Showing posts with label শিশু. Show all posts
Showing posts with label শিশু. Show all posts

Thursday, August 27, 2026

দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন by ডা. হিমেল বিশ্বাস

সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো আমাদের রোজকার খাদ্যে সিসার উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রোটিন পাউডার, দারুচিনি, আপেল এমনকি ডার্ক চকলেটের মতো জনপ্রিয় পণ্যগুলোয়ও সিসা পাওয়া যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমাদের খাবার কি তবে এক ‘অদৃশ্য ঘাতক’-এর কবলে?

লেড বা সিসা একটি মৌলিক উপাদান, যা মাটি ও পরিবেশে সব জায়গায় বিদ্যমান। ফলে গাছপালা এবং প্রাণিজ খাদ্যে সামান্য পরিমাণে সিসা থাকা স্বাভাবিক। তবে এই সামান্য উপস্থিতি থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি এবং জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্কের মধ্যে একটি বড় ফারাক রয়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ঝুঁকি উপলব্ধির ব্যবধান’।

ঝুঁকির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে শিশুরা

সিসার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট জানিয়েছে, শিশুদের জন্য সিসার সংস্পর্শে আসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। এমনকি সামান্য মাত্রাও তাদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করে, যা বুদ্ধিমত্তার বিকাশে বাধা দেয়। বাংলাদেশেও কোটি কোটি শিশু সিসা দূষণের শিকার।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার গড় ঘনত্ব হলো লিটারপ্রতি ৬৭ মাইক্রোগ্রাম। মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নিরাপদ মান লিটারপ্রতি ৩৫ মাইক্রোগ্রাম, মানে স্বাভাবিকের চেয়ে এই মাত্রা অনেকটা বেশি বলতে গেলে প্রায় দ্বিগুণ। সিসা কোনো মাত্রায় গ্রহণযোগ্য নয়। এই নীরব বিষ শিশুদের আইকিউ কমিয়ে দিচ্ছে, আচরণগত সমস্যা বাড়াচ্ছে।

তবে এ সমস্যায় আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঝুঁকির মাত্রা পরিমাপের ক্ষেত্রে ‘ডোজ’ বা পরিমাণের গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) সিসা গ্রহণের যে সর্বোচ্চ দৈনিক সীমা (আইআরএল) নির্ধারণ করেছে, তা যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই করা হয়েছে।

আমাদের করণীয় কী?

১. খাদ্যের বৈচিত্র্য: সিসা দূষণ এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা। কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার বেশি পরিমাণে বা নিয়মিত না খেয়ে, সব ধরনের খাবার পরিমিত পরিমাণে খান। এটি সিসাসহ যেকোনো পরিবেশগত দূষণকারীর সংস্পর্শ কমিয়ে দেবে।

২. সরকারি নজরদারি: সিসার প্রধান উৎস, যেমন পুরোনো রং, দূষিত পানি ও ব্যাটারি কারখানার বর্জ্য—এগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: সিসাযুক্ত মসলা, খেলনা বা প্রসাধনী ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের মাটি বা পুরোনো পেইন্টযুক্ত দেয়ালে খেলতে নিরুৎসাহিত করুন।

প্রয়োজন দ্রুত ও সম্মিলিত পদক্ষেপ

২০৪০ সালের মধ্যে ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নে গৃহীত কর্মপরিকল্পনাগুলো হচ্ছে:

১. উৎস অপসারণ: সিসা দূষণের হটস্পট চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণ ও মাটি পরিষ্কার করা।

২. নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ: সিসাযুক্ত রং, মসলা ও পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির ওপর কঠোর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

৩. জনসচেতনতা: সিসা দূষণ প্রতিরোধের উপায় (যেমন: ঘন ঘন হাত ধোয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া ও পুরোনো রং করা দেয়াল থেকে শিশুদের দূরে রাখা) নিয়ে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি করা।

সিসা নিয়ে ‘ভূতের ভয়’ নয়, বরং বৈচিত্র্যময় ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাসই হোক সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সিসামুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

সোর্স: ওয়েব এমডি, জার্নাল অব হেলথ অ্যান্ড পলিউশন

* ডা. হিমেল বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল স্টাফ, স্নায়ুরোগ বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা

দারুচিনি, আপেল এমনকি প্রোটিন পাউডারের মতো জনপ্রিয় পণ্যগুলোয়ও সিসা পাওয়া যাচ্ছে
দারুচিনি, আপেল এমনকি প্রোটিন পাউডারের মতো জনপ্রিয় পণ্যগুলোয়ও সিসা পাওয়া যাচ্ছে। ছবি: গ্রাফিকস

Saturday, August 22, 2026

শিশু হত্যা বন্ধ হলেই আমরা ন্যায়বিচার পাব: হিন্দ রজবের মা

গাজায় পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রজাবকে ইসরাইলি বাহিনী হত্যার দুই বছর পর দায় স্বীকার করেছে সামরিক বাহিনী। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রজবের পরিবারের গাড়িতে এবং তাকে বাঁচাতে পাঠানো প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অ্যাম্বুলেন্সের গুলি চালিয়েছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী।

অনেকের কাছে, এই ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণাটি গণহত্যা যুদ্ধের অন্যতম প্রতীকী একটি মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

হিন্দের মা, ওয়েসাম হামাদার জন্য, এতে খুব বেশি কিছু বদলায় না।

তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি শিশুরা যখন মারা যেতেই থাকে, তখন একটি সামরিক তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পরিমাপ করা যায় না। হিন্দের হত্যাকাণ্ড গাজার শিশুদের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

৩০ বছর বয়সী ওয়েসাম হামাদার টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ন্যায়বিচার হলো যুদ্ধ বন্ধ হওয়া।’

২০২৪ সালের ২৯শে জানুয়ারি, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নির্দেশে হিন্দ ও তার পরিবার গাজা শহর থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল।

তদন্ত অনুযায়ী, তারা যখন গাড়ি চালিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন ইসরাইলি বাহিনী তাদের বহনকারী কালো কিয়া গাড়িটির ওপর গুলি চালায় এবং এতে ৩০০টিরও বেশি গুলি লাগে।

গাড়িচালক হিন্দের চাচা এবং অন্যান্য আত্মীয়রা নিহত হন। তার ১৫ বছর বয়সী চাচাতো বোন লায়ানও নিহত হওয়ার আগে প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) ডিসপ্যাচারদের সাথে ফোনে কথা বলতে সক্ষম হয়।

একমাত্র জীবিত হিন্দ, তার আত্মীয়দের মৃতদেহের মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে ছিল। সে সাহায্যের জন্য আকুতি জানিয়ে বারবার পিআরসিএস-কে ফোন করে।

পরে সংস্থাটি তাকে উদ্ধারের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠায়, কিন্তু অবশেষে হিন্দ এবং প্যারামেডিক উভয়ের সাথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

হিন্দ রজবের চাওয়া সাহায্যের আকুতি গাজার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যা তাকে শিশুদের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহতার এক বিশ্বব্যাপী প্রতীকে পরিণত করেছে। ‘দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজব’ নামক একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত তথ্যচিত্র নির্মাণে অনুপ্রেরণা জোগায়। এই তথ্যচিত্রটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার জেতে এবং বাফটা ও অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন লাভ করে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় গণহত্যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একাধিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষিত হয়েছে, ভেস্তে গেছে বা কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও একটি বাস্তবতা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে: ফিলিস্তিনি শিশুরা এখনো সহিংসতার প্রধান শিকার হয়ে চলেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর, ২০২৩ থেকে ৭ অক্টোবর, ২০২৫-এর মধ্যে ৬৪,০০০-এরও বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে।

১০ অক্টোবর, ২০২৫-এ একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরেও সহিংসতা অব্যাহত ছিল। পরবর্তী ৩০০ দিনে গাজায় অন্তত ৩০০ শিশু নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

শিশু হত্যা বন্ধ হলেই আমরা ন্যায়বিচার পাব: হিন্দ রজবের মা
হিন্দ রজবের একটি বিশাল প্রতিকৃতি তার মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এবং তার মৃত্যু নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র অস্কার মনোনয়ন পাওয়ার পর, স্পেনের বার্সেলোনার বার্সেলোনেটা সৈকতে উন্মোচন করা হয়, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত।

Friday, August 21, 2026

ইসরাইলি সেনারাই গুলি করেই হত্যা করেছিলো হিন্দ রজবকে, বাঁচাতে আসা অ্যাম্বুলেন্সেও করা হয় হামলা

গাজায় ২০২৪ সালে পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজব ও তার পরিবারের ছয় সদস্যকে বহনকারী গাড়িতে সেনাদের গুলি চালানোর কথা অবশেষে স্বীকার করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। বুধবার এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, এ ঘটনায় মিলিটারি পুলিশের মাধ্যমে একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে গার্ডিয়ান।

২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি গাজা সিটিতে ইসরাইলি আক্রমণ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়ার সময় শিশু হিন্দের পরিবারের গাড়িটি হামলার মুখে পড়ে। গাড়ির ভেতর আটকা পড়ে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের সাথে টানা তিন ঘণ্টা ফোনে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল অবুঝ শিশু হিন্দ। তাকে উদ্ধারে যাওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্সেও হামলা চালানো হয়, যাতে দুজন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হন।

এতদিন ওই এলাকায় সেনা উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে আসলেও স্বাধীন তদন্তে ইসরাইলি ট্যাংকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। দীর্ঘ আড়াই বছর পর বুধবার ইসরাইলি বাহিনী স্বীকার করে যে, তাদের সেনারাই গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। হিন্দ রজবের ঘটনা ছাড়াও দক্ষিণ গাজার রাফায় ২০২৫ সালের মার্চে ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী ও ত্রাণকর্মীকে হত্যার ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

হামলার পর বুলডোজার দিয়ে মরদেহ ও গাড়ি গণকবরে মাটিচাপা দিয়েছিল সেনারা। তবে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের গাড়িবহরে বিমান হামলায় বিদেশি ত্রাণকর্মী নিহতের ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ইসরাইল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের হত্যার ঘটনায় ইসরাইলি বাহিনীর এমন তদন্ত ঘোষণার নজির থাকলেও দোষীদের শেষ পর্যন্ত শাস্তির আওতায় আনা হয় না বললেই চলে।

ইসরাইলি সেনারাই গুলি করেই হত্যা করেছিলো হিন্দ রজবকে, বাঁচাতে আসা অ্যাম্বুলেন্সেও করা হয় হামলা

Monday, August 3, 2026

গাজায় আবারও রক্তঝরা দিন, ইসরাইলি হামলায় প্রাণ গেল অনাগত শিশুসহ ১২ জনের

গত ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করে আবার গাজা উপত্যকা জুড়ে বিমান ও কামান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। রোববার চালানো এসব হামলায় দুই শিশু ও এক অনাগত শিশুসহ অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ‘বোর্ড অব পিস’ গাজা যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র দুই দিন পরই নতুন করে এই হামলা চালাল ইসরাইল।

উপত্যকাজুড়ে যা ঘটেছে—

দক্ষিণ গাজা (খান ইউনিস): খান ইউনিসের উত্তর-পশ্চিমের আল-কারারা এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। নিহতরা হলেন—মাহমুদ জাকি আল-হামস (৩৮), তার স্ত্রী ফাতিমা আল-হামস (৩৭) এবং তাদের ছোট মেয়ে। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন। এছাড়া খান ইউনিসের কেন্দ্রে দার আল-সালাম এলাকায় ইসরাইলি গোলন্দাজ বাহিনী গোলাবর্ষণ করলেও সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

