Friday, March 20, 2026

ইরান যুদ্ধ: ব্রিটেনকে বুঝতে হবে তারও শত্রু এখন ট্রাম্প by সাইমন টিসডাল

গত কয়েক দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো এই যুদ্ধ কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অসম্মানজনক এবং উন্মত্ততার সীমা ছুঁয়ে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিনের আঘাতে ইরানের একটি নৌজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা যেন দেখিয়ে দিল, বেপরোয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে গোটা পৃথিবীই যুদ্ধক্ষেত্র।

কূটনীতি, যা ওয়াশিংটন নিজেই বিশ্বাসঘাতকতার মতো নস্যাৎ করেছে, তার জায়গা নিয়েছে অবিরাম বিমান হামলা। সেই হামলায় মারা যাচ্ছেন শত শত সাধারণ ইরানি নাগরিক, আহত হচ্ছেন আরও অনেকে। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস দিন দিন যেন এক উন্মাদখানায় পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধের লক্ষ্য প্রতিদিন বদলাচ্ছে। এদিকে তাঁর তথাকথিত ‘যুদ্ধমন্ত্রী’ পিট হেগসেথ উন্মত্তের মতো চিৎকার করছেন—কোনো রকম দয়া ছাড়াই হত্যা করতে হবে।

এটাও এখন স্পষ্ট যে ইরানের বেঁচে থাকা অবশিষ্ট নেতারা ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভ্যুত্থানের পুনরাবৃত্তির মতো করে মাথা নত করবেন না। ইরানের সামরিক শক্তি তুলনামূলকভাবে অনেক দুর্বল হলেও তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঢেউ তুলে তারা প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল—তাদের ওপর আবার হামলা হলে পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে।

এখন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গেও যেন যুদ্ধে নেমেছেন। জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের সময়কার সেই কুখ্যাত নীতি ‘হয় তুমি আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে’—আবার সামনে এনেছেন তিনি।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, আর যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবানন, শুধু চাইছে না এই সংঘাত থামুক। ব্রিটেন ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কিন্তু তবু তাদের ধীরে ধীরে এর ভেতরে টেনে নেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ট্রাম্পের এই বিশ্বযুদ্ধে কোনো নায়ক নেই—আছে কেবল শিকার। ব্যতিক্রম বলতে স্পেনের দৃঢ়চেতা নেতা পেদ্রো সানচেজ।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। এখন ইরানে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য তাঁকে এবং ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের একটি স্কুলে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা, যা নিঃসন্দেহে জঘন্য অপরাধ। যুক্তরাজ্যসহ যেসব সরকার এখনো জাতিসংঘ সনদ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদের উচিত এই দুই নেতার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। এমনকি তাঁদের দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

অনেক আমেরিকান ও ইসরায়েলি নাগরিক তাঁদের নেতাদের এই উন্মত্ত আচরণে ক্ষুব্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই দুই নেতা তাঁদেরই নামে এই সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্বল হয়ে পড়া মার্কিন কংগ্রেস ও ইসরায়েলের নেসেট ব্যর্থ হয়েছে। তাই সচেতন নাগরিকদেরই এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধের দাবি তুলতে হবে। অনেক দিন ধরেই পরিষ্কার—ট্রাম্প ব্রিটেনের বন্ধু নন। কিন্তু সাম্প্রতিক এই প্রাণঘাতী উদ্ধত আচরণ (যার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যকে আগাম কিছুই জানানো হয়নি) প্রমাণ করে তিনি এবং তাঁর প্রশাসন এখন ব্রিটেনের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

তথ্যগুলোই দেখুন। রাশিয়া যেমন ঠুনকো অজুহাতে ইউক্রেনে হামলা করেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে। ‘আসন্ন হুমকি’র যে যুক্তি তারা দিয়েছে, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

মার্কিন বাহিনীর ওপর বিশ্বের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যুদ্ধের নিয়মকানুন মানারও বাধ্যবাধকতা নেই। নৈতিকতা বা আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না; এমনকি প্রকাশ্যেই একটি রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই উন্মত্ত অভিযান লাখো মানুষকে আতঙ্কিত ও বাস্তুচ্যুত করছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ভ্রমণ ও জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যে ইসরায়েলের মতোই একটি আইন ভঙ্গকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং এটি যুক্তরাজ্যের জন্যও মৌলিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বোঝার জন্য আর কত প্রমাণ লাগবে?

