Tuesday, June 10, 2025

জাফলংয়ে পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয়দের হাতাহাতি, উৎমাছড়া পর্যটনকেন্দ্রে যেতে বাধা

সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে পর্যটকদের হাতাহাতি হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে জাফলং বিজিবি ক্যাম্প–সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

তবে ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। এ সম্পর্কে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী প্রথম আলোকে বলেন, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছিল। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান হয়ে গেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের ভুল ধারণা হয়েছে।

রতন কুমার অধিকারী আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে পর্যটকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো পক্ষই অভিযোগ করেনি। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

জাফলংয়ে পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের হাতাহাতির ঘটনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জাফলং বিজিবি ক্যাম্প–সংলগ্ন একটি স্থানে পর্যটকদের পরিবহনে ব্যবহৃত একটি বাসের পাশে জটলা। সেখানে কথাবার্তা হচ্ছিল। তবে কী নিয়ে কথা বলছিলেন, সেটি শোনা যায়নি। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে চিৎকার ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল বিকেলে জাফলং বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে স্থানীয় কয়েক যুবকের কথা–কাটাকাটি হয়। এ সময় তাঁদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এ সময় পর্যটকদের ধাওয়া দেন কয়েক যুবক। পরে স্থানীয় মুরব্বিরা বিষয়টি মীমাংসা করে দেন।

এদিকে গত রোববার কোম্পানীগঞ্জের উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে উৎমাছড়া পর্যটনকেন্দ্রে যেতে পর্যটকদের বাধা দেওয়ার এক ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়েছে।
ভিডিওতে স্থানীয় পরিচয়ে কয়েকজন যাঁরা বেড়াতে এসেছেন, তাঁদের চলে যেতে অনুরোধ জানান। পর্যটকদের এলাকার পরিবেশ নষ্ট না করা ও অশ্লীলতা না করার কথা বলা হয়। বেড়াতে আসা অনেকেই ওই এলাকায় মদ্যপান ও অশ্লীল কার্যকলাপ করে এলাকার পরিবেশ নষ্ট করছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পর্যটকদের উৎমাছড়ায় বেড়াতে যেতে যাঁরা নিষেধ করেছিলে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জমিয়তের সহসভাপতি মুফতি রুহুল আমিন সিরাজী। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পর্যটনের কথা বলে নামে কিছু মানুষ ওই এলাকায় গিয়ে মদ্যপান ও অশ্লীল কার্যক্রম করছেন। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় আলেম-ওলামা ও মুরব্বি–যুবকদের নিয়ে ঈদের আগে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পর্যটনকেন্দ্রটি নিয়ে যাতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর অংশ হিসেবে গত রোববার বিকেলে বেড়াতে আসা লোকজনকে বুঝিয়ে বলা হয়েছে।’

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পাথর কোয়ারি
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পাথর কোয়ারি। প্রথম আলোর ফাইল ছবি

ঢাকার ৪ থানায় বিভিন্ন নামে সক্রিয় অর্ধশতাধিক অপরাধী দল by মেহেদী হাসান

রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের চারটি থানা—আদাবর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় বিভিন্ন অপরাধী দল গড়ে উঠেছে। জনবহুল এই অঞ্চলে মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে তারা নানা অপকর্মে জড়াচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি হাজারীবাগে আলাদা দুটি খুনের ঘটনার পর এ অঞ্চলের অপরাধী দলগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে আদাবর, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগে এমন অন্তত অর্ধশত অপরাধী দল সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ৫ আগস্টের পর ১০ মাসে এসব অপরাধী দলের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত ১১ জন।

পুলিশ ও র‍্যাবের দেওয়া তথ্য বলছে, ৫ আগস্টের পর এই চারটি থানা এলাকা থেকে মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও হত্যায় জড়িত অন্তত দেড় হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মধ্যে র‍্যাবের হাতেই গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৫৬ জন। এদের অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময় অপরাধী দলের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হলেও দ্রুততম সময়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন করে অপরাধে জড়াচ্ছে। এসব অপরাধী দলের কোনোটিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় দিচ্ছে, আবার কোনো অপরাধী দলকে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন। ফলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারা খুনোখুনিতেও জড়াচ্ছে।

গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারের সাদেক খান কাঁচাবাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি অপরাধী দল ‘অ্যালেক্স ইমন’ ও ‘ডাইল্লা’ গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের সময় ডাইল্লা গ্রুপের সদস্য নাছির বিশ্বাস ও মুন্না নামের দুই তরুণ নিহত হন। দুটি অপরাধী দলের সদস্যরাই চুরি-ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত। অ্যালেক্স ইমন গ্রুপকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল প্রশ্রয় দেন। জোড়া খুনের মামলাতেও পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়েছে।

যদিও নাছির বিশ্বাসের বড় ভাই সুমন বিশ্বাস প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর ভাই নাছির পেশায় রাজমিস্ত্রি, কোনো অপরাধী দলের সদস্য ছিলেন না। দুটি অপরাধী দলের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নাছির নিহত হন। তবে স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ বলছে, নাছিরের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে থানায় মামলা রয়েছে।

এদিকে গত মার্চ ও এপ্রিলে এক মাসের ব্যবধানে মোহাম্মদপুরের শের শাহ সুরী সড়কে আবাসন ব্যবসায়ী মনির আহমেদের বাসায় ঢুকে গুলির ঘটনায় দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। মনির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চন্দ্রিমা রিয়েল এস্টেটের পরিচালক। এক সন্ত্রাসী তাঁর কাছে চাঁদা চেয়েছিল। এর জেরেই গুলির ঘটনা ঘটেছে। এখন তিনি বাসা থেকে বের হতে ভয় পান।

এ ঘটনা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা  বলেন, ঘটনাটি মূলত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর দ্বন্দ্বের জেরে ঘটেছে। ওই ব্যবসায়ীও একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের অপরাধপ্রবণ চারটি থানার মধ্যে আদাবর ও মোহাম্মদপুর থানা দুটি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মধ্যে পড়েছে। এই বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশি তৎপরতায় এ অঞ্চলে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য অনেক কমে এসেছে। ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে।

তারা ভাসমান অপরাধী, স্থায়ী ঠিকানা নেই

হাজারীবাগের জাফরাবাদে গত ১৫ মে গভীর রাতে একটি পরিবারের সাতজনকে কুপিয়েছে ‘পাটালি গ্রুপ’ নামে একটি অপরাধী গ্রুপের সদস্যরা।

সম্প্রতি জাফরাবাদের ইত্যাদির মোড়ে গিয়ে কথা হয় ভুক্তভোগী পরিবারটির সঙ্গে। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায়, চেয়ারে বসে আছেন গৃহকর্তা আবুল কাশেম। বাঁ হাতের পুরোটাই ব্যান্ডেজ মোড়ানো। সেদিনের ঘটনা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার দিন গভীর রাতে তিনজন বাসায় উঁকি দিচ্ছিলেন। কেন বাসায় উঁকি দিচ্ছিলেন, জিজ্ঞেস করতেই পরিবারের সাতজনকে কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায় তারা।

এ ঘটনার পর পুলিশ অভিযানে নেমে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের ২০ জনের বেশি পাটালি গ্রুপের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযানে পাটালি গ্রুপের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি শাহিনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পাটালি গ্রুপের প্রধান আলমগীর ওরফে ফর্মা আলমগীর এখনো পলাতক।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, পাটালি গ্রুপে কতজন সদস্য আছে, এর সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে সংখ্যাটা ৭০ জনের কম নয়। এই দলের সদস্যরা ভাসমান, স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তারা ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করে। এক এলাকায় অপরাধের পর অন্য এলাকায় চলে যায়।

ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলের চারটি থানা এলাকার সীমান্ত ঘেঁষে গাবতলী–সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়ক চলে গেছে। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। এ অঞ্চলে নিম্নআয়ের অনেক মানুষ বসবাস করেন। বেড়িবাঁধ–সংলগ্ন চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান, চাঁন মিয়া হাউজিং, বছিলা, জাফরাবাদ, রায়েরবাজার, গণকটুলী এলাকায় অপরাধী গ্রুপগুলো বেশি সক্রিয়। এই অপরাধী দলগুলো ‘অদ্ভুত’ ধরনের নামে পরিচিত। যেমন ‘টিন এজ টর্নেডো’, ‘পাটালি গ্রুপ’, ‘লও ঠেলা গ্রুপ’, ‘কবজি কাটা গ্রুপ’, ‘ডার্ক স্ট্রাইকার্স’, ‘রেড ভলক্যানো’, ‘ডাইল্লা গ্রুপ’, ‘অ্যালেক্স ইমন গ্রুপ’, ‘লেভেল হাই গ্রুপ’, ‘চাঁন গ্রুপ’, ‘মাউরা গ্রুপ’, ‘ভাইবা ল’, ‘লাল গ্রুপ’, ‘ঠোঁটে ল গ্রুপ’, ‘লাড়া-দে’, ‘মেমোরি গ্রুপ’ ইত্যাদি। অপরাধী দলগুলো নিজেরাই এসব নাম ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়।

পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সহকারী কমিশনার এ কে এম মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর অঞ্চলে অনেক ভাসমান অপরাধী বসবাস করে। বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা নানা ধরনের অপরাধে যুক্ত হয়।

খুনোখুনি থেমে নেই


হাজারীবাগের জাফরাবাদে গত ১৫ মে সন্ধ্যায় একটি কিশোর দলের হাতে খুন হন আলোকচিত্রী নুরুল ইসলাম। বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি তোলার কথা বলে তাঁকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে খুন করে ১০-১২ জনের একটা কিশোর দল। তারা নুরুল ইসলামের কাছ থেকে উন্নত মানের দুটি ক্যামেরাও ছিনিয়ে নেয়।

নুরুল ইসলামের বড় ভাই ওসমান গনি বলেন, নুরুল ইসলামের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। শুধু ক্যামেরা ছিনিয়ে নিতেই ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়।

নুরুল খুনের আধা ঘণ্টা আগে হাজারীবাগের জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধী দলের হাতে খুন হন স্নাতকপড়ুয়া সামিউর রহমান।

পুলিশের ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার শাহ মোস্তফা তারিকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অপরাধী দল এ অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। এখন ভাসমান কিছু অপরাধী হাজারীবাগ ও ধানমন্ডির ‘বর্ডার’ এলাকায় কখনো কখনো সক্রিয় হয়।

আদাবর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার সুযোগে অপরাধী দলগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গত ১০ মাসে এ অঞ্চলে বিভিন্ন অপরাধী দলের হাতে ১১ জন খুন হয়েছেন। শুধু মোহাম্মদপুরেই খুন হয়েছেন সাতজন।

মোহাম্মদপুর অঞ্চলে ‘ভয়ংকর’ অপরাধী দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় আসে ‘কবজি কাটা’ গ্রুপ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই দলের সদস্যরা কবজি কেটে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিত। এই দলের ভাড়াটে খুনিও রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাতে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বিল্লাল গাজীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে তারা এই খুন করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে কবজি কাটা গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেন র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন।

গত ২৭ মে মোহাম্মদপুরে সেনাবাহিনীর অভিযানে ফরিদ আহমেদ বাবু ওরফে এক্সেল বাবু নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানিয়েছে, এক্সেল বাবুর বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখলের অভিযোগে ১৫টির বেশি মামলা রয়েছে। ‘টিন এজ টর্নেডো, ‘কবজি কাটা গ্রুপ’সহ অন্তত চারটি অপরাধী দলের নেতৃত্ব দেন এক্সেল বাবু। কবজি কাটা গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেন ওরফে কবজি কাটা আনোয়ারের গডফাদার হিসেবেও পরিচিত তিনি।

এদিকে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে চারজন খুন হয়েছেন। মুজাহির ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অসি আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে অবাধে মাদক ব্যবসা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাস করেন ব্যাংকার এ এস এম নিয়াজ মোর্শেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকা অনেক দিন ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়। এ অঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র
মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধে সক্রিয় অপরাধী চক্র। প্রতীকী ছবি

ম্যাডলিনের কিছু আটক আরোহী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েল ত্যাগ করতে পারেন