মধ্য গাজা (দেইর আল-বালাহ): দেইর আল-বালাহর আল-মাশালা এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরাইলি হেলিকপ্টার হামলায় কামাল আবু মুয়াইলিক (৬৮) এবং তার স্ত্রী হুদা (৫৯) নিহত হন। একই শহরে একটি মোটরসাইকেলে পৃথক বিমান হামলায় আরও দুইজন প্রাণ হারান।

গাজা সিটি: গাজা সিটির আল-সুসি টাওয়ারের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ইসরাইলি হামলায় আব্দুল্লাহ আবু তাইফ (৩৩), তার স্ত্রী আবীর আনান (২৯), তাদের ৫ বছরের ছেলে আজ্জাম এবং তাদের অনাগত শিশু নিহত হয়। অন্যদিকে, শহরের পশ্চিমের আল-নাসর এলাকায় ফিলিস্তিন মসজিদের কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় একজন গুরুতর আহত হন এবং আল-তুফাহ এলাকায় ইসরাইলি সামরিক যান থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়।

উত্তর গাজা: জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সরাসরি হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং অপরজন আশঙ্কাজনকভাবে আহত হন।

যুদ্ধবিরতি ও বর্তমান পরিস্থিতি:

গত শুক্রবার ট্রাম্প ও বোর্ড অব পিস যুদ্ধবিরতির নতুন রোডম্যাপে হামাসের সম্মতির কথা জানালেও ইসরাইল এ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, অব্যাহত হামলা এবং ত্রাণ সরবরাহে বিধিনিষেধের কারণে এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি ‘মরীচিকা’ বা প্রতারণায় পরিণত হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর প্রথম ধাপের যুদ্ধবিরতি চালুর পর থেকে ইসরাইল হাজার হাজার বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে দাবি ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইসরাইলি হামলায় ইতিমধ্যে ১,২২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪,০৫৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এই দুই বছরের টানা সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ৭৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৭৪,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

গাজায় আবারও রক্তঝরা দিন, ইসরাইলি হামলায় প্রাণ গেল অনাগত শিশুসহ ১২ জনের
ছবি: সংগৃহীত।

Wednesday, July 22, 2026

‘এমন জন্ম, এমন মৃত্যু যেন কারও না হয়’ by মানসুরা হোসাইন

প্রকাশ ২৩ নভেম্বর ২০২৫ঃ নির্জন কবরস্থানের এক কোণে ছোট্ট একটি কবর। মাটি এখনো নরম, ভেজা। কবরে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে কালো ফিতা দিয়ে আটকানো সাদা কাগজে লেখা—‘বেবী অফ আঁখিমনি-রন্টি (কন্যাসন্তান)’। দাফনের তারিখ ১২ নভেম্বর ২০২৫।

নারায়ণগঞ্জে ভুঁইগড়ের মামুদপুর কবরস্থানে নামহীন শিশুর এই কবরের পাশে দাঁড়ালে বোঝার উপায় নেই যে মৃত্যুর আগে বা পরে এই কন্যাসন্তান তার মা–বাবা বা কোনো স্বজনকেই কাছে পায়নি। তার চিকিৎসা ও দাফনের ব্যবস্থা করেছে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন।

কাগজে মায়ের নাম আছে, বাস্তবে মা নেই

৫ নভেম্বর ২০২৫ রাত ৩টার দিকে কে বা কারা নবজাতকটিকে শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক সমস্যা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন। এ সময় শিশুটির ওজন ছিল এক কেজির মতো। ভর্তির কাগজে মায়ের নাম লেখা ছিল—আঁখিমনি-রন্টি। ভর্তির পর থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে আর খুঁজে পায়নি। যোগাযোগের যে নম্বর দেওয়া ছিল, সেই নম্বরে কেউ ফোন ধরেননি।

মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক, পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে চিফ কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কন্যাসন্তানটিকে ভর্তির সময় মায়ের নাম আঁখিমনি-রন্টি বলে উল্লেখ করা ছিল। তাই তার কবরের ওপরে—বেবী অফ আঁখিমনি-রন্টি (কন্যা সন্তান) লিখে রাখা হয়েছে।

মজিবুর রহমান আরও বলেন, রাজধানীর বাইরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে না। তাই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলা এড়াতে নবজাতক উদ্ধার এবং মারা গেলে থানা ও প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। সকালে এই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুমতি নিতে নিতে লাশ দাফন করতে বিকেল হয়ে গেছে। জন্ম, মৃত্যু—সব জায়গাতেই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নবজাতকটিকে।

বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ মৃত্যু

এই নবজাতকের মৃত্যুর কয়েক দিন পর ১৪ নভেম্বর ২০২৫ রাজধানীর মেরুল বাড্ডার রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ৯৫ বছর বয়সী মো. আবদুল আজিজ চৌধুরী মারা যান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর আগে তিনি বারবার স্বজনদের মুখ দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ আসেননি। এমনকি মৃত্যুর পর খবর দেওয়ার পরও তাঁর লাশ নিতে আসেননি কেউ। বৃদ্ধাশ্রমের প্রশাসন আইনি ঝামেলা সামলে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করেছে।

রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রম ও ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন জন্ম ও মৃত্যু যেন কারও না হয়।

বেসরকারি উদ্যোগ ‘ভালো কাজের হোটেল’-এর পাশাপাশি রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. আরিফুর রহমান ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, গত মাসের ৮ তারিখ থেকে আবদুল আজিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন থেকেই তাঁর পরিবারের সদস্যদের বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তাঁরা কেউ দেখতে আসেননি। এমনকি মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরও লাশ নেওয়া তো দূরের কথা তাঁর পরিবারের কেউ দেখতে আসেননি।

আরিফুর রহমান বলেন, ‘নিজের পরিবার অস্বীকার করলেও রাশমনা আপনঘরের পরিবার তাঁকে অস্বীকার করেনি। আমরা তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানের দাফন করেছি।’

‘কবি কাকা’—অপরিচয়েই কাটল শেষ জীবন

আরিফুর রহমান বলেন, তিন বছর ধরে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা আবদুল আজিজের পরিচয় ছিল ‘কবি কাকা’। বৃদ্ধাশ্রমের সবাই তাঁকে এই সম্বোধনেই ডাকতেন। তিনি কবিতা লিখতেন। আচরণ ও কথাবার্তায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষের ছাপ স্পষ্ট থাকলেও নিজের পরিচয় জানাতে চাইতেন না।

আবদুল আজিজের এক ভাই, এক বোন আর এক ভাগনের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করেছিল বৃদ্ধাশ্রম কর্মৃপক্ষ। এবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে চাওয়ার কথা বলেছিলেন। সে সময় এবং মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের যে সদস্যদের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফোন কেটে দেন তাঁরা। আবদুল আজিজের ভাগনে ‘রং নম্বর’ জানিয়ে ফোন কেটে দেন জানিয়েছেন আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুসনদে আবদুল আজিজের বয়স লেখা ৯৫ বছর। তবে বৃদ্ধাশ্রমে কর্মরতারা বলছেন, বয়স এর চেয়ে কম হবে। চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, মৃত্যুসনদ ও আজিমপুর কবরস্থানের দাফন-সংক্রান্ত নথিতে রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের নাম লেখা হয়েছে।

বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তির সময় দেওয়া তথ্যে লেখা ছিল—আবদুল আজিজের স্থায়ী ঠিকানা দিনাজপুর। অস্থায়ী ঠিকানা রংপুরের বদরগঞ্জ। বাবার নাম আমিনুল হক চৌধুরী ও মায়ের নাম ফরিদা আমিন চৌধুরী।

বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আবদুল আজিজের পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কথা বলা হয়। ভাই পরিচয় স্বীকার করলেও ওই ব্যক্তি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফোন কেটে দেন।

আর নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোন পরিচয় দেওয়া একজন নারী বলেন, তাঁরা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। নিজের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়া বা ভাইয়ের লাশ আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁদের মা-বাবাও মারা গেছেন।

এই নারী আরও বলেন, তাঁর ভাই আবদুল আজিজ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। লেখালেখি করতেন। পৈতৃক ভিটা সম্পত্তি ভাগ–বাঁটোয়ারা হয়নি। তবে ধানি জমি ভাগের টাকা তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন।

বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল আজিজ খুব সম্ভবত সিনেমাও বানিয়েছিলেন। বৃদ্ধাশ্রমে আসা অধিকাংশ মানুষের মনে চাপা কষ্ট থাকে। অভিমান বা যেকোনো কারণে তাঁরা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।

আবদুল আজিজের শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পচন ধরেছিল। দুটি হাসপাতালে টানাটানি করতে হয়েছে। মারা যাওয়ার পরও তাঁর লাশটা পরিবারের কেউ নিতে আসেননি। এমন মৃত্যু কোনোভাবেই কারও কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন আরিফুর রহমান।

নবজাতক ও একটি চিরকুট

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেক নবজাতক কন্যাসন্তানকে রেখে তার পরিবার উধাও হয়ে যায় বলে ৭ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। হাসপাতালের পঞ্চম তলায় শিশু ওয়ার্ডের বেডে তাকে রেখে যান স্বজনেরা। হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্ট্রারে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়—ইনছুয়ারা, শাহিনুর, আলাদিপুর, ফুলবাড়ী।

পঞ্চাশোর্ধ্ব এক দম্পতি নানা-নানি পরিচয় দিয়ে নবজাতকটিকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। পরে তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শিশুটির পাশে একটি বাজারের ব্যাগ রেখে যাওয়া হয়েছিল। কিছু ওষুধ ছাড়াও জন্মের তারিখ লেখা ছিল ওই ব্যাগের ভেতর মায়ের ফেলে যাওয়া চিরকুটে। লেখা ছিল—‘আমি মুসলিম। আমি একজন হতভাগী। পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বাচ্চা রেখে গেলাম। দয়া করে কেউ নিয়ে যাবেন। বাচ্চার জন্মতারিখ ৪ নভেম্বর ২০২৫ (মঙ্গলবার)। এগুলো সব বাচ্চার ওষুধ...।’

প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে শিশুটি দিনাজপুরের অরবিন্দু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মজিবুর রহমান বলেন, সামাজিক বা পারিবারিক কোনো কারণে এই নবজাতকদের তাদের পরিবার ফেলে রেখে যায়। তারা বেঁচে থাকতেই মা, বাবা বা অন্য কোনো অভিভাবক পাওয়া যায় না। আর মারা গেলে তো আরও পাওয়া যায় না। তাই কন্যাসন্তানটির পরিচয় জানার আর কোনো উপায় নেই।

মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতকদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ হওয়ার পরে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবক খুঁজে পেতে সহায়তা করে। হাসপাতালটিতে এই ধরনের বেওয়ারিশ নবজাতকদের জন্য আলাদা একটি বিভাগ আছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধারের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট নবজাতক মারা গেছে। হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আরও সাত নবজাতক। অনেককে নতুন পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মজিবুর রহমান।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-22%2F1vd2r9st%2F2.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রয়াত মো. আবদুল আজিজ চৌধুরীর (ডানে) সঙ্গে আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. আরিফুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, July 18, 2026

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় প্রতিদিন একজন শিশু নিহত

গাজায় শিশুদের হত্যা করাকে নিয়মিত ঘটনা হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে দখলদার ইসরাইল।

ইসরাইলের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় প্রতিদিন গড়ে একজন শিশু নিহত হচ্ছে। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে এ পর্যন্ত ২৭৪ জন শিশু ইসরাইলের হামলায় নিহত হয়েছে। খবর আনাদোলু।

শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ২১ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। হারেৎজের তথ্যমতে, নিহত শিশুদের অধিকাংশই বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া স্নাইপারের গুলি, ভবন ধসে পড়া এবং গোলার স্প্লিন্টারের আঘাতেও অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গাজার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে চিকিৎসার অভাবে অনেক শিশু মারা গেছে। এছাড়া ক্ষুধা ও রোগে আরও শিশু প্রাণ হারালেও তাদের এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখিত পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

হারেৎজ গাজার মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার কথাও তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপুলসংখ্যক বাড়িঘর এখনো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে এবং প্রায় ১৭ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধাবিহীন তাঁবুতে বসবাস করছে।

এতে আরও বলা হয়, তাঁবু শিবিরগুলোতে ইঁদুর ও মশার উপদ্রব বেড়েছে, সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং তীব্র গরম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে হাজারো মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় ১ হাজার ১২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩ হাজার ৬৪৩ জন আহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসী হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ২৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫১ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় প্রতিদিন একজন শিশু নিহত
ছবি: সংগৃহীত।

শিশুর সুস্থতায় শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবারের গুরুত্ব by অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

আঁশযুক্ত খাবার মূলত অশোষিত শর্করা শ্রেণির। এর বেশির ভাগ আসে উদ্ভিদ থেকে যেমন—দানাদার শস্য, ফলমূল, শাকসবজি। এসব খাবার পরিপাকতন্ত্রে অপাচ্য হিসেবে থাকে। মল হিসেবে নির্গত হওয়ার আগে প্রায় ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে বৃহদন্ত্রে পৌঁছায়। যদিও আঁশজাত খাবার দেহে তেমন পরিমাণে ক্যালরি বিতরণ করে না, তবু যে কারও বিশেষ করে শিশুর সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এর ভূমিকা বহুমুখী ও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন আঁশযুক্ত খাবার দরকার

* বৃহদন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া এসব আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে প্রোবায়োটিকস, যা অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুগুলোকে পুষ্টি জোগায়।

* পরিপাকতন্ত্রে থাকা বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন এবং ক্যানসার তৈরির উপাদান বিনষ্ট করে দেয়।

* মলের আয়তন ধরে রাখে। ফলে শিশুর কোষ্ঠবদ্ধতার নিরসন হয়।

* আঁশ পাকস্থলী থেকে খাবার অন্ত্রে যাওয়ার সময় বৃদ্ধি করে মানে পরিপাকতন্ত্রের চলনকে ধীর করে এবং এভাবে শিশুর খিদে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

* ফলমূল-শাকসবজি খাওয়া হলে শর্করাজাতীয় পানীয় পানের ফলে দেহে হঠাৎ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি কম থাকে।

* শিশুর দৈনন্দিন খাবারে আঁশযুক্ত ফলমূল, শাকসবজি বা দানাদার খাবার শিশু বয়সে ডায়াবেটিস, মুটিয়ে যাওয়া, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, কোলন ক্যানসার ও আইবিডির মতো অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উপকারী।

শিশু কতটুকু আঁশ খাবে

শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন ন্যূনতম আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ নির্ণয়ে নিম্নোক্ত ফর্মুলা ব্যবহার হয়। শিশুর বয়স (বছর) + ৫ = আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ (গ্রাম হিসাবে)। যেমন—১ বছর বয়সের একটি শিশুর জন্য আঁশযুক্ত খাবারের পরিমাণ হবে: ১+৫ = ৬ গ্রাম/প্রতিদিন।

* অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-23%2Fxd4mvvuk%2FIMGL64371.avif?rect=0%2C0%2C1012%2C675&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার থাকা দরকার। ছবি: পেক্সেলস

Monday, July 13, 2026

শিশুকে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে কী হয় by ডা. মানিক মজুমদার

জ্বর হলে দোকানি বা প্রতিবেশীর পরামর্শে শিশুকে কয়েক ডোজ অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়—এই প্রবণতা বাংলাদেশে খুবই পরিচিত। কখনো জ্বর তিন–চার দিনের বেশি হলে মা–বাবারাই চিকিৎসককে অ্যান্টিবায়োটিক লিখতে চাপ দেন। তবে এই প্রবণতা কি ভালো?

রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় প্রভাব

শিশুকে অপ্রয়োজনে বারবার অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এতে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শিশুর হজমশক্তি স্বাভাবিক রাখা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে জরুরি। বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়। সাধারণ সর্দি-কাশির সঙ্গেও শিশুর ইমিউন সিস্টেম লড়াই করতে পারে না।

ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনে বা অসম্পূর্ণ কোর্সে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে শিশুর শরীরের ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে যখন শিশু সত্যিকারের মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না। এ পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর তা কল্পনারও অযোগ্য।

মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব

অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর ডায়রিয়া, বমি, অ্যালার্জি বা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—শিশুর জীবনের প্রথম দিকে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দিতে পারে। মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও নানা আচরণগত সমস্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

করণীয়

প্রথমত, কখনো নিজ থেকে বা দোকানির পরামর্শে শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াবেন না। কেবল নিবন্ধিত চিকিৎসক বা শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শে খাওয়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, মনে রাখবেন—ভাইরাসজনিত সাধারণ সর্দি, কাশি বা জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। সঠিক যত্নে এসব কিছুটা সময় নিয়ে এমনিতেই সেরে যায়। শিশুর পুষ্টি ও বিশ্রামের দিকে নজর দিন। তৃতীয়ত, চিকিৎসক যদি অ্যান্টিবায়োটিক দেন, পুরো কোর্স শেষ করুন। মাঝপথে বন্ধ করলে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে। চতুর্থত, স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে শিশুকে সঠিক সুষম পুষ্টিকর খাবার দিন। সংক্রমণ এড়াতে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি ও হাঁচি–কাশির শিষ্টাচারের দিকে লক্ষ রাখুন।

* ডা. মানিক মজুমদার, কনসালট্যান্ট (শিশুরোগ) পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি. ময়মনসিংহ

বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না
বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না। ছবি: পেক্সেলস

Monday, July 6, 2026

বাল্যবিবাহ এবং আমাদের মাধ্যমিক পড়াশোনায় বাধা by জান্নাতি আক্তার

আমাদের সমাজে এখনো অনেক মেয়েকে খুব ছোট বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় তারা তখনো শিশু। এ ধরনের বিয়ে হলো বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহ মানে এক শিশুকে তার বয়সের জন্য অনুপযুক্ত দায়িত্বে আবদ্ধ করা। সে তখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিপূর্ণ নয়। কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাকে বাধ্য করে সংসারের জন্য। তারা বলবে, ‘তোমার বয়স এখন পড়াশোনার নয়, সংসারের।’ এই বাক্য তার ছোট্ট হৃদয় ভেঙে দেয়, স্বপ্নকে থামিয়ে দেয় আর শিশুর হাসিকে থামিয়ে দেয়।

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, একটি মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার বয়সে যদি ঘরে আটকে রাখা হয়, তার জীবন কতটা কঠিন হয়ে যায়? সে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার আনন্দ উপভোগ করতে চায়, নতুন কিছু শিখতে চায়, কিন্তু সে বাধাপ্রাপ্ত হয়। স্কুলে নিয়মিত যাওয়া কঠিন হয়ে যায়, পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি অসম্ভব হয়ে যায়, হোমওয়ার্ক করা মুশকিল হয়ে ওঠে। তার স্বপ্ন থেমে যায়।

মাধ্যমিক শিক্ষা হলো এমন এক সময়, যখন একটি শিশু তার ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু বাল্যবিবাহ সেই সময়কেই ভেঙে দেয়। ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকা, পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, নতুন কিছু শেখা—সবই বাধাপ্রাপ্ত হয়। ঘরের দায়িত্ব, সংসার পরিচালনা, সন্তান দেখাশোনার মতো দায়িত্ব এসে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সে তার স্বপ্ন পূরণের পথ হারিয়ে ফেলে।

শুধু পড়াশোনা নয়, বাল্যবিবাহ মেয়েদের মানসিক ও সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করে। বন্ধুর সঙ্গে খেলার সময় কমে যায়। নতুন কিছু শেখার সুযোগ সীমিত হয়। সমাজের নানা রকম সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। কেউ বলে, ‘ছোট বয়সে বিয়ে করলে কী হবে?’ বা ‘এটা ঠিক হয়নি।’ এই কথাগুলো শিশুর মনকে আরও দমিয়ে দেয়, তার স্বপ্নের জগৎকে ছোট করে দেয়।

বাল্যবিবাহের ফলে স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেয়েরা প্রাকৃতিকভাবে বয়সের জন্য প্রস্তুত নয়। যখন তারা সন্তান ধারণ করে, তখন তাদের শরীর ও মন উভয়ই প্রভাবিত হয়। ক্লাসে যাওয়া বা হোমওয়ার্ক করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে বাল্যবিবাহের প্রভাব আরও বেশি। অনেক পরিবার মেয়েকে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেয়ে বিয়ে করাতে আগ্রহী। কেউ ভাবেন, ‘মেয়ের নিরাপত্তা সবচেয়ে বড়।’ কিন্তু বাস্তবে নিরাপত্তার নামে মেয়েদের পড়াশোনা ও স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। স্কুল হলো প্রতিটি শিশুর জন্য জ্ঞান ও স্বাধীনতার জায়গা। বাল্যবিবাহ তা বন্ধ করে দেয়।

আপনি যদি একনজরে দেখেন, দেশের বহু গ্রামের মেয়েরা মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছাতে পারে না। তারা ছোট বয়সেই সংসারের দায়িত্বে আবদ্ধ হয়। বন্ধুর সঙ্গে খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়ার আনন্দ, নতুন বই পড়ার সুযোগ—সবই সীমিত হয়ে যায়। অনেক সময় তারা হতাশ হয়। স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। তারা মনে করে, ‘আমার জীবন শেষ।’

তবে শুধু স্কুলে যাওয়া বন্ধ হওয়া নয়; বাল্যবিবাহ মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিকেও নষ্ট করে। তারা নিজের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে। মনে হয়, ‘আমি কীভাবে বড় হয়ে নিজের জীবন গড়ব?’ বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। নতুন কিছু শেখার আগ্রহও কমে যায়। মানসিক চাপ বাড়ে।

আমরা যদি সত্যিই চাই আমাদের মেয়েরা স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, তাহলে বাল্যবিবাহ রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ, সরকার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মা–বাবা যদি সচেতন থাকেন, তাঁরা মেয়েকে ছোট বয়সে বিয়ে না দিয়ে পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারেন। তাঁরা মেয়েকে বলবেন, ‘তুমি পড়াশোনা করো, বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াও।’ এই ছোট্ট কথাগুলোই মেয়ের জন্য বড় শক্তি। শিক্ষকেরা মেয়েদের উৎসাহিত করবেন। বন্ধুরা সহমর্মিতা দেখাবে। সমাজও সমর্থন করলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব।

আইনও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। অনেক পরিবার আইনের উপেক্ষা করে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়। স্কুলের পরিবেশ, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আর আইনের কঠোর প্রয়োগ—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজে মেয়েদের শিক্ষার পথ খোলা রাখতে হবে।

মাধ্যমিক পড়াশোনা মেয়ের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি তার স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বাল্যবিবাহ সেই সম্ভাবনা কেড়ে নেয়। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিটি মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে, তার পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হবে।

