Monday, June 26, 2017

'প্রেম না করলে বলিউডে কাজ পাওয়া যায় না'

বলিউডে প্রযোজক, পরিচালক বা নায়কদের সঙ্গে প্রেম না করলে সহজে কাজ পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন নব্বইয়ের দশকের ‘লাল দুপাট্টেওয়ালি’ খ্যাত জনপ্রিয় নায়িকা রিতু শিবপুরী। খবর আনন্দবাজার পত্রিকার।
রিতু শিবপুরীকেও বলিউডে কাজ পেতে দু’-তিনটি প্রেম করতে হয়েছে। আর এ বিষয়গুলো মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।
নব্বই দশকে ‘লাল দুপাট্টেওয়ালি’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে আলোচনায় আসে রিতু শিবপুরী। কিন্তু তার পর দীর্ঘদিন অনিয়মিত তিনি।
পারিবারিক কারণে অনুপস্থিত থাকলেও নতুন করে আবার কাজ শুরু করতে যাচ্ছে এ নায়িকা। তবে এবার কাজ করবেন ছোট পর্দায়।
রিতু শিবপুরী জানান, বিয়ের পর কাজ আর পরিবার, দুটোর মধ্যে কিছুতেই ব্যালেন্স করতে পারছিলাম না। শ্যুট শেষ করে যখন ফিরতাম, দেখতাম স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ও যখন দিনে বেরোত, আমি তখন ঘুমোতাম। বাচ্চা হওয়ার পর সমস্যা আরও বেড়ে গেল। একদিন ঠিক করলাম, এমনটা চলতে পারে না। তাই ছেড়ে দিলাম অভিনয়।
এখন বাচ্চারা বড় হয়েছে, তাই নতুন করে কেরিয়ারে মন দিচ্ছেন এ নায়িকা। স্টার প্লাসের ‘ইস পেয়ার কো ক্যায় নাম দু’ ধারাবাহিকে।
তবে দীর্ঘ দিন পরে কেন ছোট পর্দায় এমন প্রশ্নে রিতু শিবপুরী বলেন, ‘স্ক্রিপ্টটা পড়ে এত ভাল লেগেছিল যে, তিন সেকেন্ডে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম। আর এখন টিভি তো সব ঘরে ঘরে। সিনেমা দেখতে যাক আর না যাক, লোকে টিভি না দেখে থাকতে পারবে না। আমার মনে হয় টিভির মাধ্যমে অনেক বেশি লোকের কাছে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায়।’

ইরান হামলা চালালে সৌদি সরকার টেলিফোন করারও সময় পাবে না: পাওয়েল

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র প্রধান ম্যাক পোম্পেও দাবি করেছেন, তার দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ইরান হুমকি হয়ে উঠেছে। তিনি ইরানকে বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় সমর্থক বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার কোনো সমস্যা ছিল না। কারণ তখন ইরান ছিল এ অঞ্চলে আমেরিকার প্রধান কৌশলগত মিত্র। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক পুরো উল্টে যায়।
ইরানে ইসলামী বিপ্লবে পর দু'টি কারণে আমেরিকা খুবই চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে পড়েছে। প্রথমত, ইরানের ইসলামী সরকার ব্যবস্থা সেদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। আমেরিকার দুশ্চিন্তার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, ইসলামী ইরান অন্য স্বাধীনচেতা ও বিপ্লবী জাতিগুলোর জন্য আদর্শ বা মডেলে পরিণত হতে পারে যা কিনা এক সময় এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ রক্ষাকারী স্বৈরসরকারগুলোর জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
এ অঞ্চলে স্বাধীনচেতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা রুখে দেয়ার জন্য আমেরিকা বহু চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন রক্ষণশীল কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া গণজাগরণ থামিয়ে দেয়ার বহু চেষ্টা করছে। অথবা তারা এ অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য এমনভাবে বিন্যাস করতে চাইছে যাতে তা মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে থাকে। মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কথিত সামরিক জোট গঠনের লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত মাসে সৌদি আরব সফর করার পরই মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় উঠেপড়ে লেগেছেন। আর এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান সহযোগী হচ্ছে সৌদি আরব।
সৌদি সরকার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের জন্য দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিবর্তন আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসাবে সম্প্রতি সৌদি রাজা সালমান বিন আবদুল আজিজ তার ভাইপো মুহাম্মাদ বিন নায়েফকে যুবরাজের পদ থেকে সরিয়ে নিজ পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে বসিয়েছেন। এরফলে সালমানই হবেন পরবর্তী রাজা।
খ্যাতনামা মার্কিন চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নওম চমেস্কি কিছুদিন আগে গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাতকারে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে সবচেয়ে বড় হুমকি বলে যে মন্তব্য করেছেন সে বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, "বহু বছর ধরেই তারা এ ধরনের অভিযোগ করে আসছে। এর আগে বারাক ওমাবাও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইরানকে বিশ্বের শান্তির জন্য হুমকি বলে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন।" খ্যাতনামা এই মার্কিন চিন্তাবিদ পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, "যারা নিজেদের প্রতিরক্ষায় ব্যস্ত তারা কীভাবে অন্যের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে?"
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। আর এসব পরিবর্তনের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইরানকে হুমকি হিসাবে তুলে ধরা। ঠিক একই উদ্দেশ্যে আমেরিকা, সৌদি আরব ও দখলদার ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠন করেছে। শুধু ইরানের প্রভাব ঠেকানোর জন্যই সৌদি আরব আমেরিকার সঙ্গে ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্রক্রয় চুক্তি করেছে। কিছুদিন আগে সৌদি আরবের এক বিশ্লেষক দাবি করেছিলেন, "সৌদি আরব চাইলে মাত্র চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।"  এই দাবীর জবাবে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, "এ ধরণের কথাবার্তা খুবই হাস্যকর। কারণ ইরান যদি কখনো হামলা চালায় তাহলে সৌদি সরকার সাহায্যের আবেদন জানানোর জন্য টেলিফোন তোলারও সময় পাবে না। তাই ইরানের ব্যাপারে বাস্তব সম্মত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা উচিত এবং ইরানকে ইয়েমেন কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা করা মোটেই উচিত হবে না। কারণ খোদ মার্কিন সরকারও ইরানে হামলা চালানোর দাবি করতে পারেনি।"
যাইহোক, বর্তমানে আমেরিকা ও দখলদার ইসরাইল কয়েকটি আরব দেশের সহযোগিতায় এ অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এ লক্ষ্যে সিআইএ'র প্রধান ম্যাক পোম্পেও, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাথিউসের মতো কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভূমিকাকে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ম্যাজিক দুনিয়ার কিংবদন্তি by মোশাররফ রুমী

