Sunday, December 15, 2013

নাগরিক অভিমত- নির্বাচনের নামে দেশে একটা তামাশা হচ্ছে by রফিক-উল হক

নির্বাচনের নামে দেশে একটা তামাশা হচ্ছে। ৩০০ আসনের সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এমন আজগুবি নির্বাচন এর আগে কেউ কোথাও দেখেছে কি না, সন্দেহ আছে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও এ ব্যাপারে কিছুই বলছে না। বিএনপির নেতারা দেখি এখন সরকারি দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাতে কোনো দলই অবস্থান পরিবর্তন করবে—এমন আভাস পাওয়া যায় না। তা হলে এ আলোচনা কী জন্য, বুঝি না। এদিকে নির্বাচন তো যেকোনোভাবে হয়েই যাচ্ছে।
এরশাদ সাহেব কখন কী বলেন, কী করেন, তা বোঝা যায় না। তাঁর স্ত্রী, জাতীয় পার্টির আরেকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা বলছেন আরেক কথা। তাঁদের দলের অনেকের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হলো। অনেকের হলো না। কেন হলো, আর কেন হলো না, কেউ বলতে পারে না।
অন্যদিকে হরতাল-অবরোধে সারা দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন সাধারণ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। লুটপাটও হচ্ছে।
সব মিলিয়ে খুবই একটা খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সবাই এর ভুক্তভোগী হচ্ছি। আরও কত দিন ভুগতে হবে, কেউ জানে না।
নির্বাচন যেভাবে হচ্ছে, তা স্থগিত কিংবা বাতিল করাও এখন কঠিন। কারণ, নির্বাচন কমিশন এখন তেমন পদক্ষেপ নিলে যাঁরা ইতিমধ্যে নির্বাচিত হয়ে গেছেন বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পথে, তাঁরা তা চ্যালেঞ্জ করবেন। তাঁরা আদালতে যাবেন। তা নিয়ে সৃষ্টি হবে আরেক ধরনের জটিলতা।
এই পরিস্থিতির অবসান কীভাবে এবং কত দিনে হবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। সে কারণে সাধারণ মানুষ আরও বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ, তারা এই পরিস্থিতির অবসান চায়। দ্রুত জীবনযাত্রায় স্বাভাবিকতা ফিরে আসুক, সেটা চায়। সরকার সে জন্য কী করছে, তা দৃশ্যমান নয়।
দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে সাধারণ মানুষের শঙ্কা, আতঙ্ক দূর করতে ভূমিকা রাখা সব রাজনৈতিক দলের অবশ্যকর্তব্য। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। আমরা সরকারের এবং সব রাজনৈতিক দলের কাছে সেই দায়িত্বশীল আচরণ আশা করছি।
রফিক-উল হক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

সমঝোতার ভিত্তিতে টেন্ডার ভাগাভাগির মতো by হোসেন জিল্লুর রহমান

আগামী ৫ জানুয়ারি যে সাধারণ নির্বাচনের জন্য দিনক্ষণ নির্ধারিত আছে, সেই নির্বাচন ঘিরে প্রহসনের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এটা অনেকটা সমঝোতার ভিত্তিতে একাধিক ঠিকাদারের মধ্যে টেন্ডার ভাগাভাগির মতো হয়ে গেছে।

এ ধরনের নির্বাচন সরকারের বৈধতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। দেশে রাজনৈতিক অঙ্ক আরও ঘনীভূত হবে। বর্তমান সরকার এখনো বৈধতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সংকটে পড়েনি। কিন্তু যে ধরনের নির্বাচন হচ্ছে, তাতে এই নির্বাচনের পর সব মহল থেকে সরকারের বৈধতার প্রশ্ন উঠবে।
সেদিক বিবেচনায় আমরা বলতে পারি, বর্তমানে যে সংকট চলছে, তার চেয়ে আরও বড় সংকট ঘনিয়ে আসছে। সেই সংকট কীভাবে নিরসন করা যাবে, সে বিষয়ে বোধ হয় দেশবাসীর প্রস্তুত হওয়া দরকার।
এ ধরনের একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বর্তমান নির্বাচন কমিশনও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। তাদের অধীনে ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচন দেশবাসী মানবে কি না, সে প্রশ্ন এখন বড় হয়েই দেখ দিয়েছে।
আমাদের দেশে আশির দশকে অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী শাসনামলে দেখা গেছে ভোটারবিহীন নির্বাচন। অর্থাৎ নির্বাচন হবে, কিন্তু তাতে ভোটারদের প্রয়োজন নেই। এখন আবার আশির দশকের সেই বাস্তবতা ফিরে এসেছে। এবার যেটা হচ্ছে, সেখানেও ভোটারদের প্রয়োজন থাকছে না। বরং নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি এবার আরও একধাপ অনিয়মের দিকে এগিয়েছে, যেখানে কার্যত প্রার্থী থাকাও দরকার হচ্ছে না।
এবারের নির্বাচনে কে কোথায় প্রার্থী থাকবেন, তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতবেন, নাকি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আসবেন—এসবই নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের নামে এর চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে!
-সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

এমন হাস্যকর নির্বাচন মানুষ চায় না by রাশেদা কে চৌধূরী

দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন একটি হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের প্রজ্ঞাবান রাজনীতিকেরা এটা কী করছেন, তা বুঝতে পারছি না! তবে একজন ভোটার হিসেবে আমি এমন নির্বাচন কখনোই চাই না।
দেশের কোনো সাধারণ মানুষই এ রকম নির্বাচন চায় বলেও মনে করি না।

ভোটারবিহীন নির্বাচনের মতো প্রার্থীবিহীন এই নির্বাচন রাজনীতিকদের জন্য মোটেই সম্মানজনক হবে না। তেমনি জনগণের জন্যও এই নির্বাচন কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারবে না। সর্বসাধারণের কাছেও এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই এ ধরনের নির্বাচনের ফলাফলকে জনগণের রায় বলা বা মেনে নেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সারা পৃথিবীতে উন্নয়ন ও অগ্রগতির একটি মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ ধরনের একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন সেই উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে দেশের সব অর্জনকে ম্লান করে দেবে। এ ধরনের নির্বাচন দেখে নতুন প্রজন্ম রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরও বড় একটি আশঙ্কা জনমনে সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো প্রধান বিরোধী দল ছাড়া এ ধরনের একটি নির্বাচন কি দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারবে? এখন যে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, নির্বাচনের পর কি তার অবসান হবে? এটা শুধু আশঙ্কা নয়, জনমনের বিরাট বড় এক প্রশ্নও। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যে পারস্পরিক দোষারোপ ও কাদা-ছোড়াছুড়ি এই নির্বাচনকে ঘিরে চলছে, তার সুযোগ নিয়ে আরেক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই শক্তি সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সারা দেশে তারা জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত করে চলেছে। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রশক্তি তাদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। প্রধান বিরোধী দলও তাদের ব্যাপারে চুপ। এটা জাতির জন্য মোটেই মর্যাদার বিষয় নয়।

-সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

মিডিয়া বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে! by অমিত রহমান

দেশ জ্বলছে। পুড়ে ছারখার হচ্ছে জনপদ। ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস। মানুষ মরছে। এটা আর কোন খবর নয়। কতজন মারা গেল, তা-ও কেউ জানতে চায় না। কারণ, মৃত্যুর কাফেলা প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে।

নির্বাচনের নামে জনগণের সঙ্গে তামাশা

অর্ধেকের বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচনের ঘটনাকে জনগণের সঙ্গে তামাশা বলে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্টজনরা। আজগুবি এ নির্বাচন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বলেও তারা মত দিয়েছেন।

