Saturday, February 23, 2019

আসামে সস্তা মদপানে ৮৫ জনের মৃত্যু

ভারতের আসামে অবৈধভাবে উৎপাদিত সস্তা মদ খেয়ে অন্তত ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো প্রায় সাড়ে ৩০০ মানুষ। চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের শারিরীক অবস্থা ক্রমশ অবনতি হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। হতাহতদের সবাই চা-শ্রমিক। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি ও এনডিটিভি। বৃহস্পতিবার সেখানকার গোলাঘাট জেলায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পরে একের পর এক চা-শ্রমিকের মৃত্যু ঘটতে থাকে। বমি ও বুকে ব্যথা নিয়ে দলে দলে তারা হাসপাতালে আসতে থাকেন। হতাহতদের সবাই গোলাঘাট ও জোরহাটের চা বাগানে কাজ করেন।
গোলাঘাট জেলার পুলিশ সুপার পুস্কর সিং বলেন, অবৈধভাবে উৎপাদিত মদ পান করে তার জেলায় ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, তারা সস্তা ‘চোলাই মদ’ পান করেছিলেন। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এই মদকে অবৈধ ঘোষনা করেছে। এই মদ পান করে পাশ্ববর্তী জেলাতেও ১ ডজনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। গোলাঘাটের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার রাতুল বরদলই বলেন, বমি, বুকে তীব্র ব্যাথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চিকিৎসাধীন এক চা-শ্রমিক জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সে আধা লিটার মদ কিনে তা পান করে। প্রথমে সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু কিছু সময় পরে সে মাথা-ব্যথা অনুভব করতে থাকে। তার মাথায় এত তীব্র যন্ত্রণা হতে থাকে যে কোন কিছু খেতে বা ঘুমাতে পারছিল না।
অস্থির অবস্থায় রাত কাটে তার। সকালে বুকে ব্যথা শুরু হয়। পরে স্ত্রী তাকে চা-বাগানের হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাকে জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অবৈধভাবে উৎপাদিত মদ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ভারতে খুবই সাধারণ একটি বিষয়। দু’সপ্তাহ আগে, উত্তর উত্তর প্রদেশেও অবৈধ মদপানের কারণে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদের তুলনায় অবৈধ এসব মদের দাম বেশ সস্তা। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এগুলো খুবই সহজলভ্য।
আসামের ঘটনা তদন্ত করতে একটি অনুসন্ধানী কমিশন গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। রাজ্য পুলিশ জানিয়েছে, অবৈধভাবে উৎপাদিত মদ বিক্রির দায়ে তারা এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছেন।

যুদ্ধ কোনো পিকনিক নয়

যুদ্ধ কোনো পিকনিক নয় বলে ভারতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে সতর্ক করেছেন ভারতের গোয়েন্দা বিষয়ক সাবেক প্রধান এএস দুলাত। একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী কূটনীতির পথ অনুসরণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। তার এমন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে বিরোধী কংগ্রেস পার্টি পরিচালিত ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকায়। ১৪ই ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পালওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন সিআরপিএফ সদস্য নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। কিন্তু এমন যুদ্ধ অত্যাসন্ন বলে বিশ্বাস করেন না এএস দুলাত। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি তেমন মনে করি না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, তিনি সেনাবাহিনীকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে যুদ্ধ হলো বাজে জিনিস।
আমি বিশ্বাস করি, যুদ্ধ বাদে আরো সুযোগ খোলা রয়েছে। এমনকি মুম্বইয়ে যখন হামলা হয়েছিল, তখনও একটি যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যুদ্ধে যান নি। তাই মোদিকেও তার সুযোগগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। যুদ্ধ হলে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে জনসাধারণকে। যুদ্ধ কোনো পিকনিক নয়।  এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় হয়েছিল বাস্তব যুদ্ধ। এ ছাড়া যেসব যুদ্ধ হয়েছে সেগুলো বাস্তব যুদ্ধ নয়। কারগিল যুদ্ধ ছিল সীমিত অপারেশন। তা ছাড়া সেটা হয়েছিল এমন একটি উচ্চতায় যেখানে যুদ্ধ হলে বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কিন্তু যদি লাহোরে অথবা অমৃতসরে এমন কি মুজাফফরাবাদে বোমা ফেলা হয়, তাহলে আমরা কি তার পরিণতির জন্য প্রস্তুত আছি? ১৯৭১ সালে যে অস্ত্র দিয়ে আমরা যুদ্ধ করেছি এখন সেসব অস্ত্র পাল্টে গেছে।
আলাদা এক সাক্ষাতকারে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম একই প্রশ্ন রাখেন। তিনি বলেন, পালওয়ামা হামলার নিন্দা জানাই আমি। কিন্তু হামলাকারীতো একজন ভারতীয়, একজন কাশ্মিরী। সে তো পাকিস্তানি নয়।

কন্যার স্মৃতিতে পিতা- কবি আল মাহমুদ

বাবার সঙ্গে সুখস্মৃতি কী একজীবনে বলে শেষ করা যায়। ৮ ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম বাবার সবচেয়ে আদরের। আতিয়া বলতেই বাবা অজ্ঞান। বিদেশ থেকে এসেছেন- বাবার লাগেজ ব্যাগেজ কে খুলবে? আতিয়া ‘মায়ো’ (মা)। এভাবেই বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সোনালী কাবিনের কবি আল মাহমুদের বড় মেয়ে আতিয়া মীর।
তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তির আগে বৃহস্পতিবার পুরো দিনটিই আমি আব্বার সঙ্গে ছিলাম। ওইদিন আব্বাকে নিজ হাতে সুপ খাইয়েছি। ওটাই ছিল আমার হাতে আব্বার শেষ খাওয়া।
বিয়ের আগ পর্যন্ত আব্বার সকল মিটিং, অনুষ্ঠান, সভা- সমিতিতে কখন কোথায় যাবেন- এসব টাইমিং ডায়েরি আমিই লিখতাম। আব্বা আমাকে সবসময় সঙ্গে করে ঢাকার বাইরে, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন। ১৯৯১ সালে বিয়ে হয়ে গেলেও শ্বশুরের বাসা তেজগাঁও বেগুনবাড়ী আব্বার কাছে আসতাম। আব্বা বিদেশে গেলে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে আসতেন। আব্বা যখন বিদেশ থেকে আসতেন তখন তার ব্যাগ ও সকলের জন্য আনা উপহার আমাকে ছাড়া কাউকে খুলতে দিতেন না। আমি নিজ হাতে সবাইকে আব্বার গিফটের জিনিস বিলিয়ে দিতাম। আব্বা আমার জন্য চকলেটসহ পছন্দের জিনিস আলাদা করে মায়ের কাছে রেখে দিতেন। যেটা সম্পর্কে কেউ জানতো না। কারণ আব্বা জানতেন যে, আমি সবাইকে দিয়ে নিজের জন্য কিছুই রাখবো না। পরবর্তীতে আমাকে একা ডেকে ওই বিদেশি উপহার দিতেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার প্রথম কাজ ছিল আব্বাকে অনেকগুলো পত্রিকার হেডলাইন পড়ে শোনানো। এরপর আবার স্কুল থেকে এসে আব্বাকে তার পছন্দের নিউজ বিস্তারিত পড়ে শোনাতাম। বাসায় প্রায় ৭ থেকে ৮টি পেপার রাখতেন। আমার পছন্দের ম্যাগাজিন ছিল ইন্ডিয়ান ম্যাগাজিন সানন্দা। আব্বা নিয়মিত আমার জন্য ম্যাগাজিনটা বাসায় নিয়ে আসতেন। এমনকি বিয়ের পর ১০ বছর পর্যন্ত এটি আব্বা নিয়মিত আমার জন্য কিনতেন। আব্বা ছিলেন প্রচণ্ড আত্মভোলা মানুষ। মাকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন কিন্তু আব্বার কোনো খবর নেই। কোনো আড্ডায় আছেন বা কাজ করছেন তো করছেনই। বেড়াতে যাওয়ার কথা ভুলে বসে আছেন। আমরা ৮ ভাইবোন বাসায় এতই দুষ্টুমি, ঝগড়াঝাটি, মারামারি করতাম যে, মায়ের মাথা খারাপ হয়ে যেতো। বাবা এসবের মধ্যেও লিখেই যাচ্ছেন। দিন-দুনিয়ার কোনো খবর থাকতো না তার কাছে। তখন মা রেগে গিয়ে বলতেন আমার মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম আর তুমি বাচ্চাদের কিছুই বলছো না।     
আব্বা ছিলেন খুবই ভুলোমনা। কোনো জিনিসের কথা তার মনে থাকতো না। মা ভাত বেড়েছেন সময় গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু আব্বা বই পড়তে পড়তে খেতে আসতে ভুলে গেছেন। মায়ের ধমক খেয়ে অতঃপর খেতে আসতেন। তখন আমি খুব ছোট। সময়টা ছিল ঈদের আগমুহূর্ত। বিটিভিতে এলিগেন নামে একটি ড্রেসের বিজ্ঞাপন দেখে আব্বাকে বলেছিলাম আমাকে ড্রেসটি কিনে দিতে হবে। আব্বা বললেন ঠিক আছে অফিস থেকে এসে কিনে  দেবো। কিসের কি। রাত গভীর হয়ে যায় আব্বা আর বাসায় আসেন না। শেষমেশ আমি কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি। পরে আব্বা বাসায় এসে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে এলিফ্যান্ট রোড থেকে সেই জামাটি কিনে দেন।
একবার আদমশুমারির লোকজন বাসায় এসেছে নাম তালিকাভুক্ত করতে। আব্বা একে একে আমাদের সব ভাইবোনের নাম বললেন। কিন্তু যে আমাকে এতটাই ভালোবাসতেন, সে আমার নাম লেখানোর কথাটাই ভুলে গেছেন। শুমারির লোকটি বাসা থেকে বের হওয়ার পর আমি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করে দিয়ে বললাম আব্বা আপনি আমার নামটিই বলেন নি। তখন আব্বা বললো কি সাংঘাতিক কথা। এরপর ওই লোককে ডেকে আমার নাম তালিকাভুক্ত করান।
আমি কোনো কারণে রাগ করলে প্রায় সময় ভাত না খেয়ে ঘুমিয়ে থাকতাম। আব্বা বাসায় এসে আমাকে বলতো ‘মায়ো’ (মা) ওঠো ভাত খাবে। আব্বা দেখতে এতটাই সুন্দর ছিলেন যে, আমি প্রায়ই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম আমার আব্বা এত সুন্দর। আমরা কেউ তার মতো সুন্দর হলাম না কেনো? আব্বা তার লেখা একটি কবিতার বই ‘পাখির কাছে, ফুলের কাছে’ আমাদের তিন বোন আতিয়া, তানিয়া ও জিনিয়ার নামে উৎসর্গ করেন।

