Tuesday, December 31, 2024

বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ নয়, হবে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ -বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ নয়, মঙ্গলবার ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি পালন করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সোমবার দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছে তারা।

মঙ্গলবারের কর্মসূচি তুলে ধরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যসচিব আরিফ সোহেল বলেছেন, ‘আজ ৩১শে ডিসেম্বর, মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে “মার্চ ফর ইউনিটি” কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, আপনারা যে উদ্দীপনায় সংগঠিত হয়েছেন, তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবেন।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা গত রোববার সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তাঁরা মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দেবেন। সংগঠনের নেতারা ঘোষণাপত্রে দুটি মৌলিক বিষয়ের উল্লেখ করেন। তাতে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ‘মুজিববাদী সংবিধান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর ‘কবর’ রচনা করা এবং ‘নাৎসিবাদী আওয়ামী লীগকে’ বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করার কথা থাকবে।

এই ঘোষণাপত্র নিয়ে বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এ বিষয়ে দলগুলোর কারও কারও মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তারা মনে করছে, ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তা না করে হঠাৎ কোনো ঘোষণা বিভাজন তৈরি করবে। তবে কোনো কোনো দল ছাত্রদের ওই উদ্যোগকে নৈতিকভাবে সমর্থন জানায়।

এ নিয়ে দিনভর রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনার মধ্যে রাত পৌনে নয়টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে জরুরি প্রেস ব্রিফ করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমতে৵র ভিত্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জনগণের ঐক্য, ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সুসংহত রাখার জন্য এ ঘোষণাপত্রটি গৃহীত হবে।

সরকারের এ ঘোষণার পর মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে রাজধানীর বাংলামোটরে বৈঠকে বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা।

বৈঠক শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। প্রথমে কথা বলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেন, ৩১ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় শহীদ মিনারে ঘোষণাপত্রটি আসার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তার জায়গা থেকে পুরো বাংলাদেশকে একটি ঐক্যবদ্ধ জায়গায় এনে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সকলকে সম্পৃক্ত করে ঘোষণাপত্রটি দেওয়া উচিত বলে অনুভব করেছে।

সারজিস বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে আমাদের যে জিনিসটি মনে হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের চেয়ে রাষ্ট্র যখন, অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্বটি নিয়ে নেয়, আমরা আমাদের জায়গা থেকে এ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাই।’

পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সদস্যসচিব আরিফ সোহেল মঙ্গলবারের কর্মসূচি তুলে ধরে বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত জন-আকাঙ্ক্ষা তথা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েমের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে আবির্ভূত হয়েছে। হাজারো শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ও জন-আকাঙ্ক্ষার দলিলস্বরূপ জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র অত্যাবশ্যক ছিল। এই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের ঐতিহাসিক দায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর বর্তায়।’

আরিফ সোহেল বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার পক্ষে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রের প্রণয়ন ও ঘোষণার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। আমাদের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের আপামর ছাত্র-জনতার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত ও ইতিবাচক সাড়া সঞ্চারিত হয়েছে। এমতাবস্থায় ছাত্র-জনতার আহ্বানে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছাত্র-জনতা এই সময়পোযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছে।’

এর আগে রাত পৌনে একটার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের ঐতিহাসিক দলিল যাতে আমরা উপস্থাপন না করতে পারি, সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সরকার এটির ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। এটা আমাদের প্রাথমিক বিজয়।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ঘোষণাপত্র নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রে পেরেক মেরে দিয়েছে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার। তারা বলেছে, সরকারের জায়গা থেকে ঘোষণাপত্র দেওয়া হবে।’

জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ‘আমরা পূর্ববর্তী যে কর্মসূচি দিয়েছি, আমরা বিপ্লবীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একত্রিত হব। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণাপত্র আসবে, কিন্তু তাই বলে আমাদের একত্রিত হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে না। আগামীকাল শহীদ মিনারে আহত থেকে শুরু করে শহীদ পরিবার এবং ঢাকা শহরের মা ও বোনেরা যেভাবে ৫ আগস্ট রাজপথে নেমে এসেছিল, সেভাবে প্রোক্লেমেশনের পক্ষে রাজপথে নেমে আসবে।’

সোমবার দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যালয়ে
সোমবার দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যালয়ে। ছবি: প্রথম আলো

বছর শেষে কেমন আছেন গাজাবাসী

বছর শেষে ১৬তম মাসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে গাজা যুদ্ধ। ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক আহ্বান সত্ত্বেও এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের কাছে আশার আলো দেখা দেয়নি। ১১ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রেজ্যুলেশন অনুমোদন করে। তাতে অবিলম্বে, নিঃশর্ত এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আহ্বান করা হয় গাজায়। পাশাপাশি অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে হামাসের হাতে আটক সব জিম্মির মুক্তি দাবি করা হয়। পরিষদ থেকে নিয়ার ইস্টে ফিলিস্তিনের শরণার্থী বিষয়ক ত্রাণ ও ওয়ার্ক বিষয়ক এজেন্সিকে (ইউএনআরডব্লিউএ) তাদের ম্যান্ডেটের জন্য পূর্ণাঙ্গ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ধারণা করা হয় এটা হলো কয়েক লাখ মানুষের লাইফলাইন। এ ছাড়া এই এজেন্সির ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট একটি প্রস্তাব পাস করে। জাতিসংঘ তার বিরুদ্ধে নিন্দা জানায়। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাস আকস্মিক ইসরাইলের দক্ষিণে দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায়। তাতে নিহত হয় প্রায় ১২০০ মানুষ। হামাস জিম্মি করে প্রায় ২৪০ জনকে। এরপর থেকেই গাজার ওপর সীমাহীন ও বাধাহীন বোমা হামলা শুরু করে ইসরাইল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এসব হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার ফিলিস্তিনি। ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পয়ঃনিষ্কাশন সেবা, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ। বহু বাড়িঘরে একাধিকবার বোমা হামলা হয়েছে। গাজায় শতকরা কমপক্ষে ৮৩ ভাগ মানবিক ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেয় ইসরাইল। গাজাবাসীর জন্য যথেষ্ট নয় এমন ত্রাণ বহনকারী গাড়িবহরে লুটপাট হয়। এর ফলে গাজায় অকল্পনীয় খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। খাদ্য সংকট এবং অন্যান্য সংকটের ফলে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ অনাহারে বা অন্যান্য দুর্বিপাকে ভুগছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে যে, গাজার খাদ্য ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সেখানে প্রতিটি অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের উচ্চ ঝুঁকি আছে। গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রায় তিন মাস কোনো সহায়তা, ত্রাণ পৌঁছেনি। সেখানে ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি দুর্ভিক্ষের অত্যাসন্ন হুমকিতে। নভেম্বরে নিরপেক্ষ ফেমিন রিভিউ কমিটি সতর্ক করে বলেছে, গাজার এই অংশে দুর্ভিক্ষাবস্থা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে অথবা নিকট ভবিষ্যতে তা অতিক্রম করবে। ১লা এপ্রিল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রিপোর্ট করেছে যে, উত্তরাঞ্চলে অপুষ্টিতে এবং পানিশূন্যতায় ভুগে হাসপাতালে মারা গেছে ২৮ শিশুসহ ৩২ জন। কামাল আদোয়ান এবং আল আওদা হাসপাতালে শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে- এমন ঘটনা মার্টে প্রামাণ্য আকারে তুলে ধরেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে ত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ এজেন্সিগুলো রিপোর্ট করেছে যে, শতকরা ৫ ভাগ শিশু, যাদের বয়স দুই বছরের নিচে, তারা মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এসব কারণে এবং গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি)। রায়ে বলা হয়েছে, যদি তারা এই আদালতের সদস্য ১২৪টি দেশের কোনোটিতে সফর করেন, তাহলে তাকে বা তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। নভেম্বরের শেষের দিকে নেতানিয়াহু, ইয়োভ গ্যালান্ট এবং হামাসের কমান্ডার মোহাম্মদ দিয়েফের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে ইসরাইলের দাবি জুলাইয়ে তারা মোহাম্মদ দিয়েফকে হত্যা করেছে। তবে তাকে হত্যা করা হয়েছে নাকি তিনি জীবিত আছেন- এ বিষয়ে আইসিসি কোনো মন্তব্য করেনি। আইসিসি তার রায়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে মানুষকে অনাহারে রাখার কৌশল ব্যবহার করেছে। এর মধ্যদিয়ে তারা যুদ্ধাপরাধ করেছে। হত্যা, নিষ্পেষণ ও অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। এই ফৌজদারি অপরাধের দায় নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের। আইসিসি’র যৌক্তিক কারণ রয়েছে যে, মোহাম্মদ দিয়েফও হত্যা, নির্যাতন, অন্যান্য যৌন নির্যাতন, জিম্মি আটকসহ বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ করেছে।
কিছু সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন আরও একটু অগ্রসর হয়েছে। সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক রিপোর্টে বলেছে, দখলিকৃত গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে ইসরাইল এবং তা অব্যাহত আছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য ইসরাইলকে প্রথম দায়ী করে যেসব দেশ তার মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম। এমনকি তারা জানুয়ারিতে আইসিসিতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মামলা করে। দাবি করা হয়, ইসরাইল জোনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার এই মামলায় যোগ দেয় বা স্বাক্ষর করে বিশ্বের কমপক্ষে ১৪টি দেশ। এরমধ্যে আছে স্পেন, বেলজিয়াম, তুরস্ক, মিশর এবং চিলি।
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে যে হামলা হয় ইসরাইলে তাতে ইউএনআরডব্লিউএ’র বেশ কিছু কর্মী জড়িত বলে জানুয়ারিতে অভিযোগ করে ইসরাইল। এমন অভিযোগে ওই এজেন্সি তদন্ত শুরু করে। এ সময়ে ত্রাণ সহায়তা বন্ধ করে রাখে অনেক পশ্চিমা দাতা। তদন্ত শেষে ৯জন কর্মীকে দায়ী দেখিয়ে তাদের বরখাস্ত করে ইউএনআরডব্লিউএ। যুক্তরাষ্ট্র বাদে সব দাতা তাদের অর্থ আবার দেয়া শুরু করে। রিপোর্টে দেখা যায়, গাজায় ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত স্কুলগুলোর মধ্যে শতকরা কমপক্ষে ৭০ ভাগ স্কুল ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলের বোমা হামলায়। এসব স্কুলের শতকরা ৯৫ ভাগই ব্যবহার করা হতো ইসরাইলের হামলায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল হিসেবে। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন গাজার দক্ষিণে আল মাওয়াসি ক্যাম্পে। এটাকে মানবিক নিরাপদ জোন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল ইসরাইল। কিন্তু ৪ঠা ডিসেম্বর সেখানেও হামলা চালায় তারা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আল মাওয়াসি ক্যাম্প কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীর আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। গাজায় এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে ইসরাইল হামলা চালায়নি, আর সেখানে রক্তপাত হয়নি। 

mzamin

হাসিনারে ফেলায় দেয়ার আন্দোলন বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান না কি জনঅভ্যুত্থান? by আর রাজী

বাংলাভাষাটা ভিন্ন রকমের। সাধারণত এ ভাষার শব্দেই ঢুকানো থাকে শব্দের অর্থ। সুতরাং শব্দ খুলতে জানলেই চলে, কারও দেয়া সংজ্ঞা মুখস্থ করে শব্দের অর্থ বুঝতে হয় না। সুতরাং আপনি যদি বাংলা জানেন, তাহলেই চলবে; আপনি সহজেই বুঝবেন হাসিনারে ফেলে দেয়ার আন্দোলনকে কী নামে ডাকা উচিত।

‘প্লাবন’ শব্দটা আমাদের বেশ চেনা। ‘প্লব’-ও চেনা কিন্তু যখন তার আগে ‘বি’ থাকে তখন আরও ভালোভাবে চিনতে পারি তাকে (বি-+প্লব= বিপ্লব)। সরল শব্দার্থ কোষ বলছে: ‘প্লব’ হচ্ছে প্ল-তে বাহিত হয় যে। ‘প্ল’ হচ্ছে- ধারা, জলধারা। তাতে যে বা যা বাহিত হয় সে বা তা ‘প্লব’। যেমন হাঁস। আর ‘বিশেষ প্রকারের প্লব যাহাতে তাহাই বিপ্লব’। সমাজ-রাষ্ট্রেও ধারা থাকে- কর্মধারা যেমন। সেখানে   যে ধারায় জন বা আমলারা ভেসে বেড়াচ্ছে তা বদলে গেলে, তখন তাকে বলা হয় ‘বিপ্লব’। ‘বিপ্লব’ এমন কিছু যা ধারাটা বদলে দেয় বা জলধারায় যা কিছু ভেসে বেড়াচ্ছিল তাদের ভেসে বেড়ানোটা বিশেষভাবে বদলে দেয়। এটা দৃশ্যমান কিছু। আপনি দেখতে পাবেন যে সমাজে ভেসে বেড়ানোর ধরন বদলে গেছে। ভালো বা খারাপ  সেটা আলোচ্য না, বদলে চলা দৃশ্যমান হলে তা ‘বিপ্লব’। এটা ফল  দেখে শনাক্ত করার বিষয়। খুঁজে বলতে হয় না  যে সমাজ বা রাষ্ট্রে ‘বিপ্লব’ হয়েছে কি না?