আজও অনেক মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে পড়েছে। কেউ চাকরি করছে না, কেউ ব্যবসা করছে না, কেউ একাই সংসার সামলাচ্ছে। তারা প্রমাণ করছে—বাল্যবিবাহ শুধু তাদের শিক্ষা ও স্বপ্নকে থামায়, কিন্তু সাহস ও সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নষ্ট করতে পারে না। তারা বড় হয়ে জীবন গড়ার চেষ্টা করছে।

আমরা সবাই যদি সচেতন হই, তাহলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব। পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, সমাজ—সবাইকে মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের শিক্ষা চালিয়ে নিতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শেষ করার সুযোগ দিতে হবে। এভাবে তারা স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।

শিক্ষিত মেয়ে শুধু নিজের জীবন গড়বে না, সমাজ ও দেশের জন্যও উপকার করবে। সে ভালো চাকরি করতে পারবে। নিজের পরিবারকে সাহায্য করতে পারবে। সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে। সমাজে উদাহরণ স্থাপন করতে পারবে। বাল্যবিবাহ সবকিছু ধ্বংস করে। তাই এটি রোধ করা জরুরি।

আমাদের সমাজের প্রত্যেককে বোঝানো দরকার, বাল্যবিবাহ মানে কোনো সুবিধা নয়; এটি শিশুর জীবন, স্বপ্ন ও শিক্ষা নষ্ট করে। আমাদের কাজ হলো মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করা। ছোট্ট শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারবে—পড়াশোনা করা জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

* জান্নাতি আক্তার, শিক্ষার্থী
- ঝুমুরবাড়ি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়

বাল্যবিবাহ

Sunday, July 5, 2026

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘প্রজনন গণহত্যা’ : লক্ষ্য মা ও শিশু

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে অব্যাহতভাবে পরিকল্পিত ‘প্রজনন গণহত্যা’ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলিরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, মা ও শিশুদের হত্যা এবং পরিবেশকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে যা ফিলিস্তিনিদের বন্ধ্যাত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফিলিস্তিনি নারীবাদী গোষ্ঠীর নতুন একটি প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল এই বর্বরতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিন থেকে জীবনের চিহ্ন মুছে ফেলা।

জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিটি নিশ্চিত করেছে, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের টার্গেট করছে। স্নাইপার ও ড্রোন দিয়ে নিখুঁত নিশানা, বন্দিশালায় নির্যাতন, প্রজনন সহিংসতা এবং স্কুল-হাসপাতাল ধ্বংসের মাধ্যমে শিশুদের ওপর চরম আঘাত হানা হচ্ছে।

ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে এবং কমপক্ষে ১৫ হাজার শিশু তাদের মাকে হারিয়েছে। আল-নাসর শিশু হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় ইসরাইল। পরে হাসপাতালটির ইনকিউবেটরে থাকা চার শিশুর পচাগলা লাশ উদ্ধার করা হয়।

ফিলিস্তিনি নারীবাদী গোষ্ঠী ১৮৮ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ‘একটি শিকারী রাষ্ট্র : ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের পদ্ধতিগত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা চালাচ্ছে ইসরাইল। পানি ও স্যানিটারি পণ্য আটকে দেয়ায় তীব্র সঙ্কটে পড়েছেন নারীরা। বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়া হাসপাতালে জ্বালানি, বিদ্যুৎ বা চেতনানাশক কিছুই নেই।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়াই সেখানে সিজারিয়ান অপারেশন করতে হচ্ছে। প্রসূতি মায়েরা ডায়াপার, খাবার ও পানি পাচ্ছেন না। আইভিএফ ক্লিনিক ধ্বংস এবং সাদা ফসফরাসের মতো বিষাক্ত অস্ত্রের ব্যবহার ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘ব্যাপক অনাহার, বাস্তুচ্যুতি ও মহামারীর মধ্যেও সন্তান জন্মদান এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখার এক অসম্ভব লড়াই একা কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন ফিলিস্তিনি মায়েরা।’

রানিয়া আবু আনজা নামে এক নারী ১০ বছর চিকিৎসার পর যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসরাইলি বিমান হামলায় তার স্বামী ও দুই সন্তানই নিহত হয়। জোমানা আরাফা নামে আরেক মা যমজ সন্তান জন্ম দেন। এর ঠিক দু’দিন পর তথাকথিত নিরাপদ অঞ্চলেই তিনি এবং তার দুই শিশু ও মা নিহত হন। সন্তানদের জন্মনিবন্ধন আনতে বাইরে যাওয়ায় বেঁচে যান তার স্বামী।

ইসরাইল মূলত ফিলিস্তিনিদের বংশবৃদ্ধিকে ভয় পায়। এর আগে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার বলেছিলেন যে, তার দুঃস্বপ্ন শুরু হয় যখন তিনি ভাবেন ‘আরেকটি ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নেবে’।

জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেছেন, ‘এটি এমন এক ব্যবস্থার কলঙ্কজনক দলিল যা ফিলিস্তিনিদের জীবন, শরীর ও পরিবারকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

মায়ের কোলে এক ফিলিস্তিনি শিশু
মায়ের কোলে এক ফিলিস্তিনি শিশু। সংগৃহীত

Saturday, July 4, 2026

শিশুদের স্পিচ থেরাপি কখন দরকার হয় by ডা. ফারাহ দোলা

অনেক শিশু সময়মতো বয়স উপযোগী কথা শিখতে ব্যর্থ হয় বা দেরি করে। অথবা অনেক শব্দ শিখলে বা অনুকরণ করতে পারলেও পরিবেশ উপযোগী যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না।

অনেকে আবার অর্থবোধক শব্দ শিখতে পারে না সময়মতো। এই সমস্যাগুলোকে মোটাদাগে স্পিচ ডিলে (বিলম্বিত কথা বলা) বলা হয়ে থাকে।

সুস্থ ও স্বাভাবিক একটি শিশু সাধারণত দুই মাস বয়সেই বিভিন্ন ধ্বনি তৈরি করে কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করে। ৬ থেকে ৮ মাসের দিকে সে বাবলিং করে অর্থাৎ বা বা, দাদ দা—এই ধরনের শব্দ করতে শুরু করে।

১ বছর বয়সের দিকে সে দাদা, মামা বাদেও কমপক্ষে একটি অর্থবোধক শব্দ বলতে শেখে। ১৬ থেকে ২০ মাস বয়সের মাঝে তার শব্দভান্ডার বেড়ে ১০ থেকে ৫০-এর মাঝে আসে।

২ বছরের দিকে দুটি শব্দ জোড়া লাগিয়ে ছোট ছোট বাক্য যেমন আমি খাব, এটা কী, তুমি বস—এসব বলতে পারে। ৩ থেকে ৪টি শব্দ জুড়ে বাক্য বানাতে তার সময় লেগে যায় তিন বছরের মতো।

৪ বছরের দিকে সে একটু জটিল বাক্য বোঝে, ছড়া-কবিতা বলতেও শিখে যায়। এই স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটলে সেটিই স্পিচ ডিলে।

স্পিচ ডিলের বিভিন্ন কারণ

স্পিচ ডিলের কারণ অনেক। একটি শিশুর কথা বলার জন্য সঠিকভাবে কানে শোনা, মস্তিষ্ক দিয়ে অনুধাবন এবং মুখ দিয়ে সঠিকভাবে উচ্চারণ করা প্রয়োজন। এসব প্রক্রিয়ার কোনোটিতে বিচ্যুতি হলেই শিশুর কথা বলা বিলম্বিত হতে পারে।

* শিশু যদি কানে কম শোনে অথবা শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয়।

* শিশুর যদি স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যা থাকে, যেমন: সেরিব্রাল পালসি, অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা।

* বিভিন্ন ধরনের সিনড্রেমিক চাইল্ড, বিশেষ করে ডাউন সিনড্রোমের রোগীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।

* বিভিন্ন ধরনের ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার যেমন তোতলানো, সিলেকটিভ মিউটিজম ইত্যাদি কারণেও শিশুর স্পিচ ডিলে হতে পারে।

* এ ছাড়া মুখগহ্বরের বিভিন্ন সমস্যা যেমন টাং টাই, তালুকাটা, ঠোঁটকাটা বাচ্চাদেরও কথা বলতে সমস্যা হয় বলে স্পিচ ডিলে হতে পারে।

* শিশুদের অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বুঁদ হয়ে থাকা। এতে একদিকে যেমন পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে বহু ভাষার সংস্পর্শে এসে বিকাশের সময়টায় দুই ভাষার দ্বন্দ্বে অনেক সময় শিশুদের কথা বলা শিখতে দেরি হয়ে যায়।

* বর্তমান কালের একক পরিবারগুলোয় শিশুদের কথা বলার সঙ্গীর অভাব। সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কম পাওয়াও শিশুর দেরিতে কথা বলার একটি অন্যতম কারণ।

শিশুর স্পিচ ডিলের চিকিৎসার জন্য সবার আগে দরকার সঠিক কারণ নির্ণয়। এ জন্য শিশুবিশেষজ্ঞ অথবা শিশুস্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। এ জন্য শিশুটির ইতিহাস খুব ভালোমতো নিতে হবে।

জন্মের সময় কোনো সমস্যা ছিল কি না, মানসিক বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, পরিবারে এ ধরনের সমস্যা আর কারও আছে কি না, এসব খুঁজে দেখতে হবে।

এসব ইতিহাস নিয়ে এবং শিশুটিকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন হিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট বা কানে শোনার পরীক্ষা, সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট বা বুদ্ধি পরীক্ষা এবং শিশুটিকে যদি অটিস্টিক মনে হয় সেই অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।

শিশুর যদি শ্রবণ সমস্যা থাকে তবে স্পিচ থেরাপির আগে কানের চিকিৎসা করাতে হবে। হিয়ারিং এইড অথবা ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টশনের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর স্পিচ থেরাপি দিলে শিশুর কথা শিখতে উপকার হয়।

টাং টাই যদি কথা বলায় সমস্যা তৈরি করে তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়াটা ছাড়িয়ে পরে স্পিচ থেরাপি দিলেই শিশুর কথা বলতে আর সমস্যা হয় না।

সেরিব্রাল পালসি অথবা শিশুর অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যায় স্পিচ থেরাপি দিলে উন্নতি হয়।

শিশু অটিস্টিক হলে বিভিন্ন ধরনের আর্লি ইন্টারভেনশন থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পেশাল স্কুলিংসহ বিভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে শিশুটির চিকিৎসায়।

ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার ভাষাজনিত এমন একটি সমস্যা, যেখানে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা, শ্রবণক্ষমতা বয়স অনুযায়ী ঠিক থাকলেও কথা বলায় বয়সের তুলনায় পিছিয়ে থাকে।

এর মধ্যে আছে স্ট্যামারিং বা তোতলানো, স্থানভেদে চুপ থাকা। এই সমস্যা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও থাকতে পারে। এই শিশুদের স্পিচ থেরাপি দিলে উন্নতি হয়।

তাই কথা বলতে দেরি করলে কারণ নির্ণয় করে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তত দ্রুত শিশুটির উন্নতি আশা করা যায়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-13%2Fqxhf81cf%2Fpexels-photo-4473774.jpg?rect=0%2C0%2C5976%2C3984&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শিশু যদি কানে কম শোনে অথবা শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয় তাহলে স্পিচ ডিলের সমস্যা হয়। ছবি: পেক্সেলস

Thursday, July 2, 2026

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মাধ্যমে শিশুর যে ক্ষতি করেন বড়রা by হুমায়রা মাহজাবিন

ছোট একটি বাক্য একজন মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। লাঠি বা পাথর মানুষের হাড় ভেঙে ফেলতে পারে; কিন্তু কথা দিয়ে মানুষের মনোবল ভেঙে ফেলা সম্ভব। আর কারও আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া শারীরিক আঘাতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন (ইমোশনাল অ্যাবিউজ) শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় ব্যাঘাত ঘটায়।

