Tuesday, July 8, 2014

দুবাইয়ে এবার জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত শহর!

দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ রশিদ আল–মাখতুম
তাপমাত্রা–নিয়ন্ত্রিত নগরের নকশা দেখছেন
বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য নির্মাণ করে ইতিমধ্যে সবার নজর কেড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মরুশহর দুবাই। বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন রয়েছে এই শহরে। নৌকার পালের আকৃতির দৃষ্টিনন্দন ভবন আর সাগরে তালগাছ আকৃতির সুদৃশ্য স্থাপনায় বিলাসবহুল হোটেল করে পর্যটকদের মন জয় করেছে শহরটি। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিশ্বের প্রথম জলবায়ুনিয়ন্ত্রিত শহর! আর সেই শহরের ভেতরে থাকবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপণিবিতান। খবর ইনডিপেন্ডেন্টের। বিশ্বের প্রথম ‘তাপমাত্রানিয়ন্ত্রিত, পথচারীদের নগর’-এ থাকবে সবচেয়ে বড় বিপণিবিতানের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় থিম পার্ক, শতাধিক হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্ট। এর কেনাকাটার জায়গা হবে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের মতো। শহরের ভেতরের সব স্থাপনাকে সংযুক্ত করবে সাড়ে চার মাইল দীর্ঘ একটি সড়ক। আর পুরো শহরটি স্থাপিত হবে চার কোটি ৮০ লাখ বর্গফুট জায়গা নিয়ে।
ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাখতুম বিশাল এই প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছি, দুবাইকে আধুনিক সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও পর্যটকদের শহর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আমরা বদ্ধপরিকর।’ আল-মাখতুম বলেন, ‘পর্যটন আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আমরা ইউএইকে সারা বছর পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়তে চাই। এ কারণে আমরা গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রানিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরির কাজ শুরু করব।’ যদিও জলবায়ুনিয়ন্ত্রিত এই শহর নির্মাণের ব্যয়, কাজ শুরু, শেষ করার সময়সহ অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানানো হয়নি। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, বিশ্বের প্রথম জলাবায়ুনিয়ন্ত্রিত এই শহর চালু হলে বছর ১৮ কোটি পর্যটক ওই শহরে যাবেন। শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাখতুমের মালিকানাধীন নির্মাণপ্রতিষ্ঠান এই শহর তৈরিতে মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার কথা।

প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা কংগ্রেসেরই পাওয়া উচিত

সোনিয়া গান্ধী
কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, বর্তমান লোকসভায় কংগ্রেস এককভাবে সর্বোচ্চসংখ্যক আসন পেয়েছে। তাই প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা এবং বিরোধীদলীয় প্রধানের পদ কংগ্রেসেরই পাওয়া উচিত। খবর এনডিটিভির। গতকাল লোকসভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সোনিয়া এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘লোকসভায় এককভাবে আমাদের চেয়ে কোনো দল বেশি আসন পায়নি। নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক জোটও আছে আমাদের। তাই প্রধান বিরোধী দলের প্রধানের পদটি পাওয়ার অধিকার আমাদেরই।’ সরকার কংগ্রেসকে ওই পদ দিতে না চাইলে কী পদক্ষেপ নেবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সোনিয়া বলেন, ‘আমরা দেখছি, কী ঘটে’।
তবে তিনি বলেন, এই ইস্যুতে তাঁর দল এখনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ‘সিদ্ধান্ত নেয়নি’। তবে এর কিছুক্ষণ আগেই কংগ্রেস নেতা ও লোকসভায় দলটির জ্যেষ্ঠ সদস্য কমলনাথ টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদার ইস্যুতে কংগ্রেস আদালতে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, লোকসভার স্পিকার নির্বাচন করা হয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি থেকে...যখন কোনো ইস্যু নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হবে, তখন সিদ্ধান্ত বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষেই যাবে।’ গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে ৪৪টি আসন পেয়েছে। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে ন্যূনতম এক-দশমাংশ আসন পাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

গুহায় মুদ্রা

২৬টি অমূল্য ধাতব মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে
রোমান ও প্রস্তরযুগের ২৬টি অমূল্য ধাতব মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডার্বিশায়ারের ডোভেডেলের একটি গুহায় দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো মুদ্রাগুলো হঠাৎ এক ব্যক্তির চোখে পড়ে। তিনি সেখানে চারটি মুদ্রা পান। এরপরই সেখানে পুরোদমে খননকাজ শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুই সভ্যতার মুদ্রা একই স্থান থেকে পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ট্রাস্টের প্রত্নতাত্ত্বিক র্যাচেল হল বলেন, মুদ্রাগুলো দেখে এগুলোর মালিকদের বিত্তবৈভব ও ক্ষমতা কেমন ছিল, তা বোঝা যায়। বিবিসি

কেন সব নিষিদ্ধপল্লিকেই ‘‘রেড লাইট এরিয়া’’ বলা হয়?