মঞ্চে চলছে আলো-আঁধারের খেলা। এরইমধ্যে অসাধারণ নৈপুণ্যে বাঁশি বাজাচ্ছেন তিনি। পাশে দাঁড়ানো তার স্ত্রী বিপাশা বাঁশির সুরে মন্ত্রমুগ্ধ। ধীরে ধীরে তার চোখ বুজে এলো। বাঁশির সুর ক্রমশই হয়ে উঠলো আরো বেশি মোহনীয়। সেই সুরে সম্মোহিত হয়ে শূন্যে ভাসলেন বিপাশা। শুধু তাই নয়, গিলোটিনের ভেতর ঘাড় পেতে দিলেন তিনি। বংশীবাদক বাঁশি ছেড়ে হাতে তুলে নিলেন ঝকঝকে ইলেকট্রিক করাত। কি করতে যাচ্ছেন তিনি?  ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কি স্ত্রীর গলা কাটবেন? এমন সব জিজ্ঞাসার রেশ কাটার আগেই বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে প্রিয়তমা স্ত্রীর ঘাড় বরাবর নামিয়ে আনলেন ধারালো করাত। আতঙ্কে শিউরে উঠলো হলভর্তি দর্শক। কিন্তু কী বিস্ময়কর ঘটনা, অক্ষতই রইলেন বিপাশা। হাসি মুখে গিলোটিন থেকে ঘাড় সরিয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে মাথা নোয়ালেন। অভিভূত দর্শক দেখলো গিলোটিনের ওপর আর নিচের ফুটোয় রাখা কিছু গাজর করাত-কাটা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একই মানুষ ইলেকট্রিক করাত দিয়ে স্ত্রী বিপাশাকে দ্বিখণ্ডিত করে আবার তাকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনার ম্যাজিকেও মুগ্ধ করে চলেছেন জাদুপ্রেমীদের। এই হলেন ম্যাজিক দুনিয়ার কিংবদন্তি বিশ্বনন্দিত স্বনামধন্য জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, যিনি জাদুকে বিনোদন থেকে শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে সুপরিচিত ও সম্মানিত করেছেন। একজন ব্যতিক্রমী প্রতিভাবান, দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত, স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। তার রয়েছে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করার এক অনন্য ক্ষমতা। যা তার জাদু প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে সবসময় দেখা যায়। জুয়েল আইচ তার বড় ম্যাজিকগুলো প্রদর্শনের সময় মিউজিকের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে থাকেন। ফলে দর্শক-শ্রোতা চমৎকৃত ও বিমোহিত হন। বিশ্বে জুয়েল আইচই একমাত্র জাদুশিল্পী, যিনি তার জাদুর আবহ সংগীত হিসেবে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুলগীতি, খেয়াল, অতুল প্রসাদী, সেতার ইত্যাদি ব্যবহার করেন। মিউজিকের সঙ্গে আলোর অর্থপূর্ণ ব্যবহারও তার জাদুতে এক অকল্পনীয় মাত্রা যোগ করে। জুয়েল আইচ শুধু জাদুশিল্পী বা বাঁশিবাদকই নন, একাধারে চিত্রশিল্পী-সমাজসেবী এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। চমৎকার করে কথা বলেন তিনি। আর তার হাসি যেন মায়ার আধার। কথা বললে কিংবা হাসলেও মনে হয় সে সবই যেন জাদু। তার সুনিপুণ বাঁশি বাজানো আর ছবি আঁকাতেও জড়িয়ে থাকে দুর্দান্ত ম্যাজিকেরক আবহ। শিল্পনৈপুণ্যে ভরপুর তার জাদুর অনবদ্য উপস্থাপন দর্শককে করে দারুণভাবে পুলকিত এবং আনন্দিত। আর এসব কারণেই জুয়েল আইচ দেশ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে এক আলেচিত নাম। প্রশংসনীয় মুখ। বিশ্ববিখ্যাত জাদু গবেষক জেমস র‌্যান্ডি সারা পৃথিবীর জাদুর ইতিহাসের আদিকাল থেকে আধুনিককালের উল্লেখযোগ্য সব জাদুশিল্পীর ওপর একটি গবেষণা করেন। অবশেষে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুশিল্পীদের একটি তালিকা করেন তিনি। এতে জাদুর সব শাখা যেমন ক্লোজআপ, ক্যাবারে, কমেডি, মেন্টাল ম্যাজিক, বন্ধন মুক্তি, ভেন্ট্রিলোকুইজম এবং বৃহদাকার মঞ্চমায়া সৃষ্টিকারীদের নাম স্থান পায়। সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় ২৯৫ জন জাদুশিল্পীর নাম আছে। সেখানে জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের প্রশংসা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। জাদু বিশ্বের এক বড়মাপের প্রকাশনা ‘হুজ হু ইন ম্যাজিক’-এ লেখা হয়েছে, জুয়েল আইচের আবিষ্কৃত মঞ্চ মায়াগুলো এবং সম্পূর্ণ নতুন রূপে সাজানো ক্ল্যাসিক জাদুগুলো বিশ্ব জাদুভাণ্ডারে মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে। বাংলা সাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ তার ‘ম্যাজিক মুনশি’ উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে লিখেছেন- জুয়েল আইচ, জাদুবিদ্যার এভারেস্টে যিনি উঠেছেন। এভারেস্ট জয়ীরা শৃঙ্গ বিজয়ের পর নেমে আসেন। ইনি নামতে ভুলে গেছেন। বিশ্ববরেণ্য জাদু বিশেষজ্ঞ ডোনাল্ড ডিউইন্টার লন্ডনের বিখ্যাত ডমিনিয়ন থিয়েটারে জুয়েল আইচের শো দেখে লেখেন, এ এমনই এক অবিস্মরণীয় অনুভূতি যা বর্ণনা করা যায় না, যা শিখে আয়ত্ত করা যায় না। এ একান্তই সহজাত প্রতিভা, যা নিয়ে জন্মাতে হয়। ম্যাজিক দুনিয়ার কিংবদন্তি জুয়েল আইচ ম্যাজিকে আকৃষ্ট হলেন কিভাবে জানতে চাইলে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম স্বপ্নবিলাসী। অনেক কিছুই হওয়ার স্বপ্ন আমায় ঘিরে রাখতো। বিশেষ করে ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় খুব। আমার বাবার শখ ছিল ছবি আঁকা। তার দেখাদেখি আমিও ছবি আঁকা শুরু করি। সেই অভ্যাস এখনো আছে। গ্রামের মেলায় একবার দেখলাম এক বাঁশিওয়ালাকে, বাজিয়ে বাজিয়ে বাঁশি বিক্রি করছে। আমারও ইচ্ছে হলো বাঁশিওয়ালা হওয়ার। শুরু হলো আমার বাঁশি বাজানোর কসরত। একবার আমাদের গ্রামে বেদে দল এসেছিল। সে দলের একজনের কাছ থেকেই আমি প্রথম জাদু দেখি। বেদে জাদুকরের সেই জাদু দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম যারপরনাই। কাঠের তিনটি বাটির নিচে কাপড়ের তিনটি বল রেখে সুন্দর একটি জাদু দেখিয়েছিলেন তিনি! আর তখন থেকেই জাদু শেখার বাসনা আমার মনের মধ্যে অনবরত ডানা ঝাপটাতে থাকে। কিন্তু বেদে জাদুকরের তেল চিটচিটে কাপড়ের বল, আর তার অনাহারি রুগ্‌ণ-ভগ্ন শরীর এবং ভয়ঙ্কর দারিদ্র্যের অসহায়ত্বের যে ছাপ চেহারায় ফুটে উঠেছিল তা দেখে ওর মতো ম্যাজিশিয়ান হওয়ার ইচ্ছে তখন মনের কোনেই চাপা পড়ে যায়। অবশ্য জাদুর প্রতি আমার মূল আকর্ষণটা তৈরি হয় আরো অনেক পরে। বানারীপাড়া সার্কাস দলের এক জাদুকরের জাদু দেখে তো আমি হতবাক। সেই জাদুকর একটা ছেলের গলা কেটে ফেলছে, আবার জাদু দিয়ে গলা জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছে। ঠিক করলাম, আমিও জাদু শিখবো। ছোটবেলায় রূপকথা পড়তে আমি খুব পছন্দ করতাম। বন্দে আলী মিয়ার রূপকথা ছিল আমার খুব প্রিয়। প্রায় স্বপ্নে দেখতাম, আমি বন্দে আলী মিয়ার রূপকথার জাদুর দেশে চলে গেছি। জাদু দিয়ে পাল্টে দিচ্ছি সবকিছু। জাদুর প্রতি আমার আকর্ষণটা উন্মাদনায় পরিণত হয় সিরাজগঞ্জের জাদুকর আবদুর রশিদের জাদু দেখে। সময়টা ১৯৬৫ সাল। আমি তখন পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। সে সময়ে পিরোজপুরে তাবু ফেলে বিখ্যাত ‘সাধনা লায়ন সার্কাস’। জাদুশিল্পী হিসেবে এ সার্কাস দলের নিয়মিত পারফরমার ছিলেন জাদুশিল্পী প্রফেসর আবদুর রশিদ। তার অসাধারণ জাদু দেখে আমি বিস্মিত হই। তার ওপর  জাদুসম্রাট পিসি সরকারের (সিনিয়র) লেখা ‘ম্যাজিকের খেলা’, জাদুগির আলাদেনের লেখা ‘অভিনব ম্যাজিক’ গ্রন্থ দুটি পড়েও অনুপ্রাণিত হই। একজন শিক্ষিত মানুষ হয়েও জাদুশিল্পকে পেশা হিসেবে নিয়ে পিসি সরকার দিব্যি জীবনযাপন করছেন জানতে পেরে ভীষণভাবে উৎসাহিত হই আমি। সচেতনভাবে একজন জাদুশিল্পী হওয়ার স্বপ্নটা বোধহয় তখন থেকেই দেখতে শুরু করি। ম্যাজিক সম্পর্কিত রাজ্যের বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে শুরু করলাম ম্যাজিক প্র্যাকটিস। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাকে সেই স্বপ্ন নিয়ে তখন বেশি দূর যেতে দেয়নি। ১৯৭১ সালে স্নাতক পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল জুয়েল আইচের। কিন্তু সে সময় দেশমাতৃকার সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করতে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে গিয়ে তিনি যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। তাই সে বছর আর পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ৯ নম্বর সেক্টরের অন্তর্গত স্বরূপকাঠি এবং ঝালকাঠির সুবিশাল পেয়ারা বাগানের গেরিলা যোদ্ধাদের আক্রমণে পাক বাহিনী ছিল ভীতসন্ত্রস্ত। জুয়েল আইচ ছিলেন বিশাল বিস্তৃত সেই পেয়ারা বাগানের গেরিলা যুদ্ধের সাহসী এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কোন তাগিদ থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কোনো পূর্ব প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছাড়াই সংঘটিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ করবো, এরকম চিন্তাভাবনা আমার আগে থেকে ছিল না। কারণ আমি প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে কখনোই যুক্ত ছিলাম না। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মনে হলো, দেশে থাকলে মরতে হবে। মরতে যখন হবেই তো এভাবে মার খেয়ে কাপুরুষের মতো মরে যাওয়া ঠিক হবে না। মরবো যখন লড়াই করে মরবো, যুদ্ধ করে মরবো। অবশ্য আগেই উপলব্ধি করেছিলাম, পাকিস্তান কিছুতেই আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেবে না। তারা আমাদের অধিকারবঞ্চিত করে রাখবে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হবে। জুয়েল আইচ জানান, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তার জীবনে আঘাত হানে এক মারাত্মক দুর্ঘটনা। তার পিরোজপুরের বাড়ির সব জিনিসপত্র প্রথমে লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা। তাদেরই এক প্রতিবেশী দালাল পরিবার এ কুকর্মটি করে। এর পর পালাক্রমে বাড়ির ফার্নিচার এবং সবশেষে ঘরের মেঝের সিমেন্ট পর্যন্ত খুঁড়ে বাড়িটাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। দুর্বৃত্তদের ধারণা ছিল সচ্ছল পরিবার, অনেক স্বর্ণালঙ্কার আছে- আর এ সম্পদ হয়তো মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হতে পারে। এ সময় তার ম্যাজিকের সব যন্ত্রপাতি, বাঁশি, ছবি আঁকার ইজেল, রং-তুলি, ক্যানভাস, বইয়ের লাইব্রেরি, যাবতীয় পুরস্কার, নিজের আঁকা সব চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, তিল তিল করে জমানো জীবনের সব সঞ্চয় লোপাট হয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা দেশময় লাখ লাখ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা বা ধর্ষণের পর বাড়িঘর দোকানপাট সব পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে স্বরূপকাঠির পেয়ারা বাগান ছেড়ে বাধ্য হয়ে অসুস্থ অনাহারী জুয়েল অচেনা গ্রামের পথে হেঁটে ভারতের হাসনাবাদে গিয়ে উপস্থিত হন। সে সময়ে তার মারাত্মক রক্ত আমাশয় দেখা দেয়। ক্যাম্পের চিকিৎসকরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে যেতে তাকে বারণ করেন। বরং অপেক্ষাকৃত হালকা কাজ বাহাদুরপুর (নদীয়া) শরণার্থী ক্যাম্পের স্কুলে তাকে শিক্ষকতা করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি ম্যাজিক জানেন এ কথা ছড়িয়ে পড়ায় বাহাদুরপুর এলাকার কয়েকজন শৌখিন ভারতীয় ম্যাজিশিয়ান ক্যাম্পের স্কুলে এসে তার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে তিনিও কলকাতার কয়েকজন ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে এসপ্ল্যানেড এলাকায় কয়েকজন ফুটপাতের ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিক দেখে তিনি মজা পান। সে সময় মৃণাল রায়, ও পি আগরওয়াল, মার্কাস, সুবীর সরকারসহ বেশ কয়েকজন জাদুশিল্পীর প্রদর্শনী দেখার সৌভাগ্যও হয় তার। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ১৭ই ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই তিনি ঢাকায় না থেকে চলে যান গ্রামে। উদ্দেশ্য গরিবদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে কাজ করা। ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে সমদেকাঠি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন জুয়েল আইচ। তিনি পড়ানোর সময় রাগারাগি না করে সুন্দর সুন্দর গল্প বলে, উপমা দিয়ে, ছবি এঁকে, অভিনয় করে, জাদু দেখিয়ে প্রয়োজনে কৌতুক বলে, নিজের তৈরি নানা রকম খেলনা ও সরঞ্জামের সাহায্যে কিছুটা খেলা এবং কিছুটা কাজের মাধ্যমে শৃঙ্খলাবোধ এবং আশা জাগিয়ে তোলেন ছাত্রদের মধ্যে। স্কুলবিমুখ নিঃস্ব ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহী হয়ে উঠতে শুরু করে স্কুলে আসার জন্য। দূর-দূরান্তের ছাত্ররা এসে দলে দলে ভর্তি হতে শুরু করে সমদেকাঠি হাইস্কুলে। স্কুল ভরে ওঠে কানায় কানায়। জুয়েল আইচ গড়ে তোলেন পাবলিক লাইব্রেরি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন প্রাণের জোয়ার আসে চারদিকে। এলাকাবাসীর জোর দাবির মুখে মাত্র তিন বছরের মধ্যে তাকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে হয়। এরপর ভালোই চলছিল শিক্ষকতার পাশাপাশি ম্যাজিক নিয়ে জুয়েল আইচের পথচলা। এরমধ্যে হঠাৎই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। এ প্রসঙ্গে জুয়েল আইচ বলেন, ১৯৭৭ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি একদল দুর্বৃত্ত আমার ম্যাজিকের সরঞ্জামাদি পুড়িয়ে দেয়। সেসময় আমি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিটুল করের বাড়িতে রিহার্সাল করতাম এবং জাদু নিয়ে গবেষণা ও পড়াশোনা করতাম। ওই বাড়িতেই থাকত আমার জাদুর সব সরঞ্জাম ও প্রদর্শনীর উপকরণ। নির্বাচন নিয়ে নিটুলের সঙ্গে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার দ্বন্দ্ব বাধে। একপর্যায়ে রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ওই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যায় নিটুল করের বাড়িঘরসহ আসবাবপত্র। এর সঙ্গে রেহাই পায়নি আমার জাদুর সরঞ্জামও। ফলে দ্বিতীয় দফায় (প্রথমবার মুক্তিযুদ্ধের সময়) আবার নিঃস্ব হই আমি। জুয়েল আইচ জানান, এরপর তিনি স্কুল শিক্ষকতার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে আবার ম্যাজিকের সরঞ্জাম নতুনভাবে তৈরি করার কাজে মনোযোগী হন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের আহ্বানে আবার ফিরে আসেন ঢাকায়। এ দেশের জাদুশিল্পের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে জাদুবিদ্যার সূতিকাগার হিসেবে চেনে। তাই তিনি জাদুশিল্পের পুনঃজাগরণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু করেন নিরলস সাধনা। তিনি শুধু একজন বিশ্ববিজয়ী জাদুশিল্পীই হতে চাননি। আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জাদুর পুনঃজাগরণ চেয়েছেন। একদিকে জাদুর শৈল্পিক উৎকর্ষের জন্য কাজ করেছেন, অন্যদিকে গণচেতনা জাগানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। আর এভাবেই ক্রমশ তিনি তার চমক আর ব্যতিক্রমী বিস্ময়ে ভরপুর সব ম্যাজিকের খেলা নিয়ে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বময় নিজেকে এবং দেশকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তুলতে শুরু করেন। ১৯৮০ সালে ‘সোসাইটি অব আমেরিকান ম্যাজিশিয়ানস’ তাদের আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনে তাকে আমন্ত্রণ জানায় সদলবলে জাদু প্রদর্শনের জন্য। ১৯৮১ সালের ২৮শে জুন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাদুর মাধ্যমে তার বিশ্বজয়ের পথচলা। ওই বছর ৪ঠা জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অনুষ্ঠিত হয় বিদেশের মাটিতে জুয়েল আইচের প্রথম অনুষ্ঠান। আর এ প্রথম অনুষ্ঠানেই বাজিমাত করেন তিনি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ম্যাজিশিয়ান হিসেবে জুয়েল আইচ অসংখ্য দেশে ভ্রমণ করেছেন। সবখানেই তিনি জয় করে নিয়েছেন লাখো মানুষের হৃদয়। বিশ্বের যে জায়গাতেই তিনি একবার তার মন কেড়ে নেয়া জাদু প্রদর্শন করেছেন, সেখান থেকেই আবার শো করার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছেন এবং পাচ্ছেন। তিনি অসংখ্যবার আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, আরব আমিরাত, কুয়েত, উত্তর কোরিয়া, কাতার, থাইল্যান্ড, বাহরাইন, ইরাক, সুইডেন, ভারত, নেপালসহ আরো বহু দেশে বারবার জাদু প্রদর্শনী করেন এবং দেশের জন্য বয়ে আনেন বিরল সম্মান। তার স্ত্রী বিপাশা আইচ এবং একমাত্র কন্যাসন্তান খেয়া সহশিল্পী হিসেবে দেশ-বিদেশের মঞ্চে তার সঙ্গে পারফরম করে থাকেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রেষ্ঠ সব থিয়েটার এবং টেলিভিশন চ্যানেলে অসংখ্যবার সেসব দেশের দর্শকদের জাদু দেখিয়ে মুগ্ধ করেছেন জুয়েল আইচ। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘চ্যানেল ফোর’ দীর্ঘদিন ধরে তার জাদুর ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘হিয়ার অ্যান্ড নাউ’ প্রচার করে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি দেশের সব টিভি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে এ যাবৎ অসংখ্য অনুষ্ঠানে জাদু প্রদর্শন করেছেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদের বিশেষ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘আনন্দমেলা’ উপস্থাপনা করে এ অনুষ্ঠানটিতে তিনি সংযোজন করেছেন নতুন ও ভিন্নমাত্রা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাকে নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশ হয়েছে প্রশংসাসূচক অসংখ্য আর্টিকেল। দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত হন। বাংলাদেশের প্রায় সব রাষ্ট্রপ্রধানই তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ম্যাজিকের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, মঞ্চে তার জাদু দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। অনেকে তাদের প্রাসাদে তাকে রাজকীয় ভোজে আপ্যায়ন করেছেন। উপহার দিয়েছেন অনেক মূল্যবান উপঢৌকন। জুয়েল আইচ বাংলাদেশের যোগ্যতম সাংস্কৃতিক দূত। তিনি  ইউনিসেফের একজন অ্যাডভোকেট হিসেবে শিশুদের পক্ষে জনমত ও সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে নিয়মিত কাজ করে থাকেন। এসবের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখিও করেন জুয়েল আইচ। তার লেখা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়। এ ছাড়া ‘অন্তরালের আমি’ নামে আত্মজীবনীমূলক একটি তথ্যবহুল সুখপাঠ্য বই লিখেছেন তিনি। জাদুশিল্পে আকাশছোঁয়া সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ কিংবদন্তি এ ম্যাজিশিয়ান এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। দেশে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক পেয়েছেন তিনি। একজন জাদুশিল্পী হিসেবে জুয়েল আইচ বরাবরই ব্যতিক্রমী পরিবেশনা করে থাকেন। যাতে থাকে বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের ছোঁয়া। ১৯৮৬ সালের ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে সর্বসাধারণের সামনে খোলা মঞ্চে জাদু দেখানোর আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই জাদু প্রদর্শনী টিভিব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের ধারাবিবরণীতে কোনরকম সম্পাদনা না করে পুরোটাই বাংলাদেশ টেলিভিশনে সেদিনই দেখানো হয়েছিল। স্টেডিয়াম ঠাসা দর্শক ছাড়াও  টেলিভিশনের মাধ্যমে সারা দেশের লাখ লাখ মানুষ বিশ্ববরেণ্য জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের জাদু দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন। বিদেশের মাটিতেও এমন ব্যতিক্রমী অনেক ঘটনা রয়েছে জুয়েল আইচকে ঘিরে। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল লন্ডনে ১৯৮৮ সালের ১৮ই আগস্ট। একদল সাংবাদিক এবং পাঁচ শতাধিক দর্শকের সামনে বিশ্বনন্দিত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের চোখে প্লাস্টার লাগিয়ে ভালো করে ডাক্তারি ব্যান্ডেজ করে দেয়া হয়। চোখ বন্ধ অবস্থায় তিনি লুকিয়ে রাখা গাড়ির চাবি খুঁজে বের করেন। এর পরে অসংখ্য গাড়ির মধ্য থেকে তার জন্য রাখা নির্দিষ্ট গাড়িটি খুঁজে বের করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে চোখ প্লাস্টার এবং ব্যান্ডেজ দিয়ে বাঁধা অবস্থায়ই গাড়িটি নিয়ে লন্ডনের রাস্তায় বের হয়ে যান। হাজার হাজার মানুষকে অবাক করে দিয়ে সব ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে লন্ডন শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো ঘোরেন। অবশেষে আগের জায়গায় ফিরে আসেন। যে ডাক্তাররা তার চোখে ব্যান্ডেজ করেছিলেন তারা ভালোভাবে পরীক্ষা করে বলেন, আমরা যেভাবে তার চোখ বেঁধে দিয়েছিলাম, তা ঠিক তেমনি আছে। এ অবস্থায় একজন মানুষের পক্ষে কিছুই দেখা সম্ভব নয়। মেন্টালিজমে দারুণ দক্ষ জুয়েল আইচ। ১৯৯৬ সালের ঘটনা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জ্বরে কাঁপছে সারা বিশ্ব। চারদিকে তুমুল উত্তেজনা। কারা যাবে ফাইনালে, কারা হবে চ্যাম্পিয়ন। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে আলোচনার শেষ নেই। মানুষের চাপে পড়ে জুয়েল আইচ বাধ্য হলেন ফাইনালের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে। ঢাকা  প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জ সেদিন কানায় কানায় পূর্ণ। বিশিষ্ট সাংবাদিকদের সামনে জুয়েল আইচ ফাইনালের বেশ আগে তার ভবিষ্যদ্বাণী লিখলেন। কারা চ্যাম্পিয়ন হতে পারে শুধু তা-ই তিনি লিখলেন না, কত উইকেটে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অথবা কত রানে তাও লিখলেন। লিখলেন কার সেঞ্চুরি করার সম্ভাবনা, কার ভাগ্যে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, কার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা, সবই তিনি আগাম লিখে দিলেন। ফাইনাল খেলা হওয়ার পরে দেখা গেল তার ভবিষ্যদ্বাণী শতকরা প্রায় একশ’ ভাগ মিলে গেছে। জাদু দুনিয়ার জীবন্ত কিংবদন্তি জুয়েল আইচের জন্ম ১৯৫২ সালের ১০ই এপ্রিল, বরিশালে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সমদেকাঠি গ্রামে। তার পিতা বি কে আইচ ছিলেন ব্যবসায়ী আর মাতা সরযূ আইচ ছিলেন গৃহিণী। জুয়েল আইচের সাহসী ভূমিকায় জাদু এখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং  রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত শিল্প। এর মাধ্যমে অসামপ্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম, প্রকৃতি প্রেম, মানব সেবা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সমকালীন সমস্যা সমাধানে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। শিক্ষামূলক ম্যাজিকের ধাঁধা, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, নারীর ওপর অবিচার, ড্রাগ থেকে মুক্তিসহ অগণিত বিষয়কে উপজীব্য করে জাদু প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিনোদনের পাশাপাশি বিশ্বনন্দিত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ মানুষকে সচেতন করে চলেছেন নিয়মিত।
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

ইনস্টাগ্রামে ঝড় তুললেন সঞ্জয়ের স্ত্রী মান্যতা

বলিউডের এ সময়ের কোনো হট নায়িকা নয়, এবার দারুণ খোলামেলাভাবে নিজেকে মেলে ধরলেন একজন নায়কের সহধর্মীনী। তিনি ‘মুন্না ভাই’ খ্যাত সঞ্জয় দত্তের স্ত্রী মান্যতা। তার সুইমস্যুট পরা ছবিতে এখন কাঁপছে সোশ্যাল সাইট ইনস্টাগ্রাম। সম্প্রতি সপরিবারে ইউরোপ ঘুরতে গিয়েছিলেন সঞ্জয় দত্ত ও স্ত্রী মান্যতা। সঙ্গে ছিল কন্যা ইকরা ও ছেলে শাহরান। সেখান থেকেই ইনস্টাগ্রামে একের পর এক ছবি শেয়ার করে ঝড় তুলে দিয়েছেন একসময়ের অভিনেত্রী মান্যতা। দুই সন্তানের মা হয়ে যেভাবে তিনি নিজের সৌন্দর্য্য ধরে রেখেছেন, তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। নীল স্যুইমস্যুটে  অত্যন্ত আকর্ষণীয় তিনি। ছবিতে দেখা গেছে মান্যতার পরনে রয়্যাল ব্লু স্যুইম স্যুট। সেক্সি আউটফিটে তিনি যথেষ্ট মানানসই ও আত্মবিশ্বাসী। বেশ কিছু ছবিতে তার সঙ্গে সঞ্জয় দত্ত এবং দুই সন্তানকে দেখা গেছে। সম্প্রতি ‘পার্চড’ খ্যাত অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তের বিকিনি ছবি সোশ্যাল সাইটে ভাইরাল হয়। এবার তা ছাপিয়ে যেন সব আকর্ষণ কেড়ে নিয়েছেন মান্যতা দত্ত।

‘আজও সেই ঘটনার কথা মনে হলে লজ্জায় লাল হয়ে যাই’

২০০১ সালের কথা। সেট বানিয়ে শুটিং চলছিলো অর্জুন সাজানি পরিচালিত ‘অগ্নীবর্ষা’ নামক একটি ছবির গানের। শুটিংয়ে রগরগে দৃশ্যে অংশ নিচ্ছেন রাভিনা ট্যান্ডন ও দক্ষিণের অভিনেতা নাগার্জুনা। একেবারেই স্বল্পবসনা রাভিনা ক্যামেরাবন্দি হচ্ছিলেন। ঠিক সে সময়ে পুরো শুটিং ইউনিটের সামনে রাভিনার বুক থেকে খুলে পড়ে ছোট সেই পোশাক। একেবারেই হতবাক হয়ে যান সবাই। তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নেন রাভিনা। এরপর দুই ঘন্টা বিরতিতে যান রাভিনা। পরে আবার শুটিং শুরু করেন। এতদিন পর নিজের অভিনয় জীবনের এমনই বিব্রতকর ঘটনার কথা শেয়ার করলেন রাভিনা ট্যান্ডন। সম্প্রতি দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেই কথা মনে করে তিনি বলেন, ২০০২ সালে ছবিটি মুক্তির পর আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। আমার রোমান্সের সেই দৃশ্য নিয়েও কথা হয়েছে। আমি এসবে পাত্তা দেই না। তবে আমার অভিনয় জীবনের সব থেকে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হয়েছিলো সে গানটির শুটিংয়ে। এই বিষয়টি আমি আর কাউকে এতদিন শেয়ার করিনি। তবে আমি মনে করি অভিনয়শিল্পীদের জীবন আসলে খোলা বইয়ের মতো হওয়া উচিত। কারণ অনেকে অনুসরণ করেন তাদের। সেই বিব্রতকর মুহূর্তে নাগার্জুনা আমাকে বেশ সহায়তা করেছিলো। পরিচালকও দুই ঘন্টার জন্য প্যাকআপ করেন শুটিং। আজও সেই ঘটনার কথা মনে হলে লজ্জায় লাল হয়ে যাই।

মুসলমানেরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য: সর্বোচ্চ নেতা

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, ফিলিস্তিনি ইস্যু হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইস্যু এবং মুসলমানদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য। তিনি বলেন, “ইসলামি শরীয়াহ অনুসারে যখন কোনো শত্রু মুসলমানদের ভূমি দখল করে তখন যেকোনোভাবেই হোক সেই শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করা প্রত্যেকের দায়িত্ব হয়ে যায়।” 
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূত, ইরানের সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সর্বোচ্চ নেতা বলেন, “ইহুদিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা এখন সব মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে কিন্তু কেন অনেকেই তা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে?” তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি হচ্ছে মুসলমানদের জন্য প্রধান ইস্যু, কিন্তু কিছু মুসলিম দেশ এমনভাবে কাজ করছে যে, তাতে মনে হচ্ছে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুকে উপেক্ষা করছে এবং ভুলে গেছে।
সর্বোচ্চ নেতা আরো বলেন, মুসলমানদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি ও বিদ্বেষ সৃষ্টি ইসলাম এবং মুসলমানদের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। চলমান প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের মধ্যকার অনৈক্যকে তিনি সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন। মুসলমানদের স্বার্থেই এ সমস্যার সমাধান করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও উত্তর আফ্রিকার কিছু দেশ নিয়ে কথা বলেন।

কাশ্মিরে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরে আজ ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। আজ (সোমবার) শ্রীনগরের একটি ঈদগাহে নামাজ পড়তে গেলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বাধা দেয়। এ সময় ক্ষুব্ধ মানুষজন নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ে বিক্ষোভ দেখায়।
উভয়পক্ষের মধ্যে কমপক্ষে ২০ মিনিট ধরে সংঘর্ষের পর উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে  নিরাপত্তা বাহিনী  কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। সংশ্লিষ্ট ওই ঈদগাহে আগে থেকে ঈদের নামাজ পড়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল।
অন্য একটি সূত্রে প্রকাশ, আজ দক্ষিণ কাশ্মিরের পুলওয়ামা, অনন্তনাগ, সোপিয়ানসহ কয়েকটি এলাকায় সহিংস প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। ক্ষুব্ধ জনতা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ে। বারামুল্লা জেলার সোপরে সংঘর্ষে কয়েকজন জওয়ান আহত হন।
এছাড়া বেশ কয়েকটি এলাকায় উন্মত্ত জনতার পক্ষ থেকে দেশবিরোধী স্লোগান  দেয়াসহ পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর খবর প্রকাশ পেয়েছে। কাশ্মিরের পুলওয়ামা জেলায় বিক্ষোভকারীরা হাফিজ সাঈদ, জাকির মুসা এবং বুরহান ওয়ানির পোস্টার নিয়ে বিক্ষোভ দেখায়।
কাশ্মিরে আজ হজরতবাল মসজিদে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ঈদের নামাজে অংশ নেন। পুরোনো শহরের ঈদগাহে কমপক্ষে ৪০ হাজার মানুষ ঈদের নামাজে শামিল হন। এছাড়া উপত্যাকার সমস্ত জেলাসদরসহ বিভিন্নস্থানে ঈদগাহ এবং মসজিদে মানুষজন ঈদের নামাজে শামিল হন। 
ঈদ উপলক্ষে জম্মু-কাশ্মিরের গভর্নর এন এন ভোরা, মুখ্যমন্ত্রী মেহেবুবা মুফতি, উপ-মুখ্যমন্ত্রী নির্মল সিং রাজ্যবাসীকে শুভেচ্ছা জানান।
মেহেবুবা বলেন, ঈদ রাজ্যে আনন্দ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বকে মজবুত করে।
রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ, এমপি ডা.ফারুক আবদুল্লাহ, ডা. অমিতাভ ভট্ট, বিধায়ক দেবেন্দ্র সিং রাণাসহ অন্যরা ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

কাশ্মিরে গেরিলারা রণকৌশল পরিবর্তন করছে: স্থায়ী ঘাঁটি গাড়ছে শ্রীনগরে

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে গেরিলারা তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যের বরাত দিয়ে আজ(সোমবার) ভারতের সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সশস্ত্র গেরিলারা নিজেদের এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে বলে গোপন সূত্রের খবর থেকে জানা যাচ্ছে।
কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে অন্তত  ৫ গেরিলা ফিরে এসেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের খবরের ভিত্তিতে এ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে এ সব গেরিলা দক্ষিণ কাশ্মির থেকে দূরে তৎপরতা চালিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে গেরিলাদের অনিয়মিত চলাফেরা নজরে তাদের এসেছে। এতে করে শ্রীনগরের লালবাজার, বাটামালো এবং লাল চকে ঘেরাও এবং তল্লাসি অপারেশন চালানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, কাশ্মিরের অন্যান্য এলাকায় যে ভাবে গেরিলা তৎপরতা বেড়েছে একই ভাবে শ্রীনগরেও তা বাড়ানোর পরিষ্কার চেষ্টা চলছে।
শনিবারে সড়ক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গেরিলাদের হামলায় ভারতীয় কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী সিআরপিএফের এক জওয়ান নিহত হয়। এ ছাড়া, শ্রীনগর-জম্মু মহাসড়কে একটি স্কুল ভবনে আটকে পড়া গেরিলাদের সঙ্গে প্রায় দু’দিনব্যাপী গুলি বিনিময়ে দু’গেরিলা নিহত এবং ভারতীয় তিন সেনা আহত হয়।
অবশ্য সর্বশেষ এ ঘটনার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। চলতি মাসের ১৭ তারিখের গোয়েন্দা তথ্যে শ্রীনগরের গেরিলাদের চলাচলের ওপর তথ্য দেয়া হয়েছিল। এতে বলা হয়েছে, শ্রীনগরের অধিবাসী গেরিলাদেরকে তাদের নিজ নগরীতে ফিরতে এবং সেখান থেকে তৎপরতা চালানোর জন্য গেরিলা গোষ্ঠীগুলো থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত দশকে গেরিলারা শ্রীনগরের বাইরে থেকে তৎপরতা চালিয়েছে। এবারে তাদের শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থলে ফিরে আসার ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
হিজবুল মুজাহেদিনের জনপ্রিয় কমান্ডার বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে গেরিলা হামলা হতে পারে নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ৮ জুলাই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ওয়ানি।
পাশাপাশি শ্রীনগরে গেরিলাদের স্থায়ী ঘাঁটি করার বিষয় নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। তারা মনে করছেন, জম্মু ও কাশ্মিরের গেরিলা তৎপরতা নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

