Wednesday, January 16, 2019

ভয়াবহ এক পরাজয় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর

ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পাদিত তার ব্রেক্সিট চুক্তি মঙ্গলবার রাতে বৃটিশ পার্লামেন্টের নিন্মকক্ষ হাউস অব কমন্সে মারাত্মক পরাজয়ের শিকার হয়েছে। একে ক্ষমতাসীন একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য হাউস অব কমন্সে সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর ফলে তেরেসা মে তিন দিনের সময় পাবেন। এর মধ্যেই তাকে ‘প্লান-বি’ নিয়ে এগুতে হবে। তবে বিরোধী লেবার নেতা জেরেমি করবিন তার সরকারকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্যোগ শুরু করেছেন। তিনি তেরেসা মে’র বিরুদ্ধে উত্থাপন করেছেন অনাস্থা প্রস্তাব। শুধু যে বিরোধী দল থেকে তেরেসা মের ব্রেক্সিট চুক্তির বিরুদ্ধে ভোট পড়েছে তা নয়।
তার নিজের দল কনজার্ভেটিভ পার্টির মোট ১১৮ জন এমপি তেরেসা মে’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এতে ডাউনিং স্ট্রিট পর্যন্ত বিব্রত, হতাশ। লন্ডনের অনলাইন ইন্ডিপেন্ডেন্ট লিখেছে, এতে ইংলিশ চ্যানেলজুড়ে শকওয়েভ বা হতাশার ঢেউ  ছড়িয়ে পড়েছে। আর সমালোচকরা তেরেসা মে’র সম্পাদিত ব্রেক্সিট চুক্তিকে দেখছেন মৃত হিসেবে। অনলাইন বিবিসি লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র ব্রেক্সিট চুক্তিটি ২৩০ ভোটের বিশাল ভোটের ব্যবধানে নাকচ করে দিয়েছেন বৃটিশ এমপিরা। এই প্রথম দেশটির কোন ক্ষমতাসীন সরকার পার্লামেন্টে এত বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হলো।
প্রস্তাবটি বাতিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৪৩২জন সংসদ সদস্য, যেখানে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২০২ জন। ২৯শে মার্চের মধ্যে ইউরোপিয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল ওই চুক্তিতে। লেবার পার্টি নেতা জেরেমি করবিন এখন সরকারের ওপর একটি অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, যা দেশটিতে একটি সাধারণ নির্বাচনে গড়াতে পারে।
তেরেসা মে জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবের বিষয়ে বুধবার তিনি বিতর্কে অংশ নিতে পারেন। ওদিকে জেরেমি করবিন বলছেন, এই সরকারের পরিষ্কার অদক্ষতার ব্যাপারে কমন্স সদস্যদের মতামত জানানোর সুযোগ করে দেবে এই আস্থা ভোট। তবে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে যে, আস্থা ভোটের ক্ষেত্রে তারা মিসেস মে’কে সমর্থন করবেন। সংসদ সদস্যরা যদি অনাস্থা ভোট সমর্থন করেন, তাহলে সরকার বা অন্য কেউ যে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবেন, তাদের পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে আরেকটি আস্থা ভোটে বিজয়ী হতে হবে। সেটি না হলে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটাভুটিতে নিজের  কনজার্ভেটিভ পার্টির ১১৮ জন এমপি বিরোধী দলের সঙ্গে মিসেস মে’র চুক্তির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। সাধারণ ক্ষেত্রে এ ধরণের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপর বিশাল পরাজয়ের পর আশা করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। তবে ভোটাভুটির পরেই তেরেসা মে আভাস দিয়েছেন যে, তিনি সরকার পরিচালনা অব্যাহত রাখবেন। তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, হাউস তাদের মতামত দিয়েছে এবং সরকার সেটি শুনবে।
সব দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ব্রেক্সিটের বিষয়ে করণীয় ঠিক করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। ওদিকে ভোটের ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড টাস্ক বৃটিশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন যাতে তারা যত দ্রুত সম্ভব ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টি পরিষ্কার করে।

৫০ আসনের ৪৭টিতে অনিয়ম রাতে সিল মারা হয় ৩৩টিতে -টিআইবির রিপোর্ট

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৫০টি আসনে গবেষণা চালিয়ে ৪৭টি আসনেই অনিয়ম পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এসব অনিয়মের ব্যাপারে বিচারবিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। গতকাল ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে  টিআইবি এই তথ্য তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে টিআইবি’র গবেষণা দলের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম লিখিত প্রতিবেদনে বলেন, সংস্থাটি দৈবচয়নের মাধ্যমে ৩০০টি আসনের মধ্যে ৫০টিতে গবেষণা করে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৭টি আসনে দেখা যায়, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখা, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারা, আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া, অনেক কেন্দ্রে ভোটারকে ভোট দিতে না দেয়া, ভোটারদের জোর  করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, বেশির ভাগ কেন্দ্র আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের নেতা-কর্মীদের দখলে থাকার অভিযোগ, বেশির ভাগ কেন্দ্রে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট না থাকার তথ্য এসেছে প্রতিবেদনে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫০টি আসনের মধ্যে ৪২টি আসনের এক বা একাধিক কেন্দ্রে প্রশাসন  ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ভূমিকা ছিল নীরব। ৪১টি আসনে জালভোট দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতে সিল মেরে রাখার তথ্য মিলেছে ৩৩ আসনে।
বুথ দখল ও জালভোট পড়ে ৩০ আসনে। পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে বাধা ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয় ২৯ আসনে। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা ও জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করার তথ্য মিলেছে ২৬ আসনে। ভোট শেষ হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায় ২২টি আসনের এক বা একাধিক কেন্দ্রে। আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো হয় ২১ আসনে, ব্যালট বাক্স আগে থেকে ভরে রাখা হয় ২০ আসনে এবং প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীর নেতা-কর্মীদের মারধর করা হয় ১১টি  আসনে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সবগুলো আসনে প্রচারণার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলকে এককভাবে সক্রিয় দেখা গেছে; কোনো কোনো আসনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সরাসরি প্রচারণার জন্য সুবিধা আদায়, প্রশাসন/ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মচারী কর্তৃক প্রার্থীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ, সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে প্রচারণা করেছে।
টিআইবি সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলেছে, ক্ষমতাসীন দল ও জোটের কোনো কোনো কার্যক্রম নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। সংসদ না ভেঙ্গে নির্বাচন- সরকারে থাকার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা  আদায়-বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠী সম্প্রসারণের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনা নির্বাচনমুখী প্রকল্প অনুমোদন। নির্বাচনের প্রায় একবছর আগে থেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রচার চলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রচারণায়-মন্ত্রিসভার সদস্যদের অংশগ্রহণে সরকারি কার্যক্রমে দলীয় নির্বাচনী প্রচারণা অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ক্ষমতাসীন দলের প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান বা স্পট সম্প্রচার হয়েছে নির্বাচনের আগে। সরকারের  বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের দশটি বিষয়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচার-২৭টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কেবল ডিসেম্বর মাসে মোট এক লাখ ৫৯ হাজার ২৪১ সেকেন্ড সময় ধরে প্রচারিত হয়, যার প্রাক্কলিত আর্থিক মূল্য ৫ কোটি ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৩০ টাকা। ‘থ্যাংক ইউ পিএম’ নামে একটি টিভি স্পট অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে ১৩টি চ্যানেলে প্রচারিত হয়, যার প্রাক্কলতি আর্থিক মূল্য ৮ কোটি ৯৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪৭০ টাকা। ‘আমরা বাংলাদেশের পক্ষে’ নামে ৫৫টি টিভি স্পট ডিসেম্বর মাসে ২৫টি চ্যানেলে এক লাখ ৪৪ হাজার ৭৯৫ সেকেন্ড প্রচারিত হয়, যার প্রাক্কলতি আর্থিক মূল্য ৫ কোটি ৯৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪৫ টাকা। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রচারিত সংবাদে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের একচ্ছত্র আধিপত্য, বিরোধী দল/জোটের অনুপস্থিতি; বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বিটিভির সংবাদ প্রচারের ফলে কেবল ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রচারণা করার সুযোগ পায়।
পর্যবেক্ষণে- সার্বিকভাবে বলা হয়- সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলা গেলেও তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারেনি।
নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে পারেনি। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আছে কিনা তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ। নির্বাচনের সময়ে তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পর্যবেক্ষক ও সংবাদ মাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা; ইন্টারনেটের গতি হ্রাস; মোবাইলের জন্য ফোর-জি- থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ; জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মোটরচালিত যানবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা।
গবেষণা প্রতিবেদনে ৬টি সুপারিশ তুলে ধরেছে টিআইবি। এতে বলা হয়েছে- সৎ, যোগ্য, সাহসী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ অন্যান্য অংশীজনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হতে হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা ও বলপ্রয়োগসহ নির্বাচনী আচরণ বিধির বহুমুখী লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে সেগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে ও তার ওপর ভিত্তি করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। অন্যদিকে কমিশনের নেয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ডিজিটালাইজ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও প্রার্থীর মনোনয়ন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও গণমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের জন্য অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত  করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। একইসঙ্গে এসব অনিয়মের ব্যাপারে বিচারবিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করেছেন তিনি। বলেছেন, এ নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে, সেই আলোকে আমরা বলছি, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়েছে। তবে এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য, কী গ্রহণযোগ্য নয়- এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
তিনি বলেন, এটাকে আংশিক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যেতে পারে, কারণ সবদলের  প্রার্থী অংশ নিলেও সবার সমান প্রচারণার সুযোগ ছিল না। বিশেষ করে ভোটারদেরও তাদের অধিকার অনুযায়ী, পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেয়ার সমান সুযোগ ছিল না। কোনো কোনো কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা, অনেক কেন্দ্রে ভোটারকে ভোট দিতে না দেয়া, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারা, জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, তাদের প্রত্যাশিত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা দেখা গেছে। বিশেষ করে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তার যথেষ্ট তথ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিপক্ষকে দমনে সরকারি দলের সহায়ক অবস্থানে দেখা গেছে কমিশনকে। সবদলের প্রার্থীদের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি তারা। আচরণবিধি পালনের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ দেখা গেছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে ব্যাপক ব্যর্থতা দেখা গেছে এবং এ ব্যাপারে কমিশনের ভেতরে মতদ্বৈধতা লক্ষ্য করা গেছে- এটা অভূতপূর্ব বিষয়। গণতন্ত্রের জন্য এ ধরনের নির্বাচন ইতিবাচক নয়। এটাও ঠিক যে একটা নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র আসে না আবার ধ্বংসও হয় না।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি এডভোকেট সুলতানা কামাল  সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, নির্বাচনে যদি সমান সুযোগ দেয়া না হয় তবে গণতন্ত্রের জন্য এটা ভালো নয়। সেই কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলা হচ্ছে। নির্বাচনে সবাই সমান সুযোগ পাবে এটাই বাঞ্ছিত। সবাই সমান সুযোগ না পেলে সংশয় থেকেই যায়। এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো উদাহরণ রাখে না। নির্বাচন পরিচালনায় প্রচুর ত্রুটি ছিল। এজন্য আমরা বলছি, ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সামনের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করবেন।
টিআইবি জানায়, নভেম্বর ২০১৮ থেকে জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে বর্তমান প্রতিবেদনটি তফসিল পূর্ব থেকে শুরু করে ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এই গবেষণা গুণবাচক গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। মোট ১০৭ জন প্রার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে গবেষণায়। চট্টগ্রাম বিভাগে-৯টি আসন, ঢাকা বিভাগে ১১টি, রাজশাহী বিভাগে ৬টি, খুলনা বিভাগে ৬টি, বরিশাল বিভাগে ৪টি, রংপুর বিভাগে ৬টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৪টি ও সিলেট বিভাগে ৪টি আসন বেছে নেয়া হয় গবেষণার জন্য।