সাধারণত একজন ব্যক্তি আরেকজনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা থেকে ইমোশনাল অ্যাবিউজ করে। অনেক পরিবারে বড়দের দ্বারা এমন আচরণের শিকার হয় শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন শারীরিক নির্যাতনের মতোই ভয়াবহ। ছোটবেলার এসব মানসিক নির্যাতন শিশুর বিকাশে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারে।

শাসন যখন মানসিক নির্যাতন

সন্তান বড় করতে গিয়ে মা–বাবারা অনেক ধরনের নিয়ম বেঁধে দেন। অনেক অভিভাবক মনে করেন, এতে শিশুদের ভালো হবে। কঠোর ভালোবাসা এসব বেঁধে দেওয়া নিয়মের অন্যতম। কিন্তু এ পদ্ধতিটি শিশুদের ভালো তো করেই না, বরং তার মধ্যে হীনম্মন্যতা, ভয় এবং নিজের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করে। অনেক সময় দেখা যায়, মা–বাবা তাঁদের সন্তানকে নিয়মিত কারও সঙ্গে তুলনা করছেন। সন্তানকে অযোগ্য কিংবা কিছুই পারে না বলে বারবার তিরস্কার করলে শিশুটির মধ্যে একধরনের বিশ্বাস গড়ে ওঠে যে আসলেই সে কিছু পারে না, তাকে দিয়ে কিছুই হবে না। নিজের শক্তি আবিষ্কারের বদলে সারাক্ষণ সে হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো অনেক অভিভাবক এ ধরনের নির্যাতনকে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য মনে করেন। নিজের অস্বাভাবিক আচরণকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে অনেকে শিশুর সামনে ব্যাখ্যা হাজির করেন। অভিভাবকেরা আবার যখন ‘আমি তোমার ভালোর জন্যই করছি’ বলে নিজের কাজকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, সেটা শিশুর ওপর চাপ তৈরি করে। আবেগজনিত নির্যাতন একটি শিশুকে তার সুস্থ ও স্বাভাবিক ব্যবহার পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে।

মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের দীর্ঘ প্রভাব

মানুষ স্বভাবতই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে মনে রাখে বেশি। শৈশবে পাওয়া মৌখিক আঘাতে বড়বেলায়ও ভুগতে পারে শিশু। দীর্ঘদিন ধরে একই কথা শোনার ফলে শিশুদের মনে কথাগুলো পাকাপাকিভাবে গেঁথে যায়। একটি এমআরআই পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মা–বাবার অবমাননাকর বা নির্যাতনমূলক কথাবার্তা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশপ্রক্রিয়াই বদলে দিতে পারে। তারা এই নেতিবাচক কথাগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং ভুলভাবে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল রপ্ত করে। ফলে নিজের অজান্তেই তারা অন্যদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন প্রয়োগ করে। যারা শৈশবে মানসিক বা আবেগজনিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাঁরা উদ্বেগ, হতাশা, আত্মসম্মানের ঘাটতিতে ভোগেন। একই সঙ্গে এমন মানুষেরা স্বাস্থ্যকর ও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে দ্বিধায় ভোগেন।

সূত্র: ফিজিওলজি টুডে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-19%2Fw0ibaxuq%2FKabir-Hossain2.JPG?rect=280%2C0%2C3266%2C2177&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা হতে পারে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন। মডেল: ভুবন ও বর্ণ। ছবি: কবির হোসেন

শিশুর ভালো ঘুমের জন্য যেসব অভ্যাস করাবেন by রাফিয়া আলম

শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য ভালো ঘুমের বিকল্প নেই। কোনো কাজ শিশু কতটা মনোযোগ দিয়ে করতে পারবে, নির্ভর করবে শিশুর ঘুমের ওপর। সুস্থ থাকতে শিশুকে যেমন ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা শেখানো হয়, তেমনি তাদের নিদ্রা স্বাস্থ্যবিধিও অভ্যাস করানো উচিত। একেই বলে স্লিপ হাইজিন। এই নিদ্রা স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিই চলুন।

সময় হোক নির্দিষ্ট

রোজ একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করতে হবে। তবে বিষয়টা যেন এমন না হয় যে শিশুকে জোর করে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়ে অভিভাবক রাত জেগে মুঠোফোন স্ক্রল করছেন। ছুটির দিনে দেরি করে ওঠার অভ্যাসটিও শিশুর জন্য ভালো নয়। তাতে বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহঘড়ির সময় এলোমেলো হয়ে যায়। তাই ছুটির আগের দিনও রাত করে বাইরে ঘোরাঘুরি কিংবা রাত জেগে সিনেমা দেখা বা গল্প করা ভালো চর্চা নয়। তাতে সেদিন ঘুমাতে দেরি হবে, পরদিন ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হবে। এলোমেলো হবে দেহঘড়ির সময়। 

ঘুমের আয়োজন

  • বিছানায় পড়ালেখা, গেম খেলা, খাওয়া দাওয়া বা অন্য কোনো কাজ করা যাবে না। বিছানা কেবল ঘুমেরই জন্য ব্যবহার করতে হবে। তাহলে বিছানায় গেলে মস্তিষ্ক বুঝতে পারবে, এখন ঘুমের সময়।

  • ঘুমের আগে ছোট শিশুকে গল্প বা ছড়া বলা যেতে পারে। একটু বড় হলে ঘুমের আগে নিজেও বই পড়তে পারে শিশু। তবে উত্তেজনাপূর্ণ কোনো কিছুই ঘুমের আগে ভালো নয়। হোক তা গল্প, হোক তা বই। ঘুমের আগের সময়ে এমন বই বেছে নেওয়া উচিত নয়, যা গভীর চিন্তার খোরাক হয়ে দাঁড়ায়।

  • অন্ধকার ঘরে শিশু ভয় পেতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে ঘুমের সময় ঘরে মৃদু আলোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

  • ঘুমের আগে শিশুকে উষ্ণ পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। তাঁকে প্রার্থনা করতে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। যোগব্যায়াম, শ্বাসের ব্যায়াম, শিথিলায়নের অভ্যাস করা যেতে পারে। শোনানো যেতে পারে আয়েশি কোনো অডিও।

  • ঘুমের আগমুহূর্তে যা করতে নেই

  • ঘুমের অন্তত এক-দুই ঘণ্টা আগেই পড়ালেখা শেষ করে ফেলতে হবে। রাতে পড়া শেষ না হলে ভোরে উঠে পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

  • ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে ইলেকট্রনিক বা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের পাট চুকিয়ে ফেলতে হবে।

  • খেলাধুলা বা শারীরিক শ্রম হয়, এমন কাজ ঘুমের অন্তত চার ঘণ্টা আগেই সেরে নিতে হবে। 

    খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ

    • ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দু-তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে। রাতের খাবারটা হতে হবে হালকা, সহজপাচ্য। রাতে ভারী খাবার, মসলাদার খাবার, মিষ্টি খাবার, চিপস প্রভৃতি খাওয়া উচিত নয়।

    • ঘুমের এক ঘণ্টা আগে দুধ, খেজুর বা কলা খাওয়া যেতে পারে। তাহলে রাতে হঠাৎ খিদে পাবে না। তবে এ সময় বাড়তি কোনো স্বাদ বা ঘ্রাণের দুধ (ফ্লেভারড মিল্ক) না খাওয়াই ভালো।

    • বেলা দুইটার পর চকোলেট বা চকোলেট মেশানো খাবার না খাওয়াই ভালো। কারণ, চকোলেটে ক্যাফেইন থাকে, যা ঘুমের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটু বড় হওয়ার পর চা-কফি খাওয়ার অভ্যাস হলে তখনো খেয়াল রাখতে হবে, বেলা দুইটার পর যেন এসব পানীয় খাওয়া না হয়।

    স্লিপ হাইজিন মেনে না চলায় শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে
    স্লিপ হাইজিন মেনে না চলায় শিশুরাও আজকাল ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। মডেল: পদ্মহেম পাবন। ছবি: কবির হোসেন


Sunday, June 28, 2026

গাজায় তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা

গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় আরো এক ফিলিস্তিনি শিশুসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। গাজার কিছু অংশকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করে ‘যুদ্ধবিরতি’ চললেও ইসরাইল এই হামলা অব্যাহত রেখেছে।

চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, শনিবার দুটি অস্থায়ী তাঁবুতে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই-বোন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন ১৫ বছর বয়সি ইসলাম মুসা এবং তার ৩০ বছর বয়সি ভাই আবদুল্লাহ মুসা।

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকার ওই হামলার স্থান থেকে সাতজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের নাসের হাসপাতাল ও রেড ক্রস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আঙিনায় সাদা কাফনে জড়ানো ভাই-বোনের লাশের পাশে আত্মীয়-স্বজনদের কাঁদতে দেখা গেছে।

এর আগে দক্ষিণ গাজায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণে আহত হওয়া ১০ বছর বয়সি আরো এক ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে।

নাসের হাসপাতালের একটি সূত্র আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে, দিনকয়েক আগে আল-মাওয়াসিতে ইসরাইলি হামলায় আহত হওয়া ওয়ালিদ ইউসুফ আবু জাজার নামের ওই শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

আল-শিফা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পশ্চিম গাজা শহরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া আরেকটি তাঁবুতেও আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অ্যাম্বুলেন্স সেবা জানিয়েছে, আহতদের বেশিরভাগই নারী এবং তাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

গাজা শহর থেকে আল জাজিরার তারেক আবু আজুম জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধবিরতি’ সত্ত্বেও ইসরাইল তাদের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা ইসরাইলি নীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরো জানান, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় আমরা খবর পেয়েছি যে ইসরাইলি ড্রোনগুলো আল-মাওয়াসি এলাকার অস্থায়ী তাঁবুতে আঘাত হেনেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এই এলাকাটিকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জন্য নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।’

আজুম বলেন, ‘আমরা ড্রোন হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির সাক্ষী হচ্ছি এবং এখনও মাথার ওপরে ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।’

শিশুদের লক্ষ্য করে ইসরাইলের পরিকল্পিত হামলা

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি নথিভুক্ত করার পর ইসরাইলের ফিলিস্তিনি শিশু হত্যার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু।

শিশুদের অধিকারকর্মী রাচেল আকুরসো (মিস রাচেল নামে পরিচিত) এই প্রতিবেদনের একজন সহ-লেখকের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড থামাতে বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।

শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের নিজেদের সন্তানদের মতো শিশুরাই একটি গণহত্যার মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তবুও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

প্রতিবেদনের সহ-লেখক এবং জাতিসংঘের কমিশনার ক্রিস সিডোটি এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে ‘একেবারে হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেছেন।

সিডোটি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রগুলোর পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমাদের সাড়ে তিন বছর আগেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তবে শুরু করার জন্য এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৭ জন আহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয় আরো জানায়, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি বাহিনী ১ হাজার ৩১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ৩ হাজার ৩০৯ জনকে আহত করেছে।

সূত্র: আল-জজিরা

গাজায় তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা
ছবি: এএফপি

Saturday, June 27, 2026

৬ মাস পার হলেই কি শিশুকে মাংস খাওয়ানো যাবে? by রাফিয়া আলম

ছয় মাস পেরোনোর পর মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে দিতে হয় সম্পূরক খাবার। পুষ্টিকর খাবার হিসেবে অনেক অভিভাবকই এই বয়স থেকেই খিচুড়ির সঙ্গে শিশুকে মাংস দিয়ে থাকেন।