ঈদ স্মৃতির রকমফের by নূরে আলম সিদ্দিকী

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির মাধ্যমে। ‘মানুষ’ কবিতাটির মধ্যেও লোভী মোল্লাদের প্রতি তাঁর প্রচণ্ড প্রতিবাদ শুধু তাঁর চির উদ্বেলিত হৃদয়ের সমুদ্রের উর্মিমালায় উচ্ছ্বসিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, তার অনাবিল অনবদ্য স্নিগ্ধ মর্মস্পর্শী মানবতার প্রতি অদম্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
তাঁর অসংখ্য কালজয়ী প্রেমের বন্দনাকে বাংলা সাহিত্যের সকল কবি এমনকি রবীন্দ্রনাথও বিমুগ্ধ চিত্তে প্রশংসা করেছেন। প্রেমের আকুতিকে অনবদ্য ভাষায় প্রতিভাত করার আত্মতৃপ্তিতেই তিনি নিঃসংকোচে বলতে পেরেছিলেন, “আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দিব না ভুলিতে”।
আমি এখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপর নিবন্ধের সূচনা করছি না। বরং তার অনেক অনবদ্য ও অতুলনীয় মর্মস্পর্শী পঙ্‌ক্তির মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের নানা ভিন্ন ভিন্ন মতের হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়, এমন একটি উদ্ধৃতি প্রদান করার জন্যই এই উপক্রমণিকা।
ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে আঘাত, প্রত্যাঘাত, বিদ্রূপ, বিক্ষোভ, অযাচিত এবং অসংগত সমালোচনার নির্মম ও নিষ্ঠুর শিকার মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে তার ছোট্ট একটি পঙ্‌ক্তি সকলের মনে এমন অনুভূতি ও আকুতি সৃষ্টি করে যে, গান ও কাব্যের জগতে এটি অনন্যসাধারণ ও বিরল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকল মুসলমানের হৃদয়কে উচ্ছ্বসিত করে উচ্চকিত করে “রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”। পশ্চিম দিগন্তের বুক চিরে রমজানের শেষে সোনার থালার একটি কণার মতো যখন ঈদের চাঁদের সামান্য আভাও দেখা যায়, তখন সবার মনই গুনগুন করে গেয়ে ওঠে; যা তুলনাবিহীন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেরই হৃদয়ে নিজের জ্ঞাতে অজ্ঞাতে পঙ্‌ক্তিটি মুর্ছিত হতে থাকে আপন মহিমায়।
ঈদের কথা বলতে হলে এতটুকু উপক্রমণিকা কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। বিস্তীর্ণ জ্ঞানের পরিধি থাকলে অনেক ভাষা হতে বিশেষ করে ফারসি ভাষার পঙ্‌ক্তির উদ্ধৃতি দিতে পারতাম।
প্রতিটি মানুষের মতো আমারও জীবনে শৈশব থেকে শুরু করে জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত ৭৩/৭৪টি শুধু রোজার ঈদ এসেছে। একইভাবে কোরবানিরও। আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে উপলদ্ধি করি, বয়সের তারতম্যে ঈদ বা কোরবানির আনন্দে কোনো মারাত্মক ব্যতিক্রম বা ব্যত্যয় আমি অন্তত অনুভব করি না (মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ব্যতিক্রম বাদে)। জীবনের প্রতিটি ঈদ ও কোরবানি আমার জীবনকে আনন্দিত করেছে, উদ্বেলিত করেছে, উচ্ছ্বসিত করেছে। এমনকি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য একটা মমত্ববোধ ও ভালোবাসার উন্মেষ ঘটিয়েছে। এই জীবন সায়াহ্নে সুদূর অতীত আমার শৈশবের দিকে যদি তাকাই, সেখানেও আনন্দের অজস্র ও অফুরন্ত স্মৃতি এখনও আমাকে রোমাঞ্চিত করে, বিমোহিত করে, বিমুগ্ধ করে। সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মের সুবাদে কোনো ঈদেই আমাকে কোনো না পাওয়ার বেদনায় হৃদয়কে এতটুকু ভারাক্রান্ত করেনি। অনেক আত্মীয়-স্বজন। তাদের কাছ থেকে জামা-কাপড়, জুতা, খেলনাসহ অফুরন্ত উপহার পেয়েছি। যতই উপহার পেতাম, সেগুলোকে আমার বিছানায় সাজিয়ে রাখতাম। আমার মা মুচকি হেসে বলতেন, উপহারেই বিছানা ভরিয়ে ফেললে শোবে কোথায়? বাবাও খুব খুশি হতেন আমার উচ্ছ্বাস অনুধাবন করে। বলতেন, ওর উপহারগুলো বিছানাতেই ঘুমাক, ও না হয় আমাদের বিছানায় ঘুমাবে।
কিন্তু মজার কথা হলো, উপহারগুলো তো পরতে হবে! নামাজের কিছু আগে ছাড়া ঈদের কাপড় মা পরতে দিতেন না। তারপরে যখন যেটা পরার অবাধ স্বাধীনতা। মনে হতো একেকটা মিনিট যেন একেকটা ঘণ্টা। ঈদের দিন অনেক ভোরেই ঘুম ভেঙে যেত। তখনও বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন পাখির কলরব শুরু হতো না। সেই বয়সেও বুঝতাম, প্রভাত হতে এখনও বাকি। কিন্তু কী করবো? ঘুম তো আসে না ! আবেগ-উচ্ছ্বাসে ভরা মন সুনিবিড় আকাঙ্ক্ষায় অপেক্ষা করতো- সূর্য উঠুক। তখন থেকেই না শুরু হবে ঈদের জামাতের প্রস্তুতি নেয়া। সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান হিসেবে সুগন্ধী সাবান থেকে শুরু করে বিলাসী উপকরণের কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এই বয়সে এসেও অস্বীকার করবো না, আমার শৈশবের ঈদ বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি, নামাজ আদায়, অস্থির চিত্তে অপেক্ষা করা কখন খুৎবা ও মোনাজাত শেষ হবে। পূর্ণ স্বাধীনতায় বয়োজ্যেষ্ঠদের সালাম ও বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি করবো। আমার শৈশবের বন্ধুরা প্রায় সকলেই আমাদের বাসায় আসতো। আমার স্নেহশীলা মমতাময়ী মা নিজের সন্তানের মতোই সকলকেই ঈদের জন্য নিজ হাতে তৈরি করা সকল ধরনের মিষ্টান্ন সকলকেই খেতে দিতেন। এবং মজার বিষয় হলো, বন্ধুদের যাদের বাসায় যা কিছুই মিষ্টান্ন হোক না কেন, আমার মায়ের হাতে তৈরি মিষ্টান্ন না খেলে যেন তাদের ঈদ সম্পূর্ণই হতো না। অন্যদিকে বন্ধুদের কেউ একজন অনুপস্থিত থাকলে মায়ের চোখ এড়াতো না। তার কথা আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করতেন। বন্ধুদের নিয়ে খাচ্ছি, খেলছি, দৌড়াদৌড়ি করছি; এরমধ্যে অনুপস্থিত বন্ধুদের ব্যাপারে বারবার প্রশ্ন করায় বিরক্তই লাগতো। মা তো মা-ই।
নতুন কাপড় বা ঈদের অন্যান্য প্রসাধনী মাও অফুরন্ত পেতেন। কিন্তু সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ আসতো কম। আপ্যায়নের মাধ্যমে তিনি যে অবর্ণনীয় আনন্দলাভ করতেন, তার চোখ-মুখ খুশিতে জ্বলজ্বল করতো, তা আজও আমার স্মৃতিতে ভাসে। আমি আবারও বলি, সকলের মা-ই মা। কিন্তু আমার মাকে সবসময়ই আমার মনে হতো- তিনি অনন্যা, তিনি অসাধারণ। এই বিশাল জগত জুড়ে আমার মা এমন একজন স্নেহশীলা আবেগাপ্লুত জননী, যার কোন তুলনা নাই। ঈদের দিনে যে বিরাট ধকল, তাতে তার কোন ক্লান্তি কখনোই আমার চোখে পড়ে নাই।
আমাদের পরিবারটি ঠিক যৌথ না হলেও কার্যত আমার চাচাতো ফুফাতো খালাতো ভাই-বোনরা আমার মায়ের খুব কোল-নেওটা ছিল। সন্তান-সম্পর্কিত প্রায় সকলেই মাকে কেউ মা, কেউ আম্মা, কেউ মা-জান বলে ডাকতো। যদিও আমরা দুই সহোদর (এক ভাই, এক বোন) ভাইবোন ছিলাম। আমার মেজো খালা বা চাচী (আব্বা ও চাচা আপন দুই ভাই আম্মা ও খালা আপন দুই বোনের সাথে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমি শতভাগ নিশ্চিত এটা পারিবারিক প্রস্তাবনায় সংঘটিত হয়েছিল।) মা’কে সকলেই যখন মা বলে ডাকতো, তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে যেতেন। ক্রুদ্ধ হয়ে মাকে ভর্ৎসনা করে বলতেন, তুই কি নিঃসন্তান, বাঁজা? এত রুদ্রমূর্তিতে তীব্র বকাবকি করতেন যে, মা চুপসে যেতেন, ভয়ও পেতেন। কিন্তু নিতান্ত নির্বিকার ও নিশ্চুপ থাকতেন। আমাদের ওই সমস্ত আত্মীয়রা এমনিতে কেউ না কেউ আমাদের বাসায় অনুষ্ঠান ছাড়াই খেতেন। মায়ের হাতের রান্না না খেলে তারা নিতান্তই অতৃপ্ত থাকতেন বলে আমি তাদের মুখেই শুনেছি। এতে আমার অনাগ্রহ ছিল না, কারণ একসঙ্গে বসে বেশ ক’জন মিলে খেতে এমনিতেই ভালো লাগে। পুকুরের রুইমাছের মাথাটি বা বিশেষ পছন্দনীয় মাছটি মা কখনোই আমার পাতে তুলে দেননি। কিন্তু সৌভাগ্য আমার! যার পাতেই তুলে দিতেন, তিনিই ওটা আমাকে দিয়ে দিতেন এবং বাবা ও মা কেউ তাতে আর আপত্তি তুলতেন না। যৌথ পরিবার না হলেও ঈদ ছাড়াও দৈনন্দিন খাওয়াটা অনেকটা যৌথ পরিবেশেই হতো। সাংসারিক সচ্ছলতার কারণে এটা বোধহয় সকলকেই শান্তি, স্বস্তি ও আনন্দ দিতো। এই নিত্য-নৈমিত্তিক স্বাভাবিকতার মধ্যে ঈদের ব্যাপারটা যে আমাদের বাসাই মোটামুটি কেন্দ্রবিন্দু ছিল, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মাতৃকূল অর্থাৎ আমার খালা-মামারা আমাদের বসতি থেকে অনেক দূরে থাকতেন। তাই ঈদের দিনে চাচাতো ভাই-বোনদের সমাগমই বাসাটাকেমুখর করে রাখতো। অবশ্য কখনো কখনো খালাতে মামাতো ভাইবোনরাও ঈদ করতে আমাদের এখানে আসতো। সেই সাবলীল এবং অকৃত্রিম আনন্দঘন পরিবেশের ঈদ আমাকে আজও রোমাঞ্চিত করে, বিমোহিত করে, বিমুগ্ধ করে। শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সোপানে যখন পা রাখলাম, পড়াশোনার জন্য আমাকে ঢাকায় চলে আসতে হলো। কিন্তু ঈদের সময় ঢাকায় থাকা আমার জন্য ছিল শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবার মতো অবস্থা। কখনোই তা করিনি। ঈদে বাড়ি যেতেই হতো। ৫০ দশকের ৫৮/৫৯ সাল থেকে প্রায় স্বাধীনতা পর্যন্ত আমাদের ওখানে (ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আসার) রাস্তা সুগম ছিল না। অথচ ঝিনাইদহ থেকে কোলকাতায় মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় যাওয়া যেতো। ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের আগে ভিসা পাসপোর্টেরও বালাই ছিল না। ঢাকা থেকে ঝিনাইদহ যেতে হলে ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে প্রায় ২৩/২৪ ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গা হয়ে যেতে হতো। আমার জীবনের অন্যতম শখ বা বিলাসিতা ট্রেন বা প্লেনের উচ্চতর শ্রেণিতে ভ্রমণ করা। তাই টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে হলেও আগে থেকেই ট্রেনের প্রথম শ্রেণির টিকেট কেটে রাখতাম। বলতে সংকোচ নেই, কোনভাবেই প্রথম শ্রেণির দরজাও ঈদের সময় আটকে রাখা যেত না। অসংখ্য যাত্রী প্রথম শ্রেণিতে দরজা খুলে ঢুকে যেত। পুলিশও যেন নির্বিকার থাকতো। তবে এটুকু সৌজন্যবোধ থাকতো যে টিকেট কাটা যাত্রীদের তারা বসার সুযোগ দিতো। আর বাকি পুরো কামরাটি একদম যাত্রীতে ঠাসা, তিলধারণের ঠাঁইও থাকতো না। যাত্রাপথে বাহাদুরাবাদ-সিরাজগঞ্জে ফেরি পারাপার; একটি অদ্ভুত সুন্দর বিলাসবহুল ফেরি। যখন ফেরিতে উঠতাম, তখন সমস্ত অন্তরটা আনন্দে, উচ্ছ্বলতায় ভরে যেত। ওখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সাধারণ যাত্রীরা ঢুকতেই পারতো না। সিরাজগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদী হয়ে চুয়াডাঙ্গায় গিয়ে আমাদের নামতে হতো। চুয়াডাঙ্গায় নামতাম রাত ৯টা/১০টার দিকে। অনেক সময় ঝিনাইদহগামী শেষ বাসটি ছেড়ে দিতো। চুয়াডাঙ্গা স্টেশনে উচ্চশ্রেণির যাত্রীদের বিশ্রামাগারটি ছিল সুসজ্জিত ও মার্জিত। শোয়ার জন্য কোন খাট না থাকলেও কাঠ ও বেতের তৈরি অতি উচ্চমানের ইজি চেয়ার এতই সুন্দর ছিল যে, ঘুমাতে কোনো অসুবিধা হতো না। আমি দু’-একবার সকালের প্রথম বাসটি ধরতে পারিনি। এটি উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, আব্বা এসে অপেক্ষা করতেন ঝিনাইদহের বাসস্টপেজে। প্রতি ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গা থেকে ঝিনাইদহে বাস যেতো। এখন ভাবতে ভীষণ কষ্ট লাগে, ওই এক ঘণ্টা আব্বা কী উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতেন। আবার এটি ভাবতে ভালো লাগে যে, ভাগ্যিস, তখন মোবাইল ফোন ছিল না! থাকলে মায়ের কী দশাটাই না হতো!
কলেজে থাকা অবস্থা থেকে শুরু করে ’৬৯ সাল পর্যন্ত আমার বেশ কয়েকটি ঈদ কেটেছে কারাগারের অভ্যন্তরে। ৬৬-এর পর থেকে রাজবন্দী হিসেবেই জেল খেটেছি। আমার একটি ঈদের কথা মনে পড়ে। তখন আমি হাজতী। মামলায় জামিন না দিয়ে ওই কয়দিন আমাকে জেল খাটিয়ে একটা বিদ্বেষপ্রসূত আনন্দ (স্যাডিজম) পেতেন ম্যাজিস্ট্রেটদের কেউ কেউ। এ ব্যাপারে ঘাগু ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট মরহুম আফসার উদ্দিন। আল্লাহ্‌ তাকে বেহেশ্‌ত নসীব করুন। এটা অপ্রাসঙ্গিক কি না জানি না, আমাদের যেকোনো মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এসে দাঁড়াতেন তখনকার দিনে প্রথিতযশা ব্যারিস্টার ও এডভোকেটগণ। সর্বজনাব আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী), জহিরউদ্দিন (প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী), সালাম খান, শাহ্‌ আজিজুর রহমানসহ অনেকেই। তখন হাইকোর্টে যারা আইনজীবী হিসেবে শুধু প্রসিদ্ধই নন, আইন ব্যবসাও যাদের রমরমা। তারাও একটা অনবদ্য আকর্ষণে এসে ম্যাজিস্ট্রেটের বারান্দায় ভিড় জমাতেন। আমার অনুভূতি আজও শিহরিত হয়, রাজনীতির সেই রোমাঞ্চিত ত্যাগের মহিমায় ভরপুর দিনগুলি কি আবার কখনো অবক্ষয়ের অতলান্তে অবলুপ্ত ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থায় মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত একনায়কতান্ত্রিকতায় আচ্ছাদিত এই বাংলাদেশে ফিরে আসবে?
