Thursday, February 6, 2014

প্রবাসী-আয়ে ভাটা

আশঙ্কাটা সত্যি হলো। সত্যটা আরও কঠিন না হোক। প্রবাসী-আয়ে ভাটা পড়া কেবল অর্থনীতির জন্যই নয়, দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্যই একটি অশনিসংকেত। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন, গাফিলতির খতিয়ান প্রয়োজন। গতকাল বুধবারের প্রথম আলো জানাচ্ছে, প্রবাসী-আয়ের প্রবাহে ভাটা চলছে। ২০১২-১৩ সময়ের তুলনায় ২০১৩-১৪ সময়ে এই আয় কমেছে ৮ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের চেয়ে এই অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিদেশ থেকে অর্থ আসা কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া এই তথ্য উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত। ব্যাংকের ভাষ্যমতে, ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হওয়ায় ব্যাংক মারফত টাকা আসার পরিমাণ কমেছে। এটা হতে পারে, কিন্তু অতীতেও এ রকম পরিস্থিতিতে প্রবাসী-আয় আসার পরিমাণ তো এভাবে কমেনি। প্রধান কারণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক বছর ধরে ক্রমেই জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়া। এই কমার মাত্রা গত বছরই ছিল সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অবশ্যই এর একটি কারণ। কিন্তু কারণগুলো আরও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশি জনশক্তির প্রধান গ্রাহক মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
গত বৈশ্বিক মন্দার সময়ও যে প্রবাহ কমেনি, সেটা কেন এ রকম অনুকূল বৈশ্বিক সময়ে কমল, তার কারণ বের করতেই হবে। প্রবাসী-আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। এই উৎসে ভাটার টান পড়লে বিপদ হতে বাধ্য। প্রবাসীদের অনেকের বেকার হয়ে ফিরে আসা অথবা অনেক বেকারের বিদেশে কর্মসংস্থান না হতে পারার সম্ভাবনা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। দুবাই, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিরাট বিরাট নির্মাণকর্ম শুরু হতে যাচ্ছে, সেসব প্রকল্পে বাংলাদেশের শ্রমিক ও প্রযুক্তিবিদ এবং বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞের চাকরি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। তা ছাড়া বাংলাদেশের জনশক্তির দক্ষতাকে কায়িক শ্রমের চেয়ে আরও ওপরে ওঠানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক উন্নয়নেও মনোযোগী হতে হবে।

আদমজী পাটকল হতে দেবেন না

অনুজ প্রতিম জনপ্রিয় শিক্ষক ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বছর কয়েক আগে প্রথম আলো পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলেন এই প্রশ্ন রেখে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি আদমজী পাটকলের ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে? তখন চারদলীয় জোট সরকারের আমল। বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে, সেই অজুহাতে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে সরকার বিশ্বের বৃহত্তম পাটকলটি রাতারাতি বন্ধ করে দিল। পাটকলটি নিয়ে এই দেশের মানুষের একটি গর্ব ছিল। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে আদমজী পাটকল বন্ধ করল আর একই বিশ্বব্যাংক ভারতকে একই সময় তিনটি পাটকল প্রতিষ্ঠা করার জন্য অর্থায়ন করল। সেটি অন্য প্রসঙ্গ। যখন জাফর ইকবাল কলামটি লেখেন তখন ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের হানাহানিতে একজন নিরীহ ছাত্রের মৃত্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ছাত্র সংঘর্ষের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। সংস্কৃতিটা সেই আইয়ুব-মোনায়েম খানের জামানা থেকে চলে আসছে।
