Saturday, December 19, 2015

আবারও ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা

কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ শনিবার
ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের সময় একজনকে
গুলি ছুড়তে (লাল চিহ্নিত) দেখা যায়। ছবি: প্রথম আলো
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুপক্ষের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আজ শনিবার আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ইট-পাটকেলের আঘাতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম স্থগিত করাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের এক পক্ষের কর্মী সাইদুর রহমান গুলিবিদ্ধ হওয়াসহ উভয় পক্ষের ১০ থেকে ১৫ জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সংঘর্ষের জের ধরে আজ ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত কুমারের অনুসারী নেতা-কর্মী এবং সহসভাপতি মিজানুর রহমানের অনুসারী নেতা-কর্মীদের মধ্যে সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাইফুল-অমিত অনুসারীরা ছাত্রলীগের দলীয় তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে মিজানের অনুসারীরা ছিলেন প্রশাসন ভবনের পাশের আমবাগানে। বেলা সাড়ে বারটার দিকে তাঁরা সেখান থেকে মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং তাঁদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে থাকেন। এতে সাইফুল-অমিত অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। এ সময় কয়েকটি গুলির শব্দও শোনা যায়।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এর পর মিজানের অনুসারী নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া দিলে তাঁরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে অবস্থান নেন। আহতরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হাকিম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের বিকেল পাঁচটার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তক্রমে আগামী ২৪ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শীতকালীন ছুটি এগিয়ে এনে আজ শনিবার থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। এতে আগামী ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম চলবে এবং আগামী ৩ জানুয়ারি প্রশাসনিক ও ৬ জানুয়ারি একাডেমিক কার্যক্রম চালু হবে। ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুসারে আবাসিক শিক্ষার্থীদের অনেকেই আজ বিকেল পাঁচটার মধ্যে হল ছেড়ে গেছেন।
ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনার পর সাইফুল-অমিত অনুসারীদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ সহসভাপতির পক্ষ নিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ ছাড়া তাঁর (মিজানের) অনুসারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান তুহিনের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় বহিরাগত ও কুষ্টিয়া ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকে দেখা গেছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আমাদের দলীয় টেন্টে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলাম। একপর্যায়ে সহসভাপতির পক্ষের সন্ত্রাসীরা আমাদের লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি ছুড়লে আমরা এর প্রতিরোধ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাংশের ইন্ধনে পুলিশ সহসভাপতি পক্ষের নেতা-কর্মীদের পক্ষ নিয়ে আমাদের লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছুড়েছে।’
এদিকে দায়িত্বে থাকা কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ দুটি গুলি ছুড়েছে, কোনো গ্রুপের পক্ষ নেওয়া হয়নি।’

আমি প্রেসিডেন্ট ওবামা বলছি... by শাহদীন মালিক

প্রিয় দেশবাসী, আপনাদের সামনে আমি আজ দাঁড়িয়েছি ভগ্নহৃদয়ে, তবে একই সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চিত্তে।
আপনারা সবাই জেনেছেন, দেখেছেন, শুনেছেন কীভাবে সান বার্নাডিনোতে দুজন আততায়ী নির্বিচারে গুলি করে ১৪ জন নিরীহ নাগরিককে হত্যা করেছে, আহত করেছে আরও ৩০ জনকে। এসব হতাহতের ঘটনায় আমি আপনাদের মতোই ব্যথিত, ভগ্নহৃদয়। নিহত-আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের প্রতি রইল আমার আর আমাদের সমবেদনা ও প্রার্থনা।
এই পাশবিকতা, এই নির্মমতা, এই বর্বরতাকে রুখতে হবে। আপনাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশবাসীর কাছে এটাই আমার প্রতিজ্ঞা। এসব আক্রমণের মুখে প্রিয় দেশবাসীর জান ও মালের নিরাপত্তার জন্য আমার সরকার কী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা আপনাদের অবগত করার আগে অন্য কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই, যাতে আপনারা আমাদের প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর যথার্থতা সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।
প্রিয় দেশবাসী, আপনারা জানেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। এখনকার ব্রিটিশ সরকার অনেক ইস্যুতে আমাদের পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে এই ব্রিটিশদেরই বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল। আমাদের স্বাধীনতা যোদ্ধার বীর রক্তে বোস্টন, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটনসহ বহু শহরের মাটি লালে লাল হয়েছিল।
আমাদের ভুললে চলবে না যে আমাদের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে চার-চারটি বছর যুদ্ধ করতে হয়েছিল কনফেডারেশনের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন। কিন্তু তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিল আততায়ীর গুলিতে। আমার মতো যে অশ্বেতাঙ্গদের তিনি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন, সেই অশ্বেতাঙ্গদের উত্তরসূরি হিসেবে আমি এবং আমরা মহান আব্রাহাম লিংকনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের ষড়যন্ত্র, অত্যাচার, নিপীড়ন আজও বন্ধ হয়নি। আমেরিকার বহু শহরে এখনো শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অশ্বেতাঙ্গ নিরপরাধ যুবকদের গুলি করে মারে। আব্রাহাম লিংকনের অবদান আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, খেয়াল রাখতে হবে, যাতে স্বার্থান্বেষী মহল তরুণ প্রজন্মকে ভুল না বোঝায়, খারাপ পথে প্ররোচিত না করতে পারে।
প্রিয় দেশবাসী! আপনারা জানেন, গণতন্ত্র ও ধনতন্ত্র রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর থেকে আমেরিকান সৈন্য ও সেনাপতিরা বিশ্বের বহু দেশে সংগ্রামে-যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। ফিদেল কাস্ত্রোকে না পারলেও ইরানের মোসাদ্দেক, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির আইয়েন্দে, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণসহ বহু শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রনায়ককে অকালে ইহধাম ত্যাগ করতে আমাদের সিআইএ সাহায্য করেছে। গত শতাব্দীর ভিয়েতনাম ইত্যাদির কথা বলে আমার বক্তৃতা দীর্ঘায়িত করব না, তবে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আফগানিস্তান, ইরাক আর এখন সিরিয়ায় আমাদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে।
কিন্তু আমাদের শত্রু অনেক। আমরা শুধু এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বলতে গেলে সারা দুনিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, ধনতন্ত্র আর উন্নয়নের জন্য কাজ করি, সাহায্য-সহযোগিতা করি, প্রয়োজনে যুদ্ধও করি। কিন্তু সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের শত্রুরা আমাদের সাফল্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। প্রিয় দেশবাসী! আমাদের চতুর্দিকে ইতিহাস বিকৃতি ঘটছে। আমাদের, বিশেষত আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। আমরা সঠিক ইতিহাসের দিকে নজর দিইনি বলেই আজ সান বার্নাডিনোর মতো ঘটনা এ দেশে ঘটছে।
আমাকে দুঃখের সঙ্গে এ পর্যায়ে দুটি কথা বলতে হবে। প্রথমত, এই ২০১৫ সালে এ পর্যন্ত আমেরিকায় নির্বিচার গুলিবর্ষণে ৪৫০ জনের বেশি লোক নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন। দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকান পলিটিশিয়ানরা সান বার্নাডিনোর ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘পলিটিকস’ শুরু করে দিয়েছেন। রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর অন্তত তিনজন এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছেন আর আমার সমালোচনা করেছেন এটাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে স্বীকার বা স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করতে চাই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কখনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠী ছিল না, বর্তমানেও নেই এবং আমি যত দিন আপনাদের প্রেসিডেন্ট আছি, তত দিন এ দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের কোনো ঠিকানা হবে না।
রিপাবলিকানরা আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির কথা জেনেই আজ জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মহা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আমাদের সরকারের তথা ডেমোক্রেটিক পার্টির সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়েই তারা এই খেলায় নেমেছে। বিশ্বদরবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তারা ক্ষুণ্ন করতে চাইছে। সারা বিশ্ব জানে, আমরা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিচ্ছি, এমন প্রেক্ষাপটে খোদ আমাদের দেশেই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদী আক্রমণের কথা বলে রিপাবলিকানরা আমাদের, তথা সব আমেরিকানের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। আমার ধারণা, এই ষড়যন্ত্রে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের কিছু অন্ধভক্ত ইন্ধন জোগাচ্ছে। রাজতন্ত্রের এই ভক্তদের আমরা দেখেছি প্রিন্স উইলিয়াম আর কেট এবং নবজাতক শিশুদের নিয়ে মাতামাতি করতে। লিফলেট বিলি করতে। সম্ভবত তাদের ইন্ধন জোগাচ্ছে আমাদের উত্তরের প্রতিবেশী কানাডিয়ানরা। কারণ, রানি এলিজাবেথ তো কানাডারও রানি।
এ দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে কী থেকে কী হয় তা বোঝা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিত, আমাদের ভাবমূর্তি যাবে, নেতৃত্বও যাবে। সান বার্নাডিনোসহ সব বন্দুকধারী দেশকে অশান্ত করতে চাইছে। দেশবাসী, আপনারা সবাই জানেন যে আমাদের দেশের আয়তন বিশাল। আর আমরা ৩০ কোটি। তা সত্ত্বেও এসব হত্যাকাণ্ড এই বিশাল দেশটাকে অস্থিতিশীল করার এক ষড়যন্ত্র। কিন্তু এ দেশকে আমরা অস্থিতিশীল করতে দিতে পারি না। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হোক, এটাও কেউ বরদাস্ত করবে না। কিন্তু নিরীহ, নিরপরাধ নাগরিকদের হতাহত হওয়া রোধ করা আমার ও আমার সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
চরমপন্থী, বন্দুকধারীরা আজকাল অনেক বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আধুনিক ও মারাত্মক। তারা লেটেস্ট টেকনোলজিতে পারদর্শী। তাদের সমর্থক ও সহায়ক গোষ্ঠী শুধু রিপাবলিকান পার্টিতেই সীমাবদ্ধ না। শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী দল, উগ্র ইহুদিবাদের অন্ধ সমর্থক, লিংকন-কেনেডির হত্যাকারীদের উত্তরসূরিসহ বহু দল, গোষ্ঠী ও গ্রুপ এ দেশে ভীষণভাবে সক্রিয়।
দেশের এই সন্ধিক্ষণে তাই আমি আপনাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিম্নে বর্ণিত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি:
আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কাউকে বন্দুক হাতে দেখলে বা শরীরে অথবা পকেটে বন্দুক লুকায়িত আছে সন্দেহ করলে তাৎক্ষণিকভাবে সে ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করতে পারবে। নিহত ব্যক্তি ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে’ বলে আখ্যায়িত হবে।
রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মীরা যেহেতু স্পষ্টতই দেশের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে, ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে, দেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে, সেহেতু এটা স্পষ্ট যে এই ২০১৫ সালে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের যত ঘটনা ঘটছে, তাতে তারা উসকানি দিয়েছে। নির্বিচারে গুলিতে হতাহতের মামলাগুলোতে রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছি। বলা বাহুল্য, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী মামলা দায়ের করবে। বিচার বিভাগও যাতে আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী রায় প্রদান করে আমরা তার জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস করব।
প্রিয় দেশবাসী! নাইন-ইলেভেনের পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সে সময়ে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিইনি। তারই ফলে বছরের পর বছর শত-সহস্র আমেরিকান বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে, সান বার্নাডিনোসহ বিভিন্ন জায়গায়।
আমার ভাষণের শুরুতেই বলেছিলাম, আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রিয় দেশবাসী! আমেরিকানদের প্রাণ বাঁচাতে:
প্রথমত, আমি ইন্টারনেট অবৈধ ঘোষণা করছি, নিষিদ্ধ করছি। ডাক বিভাগ আগামী এক মাস বন্ধ থাকবে। আন্তনগর বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে বাস আর ট্রেন চালু থাকবে।
সঠিক ঘটনা, ইতিহাস ও তথ্য প্রচার নিশ্চিত করার জন্য সরকারি টিভি চালু হবে। বেসরকারি টিভি আজ থেকে সংবাদ প্রচার করবে না। টক শো অবিলম্বে নিষিদ্ধ এবং রিপাবলিকান পার্টির কোনো প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে না।
ড. শাহদীন মালিক: অাইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন কমিশনের সাবেক আইনজীবী।

‘সেনাবাহিনীর মধ্যে জঙ্গিদের ছাঁকনি দিয়ে বের করার সময় এসেছে’

চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর এক সুরক্ষিত ঘাঁটির ভেতর মসজিদে বোমা হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যে একজনকে এ পর্যন্ত আটক করার কথা স্বীকার করা হয়েছে বলা হচ্ছে সে নৌবাহিনীরই একজন কর্মচারী। শুক্রবার পুলিশ জানিয়েছিল এই হামলার সময় স্থানীয় মুসল্লিরা মিজান নামে নৌবাহিনীর একজন ‘ব্যাটম্যানকে’ আটক করে পুলিশে দিয়েছিল। সে ভূয়া শিক্ষাসনদ দেখিয়ে নৌবাহিনীতে চাকরি নিয়েছিল বলেও জানিয়েছিল পুলিশ । সুরক্ষিত সামরিক এলাকায় এধরণের হামলার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করছেন অনেকেই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ বলছেন সামরিক বাহিনীরই একজন কর্মচারী সুরক্ষিত সেনা এলাকায় হামলার সঙ্গে জড়িত বলে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক, যদিও সন্দেহভাজন হামলাকারী ইউনিফর্ম পরা সেনা কর্মচারী নয়। তিনি বলছেন এই ব্যক্তি অনেকদিন ধরেই নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিল এবং যতদূর জানা যাচ্ছে সে প্রায় বছর তিনেক ধরে নৌবাহিনীতে কাজ করেছে। মি. রশীদ বলছেন তাকে যে জঙ্গিবাদে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ‘‘তবে এই তিন বছরের মধ্যে তার জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার বিষয়টা যে ধরতে পারা গেল না – সেটা অবশ্যই চিন্তার কারণ।’’ তিনি বলছেন ওই ব্যক্তি নৌবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল প্রায় তিন বছর আগে। যে কাজে সে যোগ দিয়েছিল তার জন্যে সে ছিল ‘ওভারকোয়ালিফায়েড’। ‘‘সেক্ষেত্রে একজন ওভারকোয়ালিফায়েড ব্যক্তি যখন সেখানে স্বেচ্ছায় যোগদান করেছে – সেটাকে আমি গোয়েন্দা পরিভাষায় বলব – একধরনের ‘অনুপ্রবেশ’।’’ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যে ‘ভেটিং’ বা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ বলছেন তার মতে সেটা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তিনি একথাও বলেছেন যে সাধারণত যারা ফাঁকি দেওয়ার কাজ করে তারা জানে কীভাবে এসব তথ্য সাজালে তা নিয়োগকারীদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। যেহেতু এখন দেখা যাচ্ছে সামরিক বাহিনীকে টার্গেট করে তার ভেতরেও ‘ইনফিলট্রেশন’ বা ঢোকার একটা চেষ্টা শুরু হয়েছে তাই মি. রশীদ মনে করছেন আগের তুলনায় এই যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া আরও শক্ত হাতে করা প্রয়োজন বিশেষ করে নিচের তলার গ্রেডগুলোতে। ‘‘আমার মনে হয় এই নিচের তলার কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্যগুলো আর হাল্কা করে দেখার সুযোগ এখন আর নেই।’’ ‘‘এছাড়াও যারা বর্তমানে চাকরি করছে, তাদের বিষয়ে আবার নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে যে এরকম ফাঁকফোঁকর দিয়ে কতজন লোক এসে গেছে- আমার মনে হয় সময় এসেছে নতুন করে আবার ছাঁকনি দেবার।’’ অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশীদ মনে করছেন সামরিক বাহিনীকে টার্গেট করার পেছনে একটা কারণ আন্তর্জাতিকভাবে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করার বিষয়। তিনি বলছেন একটা সুরক্ষিত এলাকার ভেতরে কোনো হামলা করতে পারলে চিরাচরিতভাবে তারা জানে তারা সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে। তবে তিনি বলছেন জঙ্গিরা এধরনের হামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি মনে করেন না যে তারা এখনই এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে তারা এভাবে সরকারের পতন ঘটাতে পারবে।- বিবিসি

