Sunday, October 13, 2013

দুর্যোগে প্রতিবন্ধীদের পাশে থাকা জরুরি by সফিউল আযম

প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে রাখব, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ব- এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দুর্যোগ সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিবন্ধীদের চাহিদা পূরণ ও দুর্যোগে ঝুঁকি কমাতে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি সরকারি ও বেসরকারিভাবে পালিত হচ্ছে। সবার মাঝে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রতিবন্ধীদের দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। বয়স, লিঙ্গ, জাতি, সংস্কৃতি বা সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী আর ১০ জন যে কাজগুলো করতে পারে, সে কাজগুলো প্রাত্যহিক জীবনে করতে না পারার অবস্থাটাই হল প্রতিবন্ধিতা। বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি লোক বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বাস করছে। জাতিসংঘের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও সুনামির মতো দুর্যোগ ঝুঁকির তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ এবং এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয়।
সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, নির্বিশেষে সমসুযোগ ও সমঅধিকার রয়েছে এবং জাতীয় উন্নয়নে দেশের সব নাগরিকের সমঅংশীদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নাগরিকদেরও রয়েছে উন্নয়নের ও অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার। প্রতিটি প্রতিবন্ধী নাগরিক প্রথমে নাগরিক, পরে প্রতিবন্ধী। কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী নাগরিকদের প্রতি আমাদের অজ্ঞতা, ভয় ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের কারণে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের অধিকার খুবই নগণ্য?
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমঅধিকার রক্ষায় অগ্রগতি অনেক; কিন্তু এখনও তা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। একথা ঠিক যে, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
মানসিক, শারীরিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধীর ভিন্ন ধরনের চলার গতি ও চাহিদার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দুর্যোগের প্রভাব তাদের সবার ওপর প্রায় সমানভাবেই পড়ে। আমরা জানি, জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের কাছের কেউ এসবে সাহায্য করেন। যখন এসবের ব্যত্যয় ঘটে, তখন তারা ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। স্বাভাবিক আর দশজন মানুষের মতো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে তাদের কম থাকে। তাদের সমস্যাগুলোকে অনেক সময় অবজ্ঞা করা হয়। খাওয়া-দাওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সব কিছুতেই তারা পিছিয়ে যায়।
যে কোনো দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা প্রতিবন্ধী তারা আরও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এ বিষয়কে বিবেচনায় রেখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হলে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবন্ধীদের জন্য ঝুঁকি হ্রাস পাবে। এ জন্য দুর্যোগ মোকাবেলায় দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আশার কথা, দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলীর পরিমার্জিত সংস্করণে প্রতিবন্ধীদের বিষয়কে সংযুক্ত করা হয়েছে। ভিজিএফ কর্মসূচির নীতিমালায়ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং এটাকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্যোগের সময়ে তাদের যে করুণ অবস্থা হয় তা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ ও এর দ্রুত বাস্তবায়ন।
দুর্যোগকালীন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মানবেতর ঝুঁকি এবং অবহেলার শিকার হয় নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষ। প্রতিবন্ধীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নানা ধরনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবন্ধী দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষুদ্র স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প চালু করা সময়ের দাবি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তা বিধান করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এ বিষয়টি ভুলে যাই। সব সময় তাদের বিষয়টিকে চিন্তা করে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অধিক ও নিরাপদ আশ্রয় করা যেমন জরুরি, তেমনি দুর্যোগ-পরবর্তী তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
২০১০ সালের কানকুন সম্মেলনের প্রাক্কালে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের দাবি তুলে ধরেন। বাংলাদেশেও ১০০ জন প্রতিবন্ধী জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ‘আমরা নই, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ব্যর্থ বিশ্ব নেতারাই’ স্লোগান দেন। মানববন্ধন থেকে জলবায়ু অর্থের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও তথ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। আমরাও চাই, প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করা হোক এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া হোক।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অন্যসব নাগরিকের মতো সমাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। নিজের পরিবারের মতো, সন্তানের মতো দুর্যোগে তাদের পাশে থেকে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
সফিউল আযম :
উন্নয়নকর্মী

মাদকের অপপ্রয়োগ রোধে চাই ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস by ইকতেদার আহমেদ