বর্তমানে তা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়েছে। সম্প্রতি একই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলো। কিছু ফি বৃদ্ধির জটিলতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ হলো। এমন ঘটনা কিন্তু নতুন কিছু নয়। একবার আমার আগের কর্মক্ষেত্রে ৪০ মাইলের বাসভাড়া পাঁচ টাকা থেকে সাত টাকায় বৃদ্ধি করায় ছাত্রীরা আমাকে ১৭ ঘণ্টা অবরোধ করে রেখেছিল। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু এককালীন ফি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো আন্দোলন গড়ে তুললে সেই আন্দোলন অনেকটা শান্তিপূর্ণ থাকলেও অচিরেই তাদের অজান্তে আন্দোলন ক্যাম্পাস দখলধারী ইসলামী ছাত্রশিবির ছিনতাই করে নিয়ে যায় এবং ক্যাম্পাসে ব্যাপক ভাঙচুর করে প্রায় কোটি টাকার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ধ্বংস করে। অথচ এই সম্পদগুলো জনগণের অর্থে শিক্ষার্থীদের জন্য কেনা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ঠিক অনুরূপ আন্দোলন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম খবর দিচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ফি বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন, সেগুলো অধিকাংশই এককালীন দেয়। যেমন নন-কলেজিয়েট ফি। ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে তা এক হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ফি শুধু তাঁদের জন্যই প্রযোজ্য, যাঁদের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি থাকেন না। যে ছাত্রটি এই ন্যূনতম সংখ্যক ক্লাসে উপস্থিত থাকেন না, তিনি যদি পরীক্ষা দিতে চান তাহলে তাঁকে জরিমানা তো দিতেই হবে। একজন ছাত্র সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে দুবার সনদপত্র উত্তোলন করেন। তাঁকে ২০০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা দিতে হবে। এতেই আপত্তি। যাঁরা প্রধানত, এই আপত্তিটি তোলেন তাঁরা সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত এবং মনে করেন শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করা চলবে না এবং শিক্ষা সুযোগ নয়,
এটি তাঁদের অধিকার। সমাজতন্ত্রের আদি জন্মস্থান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে কখনো উচ্চশিক্ষা সবার অধিকার ছিল না। প্রাথমিক শিক্ষা সবার অধিকার হিসেবে চিহ্নিত ছিল। উচ্চশিক্ষায় কারা যাবে তা রাষ্ট্র ঠিক করত। মধ্য ষাটের দশকে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সে দেশে সব বিশ্ববিদ্যালয় সাত বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বিনা মূল্যে উচ্চশিক্ষা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই। ব্রিটেন বা যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তুকি নেই বললেই চলে। সেসব দেশে প্রাথমিক শিক্ষার প্রায় পুরোটাই ভর্তুকির ওপর চলে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিপুল পরিমাণের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকে। তার ওপর আছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ালেখা করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের সহজ শর্তে ঋণ। ষাটের দশকে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসে ১২ টাকা বেতন দিতাম। এখন তা বৃদ্ধি হয়ে ৩০ টাকা হয়েছে। হলে থাকলে বর্তমানে একজন ছাত্রকে সর্বসাকল্যে বছরে চার হাজার ৩০০ টাকার মতো বেতন ও অন্যান্য ফি দিতে হয়। মঞ্জুরি কমিশনের হিসাব মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের পেছনে রাষ্ট্রের তথা জনগণের দেয় গড়ে ভর্তুকি বছরে পৌনঃপুনিক খাতে আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ভর্তুকির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। যাঁরা এসব আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাঁদের অনেকেরই পকেটে থাকে কয়েক হাজার টাকা দামের মোবাইল ফোন আর তার পেছনে মাসে খরচ হয় আরও কয়েক শ টাকা।