সেবার হাজতী হিসেবে কারাগারে গেলেও আমাকে জেল হাসপাতালে রাখা হয়। যারা নিরাপত্তা বন্দি নন, অথচ রাজনৈতিক কর্মী, তাদের জন্য এ ব্যবস্থাটি আকাশছোঁয়া পরিতৃপ্তির। যতদূর মনে পড়ে, জেলের অভ্যন্তরে হাসপাতাল চত্বরেই ঈদের জামাত হতো। সেটিও একটি অদ্ভুত অনুভূতির ঈদ। সেই ঈদে মুজিব ভাই কারারুদ্ধ ছিলেন না। কিছু শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব, যাদের সকলেই নন-মুসলিম, তারা ভালো কাপড়- চোপড় পরে কারা অভ্যন্তরে ঈদ চত্বরে আসতেন সবার সঙ্গে মেলামেশার উদগ্র আকাঙ্ক্ষায়। আমার বন্ধু বদিউজ্জামান ঈদের জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবী রেখে গিয়েছিল। ঘাটতি, কমতি, বেদনা, ক্লান্তি কোনোকিছুই বোধ করিনি। আর খাওয়া-দাওয়া? আব্বা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে জেলখানার গেটে খাবার নিয়ে আসতেন। ডেপুটি জেলারের রুমে তার সঙ্গে কী হাজতী, কী রাজবন্দী- সকল অবস্থাতেই দেখা করার সুযোগ পেতাম। আওয়ামী লীগের জন্ম থেকেই আমার বাবা প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম। মুজিব ভাইও তাঁকে সম্মান করতেন। মুজিব ভাইয়ের কারাগারের রোজনামচা বইয়ে এ ইঙ্গিত রয়েছে। আমার কিছু অন্তরঙ্গ বন্ধু, তারাও কিছু না কিছু নিয়ে দেখা করতে আসতো। ঈদের দিনে জেল কর্তৃপক্ষও অনেকটা ঢিলেঢালা থাকতো। এখানে ওখানে যাতায়াত অবারিত না হলেও নিয়মকানুন অনেকটা শিথিল ছিল। ঈদের নামাজের শেষে সবারই সবার সঙ্গে কোলাকুলি করার উদগ্র আকাঙ্ক্ষা পরিলক্ষিত হতো। এটা একটা বিচিত্র ধরনের অনুভূতি ও আবেগতাড়িত নিষ্কলুষ আনন্দ। ৬৬ সালে ৬ দফা প্রদানের পর জুনে কারারুদ্ধ হই রাজবন্দী হিসেবে। তখন রাজনীতিকদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডেপুটি জেলার তোফাজ্জল হোসেন সাহেব। ভদ্রলোকের বাড়ি রাজশাহীতে। তিনি খুব কুশলী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। চাকরি রক্ষার সমস্ত শর্ত পালন করেও তিনি রাজবন্দীদের সঙ্গে একটা সখ্য বজায় রাখতেন। মুজিব ভাইকেও ভীষণ শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। এবং শুধু তাঁর কেন, তখনকার জেল কর্তৃপক্ষের প্রধান পরিদর্শক থেকে শুরু করে কারাগারের সকল কর্মকর্তারই বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, মুজিব ভাই পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসবেনই। ৬ দফা প্রদানের পর বঙ্গবন্ধু কারাগারের যে কক্ষটিতে অবস্থান করতেন, তখন কক্ষটির নাম ছিল ‘দেওয়ানী’। কারা অভ্যন্তরে অনেকগুলো ঈদ ও কোরবানিতে আমি অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। ঈদের দিনে অন্যান্য জায়গায় অবরুদ্ধ রাজবন্দীরা অতি উৎসাহ-উদ্দীপনা, হৃদয়ের উচ্ছ্বাস ও উদ্বেলতা নিয়ে ঈদের জামাতে আসতেন। তাদের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় থাকতো, শুধুই কোলাকুলি নয়, মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক শলা-পরামর্শ ও তাঁর সিদ্ধান্ত সরাসরি জানা। আমি মুজিব ভাইয়ের অতি সন্নিকটে থাকতাম বলে এই শলাপরামর্শে তেমন কোন আগ্রহ বোধ করতাম না। কিন্তু অন্যান্য সেল ও ওয়ার্ডে থাকা রাজবন্দীদের সঙ্গে কোলাকুলি, কথাবার্তা ও মেলামেশায় যে কী অদ্ভুত আনন্দ পেতাম, তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। প্রথিতযশা লেখক হলে হয়তো পারতাম। কারাগারের অভ্যন্তরের ঈদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, রাজবন্দীদের তরফ থেকে সকল সাধারণ কয়েদিদের জন্য বিশেষ খাদ্য পরিবেশন করা হতো। বলতে বাধা নেই, জেল কর্তৃপক্ষের এখানে একটা অকৃত্রিম সহযোগিতা ও সাহায্য থাকতো। রাজবন্দীদের তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত করা খাবার সাধারণ হাজতী ও কয়েদিদের যার যার ওয়ার্ডে ও সেলে পাঠিয়ে দেয়া হতো। কয়েদি ও হাজতীরা ঈদে ও কোরবানিতে এই সুস্বাদু খাবার খুবই পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেতো এবং তারা প্রতিটি রাজবন্দীকেই বয়স, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভীষণভাবে বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা করতো। ভাবীও ঈদের দিনে প্রচুর খাবার পাঠাতেন। মানিক ভাইয়ের তরফ থেকেও ঈদের দিন জেলখানায় খাবার আসতো। আমার বাবাসহ অনেক রাজবন্দীর পরিবারবর্গের কাছ থেকেও প্রচুর খাবার আসতো। রাজবন্দীদের যিনি প্রতিনিধি ছিলেন, বাইরে থেকে আগত খাদ্যসামগ্রী রাজবন্দীদের বিভিন্ন সেলে ফালতু, পাহারা ও মেটদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। ডিআইজি, জেল সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলারসহ কারাগারের প্রায় সকলেই হয় ঈদের জামাতে নতুবা বিভিন্ন স্থানে মুজিব ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করা অনেকটা অবধারিত ছিল। জেলখানার একটি ঈদ আমার জন্য বেদনাদায়ক, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ছিল। কারণ তার দুই-তিনমাস আগে আমি কারারুদ্ধ অবস্থায় আমার মায়ের মৃত্যু ঘটে এবং কোনভাবেই মৃত্যুশয্যায় শায়িত মাকে দেখার বা পরে মৃত মাকে দাফন করার জন্য শত চেষ্টা সত্ত্বেও আমাকে কোন পেরোল দেয়া হয়নি। সম্ভবত ওই ঈদের জামাতে আমি যাইনি। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে আমার মমতাময়ী মা’কে ঘিরে বিজড়িত স্মৃতি আমার হৃদয়কে প্রচণ্ডভাবে ভারাক্রান্ত করে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আরেকটি ঈদে আমি নামাজ তো পড়ি-ই নাই (আল্লাহ্‌ আমার গুনাহ মাফ করুন), বরং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমি একটি প্রচণ্ড উত্তেজক বক্তৃতা করে বলেছিলাম- ঈদের চাঁদ, তুমি আকাশের বক্ষ বিদীর্ণ করে বাংলাদেশে উদিত হয়ো না। আমার ধর্ষিতা বোনের বুক নিংড়ানো আর্তনাদ তোমাকে ধিক্কার দেবে, সন্তান হারানো মায়ের বুকফাঁটা আর্তনাদ তুমি সহ্য করতে পারবে না। কোথায় দাঁড়াবে ঈদের জামাত? বাংলার মাটির সর্বত্রই তো রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। এখানে খুশির জামাত দাঁড়ানোর কোনো অবকাশ নাই। আমার আবেগ, আমার উচ্ছ্বাস, আমার ক্ষোভ, আমার ক্রোধ আমাকে এতখানি আচ্ছন্ন করে যে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণে আমি তরুণ প্রজন্মকে ঈদের জামাতে অংশ না নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম (আবার আমি মহান আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইছি)।
আজ আমি জীবন সায়াহ্নে উপনীত। আমার একমাত্র গুণের দিক থেকে বিবেচনা করলে আমি আজ পঞ্চম প্রজন্মের সিঁড়িতে। আমার নিজের দৌহিত্র-দৌহিত্রী রয়েছে। এবারের ঈদে আমাকে সালামী দেওয়ার মতো কেউ নাই। বরং সালাম করলে প্রায় সকলকেই আমার সালামী দিতে হবে। এটাও ভিন্ন ধরনের আনন্দ; বিচিত্র ধরনের আস্বাদন। আমার দৌহিত্রী-দৌহিত্র সকলেই ঈদের জন্য নানারকমের সাজগোজের সামগ্রী ক্রয়ে এবং উপহার পেতে আহ্লাদিত এবং ব্যস্ত। এই বৃদ্ধ বয়সেও নিজের জন্য ঈদের জামা-কাপড় কিনতে আমারও আগ্রহের ঘাটতি নাই। পৃথিবীর যেখানেই সুন্দর পাঞ্জাবির কাপড় অথবা পাঞ্জাবি পাওয়া যায়, সবসময়ের মতো এবারও সংগ্রহের চেষ্টায় আছি।
মৌলিক অধিকার-বিবর্জিত বাংলাদেশ একটা সংকটকাল অতিক্রম করছে। আমি বিশ্বাস করি, রমজানের সম্মানের খাতিরেই সমুদ্র উপকূলে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতের ভয়াবহতা থেকে মহান আল্লাহ্‌ আমাদের রক্ষা করেছেন। যে জঙ্গি-সন্ত্রাস ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, সেই আতঙ্কও এবার ঈদের জামাতকে ঘিরে সমগ্র মানুষের। আল্লাহ্‌র কাছে আমার আকুল ফরিয়াদ, হারাম এই জঙ্গি-সন্ত্রাস থেকে আল্লাহ্‌ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল ঈদের নামাজ আদায়কারীদের রক্ষা করবেন। আমার আরও ফরিয়াদ, বিপথগামী বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত মানসিকতার যুবক, যারা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে মানুষ হত্যা করে একটা পৈশাচিক আনন্দ ও অনৈতিক পরিতৃপ্তি লাভের ঘনঘোর অমানিশার মধ্যে নিমজ্জিত, আল্লাহ্‌ তাদেরকে হেদায়েত করুন। তারা আমাদের দীনের পূর্ণতা আনয়নকারী খাতেমুন্নবীর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। এই নিবন্ধে আমি আরেকটি প্রাসঙ্গিক কথা উল্লেখ করতে চাই। জঙ্গি-সন্ত্রাস ইসলামে হারাম এটা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এই প্রসঙ্গে জোরালো প্রতিবাদ করার ততখানি সাহস না দেখিয়ে যারা মিনমিন করে কথা বলেন, জানি না তারা জঙ্গি সন্ত্রাসীদের ব্যক্তিগত জিঘাংসায় আতঙ্কিত কি না। তারা প্রায়শই জঙ্গি-সন্ত্রাসের সাথে মৌলবাদ শব্দটি সংযুক্ত করে দেন। এটা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যাই হোক, এই সংযুক্তি বিরাট বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। মৌলবাদের অর্থ হচ্ছে- যেকোনো জিনিসের মৌল বা মূল আদর্শকে অবিকৃত ধারায় অনুসরণ করা। তাই মৌলবাদী বললে শুধু ইসলাম নয়, যেকোন ধর্মানুরাগীর মূল বিশ্বাসের প্রতি কটাক্ষ করা হয়। এটা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং পরিত্যাজ্য। এখানে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য যে, জেহাদে কাফেরের হাত থেকে অস্ত্র পড়ে গেলে নিরস্ত্র অবস্থায় তার উপর অস্ত্রাঘাত করা মহানবী সম্পূর্ণ নিষেধ করেছেন। এই জীবনমুখী, মানবতাবাদী মূল্যবোধ ইসলামের মূল ও মৌলিক নির্দেশ। এই নির্দেশ অনুসরণ করলে এবং প্রতিটি পরিবার থেকে এটি অনুসরণের সৎ ও শাশ্বত তাগিদ থাকলে পৃথিবীজোড়া জঙ্গি ও সন্ত্রাস থেমে যেত। ঈদকে সামনে রেখে আমি পুনরুল্লেখ করতে চাই- আল-কায়েদা, তালেবান, আইএস-এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো ক্ষেত্রবিশেষে আমেরিকার সৃষ্টি এবং ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এখন এদের পৃষ্ঠপোষক। অথচ দায়ভার বহন করতে হচ্ছে মুসলমানদের। মোসাদ বিভিন্ন কৌশলে মুসলিম তরুণদের বিভ্রান্ত করে একটা অনৈতিক কূপমণ্ডুকতায় তাদের মগজ ধোলাই করে নিরীহ মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে এবং ইসলামের নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাছাড়া মুসলমানরাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এদের হাত থেকে মসজিদ ও ঈদের জামাতও নিরাপদ নয়। সত্যিকার ইসলামিক চিন্তার অনুসারীর দ্বারা মসজিদ ও ঈদের জামাত কখনোই আক্রমণের শিকার হতে পারে না। পৃথিবীর কোনো মানুষ, বিশেষ করে মুসলমানরা তাদের এই বর্বরোচিত ইসলাম-বিরোধী কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন থাকতো না।
মহান আল্লাহ্‌ রক্ষা করেছেন, না হলে গতবছর শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে ওদের আক্রমণটি সংঘটিত হতে পারলে যে বীভৎসতার সৃষ্টি হতো, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। অন্যদিকে পৃথিবীর বিশাল পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কী নিদারুণভাবে বিকৃত হতো- সেটি সহজেই অনুমেয়। সকল মুসলমানের প্রতি আমার বিনম্র অনুরোধ, আসুন এবারের ঈদে আমরা পরম করুণাময় আল্লাহ্‌র কাছে ফরিয়াদ তুলে ধরি- রমজানের সম্মানে ঈদুল ফিতরের জামাতগুলো নিরাপদ রাখার স্বার্থে ওইসব ভ্রান্ত ও ইসলামের চেতনা-বিচ্যুত সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুসলিম উম্মাহ্‌কে রক্ষা করুন। ঈদ সকল মুসলমানের জন্য আনন্দ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা বয়ে আনুক। আমীন। সুম্মা আমীন ॥
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

