার খবরটা তারা রহিমার আগেই জেনেছে। কৃষক পরিবারের মেয়ে হয়েও স্বামীকে কৃষিকাজে ধরে রাখতে পারেনি রহিমা, উলটো নিজেও শহরে সংসার ফাঁদার স্বপ্ন দেখেছে। ব্যবসায়ের পুঁজি জোগাড়ে স্বামীকে এজমালি জমি বন্ধক রাখতে এবং গোলার ধান ও ভিটার গাছপালা বেচতেও উৎসাহ দিয়েছে। যার জন্য এত করেছে রহিমা, সে-ই হয়তো ভাইদের কাছে ছোটলোক বউয়ের হাজারটা গিবত গেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতিও জোগাড় করেছে ভাইদের কাছে। রহিমা বিয়ের পর শহরে এক ননদের বাসায় বেড়াতে গেলে সে তার কাজের বুয়ার কাছে পরিচয় দিয়েছিল, আমাদের গ্রামের বাড়ির সব কাজ এই মেয়ে একাই সামলায়। তার মানে কী? রহিমাও তাদের কাছে তুচ্ছ কাজের লোক ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও বড় ননদের কাছে ফোন করে শাশুড়িবিহীন বাড়িতে একা হওয়ার কান্না নিয়ে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা জানায় রহিমা। ননদ সহানুভূতি দেখাবে কী, উলটো রহিমাকেই ধমক দিয়ে বলে, ‘কেমন মেয়ে রে তুই, স্বামী শহরে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়, আর তুই এতদিন মুখ বুজে ছিলি! থাক, তুই বড়বাড়ির কাজকর্ম নিয়েই থাক।’ ননদের কথার প্রতিবাদে এই মুহূর্তেই এ-বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ভাবে রহিমা। কিন্তু গরিব বাপ জমি বেচে বড়ঘরের জামাইকে মোটরসাইকেল যৌতুক দিয়েছিল। সংসার-ভাঙা মেয়েকে চিরদিনের জন্য আশ্রয় দেওয়ার সংগতি নেই তার। রহিমার ভাইয়েরাও বলে দিয়েছে, ভাগাভাগিতে পৈতৃক জমির কড়াক্রান্তিও পাবে না সে। না, বাপের বাড়িতে ফিরবে না রহিমা। তারচেয়ে বিষ খেয়েই বড়বাড়ির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ঘুচাবে। রহিমার আপন খালাতো বোন প্রেমিককে বিয়ে করতে না পেরে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বড়বাড়ির কৃষিতেও কীটনাশকের ব্যবহার দেখলে কথাটা মনে পড়ত রহিমার। নিজে লাউ-শিমের মাচায় স্প্রে করার জন্য করমালিকে দিয়ে বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনিয়ে ছিল, সেই বিষ দেখেও মনে পড়েছিল আত্মঘাতী বোনটির কথা। তাই বলে নিজে তার অনুগামী হওয়ার কথা বিয়ের আগে বা পরে কোনোদিন ভাবেনি রহিমা। নির্দোষ বোনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী প্রেমিক ছেলেটির কোনো শাস্তি হয়নি, বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে সংসার করছে এখন। রহিমাও বিষ খেয়ে মরলে দ্বিতীয় বউ নিয়ে স্বামীর সুখের সংসার আরো নিষ্কণ্টক হবে। বিষ হাতে নিয়েও রহিমা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা কল্পিত যুবতীকে স্বামীর আলিঙ্গনে সুখের হাসি হাসতে দেখে। সতিনের সুখ দেখে রহিমা যদি আজই মরে, তার অনাথ সন্তান কোথায় ঘুরে বেড়াবে? আপাতত বিষ রেখে রুম্মানকে খোঁজার জন্য রহিমা বাড়ির বাইরে বেরোয়।

নিজের মৃত্যুকামনা নিয়ে রহিমা অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীর মৃত্যুর কথাও ভাবে। মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে একদিন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে সে। আবারো যদি সেরকম কোনো দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয় দয়াময় আল্লাহ, স্বামীশোকে এক ফোঁটাও চোখের জল ফেলবে না রহিমা। স্বামী মরলেই বরং বড়বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে রুম্মান এবং স্ত্রী হিসেবে রহিমাও পাবে দুই আনা অংশ। স্বামীর ভাগ পেলে বড়বাড়িতেও নিজের আলাদা সংসার এবং পিতৃহারা ছেলের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিতে পারবে সে একাই। বিধবা শাশুড়ি যেমন বড়বাড়িকে একান্ত নিজের ভেবে দেখেশুনে রেখেছে আজীবন, নিজে বিধবা হলে রহিমাও স্বামীর সম্পদ আরো ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু স্বামী বেঁচে থাকলে নিজের ভাগ বেচে দিয়ে শহরে সতিনের সংসারে ঢালবে অবশ্যই। তালাক দিয়ে রহিমাকে বড়বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মিনিটও সময় লাগবে না তার। তখন কোথায় যাবে রহিমা? অসহায় এক নারীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য আল্লাহ যদি নেশাখোর দুশ্চরিত্র এক পুরুষকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়, সেটা কি অবিচার হবে? সুবিচার পাওয়ার জন্য রহিমা গোপনে চোখের জলের সঙ্গে আল্লাহর কাছে জরুরি আবেদন-নিবেদন জানাতেই থাকে।

মরা-বাঁচার সংকটে তার স্বামী অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুমানোর সময়ে রাতে বাড়িতে ফেরে আজ। বাড়িতে এসেও অকারণে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজায়। সাধারণত বাড়িতে ফিরলে এরকম রাতেই ফেরে সে, কিন্তু আসবে না মনে করে রহিমা তার জন্য ভাত রাখেনি। কী মনে করে কে জানে ছেলের জন্য আজ একটা খেলনা কার এনেছে কাফি। খেলনা কার পেয়ে রুম্মান মহাখুশি, ঘুমানো স্থগিত রেখে বিছানাতেও কার চালায়। আর রহিমাকে ধমকের গলায় হুকুম দেয় কাফি, ‘ভাত দে। খিদে লেগেছে।’

রহিমা বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে যায়। আধঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজের তরকারি ও ভাত গরম করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেয়। স্বামীর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে বিছানায় ছেলের পাশে গিয়ে শোয় আবার। মানুষটা খাচ্ছে খাক, রহিমা ঘুমন্ত ছেলের পাশে মৃতা শাশুড়ির মতো অসাড় পড়ে থাকে।

আরো আধঘণ্টা পরে স্বামীর বিকৃত কণ্ঠের চিৎকার শুনে বিছানায় উঠে বসতে বাধ্য হয় রহিমা। যন্ত্রণাবিকৃত গলায় চেঁচিয়ে বলছে মানুষটা, ‘হারামজাদি খাবারের মধ্যে বিষ মিশায় দিছিস নাকি? আমার এতো বুক জ্বলে কেন? এতো পেট জ্বলে কেন?’

আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়ার মতো স্বামী ফোনটা হাতে নিয়ে যন্ত্রণায় মৃত মাকে ডেকে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে থাকলে রহিমা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে এবার আল্লাহকেই ডাকে, ‘হায় আল্লা! রুম্মানের আববার কী হইল? টাউন থাকি কী বিষ খায়া আসছে আজ? বিছানায় গড়াগড়ি দেয় ক্যানে? ও জামেনা, ও উমেদভাই, আমার কপালে ফের কী আগুন লাগল!’

মধ্যরাতে বড়বাড়িতে নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে একজন-দুজন করে প্রতিবেশী ছুটে আসতে থাকে। পাড়ার দোকানে টিভি দেখছিল যারা, তাদের কয়েকজনও টিভি দেখা বাদ দিয়ে ছুটে আসে বড়বাড়িতে। অসুস্থ কাফির আর তখন কথা বলারও শক্তি নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে শারীরিক যন্ত্রণা হজম করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে উঠানে গলা ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছে রহিমা।

কান্না কোলাহলের মাঝেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছুটে আসে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসার জন্য কাফিই তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিল। কাফিকে স্ট্রেচারে তুলে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়। এদিকে আঙিনায় গড়াগড়ি দিতে থাকা রহিমার কান্নার আওয়াজ তীব্রতর হয়ে ওঠে। রাতের আঁধার চিরে ছুটে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সখানা লাল আলো চটকে আর পোঁ-পোঁ সাইরেন বাজিয়ে কার মরণ কামনা করে, রহিমা বুঝতেও পারে না।

Saturday, March 15, 2025

গল্প- একদিন অরিত্র by কানাই কুণ্ডূ

মে ট্রো অনড়। এসি কোচ, জানালা-দরজা বন্ধ। খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। তাছাড়া নেমে হাঁটার উপায় তো নেই। সুড়ঙ্গের মাঝখানে স্তব্ধ। যাত্রীরা ক্ষুব্ধ। সময়ে অফিসে পৌঁছোনোর তাড়া। নানা মন্তব্য, এমনকি দরজায় লাথি, চিৎকার হইচই।

এমন প্রায়ই ঘটে। কর্তৃপক্ষ পরের দিন পত্রিকা-টিভি মাধ্যমে খবর দেয় : কারো মরণঝাঁপ, অথবা থার্ড রেল বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন, কিংবা কোনো কামরায় ধোঁয়া দেখা গেছে।

ঝোলানো হাতল ধরে দাঁড়িয়েছিল অরিত্র। বসার জায়গা পাওয়া যায় না এই ব্যস্ত সময়ে। দাঁড়িয়েই যায় প্রতিদিন। এটাই তার কাজের সময়। কাজ বলতে বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নটা – তিন খেপ টিউশনি। এই সময়ে বিকেলের রূপসী শহরকে হারাতে হয়। বন্ধুরা অফিস-ব্যবসা সেরে শাল সোয়েটার স্যুট চড়িয়ে মোড়ের আড্ডা গুলজার করে। শীতটাও এবার জাঁকিয়ে পড়েছে। সামনের রাস্তায় এখন প্রজাপতির পাখনা মেলা। ওদের বোধহয় শীতবোধ কম। হাতকাটা বস্নাউজ, লো কাট জিন্স, বাহারি কাজের কামিজ চড়িয়ে শিখর দশনা। কেউ বা শরীরী ঢেউ তুলে অপাঙ্গী। মোড়ের বন্ধুরা ভাগাভাগি করে, ওটা আমার। ওই ফ্ল্যাট হিলের হংসীর দিকে নজর দিও না।

কেউ আপত্তি তোলে, ও আবার তোর কবে হলো। আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে চারদিন। ওখানে নোলা বাড়িও না।

এভাবেই ওদের সান্ধ্য-বিতর্ক। নয়তো কোহলি ধোনি কুলদ্বীপ বা শাহরুখ কাজল দীপিকা, মমতা রাহুল মোদি শেষে রাতের হট কফিতে যখন চুমুক সেরে কাগজের গস্নাস ছুড়ে ফেলে অরিত্র ক্লান্তপায়ে শূন্য মনে ফেরে। তখনো দু-তিনজন দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিয়ে বলে, এই যে মাস্টারমশাই, ছাত্রীকে অ্যানাটমি শেখানো হলো! শুধু টেবলের নিচে পায়ে পা ঠেকানো, নাকি জড়িয়ে ধরে চুমুচামার বিদায়!

