Thursday, May 19, 2022

মুসলিম নাম নিয়ে বেড়ে ওঠা, আমি এসব কাহিনী জানি by লায়লা খান

নয়া দিল্লিতে একটি মুসলিম নাম নিয়ে বেড়ে ওঠায় নাজিয়া ইরামের ‘মাদারিং এ মুসলিম: দি ডার সিক্রেট ইন আওয়ার স্কুলস অ্যান্ড প্লেগ্রাউন্ড’ আমাকে অবাক করেনি। ইসলামফোবিয়ার ঘটনা নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার এবং আমরা যারা এসবের শিকার হই, সহজেই বুঝতে পারি। ইরামের বইটির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, যারা এসব সহজে বুঝতে পারে না কিংবা এমনকি এসবের অস্তিত্ব আছে বলে কল্পনাও করে না, তাদের কাছে প্রামাণ্যভাবে তুলে ধরা। আর তিনি এ বইটির মাধ্যমে ভারতীয় সাহিত্যের একটি বড় শূন্যস্থান পূরণ করা শুরু করলেন।
তিনি কেবল একটি বিশেষ বদ্ধমূল ধারণার দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করেননি, বরং সেইসাথে তার গবেষণা প্রমাণ করেছে, সমস্যাটি ব্যাপক পরিসরে বিদ্যমান, এলিট স্কুল ও শিশুদের মধ্যেও তা বিরাজ করছে। বইটিতে যেসব স্কুলের কথা বলা হয়েছে, আমি নিজে তার একটিতে ছিলাম। ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বইটিতে অতিরঞ্জিত কিছু বলা হয়নি। তিনি যেসব গল্প বলেছেন, সেসব গতিশীল ও শক্তিশালী।
ইরাম তার বইতে ইসলামফোবিয়ার নানা মাত্রা নিয়ে আলোচনা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্কুলে এক মুসলিম ছাত্রকে যখন তার ক্লাসমেটরা একটি সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল, তখন তিনি শিক্ষকের নীরবতা, ওই মুসলিম শিশুটির ভয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর স্কুলের মনোভাবে পরিবর্তনের ব্যাপারে তার মা-বাবার উপলব্ধিও তুলে ধরেছেন।
এসব ঘটনা সাধারণভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয় না। বিশেষ করে মুসলিম স্কুলের অনুপস্থিতি তাদের সমস্যা প্রকট করে তোলে। মুসলিম ছাত্রের সংখ্যাই কেবল কম নয়, মুসলিম শিক্ষকের সংখ্যা আরো কম। সমস্যা আরো জটিল হয়ে যায়, মুসলিম শিশুরা তাদের কষ্টের কথা অন্য ছাত্রদের সাথে শেয়ার করতে না পারায়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে হাজির হতেও সমস্যায় পড়ে মা-বাবারা।
অনেক ক্ষেত্রে বিভাজন বাড়িয়ে দেয় খোদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই। উদাহরণ হিসেবে ভুপালের স্কুলগুলোর কথাই বলা যায়। সেখানকার স্কুলগুলোতে ছাত্রদের সংস্কৃত ও উর্দু বেছে নিতে বলা হয় ছাত্রদের। গ্রহণ করা ভাষার ভিত্তিতে শাখা ভাগ করা হয়। মুসলিম ছাত্ররা উর্দু নেয়, অমুসলিমরা নেয় সংস্কৃত।
ইরাম জানিয়েছেন, এসব স্কুলে উর্দু শাখাগুলোর সাথে ‘গোলযোগ সৃষ্টিকারী ছাত্র’ ও ‘খারাপ ছাত্রদের’ জুড়ে দেওয়া হয়। এ কারণে আহমদ সমির সংস্কৃত শাখায় ভর্তি হয়। স্কুলের একেবারে প্রথম দিন শিক্ষিকা তার সুপরিচিত ছন্দে রোলকল শুরু করেন। কিন্তু তার নামের কাছে এসেই তিনি থমকে যান। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আহমদ, তুমি কি সংস্কৃত শাখায়?’ সে যখন বলে, জি। তখন তিনি বলেন, ‘ভালো,… খুব ভালো।’ ইরাম বলেন, শিক্ষিকা সমিরের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান। কিন্তু রোল কলের মাঝামাঝিতে বিরতি দেওয়াটা ছিল আরো বড় সঙ্কেত। তা হলো সমির হলো বহিরাগত, ক্লাসের অন্য ছাত্রদের মতো নয়। কথাটা তাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
তবে ইরাম কেবল সমস্যার কথাই তুলে ধরেননি, অনেক সমাধানের সুপারিশও করেছেন। তিনি ইতিবাচক থাকার কথা বলেছেন। সেইসাথে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’, ‘বিশ্বাসের প্রতি আঘাতের ব্যাপারে সচেতন’ থাকতে বলেছেন, নানামুখী নেতৃত্ব তৈরি করতে বলেছেন।
মুসলিমবিদ্বেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর বাড়ার কয়েকটি উদাহরণ বইতে তুলে ধরা হয়েছে। জারিন সিদ্দিক জানিয়েছেন তার সাড়ে ছয় বছরের মেয়ে সামিরা মুসলিম হওয়ার কারণে স্কুলে কিভাবে নির্যাতিত হয়েছে।
একই বেঞ্চে বসা এক ছাত্র তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি মুসলিম?’ সামিরা হ্যাঁ জবাব দিলে সে জানায়, ‘আমি মুসলিমদের ঘৃণা করি।’
জারিন বলেন, তার বড় সন্তান একই স্কুলে কয়েক বছর পড়েছে। সে কখনো এ ধরনের সমস্যায় পড়েনি। গত কয়েক বছরে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
এমনকি স্কুলে নয়, মুসলিম নামের কারণে রাস্তায় চলাচলে পর্যন্ত সমস্যা হয়। তিনি জানান, তিনি উবার চালকদের তার নাম বলেন না। বাসে-ট্রেনে তারা এখন মুসলিম পরিচিতিসূচক পোশাক পরে চলাচল করতে গেলে সন্ত্রস্ত্র থাকেন।
এই সমস্যা দূর করার জন্য দরকার সম্মিলিত দায়দায়িত্ব। এ ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে সমস্যাটি স্বীকার করে নেওয়া। আর তা হতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে। তখনই সমাধান বের করা সহজ হয়ে পড়বে।
ইরামের বইটি ব্যাপকভাবে পঠিত হওয়া দরকার। এটি প্রত্যেকের দরজায় কড়া নাড়া ইসলামফোবিয়ার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতকে নিমজ্জিত করতে শুরু করা গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী পদক্ষেপ।
লেখিকা: নয়া দিল্লিতে বেড়ে ওঠেছেন, পড়াশোনা করেছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াহয়োর ওবেলিন কলেজের আন্ডারগ্রাজুয়েট

Tuesday, May 17, 2022

কাশ্মীর নিয়ে আরেক দফা ‘রাজনীতি’ by আলতাফ পারভেজ

জম্মু ও কাশ্মীর সচরাচর খবর হয়ে ওঠে সহিংসতার কারণে। কিন্তু এবার খবর হলো অহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেই। জম্মু-কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে তুমুল বিতর্ক উঠেছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। ভারত সরকারের একটা গেজেটকে ঘিরে এ বিতর্ক শুরু। পুরোনো এই ‘রাজ্য’কে ভোটের জন্য নতুন করে পুনর্বিন্যাস করার কথা জানিয়েছে ভারত। কাশ্মীরিরা বলছেন, তাঁদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা দমাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন কৌশল এটা। তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার আরেক দফা সংকুচিত হবে এতে।

একটি গেজেট ও কিছু উদ্বেগ

প্রায় সাত দশক ধরে ভারতভুক্ত জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখের যে পৃথক মর্যাদা এবং সীমিত সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসন ছিল, তার অবসান ঘটানো হয়েছিল ২০১৯ সালের গ্রীষ্মে। এর পর থেকে জম্মু ও কাশ্মীর ভারতে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সে সময় লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আলাদা করে কেন্দ্রশাসিত পৃথক আরেক এলাকা করা হয়। এতে পুরোনো এই ‘রাজ্য’ অর্ধেকের বেশি এলাকা হারায়; যদিও জনসংখ্যা লাদাখে খুব বেশি নয়।

সম্প্রতি লাদাখহীন জম্মু ও কাশ্মীরের বাকি এলাকায় সম্ভাব্য নির্বাচনের জন্য সীমানা পুনর্নির্ধারণ করিয়েছে নয়াদিল্লি একটি কমিটির মাধ্যমে। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের একটি প্যানেল দুই বছর সময় নিয়ে এ কাজ করেছে। কমিটি যে প্রস্তাব তৈরি করে, সেটাই গেজেট আকারে প্রকাশিত হলো মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।

রঞ্জনা দেশাইদের প্রস্তাব যে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সঙ্গে মিল রেখেই এগিয়েছে, সেটা না বললেও চলে। আগে জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভায় জনপ্রতিনিধিদের আসন ছিল ৮৩টি। সরকারি গেজেট অনুযায়ী এখন আসন হয়েছে ৯০টি। তবে এর মধ্যে প্রধান ঘটনা হলো সীমানানির্ধারক কমিটি জম্মুর জন্য আসন রেখেছে ৪৩টি, যা আগে ছিল ৩৭। আর কাশ্মীরে আসন রাখা হয়েছে ৪৭টি, যা আগে ছিল ৪৬। অর্থাৎ জম্মুতে আসন বেড়েছে ৬টি (১৬ শতাংশ), কাশ্মীরে বেড়েছে মাত্র ১টি (২ শতাংশ)। একই সঙ্গে পুরো জম্মু ও কাশ্মীরের পাঁচটি জাতীয়ভিত্তিক লোকসভা আসনকেও এমনভাবে নতুন করে সাজানো হয়েছে, যাতে কাশ্মীরিরা সেখানেও কম সংখ্যায় জিততে পারেন।

কাশ্মীরেও যেভাবে বিজেপির ক্ষমতা পেতে পারে

নতুন এই নির্বাচনী নকশার তাৎপর্য বহু। সহজে যা বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে কেন্দ্রশাসিত এ জনপদে রাজনৈতিকভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কাশ্মীরিদের আধিপত্য কমাতে চাইছে।

সচরাচর নির্বাচনী আসনের বিন্যাস করা হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। ভারতেও এ রকমই নিয়ম। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরের নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসে সে নিয়ম মানা হয়নি। ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে সাবেক এ রাজ্যের কাশ্মীর অংশের ৫৬ শতাংশ আসন পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তারা পেল ৫২ শতাংশ আসন। আগের পুনর্বিন্যাসে তাদের জন্য আসন ছিল ৫৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ নতুন বিন্যাসে কাশ্মীরের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ কমল। অথচ বাড়ল জম্মুর আসন। জম্মুর জন্য আসন বৃদ্ধি মানে তাতে সরাসরি লাভ হবে বিজেপির। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের বিপরীতে জম্মুতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো অমুসলিমরা। সেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ অধিবাসী হিন্দু। জম্মু-কাশ্মীর মিলে গড়ে ৭০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। কিন্তু ৭০ শতাংশ মুসলমানের এলাকা হলেও নির্বাচনী আসনগুলো এখন এমনভাবে বিন্যাস হলো, যাতে বিধানসভা ও লোকসভায় কাশ্মীরি মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব অর্ধেকের চেয়ে কমে যেতে পারে। পুরো এলাকায় সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল হতে পারে বিজেপি।

জম্মুতে আসনগুলো বাড়ানো হয়েছে বিজেপি–প্রভাবিত এলাকাগুলোয়। এখানকার ১০টি জেলার ৪টি (জম্মু, কাথুয়া, সাম্বা ও উদামপুর) হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাশ্মীরে যেভাবে বহু রাজনৈতিক দলের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে—জম্মুতে, বিশেষ করে জম্মুর হিন্দুপ্রধান ওই চার জেলায় বিজেপির তেমন কোনো প্রতিপক্ষ নেই। অর্থাৎ কাশ্মীরে যেভাবে নির্বাচনী আসন বিভিন্ন দলে ভাগাভাগি হবে, জম্মুতে সে সুযোগ নেই। ফলে এমন ঘটলে অবাক হওয়ার থাকবে না যে জম্মু ও কাশ্মীরে ‘গণতান্ত্রিক’ভাবেই শিগগিরই বিজেপি শাসন শুরু হতে পারে। এটা হবে এমন এক অভিনব ঘটনা, ভারতের মুসলমানপ্রধান একমাত্র এলাকাটিতে শাসনকাজ পরিচালনা করবেন অমুসলিম জনপ্রতিনিধিরা। ব্রিটিশদের কাছে কাশ্মীর কেনাবেচার আগে-পরে প্রায় এ রকমই ছিল কাশ্মীরের পরিস্থিতি। ৭৬ বছর পর ইতিহাসের এই প্রত্যাবর্তনকে ট্র্যাজেডি কিংবা প্রহসন, কোনটা বলা হবে, সে বিষয়ে মীমাংসায় আসা কঠিন।

নতুন গেজেট বিশ্লেষণ করে ভারতের প্রচারমাধ্যম দ্য অয়্যার দেখিয়েছে, ১ লাখ ৪০ হাজার কাশ্মীরি যেখানে স্থানীয় পরিষদে একজন প্রতিনিধি বাছাই করবেন, সেখানে জম্মুতে সেটা করতে পারবেন প্রতি ১ লাখ ২০ হাজার নাগরিক। এভাবে ৫৩ লাখ জম্মুবাসী পাবেন ৪৩টি আসন; আর ৬৮ লাখ কাশ্মীরি পাবেন ৪৭টি আসন। পদ্ধতিগতভাবেই কাশ্মীরিরা রাজনৈতিকভাবে ঠকবেন।

আলোচ্য গেজেটের আরেক তাৎপর্যময় দিক হলো কেবল জম্মুর হিন্দুপ্রধান এলাকায় নির্বাচনী আসন বাড়িয়েই চলতি সংস্কার শেষ হচ্ছে না; পুরো জম্মু ও কাশ্মীরে নয়টি আসনকে ‘শিডিউল ট্রাইব’-এর জন্য সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সংরক্ষিত আসনের তিনটি রাখা হয়েছে কাশ্মীরে, ছয়টি জম্মুতে। এতে কাশ্মীরের এত দিনের মুসলমানপ্রধান দলগুলোর সম্ভাব্য আসন হিস্যা বিধানসভায় আরও কমবে। কারণ, ‘শিডিউল ট্রাইব’ বলতে কাশ্মীরে যাদের চিহ্নিত করা হয়, তাদের বড় অংশ মুসলমান হলেও (গুজ্জার ও বাকরোয়াল) ঐতিহাসিকভাবে তারা কাশ্মীরি জন–আন্দোলনে কম সম্পৃক্ত। কাশ্মীরি রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক পরিসরের বাইরেই তাদের বিচরণ।

শেষ ভরসা সুপ্রিম কোর্ট

সীমানা নির্ধারণ কমিটি বলছে, তারা সরকারকে এসব সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে কাশ্মীরের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই। কিন্তু কাশ্মীরিরা বলছেন, তাঁদের মতামত অগ্রাহ্য করে জম্মুর জন্য আসন বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের প্রাচীন দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের তানভির সাদিকের মতে, কাশ্মীরিদের রাজনৈতিক অধিকারের সূক্ষ্ম আরেক দফা সংকোচন ঘটছে চলতি প্রকল্পের মাধ্যমে।

২০১৯ সালে সংবিধান থেকে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে দেওয়ার পর কাশ্মীরের অনেক নেতা এ অঞ্চলে মূল ভারতের নাগরিকদের এনে জনমিতিক পরিবর্তন ঘটানো হবে বলে আশঙ্কা করছিলেন। তাঁদের সেই ভয় এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে জনমিতিক পরিবর্তন না ঘটিয়েও নির্বাচনী আসনের বিন্যাসের মাধ্যমে কাশ্মীরকে অমুসলিম প্রশাসকদের দিয়ে শাসন করা সম্ভব।

