Showing posts with label পার্সটুডে. Show all posts
Showing posts with label পার্সটুডে. Show all posts

Tuesday, June 16, 2026

নয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও বড়, নির্ভুল, ধ্বংসাত্মক, গতিশীল ও অপ্রতিরোধ্য: ইসরায়েলি-মার্কিন সূত্র

পার্সটুডে: রমজান যুদ্ধের পর বিভিন্ন সূত্রে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দ্রুত উন্নয়নের খবর প্রকাশিত হয়। দুই মাস পর পরিচালিত “নাসর” অভিযানে তেহরানের আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতার উন্নতি প্রদর্শনের একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়।

ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও ধ্বংসাত্মক, দ্রুত-গতির, বড় ও অপ্রতিরোধ্য। এদিকে একজন মার্কিন বিশেষজ্ঞ স্বীকার করেছেন যে ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো “প্রতিরোধ বা ভূপাতিত করা অসম্ভব”।

গত ৮ জুন সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ২৪ ঘণ্টারও কম সময় স্থায়ী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান ইসরায়েল-অধিকৃত ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় এবং বিশ্ব গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই অনন্য অভিযান শুধু আগাম হামলা হওয়ার কারণেই নয়, একইসঙ্গে স্বল্প সময়ে ইসরায়েলের ওপর ব্যাপক আঘাত হানার কারণেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মার্কিন নৌবাহিনীর অপারেশন বিভাগের সাবেক উপদেষ্টা এবং এমআইটির অধ্যাপক থিওডর পোস্টল ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে বলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো “প্রত্যাশার তুলনায় আরও বেশি নির্ভুল ও ধ্বংসাত্মক” হয়ে উঠেছে।

পোস্টল বলেন, “ইরানিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা অসাধারণভাবে উন্নত হয়েছে। আমি প্রথমে যা দেখেছিলাম, এমনকি ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধেও (১২ দিনের যুদ্ধ) যা দেখেছিলাম, তার চেয়েও এগুলো অনেক বেশি কার্যকর। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করছে।”

হিব্রু ও পশ্চিমা সূত্রে দাবির সমর্থন

এই মার্কিন বিশেষজ্ঞের দাবি আরও গুরুত্ব পায়, যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্র ১২ ঘণ্টার ক্ষয়ক্ষতির কিছু তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর অধিকৃত ভূখণ্ডে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

হিব্রু দৈনিক ইসরায়েল হাইয়োম জানায়, মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের হামলায় অধিকৃত ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ আনুমানিক ৫০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

একই সময়ে সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকৃত ভূখণ্ডের দিকে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র “কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি”। যদিও এই নিষ্ক্রিয়তার কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হতে পারে এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে অক্ষমতা।

নাসর অভিযানে ইরান তিন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ছিল ৩০টির কিছু বেশি, যার উল্লেখযোগ্য অংশ ইহুদিবাদী ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

অজানা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চ গতি

প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত উচ্চ গতিতে তাদের লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

এর কিছুক্ষণ পর একটি অবহিত সামরিক সূত্র জানায়, অধিকৃত ভূখণ্ডের উত্তরে হামলায় ইরান “খেইবারশেকান” ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বশেষ প্রজন্ম ব্যবহার করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর দিকে ডাইভ দেওয়ার সময় প্রায় ৯ মাখ গতিতে পৌঁছায় এবং থাড (THAAD) ও অ্যারো (Arrow)-এর মতো ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও এটিকে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।

চলতি বছরের অরদিবেহেশ্ত মাসে তথা এপ্রিল-মে মাসে (২১ এপ্রিল-২১ মে) যুদ্ধবিরতির কিছুদিন পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ বিভাগের কমান্ডার জেনারেল মুসাভি জানান যে যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম পুনরায় সক্রিয় করা এবং হালনাগাদের গতি বেড়েছে।

অন্যদিকে আইআরজিসি কমান্ডারের উপদেষ্টা জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি “অরদিবেহেশ্ত মাসে (২১ এপ্রিল-২১ মে) তৈরি” নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনের কথাও উল্লেখ করেন।

যদিও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি যে নাসর অভিযানে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয়েছিল কি না, তবে এগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এমন ছিল যে অধিকৃত ভূখণ্ডে তা এক ধরনের ধাক্কার সৃষ্টি করেছে।

ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষার “বোকামিপূর্ণ” চেষ্টা

অধিকৃত ভূখণ্ডের উত্তরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একদিন পর এবং ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট আহত ইসরায়েলির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯,১২০ জনে পৌঁছেছে।

এছাড়া ইসরায়েলি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করেই জানায় যে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৭ জন নতুন আহতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

আহতের সংখ্যা রহস্যজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, ইসরায়েল হাইয়োমের উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির স্বীকারোক্তি এবং পরবর্তীতে টেল নোফ ও নেভাতিম ঘাঁটির কিছু অংশে ক্ষয়ক্ষতির স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ— এ সবকিছুই ইঙ্গিত দেয় যে নাসর অভিযানে ব্যবহৃত দ্রুতগতির ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছে।

থিওডর পোস্টলও জোর দিয়ে বলেন:

“এসব (নতুন ইরানি) ক্ষেপণাস্ত্র কোনোভাবেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়। এগুলো আরও বড় এবং অধিক ধ্বংসাত্মক ওয়ারহেড বহন করে।”

তবে এই মার্কিন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো, তিনি নিজে ঠিক কোন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলছেন তা নিশ্চিতভাবে না জানলেও, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রচেষ্টাকে “বোকামিপূর্ণ” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তার ভাষায়: “এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা নেই।”

নয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও বড়, নির্ভুল, ধ্বংসাত্মক, গতিশীল ও অপ্রতিরোধ্য: ইসরায়েলি-মার্কিন সূত্র

Thursday, April 30, 2026

পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার গোপন বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা ও যুদ্ধের ভয়াবহতা

পার্সটুডে : পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার অপরাধ একটি জটিল এবং বিতর্কিত বিষয়- যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

পার্সটুডে'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা চালানো, যা মানুষের জীবন ও পরিবেশে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো:  

পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা

১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চীন ও কোরিয়ায়, প্লেগ এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগসহ জৈবিক অস্ত্র পরীক্ষার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষাগুলো বায়োলজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক নথিপত্র ও রিপোর্ট দেখায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও কোরিয়ার কিছু অঞ্চলে প্লেগসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী। অনেক পরীক্ষা গোপনে ও সামরিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, যেখানে লক্ষ্য ছিল বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্রের প্রভাব মানুষের উপর এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উপর পরিমাপ করা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধগুলোর মধ্যে একটি ছিল কোরিয়া ও উত্তর-পূর্ব চীনে, যেখানে ব্যাপক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া, কীটপতঙ্গ, পশুর ক্ষয়িষ্ণু অংশ এবং মাছের দেহ ঝড়ানো হয়েছিল মানুষের উপর ও কৃষিভূমিতে। এর ফলে প্লেগ, অ্যানথ্রাক্স ও এনসেফালাইটিসের মত রোগের দ্রুত প্রাদুর্ভাব হয় এবং ব্যাপক মৃত্যু ঘটে। এই অপরাধগুলোর প্রভাব এখনও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে জেনেটিক্যাল রোগের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম টেনে চলেছে। এই পরীক্ষা কখনো খোলাখুলি এবং কখনো গোপনে চালানো হতো। এই পরীক্ষায় রোগগুলো সচেতনভাবেই মানুষের ও পশুর মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হতো যাতে এর প্রভাব পরিবেশ ও দেশের নিরাপত্তার ওপর মূল্যায়ন করা যায়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ব্যবহার

ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫–১৯৭৫) চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করা হয় কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস, শত্রু দমনে এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে আঘাত করার জন্য। এর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হচ্ছে 'অরেঞ্জ এজেন্ট' নামক রাসায়নিক। এই পদার্থে ডাইঅক্সিন ছিল, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং মানুষের স্বাস্থ্যে, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যদিও এটি সরাসরি দুর্ভিক্ষ বা রোগের সৃষ্টিকারী ছিল না, তবে এর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব ব্যাপক ছিল।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব স্বাস্থ্য ও পরিবেশে

চীন, কোরিয়া ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্রের ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদী ও বিধ্বংসী প্রভাব ফেলে। প্লেগ, কলেরা, ম্যালেরিয়া ও শ্বাসকষ্টের মত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়। এই রোগগুলো শুধু তখনকার সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে, যুদ্ধ শেষে অনেক মানুষ এখনো রাসায়নিক ও বায়োলজিক্যাল পদার্থের কারণে বিভিন্ন রোগে ভুগছে। অনেকেই ত্বকের রোগ, ক্যান্সার ও জন্মগত বিকলাঙ্গতায় আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবেশও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বনাঞ্চল ও কৃষিজমির ধ্বংস।

উপসংহার

পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ, বিশেষ করে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর গভীর ও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্লেগসহ মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে এসব অস্ত্রের ব্যবহার প্রমাণ করে, এই অস্ত্রগুলো শুধু তাত্ক্ষণিক ক্ষতি করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসাত্মক ফলাফল বয়ে আনে। এই ঘটনা গুলোকে আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন যাতে আন্তর্জাতিক স্তরে এর ফলাফল ও দায়িত্ববোধ স্পষ্ট হয় এবং যারা এই মানবতাবিরোধী কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

https://media.parstoday.ir/image/4c99fea2d0889c2n67h_800C450.jpg
মার্কিন বিমান থেকে ভিয়েতনামে রাসায়নিক বোমা হামলা

Monday, March 2, 2026

ইমাম খামেনেয়ীর শাহাদাত: ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পবিত্র রক্ত জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে শক্তি যোগাবে’

পার্সটুডে: ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী শহীদ হবার পর এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা এবং প্রতিরোধ সংগঠনরে নেতারা তাদের শোকবার্তায় ইরানের জনগণ এবং মুসলিম উম্মাহকে সমবেদনা জানিয়েছেন।

পার্সটুডে জানিয়েছে, ইয়েমেনের আসনারুল্লাহ আন্দোলনের রাজনৈতিক দফতর আজ এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় ইরানের সরকার ও জনগণকে সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি জানবাজি রেখে মার্কিন নেতৃত্বে শয়তানি শক্তি, জুলুমবাজ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে জিহাদ করে এসেছেন কিন্তু কখনো তিনি এই জিহাদ থেকে সরে দাঁড়াননি। তার এই চেতনা আমাদের সবার জন্য বড় শিক্ষা এবং সবসময় মুক্তিকামী মানুষের আশার প্রদীপ হয়ে ছিল এবং থাকবে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই পবিত্র রক্ত জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে শক্তি যোগাবে এবং আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হতে খুব দেরি নেই।  

আয়াতুল্লাহিল খামেনেয়ী ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রতীক ছিলেন: আম্মার হাকিম

ইরাকের ইসলামী বিপ্লবী উচ্চ পরিষদ বা সাইরি আন্দোলনের নেতা সাইয়্যেদ আম্মার হাকিম এক বিবৃতিতে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর শাহাদাতে মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বের সকল সত্যপথের অনুসন্ধানকারীদেরকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি তার বরকতপূর্ণ জীবনে ধর্ম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।

আম্মার হাকিম তার বিবৃতিতে আরো বলেন, কল্যাণ এবং হকের পথ চলা কখনো বন্ধ হবে না এবং শহীদ আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ধর্ম ও মানবতার খেদমতে যে পথ দেখিয়ে গেছেন তা চিন্তাশীল ও মুমিন মানুষের হৃদয়ে চিরকাল গেঁথে থাকবে।

ইরাকের সাদর আন্দোলনের নেতা মোক্তাদা সাদরও এক শোকবার্তায় আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর শাহাদাতের ঘটনায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহার কাছে এই বিপ্লবী নেতার জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান কামনা করছি। মোক্তাদা সাদর ইরাকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন। এরই মধ্যে নাজাফ, কারবালাসহ ইরাকের বহু শহরে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।   

'শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে মুসলিম উম্মাহর  ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখা যাবে না'

ফিলিস্তিন মুজাহেদিন আন্দোলন এই পবিত্র রমজান মাসে ইসরায়েল-মার্কিন সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি দশকের পর দশক ধরে মজলুম জনগণ বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন দিয়ে এসেছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী

Wednesday, November 5, 2025

"পশ্চিম এশিয়ায় নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ইসরায়েলকে কবরস্থ করবে"

পার্স টুডে- মিডল ইস্ট মনিটর সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলি বর্বরতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেছে।

মিডল ইস্ট মনিটর সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে লিখেছে: ইতিহাসে এমন অনেক লোক আছে যারা অংহকারের শিকার হয়ে ভাগ্যহারা হয়।  তারা তাদের তৈরি ধ্বংসযজ্ঞের উপরে দাঁড়িয়ে আছে, এখনও মাথা উঁচু করে আছে, এখনও বিশ্বাস করে যে তারা আরেকটি নৃশংসতার মাধ্যমে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারবে। নেতানিয়াহু তার নামকে এমনই এক তালিকায় যুক্ত করেছেন।

কাতারের দোহায় হামাস নেতাদের হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টা কেবল একটি সাধারণ কৌশলগত ভুল ছিল না। এটি ছিল যুক্তি, মানবতার বিরুদ্ধে এবং এখনও অবশিষ্ট সামান্য কূটনীতির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধের ডাক। কাতারে আক্রমণ করার অর্থ ছিল আরব বিশ্বের দিক থেকে ইসরায়েলের দিকে প্রসারিত একমাত্র হাতকেই কামড়ানো।

নেতানিয়াহু যা করেছেন তা কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়, এটি ছিল রাজনৈতিক আত্মহত্যা। এই আক্রমণের পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং ইসরাইলকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। নেতানিয়াহুর আর কোনও সতর্কবার্তা কোনও কাজে আসবে না। তিনি হতাশার জগতে আটকা পড়েছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী লেবানন, তুরস্ক বা কাতারে, যেখানেই হামাস নেতারা থাকবেন, সেখানেই আবারও হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু এটা অবশ্যই বলা উচিত যে নেতানিয়াহু যে অতল গহ্বর খুলে দিয়েছেন তা কেবল গাজাতেই নয় যেখানে তিনি পতিত হচ্ছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সারা বিশ্বের মানুষের রাস্তায় ইহুদিবাদ-বিরোধী মিছিল দেখতে পাচ্ছেন। একসময় ইউরোপের রাজধানীগুলোতে পতাকার জন্য খ্যাত ইসরায়েল এখন সেখানে একজন বিতাড়িতের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইহুদিবাদী  সৈন্যরা অভিশাপ পাচ্ছে। লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস এবং নিউ ইয়র্কে প্রতি সপ্তাহে এই স্লোগান শোনা যায়। আমেরিকায়, যেখানে ইহুদিবাদীরা মনে করত এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ সেখানেও পরিস্থিতি বদলে গেছে। ছাত্ররা সমস্বরে তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। আমেরিকান ইহুদিরা কাঁদতে কাঁদতে বলে: "আমরা তোমাদের (ইসরায়েল) নামের সাথে একমত নই।"