কেউ আবার টিটকারি দেয়, ভালো আছিস মাইরি। প্রতি বছর নতুন মাল। চালিয়ে যা। ফেঁসে যাস না যেন!

উত্তর দেয় না অরিত্র। সে জানে তার সকাল-দুপুর ঠিক এদের বিপরীত। তখন তার অবসন্ন অবসর। হঠাৎ কারো বাড়ি গেলে তাড়া করে, একদম সময় নেই। সাড়ে নটা বাজে। এক কাপ চা খেয়ে কেটে পড়। মা-দিদির উদ্দেশে – অরুকে চা দাও, বলে গামছা তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢোকে।

অথবা কেউ বলে, এখন এলি? আমি যে আয়েশাকে নিয়ে মুভি দেখতে যাচ্ছি। ফোনে অ্যাডভান্স টিকিট বস্নক করেছি। কিছু মনে করিস না।

না, কিছু মনে করে না অরিত্র। চা খেতে খেতে বন্ধুদের বাড়িতে ইংরেজি কাগজ দেখে। যোগ্যতা অনুসারে দরখাস্ত পাঠায়। ইন্টারভিউ দেয়। আজো ওয়াক ইন ইন্টারভিউ দিতে মেট্রোয় উঠেছে। একটু সোর্স আছে। মোড়ের বন্ধু প্রসিতের অফিস। ভ্যাকেন্সি তিন। পার্সোনাল অফিসারকে তেলিয়ে কথা বলতে পারলে শিকে ছিঁড়তেও পারে। তবে তিনি নাকি ওভারস্মার্ট ক্যান্ডিডেট পছন্দ করেন না। ফিটফাট নয়, একটু ক্যাজুয়াল। কবিতা লেখার বাতিক আছে তো। শক্তি চাটুজ্জের ফ্যান। এইসব তথ্য অন্বয়ই দিয়েছে।

মোবাইলে সময় দেখে অরিত্র। বিকল মেট্রোর ঠুকঠাক চলছে। সেও হাতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে বেরিয়েছে। পরের স্টেশন পর্যন্ত চালানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। সেখানে নেমে বাস ধরলেই হবে। ইন্টারভিউ তিনটে থেকে শুরু। এখন সবে একটা সাতচল্লিশ। সে আজ সকাল থেকে সাধ্যমতো জীবনানন্দ শক্তি সুনীল গিলেছে। পোশাকও ঢিলেঢালা। প্যান্টের ওপর পাঞ্জাবি। মাস্টারি গাম্ভীর্য ঝেড়ে মনে একটু তেল তেল ভাব নিয়ে থাকে। কিছুতে উত্তেজিত হয় না। মনে মনে কবিতার লাইন ভাঁজে। ঠিক ঠিক মনে আসে না। গুলিয়ে যায়। তবে শব্দগুলো তরতাজা …

ঘটাংঘট শব্দে মেট্রোয় চলা শুরু করে। এসি বন্ধ। তবে এটা তো শীতের সময়।

বাইরে বাস ধরতে গিয়ে তাড়াহুড়ো। দুটো পঁচিশ। পেছনে হইহই চিৎকার, সশব্দে ব্রেকচাপা চাকা ঘসটানোর আর্তনাদ। ড্রাইভারের গালাগাল, শালা মরণের ইচ্ছা তো, আমার চাকার নিচে কেন!

ততক্ষণে অরিত্র এদিকের ফুটপাতে। অনন্ত আশায় হাঁপায়। মরিনি যখন, চাকরিটা আমার হবেই।

পাশের পথিক বলে, আজ বড় ফাঁড়া গেল আপনার। আসন্ন মৃত্যুর সঙ্গে কোনো যোগ না থাকলেও তার বারবার মনে হয়, আজ বড় শুভ দিন। তার ভাগ্য বদলে গেল। তবে এই মুহূর্তে তার একটু জল খাওয়া দরকার। ফুটপাতে সারি-সারি দোকান। খদ্দেরের ভিড়। অরিত্র বলে, একটু জল পাওয়া যাবে ভাই।

জরুর। কী খাবেন, কোলা, থামসআপ, নাকি ইসপ্রাইট? ভুল জায়গায় এসেছে অরিত্র। এরা বোতলের পানীয় ছাড়া জল বোঝে না।

নিজাম প্যালেসের আগেই জটলা। রাস্তার দুই পাশে ক্ষুব্ধ জনতা। লাঠি ঢাল হেলমেটে নিষ্ঠুর পুলিশ। মাঝখানে থ্যাঁতলানো দেহ-রক্ত। কারো অসহায় বাবা অথবা স্বামী রাস্তায় নিথর। তবু বেঁচে থাকা। ইন্টারভিউ – প্রায় নিশ্চিত একটা চাকরি। ফুটপাতের কিনার ঘেঁষে এগোনো। পার্ক পস্নাজা। লিফটে লম্বা লাইন। সেভেন্থ ফ্লোর।

প্রসিত আগেই সতর্ক করেছিল, আমার সঙ্গে অফিসে কথা বলবি না। দেখাও নয়। ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে যাবি। আমি খবর পাব। প্রায় তিনশো অপেক্ষমাণ। বায়োডাটা নিয়ে যাচ্ছে চাপরাশি। সবাই টিপটপ। টাই ব্রিফকেসেও বেশ কয়েকজন। অরিত্রই কেবল ঢিলেঢালা। পায়ে চটি, ঢিলে প্যান্ট, গাঢ় গেরুয়া পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ঝোলা। আড্ডায় না ইন্টারভিউতে নির্ণয় কঠিন। তবু আশার বুদ্বুদ। ক্যান্ডিডেটরা পরস্পর বলাবলি করে, ইন্টারভিউটা তো শো, ভেতরে ভেতরে লোক ঠিক করা, রাজনীতির দাদারা না থাকলে চাকরি হয় না। খুঁটি থাকা চাই … অরিত্র ভাবে, চিফ পার্সোনাল অফিসারের যে কাব্যরোগ, সেই হদিস এরা জানবে কী করে! অনেকেই সাক্ষাৎকার সেরে বাইরে আসছে। অপেক্ষমাণদের কৌতূহল, কী জিজ্ঞাসা করছে, আইকিউ, না রিটিন? কেউ আবার বেরিয়ে বলছে, সব আইওয়াশ। এতো পড়াশোনা করে এলাম, কিছুই জানতে চাইল না। দু-চার কথার পর থ্যাংক ইউ, বলে বিদায়। ফোনে নাকি খবর পাওয়া যাবে। অরিত্র জীবনানন্দ শক্তি শঙ্খ ঘোষ জয় গোস্বামী মনে মনে ভাবতে থাকে।

বেলা সাড়ে পাঁচ। এখনো হাঁপাতে হাঁপাতে কয়েকজন ভিড় বাড়ায়। ভেতরে যাওয়া-আসা চলতে থাকে। এ কী, আরো একজন ভেতর থেকে বেরিয়ে চলে যায় না। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে! বাইরে তো মাত্র আঠারোটা মিউজিক্যাল চেয়ার। কিন্তু অরিত্রর চিমন্তা, তিনটে ভ্যাকেন্সির দুজন দেয়ালে লম্বমান। বাকি মাত্র এক। অরিত্রর ডাক আসার আগেই যদি … অরিত্র হালদার? ডাক পাওয়া মাত্র অরিত্র প্রায় লাফ দিয়ে ভেতরে ঢোকে। নমস্কারে দুই হাত তুলে বলে, শুভ সন্ধ্যা।

ও-প্রামেত্ম চার আক্রমণোদ্যত বাঘের একজন মুখে প্রসন্ন প্রশ্রয়, বসুন।

তিনিই বোধহয় কবিতাপ্রেমী চিফ। স্যুট-টাই, টাই-পিন – ফিটফাট। বাকি তিন বাঘের মধ্যে একজনের কাঁচাপাকা গোঁফ, কেউ ফ্রেঞ্চকাট, কেউ যত্নলালিত দাড়িতে যিশুখ্রিষ্ট। বায়োডাটায় নজর, কপি মেলানো, লাল পেনের দাগ টানার পর প্রশ্নের ঝড়। শেষে কবিতাপ্রেমীর নিরীহ আদেশ, প্লিজ ওয়েট আউটসাইড। ইউ মে বি কলড ব্যাক।

তাহলে এতো জীবনানন্দ সুনীল শক্তি … এত মুখস্থ … কবিতার বই হাতড়ানো বেকার! একটা লাইনও কেউ জানতে চাইল না। প্রসিত কি ভুল খবর দিলো! আজ টিউশনি কামাই হলো। হোক। আর সে পরোয়া করে না। ছুটি নেই, বন্ধ ধর্মঘট নেই, জলে-ডোবা কলকাতা অচল হলেও তার হাজিরা বাধ্যতামূলক। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বকর-বকর। তবু মা-বাপরা খুশি নয়। যদি আর একটু সময় বাড়াতে পারেন স্যার, … অথচ টাকার বেলায় দু-হাজার। আজকাল কাজের মেয়েদের মাইনে সাড়ে তিন-চার হাজার। তার ওপর পুজোয় বোনাস, নতুন শাড়ি-বস্নাউজ, বাড়তি কাজে বকশিস। তারপর তাদের ট্রেন বাস ফেল করা আছে, শরীর খারাপের ছুটি আছে। শুধু হোম টিউটরের কোনো বোনাস বকশিস ছুটি নেই। তারা যে বাড়ির ঝি-চাকরেরও অধম। আপত্তি তুললেই, অজুহাত। ছেলের তো আরো চারজন টিচার আছে। আপনার তো শুধু ম্যাথস।

যাও, এখন যাকে খুশি তাকে দিয়ে পড়াও। অরিত্র হালদার আর নেই। সে এখন সিলেকশনে থার্ডম্যান। পকেটভরা বেতন। গ্র্যাচুইটি, পিএফ, পেনশন … হিপ পকেট থেকে নোটঠাসা পার্স বের করে সেও মোড়ের আড্ডায় হাঁক দেবে, অ্যাই সহদেব, এক প্যাকেট বড় গোল্ডফ্লেক দে। কিন্তু এ কী, ওয়েটিংয়ের এক, আরো এক, তারপর আরো আরো … তাহলে অরিত্র!