একটি দেশ ও সমাজের ওপর মাদকদ্রব্যের প্রলয়ংকরী প্রভাবের জন্য এর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। মাদকদ্রব্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যুবসমাজের ভেতর মাদকদ্রব্য সেবন বা গ্রহণের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। পরিবেশ, শিথিল পারিবারিক বন্ধন, অতিরিক্ত স্নেহ, কঠোর শাসন, হতাশা প্রভৃতি একজন কিশোর বা যুবককে মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। হতাশার ক্ষেত্রে দু’ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর একটি হল সব প্রাপ্তি নিঃশেষিত হওয়ার পর অন্য কোনো প্রাপ্তি না থাকার হতাশা আর অপরটি হল অপ্রাপ্তির হতাশা। আমাদের সমাজে আগে যৌথ পরিবারের কারণে শিশুরা অধিক হারে দাদি-নানির সান্নিধ্য পেত। এটি শিশুর নৈতিক মানোন্নয়নে সহায়ক ছিল। বর্তমানে এককেন্দ্রিক পরিবার এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ে চাকরিজীবী হওয়ায় শিশুরা পর্যাপ্ত সময় মা-বাবার সান্নিধ্য পায় না। বর্তমানে অগ্রসরমান প্রযুুক্তির যুগে মা-বাবার অনুপস্থিতিতে একটি শিশু অনায়াসে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের বদৌলতে নাচ-গানে ভরপুর অশ্লীল দৃশ্যের হিন্দি ছায়াছবি এবং আপত্তিকর দৃশ্যের ছবি দেখার সুযোগ পায়। অপরিণত বয়সে এসব ছবি দেখার সুযোগ শিশুদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যার ফলে তারা বিপথগামী হয়ে পড়ে। এ বিপথগামীদের একাংশ মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
মাদক এমন দ্রব্য যা সেবনে নেশার উদ্রেক করে। একজন ব্যক্তি মাদক সেবনের পর যখন তার স্বাভাবিক জ্ঞান লোপ পায় তখন তাকে মাতাল বলা হয়। একজন ব্যক্তির পক্ষে মাতাল অবস্থায় ভালো-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ সম্ভব নয়। মাদক সেবনের পর যতক্ষণ তার ওপর মাদকের প্রভাব থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণত তার আচরণে স্বাভাবিকতা আসে না। একজন ব্যক্তিকে তখনই মাদকাসক্ত বলা হয়, যখন সে শারীরিক বা মানসিকভাবে মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল অথবা অভ্যাস বশে মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারী।
আমাদের দেশে বর্তমানে যেসব মাদকদ্রব্য মাদকসেবীদের কাছে সহজলভ্য তা হল- ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবা। এর বাইরে গাঁজা, পেথিডিন এবং বিভিন্ন রকম মদ বলতে গেলে সহজলভ্য। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভিপ্রায়ে ১৯৯০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণীত হয়। আইনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ২০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করে বোর্ডকে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব প্রদানসহ মাদকদ্রব্যের ব্যবহার রোধে অপরাপর দায়িত্ব প্রদান করা হলেও কার্যক্ষেত্রে অদ্যাবধি সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।
বর্তমানে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফরের পরিদর্শক পর্যায়ের কর্মকর্তারা তদন্ত সংক্রান্ত সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। দু-তিনটি থানার সমন্বয়ে একটি সার্কেলে এ ধরনের একজন পরিদর্শক থাকে। মাদক সংক্রান্ত মামলা সংশ্লেষে কোনো আলামত যেমন- ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা প্রভৃতি জব্দ করা হলে মামলাটির বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জব্দকৃত মালামাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফরের জেলা পর্যায়ের কার্যালয়ে সংরক্ষণ করা হয়। অপরদিকে যেসব মামলা দায়ের পরবর্তী তদন্তকাজ পুলিশ পরিচালনা করে, ওই মামলা সংশ্লেষে কোনো আলামত জব্দ করা হলে জব্দকৃত আলামত জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন মালখানায় সংরক্ষণ করা হয়।
যে কোনো মামলা সংশ্লেষে জব্দকৃত মালামালের বিষয়ে আদালত কর্তৃক বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। জব্দকৃত মালামাল মাদকদ্রব্য হয়ে থাকলে মামলার রায় প্রদানকালে আদেশাংশে উল্লেখ করা হয় যে, মামলা সংশ্লেষে বাজেয়াপ্তকৃত মাদকদ্রব্য ধ্বংস করা হোক। বাজেয়াপ্তকৃত মালামালের পরিমাণ বেশি হলে এবং তা সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে অনেক সময় বাজেয়াপ্তকৃত মালামালের কিছু অংশ নমুনা হিসেবে রেখে মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় আদালতের অনুমতি নিয়ে অবশিষ্ট বৃহদাংশ ধ্বংস করা হয়। জব্দকৃত মালামাল প্রকৃতই মাদকদ্রব্য কি-না সে সংক্রান্ত যাবতীয় পরীক্ষা মামলা তদন্তাধীন থাকাবস্থায় সম্পন্ন করা হয়।
হেরোইন নামক মাদকদ্রব্যটি দেখতে অনেকটা আটা বা অন্যান্য সাদা পাউডারের সদৃশ। এক কেজি হেরোইনের প্রকারভেদে বর্তমান বাজার মূল্য ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা। এ উচ্চমূল্যের কারণে এবং আটা বা পাউডার সদৃশ হওয়ায় জব্দকৃত হেরোইনের রাসায়নিক পরীক্ষার পর একে আটা বা পাউডার সদৃশ দ্রব্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করে মাদকদ্রব্য অধিদফরের একশ্রেণীর কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকা আয় করে সমাজে মাদকদ্রব্য ব্যবহার রোধের পরিবর্তে মাদকদ্রব্য বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনই একটি অভিযোগ দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল, যেখানে প্রকাশ পায়, ৫টি মামলা সংশ্লেষে জব্দকৃত ১৪ কেজি ১৪ কোটি টাকা মূল্যের হেরোইন ১৪ কেজি হেরোইন সদৃশ দ্রব্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়েছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত অপর এক সংবাদে জানা যায়, ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনরত জনৈক সহকারী জজ কয়েকশ’ বোতল ফেনসিডিলসহ মাইক্রোবাসযোগে পরিভ্রমণকালে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ম্যাজিস্ট্রেট বিচারিক দায়িত্ব পালনকালে জব্দকৃত আলামত ফেনসিডিল ধ্বংসের আদেশ দিয়ে একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় আসল ফেনসিডিল অপসারণপূর্বক পানিভর্তি ফেনসিডিলের বোতল দিয়ে প্রতিস্থাপনের বেআইনি ও জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিলেন। আরও আশ্চর্য হতে হয় যখন শোনা যায়, ওই ম্যাজিস্ট্রেট মন্ত্রণালয়ের সৎ, দক্ষ, জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়নে বিশেষ উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তার আশীর্বাদপুষ্ট।
১ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, ৫ হাজার ইয়াবা বিকল্প এবং ইয়াবা প্রস্তুতের সরঞ্জাম ও কাঁচামালসহ মাদকসম্রাট আমিন হুদার র‌্যাব কর্তৃক আটকের ঘটনা সম্পর্কে দেশবাসীর ধারণা রয়েছে। এই আমিন হুদা ও তার সহযোগীকে বিচারিক আদালত ৭৯ বছরের সাজা দিলে সাজা প্রদান পরবর্তী ৭ মাস অতিক্রান্তের আগে সে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জামিন লাভে সক্ষম হয়। তবে আশার কথা, আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে জামিন আদেশ বাতিল হয় এবং আবার তাকে কারাগারে যেতে হয়।
দেশে ১৯৮২ সালে ওষুধ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে কাশির সিরাপ হিসেবে ব্যবহৃত ফেনসিডিল উৎপাদন নিষিদ্ধ হয়ে যায়। মাদকসেবীদের কাছে ফেনসিডিলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় নিষিদ্ধ পরবর্তী ভারত থেকে মাদক পর্যায়ভুক্ত ফেনসিডিল চোরাচালানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং এ সুযোগটির সদ্ব্যবহার করে ভারতে বাংলাদেশ সীমান্তের চারপাশে ১৩২টি ফেনসিডিল উৎপাদন কারখানা গড়ে ওঠার তথ্য পাওয়া যায়। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, ভারত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য ও গরু নিয়ে আসার সময় অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও ফেনসিডিল নিয়ে আসার সময় হত্যাকাণ্ড দূরের কথা, আটকেরও কোনো নজির নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বর্তমানে ফেনসিডিল সহজলভ্য এবং এর শতভাগই ভারতের প্রশ্রয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশের ভূমিকা উৎসাহব্যঞ্জক নয়।
হেরোইন আফিম উদ্ভূত মাদ্রকদ্রব্য, অপরদিকে ইয়াবা সহধর্মী কৃত্রিম উপায়ে তৈরি মাদকদ্রব্য। উভয় মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে আসে মিয়ানমার থেকে এবং এ ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সে দেশের প্রশাসনিক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। ইয়াবা ছোট ট্যাবলেট আকৃতির মাদক হওয়ায় এর চোরাচালান সহজসাধ্য এবং একজন ব্যক্তি অনায়াসে পকেটে করে চার-পাঁচশ’ ইয়াবা ট্যাবলেট স্থানান্তর করতে পারে। রাজধানী ঢাকায় মানভেদে একটি ইয়াবা ট্যাবলেট পাঁচশ’ থেকে এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ইয়াবার পরিবহন সহজসাধ্য এবং লাভের মাত্রা বেশি হওয়ায় বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবার প্রতি অধিক হারে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, হেরোইন ও ইয়াবা বিপরীতমুখী মাদক। হেরোইন শরীরকে নিস্তেজ করে দেয় আর ইয়াবা প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরে উত্তেজনা বাড়ায়। যদিও পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, দুটি মাদকই একপর্যায়ে শরীরকে নিস্তেজ করে দেয়।
ইয়াবা সেবন-পরবর্তী প্রভাব বিষয়ে চিকিৎসকদের অভিমত, এটি এমন একটি ভয়ংকর মাদক যা মানুষকে শুধু মেরেই ফেলে না, মারার আগে ওই ব্যক্তিকে পাগলে পরিণত করে ফেলে এবং এ ধরনের পাগলামির কারণে গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। ইয়াবা প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি মন থেকে ভয়ভীতি দূর করে দেয়, যার কারণে সেবনকারী বুঝতে পারে না কী করবে। এভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে এক সময় ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ইয়াবা সেবনকারীর মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। একটি কাজ করলে পরে তার ফল কী হবে সেটা সেবনকারী ভাবে না। সেবনের একপর্যায়ে সে ধীরে ধীরে তার পাশে একটি অবাস্তব জগৎ তৈরি করে থাকে। কল্পনায় সে তার চারপাশের মানুষদের শত্র“ ভাবতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সে নিজেকেও শত্র“ ভাবতে শুরু করে। সে তখন অদৃশ্য শব্দ শুনতে পায় এবং অদৃশ্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তু দেখতে পায়। তার কাছে মনে হয়, তার নিজের ছবি তাকে হত্যা করবে। কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, এমনকি নিজেকেও না। তাছাড়া ইয়াবাসহ যে কোনো প্রথম শ্রেণীর মাদক মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটায়, যার কারণে সেবনকারী স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারে না। স্বাভাবিক চিন্তার অনুপস্থিতিতে অস্বাভাবিক ঘটনার জন্ম হয়। এমন একটি অস্বাভাবিক ঘটনা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে ১৭ বছর বয়সী এক সন্তানের হাতে জন্মদাতা বাবা-মা নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর ঘাতক সন্তান নির্লিপ্ত ও নির্বিকার থাকার ঘটনায়।
যে সন্তানটির হাতে সম্প্রতি পিতা-মাতা নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন, তার মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে না। এই একটি ঘটনা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তাই জাতির বিবেকের প্রশ্ন- ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে কারা জড়িত? তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কী? এ ব্যবসা রোধের পরিবর্তে দিন দিন কেন বেড়ে চলেছে? রোধের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও রাজনীতিকদের ভূমিকা কেন সহায়ক নয়? বিচারকার্য কেন যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে না? কার ব্যর্থতায় পর্যাপ্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? কার ব্যর্থতায় সহজে জামিন লাভ ও খালাসের ঘটনা ঘটছে? বিচারকালীন কাদের কারণে জব্দকৃত মাদক প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে? এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া গেলে মাদকের থাবা থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ যুবসমাজ ও কোমলমতি শিশুরা মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে নিবৃত্ত থাকবে।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