গল্প: অসেতুসম্ভব by জাকির তালুকদার

পোশাক অর্থনীতির কাছে বইয়ের বাজার মার খাওয়ার পর শাহবাগের আজিজ মার্কেট থেকে বইগুলো বহিষ্কৃত হয়ে নিজেদের জায়গা খুঁজে নিতে চেষ্টা করছে কাঁটাবনের কনকর্ড এম্পোরিয়ামে। সেতুকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম যে বিকেলে কনকর্ডে গেলাম, আড্ডার সবাই খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিল আমাদের সেই যাওয়াটিকে। এটুকু উন্নতি আমাদের হয়েছে। একটা আনকোরা নতুন মেয়েকে দেখে সবাই হামলে পড়বে, সেই অবস্থা আর নেই। আর সেতু খুবই স্মার্ট মেয়ে। নারীবাদী। তবে উগ্রতা নেই। আসলে উগ্রতা তো স্মার্টনেসের ঘাটতি থেকেই আসে। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরে আমি নিজে খুব কমই কথা বললাম তার সঙ্গে। আমাকে তো সে কিছুটা হলেও চেনে-জানে। অন্যদের সঙ্গে কথা হোক তার। চিনপরিচয় হোক। আমার আড্ডাসঙ্গীদের দেখে সে আমাকে আরও ভালোভাবে চিনতে পারবে। দুই দফা লাল চা খাওয়া আর ঘণ্টা তিনেকের গল্পগুজবের পর আমি সেতুকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে এলাম আবার আড্ডায়। তখন শুরু হলো কৌতূহলের বর্ষণ।

সেতু কি আপনার নতুন গার্লফ্রেন্ড, ওস্তাদ?

না।

বন্ধু?

না।

তাহলে জাস্ট পরিচিত?

আমি একটু ভেবে বললাম, তার চাইতে একটু বেশি।

অবধারিত প্রতিক্রিয়া, বুঝলাম না।

জাস্ট পরিচিতির চাইতে একটু বেশি। তবে বন্ধুত্বের চাইতে কম। প্রেম-ট্রেমের তো প্রশ্নই ওঠে না।

এই রকম সম্পর্কের নাম তো শুনিনি! পরিচিতের চাইতে বেশি, আবার বন্ধুত্বের চেয়ে কম! কেমন কুয়াশা কুয়াশা লাগে।

নাম তো নেই। শুনব কোত্থেকে?

তখন তত্ত্ব চলে আসে। আসলেই তো অনেক কিছুই অদ্যাবধি হয়নি সংজ্ঞায়িত। আমাদের মনের মধ্যে কত রকমের অনুভূতি আছে। কিন্তু কাম-ক্রোধ-লোভ-মদ-মোহ-মাৎসর্য, ভালোবাসা-ঘৃণা, বিষণ্নতা-আনন্দ—এই রকম কয়েকটা নাম দিয়ে তো আমরা জীবন কাটিয়ে দিই। কিন্তু অনুভূতি এবং বোধ তো আরও অনেক আছে। সেই যে জীবনানন্দ লিখেছিলেন, কোনো এক বোধ কাজ করে!

ঠিক। সমাজ যেসব সম্পর্ক নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, তার বাইরেও তো অনেক রকম সম্পর্ক আছে। সেগুলোর নাম দেওয়ার গরজ কারও নেই। নাম নেই। কিন্তু তারা আছে। সেই সব নাম না দেওয়া সম্পর্ক আছে।

আচ্ছা যাউকগা। আপনাগোর সম্পর্ক একদিন একটা নাম পরিগ্রহণ করব, ইনশা আল্লাহ! সেই খুশিতে আইসেন আমরা ধূম্রসহকারে আরেক পেয়ালা চা অগ্রিম পান কইরা লই!

তেমন কোনো সম্ভাবনা বা আশঙ্কা যে আদৌ নেই, সে কথা বলে আর জটিলতা বাড়াতে চাইলাম না।

অন্যরা তখন সমস্বরে বলে উঠেছে, আমেন!



দুই

সেতুর সঙ্গে আমার পরবর্তী দেখা প্রায় এক বছর পর। অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেতু হুবহু সেই আগের মতোই আছে। আমি কুশল বিনিময়ের আগেই প্রশ্ন করি, এখনো বিয়ে করোনি কেন?

সাহস হয় না। সেতু উত্তর দেয়, পুরুষ মানুষকে তো আমি তেমনভাবে চিনি না। একসঙ্গে একজীবন কাটানো কি সহজ ব্যাপার হবে মনে করেন?

