Tuesday, March 3, 2015

সরবরাহ ৪০ শতাংশ কমেছে -মাহবুবুল আলম by মাসুদ মিলাদ

টানা অবরোধ ও হরতালে দেশের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। সড়কপথে ঝুঁকির কারণে বেড়েছে পণ্য পরিবহন ভাড়াও। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সহিংস কর্মসূচির কারণে ব্যবসার খরচ বেড়েছে।
প্রথম আলোর সঙ্গে সম্প্রতি আলাপকালে দেশের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের এমনই চিত্র তুলে ধরেছেন খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বারেরও সভাপতি।
মাহবুবুল আলম জানান, আমদানি হওয়া ভোগ্যপণ্যের সিংহভাগই আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এখান থেকে সড়ক ও নৌপথে সারা দেশে ভোগ্যপণ্য পরিবহন হয়। বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ভোগ্যপণ্যের অন্তত ৪০ শতাংশ আনেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। বন্দর সচল থাকায় আমদানি করা পণ্য খালাসের পর চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা প্রথমে তা স্থানীয় অন্তত ৪০০ গুদামে এনে রাখেন। এরপর বিক্রি হওয়া পণ্য গুদাম থেকে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সচল থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকা যেমন সিলেট, রাজশাহী, খুলনা অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। ফলে ঝুঁকির কারণে এসব অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩৫-৪০ শতাংশ কম হচ্ছে। আবার কিছু পণ্য উত্তরাঞ্চল থেকে চট্টগ্রামে আসে। এসব পণ্যও আসছে স্বাভাবিকের তুলনায় কম।
খাতুনগঞ্জে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে অবরোধ-হরতালের এই বিরূপ প্রভাব দেশের গোটা অর্থনীতিতে বড় ক্ষত তৈরি করবে বলে মনে করেন মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, খাতুনগঞ্জে শুধু ভোগ্যপণ্যই বেচাকেনা হয় না, রাসায়নিক, শিল্পের কাঁচামাল ও শিল্পজাত পণ্য এখান থেকে সারা দেশে পরিবহন হয়। অবরোধের কারণে এমনিতেই বেচাকেনা অন্তত ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব তুলে ধরে মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আমাদের হিসাবে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ এলাকায় প্রায় দুই হাজার প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক সময়ে ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার লেনদেন করে। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্য বেচাকেনা ৪০০ কোটি টাকার কম হবে না। আমদানিকারক থেকে পাইকারি ব্যবসায়ী পর্যন্ত তিন-চার ধাপে পণ্য বেচাকেনা হয়। ফলে লেনদেনও হয় বেশি। অবরোধ ও হরতালের প্রভাবে এ বেচাকেনা প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।’
খাতুনগঞ্জে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক কর্মকর্তারা আমাকে জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ব্যাংকের লেনদেন কমেছে ৫০ শতাংশ। আগের গতিশীলতা এখন নেই।’
পণ্য বেচাকেনা, লেনদেন-ব্যবসা যত কমবে, ততই ব্যবসা চালানো কঠিন হবে ব্যবসায়ীদের জন্য। ব্যাংকের অর্থায়নে পণ্য আমদানি হয়। পণ্য আমদানি করে বিক্রি করতে না পারলে ব্যাংকের টাকা পরিশোধও কঠিন হবে ব্যবসায়ীদের জন্য। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংকঋণের সুদ মওকুফ করার পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর আগে ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হিমশিম খেয়েছেন। সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিলেন। তার আগেই আবার নতুন করে দীর্ঘ সময় ধরে সহিংস কর্মসূচির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও পাচ্ছেন না তাঁরা।

পবার নিখোঁজ মেয়রের লাশ আজিমপুর গোরস্থানে

দুই মাস ধরে নিখোঁজ রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার মেয়র আব্দুল গফুরের লাশ ঢাকার আজিমপুর গোরস্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের কাছে দ্বিতীয় দফার রিমান্ডে জান্নাতুন সালমা মিমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পবা থানা পুলিশ মঙ্গলবার বিকেলে মেয়রের লাশ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান জানান, দুপুরে পবা থানা পুলিশের একটি দল আজিমপুর গোরস্থানে পৌঁছায়। বিকেল ৫টার দিকে নিখোঁজ মেয়র আব্দুল গফুরের লাশ উদ্ধার করা হয়। আজিমপুর গোরস্থানের রেজিস্ট্রি খাতায় মেয়র গফুরের মিথ্যা পরিচয় দেয়া আছে। আর মৃত্যু ৩রা জানুয়ারি ও দাফন ৬ই জানুয়ারি উল্লেখ্য করা হয়েছে। ওসি আরও বলেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মিম স্বীকার করেন মেয়র আব্দুল গফুরকে তিনি হত্যা করেন। তবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়ার সময় হত্যার কথা অস্বীকার করেন মীম। একই সঙ্গে কোথায়, কখন ও কিভাবে মেয়র গফুরকে খুন করা হয় এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। এজন্য সোমবার তাকে আরো সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী লাশ উদ্ধারের জন্য মঙ্গলবার সকালে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেলে আজিমপুর গোরস্থান থেকে মেয়র গফুরের লাশ উদ্ধার করা হয়।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৩১ শে ডিসেম্বর ঢাকায় গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর নওহাটা পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল গফুরকে গত ৬ই জানুয়ারি হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুম করতে তা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়। এরপর থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়রের মোবাইল ফোন থেকে পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের কাছে মোবাইলে ম্যাসেজ আসতে থাকে। কিন্তু ফোন দিলে পরক্ষণেই মেয়রের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। এতে পরিবারের সবার মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে থাকে। এরআগে ১৯ শে জানুয়ারি মেয়রের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা পারুল বাদী হয়ে পবা থানায় অপহরণের মামলা করেন। পরে থানায় দায়ের করা মামলার সূত্র ধরে কথিত চিকিৎসক জান্নাতুন সালমা মীমকে ঢাকা থেকে আটক করা হয়। পরে ৩১ জানুয়ারি মীমের দুই বোন জান্নাতুন নাইম ও জান্নাতুন ফেরদৌসকে নওগাঁ ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণে কী হবে?

সব সমালোচনাকে তুড়ি মেরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস অধিবেশনে ইরান নিয়ে ভাষণ দেবেন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার রিপাবলিকান নেতা জন বোয়েনারের আমন্ত্রণে ৪৮ ঘণ্টার বিতর্কিত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন নেতানিয়াহু। তাঁর এই ভাষণকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরেই উত্তপ্ত আলোচনা চলছে। এই ভাষণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ওবামা সরকার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইসরায়েলের পছন্দ নয়। নেতানিয়াহু কংগ্রেসে ভাষণ দিলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার বাড়তি সুযোগ পাবেন বলে মনে করছে কংগ্রেস। নেতানিয়াহু কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের যৌথ অধিবেশনে যে ভাষণ দেবেন, তা হবে তাঁর এ ধরনের তৃতীয় ভাষণ। এ ভাষণে তিনি ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পাশ্চাত্যের সঙ্গে চলমান সংলাপ ও ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর উত্থানের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলবেন বলে মনে করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ ও সমালোচনায় নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়েননি নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, মার্কিন কংগ্রেসে তাঁর ভাষণের উদ্দেশ্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে অসম্মান প্রদর্শন করা নয়। টুইটারে এক টুইটে তিনি বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে, কোনো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে নয়। আমি যাচ্ছি আমার দেশকে বাঁচাতে।’
নেতানিয়াহুর ভাষণ সামনে রেখে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, সমঝোতা চুক্তি সফল হলে ইরানকে অন্তত এক দশকের জন্য তাঁদের পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রাখতে হবে। নেতানিয়াহুর সফরকে ইঙ্গিত করে ওবামা বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি যাতে সফল না হয়, সে জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চলছে। নেতানিয়াহুর সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই নিন্দা চলছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস গত বুধবার এ বিষয়ে বলেন, নেতানিয়াহুর সফর হবে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ধ্বংসাত্মক। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এর আগে সতর্কতা জারি করে বলেন, নেতানিয়াহুর এ ধরনের কার্যকলাপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
১৭ মার্চ ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা। নেতানিয়াহুর ভাষণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এতটাই তিক্ত হয়ে উঠেছে যে নির্বাচনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধী পক্ষকে সমর্থন দেবেন কি না, তা নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে হোয়াইট হাউস। আরব-ইসরায়েল বিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার মনে করেন, ওবামা ও নেতানিয়াহুর নাজুক সম্পর্কে এই আলোচনা আরও খারাপ প্রভাব ফেলবে। ওয়াশিংটনের উড্রো উইলসন সেন্টারের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট মিলার বলেন, এই ভাষণের মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক অকার্যকর হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে যদি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে জিজ্ঞেস করা হয় আপনি কাকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, তাহলে তাঁরা নিঃসন্দেহে লেবার পার্টির কথা বলবে। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।
জনমত জরিপ বলছে, কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর আজকের ভাষণ নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলও দুই ভাগে বিভক্ত। অনেকেই মনে করছে ১৭ মার্চ অনুষ্ঠেয় নির্বাচন সামনে রেখে সুবিধা লুটতে নেতানিয়াহু ভোল বদলাচ্ছেন। লেবার পার্টির নেতা আইজাক হারজগ কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর দেওয়া বক্তব্যকে কৌশলগত ভুল বলে চিহ্নিত করেন। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য নেতানিয়াহু এমনটা করছেন বলে হার্জগ উল্লেখ করেন। ইসরায়েলের বামপন্থী মেরেতজ পার্টির নেতা জাহাভা গেল অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী ওই ভাষণ দিয়ে ইসরায়েলের ক্ষতি করতে যাচ্ছেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যদের অনেকেই মার্কিন কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর ভাষণ বর্জনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও। ডেমোক্র্যাট নেতাদের অভিযোগ, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কথা বলে ওবামাকে রিপাবলিকানদের চাপে ফেলার চেষ্টা করছেন। হোয়াইট হাউস ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রন ড্রামারের ওপর ক্ষুব্ধ। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের রিপাবলিকান স্পিকার জন বোয়েচনার প্রশাসনের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনা না করে নেতানিয়াহুর সঙ্গে রিপাবলিকানদের ওই আলোচনায় বসার ষড়যন্ত্র করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা বোয়েনারকে অভিযুক্ত করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ওপর রিপাবলিকানরা চাপ দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের সমর্থকেরা ইরানের ওপর অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে। গার্ডিয়ান, বিবিসি, এএফপি অবলম্বনে

‘রাজনৈতিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিতের চেষ্টা চলছে’

চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের ওপর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমীন গাজী বলেছেন, সরকার একটি ন্যায্য রাজনৈতিক আন্দোলনকে ধ্বংসাত্মক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের একগুঁয়েমির কারণে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। অস্ত্রের ভাষা যে রাজনীতির ভাষা হতে পারে না, সে কথা কিছুতেই তারা বুঝতে চাচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যত নিয়ে গোটা জাতি আজ চিন্তিত। চারদিকে আজ দম বন্ধকর অবস্থা। রুহুল আমীন গাজী বলেন, আজ দু’মাস ধরে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ এক প্রকার অচল হয়ে আছে। একদিকে চলছে জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলন, অবরোধ-হরতাল অন্যদিকে সরকারী বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে ও সহিংসতায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত ও দগ্ধ মানুষের সারি। চলমান আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন বাহিনী সরাসরি বুকে গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। হত্যার পর বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে বলে কল্পকাহিনী প্রচার করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মীদের গাড়ি চাপা দিয়ে কিংবা শরীরে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ মৃত ব্যক্তিকে গণপিটুনীতে মৃত বলে দেখানো হচ্ছে। অবরোধের ৫৭ দিনে সহিংসতা ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ১১৩ জন নিহত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএফইউজে সভাপতি শওকত মাহমুদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গাজী মাযহারুল আনোয়ার। উপস্থিত ছিলেন ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, এ্যাব’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী আ ন হ আখতার হোসেন, বিএসএমএমইউর সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নান মিয়া প্রমুখ।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে ১৬ কূটনীতিকের বৈঠক

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আজ মঙ্গলবার দেখা করতে
তাঁর গুলশান কার্যালয়ে যান ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস

ব্লুম বার্নিকাটসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকেরা। ছবি:বিএনপির সৌজন্যে
বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাটসহ ১৬টি দেশের কূটনীতিকরা। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে অষ্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার গ্রেগ ইউলকক জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসময় তিনি একটি লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনান। এতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আমাদের দেয়া পূর্বের বিবৃতি এবং জাতিসংঘ প্রদত্ত বিবৃতিগুলো উদ্বৃত করে আমরা চলমান সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছি। আমরা আস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে পদেক্ষপ নিতে উৎসাহ দিয়েছি। একইসঙ্গে বাংলাদেশে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, প্রগতি, মানবাধিকার ও  গণতন্ত্রের স্বার্থে দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছি। বাংলাদেশের বন্ধু এবং অংশীদার হিসেবে, আমরা বিএনপি চেয়ারপার্সনের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগকে স্বাগত জানাই। আমরা সকল পক্ষের প্রতি আমাদের অভিন্ন প্রত্যাশা ব্যক্ত করা অব্যাহত রাখবো।
সন্ধ্যা পৌনে ৭টার সময় রাষ্ট্রদূতরা একটি মাইক্রোবাসে করে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান। প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইতালী, ফ্রান্স, জার্মান, জাপান, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে,কোরিয়া, স্পেন,সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার দূতরা ছিলেন।

বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ যুক্তরাজ্যের

বাংলাদেশের  চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বৃটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি তাদের নজরে রয়েছে উল্লেখ করে বৃটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের মন্ত্রী হুগো সোয়ার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও দলগুলোর মুখোমুখি সাংঘর্ষিক অবস্থানে যুক্তরাজ্য গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে, যা দেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করবে। চলমান সঙ্কট নিরসনে সকল রাজনৈতিক দলকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির এমপি সামি উইলসনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও অন্য রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি সরকারের হুমকি ও নির্যাতনের বিষয়ে সামি উইলসন এমপির প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, গত ২০শে জানুয়ারি বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তারা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ ও তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবরে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার ও ইইউ রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেন গত ১৪ই জানুয়ারি। এই বৈঠকে তারা বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা এবং গণতন্ত্রের পরিবেশ সংকুচিত হওয়ার বিষয়ে তাদের সম্মিলিত উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। মন্ত্রী হুগো সোয়ার জানান, ১১ই ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ শেষে দেয়া বিবৃতিতে চলমান পরিস্থিতি শোচনীয় বলে উল্লেখ করেছেন বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব দলকে চলমান সঙ্কট সমাধানের আহ্বান জানান বৃটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের মন্ত্রী  হুগো সোয়ার।

উজিরপুরে প্রেমিক খুন প্রেমিকার বাড়িতে আগুন ১০ জন আহত

বরিশালের উজিরপুরের হারতা ইউনিয়নের জামবাড়ী গ্রামে প্রেমের সম্পর্কের জেরে সোমবার রাতে এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল বিুব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী প্রেমিকার বাড়িতে জড়ো হয়। এ সময় প্রেমিকার পরিবারের সদস্যরা ধারাল অস্ত্র নিপে করায় এলাকাবাসী প্তি হয়ে বসতঘর, রান্নাঘর ও দু’টি গরুর খড়ের গাদায় অগ্নিসংযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। হত্যার ঘটনায় প্রেমিকাসহ পরিবারের পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সুখদেবের পরিবারের দাবি, মিতুর সাথে প্রেম করার অপরাধে সুখদেবকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার জামবাড়ী গ্রামের সুপেন মিস্ত্রির ছোট ছেলে ঢাকা মধ্যবাড্ডা এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড সুখদেব মিস্ত্রি (২৩) ও একই গ্রামের দশরথ সমদ্দারের ছোট মেয়ে কলেজছাত্রী মিতু সমদ্দারের (১৮) দীর্ঘ দিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত সোমবার সকালে ঢাকা থেকে কাকাতো বোন অপর্ণার বিয়ের জন্য সুখদেব বাড়িতে আসেন। বাড়িতে আসার পরে প্রেমিকা মিতুর সাথে দেখা করতে হাবিবপুর কলেজে যান। দুপুুর পর্যন্ত দুইজনে ঘোরাফেরা করে বাড়িতে ফিরে যান।
সন্ধ্যার পরে সুখদেব বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতে আর ফিরে আসেননি। স্থানীয় সমীর বলভ গতকাল সকালে ধানেেত পানি দিতে যাওয়ার পথে প্রেমিকা মিতুদের বাড়ির পশ্চিম পাশের বাগানে সুখদেবের লাশ পড়ে থাকতে দেখে লোকজনকে খবর দেন। হত্যার খবর জানার পর সুখদেবের স্বজনরা ও গ্রামবাসী বিুব্ধ হয়ে উঠেন। তারা সকালে মিতু ও তার পরিবারের অন্যদের দায়ী করে তাদের বাড়িতে যায়। এ সময় এলাকাবাসীকে লক্ষ্য করে ঘরে থাকা দেশীয় ধারাল অস্ত্র ছুড়ে মারা হয়। এতে এলাকাবাসী প্তি হয়ে বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় ও মিতুসহ তার পরিবারের লোকজনের ওপর হামলা চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। গ্রামবাসীর হামলা ও পুলিশের লাঠিচার্জে দশরথ সমদ্দার (৫০), তার স্ত্রী আলোমতি সমদ্দার (৪৫), কন্যা মিতু, কনক, নমিতা, পুত্র সজল সমদ্দারসহ ১০ জন আহত হন।
উজিরপুর মডেল থানার ওসি মো: নুরুল ইসলাম পিপিএম জানান, হারতা পুলিশ ক্যাম্প ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আহতদের উদ্ধার করে। একই সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বরিশাল মগে পাঠানো হয়েছে।

গাছ থেকে নামতেই পুলিশ ধরল জালাল উদ্দিনকে

তখনো জালাল উদ্দিন গাছে। নিচে আগে থেকেই প্রস্তুত পুলিশ। সকাল ৯টায় ২৪ ঘণ্টার কর্মসূচি পালন শেষে গাছ থেকে নামতেই পুলিশ তাকে আটক করে। কী তার অপরাধ? পুলিশের কাছে জানতে চান জালাল উদ্দিন। পুলিশের জবাব নেই। পুলিশের সাফ কথা অপরাধ কী তা থানায় গেলেই জানা যাবে। জালাল উদ্দিন ক্রসফায়ার, বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস কাবের একটি গাছে চড়ে ২৪ ঘণ্টার কর্মসূচি পালন করেন।
সোমবার সকাল ৯টায় দু’টি ফেস্টুন, একটি হ্যান্ড মাইক, একটি হ্যারিকেন, কিছু শুকনা খাবার ও পানীয় নিয়ে প্রেস কাবের প্রধান গেট সংলগ্ন একটি গাছে চড়েন। তিনি ২৪ ঘণ্টার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছ থেকে নামার পরেই জালাল উদ্দিনকে আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তার সাথে থাকা হৃদয় (১৮) নামের আরেকজনকেও আটক করা হয়।
জালাল উদ্দিনের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘১৬ কোটি মানুষ এই মাটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তাই গাছে উঠে দাবি আদায়ের কথা বলছি। দাবি আদায় হলে নিচে নেমে আসব।’ তিনি ক্রসফায়ারের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ আমাকে ক্রসফায়ার করে হত্যা করতে পারবে না। কারণ জনগণ দেখবে।’
তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মারকলিপি দেয়ার কথা বলেছিলেন।
আটকের ব্যাপারে শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: আব্দুল আজিম বলেন, ‘সকালে তাদের থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।’ রাতে জানা গেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। তবে তারা থানাতেই আছেন।

পরিবর্তনের বার্তাই দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর

ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এসেছে- এই বার্তাই বাংলাদেশকে দিয়েছেন দেশটির সফররত বিদেশ সচিব ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বার্তাটি স্পষ্ট করেন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের ওই কূটনীতিক। গতকাল দুপুরে ২৪ ঘণ্টার সফরে ঢাকায় আসার পর পররাষ্ট্র ভবন ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বিভিন্ন বৈঠক ও ভোজে অংশ নেন তিনি। পররাষ্ট্র দপ্তরের গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে জয়শঙ্কর ‘ভাল আলোচনা হয়েছে’ জানিয়ে দুই দেশের মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। গত ২৮শে জানুয়ারি নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ভারতের বিদেশ সচিবের পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ নির্দেশনা নিয়ে সার্কভুক্ত দেশগুলো সফরের অংশ হিসেবে ভুটানের পর বাংলাদেশ সফর করছেন তিনি। ঢাকায় এটি তার প্রথম এবং গুডউইল সফর। ভারতীয় অতিথি পররাষ্ট্র দপ্তর ছেড়ে যাওয়ার পর বিকালে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একেক সরকারের একেক পলিসি থাকে। ভারতের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ফরেন পলিসিতে ‘বড় রকমের পরিবর্তন’ এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সার্কসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যে কোন সমস্যার সমাধান দ্রুত করার ব্যাপারে দিল্লি এখন অনেক বেশি মনোযোগী বলেও মনে করেন তিনি। সচিব বলেন, ভারতের এই সরকারের বিশেষ একটি দিক লক্ষ্য করেছি আমরা। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চায়, অমীমাংসিত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে চায়। বর্তমান সরকার আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়নে ফোকাস দিচ্ছে। তার সঙ্গে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠকের বিষয়ে সচিব বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কিভাবে নতুন উচ্চতায় নেয়া যায়, সে ব্যাপারে আলোচনার জন্যই দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। প্রগাঢ় বন্ধুত্ব জোরদার করাই তার সফরের লক্ষ্য। দিল্লির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সচিবের আলোচনায় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ‘বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা’ জানানো হয়েছে উল্লেখ করে সচিব বলেন, তিস্তার বিষয়টি তারা ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে। তারাও এ সমস্যার সমাধান করতে চান। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, উপ-আঞ্চলিক, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মোটা দাগে ওই তিন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা কিভাবে আরও বাড়ানো যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব।
মন্ত্রীর সঙ্গে ‘গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে: বিকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ভারতের বিদেশ সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর বলেন, মন্ত্রীর সঙ্গে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা পারস্পরিক আরও সহযোগিতা চাই। এর আগে সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষেও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি। সেখানে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে বৈঠকের আলোচ্যসূচি নিয়ে কথা বলেন তিনি। জয়শঙ্কর বলেন, সার্ক ও বিমসটেক ও দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। অত্যন্ত ভাল আলোচনা হয়েছে আমাদের। আমি আমার পরবর্তী মিটিংগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। তিস্তা নিয়ে কি আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বলেছি, আমরা সব বিষয়েই কথা বলেছি।
হাসিনাকে মোদির চিঠি: এদিকে খুব শিগগিরই বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণের জবাব পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দিল্লির বিদেশ সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ সংক্রান্ত চিঠি হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “ওই চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তিনি আগ্রহের সঙ্গে ঢাকা সফরের জন্য অপেক্ষা করছেন।” নরেন্দ্র মোদির ওই চিঠিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রেস সচিব। জাতীয় সংসদ ভবনে ওই বৈঠক হয়। সার্ক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের প্রয়াসের অংশ হিসেবে জয়শঙ্করকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পাঠিয়েছেন মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে বৈঠকে শেখ হাসিনা জানতে চাইলে জয়শঙ্কর ইতিবাচক সাড়া দেন বলে জানান শামীম চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরাও তার জন্য অপেক্ষা করছি।’ বৈঠকে বাংলাদেশে ভারতের অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পগুলো নিয়েও আলোচনা হয়। শামীম চৌধুরী বলেন, এলওসি’র আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পগুলো ভালভাবে এগুচ্ছে বলেও জয়শঙ্কর তার সরকারের সন্তোষের কথা প্রকাশ করেন। বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ ও ভারতের সহযোগিতার বিষয়েও বৈঠকে কথা হয়। ত্রিপুরার পালটানা থেকে আরও বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আগ্রহ দেখান শেখ হাসিনা। জবাবে জয়শঙ্কর ‘অবশ্যই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আসবে’ বলে জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দুই দেশের বেসরকারি খাতকেও কাজে লাগানোর কথাও বলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। বৈঠকে ভুটান থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আনার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানান শামীম চৌধুরী। শিগগিরই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ‘ ট্রেড প্রটোকল’ এবং ‘এগ্রিমেন্ট বিটুইন কোস্টাল শিপিং’ এই দুটি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সার্কের বাইরেও দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথাও বলেছেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ উপস্থিত ছিলেন।
দেড় ঘণ্টা বিলম্বে এলেন, যাবেন আজ সকালে: সকাল পৌনে ১০টায় ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল তার। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে দুপুরের অল্প আগে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে বিদেশ সচিবকে বহনকারী ভারতীয় বিমানটি। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা বিলম্বে শুরু হয় পররাষ্ট্র দপ্তরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। সময় কমে যাওয়ায় ওই বৈঠকে ‘সুনির্দিষ্ট কিছু হয়নি’ বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। তিস্তার পানি বণ্টন এবং স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের তরফে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চায় বাংলাদেশ। স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি এখন ভারতের লোকসভার অনুমোদনের অপেক্ষায়। স্থল সীমান্ত  চুক্তির বিষয়টি শিগগিরই সমাধান হবে বলে আশাবাদী পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত যে জোর দিচ্ছে সেটি জয়শঙ্করের নিয়োগের এক মাসের মধ্যে তার এই সফরে ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ‘এতটাই গভীর’ যে ‘আপনি যদি প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে একছত্র লিখেন তাহলে ২৫ পাতার একটি দলিল হয়ে যাবে। “বিস্তারিত আলোচনা আমরা করি মূলত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠক (এফওসি) এবং যৌথ পরামর্শ কমিশন (জেসিসি) পর্যায়ের বৈঠকে।” আজকের (গতকালের) আলোচনায় আমরা একটি বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত যে সম্পর্ক ‘খুবই ভাল’ এবং সামপ্রতিক বছরগুলোতে ‘এটা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।’ এটা ভবিষ্যতে আরও জোরদার হতে থাকবে। আগামী ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে মোদির ভারত সফর নিয়ে দু’দেশের গণমাধ্যমে খবর বেরুলেও শহিদুল হক বলেন, এ বিষয়ে তারা সুনির্দিষ্ট  কান আলোচনা করেননি। ‘আমরা দিন তারিখ আলোচনা করিনি। তিনি যথাসময়ে সফর করবেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আগেই তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন।’ তিনি বলেন, উপ-আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তারা বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে পানি, বিদ্যুৎ, সংযোগ ও ট্রানজিট বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সম্মিলিতভাবে সার্কের উদ্যোগ সফল হওয়ায় উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতার উপর জোর দিচ্ছে ভারত। আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে বড় দুটি অংশের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। একদিকে আছে- পানি ও বিদ্যুৎ অন্যদিকে সংযোগ ও ট্রানজিট। এ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে চার দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আগামী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা উভয়ে আরও সহযোগিতা চাই।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর সঙ্গে দেখা করেন জয়শঙ্কর। এর পর তিনি জাতীয় সংসদে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। রাতে ভারতীয় হাই কমিশনের ডিনারে অংশ নেন। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম পর্বের সফরে আজ সকালে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। সেখান থেকে বুধবার যাবেন আফগানিস্তান সফরে।

