Thursday, July 2, 2015

বিচারপতি খায়রুলের রায় ও মায়ার মন্ত্রিত্ব by মিজানুর রহমান খান

দণ্ডিত হলে মন্ত্রিত্ব ও সংসদের সদস্যপদ যায় কি যায় না, সেটি রাষ্ট্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যে রাষ্ট্র ন্যূনতম আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না, তার পক্ষে আদালতের রায়কে শিরোধার্য করে চলা কেবল কঠিন নয়, এটা বাস্তবসম্মতও নয়। বিচার বিভাগ পৃথক্করণ ও ক্ষমতার পৃথক্করণ কী বস্তু, তা নিয়ে শিক্ষিতজনের মধ্যেই যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। নিম্ন আদালতই বিচারিক আদালত, এই আদালতের স্বাধীনতা না মানলে, তাঁকে স্বাধীনতা না দিলে আইনের শাসনের প্রবেশদ্বারটাই রুদ্ধ থাকে। কেউ স্বীকার করুক আর না-ই করুক, নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা প্রশ্নে সব থেকে গুরুতর চক্রান্ত চলমান রয়েছে। আমলাতন্ত্রের যে অংশটি গণবিরোধী, যারা স্বাধীনতার পরে ড. কামাল হোসেনের কথায়, ‘ক্ষমতা ও মর্যাদা হারানোর ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তাদেরই আমরা পৃথক্করণের উদ্যোগকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করতে দেখে চলছি। দণ্ডিত ব্যক্তির মন্ত্রী থাকা ওই রুগ্ণ আমলাতন্ত্রের জন্য সুখকর, যারা মনে করে তারাই সরকার টেকায়, তারাই সরকার চালায়।’
তবে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি মন্ত্রী থাকতে পারেন কি না, এটা যে দেশে বিতর্কের বিষয় এবং বিশেষজ্ঞরা মত-দ্বিমত করতে পারেন, সেটাই আসলে বলে দেয়, এ বিষয়টি বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ধারণার (যা বর্তমানে বহাল) সঙ্গে খাপ খায় না। যে আদর্শগত ভাবনা থেকে বাহাত্তরের সংবিধানে দণ্ডিতের মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্য না থাকার বিধান লেখা হয়েছিল, সেই রাজনীতি দেশে নেই। সেটা পুনরুজ্জীবনের কোনো আকাঙ্ক্ষাও সমাজে আপাতত অনুপস্থিত।
আমাদের উচিত হবে সেই অপারগতাটা স্বীকার করা। তাহলে আমরা কখনো সমাধানের দিকে যেতে পারি, কিন্তু কিছু মহল যখন অপারগতাকে মানতে চান না, বরং তা নিয়ে বড়াই করেন, এমনকি তাকে আইন দেখান, তখনই তা বড় করুণ ও দুর্ভাগ্যজনক হয়ে ওঠে। তবে একজন বিদগ্ধ লেখক আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সামনের রাজনীতিতে বিএনপির ওপর এই ব্যাখ্যার বিরাট তাৎপর্য আছে। সরকারি দলকে দু-একজন মায়ার মায়া কাটাতে হবে। কিন্তু বিএনপি তো শ্মশান হবে, শীর্ষ নেতারা তো নির্বাচনেই দাঁড়াতে পারবেন না। নিম্ন আদালতে দণ্ডিত ব্যক্তি যদি আপিল না করে প্রার্থী হতে না পারেন, তাহলে তাতে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সব থেকে বেশি শঙ্কিত হতে পারে। এই বাস্তব যুক্তির জোর অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু সংবিধানের একটি বিধানের বিকৃত ব্যাখ্যার ওপরে দাঁড়িয়ে ‘গণতন্ত্রচর্চার’ যুক্তি মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীনদের মতো বিএনপি হলো সেই শক্তি, যারা ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগ পৃথক্করণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। নিম্ন আদালতব্যবস্থা ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়েই চলমান রয়েছে। সেখানেই দেশের অধিকাংশ অপরাধের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সাধারণ মানুষ তা মেনে নেয়। বিচারব্যবস্থার ত্রুটি যাতে না সারে, সে জন্য পদ্ধতিগতভাবে পৃথক্করণের বিরোধিতাকারী গোষ্ঠী, যাদের আমরা ১৯৯০ থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে পেয়েছি, আরও সংক্ষেপে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বুঝে থাকি, তাহলে তারা কেন সেই একই বিচারব্যবস্থার ফলভোগী হবে না? কেন তাঁরা নিজেদের মতো করে সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে দণ্ডিত হয়েও মন্ত্রী থাকবেন এবং আমাদের তা মানতে বাধ্য হতে হবে। আমরা তো চাইব, তাঁরা আগে নিজের চরণ দুটি ঢাকুন, মানে বিচারব্যবস্থার ত্রুটি দূর করুন, তাহলে আর ধরণি ঢাকতে না হবে, মানে তাহলে আর নিম্ন আদালতের দণ্ড না মেনে খারাপ নজির স্থাপন করতে হবে না। নিম্ন আদালতের রায় হলেই সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেক নাগরিকের ওপর তার প্রভাব পড়ে, তাহলে মায়ার ওপর পড়বে না কেন, না পড়লে কারও ওপর পড়বে না।
মায়ার বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটা একটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নৈতিকতার প্রশ্ন। মায়ার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে হাজি সেলিমের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। গত জানুয়ারিতে আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বাতিল করেছেন। যদি সত্যিই মায়ার মন্ত্রিত্ব না যায়, হাজি সেলিমের সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা করা সম্ভব না হয়, তাহলে সরকারি দলের উচিত হবে ৬৬ অনুচ্ছেদটা সংশোধন করে নেওয়া। এতে একটু কম প্রতারণা ঘটবে, তখন সেটা মানা যাবে, কিন্তু সংবিধানের অসত্য ব্যাখ্যা মানা যাবে না। বিএনপিকেও বলতে হবে, সবাই মিলে আমরা এমন রাষ্ট্র গড়েছি, যেখানে দণ্ডিতকে মন্ত্রী থাকতে হবে, নইলে শিশু গণতন্ত্র কষ্ট পাবে!
দুদকের অন্যতম কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন সাংবাদিকদের গত ২৮ জুন বলেছেন, দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান মায়ার অযোগ্যতার বিষয়ে যে মত দিয়েছেন, তা নৈতিকভাবে ঠিক। আবার তিনি মনে করেন, তাঁর ব্যক্তিগত মত হলো, আইনগতভাবে মায়ার মন্ত্রিত্ব আছে। তার মানে দাঁড়াল, তিনি বলতে চাইছেন, বাংলাদেশে এ বিষয়ে এখন যে ‘আইন’ আছে, তা নৈতিকতাবিবর্জিত।
কিন্তু সত্য হলো বিদ্যমান আইন নৈতিক। এর ব্যাখ্যা ও অনুশীলন যেটা ঘটে চলেছে, সেটাই অনৈতিক ও গর্হিত। মামলা প্রত্যাহারে আপিল বিভাগের তিরস্কার সত্ত্বেও শাহাবুদ্দিন কেন মামলা তুলে নিতে চেয়েছিলেন? অনাবশ্যক ব্যক্তিগত মতামত দেওয়ার চেয়ে দুদক কমিশনারের উচিত এই কৈফিয়তটা আগে দেওয়া।
বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক দৃঢ়তার সঙ্গে মনে করেন, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া মাত্রই কোনো ব্যক্তি এমপি পদে থাকতে আপনাআপনি অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। আপিলের খোঁড়া যুক্তি দিয়ে মন্ত্রী ও এমপি পদে বহাল থাকা চলবে না। কারণ তাঁর কথায়, ‘সংবিধানপ্রণেতারা এই বিধান করেছিলেন, এমপিকে সাধারণের থেকে তফাত করতে। রাষ্ট্র পরিচালকরা আপিলে খালাস পেতে পারেন, আবার নাও পারেন, কিন্তু দণ্ডিত হওয়ার কারণে তাঁর সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তাই তিনি অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।
বিচারপতি খায়রুল হক নানা কারণে আলোচিত। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার সুবাদে তিনি বিএনপির অনেকের কাছে চক্ষুঃশূল। আবার ক্ষমতাসীন দলের অনেকের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে তাঁর বিচারিক অভিজ্ঞানকে রাজনীতিকেরা এখন পর্যন্ত তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে নিয়ে যেতে পারেননি। এটা বেশি করে সত্য ক্ষমতাসীন দলের জন্য। তাঁর সব বিচারিক অভিমতের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারে, কিন্তু তাঁর অনেকগুলো মাইলফলক সিদ্ধান্ত রয়েছে, যার প্রতি শাসক দলের দৃষ্টিভঙ্গি পীড়াদায়ক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ক্ষমতাসীন এবং তাদের মিত্রদের যে ভালো লেগেছে, তার পুনরুল্লেখ বাহুল্য। এই বিচারপতি কতটা জ্ঞানী, তা যদি আপনি এই দুটি বিশেষ রায়ের আলোকে প্রশ্ন করেন, তাহলে ক্ষমতাসীনদের তরফে উৎফুল্ল প্রতিক্রিয়া পাবেন। আবার যদি প্রশ্ন করেন, সেই একই ব্যক্তি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে এ পর্যন্ত যত রকম সুপারিশ করেছেন, তার কতটা বাস্তবায়ন করেছেন, তাহলে বিষাদময় প্রতিক্রিয়া দেখবেন। কারণ, তাঁর দেওয়া সুপারিশের এখন পর্যন্ত দুআনাও বাস্তবায়নযোগ্য মনে করে না সরকার। এখন আরেকটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, জনতা টাওয়ার মামলায় ৬৬ অনুচ্ছেদের যে ব্যাখ্যা দিতে তিনি ঠাসা ২০টি পৃষ্ঠা (১০ বিএলটি এইচসিডি ২০০২) খরচ করলেন, সেটা মেনে নিলেই আর মায়ার মন্ত্রিত্ব থাকে না। কিন্তু ক্ষমতাসীন ও তদীয় মিত্রদের এমন কাউকে পাবেন না যে বা যাঁরা বলবেন, ওই রায় তাঁরা আদৌ পাঠ করেছেন কি না।
মায়ার মন্ত্রিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে গোটা মন্ত্রিসভার নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। আইনি প্রশ্নটা কীভাবে জড়িত, সেটা বিচারপতি খায়রুলের রায়ের আলোকে আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের ইতিহাসে একমাত্র তিনিই ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ দফার ঘ উপ-দফা ব্যাখ্যা করেন। এই বিধানে বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হবেন না, যদি ‘‘তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুবছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে”।’
২০০১ সালে হাইকোর্টে আওয়ামী লীগের অ্যাটর্নি জেনারেল কে এস নবী যুক্তি দিয়েছিলেন: ‘ওই বিধানে ‘‘দোষী সাব্যস্ত’’ অর্থ ‘‘চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত’’ পড়তে হবে। কারণ আপিলের অধিকার থাকলে তা একেবারে রিভিউ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকবে।’ বিচারপতি খায়রুল তা যথার্থই প্রত্যাখ্যান করেন। আমাদের দেশে সাধারণভাবে এই ভ্রান্ত মত আর কেবল কোর্ট-কাছারির গণ্ডিতে নেই, বেশ জনপ্রিয় হয়ে পড়েছে। অনেক আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীরা বিভ্রান্ত।
বিচারপতি খায়রুলের যুক্তি হলো, সংবিধান প্রতিবন্ধকতামূলক বিধান করেছে। দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেই হলো, সেটা আপিলে খালাস না হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে। আপিল করলেন তো কী হয়েছে? এমনকি আপিলে নির্দিষ্টভাবে যদি দণ্ড স্থগিত করা হয়, তাহলেও সংবিধানের ওই তলোয়ারের কোপ থেকে তার নিস্তার নেই। আর ইতিমধ্যে আপিল বিভাগের রায়ে আমরা দেখছি তাঁর দণ্ড স্থগিত করা হয়নি বরং নতুন করে শুনানি করতে বলা হয়েছে। দণ্ডিত হওয়া মাত্রই গর্দানটা যাবে, জায়গার মুণ্ডু জায়গায় আসবে চূড়ান্তভাবে খালাস ঘোষণার পরে, তার আগে নয়। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা সম্প্রতি ঠিক একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে, নিজেদের মেরুদণ্ড সোজা করে খায়রুলের রায় জরুরি ভিত্তিতে অনুসরণ করা, সংসদের দুটি আসন শূন্য করে উপনির্বাচন দেওয়া।
ভারতে হিমাচল প্রদেশের দণ্ডিত রাকেশ সিং ১৯৯০ সালে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিনে বেরিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে রিটে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়, সুপ্রিম কোর্টই বলেন, ‘রাকেশকে আমরা জামিন ও তাঁর দণ্ড স্থগিত করেছিলাম বলে তিনি প্রার্থী হতে পারেন না।’ বিচারপতি খায়রুল এই উদাহরণ টেনেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বলেছেন, এর অন্যথা করে বাংলাদেশ সংসদ কোনো আইন তৈরি করতে পারে না।
দণ্ডিতের মর্যাদা নিয়ে একমুহূর্তের জন্য মন্ত্রী বা সাংসদ থাকার কোনো যোগ্যতা কারও নেই। যে যত উঁচু পদে থাকুন, এ বিষয়টি কারও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা সংবিধানসম্মত নয়। তাই বলি, মায়া মন্ত্রী নন, কারণ তিনি সাংসদ নন। আর হাজি সেলিমের পদও শূন্য হয়ে গেছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