এখন সাড়ে সাতটা। ইন্টারভিউ বোর্ড ছাড়া অফিস ফাঁকা। প্রসিতকেও দেখা যাচ্ছে না। কাচের দরজায় চোখ রেখেও সে খেয়াল রাখতে পারল না, প্রসিত কখন বেরোল! নাকি অন্য কোনো ঘরে। সে না থাকলে অরিত্র ইন্টারভিউর রেজাল্ট জানবে কেমন করে! অরিত্রর ডাক আসে। বেয়ারা অন্য ঘরে নিয়ে যায়। চিফ পার্সোনালের চেম্বার। অদূরে তাঁর তন্বী সিল্ক শাড়িতে সেজে থাকা পিএ। পদ্মডাঁটার মতো হিলহিলে। রঙেও পদ্মফুল। কিন্তু ওদিকে নজর অপরাধ হতে পারে। ঘরে ঢোকার আগে নেমপেস্নট দেখেছে অরিত্র। আই.বি সান্যাল। নজর তার দিকেই রেখে অরিত্র আবার নমস্কার জানায়। অবশ্য শুভরাত্রি বলা যায় না। তবে অবাক হয়ে দেখে, চিফের স্যুট থেকে টাইপিন এখনো একচুল নড়েনি। আবার তিনি সরল বাংলায় বলেন, বসুন। আপনার হবিতে লিখেছেন, কবিতা।

অরিত্র ছলকে ওঠে, একটু চর্চা করি।

প্রিয় কবি?

জীবনানন্দ দাশ।

কেন?

এমন শব্দ চয়ন, … চুল তার বিদিশার নিশা … মুখ শ্রাবসত্মীর কারুকার্য … পাখির নীড়ের মতো চোখ, কিংবা দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে … দারুচিনি দ্বীপ … ধানসিড়ি নদী …

শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়েন না?

তিনি তো আমাদের সময়ের কবি। কী তীক্ষন তির্যক ভাষা … আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে। এটাই তো আমাদের গহন বেদনার কথা!

ছায়া মারীচের বন?

হ্যাঁ। হৃদয়ে আমার গন্ধের মৃদু ভার, … আবার দেখুন হৃদয়পুরে জটিলতার চলিতেছিল খেলা, … কিংবা আঁখির আঠায় ভালোবাসার বাঘ জড়িয়ে যায় … কখনো দাপটে বলে, টাকা দাও, নাহলে ভাঙচুর হবে, ধ্বংস হবে মহাফেজখানা … অথচ সংসারে সন্ন্যাসী লোকটা … মদ্যপায়ী ভেতো … এবং আগুনে পুড়ে গেল লোকটা … কবি ও কাঙাল।

সুনীল গাঙ্গুলি?

এই দর্পিত আবির্ভাব আর কোথায়! ভারতবর্ষের মানচিত্রের ওপর পা রেখে দাঁড়ানো …

আপনি শিক্ষকতা করেন?

না। বেমালুম মিথ্যে বলে অরিত্র।

কবিতা লেখেন?

বললাম তো, চর্চা করি।

ছাপা হয়?

কখনো-সখনো।

কাব্যগ্রন্থ আছে?

না। কবিদের দুর্দশা তো জানেন। পকেট মানি বাঁচিয়ে … অনর্গল মিথ্যা বলে যায় অরিত্র। আরো বলে, আপনার ব্যস্ত সময়ের মাঝে আপনিও যে কবিতা অনুরাগী অনুমান করতে পারি …

সুন্দর কিছু সময় কাটল আপনার সঙ্গে। আরো কিছু শোনার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাইরে আরো কয়েকজন …

হ্যাঁ হ্যাঁ। অবশ্যই। আমারও খুব ভালো লাগল আপনাকে। উঠি এখন। নমস্কার।

হাত তুলে নমস্কারের ভঙ্গিতে তিনি বলেন, চর্চাটা ছাড়বেন না।

বুকভরা আশা নিয়ে বেরিয়ে আসে অরিত্র। প্রসিতের খবর নেওয়া নিষিদ্ধ। চেষ্টাও করে না। প্রথম বাস পেতেই উঠে পড়ে। ঠাসা ভিড়। তবু অরিত্রর ভালো লাগছে। ঢেপসা, রংজ্বলা সোয়েটারে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো মানুষটা নির্বিকার। উৎকট গন্ধ। তবু সরে আসছে না অরিত্র। এমনকি পা মাড়িয়ে যে পৃথুল মহিলা বাস থেকে নামল, ভালো লাগছে তাকেও। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটে শীত লাগে। সিগন্যাল আটকে থাকাও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না। আপন পুলকে রড ধরে বাসের দুলুনিতে টাল খায়। নিজের স্টপে নামে। ক্যাজুয়াল পোশাকের পাঞ্জাবি ভেদ করে ঠান্ডা কাতর করে। কান ঢাকা টুপি পকেট থেকে বের করে কানের দিকে টান দেয়। সোজা মোড়ের আড্ডায়। আড্ডার আসর তখন ভাঙাহাট। নিতান্তই পাড়ার কয়েকজন। যেমন জয়ন্ত। সারাদিনে আড্ডা ছাড়া কাজ নেই। বাবা তিনতলা বাড়ি রেখে গেছে। তিনতলায় তিনখানা ঘর রেখে সব ভাড়া। সে ওঠে সবার শেষে। সকালেও বেলা দেড়টা পর্যন্ত মোড়ে। মাঝে মাঝে বউ-মেয়ে নিয়ে বেড়াতে যায়। অর্জুনও পাড়ার ছেলে। পোস্ট অফিসে চাকরি করে। বিকেলে নাকি মাথা ঝিমঝিম করে। আড্ডা তার টনিক। বিতোষ কম্পিউটার মেকানিক। তার রোজের রোজগার হাজার আড়াই। তবে কিপ্টে, টাকা জমায়।

অরিত্রকে দেখে তারা আগ্রহী হয়। প্রসিত তার ইন্টারভিউর ব্যাপার বন্ধুমহলে আগেই ছড়িয়েছে। বেঞ্চে বসার আগেই প্রশ্ন, কেমন হলো রে?

প্রসিত এলে জানতে পারব।

সে-ব্যাটা আজ এতো দেরি করছে কেন?

লোক নেবে তিনজন। প্রার্থী তিন হাজার।

ন-টা তো বাজে। আর কি সে এদিকে আসবে?

দেখি।

তারা আবার পুরনো চর্চায় ফিরে যায়। তেতো এবং জোলো। চটকাতে চটকাতে বিরক্তি ছড়ায়। অরিত্র বলে, তোদের অন্য বিষয় নেই! সাহিত্য শিল্প, দেশ সমাজ …

আমরা কি সমাজের মাস্টারমশাই, বলে হা-হা করে হাসে জয়ন্ত।

বাকি দুজনও সায় দেয়। অরিত্রর ঘেন্না লাগে। উঠে আসার ইচ্ছা হয়। পারে না। এরাই তো বন্ধু। সাহায্য করে। প্রয়োজনে টাকা ধার দেয়। বিপদে পাশে দাঁড়ায়। চাকরির হদিস দেয়। তার মঙ্গল কামনা করে।

কাঁপুনি বাড়ে। ঠান্ডার তীব্রতা বাড়ে। বিতোষ উঠে যায়। অর্জুন সিগারেট কিনে বাড়ির পথে। অরিত্রর আজ সিঞ্চিতার কাছে যাওয়া হলো না। বলেছিল, ফলাফল নিজে এসে জানিয়ে যাবে। সিঞ্চিতা অরিত্রর ঘোলাটে জীবনের টুকরো আকাশ। তার প্রিয় ছাত্রী। পাশ করার পরেও সম্পর্ক থেকে গেছে। দিনে দিনে সম্পর্কে রঙের রামধনু ছড়িয়েছে দুজনে। স্বপ্ন দেখে, দুজনের মধ্যে কারো একটা চাকরি হলেই তারা সংসার গড়বে।

জয়ন্ত তাড়া দেয়, কী রে উঠবি তো? প্রসিত হয়তো বাড়ি চলে গেছে। রাত্রে সে তো আবার জলচর।

তুই যা। আমি আর একটু বসি।

জয়ন্ত চলে গেলে অরিত্র মোবাইলে কন্ট্রাক্ট নাম্বার হাতড়ায়। ওদিকে রাগী উত্তর, তুই এতো কবিতা মারাতে গেলি কেন। যা করছিস কর। এক খাঁচায় দুটো সিংহ থাকে! লাইন কেটে যায়।

রাস্তা ফাঁকা। দুরন্ত বেগে গাড়ি ছুটে যায়। আলোর নিচে কুয়াশা জমাট। অরিত্র বসেই থাকে। এটা যেন তার দেশ নয়। মুখস্থ করা লাইনটা মনে আসে : পৃথিবীকে মায়াবীর নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়।

Wednesday, January 15, 2025

গল্প- কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি by আহমেদ মুনির

‘তোমার কোথায় দেশ? কিবা পরমাত্মা-পরিচয়?

তুমি ছোট ঘরে বসে আজীবন পড়াশুনা করো

তোমার সামান্য আয়, তুমি স্ফীতোদর।’

(‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

বুকসেলফ …

একবার খুব টানাটানির মধ্যে পড়ে গেলাম। ২০০৯ সালের কথা। সুজলার বয়স তিন আর স্বননের সাত-আট মাস হবে। চট্টগ্রামের যে-দৈনিকটাতে কাজ করতাম সেখানে নিয়মিত বেতন হতো না। বকেয়া পড়ত প্রায়ই। তো সেরকম একটা রাতে পত্রিকার একটা বিজ্ঞাপন দেখিয়ে, দীপ্তির প্রশ্ন,

বই পাঠিয়েছ?

আমি বুঝতে পারিনি প্রথমে। তখন আমার প্রথম কবিতার বইখানা সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। কোনো একটি পুরস্কারের জন্য বই পাঠাতে বলছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনে দেখা গেল বই পাঠানোর শেষ তারিখ ছিল সেদিনই।

যে-রুমটায় থাকতাম আমরা সেখানে মেঝেতে আমার বইগুলো একটা বিছানার চাদরের ওপর সত্মূপ করে রাখা। তখন কোনো বুকসেলফ ছিল না। বই পাঠানোর সময়সীমা পার হয়েছে শুনে দীপ্তির দীর্ঘ নিশ্বাস। ছড়ানো-ছিটানো বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা বুকসেলফ তো কিনতে পারতে পুরস্কারের টাকাটা হাতে পেলে।

আশ্চর্য হলাম ওর কথা শুনে। প্রথমত আমি পুরস্কার পেতে পারি এই বিশ্বাস কি করে এলো ওর মধ্যে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চার দুধ কেনার টাকা থাকে না প্রায় সময়, এমন প্রয়োজনের বিষয় না ভেবে বুকসেলফের কথাই তার মাথায় এলো?