বেজার যদি হয় আমার ঘরের যৈবতী... by মোকাম্মেল হোসেন

নাকে-মুখে খাচ্ছি। ডালের বাটি এগিয়ে দিয়ে লবণ বেগম বলল-
: গলায় ভাত ঠেইক্যা মরবা তো! একটু আস্তে খাও।
খাওয়াটা ধীরেসুস্থেই শুরু করেছিলাম। হঠাৎ আলাল-দুলালের ফোন পেয়ে আউলা লেগে গেল। আলাল বলল-
: তুমি কই?
- বাড়িতে।
: আমগরে বাজারে আসতে বইল্যা তুমি বাড়িতে বইসা রইছ!
দুলাল বলল-
: তুমি বাড়িতে কী কর?
- ভাত খাইতেছি।
: অহনও খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে আছ- গরু কিনবা কখন?
কোরবানির গরু কিনতে আজ আমার অষ্টধার বাজারে যাওয়ার কথা। বন্ধু আলাল ও দুলালকে সাহায্যকারী হিসেবে সঙ্গে থাকার অনুরোধ করেছি। তারা এত তাড়াতাড়ি বাজারে পৌঁছে যাবে ভাবিনি। আলাল পুনরায় বলল-
: খাওন-দাওন সাইডে রাইখ্যা দৌড় দেও। নইলে পরে কিন্তু পস্তাবা...
এ কথা শোনার পর খাবারের থালা একপাশে রেখে দৌড় দেয়া উচিত। কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত খাবারগুলো পেটে চালান করে দিচ্ছিলাম। লবণ বেগম সামনে থাকায় সমস্যা হচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি বললাম-
: তুমি ফোন কইরা কী কী আনতে বলছিলা- আনছি তো...
- কই?
: আমার ব্যাগের সামনের পকেটে দেখ আছে।
লবণ বেগম উঠে গেল। এই ফাঁকে খাওয়া শেষ করে হাত ধোয়ার জন্য বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আর ঠিক তখনই ঘর থেকে লবণ বেগমের চিৎকার ভেসে এল। ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেই লবণ বেগম বিস্ফোরিত চোখে বলল-
: হোয়াট ইজ দিস?
- বলপেন।
: আমি কি তোমারে বলপেন আনতে বলছিলাম?
- কী আনতে বলছ!
: তুমি বল- কী আনতে বলছি!
- বলাবলির কী আছে! তুমি যা যা আনতে বলছ- তাই তো আনছি!
: অবশ্যই তা আন নাই। আমি তোমারে আনতে বলছি ভ্রু পেন, আর তুমি আনছ বলপেন!
- ভ্রু পেন?
: হ্যাঁ, ভ্রু পেন। মানুষের চোখের ওপর যে দুইটা ভ্রু আছে- এইটা জান তো!
- জ্বি, জানি।
: সেই ভ্রুতে ব্যবহার করার জন্য এক ধরনের কলম পাওয়া যায়। সেইটারে ভ্রু পেন বলে।
- অঃ।
: আর এইটা কী আনছ?
- লিপ লাইনার!
: ব্যাগে ভরার আগে জিনিসটা একবার নাকের কাছে নিছিলা?
- নাকের কাছে নেওন লাগব কী জন্য!
: আহা! নিছিলা কিনা সেইটা বল।
- না।
: এখন নিয়া দেখ- কী পচা গন্ধ!
- পচা গন্ধ মানে? দোকানদাররে বলছি, সবচাইতে ভালোটা দেন। দোকানদার বলছে, এইটাই ভালো। বিশ্ববিখ্যাত জর্ডানা কোম্পানির মাল। ওইটার গায়ে কোম্পানির নাম লেখা আছে দেখ।
: লেখা থাকলেই হইয়া গেল! আমি একটা সাদা কাগজের ওপর এক হাজার টাকা লেখলেই সেইটা এক হাজার টাকার নোট হইয়া যাবে?
চুপচাপ কিছুক্ষণ লবণ বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর মাথা নেড়ে বললাম-
: জি না।
থুম ধরে বসে থাকার একপর্যায়ে লবণ বেগম হাতের জিনিসগুলো সশব্দে টেবিলের ওপর রেখে বলল-
: বুঝছি! তোমার প্রতি মায়া দেখাইয়া কোনো লাভ নাই। চল আমার সঙ্গে...
- কোথায়?
: শহরে।
- তোমার সঙ্গে এখন শহরে গেলে গরু কিনব কখন?
: আগে আমার আর বাচ্চাদের কেনাকাটা শেষ কর। তারপর তুমি তোমার ছাগল-গরু-উট যা খুশি কিইন্য...
নৌকাডুবির পর সাঁতার না জানা কোনো যাত্রী যেমন সামনে খড়কুটো যা পায়- আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে, আমিও তাই করলাম। বললাম-
: এই এলাকায় আজই গরু-ছাগলের শেষ হাট।
- আগামীকাইল বিদ্যাগঞ্জের হাট আছে।
: এতদূরে যাব!
- মানুষ গরু কেনার জন্য নদী পার হইয়া সিরাজগঞ্জ চইল্যা যাইতেছে, আর তুমি বিদ্যাগঞ্জে যাইতে পারবা না?
মহাফাঁপরে পড়ে গেলাম। লবণ বেগমের হুকুম পালন না করলে সে বেজার হবে। আবার আলাল-দুলালকে ডেকে আনার পর এখন যদি অষ্টধার বাজারে না যাই তাহলে তারা বেজার হবে। কী করব- তাই নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছি, লবণ বেগম বলল-
: কী হইল, যাবা না?
এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর হওয়া উচিত- না। কিন্তু সংসারে অশান্তি যাতে কম হয় সে ব্যাপারে প্রত্যেক বিবাহিত পুরুষের যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। আমি গভীরভাবে তা উপলব্ধি করার পর লবণ বেগমকে শুনিয়ে আবৃত্তি করলাম-
আলালের বেজারে আমার হইব কী
দুলালের বেজারে আমার হইব কী
বেজার যদি হয় আমার ঘরের যৈবতী-
আন আমার জামা, আন আমার জুতা
সঠিকভাবে পালন করি যৈবতীর কথা॥
প্রতিবেশী হারেজ আলীকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন বিদ্যাগঞ্জ বাজারে গেলাম। গরু কিনতে কিনতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। লেনদেন সম্পন্ন করে চা-নাস্তা খাওয়ার পর হারেজকে বললাম-
: বিসমিল্লাহ বইল্যা তুমি গরু লইয়া হাঁটা দেও। আমি ট্রেনে পিয়ারপুর হইয়া বাড়িতে যাব।
বাড়িতে পৌঁছে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেছি- এমন সময় হারেজের ফোন পেলাম। বললাম-
: কী খবর হারেজ! কুন পর্যন্ত আসছ?
- আমি নিমতলী বাজারে।
: মাশাল্লাহ। পা চালাইয়া আইসা পড়।
- ভাইজান...
: কিছু বলবা?
- ভাইজান, একটা ঘটনা ঘইট্যা গেছে!
: কী ঘটনা!
- নিমতলী বাজারে পৌঁছার পর রেললাইন পার হইতেছিলাম, এমন সময় একটা ট্রেন...
: কও কী! গরু কি ট্রেনের নিচে কাটা পড়ছে?
- না।
: তাইলে?