তবে কাশ্মীরি নেতাদের আশা, ২০১৯ সালে তাঁদের রাজ্যের সাংবিধানিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যে আপত্তি দাখিল করা আছে, সেখানে ইতিবাচক রায় পাওয়া যাবে। সেই মোকদ্দমার শুনানিতে নির্বাচনী আসনবিষয়ক নতুন গেজেট নিয়েও কথা উঠবে। কারণ, জম্মু ও কাশ্মীরে চলতি সীমানাবিন্যাস হলো ২০১৯ সালের ‘জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠন অ্যাক্ট’-এর আলোকে। অথচ ওই ‘অ্যাক্ট’ নিয়ে মামলা চলমান। কোনো সাংবিধানিক বিষয়ে মামলা চলা অবস্থায় সেখানে এ রকম মৌলিক রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সংস্কার চলতে পারে কি না, বিচারপতিরা নিশ্চয়ই সেটাও খতিয়ে দেখবেন। প্রায় তিন বছরের পুরোনো বহু আলোচিত ওই পিটিশনের ফয়সালা হওয়ার কথা আছে শিগগিরই।

কাশ্মীরের নতুন এই উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের ক্ষোভও নজর এড়াচ্ছে না। এই জনপদ নিয়ে ভারতের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তারা বরাবরই ক্ষুব্ধ। ২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধান থেকে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে দেওয়ার পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে আলাপ-আলোচনা প্রায় বন্ধ। নয়াদিল্লির নতুন উদ্যোগের বিরুদ্ধেও পাকিস্তানের নতুন সরকার জোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইসলামাবাদে রীতিমতো ভারতের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়ে তারা পদ্ধতিগতভাবে অসন্তোষের কথা জানায়। তবে ভারত এই ক্ষোভকে আমলে নিতে প্রস্তুত নয়। কারণ, জম্মু-কাশ্মীরের যেকোনো ঘটনাকে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখে।

নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে উপত্যকা

জম্মু ও কাশ্মীরে সীমানা পুনর্নির্ধারণের চেষ্টার একটা মানে এ–ও দাঁড়ায় যে শিগগিরই হয়তো সেখানে নির্বাচন হবে। ভারত সরকার নির্বাচন দিয়ে নতুন পরিষদ গঠন করে আন্তর্জাতিকভাবে কাশ্মীর বিষয়ে তার ভাবমূর্তিকে বদলাতে চাইতে পারে। বিগত মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে কাশ্মীরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে একের পর এক। জম্মু ও কাশ্মীরে নির্বাচিত একটা পরিষদ কাজ করলে নয়াদিল্লি এসব বিষয়ে প্রত্যুত্তরের কিছু সুযোগ পাবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর আগে কাশ্মীরি নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেছিলেন, নির্বাচনী আসনের বিন্যাস শেষ হলে জম্মু ও কাশ্মীরের ‘রাজ্য’-মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেটা যে বিজেপির নেতৃত্বে বিধানসভা গড়ার মাধ্যমে ঘটতে যাচ্ছে, কাশ্মীরিরা সেটা আদৌ আন্দাজ করতে পারেননি! স্বভাবত, নতুন গেজেট দেখে উপত্যকাজুড়ে আরেক দফা প্রতারিত হওয়ার বোধ তৈরি হয়েছে।

* আলতাফ পারভেজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

২০১৯ সালে ভারতের সংবিধান থেকে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে দেওয়া হয়
২০১৯ সালে ভারতের সংবিধান থেকে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে দেওয়া হয়। ছবি: রয়টার্স

Monday, May 16, 2022

অন্তর্মুখীন অঙ্গীকারের এক উদ্ভিদবিজ্ঞানী

https://www.rokomari.com/book/author/1742/%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE
-----এক-----
দ্বিজেনদা, আমাদের সকলের প্রাণের দ্বিজেন শর্মাকে নিয়ে গুছিয়ে কিছু লেখা খুবই দুষ্কর। কত কথাই তো মনে পড়ে। পরিণত বয়সে চলে গেলেও কীর্তিমান মানুষের মৃত্যুকে সহজে মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর রুচি-সংস্কৃতি, পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি, বিদ্যানুরাগ এবং জীবন-অভিজ্ঞতা কতই না বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ।

তিনি ঔদার্যগুণে এক মহান ব্যক্তি ছিলেন। নিরহংকার ও স্বভাবধর্মে স্নেহপ্রবণ ছিলেন তিনি। সর্বদা মানবের কল্যাণ-আকাঙ্ক্ষার ভাবনায় আলোড়িত; এমন একটি মানুষের সর্বতোমুখী ভাবনা-দেশচেতনা যখন তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে তখন তাঁকে জানা ও উপলব্ধি করা কবি বিষ্ণু দে-র ভাষায় ‘মনেরই’ জয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন উটকো বিলোড়নে স্পন্দিত না হয়ে শত শূন্যতা, দুঃখ ও কষ্টেও কেমন করে সুন্দর থাকা যায়।

বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষক ছিলেন তিনি। অন্যদিকে নানা অভিজ্ঞতাঋদ্ধ এবং বহু গ্রন্থের রচয়িতা, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ। অগণিত শিক্ষার্থীকে দেশ-আত্মার মর্মবেদনা উপলব্ধির দীক্ষা দিয়েছেন। এই দীক্ষায় দীক্ষেত হয়ে বহু শিক্ষার্থী দেশের ও সমাজের প্রতি অঙ্গীকারের চেতনা নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলছেন। তিনি প্রায় সত্তর বছর ধরে প্রকৃতির রমণীয়তা সম্পর্কে এ-দেশের অসচেতন মানুষকে সচেতন করার ব্রত নিয়ে কাজ করেছেন।

তাঁর প্রিয় বিষয় নিসর্গ ও বাগান চর্চা। এ-বিষয়কে উপজীব্য করে তিনি নিরন্তর লেখালেখি করেছেন। শ্যামলী নিসর্গ ও চার্লস ডারউইন তাঁর দুটি অসাধারণ গ্রন্থ। এছাড়াও তাঁর রয়েছে অনেক গ্রন্থ, যা দীর্ঘদিনের সাহিত্য চর্চা ও সাধনার মধ্যে রচিত হয়েছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ছিমছাম ঢাকা নিয়ে যখন স্মৃতিচারণ করতেন তাঁর কথায় আমরা উপলব্ধি করতাম প্রতিটি বৃক্ষ এবং এই শহর তাঁর কত না পরিচিত ছিল। সে-সময় বন্ধু ও সখা প্রাবন্ধিক আলী আনোয়ার এই ভ্রমণে তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিলেন। হেঁটে বেড়াতেন তাঁরা। এই ভ্রমণ তাঁদের জীবন-অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সাহিত্য, প্রকৃতি ও বিজ্ঞান তাঁদের আলোচনার বিষয় ছিল।

নিসর্গ ও বাগানের বিন্যাস যে প্রকৃতি রক্ষার মানবিক সৌন্দর্যের অভ্যর্থনায় খুবই প্রয়োজনীয় – এ ছিল দ্বিজেন শর্মার ভাবনার বিষয়। বিগত দুই যুগ ধরে সমাজে প্রকৃতি ধ্বংসের যে-যজ্ঞ চলছে তিনি এক্ষেত্রে প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতেন। প্রকৃতি মানবজীবনে কত প্রাণদায়ী ও সঞ্জীবনী শক্তি নিয়ে জীবনচর্যা ও সাধনাকে সমৃদ্ধ করে, এ-বোধ তিনি সঞ্চারিত করেছেন সমাজে।

এই তো কিছুদিন আগে যখন বহু অর্থব্যয়ে বিদেশি বৃক্ষ দিয়ে বিমানবন্দর সড়কের শোভাবর্ধন করা হচ্ছিল তখন জর্জর শরীর নিয়ে তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শ্যামল নিসর্গের এই বাংলায় এত ঐতিহ্যমণ্ডত অসংখ্য বৃক্ষ থাকা সত্ত্বেও কেন বহু অর্থের বিনিময়ে বিদেশি বৃক্ষ দিয়ে শহরকে সজ্জিত করা হচ্ছে। এ কোনোভাবেই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সহায়ক নয়।

তিনি মনে করতেন, বৃক্ষরোপণও একটি বিজ্ঞান – এতে যেমন বিজ্ঞান আছে, তেমনি নন্দনতত্ত্বও আছে, তেমনি পরিবেশ-চেতনা আছে; অনেক কিছু মিলিতভাবে আছে। সেজন্য বৃক্ষরোপণের জন্য একটা নির্দিষ্ট কমিটি থাকা দরকার, তাদের আলোচনা করা দরকার, প্রজাতি নির্ধারণ করা দরকার, সেগুলো যাতে লাগানো ও রক্ষা করা যায় তার তদারকি দরকার এবং সর্বোপরি দরকার যাঁরা এ-কাজে নিয়োজিত আছেন, প্রকৃতির প্রতি তাঁদের ভালোবাসা। যান্ত্রিকভাবে এসব কাজ সম্পন্ন হয় না। সেজন্যেই বোধকরি নটর ডেম কলেজের উদ্যানটি বহু ভাবনাপ্রসূত ও দৃষ্টিনন্দন।

তাঁকে ঘিরে প্রকৃতিবিদ ও নিসর্গপ্রেমীদের যে-বৃত্ত গড়ে উঠেছিল তাঁদের তিনি নানাভাবে নিসর্গচেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। রমনা উদ্যানসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তিনি তাঁদের নিয়ে গাছ চেনাতেন।

ব্রিটিশ রাজত্বকালে যে-নিসর্গবিদ রমনা উদ্যানটি গড়ে তুলেছিলেন দ্বিজেন শর্মার ছিল তাঁর প্রতি অপরিসীম অনুরাগ। এছাড়া বৃহত্তর ওয়ারী এলাকায় প্রতিষ্ঠিত বলধা গার্ডেনের আধিকারিক শত বিরূপতার মধ্যেও এই বাগানটি রক্ষা করেছেন। তাঁর প্রতিও তিনি ছিলেন সশ্রদ্ধ।

দ্বিজেন শর্মাই বোধকরি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী, যিনি পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজন এবং প্রকৃতি ধ্বংসের ভয়াবহতা সম্পর্কেও সমাজকে, বিশেষত নবীন প্রজন্মকে, অবহিত করেছেন।

দ্বিজেন শর্মার আগ্রহ বিজ্ঞানচর্চায়ও। বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধাবলিকেও তিনি পাঠকের জন্য করে তুলেছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী।

তাঁর কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে ব্রিটিশ-ভারতে। ওই সময়ের রাজনৈতিক উত্থান-পতন তিনি দেখেছেন। প্রত্যক্ষ করেছেন ওই সময়ে অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাম রাজনীতির বিচ্যুতি। এই বিচ্যুতি তাঁকে বেদনাহত করলেও সমগ্র জীবন বাম রাজনীতির প্রতি তাঁর প্রবল শ্রদ্ধা ছিল।

দ্বিজেন শর্মা বেদনাহতচিত্তে দেশভাগ দেখেছেন; পাকিস্তানি শাসনের পীড়ন ও শোষণ দেখেছেন। মর্মঘাতী-ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা লাখ লাখ মানুষের হৃদয় বিদীর্ণ করেছে – এ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং বাস্ত্তচ্যুত মানুষের আর্তনাদ তিনি শুনেছেন। প্রথার শাসন ওই সময়ে কেমন করে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে খর্ব করেছে এবং সমাজজীবনে যুক্তি ও মানবিক-চেতনা কীভাবে অপসৃত হয়েছে সে-ও দেখেছেন। আবার গণজাগরণের মধ্য দিয়ে একটি অঞ্চলের মানসে বাঙালির স্বরূপ কতভাবে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের যে-পথ নির্মাণ করেছে এ-ও দেখেছেন। এই প্রত্যক্ষণ তাঁকে করে তুলেছে জীবনাভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, সজীব ও প্রাণবন্ত। যখন অন্ধকার গ্রাস করে সমাজজীবন কিংবা যুক্তি এবং মানবিক কল্যাণবহির্ভূত বোধে আচ্ছন্ন হয়ে যায় সমাজ, আমরা বিমূঢ় ও বিষণ্ণবোধ করি। অভিজ্ঞতায় দেখি তিনি এতটুকুও হতাশ হন না। কোথায় যেন এক অন্তহীন শক্তি, অঙ্গীকার ও বিশ্বাস নিয়ে এই সংকট অতিক্রমের জন্য তিনি সাহস পান।

মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় লুলুম্বায় অধ্যয়নরত কয়েকজনকে তিনি খুবই স্নেহ করতেন। তাঁদের জন্য তাঁর দ্বার ছিল সর্বদা অবারিত। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে যেসব প্রতিনিধি মস্কো যেতেন নানা কর্মে ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে তাঁদের তিনি আপ্যায়ন করতেন।

তাঁর সঙ্গে প্রথম কখন, কীভাবে আলাপ হয়েছিল মনে পড়ে না। তবে আমরা জানতাম এই মানুষটির নিসর্গপ্রেম কত সূক্ষ্ম। নটর ডেম কলেজের বাগান বিন্যাসে কত পরিশ্রম করে একটি চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। চিন্তাপ্রসূত ভাবনায় বৃক্ষসজ্জাও যে কত দৃষ্টিনন্দন হতে পারে, এই বিদ্যায়তনের বাগানটি দেখলে তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে।

তিনি যখন মস্কো প্রগতি প্রকাশনায় চলে যান চাকরি নিয়ে তখন থেকে তাঁর সঙ্গে নিবিড় এক সখ্যের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মস্কোতে থাকাকালীন (১৯৭৪-৯২) তাঁর লেখা অধিকাংশ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘সংবাদ সাময়িকী’তে। আমি তখন ‘সংবাদ সাময়িকী’র সম্পাদক। নিরন্তর তাগিদের ফলে ওই সময় তাঁর প্রিয় বিষয় নিসর্গ বাগান পরিচর্যা এবং পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যেসব বিরল বৃক্ষ ঢাকায় ছিল, যা নাগরিকদের হৃদয় ও মন হরণ করত, তা নিয়ে তিনি অজস্র প্রবন্ধ লেখেন। বিজ্ঞানেরও নানা প্রসঙ্গ তাঁর লেখালেখিতে প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠেছে তখন। বিশেষ করে ওই সময় স্মৃতির তাড়না থেকে রচিত কত না প্রবন্ধ আমাদের উজ্জীবিত করেছে। সৃজনশীল বন্ধুর ও আত্মজনের সৃজন-উৎকর্ষ নিয়ে, ভাবনা নিয়ে এবং অর্জন নিয়ে তিনি ওই সময় অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। কোনো কোনো বই পাঠের অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন। তাঁর পঠন-পাঠন এবং সাহিত্যে ও বিজ্ঞানে তাঁর অনুরাগ যে কত তীক্ষ্ণ ছিল, এসব প্রবন্ধে তা ধরা আছে। কোনো বাগান, বৃক্ষকে বিষয় করেও তিনি লিখেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বৃক্ষশোভিত ঢাকা যে কত পরিচ্ছন্ন ছিল, বৃক্ষের শোভায় কত মনোগ্রাহী শহর হয়ে উঠেছিল – সে কথাও লিখেছেন। ঢাকা ছিল তখন একান্ত পরিম-লের চেনা শহর। প্রতিটি ধূলিকণা এবং বৃক্ষ আপনজনের মতো হয়ে উঠেছিল। এ চেনা শহর কখন যে অচেনা হয়ে গেল সে-কথাও বলেছেন তিনি। যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে স্থাপত্যে, ভবন নির্মাণে, সৌন্দর্যহীনতায় বৃক্ষ পরিচর্যার অভাবে এ-শহর আকস্মিকই এক নৈরাজ্যময় শহরে পরিণত হলো – এ নিয়ে তাঁর দুঃখ ও কষ্টের কথাও বলেছেন। অথচ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই শহরের যে-চরিত্র গড়ে উঠেছিল তা থেকে কতভাবেই না প্রেরণা সঞ্চয় ও রস গ্রহণ করা যেত। শহরের কোনো কোনো অনুষঙ্গ তাঁকে গভীরভাবে টেনে নিত স্মৃতির অন্দরমহলে – এসব লেখায় তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তিনি বোধকরি প্রথম কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের দেশভাগভিত্তিক উপন্যাস কালো বরফ প্রকাশের অব্যবহিত পরেই গ্রন্থটিকে অসামান্য বলে উলেস্নখ করেছিলেন। এই গ্রন্থের নায়ককে বাংলা উপন্যাসে একজন উলেস্নখযোগ্য আউটসাইডারও তখন বলেন তিনি। দেশত্যাগের উন্মূল বোধ এই নায়ককে তাড়া করে সর্বদা। প্রেমে, অপ্রেমে এবং দৈনন্দিনতায় নায়ক শিকড়হীন বোধ নিয়ে অচরিতার্থতার বেদনায় কেবলই খোঁজে আপন সত্তা। জীবনদৃষ্টির গভীরতায় এমন বিশ্লেষণ দ্বিজেন শর্মার পক্ষেই সম্ভব হয়। এসব প্রবন্ধ আমি পেতাম মস্কো থেকে। ওই সময়ে আমার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আরো নিবিড় হয়ে ওঠে, যখন আমি প্রতি বৃহস্পতিবারের ‘সংবাদ সাময়িকী’ নিয়মিত মস্কো পাঠাতে শুরু করি। দ্বিজেন শর্মা ২০০০ সালে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এই যোগসূত্রের কথা উলেস্নখ করে বলেছেন, ওই সময়ে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে এবং বিশেষত সাম্প্রতিক ধারার সাহিত্যের সঙ্গে ‘সংবাদ সাময়িকী’ তাঁকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে রেখেছিল।