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আজকের আমেরিকা by হাসান ফেরদৌস

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হেন নাম নেই যে নামে ডাকা হয়নি। কেউ তাঁকে বলেছেন ফ্যাসিস্ট, কেউ বলেছেন হিটলার। উন্মাদ নামেও তাঁকে ডাকা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও জর্জ বুশ উভয়েই ট্রাম্পকে কষে গাল দিয়েছেন, কারণ তাঁর বক্তব্য ‘মার্কিন মূল্যবোধবিরোধী’। মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকান দলের নেতা সিনেটর মিচ ম্যাককনেল কিঞ্চিৎ রুষ্ট হয়ে বলেছেন, না না এসব কথা বলা ঠিক নয়। আমরা যুদ্ধের ভেতর রয়েছি, এখন দেশের মানুষকে বিভক্ত করা ঠিক নয়। কংগ্রেসের রিপাবলিকান স্পিকার পল রায়ান বলেছেন, ট্রাম্প যা বলেছেন, সেসব আমাদের দলের নীতির বিরুদ্ধে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, লোকে ট্রাম্পকে যত গালি দেয়, তাঁর জনপ্রিয়তা তত বাড়ে। কেউ যদি ভেবে থাকে লোকটা পাগল, তাহলে তারা ভুল করবে। ট্রাম্প অতি ঘাগু লোক, তিনি জানেন এ দেশের মানুষের কাছে কী চলবে, কী চলবে না। মুখে যত ভালো ভালো কথা বলা হোক না কেন, আমেরিকার একদল মানুষ ট্রাম্পকে মাথায় তুলে নাচছে, কারণ যে কথা তারা বিশ্বাস করে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে সাহস পায় না, ট্রাম্প সেই কাজটিই করেছেন। যেমন দক্ষিণপন্থী ভাষ্যকার লরা ইংগ্রাম বলেছেন, যে যা-ই বলুক, এই লোক আমেরিকার মানুষের ‘পালস’ জানে।
ট্রাম্প প্রস্তাব করেছেন, সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে আমেরিকার চলতি যুদ্ধ মিটে না যাওয়া পর্যন্ত এ দেশে কোনো মুসলমানকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। মুসলমান মাত্রই সন্ত্রাসী—এই সন্দেহ থেকে ট্রাম্প আমেরিকার সব মুসলমানের নাম তালিকাভুক্ত করতে বলেছেন। মসজিদগুলো সন্ত্রাসীদের আখড়া, অতএব তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, দরকার পড়লে বন্ধ করে দিতে হবে। তাঁর এই বক্তব্য ‘মার্কিন মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং শাসনতন্ত্রে স্বীকৃত অধিকারের লঙ্ঘন’, এমন কথা বলাতে ট্রাম্প গলার স্বর বিন্দুমাত্র না উঁচিয়ে জবাব দিয়েছেন, কেন, ঠিক সেই কাজ তো প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট করেছিলেন, পার্ল হারবারে জাপানি আক্রমণের পর এ দেশের সব জাপানিকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঢুকিয়েছিলেন। কই, তাঁকে তো কেউ হিটলার বলে গাল দেয় না? সেটা যুদ্ধের সময় ছিল, এখনো তো একটা যুদ্ধের ভেতরে আমরা।
কথাটা একদম ফেলে দেওয়ার মতো নয়। রুজভেল্ট ১৯৪২ সালে এক নির্বাহী ঘোষণায় আমেরিকার সোয়া লাখ জাপানি নাগরিককে যার যার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাহারা দেওয়া ক্যাম্পে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে আমেরিকার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ১৯৮৮ সালে মার্কিন কংগ্রেস এক সিদ্ধান্তে আটককৃত প্রত্যেক জাপানির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য ২০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করে।
একসময় যে ভুল হয়েছিল, এত দিন পর আবার সেই ভুলেরই কেন পুনরাবৃত্তি করতে হবে?
একটা কথা এখানে আমাদের মাথায় রাখা দরকার। ট্রাম্প নামক এই আপদের আবির্ভাব ঠিক আকস্মিকভাবে হয়নি। একদম শূন্য থেকেও ট্রাম্প তাঁর মুসলমান ও অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য দেননি। এক দশক ধরে এ দেশের রিপাবলিকান পার্টি খুব পরিকল্পিতভাবে অতি দক্ষিণপন্থী মনোভাব লালন করেছে। আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ ও আমেরিকার জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়াতেই তারা নিজেদের ‘বেইস’ সামলাতে এ পথে এগিয়েছে। মার্কিন জনসংখ্যায় হিস্পানিকদের অংশ ক্রমেই বাড়ছে, এতটা বাড়ছে যে ২০৪০ সালের মধ্যে আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ হবে অ-শ্বেতাঙ্গ। এ কথার অর্থ, যে দেশটা এত দিন তাদের বলে রাজত্ব করেছে সাদা মানুষ, ক্ষমতার চাবির গোছা তাদের হাত থেকে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে এ দেশের সাদা মানুষদের যত রাগ কালো ও বাদামিদের ওপর। বারাক ওবামা সেসব মানুষের একজন, তাঁর ওপর রাগের সেটাই বড় কারণ।
রিপাবলিকানদের ওবামাবিরোধী ও অভিবাসনবিরোধী এই অবস্থান কাজে লেগেছে, আমেরিকার নির্বাচনী ফলাফল থেকেই তা বোঝা যায়। গত এক দশকে এক প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়া আমেরিকার কংগ্রেসের উভয় পরিষদ রিপাবলিকানদের দখলে চলে এসেছে। দেশের রাজ্য পর্যায়ে গভর্নর ও আইন পরিষদ, উভয় ক্ষেত্রেই রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র আধিপত্য। বিচার বিভাগেও এখন রক্ষণশীলদের প্রাধান্য।
যারা হোয়াইট হাউসে একজন ডেমোক্র্যাট পরপর দুবার নির্বাচিত হওয়ায় দেশটাকে উদারনৈতিক ভাবে, তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে আনে না। আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্র এমন অদ্ভুত যে কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসীদের অধিকাংশই আটলান্টিকের পূর্ব পাড়ে ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরঘেঁষা শহরপ্রধান রাজ্যগুলোতে বাস করে। ফলে গুটি কয়েক ছাড়া আমেরিকার অধিকাংশ রাজ্যেই ‘লাল’ রিপাবলিকানদের আধিপত্য। কোনো কোনো রাজ্য অভিবাসীদের আগমনের ফলে লাল থেকে পাটকেলে রং ধরতে শুরু করেছে, তবে তার ফল পেতে আরও আট-দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই লাল-নীল বিভক্তির বড় কোনো পরিবর্তন হবে না, এ কথা আগাম বলে দেওয়া যায়। তবে মোট ভোটের হিসাবে একা ‘লাল’ ভোটে প্রেসিডেন্ট হওয়া কঠিন, ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছে ওবামার মতো আরও একজন ডেমোক্র্যাট এবারও প্রেসিডেন্ট হবেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে চলতি রিপাবলিকান নেতৃত্বের সব বাঘা বাঘা প্রতিনিধি আমেরিকার এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কথা জানেন। শুধু সাদা মানুষের ভোটে হোয়াইট হাউস দখলে আনা যাবে না, এ কথাও তাঁরা জানেন। তা সত্ত্বেও শুধু সাদা মানুষদের খুশি করা যায়, এমন নীতি তাঁরা অনুসরণ করে চলেছেন, যার মূলে রয়েছে সব রকম অশ্বেতাঙ্গদের ব্যাপারে ভীতি। এই অশ্বেতাঙ্গদের তালিকায় যেমন আফ্রিকান-আমেরিকান আছে, তেমনি আছে মেক্সিকান ও অন্যান্য বহিরাগত। এর সঙ্গে এখন যোগ করুন মুসলমানদের। অনুমান করি, রিপাবলিকান দল হিসাব করে দেখেছে, ভীতিভিত্তিক যে বর্ণ বিভাজন, তা যদি শ্বেতাঙ্গ মনের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে যে ‘শ্বেত ঐক্য’ গড়ে উঠবে, শুধু তা দিয়েই হয়তো কোনো রিপাবলিকান প্রার্থী হোয়াইট হাউস ছিনিয়ে নেবেন।
আমি যে একদম গালগপ্প করছি না, তা বোঝার জন্য পাঁড় বর্ণবাদী ভাষ্যকার অ্যান কুলটার একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি। ট্রাম্প মুসলমানদের নিষিদ্ধ করার যে প্রস্তাব করেছেন, তাকে সোল্লাসে সমর্থন করে কুলটার লিখেছেন, শুধু মুসলিম কেন, এর সঙ্গে তাবৎ ‘ইমিগ্রান্ট’দের যোগ করুন, তাতে খেলা জমবে ভালো। (‘অ্যাড ইন এভরি আদার কাইন্ড অব ইমিগ্রান্ট অ্যান্ড ইটস পারফেক্ট!)।
মনে রাখা ভালো, ট্রাম্প শুধু মুসলমানবিরোধী নন, তিনি কালো ও অশ্বেতাঙ্গ সব অভিবাসীকে একই তালিকাভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে নিজের ক্রুসেড ঘোষণা করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম পর্যায়ে তাঁর আক্রমণের এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু ছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এই লোকটা বিদেশি, তাঁর জন্ম বিদেশে, ধর্মেও কিনি খ্রিষ্টান নন—এমন কথা বলে তিনি প্রথম শ্বেতাঙ্গদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এরপর মেক্সিকানসহ দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা সব অভিবাসীকে তিনি এক কথায় ধর্ষক ও মাদক চোরাচালানকারী বলে রায় দিয়ে বসেন। আর তারপর টার্গেট করেন মুসলমানদের।
তাঁর কথা যে শ্বেতপ্রধান রিপাবলিকান সমর্থকদের মনে ধরেছে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপ থেকেই তার প্রমাণ মিলেছে। এবিসি টেলিভিশন এবং নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই দলের ৪২ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসীবিরোধী অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন এমন রিপাবলিকান সদস্য মাত্র ৩২ শতাংশ। যাঁরা সরাসরি ট্রাম্পকে সমর্থন দিতে অনিচ্ছুক, তাঁদের অধিকাংশ বলছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য অস্বস্তিকর, কিন্তু এ কথা তো ঠিক যে তিনি সত্যি কথাই বলেছেন। ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমাদের নজর দিতে বাধ্য করেছেন, এমন কথা ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরাও কবুল করেছেন (যেমন সিনেটর টেড ক্রুজ)।
এই জনমত জরিপের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, সারা দুনিয়া ট্রাম্পকে ছি ছি করলে কী হবে, তিনি নিজে ঠিক ধরতে পেরেছেন যে তাঁর প্রস্তাবের ফলে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর লড়াইয়ে তিনি পিছু হটার বদলে সামনেই এগোবেন।
ট্রাম্প আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন, এ কথা কেউ ভাবেন না। কিন্তু এই অতি চতুর ক্যাসিনো ব্যবসায়ী যে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারেন, সেই সম্ভাবনা যে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটা ব্যাপার, এ কথা এই দলের নেতারাই মানতে শুরু করেছেন। এটি দলের জন্য ভয়াবহ হবে, এ কথাও তাঁরা মানেন, কিন্তু কেউই সে কথা মুখ ফুটে বলছেন না। ট্রাম্প নিজে বলেছেন, কোনো কারণে দলের কর্তাব্যক্তিদের ষড়যন্ত্রে তিনি যদি দলের মনোনয়ন না পান, তাহলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কথা তিনি বাতিল করতে পারেন না। সে ভয় থেকেই দলের সব কর্তা এখন বলছেন, রিপাবলিকান কনভেনশনে যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তাঁকেই তাঁরা সমর্থন জানাবেন।
সত্যি যদি তাই ঘটে, অর্থাৎ ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন, তাহলে সে কথার অর্থ দাঁড়াবে এই যে একুশ শতকের শুরুতে এসে আমেরিকা এমন একজন লোককে তার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবে, যিনি হবেন হিটলার ও মুসোলিনির যোগ্য উত্তরসূরি।
এই লজ্জা কী দিয়ে ঢাকবে আমেরিকা?
গত বুধবার আমেরিকার দাসপ্রথা অবসানের ১৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রকারান্তরে সে কথাই তুলেছিলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের প্রত্যেকের মুক্তি ও স্বাধীনতা একে ওপরের মুক্তি ও স্বাধীনতার ওপর নির্ভরশীল—আমাদের গাত্রবর্ণ, জন্মস্থান বা ধর্ম যা-ই হোক না কেন। ভয় ও ঘৃণাকে জয় করতে দিলে আমেরিকা তার নিজের ইতিহাস ও মূল্যবোধই বিসর্জন দেবে।
ভয় হয়, আমেরিকা হয়তো সে পথেই এগোচ্ছে।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