নেতানিয়াহুর ক্লান্ত ও অকার্যকর লাঠি আর ভিন্নমতকে থামাতে পারবে না। জনগণ গাজার ধ্বংসাবশেষ যথেষ্ট দেখে ফেলেছে। ইহুদিবাদী রেজিমের মুখ থেকে মুখোশ খুলে গেছে। নেতানিয়াহুর দাবি যে তিনি পশ্চিম এশিয়াকে নতুন করে সাজিয়ে তুলবেন, তা কেবল একটি কল্পনা। আপনারা যে পরিকল্পনাগুলো করেছেন তা হল ধ্বংসের পরিকল্পনা; গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে, পশ্চিম তীরের আরও অনেক অংশ গ্রাস করা হয়েছে এবং সিরিয়া ও লেবাননের ভূমিতে বোমা হামলা করা হয়েছে। এই  হঠকারি কল্পনাগুলো আশ্চর্যজনক।

নেতানিয়াহু পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের জন্য যা ডিজাইন করেছেন তা হল ইসরায়েলের সমাধিফলক। একসময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কৃত্রিম পোশাকে ঢাকা ইসরাইল এখন বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা, দুর্বৃত্ত শাসনব্যবস্থা এবং লজ্জাজনক দখলদার সেনাবাহিনী হিসেবে কু্খ্যাত। নেতানিয়াহু, তুমি রুবিকন পেরিয়ে গেছো, আর ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। সেতুগুলো পুড়ে গেছে। তুমি সদিচ্ছার শেষ চিহ্নও হারিয়ে ফেলেছো। ইতিহাস তোমাকে ক্ষমা করবে না।

নেতানিয়াহু, তুমি পশ্চিম এশিয়ার চিত্র নতুন করে আঁকতে পারবে না। তুমি শুধু ইসরায়েলের মৃত্যুর বাণী লিখছ। ইতিহাস তোমাকে মনে রাখবে না, একজন মহান রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, ইসরায়েলের রক্ষক হিসেবে নয়, বরং এমন একজন হিসেবে তোমার নাম লেখা থাকবে যে ইসরায়েলকে ধংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

পশ্চিম এশিয়ায় নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ইসরায়েলকে কবরস্থ করবে
পশ্চিম এশিয়ায় নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ইসরায়েলকে কবরস্থ করবে

Tuesday, September 16, 2025

ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সাময়িকী ক্যালকালিস্টের স্বীকারোক্তি: ইরানের সাথে যুদ্ধের পর থেকে কোনো বিদেশী পর্যটক ইসরায়েলে আসেননি

পার্স টুডে - একটি ইহুদিবাদী সংবাদপত্র স্বীকার করেছে যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধ সেখানকার ইহুদিবাদীদের পর্যটন শিল্প ও দেশীয় অর্থনীতিকে গুরুতর বিপদের মধ্যে ফেলেছে।

ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সংবাদপত্র "ক্যালকালিস্ট" একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে ইসরায়েলি পর্যটন শিল্পের নজিরবিহীন সংকটের কথা তুলে ধরেছে।

ফার্স নিউজ এজেন্সির উদ্ধৃতি দিয়ে পার্স টুডে জানিয়েছে, "ক্যালকালিস্ট"-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি ইসরায়েলের বৃহত্তম হোটেল কমপ্লেক্স, ফ্যাটাল হোটেল নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতার ওপর সরাসরি ও গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা ইসরায়েলি পর্যটন শিল্পের অবস্থার এক অভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

ক্যালকালিস্ট আরও বলেন যে এই সংকটজনক পরিস্থিতির কারণে বৃহৎ ফ্যাটাল হোটেল নেটওয়ার্ক তাদের বার্ষিক রাজস্ব পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে বাধ্য হয়েছে।

হোটেল খালি থাকা ও বেকারত্ব তীব্রতর হওয়া


ক্যালকালিস্ট লিখেছে: ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইসরায়েলের ফ্যাটাল হোটেলগুলিতে অতিথি আগমন ও কর্মসংস্থানের হার মাত্র ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা প্রায় ৭২ শতাংশ ছিল এবং এটা লক্ষণীয় যে এই সময়কালটিকে ঐতিহ্যগতভাবে পর্যটনের সর্বোচ্চ ঋতু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি বসন্তকালীন ছুটি ও ইস্টার  উদযাপনের সময়। ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সংবাদপত্র জানিয়েছে যে অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে হোটেল ভাড়া নেয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় স্পষ্টতই বিদেশী পর্যটকদের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নির্দেশিত হয়েছে, অতীতে এ সমস্যা অভ্যন্তরীণ শরণার্থীদের গ্রহণ করে আংশিকভাবে পূরণ করা হয়েছিল, কিন্তু এবার এই সমাধানও পরিস্থিতি বাঁচাতে অক্ষম।

ইরানের সাথে যুদ্ধের পর নানা ধরনের ক্ষতি

হিব্রু ভাষার সংবাদপত্রটি আর্থিক তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে যে ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ বাজারে ফ্যাটালের মূল পরিচালন মুনাফা ২৫ শতাংশ কমে ১১৩ মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৩০.৫ মিলিয়ন ডলার) হয়েছে এবং কেবল জুন মাসে ইরানের সাথে যুদ্ধের ফলে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১৩.৫ মিলিয়ন ডলার) ধরা হয়েছে। এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে, কিছু ইসরায়েলি হোটেল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন হোটল মালিকরা। একই সময়ে বিদেশী পর্যটক ও বিদেশী নানা গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে বুকিং বাতিলকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বার্ষিক আয় হ্রাসের পূর্বাভাস

নতুন অনুমান অনুসারে, ইসরায়েলি হোটেল কোম্পানি ফ্যাটাল হোটেলস তাদের বার্ষিক আয়ের পূর্বাভাস ৮.১ থেকে ৮.৩ বিলিয়ন শেকেল (২.১৮ থেকে ২.২৪ বিলিয়ন ডলার) কমিয়ে এনেছে এবং পরিচালন মুনাফা ২.৭৫ থেকে ২.৯ বিলিয়ন শেকেল (৭৪২.৫ থেকে ৭৮৩ মিলিয়ন ডলার) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদেশী পর্যটকদের প্রত্যাবর্তনের জন্য অন্ধকার পূর্বাভাস

ইসরায়েলি সংবাদপত্র ক্যালকালিস্ট তাদের প্রতিবেদনের শেষাংশে বিদেশী পর্যটকদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করে বলেছে, ফ্যাটাল হোটেল চেইন বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এবং উপরন্তু, ইউরোপীয় হোটেল বা রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ তহবিল থেকে অতিরিক্ত আয়ও ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ বাজারের ব্যাপক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে না। ক্যালকালিস্টের মতে, ইসরায়েলের পর্যটন শিল্প, যা গত কয়েক বছরের উত্তেজনাপূর্ণ আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছিল তা এখন আরও গভীর পতনের সম্মুখীন হচ্ছে এবং স্বল্পমেয়াদে এর পুনরুদ্ধারের কোনও স্পষ্ট আশা নেই।

https://media.parstoday.ir/image/4c989356a18cb42myk5_800C450.jpg
ইসরায়েলি অর্থনৈতিক সাময়িকী ক্যালকালিস্টের স্বীকারোক্তি: ইরানের সাথে যুদ্ধের পর থেকে কোনো ইসরায়েলে ভ্রমণ করেনি

Friday, July 18, 2025

মুয়াবিয়াকে কখনও স্বীকৃতি দেননি ইমাম হাসান (আ)