ন্যায় ও সত্যের জয়ধ্বনি

বধ্যভূমি
বাংলাদেশে একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের নিষ্ঠুরতা ছিল মর্মান্তিক, অধিকন্তু এর দুই নিষ্ঠুরতর দিক হচ্ছে নারীদের ওপর নেমে আসা নির্যাতন ও বুদ্ধিজীবী হত্যা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকাজে নারী নির্যাতনের গুটিকয় ঘটনা উঠে এলেও এর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সংঘটিত এই অপরাধের একধরনের স্বীকৃতি মিলেছে।
বুদ্ধিজীবী হত্যা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে আলী আহসান মুজাহিদের মামলায়, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের অপহরণ ও হত্যার ঘটনায়, গোলাম আযমের মামলায় এই হত্যাযজ্ঞে তাঁর ঊর্ধ্বতন দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে, কাদের মোল্লার মামলায় কবি মেহেরুননিসা ও সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবের হত্যার অভিযোগ উত্থাপিত ও প্রমাণিত হয়েছে; কিন্তু সামগ্রিকভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা যে উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে আলবদর বাহিনী সংঘটিত করেছে, তা আদালতের বিচারভুক্ত হয়েছে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে আনীত মামলায়। এই মামলায় ১১টি অভিযোগে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ ও হত্যার জন্য এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যালোচনা করে অবশেষে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আদালত রায় ঘোষণা দেন। এই রায় ইতিহাসের এক বিশাল দায় মোচন করল এবং রায়ের মধ্য দিয়ে আইনের পথে ইতিহাসের অনেক বড় সত্য উন্মোচিত হয়েছে। আদালত ১৮ জন বুদ্ধিজীবীর হত্যা প্রসঙ্গ বিবেচনাকালে এই হত্যাকে চিহ্নিত করেছেন ‘এক্সটারমিনেশন’ বা ‘নিশ্চিহ্নকরণ’ হিসেবে, যা ছিল ব্যাপক আকারে ও পাইকারিভাবে পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের নিদর্শন। আদালত সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলবদর বাহিনীর সম্পর্ক, যে বাহিনী কাজ করেছে গোপন হন্তারক সংগঠন হিসেবে। এই রায় সবার জন্য অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত, বর্বরতার মাত্রা ও গভীরতার ইঙ্গিত এখানে মেলে, তবে বড়ভাবে পাওয়া যায় এই নিষ্ঠুরতা পরিচালনার সাংগঠনিক কাঠামোর পরিচয়। আদালত যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিধি-বিধান অনুসরণ করেন, ক্ষেত্রবিশেষে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞতার আলোকে, সিদ্ধান্ত টেনেছেন, সেই পরিচয় নানাভাবে মেলে।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল অধ্যাপক শহীদ মুনীর চৌধুরীর ছেলে মিশুক মুনীরের, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তাঁর জবানবন্দি লেখা ছিল, কিন্তু অকালদুর্ঘটনায় প্রয়াত মিশুক মুনীরের আর আদালতে উপস্থিত হওয়া হলো না। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত ফৌজদারি মামলার বিধি-বিধান প্রচলিত নয়। আন্তর্জাতিকভাবেই এই আইন অভিযুক্তের প্রতি কঠোর, পীড়নের শিকার ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল। তাই লোকমুখে প্রচলিত কথা বা ধারণাও এই আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে। একইভাবে আদালত মনে করলে গরহাজির সাক্ষীর কোনো আনুষ্ঠানিক জবানবন্দি অথবা লিখিত বক্তব্য সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। সেই বিবেচনা থেকে মিশুক মুনীর-প্রদত্ত ভাষ্য ১৯৭৩ সালের আইনের ধারা ১৯(২) অনুসারে আদালত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আদালতের বিবরণী থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পরপর বঙ্গবন্ধুর সরকারের নির্দেশনায় আলবদর পরিচালিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়। পুলিশ কর্মকর্তা আবদুস সালাম তালুকদার এই তদন্ত পরিচালনা করেন এবং তিনি টাঙ্গাইলের দূর গ্রাম থেকে ধরে এনেছিলেন ইপিআরটিসির মাইক্রোবাসের চালক মফিজকে, যাঁর গাড়ি নিয়ে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীকে তুলে এনেছিলেন এবং আটজন বুদ্ধিজীবীকে মিরপুরে আশরাফুজ্জামান খান ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা কীভাবে হত্যা করে, সেটা মফিজ দেখেছিলেন। পরে মফিজের দেওয়া তথ্য অনুসারে মিরপুরের ইটখোলা থেকে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি, হত্যাকাণ্ডের ২২ দিন পর, সাতজনের পচা-গলা লাশ উদ্ধার করা হয়। মফিজ অনেক আগেই প্রয়াত, তবে আবদুস সালাম তালুকদার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বিস্তারিত বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছিলেন, বলেছিলেন মফিজের ভাষ্য।
এরপর বিচার শুরুর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করলেও সাক্ষী হিসেবে তাঁর বক্তব্য তাই আদালতে রয়ে গিয়েছিল, তেমনি যুক্ত হয়েছিল মফিজের ভাষ্য। বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এই কর্মকর্তাও বন্দী হয়ে বধ্যভূমিতে নীত হয়েছিলেন এবং সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, কীভাবে বন্দী অবস্থায় অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও মুনীর চৌধুরীর ওপর অত্যাচার চালানো হয়। তিনি আদালতে জানান, ১৫ ডিসেম্বর রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটার দিকে দুই ব্যক্তি হারিকেন হাতে তাঁদের ঘরে ঢোকে। পেছনে ছিল লোহার রড হাতে ১০ থেকে ১২ জন মানুষ। হারিকেনের আলোয় তিনি দেখেন, এই দুজন ব্যক্তি মুনীর চৌধুরীর কাছে গিয়ে বলে, ‘এত দিন তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মন্ত্র পড়িয়েছ, এবার আমরা তোমাকে কিছু মন্ত্র শেখাব।’ এরপর তারা প্রথম মুনীর চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর বই লিখেছেন কি না। একই প্রশ্ন করে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে। তারপর সঙ্গীদের বলে, ‘এরা হলো ভারতের চর, এদের আজ কতল করা হবে।’ এর পরই শুরু হয় এলোপাতাড়িভাবে দুজনকে প্রহার। রোমহর্ষক এসব সাক্ষ্য-প্রমাণের মধ্য দিয়ে আদালত তাঁদের রায়ে উপনীত হয়েছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের জীবনকৃতির যৎসামান্য পরিচয়দানের চেষ্টাও নেওয়া হয়েছে রায়ে।