নির্বাচন নিয়ে বিএনপির উভয় সংকট by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বিএনপির নেতা মওদুদ আহমদ সহকর্মীর সঙ্গে ফোনালাপে বলেছিলেন, ‘এই বিএনপি দিয়ে হবে না।’ লাখ কথার এক কথা। তিনি ঠিকই বলেছেন। এখন বিএনপির নেতা, কর্মী, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান—তাঁদের আলাপ-আলোচনা ও বিতর্ক করে ঠিক করতে হবে এই বিএনপিকে কীভাবে মেরামত করা যাবে। এই গাড়ির পুরো ইঞ্জিন পাল্টাতে হবে। শুধু চাকা বদলালে হবে না।
আমরা চাই দেশে সুষ্ঠু রাজনীতি, সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চা, সুষ্ঠু নির্বাচন, সুষ্ঠু সংসদ। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে তার কিছুই পাচ্ছি না। এটা দেশের জন্য ভালো নয়। অনেকের মতে, এটা ছদ্মবেশী ‘বাকশাল’। ‘বাকশাল’কে সেদিনও মানুষ মন থেকে সমর্থন করেনি। এখন যে অবস্থা দেশে চলছে, তা-ও মানুষ মন থেকে সমর্থন করছে বলে মনে হয় না। সামাজিক মিডিয়া ও আড্ডার আলাপচারিতায় সেসবই শোনা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকার যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী বিএনপিও। বিএনপি গণতান্ত্রিকভাবে খেলতে পারেনি। সেই যোগ্যতা বা দক্ষতা তারা দেখাতে পারেনি। যদিও সরকারের দমননীতি এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু সরকার তো তা করবেই। বিএনপি যেন কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে, সেই লক্ষ্যে সরকার এগোচ্ছে। সরকারকে যারা নানাভাবে দেশে-বিদেশে সহায়তা করছে, তারাও বেশ শক্তিশালী।
প্রথম আলোয় খবর বেরিয়েছে, ‘আগাম নির্বাচনের অঙ্ক কষছে সরকার’। (২৪ জুন ২০১৫) রাজনীতির অঙ্গনে এ রকম খবর বেশ কিছুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল। আরও শোনা যাচ্ছে: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সরকার কয়েকটি কাজ করতে চায়। ১) যত দ্রুত সম্ভব খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের দুর্নীতির মামলার শুনানি শেষ করে শাস্তি দিয়ে তাঁদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। ২) নানা ফন্দিফিকির করে, লোভ দেখিয়ে ও ভয় দেখিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের দুই গ্রুপে ভাগ করে নতুন বিএনপি গঠনে মদদ দেওয়া। ৩) জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কচ্ছেদ করানোর সর্বাত্মক চেষ্টা। ৪) ২০-দলীয় জোটের কয়েকটি ছোট দলকে নানা টোপ দিয়ে জোট থেকে বের করে আনা ইত্যাদি। প্রথম আলোর খবরে মোটামুটি এসব ধারণারই প্রতিফলন রয়েছে। এ ধরনের খবর ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আওয়ামী লীগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তারা তো চাইবেই নানা কৌশলে বিএনপিকে দুর্বল করতে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হলে বিএনপি যদি এর প্রতিবাদে ও অন্যান্য দাবিতে আবার ‘নির্বাচন বর্জন’ করে, তখনই আওয়ামী লীগের এই ছক বাস্তবায়ন করার সুযোগ হবে। নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপিতে তখন ভাঙন ধরানো সহজ হবে। তবে বিএনপি যদি খালেদা ও তারেক ছাড়াও নির্বাচন করতে চায়, তখন আওয়ামী লীগ হতাশ হয়ে পড়বে। তাদের ব্লুপ্রিন্ট তখন আর কাজে আসবে না।
লক্ষ করার বিষয়, আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার জন্য যত চাপ দিচ্ছে, জামায়াত নিষিদ্ধ করার জন্য তারা তত তৎপর নয়। অথচ সরকার আইনানুগভাবে জামায়াত নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু করছে না। সরকার চায় বিএনপি আগে জামায়াত ছাড়ুক। এখানে আওয়ামী লীগের অন্য একটা কৌশল কাজ করছে বলে সন্দেহ হয়। বিএনপির উচিত হবে জামায়াত না ছাড়া, বরং সরকার যেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে, সে ব্যাপারে সরকারকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করা। আওয়ামী লীগ ও তাদের নানা ধরনের সমর্থকগোষ্ঠী সবাই কিন্তু জামায়াত নিষিদ্ধ করার দাবিতে সমানভাবে সোচ্চার নয়। মনে হয় জামায়াত নিয়ে আওয়ামী লীগের কৌশলটা দলের অনেকে জানেন।
আগামী সংসদ নির্বাচন বিএনপির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের গণতন্ত্রের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজয় মানতে পারবে না। কেন পারবে না, তা নিশ্চয় বিএনপি জানে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের একটা মডেল তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার একটা রিহার্সেল দিয়েছে এবং তাতে পাসও করেছে। অনেকের আশঙ্কা, মেয়র নির্বাচনের মতো সংসদ নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, বিজিবি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এক বড় অংশ সরকারের ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। নির্বাচনী মাঠে বিএনপি থাকবে একা। ভোটাররা বিএনপির শক্তি হতে পারেন, কিন্তু সাধারণ ভোটাররা সন্ত্রাস প্রতিহত করতে পারেন না। কাজেই সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মেয়র নির্বাচনের এই মডেল প্রয়োগ করতে পারে, তা বিএনপিকে বুঝতে হবে।
এই পরিস্থিতি কল্পনা করে বিএনপিকে ঠিক করতে হবে যে তারা আগামী সংসদ নির্বাচন করবে কি করবে না। বিএনপির সামনে এখন উভয় সংকট। ১. সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের ভোট প্রহসন মেনে নেওয়া, ২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। না নিলে দলের অস্তিত্ব আরও দুর্বল হয়ে যাবে। অনেক নেতা ও কর্মী ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন। নেতা ও কর্মীরা খুবই হতাশ হয়ে পড়বেন। দল টিকিয়ে রাখাই মুশকিল হবে। কাজেই উভয় সংকট।
অনেকে বলতে পারেন, ‘সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সরকার ভোট-সন্ত্রাস করবেই, তার নিশ্চয়তা কী?’ না, কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে এটা আমাদের ধারণা। নির্বাচনে জিততে হলে আওয়ামী লীগকে ভোট-সন্ত্রাসে যেতেই হবে। সাধারণ মত হচ্ছে, সুষ্ঠু ভোটে আওয়ামী লীগ জিতবে না। না জেতা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। কী বিপদ, সেটা আওয়ামী লীগ জানে। আওয়ামী লীগ কীভাবে সরকার পরিচালনা করেছে, বিরোধী দলের ওপর কীভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন করেছে, তা কি তারা জানে না? জানে। সে জন্যই সংসদ নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। যেভাবেই হোক, আওয়ামী লীগকে জিততে হবে। এই সরকারের যারা (সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি) অন্যায়ভাবে বেনিফিশিয়ারি, তারা সবাই চাইবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জেতাতে। ২৮ এপ্রিলের মেয়র নির্বাচনই তার প্রমাণ।
বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলকে এটা বুঝতে হবে। নাগরিক সমাজকেও এটা বুঝতে হবে। বক্তৃতা, বিবৃতি ও গোলটেবিল দিয়ে ভোট-সন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে না।
দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে বিএনপিকে তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। নির্বাচনে না গেলে দলের কী কী ক্ষতি হতে পারে, তা-ও তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে।
দুর্ভাগ্য, আমাদের নাগরিক সমাজও খুব দুর্বল। নানা লোভ, প্রলোভন, ভীরুতা, হুমকি ইত্যাদিতে তারা বিপর্যস্ত। নইলে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, সবার ভোট দেওয়ার অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধের দাবিতে নাগরিক সমাজও আন্দোলন করতে পারত। কিন্তু দুর্বল নাগরিক সমাজের পক্ষে এই আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
দেশে গণতন্ত্রের এমনই অবস্থা, উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বিরোধী ছাত্রসংগঠন’ বলে কিছু নেই। যে কয়েকটি ছোট সংগঠন রয়েছে, তারা দুর্বল হলেও কিছু করার চেষ্টা করছে। বিএনপির ছাত্রসংগঠন বলে এখন ক্যাম্পাসে কিছু নেই। কাজেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করবে কে?
এই পরিস্থিতির পুরো সুযোগ নিচ্ছে সরকার। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার সব দল নিষিদ্ধ করে ‘বাকশাল’ গঠন করেছিল। শেখ হাসিনাকে কোনো গণতান্ত্রিক দল নিষিদ্ধ করতে হয়নি। তিনি এমন সব কৌশল ব্যবহার করেছেন, যাতে বড় বিরোধী দল বিএনপি নিজে নিজেই দুর্বল হয়ে গেছে। বেশির ভাগ নেতা জেলে বা গ্রেপ্তারের ভয়ে ফেরারি। আর অদৃশ্য শক্তির হাতে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে। জীবনের মায়া কার নেই?
ছোট দলগুলো নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। কারণ সিএনজি অটোরিকশার মতো তারাও বলছে, ‘আমি ছোট, আমাকে ধাক্কা দেবেন না।’ শেখ হাসিনা এতটা নির্দয় নন। ছোট দলকে ধাক্কা দিতে তিনি আগ্রহী নন।
আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কী ভাবছে, এখন এটাই বিএনপির ইস্যু হওয়া উচিত। এটা জরুরি কাজ। কারণ বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে সরকার হঠাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে দিতে পারে। তখন বিএনপি চিন্তা করারও সময় পাবে না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

গ্রিসের গণতন্ত্রে ইউরোপের হামলা by জোসেফ ই স্টিগলিৎজ

ইউরোপের ভেতরে যে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ চলছে এবং তা থেকে যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বাইরের মানুষের কাছে মনে হতে পারে, এটা গ্রিস ও তার ঋণদাতাদের মধ্যে চলমান খেলার শেষ পর্যায়। বস্তুত, ইউরোপীয় নেতারা শেষ পর্যন্ত চলমান ঋণ-সংকটের আসল রূপ উন্মুক্ত করা শুরু করেছেন। আর এর উত্তরটা সুখকর নয়: এটা যত না টাকা বা অর্থনীতির ব্যাপার, তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা ও গণতন্ত্রের ব্যাপার।
অবশ্যই, ট্রয়কা (ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমএফ) পাঁচ বছর আগে গ্রিসের ওপর যে কর্মসূচি চাপিয়ে দিয়েছিল, তার অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। এর ফলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে যায়। আর কোনো মন্দা এমন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল না বা তার ফলাফল এত বিপর্যয়কর ছিল না। উল্লেখ্য, গ্রিসে বর্তমানে তরুণদের বেকারত্বের হার ৬০ শতাংশ।
বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ট্রয়কা এর কোনো কিছুরই দায়িত্ব নেয়নি। আবার তার ভবিষ্যদ্বাণী ও মডেল যে এতটা খারাপ ছিল, তাও তারা স্বীকার করেনি। এর চেয়েও বাজে ব্যাপার হচ্ছে, ইউরোপীয় নেতারা এ থেকে কিছু শেখেননি। ট্রয়কা এখনো দাবি করে যাচ্ছে, গ্রিসকে ২০১৮ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ উদ্বৃত্ত অর্জন করতে হবে।
সারা বিশ্বের অর্থনীতিবিদেরাই এই লক্ষ্যকে শাস্তির শামিল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ, এর পেছনে ছুটলে দেশটির মন্দা আরও গভীর হবে। গ্রিস ঋণ পুনর্গঠনে যদি কল্পনাতীত সফলতা দেখায়, তাহলেও দেশটি মন্দার কবলেই থাকবে। সেখানকার ভোটাররা এ সপ্তাহের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় গণভোটে ট্রয়কার লক্ষ্যে সায় দিলে ব্যাপারটা এমনই হবে।
বিপুল অঙ্কের প্রাথমিক ঘাটতিকে উদ্বৃত্তে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে গ্রিস গত পাঁচ বছরে যে সফলতা দেখিয়েছে, খুব কম দেশই তা করতে পেরেছে। আর গ্রিস সরকারের সাম্প্রতিক প্রস্তাবের কারণে মানুষকে অনেক ভুগতে হলেও ঋণদাতাদের দাবি মেটানোর ক্ষেত্রে তারা বহুদূর অগ্রসর হয়েছিল।
আমাদের পরিষ্কার থাকতে হবে: গ্রিসকে যে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল, তার প্রায় কিছুই গ্রিসের হাতে পৌঁছায়নি। বেসরকারি খাতের ঋণদাতাদের ঋণ পরিশোধে এটা ব্যয় হয়েছে, এর মধ্যে আছে জার্মান ও ফরাসি ব্যাংকগুলো। গ্রিস সামান্য কিছু পেলেও নিজেদের ব্যাংক-ব্যবস্থাকে বাঁচাতে তাকে অনেক অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। যে টাকা দাবি করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও অন্যান্য ‘আনুষ্ঠানিক’ ঋণদাতাদের তা দরকার নেই। ব্যবসার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যে টাকা পাওয়া যাবে, তা খুব সম্ভবত আবার গ্রিসকেই ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। কিন্তু আবারও বলতে হয়, এটা টাকার ব্যাপার নয়। বিষয়টা হচ্ছে, ‘সময়সীমা’ আরোপ করে গ্রিসকে নতি স্বীকারে ও গ্রহণযোগ্য নয়—এমন বিষয় গ্রহণ করতে বাধ্য করা। শুধু কৃচ্ছ্রসাধন নয়, আরও কিছু পশ্চাদ্গামী ও শাস্তিমূলক নীতি গ্রহণেও তাকে বাধ্য করা হয়েছে।
কিন্তু ইউরোপ কেন এটা করবে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা গণভোটের বিরোধিতা করছেন কেন? আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে গ্রিসের ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় ছিল ৩০ জুন, সেটাই বা আইএমএফ পেছানোর বিরুদ্ধে ছিল কেন? ইউরোপ কি তাহলে পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নয়? গ্রিসের জনগণ দেশটিতে চলমান কৃচ্ছ্রসাধন শেষ করতে চায়—এমন একটি দলকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল এ বছরের জানুয়ারিতে। সরকার যদি শুধু তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চাইত, তাহলে তারা ইতিমধ্যে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করত। কিন্তু আর্থিক পুনরুদ্ধার (বেইলআউট) কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঋণদাতা দেশ ও সংস্থাগুলো গ্রিসকে যে প্রস্তাব দিয়েছে, গ্রিসের সরকার সে-বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার জনগণের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে। এটি তাদের দেশের ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এ বিষয়ে জনগণের রায় নেওয়ার ব্যাপারটা ইউরোজোনের রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসলে এই ইউরোজোন কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যাপার ছিল না। এর অধিকাংশ সদস্যদেশই নিজেদের মুদ্রার সার্বভৌমত্ব ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) হাতে তুলে দেওয়ার আগে জনগণের রায় নেয়নি। সুইডেন তার জনগণের রায় চাইলে সুইডিশরা ‘না’ বলেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, তাদের দেশের মুদ্রানীতি যদি এমন একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যারা একনিষ্ঠভাবে শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ে কাজ করে, তাহলে তাদের দেশে বেকারত্ব বাড়বে (আর সেটা হলে আর্থিক স্থিতিশীলতায় যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হবে না)। আর এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, ইউরোজোনের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ক্ষমতা সম্পর্কের ভিত্তিতে, যার কারণে শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
আর এটা তো সত্য, ইউরোজোন এই সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক করার ১৬ বছর পর আমরা গণতন্ত্রহীনতা দেখছি। অনেক ইউরোপীয় নেতাই গ্রিসের বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাসের পতন দেখতে চান। সর্বোপরি, যে রাজনীতি সারা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই অসমতা বাড়িয়েছে, তার বিরোধিতা করে গ্রিসে এমন সরকার থাকলে তা এই রাজনীতির জন্য অস্বস্তিকরই বটে। গ্রিসের এই সরকার আবার সম্পদের অপরিসীম ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে চায়। মনে হয়, এই অগণতান্ত্রিক শক্তি এটা বিশ্বাস করে যে গ্রিসের বামপন্থী সরকারকে জনগণের ম্যান্ডেটবিরোধী চুক্তি করতে বাধ্য করে তারা তাকে গদি থেকে নামাতে পারবে।
গ্রিসের নাগরিকরা ৫ জুলাই কীভাবে ভোট দেবেন, সে বিষয়ে তাঁদের উপদেশ দেওয়া কঠিন। কারণ, ট্রয়কার শর্ত মেনে নেওয়া বা না-নেওয়া কোনোটিই খুব সহজ ব্যাপার হবে না। তারা যা-ই করুক, উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি থাকবেই। তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশটি অনিঃশেষ মন্দার কবলে পড়বে। সেটা হলে দেশটি একদম নিঃস্ব হয়ে যাবে, যারা নিজেদের সব সম্পদ বিক্রি করে দিতে ও যাদের মেধাবী তরুণেরা দেশান্তরি হতে বাধ্য হবে, তাদের ঋণ তখন হয়তো মওকুফ হয়ে যাবে। হয়তো মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়ে গ্রিস শেষমেশ বিশ্বব্যাংকের সহায়তা পাবে। আগামী দশকে হয়তো এ রকম হবে বা তারও পরের দশকে সেটা হতে পারে।
অন্যদিকে, গ্রিকরা ‘না’ ভোট দিলে দেশটি অন্তত তার শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের নিয়তি নিজেই নির্ধারণ করার সুযোগ পাবে। সেটা হলে গ্রিস নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাবে। সেটা হয়তো অতীতের মতো অত সমৃদ্ধিশালী হবে না, কিন্তু বর্তমানে যে অন্যায্য অত্যাচার তাদের সইতে হচ্ছে, তা থেকে তারা অন্তত রেহাই পাবে।
আমি জানি, এ পরিস্থিতিতে আমি কিসে ভোট দিতাম।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জোসেফ ই স্টিগলিৎজ: নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ।

এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের ভর্তি-দুর্ভোগ by মোশতাক আহমেদ

আবেদন না করেও অখ্যাত বা দূরদূরান্তের কলেজে মনোনীত হয়েছে কেউ। কেউ কেউ আবেদন করেছে ব্যবসায় শিক্ষা শাখার জন্য, কিন্তু মনোনীত হয়েছে বিজ্ঞানে। কেউ মুক্তিযোদ্ধার কোটায় আবেদনই করেনি, অথচ তাকে মনোনীত করা হয়েছে সেই কোটায়। এ জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তি করছে সেই শিক্ষার্থীকে। কেউ ভালো ফল করেও ভালো কলেজে মনোনীত হয়নি, কিন্তু তুলনামূলকভাবে খারাপ ফল করেও ভালো কলেজে ভর্তি হয়েছে। কেউ কেউ এমন সব কলেজে মনোনীত হয়েছে, যার অস্তিত্ব শুধু কাগজেই আছে।
একাদশ শ্রেণির ভর্তি বিষয়ে এ ধরনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে অসংখ্য ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী এখন প্রতিদিন ভিড় করছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে।
বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট মঞ্জুরুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, এই কয়েক দিনে সমাধানের জন্য প্রায় ১০০ আবেদন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পাঠানো হয়েছে। বুয়েট এই ভর্তির তালিকা তৈরিতে কারিগরি সহায়তা করেছে।
গতকাল বুধবার ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের উপকলেজ পরিদর্শকের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অনেকে লিখিতভাবে আবেদন করছেন, অনেকে মৌখিকভাবে সমস্যার সমাধান চেয়েছেন।
উপকলেজ পরিদর্শক অদ্বৈত কুমার রায় জানান, তাঁর কাছে প্রায় ১০০ টির মতো আবেদন জমা পড়েছে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বোর্ডেও একই ধরনের সমস্যা নিয়ে আসছে অনেক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ নিয়ে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সবাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তাদের দুষছেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, মন্ত্রণালয় ও শিক্ষাবোর্ডের সৃষ্ট সমস্যার কারণেই তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এঁদের কয়েকজনের অভিযোগ হলো, সমস্যা সমাধান করতে এসে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পেতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে প্রথম দফায় ভর্তির কাজ। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাটা আরও বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ভর্তি শেষ হওয়ার আগেই গতকাল ক্লাস শুরুর তারিখ দিলেও বাস্তবে ক্লাস শুরু হয়নি।
এ ব্যাপারে শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, যেসব সমস্যা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো সমাধান করে দেওয়া হবে। নতুন পদ্ধতি হওয়ার কারণে এবার কিছু সমস্যা হয়েছে। তবে সব শিক্ষার্থীই ভর্তি হতে পারবে। তিনি বলেন, সমাধান জানাতে আসা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষাবোর্ডের কোনো কোনো কর্মকর্তা দুর্ব্যবহার করছেন বলে তিনিও শুনেছেন। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চার দফায় পিছিয়ে গত রোববার রাতে একাদশ শ্রেণির ভর্তির জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পর বিভিন্ন ধরনের ভুলভ্রান্তি ধরা পড়ে। গতকাল দুপুরে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের উপকলেজ পরিদর্শকের কার্যালয়ে ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে অন্তত ৫০-৬০ জনকে অভিযোগ নিয়ে আসতে দেখা যায়। এঁদের কেউ লিখিত আবেদন করেছেন, কেউ বা মৌখিকভাবে সমস্যা জানিয়ে সমাধান জানতে চাইছেন।
মা ও এক শিক্ষককে নিয়ে ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে আসা আঁখি আক্তার জানায়, কে বা কারা তার পক্ষে আবেদন করায় ময়মনসিংহের মোক্ষপুর কলেজে তাকে মনোনীত করা হয়েছে। অথচ সে স্থানীয় ইছাপুর কলেজে ভর্তি হতে চায়।
মাদারীপুরের তুহিন মাতব্বরের সমস্যা হলো, সে অনলাইনে অপশন দেখে ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজে বাণিজ্য শাখার জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু তাকে মনোনীত করা হয়েছে বিজ্ঞান শাখায়। পরে জানা গেল, বিজ্ঞান কলেজে বাণিজ্য শাখাই নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সূত্রমতে, এবার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই একসঙ্গে সব কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির কাজ অনলাইনে করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে শিক্ষা বোর্ড। ১১ লাখ ৫৬ হাজার ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী কে কোন কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছে, সেই তালিকা করতে গিয়ে বোর্ডকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস টেকনোলজিও (আইআইসিটি) কারিগরি সমস্যায় পড়ে। এ কারণে তালিকা প্রকাশের সময় চার দফায় পেছাতে হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা এবং একাধিক নামকরা কলেজের অধ্যক্ষ প্রথম আলোকে বলেন, পদ্ধতি হিসেবে এটি খুব ভালো। এটি ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। কিন্তু পূর্বপ্রস্তুতি না নিয়ে এটি করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নয়, বিশ্বকাপে কী হবে ভাবুন! by রাজীব হাসান

বিশ্ব ক্রিকেটে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেই নানা সমীকরণের
সামনে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ দল। ছবি: প্রথম আলো
দক্ষিণ আফ্রিকা দল এখন বাংলাদেশে। অথচ এ দেশের ক্রিকেটে এখনো আলোচিত হচ্ছে তিনটি বিষয়: চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ত্রিদেশীয় সিরিজ আর র‍্যাঙ্কিং!
গত শুক্রবার সকালে প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত হয়: ‘বাংলাদেশকে ছিটকে ফেলতে ত্রিদেশীয় সিরিজের পরিকল্পনা’। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ক্রিকেট পোর্টাল ‘ক্রিকেট ডটকম ডট এইউ’ আর পাকিস্তানের শীর্ষ দৈনিক ডন-এর অনলাইন সংস্করণ ছিল খবরটির সূত্র। যে খবরে বলা হয়, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিজেদের খেলার সম্ভাবনা বাড়াতে জিম্বাবুয়ে-পাকিস্তান সিরিজে যোগ দিতে চাইছে ওয়েস্ট ইন্ডিজও। রোববার খবরটি নিশ্চিত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রথমে কূটনৈতিক অবস্থানেই ছিল। বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস প্রথম আলো অনলাইনকে বলেছিলেন, ‘এ নিয়ে আমরা ভাবছি না।’ কিন্তু গত সোমবার বিসিবি অসন্তোষ লুকিয়ে রাখতে পারেনি। জালাল ইউনুসই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে আনেন। বলেন, ‘যেদিন থেকে আইসিসি এফটিপি করা ছেড়ে দিয়েছে, ব্যাপারটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেদিন থেকেই সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এটা সমর্থন করি না। এটা সুস্থ প্রতিযোগিতা নয়।’ এও বলেছেন, ‘ব্যাপারটি যখন আইসিসি সদস্যদেশগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়েছে, সেখানে অনেক কিছু নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ আছে।’
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন দুটি পক্ষ। একটি পক্ষ অবশ্যই এই ত্রিদেশীয় সিরিজের বিপক্ষে। অন্য পক্ষের বক্তব্য, ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তান তো নিয়মের বাইরে কিছু করছে না। তারা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলার সুযোগ হারাতে চাইবে কেন?
ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তান আসলেই নিয়মের বাইরে কিছু করছে না। আইসিসি ঠিক করে দিয়েছে, এখন থেকে সিরিজগুলো দুই বোর্ডের আলোচনার ভিত্তিতেই হবে। ফলে যে কেউ চাইলে আলোচনার ভিত্তিতে সিরিজ করতেই পারে।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য। ভারত-বাংলাদেশ সিরিজ হওয়ার পরই কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাথায় এল, তাদের একটা ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলা উচিত? এর আগে কেন তারা ভাবেনি? ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে তাদের কোনো ওয়ানডে নেই—এই তথ্য তারা ২২ জুন সকালে ঘুম থেকে উঠে আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করেছে? বিশ্বকাপের পর অক্টোবরের আগে পর্যন্ত পাঁচটি ম্যাচ নির্ধারিত ছিল তাদের সূচিতে, পাঁচটিই টেস্ট। অথচ এই সময় দুটো দল সফর করে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজে। ইংল্যান্ড তিনটা টেস্ট খেলে দেশে ফিরেছে, অস্ট্রেলিয়া দুটো টেস্ট খেলে। কেন ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ওয়ানডেও খেলল না ওয়েস্ট ইন্ডিজ?
কারণ ইংল্যান্ড মে-তে দেশে ফিরেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটো টেস্ট সিরিজ খেলবে বলে ঠিক করা ছিল। টেস্টের মেজাজেই তারা থাকতে চেয়েছে। অস্ট্রেলিয়াও জুনে দুটো টেস্ট খেলে দেশে ফিরেছে, কারণ জুলাই থেকেই শুরু অ্যাশেজ। মাঝখানে ওয়ানডে খেলার ঝামেলায় যেতে চায়নি তারা। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া নিজেদের লাভটা বুঝেছে। নিজেদের স্বার্থ দেখেছে। এখন যে স্বার্থটা দেখতে চাইছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
পাকিস্তান এখনো এই ত্রিদেশীয় সিরিজের ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করছে না। পাকিস্তান হয়তো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে—হবে হবে। কিন্তু এও ভাবছে, শ্রীলঙ্কাকে যদি ৩-২-এ সিরিজ হারাতেই পারি, তাহলে আর ত্রিদেশীয় সিরিজে যাওয়ার ঝামেলায় কেন যাওয়া? ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাদ পড়ে পড়ুক। আবার পাকিস্তান ঠিক আত্মবিশ্বাসীও নয়—বাংলাওয়াশের টাটকা স্মৃতির পর শ্রীলঙ্কাকে তাদেরই মাটিতে ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ হারানোর চ্যালেঞ্জটা তাদের তরুণ দল নিতে পারবে তো? তাই এখনো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কেন করছে পাকিস্তান এমনটা? কারণ তারা তাদের স্বার্থ দেখছে।
ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিজেদের স্বার্থ দেখবে। বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ দেখবে না! বাংলাদেশ এই মুহূর্তে যেটা করতে পারে, এই সম্ভাব্য ত্রিদেশীয় সিরিজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা। জালাল ইউনুস সেটাই করেছেন। এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বার্থে আরও জোরালোভাবে সেটা করা দরকার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তান হয়তো মাঠের খেলাতে খেলেই বাংলাদেশকে ছিটকে ফেলতে চাইছে, টেবিলের খেলায় নয়। কিন্তু এই মাঠের খেলার ছকটা কষা হয়েছে টেবিলেই।
ত্রিদেশীয় সিরিজের পক্ষে বলতে গিয়ে যাঁরা আইসিসির এফটিপির নতুন নিয়মের দোহাই দিচ্ছেন, তাঁরা নিজেদেরই প্রশ্ন করুন, গত কয়েক বছরে কেবল ওয়ানডে ক্রিকেট নিয়ে আইসিসি কতবার নিয়ম বদলেছে? মাত্র গত সপ্তাহেই বদলাল আরও একবার!
আইসিসি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে হাস্যকর ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট অভিভাবক প্রতিষ্ঠান। আইসিসি নিয়ম করল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে হলে র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা আটে থাকতে হবে। ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলেও থাকতে হবে সেরা আটে। কিন্তু এই সেরা আট নির্ধারিত হবে যে র‍্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে, আর যে র‍্যাঙ্কিং প্রভাবিত করবে এফটিপি, সেটা নিয়ন্ত্রণের ভার নিজেদের হাতেই রাখছে না আইসিসি! এ কি পাড়াতো খেলার বিস্কুট দৌড়—যে যেভাবে পার, মেরেকেটে হোক, কিংবা ল্যাং মেরে, সবার আগে ফিনিশিং লাইন যে ছোঁবে সে-ই ফার্স্ট!
আসলে ছয় মাস আগেও কেউ কল্পনা করেনি, র‍্যাঙ্কিংয়ের ছবিটা এভাবে বদলে যাবে। ২০১৯ বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব কোথায় হবে জানেন? বাংলাদেশে। কারণ, বাছাই পর্ব যেহেতু বাংলাদেশকে খেলতেই হচ্ছে, ওদেরকে একটা সান্ত্বনা পুরস্কার দাও। নিজেদের মাঠে খেলে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে আসুক।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির কথা আপাতত ভুলে যান। বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবুন। বাছাই পর্ব ছাড়াই সরাসরি বিশ্বকাপ খেলার যে সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ, সেই সম্ভাবনা উজ্জ্বল থেকে আরও উজ্জ্বলতর হলে, ভবিষ্যতেও যে এ রকম অনির্ধারিত এক বা একাধিক সিরিজের আয়োজন হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? বাকি দলগুলোর কথা বাদ দিন, বাংলাদেশও যে ‘বিপদে পড়লে’ নির্ধারিত সূচির বাইরে ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনেক হিসেব কষে একাধিক সিরিজ আয়োজন করতে চাইবে না, সেটাও বা জোর দিয়ে কে বলতে পারে?
আইসিসির নিয়মটাতেই তাই গলদ আছে। যেখানে ‘ফেয়ার প্লে’র সুযোগ নেই। জালাল ইউনুস ঠিকই বলেছেন। বর্তমান এফটিপি প্রক্রিয়ায় অনেক ‘লুপহোল’ বা ‘ত্রুটি’ আছে। এটা এখন যেকোনো দল নিজ স্বার্থে ‘ম্যানিপুলেট’ বা ‘নিজ স্বার্থে সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার’ করতে পারে। তাঁর সবচেয়ে বড় সত্যি কথাটা হলো, এটা একটা ‘অস্বাস্থ্যকর’ প্রতিযোগিতা শুরু করে দেবে। সেই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার ছক কষা হবে টেবিলেই। যে যার কূটনৈতিক ক্ষমতাবলে আয়োজন করবে সিরিজ। এবং একজন বাংলাদেশি সমর্থক হিসেবে আপনি আশঙ্কা প্রকাশ করতেই পারেন, আইসিসি সভাপতি এখন যেহেতু একজন পাকিস্তানি, আইসিসির টাকা খরচা করেই তিনি বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানের পক্ষে দূতিয়ালি করে বেড়াতে পারেন। জহির আব্বাস এরই মধ্যে তাঁর দেশের মিডিয়াকে ‘আশ্বাস’ দিয়েছেন, পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
জহির আব্বাস সেই চেষ্টা যদি নাও করেন, তবুও পাকিস্তান সুযোগ বেশি বই কম পাচ্ছে না। বর্তমান এফটিপি অনুযায়ীই, জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ খেলবে ২০টি ওয়ানডে। পাকিস্তান কমপক্ষে ৪২টি ওয়ানডে খেলবে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় সিরিজ, সেই ওয়ানডের সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ৪৭। ২০১৭-র জুনের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জায়গা পেলে মিলবে আরও সর্বোচ্চ ৫টি ওয়ানডে খেলার সুযোগ।
২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সিরিজে ২৪টি ওয়ানডে খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আছে তাদের। সেই সঙ্গে আছে আগস্টের এই বহুল আলোচিত ত্রিদেশীয় সিরিজ। এই দুই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলতে পারে দশটি ওয়ানডে। আর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জায়গা পেলে মিলবে আরও সর্বোচ্চ ৫টি ওয়ানডে খেলার সুযোগ। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৯টি ওয়ানডে খেলার সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে, পাকিস্তান ৫২টি, আর বাংলাদেশ ২৫টি (চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলে ফাইনাল পর্যন্ত গেলে)।
সবাই সমান সুযোগ পাচ্ছে না। পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এর মধ্যে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’র লাইসেন্স দিয়ে রাখা হয়েছে নতুন সিরিজ আয়োজনে। পরিস্থিতি কতটা জটিল হয়ে ওঠে, সেটাই এখন দেখার। অনির্ধারিত বাড়তি সিরিজ আয়োজনের প্রয়োজন পড়লে বাংলাদেশকে র‍্যাঙ্কিংয়ের নিচু সারির দলগুলো ছাড়া কেউ তেমন সাড়া দেবে বলে মনেও হয় না। আর জিম্বাবুয়ে-আফগানিস্তানদের সঙ্গে খেলে বাংলাদেশের আসলে তেমন একটা লাভ নেই, বরং হেরে গেলে বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা।
আইসিসির জন্য সবচেয়ে আদর্শ ছিল, বিশ্বকাপে খেলতে চাওয়া ১৪টি দলের মধ্যে হোম-অ্যাওয়ে ভিত্তিতে দুটি করে ম্যাচের আয়োজন করে বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব করা। সরাসরি আট দল কেন সুযোগ পাবে বিশ্বকাপে—এই প্রশ্ন মাইকেল হোল্ডিং অনেক আগেই করে রেখেছেন। কিন্তু আইসিসি তা বোঝে না? বোঝে, কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশি বোঝে ব্যবসা। যে ব্যবসার কারণেই প্রতিবার বদলে যায় বিশ্বকাপের ফরম্যাট।
আইসিসি-র অনেক বিদ্রূপাত্মক পূর্ণ অর্থ চালু হয়ে গেছে। বিশ্বকাপে জায়গা পেতে ইঁদুর-লড়াইটা শুরু হয়ে গেলে নতুন আরেকটা নাম এখনই ঠিক করে রাখতে পারেন—‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটিং সার্কাস’!