- ট্রেনের শব্দ শুইন্যা গরুটা একটা লাফ দিয়া আমার হাত থেইক্যা ছুইট্যা গেল। পিছনে-পিছনে অনেকক্ষণ দৌড়াইছি ভাইজান, ধরতে পারি নাই।
: আশপাশে খোঁজ-খবর নেও নাই?
- পুরা এলাকা মই দিয়া ফেলছি ভাইজান। কোনো লাভ হয় নাই...
এবার আর ভাতের মায়া করলাম না। একটা ভ্যানযোগাড় করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিমতলী বাজারে পৌঁছলাম। হারেজ আলী রেললাইনের পাশে নির্বাক হয়ে বসেছিল। আমাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আমি ইশারায় তাকে কান্না থামানোর নির্দেশ দিয়ে বললাম-
: কাইন্দা কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। কান্না বন্ধ কর।
আকাশে জিলহজ মাসের অপূর্ণ চাঁদ। চপলা নারীর ন্যায় ভেসে বেড়ানো শরতের মেঘমালা সেই চাঁদকে একটু পরপর তার ভালোবাসার চাদরে ঢেকে দিচ্ছে। আধো আলো আধো ছায়ার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া চারপাশের পরিবেশ যেন রহস্যের বোরকা পরে বসে আছে। সেই রহস্যের অবগুণ্ঠন ভেদ করে সচল-গতিসম্পন্ন কোনো প্রাণীকে খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য বলে মনে হল। হঠাৎ হারেজ আলী বলল-
: ভাইজান, মাইকিং করলে কি খোঁজ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে?
নিমতলী বাজারে মাইকের কোনো দোকান নেই। একজন বলল-
: মাইক পাইতে হইলে মুক্তাগাছা যাওন লাগব। তবে...
- তবে কী?
: আধামাইল সামনে এক এতিমখানায় একটা মাইক আছে। সেই মাইক দিয়া এতিমখানার লোকজন বাজারের দিন টাকা-পয়সা কালেকশন করে। পয়সাকড়ি দিলে তারা মাইক দিতে রাজি হইতে পারে।
এতিমখানার মাইকটা পাওয়া গেল। কী বলতে হবে- তা একটা কাগজে লিখে হারেজের হাতে দিলাম। টর্চের আলোয় লেখাগুলো দেখতে দেখতে হারেজ বলতে লাগল-
ভাইসব- ভাইসব। একটি মাঝারি আকারের ষাঁড় হারানো গিয়াছে। ষাঁড়টির গায়ের রঙ টকটকা লাল। দুই দাঁত। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি ষাঁড়টির সন্ধান পাইলে ০১৭১৫৪০১১৪৫ নম্বরে ফোন কইরা জানাইলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। ভাইসব- ভাইসব...
মাইকিং করতে করতে অগ্রসর হচ্ছি- পাশ থেকে বয়স্ক এক ব্যক্তির ডাক শুনে ভ্যান দাঁড় করালাম। তিনি ভ্যানের সামনে এসে বললেন-
: কখন হারাইছে?
উত্তর দিল হারেজ। বলল-
: এশার আজানের একটু আগে।
মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে মুরুব্বি বললেন-
: ভালো লোকের হাতে পড়লে গরু ইনশাল্লাহ ফেরত পাওয়া যাবে। আর যদি কোনো দুষ্টুলোকের হাতে পড়ে, তাইলে তার গোশত দিয়া আগামীকাইল কোনো হোটেলে কাবাব তৈরি হবে- সেইটা আল্লাহপাক ছাড়া আর কেউ জানে না। আইচ্ছা- আপনেরা গরু সাইড় করেন নাই?
এবার উত্তর দিলাম আমি। বললাম-
: করছি তো!
- ইজারাদার যে কাগজ দিছে, তাতে গরুর মালিকের নাম-ঠিকানা লেখা নাই?
গরু নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় যাতে কোনোরকম ঝামেলা না হয়, সে জন্য মাসুলের কাগজ হারেজের হাতে দিয়েছিলাম। হারেজ পকেট থেকে সেটা বের করে দেয়ার পর দেখলাম-মালিকের নাম লেখা ইজ্জত শেক। ঠিকানা কাবারিকান্দা।
মুরুব্বিকে এ কথা জানানোর পর তিনি বললেন-
: অনেক সময় পোষা প্রাণীরা মালিকের মায়া ত্যাগ করতে পারে না। কোনোভাবে একবার সুযোগ পাইলে ছুটতে ছুটতে মালিকের বাড়িতে যাইয়া হাজির হয়। আপনেরা মাইকিং করতেছেন- করেন। তবে একবার মালিকের বাড়িতে যাইয়া খোঁজ নেন...
কাবারিকান্দা গ্রামে যখন পৌঁছলাম তখন গভীর রাত। ইজ্জত শেখের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়লাম-
: বাড়িতে কেডা আছুইন গো...
অনেকক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। মন ধৈর্যের প্রান্তসীমায় পৌঁছার ঠিক আগমুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে খুলুর-খুলুর কাশির শব্দ শোনা গেল। পুনরায় ডাক দিতেই বয়স্ক গলায় একজন বললেন-
: কেডা ডাহুইন গো!
- আমরা।
: আমরা কেডা?
- এইটা ইজ্জত শেখের বাড়ি না?
: হ।
- মেহেরবানী কইরা একটু বাইরে আসেন।
বাইরে যিনি এলেন- তিনি ইজ্জত শেখের বাবা এলেম শেখ। আমাদের মুখে সবকিছু শোনার পর এলেম শেখ বললেন-
: আমরা খাওন-দাওন শেষ কইরা শুইতে যামু, এমন সময় দেখি লালু উঠানে খাড়া। লালুরে গোয়ালে বাইন্ধা রাখছি, কিন্তু ইজ্জত তো বাড়িতে নাই।
ষাঁড়টার তাহলে একটা নামও আছে! নশ্বর পৃথিবীর এই সংসার-বাগানে মানুষ ও একটা অবলা জীবের মধ্যে যে মায়াবৃক্ষটি দিনে দিনে বেড়ে উঠেছে, তার শেঁকড় কতটা গভীরে প্রোথিত তা আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে করতে বললাম-
- ইজ্জত শেখ কই গেছে?
: সে বোরোরচর গেছে তার মেয়ের জামাইরে ঈদের দাওয়াত দিতে। টাকাগুলা অন্য একজনের হাতে পাঠাইয়া দিয়া আমারে মোবাইল কইরা শুধু বলছে- লালুরে বিক্রি কইরা দিছি। এখন সে কার কাছে বিক্রি করছে, কী বিষয়-বৃত্তান্ত- তা না জাইন্যা তো আমি গরু দিতে পারি না।
বৃদ্ধের কথা শুনে মুখ দিয়ে দম ছাড়লাম। তারপর তার হাত দুটো আমার দু’হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে বললাম-
: ঈদের তো এখনও দুইদিন বাকি আছে। এই দুইদিন লালু আপনের বাড়িতেই থাকুক। আমরা ঈদের দিন ভোরবেলা আইসা তারে নিয়া যাব...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

