Saturday, January 17, 2015

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থেই গুয়ান্তানামো বন্ধ করতে হবে : ক্যামেরনকে ওবামা

কুখ্যাত কারাগার গুয়ান্তানামো বেতে বিনা বিচারে ১৩ বছর আটকে থাকা শাকের আমেরের মুক্তির ব্যাপারে চেষ্টা করবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। শুক্রবার রাতে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সাথে এক সাক্ষাতে ওবামা এ আশ্বাস প্রদান করেন বলে জানায় ডেইলি মেইল। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন শাকের আমেরের মুক্তির ব্যাপারে গুরুত্বের সাথে কথা বলার পর প্রেসিডেন্ট ওবামা তাকে আশ্বস্ত করেন। এ ছাড়া তিনি বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করবেন বলেও জানান। শাকের আমের সৌদি বংশদ্ভোত ব্রিটিশ নাগরিক। স্ত্রী  ও চার সন্তানসহ দক্ষিণ লন্ডনে থাকতেন। ২০০২ সালে পরিবারসহ আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন। সেখানে ওসামা বিন লাদেনের অনুচর সন্দেহে গ্রেফতার হন। পরে তাকে কিউবার কুখ্যাত  বন্দী নির্যাতন কেন্দ্র গুয়ান্তানামো বেতে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ১৩ বছর বিনা বিচারেই  তাকে আটকে রাখা হয়। সংবাদমাধ্যমের  কাছে তার আইনজীবি অভিযোগ  করেন,  এ  ১৩ বছরে তার ওপর অকথ্য ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে।  কম  ঘুমুতে দেয়া  হয়েছে, নাক ও মুখের  ওপর কাপড় বেঁধে ঠাণ্ডা পানি ঢালা হয়েছে। এতে পানিতে  ডুবে থাকার মতো  কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তাকে। আইনজীবি জানান, শাকের আমেরকে কখনো প্রস্রাব খেতে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার যুক্তরাজ্যের  পক্ষ থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা  হয়েছে। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার  পর কোথায় ফিরে যাবেন, এ বিষয়টি  সুরাহা না  হওয়ায় তার মুক্তির বিষয়টিও ঝুলে আছে। আমেরের পরিবার ও  ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে যুক্তরাজ্যেই ফিরিয়ে নিতে চাইছে। কিন্তু মুক্তির পর  তাকে অবশ্যই সৌদি আরবে ফিরে যেতে হবে বলে কারাগারের পক্ষ থেকে শর্ত জুড়ে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এ বিষয়ে  সোচ্চার হয়েছেন। সর্বশেষ গত রাতে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট  ওবামার  কাছে বিষয়টি উত্থাপন  করলেন। এর আগে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে গুয়ান্তানামো থেকে আরো ১২ যুক্তরাজ্যের  নাগরিককে ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে  আনার বিষয়টি উত্থাপন করলে প্রেসিডেন্ট ওবামা তার মুক্তির ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চেষ্টা করবেন বলে কথা দেন। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট বুশের প্রতিষ্ঠিত কুখ্যাত এ কারাগারটি বন্ধ করবেন বলেও আশ্বস্ত করেন। এ ব্যাপারে ডেভিড  ক্যামেরন বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কথা  বলেছি। আমি জানি, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির স্বার্থেই তাদেরকে গুয়ান্তানামো বে করাগার বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র বারনাডেটা মেহান  বলেন, প্রথানমন্ত্রী ক্যামেরন বিষয়টি উত্থাপন করার পর প্রেসিডেন্ট তাকে বলেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন ব্রিটিশদের কাছে কেন এটি গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার  স্বার্থেই তাকে গুয়ান্তানামো বন্ধ করতে হবে।

বেলজিয়ামে পুলিশের গুলিতে দুই ‘জঙ্গি’ নিহত -ইউরোপের কয়েক দেশে গ্রেপ্তার ২৭

(বেলজিয়ামের ভের্ভিয়ে শহরে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের সঙ্গে গোলাগুলির পর পুলিশের সতর্ক পাহারা l ছবি: এএফপি) এবার ফ্রান্সের পাশের দেশ বেলজিয়ামে সন্দেহভাজন জঙ্গি ও পুলিশের সংঘাত হলো। এ ঘটনায় নিহত হয়েছে সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি। বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনার সময় আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরেকজনকে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ১২ জনকে। বেলজিয়ামের ওই ঘটনার পর জার্মানি ও ফ্রান্সের কর্মকর্তারা অন্তত ১৪ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছেন। প্যারিসে গত সপ্তাহেই বন্দুকধারীদের হাতে ১৭ জন নিহত হওয়ার পর এসব ঘটনায় ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ বেড়ে গেছে। বেলজিয়ামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও সিএনএনের। বেলজিয়ামের কর্মকর্তারা জানান, একটি সন্ত্রাসবাদী হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছে এ রকম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গত বৃহস্পতিবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এর আওতায় ওই দিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় পূর্বাঞ্চলীয় ভের্ভিয়ে শহরে অভিযান চালায়। জার্মানির সীমান্তবর্তী ভের্ভিয়ে শহরের ওই ঘটনায় জঙ্গিদের দলটিতে কমবেশি ১০ জন ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেেটর (আইএস) পক্ষে লড়াই করে ফিরে আসা। বেলজিয়ামে মারাত্মক কোনো সন্ত্রাসী হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে ছিল তারা।
পুলিশ জানিয়েছে, তল্লাশির সময় কয়েকজন সন্দেহভাজন বিশেষ বাহিনীকে লক্ষ্য করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে অতর্কিত গুলি ছোড়ে। এরপর কয়েক মিনিট ধরে বন্দুকযুদ্ধ চলে। এতে দুই সন্দেহভাজন নিহত হয়। তৃতীয় একজনকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ঘটনার পর বেশ কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি কালাশনিকভ (একে-৪৭) রাইফেল ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম।
বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর রাজধানী ব্রাসেলস ও এর আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের তল্লাশি অভিযানে নামে পুলিশ। এসব অভিযানের সময় গ্রেপ্তার করা হয় সন্দেহভাজন আরও ১২ জনকে। কেন্দ্রীয় সরকারি কৌঁসুলি এরিক ভন দার সিপ্ত বলেছেন, ওই বন্দুকধারীদের লক্ষ্য ছিল সড়কে বা থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা। চলমান তল্লাশি অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ১২টি বাড়িতে তল্লাশি শেষ করেছি। ’ তিনি জানান, তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত এসব ঘটনার সঙ্গে গত সপ্তাহে প্যারিসে হামলার যোগসূত্র পাননি।
প্যারিসে গ্রেপ্তার ১২: ফ্রান্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা গত সপ্তাহে প্যারিসে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন বন্দুকধারীর একজন আমেদি কুলিবালির সহযোগী বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার প্যারিসের একটি রেলস্টেশন বোমা হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে প্যারিসের বাইরে কোলম্ব শহরে গতকাল একটি ডাকঘরে দুই ব্যক্তিকে জিম্মি করে একজন বন্দুকধারী। তবে কিছুক্ষণ পর সে আত্মসমর্পণ করে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।
জার্মানিতে গ্রেপ্তার ২: জার্মানির কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা তুরস্কের নাগরিক।

যে কেলেঙ্কারি রুসেফের গলার কাঁটা

(ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ও ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান দিলমা রুসেফ। ছবি: এএফপি) প্রথমবার বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন দিলমা রুসেফ। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে তিনি হারতে বসেছিলেন। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী এসিও নেভিসের চেয়ে মাত্র ৩ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন রুসেফ। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা রুসেফের জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বলা যায়, এটা তাঁর গলার কাঁটার মতো।  পেট্রোব্রাসের আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ইকোনোমিস্ট সাময়িকী।‘করাপশন ইন ব্রাজিল, দ্য বিগ অয়েলি’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে তেল কোম্পানির আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পোট্রোব্রাসের আর্থিক কেলেঙ্কারি এখনো অশুভ সংকেত হিসেবে রুসেফের মাথার ওপর ঝুলছে। এ কেলেঙ্কারি তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গত বছরের মার্চে নতুন করে এ ঘটনা আবার শুরু হয়। অর্থ পাচারের তদন্তে পেট্রোব্রাসের ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল মেয়াদ পর্যন্ত থাকা প্রেসিডেন্ট পাওলো রবার্তো কস্তাকে আটক করে কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ। কস্তা এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরতে আহ্বান জানিয়েছেন। কস্তার দাবি, তাঁর বিভাগ থেকে যেসব কোম্পানি কাজ পেয়েছে, সেগুলোর শতকরা ৩ শতাংশ মূল্য রাজনৈতিক দলের ক্ষুদ্র তহবিলে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৮ হাজার ৯০৬ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করেছে পুলিশ। পেট্রোব্রাসের এ কেলেঙ্কারিকে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে গত নভেম্বরে ব্রাজিলের ছয়টি বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২৪ জন নির্বাহী কর্মকর্তাকে আটক করে পুলিশ। এঁদের সঙ্গে পেট্রোব্রাসের সাবেক এক নির্বাহী প্রধানও রয়েছেন। এ ছাড়া কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এমন ৩০ জনকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। আবার তাঁদের অধিকাংশই দিলমা রুসেফের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে যুক্ত।
এ দুর্নীতি রুসেফের জ্ঞাতসারে হয়েছে—এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আগের প্রেসিডেন্ট লুলা দি সিলভার মন্ত্রিসভার জ্বালানিমন্ত্রী ছিলেন রুসেফ। এ কারণে রুসেফ পেট্রোব্রাসের চেয়ারম্যান ছিলেন। আর ওই সময়ে এসব আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। পেট্রোব্রাসের সাবেক ব্যবস্থাপকের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রধান মারিয়া দাস গ্রে অ্যাস ফস্টার এবং অন্যান্য নির্বাহীদের অনিয়মের ব্যাপারে কোম্পানিকে তিনি অবহিত করেছেন। কিন্তু অন্য কর্মকর্তাদের অনিয়মের ব্যাপারে ফস্টার কিছু জানেন—কোম্পানি এমন অভিযোগ অগ্রাহ্য করেছে। ফস্টার রুসেফের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এ কেলেঙ্কারি আগামী দিনগুলোতে প্রধান শিরোনাম হবে। আর্থিক কেলেঙ্কারিতে যুক্ত এমন ২৮ রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম বলেছেন কস্তা। তাঁরা সবাই আবার সংসদীয় বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন। একমাত্র সুপ্রিম কোর্টই তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারবেন।
এদিকে গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় পেট্রোব্রাসের শেয়ার মূল্য অর্ধেকের বেশি কমে গেছে। শেয়ারের দরপতন ক্ষুদ্র শেয়ার মালিকদের উত্তেজিত করেছে। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের প্রিভডেন্স নগরের ক্ষতিগ্রস্ত এক বিনিয়োগকারী নিউইয়র্কের আদালতে মামলা করেছেন। মামলায় রুসেফকে সম্ভাব্য সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পেট্রোব্রাস দুর্নীতিবিরোধী আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে। সবদিক বিবেচনা করে ২০১৫ সালে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিন প্রধানকে ২০ দলের চ্যালেঞ্জ

জনসভায় ‘রাজনৈতিক’ বক্তব্য দেয়া নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের উর্দি খুলে রাজনীতির মাঠে নামার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা বলেছেন, রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের রাজনীতির মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব কর্মচারীর রাজনৈতিক খায়েশ রয়েছে আমরা তাদের উর্দি খুলে প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতি মাঠে নামার আহ্বান জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গতকাল শুক্রবার রংপুরের মিঠাপুকুরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘যারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেছে, তার খেসারত জনগণ দেবে না। বিএনপি-জামায়াতকেই এর খেসারত দিতে হবে। এদেশে আমরা আর কোনো অশুভ শক্তির উত্থান হতে দেব না।’
তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনের দাবি তুলে যারা এভাবে হরতাল অবরোধের নামে নাশকতা সন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা করছে, তারা আসলে কী চায়? দেশে তো সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে। জনগণ ভোট দিয়েছে। যারা নির্বাচন চায়নি তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে এরকম সন্ত্রাস করেছে।’
এ অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াতের সংখ্যা খুবই কম দাবি করে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের সংখ্যা খুবই কম। এদের নিশ্চিহ্ন করা কোনো ব্যাপারই নয়। আমরা এই অপশক্তিকে ২০১৩ সালে রুখে দিয়েছি। এবারও রুখে দেব ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলা যারা দেখতে চায় না। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চায় না। মানুষ দু’বেলা খেয়ে পরে ভালো থাকুক এসব চায় না। তারা খুনি। তাদের এদেশে প্রয়োজন নেই। তাদের দমনে যা যা করা দরকার সবই করা হবে।’
এটি ছিল সন্ত্রাস ও নাশকতারোধে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা।
এর প্রতিবাদে ২০ দলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রংপুরের মিঠাপুকুরে আইজিপি ও র‌্যাবের ডিজি জনসভায় রাজনীতিবিদদের ভাষণ দেয়ার মতো করে রীতিমতো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বিরোধী দল ও জনগণকে কঠোর ভাষায় হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। দেশে জাতীয় নির্বাচন কখন হবে না হবে সে ব্যাপারে তারা মন্তব্য করেছেন। আন্দোলনকারীদের জীবননাশের হুমকি দিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার কথা বলেছেন। বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কটূক্তি করে তারা ক্ষমতাসীদের রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন।
এর আগে বিজিবির ডিজিও প্রেস করফারেন্স করে একইভাবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে তারা আরো বলেছেন, এসব ঘটনা স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে অকল্পনীয়। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে বেতন-ভাতা গ্রহণকারী প্রজাতন্ত্রের এসব কর্মচারীর এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। দেশে জনপ্রতিনিধিত্বশীল কোনো সরকার থাকলে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও এখতিয়ার বহির্ভূত এমন সব বেআইনি বক্তব্য প্রদানের দায়ে তাদেরকে অবশ্যই চাকরিচ্যুত করে আইনামলে আনা হতো।
তারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীনরা এতোটাই দেউলিয়া হয়ে পড়েছে যে, এখন রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের রাজনীতির মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব কর্মচারীর রাজনৈতিক খায়েশ রয়েছে আমরা তাদেরকে উর্দি খুলে প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতি মাঠে নামার আহ্বান জানাচ্ছি।
একই সঙ্গে জনগণের পাশে থেকে তাদের আইনসম্মত পন্থায় কর্তব্য পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

