Thursday, August 21, 2025

গাজা সিটি দখলে ইসরায়েলি অভিযানের প্রথম ধাপ শুরু, ডাকা হচ্ছে ৬০ হাজার সেনা

ফিলিস্তিনের গাজা সিটি দখল ও নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিত স্থল অভিযানের ‘প্রাথমিক পদক্ষেপ’ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তারা ইতিমধ্যে গাজা উপত্যকার ওই শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছে।

এক ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র বলেন, মূল অভিযানের ক্ষেত্র তৈরির জন্য সেনারা এরই মধ্যে জেইতুন ও জাবালিয়া এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন।

গত মঙ্গলবার গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনার অনুমোদন দেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।

এ অভিযানে অংশ নিতে আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ হাজার সংরক্ষিত সেনা তলব করা হচ্ছে। তাঁদের রণাঙ্গনে লড়াইরত সেনাদের পরিবর্তে মোতায়েন করা হবে।

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্মম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা ইসরায়েল এগিয়ে নিতে থাকায় সেখানকার লাখো বাসিন্দাকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে ইসরায়েলের অনেক মিত্র গাজা সিটি দখলের এ পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে। গতকাল বুধবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, এ পরিকল্পনা ‘দুই জাতির জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং গোটা অঞ্চলকে স্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।’

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) বলেছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতা বেড়ে গেলে গাজার ২১ লাখ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

গত মাসে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির পরোক্ষ আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ইসরায়েল পুরো গাজা উপত্যকা দখলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

গতকাল টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেন, ২২ মাসের যুদ্ধে হামাস এখন ‘ক্ষতবিক্ষত ও বিধ্বস্ত’।

ডেফরিন বলেন, ‘আমরা গাজা সিটিতে হামাসের ওপর আরও গভীরভাবে আঘাত হানব। ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ ‘সন্ত্রাসী’ অবকাঠামো ধ্বংস করব এবং হামাসের ওপর জনগণের নির্ভরতা ছিন্ন করব।’

আইডিএফের এ মুখপাত্র বলেন, সেনাবাহিনী অভিযান শুরুর জন্য বসে থাকছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক পদক্ষেপ শুরু করেছি। আইডিএফ ইতিমধ্যে গাজা সিটির উপকণ্ঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।’

মুখপাত্র জানান, জেইতুন এলাকায় দুটি ব্রিগেড ও জাবালিয়ায় আরেকটি ব্রিগেড কাজ করছে। তাঁর দাবি, জেইতুনে সাম্প্রতিক অভিযানে অস্ত্রভর্তি একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গও শনাক্ত করা হয়েছে।

ডেফরিন বলেন, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে গাজা সিটির বাসিন্দাদের আগে থেকেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।

তবে হামাসশাসিত গাজার বেসামরিক নিরাপত্তা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল এএফপিকে বলেন, জেইতুন ও সাবরা এলাকার পরিস্থিতি ‘খুবই ভয়াবহ ও অসহনীয়’।

এএফপি জানিয়েছে, গতকাল ওই এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন।

ডেফরিন দাবি করেন, গাজায় এখনো ৫০ জন জিম্মি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযানে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে তাঁদের পরিবারগুলোর আশঙ্কা, স্থল অভিযানে জিম্মিদের জীবন হুমকিতে পড়তে পারে।

আইসিআরসি সতর্ক করেছে, নতুন এ অভিযান বেসামরিক নাগরিকদের পাশাপাশি জিম্মিদের জীবনও বিপদের মুখে ফেলবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2F9du46d9n%2Fgaza-city-.jpg?rect=0%2C0%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েল-গাজা সীমান্তের ইসরায়েলি অংশে সাঁজোয়া যানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক ইসরায়েলি সেনাসদস্য। ১৮ আগস্ট ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

আমেরিকার যে ভুলে চীন আজ এমন শক্তিধর by জাসিম আল-আজ্জাওয়ি

১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীনে সফর করেছিলেন। অনেকেই বিশ্বাস করেছিল, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা গেলে শক্তিশালী জোট এবং পারস্পরিক সুবিধার পথ খুলবে।

তখনকার ধারণা ছিল, একটি সমৃদ্ধ চীন উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিত হবে। অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা রাজনৈতিক সমন্বয় আনবে। পশ্চিমারা ভেবেছিল, চীনের উত্থান হুমকি নয়, বরং সুযোগ।