একটি ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী শক্তি অর্জন করল কীভাবে? by বদরুদ্দীন উমর

কোন সব ইস্যু সামনে রেখে নির্বাচন হবে তার পরিবর্তে কীভাবে ও কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে এটাই যেখানে নির্বাচনের মূল ইস্যু, সেখানে সমাজ এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চিন্তা কত পিছিয়ে আছে এটা বোঝা কোনো কঠিন কাজ নয়। বাংলাদেশে শাসকশ্রেণীর রাজনীতিবিদদের অর্ধশিক্ষিত ও অশ্লীল কথাবার্তা থেকে নিয়ে তাদের সহযোগী বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিচর্চার একটা বিশেষত্ব এই যে, এরা কোনো কোনো ঘটনা বা বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তোলপাড় করলেও এসব ঘটনা কেন ঘটছে এ বিষয়ে চিন্তা করার কোনো ব্যাপার এদের নেই। সেটা যদি থাকত তাহলে এদেশের অনেক সমস্যার সমাধান শাসকশ্রেণীর লোকদের দ্বারা সম্ভব হতো। কারণ যেখানে জানা নেই এবং জানার চেষ্টা নেই, সেখানে কোনো সমস্যার সমাধানও যে সম্ভব নয় এটা এক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রধানত খিস্তিখেউড়। শাসকশ্রেণীর প্রত্যেকটি দলই এ বিষয়ে পারদর্শী, তবে আওয়ামী লীগ ও তার নেত্রী শেখ হাসিনা অন্যদের পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে। বস্তুতপক্ষে তারাই হলেন এই রাজনৈতিক ভাষার প্রবর্তক।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রধানত দুটি রাজনৈতিক দল সমগ্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে দূষিত করে দেশকে এক চরম সংকটজনক অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এর একটি হল আওয়ামী লীগ এবং অন্যটি জামায়াতে ইসলামী। এই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আসলে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এই দেশে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তান আমলের থেকে অনেক শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভূত হল- এ প্রশ্ন কি যথাযথভাবে এদেশে শাসকশ্রেণীর দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অথবা শাসকশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী মহল থেকে কেউ উত্থাপন করেছেন? এক্ষেত্রে তাদের উভয়েরই অচিন্তিত সিদ্ধান্ত হল, জিয়াউর রহমান এর জন্য দায়ী। তিনিই ক্ষমতায় বসে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কারণে তারা এদেশে নতুনভাবে সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়েছে। এর থেকে স্থূল বক্তব্য আর কী হতে পারে?
সমাজে কোনো কিছুই হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না। কোনো ঘটনা ঘটার শর্ত যদি আগে তৈরি না হয় তাহলে সে ঘটনা হঠাৎ করে ঘটতে পারে না। জিয়াউর রহমানের আমলে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুজ্জীবন ও শক্তি সঞ্চয়ের ভিত্তি আসলে রচিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ আমলেই। শেখ মুজিব জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন ঠিক, কিন্তু আইনগতভাবে তাকে অসুবিধায় ফেললেও খুব কার্যকরভাবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর পুনরুজ্জীবনের শর্ত সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তৈরি করেছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ১৯৭২ সালেই শুরু করে দ্রুত শেষ না করে তিনি বেশ কিছু যুদ্ধাপরাধীকে কিছুকাল জেলে আটক রেখে পরে তাদের মুক্ত করেন। তিনি তাদের জন্য এক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণের জন্য তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানান! এর অর্থ কী ছিল? এই আহ্বান কি তাদের নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান ছিল না? তিনি তো তাদের আওয়ামী লীগে যোগদান করে এ কাজে এগিয়ে আসতে বলেননি। অন্যদিকে সংগঠিত না হয়ে কি কেউ রাজনৈতিকভাবে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে পারে? কাজেই জামায়াতে ইসলামীর লোকদের দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসার আহ্বানের অর্থই ছিল তাদের রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠিত হওয়ার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান। তারা যাতে এ কাজ করতে পারে এ জন্য প্রয়োজন ছিল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। কিন্তু সে সুযোগ শেখ মুজিবের হয়নি। কারণ ১৯৭৪ সালেই তার সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতন এক চরম আকার ধারণ করেছিল এবং ওই বছরেরই শেষ দিকে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের গোড়াতেই তিনি সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল নামে একটি নতুন সরকারি দল গঠন করেছিলেন। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা সম্ভব ছিল না। কাজেই তার অসমাপ্ত কাজ তার উত্তরসূরি জিয়াউর রহমানকেই করতে হয়েছিল। শেখ মুজিবুর দ্বারা নিষিদ্ধ সব রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করেছিলেন। কাজেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার শুধু জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে ছিল না। এটা প্রযোজ্য ছিল অন্য দলের ক্ষেত্রেও।
একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ছিল এ দেশে রাজনীতির ধর্মবিযুক্তির (secularisation) আন্দোলনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। অর্থাৎ ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গঠিত হবে, এটাই ছিল জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবত দেখা গেল যে, মুখে ধর্মবিযুক্তির কথা বললেও নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিণত হল লুণ্ঠনজীবীদের অভয়ারণ্য এক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে। জনগণের জীবনে নেমে এলো চরম দুর্দশা ও নিরাপত্তাহীনতা। তাদের মধ্যে দেখা গেল এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশের এ অবস্থায় সেই পর্যায়ে বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী, গণতন্ত্রী বলতে যাদের বোঝায়, তাদের কোনো কার্যকর সাংগঠনিক উপস্থিতি না থাকায় শাসকশ্রেণীর নির্যাতনের কবল থেকে মুক্তির কোনো আশু সম্ভাবনা না দেখে জনগণ ইহলোকে মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়ে পরলোকে শান্তির আশায় ধর্মমুখী হতে শুরু করল। শুরু হল রাজনীতির মধ্যে ধর্মীয় চিন্তার। এই পর্যায়ে আওয়ামী-বাকশালী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হল এবং সামরিক কর্তাব্যক্তি হিসেবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করলেন। শেখ মুজিবের দ্বারা সব নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে তিনি বাধ্য হলেন। জামায়াতে ইসলামীও একটি আইনসম্মত রাজনৈতিক দল হিসেবে আবার আত্মপ্রকাশ করল। এভাবে আত্মপ্রকাশের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ধর্মবিযুক্তিকে সম্পর্কিত করে শুরু হল রাজনীতিতে তাদের ধর্মের ব্যবহার। জিয়াউর রহমানের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার তথাকথিত আধুনিকায়নের নামে সিলেবাসে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের কিছু বিষয় ঢোকানোর ফল হিসেবে মাদ্রাসা ছাত্রদের চিন্তার কোনো আধুনিকায়ন না হলেও সাধারণ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের দরজা তাদের জন্য উন্মুক্ত হল। এ সুযোগের ব্যবহারের জন্য জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্র সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাখল ইসলামী ছাত্রশিবির। তারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে নিজেদের সংগঠিত করল, বাংলাদেশের ছাত্র সমাজের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ আমদানি করল, ছাত্র রাজনীতির অপরাধীকরণ শুরু হল। এই অপরাধীকরণ আওয়ামী লীগ-বিএনপির ছাত্র সংগঠনেও দ্রুত বিস্তার লাভ করল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনৈতিকভাবে সব থেকে লাভবান হল জামায়াতে ইসলামী। তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি কোনো কোনো বামপন্থী রাজনৈতিক দল কর্তৃক গণতান্ত্রিক দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করল! ছাত্রশিবিরকে সামনে রেখে তারা রাজনীতির মাঠে খেলোয়াড় হিসেবে নামল। তাদের অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, ধর্মীয় দল হলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই তাদের সঙ্গে বিশেষ বিশেষ অবস্থায় মৈত্রী স্থাপন করল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সমঝোতা হল। তার ভিত্তিতে নির্বাচনের পর জামায়াতের সহায়তায় আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করল। সেই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক জামায়াতপন্থী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো প্রশ্ন ছিল না। জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের মুখেই চুমু খেয়ে রাজনীতি করায় ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য করল। সরকারে মন্ত্রীর পদ লাভ করে তারা ক্ষমতাসীন হল! শুধু তাই নয়, এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা নিজেদের সংগঠন অনেক বেশি শক্তিশালী করল।
এসব ঐতিহাসিক বিষয় হিসাব করলে স্পষ্টই বোঝা যায়, বিএনপি-আওয়ামী লীগ নির্বিশেষে শাসকশ্রেণীর প্রধান দলগুলো জামায়াতে ইসলামীকে বিভিন্ন পর্যায়ে সাহায্য-সহযোগিতা করে তাকে বর্তমান পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সালে গদিনসীন হয়ে সুবিধাবাদী কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেও বিচারকে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল। বাস্তবত তারা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় নিয়ন্ত্রণ করেছিল, যার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের গোড়ার দিকে গণজাগরণ মঞ্চের তৎপরতা। নিজেদের বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সহায়তায় এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করে তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও সুদূরপ্রসারী জামায়াত নেতাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির চরিত্র গোপন রাখা আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
জামায়াতে ইসলামীর উত্থান ও শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব বিষয় ও ঘটনাবলীকে বিবেচনার বাইরে রেখে হিসাব করলে ফ্যাসিস্ট শক্তি হিসেবে তার বর্তমান অবস্থান কীভাবে তৈরি হল সেটা বোঝা যাবে না। এবং সেটা বোঝা না গেলে এই ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কীভাবে সংগঠিত করতে হবে, কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এদের শক্তির মূলোচ্ছেদ করা সম্ভব তার হদিস পাওয়া কোনোক্রমেই সম্ভব হবে না।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