‘খায়েশ থাকলে উর্দি খুলে রাজনীতিতে নামুন’ -২০ দলীয় জোট

নিরাপত্তাবাহিনীর যেসব কর্মচারীর রাজনৈতিক খায়েশ রয়েছে তাদের উর্দি খুলে ও প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে নামার আহ্বান জানিয়েছে ২০দল। গতকাল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। সেই সঙ্গে চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ, সহিংসতা বন্ধ ও বিরোধী দলের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের দেয়া বিবৃতির প্রতি সমর্থণ প্রকাশ করেন। তবে এ আহ্বানের প্রেক্ষিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাদের সংশয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ, সহিংসতা বন্ধ এং বিরোধী দল ও জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে তার প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আমরা এটিকে স্বাগত জানাই। সমস্যাটি যে রাজনৈতিক এবং বিরোধী দলের কর্মসূচি পালনে ক্ষমতাসীনদের বাধা প্রদান ও নির্যাতন থেকে উদ্ভূত তারা তা অনুধাবন করেছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তবে সহিংস ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের যে আহ্বান ক্ষমতাসীনদের প্রতি জানানো হয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের এবং বাংলাদেশের জনগণের সংশয় রয়েছে। কারণ, ভোটার-বর্জিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনী প্রহসনে ক্ষমতা জবরদখলকারীরা প্রশাসন, আইনশৃৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ ও তদন্ত প্রক্রিয়াসহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রথা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরম দলীয়করণের মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত করেছে। এদের মাধ্যমে কোনো নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও কার্যকর তদন্ত সম্ভব নয়। কাজেই রিয়াজ রহমানসহ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ওপর গুলি ও বোমা হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর প্রহরাধীনে চলাচলরত যানবাহনে রহস্যজনক হামলায় মানুষ পুড়িয়ে মারার মত নৃশংস ঘটনাবলীর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এদের দ্বারা সম্ভব নয়। এমন পৈশাচিক কার্যকলাপ অতীতে আন্দোলনের নামে তারাই করেছে, বর্তমানে যারা ক্ষমতাসীন। সাম্প্রতিকালে তাদের দলভুক্ত সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে ঘটনাস্থলে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, বোমাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হলেও তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আর মিথ্যা মামলায় বাড়ি-ঘরে হানা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন, গুম ও হত্যা করা হচ্ছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ধ্বংস এবং পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। বিবৃতিতে সেলিমা রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষপদে এমন সব চরম দলবাজ লোকদের বসানো হয়েছে যে, তারা এখন আইনকানুন এবং তাদের আওতা, পরিধি ও কর্তব্যের সীমারেখা মেনে চলারও ধার ধারছে না। গত শুক্রবার রংপুর জেলা মিঠাপুকুরে পুলিশের আইজি ও র‌্যাবের ডিজি জনসভায় রাজনীতিবিদদের ভাষণ দেয়ার মত করে রীতিমত রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। তারা বিরোধী দল ও জনগণকে কঠোর ভাষায় হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। দেশে জাতীয় নির্বাচন কখন হবে না হবে সে ব্যাপারেও তারা মন্তব্য করেছেন। আন্দোলনকারীদের জীবননাশের হুমকি দিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার কথা বলেছেন। বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কটূক্তি করে তারা ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এর আগে বিজিবি’র ডিজিও প্রেস কনফারেন্স করে একইভাবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, এসব ঘটনা স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে অকল্পনীয়। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে বেতন-ভাতা গ্রহণকারী প্রজাতন্ত্রের এসব কর্মচারির এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। দেশে জনপ্রতিনিধিত্বশীল কোনো সরকার থাকলে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও এখতিয়ার বহির্ভূত এমন সব বেআইনি বক্তব্য প্রদানের দায়ে তাদেরকে অবশ্যই চাকরিচ্যুত করে আইনামলে আনা হতো। সেলিমা রহমান বলেন, আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, ক্ষমতাসীনরা এতটাই দেউলিয়া হয়ে পড়েছে যে, এখন রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের রাজনীতির মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর যেসব কর্মচারীর রাজনৈতিক খায়েশ রয়েছে আমরা তাদেরকে উর্দি খুলে প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে ইস্কফা দিয়ে রাজনীতির মাঠে নামার আহ্বান জানাচ্ছি। নিরাপত্তা বাহিনীর সকল সদস্যের প্রতি আমাদের আহ্বান, সুবিধাভোগী ও উচ্চাভিলাসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এই সমস্ত দলবাজ কর্মকর্তাদের বেআইনি আদেশ-নির্দেশ মানতে আপনারা বাধ্য নন। আপনারা প্রকৃত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জনগণের পাশে থাকবে এবং আইনসম্মত পন্থায় কর্তব্য পালন করবেন। বিবৃতিতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জে ১১ হত্যাসহ গুম-খুনের বিভিন্ন ঘটনা বিতর্কিত র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি দেশে-বিদেশে উঠেছে। এই কালিমা দূর করে র‌্যাবের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার বদলে নতুন ডিজি আরো বিতর্কিত ও গণবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের কারো কারো নিকটাত্মীয়রা পর্যন্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। কাজেই এ ধরনের দলবাজ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সন্ত্রাস ও নাশকতা রোধে কোনো নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা আশা করা যায় না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জল অতীত রয়েছে। তারা অতীতে সব সময়েই জনগণের পাশে থেকে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকার এবং সুবিধাভোগী ও দলবাজ কতিপয় কর্মকর্তার কারণে তা যেন ভুলুণ্ঠিত না হয়, আমরা সে আহ্বান জানাচ্ছি।

‘আলোচনায় বসতেই হবে’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন আমি আশঙ্কা করে বলেছিলাম, দেশে আবারও জ্বালাও পোড়াও শুরু হবে। সব রাজনৈতিক দলগুলোকে আহবান জানিয়েছিলাম এক টেবিলে বসার। কেউ আমার কথা শুনলেন না, শেষ পর্যন্ত মনে হয় আলোচনায় বসতেই হবে। শনিবার বিকালে রাজধানীর কাকরাইলস্থ জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত শান্তি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি শান্তির ডাক দিয়েছি। আসুন এই আন্দোলনকে বেগবান করি। জাতীয় কনভেনশন করি। আলোচনার পথ খুঁজে বের করি। সরকার  জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করে এরশাদ বলেন সরকারের দায়িত্ব মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। আমি বলব, সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য সরকারকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে এরশাদ বলেন, ইজতেমার মধ্যেও অবরোধ প্রত্যাহার করলেন না আপনারা? কোন ধরণের মুসলমান আপনারা? আর মানুষ পুড়িয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যায় না। ক্ষমতায় যাওয়া যায় মানুষের ভালোবাসা নিয়ে। তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কত লাশের  প্রয়োজন আপনাদের? ভাগ্য পরিবর্তনের নাম করে পুড়িয়ে মারছেন, একি রাজনীতি? সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, আমাদের সেøাগান শান্তির জন্য পরিবর্তন। তাই পরিবর্তন আনতেই হবে। শান্তি সমাবেশে  নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেন, ২৪ বছর আগে শান্তির জন্য ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ বলছি আপনারা ঘরে বসে থাকলে হবে না,  এর প্রতিবাদ করতে হবে। আপনারা চুপ করে থাকবেন না। রাস্তায় নেমে আসুন। আজ না হয় কাল পরিবর্তন করতেই হবে।
 জাপা চেয়ারম্যান বলেন, দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ-বিএনপির অপরাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। মানুষ দুইদল মুক্ত বাংলাদেশ চায়। এভাবে বসে থাকলে চলবে না। এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। এদের ঘৃণা করুন। আমরা শান্তির রাজনীতি চাই। এরশাদ বলেন, জাতি আজ এক মহাদুর্যোগে। সুনামিÑঘূর্নিঝড় প্রাকৃতিক। এবারের মহাদুর্যোগ মানুষের সৃষ্টি। মানুষের প্রতি মানুষের কোন সহমর্মিতা নেই। দেশে এখন চলছে বর্বরতা, হিংস্রতা। মানুষের রক্ত নিয়ে হুলিখেলা চলছে। আমরা শুধু চাই ক্ষমতা। যারা এগুলো করছেন তারা কি মানুষ না। মানুষ মেরে কি ক্ষমতায় আসা যায়। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কতো লাশ দরকার আপনাদের? নতুন বছরে আপনারা জাতিকে কি উপহার দিয়েছেন?  তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, একটি দল জনগণকে জিম্মি করে রাজনীতি করতে চায়। দেশ ধ্বংস হচ্ছে। কল-কারখানা বন্ধ হচ্ছে। আপনারা বলছেন জনগণ ক্ষমতার উৎস। আবার আপনারাই তাদের পুড়িয়ে মারছেন। এ কেমন রাজনীতি! জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার সভাপতিত্বে শান্তি সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফয়শল চিশতী, আবুল কাশেম, এম এ হান্নান, হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, যুব সংহতির সভাপতি এডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক অনন্যা হুসেইন মৌসুমী, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্য সচিব মোবারক হোসেন আজাদ, মৎসজীবী পার্টির আহ্বায়ক সোমনাথ দে প্রমুখ।

পুলিশ প্রধানের বক্তব্য ধৃষ্টতাপূর্ণ- বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে: ২০ দল

বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ২০ দলীয় জোট। শনিবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই কথা জানানো হয়। ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ ২০ দলীয় জোটের সকল পর্যায়ের আটককৃত নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয় ওই বিবৃতিতে। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্রমাগতভাবে মানুষের অধিকারগুলো সংকুচিত করেছে। বিশেষভাবে গণতন্ত্রে যে বিরোধী দলের বিশেষ একটি জায়গা আছে সেটিকে তারা কখনই বিশ্বাস করেনি। গণতন্ত্রে স্বীকৃত বিরোধী দলের সকল কর্মকান্ডকে বানচাল করতে তারা দমননীতি অবলম্বন করেছে। তাদের দমননীতি অমানবিক, মধ্যযুগীয় এবং নাজি ফ্যাসিষ্টদের সমতুল্য। শুধুমাত্র কথা বলা, সভা, সমাবেশের অধিকারগুলোই তারা হরণ করেনি বরং নাজিদের কায়দায় বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে অবরুদ্ধ, কারারুদ্ধ, মিথ্যা মামলাতেই জড়ানো হয়নি, অনেককে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সমাজের নানাস্তরের মানুষসহ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম, গুপ্তহত্যা ও ক্রসফায়ারের নির্মম শিকার হতে হয়েছে। ফলে এই পৈশাচিক দুঃশাসনকে মোকাবিলা করার জন্য ২০ দলীয় জোট গঠন হওয়ার পর থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষের হারানো অধিকার পুনঃরুদ্ধারের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ২০ দলীয় জোটের অসংখ্য নেতাকর্মীদের হত্যা করে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী মহাজোট সরকার অবৈধ একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করে আরো বেশি নির্দয় ও নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মানুষের ভোটাধিকার পুনঃরুদ্ধার, বাক, ব্যক্তি ও সমাবেশের অধিকার আদায়, সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতা থেকে দেশের মানুষের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা দূরীভুত করতে গণমানুষের অবরোধ কর্মসূচির ওপর সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর কাপুরোষোচিত বর্বর হামলার নিদর্শনগুলো দেখলে মনে হয় সরকার মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ২০ দলীয় জোট নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ১৪ দিন ধরে নিজ কার্যালয়ের ভেতর অবরুদ্ধ রেখে কার্যালয়ের চারিদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ইট, বালু, কাঠের ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড করে রাখা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ ২০ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং দেশব্যাপী শত সহস্র নেতাকর্মীকে কারাগারে আটক রাখা, হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দায়ের, প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, এজেন্টদের দিয়ে যানবাহনে আগুন লাগিয়ে পরিকল্পিত নাশকতা করে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানো, প্রকাশ্যে বুকে গুলি করার নির্দেশ ইত্যাদি ভয়ংকর পরিস্থিতি এখন এদেশে বিরাজমান।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই নিষ্ঠুর কর্মযজ্ঞে নামানো হয়েছে দলীয় চেতনায় উজ্জীবিত বেশকিছু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের। আর এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে বেসামাল দলীয় ক্যাডারদের। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জে যৌথবাহিনী আওয়ামী প্রতিহিংসার চেতনা নিয়ে ছাত্রদলের এক নেতাকে হত্যা ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বাড়িতে আগুন দিয়ে ছারখার করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ৩রা জানুয়ারী থেকে অবরুদ্ধ করার পর থেকে সারাদেশে চালানো হচ্ছে হিংস্র তান্ডব, রক্ত ঝরানো হচ্ছে বিভিন্ন জনপদে। এ ছাড়া দেশের প্রখ্যাত কূটনীতিক, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী রিয়াজ রহমানও এই দুঃশাসনের ছোবল থেকে রেহাই পাননি। ক্ষমতাসীনদের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতকারীরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাজবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যৌথবাহিনীর পাশাপাশি এখন নাকি সেনাবাহিনীও নামবে। বিবৃতিতে ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী এবং সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে একটি প্রশ্ন রেখে বলা হয়, তারা কী ৫ শতাংশ ভোটের অবৈধ সরকারের নির্দেশ শুনবে নাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের পক্ষে থাকবে? এদেশে অত্যাচারীরা কোনোদিনই টিকতে পারেনি। বিবৃতিতে সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে আরো বলা হয়, তারা যেন ক্ষমতাসীন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের প্রতিশোধবাসনার যন্ত্রে পরিণত না হন, কারণ এ দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী তাদের বেতন নিশ্চিত করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই অবৈধ সরকারের অগ্রহণযোগ্য ও নিষ্ঠুর দুর্ব্যবহারের কবলে গোটা জাতি আজ অপমানিত। বৃহস্পতিবার বিজিবি মহাপরিচালক এবং শুক্রবার মহাপুলিশ পরিদর্শকের বক্তব্য জাতিকে স্তম্ভিত ও হতবাক করেছে।
ঔদ্ধতপূর্ণ এবং এখতিয়ার বহির্ভুত এই বক্তব্য জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিজিবির হাতে মারণাস্ত্র জনগণের টাকায় কেনা। এটি কোন দল বা ব্যক্তির প্রাইভেট বাহিনী নয়। পুলিশের আইজি বিএনপি চেয়ারপারসন সম্পর্কে যেভাবে বক্তব্য রেখেছেন তাতে মনে হয় একজন ছাত্রলীগের নেতা পুলিশের পোশাক পরে বক্তব্য রাখছে। পুলিশের আইজির বক্তব্য নজীরবিহীন ও চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ। তাদের মনে রাখা উচিস কোন অপকর্মই কখনও চিরদিনের জন্য মাটিচাপা থাকে না। জনগণ সকল ঔদ্ধত্য, অহংকার এবং নিষ্ঠুর অনাচরের বিচার করবেই। ২০ দলীয় জোট বিজিবির মহাপরিচালক এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের এখতিয়ার বহির্ভুত বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