‘তাঁর’ জন্য ‘তাঁরা’ও মাঠে

গল্প, নাটক কি উপন্যাস—বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘সতিন’ চরিত্রকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়। অবশ্য বাস্তবে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। বগুড়ার শিবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মাজেদা বেগম সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আর তাঁর জয়ের জন্য সতিনেরা দিনরাত মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
তিন সতিন একসঙ্গে ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাওয়ায় এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। কয়েকজন ভোটার বলেছেন, বর্তমান সময়ে সতিনদের মধ্যে সাধারণত মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত হয় না। আর এখানে এক সতিনের জয়ের জন্য অন্য দুই সতিন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। মাজেদা বেগমের পারিবারিক সূত্র জানায়, পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই পৌর এলাকার বন্তেঘরী মহল্লার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুস সামাদ তাঁর তিন স্ত্রীকে নিয়ে আলোচনায় বসেন। যেকোনো এক স্ত্রীকে দিয়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাব করেন। পরে সিদ্ধান্ত হয়, সামাদের তৃতীয় স্ত্রী মাজেদা বেগম হবেন সেই প্রার্থী।
চার-পাঁচজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাজেদা বেগম সংরক্ষিত ২ নম্বর (৪, ৫ ও ৬) ওয়ার্ডে ‘কাঁচি’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতিদিন ভোরে তিন সতিন মিনু বেগম, রেণু বেগম ও মাজেদা বেগম স্বামী আবদুস সামাদকে সঙ্গে নিয়ে প্রচারণায় বের হন। গভীর রাত পর্যন্ত ওয়ার্ডের এ-বাড়ি ও-বাড়ি ক্লান্তিহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বন্তেঘরী গ্রামের ভোটার বজলুর রহমান বলেন, তিন সতিনের প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে আলাদা একটা উৎসাহ নিয়ে এসেছে। মাজেদা বেগম এখন এ পৌরসভার আলোচিত প্রার্থী।
মাজেদা বেগম বলেন, ‘সতিন মানে মনে করা হয় শত্রু। কিন্তু আমি ভাগ্যবান। সতিনরা আমার কাছে বোনের মতো। অতি আপনজন। আমি নির্বাচিত হলে এলাকায় নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখব।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আবদুস সামাদের চার স্ত্রী। এর মধ্যে বড় স্ত্রী সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করার কারণে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারছেন না। তিনি টাকাপয়সা দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
প্রচারণায় একসঙ্গে (বাঁ থেকে) শিবগঞ্জের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মাজেদা বেগমের স্বামী আবদুস সামাদ, তাঁর স্ত্রী রেণু বেগম, মিনু বেগম ও মাজেদা নিজে l প্রথম আলো

আমি মুসলিম আমেরিকান, ট্রাম্পের বক্তব্যে হতভম্ব হয়েছি by ফরিদ জাকারিয়া

আমি নিজেকে প্রথম এবং সবার আগে একজন আমেরিকান মনে করি। এই পরিচয়ে আমি গর্বিত, কারণ একজন অভিবাসী হিসেবে দৃঢ় প্রত্যয় ও কঠিন কাজ বা কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনাক্রমে জন্ম নিয়ে নয়, আমি এই গৌরব করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছি। আমি নিজেকে ভারত থেকে আসা একজন স্বামী, পিতা, একজন সাংবাদিক ও একজন নিউ ইয়র্কার এবং (আমার ভালো দিনগুলোতে) একজন বুদ্ধিজীবী মনে করি। কিন্তু আজকের বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থায় অপর একটি পরিচয় নিয়ে আমি অবশ্যই বিব্রত। আমি একজন মুসলিম।
আমি মুসলিম হলেও ধর্মকর্ম তেমন একটা পালন করি না (প্র্যাকটিসিং মুসলিম নই)। পর্যটক ছাড়া সর্বশেষ এক দশক আগে আমি একটি মসজিদে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী খ্রিষ্টান। আমরা আমাদের সন্তানদের মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলিনি। ঈমান বা বিশ্বাসের ব্যাপারে আমার অভিমত জটিল- কোনো কোনো ক্ষেত্রে যারা কোনো ধর্ম মানে না, কিন্তু ঈশ্বরবাদী এবং যারা অজ্ঞবাদী- এ দুইয়ের মাঝামাঝি আমার অবস্থান। আমার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আমি সম্পূর্ণ সেকুলার। কিন্তু রিপাবলিকান দলীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যেভাবে আমেরিকানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছেন। তাতে আমি উপলব্ধি করলাম যে, আমি যে ধর্মীয় সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়েছি, সেটা স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ এবং যদিও ওই পরিচিতি আমাকে অথবা আমার মতামতকে পরিপূর্ণভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না। তবুও ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের গোঁড়ামিপূর্ণ বক্তব্যে আমি আতঙ্কিত। আমি একজন মুসলিম হিসেবে নই, আমি একজন আমেরিকান হিসেবে তার বক্তব্যে আতঙ্ক বোধ করছি।
ভিক্টর ক্লেমপেরের ১৯৩০-এর দশকের ডায়েরি থেকে জানা যায়, ডায়েরিতে তিনি কিভাবে একজন সেকুলার, সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীভূত জার্মান ইহুদি এবং হিটলারকে যে ঘৃণা করতেন, তা তিনি ডায়েরিতে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, একজন জার্মান হিসেবেই তিনি তা করেছিলেন। তাকে তার জার্মান পরিচিতিই নাৎসিবাদকে হাস্যকর অনুকরণ হিসেবে দেখতে সাহায্য করে। অবশেষে হায়, তাকে কেবল একজন ইহুদি হিসেবে দেখা হয়। এটা হচ্ছে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরের সত্যিকার বিপদ। যেসব লোক নিজেদের সমাজের মূল স্রোতের সাথে অঙ্গীভূত করে নিতে চায়, যারা নিজেদের নানা ধরনের বা বিভিন্নভাবে পরিচয় দিতে চায়, তাদেরকে একটি বাক্সে আবদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে। তার বাগাড়ম্বর ইতোমধ্যে পরিস্থিতিকে বিষাক্ত করে ফেলেছে। মুসলিম আমেরিকান অধিকতর ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছেন এবং তারা নিজেদের আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন। বৃহত্তর সম্প্রদায় তাদের সম্পর্কে বেশি জানবে না এবং তাদেরকে বিশ্বাসও করবে কম।
ট্র্যাজেডি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভালোভাবে অঙ্গীভূত বা আত্তীকরণ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ইউরোপের মতো নয়। আমি গত বছর নরওয়েতে মরক্কোর একজন অভিবাসীর সাথে যে কথা বলেছিলাম, এ মুহূর্তে তা স্মরণ করতে চাই। নিউ ইয়র্কে ওই অভিবাসীর একজন ভাই থাকেন। আমি তাকে তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনো ভিন্নতা আছে কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এখানে আমি সব সময় একজন মুসলিম অথবা একজন মরক্কোবাসী বা মরক্কোর নাগরিক থাকব, কিন্তু আমার ভাই ইতোমধ্যেই একজন আমেরিকান হয়ে গেছেন।’
পররাষ্ট্রবিষয়ক এক রচনায় ব্রিটিশ লেখক কেনান মালিক উল্লেখ করেন, ফ্রান্সে ১৯৬০ ও ’৭০-এর দশকে উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত অভিবাসীদের মুসলিম হিসেবে দেখা হতো না বা মুসলিম বলে ডাকা হতো না। তাদেরকে উত্তর আফ্রিকান বা আরব হিসেবে বর্ণনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ওটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা উল্লেখ করেন। যিনি বলেছেন, ‘বর্তমান ফ্রান্সে ধার্মিক আলজেরীয় অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, আমার মতো নাস্তিক ফরাসি-মৌরিতারিয়ান পরিচালক, ফুলানি সুফি ব্যাংক কর্মচারী, যিনি মান্টেস ইয়া-জুলি থেকে এসেছেন। বারগুন্ডি থেকে আগত সমাজকর্মী যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং অজ্ঞাবাদী পুরুষ নার্স যিনি কখনো তার পূর্বপুরুষের বাড়ি ওয়োজদাতে পা রাখেননি সবাই একত্রে মিলেছে। কি তাদেরকে একত্র করেছে? তার জবাব হচ্ছে : ‘আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি, যারা আমাদেরকে মুসলিম বলে মনে করে।’
আপনি যদি একবার জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্মের ভিত্তিতে সব মানুষকে পরিচয় করাতে শুরু করেন, তাহলে গোটা বা সম্পূর্ণ গ্রুপকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হবে এবং এতে করে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে।
মুসলিম আমেরিকান সৈন্যদের তীব্র খোঁচা দিয়ে লেখা এক নিবন্ধে বসনিয়া থেকে আসা উদ্বাস্তু ও মেরিন গোলন্দাজ সার্জেন্ট ইমির হাজদিক, যিনি ১৯৯০-এর দশকে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে যে বলকান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা ব্যাখ্যা করেন।
জনাব হাজদিক বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেছেন তা খুবই আতঙ্কিত করার মতো বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমি জানি কোনো ব্যক্তি যখন তার প্রতিবেশী ও বন্ধুদের মধ্যে বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য প্রচেষ্টা চালায় তখন কী হয় আমি দেখেছি। তাদের প্রত্যেকেই একে অন্যের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।’
আমি আশাবাদী ট্রাম্প- দেশকে বিস্ময়ের দিকে নিয়ে গেছেন। জনগণ আদৌ জানে না তার এই অস্পষ্ট ও অকার্যকর প্রস্তাবে কিভাবে তারা সাড়া দেবে (আমাদেরকে কিছু করতে হবে)। টেলিফোনে নেয়া পরিসংখ্যান, রহস্যময়- কৌশলী ও পরোক্ষ ইঙ্গিতপূর্ণ ষড়যন্ত্র (তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্পর্কে কী বলেছেন আমরা জানি না)। এবং জনগণের কুসংস্কার বা পক্ষপাতের প্রতি নগ্ন আবেদন ইত্যাদির ব্যাপারে আমাদেরকে কিছু করতে হবে।
এখন কিন্তু ১৯৩০-এর দশক নয়। সব পর্যায় থেকে মানুষ ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাচ্ছে। রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ তার বক্তব্য সমর্থন করলেও সর্বপর্যায়ের মানুষ তার নিন্দা করেছে।
দেশ ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে পারে না। এমনকি ১৪ বছর আগের ৯/১১-এ আমেরিকায় ইসলামি সন্ত্রাসীরা হামলা চালানোর পর সান বারনার দিনোতে ৪৫ জনকে হত্যা করা হয়। প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিনজন লোক। চলতি বছরই গুলি করে শুধু যে লোক হত্যা করা হয়েছে, তার সংখ্যা হবে পায় ১১ হাজার।
পরিশেষে বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক নেতার এই ভীতিকর বক্তব্য অতীতের মতোই প্রত্যাখ্যান করবে। তবে আমরা রাজনৈতিক ও নৈতিক চরিত্রের ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আমি আশা করি, কয়েক দশক আগের জনগণ এখানকার জনগণের দিকে ফিরে তাকাবে এবং জিজ্ঞেস করবে, ‘ট্র্যাম্প যখন আমেরিকায় ধর্ম নিয়ে পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন আপনারা কী করেছিলেন?
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

গণতন্ত্রই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারব্যবস্থা -সাক্ষাৎ​কারে : কৌশিক বসু by শওকত হোসেন

