Thursday, July 3, 2014

‘বিশ্বকাপের ফাইনালে থাকছেন শাকিরা’

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের মাধ্যমে উঠে আসেন শাকিরা। বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলেন ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গান দিয়ে। সেবার দাক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মাতিয়েছিলেন বিখ্যাত কলাম্বিয়ান পপ-সঙ্গীত শিল্পী শাকিরা। এরপর দীর্ঘ চার বছর পর আবারও তিনিই দৃশ্যপটে। যদিও এবারের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আয়োজকরা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী সঙ্গীতের জন্য বেছে নেন আমেরিকান সংগীত শিল্পী জেনিফার লোপেজকে। তার সঙ্গে ছিলেন পিটবুল ও ক্লদিয়া লেইত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা পরিবেশন করেন ‘ওলে ওলা’। কিন্তু শাকিরার ‘লা লা লা’র জনপ্রিয়তায় ছাড়িয়ে যায় ‘ওলে ওলা’কে। এবার শাকিরার ‘লা লা লা’ ঝড়তোলে ফুটবল প্রেমিদের মধ্যে। আর তাই ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজকরা সমাপনী অনুষ্ঠানটা জমিয়ে তুলতে রিওতে নিয়ে আসছেন শাকিরাকে। আর কলম্বিয়ার এই সঙ্গীত শিল্পী বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে গানটি গাইতে পারব বলে খুব রোমাঞ্চিত। এটি পরিবেশনের জন্য আর তর সইছে না বলে জানান শাকিরা। ‘লা লা লা (ব্রাজিল ২০১৪)’ গানের মিউজিক ভিডিওর পুরোটা জুড়েই আছে ফুটবল, মেসি ও নেইমার’রা।

মিয়ানমারে মুসলমানদের দোকান ও মসজিদে হামলা: নিহত ২

পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারে ফের জাতিগত সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো গতকালও তা অব্যাহত ছিল। এতে ২ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের একজনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই ব্যক্তির জানাজার প্রস্তুতি চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভোরে ফজরের নামাজ পড়ার উদ্দেশে মসজিদে যাওয়ার পথে দাঙ্গাবাজদের হামলার শিকার হন ওই ব্যক্তি। রাস্তায় তার মৃতদেহ ফেলে রেখে চলে যায় দুষ্কৃতকারীরা। নিহত অপর ব্যক্তি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে তার পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গেছে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দাঙ্গাবাজ কয়েক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে মান্দালয় শহরে ঢুকে মসজিদ ও মুসলমানদের দোকানপাট লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে থাকে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ শহরটিতে গত মঙ্গলবার রাতে শুরু হওয়া এ সহিংসতা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এর আগে অন্যান্য প্রদেশ ও শহরে বহু হামলা হলেও, মান্দালয় শহরে সহিংসতার মাত্রা ছিল কম। বহু বছর ধরে শহরটিতে সম্প্রীতির সঙ্গেই বসবাস করছিল মুসলমান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা। সাম্প্রতিক এ ঘটনায় সেখানে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১২ সালে মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতা শুরু হয় এবং এ পর্যন্ত তাতে ২৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। মূলত, মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর কট্টরপন্থী বৌদ্ধরা অধিকাংশ হামলাগুলো চালায়।

ঘুষ লাগে ৬০ ঘাটে by মুজিব মাসুদ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট কার্গো কমপ্লেক্স ও কার্গো ভিলেজ এখন চুরি আর লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। এখান থেকে পণ্য ছাড়াতে ৬০ ঘাটে ঘুষ দিতে হয়। অন্যথায় কোনো পণ্য নড়ে না। বাংলাদেশ বিমান, কুরিয়ার সার্ভিস আর কাস্টমসের একটি সিন্ডিকেট এই ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সাধারণ ব্যবসায়ীরা এর নাম দিয়েছেন ঘুষ চুরি আর দুর্নীতির বন্দর।

ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ বলেছেন, একটি পণ্য খালাস করতে বিমান ও কাস্টমসের প্রায় ৬০টি ঘাটে ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। আর প্রতিটি ঘাটে ঘাটে দিতে হয় মোটা অংকের টাকার ঘুষ। ঘুষের এই হার ৫শ’ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার বেশি। জরুরি হলে গুনতে হয় দ্বিগুণের বেশি। তাদের অভিযোগ একটি ফ্লাইট অবতরণের ২০ থেকে ২৫ দিনের আগে ওই ফ্লাইটের পণ্য খালাস সম্ভব হচ্ছে না। শুধু ঘুষ না দেয়ার কারণে এই বিলম্ব। ছাড় না পাওয়ায় পণ্যগুলো বিমানবন্দরের রানওয়ের খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পচতে থাকে। এই সুযোগে একটি সিন্ডিকেট কার্টন ভেঙে, পলিথিন খুলে হরহামেশা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে শত শত কোটি টাকার মূল্যবান পণ্য। অরক্ষিত পুরো টার্মিনাল। গার্মেন্টস এক্সেসরিস, মোবাইল ফোন, কেমিক্যাল থেকে শুরু করে এমন কোনো পণ্য নেই এখান থেকে চুরি আর লুট হচ্ছে না। প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি চুরি ও হারিয়ে যাওয়া মালামালের অভিযোগ বিমানের ক্লেইম শাখায় ফ্লাইলবন্দি হয়ে আছে।
বিমানের কার্গো কমপ্লেক্সের প্রধান জেনারেল ম্যানেজার আলী আহসান বাবু যুগান্তরকে জানান, কার্গো সেক্টরটি বিমানের সবচেয়ে বড়। কিন্তু এখানে পর্যাপ্ত জনবল নেই। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও নেই। তাই আমদানি-রফতানিকারকদের মালামাল খালাস ও ছাড় করতে কিছু সমস্যা হচ্ছে। চুরির ঘটনাও হচ্ছে। বেশ কিছু চুরি ধরাও পড়েছে বিমানের সিকিউরিটি গার্ডদের হাতে। তবে ইতিমধ্যে সেক্টরটিকে কম্পিউটারাইজ করা হয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতিও ক্রয় করা হয়েছে। কার্গো টার্মিনাল তৈরি করা হয়েছে।
ঘুষ-দুর্নীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, আগে ম্যানুয়ালি কাজ হওয়ায় কিছু ঘুষ-দুর্নীতি ছিল। এখন সবকিছু কম্পিউটারাইজড হয়ে গেছে। তার মতে, কার্গো কমপ্লেক্সে অন্তত ২০টি সংস্থার লোকজন কাজ করছে। এত সংস্থার কে কখন কি করছে তা মনিটরিং করা খুবই কষ্টকর। তারপরও তিনি বলেন, যদি কোনো সিএন্ডএফ এজেন্ট বা আমদানি-রফতানিকারক স্পেসিফিক কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেয় তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের জায়গার মালিক সিভিল এভিয়েশন। ইতিমধ্যে তারা বিমানকে কার্গো টার্মিনাল করে দিয়েছে। আরও জায়গা দেয়ার বিষয়েও কথাবার্তা চলছে। তিনি বলেন, ওয়্যারহাউসগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় মালামাল রানওয়েতে রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে দ্রুত ছাড় করা সম্ভব হলে এই সমস্যা থাকবে না। তিনি বলেন, সমস্যা না থাকলে তার টেবিলে ১ মিনিটের বেশি কোনো ফাইল থাকে না। একই নির্দেশ তিনি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও দিয়েছেন।
সিএন্ডএফ এজেন্টরা বলেন, পণ্যসামগ্রী ওয়্যারহাউসের বাইরে থাকলেও দিতে হচ্ছে গোডাউন চার্জ। ১০ দিন পরপর এই চার্জ বাড়তে থাকে। একটি অ্যারো বিলের অধীনে থাকা মালামাল একসঙ্গে না রেখে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হচ্ছে। এগুলো খুঁজে বের করতেও দিনের পর দিন কাজ করতে হচ্ছে আমদানিকারকদের প্রতিনিধিকে। নিয়ম অনুযায়ী ফ্লাইট থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালামাল নির্ধারিত গোডাউনে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু গোডাউন খালি থাকলেও এই কাজ কেউ করছে না। বর্তমানে কার্গো কমপ্লেক্সে দুটি ওয়্যারহাউস, একটি স্ট্রং রুম ও একটি ডেঞ্জার রুম রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো মালামাল রাখা হচ্ছে না।
শাহজালাল ও চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরকে ঘিরে আমদানি-রফতানিকারকদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় সাড়ে ১৪শ’ সিএন্ডএফ এজেন্ট কাজ করছেন। নিয়ম অনুযায়ী মালামাল আনা-নেয়া থেকে শুরু করে বিল তৈরি সংক্রান্ত সব কাজ বিমান ও কাস্টমস কর্মীদের করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সব কাজ করছে সিএন্ডএফ কর্মীরা। সংশ্লিষ্টরা ব্যস্ত ঘুষ বাণিজ্যে। মালামাল আনা-নেয়ার জন্য ট্রলি, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিও সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন থেকে কিনে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালটি সোনা চোরাচালানিদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ায় কার্গো কমপ্লেক্সটিকে নিরাপদ রুটে পরিণত করেছে। গত সপ্তাহে কুরিয়ার সার্ভিসের একটি কনটেইনার থেকে ৭ কেজি সোনা উদ্ধার করেছে ঢাকা কাস্টমস।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিভিল এভিয়েশন, বিমান, কার্গো টার্মিনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কুরিয়ার সার্ভিস, থানা পুলিশ, বিমান সিকিউরিট, কাস্টমস, এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন)সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে গড়া একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। আগে বিল সংক্রান্ত সবকিছু ম্যানুয়ালি হতো। সম্প্রতি সব কিছু কম্পিউটারাইজড করা হয়েছে। এ কারণে ঘুষের রেটও বেড়ে গেছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য মাত্র একটি গেট দিয়ে মালামাল আনা-নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় গেটটি। অথচ সংশ্লিষ্ট চোরাই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ব্যবহার করছে সবগুলো গেট। প্রকাশ্যে তারা গাড়ি নিয়ে সবগুলো গেইট দিয়ে নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়া করছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীই নয়, যে কেউ ঢুকে যেতে পারে অ্যাপ্রোনসহ স্পর্শকাতর এলাকায়। বুধবার সরেজমিন কার্গো কমপ্লেক্সের রানওয়েতে গিয়ে দেখা গেছে আইডি কার্ড, অ্যাপ্রোন কিংবা কোনো ধরনের পরিচয়পত্র ছাড়া অন্তত ২শ’ সাধারণ মানুষ কমপ্লেক্সে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। অনেকে কনটেনাইর থেকে পলিথিন খুলে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ পচা-গলা কাপড়ের বান্ডিল, নষ্ট গার্মেন্টস সামগ্রী কুড়িয়ে নিচ্ছে।
জানা গেছে এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিদেশ থেকে আসা মূল্যবান প্যাকেট-কার্টন ছিঁড়ে মোবাইল সেট, গার্মেন্টস সামগ্রী, কেমিক্যাল বের করে ওই প্যাকেটে অন্য দ্রব্যসামগ্রী কিংবা নকল ও ভেজাল সামগ্রী ঢুকিয়ে দিচ্ছে। প্রকাশ্যে এভাবে কার্টন খোলার ঘটনা ঘটলেও কেউ বাধা দিচ্ছে না। উত্তরা ও হাতিরপুল এলাকার একটি সিন্ডিকেট এসব নকল ও ভেজাল সামগ্রীর জোগান দিচ্ছে। বিনিময়ে তারাও প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা আয় করছে। কার্গো কমপ্লেক্সে পণ্যসামগী দেখার জন্য পর্যাপ্ত সিকিউরিটি গার্ড নেই। যার যার মালামাল তাকে কিংবা তার মনোনীত সিএন্ডএফ এজেন্টকে পাহারা দিতে হচ্ছে। যার কারণে টার্মিনালের ভেতর গিজগিজ করছে মানুষজন।
সিএন্ডএফ এজেন্ট নেতৃবৃন্দ জানান, পণ্যসামগ্রী রাখার মধ্যে কোনো ডিসিপ্লিন নেই। একজন আমদানিকারকের একটি প্যাকেট টার্মিনালে পড়ে আছে। আরেকটি প্যাকেট পড়ে আছে আধা কিলোমিটার দূরের বিমানের রানওয়েতে। চুরি হওয়া কিংবা নষ্ট হওয়া মালামালের ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাচ্ছে না। জরিমানা দিলেও সেটা নামকাওয়াস্তে। গ্রিন চ্যানেল, বিমানের কার্গো গোডাউনসহ বিমান ল্যান্ডিং এরিয়াতে অযতেœ, অবহেলায় মূল্যবান ও স্পর্শকাতর মালামাল পড়ে থাকে দিনের পর দিন। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে নষ্ট হলেও কেউ সংরক্ষণ করে না। বেশির ভাগ মালামালের প্যাকেট ছেঁড়া, ফাটা। যার কারণে প্যাকেট থেকে পড়ে গিয়ে শত শত কোটি টাকার মালামাল হারিয়ে যাচ্ছে। খোলা আকাশের নিচে বিমানের রানওয়েতে মালামাল পড়ে থাকলেও ব্যবসায়ীদের ঘণ্টা হিসাবে গোডাউন চার্জ দিতে হচ্ছে বিমানকে।
গ্রিন চ্যানেল গোডাউনে শুল্কমুক্ত মালামাল থাকার নিয়ম থাকলেও সেখানে রাখা হচ্ছে শুল্কযুক্ত মালামাল। সময়মতো লোডার, ট্রলি, ফর্কলিফট না থাকায় সেসব মাল বের করা যায় না। নিয়ম অনুযায়ী টার্মিনালের লোডাররাই মালামাল বের করে দেয়ার কথা। কিন্তু সময়মতো কোনো লোডার পাওয়া যায় না। টাকা ছাড়া তারা কোনো কাজই করে না। অভিযোগ রয়েছে, বিমানের শ্রমিক লীগ সমর্থিত সিবিএ নেতারা এই কার্গো কমপ্লেক্স থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি টাকার বেশি ঘুষ বাণিজ্য করছে।
কমপ্লেক্স থেকে মালামাল চুরি হচ্ছে যেভাবে : ১৯৮৪ সালের দিকে সিভিল এভিয়েশন কার্গো ভিলেজ ভবন তৈরি হয়। জানা গেছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি কার্গো ফ্লাইট ওঠানামা করে। নিয়ম হল ফ্লাইট নামার সঙ্গে সঙ্গে বিমান কর্তৃপক্ষ অ্যারোবিল অনুযায়ী মালামাল গোডাউনে সংরক্ষণ করা। এরপর অ্যারো বিল দেখিয়ে আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত সিএন্ডএফ এজেন্ট শুল্কায়ন শেষে মালামাল তাদের হেফাজতে নিয়ে নেবে। কিন্তু এ নিয়ম মানা হয় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে কার্গো টার্মিনালকে ঘিরে বর্তমানে সক্রিয় প্রায় অর্ধশত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। টুইন ট্রাক্টর চালক, পিকআপ চালক, লোডার, ট্রলিম্যান ও গাড়ির ড্রাইভারদের নেতৃত্বে রয়েছে একটি গ্র“প। বে (উড়াজাহাজে তোলার জন্য মাল রাখার স্থান) ও কার্গো এলাকায় রাখা মালামালের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ বিমানের নিরাপত্তা শাখার। ওই শাখার একটি সংঘবদ্ধ গ্র“পই রয়েছে চোরাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। বিমানের গোডাউন থেকে কবির এন্টারপ্রাইজের প্রায় ৫ কোটি টাকা দামের এলসি করা ৩০ বেল্ট গার্মেন্টস কাপড়ের পুরোটাই চুরি হয়ে যায়। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক মাকসুদুর রহমান বাদী হয়ে এয়ারফ্রেইটের জেনারেল ম্যানেজার বরাবর আবেদন করেন। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি তার আবেদনপত্রটিও গায়েব করে দিয়েছে। ১৮ এপ্রিল চোরাই চক্র প্রকাশ্যে টার্মিনাল এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে করে প্রায় ১০ কোটি টাকার কেমিক্যাল চুরি করে নিয়ে যায়। সম্প্রতি খোদ সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের বন্দর সম্পাদকের বিপুল পরিমাণ গার্মেন্টস সামগ্রী ও কাপড় চুরি হয়ে গেছে। এই ঘটনায় তিনি বিমানের সংশ্লিষ্ট শাখায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিমান সূত্রে জানা গেছে, গত মাসের শেষ দিকে গাজীপুর এলাকার একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর দুই কার্টন মূল্যবান বোতাম চুরি করে ওই কার্টনে মাঠ থেকে কাটা ঘাস ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। রাজধানীর মোতালেব প্লাজার একজন ব্যবসায়ী জানান, তার ১০টি কার্টন খুলে কে বা কারা মূল্যবান ৬ হাজার মোবাইল সেট নিয়ে গেছে। কার্টনগুলো খুলে দেখা গেছে সেখানে ৫শ’ খেলনা মোবাইল সেট।
ঢাকা কাস্টমস্ এজেন্টস্ অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এসএম এ খায়ের বলেন, গোডাউনে মালামাল আসার পর ফ্লাইট চেকিং করে মালামাল কোথায় কি অবস্থায় রাখা হয় তার সঠিক তথ্য বিমানের এয়ারওয়ে বিলে লেখা থাকার কথা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লেখা থাকলেও সঠিকভাবে ওই মালামাল পাওয়া যায় না। মালামাল খোঁজার জন্য বিমানে কর্তব্যরত অফিসারের শরণাপন্ন হলে তারা আবেদন করার পরামর্শ দেন। হেলপার দিয়ে ওই মাল খুঁজে দেয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেলেও ওই মাল আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ প্রসঙ্গে এয়ারফ্রেইটের জেনারেল ম্যানেজার (আমদানি) একেএম মঞ্জরুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার অফিসে গেলে তিনি সংবাদপত্রের সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না বলে সরাসরি জানিয়ে দেন। রুম থেকে বেরিয়ে এসে এই প্রতিবেদকের ভিজিটিং কার্ড ফেরত দিয়ে জেনারেল ম্যানেজার (কার্গো) আলী আহসান বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। সিএন্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ রোজা শুরুর পর ২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিমানের কোনো অফিসারকে আসনে পাওয়া যায় না। তবে তারা জানান, ম্যানেজার থেকে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা কার্গো কমপ্লেক্সকে ভালো করার চেষ্টা করলেও শ্রমিক লীগ সমর্থিত সিবিএ নেতাদের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সবকিছু ভেস্তে যাচ্ছে।