-----দুই-----
দ্বিজেন শর্মা সত্তর বছর ধরে প্রকৃতির রমণীয়তা সম্পর্কে পাঠকের অভিজ্ঞতার দিগন্ত প্রসারিত করার ব্রত নিয়ে কাজ করেছেন। বিশেষজ্ঞের মতো বাগানের বিন্যাস কেমন হবে এ নিয়ে নিরন্তন পাঠককে সজাগ করেছেন। আমরা উপলব্ধি করি, প্রকৃতির উজ্জীবনের সঙ্গে মানবকল্যাণ নিহিত এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রকৃতি চর্চা কতই না প্রয়োজনীয়।

দেবী শর্মার, তাঁর জীবনসঙ্গিনী, কিছুদিন আগের একটি মন্তব্য আমাদের মনে গেঁথে যায় এবং দ্বিজেন শর্মার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুবই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, ‘বন-জঙ্গল থেকে আনেন দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির গাছগাছালি, লাগান বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি চত্বরে ও রমনা পার্কে। শুনেছি, আমার শ্বশুরমশায়েরও এমন নেশা ছিল, গাছপালা লাগাতেন পথেঘাটে, অন্যের বাড়ি। আপাতত এসব নিয়ে ভালোই আছেন দ্বিজেন শর্মা।’

এ ছাড়া আমরা জানি যে, ‘দ্বিজেন শর্মা বড় হয়েছেন পাহাড়ি এলাকায়, ওখানকার নিসর্গ তাঁর অস্থিমজ্জায় – তেমন একটি শোভা সৃষ্টি করতে চাইতেন আমাদের সমতল বাংলায়, সেটা হয়ে উঠত না, যেজন্য এই উচাটন।’

-----তিন-----
দ্বিজেন শর্মা বেশ কিছুদিন ছিলেন মস্কোতে। ওই সময়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সমাজতন্ত্রে মানবমুক্তির অভিযাত্রার নানা অনুষঙ্গ। ওই সময় রুশ সাহিত্য ও মানস সম্পর্কে অবলোকন খুবই উদ্দীপক হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রত্যক্ষণে। একই সঙ্গে রুশিদের স্বাচ্ছন্দ্য, সুখ, সংস্কৃতি-চেতনা ও আন্তর্জাতিকতা বোধ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল এবং রুশিদের অধ্যয়নপ্রীতি কত যে বৈচিত্র্যময় ছিল এবং বিষয়ের গভীরতাকে নানাভাবে তাঁদের জীবন ও মননকে সমৃদ্ধ করত – এ বিষয়ে দ্বিজেন শর্মার বহুমুখী অবলোকন রয়েছে। পরবর্তীকালে তিনি দেখেছেন সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার ঘটনাবলি। মানবকল্যাণের জন্য ও মানবিক হওয়ার সাধনায় সমাজতন্ত্র এখনো যে কত প্রাসঙ্গিক জীবন-অভিজ্ঞতা দিয়ে এ-কথাও তিনি বলতে চেয়েছেন। সমাজতন্ত্রে তাঁর আস্থা ও প্রত্যয় যে কত প্রবল ছিল এবং রাশিয়া সমাজতন্ত্রের পতনের পরও মার্কসবাদ একটি আদর্শ হিসেবে তার প্রাসঙ্গিকতা যে হারায়নি সে-কথা তিনি বারংবার উলেস্নখ করেছেন। দু-একটি লেখনীতে এ-প্রসঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও বিধৃত হয়েছে।

আমার দৃঢ়বিশ্বাস, দ্বিজেন শর্মা উদ্ভিদবিজ্ঞান, বিজ্ঞানচেতনা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও সমাজতন্ত্রের অভ্যুদয়, পতন ও সম্ভাবনা নিয়ে যে-কথা বলতে চেয়েছেন তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য কম নয়।

-----চার-----
আমি এক বছর মস্কো ছিলাম। এই মস্কো শহর দ্বিজেনদারও প্রিয় শহর। সেজন্য দ্বিজেন শর্মা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমার মস্কো শহর প্রসঙ্গের অবতারণা। এই শহরের শিল্প-সাহিত্যের নানা প্রবণতা, অঙ্গীকার ধরা পড়েছিল আমাদের চোখে। প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম মস্কোর। বড়ই সযত্নলালিত বৃক্ষশোভিত এই শহরকে ভালো না বেসে পারা যায় না। জুন-জুলাই মাসে মস্কো শহর সবুজের সমারোহে নিবিড় সৌন্দর্যে মনকে ভরে দেয়, তা সত্যিকার অর্থে প্রাণ ও মনকে করে তোলে সজীব। আর তুষারপাত নিঃসঙ্গতায় হতাশায় ও আনন্দে এমন এক বোধে আচ্ছন্ন করে, যা জীবনের সম্পূর্ণতার সঙ্গে নিবিড় সংযোগ তৈরি করে আর আমিত্বের অন্তর্মূল ধরে টান দেয়। এ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আলাপচারিতায় দ্বিজেন শর্মাও এই কথাগুলো বলতেন।

সে-সময়ে রুশ তরুণ-তরুণীদের জন্য বিনোদনের নানা ধরনের ব্যবস্থা ছিল। বিনোদন শুধু সংস্কৃতি ভবনের সান্ধ্য আড্ডা, নাচ ও গানে সীমাবদ্ধ ছিল না। রেস্তোরাঁয় রাত্রিকালীন আহার আমাদের অনেকেরই জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। শুধু যে তন্বী রুশি রমণীরা হৃদয়হরণ করেছিল সে-সময় তা-ই নয় – রুশ ব্যালে, থিয়েটার, সিনেমা, চিত্রশালা নিয়েও মেতে উঠেছিলাম সে-সময়ে। যে-কাজে পাঠানো হয়েছিল তা শিকেয় উঠেছিল। সারা হৃদয়-মন জুড়ে ছিল মস্কো থিয়েটার, তাগানকা নাট্যদল আর মায়োকোভস্কি স্কয়ারের সারি সারি নিরীক্ষাধর্মী থিয়েটার হল। কত ধরনের নাটক, চলচ্চিত্র, ব্যালে যে দেখেছি সে-সময় তা বলে শেষ করা যাবে না। বলশয় থিয়েটারে সোয়ান লেক ব্যালেই দেখেছি বেশ কয়েকবার। রুশ কমিউনিস্ট পার্টির আতিথ্যে দীর্ঘদিন অবস্থান করায় বলশয়ের প্রবেশপত্র পাওয়াও কোনো কঠিন কাজ ছিল না।

আর ছিল পুশকিন মিউজিয়াম, যেখানে পনেরো দিন বা এক মাস অন্তর ইউরোপের বিলোড়ন সৃষ্টিকারী সব চিত্রশিল্পীর মৌলিক কাজের প্রদর্শনী হতো। পিকাসো, মাতিস, শাগাল আর ভ্যান গঘের মৌলিক কাজ দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল। শীত ও গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে শত শত মানুষ সেই প্রদর্শনী দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। বরফ পড়ছে তো পড়ছেই, তবু ভ্রূক্ষেপ নেই। এঁদের ধৈর্যের কাছে সে-সময় আমি ছিলাম প্রণত।

আর সে-সময়ে বইয়ের দোকানে বই কেনার জন্য দীর্ঘ আধমাইলের যে-লাইন দেখেছিলাম প্রথম দিন তা বিস্ময়ে আমাকে অভিভূত করেছিল।

চিত্রানুরাগী মানুষের এই লাইন দেখে আমার কেবলই মনে হতো, সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা এবং রুচির বিকাশ কোন পর্যায়ে উপনীত হলে এমন হওয়া সম্ভব।

দ্বিজেনদাও মস্কো শহরের এবং সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের গুণগ্রাহী ছিলেন। আলাপচারিতা ও আড্ডায় এ প্রসঙ্গগুলো হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে আলোচনা হতো। তাঁর পরিচিত মস্কো শহর কখন যেন আমারও প্রিয় শহর হয়ে উঠেছিল।

সত্তর ও আশির দশকে আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদ ও আফ্রো-এশীয় লেখক ইউনিয়নের সভা ও সেমিনারে যোগ দিতে কয়েকবার মস্কো যেতে হয়েছিল। একবার নভমিত্ম প্রেস এজেন্সির আমন্ত্রণে দৈনিক সংবাদ পত্রিকা আমাকে মস্কো প্রেরণ করেছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করতে। ক্রেমলিনের প্রেস সেন্টারে বসে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস দেখা ছিল বিরল এক অভিজ্ঞতা।

মস্কো পৌঁছেই ফোন করতাম দ্বিজেনদাকে। বলতেন, ‘চলে এসো; চেনো তো মেট্রো স্টেশন ইগোজাপাতনায়া। সেখান থেকে বেরিয়ে বাস। তারপর দুই স্টপ পরেই আমার আবাসন।’ খুবই পরিচ্ছন্ন ছিমছাম ছিল এ-আবাসিক এলাকা। দূরের উদার আকাশ নির্মেঘ এবং দিগন্তরেখা এক আরামবোধ এনে দেয় চোখে। কোলাহল নেই। চিনতে এতটুকু কষ্ট হতো না। মস্কো শহরে রাতবিরাতে বা নির্জন স্থানেও কোনো ধরনের কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়নি। রুশ কর্তৃপক্ষ সেই সময়ে অনুবাদ এবং অ্যাকাডেমিক কাজে নিযুক্তদের জন্য এই আবাসন গড়ে তুলেছিল। মাত্র পাঁচ কোপেক খরচ করে খুব সহজেই পৌঁছে যেতাম তাঁর গৃহে। প্রাচীন লিফটে উঠে বেল টিপলেই তিনি বেরিয়ে আসতেন। প্রাণের আবেগ ও হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানাতেন। তারপর আড্ডা আর পানাহার চলত মধ্যরাত অবধি। আমাদের কথা শেষ হতো না। আসলে যে-কোনো শিল্প ও সাহিত্যের আড্ডার প্রাণধর্মিতা হলো কথার রেশ নিয়ে ফিরে যাওয়া এবং ভাবনার বৃত্তকে সম্প্রসারিত করা। দ্বিজেনদার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে এই যে অর্জন হতো, তা সমৃদ্ধ করত আমার মানসভুবনকে। পার্টি আমলাতন্ত্রের প্রবল আধিপত্য ছিল সমাজে। এতদসত্ত্বেও সোভিয়েত রাশিয়ার অর্জন এবং সত্যিকার অর্থেই দারিদ্র্যবিমোচন কীভাবে সম্ভব হয়েছিল সে-কথা তিনি প্রায়ই বলতেন। মানুষ যে কতভাবে সমাজতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক চেতনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করেছিল এবং আনন্দে থাকত এ আমরা তাঁর পর্যবেক্ষণ থেকে গভীরভাবে অনুভব করতাম।

সেই সময়ে দ্বিজেন শর্মা প্রগতি প্রকাশনায় কর্মরত। কাজ যত না করেন তার চেয়ে অধিক শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় মেতে থাকতেন। ননী ভৌমিক, হায়াৎ মামুদ আর খালেদ চৌধুরী এই বুধম-লীর আড্ডা ও ভাববিনিময়ের শেষ ছিল না। সেজন্য আর্থিক ক্ষতি যে কীভাবে পুষিয়ে নিতেন, তা আজো ভেবে পাই না। প্রগতি প্রকাশনে যে বুধম-লীর বা নক্ষত্রম-লীর সমাবেশ হয়েছিল তার পুরোভাগে ছিলেন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক ননী ভৌমিক। আড্ডায় যাঁর জুড়ি মেলা ভার। সঙ্গে থাকতেন বিশু দাশগুপ্ত আর অরুণ সোম। আমার যখন যাওয়া-আসা তখন এই নক্ষত্রম-লীচ্যুত হয়ে খালেদ চৌধুরী আর হায়াৎ মামুদ ঢাকায় এসে থিতু হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের আড্ডার রেশ আর বোহেমিয়ান ধ্যানকে ধারণ করে দ্বিজেন শর্মা মস্কোয় অন্তহীন আড্ডা দিয়ে চলেছেন। আড্ডার অধিপতি বলতে তেমন কেউ নেই। তবু অন্তহীন আড্ডা চলছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আর কখনো বাংলাদেশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসু রুশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে।

একবার তাঁর ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেখি দ্বিজেনদা রান্নাঘরে, বাড়িতে কেউ নেই। জ্যান্ত মাছ কিনে এনেছেন আমার জন্য। গস্নাভস পরে মাছের আঁশ কুটছেন। একটু পরই রান্না বসিয়ে আড্ডা দিয়ে চলেছেন আমাদের সঙ্গে। কথা ফুরাত না। যদিও আমি আড্ডায় কথা বলতে পারঙ্গম নই, তবু দ্বিজেনদার কথা শুনতাম আগ্রহ নিয়ে, কত ধরনের বিষয়ে যে তিনি কথা বলতেন।

-----পাঁচ-----
দ্বিজেন শর্মা রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনা, বৃক্ষভাবনা, সমবায়ভাবনা, হলকর্ষণ ও কৃষি উৎপাদন থেকে পাঠ গ্রহণ করে রাবীন্দ্রিক ধ্যান ও বিন্যাসেরও এক মুগ্ধ পাঠক ছিলেন। আজ থেকে শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ শামিত্মনিকেতনে প্রকৃতি নিয়ে যেভাবে সচেতন করে তুলতেন শিক্ষার্থীদের ও নবীন যুবকদের, এক্ষেত্রে দ্বিজেন শর্মা সর্বদা স্পন্দিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জীবনের সংস্কৃতি ভাবনায়, জীবনচর্যায়, সাধনায় প্রধান অবলম্বন হয়ে প্রতিনিয়ত জীবনকে যেভাবে সমৃদ্ধ করছেন, এও তাঁর মননে প্রোথিত হয়ে ছিল।