কৌশিক বসু, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও
প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা তো করেছেনই, জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার কথাও। বলেছেন দুর্নীতি, সুশাসন ও সরকারব্যবস্থা নিয়েও। জানিয়েছেন উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা। গণতন্ত্রকে ধরে রাখার পরামর্শও দিলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শওকত হোসেন
প্রথম আলো: অর্থনীতিবিদই হতে চেয়েছিলেন?
কৌশিক বসু: অর্থনীতিতে আমার আসাটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ, আমার বাবা আইনজীবী ছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই মানুষ হয়েছি যে বড় হয়ে আইনজীবী হব। আমাকে আইন পড়তে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। কথা ছিল গোড়ায় একটু অর্থনীতি পড়ে তারপর আইন পড়ব। কিন্তু তখন আমার ওপর বিরাট একটা প্রভাব ফেলল অমর্ত্য সেনের লেকচার। তিনি তখন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াচ্ছেন। অভূতপূর্ব অমর্ত্যদার লেকচার। সেই লেকচার শুনে এত বেশি উৎসাহ পেলাম যে সিদ্ধান্ত নিলাম অর্থনীতিই পড়ব। সেই থেকে অর্থনীতিতেই আমার ক্যারিয়ার। গোড়ার দিকে দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসে অনেক বছর। এরপর আমেরিকায় চলে আসি। তারপর আবার ভারতে ফিরে এলাম। তখনকার দিনে কিন্তু পিএইচডি করে তেমন কেউ ফিরত না। আমি সেই স্বল্প কয়েকজনের একজন, দেশে ফিরে এসেছিলাম। এই হচ্ছে আমার অর্থনীতিতে আসার গল্প।
প্রথম আলো: একজন বাঙালি অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনার কাজ করার অভিজ্ঞতাটি কেমন?
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকে খুবই ভালো অভিজ্ঞতা আমার। তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। একটা হচ্ছে বৈশ্বিক সংযোগ, যেটা আমি খুব উপভোগ করি। বিভিন্ন দেশে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলা। আমি একবার লিখেছিলামও যে আমার ভেতরে অর্থনীতির সঙ্গে নৃতত্ত্বের একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে। কারণ, একজন নৃতাত্ত্বিক গ্রামে গিয়ে বসে থাকে। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এটা আমার সব সময়ই খুব ভালো লাগে। বিশ্বব্যাংকে এসে সেই অভিজ্ঞতাটি পাচ্ছি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে তাদের নীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা—এসব তো মজাই। বাংলাদেশে আসাটা ভিন্ন কিছু না আমার জন্য, কারণ পাশের কলকাতায় মানুষ হয়েছি। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন ছোট্ট একটা দ্বীপরাষ্ট্রে চলে যাই, সাব-সাহারান আফ্রিকার কোনো দেশে যাই, সেটা একদম অন্য ধরনের পরিস্থিতি, তখনকার সেই অভিজ্ঞতা অন্য রকম। এর সঙ্গে দৈনন্দিন প্রশাসনিক চাপ তো আছেই। এটা হচ্ছে এসব সুবিধা পাওয়ার একটা মূল্য।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। এর আগে পড়িয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৫২ সালে কলকাতায় তাঁর জন্ম।
প্রথম আলো: আপনি যখন অর্থনীতিবিদ ছিলেন, তখন একরকমভাবে বিশ্বব্যাংককে দেখেছেন, হয়তো সমালোচনাও করেছেন। আবার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় আরেকভাবে দেখেছেন। এখন আপনি নিজেই বিশ্বব্যাংকে কাজ করছেন। অভিজ্ঞতাগুলো কী রকম?
কৌশিক বসু: আমি জানি, বিশ্বব্যাংক বিশাল একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। এর ভেতরে তার একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। আমি যখন ভারতে কাজ করি, তখন কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমার অনেক কথাই হতো। আমি অনেক কিছু জানতে চাইতাম। ব্রাজিলে একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কীভাবে হয়েছে, সেটা জানতে চাইতাম। এ ব্যাপারে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল যে এটা একটা অনেক বড় কার্যকরী প্রতিষ্ঠান এবং আমি তাদের সঙ্গে সেই সম্পর্কটাই রাখব।
প্রথম আলো: ক্যারিয়ারের শুরুতে কখনো বিশ্বব্যাংকে কাজ করতে চাননি?
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কিন্তু আমার প্রথম কথাবার্তা হয়েছিল আরও আগে, যখন আমি পিএইচডি শেষ করি। বিশ্বব্যাংকে ইয়াং প্রফেশনাল নামে একটি কর্মসূচি আছে, সেখানে গেলে সারা জীবনের জন্য চাকরি হয়ে যায়। আমি আবেদন করলাম। ইন্টারভিউতে ডাকল। শেষ রাউন্ডের ইন্টারভিউ হলো প্যারিসে। বিশ্বব্যাংকের চাকরি বলে আমার বাবা-মা খুব উত্তেজনার মধ্যে ছিলেন। আমি যদিও খুব বেশি উত্তেজনার মধ্যে ছিলাম না। পেলে ভালো, না পেলে না। চাকরি কিন্তু পেলাম না। পাস করতে পারলাম না শেষ ইন্টারভিউতে। আমি এখন সত্যি মনে করি, জীবনের কিছু কিছু ব্যর্থতা আশীর্বাদও হয়।
আমি আপাদমস্তক একজন গবেষক। যদি বিশ্বব্যাংকের ওই চাকরিতে চলে যেতাম, তাহলে এটা আর হতো না। তাহলে পুরো চাকরিজীবন আমার আরেক ধরনের হতো। আমি যা করেছি সত্যিই আমি উপভোগ করতাম। আমার কাছে পেপার লেখা বা ক্লাসরুম লেকচার দেওয়া সত্যি দারুণ আনন্দদায়ক। আমি আমার নিজে ছেলেমেয়েদেরও বলি যে আমি ভাগ্যবান। কারণ, আমি যা করতে ভালোবাসি, তা করতে পেরেছি। একটা চাকরি ভাগ্যে পাইনি, আর আইনটা যদি পড়তাম, তাহলে কলকাতাতেই থেকে যেতাম, পৈতৃক আইন পেশারই হয়তো চর্চা করতাম।
প্রথম আলো: একাধিকবার আপনার লেখায়, বক্তৃতায় বলেছেন আপনি গবেষণাকেই বেশি পছন্দ করেন। আর গবেষণা হচ্ছে একটা খেলার মতো, অনেকে হয়তো একই বিষয় নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু সবার আগে যিনি কাজটা শেষ করতে পারবেন তিনিই বিজয়ী। এটা কি এখন মিস করেন?
কৌশিক বসু: আমার কাছে গবেষণাটা মনে হয়, এটা একটি লজিক। আমি এতে আগ্রহ পাই। অমর্ত্যদার গোড়ার কাজ ছিল পুরোপুরি লজিকনির্ভর। তিনি গাণিতিক লজিক ব্যবহার করতেন অর্থনীতিতে। এটা আমার প্যাশন। সেটা আমি উপভোগ করতাম এবং এখন মিস করি। তবে ভাগ্য ভালো যে বিশ্বব্যাংকে একটা বড় গবেষণা বিভাগ আছে। তারা আমার অধীনে। যদিও এমন নয় যে আমি তাদের সঙ্গে বসে গবেষণা করতে পারছি। আবার কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁদের সঙ্গে কিন্তু আমি এখন কাজ করতে পারছি। এ জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ দেব। সম্প্রতি আমি জোসেফ স্টিগলিজের সঙ্গে কাজ করেছি। ইউরো জোন-সংকট কীভাবে ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার একটি অংশ নিয়ে একটা পেপার লিখেছি। এখানেও আমরা আবার ‘গেম থিউরি’ ও গেম থিউরির লজিক ব্যবহার করেছি। তারপরেও বলব, গবেষণাকে আমি অনেক মিস করি এটাই সত্য।
প্রথম আলো: শুনেছি, আপনার কাজ প্রসঙ্গে আপনার মাকে নিয়েএকটা মজাদার স্মৃতি আছে?
কৌশিক বসু: এই অংশটা মজাদার। আমি লিখেছিও। আমার মা মারা যান ৯১ বছর বয়সে। শেষ দুই বছর মা শব্দ একটু গুলিয়ে ফেলতেন। একবার আমি কলকাতায় এসে মাকে বললাম যে একটা কনফারেন্সে যাচ্ছি। আর মাকে যেমন বাড়িয়ে-টাড়িয়ে বলতে হয় সে রকমভাবে খুশি করতে বললাম, সারা বিশ্বের বড় বড় ইকোনমিস্ট আসছেন। আমাকেও যেতে হবে। তারপর শুনি, মা কাকে যেন বলছে আমার ছেলে খুব ভালো করছে, একটা কনফারেন্সে যাচ্ছে, যেখানে সারা পৃথিবীর কমিউনিস্টরা আসবে।
প্রথম আলো: এবার একটু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। আপনি ২২ বছর পর বাংলাদেশে এলেন। এসে অনেক প্রশংসাও করছেন। আপনার এত প্রশংসার ভিত্তি কী?
কৌশিক বসু: একটা বিষয় আছে যে নিজেদের লোকেরা অনেক বেশি সমালোচনা করেন। ভারতেও সেটা দেখি। এর মাধ্যমে সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য হন। এটা ভালো। তবে এখানে এসে আমার নিজের যা মনে হয়েছে সেটাই বলেছি। কেবল একজন বাঙালি বলে নয়, আমি ওয়াশিংটনে বসে পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখেছি। আমার ওখানে প্রসপ্রেক্টস গ্রুপ নামে একটি বিভাগ আছে। তাদের ডেকে আমি বাংলাদেশের তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটছিলাম। তারাও আমাকে জানাল যে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এখন খুব কম জায়গায়ই হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবৃদ্ধি এখন ১ শতাংশেরও কম। ব্রাজিলে মাইনাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ভেনেজুয়েলাতেও নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি। জাপানে তৃতীয় প্রান্তিকে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফিনল্যান্ডে আমি ছিলাম, তারই ভেতরে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধির খবর এল। বিশ্বব্যাপী এ রকম এক মন্দার সময়ে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। এটা এখানকার লোকদেরও বোঝা দরকার। তাদেরও প্রশংসা করা উচিত। কার জন্য হচ্ছে সেটা জানি না, কিন্তু এটা অবশ্যই বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি।
আমাদের নিজস্ব প্রাক্কলন হচ্ছে আগামীবার বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা হবে চীনের প্রবৃদ্ধির সমান। পাঁচ বা সাত বছর আগেও ভাবা যেত না যে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে চীনের সঙ্গে পাল্লা দেবে বাংলাদেশ। ভারতের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে। বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র কিন্তু অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষের আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। আবার একটা কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আশাবাদটা আমি দিতেও চাই। কারণ, এটা একসঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহ জন্ম দেয়।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির বাধা প্রসঙ্গে আপনি জঙ্গিবাদ নিয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। রাজনৈতিক কিছু সমস্যার কথাও বলেছেন। একটু ব্যাখ্যা করবেন?
কৌশিক বসু: পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই এখন রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। আমরা বিশ্বব্যাংক থেকে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে দেখছি যে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও কমে গেলে এর কিছু প্রভাব পড়বে। চীনের অর্থনীতির গতি শ্লথ হলে এর ফলাফল হবে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক ঝুঁকিটাকেই উচ্চমাত্রায় বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ঝুঁকি সব দেশের জন্যই। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো জায়গায় নেই। কিন্তু অবশ্যই অনেক সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যেতে পারে, যদি সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি থাকে। ভারতকে এ জন্য চিন্তা করতে হবে, বাংলাদেশকেও চিন্তা করতে হবে। সচেতন থাকতে হবে। তবে ভাগ্য ভালো, এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তা অত্যন্ত স্থিতিশীল। হ্যাঁ, কিছু ঘটনা তো ঘটেছেই। সব দেশেই তা হয়। তবে অবশ্যই যতটা সম্ভব তা কমানো যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমি বলব, সাধারণ মানুষদের বুঝতে হবে যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধ কেবল সরকারকে দিয়ে হয় না। সাধারণ মানুষেরা যদি অনুভব করে যে সমাজ আগালেও সন্ত্রাসবাদ তা নষ্ট করে দিতে পারে,তাহলে সাধারণ মানুষদেরও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধে যুক্ত হতে হবে। তাহলেই এর ঝুঁকি কমবে। সাধারণ মানুষের প্রতি আমার এটাই পরামর্শ। আর হ্যাঁ, দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে মানুষেরা অনেক রেগে যায়। রাগার কথাও। তাই বলে পুরো দেশটাই যে নষ্ট হয়ে গেছে তা নয়। দুর্নীতিবাজদের ধরতে হবে, ব্যবস্থাও নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধের যুদ্ধটাও চালিয়ে যেতে হবে।
প্রথম আলো: গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্কটা তাহলে আপনি কীভাবে দেখেন?
কৌশিক বসু: আমার মতামত অমর্ত্যদার কাছাকাছি, তবে একদমই এক নয়। একনায়ক বা ‘ডিকটেটরিয়াল কন্ট্রোল’ যেসব দেশে আছে, সেখানে অভিজ্ঞতাটা বিভিন্ন রকমের দেখা গেছে। কোনো কোনো দেশ খুবই ভালো করছে, আবার পুরোপুরি বিপর্যয়ও হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও বিপদ দুটোই।
এ ক্ষেত্রে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমার এই চাকরির একটা আনন্দ যে অনেক চমকপ্রদ মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। নিকারাগুয়ার বিপ্লবী নেতা ও প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার সঙ্গে মানাগুয়াতে দেখা করেছিলাম। আমিই তাঁর সাক্ষাৎ চেয়েছিলাম। বলেছিলাম সামোজা সরকারের বিরুদ্ধে সান্দানিস্তাদের সংগ্রাম নিয়ে ছাত্রজীবনে আমার খুব আগ্রহ ছিল। এ কারণে সান্দানিস্তার সেই বিপ্লবী নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তারপর তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। নিকারাগুয়ায় একনায়ক সামোজা সরকারের সময়ে কিন্তু বিপর্যয় ঘটেছিল। পুরো দেশ বড় সংকটে পড়ে গিয়েছিল। এ রকম প্রচুর উদাহরণ আছে।
আবার কিছু কিছু দেশ আছে, যাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত এবং তারা ভালো করছে। চীন এ রকম একটি বড় উদাহরণ। তাদের সরকার অনেক শক্তিশালী এবং করছেও অনেক ভালো। আরেকটি উদাহরণ সিঙ্গাপুর। কিন্তু যদি বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে বেছে নেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। সেটা ঠিক হবে না। কারণ, বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, গণতন্ত্র ছাড়া শক্ত নিয়ন্ত্রণ পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৬০ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি মন্দ ছিল না। তারপরে তা বিশ্রী কাণ্ড হয়ে গেল।