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের তালিকা দীর্ঘ। তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছেন। বিশ্বস্ত ন্যাটো মিত্রের সার্বভৌম অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন। ইরানের কল্পিত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে চিৎকার করতে করতে নিজে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিকীকরণ করেছেন। জলবায়ু ইস্যুতে জাতিসংঘের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছেন। বিশ্বজুড়ে কঠোর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করেছেন। ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে-কে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বেদনাদায়ক, ইউক্রেনকে বিশ্বাসঘাতকতার মতো ছেড়ে দিয়ে রাশিয়ার প্রতি আপসের নীতি নিয়েছেন। এসব পদক্ষেপই ব্রিটিশ জনগণ এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

অনেকে বলেন, ব্রিটেন প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে ইরান প্রশ্নে তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব নয়। কিন্তু এটি পরাজয়ের মানসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ই ব্রিটেন মার্কিন সহায়তা ছাড়া চলেছে। ভবিষ্যতেও চলতে পারবে—যদিও শুরুতে কিছুটা কষ্ট হতে পারে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় ট্রাইডেন্ট পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন কর্মসূচি বাতিল করা হলে সেটি ইতিবাচক পদক্ষেপই হবে।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য এটাই এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যুদ্ধের প্রথম পাঠ: শত্রুকে চেনো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নাও। এটি ট্রাম্পের পছন্দের যুদ্ধ। কিন্তু ব্রিটেনেরও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আছে। আমেরিকার উপনিবেশগুলো যেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, তার আড়াই শতাব্দী পরে এবার হয়তো ব্রিটেনেরই আমেরিকার কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সময় এসেছে।

* সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান–এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানকে চীন-রাশিয়ার সারিতে রেখে ‘ভয়ংকর’ তথ্য দিলেন মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান

পাকিস্তানকে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে একই সারিতে রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড। তিনি বলেছেন, ‘দেশটির (পাকিস্তান) দ্রুত অগ্রসরমাণ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডকেও আঘাতের আওতায় আনতে পারে। এই পাঁচটি দেশ নতুন, উন্নত বা প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহণব্যবস্থা গবেষণা ও উন্নয়ন করছে, যেগুলো পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এবং আমাদের মূল ভূখণ্ডকে আঘাতের পরিসরে নিয়ে আসে।’

বুধবার (১৮ মার্চ) সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির সামনে ২০২৬ সালের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়ন উপস্থাপন করে তিনি এসব কথা বলেন।

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।

পাকিস্তান সম্পর্কে আইনপ্রণেতাদের গ্যাবার্ড বলেন, ‘পাকিস্তানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন সম্ভাব্যভাবে এমন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যার পাল্লা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখবে।’

লিখিত প্রতিবেদনে পাকিস্তানকে একাধিক হুমকি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে বলা হয়, দেশটি ক্রমবর্ধমানভাবে উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা তাদের সামরিক বাহিনীকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দিচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এমন আইসিবিএম তৈরি হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হবে।

গণবিধ্বংসী অস্ত্রের প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান, চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া সম্ভবত এমন পরিবহণব্যবস্থা গবেষণা ও উন্নয়ন চালিয়ে যাবে, যা পাল্লা ও নির্ভুলতা বাড়াবে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং নতুন ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের বিকল্প তৈরি করবে।

প্রতিবেদনটি দক্ষিণ এশিয়াকে ‘দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের অঞ্চল’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছে যে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ‘পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বহন করে যাচ্ছে’।

এদিকে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি এবং আল-জাজিরার প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেয়নি।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, ‘এমন উদ্বেগ এই প্রথম নয়। আগেও এমন মন্তব্য করা হয়েছে। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বলে আসছে, তাদের প্রতিরোধক্ষমতা—প্রচলিত ও পারমাণবিক—ভারতকে লক্ষ্য করেই। ভারত সম্পর্কেও পাকিস্তান সম্মানজনক শান্তি চায়, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে হুমকি বলেছে বলে নয়।’

গ্যাবার্ডের মন্তব্য বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞরা এমন সম্ভাবনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। পাকিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘপাল্লার কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র শাহীন-৩-এর পাল্লা আনুমানিক ২ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার, যা পুরো ভারতে আঘাত করার জন্য যথেষ্ট।

আইসিবিএম সাধারণত ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে বোঝায়, যা পাকিস্তানের কাছে বর্তমানে নেই। এর চেয়েও বড় বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের দূরত্ব ১১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি। এমন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে কেবল রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন ও যুক্তরাজ্যের রয়েছে। ভারত ও উত্তর কোরিয়া এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। ইসরায়েলের জেরিকো-৩ নামের ক্ষেপণাস্ত্রও একই রকম পাল্লার বলে ধারণা করা হয়। 

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত


ইরানে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ যেভাবে ভূরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিল by মোহাম্মদ রেজা বাহরামি

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পড়েছে। এ সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক সীমার ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক স্তরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী পদক্ষেপে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ শুধু কূটনৈতিক উদ্যোগকে বিপর্যস্ত করেনি, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক কাঠামোকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ইরান তার স্বাভাবিক ও স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এটি কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।