পরদিন এক বন্ধুর পরামর্শে যোগাযোগ করলাম পুরস্কারদাতা সংস্থার অফিসে। ওরা বলল, সময় পার হয়ে গেলেও ঈদের ছুটির কারণে অনেকের বই সময়মতো আসেনি। একদিনের মধ্যে পাঠাতে পারলে সেটা গ্রহণ করা হবে।

বই পাঠিয়ে বিষয়টা মাথা থেকে একরকম ফেলে দিয়েছি। অপেক্ষার প্রশ্নই আসে না। কারণ জানতাম, আমি কী লিখি। আর আমার সামনে কেউ বই হাতে নিলে কুঁকড়ে যেতাম সংকোচে। মনে হতো পোশাক পরিনি। ওই পাঠক নেড়েচেড়ে দেখছে আমাকে।

মাসচারেক পর হঠাৎ ফোনে জানানো হলো পুরস্কার পেয়েছি আমি। যার মূল্যমান এক লাখ টাকা।

আলমগীর মিস্ত্রি দেখতে ছোটখাটো হলেও বেশ চটপটে। সাত ফুট বাই আট ফুটের ভিনিয়ার বোর্ড কেটে বানানো বুকসেলফের নকশা দীপ্তি নিজে করেছিল। গত দশ বছরে সেলফটার নিচের অংশের গস্নাসডোরের একটাও অক্ষত নেই। দুবার বাড়ি বদলানোর ধাক্কায় কোথাও কোথাও ওপরের পস্নাস্টিক সরে গিয়ে কাঠের গুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছে। পেছনের পায়ার দিকে সামান্য পচনও ধরেছে। বছর কয়েক আগে এক লেখকবন্ধু অটবির শক্তপোক্ত একটা বুকসেলফ উপহার দিয়েছেন। সেটা আসার পর পুরনোটা বহাল হয়েছে বাড়ির নিভৃত কোণে, স্টাডি রুমে আর নতুনটা ড্রয়িংরুমে।

জীর্ণ বুকসেলফটা তবু অনেক আপন মনে হয়। তার কাছে গেলেই একটা অন্যরকম গন্ধ পাই আমি। এই গন্ধটা অনেকটা নতুন কচি বাঁশ, সুগন্ধি তেল আর ন্যাপথালিনের মিশেল বলে মনে হয়। নিউমার্কেটের মোড়ে শুকতারা নামে একটা বইয়ের দোকান ছিল। এখন নেই। সেখানে স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, শিশু, নবারুণ এসব ওলটাতাম। সেখানেই পেয়েছিলাম আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ। সেই বইয়ের ভেতরেও ছিল এমন অদ্ভুত ঘ্রাণ।

এজন্য বুকসেলফটাকে জীবন্ত মনে হয় আমার। জীবন্ত আর স্মৃতিভারাতুর। কত কাহিনি ওর পেটের ভেতর, শরীর জুড়ে। অথচ নতুন বুকসেলফটাকে মনে হয় নিশ্চল আর মৃত। কোনো গন্ধও নেই তার।

পাশে এসে বসো

চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ঘেরা একটা বাড়িতে থাকি তখন। বাড়িটাও গাছে ঘেরা একটা টিলার ওপরে। সেখানে আমার সকাল হতো বেলা দশটায়। তার আগে ঘুম ভাঙতো কদাচিৎ। লেখাপড়া, ক্লাস করার কোনো বালাই নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম মাঝে কালেভদ্রে। বন্ধু রোজাউল করিম সুমন নিয়মিতই আসত তখন। মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভাঙার আগে। খবর পেয়ে এসে দেখতাম বারান্দায় বসে একমনে স্কেচ খাতা খুলে উবু হয়ে বসা কুকুরটার ছবি আঁকছে।

দুপুরের কিছু আগে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। গন্তব্য জলসা মার্কেটের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো, বিশেষত অমর বইঘর। সেখান থেকে কবি জ্যোতির্ময় নন্দীর রহমতগঞ্জের বাসায় কিংবা লালখান বাজারের বাগঘোনার আরেক বন্ধুর বাড়িতে। মাঝে মাঝে প্রয়াত লেখক অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের বাসায়ও যাওয়া হতো। জ্যোতিদার বাড়িতে আমরা অনাহূতই ছিলাম। খুব বিরক্ত হতেন। বলতেন, আপনাদের আর কোনো কাজ নাই? কবিতা একটা লিখেই শোনানোর জন্য এখানে ছুটে আসতে হবে? তবু আমরা ছিলাম নাছোড়বান্দা। আসলে ভীষণ রকমের স্নেহই করতেন আমাদের। কয়েকদিন না গেলে জানতে চাইতেন কেন আসিনি।

নিপাট ভালোমানুষ বউদি আমাদের সাহিত্য আলোচনার কাছে ঘেঁষতেন না। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে তাঁর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন আবার। একবার জ্যোতিদার বাসায় গিয়ে শুনলাম, তিনি নেই। বউদি বললেন, আপনাদের দাদা শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। আপনারাও তাড়াতাড়ি যান। নন্দনকাননের ফুলকিতে ওরা বসেছেন।

বুঝলাম সাহিত্যের আলোচনায় যোগ না দিলেও শঙ্খ ঘোষ যে আমাদের প্রিয় কবি এ-কথাটা বউদির কানে ঠিকই পৌঁছেছে। না হয় এমন উত্তেজিত হয়ে কেন খবরটা দেবেন তিনি।

তখনো জ্যোতিদা আর ওমর কায়সার ছাড়া চট্টগ্রামের কবিদের তেমন কারো সঙ্গে আলাপ-পরিচয় নেই। আবুল মোমেন, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শাহিদ আনোয়ার, শেলিনা শেলী এদের দূর থেকে চিনি। ততোদিনে তাঁদের অনেকের কবিতাই পড়া হয়েছে। একটা মুগ্ধতাও ছিল। তবে সাহস করে কথা বলা হয়নি। এদের আসরেই শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে চলছিল সাহিত্য-আড্ডা। সেখানে কোন পরিচয়ে হাজির হই? কেমন কুণ্ঠিত ছিলাম মনে মনে। সালটা ১৯৯৮ হবে। তারিখ মনে নেই। শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা ছোট অডিও রেকর্ডার জোগাড় করে নিয়েছিল সুমন। আসরের মাঝামাঝি তখন, সবাই গোল হয়ে বসেছেন। তাঁদের মাঝে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর মোজা পরা শঙ্খ ঘোষ। ভূত দেখার মতো সবার দৃষ্টি আমাদের দিকে নিবদ্ধ। এমনকি শঙ্খ ঘোষেরও। তবে সেখানে উপস্থিত জ্যোতিদা আর আসর পরিচালনা করছিলেন যিনি, কবি ওমর কায়সার তাঁদের দেখেই সাহস পেলাম। ভেতরে ঢুকে বসে পড়লাম এক কোণে। সস্নেহে কায়সারভাই বললেন, এখানে সবাই কবিতা পড়েছে। এরপর শঙ্খ ঘোষ পড়বেন। তোমরা কি কবিতা নিয়ে এসেছো? আমি দুপাশে মাথা নেড়ে জানালাম, না, পড়ব না। কিন্তু সুমন আসরের সবার সামনে জানিয়ে দিলো সদ্য লেখা একটা কবিতা পকেটে আছে আমার। আসলে সেটা পকেটে করে নিয়ে বের হয়েছিলাম জ্যোতিদাকে শোনানোর জন্য। ওমর কায়সার সে-কথা শুনে ঘোষণা দিলেন, এখন আহমেদ মুনির কবিতা পড়বে।

আমার সারাশরীর কাঁপছে ভয়ে, লজ্জায়। ভাঁজ করা কাগজটা বের করতে করতে বলেছিলাম, দুর্ভাগ্য যে, একটা কবিতা পকেটে ছিল। সেই কবিতাখানা তুলে দিলাম এখানে –

‘ধূসর সন্ধ্যায় বাইরে আসি

বাতাসে ফুলের গন্ধ;

বাতাসে ফুলের গন্ধ;

আর কিসের হাহাকার।’

এই সমস্ত কিছুকেই আমি বলেছি ভাবালুতা

এবং অসময়ের বর্ষণও আমার আবেগকে

এখন আর জাগাতে পারছে না।

এখন আমি সকালকে বলছি সকাল

বিকেলকে বিকেল

আর সন্ধ্যাকে বলেছি কেবলমাত্র সন্ধ্যা।

বস্ত্তত এখন আমি এক প্রকার বর্ণান্ধ।

তবু এই বিকেলে আমাকে বেরোতে হলো

সমুদ্রের নোনা বাতাসের ঝাপটের মধ্যে,

জল আর জলের সবরকম তরলতার ভিতরে

ডুবে যেতে যেতে একটি উজ্জ্বল মাছ

কেবল প্রাণ পেল

অথবা বেরিয়ে এল কঠিন আড়াল থেকে;

তবু সেই বাড়িটার সামনে

আমার পদক্ষেপ কেমন টলোমলো হলো;

আর বাতাসে কিসের যেন হাহাকার

সবরকম ফুলের গন্ধকে ছাপিয়ে !

(‘ক্রমাগত ধূসর সন্ধ্যা’, আমি ও বাঘারু)

পাঠ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমার কাঁপুনি থামছিল না। হঠাৎ শুনতে পেলাম শঙ্খ ঘোষ বলছেন, আমারও দুর্ভাগ্য যে তোমার পকেটে একটা কবিতাই ছিল, আর শোনা হলো না। তুমি আমার পাশে এসে বসো।

নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আসরভর্তি মানুষের চোখ আমার দিকে। চোখের পানি লুকাতে চেষ্টা করছি প্রাণপণ। কিন্তু সহজ করে দিলেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁর পাশে বসতেই বললেন, তুমি বাছাই করে দাও আমি পড়ি। আমি তাঁর বই থেকে এক-এক করে নিজের পছন্দের কবিতা উলটে সামনে এগিয়ে দিতে থাকলাম, আর তিনি পড়তে লাগলেন। পাশে এই সব যন্ত্রে ধারণ করছিল বন্ধু সুমন। বারোটি কবিতার সেই রেকর্ডটি পরে কবিকন্যা সেবমত্মী ঘোষ অর্থাৎ টিয়াদিকেও পাঠানো হয়েছিল। সেই আসরে উপস্থিত টিয়াদি পরে বলেছিলেন, তাঁকে তখন পিএইচ.ডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে হচ্ছিল। প্রবাসে বাবার কণ্ঠ শুনবেন বলে কিছু কবিতা রেকর্ড করে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ তাতে রাজি ছিলেন না। বলেছিলেন, যন্ত্রে স্বস্তি পান না তিনি (অবশ্য পরে সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাঁর ধারণ করা কবিতা খুঁজে পেয়েছি নানা জায়গায়)। অথচ এখানে কি অবলীলায় যন্ত্রে কবিতা ধারণের সম্মতি দিলেন!