দ্বিজেন শর্মা বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন থেকে অদ্যাবধি বাঙালি সমাজজীবনের অসংগতি ও সংকটমোচনের জন্য যে-সংগ্রাম করেছেন, তা তাঁকে করে তুলেছে দেশের বিবেকবান এক অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। সমাজহিতৈষণা, গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল চেতনা, সুশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও মনীষার ঔজ্জ্বল্যে তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে প্রাণসঞ্চার করেন, তা বাঙালি জাতির জীবনসাধনায় নবীন মাত্রা সঞ্চার করেছে।

গণতন্ত্র, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের যে-স্বপ্নকে তিনি লালন করেছিলেন কৈশোরে, সে-চেতনা তাঁর মধ্যে সর্বদা দেদীপ্যমান ছিল। সেজন্য জাতীয় যে-কোনো সংকটকালে ও মানুষের মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষার যে-সংগ্রাম চলছে সমাজজীবনে, তাতেও তাঁর অংশগ্রহণ অগণিত নবীনকে উজ্জীবিত করছে। তাঁর এই বিরতিহীন কর্ম, সাহিত্যবোধ, সংস্কৃতিতে অনুরাগ, প্রকৃতি ও বিজ্ঞান চেতনা, বাঙালির মনন, বুদ্ধিবৃত্তি ও মনীষায় যুক্ত করছে সমাজকে উন্নত বোধে উজ্জীবন। এভাবেই কৃতবিদ্য এই মানুষটির অনন্য ব্যক্তিত্ব ও বহুমুখী কর্ম সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ নির্মাণে প্রাণিত করছে বাঙালি সমাজকে।

-----ছয়-----
এই যে আমাদের দ্বিজেনদা এবং অসামান্য উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা সম্পর্কে লিখতে বসে মানুষটির অর্জন এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কি আমি কিছু লিখতে পেরেছি? এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব, সৃজনধর্ম বা স্বভাবমাধুর্য নিয়ে বিসত্মৃত লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি এক্ষেত্রে দক্ষ নই। তিনি এত বছর ধরে এত বিসত্মৃত পরিসরে সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও নিসর্গচেতনা প্রসারে কাজ করে গেছেন, যা বর্ণনা করা সহজ নয়। দ্বিজেন শর্মার জন্ম ১৯২৯ সালে, সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়লেখা থানার, শিমুলিয়া গ্রামে।

Saturday, May 14, 2022

ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে দশটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

লাস্ট আপডেট- ২২ অগাস্ট ২০১৮: ফিলিস্তিনিদের রক্তাক্ত ইতিহাসে ১৪ই মে, ২০১৮ ছিল আরেকটি বিষাদময় দিন। যুক্তরাষ্ট্র সেদিন জেরুসালেমে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করছিল। আর সেদিন গাজা পরিণত হয়েছিল এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের হিসেব অনুযায়ী ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে সেদিন গাজায় নিহত হয় ৫৮ জন। আহত হয় আরও প্রায় তিন হাজার। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর এক দিনে এত বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি।
সেই দিনটি ছিল ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। ১৯৪৮ সালের এই দিনটিতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে দিনটি হচ্ছে 'নাকবা' বা বিপর্যয়ের দিন। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেদিন ইসরায়েলে তাদের বাড়ী-ঘর থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল। প্রতিবছর দিনটিকে তারা 'নাকবা' দিবস হিসেবেই পালন করেন।
যুক্তরাষ্ট্র যে তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে এসেছে, সেটিও খুবই বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এসে এই পদক্ষেপ নেয়ার পর তা ফিলিস্তিনিদের মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে।
ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী। অন্যদিকে ইসরায়েল পুরো জেরুসালেম নগরীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে কার্যত ইসরায়েলিদের অবস্থানকেই সমর্থন জানাচ্ছে বলে মনে করে ফিলিস্তিনিরা।
ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে পাথর ছুঁড়ে ফিলিস্তিনিদের লড়াই
ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ আট দশকের এই সংঘাত বুঝতে সাহায্য করতে পারে নীচের দশটির প্রশ্নের উত্তর:

১. কীভাবে এই সংঘাতের শুরু?

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদীরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেখান থেকেই 'জাওনিজম' বা ইহুদীবাদী আন্দোলনের শুরু। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র পত্তন করা।
সেই সময় প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ছিল তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। এটি মুসলিম, ইহুদী এবং খ্রিস্টান- এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত।
ইহুদীবাদী আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইউরোপের ইহুদীরা দলে দলে প্যালেস্টাইনে গিয়ে বসত গাড়তে শুরু করে। কিন্তু তাদের এই অভিবাসন স্থানীয় আরব এবং মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সেসময় আরব এবং মুসলিমরাই ছিল সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্য কার্যত ভেঙ্গে পড়ে। তখন যে লিগ অব নেশন' গঠিত হয়েছিল, সেই বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে 'ম্যান্ডেট' দেয়া হয় প্যালেস্টাইন শাসন করার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল তখন ব্রিটেন আরব এবং ইহুদী, উভয় পক্ষের কাছেই নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যালেস্টাইন নিয়ে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনটিই ব্রিটেন রক্ষা করেনি।
পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন কার্যত ভাগ-বাটোয়োরা করে নিয়েছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্স। এই দুই বৃহৎ শক্তি পুরো অঞ্চলকে তাদের মতো করে ভাগ করে নিজেদের প্রভাব বলয়ে ঢোকায়।
প্যালেস্টাইনে তখন আরব জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদীবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। ইহুদী এবং আরব মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে লাখ লাখ ইহুদীকে হত্যা করা হয় (হলোকাস্ট) তার পর ইহুদীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় চাপ বাড়তে থাকে।
জেরুসালেম নগরীর পুরোনো অংশ। এখানে মুসলিম, ইহুদী এবং খ্রিস্টান তিন ধর্মেরই প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলটি তখন ফিলিস্তিনি আর ইহুদীদের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল।
কিন্তু পরদিনই মিশর, জর্দান, সিরিয়া এবং ইরাক মিলে অভিযান চালায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা অঞ্চলে। সেটাই ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ইহুদীদের কাছে এটি স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।
জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনে আরবদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে অঞ্চলটি বরাদ্দ করেছিল, এই যুদ্ধের পর তার অর্ধেকটাই চলে যায় ইসরায়েল বা ইহুদীদের দখলে।
ফিলিস্তিনের জাতীয় বিপর্যয়ের শুরু সেখান থেকে। এটিকেই তারা বলে 'নাকবা' বা বিপর্যয়। প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে হয়। ইহুদী বাহিনী তাদেরকে বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে।
কিন্তু আরব আর ইসরায়েলিদের মধ্যে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধ মাত্র। তাদের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সূচনা হলো মাত্র।
১৯৫৬ সালে যখন সুয়েজ খাল নিয়ে সংকট তৈরি হয়, তখন ইসরায়েল মিশরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু সেই সংকটে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ব্রিটেন, ইসরায়েল আর ফ্রান্সকে পিছু হটতে হয়। ফলে যুদ্ধের মাঠ কোন কিছুর মীমাংসা সেই সংকটে হয়নি।
এরপর এলো ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ৫ই জুন হতে ১০ই জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধে যা ঘটেছিল, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল পরবর্তীকালে।
ইসরায়েল বিপুলভাবে জয়ী হয় এই যুদ্ধে। তারা গাজা এবং সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয় যা কীনা ১৯৪৮ সাল হতে মিশরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে পূর্ব জেরুসালেম-সহ পশ্চিম তীরও তারা দখল করে নেয় জর্দানের কাছ থেকে। সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে গোলান মালভূমি। আরও পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে পালাতে হয়।
আরব-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে এর পরের যুদ্ধটি 'ইয়োম কিপুর' যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের এই যুদ্ধের একদিকে ছিল মিশর আর সিরিয়া, অন্যপক্ষে ইসরায়েল। মিশর এই যুদ্ধে সিনাই অঞ্চলে তাদের কিছু হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে। তবে গাজা বা গোলান মালভূমি থেকে ইসরায়েলকে হটানো যায়নি।
জেরুসালেমের প্রাচীন অংশে ব্রিটিশদের হাতে বন্দী একদল আরব। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর প্যালেস্টাইন ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়।
কিন্তু এই যুদ্ধের ছয় বছর পর ঘটলো সেই ঐতিহাসিক সন্ধি। মিশর প্রথম কোন আরব রাষ্ট্র যারা ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করলো। এর পর তাদের পথ অনুসরণ করলো জর্দান।
কিন্তু তাই বলে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ হলো না। গাজা ভূখন্ড যেটি বহু দশক ধরে ইসরায়েল দখল করে রেখেছিল, সেটি ১৯৯৪ সালে তারা ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিরিয়ে দিল। সেখানে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরণের লড়াই হয় ২০০৮, ২০০৯, ২০১২ এবং ২০১৪ সালে।
২. মধ্যপ্রাচ্যে কেন ইসরায়েলে প্রতিষ্ঠা করা হয়?
ইহুদীরা বিশ্বাস করে বাইবেলে বর্ণিত পিতৃপুরুষ আব্রাহাম এবং তার বংশধরদের জন্য যে পবিত্রভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, আজকের আধুনিক ইসরায়েল সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই অবশ্য এই ভূমি নিয়ে সংঘাত চলছে। আসিরিয়ান, ব্যাবিলোনিয়ান, পার্সিয়ান, ম্যাসিডোনিয়ান এবং রোমানরা সেখানে অভিযান চালিয়েছে, সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। রোমানরা সেখানে 'জুডেয়া' বলে একটি প্রদেশ তৈরি করেছিল।
তবে এই 'জুডেয়া' প্রদেশের ইহুদীরা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করেছেন। রোমান সম্রাট হাড্রিয়ানের আমলে ১৩৫ খ্রিস্টাব্দে এক বিরাট জাতীয়তাবাদী ইহুদী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। তিনি সে দমন করেন। এরপর তিনি জুডেয়া এবং রোমানদের অধীন সিরিয়াকে যুক্ত করে তৈরি করেন এক নতুন প্রদেশ, যার নাম দেয়া হয় সিরিয়া-প্যালেস্টাইন।
এসব যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে সেখানে ইহুদীদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। সেখানে ইহুদীদের ব্যাপক হারে হত্যা করা হয়। অনেকে নির্বাসিত হয়। অনেক ইহুদীতে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।
অস্টম শতকে যখন ইসলামের উত্থান ঘটলো, প্যালেস্টাইন জয় করলো আরবরা। এরপর অবশ্য ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা সেখানে অভিযান চালায়। ১৫১৬ সালে এই এলাকায় শুরু হয় তুর্কি আধিপত্য। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই অঞ্চলটি এক নাগাড়ে শাসন করেছে তারা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লীগ অব নেশন্স প্যালেস্টাইন তুলে দেয় ব্রিটিশদের হাতে। সেখানে ব্রিটিশ শাসন চলেছে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত।
২০১৪ সালে গাজা যুদ্ধে সেখানে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি বোমা মেরে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল ইসরায়েল। প্রায় দুহাজারের বেশি মানুষ সেই যুদ্ধে নিহত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে যে ইহুদী নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) চলে, তার শিকার হন লাখ লাখ ইহুদী। একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর স্বীকৃতির জন্য তখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে।
কিন্তু আরব আর ইহুদীদের মধ্যে এ নিয়ে যে বিরোধ, ব্রিটিশরা তার কোন সমাধান করতে পারছিল না। তারা বিষয়টি নিয়ে জায় জাতিসংঘে। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার জন্য জাতিসংঘ একটি বিশেষ কমিশন গঠন করে।
১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্যালেস্টাইন ভাগ করার এক পরিকল্পনা অনুমোদন করে। এই পরিকল্পনায় একটি আরব এবং একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল আর জেরুসালেম নগরীর জন্য একটি বিশেষ কৌশল গ্রহণের কথা বলা হয়।
পরিকল্পনাটি মেনে নিয়েছিল ইসরায়েল, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছিল আরবরা। এই পরিকল্পনাকে আরবরা দেখছিল তাদের ভূমি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে।
কিন্তু প্যালেস্টাইনের ওপর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার মাত্র একদিন আগে ইহুদীরা ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিল।
পরের দিনই ইসরায়েল জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন জানালো, যা গৃহীত হলো এক বছর পর। জাতিসংঘের ১৯২ টি দেশের ১৬০টি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
৩. ফিলিস্তিনরা দুটি আলাদা ভুখন্ডে ভাগ হয়ে আছে কেন?
১৯৪৭ সালে প্যালেস্টাইন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছিল একটি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে "পশ্চিম গ্যালিলি, সামারিয়া এবং জুডেয়ার পার্বত্য অঞ্চল, তবে জেরুসালেম নগরী এবং মিশর সীমান্ত পর্যন্ত ইসডুডের উপকূলীয় সমভূমি এর মধ্যে পড়বে না।"
কিন্তু আজকের ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের বিভাজন মূলত নির্ধারিত হয়েছে প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির রেখা বরাবর।
ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীর (৫,৯৭০ বর্গ কিলোমিটার) এবং গাজা ভূখন্ড (৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার) হচ্ছে দুটি প্রধান ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকা। এই দুই ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের সবচেয়ে নিকটবর্তী দুটি এলাকার মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।
ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীরকে এই নামে ডাকা হয় কারণ এটি জর্দান নদী এবং ডেড সীর পশ্চিম তীরে। জেরুসালেম পর্যন্ত এর বিস্তার। যে জেরুসালেম নগরীকে কীনা ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি- উভয়েই তাদের রাজধানী বলে দাবি করে।
১৪ই মে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল। প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিচ্ছেন।
পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করে ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার। ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি দল ফাতাহ এই ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষের মূল শক্তি বা দল।
আর গাজার সঙ্গে রয়েছে ইসরায়েলের ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। মিশরের সঙ্গেও গাজার ৭ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। গাজার অন্যদিকে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূমধ্যসাগর উপকূল।
গাজা এখন নিয়ন্ত্রণ করে হামাস। ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল হামাস। অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে হামাস তাকে স্বীকৃতি দেয় না।
৪. ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিরা কি কখনো কোন শান্তি চুক্তি করেছে?
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যখন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেল, তখন ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে পশ্চিম তীর এবং গাজায়। সেখানে ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন দলে সংগঠিত হয়ে সংগ্রাম শুরু করে। গাজা নিয়ন্ত্রণ করতো মিশর। আর পশ্চিম তীর ছিল জর্দানের নিয়ন্ত্রণে। অন্য কিছু আরব দেশেও ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় শিবির তৈরি হয়।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু আগে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো মিলে গঠন করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গেনাইজেশন (পিএলও)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল ছিল ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহ। পিএলও গঠিত হওয়ার পর এর বাহিনী ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ শুরু করে। প্রথমে তারা হামলা চালায় জর্দান থেকে। এরপর লেবানন থেকে।
ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের নানা ধরণের টার্গেট লক্ষ্য করে এই হামলা চালায়। ইউরোপেও ছিল কিছু টার্গেট। বিমান, দূতাবাস থেকে শুরু করে ইসরায়েলি অ্যাথলীটদের ওপর হামলা চলে।
ফিলিস্তিনিরা একের পর এক ইসরায়েলি টার্গেটে হামলা করছিল। আর ইসরায়েল আবার পাল্টা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছিল টার্গেট করে। দুপক্ষের এই 'যুদ্ধ' চলে বহু বছর ধরে।
এরপর ১৯৯৩ সালে পিএলও এবং ইসরায়েল একটি শান্তি চুক্তিতে সই করে। অসলো শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত এটি। পিএলও সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের পথ পরিহার করে ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে এবং শান্তির অঙ্গীকার করে। তবে হামাস কখনোই এই চুক্তি মানেনি।
১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি চুক্তি সই হয় ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। এটি ছিল দুপক্ষের মধ্যে প্রথম শান্তি চুক্তি।
চুক্তি অনুসারে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে তাদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করে। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ইসরায়েল এই প্রতিশ্রুতি কখনোই বাস্তবায়ন করেনি। তারা বরং অধিকৃত এলাকায় ইহুদী বসতি গড়ে তোলে।
এই ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তি চুক্তির অধীনেই গঠিত হয়েছিল 'প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল অথরিটি' বা ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি সরকার।
সরাসরি ভোটে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।
জেরুসালেম যদিও ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বন্দ্বের অন্যতম উৎস, তারপরও এই অসলো শান্তি চুক্তিতে জেরুসালেমের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
২০১৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ঘোষণা দেন, তারা আর এই শান্তি চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নন, কারণ ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে চলেনি। তিনি আরও বলেন, একটি দখলদারি শক্তি হিসেবে এখন সবকিছুর দায়িত্ব ইসরায়েলের ঘাড়েই বর্তাবে।

৫. ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্য বিরোধের মূল বিষয়গুলো কী?

একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব, পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি নির্মাণ অব্যাহত রাখা এবং ফিলিস্তিনি ও ইহুদী এলাকার মধ্যে নিরাপত্ত প্রাচীর তৈরি করা--এগুলি শান্তি প্রক্রিয়াকে বেশি জটিল করে ফেলেছে। যদিও দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালত পশ্চিম তীরে ইহুদী বসতি নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে আছে জেরুসালেম
কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে শান্তির পথে এগুলোই একমাত্র বাধা নয়। বিল ক্লিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তখন ক্যাম্প ডেভিডে ২০০০ সালে তিনি যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেখানে এর ব্যর্থতার আরও অনেক কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত সেই বৈঠকে একমত হতে পারেননি আরও অনেক বিষয়ে।
যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য:
  • জেরুসালেম: ইসরায়েল দাবি করে জেরুসালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুসালেম দখল করে নেয়। এরপর থেকে তারা জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুসালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে চায়।
  • সীমান্ত এবং এলাকা নিয়ে বিরোধ: ফিলিস্তিনিরা চায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে যে সীমান্ত ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। ইসরায়েল এটা মানতে নারাজ।
  • ইহুদী বসতি: ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা দখল করে নিয়েছিল, সেখানে তারা অনেক ইহুদী বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। কেবল পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমেই এখন বসতি গেড়েছে পাঁচ লাখের বেশি ইহুদী।
  • ফিলিস্তিনি শরণার্থী: ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখান থেকে বাড়ী-ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। এরা ইসরায়েলের ভেতর তাদের বাড়ীঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবি করে আসছে। পিএলও'র হিসেবে এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ। কিন্তু ইসরায়েল এই অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না। তাদের আশংকা, এত বিপুল সংখ্যাক ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলে ফিরে আসে, তাদের রাষ্ট্রের ইহুদী চরিত্র আর ধরে রাখা যাবে না।
৬. ফিলিস্তিন কি কোন দেশ?
২০১২ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব ভোটে পাশ হয়। এতে ফিলিস্তিনিদের 'নন মেম্বার অবজারভার স্টেট' বা পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়।
এর ফলে ফিলিস্তিনিরা এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তারা জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠাগুলোর কাজেও অংশ নিতে পারে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস: "আমরা আর চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নই"
২০১১ সালে অবশ্য একটি পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আপত্তির কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
কিন্তু জাতিসংঘের স্বীকৃতি না মিললেও এই বিশ্ব সংস্থার ৭০ ভাগ সদস্য রাষ্ট্রই ফিলিস্তিনকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। (সাধারণ পরিষদের ১৯২ টি দেশের ১৩৪টি দেশ)।
২০১৫ সালের সেপেম্বরে জাতিসংঘ সদর দফরের বাইরে ফিলিস্তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলনেরও স্বীকৃতি মিলে।
৭. যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলের প্রধান মিত্র? আর ফিলিস্তিনের সমর্থক কারা?
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের পক্ষে রয়েছে খুবই ক্ষমতাধর একটি লবি। সেখানে জনমতও ইসরায়েলের পক্ষে। এর ফলে কোন প্রেসিডেন্টের পক্ষে ইসরায়েলেও ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়া কঠিন।
২০১৩ সালে বিবিসি ২২টি দেশে একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপে দেখা যায়, পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে একমাত্র দেশ, যেখানে জনমত ইসরায়েলের পক্ষে সহানুভূতিশীল।
শুধু তাই নয়, এই দুইদেশ ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সাহায্য পায় ইসরায়েল। এই সাহায্যের একটা বড় অংশই খরচ হয় ইসরায়েলের জন্য সামরিক অস্ত্র কেনার জন্য।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে খোলাখুলি সমর্থন যোগানোর মতে একটি বৃহৎ শক্তিও নেই।
ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এক সময় মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। কিন্তু মিশরের সেনাবাহিনী ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যূত করার পর সেখান থেকে হামাস আর কোন সমর্থন পায় না।
গাজার ইসলায়েলি সীমান্তে ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে এক কিশোর
হামাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এখন সিরিয়া, ইরান এবং লেবাননের হেযবোল্লাহ গোষ্ঠী। ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতিশীল বিশ্বের আরও অনেক দেশ। কিন্তু এই সহানুভূতি কাজে পরিণত হয় কম।
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন যে অস্থিরতা, তার কারণেও ফিলিস্তিনিদের ইস্যুটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরে গেছে।
. ফিলিস্তিনি এলাকায় সর্বশেষ দফা সহিংসতার পেছনে কি?
কিছুদিনের তুলনামূলক শান্তির পর গত ১৪ই মে, ২০১৮ হতে আবার ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়েছে গাজায়। সেদিন অন্তত ৫৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয় ইসরায়েলি হামলায়। আহত হয় তিন হাজারের বেশি।
গত ছয় সপ্তাহে একশোর বেশি ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলি এবং বোমায় নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা তাদের এই বিক্ষোভের নাম দিয়েছে 'গ্রেট মার্চ টু রিটার্ন'। অর্থাৎ নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার মিছিল।
১৪ই মে ছিল ‌ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকী। আর ফিলিস্তিনিরা সেই দিনটি পালন করে 'নাকবা' বা বিপর্যয় হিসেবে। কারণ ঐ দিনই প্রায় সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলের ভেতর থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাদের বাড়িঘর ফেলে।
আর ঠিক এরকম এক স্পর্শকাতর দিনেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস সরিয়ে নিচ্ছিল জেরুসালেমে। এটি ফিলিস্তিনিদের সাংঘাতিক ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।
ফিলিস্তিনিরা মনে করে পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী। আর যুক্তরাষ্ট্রে তাদের দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নিয়ে কার্যত পুরো নগরীরর ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সমর্থন দিচ্ছে।
৯: তাহলে কি এখন আমরা আরেকটি 'ইন্তিফাদা'র সূচনা দেখছি?
ফিলিস্তিনিরা এর আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুটি গণঅভ্যুত্থান বা 'ইন্তিফাদা' ঘটিয়েছে। প্রথমটি ১৯৮০র দশকে। পরেরটি ২০০০র এর শুরুর বছর গুলিতে।
১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনিরা ছিল কার্যত নিরস্ত্র। ফিলিস্তিনি তরুণ এবং কিশোররা পাথর ছুড়ে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবেলা করছে, এই দৃশ্য অনেক ছবিতেই দেখা যাবে।
২০০০ সাল হতে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ইন্তিফাদা ছিল অনেক বেশি রক্তাক্ত। তিন হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয় সেই সময়। ইসরায়েলিদেরও হারাতে হয় এক হাজার সৈন্য।
পাথর ছুঁড়ে ফিলিস্তিনি তরুণরা লড়ছে ইসরায়েলি সৈন্যদের বিরুদ্ধে
গাজায় সম্প্রতি যে বিক্ষোভ দেখা গেছে তা সেখানে ধূমায়িত হতে থাকা ক্ষোভ এবং হতাশার বহিপ্রকাশ বলে মনে করা হয়। কারণ শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে ব্যাপকভাবে হতাশ ফিলিস্তিনিরা।
শতাধিক ফিলিস্তিনির প্রাণহানির পর এখন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় কীনা, সে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের ধারণা, এটি গাজা থেকে পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
১০. কী ঘটলে দুপক্ষের মধ্যে টেকসই শান্তি আসবে?
ফিলিস্তিনিদের দিক থেকে দেখলে, এজন্যে প্রথমেই ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকার করে নিতে। এতে হামাসও থাকবে। গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনেদের চলাফেরার ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি হচ্ছে,এজেন্য আগে সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে সহিংসতার পথ ত্যাগ করতে হবে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
এরপর রয়েছে সীমানা এবং ভূমি নিয়ে বিরোধ। আছে ইহুদী বসতি এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ইসরায়েলে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রশ্ন।
এসব প্রশ্নেও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার দরকার হবে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেক কিছু্ই বদলে গেছে। বিশেষ করে আরব এবং ইসরায়েলিদের মধ্যে অনেক যুদ্ধের পর বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলির চেহারাই পাল্টে গেছে।
শান্তির দাবিতে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি নারীদের যৌথ মিছিল
ইসরায়েল যেহেতু অধিকৃত অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণে, তাই এর ভিত্তিতেই দরকষাকষি করতে চায় তারা। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা দাবি করছে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে যে সীমানা ছিল, সেই সীমানার ভিত্তিতেই তাদের রাষ্ট্র হবে।
আর পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যে অবৈধ বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে, সেটা নিয়ে নীরব লড়াই তো চলছেই।
তবে সবচেয়ে জটিল বিষয় মনে হয় জেরুসালেম নগরীর প্রতীকি গুরুত্ব।
পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা হামাস, উভয়েই চায় পূর্ব জেরুসালেম হবে তাদের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী। যদিও ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল হতে এটি দখল করে রেখেছে।
এই বিরোধের নিরসন ছাড়া হয়তো একটা চূড়ান্ত সমাধান কোনদিনই সম্ভব হবে না। অন্যান্য বিরোধের ক্ষেত্রে হয়তো আপোসের জায়গা আছে, কিন্তু জেরুসালেমের বেলায় নেই।
আর মৃতপ্রায় শান্তিপ্রক্রিয়াকে যে পুনরুজ্জীবিত করা যাবে, সেটাও মনে হচ্ছে না।
সত্যি কথা বলতে কি, সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই পুরোনো বিরোধের মীমাংসার জন্য এত কম চেষ্টা আর কখনো দেখা যায়নি।
আর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু - এই দুজনের কেউই যে চুক্তিতে পৌছানোর জন্য দরকারি কোন ছাড় দেবেন--সেটা কেউই বিশ্বাস করেন না।
কীভাবে ইজরায়েল গ্রাস করে নিল ফিলিস্তিন; ম্যাপে ইসরায়েল, পশ্চিম তীর এবং গাজার অবস্থান

Friday, May 13, 2022

গল্প- দখিনের জানালায় দীর্ঘশ্বাস by সাইফ বিন আইয়ুব

------এক.------
সদ্য টানানো জানালার রঙিন পর্দাগুলোর দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টি ফুটে উঠলো আমিরুল ইসলামের চেহারায়। ঠোঁট টিপে হাসলেন কতক্ষণ। পিছন ফিরে টয়লেটের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। খালি পায়ে টয়লেটের শ্যাওলা ধরা স্যান্ডেল পরতে পরতে আবার তাকালেন ঝোলানো পর্দাগুলোর দিকে। নিজের মনেই মাথা দুলিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলেন।

টয়লেটের কাজ সারার সময়ও তার মাথায় রঙিন পর্দাগুলোর কথা খেলতে লাগলো। প্যানে বসেই হঠাৎ খেয়াল করলেন মাথা সমান উঁচুতে ছোট্ট একটা ফোঁকর আছে টয়লেটের। পাশের বিল্ডিঙের প্লাস্টারবিহীন ইট চোখে পড়ছে ফোঁকর দিয়ে। ব্যাপারটা কেনো জানি পছন্দ হলো না আমিরুল ইসলামের। তাড়াহুড়ো করে বের হলেন টয়লেট থেকে। বিছানার উপর জড়ো করে রাখা পর্দার স্তুপ থেকে একটা পর্দা তুলে নিয়ে ঝুলিয়ে দিলেন বাথরুমের দেয়ালে। সন্তুষ্টি ভাবটা ফিরে এলো তার চেহারায়। পর্দার একটা পাশ ঝুলে গিয়ে ফ্লোরে লেগে আছে। লাগুক। পাত্তা দিলেন না তিনি।

কাজ সেরে হাত ধুতে গেলেন। জোরে কল ছেড়ে পা ধুলেন। পা ধুতে ধুতেই খেয়াল করলেন পানির ছিটকায় পর্দা ভিজে যাচ্ছে। ভিজা হাত দিয়েই তাড়াহুড়ো করে পর্দাটা খুলে আবার রুমে নিয়ে এলেন তিনি। একেবারে বাদাম-বুটের দামে কিনেছেন বলে পর্দাটা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।

জানালা ছাড়াও আর কোথায় পর্দা লাগানো যায় ভাবতে লাগলেন আমিরুল ইসলাম। চার দেয়ালের ছোট্ট রুমে আতিপাতি করে খুঁজেও পর্দা ঝোলানোর জায়গা পেলেন না। উল্টো হামিদা বেগমের ছবিটার দিকে চোখ পড়ল। আহা বেচারি, বেঁচে থাকলে কী খুশিই না হতো! পর্দা কিনে এতোগুলো টাকা নষ্ট করার জন্য ধমকও দিতেন তাকে। গজগজ করতে করতেই হয়তো খুব যত্ন নিয়ে পর্দাগুলো ভাঁজ করে উঠিয়ে রাখতো সে।

সেই রাতে ভালো ঘুম হলো না আমিরুল ইসলামের। তিনি দুঃস্বপ্ন দেখলেন। জেগে জেগে উঠলেন সারা রাত। দখিনা বাতাস জানালার পর্দা উড়িয়ে নিতে চাইছিল। না পেরে পর্দার কোণগুলো দিয়ে আমিরুল সাহেবের বুক-পেট-মুখ আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো শুধু।

তিনি পর্দার আলতো ছোঁয়া টের পেলেন না। তবে দখিনা বাতাসের তোড়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো বার বার।

-----দুই.-----

বায়তুল মোকাররমের উল্টো দিক। সন্ধ্যা হতেই সারি সারি লাইট জ্বলে উঠে ফুটপাতের দোকানগুলোর। সাদা ধবধবে লাইটগুলোর মাঝে একটা ষাট পাওয়ারের “না লাল – না হলুদ” রঙের বাল্বও জ্বলে উঠে। একসার সাদা লাইটের মাঝে সেই রঙ ছন্দপতন ঘটায় পথিকের। চোখে পীড়া দেয়।

পেঁচিয়ে রাখা গাট্টির দড়ি খুলে বিভিন্ন ডিজাইনের ব্যবহার্য পুরনো পর্দা নিয়ে সেখানেই বসেন আক্তার আলি। সাদা আর কমদামি বাল্বের আলোয় ভূতুড়ে চেহারা পায় বর্ণিল পর্দাগুলো। এই ভূতুড়ে চেহারাতেই নিরাপদ বোধ করেন আক্তার আলি। পর্দাগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রেখে তিনি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় তার ছোট ছেলে।

প্রতি পিস পর্দার দাম বার বার ঘোষণা করতে করতে দিনে বেশ কয়েকবার গলা ভাঙ্গে আট বছর বয়সী শিশুপুত্রের। বিরতিহীন উপর্যুপরি চিৎকারে শুধু পর্দার দাম “পঞ্চাশ” শব্দটাই হারিয়ে যায় ক্লান্ত অবসন্ন কণ্ঠ থেকে। তখন বাচ্চা ছেলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে দোকানের সামনে।

দূর থেকে দৌড়ে আসেন আক্তার আলি। ধমক লাগান, “কি রে, বই রইছত কিল্লাই? কথা বারোয় না মুহেত্তে? ভাত খাস নো?”