ইরাকে পার্লামেন্টে বিশৃঙ্খলা, স্পিকার নির্বাচন হয়নি

আইএসআইএল জঙ্গিরা ইরাক ও সিরিয়ার অধিকৃত এলাকা
নিয়ে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে সোমবার সিরিয়ার
রাক্কার রাস্তায় ট্যাংক নিয়ে উল্লাস করে জঙ্গিরা। রয়টার্স
ইরাকে জাতিগত সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার নতুন পার্লামেন্টের সম্মিলিত অধিবেশন বসেছে। তবে বর্তমান সংকট নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ফলে পার্লামেন্টে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কয়েকজন সদস্য পার্লামেন্ট থেকে ওয়াকআউটও করেন। এদিকে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ২০০ সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। খবর এএফপি ও রয়টার্সের। মার্কিন কংগ্রেসের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, ‘বাগদাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস, পৃষ্ঠপোষক ব্যবস্থা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ২০০ সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছি। মার্কিন নাগরিক ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য এসব সেনা মোতায়েন করা হবে। তারা প্রয়োজনে লড়াইয়ের জন্যও প্রস্তুত থাকবে।’ মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, ইরাকে মার্কিন দূতাবাস ও নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য এর আগে পাঠানো সেনাদল গত রোববার বাগদাদে পৌঁছায়। সর্বশেষ আরও সেনা পাঠানোর ফলে তাদের মোট সংখ্যা হবে ৭০০। সুন্নিপন্থী ইসলামিক স্টেট অব দ্য ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) জঙ্গিরা গত তিন সপ্তাহে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকা দখল করে। তারা সেখানে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠারও ঘোষণা দিয়েছে। ইরাকি পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু: গত এপ্রিলে নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে গতকাল।
বিশ্বনেতারা ও ধর্মীয় নেতারা জঙ্গিসংকট মোকাবিলায় ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেও গতকাল পার্লামেন্টে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তাঁরা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কাজটিও পূরণ করতে পারেননি। পারেননি পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচন করতে। এর আগে অধিবেশনে পার্লামেন্টের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার মেহদি আল-হাফিদ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, দেশকে ‘সঠিক’ পথে চালিত করতে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা দরকার। ইরাকে এখন যে নিরাপত্তা বিপত্তি দেখা দিয়েছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। দেশকে নৈরাজ্য থেকে রক্ষার জন্য একটি সমন্বিত নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে ইরাকি পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশন শুরু হয়েছে। সুন্নি জঙ্গিরা ইরাকে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। গেরিলা যোদ্ধা আবু বকর আল-বাগদাদিকে ‘খলিফা’ উল্লেখ করে আইএসআইএলের জঙ্গিরা নিজেদের অধিকৃত এলাকায় ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। স্বাধীনতার জন্য কুর্দিদের গণভোট হবে: ইরাকের কুর্দি সম্প্রদায় স্বাধীনতার জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই গণভোটে অংশ নেবে। তাদের নেতা মাসুদ বারজানি গতকাল এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটের জন্য এখনই সঠিক সময়। কারণ, স্বঘোষিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরাকে ইতিমধ্যেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। বারজানি বলেন, ‘কুর্দিস্তানে আমরা গণভোটের আয়োজন করব এবং জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানাব। আমি গণভাটের তারিখ নির্ধারণ করতে পারছি না। অবশ্যই এতে কয়েক মাস লেগে যাবে।’

সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি আটক

নিকোলা সারকোজি
মামলার তদন্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজিকে গতকাল মঙ্গলবার আটক করা হয়েছে। কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টকে এভাবে আটকের ঘটনা দেশটিতে এটাই প্রথম। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির। খবরে বলা হয়, গতকাল সকাল আটটার দিকে একটি কালো গাড়িতে চড়ে নাতেরির থানায় যান সারকোজি। তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁকে প্রাথমিকভাবে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। এই মেয়াদ এক দিন বাড়তে পারে। তারপর তাঁকে আদালতে হাজির করতে হবে। সেখানে তাঁকে অভিযুক্ত করা হবে, নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে—আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন। সাবেক এই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে থাকা একটি মামলার গোপন তথ্য বের করে আনার চেষ্টার অভিযোগে আগের দিন তাঁর এক আইনজীবী এবং দুজন হাকিমকে জিম্মায় নেওয়া হয়েছে। তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সারকোজি। ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। এই মামলায় অভিযুক্ত হলে তাঁর সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের মুখপাত্র স্টিফেন লি ফল জানান, সারকোজির মামলা নিয়ে আদালতের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। তিনি বলেন, আর দশজনের মতো সারকোজিও ন্যায়বিচার পাবেন। তদন্ত কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, সারকোজি হাকিমদের কোনো একজনের কাছ থেকে মামলার তদন্ত সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করেছিলেন। এর বিনিময়ে ওই বিচারককে মোনাকোতে আদালতে উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাস দেন। সারকোজির বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর জয়ী হওয়ার পেছনে লিবিয়ার নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফির একটি বড় আর্থিক ভূমিকা ছিল। তিনি সারকোজিকে পাঁচ কোটি ইউরো দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ফ্রান্সের সবচেয়ে ধনী নারী ল’অরিয়েলের মালিক লিলিয়ান বেতোঁকুর কাছ থেকেও নগদ অর্থসহায়তা পান। তবে তিনি এই আর্থিক সুবিধার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয় হওয়া এক কোটি ইউরো পরিমাণ অর্থ তিনি দলীয় খরচ হিসেবে দেখান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর দল ইউএমপির এক নেতা গত মাসে পদত্যাগ করেন। এসব অভিযোগ ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারির অভিযোগের তদন্ত চলছে।

তরুণ তেজপালের জামিন মঞ্জুর

তরুণ তেজপাল
ভারতের তেহেলকা সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক তরুণ তেজপালের (৫০) জামিন মঞ্জুর করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার সকালে শর্তসাপেক্ষে তাঁকে জামিন দেওয়া হয়। খবর এনডিটিভির। গোয়ার একটি হোটেলে অনুষ্ঠান চলাকালে এক নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গত বছরের ৩০ নভেম্বর তরুণ তেজপালকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছয় মাস কারাভোগের পর গত মে মাসে তিনি অন্তর্বর্তী জামিন পান। তাঁর মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য গত ১৯ মে তাঁকে তিন সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট গতকাল তরুণ তেজপালকে জামিন দেন একটি শর্তে।
তা হলো, শুনানিকালে তিনি কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপ বা কোনো সাক্ষীকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। মামলার বিচারকাজ চলার সময় তাঁকে আদালতে হাজির থাকতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট যতটা সম্ভব দ্রুত, পারলে আগামী আট মাসের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেন। তেজপাল আশির দশকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় যোগদানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০১০ সালে ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের পুরস্কার পান। এক নারী সহকর্মীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গত বছর ২০ নভেম্বর তেহেলকা ম্যাগাজিনের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

নারীদের নিয়ে তাপস পালের অশালীন মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গে তোলপাড়

তাপস পাল
বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দলের লোকসভার সদস্য অভিনেতা তাপস পালের আপত্তিকর মন্তব্য নিয়ে এখন উত্তাল ভারতের রাজনীতি।অবিলম্বে তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে। রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। সম্প্রতি নদীয়ার চৌমাহা গ্রামে এক দলীয় সমাবেশে তাপস পাল বলেছিলেন, ‘আমি দরকার হলে আমার ছেলেদের বলব, সিপিএমের নেতা-কর্মীদের বাড়ি যাও এবং সিপিএম নারীদের ধর্ষণ করো।’ গত সোমবার কলকাতার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচার করা তাপস পালের ওই ভিডিও খুব পরিষ্কার নয়। তবে তাঁর কথাবার্তা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। দলীয় সমাবেশে তিনি বলছিলেন, ‘আমি চন্দননগরের ছেলে। অনেক রংবাজি করেছি। আমি প্রচুর মাস্তানি করেছি। আমি পকেটে মাল নিয়ে ঘুরি।
আমি নিজে রিভলবার দিয়ে গুলি করে চলে যাব। সিপিএমকে গুলি করে মারব। আমার মা, বোন, বাবা, বাচ্চা কারোর গায়ে যদি হাত পড়ে, আমি ছেড়ে কথা বলব না। বাড়ি বাড়ি ঢুকে ছেলে পাঠিয়ে রেপ (ধর্ষণ) করে দেব। তৃণমূলের কারও গায়ে যদি কোনো সিপিএম হাত দেয়, তবে তাদের গোষ্ঠী শেষ করে দেব। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেব।’ তাপসের এই বক্তব্যের কোনো দায়দায়িত্ব নিতে নারাজ তৃণমূল। দলটির লোকসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রেইন বলেন, ‘তাপসের মন্তব্য খুবই অসংযত। আমরা টেলিভিশনে সম্প্রচার করা তাঁর ওই মন্তব্য সমর্থন করি না।’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি নিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাপস পালের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। তিনি এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সম্পাদক মুকুল রায় বলেন, তাপস পালের বিষয়ে বুধবার (আজ) দল সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, তাপসের ওই মন্তব্য মমতাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন তাপস পালের স্ত্রী নন্দিনী পাল। তিনি তাপস পালের ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি তাপসের পক্ষে ক্ষমা চাইছি। তাঁর এই বক্তব্য সমর্থন করার কোনো কারণ নেই। তবে আমি জানি, এই গল্পের আরেকটি অংশ আছে। ওই অংশটি তাঁকে চটিয়েছে।’=
তাপস পালের এ মন্তব্য ঘিরে এখন দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্য সরকারের কাছে ঘটনার প্রতিবেদন চেয়েছে। বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা কিরণ বেদি তৃণমূলের এই অভিনেতার অবিলম্বে গ্রেপ্তার দাবি করেছে। তিনি বলেন, যেভাবে তাপস নারীদের হুমকি দিয়েছেন, তাতে অবিলম্বে তাঁকে গ্রেপ্তার করা উচিত। কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীষ তিওয়ারি, বিজেপির মুখপাত্র রাজীব প্রতাপ রুডিও এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে তাপস পালের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন মমতা শর্মাও অবিলম্বে তাপস পালকে গ্রেপ্তার করে বিষয়টির তদন্ত দাবি করেন। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসের নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমার ভাবতে কষ্ট হয়, একজন নারী দলের প্রধান হওয়া সত্ত্বে কীভাবে তাঁর দলেরই একজন সদস্য এসব অশালীন মন্তব্য করতে পারেন। অবিলম্বে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া উচিত।’ সিপিএমের নেত্রী বৃন্দা কারাত বলেন, এই অশালীন মন্তব্যকে মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি তিনি লোকসভার স্পিকারের কাছে তুলে ধরবেন। অভিযোগ রয়েছে, তাপস পাল অতীতেও এমন মন্তব্য করছেন। তবে দল কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এবারও তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদে নদীয়ার কৃষ্ণনগর আসন থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

ক্যারিয়ারে ভাটার টান by সাইফ চন্দন

ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন প্রিয়দর্শিনী অভিনেত্রী কুসুম শিকদার। ইদানীং তাকে নাটক-টেলিছবিতে দেখাই যাচ্ছে না। পাশাপাশি চলচ্চিত্রে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে এক সময়ের সাড়া জাগানো এ গ্লামারাস অভিনেত্রীর ক্যারিয়ারে এখন ভাটার টান চলছে। ইদানীং খণ্ড নাটকে উপস্থিতি কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলাম। তাই খণ্ড নাটকে খুব বেশি কাজ করা হয়নি। ঈদের নাটকেও এবার আমাকে সেভাবে দেখা যাবে না। তবে সমপ্রতি একটি খণ্ড নাটকের কাজ শেষ করেছি। এর শিরোনাম ‘সিক্সথ সেন্স’। শফিকুর রহমান শান্তনুর রচনায় নাটকটি পরিচালনা করেছেন কামরুজ্জামান রনি। এছাড়া সামনে আরও কয়েকটি নাটকে আমার অভিনয়ের কথা রয়েছে।

ধারাবাহিকেও তো আপনাকে আগের মতো দেখা যাচ্ছে না? এ প্রসঙ্গে কুসুম জানান, বর্তমানে তিনি খুব বেছে বেছে কাজ করছেন। সে কারণেই ধারাবাহিকেও তার উপস্থিতি কমে গেছে। তাছাড়া ইদানীং দেশীয় ধারাবাহিকের প্রতি দর্শকরা বিমুখ হয়ে পড়েছেন। কারণ, অধিকাংশ ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে গল্পের ধারাবাহিকতা থাকে না। তাছাড়া স্বল্প বাজেটের কারণে ভাল মানের নাটক উপহার দেয়া সম্ভব হয় না। সবকিছু মিলিয়ে ধারাবাহিক নাটকের সোনালি দিনগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কুসুম শিকদার জানান, বছর দু-তিনেক আগে তিনি ‘গহিনে শব্দ’ ও ‘লাল টিপ’ নামে দুটি চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। এরপর ভাল কোন গল্প না পাওয়ায় চলচ্চিত্রে আর অভিনয় করেননি তিনি। তবে সমপ্রতি কয়েকটি ছবির প্রস্তাব পেয়েছেন। কিন্তু সেগুলোতে কাজ করবেন কিনা তা এখনও চূড়ান্ত করেননি। তবে পুরোপুরি কমার্শিয়াল ছবিতে অভিনয়ের আগ্রহ রয়েছে কুসুমের। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপ ফুটবল প্রসঙ্গে
তিনি বলেন, ‘আমি ফুটবল খেলার খুবই ভক্ত। রাত জেগে নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখছি। তবে আমার প্রিয় দল ইতালি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ায় খুবই কষ্ট পেয়েছি।’