আমাদের দেশের জন্য এ যুদ্ধ নিছক সামরিক সংঘাত নয়; এটি টিকে থাকার যুদ্ধ—যেখানে সীমিত লাল রেখা এবং সুস্পষ্ট কৌশলগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ইরানের অভিজ্ঞতায় যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। অতীতেও সংবেদনশীল আলোচনার সময় দেশটি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে। ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা—সবই দেখিয়েছে যে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া আগ্রাসনের ঝুঁকি থেকেই যায়।

বিশেষ করে পারমাণবিক আলোচনার সময় এবং নিষেধাজ্ঞা চলাকালে দুই দফা হামলার অভিজ্ঞতা (২০২৫ সালের জুনে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে) একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। তা হলো প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি অপরিহার্য। কূটনীতি কার্যকর হতে পারে তখনই, যখন তার সঙ্গে বাস্তব সামরিক সক্ষমতাও যুক্ত থাকে।

অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং ইরানের নেতৃত্ব উত্তরাধিকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তুলেছে, তা নিছক কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো মূলত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীনতাকে গভীরভাবে মূল্য দেওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনিকে বিশেষজ্ঞ পরিষদের মাধ্যমে নির্বাচনের ঘটনাই স্বাধীনতার প্রতি এ অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট প্রমাণ।

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি অত্যন্ত বড়। বর্তমানে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর বিমানবাহী রণতরি বহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।

এ বিপুল উপস্থিতি মূলত শক্তি প্রদর্শন এবং ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এত শক্তি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে নিজেদের সম্পদ পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারছে না।

এলাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন রাডার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। এটি দেখিয়েছে, ইরান উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর হুমকির মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং সংঘাতকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিচালনা করার ক্ষমতাও রাখে।

এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাস্তবতা। বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে রপ্তানি হয়। ফলে এ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিরোধক্ষমতা প্রদান করে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানিবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭৩ ডলার। এই দাম ৮ মার্চের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক এলএনজি উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যবাজার, রাসায়নিক সার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাজারে অনিশ্চয়তা এবং দামের অস্থিরতা বহু দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিমালা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানিব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছাড়াও এ যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তেহরান নীতির প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে ধীরে ধীরে মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছে। ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ, ভিন্ন নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব কারণ পশ্চিমা জোটের ঐতিহ্যগত ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে।

যুদ্ধকে একতরফা বিজয় হিসেবে তুলে ধরার যে বয়ান যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রয়োজন থেকেই। এটি করা হচ্ছে ক্ষমতা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক বৈধতা জোরদারের উদ্দেশ্যে। বাস্তবে অঞ্চলটির সামরিক পরিস্থিতি সেই বয়ানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এদিকে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো অ-পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভূমিকাও এ সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানিবাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এই দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।

বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন এবং জ্বালানি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব—সব মিলিয়ে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এ সংকট আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছে। তা হলো জটিল নিরাপত্তাহুমকির মোকাবিলায় ইরানের জন্য চারটি বিষয় অপরিহার্য—সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা, সক্রিয় কূটনীতি, জাতীয় নিরাপত্তার নিশ্চিত গ্যারান্টি ও দক্ষ সংকট ব্যবস্থাপনা।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কূটনীতির সমন্বিত প্রয়োগ ভবিষ্যতে আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত এ যুদ্ধ একটি বহুমাত্রিক সংকট, যার মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও মানবিক—সব দিকই জড়িয়ে আছে।

আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকারের ভিত্তিতে ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর আগ্রাসনের মোকাবিলা করার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে।

অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা অপরিহার্য। এ যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে—তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন, পশ্চিমা জোটের ভেতরে ফাটল এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের আকারে।

এ যুদ্ধ ইরানের কৌশলগত দর্শনের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে প্রতিরোধক্ষমতা, নিশ্চয়তাপূর্ণ কূটনীতি এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংকট ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

* মোহাম্মদ রেজা বাহরামি, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মহাপরিচালক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানিবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানিবাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ছবি : রয়টার্স

ট্রাম্প কেন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে শেষ হতে দিলেন by স্টিফেন হোমস

‘‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যার ওপর থাকা সীমাই শুধু উঠে যায়নি; বরং দুই দেশের মধ্যে যে বিশ্বাস ও তথ্যভিত্তিক সহযোগিতার ব্যবস্থা ছিল, সেটাও ভেঙে গেছে। আগে তারা একে অপরের স্থাপনা পরিদর্শন করত, তথ্য বিনিময় করত এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরানো বা পরীক্ষার আগে জানাত। এসব ব্যবস্থাই তাদের পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলেছিল।