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মধারা-রীতি-পদ্ধতি কিছুই বদলে যায়নি, কিছু লোকের বদল হওয়া ছাড়া। গত দশ বছর আগে যেমন ছিল এখনো তেমনি সবাই ভাসছেন। সমাজ-রাষ্ট্রের যে স্রোতধারা তা যেমন বদলে যায়নি, তাতে ভেসে বেড়ানো মানুষদের ভেসে বেড়েনোর প্রক্রিয়া-পদ্ধতিও বদলে যায়নি। সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ধারা বদল মানে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক বদল। তেমন বদল কি হয়েছে? কেবল কিছু মানুষের বদলে নতুন অন্য কিছু মানুষ এসেছেন। সমাজে ক্ষমতালব্ধ ও ক্ষমতা-প্রলুব্ধ অংশের মধ্যে যে লড়াই সর্বক্ষণ চলে তাতে এক পক্ষকে সরিয়ে আর এক পক্ষ ক্ষমতা নিয়েছেন। আর নতুন যারা ক্ষমতা পেয়েছেন তারা একইভাবে ভেসে বেড়াচ্ছেন। এ বিবেচনায় ৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রে বিপ্লব হয়েছে সে কথা মান্যতা পায় না। অনেকেই একে ‘অভ্যুত্থান’ বলছেন। একে কি ‘অভ্যুত্থান’ বলা যায়? ‘অভ্যুত্থান’ কাকে বলে? মানে, আমাদের বাংলাভাষায় ‘অভ্যুত্থান’ বলতে কী বুঝায়?
‘অভ্যুত্থান’ হচ্ছে- ‘অভির কারণে উত্থান যাহাতে’। ‘অভি’ বুঝায় উপরে স্থিত থাকা। অভিভাবক শব্দটা তো আমরা জানি। উপরে থেকে যিনি ‘ভাবক’ হিসেবে থাকেন- আমার উপরে স্থিত থেকে যিনি আমার ভাবনাকে প্রভাবিত করেন বা করতে পারেন তিনিই আমার অভিভাবক। একইভাবে উপরিস্থিত কারণে যে উত্থান তাকে বলে ‘অভি+উত্থান= অভ্যুত্থান’। ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ এই রাষ্ট্রে যা ঘটছে তা আমরা দেখেছি। উপরে, মানে রাষ্ট্রের মাথায় যারা ছিলেন তাদের কারণে সৃষ্ট বিরক্তিতে বা যন্ত্রণায় বা অন্য কোনো কারণে জনতার উত্থান ঘটেছে। রাষ্ট্রজন রায়ে যেখানে ছিলেন সেখান থেকে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, উত্থিত হয়েছেন এবং যারা ক্ষমতার আসনে বসে ছিলেন তাদের আসন থেকে উঠিয়ে দিয়েছেন। একটা দ্রোহ ছিল মানুষের মনে, বিশেষ সেই দ্রোহ অর্থাৎ বিদ্রোহের কারণে তাদের ‘উত্থান’ ঘটেছে। ফলত অন্যদের ‘পতন’ ঘটেছে। তার মানে ঘটনা যা ঘটেছে তাকে আমরা ‘অভ্যুত্থান’ বলতে পারি। কিন্তু তা কি ‘গণঅভ্যুত্থান’? না কি তাকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে, আরও যথাযথভাবে নামাঙ্কিত/বিশেষায়িত করার সুযোগ রয়েছে? কী নামে সেই অভ্যুত্থানকে অভিহিত করা অধিকতর সঙ্গত হবে? আর ৫ই আগস্টের ব্যাপারটাকে  কেন একটা যথাসঙ্গত নামে অভিহিত করা অত্যাবশ্যক সে প্রশ্নেও  তা ওঠার কথা, তাই খুবই স্বল্প কথায়ে লেখার   শেষে আছে তার উত্তর।   
২.
অভূতপূর্ব, সিনেমেটিক এক অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে আগস্টের ৫ তারিখে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে গেলেন। এরপর থেকে আমাদের শিক্ষিত-বাঙালি গোষ্ঠী ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান’- হিসেবে ওই ঘটনাকে উল্লেখ করতে শুরু করলো। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার প্রথম ভাষণে একে ‘ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করলেও পরের ভাষণে একে ‘ছাত্র-শ্রমিক-গণঅভ্যুত্থান’ বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ ‘ছাত্র-জনতা-সৈনিকদের ঐক্যকে’ অভ্যুত্থানের শক্তি বলে চিহ্নিত করেছেন। এইভাবে সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন বর্গকে স্বীকৃতি   দেয়ার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে আগামীতে এই অভ্যুত্থানকে ছাত্র-শ্রামিক-কৃষক-মজুর-সৈনিক ইত্যাদি ইত্যাদি বর্গযুক্ত ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলার পরেও কোনো না কোনো বর্গ বাইরে থেকে যেতে পারে আর তারা নিজেদের ‘নীরবতার শিকার’ হিসেবে হীনতায় ভুগতে এবং দুঃখ পেতে পারেন। আবার এক বর্গ অন্য আর এক বর্গকে উহ্য রেখে প্রতিশোধও নিতে পারে। অবশ্য এখন পর্যন্ত   মোটাদাগে ‘ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবেই একে নির্দেশ করা হচ্ছে। দু’-একজন পণ্ডিত ‘ছাত্র’-এর বদলে ‘শিক্ষার্থী’ শব্দ যুক্ত করছেন ছাত্রের সাথে ছাত্রীদেরও অংশভাগ নিশ্চিত করার লৈঙ্গিক সমতা বজায় রাখার তাগাদা থেকে (যদিও ব্যাকরণ বলে- ছাত্রের স্ত্রী হচ্ছেন ছাত্রী)।
৩.
ইংরেজি ‘গ্যাং’ শব্দটা মাথায় রাখলে বাংলা ‘গণ’ প্রত্যয়টা বুঝা সহজ হতে পারে। ‘গণ’ এমন এক এক দল মানুষকে বুঝায় যারা দলপতির অধীনে একসঙ্গে জীবিকা অর্জনের কর্ম করেন। মানে একই ধরনের কাজ করে এমন দলবদ্ধ মানুষ হচ্ছে ‘গণ’। বঙ্গীয় শব্দকোষে হরিচরণ ‘গণ’-এর অর্থ দিয়েছেন সমূহ, নিচয়, সমুদয়।  যেমন- পিতৃগণ, সখীগণ, নারীগণ ইত্যাদি। আর তিনি ‘গণ’ শব্দের যে বিবরণ দিয়েছেন তা হচ্ছে- ‘যাহারা মিলিতভাবে এক কার্য্যদ্বারা জীবিকা‘র্জ্জন করে (মেধাতিথি), সমবায়, সংঘ।’ খেয়াল করে  দেখেলে  তা, এই যে ‘আন্দোলন’ হলো- এখানে একই ধরনের কাজ করেন এমন মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন কি না? গার্মেন্টসের লোকজন বা পরিবহন শ্রমিক বা কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক বা রিকশাওয়ালারা কি একসঙ্গে দলবেঁধে আন্দোলনে নেমেছিলেন, কারও   নেতৃত্বে বা দলপতির অধীনে? শিক্ষকরা নেমেছিলেন, কাউকে  নেতা   মেনে? নামেন নাই। কিন্তু এই আন্দোলনে গার্মেন্টসের অনেক শ্রমিক ছিলেন, পরিবহন শ্রমিক ছিলেন, রিকশাওয়ালা ছিলেন। (কৃষক যদিও আমার নজরে পড়ে নাই!) এরা যে ছিলেন তারা দল, গ্যাং বা গণ হিসাবে ছিলেন না, ‘রহিমুদ্দীন গং নামছিল’- বলার উপায় নাই। তারা হাজির ছিলেন এক একজন বিচ্ছিন্ন ও একক পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে। আমার দেখা-জানা বলছে- ছাত্রদের সবচেয়ে বড় যে অংশ হাজির ছিলেন তারাও দল বা গ্যাং হিসেবে না- যার যার অন্তর ও/বা বিবেকের তাড়নায় রাজপথে নামছিলেন। এমনও দেখছি, কুরিয়ারের ডেলিভারিম্যান, পানির ফিটিংমিস্ত্রী তার কাজ রেখে আন্দোলনে সক্রিয় আছেন, অনেক   ক্ষেত্রে গলায় যে কোনো একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড ঝুলিয়ে নিয়ে, ছাত্র সেজে আন্দোলনে ছিলেন তারা। রাজনৈতিক দলগুলার কর্মীদের বিপুল অংশগ্রহণ দেখেছি কিন্তু সে   ক্ষেত্রেও তারা দল না, ব্যক্তি হিসেবে হাজির ছিলেন। শেষদিকে এই হাজিরা তালিকায় অনেক অনেক ছাত্রলীগ-কর্মীও দেখেছি, সদ্য দলত্যাগীকে   দেখেছি হাসিনার পতন নিশ্চিত করতে জীবন দিতেও প্রস্তুত- ১৬/১৭ই জুলাইয়ের পর তারা ভাইয়ের রক্তের বদলা নিতে চাইছিলেন এবং নিয়েই ঘরে ফিরেছেন।
এই যে, বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তি তিনিই ‘জন’। বঙ্গীয় শব্দকোষে বলা হয়েছে- ‘জন’ ধাতুটির অর্থ জনন, উৎপত্তি, হওয়া থেকে শুরু করে জন্মী, জীব ইত্যাদি অর্থ বহন করে। বাংলায় ‘জন’ ‘পুরুষ’ (নর না) অর্থেও ব্যবহৃত হয়- ‘জানেন যে জন (অন্তর্যামী যিনি)।’ কিন্তু মৈথিলি ভাষায় ‘জন’ শব্দের অর্থ শ্রমজীবী, মজুর। হরিচরণ আলালের ঘরে দুলাল থেকে ‘জন’ শব্দের ব্যবহারের যে উদাহরণ দিয়েছেন তা হচ্ছে- ‘জনখাটা ভরসা’। বাংলা ভাষাতেও এমন অসংখ্য ব্যবহার রয়েছে যেখানে ‘জন’ হচ্ছে একক মানুষ, ব্যক্তি মানুষ। আমরা যেমন বলি- কতজন এলো  গেল/ জনে জনে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে/সে আমার আপনজন ইত্যাদি। এ সবের প্রতিটি   ক্ষেত্রেই ‘জন' একক ব্যক্তিকে, বিচ্ছিন্ন মানবসত্তাকে নির্দেশ করে।
৪.
ছাত্ররা আন্দোলনে ছিলেন, তবে সব   লোক-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার পর ঢাকার ‘রাজনীতিমুক্ত’ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, যারা রাজনৈতিক দলভুক্ত বলে কখনো   কেউ  মানেননি, তারা বিপুলভাবে রাজপথে হাজির হয়েছিলেন। লীগ নিয়োজিত মাস্তানবাহিনীর যাচ্ছেতাই আচরণ, পথে পথে মোবাইলে  চক/ কেড়ে নেয়া, সন্দেহ হলেই চড়থাপ্পড় ইত্যাদি তাদের সম্ভবত ত্যাক্তবিরক্ত করে তুলছিল। পুলিশের মাতব্বরি,   শেখ হাসিনাসহ সরকারি লোকদের আহাম্মকের মতো ব্যাটাগিরি এই ছাত্রদের পথে নামতে ‘তাগাদা’ দিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমার চোখে- ছাত্রদের এই হাজিরা এমন মাত্রায় ছিল না যে তাতে সরকার পড়ে যেতে পারে। দেখেছি- আইডি ঝুলানো কিছু তরুণ, যারা আসলে একে-অপরকে  চেনেনও না, তারা রাস্তায় দাঁড়ালেই আশপাশেরে  লাকজন বিপুলভাবে তাদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে গেছেন। এই পরস্পর বিচ্ছিন্ন মানুষগুলো যেন যুগযুগান্তরের ক্ষোভকে আগুন করে ছড়িয়ে দিতে চাইছিলেন। ‘হাসিনাগংকে ফেলে দেওয়ার যুদ্ধে’ তারা শহীদ হওয়ার জন্য যেন পাগল হয়ে গিয়েছিলেন!
এই মানুষগুলো যখন পথে নেমে এসেছেন, আন্দোলনের সামনে চলে   গেছেন তখন ছাত্রদের ভূমিকা আর মুখ্য থাকেনি। তবে ছাত্রদের যদি  কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে   চেয়েছে মানুষ তাকে বাধা দেয়নি, আহ্লাদও দেখায়নি। এই নেতৃত্ব   দেয়া ছাত্ররাও একক সিদ্ধান্তে, একা সাহস করে, দল ছাড়াই ওই ঝুঁকি গ্রহণে ব্রতী হয়েছিলেন বলেই আমার পর্যবেক্ষণ।
৫.
আন্দোলনে একটা ছোট ফিচার ধরা পড়েছে আমার চোখে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল আন্দোলন থমকে যেতে পারে। পরে   খেয়াল করলাম- আন্দোলন যারা করছে, সোশ্যাল মিডিয়া বা নিউজ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাই নাই। এমন কি ইন্টারনেট থাকাকালেও   সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররা কে কী বলে চলেছেন তা শোনার ‘টাইম নাই’ তাদের। তারা যেন বুঝে গিয়েছিলেন- তারাই নিউজ-মেকার। তারা নিউজের এলিমেন্ট নন। আর যারা প্রতিদিন আন্দোলনে নেমেছেন, তারা তো স্মার্টফোনে ছেড়ে বাটন   ফোন ধরেছিলেন! নাগরিকদের একটা অংশ জীবনের সবরকম মায়া ছেড়েই ‘হাসিনারে ফেলে দিতে’ পথে ছিলেন। কিন্তু তাই বলে সামাজিক মিডিয়ার ভাষ্যকার, বিশ্লেষকদের বিপুল অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন পরিণতি পেত বলে মনে করার কারণ নাই। অথচ ইনারা কেউ গ্যাং ধরে এসব কিছু করছেন, সমিতি বানিয়ে তা করছেন অর্থাৎ ‘গণ’ হিসেবে আন্দোলনে হাজির ছিলেন বলে সাদা   চোখে ধরা পড়েনি।
৬.
মাঝেমাঝে ভাবি, যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়া-রামপুরা-আব্দুল্লাহপুর যদি রুখে না দাঁড়াতো তাহলে কী হতো? যাত্রাবাড়ীর মতো অনেক অনেক জায়গায় পরস্পর অপরিচিত ব্যক্তি বিপুল সংখ্যায় এবং নেতা/নেতৃত্ব ছাড়াই একান্ত ব্যক্তিগত দায়ে বাধ   থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘হাসিনা গংরে ফেলে দিতে’ রাস্তায়   নেমেছিলেন। এই আন্দোলনে মাদ্রাসার ছাত্রদের ভূমিকা বিশাল- কিন্তু তারা ‘তালিব’ হয়ে আন্দোলনে আসেন নাই, এসেছেন রাষ্ট্রের এক একজন নাগরিক বা রাষ্ট্রজন হয়ে।
৭.
ওপরের ভাষ্য যদি সত্য হয়- তাহলে ছাত্রদের কেন ‘গণ’-এর বাইরে রাখা হচ্ছে? তারা তো গণের অংশ হিসেবেই ক্রিয়াশীল ছিলেন। একই কথা প্রযোজ্য শ্রমিক বা অন্য যে কোনো বর্গের   ক্ষেত্রে। তারা কেউই দল বা গ্যাং বা গণ হিসেবে হাজির ছিলেন না। তাহলে তারা কী পরিচয়ে হাজির ছিলেন? আমার প্রস্তাব হচ্ছে, তারা হাজির ছিলেন ‘জন’ হিসেবে। যে ‘জন’ হচ্ছে ‘একক ব্যক্তিসত্তা’। মানে দল বা গণ/গ্যাং না, নিজের স্বাধীন ইচ্ছায়, নিজের অংশ উপ-অর্জন করেছেন একেক ‘জন’। একজন, দুইজন, বহুজন- যারা পৃথক কর্তা-সত্তা নিয়া সমাজে/রাষ্ট্রে ক্রিয়া করেন, সেই জনে জনে একতা গড়ে তুলে জনতায় উত্থিত হয়েছিলেন।  
৮.
জুলাই-আগস্টে যে আন্দোলন হয়েছিল তাকে সবচেয়ে কম কথায় যদি নির্দেশিত করতে চাই, তাহলে তা হচ্ছে- এইটা ছিল বাংলাদেশের শহুরে ব্যক্তি-মানুষের একেবারে ব্যক্তি হিসেবে ঝুঁকি নিয়ে ‘হাসিনারে  ফেলে   দেওয়ার’ আন্দোলন। যাকে ‘জন’ আন্দোলন বলে নির্দেশ করা সম্ভবত সত্যের সবচেয়ে কাছাকাছি বলে বিবেচিত হতে পারে। এই ‘জন’ আন্দোলনই ক্রমে পরিণতি পেয়েছে একটা সফল ‘জনঅভ্যুত্থান’ হিসেবে।
৯.
এই সংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তা এই কথাটি বলার জন্য যে, যেহেতু এটি ‘গণ’ নয় ‘জন’ অভ্যুত্থান ছিল ফলত এই জনঅভ্যুত্থানের দূরপ্রসারী  কোনো স্বপ্ন/চিন্তা/ভাবনা ছিল না অথবা বলা যায় সামষ্টিক একটা স্বপ্ন/কল্প ‘প্রকল্প’ আকারে গড়ে ওঠার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন ছিল তা ওই আন্দোলন পায়ইনি। ‘হাসিনারে   ফেলে দেওয়া’র লক্ষ্য পর্যন্ত জনে জনে একতা গড়ে তুলে জনতায় পরিণত হয়েছিল কিন্তু তারপরে কী হবে- সে বিষয়ে জন-তার ভাবনা-চিন্তা ছিল বলে   কোথাও কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। তাদের যদি কিছু বাসনা থেকেও থাকে, তার রূপায়ণ বা আকার ৫ই আগস্টের আগে দলগতভাবে সেই জনতার মাঝে উপস্থাপিত ও চর্চিত হওয়ার উদহারণ দুর্লক্ষণীয়।
১০.
আন্দোলন যখন দ্রুত রঙ বদলাচ্ছিল এবং ক্রমশ আরও রক্তাক্ত হয়ে উঠছিল- তখনও ‘হাসিনারে ফেলে   দেয়ার পর’ কী তরিকায় সরকার গঠন হবে, কী তরিকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হবে তা আমাদের শিক্ষিত-বাঙালি সমাজ জনপরিসরে হাজির করতে পারে নাই। অথচ এখন কত কথা হচ্ছে! ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা/অভিপ্রায়’ হিসেবে অনেকে যেন আকাশ  ভেঙে   ফেলার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছেন! ‘জন’   কে ‘গণ’-এ পরিণত করা, তাকে গঠিত ও পরিগঠিত করা হয় তো সম্ভব কিন্তু ৫ই আগস্ট পর্যন্ত যে আন্দোলন চলেছে এবং ৫ই আগস্ট যে অভ্যুত্থান হয়েছে তাতে ‘গণ’-এর উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল না। যা ছিল তা জন-এর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ওটি আদতে ছিল জন-অভ্যুত্থান। গণপরিসরে কথাবার্তা শুরু হলেও আজতক জনপরিসরে রাষ্ট্র-প্রকল্প নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরুই হয়নি।
বিচ্ছিন্ন একক মানুষের সাময়িক সমূহ হয়ে ওঠার পরিণতি যে জন-অভ্যুত্থান তা স্বল্প দূরত্বের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যকর হয়েছে মানে এই না যে তা সুদূর লক্ষ্য পর্যন্ত তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে। যদি জুলাই জনঅভ্যুত্থানকে ছেদবিন্দু ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গঠন করতে হয়, রাষ্ট্রসংস্কার করতে হয়, যদি তার নতুন গঠনতন্ত্র নির্মাণ করতে হয়, তবে অবশ্যই প্রতিটি বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তিসত্তা বা জনকে মোকাবিলা করার মাধ্যমেই তা করতে হবে।
আধুনিক রাষ্ট্রগঠন মানে প্রতিটি ব্যক্তির   সেই রাষ্ট্রের সংস্কারে ও/বা গঠনতন্ত্র নির্মাণেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অর্থাৎ প্রতিজনের মতামত প্রতিফলিত করে এমন একটি গঠনতন্ত্র ওরফে সংবিধান এবং সংস্কার-প্রস্তাব তৈরি করা। সংস্কার-প্রস্তাব ও গঠনতন্ত্রে কেবল   সেটুকুই থাকতে পারে বা গঠনতন্ত্রের   কেবল সেটুকুই সংস্কার হতে পারে যতটুকুতে প্রতিটি মানুষের সম্মতি রয়েছে বা থাকবে। বাংলাদেশে যদি ‘গণঅভ্যুত্থান’ সংঘটিত হতো, অর্থাৎ   কোনো একক নেতার নেতৃত্বধীন গণের (দলের) বা গণসমূহের (দলসমূহের) ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বে উত্থান হতো ‘গণ’-এর তাহলে সম্ভবত ‘জন’-এর  মোকাবিলা না করেও নতুন একটা গঠনতন্ত্র ও সংস্কার-প্রস্তাব পেতে পারতো বাংলাদেশ। এভাবে সংস্কার ও গঠনতন্ত্র পেয়ে যাওয়া ভালো হতো না হয়ে তা কিন্তু কাজটা সহজ হতো। এখন আর তা সম্ভব না। যেহেতু ‘গণঅভ্যুত্থান’ না হয়ে হয়েছে ‘জনঅভ্যুত্থান’, সুতরাং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠনে (প্রতি)জনকে মোকাবিলার দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করা এখন রাষ্ট্রজনদের জন্য আবশ্যিক শর্তে পরিণত হয়ে গেছে। এই পথে   ছেঁটে ফেলে সহজে কার্যসিদ্ধি করার কথা যদি রাজনীতিকরা ভাবেন তাহলে নিশ্চিত জানবেন- জনমানুষ তা অন্তর   থেকে গ্রহণ করবে না এবং ফলত সে গঠনতন্ত্র বা রাষ্ট্রসংস্কার স্থায়িত্বও পাবে না। কাঙ্ক্ষিত সংস্কার, কাঙ্ক্ষিত সংবিধান, ও কাঙ্ক্ষিত সমাজ-রাষ্ট্র পাওয়ার কোনো সহজ-সংক্ষিপ্ত পথ নাই। জনঅভ্যুত্থান তা তৈরি করে  দেয় না। দীর্ঘ ও যত্নশীল চেষ্টা ও সাধনাতই  তো কেবল হাসিল হতে পারে। জুলাই জনঅভ্যুত্থান সেই পথযাত্রার দুয়ার উন্মুক্ত করেছে মাত্র।
লেখক: শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