‘পিতা হত্যার বিচার নিয়ে সন্দিহান’ by মাহমুদ মানজুর

‘আমার বয়স যখন ৬ বছর, তখন আমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু তার। এর পর গেল ১২ বছরে ক্রমে তিনি আমার বন্ধুতে, আমার নায়কে, আমার আদর্শে, বিশ্বস্ত নির্ভরতায়, আমার নাচের সংগীতে এবং আমার বাবায় পরিণত হন।’ অকাল প্রয়াত অভিজিৎ রায় সম্পর্কে এই প্রতিক্রিয়া কন্যা তৃষা আহমেদের। অভিজিৎ রায়ের অকাল মৃত্যুর পর সমপ্রতি তার  ফেসবুক স্ট্যাটাসে এমনটাই লিখেছেন ১৮ বছর বয়সী তৃষা। এতে তার বাবার হত্যাকারীদের বিচার হবে কিনা এ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন  রাফিদা আহমেদ বন্যার প্রথম পক্ষের সন্তান তৃষা। প্রথম সংসারে বিচ্ছেদ ঘটার পর প্রায় ১৩ বছর আগে ২০০২ সালে ‘মুক্তমনা’ ব্লগসহ বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখির সুবাদে পরিচয়-সখ্য-প্রেম হয় অভিজিৎ-বন্যার। এক বছর পর ২০০৩ সালে ছ’বছর বয়সী কন্যা তৃষাকে নিয়ে বন্যা সংসার গুছান যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অভিজিৎ-বন্যা দু’জন দুই ধর্মের হলেও তাদের বিশ্বাস ছিল মূলত মানবধর্মে। নাস্তিকতা, বিজ্ঞান এবং নিরীশ্বরবাদ নিয়ে অভিজিৎ-বন্যা দু’জনই লিখেছেন অসংখ্য ব্লগ। হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণকারী অভিজিৎ নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘আমি নাস্তিক। কিন্তু আমার আশেপাশের বহু কাছের মানুষজন বন্ধু-বান্ধবই মুসলিম। তাদের উপর আমার কোন রাগ নেই, নেই কোন ঘৃণা। তাদের আনন্দের দিনে আমিও আনন্দিত হই। তাদের উপর নিপীড়ন হলে আমিও বেদনার্ত হই। প্যালেস্টাইনে বা কাশ্মীরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার হলে তাদের পাশে দাঁড়াতে কার্পণ্য বোধ করি না। অতীতেও দাঁড়িয়েছি, ভবিষ্যতেও দাঁড়াবো। এটাই আমার মানবতার শিক্ষা।
এদিকে অনেকটা একই সুরে বাবার মৃত্যুর পর কন্যা তৃষা তার ফেসবুক স্ট্যটাসে লিখেছেন, ‘ইসলামী মৌলবাদীরা তাকে (অভিজিৎ) ছুরির আঘাতে হত্যা করেছে। ওই ঘটনায় আমার মা-ও গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যদি বলি এই ঘটনায় আমি আতঙ্কিত বা মর্মাহত, তাহলে কম বলা হবে। পরিস্থিতি যত ‘খারাপ’ হোক না কেন পৃথিবীকে ‘ভালো’ জায়গায় পরিণত করতে ‘যুক্তির লড়াই’ শেষ হয়ে যাবে না।’ একই স্ট্যাটাসে তৃষা আরও লিখেন, ‘আমার বাবা ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখক। বিজ্ঞান এবং নিরীশ্বরবাদ বিষয়ে লেখার জন্য মূলত তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি আমাকে কখনোই প্রচলিত শান্তশিষ্ট অথবা বিনয়ী হতে বলেননি। তিনি আমাকে শিক্ষিত, উদ্যোগী এবং সাহসী হতে শিখিয়েছেন। তিনি আমাকে যা শিখিয়ে গেছেন, যে ভালবাসা দিয়ে গেছেন তা আমি সবসময় মনে রাখব। আমি  তোমাকে খুবই ভালবাসি বাবা। প্রতিটি জিনিসের জন্যই তোমাকে ধন্যবাদ।’ তৃষা বলেন, ওই ঘটনাটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রই শুনতে পারে কারণ বাংলাদেশ পাওয়ারলেস। এটি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সেখানে কোন আইনশৃঙ্খলা নেই। আমি গভীরভাবে সন্দিহান যে খুনিরা বিচারের আওতায় আসবে কিনা।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের দুই পুত্র। এর মধ্যে অভিজিৎ রায় বড়। ছোট ছেলে স্ত্রী নিয়ে ঢাকাতেই থাকেন বাবা-মা’র সঙ্গে। দুই ভাই-ই অসম্ভব মেধাবী ছিলেন শিক্ষা জীবনে। অভিজিৎ এর মা দীর্ঘদিন ধরে পেরালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। এদিকে অভিজিৎ-এর নৃশংস  হত্যাকাণ্ড এবং বন্যার আহত হওয়ার বিচার চেয়ে প্রথম থেকেই মিডিয়ায় বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন শিক্ষাবিদ অজয় রায়। তবে এর বাইরে বন্যার পরিবারের কোন সদস্যকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এ পর্যন্ত।
অভিজিৎ-বন্যা দম্পতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু শুদ্ধ স্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদ রশিদ টুটুল  বলেন অভিজিৎ-বন্যা দু’জনই আমার ভাল বন্ধু। আমাদের সঙ্গে পরিচয় ব্লগে লেখালেখির মধ্য দিয়ে। সত্যি বলতে আমরা সারাক্ষণ তর্ক-বিতর্কে মেতে থাকতাম নিজেদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে। আড্ডায়-ফোনে-ব্লগে আমরা লেখালেখির মধ্যে ডুবে থাকতাম। যার ফলে পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে আগ্রহ প্রকাশের সুযোগ থাকতো না। বন্ধু হিসেবে আমার কাছে এটুকু স্পষ্ট ছিল, ওরা দু’জন সংসার জীবনে খুব সুখে ছিল। মানুষ হিসেবে দু’জনই অসম্ভব সাদা মনের। দু’জনই অসম্ভব মেধাবী। ওদের ব্যক্তিগত বিষয়ে আমার জানার আগ্রহ কিংবা পরিধি এটুকুই। এদিকে একই তথ্য জানতে কথা হয় ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের বর্তমান সভাপতি অনিমেষ রহমানের সঙ্গে। তিনিও খানিক এড়িয়ে গিয়ে একই কথা বলেন। অন্যদিকে, বাবার নৃশংস মৃত্যু আর আহত মা রাফিদা আহমেদ বন্যার খবর পেয়ে গতকাল পর্যন্ত তৃষা ঢাকায় আসেননি। একাধিক সূত্র জানায়, নিরাপত্তাহীনতার কথা বিবেচনা করেই পারিবারিক সিদ্ধান্তে তৃষাকে ঢাকায় আসতে বারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অভিজিতের ফেসবুক একাউন্ট খোলা থাকলেও সেটি এখন অপারেট করছেন অন্য কেউ। যার ফলে ওই একাউন্টের নাম বদলে লেখা আছে ‘রিমেম্বরিং অভিজিৎ রায়’। এই একাউন্টে ২৬শে ফেব্রুয়ারির পর আর কোন নতুন পোস্ট নেই।
প্রকৌশলী অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হন অভিজিৎ। যন্ত্র প্রকৌশলে লেখাপড়ার পর কর্মজীবন শুরু করেন অটবিতে। চাকরিরত অবস্থায় বৃত্তি নিয়ে পিএইচডি করতে সিঙ্গাপুরে যান অভিজিৎ। পরে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তিনি জিপিএস প্রযুক্তির গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। অভিজিতের লেখা এক ডজন বই প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা (৩৫) নিয়মিত ব্লগে লেখার পাশাপাশি এনালাইসিস্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। একমাত্র কন্যা তৃষা আহমেদ (১৮) লেখাপড়া করেন সেখানে। ‘এ’ লেভেল শেষ করার পর সমপ্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন তিনি।

অচলাবস্থার শেষ কোথায়?

রাজধানীতে যানবাহনের আধিক্যে ২০ দলীয় জোটের অবরোধ-হরতাল কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাস্তাগুলোয় প্রায় স্বাভাবিক কার্যদিবসের মতোই যানবাহন চলছে, কোথাও কোথাও যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এতে মনে করার কারণ নেই, নাশকতা বন্ধ হয়েছে। বরং গত দুদিনে নাশকতার প্রকোপ আরও বেশি লক্ষ্য করা গেছে। আতংক ও নিরাপত্তার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই মানুষ প্রয়োজনে ও পেটের দায়ে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে। রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে। এর যে ক্ষতি, তা কারও বা কোনো রাজনৈতিক দলের একার নয়, বরং এ ক্ষতি সামষ্টিক। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ কথাটিই অনুধাবন করছেন না আমাদের রাজনৈতিক নেতারা। সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই যার যার অবস্থানে অনড়। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল থেকে আলোচনা-সমঝোতার আহ্বান জানানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যারা সহিংসতা করছে তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হতে পারে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত সহিংসতা বন্ধে সফল হতে পারেনি সরকার। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। আইনশৃংখলা বাহিনী দিয়ে তা করা না গেলে সরকার কোন পথে যাবে? বস্তুত যেকোনো সংকট উত্তরণে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া বর্তমান সংকটটি রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবেই এর সুরাহা হওয়া উচিত।
অপরদিকে অবরোধ-হরতালকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা চলছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যেভাবে বাসে-ট্রাকে-ট্রেনে পেট্রলবোমা ও ককটেল নিক্ষেপ করে সহিংসতা চালানো হচ্ছে, তার টার্গেট হচ্ছেন নিরীহ মানুষ, যাদের সঙ্গে সরাসরি রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি দাবি আদায়ের কোনো পন্থা হতে পারে না। ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করা হলেও বাস্তবতা হল অবরোধ-হরতালকে কেন্দ্র করেই সহিংসতা হচ্ছে। হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করা রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সহিংসতার মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শন করে জনগণকে তা পালনে বাধ্য করা আইনবিরুদ্ধ কাজ। বর্তমানে এ সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা মারাÍকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। এটি কোনো যুক্তিতেই বরদাশত করা যায় না। আমরা মনে করি, বিরোধী পক্ষের উচিত অবিলম্বে অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা। এর ফলে সহিংসতা বন্ধ হবে। একই সঙ্গে এটি আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। তখন সরকারও আর বলতে পারবে না, সহিংসতাকারীদের সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়।
আলোচনার উদ্যোগ আগে নাকি আগে সহিংসতা বন্ধ- এ নিয়ে অচলাবস্থা চলতে থাকলে সংকটের কোনো সুরাহা হবে না। বন্ধ হবে না সহিংসতাও। আলোচনার ব্যাপারে উভয় পক্ষের নেতৃত্ব পর্যায়ে গোপনেও এক ধরনের মতবিনিময় হতে পারে। শত বৈরী পরিবেশেও এমনটি হওয়ার নজির আছে। এভাবে আলোচনার বিষয়ে একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে ২০ দলীয় জোট অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করে নিতে পারে। তখন আলোচনার পরিবেশ তৈরি হবে। সংকট উত্তরণে উভয় পক্ষেরই উচিত দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দেয়া। নতুবা এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না। এটা অনুধাবন করে তারা অবিলম্বে একটি ঐকমত্যে আসবেন, এটিই দেশবাসী আশা করে।

সবচেয়ে বেশি ওজনের শিশু

ভারতের ঝাড়খন্ডের বাসিন্দা সেলিম-শাবানা দম্পতির সন্তান আলিয়ার জন্মের সময় ওজন ছিল মাত্র ৯ পাউন্ড। কিন্তু চার মাস বয়স থেকেই তার ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। এখন তার বয়স ১০ মাস হলেও শারীরিক গড়ন ৬ বছরের শিশুর মতো। তার বর্তমান ওজন ১৮ কেজি ৬শ’ গ্রাম। এ বয়সীদের মধ্যে আলিয়াই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ওজনের শিশু। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন আলিয়ার মা-বাবা। কেননা ওজন সমস্যার কারণেই মাত্র দেড় বছর বয়সে মারা গেছে তাদের প্রথম সন্তান।
সম্প্রতি আলিয়াকে দিল্লির একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার ডা. কিষান চুগের ধারণা, স্থূলতা কিংবা হরমোন সংক্রান্ত জটিলতায় ওজন সমস্যায় ভুগছে আলিয়া।
আলিয়ার মা শাবানা পারভীন বলেন, জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই ওর ওজন দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারছি না। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকরাও শিশুটির সমস্যা শনাক্ত করতে পারছেন না। শাবানা জানান, শারীরিক সমস্যায় থাকলেও গ্রামের সবাই আলিয়াকে ভালোবাসে। আশপাশের বাচ্চারা ছুটে এসে ওর সঙ্গে খেলে। ওয়েবসাইট।