আজ এতোকাল পর সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে। অচেনা এক বালকের প্রায় না হয়ে ওঠা, কাঁচা কবিতার এমন প্রশংসা করা আর তাকে পাশে ডেকে নিয়ে বসানোর মধ্যে কেবল একটা প্রশ্রয়ই ছিল বলে মনে হয়। তরুণটি কবিতা লিখছে, আর সেই লেখার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, কুণ্ঠা আছে, এটা বুঝতে পেরেছিলেন হয়তো। আর সেটা দূর করতেই তাঁর এই প্রচেষ্টা? ভাবতে গেলে আজো শঙ্খ ঘোষের প্রতি ভালোবাসায় মন আচ্ছন্ন হয়ে আসে।

শব্দ করে হাসো, যত পারো আজ বাঁচো

শোকের আপেল থেকে মুক্ত হও নরম খোসার মতো

মমতা-মাখানো ধান রুয়েছি মাটিতে

যাও তার ঘ্রাণ নিয়ে এসো।

এই নাও শেষ মদ, শস্যের সোনালি স্বেদ

জীবনের সাদা ফেনা, আশা ও শান্তির গাঢ় জল

প্রশান্ত স্নেহের জলে ডুবে আছে কালো এই পাড়া

যদি দুঃখ পেয়ে থাকো অচেনা পথের বাঁকে

দ্যাখো ধুলোলীন ঘাস, সহজ করুণ আমাদের ঘর।

(‘চাকমা বুড়োটা যা বলেছিল’, আমি ও বাঘারু)

২০০১ সালের দিকে একটা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে বছরখানেক রাঙামাটিতে কেটেছিল। শহরের রাজবাড়ি এলাকার কে কে রায় রোডের একটা বাড়িতে আরো চার চাকমা তরুণের সঙ্গে আমার নতুন সংসার। সে-বাড়ির বাসিন্দাদের একজন নন্দ চাকমার বাড়ি শুভলংয়ের কাছের একটা গ্রাম হাজাছড়ায়। নন্দর নিমন্ত্রণে একবার যাওয়া হয়েছিল ছবির মতো সুন্দর গ্রামটিতে।

শহরের রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে লঞ্চে শুভলং, সেখান থেকে ভাড়া নৌকায় হাজাছড়া। গ্রাম বলতে যে সহজ-সরল ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, হাজাছড়া সেরকম নয় মোটেও। কাপ্তাই হ্রদের মাঝে জলমগ্ন শান্ত এক গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি একেকটা টিলার ওপর। সেই টিলা আবার ডুবে আছে হ্রদের জলে। যেন অসংখ্য দ্বীপের একটা মালা। সেরকমই একটা টিলার সামনে এসে থামল আমাদের নৌকা। মূল বাড়ির আগে নৌকা ভেড়ার ঘাট, সেই ঘাট সংলগ্ন সেগুনবাগানের একটা অংশ হ্রদের জলে নিচু হয়ে মিশে গেছে। নৌকা থেকে নেমে, নন্দদা পথটা দেখিয়ে দিলেন,

সেগুনবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ, এই পথে সোজা গেলেই বাড়ি। আপনি দেখতে দেখতে আসেন, আমি বাড়ি গিয়ে খবর দিয়ে আসি।

টিলায় উঠতেই অপূর্ব দৃশ্য। সামনের নীল হ্রদের জলে ঝুঁকে পড়া সেগুনবাগানের টলটলে প্রতিবিম্ব। জলের ওপর ওঠা ঘূর্ণি বাতাস ক্ষণে ক্ষণে তাকে ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। ঢেউ শান্ত হয়ে এলে সেটা আবার ভরে উঠছে আগের চেয়ে স্পষ্ট চেহারা নিয়ে। কোথাও কোনো গাছের ডাল থেকে ডেকে উঠছে একটা কোকিল। একবার ডাকতেই তার প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতে সময় নিচ্ছে বেশ কয়েক মিনিট। বাতাসে ঘাস আর পাহাড়ি লতার অতিপরিচিত মিষ্টি ঘ্রাণ।

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল বাগানের প্রান্তে হ্রদের তীর ঘেঁষে একটা ছোট্ট মাচান ঘর। কাছে যেতেই দেখলাম, মাচানের দাওয়ায় দা-হাতে বাঁশের কঞ্চি কাটছে এক চাকমাবুড়ো। চোখাচোখি হতেই তিনি ইশারায় ডাকলেন। হাত ধরে মাচাঙে উঠে বসতে সাহায্য করলেন।

বুড়োর চোখে-মুখে হাসির ছটা। কথা বলে জানলাম, নন্দদার সেগুনবাগানের পাহারাদার তিনি। বাগানের পরিচর্যা করেন। জুমে আবাদ করে আর মাছ ধরে বেশ ভালোই কেটে যায় একার জীবন।

কথা বলতে বলতে ঘোলাটে এক গস্নাস পানীয় এগিয়ে দিলেন।

বললেন, ডাবের জল। বলেই আকর্ণবিসত্মৃত হাসি। তবে আমি যে বুঝতে পেরেছি এটা ডাবের জল নয়, তা বুঝতে দিইনি তাঁকে। বেশ ভালো এক চোয়ানি ছিল সেটা। একে তো নীরব, নিস্তব্ধ উদার
প্রকৃতি তার ওপর এমন উৎকৃষ্ট পানীয় – আমাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। চাকমা বুড়ো তখনো পর্যন্ত আমার নাম জানতে চায়নি। নন্দর সঙ্গে এসেছি এটুকু জেনেই আলাপ জমায়।

আমাদের কথোপকথন পুরোটা মনে নেই। তবে যা মনে আছে তুলে দিচ্ছি –

আপনার ডাবের পানি তো বেশ ভালো!

হা হা, হ্যাঁ নিজে বানাইসি। আমার শ্বশুর এসে বেশির ভাগ

খেয়ে ফেলসে।

বউ কই আপনার?

সে মারা গেসে দশ বছর।

তারপরও শ্বশুর আসে এখানে?

হা হা, আসে, ডাবের পানি খাইতে আসে।

আপনি চট্টগ্রাম গেছেন কখনো?

আমি রাঙ্গামাটিও যাই নাই কখনো।

বলেন কি কেন যান নাই?

হুই দূরে, কি কামে যাব? কোনো কাম নাই সেখানে।

আপনার একা থাকতে ভয় লাগে না?

ভয়? ভয় কেন লাগবে, কোনো ভয় লাগে না।

আপনার জীবনে কোনো সমস্যা নাই?

কি নাই?

সমস্যা, সমস্যা।

মাচানের ওপর দাবা (হুঁকো) টানতে টানতে কয়েকজন বাগানি আমাদের কথা শুনছিল। তাদেরই একজন সমস্যার অর্থটা বুড়োকে বুঝিয়ে বললো।

বুড়ো উত্তর দিলো,

আছে আছে, একটা অসুবিধা আসে। এখানে রাতের বেলা দেওতারা দিস্টাব (বিরক্ত) করে।

দেওতা মানে ভূত?

আমাদের মধ্যে যারা মারা যায় তারা আর কী, আশপাশেই থাকে। রাতের বেলায় মাছ ধরতে গেলে মশাল তেনে (টেনে) ধরে পানিতে দুবিয়ে (ডুবিয়ে) নিভিয়ে দেয়। ক্ষতি করে না। খেলে আর কি আমার সঙ্গে।

এটা ছাড়া অন্য কোনো অসুবিধা নাই জীবনে?

বুড়ো হাসে, হা হা হা। কেন থাকবে?

হাসি সংক্রামক। আমি আর মাচাঙে বসা পাঁচ-ছয়জন বাগানিও তাতে যোগ দিই। একজন লম্বা বাঁশের দাবা এগিয়ে দেয় টানার জন্য। তার আগে শিখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কীভাবে টানতে হবে। আমি সেই মতো টানার চেষ্টা করি। প্রথম বারে ধোঁয়া বের হয় না। এবার ফুসফুসে দম নিয়ে আবার চেষ্টা। জোরে টান। ধোঁয়ায় মুখ ভরে যায়। কড়া তামাকে প্রচ- কাশির দমক ওঠে। আমি কাশতে থাকি আর দাওয়ায় বুড়ো আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে পড়ে। আমার কাশির দমক যত বাড়ে তাদের আছাড়ি-পিছাড়ি হাসিও তত বাঁধভাঙা হয়ে ওঠে।

Sunday, September 15, 2024

গল্প- কাচঠোকরা by আশান উজ জামান

জরুরি একটা কাজে গিয়েছিলাম। শহর থেকে দূরে। অন্য শহরে। ওখানেই এক বন্ধুর বাড়ি। ওর কাছে উঠব। স্টেশন থেকে নিয়ে যাবে আমায়। এই ছিল কথা।

নেমেই খোঁজ করলাম। আসেনি।

অপেক্ষা করলাম। এলো না।

যাওয়ার পথে মোবাইল হারিয়েছি। ফলে যোগাযোগও করা গেল না।

কী করব?

তখন রাত। বাড়ছে। বিদেশবিভুঁই।

কে যেন বলেছেন, যার কোথাও থাকার জায়গা নেই, তার হোটেল আছে!

তা-ই সই। কিন্তু একা থাকার কোনো সিট ফাঁকা নেই। দুজনের রুম আছে। চাইলে ভাগাভাগি করে থাকতে পারি। পরে কেউ এলে থাকবে, না এলে নাই। এক সিটেরই ভাড়া দিতে হবে।

উঠে গেলাম। না, অন্য হোটেলে খোঁজ নেওয়ার অবস্থা তখন ছিল না আমার। সারাদিন রাস্তায়। না খাওয়া, না দাওয়া, নাড়ি চোঁ চোঁ করছে, চোখ লেগে আসছে।

খেলাম। তারপর ঘুম।

বড় ক্ষুধায় খাওয়া যেমন, বেশি ক্লান্তির ঘুমও তেমন। হয় না বেশি। হুটহাট ভেঙে যায়। তবে আমি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলাম। ডাকলেন এক ভদ্রলোক। আমার রুমমেট। ওপাশের আলোটা জ্বেলে লিখছিলেন। কাগজ শেষ! আমার কাছে চাইছেন। কাগজ একটা ছিল। মেদভুঁড়ি কমানোর উপায় – একটা পোস্ট দেখেছিলাম এফবিতে, প্রিন্ট করেছিলাম। ব্যাগেই আছে। এক পৃষ্ঠায় লেখা যাবে। লেখক মানুষ, পেয়ে বসেছে লেখায়, লিখুন। আমি ঘুমাই। ল্যাঠা চুকে গেল।

কিন্তু চুকল না আসলে।

সকালে দেখি মাথার কাছে একটা গল্প। শেষ অংশটা লেখা হয়েছে আমার ওই কাগজে!

