Friday, July 3, 2015

‘ব্লগারদের বিষয়ে সরকার নিষ্ক্রিয়’

প্রগতিশীল ও মুক্তমনা ব্লগারদের নৃশংস হত্যাকা-ের বিষয়ে সরকার নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ করেছেন নিহত ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায়। শুক্রবার বিকালে রাজধানী মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আর্টিকেল ১৯ আয়োজিত ব্লগারদের সনদ প্রকাশনা অনুষ্ঠাতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, বর্তমান সরকার ব্লগারদের কি চোখে দেখে জানি না। কোনটি নাস্তিক, মুক্তবুদ্ধির, না বিজ্ঞানমনস্ক। নাস্তিক হওয়াটা কি অপরাধ? নাস্তিক হওয়াটা যদি অপরাধ হয় তাহলে দেশের প্রচলিত আইন দ্বারা তাদের বিচার করে মৃত্যুদ- দেয়া হোক। এতে আপত্তি থাকবে না। কিন্তু, কোন অপরাধ না করে শুধু নিজের ব্যক্তিগত মতামতটুকু মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য হত্যাকা-ের শিকার হতে হবে এমন কুৎসিত বিষয় কখনই মেনে নেয়া যায় না। একে প্রতিহত করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে  ব্লগাররা মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তাদের অপরাধ কি? কি অপরাধ ছিল তার ছেলের অভিজিতের। বিজ্ঞান মনস্ক হওয়াই  কি ছিল তার অপরাধ। ব্লগার ওয়াসিকুর রহমান বাবুর অপরাধ কি ছিল? ওই ছেলেটা দিনের বেলায় একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে কাজ করতো। আর রাতের বেলায় নিজস্ব ওয়েব সাইটে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতো। তার মতামতটুকু অপরের কাছে পৌঁছে দিতো। যুক্তির শিরদার উপস্থাপন করতো। এজন্য তাদেরকে এভাবে মেরে ফেলা হবে!।
ব্লগার হত্যাকা- প্রতিরোধের ব্যাপারে সরকারের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি আরও বলেন, অভিজিৎ হত্যাকা-ের পর প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করে জানান যে, স্যার কি করতে পারি। তখন আমি বললাম, আমার ছেলেকে তো তারা বিদায় করে দিয়েছে। আর তো তাকে ফিরে পাবো না। এখন আমি আর কি চাইতে পারি। শুধু এতটুকু চাওয়ার আছে যে, যারা এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। তাদের দুজনের এই টেলিফোনের কথা মিডিয়ায় আসতে দেয়া হয়নি। তাদের ভয় ছিল যে একজন ব্লগারের পিতাকে প্রধানমন্ত্রী সান্ত¡না দিচ্ছেন। এটা অন্যরা কিভাবে দেখবে এবং ভাববে। এই অধ্যাপক আরও বলেন, অভিজিতের হত্যাকারীদের প্রকৃত খুনিদের এখনও ধরতে পারেনি পুলিশ। শুধু একজনকে ধরেছে তার নাম ফারাবী। ফারাবী ফেসবুকে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। অন্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি ব্লগার হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ব্লগ যেন ঘৃনা ছড়াছড়ির ব্যাক্সে পরিণত না হয়। তারা বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের নিরাপত্তা দেয়াটা সরকারের একান্ত দায়িত্ব। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থানকালে আর্টিকেল ১৯ বাংলাদেশ ও  দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি হিসাব মতে ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ লোক সক্রিয় আছে। এই ব্লগে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কৌশলে জামায়াত-শিবির ব্লগকে রাজনৈতিক হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে আসছে। তাদের এই ষড়যন্ত্র এখনও অব্যাহত আছে। আমাদের এই বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।

কারাগারে মেহেরুন

স্ত্রী নির্যাতনের মামলায় কারাবন্দি সাংবাদিক রকিবুল ইসলাম মুকুলের কথিত প্রেমিকা মেহেরুন বিনতে ফেরদৌস ওরফে সিঁথিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। মুকুলের স্ত্রী নাজনীন আকতার তন্বীর করা মামলায় গতকাল আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেছিলেন তিনি। আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তার বিরুদ্ধে নির্যাতনে প্ররোচনার অভিযোগ এনেছেন মুকুলের স্ত্রী নাজনীন আক্তার তন্বী। আদালত সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন করেন মেহেরুন বিনতে ফেরদৌস। জামিন শুনানিতে মেহেরুনের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান দাবি করেন, মুকুলের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। তার স্বামী রাজিউল আমিনের সঙ্গেই তিনি বসবাস করছেন। ফলে মুকুলের স্ত্রীকে নির্যাতনে প্ররোচনা দেয়ার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। এ সময় মেহেরুনের জামিনের বিরোধিতা করেন নাজনীনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী নজীবউল্লাহ হিরু, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, অ্যাডভোকেট মবিনুল ইসলাম ও সৈয়দা ফরিদা ইয়াসমিন জেসি। মুকুল ও মেহেরুনের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি আদালতকে দিয়ে অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, মেহেরুন তার স্বামীর ঘর সংসার করলে অন্যের স্বামীর সঙ্গে এমন অন্তরঙ্গ ছবি আসে কিভাবে। মেহেরুনের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের কারণেই মুকুল নাজনীনের উপর নির্যাতন করতেন। এ সময় মেহেরুনের আইনজীবী এসব ছবি কম্পিউটারে তৈরি করা বলে দাবি করেন। শুনানিতে মেহেরুনের আইনজীবীকে ম্যাজিস্ট্রেট অমিত কুমার দে বলেন, মামলায় আত্মসমর্পণ করলে তার জামিন হতে পারে, জেলও হতে পারে, এমন সংকটময় মুহূর্তে তার স্বামী আদালতে নেই কেন? তিনি কোথায়? তার স্বামীকে নিয়ে আসেন। তিনি এসে মেহেরুনকে জিম্মায় নিলেই জামিন হতে পারে। এরপর মেহেরুনের স্বামী ঢাকা ব্যাংকের মতিঝিল শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রাজিউল আমিনকে আদালতে হাজির করে আসামিপক্ষ। কিন্তু রাজিউল আমিন আদালতে এলেও মেহেরুনকে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিতে অসম্মতি জানান। বিচারক এ সময় মেহেরুন ও রাজিউলকে নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য কিছুটা সময়ও দেন। কিন্তু রাজিউল রাজি না হওয়ায় বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে মেহেরুনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলার নথির তথ্য অনুযায়ী, স্ত্রী নাজনীনের দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলায় গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে গাজী টিভির বার্তা সম্পাদক মুকুলকে গ্রেপ্তার করে মিরপুর থানার পুলিশ। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে একদিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। কারাবন্দি মুকুলকে তার কর্মস্থল গাজী টিভি থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। মুকুলের স্ত্রী নাজনীন আকতার তন্বী দৈনিক জনকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। এই দম্পতির এক সন্তান রয়েছে। দু’বছর আগে তাদের আরেক সন্তান চন্দ্রমুখী মারা যাওয়ার পর শোকে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন নাজনীন। নাজনীনের অভিযোগ, ব্যাংকারের স্ত্রী মেহেরুনের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়ানোর পর তার উপর নানা নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন মুকুল। চন্দ্রমুখী মারা যাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য কয়েক মাস হাসপাতালে থাকার সময় মুকুল ওই নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে নাজনীনের দাবি।

ওমরা পালনে সৌদি যাচ্ছেন খালেদা ও তারেক

পবিত্র ওমরাহ পালন করতে ৮ জুলাই সৌদি আরব যাবেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একই সময়ে সেখানে যাবেন খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান।   এরই মধ্যে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ওমরাহ পালনের সূচি চূড়ান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের গণমাধ্যম শাখার কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান এনটিভি অনলাইনকে জানান, আগামী মঙ্গল কিংবা বুধবার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খালেদা জিয়ার  রওনা হওয়ার কথা। খালেদা জিয়ার সৌদি আরব সফর ও ওমরার সূচি সম্পর্কে শায়রুল কবির  বলেন, তিনি ৮, ৯ ও ১০ জুলাই পবিত্র মদিনা মনোয়ারায় অবস্থান করে মসজিদে নববিতে নামাজ পড়বেন।  ১১ জুলাই ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাবেন। সেখানে ১১, ১২ ও ১৩ জুলাই অবস্থান করে ওমরা পালন করবেন। ১৩ জুলাই মক্কা মোকাররমায় পবিত্র লাইলাতুল কদরের নামাজ আদায় করবেন এবং ওই রাত ইবাদতের মাধ্যমে পার করবেন।’ এদিকে বিএনপির সূত্র উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, তারেক রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী ও দুই মেয়েও সৌদি আরব যাবেন। সৌদি আরবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মধ্যে দলের কৌশল, সম্মেলনসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।   খালেদা জিয়া কোনো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে কে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন, সে বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ইউএনবি জানিয়েছে। এক নেতার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থাটি দাবি করেছে, মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত প্রধান করার চিন্তা করছেন খালেদা জিয়া। এ বিষয়ে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলবেন। ১৪ জুলাই খালেদা জিয়া বাংলাদেশের উদ্দেশে এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে সৌদি আরব ছাড়বেন বলে জানা গেছে।

ফতুল্লায় আগুন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মেঘনা ও যমুনা জ্বালানি তেলের ডিপোর পাশে বস্তিতে আগুন লেগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে অর্ধশতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এতে একজন অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। -পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মেঘনা ও যমুনা জ্বালানি তেলের ডিপোর পাশে বস্তিতে আগুন লেগে বৃহস্পতিবার রাতে অর্ধশতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন একজন। -পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
আগুনে ডিপো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে তৎপর ফায়ার সার্ভিস।

