Thursday, October 3, 2013

নির্বাচনে মার্কাই কি যোগ্যতার মাপকাঠি? by আহমেদ সুমন

দুর্নীতি দমন কমিশন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৎ ও ভালো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাবে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। এই প্রচারণা নির্দিষ্ট কোনো দলের বা প্রার্থীর পক্ষে নয়। যে দল থেকে যিনিই মনোনয়ন পান না কেন, দুর্নীতি দমন কমিশন ভালো ইমেজের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাবে। সন্দেহ নেই, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগটি যদি বাস্তবে নির্বাচনী মাঠে দেখা যায়, সেটা হবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিপরীত। কারণ প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মার্কা দেখে ভোট দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু আওয়ামী লীগের প্রধান, সেহেতু তিনি নৌকা মার্কা দেখে দলীয় নেতা, কর্মী, সমর্থকদের ভোট দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, যারা বহুল প্রচলিত অর্থে ভাসমান ভোটার, তারা কী দেখে ভোট দেবেন? কোনো মার্কা বা প্রার্থী তো এসব ভোটারের কাছে বিবেচনার বিষয় নয়। প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজই তাদের কাছে মুখ্য। তারা কী করবে? আমরা মনে করি, এই ভোটাররা দলীয় ভোটারদের চেয়ে অগ্রসর ও সংবেদনশীল। আমরা এটাও বিশ্বাস করি, এই ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকেন, সেই প্রার্থী জয়লাভ করেন।
শুধু দলীয় ভোটে জয়লাভ করা যায় না। দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েরই শতকরা ভোটের হার চল্লিশ থেকে চুয়াল্লিশের মধ্যে। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য ভোটের ব্যবধান গড়ে দেন এই ভাসমান ভোটাররাই।
প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা এরই মধ্যে নির্বাচনী জনসংযোগ শুরু করেছেন। উন্নয়নের অঙ্গীকার, ধারাবাহিকতা দরকার বলে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে নৌকা মার্কায় ভোট চাচ্ছেন। সরকারি দলের এই যে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, তার মধ্যে কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে। আর সেটা হল নির্বাচন হবে কী হবে না? আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে কিংবা আদৌ নির্বাচন হবে কি-না, নির্বাচন হলেও সেই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি-না, তা নিয়ে সংশয়, অনিশ্চয়তা কাটছে না বরং দিন দিন বাড়ছে। সরকারি দলের এই যে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা, তা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে পারে। আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোও ভালো প্রার্থী নির্বাচিত করার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। যেসব রাষ্ট্রে শতভাগ লোক শিক্ষিত নয়, সেসব রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর একটা নির্ধারিত মার্কা বা প্রতীক থাকে। ফলে অক্ষরজ্ঞান যাদের নেই, তারা মার্কা দেখে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। সহজ কথায় এই হল মার্কার মাজেজা।
সরকারি দল থেকে এখন প্রার্থীকে বিবেচনা না করে মার্কা দেখে ভোট দেয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্রশ্নটি এখানেই। প্রধানমন্ত্রী গত ১১ সেপ্টেম্বর গণভবনে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, ‘দলের প্রার্থী পছন্দ না হলে তার মুখের দিকে তাকানো দরকার নেই। নৌকা মার্কা দেখে ভোট দেবেন।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, নির্বাচনের সময় যাতে একাধিক প্রার্থিতা সমস্যা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আওয়ামী লীগ এবার আগেভাগেই প্রার্থী মনোনয়নের কাজ শেষ করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী আগত নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি মনে করেন আওয়ামী লীগ অন্য জায়গায় জিতবে, এখানে প্রার্থী পছন্দ হয়নি, তাই তাকে হারিয়ে দেবেন- এসব করলে শুধু দলের নয়, দেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হবে। তাই, নির্বাচনে প্রার্থী নয়, নৌকা মার্কা দেখে ভোট দেবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় চিহ্নিত অপরাধী, কালো টাকার মালিক, চোরাকারবারি, সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক ইত্যাদি ধরনের ব্যক্তিদের দেখা মিলতে পারে।
রাজনীতিতে এখন ভালো লোকের কদর কম। পেশিশক্তি, অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিরাই রাজনীতিতে মহাক্রমশালী। আগে এরা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের চাঁদা দিয়ে নিজেদের কর্ম নিজেরা নির্বিঘেœ সম্পন্ন করত। এখন আর চাঁদা দিয়ে নয়, নিজেরাই রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ক্ষমতার চর্চা করছেন। গণভবনে আগত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লিখিত শ্রেণীর ব্যক্তিরা উৎসাহিত হতে পারেন।