ছোট্ট ছেলে আবার পঞ্চাস শব্দের জিগির তোলে। পথচলতি কোন কোন আমিরুল ইসলাম সেই জিগিরে মুখ তুলে তাকান। কেউ বা তাকান না।

------তিন.-----

বিকেলে অফিস থেকে ফিরে বাসার ভিতরে ঢুকেই হতভম্ব হয়ে গেলেন রওশন আরা। পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের তেরছা আলো হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছে ঘরের পর্দাহীন ন্যাংটো জানালা দিয়ে। লাঞ্চবক্সের ব্যাগটা হাত থেকে পড়েই গেলো একরকম। কষ্টের টাকায় বড় শখ করে কেনা হয়েছিলো পর্দাগুলো। জানালা খোলা পেয়ে বাইরে থেকেই টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে কেউ।

টাকাগুলির কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। খোলা জানালা দিয়ে আসা ঝাপটা দখিনা বাতাস ছিনিয়ে নিলো সেই দীর্ঘশ্বাস। কতক্ষণ ঘুরলো এই ঘরের ভেতরেই। তারপর আলতো ছোঁয়া হয়ে অপর জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলো কোনো এক আমিরুলের দিকে।

Tuesday, May 10, 2022

মাচায় বারোমাসি তরমুজ চাষে অভাবনীয় সাফল্য

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ভারাহুত গ্রামে প্রথমবারের মতো মাচায় চাষ হচ্ছে উন্নত জাতের বারোমাসি তরমুজ। কৃষি বিভাগের পরামর্শ বা কোন সহযোগিতা ছাড়াই প্রায় ২ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় এ তরমুজ। কালচে রঙের তাইওয়ান ব্ল্যাকবেবি ও হলুদ রঙের মধুমালা জাতের বারোমাসি তরমুজসহ পরীক্ষামূলকভাবে ইন্ডিয়ান জেসমিন-১ ও ২ জাতের তরমুজ চাষ করা হয়।
ভারাহুত গ্রামে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মূছা মিয়া ২.৫ শতাংশ জমিতে ৪ হাজার ৭শ’ টাকা খরচ করে পরীক্ষামূলকভাবে তাইওয়ান ব্ল্যাকবেবি জাতের তরমুজ চাষ করেন। ২ মাসেই তিনি ২৩ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেন। তার এ অভাবনীয় সাফল্যে এবার এলাকায় প্রায় ২ হেক্টর জমিতে তাইওয়ান ওই জাতের তরমুজ চাষ করা হয়।
জয়পুরহাটের ভারাহুত, কয়তাহার, দাউসারা, কুসুমসারা, মাহমুদপুর গ্রামের জমি তরমুজ চাষের উপযোগী বলে জানান বেসরকারি সংস্থা এসো’র কৃষিবিদ মোজাফফর রহমান। ব্ল্যাকবেবি ও মধুমালা জাতের তরমুজ শীতকাল ছাড়া বছরের সবসময় চাষ করা যায়। এর দামও ভালো পাওয়া যায়। মাচা পদ্ধতিতে চাষ করায় উৎপাদন হারও বেশি। মালচিং পেপার বেডে সেটিং ও নেটিংয়ের ফলে বৃষ্টি, পোকা-মাকড় ও ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। মাচা ও মালচিং পেপার তিন বার ব্যবহারের উপযোগী হওয়ায় ২য় ও ৩য় ধাপে তরমুজের উৎপাদন খরচও খুব কম হয়। কীটনাশক ছাড়া বিষমুক্ত, কেঁচো সার, কম্পোস্ট, বায়োনিম, ফেরোম্যান ট্যাপ ব্যবহারের ফলে রোগের প্রকোপ কম হয়।
ভারাহুত গ্রামের রেজুয়ান ৫৫ শতাংশ জমিতে ৪৭ হাজার টাকা খরচ করেন। এতে তার ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা লাভ হয়। বাবু ৩০ শতাংশ জমিতে ৪২ হাজার টাকা খরচ করে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা লাভ করেন। রবিউল ১৫ শতাংশ জমিতে ২২ হাজার টাকা খরচ করে ১ লাখ ৩ হাজার টাকা লাভ করেন। এভাবে অন্যরা সরকারি সহায়তা ছাড়াই স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা এসো’র সহযোগিতায় প্রায় ২ হেক্টর জমিতে চাষ করেছেন এই বারোমাসি তরমুজ।

সবকিছু মিলিয়ে প্রতি বিঘায় খরচ হয় ৩৫-৪০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় তরমুজ হয় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার কেজি। বীজ লাগানোর দিন থেকে ৬৫-৭০ দিনের মাথায় এ তরমুজ বিক্রির মাধ্যমে প্রতি বিঘায় চাষিরা লাভ করছেন ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
ভারাহুত গ্রামের একাধিক কৃষক জানান, তরমুজের দাম ৬০-৭০ টাকা কেজি হওয়ায় কম সময়ের মধ্যে প্রচুর লাভ হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার লোকজন তরমুজ চাষে উদ্ধুদ্ধ হচ্ছে।
কৃষিবিদ মোজাফফর রহমান বলেন, ‘সারা বছর তরমুজ হওয়ায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। জেলায় এমন লাভজনক ফসল দেখে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন এ তরমুজ চাষে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সুধেন্দ্র নাথ রায় বলেন, ‘মাচায় তরমুজ চাষ হওয়ায় ফলনও ভালো হচ্ছে। আমাদের কাছে এলে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে পারবো। ফলন কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে ব্যাপার কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

