Sunday, June 12, 2016

একটি ভালবাসার গল্প...

প্রতীকী ছবি
ভাই মাফ চাই, ছাইড়া দেন ভাই, ভাই দুইটা পায়ে ধরি ভাই, আর মাইরেন না, ভাই আমি রোজারাখছি, আর আমুনা ভাই। রোজার কথা শুনে থেমে গেলো দু'জন। বাড়ি কই তোর?
- কলাবাগান বস্তিতে।
- তুই মসজিদ থেকা চুরি করস? তোর কলিজা কত বড়?
পাশের লোকটা বললো ভাই থামলেন কেন? দেন আর কয়ডা, রোজার মাসে চুরি কইরা বেড়ায়, সালারে লাত্থি দেন, তুই চুরি করস আবার কিসের রোজা রাখস রে? মিছাকথার জায়গা পাস না? এই বলেই কান বরাবর সজোরে আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। ছেলেটা গালে হাত দিয়ে দেয়াল ঘেসে বসে রইলো, কান্না আর হই হুল্লোড়ের শব্দে ইমাম সাহেব দোতলা থেকে নেমে এলেন, দেখলেন মসজিদের আঙিনায় লোক জড়ো হয়ে আছে। মসজিদে আজ ইফতারির ব্যাপক আয়োজন চলছিল। ইমাম এগিয়ে গিয়ে বললেন, কি হইছে এখানে?
- হুজুর চোর ধরছি! ছেঁচড়া চোর!
ইমাম সাহেব এগিয়ে গিয়ে দেখলেন ১২-১৩ বছরের এক ছেলে দেয়াল ঘেসে বসে আছে, ছেলেটির পুরো গাল চোখের পানিতে ভেসে গেছে, গায়ের রঙ কালো হলেও আঘাতের দাগ গুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ইমাম সামনে আসাতে ছেলেটি আরও ভয় পেয়ে গেলো। এবার আর তার রেহাই নাই, হাত পা কাঁপছে।
- কি চুরি করছে? দেখি?
পাশে লোকটি পলিথিনের পোটলা এগিয়ে দিয়ে দিয়ে বললো দেখেন হুজুর, দেখেন, ইফতারের আয়োজন হচ্ছে, এই ফাঁকে শালায় পলিথিনে ভইরা লইছে। এক্কেরে হাতেনাতে ধরছি! হুজুর পলিথিন হাতে নিয়ে দেখলেন আধা কেজির মত জিলাপি, ৬ টা আপেল, আর কিছু খেজুর ভিতরে ছিলো।
হুজুর বললেন, তাই বইলা এভাবে গণপিটুনি দিছো কেন?  এইটা কেমন বিচার? বাচ্চারে কেউ এভাবে মারে নাকি?
এবার লোক জনের উত্তেজনা একটু থেমে গেলো।
হুজুর ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করেন, তর বাপ কি করে?
ছেলেটা কিছুটা সস্থি ফিরে পেলো। বললো- সাইকেল ঠিক করতো, বাপের অসুখ তাই অহন কাম করে না। হুজুর আমারে ছাইড়া দেন। আমি আগে কুনোদিন চুরি করি নাই। কয়েকটা বাসায় হাত পাইতা একটা দানাও সাহায্য পাই নাই। পরে দেহি মসজিদে খাবার। বাড়িতে নিবার জন্যে তুইলা নিছি। ভুল হইয়া গেছে আমারে মাফ কইরা দেন। পাশ থেকে লোকগুলো বলছে, এগুলা সব মিথ্যাকথা, ধরা খাইয়া এখন ভদ্র সাজে। হুজুর বললেন, ইফতার শেষ হোক, সত্য মিথ্যা দেখে ওর বাপের কাছে জানিয়ে সতর্ক করে দেয়া হবে। ছেলেটাকে কেউ পানি দেও, ও অনেক হাঁপাচ্ছে।
একজন পানির বোতল এগিয়ে দেয়। ছেলেটি উত্তর দেয়, আমি রোজা!