এটি শুধু নীতিগত ভুল নয়; এর পেছনে আছে ট্রাম্পের চিন্তাভাবনা। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান খুব মূল্যবান কিছু নয়, বরং অনেক সময় তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর কাছে কূটনীতি মানে ধীরে ধীরে সম্পর্ক গড়ে তোলা নয়; বরং আলাদা আলাদা দর-কষাকষি, যেখানে কে কতটা চাপ দিতে পারে, সেটাই আসল।

তাই ট্রাম্প জটিল আন্তর্জাতিক সমস্যা সামলাতে অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের বদলে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মতো তুলনামূলক অনভিজ্ঞ লোকদের পাঠাতে দ্বিধা করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে আগের আলোচনার ইতিহাস না জানা দুর্বলতা নয়, বরং সুবিধা।

ট্রাম্পের ব্যবসায়িক জীবনের দিকেও তাকালে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাঁর শত শত অর্থ-সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। তাঁর সাবেক সহযোগীরা বলেন, তিনি প্রায়ই প্রথমে কঠোরভাবে চুক্তি করতেন, পরে কাজ শেষ হওয়ার পর আবার দর-কষাকষি করতেন। এতে অপর পক্ষকে কম টাকায় রাজি হতে হতো, না হলে ব্যয়বহুল মামলায় জড়াতে হতো। চুক্তি আইনবিশেষজ্ঞরা একে বলেন ‘সুনাম বিক্রি করে দেওয়া’, অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার বদলে তা খরচ করে তাৎক্ষণিক লাভ তুলে নেওয়া।

এই একই মানসিকতা ট্রাম্পের জোট-রাজনীতিতেও দেখা যায়। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইউরোপীয় মিত্রদের মার্কিন সুরক্ষার জন্য ‘টাকা দিতে হবে’। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ন্যাটোর নিয়ম না মানলে রাশিয়া যেন তাদের সঙ্গে ‘যা খুশি তা–ই’ করতে পারে। এটি প্রচলিত দায়িত্ব ভাগাভাগির কূটনীতি নয়; বরং চাঁদাবাজির মতো শোনায়।

ট্রাম্প মাফিয়াপ্রধানের মতো আচরণ করেন না, কিন্তু সমস্যাটা হলো তিনি নিজের কথাও সব সময় রাখেন না। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে বলেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালে আমেরিকা তাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কথা বলেন বা আচরণ করেন, যাতে তারা সন্দেহ করে—যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ন্যাটোর প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি মানবে কি না। ফলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায়—টাকা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সুরক্ষার নিশ্চয়তা স্পষ্ট নয়।

এভাবে প্রতিশ্রুতি ভেঙে কখনো কখনো লাভ করা যায়, তবে সেটা বিশেষ পরিস্থিতিতে। যখন লেনদেন একবারের জন্য হয়, ভবিষ্যতে আবার সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে, আর আগের আচরণের খবর সহজে ছড়ায় না, তখন এটা কাজ করতে পারে। ট্রাম্পের ব্যবসা ছিল এমনই—এক শহরে হোটেল, অন্য শহরে ক্যাসিনো, অন্য কোথাও লাইসেন্সিং চুক্তি। তাই এক জায়গার সুনাম নষ্ট হলেও অন্য জায়গায় নতুনভাবে শুরু করা যেত।

কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি এমন নয়। দেশগুলোর সম্পর্ক বারবার হয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে। তারা একে অপরের আচরণ লক্ষ করে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং অতীতের অভিজ্ঞতা মনে রাখে। এখানে সুনাম শুধু এক দেশের কাছে নয়, সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ যদি একটি চুক্তি ভাঙে, ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রাখে।

এ কারণেই নিউ স্টার্ট চুক্তি শেষ হওয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার ব্যাপার নয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরকে সরাসরি পরিদর্শন করত, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার তথ্য দিত, কোথায় কী সরানো হচ্ছে তা আগে জানাত। এতে অনিশ্চয়তা কমত। পারমাণবিক কৌশলে অনিশ্চয়তা কমানো অনেক সময় অস্ত্র কমানোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাচাই-বাছাইয়ের এই ব্যবস্থাগুলোই আসলে ভবিষ্যতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

যখন যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা ভেঙে যায়, তখন জায়গা নেয় সন্দেহ। পারমাণবিক কৌশলে এই সন্দেহ দ্রুত বাড়তে থাকে। দুই পক্ষই ধরে নেয়—অন্য পক্ষের সামর্থ্য ও উদ্দেশ্য হয়তো সবচেয়ে খারাপ। তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে চায়; আরও বেশি ওয়ারহেড মোতায়েন করে, সতর্কতা বাড়ায়, নতুন অস্ত্র বানানো বা পুরোনো অস্ত্র আধুনিক করার গতি বাড়ায়। ফলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অনেক সময় এটা আগ্রাসী মনোভাব থেকে নয়; বরং তথ্যভিত্তিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ার ফলেই ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার প্রধান শক্তি যদি নিজেই এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে অন্য দেশগুলোও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার বদলে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা শুরু করে। এতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ–মুখী থাকে না। দেশগুলো হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে যায় না; বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ও সংযমের ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এর মূলে আছে ‘রাজনৈতিক সময়’ নিয়ে ভিন্ন ধারণা। বিষয়টি এই নয় যে কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে আর কেউ ভাবে না; বরং ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখা হয়, সেটাই আসল।