Thursday, May 5, 2022

নেপোলিয়নের মৃত্যু : যে রহস্যের কিনারা হয়নি এখনো by গোলাপ মুনীর

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। জন্ম ১৭৯৬ সালের ১৫ আগস্ট। মৃত্যু ১৮২১ সালের ৫ মে। মতান্তরে ৫ মের আগে কিংবা পরে কাছাকাছি কোনো এক সময়ে। ফ্রান্স সম্রাট নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়েছে, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু বিতর্ক আছে: কিভাবে তিনি মারা গেলেন? কখন মারা গেলেন?
নেপোলিয়ন ছিলেন একজন বলদর্পী মানুষ। শৌর্যবীর্য বিবেচনায় তার সাথে শুধু তুলনা চলে মহাবীর আলেক্সান্ডারের কিংবা জুলিয়াস সিজারের। এমনটি কি ভাবা যায়, তার মতো একজন শক্তিধর মানুষ একদম গতানুগতিক নীরসভাবে দক্ষিণ আটলান্টিকের এক পরিত্যক্ত দ্বীপে পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা গেছেন। বরং ওয়াটারলুর যুদ্ধেই তার মৃত্যু হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। কিংবা তিনি খুন হতে পারতেন কোনো ঈর্ষাপরায়ণ বিদ্রোহীর হাতে। শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে শত্রুর তলোয়ারের নিচে জীবন দেয়াই ছিল তার জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা শুনছি, কার্যত দেড় দশকের মতো সময় বীরদর্পে ইউরোপ শাসন করে যাওয়া নেপোলিয়ন একটি পুরোপুরি সিক্ত আধা-সেঁকা অন্ধকার এক ঘরে নির্বাসিত অবস্থায় ধীরে ধীরে নিস্তেজ বিবর্ণ হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছেন। এরপর একসময় মারা গেছেন। অন্তত নেপোলিয়নের বেলায় এমনটি অভাবনীয়, সেই সাথে অকল্পনীয়।
আমরা ইতিহাসের মামুলি কোনো চরিত্র নিয়ে কথা বলছি না। বলছি তুখোড় সামরিক ব্যক্তিত্ব, স্বৈরশাসক, প্রশাসক ও আইনপ্রণেতা নেপোলিয়নের কথা। ফরাসি বিপ্লবের শেষপর্যায়ে তিনি ছিলেন একজন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা। প্রথম নেপোলিয়ন হিসেবে তিনি ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন ১৮০৪ সাল থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত। তার আইনি সংস্কার ‘নেপোলিয়নিক কোড’ বিশ্বব্যাপী দেওয়ানি আইনব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিন্তু তিনি তার চেয়েও বিখ্যাত ছিলেন সেই সব যুদ্ধের জন্য, যেগুলো তিনি লড়েছিলেন কয়েকটি জোটের বিরুদ্ধে। এগুলো ইতিহাসে পরিচিত নেপোলিয়নের যুদ্ধ নামে। এসব যুদ্ধের মাধ্যমে নেপোলিয়ন ইউরোপের বেশির ভাগ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক ধরনের হেজেমনি তথা কর্তৃত্বপরায়ণতা।
নেপোলিয়নের জন্ম ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ কর্সিকায়। দ্বীপটির বর্তমান অবস্থান পশ্চিম ইতালিতে, ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্বে, ইতালির সার্বভৌম দ্বীপ সার্দিনিয়ার উত্তরে। নেপোলিয়ন অভিজাত ঘরের সন্তান। নেপোলিয়নের বাবা-মায়ের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বাবা কার্লো বোনাপার্ট ছিলেন একজন অ্যাটর্নি। ১৭৭৭ সালে তাকে ফ্রান্সের ষোড়শ লুইয়ের কোর্টে কর্সিকার প্রতিনিধি ঘোষণা করা হয়। মা লেটিজিয়ার প্রভাবই বেশি ছিল নেপোলিয়নের ওপর। নেপোলিয়নের বড় ভাই জুসেফ। ছোট তিন ভাই যথাক্রমে লুসিন, লুই ও জেরোম। আর ছোট তিন বোন এলিসা, পলিন ও কেরোলিন। জোসেফের আগে তার এক ভাই ও এক বোনের জন্ম হয়েছিল। এরা মারা যান ছোটবেলায়।
নেপোলিয়নের প্রথম দিকের জীবন কাটে সামরিক কর্মকাণ্ডে এবং তার বিধ্বস্ত পরিবারের দেখাশোনার পেছনে। তার পরও তিনি সময় করে নিয়েছিলেন এক বুর্জোয়া তরুণী ডিজেরি ক্যারিকে ভালোবাসার। ক্যারির পরিবারের সিল্কের ব্যবসায় ছিল মার্সিলিসে। ক্যারির পরিবার ছিল এই বিয়ের বিরুদ্ধে। ফলে তাদের বিয়ে হয়নি। কয়েক বছর পর তার বিয়ে হয় নেপোলিয়নের এক মার্শালের সাথে, এবং জীবনাবসান ঘটে সুইডেনের রানী হিসেবে। এ দিকে নেপোলিয়ন জেনারেল হওয়ার পর ১৭৯৬ সালে বিয়ে করেন সুন্দরী জোসেফাইন ডি বিউহারনাইসকে। তখন জোসেফাইনের বয়স ২৬। কিন্তু তার গর্ভে কোনো পুত্রসন্তান হয়নি। নেপোলিয়ন প্রবলভাবে উত্তরাধিকার হিসেবে পুত্রসন্তান কামনা করেছিলেন। এ কারণে ১৮০৯ সালে জোসেফইনকে তালাক দেন। এবং ১৮১০ সালে বিয়ে করেন স্বর্ণকেশী তরুণী অস্ট্রিয়ার সম্রাটকন্যা মারিয়া লুইসাকে।
নেপোলিয়নের ছিল এক পুত্র : দ্বিতীয় নেপোলিয়ন। তার জন্ম ১৮১১ সালে। মাত্র ২১ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে তিনি মারা যান ১৮৩২ সালে। নেপোলিয়নের বৈধ কোনো কন্যা ছিল না। তবে তার প্রথম স্ত্রী জোসেফাইনের প্রথম স্বামীর ঘরের এক বৈপিত্রেয় কন্যা ছিল। তার নাম হরটেনসি। নেপোলিয়নের কিছু অবৈধ সন্তানও ছিল। এর মধ্যে দুই অবৈধ সন্তানের কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
নেপোলিয়ন ফরাসি মূল ভূখণ্ডের আর্টিলারি অফিসার হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্রের সময়ে। তিনি সাফল্যের সাথে অভিযান চালান ফ্রান্স-বিরোধী প্রথম ও দ্বিতীয় কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে। প্রথম কোয়ালিশনের যুদ্ধ চলে ১৭৯২-১৭৯৭ সময়ে। এ যুদ্ধসময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো ব্যাপকভাবে উদ্যোগী হয় ফরাসি বিপ্লব সংযত করতে। ১৭৯২ সালের ২০ এপ্রিলে নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এর কয়েক সপ্তাহ পর প্রুশিয়া অস্ট্রিয়ার পক্ষে যোগ দেয়। এ সময় অস্ট্রিয়ার জোটে ছিল রোম সাম্রাজ্য, প্রুশিয়া, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স রয়েলিস্টস, স্পেন, পর্তুগাল, সার্দিনিয়া, নেপলস ও সিসিলি, অন্যান্য ইতালীয় রাজ্য, ওসমানীয় সাম্রাজ্য ও ওলন্দাজ প্রজাতন্ত্র। আর ফরাসি প্রজাতন্ত্রের জোটে ছিল ফ্র্যাঞ্চ স্যাটেলাইট স্টেটস ও পোলিশ সেনাবাহিনী। দ্বিতীয় কোয়ালিশনের যুদ্ধ চলে ১৭৯৮-১৮০২ সময়ে।
এ সময়ে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার নেতৃত্বে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ দ্বিতীয়বার উদ্যোগ নেন বিপ্লবী ফ্রান্সকে সংযত কিংবা অপসারণ করতে। এরা ফ্রান্সের পূর্ববর্তী সামরিক বিজয়কে ম্লান করে দিতে নয়া কোয়ালিশন গঠন করে। এ সময়ে এক জোটে ছিল অস্ট্রিয়া, গ্রেট ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স রয়েলিস্টস,পর্তুগাল, দুই সিসিলি ও ওসমানীয় সাম্রাজ্য। প্রতিপক্ষ জোটে ছিল ফরাসি প্রজাতন্ত্র, স্পেন, পোলিশ সেনাবাহিনী, ডেনমার্ক-নরওয়ে ফ্র্যাঞ্চ কায়েন্ট রিপাবলিক, বাটাভিয়ান প্রজাতন্ত্র, হেলভেটিক প্রজাতন্ত্র, সিসালপাইন প্রজাতন্ত্র, রোমান প্রজাতন্ত্র ও পার্থেনোপিয়ান প্রজাতন্ত্র।
সে যা-ই হোক, ১৭৯৯ সালে তিনি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন ফ্রান্সের ফার্স্ট কনসাল হিসেবে। এর পাঁচ বছর পর ১৮০৪ সালে ফ্রান্সের সিনেট তাকে সম্রাট ঘোষণা করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নেপোলিয়নের সময় ফরাসি সাম্রাজ্য বেশ কিছু দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। নেপোলিয়নকে কয়েকটি যুদ্ধ করতে হয় ইউরোপের বড় বড় শক্তির সাথে। এগুলো ইতিহাসে নেপোলিয়নের যুদ্ধ নামে পরিচিত। একনাগাড়ে কয়েকটি যুদ্ধে জয়ের পর ফ্রান্স ইউরোপে প্রভাবশালী অবস্থানে উঠে আসে। এ সময় নেপোলিয়ন ব্যাপক জোট গড়ে তুলে বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের সদস্যদের নিয়োজিত করেন ইউরোপর দেশগুলোকে কায়েন্ট স্টেট হিসেবে শাসন করার জন্য। নেপোলিয়নের এই বিজয় অভিযান আজকের দিনেও গোটা দুনিয়ার মিলিটারি অ্যাকাডেমিগুলোতে পাঠের বিষয় করে তোলা হয়েছে।
১৮১২ সালে রাশিয়ার ফ্রান্সে অনুপ্রবেশের ঘটনা ইতিহাসে চিহ্নিত নেপোলিয়নের ভাগ্যের মোড় ঘুরে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে। রাশিয়ার এ অভিযানে তার গ্রেট আর্মি বা গ্র্যান্ড আর্মি ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হয়, যার পুনর্গঠন তার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। ১৮১৩ সালে ষষ্ঠ কোয়ালিশন লিপজিগে তার বাহিনীকে পরাজিত করে। পরের বছর এই কোয়ালিশন ফ্রান্সে ঢুকে পড়ে এবং নেপোলিয়নকে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য করে। সেই সাথে তাকে নির্বাসন দেয়া হয় ইতালির ভূমধ্যসাগর তীরের এলবা দ্বীপে। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এলবা দ্বীপ থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসেন। কিন্তু ১৮১৫ সালের জুনে ওয়াটারলোর যুদ্ধে পরাজিত হন। ব্রিটিশরা সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠিয়ে তাকে আটকে রাখে। সেখানে তিনি জীবনের শেষ ছয়টি বছর কাটিয়ে মারা যান। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট মতে, তিনি পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা যান। তবে সুইডেনের দাঁতের চিকিৎসক ও বিষ বিশেষজ্ঞ স্টেন ফরশুফভুদ ও অন্যান্য বিজ্ঞানী বরাবর বলে আসছেন, নেপোলিয়নকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়।
স্টেন ফরশুফভুদ (১৯০৩-১৯৮৫) সূত্রায়ন করে গেছেন একটি বিতর্কিত তত্ত্ব। এ তত্ত্বের মতে, নেপোলিয়নের নির্বাসনের সময় তার সাথে থাকা কোনো সদস্য তাকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। তিনি ১৯৬১ সালে সুইস ভাষায় একটি বই লিখে গেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তার ধারণা ইংরেজি ভাষায়ও রেখে গেছেন তার সহ-লেখক বেন উইডারকে নিয়ে যৌথভাবে লেখা এক বইয়ে।
ফরশুফভুদ ও বেন উইডার নেপোলিয়নের পাঁচটি চুল পরীক্ষা করে আর্সেনিকের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এ পরীক্ষায় তার চুলে বিভিন্ন মাত্রার আর্সেনিক ধরা পড়ে। মোটামুটিভাবে এ মাত্রা গড় মাত্রার তুলনায় ২৮ গুণ বেশি ছিল। এর অন্তর্নিহিত অর্থ নেপোলিয়নের ওপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘনমাত্রার আর্সেনিক প্রয়োগ করা হয়েছে। আর এ বিষ প্রয়োগের কাজটি শুরু হয় মৃত্যুর কমপক্ষে পাঁচ বছর আগে। স্টেন ফরশুফভুদের এ তত্ত্ব নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক দেখা দেয়। কেননা তিনি যে চুল পরীক্ষা করেছেন তা নিশ্চিতভাবে তারিখাঙ্কিত ছিল না। তা ছাড়া এ চুল নেপোলিয়নেরই, এমনটিও সুপ্রমাণিত ছিল না। তা সত্ত্বেও ফরশুফভুদের পরীক্ষা করা সব নমুনা চুল আর নেপোলিয়নের বংশানুক্রমে ব্যবহার করা আসবাবপত্রে পাওয়া চুলের নমুনা একই। তা ছাড়া অন্যান্য চুলের নমুনাগুলোও ছিল একই ধরনের। চুলের এ নমুনাগুলো সম্ভবত নেপোলিয়নের অনুগত স্টাফদের দেয়া। অনেক নমুনা চুল ফরশুফভুদের হাত দিয়ে যায়নি, বরং এগুলো সরাসরি স্কটল্যান্ডের টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছিল। অনেকেই সমর্থন করে ফরশুফভুদের তত্ত্ব। ফরশুফভুদ ও বেন উইডারের অভিমত, নেপোলিয়নকে হত্যা করে একজন ফরাসি, যিনি নেপোলিয়নের নির্বাসনের সময়ে তার স্টাফ হিসেবে কাজ করতেন। এই ফরাসি তার প্রতি বিরক্ত হয়ে কাজটি করেন। ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ আজ নেপোলিয়নকে শ্রদ্ধা করে, সে দেশের একজন মহান বীর হিসেবে। সে জন্য তিনি ফরাসি স্টাফের হাতে তার মারা যাওয়ার বিষয়টিও ফরাসি জনগণের কাছে বিতর্কিতই রয়ে গেছে।
নেপোলিয়ন ছিলেন অন্য ধরনের এক মানুষ। তিনি হতে পারতেন উৎফুল্ল, বিমর্ষ, নিষ্ঠুর, উদার ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। কখনো মানতেন, কখনো মানতেন না কোনো যুক্তি। তিনি যুদ্ধ করেছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে, আবার প্রশংসাও করেছেন ইংরেজদের। তিনি সারা ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন বৈপ্লবিক ধারণা। সুসংহত করেছেন ফরাসি বিপ্লবের চেতনা। সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাজুড়ে। আবার এর আট লাখ বর্গমাইল এলাকা ছেড়ে দিয়েছেন থমাস জেফারসনের কাছে, মাত্র একরপ্রতি ৬ সেন্টের বিনিময়ে। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল যার পেইন্টিং আর মূর্তি, সেই মানুষটির সাধারণ মৃত্যু কল্পনা করা যায় কি! সে জন্যই তার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা অগ্রহণযোগ্য ইতিহাস ও ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব। আসলেই তিনি কি ক্যান্সারে মারা যান? তাকে কি বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল? যদি তা-ই হয়, তবে কে তাকে হত্যা করল? ১৮২১ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে যিনি মারা গেলেন, তিনি কি নেপোলিয়ন? না, সে দিন কোনো ব্যক্তিই মারা যায়নি? যদি তা হয়, তবে নেপোলিয়নের ভাগ্যে কী ঘটেছিল?
এ নাটকের চরিত্রগুলোও আকর্ষণীয়। তার এক বিশ্বস্ত ভৃত্য ছিল। তার প্রভু সম্পর্কে তার স্মৃতিকথা ১৯৫০-এর দশকের আগে ছাপা হয়নি। তার নিয়োজিত বিভিন্ন ধরনের অনুগত ক’জন পোষ্য ব্যক্তি ছিল। কারো কারো মতে, এরা ছিল প্রতারক চরিত্রের। বিশেষ করে এদের মধ্যে চারজন ছিল ষড়যন্ত্রকারী। অনেক সময় এ নাটকের অনেক দৃশ্যে আগমন-প্রস্থান ঘটেছে অনেক চিকিৎসকের। তার প্রহরীদের মধ্যে সব সময় এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করত কখন জানি তিনি পালিয়ে যান। কারণ, এর আগে তিনি পালিয়েছিলেন এলবা দ্বীপ থেকে। এমনকি দুয়েকজন মহিলাও এসে যোগ হয়েছেন এ কাহিনীতে। এ ঘটনার এক শ’ বছরেরও পর এলেন একজন উৎসুক ডাক্তার, একজন ব্যায়ামের সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক এবং অনেক ইতিহাসবিদ। সব কিছু ছাড়িয়ে আছে নেপোলিয়নক নিয়ে প্রচুর লেখালেখি। লাখ লাখ বই। এসবে বর্ণিত হয়েছে নেপোলিয়নের জীবন ও কর্র্ম। কেউ কেউ বলেন যিশু ছাড়া আর কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে এত লেখালেখি হয়নি। বিষয়টি স্পষ্ট হয়তো নেপোলিয়ন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন, নয়তো হত্যার শিকার হয়েছেন। বিয়রটি খতিয়ে দেখা যাক।
নির্বাসন
১৮১৫ সালের ওয়াটারলুর যুদ্ধে ডিউক অব ওয়েলিংটন পরাজিত করেন নেপোলিয়নকে। এর মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটে নেপোলিয়নের সম্রাট-জীবন, সেই সাথে তার তুখোড় সামরিক জীবন। তার এ পরাজয়ের মাধ্যমে বোরবন বংশ ফিরে আসে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতায়। তখন নেপোলিয়ন সামনে আসে কয়েকটি বিকল্প। ওয়াটারলুর যুদ্ধে হেরে নেপোলিয়নের সামনে করণীয় সীমিত হয়ে পড়ে। তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন আমেরিকায় পালিয়ে যেতে। এর আগে তার বড় ভাই জোসেফ পালিয়ে আমেরিকা চলে যান। আবার ভাবেন ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করে সাবেক শত্রুদেশ ইংল্যান্ডে সম্মানিত অতিথি ‘ইংলিশ কান্ট্রি স্কোয়াইর’ হিসেবে বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে। বোকার মতো তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। ব্রিটিশদের মাটিতে পা রাখার কোনো সুযোগ তার হয়নি। তাকে আটক রাখা হয় পোর্টসমাউথ উপকূলে। এবং সেখান থেকে বন্দী হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হয় সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। সেখানে তাকে রাখা হয় লংউড হাউসে। এটি ছিল একটি পুনর্গঠিত জীর্ণ কৃষিভবন। সেখানে নির্বাসনে যাওয়ার সময় তার বয়স ৪৭। নেপোলিয়ন সাথে করে সেন্ট হেলেনায় নিয়ে যান একটা রেটিনিউ, অর্থাৎ অনুচর লোকলষ্করের একটি দল। তার রাজকীয় অনুসারীদের মধ্যে বিশেষত ছয়জন ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ছয়জনের তিনজন তার পুরো নির্বাসন সময়ে (১৮১৫-১৮২১) তার সাথেই ছিলেন। এরা ছিলেন : তার অনুগত ভৃত্য লুই মার্চান্ড, তার গ্র্যান্ড মার্শাল হেনরি বার্ট্রান্ড এবং তার প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজার কাউন্ট চার্লস ডিমনথলন। বার্ট্রান্ড ও ডিমনথলনের স্ত্রীরাও তাদের সাথে ছিলেন।