mzamin

কমলাপুর স্টেশন: মানুষ বেচা কেনার হাট by শাহীন কাওসার ও ফাহিমা আক্তার সুমি

কমলাপুর রেলস্টেশন। রেলপথের পুরো দেশের কেন্দ্রস্থল। ট্রেনের হুইসেল আর লাখো যাত্রীর পদভারে রাতদিন একাকার হয়ে যায় এখানে। দিনে কতো মানুষ আসে, কতো মানুষ যায় এই স্টেশন হয়ে। এই যাত্রীদের ঘিরে জীবন-জীবিকার সংস্থান হয় অনেক মানুষের। তাদের কারও কারও আবার ঘরবাড়ি মানে এই স্টেশন। এদের কেউ ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করে আবার কেউ ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িত। এই অপরাধ চক্রের সদস্যরা মানুষ বিক্রির মতো জঘন্য কাজ করে এই স্টেশনে বসেই। অবুঝ শিশু, কিশোরী এমনকি নারীদেরও বিক্রি করে দেয় এই চক্র। সরজমিন কয়েক দিন কমলাপুর স্টেশনে অবস্থান করে মানবজমিন মানুুষ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত এই চক্রের বিষয়ে বিস্তর তথ্য পেয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে অসহায় অবস্থায় কমলাপুর এসে অনেকে আশ্রয় নেয়। এই অসহায় মানুষদেরই টার্গেট করে গড়ে উঠেছে এই চক্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিশু চুরির সঙ্গেও যোগসাজশ আছে তাদের। এই চক্রটি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চুরি করে আনা শিশু তুলে দেয় কোনো পরিবারের হাতে। আবার এই শিশুদের বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাবৃত্তির কাজে ব্যবহারেরও অভিযোগ আছে। এ ছাড়া কিশোরী বা নারীদেরও নানা পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয় তারা। এই কিশোরী বা নারীরাও নানাভাবে পরবর্তীতে পাচার বা সহিংসতার শিকার হন।

কমলাপুরে মানুষ কেনাবেচার এই চক্রটিতে ১০ থেকে ১২ জন। সোমবার কমলাপুর রেলস্টেশনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় চক্রটির মূলহোতা রুবেলের সঙ্গে। এক ব্যক্তিকে ক্রেতা সাজিয়ে তার কাছে একটি শিশুর চাহিদার কথা জানানো হয়। শুরুতে সে এড়িয়ে যেতে চাইলেও তার এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আনে। একপর্যায়ে চাহিদামতো শিশু এনে দিতে পারবে বলে জানায়, দাবি করে  মোটা অঙ্কের অর্থ। শুধু শিশু নয় কিশোরী ও তরুণীদেরও বিক্রি করে দেয়ার তথ্য দেয়। তরুণীদের গর্ভে অবৈধভাবে ধারণ করা সন্তান বিক্রিরও প্রস্তাব দেয়। একটি পাঁচ মাসের ছেলে সন্তান বিক্রির জন্য দরদামও হাঁকায়।

শিশু-কিশোরীদের পাচারের কথা জানিয়ে রুবেল বলে, ছোট-বড় যে বয়সী শিশু দরকার সেটি দিতে পারবো। শিশু সংগ্রহের কৌশলের বিষয়ে সে বলে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তার নির্ধারিত লোক শিশু চুরি করে নিয়ে আসে। এই শিশুদের পরে বিক্রি করে দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এই চক্রের সদস্যদের ধরা পড়ার তথ্যও জানায় এই যুবক।  

চক্রের ৬ সদস্য শিশু চুরির কাজ করে জানিয়ে রুবেল বলে, এখান থেকে খরচ দিয়ে আমি তিনটি মেয়েকে পাঠিয়ে দিবো। তারা যাবে ময়মনসিংহ, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া এবং জয়দেবপুর এবং অন্য কয়েকটি জেলায় যাবে বাকিরা। মোট আমাদের ছয়টি মেয়ে যাবে, তারা সঙ্গে করে দুইটা বাচ্চা নিয়ে আসবে। তারা নিয়ে এসে আমাকে খবর পাঠাবে আমরা আবার সেখান থেকে নিয়ে আসবো।

ক্রেতা সেজে একজন শিশুর চাহিদা জানালে রুবেল টাকা দাবি করে বলে, রাতে তার চক্রের ৬ সদস্যকে ঢাকার বাইরে পাঠানোর জন্য গাড়ি ভাড়ার খরচ বাবদ দুই হাজার টাকা দিতে হবে।
ঘণ্টাখানেক পর একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল করে শিশুটিকে হাতে পাওয়ার পর ১ লাখ টাকা দাবি করে রুবেল। সে বলে, কমলাপুরে এসে বাচ্চাটিকে নিতে হবে।
অন্য একজন একটি কিশোরীর চাহিদা জানালে রুবেল বলে, মারিয়া নামের একটি মেয়ে আছে। তার জন্য আমাকে ২০ হাজার টাকা দিলে হবে। মেয়েটিকে কোনো টাকা দেয়া লাগবে না। তাকে একেবারে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।

রুবেল কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে একটি পানির পাম্পে কাজ করার কথা দাবি করেন।
এসময় তিনি নিজের বাড়ি নোয়াখালী দাবি করেন। ওদিকে স্টেশনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে চক্রের কিছু কাজের আলামতও মিলে। শুধু শিশু না, ভবঘুরে ছিন্নমূল কিশোরী, তরুণীদেরও নানা কাজে ব্যবহার করে রুবেলসহ একাধিক চক্র। তাদের ভয় ও লোভ দেখিয়ে নানা অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এমন একজন কিশোরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, রুবেল ভাই আমাকে যেতে বলেছে। আর বলেছে আমি যেন গিয়ে ঠিকমতো কথা শুনি, যদি কথা না শুনি তাহলে কমলাপুরে দেখলে খারাপ হবে। এরচেয়ে আর বেশি কিছু বলেনি। কিশোরীটি বলে, আমার সৎমা ধরে আমাকে মারতো। নিজের মা আরেক জনকে বিয়ে করেছে। কিছু চাইলে ঠিকমতো দিতে চাইতো না। স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারতাম না। বই-খাতা কিনতে চাইলে কিনে দিতো না। এরপর অল্প বয়সে বাড়ি থেকে ট্রেনে করে চলে আসি কমলাপুরে। এখানে এসে থাকা শুরু করি। নিজের বলতে এখানে কেউ নেই। যখন আমার ৭ থেকে ৮ বছর বয়স তখন আসি। আমার বাড়ি রংপুর। সাত বছর ধরে থাকি। বাড়ি থেকেও কখনো কেউ খোঁজ নেয়নি। কিশোরীটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটা ও সুঁচের চিহ্ন দেখা যায়। এসব কী জানতে চাইলে সে বলে এখানে থাকা প্রায় সবাই মাদক গ্রহণ করে, নেশা করে।

আরেক কিশোরী বলে, একেবারে ছোটবেলায় চলে আসি। রাজশাহী আমাদের গ্রামের বাড়ি। এই জগতটা আর ভালো লাগে না। অনেক ঘটনা ঘটে এই কমলাপুরে। নতুন বা পুরাতন যেই আসুক মানুষের মোবাইল ছিনতাই হয়। যাত্রীদের ব্যাগ ছিনতাই হয়। অনেকে অনেকভাবে খারাপ কথা বলে। ব্লেড দিয়ে হাত-পা কাটি। শরীরে ড্রাগ নেই, এতে নেশা হয় সব ভুলে থাকি। কখনো কখনো কষ্টে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাই। এখানে আসার পর মানুষ আর ভালো থাকতে দেয়নি। এই কিশোরীও রুবেলের কথামতো কাজ করে বলে জানায়।

২৩ বছরের আরেক তরুণ বলেন, আমার জন্মই কমলাপুর। বাবা-মা গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে আসে। এখন তাদের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ তেমন নেই।
আমার কোনো বাড়িঘর নেই এই কমলাপুরই সব। আমি বাইরে কোথাও ভিক্ষা করতে গেলেও কমলাপুরের কথা আমার চোখে ভাসে। এই রেলস্টেশন আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। আমার অনেক কষ্ট আছে সেজন্য আমি এলাকায় যাই না। আমি আমার মা-বাবা ছাড়া কাউকে চিনি না। করোনার সময় মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে আর হয়নি। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়লে এক জায়গায় বসে কান্নাকাটি করে নিজের দুঃখ নিজের কাছে বলি। এই কমলাপুরই আমার ভালোবাসা। এখানে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়াও বিভিন্ন কাজ করি, তাতে প্রায় ৭-৮ শত টাকা আয় হয়।

স্টেশনে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, এখানে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায়ই অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা ট্রেনে চড়ে ঢাকায় আসে। শুধু তাই নয় ছোট ছোট শিশুরাও আসে। আবার বিভিন্ন ছেলেদের প্রেমের ফাঁদে পড়ে মেয়েরা এখানে আসে। পরে মেয়েটাকে ফেলে রেখে চলে যায়। এসব মেয়েরা আর ফিরে যায় না পরিবারের কাছে। অনেক ছেলে-মেয়ে আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে রাগ করে আসে। কেউ সৎমায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চলে আসে। এখানে অনেকে অভাবের কারণে নিজের বাচ্চা বিক্রি করে দিতে শুনেছি। যাদের বাচ্চার প্রয়োজন হয় তারা মোবাইল নাম্বার দিয়ে যায়।
বারবার নাম জানতে চাইলেও নিজের নামটি বলতে চাননি এ তরুণ। তিনি বলেন, এখানে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ নেই। আমার মতো যারা থাকে তাদের কেউ ভালো, কেউ খারাপ। তবে কমলাপুর সবারই ঠিকানা।

mzamin

Monday, December 30, 2024

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট শতবর্ষী জিমি কার্টার আর নেই

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার মারা গেছেন। স্থানীয় সময় রোববার বিকেলে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্লেইনসে নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। জিমি কার্টারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তার প্রতিষ্ঠান কার্টার সেন্টার। জিমি কার্টার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী প্রেসিডেন্ট যিনি গত অক্টোবরে ১০০তম জন্মদিন উদযাপন করেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, ১৯৭৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে পরাজিত করে প্রথম বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কার্টার। তিনি ডেমোক্রেট দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির জন্য বেশ আলোচিত হয়েছিলেন তিনি। কেননা ওই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল। তবে অর্থনৈতিক মন্দা এবং ইরানের সঙ্গে জিম্মি সংকটের কারণে ক্রমাগত অজনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন জিমি কার্টার। ৪৪৪ দিনেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন শেষ করেন তিনি। এরপর ১৯৮০ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচন করেন, তবে সেবার রিপাবলিকান দলের রোনাল্ড রিগ্যানের কাছে ভরাডুবি হয় তার। বিপুল ভোটে জয় পান সাবেক অভিনেতা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর রিগান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস ত্যাগ করার পর থেকে দেশটির প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় বেঁচে ছিলেন কার্টার। তিনি মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। একজন প্রেসিডেন্টের তুলনায় সাবেক হিসেবে অধিক সম্মান পেয়েছিলেন তিনি, যা সহজেই স্বীকার করতেন কার্টার।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রতি সহানুভূতিশীল, নম্র এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হিসেবে প্রশংসিত কার্টারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিশ্বনেতা এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি তার এক্সের পোস্টে লিখেছেন, শান্তি চুক্তি অর্জনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা... ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা থাকবে। শেষ বিদায় জানাতে অটলান্টা ও ওয়াশিংটনে জড়ো হবেন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষ। এরপর প্লেইনসে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন মার্কিন শতবর্ষী এই প্রেসিডেন্ট।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কার্টার বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। যার মধ্যে ছিল মেলানোমাও। এই রোগটি তার রক্ত এবং মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। কার্টার অতিরিক্ত চিকিৎসা হস্তক্ষেপের পরিবর্তে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হসপিস যত্ন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার স্ত্রী- রোজালিন কার্টার, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৯৬ বছর বয়সে মারা যান। হুইলচেয়ারে তার স্মৃতিচারণ এবং শেষকৃত্যে যোগ দেয়ার সময় কার্টার বেশ দুর্বল ছিলেন।
কার্টার বেশ অজনপ্রিয় অবস্থায় প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও মানবিক কাজের জন্য কয়েক দশক ধরে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সংঘাতের সমাধান খুঁজে বের করা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে এগিয়ে নেয়া এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রচারে নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে শান্তিতে নোবেল পান জিমি কার্টার। উল্লেখ্য, ৪ সন্তান ও ১১ নাতি-নাতনি রেখে গেছেন তিনি।

mzamin

আল্লাহর অলৌকিক উট by আবু আশফাক মুহাম্মাদ

দ্বিতীয় মানবসভ্যতার নবী নুহ (আ.)-এর ছেলে ছিলেন সাম। হজরত সালেহ (আ.) ছিলেন সামের বংশধর। তিনি সামুদ জাতির নবী। হিজাজ ও সিরিয়ার মধ্যস্থলে অবস্থিত ওয়াদিউল কোরা প্রান্তরে ছিল তাঁদের বসতি, বর্তমানে লোকে যাকে চেনে ‘ফাজ্জুহ নাকাহ’ বা ‘মাদায়েনে সালেহ’ নামে। আরবের বিখ্যাত ঐতিহাসিক মাসউদি বলেন, ‘সিরিয়া থেকে হিজাজে যাওয়ার পথে সামুদ সম্প্রদায়ের ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতিগুলোর ভগ্নাবশেষ এবং তার প্রাচীন চিহ্নগুলো দেখা যায়।’ (কাসাসুল কোরআন, মুহাম্মদ হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড ১, পৃ ১২৮)

বেশ সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন ছিল সামুদ জাতি। অর্থে স্বাবলম্বী ও শক্তিতে বলীয়ান ছিল। তাদের সুখ-শান্তির কমতি ছিল না। পাথর খোদাই ও স্থাপত্যবিদ্যায় তাদের বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। বড় বড় প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে দালানকোঠা বানাত তারা। কারুকার্য ও নকশা করে পাথর দিয়ে সুন্দর প্রাসাদ তৈরি করত। তাদের ছিল সবুজ-শ্যামল উদ্যান। সোনা-রুপার প্রাচুর্যে মোড়ানো জীবন। কিন্তু তারা আল্লাহকে মানত না। আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার করত। বহু উপাস্যের আরাধনা করত। মূর্তিপূজা করত। তাদের গোত্রের লোক সালেহ (আ.)। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত, বিচক্ষণ, সুবক্তা ও পণ্ডিত ব্যক্তি।

একদিন তিনি আল্লাহর নবী হয়ে তাদের কাছে গেলেন। তাদের একাত্মবাদের পথে আহ্বান করলেন। বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাসক নেই, তিনিই তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাতেই তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কাজেই তাঁর কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো, আর তাঁর দিকেই ফিরে এসো, আমার প্রতিপালক তো অতি কাছে, আর তিনি ডাকে সাড়া দানকারী।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)

দুর্বল ও নগণ্য গুটিকয়েকজন ছাড়া কেউ তাঁর ডাকা সাড়া দিল না। সতর্কবার্তাও এড়িয়ে গেল। তারা প্রাসাদ, অর্থবৈভব ও বিলাসসামগ্রী নিয়ে গর্ব-অহংকার করল। বলল, নবী হলে তো আমরা হব, সালেহ কেন হবে? পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আমাদের মধ্য থেকে কি তার ওপরই কোরআন নাজিল হলো?’ (আমরা বিদ্যমান থাকতেও কি এই লোকটির ওপর আল্লাহর নসিহতগুলো নাজিল হলো?) (সুরা সাদ, আয়াত: ৮)

তারা সালেহ (আ.)-এর কাছে নবী হওয়ার দলিল চাইল। তারা দাবি করল, আপনি যদি বাস্তবিকই আল্লাহর রাসুল হন, তাহলে আমাদের কাতেবা নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উট বের করে দেখান। সালেহ (আ.) তাদের থেকে ইমান আনার প্রতিশ্রুতি নিলেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিল। সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী উট বেরিয়ে এল পাথরময় পাহাড় থেকে। কোরআনে এটিকে ‘আল্লাহর উট’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ বিস্ময়কর মোজেজা দেখে কিছু লোক তৎক্ষণাৎ ইমান আনল। অন্যরা ইমান আনতে চাইলে পুরোহিতরা বাধা দিল।

সালেহ (আ.) তাদের উটের ব্যাপারে সতর্ক করলেন। এটিকে কষ্ট দিতে নিষেধ করলেন। বললেন, ‘আল্লাহর এই উটটি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন। অতএব তাকে আল্লাহর জমিনে বিচরণ করতে দাও এবং তাকে মন্দভাবে স্পর্শও করো না। নতুবা অতিসত্বর তোমাদের আজাব পাকড়াও করবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬৪)