অসম প্রেম by ফারহান ইশরাক রাফি

পশ্চিমা দুনিয়ায় অসম প্রেমে মজেছেন একাধিক রাজনীতিক। তাদের বয়সের ব্যবধান এত বেশি যে তা নিয়ে মাঝে মাঝেই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। বেশ রসিয়ে রসিয়ে সে কাহিনী বর্ণনা করা হচ্ছে ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলোতে। সঙ্গে চটকদার সব ছবি। এর সবটাই এখানে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবু স্মরণ করিয়ে দেয়া যায় ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনির কথা। আর হাল সময়ে ফ্রান্সের নির্বাচনে বাজিমাত করা এমানুয়েল ম্যাক্রনের কথা। বৃটেনের এমপি কেভিন ফস্টার, এমপি প্রার্থী ডেহেনা ডেভিডসনের কথাই বা বাদ রাখি কেন!
সিলভিও বেরলুসকোনি তো এরই মধ্যে লোকমুখে প্লেবয় খেতাব পেয়ে গেছেন। তিনি নারীসঙ্গ ভীষণ পছন্দ করেন। স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটেছে সে অনেক আগে। তারপর থেকে তার চেয়ে প্রায় ৫০ বছরের ছোট এক গার্লফ্রেন্ড, যুবতী ফ্রাঁসেসকা প্যাসক্যালের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছেন বেরলুসকোনি। সিলভিও বেরলুসকোনির বয়স এখন ৮০ বছরের ওপরে। তার প্রেমিকা ফ্রাঁসেসকার বয়স ৩১ বছর। অর্থাৎ তার চেয়ে প্রায় ৫০ বছরের ছোট। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেকদিন ধরেই চলছে। ঘনিষ্ঠতা এতটা গভীরে গেছে যে, পশ্চিমা কোন কোন মিডিয়া বলছে তারা গোপনে বিয়েও করে নিয়েছেন। এই বিয়ে হয়েছে বেরলুসকোনির বাড়িতে। ফ্রাঁসেসকার সঙ্গে বেরলুসকোনির জানাশোনা যখন ফ্রাঁসেসকা টিনেজ তখন থেকেই। তখন বেরলুসকোনির ঘরে স্ত্রী থাকলেও তার চোখ পড়েছিল ফ্রাঁসেসকার টলটলে শরীরের ওপর। ওই সময় ফ্রাঁসেসকা যোগ দিয়েছিলেন বেরলুসকোনির ফোরজা ইতালিয়ার এক পার্টিতে। সেই যে তার ওপর দৃষ্টিবর্শা নিক্ষেপ করেছেন বেরলুসকোনি তা থেকে মুক্তি পাননি ফ্রাঁসেসকা। তাদের এক বন্ধু ইতালিয়ান রেডিওতে বলেছেন, মিলানে অবস্থিত বেরলুসকোনির ব্যক্তিগত এক বাড়িতে তারা বিয়ের কাজটিও সেরে ফেলেছেন। বাইরের দুনিয়ার কাউকে সে বিষয়টি আঁচ করতে দেয়া হয়নি। উল্লেখ্য, ইতালির মতো দেশে টানা তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ধনকুবের বলে পরিচিত সিলভিও বেরলুসকোনি। তার রয়েছে টেলিভিশনসহ অনেক মিডিয়া। ফ্রাঁসেসকা ছিলেন টিভির শো-গার্ল। একপর্যায়ে একটি টিভি স্টেশন থেকে বুলগেরিয়ার অভিনেত্রী মিশেল বোনেভ দাবি করেন ফ্রাঁসেসকা একজন সমকামী। একথার পর তখন মিস ফ্রাঁসেসকা এক কোটি ইউরো ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসেন। তার দাবি ওই মন্তব্য মানহানিকর। ওদিকে সিলভিও বেরলুসকোনি তার ব্যক্তিগত বাড়িতে মাঝে মাঝেই নগ্ন নারীদের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আলোচনায় আসতে থাকেন। তিনি ‘বুঙ্গা বুঙ্গা’ নামে পার্টি দেন। সেখানে অর্থের বিনিময়ে মরক্কোর এক যুবতীর সঙ্গে অপ্রাপ্ত বয়সে শারীরিক সম্পর্ক গড়েছিলেন বেরলুসকোনি এমন অভিযোগও আছে। এরই মাঝে ‘বুঙ্গা বুঙ্গা’ পার্টির এক যুবতী মেরিথেল পোলানকো বলেছেন, গোপন এক অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মিস বোনেভ ওই অভিযোগ করার কয়েকদিন আগে পোলানকো বলেন, গোপন এক অনুষ্ঠানে বিয়ে করে নিয়েছেন বেরলুসকোনি ও ফ্রাঁসেসকা। তিনি বলেন, এটা একটি সাধারণ বিয়ে ছিল না। এটা ছিল সিলভিওর বাড়িতে বিয়ে। এ বিষয়টি কেউ জানতে পারেনি। তিনি ইতালিয়ান রেডিও স্টেশন ২ কে বলেছেন, তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। আমি যেতে পারিনি। কারণ, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে আমাকে থাকতে হয়েছিল লেবার রুমে। যাহোক তা সত্ত্বেও তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানিয়েছি। তারা বিয়ে সেরে ফেলেছেন। ওদিকে স্ত্রী ভেরোনিকা ল্যারিওর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি করে নেন বেরলুসকোনি। ১২ লাখ পাউন্ডে দফারফা হয়। কিন্তু তার মধ্যে যে নারীক্ষুধা তা মেটেনি। বেরলুসকোনি ও ফ্রাঁসেসকার মধ্যে বিয়ের যে কথা বলা হচ্ছে তা নিরেটভাবে যাচাই করা যায়নি। তবে এবার ফ্রান্সে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রনকে টিপ্পনি কাটতে ছাড়েননি তিনি। ফ্রান্সের নতুন ফার্স্টলেডি ব্রিজিত ট্রোগনিউসকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রন ও ফার্স্টলেডি ব্রিজিততে নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, এমানুয়েল ম্যাক্রন হলেন একজন চমৎকার পুরুষ। তার সঙ্গে রয়েছে সুদর্শনা এক ‘মাম’ বা মা।
ঝড় তোলা ম্যাক্রোন-ব্রিজিত প্রেম
এবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অকস্মাৎ ঝড় তোলা এমানুয়েল ম্যাক্রোন বিয়ে করেছেন তার চেয়ে ২৫ বছরের বড়, তারই স্কুল শিক্ষিকা ব্রিজিত ট্রেগনেউক্স’কে। ম্যাক্রোনের বয়স এখন ৩৯ বছর। ব্রিজিতের বয়স ৬৪ বছর। অর্থাৎ নিজের চেয়ে প্রায় ২৫ বছরের ছোট ম্যাক্রোনের স্ত্রী, ফার্স্টলেডি ব্রিজিত। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ব্রিজিতের প্রেমে পড়েছিলেন ম্যাক্রোন। টিনেজ ম্যাক্রোনকে তখন স্কুলে পড়াতেন ব্রিজিত। সেখানে এমানুয়েলে ম্যাক্রোনের নাটকের কোচও ছিলেন ব্রিজিত। তখন থেকেই তিনি ব্রিজিতকে তার স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার বাসনা পোষণ করেছিলেন। তার মনে জেগে উঠেছিল বাঁধভাঙ্গা এক প্রেমের অতল সমুদ্র। ফ্রান্সে এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফায় সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে থাকা ম্যাক্রোন সম্পর্কে সেই ব্রিজিত বলেছেন, ম্যাক্রোনের বয়স যখন ১৭ বছর তখনই সে আমাকে কথা দিয়েছিল- আমাকে বিয়ে করবেই। ব্রিজিত বর্তমানে সাত নাতীপুতির নানী-দাদী। এই বয়সে এসে তার ললাটে লেখা হয়েছে ফ্রান্সের ফার্স্টলেডি। এমন ঘটনা বিরল। আধুনিক ইতিহাসে ফ্রান্সের সবচেয়ে তরুণ বা কম বয়সী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ম্যাক্রোন। এই স্বামীর সঙ্গে কিভাবে ভালবাসা গড়ে ওঠে সে বিষয়ে বর্ণনা দিয়েছেন ব্রিজিত। তিনি বলেছেন, ম্যাক্রোনের বয়স যখন ১৫ বছর তখনই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। পরে সে আমার কাছে বিস্ময়কর এক প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৭ বছর বয়সে ম্যাক্রোন আমাকে বলে যে, তুমি যা-ই করো আমি তোমাকে বিয়ে করবোই। উত্তর ফ্রান্সের অ্যামিয়েনসে বেসরকারি জেসুট স্কুলে গড়ে ওঠে আমাদের এ সম্পর্ক। আমি থিয়েটারের কোচ ছিলাম। সেখানে অভিনয় করতো ম্যাক্রোন। তখন আমি পরিচিত ছিলাম ব্রিজিত আউজিয়েরে নামে। আমার ছিল তিন সন্তান। ওই সময় আমি নাটকের ক্লাবটি তদারকি করতাম। স্কুলের শেষ বছরে ম্যাক্রোন চলে যায় প্যারিসে। ওই সময় আমাদের একে অন্যের সঙ্গে সব সময়ই কথা হতো। ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতো। টেলিভিশনের এক ডকুমেন্টারিতে ব্রিজিত বলেছেন, ১৮ বছর বয়সে একটু একটু করে আমার ভিতরকার সব বাধা সে কাটিয়ে ওঠে এক অবিশ্বাস্য পথে, ভীষণ ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়ে। আসলে মননে সে একজন টিনেজ ছিল না। অন্য সব পূর্ণবয়স্কদের সঙ্গে তার সম-সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তার সঙ্গে যোগ দিতে আমিও ছুটে যাই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটাই। তারপর যা হবার তা-ই হলো। ২০০৭ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। কিন্তু আমি আমার নতুন এ স্বামীর নাম আমার সঙ্গে যোগ করলাম না। আমি রয়ে গেলাম ব্রিজিত ট্রেগনেউক্স। স্ত্রী ব্রিজিত সম্পর্কে এমানুয়েল ম্যাক্রোন ফ্রেন্স টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, আমার স্ত্রীকে আমি লুকিয়ে রাখিনি। সে আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সব সময়ই থাকবে। এপ্রিলে সমর্থকদের সামনে তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে এক মঞ্চে এই যুগল একে অন্যকে চুমু দেন। তারপর ম্যাক্রোন বলেন, এই নারীর কাছে আমি ভীষণভাবে ঋণী। কারণ, আজকের এই আমাকে গড়ে তোলার জন্য তার অবদান অনেক বেশি। উল্লেখ্য, ম্যাক্রোন দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন প্যারিস নানটেরে ইউনিভার্সিটিতে। যোগ দিয়েছিলেন ফ্রান্সের অভিজাতদের জন্য নির্ধারিত ইকোলে ন্যাশনালে ডি’অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করতে। কয়েক বছর সরকারি চাকরি করার পর তিনি রোটচাইল্ড-এ একজন বিনিয়োগকারী ব্যাংকারে পরিণত হন। এরপর তিনি দ্রুত ক্যারিয়ারের শিখরে উঠে যেতে থাকেন। আয় করতে থাকেন মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরো। এরপর তিনি ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দু’বছর পরে দায়িত্ব পান অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে। তার বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সমকামী সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে গত ফেব্রুয়ারিতে। তিনি অস্বীকার করেছেন এ অভিযোগ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অভিযোগ করে যে, তিনি সমকামীদের একটি লবি’কে সমর্থন করেন। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, রেডিও ফ্রান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ গ্যালেটের সঙ্গে তার সমকামী সম্পর্ক রয়েছে। এ অভিযোগ শুনে ম্যাক্রোন হেসেছিলেন। তিনি ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সরকারে বড় ভূমিকা রাখবেন ফ্রান্সের নতুন ফার্স্টলেডি
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প নিউ ইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারে। ছেলে ব্যারনের পড়াশোনার জন্য স্বামী, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ছেড়ে এখানে থাকতে হচ্ছে তাকে। সরকারে বা সমাজ সংস্কারে তার ভূমিকার জন্য অনেক সমালোচনা আছে। তবে দৃশ্যত তার মতো হবেন না ফ্রান্সে সদ্য ফার্স্টলেডির খেতাব যুক্ত হতে যাওয়া ব্রিজিত ট্রোগনিউক্স (৬৪)। স্বামী এমানুয়েল ম্যাক্রোনের মধ্যপন্থি সরকারে তিনি বড় একটি ভূমিকা রাখবেন। তিনি সরকারের ভিতরে মুক্তভাবে কাজ করবেন। শিক্ষা সংস্কারে রাখবেন সক্রিয় ভূমিকা। এসব কথা বলা হয়েছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে। উল্লেখ্য, এমানুয়েল ম্যাক্রোনের চেয়ে ২৫ বছরের বড় ব্রিজিত। তিনি সাবেক স্কুল শিক্ষিকা। ম্যাক্রোনের বয়স যখন ১৫ বছর তখন ব্রিজিতেরই ছাত্র ছিলেন তিনি। আস্তে আস্তে ব্রিজিতের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন ম্যাক্রোন। তার বয়স যখন ১৭ বছর তখন ব্রিজিতকে সরাসরি বলে ফেলেন, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। ব্রিজিত তখন ৩ সন্তানের মা। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্রিজিতের সঙ্গে তার পূর্বের স্বামীর বিচ্ছেদ ঘটে। তিনি বিয়ে করেন এমানুয়েল ম্যাক্রোনকে। সেই ভালোবাসার উপহার হিসেবে ব্রিজিতকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদে উঠাতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোন। ব্রিজিত এখন ৮ নাতিপুতির নানী-দাদী। তাকে নিয়ে আগ্রহ চারদিকে। বলা হচ্ছে, তিনি অন্যদের মতো নন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামার মতো জোরালো ভূমিকা রাখবেন তিনি। বিশেষ করে শিক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকায় তিনি এ খাতে নজর দিতে পারেন।
বয়সের ব্যবধান ২৮
ফ্রান্সের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোন ও তার স্ত্রী ব্রিজিতের বয়সের ফারাক শুনে অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন। ব্রিজিতের চেয়ে ম্যাক্রোন ২৫ বছরের ছোট। সেই একই রকম ঘটনার জন্ম হতে যাচ্ছে এবার বৃটেনে। সেখানে কনজারভেটিভ দল থেকে নির্বাচিত এমপি কেভিন ফস্টার। তার বয়স ৩৮ বছর। কিন্তু তিনি আগামী মাসেই ১০ই জুন বিয়ে করতে যাচ্ছেন তার থেকে ২৮ বছরের বড় হ্যাজেল নুনান (৬৬) কে। প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ঘোষিত জাতীয় নির্বাচনের দু’দিন পরেই এ বিয়ে করতে যাচ্ছেন তারা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে নিয়ে বৃটিশ মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। তাদের এমন অসম বিয়ে নিয়ে ফরাসি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোন ও ব্রিজিতের প্রেম, বিয়ের সঙ্গে তুলনা করছেন অনেকে। কেভিন ও নুনান বলেছেন, তাদের প্রেমের ক্ষেত্রে বয়স কোন ব্যবধান নয়। আসল কথা হলো তারা দু’জনে একে অন্যকে ভালোবাসেন। কভেন্ট্রিতে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ২০০০ সালে প্রথম তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় কাউন্সিল নির্বাচনে লড়াই করছিলেন হ্যাজেল নুনান। সেই সাক্ষাতের পর তাদের মধ্যে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠতে থাকে প্রেম। সেই প্রেমই পরিণতি পেতে যাচ্ছে আগামী মাসে। বিয়ে নিয়ে যুবতী মেয়েরা যেমন প্রস্তুতি নিতে থাকেন, তাদের মনের মধ্যে ভাসতে থাকে না পরিকল্পনা, একই রকম হ্যাজেল নুনানের মধ্যেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই মধ্যে তার হাতে পরিয়ে দেয়া হয়েছে এনগেজমেন্টের আংটি। আহামরি কিছু নয় তা। সাধারণ স্বর্ণ আর তার ওপর বসানো ছোট্ট ছোট্ট হীরা। এর অর্থমূল্য খুব বেশি নয়। হ্যাজেল নুনান বলেছেন, এ উপহারের সঙ্গে মিশে আছে আবেগ। তার মূল্য অসীম। তাদের মধ্যকার এ প্রেমের কাহিনী জানেন কেভিন ফস্টারের মা লিন্ডা। তাই তিনিই তিন বছর আগে হ্যাজেল নুনানকে পরিয়ে দিয়েছেন ওই এনগেজমেন্টের আংটি। এর মধ্য দিয়ে নুনানের সঙ্গে ফস্টারের সম্পর্ককে পাকা করে রেখেছেন লিন্ডা। এ ঘটনায় অনেক আলোচনা। কিন্তু বিষয়টি প্রাপ্ত বয়স্ক এ দু’জনের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন লিন্ডা। তাই কেভিন ফস্টার বলেন, হ্যাজেল নুনান অনেক বেশি বয়সী এ বিষয়টি আমি বাস্তব অর্থেই কখনো ভাবিনি। প্রথমে আমাদের যখন সাক্ষাৎ হলো তারপর থেকে আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। রাজনৈতিক সহকর্মীও। আমরা একই জিনিস পছন্দ করি। তারপর থেকে আমরা একসঙ্গেই চলছি। আমরা একে অন্যের খুব কাছে রয়েছি। হ্যাজেল নুনান একই সঙ্গে আমার প্রেমিকা ও বেস্ট ফ্রেন্ড। একই রকম কথা বলেন হ্যাজেল নুনান। তার কথায়, আমরা একে অন্যের প্রেমে পড়েছি। একজন অন্যজনের সাহচর্য উপভোগ করি। ২০০০ সালের সাক্ষাতের পর তাদের মধ্যে যে প্রেম গড়ে উঠেছে সে বিষয়টি বাইরের মানুষের চোখে পড়েছে। ওই সময় হ্যাজেল নুনান বিবাহিত ছিলেন। তার বয়স তখন ৪৮ বছর। তার ছিল দুটি সন্তান। তারা বড় হয়ে গেছে তখন। ২০১০ সালে দু’জনে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হ্যাজেল নুনান নির্বাচন করেন কভেন্ট্রি নর্থ-ইস্ট থেকে। কেভিন কভেন্ট্রি সাউথ থেকে, যদিও কেউই ওই নির্বাচনে বিজয়ী হননি। এর সাত বছর আগেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে হ্যাজেল নুনানের। তার সাবেক স্বামী মারা যান। এ সময়ই তাদের ঘনিষ্ঠতা তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকে। কেভিন ফস্টার বলেন, হ্যাজেল ও আমি একত্রে বহু সময় কাটাতে থাকি। ২০১০ সালের শেষের দিকে এসে তাদেরকে লোকজন ‘কাপল’ বা দম্পতি হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু করে। কেভিন বলেন, অনেক দিন পর্যন্ত মানুষজনকে, পরিবারের ঘনিষ্ঠদের আমি বলিনি যে আমরা একত্রে আছি। কারণ, সমাজের প্রতিক্রিয়া কি হবে তা নিয়ে আমাদের মাঝে ছিল উদ্বেগ। হ্যাজেল নুনান বলেন, আমার মনে আছে ২০১১ সালের কথা। তখন কভেন্ট্রির বিশপের কাছ থেকে একটি আমন্ত্রণ পাই। তাতে লেখা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস কেভিন ফস্টার’।
ঠিক উল্টো যাত্রা
আগামী ৮ই জুন বৃটেনে পার্লামেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত যেসব প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে অসম প্রেম রয়েছে কমপক্ষে দু’প্রার্থীর। এর একজন হলেন এমপি কেভিন ফস্টার (৩৮)। অন্যজন হলেন ডেহেনা ডেভিসন (২৩)। প্রথমজন তার থেকে ২৮ বছরের বড় ৬৬ বছর বয়সী নারী হ্যাজেল নুনানের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছেন। পার্লামেন্ট নির্বাচনের দু’দিন পরেই ১০ই জুন তাদের বিয়ে হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে ডেহেনা ডেভিসন হলেন ২৩ বছর বয়সী একজন ছাত্রী। তিনি একটি কম্পিউটার গেমের দোকানে কাজ করেন। তবে তার ভালোবাসায় রয়েছেন তার থেকে ৩৪ বছরের বড় স্থানীয় কাউন্সিলর জন ফারেহাম (৫৭)। কেভিন ফস্টার ও ডেহেনা ডেভিসন দু’জনেই ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির। ডেহেনা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আসনে। এ আসনটি হলো ডারহামের সেজফিল্প। ১৯৩৫ সাল থেকে আসনটি বিরোধী লেবার দলের দখলে। এ আসনে ২৪ বছর ধরে এমপি ছিলেন টনি ব্লেয়ার। এখানে কনজার্ভেটিভদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবু ডেভিসন বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা জানি সেজফিল্ড হলো লেবারদের ঘাঁটি। আমরা এটাও জানি সেই লিগেসির দিন এখন শেষ হয়ে গেছে। ওই আসনে বহু মানুষ আছেন যারা আমাদের পক্ষ অবলম্বন করবেন। এটা করবেন লেবার দল নেতা জেরেমি করবিনের কারণে। লোকজন এরই মধ্যে তার কারণে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র পক্ষাবলম্বন করা শুরু করেছে। উল্লেখ্য, ডেভিসনের জন্ম শেফিল্ডে। তার মা একজন নার্স ও পিতা একজন ব্যবসায়ী। তিনি বৃত্তি নিয়ে একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ার সময় মাত্র ১৫ বছর বয়সে কনজার্ভেটিভ দলে যোগ দেন। এর ঠিক দু’বছর আগে ১৩ বছর বয়সে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে তার জীবনে। ওই সময় তার পিতাকে হত্যা করা হয়। সেই আঘাত তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তারপরও তিনি বৃটিশ রাজনীতি ও আইনী বিষয়ে পড়াশোনা করতে ছুটে যান হাল-এ। সেখানেই এখন শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। আর এর ফাঁকে স্থানীয় একটি কম্পিউটার গেমসের দোকানে চাকরি করছেন। পড়াশোনার ডিগ্রি অর্জনের অংশ হিসেবে কনজার্ভেটিভ জ্যাকব রিস-মগ এর অধীনে সহকারীর কাজ করেছেন এক বছর। ২০১৫ সালে তিনি হাল নর্থ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই নির্বাচনে লেবার দল ও ইউকিপের পরেই অর্থাৎ তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। এতে ওই এলাকায় কনজার্ভেটিভ দলের ভোট বৃদ্ধি পায়। এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় প্রফুল্ল মনের অধিকারী কনজার্ভেটিভ দলের কাউন্সিলর জন ফারেহাম (৫৭) এর সঙ্গে। তার সঙ্গে আস্তে আস্তে প্রেম জমে ওঠে ডেভিসনের। এ নিয়ে অনেক সমালোচনা। তার চেয়ে ৩৪ বছরের বড় ফারেহাম। একে বিরাট এক অসম প্রেম বলে আখ্যায়িত করেন অনেকে। কিন্তু বয়সের এই বিশাল ফারাক সম্পর্কে ডেভিসন বলেছেন, বয়স গণনা হলো সংখ্যা। এর মধ্যে ফারাক খোঁজার কোনো অর্থ হয় না। এর আগে তাদের প্রেম নিয়ে বেশ খোলামেলা আলোচনা করেছেন তিনি। বলেছেন, আমি সব সময়ই পরিপক্ব। আমার পরিবার জানে আমি কোন সিদ্ধান্ত আলতোভাবে নিই না। তাই তারা সব ক্ষেত্রেই আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। আমি সুখী হলে তারাও সুখী হয়। তারা মনে করেন জন ফারেহাম আমাকে সুখী রাখছেন।
ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ পার্টির উচ্চ পর্যায়ে ডেভিসন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের সঙ্গে তার একটি ছবি টুইটারে পোস্ট করে। তার স্লোগান হলো- স্ট্যার্ন্ডি উইথ তেরেসা মে ইন সেজফিল্ড। অর্থাৎ তেরেসা মের হয়ে সেজফিল্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। ডেভিসন বলেছেন, তিনি আশা করেন প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই ওই নির্বাচনী আসন সফরে যাবেন। তবে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- এটা তো সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আসন। এখানে নির্বাচনের শক্তি পেলেন কি করে। জবাবে ডেভিসন বলেন, আমরা প্রেসের প্রচণ্ড মনোযোগ পাচ্ছি। বিশেষ করে সেজফিল্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য। আমি মনে করি এটা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারপরও এটা যে কারো কাছে একটি মার্জিনাল আসন। উল্লেখ্য, এ আসনে তার বিপরীতে লড়াই করবেন লেবার দলের ফিল উইলসন। তিনি দলীয় প্রধান জেরেমি করবিনের কঠোর সমালোচক।
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