ভদ্রলোককে দেখলাম না কোথাও। হয়তো ব্যস্ততা ছিল। উঠে গেছেন ভোরে।

রুমবয়কে জিজ্ঞেস করলাম। জানে না। ম্যানেজারকে বললাম। তিনি তো অবাক। একাই ছিলাম আমি! কেউ ওঠেনি রুমটাতে!

তা হলে?

কেউ তো নিশ্চয়ই ছিল। না হলে কে ডাকল আমায়? কাগজ চাইলে কে? গল্পটাই-বা এলো কোত্থেকে! ভাবছেন, আমি নিজেই লিখেছি, এখন ভুলে গেছি?

না, অসম্ভব। ডান হাতে লিখতাম, হাতটা কেটে ফেলতে হয়েছে এক দুর্ঘটনার পর। এখন টাইপ করে কাজ চালাই। বাঁহাতে। হ্যাঁ, এক হাতেই।

গল্পটাও অদ্ভুত! এমন লেখা লেখা তো দূরের কথা, পড়িওনি আগে।

----দুই-----

শহরের এদিকটায় খুব একটা আসেন না বোধ হয়, না? এলে চোখ এড়াত না বাড়িটা।

নজরে পড়ার মতো বিশেষ কিছু নয় যদিও। চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। সাদাসিধে। ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে ওঠা আঁটসাঁট আর দশটা বাড়ির মতো। বারান্দা নেই। ব্যালকনি নেই। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আড়মোড়া যে ভাঙবে, তার সুযোগও নেই। চারপাশের প্রাচীর ঘেঁষে দেয়াল।

সাধারণ বাড়ি। কিন্তু আপনার নজরে এটা পড়তই। এড়াত না।

প্রতিবেশী বাড়িগুলো মান্ধাতা আমলের। দেয়ালে দেয়ালে শ্যাওলা। জানালায় কাঠের পাল্লা। কিছু ভেঙে গেছে। কিছু ভাঙছে। ছাদগুলো ভাঙব ভাঙব করছে। প্রথম দেখায় অবাক হতে হয়, এখনো ভাঙেনি! বাড়িগুলো নিজেরাও অবাক হয় এই টিকে থাকা দেখে। শেষ হওয়ার পরও শেষ না হওয়া ভালো কিছু নয়। এ এক যন্ত্রণা। যন্ত্রণা বুকে নিয়েই ওরা দাঁড়িয়ে আছে। এ দিন একদিন ফুরোবে, এই আশায়।

বাড়িগুলোর মাঝখানের জায়গাটা ফাঁকা ছিল। ভরে উঠেছিল ময়লা-আবর্জনায়। কচুঘেচু বনগাছ দখল গিয়েছিল। আড্ডা বসত বেওয়ারিশ কনডম, ব্যবহৃত-অব্যবহৃত প্যাড, চিপসের প্যাকেটসহ সমমনাদের। মশা-মাছি আর রোগজীবাণুর অভয়ারণ্য হয়ে নিশ্চুপ ঘুমুচ্ছিল জায়গাটুকু। হঠাৎ সেখানে নড়েচড়ে উঠল জীবন। ইট-বালু-সিমেন্ট এলো। দু-মাস না যেতেই দাঁড়িয়ে গেল নতুন বাড়িটা। সাদা ধবধবে দেয়াল। মাঝে মাঝে জানালা। চৌকোনা থাই গ্লাসে মোড়া। নীলচে মুখোশে ঢাকা জানালাগুলো হাসতে থাকে। সবাইকে সে দেখে অথচ তাকে কেউ দেখে না – হাসির এটাই কারণ। জীর্ণ প্রতিবেশীদের দেখে ভেংচি কাটে। রোদ এলে ফিরে ফিরে যায় আলোর সংকেত হয়ে। সে-আলোয় ধাঁধা লাগে চোখে।

বিশেষণহীন হয়েও তাগড়া জোয়ান বাড়িটা তাই নজরে আসে। আসেই।

আপনারও আসত।

গল্পটা যদিও বাড়িটাকে নিয়ে নয়।

এর নায়ক একটি কাঠঠোকরা। সচল সাধারণ স্বাভাবিক একটি কাঠঠোকরা। বাড়িটার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে।

আট ফ্ল্যাটের ওই নতুন দুনিয়া এখনো জমে ওঠেনি। ভাড়াটিয়া এসেছে তিনটাতে। আরগুলো খালি। খালিগুলোর জানালা বন্ধ। এমনই চোখ-না-ফোটা এক জানালায় দেখা পাখিটাকে। আপন মনে ঠক্ ঠক্ করতে থাকে। কাচের ওপর। এই শহুরে রোদে যেখানে পাখির ছায়াই বিরল, সেখানে কাঠঠোকরা! তাও আবার থাই গ্লাসে ঠোঁট কুটে মরছে! সকালের পর সকাল। বিকেলের পর বিকেল।  মাতাল না হলে এমন হয়?

তীক্ষè পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী আপনি। আপনার চোখে নিশ্চয়ই পড়ত ঘটনাটা।

এবং আপনার মনে হতো নিশ্চয় কোনো রহস্য আছে এর পেছনে।

এবং আবিষ্কার করতেন, আপনি চেষ্টা করছেন রহস্যটা ভেদ করতে।

-----তিন-----

জানালাটার বয়স কত হবে?

কতগুলো নতুন বছর যে জানালাটা গলে ভেতরে ঢুকেছে আর   পুরনো হয়ে বেরিয়েছে, তার হিসাব নেই। আমরা শুধু দেখি জং ধরেছে লোহার শিকগুলোয়। অনেক বছর ধরে থাকতে থাকতে জংগুলোর হাত লেগে গেছে। তাই কোনোমতে জড়াপিষ্টি করে আছে তারা। আলগোছে ধরে আছে ভেতরের ক্ষীয়মাণ লোহাটুকুকে। আলতো করে টানলেও হালকা হালকা পরতে ওঠে। হেলান দিয়ে দাঁড়ালে জংয়ের নকশা আঁকা হয় কাপড়ে। বাতাসেও ঝরে যায় কিছুটা। প্রতি সকালেই তাদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায় বাড়ির বউটাকে। ঝাড়– দিয়ে। সে-সময় মধুর সুরে একটা গান গায় মেয়েটা। বাড়িটায় থাকতে আর মন চাইছে না তার। কিন্তু তার অকম্মার ঢেঁকি বর কোনোভাবেই বাসা বদলায় না। পুরো শহরে এত কম ভাড়ায় এত ভালো বাসা নাকি নেই। ভাড়া একটা ছুতো। ওপরতলার ভাবির সঙ্গে তার জমে যাওয়া ভাবই আসল কথা। না হলে এই এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ক্লাস করতে যায় তার বউ, এই ঘিঞ্জি ঘরে থাকে, এই স্যাঁতসেঁতে মেঝেয় হাঁটে, বর্ষায় মাছ ধরা যায় ঘরে, গরমে পোকামাকড় এসে আত্মীয়তা করে, ঠান্ডায় ভিজে যায় লেপ-তোশক, তবু কেন গা করে না সে? এই হলো গানের কথা। বাড়ির কর্তার ভাষায় এর নাম গ্যাজর গ্যাজর। কখনো কখনো ঘ্যানর ঘ্যানর। আজ সকালেও গানটা শুনেই ঘুম ভেঙেছে।

গান করতে করতেই ক্লাসে গেল বউটা।

বরটার কাজ আছে বাইরে; কিন্তু যাবে না। ঘ্যানঘ্যানানিতে ঘুমভাঙা দিন ভালো যায় না।

বারান্দায় এলো সে। জানালা বরাবর শুয়ে আছে একটা বিছানা। দুটো তোশক। একটা বেডশিট। দুটো বালিশ। তেল চিটচিটে ভাবটা তার কালও ছিল। ধুয়ে দিয়েছে বউ। বাতাসে আজ লেবুর সুবাস। গন্ধটা আরেকবার টেনে নিয়ে গা এলিয়ে দিলো। হাতে পত্রিকা। বালিশের পাশেই কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স।

পড়তে পড়তে তার মনে হলো কিসের যেন আওয়াজ আসছে নতুন বাড়িটা থেকে। ভাড়াটিয়া এলো নাকি? চোখ বাড়াল সে। এবং অবাক হলো। একটা কাঠঠোকরা, কাচ ঠুকছে! কোনোদিকে খেয়াল নেই। ঠুকেই যাচ্ছে।

এটা তো অস্বাভাবিক! কী হয়েছে পাখিটার?

ভাবতে থাকল সে।

তার মনে হলো প্রেমের বিয়ে কাঠঠোকরাটার।

ছাত্রজীবনেই সঙ্গী হয়েছে দাম্পত্য। গরিব ঘরের সন্তান। টিউশনির অল্প টাকায়, কাঠের চাকায়, নিজেরই ঠিকমতো চলে না, চালাতে হয় মাকেও। তার ওপর সোনার ডিম পাড়া বড় টিউশনিটা হাতছাড়া হলো ছাত্রীটাকে ঘরে তোলার কারণে। ফলে আবেগটা থিতিয়ে যাওয়ার পর তার ওপর কষ্টের বুদবুদ আর হতাশার যে-সর জমে তার আড়ালে ঢাকা পড়ে জীবন। বড়লোক বাবার বড় মেয়েটা তার বউ, যে কি না সব ছেড়ে তার ছায়া হয়েই উড়াল দিয়েছে এবং বয়সে ছোট, তাই দেহ-মন চিন্তা অপরিণত এখনো, তাই হাঁপিয়ে উঠেছে। ফলে লেগেই থাকে খিটিমিটি। জীবনটা দুজনের গলাতেই ফাঁস হয়ে ওঠে, তা না যায় খোলা, না যায় আটকানো।

কিন্তু রোদ থাক না থাক দিন পার হয়ই। রাতও।

পড়া শেষ হয়েছে পাখিটার। কিন্তু চাকরি হচ্ছে না।

জীবনধারণ জটিল হয়ে গেছে বড়। আগে যেখানে-সেখানে খাবার মিলত। এখন সব মালিকানায় চলে। কিনতে হয়।

বউয়ের পড়া শেষ হয়নি। তার খরচ আছে। সঙ্গে খাওয়া-পরা আর বাসাভাড়া। পাহাড় হয়ে দাঁড়ায় সামনে। অথচ টিউশনিই সম্বল তার। চলছে তাই না চলার মতো।

কিন্তু কীই-বা করার আছে আর? আশার পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা ছাড়া? প্রতিদিনই চাকরির সন্ধানে যায় সে। আর ফিরে আসে। আর যায়। আর আসে। জোটে না। এক ভোরে এক সাক্ষাৎকারের স্বপ্ন দেখল সে। চাকরিটা হয়েই যাচ্ছ এমন সময় বাগড়া বাধল। চাকরিদাতা বললেন, যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। ভাঙতে হবে তার ঘরের জানালাটা। পারলে তার চাকরি।

লেখাপড়ায় ভালো ছিল বরাবরই। ব্যবহারিক পরীক্ষার ফলও ভালো। কাঠ তার কাছে শোলা। শুধু যোগ্যতায় হয় না বলেই চাকরি হয়নি আজো। কিন্তু এ কেমন পরীক্ষা! কাচের জানালা কীভাবে ভাঙবে সে?