বলা হয়েছে, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডেল-প্রাপ্ত ছাত্র, ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক এবং প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের সমর্থক। কিন্তু আরও অনেক কথা তো বাকি রয়ে যায় মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সম্পর্কে, আদালতে বিবেচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার আরও ১৭ বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে। নোয়াখালীর দূর গ্রামের মসজিদের ইমামের এই ছেলে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সারা বাংলায় কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে বৃত্তি পেয়ে পড়তে এসেছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখান থেকে বিএ পাস করেন বাংলায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে। বাংলায় তাঁর প্রাপ্ত সেই নম্বর আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেননি। ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদ্যাপনকালে কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বক্তৃতা করার জন্য। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর রক্তে বোধ হয় অন্য স্পন্দন ছিল। হাজার হলেও মসজিদের ইমামের সন্তান, তিনি অনুভব করতে পারেন স্রষ্টার মাহাত্ম্য ও সৃষ্টির বিশালতা, জাগতিক বিবিধ আয়োজনের তুচ্ছতা। আর তাই তো, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষা দেওয়ার সব আয়োজন ও মোহ ত্যাগ করে চলে যান শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীতে পড়বেন বলে; যে প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রির কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তখন ছিল না, শিক্ষার বাজারে তার কানাকড়ি মূল্য নেই। শান্তিনিকেতনে সবাই তাঁকে জেনেছিল ‘মুখোজ্জ্বল’ হায়দার চৌধুরী বলে। কেন এমন নামকরণ, তার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন।
দেশভাগের পর ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতায় তিনি যোগ দেন। পরে বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁকে নিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু কাজে যোগদানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ডিগ্রি। কাগজে-কলমে তিনি কেবল একজন গ্র্যাজুয়েট মাত্র, এমএ পাসের সনদ তাঁর নেই, বিশ্বভারতীর সেকালে প্রাপ্ত ডিগ্রি তো স্বীকৃত নয়। অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন এমএ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিয়ে দিতে। বিষয় তো তাঁর সবই জানা। কেবল পরীক্ষায় বসলেই হবে, কোনোরকমে পাস করে ডিগ্রি হাতে পেলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে আর বাধা থাকবে না। এই পরীক্ষা দিতে মোটেই সম্মত ছিলেন না মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। কেননা, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষালয়ের সনদ তাঁর কাছে ছিল অনেক উচ্চ মূল্যের। শেষ পর্যন্ত সবার পীড়াপীড়িতে, পরিবারের কারণে তিনি অনিচ্ছুক পরীক্ষার্থী হতে বাধ্য হলেন এবং পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ‘সদাশিব’ বলে বাংলায় যে শব্দ রয়েছে, তার অর্থ সদা-বিনম্র, অল্পেই তুষ্ট এবং এমন একজন ব্যতিক্রমী মানুষই ছিলেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। রোগা-পাতলা, পলকা শরীর। কেবল চোখ দুটো বিশাল, যেন দুচোখ ভরে তিনি আহরণ করবেন সৃষ্টিসুধা, জীবনের আনন্দ, আর কিছুই তাঁর কাম্য নয়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও এই বোধ সঞ্চারে তিনি নিবেদিত ছিলেন, এমন মন্ত্রই তিনি সঞ্চার করে চলছিলেন অকাতরে। তাঁর জীবনের শেষ রাতটুকু, শেষ প্রহর কেমন কেটেছে, লোহার রডের আঘাতের পর আঘাত তাঁর শরীরে কী বিপুল যন্ত্রণার জন্ম দিয়েছিল, বধ্যভূমিতে যখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো,
তখন তাঁর মনে কোন বোধ সঞ্চারিত হয়েছিল—সেসব কিছু আদালত বলেননি। তবে বিচারের রায়ের ছত্রে ছত্রে আছে তা অনুধাবনের সূত্র, আছে এমন বীভৎস, নারকীয় হত্যার কার্যকারণ বুঝতে পারার অবলম্বন। ঘাতক অসহিষ্ণু হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের সঞ্চারিত মানবিক মন্ত্রে, তাঁদের দ্বারা প্রদত্ত রাবীন্দ্রিক শিক্ষায়, তাঁদের বাঙালিয়ানায়, অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। তাই তো তারা হয়ে উঠেছিল সদলবলে অমন নিষ্ঠুর ঘাতক। গণহত্যাবিষয়ক খ্যাতিমান গবেষক গ্রেগরি স্ট্যানটন গণহত্যার আটটি ধাপ সূত্রায়িত করেছিলেন, এর সূচনা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে আলাদা বা অপর হিসেবে চিহ্নিত করে, কলঙ্কিত করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা সঞ্চার দ্বারা। এই ঘৃণারই প্রতিফলন আমরা দেখি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে। আর গণহত্যার সপ্তম ধাপ হচ্ছে ‘এক্সটারমিনেশন’, যা রূপ নেয় জেনোসাইডে অথবা ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটিতে। লক্ষণীয় যে গণহত্যার অষ্টম একটি ধাপও চিহ্নিত করেছিলেন গ্রেগরি স্ট্যানটন। তাঁর মতে, সর্বশেষ এই ধাপ হচ্ছে ডিনাইয়াল বা অস্বীকৃতি। যারা গণহত্যাকারী, তারা অস্বীকার করে যে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে এই সূত্রগুলো মিলে যায় আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে, যারা গণহত্যা ঘটিয়েছে, তারা ধর্মকে অবলম্বন করে ঘৃণা সঞ্চার করেছিল অন্যের বিরুদ্ধে, কেবল অন্য ধর্ম নয়, নিজ ধর্মের ভিন্নমতাবলম্বী মানবতাবাদী অসাম্প্রদায়িক মানুষও হয় ঘৃণার উদ্দিষ্ট। সবশেষে গণহত্যাকারীরা বিচারহীনতা চাপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রচার করছিল গণহত্যার অস্বীকৃতি, ৩০ লাখ মানুষের জীবনদান নিয়ে করেছ রঙ্গ-তামাশা এবং ক্রমান্বয়ে বিরামহীনভাবে অপমানে বিদ্ধ করেছে জাতিকে। আজ সব মিথ্যার আবরণ ঘুচিয়ে ন্যায় ও সত্যের জাগরণ ঘটল বিচারের মাধ্যমে।
রায় বলছে অনেক কথা, শুনতে কি পাই আমরা?
মফিদুল হক: লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