‘প্রাতিষ্ঠানিক সময়’ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এতে লাগে অভিজ্ঞতা, যাচাই ব্যবস্থা, জোট ও অতীতের স্মৃতি। বিশ্বাস তৈরি হয় সময় নিয়ে এবং সরকার বদলালেও তা টিকে থাকে।

অন্যদিকে ‘পর্বভিত্তিক সময়’ হলো লেনদেনকেন্দ্রিক। এখানে আলোচনা মানে একেকটি আলাদা ঘটনা, যা অতীতের সঙ্গে খুব বেশি যুক্ত নয় এবং ভবিষ্যতের প্রতিও খুব দায়বদ্ধ নয়। সাফল্য মাপা হয় তাৎক্ষণিক ফল দিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব দিয়ে নয়। ট্রাম্প যখন বলেন, তিনি এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করবেন—এটা শুধু বাড়াবাড়ি কথা নয়; এতে বোঝা যায়, তিনি ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন না।

ডিলমেকারের এই চিন্তাধারা স্বভাবতই পর্বভিত্তিক। এখানে প্রতিপক্ষকে গভীরভাবে জানা কোনো শক্তি নয়, বরং বাড়তি ঝামেলা। আগের চুক্তিগুলোর সীমাবদ্ধতা বোঝাও বাস্তবতা নয়, দুর্বলতা বলে মনে হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি ভবিষ্যৎ গড়ার উপায় না হয়ে অতীতের বোঝা বলে মনে হয়।

কিন্তু পারমাণবিক স্থিতিশীলতা এভাবে চলে না। এটি নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ম, আস্থা ও পূর্বানুমেয় আচরণের ওপর। শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়, ভবিষ্যতে সেই অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার বা পরিবর্তন হতে পারে—তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকাও জরুরি। যাচাই ব্যবস্থা ভেঙে গেলে শুধু নিয়ন্ত্রণ কমে না; একে অপরকে বোঝার যৌথ ভিত্তিটাও নষ্ট হয়। তখন সবাই ধরে নেয়—অন্য পক্ষের উদ্দেশ্য হয়তো খারাপ। সবচেয়ে খারাপ ধারণাই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়।

ডিলমেকারের যুক্তি হলো একটি আলোচনা ব্যর্থ হলে অন্য কারও সঙ্গে নতুন করে শুরু করা যাবে। কিন্তু পারমাণবিক কৌশলে এমন সুযোগ নেই। এখানে নতুন বাজার নেই, নতুন প্রতিপক্ষ নেই, আর ভয়াবহ ভুল হলে দ্বিতীয়বার ঠিক করার সুযোগও নেই।

নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় একসময় এই কৌশলের সীমা ধরা পড়েছিল। ঠিকাদার, ব্যাংক ও সরবরাহকারীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যবসা করতে অস্বীকার করেন। তখন সুনামের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিন্তু মার্কিন ভোটারদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তারা দুবার এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন, যার ব্যবসায়িক ধরনই ছিল অন্যের আস্থা ভেঙে লাভ করা। এর ফল কতটা ক্ষতিকর হবে, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। তবে নিউ স্টার্ট চুক্তির শেষ হওয়া একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—প্রতিশ্রুতি ভাঙার এই প্রবণতা শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি পুরো বিশ্বের জন্য ঝুঁকির।

৫০ বছরের বেশি সময় পর এই প্রথম প্রায় ৮ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র দুই দেশের কাছে আছে; কিন্তু সেগুলোর ওপর এখন কোনো বাধ্যতামূলক সীমা নেই, ঠিকমতো যাচাই করার ব্যবস্থাও নেই।

ভাবলে ভয় লাগে—দশকের পর দশক ধরে যে পারমাণবিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা গড়ে উঠেছিল, তা খুব অল্প সময়েই ভেঙে যেতে পারে, যদি কোনো নেতা মনে করেন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা দুর্বলতার চিহ্ন।

* স্টিফেন হোমস, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব লর আইন বিভাগের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

যশোরে এক মসজিদে ইতিকাফে বসেছেন দেড় হাজারেরও বেশি মুসল্লি

যশোরের সদর উপজেলায় দেশি-বিদেশি নাগরিক মিলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মুসল্লির অংশগ্রহণে এক বিশাল ইতিকাফ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের সতীঘাটা এলাকায় অবস্থিত ‘আশরাফুল মাদারিস’ কম্পাউন্ডের মসজিদে এ সম্মিলন ঘটেছে।