ত্রাণবাহী জাহাজ ম্যাডলিনের কিছু আটক আরোহী আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েল ত্যাগ করতে পারেন। এক্সে দেওয়া ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে জানানো হয়, জাহাজটি থেকে আটক ১২ জন অধিকারকর্মীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েল ত্যাগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যাঁরা ইসরায়েল ত্যাগের নথিপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানাবেন, তাঁদের ইসরায়েলি আইনের অধীন ইসরায়েলের বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হবে। তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে আদালতের অনুমোদন নেওয়া হবে।

জাহাজটির আরোহীদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে এসে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) পরিচালিত জাহাজটি ফিলিস্তিনের গাজার ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ নিয়ে ইতালি থেকে রওনা করেছিল। জাহাজটিতে সুইডেনের পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ ১২ জন অধিকারকর্মী ছিলেন।

স্থানীয় সময় গত রোববার মধ্যরাতে গাজা থেকে প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজটি আটকে দেয় ইসরায়েলের নৌবাহিনী। পরে অধিকারকর্মীসহ জাহাজটি ইসরায়েলের বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।

জাহাজটিতে সুইডেনের পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ ১২ জন অধিকারকর্মী ছিলেন
জাহাজটিতে সুইডেনের পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ ১২ জন অধিকারকর্মী ছিলেন। ছবি: রয়টার্স

পানিতে দ্রবীভূত হয় এমন প্লাস্টিক উদ্ভাবন by জাহিদ হোসাইন খান

জাপানি বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের প্লাস্টিক উপাদান তৈরি করেছেন, যা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন উপাদানে তৈরি প্লাস্টিকের কোনো অবশিষ্টাংশ জমা হয় না। কয়েক দশক ধরে প্লাস্টিক বিশ্বব্যাপী সমুদ্রদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। আমাদের খাবারে বেশ বড় মাত্রায় এখন মাইক্রোপ্লাস্টিক দেখা যায়। মাইক্রোপ্লাস্টিক উপাদান মানব প্লাসেন্টাতেও দেখা যায়। জাপানের বিজ্ঞানীদের তৈরি একটি নতুন প্লাস্টিক উপাদান আমাদের সমুদ্রদূষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

জাপানের রিকেন সেন্টার ফর ইমার্জেন্ট ম্যাটার সায়েন্স ও টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই উপাদান তৈরি করেছেন। নতুন প্লাস্টিক উপাদান পেট্রোলিয়ামভিত্তিক প্লাস্টিকের মতো। সাধারণ প্লাস্টিক পচতে বা ভাঙতে ২০ থেকে ৫০০ বছর সময় নেয়। অন্যদিকে নতুন প্লাস্টিকের পদার্থ লবণের সংস্পর্শে এলে মূল উপাদান ভেঙে যায়। নতুন উপাদান তখন পানিতে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়। নতুন পদার্থের মাধ্যমে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ন্যানোপ্লাস্টিক কণা তৈরি হয় না। গবেষকেরা টোকিওর কাছে ওয়াকো শহরের একটি ল্যাবে নতুন ক্ষয়যোগ্য প্লাস্টিক উপাদানটি প্রদর্শন করেছেন। প্রদর্শনের সময় বিজ্ঞানীরা লবণাক্ত পানিতে নতুন পদার্থ যেভাবে দ্রবীভূত হয় তার ওপর আলোকপাত করেন। নতুন উপাদানটি সম্পূর্ণরূপে ভাঙতে প্রায় ২০০ ঘণ্টা সময় নেয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নতুন প্লাস্টিক উপাদান মানুষের জন্য বিষাক্ত নয়। আগুন প্রতিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন ও কার্বন ডাই–অক্সাইড নির্গত করে না।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি অনুসারে, ২০৪০ সাল নাগাদ প্লাস্টিক দূষণ তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তখন প্রতিবছর কেবল সমুদ্রে ২৩ থেকে ৩৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন বর্জ্য যোগ হতে পারে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত হয় এমন প্লাস্টিক দেখাচ্ছেন এক গবেষক
সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত হয় এমন প্লাস্টিক দেখাচ্ছেন এক গবেষক। ছবি: রয়টার্স

আফ্রিকার নতুন ‘চে গুয়েভারা’ ইব্রাহিম যেভাবে আলোড়ন তুললেন by জাভেদ হুসেন

আধুনিক আফ্রিকায় নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ সেনানায়ক ইব্রাহিম ত্রাউরে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন তিনি।

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে নাড়া দিয়েছেন ভিমরুলের চাকে। গোটা সাহেল অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তাও দিয়েছেন।

মালি ও নাইজারের সাম্প্রতিক সামরিক নেতাদের সঙ্গে একযোগে ফ্রান্সবিরোধী একটি জোট গড়ে তুলেছেন। এই ঘটনা আফ্রিকার নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে।

কিন্তু এই ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে? কারা এর পৃষ্ঠপোষক? এই সামরিক বাহিনী থেকে আসা নেতাদের নিয়ে আফ্রিকার জনমনে প্রতিক্রিয়া কেমন?

ইব্রাহিম ত্রাউরে আর নতুন যুগের বাসনা

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বুরকিনা ফাসোর তৎকালীন সামরিক শাসক পল-হেনরি সান্দাওগো দামিবাকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাউরে।

সেনাবাহিনীর এই বিদ্রোহের পেছনে প্রধান কারণ ছিল জিহাদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দামিবার ব্যর্থতা। এই শাসক ছিলেন ফ্রান্সপন্থী। সেটাও তরুণ বুরকিনা নাগরিকদের মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল।

ত্রাউরে শুরু থেকেই নিজেকে টমাস সাংকারার উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাংকারা ছিলেন এক বিপ্লবী নেতা। তাঁকে আফ্রিকার চে গুয়েভারা বলে ডাকা হয়। তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বুরকিনা ফাসো শাসন করেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন আফ্রিকান সমাজতন্ত্র ও স্বনির্ভরতার প্রতীক।

ত্রাউরের নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার দিয়েছে ‘জিহাদি’দের বিরুদ্ধে ‘জনগণকে সম্পৃক্ত করে’ লড়াই করার। সরকার একদিকে গণমিলিশিয়া সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের সশস্ত্র প্রতিরোধে যুক্ত করছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ত্রাউরে ফ্রান্সকে তাঁর দেশ থেকে তাদের বাহিনী সরিয়ে নিতে বলেন। বাতিল করেন ফ্রান্সের সঙ্গে করা আগের পুতুল শাসকদের সাক্ষর করা সশস্ত্র চুক্তি। এই সিদ্ধান্ত ছিল যুগান্তকারী।

টমাস সাংকারার উত্তরাধিকার

ত্রাউরের নেতৃত্বের ভাবধারায় স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হচ্ছে সাংকারার রাজনৈতিক চেতনা-জাতীয় মর্যাদা, স্বনির্ভরতা, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। সাংকারা তাঁর সময়েই বহুজাতিক করপোরেশন ও পশ্চিমা সাহায্যের বিকল্প খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন।

নারী স্বাধীনতা, গণস্বাস্থ্য, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কৃষিভিত্তিক স্বনির্ভরতা ছিল তার নীতির মূল কথা। যদিও ১৯৮৭ সালে এক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। সেই অভ্যুত্থানের সঙ্গে দেশের ফ্রান্সপন্থী শক্তির যোগসূত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। কিন্তু সাংকারার ভাবমূর্তি আজও বুরকিনা ফাসো ও গোটা আফ্রিকায় জীবন্ত।

আফ্রিকার বাস্তবতা আজ আরও জটিল। এখন আফ্রিকায় সন্ত্রাসবাদ, চরম দারিদ্র্য, দুর্বল রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্ব একই সঙ্গে উপস্থিত। কিন্তু এই জটিল সময়ে ত্রাউরে সাংকারার সেই ভাবনাকে নতুন যুগে রূপান্তরিত করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

সাহেল অঞ্চলে নতুন সামরিক জোট: ফ্রান্সের পতনের সূচনা


২০২৩–২৪ সালের মধ্যে সাহেল অঞ্চলে তিনটি দেশের ক্ষমতায় সামরিক বাহিনী এসেছে—মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার। তিন দেশের এই সামরিক নেতৃত্ব এখন একত্র হয়ে ‘সাহেল রাষ্ট্রজোট’ (আলিয়ঁস দে জেতা দ্যু সাহেল) নামের একটি জোট গঠন করেছে।

এই জোটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ফ্রান্স ও পশ্চিমাদের সামরিক প্রভাব দূর করা এবং একটি বিকল্প ভূরাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।

নাইজারে ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম খনি রয়েছে। এই খনি বহু বছর ধরে ফরাসি পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এই খনিজ সম্পদ ব্যবহারের জন্য ফ্রান্স নিজের দেশকে জ্বালানি জোগান দিচ্ছে।

কিন্তু খোদ নাইজারের নাগরিকেরা এখনো সামান্য বিদ্যুতের অভাবে ঘরে কেরোসিনের বাতি জ্বালায়। এসব কিছু সাহেল অঞ্চলে জনরোষের বড় কারণ।

নাইজারে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বাজুমকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আবদুর রহমান তিয়ানী। এরপর ফ্রান্সবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হয়।

এই জোট কেবল নিরাপত্তা নয়, একটি আদর্শিক অবস্থানও গ্রহণ করছে। আর তা হলো পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আফ্রিকার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার।

এই আন্দোলন শুধু সামরিক নয়। এর একটি গণ ভিত্তিও তৈরি হয়েছে। সেখানকার জনগণ মনে করছে, পশ্চিমা শক্তির উপস্থিতি তাদের দেশে সন্ত্রাস দমন করেনি, বরং তা আরও গভীর সংকট সৃষ্টি করেছে।

নৈতিক পরাজয়ের মুখে ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্ব

এই অঞ্চলে ফ্রান্স ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ‘সহায়তা’ প্রদান।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এই সহায়তার মধ্য দিয়ে আফ্রিকান দেশগুলোর ওপর এক প্রকার আধিপত্য কায়েম রাখা হয়েছে।

ফরাসি বাহিনীর উপস্থিতি সন্ত্রাস দমন করতে পারেনি। বরং স্থানীয় জনমনে সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে।

এখন ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পরিবর্তনের জবাবে নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। মানবিক সহায়তা বন্ধ করছে এবং সামরিক হুমকিও দিচ্ছে। কিন্তু এতে কার্যত আফ্রিকার এই নতুন নেতৃত্ব আরও জেদি হয়ে উঠছেন।

জনসাধারণের সমর্থনও বাড়ছে। আফ্রিকান জনমনে এখন প্রশ্ন উঠছে যে ফ্রান্স আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার নামে খনিজ সম্পদ লুটে নিয়েছে, তাকে আর কত দিন সহ্য করব?

রাশিয়া ও চীন: নতুন মিত্র না নতুন আধিপত্য

পশ্চিমা জগৎ আফ্রিকার এই সামরিক নেতৃত্বকে একঘরে করতে চাইছে। আর রাশিয়া ও চীন সেই শূন্যস্থান পূরণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

মালিতে রাশিয়ার ভাগনার বাহিনী প্রবল হয়েছে। বিভিন্ন দেশে ভাগনারের ভূমিকা বিতর্কিত। কিন্তু মালির সামরিক সরকার মনে করছে, রাশিয়ার সহায়তায় তারা অন্তত সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাস্তব ফল পাচ্ছে।

বুরকিনা ফাসোতেও রাশিয়ার পতাকা নিয়ে মিছিল হয়েছে। ত্রাউরে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করছেন। চীন তুলনামূলকভাবে ধীরে কিন্তু বিস্তৃত পরিসরে কাজ করছে। তারা কাজ করছে বৃহৎ পরিকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক চুক্তি ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য সহায়তার মাধ্যমে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই নতুন মিত্ররা কতটা স্বাধীনতা দেবে আফ্রিকাকে? নাকি এটি কেবল ঔপনিবেশিকতার নতুন রূপ?