আমি এ ব্যাপারে খুবই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে গণতন্ত্রই একমাত্র কাঙ্ক্ষিত বিষয়। উন্নয়নের জন্য সরকার ও মানুষকে অবশ্যই গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হবে। গণতন্ত্রে অনেক সমস্যা আছে। প্রথমত, নীতি সংস্কার ঝটপট করা যায় না। ভারতে কাজ করে দেখেছি, সবারই একটা মতামত আছে। একটা নীতি বদল করতে গেলে চারদিক থেকে বিভিন্ন মতামত আসে। কিন্তু আমি তখন সরকারকে বলতাম, এটা একটা সমস্যা বটে কিন্তু এর মধ্যেই থাকতে হবে। আর মানুষকেও বলা, তাদেরও দায়িত্বপূর্ণ হতে হবে। সবকিছুতে বাধা দিয়ে সরকারকে থামিয়ে দিলে দেশ অচল হয়ে যাবে। গণতন্ত্র এমনই একটা জিনিস, যা আস্তে আস্তে পরিপক্ব হয়। আমি যখন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর দিকে তাকাই, তখন মনে হয় অনেক দিক থেকেই তাদের গণতন্ত্র অনেক পরিপক্ব। সেখানেও অনেক বিতর্ক হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু তারপরেও পুরো সমাজ তাতে অংশ নেয় এবং এর মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সুতরাং কোনো প্রশ্নই নেই যে গণতন্ত্রই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারব্যবস্থা।
প্রথম আলো: আবার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসঙ্গে আসি। আপনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ হারের প্রশংসা করেছেন। অথচ দেখছি বেসরকারি বিনিয়োগ ১০ বছর ধরেই এক জায়গায়, ২২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে। সরকার নিজের বিনিয়োগ বাড়িয়ে সেটিকে জিডিপির ২৯ শতাংশে নিয়ে গেছে। যদিও এই বিনিয়োগের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বব্যাংকেরই বড় ধরনের অভিযোগ আছে।
কৌশিক বসু: দেখুন, সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিন্তু যথেষ্ট ভালো। এটাও সত্যি, বাংলাদেশের পক্ষে ৮ শতাংশে যাওয়া সম্ভব। আমার তো ধারণা, বিনিয়োগের হার ৩২-৩৩ শতাংশে এসে গেলে প্রবৃদ্ধিও বেড়ে যাবে। এর মধ্যে যদিও বিশ্ব অর্থনীতির ওঠানামার সঙ্গে একটা সম্পর্ক থাকবেই। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তা বাড়বে। আর সরকারি বিনিয়োগের কথা যা বললেন, ভারতেও কিন্তু তাই হয়েছে। ভারত বিনিয়োগের হার ৩০ শতাংশ অতিক্রম করল ২০০৩ সালে। তার চার-পাঁচ বছর আগ পর্যন্ত তা ২২-২৩ শতাংশে আটকে ছিল। এরপর চরচর করেগোটা কয়েক বছরে তা বেড়ে গেল। তখন সরকার সঞ্চয়ের ভূমিকায় চলে গেল, যা তারা আগে ছিল না। বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কিন্তু মোটামুটি ভালো হচ্ছে। সরকার সঞ্চয় না করে বিনিয়োগকারীর ভূমিকায়। বেশির ভাগ দেশও তাই করে। তবে এখানে যে জায়গায় মনোযোগ দিতে হবে, তা হচ্ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও আনতে হবে। এখন জিডিপির ১ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তা খুব খারাপ নয়। কিন্তু এই হার আরও বাড়িয়ে ২ বা ৩ শতাংশে আনা যেতে পারে। এ জন্য অবশ্যই অবকাঠামোকে আরও ভালো করতে হবে। বাইরে থেকে যারা আসছে তারা বিদ্যুৎ চায়, রাস্তা চায়, পথটা দিয়ে তাড়াতাড়ি যেতে চায়, ব্যবসার পরিবেশ অনেক ভালো চায়। যাতে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো আরও দ্রুত হয়।
আমি যখন ভারতে কাজ করতাম, তখন আগে উপনিবেশ হিসেবে ছিল, এ রকম দেশগুলোর সঙ্গে অনেক কথা বলেছি। মনে আছে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে অনেক সময় কাটাতাম। সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে একই ব্যবস্থা পেয়েছি। বাংলাদেশও পেয়েছে। কিন্তু ব্রিটেন নিজে সংস্কার করেছে। ওদের ফাইল চলার গতি অনেক দ্রুত। অস্ট্রেলিয়াও প্রচুর সংস্কার করেছে। অথচ আমরা সেই ঔপনিবেশিক চর্চা বদলাতে পারিনি। সুতরাং আমাদের এদিক থেকে দ্রুত আগাতে হবে, যাতে ফাইল দ্রুত আগায়। নীতি বদল করে এটা করা যায়। আবার আমাদের আমলাদের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে, যাতে তারাও দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শামিল হয়। সুতরাং বলতে পারি, অবকাঠামোর যদি আরও উন্নতি করা যায়, আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। কারণ, এখানে সস্তা শ্রমের বড় আকর্ষণ আছে। চীনের সেই সুবিধা কিন্তু চলে গেছে। সেখানে মজুরি বেড়ে যাচ্ছে। ভারতে মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে কিছু বেশি হলেও ভারত আরও কয়েক বছর এই সুবিধা পেতে থাকবে। চীন যে জায়গাটা ছাড়বে সেটি এত বড় যে ভারত তো খুব ভালোভাবেই পাবে, বাংলাদেশও পাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হবে না। দুই দেশই বিশ্বকে দিয়ে যেতে পারবে।
প্রথম আলো: আপনি আমলাতন্ত্র বা দুর্নীতির যে কথা বলছেন তা সুশাসনের অংশ। আগে বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে অনেক সোচ্চার ছিল। কিন্তু এখন আর তেমন শোনা যায় না। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বদলের পরে। আপনারা কি নীতির পরিবর্তন এনেছেন?
কৌশিক বসু: আমি তো তিন বছর ধরে বিশ্বব্যাংকে আছি। এমন তো মনে হয় না। আমরা যে ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট তৈরি করি, তার পরেরটা বের হচ্ছে ‘ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামে। এটি বের হবে আগামী জানুয়ারিতে। পরেরটি বের হবে ‘গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রুল অব ল’ শিরোনামে। আমরা জানি, এটা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিতর্ক তৈরি হবে। এখানে দুর্নীতির ওপর আলোচনা থাকবে, সরকার পরিচালনা নিয়ে আলোচনা থাকবে। আর আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা যখন সরকার পরিচালনা ও দুর্নীতি নিয়ে করা হয়, তখন বুঝতে হবে এ নিয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছি।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চায়। ৭ বা ৮ শতাংশে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়। এ ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কৌশিক বসু: ভালোভাবে শাসন পরিচালনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর প্রবৃদ্ধির কথা বলতে পারি, এটা কম-বেশি ‘অটো পাইলটের’ মতো করে চলবে। আর যেটা বললাম, অবকাঠামো আর আমলাতন্ত্র কমালে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হতে পারবে। কিন্তু সুশাসন এমন একটা বিষয়, যেখানে সাধারণ মানুষ অনেক স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু কাজটা অত্যন্ত কঠিন। আমরা যে বলি সুশাসন বাড়াও, এটা আসলে খুবই জটিল প্রক্রিয়া। চাইলেও অনেক সময় করা যায় না। আমি যখন ভারতে কাজ করতাম, দেখতাম অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কাজটা করতে চায়। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে, সেটাই বুঝতেন না। আমরা আশা করছি, কীভাবে সরকার পরিচালনার মান বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আমাদের পরবর্তী রিপোর্টে অনেক আইডিয়া দিতে পারব।
প্রথম আলো: একটু প্রসঙ্গ বদল করি। প্রশ্নটা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ট্রানজিট নিয়ে। এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু একটি সাধারণ ধারণা হচ্ছে, ভারত যা চায় তাই পাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রাপ্তি কম। এ ধারণা থেকে সাধারণ মানুষদের বের করার উপায় কী?
কৌশিক বসু: দেখুন, এটা হতে বাধ্য। একটা বড় দেশের সঙ্গে যখন লেনদেন হয়, তখন মনেই হয় যে বড় দেশটিই বেশি পাচ্ছে। ভারত যখন আমেরিকার সঙ্গে কোনো চুক্তি করে, তখন ভারতেও বলা হয় আমেরিকা বড় অংশটাই পেল, ভারত পেল না। একটা কথা অবশ্যই বলব যে নিজের স্বার্থ নিজেকেই দেখতে হবে। যখন আরেক দেশের সঙ্গে একটা ডিল বা চুক্তি করা হয়, তখন সে নিজের স্বার্থ দেখছে, বাংলাদেশ দেখছে তারটা। তবে দুটো দিকই ভুল আছে। লোকেরা ধরে নেয়, যাকে আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি ‘জিরো সাম গেম’, ওর লাভ হওয়া মানে আমার ক্ষতি হচ্ছে। সুতরাং যে-ই দেখা গেল একটা ডিল হওয়ার পর ভারতে সবাই উৎসব করছে, তখন তুলনামূলক আরেকটি ছোট দেশের মনে হবে ওরা উৎসব করছে মানে তাদের ক্ষতি হয়ে গেল। এটা ঠিক নয়। অর্থনীতিতে এমন অনেক ডিল আছে, যা থেকে উভয় দেশই লাভবান হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, ভালোভাবে চুক্তি করতে পারলে তা উভয়ের জন্য ভালো হয়। ভারত যখন আরেক দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে যাবে, তখন প্রধানত দেখা হয় কী লাভ হবে। কারণ, কেউ তো চ্যারিটি করতে যায় না। বাংলাদেশও দেখবে তাদের জন্য কী লাভ থাকবে। এই যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বা ট্রানজিট—এ থেকে কারোরই ক্ষতি নেই। মেধাভিত্তিক সামর্থ্য দুটো দেশেরই যথেষ্ট আছে। আমি সত্যিই মনে করি, ভারতের সঙ্গে খুব ভালোভাবে আলোচনা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। এই পরামর্শ আমি সবাইকে দিই না, বিশেষ করে যাদের সেই সক্ষমতা নেই। বরং তাদের বলি, বহুজাতিক কারও সঙ্গে ডিল করবে খুব সাবধানে। একটা খারাপ চুক্তি করলে সারা জীবন পস্তাতে হবে। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়। দুই দেশেরই সামর্থ্য আছে। আর সম্প্রতি যে চুক্তিগুলো হয়েছে, আমি তো মনে করি, তা থেকে উভয় দেশের জন্যই সুবিধা পাওয়ার অনেক সুযোগ আছে, সুবিধা পাবেও।
প্রথম আলো: পদ্মা সেতুর পুরো ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাংক কী শিক্ষা পেল?
কৌশিক বসু: কী শিক্ষা পেলাম জানি না। তবে এইটুকু জানি, ইতিহাস যা-ই হোক না কেন, হতে পারে ওই ইতিহাসটির কারণেই ফল যেটা এসেছে, সেটি খুবই ভালো হয়েছে। এই ফল হয়তো হতো না, যদি ওই ঘটনা না ঘটত। আমি বলছি না যে আবার ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক, তবে নিজে থেকে পদ্মা সেতু করার কথা কিন্তু সাত-আট বছর আগে ভাবাও যেত না। এটা হচ্ছে শেষ পাঁচ-ছয় বছরের ব্যাপার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ, ২০০৯-এ ছিল ৮ বিলিয়ন। এখন ২৭ বিলিয়ন। সুতরাং বাংলাদেশ এখন যা পারে, তা সাত-আট বছর আগেও ভাবতে পারত না। আমার কাছে মনে হয়, একটা দেশ করতে পারে এবং করে দেখাচ্ছে। আর আমি আশা করছি, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও ভালো সংযোগ তৈরি হবে এবং সেটি হবে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে। আর আশা করি, আমি অন্তত যত দিন এখানে আছি, আমি সাহায্য করব যাতে পার্টনারশিপ আরও ভালো হয়।
প্রথম আলো: কিন্তু পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগ তুলেছিল, তার তো সুরাহা হয়নি। দুর্নীতির ইচ্ছার অভিযোগটা থেকেই গেল। এতে কি দেশের ভাবমূর্তির সংকট হবে?
কৌশিক বসু: ভবিষ্যতে ভাবমূর্তির কোনো ক্ষতি আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে দুর্নীতি এমনই একটা বিষয়, যা প্রতিটা দেশকেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতি কমানোর পরামর্শ তো আমি সব উন্নয়নশীল দেশকেই দেব।
প্রথম আলো: সব দেশ মিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়নে অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের কী ভূমিকা থাকবে?
কৌশিক বসু: এটা এখনো একটি ওপেন কোশ্চেন হয়ে আছে। যেটাতে আমাদের সামর্থ্য সেটা হলো, এসডিজির গোটা কতক লক্ষ্য আমরা পরিসংখ্যানের দিক থেকে নিয়মিত নজর রাখব। এই কাজে বিশ্বব্যাংক খুবই ভালো। এই যে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে আমরা প্রচুর সমালোচনা পাই বটে, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের যে গ্রুপ এ নিয়ে কাজ করে, তারা অত্যন্ত দক্ষ। এটা আগে আমি জানতাম না, এখানে এসে দেখি, এ কাজে তারা আসলেই অনেক দক্ষ। কাজটা অত্যন্ত জটিল। এখন সারা পৃথিবীর দারিদ্র্য হার গণনা করা হচ্ছে, যেটাকে আমরা ‘পভক্যালনেট’ বলি, এটা খুব ভালোভাবে করা হয়। আমি আশাবাদী যে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যের মধ্যে গোটা কয়েকের ক্ষেত্রে এর তথ্য ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব নেবে। তবে এটাতে রাজনৈতিক একটা ব্যাপার এসেই যায়। কারণ, কিছু উপাত্ত নিয়ে লোকজন এদিক-সেদিক করতে চায়। আশা করছি বিশ্বব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আর আমি একটা কমিশন গঠন করেছি। আমাদের যে দারিদ্র্য নিরূপণ হয় সেটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে এই কমিশন। সেটার প্রধান হচ্ছেন খুব বড় একজন অর্থনীতিবিদ, টনি অ্যাটকিনসন। কমিটির উপদেষ্টাদের মধ্যে অমর্ত্য সেন আছেন। আমরা যে এখন কেবল দারিদ্র্য হার পরিমাপ করি, সেখান থেকে আরও বৃহত্তর জায়গা থেকে কী করতে পারি, তা নিয়ে কমিশন আমাদের সুপারিশ করবে। দেখেন, ভারতের দারিদ্র্য হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। অথচ অনেক সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে। দারিদ্র্য হার তো শুধু টাকা দিয়ে পরিমাপ করার বিষয় নয়। দারিদ্র্যকে আরও বহুমাত্রিক জায়গা থেকে দেখতে হবে। দারিদ্র্য কেবল ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। এ কমিশন এসব নিয়েই কাজ করছে। রিপোর্টটি পেতে মে-জুন হয়ে যাবে। রিপোর্টটি পেলে এটা আমরা এসডিজির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করব এবং আমাদের কাজটা কী হবে, তাও ঠিক করব তখন।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংকে ধনী দেশগুলোর কণ্ঠ অনেক বেশি জোরালো, তাদের ভোটাধিকারও বেশি। আপনি আমাদের মতো একটি দেশ থেকে বিশ্বব্যাংকে আছেন। এ বিষয়ে কিছু কি করার আছে আপনার?
কৌশিক বসু: এটা সত্যি যে ধনী দেশগুলোর কণ্ঠ এখানে অনেক বেশি। কিন্তু যেসব দেশের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা কিছুটা ভালো, সে দেশের অনেক মানুষ এখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করে। এটা ঠিক যে এসব দেশের ভোটের ক্ষমতা খুবই কম। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করে প্রচুর ভারতীয়, প্রচুর বাংলাদেশি। এদের উপস্থিতির মাধ্যমে কিন্তু ওই দেশগুলো তাদের কণ্ঠ বাড়াতে পারছে। কারণ, তাদের নিজের দেশের প্রতি একধরনের সম্পৃক্ততা কিন্তু তাদের ভেতর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে। এই সুবিধা কিন্তু সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর নেই।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
কৌশিক বসু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