আবার এর ভিন্ন চিত্রও আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী আসেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। এঁরা হলে হয় সিট পান না অথবা সিট পেতে হলে বড় ভাইদের মাসোহারা দিতে হয়, না হয় মেসে থাকতে হয়, পড়ার খরচ চালানোর জন্য টিউশনি করতে হয়। কিন্তু যাঁদের পকেটে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মোবাইল ফোন, তাঁদেরও এই শেষে উল্লেখিত শিক্ষার্থীদের মতো একই পরিমাণের বেতন ও অন্যান্য ফি দিতে হয়। এখন কেউ যদি বলেন এই সমস্যা দূর করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয় বেতন ও ফির মধ্যে বিভিন্ন স্তর থাকা বাঞ্ছনীয়, যেমনটি অন্য দেশে আছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিশ্চিতভাবে যুদ্ধাবস্থা শুরু হয়ে যাবে। শিক্ষা সংকোচন নীতির প্রস্তাব করছি মনে করে আমাকে অনেকে শাপান্ত করবেন। আমি নিশ্চয়ই তা করছি না। আমি চাই, প্রত্যেক যোগ্যতাসম্পন্ন ও মেধাবী ছাত্র যেন বাস্তবসম্মত উচ্চশিক্ষা থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হন। ইদানীং কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বিভাগে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু হয়েছে। এটি একটি মহলের কাছে কোনো বোধগম্য কারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য না হলেও বলতে হয় তা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমাদের সমাজের একটি বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী আছে, যাদের হয়তো ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত পড়ালেখা করে চাকরিতে ঢুকতে হয়। তাদের জন্য এই সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। একসময় আমাদের দেশেও বড়দের জন্য সন্ধ্যাকালীন স্কুলের ব্যবস্থা ছিল।
নিঃসন্দেহে এটিও একটি ভালো ব্যবস্থা ছিল, যা এখন আর দেখা যায় না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটাই হচ্ছে তা সারা বছর দিনে ২৪ ঘণ্টা জ্ঞানচর্চার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেখানে কোর্সটা সন্ধ্যাকালীন না দিনের বেলায়, তা বিবেচ্য হওয়ার বদলে বিবেচ্য হওয়া উচিত দুই বেলার পড়ালেখার মধ্যে কোনো তারতম্য হচ্ছে কি না। কোনো একজন শিক্ষক যদি দিনের বেলায় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় অথবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে বেশি আগ্রহী থাকেন, তাহলে তাঁকে অবশ্যই তা থেকে নিবৃত্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে। তেমন আইন না থাকলে সে রকম আইন করতে হবে। আর একজন শিক্ষক সপ্তাহে কয়টা ক্লাস নিতে পারবেন তা নির্ধারিত আছে। প্রয়োজনে তা বলবৎ করতে হবে। তবে তাঁকে দিনের বেলায় ক্লাস নেওয়াটাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো কোনো বিদগ্ধ শিক্ষাবিদকে বলতে শুনেছি, সন্ধ্যাকালীন কোর্সে পড়ালে দিনের বেলার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দেরি হয়। কথাটি একেবারেই অমূলক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ অথবা আইবিএতে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু আছে, আবার তাদের পরীক্ষার ফলাফল দিতে কখনো দেরি হয় বলে শোনা যায় না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগের ৬০ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল দিতে দুই বছর সময়ক্ষেপণ করলে পরীক্ষার্থীরা কেক কেটে তা উদ্যাপন করেছিলেন। এর কারণ ছিল পরীক্ষা কমিটির সভাপতি চট্টগ্রামে থাকার চেয়ে ঢাকায় থাকা বেশি পছন্দ করেন। কারণ, তিনি মনে করেন, ঢাকায় থাকলে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগটা বেশি হয়। তবে বেশির ভাগ বিভাগে ফলাফল সময়মতোই প্রকাশিত হয়।
সুতরাং সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আর একজন পণ্ডিত বললেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে অন্য আর একটি কারণ হচ্ছে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের পড়ালেখা দ্রুত শেষ হবে। কারণ, এখানে বিনা কারণে পড়ালেখার কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। ফলাফল তাড়াতাড়ি প্রকাশিত হবে এবং তাঁরা দিনের বেলায় পড়ুয়াদের তুলনায় চাকরির ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন। এটি একটি হাস্যকর যুক্তি। কারণ, দিনের বেলায় পড়ালেখায় কেন ব্যাঘাত ঘটবে? ব্যাঘাত কারা ঘটায়? তাতে ক্ষতি কার? সেই প্রশ্নের জবাব তো আগে মিলতে হবে। যারা ব্যাঘাত ঘটায়, তাদের যদি ভর্তুকি ছাড়া পড়ালেখা করতে হতো তাহলে তারা এই ব্যাঘাত ঘটানোর কথা