কোথায় র‌্যাব, কোথায় পুলিশ, কোথায় সরকার?

১৯৭১ সালে যে স্বপ্ন ও অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল গণতন্ত্র ও সুশাসন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও আমরা সেই গণতন্ত্র ও সুশাসনের দেখা পাইনি। গণতন্ত্র মানে আইনের শাসন, জনগণের শাসন। গণতন্ত্র মানে পাঁচ বছর পর পর এক দিনের ভোট নয়। গণতন্ত্র মানে স্বৈরাচারের বা রাজাকারের সঙ্গে হাত মেলানো নয়। গণতন্ত্র মানে জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য জনগণের শাসন। কিন্তু বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীরা মনে করেন, গণতন্ত্র হলো তাঁদের দ্বারা, তাঁদের জন্য জনগণের নামে শাসন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে জনগণ বরাবরই অনুপস্থিত। ৩০০ সংসদীয় আসনের বেশির ভাগের জনপ্রতিনিধিই ‘বহিরাগত’। তাঁরা এলাকায় থাকেন না। শীতের পাখির মতো নির্বাচনের সময়, ঈদে অথবা অন্য কোনো পর্বে এলাকায় যান। আমরা প্রতিবার ৩০০ নতুন জমিদার তৈরি করি। ভারতে অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আছেন, যাঁদের দিল্লিতে নিজস্ব বাড়ি নেই। মন্ত্রিত্ব চলে গেলে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। আর আমাদের মন্ত্রী-সাংসদ তো বটেই, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানেরও ঢাকায় বাড়ি না থাকলে ইজ্জত থাকে না। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতা ছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু নেতা একা দেশ স্বাধীন করেননি।
জনগণ তাঁর সঙ্গে ছিল, তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিল বলেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। কতিপয় রাজাকার আলবদর ছাড়া সর্বস্তরের মানুষই সেই যুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখনকার নেতা-নেত্রীরা দেশ শাসনে জনগণের ভূমিকা চান না। একজন জামায়াত-শিবির নামের দানবের কাঁধে সওয়ার হয়েছেন, আরেকজন স্বৈরাচারের হাত ধরে গণতন্ত্র রক্ষা করতে চাইছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা অসম্ভব হতো, এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি বেঠিক নয় যে আওয়ামী লীগই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি বর্তমান ভোটের রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছে। শাহবাগে এবং সারা দেশের গণজাগরণ মঞ্চে হাজার হাজার তরুণ জমায়েত হয়েছে, যাদের অনেকে আওয়ামী লীগকে সমর্থন না করেও যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল। নির্বাচনী রাজনীতি বড় জটিল ও কুটিল। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে কেউ শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলায়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচার হলো সমগ্র জাতির দাবি। ৪২ বছরের দায়মোচন। সেই দায়মোচনে আওয়ামী লীগের সমর্থক মানুষ যেমন আছে, তেমনি আছে আওয়ামী লীগের বাইরের মানুষও। কিন্তু আওয়ামী লীগ বরাবরই ‘যারা আমার সঙ্গে নেই তারা জামায়াত-শিবির’—এই নীতিতে বিশ্বাস করে। ফলে ২০০৮ সালে বিপুল ভোটে বিজয়ী দলটি এখন পরাজয়ের শঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত।
গণতন্ত্রে জনগণেরই নিয়ামক শক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতারা বরাবর তাদের দূরে রেখেছে। কাছে টেনেছে দলীয় মাস্তান, লাঠিয়াল, চাঁদাবাজ ও গডফাদারকে। পাঁচ বছর পর পর মানুষ যে ভোট দেওয়ার অধিকারটি আদায় করেছিল নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, তা-ও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এ জন্য কেবল সরকার নয়, বিরোধী দলও দায়ী। তারা মুখে যতই বলুক না কেন, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়—মনে মনে পোষণ করে, দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। ১৯৭১ সালের এই ডিসেম্বর মাসেই আমরা বিজয় অর্জন করেছিলাম প্রবল পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের পরাজিত করে। সেই পরাজয় ছিল সত্যের কাছে মিথ্যার, ন্যায়ের কাছে অন্যায়ের। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে রাজাকার আলবদরদের পরাজয়। কিন্তু আজ কি আমরা সমাজের সেই দানবীয় অপশক্তিকে পরাস্ত করতে প্রস্তুত আছি? যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মাধ্যমে অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া গেলেও বর্তমানে যে অন্যায় চলছে, তার প্রতিকারের জন্য আরও কঠিন সত্য সাধনায় আমাদের নিয়োজিত হতে হবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর যেখানে সারা দেশের মানুষ স্বস্তিবোধ করার কথা, যেখানে বিজয় মিছিল বের করার কথা, সেখানে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
আর জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা দেশজুড়ে নাশকতা চালাচ্ছে। আগুন দিয়ে মানুষ পোড়াচ্ছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। একজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর তাদের নৈতিকভাবে পরাস্ত, অবনত ও অনুতপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ভোটের রাজনীতি তাদের আরও উৎসাহিত করেছে।এই বিজয়ের মাসে সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কখন পেট্রলবোমা ছুড়ে হত্যা করা হয়, কখন আগুনে ঝলসে যায় পুরো দেহ। কখন গীতা সেনের মতো উচ্চারণ করতে হয় ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না। সুস্থ সরকার চাই।’ এই বিজয়ের মাসে কী করে মৌলবাদের দলটি সারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফেলল? কী করে জনজীবনের স্বস্তি কেড়ে নিল? কী করে তারা বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে? কী করে বিচারপতি ও মন্ত্রীদের বাড়িতে হামলা চালায়? তাহলে সরকার কী করছে? জামায়াতের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করার পরও এই শক্তি তারা কোথায় পায়? এই বিজয়ের মাসে আমরা কোনো অপশক্তির অট্টহাসি দেখতে চাই না, সেই অট্টহাসির সুযোগ যাঁরা করে দিয়েছেন, আমরা তাঁদের রাজনীতির চিরদিন বিরোধিতা করব। কিন্তু এর বিপরীতে সরকারকেও জনগণের নিরাপত্তায় এগিয়ে আসতে হবে। কেবল পুলিশ দিয়ে, র‌্যাব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা যায় না। এ জন্য চাই নৈতিক শক্তি। চাই সত্যের শক্তি। সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারে যে নৈতিক শক্তি অর্জন করেছিল, একতরফা নির্বাচনে তার অবসান হয়েছে।
সর্বদলীয় সরকার সর্বদলীয় হারিকিরিতে পরিণত হয়েছে। যে কারণে সাবেক স্বৈরাচার গণতন্ত্রের এবং সাবেক রাজাকার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের আওয়াজ তোলার সাহস পাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার যে বিশাল একটি আয়োজন, বিরাট কর্মযজ্ঞ, সেটি সরকার কখনোই মানতে চায়নি। তারা চেয়েছে, যেনতেন প্রকারে একটি বিচার শুরু করতে। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ কিংবা কৌঁসুলি নিয়োগে তারা যথেষ্ট গাফিলতি করেছে, সে কথা উঠে এসেছে আদালতের রায়েই। এ ধরনের একটি বিচারে সব শ্রেণী-পেশার মুক্তবুদ্ধির মানুষকে একত্র করতে পারলে বিচারের রায় ঘোষণার পর জামায়াত-শিবির চক্র সারা দেশে যে প্রচণ্ড সহিংসতার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা পারত না। বিরোধী দল আন্দোলনের নামে যেসব নাশকতার ঘটনা ঘটাচ্ছে, তার নিন্দা করি, বিচার দাবি করছি। একই সঙ্গে সরকার প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে যে আচরণ করছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা সংবিধান রক্ষার নির্বাচন চাই না, কার্যকর নির্বাচন চাই। আমরা আন্দোলনের নামে নাশকতা চাই না, নাশকতা রোধের আন্দোলন চাই। মৌলবাদী শক্তির ওপর ভর করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া যায় না। কেননা মৌলবাদীশক্তি কখনোই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। একাত্তরে করেনি, ২০১৩ সালেও করবে না। এই ডিসেম্বর মাসেই নির্বাচন নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি নয়, মারমুখী। একে অন্যকে পারলে নিঃশেষ করে দেয়। এই নিঃশেষকরণ প্রক্রিয়ার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আর গণতন্ত্র মানলে, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শের কথা ম্বর। আমাদের গর্বের ও আনন্দের মাস। একাত্তরে এই মাসে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম। এই মাসে সেই অপশক্তি বিজয়ের অট্টহাসি হাসছে।
এই মাসে সারা দেশে তারা ভয়াবহ তাণ্ডব চালাচ্ছে। এশুনতে হবে। গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না। বিজয়ের মাসে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার দণ্ড কার্যকর হয়েছে। এটি যেমন ন্যায়ের বিজয়, তেমনি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সূচনাও। বিজয়ের মাস ডিসেত দিন ঢাকার বাইরে তাদের নৃশংসতা দেখেছি। গতকাল ঢাকা শহরকেও তছনছ করে দিয়েছে। এটা কী করে সম্ভব হলো? কোথায় পুলিশ? কোথায় র‌্যাব? কোথায় সরকার? সরকারের দাবি, বিরোধী দলের আন্দোলনের সঙ্গে জনগণ নেই। তাহলে সরকারের সঙ্গে কি জনগণ আছে? থাকলে এভাবে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা সারা দেশে ও রাজধানীতে নাশকতা চালাতে পারত না। এই বিচারের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে। সমর্থন আছে ফাঁসির রায়ের প্রতিও। তার পরও এ রকম নাশকতা ঘটানোর সুযোগ কীভাবে পেল দুর্বৃত্তরা? রাষ্ট্রের সরকারের, সমাজের কি কিছুই করার নেই? প্রতিবারই ঘটনার অনেক পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে আসে। তাদের দায়িত্ব নিশ্চয়ই পোড়া গাড়ির গন্ধ শোঁকা নয়। গাড়ি যাতে না পোড়ে, মানুষ যাতে না পোড়ে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া। মানুষ তখনই বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, যখন দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পাশে নেই। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কাদের মোল্লার ফাঁসির পর পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা কি সরকারের নীতিনির্ধারক কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আঁচ করতে পারেনি? পারলে কেন তারা ব্যবস্থা নেয়নি? এ ব্যর্থতার দায় কে নেবে? এর আগে অতি-উৎসাহী দুই প্রতিমন্ত্রী ঘটা করে ফাঁসির দিনক্ষণ দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন। এখন তাঁদের তৎপরতা নেই কেন? কেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ঢাকা শহরে লাখো মানুষকে নিয়ে এই জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শান্তিমিছিলবের করতে পারল না?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