আফ্রিকান জনমতে নতুন আশার উত্থান

সাহেল অঞ্চলে জনসাধারণের একটি বড় অংশ সামরিক সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও গণতন্ত্রবাদীরা এতে উদ্বিগ্ন। তবে সাধারণ মানুষ এই পরিবর্তনে নিজেদের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সাংকারার মতো আদর্শবান নেতৃত্বের খোঁজে ছিল বহুদিন ধরে। সেই নেতা এখন তাঁরা ত্রাউরের মতো নেতাদের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন।

ত্রাউরের মতো নেতাদের আফ্রিকার রাজনৈতিক মঞ্চে আসা কেবল একটা দেশ চালানোর ব্যাপার নয়। এই বাস্তবতা একই সঙ্গে একটি ইতিহাসের পুনরায় আবিষ্কার।

অনেক পুরোনো এক লড়াইয়ের আবার জেগে ওঠা। আফ্রিকানরা নিজেদের মতো করে বাঁচতে চান, নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিজে গড়তে চান। সেই সঙ্গে চান নিজের সম্পদের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা।

ভবিষ্যৎ কে জানে

এই নতুন জোট ও নেতৃত্ব যতটা আশা জাগায়, ততটাই প্রশ্নও তোলে। কীভাবে এই সামরিক সরকারগুলো গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা করবে? পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া কীভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে? এখন কি ফ্রান্সের জায়গায় নতুন ঔপনিবেশিক শক্তি হয়ে আসবে রাশিয়া আর চীন?

এই নেতারা যদি সত্যিই সাংকারার উত্তরাধিকার বহন করতে চান, তবে তাঁদের স্বচ্ছতা, জনসাধারণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বাধীনতার পাশাপাশি সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথেই এগোতে হবে। নইলে এই বিপ্লবও শেষ পর্যন্ত মৌলিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে পুরোনো ক্ষমতায় নতুন শাসক আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইব্রাহিম ত্রাউরে ও সাহেল অঞ্চলের বর্তমান সামরিক আন্দোলন এক গভীর ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও আশার বহিঃপ্রকাশ। আজকের যুগেও যে উপনিবেশ প্রথা শেষ হয়নি, এই আন্দোলন সেই বিরোধী চেতনার নতুন রূপ।

আফ্রিকার মানুষ এখানে শুধু আর দরিদ্র নিঃস্বতার প্রতীক হয়ে থাকতে চাইছেন না। তাঁরা বাস্তব পরিবর্তনের অংশ হতে চাইছেন। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমাদের হাতে লেখা আফ্রিকার ইতিহাসের পাঠ নতুন করে লেখার চেষ্টা হচ্ছে। আর এবার তা আফ্রিকার মানুষ নিজ হাতেই লিখবে।

* জাভেদ হুসেন প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ সেনানায়ক ইব্রাহিম ত্রাউরে
নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন বুরকিনা ফাসোর তরুণ সেনানায়ক ইব্রাহিম ত্রাউরে। ছবি: রয়টার্স

‘মা’ বলে ডাকলে ছোট্ট রোশনি বলে উঠত, ‘মা, আমি তো এখানেই’ by আসাদুজ্জামান

আর দশটা দিনের মতোই স্কুলের ব্যাগ কাঁধে দিদার হাত ধরে বেরিয়েছিল রোশনি পাল। ছোট্ট মনে হয়তো তখন নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে খেলার আনন্দ জেগেছিল। কে জানত, যে রাজপথ দিয়ে রোশনি প্রতিদিন স্কুলে যেত, সেই পথই তার শেষ ঠিকানা হয়ে উঠবে!

রোশনির মা ও বাবার সঙ্গে গত ৫ জুন কথা হয় প্রথম আলোর। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মা চৈতি রানী পাল প্রথম আলোকে বলেন, ২৫ মে ছিল শনিবার। সেদিন তাঁর সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। মেয়েকে নিয়ে সারা দিন বাসায় ছিলেন। সেদিন রাতে মেয়েকে তিনি গল্প শুনিয়েছিলেন। মেয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

মা আরও বলেন, পরদিন (২৬ মে) মেয়ের স্কুল ছিল। মা সেদিন ঘুম থেকে মেয়েকে উঠিয়ে দেন। খাওয়াদাওয়ার পর দিদা (নানি) রেখা বিশ্বাস সকাল সাতটার দিকে রোশনিকে নিয়ে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের উদ্দেশে বের হন। এই স্কুলে রোশনি পড়ত প্রথম শ্রেণিতে।

মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সালেহ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে রশনি তার দিদার হাত ধরে কমলাপুরের দিকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ বিআরটিসির দ্বিতল একটি বাস রশনিকে ধাক্কা দেয়। তখন রশনি রাস্তায় ছিটকে পড়ে। পরে সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। চালক শাজাহানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখন কারাগারে।

ময়নাতদন্ত শেষে রশনিকে নিয়ে যাওয়া হয় নরসিংদীতে। পারিবারিক শ্মশানে তার সৎকার হয়।

মা চৈতি রানী পাল বললেন, ‘যখন আমি ঢাকা মেডিকেলে আমার মেয়ের মৃত মুখ দেখতে পাই, তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমার মা রশনি ঘুমিয়ে আছে। অনেকবার আমি রশনি মা, রশনি মা বলে চিৎকার করি।...আমার মা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে আছে।’

রশনির বাবা পলাশ পাল এক যুগের বেশি সময় ধরে কর্মসূত্রে ব্রাজিলে বসবাস করছেন। এক বছর আগে তিনি বাংলাদেশে আসেন। বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়েই ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমি কোনো দিন কল্পনাও করিনি আমাকে মেয়ের মৃত মুখ দেখতে হবে। আমি বড় দুর্ভাগা, আমি বেঁচে আছি, আমার রশনি পৃথিবীতে বেঁচে নেই।’

রশনিকে যাঁরা চিনতেন, তাঁদের চোখে এখনো ভাসছে তার হাসিমাখা মুখ। ক্লাসের চঞ্চল মেয়েটি আর কোনো দিন স্কুলে আসবে না। টিফিনের বিরতিতে বন্ধুদের সঙ্গে তার খুনসুটি আর শোনা যাবে না। রোশনির অকালমৃত্যুতে কেবল তার পরিবারই নয়, স্কুল, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সহপাঠীরাও বাক্‌রুদ্ধ।

রশনি তার মায়ের কাছে থেকেই লেখাপড়া করত। রশনি ছিল মায়ের সব কষ্টের উপশম, তার একমাত্র অবলম্বন। মায়ের চোখেমুখে এখন কেবলই শূন্যতা।

রোশনির সঙ্গে মায়ের এই ছবি এখন কেবল স্মৃতি
রোশনির সঙ্গে মায়ের এই ছবি এখন কেবল স্মৃতি। ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

রহস্যময় স্টোনহেঞ্জ দর্শন by রবিউল ইসলাম

স্টোনহেঞ্জ
ইংল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ স্টোনহেঞ্জ এককথায় অসাধারণ। তবে কিছু পাথরখণ্ড ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই! সালিসবুরির কাছে নিওলিথিক যুগের এই পাথর বৃত্তের সৃষ্টি আজও এক রহস্য। এজন্যই পর্যটকদের কাছে এটি বেশ আকর্ষণীয়।
‘তোমার ঐতিহাসিক ব্যাপারে আগ্রহ থাকলে যেতে পারো’– সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি পরামর্শ দিলেন এভাবেই। ব্রিস্টল থেকে টন্টনে ঢুকেই একদিনের ব্যবধানে রনি ভাই-সাকেব ভাই স্টোনহেঞ্জ দেখে ফেলেছেন। ফেসবুকে সেসব ছবি চোখে পড়ায় রনি ভাইকে ফোন দিলাম। তার মুখে গল্প শোনার পাশাপাশি গুগলে স্টোনহেঞ্জ সম্পর্কে অল্পবিস্তর পড়াশোনার সুবাদে জায়গাটির ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহ তৈরি হলো। কিন্তু টন্টনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের দশজনের দলটা স্টোনহেঞ্জে যাওয়ার সময় বের করতে পারেনি। টন্টন থেকে নটিংহাম যাওয়ার পথে অবশেষে সেই ইচ্ছেপূরণ হলো।
বাসে চড়ে টন্টন থেকে নটিংহাম ছয়-সাত ঘণ্টার পথ। এত্তো লাগেজ নিয়ে এমন লম্বা পথ বাসে কীভাবে পাড়ি দিবো ভেবে সবার কপালে ভাঁজ। এর মধ্যে সুমন ভাইয়ের মাথায় আইডিয়া এলো– ‘রবি, আমরা নিজেরাই তো একটা ১২ আসনের গাড়ি ভাড়া করতে পারি।’ যেই ভাবা সেই কাজ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নটিংহামে যাওয়ার পথে স্টোনহেঞ্জ দেখবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাওয়ার পথে ঠিক নয়, ওয়াল্টশায়ার কাউন্টিতে অবস্থিত স্টোনহেঞ্জ দেখে নটিংহামের পথ ধরতে অনেকটা পিছিয়ে আসতে হবে! তবুও যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমন সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে!

আমাদের সবুজ রঙা গাড়ি ছুটে চলছে। যেতে যেতে ফিরে গেলাম ২০০০ সালে। সেই সময় কম্পিউটারে স্ক্রিনে প্রথম এই রহস্যময় পাথরখণ্ডগুলো দেখি। এবার সামনে থেকে স্টোনহেঞ্জ দেখবো– এমন রোমাঞ্চ নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওয়াল্টশায়ার পৌঁছে গেলাম।
গাড়ি থেকে নেমে কম্পার্টমেন্টে ঢুকতেই চোখে পড়ে খাবারের দোকান, স্টেশনারি হাউস, স্যুভেনির হাউস। একইসঙ্গে বিশাল আকৃতির বাগান। সেখানে খড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট কিছু ঘর। একপাশে বিশাল পাথরখণ্ডের একটি নমুনা।
স্টোনহেঞ্জ দর্শনের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের খরচ করতে হয় ২১ পাউন্ড। ভ্রমণসঙ্গী ইয়াসিন রাব্বি দ্রুত টিকিট কেটে নিয়ে এলো। আমরা স্টোনহেঞ্জ দেখার উদ্দেশে পা বাড়ালাম। তবে এর আগে ছোট্ট একটি জাদুঘরে এ প্রসঙ্গে ধারণা পাওয়া গেলো। এতে স্টোনহেঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক তথ্য রয়েছে। কীভাবে ধীরে ধীরে এর পরিসর বেড়েছে, সেই সম্পর্কেও বলা আছে।
প্রায় চার হাজার বছর আগে তৈরি পাথরখণ্ডের এই স্তূপ নিয়ে হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় অনেক প্রশ্ন। কারা বানিয়েছে স্টোনহেঞ্জ? কেন বানিয়েছে? এটা কি কোনও কবরস্থান? এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিছু কিছু ব্যাখা ছোট্ট জাদুঘরটিতে আছে। সেখানে একটি ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে স্টোনহেঞ্জের অতীত ও বর্তমান কিছু তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকেরা স্টোনহেঞ্জ নির্মাণের তিনটি সময়কাল নির্ধারণ করেছেন। অনেকে প্রথম ধাপটি প্রাগৈতিহাসিক যুগের চেয়ে এক হাজার বছর আগের হিসাব করলেও এ নিয়ে দ্বিমত আছে। প্রথম ধাপে এর বাইরের দিকের ৩৬০ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার পরিখা খননের কাজ শুরু হয়, যার গভীরতা ছয় ফুট। পরিখার উত্তর-পূর্বে একটি বড় প্রবেশপথ ও দক্ষিণ দিকে একটি ছোট প্রবেশপথ আছে। এই পরিখা ও এর ঢালু কিনারাকে একত্রে ‘হেঞ্জ’ বলা হয়।

পুরো হেঞ্জজুড়ে রয়েছে ৫৬টি ছোট ছোট খাদ, এসবের প্রতিটির ব্যাস তিন ফুটের মতো। ১৭ শতকে জন অব্রে নামক এক ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক এই খাদ বা গর্ত আবিষ্কার করেন। তার নামেই এগুলোর নামকরণ হয় ‘অব্রে হোল’। ধারণা করা হয়, গর্তগুলোকে ‘ব্লুস্টোন’ অথবা কাঠের তক্তা দিয়ে ভরাট করা হয়েছিল। ব্লুস্টোন হচ্ছে স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে ছোট আকারের পাথর, যেগুলো ভেজা অবস্থায় কিছুটা নীলাভ দেখায়।
দ্বিতীয় ধাপে ঠিক কী কাজ হয়েছিল সেই প্রমাণ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, আগেরটি শেষ হওয়ার ১০০ থেকে ২০০ বছর পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কাজ। এ সময় থেকে স্টোনহেঞ্জকে সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে। তখন কেন্দ্রে ছাদসদৃশ গঠন বানানো হয়। বৃত্তাকার পরিখায় শবদাহের জন্য নতুনভাবে আরও ৩০টি গর্ত খনন করা হয়।