চিন্তাই করত না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রোববারের ঘটনা যারাই ঘটাক, সত্যটা হচ্ছে ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। নেতা-কর্মী যে দলেরই হোক তার হাতে এমন অস্ত্র প্রদর্শন কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো কোনো মহল থেকে এদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাতে এরা আরও সাহসী হয়ে উঠবে। সরকারের নিজেদের স্বার্থে এখন উচিত হবে প্রত্যেক দুর্বৃত্তকে আইনের আওতায় এনে সাজা দেওয়া। ঠিক যেমনটি বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বেলায় হয়েছিল। সংসদে প্রধানমন্ত্রীও তা অঙ্গীকার করেছেন। মনে রাখা ভালো, বাংলাদেশের মতো দেশে বড় পরিসরে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার এখনো আশা-ভরসা হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সম্পূরক ভূমিকা পালন করতে পারে আবার তার অনেকগুলোই নানা সমস্যায় জর্জরিত। সুতরাং দেশের উচ্চশিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান রক্ষা করতে হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আদমজী পাটকলে রূপান্তরিত হতে দেওয়া চলবে না। আর মনে রাখতে হবে, একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও যেন অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হন।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পঠনপাঠন কমে যাওয়া ভালো নয়

সম্প্রতি ঢাকার এক উল্লেখযোগ্য স্কুলের গেটে দেখা এক সহকর্মীর সঙ্গে। খুবই রাগান্বিত ও উত্তেজিত তিনি; পাশে তাঁর স্কুলপড়ুয়া মেয়েটি বাবার এহেন অবস্থায় খানিকটা লজ্জিত ও ম্লান। আমাকে পেয়েই সহকর্মী তাঁর রাগ ও উত্তেজনার ঝাঁজ খানিকটা প্রশমিত করার চেষ্টা করলেন। ব্যাপার কী? ব্যাপার আর কিছু নয়—সহকর্মীটির মেয়ে অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে ভালো ফল করেই উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি মেয়েকে স্কুলে নিয়ে এসেছিলেন নবম শ্রেণীতে মানবিক শাখায় ভর্তি করাবেন বলে। কিন্তু স্কুলে এসে জানা যায়, ওই স্কুল থেকে মানবিক শাখা আগের বছরই তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা (বাণিজ্য) শাখায় ভর্তি চলছে। আমিও অবাক! জিজ্ঞেস করলাম: এখন উপায়? উপায় আবার কী? সহকর্মীটির উত্তেজনা তখনো ফুরিয়ে যায়নি। বললেন: আগামীকাল এসে মেয়েকে হয়তো তিনি বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি করাবেন। কিন্তু একাদশ শ্রেণীতে মেয়েকে তিনি মানবিক শাখাতেই পড়াবেন, তা সে যে প্রতিষ্ঠানেই হোক! ‘তা সে যে প্রতিষ্ঠানেই হোক’—কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর পুরো ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের উচ্চশিক্ষার এক ফাঁপা সত্য। সত্যি, ঢাকার তথাকথিত নামীদামি স্কুল ও কলেজ থেকে মানবিক শাখায় পঠনপাঠন আশঙ্কাজনকভাবে উঠে যাচ্ছে। সবাই ঝুঁকছে ব্যবসায় শিক্ষা (বাণিজ্য) ও বিজ্ঞান শাখায় পড়ার দিকে।
অথচ, তারা খোঁজ নিচ্ছে না এসএসসি বা এইচএসসি পাসের পর উচ্চশিক্ষায় তার প্রিয় সন্তানটির জন্য সারা দেশে কোন কোন প্রতিষ্ঠানে কতগুলো আসন রয়েছে? আমাদের স্কুল-কলেজগুলোও বোধ করি উচ্চশিক্ষার প্রকৃত অবস্থা বিদ্যার্থীদের সামনে তুলে ধরতে সফল হচ্ছে না, যে অবস্থা তুলে ধরলে বিদ্যার্থীরাই বুঝে যাবে পরবর্তীকালে কোন শাখায় তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। আজকের বাস্তবতা হলো, ঢাকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য স্কুল-কলেজে মানবিক শাখার পঠনপাঠন প্রায় উঠে গেছে, দু-একটিতে থাকলেও বিদ্যার্থীর সংখ্যা হাতে গোনা। আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, গত শতকের সত্তর বা আশির দশকে—তখনো বিজ্ঞান, বাণিজ্য, মানবিক এই তিন শাখায়ই মুখ্যত ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হতো। সে সময় অবশ্য বিজ্ঞান আর মানবিক শাখার প্রতি সবার আগ্রহ ছিল বেশি। এর কারণও ছিল। প্রথমত, সমাজবিকাশে বিজ্ঞান ও মানবিক শাখার গুরুত্ব; দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষায় এ দুটি শাখার উন্মুক্ত দ্বার। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে মুক্তবাজারের বদৌলতে বাণিজ্যশিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে এই শাখার নাম বাহারিভাবে পাল্টে যায়; হয় বাণিজ্য থেকে ‘ব্যবসায় শিক্ষা’। এই আগ্রহ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবসায় শিক্ষা শাখার বিদ্যার্থীদের পঠনপাঠনের আসন বৃদ্ধি বা পরিধি প্রসারিত হয়েছে—এমন বলা যাবে না; বিশেষ করে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। সরকারি অনুদানে পরিচালিত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে রেখে বুঝে নেওয়া যাক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক শাখায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুযোগ কতটা রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখায় উত্তীর্ণ হলে কোনো বিদ্যার্থী বিজ্ঞান অনুষদের সাতটি,
জীববিজ্ঞান অনুষদের দশটি, ফার্মেসি অনুষদের তিনটি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের চারটি, আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের চারটি বিভাগসহ কয়েকটি ইনস্টিটিউটে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারে। তা ছাড়া ইউনিট পরিবর্তন করেও বিজ্ঞান শাখার বাইরে প্রায় এক হাজার আসনে ভর্তির সুযোগ পেতে পারে। মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে বিজ্ঞান শাখা থেকে উত্তীর্ণদের জন্য। আর উচ্চমাধ্যমিকে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীরা বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের আটটি বিভাগে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ’ ইউনিটে অর্থাৎ ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মাধ্যমে এবার মাত্র এক হাজার ১৭৫ আসনে ভর্তি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শাখা পরিবর্তন করার ‘ঘ’ ইউনিটের মাধ্যমে কিছু আসনে তারা ভর্তি হতে পারে। গত বছর যেখানে সারা দেশে উচ্চমাধ্যমিকে ব্যবসায় শিক্ষায় দুই লাখ ১৫ হাজার ৩১৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, সেখানে এক হাজার ১৭৫ আসন খুবই অপ্রতুল নয় কি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তবু আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০০টি আসন বৃদ্ধি করেছে। তার পরও এই বিপুলসংখ্যক উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর বিপরীতে তা সামান্যই। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ব্যবসায় শিক্ষার জন্য আসনসংখ্যা খুব বেশি নয়। তাই কৃতকার্যদের অনেকেই অধিক টাকা ব্যয়ের কথা জেনেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ধাবিত হয় বাধ্য হয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক শাখায় আসনসংখ্যা সেদিক থেকে প্রায় দ্বিগুণ: দুই হাজার ৩০০-এর বেশি।
উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক শাখা থেকে উত্তীর্ণ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদভুক্ত ১৬টি বিষয়, সামাজিক অনুষদভুক্ত ১২টি বিষয় ছাড়াও আইন, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ গ্রহণ করা যায়। অর্থনীতি, লোকপ্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, নৃবিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি আকর্ষণীয় বিষয়ে প্রধানত উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক শাখার শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে থাকে। এখান থেকে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করার পর, প্রয়োজন হলে কেউ যদি জীবিকার জন্য এমবিএ ডিগ্রি করে নেয়, তাহলে তার অবস্থা কোনো দিক থেকেই খারাপ হয় না। অর্থনীতি, ইংরেজি, লোকপ্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় থেকে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে অনেকেই বড় বড় ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এই সত্যটি না জানার কারণে ঢাকা তো বটেই, অন্য শহরগুলোতেও মানবিক শাখায় পঠনপাঠনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। চাকরি ও উচ্চশিক্ষার অধিকতর সুযোগের কথা ছেড়ে দিলেও বলা প্রয়োজন, সুশীল সমাজ গঠনের জন্য মানবিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই স্কুল-কলেজে মানবিক শাখায় পঠনপাঠন কমে যাওয়া মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।