শতবর্ষে নবকুমার ইনস্টিটিউশন

মূল স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯১৬ সালে, প্রায় তিন একর জায়গার ওপর বকশীবাজারের আহমদিয়া মসজিদ থেকে ২০-২৫ গজ দূরে। সেখানে অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। মেয়েদের জন্য একটি কলেজ করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলার সরকার নবকুমার স্কুল স্থানান্তরিত করে ১৬ নম্বর উমেশ দত্ত রোডে—গোবিন্দ কুটিরে। নবকুমার ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ স্কুল কম্পাউন্ডে সত্তরের দশকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কলেজ স্থাপন করে। এর পেছনে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নানের বিশেষ অবদান ছিল। উর্দু রোডের ঢাল থেকে এগুলো জয়নাগ রোড, যেটা উমেশ দত্ত রোডের সমান্তরাল একটি রাস্তা, যেখানে পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড অবস্থিত ছিল। সেখানে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী নাসির উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন, তাঁর ছেলে সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী, যিনি বছর খানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। স্বরাষ্ট্রসচিবের ছেলে মনি আর মিন্টু পড়ত কলেজিয়েট স্কুলে। মনিদের উত্তর দিকের বাড়িতে থাকতেন এক কন্ট্রাক্টর, তাঁদের ভাই শামসুল আলম দিলদরাজ মানুষ ছিলেন। এই স্কুলের কয়েক বাড়ি পরে ২৬ নম্বর উমেশ দত্ত রোডে থাকতেন খাইরুল হুদা ও নাজমুল হুদা। তাঁরা নবকুমার ইনস্টিটিউশনে পড়তেন, তাঁদের বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। তাঁদেরই আত্মীয় ছিলেন ফজলুর রহমান, যিনি পাকিস্তান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। এই ফজলুর রহমানই বাংলা ভাষার অক্ষর বিলোপ করে আরবি অক্ষরে বাংলা প্রচলনের প্রস্তাব করেছিলেন এবং তাঁর আমলেই ষোলো টাকা সেরে লবণ বিক্রি হয়েছিল। ইডেন কলেজের পাশের বাড়িতেই থাকতেন রফিক, জাহাঙ্গীর ও তাঁদের অন্য ভাইবোনেরা। এঁদের বাবা দবির উদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। রফিকের এক বোন সুলতানা, যিনি শেখ কামালকে বিয়ে করেছিলেন। সুলতানা আমার বোনদের সমবয়সী ছিলেন, নামকরা ক্রীড়াবিদ। শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ওসমানীকে বহনকারী বিমানে সিলেট এলাকায় গুলি হলে চিফ অব স্টাফ জেনারেল এম এ রব ও শেখ কামাল আহত হন। আমি জেনারেল রবকে বিমানেই কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনি। আজ যেখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেল, আলিয়া মাদ্রাসা এবং পপুলার ও হাসিনা হোটেল, সেখানে ছিল ধু ধু মাঠ। ছোটবেলায় আমরা খেলতে আসতাম। এখানে একটা রেলপথ ছিল, যার ওপারেই ছিল আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BUET) নামে পরিচিত। নবকুমার স্কুলের শিক্ষকেরা, বিশেষত প্রধান শিক্ষক প্রতিটি ছাত্রকে যত্ন করতেন। স্কুলের হেড মৌলভি শফিকুল ইসলামের মার খায়নি এমন ছাত্র কমই ছিল। তাঁর ধমক ও বেতের কারণে পাকিস্তান আমলের ছাত্ররা সহজে উর্দু ভাষায় মোজাক্কার ও মোয়ান্নাস রপ্ত করে এবং উর্দুতে সাত সেতারা মুখস্থ করে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ৭০ থেকে ৮০ নম্বর পেয়েছে। আনন্দবাবুর পর প্রধান শিক্ষক হন আবদুল মান্নান। তাঁর নেতৃত্বে স্কুলের বেশ উন্নতি হয়েছিল।
দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। স্কুলের অপর স্মরণীয় শিক্ষক গণিতশাস্ত্রের ‘হামিদুল স্যার’ যিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও প্রাইভেট টিউশনি করেননি। তাঁর বহু ছাত্র সফল ব্যবসায়ী, ইঞ্জিনিয়ার, রাষ্ট্রদূত ও সচিব হয়েছেন। হামিদুল স্যার আমাকে গণিত শিখিয়েছেন। তাঁদের সবার প্রতি আমি ঋণী। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাবা আমাদের দুই ভাইকে তাঁর সাইকেলের সামনে ও পেছনে বসিয়ে সেন্ট্রাল জেলের সীমানা থেকে ১৫-২০ গজ দূরে গোবিন্দ কুটিরে নিয়ে আসেন। স্কুলের নাম নবকুমার ইনস্টিটিউশন। সামনে স্কুলের খেলার মাঠ। বাবা আমাদের নিয়ে ঢুকলেন হেডমাস্টারের আনন্দবাবুর রুমে। তিনি হেসে বাবার সঙ্গে কথা বললেন। জিজ্ঞেস করলেন কোন ক্লাসে ভর্তি হবে? আমি বললাম ক্লাস ফোরে, ছোট ভাই রচি বলল ক্লাস থ্রিতে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফোর’ বানান করো, আমি বললাম FOUR। দুই ভাই ভর্তি হয়ে গেলাম। তিনি দুজন ক্লাস শিক্ষককে ডেকে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। হেডমাস্টারের রুমে বসে ছিলেন লম্বা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক। পরে জানলাম তিনি ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। তিনি বললেন তোমরা পড়তে এসেছ ভালো, আমার নাতিরাও তো এখানে পড়ে। তিনি খুবই স্নেহপরায়ণ ছিলেন, মাঝেমধ্যে স্কুলে আসতেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমানের আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের উদ্যোগের জোরালো প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর নাতি জিয়াউল হক খোকন আমার সমবয়সী ছিল। সে আরমানিটোলা স্কুলে পড়ত, পরে পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগ দেয়, সে বিটিভির প্রথম ক্যামেরাম্যান। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকা তাঁর প্রথম ছবিগুলো জিয়ারই তোলা। প্রাণস্পর্শী সেই ছবি। তারা থাকত বেগম বাজারের কাছে আলীর নকী দেউড়িতে। জেলখানার ভেতর থেকে রাস্তা ছিল, সেটা পার হলেই আলীর নকী দেউড়ি। ওর বাবা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের প্রধান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, খুবই গুণী ব্যক্তি। ভালো স্কুলের সংজ্ঞা কী? অনেকে মনে করেন, প্রবেশিকা পরীক্ষায় কতজন প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান পেয়েছে, কতজন বৃত্তি পেয়েছে, তা দিয়ে ভালো স্কুল নির্ধারিত হয়। না, সেটাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। দেখা দরকার স্কুল কতজন দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি করেছে, কতজন ছাত্রকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছে। কতজন জনসেবায় নিবেদিত হয়েছে। নবকুমার স্কুলের বহু ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এই স্কুলের ছাত্র মতিউর তো সংগ্রামের অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছিল ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে। এই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শহীদ ছিল কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা। বয়স কত ছিল? ১৪ বছর। শহীদ ঢাকা-দাউদকান্দি রোডে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশ নেয় এবং ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। নবকুমার ইনস্টিটিউশন এ দেশের ইতিহাসের একটা অংশ। এটা বহুদিন উজ্জ্বল থাকবে। মতিউরকে লাল সালাম।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

সৌদি জোটে যোগদান

সন্ত্রাসবিরোধী জোট যখনই হয়, তখন তাতে সাধারণত পশ্চিমা বিশ্ব নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। সেদিক থেকে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সমন্বয়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী পৃথক জোট গঠন হতেই পারে। জাতিসংঘের বাইরে ওআইসি ও আরব লিগের মতো যদি আলাদা সংস্থা থাকতে পারে, তাহলে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে একটি ইসলামি জোট নিশ্চয় গতিশীল ভূমিকা রাখতে পারে। পবিত্র ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ ও ক্রমবর্ধমান রক্তপাত ও হানাহানি দেখে বিচলিত হয়ে সৌদি আরব যদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে এবং সে অনুযায়ী তারা যদি জঙ্গিবাদ দমনে একটি অভিন্ন রণকৌশল প্রণয়নে উদ্যোগী হয়, তাহলে তা বিশ্বমানবতার জন্য সুসংবাদ। তবে সৌদি আরবকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তাকে সতর্ক থাকতে হবে যে অহেতুক বিতর্কে জড়ানো তার জন্য অতিরিক্ত স্পর্শকাতর এবং মূল্যটা হবে অনেক চড়া। প্রস্তাবিত ‘ইসলামি সামরিক জোটের’ লক্ষ্য ও কর্মপ্রক্রিয়া পরিষ্কার নয়। এটা সত্যিই সুন্নি দেশগুলোর মোর্চা হলে তা আইএসবিরোধী কার্যক্রম কতটা এগিয়ে নেবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
সৌদি আরব তথা মধ্যপ্রাচ্যের আরব নেতৃত্বকে একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে অটল থাকতে হবে। এটা অবশ্যই প্রত্যাশিত নয় যে মুসলিম দেশগুলো সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠন করতে গিয়ে নতুন করে কোনো টানাপোড়েন বা বিভেদের মধ্যে জড়িয়ে পড়ুক। বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এর আগে বাংলাদেশ ইয়েমেনের ‘অনির্বাচিত’ সরকারের পতনে সৌদি সামরিক জোটে গেছে। এবারও নীরবে তারা প্রস্তাবিত জোটে নাম লিখিয়েছে, এই ধারাটা গ্রহণযোগ্য নয়। অবিভক্ত পাকিস্তান বিভিন্ন সামরিক জোটে নাম লিখিয়ে চরম মূল্য দিয়েছিল। আমরা আশা করি, সরকার এ বিষয়ে অবিলম্বে একটি আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নেবে। সিদ্ধান্ত অপরিণামদর্শী বা আগ বাড়ানো হলে তাকে দ্রুত শোধরাতে হবে। প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর যুক্তিমতে, এটা অবশ্যই ‘সৌদির প্রবাসী শ্রমিকদের আইএস থেকে বাঁচানোর উপায়’ হতে পারে না।

শেষ হলো শূন্য সুদহারের যুগ by শওকত হোসেন

জ্যানেট ইয়েলেন, চেয়ারম্যান, ফেডারেল রিজার্ভ
শূন্য সুদের যুগ শেষ হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় এক দশক পর প্রথমবারের মতো সুদহার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। এর ফলে এখন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সুদের হার দাঁড়াল শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ।
সুদহার সামান্য বাড়লেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব অতটা সামান্য হবে না। এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকা মার্কিন অর্থনীতিকে একটু টেনে ধরার জন্যই সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এতে অবশ্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে। আর যুক্তরাষ্ট্র সেটাই চায়।
গত বুধবার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জ্যানেট ইয়েলেন এই সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এর আগে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি বা এফওএমসি এ নিয়ে দুই দিন বৈঠক করেছে। বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে আর এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। কমিটি মনে করছে, এই অবস্থায় ফেডারেল ফান্ডের সুদহার সামান্য বাড়ানোই যথাযথ হবে।
ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়েই। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত। জরিপেও দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই নিশ্চিত ছিল যে এই ঘোষণা আসবে। ফলে সব পক্ষই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং বাজারও সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সর্বশেষ সুদের হার বাড়িয়েছিল ২০০৬ সালে। এরপর তা কমে ২০০৮ সালে শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছায়। সুদ হার ছিল দশমিক ২৫ শতাংশ, যাকে প্রায় শূন্যই বলা যায়। বড় ধরনের মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র শূন্য সুদহারের নীতি নিয়েছিল। এখন দেশটি মনে করছে সেই নীতি থেকে সরে আসার সময় হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের আশা, এবার প্রবৃদ্ধি আরেকটু বাড়বে, হবে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রায় এক দশক আগে ফেডারেল রিজার্ভের সে সময়ের চেয়ারম্যান বেন বার্নানকে সুদহার শূন্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রত্যাশা ছিল, এর ফলে মানুষের হাতে বাড়তি টাকা আসবে, ঋণ সস্তা হবে, উৎপাদন বাড়বে, অর্থনীতি চাঙা হবে। এটা সত্যি, তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে। ইউরোপ মন্দা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। চীন ও অন্যান্য উঠতি অর্থনীতির দেশও নানা সংকটে আছে। এ অবস্থায় মূলত ২০১৩ সাল থেকেই মুদ্রানীতি বদলের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে সুদহার বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ানোর কথাও হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত আর এ পথে এগোয়নি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। বিশেষ করে গত আগস্টে চীন হঠাৎ করে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের দুই দফা অবমূল্যায়নের পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাযুদ্ধ শুরু হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকায় পিছিয়ে যায় ফেডারেল রিজার্ভ।
মূলত দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুদ্রানীতি পরিচালনা করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ। এর একটি হচ্ছে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান, অন্যটি স্থিতিশীল মূল্যস্তর। সাধারণত অর্থনীতি যখন দুর্বল থাকে তখন মূল্যস্ফীতিও কমতে থাকে। আবার অর্থনীতি যখন সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের দিকে যায় তখন মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি হয় এবং এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। অর্থনীতি খুব দ্রুতগতিতে এগোতে থাকলে ফেডারেল রিজার্ভ তার বেঞ্চমার্ক সুদহার বাড়িয়ে দেয়। তাতে মানুষ খরচ কমিয়ে দেয় এবং সঞ্চয় বেশি করে। এর ফলে অর্থনীতি একটু শ্লথ হয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যায়। আবার অর্থনীতি বেশি শ্লথ হয়ে গেলে ফেড তখন সুদহার কমিয়ে দেয়। যেমন ২০০৮ সালের মন্দার পর কমাতে কমাতে প্রায় শূন্য হারে নিয়ে আসা হয়েছিল।
ফেডারেল রিজার্ভ মনে করছে, মূল্যস্ফীতি এখন কম। তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম কম থাকায় চাপটি কমই থাকবে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও যথেষ্ট ভালো। সুতরাং এখন সুদহার কম থাকায় মানুষ হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। ফলে এখনই সুদহার বাড়ানোর উপযুক্ত সময়।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সুদহার বাড়ানোর ফলে শক্তিশালী থাকা ডলার আরও শক্তিশালী হবে। আর এতে অনেক দেশ ও কোম্পানি ঋণ নিতে সমস্যায় পড়বে। আর এতে ঝামেলায় পড়বে ইউরোপ। মন্দাকবলিত ইউরোপ এখন ঋণ নেওয়া আরও সহজ করতে চাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র নিল উল্টো পথ।
তবে খুব প্রত্যাশিতভাবেই ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী সুদহার বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা দিয়েছে। ইউরোপিয়ান শেয়ারের দর কিছুটা বেড়েছে। ডলারের মানও বেড়েছে। আবার লন্ডন আন্তবাজার সুদহার বা লাইবর ২০০৯ সালের পর বেড়ে হয়েছে সর্বোচ্চ। তবে তেলের দাম কমেছে। এখন আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে ইউরোপ ও উঠতি অর্থনীতি আরও কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তার জন্য। তবে শেষ কথা হচ্ছে সস্তায় বিনিয়োগের দিন আপাতত শেষ।

একটি ঐতিহাসিক চুক্তি by রবার্ট ওয়াটকিন্স

গত শনিবার কপ–২১ সম্মেলনের সমাপ্তি দিনে বিশ্বনেতারা একটি চুক্তিতে উপনীত হন, এর মধ্য দিয়ে এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কাজ করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। যদিও আলাপ-আলোচনা চলাকালে অনেকেই উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে যে রাষ্ট্রগুলো একটি চুক্তিতে উপনীত হতে সক্ষম হয় কি না, কিন্তু জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন–বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের ২১তম সম্মেলনের পক্ষগুলো একটি ঐতিহাসিক চুক্তি উপহার দিয়েছে। ১৯৬টি দেশের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে অর্জিত প্যারিস চুক্তি হলো প্রথম সর্বজনীন জলবায়ু চুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলোকে সীমিত ও নিরসনকল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি আমাদের এই সময়কালের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, যা সমগ্র বিশ্ব ও সম্প্রদায়গুলোর মাঝে বর্ধিতভাবে অনুভূত হচ্ছে। ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশে জলবায়ুর আঘাত ও চাপ সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, জীবিকার সংকোচন করেছে এবং মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনকে বিশ্ব কীভাবে মোকাবিলা করবে, প্যারিসে সম্পাদিত চুক্তিটি এর একটি দিকনির্দেশক।
এই চুক্তিটি বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির নিচে সীমাবদ্ধ রাখতে বিশ্বকে পথনির্দেশ করে, যেখানে দৃষ্টি থাকবে লক্ষ্যমাত্রা ১ দশমিক ৫-এর সুবিধাগুলো অর্জন। এ ছাড়া প্যারিস চুক্তিটি একটি উচ্চাভিলাষী, গতিশীল ও সর্বজনীন চুক্তি। এটি উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশকে ও সব ধরনের নিঃসরণকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং স্থায়িত্বের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে।
প্যারিস চুক্তিটি বিশ্ববাসীর কাছে একটি বার্তা প্রেরণ করে যে রাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তন–বিষয়ক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন। যেখানে কিয়েটো প্রটোকলে কিছু রাষ্ট্রকে গ্যাস নিঃসরণ কমানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে প্যারিস চুক্তি নিজেদের পরিবেশ ও পরিস্থিতির ভিন্নতাকে স্বীকার করেও প্রতিটি রাষ্ট্রকে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়। নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকে জলবায়ু পরিবর্তন নিরসন ও পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রগুলো সরকারিভাবে তাদের কর্মপরিকল্পনা পেশ করেছে, যাতে নিঃসরণ হ্রাসও অন্তর্ভুক্ত।
এখন দেশগুলো এসব কর্মপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ এবং যদি তারা এটি করে, তবে সেটি ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির অনুমেয় হারকে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এটি ইতিমধ্যেই অনুভূত হচ্ছে যে বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন দেশগুলো, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব ফেলে, যেমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের রূপ পরিবর্তন, সেখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অবদানই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
চুক্তিটি শুধু জলবায়ু পরিবর্তন রোধে জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির প্রক্রিয়াকেই আনুষ্ঠানিকতা দেয় না বরং এটি প্রতি পাঁচ বছর পরপর এই পরিকল্পনার অগ্রগতিকে মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনা করতে একটি বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে কাজ করে। এই পদ্ধতির জন্য দেশগুলোকে ক্রমাগত তাদের প্রতিশ্রুতিগুলোর হালনাগাদ করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে কোনো পশ্চাৎমুখিতা নেই। চুক্তিটি বৈশ্বিক অংশীদারত্বকে এগিয়ে নিতে একটি মূল উপকরণ হিসেবে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনকে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বর্ধিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে।
একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলো কারিগরি সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থ জোগান এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এর অন্তর্ভুক্ত হলো প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যমান তহবিলের অর্থায়ন ২০২০ সালের পরেও চালিয়ে যাওয়া, যা ২০২৫ সাল নাগাদ আরও বৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে করতে হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অর্থায়নের চেষ্টা করছে, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য জলবায়ু সংবেদনশীল স্থানগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি করার জন্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি সুসংবাদ।
বাংলাদেশ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সম্পৃক্তকরণে উদ্যোগ তীব্রতর করেছে, যাতে গোল ১৩-জলবায়ু ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি কার্যক্রম গ্রহণ মূল জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে।
এ সম্পর্কে গৃহীত চুক্তিটি বাস্তবায়নে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোকে দেশগুলোর সহায়তায় আহ্বান জানায়, এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ উচ্চমানসম্পন্ন নীতিপরামর্শ ও কার্যক্রম সহায়তাসহ বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। প্যারিস চুক্তি পরিবর্তিত জলবায়ুতে জীবন ও জীবিকা নিরাপদ রাখার উপযোগিতা অর্জন এবং নিম্ন-কার্বন নিঃসরণ অর্থনীতি গ্রহণ—বাংলাদেশের জন্য এ দুটি বিষয়ের প্রয়োজনীয়তাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি নিম্নপর্যায়ে রাখতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিম্ন-কার্বন নিঃসরণ অর্থনীতি গ্রহণ ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার এখনই প্রকৃত সময়। বৈশ্বিক রূপান্তর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্যারিস চুক্তি বাংলাদেশ ও অবশিষ্ট বিশ্বের জন্য একটি অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে, যা আগামী বংশধরদের জন্য আমাদের এই ধরিত্রীকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
রবার্ট ওয়াটকিন্স: বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী

শতবর্ষে নবকুমার ইনস্টিটিউশন by জাফরুল্লাহ চৌধুরী

মূল স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯১৬ সালে, প্রায় তিন একর জায়গার ওপর বকশীবাজারের আহমদিয়া মসজিদ থেকে ২০-২৫ গজ দূরে। সেখানে অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। মেয়েদের জন্য একটি কলেজ করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলার সরকার নবকুমার স্কুল স্থানান্তরিত করে ১৬ নম্বর উমেশ দত্ত রোডে—গোবিন্দ কুটিরে। নবকুমার ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ স্কুল কম্পাউন্ডে সত্তরের দশকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কলেজ স্থাপন করে। এর পেছনে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নানের বিশেষ অবদান ছিল।
উর্দু রোডের ঢাল থেকে এগুলো জয়নাগ রোড, যেটা উমেশ দত্ত রোডের সমান্তরাল একটি রাস্তা, যেখানে পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড অবস্থিত ছিল। সেখানে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী নাসির উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন, তাঁর ছেলে সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী, যিনি বছর খানেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। স্বরাষ্ট্রসচিবের ছেলে মনি আর মিন্টু পড়ত কলেজিয়েট স্কুলে। মনিদের উত্তর দিকের বাড়িতে থাকতেন এক কন্ট্রাক্টর, তাঁদের ভাই শামসুল আলম দিলদরাজ মানুষ ছিলেন। এই স্কুলের কয়েক বাড়ি পরে ২৬ নম্বর উমেশ দত্ত রোডে থাকতেন খাইরুল হুদা ও নাজমুল হুদা। তাঁরা নবকুমার ইনস্টিটিউশনে পড়তেন, তাঁদের বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। তাঁদেরই আত্মীয় ছিলেন ফজলুর রহমান, যিনি পাকিস্তান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। এই ফজলুর রহমানই বাংলা ভাষার অক্ষর বিলোপ করে আরবি অক্ষরে বাংলা প্রচলনের প্রস্তাব করেছিলেন এবং তাঁর আমলেই ষোলো টাকা সেরে লবণ বিক্রি হয়েছিল।
ইডেন কলেজের পাশের বাড়িতেই থাকতেন রফিক, জাহাঙ্গীর ও তাঁদের অন্য ভাইবোনেরা। এঁদের বাবা দবির উদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। রফিকের এক বোন সুলতানা, যিনি শেখ কামালকে বিয়ে করেছিলেন। সুলতানা আমার বোনদের সমবয়সী ছিলেন, নামকরা ক্রীড়াবিদ। শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ওসমানীকে বহনকারী বিমানে সিলেট এলাকায় গুলি হলে চিফ অব স্টাফ জেনারেল এম এ রব ও শেখ কামাল আহত হন। আমি জেনারেল রবকে বিমানেই কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনি।
আজ যেখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেল, আলিয়া মাদ্রাসা এবং পপুলার ও হাসিনা হোটেল, সেখানে ছিল ধু ধু মাঠ। ছোটবেলায় আমরা খেলতে আসতাম। এখানে একটা রেলপথ ছিল, যার ওপারেই ছিল আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BUET) নামে পরিচিত।
নবকুমার স্কুলের শিক্ষকেরা, বিশেষত প্রধান শিক্ষক প্রতিটি ছাত্রকে যত্ন করতেন। স্কুলের হেড মৌলভি শফিকুল ইসলামের মার খায়নি এমন ছাত্র কমই ছিল। তাঁর ধমক ও বেতের কারণে পাকিস্তান আমলের ছাত্ররা সহজে উর্দু ভাষায় মোজাক্কার ও মোয়ান্নাস রপ্ত করে এবং উর্দুতে সাত সেতারা মুখস্থ করে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ৭০ থেকে ৮০ নম্বর পেয়েছে। আনন্দবাবুর পর প্রধান শিক্ষক হন আবদুল মান্নান। তাঁর নেতৃত্বে স্কুলের বেশ উন্নতি হয়েছিল। দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। স্কুলের অপর স্মরণীয় শিক্ষক গণিতশাস্ত্রের ‘হামিদুল স্যার’ যিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকলেও প্রাইভেট টিউশনি করেননি। তাঁর বহু ছাত্র সফল ব্যবসায়ী, ইঞ্জিনিয়ার, রাষ্ট্রদূত ও সচিব হয়েছেন। হামিদুল স্যার আমাকে গণিত শিখিয়েছেন। তাঁদের সবার প্রতি আমি ঋণী।
১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাবা আমাদের দুই ভাইকে তাঁর সাইকেলের সামনে ও পেছনে বসিয়ে সেন্ট্রাল জেলের সীমানা থেকে ১৫-২০ গজ দূরে গোবিন্দ কুটিরে নিয়ে আসেন। স্কুলের নাম নবকুমার ইনস্টিটিউশন। সামনে স্কুলের খেলার মাঠ। বাবা আমাদের নিয়ে ঢুকলেন হেডমাস্টারের আনন্দবাবুর রুমে। তিনি হেসে বাবার সঙ্গে কথা বললেন। জিজ্ঞেস করলেন কোন ক্লাসে ভর্তি হবে? আমি বললাম ক্লাস ফোরে, ছোট ভাই রচি বলল ক্লাস থ্রিতে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফোর’ বানান করো, আমি বললাম FOUR। দুই ভাই ভর্তি হয়ে গেলাম। তিনি দুজন ক্লাস শিক্ষককে ডেকে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। হেডমাস্টারের রুমে বসে ছিলেন লম্বা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক। পরে জানলাম তিনি ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। তিনি বললেন তোমরা পড়তে এসেছ ভালো, আমার নাতিরাও তো এখানে পড়ে। তিনি খুবই স্নেহপরায়ণ ছিলেন, মাঝেমধ্যে স্কুলে আসতেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফজলুর রহমানের আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের উদ্যোগের জোরালো প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁর নাতি জিয়াউল হক খোকন আমার সমবয়সী ছিল। সে আরমানিটোলা স্কুলে পড়ত, পরে পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগ দেয়, সে বিটিভির প্রথম ক্যামেরাম্যান। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকা তাঁর প্রথম ছবিগুলো জিয়ারই তোলা। প্রাণস্পর্শী সেই ছবি। তারা থাকত বেগম বাজারের কাছে আলীর নকী দেউড়িতে। জেলখানার ভেতর থেকে রাস্তা ছিল, সেটা পার হলেই আলীর নকী দেউড়ি। ওর বাবা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের প্রধান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, খুবই গুণী ব্যক্তি।
ভালো স্কুলের সংজ্ঞা কী? অনেকে মনে করেন, প্রবেশিকা পরীক্ষায় কতজন প্রথম ১০ জনের মধ্যে স্থান পেয়েছে, কতজন বৃত্তি পেয়েছে, তা দিয়ে ভালো স্কুল নির্ধারিত হয়। না, সেটাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। দেখা দরকার স্কুল কতজন দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি করেছে, কতজন ছাত্রকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছে। কতজন জনসেবায় নিবেদিত হয়েছে। নবকুমার স্কুলের বহু ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এই স্কুলের ছাত্র মতিউর তো সংগ্রামের অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছিল ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে। এই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র শহীদ ছিল কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা। বয়স কত ছিল? ১৪ বছর। শহীদ ঢাকা-দাউদকান্দি রোডে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশ নেয় এবং ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। নবকুমার ইনস্টিটিউশন এ দেশের ইতিহাসের একটা অংশ। এটা বহুদিন উজ্জ্বল থাকবে। মতিউরকে লাল সালাম।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

যুদ্ধের কারণে দিনে পালাচ্ছে ৪৬০০ জন

এ বছরে যুদ্ধ, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে মানুষের নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। ২০১৪ সালে এসব কারণে প্রায় রেকর্ডসংখ্যক ৬০ কোটি মানুষ অভিবাসনপ্রত্যাশী হিসেবে দেশ ছেড়েছে। শুক্রবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) এক প্রতিবেদনে এ বছরের প্রথম ছয় মাসের হিসাবে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে বিশ্বে ১২২ জনের মধ্যে একজন মানুষ নিজ দেশ থেকে অন্যত্র পালাতে বাধ্য হচ্ছে। সেই অনুযায়ী দিনে চার হাজার ৬০০ মানুষ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে।
ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এএফপির খবরে জানানো হয়, আশ্রয়প্রার্থী, শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র বসবাসকারী লোকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এই হিসাব এ বছরের প্রথম ছয় মাসের। পুরো বছরের হিসাব ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে।
ইউএনএইচসিআর বলছে, ‘প্রায় ১০ লাখ মানুষ এ বছর ভূমধ্যসাগরের পাশের দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। সিরিয়ায় সংঘাত ও অন্য দেশগুলোতে দুর্ভোগের কারণে বেশি সংখ্যক মানুষ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। অন্য দেশে চলে যাওয়া এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার কারণে এ বছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
গত বছর পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বছর শেষে এ সংখ্যা ৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত ৪৬০০ জন
প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫০ লাখ মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গেছেন। ৪২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে নিজ দেশেই আছে। আট লাখ ৩৯ হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে গেছে।
এ বছরের জুন শেষে শরণার্থী হিসেবে সারা বিশ্বে দুই কোটি দুই লাখ মানুষ বাস করছে। ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ শতাশের বেশি মানুষ এখন শরণার্থী। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার মতে, শরণার্থীর এই সংখ্যা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ। এ কারণে বছরের প্রথম ছয় মাসে সিরিয়ার ৪২ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে। সিরিয়ার ওই ঘটনা বাদ দিলে ২০১১ থেকে ২০১৫‍—এই চার বছরে বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার মাত্র ৫ শতাংশের মতো হতো।
সংস্থাটি বলছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে শরণার্থীর সংখ্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও এ বছরের শেষ ছয় মাসের হিসাব করা হয়নি। বছরের শেষ ছয় মাসে এই সংখ্যা আরও ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বৃহত্তম গণতন্ত্রে সমকামিতা অপরাধ