বাংলাদেশ প্যারাডক্স

বাংলাদেশে আবার সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছর পর পর আসে এই রাজনৈতিক সংকট। ব্যাপারটা টের পাওয়া যায় দেশটিতে বর্ষাকালের আগমনের মতোই, তবে অতটা একঘেয়েভাবে নয়। এমনটা ঘটার কারণ, দেশটির সংবিধানে পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং সেই নির্বাচনই সংকট নিয়ে আসে। কারণ, সংশ্লিষ্ট দলগুলো নির্বাচনে আবার জয়লাভের চেষ্টায় কোনো সুযোগই নষ্ট করে না, সেটা আইনি বা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হোক আর না হোক। বিরোধী দলের ভূমিকাও কোনো অংশে কম নিন্দনীয় নয়। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তাদের জন্য যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক, নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিতে তারা সচেষ্ট থাকে। সহিংসতা এবং কখনো কখনো অতিমাত্রায় সহিংসতার বিষয়টি থাকে উভয় দলের জন্যই নির্বাচনী লড়াইয়ের কৌশল হিসেবে। আর নির্বাচনী রাজনীতির যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দলই পুনর্নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যেতে পারেনি। কারণ, প্রতিটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ড এমন ছিল যে ভোটাররা বিরোধী দলকে ক্ষমতায় গিয়ে ভালো কিছু করে দেখানোর একটি সুযোগ দিতে উন্মুখ হয়ে থাকেন। তবে ভোটাররা সব সময়ই হতাশ হন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর সব দেশের রাজনীতিতে যেমনটা হয়, আশা বরাবরই অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যায়। এ বছরও তা-ই: জনমত জরিপ বলছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিরোধী দলই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে; আর সরকার তাদের ক্ষমতার পুরোটাই ব্যবহার করেছে এবং সম্ভবত যদি সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টকে আক্ষরিক অর্থেই দেখা হয়, ক্ষমতায় থাকার জন্য সরকার এমন অনেক কিছুই করেছে, যা আইনসিদ্ধ নয়। সম্প্রতি নির্বাচন-প্রক্রিয়া নিয়ে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি বিরোধী দলকে চালিত করেছে নির্বাচন বয়কটের হুমকি দিতে এবং ঢাকায় সহিংস অবরোধ পালনে। বিরোধী দলের অনুমান, রাজনৈতিক ব্যবস্থার অর্ধেকের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হলে তা অন্তত অর্ধেক ভোটার ও বহির্বিশ্বের কাছে অবৈধ বলে গণ্য হবে। এদিকে সহিংসতায় প্রাণহানি বাড়ছেই, কেবল রাজনীতিসংশ্লিষ্ট লোকজনই নয়, নির্দোষ লোকজনও এর শিকার হচ্ছে। তবু সরকারের মধ্যে সমঝোতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়িক নেতারা, সুশীল সমাজের অধিকাংশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমঝোতার জন্য প্রধান দুই দলের নেতাদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে আসছে। সুশীল সমাজের অনেকে রাজনীতি থেকে একটি ‘অবকাশ’ (রিসেস) চায়, যার উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১) পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিতকরণ;
২) একটি ‘পুনর্গঠনমূলক বিরতি’, যা একটি সামরিক হস্তক্ষেপ ও টেকনোক্র্যাট সরকারেরই অপর নাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে এই সরকার। এ রকম ব্যবস্থা আগে সফল হয়নি, তাই এখন সেটা কেন কাজ করবে? সম্ভবত এর উত্তর রয়েছে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ নামের একটি ধাঁধার মধ্যে। এই প্যারাডক্সটি হচ্ছে বাংলাদেশ আধুনিকায়ন তত্ত্বকে উপেক্ষা করে, যা অধিকাংশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সহজ কথায়, এই তত্ত্ব অনুযায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উচ্চ হার বজায় রাখা, দারিদ্র্যের নিম্ন হার, শিক্ষা, সাক্ষরতা, গণস্বাস্থ্য প্রভৃতি সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সঙ্গে রাজনৈতিক উন্নয়ন যুক্ত রয়েছে। অন্য কথায়, আয় ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জোয়ার সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেছে এবং মধ্যবিত্ত, গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ও অগ্রগতির মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধি অপরিহার্যভাবে আসবে এবং গণতন্ত্র নিজেও এগিয়ে যাবে। এই উপসংহারের পক্ষে প্রায়োগিক প্রমাণ নেই, বরং বিপক্ষে অনেক প্রমাণ রয়েছে (চীন, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশ)। বাংলাদেশ জিডিপিতে প্রায় ২০ বছরে ৫ থেকে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে; দেশটির বিভিন্ন সামাজিক সূচক ভারতের তুলনায় ভালো (এবং পাকিস্তানের চেয়ে সামগ্রিকভাবে ভালো) এবং দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র শ্রীলঙ্কাই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তাই কী কারণে দেশটি কর্তৃত্ববাদী/গণতান্ত্রিক পথ ধরে পেছনের দিকে হেঁটে আরও কর্তৃত্ববাদী একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে? নিশ্চিতভাবে প্রথম কারণটি হচ্ছে আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র,
যাতে ভারসাম্য ও প্রকৃত গণতন্ত্রের ঘাটতি রয়েছে। এই আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অন্তঃসারশূন্য করে দিয়েছে এবং সেগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের (প্রধান দুটি দলের মধ্যে) কৌশল বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত করেছে সম্প্রসারণশীল অর্থনীতি থেকে নিজেদের আর্থিক সুবিধা আদায় করে নেওয়ার জন্য। বর্তমান সংকট নিয়ে বিদেশিদের অধিকাংশেরই প্রতিক্রিয়া এ রকম যে, ঘটনাপ্রবাহ এবারও আগের বছরগুলোর মতোই হবে। বিগত সংকট মুহূর্তগুলোতে সরকারি দলটি সব সময়ই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় এবং বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে। এর ফলে কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলেও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে ইতিহাস সব সময় নিজেকে পুনরাবৃত্ত করে না। সরকার যদি সত্যিই তার পরিকল্পিত একদলীয় নির্বাচনের পথে এগিয়ে যায়, এর ফলে সহিংসতার যে সূত্রপাত হবে তা সরকারের পতনঘটাতে পারে অথবা আরেকটি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে; যাতে বিরোধীদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুঃখজনকভাবে এটাই হবে সবচেয়ে ভালো পরিণতি। কারণ, বিকল্পটি আরও খারাপ—একটি সরকার—দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকারগ্রস্ততার কারণে, এমন একটি অবস্থায় রয়েছে, যা বিরোধী দলকে বলপূর্বক দমন করে একটি একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এই নির্বাচন, আগে যা কিছু হয়েছে তার বদলে, উপমহাদেশে সম্পূর্ণ নতুন কিছুর ইঙ্গিত নিয়ে আসতে পারে।