ড. সৌমিত্র শেখর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
scpcdu@gmail.com

সম্পদের হিসাব চাওয়া

মুখরক্ষা করতে গিয়ে দুদক সম্ভবত উভয়সংকটে পড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্পদের হিসাব বিবরণীর সূত্র ধরে তারা এখন পর্যন্ত মাত্র এক সাংসদকে তলব করেছে। মাত্র সাতজনকে নোটিশ জারি করতে গিয়ে তাদের ইতস্তত মনোভাব চাপা থাকছে না। যে সাতজনকে নোটিশ দেওয়া হবে তাঁদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের পাঁচ বর্তমান সাংসদ, একজন সাবেক সাংসদ এবং বিএনপির একজন সাবেক সাংসদ রয়েছেন। আরও যাঁদের নোটিশ দেওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল, তাঁদের অন্যতম সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্ত্রী। তিনি ইতিমধ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে আরও ইঙ্গিত মিলছে, নোটিশ পেতে বিলম্ব ঘটলে আরও অনেকে দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন। তাই আমরা আশা করব, দুদক সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তদন্তে যেন বিলম্ব না করে এবং তাদের উচিত হবে তাঁদের দেশত্যাগে বিধিনিষেধ আরোপে সরকারকে অনুরোধ জানানো। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের সাংসদ আবদুর রহমান বদিকে তলব করা হয়েছে। দুদকের এ উদ্যোগকে যথেষ্ট ইতিবাচক মনে করা হলেও এর পরিণতি কী হবে, তা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। কারণ কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশের কারণেই আপাতত সাত সাংসদের সম্পদের অনুসন্ধানে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে দুদক কর্তৃপক্ষ। অপ্রিয় হলেও এটা সত্য যে এ উদ্যোগ যে শেষ পর্যন্ত আইনের আপন গতিতে চলবে তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তদুপরি দুদক নামের একটি প্রতিষ্ঠান যে এখনো তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে, এটি হয়তো তার একটি প্রমাণ।
কিন্তু এটা অনুমেয় যে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নিতান্ত দায়সারা উপায়ে প্রার্থীরা তাঁদের সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রকাশ করেছিলেন। লক্ষণীয়, যে সাতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাঁদের পাঁচজনই ক্ষমতাসীন দলের হলেও তাঁদের বাছাইপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ, তা বলা কঠিন। কারণ একই দলের আরও অনেকে আছেন, যাঁদের হিসাব বিবরণীতে প্রকাশিত সম্পদ ওই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চেয়ে কম নয়। আসলে এ ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আছে বললে কম বলা হয়। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চকে আদেশ দিয়ে বলতে হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করতে হলে সরকারের পূর্ব অনুমোদন নিতে হবে না। এ রায় যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে আইনে উপযুক্ত সংশোধনী আনতে হবে। গত বছরের নভেম্বরে দুদক আইনে আরও একটি ক্ষতিকর ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। দুর্নীতি বিষয়ে কেউ অসত্য তথ্য দিলে তাঁকে দুই থেকে পাঁচ বছরের জেল দেওয়া যাবে। হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেছেন। এ রকমের একটি ধারা থাকলে সহজে কেউ দুদককে সহায়তা করার ঝুঁকি নেবে না। সরকারের উচিত হবে আদালতের দিকে না তাকিয়ে উপযুক্ত সংশোধনী এনে এ ধারাও বাতিল করা। আর এই মুহূর্তে বর্তমান সংসদের সরকারদলীয় পাঁচ সাংসদের জবাবদিহি কীভাবে দুদক নিশ্চিত করে, সেটা দেখতে সচেতন মহল অপেক্ষায় থাকবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউ যাতে দেশ ত্যাগ না করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।