ইমাম সাহেব এবার লোকগুলোর দিকে একটু বিরক্ত মুখে তাকালেন। ছেলেটিকে অজু করিয়ে তার পাশে বসিয়ে ইফতার করালেন। ইফতার আর নামাজ শেষে সেই দুই জন লোক ও ছেলেটিকে নিয়ে ইমাম সাহেব বস্তির দিকে এগুলেন। এক চালা টিনের ঘর, বাইরে দুয়ারে ছেলেটির বাবা বসে আছে। সব কিছু শুনে বাবাটি তার ছেলের গালে থাপ্পড় মারার জন্যে হাত উঠায়। হুজুর বাধা দিয়ে বলেন, যথেষ্ট মার হইছে, ওরে আর মাইরেন না।
বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলে, বিশ্বাস করেন হুজুর, আমার ছেলেরে আমি এই শিক্ষা দেই নাই। বেশ কয়দিন ধইরা আমার অসুখ। কাম কাজ নাই, পোলাপানগো ঠিক মত খাওন যোগাইতে পারি না। কিন্তু পোলায় চুরি করবো কুনোদিন ভাবি নাই। ও অমন পোলা না।
এরই মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ছেলেটির বোন। মেয়েটার বয়স ছয় বছরের মতো। বোনটি তার ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, কোমল স্বরে বলে, ভাই, জিলাপি আনো নাই? তুমি না আইজকা জিলাপি আনবা কইছো? ভাইয়ের মুখে কোনো কথা নেই, চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই আরেকটি চার বছরের ছোট্ট বোন ঘর থেকে ছুটে এসে বলে, ‘ভাই, ওরে না, ওরে না আমারে আগে দিবা, আমারে।’
এই বলেই হাতটি বাড়িয়ে দেয়, ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ভাই তুমি একলা একলাই খাইয়া আইছো? আমার জন্যে আনো নাইই? ভাইটি এবার ছোট বোনের কথা শুনে কেঁদে ফেলে। বোন দুইটা মন খারাপ করে ঘরে ঢুকে যায়। ছোট বোনটা মায়ের কোলে উঠে কান্নাজুড়ে দেয়। মা আচলে মুখ ঢেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বলেন, মাইয়া দুইটা কয়দিন ধইরা জিলাপি খাইতে চাইতেছে, ওগো বাপের অসুখ। টেকা পয়সাও নাই, তাই পোলারে বাইরে পাঠাইছিলাম বাড়ি বাড়ি গিয়া কিছু সাহায্য চাইয়া আনতে। ছোট মানুষ বুঝে নাই, তাই ভুল করে ফেলছে। খাবার সামনে পাইয়া নিয়া নিছে, অরে আফনেরা মাফ কইরা দিয়েন। এদিকে বাচ্চা মেয়েটা চোখ ভিজিয়ে মায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে নালিশ করেই যাচ্ছে- মা, ভাই আইজকাও জিলাপি আনে নাই, ভাই আমাগো খালি মিছা কথা কয়! ভাইটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বোনটি খেয়াল করে ভাইয়ের শার্টের পকেট ভেজা!
- ভাই তোমার পকেটে কি? এই বলেই হাত ঢুকিয়ে দেয়, বের করে দেখে দুইটা জিলাপি! ভাই তুমি আনছো? দুই বোনের মুখে হাসি ফুটে উঠে!
ভাইয়ের মুখ এবার ভয়ে চুপসে যায়। লোকদুটির দিকে ভয়ার্ত ভাবে তাকিয়ে বলে, স্যার, এইটা আমি চুরি করি নাই। হজুরের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, বিশ্বাস করেন হজুর, এইটা আমার ভাগের জিলাপি, ইফতারির সময় আমার ভাগেরটা উঠাইয়া রাখছিলাম বোইন দুইটার জন্যে, সত্যি আমি চুরি করি নাই হজুর।
সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হজুর ছেলেটারে টেনে বুকে জড়িয়ে নেন। মাথাটা বুকে চেপে ধরে রেখে চোখের পানি ফেলতে থাকেন। লোক দুইজন এবার সশব্দে কেঁদে ওঠেন। কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটির বাবার কাছে এগিয়ে যায়। তার হাতদুটি ধরে বলে, ভুল হয়ে গেছে আমাদের, আপনার ছেলের গায়ে হাত তুলছি আমরা, মাফ করে দিয়েন আমাদের। লোকটি পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে বাবার হাতে দিয়ে বললেন, এখানে যা আছে তা দিয়ে বাচ্চাদের কিছু খাওয়াবেন। তারা লজ্জায় আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না, বিদায় নেয় দ্রুত।
আমরা শুধু অপরাধীকে দেখি কিন্তু অপরাধের পেছনের অংশটুকু দেখি না, দেখতে চাইও না। আমরা চকের বাজার, বাবুবাজার, খানদানী, নামিদামি, নানা শাহী ভোজ দিয়ে ইফতার করতে যাই অথচ পাশের মানুষটি দু’মুঠো খাবারের জন্যে রাস্তায় বের হয়েছে, সেদিকে সেদিকে কারো কোনো দৃষ্টিপাত নেই। নামিদামি রেস্টুরেন্টে গেলে আর ইভেন্ট করে সেল্ফি তুললে কি আমাদের নেকি দশ গুণ বেশি হয়ে যাবে? কোন সমাজে বসবাস আমাদের? আমরা ইফতার পার্টির নাম দিয়ে পিকনিক করি, আমরা এলাকায় দোয়া মাহফিল করে এ বাসায় ও বাসায় প্যাকেট বিলি করি, যাদের খাদ্য আছে তাদের মাঝেই চলে বিতরণ, অথচ যারা অভাবী তাদের ভাগ্যে এসব জোটে না। আমরা পছন্দের জামা কিনতে গেলে এক দুইশ টাকা বেশি গেলেও কিছু যায় আসে না, কিন্তু ফকিরকে পাঁচ টাকার বেশি দিতে গেলে আত্মায় গিয়ে লাগে। আমরা কি পারিনা ইফতারির কিছু খাবার ওদের দিতে? আমরা কি পারিনা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা ওদের দান করতে? আমরা কি এতটাই ফকির? আসলে ফকির আমরা না, ফকির ওরাও না, ফকির হচ্ছে আমাদের মন-মানসিকতা! ফকির হচ্ছে আমাদের বিবেক।।
(ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া অজ্ঞাত লেখকের একটি স্ট্যাটাস)

বাংলাদেশী হিন্দুরা নরেন্দ্র মোদি ও ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন -পিটিআইয়ের রিপোর্ট

‘ঝুঁকিতে’ থাকা বাংলাদেশী হিন্দুরা  তাদের নিরাপত্তার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও দেশটির সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। খবরটি প্রকাশিত হয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অনলাইন ও হিন্দুস্তান টাইমসে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ধারাবাাহিক হামলার প্রেক্ষিতে তারা চাইছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ভারত সরকার যেন বিষয়টি ঢাকার কাছে তুলে ধরে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী রানা দাসগুপ্ত পিটিআইকে বলেছেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হলো হিন্দুরা। এ সম্প্রদায়টি বাংলাদেশে ঝুঁকির মুখে। মৌলবাদী ও জামায়াতিরা বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের মূলোৎপাটনের চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশ হিসেবে ভারত এক্ষেত্রে কিছু করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে আমাদের বড় আশা রয়েছে। তার উচিত এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছে তুলে ধরে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ১০ই জুন হিন্দুদের আশ্রমের সেবক নিত্যরঞ্জন পান্ডে (৬০)কে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্দেহজনক ইসলামপন্থিরা। এ নিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার চতুর্থ শিকার হলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এ ব্যক্তি।
রানা দাসগুপ্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একজন প্রসিকিউটরও। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ও মৌলবাদী গ্রুপগুলো হিন্দু সম্প্রদায়কে সমূলে উৎপাটন করতে চায়। গত দু’বছর ধরে ধর্মীয় এই তৎপরতার আরও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে দিয়ে স্থিতিশীল ভারত উপমহাদেশ অর্জন করা কখনও সম্ভব হবে না। তাই ভারত যদি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চায় তাহলে আমাদের দেশে (বাংলাদেশে) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিনাশ করা বন্ধ করতে তাদেরকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে একজন পুরোহিত, একজন খ্রিস্টান দোকানি, একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীসহ এক সপ্তাহে নিত্যরঞ্জন পান্ডেকে হত্যা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে, উগ্রপন্থিরা একটি মন্দিরের পুরোহিতকে কুপিয়ে হত্যা করে। তার সহায়তায় এগিয়ে যাওয়া এক ভক্তকে গুলি করে আহত করে। এপ্রিলে উদারপন্থি একজন প্রফেসরকে রাজশাহীতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একই মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন দর্জিকে হত্যা করা হয় তার দোকানের ভিতর। বাংলাদেশে প্রথম এলজিবিটি সম্প্রদায়ের ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও তার এক বন্ধুকে ইসলামপন্থিরা ঢাকায় তার বাসায় হত্যা করেছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি ব্লগারদের ওপর ধারাবাহিক হামলা হয়েছে।