বেলজিয়ামে পুলিশের গুলিতে দুই ‘জঙ্গি’ নিহত

বেলজিয়ামের ভের্ভিয়ে শহরে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের সঙ্গে
গোলাগুলির পর পুলিশের সতর্ক পাহারা। ছবি: এএফপি
এবার ফ্রান্সের পাশের দেশ বেলজিয়ামে সন্দেহভাজন জঙ্গি ও পুলিশের সংঘাত হলো। এ ঘটনায় নিহত হয়েছে সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি। বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনার সময় আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরেকজনকে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ১২ জনকে। বেলজিয়ামের ওই ঘটনার পর জার্মানি ও ফ্রান্সের কর্মকর্তারা অন্তত ১৪ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছেন। প্যারিসে গত সপ্তাহেই বন্দুকধারীদের হাতে ১৭ জন নিহত হওয়ার পর এসব ঘটনায় ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ বেড়ে গেছে। বেলজিয়ামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও সিএনএনের। বেলজিয়ামের কর্মকর্তারা জানান, একটি সন্ত্রাসবাদী হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছে এ রকম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গত বৃহস্পতিবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এর আওতায় ওই দিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় পূর্বাঞ্চলীয় ভের্ভিয়ে শহরে অভিযান চালায়। জার্মানির সীমান্তবর্তী ভের্ভিয়ে শহরের ওই ঘটনায় জঙ্গিদের দলটিতে কমবেশি ১০ জন ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেেটর (আইএস) পক্ষে লড়াই করে ফিরে আসা। বেলজিয়ামে মারাত্মক কোনো সন্ত্রাসী হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে ছিল তারা। পুলিশ জানিয়েছে, তল্লাশির সময় কয়েকজন সন্দেহভাজন বিশেষ বাহিনীকে লক্ষ্য করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে অতর্কিত গুলি ছোড়ে। এরপর কয়েক মিনিট ধরে বন্দুকযুদ্ধ চলে।
এতে দুই সন্দেহভাজন নিহত হয়। তৃতীয় একজনকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ঘটনার পর বেশ কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি কালাশনিকভ (একে-৪৭) রাইফেল ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম। বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর রাজধানী ব্রাসেলস ও এর আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের তল্লাশি অভিযানে নামে পুলিশ। এসব অভিযানের সময় গ্রেপ্তার করা হয় সন্দেহভাজন আরও ১২ জনকে। কেন্দ্রীয় সরকারি কৌঁসুলি এরিক ভন দার সিপ্ত বলেছেন, ওই বন্দুকধারীদের লক্ষ্য ছিল সড়কে বা থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা। চলমান তল্লাশি অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ১২টি বাড়িতে তল্লাশি শেষ করেছি। ’ তিনি জানান, তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত এসব ঘটনার সঙ্গে গত সপ্তাহে প্যারিসে হামলার যোগসূত্র পাননি। প্যারিসে গ্রেপ্তার ১২: ফ্রান্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা গত সপ্তাহে প্যারিসে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন বন্দুকধারীর একজন আমেদি কুলিবালির সহযোগী বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া গতকাল শুক্রবার প্যারিসের একটি রেলস্টেশন বোমা হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে প্যারিসের বাইরে কোলম্ব শহরে গতকাল একটি ডাকঘরে দুই ব্যক্তিকে জিম্মি করে একজন বন্দুকধারী। তবে কিছুক্ষণ পর সে আত্মসমর্পণ করে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। জার্মানিতে গ্রেপ্তার ২: জার্মানির কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা তুরস্কের নাগরিক।

শেষ পর্যন্ত বইটি ভারতে

দ্য রেড শাড়ি
প্রভাবশালী গান্ধী পরিবারকে নিয়ে স্পেনের লেখক হাভিয়ের মোরোর লেখা দ্য রেড শাড়ি বইটি অবশেষে ভারতের বাজারে এসেছে। সত্যি ঘটনার ভিত্তিতে লেখা হলেও বইটির লেখক ‘নাটকীয়তার’ আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খবর এনডিটিভির। দ্য রেড শাড়ি সাত বছর আগে স্পেনে প্রথম প্রকাশিত হয়। কিন্তু ইংরেজি অনুবাদের জন্য কোনো প্রকাশক বিনিয়োগ না করায় এত দিন পর্যন্ত ভারতের বাজারে আসেনি। কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিংভি বইটির লেখকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
গান্ধী পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ ছিল না হাভিয়ের মোরোর। তবু তিনি বইতে ভারতের প্রয়াত দুই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী এবং দলটির বর্তমান প্রধান সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিগত আলাপচারিতার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন: ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে রাজীব যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান পেলেন, তাঁর স্ত্রী সোনিয়া তখন এমনভাবে আঁতকে উঠেছিলেন যেন তাঁর (রাজীব) মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তিনি (সোনিয়া) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে, মেরে ফেলবে।’

সংঘাত থামাও- সব রাজনৈতিক দলের প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের আহ্বান

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশন। সংস্থাটি সব রাজনৈতিক দলকে এখনই সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, এরই মধ্যে সংঘাতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং তা আরও বাড়তে পারে বলে তারা শঙ্কিত, যেমনটা দেখা গিয়েছিল গত নির্বাচনের আগে। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনের কার্যালয়ের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপি দেশজুড়ে অবরোধের ডাক দেওয়ার পর থেকে চলমান সংঘাতের শুরু। দলটির চেয়ারপারসন ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে বাধা দেয় সরকার। এরপর থেকে সহিংসতায় এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বিরোধী দলের অনেক বড় নেতাকে আটক করা হয়েছে। একের পর এক যানবাহনে হামলার ঘটনাকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, গত মঙ্গলবার একটি যাত্রিবাহী বাসে দেওয়া আগুনে পুড়ে চারজনের (পরে হাসপাতালে একজন মারা যাওয়ায় সংখ্যাটি এখন পাঁচ) মৃত্যু হয়েছে। একই দিন বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁর গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাসে দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা গেছেন একজন। এই পরিস্থিতিতে সংযম প্রদর্শন এবং এখনই সংঘাত বন্ধের উদ্যোগ নিতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানায় জাতিসংঘের সংস্থাটি। একই সঙ্গে হত্যার ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিরোধী নেতাদের যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, সেটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা-ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ ছাড়া শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, চলাচল ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এক দিন আগে বুধবার ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকেরাও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে গুলির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, যুক্তরাজ্য হাইকমিশন ও ইইউ দূতাবাস। পৃথক বিবৃতিতে তারা এই হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। ইইউ রাষ্ট্রদূত রাজনৈতিক ক্ষেত্র ‘সংকুচিত’ হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সহিংসতা রোধের তাগিদ দেন। তাঁর মতে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপগুলো মানুষের সমাবেশ, চলাচল ও বক্তব্যের অধিকার হরণের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়।

শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা

(ছবি:-১ বঙ্গভবনে আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে শপথবাক্য পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ছবি: ফোকাস বাংলা ছবি:-২ প্রধান বিচারপিত সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ দেন। ছবি: ফোকাস বাংলা) সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তিনি এস কে সিনহা নামে পরিচিত। আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁকে শপথবাক্য পড়ান। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, বিদায়ী বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ছাড়াও কয়েকজন সাবেক প্রধান বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে প্রধান বিচারপতি হিসেবে এস কে সিনহাকে নিয়োগ দেন। আইন মন্ত্রণালয় ১২ জানুয়ারি এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই নিয়োগ ১৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। সে অনুসারে আজ শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এস কে সিনহার বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার তিলকপুর গ্রামে। তাঁর জন্ম ১৯৫১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এই হিসাবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি প্রধান বিচারপতির পদে থাকতে পারবেন। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ১৯৭৪ সালে সিলেট বারে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি ১৯৭৮ সালে হাইকোর্টে এবং ১৯৯০ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর এবং আপিল বিভাগের বিচারপতি হন ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রয়াত শিক্ষক ললিত মোহন সিনহা ও ধনবতী সিনহা দম্পতির বড় ছেলে বিচারপতি এস কে সিনহা। তাঁদের গ্রামের বাড়িতে থাকেন তাঁর একমাত্র ছোট ভাই নীলমণি সিনহা। এস কে সিনহার স্ত্রী সুষমা সিনহা। তাঁদের বড় মেয়ে সূচনা সিনহা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন। ছোট মেয়ে আশা রানী সিনহা ভারতে পড়াশোনা শেষ করে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন।

পারিলার চাষিরা পারলেন- বাজারের ব্যাগে তাজা মাছ, ফরমালিনের সন্দেহও নেই by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

(বড় মাছ তাজা রেখে সেগুলো প্রতিদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন রাজশাহীর পারিলা গ্রামের মাছচাষিরা l ছবি: শহীদুল ইসলাম) রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প—যত বড় হবে তত কদর বেশি, দামও। আর এ মাছ যদি জীবিত বা তাজা হয়, তাহলে তো দাম আরও বেশি। কিন্তু পানি থেকে ওঠানোর পর মাছ বেশিক্ষণ বাঁচানো কঠিন। ভাবতে ভাবতে উপায়ও একটা বের করলেন সোহরাব হোসেন। রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের মাছচাষি তিনি।
একসময়ের দরিদ্র চাষি সোহরাব হোসেনের হাত ধরে এখন মাছ চাষ ও তাজা মাছ বাজারজাত করার ব্যবসায় নেমে পড়েছেন পারিলার ২০০ চাষি। ভোক্তার কাছে তাজা মাছ পৌঁছে দিতে এবং এর মাধ্যমে ফরমালিন আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসতে এই চাষিরা গড়ে তুলেছেন এক সফল আন্দোলনও।
পদ্ধতিটি সহজ, তবে এতে বাড়তি শ্রম লাগে। বড় মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে সোহরাব মূলত পোনা মাছ বাজারজাত করার পদ্ধতিটিকেই কাজে লাগিয়েছেন। পুকুর থেকে ধরার পর মাছ পানিভর্তি ড্রামে নেওয়া হয়। সেই পানিসুদ্ধ ড্রামই যায় স্থানীয় বাজারে। ক্রেতা সেখান থেকে কিনে নেন জেতা মাছ। আর ঢাকাসহ দূরের বাজারে মাছ নেওয়া হয় ট্রাকে।
ট্রাকের ভেতর মোটা পলিথিন বা নিশ্ছিদ্র ত্রিপল বিছিয়ে পানি ভরা হয়। তাতেই ‘খেলা করতে করতে’ মাছ যায় বাজারে। যাত্রার এ সময় অক্সিজেনের ঘাটতি মেটাতে পাতিলে পা ঢুকিয়ে পানিতে অনবরত ঢেউ তোলা হয়।
কয়েক বছরে এই প্রক্রিয়াটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। এখন প্রতিদিন পারিলার জেতা মাছ যাচ্ছে ঢাকার নিউ মার্কেট, যাত্রাবাড়ী ও রামপুরা (মধ্যবাড্ডা), সাভারের ফুলবাড়ী বাজার, গাজীপুরের কালিয়াকৈর বাজারে। একইভাবে যায় রংপুর পৌরসভা, বগুড়া চেলোপাড়া, টাঙ্গাইলের পার্কবাজার, সিরাজগঞ্জের গোলচত্বর ও নরসিংদীর পাঁচদানা বাজারে। রাজশাহীতে শুধু সাহেব বাজারে এই মাছ পাওয়া যায়।
ট্রাকে থাকা অবস্থায় মাছের দাম করা হয়। প্রথমে পানিসহ ট্রে আলাদা করে ওজন করা হয়। পরে মাছসহ ট্রে ওজন করে মাছের ওজন নির্ধারণ করা হয়। পাঁচ কেজি ওজনের একটি মাছ পাইকারি বাজারে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন চাষিরা।
বড় মাছ চাষ ও সেগুলো বেশি মুনাফায় বাজারজাত করার এই উদ্যোগ ভাগ্য বদলে দিয়েছে পারিলার মানুষদের। একসময় যে গ্রামের মানুষের বাইসাইকেল কেনার পয়সা ছিল না তাঁদের ঘরে এখন মোটরসাইকেল। বড় মাছ চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামে গড়ে উঠেছে বহুমুখী ব্যবসা।
গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ পরিবারই এখন কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে মাছ ব্যবসায়। নিজেদের চাষ করা মাছ পরিবহন করতে গ্রামবাসী কিনেছেন ছোট-বড় অন্তত ৮০টি ট্রাক। খাটছে ভাড়ার ট্রাকও। প্রতি রাতে এসব ট্রাকে করে গ্রাম থেকে তাজা বড় মাছ যাচ্ছে বিভিন্ন বাজারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক আখতার হোসেন বলেন, পারিলার মাছচাষিরা বাজারে তাজা মাছ সরবরাহ করতে গিয়ে মাছে ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি ওই গ্রামের ১০ জন চাষিকে নিয়ে কাজও করেছেন।
যেভাবে শুরু: ১৯৯৮ সালের কথা। পারিলা গ্রামের যুবক সোহরাব হোসেন এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারেননি। চাকরিও হয়নি। কাজ খুঁজে হয়রান। একসময় খেয়াল করলেন গ্রামের সস্তা জমি ইজারা নিয়ে বাইরের মাছ ব্যবসায়ীরা পোনা মাছ চাষ করছেন। ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে বড় মাছ চাষের পরিকল্পনা করেন তিনি। সফলও হন। ১০-১২ কেজি ওজনের মাছও উৎপাদন হয় তাঁর পুকুরে। কিন্তু এত বড় মাছ নিয়ে বাজারে গেলেই শুনতে হয়—বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছ। তার ওপর মরা। কেউ বিশ্বাস করতে চায় না, এটা পারিলার পুকুরের মাছ। মাছ বড় করেও ভালো দাম পান না সোহরাব। ভাবেন, জেতা মাছ নিয়ে বাজারে যেতে পারলে কেউ আর বলতে পারবে না আমদানির মাছ।
সোহরাব বলেন, পানিভর্তি ড্রামে করে রাজশাহীর বাজারে নিয়ে যান তাজা মাছ। এবার ক্রেতাদের চোখ তাঁর মাছের দিকে। আগের তুলনায় কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দাম পাওয়া গেল। আস্তে আস্তে বগুড়া ও ঢাকায় ভালো বাজার খুঁজে পান। গত চার বছর ঢাকার নিউ মার্কেটসহ অন্যান্য বাজারে যাচ্ছে পারিলার তাজা বড় মাছ।
সোহরাব বলেন, ‘বলতে গেলে আমার কিছুই ছিল না। এখন ৩০০ বিঘা জমির পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছি। তিনটা ট্রাক কিনেছি মাছ পরিবহনের জন্য। মনের মতো বাড়িও করেছি একটা। বিঘা দশ জমিও কিনেছি।’ সোহরাব জানান, সিড (SEED) নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ওয়েবসাইটেও এ গ্রামের মাছ চাষের কাহিনি স্থান পেয়েছে।
সোহরাব জানান, ধরার পর মাছ দ্রুত পানিভর্তি ড্রামে তোলা হয়। স্থানীয় বাজারে পৌঁছা পর্যন্ত পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি মেটাতে অনবরত হাত দিয়ে ঢেউ তোলা হয়। আর একসঙ্গে বেশি মাছ ঢাকাসহ দূরের জেলায় পাঠাতে ট্রাকের ভেতর মোটা পলিথিন বা নিশ্ছিদ্র ত্রিপল বিছিয়ে পানি ভরা হয়। অক্সিজেনের ঘাটতি মেটাতে একটা খালি পাতিলের ভেতর পা ঢুকিয়ে ট্রাকের ওপর বসে সেটার সাহায্যে অনবরত ঢেউ দিতে হয়। রাজশাহী থেকে ঢাকার মতো দূরত্বে নেওয়ার জন্য পথে একবার পানি বদল করতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় একটি ট্রাকে ১২ থেকে ১৪ মণ মাছ পরিবহন করা হয়।
বদলে গেছে গ্রাম: পারিলার এক বিঘা জমি আগে পাঁচ হাজার টাকায় এক বছর মেয়াদে ইজারা পাওয়া যেত। এখন ইজারা নিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লাগে। গ্রামে প্রায় ২ হাজার বিঘা জমির পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। গ্রাম ছাপিয়ে এখন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে যেখানেই পুকুর সেখানেই আছেন পারিলার চাষিরা। স্থানীয়দের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় মাছ চাষ করছেন তাঁরা।
তাজা মাছের এই ব্যবসায় জড়িয়ে গ্রামের কেউ এখন জাল বোনেন, কেউ পুকুরে জাল টানেন, কেউ পুকুর পাহারা দেন, কেউ ট্রাকে পানি ভরেন, কেউ ট্রাক চালান, কেউ পানিতে ঢেউ দেন, কেউ মাছের খাবারের ব্যবসা করেন, আর কেউবা বিদেশ থেকে খৈল আমদানি করেন। গ্রামের কোনো সামর্থ্যবান নারী-পুরুষ বেকার নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও পুকুরে দুই-এক ঘণ্টা জাল টেনে নিজেই নিজের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করেন।
গ্রামের চাষি ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য শফিকুল আলম বলেন, এই মাছ চাষ গ্রামের মানুষের ভেদাভেদও ভুলিয়ে দিয়েছে। নেই কোনো রকম রাজনৈতিক বৈরিতা। আছে কেবল ভালো মাছ চাষ ও নতুন বাজার ধরার প্রতিযোগিতা।
শফিকুল আলমের দাবি, মাছের খাবার হিসেবে কোনো ধরনের বিষ্টা বা অখাদ্য কিছু ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মাছের খাবার হিসেবে রেডি ফিড, খৈল ও গমের ভুসি ব্যবহার করা হয়। সেই সঙ্গে পানিতে শেওলা তৈরির জন্য মাসে একবার হালকা টিএসপি সার ব্যবহার করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ বিভাগের পিএইচডি গবেষক আরিফুল ইসলাম বলেন, পারিলার মাছচাষিরা যে তৈরি খাবার ব্যবহার করেন, তা সরকার অনুমোদিত। এর মধ্যে কোনো ধরনের ‘গ্রোথ হরমোন’ ব্যবহার করা হয় না।
আর সোহরাব জানান, সাধারণত রুই মাছ ২২ মাসে, কাতলা ও সিলভার কার্প মাছ ১৮ মাসে পাঁচ কেজি ওজনের হয়।
সম্প্রতি একদিন সন্ধ্যায় গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাক। ট্রাকে রাখা মোটা পলিথিনের আধারে পাম্পের সাহায্যে পানি ভরা হচ্ছে। পুকুর পাড়ে রাখা সারি সারি ভ্যান। ভ্যানের ওপর পানিভর্তি ড্রাম। মাছ ধরে তোলা হচ্ছে ড্রামে। পরে ভ্যানগুলো যাচ্ছে ট্রাকের কাছে। ট্রাকে মাছ ওঠানোর পর একজন পানিতে অনবরত ঢেউ দিচ্ছেন। পুকুরগুলোর ধার দিয়ে কলা আর শাক-সবজির চাষ চোখে লাগার মতো।
গ্রামের এই মাছচাষিদের একটি অনুযোগ আছে। ট্রাকে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই কি না—তা যাচাইয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায় অন্যান্য ট্রাকের সঙ্গে তাঁদের মাছবাহী ট্রাকও দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। মাঝেমধ্যেই এত দেরি হয় যে বাজারের সময় চলে যায়। মাছও মারা যায়। ফলে বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে কম দামে মাছ বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে হয় তাঁদের।
চাষিরা বলেন, তাঁদের ট্রাকে শুধু পানি ভর্তি থাকে। আর থাকে কিছু মাছ। পানি দিয়ে তো কখনোই ট্রাক অতিরিক্ত বোঝাই করা সম্ভব নয়। তাই এই ট্রাকগুলোকে স্কেলিংয়ের জন্য লাইনে দাঁড় না করিয়ে যেন দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রধান রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, তাজা মাছের ট্রাক আলাদা সারিতে নিয়ে আগে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয়ভাবে তাঁরা কিছু করতে পারবেন না। এ জন্য সেতু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত লাগবে।

আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্য ইনস্টিটিউট চালুর ঘোষণা

বক্তব্য দেন স্থপতি ফুমিহিকো মাকি
স্থাপত্য, নকশা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে ও গবেষণার মান বাড়াতে চালু হচ্ছে বেঙ্গল আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউট। এটি হবে আন্তর্জাতিক মানের একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ‘এনগেজ ঢাকা ২০১৫’ শীর্ষক তিন দিনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার এই ঘোষণা দেওয়া হয়। রাজধানীর বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘর মাঠে এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
এ ছাড়া গতকাল প্রিট্জকার অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী জাপানের বয়োজ্যেষ্ঠ স্থপতি ফুমিহিকো মাকিসহ কয়েকজন খ্যাতনামা স্থপতি তাঁদের স্থাপত্যকর্ম প্রদর্শন এবং স্থাপত্যচিন্তা ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। এই আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। রেডিও পার্টনার এবিসি রেডিও এবং সম্প্রচার সহযোগী চ্যানেল আই। মিডিয়া পার্টনার আইস মিডিয়া। বিকেলে নতুন ইনস্টিটিউট চালুর ঘোষণায় জানানো হয়, আগামী আগস্ট থেকে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। এটির শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান স্থপতি, ইতিহাসবিদ, পেশাজীবী শিক্ষকেরা।
এ সময় স্থপতি সামসুল ওয়ারেস বলেন, একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। দেশে বর্তমানে ২০টির মতো স্থাপত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্থাপত্যের মতো উদ্ভাবনী বিষয়ে জ্ঞান আহরণে ভালো একটি প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের বলেন, ‘শিল্পকলার সর্বোচ্চ স্তর বা রূপ হচ্ছে স্থাপত্য। যদিও আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের এ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাই স্থাপত্যকলা বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি ও এটির গুরুত্ব বিবেচনায় সম্মেলন আয়োজনের পাশাপাশি এ-বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
এ সময় আরও বক্তব্য দেন বেঙ্গল আর্কিটেকচার অ্যান্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউটের পরিচালক কাজী খালিদ আশরাফ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চীনের বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি কনজিয়ান ইয়ু। কনজিয়ান ইয়ুও এই ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থাপত্যকর্ম প্রদর্শন: গতকাল সকাল থেকে সম্মেলনে আমন্ত্রিত বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা স্থাপত্যকলার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তাঁরা বিশ্বের প্রসিদ্ধ বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শন তুলে ধরে সেগুলোর খুঁটিনাটি দিক বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা নকশানির্ভর স্থাপনার পরিবর্তে প্রকৃতি, স্থান, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে স্থাপত্যবিদ্যা চর্চার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থপতিরা কীভাবে একটি স্থাপনাকে অনন্য করে তুলতে পারেন, তারও ধারণা দেন।
ফুমিহিকো মাকি প্রজেক্টরের মাধ্যমে তুলে ধরেন ‘মাকি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর নির্মিত এবং বর্তমানে নির্মাণাধীন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্থাপনা-প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৭ সালে সিঙ্গাপুরে নির্মিত রিপাবলিক পলিটেকনিক, জাপানের মিহারা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার। নিউইয়র্কে নির্মাণাধীন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার (নির্মাণ শেষ হবে ২০১৫ সালে), সিঙ্গাপুরের মিডিয়া করপোরেশন, ভারতের বিহার মিউজিয়াম এবং চীনে শেনজেন সি ওয়ার্ল্ড কালচারাল আর্টস সেন্টার, নির্মাণাধীন বৈরুত’স ব্লক ২০-২০ অফিস টাওয়ার (নির্মাণ শেষ হবে ২০১৭ সালে)। অধিবেশনে মাকিকে ঘিরে টুইন টাওয়ার প্রকল্পের ওপর একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
স্থাপত্যকর্ম প্রদর্শনকালে মাকি মানবতার জন্য স্থাপত্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অবয়ব ও পরিচয়, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি—এই বিষয়গুলো পারস্পরিক নির্ভরশীল। সেদিক থেকে মানুষ, প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের পরস্পরের নৈসর্গিক সম্পর্কের ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হয়—এমন কিছু করা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থাপত্য-ইতিহাসবিদ অধ্যাপক কাজী খালেদ আশরাফ স্থাপত্যকর্ম প্রদর্শনকালে বলেন, দিন পাল্টানোর সঙ্গে মানুষের পছন্দ পাল্টাচ্ছে। স্থাপত্য এখন একটি সংস্কৃতি। মানুষ আজ মজবুত ভবনের পাশাপাশি স্থাপনার সৌন্দর্যের প্রতিও আগ্রহ রাখছে।
ভারতের অরোভিল এবং স্পেনের মাদ্রিদে কর্মরত স্থপতি অনুপমা কুন্ডু তাঁর স্থাপত্যকর্ম প্রদর্শন করেন। প্রদর্শনীতে উঠে আসে বিভিন্ন স্থানের মানুষকে ঘিরে অনুপমার স্থাপত্যকাজের বিবরণ।
স্থাপত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন মাদ্রিদের হেক্টর ফার্নান্দেজ এলোরজা এবং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জন লিন।
বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অদিতি মহসিন ও সরোদশিল্পী রাজরূপা চৌধুরীর পরিবেশনা দিয়ে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের আয়োজন শেষ হয়।
‘এনগেজ ঢাকা ২০১৫’ শীর্ষক স্থাপত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয় নতুন ধরনের চিন্তা থেকে। আয়োজকদের মতে, শুধু নকশা প্রণয়ন, ত্রিমাত্রিক গঠন ও অট্টালিকা নির্মাণের সংকীর্ণতর গণ্ডির মধ্যে স্থাপত্যচর্চাকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এতে স্থাপত্যরুচির পথ অনালোকিত এবং অবরুদ্ধ হয়, প্রশ্রয় পায় অনুকরণপ্রিয়তা।

এবার প্রথম সরস্বতী পূজা ঢাকার সংসদে: আনন্দবাজার পত্রিকা

“রীতিমতো ম্যারাপ বেঁধে, প্রতিমা এনে ধুমধাম করে সরস্বতী পূজা হবে এ বার বাংলাদেশের সংসদে। বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো পূজার অনুষ্ঠান হবে খাস সংসদে। সাজসাজ রব পড়ে গিয়েছে। চাঁদা তোলা হচ্ছে সংসদের কর্মীদের কাছ থেকে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও তোড়জোড় চলছে। সে জন্য সংসদের গেট খুলে দেওয়া হবে সাধারণের জন্য।” আজ এই খবর দিয়েছে ভারতের কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা। আনন্দবাজার লিখেছে, “বাংলাদেশের সংবিধানে সংশোধন এনে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ফিরিয়ে এনেছে শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগ-জোট সরকার। সম্প্রতি সুরেন্দ্রকুমার সিনহা সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছেন। বিরোধী বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী প্রভাবিত আইনজীবীদের সংগঠনও তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। কিন্তু তার মধ্যেও বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ-হরতালের সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কিছু ঘটনা যে বাংলাদেশে ঘটছে না তা নয়। দিন দুয়েক আগেই বরিশালে কিছু দুর্বৃত্ত একটি কুমোরটুলিতে ঢুকে প্রায় ৭০টি নির্মীয়মাণ সরস্বতী প্রতিমা ভাঙচুর করেছে। তবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহল তার সমালোচনায় সরব হয়েছে। প্রশাসনও সক্রিয়। তার মধ্যেই ১৯ তারিখে সংসদে অধিবেশন শুরু হচ্ছে। কিন্তু অধিবেশন চালু থাকাকালীনই সরস্বতী পূজা করার অনুমতি দিয়ে নজির গড়লেন স্পিকার।” আনন্দবাজার জানায়, “প্রস্তাবটি দেন বরিশালের সাংসদ পঙ্কজ নাথ। সেই প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেন স্পিকার শিরিন শরমিন চৌধুরীর কাছে। তিনি এই প্রস্তাবে অনুমতি দেন। পঙ্কজবাবু বলেন, ‘সংসদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ইস্টার সানডে-ও পালিত হয়। কিন্তু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কোনও পূজা করা হয় না। তাই আমি ওই প্রস্তাবটি দিই।’ তার কথায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ নিয়ে চলেন। সব ধর্মের প্রতি সমান মর্যাদা দেওয়ার কথা বলেন। তাই সংসদে সরস্বতী পূজার প্রস্তাবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়েছেন।” প্রতিবেদনে আরো জানোনো হয়, “সরকারের সব শরিক দলও এই প্রস্তাবে রাজি। নির্বাচন বয়কট করে সরকারকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দেওয়া বিএনপি অবশ্য এই প্রস্তাব নিয়ে রা কাড়তে নারাজ। তবে বিরোধী দল হুসেইন মহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি জানিয়েছে, তারা কোনো আপত্তি দেখছে না। দলের মুখপাত্র রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘সব ধর্মের সমানাধিকার থাকাটাই কাম্য।” আওয়ামি ও বিএনপি জোটের বাইরে নতুন জোট গঠনে উদ্যোগী ন্যাশনাল পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান শেখ সাকায়াত হোসেন নিলুও সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান সংসদে হতে পারলে সরস্বতী পূজা হতেই পারে। এত দিন কেন হয়নি সেটাই প্রশ্ন’।” আনন্দবাজার জানায়, “স্পিকার অনুমতি দেওয়ার পরেই সংসদের অতিরিক্ত সচিব প্রণব চক্রবর্তীকে আহ্বায়ক করে পূজা কমিটি গড়া হয়েছে। সংসদের হিন্দু কর্মকর্তাদের জন্য ১৫০০ টাকা ও সাধারণ কর্মীদের জন্য ৫০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য হয়েছে। পূজা উপলক্ষে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজনও হচ্ছে। চলছে শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগের পর্ব। শুধু নিরাপত্তা কর্মীরাই একটু উদ্বেগে রয়েছেন। একে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধে নাশকতা চলছে দেদার। তার ওপর সে সময়ে সংসদে অধিবেশনও চলবে। সংসদের ডেপুটি সার্জেন্ট সাদরুল আহমেদের কপালে তাই ভাঁজ। তবে নিরাপত্তায় কোনও খামতি হবে না বলেই তার আশ্বাস।”