ভীতিজনক রাষ্ট্রে পরিণত বাংলাদেশ- ডয়েচে ভেলের রিপোর্ট

জার্মান বেতার ডয়েচে ভেলে গত ১লা এপ্রিল বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীদের ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে তারা বলেছে, নিপীড়ন চালানোর কারণে বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর হামলায় বাংলাদেশ একটি ভীতিজনক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ বাড়তে থাকে যখন সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী দল, যারা যুদ্ধপরাধের দায়ে বিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল তাদের ওপর হামলা ও নিপীড়ন বাড়িয়ে দেয়।
রিপোর্টে বলা হয়, চলতি বছরের গোড়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যায়, যখন ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন বিরোধী দল বয়কট করে। রাইট গ্রুপগুলো বলেছে, গত দু’বছরে শ’ শ’ লোককে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের ওপর সরকারি বাহিনীর নিপীড়ন অনেক বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও গুমের ঘটনায় রাইট গ্রুপগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করছে। গত ১৫ই মে  আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নূর খান লিটন অল্পের জন্য অপহরণ থেকে রক্ষা পান। তিনি ডয়েচে ভেলেকে বলেছেন, তিনি র‌্যাবের দ্বারা কথিতমতে সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকা-ের তদন্ত করছিলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয় পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, র‌্যাব অনেক ক্ষেত্রে ঠা-ামাথায় নিরীহ মানুষকে হত্যা করে থাকে, এরপর ক্রসফায়ার হিসেবে চালানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাইট গ্রুপগুলো দ্বারা সমালোচিত হচ্ছেন যে, তারা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। অধিকারের আদিলুর রহমান ডয়েসে ভেলেকে বলেছেন, কর্তৃপক্ষ এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে যাতে অধিকার এখন বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশীয় পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি ডয়েসে ভেলেকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার তথ্য প্রযুক্তি আইনকে কেবল ব্লগার ও অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছেন না- একে টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়ার কাজেও ব্যবহার করছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, এনজিও সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের খসড়া ইতিমধ্যেই উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ এটা পাস হলে সরকার এনজিওর ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে। ব্র্যাড অ্যাডামসের মূল্যায়ন হলো: সরকার মানবাধিকার গ্রুপগুলোর জন্য একটি নেতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে। নূর খান লিটনের কথায়, ‘রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে ভয়মুক্ত ও স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ প্রতি মিনিটে সঙ্কুচিত হচ্ছে।’

কেন এমন হচ্ছে by মীর আব্দুল আলীম

মানুষের বিবেক আজ প্রশ্নবিদ্ধ। বিবেকের কপাট  একে একে তালায় আটকে যাচ্ছে। আমরা যে যার মতো করে অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছি। তাই কেবল অরাজকতা, হিংসা-হানাহানি আর খুন-খারাবির ঘটনা ঘটছে সর্বত্র। এতটুকুও বিবেকের দংশন করছে না কাউকে। দেশ জুড়ে একের পর এক ঘটছে নিষ্ঠুর সব ঘটনা। দেশে নিষ্ঠুরতার ব্যারোমিটার যে বেশ চড়েছে তা হাল সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায়ই অনুমান করা যায়। এ অবস্থায় আমজনতা বড্ড বিপদে আছে।  সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ, ফেনী ও রাজধানীর পল্লবীর কুর্মিটোলায়। আর তিনটি ঘটনায়ই সরকারদলীয় রাজনীতিকদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। স্ব স্ব এলাকার সরকারদলীয় এমপিদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার আঙ্গুলি উঠেছে। নারায়ণগঞ্জে প্যানেল মেয়র নজরুলসহ ৭ হত্যাকা-, ফেনীর উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যাকা- এবং সর্বশেষ রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে বিহারি ক্যাম্পে আগুনে পুড়িয়ে ১০ হত্যা। এ তিনটি ঘটনায় নিষ্ঠুরভাবে জীবন দিতে হয়েছে ১৮ জনকে। এমন সব নিষ্ঠুর হত্যাকা-ে দেশের জনগণ হতভম্ব। ক্ষুব্ধ দেশবাসী। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে শুরু করে সব ধরনের নাগরিক অধিকার থেতে বঞ্চিত হচ্ছেন। নাগরিক অধিকারের কোনটাই পাচ্ছে না জনগণ। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? স্বাধীন দেশে এমনটাতো হওয়ার কথা নয়। নারায়ণগঞ্জে ৭ জনকে দিনে- দুপুরে অপহরণের পর হত্যার ঘটনা দেশবাসী নয়, বহির্বিশ্বেও আলোচিত হয়েছে। কলকাতায় নূর হোসেন গ্রেপ্তারের পর তাকে দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। নূর সেদেশের পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে যারা আমাকে দেশ থেকে পালাতে সহযোগিতা করেছে তারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আর এনিয়ে অনেক রাঘববোয়াল এখন মহাচিন্তায় আছেন। নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলেই আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা গডফাদার কে বা কারা তা বেরিয়ে আসবে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীর কুর্মিটোলায় বিহারি ক্যাম্পে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা সে সঙ্গে সরকারদলীয় এমপির জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়েও তোলপাড় চলছে সর্বত্র। সেখানে বিহারিদের ঘর তালাবদ্ধ করে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, গর্ভবতী দুই নারীসহ ১০ জনকে হত্যার পরও বিবেকে নাড়া দেয়নি। কালশীর বিহারি পল্লীতে যারা বসবাস করেন তাদের কি মানুষ মনে করা হচ্ছে না? তা না হলে কেন আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছি? সরকারই বা কেন চুপ? অবশ্য সরকারদলীয় এমপি ইলিয়াস মোল্লা নিহতের পরিবারকে কিছু অর্থ দেয়ার চেষ্টা করছিল। সে টাকা এমপির মুখের উপর ছুড়ে মেরে ভিকটিম পরিবারের সদস্য বলেছে, আপনার লোকজনই আমাদের হত্যা করেছে। জমি দখল নেয়ার জন্য যুবলীগের স্থানীয় নেতার নেতৃত্বে ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে। পুলিশ সেখানে নীরব দর্শক ছিল। অথচ পরে আতশবাজি আর বিবদমান দুই গ্রুপের মধ্যকার সংঘর্ষে এতোগুলো মানুষ মারা গেছে বলে প্রচার করছে। ইলিয়াস মোল্লার ফাঁসির দাবিতে কালশীতে মিছিল হয়েছে। কিন্তু কিছুই হয়নি। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে যারাই হামলা করুক না কেন, তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করা উচিত। এ জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে প্রয়োজনে বিচারবিভাগীয় তদন্তের কথা ভাবা যেতে পারে। আশা করি, কালশী বর্বরতার শিকার হতাহত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণে সরকার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেবে। দেশের নিষ্ঠুরতার ব্যারোমিটার একদম নিচে নেমে এসেছে। মানুষ এখন একেবারেই মূল্যহীন। সভ্যতা, মানবতা, সহনশীলতা, মমত্ববোধ, ভালবাসা আজ নির্বাসিত দেশ থেকে। ভদ্রতা, সভ্যতা, মায়া-মমতা যেন দেশ থেকে উধাও। নোংরামি, হিংস্রতা, দুর্নীতি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, সন্ত্রাস, খুন-খারাবিসহ অপরাধের সমস্ত কিছু দেশে ভর করেছে। সর্বদাই নোংরা, নিষ্ঠুর এবং ঘৃন্য ঘটনা ঘটছে তো ঘটছেই। এ থেকে জনগণ মুক্তি চায়। চাইলেই কি মুক্তি মিলবে?
বর্তমান সময়ে নানা ইস্যুতেই যেভাবে হত্যাকা- হচ্ছে, তা কোন সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না। সমাজ থেকে ঘৃণ্যরূপী এ মানুষকে যথাযথ শাস্তির আওতায় না আনা গেলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে দেশ। দেশজুড়ে  কেবল গুম, খুন, হুঙ্কার আর অশান্তির দাবানল। জনগণ শান্তি চায়, জীবনের নিরাপত্তা চায়, চায় একটু স্বস্তি। ঘুমানোর সময় নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চায়। জনগণকে স্বস্তি, শান্তি এবং জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই।

লিওনেল মেসি এখন রুপালি পর্দারও রাজপুত্তুর

ক্রমশ রূপকথা ও রুপালি পর্দার রাজপুত্তুর বনে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। পূর্ণ দৈর্ঘ্য হলিউডের ‘রকি’ স্টাইলের চলচ্চিত্র আসবে আরও পরে। তবে বিশ্বকাপ চলমান থাকতেই প্রামাণ্য ফিল্ম ‘মেসি’র প্রিমিয়ার হলো গতকাল। তার প্রতি বিখ্যাত স্পেনিশ পরিচালক অ্যালেক্স দ্য লা ইগলেসিয়া শ্রদ্ধা জানালেন। এটি যেনতেন বা কাঠখোট্টা ধরনের ডকুফিল্ম নয়। এতেও রীতিমতো সিনেমাটিক স্টাইল গ্রহণ করা হয়েছে। ছোট বেলার মেসি রোজারিও রাস্তায় ফুটবলে লাথি মারছে। এই দিয়ে এর শুরু।

মেসির ওপর ফিল্ম তৈরি করেছেন, করছেন এবং আরও অনেকেই করবেন। ইতিমধ্যে আরব পরিচালক সাহিম ওমর খলিফা অনেকগুলো নামীদামি পুরস্কার জুটিয়েছেন। তার মুভির নাম ‘বাগদাদ মেসি’। ২০০৯ সালে নির্মিত এই ছবির বিষয়বস্তু মেসি ও রোনাল্ডোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা। কিন্তু তার পটভূমি বাগদাদের ধূসর মরুভূমি। ১০ বছরের ছোট্ট হামুদি মরুভূমিতে ফুটবল খেলছে। আর অবশিষ্ট বিশ্বের মতোই বার্সেলোনা ও ইউনাইটেড মানচেস্টারের মধ্যে কবে চ্যাম্পিয়ন লিগ খেলা হবে সেজন্য অপেক্ষার প্রহর গুণছে। মেসি ও রোনাল্ডোর লড়াই দেখাই তাদের আকর্ষণ। কিন্তু তখনই হামুদির টিভি সেট ভেঙে গেল। এরপর কাহিনী এগিয়ে চলে।
এই বাগদাদ মেসির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিল দশ বছরের আরব বালক আলি আল জায়েদওয়াই। গত বছর মে মাসে মেসি দোহা সফরে গেলে আলির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেটি ছিল ১৯ মিনিটের শর্ট ফিল্ম। এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল ইরাকে রক্তের নহর বইলেও ফুটবলের প্রতি মানুষের যে দুর্নিবার আকর্ষণ তা থমকে যায়নি। আর তার মহানায়ক মেসি। মেসি ইউনিসেফের শুভেচ্ছা রাষ্ট্রদূত, সে কারণে সম্প্রতি মেসি শিশুদের সঙ্গে করমর্দনে অনীহা প্রকাশের খবরে হৈচৈ হয়। 
মেসি এবং অন্যান্য নির্মীয়মান ছবিতে মোটামুটি চার বছর বয়স থেকে মেসির বেড়ে ওঠা চিত্রিত হয়েছে ও হচ্ছে।  মেসির ১১ বছর বয়সে ধরা পড়লো যে তিনি হরমোন ঘাটতির শিকার। এফসি বার্সেলোনা তখনই তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। মেসির ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচার যোগান দিয়েছিল। এই প্রামাণ্য ফিল্মে ইয়োহান ক্রাফ, হাভিয়ার মাসসেরানো, পিক, আন্দ্রেজ ইনিয়েস্তা এবং বার্সেলেনো ম্যানেজার মতো তারকাদের মন্তব্য রয়েছে।
তবে গতকাল যখন মেসি ছবির প্রিমিয়ার হলো তখন ম্যারাডোনার সমালোচনামূলক মন্তব্য বাতাসে ভাসছিল। বলেছেন গ্রুপম্যাচগুলোতে আর্জেন্টিনা খুবই খারাপ খেলেছে। সুইসদের সঙ্গে খেলারও প্রশংসা করেননি ম্যারাডোনা। গতকাল ওলে লিখেছে, ‘খেলোয়াড়দের উচিত ছিল অন্য ধরনের একটি খেলা উপহার দেয়া। আমরা তো শুরুই করলাম না। ৪০ ভাগ পর্যন্ত খেলেছে আর্জেন্টাইন টিম। গোলবারের দশটি শট সবটাই স্পাইসি। আমরা একটি মেসি সর্বস্ব টিমে পরিণত হতে পারি না।’
চলচ্চিত্র নির্মাতারা যেসব বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন তার মধ্যে মেসির অনেক অজানা কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হবে। আর্জেন্টাইন বিপ্লবী চে গুয়েভারা আর মেসির জন্ম একই স্থানে। তার পরিবার ইতালীয় বংশোদ্ভূত। মধ্যবিত্ত।
ফুটবলের ‘মোস্ট গিফটেড’ রাজপুত্তুর লিওনেল মেসি তার ২৭তম জন্মদিনে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে যে ‘গোল’ স্থির করেন সেটা অনবদ্য। একজন মানবিক মেসিকেও ফিল্ম নির্মাতারা বিবেচনায় নিয়েছেন। কারণ বিনয়ী মেসি বলেন, ‘অন্য সবার চেয়ে বেশি গোল করা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে গোল করে এগিয়ে থাকার চেয়ে আমি আমার টিমের বিজয়ে গৌরবান্বিত বোধ করি। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার চেয়ে একজন ভাল মানুষ হওয়ার বিষয়ে আমি বেশি উদ্বেগ অনুভব করি। যখন সব কিছুই হারিয়ে যাবে, তখন আপনার সামনে কি অবশিষ্ট থাকবে? আমি যখন অবসর নেবো, তখন আমি আশা করি, একজন শিষ্টাচারসম্মত মানুষ হিসেবে আমি মানুষের মনে বেঁচে থাকতে চাই।’
 বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সম্পর্কে মেসি বলেছেন, আপনাকে অবশ্যই বিশ্বকাপে  নৈপুণ্য দেখাতে হবে এবং একটি বিশ্বকাপে যে কোন কিছু ঘটতে পারে।
২৬ বছরে মেসি শব্দের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ম্যাজিক শব্দটি সমার্থক হয়ে উঠেছে। পিতা জর্জ হোরেসিও মেসি ছিলেন একটি ইস্পাত কারখানার শ্রমিক। তবে এখন সে পরিচয় ছাপিয়ে এটাই বড় হয়ে উঠবে যে, মেসি উত্তরাধিকার সূত্রে ফুটবলার হয়েছেন। মেসির পিতা জর্জ রোজারিও স্থানীয় যুব ফুটবল টিমের কোচ ছিলেন। তার মানে এক অখ্যাত ফুটবল কোচের ছেলে বিখ্যাত ফুটবলার হয়েছেন। কেবল পিতাই নন, মেসির পারিবারিক পরিবেশও ফুটবলময়।
আর মা সিলি মারিয়া ছিলেন একজন খ-কালীন পরিচ্ছন্নকর্মী। এর আগে ‘ওলে’ জানিয়েছে, গতবারের বিশ্বকাপের মতো নয়, এবারে মেসির পুরো পরিবারই তার সঙ্গে। বাবা-মা, ছেলে থিয়াগো, বউ আন্তোলিনা ছাড়াও দুই ভাই রডরিগো ও মাতিয়াস রয়েছেন। তবে বরাবরের মতোই তারা লো প্রফাইলে আছেন। এমনকি জন্মদিনের কেক কাটার মতো আলোকচিত্র মিডিয়া আসতে দেননি।
মেসির বউ ও তার পরিবার প্রচার বিমুখ। ২০১০ সালে প্রিটোরিয়ায় ওলের অনুরোধে মেসি তার একটি আলোকচিত্র ধারণ করেছিল। কিন্তু ফ্লাশ দিয়ে নয়। সেই ছবি অবশ্য কোথাও ছাপা হয়নি।
মেসি যখন বার্সা এসেছিলেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৩। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটলো তার বার্সায়। ১৬ বছরে ফুটবলের শুরু। ৪৬৬ খেলায় ৩৮১ গোল করে তিনি বিশ্বের নন্দিত ফুটবলালের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে চলেছেন। বড় পত্রিকাগুলো ইদানীং একটি প্রবণতা দেখাচ্ছে। তারা বলছে, মেসি সর্বকালের সেরা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন। অনেকেই তাকে পেলে ও ম্যারাডোনার চেয়ে মেধাবী ও শ্রেয়তর মনে করেন।
মেসি ২০০৯ থেকে ২০১২- টানা চারবার বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খোলোয়াড়ের বিজয় মুকুটে শোভিত হয়েছেন। উপরন্তু ইউরোপের শীর্ষ গোলদাতার খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছেন টানা ছয় বছর। তার এ সাফল্যের, এই বীরত্বের, এই নান্দনিকতার গল্প ফুরোনোর নয়।
আর্জেন্টিনার ফুটবল বাইবেল ওলে মেসির জন্মদিনে লিখেছে, এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল তারকা মেসি ২৭ বছরে পা রেখেছে।
বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির প্রথম চুক্তি নিজেই একটি ইতিহাস। কারণ বালক মেসির নৈপুণ্যে মুগ্ধ কর্তারা হাতের কাছে কাগজ না পেয়ে পেপার ন্যাপকিনে ঝটপট শর্তাবলী লিখে ফেলেছিলেন। এ সময়টায় ধরা পড়ে যে মেসি সুস্থ নন। অপুষ্টির শিকার। তাঁর চিকিৎসা দরকার। বার্সেলোনার হিরে চিনতে ভুল হয়নি। চুক্তি করার জন্য মেসির পুরো পরিবারকে স্পেনে নিয়ে যায়। তখন মেসির বয়স মাত্র ১৩। ২০০৫-২০০৬ সাল থেকে মেসিকে ফার্স্ট টিম সদস্য হিসেবে বেতন-ভাতা দেয়া শুরু হয়। মেসির রয়েছে দু’টো পাসপোর্ট। আর্জেন্টিনা ও স্পেনের।
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মেসি স্পেনেরও নাগরিক। তবে স্পেন যখন তার জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে নাম লেখানোর প্রস্তাব দিলো, মেসি তখন তা ফিরিয়ে দিলেন। মেসি হলেন বিশ্বকাপের ষষ্ঠতম কনিষ্ঠ, যিনি বিশ্বকাপে নেমে গোল করতে পেরেছিলেন। তার গতি ও ক্ষিপ্রতার কারণে লিওনেল ও মেসি ছাড়াও তার কিন্তু আরও একটি ডাক নাম আছে। সেটি হল ফ্লিয়া।
  স্পেনিশ ফার্স্ট ডিভিশন লীগে মেসি ১৭ বার অংশ নিয়ে ৬ বার গোল করেন। ২০০৫ সালে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন। আর মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। কারণ রেফারি তাঁকে লাল কার্ড দেখান।
২০০৮ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসে মেসি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। একই বছরের গ্রীষ্মে মেসি আরেক মহান ফুটবলার রোনালদিনহোর কাছ থেকে ১০ নম্বর বার্সা জার্সি লাভ করেন। পরের বছরই মেসি ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলার ঘোষিত হন। ইংল্যান্ডের ভিভিয়ান উডওয়ার্ড ছাড়া মেসি হচ্ছেন অপর সেরা তারকা যিনি একটি বছরে ক্লাব ও নিজের দেশের জন্য ২৫টি গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
ইরানের সঙ্গে আর্জেন্টিনার শ্বাসরুদ্ধকর খেলায় ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চেপে মেসিপুত্র ও মেসিপত্নী মাঠে এসেছিলেন। মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন দিয়াগো ম্যারাডোনা। দিয়াগো সেদিন মাঠ ছাড়ার একটু পরেই মেসি তাঁর মনমাতানো গোলটি করেন। লন্ডনের গার্ডিয়ান লিখেছিল, ‘এটা সম্ভব হয়েছে কারণ দিয়াগো  মেসির চোখের আড়াল হয়েছিলেন বলেই!’ আর ভেনেজুয়েলার টিভি তেলেসুরে দিয়াগো রসিকতা করে বলেছেন, ‘মেসি এটা পেরেছে কারণ সে মেধাবী বলেই। আমার মাঠ ত্যাগের সঙ্গে মেসি গোলের কোন সম্পর্ক নেই।’
তবে সব কিছুর পরেও মেসি জানেন ‘বিশ্বকাপে যা কিছু ঘটতেই পারে’। যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন তারাও বিনিয়োগের দিকে নজর দিচ্ছেন। ১৯৮৬ সালের সেই ঝড় তোলা বিশ্বকাপে, একাই এক শ’ হয়ে সোনার কাপ ছিনিয়ে  নেয়ার সময় দিয়াগো ম্যরাডোনার বয়স ছিল ২৫। আর মেসি গত ২৪শে জুন ২৬ অতিক্রম করেছেন।
তদুপরি খবর বেরিয়েছে, হলিউড ফিল্মের চিত্রনাট্য তৈরি হচ্ছে। এপিক পিকচার্স গ্রুপের উদ্যোক্তা। ‘মেসি: দি ইনসাইড স্টোরি অব দ্য বয় হু বিকেম এ লিজেন্ড’- লুকা সাইয়োলির লেখা বই অবলম্বনে চিত্রনাট্য হচ্ছে। এর অর্থায়ন ও প্রযোজনা করবে এপিক। এই সংস্থার প্রধান প্যাটরিক ওয়ার্ল্ড এবং শেকড বেরেনসন এখন চিত্রনাট্য নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন।

আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাস by মোহাম্মদ আবুল হোসেন


আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মুখে তখন হাত। স্তব্ধ সবাই। হাতে ধরা চায়ের কাপ কখন ঠান্ডা হয়ে গেছে বুঝতেই পারেননি অনেক সমর্থক। কি হচ্ছে ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্স স্টেডিয়ামে! বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি, অ্যানজেল ডি. মারিয়া প্রাণান্ত যুদ্ধ করছেন সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের ‘কংক্রিটের’ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে ওই চার কোণার টার্গেটে বল পৌঁছাতে পারছিলেন না। যখনই মেসি, ডি. মারিয়া লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান বীরবিক্রমে তখনই বুকে আশার সঞ্চার হয় আর্জেন্টিনা সমর্থক শিবিরে। কিন্তু না। প্রতি বারই লক্ষ্যভ্রষ্ট। উত্তেজনার পারদ তখন স্ফুটনাংকে। রক্তের গতি বেড়ে গেছে বহুগুণ। হিমোগ্লোবিন হয়তো আস্তে আস্তে হিম হয়ে আসছে। এমন দৃশ্য বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। শুধু কি তাই! যে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে লড়ছে, এবারের বিশ্বকাপে ফেভারিট- তাদের দেশে তখন হিমশীতল এক অনুভূতি। মানুষের মুখে কোন কথা নেই। আঠার মতো কোটি চোখ লেগে আছে টেলিভিশন পর্দায়। দম বন্ধ করা এক মুহূর্ত। ঠিক এমন সময় যেন বোমা ফাটলো। বোমা নয় তো নিউক্লিয়ার বোমা। হিরোশিমা নাগাসাকিকে যে হাইড্রোজেন বোমা মৃতপুরীতে পরিণত করেছিল তার চেয়ে যেন শতগুণ শক্তি নিয়ে ফাটলো সে বোমা। পটোম্যাক থেকে পদ্মা, উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু সর্বত্রই যেন ভূমিকম্প হলো। গগনবিদারি চিৎকারে আকাশ বাতাস ফাটিয়ে সমস্বরে বিস্ফোরণ হয় ‘গো...ল’। হ্যাঁ, গোল। অতিরিক্ত সময়ের শেষ হওয়ার তখন দুই কি তিন মিনিট বাকি। ঠিক এমন সময়েই আর্জেন্টিনার ‘খাঁটি সোনা’ সেই লিওনেল মেসি শতভাগ খাঁটি কাজটি করলেন। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের সামনে গিয়ে যে বল পাস দিলেন ডি. মারিয়ার কাছে, তার শতভাগ সদ্ব্যবহার করলেন মারিয়া। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার- যেখানে মানুষ ঘুমিয়ে পড়েন সন্ধ্যা সাতটা বা আটটার মধ্যে, সেখানকার মানুষও আনন্দে ফেটে পড়লেন। একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করলেন। কেউবা আবেগে কেঁদে ফেললেন। অনেক গ্রামে-গঞ্জে, বাজারে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে শুরু হলো মিছিল, আনন্দমিছিল। দূর গ্রামের রাজ্জাক শেখ বললেন, বাড়িতে টেলিভিশন নেই। এক কিলোমিটার দূরে ভাটদি বাজারে গিয়েছিলাম খেলা দেখতে। একপর্যায়ে ভাই দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু কি দেখালেন মেসি! অবিশ্বাস্য! পুরোপুরি জাদু! তাই তাকে নিয়ে সারা বিশ্বে এত মাতামাতি। ঢাকার চিত্র তো বলার অপেক্ষা রাখে না। রোজা রেখে ক্লান্ত হয়েও ঢাকার কোটি দর্শক টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। শ্বাসরুদ্ধকর এ প্রতীক্ষার অবসান হতেই ঢাকার দালানগুলোর ভিতর থেকে চিৎকার, উল্লাস, আনন্দ-আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। এমন দৃশ্য, এমন অভিজ্ঞতা সহসা মেলে না। যারা আর্জেন্টিনার ভক্ত, যারা ভক্ত নন, ব্রাজিলের ভক্ত- সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন মেসিযুদ্ধ। মেসির সমালোচনা করেন অনেকে। কিন্তু মুখ টিপে গোপনে তার খেলা ভালবাসেন। এমনকি প্রতিপক্ষ ব্রাজিলের গোলের নায়ক নেইমারও মেসির ভক্ত। মঙ্গলবার রাতের ফুটবলযুদ্ধ শেষে ঢাকার আকাশে, দূরে ফাঁকা মাঠের মধ্যে দ্বীপের মতো দাঁড়ানো গ্রামের মাথার ওপরে টাঙানো আর্জেন্টিনার পতাকা যেন আরও পত্‌ পত্‌ করে উড়ছে। এদেশের গ্রামে-গঞ্জে আর্জেন্টিনার যে অগণিত, স্বার্থহীন প্রেমিকদল আছেন তারা পকেটের টাকা খরচ করে উৎসবে মেতে উঠেছেন। কোথায় নেই তারা! যেমন আছেন ব্রাজিলের ভক্ত। তেমনি আছেন আর্জেন্টিনার ভক্ত। আর্জেন্টিনার ভক্তরা এখন উল্লাস করতে করতে বলছেন, ব্রাজিল তো জিতেছে টাই-ব্রেকারে। কিন্তু আর্জেন্টিনা জিতেছে খেলে। হতে পারে সে জেতা অনেক কঠিন ছিল। এর মূল্য অসীম। আর তাই তো আর্জেন্টিনা এখন কোয়ার্টার ফাইনালে। আর্জেন্টিনার রাজধানী  মঙ্গলবার রাতে ঘুমায়নি। সুনসান বুয়েন্স আয়ারস যেন এক তিলিকের মধ্যে আনন্দের নগরীতে পরিণত হলো। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সমস্বরে তারা গাইলেন মেসি বন্দনা। গাইলেন জাতীয় সঙ্গীত। গাড়ির হর্নে বেসামাল হয়ে পড়লো প্রতিটি গলিপথ, রাজপথ। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল। খুলে গেছে সব বার, পাব। সেখানে মানুষের ভিড়। সবারই এক আনন্দ। কোন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নেই। সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে পড়েন। তাদের মুখে, বুকে আর্জেন্টিনার পতাকা আঁকা। কেউ চুল কাটিয়েছেন মেসির মুখাবয়বে। কত যে আয়োজন তখন বুয়েন্স আয়ারসে তার শেষ নেই। আর গ্রাম, গাঁয়ে ছেলে-বুড়ো-ঝি বেরিয়ে পড়েছেন। তাদের হাতে হাতে পতাকা। দেশের পতাকা। কিন্তু এই আনন্দের মাঝে তারা একজনের অভাব বড় বেশি করে অনুভব করলেন। তিনি হলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের কিংবদন্তি দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।

মেসিকে আর্জেন্টাইন মডেলের চ্যালেঞ্জ

আর্জেন্টাইন মডেল ফিওরেলা ক্যাস্তিলো দাবি করেছেন, ইপানেমা সৈকতে তিনি ফুটবল নিয়ে কারিকুরির দিক দিয়ে এই পর্যন্ত ৮০০ পুরুষকে হারিয়েছেন। ২৪ বছর বয়স্ক এই মডেল অনেকের মতে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় মেসিকে তার এই ফুটবল দক্ষতা দেখাতে চান। ক্যাস্তিলো বলেছেন, আমি এমনটা করতে ভালোবাসি। সবার আগে ইপানেমা সৈকত ও ব্রাজিলে অবস্থান করা খুব সুন্দর। এরপর ৮০০ জন পুরুষের মুখোমুখি হয়ে তাদের সকলকে হারানো আমার জন্য বিশাল আনন্দের। তাই আমি খুশি মনে বাড়ি ফিরবো। এরপর যে-ই আমার মুখোমুখি হতে চায়, তাকে স্বাগতম। এমনকি তিনি মেসির বিরুদ্ধেও বল দখলের লড়াইয়ে জিতবেন বলে তার বিশ্বাস! তার ভাষায়, আমি কি মেসির বিরুদ্ধে জিতব? অবশ্যই!

হামশাকালস না দেখতে বাবাকেই মানা এষা গুপ্তার

মাত্র দুই বছরের ক্যারিয়ার। এখনো আনকোরা গন্ধটা মুছে যায়নি। প্রতিটা ছবিই নিশ্চয়ই তাঁর কাছে নতুনের রোমাঞ্চ এনে দেয়। মুখিয়ে থাকেন সবাইকে দেখানোর জন্য। কিন্তু এষা গুপ্তা জানালেন, তিনি চান নতুন ছবি হামশাকালস তাঁর পরিবারের কেউ না দেখুক। বিশেষ করে তাঁর বাবা।
ছবিটার পরিচালক সাজিদ খান। আর সাজিদের ছবি মানে হাস্যরসে ভরপুর। নির্মল বিনোদন। সাজিদের ছবির মধ্যে শিল্পরস খোঁজা বোকামি। এই ছবিটা বিমানবাহিনীর সাবেক কর্তা বাবার রুচির সঙ্গে যাবে না বলেই মনে করেন এষা। কিন্তু প্রকাশ ঝার চক্রব্যূহ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এই অভিনেত্রী মনে করেন, বলিউডের মূলধারায় ঢোকার জন্য এ ধরনের ছবিও করা জরুরি ছিল তাঁর জন্য। টিওআই।

পড়াশোনায় মনোযোগী আলিয়া ভাট!