জাতিসংঘের কাছে শীর্ষ দেনাদার যুক্তরাষ্ট্র, পাওনাদার বাংলাদেশ by শিহাবউদ্দীন কিসলু

আর্থিক টানাটানিতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জাতিসংঘ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে তাদের সদস্য চাঁদা ও প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধে বিশেষভাবে আহবান জানানো হয়েছে।

মহানবমীতে দেবীকে ভক্তরা পূজা দিলেন by সুকুমার সরকার

রোববার শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী। এদিন সকাল ৯টা ৪৮ মিনিটের মধ্যে দুর্গাদেবীর মহানবমী কল্পারম্ব ও বিহিত পূজা প্রশস্তা। এরআগে হয়েছে বীরাষ্টমীব্রত ও মহাষ্টমী ব্রতের পালন।

পুলিশকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে মোশা

দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোশারফ বাহিনীর প্রধান মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া (মোশা) পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে কোনো উত্তর দিচ্ছে না।

তাজমহলে মিস ইউনিভার্স কাণ্ডে আয়োজকদের দুঃখ প্রকাশ

তাজমহলে রোববারের ঘটনায় মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার আয়োজকরা ভারতের কাছে ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের ২১ বছর বয়সী বর্তমান মিস ইউনিভার্স অলিভিয়া কালপো তাজমহল দেখতে গিয়ে জুতা পায়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়ার ঘটনার জের ধরে তার বিরুদ্ধে তাজমহলকে অসম্মান করার অভিযোগে পুলিশ একটি মামলা করে।
আইন অনুযায়ী তাজমহলে কোনো বিজ্ঞাপন বা অনুরূপ কোনো কাজের চিত্রায়ন নিষিদ্ধ।তাজমহলের কেয়ারটেকারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অলিভিয়া কালপোর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতে এএফপির কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মিস ইউনিভার্স সংস্থা বর্তমান মিস ইউনিভার্সকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনার জন্য ভারতের জনগণের কাছে গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।’বিবৃতিতে বলা হয়, কালপো তার ভক্তদের জন্য একটি ভিডিও ডায়েরি তৈরি করছিলেন। তারই অংশ হিসেবে ওই ভিডিও শুটগুলো নেয়া হয়। কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়। বিবৃতিতে এ ঘটনায় যে কোনো ধরনের অনিচ্ছাকৃত অশোভন বা অসংবেদনশীল আচরণের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া হয়।