‘ব্যর্থ রাষ্ট্র ঠেকাতে সংলাপে বসুন’

বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে দ্রুত সংলাপ অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ। বলেছেন, যারা ক্ষমতায় আর যারা বিরোধী জোটে আছে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য। যদি দলগুলো এই আলোচনায় না বসে, আর এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই এই দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সেন্টার ফর ন্যাশনালিজম স্টাডিজ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকের মূল বিষয় ছিল ‘জাতি গঠনে বাধা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ’। বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. এমাজউদ্দিন বলেন, বিশ্বে শতাধিক রাষ্ট্রে সংসদ চালু রয়েছে। তারা বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়েই সরকার পরিচালনা করে। রাজনীতির দায়িত্ব সমস্যার সমাধান করা। সমস্যা সৃষ্টি করা নয়। ঐক্য সৃষ্টি করা। বিভক্তি নয়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদের একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এটাই গণতন্ত্র। মুক্তিযোদ্ধারা এই স্বপ্নই দেখেছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয়ে থাকে তবে সে চেতনাকে জীবন্ত করতে হলে একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার পেছনে রাজনীতিবিদদের গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা দায়ী উল্লেখ করে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, সামপ্রতিক সময়ে নিম্ন আদালতের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিচার বিভাগের ওপর থেকে মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ এখনও ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়নি। তবে এভাবে চলতে থাকলে এটা ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে যাবে। সবকিছু হচ্ছে অব্যবস্থাপনার কারণে। সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আলোচনার লক্ষ্য হবে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন। জনগণের ম্যান্ডেট হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি। ২০১৪ সালে যে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে তাতে জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না। ১৫৩ আসনে ক্ষমতাসীনরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অবিলম্বে দুই দলকে একসঙ্গে বসতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক পথে চালানোর জন্য পরামর্শ দিতে হবে। দেশ এখন চরম সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত খারাপ সময় এর আগে আসেনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশে বিষাক্ত রাজনীতি চলছে। দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিকৃতভাবে কাজ করছে। দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করছে না। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে বিরোধী দল দমনে কাজ করছে। গুম-খুন-অপহরণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। র‌্যাব ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এটা আমরা দেখতে পেয়েছি।
বিরোধী জোটের আন্দোলন দমনে বিজিবি মহাপরিচালকের অবস্থানের সমালোচনা করে এমাজউদ্দিন বলেন, বিজিবি প্রধানের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যায় কেউ করলে তার দায়িত্ব হচ্ছে শাস্তি বিধান করা। এই পর্যায়ের ব্যক্তির কাছে কেউ এটা আশা করে না।
‘বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দেখলে পায়ে গুলি করার নির্দেশ দেয় যে সংসদ সদস্য, সংসদে তার স্থান হয় কিভাবে’ প্রশ্ন রেখে এমাজউদ্দীন বলেন, অনির্বাচিত সরকার গঠনের কারণেই তারা আজ সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন। আর অনির্বাচিত প্রতিনিধিরাই এমন নির্দেশ দিতে পারেন। বৈঠকে অংশ নিয়ে সাংবাদিক ও কলামিস্ট সাদেক খান বলেন, দেশের গণতন্ত্র আজ অকেজো হয়ে গেছে। সংবিধানে এতটা কাটাছেঁড়া করা হয়েছে যে সেটার অবস্থাও একই। এখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, সংলাপের জন্য বাধ্য করতে হয়। এর জন্য যে আন্দোলন চলছে তাতে আমি ঐক্যমত পোষণ করছি। এটা চলতে থাক। গণতন্ত্রে ফিরে আসার সমাধান হলো- আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি। তবে দুই বা তিনটি দলের জন্য করলে হবে না, সকলের জন্য করতে হবে। সরকারকে উদ্দেশ্য করে সাদেক খান বলেন, মনে রাখতে হবে পৃথিবীর সব পরাশক্তি মনে করতো তাদের শক্তি দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারবে। কিন্তু তারা আজীবন টিকে থাকতে পারেনি। তাদের পরাজয় হয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, বিএনপি ৭ দফা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল সরকারকে। কিন্তু সরকার তা মেনে না নিয়ে বিএনপিকে ইচ্ছে করে রাজপথে আন্দোলনে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা চাই শান্তি। আর এ জন্য সংলাপের বিকল্প নেই। সংলাপের মাধ্যমেই সরকার এ সঙ্কট দূর করতে পারে।
তিনি বলেন, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ দিয়ে জাতিগঠন হয় না। সুন্দর জাতি গঠন করতে চাই গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্র রক্ষার একটাই পথ- সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। শওকত মাহমুদ আরও বলেন, বিজিবির কাজ সীমান্ত পাহারা দেয়া। সেখানে বিএসএফ বাংলাদেশীদের হত্যা করছে বিজিবি পদক্ষেপ না নিয়ে নিজের দেশের মানুষকে হত্যার ঘোষণা দিয়েছে। বিজিবিকে গুলি চালানোর ঘোষণা দেয়ার অধিকার দিয়েছে কে -এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, বিজিবি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা  করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, আজ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচন চাইলে তাকে ‘বিএনপি’ বলা হচ্ছে। সংগঠনের সভাপতি ব্যারিস্টার ফাতেমা আনোয়ারের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশ নেন উন্নয়ন পরামর্শক মেহবুবুর রহমান, রুবি আমাতুল্লাহ প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক কর্ণেল (অব.) জেআরএম আশরাফ উদ্দিন।

রাজধানীতে দুই বাসে আগুন, জবি ছাত্রী দগ্ধ

২০ দলের অনির্দিষ্টকালের অবরোধে সকালে রাজধানীতে দুটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী দগ্ধ হয়েছেন। এসময় আরও তিনজন আহত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষনিকভাবে তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর-১৩ নম্বর এবং পৌনে ৯টার দিকে কদমতলী থানার রায়েরবাগে এ আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। রায়েরবাগে বাসে দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়েছেন সুলতানা ইসলাম নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তরের এক ছাত্রী। তাকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মিরপুর ১৩ নম্বরে একটি মিনিবাসে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনায় কোন হতাহত খবর পাওয়া যায়নি।

প্রাথমিক শিক্ষকদের ছুটি হোক শিক্ষাবান্ধব by মোঃ সিদ্দিকুর রহমান

প্রত্যেক মানুষ জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কিছু না কিছু পরিকল্পনা করেন। পেশাজীবী হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষকরাও এর ব্যতিক্রম নন। লক্ষ্যে সফল হওয়ার একমাত্র মূলমন্ত্র হচ্ছে কাজ, কাজ এবং কাজ। মানবজাতি তার কাজের মাধ্যমেই গুহাজীবন ত্যাগ করে আজকের সভ্যজীবনে প্রবেশ করেছে। এর পেছনে কি শুধুই কাজের ভূমিকা ছিল?
বিশ্রামও কিন্তু ভূমিকা রেখেছে। কাজের পাশাপাশি মানুষ তার চিত্তকে বিকশিত করতে নানা সময় নানাভাবে বিশ্রামের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কারণ পর্যাপ্ত বিশ্রাম পরবর্তী কার্য সম্পাদনকে সহজ করে এবং সৃজনশীলতার নতুন মাত্রা যোগ করে। কবি যথার্থই বলেছেন-
বিশ্রাম কাজের অঙ্গ এক সাথে গাঁথা
নয়নের অঙ্গ যেন নয়নের পাতা।
বিশ্রাম কর্মপরিকল্পনাকে নষ্ট করে না বরং কর্মস্পৃহাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শিশু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের পাঠ গ্রহণকে সহজসাধ্য ও আনন্দদায়ক করতে এবং নবোদ্যমে বিদ্যার্জনে ব্রতী হতে বিদ্যালয়গুলোতে ছুটির বিধান রাখা হয়েছে। কাজের গুণগত মান বিকাশে বিশ্রামের গুরুত্ব যথেষ্ট। বিদ্যালয়ের কার্যধারা শুধু শিক্ষার্থীদের নিয়েই নয়। বিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক সমাজের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণের পরিকল্পনা নির্ধারিত বিদ্যালয় কার্যকালকে মাথায় রেখেই। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুটি পৃথক মন্ত্রণালয়। শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পাদনই দুটি মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য। কিন্তু লক্ষণীয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রীষ্মকালীন/শীতকালীন ছুটি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ছুটির মাঝে বিরাট সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এই সমন্বয়হীনতায় অভিভাবকদেরই বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়। একই পরিবারের ভাই-বোনেরা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত হলে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ছুটির সমন্বয়হীনতায় পিতা-মাতারা অবকাশযাপনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক ছুটি ৮৫ দিন অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তালিকাভুক্ত ছুটি বছরে ৭৫ দিন। এর মধ্যে শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, জাতীয় শোক দিবস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিবস, বাংলা নববর্ষে ছুটি থাকা সত্ত্বেও দিবসগুলো উদযাপনের জন্য শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক উপস্থিত থাকতে হয়। এ দিবসগুলো উদযাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় চেতনাবোধ জাগ্রত হয় ঠিকই, তবে শিক্ষকদের মাঝে কিছুটা হতাশা বিরাজ করে। কারণ দিনগুলো ছুটির তালিকাভুক্ত থাকে। তারপরও বাধ্য হয়ে তাদের কর্মদিবস হিসেবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ৭৫ দিন ছুটির আওতাভুক্ত থেকে গ্রীষ্মের ছুটি ১৫ দিন করা হলে প্রাথমিক শিক্ষকরাও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতো গ্রীষ্মকালীন ছুটিকে শ্রান্তি বিনোদনের ছুটি হিসেবে গণ্য করে তাদের প্রাপ্য শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পেতে পারেন। রমজানের বন্ধকে ছুটি হিসেবে গণ্য করা হলে প্রাথমিক শিক্ষকরা শ্রান্তি বিনোদন ভাতা তিন বছরের পরিবর্তে চার বছর অন্তর পাবেন। কারণ আরবি বছরে খ্রিস্টীয় বছরের চেয়ে ১১ দিন কম থাকে। এ অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে। সরকারি অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির আবেদনের প্রেক্ষিতে বিগত সময়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি ১৫ দিন রাখার বিধান রাখা হয়। এ বছর গ্রীষ্মকালীন ছুটি রাখা হয়েছে মাত্র ৫ দিন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বঞ্চিত রাখা বা যথাসময়ে পাওনা না দেয়া যেন বিশাল কৃতিত্বের কাজ বলে মনে করা হয়।
এক বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক সংস্থাপন, অর্থ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা ও সহকারী শিক্ষকদের বৈষম্যমূলক বেতন প্রদানের আদেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা আদৌ শিক্ষকদের ভাগ্যে জুটছে না। শিক্ষকদের এই প্রাপ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন শুরু হয়েছে। যেন শিক্ষকদের এই সামান্য অর্থ দিতে বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন। ভাবখানা এমন, শিক্ষকদের পাওনা সহজে দিতে মানা। শিক্ষকদের দিয়ে ছুটির দিনে মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুননেছা গোল্ডকাপ অনুষ্ঠান, উপবৃত্তি প্রদান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ কমিটির কার্যক্রমের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করানো হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছুটির দিনে কাজ করলে টিএ/ডিএ পেয়ে থাকেন। অথচ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ভাতা তো দূরের কথা, তাদের ভোকেশনাল বিভাগের মতো ছুটিও দেয়া হচ্ছে না। আবার নন-ভোকেশনাল সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এবার সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়/দফতরের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষকদের ছুটির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি। প্রাথমিক শিক্ষকরা বছরে সর্বমোট ৭৫ দিন তালিকাভুক্ত ছুটি পান। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরে ২৩ দিন সরকারি তালিকাভুক্ত ছুটি পান। এ ছুটি প্রাথমিক শিক্ষকদের ৭৫ দিন ছুটির অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের বাড়তি ছুটি থাকে (৭৫-২৩) ৫২ দিন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবক্ষেত্রে শুক্র ও শনি ২ দিন সাপ্তাহিক ছুটি পান। কিন্তু শিক্ষকরা শনিবারও কর্মরত থাকেন। তারা অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর তুলনায় ৫২ দিন ছুটি কম ভোগ করছেন। তাহলে তাদের বাড়তি ছুটি থাকে (৫২-৫২) ০ দিন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় দিবস ৬ দিন, যা ছুটির তালিকায় ছুটি হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু বাধ্যতামূলক উপস্থিতিরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ছুটির নামে এই প্রবঞ্চনা দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চলছে। অর্থাৎ শিক্ষকরা ৬ দিন ছুটি কম পাচ্ছেন। এছাড়াও ছুটির দিনে শিক্ষকদের দিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করানো হয়। বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষকরা সরকারের অন্যান্য কর্মচারীর চেয়ে কম ছুটি ভোগ করেন। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ কিছু সুপারিশ রাখতে চাই-
ছুটির তালিকা সংশোধন করে জাতীয় দিবসগুলোকে কর্মদিবস দেখানো হোক। শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ভাতা প্রতি ৩ বছর পরপর প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য জাতীয় দিবসের ছুটিসহ প্রয়োজনে অন্যান্য ছুটি কমিয়ে ১৫ দিন গ্রীষ্মের ছুটির বিধান রাখা হোক। প্রাথমিক শিক্ষকদের ছুটি অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর চেয়ে কম। অথচ শিক্ষকরা কেন ভোকেশনাল বিভাগের অন্তর্ভুক্ত থেকে চিকিৎসা ছুটি অর্ধ-বেতনে ভোগ করবে? চাকরি লাম্পগ্র্যান্ট কেন সরকারি অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো পাবে না? অর্জিত ছুটিতে কেন বৈষম্য থাকবে? প্রাথমিক শিক্ষকদের নন-ভোকেশনাল বিভাগের আওতাভুক্ত করে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হোক। বাংলাদেশ শিক্ষার্থী-শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা কমিটি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করছে। এ বিষয়ে তারা শিগ্গিরই সংগঠিত হবে।
আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করবেন। কতিপয় স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তার ভুলের জন্য বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি মোটেই কাম্য নয়। শিগ্গিরই প্রতিষ্ঠিত হবে শিক্ষকদের অধিকার- অধীর আগ্রহে সেই প্রত্যাশায় রয়েছে শিক্ষক সমাজ।
মো. সিদ্দিকুর রহমান : শিক্ষক নেতা ও প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক গবেষক