ঢাকা–চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প: ব্যয় বাড়ছে ১৩৩৫ কোটি টাকা by আনোয়ার হোসেন

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে উড়ালসড়ক
নির্মাণকাজের জন্য মহাসড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বাড়তি যানবাহনের চাপে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ।
গত রোববার চলছিল মেরামতের কাজ l ছবি: হাসান রাজা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজের ব্যয় বাড়ছে ১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৬২ শতাংশ। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এখন বেড়ে হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। সময়মতো কাজ না হওয়ায় ঠিকাদারদের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে।
ব্যয় বাড়লেও প্রকল্পের কাজ শেষই হচ্ছে না। দুই দফা সময় বৃদ্ধির পর এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত মাস পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৭০ শতাংশ।
প্রকল্পের অগ্রগতিসংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের অধীন ১৯২ কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে গত সপ্তাহ পর্যন্ত ১৪২ কিলোমিটার পিচ ঢালাই হয়েছে। তবে তা একটানা নয়, খানিক বাদে বাদে। ফলে পুরোনো সড়কের পাশাপাশি নতুন সড়ক পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
১৪২ কিলোমিটারের বাইরে মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার পথ প্রাথমিক পাকা করার কাজ হয়েছে। এর ওপর পুনরায় পিচ ঢালাই হবে। বাকি ৩০ কিলোমিটার সড়কে এখনো মাটির কাজ চলছে; যার বেশির ভাগই পড়েছে কুমিল্লা থেকে ফেনীর মধ্যে।
আর প্রকল্পের অধীন সাতটি সেতু ও তিনটি উড়ালসড়ক নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছিল ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। চুক্তি অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। গত মাস পর্যন্ত অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্র জানায়, বাড়তি ব্যয় সংযোজন করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আরেকটি সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করছে। সেটি শিগগিরই অনুমোদনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ওই প্রস্তাবে প্রকল্পের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাবও থাকবে। ২০০৬ সালে করা মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। ২০১২ সালে সংশোধনের পর তা দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এখন যে প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, তাতে ব্যয় গিয়ে ঠেকছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।
গণখাতে ক্রয়সংক্রান্ত আইনে (পিপিআর) বলা হয়েছে, কোনো প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের পর ওই ঠিকাদারের পেছনে মূল চুক্তির ৫০ শতাংশের বেশি খরচ করা যাবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ৬২ শতাংশ।
সওজ সূত্র জানায়, এই বাড়তি খরচের বেশির ভাগই যাচ্ছে ঠিকাদারের মাশুল হিসেবে। কারণ, ঠিকাদারের সঙ্গে করা চুক্তিতে মূল্যবৃদ্ধি যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে বছর বছর নির্মাণসামগ্রী ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠিকাদারের বিলও বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যত বেড়েছে, ঠিকাদারের মাশুলও বেড়েছে সেই হারে।
আর দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলার কারণে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরোনো সড়কটিও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সড়ক অচল হয়ে যাবে—এ আশঙ্কায় সওজ কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারদের দিয়ে সড়ক মেরামতের কাজ করায়। এর জন্য বাড়তি বিলও দিতে হয় ঠিকাদারদের। চুক্তিপত্রে নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সড়কটিও চালু রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু চীনা কোম্পানি সিনোহাইড্রো পুরোনো সড়ক মেরামতের কাজ করবে না বলে জানিয়ে দেয়। পরে সওজ চীনা কোম্পানির আওতাধীনসহ পুরো সড়কের মেরামতকাজের দায়িত্ব দেয় ওই প্রকল্পের বাকি দুই ঠিকাদার বাংলাদেশের রেজা কনস্ট্রাকশন ও তাহের ব্রাদার্স লিমিটেডকে।
প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল, পুরো মহাসড়কই হবে পিচের। কিন্তু পরে মহাসড়ক ঘেঁষে বাজার গড়ে ওঠা স্থানগুলোতে প্রায় দেড় লাখ বর্গমিটার কংক্রিটের ঢালাই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য কিছু ব্যয় বাড়ে।
সময় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক ইবনে আলম হাসান বলেন, তাঁরা এখনো ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। না পারলে সেটা পরে দেখা যাবে। আর ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং চুক্তির বাইরে কাজ করার কারণে ব্যয় বেড়েছে। পুনরায় ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
বাড়তি এই ব্যয় পিপিআরের লঙ্ঘন কি না, জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রতিবছরের মূল্যবৃদ্ধি আর বাড়তি কাজের খরচ এক জিনিস নয়। বাড়তি কাজের বিল ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের নিয়ম আছে। এ ক্ষেত্রে আইনের লঙ্ঘন হয়নি।
বাড়তি কাজের নামে বিল: দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেন করার ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। শর্ত ছিল, তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। এরপর সময় বাড়িয়ে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। তাতেও ব্যর্থ হলে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখন আরেক দফা সময় বাড়াতে হবে।
সড়ক চার লেন করার কাজ ১০টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। সাতটি প্যাকেজের কাজ পায় চীনের সিনোহাইড্রো। বাংলাদেশের রেজা কনস্ট্রাকশন পায় দুটির এবং তাহের ব্রাদার্স পায় একটি।
সওজ সূত্র জানায়, মেরামত ও বাড়তি কাজ করার দাবি করে রেজা কনস্ট্রাকশন মূল চুক্তির চেয়ে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা বাড়তি পেয়েছে। এর সঙ্গে বছর বছর মূল্যবৃদ্ধি তো আছেই। মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া তাহের ব্রাদার্স বাড়তি পাচ্ছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। সিনোহাইড্রো মেরামতসহ অন্য কিছু কাজ ছেড়ে দেওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ছে না। তবে নির্মাণসামগ্রী ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির জন্য বাড়তি টাকা পাচ্ছে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সেতু ও উড়ালসড়কের কাজে ধীর গতি: সাতটি সেতু ও তিনটি উড়ালসড়কের কাজ ভাগ করা হয়েছে তিন ভাগে। এর মধ্যে চৌদ্দগ্রামের মিয়ার বাজারে একটি সেতু নির্মাণের কাজ পেয়েছিল তাহের অ্যান্ড সন্স। সেটির কাজ সময়মতো শেষ হয়েছে। আরও ছয়টি বড় সেতু ও তিনটি উড়ালসড়ক নির্মাণের দুটি আলাদা প্যাকেজের কাজ পেয়েছিল শিখো-পিবিএল (যৌথ) ও গ্যানন ডানকারলি অ্যান্ড কোম্পানি। দুটি প্রতিষ্ঠানকেই ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত মাস পর্যন্ত শিখো-বিপিএল কাজ করেছে ৫৬ শতাংশ। আর গ্যানন ডানকারলি করেছে ৮১ শতাংশ।
সওজ সূত্র জানিয়েছে, শিখো-পিবিএল যৌথভাবে কাজ পেলেও মূল দায়িত্ব পিবিএল বা প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেডের। বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠান ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পেও কাজ পেয়ে তা শেষ করতে পারছে না। সওজের চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলের অধীনে দুটি প্রকল্পের কাজ নিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করার কারণে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য চিঠি দিয়েছেন সওজের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে গ্যানন ডানকারলি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। এর কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে থাকেন, বর্ষায় চলে যান। এ সময় সাধারণ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়েও ঝামেলা তৈরি হয়।

ভর্তিচ্ছুদের তোপের মুখে অবরুদ্ধ পরিদর্শক- ভোগান্তির নানা চিত্র

একাদশে ভর্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। একের পর এক সমস্যায় নাজেহাল হচ্ছে ভর্তিচ্ছুরা। ১ম মেধাতালিকা প্রকাশের পর মনোনীতরা পছন্দের কলেজ না পেয়ে গতকাল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শকে অবরুদ্ধ করে রাখে। দুপুরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা কলেজ পরিদর্শকের কক্ষে চড়াও হয় এবং উপ-কলেজ পরিদর্শক অদৈত্য রায়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন। দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার বাহিনীর সদস্যদের ডেকে কলেজ পরিদর্শকের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অনলাইনে ভর্তি প্রক্রিয়া বা স্মার্ট সিস্টেম চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আর হয়রানি যেন পিছু সরছে না। সংশোধনের অপেক্ষার ২য় তালিকা ও পরে রিলিজ স্লিপের জন্য প্রহর গুনা ছাড়া কিছুই করার নেই এসব শিক্ষার্থীর। সরজমিনে ঢাকা বোর্ডে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত ভর্তিচ্ছু আর তাদের অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বোর্ড কর্মকর্তাদের প্রতি মারমুখী হয়ে ওঠেন। চারদিন ভোগান্তি ও হয়রানির অনেকটাই তড়িঘড়ি আর গোঁজামিল দিয়ে ভর্তি আবেদনের প্রথম মেধা তালিকা প্রকাশ করে আন্তঃবোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি। এ তালিকা নিয়ে সারা দেশে প্রায় ১১ লাখ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী নতুন হয়রানি ও বিড়ম্বনার মুখে পড়েছে।
বই ছাড়াই ক্লাস: চলতি বছর একাদশ শ্রেণীতে জটিলতায়, বিপত্তি, আপত্তি, ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা আর পদে পদে ভোগান্তির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ বই ছাড়া ক্লাসে বসতে হচ্ছে একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য, বাংলা সহপাঠ ও ইংলিশ ফর টুডে পাঠ্যপুস্তক তিনটি নতুনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষানীতি-২০১০’র আলোকে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর ইংলিশ ফর টুডে পাঠ্যপুস্তকটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রণয়ন করেছে এনসিটিবি। এছাড়া বাংলা সাহিত্য পাঠ (গদ্য ও কবিতা) এবং সহপাঠ (উপন্যাস ও নাটক) পাঠ্যপুস্তক দুটির ব্যাপক পরিমার্জন ও সংশোধনও করা হয়েছে। গতকাল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এনসিটিবি কার্যালয়ে এই পাঠ্যপুস্তক তিনটির বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এনসিটিবির কর্মকর্তা বলছেন এই বইগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে আরও ১৫ দিন সময় লেগে যেতে পারে।
ভর্তিতে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ:  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারণ করে দেয়ার ফি চেয়ে বেশি ফি আদায় করছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি কলেজগুলো এগিয়ে আছে। এ নিয়ে গতকাল ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে বেশকিছু অভিযোগ এসেছে। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, গত বছর হাইকোর্ট অতিরিক্ত টাকা আদায়ে অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ভৎর্সনা করেছেন। আমরাও তাদেরকে সর্তক ছাড়াও শোকজ নোটিশ দিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একাদশ শ্রেণীর ভর্তিতে স্পষ্ট বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের বাইরে কোন অর্থ আদায় করলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, অনলাইন ভর্তিতে একটু জটিলতা চলছে। তবে অভিযোগ পাওয়া সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি কলেজগুলো সরকার নির্ধারিত ফি’তে ভর্তি করাচ্ছে। তবে কিছু কলেজ উন্নয়ন ফি নামে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি আদায় করছে। তবে অধিকাংশ কলেজই সরকারের নির্ধারিত ফিতে ভর্তি করাচ্ছে। এবার রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন কলেজে ভর্তিতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই কলেজে অধ্যক্ষ প্রফেসর শহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা সরকারি নীতিমালার প্রতি সম্মান রেখে ভর্তির টাকা নিচ্ছি। তিনি বলেন, সরকারের নীতিমালায় আংশিক নন এমপিও কথা বলা হলেও এমনপিও বিহীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কিছু বলেনি। তার পরও আমরা সরকারের ফির প্রতি সম্মান দেখাচ্ছি।
ভোগান্তির নানা চিত্র: রাজধানীর গুলশানে কালাচাঁদপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মেয়েদের জন্য। সেখানে একাদশ শ্রেণীতে ৩৮টি আসন রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য বোর্ডের প্রকাশ করা মেধা তালিকায় রয়েছে ২২ জন ছেলে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ কলেজের শিক্ষকরা। থমকে গেছে তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া। শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পাঠদানের অনুমতি নেই। কিন্তু সেখানে ৩৯ জন ছাত্রীকে ব্যবসায় শাখায় ভর্তির মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ওই কলেজের অধ্যক্ষ আশীষ চন্দ্র কর বিষয়টি জানান ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে। ছাত্রীদের কলেজে ভর্তি করা হবে কি না এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তেজগাঁওয়ে সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা না থাকলেও সেখানে ভর্তির জন্য ১৫০ জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এই দেড়শ‘ শিক্ষার্থীই এখন বোর্ডে কর্মকর্তাদের রুমে রুমে ধর্না দিচ্ছেন।
৬ই জুলাই দ্বিতীয় মেধা তালিকা: আগামী ৬ই জুলাই দ্বিতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করা হবে। এ তালিকা অনুসারে ৭ ও ৮ই জুলাইয়ের মধ্যে ভর্তি কার্যক্রম শেষ করতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হবে না বা কোন কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হবে না তাদেরকে রিলিজস্লিপধারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। খালি আসনের বিপরীতে অনলাইনে সর্বোচ্চ ৫টি কলেজের পছন্দক্রম দিয়ে ৯ থেকে ১০ই জুলাইয়ের মধ্যে আবেদন করতে পারবে তারা। এ ক্ষেত্রে কোন আবেদন ফি দিতে হবে না। রিলিজস্লিপধারী প্রার্থীদের আবেদনের ফল ১১ই জুলাই প্রকাশ করা হবে। রিলিজস্লিপধারী প্রার্থীদেরকে ১২ই জুলাই বিলম্ব ফিসহ সংশ্লিষ্ট কলেজে ভর্তি হতে হবে। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থী পূর্বে অনলাইন বা এসএমএসের মাধ্যমে আবেদন করেনি সেসব শিক্ষার্থী কলেজের শূন্য আসন দেখে ৯ থেকে ১১ই জুলাইয়ের মধ্যে অনলাইনে নির্দিষ্ট আবেদন ফির মাধ্যমে পাঁচটি কলেজের পছন্দক্রম দিয়ে আবেদন করতে পারবে।