কোনো মধ্যপন্থা না নিয়ে আমি সরাসরিই বলি, না। মোটেই সহজ হবে না। সহজ হয় না। কোনো দিনই সহজ ছিল না।

পুরুষতন্ত্র খুবই খারাপ।

আমি বলি, শুধু যে পুরুষতন্ত্রই দায়ী তা নয়, অসংখ্য জিনিস আছে যেগুলো দুইজন মানুষের সম্পর্কের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

টিএসসির বহির্দেয়াল ঘেঁষে গড়ে ওঠা চায়ের দোকানগুলোর একটার বেঞ্চিতে বসি আমরা। চারপাশে শব্দ। মানুষ কথা বলছে অবিরাম। আমি একটু হাসি। সেতু জিজ্ঞেস করে, আপনি হাসলেন কী দেখে?

চারপাশে কত রকমের শব্দ হচ্ছে, শুনতে পাচ্ছ?

পাচ্ছি।

এত শব্দের মধ্যে আমাদের তো বেশ জোরে জোরে কথা বলতে হবে। তা না হলে পাশাপাশি বসেও আমরা পরস্পরের কথা ভালো করে শুনতে পাব না।

সেতু বলে, তা ঠিক। অস্বস্তিকর। অন্যদের কানেও কথাগুলো চলে যাবে।

আমি বলি, না, যাবে না। সবাই নিজের নিজের সঙ্গীকে শোনানোর জন্য উচ্চ শব্দ দিয়ে কথা বলছে। আর বাড়তি মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছে। তাই এই ভিড়ের মধ্যেও আমাদের শব্দের প্রাইভেসি বজায় থাকবে। সেই কথাটা মনে করেই হেসেছিলাম।

চায়ে চুমুক দিয়ে সেতু বলে, পুরুষেরা কোনো দিন বোধ হয় বউদের নিজেদের সমান করে ভাবতে পারে না, তাই না?

এ কথা কেন মনে হলো?

যতজন বিবাহিত মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, সবাই এই কথাটাই বলেছে। স্বামীর মন রাখার জন্য প্রত্যেক মেয়েকেই তার নিজের ইগো বিসর্জন দিতে হয়। তা ছাড়া নিজের মা-বাবাকে তো দেখেছি। বাবা তো আমার চোখে বাবা। আমার নির্ভরতা। আমার আশ্রয়। কিন্তু যখন মায়ের সঙ্গে তার আচরণগুলো বিশ্লেষণ করতে বসি, তখন দেখি একজন পুরুষ তার সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দিচ্ছে নারীর ওপর।

আমি বলি, পুরোপুরি বেঠিক বলা যাবে না তোমার কথা।

সেতু জোর দিয়ে বলে, বেঠিক কেন হবে? বরং পুরোপুরিই সঠিক।

তোমার মা-ও কিছু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় বাবার ওপর। সেগুলো হয়তো তুমি খেয়াল করোনি।

সেতু যুক্তি দিয়ে বিচার করতে পারে। পুরোপুরি অস্বীকার করে না আমার কথা। বলে, হতে পারে। তবে খুব সাদাচোখে যা দেখা যায়, আমি সেটাই বললাম।

চা শেষ করে আমরা উঠে পড়ি। পাবলিক লাইব্রেরির দিকে হাঁটি। এই অঞ্চলটুকু সব সময় প্রাণবন্ত থাকে। কোনো না কোনো প্রদর্শনী চলে, ফিল্ম শো হয়, নাটক হয়, সেমিনার হয়, মানববন্ধন হয়। বাঙালি মধ্যবিত্তের শিল্পচিন্তা আর দেশভাবনার মধ্যবিত্ত এখানে এলে বেশ ভালোভাবে বোঝা যায়।

পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়ির একটা কোণ ঘেঁষে বসি আমরা। সেতু আগের কথারই খেই ধরে, বাঙালি পুরুষ কি কখনো তার বউয়ের সত্তাকে নিজের সত্তার সমান মর্যাদা দেয়?

মর্যাদা দিচ্ছে কি না, সেটি বুঝবে কীভাবে?

এই ধরুন দুজনেই বাড়ির কাজগুলো সমানভাবে ভাগ করে করল।

একটা গল্পের কথা মনে করে আমি একটু জোরেই হেসে ফেলি।

সেতু প্রশ্নবোধক তাকায়।

একটা গল্প বলি, শোনো।

নববিবাহিত দম্পতির গল্প।

বাসর রাত। ভোরের দিকে ঘুম এসে গিয়েছিল বধূটির। সকাল সাতটায় তার কপালে মোলায়েম হাতের স্পর্শে চোখ মেলে তাকায়। দেখল তার স্বামী ট্রেতে করে পানি, ধূমায়িত খশবুদার চা আর খবরের কাগজ সাজিয়ে রেখেছে পাশের টিপয়ে। বউকে তাকাতে দেখে মধুর হাসল স্বামী। বলল, সাতটা বাজে। ওঠো। তোমার জন্য বেড টি এনেছি।

নববধূ মুগ্ধ।

মৃদুমন্দ গল্পের সঙ্গে চা খাওয়া হলো। স্বামী বলল, ওয়াশরুমে বাথটাবে গরম আর ঠান্ডা পানি মিশিয়ে রেখেছি তোমার জন্য। সাবান, তোয়ালে, শ্যাম্পু, ব্রাশ—সব ঠিকমতো রেখেছি।

সদ্যস্নাতা স্নিগ্ধ বধূ বাইরে বেরিয়ে দেখল নাশতার টেবিল নিখুঁতভাবে সাজানো। শুধু চেয়ার টেনে বসা আর খেতে শুরু করা। আহ্, কত চমৎকার স্বামী জুটেছে তার কপালে!

দুপুরেও একই ব্যাপার। সব রেডি করে রেখেছে স্বামী।

দুপুরের পর একটু গড়াগড়ি। কথা বলতে বলতে চোখ বুজে আসা। সন্ধ্যার মুখে চোখ খুলে বউটি দেখল তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে স্বামীর হাসিমুখ। সে চোখ মেলতেই স্বামী বলল, চলো। সান্ধ্য চা-জলখাবার তৈরি হয়ে গেছে।

সুখের আবেশে শরীর-মন আরও স্নিগ্ধ হয়ে গেল নববধূর।

রাত দশটা বাজতেই দেখা গেল ডিনার তৈরি।

রাতে শুয়ে শুয়ে নববধূ মন খুলে শোকরগোজারি করল আল্লাহর কাছে। কত ভাগ্য তার, এমন একটা স্বামী পেয়েছে। আগে যেসব মেয়ের কাছে স্বামীদের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনেছে সে, তাদের সবাইকে, এমনকি পুরো নারী জাতিকে মিথ্যেবাদী মনে হলো তার।

পরদিনও একই আনন্দে কাটল।

তার পরের দিনও।

এইভাবে পুরো এক সপ্তাহ। নববধূ তখন সুখের সাগরে ভাসছে।

সপ্তম রাতে স্বামী জিজ্ঞেস করল, এই কয় দিনে নিশ্চয়ই তোমার মুখস্থ হয়ে গেছে আমাদের রুটিন?

মাথা পুরো একদিকে হেলিয়ে সহাস্য বধূ জানাল, হ্যাঁ।

স্বামী বলল, গুড। আমার টিচিং তাহলে পারফেক্ট হয়েছে। কাল থেকে তুমি এই রুটিন মেনে সবকিছু করবে। কোনো কিছু যেন নড়চড় না হয়।

শব্দ করে হেসে ফেলল সেতু। হাসতে হাসতে বলল, পুরুষ মানুষ মানেই শয়তানের ডিব্বা।

কথাটা শুনে আমার মনে হলো, এ শুধু রাগের কথাই নয়, শয়তানের ডিব্বার প্রতি একটু প্রশ্রয়ও বটে। এই রকম প্রশ্রয়েই শয়তানের ডিব্বারা কিছুক্ষণের জন্য হলেও সত্যিকারের প্রেমিক হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণেই জীবনটা সহনযোগ্য হয়ে ওঠে।

সেতুকে দেখে মনে হলো কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু বলবে কি না, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। আমি তাকে উৎসাহ জোগাই, কিছু একটা বলতে চাইছ মনে হচ্ছে?

না, মানে, ইয়ে আরকি! মানে আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাকে ঠিক কী বলা যাবে?