তৃতীয় ধাপের কাজ শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর পর। প্রধান কাজ মূলত এ সময় হয় এবং এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ ধাপ। তখন অব্রে হোলগুলোর ব্লুস্টোন তুলে ফেলে বসানো হয় ৩০টি বিশালাকার ‘সারসেন’। স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে বড় পাথরগুলোকে সারসেন বলা হয়। এগুলো ২৫ মাইল দূরবর্তী মার্লবোরো নামক স্থান থেকে আনা হয়েছিল। প্রতিটি সারসেন উচ্চতায় ১৩ ফুট ও প্রায় ৭ ফুট চওড়া। এগুলার ওজন প্রায় ২৫ টন! ওই সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এত বড় পাথরগুলো কীভাবে টেনে আনা হয়েছে তা আজও বিস্ময়!
জাদুঘরে স্টোনহেঞ্জের নকশা
স্টোনহেঞ্জ একটি সমাধিস্থলই ছিল, আশেপাশের এলাকা থেকে পাওয়া হাড় ও কঙ্কাল থেকে সেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এ থেকে ধারণা করা হয়, বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে লোকজন এখানে উপাসনার জন্য আসতো। এতে ৬৩ জন মানুষের হাড়ের টুকরো খুঁজে পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘণীভূত হয়েছে। হুট করেই মনে পড়লো কিছুদিন আগে তো এখানে অনেক মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। নরবলি হতো কিনা কে জানে! ভাবনার জগতে চলে গেলাম– গভীর রাতে পুরোহিতের নেতৃত্বে একদল মানুষ মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন স্টোনহেঞ্জের দিকে। ভাবতেই কেমন যেন লাগছে!
অনেকেরই ধারণা, অদ্ভুত গঠনের স্টোনহেঞ্জকে পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহার করতেন ধর্মযাজকরা। তারাই এর নির্মাণের নেপথ্যে ছিলেন। তাদের বলা হয় ড্রুয়িদ। ১৭৪০ সালে এটি ড্রুয়িদদের প্রার্থনার ঘর হিসেবে ব্যবহার হতো। প্রাচীন জাদুর কেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবকহৃত হতো বলে জনশ্রুতি আছে। জাদুঘরে এসব তথ্যে চোখ বোলাতে বোলাতে আধঘণ্টা কীভাবে কাটলো টেরও পেলাম না।
এবার আমাদের সেই রহস্যময় পাথরখণ্ডের সমষ্টি দেখার পালা। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে নির্ধারিত গাড়িতে উঠতে দেরি হলো না কারও। ১০ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

গাড়ি থেকে নেমে হা হয়ে দেখছি! সত্যিই কি আমরা স্টোনহেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে! ব্যাপারটা যে কল্পনার রাজ্যে আবদ্ধ নেই, তা বুঝতে হাতে চিমটি পর্যন্ত কাটা হলো। সত্যিকার অর্থেই স্টোনহেঞ্জ অপার এক সৌন্দর্যের নাম। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীর পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্টোনহেঞ্জ দেখছেন, ছবি তুলছেন। মোদ্দাকথা, তারা বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করছেন বিস্ময়কর এই জায়গা। তবে কাছে যেতে না পারায় অনেকের মধ্যে ছিল আক্ষেপ।
১৯৮৬ সালে স্টোনহেঞ্জকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা দেয় ইউনেস্কো। এরপর থেকে এর কাছে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। স্টোনহেঞ্জের খুব কাছাকাছি পর্যটকদের চলাফেরা নিষিদ্ধ। এ কারণে দর্শনার্থীদের একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখতে হয় নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিস্ময়টিকে।

প্রতিদিনই স্টোনহেঞ্জে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভিড় জমে। কার্ডিফ থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এসেছেন পিটার নিক্সন নামের একজন শিক্ষক। পৃথিবীর ইতিহাসসহ জটিল সব রহস্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার কথায়, ‘এই ছেলেমেয়েরা কার্ডিফে পড়াশোনা করে। শিক্ষা সফরে এখানে এসেছে ওরা। স্টোনহেঞ্জের ইতিহাস বেশ রহস্যময়। আশা করি, এই প্রজন্ম একদিন তা উন্মোচন করতে পারবে।’
১৯১৮ সালের ২৬ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকারের হাতে স্টোনহেঞ্জ তুলে দেন শিল্পপতি সেসিল চাব। এরপর এটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসিল ও ম্যারি চাবের উদারতা স্টোনহেঞ্জকে বাঁচিয়েছে নিঃসন্দেহে। এর মাধ্যমে অবহেলিত ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি পরিণত হয়েছে ব্রিটেনের জাতীয় সম্পদে।

স্টোনহেঞ্জের গঠন খানিকটা জটিল। তবে এটি তৈরিতে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। ধূসর বর্ণের প্রায় ১৩ ফুট উচ্চতার পাথরগুলোতে ফুটে উঠেছে জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের ছাপ। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সঙ্গে এই স্থাপত্যের খানিকটা মিল পাওয়া যায়। স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলোর গঠনে আছে দুটি বৃত্তাকার ও দুটি ঘোড়ার খুরের নলের আকারবিশিষ্ট পাথরের সারি। এছাড়া কতগুলো পৃথক পাথর রয়েছে অল্টার স্টোন।
সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমাদের যেতে হবে নটিংহামে। সবুজ রঙের বাসটিতে চেপে বসার পরও যতক্ষণ পারা যায়, পেছন ফিরে বিস্ময়কর এসব পাথরখণ্ড থেকে দৃষ্টি সরলো না।
>>>ছবি: লেখক
স্টোনহেঞ্জের সামনে লেখক

গাজায় ত্রাণ নিতে আসা ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর গুলি, নিহত ১৩০

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ত্রাণ বিতরণের সময় ক্ষুধার্ত শতাধিক মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিবর্ষণে কমপক্ষে ১৩০ জন নিহত হয়েছেন।

উপত্যকাটির সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত ত্রাণকেন্দ্রগুলোতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, পাশাপাশি এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। খবর আল জাজিরা।

জিএইচএফ নামক সংগঠনটি ইসরায়েল সমর্থিত একটি প্রতিষ্ঠান, যা মে মাসের শেষের দিকে গাজায় ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। তবে তাদের ত্রাণ গ্রহণ করতে গিয়ে স্থানীয় ক্ষুধার্ত ও দুর্ভিক্ষগ্রস্ত মানুষদের ওপর গুলি চালানো হয়। ত্রাণ বিতরণের স্থানগুলোতে সংঘটিত এই হামলায় প্রাণ হারানোদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তরফ থেকে বলা হয়েছে, জিএইচএফ কখনো মানবতার পক্ষে ছিল না। বরং এটি বেসামরিক জনগণের ওপর চাপ, অনাহার এবং হত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা বিশ্ববাসীকে এই সংগঠনের মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ড থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।

এছাড়া, তারা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজার মানুষদের জন্য সহায়তা কার্যক্রম পুনরায় চালু করার জন্য জোর দাবি তুলেছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার জন্য ত্রাণ ও খাদ্য সরবরাহে নিয়োজিত ফিলিস্তিনি-সমর্থিত আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠন ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের (এফএফসি) খাদ্যবাহী জাহাজ ‘ম্যাডলিন’ ইসরায়েলি নৌবাহিনী দ্বারা আটকানো হয়েছে। জাহাজটির ১২ জন ক্রু সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের নিজ দেশে নিয়ে গেছে।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে সুইডেনের পরিবেশ আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এবং ফ্রান্সের পার্লামেন্ট সদস্য রিমা হাসানও রয়েছেন।

রিমা হাসান এক্স (টুইটার)-এ এক পোস্টে জানিয়েছেন, রোববার (০৮ জুন) স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে ভূমধ্যসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি নৌবাহিনী তাদের আটক করে। পরে জাহাজ এবং ক্রুদের ইসরায়েলের উপকূলে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা নিরাপদে তাদের হেফাজতে আছেন এবং তাদেরকে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এই ঘটনা ‘নাটক’ এবং পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গাজার সাধারণ জনগণের ওপর চলমান এই সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ ও মানবিক সাহায্য আটকে রাখার ঘটনাগুলো সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মত বিশ্লেষকদের।

ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করছেন এক ফিলিস্তিনি তরুণ। ছবি : সংগৃহীত
ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করছেন এক ফিলিস্তিনি তরুণ। ছবি : সংগৃহীত


ইসরাইলের উন্মত্ততা চলছেই

গাজা উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ‘ম্যাডলিন’ নামের ত্রাণবাহী জাহাজ দখলে নেয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জলদস্যুদের মতো আচরণ করে ইসরাইলি কমান্ডোরা ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের এই জাহাজটি দখল করে। এতে থাকা ১২ জন কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে সুইডেনের জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গও রয়েছেন।

জাহাজটি গত ১লা জুন সিসিলি থেকে রওনা হয় এবং গাজা থেকে মাত্র ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল। এতে থাকা ত্রাণসামগ্রী যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অভুক্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য পাঠানো হচ্ছিল। কিন্তু সেখানে ২০০৭ সাল থেকে ইসরাইল স্থল, নৌ ও আকাশপথে অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। যদিও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি কিছুটা অবরোধ শিথিল করা হয়, তবে বাস্তব চিত্র এখনও শোচনীয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত গাজায় ৫৪,৯২৭ জন মানুষ নিহত হয়েছেন বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোকেও নিরাপদ রাখা যাচ্ছে না।

দেইর আল-বালাহ থেকে সাংবাদিক হিন্দ খুদারি জানিয়েছেন, খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের ওপর ইসরাইলি সেনারা গুলি চালাচ্ছে। আজকেও রাফাহ ও মধ্য গাজায় গুলিতে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এর অনেকেই শিশু ও নারী। অধিকাংশের শরীরে বুকে, গলায় ও মাথায় গুলি লেগেছে। খান ইউনিসে বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন আরও ১৩ জন, যার মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। এক নারীকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়, আরেক শিশুকে গুলি করে হত্যা করা হয় শিল্প এলাকার কাছে। এরই মধ্যে পশ্চিম তীরের তুলকারেম শরণার্থী শিবির এবং আশপাশের গ্রামগুলোতেও ইসরাইলি অভিযান চলছে। বাড়িঘর ধ্বংস, স্থানীয়দের আটকের মাধ্যমে সেখানে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে। আলার, সাইদা এবং রামিন শহরে কয়েকজন যুবককে আটকের খবর দিয়েছে ওয়াফা সংবাদ সংস্থা। অনেক দোকানেও তল্লাশি চালানো হয়েছে।

লেবাননে দক্ষিণাঞ্চলের আল-নুমাইরিয়া শহরের কাছে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় একটি গাড়ি বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও নভেম্বর মাসে হেজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, বাস্তবে ইসরাইল নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া স্টেনারগার্ড বলেন, গত ১০ বছর ধরে সুইডেন সরকার গাজায় ভ্রমণে বিরত থাকতে নাগরিকদের পরামর্শ দিয়ে আসছে। তাই যারা সেখানে যায় তারা কিছুটা দায়িত্ব নিজের কাঁধেও নেয়।

এদিকে, বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘ম্যাডলিন’ জাহাজ দখলের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করছে। ফ্লোটিলা কোয়ালিশন দাবি করেছে, তাদের জাহাজ ছিল স্পষ্টভাবে মানবিক সহায়তা। আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনোভাবেই এমন দখল বৈধ হতে পারে না। ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা ও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনমত আরও প্রবল হচ্ছে। তবে এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সমাজ কেবল বিবৃতি দিয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে এগিয়ে আসবে।

mzamin

ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করছেন গভর্নর নিউসম

ক্যালিফোর্নিয়া পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে। অভিবাসন ইস্যুতে সৃষ্ট অস্থিরতা দমাতে সেখানে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গাভিন নিউসম বলেছেন, তার এমন পদক্ষেপের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করছেন। ওদিকে তৃতীয় দিনশেষে রাতভর বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত ছিল বলেই মনে হয়েছে। মেয়র ক্যারেন ব্যাস তাদেরকে সহিংসতা ও বিশৃংখলা এড়িয়ে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ফেরার পর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট লস অ্যানজেলেসে অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে এক লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে।