এতে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও পানামাসহ বিভিন্ন দেশের ৭৫ জন বিদেশি নাগরিক অংশ নিয়েছেন।

সাধারণত ২০ রমজান থেকে সুন্নত ইতিকাফ শুরু হলেও এই মসজিদে প্রথম রমজান থেকেই অনেকে নফল ইতিকাফ শুরু করেন। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লির সংখ্যাও বেড়েছে। ২২ রমজান পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সুন্নত ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন মুসল্লি। চারতলা বিশিষ্ট এই মসজিদে সহস্রাধিক মুসল্লির অবস্থানের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিপুল সংখ্যক মুসল্লির সুবিধার্থে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইফতার, রাতের খাবার ও সাহরির আয়োজন করা হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। মাদ্রাসার শিক্ষক, কর্মচারী এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দিনরাত কাজ করছেন।

আশরাফুল মাদারিসের শিক্ষা সচিব হাফেজ মাওলানা সাব্বির আহমাদ জানান, শায়খুল হাদিস মাহমুদুল হাসান গাঙ্গুহি (রহ.)-এর সিলসিলার অনুসারীরা মূলত এখানে সমবেত হয়েছেন। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আলেম শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকি এ সিলসিলার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। তিনি যেখানে অবস্থান করেন, দেশ-বিদেশের অনুসারীরা সেখানে ছুটে আসেন। এবার তিনি যশোরে অবস্থান করায় দেশি-বিদেশি বহু আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে ইতিকাফে যোগ দিয়েছেন।

মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা নাসীরুল্লাহ জানান, ২০২৩ সাল থেকে এখানে বৃহৎ পরিসরে ইতিকাফের আয়োজন করা হচ্ছে। এরপর থেকে প্রতিবছরই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এর আগে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের বড় জমায়েত হলেও এবার যশোরের এই মাদারিস প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের পদচারণায়। 

যশোরের সদর উপজেলায় এক মসজিদে ইতিকাফে বসেছেন দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় ১ হাজার ৬০০ মুসল্লি। ছবি : কালবেলা
যশোরের সদর উপজেলায় এক মসজিদে ইতিকাফে বসেছেন দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় ১ হাজার ৬০০ মুসল্লি। ছবি : কালবেলা

গলার চেইন ‘ছিনিয়ে নিতে’ শিশু হত্যা, লাশ লুকানো হয় চুলার ভেতরে

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে নিখোঁজ এক শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে প্রতিবেশীর রান্নাঘরের চুলার ভেতরে। চার বছর বয়সী ওই শিশুকে দুপুর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগমুহূর্তে তার লাশ পাওয়া যায়। শিশুটির গলায় থাকা একটি রুপার চেইন ছিনিয়ে নিতে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

নিহত শিশুর নাম মরিয়ম আক্তার (৪)। সে উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের মারুয়াখালি গ্রামের মিজানুর রহমান ও রিমা আক্তার দম্পতির মেয়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা ১টা থেকে মরিয়মকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজন দিনভর হন্যে হয়ে আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। ইফতারের আগমুহূর্তে এক প্রতিবেশীর বাড়ির রান্নাঘরের চুলার ভেতরে তার লাশ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। এই ঘটনায় ওই প্রতিবেশী ও তাঁর ১৬ বছর বয়সী কিশোর ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, ‘কিশোরটি নেশাগ্রস্ত। শিশুটির গলায় থাকা একটি রুপার চেইন ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করেছে বলে আমরা ধারণা করছি।’

পুলিশ সূত্র জানায়, মরিয়ম আক্তারের গলায় ১২ আনা ওজনের রুপার একটি চেইন ছিল। নেশার টাকার জন্য সেই চেইন ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে ওই কিশোর। শিশুটি কান্না শুরু করলে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে নিজেদের রান্নার চুলার ভেতর ঢুকিয়ে রাখে। পরে সেই রুপার চেইন আঠারবাড়ি বাজারের একটি দোকানে নিয়ে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করে।

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল আজম বলেন, ‘শিশুটির গলায় থাকা রুপার চেইনের জন্য হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত কিশোরকে আমরা হেফাজতে নিয়েছি। তার বাবাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য শিশুটির মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

মরিয়ম আক্তার
মরিয়ম আক্তার। ছবি: সংগৃহীত

বিড়ালকে খাবার খাইয়ে দুই সপ্তাহে আয় ২৮ লাখ টাকা

প্রকাশ ০৫ মার্চ ২০২৬ঃ দুই সপ্তাহ শুধু বিড়ালকে খাবার দিয়েছেন, খাবার খাইয়েছেন। আর তাতেই চীনা এক তরুণ ১ লাখ ৬০ হাজার ইউয়ান আয় করেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বেশি।

চীনা এই তরুণের অর্থ উপার্জন কৌশল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

