Thursday, March 13, 2014

লকারবি বোমা হামলা লিবিয়ার নয়, ইরানের কাজ?

আলোচিত লকারবি বোমা হামলার নির্দেশদাতা ছিল ইরান। আর সিরিয়াভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলাটি চালিয়েছিল। ইরানের সাবেক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এমনই দাবি করেছেন। আবুলগাশেম মেসবাহি নামের ইরানের ভিন্নমতাবলম্বী সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বর্তমানে জার্মানিতে রয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ১৯৮৮ সালে প্যান এএম-১০৩ ফ্লাইটের উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করার ঘটনাটি ছিল প্রতিশোধমূলক। ওই ঘটনার ছয় মাস আগে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে আক্রমণ করে, যাতে ২৯০ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই লকারবি বোমা হামলা চালানো হয়। মেসবাহি দাবি করেন, ‘ইরানি এয়ারবাসটির ভাগ্যে যা ঘটেছিল, ঠিক তা-ই ঘটানোর জন্য ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ওই বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’ লকারবি হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যে লিবিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবদেলবাসেত আল-মেগরাহি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। মামলার আপিল আবেদনের শুনানির সময় হাজির করা তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে মেসবাহির দাবির মিল রয়েছে। আল-জাজিরা টেলিভিশন ‘লকারবি: প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল’ শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য যেসব নথি জোগাড় করেছে, তাতে বেশ কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে, যারা ওই হামলায় সম্পৃক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছে অভিযুক্ত বোমা প্রস্তুতকারী, হামলার পরিকল্পনাকারী এবং বোমায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেই বোয়িং-৭৪৭ বিমানে বোমা স্থাপনকারীর নামও।
নতুন এসব নথি কেবল মেগরাহিকে ওই হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করার ব্যাপারে প্রশ্নই তোলেনি। পাশাপাশি ওই হামলার প্রকৃত সত্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র চাপা রাখতে চেয়েছিল বলে যে দাবি রয়েছে, সেটিকেও উসকে দিল। দেশ দুটি তখন তাদের শত্রু সাদ্দাম হোসেনের দেশ ইরাকের প্রতিবেশী গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সিরিয়াকে খেপাতে চায়নি বলেই সত্য চাপা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্য এযাবৎ যেসব সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে লকারবি। ওই হামলায় এ পর্যন্ত একমাত্র মেগরাহিকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় ২০০৯ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ১৯৮৬ সালে লিবিয়ার ত্রিপোলি ও বেনগাজিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতে প্রয়াত নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি লকারবি হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে আল-জাজিরার প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, ১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে ভুলবশত একটি ইরানি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স ভূপাতিত করার প্রতিশোধ নিতেই ইরান লকারবি হামলা চালিয়েছিল। দ্য টেলিগ্রাফ।

আন্নাকে পাচ্ছেন না মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
বড় আশা করে প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারের হাত ধরেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে গতকাল বুধবার জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে জনসভায় এলেন না আন্না হাজারে। সুবিশাল রামলীলা ময়দানও প্রায় খালি পড়ে রইল। সেই ভাঙা হাটে একাকী মমতা বললেন, নির্বাচনের পর তাঁরা কংগ্রেস ও বিজেপি—কোনো দলকেই সমর্থন করবেন না। মমতা বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির নাম উল্লেখ না করে বললেন, ‘গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী সাম্প্রদায়িক। আমরা সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে যেতে পারি না।’ ঢাকঢোল পিটিয়ে মমতার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন করে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েও কেন এলেন না আন্না?