মার্কিন রাজনীতি: আমেরিকায় বামপন্থীরা জাগছেন by হাসান ফেরদৌস

মাত্র ২৯ বছর বয়স মেয়েটির। নাম আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেস। মার্কিন কংগ্রেসের কনিষ্ঠতম সদস্য, দীর্ঘদিনের পুরোনো এক ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসম্যানকে হারিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা চান। রাখঢাক ছাড়াই ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। তাঁকে এ জন্য উপহাস করা হবে—এ কথা জেনেও।
আলেকজান্দ্রিয়াই যে মার্কিন কংগ্রেসের প্রথম সমাজতন্ত্রী, তা নয়। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন যদিও কখনো নিজের নামের আগে সমাজতন্ত্রী শব্দটি ব্যবহার করেননি, তাঁর কথায় সমাজতান্ত্রিক ধারণার স্পষ্ট প্রকাশ রয়েছে। স্যান্ডার্স, ওয়ারেন ও কর্তেস—এঁরা প্রত্যেকেই মনে করেন, আমেরিকায় যে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তা শুধু দেশের ১ শতাংশ ধনীর পক্ষে কাজ করছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, গরিবরা আরও গরিব। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমূল না ভেঙেই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।
স্যান্ডার্স ও ওয়ারেন মূলত চলতি আইন পরিবর্তনের কথা বলেছেন। তাঁরা বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন নির্বাচনী ব্যবস্থা ও আর্থিক সংস্থাসমূহের ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ওপর। আলেকজান্দ্রিয়া তাঁদের সঙ্গে একমত, কিন্তু তাঁর বিশেষ আগ্রহ সব ক্ষেত্রে নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতি। তাঁর কথায়, ‘আমি চাই সবার মানসম্পন্ন শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, কর্মের অধিকার। কারও বর্ণ, ধর্ম বা আর্থিক মর্যাদা দ্বারা এই অধিকার নিয়ন্ত্রিত হবে না।’
স্যান্ডার্স থেকে কর্তেস—প্রত্যেকেই নাগরিক জীবনে রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়াতে চান। তাঁরা প্রস্তাব করেছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ চাই। প্রতিটি মানুষ যাতে একই মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–সুবিধা পায়, সে জন্য এই দুই খাতের ওপর ব্যক্তিগত খাতের প্রভাব কমিয়ে রাষ্ট্রীয় খাতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কর্তসে ও কংগ্রেসে তাঁর সমমনা সদস্যরা জলবায়ু–সংকট রোধের লক্ষ্যে সম্প্রতি এক নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিকে পুরোপুরি ‘সবুজ’ করার মাধ্যমে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাসের প্রভাব ঠেকানো। মার্কিন অবকাঠামো ঢেলে সাজানো ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোয় সক্ষম মজুরির দাবিও এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির যেসব সদস্য ২০২০ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই এই ‘নিউ গ্রিন ডিল’ সমর্থন করেছেন।
বলা বাহুল্য, করপোরেট আমেরিকা ব্যাপারটাকে ভালো চোখে দেখেনি। যাকে আমরা মূলধারার তথ্যমাধ্যম বলি, তারাও ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে ব্যাপারটা যে হাসির নয়, সে কথার স্বীকৃতি মিলেছে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথা থেকে। এই মাসের গোড়ায় তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি সমাজতন্ত্রের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। ‘এখানে কেউ কেউ সমাজতন্ত্রের কথা বলা শুরু করেছেন, তাঁদের এইসব কথাবার্তা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমেরিকা কখনো সমাজতান্ত্রিক হবে না।’ তিনি কর্তেজের নাম উচ্চারণ করেননি, কিন্তু কথাটা যে তাঁকে উদ্দেশ করেই বলা, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
আমেরিকা রাতারাতি সমাজতন্ত্রে প্রবেশ করছে, এ কথা কেউ বলে না। ট্রাম্প বা দক্ষিণপন্থী নেতারা যে তেমন ইঙ্গিত করছেন, তার কারণ এ দেশের জনগণের মনে তাঁরা ভীতির সঞ্চার করতে চান। তাঁদের রাজনীতির কেন্দ্রেই রয়েছে ভীতি—বিদেশিদের ভীতি, ভিন্ন ধর্মে ভীতি, সমাজতন্ত্রে ভীতি।
তবে এ কথায় ভুল নেই যে, মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বামপন্থী প্রবণতা বাড়ছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা যে এখন তথাকথিত ১ শতাংশের বিরুদ্ধে সুর তুলেছেন, তার কারণই হলো আমেরিকান জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মানুষ চলতি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ফায়দা পাচ্ছে না। যে ১ শতাংশ লোকের হাতে এখন দেশের ৪০ শতাংশ সম্পদ, তারা শুধু অর্থনীতি নয়, নাগরিক জীবনের সব ক্ষেত্রেই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। আলেকজান্দ্রিয়া ও তাঁর বামপন্থী বন্ধুরা এই অবস্থার পরিবর্তন চান। একে যদি সমাজতন্ত্র বলা হয়, তাতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।
-------২--------
বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়ও সেটি ছিল একটি প্রধান স্তম্ভ। অথচ আজকের বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের দাবি শোনা যায় না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোনো প্রধান দলের অর্থপূর্ণ কর্মসূচি নেই। বামপন্থী দলগুলো অবশ্য যথারীতি সমাজতন্ত্রের দাবি তুলে যাচ্ছে, কিন্তু তারা রাজনৈতিকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, তাদের প্রাসঙ্গিকতাও অনেক কমেছে। ফলে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে তাদের কথার প্রতিফলন।
২৯ বছরের এক নারী, যিনি রাজনীতিতে একজন নবিশ, তিনি আমেরিকায় যে কাজ করতে সক্ষম হলেন, আমাদের ঘাগু বামপন্থী রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা তার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছেন না কেন?
এর উত্তর আমাদের বিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে পেতে হবে। অর্ধশতক আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বামপন্থীদের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। এই প্রভাব আইনসভার ভেতরে যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল তার বাইরে। আমাদের প্রায় প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনের অ্যাজেন্ডাই নির্মিত হতো বামপন্থীদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে। একাত্তরে যে আমরা সমাজতন্ত্রকে একটি মূল নীতি হিসেবে গ্রহণ করি, তার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এমন বামপন্থী দল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
১৯৯০–এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং তারও আগে চীনের আদর্শিক ডিগবাজির পর বিশ্বের সর্বত্রই বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনে সংকট সৃষ্টি হয়। আমরাও তার শিকার। আমাদের অন্য সমস্যাও ছিল। স্বাধীনতার পর নিজেদের রাজনৈতিক আন্দোলন সংহত করার বদলে বামপন্থীরা নিজেদের ক্ষমতার রাজনীতির অংশীদার করে ফেলেন। ফলে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাঁরা নিজেদের নীতিগত উচ্চাসন হারিয়ে ফেলেন। বামপন্থী আন্দোলনের অন্য ব্যর্থতা, একটি প্রকৃত বামপন্থী কর্মসূচির পক্ষে ব্যাপক রাজনৈতিক জোট গঠনে অক্ষমতা। পৃথিবীর সর্বত্র বামপন্থী আন্দোলন চিরকালই শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। আমাদের দেশে এই দুইয়েরই কোনো কার্যকর অস্তিত্ব নেই।
বামপন্থী দল না থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সমর্থন নেই, এ কথা ভুল। রক্তচোষা পুঁজিপতি ছাড়া বৈষম্যবিহীন সমতাপূর্ণ সমাজব্যবস্থা সমর্থন না করার কোনো কারণই থাকতে পারে না। কিন্তু সে জন্য ঠিক কী ধরনের সমাজব্যবস্থা চাই, তার রূপরেখাটি স্পষ্ট করে তুলে ধরা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে আমরা আলেকজান্দ্রিয়া কর্তেসের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। নিউইয়র্ক সিটির ব্রংক্স এলাকার এক কর্মজীবী পরিবারের এই মেয়েটি উঠে এসেছেন স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি সংগঠনের ভেতর দিয়ে। তিনি কী চান, সে কথাটি বোধগম্য ভাষায় প্রকাশে সক্ষম হয়েছেন, ফলে মানুষকে নিজের পক্ষে টানতে পেরেছেন। তিনি জানেন, ধনতন্ত্রকে পরাজিত করার আগে মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে হবে। নিউইয়র্কে তাঁর আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রত্যেক শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন বাড়ানো। আমেরিকার অনেক অঙ্গরাজ্যেই এই দাবির পক্ষে সমর্থন মিলেছে। নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো রাজ্যে এই দাবি সমর্থন করে আইনও পাস হয়েছে।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি

যেভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে অর্থ by এম এম মাসুদ

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরই টাকা পাচার বাড়ছে। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে যেসব চ্যানেলে টাকা বেরিয়ে গেছে এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে পণ্য আমদানির সময় কাগজপত্রে বেশি দাম উল্লেখ করে টাকা পাচার। আরেকটি হচ্ছে পণ্য রপ্তানি করার সময় কাগজপত্রে দাম কম দেখানো। পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে বিশাল একটি অঙ্ক পাচার হচ্ছে। এ ছাড়া দুর্নীতি, কালো টাকা বেড়ে যাওয়া, বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বাড়ছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি ও আইনের শাসনের ঘাটতির কারণেও পাচার থামছে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তারা জানান, তদন্তে অস্পষ্টতা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই বেড়েছে অর্থ পাচার। অর্থ পাচার রোধ করতে হলে দুর্নীতি কমিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে বলে জানান তারা। সাম্প্রতিক সময়ে ৩টি সংস্থার রিপোর্টেই বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাগুলোর মধ্যে আছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), সুইস ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের পানামা ও প্যারাডাইস পেপার। এসব প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও পাচার বন্ধে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সর্বশেষ জিএফআই ২৮শে জানুয়ারির প্রকাশিত রিপোর্টেও দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য (আমদানি-রপ্তানি) হয়েছে, এর মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। গত দশ বছরে দেশ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। যা চলতি (২০১৮-২০১৯) জাতীয় বাজেটের প্রায় দেড়গুণের কাছাকাছি এবং দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির তিনগুণেরও বেশি।
এদিকে গত বছরের জুনে প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) পানামা এবং প্যারাডাইস পেপার্সে এ পর্যন্ত অর্থ পাচারকারী হিসেবে ৮২ জন ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ করেছে। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়নি বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন। কারা টাকা পাচার করছেন, কেন করছেন, পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার করার কি পদক্ষেপ নেয়া যায় সে বিষয়ে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।
এদিকে আমদানির নামে এলসি বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। প্রভাবশালী মহল পণ্য জাহাজিকরণের কাগজ জাল করে এলসিকৃত পণ্যের পুরো টাকাই তুলে নিয়ে বিদেশে রেখে দিচ্ছেন। এ ধরনের বেশ কিছু কেস স্টাডি পাওয়া গেছে। এগুলো পর্যালোচনার পর পাচার বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। এ ছাড়া রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানি মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। সম্প্রতি টাকা পাচারের একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিটেন্স। একটি চক্র বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ উপায়ে খুব দ্রুতই সম্পদ বৃদ্ধি করা যায়। এর বড় অংশই বাইরে যায়। কারা পাচার করছে, তা জানা সত্যেও কোনো শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। এলসি খোলার পর ঠিকমতো জিনিসপত্র আসছে কিনা, সঠিক দামে খোলা হয়েছিল কিনা, তার নজরদারি নেই। এসব বিষয়ে সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিলে টাকা পাচার বন্ধের সম্ভাবনা নেই। সরকারকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করে তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তথ্যের আদান-প্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ১৫৯টি দেশ ওই গ্রুপের সদস্য। বাংলাদেশ এই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় এখন সবগুলো দেশ থেকে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা টাকা পাচার বিষয়ক যেকোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু টাকা পাচার থেমে নেই, বরং বেড়েই চলছে। আবার দেশ থেকে টাকা পাচার কিভাবে থামানো যায় তারও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, সাধারণত আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। গোটা পৃথিবীতে বিশ্ববাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে এখন সবাই সতর্ক। তিনি বলেন, টাকা পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন রয়েছে, আমরা তা পুরোপুরি মেনে চলছি।
এদিকে টাকা পাচার বেড়ে যাওয়ায় দেশ বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এটা অব্যাহত থাকলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো- জাতীয় জীবনে নিরাপত্তা অনিশ্চিত হলে দেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পান বিনিয়োগকারীরা। আর এ কারণেই তাদের মূলধন বিদেশে নিয়ে যান অনৈতিক পন্থায়। তিনি বলেন, দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার অর্থই হলো দেশকে বঞ্চিত করা। টাকা দেশে বিনিয়োগ করলে কর্মসংস্থান বাড়তো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা খুবই জটিল প্রক্রিয়া। দুই প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, অর্থ পাচারের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেতে হবে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলা করতে হবে। স্থানীয় আদালতে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পক্ষে রায় দিতে হবে। আদালতের এ রায়ের কপি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে যে দেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে ওই দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে অবহিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস অর্থ ফেরত দেয়া যায় কি না তা নিয়ে ওই দেশের আদালতে মামলা করবে। সংশ্লিষ্ট দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে আইনি জটিলতা রয়েছে কী না তা যাচাই-বাছাই করবে। পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে আইনি জটিলতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়ে রায় প্রদান করবে। এর পরই কেবল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্র জানায়, সবকিছু অনুকূলে থাকলে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ ফেরত আনতে ৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মামলা করা ছাড়াও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যায়, যদি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কোনো জটিলতা না থাকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থা এগমন্ড গ্রুপের সদস্য হবে হবে।
জিএফআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর গড়ে ৬৫১ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে। ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ডলার অর্থ পাচার হয়েছিল। তিন বছরের ব্যবধানে এ অর্থ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯৬৬ কোটি ডলারে। তবে ২০১৪ সালে ৯১১ কোটি ডলার। আর ২০১৫ সালে তা ৫৯০ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি, পরের বছর ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে পাচারের পরিমাণ ৬৪৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী দু’বছর অর্থ পাচার কিছুটা কমে আসে। ওই বছর ছিল ৫১০ কোটি ডলার। এ ছাড়া ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়।

লাশটাও যদি পাওয়া যায় by জিয়া চৌধুরী

চুড়িহাট্টা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ। অনবরত ছুটে চলেছে ইসরাফিল। কোলে ছোট্ট ভাগ্নি সানিন। মর্গে পড়ে থাকা লাশগুলো দেখছে। বার্ন ইউনিটে ছুটে যাচ্ছে। অন্তত লাশটাও যদি পাওয়া যায়। সানিন মামার কাছে আবদার করছে আজ কিন্তু মাকে  না নিয়ে যাবো না। মামা ইসরাফিলের বুক ফাটা কান্না থামছে না।
ভাগিনি সানিনকে কি বলবে? চকবাজারের চুড়িহাট্টায় বুধবার রাতের অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে মাকে খুঁজছে সে। মামার কোলে চড়ে পাঁচ বছরের ছোট্ট সানিন এসেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। তার প্রশ্ন, মা তো একটু বাসার নিচে গিয়েছিল। তাহলে এখনো ফিরল না কেন? উম্মে হাবিবা বেগম শিলার লাশ শনাক্ত করতে মেয়ে সানিনের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা নিয়েছে সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল।
নমুনা নিতে গেলেও সানিনের একই প্রশ্ন, মাকে কি পাওয়া যাবে? আবারো প্রশ্ন আমার কি ব্যথা লাগবে? পরে অবশ্য সানিনের কাছ থেকে শুধু লালা সংগ্রহ করে সিআইডি। সানিনের মামা ইসরাফিল জানান, চকবাজারের ঘটনাস্থল থেকে মাত্র দুইশ’ গজ দূরেই সানিনদের বাসা। সেদিন রাতে সানিনের জন্য ওষুধ আনতে বাসা থেকে বের হন মা উম্মে হাবিবা বেগম শিলা। বাসার কাছের হায়দার মেডিকেল ফার্মেসি থেকেই নিয়মিত ওষুধ কিনতেন তারা। সেদিনও গিয়েছিলেন হায়দার মেডিকেলে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ছেলের ওষুধ নিয়ে তার আর বাসায় ফেরা হয়নি। শিলার বোনের স্বামী মো. বেলাল হোসেন জানান, বুধবার রাতে সানিনের বাবা মোহাম্মদ সুমন তার দোকানে ছিলেন। সানিন একটু অসুস্থ হওয়ায় তার জন্য ওষুধ আনতে চারতলার বাসার নিচে যায় তার মা শিলা।
এ সময় সানিন ও তার পাঁচ মাসের সহোদরকে বাসায় বোনের কাছে রেখে যান তিনি। আগুন শিলাদের বাসা অবধি না পৌঁছলেও সানিনের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে তার মাকে। মোহাম্মদ সুমন হারিয়েছেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। মর্গের সামনে সুমন শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়েই ছিলেন। এতকিছুর ভিড়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। সানিনের মামা ইসরাফিল বলেন, ওষুধ আনতে না গেলে হয়তো শিলা এভাবে হারিয়ে যেতো না। তাকে ফিরে পাবার আশা আমাদের নেই, এখন মরদেহটা খুঁজে পেলেও শান্তি। এতো গেল ছোট্ট সানিনের মাকে খোঁজার কথা। বাবা মোহাম্মদ জাফরকে (৪৩) খুঁজতে মর্গে আসেন দুই সহোদর মোহাম্মদ রাজু ও মোহাম্মদ সাদিক। তারা থাকতেন পুরান ঢাকার সাবরাজা শুকু মিয়ার গলি এলাকায়। চকবাজারে মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও প্লাস্টিকের জিনিস কেনাবেচার কাজ করতেন জাফর। বুধরাত রাত থেকে জাফর নিখোঁজ থাকায় শেষমেষ তার ছেলেরা মর্গে আসেন। সব মরদেহ দেখেও চিহ্নিত করতে পারেননি বাবাকে। বাবার লাশ খুঁজে পেতে সিআইডির কাছে রক্তের নমুনা দেন দুই ভাই রাজু ও সাকিব।
মোহাম্মদ রাজু জানান, ঘটনার সময় শার্ট ও লুঙ্গি পরা ছিলেন তার বাবা। বিকালেই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, যাবার সময় রাতে বাসায় ফিরে খাবার কথাও বলে গেছেন। পরিবারের সঙ্গে রাতের খাওয়াটা আর হলো না মোহাম্মদ জাফরের। তার ছেলেরাও আজ দু’দিন হলো অনেকটা না খেয়েই আছেন। হাসপাতাল, মর্গ আর চকবাজার এলাকায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন জন্মদাতা পিতাকে। সালেহ মোহাম্মদ লিপু ও সোনিয়া জাহান দম্পতির কাহিনী আরো করুণ। কেরানীগঞ্জে ঈগলু আইসক্রিমের পরিবেশক ছিলেন সালেহ মোহাম্মদ। আর স্ত্রী সোনিয়া ছিলেন পুরান ঢাকার আশিক টাওয়ারের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। বুধবারের আগুনে এই দু’জনের সঙ্গে প্রাণ গেছে তাদের আট বছরের একমাত্র ছেলে আপতাহিরও। সবে মাত্র ১৫ দিন হলো লিপু ও সোনিয়া চকবাজার ঈদগাহ এলাকায় বাসা নিয়েছেন। এর আগে থাকতেন লালবাগে। সোনিয়ার বড় ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার বোন ইডেন কলেজে পড়াশোনা করেছে। লিপুর সঙ্গে দশ বছরের সংসার জীবন তাদের।
আট বছরের ছেলে আপতাহির পড়তো বকশীবাজারের বীকন স্কুলে। কেরানীগঞ্জে কাজ করায় প্রতিদিনই রাতে সোনিয়ার অফিস থেকে তাকে নিয়ে রিকশায় বাসায় ফিরতো লিপু। ঘটনার দিন রাতে লিপু নৌকায় করে কেরানীগঞ্জ থেকে এপারে আসে। মায়ের অফিসেই ওই সময় বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল আপতাহির। বাবা আসলে সবাই মিলে একসঙ্গে বাসায় যাবে। বাড়িতে সেদিন রান্না না হওয়ায় পছন্দের দোকান থেকে বিরিয়ানি কিনে নেবার কথা ছিল তাদের। আশিক টাওয়ারে পৌঁছানোর পর স্ত্রী সোনিয়া ও ছেলে আপতাহিরকে নিয়ে রিকশায় করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয় লিপু। আগুন লাগার ৪-৫ মিনিট আগে উর্দু রোডের দিকে যায় তারা। এ সময় আমাদের সঙ্গে লিপুর কথা হয়।
এরপর থেকে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মির্জাগঞ্জের রাহেলা বেগম এখনো জানেন না তার ছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র (৪০) করুণ পরিণতির কথা। তিনি শুধু টিভিতে দেখেছেন পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুন লেগেছে। এরপর থেকে ছেলেকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মায়ের মন। মায়ের ছটফটানিতে ইতালি থেকে একদিনের নোটিশে চলে এসেছেন আনোয়ারের আরেক ভাই শাহজাহান ফিরোজ। বড় ভাই সাজ্জাদ হোসেন মর্গে এসেছেন ভাই আনোয়ারকে খুঁজতে। পুরান ঢাকায় বড় ভাইয়ের দোকানে কাজ করতো আনোয়ার। দুই ভাই একসঙ্গে বাংলাদেশে ল কলেজে পড়তেন আইন বিষয়ে। সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমার ভাই সব সময় তার সঙ্গে ল কলেজের আইডি কার্ডটা রাখতো। আমি প্রতিটা লাশ তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কোথাও আমার ভাইকে খুঁজে পাইনি।
আমরা আনোয়ারের ডেডবডিটা হলেও চাই। তাকে হারাতে চাই না। নোয়াখালীতে গ্রামের বাড়ি হলেও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ১৮ নম্বর নন্দকুমার দত্ত রোডে থাকতেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ছয় বছরের ছেলে মাহী বি চৌধুরী ও পাঁচ বছরের মেয়ে সানজিদা বাবার ফেরার অপেক্ষায় এখনো কষ্টের প্রহর গুনছে। গতকাল রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৪৬ জনের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানায় ঢাকা জেলা প্রশাসন। বাকি ২১ জনের মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন। এসব নমুনা সংগ্রহের পর মরদেহ শনাক্ত করতে প্রায় চার মাস লাগতে পারে বলে জানান সিআইডির এই কর্মকর্তা। গতকাল রাত পর্যন্ত মোট ১৭ জনের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডি।