চীনা এই তরুণের নাম হুয়ান কং, জন্ম ১৯৯১ সালে, থাকেন সাংহাইয়ে। এ বছর চীনা নববর্ষের সময় তিনি এই অর্থ আয় করেন। এ বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত চীনা নববর্ষ উদ্‌যাপন করা হয়।

চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব চীনা নববর্ষ। এ সময়ে দীর্ঘ ছুটি থাকে, যে কারণে দেশটির প্রচুর মানুষ ভ্রমণ করেন। কেউ লম্বা ছুটির সুযোগে বেড়াতে বের হন, আবার কেউ কেউ শহর থেকে গ্রামে বা ছোট শহরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান। বলা হয়ে থাকে, চীনা নববর্ষের সময়ই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ ভ্রমণ করেন।

কিন্তু ভ্রমণের সময় পোষা প্রাণীকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ সবার থাকে না। তাই এই সময়ে পেশাদার প্রাণী-যত্ন সেবার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। হুয়ান ৯ বছর ধরে পেশাদার হিসেবে এই খাতে কাজ করছেন। তিনি নিজের একটি দল গড়ে তুলেছেন।

হুয়ান মূলত গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিড়ালকে খাবার দিয়ে আসার কাজ করেন।

এ বছর চীনা নববর্ষের সময় হুয়ান ও তাঁর চার সদস্যের দল সাংহাই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে তাঁরা ভ্রমণে গেছেন বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে নিজ নিজ শহরে গেছেন, এমন ব্যক্তিদের পোষা বিড়ালকে খাবার দেওয়ার দায়িত্ব নেন।

উৎসবের আগে ও পরে মিলিয়ে ২০ দিনের বেশি সময় ধরে হুয়ানের দল প্রায় দুই হাজার বাড়িতে গিয়ে বিড়ালকে খাবার দিয়েছেন। হুয়ান নিজে প্রায় এক হাজার বাড়িতে গিয়েছেন।

হুয়ানের দল যাঁদের সেবা দেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত সেবাগ্রহীতা, প্রায় প্রতিবছরই তাঁরা সেবা নেন।

উৎসবের সময় হুয়ান প্রতিদিন ভোর তিনটায় কাজ শুরু করেন। একটানা রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কাজ করেন। এ সময় তিনি দিনে মাত্র তিন-চার ঘণ্টা ঘুমান। সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে তিনি প্রায় ৫৫টি বাড়িতে যেতে পারেন।

প্রতিটি বাড়িতে হুয়ানের ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে তিনি বিড়ালের মলমূত্র (লিটার বক্স) পরিষ্কার করেন, খাবার ও পানি পাল্টে দেন এবং বিড়ালের স্বাস্থ্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন, পরে সঙ্গে করে সব আবর্জনা নিয়ে বেরিয়ে আসেন।

এ সময় অর্থের বিনিময়ে হুয়ান বাড়তি সেবাও দেন। যেমন বিড়ালকে ওষুধ খাওয়ানো, নখ কেটে দেওয়া ইত্যাদি।

উৎসবের সময় হুয়ানদের বড় অঙ্কের আয় দেখাচ্ছে, বড় উৎসবের সময় যখন পোষা প্রাণীর মালিকেরা বাড়ির বাইরে থাকেন, তখন পোষা প্রাণীর যত্নে বিশ্বাসযোগ্য পরিষেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। এআই/প্রথম আলো

ইরান যুদ্ধে না জড়িয়েও চড়া মূল্য দিতে হবে ইউরোপকে by অ্যাড্রিয়েল কাসোন্তা

কোনোভাবেই ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে সম্পৃক্ত বলা যায় না। ইউরোপীয় সেনারা ইরানের মালভূমিতে হামলা চালাচ্ছে না। ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানও তেহরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে আঘাত হানছে না। তবু সংঘাত যত দিন থেকে সপ্তাহে গড়াচ্ছে, যুদ্ধের বোঝা ততটাই ইউরোপের কাঁধে এসে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সাধারণত আঞ্চলিক সীমার ভেতরে আটকে থাকে না। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ যুদ্ধ ইউরোপের জন্য শুধু ভূরাজনৈতিক নয়; অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে অভিবাসনপথ, ন্যাটো জোট থেকে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এর ঢেউ ইতিমধ্যেই ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রথম ধাক্কাটি কৌশলগত। যুদ্ধটি নিয়ে ইউরোপ নিজেই গভীরভাবে বিভক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক ভাষায় ‘সর্বোচ্চ সংযম’ দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। এ ভাষা আসলে ২৭টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার কঠিন বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। কারণ, এ সংঘাত নিয়ে তাদের অবস্থান এক রকম নয়।

এই বিতর্কের এক প্রান্তে আছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন গোপন করেননি। পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর প্রচেষ্টা হিসেবে তিনি তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। বার্লিনের অনেক কৌশলবিদের কাছে বিষয়টি সরল। তাঁদের মতে, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, পুরো পশ্চিমা নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্যই হুমকি।