ভারত পাকিস্তানের দুই সমকামীর চুম্বনে দুই ভূখণ্ডেই উত্তেজনা

ভারত-পাকিস্তানের দুই সমকামীর চুম্বনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে দুই ভূখণ্ডের সংবাদ ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর চুম্বনের সেই ছবি ঘুরছে এখন সংবাদপত্র এবং ফেসবুক টুইটারের পাতায় পাতায়। ছবিটি হচ্ছে- কদিন আগে সমলিঙ্গ বিবাহ বৈধতা পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সেই আনন্দে ভারতের রাস্তায় প্রকাশ্য চুম্বন করছেন ভারত ও পাকিস্তানের দুই তরুণ নাগরিক। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ওই দু’জন নিজেদের দেশের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে পরস্পরকে চুম্বন করছেন। নতুন রূপে দিলেন বৈরী দুটি দেশের মধ্যে ঐক্যের বার্তা।
যেখানে সমলিঙ্গ বিবাহের ক্ষেত্রে দু’দেশই প্রচণ্ডভাবে বিরোধী, সেখানে সেই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেয়া এই ঐক্য বার্তায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। আবার কেউ জানিয়েছেন স্বাগত, কেউ জানিয়েছেন নিন্দা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তো এই ছবি এখন হট কেক। ফেসবুকে সমিরন রায় নামে একজন লিখেছেন ‘হোমোরাই পারবে পাক-ভারত ঘৃণা দূর করতে।’ অঙ্কিতা রানী সীমান্ত লিখেছেন ‘বিউটিফুল নিউজ, আরও আরও প্রেম চাই। প্রেম-ই পারবে পাকের ঘৃণাকে শেষ করে দুই দেশকে মেলাতে।’ সর্বজিৎ বাগচী লিখেছেন ‘মোদি-নওয়াজ শরিফ এমন আলিঙ্গন কবে করবে?’

না ভোট দেয়ার আহ্বান সরকারের

ঋণদাতাদের শর্ত মানা না মানার প্রশ্নে রোববার গ্রিসে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘না’ ভোট দিতে আবারও জনগণকে আহ্বান জানালেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপরাস। একইসঙ্গে রোববারের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোরও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে ঋণদাতাদের শর্ত প্রত্যাখ্যান করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান সিপরাস। তিনি বলেন, ‘ঋণদাতাদের শর্ত প্রত্যাখ্যানের ঘটনা গ্রিসকে ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে। আর তাই আপনারা আত্মর গভীর থেকে ঋণদাতাদের শর্ত প্রত্যাখ্যান করবেন বলে আমি আশা করছি।’
সিপরাস যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন পার্লামেন্টের সামনে জড়ো হয়ে সিপরাসকে সমর্থন জানান লাখ লাখ মানুষ। এদিকে মঙ্গলবার সিপরাসের বিরোধীদেরও একটি সমাবেশ করার কথা রয়েছে। ভাষণে সমালোচকদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন সিপরাস। কোনো হুমকিতে ভয় না পেতে নাগরিকদেরও আহ্বান জানান তিনি। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা হুশিয়ারি দেন যে গ্রিসের জনগণ যদি ‘না’ ভোট দেয়ার মাধ্যমে ঋণদাতাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাহলে গ্রিসকে ইউরো অঞ্চল থেকে বের করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, কৃচ্ছে র বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভোট এ সংকটের সুষ্ঠু নিষ্পত্তিতে সহায়তা করবে। আর ব্যয় হ্রাসের পক্ষে জনগণ মত দিলে তিনি আর ক্ষমতায় থাকবেন না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

গ্রিসকে শেষ সুযোগ দেবে ইইউ

ঋণখেলাপি হওয়া থেকে গ্রিসকে বাঁচাতে আরেকবার সুযোগ দিতে চেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৭০ কোটি ডলার ঋণ পরিশোধের সময়সীমা মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে নতুন একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে গ্রিক সরকারকে। গ্রিসের অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস অর্থ পরিশোধ করবে না সাফ জানিয়ে দেয়ার পর এ নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ঋণ পরিশোধ ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি দেয়া হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা গ্রিসকে একটি শেষ সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করেছে। ইউরোজোন থেকে যাতে গ্রিসকে ছিটকে না পড়তে হয়, সেজন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলেক্স সিপরাসকে নতুন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জিন ক্লদ জাঙ্কার বলেছেন, গণভোটকে সামনে রেখে আমরা একটি শেষ সমাধানের (লাস্ট মিনিট সলিউশন) প্রস্তাব দিয়েছি। তবে কী সেই প্রস্তাব বা তার রূপরেখা কেমন সে সম্পর্কে কিছুই প্রকাশ করা হয়নি। জানা গেছে, আগামী অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে যাতে হ্যাঁ ভোট পাসের মাধ্যমে ঋণদাতাদের শর্ত মেনে নিতে পারে- এ ব্যাপারে রাজি করাতে গোপন সমঝোতা করতে চেয়েছে ইইরোপীয় কমিশন।
নতুন প্রস্তাব সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না-মার্কেল : গ্রিসের ঋণ সংকটের সহজ সমাধানের জন্য ইউরোপীয় কমিশনের দেয়া নতুন প্রস্তাব সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর মার্কেল। গ্রিসের ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে মার্কেলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি শুধু জানি, গ্রিসের সামনে এটাই শেষ সুযোগ। নতুন কোনো প্রস্তাব দেয়া হয়েছে কিনা- সে সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর আঞ্জেলা মার্কেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজিসহ অন্যান্য ইইউ নেতারা গ্রিসকে নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এদিকে, দাতাদের দেয়া আর্থিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির প্রস্তাবের (বেইল আউট) পক্ষে-বিপক্ষে আগামী ৫ জুলাই গণভোট আয়োজন করেছে গ্রিস। গ্রিসের ঋণ সংকট সমাধানে বিদেশী ঋণদাতাদের প্রস্তাবিত বেইল আউট নিয়ে দেশের নাগরিকদের মতামত নিতে এ গণভোটের ডাক দেয়া হয়। রোববার দেশটির ৩০০ সদস্যের পার্লামেন্টে অন্তত ১৭৯ এমপি’র ‘হ্যাঁ’ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। কয়েকশ’ কোটি ইউরো বেইল আউট তহবিল নেয়ার জন্য ঋণদাতাদের দেয়া সর্ব সাম্প্রতিক শর্তগুলো গ্রহণ নাকি প্রত্যাখ্যান করা হবে- গণভোট হবে সে প্রশ্নেই। বেইল আউট তহবিলের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেয়া আগের শর্তগুলোও প্রত্যাখ্যান করে আসছিল গ্রিক সরকার। কারণ সরকার বলছে, আরও বেশি বাজেট কাটছাঁটের প্রস্তাব পালন করা গ্রিসের পক্ষে কঠিন। মঙ্গলবার গ্রিস আইএমএফের ঋণ শোধ করতে না পারলে তারা ঋণখেলাপি হবে। এতে করে দেশটিকে ইউরোজোন থেকে বেরিয়ে যেতে হতে পারে।

মানুষের ভাষায় কথা বলবে অস্ট্রেলিয়ার গল্পবাজ পাখি!

আদিম মানুষের ভাষায় কথা বলে পাখি। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার জনমানবহীন অঞ্চলে এমন পাখির সন্ধান পেয়েছে একদল গবেষক। ভাষাজ্ঞানের অধিকারী পাখিদের এই প্রজাতিটি অস্ট্রেলিয়ায় ‘গল্পবাজ’ পাখি নামেই বিশেষ পরিচিত। মঙ্গলবার এএফপি এক খবরে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার পিএলওএস জার্নালের পরিচালক গবেষণায় দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘চেসটনাট ক্রাউনড ব্যবলার’ বা আধো-আধো ভাষায় কথা বলা পিঙ্গল বর্ণের সুশোভিত পাখির সন্ধান পেয়েছে। এ প্রজাতির পাখি আদিম মানুষের ভাষায় কথা বলে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রাথমিক আধো-আধো ভাষাই পর্যাক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষার রূপ নেবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই পাখিরা কতিপয় ধ্বনি একত্রে উচ্চারণ করে তৈরি করে অর্থপূর্ণ শব্দ। আর তা দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভাব বিনিমিয় করে। বিজ্ঞানীরা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন,
ওই পাখির ব্যবহৃত দুটো ধ্বনি ‘এ’ এবং ‘বি’ হলে ভাষার ক্ষেত্রে শব্দ হবে ‘এব (AB) যা ওই পাখিরা আকাশে উড়ার নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে। আবার খাবার খাওয়নোর জন্য মা-পাখি যে শব্দ ব্যবহার করে তা হল বিএবি (BAB)। বিজ্ঞানীরা পাখির ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ ধারণ করে তা আবার ধ্বনিত করলে পাখি ভিন্ন শব্দের জন্য ভিন্ন প্রতিক্রিয়া করে। গবেষণার সহযোগী লেখক ড. সাইমন টাউনসেন্ড বলেন, মানবজাতি ছাড়া অর্থহীন কোনো উপাদানের সমন্বয় করে ভাবপ্রকাশের মাধ্যমে আবিষ্কার এটাই প্রথম। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষক সাবরিনা এনডোসার বলেন, আমরা অনেকদিন ধরে জেনে আসছি পাখি তার স্বরতন্ত্র দিয়ে কিছু নির্দিষ্ট ধ্বনি তৈরি করে আর তার সমন্বয়ে তৈরি হয় গানের সুর। কিন্তু কণ্ঠস্বর বারবার পরিবর্তন করে যে শব্দ এ প্রজাতির পাখি করে তা সামগ্রিকভাবে একটি বার্তা প্রদান করে।