একই কূপ থেকে উটনী ও অন্য জন্তুদের পানি পান করাত তারা। উটনী পানি পান করলে পানি শেষ হয়ে যেত। সালেহ (আ.) উটনীর জন্য একদিন ও তাদের জন্য একদিন নির্ধারণ করে দিলেন। অনেকেই সালেহ (আ.)-এর কথা মেনে নিল। এভাবে কিছুদিন চলল। তারা উটনী ও তার বাচ্চাদের থেকে উপকৃত হলো। এর মধ্যে তারা পানি নিয়ে উটনীর দিনটাকে ঝামেলা মনে করল। উটনীকে হত্যা করতে ফন্দি আঁটল। একপর্যায়ে সামুদ জাতির ‘মিসদা’ ও ‘কাসার’ নামের দুই যুবক বিভিন্ন প্রলোভনের নেশায় মত্ত হয়ে এই উটনীকে হত্যা করে। (কাসাসুল কোরআন, মুহাম্মদ হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড ১, পৃ ১৪৪-১৪৫)

আল্লাহ–তায়ালা সে অবস্থার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর তারা উটনীকে হত্যা করল এবং স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। তারা বলল, হে সালেহ, নিয়ে এসো যা দিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে, তুমি যদি রাসুল হয়ে থাকো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৭৭)

সালেহ (আ.) উটনী হত্যার কথা শুনে লোকদের কাছে গেলেন। আজাবের দিনক্ষণ জানিয়ে দিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘তারা ওকে মেরে ফেলল, তখন সে (সালেহ) বলল, তোমরা নিজেদের ঘরে আরও তিন দিন বাস করে নাও; এটি ওয়াদা, যাতে বিন্দুমাত্র মিথ্যা নেই।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬৫)

প্রথম দিন তাদের সবার মুখমণ্ডল হলদে ফ্যাকাসে, দ্বিতীয় দিন লাল এবং তৃতীয় দিন ঘোর কালো হয়ে গেল। এক শনিবার ভোরে গগনবিদারী গর্জন, মুহুর্মুহু বিজলির চমক আর ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাদের মৃত্যু হলো। তারা নিজ নিজ ঘরে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর পাকড়াও করল তাদেরকে ভূমিকম্প। ফলে সকালবেলায় নিজ নিজ ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৭৮)

* আবু আশফাক মুহাম্মাদ: লেখক ও আলেম

প্যারিসের ‘উন্মুক্ত জেলে বন্দী’ দেশহীন ফরিদুলের গল্প by মুহম্মদ মুহসীন

তাঁর সঙ্গে আমার দেখা প্যারিসের লা-কুন্নভের একটি বাড়িতে। সে বাড়িতে একটি মেস আছে। সেখানে কয়েকজন বাঙালি থাকেন। তাঁদের রান্নাবান্নার কাজ করেন তিনি।

তাঁর নাম ফরিদুল আলম। ডাক নাম ফরিদ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চেহারায় স্থায়ী বিষন্নতার ছাপ।

ফরিদের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি যে ‘আত্মজীবনী’ শোনালেন, তা ‘রীতিমতো নভেল’। কোনো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নয়, বরং পরিবারের সদস্যরা যাতে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্য মরিয়া হয়ে ‘দেশ থেকে দেশ–দেশান্তরে’ তাঁর ছুটে বেড়ানোর গল্পটা যে কোনো কাহিনি–লোভাতুর চিত্রনির্মাতাকেও হয়তো ‘তারপর? তারপর?’ বলতে বাধ্য করবে।

লা কুন্নভের ওই বাড়িতে ফরিদ নিজের হাতে রান্না করে খাইয়ে তাঁর গল্পটা যখন বলছিলেন, তখন আধুনিক সভ্যতার অভিবাসন ব্যবস্থা, পরিযায়ী শ্রমিকদের কষ্ট আর আমাদের অভিবাসন ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেন তিরের মতো আমাদের বুকে বিঁধছিল।

ফরিদের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে। বাবার নাম আমিরুল আলম। মায়ের নাম আয়শা খাতুন। গরিব বাবার সংসারে জন্ম। তাই লেখাপড়ার সাধ তাঁর পূরণ হয়নি।

দুবাই দিয়ে শুরু

২০০৩ সালে আয়ের আশায় ফরিদ পাড়ি জমিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আরব আমিরাতের আলোঝলমল শহর দুবাইয়ে।

সেখানে পৌঁছে দেখেন বাঙালি শরীরে গতর খেটে এখানে পয়সা খুব একটা আসে না। কোনো দিন কাজ জোটে, কোনো দিন জোটে না।

কোনো মাসে বাংলাদেশি টাকায় ১০ হাজার, আর কোনো মাসে হয়তো ২০ হাজার আয় করা যায়।

এ দিয়ে নিজের খরচ শেষে দেশে পাঠানোর মতো তেমন কিছু আর হাতে থাকে না।

অথচ দেশ ছাড়ার আগে কতই না স্বপ্ন ছিল! বাবা-মাকে টাকা পাঠাবেন, সঞ্চয় করবেন আর সেই সঞ্চয় দিয়ে দেশে ফিরে বিয়ে-থা করে সুখের সংসার গড়বেন।

কয়েক বছর পার করে ফরিদের স্থির বিশ্বাস হয়, দুবাই শহরে গতর খেটে এই স্বপ্ন কোনো দিন বাস্তবের কাছেও আসবে না।

ইউরোপের স্বপ্ন

ফরিদের মনে হলো, স্বপ্ন পূরণ হবে যদি পা রাখা যায় ইউরোপের মাটিতে।

কিন্তু ফরিদ কীভাবে ইউরোপ যাবেন? কীভাবে এ স্বপ্ন তাঁর পূরণ হবে? এই স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে ভাবতে অল্প দিনেই ফরিদ দেখলেন, তাঁর মতো বহু ফরিদের স্বপ্ন পুঁজি করে দুনিয়াজোড়া এক রমরমা অবৈধ আদম পাচারের ব্যবসা চালু আছে।

ব্যবসাটা অবৈধ হলেও তাকে অবৈধ বলতে মন সায় দেয় না। কারণ দেশে দেশে এর সঙ্গে জড়িত আছেন হাজার হাজার পুলিশ, শত শত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এবং বড় বড় গডফাদার।

কেতাবি আইনে এ ব্যবসা যতই অবৈধ হোক, আইনি লোকজনের সায় সম্বল করেই এ ব্যবসা চলছে এবং সত্যিকারেই এই উপায়ে এশিয়া আফ্রিকার শত শত মানুষ পৌঁছে যাচ্ছে স্বপ্নের ভূমি ইউরোপের মাটিতে।

সুতরাং ‘যা করে খোদায়’ বলে ফরিদও এই পথে পা বাড়ানোর ইরাদা করলেন। অনেক ভাবাভাবি আর সাধ্যমতো তত্ত্বতালাশের পরে ধরলেন দেশেরই এক দালালকে। দালালের নাম নূর ইসলাম, তাঁর বাড়ি নোয়াখালী।

দালালের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি হলো পাঁচ লাখ টাকায়। ঠিক হলো, দালাল তাঁকে গ্রিস পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন। এজন্য ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হবে।

এরপর দেড় লাখ টাকা দিতে হবে ইরানে পৌঁছানোর পরে। আর তুরস্কে যাওয়ার পর অবশিষ্ট তিন লাখ পরিশোধ করতে হবে।

সেই টাকা পেলে দালালের লোকজন ফরিদকে ইউরোপে পৌঁছে দেবেন।

দুবাই থেকে ওমান দিয়ে ইরান হয়ে দুঃস্বপ্নযাত্রার শুরু

‘কন্ট্রাক্ট’ অনুযায়ী ফরিদ শুরু করলেন তাঁর স্বপ্নযাত্রা। সময়টা ২০১০ সালের শেষ দিকে। আদম ব্যবসার লোকজন দুবাই থেকে ফরিদ এবং ফরিদের মতো কয়েকজনকে একসঙ্গে তুলে দিল একটি ট্যাক্সিতে।

ট্যাক্সি পৌঁছাল ওমানের সমুদ্র-তীরবর্তী পাহাড়ি এক এলাকায়। সে এলাকার নাম ফরিদ বলতে পারেননি। যাত্রীদের কোনো ধরনের পাসপোর্ট-ভিসা না থাকলেও তাঁদের নিয়ে ট্যাক্সিটি আরব আমিরাতের সীমান্ত পার হয়ে ওমান পৌঁছাল।

কোনো সমস্যা হলো না। কারণ, দালালদের সঙ্গে সীমান্তরক্ষীদের প্রয়োজনীয় রফা করা ছিল।

ওমানের সমুদ্র-তীরবর্তী এই জায়গা থেকে ফরিদের মতো আরও জনা তিরিশেক যুবককে একত্রে তুলে দেওয়া হলো একটি বোটে।

বোট পৌঁছাল ইরানের বন্দর আব্বাসে, যাকে ফরিদ যাকে বলেছেন ‘বান্দ্রাবাস’। বন্দর আব্বাসে মাসুম নামের আরেক বাঙালি দালাল তাঁদের রিসিভ করলেন এবং কোনো ভোগান্তি ছাড়াই পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন অবস্থায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো ইরানের অভ্যন্তরে; কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বোঝাপড়া আগেই সম্পন্ন ছিল।

ইরানে পৌঁছানোর পর দালালদের দেওয়া ইরানি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরও দেড় লাখ টাকা ফরিদের ভাই সম্পর্কীয় একজন দুবাই থেকে জমা দেন।

ইরান থেকে তুরস্কে

ইরানে সাত দিনের মতো তাঁদের রাখা হয় বেশ আদরযত্নে। এক সপ্তাহ পর তাঁদের ইরান থেকে প্রথমে ট্যাক্সিতে ও পরে বাসে নিয়ে যাওয়া হয় তুরস্কে।

ইরানের বন্দর আব্বাস ত্যাগ করার পরে কোন কোন শহর হয়ে কোন পথে তাঁদের তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হয়, তা ফরিদ বলতে পারেন না।

ইরান-তুরস্ক সীমান্তের বা চেকপোস্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া ছিল বলে এই সীমান্ত অতিক্রম করতেও ফরিদ বা তাঁদের বহরের অন্যদের কোনো বেগ পেতে হয়নি।

এমনকি ইরানে তাঁদের সহযোগিতা দিয়েছেন যে দালালেরা, তাঁদের একজন তুরস্ক পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তুরস্কের অভ্যন্তরে।

তুরস্কের সীমান্ত পার হওয়ার পর প্রথমে ট্যাক্সিতে ও পরে বাসে করে তাঁরা ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হন। পথে পুলিশ বাস থেকে তাঁদের নামিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

তাঁরা আবার ফিরে আসেন তুরস্কের সীমান্তে। দালাল আবার তাঁদের আশ্রয় দেন এবং কিছুদিন পরে আবার ইস্তাম্বুল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এবারও পুলিশের হাতে তাঁরা ধরা পড়েন।

এভাবে ইস্তাম্বুল যাওয়ার পথে ছয়বার তাঁরা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ছয়বার পুলিশ তাঁদের ফেরত পাঠিয়ে দেয় এবং ছয়বারই পুনরায় দালালের লোকজন তাঁদের ইস্তাম্বুল পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

ছয়বারের পর সপ্তমবারে তাঁরা পুলিশের হাতে ধরা না পড়ে ইস্তাম্বুল পর্যন্ত পৌঁছাতে সমর্থ হন। ইস্তাম্বুলে এক বাঙালি তাঁদের রিসিভ করেন।

ইস্তাম্বুলে অবশ্য থাকা-খাওয়ায় সেই ইরানি কদর আর জোটে না। এক রুমে গাদাগাদি করে অনেককে রাখা হয় এবং বাইরে বেরোতে দেওয়া হয় না।

এক মাসের বেশি সময় এখানে তাঁদের এভাবে পড়ে থাকতে হয়। এখানে থাকতেই চুক্তির বাকি টাকা দালাল তথা পাচারকারীদের দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হয়।

তুরস্ক থেকে গ্রিস

গ্রিসে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় ‘আদম সংখ্যা’ পূরণ হওয়া, লরি ড্রাইভারের সঙ্গে চুক্তি করা, সীমান্ত ও বিভিন্ন চেকপোস্টের কর্মচারীদের সঙ্গে বোঝাপড়া ও তাঁদের গ্রিন সিগন্যাল ইত্যাদির সমন্বয় ঘটাতে অনেক সময় লেগে যায়।

এক মাসের বেশি সময় এখানে থাকার পর ফরিদসহ আরও অনেক ব্যক্তিকে একটি বদ্ধ লরির মতো গাড়িতে তোলা হয় গ্রিসে পৌঁছানোর জন্য।

এই গাড়ির ধারণক্ষমতা বড়জোর ২৫-৩০ জন। কিন্তু এই গাড়িতে শ খানেকের মতো লোক ওঠানো হয়। ফরিদের ভাষ্যমতে, সে এক বিভীষিকাময় যাত্রা। গাড়িতে শ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মরে যাওয়ারই কথা।

তারপরও আল্লাহর রহমতে কেউ মারা যাননি। ফরিদুল আলম মনে করেন, এই বদ্ধ গাড়িগুলোকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেওয়া হয়েছিল; কারণ সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিতদের সঙ্গে এই পাচার চক্রের সমঝোতা ছিল।

সীমান্ত অতিক্রমের পর যেখানে তাঁদের নামানো হয়, সেখান থেকে গ্রিসের সেনাবাহিনী বা সীমান্তরক্ষীরা তাঁদের ধরে নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়।

পরে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার লোকজন তাঁদের নিয়ে শরণার্থীশিবিরে স্থান দেন।

এথেন্সে শরনার্থী জীবন, পুলিশ ধরে আর ছাড়ে

এই শরণার্থীশিবিরে দিন দশেক থাকার পর তাঁদের ‘স্টে পেপার’ নামে একটি ডকুমেন্ট দেওয়া হয়। এই স্টে পেপার হাতে নিয়ে তাঁরা একটি বাসে চড়ে এথেন্সের উদ্দেশে রওনা হন।

ইস্তাম্বুল থেকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় পাচারকারীরা তাঁদের হাতে জনপ্রতি ৬০ ইউরো দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই টাকায় বাসের টিকিট কিনে তাঁদের এই এথেন্স-যাত্রা শুরু হয়।

এথেন্সে এসে ফরিদুল স্টে পেপার নিয়ে কোর্টে যান অ্যাসাইলাম চেয়ে আবেদনের জন্য।

উল্লেখ করার মতো বিষয়, গ্রিসে থাকার সময় সব অ্যাসাইলামের আবেদনে ফরিদ নিজেকে রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়েছিলেন, কারণ পাচার চক্রের দালালেরা পরামর্শ দিয়েছিল, এই পরিচয়ে অ্যাসাইলাম সহজ হতে পারে।

আদালত ফরিদের অ্যাসাইলাম আবেদন গ্রহণ না করে স্টে পেপারে ছবি লাগিয়ে একটি সিল দিয়ে দেন। এই পেপার তাঁকে এক মাস থাকার বৈধতা দেয়। কিন্তু এই পেপার নিয়ে তিনি কিছু একটা রোজগারের কাজ শুরু করেন।

কাগজের বৈধতা শেষ হওয়ার পর একসময় পুলিশ ফরিদকে ধরে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে কিছু লোক এথেন্সে পরিচিত হওয়ায় তাঁদের সহযোগিতায় এক উকিল ধরা হয়।

উকিল থানায় গিয়ে আইনি কিছু পদক্ষেপ নেন এবং সে সুবাদে আবার এক মাসের স্টে পেপার দিয়ে দু-তিন দিন পরে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়।

ছাড়া পেয়ে এবার ফরিদ নিজেই অ্যাসাইলাম উকিলের দ্বারস্থ হন। আবার অ্যাসাইলামের আবেদন করা হয়। অ্যাসাইলাম না মিললেও এবার তিনি একটি লাল কার্ড পান।
এ কার্ডের পারিভাষিক নাম ফরিদ বলতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, এই লাল কার্ড নিয়ে এথেন্সে অনেকে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন।

এই লাল কার্ড থাকলে মাঝেমধ্যে পুলিশি হয়রানি সহ্য করতে হলেও একেবারে ডিপোর্টেড হতে হয় না।

এথেন্সে লাল কার্ড পাওয়ার পর উকিলের সুবাদে অ্যাসাইলামের জন্য ফরিদুল চার-পাঁচবার ইন্টারভিউ দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁর কখনোই প্রসন্ন হয়নি।

অ্যাসাইলামের কাগজ তাঁর কখনো জোটেনি। তাই সময়ে-অসময়ে থানায় চলে যাওয়া, হকারির জিনিসপত্র পুলিশের হাতিয়ে নেওয়া, ইত্যাকার ঝক্কি-ঝামেলার মধ্য দিয়েই স্বল্প আয়ে চলতে থাকে তাঁর এথেন্সের দিনগুলো।

একধরনের অবৈধ নিবাসের মধ্য দিয়ে হকারি বা কায়িক শ্রম দিয়ে যা যৎসামান্য রোজগার করতে পারেন, তা দিয়ে নিজের পেট চালিয়ে আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

ফলে দেশে বাবা-মা-ভাইবোনের জন্য কিছু পাঠানোও সম্ভব হয় না।

জীবন বাজি রেখে ইউরোপে পৌঁছে যে স্বপ্নপূরণের আশা ফরিদ এত দিন বুকের মধ্যে লালন করছিলেন, তা ধীরে ধীরে তাঁর বুকের মধ্যেই মিলিয়ে যেতে থাকে।