‘বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ নয়’ -অনন্য আজাদ

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। কোন আইন নেই। বিচার নেই। আর সরকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়ায় না। মনে হচ্ছে যেন তারাও ব্লগার হত্যাকারীদের সঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত। দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদ (২৫)। প্রাণনাশের হুমকির মুখে বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তার সঙ্গে আলাপ করেছেন ডিপ্লোম্যাটের সঞ্জয় কুমার। এখানে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো: প্রশ্ন: দেশ কেন ছাড়ছেন? অনন্য আজাদ: আমি দেশ ছাড়ছি, কারণ আমার জীবন হুমকির মুখে। স্বাভাবিক থাকাটা আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। আমি মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখি। যুদ্ধাপরাধী আর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লেখি। আমি তাদের বিরুদ্ধে লেখি যারা সমাজকে ভুল পথে চালিত করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। ফলে, মানুষ মনে করে আমার লেখা তাদের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে তারা আমাকে হত্যা করতে চায়। কয়েক মাস ধরে আমি বলতে গেলে প্রায় লুকিয়ে বাস করছি; আমার চাকরি ছেড়েছি, লেখালেখি কমিয়ে এনেছি, আমার ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেছি। আমার জন্য জীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে থাকলে আপনি হত্যার শিকার হতে পারেন সেজন্য নিশ্চয়ই আপনি ভীত? বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। যারা অযৌক্তিকতার বিরুদ্ধে লেখে বা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলে তাদের কারও জন্য কোন নিরাপত্তা নেই। মৌলবাদীরা ইতিমধ্যে নয়জন ব্লগারকে হত্যা করেছে, যারা মুক্তচিন্তার জন্য লড়াই করছিল। ইসলামী চরমপন্থার বিরুদ্ধে লেখার কারণে অনেক লেখক, ব্লগারের নাম মৌলবাদী শক্তিগুলোর হিট-লিস্টে রয়েছে। এসব ব্লগারের জীবন রক্ষার্থে সরকার কোন কিছুই করছে না। ব্লগাররা সার্বক্ষণিক আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন। আর তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর কোন প্রচেষ্টাই নেই। সরকার আপনাকে বা অন্য ব্লগারদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়- এমনটা কেন মনে করছেন? কোনো আইন নেই। কোন বিচার নেই। আর সরকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়ায় না। মনে হচ্ছে যেন হত্যাকারীদের সঙ্গে তারাও চক্রান্তে লিপ্ত। লেখক আর ব্লগারদের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি থাকা সত্ত্বেও সরকার মৌলবাদী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। দেশের ভেতরের অবস্থা ভাল না। হয়তো মৌলবাদী শক্তি আর সরকার একসঙ্গে কাজ করছে। এ কারণেই পুলিশ এ যুক্তি মেনে নিচ্ছে যে ব্লগাররা নাস্তিক আর তাদের টার্গেট করা উচিত। ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে স্বতন্ত্র ধারণা থাকার কারণে কেন একজন হত্যার শিকার হবে? এটা ভালো রাজনীতির লক্ষণ নয়। আমি মনে করি দিন দিন এ দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। আর দেশের মৌলিক নীতিগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য হস্তক্ষেপ করার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ব্লগারদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক হামলার জন্য আপনি কাকে দায়ী করেন? এটা সত্যি, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন করে পাকিস্তান। আর আমাদের দেশে আমরা যুদ্ধাপরাধী আর তাদের স্বাধীনতাবিরোধী মতাদর্শের বিরুদ্ধে। কাজেই, ব্লগারদের ওপর হামলা আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলোর জন্য সমর্থনের মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের একটি পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি সব সময়ই রয়েছে, যা তালেবান আর একই ধরনের জঙ্গি শক্তির উৎপত্তিস্থল। কট্টরপন্থিদের অভিযোগ, আপনি ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে লেখেন? এটা সত্যি নয়। এটা একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত্র। ব্লগারদের নাস্তিক আর ইসলামবিরোধী বলা হয়। দেখুন, আমাদের একমাত্র এজেন্ডা হলো, পড়াশোনা করা, লেখা এবং সমাজে মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যারা কিনা ৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের সময় ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আমরা ওই শক্তিগুলোর সমালোচনা করি যারা নিজস্ব রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে। যারা ইসলামের নামে হত্যা করে আমরা তাদের নিন্দা জানাই। এমন লেখাগুলোতে তাদের মুখোশ খুলে দেয়, ফলে আমরা স্বাভাবিক টার্গেটে পরিণত হই। বাংলাদেশ প্রধানত একটি মুসলিম দেশ। আর মৌলবাদীরা আমাদের নাস্তিক বা ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতি উসকে দেয়ার চেষ্টা করে। এভাবে তারা ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের হত্যার যথার্থতা নিরূপণ করছে। বাংলাদেশী সমাজ নিজেদের প্রথমে বাঙালি ও পরে মুসলিম হিসেবে চিহ্নিত করে। আর বাংলাদেশী এ সমাজে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার একটি গভীরে প্রোথিত ষড়যন্ত্র রয়েছে। আপনার পরিবার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? তারা অনেক বেশি সহযোগিতামূলক। অস্পষ্ট, গোপন এসব শক্তির বিরুদ্ধে আমার সংগ্রামে আমার পরিবার আমার পাশে আছে। তারা ভীত, কিন্তু যে আদর্শের জন্য আমাদের অবস্থান তাতে তাদের বিশ্বাস রয়েছে। আপনার পিতা, হুমায়ুন আজাদ মৌলবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার জীবন হারিয়েছিলেন? তিনি দেশের জন্য বিরাট এক অবদান রেখেছেন। নিজের জীবন দিয়ে তিনি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আর যৌক্তিকতার শিখা প্রজ্বলিত রেখেছেন। তিনি শুধু আমার জন্যই অনুপ্রেরণা নন, বরং তিনি তাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা যারা বাংলাদেশকে প্রগতিশীল একটি সমাজ হিসেবে দেখতে চায়। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কী আপনি সমর্থন পান? নতুন প্রজন্ম ধর্মকে সম্মান করে। কিন্তু তারা ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত। তারা জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করে না, যারা ধর্মের নামে সব কিছু করতে পারে। নতুন প্রজন্ম ধর্মনিরপেক্ষতা পছন্দ করে। কিন্তু তারা উগ্রপন্থি শক্তিদের দ্বারা নাস্তিক আখ্যায়িত হতে চান না, যা নিশ্চিত এক মৃত্যুকে নিমন্ত্রণ দেয়। মানুষ ভীত। বাংলাদেশের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন কেন? অনন্য আজাদ: পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের পৃথক হওয়ার পুরো ভিত্তিই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম কারণ এটা ইসলামপন্থি দেশ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের গঠনও আজ পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের দেশ সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ নয়। ইসলাম এখন আমাদের রাষ্ট্রধর্ম। এটা ভালো নয়। আমাদের জীবনধারা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। স্বার্থের কারণে ধর্ম ব্যবহৃত হলে তা নিয়ে সমালোচনা করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। এখন আপনার পরিকল্পনা কী? এটা আমি এখন আপনাকে বলতে পারবো না। আমি যদি আমার পরিকল্পনা প্রকশ করি, তাহলে সেটা আমার জন্য সমস্যার সৃষ্টি করবে। কিন্তু যেটা নিশ্চিত তা হলো আমি লেখা বন্ধ করতে পারবো না। আমি আমার পরবর্তী বই প্রকাশ করবো। আমি ধর্মনিরপেক্ষতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তাধারার একজন শক্ত সমর্থক। আর আমি এসব ইস্যুতে লেখা অব্যাহত রাখবো।       মূল সাক্ষাৎকার: July 02, 2015 Exile From Extremism in Bangladesh: A Conversation with Ananya Azad The Diplomat‘s Sanjay Kumar speaks with Ananya Azad about freedom of expression in Bangladesh. The options for him were either exile or death. He chose the former. Ananya Azad, 25, left Bangladesh on a self-imposed exile to save himself from attack by Islamic fundamentalist forces, who have marked him as a top target. A decade ago Humayun Azad, his father, became the first victim for radical Islamists for his writings against fundamentalism. The young Azad has also faced constant threats on his life and he was one of the names on the list of 84 bloggers that Bangladeshi extremist groups have marked for targeting. The Diplomat’s Sanjay Kumar spoke to Ananya Azad just a day before he left Bangladesh. An excerpt of the interview follows. The Diplomat: Why you are leaving the country? Ananya Azad: I am quitting the country as my life is under threat. It has become difficult for me to be normal. I write against fundamentalism, war criminals, religious intolerance. I write against those who use religion to misguide this society. As such, people think that my writing is harmful for them. That’s why they want to kill me. For the last few months, I have been living almost in hiding; I left my job, scaled down my writing, put my webpage on hold—for me life has lost its normalcy. You are scared that if you stay back in Bangladesh you will be killed? Yes. The present situation in Bangladesh is very uncertain. There is no security for anyone who writes against irrationalism and advocates secular values. The fundamentalists have already killed nine bloggers who have been fighting for free thought. There are many writers, bloggers, and editors who are on the hit list of the fundamentalist forces for writing against Islamic extremism. The government is doing nothing to protect the lives of these bloggers. The bloggers are living in constant fear and there is no attempt by the regime to address their security. Why do you think the government is not able to protect you and other bloggers? There is no law, there is no justice and the government does not stand by secular forces. It seems as if they are in cahoots with the killers. Despite open threats to writers and bloggers, the government is not able to rein in fundamentalist groups. The condition inside the country is not good. Maybe fundamentalist forces and the government are working in tandem. That’s why the police buy the argument that the bloggers are atheist and should be targeted. Why someone should be killed for having an independent mind about religion and politics? This is not a sign of good politics. I think day by day the condition of this country is getting worse and there is an urgent need to intervene and  restore the fundamental principles of the country. Who do you blame for this systematic attack on bloggers? It is true that Pakistan supports war criminals in Bangladesh and we in the country are against war criminals and their anti-liberation ideology. Therefore, there is a connection between the attacks on bloggers and support for anti-liberation forces. There is always a danger of Bangladesh turning into a Pakistan or a Afghanistan, a breeding ground for the Taliban and similar extremist forces. Fundamentalist forces allege that you write against Islam and Prophet Mohammad? This is not true. This is a political conspiracy. Bloggers are said to be atheists and anti-Islam. See, our only agenda is to read and write and create awareness in the society about fundamentalism and war criminals who created havoc in 1971, during Bangladesh’s freedom struggle. We criticize forces which exploit Islam for their own political and personal benefit. We condemn those who kill people in the name of Islam. Such writings expose them and thereby we become a natural target. Bangladesh is a predominantly Muslim country and the fundamentalists try to incite religious passions by calling us atheists and anti-Islamic; this way they justify the killings of secular writers. This is a deep-seated conspiracy to radicalize Bangladeshi society which identifies itself as Bengali first and Muslim second. How has your family reacted? They are very supportive and stand by my struggle against obscurantist forces. They are scared but they believe in the cause we stand for. Your father, Humayun Azad, lost his life in the fight against fundamentalist forces. He has made a great contribution for the country. By giving up his life, he has kept the flame of secularism and rationalism alive in Bangladesh. He is an inspiration not only for me, but also for those who want to see Bangladesh as a progressive society. Do you get support from the common people ? The new generation respects religion, but they are very scared of the religious extremism. They don’t like Jamaat-e-Islami, which can do anything in the name of religion. The new generation respects secularism, but they don’t want to be branded as atheists by fundamentalist forces because that invites certain death.People are afraid. Why do you think it is important for Bangladesh to be a secular country? The whole premise of our separation from Pakistan was Bengali nationalism and secularism. We rejected Pakistan because it was an Islamist country. But unfortunately, the composition of Bangladesh is also changing today. Our country is not a secular country in the strict sense of the term. Islam is our religion now. This is not good. We should have the liberty to choose our way of life and have the freedom to be critical of religion if it is exploited by vested interests. What are your plans now? I cannot tell you right now. If I reveal my plans, it would be very problematic for me. But what’s certain is I cannot stop my writing. I will publish my next book. I am an ardent supporter of secularism and rationalist thinking and I will continue to write on these issues.

বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি কি পরিত্যক্ত by ড. তারেক শামসুর রেহমান