তবু। চেষ্টা করতে দোষ কী?

তাই লেগে পড়ে কাজে। বীরবিক্রমে ঠোকরাতে থাকে। কিন্তু কাচ ভাঙে না, ভাঙে ঘুম।

সেই থেকে স্বপ্নটাকেই তার সত্য মনে হয়। মনে হয় কাচটা ভাঙলেই তো চাকরি। অন্যান্য চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে তাই এটাও চলে। নিয়ম করে। কখনো সকাল। কখনো বিকেল। দিন যায়। মাস যায়। কিন্তু ভাঙে না জানালাটা। তবু হাল ছাড়ে না সে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখেছিল যার যত শব্দ, তা ততই হালকা। কাচটার আওয়াজ শুনে সাহস পায় তাই। আর ঠোকর মারে।

তাই কি? এটাই কি কারণ ওই পাগলামির?

ভাবনাটা আর এগোল না।

মেঝেতে খবরের কাগজ পাতা। তাতে সাজানো তার বই। তার মধ্যে একটা ইঁদুর ঢুকতে দেখা গেল। তাড়াতে হবে। নইলে একটা  বইও আস্ত রাখবে না।

ইঁদুর তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছেলেটা।

----চার----

ওই দালানেরই দ্বিতীয় তলার কথা।

আগেরটার মতোই জানালা। কাঠের পাল্লা। লোহার শিক। গরাদের মতো। লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কেউ দাঁড়ালে বাইরে থেকে কয়েদি মনে হয়।

এ-মুহূর্তে একজন বসে আছেন জানালাটার সামনে।

একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন ভদ্রলোক।

বউ পোয়াতি। আট মাস চলছে। বাপের বাড়ি আছে।

আজ ছুটির দিন না। কিন্তু ইচ্ছে করছিল না যেতে। তাই যাননি অফিসে। অসুস্থ বলে থেকে গেছেন।

এই যুগে অফিসই ঘর। ঘরই অফিস। কাজ থাকেই।

কিছু কাজ বাকি আছে। করতে হবে। ল্যাপটপটা চালু করলেন। শুরু হলো কাজ। হঠাৎ খেয়াল হলো অনেকদিন কিছু দেখা হয় না। তার সংগ্রহ ভালো। বেছে বেছে একটা চালিয়ে দিলেন। বাসায় কেউ না থাকলে এ এক সুবিধা। উপভোগ করা যায় সময়টাকে।

যেভাবে খুশি সেভাবে। যখন খুশি তখন।

আয়োজন সম্পন্ন। এবার ডুব। দেবেন দেবেন করছেন। এমন সময় খেয়াল করলেন কাঠঠোকরাটার আওয়াজ। মনোযোগ        দিলেন সেদিকে। আগের ছেলেটা, আপনি এবং আমি অবাক হয়েছি। তারও হওয়ার কথা। হতেনও। কিন্তু নতুন বাড়িরই নিচতলার একটি   জানালা সুযোগটা দিলো না।

জানালা বরাবর ড্রেসিং টেবিল। তার সামনে ও-বাড়ির মেয়েটা। নিজেকে আবিষ্কারে মত্ত। এদিকে ঘুরছে। ওদিকে ঘুরছে। এটা ধরছে। ওটা মাপছে। চোখদুটো আয়নায়। আয়নাটাতে নেচে যাচ্ছে তার ছায়া। ছায়াটার পায়ে জুতো নেই। হাতে চুড়ি নেই। গলায় হার নেই। পোশাক নেই পরনে। সব ছাড়াও ছায়াটা এত সুন্দর! এত রূপসী! অবাক হয়ে তাই দেখছে ছায়ার অধিকারী দেহটা। আশ মিটছে না তার। বারবার দেখছে।

হঠাৎ থামল সে। কী যেন ভেবে ঘুরে তাকাল।

এ-বাড়ির ভদ্রলোক তখনো হাঁ। চোখ ঠিকরে আছে তার।       গোগ্রাসে উপভোগ করছেন কচি দেহটার নড়াচড়া। অকস্মাৎ ওই দৃষ্টির আঘাত তিনি প্রত্যাশা করেননি। অপ্রস্তুত হলেন। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। ধরা পড়লেন। একটু কি লজ্জা তাতে পেলেন? বোঝা গেল না।

মেয়েটার রং কিন্তু বদলে গেল। মনে হলো তার মাথাটা কাটা গেছে। লজ্জায়। কিছুই অনুভব করতে পারছে না সে। কিন্তু আড়াল যে নিতে হবে, সেটা বুঝল।

খুব গরম বোধ হচ্ছিল এ-বাড়ির কর্তার। ঠান্ডা হওয়া দরকার। একটু ভেজা দরকার। ভিজবেন। কিন্তু মনোযোগ হারালেন। আবার। রিংটোন বাজছে।

একটা গালি দিলেন। গালিটা দেখা যায় না কোনোভাবেই।

ফোন করেছেন তার বস।

-----পাঁচ-----

কিসের যেন আওয়াজ। ঘুম ভেঙে গেল। আওয়াজের উৎস খুঁজতে বাইরে তাকালেন ভদ্রলোক।

ঠক্ ঠক্ ঠক্।

ঠক্ ঠক্ ঠক্।

কাঠঠোকরা।

অসময়ে অজায়গায় পাখিটাকে দেখে খুব আগ্রহ বোধ করলেন তিনি।

কতদিন গ্রামে যান না। কোনো পাখি দেখেন না। কাঠবিড়ালি দেখেন না। পানকৌড়ি দেখেন না। কতদিন! পাখিটাকে খুব আপন মনে হলো। শৈশবের মতো।

আরেকটু ভালোভাবে দেখতে চাইলেন তাই; কিন্তু ক্ষমতা নেই। যে-হাত দিয়ে জানালাটা খুললেন, সেটা কাঁপছে। জানালার পাশে দাদুভাইর পরীক্ষার রুটিন সাঁটা। চোখ পড়ল। স্পষ্ট দেখতে পেলেন না। সবকিছু ঝাপসা। চশমাটা ও-ঘরে। নিয়ে আসতে আসতে যদি উড়ে যায় পাখিটা! তাই গেলেন না। আনলেও লাভ হতো না। পাওয়ার ঠিক নেই। দেখা যায় না ঠিকমতো।

চশমার চিন্তা বাদ দিয়েই তিনি দেখছেন পাখিটাকে। অস্পষ্ট লাগছে। তাতে কী? চিন্তা করতে পারলে দেখতে পারতে হয় না। ভাবলেন।

মনে হচ্ছে পাখিটার একটা ছেলে আছে।

ছেলেটা খুব ভালো কাঠ ঠুকতে পারে। চাকরি করে একটা কোম্পানিতে। কোম্পানিটা বাসা বানায়। অন্য পাখিদের জন্য। তার বেতন ভালো। কিন্তু উন্নতি হচ্ছে না। বাবার অসুখ। মার অসুখ। ছেলে পড়ছে। বউ আবার পোয়াতি হয়েছে। কাজে যেতে পারে না। চিকিৎসার খরচ আছে। অন্যান্য ব্যয় আছে। সব মেটাতে হাবুডুবু হাবুডুবু।

একটা কোচিং আছে তার। বাসার ডালে অফিস। কাজ থেকে ফিরে কোচিংয়ে যায়। গোটাপাঁচেক তরুণ কাঠঠোকরা পড়তে আসে। স্যার হিসেবেও ভালো সে। দারুণ করে পড়ায়। কীভাবে কাঠ ঠুকতে হয় পড়ায়। কীভাবে উড়তে হয় পড়ায়। কীভাবে হাসতে হয় পড়ায়। কীভাবে কষ্ট গোপন করে ভালো থাকতে হয় পড়ায়।

পড়ানো শেষে বাসায় ফিরে আবার পড়ায় :

বাবাকে। কীভাবে ওষুধ খেতে হয়। কীভাবে চশমার কাচ মুছতে হয়। কীভাবে চলতে হয়!

মাকে। কীভাবে ছানা পাখিদের কোলে নিতে হয়! বড় করতে হয়!

বউকে। কীভাবে খাবার তৈরি  করতে হয়! শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে কীভাবে খুঁজে নিতে হয় বাবা-মাকে।

তারপর খায়। তারপর শুতে যায়। তখন তার বড় ছেলেটা তাকে পড়ায়। বাতাসে কিসের গন্ধ থাকলে ঝড় হয়। কোন তারা কোথায় থাকলে ভোর হয়। কোন গাছের ছাল শক্ত কিন্তু কাঠ নরম। তার কোন স্যার সবচেয়ে ভালো। কোন ম্যাডামটা বেশি সুন্দর। ইত্যাদি। পড়তে পড়তে ঘুম আসে তার। ঘুমিয়ে যায়। তারপর রাত গভীর হয়। তারপর ফ্যাকাশে হয়। তারপর সকাল। তারপর কাজে যায় সে।

যায়, বিকেলে ফেরার আশায়।

যায়, ওষুধ নিয়ে আসবে বলে।

যায়, বাইরে গেলে ঘরে ফেরা নিয়ম বলে।

দিনশেষে ফিরেও আসে।

আবার পড়ায়। আবার ঘুমোয়। আবার ওঠে। আবার যায়। আবার আসে। আবার যায়।

একদিন হোঁচট খায় নিয়মটা। ফেরা হয় না তার।

ফেরা হয় না পরের দিনও।

তার পরের দিনও।

তার পরের দিনও।

ফেরে না সে।

তার বাবা, মানে ওই কাঠঠোকরাটা, চিন্তায় পড়ে যায়। ছেলে তার আসে না কেন। ওষুধ শেষ। তার মা, মানে কাঠঠোকরাটার বউ, চিন্তায় পড়ে। ছেলে তার আসে না কেন। বাত বেড়েছে।

তার বউ, মানে কাঠঠোকরাটার ছেলের বউ, চিন্তা করে। স্বামী তার আসে না কেন। খাবার নেই। তার ছেলে, মানে ওই কাঠঠোকরার নাতি, চিন্তায় পড়ে। কাল পরীক্ষা। বেতন নাকি। বাবা তার আসবে কবে।

কী হলো তার? কোথায় গেল? এমন কেন? কেন আসে না?