মার্চান্ড,বার্ট্রান্ড ও ডিমনথলনের ছবি দেখে বোঝা যায় এরা ছিলেন সুদেহী। বার্ট্রান্ড ও ডিমনথলন ছিলেন অসাধারণ সুন্দর। বাকি তিন উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ চাকর ছিলেন ফ্র্যানসিস্কি চিপরিয়ানি, নেপোলিয়নের সব কাজের কাজী ইমানুয়েল ল্যাসক্যাসেস এবং তার লিটারারি অ্যাডভাইজার গ্যাসপার্ড গোরগার্ড। নির্বাসনের সময়ে সাথে গিয়েছিলেন বেশ ক’জন ডাক্তারও। এর মধ্যে গুরুত্বক্রমে কয়জন হলেন : ব্যারি ওমিয়ারা, ফ্রানসিস্কো অ্যান্টোমার্কি ও আলেক্সান্ডার আর্নট। এসব চরিত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের কাছে নেপোলিয়নের নির্বাসন ও মৃত্যু সম্পর্কিত রেকর্ড আছে। এদের চারজন মার্চান্ড, বার্ট্রান্ড, ওমিয়ারা ও ডি মনথলন লিখে গেছেন তাদের বিস্তারিত স্মৃতিকথা। অন্যদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি নানা দলিলপত্র, চিঠিপত্র, রিপোর্ট ও নানা পর্যবেক্ষণ। আমরা যদি ধরে নিই নেপোলিয়নের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি, তবে এদের মধ্য থেকেই আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে কে নেপোলিয়নের খুনি। আর তাদের পাশে তো নাম আসবেই সেন্ট হেলেনার গভর্নর ও নেপোলিয়নের জেলর স্যার হাডসন লাউই’র।
মৃত্যু-পূর্ব ঘটনাবলি
১৮২০ সালের শরৎকাল। নেপোলিয়নের স্বাস্থ্য ভলো যাচ্ছে না। পেটে প্রচণ্ড ব্যথা। শরীর দুর্বল। সাথে বমি বমি ভাব। মনে হলো, তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন। নেপোলিয়নের চিকিৎসকেরা যখন হাডসন লাউই’র কাছে এ কথা জানান তখন হাডসন তা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এসব ইংরেজদের অপপ্রচার। দু’জন চিকিৎক অবশ্য বলেছিলেন, নেপোলিয়ন হেপাটাইটিসে আক্রান্ত, সেই সাথে আছে আমাশয়। হাডসন সে কথাও কানে তোলেননি।
এর আগে ১৮১৯ সালে নেপোলিয়নের বিশ্বস্ত অনুসারী চিপরিয়ানি কর্সিকান অসুস্থ হয়ে মারা যান। একইভাবে মারা যান লংউড হাউসের আরো দুই ভৃত্য। পরিস্থিতি ছিল রহস্যজনক। দ্রুত এই তিনজনের অসুস্থ হয়ে পড়া ও মারা যাওয়ায় মনে করা হয় তাদের ওপরও বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। নেপোলিয়ন আভাস দিয়েছিলেন, তিনিও এমনটি সন্দেহ করছেন। এবং তিনি আশঙ্কা করছেন, তিনি হতে পারেন এদের টার্গেট। ১৮২১ সালে নেপোলিয়নের স্বাস্থ্যের আরো অবনতি ঘটে। এবং মাসজুড়ে প্রচণ্ড পেটব্যথায় ভুগে ৫ এপ্রিল মারা যান। লাশের ময়নাতদন্ত করেন ডাক্তার অ্যান্টোমার্কি ও আরো পাঁচ ইংরেজ ডাক্তার। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, তার মৃত্যু পাকস্থলীর ক্যান্সারে। তার বাবাও ১৭৮৫ কালে একই রোগে মারা যান। তখন কিছু দ্বান্দ্বিক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে তার লিভারের আকার ও অবস্থা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। একজন ইংরেজ ডাক্তার বললেন, তার মৃত্যু হেপাটাইটিস-সহ পেটের অসুখে। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অংশবিশেষ হাডসন লাউই মুছে ফেলেন। নেপোলিয়নের শরীরে তুলনামূলক কম লোম ও তার নারীদের মতো নরম দেহের বিষয়টিও রিপোর্টে উল্লিখিত হয়।
মৃত্যুর পরদিন ইংলিশ গ্যারিসন পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় লংউডের অদূরে একটি কবরে নেপোলিয়নকে সমাহিত করে। তাকে রাখা হয় চারটি কফিনে। একটি মেহগনি কাঠের কফিনে রাখা হয় তার লাশ।
এ কফিনটি রাখা হয় আরেকটি মেহগনির কফিনে। এ দু’টি কফিন রাখা হয় আরেকটি সিসার কফিনে। এরপর এই তিনটি কফিন পুরে দেয়া হয় অন্য আরেকটি সিসার কফিনে। এমনকি কবর থেকেও যেন পালাতে না পারে। কবরে পাশে কোনো হেডস্টোন স্থাপন করা হয়নি। কারণ তার পরিবার চায়নি তিনি শুধু নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নামে পরিচিত হোন। আর লাউই রাজি হননি তার হেডস্টোনে ‘এম্পারার নেপোলিয়ন’ কথা লেখা থাকুক। এর ১৯ বছর পর ১৮৪০ সালে নেপোলিয়নের কবর খোলা হলো। এ সময় সেখানে ছিলেন এমন কয়েকজন, যারা তার সাথে নির্বাসনে ছিলেন। দেখা গেল, তার দেহ অবিশ্বাস্যভাবে সংরক্ষিত। কফিনের খিলগুলো আবার বন্ধ করে দেয়া হলো। নেপোলিয়নের লাশ ফিরিয়ে নেয়া হলো প্যারিসে। সেখানে তার লাশ রাখা হলো গির্জার সুরম্য এক গম্বুজের নিচে। সেটি আজ পরিচিত ‘নেপোলিয়ন টম্ব’ নামে। তার লাশ আজো সেখানেই আছে। সেটি আজ পর্যটকদের এক আকর্ষণে পরিণত।
মৃত্যুর কারণ কোন রোগ?
কিছু কর্তৃপক্ষ এটি মেনে নিয়েছে যে, নেপোলিয়ন ক্যান্সারে মারা গেছেন। ২০০৩ সালে ফ্রান্সের কিছু জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত লেখায় নানা সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে এ কথা বলা হয়। তবে সবাই তা মেনে নেয়নি। তার মতো আর কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের মেডিক্যাল রিপোর্ট এতটা খতিয়ে দেখা হয়নি। বলা হয়, নেপোলিয়ন নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে তিনি শিকার হয়েছিলেন হেমোরয়েডসের। পাঁচড়া ছাড়াও তার ছিল দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ নিউরোডারমিটিটিস, রেগে যাওয়ার রোগ, মাইগ্রেন ও প্রস্রাবের জ্বালা সৃষ্টিকারী রোগ ডাইসুরিয়া। ১৯৬৬ সালে একটি মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত এক লেখায় উল্লেখ করা হয়, এসব রোগের জের হিসেবে তিনি প্যারাসাইটিক রোগ সিসটোসোমিয়াসিসে ভুগছিলেন। ১৭৯৮ সালে মিসর অভিযানের সময় তার এ রোগ দেখা দেয়। এসব রোগের পর বিষ প্রয়োগের তত্ত্ব তো আছেই।
খুনের সাক্ষ্যপ্রমাণ
নেপোলিয়নের সাথে ১৮১৫ থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত পুরো কিংবা আংশিক সময়ে সেন্ট হেলেনাতে অনেকেই ছিলেন। তাদের কয়েকজন স্মৃতিকথা লিখে গেছেন। তার শেষ জীবনের পরিপূর্ণ একটা রেকর্ড পাই ভৃত্য মার্চান্ডের কাছে। নেপোলিয়নের মৃত্যু উপাখ্যানে তার এ রেকর্ড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মার্চান্ডের স্মৃতিকথা ১৯৫৫ সালের আগে ছাপা হয়নি। সে বছর একজন দাঁতের চিকিৎসক, শৌখিন বিষ বিশেষজ্ঞ ও নেপোলিয়নের বিষয়ে আত্মত্যাগী সংগ্রাহক ফরশুফভুদ আসেন আলোচ্য মৃত্যু নিয়ে, নতুন বিতর্কিত দাবি নিয়ে : নেপোলিয়নকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। তিনি সুসমন্বিতভাবে আর্সেনিক প্রয়োগের বিষয়গুলোকে সংশ্লিষ্ট করেন। তিনি দেখান নেপোলিয়নের চুলে আর্সেনিকের মাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, কয়েক বছর ধরে তার দেহে আর্সেনিক প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তার সাথে যোগ দেন আরো অনেকেই।
খুনতত্ত্ব
নেপোলিয়নের দেহে যদি আর্সেনিক প্রয়োগ করা হয়েই থাকে, তবে কে এই বিষ প্রয়োগ করেছিল? আর তার উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? একটা বিষয় স্পষ্ট। খুনি যেই হোন, তিনি নেপোলিয়নের পুরো বন্দীত্বের সময়ে সেন্ট হেলেনাতেই ছিলেন। তাহলে খুনির তালিকা থেকে বাদ পড়েন ইমানুয়েল লেসক্যাসেস, তিনি সেন্ট হেলেনা ছাড়েন ১৮১৮ সালে। এর পরের বছর চলে যান জেনারেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্র্যাঙ্কি গোরগার্ড। অতএব তার নামটিও একই কারণে বাদ পড়ে। যেহেতু নেপোলিয়নকে দেখাশোনার জন্য এক ডাক্তার আসতেন আরেকজন যেতেন, অতএব তাদের কোনো একজনকে খুনি বিবেচনা করা যায় না।
এর পর অবশেষে থাকে দু’টি সম্ভাবনা : হাডসন কিংবা নেপোলিয়নের ঘরের কেউ। প্রথম সম্ভাবনা বাস্তব নয়। হাডসন লাউই জেলরের দায়িত্ব বহন করছিলেন। তিনি বার বার চেষ্টা করেছেন ইংরেজদের ঘাড়ে এমন বদনাম যেন না আসে যে, ইংরেজেরা এই বিখ্যাত বন্দিব্যক্তিত্বের প্রতি খারাপ আচরণ করছে। তা ছাড়া ইংরেজেরা ও ইউরোপীয়রা চায়নি নেপোলিয়নের খুনি হিসেবে পরিচিত হতে। তা ছাড়া নেপোলিয়নের কাছে পৌঁছাও ছিল কঠিন। ১৯১৬ সালের পর স্বল্পবাক হাডসন কখনোই নেপোলিয়নের সাথে দেখা পর্যন্ত করেননি। যে ইংলিশ গ্যারিসন নেপোলিয়নের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল, তারাও খুব কমই তার সাক্ষাতে আসত।
তা হলে নেপোলিয়নের ঘরের কেউ তাকে খুন করার প্রশ্ন আসে। শেষ দিন পর্যন্ত তার সাথে ছিলেন চার ব্যক্তি। প্রথমত, তার অনুগত বিশ্বস্ত ভৃত্য মার্চান্ডকে খুনি ভাবা কঠিন। এরপর সেখানে ছিল বার্ট্রান্ড, গ্র্যান্ড মার্শাল ও তার স্ত্রী। তার স্ত্রী থাকতেন লংউড থেকে এক মাইল দূরে। তখন অবশেষ সম্ভাবনা থাকে কাউন্টেস ডি মনথলন খুনি হওয়ার। ১৮১৯ সালে কাউন্টেস ডি মনথলন তার নবজাতক কন্যা নেপোলিয়ানাকে নিয়ে সেন্ট হেলেনা ছেড়ে যান। কেউ কেউ মনে করেন নেপোলিয়নই নেপোলিয়ানার বাবা।
নেপোলিয়ন টম্বের নিচে কার লাশ?
একটা ধারণা আছে, নেপোলিয়ন ১৮২১ সালের ৫ এপ্রিল মারা যাননি। তিনি সেন্ট হেলেনা থেকে পালিয়ে গেছেন। ধারণাটা অদ্ভুত শোনায়। যেমনটি অদ্ভুত শোনায় হিটলার বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আর্জেন্টিনার পর্বতাঞ্চলে বললে। বেশ কিছু লেখক, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য থমাস হুইলার অভিমত দিয়েছেন, সেন্ট হেলেনায় বন্দী থাকার প্রথম দিকের বছরগুলোতে নেপোলিয়নের জায়গায় আনা হয় আরেকটি দ্বৈতচরিত্র। হুইলারের বিশ্লেষণ মতে, সার্জেন্ট পিয়েরে রোবিয়াউডকে আনা হয় নেপোলিয়নের জায়গায়। অন্যত্র তিনি পরিচিত ফ্রাঙ্কো ইউজেনি রোনিয়াউডভ নামে। তিনিই সেন্ট হেলেনায় ক্যান্সারে মারা যান। তার লাশই এখন সমাহিত আছে নেপোলিয়নের টম্বে।
এক খুনির প্রতিকৃতি
১৮৪০ সালের অক্টোবরের দিকে নেপোলিয়নবাদীরা রাজা লুই ফিলিপকে চাপ দেয় সেন্ট হেলেনা থেকে তাদের বীরদের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য। বিক্ষোভকারীদের চাপে পড়ে লুই ফিলিপ নেপোলিয়নের নির্বাসনের সাথীদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠায় সেন্ট হেলেনা থেকে লাশ ফেরত আনার জন্য। এদের মধ্যে যারা জীবিত ও চলনক্ষম ছিলেন তারা এ প্রতিনিধিদলের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। একমাত্র কাউন্ট ডি মনথলন এ প্রতিনিধিদলের সদস্য হতে পারেননি। ৬৭ বছর বয়সী বার্ট্রান্ডও সে সফরে ছিলেন। তার স্ত্রী ফ্যানি মারা যান ১৮৩৬ সালে। লেসক্যাসেস তখন বৃদ্ধ ও অন্ধ। তার প্রতিনিধিত্ব করেন তার পুত্র ইমানুয়েল, যিনি বালক বয়সে বাবার সাথে লংউডে ছিলেন। চিকিৎসক ব্যারি ওমিয়ারা ও ফ্রানসিসকো অ্যানটোমার্কি কয়েক বছর আগে মারা যাওয়ায় যেতে পারেননি। মধ্যবয়সী বিশ্বস্ত লুই এ প্রতিনিধিদলে ছিলেন। কাউন্ট ডি মনথলরন সে সময়ে জেলে থাকায় যেতে পারেননি।
নেপোলিয়নবিষয়ক শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড চ্যান্ডলার জোর দিয়ে বলেছেন, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নকে খুন করেছেন তার স্বদেশী কাউন্ট ডি মনথলন। তিনি এ ব্যাপারে ৯৯.৯৯ শতাংশ নিশ্চিত বলে ঘোষণা দেন। তার মতে, সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নের নির্বাসনে যাওয়া আর মৃত্যুর মধ্যবর্তী ছয় বছর সময়ে ধারাবাহিকভাবে তার ওপর আর্সেনিক প্রয়োগ করেছেন কাউন্ট চার্লস ডি মনথলন। তাকে এ নির্বাসন দ্বীপে মনে করা হতো নেপোলিয়নের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু আসলে তিনি কাজ করছিলেন ফরাসি রয়েলিস্টদের আদেশ-নির্দেশে। ফরাসি রাজতন্ত্রীদের ভয় ছিল নেপোলিয়ন আবার ফ্রান্সে ফিরে এসে আরেক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে। তার যোগাযোগ ছিল ফরাসি রাজা দশম চার্লসের সাথে। ফরশুফভুদ ও উইডারের মতে, মনথলন তার কাছ থেকেই নেপোলিয়নকে খুন করার আদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু তার এ গোপন যোগাযোগ কোনো কাজে আসেনি। কারণ এই প্রতারক রাজা ১৮৩০ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন।
১৮৪০ সালের প্রথম দিকে রাজা লুই ফিলিপ নেপোলিয়নের লাশ প্যারিসে ফিরিয়ে আনবেন কী আনবেন না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ভাবছিলেন। ডি মনথলন তখন সংযুক্ত ছিলেন লুই বোনাপার্টের সাথে। লই বোনাপার্টেরই তৃতীয় নেপোলিয়ন হওয়ার কথা। তখন ডি মনথলন তার ইংল্যান্ডের ঘাঁটি থেকে ফ্রান্স আক্রমণের উদ্যোগ নেন। ডি মনথলনের বেশির ভাগ উদ্যোগের মতো এটিও ব্যর্থ হয়। ফ্রান্সের রাজকীয় বাহিনীর হাতে তিনি বন্দী হন। রাজা লুই সরকার তাকে ২০ বছরের শাস্তি দিয়ে কারাগারে পাঠায়। সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিতেরা যখন পুনর্মিলনী উৎসবে যোগ দেন, তখন ডি মনথলন তার সাজার মেয়াদ শুরু করেন।
১৮৫০ সালে নেপোলিয়নের ভাইয়ের ছেলে লুই বোনাপার্ট হন তৃতীয় নেপোলিয়ন। অবশ্য বিখ্যাত নেপোলিয়নের ছেলে ছিলেন দ্বিতীয় নেপোলিয়ন। কিন্তু তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে ১৮৩২ সালে মারা যান। ডি মনথলন কখেনা ভালো কখনো খারাপ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছিলেন বোনাপার্ট পরিবারের সাথে। তবে তার স্থান হয়নি তৃতীয় নেপোলিয়নের সরকারে। নির্ধারিত ২০ বছর সাজার ছয় বছর ভোগের পর ডি মনথলন বৈশিষ্ট্যহীনভাবে অনেকটা নীরবে মারা যান ১৮৫৩ সালে।
নেপোলিয়ন খুন হয়েছিলেন কি না, তিনি তার খুনি ছিলেন কি না, এ সম্পর্কে তিনি কিছুই বলে যাননি। তার স্মৃতিকথায় এ ব্যাপারে কোনো উল্লেখ নেই, আভাস-ইঙ্গিত নেই। তার স্ত্রীর স্মৃতিচারণে উল্লেখ আছে, তার স্বামীর এ সম্পর্কিত কোনো পরিকল্পনার কথা তিনি জানেন না। অন্য যারা এ সম্পর্কিত স্মৃতিকথা লিখে গেছেন, তারাও ডি মনথলনকে খুনি চিহ্নিত করে কিছু বলেননি। যদি ডি মনথলন নেপোলিয়নের খুনি হিসেবে কোনো লেগ্যাসি রেখে গিয়ে থাকেন, তবে তিনি হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত খুনি। আর কারো কারো মতে, তিনি হবেন ইউরোপীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র।
নেপোলিয়নকে নিয়ে লেখালেখি
এক হিসাব মতে, বিভিন্ন ভাষায় নেপোলিয়নকে নিয়ে কমপক্ষে পাঁচ লাখ বই লেখা হয়েছে। কম করে বললেও বলতে হয়, ১৮২১ সালে নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর প্রতি বছর নেপোলিয়নের ওপর এক হাজার ৪০০ করে বই বের হচ্ছে। আর অন্য অর্থে গড়ে প্রতিদিন বের হচ্ছে চারটি করে বই। নেপোলিয়নের নির্বাসনের ওপর রয়েছে ২৫ হাজার বই। এর পাঁচ ভাগের এক ভাগ বইও যদি ইংরেজিতে লেখা হয়ে থাকে, তবে তার ওপর ইংরেজি বই রয়েছে পাঁচ হাজার।
নেপোলিয়নকে নিয়ে লেখা অগুণতি বইয়ের মধ্যে আছে সেন্ট হেলেনার নির্বাসন সময়ে সেখানে থাকা তার চার ঘনিষ্ঠ স্টাফ বার্ট্রান্ড, মনথলন, লেসক্যাসাস ও গোরগার্ডের লেখা বই। আছে তার প্রধান এক ভৃত্য মার্চান্ড। এসব স্মৃতিকথার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কিছু আধুনিক বই বিষ প্রয়োগে নেপোলিয়নকে হত্যা করার ধারণা থেকে লেখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে যেসব লেখকের বই উল্লেখযোগ্য তারা হচ্ছেন ফরশুফভুদ (১৯৬১, ১৯৯৫), উইডার (১৯৮২, ১৯৯৫)। আরো কয়েকটি বই রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে নেপোলিয়ন ১৯২১ সালের ৫ মে মারা যাননি। এ ছাড়া কিছু বইয়ে সেন্ট হেলেনায় তার নির্বাসন জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে আনা হয়েছে। এসব লেখকের মধ্যে আছেন কাউফম্যান (১৯৯৯) ও গিলস (২০০১)।
অবশ্য যে কারোরই উচিত নেপোলিয়নের পূর্ণ জীবনী পড়া। সাম্প্রতিক এমনি দু’টি বই লিখেছেন স্কম (১৯৯৭) ও ম্যাকলিন। স্কমের অভিমত, নেপোলিয়ন নিশ্চয়ই স্বাভাবিকভাবে মারা যান। আর ম্যাকলিন বলছেন নিশ্চিতভাবেই বিষ প্রয়োগে নেপোলিয়নকে হত্যা করা হয়েছে। নেপোলিয়নকে নিয়ে লেখা অনেক বই-ই উপন্যাসসম। কিন্তু তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস একটি গুরুত্বপূর্ণ বই।