নিমতলী থেকে চকবাজার: মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস! by নুরুজ্জামান লাবু

নয় বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছিলেন ১২৪ জন। বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সেই নিমতলী থেকে দেড় কিলোমিটারের দূরত্বে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে মারা গেলেন ৬৭ জন। আগুনের সূত্রপাত ভিন্ন হলেও দুটি ঘটনায় মিল অনেক। ২০১০ সালের ৩ জুনের আগুন অবৈধভাবে পরিচালিত কেমিক্যালের গুদামের কারণে তীব্রতা পেয়েছিল বেশি আর সেজন্য ক্ষয়ক্ষতিও হয় ব্যাপক। বুধবারের আগুনের ভয়াবহতাও বাড়ায় বসতবাড়িতে অবৈধভাবে পরিচালিত হওয়া কেমিক্যাল গুদাম।
২০১০ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। আগের মতোই পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে চলছে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদামজাতকরণ। এই এলাকার বাসিন্দারা যেন মৃত্যুর সঙ্গেই বসবাস করছেন প্রতিটি মুহূর্ত।
বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টার সর্বনাশা আগুনের পর আবারও আলোচনায় এসেছে সেই কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম। রাত সাড়ে দশটার দিকে একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত বলে জানা গেছে। পাশেই দাহ্য পদার্থের মজুদ থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। আগুনের লেলিহান শিখায় সড়কের যানজটে আটকে থাকা লোকজনসহ আশেপাশের দোকানপাট ও বসতবাড়ির বাসিন্দারা দিগ্বিদিক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন। নারী ও শিশুসহ ৬৭ জন ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। আগুনে পুড়ে ও আগুন থেকে বাঁচতে ছোটাছুটির সময় নানাভাবে আহত হন ৪১ জন। যাদের মধ্যে নয়জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। আর শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত ৬৭ জনের মধ্যে ৩৯ জনের মরদেহ শনাক্তের পর তাদের পরিবারের সদস্যরা নিয়ে গেছেন। বাকিদের ডিএনএ ম্যাচিং করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, বুধবার রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে আগুনের সূত্রপাতের খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের লালবাগ স্টেশনের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। আগুনের ভয়াবহতা দেখে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে সদর দফতর ও সদরঘাট স্টেশন থেকে আরও কয়েকটি ইউনিট পাঠানো হয় ঘটনাস্থলে। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে রাতে ঢাকা ও এর আশেপাশের সব ফায়ার স্টেশনের ইউনিটগুলোকে মুভ করতে বলা হয় চকবাজারের উদ্দেশে। শেষ পর্যন্ত ৩৯টি ইউনিট ভোর (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত টানা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। যদিও বৃহস্পতিবার দিনভর থেমে থেমে ছোট ছোট আগুনের কুণ্ডলী ও ধোঁয়া দেখা যায়, এমনকি বিকেলের দিকে স্প্রে ক্যানগুলো শব্দ করে ফুটতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোর থেকেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা একের পর এক লাশ উদ্ধার করতে শুরু করেন। লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে স্বজনদেরও ভিড়। ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। মধ্যরাতেই ঘটনাস্থলে যান ঢাকা দক্ষিণের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের ৬৭টি লাশ উদ্ধারের খবর জানান।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলেন, ‘আগুন নেভানোর কাজ শুরুর পর পানিস্বল্পতা হয়েছিল। পরে অবশ্য সেটার সমাধান করা হয়। এছাড়া ওই সময় রাস্তায় যানজট ছিল। তাই আগুন লাগার পর কেউ বের হতে পারেননি। আগুনে ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান। আমরা খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, একটি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটেই দ্রুত চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পাশে প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত আগুন বড় আকার ধারণ করে। বিস্ফোরণের পর ফায়ার সার্ভিসের কেউ ধারেকাছেও আসতে পারছিলেন না। গলিগুলোও খুব সরু। এ কারণে কাছে এসে কাজ করা কঠিন ছিল।’
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটা খুব জনবহুল এলাকা, প্রচুর মানুষ থাকে। তবে আমরা চেষ্টা করি এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রাখার। মানুষ সচেতন না হলে যেকোনও বড় ধরনের ঘটনা ঘটে যায়। এ ধরনের এলাকার বিষয়ে এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’
সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল সাড়ে দশটার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিম। ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসেছি। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছি। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে সব ধরনের সহায়তা করবে।’ বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্তের পর সরকার পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল কারখানা পুরোপুরি উচ্ছেদ কার্যক্রমে (এভিকশন ড্রাইভ) যাবে।’ এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সঙ্গে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘নিমতলীর ঘটনার পর থেকে আমরা বলে আসছি, ওখান থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নিতে। এরপর আবার চলে আসছে। তাই এখন মেয়র মহোদয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি আর লাইসেন্স রিনিউ করছেন না। এখন পর্যন্ত আমি যতটুকু জানি, তিনি একটা পদক্ষেপ নেবেন এগুলো সরিয়ে দেওয়ার জন্য।’
ধ্বংসস্তূপে পরিণত চুড়িহাট্টা
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের মোড় পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। সাড়ে চারতলা হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ভবনের নিচতলায় ছিল মার্কেট। দোতালায় ছিল পারফিউম, অ্যারোসোল ও আফটার শেভ লোশন ক্যানের গুদাম। তিনতলার অর্ধেক ছিল বসতবাড়ি আর বাকি অর্ধেক ব্যবহৃত হতো গুদাম হিসেবে। চারতলায় থাকতেন বাড়ির মালিক। ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশের ভবনের নিচতলার রাজমহল রেস্টুরেন্ট, দোতালায় রেস্টুরেন্ট কর্মচারীদের মেস, তিনতলায় বসতবাড়ি— সব পুড়ে গেছে। ওয়াহেদ ম্যানশনের বিপরীতে দুটি ভবন ও পশ্চিম দিকের সামনের ভবনের দোকানপাট ও বসতবাড়িও ছাই হয়ে গেছে আগুনে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কে প্লাস্টিকের দানা পড়ে আছে ছড়িয়েছিটিয়ে। মসজিদের সামনের অংশে পুড়ে কঙ্কালসার অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে দুটি প্রাইভেটকার। ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে দুটি পিকাপ ভ্যান। এছাড়া বাইসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, মটরসাইকেল, ঠেলাগাড়ি— সব পুড়ে ছাই। চারদিকের ভবনের দেয়ালগুলো ভেঙে পড়েছে রাস্তায়। এই ধ্বংসস্তূপ ভারী হয়ে ওঠে স্বজনহারাদের আকুতি, আহাজারিতে। কৌতূহলী হাজারো মানুষের ভীড় সামলাতেও রীতিমতো বেগ পেতে হয় পুলিশের।
সরেজমিন দেখা যায়, দুপুরে ধ্বংসস্তূপ থেকে আলামত সংগ্রহ করেন সিআইডির ক্রাইম সিনের সদস্যরা। পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্য, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই ও থানা পুলিশ সদস্যদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আগুনের কারণ, নানা উপকরণ সংগ্রহ, নাশকতা কিনা, তা যাচাই-বাছাই করতে তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যস্ত ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দুপুর একটার দিকে জনগণের চলাচল উন্মুক্ত করে দিলে মুহূর্তে ঘটনাস্থলসহ আশপাশ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বিকেলে মানুষের চলাচল আবার নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। সন্ধ্যায় সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা রাস্তা থেকে সবকিছু সরিয়ে ফেলেন।
হাসপাতালে কান্না-আহাজারির রোল
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে সারি সারি লাশ। বাইরে স্বজনদের কান্না, আহাজারি। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে স্বজনদের করুণ অপেক্ষা। নিখোঁজ স্বজনের ছবি নিয়ে অনেকে ঘোরাঘুরি করছেন। কেউ কাঁদছেন প্রিয় সন্তান হারিয়ে আবার কেউ স্বামী কিংবা ভাই। পিতৃহারা হয়ে কেউ কেউ চোখের জলে ভেসেছেন পুরোটা সময়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নিহতদের শনাক্তের জন্য ব্যাপক তৎপর ছিল পুলিশ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে বিশ হাজার টাকা করে দাফন বা সৎকারের খরচ। লাশবাহী কফিন বক্স নিয়ে এসে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা। দুপুর দুইটার পর কামলা নামে একজনের লাশ স্বজনদের হাতে তুলে দিয়ে শুরু হয় হস্তান্তর প্রক্রিয়া। এরপর তা চলে রাত পর্যন্ত। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলো সাইরেন বাজিয়ে একটি করে লাশ নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল গন্তব্যে।
জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের বিশ হাজার টাকা করে জানাজা বা সৎকারের খরচের বাইরে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের জন্য এক লাখ এবং যেসব শ্রমিক আহত হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান।
আবারও একাধিক কমিটি, আশ্বাস!
নয় বছর আগের নিমতলী ট্রাজেডির পর এবারও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পক্ষ থেকে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা শুনিয়েছেন বিভিন্ন আশ্বাসবাণী। পুরান ঢাকার অলিগলিতে বাসিন্দারা যেভাবে দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস করছেন তা নিরসন করতে নানা উদ্যোগের কথা বলেছেন তারা। দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশনস) মেজর শাকিল নেওয়াজ জানান, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা। উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধনের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তারা আগুনের সূত্রপাতের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মফিজুল হককে কমিটির আহ্বায়ক এবং বিসিকের পরিচালক (প্রকল্প) আব্দুল মান্নানকে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে বলে পিআইডি’র এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল ও বিকেলে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন শেষে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘চকবাজার এলাকার রাজ্জাক (হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন) ভবনে সংঘটিত আগুনের ঘটনা গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকে হয়েছে। এরপরও এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং আগুন দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ দেওয়ার জন্য এরই মধ্যে ১২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।’
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “রাজধানীর পুরনো ঢাকার কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক কারখানাগুলো পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তরের জন্য কেরানীগঞ্জে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৫০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এ প্রকল্পে ৯৩৬টি প্লট থাকছে। ২০১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।’
যদিও নয় বছর আগে নিমতলী ট্রাজেডির পর এরকম একাধিক উদ্যোগ ও সুপারিশের কথা জানানো হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু নয় বছরেও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম সরেনি। উল্টো ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একবার এসব অবৈধ কারখানা ও গুদামের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও অজানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন অবশ্য বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, সম্প্রতি তারা আবার সেই অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটে গেছে। এই অভিযান এখন আরও জোরদারভাবে পরিচালনা করা হবে।
রাতে ঢাকা মেডিক্যালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরান ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে একই ভবনে ব্যবসা, দোকান আর মানুষজন থাকেন। এর মধ্যে ছোট ছোট কারখানার থাকে। এই দুঃখজনক ঘটনার পর সবার টনক নড়বে।’ তিনি বলেন, ‘এখানে হয় মানুষ বসবাস করবে, না হয় শিল্পকারখানা থাকবে। যেকোনও একটা সিদ্ধান্তে যেতে হবে।’