অভিনয়ের পোকা খুব অল্প বয়স থেকেই ভর করেছে আলিয়া ভাটের মাথায়। তাই তো কোনো রকমে কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই বলিউডে নাম লেখান এই ভাট-কন্যা। অভিনয়টা যে শুধু পড়াশোনা দিয়েই হয় না, লাগে কিছু জেনেটিক প্রভাবও, তা আলিয়ার মেধা দেখলেই বোঝা যায়। স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার, হাইওয়ে আর সবশেষ টু স্টেটস—সবই সফল। কিন্তু অভিনয়ের বাইরের জগতে নিজের ছাপ রাখার জন্য পড়াশোনায় কিছুটা তো হালনাগাদ হতেই হয়। এই যেমন এখন আলিয়া হচ্ছেন। ‘কফি উইথ করন’-এ নিজ দেশের রাষ্ট্রপতির নাম ভুল বলার পর থেকেই সাধারণ জ্ঞানের ওপর বেশ জোর দিচ্ছেন তিনি। নিয়মিত নিচ্ছেন হাল আমলের সব পাঠ।

বিকিনিকে ‘না’, শর্ট স্কার্টকে ‘না’

নারীর নিজের নিরাপত্তার জন্য সাগরসৈকতে বিকিনি পরে যাওয়া উচিত নয়। শর্ট স্কার্ট পরে তরুণীদের যাওয়া উচিত নয় পানশালায়। এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের গোয়া রাজ্যের বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের জ্যেষ্ঠমন্ত্রী সুদিন ধাভালিকার। গতকাল মঙ্গলবার এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

গত সোমবার বিজেপির মিত্র মহারাষ্ট্রবাদী গোমানতাক পার্টির নেতা ধাভালিকারের এই মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে স্থানীয় কংগ্রেস। কংগ্রেস মনে করে, মন্ত্রীর এ বক্তব্য সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের দীর্ঘ দিন ধরে প্রচলিত সংস্কৃতির বিরোধী।

গোয়ার কংগ্রেসের মুখপাত্র দুর্গাদাস কামাত বলেন, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ধাভালিকারের বাড়িতে গোলাপি রঙের একটি স্কার্ট পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পার্টির পোশাক কী, তাঁর দেখা উচিত। পার্টির পোশাক মানে কোনো সংস্কৃতিতে আঘাত করা নয়।

এ বিষয়ে এনডিটিভি জানতে চাইলে ধাভালিকার বলেন, সবার জন্য উন্মুক্ত সৈকতে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই নারীদের বিকিনি পরা উচিত নয়। তবে নিজস্ব গণ্ডিতে নারীরা এই পোশাক পরতে পারেন। এতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।

গোয়ার গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘পানশালার সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতি নয়। আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতি চাই না। তরুণ-তরুণীরা প্রায়ই মদ পান করতে যায়। এসব করতে গিয়ে প্রায়ই আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়। আমাদের বোন আর মেয়েরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। গোয়া হচ্ছে মন্দির ও গির্জার শহর। এখানে পানশালানির্ভর পর্যটনশিল্প গড়ে উঠুক, আমরা তা চাই না।’

ইরাক কি ভেঙে যাচ্ছে?

ইরাকে একদিকে রাজনৈতিক সংকট আর অন্যদিকে সুন্নি জঙ্গিদের উত্থান ও অগ্রযাত্রার ফলে ভাঙনের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত সরকার গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও দেশটির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নেতারা মতৈক্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন। নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন থেকে সুন্নি ও কুর্দি সম্প্রদায়ের নেতারা গত মঙ্গলবার ওয়াকআউট করেছেন। কারণ শিয়া সম্প্রদায়ের আইনপ্রণেতারা ওই দিন নুরি আল-মালিকির পরিবর্তে নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী বাছাই করতে পারেননি। ফলে দেশটির অখণ্ডতা রক্ষায় শিগগিরই একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে।

এদিকে, সুন্নি জঙ্গিদের উত্থানের ঘটনাটিকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে কুর্দি সম্প্রদায়। তারা একটি স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে কয়েক মাসের মধ্যেই গণভোট হবে বলে জানিয়েছেন কুর্দি নেতারা। আর ইরাক ও সিরিয়ার যেসব এলাকা সুন্নি জঙ্গিরা দখল করে নিয়েছে, সেখানে আল-কায়েদার একজন সাবেক নেতার নেতৃত্বে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় ইরাকে রাষ্ট্রীয় ভাঙন ঠেকাতে সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠন করতে রাজনীতিকদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, ইরানের সরকার এবং ইরাকের শিয়া সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা ইরাকিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সম্মিলিত একটি সিদ্ধান্ত জরুরি হওয়া সত্ত্বেও মঙ্গলবার নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনে অচলাবস্থা তৈরি হয়। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আবার অধিবেশন বসার সম্ভাবনা নেই। ফলে দেশটিতে চলমান অস্থিরতা চলবে এবং মালিকিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান পদে বহাল থাকবেন।
প্রয়াত স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর থেকে ইরাকি সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী পদে সব সময় একজন শিয়া মুসলমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর পার্লামেন্ট স্পিকার পদে একজন সুন্নি এবং প্রেসিডেন্টের আলংকারিক পদে কুর্দি সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রী বাছাইয়ের জন্য শিয়া রাজনৈতিক জোট সম্প্রতি বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছে। কিন্তু এখনো মালিকির বিকল্প হিসেবে কাউকে বাছাই করা হয়নি। আবার তাঁকে তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারেও মতৈক্য হয়নি। সুন্নি সম্প্রদায়ের রাজনীতিকেরা বলছেন, শিয়া নেতারা প্রধানমন্ত্রী বাছাই করার আগ পর্যন্ত তাঁরা পার্লামেন্টে স্পিকার পদে কাউকে মনোনীত করবেন না।
সুন্নি নেতা ও সাবেক স্পিকার ওসামা আল-নুজাইফি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক সমাধান না হলে অস্ত্রের ঝনঝনানি আরও হবে এবং দেশ একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গে প্রবেশ করবে।
শিয়া আইনপ্রণেতারা অবশ্য সুন্নি ও কুর্দি নেতাদের ওপর দায় চাপাতে চাইছেন। শিয়া সম্প্রদায়ের নেতাদের যুক্তি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সবার শেষে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করার কথা। পার্লামেন্টের প্রবীণতম সদস্য মেহদি আল-হাফিদ এখন ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, আলোচনায় মতৈক্য হলে আগামী সপ্তাহে অধিবেশন শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, ইসলামিক স্টেট অব দি ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর লড়াই তিন সপ্তাহ ধরে অব্যাহত রয়েছে। জঙ্গি গোষ্ঠীটি চলতি সপ্তাহে নিজেদের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে ‘খলিফা’ ঘোষণা করেছে। সুন্নিপন্থী ওই জঙ্গিরা দেশটির উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, কেবল জুন মাসেই ইরাকে অন্তত দুই হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মালিকিকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে কিছু না বললেও দেশটিতে অধিকতর জাতিগত অংশগ্রহণমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে। ইতিমধ্যে ৩০০ জন বিশেষ সামরিক উপদেষ্টা ইরাকের সরকারি বাহিনীকে সহায়তার জন্য বাগদাদে পৌঁছেছেন। আর দেশটিতে মার্কিন দূতাবাসকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কয়েক দফা সেনা পাঠিয়েছে।

ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না by ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

বিচারিক প্রক্রিয়া সর্বাবস্থায় স্বচ্ছ ও যথাযথ হওয়া আবশ্যক। ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত হচ্ছে- কেবল ন্যায়বিচার করলেই হবে না, ন্যায়বিচার হয়েছে সেটাও স্পষ্ট হতে হবে। সুবিচার এবং বিচারের গ্রহণযোগ্যতার প্রয়োজনেই তা দরকার। সেটা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চার দশক আগে যারা সেদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং পাকবাহিনীর অনুচর হয়ে নানা অপকর্ম ও ফৌজদারী অপরাধে জড়িত হয়েছে, তাদের অপকর্মের বিচার অনেক আগেই সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল। বিলম্বে হলেও সরকার সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে, সে জন্য সাধুবাদ জানাতে হয়। তবে এই বিচিত্র অপরাধের বিচার করতে গিয়ে যেন কোনোভাবেই স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ব্যত্যয় না ঘটে।
লক্ষ করা যাচ্ছে, এই বিচার কার্য চালাতে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা, মামলা পরিচালনাকারী ও বিচারকবৃন্দ সবাই হিমশিম খাচ্ছেন। সুদীর্ঘকাল আগে সংগঠিত কোনো অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পরিচালনা করা নানা কারণে দুরূহ হয়ে পড়ে। সময় ক্ষেপণের কারণে অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণ হারিয়ে যায়। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব এবং অস্পষ্টতা প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল দেয়। আবার একের অপরাধ অন্যের ওপর চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় রাজনীতির দুই বিবদমান পক্ষের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও জিঘাংসা। এমনই এক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নটি গৌণ হয়ে পড়েছে। একপক্ষ চাইছে প্রতিপক্ষকে যে কোনো পন্থায় ঘায়েল করতে, যুক্তি-তর্ক সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন নেই, অপরাধের গুরুত্ব বা আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচ্য নয়। ন্যায়-অন্যায় যে কোনো পন্থায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে। এক পক্ষের কাছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কোনো শাস্তি নয়, মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কোনো দণ্ডই দণ্ড নয়। অপর পক্ষ প্রমাণ করতে চায়, সব অভিযোগই মিথ্যা, একাত্তরে এই অভিযুক্তদের কেউ-ই কোনো অপরাধ করেনি।
এমন পরিস্থিতিতে বিচারকার্য চালানো যে কতটা বিব্রতকর, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই তা অনুভব করছেন। মনে হয় সেটা এখন সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। তার দলেরই একাংশের অতি উৎসাহে গড়ে উঠেছিল শাহবাগের কথিত গণজাগরণ মঞ্চ। সেই মঞ্চ থেকে ফরমান জারি করে বিচারকার্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অগ্রপশ্চাত বিবেচনা না করে তার দলের এ নেতা-নেত্রীরা এই মঞ্চের পেছনে কাতারবন্দি হয়ে গেলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন স্তরের নিরাপত্তায় শাহবাগের ব্যস্ত চৌরাস্তাটিকে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে। সেই চাপের মুখে সরকারকে আইন পাল্টাতে হয়েছে। আদালতকে রায় পাল্টাতে হয়েছে। এখন আবার সরকার পক্ষই সেই মঞ্চ ভেঙে ফেলার কাজে হাত দিয়েছে। মনে হয় তারা এতদিনে বুঝতে পেরেছেন যে, তারা আসলে ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরি করেছেন। ফ্রাংকেনস্টাইন তার নির্মাতাকেও ছাড় দেয় না।
প্রথম যখন কিছু তরুণ ব্লগার কায়রোর তাহরির স্কয়ারের ধাঁচে শাহবাগ চত্বরে জমায়েত হয়, তখন অনেকেই রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন। আমাদের চলমান বন্ধ্যা ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশের তরুণ প্রজন্ম প্রতিবাদী হয়েছে- তেমন ধারণার বশবর্তী হয়ে আমি নিজেও তাতে আশার আলো দেখে উৎসাহ বোধ করেছি। শাহবাগ চত্বরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। চায়ের দোকানে বসে উদ্যোক্তাদের উদ্দীপনাময় বক্তব্য শুনেছি। কিন্তু দু-একদিন পরই ভুল ভাঙ্গতে শুরু করে। প্রথমত, সরকারি দল ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার নজীরবিহীন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা থেকে স্পষ্ট হয়ে পড়ে, এই মঞ্চ তরুণ প্রজন্মের স্বতঃপ্রণোদিত প্রতিবাদী কণ্ঠের বহিঃপ্রকাশ নয়; সরকারি দলেরই মদদে পরিকল্পিতভাবে তার আÍপ্রকাশ ও বিকাশ ঘটছে। অতঃপর কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্লগারের মহানবী ও ইসলামের বিরুদ্ধে নোংরা লেখালেখি নিয়ে বিভিন্ন মহলের ক্ষোভ ও সমালোচনার প্রেক্ষাপটে শাহবাগের মঞ্চ থেকে সেই ব্লগারদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা সবার চোখ খুলে দেয়। ফলে আবার কলম ঘুরিয়ে লিখতে হয়েছে। আমার মতো অনেকের ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে। গণজাগরণ মঞ্চই এখন এই সরকারের গলার কাঁটা। সেই কাঁটা অপসারণের অপারেশন চলছে, তবে সরকারের যতটা ক্ষতি হওয়ার তা হয়েই গেছে।
জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে সরকারি দলের পক্ষ থেকে। এ নিয়ে দেদার মিটিং-মিছিল হচ্ছে। কিন্তু সে ব্যাপারে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট নয়। আইনমন্ত্রী বলেছেন, আইনের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেছেন, আজ জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হবে, আর আগামীকাল সে জন্য আইন পরিবর্তন করা হবে, আমি এর পক্ষে নই। এ থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে বিদ্যমান আইনে তিনি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তিনি আরও বলেছেন, আমাকে সারা পৃথিবীতে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে কাদের মোল্লার ব্যাপারে।
তা থেকেও সরকারের নাজুক অবস্থান বুঝতে আর কিছুই বাকি থাকে না।
কাদের মোল্লা নির্দোষ ছিলেন তা মনে করার কোনো কারণ নেই। একাত্তরে জামায়াত যে ভূমিকা পালন করেছে, তার অনেক কিছুই ক্ষমার অযোগ্য। কাদের মোল্লাও তখন তাতে শরীক ছিলেন। কিন্তু অপরাধের শাস্তির পরিমাপ বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে হয়। কত বছরের সাজা হবে, মৃত্যুদণ্ড হবে কি-না, তা বাদী বা সংক্ষুব্ধদের দাবির ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। তাহলে তো আদালতের প্রয়োজন থাকে না। রাজপথে জনতার আদালত বসিয়েই বিচারকার্য সম্পন্ন করা যায় এবং রাজপথেই সেই দণ্ডাদেশ কার্যকর করা যায়। আইনমন্ত্রী কি সে ব্যাপারেই পৃথিবীতে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন?
দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এই জাতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। একাত্তরে জামায়াত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অস্ত্র ধরেছে। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যায় এ দলের অঙ্গসংগঠন আলবদর বাহিনী প্রত্যক্ষ ভূমিকায় ছিল বলে সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে। এরপরও এই নামে এ দেশে দল পরিচালনা করতে দেয়া নাৎসি দলকে জার্মানিতে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়ার সুযোগ প্রদানের সমতুল্য। জার্মানি কি তা দিয়েছে?
একাত্তরে আমরা যখন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছি, তখন এই দলের যে নেতা-কর্মীরা পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণ করেছিলেন, তারা কি এখনও পাকিস্তানের প্রতি অনুগত আছেন? তারা কি এখন উপলব্ধি করেন যে, তাদের সেদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ভুল ছিল? তারা কি সেই আনুগত্য প্রত্যাহার করে তাদের সেদিনের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন? পাকিস্তানিদের আÍসমর্পণ এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সর্বজনীন স্বীকৃতির পর এদেশের কোনো নাগরিকের পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। সে কারণেই একাত্তরে যারা প্রকাশ্যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে রক্ষা করার প্রয়াসে সক্রিয় ছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছে কি-না ্এবং তারা বাংলাদেশকে মেনে নিয়েছে কি-না, তা অবশ্যই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো এ বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেয়নি।
বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ, কিংবা ফৌজদারী অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। সাধারণ ক্ষমার আওতায় পড়ে না- এ ধরনের অপরাধ যারা করেছে তাদের চিহ্নিত করে বিচারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা অত্যাবশ্যক ছিল। বাদবাকি পাকিস্তান সমর্থক সাধারণ নাগরিককে অনুশোচনার সুযোগ দিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে দেয়াও জাতীয় সংহতির স্বার্থে জরুরি ছিল। বঙ্গবন্ধু সে পথেই এগোতে চেয়েছেন। কাজটি তখন ঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়নি। সেদিন তা করা হয়নি বলেই আজ কাফ্ফারা দিতে হচ্ছে।
একাত্তরে কোনো ব্যক্তি যদি তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা থেকে নীতিগতভাবে মনে করে থাকে যে, পাকিস্তান ভেঙে ফেলার পরিণতি ভালো হবে না, আমরা এক শোষণের হাত থেকে আরও বড় শোষণের আওতায় চলে যাব, সেই ব্যক্তি যদি অন্য কোনো অন্যায় বা জবরদস্তিমূলক কাজে না জড়িয়ে থাকে, তাহলে সেটাকে রাজনৈতিক ভিন্নমত হিসেবে গণ্য করতে হবে, অপরাধ হিসেবে নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক ভিন্নমতের জবাব রাজনৈতিকভাবেই দিতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষ শক্তিকে তাদের কাজের মধ্য দিয়ে এবং দেশ গঠনের সফলতা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। দেখিয়ে দিতে হবে, দেশ ও দেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে। যা পাকিস্তানের কাঠামোতে সম্ভব ছিল না। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি।
আমরা কি সেই শাস্তির পটভূমি তৈরি করতে পেরেছি?
জাতি গঠন এবং সুশাসনের রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ না করে কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে কিংবা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বিভাজনের মাধ্যমে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে একাত্তরের দানবটিকে কবর থেকে তুলে এনে আবার জীবন্ত করা হয়েছে। যার মোকাবেলায় এখন সরকারের নিজেকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। অপরদিকে শত্র“র শত্র“ আমার বন্ধু- এ নীতি অবলম্বন করে আমাদের প্রধান বিরোধী দল সেই দানবকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সিন্দাবাদের কাঁধে চেপে বসা দৈত্যের মতো সেই দানব আমাদের বিরোধী দলের পথনির্দেশক হয়েছে! জাতিকে কি নতুনভাবে একাত্তরের বিভাজনে বিভাজিত করার চেষ্টা চলছে? জাতির জন্য এর চাইতে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!
১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলবিধি আইন জারি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বিধি জারি করেন। সেই বিধি অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামীও নতুনভাবে দল গঠনের সুযোগ লাভ করে। সেই কাজটি বিবেচনাপ্রসূত হয়েছে বলা যায় না। একাত্তরে যেসব দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকবাহিনীর সহযোগী হয়েছে, বিশেষ করে যুদ্ধ কবলিত দেশে শত্র“র দেয়া নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতার ভাগ নিয়েছে, তাদের দল পুনরুজ্জীবনের সুযোগ না দিলে তা মোটেই অযৌক্তিক হতো না। তাতে কারোই কিছু বলার থাকত না। সেক্ষেত্রে এসব দলের বা চিন্তাধারার লোকেরা নতুন রাষ্ট্রের বাস্তবতা মাথায় রেখে তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার পুনর্র্বিন্যাস ঘটাতে বাধ্য হতো। তাদের একাত্তরের পরিচয় পেছনে রেখে নতুনভাবে নতুন কোনো নামে দল গড়ে তুলতে হতো। যেমনটি শুরু করেছিলেন জামায়াতের তাত্ত্বিক ও বর্ষীয়ান নেতা মওলানা আবদুর রহীম। তিনি নতুন করে জামায়াতে ইসলামী নামে দল গঠনের বিরোধী ছিলেন এবং ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ঢালাওভাবে সব দলের পুনরুজ্জীবনের সুযোগ অবারিত হওয়ার পর তার প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যায়। কট্টরপন্থীরা পুরনো নামেই এবং পুরনো চিন্তাধারা মাথায় নিয়েই নতুনভাবে রাজনীতির মাঠে নামার সুযোগ পায়।
যে কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরুদ্ধ পক্ষ বা পঞ্চম বাহিনী থাকা বিচিত্র নয়। স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর তাদের সবাইকে শূলে চড়াতে গেলে তা হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে। সে জন্যই বিরুদ্ধ পক্ষের সবাইকে ঢালাওভাবে যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী আখ্যা দিয়ে সবার জন্যই মৃত্যুদণ্ড পূর্বনির্ধারিত করে দেয়া দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক নয়। জাতিদেহের সুস্বাস্থ্যের জন্যই যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করার বিকল্প নেই। তবে বিচার প্রক্রিয়াকে অবশ্যই তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে এবং তার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত ও দৃশ্যমান হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন এমন ধারণা সৃষ্টির সুযোগ দেয়া না হয় যে, বিরোধী দলকে দমনপীড়নের লক্ষ্যে এই বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com