এক সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তেমন কোনো কথাবার্তা শোনা যায় না। এমনকি সরকার প্রধান কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্যেও এটা প্রমাণিত হয়নি যে বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছে। বলতে গেলে চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামালেই (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার পররাষ্ট্রনীতিতে পূর্বমুখিতার কথা বলে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। বাংলাদেশের গত ৪৪ বছরের পররাষ্ট্রনীতিতে পূর্ব দিগন্তের দেশগুলো ছিল উপেক্ষিত। বিশেষ করে মিয়ানমার কিংবা থাইল্যান্ডের মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার কোনো বড় উদ্যোগ অতীতে লক্ষ্য করা যায়নি। পূর্বমুখী নীতি বলতে সাধারণত দক্ষিণ পূর্ব ও প্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, জোরদার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে বোঝায়। এটি ছিল অনেকটা উপেক্ষিত। যেমন বলা যেতে পারে সিঙ্গাপুরের কথা। ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশটি সফর করেছিলেন। এরপর ২০০৪ সালে সিঙ্গাপুরের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোহ চোক টং বাংলাদেশে এসেছিলেন। এরপর থেকে দেশ দুটির মাঝে উচ্চ পর্যায়ে তেমন একটা সফর বিনিময় হয়নি। তবে বেগম জিয়া ২০০৫ সালে সিঙ্গাপুর সফর করেছিলেন। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের একটা গুরুত্ব আছে। সিঙ্গাপুর কর্তৃক প্রস্তাবিত আমেড-৮ এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী এশিয়া মিডিল ইস্ট ডায়লগ-৮ (আমেড-৮) এর প্রস্তাব করেছিলেন। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, মিসর, জর্ডান, কুয়েত এবং বাহরাইনের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত এই ফোরামের লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় এবং পারস্পরিক উন্নয়নের জন্য একে অপরকে সাহায্য করা। পরবর্তীতে চীনের উদ্যোগে ও ভারতের সমর্থনে নতুন একটি অর্থনৈতিক জোট বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার) গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় শোনা গেল বিসিআই’র (ভুটান, বাংলাদেশ ভারত-সাতবোন রাজ্য ও নেপাল) কথা। এগুলো সবই আঞ্চলিক সহযোগিতা। তবে এর মাঝে বিসিআইএম’র গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০০৩ সালে চীনের প্রস্তাবিত উদ্যোগই পরবর্তীতে বিসিআইএম নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। মজার ব্যাপার ভারত এ ব্যাপারে আগ্রহী হওয়ার পরেই এই বিসিআইএম জোটের ধারণা শক্তিশালী হয়। এই জোটটি কার্যকরী হলে কুনমিং (ইউনান প্রদেশের রাজধানী) থেকে সড়ক পথে বাংলাদেশে ও ভারতেও আসা যাবে এবং পণ্য আনা নেয়া করা যাবে। এর ফলে চীনা পণ্যের দামও কমে যাবে।
দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালের মধ্যে আসিয়ানে মুক্তবাজার সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য প্রবেশাধিকারের পথ সহজ হবে। বিসিআইএম’র আওতায় কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক হবে। তিনটি রুটে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারত সংযুক্ত হবে। নর্থ রুটে কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মিয়াতকিহা হয়ে ভারতের লিডো পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। এই রুটে বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে না। এই রুটটি অনেক কঠিন। সাউথ রুটে ইউনান থেকে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দর সোনাদিয়া পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। কুনমিং মান্দালয় (মিয়ানমার) ও এওয়ে (মিয়ানমার) হয়ে এই রুটটি চট্টগ্রামে প্রবেশ করবে। পরে ঢাকা হয়ে কলকাতা যাবে। এখন সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত না হওয়ায় (ভারতের আপত্তির কারণে) এই প্রস্তাবিত রুটটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তৃতীয় প্রস্তাবিত রুটটি হচ্ছে মিডল রুট। এই রুটটি ভালো এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটাই প্রাচীন সিল্ক রুট। কুনমিং বামো-লেসহিয়ো-টামু (মিয়ানমার), ইমফল (ভারত)-সিলেট-ঢাকা ও কলকাতা হচ্ছে এই রুট, যা কীনা কেটুকে নামেও পরিচিত। অর্থাৎ কুনমিং থেকে কলকাতা। অনেকের স্মরণ থাকার কথা এই রুটে (২৮০০ কিলোমিটার) একটি মোটর র‌্যালি (২০১৩) চালু হয়েছিল। এই জোটের সম্ভাবনা ছিল বিশাল। কেননা এই চারটি দেশের (বিসিআইএম) রয়েছে বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ (মিয়ানমার), রয়েছে শক্তিশালী অর্থনীতি (চীন ও ভারত), রয়েছে শিল্প (চীন), শক্তিশালী সার্ভিস সেক্টর, রয়েছে বিশাল অব্যবহৃত জমি (মিয়ানমার) এবং সমুদ্র বন্দর (বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার)। ফলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে আগামীতে যদি বিসিআইএম জোটকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়। আঞ্চলিক অর্থনীতি তো বটেই, বিশ্ব অর্থনীতিকে অনেক অংশে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এই জোট। এই চারটি দেশের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা বিশ্ব জিডিপির ১০ ভাগ। ১৯৯১ সালে বিসিআইএম’র অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল যেখানে ১.২ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১১ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৯০.২১ মিলিয়ন ডলারে। ১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা আর ৪৪০ মিলিয়ন মানুষের বাস এই বিসিআইএম জোটভুক্ত দেশগুলোতে। পূর্বে রয়েছে কুনমিং আর পশ্চিমে কলকাতা। ভারত এ জোটের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল এ কারণে যে এতে করে আগামী দিনে ভারতের আসিয়ানের সদস্যপদ পেতে সহজ হয়। ভারত ২০০৭ সালে আসিয়ানের সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইতোমধ্যে ভারত আসিয়ানের ‘ডায়লগ পার্টনার’ এর মর্যাদা লাভ করেছে (বাংলাদেশের অবস্থান আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামে)। ‘ডালগ পার্টনার’ এর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে পূর্ণ সদস্য। তাই ভারতের আগ্রহ ছিল, যাতে করে ভারত তার পণ্য নিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণ করে আসিয়ান বাজারে প্রবেশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি সরকার এই বিসিআইএম নিয়ে আদৌ এগিয়ে যাবে কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন এখন। তার আগ্রহ বেশি বিবিআইএন জোট নিয়ে। ফলে বিসিআইএম জোট নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি ভারত মহাসাগরে প্রভাব বলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীন এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, নৌ তৎপরতা এবং জিবুতিতে একটি নৌ ঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ, এমনকি হামবানতোতায় চীনা  সাবমেরিনের উপস্থিতি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলংকায় সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এমনকি ভারত মহাসাগরভুক্ত সিসিলি, মরিশাসে ভারত নৌ ঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জেন পিং ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ এর যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে ৬০ দেশকে তিনি চীনের প্রভাব বিস্তারের আওতায় আনতে চান। ভারত মহাসাগরভুক্ত দেশগুলোও এর মাঝে আছে। এটা সেই পুরনো ‘সিল্ক রোড’ এরই আধুনিক সংস্করণ। ভারত এতে উদ্বিগ্ন। ফলে ভারত তার সেই পুরনো ‘কটন রুট’ নিয়েই চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হলেও এই প্রভাব বিস্তার করার প্রতিযোগিতা দেশ দুটির মাঝে এক আস্থাহীনতার সৃষ্টি করবে। এতে করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও প্রভাবিত হতে বাধ্য। তাই বিসিআইএম জোট নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হলেও এ অঞ্চলে ভারতীয় কর্তৃত্ব বাড়বে। চীনের প্রভাব এর মাঝ দিয়ে সংকুচিত হবে। তাই খুব স্পষ্ট করেই বলা যায় বিসিআইএম জোটের বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখানে চীনের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়বে, এটাই মনে করেন ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা। ভারতীয় স্বার্থ ক্ষুণœ হয় এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাবে না ভারত। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বিসিআইএম জোট তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে। দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে ভারতের প্রভাব বাড়ছে। আগামীতে এ অঞ্চলের তিনটি দেশ (ভুটান, নেপাল ও বাংলাদেশ) ভারতের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বাণিজ্য নির্ভরতা এই দেশগুলোকে ভারতমুখী করে তুলবে। আর এ ক্ষেত্রে ভারতের স্ট্র্যাটেজি হবে বিবিআইএন জোটকে গুরুত্ব দেয়া এবং বিসিআইএমকে নিষ্ক্রিয় করা। এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হবে, এ প্রশ্ন এখন উঠেছে। বিবিআইএন’র গুরুত্ব যেমনি রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে বিসিআইএম এরও গুরুত্ব। এমনকি আমেড-৮ কেও অস্বীকার করা যায় না।
বাংলাদেশের বিপুল জ্বালানি এবং পানি সমস্যার সমাধান করতে হলে বিবিআইএন জোটকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা এ অঞ্চলে বিশাল এক জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। শুধুমাত্র ভারতের সাত বোন রাজ্যে ৭০ হাজার মেগাটাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ভুটান ও নেপালেও রয়েছে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনা ভারত এখন দ্বিপাক্ষিকভাবে ব্যবহার করছে, যেখানে বাংলাদেশের দাবি উপেক্ষিত ছিল। একই কথা প্রযোজ্য পানি জলাধারের মাধ্যমে সংরক্ষণের একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও। শুষ্ক মৌসুমে ভারতের যেমনি পানির প্রয়োজন, ঠিক তেমনি প্রয়োজন আমাদেরও। এ ক্ষেত্রে বর্ষার সময় পানি ধরে রেখে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। এমনকি বাংলাদেশ যে গঙ্গা ব্যারাজ করতে চাচ্ছে এ ক্ষেত্রেও ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশা থেকে ভারতের সীমান্তের পাংখ্যা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার এলাকায় জলাধার নির্মাণ করা যায়। যাতে করে বছরে ২৫ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সমস্যা হচ্ছে ভারত এ বিষয়টি দেখছে দ্বিপাক্ষিকতার আলোকে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির এপ্রোচটা ভিন্ন বলেই মনে হয়। তিনি বাংলাদেশে এসেও বলে গেলেন সবাইকে নিয়েই তিনি চলতে চান। তাই একটা প্রশ্ন থাকলই যে, বিবিআইএন জোটটি না শেষ পর্যন্ত একটি দ্বিপাক্ষিক জোটে পরিণত হয়। যেখানে ভারতের স্বার্থ বেশি! একই সঙ্গে আমরা যদি বিসিআইএম জোটের দিকে তাকাই যা এখনো পূর্র্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করেনি, তাহলে দেখব এতে করে বাংলাদেশের স্বার্থ অনেক বেশি। এর মাধ্যমে কুনমিং-কক্সবাজার প্রস্তাবিত সড়কটি তৈরি শেষ হবে। সড়ক পথে চীনা পণ্য এ দেশে আসবে। ফলে চীনা পণ্যের দাম কমবে। এই জোটের মাধ্যমে পূর্বের দিকে আমাদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে। আসিয়ানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। আসিয়ান রেজিওনাল ফোরাম থেকে আমাদের সদস্যপদ ভারতের মতো আসিয়ান ডায়ালগ পার্টনারে উন্নীত হতে পারে। এতে করে ভবিষ্যতে আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ পেতেও আমাদের সুবিধা হবে, যা ভারত এখন চাচ্ছে। উপরন্তু আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে যে শুল্কমুক্ত বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে শুল্কমুক্তভাবে আমাদের পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। অন্যদিকে আমেড-৮ এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমনি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বে বাংলাদেশ যে একটি সহনীয় ইসলাম (মডারেট ইসলাম) ধারণ করে, এই ধারণা আরো শক্তিশালী হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা হবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর।
বর্তমান সরকারের আমলে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা ভারতের দিকে ঝুঁকে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে না, এটাই প্রত্যাশা করি। ভুলে গেলে চলবে না এই পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সরাসরিভাবে জড়িত।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ-বিদেশের রাজনীতির বিশ্লেষক

‘বিচারের নামে তামাশা করেছে বিএসএফ’

বিচারের নামে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তামাশা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ফেলানির বাবা নুরুল ইসলাম। ফেলানি হত্যা মামলায় বিএসএফের হাবিলদার অমিয় ঘোষকে দেয়া খালাসের রায়ের এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, মেয়ে হত্যার ন্যায্য বিচার পায়নি। আমি দুই দফা সাক্ষ্য দিলাম। অমিয় ঘোষের ফাঁসি হওয়া উচিৎ ছিল। তা না করে ভারত সরকার বিচারের নামে তামাশা করেছে আমাদের সঙ্গে। ন্যায় বিচারের জন্য এই রায়ের বিরুদ্ধে আবার আবেদন করবেন বলে জানান তিনি। এর আগে ফেলানি খাতুন হত্যা মামলায় বিএসএফের নিজস্ব আদালত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট বা জি এস এফ সি প্রথমে যে রায় দিয়েছিল অমিয় ঘোষকে নির্দোষ বলে, পুনর্বিবেচনার পরেও সেই রায়ই বহাল রেখেছে তারা। বাহিনীর একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে, তবে বি এস এফ আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের কথা ঘোষণা করে নি। ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে ফেলানিকে (১৫) গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের এক  সদস্য। ফেলানীর বাবা নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা ইউনিয়নের বানার ভিটা গ্রামের নুরুল ইসলাম ১০ বছর ধরে দিল্লিতে কাজ করতেন। তার সঙ্গে সেখানেই থাকতো ফেলানি। দেশে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বাবার সঙ্গে ফেরার পথে সীমান্ত পার হওয়ার সময় কাঁটাতারের বেড়ায় কাপড় আটকে যায়  ফেলানির। এতে ভয়ে সে চিৎকার দিলে বিএসএফ তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং পরে লাশ নিয়ে যায়।