কী শর্তে আড়ি পাতা? by মিজানুর রহমান খান

বিশ্বের দেশে দেশে আড়ি পাতা নিয়ে বড় ধরনের কোনো হুলুস্থুল বঁাধলেই অনেকেই জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি–ফোর নামের ব্যঙ্গ উপন্যাসটি স্মরণ করেন। অরওয়েলের কল্পরাজ্যটাই ছিল এক আড়ি পাতার রাজ্য। এ রাজ্যের নৃপতি বিগ ব্রাদার, যার মূল দর্শন হলো অব দ্য পাওয়ার, বাই দ্য পাওয়ার, ফর দ্য পাওয়ার। তাঁর একটি উক্তি হলো: টোটালিটারিয়ানিজম (যে রাজনৈতিক দল একটি দল ভিন্ন অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে মানতে রাজি নয়) দ্বারা দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে কারও বরং তেমন দেশে বাস করারই দরকার নেই। বিএনপি ও জামায়াত ২০০৬ সালে আমাদের দেশটাকে অন্তত অনেকখানি আড়ি পাতা রাজ্যে রূপান্তরিত করে রেখে যায়। সংবিধান বলেছে, জরুরি অবস্থায় গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারসংক্রান্ত ৪৩ অনুচ্ছেদটি স্থগিত করা যাবে না। অথচ খালেদা জিয়ার গড়ে দেওয়া আইন বলছে, জরুরি অবস্থা না থাকলেও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা নৈরাজ্য দেখা দিলে এর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে। বেশি সরলীকরণ হবে কি না জানি না, তবে বিএনপি জঙ্গি দমনের নামে একটি বেপরোয়া টেলিযোগাযোগ আইন করে ব্যক্তিস্বাধীনতার যে বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গেছে, তা জর্জ অরওয়েলের আড়ি পাতা রাজ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিএনপি সম্ভবত কেবল জঙ্গি নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতেও ওই গর্ত খুঁড়েছিল বলে আমি সন্দেহ করি। সেই গর্তে নিজের সঙ্গে তারা দেশবাসীকেও ফেলেছে।
মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাদেক হোসেন খোকার ফাঁস হওয়া আলোচিত কথোপকথন আমাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্র কি বিশ্বস্ততার সঙ্গে সু-আইনের সুশাসনের শর্ত পূরণ করবে, নাকি আগেভাগে ফাঁস করে দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করবে? রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই মিডিয়া ট্রায়ালকে উৎসাহিত করতে পারে না, তাকে অবশ্যই আদালতের বিচারে আস্থাশীল হতে হবে। এটা না করা হলে সত্যি যখন কোনো উপযুক্ত ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থে দ্রুত বিচার কাম্য হবে, তখন তা বিঘ্নিত হতে পারে। আদালতে পেশযোগ্য কোনো বৈধ আলামতকে লিফলেট বানানোর কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আড়ি পাতা–সংশ্লিষ্ট মামলায় কারও বিচারের ক্ষেত্রে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনে যে সুপ্রতিষ্ঠিত রক্ষাকবচ ছিল, তাও বাতিল হয়ে গেছে। বলা হয়েছে, সাক্ষ্য আইন লাগবে না, আড়ি পাতা মালমসলা দিয়েই বিচারকাজ চলবে। প্রযুক্তি আইনজ্ঞ তানজীব-উল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে বিচার চাইতে হলে মাহমুদুর রহমানকেই মামলা ঠুকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের কথোপকথন অবৈধভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কথোপকথন দলিল হিসেবে উপস্থাপন করলে রাষ্ট্রকে রেকর্ড করার দায় নিতে হবে। আর অবৈধভাবে রেকর্ড করা হলে তা পেশ করতে আদালতের অনুমতি লাগবে। সে ক্ষেত্রে যারা প্রকাশ করেছে, তাদের বিষয়টি গৌণ হয়ে যাবে।’
অবশ্য মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাদেক হোসেন খোকা দুজনেই ওই টেলিফোন আলাপের কথা স্বীকার করেছেন। মার্কিন আইনে অবৈধ রেকর্ড অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবহার গ্রহণযোগ্য হয় না। ব্রিটেনেও চলে না, কিন্তু অন্যান্য প্রমাণ দিয়ে তা সমর্থিত হলে অবৈধ রেকর্ড বাধা হয় না। তবে সেখানে আড়ি পাতার শিকার হওয়া ব্যক্তির সুরক্ষায় আলাদা আদালতসহ অনেকগুলো সুরক্ষা আছে। আর বাংলাদেশে আড়ি পাতার ‘বৈধ’ আলামত ক্রমশ অজ্ঞাতনামা লিফলেটে পরিণত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এর আগে দুই নেত্রীর টেলিফোন সংলাপ কারা কীভাবে ফাঁস করল, তা আমাদের এখনো অজানা রয়ে গেছে।
আমাদের আইনে সাধারণভাবে আড়ি পাতা নিষিদ্ধ। আপনি চাইলেই যে কারও ফোনে আড়ি পাততে পারেন না। অবৈধ আড়ি পাতাকে নিরুৎসাহিত করতে দুই বছরের জেল ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেওয়ারও বিধান রাখা হয়েছে। তবে সরকার থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থার কোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে না।
বিএনপির বিগত সরকারের আমলে টেলিযোগাযোগ আইনে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে বিশেষ বিধান আনা হয়েছিল। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্পের আওতায় কামাল হোসেন অ্যাসোসিয়েটস টেলি আইনের খসড়া করেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত থাকা তানজীব-উল আলম বলেন, ‘আমরা ১৯৯৭-৯৮ সালে খসড়া তৈরির সময় বিধান করেছিলাম যে বিটিআরসির কাজ হবে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা। আইনটি প্রথমে আওয়ামী লীগই পাস করেছিল। কিন্তু টুইন টাওয়ার ও বাংলা ভাইদের জঙ্গিত্বে বদলে যাওয়া পটভূমিতে বিএনপি একে কঠোর করে। গোপনীয়তা সুরক্ষার বিধান বাস্তবে উল্টে যায়।’ তবে অনেকে দাবি করেন বিএনপি পরে যেসব বিধান ঢুকিয়েছিল, তেমন বিধান অন্যান্য দেশে রয়েছে। আমি এর সঙ্গে দ্বিমত করি। কারণ, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভারতেও আড়ি পাতা বৈধ। কিন্তু তার সুষ্ঠু প্রয়োগে ব্রিটেনের মতো ভারতেও অসাধারণ রক্ষাকবচ দেওয়া আছে, সে তুলনায় বলা চলে বাংলাদেশের শাসকেরা তাঁদের প্রজাকুল বা সাবজেক্টদের জন্য তেমন কিছুর কথা একদম ভাবেননি।
২০০১ সালের আইনে ২০০৬ সালে ৯৭ক ধারা যুক্ত করে বলা হয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে যেকোনো বার্তা ও কথোপকথন প্রতিহত, রেকর্ড ধারণ বা তথ্যাদি সংগ্রহ করা যাবে। তবে এ জন্য ‘সরকার সময় সময় নির্ধারিত সময়ের জন্য’ গোয়েন্দা বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থার কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা দিতে পারবে। এখানে ভারতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলেই আপনার কাছে বাংলাদেশের নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারবিধ্বংসী ভয়ানক চিত্রটি পরিষ্কার হবে। ‘সরকার’ বলতে দিল্লির মতো ঢাকাতেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বোঝায়। আমাদের আইন বলছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এই বিধান প্রয়োগযোগ্য হবে। স্বরাষ্ট্রের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেন্টার এনটিএমসি আছে। কিন্তু সেটা বাস্তবে কী করে চলে তা আমাদের জানা নেই।
বাক্স্বাধীনতার সঙ্গে ইন্টারনেট ইত্যাদি বিষয়ক কালাকানুন, যা বিএনপি-জামায়াত করে গেছে, তা সংবিধানের ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘যুক্তিসংগত বাধানিষেধ’-এর শর্ত কতটা কী পূরণ করেছে, বিশেষ করে তা কীভাবে আওয়ামী লীগের ‘প্রগতিশীল’ শাসনের সঙ্গে খাপে খাপ মিলে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। বিএনপি-জামায়াতের সৃষ্টি করা ডিক্রিগুলো দিয়ে আওয়ামী লীগ কীভাবে আইনের শাসন চালাচ্ছে, তার একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে তাদের মাইলফলক রায়ে যা বলেন, তা আমাদের দেশে অনুসরণীয় হওয়া উচিত। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খেয়াল-খুশিমাফিক আড়ি পাতার অনুমতি দিতে পারবে না। তাকে তার প্রতিটি আদেশে উপযুক্ত ও শক্তিশালী কারণ দেখাতে হবে। কোনো আদেশের মেয়াদ অনির্দিষ্টকাল হবে না। দুই মাস মেয়াদ থাকবে। এরপর আবার কারণ দেখিয়ে উপযুক্ত কমিটি দিয়ে বাড়ানো যাবে, কিন্তু তা ছয় মাসের বেশি হবে না। আবার এভাবে আড়ি পেতে যে রেকর্ড করা হবে, তা রেকর্ড করা থেকে দুই মাসের মধ্যে ব্যবহার ও তা ধ্বংস করে দিতে হবে। যেকোনো মূল্যে অবৈধ আড়ি পাতা এড়াতে হবে। কারও গোপনীয়তায় অনুপ্রবেশ হতে হবে ন্যূনতম।’ ১৯৯৬ সালে পিইউসিএল বনাম ভারত মামলায় বিচারপতি কুলদীপ সিং ও এস সগির আহমেদ রায়ের শুরুটাই করেছেন এই বলে যে আড়ি পাতা ব্যক্তির গোপনীয়তায় একটি মারাত্মক আগ্রাসন। আদালতের দেওয়া শর্তে আছে, কোনো রেকর্ডের কতটি অনুলিপি হবে, কতটুকুর ট্রান্সক্রিপশন হবে, কে কে দেখতে পাবেন, সেসব প্রাথমিক অনুমতির আদেশেই নির্দিষ্ট করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট এমনকি মন্ত্রিসভা, আইন ও টেলিযোগাযোগ—এই তিন সচিব দিয়ে রিভিউ কমিটি গঠনের উপায় বাতলে দেন। আমরা আশ্বস্ত হতে চাই যে আমাদের রাষ্ট্র ওই ধরনের কিংবা ন্যূনতম সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে সংকল্পবদ্ধ। আমরা জানতে চাই, ২০০৬ সালের সংশোধনীতে দেওয়া ক্ষমতার কোনো অপব্যবহারের তদন্ত এ পর্যন্ত হয়েছে কি না? হলে তার ফলাফল কী?
ভারতের ওই রায়ে দেখি, আড়ি পাতা অপব্যবহারের ঘটনা সিবিআই তদন্ত করেছিল। আর তাতে দেখা যায়, ১৮০ দিনের সময়সীমা পেরোনোর পরেও ১১১টি কলে আড়ি পাতা চলছিল। একটি এজেন্সি কত কলে আড়ি পেতেছে তার লগবুক রাখেনি। ওই মামলায় নাগরিক সমাজের পক্ষে সুপারিশ ছিল যেকোনো আড়ি পাতার আদেশে কমিটির সইয়ের আগেই বিচার বিভাগীয় যাচাই-বাছাইয়ের দরকার হবে। আড়ি পাতার কোনো আদেশ হওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে তা একটি বোর্ডে আসবে। আমরা মনে রাখব, এই আড়ি পাতার সঙ্গে মিডিয়ার স্বাধীনতার নাড়ির সম্পর্ক থাকতে বাধ্য। সে জন্য বিচারপতি পি কে গোস্বামীর নেতৃত্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রেস কমিশন সুপারিশ করেছিল যে, যেভাবে কোনো ডিটেনশন আদেশ রিভিউ হয়, সেভাবে কোনো আড়ি পাতার আদেশ হওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে তা রিভিউর জন্য বোর্ডে আসবে।
উল্লেখ্য, আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আমাদের সংবিধানে একটি উপদেষ্টা পর্ষদ করে দেওয়া আছে। এ রকম কোনো পর্ষদের কাছে আড়ি পাতার আদেশ রিভিউর জন্য প্রেরণের নিয়ম করা যায়। ওই পর্ষদ অনুমোদন না দিলে আড়ি পাতা তাৎক্ষণিক বন্ধ করতে হবে। আলামত ধ্বংস করতে হবে। আড়ি পাতা ক্ষমতার অপব্যবহারকে গুরুতর অসদাচরণ গণ্যে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২০০৬ সালের মে মাসে বিএনপির আড়ি পাতা আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের দায়ের করা একটি রিটে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে এর উত্তরদানের আদেশে সাড়া দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ। কিন্তু রাষ্ট্র নীরবতা বজায় রাখছে। তাই এসব বিষয়ে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইটা যত তাড়াতাড়ি বেগবান করা যায়, ততই উত্তম। আমরা একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকারের সংকোচনের বিধানসংবলিত আড়ি পাতা আইনের বৈধতা পরখ ও তা প্রয়োগের ব্যাপারে স্বচ্ছতা চাই। একটি গাইডলাইন ও তার বাস্তবায়ন চাই।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