ভয় পেয়েছিলেন মেসি!

সুপার হিরোরাও ভয় পান! পানই তো। লিওনেল মেসি অবলীলায় সেই ভয়ের কথা বলেও দিতে জানেন। সেই ভয়, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়ার। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে ডি মারিয়ার একমাত্র গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে আবারও আর্জেন্টিনার ত্রাতা মেসিই বটে। তার বানিয়ে দেয়া বলকে জালে জড়িয়েছেন ডি মারিয়া। দলকে নিয়ে গেছেন কোয়ার্টার ফাইনালে। কিন্তু পরশু সাও পাওলোর করিন্থিয়ান্স অ্যারেনার এই লড়াই চারবারের বিশ্বসেরা ফুটবলারের পুরস্কার জেতা মেসিকেও নার্ভাস করে দিয়েছিল। তবে সব শংকা কাটিয়ে জিতেছে আর্জেন্টিনা। ৫ জুলাই ব্রাসিলিয়ায় বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে তারা।

নকআউট পর্বের ম্যাচে আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে ডিফেন্স করে খেলাই ভালো মনে করেছে সুইজারল্যান্ড। তাতে তারা লাভবানও হয়েছে। হতাশা ছড়িয়ে গেছে ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মধ্যে। সময় গড়িয়েছে, গোল হয় না। ৯০ মিনিটেও হল না। মনে হচ্ছিল ১২০ মিনিটেও হবে না। আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্সের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। মনে হচ্ছিল ম্যাচ যাচ্ছে পেনাল্টি শুট আউটে। ১২০ মিনিটে ২৯টি শট নিয়েছে আর্জেন্টিনা। টার্গেটে শট গেলেও কোনো না কোনোভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে নিয়েছে সুইসরা।
এই যখন অবস্থা তখন একজন খেলোয়াড়ের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কেমন হতে পারে? শোনা যাক মেসির অবস্থা কী হয়েছিল তা। ‘দুশ্চিন্তায় ভুগছিলাম। তেমনটাই লাগছিল।’ টানা চতুর্থ খেলায় ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার হাতে মেসি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আর সবাই আমার মতো নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। আমি নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম খুব। কারণ, আমরা গোল করতে পারছিলাম না। আর যে কোনো ভুল আমাদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দিতে পারে।’ বিশ্বকাপ থেকে আউট হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। আর একটা বিষয় এড়াতে চাইছিলেন। মেসির ভাষায়, ‘সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। আর আমরা চাইছিলাম না ম্যাচটা কোনোভাবে পেনাল্টি শুট আউটে যাক।’ ১১৮ মিনিটে বলটা নিয়ে ডি বক্সে ঢুকে পড়ছেন মেসি। একক চেষ্টায় গোল করবেন। হঠাৎ ডান পাশে বলটা বাড়ালেন। ডি মারিয়া করলেন লক্ষ্যভেদ। যখন সবাই তাকে জয়ের নায়ক বলছে তখন ডি মারিয়া বললেন, ‘আমি নই। জয়ের নায়ক আমাদের ২৩ খেলোয়াড় আর সব স্টাফ।’ মেসি একবার ভেবেছিলেন নিজেই গোলে শট নেবেন। ওই গোলের প্রসঙ্গেই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মেসি বলেছেন, ‘প্রথমে ভাবলাম আমি নিজে চেষ্টা করি। পরে ডি মারিয়াকে দেখলাম। ভাগ্য ভালো, সে গোল করতে পারল। এটাই ফুটবল। ভাগ্য আমাদের সঙ্গে ছিল।’কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলা ভেবেছিলেন, নির্ধারিত সময়েই ম্যাচের ফল এসে যাবে। তারা জিতবেন। কিন্তু সেই জয় পেতে আরও বাড়তি ৩০টি স্নায়ুক্ষয়ী মিনিট কাটাতে হয়েছে। এখন কি ব্রাজিলের সঙ্গে ফাইনালের কথা ভাবতে পারছেন সাবেলা। কোচ এখনই মারাকানার ফাইনালে পৌঁছে যেতে নারাজ। ‘আমাদের স্বপ্ন বলুন আর যা, তা হল আগামী ম্যাচ পর্যন্ত। ওটা খেলে সেমিফাইনালে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। এর চেয়ে বেশি দূরে তাকাতে চাই না।’ ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য সাবেলার, ‘যখন মাত্র এক পা ফেলা যায়, তখন দুই পা ফেলার ভুল কিছুতেই করতে চাই না আমরা।’
সাবেলার বিশ্লেষণে ম্যাচের প্রথমার্ধটা ছিল দুই দলেরই। তারপর ম্যাচ ঝুঁকে পড়ে আর্জেন্টিনার দিকে। সাবেলার ভাষায়, ‘দ্বিতীয়ার্ধে আমরা অনেক ভালো খেলেছি। গোল করার পাঁচ থেকে ছয়টা সুযোগ পেয়েছিলাম। নির্ধারিত সময়েই জয় আমাদের প্রাপ্য ছিল। ওটাই আদর্শ হতো। তবে অতিরিক্ত সময়ে আমরা আরও বেশি সুযোগ তৈরি করেছি, খুব কঠিন এক দলের বিপক্ষে সুন্দর একটা খেলা খেলেছি আমরা।’ ম্যাচ শেষে মেসির প্রশংসায় মুখর হয়েছেন সুইজারল্যান্ডের জার্মান কোচ ওটমার হিজফেল্ড, ‘তিন-চারজন খেলোয়াড় নিয়োগ করে মেসিকে থামাতে চেয়েছিলাম। এ রকম একটা দলের বিপক্ষে শুধু একজনের দিকে চোখ রাখলে চলে না। ডি মারিয়া সেটাই প্রমাণ করেছে। অসাধারণ ফিনিশিং তার।’ এবার প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। এই টুর্নামেন্টের ডার্ক হর্স। দ্বিতীয় রাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে বহুকাল পর কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। শেষবার শেষ আটে খেলেছে ১৯৮৬ সালে। সেবার ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে বেলজিয়ামকে উড়িয়ে দিয়ে গেছে। তৃতীয় শিরোপার খোঁজে মেসির আর্জেন্টিনা। এবার কী হবে? জবাব মিলবে রোববার। এএফপি/ওয়েবসাইট।

বিশ্ববিদ্যালয়-ব্যবসা- প্রতারকদের হটান, যোগ্যদের পুরস্কৃত করুন

শিক্ষা যখন ব্যবসা, ব্যবসা যখন দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়–ব্যবসাও দুর্নীতিগ্রস্ত না হয়ে পারে না। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে অর্থের বিনিময়ে সনদ বিক্রিসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে যথেচ্ছ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে মধ্যবিত্ত সমাজ সর্বজনের (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে দিতে না পেরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের বোঝা বহন করছে, তাদের সঙ্গে এমন প্রতারণার দায় তদারককারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এড়াতে পারে না।
টিআইবির এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে স্বয়ং শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাদের উচিত ছিল অভিযোগগুলো তদন্ত করে বিহিত করা। তা না করে অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আসলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন চলছে, তেমনি চলার সবুজসংকেতই দিল।
শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে নীতিনৈতিকতা ও জাতির মেধাসম্পদের বিকাশের প্রশ্ন জড়িত। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির এমন মচ্ছবে সরকার নির্বিকার থাকলেও দেশবাসী উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। ঘুষ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি থেকে নিয়োগ, পাঠ্যক্রম অনুমোদন, অডিটের মতো যাবতীয় প্রশাসনিক বিষয় যদি তারা সম্পন্ন করে থাকে, সেখানে শিক্ষাদান গুরুত্ব পেতে পারে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনি শর্ত পূরণ না করে থাকলে কীভাবে অনুমোদন পেল? এখানেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই শর্ত পূরণ করছে কি না, সেটি তদারক করা। কিন্তু তারা যদি তদারকির কাজটি সুষ্ঠুভাবে না করে, তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মের অধীনে নিয়ে আসা যাবে না। আর সে ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার নামে এ ধরনের দুর্নীতি-জালিয়াতি চলতেই থাকবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বাস্তবতা বাংলাদেশে শিক্ষার সার্বিক পতন এবং সর্বগ্রাসী দুর্নীতিরই প্রতিফলন। যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা প্রশাসন এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দুর্নীতিমুক্ত থাকত, তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে এ রকম দুর্নীতিতে মেতে ওঠা সম্ভব হতো না। দ্বিতীয়ত, সরকার যদি শিক্ষার মানের প্রশ্নে অবহেলা না করত, তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ শিক্ষাদানের উপযুক্ত পরিবেশ বিরাজ করত। টিআইবির প্রতিবেদনকে আমলে নিয়ে সরকারের উচিত ছিল ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে যোগ্যকে পুরস্কৃত করা এবং অযোগ্যদের বিতাড়িত করার বিকল্প নেই।
আশার কথা, এত সব অনিয়মের মধ্যেও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক উৎকর্ষে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষিত জনসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাও প্রয়োজনীয়। কিন্তু বাণিজ্যিক শিক্ষাব্যবস্থা যেভাবে কালোটাকা সাদা করার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, তাতে এ আশা বিফলে যেতে পারে। এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষার মানের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ যেন তাতে না থাকে।

বন্ধুতার বার্তা ও বিশ্বাসের বীজ by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ঢাকা সফর করে ফিরে আসার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, কেমন হলো, তাহলে এক শব্দের উত্তর পাবেন—দারুণ। সামান্য একটু ব্যাখ্যা চাইলে সাউথ ব্লক বলবে, বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন, বিশ্বাসের বীজ বপন করে ফিরেছেন। অতি সংক্ষেপে এই সফরের নির্যাস এটাই। বন্ধুতা, বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ—এ বার্তাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একেবারে প্রথম দিন থেকেই প্রতিবেশীদের দিতে চেয়েছেন। শপথ গ্রহণের দিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রনায়কদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভুটানকে বেছে নিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম একক সফরের জন্য বাংলাদেশকে পছন্দ করেছেন।