এথেন্স থেকে মেসিডোনিয়া–সার্বিয়া–হাঙ্গেরি

এভাবে চার-চারটি বছর চলে যায়। এর মধ্যে ২০১৪ সালের শেষ দিকে মানবতার এক মহাবিপর্যয় ফরিদুল আলমের মরতে বসা স্বপ্নের গোড়ায় বেঁচে ওঠার জন্য যেন আচমকা এক ঘটি পানি ঢেলে দিল।

সিরিয়ার ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের কারণে জীবন বাঁচাতে মানুষের স্রোত তখন ধেয়ে আসে ইউরোপের দিকে।

জার্মানিসহ অনেকগুলো পূর্ব ইউরোপের দেশ তাদের সীমান্ত খুলে দেয় এই শরণার্থীদের জীবন বাঁচাতে।

ফরিদ ভাবলেন, হয়তো আল্লাহ তাঁর আপাত-অবোধ্য জটিল কর্মপ্রক্রিয়ার ধারায় এত দিনে তাঁর স্বপ্নের প্রতি মুখ তুলে তাকিয়েছেন। তিনি আবার পথে নামলেন। এই জনতার সঙ্গে মিশে তিনি এবার ঢুকতে চেষ্টা করলেন পশ্চিম ইউরোপের দেশ জার্মানি, সুইজারল্যান্ড বা ফ্রান্সে।

২০১৪ সালের শেষ দিকে তিনি তাঁর প্রায় নিভে যাওয়া স্বপ্ন বাঁচিয়ে তোলার আশায় এত দিনের আয়রোজগার থেকে সঞ্চিত টাকা পয়সাটুকু ট্যাঁকে গুঁজে এথেন্স থেকে যাত্রা শুরু করলেন।

সঙ্গে আরও দু-তিনজন বাঙালির সঙ্গে বাসে রওনা হয়ে ফরিদ প্রথমে এলেন মেসিডোনিয়ায়।

সেখান থেকে আরেক বাসে সার্বিয়া এবং তারপর আরেক বাসে সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরি।

হাঙ্গেরিতে ঢোকার সময় ফরিদ এথেন্সে পাওয়া তাঁর লাল কার্ডটি ফেলে দেন।

হাঙ্গেরিতে তাঁরা যে বাসে পৌঁছেছিলেন, সে বাস ভর্তি ছিল আফগানি, পাকিস্তানি আর বাঙালি শরণার্থীতে।

হাঙ্গেরিতে পুরো শরণার্থীর এই বাসটি নিয়ে যাওয়া হয় একটি রিফিউজি ক্যাম্পে।

ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁদের দুই সপ্তাহ ওই ক্যাম্পে অবস্থানের জন্য একটি ডকুমেন্ট দেয়। কিন্তু ফরিদ এই ক্যাম্পে ১৫ দিন না থেকে অস্ট্রিয়ায় ঢোকার নিয়তে ক্যাম্প ত্যাগ করেন।

টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠে ঘুম, গন্তব্য জার্মানি, গেলেন চেক রিপাবলিক

জার্মানি যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে তিনি অস্ট্রিয়ায় এক দিন থাকেন। সেখান থেকে টিকিট কেটে তিনি জার্মানির উদ্দেশে ট্রেনে ওঠেন।

এত দিনের খাওয়া-না-খাওয়া আর টেনশনের ভ্রমণে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহটি ট্রেনে উঠে সিটে বসার কিছু সময়েই ঘোর ঘুমের রাজ্যে চলে যায়।

সে ঘুম ফরিদকে স্বপ্নের পরিবর্তে উপহার দেয় কঠিন দুঃস্বপ্ন। তাঁর গভীর ঘুমের মধ্যে কোথায় কী হয় তিনি বলতে পারেন না। তাঁর ঘুম ভাঙে পুলিশের ডাকে।

পুলিশ তাঁকে ট্রেন থেকে এক স্টেশনে নামিয়ে দেয়। ট্রেন থেকে নেমে তিনি ধীরে ধীরে বুঝে উঠতে পারেন, তিনি যে দেশে নেমেছেন, সেটি তাঁর স্বপ্নের দেশ জার্মানি নয়, বরং সেটি অন্য দেশ; চেক রিপাবলিক।

চেক রিপাবলিকে পুলিশ ফরিদকে থানায় নিয়ে যায়। থানা হেফাজতে তাঁকে আট-দশ দিন চেক রিপাবলিকে রাখা হয়।

এরপর হেফাজতে নেওয়া অনেকগুলো মানুষের মধ্যে কাউকে অস্ট্রিয়ার পাঠিয়ে দেওয়া হয় আর কাউকে হাঙ্গেরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ফরিদের ক্ষেত্রে ঘটে একটি ভিন্ন রকম ঘটনা।

থানা হেফাজতে পুলিশ ফরিদের ব্যাগে-পকেটে টাকাপয়সা ও কাগজপত্র যা পায়, তা নিয়ে নেয়। তাঁর আশা ছিল, ইউরোপের পুলিশ বাঙালিদের মতো হবে না।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সবই আবার তাঁকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু এই পুলিশ তাঁর কিছুই আর ফেরত দেয় না। তবে অন্যদের মতো তাঁকে অস্ট্রিয়ায় বা হাঙ্গেরিতে ফেরতও পাঠায় না।

বরং তাদের গাড়িতে করে নিয়ে দূরে একটি ছোট ট্রেন স্টেশনের কাছে নামিয়ে দেয় আর ইশারায় দেখিয়ে দেয় কোন দিকে গেলে অস্ট্রিয়ায় ফেরত যাওয়া যাবে, আর কোন দিকে গেলে জার্মানির উদ্দেশে অগ্রসর হওয়া যাবে।

খালি পেট আর খালি পকেটে ফের জার্মানির পথে, ফের ট্রেনে ঘুমিয়ে পুলিশের হাতে

আবারও ফরিদ জার্মানিমুখী ট্রেনে ওঠার ইরাদা করলেন। কিন্তু কীভাবে উঠবেন? তাঁর হাতে তো কোনো টাকা নেই ট্রেনের টিকিট কাটার।

কী আর করা? বিনা টিকিটেই উঠে পড়বেন, যা করে খোদায়। ঠিকই তা-ই করলেন। পুলিশের দেখানো দিকের ওপর ভর করে একটি ট্রেনে উঠলেন। ট্রেনটিতে লোকজন খুব কম।

তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এক আরব লোকের সঙ্গে এই ট্রেনে তাঁর দেখা হলো। দুবাইয়ে শেখা কিছু আরবি শব্দের ওপর ভর করে এই লোকটিকে তাঁর অবস্থার কথা কিছুটা বোঝাতে পারলেন।

আরব লোকটি তাঁকে একটি বড় স্টেশনে নামিয়ে দিলেন এবং বললেন এই স্টেশন থেকে ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাকার ইউরোপের যেকোনো দেশে যাওয়ার ট্রেন পাওয়া যাবে।

ফরিদ এই স্টেশনটির নাম অবশ্য বলতে পারেননি।

এই স্টেশনে যখন ফরিদ নামলেন, তখন তাঁর পেটে অনেক ক্ষুধা। কিন্তু খাবার পাবেন কোথায়? তাঁর পকেটে তো কোনো খাবার নেই। কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না।

তীব্র ক্ষুধায় কারও কাছে কিছু চাইতে পারছেন না। কারণ তাঁর এখানকার কোনো ভাষাই জানা নেই।

এভাবে কাটছে অসহায় সময়। এমন সময় তাঁর মনে হলো, আল্লাহ অনেক দয়ালু হয়ে একটি লোক তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরেকজন আরব। ফরিদ তাঁর ক্ষুধা ও অসহায়ত্বের কথা ইশারা ইঙ্গিতে এই লোকটিকে বললেন।

আরব লোকটি দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে একখানি ১০০ ইউরোর নোট দিলেন এবং বলে দিলেন জার্মানিগামী ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্মে থামবে।

তাঁর নির্দেশনামতো ফরিদ এবার জার্মানিগামী ট্রেনেই উঠলেন। এবারও বিনা টিকিটে। পকেটে সম্বল তো মাত্র ১০০ ইউরো। টিকিট কিনে সেটা শেষ করলে তারপর কী হবে?

ট্রেনে ওঠার পর ক্লান্ত ও শ্রান্ত শরীরে আবারও একই রকম ঘুম। যখন ঘুম ভাঙে তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন পুলিশের হাতে।

পুলিশ তাঁকে এবার আরেকটি স্টেশনে নামিয়ে দেয়। ফরিদের বক্তব্যমতে এটি ছিল জার্মানির ‘মুনশিয়ান বর্ডার’। গুগল ম্যাপে এ রকম বর্ডারের নাম খুঁজে পাওয়া গেল না।

ফরিদ অক্ষর চেনেন না, তাই বানানও বলতে পারেন না। তবে চেক রিপাবলিকের কাছে ভাল্ডমুশেন নামে একটি শহর গুগল ম্যাপে দেখা যায়।

ফরিদের বলা ‘মুনশিয়ান বর্ডার’ এই শহরটিও হতে পারে। স্টেশনে নামান পর পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে যায়।

সেখানে ফরিদের জন্য একটি অ্যাসাইলাম ফাইল খোলা হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে তাঁর দাখিলকৃত একটি আবেদন নথিতে তোলা হয়।

এক আফগানি ভদ্রলোককে তাঁর দোভাষী নিযুক্ত করা হয়।

শরনার্থী শিবিরে

এই ফাইলের সাপোর্টে ফরিদকে একটি উদ্বাস্তু শিবিরে তোলা হয়। ক্যাম্পের শহরটির নাম ফরিদ  বলছেন রেজবিন। কিন্তু যথারীতি এই নামের কোনো শহরও গুগলে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না জার্মানিতে।

হয়তো ফরিদ ভাই মানুষের মুখে শোনা নাম সঠিক উচ্চারণে রপ্ত করতে পারেননি, আর তাই-ই হয়তো মূল নামটি আমরা সঠিক বানানে লিখতে না পারায় গুগলও আমাদের সাহায্য করছে না।

এ ক্যাম্পে থাকাকালে তাঁর অ্যাসাইলামের আবেদন বিবেচনায় ফরিদের জন্য একজন আফগান দোভাষীও নিযুক্ত হয়। কিন্তু আবেদন নামঞ্জুরই থেকে যায়।

এরপর বাসে করে তাঁকে ও ক্যাম্পের আরও অনেককে আরও বড় উদ্বাস্তু শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফরিদ শহরটির নাম বলেছেন—কেমরুজ। এই নামে কোনো শহরও আমি গুগলে পাচ্ছি না।

তাঁর বর্ণনামতে শহরটি মোটামুটি বড় এবং সেখানকার উদ্বাস্তু শিবিরটিও বেশ বড়।

এখানেই তিনি প্রথম দেখলেন, উদ্বাস্তু শিবিরেও শরণার্থীদের জন্য সুন্দর ওয়াশরুমসহ সুন্দর খাট ও ভালো খাবার থাকতে পারে।

অবশ্য এই উন্নত শিবিরেও তাঁর এক সপ্তাহের বেশি থাকা হয় না। এক সপ্তাহ পরে তাঁকেসহ অনেককে এক বাসে করে নিয়ে আসা হলো পশ্চিম জার্মানির একসময়ের রাজধানী বন শহরে।

ইউরোপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আশা শেষ, পরিচয়হীন জীবন

বছরের পর বছর নিজের ও পরিবারের সুখের দিনের স্বপ্ন বয়ে এমন বুকভাঙা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ফরিদ শেষ পর্যন্ত নিজেকে সব আশা ও স্বপ্ন থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলেন।

জীবনের অসহনীয় বেদনা ও বঞ্চনার ঘটনাপুঞ্জ তাঁর সব স্বপ্ন ও আশা ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে সমাহিত করে দিল যেন।

তিনি বুঝতে পারলেন, দুনিয়ায় সব মানুষের জন্য আল্লাহ স্বপ্ন রাখেননি। এবার তাই সব স্বপ্ন ও আশা তিনি ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে শুধু মসজিদমুখো হলেন।

ক্যাম্প থেকে আর পালানোর কোনো চেষ্টায় তিনি নামলেন না। এখন ক্যাম্প থেকে পাওয়া মাসিক ৩৫০ ইউরো দিয়ে নিজের পেট চালান আর মসজিদে গিয়ে আল্লাহকে ডাকেন। আর আল্লাহর কাছে মাফ চান বান্দা হয়ে এমন সুখের দিনের স্বপ্ন দেখার গোস্তাখির জন্য।

২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এভাবে জীবন কাটিয়ে তাঁর মনে হলো ইসলামি জীবন যাপনের বন শহরের চেয়ে প্যারিস হয়তো আরেকটু ভালো হবে।

অনেকে বলল, প্যারিসে অ্যাসাইলামের দরখাস্ত করলে আবেদন মঞ্জুরের সম্ভাবনাও নাকি বেশি।

শেষ ঠাঁই প্যারিসে, পাসপোর্ট নেই, পরিচয় নেই

২০১৮ সালে ফরিদ চলে এলেন প্যারিসে। এখানেও আবার অ্যাসাইলামের জন্য আবেদন দাখিল করেন। কিন্তু যথারীতি তাঁর আবেদন এখানেও নামঞ্জুর হয়। তবে মঞ্জুর-নামঞ্জুরের এই প্রক্রিয়ায় তাঁর ২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রায় তিন বছর চলে যায়।

এ নিয়ে অবশ্য ফরিদের তেমন কোনো আফসোস নেই। তিনি আর অ্যাসাইলাম চানও না। নিজের একটি প্রতিষ্ঠিত জীবনও আর তিনি চান না; মা-বাবা-ভাই-বোনের সামান্য কিছু সুখের জন্য দুটি ডলার বা ইউরোর আয়ও তিনি আর চান না; এমনকি বিয়ে-শাদির মাধ্যমে একটি নারীর সান্নিধ্যে পুরুষের জেগে ওঠার অতি ন্যায্য সুখটুকুও তিনি আর চান না।

আজ ফরিদুল শুধু একটু কাগজ চান, যার বলে তিনি বলতে পারবেন, তাঁরও একটি দেশ আছে, একটি জন্মভূমি আছে এবং সেখানে ফেরার তাঁর অধিকার আছে।

ফরিদ এখন লা কুন্নভের একটু মেসে রান্নাবান্নার কাজ করেন। পাশে আনওয়ার–এ–তৈয়বা নামের একটি মসজিদ আছেন। সেখানে বেশিরভাগ সময় কাটান। আর প্রতি শুক্রবার মসজিদের সামনের ফুটপাতে অল্প কিছু টুপি–তসবিহ নিয়ে বিক্রি করতে বসেন।

তবে ফরিদের জাগতিক জীবনে প্রতিষ্ঠার সব আশা শেষ হয়ে গেলেও নিজের দেশে মরার আশা শেষ হয়নি।

জীবনের শেষবেলায় সেই আশাটুকু নিয়ে ফরিদ  গিয়েছিলেন প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাসে। তিনি সেখানে প্রার্থনা করলেন, একটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট; যেটি থাকলে তিনি বলতে পারেন তাঁর একটি দেশ আছে এবং সেখানে যাওয়ার তাঁর অধিকার আছে।

দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাঁর আবেদন রাখল, তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট রাখল। তারপর অনেক দিন ঘুরিয়ে তাঁকে বলল, তাঁর পুরোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা না দিতে পারলে তাঁরা তাঁকে কোনো নতুন পাসপোর্ট দিতে পারবে না।

কিন্তু ফরিদ কোথায় পাবেন তাঁর সেই পুরোনো পাসপোর্ট। সেটি তো তাঁকে ফেলে দিতে হয়েছে দুবাই থেকে তাঁর যাত্রা শুরুর সঙ্গেই। ওটি হাতে রেখে তো অ্যাসাইলামের আবেদনই করা যায় না।

বাংলাদেশের মানুষ-বাবা-মা-দাদা-দাদি চৌদ্দ পুরুষ যাঁর বাংলাদেশি, সে আজ একটি কাগজের অভাবে বাংলাদেশি বলে নিজেকে দাবি করতে পারছে না।

হয়তো সমস্যাটি কাগজ না থাকার মধ্যে নয়। হয়তো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থিতার দ্বারা দেশের ওপর যে কালিমা লেপন হয়েছে, সেই কারণেই দেশ হয়তো তাঁকে অস্বীকারের পথে এগোচ্ছে।

কিন্তু দেশের এ-সংক্রান্ত কর্তাদের কি একবার ভেবে দেখা উচিত না যে, ফরিদুল আলমরা দেশের বিরুদ্ধে বলতে বা দেশের রাজনৈতিক অপচর্চা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানাতে এমন পদে পদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার পথে পা বাড়ান না?

ফরিদের শেষ ইচ্ছা

প্রতি পদে জীবনকে বাজি রেখে এবং দেশের সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা বলে বলে প্রাণান্তকরভাবে তাঁদের একটিই আকাঙ্ক্ষা, আর তা হলো ইউরোপের মাটি থেকে দুটো ডলার বা ইউরো উপার্জন করে দেশের আপনজনের কাছে পাঠানো আর সেই আপনজন তথা দেশবাসীর সামগ্রিক সুখের সূচকটি একটু এগিয়ে নেওয়া।

সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে অসমসাহস নিয়ে কেউ ওঠে ভূমধ্যসাগরের অবৈধ বোটে আর অহরহ সেই বোট ডুবে যায় আর তাঁদের মৃতদেহ হয়ে যায় ভূমধ্যসাগরের মাছ ও হাঙরের খাবার।

কেউ অর্থহীন-বস্ত্রহীন অবস্থায় ওঠে গ্রিসের উপকূলে। আর সেখানে বস্ত্রহীন তাঁদের শরীর কঠিন শীতে ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। অনেকটা তাঁদেরই একজন ফরিদুল আলম।

বাংলাদেশে আবাল্যলালিত প্রিয় মুখগুলো থেকে এভাবে চিরতরে হারিয়ে না যেতে তাঁর করুণ আকুতি নিজ দেশের একটি পাসপোর্টের জন্য।

আমাদের প্যারিস দূতাবাস এবং আমাদের পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কি ফরিদুলের কষ্টের ভাগ নেবেন?  

কেউ কি একটু ভেবে দেখবেন নিজ দেশের একটু সুখের জন্য জীবন বিপন্নকারী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ব্যর্থ ও পরাজিত এই মানুষটিকে তাঁর নিজ দেশের আপন মানুষের কাছে এসে মরতে চাওয়ার সুযোগ করে দিতে কীভাবে একটি পাসপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়?

এমন মানুষ নিশ্চয়ই আছেন। সেই মানুষটির জন্য ফ্রান্সের একটি মোবাইল নম্বর (+ ৩৩৭৫৩৭১৮৩২৮) রাখলাম যা দিয়ে ফরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

ড. মুহম্মদ মুহসীন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক

ভাগ্যান্বেষণে ‘দেশ থেকে দেশ–দেশান্তরে’ 
ফরিদুল আলমের ছুটে বেড়ানোর গল্পটা যেন ‘রীতিমতো নভেল’।
ভাগ্যান্বেষণে ‘দেশ থেকে দেশ–দেশান্তরে’ ফরিদুল আলমের ছুটে বেড়ানোর গল্পটা যেন ‘রীতিমতো নভেল’। ছবি: জাকের হোসেন

মসজিদের লাউডস্পিকার খুলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বার্তা উত্তরপ্রদেশ পুলিশের

আবারো বিতর্কে যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ। ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের  ফিরোজাবাদ  জেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মসজিদের লাউডস্পিকার সরিয়ে নেওয়া হল।  এই ঘটনায় বিতর্ক চরম আকার নিতেই পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, জোরে স্পিকার বাজানোর জেরে মসজিদ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল পুলিশের কাছে, যার জেরেই এই পদক্ষেপ। ফিরোজাবাদের   পুলিশ সুপার রবি শঙ্কর প্রসাদ জানান, মসজিদ থেকে উচ্চস্বরে আওয়াজ আসায়, সেই এলাকার অনেকেরই সমস্যা ছিল। তা নিয়ে একাধিকবার অভিযোগও পেয়েছেন তাঁরা। একাধিক অভিযোগ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।  অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কিছু মসজিদে লাউডস্পিকারের শব্দ কমিয়ে দেয়, আবার কিছু মসজিদে লাউডস্পিকার সরিয়ে নেয়। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, 'আমরা সব ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাই। কিন্তু নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কীসে জনসাধারণের সমস্যা হচ্ছে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। এমনকি প্রচণ্ড আওয়াজে শব্দ দূষণও হচ্ছিল। এই পদক্ষেপ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের কথা মাথায় রেখেই নেওয়া হয়েছে।' ওই পুলিশকর্তা আরও জানান, শনিবার জেলার একাধিক মসজিদে অভিযান চালানো হয়। যেখানে তারস্বরে মাইক বাজানো হচ্ছিল। সেখানকার মাইকগুলি খুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কিছু মসজিদের মাইকের শব্দ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের তরফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সমস্ত ধর্মীয়স্থান ও প্রতিষ্ঠানকে শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধি মেনে চলার জন্য। যদি তা লঙ্ঘন করা হয় সেক্ষেত্রে আইনানুগ কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে

mzamin

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিমান ট্র্যাজেডি নিহত ১৭৯

দক্ষিণ কোরিয়া জুড়ে শোকের ছায়া। রোববার সকালটা বিষাদের এক খবরে মুষড়ে পড়ে দেশটি। ১৮১ আরোহী নিয়ে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুনের বলয় তৈরি হয়ে তা বিস্ফোরিত হয়। এতে কমপক্ষে ১৭৯ জন নিহত হয়েছেন। বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুই জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তবে তাদের অবস্থা কেমন তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এ ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘোষণা করা হয়েছে সাতদিনের শোক। ওদিকে এ খবর পেয়ে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর সদস্য এবং তাদের বন্ধুরা ছুটে যান মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে তারা অশ্রুসজল চোখে প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছিলেন। বিমানটির একজন যাত্রীর পরিবার বলেছে, তারা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগে একজন যাত্রীর কাছ থেকে টেক্সট মেসেজ পেয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, ফ্লাইটের পাখায় একটি পাখির ধাক্কা লেগেছে। আরেকজন মেসেজ লিখেছেন, আমার শেষ কথা বলে দেয়া উচিত। স্থানীয় অনেক মানুষ বিমানটির জেট ইঞ্জিনে আগুনের বলয় দেখেছেন। শুনতে পেয়েছেন কয়েকদফা বিস্ফোরণের শব্দ। বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার দূরে ছিলেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন- হঠাৎ দেখি বিমানটি ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। মনে করেছিলাম তা অবতরণ করছে। কিন্তু তারপরই দেখতে পাই আগুন জ্বলছে। এরপরই বিকট বিস্ফোরণ। বাতাসে ধোঁয়া উড়লো। ধারাবাহিকভাবে কতোগুলো বিস্ফোরণ হলো। এর ফলে যে প্রাণহানি হয়েছে তা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ শোক প্রকাশ করছে নিহতদের জন্য। শোক জানিয়েছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি। শোক প্রকাশ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও।

উল্লেখ্য, জেজু এয়ারের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানটি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার মুয়ান যাচ্ছিল। স্থানীয় সময় রোববার সকাল ৯টার সামান্য পরেই তা অবতরণের চেষ্টা করে। কিন্তু অবতরণ নয়, তা একটি দেয়ালের ওপর বিধ্বস্ত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানটি রানওয়ে থেকে পিছলে যায়। তারপরই বিধ্বস্ত হয়। আগুন ধরে তা বিস্ফোরিত হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয়। তবে ফ্লাইটের শুধু টেইলের বা পেছন দিকের একটি পোড়া অংশ পাওয়া গেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, ল্যান্ডিং গিয়ার পুরোপুরি প্রসারিত না হওয়া সত্ত্বেও বিমানটি ‘বেলি ল্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করে। এখন তদন্তকারীরা যাচাই করে দেখছেন পাখির সঙ্গে ধাক্কা লেগে এ ঘটনা ঘটেছে, নাকি খারাপ আবহাওয়া এর কারণ। দুর্ঘটনার কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পরেও ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়া উড়ছিল। অন্যদিকে চলছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিমানের বিধ্বস্ত অংশ সংগ্রহের কাজ। ঘটনাস্থলে যাত্রীদের পোশাক, লাগেজ, পানির বোতল- সবই রক্তে ভেজা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। স্থানীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, বিমানের দু’জন আরোহীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফ্লাইটে সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি ছিলেন ৭৮ বছর বয়সী একজন পুরুষ। আর সবচেয়ে কম বয়সী ছিল তিন বছর বয়সী একটি শিশু। বিমানটিতে দু’জন থাই যাত্রী ছিলেন বলে রিপোর্টে বলা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েটংতার্ন শিনাওয়াত্রা এক্সে শোক জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি আমরা শোক প্রকাশ করছি। ওই বিমানে কোনো থাই যাত্রী আছেন কিনা তা যাচাই করতে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের অবস্থা কী তাও তিনি জানতে চেয়েছেন।

ওদিকে খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছান দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট চোই সাং মোক। তিনি কর্মকর্তাদের জোরালো অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে যে, বিমান দুর্ঘটনার প্রতি সরকারি প্রতিক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিজে। উল্লেখ্য, জেজু এয়ার পরিচালিত ৭৩৭-৮০০ মডেলের ওই বিমানে ১৭৫ জন যাত্রী ও ৬ জন ক্রু ছিলেন। এ ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে জেজু এয়ার। তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই দুর্ঘটনায় করণীয় সব কিছু করতে আমাদের শক্তি ব্যবহার করবে জেজু এয়ার। আতঙ্ক, ক্ষতির জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। বিমান সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিম ই-বায়ে টেলিভিশনে বলেছেন, বিমানটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। বিমানটির কোনো দুর্ঘটনায় পড়ার কোনো রেকর্ড নেই। আগে কোনো রকম ত্রুটির আলামত পাওয়া যায়নি এতে। তদন্তে সহযোগিতা করবে এই এয়ারলাইন। নিহতদের জন্য সমর্থন দেয়াকে শীর্ষ অগ্রাধিকার মনে করবে। ওদিকে মুয়ান বিমানবন্দরে সব রকম অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়।

মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিবিসি’র সাংবাদিক জ্যাঁ ম্যাকেঞ্জি বলছেন, একটি কক্ষে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিহতদের দেহ শনাক্ত করতে কয়েকশ’ পরিবার সেখানে অপেক্ষা করছেন। নিহতদের শরীরের ক্ষত এত বেশি যে, তারা ছেলে না মেয়ে তা চেনার উপায় নেই। কেউ স্বামীকে হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন স্ত্রীকে। কেউবা ছেলেমেয়ে, কেউবা নাতিপুতিকে হারিয়েছেন। অনেক পরিবার একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই থাইল্যান্ডে বড়দিন উদ্‌যাপন করে ফিরছিলেন। মায়েং জি-সু (৭৮) বলেন, তার এক ভাতিজা ও ভাতিজার দুই সন্তান ছিল ফ্লাইটে। কিন্তু পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। তিনি হাউমাউ ও চিৎকার করে বলেন, বিশ্বাস করতে পারছি না একটি পুরো পরিবার অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার হৃদয়ে খুব বেশি ব্যথা বোধ করছি।

mzamin

Sunday, December 29, 2024

এক ভবনেই বাস পুরো শহরের মানুষের

গোটা শহরের মানুষ বাস করে মাত্র একটি ভবনে। বিচ্ছিন্ন এই শহরেও রয়েছে বাজার, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও স্কুল থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। আর এত সব পরিষেবা পাওয়া যায় শহরের একমাত্র ভবনটিতেই, যেখানে বাসিন্দারা থাকেন। হোয়িটিয়ার নামের ব্যতিক্রমী এই শহরটি অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য আলাস্কায়। সিবিএস নিউজ, উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শহরটির বর্ণনা উঠে এসেছে।

শহরের একমাত্র ভবনটিকে ডাকা হয় বেগিচ টাওয়ার নামে। এটি ১৯৫৩ সালে নির্মাণ করা হয়। শহরটির বয়সও এর ভবনের কাছাকাছি। শুধু একটি ভবনেই গোটা শহর অবস্থান করায় হোয়িটিয়ারকে বলা হয় ভার্টিক্যাল টাউন। অতীতে এটি কোনো শহর ছিল না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই ভবনটি ছিল একটি সেনা ব্যারাক। স্নায়ুযুদ্ধ শেষে সেনারা সেখান থেকে সরে গেলে একটিকে বেসামরিক বাসভবনে পরিণত করা হয়। এরপর করিডোর এবং লিফটের মাধ্যমে পুরো বিল্ডিংকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

১৪ তলা বিশিষ্ট বেগিচ টাওয়ারে মোট ১৫০টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৭২ জন মানুষ এখানে বসবাস করছে। আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি এই ভবনে পোস্ট অফিস, জেনারেল স্টোর, লন্ড্রি, চার্চ, থানা, কনফারেন্স রুম এবং ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডেরও ব্যবস্থা রয়েছে ভবনটিতে।

এই শহরের ভেতরে প্রবেশ করার একটাই রাস্তা, যা মূলত ৪ কিলোমিটার লম্বা একটি টানেল। রাত সাড়ে ১০টার পর বন্ধ করে দেওয়া হয় টানেলটি। শহরটিতে একটি এয়ারফিল্ড থাকলেও ১৯৬৪ সালে ভূমিকম্পের পর এটি ব্যবহারযোগ্য নেই। উপকূলীয় শহর হওয়ার কারণে শহরটির একটি বন্দর থাকলেও শীতকালে কিংবা আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে নৌপথে চলাচল ও বাসিন্দাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

হোয়িটিয়ারের ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটি নর্থ আমেরিকার সর্ববৃহৎ যৌথ রেল ও হাইওয়ে টানেল। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে রেল আসা যাওয়া করে টানেলটি দিয়ে, সে সময় অন্যান্য যানবাহন চলাচল বন্ধ। রাত সাড়ে ১০টায় টানেলের গেট বন্ধ করার পর আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী দিন সকালে আবার টানেলের গেট খোলা হয়।

আলাস্কার আবহাওয়া সারা বছরই খারাপ থাকে। কঠিন আবহাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে এই বেগিচ টাওয়ারে মানুষ বসবাস করে। হোয়িটিয়ারের আবহাওয়া এতোই খারাপ থেকে যে শীতকালে এর তাপমাত্রা নেমে আসে মাইনার ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঘণ্টায় ৯৬ কিলোমিটার বেগে বাতাস ও ৬ মিটার তুষারপাত হয়। এ কারণে এই ভবন ছেড়ে লোকজন অন্য কোথাও যান না।

এক ভবনেই বাস পুরো শহরের মানুষের

’২৫ সালের মধ্যেই জুলাই হত্যার বিচার

আগামী বছরের ১৬ই ডিসেম্বরের আগে জুলাই গণহত্যার বিচার শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন- আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন বিচার সম্পন্ন করে বিজয় উদ্‌যাপন করা হবে। শনিবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন’ নিয়ে দুই দিনব্যাপী সংলাপের দ্বিতীয় দিনে ‘গুম-খুন থেকে জুলাই গণহত্যা: বিচারের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন। দুই দিনব্যাপী এই সংলাপের আয়োজন করেছে ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ। একই অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও এক বছরের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার কথা বলেছেন।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতের হত্যাকাণ্ডসহ ধারাবাহিকভাবে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদেরও বিচার করা হবে। এসব বিচার করবে আইন বিভাগ। কোনো গাফিলতি হবে না। সারা দেশে দায়ের হওয়া গায়েবি মামলার আনুমানিক সংখ্যা নির্ধারণের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কতোগুলো ‘গায়েবি’ মামলা হয়েছে তার হিসাব বের করতে সব জেলার পাবলিক প্রসিকিউটরদের তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ৫১টি জেলা থেকে গায়েবি মামলার আনুমানিক হিসাব পেয়েছে। আরও ১৩টি জেলা থেকে তথ্যের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চার হাজারের বেশি পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়েছে। এই কাজ তারা করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিল না, তদন্ত কর্মকর্তা ছিল না জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে প্রসিকিউশন টিম করা হয়েছে। তড়িঘড়ি করে বিচার করে বিচারকে প্রশ্নের মুখে ফেলা যাবে না। বিচার নিয়ে কোনো গাফিলতি হবে না, নিশ্চিত করে বলতে চাই। বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দেরি হচ্ছে না। এ সময় আসামিদের হাতকড়া পরানো নিয়ে উপদেষ্টা আরও বলেন, মামলার শুনানির সময় ও আসামিদের হাতকড়া না পরানো নিয়ে এখন সমালোচনা হচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় আসামিদের আইনজীবী যিনি ছিলেন, তিনি বলেছেন, শুনানির জন্য সে সময় তিন মাস দেয়া হয়েছিল। এখন শুধু এক মাস দেয়া হয়েছে। তখন আসামিদের কাউকে হাতকড়া পরানো হয়নি, এখনো আসামিদের হাতকড়া পরানো হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৫৮ জন, আহতের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৩৬ জন। অভ্যুত্থানে হতাহতদের প্রথম ধাপের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক বিশেষ সেল। সম্প্রতি সেলের প্রধান, অতিরিক্ত সচিব খন্দকার জহিরুল ইসলামের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে হতাহতের এ তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়। পরে জুলাই-আগস্টে নিহত এবং আহতদের তালিকা তৈরি করতে ১৫ই আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।

এ কমিটি গত ২৯শে সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ৭১৭ জনের নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম-এমআইএস। তবে ২৮শে সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি আন্দোলনে নিহত ও আহতদের সংখ্যা আর বেশি বলে দাবি করে। সেদিন বলা হয়, আন্দোলনে ১৫৮১ জন নিহত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেদিন বলা হয়, আন্দোলনকালে ৩১ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন। তবে এটি আরও যাচাই-বাছাই করা হবে।

ট্রাইব্যুনালে ‘টপ কমান্ডার’সহ সবার বিচার আগামী বছরের মধ্যে শেষ হবে: চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণত ‘টপ কমান্ডার’ বা শীর্ষ অপরাধীদের বিচার করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সবার বিচারই প্রায় আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা হবে। চিফ প্রসিকিউটরকে এই অধিবেশনে সঞ্চালক মনির হায়দার প্রশ্ন করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে সক্ষমতা আছে, তা গণহত্যা, গুম-খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের এত বড় পরিধির বিচারের জন্য কি যথেষ্ট? জবাবে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনালের ১০ জন প্রসিকিউটর ও ১৭ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা আছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে গুম, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বাংলাদেশের মাটিতে হয়েছে, সেই অপরাধের যারা মাস্টারমাইন্ড (হোতা), যারা একদম সর্বোচ্চ জায়গায় বসে থেকে অপরাধগুলো সংঘটিত করেছিলেন প্রাধান্য দিয়ে, তাদের বিচার করা। সেক্ষেত্রে এই ট্রাইব্যুনাল হাজার হাজার মানুষের বিচার করতে পারবে না এবং সেই লক্ষ্যে অগ্রসরও হচ্ছেন না তারা।
সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এর সঙ্গে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা ছিল। দেশব্যাপী সবকিছুর বিচার করতে গেলে এই ট্রাইব্যুনালের পক্ষে তা সম্ভব নয় বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর। তাজুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণত টপ কমান্ডারদের বিচার করা হয়। জুলাই-আগস্টের গণহত্যার প্রধান নিউক্লিয়াস ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার নিচের দিকে কয়েকজন ছিলেন, তাদের বিচারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তাদের বিচার শেষ করতে চান। সেই সক্ষমতা তাদের আছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলা ও সবার বিচারই প্রায় আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা যাবে। দেশব্যাপী যত অপরাধ হয়েছে, সে জন্য বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে এবং সাধারণ আদালতে বিচার চলছে, সেটা চলবে বলেও জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সেই বিচার করতে কতো সময় লাগবে, সেটা সংশ্লিষ্ট আদালত বলতে পারবেন। দুইদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের অনেক প্রাধান্য আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাধান্য হচ্ছে যারা দেশটাকে খুন ও গুমের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল, যারা ছাত্র-জনতার রক্তে এই বাংলার মাটি রঞ্জিত করেছে, তাদের বিচার এক নম্বর প্রাধান্য। এই জায়গায় ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে বঙ্গোপসাগর: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু আর হিমালয় নয়, কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বঙ্গোপসাগর বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, সরকার এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে। সেই নেতৃত্ব দেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি পরিবর্তন হচ্ছে মন্তব্য করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় রকমের পরিবর্তন হবে। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরে পরিবর্তন হবে। এ অঞ্চলে কোনো নেতা নেই, যিনি বঙ্গোপসাগরে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয়ভাবে নেতৃত্ব দান করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রতিবেশী আসতে পারে, নতুন রাষ্ট্রের উত্থান হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে, ভূরাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেবে।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সংস্কার ও নির্বাচনকে পাল্টাপাল্টি না বলে ন্যূনতম ঐক্যের দিকে যেতে হবে। অর্থনীতি মন্দা অবস্থায় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতির উৎপাদন সম্পর্কে কোনো কথাবার্তা নেই। সেটা আসলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কায়দায় চলবে না, অন্য কোনো কায়দাও চলবে না। দেশজ কায়দা চলতে হলে দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাবে। কিন্তু সামগ্রিক সংস্কার করা যাবে না। সরকারের একটাই লক্ষ্য থাকতে হবে, দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। চারটা থেকে পাঁচটা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অনুমোদন দেয়া ১২ ব্যাংকের স্পন্সর কোথা থেকে পেয়েছে, তা বের করা এনবিআরের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

প্রতিশোধ নয়, বিচার করতে চায়: অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘জুলাই গণহত্যার বিচারে আমরা কি প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি এমন অনেক প্রশ্ন আসছে। আমরা বলতে চাই, আমরা প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি না। আমরা বিচার করতে চাচ্ছি। কেন বিচার করতে চাচ্ছি? আমরা আগামী প্রজন্মকে ইতিহাসের একটি দায় থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান সময়ে এসে কেউ জমি দখলে ব্যস্ত, কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত, কেউ পদ-পদবি দখলে ব্যস্ত, কেউ নিজস্ব লোক পুনর্বাসনে ব্যস্ত, কিন্তু খুনিদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য, খুনিদের বিচারের জন্য আমাদের ওপর যে পরিমাণ চাপ প্রয়োজন ছিল সেদিকে আপনারা ফোকাস করেননি। তিনি বলেন, আপনারা যত বেশি চাপে রাখবেন, আমরা তত বেশি এই বিষয়টাকে (বিচার) সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দৃঢ় চেষ্টা থাকবে। আপনারা যত বেশি অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করবেন আমরা রাষ্ট্রকে এবং জনগণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ততবেশি এজেন্ডা ভিত্তিক সাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাবো।

দেশে ঐক্যের প্রয়োজন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঐক্য ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়। সংস্কার ছাড়া যৌক্তিক কোনো বাংলাদেশ আপনাদের উপহার দেয়া সম্ভব নয়। ঐক্য ছাড়া, সংস্কার ছাড়া এই বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে করাটা কঠিন এবং দুরূহ।’

বিচারের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আলোচনা কম হওয়ায় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রের প্রধান এ আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল চ্যালেঞ্জের জায়গাটা কি সেটা আমাদের বলবেন। আমরা সেটায় যেন যৌক্তিক সমাধানের জায়গায় যেতে পারি, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা পাইনি। তিনি বলেন, আমার কাছে চ্যালেঞ্জের প্রধান জায়গাটা হলো, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের বিনিময়ে যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা রাস্তায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্য, সেই ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, সেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত মিলিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করার যে ঐক্য, সেই ঐক্যটাতে যে ফাটল ধরেছে সেই ফাটলটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। ’

বিভিন্ন মিথ্যা মামলা প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পার্সোনাল গ্রাস এক্সপোজ করার জন্য মামলা দিয়েছেন, আসামির খাতায় নাম দিয়েছেন, এই মামলাগুলোর পরিণতি কি হবে এবং এটার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে মামলা তার কোনো কনফ্লিক্ট হবে কিনা প্রশ্ন এসেছে। আপনাদের আইনিভাবে, স্পষ্টভাবে বলতে চাই, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, সেই ট্রাইব্যুনাল ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৯৭৩ এর ১৯ নাম্বার আইন। সে আইনে মানবতাবিরোধী আইনের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, গুমসহ অনেকগুলো অপরাধের কথা বলা হয়েছে, যে অপরাধগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সিভিলিয়ান পপুলেশনের ওপর ঘটনা ঘটানো হয়েছে তার বিচার হবে। সেটি একটা দুইটা স্পেসিফিক ঘটনার দরকার নেই। ইন জেনারেল সেটার বিচার হবে। ঐ আইনেই বলা আছে ডমেস্টিক অন্যান্য আইনে যাই বলা থাকুক না কেন, ঐটার বিচার ওখানে হবে। অর্ডিনারি গুমের বিচার, খুনের বিচার, নির্যাতনের বিচার, নিপীড়নের বিচার, এইগুলো অর্ডিনারি কোর্টে হতে কোনো বাধা নেই এবং সেটাও চলবে।

সংস্কারের বিষয়ে সরকার একা সিদ্ধান্ত নেবে না: উপদেষ্টা মাহফুজ
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। মাহফুজ বলেন, ‘কমিশন থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর সব রাজনৈতিক দল এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার পরিকল্পনা করছে সরকার। যা জানুয়ারিতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংস্কারের বিষয়ে সরকার একা কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।’
তিনি বলেন, ‘কতোটা সংস্কার সম্ভব এবং কোনটা স্বল্পমেয়াদি আর কোনটা দীর্ঘ সময়ের জন্য সব কিছুই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এরপর জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে পরিষ্কার হবে যে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক সংস্কারগুলো কী এবং আমরা কী করতে সক্ষম হবো।’

মাহফুজ বলেন, ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ঐক্য দিয়ে কী করবেন। রাষ্ট্র প্রধানত তার প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আমরা ৭২’র সংবিধানের সমালোচনা করছি কারণ এর দ্বারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তাহলে এ সংস্কার ক্ষমতার পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না।’

ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘১৯৭১ সালের পর আমরা দেশকে সংস্কার ও প্রতিষ্ঠা করতে বড় একটা সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা যদি রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হই, তাহলে সবকিছু ভেস্তে যাবে।’ গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমরা চাই জনগণ সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করুক। কেননা এটি সরকারের কাজের গতি ত্বরান্বিত করে। জনগণের ব্যাপক সমালোচনা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

সংলাপে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা যায় কিনা, তা সংবিধান সংস্কার কমিটিকে ভাবতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় শেখ মুজিবও কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেননি। সংবিধান নতুন করে রচনার সময় এ অঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। আতাউর রহমান দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দেন।

জাতীয় নাগরিক কমিটির সরোয়ার তুষার বলেন, ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের যে সংবিধান তা বাতিল হয়ে গেছে। বলা যায়, এ সংবিধান এখন কোমায় চলে গেছে। সংবিধান পরিবর্তন করার লক্ষ্যে একটি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, গঠন করতে হবে একটি গণপরিষদ। এ গণপরিষদ সংবিধান রচনা করবে নতুন করে। এই গণপরিষদ পরে আইনসভা বা জাতীয় সংসদে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজনে গণভোট করা যেতে পারে।
তবে তুষারের কথার বিরোধিতা করেন ছাত্রদলের গবেষণা সেলের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবীব। তিনি বলেন, ‘যে সংবিধানের ১০৪ ধারা মতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে, আপনারা শপথ নিয়েছেন, তা এত সহজে বাতিল করে দেবেন? সংবিধান সংস্কার করতে গেলে প্রয়োজন গণভোট। থাকতে হবে জনগণের ভাষ্য। জনগণের কথা বলবেন, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। জনগণের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে কেবল ১০-১২ জনের পাঠচক্রে সংবিধান সংস্কার করে ফেলবেন?’ জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, রাজনৈতিক দলই জনগণের প্রতিনিধি এটা ভুল ধারণা। তাহলে জুলাই বিপ্লবে ছাত্রদের ডাকে সাধারণ মানুষ নেমে আসতো না।

দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিনের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, গণফোরামের কো-চেয়ারম্যান সুব্রত চৌধুরী, গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরাজী, গণসংগীত আন্দোলনের আবুল হাসান রুবেল প্রমুখ।

সৈয়দ আবদুল্লাহর সঞ্চালনায় অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন- নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি’র সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু, মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির চেয়ারপারসন রোকসানা খন্দকার, মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, এডভোকেট দিলরুবা শারমিন, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

mzamin

পুলিশ ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল হয়ে উঠেছিল

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, বিপ্লবের আগে পুলিশ ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল হয়ে উঠেছিল। পুলিশের নেতৃত্ব স্তর ভেঙে পড়েছিল, জনআস্থা থেকে পুলিশ ছিটকে পড়েছিল। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, জনগণের কাছে পুলিশকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার্স কল্যাণ সমিতির (বিআরপিওডব্লিউএ) এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

আইজিপি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ একটি ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে পুলিশকে এমন অবস্থায় পতিত হতে হয়নি। জুলাই-আগস্ট বিপ্লব-পূর্ব ও বিপ্লব-উত্তর পুলিশের পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। বিপ্লবের আগের সময়ে পুলিশ হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের লাঠিয়াল। ফলে পুলিশকে জনরোষের শিকার হতে হয়েছে। এখন উদ্যম, আগ্রহ আর নিষ্ঠা নিয়ে আমরা পুলিশকে সংগঠিত করছি। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুলিশকে সুসংগঠিত করা, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং এ পুলিশ যাতে আর কখনো জনবিরোধী অবস্থানে ফিরে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা করা।

আইজিপি বলেন, সারা দেশে অপরাধ দমনে পুলিশ কাজ করছে এবং এর কোনো ম্যাজিক সলিউশন (জাদুকরি সমাধান) নেই। সারা দেশের এসপিদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমাদের কাছে কোনো জাদুকরি সমাধান নেই কারণ আপনি পরিস্থিতি জানেন এবং কোথা থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড বেড়েছে, পুলিশ কী ভূমিকা নিচ্ছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, আমরা পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর করতে এবং তাদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। আমরা মানুষের আরও কাছাকাছি যেতে চাই এবং তাদের সহযোগিতা চাই। আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদেরও আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে আমাদের সমপ্রদায়ের (পুলিশ সদস্যদের) সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করেন।

সমপ্রতি বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থী সমন্বয়কারীদের হুমকির বিষয়ে আইজিপি বলেন, আমরা প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে সমাধান করেছি। কালিয়াকৈরে ডাকাতি ও নারায়ণগঞ্জে মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত হয়েছে। ছাত্র সমন্বয়কদের নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হলে তারা ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফলাফলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সব ঘটনা পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা নয় বলেও উল্লেখ করেন আইজিপি। হুমকিসহ আরও দু’টি ঘটনার কথাও উল্লেখ করে আইজিপি বলেন একটি হলো- ময়মনসিংহ থেকে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে তার বাবা-মায়ের জিম্মায় দেয়া হয়। অপর ঘটনায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেহের নামে এক শিক্ষার্থীকে হুমকি দেয়া হয়, যার ফলে সিরাজগঞ্জ থেকে জাহিদ হাসানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আইজিপি বলেন, আমরা প্রতিটি ঘটনা সমাধানের জন্য কাজ করছি, তবে সবগুলো ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র নেই। সমপ্রতি সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এটা তদন্ত কমিটি কাজ করবে। আমি এ বিষয়ে কথা বলতে পারবো না। পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতির বিষয়ে আইজিপি বলেন, কর্মকর্তাদের অবদানের প্রতি সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের উপায় হিসেবে মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন চাকরির মেয়াদ বাকি থাকতেই পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। তার নিজের চাকরির মেয়াদ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, আমি অবসর থেকে ফিরে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। জানি না কতটুকু অর্জন করতে পারবো। তবে আমি চলে যাওয়ার সময় সম্মানটা সঙ্গে করে নেয়ার চেষ্টা করবো।

আইজিপি বলেন, গর্ব করার মতো অবদান আছে পুলিশের। এই বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ রুখে দিয়ে গড়ে তুলেছিল সশস্ত্র প্রতিরোধ। আমরা সে বাহিনীর উত্তরসূরি। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পুলিশের পুনর্গঠনের পবিত্র দায়িত্ব আমার ওপর বর্তেছে। আশা করি, পুলিশ পুনর্গঠনের এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে অবসরপ্রাপ্ত সব পুলিশ সদস্য আমাকে সহায়তা করবেন। এর আগে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে বিআরপিওডব্লিউএ’র ৪১তম বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সমিতির মৃত্যুবরণকারী সব সদস্য ও গত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শাহাদতবরণকারী সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। পরে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে আইজিপি বাহারুল আলম সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির পাঁচজন বয়োজ্যেষ্ঠ পুলিশ সদস্যকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেয়া হয়। কমিউনিটি পুলিশিং ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘এসএম আহসান স্মৃতি পুরস্কার’ দেয়া হয়। এ ছাড়া নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু সুরক্ষায় ভিকটিম সাপোর্ট কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘প্রফেসর অনামিকা হক লিলি-ড. এম এনামুল হক অ্যাওয়ার্ড’- দেয়া হয়।

mzamin

ভারতের কারাগারে নেয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা সুখরঞ্জন বালির

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালি কীভাবে ভারতের কারাগারে পৌঁছান, এর লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর সকালে ঘটনাটি ঘটে। অপহৃত হওয়ার পর তার সঙ্গে কী কী ঘটেছে, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে আলাপকালে তার বিশদ বর্ণনা তুলে ধরেন সুখরঞ্জন বালি।

বাসসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুখরঞ্জন বালি বলেন, ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর আমি ঢাকায় কোর্টে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে দু’জন ব্যারিস্টার ও দু’জন উকিল ছিলেন। আমাদের গাড়ি দেখে কোর্টের গেটে আটকে ফেলা হয়। তখন আমার সঙ্গে থাকা আইনজীবীদের সঙ্গে গেটের লোকদের তর্কবিতর্ক চলছিল। আমি গাড়িতে দু’জন ব্যারিস্টারের মাঝে বসা ছিলাম। এ সময় কিছু সাদা পোশাকের লোক আমাকে নামিয়ে টানাটানি করতে লাগলো। তারা বলছিল, যার জন্য গাড়ি থামানো হয়েছে, সেই লোক উনি। একেই আমাদের দরকার। সেই লোকরা আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে টেনে-হিঁচড়ে পাঁচ-ছয় হাত দূরে অপর একটি গাড়িতে তুলে আমার চোখ বেঁধে ফেলে এবং একটু পরে গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়িটি চালানোর পর সাদা পোশাকের লোকেরা আমাকে হাঁটাতে থাকে। এ সময় আমি নিচের দিকে নামার মতো অনুভব করি। কিছুদূর হাঁটিয়ে একটা দরজা খুলে অন্ধকার জায়গায় আমাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কোনো আলো সেখানে ছিল না, অথচ তখন সকাল ১০টা-১১টা বাজে।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, আমাকে একটি খালি রুমে আটকে দেয়া হয়। বাইরে কোনো শব্দ ছিল না। ঘরে কোনো জানালা বা ফাঁকা ছিল না, যা দিয়ে কোনোরকম আলো ভেতরে আসতে পারে। তখন আমাকে মাঝে মাঝে অল্প করে খাবার দেয়া হতো। সেখানে কিছু লোক ছিল, যারা আমাকে খাবার দিতো বা পাহারায় আসতো; তারা নীল রংয়ের পোশাক পরা থাকতো।