‘‘রেড লাইট’’ বা লাল আলোর সঙ্গে দেহব্যবসার কী সম্পর্ক? কোথা থেকে এল এই ‘‘রে়ড লাইট’’ শব্দটি? কীভাবেই বা তা জুড়ে গেল দেহব্যবসার সঙ্গে?
ঠিক কীভাবে লাল আলোর সঙ্গে দেহব্যবসা জুড়ল, তার বিবিধ ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়ে থাকে, হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে লাল বাতির সঙ্গে যৌনকর্মীদের সম্পর্ক রয়েছে। ‘লাল’ আলোর সঙ্গে যৌনতা সম্পৃক্ত বলে মনে করা হত আমেরিকা এবং ইউরোপের একাংশে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের বহু যৌনপল্লিতে নীল আলো ব্যবহার করা হত। নীল আলোর অর্থ ছিল, সেই সব যৌনপল্লিতে একমাত্র উচ্চপদাধিকারীদের প্রবেশাধিকার রয়েছে। লাল আলো যেখানে জ্বালানো হত, সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল বাকিদের।
আর একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, চিনের যৌনপল্লিগুলিতে লাল লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখার রেওয়াজ ছিল। সেই থেকেই লালের সঙ্গে যৌনপল্লির যোগ। তৃতীয় ব্যাখ্যাটি বেশ মজাদার। বলা হয়, একসময়ে ইউরোপের বেশিরভাগ যৌনপল্লিই ছিল রেললাইনের আশপাশের অঞ্চলে। রেলকর্মীরা সে সব জায়গায় যেতেন। কিন্তু যৌনপল্লিতে ঢোকার আগে তাঁরা তাঁদের লাল লণ্ঠনটি বাইরে রেখে যেতেন, যাতে যে কোনও প্রয়োজনে বোঝা যায়, তাঁরা কোথায় রয়েছেন।
চতুর্থ ব্যাখ্যায় এর যোগ পাওয়া যায় জাপানের সঙ্গে। ‘‘রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট’’-এর অন্যতম জাপানি অনুবাদ হল ‘‘আকাসেন’’। যার আক্ষরিক অর্থ ‘‘লাল দাগ’’। বৈধ যৌনপল্লিগুলির এলাকা বোঝাতে জাপানি পুলিশ লাল দাগ দিয়ে সেগুলির সীমানা চিহ্নিত করত। বাকি এলাকা চিহ্নিত করা হত নীল কালি দিয়ে। আবার, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে যে পৃথিবীবিখ্যাত যৌনপল্লি রয়েছে, সেখানেও প্রধান রং লাল। পঞ্চম ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই এলাকা থেকেই ‘রেড লাইট’ নামটি ছড়িয়েছে। শুধু নেদারল্যান্ডসই নয়, ইউরোপের বহু দেশেই দেহব্যবসা বৈধ করা হয়েছে। এই এলাকাগুলি ফ্লুরোসেন্ট লাল আলো দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। ষষ্ঠ ব্যাখ্যা বলে, এই সব এলাকা থেকেই ‘‘রেড লাইট এরিয়া’’ নামটি এসেছে।

গুঞ্জন শুনি -খানদের বিপরীতে এশা গুপ্তা

বলিউডি খানদের দখল করতে কার না ইচ্ছে হয়। কেউ যখনই বলিউডে নায়িকা হিসেবে নাম লেখান, খানজাদাদের সঙ্গে অভিনয় করার স্বপ্নে বিভোর থাকে। এই স্বপ্ন কারও প্রকাশ পায় কারোটা গোপনই থেকে যায়। হালে বলিউড নায়িকা হিসেবে এশা গুপ্তা নিজেকে ভালোভাবেই মেলে ধরেছেন। স্বকীয় অভিনয়শৈলীর দ্বারা সাইফ আলী খানের বিপরীতে অভিনয় করে ‘হামশকলস’কে হিট ছবির তালিকায় তুলে এনেছেন। এবার তার ইচ্ছে অন্য খানদের বিপরীতে অভিনয় করা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমন কথাই বলেন এশা গুপ্তা। শাহরুখ খান, সালমান কিংবা আমির খানদের দখল করা যে কতটা কঠিন সেটা কি বোঝেন না তিনি? এমন প্রশ্ন করে বেড়াচ্ছেন অনেকে। তবে নায়িকা হিসেবে শুধু খানজাদারা কেন, সব নায়কের বিপরীতেই অভিনয় করার দক্ষতা রয়েছে সেটা এবারই প্রমাণ করেছেন তিনি। তাহলে এশার এমন ইচ্ছে কি পূরণ করবেন সালমান, শাহরুখ কিংবা আমিররা? গুঞ্জন রয়েছে, এরই মধ্যে বেশ কিছু ছবিতে অভিনয়ের ডাক পেয়েছেন এশা। তার মধ্যে নাকি একটিতে শাহরুখের বিপরীতে অভিনয় করার কথা রয়েছে তার।