আমি হেসে উঠি শব্দ করে। উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করি, তুমি জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ো?

পড়ি মানে? জীবনানন্দের কবিতা বাদ দিয়ে মানুষ থাকতে পারে? রোজ রোজ না পড়লেও পড়তে তো হবেই! কিন্তু আমার প্রশ্নের সঙ্গে জীবনানন্দের কবিতার কী সম্পর্ক?

আছে। সেটা পরে বলছি। এখন বলো, জীবনানন্দের কবিতা পড়ে তোমার কেমন অনুভূতি হয়?

কষ্ট হয় মাঝেমধ্যে।

শুধু কষ্ট?

না, মানে একধরনের বিষাদও।

আর?

সেতুকে বিভ্রান্ত দেখায়। বলে, আসলে কষ্ট, বিষাদ মিলিয়ে এমন একটা অনুভূতি হয়, যা ঠিক বলে বোঝানো যায় না। সেতু যেন লজ্জা পেয়েই বলে, আমি বোধ হয় জীবনানন্দ ঠিকমতো বুঝি না।

আমি তাকে আশ্বস্ত করি, তুমি ঠিকই বুঝেছ জীবনানন্দকে।

সেতুর বোধ হয় বিশ্বাস হয় না আমার কথা। প্রশ্ন করে, সত্যি বলছেন?

হ্যাঁ। ঠিক বলছি।

সেতু অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে, কী জানি! ঠিক বুঝি বলে মনে হয় না।

আমার মনে হয়েছে জীবনবাবুর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য পাঠকেরা খেয়াল করে না।

কী?

মানুষের অনুভূতিগুলোর নাম তো আমরা জানি। মনোবিজ্ঞানী, শরীরবিজ্ঞানী, আচরণবিজ্ঞানীরা মানুষের অনেকগুলো অনুভূতির নাম দিয়েছেন।

সেতু কথা বলে না। চোখে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। বলি, কিন্তু এত দিনেও নিজেদের সব অনুভূতির নাম দিতে পারেনি মানুষ। আনন্দ, বেদনা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, বিষাদ, স্নেহ, ভালোবাসা, ঘৃণা, শোক, বিহ্বলতা—এই রকম কিছু শব্দ দিয়েই তো মানুষের রিপু আর অনুভূতিগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে। তাই না?

হুম।

কিন্তু আমরা জানি যে এই কয়েকটি নাম দিয়ে আমরা আমাদের মনের সব অনুভূতিকে ছকে ফেলতে পারি না। এমন সব অনুভূতি আমাদের মধ্যে যখন-তখন সক্রিয় ওঠে, যেগুলোর নাম আমরা জানি না। কোনো মানুষই জানে না। এই যে তুমি একটু আগে বললে যে কবিতা পড়ে কেমন যে লাগে, তা তুমি ঠিক শব্দ দিয়ে বোঝাতে পারছ না।

ঠিক বলেছেন।

জীবনানন্দ তাঁর কবিতাগুলোতে সেই সব অনুভূতিকে তুলে এনেছেন, এখনো যেগুলোর নাম দেওয়া হয়নি।

চকচক করে ওঠে সেতুর চোখ, ঠিক বলেছেন।

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলি, সেই রকম মানুষে মানুষে কত রকমের সম্পর্ক যে হতে পারে, সেগুলোকেও মানুষ এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি। তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সেই রকমই একটা কিছু।

সেতুও উঠে দাঁড়ায়। মেয়েটির পরিমিতিবোধ অসাধারণ। সে আমাকে আরেকটু বসার জন্য একবারও অনুরোধ করবে না।

আমরা দুজন একসঙ্গে হেঁটে যাই শাহবাগ মোড় পর্যন্ত। এবার সে চলে যাবে মিরপুরের দিকে। আর আমি মোহাম্মদপুরের দিকে। বিদায় নেওয়ার সময় সেতু অনুচ্চ কণ্ঠে জানতে চায়, আপনাকে আমি কী বলে ডাকব?

আমি বলি, সেটাও এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

নানা কৌশলে ক্যাম্প ছাড়ছে রোহিঙ্গারা by সরওয়ার আলম শাহীন

উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গারা সপরিবারে ক্যাম্প থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই মালয়েশিয়া পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ছে। কিছু কিছু রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত আত্মীয় পরিজনের আহ্বানে ক্যাম্প ছাড়ছে। চলতি মাসে মাছ সরবরাহ ড্রামের ভেতর অবস্থান নিয়ে সড়কপথে পালানোর সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের পৃথক অভিযানে ১০ জন রোহিঙ্গা আটক হয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক এক শ্রেণির রোহিঙ্গা দালাল মালয়েশিয়া পাড়ি জমানোর জন্য রোহিঙ্গাদের উদ্ধুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে বিজিবি সদস্যরা টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ চরাঞ্চল থেকে ১১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে হস্তান্তর করেছে। এসব রোহিঙ্গাদের তথ্যে উঠে এসেছে তারা দালালের খপ্পড়ে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ক্যাম্প ত্যাগ করেছিল।
কুতুপালং ক্যাম্পের ১২নং ব্লকের কর্মরত এনজিও সংস্থা ইপসার এক কর্মকর্তা ১৩ই জানুয়ারি সকালে উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জকে অবহিত করে বলেছেন, বেশ কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে যেকোনো সময়ে ক্যাম্প ত্যাগ করতে পারে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছেন বলে ইপসার ওই কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা রশিদ আহমদ ক্যাম্প থেকে পালানোর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কিছু কিছু রোহিঙ্গা আছে যারা এ পর্যন্তও তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি তারা সরকারিভাবে প্রদত্ত ত্রাণ সামগ্রীও পায়নি। এসব রোহিঙ্গা জীবন জীবিকার তাগিদে ও উন্নত জীবন যাপনের আশা করে ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে। তিনি বলেন, সীমিত একটি জায়গায় প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। এসব রোহিঙ্গা কখন কে কোথায় যাচ্ছে তার কোনো হদিস নেই। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা শহরের গার্মেন্টস অথবা বিভিন্ন কাজের অজুহাতে ক্যাম্প ছাড়ছে। অনেকেই বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বসবাসরত আত্মীয় স্বজনের আহ্বানে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ রেজাউল করিম জানান, রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পালানোর কোনো সুযোগ নেই। যেসব রোহিঙ্গা নতুন করে এসে বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে তারাই মূলত বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্রে চলে যাচ্ছে।
উখিয়া থানা অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের জানান, সড়কপথে ৪টি পুলিশ চেকপোস্ট দিয়ে বিশাল রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও যেসব রোহিঙ্গা পালাতে গিয়ে ধরা পড়ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, বর্তমান সরকারের দক্ষতায় যদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হয় তাহলে ক্যাম্প পালানো রোহিঙ্গাদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনকে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে পালানো প্রবণতা প্রতিরোধে আরো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

ভারতের নাগরিকত্ব আইনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে -হিন্দু সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিক্রিয়া

ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন বিল নিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া  হয়েছে। প্রথম সারির হিন্দু নেতারা মনে করেন, ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ পাকিস্তান বা পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশকেও ইসলামী দেশে পরিণত হওয়ার দিকে ঠেলে দেবে।  কেননা, ভারতের পার্লামেন্টে যদি চূড়ান্তভাবে বিলটি পাস হয়, তাহলে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী শক্তি এদেশ থেকে সংখ্যালঘুদের বিতাড়িত করতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। তারা কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই হিন্দুদের জমি ও সহায় সম্পত্তি দখল করে নেবে। ফলে বাংলাদেশ পাকিস্তান বা পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশের মতো ইসলামী দেশে পরিণত হবে। ভারতের সংবাদ মাধ্যম ফার্স্টপোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, ভারতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০১৬ (বা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন বিল)-এর কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রথম সারির কিছু নাগরিক। এই আইন বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করবে বলে আশঙ্কা করেন তারা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে যেমন ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এ বিল নিয়ে, তারই যেন প্রতিধ্বনি উঠেছে তাদের সমালোচনায়।
এ বিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমটির সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় উন্নয়ন বিষয়ক অর্থনীতিবিদ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাবেক বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্ত, ঐক্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, (ভারতের) এই আইনি পদক্ষেপ বা অ্যাকশন আমাদের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যদি এই আইন সংশোধনের একটি উদ্দেশ্য হয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংখ্যালঘুদের আইনগত নিরাপত্তা দেয়া, তাহলে এর ঠিক উল্টোটা ঘটতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান আরো দুর্বল হবে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জেনেভা ও ভিয়েনায় জাতিসংঘের অফিসেও বাংলাদেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন বিলকে দু’দিকে ধারসম্পন্ন তরবারির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, সাধারণভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে হিন্দুরা তাদের মূল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এখন ভারতে এই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলে তাদের বিরুদ্ধে যে বৈষম্য আছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইকে আরো খর্ব করবে এবং দেশের  ভেতরে তাদের দীর্ঘ মেয়াদি যে ভবিষ্যৎ আছে তা হাল্কা করে দেবে। এ ছাড়াও এই আইনকে স্বার্থান্বেষী মানুষরা বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারতে তাড়িয়ে দেয়ার অজুহাত হিসেবে নিতে পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ৬টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, যারা নির্যাতনের অভিযোগে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন বিল। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই তিনটি দেশের হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টানদের নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারত সরকার তাদের  নাগরিকত্ব দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এই অজুহাতে যে, তারা ওই তিনটি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের হাতে নির্যাতনের শিকার।
বিজেপি সরকারের এমন উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাসগুপ্তও। তার সংগঠন হলো বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শীর্ষ স্থানীয়। রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, যদি নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন বিলটি ভারতের পার্লামেন্ট পাস করে তাহলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী শক্তি সংখ্যালঘুদের তাড়িয়ে দিতে উৎসাহিত হবে। তারা কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই এসব সম্প্রদায়ের জমি ও সহায় সম্পত্তি গ্রাস করবে। এ ছাড়া এই বিলটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলবে এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা পশ্চিম এশিয়ার কিছু দেশের মতো ইসলামিক দেশে পরিণত করবে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ছিল শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ। ১৯৭০ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় প্রায় ২০ ভাগে। বাংলাদেশ জনসংখ্যা পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, সংখ্যালঘুদের শতকরা হার ২০১১ সালে নেমে এসেছে শতকরা প্রায় ১০ ভাগে। রানা দাসগুপ্ত বলেন, এই ব্যুরো এক বছর আগে বলেছে যে, গত ৫ বছরে হিন্দু জনসংখ্যা বেড়েছে শতকরা প্রায় ২ ভাগ। এই হিসাবে বাংলাদেশে এখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শতকরা প্রায় ১১.৭ ভাগ।
ঐক্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ঐক্য ন্যাপ) প্রেসিডেন্ট পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেছেন, লোকসভায় এই বিল পাস হলে তা বৈষম্যমূলক  ও বিভক্তির রাজনীতিকে উস্কে দেবে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে যায়। এ বিলের একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশে। এর ফলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনকে উস্কে দেয়ার একটি ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ছাড়া এ বিলের ফলে ভারতের মুসলিমদের মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে আসামে এ ধরনের ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
তবে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো ইসলামী রাষ্ট্র হবে, নাকি ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থি প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে উঠবে, এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ বিষয়টিকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি না। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি বাংলাদেশের উদার, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও গণমাধ্যম তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও পাকিস্তান দফায় দফায় বাংলাদেশকে ইসলামীকরণ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
তবে পঙ্কজ ভট্টাচার্য আশা প্রকাশ করে বলেন, চূড়ান্তভাবে মানবতা ও সাম্যের জয় হবে। ক্ষমতায় বসার জন্য ভোটারদের প্রভাবিত করতে ধর্মীয় মৌলবাদকে যেন উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে একাট্টা হতে হবে। সর্বোপরি, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী কোনো নাগরিক এই বিলকে আইনে পরিণত হতে দেবে না বলেও মনে করেন তিনি।

সংলাপ নিয়ে কাদের এইচ টি ইমাম যা বললেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ হবে নাকি শুভেচ্ছা বিনিময় হবে তা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন , প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবার সহায়তা চান, সে কারণেই তিনি আবার একটি সংলাপ করবেন। অন্যদিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তো সংলাপ শব্দটি উচ্চারণ করিনি। বলা হয়েছে গণভবনে নেত্রী আমন্ত্রণ জানাবেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। একটু আপ্যায়নের ব্যবস্থাও থাকবে। নতুন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া পাঁচজন গতকাল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এইচ টি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবার সহায়তা চান।
সে কারণেই তিনি আবার একটি সংলাপ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী সকলের প্রধানমন্ত্রী। কাজেই অন্যান্য দল, তারা যদি মেনে নেন, আমার মনে হয়, নিশ্চয়ই মেনে নেবেন যে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা তাদের করতে হবে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী আবার বলেছেন, উনি আরেকটি সংলাপ করবেন। সেই সংলাপে সকল পার্টি যারা এর আগের সংলাপে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদেরকেও উনি আমন্ত্রণ করেছেন। তবে বিএনপি পুনঃনির্বাচনের যে দাবি তুলেছে, তাকে ‘অত্যন্ত অবাস্তব এবং হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিএনপির তরফ থেকে যেটি বলা হচ্ছে, যে নতুন নির্বাচন, এটি তো সম্ভব না। পাঁচ বছর পরেই নির্বাচন হবে। অতএব এখন মেনে নিয়ে, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সকলে যদি সহায়তা করেন, আমাদের দিক থেকে বলতে পারি, আমরা পাঁচজন অথবা আমাদের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, অথবা সরকারে যারা আছেন, আমরা সকলে সকলের সহায়তা চাইব। প্রধানমন্ত্রী বললে আমরা অন্যদের সঙ্গে (বিরোধী রাজনৈতিক দল) কথাও বলব- আপনারা আসুন, সহায়তা করুন। বাংলাদেশ তো সকলের, দেশকে গড়ে তুলি।
অন্যদিকে গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় সমাবেশ উদযাপনের প্রস্তুতি সভা শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি কখনো বলিনি সংলাপ হবে। কেউ যদি মনগড়া খবর পরিবেশন করেন তাহলে তো কিছু করার নেই। আমি যে বক্তব্য রেখেছি তার অডিও-ভিডিও ক্লিপ রয়েছে, সেখানে সংলাপের কোনো বিষয় নেই।
আগামী ১৯শে জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট, যুক্তফ্রন্ট, বিএনপি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী জোট সব মিলিয়ে মোট ৭৫টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন। সেই দলগুলোর নেতৃবৃন্দকে আমাদের নেত্রী আবারো গণভবনে আমন্ত্রণ জানাতে চান, শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য। সংলাপ হবে না দাবি করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই।
এখানে সংলাপ নিয়ে ধূম্রজাল কোথা থেকে এলো? আমি তো সংলাপ শব্দটি উচ্চারণ করিনি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একবারও সংলাপের কথা বলেননি। আমি বলেছি তিনি আমন্ত্রণ জানাবেন। যে নির্বাচন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত সেখানে সংলাপের প্রশ্ন আসে কিভাবে? জাতিসংঘ বলেছে শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করতে তারা রাজি। এই নির্বাচনে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার বিপুল জয় হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সংলাপ হাস্যকর। তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের দল অনেক ঐক্যবদ্ধ। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে আমাদের সবচেয়ে কমসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। শেষ পর্যন্ত আপনারা দেখেছেন মাত্র দু’জন বিদ্রোহী ছিল। এটা আওয়ামী লীগের বৃহত্তর ঐক্যের ফসল। ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা দলে কোনো পদে নেই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পদায়ন করা হবে। বঞ্চিত নেতারা যেন হতাশাগ্রস্ত না হয়ে যান সে ব্যাপারে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। হতাশা যেন তাদের গ্রাস না করতে পারে। তাদের খোঁজ-খবর আপনাদের রাখতে হবে।
কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। বিজয় উদযাপন সমাবেশ সম্পর্কে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, সমাবেশে আপনারা যাবেন, আপনাদের সবার দায়িত্ব আছে। সমাবেশে আমাদের প্রমাণ করতে হবে আমরা সুশৃঙ্খল একটি দল। উৎসবমুখরভাবে সমাবেশে উপস্থিত হবেন সমাবেশের সরঞ্জাম নিয়ে। তবে সমাবেশস্থলে ঢোকার আগে ফেস্টুন-ব্যানার বাইরে রাখতে হবে। গেটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। নারীদের জন্য আলাদা গেটের ব্যবস্থা থাকবে। বেলা ২টার মধ্যে সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে হবে। সমাবেশ শেষ না হওয়া বা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সমাবেশস্থল ত্যাগ করবেন না। তিনি বলেন, রাস্তায় যখন মিছিল করবেন পুরো রাস্তা দখল করবেন না। এক সাইড ফাঁকা রাখবেন। রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে মহাবিজয়ের মহাদাপট দেখাচ্ছে এমন যেন না হয়। সহিষ্ণু হতে হবে, বড় বিজয়ের সঙ্গে বড় দায়িত্ব।
উপজেলা নির্বাচন জোটগতভাবে হবে না
এদিকে উপজেলা নির্বাচন জোটগতভাবে হবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, আমরা দলীয়ভাবে উপজেলা নির্বাচন করবো। নৌকার টিকিটে আমাদের প্রার্থীরা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবেন। কোনো শরিক দলের প্রার্থীকে নৌকা দেয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের যারা শরিক আছে তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে তারা যেন প্রত্যেকে যার যার মতো করে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা স্থানীয় নির্বাচন সব সময় দলীয়ভাবে করি। জোটগতভাবে করি না। এর আগে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয়নি। তবে এবার শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাচন আমরা দলীয় প্রতীকে করবো। যারা মনোনয়ন চাইবেন তাদের প্রথমে তৃণমূল পর্যায়ে রেকোমেন্ডেশন আনতে হবে। জেলা-উপজেলার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি তিনজনের নাম আমাদের কাছে দেবে। সেখান থেকে জরিপের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবেন। আগামী মার্চ থেকে ধাপে ধাপে উপজেলা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা শুরু হবে।