তিনি বলেন, এর দু’দিন পর আমাকে সেই রুম থেকে বের করে অন্য একটি রুমে নেয়া হয়। সেখানে আমাকে নিয়ে তারা জোর করে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি নিতে চায়। সে রুমে অনেকগুলো ক্যামেরা লাগানো ছিল আমি দেখতে পাই। আমার ভাইয়ের হত্যায় সাঈদী হুজুর জড়িত কিনা জানতে চাইলে আমি যখন অস্বীকার করি এবং বলি যে, যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, তাদের আমি চিনি। তাদের বিরুদ্ধে আমি সাক্ষ্য দিতে পারবো। কিন্তু তারা বারবার আমাকে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বলে এবং একপর্যায়ে তারা আমাকে মারধরসহ কারেন্টের শক দেয়, নির্যাতন করে।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, তারা আমাকে একপর্যায়ে টাকা দিয়ে লোভ দেখানোর চেষ্টা করে। এরপরও রাজি না হলে তারা অমানবিক নির্যাতন চালায়। সেখানে টানা কয়েকদিন ছিলাম। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তখন তিন-চারজন লোক জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তাদের অত্যাচারে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর তারা একদিন সকাল ৭টা কি ৮টার দিকে আমাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলে। আয়নাঘর থেকে যখন গাড়িতে উঠানো হচ্ছিলো, তখন আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? জবাবে তারা বলেছিল, আমরা তোকে তোর দেশে নিয়ে যাবো। বল কোথায় নামিয়ে দিলে তুই তোর বাড়ি চিনে যেতে পারবি। তখন বলি, বাগেরহাটে নামিয়ে দিলে আমি আমার বাড়িতে যেতে পারবো। সারাদিন গাড়ি চালানোর পর মাঝে একবার ফেরিতে উঠানো ও নামানো হয়, সেটা আমি অনুভব করতে পারি।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে আবার গাড়ি চলতে শুরু করে; দীর্ঘক্ষণ চালানোর পর দুইজন লোক গাড়িতে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পর ১০-১২ মিনিটের মতো হবে গাড়িটি চলতে চলতে থেমে যায়। এ সময় গাড়ি থেকে আমাকে নামানো হয় এবং চোখ খুলে আমাকে সামনে এগোতে বলা হয়। জায়গাটি বাগেরহাট কিনা, সেটা বুঝতে চেষ্টা করি। আমি বুঝতে পারি যে, ওটা বাগেরহাট নয় এবং স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সামনে বিএসএফ, এটা বর্ডার এলাকা। সেখানে যারা আমায় নিয়েছে, কান্না করতে করতে আমি বিএসএফ-এর হাতে তুলে না দিতে তাদের অনুরোধ করি। আমি বলি এদের হাতে তুলে দিয়েন না। প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেলেন। এ কথা বলতে বলতে আমি মাটিতে পড়ে যাই।

সুখরঞ্জন বলেন, আমাকে নেয়া গাড়ির লোকেরা জোর করে বিএসএফ-এর কাছে দিয়ে আসে আমায়। এ সময় আমি দেখতে পাই গাড়িতে ৬-৭ জন সবুজ পোশাকের পুলিশের সঙ্গে দু’জন বিজিবি সদস্য আছেন। তখন আমি বুঝতে পারি গাড়ি থামিয়ে যাদের নেয়া হয়, তারাই বিজিবি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের একজন নিরপরাধ নাগরিককে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরেকটি দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেয় কেমন করে?

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুখরঞ্জন বালি বলেন, আমি যেতে না চাইলে জোর করে তারা আমাকে ধরে বিএসএফ সদস্যদের হাতে তুলে দেয়। বিএসএফ কিছু জিজ্ঞাসা না করেই আমাকে প্রচুর মারধর শুরু করে। বিএসএফ হিন্দিতে কথা বলছিল এবং আমি আমাকে না মারার জন্য বাংলায় বোঝাতে চেষ্টা করি। আমার কোনো কথা তারা বুঝতে পেরেছিল কিনা, আমি আজও বুঝিনি। একপর্যায়ে বিএসএফ মোটা দড়ি দিয়ে পেছন দিক দিয়ে আমার হাত বেঁধে ফেলে। হাত বাঁধার সেই দাগ এখনো স্পষ্ট। সেটা তিনি এই প্রতিবেদককে দেখান। বিএসএফ-এর মারধরের পর তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা বেহুঁশ ছিলেন। তিনি বলেন, বিএসএফ-এর ক্যাম্পটির বিষয়ে জানতে পারি, এটি বৈকারী বাজার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-চব্বিশপরগণা জেলার স্বরূপনগর থানা এলাকা। এরপর বশিরহাট জেলে আমাকে ২২ দিন রাখা হয়। সেখানে একদিন আমাকে কোর্টেও নেয়া হয়। এরপর আনা হয় দমদম জেলে।

সুখরঞ্জন বলেন, দমদম জেলে থাকাকালীন সেখানে এক বন্দিকে (সম্পর্কে আমার ভাগনে হয়) আমি দেখি। সে আমাকে চিনতে পারেনি। আমি সুযোগ বুঝে তাকে আমার পরিচয় দিলে সে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, মামা তুমি বেঁচে আছ। আমরা তো জানি তুমি মারা গেছ। সে ভাগনে কারামুক্তির পর আমার বাড়িতে ও নিকটাত্মীয়দের আমার বেঁচে থাকা ও ভারতের দমদম জেলে বন্দি থাকার কথা জানায়। তিনি বলেন, আমার বাড়ির লোকেরা ভারতে প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলে মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ২০১৮ সালের প্রথমদিকে ৫ বছর জেল খেটে আমি মুক্ত হয়ে দেশে ফেরত আসতে পারি।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, সেই দৃশ্য আমি আমার বাড়ির পাশে টয়লেটের ভেতর লুকিয়ে থেকে নিজ চোখে দেখেছি। সেখানে সাঈদী হুজুরকে আমি দেখিনি। তখন এ নামে কাউকে আমি চিনতামও না। উনি আমাদের এলাকা থেকে নির্বাচিত দুই/দু’বারের এমপি ছিলেন। তখন উনার সম্পর্কে জানি ও চিনতে পারি। সাঈদী হুজুর যখন এমপি ছিলেন, তখন আমাদের মনে হতো যেন আমরা মায়ের কোলে আছি। হুজুর নিরপরাধ-নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে শত নির্যাতন সহ্য করেও আমি সাক্ষ্য দিইনি। আমাকে ক্ষুদিরামের মতো ফাঁসি দিলেও আমি প্রস্তুত ছিলাম। তিনি বলেন, ভারত থেকে দেশে ফিরেও আমি নিজ এলাকায় পিরোজপুরের ইন্দুরকানিতে যেতে পারিনি। নিরাপত্তার কারণে বাগেরহাটে আত্মীয় ও পরিচিতদের সহায়তায় তাদের আশ্রয়ে ছিলাম।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানি (সাবেক জিয়ানগর) উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামে আমার বাড়ি। আমি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। আমার ছেলেও কাঠমিস্ত্রির কাজ করতো। তাতে যে আয়রোজগার ছিল, তাতে আমি পরিবার নিয়ে ভালোই চলতাম। সাঈদী হুজুরের মামলায় সাক্ষ্য দেয়াকে কেন্দ্র করে আমাকে অপহরণ করে গুম করে নির্যাতন, নিপীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিজিবি’র সহায়তায় বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিয়ে টানা ৫ বছর কারাবন্দি করে অবর্ণনীয় সাজা ভোগে বাধ্য করা হয়। অনেক ভয়-আতঙ্কের পরও সাঈদী হুজুরের মুত্যুর পর তার জানাজায় উপস্থিত হয়েছিলাম। তারপর আবারো আমি নিরাপত্তার কারণে আড়ালে চলে যাই। তিনি জানান, তার ওপর ঘটে যাওয়া এত ঘটনার পর তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারেননি। নিজ পেশায়ও ফিরে যেতে পারেননি। ফলে অর্থকষ্টে ও অভাবে দিন কাটছে তার ও পরিবারের।

সুখরঞ্জন বালি রাষ্ট্রের প্রষ্ঠপোষকতায় অপহরণ, গুম এবং ৫ বছর কারাবন্দি থাকাসহ তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব অন্যায়ের বিচার চান তিনি। ক্ষতিপূরণ চান রাষ্ট্রের কাছে।

উল্লেখ্য, সুখরঞ্জন বালি পশ্চিমবঙ্গের এক কারাগারে আছেন, এ খবর প্রথম প্রকাশ করে ঢাকার একটি ইংরেজি পত্রিকা। ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবীরা তখন অভিযোগ করেছিলেন যে তাকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন অপহরণ করে নিয়ে গেছে। ইংরেজি দৈনিকটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের পক্ষে একজন ভারতীয় নাগরিক কারাগারে সুখরঞ্জন বালির বক্তব্য নেন, যেখানে বালি বলেন, তাকে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অপহরণ করে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর কাছে তুলে দেয়।

mzamin

নতুন বছরে ট্রাম্পের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতি, যুদ্ধ, চীন ইস্যু, জলবায়ু

নতুন বছরে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তার ওপর ভোটাররা যে আস্থা প্রকাশ করেছেন, তা অর্জন করতে হলে তাকে পাড়ি দিতে হবে চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণার সময় অন্যতম ইস্যু ছিল অর্থনীতি। মার্কিন ভোটাররা যে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রোসারিগুলোতে মূল্যস্ফীতি অনেক এবং পণ্যের মূল্য অনেক বেশি। ডনাল্ড ট্রাম্পকে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছে। এ উপলক্ষে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ১২ই ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, মার্কিনিরা খুব শিগগিরই গ্রোসারিতে কেনাকাটায় সক্ষম হবেন। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব হাউসটনের অর্থনীতি বিভাগের এনার্জি বিষয়ক ফেলো এড হিরস বলেন, তিনি যতটা বলেছেন অতটা সহজ হবে না। অন্তত সঙ্গে সঙ্গে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। ওদিকে  মেক্সিকো, কানাডা সহ শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছ থেকে পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এড হিরস বলেন, যদি তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমদানি কর বাড়িয়ে দেন, তাতে পণ্যমূল্য বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, যদি মেক্সিকোর পণ্যের ওপর শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনকারীর সেই ২৫ ভাগ মূল্য বাড়ানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। ঘটবে এটাই। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা মিলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ করে থাকে বছরে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ট্রাম্প যদি শুল্ক হার বৃদ্ধি করেন তাহলে উৎপাদিত পণ্যের খুচরা দাম অনেক বেড়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, কানাডা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কানাডার কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ওপর শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হলে পুরো দেশে প্রতিজন ভোক্তার ওপর তার ফল পড়বে। তাদের তেলের দাম বেড়ে গেলে তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকারীরাও তাদের পণ্যের সমান মূল্য বাড়িয়ে দেবেন। ট্রাম্প মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাই তিনি এ সংক্রান্ত আইন ঢেলে সাজাবেন। তবে শুরু করবেন গণহারে অভিবাসীদের দেশ থেকে বের করে দিয়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করলেই তাকে নাগরিকত্ব দেয়ার যে বিধান আছে, তাও বাতিল করে দিতে চেয়েছেন। কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। একটি নতুন আইন করার কথাও তুলেছেন তারা। এড হিরস বলেন, গণহারে লাখ লাখ ডকুমেন্টবিহীন অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। শ্রমিকদের করা কাজ বা গড়পড়তার কাজের ক্ষেত্রে জনশক্তির সংকট দেখা দেবে। এসব এমন কাজ, যা মার্কিনিরা করতে চান না। এর মধ্যে আছে বাড়ির লন দেখাশোনা করা, হাঁড়িপাতিল পরিষ্কার করা, রেস্তরাঁর টেবিল পরিষ্কার করা। তিনি টেক্সাসের পশ্চিমে পারমিয়ান বেসিনে তেলক্ষেত্রগুলোর কাজের দিকে ইঙ্গিত করেন। বলেন, এসব স্থানের তাপমাত্রা ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪৮.৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়। এত কড়া তাপমাত্রায় কাজ করার জন্য কর্মী পাওয়া কঠিন হবে। গ্রীষ্মের কড়া গরমে তেলক্ষেত্রগুলোতে কাজ করতে হয়। ফলে এসব অভিবাসী শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হলে তার আগে ওই কাজ করবে এমন মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে খুঁজে বের করতে হবে।

ওদিকে চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক মোটেও ভালো নয়। তিনি নিজে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ে ২০২০ সালে তিনি প্রথম মেয়াদে ওভাল অফিসের দায়িত্বে থাকার সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল উত্তেজনার। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো অবকাশযাপন কেন্দ্রে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কোভিডের পূর্ব পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। তিনি শি জিনপিংকে একজন বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট একজন বিস্ময়কর মানুষ। ট্রাম্প আরও বলেন, কোভিড সম্পর্ককে শেষ করে দেয়নি। কিন্তু সেই সম্পর্ক আমার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধের আবির্ভাব হয়। এর ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনকে এলোমেলো করে দেয়। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কারণ, চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধের ফলে বিশ্ব জুড়ে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়। কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেখানে রেখে এসেছিলেন সেখান থেকে শুরু করতে চান। চীন থেকে পণ্য আমদানি করলে শতকরা ৬০ থেকে ১০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তা যদি করেন তাহলে সেটা হবে আরেকটি বাণিজ্যিক যুদ্ধ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আবারো বিঘ্নিত হবে। আরও ক্ষতির শিকার হবে যুক্তরাষ্ট্র। এড হিরস বলেন, ট্রাম্প যদি মেক্সিকো, কানাডার পণ্যের ওপর শতকরা ২৫ ভাগ শুল্ক সহ এই পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন, তাহলে দ্রুততার সঙ্গেই মুদ্রাস্ফীতি এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা কখনো দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, চীনের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করে ট্রাম্প আক্রমণ চালিয়েছিলেন তার প্রথম মেয়াদে- এটা আমরা জানি। জবাবে চীন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপরে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শস্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল।

বিশ্ব ক্রমশ সংঘাতময় হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত যুক্তরাষ্ট্র। এসব যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। তিনি যদি এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তাহলে প্রশংসিত হবেন। বিশেষ করে গাজাকে কেন্দ্র করে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ। তবে ট্রাম্প যে ইসরাইলের প্রতি ভীষণভাবে ঝুঁকে আছেন বা থাকবেন তা নতুন করে বলার কিছু নেই। ফলে তিনি ফিলিস্তিনবাসীর স্বার্থকে বড় করে দেখবেন না। ইসরাইলের সঙ্গে তার সখ্য কোনো গোপন কথা নয়। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইল সেখানে বিমান, স্থল হামলা চালিয়ে গণহত্যা চালিয়ে কমপক্ষে ৪৫ হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ইসরাইলকে সামরিক সহ নানাবিধ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে, যা দিয়ে তারা নিরীহ গাজাবাসীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। ট্রাম্প কি তার ব্যতিক্রম কিছু করবেন? এ জন্য তার দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মহল এই যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প কি করেন সেদিকে তাদের অণুবীক্ষণ যন্ত্র সেট করে রাখবে। এখানে উল্লেখ করতেই হয় যে, ১৯৬৭ সালে সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমিকে কেড়ে নেয় ইসরাইল। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে এই গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলিদের নিয়ন্ত্রণ সরকারি ভাবে পশ্চিমা নেতাদের মধ্যে সবার আগে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। এখন তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত। ফলে ইসরাইল সরকারের কিছু সদস্য আশা করছেন, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে সম্প্রসারিত ইসরাইলি বসতিকে তিনি স্বীকৃতি দেবেন। পশ্চিম তীর বর্তমানে আইনগতভাবে ফিলিস্তিনিদের। কিন্তু সেখানেও থাবা বসিয়েছে ইসরাইল। এড হিরস বলেন, কোনো পক্ষ নেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি বলেন, গাজা উপত্যকার ট্র্যাজেডি হলে কয়েক লাখ মানুষ সত্যিকার অর্থে দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে। তারা সমুদ্রের পাড়ে তাঁবুতে বসবাস করছেন। খাবার নেই। এটা নরহত্যা। এটা যুদ্ধের একটি সবচেয়ে খারাপ দিক। আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসন কি গাজার সমাজ ব্যবস্থাকে গড়ে তোলার জন্য কোনো ভূমিকা নেবেন কিনা- জানি না। এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় আসবেন, তখনো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলতে থাকবে। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে তিনি কথা বলবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে। তিনি তাদেরকে একটি চুক্তি করার ওপর জোর দেন। এর মধ্যদিয়ে উভয় নেতা যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেবেন। ট্রাম্প বলেন- এই যুদ্ধ থামাতে হবে। এমন অনেক শহর আছে, যেখানে কোনো ভবন আর দাঁড়িয়ে নেই। এড হিরস বলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের মতোই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যদিও ট্রাম্প বলেন, তিনি চান দুই দেশ যুদ্ধবিরতি চুক্তি করুক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাতে জড়িত হবে না। তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাড়াতে পারে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা সতর্কতার সঙ্গে মনে করে ন্যাটো সহ আন্তর্জাতিক বড় বড় জোট থেকে যদি ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন, তাহলে তার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে টেক্কা দেয়ার জন্য বিশ্বের অন্য সুপার পাওয়ারগুলোর জন্য সুযোগ করে দেয়া হবে। যদি ট্রাম্প এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে না আসেন, তাতে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এর ফলে শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন অথবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এগিয়ে আসবে। তাতে বিশ্বনেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা খর্ব হবে। এটা হবে তাদের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতি।

আরও একটি বৈশ্বিক স্বার্থে ট্রাম্পকে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে। তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ কমিয়ে আনার জন্য একটি আইন করেছে। এর নাম ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট (আইআরএ)। গ্রিনহাউজ নির্গমন কমাতে বিনিয়োগ করা হবে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তারপর জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে তা পুনর্বহাল করেন। এখন আবার ট্রাম্প কি করবেন- তা সময়ই বলে দেবে। 

mzamin