এই কালসাপের জন্মদাতা কারা? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

লন্ডনের একটি আলোচনা সভায় গিয়েছিলাম। যদিও আলোচনাটি একাডেমিক, কিন্তু আলোচ্য বিষয়টি ছিল রাজনৈতিক। আলোচক ছিলেন অনেকেই। তাতে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে অধ্যয়ন ও গবেষণা কাজে রত কয়েকজন ভারতীয় এবং পাকিস্তানিও ছিলেন। আলোচনা হচ্ছিল অনেক বিষয় নিয়েই। শেষ পর্যন্ত তা গড়াল পাকিস্তানে। প্রশ্ন হল, জঙ্গি মৌলবাদের কব্জা থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান টিকে থাকতে পারবে কিনা। নাকি গৃহযুদ্ধে ইরাকের মতো বিভক্ত হয়ে যাওয়ার আশংকার মুখে পড়বে? যদি তা হয় এবং পাকিস্তান তার বর্তমান অস্তিত্ব হারায়, তাহলে উপমহাদেশে শান্তি ফিরবে কি? ভারত অস্ত্রসজ্জা বন্ধ করে জনগণের দারিদ্র্য মোচনকে অগ্রাধিকার দেবে কি এবং উপমহাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা কি নিরাপদ হবে?
এই আলোচনাটি হয়তো একেবারে পাকিস্তানকেন্দ্রিক হয়ে পড়ত না যদি সভায় এক আলোচক আমেরিকার সাবেক ফার্স্টলেডি ও বিদেশমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সম্প্রতি প্রকাশিত আত্মজীবনী লিভিং হিস্ট্রি বইটি সঙ্গে নিয়ে না আসতেন এবং পাকিস্তান সম্পর্কে হিলারির একটি মন্তব্য তার আলোচনায় তুলে না ধরতেন। সম্প্রতি এনডিটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, নিজের ঘরে কালসাপ পুষছে পাকিস্তান। সেই বিষাক্ত সাপ একদিন ফণা তুলে পাকিস্তানকেই ছোবল মারবে। বিষাক্ত ছোবলের আঘাত থেকে রক্ষা পাবে না পাকিস্তান এবং তার আশপাশের দেশও।
এই বিষাক্ত সাপটির পরিচয় হিলারি তার বক্তব্যে তুলে ধরেছেন। বলেছেন, আল কায়দা ও তালেবান জঙ্গিগোষ্ঠীর আস্তানা কোথায় সেটা পাকিস্তান জানে না এমন নয়, কিন্তু জেনেশুনেও তারা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এর পরিণতি ভালো নয়। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থেকে পাকিস্তানকে অবশ্যই মুক্ত হতে হবে।
লন্ডনের আলোচনা সভায় অনেকেই হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করলেন। কিন্তু তাদের যুক্তিতর্ক শুনতে শুনতে আমার মনে হল, ভবিষ্যতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন যিনি, সেই হিলারি তার বক্তব্যে আমেরিকার বর্তমান এশীয় নীতির উদ্দেশ্যটাই প্রকারান্তরে বলে ফেলেছেন। অর্থাৎ তাদের নতুন এশীয় নীতিতে পাকিস্তানকে আর ততটা তাদের দরকার নেই।
কারণ, ভারতকে তারা পক্ষপুটে পাবেন মনে করছেন। এজন্যই পাকিস্তানে ক্রমাগত ড্রোন হামলা চালিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে আমেরিকার দ্বিধা নেই। একদিকে সন্ত্রাস দমনের নামে আমেরিকায় এই একতরফা হামলা, অন্যদিকে ভারতকেও হুশিয়ার করে দেয়া হচ্ছে যে, পাকিস্তানের জঙ্গিরা ভারতের জন্যও বিপদের কারণ হবে।
আগে ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে ভারত জুজুর ভয় দেখিয়ে কাছে টানতে চেয়েছিল; এখন ভারতকে পাকিস্তান জুজুর ভয় দেখিয়ে কোলে টানতে চাইছে। অর্থাৎ উপমহাদেশে আমেরিকার সেই পুরনো বিভেদ নীতির খেলা। হিলারি ক্লিনটন উপমহাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য এখন পাকিস্তানের কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে সেই পুরনো খেলা খেলতে চাইছেন। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের নতুন মোদি সরকার সেই খেলার ফাঁদে পা দেবে কিনা সেটা এখনও দেখার রয়েছে।
লন্ডনের আলোচনা সভায় একজন ভারতীয় ছাত্র যথার্থই বলেছেন, একসময় ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে পাকিস্তান সৃষ্টি যেমন ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের খেলা; আজও তেমনি তাদের চীনবিরোধী স্ট্র্যাটেজিতে ভারতকে কোলে টানার জন্য পাকিস্তানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করা মার্কিন নীতির লক্ষ্য। বর্তমানে পাকিস্তান ধ্বংস হলে বা আরও বিভক্ত হলে ভারতের কোনো লাভ নেই। বরং পাকিস্তানে আশ্রিত জঙ্গিরা উপমহাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে এবং ভারতকে দৃশ্যমান শত্র“র বদলে এক অদৃশ্য শত্র“র সন্ধানে এবং তাকে দমনে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে হবে।