এই প্রশ্নই ঘুরপাক খেল বারবার। সমাবেশে মমতা বলেন, ‘শুনেছি, উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর সুস্থতা কামনা করি।’ মমতা এড়ালেও তিনি আন্নার আচরণে ক্ষুব্ধ। তৃণমূল কংগ্রেসও বিস্মিত। কেউ কেউ বিজেপির হাত দেখতে পাচ্ছেন। কারণ, আন্নাকে জনসভায় আনতে ব্যর্থ হয়ে তৃণমূলের নেতা মুকুল রায় ফিরে আসার আধা ঘণ্টার মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ভি কে সিং আন্নার সঙ্গে দেখা করতে যান। মমতা বলেন, ‘আমি তো শুনেছি, কংগ্রেসেরও কেউ কেউ মঙ্গলবার রাতে আন্নার সঙ্গে দেখা করেন।’ বিজেপির কিরণ বেদী ও ভি কে সিং তৃণমূল নেত্রীর কাছ থেকে আন্নাকে সরিয়ে দিয়েছেন। আন্নার সঙ্গে মমতার সম্পর্কের এখানেই ইতি বলে মনে করা হচ্ছে।

হারের ভয়ে প্রার্থী হতে চান না কংগ্রেস নেতারা!

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে দলের নেতারা অনেকটা শঙ্কায় রয়েছেন। দলের বড় বড় নেতা একের পর নির্বাচন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় এমন ধারণার পালে হাওয়া পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় জাহাজমন্ত্রী জি কে বসন গত মঙ্গলবার ঘোষণা দেন, তিনি আসছে লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তাঁর এই ঘোষণার আগে খবর বেরোয়, কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মনীশ তিওয়ারি পাঞ্জাবের লুধিয়ানা আসনে নির্বাচনে দাঁড়াতে চান না। অবশ্য, ব্যক্তিগত কারণে তিনি নির্বাচন করতে অনাগ্রহী বলে সূত্র জানিয়েছে। মনীশ তিওয়ারি পাঞ্জাবের লুধিয়ানা ছেড়ে সাবেক রেলমন্ত্রী পবন বনসলের আসন চন্ডিগড় থেকে প্রার্থী হতে চাইছেন। লুধিয়ানায় কংগ্রেসের জয় নিয়ে শঙ্কা দুটি কারণে। প্রথমত, নতুন দল আম আদমি পার্টির (এএপি) টিকিট নিয়ে সেখানে এবার নির্বাচন করবেন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের কর্মী এইচ এস ফুলকা। দ্বিতীয়ত, শিরোমনি আকালি দলের (এসএডি) সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জোট। তামিলনাড়ু রাজ্যে ডিএমকের মতো মিত্রদের সঙ্গে কংগ্রেস জোট করতে না পারায় বসন নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। জোট না হওয়ায় তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। অবশ্য, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে বসন প্রচারণার দায়দায়িত্ব সামলানোকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেছেন। শুধু এই দুজন নন।
দলের প্রথম সারির আরও অনেক নেতা এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন না। গতকাল বুধবার কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির বৈঠক বসে। দলের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী চান, এবারের কঠিন নির্বাচনে দলের সব শীর্ষ নেতা এমনকি রাজ্যসভার সদস্যরাও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় একজোট হয়ে নির্বাচনে লড়ুন। রাহুল চাইলেও কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মনীশ তিওয়ারি, অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম, রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শচিন পাইলট, সাবেক পরিবেশমন্ত্রী জয়ন্তী নটরাজন, পশ্চিমবঙ্গের মানস ভূঁইয়া, সাবেক প্রদেশ সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্যসহ অনেকেই নির্বাচনে লড়তে আগ্রহী নন। চিদাম্বরমের আগের ভোটের ফলাফলও ছিল বিতর্কিত। তিনি তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা আসন থেকে এবার ছেলে কার্তিককে দাঁড় করিয়ে নিজে রাজ্যসভায় আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। শচিন পাইলট আজমীর আসনে নিশ্চিন্ত নন। জয়ন্তী নটরাজনকে কোনো সমর্থন ছাড়াই তামিলনাড়ুতে লড়তে হবে। ভোটে দাঁড়িয়ে হারতে নারাজ তিনি। কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এভাবে নির্বাচনী লড়াই থেকে পিছু হটায় ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৪ সাল কংগ্রেসের জন্য কঠিন একটা পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিভিন্ন মতামত জরিপও এখন পর্যন্ত সেই আভাসই দিচ্ছে।