গাড়িতে গাড়িতে ‘গ্যাস বোমা’ by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

একেকটি যানবাহনে গ্যাস সিলিন্ডার যেন শক্তিশালী বোমা। বিপজ্জনক এ সিলিন্ডার এখন ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। যানবাহন, বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁয় অনিরাপদ সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিটি গাড়িই যেন গ্যাস বোমা বহন করছে! নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার এখন বিপজ্জনক বোমায় পরিণত হয়েছে। বৈধ বা অবৈধভাবে গাড়িতে সংযোজিত সিএনজি সিলিন্ডার এখন জানমালের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনায় অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। কিন্তু সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার তেমন কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না।
চকবাজার ট্র্যাজেডির পর গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার না করার বিকল্প ভাবছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ওই সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। এ আশঙ্কা রোধে গ্যাস সিলিন্ডারের সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি পুরনো সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষায় কেউ উদ্যোগী হচ্ছে না। রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ বেশিরভাগ গাড়ি বিপজ্জনক সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় চলছে প্রতিদিন। ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে সিএনজি সিলিন্ডারের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লি. (আরপিজিসিএল)।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গাড়িতে ব্যবহার করা গ্যাস সিলিন্ডার মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। মানহীন ও সময়মত পুনঃপরীক্ষা না করানোই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত দায় চাপাচ্ছে বিআরটিএ’র (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) কাঁধে। বলছে, বিষয়টি আইনের মধ্যে না থাকায় রোধ করা যাচ্ছে না সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। আরপিজিসিএল’র হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে একই সিলিন্ডার পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার করা গাড়ির সংখ্যা অর্ধেকের বেশি। পুনঃপরীক্ষা ছাড়াই চলছে সড়ক-মহাসড়কে।
এ বিষয়ে আরপিজিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মহাম্মদ আলী বিশ্বাস বলেন, ৫ লাখ গাড়িতে সাড়ে ৫ লাখ সিলিন্ডার রয়েছে। এর অর্ধেকের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও রিটেস্ট করাতে আসে না। আর ট্রাকগুলো যে সিলিন্ডার ব্যবহার করে তার পুরোটাই অবৈধ। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি সিলিন্ডার ৫ বছর অন্তর পরীক্ষা করানোর কথা থাকলেও পরিবহনগুলো আসে না। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বিআরটিএ’র ভূমিকা রয়েছে। ফিটসেনকে ঠিকমত দেখলে এ রকম দুর্ঘটনা ঘটতো না।
সূত্র জানায়, সারা দেশে রিটেস্ট সেন্টার রয়েছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪টি। বিআরটিএ থেকে ফিটনেস নেয়ার সময় যদি রিটেস্ট বা পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে কমবে ঝুঁকি। আর বাঁচবে জীবন। বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা সাড়ে ৩৮ লাখ। এর মধ্যে ঢাকায় চলছে ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ১৯২। যার বড় একটি অংশ সিএনজিচালিত। কিন্তু এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। ঢাকাসহ সারা দেশে যানবাহনের একটি বড় অংশই সিএনজিচালিত। কিন্তু সিলিন্ডারের ফিটনেস পাঁচ বছর পর পর পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও, তা করা হচ্ছে না। জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে চার লাখ গ্যাস সিলিন্ডারের মধ্যে মাত্র ৫৩ হাজার ৮০০ সিলিন্ডারের রিটেস্টিং করা হয়েছে। মোট সিলিন্ডারের যা মাত্র ১৪ ভাগ। সারা দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১৮০ সিএনজি কনভারশন ওয়ার্কশপ রয়েছে। দেশে গত ১৫ বছর ধরে সিএনজিচালিত গাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিনের পুরাতন সিলিন্ডার ব্যবহার করায় গাড়িচালক ও ব্যবহারকারী নিজেই জানেন না তার গাড়িটি বিপজ্জনক বোমা হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে প্রচার কম থাকার অভিযোগ উঠছে। অথচ মেয়াদোত্তীর্ণ এক একটি সিলিন্ডার একটি বোমার চেয়েও ভয়াবহ। সূত্র মতে, প্রতিটি গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডার রিটেস্টিং জন্য দু-তিনদিন সময় লাগে। এ ছাড়া রিটেস্টিং করাতে গেলে ২০ থেকে ৪০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য দুই হাজার টাকা, ৪০ থেকে ৬০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য আড়াই হাজার টাকা, ৬০ থেকে ৮০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য তিন হাজার টাকা এবং ৮০ লিটারের বেশি প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। এ কারণে গাড়ির মালিকরা এ প্রক্রিয়াকে বাড়তি খরচ ও সময় নষ্ট বলে মনে করেন। সূত্র জানায়, মাঝে মধ্যে কিছু প্রাইভেটকারের পুনঃপরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া যায় তবে বাস-ট্রাক বা অন্য যানবহনগুলোর কোনো তথ্যই নেই।
অভিযোগ রয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির আড়ালে কিছু অসাধু ব্যক্তি নিয়মের তোয়াক্কা না করে কম পয়সায় যানবাহনকে সিএনজিতে রূপান্তর করে দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে অক্সিজেন সিলিন্ডার এমনকি কম দামি জোড়াতালি দেয়া সিলিন্ডারও গাড়িতে বসানো হয়। রফিক নামের একজন সিএনজিচালক মানবজমিনকে বলেন, নতুন গাড়ির সঙ্গে যে সিলিন্ডারগুলো আসে সেগুলো পাঁচ বছরের বেশি সময় যায়। তার গাড়ি বয়স ৬ বছরের উপরে। এখনো পুরানো সিলিন্ডার দিয়েই চলছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি জোড়াতালি দেয়া সিলিন্ডার তৈরি করে দেশে। এগুলোই দুর্ঘটনা ঘটায়। মানুষ মারা যায়। মনে হচ্ছে দেখার কেউ নেই। গাড়ির জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা সিলিন্ডারগুলো উচ্চ তাপমাত্রা ও হাইড্রোলিক চাপ সহনীয় করে তৈরি করা হয়। সেখানে জোড়া থাকে না।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, বাজারে গুণগত সিলিন্ডার আসছে না। গাড়িগুলো সিলিন্ডার সঠিক সময় পরীক্ষা করছে না। মান ঠিকমত যাচাই হচ্ছে না। ফিটনেস দেখা হচ্ছে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার এখন জীবন্ত বোমায় পরিণত হচ্ছে। পাঁচ বছর পর পর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তা ব্যক্তিরা ঘুষ খেয়ে সুবিধা দিচ্ছে। এদিকে মানুষের জীবন যাচ্ছে। জীবন রক্ষার অধিকার হারাচ্ছে জনগণ। দেশে সুশাসনের অভাবেই এসব ঘটনা ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওবায়দুল কাদের যা বললেন: এদিকে গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের দেখতে এসে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পুরান ঢাকার চকবাজার ট্র্যাজেডির দায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না। সরকার নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে না। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তার জন্য কাজ করছে। তিনি বলেন, এখানে জীবিকার চেয়ে জীবনের ঝুঁকি বেশি। তাই এখানে কেমিক্যাল গোডাউন থাকতে দেয়া হবে না। নিমতলির ঘটনার পর কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্লোজ মনিটরিংয়ের অভাব ছিল। তাই এখানে আবার গোডাউন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, গাড়িতে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিপজ্জনক ঘটনা ঘটাচ্ছে। সিলিন্ডার ব্যবহার না করাই ভালো। এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার না করার বিকল্প ভাবা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যাতে কেমিক্যাল গোডাউন না থাকে। এ সময় নিহত মধ্যে ৯ জনকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একলাখ টাকা দেন সেতুমন্ত্রী।

মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ

সিগন্যালে আটকে আছে সারি সারি যানবাহন। সারির সামনে ২০-২৫টি মোটরসাইকেল। একটু ফাঁকা পেয়েই ভোঁ টান দিয়ে মোড়ের এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলে গেল কয়েকটি মোটরসাইকেল। অন্য বাহনগুলো তখনো সিগন্যালে আটকে। গতকাল বুধবার আসাদগেট মোড়ে দেখা মেলে এই দৃশ্যের। তবে এই চিত্র কেবল আসাদ গেটের নয়, রাজধানীর সড়কে এই দৃশ্য দেখা যায় নিত্যদিন।
ট্রাফিক পুলিশ বলছে, মোটরসাইকেলের এমন বেপরোয়া চালনার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। বাড়ছে যানজটও। অথচ রাইড শেয়ারিং সেবার কারণে রাজধানীতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই রাইড শেয়ারিং সেবায় মোটরসাইকেল যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ চাইছে তারা। বিআরটিএর কাছে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবায় বা রাইড শেয়ারিংয়ে ঢাকার বাইরে নিবন্ধিত কোনো মোটরসাইকেল যাতে যুক্ত হতে না পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে।
জানা গেছে, অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবার জন্য গত বছর একটি নীতিমালা করেছে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা চালাতে হলে বিআরটিএর কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধন থাকতে হবে এই সেবায় যুক্ত মোটরসাইকেলেরও। এ জন্য অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিআরটিএর দ্বারস্থ হয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানায়, অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবায় ঠিক কতগুলো মোটরসাইকেল যুক্ত, এ–সংক্রান্ত কোনো তথ্যভান্ডার এখনো তৈরি হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরের নিবন্ধিত অনেক মোটরসাইকেল অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবায় যুক্ত। ট্রাফিক পুলিশের দাবি, রাইড শেয়ারিং সেবায় ঢাকার বাইরে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল চলতে দেওয়া না হলে ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা কমবে এবং একে নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ১৯২টি। এর মধ্যে শুধু মোটরসাইকেলই ৬ লাখ ২৫ হাজার ৪১৮টি।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘অতিরিক্ত আয়ের জন্য অনেকেই মফস্বল থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকায় আসছেন। রাইড শেয়ারিং সেবার মাধ্যমে মোটরসাইকেলগুলো চলছে। রাইড শেয়ারিং সেবার কারণে চলাচলে যেমন সুবিধা হয়েছে, তেমনি যানজটও বেড়েছে। আমরা চাই গণপরিবহনের উন্নতি হোক এবং রিকশা, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমুক। তাই রাইড শেয়ারিং সেবায় ঢাকার (ঢাকা মেট্রো) বাইরে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল না চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি এ নিয়ে বিআরটিএতে একটি বৈঠকও হয়েছে। এতে অন্যান্য অংশীজনও ছিলেন। তবে বিআরটিএ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।’
সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
ট্রাফিক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, ঢাকা শহরে চলা যান্ত্রিক বাহনের মধ্যে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা বেশি। ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়, তার অর্ধেকই হয় মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। তারপরও ফুটপাত দিয়ে চলা, উল্টো পথে চলা, সিগন্যাল না মানাসহ নানা সমস্যা দূর করা যাচ্ছে না। তাঁদের মতে, মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এ সমস্যা আরও বাড়বে।
ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার ট্রাফিক আইন অমান্য করায় ঢাকা শহরে ৬ হাজার ১৫১টি মামলা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। যার মধ্যে ২ হাজার ৫১৪টি মামলাই হয়েছে মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে।
মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সুপারিশ সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সুপারিশটি যৌক্তিক। মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু ব্যবহারে নয়, উৎপাদনের ক্ষেত্রেও। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধি ভবিষ্যতের জন্য বিরাট হুমকি হিসেবে আসছে। এই হুমকি সড়কের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য।

টার্গেটে বিশ্বের সব থেকে বড় বাংলা ব্লগ

গত সপ্তাহে কর্তৃপক্ষ পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে যে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে তার অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮০০০ ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষার সব থেকে বড় ব্লগিং সাইট সামহোয়্যারইন ব্লগও। এছাড়া আছে গুগল বুকস, বিখ্যাত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাপ টিকটক ও বিগো। একইসঙ্গে বেশ কয়েকজন নামকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীকে পুলিশ স্টেশনে ডেকে নিয়ে তাদের তৈরি ‘অমার্জিত’ কনটেন্ট মুছে ফেলতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গ্লোবাল ভয়েজ।
১৮ই ফেব্রুয়ারি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার তার ফেসবুক পাতায় লেখেন, আমি ১৫,৬০৬টি পর্নোসাইট ও ২২৩৫টি জুয়ার সাইট খুঁজে পেয়েছি। এরমধ্যে রয়েছে টিকটক ও বিগো। সবগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে অনেকেই এখন ভিপিএন বা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব সাইটে ঢুকতে পারছেন।
বাংলাদেশে অনলাইন কনটেন্ট নিষিদ্ধ করা নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমও পর্নোসাইট বন্ধের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। সেসময় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রায় ৫ শতাধিক পর্নোসাইট বন্ধ করেছিল। তবে পরে কিছু সাইট এইচটিটিপিএস এ আপগ্রেড করলে তা পুনরায় চালু হয় এবং তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সামহোয়্যারইন ব্লগের বিষয়ে মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এসব ওয়েবসাইটের বিষয়ে রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি স্বীকার করেছেন ওয়েবসাইট যাচাইয়ে কিছু ভুল হয়তো হতে পারে তবে তা ঠিক করে দেয়া হবে।
সামহোয়্যারইন ব্লগ (বাঁধ ভাঙার আওয়াজ) বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম ব্লগিং সাইট। এটি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এটিই বাঙালি ব্লগারদের জন্য বিশ্বের সর্ববৃহত সাইট। প্রতিদিন এখানে গড়ে ৬০,০০০ ব্লগার সক্রিয় থাকেন। গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি ব্লগটির পাঠকরা জানান, তারা আর এতে প্রবেশ করতে পারছে না। এরপর ব্লগ থেকে জানানো হয় যে তাদের সিস্টেমটি ঠিকভাবেই কাজ করছে এবং কর্তৃপক্ষ থেকে তারা এ বিষয়ে কোনো নোটিস পায়নি। কিন্তু এরপর আনুষ্ঠানিক নিষিদ্ধ সাইটের তালিকায় সামহোয়্যারইন ব্লগের নাম পাওয়া যায়। গ্লোবাল ভয়েসকে ব্লগটির একজন প্রতিষ্ঠাতা জানান, এই ব্লগে পর্নোগ্রাফি কিংবা আপত্তিকর কোনো কনটেন্ট দেয়া হলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকজন সেক্যুলার ব্লগার ও অধিকারকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ফয়সাল আরেফিন দিপন, শফিউল ইসলাম, ওয়াশিকু রহমান বাবু, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাস। এর আগেও বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় ব্লগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশ সানাই মাহবুব নামের একজন অভিনেত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নেয়। পুলিশ তাকে তার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক পাতা থেকে ‘উত্তেজক’ সকল ছবি মুছে ফেলতে বলে। এ বিষয়ে ব্লগার কুং থাং ফেসবুকে লিখেছেন, আমি বুঝতে পারছি না সানাই কি দোষ করেছে। স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক কি তার মতো করে থাকতে পারবে না? কেউ চাইলেই ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করে ফেসবুকে তা মানুষকে দেখাতে পারে। আমি যদি এটা পছন্দ না করি আমি কখনো তার পেজে যাব না। এর দুদিনের মাথায় জনপ্রিয় ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরকেও তার একটি মিউজিক ভিডিও নিয়ে পুলিশ একই আহ্বান জানায়। সালমান মুক্তাদির তার বিতর্কিত ওই ভিডিওটি প্রকাশ বন্ধ করে দেয় এবং ফেসবুকে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