পাকিস্তানে পিটিএম: আরেকটি ‘বাংলাদেশ’ গড়ে উঠছে? by তাহা সিদ্দিকী

এক বছর আগে এই দিনে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর করাচিতে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন নকিবুল্লাহ মেহসুদ নামে এক যুবক। প্রথমদিকে পুলিশ দাবি করেছিল যে, মেহসুদ পাকিস্তানি তালেবানের একজন কট্টর সদস্য। সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় ঘেরাও দিয়ে অভিযান চালানোর সময় তিনি নিহত হয়েছেন।
কিন্তু তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও কিছু মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, মেহসুদ শুধুই একজন নিরাপদ দোকানি এবং উচ্চাকাঙ্খী মডেল।
সরকার এ নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিলো। তদন্ত শুরু করলো পুলিশি কমিটি। তাতে কোনো গোলাগুলি (শুট আউট) বা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে কমিটি নিশ্চিত হলো যে, পুলিশের ভুয়া এনকাউন্টারে নিহত হয়েছেন মেহসুদ। এমন এনকাউন্টারে জড়িত থাকার অভিযোগ পাকিস্তানি নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই শোনা যায়। তবে মেহসুদকে হত্যায় জড়িত থাকা অফিসারদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং সেই বিচার এখনও চলমান।
অতীতে এই হত্যাকান্ডের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অভিযোগ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে অস্বীকার করে গেছে। ফলে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের দায়মুক্তির অধীনে তাদের কাজ করতে অনুমতি দেয়া হয়েছে। মেহসুদের ঘটনায় সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। তাকে নিয়ে তার নিজের শহর মাকিনের ওয়াজিরিস্তানে খুব কম পরিচিত একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সেই আন্দোলনের নাম : ‘দ্য পস্তুন তাহাফ্ফুজ মুভমেন্ট’ (পিটিএম)। এর অর্থ হলো পস্তুন সুরক্ষা আন্দোলন।
পস্তুন জাতির নানারকম বঞ্চনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পিটিএম আন্দোলন চালু করেছেন মানবাধিকার বিষয়ক কর্মী মানজুর পাসতিন। এই পস্তুন জাতিটি পাকিস্তানে দ্বিতীয় বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী। তাদের বেশির ভাগই বসবাস করেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আফগানিস্তান সীমান্ত এলাকার কাছে।
প্রায় দুই দশক ধরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ ধকল বহন করছে এই পস্তুনরা। ২০০১ সালের ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। ওই সময় আফগানিস্তানের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সদস্যরা সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের ভিতরে প্রবেশ করে। পস্তুনদের বসবাস করা এলাকায় আশ্রয় নেয় তারা। এর ফলে পাকিস্তানি সেনারা ওই এলাকাকে সন্ত্রাসীমুক্ত করতে অভিযান চালানো শুরু করে। কিন্তু সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধ করার চেয়ে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের ওপর সামরিক অভিযান বাড়তে থাকে। পাকিস্তানজুড়ে পস্তুনদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা শুরু হয়, তারা নিজেরাও সন্ত্রাসের শিকার হওয়া সত্ত্বেও।
ন্যায়বিচারের দাবি
করাচিতে মেহসুদকে হত্যার পর ওয়াজিরিস্তান থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত লংমার্চের ডাক দিলেন মানজুর পসতিন। তার ডাকে শুধু একজন মানুষকে হত্যার বিচার দাবিতে নয়, একই সঙ্গে সব পাস্তুন, যারা পাকিস্তানে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, তাদের হাজার হাজার সদস্য ওই লং মার্চে যোগ দিলেন।
এই লং মার্চ দ্রুততার সঙ্গে সারাদেশে অধিকার আন্দোলনে রূপ নিলো। ফলে জন্ম হলো পিটিএম। সারা দেশে র‌্যালি করে পাসতিন ও তার সমর্থকরা প্রশ্ন তুললেন তাদের এলাকা থেকে সেনাবাহিনী কেন জঙ্গিদের সরাতে ব্যর্থ হচ্ছে? তারা আরো প্রশ্ন তুললেন, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কি আসলেই এমন গ্রুপগুলোকে উৎখাত করতে চায় কিনা তা নিয়ে।
এ সময় তারা বেশির ভাগ সময়ে একটি স্লোগান ব্যবহার করেছেন। তা হলো ‘এই সন্ত্রাসের পিছনে কি কোনো ইউনিফর্ম রয়েছে’। এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, সন্ত্রাসী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বোঝাপড়া আছে।
সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে পিটিএম। একই সঙ্গে জোরপূর্বক গুম বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপহরণকে এই টার্ম ব্যবহার করে বর্ণনা করা হয়। এ ছাড়াও পাসতিন ও তার সমর্থকরা পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা শুরু করলেন যেন, উপজাতি এলাকা শাসন করতে যেসব কুখ্যাত আইন রয়েছে তা সংস্কার করা হয়। কারণ, এসব আইন মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। এমন আইনের অধীনে একজন মাত্র ব্যক্তির অপরাধে পুরো পরিবার, গ্রাম এমনকি উপজাতিগোষ্ঠীকে শাস্তি দেয়া হয়।
এসব ক্রমবর্ধমান দাবির দিকে দৃষ্টি না দিয়ে পাকিস্তান সরকার দমনপীড়নকেই বেছে নেয়।
পিটিএম আন্দোলন নিয়ে রিপোর্ট করা বন্ধ করে দিয়েছে পাকিস্তানি মিডিয়া। এই আন্দোলনের বহু সদস্য ও নেতাকে বার বার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কোথাও র‌্যালি করতে চাইলে নেতাদের পাকিস্তানের সেই এলাকায় প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখা হয়। সম্প্রতি পিটিএমের কিছু সদস্যের পাকিস্তান ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
এক সরকারি ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনীর মিডিয়া বিষয়ক মুখপাত্র পিটিএমকে পাকিস্তান বিরোধী এজেন্ডা নিয়ে কাজ করার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। অভিযোগ করা হয়েছে, পিটিএম বিদেশি শত্রু রাষ্ট্রের সহায়তায় এসব করছে। সমালোচকদের নিন্দা জানাতে পাকিস্তানি সেনারা মাঝে মাঝেই এই ধরনের কৌশল নিয়ে থাকে।
কিন্তু এই কণ্ঠ স্তব্ধ করার ও আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় যে প্রচেষ্টা, ঘটেছে তার উল্টো। রাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এমন অভিযান বা দমনপীড়নের ফলে পিটিএম আন্দোলন আরো বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে এবং তাদের সভাসমাবেশে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মানুষের সমাগম হচ্ছে।
পিটিএম সব সময়ই বলে আসছে তাদের আন্দোলন অহিংস। কিন্তু এখন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যে, এই আন্দোলনকে দমন করতে এমন কঠোর ও অব্যাহত কৌশলের ফলে সংঘাতময় অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এমন ঘটনা অতীতেও পাকিস্তানে দেখা গেছে।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা
অতীতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অধিবাসীরা একই রকম অধিকার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ১৯৭১ সালে সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
১৯৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠী, যারা ওই সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় জাতিগোষ্ঠী ছিলেন, তাদেরকে জেনারেল আইয়ুব খান নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অবজ্ঞা করেছিল। তাদের বঞ্চনা ও তারা যে অবিচারের অভিযোগ তুলেছিল তার প্রতি কর্ণপাত করার পরিবর্তে ক্ষব্ধ সেই জনতার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিল সেনাবাহিনী। এর ফলে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করতে বাধ্য হয় বাঙালিরা। এর ফলে পাকিস্তান ভেঙে যায়।
প্রায় ৫০ বছর পরে দেখে মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের অভিজাত শাসক শ্রেণি অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নি। দৃশ্যত তারা আবারও সেই একই ভুল করছে, যা থেকে ১৯৭০ এর দশকে জাতির জন্য বেদনা, রক্তপাত এবং অপূরণীয় ক্ষতি এনে দিয়েছিল।
এখন পিটিএম তার আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ করেছে। তাই এখন পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দের সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেয়া উচিত পস্তুন জাতিগোষ্ঠীর বৈধ দাবিগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া। তাদের দাবি মেনে নেয়া, যা পাকিস্তানের সংবিধানের মধ্যেই আছে। একই সঙ্গে যারা তাদের মৌলিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করছে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে বিচার বন্ধ করা।
যদি তা না হয়, তাহলে এরই মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়া দেশের ভাঙনে একটি অনুঘটকের মতো হয় উঠতে পারে পিটিএম। আর তাতে পাকিস্তান আরেকটি জাতীয় বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
(তাহা সিদ্দিকী, পুরস্কার বিজয়ী পাকিস্তানি সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন। অনলাইন আল জাজিরা থেকে অনুবাদ)