রাজনৈতিক তাত্ত্বিক জন মিয়ারশাইমার সতর্ক করেছিলেন, অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা দেশগুলোকে কৌশলগত ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ব্যাপারে তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন। মিয়ারশাইমার বলেছিলেন, অর্থনৈতিক সংহতির বিষয়টি থাকুক বা না থাকুক, একটি উদীয়মান শক্তি স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে।

আজ এই বিতর্ক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন। চীন ও রাশিয়া মিলিত হয়ে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। পশ্চিমা বৈদেশিক নীতির একটি মৌলিক ভুলকে উন্মোচন করেছে।

একটি বদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র থেকে চীন বৈশ্বিক অর্থনীতির মহাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এর শুরুতেই চীনের নেতৃত্ব ও মতাদর্শে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল। ১৯৭৬ সালে চীনের কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা মাও সে–তুংয়ের মৃত্যুর সময় দেশটি দরিদ্রপীড়িত ও কৃষিভিত্তিক ছিল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিশৃঙ্খলা তখনো সমাজে দৃশ্যমান।

মাওয়ের স্ত্রীর নেতৃত্বাধীন চারজনের দল দেশটিকে আরও গভীর সংকটে ফেলে দেয়। তারা আদর্শগত কঠোরতা ও নীতিবদ্ধ বিশুদ্ধতাবাদের মাধ্যমে ক্ষমতা সংহত করেছিল। তারা গ্রেপ্তার হওয়ার পরই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্যদের মধ্যে বাস্তববাদী একটি গোষ্ঠী দেশকে স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা নেন। দেং জিয়াওপিংকে মুক্তি দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তিনি মাওয়ের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। দেং জিয়াওপিংকে লক্ষ্য ছিল চীনকে আধুনিয়াকায়নের পথে নিয়ে যাওয়া।

দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীন মাওবাদী মতাদর্শ থেকে বাস্তব অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথ তৈরি করে।

দেংয়ের দর্শন ছিল বাস্তবধর্মী। তিনি বলতেন, ‘পাথর অনুভব করে নদী পার হতে হয়।’ তিনি চীনের দরজা পশ্চিমের বিনিয়োগ ও সহযোগিতার জন্য খুলে দেন। রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ভেঙে বাজারভিত্তিক সংকর মডেল আনেন। পশ্চিমা কোম্পানির জন্য চীনের বিশাল বাজার ও সস্তা শ্রমশক্তি ছিল প্রধান আকর্ষণ। ফলে বহু কারখানা পশ্চিম থেকে চীনে চলে আসে এবং কোটি কোটি ডলার মুনাফা হয়।

দেং বলতেন, ‘ধনী হওয়া গৌরবজনক।’ এ ধারণা সাধারণ চীনা নাগরিকদের মানসিকতা বদলে দিল। মানুষ শ্রমের ক্লান্তি থেকে ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি অর্জনের দিকে মন দিল। পলিটবুরোর সহকর্মীদের তিনি সময় মেনে চলার জন্য সতর্ক করেছিলেন, যেন যুদ্ধ ও সংকট এসে চীনের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে বিঘ্ন না ঘটাতে পারে।

চীনের অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে পশ্চিমারা সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকেই মনোযোগ দিয়েছিল। শীতল যুদ্ধের সময়ে পশ্চিমারা চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারসাম্য আনার জন্য। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বিশ্বমানচিত্রে পরিবর্তন আনে। যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন অনেক পশ্চিমা নেতা বিশ্বাস করলেন, একটি সমৃদ্ধ চীন স্বাভাবিকভাবে গণতন্ত্রের পথ গ্রহণ করবে।

হেনরি কিসিঞ্জার ও জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি (মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা) বলেছিলেন, একটি ধনী চীন পশ্চিমের সঙ্গে মিলিত হবে এবং রাশিয়ার উত্থান ঠেকাতে পশ্চিমা জোটের সঙ্গী হবে। তবে জন মিয়ারশাইমার মনে করতেন, এটা অদূরদর্শী ধারণা। চীনকে প্রতিহত করার জন্য নীতি নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেছিলেন। অন্যদিকে ব্রেজিনস্কি বলেছিলেন, চীনের ধনী হওয়া মানে এমনিতেই একদিন দেশটি গণতন্ত্র গ্রহণ করবে। বাস্তববাদকে তখন ঢেকে দিয়েছিল উদার আশাবাদ।