এই বক্তা তার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যতদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব ছিল, ততদিন আমেরিকার একটি দৃশ্যমান শত্র“ ছিল এবং তাদের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ছিল। এই দৃশ্যমান শত্র“র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমেরিকার পক্ষে সহজ ছিল এবং সেই যুদ্ধ চালিয়ে সে জয়ীও হয়েছে। কিন্তু আজ ইসলামী সন্ত্রাসীরা কোনো দৃশ্যমান শত্র“ নয় এবং তাদের কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় অবস্থানও নেই। এই শত্র“ দমনের জন্য আমেরিকাকে এখন কানা দৈত্যের মতো যেখানে সেখানে যুদ্ধ করতে হচ্ছে কিন্তু জয়ী হতে পারছে না। আমেরিকার জনগণ এখন যুদ্ধক্লান্ত, তারা আর যুদ্ধ চায় না। তাদের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। প্রেসিডেন্ট ওবামার জনপ্রিয়তা এখন ফুটো বেলুনের মতো।
এই বক্তার মতে, মোদির ভারতও দূরদর্শী হলে পাকিস্তানের ধ্বংস কামনা করে আমেরিকার মতো অদৃশ্য শত্র“র বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধের ফাঁদে পা দেবে না। মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবেন, দারিদ্র্য মোচন করবেন এটাই সবাই আশা করে। আর তা যদি করতে হয়, তাহলে মোদি সরকারকে যুদ্ধ খাতে নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের খাতে অধিক অর্থ বরাদ্দ করতে হবে এবং উন্নয়নের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় নিরবচ্ছিন্ন শান্তি, আঞ্চলিক মৈত্রী ও সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
এই প্রয়োজন ক্ষমতায় থাকার শেষ দিকে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী উপলব্ধি করেছিলেন। সেজন্যই তিনি তৎকালীন দুই সুপার পাওয়ারেরই প্রভাবমুক্ত ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় জোন অব পিস গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যদি তার দেশকে একটি দারিদ্র্যমুক্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় সংঘাতমুক্ত একটি জোন অব পিস (শান্তির এলাকা) গড়ে তোলার ওপরই তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচনা সভায় ভারতীয় বক্তা এই বলে তার বক্তব্য শেষ করেছিলেন যে, ভারতের গণতন্ত্রকে যদি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো একটি গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের সহযোগিতাও ভারতের প্রয়োজন হবে। এজন্যই সন্ত্রাস দমনের জন্য পাকিস্তানকে ধ্বংস করা নয়, পাকিস্তান যাতে জঙ্গিবাদ ও সেনা-নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাতে সহযোগিতা দান ভারতের অবশ্য কর্তব্য। একটি গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের সহযোগিতা নিয়েই উপমহাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রাম করা সম্ভব। পাকিস্তানকে ধ্বংস করে সন্ত্রাস দমন করা যাবে না; বরং সন্ত্রাস সারা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।
আলোচনা সভা শেষে বাসায় ফিরে হিলারি ক্লিনটনের আত্মজীবনীমূলক বই লিভিং হিস্ট্রি কেনার জন্য অর্ডার দিয়েছি। এই আমেরিকান নেত্রী নিজেকে লিভিং হিস্ট্রি বা জীবন্ত ইতিহাস বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তার বইটির যেটুকু অংশ (সংবাদপত্রে প্রকাশিত) পড়েছি, তাতে মনে হয় বইটি সত্যের অপলাপ ও তত্ত্বের বিকৃতিতে ভর্তি। এটা তিনি স্বজ্ঞানে ও সচেতনভাবে করেছেন কিনা আমি জানি না।
হিলারি অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান তার ঘরে জঙ্গি কালসাপ পুষছে এবং দেশটির উচিত সেনাবাহিনীর কবলমুক্ত হওয়া। হিলারি যে টিভি সাক্ষাৎকারে একথাগুলো বলেছেন, সেই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কোনো সাংবাদিক তাকে দুটি প্রশ্ন কেন করেননি তা ভেবে বিস্মিত হই। প্রথম প্রশ্নটি হল, জঙ্গিবাদের যে কালসাপ পাকিস্তান পুষছে, তার সৃষ্টিকর্তা কে এবং কারা সেই কালসাপ পাকিস্তানের গলায় জোর করে পরিয়ে দিয়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হলেও ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশটিতে গণতন্ত্র ধ্বংস করে সামরিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল কারা? আমেরিকা কি একই কাজ আলেন্দের চিলিতেও করেনি?
একথা তো আজ ইতিহাসের সত্য, পাকিস্তানের নাজিমউদ্দীন সরকার আমেরিকার সামরিক চুক্তি- বাগদাদ জোটে যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় আমেরিকাই দেশটির সেনাপতি আইয়ুব খানকে কব্জা করে তার সাহায্যে আধাসামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নাজিমউদ্দীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে এনে অবৈধভাবে শাসন ক্ষমতায় বসায়। তারপর একে একে সিভিল গভর্নমেন্টগুলোকে বন্দুকের সাহায্যে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনীকে (১৯৫৮ অক্টোবর সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার সমর্থনে ও সাহায্যে) ক্ষমতায় এনে বসানো হয়। শুরু হয় পাকিস্তানে গণতন্ত্রের উচ্ছেদ ও ফৌজি শাসন।
প্রতিবেশী পাকিস্তানে গণতন্ত্রের উচ্ছেদে তখন সঙ্গতভাবেই শংকিত হয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহেরু। তিনি পাকিস্তানে সামরিক শাসনকে বাধাদানের উদ্দেশ্যে এই শাসনকে আখ্যা দিয়েছিলেন Naked military dictatorship বা নগ্ন সামরিক স্বেচ্ছাতন্ত্র। ভারত তখন এই নগ্ন ফৌজি শাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিলে পাকিস্তানে ওই শাসন স্থায়ী হতে পারত না। কিন্তু নেহেরুর মনোভাব টের পেয়েই দিল্লিতে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার কাছে ছুটে যান এবং আশ্বাস দেন, পাকিস্তানে একটি মিলিটারি সরকারের সঙ্গেই ভারত তার নিজের শর্তে কাশ্মীর বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে পারবে। নেহেরু এই প্রতারণার ফাঁদে পা দেন এবং পরদিনই নিজের বক্তব্য পাল্টে সামরিক অভ্যুত্থানকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে আখ্যা দেন এবং পরে কাশ্মীর সমস্যা মীমাংসার জন্য পাকিস্তানের মারীতে ফৌজি নায়ক আইয়ুবের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতে রাজি হন। নেহেরুর এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত এখনও ভারত করছে।
কথায় বলে সাপ হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো। পাকিস্তান সম্পর্কে আমেরিকায় হিলারিদের আজ এই ভূমিকা। গণতন্ত্র ধ্বংস করে পাকিস্তানে সামরিক শাসনের অভিশাপ চাপিয়ে দিয়ে তাকে বেশুমার অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিয়ে মনস্টারে পরিণত করার পর হিলারি ক্লিনটন নির্লজ্জ ভাষায় পাকিস্তানের জনগণকে হিতোপদেশ দিচ্ছেন, তাদের উচিত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া। ক্লিনটন-দম্পতির নৈতিক চরিত্রের কোনো বালাই নেই। তাদের মুখেই এই ধরনের কথা সাজে।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন, আজ যে আফগানিস্তান, ইরাকসহ পাকিস্তানে আল কায়দা ও তালেবান জঙ্গি গোষ্ঠীর এত উৎপাত তার জন্য দায়ী কারা? এই কালসাপের জন্মদাতা কি আমেরিকা নয়? কাবুলে একটি সেকুলার ও সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের জন্যই কি মার্কিন অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণে আল কায়দা ও তালেবানের জন্ম নয়? পাকিস্তানে এই তালেবানদের ঘাঁটি গাড়তে দিতে পাকিস্তানকে কারা বাধ্য করেছিল? সে কি আমেরিকা নয়? এই জঙ্গি কালসাপ লালন ও পোষণের জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে কারা দায়িত্ব দিয়ে তথাকথিত আফগান মুজাহিদে পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলগুলো ভরে ফেলেছিল? সে কি আমেরিকা নয়? এখন সেই জঙ্গিদের দমনের নামে বর্বর ড্রোন হামলায় শয়ে শয়ে নিরীহ পাকিস্তানি নর-নারী, শিশু নির্বিচার হত্যা করে চলেছে কারা? সেও কি আমেরিকা নয়?
আসলে যে বিষধর কালসাপ আজ পাকিস্তানের গলায়, তার জন্মদাতা এবং বহুদিনের প্রতিপালক আমেরিকা। এই কালসাপের দংশনে আজ শুধু পাকিস্তান নয়, আমেরিকাও জর্জরিত। আমেরিকা তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত শুরু করেছে মাত্র।
লন্ডন ৬ জুলাই রোববার, ২০১৪

সুস্থ কর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় অটোমেশন by ড. মোঃ আবদুর রউফ

কর সংস্কৃতি হল যথাযথভাবে কর প্রদানের জন্য জনগণের প্রবণতা। কর হল জনগণের কাছে সরকারের প্রাপ্য অর্থ। জনগণ কর্তৃক পণ্য ও সেবার সরবরাহ, জনগণের আয়, জনগণের সম্পদ ইত্যাদির ওপর কর আদায় করা হয়। অর্থাৎ জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত সরবরাহ, জনগণের আয়, জনগণের সম্পদ ইত্যাদির একটা অংশ জনগণের নিজস্ব নয়, তা হল সরকারের। সরবরাহ, আয়, সম্পদ ইত্যাদি থেকে সরকারের প্রাপ্য কর সঠিকভাবে পরিশোধ করার প্রবণতাকে সুস্থ কর সংস্কৃতি বলে। আমাদের দেশে সুস্থ কর সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এখানে জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। তাই আমাদের দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশ কম, যা বর্তমানে ১২.২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও এ কর-জিডিপি হার কম, উন্নত দেশের তুলনায় কম তো বটেই। সুস্থ কর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাত সন্তোষজনক হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে সুস্থ কর সংস্কৃতি বিকশিত না হওয়ার বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হল, কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ এবং ফাঁকি প্রদান পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা না থাকা। কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ পেলে অনেকেই সে সুযোগ গ্রহণ করে। কর ব্যবস্থাপনায় বর্তমানের ম্যানুয়্যাল পদ্ধতির হিসাব সংরক্ষণের কারণে যেহেতু কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থেকে যায়, সেহেতু অনেকেই সে সুযোগ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় কর ফাঁকি দেয়ার পর অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থায় নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা নেই। শাস্তির এ অনিশ্চয়তাও অনেককে কর ফাঁকি প্রদানে উৎসাহিত করে। তাই কর ফাঁকি প্রদানের সুযোগ বন্ধ করা সম্ভব হলে এবং ফাঁকি প্রদান পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে, ফাঁকি প্রদান নিরুৎসাহিত হবে, মানুষের মধ্যে সুস্থ কর সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
অটোমেশন কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ বহুলাংশে বন্ধ করে দেয়। ম্যানুয়্যাল পদ্ধতিতে করযোগ্য সব কর্মকাণ্ড থেকে কর আদায় করা সহজসাধ্য হয় না। কিন্তু অটোমেটেড পদ্ধতিতে তা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। কারণ অটোমেটেড পদ্ধতিতে তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ সহজ হয়। বহু তথ্য একত্রে এবং অল্প সময়ের মধ্যে হাতের নাগালে পাওয়া যায়। যেহেতু করদাতাদের তথ্য কর কর্মকর্তাদের হাতের নাগালে থাকে, তাই তাদের মধ্যে তথ্য গোপন করার প্রবণতা থাকে না। অটোমেশন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেয় ব্যাপকতা এবং গতি। কর ফাঁকি প্রদান পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত শাস্তির ব্যবস্থা করতে অটোমেশন অনেকটাই সক্ষম। অটোমেটেড ব্যবস্থায় প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা যায়। বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত প্রতিপরীক্ষা (Cross check) করা যায়। কর ফাঁকি সহজে শনাক্ত করা যায়। তাই কর ফাঁকি প্রদানকারীকে সদা শাস্তির ভয় তাড়া করে ফিরে। তাই অটোমেটেড কর ব্যবস্থা সুস্থ কর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক।
অটোমেশনের দিক থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেশ পিছিয়ে ছিল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা বাদ দিয়ে সরকারের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে তুলনা করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অটোমেশনের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য নয়। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১১ সালে ডিজিটাল এনবিআর গড়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ২০১১ সালের বাজেটের সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা সরকার অনুমোদন করে। এ পরিকল্পনার একটি অংশ ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ডিজিটাইজড করা। এজন্য একটি ডিজিটাল কোর কমিটি গঠন করা হয়। ডিজিটাল কোর কমিটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সামগ্রিক অটোমেশনের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে। নানা কারণে টেন্ডারটি বাতিল হয়ে যায়। অতঃপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুবিভাগগুলো পৃথকভাবে অটোমেশন কার্যক্রম শুরু করে। কার্যত শুল্ক বিভাগের অটোমেশন শুরু হয়েছে অনেক আগ থেকেই। প্রথমত ১৯৯৪ সালে ঢাকা কাস্টম হাউস এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ASYCUDA ২.৭ চালু করা হয়। অতঃপর ২০০২ সালে ওই সিস্টেমের উন্নত সংস্করণ ASYCUDA++ ঢাকা কাস্টম হাউস, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস, আইসিডি কমলাপুর এবং বেনাপোল কাস্টম হাউসে চালু করা হয়। ওই সিস্টেমে ট্যারিফ ম্যানেজমেন্টের জন্য ইউনিফর্ম ফাইল চালু করা হয়।