মাংস থেকে আমিষ, আয়রন, ভিটামিন বি১২, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে এসব উপাদান কাজে লাগে। ছোট্ট শিশুকে মাংস খাওয়ানো প্রসঙ্গে পরামর্শ দিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তাসনুভা খান।

অভ্যস্ততা

ছয় মাস বয়স পার হলেই মুরগির মাংস দেওয়া যায়। তবে হাঁস, গরু বা খাসির মাংস এক বছর পার হলে খাওয়ানো ভালো। এসব মাংস হজম হতে একটু বেশি সময় লাগে। সব ধরনের মাংস সব শিশুর সহ্য না-ও হতে পারে।
যেকোনো নতুন খাবারে শিশু ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। মাংসের বেলাতেও তা–ই। শিশুকে যেকোনো নতুন খাবারই খুব অল্প পরিমাণে শুরু করতে হয়। অনেক বাড়িতেই ছোট্ট শিশুকে সুজি ও নরম খিচুড়ির মতো খাবার দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে শিশু পরিবারের সাধারণ খাবারের স্বাদের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
শিশুকে শুরুতেই নরম খিচুড়ি বা নরম ভাতের সঙ্গে অল্প পরিমাণে মাংস মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে ধীরে ধীরে মাংসের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।

খেয়াল রাখুন

* শিশুকে মাংস দিলে অবশ্যই খুব ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে। আধসেদ্ধ মাংস দেওয়া যাবে না।

* শিশুকে মাংস দেওয়ার পর সে তা খেতে পারছে কি না, তা–ও দেখতে হবে।

* যে শিশু মাত্র খেতে শিখেছে, তাকে মিহি করে মাংস দিতে হবে। শুরুর দিকে ব্লেন্ড করে দেওয়া যেতে পারে।

* সেদ্ধ করার পর হাত দিয়ে চটকে নরম করে দিলেও ছোট শিশু তা খেতে পারবে।

* মুরগি আর সবজি দিয়ে পুষ্টিকর স্যুপও করে দিতে পারেন।

* মাংসের শক্ত টুকরা বা হাড়ের টুকরা দেওয়া যাবে না। এসব অংশ শিশুর গলায় আটকে যেতে পারে।

* যেকোনো মাংসের চর্বি বা শক্ত চামড়ার অংশ ফেলে দিন। ফার্মের মুরগিতেও চর্বি থাকে।

* যেকোনো নতুন খাবার শুরু করার তিন দিনের মধ্যে অন্য আরেকটি খাবার শুরু না করাই ভালো। শিশুর কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে এভাবে তা বোঝা সহজ হয়।

* শিশু একটু বড় হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো। এতে সে নানান রকম খাবারের প্রতি আগ্রহী হবে। এভাবে সে অল্প অল্প করে মাংসের নানান পদে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।

* যে বয়সে শিশু নিজ হাতে খাবার ধরতে পারে, সেই বয়সে হাতে মুরগির লম্বা হাড় তার হাতে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে সে একটু একটু করে চুষে খেতে শিখবে। উৎসাহও পাবে।

শিশুকে যেকোনো নতুন খাবারই খুব অল্প পরিমাণে শুরু করতে হয়
শিশুকে যেকোনো নতুন খাবারই খুব অল্প পরিমাণে শুরু করতে হয়। ছবি: পেক্সেলস

Sunday, June 21, 2026

শিশুর জ্বরে কখন ও কীভাবে প্যারাসিটামল খেতে দেবেন by ডা. মানিক মজুমদার

শিশুর শরীর সামান্য গরম মনে হলেই অনেক মা-বাবা উদ্বিগ্ন হন। তাড়াহুড়ো করে প্যারাসিটামল খাওয়ানো শুরু করেন। অনেক সময় তাপমাত্রা না মেপেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় এবং শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমেই জানা জরুরি শিশুকে কখন প্যারাসিটামল দেওয়া উচিত।

কখন শুরু করবেন প্যারাসিটামল

শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হলেই প্যারাসিটামল প্রয়োজন হয়। এর মাত্রা নির্ধারিত হয় শিশুর ওজনের ভিত্তিতে, বয়সের ভিত্তিতে নয়। সাধারণ হিসাব প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রায় ১৫ মিলিগ্রাম।

উদাহরণ দেওয়া যাক তাহলে। প্রায় ৮ কেজি ওজনের একটি শিশুর জন্য সিরাপের পরিমাণ এক চা-চামচ অথবা পাঁচ মিলিলিটার আর ১৬ কেজি ওজনের শিশুর জন্য তা দ্বিগুণ অর্থাৎ দুই চা-চামচ। এই সিরাপ প্রতি ছয় ঘণ্টা অন্তর দেওয়া যায়। দিনে সর্বোচ্চ চারবার। যদি জ্বর ১০২ ডিগ্রি বা তার বেশি হয় ও শিশু সিরাপ খাওয়ার অবস্থায় না থাকে, তখন ওজন অনুযায়ী পায়ুপথে সাপোজিটরি দিতে পারেন আট ঘণ্টা অন্তর এক দিনে সর্বোচ্চ তিনবার।

প্যারাসিটামল কতটা নিরাপদ

নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান না মেনে বা অতিরিক্ত মাত্রায় প্যারাসিটামল দিলে শিশুর লিভার ও কিডনির ক্ষতি হতে পারে। শিশুর শরীরে র‍্যাশ, ফুসকুড়ি, মুখ অথবা ঠোঁট ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘুম, খিঁচুনি বা জন্ডিসও হতে পারে। তাই এই ওষুধকে নিরাপদ মনে করে নিজের ইচ্ছামতো বারবার প্রয়োগ করাটা মোটেও উচিত নয়।

অ্যান্টিবায়োটিক কি জরুরি

আরেকটি বিষয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকে, তা হলো জ্বরের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের সম্পর্ক। শিশুর জ্বর হলেই অনেক মা-বাবা মনে করেন, দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই সমস্যা মিটবে। বাস্তবতা হলো, শিশুদের অধিকাংশ জ্বরের কারণ ভাইরাসজনিত, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা নেই। জ্বর এলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা প্রক্রিয়া, জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি অংশ। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করলে তা শুধু শিশুর শরীরের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে না, ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অথবা প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এতে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা কঠিন করে তোলে।

শিশুর জ্বর হলে কী করবেন

শিশুর জ্বর হলে প্রথমেই তাপমাত্রা মেপে দেখুন। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় প্যারাসিটামল দিন। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে অথবা শিশুর অস্বাভাবিক দুর্বলতা, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

* ডা. মানিক মজুমদার, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, ময়মনসিংহ

জ্বর হলেই তাড়াহুড়ো করে প্যারাসিটামল খাওয়ানো ঠিক নয়
জ্বর হলেই তাড়াহুড়ো করে প্যারাসিটামল খাওয়ানো ঠিক নয়। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

Thursday, June 18, 2026

শিশুদের বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে by মৃণাল সাহা

শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো পরিশ্রমের সময়, এখানে অবসাদ স্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগই নেই; বরং তাকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেন অনেকে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার চাপই ডেকে আনতে পারে অবসাদ, প্রভাব ফেলতে পারে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।

বার্নআউট’ শব্দটা সম্ভবত সবচেয়ে খাপ খায় করপোরেট চাকরিজীবীদের সঙ্গে। কাজের চাপে পিষ্ট হয়ে অবিরাম ডেডলাইনের চাপে মানসিক চাপ ছাড়িয়ে যায় সহ্যের সীমা। তখনই ভেঙে পড়ে শরীর ও মন। সাধারণ কাজকর্ম করতেও তখন বিরক্ত লাগে, মানসিক অবসাদ মিলিয়ে শরীর আর চলতে চায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই বার্নআউট।

অনেকেরই ধারণা, এ ধরনের বার্নআউট শুধু মাঝবয়সী চাকরিজীবীদেরই হতে পারে। কিন্তু তা নয়, বার্নআউট হানা দিতে পারে যেকোনো বয়সে। মূলত মানুষের মস্তিষ্ক যখন প্রতিদিনের কাজের চাপ একত্রে আর নিতে পারে না, তখনই চেপে বসে মানসিক অবসাদ। আর সেই অবসাদ থেকে শরীর ও মন দুটিই হাল ছেড়ে দেয়। এই অবসাদ যে শুধু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জমা হয়, তা নয়; বরং শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ।

শিশুদের বার্নআউট কেন হয়?

শিশুরা বার্নআউট হতে পারে বিভিন্ন কারণে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা, পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে শুরু করে পরিবারের মানুষের চাপ। অনেক সময় একটা পরীক্ষার ফল ভালো না হওয়ার প্রভাবও পড়তে পারে অনেক বড় আকারে। তাই মানসিক চাপ ভালোভাবে মনে গেঁথে বসার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ঠিক এই জায়গায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মা–বাবার ভূমিকা। কারণ, একটি শিশুকে খুব কাছ থেকে দেখেন তার মা-বাবা। সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আর লক্ষণ দেখে সহজেই ধারণা করতে পারবেন, আপনার সন্তান বার্নআউট হয়ে যাচ্ছে কি না এবং তখন থেকেই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে এই অবসাদ মনে আজীবনের মতো চেপে না বসে।

বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে?

হঠাৎ করেই গড়িমসি করা

আগে হয়তো আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফিরেই নিজে থেকে পড়তে বসে যেত, কিন্তু এখন তাকে পড়তে বসার কথা বারবার মনে করাতে হচ্ছে। বাসার পড়া তো পড়ছেই না, বইপত্রের মুখোমুখিই হতে চাচ্ছে না। নানা অজুহাতে পড়তে বসা পিছিয়ে দিচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি অবসাদ, বার্নআউট থেকে এমনটা হতে পারে।

উদাসীন ভাব

হঠাৎ করেই সন্তানের মধ্যে সবকিছুর প্রতি একধরনের অনীহা বা উদাসীনতা দেখা দিতে পারে। আগে স্কুল থেকে ফিরেই প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কথা বলত; কিন্তু হঠাৎ করেই এমন কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে সে। জিজ্ঞেস করলেও দুই এক শব্দের মধ্যেই কথা শেষ করতে চায়। হুট করে আগ্রহ কমে যেতে পারে বার্নআউট থেকে।

প্রিয় কাজে অনীহা

পড়াশোনার পাশাপাশি আগে যেসব কাজ করার জন্য উৎসুক ছিল, যেমন কোনো শখের কাজ বা খেলাধুলায় যেতে ভীষণ অনীহা দেখানো, নতুন নতুন বাহানা তৈরি করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

শিশুরা সাধারণত দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু হুট করেই যদি দেখেন তার মনোযোগ কমে গেছে, আগে টানা ২০-৩০ মিনিট মনোযোগ দিতে পারত, সে এখন ১০ মিনিটও স্থির থাকতে পারছে না; তাহলে সেটিও হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শারীরিক ক্লান্তি থেকে মনোযোগ অনেক সময় কমে যায়।

খিটখিটে মেজাজ

বার্নআউটের অন্যতম লক্ষণ খিটখিটে মেজাজ। হুট করেন শিশুর হাসিখুশি চেহারা উবে যায়, আর মনমেজাজ হয় তিরিক্ষি। ছোটখাটো বিষয়ে রিঅ্যাক্ট করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

সাহায্য করবেন কীভাবে?