ইতিহাসের চাকা উল্টে বৃহত্তম গণতন্ত্রের শীর্ষ আদালত জানাল, সমকামিতা অপরাধ৷ বদলে গেল ২০০৯-এ দিল্লি হাইকোর্টের রায়ের পর তৈরি হওয়া ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বিলোপের আশা৷ কোনও ব্যক্তির নিজের পছন্দ মতো যৌন সঙ্গী বেছে নেওয়ার একান্ত মৌলিক অধিকারে সুপ্রিম কোর্টের রায় বড়সড় এক আঘাত বলেই মনে করছে বিভিন্ন মহল৷
কারও কারও মত, শীর্ষ আদালতের রায় কার্যত ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাছেই আত্মসমর্পণ৷ কারণ, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মৌলবাদী সংগঠনগুলি দিল্লি হাইকোর্টের রায়ের বিরোধিতায় কোমর বেঁধেছিল৷ তারাই সুপ্রিম কোর্টে দিল্লি হাইকোর্টের রায় বাতিলের আর্জি পেশ করেছিল৷ আবার এ প্রশ্নও উঠছে, ২০০৯-এ হাইকোর্টের রায়ের পর কেন্দ্রীয় সরকারই বা কেন এত দিন দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাটি বাতিলের জন্য সংসদে বিল আনেনি৷ তারও আগে ২০০০ সালে প্রকাশিত ল কমিশনের ১৭২ নম্বর রিপোর্টেও ৩৭৭ ধারা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল৷ কিন্ত্ত সরকার এক দশকেরও বেশি সময়ে এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপই করেনি৷
সব মিলিয়ে উঠে আসছে সেই পুরোনো ভাবনাচিন্তা বয়ে বেড়ানোর রক্ষণশীল মানসিকতার কথাই৷ সে আদালত এবং রাজনীতিক--দুতরফেই৷ ব্রিটিশরা ৬৬ বছর আগে ভারত ছেড়ে চলে গেলেও তাদের তৈরি আইন আঁকড়েই পড়ে রয়েছে এই দেশ৷ ভিক্টোরীয় নৈতিকতা বজায় রাখতে লর্ড ম্যাকলে ১৮৬০ সালে এই আইন প্রণয়ন করেছিলেন৷ দণ্ডবিধির এই ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক নিয়ম -বিরোধী যে কোনও ধরনের যৌন সংসর্গই অপরাধ বলে গণ্য হবে৷ প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ যদি পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা দশ বছর পর্যন্ত কারাবাস ও জরিমানা হতে পারে৷ বুধবার শীর্ষ আদালতে বিচারপতি জি এস সিঙ্ঘভি ও এস জে মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগকে মনে রেখেই ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে বহাল রাখা হচ্ছে৷ তবে প্রয়োজনে, সংসদ এই বিষয়ে, অর্থাত্‍ সমকামিতা অপরাধ নয়, এই মর্মে আইন আনার কথা ভাবতে পারে৷ প্রশ্ন উঠছে, সংখ্যাগুরুর আবেগের উপর আদালতের এই গুরুত্ব আরোপ নিয়েও৷ তা হলে কি গণ-হিস্টিরিয়াকেও পরোক্ষে মান্যতা দিচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত? রায়ের সঙ্গে সঙ্গেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এলজিবিটি কর্মী থেকে শুরু করে বিশিষ্ট আইনজীবী, সাধারণ মানুষ৷ সকলেই মনে করছেন, শীর্ষ আদালতের রায়ের ফলে সমকামী আন্দোলন বড় ধাক্কা খেল৷ ব্যক্তি স্বাধীনতার মর্মমূলেই আঘাত হানল এই রায়৷
স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়েটসের কথায়, মানবাধিকারের নিরিখে পৃথিবীতে যে পরিবর্তন আসছে, সেই পরিবর্তনের পরিপন্থী এই রায়৷ এর ফলে এলজিবিটি আন্দোলন মারাত্মক পিছিয়ে গেল৷ নাজ ফাউন্ডেশশনের পক্ষে অঞ্জলি গোপালন এই সময়কে ফোনে বলেন, এর থেকে অন্ধকার দিন আমাদের আসবে না৷ যে আন্দোলনকে এতটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার ভবিষ্যত্‍ আপাতত অনিশ্চিত৷ প্রসঙ্গত, আরও অনেকের সঙ্গে নাজ ফাউন্ডেশনও ৩৭৭ ধারা বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিল৷ আইনি বিশেষজ্ঞেরা স্পষ্টই বলছেন, সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ ধারা ব্যক্তি মানুষের যে সমানাধিকার ও স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, সুপ্রিম কোর্টের রায় তার পরিপন্থী৷
অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ইন্দিরা জয়সিংও প্রকাশ্যে বলেছেন, সংবিধানে যে মূল্যবোধের কথা বলা আছে, তাকে বিস্তৃত করার ঐতিহাসিক সুযোগ হারাল দেশ৷ সুপ্রিম কোর্ট যেখানে নানা বিষয়ে তাদের মত দেয়, এ বিষয়ে তারা নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলে ফের সংসদের কোর্টেই বল ঠেলে দিল৷
রায় মানতে পারছেন না কলকাতার এনইউজেএসের অধ্যাপক শমনদ বশিরও৷ তাঁর কথায়, আমাদের মহামান্য শীর্ষ আদালত নিজেকে নীতিবাগিশ ভিক্টোরিয়ান হিসেবে প্রতিপন্ন করল, এবং প্রমাণ করল আইনও সব সময় যুক্তি মানে না৷ ভারতে এলজিবিটি আন্দোলন বেশ কয়েক বছর ধরেই গতি পেয়েছে৷ ২০০৯-এ দিল্লি হাইকোর্টের রায়ের পর তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনাও শুরু হয়৷ কিন্ত্ত এই রায় এ দিন সকলকেই হতাশ করেছে৷ এ বার এই আন্দোলনের দিশা কী হবে তা নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা৷ আপাতত তাঁরা সুপ্রিম কোর্টেরই সাংবিধানিক বেঞ্চে আপিল করার কথা ভাবছেন৷ শমনদ মনে করছেন, বৃহত্তর বেঞ্চে রায় বদলেও যেতে পারে৷
প্রশ্ন উঠছে বেঙ্গালুরুর প্রথম সমকামী রেডিও স্টেশন কিউ-এর ভবিষ্যত্‍ নিয়েও৷ নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী এই সময়-কে বলেন, এখনও জানা নেই ভবিষ্যত্‍ কী হতে চলেছে৷ তবে আমরা মর্মাহত৷ সাহিত্যিক বিক্রম শেঠ থেকে শুরু করে অভিনেতা আমির খান--প্রত্যেকেই এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন৷
তবে রায়ে খুশি আবেদনকারীরা৷ এর মধ্যে মুসলিম, হিন্দু সব সম্প্রদায়ের লোকই ছিলেন৷ তাঁরা বলছেন, এই রকম (সমকামী) সম্পর্ক সমাজ-বিরুদ্ধ৷ অন্যায়৷ কাজেই সুপ্রিম কোর্টের রায় একেবারে ঠিক৷ সমাজতাত্ত্বিক দীপঙ্কর গুপ্ত তাই মনে করছেন, আদালতের এ রকম সিদ্ধান্ত ধর্মীয় সংগঠনের কাছে আত্মসমর্পণের সামিল৷ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শেও আঘাত৷ আর সংসদ কবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিয়ে কিছুই বলা যায় না৷
আপাতত সংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের যে অবস্থা, তাতে আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে নতুন আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা প্রায় নেই৷ তবে আইনমন্ত্রী কপিল সিবাল, বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মণীশ তিওয়ারি সকলেই বলেছেন, সরকার তাঁর দায়িত্ব পালন করবে৷ সরকার সকলের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবে৷ বিল নিয়ে আসবে৷ আইনমন্ত্রী কপিল সিবালের কথায়, সুপ্রিম কোর্টের অধিকার হল, কোনও আইন সংবিধানসম্মত কি না তা দেখা৷ তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে৷ সরকারের অধিকার হল, আইন তৈরি করা৷ সরকার তার অধিকার প্রয়োগ করবে৷ তবে সংসদ চালু থাকলে তো আইন পাশের কথা আসে৷ জয়রাম রমেশও বলেন, এই রায়ের ফলে আরও পিছিয়ে পড়লাম আমরা৷
মন্ত্রীরা এ কথা বললেও বাস্তবে নতুন করে আইন পাশ করানো বেশ কঠিন৷ কারণ, ধর্মীয় সংগঠনগুলির মনোভাব৷ ভোটের আগে কোনও রাজনৈতিক দলই তাদের চটাতে চাইবে না৷ এমন বিতর্কিত বিষয় নিয়ে এগোতে চাইবে না৷ এমনকি নতুন যে সরকার আসবে, তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় বিষয়টি থাকবে, এমন কথাও হলফ করে কেউ বলতে পারছে না৷
এই আঁধারে আপাতত ফের আলোর দিশা খোঁজার চেষ্টা শুরু করছেন এলজিবিটি কর্মীরা৷
সুত্রঃ এই সময়

‘মাসুদ গলায় দড়ি প্যাঁচিয়ে ধরে আমরা দুজন টান দেই’ by নুরুজ্জামান লাবু

‘আমি ঘুমাইয়্যা ছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। দেখি অচেনা রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাইতেছে। আমি মাসুদরে বলি, এইটা কোন রাস্তা। মাসুদ বলে, আমি চিনি। একটু পর মাসুদ গাড়ি থামাইতে কয়। গাড়ি থামা মাত্রই পেছন থিকা ড্রাইভারের গলায় প্লাস্টিকের একটা দড়ি প্যাঁচাইয়া ধরে। আমি আর মোফাজ্জল সেই রশি ধইরা টান দেই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ড্রাইভার নীরব হইয়া যায়। পরে তারে রাস্তার পাশে একটা বাঁশঝাড়ে ফেইলা দেই।’ এভাবেই নৃশংস এক খুনের আদ্যোপান্তর বর্ণনা দেয় ১৯ বছরের তরুণ আজহার। তিন বন্ধু আজহার, মোফাজ্জল ও মাসুদ মিলে খুন করে জাহাঙ্গীর নামে প্রাইভেটকার চালককে। যিনি ওই প্রাইভেটকারের মালিকও। ঢাকার ডেমরা থেকে ভাড়ায় নেত্রকোনা নিয়ে যাওয়ার নামে তাকে হত্যা করা হয়। পরে গাড়িটি ছিনিয়ে নিয়ে যায় এই তিন দুর্বৃত্ত। এদের মধ্যে আজহার ও মোফাজ্জলকে নেত্রকোনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ- ডিবি। কিন্তু মাসুদ পালিয়ে গেছে। মাসুদকে ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ডিবির কর্মকর্তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় গ্রেপ্তারকৃত দুই খুনির সঙ্গে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত ৩০শে নভেম্বর ঢাকায় আসে এই তিন বন্ধু। পরে যায় নারায়ণগঞ্জের তারাবতে। সেখানে তিন জন একটি গার্মেন্ট কারখানায় কাজ নেয়। কিন্তু গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষ আজহার ও মোফাজ্জলকে মাসে ৪ হাজার টাকা বেতন দিতে চায়। কাজের পূর্বাভিজ্ঞতা থাকায় মাসুদের বেতন একটু বেশি দিতে চেয়েছিল। ১লা ডিসেম্বর কাজও করে তারা। কিন্তু ৪ হাজার টাকায় পোষাবে না বলে কাজ ছেড়ে দেয় তিন জনই। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার কমলাকান্দায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পকেটে গাড়ি ভাড়া নেই। তিন জন মিলে বুদ্ধি আঁটে প্রাইভেটকার ভাড়া করে গ্রামে যাবে। এলাকায় গিয়ে প্রাইভেটকারের ভাড়া না দিয়েই পালিয়ে যাবে। এই উদ্দেশ্যে ভাড়ায় চলা প্রাইভেটকার খুঁজতে থাকে এই তিন জন। এক সিএনজি চালকের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর নামে এক প্রাইভেটাকারচালকের খোঁজ পায় তারা। তাকে ফোন দিয়ে বিভিন্ন রকম মিথ্যা কথা বলে। বলে- বাসায় অসুস্থ স্বজন। দ্রুত তাদের দেখতে যেতে হবে। তাদের পকেটে টাকা নেই। কিন্তু ভাড়া যা হয় সব বাড়িতে গিয়ে দিয়ে দিবে। রাজধানীর বাসাবো কদমতলার বাসিন্দা প্রাইভেটকারের মালিক ও চালক জাহাঙ্গীরের মন গলে যায় তাদের কথায়। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ডেমরা থেকে তাদের গাড়িতে তুলে নেন জাহাঙ্গীর। তারপর শুরু হয় নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে যাত্রা।
তিন কিলারের একজন আজহার জানায়, সে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছিল। পেছনের সিটে বসেছিল মাসুদ ও মোফাজ্জল। নেত্রকোনার কমলাকান্দা থানাধীন গোড়গাঁও এলাকায় তাদের বাড়ি। বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে তারা প্রাইভেটকার থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাবে- এরকমই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু গাড়িতে ঘুমিয়ে যায় আজহার। ঘুম থেকে উঠে দেখে তারা কমলাকান্দার রাস্তায় না গিয়ে পূর্বধলার হুগলা এলাকার দিকে যাচ্ছে। আজহার এ নিয়ে প্রশ্ন করলে মাসুদ জানায় এটা শর্ট রাস্তা। প্রাইভেটকারটি পাকা রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোয়। এরপর কাঁচারাস্তায় যায় আরও কিছুদূর। তখন ভোর হয়ে আসছিল। হঠাৎ মাসুদ প্রাইভেটকার  চালককে গাড়ি থামাতে বলে। বলে- এসে গেছি। গাড়ি থামা মাত্রই পেছন থেকে লুকিয়ে রাখা প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে ড্রাইভারের গলায় প্যাঁচিয়ে ধরে মাসুদ। মাসুদের কথায় আজহার ও মোফাজ্জলও সেই দড়ি ধরে টান দেয়। চেপে ধরে গলা। মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে চালক জাহাঙ্গীর। তারপর তিন জন মিলে জাহাঙ্গীরের লাশ টেনে পাশের বাঁশঝাড়ে নিয়ে ফেলে দেয়।
আজাহার জানায়, দুই মাস আগে সে গাড়ি চালানো শিখেছিল। তাই নিজেই সেই গাড়িটি চালিয়ে পাশের জাড়িয়া বাজারে যায়। বাজারের পাশের একটি মাঠে গাড়িটি লক করে রাখে। হাতে কোন টাকা না থাকায় তারা শাহীন নামে পরিচিত এক বড় ভাইকে ফোন করে। পরে তার কাছ থেকে দেড় শ’ টাকা নিয়ে তিন জনই নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়। আরেক কিলার মোফাজ্জল দাবি করে, প্রাইভেটকার ছিনিয়ে নেয়া কিংবা হত্যাকাণ্ডের কোন পরিকল্পনা ছিল না তাদের। তারা শুধু টাকা না থাকায় প্রাইভেটকার থেকে দৌড়ে নেমে যেতে চেয়েছিল। সকল পরিকল্পনা ছিল মাসুদের। মাসুদই সবকিছু করেছে। আজহার ও মোফাজ্জল জানায়, মাসুদ অনেকদিন গাজীপুরের মাওনায় ছিল। মাসুদের পরামর্শেই তারা ঢাকায় এসেছিল। সে হয়তো গাড়ি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতও থাকতে পারে। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, দুই খুনি সব দোষ মাসুদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে। টাকা না থাকায় শুধু পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে চালককে খুন করতো না। এমনিতেই গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালাতে পারতো। আবার খুনের পর গাড়িটিও নিজেরা নিয়ে যেত না। গ্রেপ্তারকৃতরা আসলে সংঘবদ্ধ গাড়ি ছিনতাই চক্রের সদস্য। পরিকল্পনা করে গাড়ি ভাড়া নিয়ে চালককে হত্যা করে গাড়িটি ছিনতাই করেছে তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) ইকবাল হোছাইন জানান, সবুজবাগ থানার একটি মামলার সূত্র ধরে এই দুই কিলারকে তারা নেত্রকোনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। পূর্বধলা থানার জাড়িয়া বাজার থেকে চালককে হত্যার পর ছিনিয়ে নেয়া প্রাইভেটকারটিও উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা বড় কোন গাড়ি চুরি দলের সদস্য কিনা তা খতিয়ে দেখতে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান তিনি। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, শনিবার এই দু’জনকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড চাওয়া হবে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ২রা ডিসেম্বর রাতে জাহাঙ্গীর নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পর ভোর থেকে তার মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শিখা আক্তার বিষয়টি জানিয়ে রাজধানীর সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন। পরে বিষয়টি আমলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম অনুসন্ধান শুরু করে। পরে প্রযুক্তির সহযোগিতায় যারা গাড়িটি ভাড়া নিয়েছিল তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গতকাল তিন জনের মধ্যে দুজনকে আটক করে। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শিখা আক্তার জানান, মাস দুয়েক আগে তার স্বামী আড়াই লাখ টাকা দিয়ে প্রাইভেটকারটি কেনে। আরও  লাখ খানেক টাকা খরচ করে সেটি ঠিকঠাক করে ভাড়ায় চালানো শুরু করে। এর আগে তার স্বামী সিএনজি চালাতো। শিখা আক্তার জানান, কয়েক মাস আগে তাদের সিএনজিটি ছিনতাই হয়েছিল। পরে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে সেটি ফেরত এনেছিল। এরপর সিএনজি বিক্রি করে প্রাইভেটকারটি কেনে। শিখা জানান, তার স্বামী খুব সহজ-সরল ছিল। রাতে সাধারণত ঢাকার বাইরে কোথাও গাড়ি নিয়ে যেত না। কিন্তু সেদিন তারা এত অনুনয়-বিনয় করে যে সে উপকার করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে দিল। শিখা জানান, তাদের জোনায়েদ নামে ছয় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। তাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর পলাশ থানার ডাঙ্গায়। বাসাবোর কদমতলার ৬৯/৪/সি/৩ নম্বর বাসায় স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন।