Saturday, November 2, 2013

প্রবাসী কর্মীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

সম্প্রতি এক খবরে জানা যায়, প্রবাসী আয়ের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এক্ষেত্রে ভারত ও চীন যথাক্রমে ৭১ ও ৬০ বিলিয়ন ডলার আয় করে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে। তার পরেই রয়েছে ২৬, ২২, ২১, ও ২০ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করা যথাক্রমে ফিলিপাইন, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও মিসর। ২০১১-১২ সালে আমাদের রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার আর এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে। রাজনৈতিক সংঘাতে পিষ্ট হওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে দি ইকোনমিস্ট পত্রিকায় যে ম্যাজিকের কথা বলা হয়েছে, তার একটি হল প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তবে এই প্রবাসী কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আমরা যে তাদের দারুণভাবে সহায়তা করি, তা নয়। পরিসংখ্যান বলে, একজন স্বল্প দক্ষ কর্মীকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের জন্য যেতে ব্যয় করতে হয় দুই থেকে চার হাজার ডলার, যা আমাদের মাথাপিছু জিডিপির আড়াই থেকে পাঁচগুণ এবং যা তার প্রবাসের ১৪ মাসের আয়ের সমান। পক্ষান্তরে ইন্দোনেশিয়ার অনুরূপ কর্মীর ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় হয় তার প্রবাসের ৫ মাসের আয়ের সমান এবং একজন নেপালির ক্ষেত্রে তা ছয় মাসের আয়। এই পরিসংখ্যানই বলছে- জীবনের সুখ, পরিবারের সান্নিধ্য ত্যাগ করে নিশ্চিত নিগ্রহ ও বিড়ম্বনার জীবন বেছে নিয়ে মহাপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে যারা সচল রেখেছেন, তাদের দেখভালের জন্য আমাদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। প্রয়োজনে অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে তারা দেশে কষ্টলব্ধ টাকা পাঠায়। অন্যদিকে হতদরিদ্র জনগণের অর্থে যারা বিনাবেতনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ালেখা করে উন্নত দেশগুলোকে সেবা দিয়ে নিজেদের জীবনকে ধন্য করে, তারা বাংলাদেশকে স্প্রিংবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে তাদের সব সম্পত্তি বিক্রি করে দেশকে দরিদ্রতর করে বিদেশে পাড়ি জমায়। দেশের সব সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ নিয়ে যেসব মানুষের শিক্ষার আলোতে আলোকিত হওয়ার কথা, তারা দেশের ঋণ পরিশোধ করার কথা চিন্তাও করতে পারে না। অথচ দেশ যাদের মানুষের মতো মানুষ হয়ে শ্রেয়তর জীবনের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টি করেনি, তারাই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে বিদেশে নিগৃহীত হয়ে। আমার মনে হয়, সরকার এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারে- শিক্ষিত মানুষেরা আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে কী অবদান রাখে আর অশিক্ষিত মানুষেরা মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্যান্য দেশে গিয়ে কী অবদান রাখে। রাজউক যখন তার প্লট কিংবা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়, সেখানেও প্রবাসীদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করে। সে ক্ষেত্রে একটু দেখা দরকার, যে প্রবাসী আবেদন করেছে, এর আগে সে কী পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছে। নাকি এই প্রথম সে বাংলাদেশকে একটি ব্যবসাক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। নিশ্চয়ই সরকারের জন্য এই পরিসংখ্যান/উপাত্ত সংগ্রহ করা খুব কষ্টসাধ্য হবে না। মোটের ওপর অন্যান্য দেশের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে এই অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, অদক্ষ মানুষের জীবন শ্রেয়তর করার জন্য আমাদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য অন্তত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১. যেহেতু তারা আমাদের অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি, সরকারি (দূতাবাসসহ), স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন ও অন্যান্য সুবিধার অংশবিশেষ তাদের পাঠানো অর্থেই হয়ে থাকে, তাই বিদেশে তাদের যত রকম সহায়তা দেয়া প্রয়োজন, তা দিয়ে যেন আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গর্ববোধ করতে পারে। বিদেশ বিভুঁইয়ে দূতাবাস যেন তাদের নিকটাত্মীয়ের দায়িত্ব পালন করে। আমাদের দূতাবাসগুলো এই প্রবাসী কর্মীদের কতটা কার্যকরভাবে সহায়তা করছে, তার একটি হিসাব রেখে দূতাবাস কর্মীদের এ কাজে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
২. অনেক ক্ষেত্রে এসব মানুষের শিক্ষা লাভের সুযোগ হয়নি। তাই পাসপোর্ট, ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত। বিমানবন্দরে গিয়ে যাতে তাদের নিগৃহীত হতে না হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিত। যেমন, বিমানে আরোহণের কার্ডটি আগেই পূরণ করে দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া ইমিগ্রেশনের কাউন্টারেও যাতে তাদের বিড়ম্বিত না হতে হয়, এ সংক্রান্ত সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। প্রতিটি প্রশ্ন, লাইন থেকে সরিয়ে দাঁড় করানো- সবই তাদের অসম্ভব অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
৩. এসব মানুষ বাংলাদেশ থেকে যখন বিদেশে যায়, তখন তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে বিদায় জানানোও প্রয়োজন। কারণ তারা আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখতে যাচ্ছেন নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে। আবার তারা যখন দেশে ফিরবেন, তখনও তাদের স্বাগত জানানো উচিত এবং বিমানবন্দরে যত কম ঝামেলা হয় ততই তাদের জন্য মঙ্গল। এরকম প্রবাসী প্রত্যেক কর্মীর পাঠানো অর্থের হিসাব রেখে নিয়মিতভাবে তাদের পুরস্কৃত ও সম্মানিত করা প্রয়োজন। আমরা যেমন সর্বোচ্চ করদাতাদের পুরস্কৃত করে থাকি। তাদের থেকে দেশের অর্থনীতিতে এদের অবদান মোটেই কম নয়।
৪. যারা প্রবাসে চাকরি করতে আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অধিকতর বেতনের চাকরিতে পাঠানো সম্ভব। এ বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিলে আমাদের রেমিট্যান্সের পরিমাণ যেমন বাড়বে, একইভাবে আমাদের দেশের মানুষ অধিকতর দক্ষ কাজে সম্মানের সঙ্গে চাকরি করতে পারবে। মনে হয়, ভারতীয়রা প্রবাসে শ্রেয়তর কাজে নিযুক্ত হয়, বেশি উপার্জন করে এবং শ্রেয়তর জীবনযাপন করে। আমাদেরও সেই চেষ্টা করতে হবে। 
৫. প্রবাসে যাওয়ার ব্যয় যৌক্তিক মাত্রায় নামিয়ে আনতে হবে, যাতে তা এক্ষেত্রে নেপাল কিংবা ইন্দোনেশিয়ার ব্যয়ের অনুরূপ হয়। এছাড়া আমাদের প্রবাসীদের যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে নামলে এ খাত থেকেও বিমানের একটি উল্লেখযোগ্য আয় হতে পারে। যারা পুত্র-কন্যা, পরিবার, পিতামাতার সান্নিধ্য, মায়া-মমতা ত্যাগ করে নিশ্চিত কষ্ট, বিড়ম্বনা, অনিশ্চয়তা ও নিগ্রহের জীবন বেছে নিয়ে আমাদের দুর্বল অর্থনীতির এ দেশটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাদের জন্য রইল টুপিখোলা অভিবাদন।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সংবিধান সংরক্ষণ, না গণতান্ত্রিক নির্বাচন? by ড. শরীফ মজুমদার

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সংবিধান সংরক্ষণ এবং সব দলের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক নির্বাচন- এ দুটি একসঙ্গে আমাদের বাস্তবতায় অন্তত এবারের জন্য আর হয়ে উঠছে না। জনগণের ভাবনা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণে এ দুইয়ের মধ্যে কোনটি আমাদের জন্য এ মুহূর্তে বেশি জরুরি তা-ই এখনকার বিবেচ্য বিষয়। যদি সংবিধান সংরক্ষণ একেবারেই বাধ্যতামূলক হতো তাহলে সংবিধানে সংশোধনী আনারও সুযোগ থাকত না। সংবিধানের প্রতিটি সংশোধনীই আনা হয়েছে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে। কারণ সংবিধান জাতির জন্য, সংবিধানের জন্য জাতি নয়। তাই বলে যখন তখন যদি সংবিধানের বাইরে যেতে হয়, তাহলে সংবিধান থাকার দরকারটা কী? তবে কমবেশি প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই সংবিধানের বাইরে অনেক কিছুই করতে হয়েছে; বিশেষ করে যতক্ষণ না সাংবিধানিক কার্যপ্রণালী সবার কাছে সানন্দে গৃহীত হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় নির্বাচনের ব্যাপারে সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়ার মতো ঘটনা কোনো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে ঘটেছে, সে ধরনের নজির খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। তাদের কাছে সংবিধানের কিছু কার্যপ্রণালী সংরক্ষণ সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন পরিচালনা করার প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কখনোই বেশি গুরুত্ব পায় না। নিঃসন্দেহে আমাদের বাস্তবতায়ও গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচনের গুরুত্ব সংবিধান সংরক্ষণের গুরুত্বের চেয়ে অনেক বেশি। আর সংবিধানের যে কার্যপ্রণালী দিয়ে সংবিধান সংরক্ষণের দোহাই উপস্থাপন করা হয় তা যদি বিতর্কিত কার্যপ্রণালী হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তো কথাই নেই। সংবিধান তখনই উপকারে আসে যখন দেশে গণতন্ত্র থাকে; অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসিত দেশে সংবিধান থাকা না থাকায় তেমন কোনো পার্থক্য উপলব্ধি করা যায় না। অন্যদিকে সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের গুরুত্ব গণতন্ত্র রক্ষায় অপরিসীম এবং শুধু গণতন্ত্র রক্ষা পেলেই সেই গণতন্ত্রকে কার্যকর গণতন্ত্রে রূপ দিতে গিয়ে সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যায়। এক কথায়, গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতিতে সংবিধানের গুরুত্ব অনেকটা বর-কনেহীন বাসর ঘরে ফুলশয্যার গুরুত্বের মতোই। অতএব, আগে গণতন্ত্র রক্ষা করি, পরে সংবিধান সংরক্ষণ নিয়ে চিন্তা করা যাবে।
গণতন্ত্র রক্ষা ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন বিশ্বজুড়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সময়ের আবর্তনে অগণতান্ত্রিক দেশগুলোও গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিতে আস্থা আনছে। হয়তো কিছুটা ধীরে কিন্তু গণতান্ত্রিক জাগরণ বিশ্বব্যাপী ‘গণতন্ত্রকে’ স্পষ্টতই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসন ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। অনেকে সমালোচনাও করছে যে চীন যদি গণতন্ত্র ছাড়াই ৭ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে তাহলে গণতন্ত্রের দরকার কী? তার প্রকৃত উত্তর হচ্ছে এই যে, ৭ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হলেও চীনের নাগরিকরা দেশের নীতিনির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে করে না; যার ফলে তারা নিজভূমে পরবাসের মতো জীবন অতিবাহিত করে এবং প্রচুর অর্থের মালিক হলেও সুযোগ পেলে দেশত্যাগে দ্বিধা করে না। তাই তাদের নিজ দেশে ‘বিলং’ করার ‘সেন্স’ নেই বললেই চলে। এ ‘সেন্স অব বিলংগিং’ একমাত্র গণতন্ত্রেই সম্ভব। মূলত এ ‘সেন্স অব বিলংগিং’ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই বহু দেশে আজ চরম অশান্তি বিরাজ করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশে ‘সেন্স অব বিলংগিং’ রক্ষা করার জন্য গণতান্ত্রিক নির্বাচনের কোনো বিকল্প আছে এমনটি প্রতীয়মান নয়; বরং সেক্ষেত্রে সংবিধান বা সংবিধানের কিছু কার্যপ্রণালীর সংরক্ষণ কতটা গুরুত্ব বহন করে, তা প্রশ্নের দাবি রাখে। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে ‘সেন্স অব বিলংগিং’ থাকে না এবং সেখানে গণতন্ত্রও থাকে না। আর গণতন্ত্র না থাকলে সংবিধান সংরক্ষণের কথা চিন্তা করাটা নিতান্তই অর্থহীন। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, সর্বস্তরের মতাদর্শের এবং শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সে সরকারকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সাংবিধানিক পন্থা অনুসরণের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া। সুতরাং সংবিধান সংরক্ষণের ব্যাপারটি গুরুত্ব পায় মূলত গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে। মেয়াদ শেষে আবার সর্বস্তরের মতাদর্শের এবং শ্রেণী-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততায় নির্বাচন পরিচালনা করতে যদি ক্ষমতাসীন দলের সংশোধিত সংবিধান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে অবশ্যই কার্যকর গণতন্ত্র কিছুটা হোঁচট খায়। তাছাড়া সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার যদি কোন মতাদর্শ বিতর্কিত আর কোন মতাদর্শ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তা নিজেই নির্ণয় করে ফেলে, তাহলে নির্বাচনে জনগণের নির্ণয়ের জন্য আর থাকেই বা কী? পৃথিবীর বহু দেশেরই বিতর্কিত ইতিহাস আছে, কিন্তু তারা সে ইতিহাস নিয়ে বসে থাকেনি। বিতর্কিত মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে পৌঁছে গেছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ ও শ্রেণী-পেশার মানুষকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেয়া কার্যকর গণতন্ত্রের ধারণার মধ্যে পড়ে না। ভারতের উগ্র ধর্মীয় দল বিজেপি একটি মূলধারার রাজনৈতিক দল, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার তাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিতে পারেনি; ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি জার্মানির ক্ষমতাসীন দল, যারা স্পষ্টতই গণতন্ত্রের ধারণার চেয়েও ধর্মীয় ধারণাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কিন্তু তাতে করে তাদের রাজনীতি করার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি। কানাডার গণতান্ত্রিক দলগুলোর শিকড়ও চার্চের বাইরে নয়। আমেরিকায় আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল ইহুদিদের প্রত্যক্ষ সহায়তা ও আর্থিক সাহায্য ছাড়া ক্ষমতায় আসতে পারেনি, কিন্তু তাদের কেউ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে নীতি কথা শোনায় না। সুতরাং সংবিধান সংরক্ষণের দোহাই দিয়ে আমাদের নির্বাচন কমিশন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে যে নির্বাচনের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তা কতটা গণতান্ত্রিক সেটি জনসাধারণের কাছে বোধগম্য নয়। যদি তা কার্যকর গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় না পড়ে, তাহলে তা স্পষ্টতই গণতন্ত্রকে অকার্যকর করার পথে একটি মাইলফলক।
আমরা সাধারণ মানুষ এমন কোনো নির্বাচন চাই না যাতে প্রধান বিরোধী দল থাকবে না; যাতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার নামে জনগণের একটি বিশাল অংশের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না; যাতে সাবেক সেনাশাসকের অধীনের কোনো মূলধারার গণতান্ত্রিক দল অংশগ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করবে। কারণ আমরা জানি, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এসব শ্রেণী-পেশার মানুষকে বাদ দিলে যে প্রতিযোগিতা হবে, তার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। আমরা চাই সব মতাদর্শ ও শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে একটি নির্বাচন; আমরা চাই দেশের জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কোন মতাদর্শ বিতর্কিত বা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে কী পারবে না। তাতে করে যদি সংবিধান কিছুটা অসংরক্ষিতও হয়ে পড়ে তবুও সত্যিকারের গণতন্ত্রের স্বার্থে জনগণ তা নিয়ে পরে কোনো প্রশ্ন তুলবে না। আইয়ুব খানও বেসিক ডেমোক্রেসির নামে শুধু নিজস্ব প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করে প্রহসনের নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু তাতে করে জনগণের স্পৃহা বেশি দিন দমিয়ে রাখতে পারেননি। বাংলাদেশেও সংবিধান সংরক্ষণের দোহাই দিয়ে তড়িঘড়ি করে এ ধরনের প্রহসনের নির্বাচন হয়েছিল, তাতে কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি বরং সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছিল। এখন যদি ব্যাপারটা এমন হয় যে, সংবিধান সংরক্ষণের দোহাই দিয়ে বস্তুত সেই প্রতিহিংসার প্রহসনের নির্বাচন করাটাই সরকারের লক্ষ্য বা বিবেচ্য বিষয় তাহলে বলতে হবে, এ জাতির কপালে দুঃখ আছে। সংবিধান সংরক্ষণের দোহাই যদি জাতিকে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে তা সবচেয়ে অবমাননাকর হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্যই। কারণ তিনি নিজেকে এক সময় গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলে পরিচয় দিতেন; গণতন্ত্রের স্বার্থেই দেশে-বিদেশে ‘নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের কথা বলতেন; গণতন্ত্র সুসংহত রাখতে আপস সমঝোতার কথা বলতেন। ৯০ দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সহিংসতার জন্ম দেবে, না সংবিধান সংরক্ষণের দোহাই দেয়া আপস সমঝোতাহীন একদলীয় নির্বাচন দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতার জন্ম দেবে- সে সিদ্ধান্তটিতে প্রধানমন্ত্রীকেই উপনীত হতে হবে। তাকে একদলীয় নির্বাচনী চিন্তাভাবনার বাইরে আসতে হবে। সংবিধান সংরক্ষণের কথা আপাতত ভুলে গিয়ে কিভাবে একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচন করা যায়, তা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গেই আলোচনায় বসতে হবে। আমরা সাধারণ মানুষ চাই না, কেউ এ সভ্য দেশে আবার কোনো অসভ্য চিন্তা করুক। আমরা চাই না, কেউ গণতন্ত্রে বিশ্বাস হারিয়ে লগি-বৈঠায় বিশ্বাস খুঁজুক বা গণতন্ত্রে শ্রদ্ধা হারিয়ে ২১ আগস্টের মতো নিকৃষ্ট অধ্যায়ের ভাবনায় ফিরে যাক। আমাদের বুঝতে হবে আমাদের চারপাশ কতটা ভয়ংকর; আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো দেখলে আমাদের প্রতিবেশীরা সত্যিই দুঃখ পাবে, না খুশি হবে- তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এ পরিস্থিতিতে সবার অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, তাতে সংবিধান সংরক্ষিত থাকল কী থাকল না, তা নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো স্বস্তি বিরাজ করবে না।
নির্বাচন সারা দেশে একটি আনন্দঘন অধ্যায়ের সূচনা করবে, সেটাই গণতান্ত্রিকভাবে কাম্য। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে পুরো জাতি নির্বাচনপূর্ব আমোদে মেতে ওঠে, সেখানে সহিংসতার তেমন কোনো নজির দেখা যায় না। সংবিধানের কিছু বিতর্কিত সংশোধনী কিছুটা অসংরক্ষিত হলেও যদি পুরো জাতি একটি গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচন উপহার পায়, তা কি জাতির জন্য কল্যাণকর নয়? আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে জাতি সহিংসতায় মেতে উঠবে- এ গুজব যতটা না মানুষকে নির্বাচন সম্পর্কে ভীতসন্ত্রস্ত করছে, তার চেয়ে বেশি সুযোগ সন্ধানী করে তুলছে একটি বিশেষ মহলকে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের শুধরে নিয়ে জনগণের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ার দাবি রাখে, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের শুধরে নিয়ে জাতিকে আরও ভালো ৯০ দিন উপহার দিতে পারবে না- এমনটি ভাবার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন আছে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা(!) এ বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন এবং জাতিকে আনন্দঘন গণতান্ত্রিক নির্বাচন উপহার দেবেন, সেটাই সবার আশা। জাতি কখনোই আপনাকে সংবিধান সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করবে না- এটুকু বিশ্বাস জাতির ওপর আপনি রাখতে পারেন। কোনো পরিস্থিতিতেই আনন্দহীন নির্বাচন কাম্য নয়।
ড. শরীফ মজুমদার : সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বন্ধ হোক সব সহৃদয় হত্যাকাণ্ড by শাহ নেওয়াজ বিপ্লব

বাংলাদেশের মানুষ একটি স্লোগানের সঙ্গে খুব পরিচিত। স্লোগানটি হচ্ছে : ‘লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই; লড়াই করে বাঁচতে চাই’। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা চলছে, সে বিচারে তো বটেই; সামাজিক ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও ‘লড়াই’য়ের জায়গায় আমরা আর পৌঁছতেই পারছি না। লড়াই করার আগেই আমরা পরাজিত হচ্ছি। সামাজিক ক্ষেত্রে এই চিত্রটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আগের দিনে আমাদের দেশে বিবদমান দুই গোষ্ঠী একে অপরকে উদ্দেশ করে বলত, তোকে মামলায় জড়াব, তোকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ব। তারা এখন আর মামলার কথা বলে না। এখন তারা চায়, মামলা নয় বরং প্রতিপক্ষ বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হোক। কারণ অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে বেশিরভাগ গরিব মানুষ বড় ধরনের রোগগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলেছে। গবেষক চিকিৎসকরা যখন বুক ফুলিয়ে দর্পিত কণ্ঠে বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ নেই যার চিকিৎসা নেই, তখন বাংলাদেশের গরিব মানুষ ভাবে অন্য কথা। আকাশছোঁয়া চিকিৎসার খরচ জোগাবে সাধ্য কার। তার চেয়ে মৃত্যু ভালো। এই যে চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে গরিব-দুঃখী রোগীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা, ইংরেজিতে একে বলে মার্সি কিলিং। বাংলায় এর অর্থ হচ্ছে : ‘সদয় হত্যা’ বা ‘সহৃদয় হত্যা’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পৃথিবীবিখ্যাত স্বাস্থ্য পত্রিকা দ্য ল্যানসেটের সমীক্ষাগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর তিন লাখেরও বেশি মানুষ ওষুধ, চিকিৎসকের মোটা অংকের ফি এবং বিভিন্ন রকম প্যাথলজিক্যাল টেস্টের খরচ বহন করতে না পেরে অসহায় হয়ে মৃত্যুকে শ্রেয়তর ভাবে। বড় রকমের এবং জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনরাও এই মার্সি কিলিংকে মেনে নেয়। টাকা-পয়সার অভাবে এছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথও খোলা থাকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দ্য ল্যানসেটের মতে, গত দুই বছরে বাংলাদেশে ডাক্তারদের কনসালটেশন ফি বেড়েছে ৫০ শতাংশ। প্যাথলজিক্যাল টেস্টের খরচ দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি বেড়ে গেছে। আর ওষুধের দামের তো কোনো মা-বাপই নেই। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এর বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো চড়া হারে ফি বাড়িয়ে মধ্যবিত্ত আর নিু-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর গলায় অতি দ্রুত ঋণের মালা পরিয়ে দিতে কালবিলম্ব করছে না।
এর ভেতর পত্রিকাগুলোয় খবর প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশ ওষুধ প্রস্তুতকারক সমিতি নিজেদের ইচ্ছামতো ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এ বিষয়ে মাস দেড়েক অগে কৈফিয়ত চেয়েছিল ওষুধ শিল্পের মালিকদের কাছে। তারা জানিয়েছিলেন, বিদেশী ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এঁটে ওঠার জন্য ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছেন তারা। এর অর্থ হচ্ছে এই, মানুষ চিকিৎসা পাক বা না পাক, তদর্থে বাঁচুক বা না বাঁচুক, তাতে কিছু যায় আসে না- দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা বিদেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারলেই হল।
দ্য ল্যানসেট বাংলাদেশের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৭৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার ব্যয় বহন করে নিজের পকেট থেকে আর ৭২ শতাংশ মানুষ ওষুধপত্র কেনে গাঁটের পয়সা খরচ করে। দ্য ল্যানসেটের মতে, প্রতিবছর বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ শুধু চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যাচ্ছে। পত্রিকাটি তথ্য দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলের ৪৮ শতাংশ মানুষ হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসার জন্য যায় আর গ্রামাঞ্চলের ৩১ শতাংশ মানুষ এই সুযোগ নিয়ে থাকে। প্রতি ক্ষেত্রেই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হয়, না হলে বাড়ি, ঘর-দুয়ার অথবা অন্য সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়। এর কারণ, বাংলাদেশে যে শুধু ওষুধপত্রের দাম অথবা চিকিৎসকের ফি বেড়েছে তাই নয়, বরং এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর রমরমা ব্যবসা। যেমন এমআরআইয়ের খরচ ৩ থেকে ১০ হাজার টাকা। সিটি স্ক্যান ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা। লিপিড প্রোফাইল ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। থাইরয়েড প্রোফাইল ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। সনোগ্রাফি ১ থেকে ২ হাজার টাকা।
এর বাইরে বিভিন্ন রকম অপারেশনের খরচও দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর কোনো মানদণ্ডও নেই। যত নামকরা ডাক্তার, তত বেশি ফি। ব্যাপারটিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশে বেশিরভাগ লোকই এখন বিশ্বাস করছে, যদি কোনো অপারেশন কম ফি দিয়ে করানো হয়, তাহলে জীবনের ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাবে। ফলে কেউ এখন আর একান্ত বাধ্য না হলে ওই ঝুঁকি নিতে চান না। আবার কিছু মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা আছে যে, সরকারি হাসপাতালগুলোয় ভালো চিকিৎসা হয় না। ভালো চিকিৎসা পেতে গেলে বেসরকারি হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকগুলোয় যেতে হবে। বস্তুত কিছু দুষ্ট বুদ্ধিসম্পন্ন ক্লিনিক মালিক-চিকিৎসক ক্লিনিক ব্যবসাটা ভালোভাবে চালানোর জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারণার সৃষ্টি করেছেন। একটা সময় ছিল, যখন চিকিৎসা এক মহান পেশা হিসেবে চিহ্নিত হতো আমাদের দেশে। ফলে চিকিৎসকদের শ্রদ্ধার একটা আসনে বসানোর প্রবণতা ছিল মানুষের মধ্যে, যা আজ তিরোহিত। এর জন্য দায়ী কি শুধু রোগী ও তার পরিজনরাই, ডাক্তাররা নন?
চিকিৎসার এই যে লাগামছাড়া খরচ এবং সব মিলিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য চলছে, তা দেশের অসহায় আর গরিব চিকিৎসা প্রার্থীদের অনেককেই আজ মার্সি কিলিং বা সহৃদয় হত্যাকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর এ অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের মধ্যে এক নম্বরে আছে সরকার এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও ডাক্তারের ফি, চিকিৎসা ও সেবার কোনো মানদণ্ড সরকার বা বিএমডিসি আজও নির্ধারণ করতে পারেনি। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর গলাকাটা ব্যবসার কথা তো বলাই বাহুল্য। চিকিৎসাব্যবস্থায় এই যে নৈরাজ্য আমাদের দেশে, এই চক্রে যুক্ত আছেন একশ্রেণীর কিছু স্বার্থপর চিকিৎসকও। আর তাদের জন্য সৎ ও নিষ্ঠাবান চিকিৎসকরাও আজ বদনামের অংশীদার হচ্ছেন। এসব বিষয়ে যারা ত্রাতার ভূমিকা নিতে পারে, সেই মিডিয়ার ভূমিকাও অস্বচ্ছ।
তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এ নিয়ে যদি লড়াই করতে হয়, তাহলে সেই লড়াইটা তারা করবে কোথায়? মাঝে মাঝে পত্রিকাগুলোয় খবর প্রকাশিত হয়, ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর পর রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা ভাংচুর করেছে ক্লিনিক বা হাসপাতাল। এসব করে সাময়িক উত্তেজনার প্রশমন ঘটে, কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রিত্বের পাঁচ বছর মেয়াদের প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে তার হাতে আরও কয়েকটা দিন সময় এখনও আছে। এ স্বল্প সময়ে বাংলাদেশের আগামী দিনের সহৃদয় হত্যাকাণ্ড বন্ধে কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন কি?
কে জানে? বাংলাদেশের গরিব, অসহায় আর সাধারণ মানুষ কিন্তু আশায় দিন গুনছে।
শাহনেওয়াজ বিপ্লব : কবি, গল্পকার ও অস্ট্রিয়া প্রবাসী গবেষক

বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবিতা by ফরহাদ মজহার

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে। এতে যে কোনো নাগরিকই দুঃখিত ও মর্মাহতই হবেন। আমি ব্যতিক্রম নই। শুধু তা নয়, একইভাবে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। এ পরিস্থিতিতে গত ২৮ অক্টোবর রাতে ইটিভির ‘একুশের রাত’ অনুষ্ঠানে আমি গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নিজ দায়িত্বে কিছু কথা বলেছি। আর, আমি দায়িত্ব নিয়েই কথা বলি। সাংবাদিক মনির হায়দার অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন। এতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আমার বিশ্লেষণ ও মন্তব্য নিয়ে তর্ক তৈরি হয়েছে। তার কিছু উত্তর আরেকটি দৈনিকে আমি দিয়েছি। এই তর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিন্ন কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করব। তর্ক-বিতর্ক গণতন্ত্রের মর্ম। কিন্তু সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা ভঙ্গ করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একাত্তর টেলিভিশন আমার বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক প্রচার শুরু করে। তারা তাদের নিজেদের একটি টকশো আয়োজন করে। ইটিভির টকশো থেকে বেছে বেছে খণ্ডিত কিছু অংশ পরিবেশন করে। এমনভাবে তা হাজির করে যাতে ইটিভির টকশোতে আমার মূল বিশ্লেষণই হারিয়ে যায়। সর্বোপরি কেন আমি সেদিন গণমাধ্যম সম্পর্কে এভাবে মন্তব্য করছি সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুই বাদ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, সেদিন একাত্তরের টকশোতে যারা হাজির ছিলেন, তারা বিভ্রান্ত হয় এবং আমাকে ভুল বোঝে। বিচক্ষণ দুই-একজন আলোচক সেই মুহূর্তে না বুঝলেও পরে ইটিভির টকশোর পুরোটা দেখার পর একাত্তর টিভির মিথ্যাচার থেকে মুক্ত হয়েছেন। এই প্রত্যাশা আমি করি।
যে মন্তব্য নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আমার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলেছে সেই মন্তব্য সম্পর্কে সেই একই দিনে একই রাতে একই অনুষ্ঠানে আমি এটাও বলেছি যে, ‘আমি স্বভাবতই কখনোই চাইব না কেউ পটকা, নিন্দা বা ঢিলও যেন গণমাধ্যমের ওপর ছুড়ুক। এটা কথার কথা, rhetoric। আলোচনা করার জন্য, যাতে আমরা বুদ্ধিজীবীরা, গণমাধ্যমের কর্মীরা বুঝতে পারি যে, এই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া একমাত্র দায়ী নন। আমরা, আমাদের ভূমিকার কারণে আজকে এই পরিস্থিতি আমরা তৈরি করেছি।’ একাত্তর টিভি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার মন্তব্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়েছে।
এমনকি একাত্তর টিভি আমি রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ করেছি, সেটাও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। ডক্টর সলিমুল্লাহ খান এই কথাগুলো বলেছেন। টিভিতে তার মুখভঙ্গির মধ্যে আমাকে রাষ্ট্রের নিপীড়িনমূলক যন্ত্রের দ্বারা শাস্তি দেয়ার জিঘাংসা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তার চোখে-মুখে যে হিংস্রতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ফুটে উঠেছে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি। যাক, আমাদের দেশে এ ধরনের বুদ্ধিজীবীর জন্ম হয়েছে, যারা প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে শাস্তি দিতে ইচ্ছুক। সত্যিই আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। ইতিমধ্যে আমার নামে থানায় দুটি জিডি হয়েছে। ডক্টর সলিমুল্লাহ খান অবশ্যই এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল।
যেখানে যুগে যুগে বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছে, মতভিন্নতা থাকলেও পরস্পরকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, সেখানে তিনি আমাকে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের হাতে নির্যাতনের জন্য তুলে দিতে চাইছেন। এ ধরনের মহৎ কাজ করেছেন বলে আমি তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না। প্রকাশ্যে তিনি টেলিভিশন টকশোর বরাতে রাজসাক্ষী হয়েছেন। আমি তার এই উন্নতিতে অভিভূত।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ডক্টর খান আমাকে হত্যাই যদি করতে চান, করতেই পারেন। তবে যার বক্তব্য তিনি পছন্দ করেন না, তার চিন্তার বিরুদ্ধে লড়ার কাজকে এতকাল তিনি গালিগালাজ বলেই বুঝেছেন। এখন আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আমাকে হত্যা করতে চান। এটাই তার বুদ্ধিজীবিতা। এটাই আমরা শেষমেশ জানলাম। তাকে যখন চিনতাম তখন তার মধ্যে এই ধরনের জিঘাংসা কাজ করে সেটা আমি কখনোই বুঝতে পারিনি। নিজের এই অক্ষমতার জন্য আত্মসমালোচনা করা ছাড়া আমার আর উপায় কী!
ডক্টর খানের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আমার কিছুই বলার নাই। তিনি প্রায়ই আমাকে গালিগালাজ করেন। যার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থ তর্ক-বিতর্কের কোনোই সম্পর্ক নাই। তার গালিগালাজের কোনো উত্তর দেয়া আমি সমীচীন মনে করি না। ইতিমধ্যেই একাত্তর টিভির কল্যাণে ও তার মতো ব্যক্তিদের উস্কানির কারণে নানান স্তরের সন্ত্রাসীরা আমার ক্ষতি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, বিষয়টি থানা, পুলিশ, আইন ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডল অবধি নিয়ে গিয়েছে। এ কথাগুলোও বলতে চাইনি। না চাইলেও এখন উপেক্ষা করতে পারছি না।
গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে সেটা কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয় সেই পাণ্ডিত্য বোঝার ক্ষমতা আমার নাই; এটা সত্য, বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তর ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব, সেটা আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলছি। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কেউ নির্বাচিত হয়ে এলেও সেটা গণতন্ত্র নয়, বরং সেটা সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করে। এই বক্তব্য আজ নয়, নব্বই দশক থেকেই আমি বলে আসছি। বাংলাদেশের সংবিধানের সমালোচনা যখন আমি শুরু করি, তখন কেউই এই গোড়ার গলদ নিয়ে কিছু বলেনি। বাহাত্তরের সংবিধান প্রায় সবার কাছেই ছিল পূতপবিত্র জিনিস। কিভাবে সংবিধান ধর্মগ্রন্থের স্তরে উন্নীত হয় সে এক আজব কাহিনী। নৃতত্ত্ববিদদের দারুণ খোরাক। কিভাবে সেকুলার ধর্মপ্রাণতা ফ্যাসিবাদকে ভিত্তি দেয় তার নানান নজির আমরা বেয়াল্লিশ বছর ধরেই দেখছি।
কিন্তু সেই প্রসঙ্গ এখন থাক। আমরা এখন পঞ্চদশ সংশোধনী সংবলিত সংবিধানের কালপর্বে রয়েছি। মজা হচ্ছে, এই সংবিধানের ভিত্তিতে যে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে, সেই রাষ্ট্রের আমি দ্রোহী নই। বরং গণমাধ্যমের সমালোচনার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহী। সত্যি চমৎকার। যিনি এই দাবি করছেন, তিনি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকাকেই আসলে স্বীকার করে নিচ্ছেন। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষার জন্য তারা মরিয়া। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তার যে দুর্দশা ঘটেছে, তার কারণে রাষ্ট্রের এই মহৎ রূপান্তরের পক্ষে তারা প্রকাশ্যে দাঁড়াতে পারছেন না। ক্ষমতাসীন শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা উভয় রক্ষা করা এখন নীতিনৈতিকতার দিক থেকে কঠিন হয়ে পড়েছে। অতএব বলতে হচ্ছে, আমি গণমাধ্যমে বোমা মারতে বলেছি, আমি রাষ্ট্রদ্রোহী। অথচ আমি পরিষ্কার করে কী বলেছি, তা উপরে উদ্ধৃত করেছি। আমি কথার ছলে রেটরিক হিসেবে যা বলেছি তার ব্যাখ্যাও দিয়েছি।
আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি যে, পঞ্চদশ সংশোধনীর পর রাষ্ট্রব্যবস্থার যে ফ্যাসিস্ট রূপান্তর ঘটেছে, তাতে বাংলাদেশের জনগণকে অবশ্যই নতুনভাবে বাংলাদেশ ‘গঠন’ বা কন্সটিটিউট করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক বা রাষ্ট্রদর্শনের জায়গা থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিচার করে এ সিদ্ধান্তে আমি অনেক আগেই এসেছি। এছাড়া অন্য কোনো পথ নাই। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রগঠন সভার (ঈড়হংঃরঃঁবহঃ অংংবসনষু) প্রয়োজন অবশ্যই হবে। আমার এই রাজনৈতিক অবস্থান আমি কখনোই লুকাইনি। এই গোড়ার জায়গা বাদ দিয়ে যারা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে, তারা বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করতে চায়, সে কথাও আমার চেয়ে শক্তভাবে কেউ বলেছে বলে আমার জানা নাই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকে বহাল রেখে বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার মামলা এটা নয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এটা, কোনোভাবেই এক-এগারোর ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার প্রয়োগ নয়। এখনকার লড়াই হচ্ছে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াই। এ লড়াইয়ে মতাদর্শিক বিভাজন হচ্ছে কারা বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে আর কারা তার রূপান্তর কামনা করে। জনগণের মধ্যে নানান মতাদর্শিক বিভ্রান্তি, বিরোধ ও বিভাজনের সুরাহা করে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের গণতান্ত্রিক কর্তব্য বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া। আমি এই রাজনীতিকেই সঠিক মনে করি। এটাই আমার রাজনীতি। যারা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা শুধু নয়, সেই রাষ্ট্রের ফাঁসির কাষ্ঠে প্রতিপক্ষকে ঝোলাতে মরিয়া হয়ে যায়, তাদের সঙ্গে এই রাজনীতির পার্থক্য দুস্তর। নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠন নিয়ে অবশ্যই তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। সেখানে কিভাবে ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়া যায় তা নিয়ে আমাদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে, নতুনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের জন্য লড়েছি, কোনো বিদেশী প্রভুর নির্দেশ বা কোনো একটি দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নয়। যে কেউই ইচ্ছা করলে স্বাধীনতার ঘোষণা পড়ে দেখতে পারেন। এই তিন নীতির ভিত্তিতেই যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে স্বাধীনতার ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা এই তিন নীতি কায়েমের জন্য অকাতরে শহীদ হয়েছেন। বেয়াল্লিশ বছর এদেশের জনগণকে একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের জনগণকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তির অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকার করে নেয়ার রাজনীতির চর্চা হয়েছে। আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি, কারও পরাধীনতা মেনে নেয়ার জন্য নয়। বেয়াল্লিশ বছর ধরে এ দেশের জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
খেয়াল করতে হবে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার ভিত্তি, একই সঙ্গে ইসলামের নৈতিক ও দার্শনিক আদর্শের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত। এই তিন নীতির ভিত্তিতেই জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব। গুরুতপূর্ণ দিক হল, একই সঙ্গে এর ঐতিহাসিক ও আইনি ভিত্তি আছে। ঐতিহাসিক কারণ এই তিন নীতি কায়েমের জন্য আমরা লড়েছি। এর আইনি ভিত্তি আছে, কারণ স্বাধীনতার ঘোষণার দলিলেই তা ঘোষিত ও সন্নিবেশিত। ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের যে সংঘাত, যার কারণে আমরা বিভক্ত ও জর্জরিত এবং এখন পরস্পরকে ধ্বংস করতে উদ্যত- তা রাজনৈতিকভাবে নিরসনের এটাই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পথ। এর ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। এর ন্যায্যতা ইতিহাসে, বাংলাদেশের প্রতিটি বড় কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার রাজনৈতিক আকাক্সক্ষায় এবং প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষের রূহানি সত্তায়। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই আমার রাজনীতি। কাউকে গ্রেফতার ও ফাঁসিতে ঝোলানো নয়, এমনকি কটু কথা বলাও নয়।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একটি অংশের বিবৃতি দেখে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত, বিমূঢ় ও হতবাক। সারা দেশে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ খুবই দুঃখজনক। গণমাধ্যমের ওপর কেন এই ধরনের হামলা হয়, আমি ২৮ অক্টোবর রাতে ‘একুশের রাত’ টকশোতে তারই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ হাজির করেছি। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ যেভাবে ব্যাখা করেছেন তা যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, তারা নিজেরা তাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করলেই বুঝবেন। তারা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে এই বিষোদ্গার করছেন। গণমাধ্যমের ওপর দুঃখজনক হামলার যে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ আমি করেছি, তার সঙ্গে তারা একমত না হলে ভিন্ন ব্যাখ্যা হাজির করতে পারেন। একেই বলে বাক, ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, একেই বলে গণতন্ত্র চর্চা। কিন্তু সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ তা না করে আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণের দাবিই শুধু করছেন না, আমার কণ্ঠরোধ করতে চাইছেন। তারা এতই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়েছে যে সারা দেশের সাংবাদিকদের ওপর হামলার জন্য আমাকে এককভাবে দায়ী করে আমাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্যাতনের জন্য উস্কানি ও হুমকি দিচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার যে নজির তারা সৃষ্টি করেছেন, তা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কলংকজনক, নিন্দনীয় ও প্রতিহিংসামূলক অধ্যায় হিসেবে চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমি জানি, এই বক্তব্য গণতন্ত্রমনা সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না, এটা পরিষ্কার। গত দুদিন ধরে টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে এদেরই কেউ কেউ আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, মিথ্যাচার ও বিকৃত ব্যাখ্যা করে যাচ্ছে, তাতে নাগরিক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন এবং আমার নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করি।
সাংবাদিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ টেলিভিশন টকশোতে আমি কী বলেছিলাম, তা পর্যালোচনা না করে যে অসহনশীল বক্তব্য দিয়েছেন তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। একজন নাগরিকের শুধুমাত্র টেলিভিশনের একটি টকশোতে একটি বিশ্লেষণমূলক বক্তব্যকেই বাংলাদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সব হামলার কারণ বলে দায়ী করা সাংবাদিক নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে সত্য উদ্ঘাটন করা, কিন্তু তারা নিজেরাই মিথ্যাচার করছেন। গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রে যারা কাজ করেন, সাধারণত তারা সংবাদ বা গণমাধ্যম কর্মী বলে পরিচিত। কিন্তু সাংবাদিকতা একটা পেশা। যেমন- ডাক্তারি, শিক্ষকতা, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি। প্রত্যেকটি পেশারই নিজস্ব কিছু বিধিবিধান আছে, কিছু পেশাগত নৈতিকতা বা মানদণ্ড আছে, যাতে পেশার ভাবমূর্তি বা পেশাদারিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়। সাংবাদিকদেরও আছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাই তাদের পেশাদারিত্বের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য কিছু লিখিত বা অলিখিত মানদণ্ড অনুসরণ করে। কেউ তা মানছেন কিনা, তার দ্বারা তিনি সেই পেশার আদৌ অন্তর্ভুক্ত কিনা বোঝা যায়। সরকারপন্থী সাংবাদিক ইউনিয়ন আমাকে গণমাধ্যমের শত্র“ ঘোষণা করেছে। মিথ্যাচার ও অন্যের বক্তব্যের বিকৃতি ঘটিয়ে যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন শক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য তৎপর থাকে, নিজেদের তারা গণমাধ্যমের কর্মী দাবি করতে পারে না। এরাই বরং গণমাধ্যমের শত্র“।

পর্যটকদের জন্য গান্ধীর আশ্রম জীবন

ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর জীবন আচরণের সঙ্গে ইচ্ছে করলেই পর্যটকরা মিলিয়ে নিতে পারে নিজেদের। আর এজন্য গান্ধীর নির্মিত আশ্রমে থাকার সুযোগ পাবেন তারা। পৃথিবীর যে কেউ এ সুযোগ নিতে পারেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা মহাÍা গান্ধীর অহিংস, নিরহংকার জীবন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়। তারা আশ্রম জীবনের সাদামাটা কর্মের মধ্য দিয়েও তিনি লক্ষ্য অর্জনে অটুট ছিলেন। কিভাবে তিনি ক্ষমতার মায়াজাল ছিন্ন করে শুরু করেছিলেন চরকায় কাপড় বোনা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান আধুনিক বিশ্বের অনেকেই। আর তাদের জন্য এ সুযোগ সৃষ্টি করছে ভারত সরকার। গান্ধীজির নিজের হাতে তৈরি ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের একটি আশ্রম খুলে দেয়া হচ্ছে বিশ্বের আপামর পর্যটকদের জন্য। এ আশ্রমটির নির্মাণকাল ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ। এটিই গান্ধী নির্মিত প্রথম আশ্রম। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পর্যটকরা এ আশ্রমে ‘গান্ধী জীবন’ উপভোগ করতে পারবেন।
গান্ধীজির চরকায় সুতাকাটা, কাপড় বোনার সুযোগ পাবেন সবাই। এছাড়া পাড়ায় পাড়ায় গান্ধীজির মতো ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ থাকছে। গান্ধীর মতো প্রার্থনা, সাধনা সবই করতে পারবেন আগতরা। তবে সব কিছু করতে হবে মহাত্মার মতো খাদি পোশাক পরে অথবা শরীরে লাগাতে হবে হাতে বোনা পোশাক। আশ্রমে এক রাত থাকতে পর্যটকদের গুনতে হবে ১ হাজার ভারতীয় রুপি অর্থাৎ ১৬ মার্কিন ডলার। এ পরিমাণ অর্থ শোধ করে যার যতদিন খুশি আশ্রমে থাকতে পারবেন। এক্ষেত্রে পর্যটকদের জন্য ভারত সরকারের হুশিয়ারি হল, গান্ধী জীবন অনুকরণের সময় কোনো কিছুতেই চাকচিক্য যোগ হবে না। থাকবে না মনোহারি খাবার-দাবার। সবাইকে গান্ধীর ‘১১ শিক্ষা’ মেনে চলতে হবে। ভারত সরকার স্পষ্ট করেই বলেছে, তাদের এ কাজের উদ্দেশ্য গান্ধীর সাদামাটা জীবনাচরণের সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সুযোগ অবারিত রাখা। তথ্যসূত্র : এএফপি।

শিক্ষকের নির্দেশে বালকের ৩০ তলা থেকে লাফ

চীনের একটি স্কুল বালক ৩০ তলা বিশিষ্ট ভবনের ওপর থেকে লাফ দিয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। ওই বালকের বয়স মাত্র ১০ বছর। অভিযোগ করা হয়েছে, তার স্কুল শিক্ষক তাকে লাফ দিতে নির্দেশ দেয় এবং সে লাফ দেয়। শিক্ষকের নির্দেশে লাফ দেয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক নির্মম গল্প। পাঠদানের সময় শিক্ষক ছাত্রদের আত্মসমালোচনার ওপর একটি চিঠি লিখতে দেন। বরাবর ওই শিক্ষকই। পঞ্চম গ্রেডের এই ক্ষুদে বালক লেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
মাত্র ১০ বছর বয়সে আত্মসমালোচনা লেখা কতটা কঠিন তা হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করতে পারছেন। শিশুটি যখন চেষ্টা করছিল এবং পারছিল না তখন তাকে ধমকও দেন ওই শিক্ষক। এক হাজার শব্দের লেখাটি শেষ পর্যন্ত লিখতে পারেনি শিশুটি। কেন পারেনি- এই অপরাধে তাকে ৩০ তলা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে বাধ্য করেন তার শিক্ষক। এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় চলছে চীনের শিক্ষাঙ্গণে। এত বেশি উচ্চতা থেকে লাফ দেয়ায় তার শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যে ভবনের ছাদ থেকে লাফ দেয় তার নিচে পার্ক করা একটি প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় শিশুটি। নিহত শিশুর ক্ষুব্ধ এক আÍীয় দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর চেংডুতে অবস্থিত ওই স্কুলের সামনে একটি ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে এ হত্যার বিচার দাবি করেছে।