অনলাইন বিবিসি এ খবর দিয়ে বলছে, সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, লস অ্যানজেলেসে চলমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে সেখানে নৌ সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। এই ঘোষণার পর অনেকেই এ ধরনের পদক্ষেপের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এই হুমকিকে ‘উন্মাদের আচরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে মার্কিন ইতিহাসে এটি নতুন কিছু নয়। এর আগে ১৯৯২ সালের মে মাসে লস অ্যানজেলেসে রডনি কিং নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে মারধরের মামলায় চার শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার বেকসুর খালাসের প্রতিবাদে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গার সময়ও প্রায় ১,৫০০ মেরিন সেনা সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। তিনি ইনসারেকশন অ্যাক্ট নামের একটি আইনি কাঠামো ব্যবহার করে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেন।

ইনসারেকশন অ্যাক্ট কী?
ইনসারেকশন অ্যাক্ট হলো ১৮০৭ সালের একটি মার্কিন আইন, যা প্রেসিডেন্টকে জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ক্ষমতা দিয়েছে। মূলত যখন কোনো অস্থিরতা বা সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যা স্থানীয় বা রাজ্য সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন এই আইনের মাধ্যমে ফেডারেল সেনা মোতায়েন করা যায়। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিস-এর মতে, গত অর্ধশতাব্দীতে এই আইনের অধীনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ঘটনা খুবই বিরল। তবে আইনের ভাষা অস্পষ্ট হওয়ায়, এটি প্রেসিডেন্টকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করে— তিনি নিজের বিবেচনায় নির্ধারণ করতে পারেন কখন এবং কোথায় এই আইন প্রয়োগ করা হবে।

তবে বিতর্ক কেন?
অনেকেই মনে করছেন, লস অ্যানজেলেসের পরিস্থিতি এখনো এতটা গুরুতর নয় যে সেখানে ফেডারেল সেনাবাহিনী প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনসারেকশন অ্যাক্ট ব্যবহার করার আগে প্রমাণ করতে হবে যে রাজ্য বা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু যদি প্রেসিডেন্ট এই আইন প্রয়োগে একতরফা সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আর এই সুযোগটাই ব্যবহার করছেন গ্যাভিন নিউসম। তাই তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম নিশ্চিত করেছেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছেন। এক্সে পোস্ট করে নিউসম বলেন— এটাই ছিল ডনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য। তিনি আগুনে ঘি ঢেলেছেন এবং বেআইনিভাবে ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন। তিনি যে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন তা শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার জন্য নয়— এটি যেকোনো রাজ্যে একইভাবে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেয়। আমরা তার বিরুদ্ধে মামলা করছি। তিনি আরও বলেন, এটি সংবিধানবিরোধী পদক্ষেপ এবং আমরা আদালতে সেই দাবির সত্যতা পরীক্ষা করব।

নিউসমের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্রের অভিযোগ
তবে নিউজমের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। এক্সে পোস্ট করে তিনি বলেন, গ্যাভিন নিউজম দুর্বল। যখন সরকারি কর্মকর্তারা আক্রান্ত হচ্ছিলেন তখন এবং দাঙ্গার সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। লেভিটের ভাষায়, লস অ্যানজেলেসে দিনের পর দিন সহিংস দাঙ্গা চলেছে এবং গভর্নর নিউজম কিছুই করেননি। ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের ‘সহিংস উগ্রবাদী’ ও ‘অবৈধ অপরাধীদের’ আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। অথচ গভর্নর এতটাই দুর্বল ছিলেন যে শহরটিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। তিনি আরও বলেন, লস অ্যানজেলেস পুলিশ প্রধান নিজেও স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল।

রাজনীতির তীব্র দ্বন্দ্ব
এই মন্তব্যগুলো এমন সময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন নিয়ে মামলা করছেন গভর্নর নিউসম। নিউসমের মতে, সেনা মোতায়েন তার অনুমতি ছাড়াই করা হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পরিপন্থী। তবে হোয়াইট হাউজের দাবি, রাজ্য সরকার যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ফেডারেল সরকার হস্তক্ষেপ করতেই পারে। প্রেস সেক্রেটারি লেভিটের মন্তব্য সেই অবস্থানকেই জোরদার করেছে।

জনমত বিভক্ত
জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। একদিকে অনেকে মনে করছেন, ফেডারেল হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে অনেকেই বলছেন, এটি রাজ্য স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ এবং একটি বিপজ্জনক নজির।

mzamin

মুখ ফিরিয়েছে বিশ্ব, গাজা কি নিভে আসছে by আব্বাস নাসির

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের (৪ জুলাই) এক মাস আগে দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ভেটো (‘না’ ভোট) দিয়ে আটকে দেয়।

প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, গাজায় সব পক্ষকে মেনে চলার জন্য ‘একটি স্থায়ী, নিঃশর্ত ও দ্রুত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা’ দিতে হবে এবং হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীর হাতে থাকা সব ইসরায়েলি বন্দীকে সম্মানজনকভাবে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যদেশের মধ্যে ১৪টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা করায় সেটি বাতিল হয়ে যায়।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছিল, গাজায় মানবিক ত্রাণ পৌঁছাতে যেসব বাধা আছে সেসব বাধা এবং গাজার ওপর আরোপ করা সব নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে হবে; জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা যেন নিরাপদে বাধা ছাড়া ত্রাণ পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই ভেটোর ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা দেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) চারজন বিচারককে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আনা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শুধু গাজায় যুদ্ধবিরতি থামানোর প্রস্তাবে বাধা দেয়নি, বরং যাঁরা যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে চান, তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রধান মিরিয়ানা স্পলিয়ারিচ গাজাকে ‘পৃথিবীর নরক থেকেও ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের চূড়ান্তভাবে উচ্ছেদ করা। এই নীতিকে টিকে থাকতে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন এবং আরব দেশগুলোর নীরবতা।

ইসরায়েলের সরকারে যাঁরা আছেন, তাঁরা তাঁদের এই সামরিক লক্ষ্য নিয়ে কোনো রাখঢাক করছেন না; বরং স্পষ্ট করেই বলে আসছেন, তাঁরা কী করতে চান।

গাজায় মানুষের জীবনধারণের জন্য যেসব মৌলিক জিনিস দরকার, যেমন পানি, বিদ্যুৎ, ঘরবাড়ি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি হাসপাতাল—সবই ইসরায়েল ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন গাজায় ঠিকমতো কাজ করতে পারছে, এমন হাসপাতাল আছে মাত্র দুটি।

জাতিসংঘ বলছে, এ দুটি হাসপাতালকে নিরাপদ রাখতে হবে, কারণ প্রতিদিন গাজায় বিমান হামলা আর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে বহু মানুষ মারা যাচ্ছে বা আহত হচ্ছে। এদের মধ্যে শিশু আর বৃদ্ধের সংখ্যা অনেক বেশি। জাতিসংঘ আরও জানাচ্ছে, প্রতিদিন গাজায় অপুষ্ট শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে।

এই অপুষ্টির প্রধান কারণ হলো ইসরায়েলের আরোপ করা খাদ্য অবরোধ। আন্তর্জাতিক অনেক সাহায্য সংস্থা এই অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু ইসরায়েল তা গ্রাহ্য করেনি। বরং তারা নিজেরাই কিছু ‘খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র’ চালু করেছে।

এসব জায়গায় বহু ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিকে (যাঁদের মধ্যে নারীও রয়েছেন) ইসরায়েলি ট্যাংকে বসানো মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

গাজায় খাদ্যসংকটের এই জটিল পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, তাঁর সরকার এমন একটি গোষ্ঠীকে অস্ত্র দিয়েছে, যাদের অনেকেই অপরাধী এবং যাদের সম্পর্কে ধারণা করা হয়, তারা ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের রাজনীতিক আবিগদর লিবারম্যান ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজেই একতরফাভাবে আবু শাবাব নামের একটি গোষ্ঠীকে অস্ত্র দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন এবং তাদের কাছে অস্ত্র হস্তান্তরও করেছেন।

তাঁর ভাষায়, ‘ইসরায়েলি সরকার একদল অপরাধী ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অস্ত্র দিচ্ছে, যাদের অনেকেই আইএস গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।’

বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যাদের ইসরায়েলি সরকার অস্ত্র দিয়েছে, সেই গোষ্ঠীর নেতা ইয়াসির আবু শাহাব একজন সাবেক আইএস কমান্ডার এবং বর্তমানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছেন।

ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর (ইসরায়েলি অকুপেশন ফোর্সেস) মতে, শাহাবের নেতৃত্বাধীন প্রায় ৩০০ জনের একটি দল গাজায় প্রবেশ করা খাদ্যবাহী ট্রাকগুলোর ‘রক্ষা করার’ কাজ করছে। কিন্তু গাজা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এই দল আসলে ঠিক তার উল্টো কাজ করছে।

তারা এই খাদ্যবাহী ট্রাকগুলো দখল করে নিচ্ছে এবং অপুষ্টিতে ভোগা, ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী লুট করছে।

এই একতরফা জাতিগত নির্মূল কার্যক্রম (যা যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সক্রিয় সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে) তা ইউরোপের অন্তত কিছু জনগণের মধ্যে মতামতের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে।

স্টিভ উইটকফের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ উঠেছে, তিনি হামাসের সঙ্গে একরকম চুক্তি করে পরে তা অমান্য করেন এবং দোষ চাপান হামাসের ওপর। তিনি প্রকৃত সত্য গোপন করে ঘটনাকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে ইউরোপে জনমত ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করা প্রচারণাকারীদের এখন অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। এত দিন তাঁরা কোনো বাধা ছাড়াই মিথ্যা প্রচার চালিয়ে যেতে পারলেও, এখন কিছু সাংবাদিক সেই প্রচারণার বিরুদ্ধেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

সম্প্রতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইউগোভ পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ইসরায়েল বিষয়ে জনমত পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার সবচেয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড অন্যায্য।

তবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁর ‘গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা’ ঠিক পথেই রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করাই হবে বাস্তবতা।

ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার মতো আরব বিশ্বের বন্ধু কম; বরং এই অঞ্চলের নেতারা ট্রাম্পকে হাত খুলে অর্থ দিয়েছেন, কিন্তু গণহত্যা বন্ধে কোনো চাপ প্রয়োগ করেননি।

গাজায় যখন গণহত্যা চলছে, তখন আমরা দেখলাম, ‘উম্মাহ’র সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাশক্তি যে দেশটির হাতে, সেই দেশের ক্ষমতাধর অভিজাত কর্মকর্তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মার্কিন দূতাবাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ‘সম্মান’ পাওয়ার আশায়।

* আব্বাস নাসির ডন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক
- ডন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ঈদের নামাজ পড়ার পর গাজার এক শিশু নিহত স্বজনদের কবর জিয়ারত করছে।
ঈদের নামাজ পড়ার পর গাজার এক শিশু নিহত স্বজনদের কবর জিয়ারত করছে। ছবি: এএফপি

আবার উত্তাল মণিপুর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চাপে প্রশাসন by শুভজিৎ বাগচী

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের চার মাস পর আবার উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ইম্ফল ও আশপাশের এলাকা। বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ি অঞ্চলে গতকাল রোববার রাত থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজ্য পুলিশ আজ সোমবার জানিয়েছে, গত রাত থেকে চলা সহিংসতায় সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যার মধ্যে ইম্ফল পশ্চিম জেলার সাব-ডিভিশনাল কালেক্টর বা উপ-মহকুমা শাসকের অফিসও রয়েছে। ফলে উপ-মহকুমা শাসকের ওই অফিসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে গেছে। ভবনটিও আংশিকভাবে পুড়ে গেছে।

রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র সংগঠন আরাম্বাই টেঙ্গলের এক শীর্ষ নেতা অসেম কানন সিংসহ আরও চারজনকে অতীতের সহিংসতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ভারতের একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, কয়েকজনকে ইম্ফল বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ঠিক কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে এখনো জানানো হয়নি। এই গ্রেপ্তারের ঘটনার পর গত শনিবার রাতে সর্বশেষ এই সহিংসতা শুরু হয়।