ধর্ষক ও নির্যাতিতের মধ্যে মধ্যস্থতার সুযোগ বাতিল -ভারতে সুপ্রিম কোর্টের রুল

ভারতে ধর্ষক ও নির্যাতিত নারীর মধ্যে মধ্যস্থতার সুযোগ দেওয়া-সংক্রান্ত আদালতের একটি আদেশ বাতিল করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। এ রুলকে স্বাগত জানিয়েছেন নারী মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁরা বলেন, নিম্ন আদালত থেকে হরহামেশাই ওই আদেশ দেওয়ার ঘটনা দেশে ঘটে চলেছে। খবর এএফপির।
বিচারপতি দীপক মিশ্র ও পি সি প্যান্টের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ গত বুধবার ওই রুল দিয়েছেন। সম্প্রতি একজন বিচারক ধর্ষণের একটি ঘটনায় অভিযুক্ত একজনের জামিন মঞ্জুর করেন। যে নারীকে ওই ব্যক্তি ধর্ষণ করেছিলেন, তিনি যেন তাঁকে বিয়ে করতে পারেন, সে লক্ষ্যে মধ্যস্থতার সুযোগ দিতে ওই জামিন মঞ্জুর করা হয়।
বিচারকের এ সিদ্ধান্তে জনমনে ক্ষোভ দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিতে ওই রুল দিলেন। রুলে সর্বোচ্চ আদালত বলেন, বিচারকদের মধ্যস্থতার এমন সব আদেশ থেকে বিরত থাকা উচিত, যা কেবল ‘দর্শনীয় ত্রুটিই’ নয়, বরং নারীদের মর্যাদার ওপরও আঘাতস্বরূপ।
রুলে আরও বলা হয়, ‘এগুলো (এ ধরনের মধ্যস্থতা) এমনই অপরাধ, যা নারীদের শ্বাস-প্রশ্বাসকে রুদ্ধ ও সুনামকে কলুষিত করে। ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনায় কোনো অবস্থাতেই মধ্যস্থতার ধারণা চিন্তা করা যায় না।’
ভারতের নারী মানবাধিকারকর্মী রঞ্জনা কুমারী এ রুলের প্রশংসা করে বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকেরা প্রায়ই ধর্ষণ-সংক্রান্ত বিরোধের বিচার শেষ না করে সেটা নিষ্পত্তির একটি পন্থা হিসেবে মধ্যস্থতার ইঙ্গিত করছেন।
রঞ্জনা কুমারী আরও বলেন, ‘ধর্ষক ও নির্যাতিত নারীর মধ্যে যেকোনো মধ্যস্থতা অবৈধ। আমরা এ রুলকে স্বাগত জানাই এবং আশা করি, নিম্ন আদালত তা মেনে চলবেন।’

বাসাবো মাঠ রক্ষার জন্য নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে: মকসুদ

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহ-সভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ও সরকারের মূলনীতি উপেক্ষা করে দখলদাররা বাসাবো খেলার মাঠ খেয়ে ফেলার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর রুনি হলে শুক্রবার ‘বাসাবো বালুর মাঠে স্থাপনা নির্মাণ পরিকল্পনা’র প্রতিবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)সহ ৮টি সংগঠন এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। আয়োজক অন্য সংগঠনগুলো হল— বালুর মাঠ রক্ষা কমিটি, ব্লু প্লানেট ইনিসিয়েটিভ (বিপিআই), নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, গ্রীন ভয়েজ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, আদি ঢাকাবাসী ফোরাম এবং সুন্দর জীবন ও পিস।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, শাসক শ্রেণীর লোকেরা নদী, হাট, ঘাট, সড়ক ও খেলার মাঠের জায়গার শতকরা ৯৯ ভাগ দখল করেছে। বাকি ১ ভাগ জায়গাও সরকারের লোকেদের আনুকূল্যে থাকা লোকজন দখল করে নিয়েছে। এমপি সাহেবদের তুষ্ট করার জন্য কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে জনবহুল এলাকায় খেলার মাঠ ধ্বংস করে বিশেষায়িত বিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অথচ জনবহুল এলাকায় ফাঁকা জায়গা থাকা অত্যন্ত জরুরি। খেলার মাঠ ছাড়া সুনাগরিকও তৈরি করা যায় না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জায়গাও স্কুল কলেজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। এখন সরকারের বোধদয় না হলে উন্মুক্ত স্থান ও মাঠ রক্ষার জন্য নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন, বাপার আলমগীর কবির ও বাসাবো বালুর মাঠ রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব এবং রিটকারী হানিফ সহিদ, ধানমন্ডি খেলার মাঠ রক্ষার পক্ষের রিটকারী স্থপতি মোবাশ্বর হোসেন, ক্রীড়াবিদ গাজী আশরাফ লিপু ও বাপার যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব। উপস্থাপনা করেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল।

লেখাপড়া করে এমপিদের সংসদে যাওয়া উচিত -ডিআরইউতে ডেপুটি স্পিকার

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া বলেছেন, সংসদ সদস্যদের (এমপি) লেখাপড়া করে সংসদে যাওয়া উচিত। কিন্তু অনেকেই তা করেন না।
শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) আয়োজিত সংসদবিষয়ক রিপোর্টিং প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি ও রিসোর্স পারসনের বক্তৃতায় ডেপুটি স্পিকার এ কথা বলেন। তিনি বলেন, অনেক সংসদ সদস্যের পার্লামেন্টের ‘রুলস অব প্রসিকিউর’ সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা নেই। তাদের উচিত তা আয়ত্ত করা। তবে বর্তমান সংসদে অনেক তরুণ সদস্য আছেন, যারা ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডিআরইউর সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন, কালার স্টাইল বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান মুকুল। এতে সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউর প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদক কাজী সোহাগ।

অতীত রেকর্ডে বিশ্বাস নেই হাথুরুর

নতুন চ্যালেঞ্জ। নতুন মিশন। শিষ্যদের কানে নতুন প্রেরণামন্ত্র
১৯৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটনের সেই ম্যাচটি ছাড়া পাকিস্তানের বিপক্ষে আরও কোনো ধরনের ম্যাচেই জয় ছিল না বাংলাদেশের। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওয়ানডে রেকর্ডটিও ছিল ২৯-৩। যদি অতীত রেকর্ডই ম্যাচের ফল ঠিক করে দেয়, তাহলে আর মাঠে নেমে খেলার ​কী দরকার। চণ্ডিকা হাথুরুসিংহে তাই অতীত পরিসংখ্যান ঘাঁটাঘাঁটিতে উৎ​সাহী নন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও বাংলাদেশের রেকর্ড ভালো নয়। আরও স্পষ্ট করে বললে—যাচ্ছেতাই। তিন ধরনের ক্রিকেটে ২৪টি ম্যাচ খেলে মাত্র একটি জয়, ২০০৭ বিশ্বকাপে গায়ানায়। বাকি ১৩ ওয়ানডেতেই হার। হেরেছে ৮ টেস্টের প্রত্যেকটিতে। দুটো টি-টোয়েন্টিতেও।
বাংলাদেশ কোচ যে এই রেকর্ডের তথ্য জানেন না, এমন নয়। তবুও যখন মনে করিয়ে দেওয়া হলো, হাথুরুর উত্তর, ‘অতীত বিশ্বাস করলে আজ আমি এখানে থাকতাম না। অতীত রেকর্ডে আমার বিশ্বাস নেই। এটা বদলাবেই। অতীত রেকর্ডে কিছু যায় আসে না। আপনি এখন কী করছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে সব। আমরা অতীতে বাস করি না, বাস করি বর্তমানে। খেলোয়াড়েরা অতীত রেকর্ড নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে কি না, সেটা আমার হাতে নেই। আমি শুধু আমার খেলোয়াড়দের দিক নির্দেশনা দিতে পারি—এই হলো আমাদের শক্তি, আর এই এই কাজগুলো আমাদের করা উচিত। আমি সব সময়ই তাদের মনে করিয়ে দিই, খেলোয়াড় হিসেবে তারা কতটা অসাধারণ, আর তাদের পক্ষে কী করা সম্ভব।’
দলকে যে তিনি দারুণ উজ্জীবিত করতে জানেন, সেটা খেলোয়াড়দের দেহভাষাতেই এখন পরিষ্কার। অন্তত ছোট সংস্করণে বাংলাদেশ এখন কাউকেই ভয় পায় না। তবে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বা বাড়তি আত্মবিশ্বাস অনেক সময় আত্মঘাতী হয়ে যায়। হাথুরু অবশ্য আশ্বস্ত করছেন, ‘এমন কিছু দেখিনি যেটায় মনে হয়েছে দলের মনোযোগ সরে যাচ্ছে। তারা মাটিতেই পা রাখছে। তবে সাফল্য জিনিসটা উপভোগও করতে হবে। এই খেলোয়াড়েরা এমন কিছু করে দেখিয়েছি, যা আগে কেউ কখনো করেনি। তাদের সেই অধিকার আছে এই সাফল্য উপভোগ করার, নিজেদের আত্মবিশ্বাসী ভাবার।’
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে দুটো প্রধান কৌশলগত প্রশ্নের সামনে। পেস নাকি স্পিন; এবং মুশফিক নাকি লিটন দাস? দুটোরই উত্তর দিলেন হাথুরু। মুশফিকের ফিটনেসের ওপর নির্ভর করছে কে করবে কিপিং। আর বোলিং আক্রমণ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা, ‘এখন আমাদের স্পিন আর পেস আক্রমণে একটা ভারসাম্য এসেছে। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদে​শে অনেক ভালো স্পিনার উঠে এসেছে। এখনো আছে। হয়তো আমাদের পর্যাপ্ত ভালো ফাস্ট বোলার নেই, কিন্তু তারাও দলের মধ্যে বাড়তি শক্তি যোগ করেছে। কেউ হয়তো লম্বা, কারও বোলিংয়ে দারুণ বৈচিত্র্য, কেউ সুইং করাতে পারে। আমাদের হাতে তাই এখন অনেক বিকল্প। দক্ষিণ আফ্রিকা দলে অনেক ভালো ফাস্ট বোলার আছে, আর ওদের ব্যাটিংটাও দুর্দান্ত। এখন তো ওরা স্পিনেও দারুণ খেলে। আমাদের তাই ধারাবাহিক ক্রিকেটটা খেলতে হবে। মাঠে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হবে।’