বর্তমানে ASYCUDA WORLD প্রচলনের কাজ চলছে। এ সিস্টেম হল ইন্টারনেট বেজড। ঢাকা, চট্টগ্রাম, আইসিডি এবং বেনাপোল কাস্টম হাউসসহ ১০টি ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশনে ASYCUDA WORLD সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। এই সিস্টেমে ম্যানিফেস্ট এবং বিল-অব-এন্ট্রির সংযোগ তৈরি করা হচ্ছে। তাছাড়া ম্যানিফেস্ট, এক্সিট নোট, ডেসপাস নোট, পেমেন্ট, এলসি, ইএক্সপি ইত্যাদি অন-লাইন করা হচ্ছে। ব্যাংক, বিএসটিআই, ইপিবি, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দফতরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পণ্য শুল্কায়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অধিকাংশই এখন অটোমেটেড। আমরা এখন উন্নত দেশের বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার স্বপ্ন দেখছি। সেটা এমন ব্যবস্থা, যেখানে রফতানি বন্দরে পণ্য জাহাজে বোঝাই হওয়ার সময়ই আমাদের আমদানি বন্দরে আমরা সব তথ্য পেয়ে যাব এবং অগ্রিম শুল্কায়ন সম্পন্ন করা যাবে। পণ্য আগমনের পর অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবে না। দ্রুত পণ্য খালাস হয়ে যাবে। পণ্যের কায়িক পরীক্ষা (physical examination) করা হবে খুব কম। প্রয়োজনে পণ্যের খালাসোত্তর নিরীক্ষার (post-clearance audit) মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি শনাক্ত করা হবে।
আয়কর অনুবিভাগও অটোমেশনে বেশ এগিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে ই-টিআইএন ব্যবস্থা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। Tax Payers Idendtification Number (TIN)-এর ক্ষেত্রে ১০ ডিজিটের ডাটাবেইজে ভুল-ভ্রান্তি ছিল। তা এখন প্রায় সমাধানের পথে। টিআইএন ডাটাবেইজ পরিষ্কার করা হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেইজের সঙ্গে টিআইএন ডাটাবেইজ সংযুক্ত করা হয়েছে। ই-পেমেন্টের মাধ্যমে আয়কর পরিশোধ করার ব্যবস্থাও ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই নম্বরে একাধিক টিআইএন ইস্যুর ফলে টিআইএন ডাটাবেইজের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো। নতুন ব্যবস্থায় ই-টিআইএন ইস্যু করা হচ্ছে। ই-টিআইএন ইস্যু সম্পন্ন হলে করদাতার সংখ্যা ৫০ (পঞ্চাশ) লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
মূসক অনুবিভাগও পিছিয়ে নেই। মূসক ব্যবস্থায় সংস্কারের অংশ হিসেবে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। এ আইন বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় সামগ্রিক মূসক ব্যবস্থাপনার অটোমেশন করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ অটোমেডেট ভ্যাট ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অটোমেডেট ভ্যাট ব্যবস্থায় ভ্যাটের আওতায় রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট পরিশোধ, দাখিলপত্র পেশ, অডিট ইত্যাদি সব কাজ অটোমেডেট পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হবে। ভ্যাটদাতা এবং ভ্যাট কর্মকর্তাদের কায়িক আন্তঃক্রিয়া (physical interaction) হবে কম। ওয়েববেইজড সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভ্যাট ব্যবস্থার প্রায় সব কাজ সম্পন্ন করা হবে।
পরিপূর্ণ অটোমেডেট পরিবেশে সুস্থ কর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করা যায়। কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ হ্রাস পেলে এবং কর ফাঁকি প্রদান পরবর্তী সময়ে শাস্তির নিশ্চয়তা থাকলে সুস্থ কর সংস্কৃতি গড়ে উঠবে অবশ্যই। তাই, কার্যকর অটোমেশনের ওপর জোর দেয়া খুবই জরুরি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অটোমেশন এবং সুস্থ কর সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক বলা যায়। সুস্থ কর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাতের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। অটোমেশন এখন যুগের দাবি। অটোমেশনের মাধ্যমে বর্তমানে নানা ধরনের সেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের লেনদেন এখন আমরা আমাদের ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনে ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারি। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এখনও আমাদের করদাতাদের ই-মেইল বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি পাঠাতে পারেনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আর পিছিয়ে থাকার অবকাশ নেই। আশা করা যায় বর্তমান কার্যক্রমগুলো অব্যাহত থকলে আর দু-এক বছরের মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, দেশে আধুনিক ও আদর্শ কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা হবে রাজস্ববান্ধব (revenue-friendly) এবং ব্যবসা-বান্ধব (business-friendly)।
ড. মোঃ আবদুর রউফ : পরিচালক, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড roufcus@yahoo.com