ব্যুরো থেকে কমিশন : অর্জন নাকি বিসর্জন? by ইকতেদার আহমেদ

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ১৯৫৭-এর মাধ্যমে দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। একজন মহাপরিচালক এবং একাধিক পরিচালক সমন্বয়ে ব্যুরো গঠিত হয়েছিল। ব্যুরোর মহাপরিচালক ও পরিচালকরা সরকারের বিভিন্ন বিভাগ প্রধানত, প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ থেকে প্রেষণে (ডেপুটেশন) নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নং ১৯৭-এ উল্লেখ রয়েছে, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ কোনো সরকারি কর্মচারী যারা সরকারের অনুমোদন ব্যতিরেকে অপসারণযোগ্য নন তারা সরকারি দায়িত্ব পালন সংশ্লেষে কোনো অপরাধ করে থাকলে সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে কোনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির এ বিধানটি ব্যুরো কর্তৃক তদন্ত কার্য সমাপনান্তে অভিযোগপত্র বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করায় কোনো আদালত ব্যুরো কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগপত্র সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারত না। ব্যুরো কর্তৃক তদন্তের ক্ষেত্রে অভিযোগপত্র দায়ের পরবর্তী সরকারের পূর্বানুমোদনের বিধান ব্যুরোর স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হতো এবং এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ব্যুরোর বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত কার্যকেও প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দিত।
পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পর প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ প্রণীত হয় এবং পরবর্তীকালে এ আইনসহ দণ্ডবিধির অধীনে কৃত কতিপয় অপরাধ দুর্নীতি দমন আইন ১৯৫৭-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য করা হয়। সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যুরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারায় এবং কার্যকর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন বাধা হিসেবে দেখা দেয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সার্থকভাবে প্রতিরোধের লক্ষ্যে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা অনুভূত হতে থাকে। এরই ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর মাধ্যমে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ কমিশন তিনজন কমিশনার সমন্বয়ে গঠিত এবং কমিশনারদের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
কমিশনারদের নিয়োগ বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য আইনে পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটির বিধান রাখা হয়েছে। এ পাঁচ সদস্য হলেন- (ক) প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারক, (খ) প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, (গ) বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, (ঘ) সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান এবং (ঙ) অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের মধ্যে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের বিচারককে কমিটির সভাপতির দায়িত্ব প্রদানপূর্বক বলা হয়েছে, কমিটি সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দু’জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে নিয়োগ প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরণ করবে।
আইনে কমিশনারদের অপসারণ বিষয়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না।
কমিশনারদের যোগ্যতা বিষয়ে যদিও আইনে বলা হয়েছে- আইনে, শিক্ষায়, প্রশাসনে, বিচারে বা শৃংখলা বাহিনীতে অন্যূন ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি কমিশনার হওয়ার জন্য যোগ্য হবেন, কিন্তু কমিশন প্রতিষ্ঠা অবধি এ যাবৎকাল পর্যন্ত যে চারজন কমিশনের চেয়ারম্যান ও ছয়জন কমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের সবার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত হওয়ার পর কমিশনে তাদের নিয়োগ ঘটেছে। চারজন চেয়ারম্যানের মধ্যে প্রথমোক্ত জন ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, দ্বিতীয় জন ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদধারী অবসরপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান, তৃতীয়জন ছিলেন সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব এবং চতুর্থজন যিনি বর্তমানে কর্মরত, তিনি সরকারের একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব।
এটি স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বর্তমানে আমাদের দেশের প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষ আওয়ামী ও বিএনপি এ দুটি ধারায় বিভক্ত। এ বিভক্তি থেকে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনোটিই মুক্ত নয়। তাই দুদক প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেছে, যখন যে দল ক্ষমতায় ছিল সে দলের মতাদর্শের প্রতি অনুগত ব্যক্তিদের কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাছাই কমিটির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দলীয় সরকারের আকাক্সক্ষার বাইরের কোনো ব্যক্তি কমিটির সুপারিশে স্থান লাভ করতে পারেন না। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় সুপারিশকৃত দু’জনের একজন কমিটির আকাক্সক্ষায় স্থান লাভ করেছেন, সেক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শানুযায়ী নিয়োগ কার্যটি সমাধা হওয়ায় দলীয় সরকারের অধীনে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষার বাইরে যাওয়ার সুযোগ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত।
কমিশনারদের অপসারণ পদ্ধতি উচ্চ আদালতের বিচারকদের অনুরূপ হওয়ায় তারা দলীয় সরকারের সময় দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ লাভ করলেও তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কিছু চাঞ্চল্যকর বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম যথা- শেয়ার কেলেংকারি, হলমার্ক কেলেংকারি, পদ্মা সেতু কেলেংকারি ও রেলের কালোবিড়াল কেলেংকারি অবলোকনে দেখা যায়, কমিশন যে কোনো কারণেই হোক সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী সাব্যস্তে তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে কমিশনকে অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনা বিষয়ে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাতে আগের দুর্নীতি দমন আইন ১৯৫৭-এর অতিরিক্ত এ আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে বর্ণিত সহায় সম্পত্তির ঘোষণায় অসঙ্গতি ও জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত সম্পত্তির দখলসহ দণ্ডবিধির ১০৯, ১২০বি ও ৫১১-এর অপরাধসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, আগের দুর্নীতি দমন আইনের মতো বর্তমান দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে দণ্ডবিধির ১৬১-১৬৯, ২১৭, ২১৮, ৪০৮, ৪০৯ ও ৪৭৭ক-এর অপরাধসমূহ শাস্তিযোগ্য। সে নিরিখে বলা যায়, বর্তমান দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭সহ দণ্ডবিধির যেসব ধারার অপরাধ শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে তাতে দেখা যায় এ আইনটি সরকারি কর্মকর্তাসহ সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কমিশনার, মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী আইন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমকে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রেও আইনটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সরকারি কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল পরবর্তী মামলা বিচারার্থে গ্রহণের উদ্দেশ্যে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারায় উল্লিখিত বিধানের অবলুপ্তি। এ অবলুপ্তিতে যে শুধু কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্য পরিচালনা স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করার জন্য সহায়ক হয়েছে তাই নয়, বরং মামলা বিচারার্থে গ্রহণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগে ১৯৭ ধারার বাধা অপসারিত হওয়ায় স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ উন্মোচিত হয়েছে। কমিশন প্রতিষ্ঠার পর মামলা বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের বিধানের অবসান কমিশনের কার্যক্রম স্বাধীনভাবে পরিচালনাসহ কমিশন কর্তৃক দায়েরকৃত মামলাসমূহের বিচারকার্য স্বাধীনভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অর্জন। এ অর্জনটিকে কমিশন যখন সার্বিক ও সফলভাবে কাজ করার জন্য সহায়ক বিবেচনায় এর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও বেগবান করার লক্ষ্যে কমিশন আইনে কতিপয় সংশোধনী আনার জন্য দীর্ঘ তিন বছরের অধিককাল চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, তখন আকস্মিকভাবে আদালত কর্তৃক মামলা বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের বিধানের পুনঃপ্রবর্তনকে কমিশনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ আইনাঙ্গন ও দুর্নীতি নির্মূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত অর্জনকে বিসর্জন হিসেবে দেখছেন। সংশোধিত আইনে মিথ্যা মামলা বিষয়ে যে বিধান করা হয়েছে তাতে উল্লেখ রয়েছে, মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে দুদকের কর্মকর্তাদের অপরাধের তদন্ত পুলিশ পরিচালনা করবে।
দুদকের মামলাকে মিথ্যা গণ্যে পুলিশ কর্তৃক তদন্তের যে বিধান করা হয়েছে তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমাদের দেশের প্রভাবশালীরা যেভাবে ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্যে বস্তুনিষ্ঠ মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন সে দৃষ্টিকোণ থেকে দুদকের একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রভাবশালীদের মামলার ক্ষেত্রে সব সময় স্বাধীনভাবে তদন্তকার্য পরিচালনায় শংকিত থাকবেন। বস্তুত এ বিধানের অন্তর্ভুক্তি দুদকের সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সুষ্ঠুভাবে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে।
এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার যে বিধান রয়েছে তার সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের আবশ্যকতা সাংঘর্ষিক এবং কমিশন আইনে সংবিধানের সঙ্গে এ ধরনের কোনো সাংঘর্ষিক বিধানের অন্তর্ভুক্তি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত ও যথার্থ বলে বিবেচিত হতে পারে না। তাছাড়া সংবিধানে উচ্চ আদালত ও নিু আদালত উভয় আদালতের বিচারকদের বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীন মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, সংবিধান অনুযায়ী বিচারকরা বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীন হয়ে থাকলে মামলা বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন সে স্বাধীনতার অন্তরায় নয় কি?
আইনের দৃষ্টিতে সমতা শুধু আমাদের সংবিধানে নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের দিক থেকেও সুদীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন দেশ ও সমাজে অনুসৃত হয়ে আসছে। তাই একটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও কার্যকর করার জন্য মামলা বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের যে বৈষম্যমূলক বিধানের অবসান ঘটিয়ে কমিশন প্রতিষ্ঠাকালে তাকে অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছিল, কমিশনের দীর্ঘ ৯ বছরের অধিক পথ পরিক্রমার পর সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসহ সার্বিকভাবে দেশের জনমানুষের আকাক্সক্ষার বিপরীতে ওই বিধানের অন্তর্ভুক্তি বিসর্জন বৈ অন্য কিছু কি হতে পারে!
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