শাকিব-অপুর যেভাবে কেটেছে বিয়ের ৯ বছর by কামরুজ্জামান মিলু

ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় দুই মুখ শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। ২০০৮ সালের ১৮ই এপ্রিল ভালোবেসে বিয়ে করেন তারা। এরই মধ্যে তারা পার করেছেন নবম বিবাহবার্ষিকী। তাদের একটি ছেলেও আছে। ছেলের নাম আব্রাহাম খান জয়। এই দম্পতিকে ঘিরে গত এক মাসে অনেক আলোচনা হয়েছে মিডিয়ায়। তার পরও থেকে যায় জীবনের নানান কথা। কারণ, বিয়ে করে সংসার করার পরও দীর্ঘদিন আড়ালেই ছিলেন তারা।
অপু ও শাকিবের বিয়ে নিয়ে এখনও ভক্ত বা পাঠকদের মনে জানার আগ্রহের কমতি নেই। কীভাবে শাকিব-অপুর পরিচয়, বন্ধুত্ব ও বিয়ে এবং বিয়ের পর কীভাবে কেটেছে গত নয়টি বছর? এসব বিষয়ে মানবজমিনের সঙ্গে জীবনের একান্ত কিছু কথা শেয়ার করেছেন অপু বিশ্বাস। 
শাকিব ও অপুর পরিচয়
তখন অপু বিশ্বাস বগুড়ায় সরকারি ইয়াকুব আলী স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে নবম শ্রেণির ছাত্রী। ২০০৫ সালে আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় ‘কাল সকালে’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এরপর শাকিব খানের বিপরীতে এফআই মানিকের ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবির জন্য প্রস্তাব পান অপু। সে সময় শাকিবকে তেমন চিনতেন না তিনি। কারণ, বাংলা ছবি তেমন দেখা হতো না তার। আর পরিবারের শাসনের কারণে সিনেমা হলে গিয়েও ছবি দেখা হয়ে ওঠেনি। অপু বলেন, যখন জানতে পারি নতুন ছবিতে আমার হিরো শাকিব খান, এটা জানার পর বাসায় সিডি ভাড়া করে এনে তার অভিনীত ‘শুভা’ ছবিটি দেখলাম। তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। প্রয়াত গুণী নির্মাতা চাষি নজরুল ইসলামের পরিচালনায় এ ছবিতে শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করেন পূর্ণিমা। এ ছবিটা দেখার পর আমার বান্ধবীরা (বৃষ্টি, সিমিম, রিক্তা) সকলে বলল, শাকিব তো বেশ ভালো অভিনয় করেন। আমার বাংলা ছবি তখন তেমন দেখা হতো না। বলিউডের শাহরুখ খানের ছবি দেখা হতো বেশি। শাহরুখ খান ছিল আমার প্রিয় নায়ক। শাকিব খানের সঙ্গে প্রথম আমার দেখা এফডিসিতে। আমার মনে আছে সেই দিনটার কথা। ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’ ছবির সেটে ছিলেন শাকিব। তখন পরিচালক এফআই মানিক ভাই আমার সঙ্গে শাকিবের পরিচয় করিয়ে দেন। তখন বগুড়া থেকে এসে উত্তরায় আমাদের পারিবারিক আত্মীয় রাজু ভাইয়ের বাসায় থেকে আমি ‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবির কাজ শুরু করলাম। নায়করাজ রাজ্জাক আংকেলকে আমার মা খুব পছন্দ করতেন। মূলত সিনেমা করতে গেলে এই অঙ্গনের অনেকের সঙ্গে দেখা হবে, এই ভেবে অনেকটা শখের বশে কাজ শুরু করা হয় আমার।
অপুকে শাকিবের প্রথম প্রেমের প্রস্তাব
‘কোটি টাকার কাবিন’ ছবির জন্য সাভারে শুটিং সেট ফেলা হয়। সেখানে কাজ করতে গিয়ে তাদের সঙ্গে আন্তরিকতা গড়ে ওঠে। আর এক্ষেত্রে অপুর কথা মতো শাকিব খান এক ধাপ এগিয়ে ছিলেন। অপু বলেন, প্রথম ছবি থেকেই শাকিব আমার দিকে রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। আমার মা (শেফালী বিশ্বাস) শুটিংয়ে আমার সঙ্গে সবসময়ই থাকতেন। তাই মাকে আমি বেশি দোষ দিতে চাই। কারণ, ছোটবেলা থেকে আমি গার্লস স্কুলে বান্ধবীদের সঙ্গে মিশেছি। বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না আমাদের। তাই তেমন ঘুরতে বের হতে পারতাম না আমি। কড়া শাসনে আমাকে থাকতে হয়েছে। যে কারণে কোনো ছেলেবন্ধু ছিল না আমার। বাড়ি থেকে বাইরে একা কোথাও ছাড়ত না। খুব বেশি শাসন না করলে হয়তো আমার জীবনে এত বড় ভুল হতো না। এসবের কারণে ছেলেমানুষের সঙ্গে একটা নতুনত্ব ছিল আমার কাছে। প্রথম ছবিতে একটি দৃশ্য ছিল যে, দৌড়ে এসে শাকিব খানকে জড়িয়ে ধরার। একটা সময় আমি দৌড়ে আসলেও আমি শাকিবের সামনে এসে ফ্রিজ হয়ে যেতাম। জড়িয়ে ধরতে পারতাম না। তখন পরিচালক মানিক ভাই শটটা ঘুরিয়ে দিলেন। তখন উল্টো শাকিব দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই সময়ের সেই মুহূর্তটি আমার কাছে ভিন্ন রকম ছিল। অপু আরও বলেন, এরপর শাকিব আমাকে বিভিন্নভাবে বলেছে যে, আমি শাকিবের কাছে প্রথম ভালোলাগার মতো একটি মেয়ে। তার জীবনে এর আগে এমন মেয়ে আসেনি। তখন শুটিংয়ে আমি একটা ফোন ব্যবহার করতাম। তখন শুটিং বিরতিতে ইশারা করে আমার কাছে ফোন নাম্বার চাইল একদিন শাকিব। আমি টিসুতে আইভ্রু পেন্সিল দিয়ে লিখে আমার ফোন নাম্বারটা শাকিবকে দিয়েছিলাম। শাকিব এরপর প্রায়ই ফোন দিত। অনেক সময় মা ফোন ধরলে শাকিব ফোন কেটে দিত। আমি ফোন রিসিভ করলে কথা বলত, এমন ঘটনা প্রায়ই হয়েছে। নাম্বারটা দেওয়ার পর ফোনে কথা শুরু হয় আমাদের।
অপুর জন্য শাকিবের বগুড়া- শিলিগুড়ি ও দার্জিলিং যাওয়া
বগুড়ায় এসএসসি পাস করার পর সিনেমা ছেড়ে ইন্ডিয়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অপু। সেখানে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কারণ, ভারতে অপুর মেজো বোন লতা সিংহ রায় থাকতেন। অপু এ প্রসঙ্গে বলেন, ইন্ডিয়াতে যাওয়ার কারণ হচ্ছে সিনেমা কন্টিনিউ করার ইচ্ছে ছিল না আমার। তখন শাকিব আমার জন্য বেশকিছু দিন বগুড়া গিয়েছিল এবং পরে আমি ইন্ডিয়া যাওয়ার পর বাই রোডে লালমনিরহাট পাটগ্রামের বুড়িমারী বর্ডার হয়ে চেংড়াবান্ধা সীমান্ত দিয়ে শিলিগুড়ি গিয়েছিল শাকিব। লতা দিদি আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছেন। শাকিব খান শিলিগুড়ি যাওয়ার পর দিদি বলল, শাকিব যেহেতু এত দূর এসেছে ঠিক আছে তুই দেখা কর। তিন দিন সেখানে একটি তিন তারকা হোটেলে ছিল শাকিব। এটা ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছিলেন অপু। ওই সময় শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস শুটিংয়ে না একসঙ্গে সময় কাটাতে দার্জিলিংয়ে ঘুরতে যান। আর সেখানে অপুকে দেখতেই মূলত ঢাকা থেকে আসেন শাকিব খান। অপু বিশ্বাস বলেন, সেদিন শাকিবসহ দার্জিলিং যাওয়ার সময় শেবক রাস্তায় একটা বড় কালীমন্দির আছে। সেখানে যেতে চাইলো শাকিব। কারণ, ওয়েদারটা খুবই ভালো ছিল। শাকিব জায়গার প্রেমে পড়ে যায়। আমরা তখন ওই মন্দিরে গেলাম। কেউই বাধা দেয়নি আমাদের। টিয়া কালারের একটি জ্যাকেট ও জিনস প্যান্ট পরেছিল শাকিব। মন্দিরে প্রবেশের পর পুরোহিত প্রশ্ন করলেন, আপনারা কারা ? তখন আমি উত্তরে বললাম, আমরা স্বামী ও স্ত্রী। মজা করেই আমি সেদিন বলেছিলাম। শাকিব বললো, আমি মাড়োয়ারি হিন্দু। তখন পুরোহিত বললো, তোমার স্ত্রীর কপালে সিঁদুর কোথায়। তারপর পুরোহিত শাকিবকে কপালে টিকা ও শাকিব আমার কপালে সিঁদুর দিয়ে দিল। সেই হিসেবে তখনই আমাদের বিয়ে হয়। যখন ঘুরাফেরা শেষ করে শাকিব ঢাকাতে ফিরল। আর ফেরার পথে বাসে শাকিব ফোন করে বলেছিল, সবকিছু রেখে শুধু আমার কলিজা নিয়ে বাসায় ফিরছি। একা ফিরতে খুব খারাপ লাগছে। এরপর আমার একটু একটু ভালো লাগা মনে কাজ করছিল। অপু আরও বলেন, এরপর আমি শাকিবের বিষয়ে ঢাকায় নানাভাবে কিছু খোঁজখবর নিয়ে সম্পর্ক থেকে পিছিয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি অন্য হিরোর বিপরীতে কাজ করব। আমি তখন হিরো মান্না ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম শাকিবের সঙ্গে আমার ভালোবাসাটা এ পর্যন্তই থাক। বিয়ে পর্যন্ত গড়াক এটা চাইনি। রাজ্জাক আংকেলের একটা প্রোডাকশনেও কাজ করার জন্য কথা হলো। তখন আমি ভেবেছি, শাকিবের সঙ্গে ছবি না করলে তো শাকিব আমার কাছ থেকে এমনিতেই দূরে সরে যাবে। শাকিবকে তখন বলেছিলাম, যা হওয়ার হয়েছে। ভালো বন্ধুত্ব আছে, সেটাই থাক আমাদের। এরপর ঢাকায় এসে আবার কাজ শুরু করলাম। কিন্তু শাকিবের খুব কাছের প্রযোজক ও প্রোডাকশন ম্যানেজার মামুনুজ্জামান মামুন ভাই আমার বাসায় এসে প্রায়ই শাকিবের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশংসা করতেন। কখনও খাসির মাংস, মাছ, পোলাও বিভিন্ন কিছু নিয়ে আসতেন। তিনি এসে বলতেন, শাকিব আপনাকে কতটা পছন্দ করেন, তা আপনি জানেন না। ইন্ডিয়া থেকে আসার পর থেকে শুধুই আপনার কথা বলছে। এরপর আস্তে আস্তে আমি শাকিবের প্রতি দুর্বল হলাম। পরে বগুড়ায় সরকারি মুজিবর রহমান মহিলা কলেজে পড়া শেষ করলাম। আর ছবিতে কাজ কন্টিনিউ করা শুরু হলো আমার। ছবিও হিট করা শুরু করল। ঢাকায় একেবারে চলে আসলাম। ব্যস্ততা বাড়ল আমার।
সম্পর্ক ও বিয়ে
জাকির হোসেন রাজুর ‘মনে প্রাণে আছো তুমি’ ছবিতে কাজ করতে গিয়ে আবারও শাকিব অপু এক হয়। এ ছবি করতে গিয়ে আবার ফোনে কথা বলা শুরু হয় শাকিব ও অপুর। সম্পর্ক সামনে এগুতো থাকলো। এরপর আবারও দ্বিতীয়বারের মতো শাকিবের প্রতি দুর্বলতা কাজ করা শুরু করলো অপু বিশ্বাসের। অপু বলেন, তখন শাকিব খান হ্যারিয়ার গাড়ি ব্যবহার করত। তখন আশুলিয়ার প্রিয়াঙ্কায় পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ‘কথা দাও সাথী হবে’ ছবির শুটিং চলছিল। একদিন গাড়িতে মামুন ভাই, শাকিব ও আমি ছিলাম। হঠাৎ শাকিব মামুন ভাইকে একটা জায়গায় নামিয়ে দিয়ে আমার সঙ্গে গাড়িতে কথা বলা শুরু করল। ওই ছবির শুটিং চলা অবস্থাতেই শাকিব বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তখন মিরপুর শাহ আলী মাজার রোডের একটি বাসায় থাকতাম আমি। শাকিব আমাকে সেদিন বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পর আমি শাকিবকে বললাম, এটা সিনেমা না আমার জীবন। স্বামী হিসেবে স্ত্রীকে যেসব মর্যাদা দেয়া উচিত সেগুলো আমি পাব কি-না সেটা জানতে চাই। তখন আমার সব কথা মেনে নিয়েছিল শাকিব। এরপর দুজনের সিদ্ধান্তে বিয়ে হয় আমাদের। ২০০৮ সালের  ১৮ই এপ্রিল শুক্রবার বিয়ে হয় আমাদের। মামুন ফরিদপুরে শাকিবের বাড়ির কাছ থেকে মজিবুর রহমান নামের এক কাজী সাহেবকে নিয়ে আসে এবং আমরা বিয়ে করি। বিয়ের পুরো বিষয়টি তখন কেবল আমার মেজ বোন লতা ও শাকিবের চাচাতো ভাই মনির জানতেন। এরপরের গল্পটা সবার জানা।
শাকিবের বাড়িতে অপু
বিয়ের পর শাকিবের বাসায় বেশিরভাগ সময় থাকতেন অপু বিশ্বাস। তবে অনেকটা লুকোচুরি করে থাকতে হয়েছে তাদের। তাই মাঝে মাঝে শুটিং শেষে অপু নিজের বাসায়ও চলে যেতেন। আবার কখনও গভীর রাতে শাকিবের গুলশানের দুইয়ের বাসায় উঠতেন এবং ভোরবেলা নিজের গুলশান নিকেতনের বাসায় গিয়ে রেডি হয়ে শুটিংয়ে বেরিয়ে পরতেন। অপু বলেন, বিয়ের পর গুলশান দুইয়ে শাকিবের বাসায় উঠলাম আমি। তবে দুজনেই শুটিং থাকার কারণে বেশ ব্যস্ততায় সংসার কাটে আমাদের। এরপর জানলাম, মনি নামে শাকিবের একটা ছোট বোন আছে। পরিবারের অজান্তে অন্য জায়গায় মনি বিয়ে করার কারণে শাকিব মনির সঙ্গে রাগ করে সাত বছর ধরে কথা বলতো না। পরে আমি শাকিবকে বুঝিয়ে মনিকে আমার বাসায় নিয়ে আসলাম। ভাইবোনকে এক করে দিয়েছি। যে কারণে শাকিবের বাসায় এখন মনি থাকেন। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সংসার করতে হয়েছে আমাকে। শাকিবের বাসায় আমার শ্বশুর (আব্দুর রব)-শাশুড়ি (রিজিয়া বেগম) থাকতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় শাকিবের পরিবার আমাকে কেনো পছন্দ করে না, সেটা আমি জানি না। এটা আমার কাছে খুবই কষ্টের। বিয়ের পর শাকিবের জন্য প্রথম রান্না কি ছিল জানতে চাইলে অপু বলেন, আমি শাকিবের জন্য বিয়ের পর প্রথম খিচুড়ি রান্না করেছিলাম। আমার হাতে ডেজার্ট আইটেম খেতে পছন্দ করে শাকিব। পোলাও, মম, ছানার মিষ্টি, বিরিয়ানি-এই ধরনের রিচ ফুড খেতে খুব পছন্দ করে শাকিব। এছাড়া প্রায়ই বগুড়া থেকে দই এনে শাকিবকে খাওয়াতাম। একবার শুটিং করতে ব্যাংককে গিয়ে শাকিব আমাকে ট্রিট দিলো। একটা জাপানিজ রেস্টুরেন্ট ছিল যেখানে খাবারগুলো ঘুরতো চারপাশে। আর নিজের পছন্দমত কাঁচা খাবার রান্না করে খাওয়া যেত। এভাবেই খাবারগুলো রাখা ছিল। ওখানের চিংড়ি টেম্পুরা আমাকে খাওয়াইছে শাকিব। এটা আমার খুব পছন্দের ছিল। ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’ ছবির শুটিংয়ে ব্যাংককে প্রথমে সিজলারে খাওয়ানোর পর ওই জাপানিজ রেস্তরাঁয় আমাকে খাওয়ায় শাকিব। এরপর যতবার আমাদের ব্যাংককে যাওয়া হয়েছে ততবার সেই রেস্তরাঁয় খাওয়া হয়েছে আমাদের। শুটিংয়ের বাইরে একবার ফুকেটের ফি ফি আইল্যান্ডে ঘুরতে গিয়েছিলাম আমি ও শাকিব। শুটিংয়ের বাইরে দুজনের তেমন ছবি ওঠানো হতো না। এর কারণ জানতে চাইলে অপু বিশ্বাস বলেন, আমি জানি না। অনেকে শুনলে হইতো বিশ্বাস করবে না যে, আমাদের বিয়ের ছবিটিও ওঠানো হয়নি। আর যেখানে আমরা ঘুরতে যাইতাম শাকিব ছবি ওঠাতে পছন্দ করতো না। তবে ফুকেটের ফি ফি আইল্যান্ডে ঘুরতে গিয়ে সবশেষ আমরা একটি ছবি তুলেছিলাম। তাছাড়া আমরা এত জায়গায় ঘুরেছি দুজনের তেমন কোনো ছবি নেই। পছন্দের মানুষকে উপহার দেয়ার বেলায় প্রথম ছিলেন অপু। সেই বিষয়ে তিনি বলেন, আমি শাকিবকে পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পোশাক পছন্দ করে কিনে দিতাম, অনেক পোশাক উপহারও দিয়েছি। আর শাকিবও আমাকে গলার হীরের মালাসহ বেশকিছু উপহার দিয়েছে।
শাকিব-অপুর সংসার
শাকিবের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে কলকাতার একটি হাসপাতালে নিজে বন্ডে সাইন দেয়ার পর সিজার হয় অপুর। ২০১৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর শাকিব ও অপুর ঘরে ছেলে সন্তান আব্রাহাম খান জয় আসে। তারপরও শাকিব এ খবর অপুকে গোপন রাখতে বলেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, দুজনের ক্যারিয়ারের স্বার্থে সন্তান ও বিয়ের কথা গোপন রাখার কথা বলেছিল শাকিব। তবে আমি অনেকদিন লুকোচুরি সংসার করেছি। অপেক্ষাও করেছি অনেকবার। এরপর আর দেরি করতে চাইনি। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে টিভি লাইভে গিয়ে বিয়ে ও সন্তানের বিষয়টি ক্লিয়ার করি। একটানা এই কথাগুলো বলেন অপু বিশ্বাস। বর্তমানে শাকিব বিভিন্ন সিনেমার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আর এবারের ঈদে অপু ও শাকিব অভিনীত একটি ছবি মুক্তি পাবে। বুলবুল বিশ্বাস পরিচালিত এ ছবির নাম ‘রাজনীতি’। এ ছবি মুক্তি পাবার পর আবারও নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অপু। আর শরীরের ওজন কমানোর জন্য বনানীর একটি ব্যায়ামাগারে নিয়মিত সময়ও দিচ্ছেন। তবে সকলের প্রত্যাশা শাকিব ও অপু আবারও এক ছাদের নিচে সংসার করবেন। সুখে থাকবেন। কারণ তাদের ঘরে এখন ফুটফুটে সন্তান আব্রাহাম খান জয়। শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের জীবনে পেছনে ফেলা আসা বা সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে সব জটিলতার অবসান হোক এটাই প্রত্যাশা সবার। 
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