আজ আমরা এমন একজনের কথা বলব যাকে রাসূল (সা.) নিজের প্রিয় সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন, যিনি ছিলেন রেসালাতের প্রোজ্জ্বল প্রদীপের শিখা এবং এমন এক আহলে বাইতের সদস্য যাদেরকে আল্লাহ সব সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা ও দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত রেখেছেন; এমনকি কুরআনের আয়াত অনুযায়ী যাদেরকে ভালবাসা ফরজ বলে ঘোষণা করেছেন।
আজ আমরা এমন একজনের কথা বলব যাকে রাসূল (সা.) নিজের প্রিয় সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন, যিনি ছিলেন রেসালাতের প্রোজ্জ্বল প্রদীপের শিখা এবং এমন এক আহলে বাইতের সদস্য যাদেরকে আল্লাহ সব সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা ও দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত রেখেছেন; এমনকি কুরআনের আয়াত অনুযায়ী যাদেরকে ভালবাসা ফরজ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন তৃতীয় হিজরির ১৫ ই রমজানে।  আর শাহাদত বরণ করেন ৫০ হিজরির ২৮ শে সফর। ইনি হলেন বেহেশতি যুবকদের অন্যতম সর্দার এবং বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ও অন্যতম প্রিয় নাতি হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)। তিনি ছিলেন আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা (সা.)'র প্রথম সন্তান এবং সে যুগের সব মু’মিন মুসলমানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রিয় শিশু। 
হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)'র জন্ম-বার্ষিকী উপলক্ষে  সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ।
বিশ্বনবী (সা.) মহান আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় প্রথম নাতীর নাম রাখেন হাসান। হাসান শব্দের অর্থ সবচেয়ে ভাল বা উত্তম, পছন্দনীয় ইত্যাদি। ইমাম হাসান (আ.)'র সাত বছর বয়স পর্যন্ত মহানবী (সা.) বেঁচে ছিলেন। রাসূল (সা.) বহুবার প্রিয় এই নাতিকে কাঁধে নিয়ে বলেছেন, “হে প্রভু, আমি ওকে ভালবাসি, আপনিও তাকে ভালবাসুন।“তিনি আরও বলতেন, “যারা হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসবে তারা আমাকেই ভালবাসল। আর যারা এ দুজনের সঙ্গে শত্রুতা করবে তারা আমাকেই তাদের শত্রু  হিসেবে গণ্য করল।”বিশ্বনবী (সা.) হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে “বেহেশতের যুবকদের নেতা”ও “মুসলিম উম্মাহর দুই সুবাসিত ফুল”বলে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি আরও বলেছেন, “আমার এই দুই নাতি উভয়ই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা, তা তারা (তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে) রুখে দাঁড়াক বা না দাঁড়াক।”বিশ্বনবী (সা.) এই দুই নাতির (শৈশবে) সঙ্গে খেলতেন, তাদের বুকে চেপে ধরতেন, চুমু খেতেন এবং তাদের ঘ্রাণ নিতেন। তারা বিশ্বনবী (সা.)’র নামাজের সময় নানার গলায় বসে পড়লে নানা সিজদা থেকে উঠতেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরাই উঠে যেতেন।
বিশ্বনবী (সা.) ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে তাঁদের শৈশবেই অনেক চুক্তিপত্রের সাক্ষী হিসেবে মনোনীত করেছেন। যখন মহান আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুবাহিলা করার ( তথা যারা সত্য ধর্মের বিরোধিতায় লিপ্ত তারা  আল্লাহর অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাবে –বিতর্ককারী খ্রিস্টানদের সঙ্গে যৌথভাবে এমন ঘোষণা দেয়ার) সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন আল্লাহর নির্দেশেই সঙ্গে নিয়েছিলেন হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.)সহ ইমাম আলী (আ.) ও ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহা)-কে। আর সে সময়ই আলী (আ.)সহ নবী-পরিবারের এই সদস্যরা যে পবিত্র সে বিষয়ে কুরআনের আয়াত নাজেল হয়েছিল। 
বিশ্বনবী (সা.) ওফাতের পর থেকে ইমাম হাসান (আ.) ছিলেন তাঁর পিতার অনুসারী এবং পিতার মতই অত্যাচারীদের সমালোচনা করতেন ও মজলুমদের সমর্থন দিতেন। তিনি জামাল ও সিফফিন যুদ্ধে পিতার পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন এবং অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জামাল যুদ্ধের আগুন নেভানোর জন্য তিনি পিতার নির্দেশে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে সঙ্গে নিয়ে কুফায় গিয়ে সেখানকার জনগণকে পিতার পক্ষে সংঘবদ্ধ করে তাদেরকে বসরায় নিয়ে এসেছিলেন।
আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.) নিজের ইন্তিকালের সময় ইমাম হাসান (আ.)-কে তার খেলাফতের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন। বিশ্বনবী (সা.)ই তা করার জন্য ইমাম আলী (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজের জীবদ্দশায়।
ইমাম হাসান (আ.) যখন ওজু করতেন তখন আল্লাহর ভয়ে তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত এবং তিনি কাঁপতে থাকতেন। মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা যখন স্মরণ করতেন তখন তিনি কাঁদতেন ও বেহাল হয়ে পড়তেন। তিনি পায়ে হেটে এবং কখনও নগ্ন পায়ে ২৫ বার মদিনা থেকে মক্কায় গিয়ে হজ্ব বা ওমরাহ করেছেন। ইমাম হাসান (আ.) জীবনে অন্ততঃ দুবার তাঁর ব্যক্তিগত সব সম্পদ দান করে দিয়েছেন এবং বেশ কয়েকবার অর্ধেক বা তারও বেশি সম্পদ দান করে দিয়েছিলেন। নিষ্পাপ ইমাম হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর দরবারে নিজেকে পাপী বলে অভিহিত করে আল্লাহর  ক্ষমা ও দয়া ভিক্ষা করতেন।  কোনো প্রার্থীকে বিমুখ করতেন না ইমাম হাসান (আ.)। তিনি বলতেন, “আমি নিজেই যখন আল্লাহর দরবারে ভিখারি (ও তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি) তখন কোনো প্রার্থীকে বিমুখ করতে আমার লজ্জা হয়।”
মানুষের সমস্যা সমাধানে তিন এত উদগ্রীব ও ব্যস্ত থাকতেন যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের কথা তাঁর জানা ছিল না। তিনি নিজেই এ ব্যাপারে বিশ্বনবী (সা.)’র একটি বাণী তুলে ধরে বলতেন, রাসূল (সা.) বলেছেন যে তার মুমিন ভাইয়ের কোনো একটি সমস্যা সমাধান করবে  সে যেন নয় হাজার বছর ধরে আল্লাহর এমন গভীর ইবাদত করল যেন ওই নয় হাজার বছরের দিনগুলোতে সে রোজা রেখেছে ও রাতে ইবাদত করেছে।
ইমাম হাসান মুজতাবা(আ.)’র ক্ষমাশীলতা,পরোপোকারিতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা শত্রুদেরও মুগ্ধ করত। মারওয়ান হাকাম এই মহান ইমামকে সব ধরনের কষ্ট দিয়েছে ও বিরক্ত করেছিল। কিন্তু ইমামের শাহাদতের পর মারওয়ান তাঁর জন্য কাঁদতে বাধ্য হয়েছিল এবং ইমামের জানাজার মিছিলেও অংশ নেয়। মারওয়ান বলেছিল, ইমামের সহনশীলতা ছিল (মদীনার) এই পাহাড়ের চেয়েও অনেক বেশি।
ইমাম হাসান (আ.) খলিফা হওয়ার পর মুয়াবিয়া তা মেনে নেয়নি। আলী (আ.)'র বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের যে ধারা মুয়াবিয়া সূচিত করেছিল এই নতুন ইমামের বিরুদ্ধেও সেই একই ধারা অব্যাহত রাখে। ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার কাছে এক দীর্ঘ চিঠি লিখে তাকে সুপথে আনার চেষ্টা করেছিলেন। সেই চিঠির একাংশে তিনি লিখেছিলেন, “তুমিও অন্যদের মতই আমার হাতে বাইয়্যাত গ্রহণ কর। তুমি নিজেই ভাল করে জান যে আমি তোমার চেয়ে বেশি যোগ্যতার অধিকারী। আল্লাহকে ভয় কর এবং অত্যাচারী জালিমদের মধ্যে গণ্য হয়ো না।”
মুয়াবিয়া যদি এখনও ভুল করে (অর্থাত বিদ্রোহ অব্যাহত রাখে) তাহলে ইমাম হাসান (আ.) মুসলমানদেরকে নিয়ে তাকে শাস্তি দেবেন বলেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন ওই চিঠিতে। তিনি তাকে এও লিখেছিলেন যে, “আল্লাহকে ভয় কর, জুলুম ও মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ কর। অনুগত ও শান্তিকামী হও। আর এমন লোকদের সঙ্গে কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ করো না যারা তোমার চেয়ে এ কাজে বেশি যোগ্য।”
কিন্তু মুয়াবিয়া চিঠির উত্তরে নিজেকে বেশি অভিজ্ঞ বলে দাবি করে। অবশ্য সে প্রলোভন দেখানোর জন্য বলে যে, ইমাম হাসান (আ.) তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নিলে পরবর্তী খলিফা ইমামকেই করা হবে।
মুয়াবিয়া এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। সে ইমামকে গোপনে হত্যার জন্য কিছু লোককে নিয়োজিত করে। খলিফা হিসেবে ইমাম হাসান (আ.)-কে মেনে না নেয়ার কারণ হিসেবে ইমামের বয়সের স্বল্পতার অজুহাত দেখানো সত্ত্বেও  মুয়াবিয়া নিজের তরুণ সন্তান ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে। এছাড়াও মুয়াবিয়া ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোকজন জড় করে তাদেরকে ইরাকে পাঠায়।
এ অবস্থায় ইমামও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন এবং ইমামের কয়েকজন অনুসারী যুদ্ধের জন্য জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে জনগণের এক বিশাল অংশকে যুদ্ধের জন্য সংঘবদ্ধ করেন। কিন্তু এদের মধ্যে একদল ছিল খারেজি। এরা মুয়াবিয়ার বিরোধী হলেও ইমামের অনুগত ছিল না। আর একদল এসেছিল কেবল গণিমতের লোভে। আর একদল ছিল গোত্রবাদের কারণে গোত্রীয় সর্দারদের নির্দেশে যুদ্ধ করতে আসা ব্যক্তি। এদের কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না। আর অতি অল্প কয়েক জন ছিল ইমামের খাঁটি সমর্থক।
ইমাম হাসান (আ.) তাঁর বাহিনীর একাংশকে পাঠান আনবার শহরে হাকামের সেনাপতিত্বে। হাকাম মুয়াবিয়ার সঙ্গে আঁতাত করে বসে। পরবর্তী সেনাপতির অবস্থাও হয়েছিল একই রকম। ইমাম নিজে মাদায়েনের সাবাত্ব এলাকায় গিয়ে সেখান থেকে বারো হাজার সেনাকে ওবায়দুল্লাহ বিন আব্বাসের সেনাপতিত্বে মুয়াবিয়ার সঙ্গে লড়াই করার জন্য পাঠান। আর কেইস বিন সা'দ বিন ইবাদাহকে উপ-সেনাপতি  করেন যেন ওবায়দুল্লাহর অনুপস্থিতিতে তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এদিকে মুয়াবিয়া কেইসকে ধোঁকা দেয়ার ফন্দি করে। সে তার সঙ্গে সহযোগিতা অথবা অন্ততঃ ইমামের পক্ষ ত্যাগ করার জন্য কেইসের কাছে এক মিলিয়ন দেরহাম পাঠায়। কেইস জবাবে বলে: “প্রতারণার মাধ্যমে তুমি আমার ধর্মকে কেড়ে নিতে পারবে না।”কিন্তু প্রধান সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কেবল সেই অর্থেই প্রতারিত হয় এবং রাতের অন্ধকারে তার একদল একনিষ্ঠ অনুসারী নিয়ে মুয়াবিয়ার দিকে পালিয়ে যায়। কেইস এই ঘটনা ইমাম হাসান (আ.)-কে জানান এবং বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। এ অবস্থায় মুয়াবিয়া  ইমামের সেনাবাহিনীতে  গুপ্তচর পাঠিয়ে মুয়াবিয়ার সঙ্গে কেইসের সন্ধি হওয়ার বানোয়াট সংবাদ প্রচার করতে থাকে। আর মুয়াবিয়ার আরেক দল গোয়েন্দা কেইসের সেনাবাহিনীতে ঢুকে এ কথা প্রচার করতে থাকে যে ইমাম হাসান (আ.) নিজেই মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করেছেন। এভাবে খারেজি ও সন্ধি-বিরোধীরা প্রতারিত হয়। তারা বিদ্রোহ করে ও হঠাত ইমামের তাবুতে হামলা চালায় ও লুট-তরাজ করে। এমনকি ইমামের বিছানা পর্যন্ত লুট করে এবং ইমামের উরুতে তলোয়ার দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানে। ফলে তিনি শোচনীয়ভাবে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ইমামের সঙ্গীরা তাঁকে মাদায়েনের গভর্নরের বাড়ীতে নিয়ে যান। সেখানে কিছুদিন তাঁর চিকিতসা চলে।
এ সময় ইমাম হাসান (আ.) জানতে পারেন যে অনেক গোত্র-প্রধান বা সর্দার  তাঁকে মুয়াবিয়ার  কাছে তুলে দিতে প্রস্তুত বলে গোপনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মুয়াবিয়া হুবহু তাদের চিঠিগুলো ইমামের কাছে পাঠিয়ে সন্ধির অনুরোধ করে এবং বলে যে এই সন্ধিপত্রে ইমাম যেই শর্তই দেন না কেন, তা-ই মেনে নেয়া হবে।
এ অবস্থায় ইমাম হাসান (আ.) যখন একদিকে অসুস্থ ও তাঁর অনুসারীরা নানা দিকে বিক্ষিপ্ত ও ছিন্ন-ভিন্ন এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে পথ ও মতের মিল ছিল না  তখন যুদ্ধ অব্যাহত রাখা আর ইসলামের স্বার্থের অনুকূল রইল না।  কারণ, মুয়াবিয়া যুদ্ধে জয়ী হলে ইসলামের মূলোতপাটন করে ছাড়ত। তাই ইমাম বেশ কিছু কঠিন শর্ত দিয়ে সন্ধি-চুক্তি তথা যুদ্ধ-বিরতি করতে সম্মত হলেন।
উল্লেখ্য, বিদ্রোহী মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে উতসাহিত করার জন্য হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) খেলাফতের দায়িত্ব নেয়ার পর পরই যোদ্ধাদের বেতন শতকরা ১০০ ভাগ বৃদ্ধি করেছিলেন। তাই এ ধারণা ঠিক নয় যে ইমাম হাসান (আ.) সাহসী ও জিহাদপন্থী ছিলেন না।  মিথ্যা প্রচারে অভ্যস্ত উমাইয়ারাই ইমামকে ভীরু ও বিলাসী হিসেবে ইতিহাসে তুলে ধরতে চেয়েছে। তিনি যদি জিহাদকে ভয় পেতেন তাহলে বাবার সঙ্গে জামাল ও সিফফিন যুদ্ধে অংশ নিতেন না।
এ ছাড়াও হাসান (আ.) জানতেন যে মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এই সুযোগে বাইজান্টাইন সম্রাট ‘চতুর্থ কনস্তানতিন’  মুসলমানদের প্রথম কিবলা অধ্যুষিত বায়তুল মোকাদ্দাস শহরটি দখলের পদক্ষেপ নেবে। তাই ইমাম শান্তি ও কূটনৈতিক পন্থার মাধ্যমে প্রিয় নানার ধর্মের বার্তা তথা খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামকে রক্ষার জন্য ও  ইসলামকে দূষণমুক্ত করার যে কাজ পিতা হযরত আলী (আ.) শুরু করেছিলেন সেই মিশনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতির কারণেই ইমাম হাসান (আ.)-কে যুদ্ধ-বিরতির পথ বেছে নিতে হয়েছিল।
ইমাম (আ.) এও জানতেন যে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা শাসন-ক্ষমতা হাতে না পেলেও  মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত  ইমামই থেকে যাবেন। তাই মুয়াবিয়ার স্বরূপ  বা আসল চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য তাকে কিছু (নোংরা কাজের সুযোগ) অবকাশ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে এ সন্ধির ফলে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল।