সন্তানকে জানুন

প্রতিটি শিশুর আচরণ, স্বভাব, মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা আলাদা। সময়ের সঙ্গে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এসব গড়ে ওঠে। কোন বিষয়গুলো আপনার সন্তানকে আনন্দ দিচ্ছে, কোন বিষয়গুলো তার মনে বিরক্তির উদ্রেক করছে—এসব বোঝার চেষ্টা করুন। সময় দিয়ে তাকে বিভিন্ন কাজে আগ্রহী করে তুলুন।

সন্তানকে পথ দেখান

সন্তান সুন্দর একটা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক, তা কে না চান! কিন্তু সেই চাওয়া-পাওয়া সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমন চাপ থেকেও মানসিক অবসাদ আসে। সন্তানের ওপর আপনার চাওয়া-পাওয়া যে বাড়তি চাপ নয়, সেটি তার ছোট্ট মনে গেঁথে দিন।

সন্তানের কথা শুনুন

বেশির ভাগ সময়েই মা-বাবা সন্তানের কথার তেমন মূল্য দেন না; বরং নিজের কথাকেই বড় মনে করেন। তবে এই সময়ে শিশুদের মানসিক স্বস্তির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সে–ও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানো।

বিশ্রাম দিন

বেশির ভাগ বার্নআউটের পেছনে কারণ থাকে টানা কাজ করে যাওয়া। ক্লান্ত মন ও শরীরকে নতুন করে সতেজ করতে সবারই পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন। পড়াশোনা দূরে রেখে তাকে একটু নিজের মতো সময় কাটাতে দিন। তার শরীর ও মনকে একটু আরাম করতে দিন।

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন

ডিভাইস বা ফোনের স্ক্রিনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা শিশুদের মস্তিষ্ককে শান্ত করে না, উল্টো বার্নআউটের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডিভাইসের সামনে না বসিয়ে অফলাইন বা মাঠে খেলতে নিয়ে যান। এতে তারা যেমন শারীরিকভাবে অ্যাকটিভ হবে, তেমনই মানসিক চাপও অনেকটা ঝেড়ে ফেলতে পারবে।

চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখান

মানসিক চাপ বা কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে বুদ্ধি দিয়ে সামলাতে হয়, তা সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই একটু একটু শেখান। পরীক্ষার সময়ের চাপ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আবেগকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে কথা বলুন। মন খারাপ হলে বা চাপ অনুভব করলে তা নিয়ে কথা বলা, ডায়েরি লেখা বা খেলাধুলার অভ্যাস দারুণ উপকারে আসে।

সূত্র: চাইল্ড ফোকাস
শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ
শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ। ছবি: প্রথম আলো
 

Monday, June 15, 2026

কেনিয়ায় কারা এই ‘ম্যাডাম’, কীভাবে শিশুদের বিপদগামী করেন তাঁরা

আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় শিশুদের যৌনবৃত্তিতে জড়াচ্ছেন কিছু নারী। সেখানে এসব নারীকে ‘ম্যাডাম’ নামে ডাকা হয়ে থাকে। তাঁরা মাত্র ১৩ বছর বয়সী শিশুদের পর্যন্ত যৌনকর্মে জড়াতে বাধ্য করছেন। বিবিসি আফ্রিকা আই–এর এক অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউতে দিনরাত ট্রাক ও লরি চলাচল করে। পণ্য ও মানুষ নিয়ে এসব যানবাহন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এমনকি উগান্ডা, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রের মতো অন্য দেশ পর্যন্ত যায়।

শহরটির অবস্থান নাইরোবি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) দূরে। এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি আগে থেকেই যৌন ব্যবসার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এটি শিশুদের যৌন নিপীড়নের জায়গাও হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের দুজন নারী অনুসন্ধানী প্রতিবেদক যৌনকর্মী সেজে ওই শহরের যৌন ব্যবসা চক্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ওই দুই অনুসন্ধানী সাংবাদিক এমন ভাব করছিলেন, যেন কীভাবে ‘ম্যাডাম’ হওয়া যায়, তা তাঁরা শিখতে চান।

ওই দুই সাংবাদিক গোপনে কিছু ভিডিও ধারণ করেছেন। ভিডিওতে অন্য দুজন নারীকে কথা বলতে শোনা যায়। তাঁরা বলছিলেন, এটা যে বেআইনি কাজ, তা তাঁরা জানেন। এরপর ওই দুই নারী বিবিসির সাংবাদিকদের সঙ্গে যৌন পেশায় জড়িত কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের পরিচয় করিয়ে দেন।

বিবিসি ওই ভিডিও এবং তাদের পাওয়া সব তথ্য গত মার্চে কেনিয়ার পুলিশকে দেয়। বিবিসির ধারণা, এরপর ‘ম্যাডামরা’ তাঁদের জায়গা বদলে ফেলেছেন। পুলিশ বলেছে, যেসব নারী ও মেয়েদের ভিডিওতে দেখা গেছে, তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

কেনিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। মামলায় জিততে হলে পুলিশের ও সংশ্লিষ্ট শিশুর সাক্ষ্য দরকার হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময় শিশুরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়।

বিবিসির রাতের আঁধারে গোপনে ধারণ করা ঝাপসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী নিজেকে ‘নিয়ামবুরা’ নামে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি হেসে হেসে বলছেন, ‘তারা তো এখনো বাচ্চা। তাই একটু মিষ্টি দিলেই সহজে কাবু করে ফেলা যায়।’

নিয়ামবুরা নামের ওই নারী বলেন, ‘মাই মাহিউতে যৌনবৃত্তি যেন নগদ ফসলের মতো। ট্রাকচালকেরাই এর মূল চালিকাশক্তি। আমরা সেখান থেকেই মুনাফা করি। মাই মাহিউতে এটা এখন একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।’

নিয়ামবুরা বলেন, তাঁর কাছে মাত্র ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়ে আসে। সে ছয় মাস ধরে যৌন পেশায় কাজ করছে।

নিয়ামবুরা আরও বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে কাজ করাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি তাদের শহরে খোলাখুলি আনতে পারেন না। আমি শুধু গভীর রাতে, চুপিসারে তাদের বাইরে নিয়ে আসি।’

কেনিয়ার জাতীয় আইনে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের নিজেদের সম্মতিতে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে অনেক পৌরসভায় স্থানীয় আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাই মাহিউ শহরটি নাকুরু কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত। সেখানে এটা নিষিদ্ধ নয়।

তবে কেনিয়ার দণ্ডবিধি অনুযায়ী, যৌনবৃত্তি থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবন যাপন করাটা বেআইনি। হোক তিনি যৌনকর্মী নিজে বা কোনো দালাল। ১৮ বছরের কমবয়সী কোনো শিশুকে যৌন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিক্রি বা পাচার করার অপরাধে ১০ বছর থেকে শুরু করে আমৃত্যু কারাদণ্ড হতে পারে।

আরেকটি সাক্ষাতে নিয়ামবুরা গোপনে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তিনজন কিশোরী একটি সোফায় বসে ছিল। আরেকজন বসে ছিল একটি কাঠের চেয়ারে। এরপর নিয়ামবুরা ঘর থেকে বের হয়ে যান। আর এতে অনুসন্ধানকারী একা একা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।

মেয়েরা জানায়, তাদের দিনে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়।

একজন মেয়ে বলে,‘ অনেক সময় এক দিনেই অনেক লোকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে হয়। খদ্দেররা এমন সব কাজ করতে বাধ্য করেন, যা কল্পনাও করা যায় না।’

কেনিয়ায় কতজন শিশুকে জোর করে যৌন ব্যবসায় যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১২ সালে কেনিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছিল, প্রায় ৩০ হাজার শিশু তখন যৌনকাজে জড়িত ছিল।

কেনিয়ার তৎকালীন সরকার এবং বর্তমানে বিলুপ্ত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইরাডিকেট চাইল্ড প্রস্টিটিউশন ইন কেনিয়া’র দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল।
২০২২ সালে গ্লোবাল ফান্ড টু অ্যান্ড মডার্ন স্লেভারি নামের এনজিও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিলিফি ও কোয়ালে কাউন্টিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিশুকে জোর করে যৌনকর্মে যুক্ত করা হয়েছে।

বিবিসির আরেক অনুসন্ধানী সাংবাদিক যৌনপল্লির অন্য এক নারীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন। ওই নারী নিজের নাম চেপ্টু বলে উল্লেখ করেন।

বিবিসির সাংবাদিককে চেপ্টু বলেন, তিনি কমবয়সী মেয়েদের বিক্রি করে জীবিকা উপার্জন করেন এবং আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারেন। বেআইনি হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসা খুব গোপনে করতে হয়।

চেপ্টু আরও বলেন, ‘যদি কেউ ছোট মেয়ের চাহিদা জানান, আমি তাঁদের কাছে অর্থ চাই। আমাদের নিয়মিত কিছু খদ্দেরও আছেন, যাঁরা বারবার তাদের জন্য ফিরে আসেন।’

চেপ্টু গোপন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে একটি ক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অধীন কাজ করা চারজন মেয়ে ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৩ বছর। বাকিরা বলেছে, তাদের বয়স ১৫।

কমবয়সী মেয়েদের থেকে কত আয় হয়, সে বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন চেপ্টু। তিনি বলেন, মেয়েরা প্রতি ৩ হাজার কেনিয়ান শিলিং (প্রায় ২৩ ডলার বা ১৭ পাউন্ড) আয় করলে, তাতে তার নিজের ভাগের পরিমাণ হয় ২ হাজার ৫০০ শিলিং (প্রায় ১৯ ডলার বা ১৪ পাউন্ড)।

আরেক সাক্ষাতে মাই মাহিউ শহরের একটি বাড়িতে চেপ্টু অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে একা রেখে চলে যান। ওই মেয়েদের একজন বলে, সে গড়ে প্রতিদিন পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়।

কেনিয়ার যৌনবৃত্তি এক জটিল ও অন্ধকার জগৎ। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ উভয়ই শিশুদের যৌনবৃত্তিতে নিয়ে আসার সঙ্গে জড়িত।

মাই মাহিউ শহরে ঠিক কতজন শিশুকে জোর করে এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এই ছোট্ট শহরে তাদের খুঁজে পাওয়া খুব সহজ।

‘বেবি গার্ল’ নামে পরিচিত এক সাবেক যৌনকর্মী এখন মাই মাহিউ শহরে যৌন নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মেয়েদের আশ্রয় ও সহায়তা দেন। বর্তমানে ৬১ বছর বয়সী এ নারী ৪০ বছর যৌনকাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ২০-এর কোটায়, তখন তিনি পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে এসে পথে বসেন। তাঁর সঙ্গে তিন সন্তান ছিল এবং তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে তিনি যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

বাড়ির সামনের অংশে একটি আলো ঝলমলে ঘরে কাঠের টেবিলে বসে এই নারী বিবিসির সাংবাদিককে চারজন তরুণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই চারজনকে শৈশবে মাই মাহিউ শহরের কিছু ‘ম্যাডাম’ জোর করে যৌনবৃত্তির পথে ঠেলে দিয়েছিলেন।

প্রত্যেক তরুণীই বলেছেন, হয় তাঁদের মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল অথবা মা-বাবা বেঁচে ছিলেন না, নয়তো বাড়িতে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তাঁরা নিজেদের বাড়ি থেকে পালিয়ে নিরাপত্তা পাওয়ার আশায় মাই মাহিউতে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে আবারও নিপীড়নের শিকার হন তাঁরা।

মিশেল নামের এক তরুণী বলেন, ১২ বছর বয়সে তিনি মা–বাবাকে এইচআইভির কারণে হারিয়েছিলেন। তারপর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। রাস্তায় এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়। ওই লোক তাঁকে থাকার জায়গা দেন। কিন্তু তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন শুরু করেন।