স্বাধীনতা অর্জনের মাস, বাঙালির চেতনারও বিজয়ের মাস by মাহমুদুল বাসার

বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন বলে মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তিকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম আমরা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল আধুনিক, গণতান্ত্রিক, সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিতে। এ কারণেই আমরা ভারত-রাশিয়াসহ বিশ্ববিবেকের সমর্থন পেয়েছিলাম। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌল কারণ, দর্শন ও প্রেক্ষাপট বিশ্ববিবেকের কাছে তুলে ধরেছিলেন। বলেছিলেন, আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, আমরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছি, আমাদের ক্ষমতা পাওয়ার কথা, সেখানে আমাদের বুকে চালানো হয়েছে গুলি। এখন আর আমাদের পিছু হটার উপায় নেই যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা ছাড়া। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মুজিবনগর সরকার গঠন করেছিলেন। তারাই নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এ জন্য মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমের কথাটি অত্যন্ত মূল্যবান। ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ কোনো সামরিক অভিযান নয়- স্বাধীনতার যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনো স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে পারে না। মুক্তির সশস্ত্র চূড়ান্ত যুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হয় না।’
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল আমাদের স্বাধীনতার ইশতেহার। বহুমুখী তাৎপর্যপূর্ণ। হটকারিতাকে পরিহার করার জন্য জিন্নাহর মতো ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা না করে তিনি কৌশলে শব্দচয়ন করে জনগণকে গেরিলা যুদ্ধের রূপরেখা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে। চূড়ান্ত ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’
একজন সিভিল সমাজের নেতা, একজন অসামরিক, অকম্যুনিস্ট জাতীয়তাবাদী, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রবক্তা এর বাইরে কোনো কথা বলতে পারেন না।
জনাব জিয়াউর রহমানসহ আমাদের সেনা অফিসাররাও বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল আমাদের কাছে সবুজ সংকেত’।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধাপগুলো ছিল গণতান্ত্রিক। বাঙালি জাতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা, যেমন- শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, আবুল হাশিম- এরা প্রত্যেকে ছিলেন গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিভূ। এরা আন্ডারগ্রাউন্ডের নেতা ছিলেন না, এরা কখনও গলা কাটা রাজনীতি কিংবা শ্রেণী-শত্র“ খতমের রাজনীতি করেননি। বঙ্গবন্ধু তার মুরুব্বিদের রাজনৈতিক ভূমিকা অনুকরণ করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে অগ্রসর হয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে একক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠা করেন। এ জন্য মওলানা ভাসানী অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। এরও গুরুত্ব আছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিকে ইচ্ছে করলে সপ্তম শতাব্দীর শশাঙ্কের আমলেও নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বিজয়ের ইতিহাসকে স্বচ্ছভাবে বোঝার জন্য ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করাই ভালো। বঙ্গবন্ধুও বলেছেন, তিনি ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকে একটু একটু করে দেশভিত্তিক আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন।
ভাষা আন্দোলন ছিল সর্বাংশে ধর্মনিরপেক্ষ- অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন। বাংলাভাষা হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব বাঙালির ভাষা। বিদ্যাসাগর বলেছেন, আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি, তাই আমরা বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আমরা বাংলাভাষা বলি বলেই আমাদের বাঙালি বলা হয়। বাংলা ভাষা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ বলেই ভাষার ওপর আঘাতটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষতারও জন্ম দিয়েছিল। তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি মুসলমানেরা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিল। কবি অন্নদা শঙ্কর রায় বলেছেন, উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে যে রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটেছিল, সেখানে মুসলমান ছিল না, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারির পর যে রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটেছিল সেখানে বাঙালি মুসলমানের প্রাধান্য ছিল। এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯২৬ সালে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ভেতর দিয়ে। তাই অনেকে মনে করেন, ১৯৭১-এর মুক্তি আন্দোলন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
১৯৫২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’ এবং ডি-এল-রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা’ গানটি গাওয়া হতে থাকে। ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৭১ সালের বিজয় অর্জন পর্যন্ত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি’ গানটিও আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে।
১৯৫২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালির লোকায়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনা অপ্রতিরোধ্য গতিতে শক্তিশালী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাঙালিদের শিরায় শিরায় টগবগ করছিল অখণ্ড বাঙালিয়ানা। বাঙালি বীরেরা শ্রদ্ধাবান হয়ে উঠেছিলেন। হাজী শরিয়তুল্লাহ, দুদু মিঞা, তিতুমীর, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা আমাদের কাছে অতি আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬৮ সালে চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমান নির্মাণ করেন তার কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘সিরাজউদ্দৌলা’। সাংঘাতিক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ছবিটি। খান আতাকে বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুই নাকি নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছবি বানাইতেছস, আমার মতো কথা কওয়াইতেছস নবাবের মুখ দিয়া?’
(মাহবুব আজাদ- খান আতউর রহমান বাংলা একাডেমি পৃঃ ১৯৮)।
অসামান্য প্রেরণাদায়ক ব্যাপার। ১৯৭০ সালে নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’- অমর চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। সে ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’, বিদ্রোহী কবির ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ এবং আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারি’ গান ব্যবহার করা হয়েছিল। বাঙালির রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল। এ ছবিতেও দেখলাম বঙ্গবন্ধুর মতো আনোয়ার হোসেনও কারাগার থেকে বের হয়ে বাংলার জমিন থেকে একমুঠো মাটি নিয়ে কপালে ছুঁইয়ে শপথ নিলেন।
দুটো ছবিই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শাণিত করেছিল।
একদা জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ ১৯৭১ সালে জ্ঞানতাপস, বাঙালি মনীষীর ঘোষণা জয়যুক্ত হয়েছিল। একদা বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে- বাঙালির বাঙলা- সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।’ একদা মনীষী এস ওয়াজেদ আলী বলেছিলেন, ‘সমগ্র ভারতে কেবল বাঙালিরাই পারে একটি রাষ্ট্র গঠন করতে; সেটা হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।’ একদা রবীন্দ্রনাথ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, ‘আশা করব মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর এক দিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সব বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাওয়ার পথে।’ (সভ্যতার সংকট)।
১৯৭১ সালের বিজয়ের মাসে বাঙালি মনীষীদের চেতনারই বিজয় হয়েছিল।
মাহমুদুল বাসার : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, গবেষক

সংবিধান, সংসদীয় রাজনীতি, নির্বাচন- সব কিছুই ভুয়া ব্যাপারে পরিণত হয়েছে by বদরুদ্দীন উমর