অবশ্য ইমাম হাসান (আ.)  ছোট ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)’র মতই জালেম শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদের পথই ধরতেন যদি তিনি দেখতেন যে, অল্প কিছু সংখ্যক হলেও তাঁর কিছু একনিষ্ঠ ও নিবেদিত-প্রাণ সমর্থক রয়েছেন যারা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে ও শহীদ হতে প্রস্তুত। ইতিহাসে দেখা যায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন (বা কিছু কম/বেশি) শাহাদত-পাগল ও আহলে-বাইত প্রেমিক মুসলমান ইমাম হুসাইন (আ.)’র সঙ্গে স্বেচ্ছায় থেকে গেছেন এবং মহাবীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছেন। ইমাম হুসাইন (আ.) কুফার প্রায় সব মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন প্রথম দিকে। তারা পরবর্তীতে এই ইমামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অন্যদিকে ইমাম হাসান (আ.)’র সঙ্গীরা প্রথম দিকেই তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং এমনকি গোপনে শত্রু -শিবিরে যোগ দেয়। তাই ইমাম হাসান (আ.)’র  নিবেদিত-প্রাণ সমর্থকের সংখ্যা ছিল ইমাম হুসাইন (আ.)’র  নিবেদিত-প্রাণ সঙ্গীদের সংখ্যার চেয়েও অনেক কম বা হাতে গোনা যে কয়জন সঙ্গী ছিল তাদের ওপর ভরসা করতে পারেননি বড় ভাই ইমাম হাসান (আ.)। কারণ, আদর্শিক দৃঢ়তা তাদের মধ্যে ছিল না।
উল্লেখ্য, মুয়াবিয়ার বাবা আবু সুফিয়ান ছিল ইসলামের ও বিশ্বনবী (সা.)’র কঠোরতম শত্রু । মক্কা বিজয়ের পর (অষ্টম হিজরিতে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর সঙ্গে তার শত্রুতা অব্যাহত থাকে। হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে এক মিথ্যা অজুহাতে সে সিরিয়া থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এই বিদ্রোহের কারণে। এই যুদ্ধে মুয়াবিয়ার পক্ষে ৪৫ হাজার নিহত এবং হযরত আলী (আ.)’র পক্ষে শহীদ হন পঁচিশ হাজার মুজাহিদ।
হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ছিল তার প্রমাণ হল হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও  মুয়াবিয়া আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত আলী (আ.)’র মত কঠোর ন্যায়-বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোন পদ দেবেন না। তাই আলী (আ.) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত মুয়াবিয়াকেও পদচ্যুত করলে ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্র প্রবর্তনকারী মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে।
মুয়াবিয়ার সঙ্গে ইমাম হাসান (আ.)’র সন্ধির কিছু শর্ত:
-আহলে বাইতের অনুসারীদের রক্ত সম্মানিত ও হেফাজত থাকবে এবং তাদের অধিকার পদদলিত করা যাবে না।
-মুয়াবিয়াকে হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, গালি-গালাজ, অপবাদ ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।
-জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারগুলোকে এক মিলিয়ন দেরহাম অর্থ সাহায্য দিতে  হবে ইরানি প্রদেশগুলোর সরকারি আয় থেকে।
- ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়াকে আমিরুল মু’মিনিন বলে উল্লেখ করবেন না।
-মুয়াবিয়াকে অনৈসলামী আচার-আচরণ পরিহার করতে হবে এবং আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাত অনুযায়ী আমল করতে হবে।
-মুয়াবিয়া কোনো ব্যক্তিকেই (খেলাফতের জন্য) নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করতে পারবে না। মুয়াবিয়া মারা গেলে খেলাফত ফেরত দিতে হবে ইমাম হাসান (আ.)’র কাছে।
-ইমাম হাসান (আ.) যদি মারা যান, তাহলে মুসলিম জাহানের খেলাফত হস্তান্তর করতে হবে রাসূল(সা.)’র ছোট নাতি হযরত ইমাম হুসাইন(আ.)’র কাছে।
কিন্তু মুয়াবিয়াপ্রকাশ্যেই নির্লজ্জভাবে সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছিল। মুয়াবিয়া ৫০ হিজরিতে  গোপনে বিষ প্রয়োগ করে ইমাম হাসান(আ.)-কে শহীদ করে। ৬০ হিজরিতে মৃত্যুর কিছু দিন আগে মুয়াবিয়া তার মদ্যপ ও লম্পট ছেলে ইয়াজিদকে মুসলমানদের খলিফা বলে ঘোষণা করে। 
মুয়াবিয়া বলত যেখানে টাকা দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি টাকা বা ঘুষ ব্যবহার করি, যেখানে চাবুক দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি তরবারি ব্যবহার করি না, আর যেখানে তরবারি দরকার হয় সেখানে তরবারি ব্যবহার করি। মুয়াবিয়া রাজ-কোষাগারকে ব্যবহার করত প্রভাবশালী লোকদের পক্ষে আনার কাজে।
মুয়াবিয়া ইমাম হাসান (আ.)’র সঙ্গে স্বাক্ষরিত সন্ধি-চুক্তির অপব্যবহার করেছিল। সে কুফায় প্রবেশ করে  বক্তৃতার আসনে এটা বলে যে “হাসান  আমাকে যোগ্য মনে করেছে, নিজেকে নয়। এ জন্য সে খেলাফত আমার কাছে ছেড়ে দিয়েছে।”  ইমাম হাসান (আ.) সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “মুয়াবিয়া মিথ্যাচার করছে।“এরপর তিনি তার যোগ্যতা ও মর্যাদার ব্যাপারে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। সেসবের মধ্যে মুবাহিলাতে তাঁর অংশ গ্রহণের কথা তুলে ধরেন। অবশেষে তিনি বলেন, “আমরা কুরআন এবং নবীর সুন্নত মতে সবার চেয়ে উত্তম এবং এ কারণেই সবার চেয়ে যোগ্যতর।”
ইমাম সন্ধির শর্তেই এটা উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি মুয়াবিয়াকে আমিরুল মু’মিনিন বলবেন না। এরই আলোকে তিনি কখনও মুয়াবিয়ার হাতে বাইয়্যাত হননি এবং মুয়াবিয়ার কোনো নির্দেশই মান্য করতেন না। যেমন, মুয়াবিয়া খারেজিদের বিদ্রোহ দমনে ইমামের সহায়তা চান এবং তাঁকে খারিজিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু ইমাম হাসান (আ.) তাঁর কথায় মোটেও কর্ণপাত করেননি।
অনেকে এ প্রশ্ন করেন যে, একদল লোক তো মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল। তাহলে ইমাম হাসান (আ.) কেন যুদ্ধ করলেন না? এর উত্তর হল, সে সময় যুদ্ধ করাটা ছিল মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী, তাই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দাবি যারা করেছিল তা মেনে নেয়াকে ইমাম যৌক্তিক মনে করেননি। নবী ও ইমামরা কখনও ভুল করেন না, যদিও জনগণ অনেক সময় এই ঐশী নেতৃবৃন্দের দূরদৃষ্টিপূর্ণ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে না বরং বহু পরে বুঝতে পারে। যেমন, বিশ্বনবী (সা.)’র সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি। যেমন, ওমর ইবনে খাত্তাব (দ্বিতীয় খলিফা)  হুদায়বিয়া সন্ধির  অপমানজনক (দৃশ্যত)শর্তগুলোর আলোকে এ সন্ধির সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা.) তখন বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি কখনও তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা করি না এবং তিনি কখনও আমার কোনো ক্ষতি করেন না”। আর তাই হয়েছিল। কিছু দিন পর এই শান্তি চুক্তির কল্যাণকর দিকগুলো সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ, যুদ্ধের আগুন নিভে যাওয়ায় ও মক্কাতে মুসলমানদের গমনাগমনের কারণে মুশরিকরা ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ বোঝার সুযোগ পেয়েছিল এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে যায়। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মক্কার অধিবাসীদের বেশিরভাগই ইসলামে দীক্ষিত হয়।
ইমাম হাসান (আ.) –কে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল মুয়াবিয়া জালিম হওয়া সত্ত্বেও আপনি নিজে সত্য পথে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও কেন তার সঙ্গে যুদ্ধ-বিরতি বা সন্ধি করেছেন? ইমাম তখন হুদায়বিয়ার সন্ধির দৃষ্টান্ত দেন এবং খিজির (আ.)’র কাজগুলোর রহস্যময় উদ্দেশ্য বুঝতে না পারার কারণে হযরত মুসা নবী (আ.)’র রাগের কথা তুলে ধরেন। তিনি আরো জানান যে, মুয়াবিয়ার সঙ্গে ওই সন্ধি না করলে পৃথিবীর বুকে আহলে বাইতের কোনো অনুসারী টিকে থাকত না।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চনেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এক বিশ্লেষণে বলেছেন, ''ইমাম হাসান (আ.)’র যুগে কপটতা বা মুনাফিকির মাত্রা তাঁর বাবার যুগের তুলনায় এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে ইমাম জানতেন তিনি যদি তাঁর মুষ্টিমেয় সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যান তাহলে নৈতিক অধঃপতনে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ততকালীন মুসলিম সমাজ তাঁর রক্তের বদলা নেয়ার কোনো চেষ্টাই করত না। বরং মুয়াবিয়ার প্রচারণা, অর্থ বা ঘুষ ও কূট-কৌশলগুলো সবাইকে এমনভাবে বশে নিয়ে আসত যে দুই-এক বছর পর লোকেরা বলবে, ইমাম হাসান (আ.) বৃথাই বা অনর্থক মুয়াবিয়ার মোকাবেলায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই ইমাম সব ধরনের কষ্ট নিজের জন্য ডেকে এনে সেসব সহ্য করলেন, কিন্তু তবুও শাহাদতের পথ ধরেননি; কারণ, তিনি জানতেন যে তাঁর শাহাদত বৃথাই যেত।''
উল্লেখ্য, ইমামদের কর্মপদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য থেকে থাকলেও  তা নিছক পরিবেশ ও পরিস্থিতির দাবিতেই হয়, কখনও তা তাদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য থেকে উদ্ভুত হয় না। তাই এটা বলা ভিত্তিহীন যে যদি ইয়াজিদের সময় ইমাম হাসান (আ.) জীবিত থাকতেন তবে  তিনি যুদ্ধ-বিরতির  নীতি গ্রহণ করতেন। না, কখনই এ দাবি সত্য নয় যে, ইমাম হাসান (আ.) যুদ্ধ পছন্দ করতেন না বলে শান্তিপূর্ণ পথকে প্রাধান্য দিতেন।
এর প্রমাণ  হল,  প্রথমত মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (আ.) উভয়েই একরূপ ছিলেন এবং নীতির ক্ষেত্রেও তাঁদের মধ্যে অভিন্নতা ছিল। তাঁরা উভয়েই একদিকে অত্যন্ত সাহসী ও অন্যদিকে বীর যোদ্ধা ছিলেন। নাহজুল বালাগার ২০৭ নং খুতবায় হজরত আলীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তিনি সিফফিনের যুদ্ধে ইমাম হাসানের দুঃসাহসিকতায় এতটা শঙ্কিত হন যে স্বীয় সঙ্গীদের বলেন : ‘হাসানকে এভাবে মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করা থেকে নিবৃত কর আমি তাকে হারানোর আশঙ্কা করছি।’তা্ই নিঃসন্দেহে বলা যায় মুয়াবিয়ার সাথে তিনি সঙ্গীদের অসহযোগিতার কারণে যদ্ধ-বিরতির সন্ধি করতে বাধ্য হন, ভীরুতার কারণে নয়। ঐতিহাসিক মাসউদী তার ‘ইসবাতুল ওয়াসিয়া’গ্রন্থে ইমাম হাসানের যে বক্তব্যটি উল্লেখ করেছেন তাতে তিনি বলেছেন : ‘আমি যদি উপযুক্ত সঙ্গী পেতাম তবে খেলাফত লাভের জন্য এমন বিপ্লব ও আন্দোলন করতাম যে কেউ তার নজির দেখেনি।’
দ্বিতীয়ত মুয়াবিয়ার বাহ্যিক ধার্মিকতার বিষয়টি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বৈধতাকে জনগণের সামনে স্পষ্ট করা বেশ কঠিন ছিল। একারণে আমরা দেখি ইমাম হাসানের (আ.) মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া দশ বছর জীবিত থাকলেও ইমাম হোসাইন (আ.) তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের আহ্বান জানাননি। এর বিপরীতে ইয়াজিদের সময় যেভাবে অধার্মিকতা প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছিল ইমাম হাসানের (আ.) জীবদ্দশায় এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হলে সেক্ষেত্রে তিনিও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ইমাম হোসাইনের (আ.) মতই বিদ্রোহ করতেন।
ইমাম যে অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন তার সাক্ষ্য বহু আগেই দিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় নানাজি বিশ্বনবী (সা.)। তিনি বলেছিলেন, “বুদ্ধিমত্তা যার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সে হল হাসান বিন আলী।“ 
মুয়াবিয়া ইমাম হাসানের (আ.) সঙ্গে সন্ধির পর যখন সব কিছুর ওপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় তখন সে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করবে বলে জানিয়ে দেয়। মুয়াবিয়া ইমামকে মদীনায় সব ধরনের কষ্ট দেয়ার চেষ্টা চালায় এবং মদীনায় নিয়োজিত  তার গভর্নররাও একই কাজে   মশগুল ছিল। ফলে ইমাম মদীনায় দশ বছর অবস্থান করা সত্ত্বেও তার অনুসারীরা এই মহান ইমামের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ খুবই কম পেত। ফলে ইমাম হাসান (আ.)’র মত মহাজ্ঞানের উৎস থেকে খুব কম সংখ্যক অনুসারীই উপকৃত হতে পেরেছে। এই মহান ইমাম থেকে বর্ণনার সংখ্যাও তাই খুব কম দেখা যায়।
মুয়াবিয়া নিজের মৃত্যু আসন্ন এটা উপলব্ধি করতে পেরে নিজের ছেলের জন্য ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার আয়োজন করতে থাকে। সে এটাও বুঝতে পেরেছিল যে, ইমাম হাসান (আ.) বেঁচে থাকলে জনগণ সহজেই তার লম্পট ছেলেকে খলিফা হতে দেবে না। তাই মুয়াবিয়া বেশ কয়েকবার ইমামকে শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করে। অবশেষ চক্রান্তের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে ইমামকে শহীদ করে। মুয়াবিয়া অত্যন্ত কূট-কৌশলে ইমামের (আ.) এক স্ত্রীকে বিভ্রান্ত করে তাঁকে দিয়ে বিষ-প্রয়োগের মাধ্যমে ইমামকে শহীদ করতে সক্ষম হয়।  পঞ্চদশ হিজরির সফর মাসের ২৮ তারিখে ৪৭ বা ৪৮ বছর বয়সে শাহাদতের অমৃত পান করেন ইমাম হাসান (আ.)। বলা হয় ইমাম হাসান (আ.)-কে তাঁর প্রিয় নানার কবরের পাশে দাফন করার উদ্যোগ নিয়েছিল নবী-পরিবার। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের এই উদ্যোগকে বাধা দেয় বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের বিদ্বেষী প্রভাবশালী মহলগুলো। ফলে রাসূল (সা.)'র রওজা থেকে বেশ কিছু দূরে জান্নাতুল বাকি গোরস্তানে দাফন করা হয় এই মহান ইমামকে।
ইমাম হাসান (আ.) দেখতে প্রায় নানার মত তথা বিশ্বনবী (সা.)’র মত ছিলেন। তাঁর আচার-আচরণও ছিল সে রকম। তাঁকে দেখলেই রাসূল (সা.)’র স্মৃতি চাঙ্গা হত দর্শকদের মনে।
এই মহান ইমামের মূল্যবান একটি বাণী শুনিয়ে এবং সবাইকে আবারও মুবারকবাদ জানিয়ে শেষ করবো আজকের  এই আলোচনা। 
ইমাম হাসান (আ.)  বলেছেন- “আমি বিস্মিত হই তার ব্যাপারে যে তার খাদ্যের মান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে বা চিন্তিত অথচ নিজের চিন্তার খোরাক নিয়ে ভাবে না। অর্থাত সে তার পাকস্থলীর জন্য ক্ষতিকর খাবার বর্জন করলেও তার চিন্তার জগতে এমন কিছুকে প্রবেশ করতে দেয় যা তাকে ধ্বংস করে।”