সামাজিক উদ্যোগে জলবিদ্যুৎ

জলবিদ্যুেকন্দ্রে কাজে ব্যস্ত কর্মীরা ছবি: এএফপি
পাকিস্তান যখন বিদ্যুৎসংকটে নিমজ্জিত, তখন কাশ্মীরের এক প্রান্তে লোকজন নিজেরাই সংকট সমাধানের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। তারা ছোট পাল্লার ঘূর্ণনযন্ত্র (টারবাইন) ব্যবহার করে নদীর পানি থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রীষ্মকালে পাকিস্তানের কিছু কিছু অংশে দিনে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার নজির রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকার বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তেমন সাফল্য আসেনি। তারা মূলত মূল্যবান তেল ও সস্তা কয়লা আমদানির ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নীলাম উপত্যকার সামাজিকভাবে শতাধিক পরিবার বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে পরিবেশবান্ধব উপায় বেছে নিয়েছে। দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেতে তারা ছোট পাল্লার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু করেছে। এমন একটি টারবাইনের চালক রহিমুল্লাহ বলেন, ৫০টি পরিবারের অর্থায়নে তিন লাখ রুপি দামের টারবাইনটি আনা হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ আধার কাশ্মীরের নীলাম উপত্যকার দুই লাখ বাসিন্দার অর্ধেকের বেশি মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ছোট টারবাইনগুলো জেনারেটরের মাধ্যমে নীলাম নদীর পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। জলবিদ্যুৎ বোর্ডের উপপরিচালক শফিক উসমানি বলেন, ছোট টারবাইনের সাহায্যে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। সেখানকার চাহিদা মাত্র ১৫ থেকে ২০ মেগাওয়াট। স্থানীয় বাসিন্দা মুশতাক আহমদ বলেন, তিন বছর ধরে জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁদের জীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে। এএফপি।

দুর্নীতির অভিযোগে লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী বরখাস্ত, দেশত্যাগ

আলী জেইদান
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী আলী জেইদানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টের ভোটাভুটিতে বরখাস্ত হওয়ার পরপরই দেশত্যাগ করেন তিনি। একই দিন লিবিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদুল্লাহ আল-থান্নিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয় পার্লামেন্ট। জেইদানের বিদেশভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তাঁর দেশত্যাগের সত্যতা নিশ্চিত করে মালটার প্রধানমন্ত্রী যোশেফ মাসকাট রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, জেইদান মঙ্গলবার বিমানে মাল্টায় পৌঁছান। এরপর ইউরোপের অন্য কোনো দেশে যাওয়ার কথা তাঁর। এ বিষয়ে জেইদানের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন যোশেফ। লিবিয়ার সরকারি কৌঁসুলি আবদেল-কাদের রেদোয়ান বলেন, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জেইদানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এ জন্য তাঁর বিদেশভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। রয়টার্স।

মোদি ভারতের হিটলার : রাহুল

বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি ভারতের হিটলার। জার্মানির ওই স্বৈরশাসকের মতো মোদিও নিজের কাজকেই সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করেন। নিজেকে জনগণের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করেন অথচ তিনি জনগণের অধিকার হরণ করছেন। মঙ্গলবার গুজরাটের এক র‌্যালিতে মোদির নাম না নিয়েই তাকে উদ্দেশ্য করে এসব কথা বলেন কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, দুই ধরনের নেতা আছেন। এক ধরনের নেতা আছেন যারা গান্ধীজীর মতো জনগণের সঙ্গে মেশেন, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখের কথা জানতে চান। আরেক ধরনের নেতা আছেন যারা হিটলারের মতো।
তিনি দাবি করেন, কংগ্রেসে প্রথম ধরনের মতো অনেক নেতা আছেন। আর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী যিনি নিজেকে জনগণের নিরাপত্তারক্ষী বলে দাবি করেন, তিনি দ্বিতীয় ধরনের নেতা। মোদির নিজেকে জনগণের পর্যবেক্ষক (ওয়াচম্যান) দাবি করার উত্তরে রাহুল বলেন, ভারতের জনগণের কোনো নিরাপত্তারক্ষীর প্রয়োজন নেই, তাদের প্রয়োজন নিজেদের অধিকার। গুজরাটের কৃষকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে মোদি সরকার জমি দখল করেছে দাবি করে কংগ্রেসের এই নেতা বলেন, গরিব মানুষের জমি অবৈধভাবে দখল করা কিভাবে তাদের অধিকারের নিরাপত্তা বিধান করে? কৃষকের কাছ থেকে জমি কেড়ে নেয়া একটা চুরি, এটা চৌকিদারি নয়। রাহুল গান্ধী গুজরাটের উন্নয়ন নিয়ে এ সময় মন্তব্য করে বলেন, গুজরাট হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তির জন্য উন্নত।

ক্রসফায়ারে খুশি হচ্ছে কারা

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ক্রসফায়ার মানুষ গ্রহণ করেছে। মানুষ বলতে তিনি কাদের বুঝিয়েছেন, তা আমি জানি না। তবে আমার ধারণা, যাঁরা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন বা এর আশঙ্কায় আছেন, তাঁরা বা তাঁদের বন্ধু-বান্ধব-স্বজন ক্রসফায়ারে খুশি হতে পারেন না। বিগত কয়েক মাসে, বিশেষ করে গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন, গুম হয়েছেন বা নিখোঁজ আছেন। তাঁদের প্রায় সবাই বিএনপি বা এর মিত্র সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মী। এসব ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনা বিরোধী দলগুলোর নেতা, সংগঠক, কর্মী ও সমর্থকদের প্রাণভয়ে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। এমন আতঙ্ক কারোর খুশিমনে গ্রহণ করার কথা নয়। ক্রসফায়ার বা গুম যদি কারও স্বার্থসিদ্ধি বা প্রতিশোধস্পৃহা পূরণ করার জন্য করা হয়, তিনি যদি অসুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ হন, তাহলে তাঁরই একমাত্র এতে খুশি হওয়ার কথা। মন্ত্রী বা নেতারাও মানুষ, মানুষের পাশবিক মৃত্যু নিশ্চয়ই তাঁদেরও বিচলিত করে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আমরা আসাদুজ্জামান নূরের ওপর বর্বর আক্রমণের ঘটনা দেখে বিচলিত হয়েছিলাম। ঘটনার দুই দিন পরে বাংলাভিশনে একটি টিভি অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে আমার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলাম। নূর এ ঘটনায় কষ্ট পেয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে কেঁদে ফেলেছিলেন। তাঁর কান্না অন্য সবার মতো আমাকেও স্পর্শ করেছিল। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁর গাড়িবহরে আক্রমণ করে দলীয় পাঁচজন নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়। সেই হত্যা মামলায় অভিযুক্ত চারজন আসামি একে একে ক্রসফায়ারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। নূর একজন শিল্পী মানুষ; হূদয়বান ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে। আমি জানি না এসব হত্যাকাণ্ড তিনি ঠেকাতে পারতেন কি না। কিন্তু এটি আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে আসাদুজ্জামান নূর এসব অপঘাতে মৃত্যুতে কষ্ট পাননি! শিল্পীর হূদয়ে ন্যায়বিচারের প্রত্যয় থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে পারে না।