হরতাল সাহেব মারা গেছেন! by মনজুরুল হক

মৃত্যুর সংবাদ সর্বদা বেদনাদায়ক নয়। বাংলাদেশে হরতাল সাহেবের যে মৃত্যু, সেই সত্য আবারও আমাদের সামনে প্রতিভাত হলো। আর হরতাল সাহেবের এই মৃত্যুর জন্য যে টোটকা চিকিৎসক এর চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন, সেই সালাহউদ্দিন আহমদকেও অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হয় বাংলাদেশকে হরতাল নামের এক অভিশাপ থেকে মুক্ত করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায়। আমার  মনে হয় না, জুতসই একটি রাজনৈতিক অস্ত্রের এতটা ঢালাও অপপ্রয়োগে তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা নিয়োজিত না থাকলে এতটা সহজে হরতাল সাহেবের খপ্পর থেকে আমরা মুক্ত হতে পারতাম। হরতাল যে দাবি আদায়ের শেষ অস্ত্র, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সেই দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া জনতা এর সঙ্গে যুক্ত থাকলেই কেবল গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, অন্যথায় নয়। এই সত্য যাঁদের জানা নেই, হরতাল তাঁদের কাঁচা হাতের খেলায় এমন ভোঁতা অস্ত্র হয়ে ওঠে, জনগণের অধিকার আদায়ের বদলে যা কিনা নাগরিক জীবনকে করে তোলে অতিষ্ঠ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও এর সূত্র ধরে হরতালের মৃত্যু সেই ধ্রুব সত্যকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে দিল। আর তাই আশা করা যায় যে অর্থহীন হরতালের তিক্ত যন্ত্রণা থেকে আমাদের সমাজ আর অর্থনীতি এখন মুক্ত হয়ে আবারও সামনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশে হরতালের মতো আত্মঘাতী পথ অবলম্বন করা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটা চিন্তা করে দেখার উপযুক্ত সময় মনে হয় এখন উপস্থিত। বিশ্বায়নের কথা যাঁরা বলে বেড়ান, বিশ্বের দিকে আরেকটু ভালোভাবে নজর দিলে হরতালের এই আত্মঘাতী দিক এবং সে কারণে বিশ্বজুড়ে সেই পথে রাজনীতিবিদদের পা না বাড়ানো তাঁরা নিশ্চয় আরেকটু ভালোভাবে অনুভব করতে সক্ষম হবেন।
প্রথমেই যে বিষয়টি হরতাল-সমর্থকদের বিবেচনা করে দেখা দরকার, তা হলো মানবাধিকারের সংজ্ঞার দিক থেকে হরতাল কতটা গ্রহণযোগ্য। সর্বজনীন মানবাধিকারের যে সনদ জাতিসংঘ অনুমোদিত এবং বিশ্বের সব কটি দেশে স্বীকৃত, সেই সনদের ১৩ নম্বর ধারার প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতরে প্রত্যেক মানুষের চলাচল ও বসবাসের স্বাধীনতা রয়েছে।
মানবাধিকার সনদের এই ধারার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হলে হরতাল আমাদের অবশ্যই বর্জন করা দরকার। আমার চলাচলের স্বাধীনতার ওপর প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অধিকার হরতাল আহ্বানকারীর আছে কি? মানবাধিকারের সংজ্ঞা তো সেই অধিকার তাকে দেয় না।
তার পরও কেন হরতাল? পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এভাবে বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠীর গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত গায়ের জোরে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নজির নেই। উন্নত বিশ্বের কথা আমরা নাহয় বাদই দিলাম, কেননা সেখানে সে রকম কিছু একটা কেউ করতে গেলে আইনের মারপ্যাঁচে তার বা সেই গোষ্ঠীর কুপোকাত হয়ে পড়া অবধারিত। শুধু তা-ই নয়, একই সঙ্গে শ্রীঘরবাসের ব্যবস্থাও এর মধ্য দিয়ে তাদের জন্য হয়ে যাবে। উন্নত সেই বিশ্বের বাইরে নজর দিলেও খুব বেশি দৃষ্টান্ত খুঁজে বের করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর আরেকটি কারণ বিশ্বায়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্বের কোনো দেশের অর্থনীতিই এখন আর আগের মতো সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির চাকা অবিরাম সচল থাকার মুখে নিজের দেশে সেই চাকা বন্ধ করে দেওয়া অন্যের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, নিজের জন্য সেই ক্ষতির মাত্রা হচ্ছে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। হরতালের মধ্য দিয়ে যেনতেন উপায়ে অধিকার আদায় করে নেওয়া সম্ভব হলেও সেই ক্ষতি কোনো অবস্থাতেই পুষিয়ে নেওয়ার নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে বিদেশের ক্রেতাদের ইদানীংকার ভাবনাচিন্তা তো সে কথাই বলে। উন্নত বিশ্বের তৈরি পোশাকের বাজার ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। শীত মৌসুম শেষ হয়ে আসার আগেই বসন্তের নতুন ডিজাইনের সাজ-পোশাকে দোকান সাজিয়ে নিতে না পারলে দোকানির লোকসানের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। যে মৌসুমে দুই মাসের টানা হরতালের খপ্পরে আমরা পড়ে গেছি, সেটা হচ্ছে পাইকারদের বসন্তের পণ্য সরবরাহ পাওয়ার মৌসুম। জটিল অঙ্কের হিসাব নয়, বরং সাধারণ যুক্তি বলে দেয় যে হরতাল আর অবরোধে যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়লে পশ্চিমের পাইকারেরা হরতাল শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে যে দেশ হরতালমুক্ত অবস্থায় সরবরাহ দিতে সক্ষম, সেই দেশের দিকে ঝুঁকে পড়বে। মূল্য এ ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি দিতে হলেও আপত্তি তাদের নেই। বাস্তবেও ঘটছে কিন্তু তা–ই।
জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে টোকিওতে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের বেশ কিছু পোশাক ও চামড়াশিল্পের প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। তবে জাপানি পক্ষের সাড়া সেখানে ছিল খুবই সতর্কতামূলক। এর কারণ এই নয় যে বাংলাদেশে তৈরি পণ্যের মান নিয়ে তারা অসন্তুষ্ট। বরং কারণটি ছিল সেই একই উদ্বেগ, অর্থাৎ রাজনৈতিক টালমাটালে মৌসুম ধরতে পারা আমদানিকারকদের পক্ষে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দেওয়া দুর্ভাবনা। এ রকম এক সময়ে সেটা ঘটেছে, যার মাত্র কিছুদিন আগে জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংগঠন জেট্রো বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনার ওপর প্রকাশিত একটি বইয়ের শিরোনামে উল্লেখ করেছিল, ‘এখনই সময়’, যার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের সক্রিয় হয়ে ওঠা বিনিয়োগ পরিবেশের সুযোগ নিতে হলে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটাই হচ্ছে সঠিক সময়। আমরা জানি, এর ঠিক পর পর শুরু হয়ে যায় টানা হরতাল, যার মধ্য দিয়ে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে সেই বিনিয়োগ পরিবেশের অনেকটাই আমরা এখন নষ্ট করে দেওয়ার পথে রয়েছি।
সহজ এই বিষয়টি আমরা বুঝতে না পারলেও বিদেশে অনেকেই কিন্তু সেটা বুঝতে পারছেন এবং বুঝতে পারছেন বলেই বাংলাদেশের জন্য একধরনের বেদনাও তাঁরা বোধ করছেন। বাংলাদেশকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসেন সে রকম একজন বিদেশি হলেন জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাৎসুশিরো হোরিগুচি। জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় এক দশকের বিরতিতে বাংলাদেশ সফর করেন তিনি। সেটা ছিল হরতাল আর অবরোধের সময়। জাপানে ফিরে এসে ছোট একটি নিবন্ধ তিনি লিখেছিলেন টোকিওতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবেশন করার জন্য। গত এক দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি যে চোখে পড়ার মতো, তার উল্লেখ করে সেখানে তিনি বলেছেন:
‘বাংলাদেশে থাকা অবস্থাতেই যে ভাবনা একসময় আমার মাথায় এসেছিল তা হলো, মাতৃভাষার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতাসংগ্রাম পর্যন্ত যে লাখ লাখ মানুষ তাঁদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, স্বাধীন দেশ হিসেবে গত ৪৪ বছরের অগ্রগতিকে তাঁদের আত্মা কীভাবে দেখবেন। আমার ভাবতে ইচ্ছা করে যে এঁদের প্রায় সবাই জনতার কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অর্জিত অগ্রগতিতে সন্তোষ বোধ করলেও তাঁরা হয়তো এ রকমও ভাববেন যে এত বেশি জীবনের মূল্যের বিনিময়ে পাওয়া দেশটি হয়তো আরও একটু এগিয়ে যেতে পারত। তাঁরা হয়তো এ রকমও ভাববেন যে সেই অর্জন অবশ্যই সম্ভব হতো, রাজনৈতিক দলগুলো যদি একে অন্যের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে হরতাল, নাগরিকদের জীবনহানি, সম্পদ ধ্বংস করা, অর্থনীতির ক্ষতিসাধন ও পথচারীদের সুখী জীবন বাধাগ্রস্ত করায় জড়িত না হতো।’
নিজেদের পায়ে সমানে কুঠারাঘাত করে যাওয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো রাজনীতির চোখ ধাঁধানো চমকে আমাদের চোখে না পড়লেও বাংলাদেশের দিকে ভালোবাসার চোখ মেলে তাকানো বিদেশিরা কিন্তু তা ঠিকই দেখতে পাচ্ছেন। ফলে মানবাধিকার বলুন আর অর্থনীতির হিসাব-নিকাশই বলুন, কোনো দিক থেকেই দেশের উপকারে আসার মাধ্যম হরতাল হতে পারে না। সংকীর্ণ ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থই কেবল এর মধ্য দিয়ে উদ্ধার হতে পারে এবং শুধু সেটুকুই।
আসুন, হরতালের মৃত্যুতে তাই কেবল আনন্দ অনুভব করাই নয়, বরং একই সঙ্গে সে রকম শপথও আমরা নিই যে মৃত হরতালের প্রেতাত্মা পুনর্জন্ম লাভ করে আবারও যেন ফিরে আসতে না পারে, সে ব্যাপারে আমরা সজাগ থাকব। যত দিন আমরা পরাধীন ছিলাম, নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই যত দিন আমাদের চালিয়ে যেতে হয়েছে, হরতালের গ্রহণযোগ্যতা তখন সার্বিক জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে
স্বীকৃতি পেলেও স্বাধীন দেশে জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় সেই কৌশলের প্রয়োগ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে নিজের ক্ষতি ডেকে আনাই নয়, একই সঙ্গে তা হচ্ছে মানুষের স্বীকৃত অধিকারকেই অপমানিত করা। রাজনৈতিক অধিকারের নামে হরতালে যাঁরা সায় দিচ্ছেন, এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে তাঁরাও উপকৃত হবেন এবং বিদেশি অর্থের চালান আসার অপেক্ষায় প্রহরও তাঁদের গুনতে হবে না।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক৷