দুই বছর পর মাই মাহিউর এক ‘ম্যাডাম’ তাঁর কাছে এসে তাঁকে যৌনকর্মে যুক্ত হতে বাধ্য করেন।

লিলিয়ান নামের ১৯ বছর বয়সী আরেক তরুণী বলেন, ছোটবেলাতেই তিনি মা–বাবাকে হারিয়েছেন। তিনি তাঁর চাচার কাছে ছিলেন। ওই চাচা তাঁকে গোসলের সময় গোপনে ভিডিও করেন এবং সেই ভিডিও বন্ধুদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে পরে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।

ঘটনার সময় লিলিয়ানের বয়স ১২ বছর ছিল। তিনি তখন পালিয়ে যান। এরপর আবার এক ট্রাকচালকের হাতে ধর্ষণের শিকার হন। ওই ট্রাকচালকই তাঁকে মাই মাহিউতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে এক নারী তাঁকে সেখানে যৌনকর্মের সঙ্গে যুক্ত করেন।

এই তরুণীরা এখন ‘বেবি গার্ল’-এর আশ্রয়ে আছেন। তাঁদের দুজন এখন ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে আর দুজন সৌন্দর্য চর্চাকেন্দ্রে কাজ করছেন।

তাঁরা সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ‘বেবি গার্লকে’ সহযোগিতা করেন।

লিলিয়ান ফটোগ্রাফি শেখা এবং অতীতের নির্যাতনের ক্ষত থেকে সেরে ওঠার ওপর মনোনিবেশ করেছেন।

লিলিয়ান বলেন, ‘আমি আর ভয় পাই না। কারণ, “বেবি গার্ল” আমার পাশে আছেন। তিনি আমাদের অতীতকে ভুলে যেতে সাহায্য করছেন।’

কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত
কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে

Thursday, May 28, 2026

কিশোরদের যৌন সম্পর্ক কি অপরাধ, কী চাচ্ছেন ভারতের শিশু অধিকারকর্মীরা

ভারতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য যৌন সম্পর্ক বেআইনি। প্রচলিত আইনে এটিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এ বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দেশটির আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। এ–সংক্রান্ত আইনকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ভারতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জয়সিং যুক্তি দেন, পারস্পরিক সম্মতিতে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক শোষণমূলক নয় কিংবা নিপীড়নমূলকও নয়। এ ধরনের সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধের আওতার বাইরে রাখতে আদালতের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।

আদালতে জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক নথিতে জয়সিং বলেন, আইনের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো নিপীড়ন রোধ করা, ওই সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার জয়সিংয়ের এই দাবির বিরোধিতা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের যৌন সম্পর্কের বৈধতা দিলে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। এতে তারা নিপীড়ন ও শোষণের শিকার হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টে জয়সিংয়ের এই চ্যালেঞ্জের কারণে ভারতে আবারও যৌন সম্পর্কে সম্মতি এবং শিশুদের যৌন সুরক্ষা আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধান আইন পসকো অ্যাক্ট-২০১২।

এ আইন অনুযায়ী, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেও ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যৌন সম্পর্কে জড়ালে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিষয়টি পসকো আইন থেকে বাদ দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ভারতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের এই আইনের আওতামুক্ত রাখলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে। অন্যদিকে এই মতের বিরোধীরা বলছেন, এতে মানব পাচার ও বাল্যবিবাহের মতো অপরাধ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিপীড়নের শিকার হলে কিশোর-কিশোরীরা কি আদৌ প্রমাণের দায়ভার বহন করতে সক্ষম? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ করে দেয় কে। আর এই আইন আদতে কার স্বার্থ রক্ষা করে?

অনেক দেশের মতো ভারতেও যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে এই বয়স ভিন্ন হতে পারে। তবে ভারতজুড়ে একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া আছে।

ইউরোপের অধিকাংশ দেশ কিংবা যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়স ১৬। কিন্তু ভারতে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা এর চেয়ে বেশি।

১৮৬০ সালে যখন ভারতে ফৌজদারি বিধি চালু হয়, তখন যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির ন্যূনতম বয়স ছিল ১০ বছর। ১৯৪০ সালে এই বিধি সংশোধনের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়।

পরে ২০১২ সালে পসকো আইনের মধ্য দিয়ে বড় পরিবর্তন আসে। এতে যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স ১৮ বছরে উন্নীত করা হয়। এক বছর পর ভারতের ফৌজদারি আইন এই পরিবর্তন অনুযায়ী সংশোধিত হয়। ২০২৪ সালে প্রণীত নতুন দণ্ডবিধিতেও এই বয়সসীমা বহাল রাখা হয়েছে।

ভারতে কিশোর-কিশোরীদের সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক কেন অপরাধ

কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেক শিশু অধিকারকর্মী এবং এমনকি আদালতও যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়সসীমার সমালোচনা করেছেন এবং এই বয়সসীমা ১৬ বছরে নামিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পসকো আইন কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্করা এ ধরনের সম্পর্কে বাধা দিতে এই আইনের অপব্যবহার করেন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে।

ভারতে এখনো যৌনতা একটি নিষিদ্ধ ও অস্বস্তিকর বিষয়। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোটি কোটি ভারতীয় কিশোর-কিশোরী যৌন সম্পর্কে সক্রিয়।

শিশুদের যৌন নিপীড়ন রোধে কাজ করা সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন-মুসকানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শর্মিলা রাজ বলেন, ‘আমাদের সমাজ জাত, শ্রেণি ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত। ফলে সহজেই এ আইনের অপব্যবহার করা যায়।’

২০২২ সালে কর্ণাটক হাইকোর্ট ভারতের আইন সংস্কার সংস্থা ল’ কমিশনকে নির্দেশ দেন, যেন তারা পসকো আইনের আওতায় যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স পুনর্বিবেচনা করে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে বলা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, বহু ক্ষেত্রে ১৬ বছর পেরোনো কিশোরীরা প্রেমে পড়ে পালিয়ে যায় এবং যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু পরে শুধু ছেলেটির বিরুদ্ধে পসকো আইন ও দণ্ডবিধির আওতায় অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।

পরের বছর ২০২৩ সালে ল’ কমিশনের প্রতিবেদনে বয়সসীমা কমানোর প্রস্তাব নাকচ করা হয়। তবে কমিশন সুপারিশ করেছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে সাজা দেওয়ার সময় বিচারকদের জন্য ‘নির্দেশিত বিচারিক বিবেচনার’ সুযোগ রাখা উচিত। এর অর্থ হলো বিচারক যাতে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে সাজা কমাতে বা মওকুফ করতে পারেন।

এটি এখনো কার্যকর না হলেও মামলার তথ্য ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন আদালত এই নীতির ভিত্তিতে জামিন, খালাস বা মামলা বাতিলের সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।

শর্মিলা রাজসহ অনেক শিশু অধিকারকর্মী চান, এই বিধানটি যাতে আইনে পরিণত হয়। শুধু প্রস্তাব আকারে থাকলে আদালত তা উপেক্ষা করতে পারেন।

ইন্দিরা জয়সিং মনে করেন, শুধু বিচারকের বিবেচনা যথেষ্ট নয়। কারণ, অভিযুক্তকে পুলিশের জেরা, আদালতের দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও সামাজিক লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়। ভারতের বিচারব্যবস্থা এতটাই ধীর যে বহু মানুষ এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই শাস্তি পেয়ে যান।

ইন্দিরা জয়সিং আরও বলেন, প্রতিটি মামলা বিচারকের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া সেরা সমাধান নয়। কারণ, এতে ফলাফল অসম হতে পারে এবং পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কাও থেকে যায়।

ভারতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পসকো আইনের আওতায় বিশেষ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ।

জয়সিংয়ের দাবি, বয়সের ব্যবধান যদি খুব সামান্য হয় এবং উভয়েই সম্পর্কের জন্য সম্মত থাকে, তবে সে যৌন সম্পর্ককে যাতে ধর্ষণ বা শোষণের মতো অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করা হয়।

প্রতীকী ছবি: রয়টার্স  
প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

Wednesday, May 20, 2026

সাইবার বুলিং কাদের ওপর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলে by কুমকুম হাবিবা জাহান

প্রযুক্তির বিপ্লব আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও উন্নত করার পাশাপাশি কিছু সংকটও তৈরি করেছে। ক্রমশ বাড়তে থাকা সাইবার বুলিং যার মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করছে। আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশেষ এই দিনে জেনে নেওয়া যাক কাদের ওপর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে সাইবার বুলিং। আর আমাদের করণীয়ই–বা কী।

বেড়েই চলেছে সাইবার বুলিং

বিনোদন থেকে শুরু করে পড়াশোনার জন্যও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনকার সময়ের একটা বড় অংশ কাটে ইন্টারনেটে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ইন্টারনেটের পরিসরও এখন অনেক বড়। কৌতুক করার নামে ট্রল, আক্রমণাত্মক মিম, বডিশেমিং, মিথ্যাচার, অনলাইনের দুনিয়ায় দল বেঁধে চেহারা ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কটু কথা বলা—এমন সব ঘটনা বেড়েই চলেছে।

‘বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রেন্ড ২০২৩’–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে রিপোর্ট করা সাইবার অপরাধের মধ্যে ৫২ শতাংশই ছিল সাইবার বুলিং। আর এর বড় একটা অংশের শিকার হলো স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী। সাইবার বুলিং এমন ব্যাপক আকার ধারণ করার পেছনে রয়েছে সামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক কারণ। যেমন ধর্মের অপব্যাখ্যা, অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা, সংবেদনশীলতা ও শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। এ ধরনের হয়রানির সবচেয়ে ভয়ানক ফল হলো মানসিক বিপর্যয়। হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন ভুক্তভোগীরা। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও কমে যায়। যে কারণে তাঁদের সামাজিক আচরণও বদলে যায়।

বুলিংয়ের শিকার শিশু-কিশোরদের মানসিক এই অবস্থা সব সময় বাইরে থেকে বোঝাও যায় না। অথচ মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, আত্মসম্মানের অভাব ও একাকিত্বের মতো সমস্যা তাঁদের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে যায়। একজন কিশোর বা কিশোরীর জন্য এ ধরনের মানসিক চাপ অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা এগুলোর সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’ বা পাত্তা না দেওয়ার মতো মানসিক পরিপক্বতা এই বয়সে তাঁদের ভেতর থাকে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর স্বাভাবিক বিকাশ। এগুলো কখনো কখনো তাদের মধ্যে প্রতিহিংসার মনোভাব তৈরি করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো, সাইবার বুলিংয়ের কারণে আত্মহননের পথও বেছে নেন কেউ কেউ।

এখন তবে কী করণীয়?

দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাইবার অপরাধ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কাজ করছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শুধু এ পদক্ষেপ গ্রহণই যথেষ্ট নয়। সমাজের বড় একটি অংশ এখনো এই সমস্যার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে পারেনি। এই সংকট প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। স্কুল থেকেই শিশুদের ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশের কিছু স্কুলে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। যেমন শিক্ষার্থীদের মানসিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং (এসইএল) ক্লাস চালু করেছে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশু ও তরুণ শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এমন পাঠ্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

* কুমকুম হাবিবা জাহান, হেড অব জুনিয়র স্কুল, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা। 

সাইবার বুলিংয়ের ভুক্তভোগীরা হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন
সাইবার বুলিংয়ের ভুক্তভোগীরা হতাশা, মানসিক চাপ, হীনম্মন্যতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্বসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগেন। ছবি: প্রথম আলো