কতদূর যেতে পারবেন সিরিসেনা? by তারেক শামসুর রেহমান

শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবে মিথ্রিপাল সিরিসেনার বিজয়ের পর একটি প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠেছে- তিনি কতদূর যেতে পারবেন? কতগুলো সিদ্ধান্তের কথা তিনি নির্বাচনের আগে ও পরে জানিয়েছেন। এগুলোর সব কি তিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন? শ্রীলংকার মানুষ একটি পরিবর্তন চেয়েছে। আর সেই পরিবর্তনটি সম্পন্ন হয়েছে। ছ’বছরের জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু যেতে হবে অনেক দূর।
যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তিনি জানিয়েছেন, তা শ্রীলংকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক. তার এক ঘনিষ্ঠ সহচর জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা আগামী মাসে নয়াদিল্লি সফর করবেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং শ্রীলংকার বৈদেশিক নীতির সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে অতিমাত্রায় চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এমনকি তার শাসনামলে এ অঞ্চলে চীন-পাকিস্তান-শ্রীলংকা একটি অক্ষ তৈরি হয়েছিল। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, চীন শ্রীলংকার উন্নয়নে একটি বড় অবদান রেখেছে। রাজাপাকসের নিজস্ব এলাকা হচ্ছে হামবানতোতা। একসময় এ অঞ্চল ছিল গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ও অনুন্নত। রাজাপাকসে চীনের সহায়তায় এ অঞ্চলে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছেন। একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম তৈরি করে দিয়েছে চীন। এখন সিরিসেনা চীনের ওপর এ নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেবেন। তবে এটাও সত্য, শ্রীলংকার মানুষ কিছুটা স্বাধীনচেতা। ভারতীয় ‘আধিপত্যকে’ তারা কখনও স্বীকার করে নেয়নি। তামিল বিদ্রোহ ঠেকাতে ১৯৮৭ সালে ভারতীয় সৈন্য জাফনায় প্রবেশ করেছিল। ওই ‘যুদ্ধে’ প্রায় ১২শ’ ভারতীয় সৈন্য প্রাণ হারায়। ফলে ১৯৯০ সালে ভারত তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয়ত, একটি ঐকমত্যের সরকার গঠন করার কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু সংসদে রাজাপাকসের সমর্থকের সংখ্যা বেশি। সিরিসেনা শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টির সবার সমর্থন পাবেন, এটা মনে করার কারণ নেই। তৃতীয়ত, তিনি প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন এবং সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী পুনঃস্থাপনের (রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বাতিল) কথাও বলেছেন। এ ক্ষেত্রে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন তিনি নাও পেতে পারেন। চতুর্থত, শিরানি বন্দরনায়েকে অর্থাৎ সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তিনি ফিরিয়ে আনার কথাও বলেছেন। এটিও খুব সহজ হবে না। স্বাধীন বিচার বিভাগ, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কাজটিও খুব সহজ হবে না।
তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, শ্রীলংকায় গণতন্ত্রেরই বিজয় হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি মাহিন্দ রাজাপাকসে হেরে গেছেন। উন্নয়নশীল দেশের গণতন্ত্রের জন্য এটা একটা বড় শিক্ষা, যেখানে ক্ষমতায় থেকেও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জনরায়ে হেরে যান। হেরে যাওয়ার আগেই তিনি পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিলেন এবং কোনো রকম আপত্তির কথা তার সমর্থকদের মুখ থেকে শোনা যায়নি। কোনো ধরনের ‘সূক্ষ্ম কারচুপির’ কথাও আমরা শুনিনি। এটাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় যাওয়া যায়। আবার জনসমর্থন না থাকলে ‘জোর করে’ সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করেও ক্ষমতায় থাকা যায় না। রাজাপাকসের বিদায় এটাই প্রমাণ করল আবার। অথচ রাজাপাকসে একসময় যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। শ্রীলংকাকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে তিনি রক্ষা করেছেন। ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তিনি ‘বিজয়ী’ হয়েছেন। তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে শ্রীলংকার সেনাবাহিনীর বিজয় নানা বিতর্কের জন্ম দিলেও এটা প্রমাণিত হয়েছিল যে, রাজাপাকসে যদি ওই সময় টাইগারদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা না করতেন, তাহলে সম্ভবত শ্রীলংকা তার রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারত না।
এখানে বলা ভালো, রাজাপাকসে ২০০৫ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে সেখানে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার একটি প্লাস পয়েন্ট ছিল, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চলা তামিল বিদ্রোহ দমন করেছিলেন। ২৬ বছর ধরে চলা তামিল বিদ্রোহ দমন করে তিনি সিংহলি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল পারিবারিকীকরণের। তার দু’ভাই, ছেলে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তারা প্রভাব খাটাতেন। এ পারিবারিকীকরণ শ্রীলংকার সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। তামিল টাইগারদের পরাজিত করার মাধ্যমে অর্জিত জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে ২০১০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। তার দ্বিতীয় টার্ম শেষ হওয়ার কথা আরও দু’বছর পর। তৃতীয় টার্মে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন না- এ ক্ষেত্রে সংবিধান অন্যতম বাধা ছিল। কিন্তু অত্যন্ত উচ্চাকাক্সক্ষী রাজাপাকসে সংবিধানে পরিবর্তন এনে নিজের জন্য তৃতীয়বার প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ প্রশস্ত করেন। তার ধারণা ছিল, তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাবে না বিরোধী দল। কিন্তু তার সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিথ্রিপাল সিরিসেনা যে খোদ তাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসবেন, এটা তিনি বুঝতে পারেননি। একসময় সিরিসেনা তার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এমনকি ক্ষমতাসীন শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টির তিনি ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সিরিসেনা অক্টোবরে (২০১৪) মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এক পর্যায়ে রাজাপাকসেকে তিনি চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি কোনো প্রার্থী দেয়নি। বরং তারা একত্রিত হয়ে সিরিসেনাকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে এবং নির্বাচনে তাকে সর্বাত্মক সমর্থন দেয়। নির্বাচনের আগে সিরিসেনার সঙ্গে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির যে সমঝোতা হয়েছিল, তার আলোকেই বিরোধীদলীয় নেতা রনিল বিক্রমাসিংহকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। বিক্রমাসিংহ ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথও নিয়েছেন।
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিরিসেনার বিজয় এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ জয়ের সুবাদে এত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও রাজাপাকসে হেরে গেলেন কেন, এ প্রশ্ন এখন অনেকেই করেন। রাজাপাকসে জনগণের পালস বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ক্ষমতা মানুষকে যে ‘অন্ধ’ করে দেয়, রাজাপাকসে ছিলেন তার বড় প্রমাণ। তিনি শ্রীলংকার মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে এক ধরনের একনায়কতন্ত্র চালু করেছিলেন। তার নিজের কথাই ছিল আইন। প্রায় ৯৮ ভাগ শিক্ষিতের দেশ শ্রীলংকার মানুষ এটা গ্রহণ করে নেয়নি। তার এই একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে মানুষ তার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। তিনি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, যা শ্রীলংকার সাধারণ মানুষ সমর্থন করেনি। তিনি পরিবারতন্ত্র চালু করেছিলেন, এটাও মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। যদিও শ্রীলংকায় এক ধরনের পরিবারতন্ত্র চালু আছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা কিংবা তার মা প্রয়াত শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে পরিবারতন্ত্রেরই প্রতিনিধিত্ব করে গেছেন। বন্দরনায়েকে ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তী (১৯৪৮ সালে দেশটি স্বাধীন হয়) শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী শ্রীমাভো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে মেয়ে চন্দ্রিকাও প্রেসিডেন্ট হন। মেয়ে চন্দ্রিকা যখন প্রেসিডেন্ট, তখন মা শ্রীমাভো দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
সিরিসেনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্তি সবাইকে অবাক করেছে। তাকে ঘিরে একটি বড় ধরনের ‘ঐক্য’ গড়ে উঠেছে। আমাদের মতো দেশ হলে বিরোধী দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) নিজেদের প্রার্থী দিত। কিন্তু দলটি তা করেনি। বরং সিরিসেনাকে সমর্থন দিয়ে শ্রীলংকায় একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই অনেক প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে। এক. যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আদৌ থাকবে কি-না? সিরিসেনা ইতিমধ্যেই ইউএনপি নেতা রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধানমন্ত্রী করলেও প্রশ্ন হচ্ছে, সিরিসেনার নিজের দল শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি এই ঐকমত্যের প্রক্রিয়াকে সমর্থন করবে কি-না? সাধারণত যিনি হেরে যান, তিনি আর রাজনীতিতে তেমন একটা সক্রিয় থাকেন না (যেমন চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা)। এখন দেখার বিষয়, রাজাপাকসে আদৌ শ্রীলংকার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন কি-না। তবে শ্রীলংকার ইতিহাস বলে, ফ্রিডম পার্টিকে এখন নতুন একজন নেতা খুঁজতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে রাজাপাকসে শ্রীলংকার অখণ্ডতা রক্ষা করেছেন সত্য, কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি শ্রীলংকার তামিলদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। এটা ছিল তার বড় ব্যর্থতা। সাধারণ তামিলরা তাকে বরাবর ঘৃণা করে আসছে। এবং নির্বাচনে তারা এককভাবে সিরিসেনাকে ভোট দিয়েছে। এখন সিরিসেনার প্রধান কাজ হবে তামিলদের আস্থা অর্জন করা। সেই কাজটি করা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। সিংহলিদের একটা অংশ এখনও তামিলবিরোধী। শ্রীলংকার জাতিগত দ্বন্দ্বের ইতিহাসও বেশ পুরনো। ৬৫ হাজার ৬০৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট এ দেশটির লোকসংখ্যা মাত্র ২ কোটি ৩ লাখ। ভারত মহাসাগর ঘেঁষা এ দেশটি বিভিন্ন সময়ে পর্তুগাল, হল্যান্ড ও ব্রিটেনের কলোনি ছিল। ১৫০৫ সালে পর্তুগিজরা দেশটির পশ্চিমে ও দক্ষিণে বসতি স্থাপন করে। পনেরো শতকের মাঝামাঝি ডাচরা (হল্যান্ড) দেশটি দখল করে নেয়। ১৮০২ সালে শ্রীলংকা পৃথক ব্রিটিশ কলোনিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দেশটির পরিচয় ছিল সিংহল হিসেবে।
তৃতীয়ত, তামিলদের আস্থা অর্জন করার কাজটি হবে কঠিন। জনগোষ্ঠীর ১১ দশমিক ২ ভাগ তামিল। তামিল টাইগার নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের ‘হত্যাকাণ্ডের’ ঘটনা সাধারণ তামিলরা মেনে নিতে পারেননি আজও। প্রবাসী তামিলদের মাঝে স্বাধীনতার চেতনা এখনও আছে। শ্রীলংকার মূলধারার রাজনীতিতে এদের নিয়ে আসার কাজটি হবে কঠিন। তামিল অধ্যুষিত দুটি প্রদেশ (মোট প্রদেশ ৯টি) পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলকে ২০০৬ সালে একত্রিত করা হয়। কিন্তু প্রাদেশিক নির্বাচন ও প্রাদেশিক সরকার গঠিত হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব বেশি। সত্যিকার অর্থে প্রাদেশিক সরকার কোনো স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে না। ফলে তামিলরা এখনও নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। সিরিসেনাকে এখন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বলা ভালো, ইংরেজরা শ্রীলংকায় ব্রিটিশ শাসন কায়েম করার আগে থেকেই সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী তামিলরা বসতি স্থাপন করে। তামিলরা আসে মূলত ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য থেকে। ব্রিটিশরা তাদের এ অঞ্চলে চায়ের বাগান ও রাবার বাগানে কাজ করার জন্য নিয়ে এসেছিল। তবে দীর্ঘদিন তাদের শ্রীলংকার নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। এ বৈষম্যমূলক আচরণের ফলেই তামিলরা ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করে। তবে তামিল টাইগারদের (তারা প্রতীক হিসেবে বাঘের মুখ ব্যবহার করত বলে তামিল টাইগার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল) কথা প্রথম জানা যায় ১৯৭৫ সালে যখন জাফনার মেয়র দুরায়াপ্পাকে টাইগাররা হত্যা করে।
চতুর্থত, শ্রীলংকার জনসংখ্যার ১০ ভাগ হচ্ছে মুসলমান (জনসংখ্যার ৭৪ দশমিক ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী)। সাম্প্রতিককালে সেখানে মুসলমান-বৌদ্ধ দাঙ্গার খবর আমরা জানি। বাংলাদেশ দূতাবাস আক্রান্ত হওয়ার খবরও রয়েছে। একটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জঙ্গিগোষ্ঠী ‘বদু পালা সেনা’র অপতৎপরতা এবং শ্রীলংকাকে একটি পরিপূর্ণ বৌদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার ঘোষণার খবরও আমরা জানি। রাজাপাকসে এদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এখন দেখার বিষয় সিরিসেনা এদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেন।
পঞ্চমত, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শ্রীলংকায় মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় সোচ্চার। জাতিসংঘ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে এবং শ্রীলংকার বেশ কিছু সামরিক কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শ্রীলংকাকে দেয়া জিএসপি সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে। এখন সিরিসেনাকে বহির্বিশ্বের, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আস্থা অর্জন করতে হবে। কাজটি খুব সহজ হবে না নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য।
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার জন্য একটা খারাপ খবর হল সংসদের স্পিকার হচ্ছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের ভাই চামাল রাজাপাকসে। ২২৫ আসনবিশিষ্ট সংসদে রাজাপাকসের সমর্থকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তার দলের সদস্য সংখ্যা ১৪৪। আর প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের (যিনি এর আগেও দু’বার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং একবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসের কাছে হেরে যান) দলের সদস্য সংখ্যা মাত্র ৬০। সমস্যাটা এখানেই তৈরি হবে। বিক্রমাসিংহ সংসদের আস্থা নাও পেতে পারেন। ২০১৬ সালে সেখানে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এটা সত্য, সিরিসেনা একটি ভালো নির্বাচন দেয়ার জন্য রাজাপাকসেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে এ প্রশ্নও উঠেছিল- নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশংকায় রাজাপাকসে সেনা নামাতে চেয়েছিলেন। তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রীলংকায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে। একটি ভালো নির্বাচন সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবেই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ঋণখেলাপি হওয়ার কারণগুলো দূর করা দরকার by মোঃ খলিলুর রহমান চৌধুরী