কোথায় হারালো দুই বোন

ফাতেমা-তুজ জোহরা বৃষ্টি ও রেহেনুমা তারান্নুম দোলা খালাতো বোন। শাড়ি ছিল তাদের   দু’জনের ভীষণ প্রিয়। উৎসব, উপলক্ষ কিংবা যেকোনো আয়োজনে শাড়ি থাকতো তাদের পছন্দের তালিকায়। দোলা আর বৃষ্টির ফেসবুক টাইমলাইনজুড়ে থাকা বেশিরভাগ শাড়ি পরা ছবি তারই প্রমাণ দেয়। আপন বোন না হলেও দু’জনের চালচলনে ছিল বেশ মিল। দু’জনেই চশমা পরতেন, তাও প্রায় একই রকম ফ্রেমের। শিল্প-সাহিত্যেও আগ্রহ ছিল বেশ। আবৃত্তিতে ঝোঁক কিছুটা বেশি।
দু’বোন মিলে ভর্তিও হয়েছিলেন প্রজন্মকণ্ঠ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির একটি আবৃত্তি সংগঠনে। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি দারুণ ঝোঁক থাকায় পরিবারও দু’জনকে বেশ উৎসাহ দিতো। ‘একা থাকার এই ভালো লাগায় হারিয়ে গিয়েছি, নিঃসঙ্গতা আমাকে আর পাবে না...’ গত ৩রা জানুয়ারি ফেসবুকে এমন একটি লেখা পোস্ট করেছিলেন রেহেনুমা তারান্নুম দোলা।
অথচ তার প্রায় দেড় মাস পর বোন ফাতেমা-তুজ জোহরা বৃষ্টিকে নিয়ে সত্যিই হারিয়ে গেছেন দোলা। গত বুধবার চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনের ঘটনার পর থেকে দোলা আর বৃষ্টিকে হন্যে হয়ে খুঁজছে তাদের পরিবার। দলিলুর রহমান দুলাল ও সুফিয়া কামালের কন্যা রেহনুমা তারান্নুম দোলা থাকতেন ১৩৮/৯ লালবাগ রোড এলাকায়। এর ঠিক পাশেই ৪১/১ হাজী রহিম বক্স লেনে থাকতো জসিম উদ্দিন ও শামসুন্নাহারের মেয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টি। পড়তেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের তৃতীয় বর্ষে। আর দোলা আইন নিয়ে পড়তেন মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে। গত বুধবার বিকালে সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমিতে নিজেদের আবৃত্তি সংগঠন প্রজন্ম কণ্ঠের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে একসঙ্গে বাসা থেকে বের হয় দোলা ও বৃষ্টি। সেদিনও দু’জনে শাড়ি পরাই ছিলেন। খোঁপায় ছিল ফুলও। দুপুরের পর বাসা থেকে চলে যান শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানে। দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরে আসবে বলেও জানায় দু’জনে। অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন দুই বোন। কেবি রুদ্র রোড এলাকায় পৌঁছালে মুঠোফোনে কথা হয় ভাই সাজিদুল ইসলাম সাজিদের সঙ্গে। ১০টার কিছুক্ষণ পরেই তাদের সঙ্গে কথা হয় বলে জানান সাজিদ। তিনি বলেন, আমাকে ফোনে বলেছিল আর মিনিট দশেকের মধ্যে তারা বাসায় চলে আসবে। অথচ দু’দিন হয়ে গেল এখনো আমার বোনদের খুঁজে পেলাম না।
প্রজন্মকণ্ঠ আবৃত্তি সংগঠনের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুমন জামান জানান, বুধবার শিল্পকলায় একুশের প্রথম প্রহর উদযাপনের অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষ করে বাসার ফিরে যাবার সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালবাগ শাহী মসজিদ এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় দু’জনে। মাঝে আমার সঙ্গে কথা হয়। ওরা শিল্পকলা একাডেমি থেকে রিকশায় করে যাচ্ছিল। দোয়েল চত্বর দিয়ে ঢুকতে না পেরে চানখারপুল, হোসেনি দালান ও লালবাগ মসজিদ হয়ে বাসার দিকে যাচ্ছিল তারা। দোলা ও বৃষ্টি দু’জনের মুঠোফোনের সবশেষ লোকেশন লালবাগ শাহী মসজিদ এলাকাতেই দেখাচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে অশ্রুসজল নয়নে বোনদের ফেরার অপেক্ষায় ভাই সাজিদ। কথা বলতে গিয়েই ঢুকরে কেঁদে উঠেন। জানান পড়াশোনা নিয়ে তেমন খুনসুটি ছিল না দু’জনের। তবে, কবিতা ও আবৃত্তি নিয়ে দোলা ও বৃষ্টি বেশ প্রতিযোগিতা করতো। অনেক সময় বাসাতেই নিজেরা অনুশীলন করতো। কোনোখানে ভুল করলে একজন আরেকজনকে বেশ ক্ষেপাতো। আর টিভিতে কারো আবৃত্তি দেখলে এক বোনকে আরেক বোনকে বলতো, একদিন দেখিস আমিও এরকম হবো...

যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আরেকটি ‘কিউবার মিসাইল সংকটের’ জন্য প্রস্তুত রাশিয়া

আরেকটি ‘কিউবার মিসাইল সংকটের’ জন্য প্রস্তুত রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে এ কথা বলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বুধবার সাংবাদিকদের কাছে এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারন করেছেন তিনি। পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নির্বোধের মত আচরণ করতে থাকে তাহলে রাশিয়াও প্রস্তুত। পরমাণু আক্রমণে রাশিয়াই এগিয়ে আছে। এ খবর দিয়েছে আল-জাজিরা।
এ হুমকির মাধ্যমে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পার্শ্ববর্তী কমিউনিস্ট দেশ কিউবার সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর আগে পুতিন ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপের কোনো দেশে রাশিয়া থেকে কাছাকাছি কোথাও পরমাণু বোমা মোতায়েন করে তাহলে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের আরো নিকটে পরমাণু বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে। ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র তুরস্কতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল।
জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে কিউবাতে ব্যালেস্টিক মিসাইল মোতায়েন করে। এর ফলে তখন পৃথিবীতে পরমাণু যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে মিসাইল সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর দেশদুটি এ ধরণের কোনো ব্যবস্থা নেবে না এমন চুক্তি সাক্ষর করে। কিন্তু সেই চুক্তি এখন বাতিল হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পরমাণু সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব।
ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, এমন অবস্থা হোক আমরা সেটা চাই না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি চায় তাহলে ঠিকাছে, তাকে স্বাগতম। পুতিন আরো বলেন, রাশিয়া সাবমেরিনে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে পারে যার মাধ্যে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভ’খণ্ডে আঘাত হানা যাবে।