দুই বাংলার পুনঃএকত্রীকরণ কিভাবে চাচ্ছেন? by ইকতেদার আহমেদ

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাভূত করে বাংলার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে তাদের শাসনের সূচনা করে। সিরাজউদ্দৌলার শাসনকার্য বাংলার বাইরে বিহার ও উড়িষ্যা অবধি বিস্তৃত ছিল। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভের ইংরেজ বাহিনীর নিকট সিরাজউদ্দৌলার পতন হওয়ার পর দিল্লি ইংরেজদের দখলে আসতে ১০০ বছর লেগে যায়। এরপর ভারতবর্ষে ইংরেজদের শাসনের স্থায়িত্ব ছিল ৯০ বছর।
ভারতবর্ষের বাংলা, দিল্লি, হায়দরাবাদ, মহিশুর প্রভৃতি অঞ্চল ইংরেজদের দখলে আসার আগমুহূর্ত পর্যন্ত মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আগমনের আগ থেকে প্রায় এক হাজার বছর ধরে এ উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমানেরা পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির ভিত্তিতে বসবাস করে আসছিল। ভারতবর্ষ মুসলমানদের শাসনাধীন থাকাবস্থায় এখানে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা সংঘটনের কোনো নজির নেই। তাছাড়া মুসলিম শাসকেরা তাদের এক হাজার বছরের শাসনামলে এ দেশের হিন্দুদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেছেন, এমন একটি উদাহরণও নেই।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম শাসকদের পরাভূত করে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে তারা প্রথম থেকেই মুসলমানদের বৈরী দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন। এ সুযোগে হিন্দুরা ইংরেজদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পায়। এভাবে প্রথম থেকেই হিন্দুরা ইংরেজদের নৈকট্য লাভ করায় তারা চাকরি, ব্যবসায় ও শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়। সে সময় মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের অপপ্রচারের কারণে মুসলমানেরা ইংরেজি শিক্ষায় অনীহা ছিল। এ অনীহার কারণেই হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানেরা যে পিছিয়ে পড়েছিল তা অনুধাবন করতে মুসলমান নেতাদের অনেক সময় লেগে যায়।
ব্রিটিশ ভারতে বাংলা একটি পৃথক প্রদেশ ছিল। সে সময় বাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ হলেও এর পশ্চিমাংশের কয়েকটি জেলায় হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা চাকরি, ব্যবসায় ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকার কারণে এদেরকে এ তিনটি ক্ষেত্রে হিন্দুদের সমপর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশরা ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাকে বিভাজনপূর্বক পূর্ব বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে একটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করেন। পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার হিন্দুরা বাংলার বিভাজনকে এ অঞ্চলে তাদের স্বার্থের প্রতিপন্ন মনে করে শুরু থেকেই এ বিভাজন রদে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। বিভাজন রদের এ আন্দোলনে হিন্দুরা নেতৃস্থানীয়ের ভূমিকায় পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। বাংলার বিভাজনে রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক জমিদারির প্রায় শতভাগ পূর্ব বাংলায় থাকায় তার বিবেচনায় তা তার পরিবারের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য খুবই হানিকর ছিল। তাই বিভাজনের বছর ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে ও অভিমানে বাংলার অখণ্ডতাকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য রবীন্দ্রনাথ তার ঐতিহাসিক গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালো বাসি’ রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীন বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন ছয় বছরের মাথায় ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে সফলতা পায়। এর ফলে বাংলা পুনঃঅবিভক্ত আকার লাভ করে।
বঙ্গভঙ্গ রদ পূর্ব বাংলার মুসলমান নেতৃবৃন্দকে মর্মাহত ও ব্যথিত করে। সুচতুর ইংরেজরা রদ-পরবর্তী মুসলমানদের ক্ষোভ প্রশমনে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে তা প্রথমেই সমগ্র বাংলার হিন্দু নেতৃস্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে। ইংরেজরা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে গেলে যথারীতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়ে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে এটি যাত্রা শুরু করে। রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে হিন্দু সম্প্রদায় ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা-পরবর্তীতে দেখা গেল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত বেশির ভাগই হিন্দুধর্মাবলম্বী এবং ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও একই ধর্মাবলম্বী। সুদূর অতীত থেকে হিন্দু ও মুসলিম- এ দু’টি ধর্মে বিভক্ত বাঙালিরা একটি একক জাতি হিসেবে বাংলায় বসবাস করে আসছিল। বাংলায় বসবাসরত বাঙালিরা পৃথক দু’টি ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাদের ধর্মীয় অনুশাসনে ভিন্নতা থাকলেও তা তাদের ভাষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে ম্লান করেনি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের বিজয় হলে যুদ্ধ-পরবর্তী ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে স্বাধীনতার দাবি ওঠে। এ স্বাধীনতার দাবিটি দিন গড়িয়ে জোরালো হতে থাকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে অক্ষশক্তির (জার্মান, ইতালি ও জাপান) কাছে মিত্রশক্তি (য্ক্তুরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স) মার খেতে থাকলে ব্রিটিশরা যুদ্ধে এদেশীয়দের সহায়তার বিনিময়ে স্বাধীনতার আশ্বাস দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের বিজয় ঘটলে এ দেশের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ স্বাধীনতার দাবিতে আবারো সোচ্চার হয়। সে সময় এ দেশে প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের একটি হলো হিন্দু প্রাধান্য-বিশিষ্ট কংগ্রেস এবং অপরটি মুসলিম প্রাধান্য-বিশিষ্ট মুসলিম লীগ। কংগ্রেস প্রথম থেকেই হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় সমন্বয়ে অবিভক্ত স্বাধীন ভারতের দাবি করে আসছিল। অপর দিকে মুসলিম লীগের দাবি ছিল, যেসব প্রদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব প্রদেশ সমন্বয়ে এক বা একাধিক পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র হবে। উভয় দলের দাবি-পাল্টা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে প্রথম যে প্রস্তাব দেয়া হয় তাতে বলা হয়, ভারতবর্ষ একটি ডমিনিয়ন হবে, যা সম্পূর্ণরূপে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। ব্রিটিশদের এ প্রস্তাবটি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে তারা দ্বিতীয় প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে। এ প্রস্তাবটিতে বলা হয় ভারতবর্ষের পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশগুলোর সমন্বয়ে এ, বি ও সি- এ তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ফেডারেল কাঠামোর অধীন একটি কনফেডারেশন হবে। এ প্রস্তাবটিও যখন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় তখন শেষ অবধি ইংরেজরা হিন্দু ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সমন্বয়ে দু’টি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নেয়। তা ছাড়া কিছু কিছু মহারাজা ও রাজা-শাসিত অঞ্চলকে তারা মহারাজা বা রাজার ইচ্ছানুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার স্বাধীনতা দেয়।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভারতবর্ষের ছয়টি প্রদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এ ছয়টি প্রদেশ হলো বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ; যার বর্তমান নাম খাইবার পোখতুন খোয়া ও কাশ্মির।
স্বাধীনতার আগের বছর বাংলা ও পাঞ্জাবে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এ দাঙ্গা পরবর্তীকালে বিহার ও দিল্লিতেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ও পাঞ্জাবে দাঙ্গায় বহু নিরীহ হিন্দু ও মুসলমান নরনারীর মৃত্যু ঘটে। এ সংখ্যাটি ছিল প্রায় ছয় লাখ। বাংলা ও পাঞ্জাবের দাঙ্গায় ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ দাবি উত্থাপন করেন, হিন্দু ও মুসলমান- এ দু’টি ধর্মাবলম্বীদের ভিত্তিতে দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা তারা মেনে নেবেন, যদি একই ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাবকে বিভাজন করা হয়। উভয় সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা ইংরেজদেরও বিচলিত করে তুলেছিল এবং শেষ অবধি তারা কংগ্রেসের দাবি মেনে নিয়ে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাজনে সম্মত হন।
ভারতবর্ষ বিভাগের অব্যবহিত আগে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এদের তিনজনের কলকাতা পৌর করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালনেরও সুযোগ ঘটেছিল। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে যখন বাংলাকে বিভাজন করা হয় তখন এর বিরোধিতা আসে হিন্দুদের মধ্য থেকে। অতঃপর ভারতবর্ষ বিভাজনের সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ হিসেবে যখন অবিভক্ত বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে চলে তখন হিন্দু নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাকে বিভাজিত করে পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পশ্চিম বাংলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া পূর্ব পাকিস্তান তার রজতজয়ন্তীতে পৌঁছানোর আগেই জাতিগত জাতিসত্তার ভিত্তিতে পৃথক হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আলাপ আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে হলেও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের পৃথক হওয়া শান্তিপূর্ণ ছিল না।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ বিভাজনের সময় পেছনের মূল দর্শন ছিল ধর্মীয় জাতিসত্তা। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয় তখন তাতে জাতিগত জাতিসত্তার প্রভাব ছিল মুখ্য। ভারতের পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সম্প্রতি কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, জাতি হিসেবে উভয় বাংলার বাঙালিরা এক, ধর্ম তাদের শুধু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে পৃথক করেছে কিন্তু তাতে বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে কোনো ধরনের বিভেদের সৃষ্টি হয়নি। তার এ বক্তব্যের পর এক মাস না পেরোতেই তিনি বাংলাদেশ সফরে আসেন। তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক নেতারা। তার বাংলাদেশে অবস্থানকালীন পশ্চিম বাংলার চিত্রনায়ক দেব এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গৌতম আবেগাপ্লুত হয়ে দুই বাংলা একীভূত হওয়ার দাবি তোলেন। তাদের এ দাবির ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হলেও বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, ভারতের পশ্চিম বাংলার শতকরা ৯০ ভাগের অধিক অধিবাসী বাঙালি বিধায় তাদের সাথে তাদের রাজ্যের লাগোয়া ভারতের অন্যান্য রাজ্য যেমন বিহার, উড়িষ্যা, আসাম প্রভৃতির অধিবাসীদের জাতিগত জাতিসত্তা ভিন্ন হওয়ার কারণে ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সভ্যতা সম্পূর্ণ আলাদা। এ কথাটি সত্য, ভারতবর্ষ বিভাজনের পর তিন যুগ পার হওয়ার আগেই প্রমাণিত হলো যে, ধর্মীয় জাতিসত্তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দু’টি পৃথক জাতিকে এক রাখতে পারে না। আর এ কারণে দেখা যায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও পৃথক জাতিসত্তার কারণে তারা ধর্মীয় নয় জাতিগত জাতিসত্তার ভিত্তিতে স্বাধীন দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অধিবাসীদের ধর্ম ও ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত জাতিসত্তার ভিন্নতায় তারা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র।
ভারতের পশ্চিম বাংলার চিত্রনায়ক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তথাকার মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে উভয় বাংলা একীভূত হওয়ার যে দাবি উত্থাপন করেন তাতে জনমতের প্রতিফলনে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থন রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। পশ্চিম বাংলার বাঙালি এবং বাংলাদেশের বাঙালিরা যে বাংলা ভাষাভাষী একই জাতি এ প্রশ্নে কোনো বিতর্ক নেই। ধর্মীয় জাতিসত্তা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে না পারায় এ কথাটি সত্য যে, শুধু ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে দু’টি জাতিকে এক রাষ্ট্রভুক্ত করে রাখা যায় না। পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা জাতিগত জাতিসত্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আজ উভয় বাংলা একীভূত করে এপার বাংলা ওপার বাংলার যে অবসান ঘটাতে চাচ্ছেন তাকে বাস্তবরূপ দিতে গেলে পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের স্বভূমি থেকেই দিল্লিকে তাদের চাওয়ার কথা জানিয়ে দিতে হবে। আর নিজ ভূমিতে এ বিষয়ে চুপচাপ থেকে পরভূমিতে এসে এ ধরনের কথা বলা নিছক ধূম্র্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে সাময়িক নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দেখানোর প্রচেষ্টা বৈ অন্য কিছু নয়।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান ও
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

ফোনালাপকারী সেই ব্যবসায়ী আটক? by তোহুর আহমদ

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় নিয়ে ফোনালাপকারী সেই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তার পুরো নাম মশিউর রহমান মামুন। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। বর্তমানে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন বলে সূত্র দাবি করছে। তবে তাকে আটক করার বিষয়টি এখন পর্যন্ত দায়িত্বশীল কেউ স্বীকার করেননি।
সূত্র জানায়, মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে ২৩ ফেব্র“য়ারি ভাইবারে ফোনালাপের সময় উল্লিখিত মামুন রাজধানীর ধানমণ্ডিতে অবস্থান করছিলেন।
এমন তথ্য জানার পর গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয় যে, এই ব্যক্তি বেশির ভাগ সময় ধানমণ্ডি ১৪/এ এলাকায় অবস্থান করেন। এরপর সন্দেহভাজন এই ব্যক্তি এর আগের এক সপ্তাহ ধরে কোথায় কার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তা জানার উদ্যোগ নেয়া হয়। একই সঙ্গে তার সার্বিক কর্মকাণ্ড নজরদারির মধ্যে আনা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট টিম জানতে পারে, তিনি লন্ডন প্রবাসী একজন ব্যবসায়ী এবং তার সঙ্গে সমাজের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকের যোগাযোগ রয়েছে। এর এক পর্যায়ে তাকে আটক করা হয়।
জানা গেছে, এই মশিউর রহমান মামুন ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে একজন প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় ওই কর্মকর্তার প্রভাবে তিনি বিভিন্ন সরকারি অফিসে দাপটের সঙ্গে ছড়ি ঘুরাতেন। তাকে দেখলে অনেকে গ্রেফতার আতংকে ভুগতেন। দু’বছর মেয়াদি ওয়ান-ইলেভেন সরকার বিদায় হলে তিনি পাততাড়ি গোটানো শুরু করেন।
তাকে শেলটার দেয়া প্রভাবশালী কর্মকর্তার মতো তিনিও বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং এক পর্যায়ে যুক্তরাজ্যে চলে যেতে সক্ষম হন।
সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় নানা উপায়ে উপার্জন করা বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে যুক্তরাজ্যে তিনি একক মালিকানায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ব্যবসায় লগ্নি করা টাকা তিনি হুন্ডিতে নিয়ে যান। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার উপরতলার মানুষের সঙ্গে তার বিশেষ যোগাযোগের নানা মাধ্যমও গড়ে ওঠে।
সূত্র বলছে, এ রকম একটি মাধ্যমে মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে।
মশিউর রহমান মামুনের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার পারসাতুরিয়া গ্রামে। তার গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা যুগান্তরকে জানান, মামুনের পিতার নাম মতিউর রহমান মতি মিয়া। বহুদিন আগে থেকেই তাদের পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে ঢাকায় বসবাস করছেন। গ্রামের বাড়িতে শুধু মামুনের দূরসম্পর্কের এক চাচা থাকেন। এলাকায় তারা তেমন একটা যাতায়াতও করেন না। এলাকাবাসী জানে মামুন স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকলেও বেশির ভাগ সময় তিনি ব্যবসায়িক কাজে থাইল্যান্ডে অবস্থান করেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি থাকেন লন্ডনে।
সূত্র জানায়, ২৩ ফেব্র“য়ারি মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে ফোনালাপের মাত্র এক সপ্তাহ আগে মামুন দেশে আসেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালীন মামুন বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ’ রাখছিলেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন।
জানা গেছে, মামুন নটর ডেম কলেজ থেকে পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
এর আগে তিনি খুলনা রোটারি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক দলের নামে সংবাদ গ্র“প ও সাপোর্ট গ্র“পসহ নানা ধরনের নতুন নতুন সংগঠন তৈরির সঙ্গে যুক্ত।