কাদের গ্রেপ্তার করা হলো

কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আজ সোমবার নিশ্চিত করেছে মণিপুর পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেরিফায়েড পেজে এক বিবৃতিতে মণিপুর পুলিশ বলেছে, দুই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) এবং ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এনএসএ) বিবৃতি থেকে জানা গেছে, ৪৬ বছর বয়সী অসেম কানন সিংকে নানা অপরাধমূলক কাজকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, কানন সিং মণিপুর পুলিশের সদস্য ছিলেন। অস্ত্র পাচারের অভিযোগে গত মার্চের গোড়ায় তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাঁকে গ্রেপ্তারের পরই ৭ জুন থেকে ইম্ফল উপত্যকা উত্তাল হয়ে ওঠে। এ ছাড়া ৬ ও ৭ জুন নিরাপত্তা বাহিনী মধ্য মণিপুরের থৌবাল জেলার অধীনে লেইশাংথেম বাজারে সশস্ত্র মাওবাদী সংগঠন কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ গোষ্ঠী) আরও দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন লেইশাংথেম আমুজাও সিং (৩১) ও ইলাংবাম উমা রানী দেবী (৩২)। তাঁরা থৌবাল জেলায় চাঁদাবাজি করছিলেন।

কাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ গোষ্ঠী) আরেক সক্রিয় সদস্য ৩৫ বছরের ওয়াহেংবম নাওটন মেইতেইকেও ওই সময় ইম্ফল পূর্ব জেলার অন্তর্গত সাওমবুং ওয়াইরি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এলাকার সাধারণ মানুষকে পার্টির নির্দেশিত নৈতিক–সামাজিক (মরাল পলিসিং) আচরণ বজায় রাখতে নানাভাবে হুমকি দিয়েছিলেন। একজন সাধারণ মানুষ সামাজিক নৈতিকতাবিষয়ক নির্দেশ দিতে পারেন না বলে স্থানীয় প্রশাসন জানায়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অনেকেই আরাম্বাই টেঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জেরে শনিবার থেকে অশান্ত হয়ে ওঠে মণিপুর। গতকাল রোববার সহিংসতা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা রোববার দুপুর থেকে বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হতে শুরু করেন। তাঁরা মাটি দিয়ে রাস্তার ওপরে বিশাল প্রাচীর তৈরি করেন, যাতে পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর গাড়ি যেতে না পারে।

মূলত পশ্চিম ইম্ফলে প্রথম এ ধরনের প্রাচীর তৈরি করা হয়। এরপর সর্বত্র গাড়ির টায়ার জ্বালানো শুরু হয়। পশ্চিম ইম্ফলের সেকমাই, কইরেঙ্গাইসহ কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের মাটির প্রাচীর বানানোর পাশাপাশি গাড়ির টায়ার জ্বলানো হয়। একইভাবে পূর্ব ইম্ফল জেলার ওয়াংখেই, ইয়াইরিপোক, খুরাই প্রভৃতি অঞ্চলে টায়ার জ্বালিয়ে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হয়।

রাজ্য পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। পূর্ব ও পশ্চিম ইম্ফলের আরও অসংখ্য জায়গায় বিভিন্ন ভবন ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করা হয় বলেও স্থানীয় প্রচার মাধ্যম জানিয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ জায়গাতেই নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছাতে পারেনি।

আরাম্বাই টেঙ্গল ১০ দিনের জন্য রাজ্যজুড়ে, বিশেষত তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ধর্মঘট ডেকেছে। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সবকিছুই এই ধর্মঘটের আওতা থাকবে।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিদ্রোহীদের গ্রেপ্তার করতে রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।

আদিবাসীদেরও গ্রেপ্তার

অন্যদিকে আদিবাসী কুকি-জো সমাজের তিন ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পুলিশের ওপর প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

আসামের শিলচর থেকে গত ১৯ মে আটক করা হয় কুকি-ইনপি টেংনোপাল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর থাংমিনলেন মেটকে নামের এক ব্যক্তিকে।

এ ছাড়া কুকি ন্যাশনাল আর্মির সদস্য কামগিনথাং গ্যাংটে এবং চুড়াচাঁদপুর জেলার গ্রাম স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হেন্টিনথাং কিপগেন ওরফে থাংনিও কিপগেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

ইম্ফল উপত্যকার মতো পাহাড়ে কুকি-জো জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ শুরু হয় ৬ জুন। সেখানে তিন দিন প্রতিবাদ চলে এবং সেখানেও উত্তেজনা রয়েছে। তবে ইম্ফলের তুলনায় পাহাড়ে পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

রাজ্য প্রশাসনের পদক্ষেপ

পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, অনেকগুলো এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া রাস্তা খোলা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বিমানবন্দরে যাতায়াতের প্রধান সড়ক টিডিম রোড। তবে এখনো অসংখ্য রাস্তা, সংলগ্ন সরু গলি বা বিভিন্ন মহল্লার সরু রাস্তা বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলে স্বীকার করছে রাজ্য পুলিশ। মেইতেই সমাজের বিভিন্ন নারী সংগঠনও প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। গতকাল রোববার সারা রাত তাঁরা মশালমিছিল করেছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজ্য প্রশাসনের তরফে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, বিভিন্ন সরকারি ভবনে যে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, সেসব ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি সরকারি ভবনগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ইম্ফল পশ্চিম, ইম্ফল পূর্ব, থৌবাল, বিষ্ণুপুর ও কাকচিং জেলায় বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি করা হয়েছে। যেমন এলাকায় একাধিক ব্যক্তির সমাবেশ বা কোনো ধরনের সাধারণ জিনিস, যেমন লাঠি নিয়ে অঞ্চলে ঘোরাঘুরির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ

শনিবার থেকে সহিংসতার জেরে ইম্ফল ও সংলগ্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএনও রয়েছে। ভিপিএনের সাহায্যে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহার করা হলে গ্রাহকের ইন্টারনেট ঠিকানা বোঝা সম্ভব হয় না। ফলে তিনি কোথা থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, সেটাও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায় না।

ভারতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে। ডিজিটাল অধিকার সংস্থা ‘অ্যাকসেস নাও’–এর পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৪ সালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮৪ বার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। তবে তার আগের বছর; অর্থাৎ ২০২৩ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১১৬ বার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ‘অ্যাকসেস নাও’।

রাজ্যপালের বৈঠক

মণিপুরের রাজ্যপাল এবং ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় কুমার ভাল্লা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকাল রোববার বহুদলীয় বিধায়কদের ২৫ সদস্যের একটি দল ভাল্লার সঙ্গে দেখা করে।

রাজ্যসভার সংসদ সদস্য লেইশেম্বা সানাজাওবাও ওই দলে ছিলেন। তাঁরা রাজ্যপালের কাছে জানতে চান, কীভাবে পরিস্থিতি এত দ্রুত হাতের বাইরে চলে গেল। গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পর এত বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা রাজধানী এবং সংলগ্ন এলাকায় ঘটেনি।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে চলা সহিংসতায় মণিপুরে অন্তত ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে, গৃহহীন হয়েছেন ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। সেখানে এখনো শান্তি ফেরেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত দুই বছরে মণিপুর সফর করেননি। এ নিয়ে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তাঁর সমালোচনা করছে।

রাজ্য বিধানসভা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে রাখা হয়েছে। সর্বভারতীয় প্রচারমাধ্যম ইতিমধ্যে বিভিন্ন সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর কুকি-জো আদিবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকার যখন দিল্লিতে এ ব্যবস্থা নিচ্ছে, ঠিক তখনই আবার রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে।

ভারতের মণিপুর রাজ্যে সড়ক অবরোধ। ১ জুন, কাংচুক এলাকা
ভারতের মণিপুর রাজ্যে সড়ক অবরোধ। ১ জুন, কাংচুক এলাকা। ছবি: এএনআই

ত্রাণবাহী জাহাজ ‘ম্যাডলিন’ দখলে নিয়েছে ইসরায়েল, আছেন গ্রেটাসহ ১২ মানবাধিকারকর্মী

আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) পরিচালিত ত্রাণবাহী জাহাজ ‘ম্যাডলিন’ গাজায় ভিড়তে দেয়নি ইসরায়েল। ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য ইতালি থেকে জাহাজটিতে করে ত্রাণ নিয়ে আসা হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকেই জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ওই পোস্টে জাহাজটিকে সেলফি ইয়ট বলে উল্লেখ করেছে ইসরায়েলি মন্ত্রণালয়। তারা লিখেছে, ‘তারকাদের’ বহনকারী ‘সেলফি ইয়ট’–কে নিরাপদে ইসরায়েলের উপকূলের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে।

‘ম্যাডলিন’ জাহাজে মোট ১২ জন মানবাধিকারকর্মী আছেন। তাঁরা হলেন সুইডেনের পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রিমা হাসান, জার্মানির ইয়াসেমিন আচার, ফ্রান্সের ব্যাপতিস্ত আন্দ্রে, ব্রাজিলের থিয়াগো আভিলা, ফ্রান্সের ওমর ফায়াদ, পাস্কাল মৌরিয়েরাস, ইয়ানিস মোহামদি, তুরস্কের সুলাইব ওর্দু, স্পেনের সার্জিও তোরিবিও, নেদারল্যান্ডসের মার্কো ফন রেনেস ও ফ্রান্সের রিভা ভিয়া।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই পোস্টে সুইডেনের পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানানো হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়, এ মানবাধিকারকর্মীরা গণমাধ্যমকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। শুধু প্রচার পাওয়ার উদ্দেশে তাঁরা এই কাজ করেছেন।

ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনও (এফএফসি) জাহাজটি ইসরায়েলের দখলে যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। তারা বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে লিখেছে, জাহাজের সঙ্গে তাদের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এছাড়া টেলিগ্রামে একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে ত্রাণ দিতে যাওয়া মানবাধিকারকর্মীদের হাত ওপরের দিকে তুলে বসে থাকতে দেখা গেছে।

গত ২ মার্চ থেকে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। এমন অবস্থায় অনাহারে ভুগে বেশ কয়েকটি শিশু মারা যায়। ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ‘ম্যাডলিন’ নামের এ জাহাজ ১ জুন ইতালির সিসিলির কাতানিয়া শহর থেকে যাত্রা শুরু করে।

বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার হিসাব অনুসারে, গাজার ২৩ লাখের বেশি বাসিন্দার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ তীব্রমাত্রায় খাদ্যসংকটে ভুগছেন।

গাজার প্রথম ও একমাত্র নারী মৎস্যশিকারির নামানুসারে ‘ম্যাডলিন’ জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ত্রাণবাহী জাহাজটিকে নিজেদের জলসীমায় প্রবেশ করতে দেবে না।

ফ্রি ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গাজার মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে যেসব সহায়তা দরকার, সেগুলো বহন করছে জাহাজটি। এর মধ্যে আছে চিকিৎসার সরঞ্জাম, ময়দা, চাল, শিশুদের দুধ (বেবি ফর্মুলা), ডায়াপার, নারীদের স্যানিটারি পণ্য, পানি বিশুদ্ধকরণ কিট, ক্রাচ ও শিশুদের কৃত্রিম অঙ্গ।

আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকেই জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে
আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকেই জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি: ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি)

যুক্তরাষ্ট্রকে না, পারমাণবিক ইস্যুতে নতুন পথে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে তার জবাবে নতুন একটি পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব দেবে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, এই প্রস্তাব ওমানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

সোমবার (৯ জুন) তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি। খবর : রয়টার্স।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রস্তাব আমাদের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আগের আলোচনার কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আমরা এখন এমন একটি প্রস্তাব তৈরি করছি যা হবে যুক্তিসংগত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং যৌক্তিক। এটি ওমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে জানানো হবে।

বাঘায়ি আরও জানান, আমরা চাই, অবরোধ তোলার আগে নিশ্চিত হতে হবে- ইরান আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উপকারভোগী হবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য স্বাভাবিক হবে।

এর আগে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, মে মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, মজুত ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কার্যকর রূপরেখা নিয়ে মতপার্থক্য থেকেই গেছে। ইরানি কূটনীতিকরা বলছেন, এসব মৌলিক বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় ইরান সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বাঘায়ি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যেসব দেশ ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারাই আবার ইসরায়েলের সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। আমরা ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানাই।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল কখনো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাধিকার স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। তবে তেহরানের অভিযোগ, ইসরায়েল ইরানের পরমাণু আলোচনা বিঘ্নিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দেন এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করে পুনরায় অবরোধ আরোপ করলে চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে। এর পালটা জবাবে ইরানও ধীরে ধীরে চুক্তির সীমা লঙ্ঘন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ায়।

সংবাদ সম্মেলনে বাঘায়ি জানান, ষষ্ঠ দফা পারমাণবিক আলোচনা কবে শুরু হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত


‘হানিমুনে স্বামী হত্যা’, অতঃপর...