ওখানেই থেমে থাকেননি তিনি। শ্রীহরিকোটা থেকে ভারতের আরও একবার সফল উপগ্রহ উৎক্ষেপণের দিন তিনি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এবার একটা সার্ক উপগ্রহ তৈরি করুন, যা আমরা প্রতিবেশীদের উপহার দেব। সেই উপগ্রহ, যা আমাদের দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর করতে সাহায্য করবে, সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানের প্রসার ঘটাবে, সার্কের যুব সম্প্রদায়ের বিকাশের জন্য সুযোগ ও সুবিধার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।’ সংক্ষেপে, সুষমার তিন দিনের ঢাকা সফর ছিল প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক প্রতিবেশী-পরিকল্পনারই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
কংগ্রেস সরকারের বাংলাদেশ-নীতি নতুন সরকারের আমলে বদলায় কি না, এমন একটা জল্পনা বাংলাদেশে ভোটের আগে-পরে মাথাচাড়া দিয়েছিল। এর নানাবিধ অভ্যন্তরীণ কারণ আছে। সেই কারণগুলোর কিছু কিছু অতিসরলীকরণও বটে। যেমন, ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বিজেপি যেহেতু ভিন্ন মেরুর, কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক যেহেতু মাখামাখি, সেহেতু ক্ষমতায় এসে কংগ্রেসি-নীতি বিজেপি বদলে দেবে, বিজেপি-বিএনপি কাছাকাছি আসবে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করবে ইত্যাদি।
এ ধারণা যাঁদের হচ্ছিল, তাঁরা কিন্তু এটা বুঝলেন না যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় না। তাঁরা এটাও দেখলেন না যে, যে নির্বাচন নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, মোদি সেই নির্বাচনে জিতে আসা সরকারের প্রধানমন্ত্রীকেই তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেন। এ-ও দেখলেন না, সেই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণেই সুষমার ঢাকা সফর। নির্বাচন নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক, ভারত সেই নির্বাচনকে প্রথম দিনেই সাংবিধানিকভাবে বৈধ বলে জানিয়েছে, নতুন সরকারও সেই বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি; বরং তার আচরণ সেই বৈধতাকেই মান্যতা দিয়েছে।
সুষমার এ সফর স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে ভিত এত বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তা মজবুত করে তার ওপরেই সম্পর্কের শক্তপোক্ত খিলান গড়ে ভারত এগোতে চায়। বাংলাদেশের জনগণই ঠিক করবেন, তাঁরা কোন ধরনের সরকার চান, কাদের তাঁরা ভরসা করবেন, পছন্দ করবেন। এই বার্তা সুষমা আন্তরিকতার সঙ্গেই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষকে দিয়ে আসতে পেরেছেন।
যেকোনো সম্পর্কেরই দুটি দিক থাকে। একটি তাৎক্ষণিক, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটা ভারত দীর্ঘ মেয়াদের আলোয় দেখতে চাইছে। সুষমাও বারবার সেটা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন। এবং সে কারণেই তিনি এ সফরকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত হিসেবে দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাণিজ্য, সংযোগ, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলমিশ বাড়ানোর কথা যেমন বলেছেন, তেমনই সন্ত্রাস, মৌলবাদ, দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো একই ধরনের সমস্যাগুলোর নিরসনে যৌথ প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি জানতেন, আস্থার কথা, ভরসার কথা, শুভেচ্ছার কথা যতই বলা হোক, কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয় বাংলাদেশ তুলবেই এবং সেগুলোর জবাব এড়ানো যাবে না।
এই অতি স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত প্রটোকল বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা এবং অবৈধ অভিবাসনের মোকাবিলার প্রশ্নগুলো। সুষমা কিন্তু এ প্রশ্নগুলোর একটিও এড়িয়ে যাননি। এটা ঠিক, এ চারটি ক্ষেত্রেই দলগতভাবে বিজেপির ভূমিকা বেশ কঠোর। কিন্তু সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বাস্তবোচিত ভূমিকা নিয়ে সমাধানের প্রক্রিয়ায় যে তাঁরা আগ্রহী, সেই বার্তা কিন্তু তিনি দিতে পেরেছেন এবং সেই ভরসা তিনি জোগাতে সফল। তিস্তা ও সীমান্ত প্রটোকল নিয়ে সফরের দিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনালাপ সুষমার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতারই পরিচায়ক।
এটা ঠিক যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আধার হিসেবে তিস্তা ও সীমান্ত বিরোধকে প্রধান করে তোলার বাংলাদেশি মানসিকতা ভারতের সাউথ ব্লকের রীতিমতো না-পছন্দ। কিন্তু সেই দেশের রাজনৈতিক আবহে এ দুই বিষয়ই যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এ বাস্তবতাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্বীকার করতে পারছে না। বাংলাদেশকে সুষমা এটা বোঝাতে চেয়েছেন, স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মীমাংসায় সরকার একান্তই আগ্রহী। সে জন্য সময় লাগবে। কিন্তু সম্পর্কের প্রবাহ সেই কারণে থমকে যাওয়া উচিত নয়।
সীমান্ত হত্যা ও অনুপ্রবেশের সমস্যাও স্পর্শকাতর বিষয়। সুষমাকে এ দুই প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তাঁর পক্ষে এ দুই বিষয়ে বাংলাদেশি মানসিকতার মোকাবিলা করাটাও ছিল কঠিন। কারণ, দলীয় অবস্থান। ভোটের আগে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি বিভিন্ন জনসভায় অনুপ্রবেশ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, যা বাংলাদেশের অপছন্দ। সীমান্তে নরম মনোভাব গ্রহণও বিজেপির দলগত নীতির পরিপন্থী। সুষমা কিন্তু বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করেননি; বরং দলীয় অবস্থানের বাইরে এসে সমস্যা দুটি ‘মানবিক’ আখ্যা দিয়ে তার সার্বিক মোকাবিলার ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের নেতাদের তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন, অনুপ্রবেশ সত্যিই যে একটা সমস্যা, সেটা অস্বীকার করলে ভাবের ঘরে চুরি করা হবে। এ সমস্যা বিশ্বব্যাপী। সর্বজনীন। অতএব এর মোকাবিলায় যা কিছু করণীয়, তা করতে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে দুই দেশই সমস্যামুক্ত হয়।
বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সুষমা দেখা করেন কি না, সেই আগ্রহ বাংলাদেশে যেমন ছিল, তেমনই ছিল দেখা হলে আলোচনার গতিপ্রকৃতি কোন খাতে বয়, তা নিয়ে। এই সাক্ষাৎ নিয়ে শাসকগোষ্ঠীরও হয়তো কিছুটা আড়ষ্টতা ছিল। শেষ পর্যন্ত সুষমার হোটেলে এসে খালেদা দেখা করেন। গণতান্ত্রিক ভারত কোনো দেশের বিরোধীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও যে গণতন্ত্রী, খালেদার সঙ্গে দেখা করে সুষমা সেটাও বুঝিয়ে দিলেন। খালেদার সঙ্গে সুষমার কথাবার্তা প্রায় পুরোটাই ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক, একমাত্রিক ও নালিশে ভরা। সুষমা তাঁকেও বুঝিয়ে দিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ সমস্যার মোকাবিলা বাংলাদেশের জনগণকেই করতে হবে। ভারত সম্পর্ক রাখবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে। বিরোধী নেত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গেও সুষমা দেখা করেছেন। তাঁকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন; অথচ খালেদা জিয়াকে তা জানাননি। দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশি রাজনীতিতে এটা নিশ্চিতভাবেই আওয়ামী লীগের কাছে শ্লাঘার বিষয়।
ভারত যে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ দেখতে চায়, এ বার্তা সুষমা বারবার দিয়েছেন। প্রতিবেশী অশান্তিতে থাকলে ভারতও যে শান্তিতে থাকতে পারে না, এ কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বুঝিয়েছেন। প্রতিবেশীদের সবাইকে নিয়ে ভারত উন্নতির সিঁড়িগুলো ভাঙতে চায়, বিকাশের পথে এগোতে চায়—এ কথাও মোদি বারবার বলছেন। এগুলো যে কথার কথা নয়, ক্ষমতায়নের এক মাসের মধ্যেই তা তিনি রেখেছেন। সুষমাকে ঢাকা সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত তারই প্রমাণ।
এ সফরে সুষমা তাঁর একমাত্র সাক্ষাৎকারে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘গত আর্থিক বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৫৬৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।’ ভারত চায়, অচিরেই রপ্তানির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াক। তাহলে সহযোগিতার বহর বৃদ্ধি বোঝানো যাবে। এর অর্থ বাংলাদেশের আর্থিক দিক থেকে বলশালী হওয়া। মোদি সরকারের লক্ষ্যও বাংলাদেশকে শক্তিশালী ও বিত্তশালী দেখা। প্রথম একক সফরে ঢাকায় গিয়ে সুষমা সেটাও বোঝাতে পেরেছেন।
সুষমার এই সফরকে ‘শুভেচ্ছা সফর’ বলা হয়েছে। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে জানা, সে দেশের সরকার ও জনগণকে চেনা-জানা ও নিজেকে চেনানো। পরস্পরকে জানা-চেনার এই প্রাথমিকতায় সুষমা স্বরাজ সফল। প্রথম সফরে তিনি কীভাবে আদৃত এবং পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা স্থাপনে কতটা সফল, একটি ছবিই সম্ভবত তা বুঝিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। ২৯ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত হাসিনা ও সুষমার সেই ছবিটা আরও একবার ভালো করে দেখুন। কোনো কোনো ছবি কিছু না বলেও অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়; ক্যাপশনের প্রয়োজন হয় না।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

পাহাড়ি উচ্ছেদ করে দীঘিনালার নিরাপত্তা! by ইলিরা দেওয়ান

সম্প্রতি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় বাবুছড়া নামক স্থানে বিজিবির ৫১ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য বিজিবি জমি দখলে নেওয়ার পর ওই এলাকার ২১টি পাহাড়ি পরিবার ভিটেছাড়া হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের এলাকার পাহাড়িরাও উচ্ছেদ-আতঙ্কে অনিশ্চিত প্রহর গুনছেন। গত ১৪ মে বিজিবির সদস্যরা গভীর রাতে বাবুছড়ায় অবস্থান নেন। এ আকস্মিক দখল-প্রক্রিয়া ভোরের আলো ফোটার পরে স্থানীয় পাহাড়িদের বিস্মিত করেছে।
কারণ, ২০০৫ সাল থেকে পাহাড়ি–অধ্যুষিত এ লোকালয়ে বিজিবির সদর দপ্তর স্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বিজিবির এ জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট (মামলা নং-৩৪৫৫-৩৪৬৪/২০০৫) করা হলে ওই বছরের ১৯ মে হাইকোর্ট এ জমি অধিগ্রহণের নোটিশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি করেন এবং এ রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ নোটিশ স্থগিতের নির্দেশ দেন, যার এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু গত ১৫ মে আদালতের এ আদেশকে উপেক্ষা করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজিবিকে অধিগ্রহণকৃত জমিটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
বিজিবির দখলকৃত জমির মধ্যে কেবল পাহাড়ি বসতভিটা ও জমি নয়, একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুল, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমিও রয়েছে। প্রাইমারি স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে স্কুলের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিজিবির সদস্যরা সাধারণের জন্য চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে স্থানীয় পাহাড়িদের একপ্রকার অবরুদ্ধ করে দেন।
অন্যদিকে, বিজিবির বাধার কারণে প্রায় ২১টি পরিবার নিজের বাড়িঘর ছেড়ে স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলে এ স্কুলটির শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিজিবির সদস্যদের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। গত ১০ জুন বাবুছড়ার স্থানীয় জনগণ বিজিবির সদর দপ্তর স্থাপনের প্রতিবাদে মানববন্ধন করতে গেলে বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে নারী-পুরুষসহ কমপক্ষে ১৮ জন পাহাড়ি আহত হন।
অন্যদিকে বিজিবির কয়েকজন সদস্যও আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। এ ঘটনার পর চিকিৎসাধীন আহত চারজন নারীসহ ছয়জনকে হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় আড়াই শতাধিক নারী-পুরুষকে আসামি করে বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। আসামির তালিকায় ৩০ ও ৩২ নম্বর ব্যক্তিদ্বয় মৃত হলেও তাদের নামেও মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া একজন সরকারি কৌঁসুলির নামও এতে যুক্ত করা হয়েছে। তাই বিজিবির এ মামলা যে হয়রানিমূলক ও জনমনে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তা সহজে অনুমেয়।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়িদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। বাবুছড়ার আগে বাঘাইছড়ির দ্বি-টিলা নামক স্থানে একটি ধর্মীয় উপাসনালয় (বৌদ্ধদের) স্থাপন করতে গেলে সেখানেও প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। এ ছাড়া বন বিভাগকে দিয়ে চার শতাধিক লোকের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা [ধারা ১৯২৭ সালের বন আইন (সংশোধিত), ২০০০ সালের ২৬(১ক)] করা হয়েছে।

দুই

কিছুদিন আগে সরকার তিন পার্বত্য জেলায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি ‘পাহাড়ি ব্যাটালিয়ন’ নামে র্যাবের একটি ‘বিশেষ’ ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে (সূত্র: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, দৈনিক যুগান্তর)। এ বিশেষ ব্যাটালিয়নটি চৌকস সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত হবে এবং তাঁরা সার্বক্ষণিকভাবে একে-৪৭ রাইফেলসহ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করবেন। এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ সীমাবদ্ধতার কারণে এ বাহিনী হেলিকপ্টার ও স্পিডবোটে অভিযান চালাবে বলে খবরে প্রকাশ।
তাই এ বিশেষ ব্যাটালিয়ন গঠনের সংবাদে পাহাড়ের মানুষের মনে এ প্রশ্নই বারবার জাগছে—চারটি সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতির পাশাপাশি সন্ত্রাস দমনের নামে যদি আরও একটি বিশেষ ব্যাটালিয়ন যুক্ত করা হয়, তাহলে পাহাড়ে কেবল হেলিকপ্টারের গর্জন আর অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের ঝংকারের শব্দই শোনা যাবে। যে বাহিনীর (র্যাব) বিরুদ্ধে গঠনলগ্ন থেকে ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বারবার উঠছে, আর তাদের ভাষ্যমতে, পাহাড়ি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের (!) পাকড়াও করতে অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিকল্প নেই!
তাই অদূর ভবিষ্যতে পাহাড়ে অস্ত্রের ঝংকার আর অহরহ ‘গুলিবিনিময়’ বা ক্রসফায়ারের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
২০১২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের এক-তৃতীয়াংশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে (সূত্র: Militarization in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh: Published by IWGIA, Organising Committee CHT Campaign and Shimin Gaikou Centre, 2012)। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী ছয়টি সেনানিবাস ছাড়া বাকি সব অস্থায়ী সেনাছাউনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল।
অথচ চুক্তির শর্তের তোয়াক্কা না করে একের পর এক চুক্তিভঙ্গের পদক্ষেপ যেমন, বিশেষ ব্যাটালিয়ন গঠনের সিদ্ধান্ত, যেখানে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার সদস্য থাকবেন, বান্দরবানের রুমায় সেনা গ্যারিসন, রোয়াংছড়ি উপজেলায় বিজিবির হেডকোয়ার্টার, দীঘিনালার বাবুছড়ায় বিজিবির হেডকোয়ার্টার স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নিরাপত্তার নামে সশস্ত্র বাহিনীর অধিক উপস্থিতি পাহাড়ের সবুজ স্নিগ্ধ পরিবেশ বারবার রঞ্জিত করেছে। তাই সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি এ ‘বিশেষ ব্যাটালিয়ন’ গঠনের সিদ্ধান্ত যদি অচিরে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য এটি নিঃসন্দেহে আরেকটি অশনিসংকেত হবে।
সম্প্রতি র্যাব পুনর্গঠন বা সংস্কারের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি অনেকে র্যাবের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন। এমনতর পরিস্থিতিতে পাহাড়ে নতুন করে ‘বিশেষ ব্যাটালিয়ন’-এর নামে র্যাব মোতায়েনের খবরে পাহাড়ের মানুষ স্বাভাবিকভাবে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। গত ১৬-১৭ বছরেও পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ের মানুষের মনে যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার বীজ জন্মেছে, সে আস্থাহীনতার মধ্যে ‘বিশেষ ব্যাটালিয়ন’ মোতায়েন করা হলে পাহাড়ের পরিবেশ বরং ক্রমে আরও অস্থিতিশীল ও অশান্ত হয়ে উঠবে।
তাই এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সরকারের বিষয়টি নিয়ে আরও ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করা এবং স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভালোমন্দ বিবেচনায় নেওয়া উচিত। একইভাবে দীঘিনালার বাবুছড়ায় পাহাড়ি–অধ্যুষিত লোকালয়ে বিজিবির সদর দপ্তর স্থাপনে বল প্রয়োগ না করে এমন একটি স্থানে এ সদর দপ্তর স্থাপন করা হোক, যেখান থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষা করা সহজতর হবে।
ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
ilira.dewan@gmail.com

প্রতিশোধ—ছাত্রলীগ স্টাইল! by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