আজ দেখা যাচ্ছে, মিয়ারশাইমারের সতর্কতা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। চীন উদার গণতন্ত্র গ্রহণ করেনি। বরং অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেছে, সামরিক ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং বিশ্বে তার প্রভাব দেখাচ্ছে। অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা একসময় শান্তির রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হলেও এখন সেটাকে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবেই দেখা হয়।

ফলে বর্তমানে ভূরাজনৈতিক মানচিত্রও বদলে গেছে। চীন ও রাশিয়ার নতুন অক্ষ গড়ে উঠেছে। এই শক্তি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা এ জোটকে শক্তিশালী করেছে। এটি পশ্চিমাদের অদূরদর্শী আর্থিক লক্ষ্য ও রাজনৈতিক উদারতার ওপর ভুল অনুমানের ফল।

* জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমকর্মী
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

চীন ও রাশিয়ার নতুন অক্ষ গড়ে উঠেছে। এই শক্তি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
চীন ও রাশিয়ার নতুন অক্ষ গড়ে উঠেছে। এই শক্তি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ছবি : এএফপি

জেলেনস্কির নামই মুখে নেন না পুতিন, তিনি কি তাঁর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণঃ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অবজ্ঞা এতটাই গভীর যে তিনি কালেভদ্রেও ‘জেলেনস্কি’ নামটি মুখে আনেন না। ক্রেমলিনের মতে, তিনি অবৈধ নেতা। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন তাঁকে ‘ভাঁড়’ সম্বোধন করে থাকে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার ভিত্তির ধারণাই হলো এই—যুদ্ধ শেষ করতে হলে পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসতেই হবে। গত সোমবার পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পর ট্রাম্প বলেন, তিনি এ ধরনের বৈঠকের ‘ব্যবস্থা শুরু করেছেন’।

এর পর থেকে মস্কোয় কূটনৈতিক আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ ঘিরে মঙ্গলবার বড় প্রশ্ন ছিল, এই যুদ্ধের প্রধান শত্রুরা (পুতিন-ট্রাম্প) কি সত্যিই দ্রুত একান্তে বসতে যাচ্ছেন?

পুতিনের জন্য এ ধরনের শীর্ষ বৈঠক একটি শান্তিচুক্তি পাকা করার সুযোগ, যাকে ক্রেমলিন বিজয় হিসেবে প্রচার করতে পারবে। তবে তা তখনই সম্ভব হবে, যদি ইউক্রেনের ভূমি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে পুতিনের দাবির বিষয়ে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে রাজি করাতে পারেন। কিন্তু এতে রাজনৈতিক ঝুঁকি আছে। কারণ, ক্রেমলিন এত দিন ধরে ইঙ্গিত দিয়ে এসেছে, জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসা রুশ প্রেসিডেন্টের মর্যাদার জন্য হানিকর।

‘এটি একধরনের আপস’ বলে মন্তব্য করে মঙ্গলবার এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা কনস্তান্তিন জাতুলিন বলেন, পুতিন-জেলেনস্কি সম্ভাব্য বৈঠকটিকে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে একধরনের ছাড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে রাশিয়া জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক–সম্পর্কিত নিজেদের উদ্বেগ এক পাশে সরিয়ে রাখবে।’

জাতুলিন বলেন, রাশিয়ার কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, পুতিনের কোনো পরিস্থিতিতেই জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করা উচিত নয়। কারণ, ‘রাশিয়া সর্বত্র জেলেনস্কির অবৈধ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলছে’। কিন্তু জাতুলিনের ব্যক্তিগত মত হলো, জেলেনস্কির সঙ্গে একটি শীর্ষ সম্মেলন বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ, ‘পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে কোনো সম্ভাবনাকেই উপেক্ষা করা ঠিক নয়’।

ক্রেমলিন পুতিন-জেলেনস্কির বৈঠকের সম্ভাবনার দরজা সব সময় খোলা রেখেছে। চলতি সপ্তাহেও এক বার্তায় তারা বলেছে, পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠক সম্ভব। কিন্তু তা শিগগিরই হবে কি না, তা নিয়ে তারা কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ক্রেমলিন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলেনস্কি রাশিয়ার মূল দাবিগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত, এমনটি যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে পুতিনের বৈঠক কল্পনা করাটাই কঠিন।

সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ গ্রিগরি গোলোসভ এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘শিগগিরই বা অদূর ভবিষ্যতে আমি এমন কোনো বৈঠকের সম্ভাবনা দেখি না।’ তাঁর ধারণা, পুতিন কেবল তখনই জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করতে রাজি হবেন, যদি এটা স্পষ্ট হয় যে ইউক্রেনের আত্মসমর্পণ বা জেলেনস্কিকে পরাজয় স্বীকার করাতে এমন একটি বৈঠকের প্রয়োজন আছে।

অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক হলে রাশিয়ায় বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। পুতিন ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর যুক্তি হিসেবে বলেছেন, জেলেনস্কি এমন একটি ‘শাসনব্যবস্থা’ চালাচ্ছেন, যা রুশভাষীদের ওপর গণহত্যা (জেনোসাইড) চালাচ্ছে। পুতিনের এই বয়ান মিথ্যা। কারণ, জেলেনস্কি নিজেই রুশ ভাষায় কথা বলে বড় হয়েছেন।

২০১৯ সালে জেলেনস্কি বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় মস্কোতে আশার আলো দেখা দিয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, তিনি কিয়েভে এমন একটি সরকার গঠন করবেন, যা হবে রাশিয়ার প্রতি আরও বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ।

কিন্তু পুতিন সেই সময় থেকে জেলেনস্কির বিষয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিদ্রূপপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছেন। উদাহরণ হিসেবে ২০২৩ সালের একটি ঘটনার কথা বলা যায়। তখন জেলেনস্কির ইহুদি পরিচয়কে আক্রমণ করে পুতিন বলেছিলেন, তাঁর ইহুদি বন্ধুরা তাঁকে বলেছেন, ‘জেলেনস্কি ইহুদি নন, তিনি ইহুদি নামের কলঙ্ক।’

পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠক করলে তাঁরা সমমর্যাদার বলে প্রমাণিত হবেন। এই কারণে জেলেনস্কি ও পুতিন বৈঠক করতে যাচ্ছেন বলে ট্রাম্প বারবার যে দাবি করছেন, তা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছে।

মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের বৈঠক সম্পর্কে ট্রাম্প বলেছেন, ‘তাঁরা হয়তো আমার ধারণার চেয়ে কিছুটা ভালো সম্পর্ক তৈরি করছেন।’ কিন্তু পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে সুসম্পর্কের কোনো প্রমাণ নেই। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেছেন, ‘এই কারণে আমি প্রথমে ত্রিপক্ষীয় নয়, বরং তাঁদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব করেছি।’

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘অন্যথায় আমি দুজনকে আলাদা করে বসানোর ব্যবস্থা করতাম না। আমি তিনজনের বৈঠকের ব্যবস্থা করতাম।’

সোমবার ফোনালাপের পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে একটি একান্ত বৈঠকের আয়োজন করা হবে। জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের একপর্যায়ে তিনি পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। বৈঠক শেষে জেলেনস্কি সাংবাদিকদের বলেন, আগের মতো তিনি এখনো পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রস্তুত।

সোমবার পুতিন-ট্রাম্পের ফোনালাপ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাশিয়ার বিদেশনীতি-বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ। এতে তিনি পুতিন-জেলেনস্কির শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে কিছু বলেননি।

উশাকভের ভাষ্যমতে, ট্রাম্প ও পুতিন ‘রাশিয়া ও ইউক্রেনের সরাসরি আলোচনায় আরও উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যুক্ত করার সম্ভাবনাগুলো খুঁজে দেখার’ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তা বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও একই রকমের অস্পষ্ট মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্রেমলিন নীতিগতভাবে জেলেনস্কি ও পুতিনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিরুদ্ধে নয়। তবে ‘উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যেকোনো বৈঠক খুব সতর্কভাবে আয়োজন করা উচিত’।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পুতিনের কূটনৈতিক তৎপরতায় এক অস্বাভাবিক গুরুত্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, তিনি ট্রাম্পের উদ্যোগকে গুরুত্বসহকারে নিচ্ছেন। ক্রেমলিন চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, পুতিন সৌদি আরব, কিরগিজস্তান, ব্রাজিল, ভারত, তাজিকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও বেলারুশের নেতাদের ফোন করেছেন। তাঁদের তিনি ইউক্রেন–সংক্রান্ত সর্বশেষ আলোচনার বিষয়ে জানিয়েছেন।