মের্ৎসের অবস্থান জার্মানির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কৌশলগত নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই নীতির মূল তিনটি স্তম্ভ হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সংহতি, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং এই বিশ্বাস যে কখনো কখনো ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, এটি এমন এক কাজ, যা অন্যদের জন্যও করা হচ্ছে।

কিন্তু ইউরোপের রাজনৈতিক পরিসরের অন্য প্রান্তে আছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সানচেজ এ হামলাকে উত্তেজনা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে এটি পুরো অঞ্চলকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, এই যুদ্ধ লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক জুয়া খেলার মতো।

মের্ৎস ও সানচেজের অবস্থানের এই সংঘাত ইউরোপের একটি গভীর সমস্যাকে সামনে আনে। মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে ইউরোপের কোনো একক কৌশলগত নীতি নেই। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল ইউরোপকে প্রভাবিত করবে, তারা একমত হোক বা না হোক। সবচেয়ে দ্রুত যে অভিঘাতটি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনৈতিক। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে সতর্কতার কারণে এই পথ ইতিমধ্যেই বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে জানা গেছে।

ইউরোপের জন্য সময়টি মোটেই সুবিধাজনক নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে ইউরোপ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ইউরোপীয় অর্থনীতি এখনো জ্বালানির ধাক্কার প্রতি খুব সংবেদনশীল। গত তিন বছরে রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে ইউরোপ এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করেছে, নতুন উৎস খুঁজেছে এবং আমদানিতে বৈচিত্র্য এনেছে। তবু একটি মৌলিক বাস্তবতা রয়ে গেছে। ইউরোপ তার জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যদি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে, ইউরোপ খুব দ্রুত তার প্রভাব টের পাবে। জ্বালানির দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে এই সংঘাত বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক গতিকে দুর্বল করতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সময়ের মুদ্রাস্ফীতির পর তারা ধীরে ধীরে সুদের হার শিথিল করার পথে হাঁটছিল। কিন্তু জ্বালানির দাম আবার বাড়লে সেই সিদ্ধান্ত কঠিন হয়ে উঠবে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তবে অর্থনীতি হয়তো যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ফোরক রাজনৈতিক প্রভাব নয়। অভিবাসন হতে পারে আরও বড় প্রশ্ন। গত এক–চতুর্থাংশ শতকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি বড় সংঘাতই শেষ পর্যন্ত ইউরোপে শরণার্থী স্রোত তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম না–ও হতে পারে। বিশেষ করে যদি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অথবা ইরাক, লেবানন কিংবা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। এর একটি ছোট অংশও যদি আশ্রয়ের খোঁজে ইউরোপমুখী হয়, তাহলে ইউরোপের অভিবাসনব্যবস্থা তীব্র চাপের মুখে পড়বে। ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর থেকেই এ ব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে নড়বড়ে হয়ে আছে। আর ইউরোপে অভিবাসনের প্রশ্ন খুব দ্রুত মানবিক ইস্যু থেকে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ নেয়।

পুরো মহাদেশে জনতুষ্টিবাদী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলো সীমান্ত, পরিচয় ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে। জার্মানির রাজনৈতিক দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি, ইতালির জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ফ্রান্সে মেরিন লো পেনের আন্দোলন কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কট্টরপন্থী দলগুলোতে এই প্রবণতা স্পষ্ট। নতুন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে যদি আবার আশ্রয়প্রার্থীর ঢল নামে, তাহলে এসব রাজনৈতিক শক্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক বৈপরীত্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ইউরোপীয় সরকারগুলোকে বিদেশে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন বা সহনীয় করে তুলতে পারে, সেই অস্থিরতাই পরে দেশের ভেতরের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। সিরিয়া যুদ্ধের পর ইউরোপ এই বাস্তবতা দেখেছে। ইরান যুদ্ধ সেই অভিজ্ঞতাকে আবার সামনে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপ এক পরিচিত পরিস্থিতির মুখোমুখি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে থেকেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে তার অভিঘাত থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার প্রভাব তত তীব্র হবে। জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। অভিবাসনের চাপ বাড়তে পারে। জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। আটলান্টিক জোটের ভেতরে মতপার্থক্যও বাড়তে পারে।

ইউরোপ হয়তো এই যুদ্ধে সরাসরি লড়ছে না। কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি থেকে তার মুক্তি নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহই বলে দেবে ইউরোপ এই সংকটের মুখে ঐক্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাত আবারও ইউরোপের ভেতরের বিভাজনকে গভীর করে তুলবে।

অ্যাড্রিয়েল কাসোন্তা, লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী ও রাজনৈতিক ঝুঁকিবিশ্লেষক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইরানে ইসরায়েলের হামলা