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গতকাল ১৩ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। দেখা যাচ্ছে, এই প্রত্যাহারের পর ৩০০ আসনের মধ্যে ১২৮ আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন! (উধরষু ঝঃধৎ, ১৪.১২.১৩)। এ ধরনের ব্যাপার ইতিপূর্বে বাংলাদেশে কোনো স্বাভাবিক নির্বাচনে তো হয়ইনি, বিশ্বের কোনো দেশে হয়েছে বলেও জানা নেই। এর একমাত্র ব্যতিক্রম বিএনপির আমলে ১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারি নির্বাচন। তখন ৪৮ জন বিএনপি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাস্তবত সাধারণত নির্বাচনে কোনো আসনেই কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন না। সেটা কখনও হলেও ঘটে কালেভদ্রে। কিন্তু বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে দু-একজন বা দু-চারজন নয়, একেবারে ১২৮ জন নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়!! এই হল প্রার্থীদের অবস্থা। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে প্রার্থীদের এই অনীহা থাকলে সাধারণ ভোটারদের অবস্থা কী দাঁড়াবে সেটা বলাই বাহুল্য। তবে এ ক্ষেত্রে একটা রাস্তা খোলা আছে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধির এবং সে রাস্তা হল দলীয় গুণ্ডাপাণ্ডা, কর্মী এবং নির্বাচনী অফিসারদের দ্বারা জাল ভোট দিয়ে বাক্সভর্তি করা। এটা খুব সহজ হবে, কারণ ভোটকেন্দ্রে কোনো বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিই উপস্থিত থাকবেন না।
লক্ষ্য করার বিষয়, এভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীদের নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা একেবারে সরাসরি। তার নির্দেশে বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগের প্রার্থীও নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে দিয়েছেন! চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ প্রার্থী নূরুল ইসলাম বিএসসি নির্বাচন কমিশনের কাছে দেয়া তার প্রত্যাহারপত্রে লিখেছেন, তিনি তাদের দলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করছেন! (উধরষু ঝঃধৎ, ১৪.১২.১৩)
এভাবে যে নির্বাচন ৫ জানুয়ারি হতে যাচ্ছে, সেটা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই নির্বাচন হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য নয়। এই একইভাবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি বিএনপি নির্বাচন করেছিল। তার পরিণতি সবারই জানা। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনের অবস্থা আরও খারাপ। একতরফা এই নির্বাচনে যেভাবে এত বিশালসংখ্যক আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তাতে একে প্রহসন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এই প্রহসন সম্ভব করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা সংবিধান এবং সংসদীয় রাজনীতিকেও প্রহসনে পরিণত করেছেন। সংবিধানের পবিত্রতা এবং তা রক্ষা করা নিয়ে অনেক গালভরা কথা তার দ্বারা অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলছেন। কিন্তু তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সংবিধানের পবিত্রতার যে কথা তারা বলছেন সেটা নষ্ট ও কলুষিত করার ব্যাপারে তার ভূমিকাই প্রধান। আসলে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যেভাবে সংবিধানের অন্যতম প্রধান খুঁটি গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই শেখ হাসিনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে নিজেদের সংবিধানকে একটা ভুয়া দলিলে পরিণত করেছেন। ১৯৭৩ সালের মূল সংবিধানে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে হলেও যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলা হয়েছিল, তার প্রত্যেকটিই এখন ভূলুণ্ঠিত। বাহ্যত, সেই সংবিধানের যে গণতান্ত্রিক চরিত্র ছিল, শেখ মুজিব নিজে এবং তারপর জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা তার লেশমাত্র আর অবশিষ্ট রাখেননি।
সংবিধান এমন কোনো পবিত্র জিনিস নয় যা চিরকালীন ও অপরিবর্তনীয়। সংবিধান পরিবর্তনের ব্যবস্থা সংবিধানেই থাকে। তার কারণেই সংবিধান সংশোধন করা হয়। সংবিধান আকাশ থেকে পড়ে না, শাসক শ্রেণীর চরিত্রের দ্বারাই সংবিধানের চরিত্র নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশও এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৩ সালে জনগণকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে সংবিধানে অনেক ভালো ভালো কথা বলা হয়েছিল। অনেক ধারা রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেসবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শেখ মুজিবই মূল সংবিধানের সংশোধনী এনে তার শাসনের মেয়াদকালেই বাংলাদেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসনের প্রবর্তন করেছিলেন। সেই ফ্যাসিস্ট শাসনের নানা রদবদল সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ধারাবাহিকভাবে যেসব সংশোধনী পাস করা হয়েছে, তাতে মূল সংবিধানের খুঁটিগুলোর কোনটিরই আর অস্তিত্ব নেই। এই সংশোধনীগুলোর সর্বশেষ হল শেখ হাসিনার দ্বারা কৃত পঞ্চদশ সংশোধনী। এর মাধ্যমে তিনি তার কমে যাওয়া জনপ্রিয়তার মুখে ক্ষমতাসীন থাকার উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা করেছেন নিজে প্রধানমন্ত্রী থেকে ও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার। যেভাবে তিনি অনড়ভাবে তার এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাণপাত করছেন, তাতে বাংলাদেশে শুধু আওয়ামী লীগেরই নয়, সমগ্র শাসকশ্রেণীর চরিত্রই উন্মোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোও যা করছে, সেটা আওয়ামী লীগের সংসদীয় নির্বাচনের ফ্যাসিস্ট চরিত্রের অন্য একদিক। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের নামে হরতালের পর হরতাল, অবরোধের পর অবরোধ দিয়ে দেশের জনগণের জীবন তারা বিপর্যস্ত করছে। আওয়ামী লীগকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য বাধ্য করার উদ্দেশ্যে যেভাবে বোমাবাজির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি তারা চালিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গেও কোনো বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এই শাসকশ্রেণী এতই অধম যে, এদের প্রকৃত বুর্জোয়া বলাও সম্ভব নয়। এরা হল লুটপাট, চুরি, দুর্নীতি, প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে গঠিত এমন এক শাসকশ্রেণী, যাদের পক্ষে প্রকৃতপক্ষে বুর্জোয়া হয়ে ওঠাও সম্ভব হয়নি। কাজেই লুম্পেন বুর্জোয়াদের এই শাসনে জনগণের কোনো অধিকার যে কোনো ক্ষেত্রেই নেই, এতে বিস্মিত হওয়ার কী আছে?
এরশাদ নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেয়া সত্ত্বেও তার দলের মধ্যে ভাঙনের চেষ্টা করে তার নিজের এবং দলের অন্যদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে হুকুম দিয়ে এবং চিকিৎসার নামে এরশাদকে হাসপাতালে আটকে রেখে যে খেলা শেখ হাসিনা দেখাচ্ছেন, এটা কোনো বুর্জোয়ার কাজ নয়। বুর্জোয়া নামেরও অযোগ্য লুম্পেন বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি হিসেবেই শেখ হাসিনা এ কাজ করেছেন। এ ধরনের কাজ করার জন্যই যে তিনি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী গায়ের জোরে জাতীয় সংসদে পাস করেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর মাধ্যমে তিনি এ বিষয়টি প্রমাণসিদ্ধ করেছেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান, সংসদীয় রাজনীতি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক ভুয়া ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে এটা মনে করার কিছুই নেই যে, এসব কাজ করে শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবেন। অতি চালাকের যে অবস্থা হয়, শেখ হাসিনার অবস্থা তা-ই হবে। তবে এর দ্বারা শুধু তারই ভরাডুবি হবে না, তাদের নৌকার তলা তিনি যেভাবে ফুটো করেছেন, তাতে তার দল আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়েই তিনি তলিয়ে যাবেন।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

ক্ষমতাধর ফুপাকে ফাঁসিতে ঝুলালো কিম জং উন

দুর্নীতির অভিযোগে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাধর ফুপাখ্যাত ও এক সময়ের ক্ষমতার নেপথ্য নায়কখ্যাত এবং দেশটির সরকার প্রধান কিম জং উনের ফুপা চ্যাং সং থায়েকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। শুক্রবার দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ এ সংবাদ নিশ্চিত করে। চলতি মাসের শুরুতেই চ্যাং সংকে দেশটির সামরিক কাউন্সিলের উপপ্রধানের পদ থেকে বরখাস্ত ও গ্রেফতার করা হয়। সে সময় তার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া দুই সহযোগীর মৃত্যুদণ্ড আগেই কার্যকর হয়েছে। চ্যাং সংয়ের মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে কেসিএনএ জানায়, গত বৃহস্পতিবার দুর্নীতি ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে তার বিচার হয়।
বিচারে তিনি দোষী প্রমাণিত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং খুব দ্রুত তা কার্যকরও হয়। কেসিএনএ এক সমালোচনায় একসময়ে দেশের পাওয়ার হাউসের নিয়ন্তা হিসেবে খ্যাত চ্যাং সংকে ‘কুকুরের চেয়ে খারাপ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। সমালোচনায় বলা হয়েছে, চ্যাং সং তার পদমর্যাদা ও ক্ষমতাকে নিজের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস পূরণ এবং দেশবিরোধী কাজে ব্যবহার করেছেন। তিনি একসময় শুধু ক্ষমতাসীন দলেরই নয় একইসঙ্গে ছিলেন জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিশন ও সেনাবাহিনীরও শীর্ষ কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়ার সাবেক নেতা কিম জং ইলের মৃত্যুপরবর্তী সময় তার ছেলে কিম জং ইল ক্ষমতা গ্রহণের পর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষ বলে বিবেচিত চ্যাং সংকে দল থেকে বহিষ্কার, গ্রেফতার ও মৃত্যুদণ্ডকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০১?১ সালে ইলের মৃত্যুর পর কিম জং উন দেশের ক্ষমতা হাতে নিয়েছিলেন। আলজাজিরা।

গ্রেফতার করলে ইতালিতে বিপ্লব ঘটবে : বার্লুসকোনি

কর জালিয়াতির জন্য এক বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি বৃহস্পতিবার বলেছেন, তাকে জেলে দেয়া হলে ইতালিতে ‘বিপ্লব’ ঘটে যাবে। কর জালিয়াতির এক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বার্লুসকোনি চলতি বছরের গোড়ার দিকে তার পার্লামেন্ট সদস্য পদ হারান। রোমে নিজ বাসভবনে ইউরোপ-১ রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, তারা এটি করতে পারবে না। করলে ইতালিতে বিপ্লব ঘটে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো কঠিন হবে। আমি আগামী নির্বাচনে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবো। আর সর্বোপরি আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আমি কোনো কিছুকে ভয় পাই না।’ বার্লুসকোনি দেশ ছাড়ার কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি আমার দেশকে ভালোবাসি।
দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে আমি একজন দেশপ্রেমিক ও রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার ভূমিকার অবসান ঘটাতে পারি না।’ ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি বৃহস্পতিবার বলেছেন, তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলে অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়ে যেত। গত মাসে সিনেট থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় পর সংসদীয় বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা হারিয়েছেন তিনি। ৭৭ বছর বয়সী এ মিডিয়া ম্যাগনেট কর কেলেংকারিতে অভিযুক্ত প্রমাণিত হওয়ায় সংসদের আসন হারান। ৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত। ইতিমধ্যে এক বছর পার হয়ে গেছে। সংসদ আসন হারানোর ফলে এখন আর বিশেষ সুরক্ষা সুবিধা পাচ্ছেন না তিনি। কাজেই অন্যান্য দুর্নীতি ও অপরাধ মামলায় গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এখন।