সাগরদাঁড়ি থেকে ভার্সাই by পার্থপ্রতিম মজুমদার

মানুষের তৈরি চার্চের আমি ধার ধারিনে। আমি আমার স্রষ্টার কাছে ফিরে যাচ্ছি। তিনিই আমাকে তাঁর সর্বোত্তম বিশ্রাম- স্থলে লুকিয়ে রাখবেন। আপনারা যেখানে খুশি আমাকে সমাধিস্ত করতে পারেন- আপনাদের দরজার সামনে অথবা কোনো গাছতলায়। আমার কঙ্কালগুলোর শান্তি কেউ যেন ভঙ্গ না-করে। আমার কবরের ওপর যেন গজিয়ে ওঠে সবুজ ঘাস।
-মাইকেল মধুসূদন দত্ত
‘যে দেশে একজন সুকবি জন্মে,
সে দেশের সৌভাগ্য যে দেশে
সুকবি যশঃ প্রাপ্ত হয়, সে দেশের
আরও সৌভাগ্য। ...যে দেশের
শ্রেষ্ঠ কবি যশস্বী হইয়া জীবন
সমাপন করেন, সে দেশ প্রকৃত
উন্নতির পথে দাঁড়াইয়াছ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে যশস্বী
হইয়া মরিয়াছেন, ইহাতে বোঝা যায়
যে, বাঙ্গালা দেশ উন্নতির পথে
দাঁড়াইয়াছে’।...
- সাহিত্যিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
এই ক্ষণজন্মা মহাকবির (১৮২৪-১৮৭৩) জন্ম হয়েছিল আমাদেরই এই বাংলাদেশের কেশবপুর থানার অন্তর্গত যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে ২৫শে জানুয়ারি ১৮২৪ সালে। বাবা রাজ নারায়ণ দত্ত সেকালের রীতি অনুযায়ী ফার্সি ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। কলকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের ব্যবহারজীবীরূপে তিনি প্রভূত প্রতিষ্ঠা ও অর্থ উপার্জন করেছিলেন। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কলকাতায় যখন পরিবার নিয়ে যান, কবির বয়স তখন মাত্র সাত বছর। নিজ গ্রাম সাগরদাঁড়িতে মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। রামায়ণ মহাভারতের প্রতি আকর্ষণের বীজ সম্ভবত এই সূত্রেই তাঁর মনের কোণে সারা জীবন প্রজ্বলিত ছিল। এই ছোট্ট বয়সে তিনি ফার্সি ভাষার চর্চাও শুরু করেছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে গ্রামছাড়া হলেও নিজের শিকড়ের প্রতি তাঁর আন্তরিক আকর্ষণ সারা জীবন তাঁর মধ্যে টিকে ছিল। তাঁর সাহিত্য এবং তাঁর জীবনের নানা ঘটনা বিশ্লেষণ করলে নিজের উৎসের প্রতি তাঁর এই দরদ কত আন্তরিক এবং শক্ত ছিল, নির্ভুলভাবে তা বোঝা যায়। সাগরদাঁড়ি থেকে চলে যাবার তেত্রিশ বছর পরেও ছয় হাজার মাইল দূরে বসেও তিনি তাঁর শৈশবের গ্রামের প্রতি নাড়ির টান অনুভব করেছেন, বাল্য এবং কৈশোর কালে তাঁর মনে বিশেষ করে যা গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল, তা হলো গ্রামবাংলার নিসর্গ। যেসব সনেটে মাইকেল তাঁর বাল্যের লীলাক্ষেত্র ফেলে আসা সাগরদাঁড়ির স্বপ্ন দেখেছেন অথবা স্মরণ করেছেন স্বদেশের কথা, সেসব সনেটেই তাঁর ভাবাবেগ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। ‘কপোতাক্ষ নদ’ এই প্রসঙ্গে সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এ নদকে তিনি সতত মনে করেছেন এবং বিরলে বসে সতত এর কথা ভেবেছেন। তাঁর চেতনা এবং অবচেতনায় এই নদ, বস্তুত একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই আন্তরিকতা এবং গভীরতা পাঠককে নাড়া না দিয়ে পারে না।
সতত (যেমনি লোক নিশার স্বপনে শোনে মায়া যন্ত্র ধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির চলনে।...
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতরূপী তুমি জন্মভূমি স্তনে।...
এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে...
এবার ভাবুন এই মানুষটি ১৮৬৩ সালের মাঝামাঝি সপরিবারে প্রায় শূন্য হস্তে ভার্সাই শহরের একটু গরিব এলাকায় অবস্থিত ১২নং রু দ্য-এতা জেনেরো (12  rue des Etals-Generaxu) আগের নাম মানে সে সময়ে এই রাস্তার নাম ছিল পাশের রেল স্টেশনের নাম অনুসারে 12 rue des Chantiers-এর দোতালার তিন কুঠুরির খুবই ছোট এপার্টমেন্টে যিনি কোনদিন টাকা গুনে খরচ করেননি তাঁকে প্রতিটি পয়সা গুনে গুনে চিন্তা করে খরচ করতে হচ্ছে। আমি ১৯৮২ সালে এই ফ্ল্যাটে গিয়েছি ঘরগুলো এত ছোট ভাবা যায় না। টয়লেট ছাড়া কোনো স্নানের ঘর আমার চোখে পড়েনি। রান্নার জায়গাটি এত ছোট যে দুজন এক সাথে দাঁড়ানো যায় না। তখন ওই ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন গ্রেগোরী নামের একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। উনি আমার পরিচয় পেয়ে ও আমাদের এক মহাকবি এক সময় ১৮৬৩-১৮৬৫ এই ফ্ল্যাটে বাস করে গেছেন শুনে প্রস্তাব দিয়ে বসলেন, ‘আমার স্ত্রীর বাচ্চা হবে তাই এটা আমাদের জন্য খুবই ছোট হয়ে যাচ্ছে তাই পুরো ফ্ল্যাটটা ঢেলে সাজিয়ে রং করে বিক্রি করবো, আপনি ইচ্ছা করলে কিনে নিতে পারেন অথবা আপনাদের দূতাবাসকে কিনতে বলতে পারেন’। হায় তখনতো আমি সদ্য এসেছি ছাত্র হিসেবে। উনি জানালেন ও পুরোনো কাগজপত্র দেখালেন ১৯০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭ জন মালিক বদল হয়েছে। তার আগে কারা মালিক ছিলেন উনি জানেন না। গ্রেগোরী রাস্তার দিকের জানালার কাছে নিয়ে রাস্তার অপর পাড়ের বাড়িটি দেখিয়ে এবং তার বাইরের একটি স্মৃতিফলক দেখিয়ে বললেন, ‘ওপাশের বাড়িটি কি জানেন’? ওনার কাছেই প্রথম শুনলাম ১৭৮৯ এর ৫ই মে থেকে ১৫ই অক্টোবরের মধ্যে সামনের ওই বাড়িতে সারা ফ্রান্সের সর্বশ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্বকারীদের নিয়ে যেমন ধর্মযাজক, সাহিত্যিক ও সাধারণ মানুষ এদের নিয়ে ফ্রান্সের প্রথম সংবিধান রচনা করা হয়েছিল। এটা ফ্রান্সের ঐতিহাসিক স্থান।
কবি ১৮৬২ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে ইংল্যান্ড এসেছিলেন ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ‘গ্রেজ-ইন’-এ যোগ দিয়েছিলেন, পরিবার তখন রেখে এসেছিলেন কলকাতায়। এক বছরও পূর্ণ হয়নি ১৮৬৩ সালের ২রা মে স্ত্রী হেনরিয়েটা সন্তানসহ ইংল্যান্ড চলে আসেন। কারণ যাদের ওপর তিনি বিষয় সম্পত্তির দায়িত্ব দিয়ে ইংল্যান্ডের পড়ার খরচ পাঠাবার ও পারিবারিক মাসিক টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করে এসেছিলেন, তারা সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। কোনোভাবে ইংল্যান্ড আসার ভাড়া জোগাড় করে সন্তানসহ হেনরিয়েটা ইউরোপ এসে পৌঁছান। অর্থাভাবে মধুসূদন চরম বিপদে পড়লেন। বন্ধু-বান্ধবদের বহু চিঠি লিখেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। ১৮৬৩ সালের মধ্যভাগে ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে কিছু কম খরচে জীবন সংগ্রাম চালাতে পারবেন ভেবে চলে আসেন। শোনা যায় প্রথম কিছুদিন প্যারিস শহরে ছিলেন (যার আজ পর্যন্ত কোনো সত্যতার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি), সেখানে অতিরিক্ত খরচ বিধায় ভার্সাই শহরে আগমন। ভার্সাই শহরের এই বাসাতে কেটেছে তাঁর জীবনের চরম দুঃখের দিনগুলো। অচেনা পরিবেশে কোনো চাকরি জোগাড় করতে পারেননি অথবা হয়তো সম্মানে লাগবে ভেবে চেষ্টাও করেননি। সামান্য টাকা-পয়সা তখনো হাতে যা ছিল তা দিয়ে যাতে সবচেয়ে বেশি সময় টিকে থাকা যায়, তার জন্য তিনি অথবা হেনরিয়েটা চেষ্টার কোনো কসুর করেননি। জীবিকা নির্বাহের জন্য স্ত্রীর অলঙ্কার, গৃহসজ্জার উপকরণ এবং পুস্তকাদি বন্ধক বা বিক্রি করে চলতে হয়েছিল। এ সময় আশেপাশের মানুষের কাছে প্রচুর ঋণও জমে গিয়েছিল। বহু মাসের বাসা ভাড়া বাকি নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানে বহু টাকা বাকি- পাগলপ্রায় অবস্থা ঋণের দায়ে একবার জেলে পর্যন্ত যাবার উপক্রম হয়েছিল সে সময় সুন্দরী এক ফরাসিনী তাঁকে জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচান। চাতক পাখির মতো প্রতিদিন ডাকের অপেক্ষা করতেন কলকাতা থেকে কখন তার প্রাপ্য টাকা এসে পৌঁছাবে। অথবা দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর কখন তাঁকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে অর্থ পাঠাবেন তার অপেক্ষায় বুকভরা আশা নিয়ে দিন গুনতেন। আর এ সময় তিনি প্রায় প্রতিদিনই তাঁর পাওনাদারদের কাছে এবং বিপদের দিনের গ্রেটবন্ধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে চিঠি লিখতেন। তাঁর মত্তো এত্তো বড় অসাধারণ কবি ও বড়লোক বাড়ির ছেলে হয়ে (যিনি গুনে কোনোদিন টাকা কাউকে দেননি) এ সময়ে যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন তা ভাবলে আজও আমরা অবাক হই। দেনার দায়ে যখন নাভিশ্বাস উঠেছে একদিন রাগ করে বিদ্যাসাগরকে চিঠি লিখেছিলেন ‘কোনোভাবে টাকা জোগাড় করে আমি কলকাতা পৌঁছোবো, তারপর যারা আমার ন্যায্য টাকা দেয়নি তাদের একজন একজনকে খুন করে প্রয়োজনে ফাঁসিতে ঝুলবো’। এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও তাঁর প্রতিভা থেমে থাকেনি। ভার্সাইতে অনাহার এবং অর্ধাহারের মধ্যেও নতুন ভাষা শিক্ষার অথবা সাহিত্যচর্চার উৎসাহ কখনোই তিনি হারাননি। ভার্সাই থাকাকালীন তাঁর জীবনের একটি মুখ্য রচনা ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’। তিনি এখানে বেশ কিছু সনেটও রচনা করেন। যা ইটালিয়ান সনেট থেকে অনুপ্রাণিত এবং নীতিগর্ভ কিছু কবিতাও রচনা করেন যা ফরাসি সাহিত্য ও কবিতা থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়া। লেখার সাথে সাথে তা কলকাতায় পাঠিয়ে দিতেন ছাপার জন্য। নীতিগর্ভ কাব্যের প্রথম তিনটি কবিতা, চতুর্দশপদী কবিতাবলীর সমকালে রচিত। ফরাসি বিখ্যাত কবি জঁ-দে লা ফঁতেন (১৬২১-৯৫)-এর ্তুঞযব ঋধনষবং ড়ভ খধ ঋড়হঃধরহব্থ কবিতার আদর্শে এগুলি সে সময় ভার্সাইতে রচনা। ভার্সাইয়ে বসবাসকালে ইটালিয়ান বিখ্যাত কবি দান্তের ষষ্ঠ জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি সনেট রচনা করে ইটালীয় ও ফরাসি নিজকৃত অনুবাদসহ ইটালির রাজা ভিক্টর ইমানুয়েলের কাছে পাঠিয়ে দেন। আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির ঐক্যের দিক থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর কবির এই প্রচেষ্টা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
‘কবিগুরু দান্তে’
নিশান্তে সুবর্ণ-কান্তি নক্ষত্র যেমতি
(তপনের অনুচর) সুচারু কিরণে
খেদায় তিমির-পুঞ্জে; হে কবি, তেমতি
প্রভা তব বিনাশিল মানস-ভুবনে
অজ্ঞান! জনম তব পরম সুক্ষনে।
নব কবি-কুল-পিতা তুমি, মহামতি,
ব্রহ্মাণ্ডের এ সুখণ্ডে। তোমার সেবনে
পরিহারি নিদ্রা পুনঃ জাগিলা ভারতী।
দেবীর প্রসাদে তুমি পশিলা সাহসে
সে বিষম দ্বার দিয়া আঁধার নরকে,
যে বিষম দ্বার দিয়া, ত্যজি আশা, পশে
পাপ প্রাণ, তুমি, সাধু, পশিনা পুলকে।
যশের আকাশ হতে কভু কি হে খসে
এ নক্ষত্র? কোন্‌ কীট কাটে এ কোরকে?
সনেট রচনায় তিনি গুরু মেনেছিলেন ইটালিয়ান পণ্ডিত কবি পেত্রার্কাকে (১৩০৪-১৩৭৪)। তাঁদের উভয়ের চরিত্রের মধ্যে মিল ছিল অনেক। পেত্রার্কা যেমন তার প্রেমিকাকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতায় রোম্যান্টিকতার ছড়াছড়ি করতেন-কিন্তু নিজে বিচরণ করতেন ধ্রুপদী সাহিত্যের জগতে। মাইকেলও ছিলেন হুবহু একই রকমের। মনে প্রাণে রোমান্টিক হওয়া সত্ত্বেও, তিনিও সারাক্ষণ চর্চা করতেন ধ্রুপদী ভাষা এবং সাহিত্য। সমকালীন ফরাসি কবি ভিক্টর হুগো এবং ইংরেজ কবি অ্যালফ্রেড টেনিসনকে উদ্দেশ্য করেও মাইকেল দুটি সনেট লিখেছিলেন। কারো কারো মনে হতে পারে যে, তিনি বোধ হয় এ দু’জন কবির ভক্ত ছিলেন অথবা তাঁদের কাব্য দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন (ভক্ত) সেটা আদপেই ঠিক নয়। ভিক্টর হুগো আর টেনিসন ছিলেন সে সময়কার যথাক্রমে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত কবি। ১৮৬৫ সালে এঁদের বয়স ছিল যথাক্রমে ৬৩ এবং ৫৬। ফ্রান্সের রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের প্রধান নায়ক হিসেবে ভিক্টর হুগোর নাম অবিস্মরণীয়। ঔপন্যাসিক এবং প্রতিষ্ঠান বিরোধী রাজনীতিক হিসেবেও তাঁর নাম কম ছিল না। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ধারার দরুণ তাঁকে দু’দশকের জন্য স্বেচ্ছা নির্বাসন নিতে হয়েছিল। মাইকেল তাঁকে নিয়ে সনেট রচনা করার পনেরো বছর আগে রাজকবি হিসেবে তিনি শিরোপা লাভ করেছিলেন। রাজকবিদের মাইকেল দেখতেন বিশেষ ঈর্ষা ও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে। নিজেও কবি হবার স্বপ্ন দেখেছেন- বোধ হয় সারা জীবন।
বছর ঘুরতেই ১৮৬৪ সালের ৩রা আগস্ট মাইকেল মধুসূদন দত্তর স্ত্রী এমিলি হেনরিয়েটা সোফি হোয়াইট (২৭) এই বাড়িতেই একটি মৃত কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। মাইকেলের বয়স তখন তেত্রিশ।
এরপরের ঘটনা সবারই জানা। দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন সংগ্রহ বা টাকা আদায় করতে পেরেছেন সেই টাকা সাথে সাথে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ভার্সাইয়ের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠিয়ে দিয়েছেন। যেমন টাকা পৌঁছেছে দেনা শোধ করতে গিয়ে তা সাথে সাথেই শেষ হয়ে গিয়েছে। ‘গ্রেজ ইন এ’ যোগ দেবার মতো টাকা পাবার অপেক্ষা তাঁকে নিদারুণ দরিদ্রতার মধ্যে প্রায় দু’বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। অবশেষে বিদ্যাসাগরের পাঠানো বেশকিছু টাকা এক সাথে এসে পৌঁছলে ভার্সাই রাজবাড়ীর গা ঘেঁষে বনেদি পাড়ায় বাসা ভাড়া করে স্ত্রী সন্তানদের রেখে তিনি বিপদমুক্ত হতে আবার ‘গ্রেজ-ইনে’ যোগ দিতে ইংল্যান্ডের পথে পাড়ি জমান। ভার্সাই থাকাকালীন আরো কিছু কাহিনী কাব্য লিখতে শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ করতে পারেননি। কবির পরিবার ভার্সাই থেকে যাবার কারণ হচ্ছে, কবির ইচ্ছা ছিল পুত্র-কন্যাদের ইউরোপীয় শিক্ষাদানে গড়ে তোলার। কবি সমন্ধে তাঁর এক জীবনীকার ক্ষেত্রগুপ্ত লিখেছেন, ‘যে ব্যক্তি একই সঙ্গে ক্ষুণ্নিবৃত্তির জন্য কাতর এবং সন্তানদের ইউরোপীয় শিক্ষা দিতে সংকল্পবদ্ধ, ঋণের দায়ে জেলে যেতে যেতে ফরাসি, ইটালীয় ও জার্মান ভাষা শিক্ষায় একাগ্রচিত্ত তাঁকে হয় পাগল না হয় প্রতিভাবান বলে ধরে নিতে হবে এবং পণ্ডিতদের মতে এ দুয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য আছে’। ইউরোপীয় সভ্যতাকে শুধু সাহিত্যিক আদর্শের মধ্যে নয়, জীবনাদর্শের মধ্যে কবি গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন।
রাজবাড়ী ঘেঁষা নতুন বনেদি পাড়ার ফ্ল্যাটে ৬ rue Maurepase ২৬শে আগস্ট ১৮৬৭ ভোর চারটায় মাইকেল হেনরিয়েটার তৃতীয় পুত্র সন্তান আলবার্ট জর্জ নেপোলিয়ানের জন্ম হয়। সে সময় রাজপরিবার বা নেপোলিয়ান প্রবর্ত্তিত ফরাসিদের রাষ্ট্রসম্মান ‘শেভালিয়ে দ্য লা লিজিঁওনার’ প্রাপ্ত ডা. লুইস জুলিয়ান পারনার (৪৭) ও বাড়ির মালিক আনাবেল নিকোলা কারে (৬৯) উপস্থিত ছিলেন।
কবির ভার্সাইয়ের অবস্থান দীর্ঘ নয়। তার চিঠিপত্র থেকে জানা যায়, তার স্বপ্নের দেশ ছিল ইংল্যান্ড-
And oh! I Sigh for
Albion&_s Strond
As if She were my native land
যতই তিনি সাহেব সাজবার চেষ্টা করুন বার বার তিনি ফিরে গেছেন জ্ঞানে-অজ্ঞানে তাঁর আদি জন্মভূমি সাগরদাঁড়ি (কেশবপুর, যশোর) গ্রামে। তাইতো দেখি প্রবাসে বসেও তিনি লেখেন-
রেখো, মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে
সাধিতে মনের সাদ    ঘটে যদি পরমাদ
মধুহীন করো না গো তব মনঃ কোকনদে।
প্রবাসে, দৈবের বসে,    জীব-তারা যদি খসে
এ দেহ-আকাশ হতে, -নাহি খেদ তাহে।
জন্মিলে মরিতে হবে    অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর, হায়রে, জীবন-নদে?
কিন্তু যদি রাখ মনে,    নাহি, মা ডরি সমনে;
মক্ষিকাও গলে না গো, পড়িলে অমৃত হ্রদে।
লেখক : বিশ্বনন্দিত মুকাভিনয় শিল্পী। ফ্রান্স প্রবাসী
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাবমেরিন ডিটেক্টর আবিষ্কার চীনের

সামরিক ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী হচ্ছে চিন। এবার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাবমেরিন ডিটেক্টর আবিষ্কার করে ফেলল বেইজিং। এমনটাই চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন ‘দ্য চাইনিজ আকাদেমি অব সায়েন্সেস’-এর একদল বিজ্ঞানী। গবেষকদের দাবি, এই ডিটেক্টর ঠিকভাবে কাজ করলে বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী দেশের সাবমেরিন চীনা ভুখন্ডের আনাগোনা করলেই তা রাডারে ধরা পড়ে যাবে। পাশাপাশি সবদিক থেকে সুরক্ষিত থাকবে চীনা ভুখন্ড।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, শক্তিশালী এই সাবমেরিন ডিটেক্টর ম্যাগনেটিক ডিটেনশন টেকনোলজি’র সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ডিটেক্টরে বসানো ডিভাইস আকাশ থেকে পৃথিবীর তলদেশের যেকোনো ধাতব পদার্থের সন্ধান দিতে পারবে। এর ফলে শত্রুপক্ষের সাবমেরিনের সঠিক অবস্থানও জানা সম্ভব হবে। সামরিক ও অসামরিক দু’টি ক্ষেত্রেই ডিভাইসটি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের দাবি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এই ডিটেক্টর চীনা সেনাবাহিনীর হাতে চলে আসবে বলে জানা গেছে। আর তা হাতে আসলে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হওয়া থেকে চীনকে কেউ আটকাতে পারবে না।

সৌদি শর্তে ক্ষুব্ধ তুরস্ক

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, কাতারের ওপর প্রতিবেশী দেশগুলোর দেয়া শর্তগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী, এবং সে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ।
সৌদি আরবের নেতৃত্বে চারটি আরব দেশ নিষেধাজ্ঞা এবং অবরোধ তোলার বিপরীতে যে ১৩টি শর্ত কাতারের ওপর চাপিয়েছে, তার মধ্যে আল জাজিরা টিভি বন্ধ, ইরানের সাথে সম্পর্ক কমানো এবং তুরস্কের একটি সামরিক বিমান ঘাঁটি বন্ধের দাবি রয়েছে।
শুক্রবার এই দাবিগুলো দিয়ে কাতারকে ১০ দিন সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।
দুদিন পর আজ (রোববার) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েপ এরদোগান সৌদি এসব শর্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, এসব শর্ত আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং কাতারের সার্বভৌমত্ব খর্ব করার সামিল।
কাতার যে এসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে তার জন্য কাতারের প্রশংসা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান।
কাতার ইতিমধ্যেই সৌদি আরবসহ চারটি আরব দেশের এসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এসব শর্ত অযৌক্তিক এবং এগুলো মানা সম্ভব নয়।
কাতার সন্ত্রাসবাদকে সহায়তা করছে এই অভিযোগে সৌদি আরব, ইউএই, মিসর এবং বাহরাইন কাতারের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে।
সূত্র : বিবিসি