Tuesday, May 6, 2025

ট্রাম্প-কেনেডি স্টাইলের গণহত্যা; আমেরিকা কি জেনেটিক পরিবর্তনের আধুনিক পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে?

পার্সটুডে- ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান জানিয়েছে, জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ বা গণহত্যার মাধ্যমে ইউজেনিক্সের পুরানো পদ্ধতি বাতিল হওয়ায় এখন মার্কিন সরকারের নীতি হলো সমাজের দুর্বল অংশের জন্য জীবনযাত্রাকে পদ্ধতিগতভাবে আরও কঠিন করে তুলে ইউজেনিক্সের নরম (সফ্ট) পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আমেরিকায় ‘ইউজেনিক্স’ নামক এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রয়োগ করে মানবজাতির উন্নয়ন আর সুস্থ-সবল ভবিষ্যত প্রজন্ম তৈরির নামে হাজার হাজার মানুষকে বন্ধ্যা করা হয়েছিল, এমনকি কেড়ে নেয়া হয় বহু লোকের প্রাণও।

পার্সটুডে বলছে, গার্ডিয়ান পত্রিকা সোমবার এক প্রতিবেদেনে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে পরিবেশ, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে 'সফ্ট ইউজেনিক্স' প্রয়োগ করছে। এই পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গির মূল চেতনা হচ্ছে- দুর্বলদের হত্যা করে বুদ্ধিমান জাতি ও বর্ণকে সহযোগিতা করো।

দ্য গার্ডিয়ান আরও লিখেছে, মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র সব সময় তার যৌবনকালের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সেই সময় মানুষ জানতই না ডায়াবেটিস ও অটিজম কী জিনিস। একই সঙ্গে সে সময় স্থূলতার হার অনেক কম ছিল। তিনি প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষেও কথা বলেন।

এই প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের নীতির সমালোচনা করে বলা হয়েছে, সমাজের দুর্বল অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনেডি আসলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলোকে এড়িয়ে মার্কিন সমাজে সফ্ট ইউজেনিক্স প্রয়োগ করছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, কেনেডির পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের আরো অনেকেই এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করছেন। মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সম্পর্কে বাড়তি উত্তেজনা এবং উৎসাহের কারণ হলো তারা যুক্তরাষ্ট্র এমনকি বিশ্বের অন্যান্য অংশের মানুষের জেনেটিক গঠনে হস্তক্ষেপ করতে চান।  ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টা ইলান মাস্কের উদ্যোগে বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস করা হয়েছে। এর ফলে আফ্রিকায় শিশুমৃত্যু এবং এইডস ও ম্যালেরিয়ার ঘটনা ইতিমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

গার্ডিয়ান এই সমস্ত নীতিকে "সফ্ট ইউজেনিক্স" হিসেবে অভিহিত করে লিখেছে, যদি দুর্বল মানুষদের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবন রক্ষাকারী সেবাগুলো কেড়ে নেওয়া হয় তাহলে আপনি প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিলেন। এর ফলে শেষ পর্যন্ত কেবল সবচেয়ে যোগ্য মানুষেরাই বেঁচে থাকতে পারবে।

ট্রাম্প প্রশাসনে তৎপর কেনেডির মতো কর্মকর্তাদের মতে, সমাজের ভয়াবহ অবস্থার কারণ হচ্ছে অসুস্থ ব্যক্তিরা। যারা অসুস্থ ব্যক্তিদেরকে স্বাস্থ্যকর খাবার এবং চিকিৎসা সেবা পেতে বাধা দেয় তারা এই অবস্থার জন্য দায়ী নয়।

মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র

Monday, May 5, 2025

ইরান কেন আমেরিকাকে বিশ্বাস করে না: ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা

সাইফুল খান: ইরান-আমেরিকা সম্পর্কের দ্বন্দ্ব কোনো হঠাৎ সৃষ্ট রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘ সাত দশকের সংঘাত, ষড়যন্ত্র ও একতরফা আধিপত্যবাদের ফল। এই সম্পর্কের প্রতিটি অধ্যায় যেন ইরানিরা তাদের রক্ত ও অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখেছে।

আধুনিক ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যেগুলো ইরানিদের মনে আমেরিকার প্রতি এক গভীর অবিশ্বাস ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। এই নিবন্ধে আমরা সেই ঘটনাগুলো, তাদের প্রেক্ষাপট, ইরানি জনগণের অভিজ্ঞতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করব:

১. ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান: গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রথম খোঁচা

ইরানে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ১৯৫১ সালে Anglo-Iranian Oil Company জাতীয়করণ করেন। এতে ব্রিটিশ ও মার্কিন স্বার্থে আঘাত লাগে। এর পরিণতিতে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6 যৌথভাবে " Operation Ajax" নামের এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেক সরকারকে পতন করিয়ে শাহ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসায়।

এই ঘটনার মাধ্যমে ইরানিদের মনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে এক তীব্র অনাস্থা জন্ম নেয়। ইরানিসমাজ বুঝে যায় যে, আমেরিকা কেবল গণতন্ত্রের মুখোশ পরে আছে, আসলে তাদের আসল উদ্দেশ্য ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। ইরানের সম্পদ ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। হাজার বছরের পুরাতন সভ্যতা ও শিক্ষার দেশ ইরানকে সদ্য জন্ম নেয়া বহুজাতিক আমেরিকা পরিচালনা করবে! এটা ইরানিদের আত্মমর্যাদা, আভিজাত্য আর ইতিহাসের নির্মাণের সাথে কেবলই সাংঘর্ষিক।

২. শাহের স্বৈরতন্ত্র ও সাভাক-এর দমন-পীড়ন: মার্কিন সমর্থন

মোসাদ্দেক পতনের পর আমেরিকার সমর্থনে শাহ ইরানে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। তার শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয় সাভাক (SAVAK) নামের ভয়ঙ্কর গোয়েন্দা সংস্থা। মার্কিন প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা এই বাহিনী অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের গুম, আটক ও হত্যায় অংশ নেয়।

শাহের পশ্চিমঘেঁষা নীতিতে ইসলামি ঐতিহ্য, পোশাক ও সমাজব্যবস্থা আক্রান্ত হয়। ইরানিরা এই শাসনকে কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং মার্কিন আধিপত্যের এক ছায়া সরকার হিসেবে দেখেছিল।

৩. ইসলামি বিপ্লব (১৯৭৯): আত্মপরিচয়ের বিপ্লব

১৯৭৯ সালের বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। শাহ পালিয়ে গেলে ইরানি জনতা আমেরিকার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, কারণ তারা মনে করত আমেরিকা তাদের স্বৈরশাসককে রক্ষা করেছিল।

তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস দখল ও ৫২ জন কূটনীতিককে বন্দি রাখা হয় ৪৪৪ দিন। এই ঘটনা ইরান-আমেরিকার সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইরান এই দূতাবাসকে "স্পাই হাউজ" হিসেবে ঘোষণা করে।

৪. ইরান-ইরাক যুদ্ধ ও আমেরিকার পক্ষপাত

১৯৮০ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এই যুদ্ধে আমেরিকা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ইরাককে সমর্থন করে। অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে চুপ থাকার অভিযোগ ওঠে।

যুদ্ধে প্রায় তিন লাখের বেশি ইরানি শহীদ হন। তারা স্পষ্টভাবে দেখে যুদ্ধ ইরানের মাটিতে, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব সাদ্দামের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমেরিকার প্রতি ঘৃণা আরও গাঢ় হয়।

৫. ইরান এয়ার ৬৫৫ ট্রাজেডি: নিরীহ যাত্রীদের মৃত্যুও মাফ হয়নি

১৯৮৮ সালে আমেরিকার ইউএসএস ভিনসেন্স রণতরী ইরান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এতে ৬৬ শিশুসহ ২৯০ জন নিহত হন। আমেরিকা এটিকে ভুল আখ্যা দিলেও কোনো দুঃখপ্রকাশ করেনি।

ইরানিদের কাছে এটি ছিল সরাসরি এক গণহত্যার দৃষ্টান্ত, যা আরও একবার প্রমাণ করে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানি প্রাণের মূল্য নেই।

৬. JCPOA চুক্তি ভঙ্গ: প্রতিশ্রুতি ভাঙার রাজনীতি

২০১৫ সালে ইরান ও পাঁচ+১ গ্রুপের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় যুগান্তকারী পারমাণবিক চুক্তি JCPOA। এতে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে, আর আমেরিকাসহ পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সম্মত হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে যান এবং আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

ইরানিদের কাছে এটা ছিল সরাসরি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা। তাদের মতে, আমেরিকার কথা ও চুক্তির কোনো মূল্য নেই। আমেরিকা নিজের ওয়াদাকে নিজেই সম্মান করতে জানেনা।

৭. সোলাইমানি হত্যা: জাতিগত অসম্মানের নতুন অধ্যায়


২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় শহীদ হন ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। তিনি দেশের জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডে ইরানিদের মনে প্রতিশোধ ও ঘৃণার আগুন আরো জ্বলে ওঠে।

শুধু একজন নেতাকেই নয়, এই হামলায় ইরান অনুভব করে যে তাদের সার্বভৌমত্বকেও হত্যা করা হয়েছে।

৮. অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: নিরীহ জনগণকে শাস্তি

মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতি বিধ্বস্ত করে। ওষুধ, খাদ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে বাধা সৃষ্টি হয়। সাধারণ নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত একাধিকবার জানায় এই নিষেধাজ্ঞা মানবিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে দশকের পর দশক ধরে।

৯. সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক আগ্রাসন

মার্কিন গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্র একতরফাভাবে ইরানকে প্রায়শ 'সন্ত্রাসী রাষ্ট্র' হিসেবে মিথ্যা-বানোয়াট উপস্থাপন করে। পশ্চিমা রাজনীতিবিদদের বক্তব্যেও ইরানবিরোধিতা ঘৃণামূলক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

সেই সাথে আমেরিকা ইসরাইল ও সৌদি আরবের সাথে মিলিত হয়ে ইরানবিরোধী সামরিক জোট গঠন করে। এতে ইরান নিজেকে আরও বেশি 'ঘেরাও করা' ও কোণঠাসা মনে করে। ইরান ও আমেরিকার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ইরানের আচরণ ও বাকশৈলীর শালীনতা লক্ষনীয় যা আমেরিকার বক্তব্যে অনুপস্থিত।

১০. ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: পুনরায় বিশ্বাসের সেতু?

ইরান একাধিকবার প্রমাণ দিয়েছে যে, তারা সংলাপ ও সহযোগিতার পথে যেতে চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তার কথার পেছনে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণে ব্যর্থ।

বিশ্বাসভঙ্গের ইতিহাস, একতরফা আধিপত্য ও নৈতিক দ্বিচারিতা ইরানিদের মনে মার্কিন বিদ্বেষের বীজ বপন করেছে। শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি।

পরিশেষ

ইরান কেন আমেরিকাকে বিশ্বাস করে না তার উত্তর ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে। এটা কেবল কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং একটি জাতির সম্মান, স্মৃতি ও স্বকীয়তা রক্ষার সংগ্রাম। আমেরিকা যদি সত্যিই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন চায়, তবে তাকে শুধু চুক্তি নয় আচরণেও দায়িত্বশীল হতে হবে।

ইরান কেন আমেরিকাকে বিশ্বাস করে না: ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা

Saturday, August 24, 2024

কেন পশ্চিমা নারীবাদীদের কাছে ফিলিস্তিনি নারীদের ধর্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

পার্সটুডে- নারীবাদী আন্দোলন তার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়নি। ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতাকে নারীবাদী আন্দোলনের নেতারা চরমভাবে উপেক্ষা করে চলেছেন।

গত দশ মাসে, সহমর্মিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক পশ্চিমা নারীবাদী বিশেষ করে ব্রিটেনের নারীবাদী সংগঠনগুলোর দ্বিমুখী আচরণ প্রত্যক্ষ করা গেছে।  পার্সটুডে'র মতে, ইসরাইলি নারীদের প্রতি সমর্থনে এই নারীবাদীদের কাছ থেকে অসংখ্য দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও,ফিলিস্তিনি নারীদের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে রহস্যজনকভাবে তারা নীরবতা রয়েছে।

ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনি নারীদের উপর ব্যাপক যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও এদিকে কারো কোনো নজর নেই। অথচ ফিলিস্তিনি নারীদের দুরবস্থার প্রতি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার উচিত ছিল।

৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত শত শত ফিলিস্তিনি নারীকে ইসরাইল আটক করেছে এবং তাদের ওপর যৌন নির্যাতন, নগ্ন করে শারিরিক নির্যাতন, ধর্ষণের হুমকিসহ বিভিন্নভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে। এর মধ্যে দুটি ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পশ্চিমা নারীবাদীরা চোখ বন্ধ করে রেখেছে

চলতি বছর ১৯ ফেব্রুয়ারী জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নথিভুক্ত যৌন নিপীড়নের দুটি ঘটনাকে উপেক্ষা করা হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, গত ৭৬ বছরে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনি নারীদের ওপর যে সহিংসতা চালিয়েছে এবং এর যে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে সেটাকে কীভাবে উপেক্ষা করা যায়?

সাত অক্টোবরের আগে প্রকাশিত ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এই সহিংসতার অসংখ্য রিপোর্ট, প্রতিবেদন সহজেই পাওয়া যায়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই সব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেমন ইসরাইলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেনারেল কমিটি, জেরুজালেম-ভিত্তিক মহিলা আইনি পরামর্শ এবং সহায়তা কেন্দ্র,এর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যায়।

এই প্রতিবেদনগুলো আইনি শুনানি, আইনি অভিযোগ, প্রতিরক্ষা অ্যাটর্নিদের নথি এবং বন্দীদের সাক্ষ্যগুলোর উপর ভিত্তি করে, ইসরাইলে আটকে থাকা ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন সহিংসতা, নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের চিত্রিত ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।  যদি নারীবাদীরা সত্যিই যুদ্ধে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তাহলে ফিলিস্তিনি নারীদের বিরুদ্ধে চলমান অপরাধগুলো নিয়ে তাদের অবশ্যই কথা বলা উচিত।

গত দশ মাস ধরে ৪০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা যাদের অর্ধেকই নারী ও শিশু এবং ২১ হাজারটিরও বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটলেও নারীবাদীদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। বরং তারা ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর  চলমান সহিংসতা চরমভাবে উপেক্ষা করে গেছে।

একইভাবে, গত ১২ জুন প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও  ফিলিস্তিনি নারীদের দুর্দশার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে এবং এসব ঘটনা তাদের বিবেককেও আলোড়িত করতে পারেনি।

যৌন সহিংসতার সংস্কৃতি

যৌন সহিংসতার ঘটনা পুরুষদের বিরুদ্ধেও হয়েছে। ইসরাইলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনি পুরুষদেরকে জোরপূর্বক নগ্ন করে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে সেদেহ তামান কারাগার থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায় ইসরাইলি সেনারা একজন ফিলিস্তিনিকে গণধর্ষণ করছে। বেজালেল স্মোট্রিচসহ ইসরাইলি মন্ত্রীরা ভিডিওটি প্রকাশের নিন্দা জানিয়েছিলেন, তবে যৌন নিপীড়নের কোনো নিন্দা তারা করেননি। লিকুদ পার্টির হ্যানোচ মিলভস্কির মতো কেউ কেউ এই নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছেন। যেমনটি পশ্চিমা নারীবাদীরা নীরব রয়েছে।

পাশ্চাত্যের নারীবাদীদের মতো বিশ্বের অন্য প্রান্তের নারীবাদীদের নীরবতাও নিন্দনীয়। ফিলিস্তিদের সীমাহীন দুর্দশার ব্যাপারে সবার নীরবতা থেকে মানবতার চরম অধ:পতনের প্রমাণ পাওয়া যায়।

যখন নিহতদের ৭০% নারী ও শিশু, ফিলিস্তিনি নারীরা যখন ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে বের করে, মায়েরা যখন তাদের প্রাণহীন শিশুদের আলিঙ্গন করে, যখন পরিবারগুলো শরণার্থী শিবিরে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে মারা যায়, ইসরাইলের অবরোধের কারণে মায়েরা যখন তাদের সন্তানদের অনাহারে মরতে দেখে এবং যখন শিশুরা চরম দুর্ভিক্ষে খাবারের জন্য এদিক ওদিক ছুটাছু করে এবং কান্নাকাটি করে তখন এ নিষ্ঠুর নীরবতা কোনো রাজনীতি নয় বরং তা  নারীদের প্রতি কথাকথিত নারীবাদীদের বিশ্বাসঘাতকতা।