গণমাধ্যমে প্রায়ই ব্যাংকিং খাতের ওপর নানা নেতিবাচক সংবাদ থাকে। এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সুনাম পুনরুদ্ধার করতে হলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করা প্রয়োজন। যেমন- খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের অন্যতম সমস্যা। ঋণ প্রদান করা হয় সাধারণত ভূমি, ভবন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সম্পদ বন্ধক রেখে। সাধারণত এক-দেড়গুণ (ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী) সম্পদ জামানত হিসেবে বন্ধক নিয়ে ঋণ প্রদান করা হয়। কিন্তু ঋণ শ্রেণীবিন্যাসের নীতিমালা অনুসারে মঞ্জুরিকৃত ঋণের যোগ্য জামানত বিবেচনাকালে ভূমি ও ভবনের ৫০ শতাংশ মাত্র বিবেচনা করা হয়, যন্ত্রপাতি বিবেচনাই করা হয় না। আবার ঋণের জামানতের ১৫ শতাংশের বেশি মূল্য বিবেচনা করা যায় না। ফলে ঋণ শ্রেণীবিন্যাসের সময় জামানতের ঘাটতি সৃষ্টি হয়, যার কারণে ঋণ সঞ্চিতি সৃষ্টি করতে হয়।
ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি ও দায়িত্বে ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়ন করে ঋণ প্রদান করে থাকে। ব্যাংকগুলো কেবল বন্ধককৃত জামানত থেকেই ঋণ আদায় করতে আইনগতভাবে বাধ্য নয়। ঋণ গ্রহীতারা ঋণ নিয়েছেন ঋণ ফেরত দেয়ার জন্য। এ ধরনের সংস্কৃতি ও আইনানুগ পরিবেশ যদি বিরাজমান থাকে, আইন-কানুন ও তার প্রয়োগ যদি যথাযথ থাকে, তাহলে আদায়-সন্দেহজনক ঋণের বিষয়ে হিসাবের সঞ্চিতি গড়ে তোলাই ভালো। একসময় এভাবেই সন্দেহজনক ঋণের সঞ্চিতি গড়ে তোলা হতো। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যমান ঋণ শ্রেণীবিন্যাসের স্থান, কাল, পাত্র, প্রেক্ষাপট নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য গতানুগতিক গাণিতিক নীতিমালার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাই ঋণ মঞ্জুরকালে পর্যাপ্ত জামানত থাকারও বিধান থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুসারে কোনো ঋণ তিনবারের বেশি পুনঃতফসিলিকরণ করা যায় না। ঋণের শ্রেণীবিন্যাসের ধরন অর্থাৎ সাবস্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল, ব্যাড অ্যান্ড লস এবং কতবার ঋণ পুনঃতফসিলি করা হয়েছে ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে ঋণের মেয়াদ ক্ষেত্রভেদে ১২ মাস থেকে ৩৬ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করার বিধান করা হয়েছে। তাছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলিকরণকালে কতবার ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ করা হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হারে ডাউন পেমেন্ট প্রদান করতে হয়। সাধারণত সমস্যাগ্রস্ত প্রকল্পের ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ করার প্রয়োজন হয়। ঋণ পুনঃতফসিলিকরণকালে পেশাগতভাবে দেখার বিষয় হচ্ছে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা যথাযথ আছে কি-না, প্রকল্পের যন্ত্রপাতির উৎপাদন যথাযথ আছে কি-না, ঋণের জামানত সঠিক আছে কি-না, প্রকল্প সম্পদের আয়ুষ্কাল কত, প্রকল্পের প্রাক্কলিত আয় প্রবাহের ভিত্তিতে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে কত সময় লাগবে ইত্যাদি। এসব বিবেচনা না করে সব ক্ষেত্রে গতানুগতিকভাবে ঋণের কিস্তি ও পরিমাণ নির্ণয়পূর্বক ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের ফলে কিস্তির পরিমাণ অযৌক্তিক হয়, যা ঋণগ্রহীতারা পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এর পরিণতিতে শ্রেণীকৃত ঋণ বৃদ্ধি পায়, প্রভিশনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংকের মুনাফায় বিরূপ প্রভাব পড়ে।
যেসব ঋণ আদায়ের কোনোই সম্ভাবনা নেই এবং আদায়ের সব প্রচেষ্টাই নিঃশেষ হয়েছে, সেক্ষেত্রেই কেবল ঋণ অবলোপন করা যায়। অথচ দেখা যাচ্ছে, মামলার নিষ্পত্তি হয়নি, আদায়ের সব প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি, আদায়ের সম্ভাবনাও শেষ হয়নি- এমন ঋণও অবলোপন করতে হচ্ছে গতানুগতিক নিয়মনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে। অবলোপনকৃত ঋণ ব্যালেন্স শিটের বাইরে থাকছে। ফলে ঋণগুলোর ওপর ব্যাংকের থ্রেড অব ওয়ার্ক শিথিল হচ্ছে। তাছাড়া ঋণগুলো আদায়ের ব্যাপারে ব্যাংকের নৈতিক অধিকারও দুর্বল হচ্ছে। এভাবে একপর্যায়ে অবলোপনকৃত ঋণের সুদও শতভাগ মওকুফ হচ্ছে। তবে ওই ধরনের মওকুফের ক্ষেত্রে ঋণের জামানত বিক্রি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও আর্থিক অবস্থা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়েই মওকুফ করা দরকার। ওই ঋণগুলো থেকে আদায়কৃত অর্থ ব্যাংকের হিসাবের খাতায়ই থাকছে। ফলে অবলোপন সংক্রান্ত ঋণ হিসাবগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে সত্য ও সঠিক চিন্তা প্রতিফলিত হয় না। মন্দ ঋণের ক্ষেত্রে আদায়ের সব প্রচেষ্টা ও সম্ভাবনা নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত ঋণের সন্দেহজনক সঞ্চিতি গড়ে তুলতেই হয়। এতে অন্তত পাওনার ওপর নৈতিক অধিকার সবল থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনঃতফসিলি করতে হলে ন্যূনতম ডাউন পেমেন্ট প্রয়োজন হয় ১০ শতাংশ অথচ স্বল্পমেয়াদি ঋণ পুনঃতফসিলি করতে ডাউন পেমেন্ট লাগে ৫ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদি ঋণকে পুনঃতফসিলি করে দীর্ঘমেয়াদি করতে হলে সেক্ষেত্রে স্থায়ী জামানত বন্ধক নিয়ে ঋণকে জামানত সমৃদ্ধ করতে হবে কি-না সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। স্বল্পমেয়াদি ঋণকে যদি দীর্ঘমেয়াদি ঋণেই রূপান্তর করার সুযোগ দেয়া হবে, তাহলে তা এক বছরের জন্যই বা কেন এবং কিস্তিই বা মাসিক হবে কেন? পুরো বিষয়টি প্রকল্পের আয়ুষ্কাল ও আয় প্রবাহের ভিত্তিতেই করা দরকার।
ব্যাংকের মূল কাজ জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ করে মূলধন সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে বিনিয়োগ করা। তাতে সঞ্চয়কারীরা সঞ্চয় করতে উদ্বুদ্ধ হয়, মুনাফা পায়। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের, শিল্পের মালিকরা মূলধনের চাহিদা মেটাতে পারে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে এবং জিডিপি ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যে কম সুদে আমানত সংগ্রহ করে ন্যূনতম মার্জিন রেখে ঋণ প্রদান করতে পারে সে তত দক্ষ ব্যাংকার। এ ধরনের প্রতিযোগিতা সুস্থ অর্থনীতি বিকাশের জন্যই প্রয়োজন। কিন্তু ঋণ প্রদানের প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে যদি সিলিং নির্ধারণ করে দেয়া থাকে, অন্যদিকে আমানত সংগ্রহের জন্য যদি কোনো সিলিং না থাকে, তাহলে আমানত সংগ্রহের পর সেগুলো বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় সঞ্চয়ের খরচের হারের চেয়ে কম হারে যেনতেনভাবে যেখানে সেখানে বিনিয়োগ করে ব্যাংককে লোকসান দিতে হয়। আবার আমানতকে নিরুৎসাহিত করা ব্যাংকের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং তা দেশের মূলধন গঠন করার নীতিরও পরিপন্থী।
ঋণ শ্রেণীবিন্যাসের কারণে অনেক ব্যাংককে নেট লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করতে হলে ব্যাংকের লাভ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তা করতে হলে প্রথমেই আমানত সংগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ দান বৃদ্ধি করতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, দেশে বর্তমান খেলাপি সংস্কৃতির পরিবেশে সমাজে ঋণ দান করলেই খেলাপি হবে, অতএব কোনো ঋণ দেয়া ঠিক হবে না। তাই বলে ব্যাংক ঋণদান বন্ধ করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কাকে ঋণ দেয়া হলে খেলাপি হবে না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য যা করা দরকার তা-ই করা উচিত।
ব্যাংকিং খাত পরিচালনার জন্য কিছু মৌলিক নীতিমালা থাকা উচিত, যেমন- সার্ভিস রুল, অর্গানোগ্রাম, নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা ইত্যাদি। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও নির্দেশনা এ রকম। অর্থাৎ পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা অনুমোদন করবে এবং সিইও সেই নীতিমালা অনুসারে ব্যাংক পরিচালনা করবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিমালাগুলো অনুমোদিত, জারিকৃত ও পরিপালিত হওয়া উচিত। এ নিয়মের ব্যত্যয় কাম্য নয়। ব্যাংক পরিচালনা করতে হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা জাগ্রত রাখতে হবে। এজন্য প্রত্যেক কর্মকর্তা তথা ব্যাংকের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিু পর্যন্ত পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, ভালো কাজের পুরস্কার, মন্দ কাজের শাস্তির বিধান থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সিইওর নিচে বিভিন্ন স্তরে অনেক কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত এবং লাইন ম্যানেজমেন্টে কর্মরত, যাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সার্ভিস রুল প্রযোজ্য নয়। তাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা কাজকর্মে ব্যাংকের নিয়মনীতির প্রতি থাকেন উদাসীন ও অমনোযোগী।
মোঃ খলিলুর রহমান চৌধুরী : ব্যাংকার

তিনি ছিলেন জনমানুষের নেতা by ড. সুশান্ত দাস

আজ ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সভাপতি কমরেড অমল সেনের দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী। এ বছরই পালিত হচ্ছে তার জন্মশতবর্ষ। সেদিক দিয়ে এ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করা অন্যান্য বছরের চেয়ে ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে।
সময় ও ইতিহাস প্রয়োজনে ক্ষণজন্মা মানুষদের তৈরি করে, আবার এরাই ইতিহাস তৈরি করে সময়কে এগিয়ে নেয়ার জন্য- এটাই সভ্যতার শিক্ষা। কমরেড অমল সেনদের আদর্শ ও কর্মকে বুঝতে হলে তাদের সময়কালটা বুঝতে হবে। তিনি জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালের ১৯ জুলাই, যশোর জেলার আফরা গ্রামে এক জমিদার পরিবারে। মহামতি লেনিনের বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে সফল হয়েছিল রুশ বিপ্লব। পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এ বিপ্লবের অভিঘাত বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে তৈরি করে এক যুগান্তকারী চেতনা। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক শাসন আর শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম নতুন গতিবেগ আর দিকনির্দেশনা পায়। তৎকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আবহে বেড়ে ওঠা কমরেড অমল সেনও জড়িয়ে পড়েন জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে এদেশেও। তিনি দ্রুতই আকৃষ্ট হন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের প্রতি। তিনি আরাম-আয়েশে গড়ে ওঠা সামন্ত পরিবারের আবহ উপেক্ষা করে জায়গা করে নেন গরিব কৃষকের কুঁড়েঘরে। গড়ে তোলেন যশোর-নড়াইল অঞ্চলের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন। এ কৃষক সংগ্রাম তৎকালীন রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এ আন্দোলন কৃষকের কিছু দাবি নিয়ে গড়ে উঠেছিল ঠিকই; কিন্তু সীমাবদ্ধ থাকেনি তাতে। এ আন্দোলনের দোলাচলে যুগ যুগ ধরে অন্ধকারে পড়ে থাকা মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে শিক্ষা, সংস্কৃতি আর চেতনার এক নবদিগন্ত। কমরেড অমল সেন ছিলেন সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা নেতা। যখন নির্যাতন-নিপীড়ন নেমে এসেছে, তখনও তিনি সামনে দাঁড়িয়েই তা সহ্য করেছেন। পাকিস্তান আমলে তাকে ১৯ বছর কাটাতে হয়েছে জেলে। জেলের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে তাকে ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি শত নির্যাতনেও দেশত্যাগ করেননি, ত্যাগ করেননি বিপ্লবী জীবন।
ব্যক্তিজীবনে অকৃতদার এ মানুষটির জীবনেও কম টানাপোড়েন আসেনি। তিনি তা মোকাবেলা করেছেন তাত্ত্বিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত লাইনের বাম বিচ্যুতি (‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ স্লোগান) পার্টিকে যে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে, তা তিনি তার কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক চেতনা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন এবং এর বিরোধিতা করেছিলেন। ষাটের দশকে যখন বিশ্বব্যাপী চীন-সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শগত বিতর্ক দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে দ্বন্দ্ব ও ভাঙনের মুখোমুখি করে, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিও সে বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারেনি। তিনি গোটা বিষয়টিকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবেলা করেছেন, যা তার দুটি ঐতিহাসিক দলিলে লিখে গেছেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের ভূমিকাকে সামনে নিয়ে তিনি তাতে অংশ নিয়েছেন, পাশাপাশি তাদের ঐক্যবদ্ধও করেছেন। তিনি কমিউনিস্টদের ঐক্যের প্রতিভূ হয়ে উঠেছিলেন।
রাজনৈতিক কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান ছিলেন সন্দেহ নেই; কিন্তু মানুষ হিসেবে ছিলেন সম্ভবত আরও বড়। তার ব্যক্তিত্বের ঔদার্যে আর চরিত্রের মাধুর্যে অনেক মানুষই অভিভূত হয়েছেন। ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে একবার তার সংস্পর্শে এসেছে, সে-ই তাকে সারাজীবন মনে রেখেছে। অনেকেই জানেন না তিনি কবি ছিলেন। তার লেখা কবিতায় কৃষক রমণীর দুঃখগাথা থেকে কৃষকের কিশোরীকন্যার স্বপ্ন সবই স্থান পেয়েছে। তিনি ভালো অভিনেতা ছিলেন। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক যখন জেলখানায় প্রথম মঞ্চস্থ হয়, তাতে অমল সেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। দর্শনে তার ব্যুৎপত্তি ছিল অত্যন্ত উঁচুমানের। তার লেখা ‘দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিতে মুখ্যদ্বন্দ্ব’ প্রবন্ধটি মার্কসীয় দর্শনে একটি মৌলিক অবদান।
সবশেষে, যে কথাটি বিশেষভাবে না বললেই না তা হল, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক কৃষকের বন্ধু, কৃষক নেতা। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতা হতে চাননি, প্রয়োজনে তাকে সেই পদ নিতে হয়েছিল; কিন্তু মনেপ্রাণে তিনি কখনও কৃষকের আঙিনা ছাড়তে চাননি। কৃষিপ্রধান এ বাংলাদেশে এখন কৃষকনেতা নেই। কৃষকরা নিজেরাই নীরবে বিপ্লব সাধন করে এদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছেন; কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে, সামনে থেকে দুঃখ-বেদনা নিজের করে নেয়ার কেউ নেই। হয়তো অমল সেনরা আজও নিঃশব্দে তাদের হৃদয় কন্দরে নিঃশ্বাস ফেলে তাদের শক্তি জোগায়।
ড. সুশান্ত দাস : প্রাবন্ধিক