হাসিনা এমন নির্বাচন না করলেও পারতেন -নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়

টানা প্রায় ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিস্ময়কর কাজ করেছেন। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্রতম ও সবচেয়ে কম উন্নত দেশের অন্যতম এ দেশটিতে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা প্রায় ১৫০ ভাগ। চরম দারিদ্র্যে বসবাসকারী মানুষের হার শতকরা ১৯ ভাগ থেকে কমে এসেছে প্রায় ৯ ভাগে। তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো- সরাসরি কর্তৃত্বপরায়ণতার দিকে ঝুঁকে যাওয়া ও এমন একটি নির্বাচন, যাতে শেখ হাসিনার দল জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতেই জয় পেয়েছে। শতকরা ৯৬ ভাগ জয় পাওয়া এক অসম্ভব ব্যাপার। এসব তার অর্জনকে খর্ব করেছে।
৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের কয়েক মাস ও সপ্তাহ আগে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো বিরোধী দলগুলোকে ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা থেকে শুরু করে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের গ্রেপ্তার, তাদের সমর্থকদের ওপর নজরদারি ও বহুল সমালোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিষ্ঠুর ব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে ‘আগ্রাসী অথবা ভীতিকর’ কোনো উপাদান পোস্ট করা হলে জেলের বিধান রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় সহিংসতায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৭ জন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার এক রিপোর্টে বর্ণনা করেছে বিচার ব্যবস্থা (ইনটিমিডেটেড জুডিশিয়ারি) অথবা নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ নেই এমন ‘একটি আতঙ্কের পরিবেশ নিয়ে। এমন আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজমান সমাজের উচ্চকিত কণ্ঠ থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত’। 
ডিসেম্বরে দ্য টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী দৃশ্যত সর্বত্র স্বৈরতন্ত্রের বিভ্রান্তি নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেছেন, একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ হলো একটি প্রান্তিক (পেরিফেরাল) বিষয়। তিনি বলেছেন, ‘যদি আমি খাদ্য, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারি সেটাই হলো মানবাধিকার। বিরোধীরা বা নাগরিক সমাজ অথবা আপনার এনজিওরা যা বলছেÑ তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি আমার দেশকে জানি এবং আমি জানি কিভাবে আমার দেশের উন্নতি করতে হয়’।
শেখ হাসিনার বয়স এখন ৭১ বছর। তিনি তার দেশকে জানেন- এটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে না। তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। তাকে ১৯৭৫ সালে যখন হত্যা করা হয় তখন হাসিনা ছিলেন দেশের বাইরে। ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফেরেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিতে। তারপর থেকে তিনি এর নেতৃত্বেই আছেন। তার দল এবং আরেকজন শক্তিধর নারী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রতিবাদ করে ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। এর ফলে শেখ হাসিনাকে একটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন ক্ষমতার মেয়াদ দেয়া হয়। গত বছর দুর্নীতির অভিযোগে জেল দেয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে। শেখ হাসিনা আরো এক দফায় ক্ষমতায় ফিরেছেন, যা এরই মধ্যে কার্যত একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে প্রস্তত তারা।
কিন্তু কেন? যখন জনমত জরিপ ইঙ্গিত দিয়েছিল, সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও শেখ হাসিনা ভালোভাবে বিজয়ী হবেন তাহলে কেন অপ্রয়োজনীয় নির্বাচনী ফল তৈরি করা হলো? এখন শেখ হাসিনার কতৃত্ববাদী পদ্ধতি (অথরিটারিয়ান মেথড) ও নিস্পেষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কলঙ্কিত করবে তার প্রতিটি অর্জনকে। তার সমালোচক, যারা নির্বাসনে গেছেন অথবা আন্ডারগ্রাউন্ডে গেছেন, তারা শুধু আরো বেশি কঠোর হয়ে উঠবেন। তার বিদেশি সমর্থক যারা আছেন তারাও আরো সতর্ক হবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সবচেয়ে বড় সিঙ্গেল-কান্ট্রি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনী প্রচারণার সময় হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং একই সঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানে সব পক্ষকে নিয়ে কাজ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রতি। যেসব সহিংসতা ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল, যা প্রচারণা ও ভোটকে কলঙ্কিত করেছে, সে বিষয়ে তদন্তের জন্য একই রকমভাবে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত গতিবিধি বলে দেয়, এমন মৃদু ভর্ৎসনায় তিনি পাল্টে যাবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশের নেতারা ব্যবসা করছেন এবং এ দেশে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের জন্য উল্লসিত, শেখ হাসিনাকেও তার মিত্রদের তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া উচিত, মানবাধিকার বহির্জাগতিক কোনো আরোপিত সংস্কৃতি নয়। এটা হলো উন্নয়ন ও অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।   
(যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র অনুবাদ)