অমর্ত্য সেন অন্ধকারের মধ্যে আশার আলো ছড়াতে পারতেন by মইনুল হোসেন

আলোচনা না করলে কিছু বদলানো সম্ভব নয়: অমর্ত্য সেন
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর অমর্ত্য সেনের বাংলাদেশ সফরে আসা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়। তার সাম্প্রতিক সফরটি এমন সময়ে হল যখন বাংলাদেশ বিপথগামী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলেছে। এ সময়ে জনগণের উদ্দেশে চিন্তাবিদ হিসেবে যিনি কিছু বলবেন তিনি যে-ই হোন না কেন, তিনি তো অন্ধকারের মধ্যে কিছু আশার আলো ছড়াবেন।
গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর তার পর্যবেক্ষণ যতই গভীর হোক না কেন, তা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা বিভিন্নজন তাদের স্বার্থের অনুকূলে ব্যাখ্যা করতে পারে। মহলবিশেষ তার বরাত দিয়ে বলতে পারে, যেমনটি তারা আগে থেকেই বলে আসছে যে, ব্যক্তিস্বাধীনতা ব্যতিরেকেও গণতন্ত্র হতে পারে। অন্যরা ভিন্নভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারে। একটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক তার বক্তৃতা এ শিরোনাম দিয়ে ছেপেছে, ব্যক্তিস্বাধীনতার বিনিময়ে গণতন্ত্র নয়। এ শিরোনাম বলে দিচ্ছে কেমন করে বক্তব্যের তত্ত্বগত অর্থ যাই হোক না কেন সহজ অর্থে ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। গণতন্ত্র চাই কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতা বাদ দিয়ে নয়। যেন ব্যক্তিস্বাধীনতা ছাড়াও গণতন্ত্র হতে পারে।
আমাদের দেশে বিদ্যমান পটভূমিতে অধ্যাপক সেনের গণতন্ত্র সম্পর্কিত অভিমত বিশেষ তাৎপর্য বহন না করে পারে না, যখন বাংলাদেশ গণতন্ত্রের জন্য সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ সংকট মোকাবেলা করছে। আর যেটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারেই অবিশ্বাস্য, তা হল এ সংকটের উদ্ভব ঘটেছে নতুন করে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে, যার প্রতিশ্র“তি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার সমর্থকরা সেই প্রতিশ্র“তি ভুলে থাকার সব রকম কৌশল গ্রহণ করছেন। ব্যক্তিস্বাধীনতা যেখানে সুরক্ষিত নয়, সেখানে গণতন্ত্র থাকার প্রশ্ন ওঠে না। গণতন্ত্রের প্রয়োজন হয় সবার ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার জন্য।
নির্বাচনী ইস্যু নিয়ে সরকারের দুঃসহনীয় নিবর্তনমূলক আচরণ দেশকে এক জীবনবিধ্বংসী সংঘাতে ঠেলে দিয়েছে। আর সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে পুলিশি শক্তির সঙ্গে রাস্তার শক্তি। পরিস্থিতির বিশেষ আতংকের দিক হচ্ছে, সরকারের কোন এজেন্সি কার কর্তৃত্বে কি করছে তা জানার উপায় নেই। কে কখন কীভাবে কার হাতে গুম হবে বা মৃৃত্যুবরণ করবে তার কারণ দর্শানোর কেউ নেই। চলছে শুধু গ্রেফতার আর গ্রেফতার।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আইন প্রয়োগ করার সময় আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রাখতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের লুকোচুরির আশ্রয় নেয়া যাবে না। আইনসম্মতভাবে যদি কাউকে গ্রেফতার করতে হয় তবে পুলিশের উচিত হবে এ ব্যাপারে কোনো রকম অনিশ্চয়তার আতংক সৃষ্টি না করা।
দেশে যখন হিংসার রাজনীতি চলে, হরদম ধরপাকড় হতে থাকে, কে কখন কীভাবে নিখোঁজ হবে তা যে-কারও জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে পড়ে, তখন পুলিশের গ্রেফতার এবং দুষ্কৃতকারীদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। কাউকে গ্রেফতার করা হলে স্থানীয় পুলিশকে অবশ্যই বিষয়টি জানাতে হবে এবং মধ্যরাতে দরজায় কড়ানাড়া পরিহার করতে হবে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পুলিশের দ্বারা হতে পারে না। পরাধীন ব্রিটিশ আমলেও গভীর রাতে কাউকে গ্রেফতার করা হতো না। স্বাধীন দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেই দায়িত্ব ও দেশপ্রেম বেশি থাকতে হয়। তারা অনেকের চেয়ে বেশি শিক্ষিত এবং তাদের মধ্যে সচেতনতাও বেশি থাকার কথা। পুলিশ এমনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে না, যাতে আইনভঙ্গকারীরা নির্ভয়ে সাধারণ পোশাকে পুলিশ সাজার সুযোগ নিতে পারে। নিজেদের অপরাধগুলো পুলিশের কাঁধে চাপাতে পারে।
প্রফেসর সেনকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন পত্রিকায় বলা হয়েছে : গণতন্ত্রের জন্য ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করতে হবে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকুচিত করার ওপর জোর দিতে গিয়ে তার বক্তব্যে এমন ধারণা সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয় যে, সরকার গণতন্ত্র রক্ষা করার ব্যাপারে আগ্রহী। অথচ ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা গণতন্ত্র নয়। সরকার গণতন্ত্র রক্ষার জন্য মাথা ঘামাচ্ছে এটা মোটেই বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র নয়। সরকারকে বিপরীত পথেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষা পাবে কিনা এটাই মূল সংকট। গণতন্ত্রের জন্য এদেশের জনগণ যে সংগ্রাম করেছে, যুদ্ধ করেছে এটাই যেন মিথ্যা প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে এমন এক অসহায় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে মনে হয় না ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব পালনে সরকারের কোনো সদিচ্ছা আছে। রাজনৈতিকভাবে কারও কোনো ভিন্ন মতই সরকারের কাছে গ্রহণীয় হচ্ছে না। ভিন্ন মত পোষণকারীকে দেশ ও জাতির শত্র“ হিসেবে দেখতে পারলেই যেন সরকার সফল হবে। ভেবে দেখা হচ্ছে না, যুক্তিবাদী রাজনীতি বিসর্জন দেয়ার পরিণতিই হল সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি। তাই পরিষ্কার ভাষায় খোলাখুলিভাবেই মুক্তচিন্তার পণ্ডিতদের সঠিক কথাটি বলতে হবে। ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষাই গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্রই ব্যক্তিস্বাধীনতা।
সংলাপ নয়, নির্বাচন নয়, এরকম অবস্থা আর যাই হোক কোনো গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য নয়। নোবেল বিজয়ী সেন ঠিকই বলেছেন, গণতন্ত্রের বিভিন্ন দিক আছে। এ বক্তব্যের দ্বারা তিনি নিশ্চয়ই এটা বোঝাতে চান নাই যে, গণতন্ত্রের কোনো কোনো দিককে বাদ দিয়েও গণতন্ত্র চলতে পারে। অথচ এরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেয়ার জন্য সরকারের আশপাশে অনেকেই আছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝাবেন যে, গণতন্ত্রের সবদিকই অর্থাৎ সংলাপের রাজনীতি বা জনগণের নির্বাচন মানতে হবে, এমনটি নয়।
এখন গোটা ঢাকা মহানগরীতে একজন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের পোস্টার শোভা পাচ্ছে। পোস্টারটির ওপর প্রফেসর সেনের নজর পড়েছে কিনা আমরা নিশ্চিত নই। এই পোস্টারে বলিষ্ঠভাবে এবং উচ্চস্বরে বলা হয়েছে, আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র। এ ধরনের চিন্তাভাবনা কেবল কোনো একজন আওয়ামী লীগ নেতার নয়, সংসদেও এ ধরনের রাজনৈতিক থিওরি পেশ করা হয়েছে। বর্তমান সরকারে এমন কিছু প্রভাবশালী লোক আছেন যারা গণতন্ত্রের নাম নিশানা রক্ষায় একদম বিশ্বাসী নন।
কিন্তু সত্যিকারের উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রগতি কোনো দেশ অর্জন করতে পারে না যদি সেই দেশের সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এড়াতে নির্বাচনকে ভয় পায়। অর্থনীতিবিদ প্রফেসর সেন এটা ভালো জানেন যে, সত্যিকারের উন্নয়ন সাজানো অংকের হিসাবে পরিমাপ করা যায় না। সেটা পরিমাপ করতে হয় জনগণের সুখ-শান্তি ও জীবনমানের গড় উন্নতির নিরিখে। আর সেই জীবনমানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা। পুলিশি তৎপরতার মাধ্যমে জনমনে নিরাপত্তাহীনতার আতংক সৃষ্টি কোনো দায়িত্বশীল উন্নয়নকামী সরকারের কাজ হতে পারে না। সন্ত্রাস দমনের নামে সরকার কীভাবে সন্ত্রাসী তৎপরতায় মদদ জুগিয়েছে তা তো যে কারও কাছে এখন পরিষ্কার।
প্রফেসর সেনের বক্তব্যে উন্নয়নের জন্য অধিকতর শক্তিশালী সরকারের প্রসঙ্গ এসেছে। সে বিষয়টিও সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করে দেখা দরকার- যাতে সরকার এর ভুল ব্যাখ্যা করতে না পারে।
কোনো সরকার পুলিশি শক্তির ওপর নির্ভর করে শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের দৃঢ় সমর্থনপুষ্ট হলেই সরকার শক্তিশালী হতে পারে।
বর্তমান সরকার যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হতে পারেনি এটাই এ সরকারের বড় দুর্বলতা। এখন যদি বলা হয় উন্নয়নের জন্য এ সরকারকে অধিকতর শক্তিশালী হতে হবে তাহলে এটাই বোঝানো হবে যে, গণতান্ত্রিকভাবে উন্মুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার দেশের উন্নয়নের জন্য উপযোগী নয়।
গণতন্ত্র হত্যাকারী সব একনায়কই দেশের উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী সরকারের অজুহাত দেখিয়ে থাকেন। যেহেতু একনায়কত্ববাদী সরকার হচ্ছে ভয়ভীতির সরকার, ব্যক্তিস্বাধীনতার সরকার নয়, তাই ডিক্টেটররা যা বলে তাকে সত্য বলে স্বীকার করার বাধ্যবাধকতা থাকে। আর এটাও অজানা নয় যে, একনায়করা টিকে থাকে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। উন্নয়নের গালভরা কথা তাদের শোনাতে হয়।
এটাও সর্বজনীন সত্য যে, যেখানে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার হাত ধরাধরি করে চলে এবং বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দেয়া হয় সেখানে ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন হতে পারে না। যুদ্ধের মতো একনায়কত্ববাদী শাসনেও প্রথম বলি হয় সত্য।
দেশকে চরম নৈরাজ্য এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রেখেই তাদের বিদায় নিতে হয়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের অবস্থা দেখলেই বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হবে। দেশ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, জনজীবনে নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। প্রাণে বাঁচার জন্য লাখ লাখ লোককে সবকিছু ছেড়ে বিদেশে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। চারদিক দিয়ে বিদেশী অস্ত্রধারীরা দেশে ঢুকছে। তবুও তিনি ক্ষমতা ছাড়ার কথা ভাবতে পারছেন না। ক্ষমতা পাগলরা প্রশ্রয় পেলে যা হয় তার সেটাই হয়েছে।
নোবেল বিজয়ী পণ্ডিতের রাজনৈতিক বক্তব্যে নানা ধরনের অস্পষ্টতা থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা থাকায় তার বিভিন্ন গভীর চিন্তামূলক মন্তব্য কতটা সঠিকভাবে গ্রহণ করা হবে এবং আমাদের চিন্তাভাবনায় কতটা কল্যাণধর্মী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
বাংলাদেশের এমন সময় তিনি আমাদের গণতন্ত্র ও অর্থনীতি নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন যখন গণতন্ত্র বিপন্ন হওয়ার পথে এবং অর্থনীতিও বিপর্যস্ত। দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তা তো ব্যবসায়ী সমাজসহ আমাদের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরাই বলছেন। অথচ বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে প্রফেসর সেনের কাছ থেকে শুনতে হল প্রশংসার পর প্রশংসা।
বর্তমানে আমরা যে ধরনের সর্বনাশা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছি, জনগণ যেখানে আতংক এবং নিরাপত্তাহীতার মধ্যে কাল কাটাচ্ছে, সেখানে প্রফেসর সেনের উপস্থিতি সরকার ও দেশবাসীর জন্য প্রভূত সুফলদায়ক হতে পারত, যদি তিনি বাংলাদেশের একজন সুহৃদ হিসেবে অধিকতর বাস্তবধর্মী বক্তব্য রাখতে পারতেন। বাংলাদেশের মানুষতো তাকে একজন আপনজন হিসেবে গ্রহণ করতে বা তার প্রতি প্রাণঢালা শ্রদ্ধা জানাতে কখনও এতটুকু কার্পণ্য করেনি।
আমরা জানি, আমাদের যে-ই যত কথা বলি না কেন, আমাদের বৃত্তবন্দি দলীয় রাজনীতিকে মুক্ত করতে না পারলে গণতন্ত্রকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়া যাবে না। জাতির চরম সংকটের সময় জনগণ তাদের শুভাকাক্সক্ষীদের পাশে দেখতে চায়। সহজভাবে সহজ কথাটি বলতে হবে : নির্বাচন দিতে হবে। দেশের ভালো-মন্দের ব্যাপারে জনগণের রায় মানতে হবে।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