Tuesday, March 30, 2021

আল আকসা মসজিদ ইসলাম ও ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচিতি

বিশ্ব কুদস দিবস। গত প্রায় ৭০ বছর ধরে ইহুদিবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জবর দখল করে আছে। ফিলিস্তিন জবর দখলের এতো বছর পরও ইসরাইল বর্বর নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।

ইহুদিবাদী ইসরাইলের এই ন্যক্কারজনক আগ্রাসনের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মজলুম জনতা তাদের দেশের ভূখণ্ডকে স্বাধীন করার তথা ইহুদিবাদী দখলমুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্রও হাল ছাড়ে নি। বরং ফিলিস্তিনিদের মনোবল ও সংগ্রাম আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেগবান হয়েছে। ইরানের জনগণ সেই বিপ্লব বিজয়ের আগে থেকেই ফিলিস্তিনের মজলুম জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয় ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য চপেটাঘাত। কেননা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কেবল ইরানের জনগণকেই নয় বরং বিশ্বের সকল মুসলমান ও স্বাধীনচেতা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য। ইমামের ওই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবস পালিত হয়।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ) ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষাক্ত টিউমার বা ক্যান্সার বলে অভিহিত করেছেন। ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অধিকারের প্রতি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্যে রমযানের শেষ শুক্রবারে নানা কর্মসূচি, অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ঘোষণার আহ্বান জানান। বিশ্ববাসী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তাঁর এই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং এই দিনকে কুদস দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। এই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখা এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

এ বছর এমন সময় বিশ্ব কুদস দিবস পালিত হতে যাচ্ছে যখন মার্কিন নতুন ষড়যন্ত্রের কারণে ফিলিস্তিন সংকট অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সমাজের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্বেও তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করে আমেরিকা। আমেরিকার এ পদক্ষেপ দখলদার ইসরাইলের সম্প্রসারণকামীতাকে পূর্ণতা দিয়েছে যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক পরিণতি ডেকে আনবে। বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে আমেরিকা ফিলিস্তিনিদেরকে এ বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে যে, ইসরাইলের স্থিতিশীলতা ও দখলদারিত্বের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে। আল আকসা মসজিদ ইসলাম ও ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচিতি। এটি মুসলমানদের প্রথম কেবলা হওয়ার কারণে শুধু ফিলিস্তিন নয় বরং সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এর ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। মুসলমানদের সবচেয়ে তিনটি পবিত্র স্থানের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস হচ্ছে অন্যতম। অথচ আমেরিকা দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে শুধু যে মুসলমানদের অবমাননা করেছে তাই নয় একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রীতি ও জাতিসংঘের ২৩৩৪ ও ৪৭৮ নম্বর প্রস্তাবও লঙ্ঘন করেছে।

দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে আমেরিকা দু'টি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করা। আর দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে, লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগ্রামীদেরকে নির্মূল করা যাতে দখলদার ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমানে আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন নিয়ে দখলদার ইসরাইল পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইসরাইল গাজার নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তা তারা গত সাত দশক ধরে চালিয়ে আসছে। অথচ জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী আগ্রাসীদের মোকাবেলায় অস্ত্র ধারণা করার অধিকার ফিলিস্তিনিদের রয়েছে।

আমেরিকা তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করায় এর প্রতিবাদে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি সেনাদের হামলায় প্রথম দিনেই ৬০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হন। প্রকৃতপক্ষে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের প্রধান শরীক হচ্ছে আমেরিকা। এ কারণে ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজা উপত্যকায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, "ফিলিস্তিনি জনগণ আর তাদের সংকট সমাধানের জন্য আমেরিকাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেবে না।" তিনি বলেন, "এই অপরাধযজ্ঞের ঘটনায় 'ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায়' আমেরিকার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কার্যত শেষ হয়ে গেছে।" তবে সব ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ ও অন্যায় আচরণ সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে আমেরিকা নতুন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচয় অর্থাৎ বায়তুল মোকাদ্দাসের পরিচিতি ধ্বংসের চেষ্টা করছে যাতে ফিলিস্তিনিদের আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইল-মার্কিন ষড়যন্ত্রে নতুন করে যোগ দিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক এতদিন গোপন থাকলেও এখন তা প্রকাশ্যে এসেছে। সৌদি আরবের সাবেক সামরিক কমান্ডার জেনারেল আনোয়ার এশকি বলেছেন, তার দেশ ইসরাইলি দখলদারিত্বের মুখে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে বাধ্য নয়।" তিনি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, "ফিলিস্তিনিদের রক্ষার বিষয়ে সৌদি আরবের বাড়তি কোনো দায়িত্ব নেই। ফিলিস্তিনিরা যেহেতু সৌদি নাগরিক নন সে কারণে রিয়াদের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তারা রাখেন না।"  তিনি বলেন, "ইসরাইলকে শুধু শুধু শত্রু ভাবা হয়।”

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনি দখলদার ইসরাইলের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন। বিশ্ব কুদস দিবস পালন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, "কুদস দিবস কেবল ফিলিস্তিনিদের দিবস নয়। এটি এমন একটি দিবস যে, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে এটা বুঝিয়ে দেয়া, তারা আর কোনো মুসলিম ভূখণ্ডকে এভাবে গ্রাস করতে পারবে না।" ইমাম খোমেনি(র.) আরো বলেছিলেন, "বিশ্ব কুদস দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা বলদর্পী শক্তিগুলোকে এমন একটি হুঁশিয়ারি সংকেত দিতে চাই যে তারা মুসলমানদের ওপর আর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না এবং কুদস দিবস বিশ্ব মুসলমানদের প্রেরণা ও বেঁচে থাকার দিবস।"

ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, "ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করা সব মুসলমানের দায়িত্ব।"

ইহুদিবাদী ইসরাইলের নির্যাতনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে কখনোই দমানো যায় নি বরং কুদস দিবস পালন কিংবা মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপের মাধ্যমে তাদেরকে কিছুটা দমানো সম্ভব হয়েছে। এবারের বিশ্ব কুদস দিবস ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের জন্য এ বার্তাই পৌঁছে দেবে যে, ফিলিস্তিনের ওপর দখলদারিত্ব ও জুলুম নির্যাতনের দিন শেষ হয়ে এসেছে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের উচিত মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা উদ্ধারে বিশ্ব কুদস দিবসে শরীক হওয়া যাতে ইসরাইলের দখল থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড উদ্ধারকে আরো তরান্বিত করা যায়।

Thursday, March 18, 2021

ইরানে অবস্থিত ৪০০ বছরের পুরোনো ভবন

ইরানের ইয়াজদ প্রদেশে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ভবন যা এখনো বিদ্যমান আছে। এ ভবনের আয়তন ৭৭৯০ বর্গমিটার। সাসানীয় যুগে এ ভবনটি তৈরি করা হয়। ইরান সরকার ১৩৫৪ ফার্সি সনে এটি জাতীয়করণ করে। ইরানের পুরাতত্ত্ব বিভাগ এটির রক্ষণাবেক্ষণ করে যাচ্ছে।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

Thursday, September 24, 2020

যে বাড়িতে বেড়ে ওঠেন ইমাম খোমেনী (র.)

এই বাড়িতেই ইমাম খোমেনী (র.)-এর শৈশব-কৈশোর কাটে।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনী ১৯০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইরানের খোমেন শহরের একটি সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সাইয়্যেদ মোস্তফা মুসাভি আল খোমেনী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুস্তরের আলেম। ইরাকের নাজাফ ও সামেরায় পড়াশোনা করে একজন বিশিষ্ট মুজতাহিদ হিসেবে পরিচিত হন তিনি।
খোমেন শহরের অত্যন্ত প্রভাবশালী ইসলামী নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তৎকালীন অত্যাচারী জমিদার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর এ সময়েই জন্ম হয় তাঁর তৃতীয় সন্তান সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেনীর। খোমেন শহরের এই বাড়িতেই তিনি জন্মের পর থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত কাটান।

ইমামের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পবিত্র কুরআন হেফ্‌জ করার মধ্যদিয়ে। এরপর তিনি ইরানের আরাক শহরে (১৯২০-২১) এবং পরবর্তীতে কোমে (১৯২৩) ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন।
১৯৩০ এর দশকে ইমাম খোমেনী (রহ.) কোমের ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রের ছাত্রদের ইসলামি আইনশাস্ত্র শিক্ষা দেন।
১৯৫০ এর দশকে তিনি ইসলামি ফিকাহশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করে মুজতাহিদ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে ইমামের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।

১৯৬৩ সালে তিনি তৎকালীন শাহ সরকারের অত্যাচার, নিপীড়ন ও আমেরিকার পদলেহী নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সে সময় মোহাম্মাদ-রেজা শাহ ইরানে কথিত স্বেতবিপ্লব শুরু করেছিলেন।
ইমামের নেতৃত্বে দেশে বসবাসরত ইরানি জনগণের পাশাপাশি সারাবিশ্বে অবস্থানরত ইরানিরা শাহ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবি তৎপরতা শুরু করে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সে বিপ্লব চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে এবং  এর মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজীরবিহীন বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন ইমাম খোমেনী (রহ.)। 

ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ১০ বছর তিনি সব বিতর্কের উর্ধ্বে থেকে ১৯৮৯ সালে আল্লাহর সাক্ষাতে চলে যান। তাঁর জানাযার নামাজে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল।
১৯৮৯ সালের ২৩ মে মস্তিস্কের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য ইমামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং এর ১১ দিন পর ৪ জুন তিনি ৮৭ বছর বয়সে তেহরানের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

 
 
 
 
 
 

Wednesday, September 9, 2020

দ্বিতীয় মুয়াবিয়ার সাক্ষ্যসহ ইমাম হোসাইনের (আ) বিজয়ের কিছু প্রমাণ

ইমাম হোসাইন (আ) কারবালার মহাবিপ্লবে তাঁর ও মহান সঙ্গীদের অনন্য আত্মত্যাগের মাধ্যমে কেবল ইসলামের নিস্তেজ হয়ে আসা গাছকেই রক্ষা করেননি ও স্বৈরতান্ত্রিক খোদাদ্রোহী শাসনের মেরুদণ্ড গুড়িয়ে দেননি, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ও সুদূরপ্রসারী নানা বিজয়ও অর্জন করেছিলেন।

‘‘তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত,মানবতার স্বার্থেই তোমাদের এ পৃথিবীতে আগমন। কেননা তোমরা আমর বিল মারুফ এবং নাহী আনিল মুনকার কর।’’

আদেশ প্রদানকারী বা বাধা প্রদানকারীর জন্যে দুটো শর্ত রয়েছে। প্রথমত জ্ঞান বুদ্ধির পরিপক্কতা ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিশক্তি। যেনতেনভাবে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনীল মুনকারের কোন সার্থকতা নেই। আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনীল মুনকার সম্বন্ধে আমার কতটুকু ধারণা রয়েছে? আর কেমন করেই বা তা কার্যকরী করা সম্ভব? এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণার অভাব আছে বলেই আমরা এতকাল অন্যের বিকৃত চুলের স্টাইল কিংবা জামার বোতাম আর জুতোর ফিতার বিকৃত স্টাইলের বিরুদ্ধে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনীল মুনকার করে এসেছি। মুনকারকে মারুফ আর মারুফকে মুনকার জ্ঞান করার ঘটনাও বিরল নয়। এসব ক্ষেত্রে আমাদের আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনীল মুনকার না করাই শ্রেয়। কেননা এ ধরনের আমর বিল মারুফ করতে গিয়ে কত মুনকারেরই প্রচলন হতে দেখা গেছে। তাই এ কাজে হাত দেবার আগে পর্যাপ্ত-জ্ঞান গবেষণা,পরীক্ষা-নিরীক্ষা,মনস্তত্ব আর সমাজ পরিচিতির মতো অনেক কিছুর প্রয়োজন রয়েছে। যাতে সর্বোত্তম উপায়ে ও সর্বোচ্চ কার্যকরী পন্থায় ইসলামের এ  মূলনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। মারুফ ও মুনকারকে শনাক্ত করতে হবে, এগুলোর মূল উৎস কোথায় তা খুঁজে বের করতে হবে। এ কারণে ইমামগণ অজ্ঞ লোকদেরকে আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনীল মুনকার করতে বারণ করেছেন। কেননা  لِاَنَّهُ مَا یُفْسِِدُهُ اَآْثَرُ مِمَّا یُصْلِحُهُ  তারা যতটা না সংস্কার করতে পারে তার চেয়ে বেশী ধ্বংস করে দেয়। তারা ভাল করতে চায় কিন্তু ফলাফলে খারাপ হয়ে যায়। এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি রয়েছে।

এখানে হয়তো অনেকে অজুহাত তুলতে পারে: আমরা যেহেতু অজ্ঞ শ্রেণীর লোক তাই এ ব্যাপারে আমাদের আর কোনো করণীয় রইল না। পবিত্র কোরআন সুস্পষ্ট ভাষায় এর উত্তর দিয়েছে:

)لِیَهْلِکَ مَنْ هَلَکَ عَنْ بَیِّنَةٍ وَ یَحْیَی مَنْ حَیَّ عَنْ بَیِّنَةٍ(

যাতে যে ধ্বংস হবে সে যেন সত্যাসত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশের পর ধ্বংস হয় এবং জীবিতদের মধ্য থেকে যে জীবিত  থাকে সে যেন জীবিত থাকে সত্যাসত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশের পর। (আনফাল-৪২)

অথবা,

)لِئَلِّا یَکُونَ لِلنَّاسِ عَلَی اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرَّسُولِ (

‘‘যাতে রসুল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।’’ (নিসা-১৬৫)

ইমামদের (আঃ) একজনকে প্রশ্ন করা হল: একদল মানুষ অজ্ঞ । কিয়ামতের দিন এদেরকে কিভাবে বিচার করা হবে? জবাবে তিনি বললেন: সেদিন একজন আলমকে হাজির করা হবে যে সবকিছু জেনেশুনেও তা পালন করতো না। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হবে তুমি এসব জেনেও মেনে চলতে না কেন? এবার তার আর কোনো অজুহাত থাকবে না। তখন তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করতেই হবে। আরেকজনকে হাজির করে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে তুমি কেন পালন করতে না? জবাবে সে বলবে: আমি জানতাম না বলে পালন করিনি। প্রত্যুত্তরে বলা হবে:

 هَلاَّ تَعَلَّمْتَ জানতে না তবে শিখতে তো আর বাধা ছিল না,জেনে নাওনি কেন? জানতাম না,বুঝতাম না এটা কোনো জবাব হল নাকি? বিবেককে আল্লাহ কী কারণে সৃষ্টি করেছেন? যাতে জ্ঞানার্জন করতে পার,পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করতে পার। এজন্যেই তোমাকে বিবেক দান করা হয়েছে। তোমাকে তেমন জ্ঞানী হতে হবে যারা কেবল চলতি ঘটনাবলীরই আচার-বিচার করে ক্ষান্ত হয় না,অতীত ও ভবিষ্যতও যাদের নখাগ্রে থাকে। হযরত আলী (আঃ) বলেছেন :

 -وَ لاَ نَتَخَوَّفُ قَارِعَةً حَتَّی تَحُلَّ بِنَا  আমাদের জনগণ গণ্ডমূর্খ হয়ে গেছে। কোন বিষয় যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদেরকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে ততক্ষণ তারা বেখবর থাকে। (নাহাজুল বালাগা-3২ নং খোতবা) এদের মধ্যে কেউ ভবিষ্যৎ বক্তা নেই। এদের ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতার প্রয়োজন। কেবল সমসাময়িক জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। সমাজতত্ত্বে এমন দখল থাকতে হবে যে,পঞ্চাশ বছর শত বছর কিংবা হাজার বছর পরের যে বিপর্যয় মানব জাতিকে হুমকি দিচ্ছে তাকেও যেন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। হযরত ইবরাহীম(আঃ)-এর জ্ঞানের পরিসীমা বর্ণনায় আল্লাহ বলছেন,‘‘আমরা ইবরাহীমকে পরিপক্ব জ্ঞান দান করেছি।’’ (আম্বিয়া ৫১)। তাই সমাজে সংস্কার আনতে পরিপক্ব  জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। দূরদর্শিতা বা ভবিষ্যৎ  জ্ঞান ইমাম হোসাইনের (আঃ) বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইমাম হোসাইনের (আঃ) দূরদর্শিতার দৃষ্টিপটে ভবিষ্যৎ স্বচ্ছ হয়ে ধরা দিয়েছিল। অর্থাৎ তিনি খড়কুটোর মধ্যে ও ভবিষ্যতের যে আভাস প্রত্যক্ষ করতেন,অন্যরা আয়নায়ও তা দেখতে পেত না। আজ আমরা সে যুগের পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারি। কিন্তু সেদিনকার মানুষের কাছে ইমাম হোসাইনের (আঃ) কথা-কাজ ছিল দুর্বোধ্য-দুর্গম।

আশুরার দিনেও তিনি নির্দ্বিধায় ঘোষণা দিলেন,ওরা আমাকে হত্যা করবেই। তবে আমি আজ তোমাদেরকে বলে যাচ্ছি,আমার হত্যার পর ওদের পতন অনিবার্য হবে। অনতিবিলম্বে তাদের পতন ঘটবে। এদের পতন ছিল আশাতীতভাবে দ্রুত। বনি উমাইয়ারাও বেশী দিন ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেনি। তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করলো বিন আব্বাসীয়রা। এরপর থেকে দীর্ঘ পাঁচ শতাধিক বছর ধরে মসনদ থাকলো তাদের আয়ত্তে। মোটকথা,কারবালার হত্যাকাণ্ড থেকে যে বনি উমাইয়ার প্রাসাদে ভাঙন ধরলো,অনতিবিলম্বেই তা তাদের চরম পতনের মাধ্যমে পরিণতি লাভ করলো। এ সমস্ত ঘটনা ইমাম হোসাইনের (আঃ) অনন্য দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।

কাপুরুষ ইবনে যিয়াদের উসমান নামের এক ভাই ছিল। একদিন উসমান বলল,হে ভাই,যিয়াদের সব সন্তান যদি দারিদ্র,অপমান আর দুঃখের সাথে বেঁচে থাকতো তাতেও আমি অসন্তুষ্ট হতাম না, যত না অসন্তুষ্ট হয়েছি তোমার হাতে আমাদের খান্দানে (কারবালার) এ অপরাধ দেখে। ইবনে যিয়াদের মা ছিল পরকীয়া-ব্যভিচারিণী। সেও একদিন ইবনে যিয়াদকে ভর্ৎসনা করে বলল: জেনে রেখো তুমি যে অপরাধ করেছ তাতে তোমার বেহেশতের কোনো আশা নেই। এমন কি মারওয়ান ইবনে হাকামের মতো জঘন্য কাপুরুষও ইয়াযিদের দরবারে প্রতিবাদী হয়ে বললোঃ সুবহানাল্লাহ,সুমাইয়ার (অর্থাৎ যিয়াদের মার) সন্তানেরা সম্মানিত হোক,কিন্তু নবীর বংশকে এ অবস্থায় তুমি দরবারে আনতে পারলে?

হ্যাঁ,এভাবেই সেদিন ইমাম হোসাইনের (আঃ) ভবিষ্যৎ বার্তা ফলতে শুরু করেছিল এবং তা দুশমনের কণ্ঠ থেকেও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। স্বয়ং ইয়াযিদের স্ত্রী হিন্দের কথাও হয়তো শুনে থাকবেন। ইয়াযিদের ক্রিয়াকর্মের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সে ইয়াযিদের কাছে এসবের ব্যাখ্যা দাবি করে। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে ইয়াজিদ এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বসে। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের ঘাড়ে সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে সে আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা করে।

ইমাম হোসাইনের (আঃ) সর্বশেষ ভবিষ্যদ্বাণী ছিল অনতিবিলম্বে ইয়াযিদের পতন হবে। এদিকে কারবালা ঘটনার পর মাত্র দু’তিন বছর চরম দুর্দশা ও হতাশার মাধ্যমে ইয়াযিদী শাসন অব্যাহত থাকে তারপর তার জীবনাবসান ঘটে। পিতার মৃত্যুর পর ইয়াযিদ-পুত্র ‘দ্বিতীয় মুয়াবিয়া’ চেপে বসলো মসনদে। কিন্তু মাত্র চল্লিশ দিন পার না হতেই একদিন সে ঘোষণা দিল, হে লোকসকল! আমার পিতামহ মুয়াবিয়া (প্রথম) আলী ইবনে আবু তালিবের (আঃ)-সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অথচ হক ছিল আলীর (আঃ) সাথে। আবার,আমার পিতা ইয়াযিদ দাঁড়ায় হোসাইন ইবনে আলীর (আঃ) বিরুদ্ধে । এখানেও হোসাইন (আঃ) ছিল সত্যের উপরে, আমার পিতা নয়। আর আমি আমার পিতার ওপর অসন্তুষ্ট। নিজেকেও খেলাফতের যোগ্য বলে মনে করি না। তাই আমার পিতামহ কিংবা পিতার অপরাধের পুনরাবৃত্তি এড়ানোর লক্ষে এখানেই আমার পদত্যাগের ঘোষণা দিলাম। সে ক্ষমতা ছেড়ে দিল।

আর এভাবে জয় হল সত্যের। মিথ্যা হল অস্তমিত। ইমাম হোসাইন (আঃ) অসীম আধ্যাত্মিক শক্তিবলে শত্রু-মিত্র উভয়কেই ন্যায়ের পথে উদ্দীপ্ত করে দিলেন। সূচিত হল তরবারির উপর রক্তের বিজয়।

আশুরার রাতের দুর্বিষহ অবস্থা দেখে হযরত যয়নাব দু’একবার কেঁদেও ফেলেন। একবার ইমাম হোসাইনের (আঃ) কোলে মাথা রেখে তিনি এতোই কাঁদলেন যে,বেহুশ প্রায় হয়ে পড়েন। ইমাম হোসাইনের (আঃ) বিভিন্ন ভাবে তাকে শান্ত করেন। তারপর বলেন,

لَا یُذْهِبَنَّ حِلْمَکَ الشَّیْطَانُ

‘‘বোন আমার! শয়তান যেন তোমার ধৈর্যচ্যুতি না ঘটায়।’’ (এ’লামুল ওরা: ২৩৬,ইরশাদে মুফীদঃ ২৩২ বিহারুল আনওয়ারঃ ৪৫/২)

তিনি হযরত যয়নাবকে (আঃ) বলেনঃ আমাদের নানাইতো এপথ দেখিয়ে গেছেন। বাবা-মা-ভাই সবাইতো এপথে শাহাদাত বরণ করেছেন। এতে তো গৌরব ছাড়া কাঁদার কিছুই নেই।

হযরত যয়নাব (আঃ) নিজেকে কিছুটা সংযত করে বলেনঃ ‘আমি কোনো কষ্টের জন্যে কাঁদছি না। আমার দুঃখ হলো এ কারণে যে, নানাকে হারিয়েছি,বাবাকে হারিয়েছি, মাকে হারিয়েছি, বড় ভাই হাসানকে (আঃ) হারিয়েছি। তারপরও এতদিন আপনার দিকে চেয়ে আমি সব দুঃখ ভুলেছিলাম। কিন্তু আজ তোমাকেও হারাতে হবে তাই আমার কষ্ট হচ্ছে ।

অথচ কারবালার ঘটনার পর-মুহূর্ত থেকে হযরত যয়নাব আর আগের যয়নাব রইলেন না। ইমাম হোসাইনের শৌর্য-বীর্য এবং ধৈর্য দেখে তিনি এমন মানসিকতা অর্জন করলেন যে, যত বড় ব্যক্তিত্বই হোক না কেন, যয়নাবের (আঃ) সামনে সে তুচ্ছ। ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ) বলেনঃ আমরা বারোজন ছিলাম। সবাইকে এক শিকলে বেঁধে শিকলের একমাথা আমার বাহুতে এবং অন্য মাথা আমার ফুফুর বাহুতে বেঁধে দেয়া হয়।

বলা হয় যে,নবী পরিবারকে ২রা সফর তারিখে বন্দী অবস্থায় সিরিয়ায় নিয়ে আসা হয়। এ হিসাব অনুযায়ী কারবালার ঘটনা থেকে যখন বাইশ দিন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তখন বন্দীদেরকে ইয়াযিদের সবুজ প্রাসাদে নেয়া হল। সবুজ প্রাসাদ মুয়াবিয়ার তৈরি।

এই প্রাসাদ ঝলমলে,রাজকীয় সাজে সজ্জিত,আয়া-খানসামাদের ভিড় প্রভৃতিতে ভরা ছিল এবং কেউ এর মধ্যে ঢ়ুকলে হতবাক হয়ে পড়তো। বলা হয় যে,সাত সাতটা বড় বড় হল ঘর পার হলে তারপর ইয়াযিদের মণিমাণিক্য খচিত দরবারে আসা যেত। সেখানে ইয়াযিদ দাস-দাসী,উজির-নাযির সবাইকে নিয়ে বসে আছে। এমনি অবস্থায় বন্দী নবী পরিবারকে দরবারে আনা হল। কিন্তু হযরত যয়নাব (আঃ) এত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার পরও ইয়াযিদের দরবারে এমন সাহসী ভূমিকা নিলেন যে,সমস্ত দরবার কেঁপে উঠলো এবং উপস্থিত সভাসদরা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। এমন কি বাকপটু ইয়াযিদও সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেল। ইয়াযিদ প্রথমে গর্বভরে তার বিজয় উল্লাস করছিল। সাথে সাথে হযরত যয়নাব (আঃ) বাঘের মতো গর্জে উঠে বললেন:

اَظَنَنْتَ یَا یَزِیدُ حَیْثُ اَخَذْتَ عَلَیْنَا اَقْطَارَ الْاَرْضِ وَ آفَاقَ السَّمَاءِ فَاَصْبَحْنَا نُسَاقُ آکمَا تُسَاقُ الْاُسَارَی اَنَّ بِنَا عَلَی اللهِ هَوَاناً وَ بِکَ عَلَیْهِ کرَامَة ؟

‘হে ইয়াযিদ খুব যে ফুর্তি করছ! আমাদেরকে এই হালে ফেলে ও নিজের হাতের মুঠোয় পেয়ে বোধ হয় মনে করছ যে,পৃথিবীর সব কিছু থেকে আমাদের বঞ্চিত করে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নেয়ামত লাভ করেছ। আল্লাহর শপথ করে বলছি যে,আমার দৃষ্টিতে তোমার মতো কাপুরুষ আর কেউ নেই। আমার দৃষ্টিতে তোমার এক কানাকড়িও মূল্য নেই।’ (আল লুহুফঃ ৭৬,মাকতালুল মোকাররামঃ ৪৬২ বিহারুল আনওয়ারঃ ৪৫/১৩৩)

একবার লক্ষ্য করুন যে, কেবল ঈমান ও ব্যক্তিত্ব ছাড়া সবকিছু হারিয়েছেন এবং বর্তমানে বন্দী অবস্থায় সবচেয়ে জঘন্য লোকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন-এরকম একজন মহিলার কাছ থেকে কী আশা করা যেতে পারে? কিন্তু দেখুন হযরত যয়নাব (আঃ) এমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন যে, অতি শীঘ্রই শামে বিপ্লবের ঘনঘটা শুরু হয়।

ঐ দরবারে বসেই ইয়াযিদ তার কৌশল বদলাতে বাধ্য হয়। বন্দীদেরকে সসম্মানে মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে। তারপর নিজে অনুতাপ প্রকাশ করে ও ইবনে যিয়াদকে অভিসম্পাত করে বলে আমি ওকে এ কাজ করতে আদেশ দেইনি। সে নিজেই একাজ করেছে। এই বিপ্লব কে ঘটালেন? ইসলামের মহীয়সী নারী হযরত যয়নাবই (আঃ) এরকম বিপ্লবের ভিত্তি রচনা করে যান। তারপর তার বক্তব্যের শেষাংশে যে ইয়াজিদকে হাজার হাজার মানুষ জাঁহাপনা বলে ডাকতো সেই ইয়াজিদকে ব্যঙ্গ করে হযরত যয়নাব বললেন:

یَا یَزِیدُ آِدْ کِیْدَکَ وَاسْعَ سَعْیَکَ نَاصِبْ جَهْدَکَ فَوَاللهِ لَا تَمْحُوا ذِکرَنَا وَ لَا تَمِیتَ وَحْیَنَا