সব চিন্তা বোঝা হয়। আশ্রয় নেয় কাঠঠোকরাটার মাথায়। অচল পাখি সে। পাখা মেলতেই হাঁপিয়ে ওঠে। তবু প্রতিদিন বের হয়। খুঁজে আসে ছেলেকে। পায় না।

একজনের কাছে জানতে চায়। দেখো হয়তো পেট্রল বোমায় পুড়েছে। সে বলে।

আরেকজনের  কাছে জানতে চায়। দেখো কেউ কুপিয়েছে কি না। সে বলে।

আরেকজন বলে অন্য কথা। দেখো মাদক বেচার দায়ে পুলিশে ধরেছে কি না।

দেখো গুলিতে মরল পড়ল কি না। শিশুহত্যার দায়ে গণপিটুনিতে মরল কি না। গুম হলো কি না। আরেকটা বিয়ে করে পালিয়ে গেল কি না।

সবাই যার যার মতো সমাধান দেয়। কিন্তু ছেলে তার ফেরে না।

তাই আবার বের হয়। পায় না।

আবার বের হয়। পায় না।

বাবার বুক ছিঁড়ে যায়। মার বুক ছিঁড়ে যায়। বউয়েরও। আর কারো কিছু হয় না। না প্রতিবেশীদের। না পথচারীদের। তাদের যেন বুকই নেই! কাঁপবে কী! অথবা পাখিটা যেন কেউ না। তার জীবনের কোনো দাম নেই। তার থাকা-না-থাকার কোনো গুরুত্ব নেই! এ কেমন সময়! অবাক লাগে বাবার।

একদিন বেরিয়েছে বাবা পাখিটা। ছেলের কারখানায় যাবে। কিন্তু ঠিকানা জানে না। উড়তে উড়তে এদিকে চলে এসেছে। যাওয়ার সময় থামল নতুন বাড়িটা দেখে। বাকশোর মতো বাড়ি। সাদা। গায়ে খোপ খোপ। খোপগুলো নীল। এমনই এক নীল খোপের ভেতর ছেলের দেখা পাওয়া গেল। কিন্তু এ কি? ছেলেটা যে বুড়ো হয়ে গেছে! তার মতো। তার পাখনা তার পা তার চোখ তার ঝুঁটি সব তো তার মতো। তার মতো করে উড়ছে। তার মতো করে ডানা ঝাপটাচ্ছে। কী করে হলো! এই কদিনে!

এত চিন্তার সময় এখন না। ওকে বের করতে হবে আগে।

সেই থেকে ঠুকরিয়ে যাচ্ছে সে। ভেতর থেকে ছেলেও ঠোকরাচ্ছে। তার মতো করেই। দেখছে সে। কিন্তু দেয়ালটা ভারি শক্ত। ছিদ্র হচ্ছে না। হাল ছাড়ার পাত্রও সে নয়। ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে। যদি না পারে? যদি সে দমবন্ধ হয়ে মরে?

এটুকু ভেবেই পড়ে গেলেন লোকটা। জানালার একটা শিক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেটা খুলে গেছে বলেই পড়ে গেছেন। উঠতে হবে তাকে। কাঠঠোকরাটার কী হলো জানা দরকার। কিন্তু মাথা তুলতে পারছেন না। চোখজুড়ে অন্ধকার।

-----ছয়-----

পাখিটার সমস্যা গুরুতর।

চাকরি করে সে। করে তার সঙ্গীও।

সংসার দেখে সে। দেখে তার সঙ্গীও।

তার বাবা-মা গরিব। গরিব তার সঙ্গীর বাবা-মাও। সবাই থাকে গ্রামে।

তার সঙ্গী তার মা-বাবার খরচ দেয়। কিন্তু সে দিলে দোষ। নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কিছুই করা যাবে না।

সঙ্গীটা তার যখন-তখন বাইরে যায়, যখন-তখন আসে, যার-তার সঙ্গে মেশে। ঠিক আছে। কিন্তু তার কাজ একটু দেরিতে শেষ হলে বা মেঘ করলে বাসায় ফিরতে দেরি হলে, হতেই পারে, বা অফিসের কোনো আয়োজন তার বিলম্ব ঘটালে, টেকা যায় না। চাকরিটা তাই ছেড়ে দিতে হলো! কারো সঙ্গে কথা বলা যাবে না। হাসা তো যাবেই না। তার কোনো বন্ধু বা বান্ধবী বা আত্মীয় বাসায় আসতে পারবে না।

না।

হুট হাট করে বাসায় চলে আসে সঙ্গীটা। খুঁজে দেখে কেউ আছে কি না! সন্দেহ সারাক্ষণ।

কিছু হলেই বাপ-মা তুলে গালাগাল। বাবা-মা গরিব বলেই হয়তো।

সহ্য হয় না এই কারাগার জীবন। বুক ভেঙে যায়।

ভালো লাগে না কিছুই। মন বসে না। বাড়ির কথা মনে পড়ে। ছোট ভাইটার কথা মনে পড়ে। খেতে বসলেই মনে হয় ওরা না খেয়ে আছে। পরতে গেলেই প্রশ্ন জাগে ওরা পরছে কী? মাখতে গেলেও চিন্তা হয়। কিন্তু কিছু করতেও পারছে না। দুই ডানা বাঁধা। প্রিয় টিং টংয়ের কথা মনে পড়ে। পড়ে আছে গ্রামে।

কত স্মৃতি কত কথা কত খুশি মেঘে মেঘে আঁকা হয়, ও দেখে। ছুঁতে পারে না। তাই বৃষ্টি ঝরে চোখে।

টিংটংয়ের সঙ্গে ঘর হলে নিশ্চয় এমন হতো না। মনে হয় ছুটে যায় তার কাছে। মানুষ যদি হতো, হেঁটেই পাড়ি দিত হাজার মাইল, বাড়ি চলে যেত।

কিন্তু পারে না। কাজে যাওয়ার সময় বাসা বন্ধ করে যায় সঙ্গীটা!

কথা বলা যায় না। বের হতে পারে না। পাখিটা তাই মাথা কুটে মরে। কাচের দেয়ালে।

ভাবছিল একটি মেয়ে। আগের বাড়িটার পাশের বাড়িতে বাস তার। বাড়িটার অবস্থা বেশ ভালো। আগেরটার মতো পুরনো নয়। জানালার শিকে জং নেই। আছে রঙের নকশা। সেই নকশার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল মেয়েটাকে। রঙিন পোশাকে ঢাকা শ্যামলা রঙের গা। মুখটা বেজার। চোখটা আরো বেজার। বেজার সেই চোখদুটোয় কাঠঠোকরাটার ছায়া নাচছিল। আর সে ভাবছিল পাখিটার কাহিনি।

ভাবতে ভাবতে থামল মেয়েটা। পাখিটা মাথা কুটছে না, কুটছে ঠোঁট। শুধরে নিল। তাছাড়া বের হতে না পারাটাও ভুল। পাখিটা জানালার বাইরে থেকেই ঠোকরাচ্ছে। গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে হলে সে তো যেতেই পারে। তার মানে ঘটনা অন্য। কী হতে পারে? সেটা খোঁজার সুযোগ সে পেল না। চুলায় দুধ ছিল। পোড়া লেগেছে। গন্ধ ছুটেছে। ছুটতে হলো তাকেও।

কয়েকবার পড়লাম গল্পটা। ইনিয়ে-বিনিয়ে। বুঝলাম না কিছুই! কিন্তু ও নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। কাজ ছিল। করলাম। একটু ঘুরলাম শহরটাতে। বিকেলে চেক আউট করলাম। বাড়ি ফিরব। বাসস্ট্যান্ডে দেখা হলো বন্ধুটির সঙ্গে! কাল থেকে অপেক্ষা করছে আমার জন্য! কী এক ঝামেলায় আটকে গিয়েছিল। তাই আসতে পারেনি সময়ে। তারপর থেকে ওঠেনি আর। যদি আমি আসি! কী গাধামিটাই না করেছি।

ফেরা হলো না। যা হোক। বন্ধুর বাড়ি শহরের কাছেই। নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায়।

চমৎকার বাড়ি! আধুনিক ফিটিংস। পরিবারটাও দারুণ। বোনটা তো আপু আপু করে পাগল করে তুলল। একটা ঘর দেওয়া হলো আমাকে। তিনতলায়।

দুদিন ছিলাম।

দুদিনই দেখেছি একটা কাঠঠোকরা ঠোকরাচ্ছে আমার জানালার কাচ। ওই গল্পের মতো করে! আগে থেকেই কি ঠোকরায়? জিজ্ঞেস করেছিলাম। না। সেদিনই প্রথম দেখল ব্যাপারটা। সবকিছু খুব অদ্ভুত ঠেকল আমার কাছে। কিন্তু কোনো বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তা করলে সেটা পেয়ে বসে। তাই পাত্তা দিলাম না।

তবু রেহাই নেই।

বাড়ি এলাম যেদিন, তার পরদিন বিকেল থেকে আমার জানালায়ও তার দেখা মিলছে। প্রথমে শুধু ঘুরত। উড়ত। এখন ঠোকরায়!

যখন খুশি, তখন। প্রতিদিন।

বছর ঘুরতে চলল, কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

এবং এ-কারণেই কিনা জানি না। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। সম্ভবত।

যেখানেই থাকি, যতদূরেই থাকি, ঠক্ ঠক্ আওয়াজটা শুনতে পাই। বুকে ব্যথা হয় ঠোকরের তালে। মনে হয় প্রতিটা ঠোকর পড়ছে আমার বুকে। কাচে নয়।

বিশ্বাস করছেন না, তাই না? দোষ দেবো না আপনাকে। আমার বর বিশ্বাস করেনি। পরিবার করেনি। প্রতিবেশী না, ডাক্তারও না। অথচ আমি এখন বাড়ি নেই। আছি অনেক দূরে। আপনার কাছে।

এই যে শুনুন। ঠক্ ঠক্ আওয়াজটা! শুনতে পাবেন।

একটু খেয়াল করুন!