‘বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থা ভয়াবহ। যদিও আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার রয়েছে তবু তৃণমূল পর্যায়ে পরিস্থিতি নির্মম। ধর্ষণ, হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ, হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সহায় সম্পত্তির ক্ষতিসাধন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।’ বাংলাদেশের সুপরিচিত অভিনেতা ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিযুষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলাদেশের ওপর ভারত চাপ সৃষ্টি না করলে মৌলবাদীদের থামানো যাবে না। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে ভারত একটি বড় শক্তিধর দেশ। প্রতিবেশী দেশে যখন হিন্দুদের নৃশংসভাবে জবাই করা হয় ভারত তখন অলস বসে থাকতে পারে না। পুরোহিতকে হত্যার পর বাংলাদেশে ভারতীয় হাই কমিশন তাদের কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছে নিহতের পরিবার ও আশ্রমের সহযোগীদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে। কমিশনের দ্রুত এ পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন পিযুষ বন্দ্যোপাধ্যায় ও রানা দাসগুপ্ত। তারা বলেছেন, ভারতকে এর চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। মানবাধিকার গ্রুপ ও বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা দাবি করছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আরও নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। ধর্মীয় সংখ্যালঘু নেতারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের একজন সিনিয়র মন্ত্রী মনে করছেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা আসলে ধর্ম নিরপেক্ষ ও উদার আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টির জন্য করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে টেলিফোনে পিটিআইকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে এর জন্য দায়ী মৌলবাদী ও জামায়াত চক্র। তারা বাংলাদেশের খারাপ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চায়। এসব হামলা সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্য করে নয়, বরং আসল টার্গেট হলো আমাদের সরকারের ক্ষতি করা এবং আমাদের দেশকে একটি মৌলবাদী দেশে পরিণত করা। আমরা কখনও তা হতে দিতে পারি না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর পদক্ষেপ।
তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, হিন্দুদের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারত যদি পদক্ষেপ নেয় তাহলে ঢাকা কি করবে। এমন প্রশ্নের উত্তরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সুসম্পর্ক। ভারত আমাদের বন্ধু। যদি ভারত বিষয়টি আমাদের কাছে তুলে ধরে আমরা আলোচনা করবো। এতে ক্ষতির কিছু নেই।

সৌদি আরবকে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না- জন ব্রেনান

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সৌদি আরবকে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেছেন সিআইএ প্রধান জন ব্রেনান। তিনি বলেছেন, ওই হামলা নিয়ে ২০০২ সালে মার্কিন কংগ্রেস যে গোপন তদন্ত করেছে তাকে প্রমাণ হিসেবে ধরে সৌদি আরবকে সহযোগী হিসেবে ধরা উচিত হবে না। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এতে বলা হয়েছে, ওই তদন্ত রিপোর্ট ২৮ পৃষ্ঠার। এটি ক্লাসিফায়েড হিসেবে রাখা হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটি এ রিপোর্ট তৈরি করেছে। তবে রিপোর্টটি প্রকাশ করা হবে কিনা সে বিষয়ে সহসাই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তদন্তের সময় সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির প্রধান ছিলেন সাবেক সিনেটর বব গ্রাহাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, ২০০১ সালে বিমান ছিনতাই করায় সহযোগিতা দিয়েছিলেন সৌদি আরবের কর্মকর্তারা। তিনি আরও বলেছেন, ২৮ পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। ওদিকে আল আরাবিয়াকে এক সাক্ষাতকারে জন ব্রেনান বলেছেন, আমি মনে করি ২৮ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টটি প্রকাশ হতে যাচ্ছে। এটা একটি ভাল বিষয়। কিন্তু ওই হামলায় সৌদি আরবকে জড়িত থাকার বিষয়ে এটাকে প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত হবে না মানুষের। ওই হামলার মাত্র এক বছরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল রিপোর্টটি। জন ব্রেনান বলেন, এটা ছিল একদম প্রাথমিক একটি রিভিউ।

একুশ বছর পর...

একুশ বছর পরে মায়ের সঙ্গে ছেলের সাক্ষাত। সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হলো আবেগঘন এক পরিবেশ। দু’জনে একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন দীর্ঘসময়। যে মা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন ২১ বছর আগে অপহরণ হওয়া তার ছেলে আর কোনদিন ফিরে আসবে, তিনি সত্যি সত্যি ছেলেকে ফিরে পেয়ে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার বুক উতলে উঠছে কান্না। ছেলে স্টিভ হার্নান্ডেজকে সর্বশেষ দেখেছিলেন তিনি ১৯৯৫ সালে। তখন স্টিভের বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। ক্যালিফোর্নিয়ার এই মায়ের নাম মারিয়া মানসিয়া (৪২)। তার বাড়ি সেখানকার র‌্যানচো কুকামোঙ্গাতে। সেই বাড়ি ভেঙেচুড়ে দেয়া হয়েছিল। সেখানে ফিরে গিয়ে দেখেন স্টিভ নিখোঁজ। তাকে অপহরণ করেছিলেন স্টিভেনের পিতা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন হাফিংটন পোস্ট। এতে বলা হয়েছে, ছেলেকে হারিয়ে মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের কাছে অপহরণের অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সেই মামলা শীতল হয়ে পড়ে। তখন থেকেই স্টিভেনের একটি ছবিই সম্বল মারিয়ার। বাকি সব ছবি নিয়ে যায় স্টিভেনের পিতা। এ মামলার তদন্তকারী কারেন ক্রেগ বলেছেন, মারিয়ার কাছে গত ২১টি বছর ওই একটি ছবিই সম্বল। এই নিয়েই তিনি বেঁচে আছেন। ফেব্রুয়ারিতে ক্রেগ ও তার সহকর্মী মিশেল ফ্যাক্সন একটি ক্লু পান। তারা জানতে পারেন স্টিভেনের বয়স এখন ২২ বছর। সে এখন তার পিতার সঙ্গে মেক্সিকোর পুয়েবলায় বসবাস করছে। এ সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ক্রেগ। তিনি বলেন, আমরা তাকে তখন বলেছি, আমরা তার পিতা নিখোঁজ হয়েছেন এটা তদন্ত করছি। এ জন্য তার ডিএনএ পরীক্ষা করা দরকার। তাতে আমাদের তদন্তে সহায়ক হবে। কোন ভীতি সৃষ্টি হোক এমনটা আমরা করতে চাই নি। আমরা আসলে নিশ্চিতও ছিলাম না যে, সেখানে আসলে কি পরিস্থিতি বিরাজমান। ফলে আমাদেরকে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। মে মাসে তার ডিএনএর সঙ্গে মারিয়ার ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয় ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসে। তবে এ বিষয়ে স্টিভেন বা মারিয়া কাউকে জানতে দেয়া হয় নি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রিপোর্ট হাতে আসে। তাতে তাদের ডিএনএ মিলে যায়।  ক্রেগ ও ফ্যাক্সন দ্রুত চলে যান মারিয়ার বাড়িতে খুশির খবর শোনাতে। এ খবর শুনে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না মারিয়া। তিনি শুরু করেন কান্না। মারিয়া বলেন, স্টিভেন এখনও বেঁচে আছে এটা তিনি বিশ্বাস করেন না। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার মা-ছেলের মিলন হয়। মারিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি চিৎকার দিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন, আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি। তার জন্য গত ২১টি বছর আমি অপেক্ষায় ছিলাম।

নিষ্ঠুরতা! মায়ের কোলেই হত্যা

শিশুটির বয়স আট মাস। তার নাম মেহেদি হাসান রোশনি। মায়ের কোলেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাকে। নিষ্ঠুরভাবে। কক্সবাজারের চকরিয়ায় এমন নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড- চালিয়েছে এক অটোরিকশা চালক ও তার সহযোগিরা। এ সময় গুরুতর আহত হয়েছেন শিশুটির মা এবং বাবা। শিশুটির বাবা মনজুর আলমের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার গারাঙ্গিয়া ইউনিয়নে। শনিবার রাত ৯টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার চকরিয়া পৌরশহরের ব্যস্ততম চিরিঙ্গা সোসাইটি বাঁশঘাটা রোডের মাথায় এ ঘটনা ঘটে। শিশুটির হতভাগ্য বাবার অভিযোগ, রোশনিকে নিয়ে স্ত্রীসহ ১৫ দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসা শেষে শনিবার রাত নয়টায় চকরিয়া পৌর বাসটার্মিনালে নামেন। সেখান থেকে তারা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে বাঁশঘাটা রোডস্থ কামাল ম্যানশনের ভাড়া বাসায় যাচ্ছিলেন। অটোরিকশাচালক বাসায় যাওয়ার সড়কে না ঢুকে তাদের সড়কের মাথায় নামিয়ে দেন। এছাড়া নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া দাবি করেন। এ সময় সিএনজি চালকের সঙ্গে তাদের ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে চালক নাছির উদ্দিনের সঙ্গে তার ভাগ্নে ফয়সালও যোগ দেয়। মামা-ভাগ্নেসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন মিলে মনজুর আলম ও তার স্ত্রীকে উপর্যুপুরি কিলঘুষি মারতে থাকেন। স্থানীয়রা জানায়, এ সময় মা তার কোলের শিশুকে কিল-ঘুষি থেকে রক্ষার জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু মায়ের কোলে থাকা আট মাস বয়সী শিশু রোশনির ছোট শরীরেরও ওই দুর্বৃত্তদের বহু কিল-ঘুষি পড়ে। এতে মারাত্মকভাবে আহত হয় শিশু রোশনি। পরে তাকে পাশের স্থানীয় জমজম হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয়রা