ভোল পাল্টালেন নূর হোসেন by কৃষ্ণকুমার দাস

ভোল পাল্টালেন নূর হোসেন। ১৪ দিন আগে জেলহাজতে যাওয়ার সময় সংবাদমাধ্যমকে যা বলেছিলেন সোমবার ঠিক তার উল্টো বক্তব্য রাখলেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হেসেন। বেনাপোল সীমান্ত থেকে ৩৫ কিমি. দূরে বারাসত কোর্টে এদিন হাজির করার সময় স্বপ্রণোদিত হয়ে নূর চিৎকার করে বলেন, ‘আমি কোনো নেতার নাম বলিনি। আমাকে কোনো নেতা ভারতে পাঠায়নি। আমি নির্দোষ, আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।’
২৩ জুন এই আদালতেই প্রিজন ভ্যানে উঠে দমদম জেলে যাওয়ার সময় নূর হোসেন বলেছিলেন, ‘নেতার নির্দেশে ভারতে আÍগোপন করতে এসেছি। কে সেই নেতা তা আপনারাই খোঁজ নিয়ে দেখুন।’ এদিন ফেরত পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের কোনো শুনানি না হওয়ায় নূর হোসেনের নারায়ণগঞ্জের মামলায় ঢাকা ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পুরো বিশ বাঁও জলে চলে গেল। তবে এদিনই নূর হোসেনসহ তিনজনের বিরুদ্ধেই বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে চার্জশিট পেশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বাগুইনআটি থানা। কিন্তু এদিন নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মূল অভিযুক্ত নূর হোসেনের এমন ডিগবাজিতে এদিন রীতিমতো বিস্মিত পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ও বারাসত কোর্টের আইনজীবীরাও। প্রশ্ন উঠেছে, জেলের মধ্যে এমন কী হল যে নূর ভয় পেয়ে গিয়ে পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে নেতাকে সাফাই দিলেন। কে বা কারা দমদম জেলে নূরের সঙ্গে দেখা করে কী শুনিয়ে গেলেন, যে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা না করা সত্ত্বেও স্বপ্রণোদিত হয়ে নেতাকে ‘ক্লিনচিট’ সার্টিফিকেট দিলেন।

এদিন আদালতের মুখ্য বিচার বিভাগীয় বিচারক মধুমিতা রায় নূর ও তার দুই সঙ্গীকে ফের ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। কিন্তু নূরের সঙ্গী খান সুমন যে অবৈধভাবে ভারতে আসেনি তার প্রমাণ আদালতে পেশ করা হয়। সুমনের আইনজীবী তারক দাস জানান, খান সুমনের বাংলাদেশী পাসপোর্ট নম্বর এই ০৭৯২৪২৮, মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ১০/২/১৮। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন খান সুমনকে যে ভিসা দিয়েছিল তার নম্বর হল- ৬০০৯১৪৫৩, মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন ছিল ১৬/১০/১৪। সুমনের পাসপোর্টে ঢাকা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ছাপও দেখান আদালতে। এদিন আদালতে ১৪ জুন সুমনের বিমান টিকিটের জেরক্সও পেশ করেন তার আইনজীবী। গোটা বিষয়টি দেখার পর বিচারক আগামী ১১ জুলাই বাগুইআটি থানার তদন্তকারী অফিসারকে হাজিরার নির্দেশ দিয়েছেন। সেদিন সুমনের জামিনের শুনানি হবে। তবে এদিনও নূর হোসেন ও তার অপর সঙ্গী শামিমের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে ছিলেন না। প্রশ্ন উঠেছে, নারায়ণগঞ্জের মাস কয়েক আগের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কাউন্সিলরের হয়ে কেউ কী আদালতে দাঁড়াতে রাজি হচ্ছেন না? না কি সত্যি সাত খুনের বিষয়ে সবাই অত্যন্ত ঘৃণ্য আচরণ করছে, পরিবারের লোকেরাও দূরে সরে থাকছে।
বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে সাতটি খুনের মূল অভিযুক্ত নূর হোসেনকে ভারত থেকে নিজের দেশে ফিরিয়ে নিতে চায় বাংলাদেশ। তারই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১৪ জুন কৈখালির একটা ফ্ল্যাট থেকে দু’জন সঙ্গীসহ ধরা পড়ে বাংলাদেশের কুখ্যাত অপরাধী নূর হোসেন। সল্টলেকের সিটি পুলিশের জঙ্গি দমন শাখা তাকে গ্রেফতার করে। মূলত অনুপ্রবেশের কারণেই নূরকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতার করার পর নূরের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছিল বাগুইআটি থানা। অনুপ্রবেশসহ বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে এক আইনজীবীসহ সাতজনকে খুনের অভিযোগ রয়েছে নূরের বিরুদ্ধে। কৈখালিতে ধরা পড়ার পর দমদম জেলে রাখা হয়েছিল নূরকে।
নূরের বিচার প্রক্রিয়া তাড়াতাড়ি শেষ করতে চায় পুলিশের একটি মহল। নূরকে সরকারিভাবে বাংলাদেশে হস্তান্তরের প্রসঙ্গ আসায় বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে চায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। কারণ সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের সময় নূর হোসেনকে দ্রুত ফেরত দেয়ার আবেদন করেছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কৃষ্ণকুমার দাস > কলকাতা থেকে