তাই আমি মনে করি না, নূরের ওপর হামলাকারীদের ক্রসফায়ার বা হত্যাকাণ্ড তিনি গ্রহণ করেছেন। নূরের মতো সংবেদনশীল, হূদয়বান বা ভালোবাসাময় বহু মানুষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে রয়েছেন। সরকারের মধ্যে আমার খুব চেনা এমন মন্ত্রীরাও আছেন, যাঁরা কখনো বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করতে পারেন না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বহুবার শর্তহীনভাবে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছে। ক্রসফায়ারের শিকার বিরোধী দলের কর্মী হোক বা তখনকার সরকারি দলের কমিশনার বা যুব সংগঠনের (যুবদল) নেতা হোক, কোনো ক্রসফায়ারেই আওয়ামী লীগ অতীতে উল্লসিত হয়নি, কোনোটিই গ্রহণযোগ্য বলেনি। ২০০৯ সালের নির্বাচনের ম্যানিফেস্টোতে আওয়ামী লীগ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত দিয়েছিল। অথচ আমার যত দূর মনে পড়ে, ২০১৩ সালের নির্বাচনের ম্যানিফেস্টোতে আওয়ামী লীগ এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এর একটি মানে হতে পারে, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী কেউ কেউ এখন ক্রসফায়ারে বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। কিন্তু সেটি নিশ্চয়ই শুধু তাঁদের শাসনামলের জন্য। আওয়ামী লীগে একটি লোকও থাকা সম্ভব নয়, যিনি বলতে রাজি হবেন যে ভবিষ্যতে বিরোধী দলে গেলেও তাঁরা ক্রসফায়ার সমর্থন করবেন! আর এখনকার ক্রসফায়ার সমর্থন করছেন— এমন লোক আওয়ামী লীগেও খুব বেশি আছে বলে আমি মনে করি না। এমন মনে করার কারণ রয়েছে; এই লেখা লেখার সময় দেখলাম, প্রথম আলোর প্রতিদিনের অনলাইন জরিপে ৮২ শতাংশ মানুষ ক্রসফায়ারের বিপক্ষে মতামত জানিয়েছেন। সরকার ও তার সুবিধাভোগীরা ক্রসফায়ারের শিকার ব্যক্তিরা সন্ত্রাসী, জঙ্গি আর নাশকতাকারী—এ ধরনের সার্বক্ষণিক প্রচারণা চালানোর পরও এর পক্ষে মতামত দিয়েছেন প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, শাজাহান খান কি মানুষ বলতে এই ১৬ শতাংশকে বুঝিয়েছেন, বাকি ৮২ শতাংশ তাহলে কি মানুষ নন! তাঁর মতো মন্ত্রীরা কয়েক যুগ ধরে রাজনীতি করছেন। মানুষ কারা, আর মানুষের মতামত কি সত্যি বুঝতে পারেন না তিনি?
দুই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা গুম) সমর্থন-অসমর্থনের বিষয়ও নয়; এটি গুরুতর অপরাধ, ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নতুন বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে মানবাধিকার। মানবাধিকার শুধু বৈশ্বিক অঙ্গীকার নয়, পৃথিবীর সব দেশের সংবিধানে স্বীকৃত আদালতে বলবৎযোগ্য অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম বা ক্রসফায়ার সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলেছে, আইনের চোখে সবাই সমান, সবাই আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী। ৩১ অনুচ্ছেদ বলেছে যে ‘আইন অনুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ কারও সঙ্গে নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর ব্যবহারই নিষেধ করেছে। ক্রসফায়ার বা গুম বাংলাদেশ সংবিধানের এসব অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যাঁরা বলছেন, এসব মানুষ গ্রহণ করেছে, তাঁরা সংবিধান লঙ্ঘনকে উৎসাহিত করে সংবিধানেরই ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ করছেন। স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী ক্রসফায়ারকে সমর্থন করা বা একে প্রকাশ্যে উৎসাহিত করার মানসিকতা এখনো পোষণ করেন না। সরকার, বিশেষ করে র‌্যাব-পুলিশ বরং নিহত ব্যক্তি ‘সংঘর্ষকালে বা পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে’ ধরনের গৎবাঁধা বুলি আউড়ে থাকে।