হাসিনাকে হত্যা চক্রান্তে ছিলেন খুনি ডালিম by মিজানুর রহমান খান

শরিফুল হক ডালিম, মেজর জিয়াউল হক, ইশরাক আহমেদ
সাড়ে তিন বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম। ঢাকার সৌদি আরবের দূতাবাস রিয়াদে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সে রকমটিই জানিয়েছিল। উইকিলিকসে সদ্য ফাঁস হওয়া সৌদি কূটনৈতিক বার্তায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।
উইকিলিকসে সৌদি গোপন নথি: ‘২০১১ ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টায় বিএনপি, তারেক ও জামায়াতকে জড়িত করা যুক্তিযুক্ত নয়’ আরবি ভাষায় পাঠানো এসব বার্তার বাংলা ভাষান্তর করে দেখা যায় যে সৌদি দূতাবাস রিয়াদে তাদের মন্ত্রণালয়কে ঘটনাবলির যে বিবরণ জানিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছে যে অভ্যুত্থানকারীরা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধানসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিল। সৌদি দূতাবাসের মতে, ঘটনাটি কার্যত ছিল ‘অত্যন্ত সীমিত’। তবে সরকার বিষয়টিকে তার পক্ষে প্রচারণার কাজে লাগিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপি, তারেক রহমান ও জামায়াতকে জড়িত করা ‘যুক্তিযুক্ত নয়’ বলেও ওই বার্তায় অভিমত প্রকাশ করা হয়।
১৪৩৩ হিজরি সনের (ইংরেজি ২০১২ সাল) ২৪ রবিউল আউয়াল বাংলাদেশে সৌদি দূতাবাস তাদের অতিগোপনীয় এক পত্রের মাধ্যমে এসব তথ্য সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছিল। বাংলাদেশ-সংক্রান্ত এসব সৌদি বার্তার ইংরেজি তরজমা গত ৩০ জুন ই-মেইলে সৌদি দূতাবাসে পাঠিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যোগাযোগ ও মতামত চাওয়া হলেও দূতাবাস কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
২০১২ সালের ৩ জানুয়ারি বর্তমানে বন্ধ থাকা দৈনিক পত্রিকা আমার দেশ ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মধ্যম সারির কর্মকর্তারা অচিরেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন’ মর্মে মেজর জিয়াউল হক প্রচারিত একটি ই-মেইল প্রকাশ করে। এর ছয় দিন পরে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে এক জনসভায় সেনাবাহিনীতে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে উল্লেখ করেন।
আমার দেশ-এর ওই বিবৃতি প্রকাশ এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ব্যর্থ করে দেওয়া একটি অভ্যুত্থানচেষ্টার কথা প্রকাশ করে। তবে সেনাবাহিনীর প্রকাশিত বিবরণে শরিফুল হক ডালিমের কোনো উল্লেখ ছিল না। বাংলাদেশে এর আগে কখনোই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো ব্যর্থ অভ্যুত্থান-চেষ্টার তথ্য সেনাবাহিনী বা সরকার প্রকাশ করেনি।
সৌদি নথিতেই প্রথম দেখা যাচ্ছে যে ওই অভ্যুত্থানচেষ্টার পরিকল্পনা তিনটি দেশে বসে ঘটেছে এবং এর ‘সমন্বয়কারীর’ দায়িত্ব পালন করেছেন পঁচাত্তরের আগস্ট অভ্যুত্থানের অন্যতম কুশীলব ডালিম, যিনি ‘বর্তমানে আফগানিস্তানে রয়েছেন’ বলেও উল্লেখ করা হয়।
সামরিক বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরে (আইএসপিআর) যোগাযোগ করে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে তারা কোনো কথা বলতে চায়নি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে। পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক উইকিলিকসের এ বিষয়টি তাঁর জানা নেই বলে কোনো মন্তব্য করেননি।
গত ১৯ জুন উইকিলিকস ওয়েবসাইটে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের গোপন নথি প্রকাশের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী একটা হইচই পড়ে যায়। গত দুই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক নথি সৌদি সরকার ও রাজপরিবারের সদস্যদের বিব্রত করেছে। কিন্তু সৌদি আরব সরকার কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে। বরং সৌদি সরকার তাদের নাগরিকদের হুঁশিয়ার করে বলেছে যে তারা যেন ‘ভুয়া হতে পারে এমন সব নথিপত্র বিতরণ করা থেকে বিরত থাকে’। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টুইটারের মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে অবশ্য সরাসরি কোনো নথিপত্রের সত্যতা নাকচ করে দেয়নি। এর পরদিন সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘কোনো নথি বিনিময় কিংবা প্রকাশ করে রাষ্ট্রের শত্রুদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে দেওয়া কোনো নাগরিকের উচিত হবে না। এর অনেক নথিই বিভিন্ন উপায়ে বানোয়াট হতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে, জড়িতদের শাস্তি দেওয়া হবে।’
উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে অবরুদ্ধ থাকার তিন বছর পূর্তিতে ১৯ জুন সৌদি আরব সরকারের পাঁচ লাখের বেশি গোপন নথি প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফাঁস করে দেওয়া মার্কিন নথি-সংবলিত উইকিলিকস ওয়েবসাইটে ওই দিন সৌদি প্রশাসনের প্রায় ৬১ হাজার গোপন নথি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত কিছু নথির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে।
প্রথম আলোর খুঁজে পাওয়া ঢাকার সৌদি দূতাবাসের স্মারক নং ২১৮/৫/৫-৩২৬ তাং ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩ তারবার্তাটিতে এক মাস আগে পাঠানো আরও দুটি বার্তা (‘অতিগোপনীয়’ চিহ্নিত স্মারক নং ৫/৫/৬৫০৭৭ তাং ২৬/২/১৪৩৩ এবং স্মারক নং ২১৮/৫/৫/২২৮ তাং ২/৩/১৪৩৩) উল্লেখ রয়েছে যা পাওয়া যায়নি। ওই তারবার্তায় দূতাবাস মিডিয়ার বরাতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ জন কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালায়, যার লক্ষ্য ছিল সেনাপ্রধানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো। এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হয়েছিল হংকং, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায়।
ওই সৌদি নথিতে বলা হয়, ‘এ অভ্যুত্থানের সমন্বয়কারী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা শরিফুল হক ডালিম এবং হংকংয়ে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ ওই কাজে অর্থায়ন করেন এবং অভিযোগ রয়েছে যে তিনি নিষিদ্ধঘোষিত হিযবুত তাহ্রীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে সরকার এই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।’
এরপর ওই নথিতেই বলা হয় যে ‘সৌদি দূতাবাস মনে করে অভ্যুত্থানচেষ্টা খুব সীমিত আকারে ছিল। কিন্তু সরকার এ ঘটনাকে তার পক্ষে প্রচারণার জন্য কাজে লাগিয়েছে এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দলকে এ ঘটনায় অভিযুক্ত করছে। কিন্তু দূতাবাস মনে করে এই অভিযোগ সত্য নয়।’
২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ রাজ্জাক আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশ করেছিলেন যে ১৬ জন ইসলামি উগ্রপন্থী সেনা কর্মকর্তা ২০১১ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাতের চক্রান্ত করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। এর আগের বছরের (২০১১) ১৩ ডিসেম্বর এ পরিকল্পনা সেনাবাহিনী জানতে পারে। এরপর ঘটনা তদন্তে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মিলে প্রথমে পাঁচটি, পরে আরও ছয়টিসহ মোট ১১টি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়। আদালত মোট ৭৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ তদন্ত করে ও তাঁদের জবানবন্দি গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত একজন মেজর জেনারেল, একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ ১৫ কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করে।
ওই সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজন অবসরপ্রাপ্ত এবং ১৩ জন কর্মরত কর্মকর্তা ছিলেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে আটজন বিভিন্ন সময় ফৌজদারি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এসব জবানবন্দিতে তাঁরা ঘটনার সঙ্গে নিজে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম বলেন। এসব জবানবন্দি ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে পরে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ধরনের সাজা দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর মেজর জেনারেল পদের কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয় এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ২১ জানুয়ারি গণভবনে এক মতবিনিময় সভায় খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। এখন তাঁর কথার অর্থ বোঝা গেল এবং এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’ পরদিনই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াসের অংশ হিসেবে সরকার বিরোধী দলের দিকে ইঙ্গিত করছে।’ সেনাসদরের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাসুদ রাজ্জাক চট্টগ্রামে দেওয়া খালেদা জিয়ার মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল সেনাবাহিনীতে গুমের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করে, যা সেনাবাহিনীসহ সচেতন নাগরিকের মধ্যে উসকানিমূলক বিতর্কের সৃষ্টি করে।’ মির্জা ফখরুল এর উত্তরে বলেছিলেন, সেনাসদরের কিছু কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
সৌদি দূতাবাস তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল, ‘সরকার ওই অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টার সঙ্গে ব্রিটেনে বসবাসরত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমিরের ছেলে লোকমান আল আজমিকেও অভিযুক্ত করেছে। সরকার আরও প্রচার করেছে যে এই অভ্যুত্থান-প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাগণ কট্টর ইসলামপন্থী। মনে হয় সরকার এই অপবাদ দিয়ে ইসলামি কট্টরপন্থী লোকজনকে অপসারণের মাধ্যমে সেনাবাহিনী শুদ্ধকরণে ব্যবহার করবে।’
ওই অভ্যুত্থানে জড়িতদের পরিচয় সম্পর্কে সেনাসদরের মুখপাত্র ‘ধর্মান্ধের অনুভূতি’ এবং ‘ধর্মীয় অনুশাসন পালনে হঠাৎ অতিমাত্রায় কট্টর’ বলে উল্লেখ এবং তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ২০১২ সালের ২০ জানুয়ারি এ ঘটনার সঙ্গে ‘বিএনপি-জামায়াত জোটেরও সংশ্লিষ্টতা’ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন।
ওই সৌদি নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে এবং ভারত এ জন্য বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকেও অভিযুক্ত করেছে।’ এই নথিটির এর পরের অংশ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তৎকালীন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদ আল ফয়সাল (বর্তমানে তিনি বাদশাহর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা) এই নথিটিই হিজরি ১৪৩৩ সনের ২৭ রবিউল আউয়াল তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর নজরে এনেছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত এক পৃষ্ঠার ‘একটি বিশেষ গোপনীয় পত্র’ থেকে দেখা যায়, ওই নথিতে তারেক প্রসঙ্গের পরে দূতাবাসের মূল্যায়ন হিসেবে লেখা আছে, ‘এই বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়ার দল ও তাঁর ছেলে এবং জামায়াতে ইসলামীকে অভিযুক্ত করা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি যে বিরোধী দল বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া সরকার পতনের জন্য কখনো সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে বিরোধী দল যখন ভালো করেই জানে যে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব শেখ হাসিনা সরকারের অনুগত।’ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই চিঠির অনুলিপি সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধানকেও দিয়েছিলেন।
এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেনাবাহিনী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী। তাদের অবশ্যই বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। সৌদি নথিতে ওই ঘটনা সম্পর্কে তাদের সরকারের যে মনোভাবের ইঙ্গিত পাচ্ছি, তাতে বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটেছে।’
উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায় এই অভ্যুত্থানচেষ্টা বিষয়ে পাকিস্তানে সৌদি আরবের ইসলামাবাদের দূতাবাস তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক নোট (নং-৩/১/৭১২১ তাং-৭-৩-১৪৩৩ হিজরি) পাঠিয়েছিল। ওই নোটে বলা হয় যে ‘অধিকাংশ পাকিস্তানি মনে করে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের ক্রীড়নক হিসেবে তাঁর দেশে ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন এবং গত সপ্তাহের অভ্যুত্থানচেষ্টাবিষয়ক প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল এর সঙ্গে জড়িয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেই সমস্ত কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা, যাঁরা বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করছিলেন। উপরন্তু শেখ হাসিনা এই অভ্যুত্থানের ঘটনাকে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তাঁর যারা বিরোধী রয়েছে, তাদের শায়েস্তা করতেও একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবেন।’