নারী হলেও! by হাসান ফেরদৌস

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে রকম নায়কোচিত সংবর্ধনা ঢাকায় পেয়েছেন, তা দেখে খুব যে অবাক হয়েছি, তা বলব না। মোদি যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। কিন্তু মাঝখানে এক ফোঁটা চনা পড়ে সব গুবলেট হয়ে গেল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানটি খুবই পরিকল্পিত ছিল। পুরো মঞ্চটি একা মোদির জন্য, আশপাশে অন্য কেউ নেই। অনুমান করি, অন্য কারও সঙ্গে সেই মঞ্চ তিনি ভাগাভাগি করবেন না, সফরকারী ভারতীয় দল তেমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছিল। কোনো কাগজপত্র ছাড়া একদম ‘এক্সটেম্পোর’ ভাষণ দেওয়াটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজের ট্রেড মার্ক করে নিয়েছেন। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তাঁকে লম্বা ভাষণ দিতে দেখেছি, সেই একই কায়দা। কিন্তু কাগজপত্র ছাড়া ভাষণ দেওয়ার সমস্যা হলো মুখ ফসকে দু-চারটে কথা একবার বেরিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। নিউইয়র্কে কোনো অঘটন ঘটেনি, সেখানে তিনি যথার্থই এলেন, ভাষণ দিলেন, জয় করে দেশে ফিরে গেলেন।
ঢাকায়ও তা-ই হতো, কিন্তু যত সমস্যা বাধল আট-দশ শব্দের ওই এক বাক্যে। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে, মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ধরে তিনি বললেন, নারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখিয়েছেন। তাঁর সেই কথা শুনে হলভর্তি মানুষের সে কী হাততালি। সামনের সারিতে দেশের সব বাঘা বাঘা মন্ত্রী, পরের সারিতে বুদ্ধিজীবী, ওপরতলায় কয়েক শ ছাত্রছাত্রী। সবাই ধরে নিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে মস্ত একটা তারিফ করলেন। সম্ভবত মোদি সাহেব নিজেও ভেবেছিলেন, এ কথা বলে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর নিজস্ব কায়দায়—অর্থাৎ বড় ভাইয়ের মতো—কিঞ্চিৎ পিঠ চুলকে দিলেন।
এক দিন পর আমাদের ঠাহর হলো, কথাটা বলে মোদি সাহেব যে শুধু আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নয়, বিশ্বের সব নারীকে খাটো করেছেন। সে কথা আমাদের জানতে হলো ভারতের নারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে, যাঁরা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রধানমন্ত্রীকে ভর্ৎসনা করে এক প্রচারণা শুরু করে দেন।
ইউরোপ–আমেরিকায়ও নারীরা সেই প্রচারে অংশ নেন, নারী হয়েও কোন দেশের কে জগৎজোড়া কী অর্জন করেছেন, তার ফিরিস্তি দেওয়া শুরু করেন। তিনি এ কথাও মনে করিয়ে দিলেন, ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধে ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে, সেই যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন একজন নারী।
বাংলাদেশে এ নিয়ে তখন পর্যন্ত কার্যত টুঁ শব্দটি শোনা যায়নি।
অনুমান করি, মোদি সাহেবের কল্পনাতেও ছিল না যে তারিফ হিসেবে যে কথা তিনি বলেছেন, তার এমন ব্যাখ্যা হবে। ভারতে কেন, উপমহাদেশের সর্বত্র পুরুষেরা ধরেই নেন নেতৃত্ব দেবেন তাঁরা, তা ঘরের ভেতরে হোক বা বাইরে, আর নারীরা তাঁদের পিছু পিছু হাঁটবেন। যদি নারীরা নেতৃত্বের শীর্ষে উঠেই আসেন, তাঁর পেছনে অনিবার্যভাবে থাকবেন কোনো পুরুষ। হয় বাবা, অথবা স্বামী। মোদিই বা এই মানসিকতার ব্যতিক্রম কেন হবেন?
মনে রাখা ভালো, মোদি বিয়ের পর তাঁর স্ত্রীকে ত্যাগ করে বিবাগি হন। নিজে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার পরেও নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন দেখেননি। এ নিয়ে কখনো কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেননি।
মানছি, এটি মোদির একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, এ থেকে সব নারীর প্রতি তাঁর অবজ্ঞা বা ঘৃণা প্রকাশিত হয়, এমন কথা ভাবা অন্যায়। বস্তুত, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নারীদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় তিনি একটি সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছেন। তাঁর ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ আন্দোলন কেবলই লোক দেখানো ব্যাপার নয়। ব্যাংকে অধিক সুদে ‘সুকন্যা সমৃদ্ধি’ অ্যাকাউন্ট খোলার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন, সেটিও শুধু কাগজের শিরোনাম হওয়ার জন্য নয়। ফলে, সেই প্রধানমন্ত্রী যখন প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে এমন অসম্মানজনক মন্তব্য করেন, তখন বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করতেই হয়, ব্যাপারটা কি মুখ ফসকে বলা, নাকি এর পেছনে গভীরতর কোনো কারণ রয়েছে?
এক দিন পর আমাদের ঠাহর হলো, কথাটা বলে মোদি সাহেব যে শুধু আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নয়, বিশ্বের সব নারীকে খাটো করেছেন। সে কথা আমাদের জানতে হলো ভারতের নারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে নারীদের প্রতি উপমহাদেশের পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি যে বৈষম্যমূলক, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। রয়েছে ধর্মের অনুশাসন। সমাজের চোখে নারীরা সেখানে বোঝা ছাড়া অন্য কিছু নয়। ভারতে এখনো অনেক জায়গায় কন্যাশিশু জন্মালে তাকে গলা টিপে মেরে ফেলা হয়। ভারতে এই সেদিন পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ভ্রূণ হত্যায় উৎসাহ জোগানো হতো। আইন করে সেই ব্যবস্থা বাতিল করেছে ভারত সরকার, কিন্তু ভ্রূণ হত্যা একদম বন্ধ হয়েছে, এ কথা বলা যাবে না। আর পুরুষদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে
মেয়েশিশু যদি জন্মগ্রহণ করত, তো তারা অনভিপ্রেত, এই ভর্ৎসনা আজন্ম বয়ে বেড়াতে হয় তাদের। বছর দুয়েক আগে এক ভারতীয় শ্বশুর তার পুত্রবধূর ঘরে মেয়ে আসছে জেনে সাত মাসের পোয়াতি মেয়েটির শরীরে এইচআইভি এইডসের দূষিত রক্ত ঢুকিয়ে দেন। তঁাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর মুখের ভাবখানা ছিল, কাজটা তো তিনি মা-মেয়ে উভয়ের ভালোর জন্যই করেছেন!
নারীদের সামনে ঘরের ভেতরে যেমন, তেমনি ঘরের বাইরেও পদে পদে বাধা ও বৈষম্য। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের উদাহরণ থেকেই বোঝা সম্ভব এই বৈষম্য কতটা গভীরে প্রথিত। সরকারিভাবে বিস্তর চেষ্টা সত্ত্বেও ভারতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের শিক্ষার হার এখনো প্রায় অর্ধেক। স্কুল শুরুর ক্ষেত্রে অধিক সমতা থাকলেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের স্কুল ছেড়ে যাওয়ার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
সেই তুলনায় বাংলাদেশ নারীদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনতে পেরেছে। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। কিন্তু নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির বদল হয়েছে, এ কথা বলা যাবে না। গত পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ও অন্যান্য জায়গায় যে গভীর লজ্জার ঘটনা ঘটে গেল, তার জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল নারীদেরই। অত রাতে তাদের বাইরে থাকার দরকার কী? আর অমন পোশাক পরেই বা তারা যায় কেন?—এ ধরনের নানা কথা বলা হয়। কয়েক বছর আগে সংখ্যালঘু নারীরা ধর্ষিত হয়েছেন, এ কথা শুনে আমাদের জাতীয় সংসদে এক সাংসদ মন্তব্য করেছিলেন, সুযোগ থাকলে তিনিও সে কাজে নেমে পড়তেন। তাঁর সেই কথা শুনে সারা হলঘরে হাসির রোল উঠেছিল।
আসলে শুধু কাগজে-কলমে আইন করে নারীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো যাবে না। দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপারটা মনোগত, ফলে পরিবর্তনটা আসতে হবে আমাদের, বিশেষ করে পুরুষদের মনে। কিন্তু পুরুষেরা তাঁদের মনের দরজায় অনেক আগেই খিল দিয়েছেন, মনোজগতের পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছাই তাঁদের নেই। ফলে যা করার নারীদের নিজেদেরই করতে হবে। আর তার সেরা উপায় হাতে-কলমে এ কথা প্রমাণ করা যে পুরুষদের তুলনায় তারা কোথাও বিন্দুমাত্র পিছিয়ে নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে সে কথার প্রমাণ। গত কয়েক বছরে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের পরীক্ষায় মেয়েদের ফলাফল থেকে স্পষ্ট, হাজারো বাধা সত্ত্বেও মেয়েরা ছেলেদের টপকে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ির চালকের আসনে যখন নারীই বসবেন, তখন যাত্রী হিসেবে পুরুষ কী ভাবল না–ভাবল, তাতে বিন্দুমাত্র হেরফের হবে না।
হাসান ফেরদৌস: নিউইয়র্কে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

তামিম সাকিব নাসিরদের ব্যাটিং অনুশীলন

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের হোম সিরিজ শুরু হবে টি ২০ ম্যাচ দিয়ে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার ও হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের ক্রিকেটাররা লাল ও সবুজ দলে ভাগ হয়ে কাল মিরপুর স্টেডিয়ামে একটি টি ২০ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছেন। প্রস্তুতি ম্যাচে তামিম ইকবাল, নাসির হোসেন, সাকিব আল হাসান ও এনামুল হক ব্যাটিং প্রস্তুতি সেরে নিলেন। নাসির ও তামিম হাফ সেঞ্চুরি করেন। ভারতের বিপক্ষে সিরিজ শেষে বাংলাদেশ দল চার দিনের বিশ্রাম শেষে সোমবার অনুশীলন শুরু করেছে। মিরপুর স্টেডিয়ামে দুপুরে শুরু হওয়া টি ২০ ক্রিকেটে মাশরাফি মুর্তজার লাল দল প্রথমে ব্যাট করে নয় উইকেটে ১৩৬ রান করে। সর্বোচ্চ ৫৭ রান করেন নাসির হোসেন। তার ৪৩ বলের ইনিংসে ছিল সাতটি চারের মার। সাকিব আল হাসানের সবুজ দলের তামিম ইকবাল ও এনামুল হক দুর্দান্ত শুরু করেন।
তামিম ৩০ বলে সাত চার ও দুই ছয়ে ৫২ রান করেন। মাত্র ১২ ওভারে সবুজ দল ১২৮ রান তুলে ফেললে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে লক্ষ্যটা বাড়িয়ে ১৯৬ করে দেন। ২০ ওভার শেষে সবুজ দল সাত উইকেটে ১৯৯ রান তোলে। এনামুল হক ৩২ বলে ৪৮ এবং সাকিব ৪৩ রান করেন। দুটি করে উইকেট নেন সাব্বির ও আবুল হাসান। জয়-পরাজয় এ ম্যাচে মুখ্য না হলেও নিজেদের ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন ব্যাটসম্যানরা। উইকেটকিপিংয়ের সময় লিটন কুমার মুস্তাফিজুর রহমানের একটি বল ঠেকাতে গিয়ে আঙুলে চোট পেলেও তা গুরুতর কিছু নয়। প্রথম টি ২০ ম্যাচের আগে আরও চার দিন অনুশীলনের সুযোগ পাবেন মাশরাফিরা। ৫ জুলাই মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম টি ২০ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। একই মাঠে ৭ জুলাই দ্বিতীয় ও শেষ টি ২০। বিসিবি আজ বাংলাদেশ টি ২০ দল ঘোষণা করতে পারে।

পরিকল্পনা করে কিছু হয় না

* বর্তমান ব্যস্ততা কি নিয়ে?
**আগের কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো করছি। এছাড়া ঈদের জন্য গোলাম সোহরাব দোদুল, রাসেল সিকদার, শাফায়াত নেসুসহ কয়েকজনের পরিচালনায় কাজ করছি। সামনে আরও কিছু কাজের কথা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করছি।
* এর আগে কোন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেছেন?
**এর আগে রান্না বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেছিলাম। এরপর আর করা হয়নি। এখন সৌন্দর্য বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি।
* হঠাৎ করে উপস্থাপনা করার কারণ কী?
**বিশেষ কোনো কারণ নেই। অভিনয় তো সবসময় করি। পাশাপাশি উপস্থাপনা করতেও ভালোলাগে। এই ভালোলাগা থেকেই উপস্থাপনা করছি।
* কি ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন?
**এটি একটি সৌন্দর্য বিষয়ক অনুষ্ঠান। যেখানে প্রতিদিন একজন করে অতিথি আসবেন। তারা সৌন্দর্য বিষয়ে নানা রকম কথা বলবেন। কীভাবে সুন্দর থাকা যায়।
* অভিনয় নিয়ে আগামীর পরিকল্পনা কী?
**পরিকল্পনা করে আসলে কিছু করা হয় না। নিজের পছন্দ মতো কাজ করছি। সামনে ভালো মানের কাজ করতে চাই। ভালোভাবে অভিনয় নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। য় সাদিয়া ন্যান্সি