গুমের ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য আরও দায়সারা, আরও অনায়াস। ক্রসফায়ার হলে মৃতদেহ পাওয়া যায়, তার কোনো না কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয়। গুম হলে তারও প্রয়োজন নেই। গুমের অভিযোগ করা হলে সরকারের বাহিনী থেকে তাই স্রেফ বলে দেওয়া হয় যে তারা কিছুই জানে না। কিন্তু তাদের এই বক্তব্য কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ গ্রহণ করছে না, করার কথাও নয়। আমরা বরং কিছু ঘটনাতে হলেও মানবাধিকার কমিশনকে বলতে শুনেছি যে গুম বা ক্রসফায়ারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জড়িত রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেও এর আলামত পাওয়া যায়। প্রথমত, র‌্যাব বা পুলিশ ছাড়া অন্য কারও পক্ষে লোকজনের, বিশেষ করে গ্রামবাসীর সামনেই কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সাহস করার কথা নয়। দুই, উধাও হয়ে কিছু ক্ষেত্রে ফেরত আসা মানুষেরা আটককালে যে বিশেষ বন্দিশালার বর্ণনা দিচ্ছেন, তা পেশাদার অপরাধীদের তৈরি করে রাখার কোনো কারণ নেই। তিন, অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীরা আটককারীদের গাড়িতে বা পোশাকে র‌্যাব লেখা ছিল বলে যে বর্ণনা দিচ্ছেন, তা অসত্য হওয়ার কথা নয়। র‌্যাবের নামাঙ্কিত পোশাক বা গাড়ি নিয়ে, গ্রামবাসীর সামনে কাউকে ধরে, টর্চার সেলের মতো কক্ষে আটক রাখার দুঃসাহস যদি পেশাদার অপরাধীদের থাকে, আর তাদের যদি আইনের হাতে সোপর্দ করা না যায়, তাহলে তো অবস্থা আরও ভয়ংকর!
তিন ক্রসফায়ারের সঙ্গে বরং সরকারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গুম বা উধাও করার ঘটনাও সরকারের বাহিনী করছে—এমন অভিযোগ ক্রমে আরও জোরালো হয়ে উঠছে। এ ধরনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তদন্ত কিংবা নথিভুক্ত করতে পুলিশ যে অনীহা দেখাচ্ছে, তাতে এই সন্দেহ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। দৈনিক মানবজমিন-এর ১০ মার্চের প্রধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়েই চলছে।...মাসের পর মাস গুম হয়ে থাকলেও তাদের উদ্ধারে তৎপরতা ও ঘটনা তদন্তে অনীহা দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে গুম হওয়া কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধার করা যায়নি। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করছেন, গুম বা নিখোঁজের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকায় তাঁরা এ নিয়ে কোনো তদন্তও করেন না। এ কারণে অন্য অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও গুম হওয়া কোনো ব্যক্তি উদ্ধার কিংবা এর সঙ্গে জড়িতরা কেউ গ্রেপ্তার হয় না।’ সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব যেকোনো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, কোনো মানুষ উধাও বা খুন হলে দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা এবং বিচারের জন্য সোপর্দ করা। সরকার যদি এটি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দুটো অনুসিদ্ধান্তই কেবল নেওয়া সম্ভব। এক, সরকার নিজে তা করেছে বলে বিচার করতে অনিচ্ছুক। দুই, সরকার অপরাধী শনাক্ত বা অপরাধটির বিচার করতে অক্ষম। যদি এর একটিও সত্যি হয়, তাহলে সেই সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। আজকে দূরের মানুষ মারা যাচ্ছে, আগামীকাল মারা যাবে প্রতিবেশী বা স্বজন, পরদিন খুন বা গুম হব আমরা নিজেরা। আমরা কি এখনো বুঝতে পারছি না তা?
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘শিশু জেলখানায় যাইবেন, স্যার?’

কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্যাতিত এক কিশোরের
চিঠি (প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি)
১০-১১ বছর আগে কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের জন্য ‘অলটারনেটিভ মেজারস’ বা ‘বিকল্প ব্যবস্থা’বিষয়ক একটি গবেষণাকাজের জন্য আমাকে যশোরে যেতে হয়েছিল। দড়াটানা মোড়ের পাশের একটি আবাসিক হোটেলে রাত কাটিয়ে সকালবেলা যশোরের তৎকালীন ডিসির সঙ্গে দেখা করলাম। ডিসি অফিস থেকে বেরিয়ে এক রিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি পুলেরহাট কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যাবেন কি না। তিনি বুঝতে পারলেন না। তাঁকে যখন বুঝিয়ে বললাম যে আমি কিশোর অপরাধী ও অবাধ্য কিশোরদের যেখানে রাখা হয় সেখানে যেতে চাই, তখন তিনি বুঝলেন। রিকশাচালক মাথা নেড়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শিশু জেলখানায় যাইবেন, স্যার?’ রিকশাচালকের ওই কথাটি আমার কানে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। কথাটি আবারও মনে পড়ে গেল টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কিশোরদের আকুতি শুনে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কিশোরদের দুর্দশা নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মা গো মা, আমার জামিন করাও না।’ বাংলাদেশে টঙ্গী ও যশোরে দুটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে একটি কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র আছে; জয়পুরহাটে আরেকটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র নির্মাণাধীন। কিশোর বা কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রকে আগে বলা হতো সংশোধন কেন্দ্র। কিন্তু সংশোধনের কথা বলা হলে মনে হতে পারে, কোমলমতি শিশুরা হয়তো ভয়ানক কোনো অপরাধ করে ফেলেছে অথবা সংশোধন কেন্দ্রের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ‘গিল্টি ফিলিং’ জমাট বাঁধতে পারে।
এ জন্য আন্তর্জাতিক কিছু সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থার চাপে বা প্রভাবে ‘সংশোধন কেন্দ্রগুলো’ হয়ে গেল ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’। কিন্তু নামই শুধু পরিবর্তন হলো, না হলো কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়ন, না বদলাল কেন্দ্রগুলোর চরিত্র। ১০-১১ বছর আগে আমি উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর যে অবস্থা দেখে এসেছিলাম, এখনো সেই অবস্থাই বিরাজমান। প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন সে সাক্ষ্যই দিচ্ছে। যেসব কিশোর-কিশোরী অপরাধ করেছে, বা স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হয়েছে, অথবা যাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, তাদেরকে উন্নয়ন কেন্দ্রে এনে রাখা হয়। এসব উন্নয়ন কেন্দ্রের লক্ষ্য কিশোর আদালত কর্তৃক দেওয়া রায় মানবিকতার সঙ্গে কার্যকর করা। বিচ্যুত, অবাধ্য বা দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের সংশোধনের মাধ্যমে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া। উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে যেসব বিচ্যুত, অবাধ্য ও দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরী আছে, তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য দিয়ে, খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা আবার সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে তাদেরকে উন্নয়ন কেন্দ্রে আবদ্ধ করে রাখা হয়, সেই মুহূর্ত থেকে তারা যেমন ওই স্থানটিকে কারাগার মনে করে, তেমনি সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে সেটি হয়ে যায় ‘শিশু জেলখানা’! এ জন্যই উন্নয়ন কেন্দ্র বা কোথাও আবদ্ধ না রেখে বিচ্যুত, অবাধ্য ও লঘু অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের প্রবেশন কর্মকর্তা, মহিলা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা অথবা কোনো মহানুভব ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে বৃহত্তর সমাজের মধ্যে রাখা উচিত। এতে করে বিচ্যুত, অবাধ্য ও লঘু দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের দ্রুত সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এসব কিশোর-কিশোরীকে মুক্ত সমাজের সুস্থ পরিবেশের পরিবর্তে উন্নয়ন কেন্দ্রের আবদ্ধ ও অসুস্থ পরিবেশে রেখে পুনর্বাসনের চেষ্টা হলে পুনর্বাসন তো হবেই না, বরং তারা ওই কেন্দ্রগুলো থেকে বেরিয়ে পুরোদস্তুর অপরাধীতে পরিণত হয়ে যেতে পারে। আর যে স্বল্পসংখ্যক কিশোর বা কিশোরীকে কিশোর আদালত হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতির মতো ভয়াবহ অপরাধের জন্য দণ্ড প্রদান করবেন, শুধু তাদেরই কোনো স্থানে আবদ্ধ করে রাখা যেতে পারে। তবে ওই স্থানটিকে দণ্ডপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরীদের সত্যিকার পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত করতে হলে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, প্রশিক্ষণসহ তাদের প্রাপ্য সব অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে; সাধারণ মানুষের মানসিকতাও বদলাতে হবে।
কিশোর, কিশোরী, যুবক, প্রবীণ, বৃদ্ধ যেই হোক, তাকে যদি লোহার গ্রিল দেওয়া কোনো কামরায় বন্দী করে রাখা হয় অথবা বিশাল বিশাল পাঁচিলের মাঝখানে দিনের পর দিন আবদ্ধ করে রাখা হয়, তাহলে ওই ব্যক্তি আস্তে আস্তে মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে থাকে। তদুপরি ওই ব্যক্তি যদি পেট ভরে খেতে না পায়, রাতে ছারপোকার যন্ত্রণায় ঘুমোতে না পারে, অসুখে চিকিৎসা না পায়, জেল কর্মকর্তা বা তত্ত্বাবধায়কের প্রহারে আহত হয়, তাহলে কীভাবে তার সংশোধন হবে, আর কীভাবেই বা ধরা যাবে ‘উন্নয়ন’-এর সোনার হরিণ? সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের কারাগারে আবদ্ধ করে না রেখে প্রবেশন, প্যারোলসহ নানা বিকল্প ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’-এর ক্ষেত্রে সারা বিশ্ব অপরাধীদের মুক্ত সমাজে রেখে সংশোধন ও পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে, অথচ আমরা এখনো কারাগারকেন্দ্রিক ‘পেনাল পলিসি’ নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও নির্মূলের চেষ্টা করছি। ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’-এর ক্ষেত্রে যখন শাস্তির চেয়ে সংশোধন ও পুনর্বাসন প্রধান হয়ে উঠেছে, তখন শিশু-কিশোর (জুভেনাইল জাস্টিস) ক্ষেত্রে বিষয়টা তো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিশু-কিশোরেরাই সমাজের ভবিষ্যৎ। তারা যদি বিচ্যুত হয় বা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের কোনো স্থানে (সংশোধন বা উন্নয়ন কেন্দ্র যা-ই বলি না কেন) আটকে না রেখে বরং মুক্ত সমাজে রেখে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা উচিত, যাতে তারা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে অনেক ইতিবাচক বিধান ছিল, কিন্তু তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়নি। ২০১৩ সালে যে আইনটি হয়েছে, সেটির যথাযথ প্রয়োগ হবে কি না, সে ব্যাপারেও সন্দেহ থেকে যায়। দারিদ্র্য, মাদক ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা, সামাজিক রূপান্তর, দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বিবাহবিচ্ছেদ, পরিবার ভেঙে যাওয়া, মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অভাবসহ নানা কারণে দেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। ক্ষমতাসীন, ক্ষমতাপ্রত্যাশী ও তাদের সমর্থকেরা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, বাবা-মা অফিস-আদালত বা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। মানুষ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে টাকা আর ভোগের পেছনে। শিশুদের দিকে তাকানোর কেউ নেই, কিশোর-কিশোরীদের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-যন্ত্রণা বোঝার কেউ নেই। ফলে তাদের অনেকে বিচ্যুত হচ্ছে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন থেকে, অনেকে জড়িয়ে পড়ছে নানা রকমের অপরাধের সঙ্গে। শিশু-কিশোরদের এ চিত্র কি গভীর কোনো সামাজিক সংকট উন্মোচিত করছে না? আমরা কি সঠিক পথে এগোচ্ছি?
শেখ হাফিজুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
hrkarzon@yahoo.com