জানায়, অটোরিকশাচালক নাছিরউদ্দিন ঘটনাস্থলের পাশে পৌরশহরের লামার চিরিঙ্গার হাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি স্থানীয় সন্ত্রাসীও। এজন্য আশপাশেরর লোকজন এ ঘটনা দেখেও এগিয়ে যেতে সাহস করেনি। চকরিয়া থানার ওসি জহিরুল ইসলাম খান জানান, খবর পেয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিশুটিকে দেখতে মনজুরের ভাড়া বাসায় যান তিনি। শিশু রোশনির খুনিদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন তিনি। নিহত শিশুর বাবা মনজুর আলম চকরিয়া পৌরশহরের সোসাইটি বাবুল শফিং কমপ্লেক্সের একজন ব্যবসায়ী। সেখানে তার একটি ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামের দোকান রয়েছে। এ কারণেই শিশু সন্তান রোশনি ও স্ত্রীকে নিয়ে শহরের বাঁশঘাটা রোডস্থ কামাল ম্যানশনের ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে কি লাভ হলো বিএনপির by কাফি কামাল

রাজনীতির মাঠে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে কি লাভ হলো বিএনপির? দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ প্রশ্নই এখন দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে। বিএনপি কতটুকু লাভবান হয়েছে সেটা তর্কসাপেক্ষ হলেও জামায়াতের লাভ নিয়ে প্রশ্ন নেই কারো। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে বিএনপির সহায়ক হয়েছিল জামায়াতের সমর্থন। ব্যস, লাভ এটুকুই। কিন্তু দিনের পর দিন বিএনপির জন্য বোঝা হয়ে উঠেছে জামায়াত। দলের সাংগঠনিক  ক্ষতি, কর্মীদের মনোবল ঘাটতি হওয়ার পাশাপাশি দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিএনপির রাজনীতি। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দলের ভাবমূর্তি। তরুণ প্র্রজন্মের কাছে অব্যাহতভাবে পৌঁছাচ্ছে ভুল বার্তা। বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল থেকে তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপে তারা এমন উপলব্ধির কথা জানিয়েছেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়ে আর কোনো লাভের উপলক্ষই দেখেন না তারা।
বিএনপির কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষাকারী দুইজন নেতা জানান, প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবন্ধক হয়ে আছে দুইটি বিষয়। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও ভবিষ্যতে সুশাসনের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে না পারা। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার সময়ও বিএনপির অস্বস্তির বিষয় ছিল এ দুটি বিষয়। অন্যদিকে গত বছর জানুয়ারিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পাস হওয়া এক প্রস্তাবে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার কথা বলা হয়েছে। নেতারা বলেন, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, জামায়াতকে দেখেই বিএনপিকে বিচার করছে কূটনীতিক মহল। ফলে বিএনপি-জামায়াত জোট কেবল নির্বাচনী জোট এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করা দিনের পর দিন কঠিন হয়ে ওঠছে বিএনপির সামনে। আর বর্তমান বাস্তবতায় কেবল জনসমর্থন ও জনপ্রিয়তা থাকলেই হয় না প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন। অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তার ‘কারাগারে কেমন ছিলাম (২০০৭-২০০৮)’ বইয়েও জামায়াত ইস্যুকে আন্তর্জাতিক সমর্থনে প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ পথচলা কতটুকু সুখের হবে? বিএনপিকে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসতে হলে যেসব শক্তিকেন্দ্রের সমর্থন প্রয়োজন, জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা থাকলে সেসব শক্তিকেন্দ্রের আনুকূল্য পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? এ ব্যাপারে সে বইয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ। তিনি লিখেছেন, ‘বিএনপি যদি দুইয়ের গ্লানি কাটিয়ে ভারসাম্যময় মধ্যপন্থি গণতন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। কোনোরকমে আসতে সক্ষম হলেও বেশিদিন তা ধরে রাখতে পারবে না।’ যুদ্ধাপরাধের তকমা পাওয়া দলটির সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির চাপ বাড়ছে ক্রমাগত। দেশি-বিদেশি শুভাকাঙক্ষীদের পক্ষ থেকে পরামর্শ আসছে জামায়াত ছেড়ে নিজস্ব শক্তিতে পথ চলার। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহলে ধর্মভিত্তিক এ দলটি নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ।