চুপ থাকলে চলবে না by নাতাশা ইসরাত কবির

ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীর নারী শিক্ষার্থীরা প্রজনন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, যারা তথাকথিত প্রতিবন্ধী হিসেবে পরিচিত, নাকি মূলধারা গোষ্ঠীর মানসিক প্রতিবন্ধকতা? যেমন ফেসবুকের একটি গ্রুপের নাম 'সিস্টারহুড'। সেখানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লিখেছেন_ রাজশাহী নিবাসী তার এক বান্ধবীর বক্তব্য ছিল এমন : 'আমার মেয়েটির বয়ঃসন্ধিকাল পরিবর্তন বন্ধ করা জরুরি। কারণ আমি এক অক্ষম মা, যার মেয়ে ডাউন সিনড্রোমে ভুগছে।' যার পরিচয় এক কথায় বলতে গেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। উপরের কথাগুলো একজন মা যখন দুঃখে, বিধ্বস্ত মনের আকুতি নিয়ে বলছেন, তখন আমরা আসলে অনেকে জানি না ডাউন সিনড্রোম সম্পর্কে। আর এ মুহূর্তে প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ভিন্নভাবে সক্ষম শব্দটি ও একজন মাকে নির্ভরতা ও নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। কারণ প্রতিবন্ধকতা এখনও আমাদের মানসিকতায়। এ সংকট আরও ঘনীভূত হয় অটিস্টিক কিশোরী ও তরুণীর ক্ষেত্রে। সুইড বাংলাদেশের একজন শিক্ষিকা বলেন, অনেক বাবা-মা লোকলজ্জাকে এত বেশি প্রাধান্য দেন যে, নিজের মেয়েটির সমস্যা তার কাছে গৌণ।
২০১০ আমি যখন ফেলোশিপে কাজ করি, তখন আমার কাজের জন্য বেছে নিই সমাজের সেই শ্রেণীর নারীদের, যারা মূলধারা থেকে সেই বাস্তবতা আমাকে বিশালভাবে ভাবায় যখন নারীদের একটা অংশ প্রজনন সংক্রান্ত অজ্ঞতা নিয়ে দিনের পর দিন পার করছে এবং যারা মূলধারা থেকেই বিচ্ছিন্ন। তাদের ছাড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব? কথা হচ্ছিল এনজেন্ডার হেলথের তৎকালীন সময়ের প্রোগ্রাম অফিসারের সঙ্গে, তিনি নিজেও এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি।
আজ ২০১৫ সালে আমি নিজেই যখন ভিন্নভাবে সক্ষম গোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছি, তখন বুঝতে পারছি পরিস্থিতি আরও কতটা সংকটময়। তাদের এক কথায় প্রতিবন্ধী বলা হচ্ছে; কিন্তু প্রতিবন্ধকতা আসলে আমাদের মনমানসিকতায় যারা মূলধারার জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেকে দাবি করে। ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই বললে চলে। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই, পড়াশোনা যাদের জীবনে অনিশ্চিত আর জীবনটাকে যাদের বোঝা হিসেবে বয়ে বেড়ানোর অনিশ্চয়তা বহন করতে হয়, সেখানে প্রজনন শিক্ষা তো দূর প্রয়োজনীয় শিক্ষার জায়গাটি অনিশ্চিত।
মনে আছে, বধির স্কুলের ছাত্রী সুমি (১৮) প্রথম জানতে পারে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে, পরিবারে তো আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না আর স্কুলে তো সুযোগ নেই। তাকে যখন প্রশ্ন করা হয় সে এ বিষয়ে ট্রেনিং নিতে আগ্রহী কিনা, সে কিছুটা ইতস্তত করে এবং ইশারা ভাষায় জানায়, ছেলেদের সঙ্গে একই শ্রেণীকক্ষে না। সুমিকে যখন প্রশ্ন করা হয়, কেন ছেলেদের সঙ্গে নয়! উত্তরটা শুধুই সংকোচের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। অবশ্য মাশিয়াত (১৮) এ বিষয়ে কোনো আপত্তি জানায়নি, সে ও সুমি একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলেও সুমীর ক্ষেত্রে যেখানে অভিভাবক ভূমিকাহীন, সেখানে মাশিয়াত মনে করে, তার মা তাকে অনেক তথ্য দিয়েছেন। শান্তা আর মৌ একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তারাও সংকোচবোধ করছিল বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা না থাকায়। প্রথম যখন বিষয়টা উপস্থাপন করা হয়, তখন তারা প্রশ্নগুলো দেখে বুঝতে পারেনি। পরবর্তীকালে যখন বুঝিয়ে বলা হয় অনেকক্ষণ সময় নিয়ে, তাদের কাছে প্রতিটি বিষয় নতুন মনে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে এ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া থাকলেও তা অপ্রতুল এবং তা থেকে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয় না। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীরা তথা ভিন্নভাবে সক্ষম নারীরা। ফলে বাল্যবিয়ে, বারবার গর্ভধারণ, অপুষ্টি, মাতৃত্বকালীন মৃত্যু, দুর্বল ও মৃত সন্তান প্রসব বেড়ে চলেছে। একজন শারীরিক ও ভিন্নভাবে সক্ষম নারী বর্তমানে দেশের একটি বিখ্যাত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। তিনি প্রতি মুহূর্তে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। তবু পত্রিকা, বেতার আর টেলিভিশন থাকায় তিনি কিছুটা ধারণা পেয়েছেন।
সমস্যাটা এখানেই, ছাত্রীদের মধ্যে অনেকের পারিবারিক পরিবেশ অনুকূল নয়; বিশেষত বধিরদের ক্ষেত্রে বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া সহজ নয়। কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, তাদের এক সহপাঠীর অষ্টম শ্রেণীতে থাকতে বিয়ে হয়ে যায়। তিন বছরের মধ্যে তিনটি সন্তানের মা হয় এবং মা-শিশু উভয়ে অপুষ্টির শিকার। তার কাছ থেকে তার সহপাঠীরা কিছু ধারণা পায়। কিন্তু প্রশ্ন এখানেই, সে যদি সচেতন থাকত তাহলে এ সমস্যা হতো না। যে বিষয়টা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় তা হলো, মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে পারিবারিক আর সামাজিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
২০০৬ সালে জাতীয় প্রজনন স্বাস্থ্য নীতিমালার কৌশলপত্র ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০০৩ সালে ছয়টি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ছয়টি মন্ত্রণালয় নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত। প্রস্তাবিত উদ্দেশ্য হলো, পাঠ্যক্রমও কমিউনিটিভিত্তিক কৈশোর-প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা, বাল্যবিয়ে ও গর্ভধারণের ঘটনা কমানোর কৌশল এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রসার, এইচআইভি এইডসসহ যৌন সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ, কৈশোর প্রজনন স্বাস্থ্য ও সংশিল্গষ্ট সেবা কিশোর-কিশোরীদের নাগালে নিয়ে আসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিরুৎসাহিত করা।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্পর্শকাতর এইচআইভি এইডসকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরপরও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কাজটি শুধু প্রকল্পের অধীনে করলে চলবে না।
সবকিছুর পর যে প্রশ্নটা আবারও আসে, মূলধারা বলে বিচ্ছিন্ন নীতির যে ধারা অব্যাহত আছে তখন বিশেষভাবে সক্ষম গোষ্ঠী আর তাদের অভিভাবকদের সচেতন করার দায়িত্ব কে নেবে? যেখানে দেশের তরুণ ও তরুণীর একটি অংশ বিশেষভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠী, তাদের কথা না ভেবে নীতিমালা, সভা-সমিতি এবং সচেতনতাকে প্রাধান্য দেওয়া কীভাবে সম্ভব?
এখনই আসলে এ উদ্যোগটি নিয়ে ভাবতে হবে, যেখানে অভিভাবককে বোঝানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও ভূমিকা রাখতে পারেন। ভিন্নভাবে সক্ষম গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ এড়ালে চলবে না। কারণ তাদের জানার পরিধি ্র সুযোগ অনেক কম আর সেজন্য বিশেষ কর্মসূচি থাকতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বেতার ও টেলিভিশনের সব কার্যক্রমও মূলধারার গোষ্ঠী নিয়ে। আমাদের মানসিক প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে কেউ কথাই বলতে চায় না। আমাদের চুপ থাকলে চলবে না। পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, তথ্য বিনিময়, পরামর্শ চালিয়ে যেতেই হবে।
গবেষক

অভিজিৎ হত্যার পৌনঃপুনিকতা যদি রোধ করতে হয়- by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

অভিজিৎ রায় ছিলেন বিজ্ঞানের সাধক। তারুণ্যভরা জীবনটি তিনি বিজ্ঞানের সত্য সাধনায় কাটিয়েছেন। তিনি তার মরদেহও দান করে গেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেবায়। তাকে শহীদ বলা হলে অত্যুক্তি হবে না। তিনি সত্যের সন্ধান ও সাধনায় জীবন দান করেছেন। কিন্তু সব সত্য সাধকের বেলাতেই যা হয় তার বেলাতেও অন্যথা হয়নি। তার পরিবারের ওপর থেকে বিপদটি এখনও কাটেনি। ঘাতকের দল এতই বিবেকবিহীন পশু যে, অভিজিৎকে হত্যার পর তার শোকার্ত পিতা অধ্যাপক অজিত রায়কেও জীবননাশের হুমকি দিতে দ্বিধা করছে না। আমি জানি না, এই সাহস তারা কোথা থেকে এবং কেমন করে পায়? অভিজিৎ হত্যায় বিক্ষুব্ধ মানুষ দেশে এবং বিদেশেও (লন্ডনে আজ রোববারেও ট্রাফালগার স্কোয়ারে প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে) দাবি তুলেছে এই নরপশুদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। সরকার যদি তা না পারে, তাহলে তা তাদের দুর্বলতা অথবা ব্যর্থতা বলে গণ্য হবে। আমি সব ব্যর্থতার দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপাবো না। এই ঘাতকদের দেশ থেকে নির্মূল করার ব্যাপারে আমাদের একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। সেটি আমরা পালন করছি না, অন্যদিকে এই ঘাতক দমনে সরকারের নীতিতেও যথেষ্ট দুর্বলতা ও ধীরে চলার কৌশল লক্ষণীয়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সন্ত্রাস যে নির্মূল করা যাচ্ছে না, তার একটা বড় কারণ, এই সন্ত্রাসের পেছনে আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য রয়েছে। এই সন্ত্রাস এখন জিহাদিষ্ট নামে চিহ্নিত হয়ে একটি তথাকথিত আন্তর্জাতিক মতবাদে পরিণত হয়েছে। এই মতবাদে দীক্ষা নিচ্ছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার যে তরুণরা, তাদের মধ্যে অমুসলিমও রয়েছে। তারা শিক্ষিত, কিন্তু ধর্মান্ধ। এই ধর্মান্ধতার কারণে তারা ইরাকে ও সিরিয়ায় ‘ইসলামিক স্টেটে’ যোগ দিয়ে জেহাদে অংশ গ্রহণের জন্য ছুটে যাচ্ছে। এদের নিরস্ত্র ও দমন করার কাজে ইউরোপীয় সরকারগুলোই হিমশিম খাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কথা আলাদাভাবে চিন্তা করা বাতুলতা।
তবু বাংলাদেশেই সরকার পারত এই নিষ্ঠুর বুদ্ধিজীবী হত্যা রোধে আরও সফল হতে, যদি তারা মৌলবাদী ও তাদের আর্মড উইং- জেহাদিস্টদের সম্পর্কে আরও কঠোর হতে পারত। অন্যদিকে আমাদের সুশীল সমাজ এবং নাগরিক সমাজও এই ঘাতক চক্রকে প্রতিরোধ করার ব্যাপারে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে ততোটা সচেতন ও সক্রিয় নন। আওয়ামী লীগ সরকারের কবল থেকে তাদের কল্পিত গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য আমাদের সুশীল সমাজ যতটা সরব ও সক্রিয়; দেশের জনগণকে, সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজকে ভয়াবহ মৌলবাদী উত্থান এবং তাদের ঘাতক বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচাতে তারা ততোটা সক্রিয় ও আগ্রহী নন। বরং তাদের একটি অংশ সম্ভবত মৌলবাদী হিংস্রতাকে তাদের গণতন্ত্রের আন্দোলনের সহায়ক শক্তি মনে করেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান আমলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমন ও দাঙ্গাবাজদের রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে দেশের সুশীল সমাজ ও ছাত্রসমাজকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। এবার সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চেয়েও ভয়াবহ হিংস্র জিহাদিস্টদের রুখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে দেশের সুশীল সমাজ ও ছাত্রসমাজের মধ্যে আগের সেই ঐক্য ও মিলিটেন্সি নেই। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের আগের সংগ্রামী ভূমিকা নেই। নানা স্বার্থদ্বন্দ্বে তারা বহুধাবিভক্ত এবং নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত।
অন্যদিকে একটি সুশীল শ্রেণী এখন চরম সুবিধাভোগী সমাজে পরিণত হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্রের জন্য বাঘ হিসেবে চিত্রণ করে মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের মতো টকশোতে গিয়ে চিৎকার করা এবং দেশে অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ওই সরকারকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা জোগান দেয়াই তাদের প্রধান কাজ। আরও লক্ষ্য করার বিষয়, ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী বা জিহাদিস্টরা এ সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীদের গায়ে কখনও হাত দেয় না।
অভিজিৎরা নৃশংসভাবে মরবে, দেশ মেধাশূন্য হবে, আমরা শুধু প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করব এবং সরকার শুধু তদন্তের আদেশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে। সেক্ষেত্রে এই পৌনঃপুনিক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কখনও বন্ধ হবে না। সরকারের পুলিশি তদন্ত দীর্ঘকাল ধরে চলে। তারপর দু’একজন দুষ্কৃতকারী ধরা পড়ে ও সাজা পায়; যেমন পেয়েছে রাজশাহীর অধ্যাপক ইউনুসের এবং অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের দু’এক ঘাতক। তাতে ঘাতক শ্রেণীর সংখ্যা কমে না, রিক্রুটমেন্ট বন্ধ হয় না। বরং তাদের সাহস ও তৎপরতা বাড়ে। যেমন বাড়তে দেখা গেছে অভিজিৎকে হত্যার পর তার পিতা অধ্যাপক অজিত রায়কে হত্যার হুমকি দেয়ার মধ্যে। ঘাতকদের এই সাহস বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এক, একাত্তরের দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করা ক্রমাগত বিলম্বিত হওয়ায় এই ঘাতক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মনে এই ধারণাটি জন্ম নিয়েছে যে, সরকার এই দণ্ডদানে ভীত। সরকারের নীতি দুর্বল ও আপসবাদী। দুই, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এই ঘাতক চক্রের সহায়ক এবং দেশের সুশীল সমাজও এই হিংস্র মৌলবাদীদের বদলে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বেশি সরব ও সক্রিয়। তিন, বিএনপির তথাকথিত রাজনৈতিক আন্দোলনও এই সন্ত্রাসীদের তৎপরতার সহায়ক।
বর্তমান সরকারের প্রশাসনের মধ্যেও ভ্রান্ত ধর্মীয় অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত, মৌলবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি বড় অংশ আছে। পুলিশ প্রশাসনেও এদের সংখ্যা কম নয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও আছে মৌলবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি অংশ। স্থানীয়ভাবে প্রভাব প্রতিপত্তি ও ভোটের বাক্স রক্ষার জন্য এরা মৌলবাদীদের তুষ্ট রাখতে চায়, এমনকি তাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যেও জড়িত তারা। ফলে এই ঘাতকদের ধরা সব সময় সহজ হয় না। অপরাধ অনুষ্ঠানের পর পালিয়ে গিয়ে তারা নিরাপত্তা ও আশ্রয় দুটোই পায়। পুলিশ তাদের নাগাল পায় না। অথবা নাগাল পেলেও ধরতে পারে না। নইলে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর হত্যাকাণ্ডের মীমাংসায় এত বিলম্ব ঘটে?
অভিজিতের হত্যাকারীদের ধরার ব্যাপারে সরকার এবার অন্তত কঠোর হোক। তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করুন। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ এসব সন্ত্রাসীর রিক্রুটের ঘাঁটি, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। সন্ত্রাসীদের পিতামাতা ও অভিভাবকদের সতর্ক করুন। সুশীল সমাজ ও বৃহত্তর নাগরিক সমাজ কেবল মানববন্ধন না করে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সর্বদলীয় ছাত্রসমাজ সন্ত্রাস রোধে রাজপথে নামুন। সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত ও প্রতিহত করার ব্যাপারে তারা ভিজিলেন্স কমিটি গঠন করুন।
বাংলাদেশে এই বুদ্ধিজীবী হত্যা ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক যোগসূত্র রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এমনকি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসএর সঙ্গে এই সন্ত্রাসী ও ঘাতকদের যোগাযোগ থাকার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই যোগাযোগ ছিন্ন করার জন্য সরকারের আরও উদ্যোগী হওয়া দরকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণও প্রয়োজন। হিংস্র মৌলবাদ ও সন্ত্রাস দমনে সরকার যদি সর্বাÍক নীতি গ্রহণ না করে এবং দেশের নাগরিকদের সব অংশকে এই নরপশুদের বিরুদ্ধে সজাগ ও সক্রিয় করে না তোলে, তাহলে দেশে পৌনঃপুনিক বুদ্ধিজীবী হত্যা, মেধা হত্যা অব্যাহত থাকবে এবং পরিণামে দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে। এই ঘাতকরা বিভ্রান্ত তরুণ নয়; এরা শিক্ষিত, ট্রেনিংপ্রাপ্ত, রাজনৈতিক প্রভুদের দ্বারা আদিষ্ট ও পরিচালিত নিষ্ঠুর, বিবেকবর্জিত ঘাতক। এদের বিরুদ্ধে দেশের সম্মিলিত সামাজিক ক্রোধ ও প্রতিরোধ জাগ্রত করা প্রয়োজন।
দেশ যেন আরও অভিজিৎ না হারায়।
লন্ডন ১ মার্চ, রোববার, ২০১৫