কাকস্য বেদনা by শাহ্নাজ মুন্নী

মানুষ শখ করে কত ধরনের পাখি পোষে! কবুতর, তোতা, টিয়া, কাকাতুয়া, জোড়ায় জোড়ায় লাভ বার্ড! আর আমি কিনা পুষি কালো পাখি—কাক!
তা-ও খাঁচায় বন্দী করে না, ছাড়া রেখেই। আমার সেই পোষা কাকগুলো সারা দিন যথেচ্ছ উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায়, সন্ধ্যা হলে ভালো ছেলেদের মতো ঘরে ফিরে আসে। বাসার পেছনের বারান্দায় স্তূপ করে ফেলে রাখা ভাঙা চেয়ার, নষ্ট হয়ে যাওয়া জং-ধরা বাইসাইকেল, পা-ভাঙা সোফা আর পুরোনো আলমারির খোপের ভেতর ঢুকে আরাম করে ঘুমায়।
মাঝে মাঝে তারা কোথাও যায় না, বারান্দার রেলিংয়ে চুপচাপ ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো বসে থাকে। এদিক-ওদিক মাথা নাড়ায়, খিদে পেলে গৃহস্থালি ময়লা ফেলার ঝুড়ি থেকে নিজেদের পছন্দমতো খাবার খুঁটে খায়।
ওদের আমি খুব বেশি ঘাঁটাই-টাটাই না, নিজের মতোই থাকতে দেই। দূর থেকে ওদের হাবভাব দেখি। মাঝে মাঝে যখন কাকদের মেজাজ খুব ভালো থাকে, তখন ওরা নিজেরাই আমাকে ডাকে গল্পগুজব করার জন্য, বিশেষ করে যখন প্রখর জোছনার প্লাবনে চরাচর ভেসে যায়, কাকসমাজ চাঁদের আলোকে দিন ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন কাকদের কথা বলার ইচ্ছা জাগে। এমনিতে কাকের গলার স্বর কর্কশ। কিন্তু যখন কথা বলে, তখন ওদের গলা খুব মিষ্টি শোনায়। পাতিকাকের গলা শুনলে মনে হয়, একটা অল্প বয়সের মেয়ে টুক টুক করে কথা বলছে।
দাঁড়কাকের কণ্ঠ আবার বেশ ভরাট, যেন মনে হয় কোনো বিখ্যাত আবৃত্তিকারের গমগমে কণ্ঠস্বর শুনছি।
বিচিত্র বিষয়ে প্রবাহিত হয় আমাদের আলাপ। কাকেরা বলে, গাছের আত্মাকে তারা দেখতে পায়। কারণ, আত্মা একটা পাতলা ছায়ার মতো গাছের গায়ে লেপ্টে থাকে। ‘মানুষ কিছুই দেখে না, তাদের চোখ বড় সাধারণ।’—মোটা ঠোঁট নাড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে মন্তব্য করে দাঁড়কাক।
পাতিকাক বলে, ‘আকাশে ভেসে চলা মেঘের ভাষা ওরা বুঝতে পারে। মেঘগুলো নাকি সারাক্ষণ বালিকা বিদ্যালয়ের চপলা মেয়েদের মতো নিজেদের মধ্যে পুটুস পুটুস কথা বলতেই থাকে। সেসব কথার শুরুও নেই, শেষও নেই, আগাও নেই, মাথাও নেই।’
কখনো আমি প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে নির্বোধের মতো ওদের প্রশ্ন করে বসি—
‘আচ্ছা, বলো তো, কাক কেন কাকের মাংস খায় না?’
আমার প্রশ্নকে মোটেও গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের মতো কথা বলে যায় তারা। বলে, ‘এই যে আমাদের দেখছ, এটা আমাদের দ্বিতীয় রূপ। আদিতে কাকের গায়ের রং ছিল ধবধবে সাদা, বুঝলা? সাদা পালক, গোলাপি ঠোঁট, গোলাপি পা। আমাদের পাখায় ছিল প্রচণ্ড শক্তি। তীব্র গতিতে উড়তে পারতাম, কখনো কখনো ছুঁয়ে ফেলতাম সূর্যের শরীর, চাঁদের হাত-পা। এতে খুব হিংসা হলো সূর্যের। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এল সে। তারপর নিজের উত্তাপের অহংকার দিয়ে আমাদের পুড়িয়ে কয়লার মতো কালো বানিয়ে দিল, আমাদের গায়ের রং গেল পাল্টে...’
‘ঠিক নয়।’—সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে বলি আমি, ‘টেড হিউজের কবিতায় আছে, আসলে নিজের চাইতে সাদা আর উজ্জ্বল সূর্যকে দেখে কাকের হিংসা হয়েছিল, কাকই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আক্রমণের, নখর শাণিয়ে সে-ই ছুটে গিয়েছিল সূর্যের দিকে আর পরাজিত হয়ে কয়লার কালো নিয়ে ফিরে এসেছিল।’
‘ইতিহাস বিকৃতি’—দাঁড়কাক ভারি কণ্ঠে বলে।
‘না জেনে কী সব লিখেছে।’—হাসতে থাকে পাতিকাক।
কাকের হাসি, মানবশিশুর কান্নার শব্দের মতো, ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া; কিন্তু খুবই মধুর এবং ছন্দময়। সেই ছন্দের মাধুর্যে আমি আচ্ছন্ন ও আকৃষ্ট হই। সব মিলিয়ে কাক হয়ে যায় আমার প্রিয় পাখি। আমি কাক ভালোবাসি। কাকের সত্যি তুলনা নেই। ‘কলসের মধ্যে পাথর ফেলে তৃষ্ণার্ত কাকের পানি ওপরে তুলে এনে খাওয়ার’ সেই গল্পটি পড়ার সময় থেকেই আমি এদের ব্যাপক ভক্ত। বুদ্ধিমান বলেই না কাক এভাবে পানি খেতে পেরেছিল, বলো!
আমার এই কাকপ্রীতি দু-চক্ষে দেখতে পারে না অনিতা। অনিতা সূর্যের মতো সুন্দরী। কাককে সে মনে করে অশুভ আর অর্থহীন। কাক ঘৃণা করে অনিতা। আমার মনে হয়, অনিতা আমাকেও ঘৃণা করে। কিন্তু আমি অনিতাকে ভালোবাসি, যেমন ভালোবাসি কাককেও। অনিতার পছন্দ সাহসী ইগল, অনেক উঁচুতে যারা স্থির হয়ে ভেসে বেড়ায়।
কাক তার পুরোনো কথার জের ধরে বলে, ‘জেনে রাখো, নিজের অহংকারে সূর্য নিজেই একদিন কালো হয়ে যাবে, তার গায়ে অজস্র ফুটকির মতো উড়তে থাকবে কাক। তার পোশাক হলুদ হবে, তার আলো ম্লান হবে, তখন জন্ম নেবে একটি কালো সূর্য।’
কাকের কথার মর্ম না বুঝে আমি চুপ করে থাকি। কাক আবারও বলে, ‘তোমরা তো শুধু আমার কালো শরীর দেখো। এই কালোর মধ্যে কত রং লুকিয়ে থাকে, জানো? জানো, ঘন ঘাসের আসল রহস্য কী? জানো, পেঁচা কীভাবে কাকের শত্রু হলো? বুনো ফুলে কেন এত সুগন্ধ ঝরে পড়ে, মেঠো ইঁদুর কোথায় লুকিয়ে রাখে কৃষকের ধান? ধুলোয় গড়িয়ে চলা একহারা সাপ মাটির সঙ্গে রসিকতা করে কী কথা বলে, জানো সেটা? জোনাকি পোকা খেতে কেমন লাগে, বলতে পারো তোমরা?’
কাকেদের ধারাবাহিক প্রশ্নের সামনে আমি বোকা হয়ে, বোবা হয়ে যাই, আর ভাবি এরা অবশ্যই চতুর, এরা নিশ্চয়ই বিভ্রান্তিমূলক, এরা যুগপৎ পরিশীলিত আবার জটিল।
অনিতা আমার উপলব্ধি শুনে মুখ ফিরিয়ে থাকে। তীব্র গলায় বলে, ‘তুমি উন্মাদ। তুমি নোংরা। তুমি নিজেই একটি মানুষরূপী কাক।’
অনিতাকে মনে হয় চুলার ওপরে জ্বলতে থাকা ফুটন্ত পানি, নৃত্যরত আগুন, আমি অনিতাকে ছুঁতে গিয়ে পুড়ে যাই, ডুবে যাই, গলে যাই, মরে যাই। মুমূর্ষু কণ্ঠে বলি, ‘অনিতা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।’ এ কথা শুনে আরও রেগে যায় অনিতা। বলে, ‘আগে কাকদের তাড়াও, তারপর ভালোবাসার কথা বলতে এসো।’ অমি মাথা নিচু করে বসে থাকি। অনিতা অবশেষে আমাকে পরিত্যাগ করে। ভাঙা মন নিয়ে আমার ভাঙা বারান্দায় ফিরে যাই আমি। কাকেরা আমাকে দেখে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। ‘কাক কি তবে দুঃখ বোঝে? প্রেম বোঝে? বিরহ? বেদনা? কবিতা? প্রথম দর্শনে তীব্র ভালোবাসা, ওরে কাক, তুই কি বুঝিস এসব? মহামান্য কাক, বলুন, অশ্রু, হাহাকার তৃষ্ণা আর মুগ্ধতার মোহ আলোড়িত করে কি আপনাকে?’
নবজাতকের কান্নার মতো মধুর শব্দ করে হাসে কাক। তার মৃদু হাসি ধীরে ধীরে পরিণত হয় অট্টহাসিতে। আমি দেখি, পোষা বায়স-কুল একসঙ্গে ডানা ঝাপটায়। যেন এক্ষুনি তারা আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে, নরম কোনো কথায় আমার ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে দেবে, আমি ভাবি, কিন্তু বাস্তবে তারা দল বেঁধে উড়ে যায়। বলে ‘কা-কা-কা ...’ ‘উত্তর নিয়ে ফিরে আসিস।’—পেছন থেকে চিৎকার করে বলি আমি।
পরদিন দেখি কাক নয়, অপ্রত্যাশিতভাবে এক কোকিল এসে বসে আছে বারান্দার নোংরা রেলিংয়ে। অদ্ভুত! কোকিল বড় অসামাজিক হয় জানি, পাতার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, সে কেন আজ এল এখানে? কাকের বাসায় চুপি চুপি ডিম পাড়তে এসেছে?
কোকিল তার সুমিষ্ট কণ্ঠে বলে, ‘না গো না...তুমি নাকি কী সব দুঃখ, প্রেম আর বেদনার কথা জানতে চাইছ, তাই কাকেরা পাঠাল আমাকে, পক্ষিকুলে এসব নিয়ে আমিই চর্চা করি কিনা। আমিই তো ঘর না বাঁধা উদাস পাখি, গান গাই, গান বাঁধি।’
কোকিলকে আমার কিছুটা চপল আর চঞ্চল মনে হয়। যেন সে অস্থির, নিরাশ্রয় আর পথভ্রষ্ট। তবু তার কাছে জানতে চাই, ‘বলো হে সুরের পাখি, বসন্তের দূত, প্রাণিজগৎ কেন পা রাখে প্রেমের পথে...?’
কোকিল বলে, ‘এর উত্তর জানি না। শুধু জানি এটাই নিয়তি। প্রেমে তোমার অন্তর রক্তাক্ত হবে আর সেই রক্ত থেকে ফুটবে গোলাপ। তার সুগন্ধে আমোদিত হবে চারপাশ।’
‘প্রেম কেন বেদনা হয়ে জেগে ওঠে?’
কোকিল বলে, ‘তুমি কি জানো না প্রেম এক আগুনের নাম, পোড়ানোই তার ধর্ম, সমস্ত উড়ন্ত পতঙ্গই তা জানে...’
‘তবে পরিত্রাণের উপায় কী, হে সুকণ্ঠি পাখি?’
শূন্যে ডানা মেলে দেয় কোকিল। বলে, ‘পরিত্রাণ আমার জানা নেই হে সম্মানিত প্রশ্নকারী, বিদায়।’
আমি আকুল হয়ে জানতে চাই, ‘আমার প্রিয় কাকেরা কোথায় গেল?’
কোকিল বলে, ‘তারা আরও গভীর আরও মহৎ আরও গোপন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত আছে। বিদায়।’
কোকিলের এ কথা শুনে আমার রাগ হয়, মনে মনে বলি, ‘প্রেমের চাইতে গভীর, প্রেমের চাইতে মহৎ, প্রেমের চাইতে গোপন আর কী থাকতে পারে? কুৎসিত কাকেরা কী নিয়ে এত ব্যস্ত? কোথায়, কোন আবর্জনা ঘাঁটতে গেছে তারা?’
আমার অন্যমনস্কতার সুযোগে উড়ে যায় পরভৃৎ কোকিল। ওড়ার আগে কাঁপা কণ্ঠে জানিয়ে যায়, ‘জগৎ পরিদর্শন শেষে ফিরে আসবে কাকেরা। তাদের ডানায় বিস্তৃত হয়ে আছে বাতাসের গতি। বিদায়, ওহে প্রশ্নকারী প্রাণী, বিদায়।’ আমি বারান্দার একটা ভাঙা চেয়ারে বসে এক মনে আমার পোষা কাকদের জন্য, জগতের জ্ঞানবান পাখিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আমার চেহারা আগে থেকেই বেশ কালো, রোদে বসে থাকতে থাকতে সেই চেহারা আরও কালো হয়ে যায়। আমি শোকমগ্ন কালো পোশাক পরে বসে থাকি এক ঠায়। কাকেরা ফিরে আসে না। তখন আমি ভাবি, কাকরা না ফিরলে অনিতা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু অন্তহীন শব্দহীনতায় ডুবে থাকে চারপাশ। নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিয়ে ফেরে না কেউ। আমার গায়ে ধীরে ধীরে কালো মসৃণ পালক গজায়। আমার ঠোঁট লম্বা, সরু ও শক্ত হতে থাকে। কণ্ঠ হয় কর্কশ। আমার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়। তবু অনিতা বা কাক, কারোর দেখা মেলে না। তারপর এক রাতে চরাচর ভাসিয়ে তরল রুপার মতো উজ্জ্বল সাদা জোছনা নামে। মনে হয়, রাত শেষে আলোময় ভোর এসে গেছে। নিজের মধ্যে একধরনের বন্য অস্থিরতা অনুভব করি আমি। আর তখনই শুনতে পাই পাখা ঝাপটানোর পরিচিত শব্দ। দেখি ফিরে আসছে কাকের দল। তারা এসে পুরোনো বন্ধুর মতো, শোকগ্রস্ত স্বজনের মতো আমাকে ঘিরে বসে। বলে, ‘কত দিন আর এমন চিন্তিত ও ব্যথিত থাকবে, হে সহমর্মী মানুষ? এবার, আমাদের সঙ্গে চলো, তোমাকে জ্ঞানবৃক্ষের কাছে নিয়ে যাই।’ আমি তাদের সঙ্গে ডানা মেলে দেই। একটা বিশাল দাঁড়কাক হয়ে অসংখ্য কাকের সঙ্গে আকাশ ছুঁয়ে নির্ভার উড়তে থাকি।

ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে হবে by মইনুল ইসলাম

১৫ জুন ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে যান চলাচলে রূপরেখা চুক্তি সই হয়। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দেশগুলোর মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করতে পারবে। এতে বাংলাদেশ কী আর্থিক সুবিধা পেতে পারে এবং কী ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে, সে সম্পর্কে বলেছেন অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান—এই চার দেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচলের যে রূপরেখা চুক্তি সই হলো, তা উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি বলে আমি মনে করি। চুক্তিটি ছয় মাস পর থেকে কার্যকর হবে। তবে এতে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে যেসব অনুমতি ও শর্তের কথা বলা হয়েছে, তাতে মানুষ নিরুৎসাহিত হতে পারে। তবে পণ্যবাহী যান চলাচলের ক্ষেত্রে এটি আকর্ষণীয় হতে পারে। সেটা আবার নির্ভর করবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর প্রয়োজনীয়তার ওপর।
এই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল করতে হবে। ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশের ট্রাকের তুলনায় অনেক বড়। আমাদের ট্রাকগুলোর ভার বহনের ক্ষমতা যেখানে সর্বোচ্চ ১২ টন, সেখানে ভারতীয় ট্রাক বা লরির ভারবহন ক্ষমতা ১৭ টন। ফলে বাংলাদেশের সড়কে ১২ টনের চেয়ে বেশি ভারবাহী ট্রাক চলাচল করলে তা টিকবে না, ভেঙে যাবে। সে কারণে সরাসরি ভারতীয় এই বিশালাকৃতির লরিগুলো বাংলাদেশের সড়কে চলতে দেওয়া ঠিক হবে না। চুক্তিতে এ বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়েছে বলে দেখিনি। আবার চুক্তি যেহেতু কার্যকর হবে ছয় মাস পর, এর মধ্যে বাংলাদেশের সড়কগুলো সংস্কার করা যেতে পারে। সেটা সম্ভব না হলে বাংলাদেশের ট্রাক ভারতীয় পণ্য এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। সেটা হলে বাংলাদেশের ট্রাকমালিকেরাও উপকৃত হবেন।
এদিকে নৌ-চলাচল তো আরও আগেই শুরু হয়ে গেছে। এখন আমাদের এর টোল/মাশুল নির্ধারণ করতে হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ট্রানজিটের টোল নির্ধারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি অনুসরণ করা হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিতে কী আছে, আমরা তা জানি না। ফলে সেটার ওপর মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কিন্তু মাশুল নির্ধারণে একটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। শিলিগুড়ির পার্বত্য এলাকার চিকেন নেক দিয়ে সেভেন সিস্টার বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য নিতে গেলে ভারতের অনেক খরচ হয়। তারা বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সেটা করলে পরিবহন খরচ কমে যাবে। ফলে ভারতের পণ্য পরিবহনে অনেক সাশ্রয় হবে। এই সাশ্রয়ের একটা অংশ বাংলাদেশের পাওয়া উচিত। অর্থাৎ এ থেকে শুধু ভারতই লাভবান হলে সেটা ন্যায্য বিচার হবে না। ট্রানজিটের টোল নির্ধারণে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। তারা তাদের মতামতও দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেটা গ্রহণ করেছে না করেনি, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু বলেনি। প্রখ্যাত সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়াত এম রহমতউল্লাহ এই টাস্কফোর্সে কাজ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, ট্রানজিট পেলে ভারতের যে ব্যয় সাশ্রয় হবে, তার অর্ধেক বাংলাদেশের দাবি করা উচিত।
এখন কথা হচ্ছে, এই মাশুল নির্ধারণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শুরু করতে হবে। নৌপরিবহন তো শুরু হয়ে গেছে। ফলে আশুগঞ্জ নদীবন্দরের উন্নয়নকাজ শুরু করে দিতে হবে। একই সঙ্গে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কের সংস্কারকাজও শুরু করতে হবে। ফেনী নদীর ওপর ত্রিপুরার সাব্রুম থেকে বাংলাদেশের রামগড় পর্যন্ত একটি সেতু নির্মাণের কথা রয়েছে, সেটি যত শিগগির সম্ভব শেষ করতে হবে। এটি তেমন বড় সেতু নয়, আর ভারতই এর খরচ বহন করবে। ওদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ হয়ে রামগড় পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ হওয়ার কথা। সেটির কাজ এখনো শুরু হয়নি। এটি হয়ে গেলে চট্টগ্রাম থেকে রামগড় পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা যাবে, আর সেখান থেকে অনায়াসে তা ত্রিপুরায় নেওয়া যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আমরা পুরোপুরি ব্যবহার করছি না, এর ২০ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। ফলে প্রাথমিকভাবে এই বন্দরের সেভেন সিস্টারগামী পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পুরোদমে এই পণ্য পরিবহন শুরু হয়ে গেলে সেটা আর সম্ভব হবে না। তখন কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে আরও কিছু জেটি নির্মাণ করতে হবে। এ বছরই কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা। সেটির কাজ দ্রুত শুরু করে দিতে হবে। এদিকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করলেও ভারতের আপত্তির মুখে বাংলাদেশ সেখান থেকে সরে এসেছে। কিন্তু সেটা করা উচিত হয়নি। এই বন্দর হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমত। এই গভীর সমুদ্রবন্দর আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। ফলে সেটি নির্মাণের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে হবে।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এ সত্যটি আমাদের বুঝতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশই অন্য দেশকে ট্রানজিট দেয়। ফলে আমরাও তা দিতে পারি, তবে সে ক্ষেত্রে নিজেদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে হবে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃটিশ সৈন্য হাঁটছেন বহিঃকঙ্কালের সাহায্য

আফগানিস্তান যুদ্ধে আহত হওয়ার পর চিরতরে কোমর থেকে পা পর্যন্ত পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন বৃটিশ এক সৈন্য। গ্রেনেডিয়ার গার্ডের সাবেক সেনা সদস্য জেমস জনসন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলেও, ‘এক্সোস্কেলেটন’ বা বিশেষ ধরনের এক বহিঃকঙ্কালের সাহায্যে এখন হাঁটতে পারছেন তিনি। এজন্য তাকে রোবট বহিঃকঙ্কালের সঙ্গে প্রথমে হাঁটাটা রপ্ত করতে হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। স্যালফোর্ড ইউনিভার্সিটির পাইলট স্কীমের লক্ষ্য, কিভাবে রোবট প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাঁটা যায়, তা মানুষকে শেখানো। প্রথম পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে সে স্কীমের অংশ হলেন জেমস জনসন। গত দুই বছরে এক্সোস্কেলেটন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে। তবে অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় তা ক্রয় করা অধিকাংশের পক্ষেই সম্ভব নয়। জনসন যে ‘রিওয়াক সিস্টেম’টি কিনেছেন, তার দাম ৬৬ হাজার ৫৪১ ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এক্সোস্কেলেটনটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আশা করছে, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো পক্ষাঘাতগ্রস্ত অন্য রোগীদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবে। ফলে, তারাও আবার হাঁটতে পারবেন। কৃত্রিম বা বায়োনিক পায়ের সাহায্যে হাঁটাটা যদিও আসল পায়ের মতো স্বাভাবিক নয়, তারপরও আবার হাঁটতে পারার স্বপ্ন আচ্ছন্ন করবে পক্ষঘাতগ্রস্ত রোগীদের প্রায় সবাইকেই।

বর্তমান সংসদ কি গণতন্ত্রের প্রতীক? by গোলাম মোহাম্মদ কাদের

কয়েক দিন আগে একজন গুণী ব্যক্তির একটি সুন্দর বক্তব্য শুনলাম। একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক’। অত্যন্ত মূল্যবান কথা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গণতন্ত্রের চর্চার যে কয়েকটি ব্যবস্থা বিদ্যমান, তার মধ্যে সংসদীয় পদ্ধতি অন্যতম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থায় এ কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে করে ওই সব দেশের গণতন্ত্রায়ণের চর্চা ও উৎকর্ষ সাধন সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতির পথিকৃৎ বলা যায় যুক্তরাজ্যকে। ভারত এ বিষয়ে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হতে পারে। যেকোনো গণতন্ত্রেÿ ক্ষমতার মূল মালিক জনগণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জনগণের স্বার্থে এ ক্ষমতা ব্যবহার করবেন, এটাই লক্ষ্য।
সংসদীয় পদ্ধতির শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা ও দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন স্তরে অনেক ধরনের প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে। সংসদের উদ্দেশ্য থাকে সকল প্রকার ক্ষমতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয় সাধন, পরস্পরের মধ্যে জবাবদিহির মাধ্যমে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি সৃষ্টি ও সার্বিকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি। লক্ষ্য থাকে সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন ও অন্য যেকোনো প্রকারে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা, যাতে করে কেউই এককভাবে ক্ষমতাধর হয়ে অন্য সবার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম না হন। একনায়কতন্ত্রের বিপরীত অবস্থান গণতন্ত্রের। সংসদীয় ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মুখ্য দায়িত্ব থাকে সংসদের ওপর। এ দায়িত্ব পালন সুষ্ঠু ও সহজতর করার জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা একটির জায়গায় দুটি সংসদ রাখার বিধানও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে।
বাংলাদেশের শাসনপদ্ধতি বা সরকারব্যবস্থা এককক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় কাঠামোর বলে দাপ্তরিকভাবে বলা হয়। সংসদ এলাকাভিত্তিক, সরাসরি জনগণের ভোটে ৩০০টি আসন ও সাংসদদের ভোটে বর্তমানে ৫০টি মহিলা সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা গঠিত হয়। সাংসদদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান নিয়োগ পান। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়। সংসদ নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে, তারাই সাধারণত তাদের দলীয় প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনি আবার সেই দলের সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হন।
সংসদের প্রায় সব সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়। সংবিধানের বিধান (৭০ অনুচ্ছেদ) অনুযায়ী দলীয় সাংসদেরা দলীয় যেকোনো প্রস্তাবে সমর্থন দিতে বাধ্য থাকেন। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও দলীয় সংসদীয় দলের প্রধান। তিনি তাঁর দলীয় সাংসদদের সমর্থন লাভে নিশ্চিত থাকেন। ফলে নির্বাহী বিভাগের বা এককথায় প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো প্রস্তাব সংসদে পেশ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলীয় সাংসদদের সমর্থনে তা অনুমোদিত হবে, এটা স্বাভাবিক এবং তাই হয়ে আসছে।
সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে সমর্থনের বাধ্যবাধকতা থাকায় সংসদপ্রধান (স্পিকার) নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ব্যবহারকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। একই পদ্ধতিতে অপসারণও প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় সংসদের স্পিকারের কার্যকালের স্থায়িত্বও প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকে। রাষ্ট্রপতির নিয়োগও একইভাবে হয় এবং সে কারণে প্রধানমন্ত্রীর আওতাভুক্ত। অবশ্য রাষ্ট্রপতির অপসারণে দু-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আবশ্যক। বর্তমান সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সে সংখ্যার অধিক দলীয় সাংসদ আছেন। ফলে পদে থাকতে হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর সন্তোষভাজন হতে ও থাকতে হবে, এটাই অনেকের ধারণা।
উচ্চ আদালতের বিচারক, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক পদসমূহ সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী) কর্তৃক নিয়োগের জন্য নির্বাচন করা হয় বা তাঁর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে। ওই নিয়োগপ্রাপ্ত পদসমূহের অপসারণ দু-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদের দ্বারা করার বিধান বর্তমান সংসদে করা হয়েছে। এখন সংসদে সরকারি দলের এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের শুধু নিয়োগ নয়, অপসারণ করার কর্তৃত্বের অধিকারী।
৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন ও তার ফলে সৃষ্ট সংসদ বর্ণিত পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিছু কারণ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ওগুলো সংশোধন না করে বরং বর্তমানে সমস্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে সংসদের একটি প্রধান কাজ সরকার ও সরকারপ্রধানের জবাবদিহির ব্যবস্থা করা। বিরোধী দল এ দায়িত্বে মুখ্য ভূমিকা পালনের কথা। বর্তমান সংসদে প্রধান বিরোধী দল (জাতীয় পার্টি) মন্ত্রিপরিষদে প্রতিনিধিত্ব থাকার কারণে একই সঙ্গে সরকারের অংশীদার। ওই দলের নেতা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে সরকারবিরোধী কোনো ভূমিকা রাখা তা সে সংসদেই হোক বা সংসদের বাইরেই হোক, ওই দলের পক্ষে সম্ভব নয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদে প্রধান বিরোধী দল সরকারের কোনো প্রস্তাবে না ভোট দিলে, সংবিধানের ৫৫ (৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব করার জন্য সে বিরোধীদলীয় মন্ত্রীদের সাংসদ পদ বাতিল হবে। ফলে প্রধান বিরোধী দল সাংবিধানিক কারণে সংসদে সরকারের বিরোধিতা করতে অক্ষম। বিরোধী দলপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে হওয়ায় সংসদের বাইরের এ দলের সরকারবিরোধী ভূমিকা গ্রহণযোগ্য হয় না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য সব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম।
প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনা বা দায়বদ্ধ করার প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকায় তিনি তাঁরÿ ক্ষমতা ব্যবহারে অপ্রতিরোধ্য। ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা কোনোক্রমেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় কাম্য নয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ পদ্ধতি একনায়কতন্ত্রের যেকোনো সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে বলা যায়।
৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের নির্বাচন যে প্রক্রিয়ায় ও যে পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাকে স্বাভাবিক বলা যায় না। গঠিত সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষিত হয়েছেন। তাঁদের সমর্থনে সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। সে কারণে, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের সম্পৃক্ততা কতটুকু ছিল, সে বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে।
যে আসনগুলোতে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে বাস্তবে অধিকাংশ ভোটার ভোট দিতে যাননি বা যেতে পারেননি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তা ছাড়া, নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার মালিক জনগণ। বেশির ভাগ ভোটার তাঁদের ক্ষমতা ব্যালটের মাধ্যমে অন্য কাউকে ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করার সুযোগ পাননি। তারপরও সেটার ব্যবহার কতটুকু নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, সে প্রশ্নও থেকে যায়।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারপ্রধান বা সার্বিকভাবে সরকারকে দায়বদ্ধ করার যে সুযোগ ও অধিকার জনগণের ছিল, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে তা তাঁরা হারিয়েছেন বলে বেশির ভাগ মানুষের ধারণা। তাঁদের আশঙ্কা, খুব শিগগির বা খুব সহজে এ অধিকার তাঁরা ফিরে পাবেন কি না। বর্তমান নির্বাচনব্যবস্থা পরিবর্তন ছাড়া এটা সম্ভব মনে হচ্ছে না।
৫ জানুয়ারি, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন ও তার ফলে সৃষ্ট সংসদ বর্ণিত পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিছু কারণ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ওগুলো সংশোধন না করে বরং বর্তমানে সমস্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংসদের মুখ্য দায়িত্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মূল্যবোধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সংসদ সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। বরং এখন একনায়কত্বের সহায়ক হিসেবে অবতীর্ণ বলা যায়।
ফলে বর্তমান সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক নয়। বরং মৃত গণতন্ত্র সংরক্ষণের কফিনের প্রতীক হিসেবে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।
শান্তিপূর্ণভাবে এ সমস্যা উত্তরণে দেশপ্রেমিক নাগরিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশনসহ অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করে নিরপেক্ষ ও অধিকতর কার্যকর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
গোলাম মোহাম্মদ কাদের: সাবেক মন্ত্রী, প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় পার্টি।