ভারতের মেঘালয় রাজ্যে হানিমুনে গিয়ে স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যার পর নিখোঁজ নববধূ সোনম রঘুবংশী (২৫)। এ নিয়ে নানা রহস্যের পর অবশেষে আত্মসমর্পণ করেছেন সোনম। উত্তর প্রদেশের গাজিপুর জেলার নন্দগঞ্জ থানায় সোমবার সকালে তিনি আত্মসমর্পণ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। মেঘালয়ের পুলিশ জানিয়েছে, সোনম তার স্বামী রাজা রঘুবংশীকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেছিলেন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আরও তিনজন এবং মেঘালয় থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোট চারজন অভিযুক্ত পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।

পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম ব্রিফিংয়ে বলেন, সোনম হলেন মামলার প্রধান সন্দেহভাজন। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি জানান, অভিযুক্তদের একজনের সঙ্গে সোনমের সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে ‘ডটগুলো মিলিয়ে নিলে সেরকমই মনে হয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ১১ই মে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরে পারিবারিকভাবে রাজা (৩০) ও সোনমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ২০ মে এই দম্পতি মেঘালয়ে হানিমুনে যান। চারদিন পর তাঁরা নিখোঁজ হন। এক সপ্তাহ পরে রাজার পচা-গলা মৃতদেহ একটি গিরিখাতে উদ্ধার করা হয়— তার গলা কাটা পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানিব্যাগ, সোনার আংটি ও চেইন পাওয়া যাচ্ছিল না। সোনম তখনও অজ্ঞাতভাবে নিখোঁজ ছিলেন।

পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা মেঘালয়ের পুলিশকে অভিযুক্ত করে প্রচারণা শুরু করেন। তারা অভিযোগ করেন, রাজ্যের পুলিশ যথাযথ তদন্ত করছে না এবং সোনমকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ। পরিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও চিঠি দিয়ে বিচার চেয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবিতে বিভিন্ন রাজনীতিক ও জাতিগত নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সোমবার সকালে পুলিশ জানায়, সোনম গাজিপুরের একটি ধাবায় (সড়কপথের খাবারের দোকান) পৌঁছান, সেখানে তিনি একজনের মোবাইল ধার করে তার ভাইকে ফোন করেন। তিনি এরপর পুলিশকে খবর দেন।

সোনমের পিতা দেবী সিং দাবি করেন, আমার মেয়ে নির্দোষ। সে এটি করতে পারে না। হয়তো সে অপহরণকারীদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছে। তিনি মেঘালয় পুলিশের বিরুদ্ধে ‘গল্প তৈরি’ করার অভিযোগ করেন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কাছে অনুরোধ জানান যাতে এই মামলার কেন্দ্রীয় তদন্ত করা হয়। রাজার ভাই বিপিন রঘুবংশী প্রাথমিকভাবে বলেন, সোনম নিজে না বললে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না যে সে জড়িত। তবে পরে তিনি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া একজন অভিযুক্ত সোনমের অফিসের কর্মী ছিলেন। তাই এখন শুধু সোনমই সত্যটা বলতে পারে। যদি সে দোষী হয়, তবে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা বলেছেন, এই মামলায় আমাদের রাজ্যের পুলিশের বড় সাফল্য মাত্র সাতদিনে। একজন মন্ত্রী আলেকজান্ডার লালু হেক বলেন, যখন উদ্ধার অভিযান চলছিল, তখন পুলিশ ও সরকারকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হচ্ছিল। এখন সত্য উদঘাটিত হয়েছে।

mzamin

ত্রাণবাহী জাহাজ ‘ম্যাডলিন’ নিজেদের বন্দরে নিয়ে গেছে ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) পরিচালিত ত্রাণবাহী জাহাজ ‘ম্যাডলিন’ ইসরায়েলের বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার রাতে ১২ জন মানবাধিকারকর্মীসহ জাহাজটি ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরে নিয়ে যায় দেশটির নৌবাহিনী। জাহাজটিতে করে গাজার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

মানবাধিকারকর্মীদের ইসরায়েলের রামলে শহরের একটি আটক কেন্দ্রে রাখা হতে পারে। পরে তাদের ইসরায়েল থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আদালাহ। তারা এই মানবাধিকারকর্মীদের প্রতিনিধিত্ব করছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘ম্যাডলিন’ জাহাজটি বন্দরে ভিড়েছে। জাহাজে থাকা মানবাধিকারকর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। তারা দুজনের ছবি প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে গ্রেটা থুনবার্গের ছবিও রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জাহাজটি কিছুক্ষণ আগে আশদাদ বন্দরে ভিড়েছে। যাত্রীদের সুস্থ্য আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।

‘ম্যাডলিন’ জাহাজে মোট ১২ জন মানবাধিকারকর্মী আছেন। তাঁরা হলেন সুইডেনের পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রিমা হাসান, জার্মানির ইয়াসেমিন আচার, ফ্রান্সের ব্যাপতিস্ত আন্দ্রে, ব্রাজিলের থিয়াগো আভিলা, ফ্রান্সের ওমর ফায়াদ, পাস্কাল মৌরিয়েরাস, ইয়ানিস মোহামদি, তুরস্কের সুলাইব ওর্দু, স্পেনের সার্জিও তোরিবিও, নেদারল্যান্ডসের মার্কো ফন রেনেস ও ফ্রান্সের রিভা ভিয়া।

গত ২ মার্চ থেকে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। এমন অবস্থায় অনাহারে ভুগে বেশ কয়েকটি শিশু মারা যায়। ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ‘ম্যাডলিন’ নামের এ জাহাজ ১ জুন ইতালির সিসিলির কাতানিয়া শহর থেকে যাত্রা শুরু করে।

ফ্রি ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গাজার মানুষের জন্য অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে যেসব সহায়তা দরকার, সেগুলো বহন করছে জাহাজটি। এর মধ্যে আছে চিকিৎসার সরঞ্জাম, ময়দা, চাল, শিশুদের দুধ (বেবি ফর্মুলা), ডায়াপার, নারীদের স্যানিটারি পণ্য, পানি বিশুদ্ধকরণ কিট, ক্রাচ ও শিশুদের কৃত্রিম অঙ্গ।

স্থানীয় সময় রোববার মধ্যরাতে গাজা থেকে প্রায় ১৮৫ কিলোমেটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজটি আটকে দেয় ইসরায়েলের নৌবাহিনী। পরে মানবাধিকারকর্মীসহ জাহাজটি ইসরায়েলি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ‘ম্যাডলিন’ জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ‘ম্যাডলিন’ জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প কেন উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানসাধনাকে শত্রু ভাবছেন by ইয়ান বুরুমা

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ২০২১ সালের এক বক্তৃতায় আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমালোচনা করতে গিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের একটি বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করেছিলেন। নিক্সনের কথাটি ছিল, ‘অধ্যাপকেরা আমাদের শত্রু।’

যদিও ভ্যান্স নিজে ইয়েল ল স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছেন, এরপরও তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অভিযানে’ একজন সক্রিয় সৈনিক হিসেবে কাজ করছেন।

এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে গবেষণার জন্য অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া, বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী পড়ানো হবে ও কীভাবে পড়ানো হবে—তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।

‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) স্লোগান বাস্তবায়নের কথা বলে ট্রাম্প এখন এমন সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছেন, যেগুলো একসময় আমেরিকাকে মহান করে তুলেছিল।

প্রশ্ন হলো যেসব প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি এনেছে, সেগুলোর ওপর এত আক্রমণ চালানোর পেছনে উদ্দেশ্যটা আসলে কী?

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘ইহুদিবিদ্বেষের আঁতুড়ঘর’ হিসেবে করা একধরনের ধৃষ্টতা। এই মন্তব্যটি এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এসেছে, যিনি মশাল হাতে ‘আমাদের ভূমিতে ইহুদিদের ঠাঁই হবে না’ বলে স্লোগান দেওয়া নাৎসিদের মধ্যেও ‘অনেক ভালো মানুষ’ আছে বলে অতীতে মন্তব্য করেছেন।

আসলে, ‘মাগা’পন্থী, অর্থাৎ ট্রাম্পের অনুসারীদের কাছে ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা খুব সংকীর্ণ। তাঁদের মতে, যাঁরা ইসরায়েলের বর্তমান সরকার বা নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন, তাঁরা ইহুদিবিদ্বেষী। অর্থাৎ কেউ যদি ইহুদি রাষ্ট্রবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তবে তাঁকে তাঁরা ইহুদিদের ঘৃণা করা লোক বলেই ধরে নেন। সব সমালোচক ইহুদিবিদ্বেষী নন—এই সহজ কথাটা তাঁরা মানতে চান না।

ফিলিস্তিনপন্থী ছাত্র আন্দোলনকারীদের মধ্যে কিছু মানুষ ইহুদিবিদ্বেষী হতে পারেন; শিক্ষকদের মধ্যেও কেউ কেউ হয়তো এমন আছেন। কিন্তু এই কয়েকজনের কারণে গোটা উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (যেমন হার্ভার্ড, ইয়েল, প্রিন্সটন ইত্যাদি) ইহুদিবিদ্বেষ দূর করার যে কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে একটি অজুহাতমাত্র। এর লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী আর উদারপন্থী মানুষদের ওপর আঘাত হানা, যাঁদের অনেকে নিজেরাও ইহুদি।

জ্ঞানী-গুণী মানুষদের, বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের প্রতি ঘৃণা চরমপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির পুরোনো বৈশিষ্ট্য। ১৯৩০-এর দশকে হিটলার বলেছিলেন, ‘জার্মানরা বেশি শিক্ষিত হয়ে পড়েছে। শুধু জ্ঞানকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব জ্ঞানী কাজের শত্রু।’

বিজ্ঞান এমন এক জিনিস, যা সব দেশের, সব জাতির মানুষ একসঙ্গে করে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গিকে নাৎসিরা অপছন্দ করতেন। কারণ, তাঁরা চাইতেন সবকিছুই যেন শুধু জার্মান জাতির জন্য হয়। তাই তাঁরা বিজ্ঞানকে ‘সবার জন্য’ বলে ভাবতেন না। তাঁরা বলতেন, ‘গবেষণা করতে হলে আগে দেখতে হবে তুমি কোন জাতির লোক।’

১৯৩৪ সালে জোহানেস স্তার্ক নামের এক নাৎসিবাদী জার্মান বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘নাৎসি সরকারের অধীনে বড় কোনো বৈজ্ঞানিক দায়িত্বে এমন কাউকে বসানো যাবে না, যিনি জার্মান নন বা জার্মান জাতিকে ভালোবাসেন না; শুধু সেই মানুষেরাই এসব জায়গায় বসতে পারবেন, যাঁরা জার্মান এবং গর্বের সঙ্গে নিজেদের জার্মান বলে মনে করেন।’

মাগা ভাবধারার লোকেরা যে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির মতো কার্যক্রমকে ঘৃণা করেন, তার পেছনে নাৎসি চিন্তার ছায়া আছে। সে কারণে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ বা বিরুদ্ধচিন্তার লোকদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আবার বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও তাঁরা ক্ষুব্ধ। অথচ এসব বিদেশি শিক্ষার্থী আমেরিকায় শিক্ষা খাতে প্রচুর অর্থ আনেন এবং সাংস্কৃতিকভাবে নানা রকম সুফল দিয়ে থাকেন। এই বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি যে বিদ্বেষ, তা কেবল জাতিবিদ্বেষ নয়, বরং আমেরিকার সাংস্কৃতিক শক্তিকেও (সফট পাওয়ার) দুর্বল করে দেয়। শুধু জাতিবিদ্বেষ নয়, এই আক্রমণের পেছনে রয়েছে শ্রেণিদ্বেষ বা ‘ক্লাস রিসেন্টমেন্ট’।