এক বছর আগে, ২০১৩ সালের ১৬ জুন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। সেদিন নায়েব হোসাইন খান নামের এক তরুণ শিক্ষার্থীর হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে নিয়েছিলেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে—এই আশঙ্কায় ওই বছরই ১৭ জুন থেকে এক মাসের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে। কর্তৃপক্ষ হয়তো ‘টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার’ আপ্তবাক্যের ওপর আস্থা রেখে ভেবেছিল, সময়ের নিয়মেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাদের ধারণা সত্য হয়নি। বরং সাময়িকভাবে সংঘর্ষ স্থগিত রাখার যে কৌশল তারা নিয়েছিল, তাতেই উপ্ত ছিল দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার বীজ।
এক বছর পর হিংসার বর্ষপূর্তি পালন করল ছাত্রলীগের আরেকটি গ্রুপ। সেই ১৬ জুন। একই তারিখে একই কায়দায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালিয়ে শামীম তালহা নামের এক শিক্ষার্থীর হাতের কবজি কেটে প্রতিশোধ নিয়েছে তারা। উত্তেজিত হয়ে নয়, রাগের মাথায় তাৎক্ষণিক বিচারবুদ্ধি হারিয়েও নয়, সম্পূর্ণ ঠান্ডা মাথায় দিনক্ষণ নির্ধারণ করেই এই আক্রমণ। প্রতিশোধ নেওয়ার এই নমুনা দেখে মনে হয় যেন ছাত্র নন তাঁরা, বিবদমান কোনো আদিম গোত্রের সদস্য, যারা বছরের পর বছর মনের ভেতর বাঁচিয়ে রাখে প্রতিশোধের আগুন। হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে নেওয়ার প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে হাতের কবজি কেটে। এর মধ্যে কেমন যেন হিন্দি-মসালা ছবির প্রভাব বা প্ররোচনাও আছে। একসময়কার সুপারহিট ছবি শোলের খলনায়ক গব্বর সিংয়ের সেই বিখ্যাত সংলাপটি অনেকেরই মনে থাকতে পারে, একজনের হাত কেটে নেওয়ায় আগের নৃশংস মুহূর্তটিতে ক্রূর হাসিতে মুখ ভরিয়ে গব্বর সিং বলেছিলেন, ‘ইয়ে হাত হামকো দে দে ঠাকুর।’ হায়, জঙ্গলের সেই নৃশংসতারই যেন পুনর্নির্মাণ হচ্ছে আজ আমাদের মেধাবী তরুণদের হাতে।
১৬ জুনের ঘটনার পর এক মাসের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঠিক এক বছর আগে যা করেছিল তারা। এ রকম আকস্মিক বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টার মধ্যে একধরনের ‘আপস’ আছে বলে মনে করি আমরা। যেহেতু হামলাকারীদের তাৎক্ষণিক ধরা যাচ্ছে না, আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না বা শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না, সুতরাং কয়েকটা দিন প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে প্রতিকারের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা। এই প্রক্রিয়ায় বারবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হচ্ছে, আবাসিক ছাত্রছাত্রীরা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন, শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত হচ্ছে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটি আর বাঁধা হচ্ছে না। সন্ত্রাসীরা হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য।
এখানে বলা প্রাসঙ্গিক, হরতাল-অবরোধ–ধর্মঘট বা অন্য যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির সময়ও চুয়েটের ক্যাম্পাস সচল থাকে। নিয়মিত ক্লাস বা পরীক্ষার রুটিনেও কোনো পরিবর্তন আনা হয় না। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্যাম্পাসে হরতাল-অবরোধের সময় যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে যানবাহনের অপ্রতুলতা যেমন একটি বড় সমস্যা, তেমনি নিরাপত্তার ব্যাপারটিও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে অভিভাবকদের জন্য।
আবার কর্তৃপক্ষের এই কালাপাহাড়ি মনোভাবের কারণেই যে শিক্ষার্থীরা অন্তত সেশনজট থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, এটা ছিল স্বস্তির বিষয়। কিন্তু বাইরের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে তোয়াক্কা না করে ক্লাস চালু রাখার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়ে চুয়েট প্রশাসন যে কঠোর ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, সে তুলনায় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দাপটের কাছে অনেক নড়বড়ে মনে হয়েছে তাদের অবস্থান। ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দল ও সংঘর্ষের কারণে বারবার বন্ধ রাখা হয়েছে এই ক্যাম্পাস। গত বছর ১৬ জুনের ঘটনায় মোট নয়জনকে দায়ী করে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরবর্তীকালে আবার দয়াপরবশ হয়ে সেই শাস্তি কোনো ক্ষেত্রে হ্রাস ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মওকুফ
করে দিয়েছে তারা। ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’—আজকাল খুবই সাধারণ ও সর্বক্ষেত্রে উচ্চারিত দাবি। বহুল উচ্চারিত বলে এর আলাদা কোনো তাৎপর্যও নেই আর। কিন্তু আমাদের মতো সমাজে শাস্তিদানের বিষয়টিকে যে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপনেরও প্রয়োজন আছে, এ কথা কি এখনো উপলব্ধি করতে পারছে না চুয়েট কর্তৃপক্ষ?
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ২০১১ সাল থেকে চুয়েটে সভা-সমাবেশসহ সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ রাখা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একবার সমাবেশ করায় ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আজীবন হল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অথচ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের কর্মীরা নিয়মিত সভা-সমাবেশ করলেও এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এই পক্ষপাতমূলক আচরণই ছাত্রলীগকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে বলে আমাদের ধারণা। বর্তমানে এই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া আর কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব কার্যত নেই। প্রতিপক্ষ নেই, তাই নিজেরাই নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে ছাত্রলীগ। আর বিপন্ন করছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন।
এই অন্তঃকোন্দল নিরসনের জন্য ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্যোগও বিফলে গেছে বলে মনে হয়। কেন্দ্রীয় নেতারা বারবার চট্টগ্রামে এসে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছেন। সম্প্রতি আগের কমিটি বাতিল করে ২৫ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটিও ঘোষণা করেছেন তাঁরা। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়ে ছাত্রলীগের এই ক্যাম্পাসের কর্মীরা প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের আস্থা ও আনুগত্যকেই অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে এই উচ্ছৃঙ্খল ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বারবারই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে চুয়েট কর্তৃপক্ষ। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের এই তুঘলকি আচরণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলেন। এই সংঘর্ষের জের ধরে ৩১ দিন বন্ধ ছিল ক্যাম্পাস। বারবার এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হলেও নিয়ম অনুযায়ী তা কার্যকর করা হয়নি।
‘ছাত্রলীগ হলে সাত খুন মাফ’—চুয়েটের এই অলিখিত নিয়ম সম্ভবত সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাও অনুধাবন করতে পেরেছেন ইতিমধ্যে। ফলে নীতি-আদর্শের প্রতি আনুগত্য না থাকলেও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই যেন ছাত্রলীগের কোনো না-কোনো গ্রুপের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছেন অনেকেই। যেমন ২০১৩ সালে যে ছাত্রটির (নায়েব হোসাইন খান) ওপর হামলা করে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে নিয়েছিল ছাত্রলীগের একাংশ, তিনি তখন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন না। কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহা থেকেই হোক বা নিরাপত্তার কারণেই হোক, নায়েব হোসাইন এখন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। তার চেয়েও বড় কথা, এ বছরের ১৬ জুন প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও একজন ছাত্রের (শামীম তালহা) কবজির রগ কেটে দেওয়ার ঘটনায় অন্যদের সঙ্গে তিনিও ছিলেন অগ্রভাগে। এভাবেই প্রতিহিংসা চরিতার্থ হচ্ছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে। কারণ, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। প্রতিটি সংঘর্ষের ঘটনার মধ্যেই থাকছে ভবিষ্যতে আরও সংঘর্ষের আশঙ্কার বীজ।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার আগে যন্ত্রকৌশল বিভাগের চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। দুটি পরীক্ষা সম্পন্নও হয়েছে। নিয়মানুযায়ী পরীক্ষা হলে আসন্ন ঈদের আগেই শিক্ষাজীবন শেষ হতো তাঁদের। এভাবে প্রলম্বিত হচ্ছে শিক্ষাজীবন। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে এই শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠেছিলেন অভিভাবকদের আশা ও আশ্বাস। কিন্তু রাজনীতির নামে কিছু কিছু ছাত্রের হঠকারিতা আর কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবে তাঁদের চোখেমুখে আজ আশঙ্কার ছায়া।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচন- ভোট জালিয়াতির নতুন পন্থা by এস এম আকরাম

২৬ জুন, ২০১৪ অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের উপনির্বাচন যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়নি সেটা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই নির্বাচনে সরকার-সমর্থিত জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমান প্রায় ১৬ হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি জাতীয় পার্টির প্রার্থী, তাঁর ভাই শামীম ওসমানের লোকজনের নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছিলাম। সুনির্দিষ্ট ১০টি অভিযোগ জানালেও একটি বাদে কোনো অভিযোগই পাত্তা পায়নি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে।

নারায়ণগঞ্জের বিশেষ পরিস্থিতির কথা সবাই জানেন। অব্যাহত চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ, খুন ও সন্ত্রাসের পেছনে ভূমিকার জন্য যে পরিবারটির দিকে সবাই আঙুল তোলেন, সেই পরিবারের এক প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই নানাভাবে আমাকে বসিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা শুরু হয়। দিন যতই ঘনিয়ে আসতে থাকে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করা ও ভোটারদের বিভ্রান্ত করার অপতৎপরতা জোরালো হয়ে ওঠে। পার্শ্ববর্তী আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের বিধি লঙ্ঘনের খবরও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। তার পরও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তঁার অডিও টেপের বক্তব্য সরাসরি নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের শামিল হলেও সবাইকে হাত গুটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব দেখে নির্বাচনের আগেই আমি যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম, পরবর্তী ঘটনাবলি তার সত্যতা প্রমাণ করেছে।
নির্বাচনের দিন ও পরবর্তীকালে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত খবর থেকেই নির্বাচন কেমন হয়েছে সেটা জানার কেউ বাকি আছেন বলে আমি মনে করি না। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি এবং গণনাকৃত ভোটের সংখ্যা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন উঠেছে। কমপক্ষে ৫০টি কেন্দ্রে অনিয়ম, ভোট জালিয়াতি, আমার পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়া, কেন্দ্র দখল করে ভোট কারচুপির মতো ঘটনা সরেজমিন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
ভোটকেন্দ্র দখলে বাধা দেওয়ায় কর্তব্যরত একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে যেভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে, সেটা থেকেই বাস্তব পরিস্থিতি অনুমান করা যায়। যাঁরা পুলিশকে এভাবে ভয়ভীতি দেখাতে পারেন, তাঁরা সাধারণ ভোটারদের মনে কতটা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন—সেটা না বললেও চলে। ইতিমধ্যে পত্রপত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখিতে বিভিন্ন কেন্দ্রের নামসহ অনিয়মের ঘটনা কারও কাছেই গোপন নেই। আমি এখানে সেসবের পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। এমনকি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনগুলোর গ্রুপ ইডব্লিউজির প্রকাশিত রিপোর্টেও তথ্য–প্রমাণসহ শতকরা ৩০টি কেন্দ্রের অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। এর বাইরেও রাজধানীর নাগরিক নেতারা বিশেষ করে ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অন্যরা নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচন নিয়ে নির্বাচনের আগে যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চিঠি দিয়েছেন, সেটাও সবার জানা। এসবই নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। এখানে আমি নতুন কিছু বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই।
ভোট জালিয়াতির অভিনব পন্থা: ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কৃতিত্বের দাবি এই নির্বাচনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। প্রথমত, ভোটার তালিকার ছবি অস্পষ্ট। এ থেকে ভোটারদের চেহারা মিলিয়ে দেখাও অসম্ভব। তারপর যদি এর ফটোকপির ফটোকপি থেকে মেলানোর চেষ্টা করা হয় তাহলে বলার কিছুই থাকে না। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটো সম্পর্কেও একই কথা বলা হয়।
নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচনে আমার প্রতিপক্ষ ভোটার স্লিপের কোনো ব্যবস্থাই করেননি। এর বদলে তাঁরা নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকেই এলাকায় এলাকায় ক্যাডার পাঠিয়ে ভোটারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোর ফটোকপি তৈরি করেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র যে হস্তান্তরযোগ্য নয়, এখানে তার কার্যকারিতা থাকেনি। তাঁরা নগদ অর্থ প্রদান এবং নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারি ত্রাণ ও ব্যক্তিগত দান বিতরণ করার কথা বলেই পরিচয়পত্র নিয়েছেন।
অভিযোগ আছে, ফটোকপি করার কাজ শেষ হয়ে গেলে মূল পরিচয়পত্র ফেরত দেওয়ার সময় নগদ অর্থও দেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ফলে ভোটের দিন আবহাওয়ার উন্নতি ঘটলেও ভোটার উপস্থিতি বেশি হয়নি কোথাও। যদিও গণনার পর প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা দেখা গেছে অনেক বেশি। ভোটার তালিকায় অস্পষ্ট ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে নিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকায় ভোটের দিন আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থক, এমনকি পোশাক কারখানার শ্রমিকদেরও ভোটার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। কৌশলে ভোটকেন্দ্র দখল ও পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিতির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে। তা ছাড়া ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় আগের মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তালিকা করার বদলে নির্দিষ্ট স্থানে এসে ছবি তোলা ও কম্পিউটারে নাম, ঠিকানা লেখানোর ব্যবস্থা একটা জটিল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই বাড়ির একই পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এটাও ভোট কারচুপির সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিভিন্ন দলমতের ও সাধারণ মানুষের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সরকার-সমর্থক ও পেশিশক্তির অধিকারী হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মতো আমার পোলিং এজেন্টদেরও ভয়ভীতি প্রদর্শন বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কম্পিউটারে কম্পোজ করে ভোটার স্লিপ তৈরি করলেও সেগুলো ঠিকমতো কাজে লাগানো যায়নি। অনেক কেন্দ্রে নিজেদের লোককে আমার মার্কা আনারসের ব্যাজ লাগিয়ে আমার এজেন্ট হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। কেন্দ্র দখল করে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই ভোটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ফলে ভোটার উপস্থিতির চেয়েও ভোট প্রদানের হার অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। বাস্তব কারণে বিষয়টি ঠিকমতো চ্যালেঞ্জ করাও সম্ভব হয়নি। পোলিং কর্মকর্তারাও বিষয়টি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেছেন। তাঁরা সুষ্ঠু ভোটের চেয়েও ভোট প্রদানের সংখ্যা বাড়ানোই তাঁদের কৃতিত্ব মনে করেছেন। হয়তো ওপরের নির্দেশও এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে।
ফলে দু-একটি কেন্দ্র ছাড়া তেমন সহিংসতা করে কেন্দ্র দখলের প্রয়োজন হয়নি। খুবই সুপরিকল্পিতভাবে বেশ কিছু কেন্দ্র দখল করে ইচ্ছেমতো ভোট দেওয়া হয়েছে। ৫০টির বেশি কেন্দ্রে ভোট গণনার হিসাব দেখলেই কারচুপির বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে। তা ছাড়া ভোট জালিয়াতির জন্য প্রতিপক্ষ যে পাঁচ-সাতটি এলাকা বেছে নিয়েছিলেন, সেগুলোতে প্রদত্ত ভোটের পরিসংখ্যান থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। এলাকাগুলো হচ্ছে আলিরটেক ইউনিয়ন, গোগনগর ইউনিয়ন, বন্দর ইউনিয়ন, মূসাপুর ইউনিয়ন, মদনপুর ইউনিয়ন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড। এসব এলাকার কেন্দ্রগুলোতেই প্রধানত জবরদখল ও ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।
এর ফলে নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। ফলাফল ঘোষণার পরপরই আমি সংবাদ সম্মেলন করে তা প্রত্যাখ্যান করেছি এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যে সম্ভব নয়, সেটাও জোরের সঙ্গে উল্লেখ করেছি। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) লিখিতভাবেও জানিয়েছি। আমার বক্তব্যের সমর্থনে দেশের বিশিষ্ট নাগিরক হিসেবে ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, আইনজীবী সুব্রত চৌধুরীও সিইসিকে চিঠি দিয়েছেন। আমরা সবাই ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত করে পুনর্নির্বাচনের দাবিও জানিয়েছি। এসবই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এই উপনির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি কিছু প্রস্তাব রাখতে চাই। প্রথমত, অস্পষ্ট ছবিযুক্ত ভোটার তালিকায় বিদ্যমান ত্রুটিগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে জালিয়াতি বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা এবং প্রার্থীদের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের অগ্রহণযোগ্য পদক্ষেপের খবর পাওয়ামাত্র তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান অবস্থায় দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বশিরউদ্দীনের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা না করে পারা যায় না। চতুর্থত, নির্বাচনে অবাধে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে পুরো ভোট ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা উচিত। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা না হলে এসবের কিছুই ফলদায়ক হবে না। কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হবে না।
এস এম আকরাম: সাবেক সাংসদ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী।
akram1939@gmail.com