রাসায়নিকের গোডাউন ওয়াহেদ ম্যানশন by রুদ্র মিজান ও শাহনেওয়াজ বাবলু

পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে গোডাউন। সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি এসব গোডাউনে রয়েছে বিপুল কেমিক্যাল। ট্রাকে-পিকআপে করে রাতে-দিনে কেমিক্যাল আনা-নেয়া হয় সেখানে। আছে নানা ধরনের কারখানাও। যেখানে তৈরি করা হয় কেমিক্যাল জাতীয় বিভিন্ন পণ্য। তেমনি একটি মার্কেট হচ্ছে আবদুল ওয়াহেদ ম্যানশন। চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এই মার্কেট থেকেই সবচেয়ে বেশি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। চার তলা ভবনের বিশাল বেজমেন্ট জুড়ে নানা ধরনের কেমিক্যাল।
গোডাউনের কেমিক্যাল বিস্ফোরিত হলে অবস্থা হতো আরো ভয়াবহ। বিশেজ্ঞরা বলছেন পুরো ভবনটিই হয়তো উড়ে যেতো।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক ও চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, আবদুল ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টে বিপুল কেমিক্যাল। এখানে টিন, ড্রাম, কন্টিনার ভরা কেমিক্যাল পাওয়া গেছে। আগুন লাগার পর আমরা বিষয়টি জানতে পারি। তাই ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম সক্রিয় ছিল যাতে বেজমেন্টে আগুন ছড়াতে না পারে। এখানে আগুন ছড়ালে ভয়াবহতা আরো বেশি হতো। এগুলো বিস্ফোরিত হলে বিল্ডিং হয়তো ধসে পড়তো। পার্কিংয়ের স্থানে কেমিক্যালের গোডাউনটি বেআইনি বলে দাবি করেন তিনি।
আবদুল ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টের ভেতরে গাঢ় অন্ধকার। গতকাল সেখানে ঢুকে আলো জ্বেলে দেখা গেছে, সরু রাস্তা ছাড়া পুরো বেজমেন্টজুড়ে নানা ধরনের ড্রাম, বস্তা রাখা হয়েছে। বস্তার গায়ে বড় করে লেখা আছে কেভিন পিগমেন্টেড। টেক্সটাইলে রঙে ব্যবহৃত হয় কেমিক্যাল। একইভাবে সারি সারি সাজানো আছে প্রিনটেক্স ভি, গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইল, রি-অ্যাকটিভ এসিড, বেসিক, সলভেন্ট ডাই, ইঙ্কজেক্ট, সোপ-ডিটারজেন্ট পিগমেন্ট, ন্যাফথল, ফাস্ট বেস এবং কালার সল্ট, টেক্সটাইল অক্সিলিয়ারি, অপটিকাল ব্রাইটনার, ক্যারামেল কালার, সিনথেটিক ফুড কালার, থিকেনার, এডহেসিভ, এনজাইম ও ল্যাব কেমিক্যাল। আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এসব রাসায়নিক পদার্থ। এক-একটি বস্তা বা ড্রাম হয়ে উঠে এক একটি শক্তিশালী বোমা।
আবদুল ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় উঠে দেখা গেছে, ফ্লোর পুড়ে কালো, বাদামি হয়ে গেছে হাজার হাজার কৌটা। কৌটাগুলো মূলত পারফিউম, লোশন, বডি স্প্রের। আশেপাশের বাসিন্দারা জানান, এখানে বডি স্প্রে ও পারফিউম তৈরি হতো। এসব তৈরি করতে গ্যাস ও কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। চুড়িহাট্টার মসজিদ মোড়ে গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের মধ্যে ওয়াহেদ ম্যানশনে ছড়িয়ে যায় আগুন। এ সময় বোমার মতো উড়ে উড়ে বিস্ফোরিত হচ্ছিল কেমিক্যালের কৌটা, বডি স্প্রে।
গতকাল এসব পরিষ্কার করছিলেন স্বেচ্ছাসেবী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পুড়ে যাওয়া রাজ্জাক ভবনে গিয়ে দেখা গেছে একই অবস্থা। বেশিরভাগ দোকানই কেমিক্যাল জাতীয় পণ্য ও প্লাস্টিকের দানার। পুরান ঢাকা জুড়েই এসব দোকান, কারখানা ও গোডাউন। ২০১৭ সালে পুরান ঢাকায় একটি জরিপ করে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স। তাদের জরিপ অনুসারে সহস্রাধিক ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে ওই এলাকায়। লালবাগ ও মিটফোর্ড এলাকার ২৪ ও ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল কারখানা ও গুদাম শনাক্ত করেছিল ফায়ার সার্ভিস। ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউন ও কারখানার বেশির ভাগই রয়েছে পুরান ঢাকার লালবাগ, ইসলামপুর, ইসলামবাগ, শহীদনগর, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচরসহ আশেপাশের এলাকায়। এগুলোর বেশির ভাগেরই সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোনো অনুমোদন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বহাল তবিয়তে চলে এই ব্যবসা।
তদন্ত কমিটির সদস্য বললেন ভবনে কেমিক্যাল ছিল
চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভবনগুলোতে কেমিক্যালের উপস্থিতি ছিলো কিনা তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। এ নিয়ে পৃথক দু’ধরনের বক্তব্য দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিস। শিল্প মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এখানে কোনো কেমিক্যাল গোডাউন ছিল না। অন্যদিকে গতকালও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা কেমিক্যাল থাকার কথা জানিয়েছেন।
গতকাল সকালে চুড়িহাট্টা মোড়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এ ছাড়া আরো অন্যান্য কেমিক্যাল ছিলো। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জুলফিকার বলেন, অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। যা যা ছিল, সেগুলো এক ধরনের কেমিক্যাল। এগুলোর জন্যই আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় লেগেছে বেশি।
ডিএসসিসির তদন্ত কমিটির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আমরা আজ সকাল ৯টার পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পরিদর্শনে এসেছি। আগুনে পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যেতিনটি ভবন প্রাথমিকভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী বলে মনে হয়েছে।
আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউনের কোনো অনুমতি নেই। সরকারের নির্দেশনার পর নতুন করে লাইসেন্স দেয়া হয়নি। এ ঘটনায় কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মেয়র বলেছেন, যে কোনো মূল্যে সবাই মিলে এসব এলাকার কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেয়া হবে।
এতদিন সরানো হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই চেষ্টা করে যাচ্ছি। এবার যেকোনো মূল্যে সেগুলো সব সরিয়ে নেয়া হবে।
এ কমিটির সদস্য বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হওয়া ওয়াহেদ মঞ্জিলের গ্রাউন্ড ফ্লোর ও দোতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিম ও কলামগুলো বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩-৪ তলার বিম ও কলাম তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এক সপ্তাহ পর জানা যাবে, ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী কি না। আগুন লাগা অন্যান্য ভবনগুলোও আমরা পরিদর্শন করেছি। তবে এগুলো ব্যবহারের উপযোগী কি না পরীক্ষা শেষে এক সপ্তাহ পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন প্রফেসর ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী (পুর কৌশল বিভাগ-বুয়েট), প্রফেসর ড. ইশতিয়াক আহমেদ (পুর কৌশল বিভাগ-বুয়েট), লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান (পরিচালক-ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স), মো. আসাদুজ্জামান (অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-ডিএসসিসি), মো. জাফর আহম্মেদ (অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-ডিএসসিসি), মো. সিরাজুল ইসলাম (প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ-ডিএসসিসি), মো. নুরুল ইসলাম (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-রাজউক),  মো. শাহ আলম (পরিচালক-রাজউক), মো. নুরুজ্জামান জহির (অথরাইজড অফিসার-রাজউক) ও সদস্য সচিব মুন্সী মো. আবুল হাসেম (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-ডিএসসিসি)।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সুরক্ষাসেবা বিভাগ সংশ্লিষ্ট জরুরি কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে। কন্ট্রোল রুমটির সার্বিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব  প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী। কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম চলে গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত।
১২ সদস্যের আরেকটি কমিটি ঘোষণা করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মফিজুল হককে প্রধান করে এ কমিটি করা হয়। কমিটিকে পাঁচদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ওদিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মেদ খান বলেছেন, ভবনে দাহ্য পদার্থ, থিনার থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখানে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র, বডি স্প্রে বানানো হয়। যে কারণে আগুনের ভয়াবহতা বেড়ে যায়। তিনি বলেন, আগুনের সূত্রপাতের বিষয়টি নিয়ে এখনও তদন্ত হচ্ছে।

ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় কারা?

বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি হামলার শিকার হওয়ার পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ভারত। এসব ঘটনায় শত শত প্রাণহানির সঙ্গে হামলার ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে আরও অনেককে। এসব ঘটনায় দিল্লি যাদের অভিযুক্ত বলে মনে করে তাদের অনেকেই এখন ভারতের বাইরে পালিয়ে রয়েছে। তবে তাদের অনেকেই আবার ভারতে লুকিয়ে রেখে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করে দিল্লি। ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা শীর্ষ কয়েকজন সন্দেহভাজন অপরাধীর তালিকা দেখে নেওয়া যাক।
দাউদ ইব্রাহীম ও মাসুদ আজহারদাউদ ইব্রাহীম ও মাসুদ আজহার
দাউদ ইব্রাহীম
ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার প্রথমেই আসে দাউদ ইব্রাহিমের নাম। ১৯৯৩ সালের মু্ম্বাই হামলার মূল হোতা বলে দাউদকে সন্দেহ করা হয়। ভারতসহ উপমহাদেশের অপরাধ জগতের বড় ক্রীড়নক বলে মনে করা হয় তাকে। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাতে দ্বিতীয় স্থানে আছে দাউদ। ডি কোম্পানি নামে নিজের অপরাধ জগত চালায় বলে মনে করা হয়। ধারণা করা হয় পাকিস্তানে নিরাপদে বসবাস করেই নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে দাউদ।
মাসুদ আজহার
পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদের এই নেতা ২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে  হামলায় জড়িত বলে দাবি করে থাকে ভারত। ভারতের হাতে আটক হলেও আফগানিস্তানের কান্দাহারে বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায়  তাঁকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন ভারত সরকার। সম্প্রতি কাশ্মিরের পুলওয়ামাতে  ভারতের ‘সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স’র গাড়ি বহরে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় তার হাত আছে বলে অভিযোগ তুলেছে দিল্লি।
সাইদ সালাউদ্দিন
সাইদ সালাউদ্দিনসাইদ সালাউদ্দিন
ভারতে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের প্রধান সাইদ সালাউদ্দিন। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সালাউদ্দিন যুদ্ধ চালিয়ে আসছে বলে মনে করা হয়। ২০১১ সাল থেকে তাকে খুঁজছে ভারতের গোয়েন্দারা।
হাফিজ মোহাম্মদ সাইদ
হাফিজ মোহাম্মদ সাইদহাফিজ মোহাম্মদ সাইদ
জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা প্রধান হাফিজ মোহাম্মদ সাইদ। তাকে ২৬/১১ মুম্বাই হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড বলে মনে করে ভারত। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের জঙ্গি হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাকে অভিযুক্ত করে ভারত। তবে পাকিস্তানে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় সাইদ।  ২০১৮ সালের পাকিস্তানের নির্বাচনে অংশগ্রহণও করেছিল সে।
জাকি-উর-রহমান লাখভি
জাকি-উর-রহমান লাখভিজাকি-উর-রহমান লাখভি
লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য পাকিস্তানি নাগরিক জাকি-উর-রহমান লাখভি বর্তমানে কাশ্মিরের সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করে ভারতের গোয়েন্দারা। মুম্বাই হামলাতেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করে ভারত। দিল্লির অভিযোগ হামলায় অংশ নিতে ধরা পড়া হামলাকারী আজমল কাসভের পরিবারকে দেড় লক্ষ টাকা দিয়েছিলো লাখভি।  ২০০৮ থেকে ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছে তার নাম।
ছোটা সাকিল
ছোটা সাকিলছোটা সাকিল
মোহাম্মদ শাকিল বাবু মিয়া শেখ অপরাধ জগতে ছোটা সাকিল নামেই  পরিচিত। তাকে ১৯৯৩-এর মুম্বাই হামলায় দাউদের অন্যতম সঙ্গী বলে মনে করা হয়। গোয়ান্দাদের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এই অপরাধী ২০১৭-র ডিসেম্বরে মারা গিয়েছে বলে খবর রটে। কিন্তু সেই খবরের সত্যতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে গোয়েন্দাদের মধ্যে।
আব্দুল সুভান কুরেশি
আব্দুল সুভান কুরেশিআব্দুল সুভান কুরেশি
ভারতের বিন লাদেন বলে কুখ্যাত আব্দুল সুভান কুরেশি। ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের এই সদস্য বোমা বানানোয় পারদর্শী। ২০০৬-এর ১১ জুলাই মুম্বাইয়ের ট্রেনে হামলায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দারা।
মোহাম্মদ আহমেদ সিদ্দিবাপ্পা
মোহাম্মদ আহমেদ সিদ্দিবাপ্পামোহাম্মদ আহমেদ সিদ্দিবাপ্পা
অপরাধ জগতে তার নাম ইয়াসিন ভাটকল। জঙ্গি সংগঠন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন-এর  অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলে পরিচিত ভাটকল। জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই ছিল তার কাজ। দীর্ঘদিন ওয়ান্টেড তালিকায় থাকার পর ২০১৩ সালে ভারত-নেপাল সীমান্তে ধরা পড়ে সে। ২০১৬ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ভারতের বিশেষ আদালত।
আব্দুল রউফ আসগর
আব্দুল রউফ আসগরআব্দুল রউফ আসগর
জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহম্মদ-এর নেতা মাসুদ আজহারের ছোট ভাই আব্দুল রউফ আসগর।  ভারত ও আফগানিস্তানে একাধিক হামলায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করা হয়। কান্দাহারে বিমান ছিনতাইয়ের নেতৃত্ব দেয় সে।  ওই বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় মাসুদ আজহারকে ভারত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় সে।