গত এক শ বছরে পশ্চিমা সমাজে, বিশেষ করে আমেরিকায়, মেধাভিত্তিক সমাজ বা ‘মেরিটোক্রেসি’ গড়ে উঠেছে। এখন শুধু পরিবার বা অর্থ নয়, বরং কে কতটা শিক্ষিত, সেটাই সমাজে উচ্চমর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

তবে শিক্ষিত হওয়া মানে কেবল ডিগ্রি পাওয়া নয়। শিল্পকলায় রুচি থাকা, বই পড়ার প্রতি ঝোঁক থাকা এবং একাধিক ভাষায় জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা থাকাও এই ‘শিক্ষিত শ্রেণির’ বৈশিষ্ট্য।

ট্রাম্প অনেক ধনী এবং তিনি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়—ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার হোয়াটন স্কুল থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি পেয়েছেন। কিন্তু তিনি বইপত্র পড়েন না, বড় কোনো জ্ঞানেও দক্ষ নন।

আসলে মাগা ধারার লোকেরা শুধু নিজেরা অযোগ্য বলে যে শিক্ষিতদের ঘৃণা করেন, বিষয়টি এমন নয়। এর পেছনে শ্রেণিগত ক্ষোভও আছে।

শুধু ডিগ্রি বা ভালো সংগীতের রুচি থাকলেই সমাজে মর্যাদা পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে উচ্চমর্যাদা পেতে হলে জাতি, লিঙ্গ বা যৌনতা নিয়ে নির্দিষ্ট ‘প্রগতিশীল’ দৃষ্টিভঙ্গি থাকাও দরকার হয়। অনেকের কাছে এই প্রগতিশীলতা মানে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতা নয়, বরং নৈতিক উৎকর্ষের চিহ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, যারা এই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি বা স্বীকৃতি পায়নি, তারা এখন এই ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করতে চায়।

আমেরিকার অনেক সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে পড়েছে। এটি একেবারেই একাডেমিক বা শিক্ষাবিষয়ক স্বাধীনতার পরিপন্থী। রাজনীতিকে এখন অনেক সময় ধর্মবিশ্বাসের মতো করে দেখা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন এমন একধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু কিছু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অন্যদের মতকে সহ্য করতে চান না। বিশেষ করে, যাঁরা রক্ষণশীল মতাদর্শে বিশ্বাস করেন বা মাগা ধারার সমর্থক, তাঁদের অনেক সময় বিপক্ষ শিবির বা নৈতিকভাবে নিচু শ্রেণির মানুষ বলে দেখা হয়।

অনেক শহুরে শিক্ষিত অভিজাত মানুষ মনে করেন, যাঁরা গ্রামে থাকেন, বন্দুক রাখেন, খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস করেন বা ভালো বই পড়েন না, তাঁরা নিচু শ্রেণির মানুষ। এই শিক্ষিত শ্রেণির ধারণা রক্ষণশীলদের আহত করে; তাঁরা অপমান বোধ করেন। এ অপমানবোধ তাঁদের শিক্ষিত ও প্রগতিশীলদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন করে তোলে। এটিকেই ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন।

তবে ট্রাম্প বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে যে আক্রমণ চালাচ্ছেন, তা দিন শেষে সবার উপকারও করতে পারে। এটি মানুষকে আগের চেয়ে বেশি জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

* ইয়ান বুরুমা ডাচ-ব্রিটিশ লেখক, সম্পাদক ও প্রাবন্ধিক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল গার্ড’ কী, কখন এই বাহিনী মোতায়েন করা হয়

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটির লস অ্যাঞ্জেলেস শহর ও আশপাশের এলাকা। গত শুক্রবার থেকে সেখানে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল রোববার লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯২ সালের পর থেকে এই প্রথম ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করলেন দেশটির কোনো প্রেসিডেন্ট। সে বছর লস অ্যাঞ্জেলেসে শুরু হওয়া দাঙ্গা মোকাবিলায় ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছিল। রডনি কিং নামের একজন কৃষ্ণাঙ্গ গাড়িচালককে মারধরের অভিযোগ থেকে চার শেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তাকে খালাস দেওয়ার পর ওই দাঙ্গা শুরু হয়েছিল।

ন্যাশনাল গার্ড কী

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি অংশ ন্যাশনাল গার্ড। কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও প্রেসিডেন্ট—দুজনের অধীনেই কাজ করে এই বাহিনী। ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা মার্কিন সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর রিজার্ভ (সংরক্ষিত) সেনাদের অংশ। খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করেন তাঁরা। যুদ্ধ বা সহায়তা অভিযানের জন্য তাঁদের বিদেশে মোতায়েন করা হতে পারে। তবে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করে ন্যাশনাল গার্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলের (ওয়াশিংটন ডিসিসহ) নিজস্ব ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী রয়েছে। যেকোনো সময় যেকোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দিতে পারেন। এই বৈশিষ্ট্যটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখা থেকে ন্যাশনাল গার্ডকে আলাদা করে তুলেছে।

আগে যেসব অঙ্গরাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাধিকবার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। করোনা মহামারির সময় কিছু অঙ্গরাজ্যে মাস্ক তৈরি করা, বিভিন্ন স্থাপনা জীবাণুমুক্ত করা এবং করোনা টেস্ট কিট তৈরিসহ নানা কাজে সহায়তা করেছিলেন এই বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে দাঙ্গার পর নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের পাঠিয়েছিল কয়েকটি অঙ্গরাজ্য।

কেন্দ্রীয়ভাবে মোতায়েনের ঘটনা

যুক্তরাষ্ট্রে কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের অনুরোধ ছাড়া প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সরাসরি ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের ঘটনা বিরল। গতকাল রোববার ট্রাম্প ঠিক এই কাজটিই করেছেন।

১৮৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের ১১টি অঙ্গরাজ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি আলাদা সরকার গঠন করে। তখন ওই অঙ্গরাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সেনা মোতায়েন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। তবে বিংশ শতাব্দীর আগপর্যন্ত বর্তমান রূপ পায়নি ন্যাশনাল গার্ড।

লিংকনের পর ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেননি। সে বছর আরকানস অঙ্গরাজ্যে একটি স্কুলে বর্ণবৈষম্য অবসানের সময় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছিল।

ন্যাশনাল গার্ডের তথ্যানুসারে, ১৯৬৭ সালে ডেট্রয়েট দাঙ্গার সময় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাহিনীটির সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল। এ ছাড়া ১৯৬৮ সালে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে হত্যার পর এবং ১৯৭০ সালে নিউইয়র্কে ডাক পরিষেবা ধর্মঘটের সময় ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের মাঠে নামানো হয়েছিল।

ন্যাশনাল গার্ড না দিলে লস অ্যাঞ্জেলেস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিবাসনবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন অনেকে। তবে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি বেশ আস্থা রয়েছে ট্রাম্পের। তিনি বলেছেন, এমনটা না করা হলে লস অ্যাঞ্জেলেস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত।

লস অ্যাঞ্জেলেস ও এর আশপাশে এলাকায় এই বিক্ষোভ শুরু হয় গত শুক্রবার। গতকাল রোববার তা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এদিন রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। সড়ক অবরোধসহ গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল গার্ডের ২ হাজার সদস্যকে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের অনুরোধ সাপেক্ষে সেখানে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট। তবে এবার ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গাভিন নিউসমের অনুরোধ ছাড়াই বাহিনীটি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর এমন পদক্ষেপের বিরোধিতাও করেছেন নিউসম। তবে তা কানে তোলেননি ট্রাম্প।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়ায় সহিংস, উসকানিমূলক দাঙ্গা মোকাবিলার জন্য ন্যাশনাল গার্ড পাঠানোর সিদ্ধান্তটি চমৎকার ছিল। আমরা যদি এমনটা না করতাম, তা হলে লস অ্যাঞ্জেলেস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত।’

গভর্নর গাভিন নিউসম ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাসের সমালোচনা করে ট্রাম্প লেখেন, ‘চরম অযোগ্য গভর্নর গাভিন নিউসম ও মেয়র কারেন বাসের বলা উচিত ছিল, “ধন্যবাদ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আপনি খুবই অসাধারণ। আপনি ছাড়া আমরা কিছু করতে পারতাম না।” তবে তাঁরা আমেরিকা ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষের সঙ্গে মিথ্যা বলাকে বেছে নিয়েছেন।”

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভ দমনে গতকাল রোববার মোতায়েন করা হয় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভ দমনে গতকাল রোববার মোতায়েন করা হয় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের। ছবি: রয়টার্স

মঙ্গল গ্রহে বিশ্বের উচ্চতম আগ্নেয়গিরি চেয়েও উঁচু আগ্নেয়গিরির সন্ধান পেলো নাসা

২০০১ সালে মঙ্গলে পাঠানো নাসার মার্স ওডিসি অরবিটার লাল গ্রহের মেঘের মধ্য দিয়ে উঁকি দিয়ে ২০ কিলোমিটার উঁচু একটি আগ্নেয়গিরির অত্যাশ্চর্য ছবি তুলে এনেছে। নাসার ওডিসি অরবিটার লাল গ্রহের বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছে। তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলের ওই আগ্নেয়গিরির নাম আরসিয়া মনস। মঙ্গলের নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে এর অবস্থান। পৃথিবীর উচ্চতম আগ্নেয়গিরি মাউনা লোয়া  (হাওয়াইতে অবস্থিত) ভূপৃষ্ঠ থেকে ৯ কিলোমিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে। তুলনা করলে মঙ্গলের ওই আগ্নেয়গিরির কাছে প্রায় বামন মাউনা লোয়া। কারণ ১২০ কিলোমিটার প্রশস্ত, আরসিয়া মনস শীর্ষ শৃঙ্গ ক্যালডেরা পৃথিবীর অনেক আগ্নেয়গিরির চেয়েও বড়। ওডিসির নতুন ছবিতে দেখা গিয়েছে, লাল গ্রহের এই অংশটি সূর্য থেকে অনেকটা দূরে। তাকে ঘিরে রয়েছে মেঘের বলয়, যাকে বলা হচ্ছে ‘অ্যাফেলিয়ন ক্লাউড বেল্ট’।

এই অংশে ধুলো এবং বরফশীতল মেঘের অবস্থান টের পাওয়া যাচ্ছে। মঙ্গলের আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে এখানকার পরিবেশও বদলায়। ২রা মে তারিখে থার্মাল ইমিশন ইমেজিং সিস্টেম (THEMIS) ব্যবহার করে তোলা প্যানোরামা ছবিতে প্রথমবারের মতো লাল গ্রহের বিশাল আগ্নেয়গিরি দেখা গেছে। টেম্পের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জোনাথন হিল যিনি THEMIS অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলছেন, আমরা আরসিয়া মনসকে বেছে নিয়েছিলাম এই আশায় যে আমরা ভোরের মেঘের উপরে চূড়াটি দেখতে পাবো। এবং এটি আমাদের  হতাশ করেনি।

গবেষকরা বলেছেন যে, আরসিয়া মনসের উপর মেঘ বিশেষ করে ঘন থাকে যখন লাল গ্রহটি সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে, এই সময়কালকে বলা হয় অ্যাপেলিয়ন। নাসা জানিয়েছে, মঙ্গলের আবহাওয়া এবং ধুলো ঝড়ের মতো ঘটনা কীভাবে ঘটে তা বোঝার জন্য এই গ্রহের মেঘের ধরণ বোঝা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ওডিসি অরবিটারটি ২০০১ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং এটিকে  দীর্ঘতম চলমান মিশন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মঙ্গল পৃষ্ঠের ছবি  তোলার জন্য, অরবিটারটি কক্ষপথে থাকাকালীন ৯০ ডিগ্রি ঘুরতে পারে । ক্যামেরার এই অবস্থান  বিজ্ঞানীদের ধুলো এবং পানির বরফের মেঘের স্তর দেখতে সক্ষম করে , যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে  ঋতুর পরিবর্তনগুলো  পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অবস্থিত নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গ্রহ বিজ্ঞানী মাইকেল ডি. স্মিথ বলেছেন, দিগন্তের চিত্রগুলোতে আমরা সত্যিই কিছু উল্লেখযোগ্য ঋতুগত পার্থক্য দেখতে পেয়েছি। এটি আমাদের মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল সময়ের সাথে সাথে কীভাবে পরিবর্তিত  হয় সে সম্পর্কে নতুন তথ্য  দিচ্ছে।'

সূত্র : এনডিটিভি