বিএনপি সিনিয়র দুই নেতা বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও উন্নয়নে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হয়। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা ও জামায়াত সংশ্লিষ্টতার কারণে সামপ্রতিক বছরগুলোতে দেশটির সঙ্গে তৈরি হয়েছে অনাস্থার পরিবেশ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি উদ্যোগ নিয়ে দেশটি সফর করেছিলেন খালেদা জিয়া। ইতিবাচক সাড়াও মিলেছিল। কিন্তু ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি যখন বাংলাদেশে আসেন তখন হরতালের ডাক দেয় জামায়াত। সেদিন হরতালে বের হলে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখিয়ে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকটি বাতিলে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে জামায়াত। যে বৈঠক বাতিলের সূত্র ধরে ভারতের কৌশলগত রোষানলে পড়ে বিএনপি। এদিকে গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন খালেদা জিয়া। কিন্তু মোদি ঢাকায় আসার আগে জামায়াতের পক্ষ থেকে ওই সফরকে স্বাগত জানানো হলেও ঢাকা ছাড়ার দিনেই বিবৃতি দিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করে। বিএনপি সিনিয়র নেতারা মনে করেন, বিএনপির ব্যাপক জনসমর্থন এবং পশ্চিমা দেশগুলো চাইলেও সরকারকে চাপে ফেলা যাচ্ছে না মূলত ভারতের কারণেই। এখানেই বিএনপির গলার কাঁটা হয়ে আছে জামায়াত। 
জামায়াত নিয়ে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যস্ত সব স্তরেই রয়েছে অস্বস্তি। বিএনপি জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা মনে করেন, জামায়াতনির্ভরতার কারণে এতদিন ক্ষতিই হয়েছে বিএনপির। আর সঙ্গে থেকে লাভ হয়েছে জামায়াতের। এমন অবস্থায় সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করা হবে আত্মঘাতী। গত বছর একটি আলোচনা সভায় খালেদা জিয়ার সামনে জোট ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম। সে সময় তাকে সমর্থন করেছেন দলটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অঘোষিত দূরত্ব তৈরি হলেও বিএনপির তরফে প্রকাশ্যে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। আপাতত রাজনীতিতে জোট না ভেঙেই ‘একলা চলো নীতি’ অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে চাইছে বিএনপি। তবে জোটের কোনো কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দণ্ড কার্যকর করা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি বিএনপি। এ নিয়ে ফেসবুকে বিএনপিকে অকৃতজ্ঞ বলে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধের বিচারে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত গোলাম আযমের ছেলে। বিএনপি এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না করলেও দারুণ ক্ষুব্ধ দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতারা অতীতের নানা ঘটনার উল্লেখ করে বলছেন, জামায়াতই অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে বারবার। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাওয়া জামায়াত রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পেরেছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের নীতির কারণে। কিন্তু স্বৈরাচার এরশাদ আমলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও অংশ নিয়েছিল জামায়াত। পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিএনপির সঙ্গে সরকারি দলের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও দ্রুততম সময়ে পল্টি দেয় দলটি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে করেছে যুগপৎ? আন্দোলন। বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আওয়ামী লীগকে কৌশলে বিতর্কিত অবস্থানে ঠেলে দিয়ে লাভবান হয়েছে জামায়াত। খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচারে গণআদালত গঠন করা হলে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। কৌশলে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব হাসিল করে নেয় জামায়াত। এ ঘটনার দায়ভার গিয়ে পড়ে বিএনপির ঘাড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের দল হয়েও বিএনপিকে মোকাবিলা করতে হয় প্রগতিশীলদের বিরোধিতা। ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াত ক্ষমতার সরাসরি অংশীদারিত্ব ও দুই জামায়াত নেতা মন্ত্রিত্ব ভোগ করেন। এ সময় জামায়াত তাদের সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক শক্তি গোছায়। অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের মন্ত্রিত্ব দেয়ায় বিএনপির গায়ে উগ্রপন্থিদের পৃষ্ঠপোষকতা ও যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায়নের কালিমা লিপ্ত হয়। আবার ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসনসহ বেশির ভাগ নেতা যখন কারাবন্দি তখন ফুরফুরে মেজাজে রাজনীতি করেছে জামায়াত। দুই বছরের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার পর গোপন শর্তযুক্ত নির্বাচন দেয় ওয়ান ইলেভেন সরকার। জামায়াতের চাপের কারণেই নিশ্চিত ভরাডুবি জেনেও নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি। যার কারণে একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে সংসদ গঠনের সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ। আর মহাজোট আমলে নির্যাতন-নিপীড়নসহ রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে বিএনপি। ওই সময় বিএনপির প্রতিটি জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচিকেও যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে প্রচারণা চালায় সরকার। এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিএনপির জনস্বার্থমূলক আন্দোলন। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিগত বছরগুলোতে পালন করা হরতালসহ নানা কর্মসূচিতে সারা দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য হয়। যার দায়ভার এসে পড়ে বিএনপির ঘাড়ে। অপপ্রচারের পাশাপাশি হাজার হাজার মামলার শিকার হয় দলটির নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে বিগত কয়েক বছরের আন্দোলন- সংগ্রামে সামনের সারিতে ছিল জামায়াতের সক্রিয় কর্মীবাহিনী। সেটার সুযোগ নিতে গিয়ে দিন দিন আত্মবিশ্বাসহীন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন বিএনপি কর্মীরা। ফলে আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে আশি-নব্বইয়ের দশকের মতো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে না বিএনপি। আবার যে ভোটের রাজনীতি বিবেচনায় জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল বিএনপি সেখানে দেখা গেছে উল্টোচিত্র। বর্তমান সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি প্রার্থীদের সমর্থন করেনি জামায়াত। বরং বেশিরভাগ এলাকায় সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষেই মৌন সমর্থন দিয়ে গেছে দলটি। যার ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপির চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থীরা হারলেও সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের শতাধিক ভাইস চেয়ারম্যান পদ নিশ্চিত করেছে জামায়াত। এ সময় জামায়াতের বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগও উঠে। গত বছরের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরেও দুলের মধ্যে ছিল টানাপড়েন।
ভোটের রাজনীতি বিবেচনায় জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করলেও সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির কারণে সক্রিয় কর্মীবাহিনীই ছিল জামায়াতের শক্তি। অন্যদিকে বিএনপির শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। জোটের রাজনীতি করতে গিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে কিছু আসনে জামায়াতের ৪-৫ ভাগ ভোটের সমর্থন পেয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতকে ছাড় দিতে হয়েছে ২০-৪০ ভাগ সমর্থনের বেশকিছু আসন। যেসব আসনে জামায়াত বিএনপিকে ভোটে ছাড় দিয়েছিল সেখানে রাজনীতিতে ছাড় দেয়নি মোটেই। উল্টো বিএনপির সমর্থন নিয়ে শক্তিশালী করেছে নিজেদের অবস্থান। অন্যদিকে যেখানে জামায়াতকে ছাড় দিয়েছে সেখানে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে দেয়নি জামায়াত। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পাবনা, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, খুলনা, বগুড়া, সিলেট, রংপুরসহ অনেক জেলায় এমন সাংগঠনিক ক্ষতির শিকার হয়েছে বিএনপি। বিএনপির ঘাঁটি খ্যাত বগুড়ায় ভাগ বসিয়েছে জামায়াত। চট্টগ্রামের একটি আসনে জামায়াতের সঙ্গে ঝামেলা বেঁধেছিল তৎকালীন বিএনপি নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের। বিএনপি নেতৃত্ব সেদিন জামায়াতের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে আসনটিতে দলের রাজনীতিকে ঠেলে দেয় বিপর্যয়ের পথে। পরে জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে খ্যাত কর্নেল (অব.) অলি দল ছেড়ে গিয়ে তৎকালে বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনেন তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। এভাবেই জামায়াতকে জোটে নিয়ে বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক সক্ষমতা, সাংগঠনিক কাঠামো ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়েছে দিন দিন। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের কারণে যুদ্ধাপরাধীদের লালন ও জামায়াতকে সুসংগঠিত হয়ে ওঠার দায়ভার বিএনপির কাঁধে এসে পড়েছে। তাই বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক ডানপন্থি ও উদারবাদীদের দল হওয়া সত্ত্বেও কিছু কট্টর ইসলামপন্থি নেতার কারণে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচারণায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, জামায়াত তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। তারা সুঁই হয়ে ঢুকেছে- ফাল হয়ে বেরুচ্ছে। এছাড়া, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি জোট গঠন নিয়ে কেবল প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক মহল থেকেই নয়, ইসলামপন্থি বলে পরিচিত একাধিক দলের সমর্থনও গেছে বিএনপির বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে প্রগতিশীল অনেক দল ও নেতা বিএনপির আন্দোলনের দাবির প্রতি ঐকমত্য পোষণ করেন। কিন্তু জামায়াতের কারণে তারা যোগ দিচ্ছেন না বিএনপির প্ল্যাটফরমে। এত বিপুল ক্ষতির পরও জামায়াত ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন এখন বিএনপির দলীয় মহলেই।