আওয়ামী লীগ নিজেকে বদলাতে পেরেছে কি? by মহিউদ্দিন আহমদ

আজ বাংলাদেশে একটি শিশুর জন্ম হলে এটাই ধরে নেওয়া হবে যে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৬৮ বছর। চল্লিশের দশকে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল চল্লিশের নিচে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে।
এই টিকে থাকার সম্ভাবনা বা টেকসই হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি খুবই অনিশ্চিত রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে। একটি দল হয়তো হঠাৎ গজিয়ে ওঠে। আবার কয়েক দিন পর তা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। দেশে সাইনবোর্ড আর প্যাডসর্বস্ব দলের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে ব্যতিক্রম কেবল আওয়ামী লীগ। আজ তার ৬৭তম জন্মদিন। কালের বিবর্তনে টেকসই হয়ে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন।
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। কাকতালীয় হলেও এ দেশের ইতিহাসে দিনটি উল্লেখযোগ্য। ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর আমবাগানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীকে হারিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা বাংলা দখল করে নিয়েছিল। ১৯৪৯ সালের এই দিনে যখন আওয়ামী লীগ ভূমিষ্ঠ হলো, তখন কে ভেবেছিল যে এই দলের হাত ধরে একদিন বাংলা মুক্ত হবে?
ঢাকার নবাবপুরে মুসলিম লীগের কর্মীরাই আওয়ামী লীগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম লীগকে একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। ঢাকার কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেনের দোতলার হলঘরে আজকের এই দিনে ৬৬ বছর আগে ২৫০ থেকে ৩০০ প্রতিনিধির এক সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ৪০ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি তৈরি হলো। ‘আওয়ামী লীগ’ নামটা প্রস্তাব করেছিলেন মাওলানা ভাসানী। প্রথম কমিটির নির্বাহীদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ভাসানী (সভাপতি); আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমেদ খান, আলী আমজাদ খান ও আবদুস সালাম খান (সহসভাপতি); শামসুল হক (সাধারণ সম্পাদক); শেখ মুজিবুর রহমান (যুগ্ম সম্পাদক); খন্দকার মোশতাক আহমদ, এ কে এম রফিকুল হোসেন (সহসম্পাদক) এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান (কোষাধ্যক্ষ)। শেখ মুজিব তখন ‘নিরাপত্তা আইনে’ জেলে আটক ছিলেন।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৯৫২ সালে শেখ মুজিব দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৩ সালে দলের প্রথম কাউন্সিল সভায় শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ভাসানী-মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্রুত দেশের আনাচে–কানাচে সংগঠন গড়ে তোলে এবং ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ তখন শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট’ করেছিল। ফজলুল হকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ক্ষমতার সম্মিলনে এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ধরাশায়ী হয়।
১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে একে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানী দলের একটি অংশ নিয়ে বেরিয়ে যান এবং ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) নামে নতুন সংগঠন তৈরি করেন। বলা যায়, তখন থেকেই আওয়ামী লীগে শেখ মুজিবের নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পথকে চার পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্বটি ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। মাঝে আওয়ামী লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ১৩ মাস (১৯৫৬–৫৭ সালে) এবং প্রদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে) কয়েক মেয়াদে প্রায় দুই বছর সরকার পরিচালনা করলেও বাকি সময় ছিল বিরোধী দলে। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিব আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা রূপরেখা ঘোষণা করলে এ দেশে রাজনীতির ব্যাকরণ আমূল পাল্টে যায়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ নামের একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একাত্তর সাল আমাদের সবচেয়ে আনন্দের, গৌরবের ক্ষণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেদনারও। স্বাধীনতার জন্য এ দেশের সাধারণ মানুষকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। সংখ্যা দিয়ে তার গুরুত্ব নির্ধারণ করা যাবে না।
১৯৪৯-৭১ পর্বটি ছিল আমাদের একটি জাতি হিসেবে জেগে ওঠার সময়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থানপর্ব। একই সময়ে এটা ছিল শেখ মুজিবের ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠা। প্রচণ্ড ঘ্রাণশক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির প্রধান নেতা, আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাঁর হাত ধরে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার সিঁড়ি একটা একটা করে পার হয়েছিল।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বলা যায় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় পর্ব। দলটি ইতিমধ্যে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। রাজপথের আন্দোলন থেকে পৌঁছে গেছে ক্ষমতার অন্দরমহলে। এই সাড়ে তিন বছরে দলটির অর্জন অনেক। আমরা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একটা সংবিধান পেলাম। বাংলাদেশ বিশ্বসভায় আপন মর্যাদায় স্বীকৃতি পেল। ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো নতুন করে তৈরি হলো। কিন্তু দেশ পড়ে গেল রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সহিংসতার চক্রে। দলটি ক্রমেই হয়ে উঠল অসহিষ্ণু। বাকশাল নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হলো। ‘সুশাসন’ ক্রমে নির্বাসিত হলো। দলের মধ্যকার চাটুকার ও বশংবদ বুদ্ধিজীবীরা শেখ মুজিবকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। দেশটা যে তিন-চার বছরে অনেক বদলে গেছে, তিনি তা বুঝতেই পারেননি। এই সুযোগে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা পকেটে পুরে ফেলল। শেখ মুজিব সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হলেন।
১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্ট থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দলটি তৃতীয় পর্ব পার করল। রাজনীতি তখন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সামরিক বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছিল। ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ আবার দল গোছানো শুরু করে। তার পরও ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছিল না। ১৯৮০ সালের মে মাসে শেখ হাসিনা দীর্ঘ প্রবাসজীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন এবং দলের হাল ধরেন। ফলে দলটি আবার কোমর সোজা করে উঠে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগ এ সময় যুগপৎ সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ক্ষমতার অংশীদার হওয়া—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল নেয়।
১৯৯১ সালে এ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় আওয়ামী লীগের চতুর্থ পর্ব। এই পর্বে আওয়ামী লীগ কখনো হয়েছে প্রধান বিরোধী দল, আবার কখনো এসেছে সরকারে। দলের সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ৩৫ বছর পার করলেন। এটা দলকে যেমন ধারাবাহিকতা দিয়েছে, তেমনি সংকটও তৈরি করেছে। এই সংকটের বিস্ফোরণ ঘটেছিল ‘এক-এগারো’–পরবর্তী সময়ে, যখন শেখ হাসিনাকে দল থেকে ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দলেরই কয়েকজন নেতা। পরে অবশ্য দল ওই সংকট কাটিয়ে উঠেছিল। শেখ হাসিনা একটা কথা বলেছিলেন, ‘আমি ফরগিভ করব, ফরগেট করব না।’ তিনি কথা রেখেছেন। ফলে দলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁর একক নেতৃত্ব। দলের মধ্যে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করা দূরে থাক, সমালোচনা করার সাহসটুকুও কারও নেই। দলের সুস্বাস্থ্যের জন্য এটা ভালো নয়।
১৯৯০-পরবর্তী ২৫ বছরে আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদে সরকারে এসেছে এবং তা এখনো অব্যাহত আছে। দেশ এগিয়েছে অনেক। ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ থেকে দেশের এখন উল্লম্ফন ঘটেছে দুনিয়ার ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে। মানব উন্নয়নের অনেক সূচকে বাংলাদেশ সমমানের অনেক দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। এই অর্জনগুলোর বেশির ভাগই এসেছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে।
টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সক্ষমতা দুটিই অত্যন্ত জরুরি বিষয়। সত্তর ও আশির দশকে নির্বাচন নিয়ে এ দেশে ছেলেখেলা হয়েছে। ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে মানুষ অবাধে ভোট দেওয়ার অনুকূল বাতাবরণ পেয়েছিলেন। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো ছাড়া সবার কাছেই নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়া হোঁচট খেয়েছে বারবার। ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা হয়েছে। অর্জনের কৃতিত্ব যেমন অনেকটাই আওয়ামী লীগের, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হওয়ার দায়ও অনেকটাই আওয়ামী লীগের।
তারপরও বলব, আওয়ামী লীগই এ দেশের একমাত্র সংগঠিত রাজনৈতিক দল, যার কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা অনেক। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমতও প্রবল হচ্ছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে ২০১৩ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে, যেখানে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সব প্রার্থীই পরাজিত হয়েছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা থেকে অনেকটা ছিটকে পড়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হতে পারে, এমন কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দেশে এখন আর নেই। একসময় বিএনপি ছিল আওয়ামী লীগের বিকল্প। আজ দলটি বিতর্কিত এবং বিপর্যস্ত। আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় বিএনপি আবারও যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এটা আওয়ামী লীগের জন্য একাধারে আশীর্বাদ এবং অভিশাপ। কারণ, আওয়ামী লীগ এখন বাধাহীন, বল্গাহীন। অসহিষ্ণুতা আওয়ামী লীগকে গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। অথচ দলটির হওয়া উচিত আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল, দায়িত্ববান ও স্বচ্ছ। দলের ভেতর থেকেই আসতে হবে পরিবর্তন। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, যারা একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ডুবিয়েছিল, তাদের শাখা-প্রশাখা এখনো ক্ষমতার বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছে। চাটুকার ও বর্ণচোরারা এখন সবাই ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হয়ে গেছেন। এটা আওয়ামী লীগের জন্য ঘোরতর বিপদ ডেকে আনবে।
হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এ দেশে একসময় বড় বড় রাজনৈতিক দল ছিল। যেমন: মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ ইত্যাদি। এগুলো আজ ছিন্নভিন্ন। কয়েকটি দলকে তো বিলীয়মান প্রজাতির তালিকায় অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে। অথচ প্রবল প্রতাপে টিকে আছে আওয়ামী লীগ। কেননা, শুরু থেকেই এটা ছিল জনগণের দল, গরিব মানুষের দল। আবার এটাও সত্য যে নির্ভরযোগ্য বিকল্প না থাকার কারণে মানুষ অনন্যোপায় হয়ে আওয়ামী লীগকে আরও কিছুকাল সমর্থন দিয়ে যাবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর ফল শুভ হবে না। আওয়ামী লীগকে বদলাতে হবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের’ কথা বলেছিল। তখন এটাই ছিল সবচেয়ে সময়োপযোগী স্লোগান। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিজেকে বদলাতে পেরেছে কি? দলটি সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাছে অনুগত হোক। রাজনৈতিক ভাঁড়দের কবল থেকে দলটি মুক্ত হোক। আওয়ামী লীগের জন্মদিনে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক-গবেষক।
mohi2005@gmail.com

তিন মাসেও অধরা জহির, আতঙ্কে শীতাংশু by কমল জোহা খান

জহির আহমেদ
কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস
‘তিন মাস চলে গেছে একমাত্র আসামি জহির গ্রেপ্তার হয়নি। তাই আতঙ্কের মধ্যেই অফিস করছি। ঘরে ফিরলেও এই আতঙ্ক কাটে না।’ তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ীতে নিজ কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপপরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাস। যদিও ঘটনার পর মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শিগগির জহিরকে ধরা সম্ভব হবে।
মোহাম্মদপুরের নিজ ফ্ল্যাটে গত ৩০ মার্চ রাতে শীতাংশু শেখরের স্ত্রী কলেজ শিক্ষিকা কৃষ্ণা কাবেরী বিশ্বাস (৩৫) খুন হন। হত্যাকারীর হামলায় শীতাংশু ও তাঁর দুই মেয়ে শ্রোভনা বিশ্বাস (১৫) ও অদিতিয়া বিশ্বাস (৮) মারাত্মক আহত হন। তিনজনকে প্রায় এক মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এই ঘটনায় প্রধান ও একমাত্র অভিযুক্ত জহির আহমেদ। কিন্তু জহির এ ঘটনা কেন ঘটালেন তা এখনো বুঝতে পারছেন না শীতাংশু। জহির আহমেদ কাজ করতেন হাজি আহমেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জের গুলশান শাখায়। কিন্তু ঘটনার পর থেকে হত্যাকাণ্ডের পর থেকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। এই গুলশান শাখাটি বন্ধ রয়েছে বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার কিছুদিন পরও জহির বিভিন্ন নম্বর দিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতেন। কিন্তু এখন সেসব নম্বর বন্ধ।’ তবে জহির দেশেই আছেন বলে দেলোয়ার মনে করেন।
এদিকে মেসার্স হাজি আহমেদ ব্রাদার্সের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির বনানী শাখার ব্যবস্থাপক শামসুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কাজের সুবিধার জন্য গুলশান শাখা বন্ধ করে মহাখালীতে নতুন অফিস করা হয়েছে। হত্যার ঘটনার পর থেকে জহির পলাতক আছেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ নেই।’
জহির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে শামসুল ইসলাম মেসার্স হাজি আহমেদ ব্রাদার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আয়েশা দাদার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আয়েশা দাদার দেশের বাইরে আছেন।
এদিকে শীতাংশু জানিয়েছিলেন, জমানো কিছু টাকা দিয়ে আইডিএলসি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ নামে একটি ব্রোকারেজ হাউসে স্ত্রী ও তাঁর নামে দুটি বিও অ্যাকাউন্ট খোলেন তিনি। আইডিএলসিতে জহির কাজ করতেন। সেখানে তাঁর নয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করা ছিল। এই দুটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা করতেন জহির আহমেদ। পরে হাজি আহমেদ ব্রাদার্সে ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন জহির। লেনদেনের সুবিধার জন্য বিও অ্যাকাউন্ট দুটি ওই প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের কথা শীতাংশুকে জানান জহির। এ সংক্রান্ত কাগজ নিয়ে ঘটনার দিন রাতে এসেছিলেন জহির।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর পুঁজি বাজারের ব্যবসা সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যের ব্যাপারে শীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, ‘আমি বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছি। ফিন্যান্সে এমবিএ করেছি। ২৫ বছর ধরে চাকরি করছি। পৈত্রিক সম্পত্তি আছে গ্রামের বাড়িতে। আমি নয় লাখ জোগাড় করতে পারি না? অথচ লেখা হয়েছে আমার নাকি ১৫ কোটি টাকা পুঁজিবাজারে খাটছে।’

অর্থনীতি- ইউরোপের শেষ কাজ by জোসেফ ই স্টিগলিৎজ

গ্রিস সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সরকারগুলো বিপজ্জনক নীতি অনুসরণ করেই চলেছে। গ্রিস তার ঋণদাতাদের দাবির অর্ধেকের বেশি মিটিয়েছে। তারপরও জার্মানি ও গ্রিসের অন্য ঋণদাতারা দাবি করেই চলেছেন যে দেশটি এমন নীতি গ্রহণ করুক, যা ইতিমধ্যে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। আর খুব কম অর্থনীতিবিদই ভেবেছেন, এটা কখনো বাস্তবায়িত হতে পারে, হওয়া উচিত বা হবে।
গ্রিস তার রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তন এনে প্রাথমিক ঘাটতি থেকে যে বিশাল উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে, তা নজিরবিহীন। কিন্তু দেশটি মোট দেশজ উৎপাদনের ৪ দশমিক ৫ ভাগ উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করুক, এই দাবি একেবারেই অবিবেচকের মতো। কিন্তু ‘ট্রয়কা’ অর্থাৎ ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গ্রিসের জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক কর্মসূচি প্রণয়নের সময় এই দায়িত্বজ্ঞানহীন দাবি তুলেছিল। তখন অবশ্য দেশটির তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
এই নীতিতে অটল থাকাটা ভুল ছিল, গ্রিস এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ফলে সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রিসের মোট দেশজ উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে গেছে। ট্রয়কা যে কর্মসূচি গ্রিসের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল, সামষ্টিক অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে তাদের ধারণা ভুল ছিল। প্রকাশিত ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে তারা বিশ্বাস করত, মজুরি কমিয়ে দিয়ে ও অন্যান্য কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করলে গ্রিসের রপ্তানি বাড়বে, আর দেশটি শিগগিরই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারবে। তারা আরও বিশ্বাস করত, প্রথম ঋণ পুনঃকাঠামো কর্মসূচি ঋণকে আরও টেকসই করবে।
ট্রয়কার ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে, শুধু একবার না, বারবারই তা ভুল প্রমাণিত হয়েছ। আবার সেই ভুলের ব্যাপ্তি ছোট হবে না, অনেক বড়ই হবে। গ্রিসের ভোটাররা সঠিকভাবেই এর পরিবর্তন চেয়েছেন, আবার সরকারও সঠিক। কারণ, তারা একটি মারাত্মকভাবে ভুল নীতি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এ কথা বললে এটাও স্বীকার করতে হয় যে চুক্তি করার সুযোগ আছে। গ্রিস তার লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার করেছে, তারা ধারাবাহিকভাবে সংস্কার করতেই চায়। আর কিছু ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করতে দেশটি ইউরোপের সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছে। গ্রিসের ঋণদাতারা একটু বাস্তবানুগ হলে তা পুরো ইউরোপের জন্যই ভালো হয় এমন মতৈক্যের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারত: কী অর্জন করা যায়, আর সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিভিন্ন রাজস্ব ও কাঠামোগত সংস্কারের কী প্রভাব পড়বে।
ইউরোপের কেউ কেউ বিশেষ করে জার্মানি গ্রিসের ইউরোজোন ত্যাগের ব্যাপারে উদাসীন। তাঁরা দাবি করেন, বাজার ইতিমধ্যে সেই সম্ভাব্য বিচ্ছেদের মূল্য পরিমাপ করেছে। অনেকে আবার এ-ও বলেন, এটা মুদ্রা একীভূতকরণের পক্ষে ভালো।
আমি মনে করি, এমন দৃষ্টিভঙ্গি খুবই তাৎপর্যপূর্ণভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির অবমূল্যায়ন করে। ২০০৮ সালে লেহম্যান ব্রাদার্সের পতনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একই রকম আত্মসন্তুষ্টি দেখা গেছে। মার্কিন ব্যাংকের ভঙ্গুরতা সম্পর্কে মানুষ বহুদিন আগে থেকেই অবগত, অন্তত গত মার্চে বিয়ার স্টার্নস দেউলিয়া হওয়ার পর থেকে এটা স্পষ্ট। তারপরও স্বচ্ছতার অভাবে (এর আংশিক কারণ হচ্ছে আইনের দুর্বলতা) বাজার ও নীতিপ্রণেতা উভয়েই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি।
হ্যাঁ, বটেই দুনিয়ার আর্থিক খাত লেহম্যান পতনের ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর ব্যাংকগুলো এখনো অস্বচ্ছ, ফলে সেগুলো ঝুঁকির মুখে আছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আদতে কী সম্পর্ক বিরাজ করে, তার আদ্যপান্ত এখনো আমরা জানি না। এর মধ্যে অস্বচ্ছ ডেরিভেটিভ ও ঋণ বদলা বদলিজনিত যে সম্পর্ক তাদের মধ্যে আছে, সে ব্যাপারেও আমরা অন্ধকারে।
ইউরোপে আমরা ইতিমধ্যে অপর্যাপ্ত বিধিবিধানের ফলাফল কী হতে পারে, তা দেখেছি। ইউরোজোনের ভুল নকশা সম্পর্কেও আমরা জেনেছি। আমরা জানি, ইউরোজোনের কাঠামো বিচ্যুতিকে উৎসাহিত করে, সমকেন্দ্রাভিমুখতাকে নয়। পুঁজি ও মেধাবী মানুষেরা সংকট-আক্রান্ত অর্থনীতি ত্যাগ করার কারণে এসব দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা কমে যায়। বাজার যখন বুঝতে পারে, ইউরোর মানের সর্পিল পতনের ব্যাপারটি এর কাঠামোর মধ্যেই নিহিত আছে, তখন পরবর্তী সংকটের ক্ষেত্রে পরিণতি খুবই গভীর হয়ে ওঠে। আর আরেকটি সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে, এটা পুঁজিবাদের প্রকৃতিতেই আছে।
ইসিবির প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘির আত্মবিশ্বাসের চালাকি আজ পর্যন্ত কাজেই দিয়েছে। তিনি ২০১২ সালের ঘোষণায় বলেছিলেন, মুদ্রা কর্তৃপক্ষ ইউরো রক্ষা করতে যা যা করা দরকার, তা করবে। কিন্তু ইউরো যে এর সদস্যদের ক্ষেত্রে বাধ্যকরী নয়, এটা জানাজানি হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে এর কার্যকারিতা কমবে। বন্ডের সুদের হার বাড়তে পারে। আর ইউরোপ ও ইসিবির নেতারা যতই নিশ্চয়তা দেন না কেন, কোনোভাবেই এই সুদের হার আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনা যাবে না। কারণ, দুনিয়া এখন জেনে গেছে, ‘প্রয়োজনীয় কাজগুলো’ তারা আর করবে না। গ্রিসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন ভোটের রাজনৈতিক দাবিতে যা উঠে আসবে, তারা শুধু সেটাই করবে।
আমার ভয় হচ্ছে, এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে ইউরোপের সংহতি দুর্বল হতে দেখব। ধারণা ছিল, ইউরো সেই ঐক্যকে সংহত করবে। বাস্তবে এর ফলাফল উল্টোই হলো।
ইউরোপের প্রান্তে একটি দেশ তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে, এটা ইউরোপ বা দুনিয়ার কারও স্বার্থের জন্যই ভালো নয়। বিশেষ করে, এ মুহূর্তে যখন ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা একদম দৃশ্যমান। প্রতিবেশী মধ্যপ্রাচ্যেও নানা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ওদিকে ইউরোপ নব্য আগ্রাসী শক্তি রাশিয়ার গলায় লাগাম দেওয়ার চেষ্টা করছে। আবার চীন এখন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্য, সঞ্চয় ও সার্বিকভাবে (ক্রয়ক্ষমতার সমতা) তারা এখন দুনিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে তারা পশ্চিমের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ফলে এ সময় ইউরোপের সংহতিতে চিড় ধরার অবকাশ নেই।
ইউরোপীয় নেতারা যখন ইউরো সৃষ্টি করেন, তখন তাঁরা নিজেদের স্বপ্নদ্রষ্টা ভাবতেন। নেতারা ভেবেছিলেন, রাজনীতিকদের মতো স্বল্পমেয়াদি দাবির ভিত্তিতে তাঁরা কাজ করছেন না।
দুর্ভাগ্যবশত, অর্থনীতিবিষয়ক বোঝাপড়া তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। আর সে সময়ের রাজনীতির কারণে তাঁদের পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি, যেটা হলে ইউরো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কাজ করত। যদিও একক মুদ্রার নজিরবিহীন সমৃদ্ধি আনার কথা কথা ছিল, সংকটের আগে পুরো ইউরোজোনের জন্য এটা তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক ফলাফল বয়ে এনেছে, এমনটা দেখা যায়নি। যদিও সংকটের পর থেকে প্রতিকূল ফলাফলের ভূরি ভূরি নজির দেখা গেছে।
ইউরোজোনের রাজনৈতিক নেতারা অর্থনীতিবিষয়ক কিঞ্চিত বোঝাপড়ার সঙ্গে তাঁদের ইউরোপীয় সংহতির ধারণা ও এ–বিষয়ক উদ্বেগের মিলন ঘটাতে পারবেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে ইউরোপ ও ইউরোর ভবিষ্যৎ। হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের উত্তর আমরা পেতে শুরু করব।
জোসেফ ই স্টিগলিৎজ
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জোসেফ ই স্টিগলিৎজ: নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ।

বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : তোফায়েল আহমেদ by আব্দুল কাইয়ুম ও ফখরুল ইসলাম

তোফায়েল আহমেদ
চারদেশীয় মোটরযান চুক্তির পর আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো মুখোমুখি হয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুমফখরুল ইসলাম
প্রথম আলো : আগেরবার যখন মন্ত্রী ছিলেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর চুক্তি করেও কিন্তু সফল হতে পারেননি। এখন করলেন চারদেশীয় চুক্তি। এবারও কি আগের মতো সমস্যা হতে পারে?
তোফায়েল আহমেদ: আসলে ১৯৯৬ সালে আমি যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন নেপালের বাণিজ্যমন্ত্রী ও আমি মিলে পঞ্চগড়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর উদ্বোধন করেছিলাম। পরে সেটা কার্যকর হয়নি। কারণ, ভারতের সঙ্গে তখন সংযুক্তির (কানেকটিভিটি) চুক্তি ছিল না। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে সেই সমস্যার নিরসন হয়েছে। এখন সেই সমস্যা নেই।
প্রথম আলো : ওই সময় নেপালের ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা না থাকায় পণ্য পাঠানো সমস্যা।
তোফায়েল আহমেদ: না। আসল কথা, তখন ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ছিল না। কিন্তু এবার যে চুক্তি হয়েছে, তাতে ভারত, নেপাল ও ভুটানে সরাসরি পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। শুধু তা-ই নয়, এখান থেকে যাত্রীরাও তিন দেশে যাওয়া-আসা করতে পারবেন।
প্রথম আলো : আমাদের পণ্য যাবে, ওদের পণ্য আসবে, নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে না?
তোফায়েল আহমেদ: এখন তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। আমাদের অংশে যেমন নিরাপত্তার সমস্যা নেই, তাদের অংশেও নেই। তবে এটা ঠিক, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
প্রথম আলো : ব্যাপারটা কি এমন যে আমাদের রাস্তার উন্নয়ন আমরা করব, আর তারা করবে তাদেরটা?
তোফায়েল আহমেদ: ঠিক তা-ই।
প্রথম আলো : আগে বলা হতো নেপাল ও ভুটানের পণ্য মংলা বন্দর দিয়ে আসবে?
তোফায়েল আহমেদ : আমাদের দুইটা বন্দর। তিন দেশই এ দুই বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। তাদের থেকে আমরা রাজস্ব পাব। সিঙ্গাপুরের উন্নতি ও লাভবান হওয়ার কারণ হচ্ছে দেশটির বন্দর বিশ্বের সবাই ব্যবহার করতে পারে। শ্রীলঙ্কাও অন্যদেরও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে লাভবান হচ্ছে। বন্দর শুধু আটকে রাখলে হবে না। তাই বন্দরেরও আমরা আধুনিকায়ন করছি।
প্রথম আলো : আগে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, নেপাল-ভুটানের জন্য মংলা ব্যবহৃত হলে পশ্চিম বাংলার বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
তোফায়েল আহমেদ : না, তা হবে না। যেমন পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছি ভারতের কাছ থেকে। চারদেশীয় চুক্তি যদি কাজে লাগাতে পারি, আমরা লাভবান হব।
প্রথম আলো : চুক্তির ফলে লাভবান বেশি হবে কারা?
তোফায়েল আহমেদ : বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। আজকে বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের যুগে সংযুক্তি ছাড়া কোনো দেশেরই ব্যবসা-বাণিজ্য সফলতা লাভ করে না। এখন আমাদের চার দেশের মধ্যে সংযুক্তি হয়ে গেল। তারপর আমরা জোর দেব বিসিআইএমের ওপর। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার—এই চার দেশের অর্থনৈতিক করিডর থেকেও আমরা সাংঘাতিক লাভবান হব। ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনাও চলছে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) বিনিয়োগ করবে।
প্রথম আলো : অনেকের সন্দেহ যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা আসলেই লাভবান হব কি না?
তোফায়েল আহমেদ : যারা এ দেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি করে, তারাই এসব কথা বলে। তাদের দল বা গোষ্ঠীবিশেষের জন্মই হয়েছে ভারতবিরোধিতা ও মৌলবাদিতার ওপর ভিত্তি করে। এগুলো আসলে স্রেফ ভারতবিরোধিতা।
নরেন্দ্র মোদির সফর দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ৪১ বছরেও যে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন হয়নি, সম্প্রতি ভারত তা সর্বসম্মতভাবে করেছে। তারপর আছে সমুদ্রসীমা। সমুদ্রসীমা নিয়ে মামলা করতে আমরা ইতস্তত করিনি। ভুটান ও নেপালে আমরা সরাসরি যেতে পারতাম না। আজ সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা বিরোধিতা করে, তারা কেন গঙ্গার পানি আনতে পারল না? শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা আনতে পারল না?
প্রথম আলো : ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি তো অনেক বেশি।
তোফায়েল আহমেদ : বাণিজ্য ঘাটতি সব সময় যে ক্ষতি করে, তা নয়। চীনের সঙ্গে আমাদের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য; চীন যদিও বলে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি আছে, পাশাপাশি চীনে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।
আবার ভিন্ন চিত্রটিও দেখুন। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা ৫৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করি, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে করি ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউ কিন্তু সে তুলনায় আমাদের কাছে রপ্তানি কম করে। এই বাণিজ্য ঘাটতির জন্য কি তারা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? প্রায়ই বক্তৃতা দেওয়া হয়, বাণিজ্য ঘাটতি, বাণিজ্য ঘাটতি। আমি চাই, এটা নিয়ে প্রথম আলো লিখুক।
প্রথম আলো : কিন্তু আমাদের রপ্তানি যদি ভারত বা চীনে আরও বাড়ানো যেত ভালো হতো না?
তোফায়েল আহমেদ : তা হতো। কিন্তু আমরা চীন-ভারতের কাছ থেকে পণ্য এনে নিজেরা লাভবান হই। ভারত যদি তুলা, সুতা বা পেঁয়াজ-রসুন ইত্যাদি নিত্যপণ্য আমাদের কাছে বিক্রি না করে, আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। ভারত যদি এখন মনে করে তারা বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? বাংলাদেশ। আর ভারতে রপ্তানি করতে না পারার যে প্রশ্নটি এসেছে, সে বিষয়ে বলব, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক বড়। তাদের পণ্যের দাম কম। সেখানে আমাদের পণ্য রপ্তানি করে তেমন সুবিধা করা সহজ নয়।
প্রথম আলো : তাহলে তো যেখানে রপ্তানি করলে সুবিধা হবে, সেখানেই যাওয়া উচিত।
তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ। সে জন্যই তো আমরা বিদ্যমান বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকা, ব্রাজিল, চিলিতে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) হয়েছে।
প্রথম আলো : ট্রানজিটের শর্তের মধ্যে কি মাশুলের (ফি) হার নির্ধারণের বিষয়ে কিছু বলা আছে?
তোফায়েল আহমেদ : বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ঠিক করা হবে। প্রতিটি দেশের মাশুল-হারের নিজস্ব হিসাব আছে, সেভাবে দিতে হবে। যেমন ইইউতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য যায়। তারা কীভাবে দেয়? এগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে শুল্ক দিতে হবে।
প্রথম আলো : এর আগে প্রয়াত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতউল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিটির একটা সুপারিশ এসেছিল। বলা হয়েছিল, যেহেতু ট্রানজিট দেওয়া হলে ভারতের পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে ৮০ শতাংশ, তাই এর একটা অংশ বাংলাদেশের পাওয়া উচিত।
তোফায়েল আহমেদ : আমরা বিভিন্নভাবে লাভবান হব। যেমন আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত ২০০ কোটি ডলার সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে।
প্রথম আলো : ভারী ট্রাক আসা-যাওয়া করবে, কয়েক দিনের মধ্যে মেরামত করতে হবে। তখন?
তোফায়েল আহমেদ : এটা ঠিক না যে ভারী ট্রাকের কারণে রাস্তা ভেঙে যাবে। আমাদের প্রাণ গ্রুপ ত্রিপুরায় শিল্প করেছে। পূর্ব ভারতের প্রতিটি রাজ্যে প্রাণ পণ্য রপ্তানি করে। ওই রাজ্যগুলোতে আমাদের পণ্য ভারতের পণ্যের চেয়েও বেশি যাবে।
প্রথম আলো : কিন্তু ভারত ট্রানজিট পেলে পূর্ব ভারতে প্রাণ বাজার হারাবে কি না?
তোফায়েল আহমেদ : না, মোটেই না। কারণ, আমরা যত সহজে ও কম ব্যয়ে পূর্ব ভারতে পণ্য পাঠাতে পারব, দিল্লি বা ভারতের অন্য রাজ্য সেই সুবিধা পাবে না।
প্রথম আলো : তিস্তার পানি পেলাম না, অথচ ট্রানজিট দিয়ে দিলাম?
তোফায়েল আহমেদ : তিস্তার পানিও পাব আমরা। শুধু সময়ের ব্যাপার। প্রতিটি দেশেরই রাজনীতি আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুবার ঢাকা সফর করেন। পশ্চিম বাংলা চায় ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর বিষয়টা সমাধান করতে। এটা হলো বাস্তব কথা।
প্রথম আলো : ভারতকে দুইটা বিদ্যুৎকেন্দ্র আমরা দিয়ে দিলাম দরপত্র আহ্বান ছাড়াই। এই সময়ে এসে এমন দায়মুক্তি দেওয়ার দরকার ছিল?
তোফায়েল আহমেদ : দেখুন, বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের দরকার। এখন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোক বিদ্যুৎ পায়। আমরা সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে চাই। কুইক রেন্টাল পাওয়ার যখন চালু করেছি, সমালোচকের কোনো অভাব ছিল না। তখন ছিল ঘরে ঘরে অন্ধকার। আর এখন আলোকিত বাংলাদেশ। কীভাবে হয়েছে?
সমালোচনা করবেন তখন, যদি দেখবেন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনছি। রামপালে আমরা কি এমন কোনো প্রকল্প করব, যা আমাদের স্বার্থের বিরোধী? আমরা কি দেশকে ভালোবাসি না? সবকিছু বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েই করা হচ্ছে।
প্রথম আলো : আপনি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সেই সময়ের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
তোফায়েল আহমেদ : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দেশ স্বাধীন করার। সে জন্য তিনি অনেক জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। ফাঁসির কাষ্ঠে পর্যন্ত গিয়েছেন। তাঁর সেই স্বপ্ন এখন ধীরে ধীরে পূরণ হতে চলেছে। আমরা সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হব এবং ২০৪১ সালের মধ্যে হব উন্নত দেশ।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ : ধন্যবাদ।