চেচনিয়ায় সমকামীদের ওপর দমনপীড়নের অভিযোগ

চেচনিয়ায় সমকামীদের বিরুদ্ধে নতুন করে দমনপীড়ন শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে রাশিয়ার অধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন সমকামীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্যাতনে দু’জন মারা গেছেন। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে সরকার। তারা বলেছে, এ অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
২০১৭ সালে চেচনিয়ায় আটক করা হয় কয়েক ডজন সমকামীকে। এরপর থেকেই মুসলিম অধ্যুষিত ওই রাশিয়ার এই প্রদেশটিতে সমকামীদের বিষয়ে নজরদারি করে আসছে দ্য রাশিয়ান এলজিবিটি নেটওয়ার্ক।
তাদের ওই অভিযোগের জবাবে চেচনিয়া ও এর নেতা রমজান কাদিরভ অব্যাহতভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বলছেন, অবৈধভাবে কাউকে আটক করা হয় নি। লঙ্ঘন করা হয় নি মানবাধিকার। গত বছর তিনি বিবিসিকে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, এমন অভিযোগ করা হচ্ছে বিদেশী এজেন্টদের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে তারা পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে চায় অথবা অর্থ চায় এমন অধিকারকর্মীরা এমন অভিযোগ সৃষ্টি করছে। তিনি ও তার সরকারের অন্য নেতারা বার বার বলে আসছেন চেচনিয়ায় মোটেও কোনো সমকামী নেই।
তবে সরকারি এমন প্রত্যাখ্যানের মধ্যেও কয়েক ডজন মানুষ সামনে এগিয়ে এসেছেন এবং অভিযোগ করেছেন তাদেরকে তাদের যৌন জীবন যাপন পদ্ধতির কারণে আটক করে নির্যাতন করেছে কর্তৃপক্ষ। এমন অভিযোগের পর বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে নিন্দা জানানো হয়েছে।
দ্য রাশিয়ান এলজিবিটি নেটওয়ার্ক সোমবার একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে সমকামীদের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সমকামীদের সামাজিক যোগাযোগ বিষয়ক একটি নেটওয়ার্কের একজন প্রশাসককে গ্রেপ্তারের পর এমন ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা মনে করছে, গ্রোজনি শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে আরগুন নামে একটি বন্দিশিবিরে সম্প্রতি আটক করা কয়েক ডজন সমকামীকে রাখা হয়েছে।
মস্কো টাইমসকে দ্য রাশিয়ান এলজিবিটি নেটওয়ার্কের প্রধান ইগর কোচেতকোভ বলেছেন, এখন  আটক সমকামীদের ভ্রমণের সব ডকুমেন্টও কেড়ে নিচ্ছে পুলিশ। এটা করা হচ্ছে যাতে তারা দেশের বাইরে যেতে না পারে। এমন নির্যাতন শুরু হওয়ার পর ওই এলাকা ছাড়তে তার সংগঠন ১৫০ জনকে সহযোগিতা করেছে।
এই সংগঠনটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, সম্প্রতি নির্যাতনে আটক দু’জন ব্যক্তির যে মৃত্যু হয়েছে তার প্রমাণ রয়েছে তাদের কাছে। আছে এর প্রত্যক্ষদর্শীও।

প্রথম যৌনমিলন কোন বয়সে হওয়া উচিত?

বৃটিশদের যৌনতা বিষয়ক সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে যে, তরুণদের প্রধান আফসোসের বিষয় যথাযথ বয়সের অনেক আগেই প্রথম যৌনমিলন সম্পন্ন করা।
জরিপে অংশ নেওয়া কিশোর ও তরুণদের এক তৃতীয়াংশের বেশি নারী এবং এক চতুর্থাংশের বেশি পুরুষ মনে করেন যে তারা প্রথম যখন যৌন সঙ্গম করেন সেটি 'সঠিক সময়' ছিল না।
আইন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে যৌনমিলনের সম্মতি প্রদানের জন্য কোনো ব্যক্তিকে অন্তত ১৬ বছর বয়সী হতে হয়।
যুক্তরাজ্যের মানুষের যৌন আচরণ এবং জীবনধারা নিয়ে সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে যে ঐ বয়সে অনেকেই যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত থাকে না।
'ন্যাটস্যাল সার্ভে' নামে পরিচিত এই জরিপটি প্রতি দশকেই পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের গবেষকরা ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জরিপে অংশ নেওয়া ৩ হাজার তরুণ-তরুণীর দেয়া তথ্য ব্যবহার করেছেন এই জরিপে।
জরিপের ফলাফল
অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া উত্তর থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০% নারী এবং ২৬% পুরুষ মনে করেন যে তাদের প্রথম যৌনমিলন 'সঠিক সময়ে হয় নি'।
এদের অধিকাংশই মনে করেন যে, কৌমার্য বা কুমারীত্ব পরিত্যাগ করার আগে তাদের আরো অপেক্ষা করা উচিত ছিল।
তবে স্বল্পসংখ্যক উত্তরদাতা প্রথম যৌন সঙ্গম আরো আগে সংঘটনের পক্ষ নেন।
অধিকাংশই ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই প্রথমবার যৌনমিলনের স্বাদ নিয়েছেন - যাদের প্রায় অর্ধেক নিজেদের ষোড়শ বর্ষের শেষদিকে যৌন সঙ্গম করেছেন।
এক তৃতীয়াংশের প্রথমবার ছিল তাদের বয়স ১৬ বছর হওয়ার আগেই।
ইচ্ছা ও প্রস্তুতি
জরিপে যৌনমিলনের প্রস্তুতির বিষয়টিরও ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি সজ্ঞানে এবং স্বেচ্ছায় প্রথমবার যৌন সঙ্গম করার যৌক্তিক সিদ্ধান্তে সম্মত হতে সক্ষম কিনা - তা যাচাই করার চেষ্টা করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরুপ, সম্মতি দেয়ার সময় কোনো ধরণের মাদকের প্রভাবে না থাকা বা সঙ্গী, বন্ধুবান্ধবদের চাপে পড়ে সম্মতি না দেয়ার মতো বিষয়ের দিকে নজর দেয়া হয়েছে।
জরিপে অংশ নেয়া নারীদের প্রায় অর্ধেক এবং পুরুষদের প্রায় ৪০% এই ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়।
নারীদের প্রতি পাঁচজনে একজন এবং পুরুষদের পুরুষদের প্রতি ১০ জনে ৪ জনই মনে করেন প্রথম মিলনের সময় তাদের সঙ্গী সমান আগ্রহী ছিল না। অর্থাৎ তারা মনে করেন তাদের সঙ্গীরা অনেকটা চাপে পড়েই প্রথম মিলনে সম্মতি দিয়েছিলেন।
'ন্যাটস্যাল সার্ভে'র প্রতিষ্ঠাতা কায়ে উইলিংস মনে করেন কোনো ব্যক্তি যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত কিনা তা বয়সের মানদণ্ডে যাচাই করা উচিত নয়।
"প্রত্যেক তরুণই আলাদা - কেউ ১৫ বছর বয়সেও যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত হয়, আবার অনেক ১৮ বছর বয়সীও প্রস্তুত না থাকতে পারেন", বলেন মি. উইলিংস।
সহ-গবেষক মেলিসা পামার বলেন, "আমাদের পাওয়া তর্থ বিশ্লেষণ যাচাই করে ধারণা করা যায় যে, প্রথম যৌনমিলনের সম্মতি দেয়ার ক্ষেত্রে উঠতি বয়সী তরুণদের চেয়ে তরুণীরা অপেক্ষাকৃত বেশি চাপের মধ্যে থাকে।"
তিনি বলেন তরুণ-তরুণীরা যেন প্রথম যৌনমিলনের ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক ও নিরাপদ যৌন সঙ্গমের নিশ্চয়তা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে স্কুলগুলোর যৌনতা বিষয়ক পাঠ্যসূচি সাজানো প্রয়োজন।
কখন সঠিক সময়?
আপনি যদি মনে করেন যে আপনার যৌন সঙ্গমের সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে আগে নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করুন।
  1.     আমি কি সঠিক কাজ করতে যাচ্ছি?
  2.     আমি কি আমার সঙ্গীকে ভালোবাসি?
  3.     আমার সঙ্গীও আমাকে সমান পরিমাণ ভালোবাসে?
  4.     যৌন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আমি কি সঙ্গীর সাথে সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা করেছি? আলোচনা কি যথাযথ ছিল?
  5.     যৌন মিলনের ক্ষেত্রে হঠাত মত পরিবর্তন হলে যে কোনো সময় কি আমি 'না' বলতে পারবো? সেই সিদ্ধান্তে আমি ও আমার সঙ্গী দুজনেই কি সন্তুষ্ট থাকবো?
  6. এই সব প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে হয়তো আপনি যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু নিচের কোনো প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি প্রস্তুত নাও হতে পারেন:
  7.     আমি কি আমার সঙ্গী বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে কোনো ধরণের চাপ অনুভব করছি?
  8.     যৌনমিলনের পরে কী আমার মধ্যে কোনো ধরণের আক্ষেপ জন্ম নিতে পারে?
  9.     আমি কি আমার বন্ধুদের সাথে তাল মিলাতে যৌন সঙ্গম করার কথা চিন্তা করছি?
  10.     আমি কি আমার সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যৌনমিলনে আগ্রহী হচ্ছি?
সূত্রঃ বিবিসি।