সহিংস রাজনীতি বন্ধের একমাত্র পথ গণতন্ত্রে উত্তরণ by মইনুল হোসেন

মনে হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী জোট টার্গেট হামলার প্রস্তুতি নিয়েই রাস্তায় নেমেছে। কার গুপ্তহত্যার তালিকা কার কাছে সেটা তারাই ভালো জানে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্য হচ্ছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানের ওপর গুলশান এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী আটজন যুবক হামলা চালায়। তাকে গুলিবিদ্ধ করে। তার গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। যারা সন্ত্রাসীদের বিচার দাবি করছেন, তাদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য হল, সন্ত্রাসীদের সাহস জোগানোর রাজনীতিতে কে কার বিচার করবে? যারা জড়িত তারা নিশ্চয়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এখনও দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য সোচ্চার হতে পারছেন না। মনে করছেন, নিজেরা নীরব থাকলে তারা নিরাপদ থাকবেন। এখনও তাই অন্যায় সুবিধাভোগীরা ভাবছেন তাদেরই বিজয় হবে। জাতি অসহায় ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে সবই মেনে নেবে।
সরকারি নেতৃত্বের একগুঁয়েমির স্বরূপ প্রকট হওয়ার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান ভয়াবহ সংকট নিরসনের কোনো সদিচ্ছা যে সরকারের নেই, তা এখন সবার কাছে পরিষ্কার। অবস্থা এসে এমন জায়গায় ঠেকেছে যে, স্বাধীন দেশের জনগণ অবাধ নির্বাচন প্রত্যাশা করতে পারবে না। কিন্তু স্বাধীনতার তাৎপর্য হচ্ছে, সরকার হবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। উন্নয়নের কথা শুনিয়ে ক্ষমতা দখলের ন্যায্যতা দাবি করা স্বৈরতন্ত্রের চিন্তাভাবনা। আমরা যখন বলি, পাকিস্তান আমলে আমরা স্বাধীন ছিলাম না, তখন অনির্বাচিত সরকারের স্বৈরশাসনের কথাই বুঝিয়ে থাকি।
প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম আমলা-উপদেষ্টা এইচটি ইমাম সাহেব প্রকাশ্যে বলে দিলেন, নির্বাচন কবে হবে তা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে, নির্বাচন কখন হবে সে ব্যাপারে সরকার শাসনতান্ত্রিক বিধান মানতে বাধ্য। অর্থাৎ বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হতে পারে না। নির্বাচন না করেই সরকার গঠনের দাবি কেউ করতে পারেন না। সরকারের পক্ষে জনসমর্থন থাকলে অবাধ নির্বাচনে তো কারও ভয়-ভীতি থাকতে পারে না। সরকারের নেতারা বলছেন, সন্ত্রাসীদের নিয়ে আলোচনায় বসতে পারেন না। অন্যরাও তো দাবি করতে পারেন, ভোট হরণকারীদের সঙ্গে তারা বসবেন না। সেজন্য স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে, জনগণের ভোটের অধিকার দলীয় রাজনীতির তর্ক-বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। বিজ্ঞ উপদেষ্টা সাহেব এমনও বলেছেন, প্রয়োজন হলে বিএনপিকে অবৈধ করা হবে। তিনি মনে করছেন, বিএনপিকে শেষ করতে পারলেই জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া যাবে।
এটা বলা নিশ্চয়ই অন্যায় হবে না যে, একশ্রেণীর বিবেকবর্জিত আমলা আছেন, তাদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন, তারা জনগণের অর্থে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করেন অথচ জনগণের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করেন না। পুলিশি ক্ষমতার অবপব্যবহারই তাদের শক্তি- জনগণ বা জনমত নয়। তারা সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য দিতে জানেন না। পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলবেন না।
এখন সরকার তাদের বুদ্ধিদাতাদের পরামর্শে গণতন্ত্রের কথা বেশি না বলে উন্নয়নের রাজনীতির কথা শোনাচ্ছে। দেশের জনগণকে খুব বেশি বোকা হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং নিজেদের খুব বুদ্ধিমান মনে করা হচ্ছে।
এটা সত্য হলে তাদের এও বলতে হবে যে, অতীতে বড় বড় নেতা গণতন্ত্রের নামে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছেন, তারা জনগণের উন্নয়ন-অগ্রগতি চাননি।
গণতন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় জনগণের ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য। স্বৈরশাসনেও উন্নয়ন হয়; কিন্তু সে উন্নয়নের সিংহভাগ ভোগ করে দুর্নীতিপরায়ণ লুটেরা শ্রেণী। তাই যারা গণতন্ত্রবিহীন উন্নয়নের কথা বলছেন, তারা তো লুটেরাদের উন্নয়নের কথা বলছেন। লুটেরাদের নিয়ে নিজেরা লাভবান হওয়ার একটি পাকাপোক্ত গণবিরোধী ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করার কথাই ভাবছেন।
সরকারের সুবিধাভোগীরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ের লোকের সম্পৃক্ততা না থাকলে বিএনপির আন্দোলন জনগণের আন্দোলনে রূপ নেবে না। তারা এখন সরকারের বিরুদ্ধে মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন দেখতে চাইছেন।
অর্থাৎ সিভিল ওয়ার। দায়িত্বহীনতার একটা সীমা থাকা দরকার।
নির্বাচনী বৈধতার জন্য মাঠ পর্যায়ের লোকদের সমর্থন তো প্রয়োজন হবে সরকারের। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য মাঠ পর্যায়ের কেন, কোনো পর্যায়ের আন্দোলনই তো হওয়ার কথা নয়। জনগণের ভোটের অধিকার স্বাধীনতার অধিকার, জনগণের সার্বভৌমত্বের অধিকার। এটি কারও সঙ্গে আপস-সমঝোতার বিষয় নয়। জনগণ স্বাধীনতার মাধ্যমে এ ভোটাধিকার অর্জন করেছে- কারও অনুগ্রহের অনুদান হিসেবে পায়নি। এজন্যই আমাকে বারবার বলতে হচ্ছে, দেশে সত্যিকার রাজনীতি নেই, রাজনৈতিক নেতৃত্বও নেই।
একটি ভুয়া নির্বাচনকে যেসব বুদ্ধিজীবী গণতন্ত্র মনে করেন, তারাই যখন আবার বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চলতে দেখে গণতন্ত্র গেল, গণতন্ত্র গেল বলে হা-হুতাশ করেন, তখন বুঝতে পারি না তারা আসলে নিজেদের কত চালাক-চতুর মনে করেন। অপরদিকে একদল বড় ব্যবসায়ী আছেন, যারা জনসাধারণের ভাগ্যে যা-ই ঘটুক না কেন এবং তাদের ওপর যে কোনো ধরনের অন্যায়-নির্যাতন চালানো হোক না কেন, পুলিশের ব্যবস্থাধীনে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে পারলেই তারা খুশি। বলবেন, দেশে শান্তি বিরাজ করছে। অপর একদল আছেন যারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির থিওরি দেবেন; কিন্তু নির্বাচনই যে সংকট নিরসনের সহজ ও একমাত্র পথ তা স্পষ্টভাবে বলবেন না। প্রহসনের নির্বাচন করতে গিয়েই যে বর্তমানের ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তাও তারা স্বীকার করবেন না।
অথচ সবাই মিলে যদি কিছুটা দূরদর্শিতা, কিছুটা সৎ সাহসের স্বাক্ষর রাখতে পারতাম, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হতো না যে, জনমতের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়ে শুধু পুলিশি নির্যাতনের ওপর নির্ভর করে কোনো সরকার জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা আনতে পারে না, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে পারে না। লজ্জাজনক হলেও বলতে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষিত সচেতন শ্রেণীর লোকজন একটু দূরদর্শী হলে, কম সুবিধাবাদী হলে স্বাধীন বাংলাদেশে জেল-জুলুম-হত্যা-গুমের রাজনীতির কথা ভাবাই অসম্ভব হতো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে নিয়মিত ক্ষমতা হস্তান্তর হলে দেশব্যাপী সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতা এত উৎকট হতো না। বিএনপির পক্ষে অবাধ নির্বাচনের যে দাবি তোলা হয়েছে, সেটা শুধু দলীয় দাবি নয়। তাই এ বিষয়টির গুরুত্ব অস্বীকার করার মতো নয়। বিষয়টি স্বাধীন জনগণের ভোটাধিকার, অর্থাৎ আমার, আপনার- সবার ভোটের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচন করা আমাদের সবার অধিকার ও দায়িত্ব। সরকারকে তাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেই হবে।
শিক্ষিত সুবিধাবাদীদের রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা ও সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাদেরই সাহায্য করছে, যারা জনগণের ওপর অবৈধ ও অবাঞ্ছিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু এখনই নয়, অতীতেও একই কাজ করা হয়েছে। যে কারণে এখন সরকারের পক্ষে বলা সহজ হচ্ছে, কখন নির্বাচন হবে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার এবং সে নির্বাচনও হবে তাদের সরকারের অধীনেই। অর্থাৎ দেশের মালিক-মোক্তার তারা, আমরা নই, জনগণও নয়। আমাদের কারও কিছু বলার নেই। কারও সঙ্গে আলাপ-আলোচনারও তো কিছু থাকতে পারে না। আরও কঠিন হওয়ার কথাই সরকার বারবার শোনাচ্ছে। এ মুহূর্তে দেশব্যাপী সহিংসতার কারণে যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে, তা থেকে কোর্ট-আদালতের বিচারকরাও নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারছেন না। স্বৈরশাসন সুবিচারের সহায়ক শক্তি হতে পারেনি বলেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠানের ওপর। অথচ হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টের কাছ থেকে তারা কিছুটা হলেও বিচার পেয়েছে।
যে ভোটাধিকারের জন্য এদেশের জনগণকে পাকিস্তান ভাঙতে হয়েছে, লাখ লাখ লোককে প্রাণ দিতে হয়েছে- সেই ভোটাধিকারের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণকে ঘুরেফিরে বারবার রক্ত দিতে হচ্ছে। দেশব্যাপী ভয়াবহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রশ্রয় পাচ্ছে।
এটা কে না জানে যে, আমাদের রাজনীতির বিরাট অংশজুড়ে চলছে দুর্নীতি, ভুয়া মামলা আর মিথ্যার খেলা। খুন-খারাবি, হরতাল-অবরোধ বা ঘেরাওয়ের রাজনীতি তো নতুন কিছু নয়। জনগণ রক্ত দেবে আর নেতারা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। যারা ক্ষমতায় থাকবেন, তারা পুলিশসহ সব রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করবেন। যারা বিরোধী দলে আছেন, তারাও দলীয় পেশিশক্তি প্রয়োগ করবেন। ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াওয়ের আশ্রয় নেবেন। প্রশ্ন করলে নেতাদের অনুসারী ও সহযোগীরা বলেন, এটাই রাজনীতি।
পুলিশি ক্ষমতা যতই দেখানো হোক না কেন, বাস্তবে সরকার যে কত অসহায় তার দৃষ্টান্ত দেখা গেল বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতের বিজেপি সভাপতির তথাকথিত টেলিফোন কল নিয়ে। বেগম খালেদা জিয়ার ওপর পুলিশ পিপার স্প্রে করার পর তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সভাপতি টেলিফোনে খোঁজখবর নিয়েছেন শুনে সরকারকে অস্বাভাবিক অস্বস্তিতে ভুগতে হয়েছে। অথচ দুটি বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে অপর একজন রাজনৈতিক নেতার সৌজন্যমূলক ফোনালাপ হতেই পারে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আমাদের সরকার এতটা দুশ্চিন্তায় পড়ল যা দেখে মনে হয়েছে, বৈধ সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ভারত তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। নইলে এত শংকা ও উদ্বেগের কারণ ছিল না। আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি যে কত বিদেশনির্ভর, এ ঘটনায় তা পরিষ্কার হয়েছে। সরকার ও বিএনপির মধ্যে সংলাপ হবে না। কিন্তু সরকার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আলোচনা-সমঝোতার চেষ্টা করলে সেটাই হতো সবার জন্য শুভ ও কল্যাণকর। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

গুজরাট দাঙ্গায় মোদিকে দায়মুক্তি দিলেন মার্কিন আদালত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভয়াবহ গুজরাট দাঙ্গার দায় থেকে অব্যাহতি দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। বুধবার নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত এ ব্যাপারে রুল জারি করেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আমেরিকান জাস্টিস সেন্টার নামের মানবাধিকার সংগঠনটির সভাপতি জোসেফ হুইটিংটন ও ইলিনয়েসের সিটি কাউন্সিলের একজন সদস্য গত বছর সেপ্টেম্বরে মোদির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছিলেন। মামলার আর্জিতে বলা হয়, ‘মোদি দাঙ্গা বন্ধে ব্যর্থ হয়েছেন। এটি পরিষ্কার যে, গণহত্যার ঘটনাটি উপেক্ষার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে ভারতে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়।’ বুধবার শুনানি শেষে বিচারক অ্যানালিসা টরেস জানিয়েছেন, মার্কিন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী- বর্তমান সরকার প্রধান হিসেবে দায়মুক্তি পাওয়ার যোগ্য মোদি। মামলা দায়েরের সময় জোসেফ হুয়িটিংটন বলেছিলেন, এই মামলায় সফলতা পাওয়ার সুযোগ খুব কম। এটি একটি প্রতীকী বিজয়।
তবে আদালতের নতুন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে হুয়িটিংটনের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ২৬ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরের আগে এ সিদ্ধান্ত দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভারত সরকারও কিছু জানায়নি। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে গুজরাটের গোধরা স্টেশনে একটি ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অর্ধশতাধিক হিন্দু নিহত হওয়ার পর মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা শুরু করা হয়েছিল। মুসলিমবিরোধী ওই ভয়াবহ দাঙ্গায় দুই হাজারেরও বেশি মুসলমান নিহত হন। সে সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি। ওই দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে মোদির ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছিল মার্কিন সরকার। কিন্তু গত বছরের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় মোদির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আমেরিকা। টাইমস অব ইন্ডিয়া।