মস্কোর হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের নিরাপত্তানীতি–বিশেষজ্ঞ দিমিত্রি ট্রেনিন বলেছেন, পুতিন ‘সম্ভবত মনে করছেন, এটাই প্রকৃত কূটনীতির সময়। (আলাস্কায়) ট্রাম্পের সঙ্গে সমাধানের যে রূপরেখা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তা সম্ভবত তাঁর জন্য সুবিধাজনক।’

দিমিত্রি ট্রেনিন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যা ছাড় দিতে প্রস্তুত, তা নিয়ে যদি ক্রেমলিন সন্তুষ্ট হতে পারে, তাহলে তখনই হয়তো জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হবেন পুতিন। এই নিরাপত্তা–বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, পুতিন তাঁর বিস্তৃত দাবি থেকে এখনো সরেননি। যেখানে ইউক্রেনের ভূখণ্ড নিজেদের করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশটির সামরিক ক্ষমতা সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুতিন-জেলেনস্কির বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প চাপ সৃষ্টি করছেন। মনে হচ্ছে, তিনি জেলেনস্কির সঙ্গে সংলাপ করতে পুতিনকে প্ররোচিত করেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পকে ফোনালাপে পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জেলেনস্কি সরকারকে সরিয়ে কিয়েভে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সাময়িক প্রশাসন বসালেই কেবল যুদ্ধ শেষ হতে পারে। পুতিনের এই মনোভাব ট্রাম্পকে বিরক্ত করেছিল।

সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষক গ্রিগরি গোলোসভের মতে, ‘ফেব্রুয়ারির ট্রাম্প-পুতিনের আলাপের পর থেকে রাশিয়ার বক্তব্য কিছুটা কোমল হয়েছে। তবে জেলেনস্কির বিরুদ্ধে তাদের এখনো প্রচুর সমালোচনা আছে। কিন্তু তারা এখন এ কথা বলার সাহস করছে না—তিনি (জেলেনস্কি) এতটাই অবৈধ প্রেসিডেন্ট যে তাঁর সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন আছে।’

রাশিয়ার আইনপ্রণেতা জাতুলিন বলেন, ক্রেমলিন যে জেলেনস্কির সঙ্গে পুতিনের বৈঠকের কথা বিবেচনা করছে, তা রাশিয়ার সেই প্রচেষ্টার অংশ, যাতে ট্রাম্পকে দেখানো যায়, তারা ‘চুক্তি করার জন্য প্রস্তুত’। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া এই পথ বেছে নিয়েছে এবং ট্রাম্পের ওপর সেটার প্রভাব পড়েছে।’

মঙ্গলবার রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে পুতিন-জেলেনস্কির বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু যা আলোচনা হয়েছে, তাতেই ক্রেমলিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ চ্যানেলগুলো জেলেনস্কিকে উপহাস করতে ছাড়েনি। রাজনৈতিক টক শো ‘সিক্সটি মিনিট’–এর উপস্থাপিকা অলগা স্কাবেয়োভা বলেন, সোমবার হোয়াইট হাউসের বৈঠকে জেলেনস্কি ‘স্কুল ছেলের মতো’ আচরণ করেছেন। ‘বোকার’ মতো হেসেছেন এবং ‘বরাবরের মতো খটমট ইংরেজিতে’ কথা বলেছেন।

বিশ্লেষকদের অনুমান, পুতিন যদি মনে করেন, এমন বৈঠক করা লাভজনক, তাহলে এখন যেসব অপপ্রচার চলছে, তা মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। মস্কোর রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিখাইল বিনোগ্রাদভ বলেন, ক্রেমলিন মনে করছে, জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করলে পুতিনকে তেমন কোনো চড়া রাজনৈতিক মূল্য গুনতে হবে না।

বিশ্লেষক মিখাইল বিনোগ্রাদভ বলেন, ‘প্রচার যন্ত্র ধরে নিচ্ছে যে (পুতিন-জেলেনস্কির) মধ্যকার আলোচনার যেকোনো ফলাফল গ্রহণ করতে সমাজ প্রস্তুত। সমাজ এখানে বড় কোনো বাধা নয়। রাশিয়ার সমাজ এরই মধ্যে অনেক কিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।’

 রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফাইল ছবি: রয়টার্স