‘‘হে ইয়াযিদ! তোমাদের যে জল্পনা-কল্পনা আর ষড়যন্ত্র আছে সবই করো। তবে জেনে রেখো যে আমাদের স্মরণকে মানুষের অন্তর থেকে কোনোদিন  মুছে ফেলতে পারবে না। আমাদের এ বাণী চিরন্তন। আর যারা নিশ্চিহ্ন হবে সে হলো তুমি এবং তোমার চাটুকাররা’’(আল লুহুফঃ ৭৭,বিহারুল আনওয়ারঃ ৪৫/২৩৫)

একথা শুনে ইয়াজিদ প্রথম চুপ রইলো তারপর পাপিষ্ঠ ইয়াযিদ ভিতরে জ্বলে উঠলো এবং হযরত যয়নাবকে (আঃ) আরও কষ্ট দেয়ার জন্যে তার হাতের লাঠি দিয়ে ইমাম হোসাইনের (আঃ) ছিন্ন মস্তকে খোঁচা মারল। (লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আলিয়িল আযিম)

ইমাম হোসাইন (আঃ) দূরদর্শী ছিলেন। তিনি যা দেখতেন সমসাময়িক কালের কোনো বুদ্ধিজীবী কিংবা চিন্তাবিদের মাথায়ও তা আসতো না। তিনি মানুষের পরিত্রাণের উপায় তাদের নিজেদের চেয়ে ভালো বুঝতেন। দশ,কুড়ি,পঞ্চাশ,শত বছর যখন পার হয় তখন মানুষ একটু একটু বুঝতে পারে যে,সত্যিই তো! তিনি তো এক মহা-বিপ্লব করে গেছেন। আজ আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি যে,ইয়াযিদ কি ছিল আর মুয়াবিয়া কি ছিল বা উমাইয়াদের ষড়যন্ত্র কি ছিল। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আঃ) সেদিনই এর চেয়ে ভালো বুঝতে পেরেছিলেন। সেকালে বিশেষ করে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মদীনার লোকজন ইমাম হোসাইন (আঃ) কি চান তা অনুধাবন করতে পারেনি। কিন্তু ইমাম হোসাইনের (আঃ) নিহত হবার সংবাদ যেদিন তাদের কানে গেলো,অমনি যেন সবার টনক নড়ে উঠলো। সবার একই প্রশ্নঃ হোসাইন ইবনে আলীকে (আঃ) হত্যা করা হলো কেন? এ বিষয়ে তদন্ত করার জন্য মদীনার চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। এর প্রধান ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালা। তদন্ত কমিটি শামে গিয়ে ইয়াযিদের দরবারে এসে উপস্থিত হলো। মাত্র ক’দিন অতিক্রান্ত হতে না হতেই তারা অবস্থাটি ধরে ফেললো। অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে তারা শীঘ্রই মদীনায় ফিরে এলো। লোকজন জিজ্ঞেস করলো কী দেখে এলেন? জবাবে তারা বললোঃ শুধু এইটুকুই তোমাদের বলি যে,আমরা যে ক’দিন শামে ছিলাম সে ক’দিন শুধু এ চিন্তায় ছিলাম যে,খোদা এক্ষুণি হয়তো এ জাতিকে পাথর নিক্ষেপ করে ধ্বংস করবেন! লোকজন বললোঃ কেন,কী হয়েছে? তারা বললোঃ আমরা এমন এক খলিফার সামনে গিয়েছিলাম যে প্রকাশ্যে মদ খাচ্ছিল,জুয়া খেলছিল,কুকুর-বানর নিয়ে খেলা করছিলো,এমন কি বেগানা নারীর সাথে যেনাও করছিলো!

আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালার আটজন ছেলে ছিল। তিনি মদীনার জনগণকে বললেন: তোমরা বিদ্রোহ কর আর না করো আমি শুধু আমার আটজন ছেলেকে নিয়ে হলেও বিদ্রোহ করতে যাচ্ছি । কথামতো তিনি তার আটজন ছেলেকে নিয়ে বিদ্রোহ করলেন এবং ইয়াযিদের বিরুদ্ধে ‘‘হাররা বিদ্রোহে’’ প্রথম তার আটজন ছেলের সবাই এবং পরে তিনি নিজেও শহীদ হন। (মুরুজুয যেহাব ৩/৬৯)

আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালা নিঃসন্দেহে একজন চিন্তাশীল লোক ছিলেন। কিন্তু তিন বছর আগে ইমাম হোসাইন (আঃ) যখন মদীনা থেকে বেরিয়ে আসনে তখন তিনিও ইমামের (আঃ) কাজকর্ম থেকে কিছুই বুঝতে পারেননি।

ইমাম হোসাইন (আঃ) বিদ্রোহ করলেন,আন্দোলন করলেন,জানমাল উৎসর্গ করলেন। তিন বছর কেটে গেলো। তারপর আজ এসে আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালার মতো ব্যক্তিরও টনক নড়লো। এ হলো ইমাম হোসাইনের (আঃ) দূরদর্শিতা এবং বিচক্ষণতার স্বরূপ মাত্র ।

কারবালার মতো ঘটনাকেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে ঘটনায় আত্মিক ও মানসিক  উভয় দিক দিয়ে মাত্র ৭২ জনের এক বাহিনী ত্রিশ হাজার লোকের বাহিনীকে পরাজিত করেছে। তারা সংখ্যায় মাত্র ৭২ জন ছিলেন এবং মৃত্যু যে নির্ঘাত এটিও তারা নিশ্চিতভাবে জানতেন। তবুও কিভাবে তারা ত্রিশ হাজারের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হলেন?

প্রথমত তারা এমন শক্তিতে শক্তিমান ছিলেন যে,শত্রুদের থেকে হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহীর মতো ত্রিশ জনের অধিক লোককে বেঁচে থাকার ঘাঁটি থেকে নির্ঘাত মৃত্যুর ঘাঁটিতে আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। কিন্তু মৃত্যু ঘাঁটি থেকে একজন লোকও ইয়াযিদের দুনিয়াবি ঘাঁটিতে যায়নি। তাহলে বুঝতে হবে যে,এ ঘাঁটিতে সংখ্যা কম এবং নিশ্চিত হলেও এখানে শক্তি -সামর্থ্য অনেক বেশী যা দিয়ে শত্রুদেরকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয়ত আরবের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী একজনের মোকাবিলায় অন্য আরেকজন যুদ্ধ করতো। কারবালায় ইবনে সা’দ প্রথমে এভাবেই যুদ্ধ করতো রাজি হয়। কিন্তু যখন দেখল যে,এভাবে যুদ্ধ করলে ইমাম হোসাইনের (আঃ) একজন সৈন্যই তার সমস্ত সৈন্যকে সাবাড় করে দিতে যথেষ্ট তখন সে এ যুদ্ধ বর্জন করে দল বেঁধে আক্রমণ করার নির্দেশ দিতে বাধ্য হলো।

আশুরার দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একে একে ৭১ জন শহীদের লাশকে ইমাম হোসাইন কাঁধে বয়ে তাঁবুতে নিয়ে এসেছেন। তাদের কাছে গিয়ে অভয় বাণী দিয়েছেন,তাঁবুতে এসে সবাইকে শান্ত করেছেন,এছাড়া তিনি নিজেও কত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন। ৫৭ বছরের একজন বৃদ্ধলোক এত ক্লান্ত, শ্রান্ত অবস্থায় যখন ময়দানে এলেন তখন শত্রুরা ভেবেছিলো হয়তো সহজেই তাকে পরাস্ত করা যাবে। কিন্তু একটু পরেই তাদের সব আশা-ভরসা উড়ে গেলো। ইমাম হোসাইনের (আঃ) সামনে যে-ই এলো এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারলো না। ইবনে সাদ এ অবস্থা দেখে চিৎকার করে বলে উঠে:



هَذَا ابْنُ قَتَّالِ الْعَرَبِ

‘‘তোমরা জান এ কার সন্তান? এ তারই সন্তান যে সমস্ত আরবকে নিশ্চিহ্ন করতে পারতো। এ শেরে খোদা আলীর (আঃ) সন্তান।’’(মাকতালু মোকাররম: ৩৪৬ বিহারুল আনওয়ারঃ ৪৫/৫৯ মানাকিবে ইবনে শাহের অশুবঃ ৪/১১০)

 وَاللهِ نَفْسُ اَبِیهِ بَیْنَ جَنْبَیْهِ

তারপর বলে : ‘‘আল্লাহর শপথ করে বলছি,তার দু’বাহুতে তার বাবার মতোই শক্তি । আজ যে তার মোকাবিলায় যাবে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।’’ এটি কি ইবনে সা’দের পরাজয়ের প্রমাণ নয়? ত্রিশ হাজার সেনা নিয়ে যে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত,বয়োবৃদ্ধ,অপরিমেয় দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে পশ্চাদপসরণ করে ছুটে পালায় এটি কি তাদের পরাজয় নয়? (ইরশাদে মুফিদঃ ২৩০ বিহারুল আনওয়ারঃ ৪৪/৩৯০)

তারা তলোয়ারের মুখে যেমন পরাজয় বরণ করে তেমনি ইমাম হোসাইনের (আঃ) চিন্তাধারার কাছেও তাদের হীন চিন্তাধারা পরাজিত হয়।

আশুরার দিন যুদ্ধ আরম্ভ হবার আগে ইমাম হোসাইন (আঃ) -তিনবার বক্তৃতা দান করেন। এ বক্তৃতাগুলো প্রত্যেকটি বীরত্বপূর্ণ ছিল। যাদের বক্তৃতা করার অভ্যাস আছে তারা হয়তো জানেন যে বক্তৃতার ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত মানসিকতার দরকার হয়। সাধারণ অবস্থায় মানুষ একটি অসাধারণ বক্তব্য রাখতে পারে না। যে হৃদয় আঘাত পেয়েছে সে ভালো মর্সিয়া পড়তে পারে। যার হৃদয় প্রেমে ভরা সে ভালো গজল গাইতে পারে। তেমনি কেউ যদি বীরত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করতে চায় তাহলে তার অস্তিত্ব বীরের ভাবানুভবে ভরা থাকতে হবে। ইমাম হোসাইন (আঃ) আশুরার দিনে যখন বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন তখন ইবনে সা’দ চিন্তায় পড়ে গেল। সবার কানে যাতে ইমামের কথা পৌঁছায় সে জন্য ইমাম হোসাইন (আঃ) একটি উঁচু জায়গা হিসাবে উটের পিঠে উঠে দাঁড়ালেন এবং চিৎকার করে বললেন:

تَبّاً لَکُمْ اَیَّتُهَا الْجَمَاعَة وَ تَرْحاً حیْنَ اسْتَصْرَخْتُمُونَا وَالِهین فَاَصْرَخْنَاآکمْ مُوجِفِینَ

‘‘হে জনগোষ্ঠী! তোমাদের জন্য ধ্বংস এ জন্য যে,তোমরা জটিল পরিস্থিতিতে আমার সাহায্য চেয়েছ। আমি তোমাদের সাহায্যের জন্য ছুটে এসেছি। কিন্তু যে তরবারি আমার সাহায্যে পরিচালনার শপথ তোমরা নিয়েছিলে আজ আমাকে হত্যার জন্য সে তরবারি হাতে নিয়েছ।’’ (আল-লুহুফঃ ৪১ তুহফাল উকুল: ১৭৩ মানাকিবে ইবনে শাহরে অশুবঃ ৪/১১০ মাকতালু মোকাররামঃ ২৮৬/৬)

সত্যিকার অর্থে হযরত আলীর (আঃ) জ্ঞানগর্ভমূলক বাগ্মিতার পর এ ধরনের বক্তৃতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ইমাম হোসাইনের(আঃ) বক্তৃতায় যেন হযরত আলীরই (আঃ) বিচক্ষণতা। যেন সেই জ্ঞান,সেই সাহস,সেই বীরত্ব । ইমাম হোসাইন (আঃ) এ কথা তিনবার চিৎকার করে বললেন। তাতেই ইবনে সাদের মনে ভয় ঢুকে গেলো যে,এভাবে কথা বলতে দিলে এক্ষুণি তার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে। তাই ইমাম হোসাইন (আঃ) যখন চতুর্থ বারের মত কথা বলতে যাবেন এ সময় পরাজিত মনোবৃত্তি নিয়ে কাপুরুষ ইবনে সাদ নির্দেশ দিল যে,সবাই হৈ-হুল্লোড় করে উঠবে যাতে ইমাম হোসাইনের (আঃ) কথা কেউ শুনতে না পারে। এটি কি পরাজয় নয়? এটি কি ইমাম হোসাইনের (আঃ) বিজয় নয়?

ইতিহাসে আছে, আশুরার দিন ভোর বেলায় ইমাম হোসাইন নামাজ সেরে তার সঙ্গী-সাথীদেরকে বললেন, তৈরি হয়ে যাও। মৃত্যু এ দুনিয়া থেকে ঐ দুনিয়ার পার হবার জন্য একটা সাকো বৈ কিছুই নয়। একটা কঠিন দুনিয়া থেকে তামাদেরকে একটা মর্যাদাশালী মহান জগতে পার করে দেব। এ ছিল ইমাম হোসাইনের (আঃ) বক্তব্য। এ ঘটনাটি ইমাম হোসাইন (আঃ) বর্ণনা করেননি। কারবালায় যারা উপস্থিত ছিল তারাই বর্ণনা করেছে। এমন কি ইবনে সা’দের বিশিষ্ট রিপোর্টার হেলাল ইবনে নাফেও এ ঘটনা বর্ণনা করেছে যে,আমি হোসাইন ইবনে আলীকে (আঃ) দেখে অবাক হয়ে যাই। তার শেষ মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিলো এবং যতই তার কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠছিল ততই তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। যেন দীর্ঘ বিরহের পর কারো তার আপনজনের সাথে মিলনের সময় হয়েছে। আরও বলে যেঃ

 لَقَدْ شَغَلَنِی نُورُ وَجْهِهِ جَمَال هَیْبَتِهِ عَنِ الْفِکْرَةِ فِی قَتْلِهِ

এমনকি যখন অভিশপ্ত শিমার ইমাম হোসাইনের শিরশ্ছেদ করছিলো তখন আমি তার চেহারায় এমন প্রসন্নতা এবং উজ্জ্বলতা দেখেছিলাম যে তাকে হত্যা করার কথা একবারে ভুলেই গিয়েছিলাম। (আল লুহুফঃ ৫৩, বিহারুল আনওয়ারঃ ৪৫/৫৭) #

সূত্র: ইমাম হোসাইনের (আ) কালজয়ী বিপ্লব: শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মূর্তাজা মোতাহ্হারি