৫ই জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত

৫ই জানুয়ারি নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ‘অপরিবর্তিত’ রয়েছে বলে আবারও জানালেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট। গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন। আলাপ-আলোচনা এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের তাগিদ দেন তিনি। আহ্বান জানান সব দলের ‘রাজনীতি’ এবং ‘গণতন্ত্র’ চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করার। এত কিছুর মধ্যেও নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের জাতিতে উন্নীত হওয়ায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান বার্নিকাট। এটাকে ‘অনন্য সাধারণ উন্নতি’ হিসাবে দেখছেন তিনি। আঞ্চলিক যোগাযোগ বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত নেপাল ও ভুটান চতুর্দেশীয় কানেকটিভিটির প্রশ্নে বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং এ খাতে সুনির্দিষ্টভবে সামপ্রতিক সময়ে যে অগ্রগতিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, এখানে আমেরিকান কোম্পনিগুলোরও যুক্ত হওয়ার সূযোগ রয়েছে বলে মনে করি। রাজনীতির মাঠে বিরোধ থাকলেও রমজান মাসে ইফতারকে কেন্দ্র করে পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে ইতিবাচক রাজনীতি হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাষ্ট্রদূত রমজানকে ‘মান্থ অব রিফ্লেকশন’ বা প্রতিফলের মাস হিসাবে আখ্যায়িত করেন। ইফতার রাজনীতির প্রশংসা করেন তিনি বলেন, আমি মনে করি এটা ‘ভাল চিন্তা’। মাকিন দূত বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। বলেন, এমডিজি অর্জনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি তাতে আমরা খুবই আনন্দিত। সামপ্রতিক সময়ে মানবপাচার রোধে বাংলাদেশ গৃহীত ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশনসহ চলমান লড়াইয়ের প্রশংসাও করেন তিনি। এটি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র আরও ঘনিষ্ট হয়ে কিভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে পারে সেটি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানান রাষ্ট্রদূত। সেখানে দেশের তৈরী পোশাক শিল্প এবং এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন জানিয়ে বার্নিকাট বলেন, এ শিল্পের অনেক বিষয়ে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু কেবল নিরাপত্তা খাতের উন্নতিই যথেষ্ট নয়। এখানে শ্রমিকদের অধিকার এবং তাদের সংগঠনের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ সব বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। উন্নয়নের প্রশ্নে বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন খাতে অনেক কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কর্মসূচিও আছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, সফরটি যাতে হয় এ জন্য আমরা স্টেট ডিপার্টমন্টেকে নিয়মিত তাগিদ দিচ্ছি, কিন্তু এ নিয়ে নতুন কোন খবর পাইনি। বিষয়টি নিয়ে হাসতে হাসতে রাষ্ট্রদূত উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, যতক্ষণ না হচ্ছে, ততক্ষণ আপনারা প্রশ্ন করতে থাকুন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির যে চিত্র সমপ্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্টে ওঠে এসেছে তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কোন আলোচনা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, হ্যাঁ, এটি প্রকাশিত রিপোর্ট। মন্ত্রীও দেখেছেন। এটি নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই এমন রিপোর্ট প্রকাশ পায়। এখানে যে সব বিষয় স্থান পেয়েছে তার অনেক কিছুতে পরিবর্তন এসেছে। মানুষকে কিভাবে আরও ভাল রাখা যায় সেটাই বিবেচ্য বিষয়। এখানে যে সব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে তা নিয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা এসব উদ্বেগ নিরসনে কাজ করছি। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান বার্নিকাট। এ সময় মন্ত্রণালয়ের আমেরিকাস অনুবিভাগের কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। এরপর তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন। গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঢাকায় যোগদানের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এটা তার দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক। গত চার মাসে মন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সাক্ষাৎ হলে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি।

বিচারের ভয়ে নির্বাচন দিতে চায় না আওয়ামী লীগ- খালেদা জিয়া

‘লুটপাট-দুর্নীতির বিচারের ভয়ে নির্বাচন দিতে ভয় পায় আওয়ামী লীগ’ মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হলে জনগণ সরকারের মুখে জুতো মারতো। তিনি বলেন, বিদেশীরাও বলছেন- বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। অতিদ্রুত আলোচনার মাধ্যমে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এত খুন-খারাবি ও লুটপাট করেছে যে, মানুষের ভয়ে এখন নির্বাচন দিতে ভয় পায়। তারা জানে নির্বাচন দিলে মানুষ কিভাবে প্রত্যাখ্যান করবে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তা দেখিয়ে দিয়েছে। যদি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনটা হতে পারতো, তাহলে মানুষ সত্যিকারে জবাব দিতো। মানুষ তাদের মুখে জুতো মারতো। গতকাল হোটেল পূর্বানী ইন্টারন্যাশনালে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল ইসলামী ঐক্য জোটের ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ কারাগারে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ, বিএনপি ও ২০ দলের নেতাকর্মীরা কারাগারে বন্দি। আর আওয়ামী লীগের লোকেরা যতই চুরি-চামারি করুক তারা বহাল তবিয়তে আছেন। তিনি বলেন, বিচারবিভাগ দলীয়করণ করা হয়েছে। সুবিচার পাওয়া যায় না। বিএনপি ও ২০ দলের নেতাকর্মীদের জেলে পচে মরতে হয়। আওয়ামী লীগের লোকেরা ফ্রি থাকে তাদের জেলে দেয়া হয় না। আর তাদের মন্ত্রীরা লুটপাট করছে, তাদের এগুলো কী অপরাধ নয়? তারা আওয়ামী লীগের লোক বলে মাফ পেয়ে যায়। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ঢাকা শহর দিয়ে বিবেচনা করলে হবে না। আমরা যারা ঢাকা শহরে থাকি তারা কোনরকম আছি। গ্রামের কথা চিন্তা করুন। তারা বিচার পাচ্ছে না। অসহায় জীবন-যাপন করছেন। বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে। এয়ারপোর্ট থেকে যেতে না পেরে জাহাজে করে যেতে চেষ্টা করে এখানেও আওয়ামী লীগের দালাল ও পুলিশ জড়িত রয়েছে। সাগরে ভাসতে কোথাও জায়গায় পাচ্ছে না। বাংলাদেশেও তাদের জায়গা নেই। দেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে মরছে। আর বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বাংলাদেশকে এখন আর কোন দেশ বিশ্বাস করে না। খালেদা জিয়া বলেন, মহিলারা ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়।  আমরা চাই দেশের মানুষ ভাল থাকুক, নিরাপদে থাকুক। ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামীর সভাপতিত্বে দোয়া ও ইফতার মাহফিলে জোট শরিকদের মধ্যে জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, জামায়াতে ইসলামীর আমিনুল ইসলাম, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, মুসলিম লীগের সভাপতি এএইচএম কামরুজ্জামান, এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব খন্দকার গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, লেবার পার্টির মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদী, খেলাফত মজলিসের গোলাম আকবর ও ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি প্রমুখ অংশ নেন। ইফতারে বিএনপি নেতাদের মধ্যে- স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, সহদপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহিন, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা ও শামা ওবায়েদ অংশ নেন। এছাড়া ইসলামী ঐক্য জোট নেতাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট আবদুল লতিফ, মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক মুপতি মোহাম্মদ তৈয়্যব হোসোইন সহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ইফতারের আগে টেবিলে টেবিলে ঘুরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন খালেদা জিয়া। এছাড়া ইফতারের আগে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এদিকে শনিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ইফতার মাহফিলে যোগ দেবেন খালেদা জিয়া।

এবার আইএস জঙ্গিদের শিরশ্ছেদ করল সিরিয়ার বিদ্রোহীরা

কালো রঙের পোশাক পরে কমলা পোশাকধারী বন্দিদের হত্যা করছে আইএস (ইসলামিক স্টেট) সদস্যরা- এ দৃশ্যের সঙ্গে বিশ্ববাসী বেশ পরিচিত। কিন্তু এবার কমলা রঙের পোশাক পরে কালো রঙের পোশাক পরিহিত আইএস শিরশ্ছেদ করল সিরিয়ার বিদ্রোহীরা। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, ‘জিহাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্যোগ’ ও ‘মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিকারী’ আখ্যা দিয়ে ১৩ আইএস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে সিরীয় বিদ্রোহী সংগঠন জায়শ আল-ইসলাম। সম্প্রতি সংগঠনটি এ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ করেছে। ১৯ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে,
আইএস সদস্যদের হাঁটু গেড়ে বসিয়ে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ‘আর্মি অব ইসলাম’ নামে নিজেদের পরিচয় দেয়া জায়শ আল-ইসলামের এক কমান্ডার আইএস যোদ্ধাদের হত্যার আগে বলেন, ‘আল্লাহ প্রতিষেধক না দিয়ে কোনো রোগ পাঠান না।’ আইএসকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তারা বর্তমান জিহাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। তারা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ বৃদ্ধি করতে চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দলটি খেলাফতের দাবি করে ও অন্য মুসলিমদের ধর্মত্যাগী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাদের রক্তপাত এবং সম্পদ ও সম্মান লুট করে।’ আইএসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘তারা ধর্ম ও মুসলিমদের জীবনযাপনকে কলুষিত করছে। যারা আমাদের ভঙ্গুর জাতির জন্য জিহাদ করছেন, সেই নেতাদের তারা হত্যা করছে।