নির্বাচনে মার্কাই কি যোগ্যতার মাপকাঠি? কখনোই তা নয়। মার্কা একটা দলীয় প্রতীক। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতীক মুখ্য বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। আমরা জানি, পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হেরে প্রধানমন্ত্রী আশাহত হয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগের ভালো ইমেজের প্রার্থীরা জনসাধারণের নেতিবাচক ভোটে পরাজিত হয়েছেন। এই নেতিবাচক মনোভাবটা ছিল সরকারের বিরুদ্ধে। এসব নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের এমন কোনো গুণাগুণ ছিল না যে, লোকজন তাদের ভোটের বাক্স ভরে দেবে। এ বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো সেই ভুলটি করছেন। নির্বাচনে মার্কা মূল বিষয় নয়। দেশের অনেক পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে তো মার্কাই থাকে না। সেখানে প্রার্থী দেখে ভোট দেয়া হয়। এদেশের জনসাধারণ যদি শতভাগ শিক্ষিত হতো, সেক্ষেত্রে কোনো নির্বাচনেই প্রতীক বা মার্কার প্রয়োজন হতো না।
শুধু মার্কায় ভোট চাওয়া ‘মার্কা মারা নির্বাচন’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। মার্কার জয়গান কখনোই গণতন্ত্রের জয়গান হতে পারে না। মার্কার কাছে জনসাধারণ প্রত্যাশা-প্রাপ্তির কৈফিয়ত বা জবাবদিহিতা চাইতে পারে না। মার্কা জড় পদার্থ। মার্কা জনপ্রতিনিধিত্ব করতে পারে না, এখানে ব্যক্তি বা প্রার্থীই মুখ্য। এবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী স্লোগান ‘এগিয়ে এসেছি, পিছিয়ে যেতে চাই না’। নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে এই পঙ্ক্তিমালা ভালো। জনসাধারণ এতে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করলে আওয়ামী লীগের জন্য মঙ্গল হতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এই স্লোগানটি জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেবেন। সুতরাং এখানে ব্যক্তি বা প্রার্থী মুখ্য, মার্কা কোনো বার্তা পৌঁছে দিতে পারে না। এ বিষয়টি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।
আহমেদ সুমন : গবেষক ও বিশ্লেষক

অথঃ শিক্ষক রাজনীতি সমাচার ভিসি রাত কাটালেন রাস্তায় by একেএম শাহ নাওয়াজ

স্কুলে ব্যাকরণ শিক্ষক আমাকে একটি লাইনের ব্যাখ্যা করতে বলেছিলেন। তা হচ্ছে, ‘দুঃসংবাদ বেগে ধায়’। আমি সম্ভবত ভালো উত্তর দিতে পারিনি। পরে তাৎপর্য বুঝেছি। আজ সকালে আরও স্পষ্ট হল। পারিবারিক কাজে গত দু’দিন ব্যস্ত ছিলাম। ঢাকা-জাহাঙ্গীরনগর করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকটের শেষ অবস্থার খোঁজ নিতে পারিনি। নিুরুচির শিক্ষক রাজনীতির ধারা দেখে তথ্য জানার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছি। কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে সাফসুতরো রাখার স্বার্থপরের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফোন করলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকর্মী। বললেন, আপনারা তো ভিসি তাড়ানোর নানা কসরৎ আমাদের শেখাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত একজন উপাচার্যকে রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য করলেন! নাকি উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন আপনাদের কষ্টের প্রতি সহমর্মী হয়ে আপনাদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে কষ্ট ভাগ করে নিলেন। তবে মানতেই হবে, এ পর্বে ভিসি সাহেবই জিতে গেলেন।
ধীরে ধীরে আমি সব বিষয় অবহিত হয়ে নিজের অস্তিত্বের দিকে তাকিয়ে দারুণ বিব্রত হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের যা সম্মানহানি হওয়ার, গত কয়েক মাসে তো তা হয়েছেই। নষ্ট ও স্বার্থবাদী শিক্ষক রাজনীতি যে প্রতিদিন নানা অঘটনের জন্ম দিয়ে জ্ঞান কেন্দ্র হিসেবে এতদিনের একটি সুনামধারী প্রতিষ্ঠানকে এতটা কলংকিত করবে, তা ভাবতে ইচ্ছে করেনি। এখন বন্ধু পরিচিতজনদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো মনের জোর আর খুঁজে পাই না। যখন কেউ প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা বলুন তো কী হচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে? সেখানে কি আদৌ লেখাপড়ার পরিবেশ রেখেছেন আপনারা?’ এখন আর জবাব দেই না। হাত জোর করে মাথা নিচু করি।
দু’দিন আগে জ্ঞানরঞ্জন চাকমা ফোন করলেন। তিনি বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন। ফোন করলেন আমাদের ভর্তি পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিষয় জানতে। তার মেয়ে এবার পরীক্ষা দেবে। পরবর্তী প্রশ্নবাণ ছুটে আসবে ভেবে বুক দুরু দুরু করছিল। এলো সেই প্রশ্ন। বললেন, ‘দোস্ত আমাদের মান-সম্মান তো আর রইল না। তোমরা তোমাদের সহকর্মীদের বোঝাও। এসব মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কয়েকজনের নয়। বিশ্ববিদ্যালয় সবার। আমাদের এখানে অনেক অভিভাবক বলছেন, তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের ভর্তি পরীক্ষা দেয়াবে না।’
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মাস্টার্সের ছাত্র। নাম শুভ। এটি তার আসল নাম নয়। তার অনুরোধে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হল। কারণ ভয়, আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতা তার সরাসরি শিক্ষক। তার স্যার ক্লাস নেয়ার সময় পান না, তবে জানলে তার ওপর খক্ষ নামতে পারে। বলল, স্যার, আমাদের সহপাঠী বিনাচিকিৎসায় মারা গেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ অন্য শিক্ষকদের বাসায় ভাংচুর করেছিল। আপনি আমাদের এ কারণে তিরস্কার করেছিলেন। বলেছিলেন, প্রকৃত কারণ না জেনে অমন আচরণ করা ঠিক হয়নি। আন্দোলনের নামে শিক্ষকদের বাসা পর্যন্ত ধাওয়া করা অসভ্যতা। কিন্তু এখন আপনারা আমাদের চেয়ে বড় অন্যায় করছেন। আমরা তো বয়সের কারণে ভুল করতেই পারি। বন্ধুর মৃতদেহ সামনে রেখে উত্তেজিত হয়ে অন্যায় করে ফেলেছি। কিন্তু আপনারা কী করছেন! ভিসিবিরোধী যে আন্দোলন করছেন, তা একান্তই আপনাদের শিক্ষক রাজনীতির সংকীর্ণ বিষয়। অধিকাংশ শিক্ষকের সায় নেই এ আন্দোলনে। রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কোনো ছাত্র সংগঠন এর প্রতি সমর্থন জানায়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিক রাখার জন্য মিছিল করেছে, ব্যানার টানিয়েছে। আর আপনারা একদল শিক্ষক দিনের পর দিন অফিসে বন্দি করে রেখেছিলেন একজন উপাচার্যকে। বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল দেখাতে রেজিস্ট্রারকে দু’দিন ধরে তার অফিস কক্ষে আটকে রেখেছেন। এরপর কথা নেই, বার্তা নেই, নতুন কোনো ঘটনা নেই, উত্তেজনা নেই- তারপরও আপনারা জনাকয়েক চেয়ার পেতে ভিসির বাসভবনের সামনে বসে অশ্লীলভাবে মাইক বাজিয়ে তাকে আর তার পরিবারকে বিরক্ত করছেন। স্যার, মানতে হবে আমরা ছাত্ররা কিন্তু এতটা নিচে নামিনি।
আমি জানি, আমার ছাত্রের প্রশ্নের কোনো জবাব আমার কাছে নেই। তাই মাথা নিচু করলাম। ছাত্রছাত্রীদের সামনে ‘ভালো’ মডেল হয়ে যাচ্ছি আমরা। এবার সহকর্মী ড. এমরান জাহানের কথা বলছি। ভিসি ভবনের উল্টো দিকে মাঠের অপর পাশে তার বাসা। বললেন, আন্দোলনকারী সহকর্মীরা ভিসিকে বিরক্ত করার জন্য জোরে মাইক বাজাচ্ছিলেন। এদিকে পড়ার ব্যাঘাত ঘটছিল আমার মেয়ের। দরজা-জানালা বন্ধ করেও রেহাই পাচ্ছিলাম না। আমি বললাম, ছাত্ররা সন্ত্রাসী করলে সমালোচনা করতেন, এখন এর নৈতিকতাও হারালেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যুক্তিহীন নিুমানের আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য নিয়ে জাতীয় দৈনিকে অনেক লিখেছি। আরও অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু যাদের আত্মচৈতন্যে ফিরে আসা দরকার, তারা গোয়ার্তুমি থেকে ফিরতে পারছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষদের গৌরবময় আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছেন।
আরেকটি গোলমেলে বিষয় যুক্ত হয়েছে এখানে। দুর্বল ইস্যুর ওপর ভর করে পদত্যাগী সাবেক ভিসির অনুগত শিক্ষক গ্র“প নতুন ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য আন্দোলনে নামে। আন্দোলনে একের পর এক নেয়া কর্মসূচি দেখলে বোঝা যায়, এতে প্রতিহিংসাপরায়ণতা কত তীব্র। আগের ভিসির বিরুদ্ধে নানা স্খলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। তাই আন্দোলন ছিল সর্বাত্মক। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন হলেও এ আন্দোলনের কর্মসূচিগুলো তেমনই নেয়া হচ্ছে, যা যা নেয়া হয়েছিল আগের ভিসির বিরুদ্ধে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় এখানে যে, আগের ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন যে বিএনপি গ্র“পের শিক্ষকরা, এবার তারাই নিজেদের রাজনৈতিক লাভ পাওয়ার জন্য হাত মেলালেন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নাম জড়ানো গ্র“পের সহকর্মীদের সঙ্গে। কোনো আদর্শ ধারণ না করে এভাবে তেল-জল একসঙ্গে সাঁতার কাটছে আর নষ্ট করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ।
শিক্ষক রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কিছুসংখ্যক শিক্ষক নিজেদের লাভ, স্বার্থ ও ঈর্ষাকে মূল্য দিতে গিয়ে ক্লাস পরীক্ষা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এরপর নানা সমালোচনার মুখে ক্লাস পরীক্ষার ওপর অবরোধ তুলে নেন। এবার অবরোধ করেন প্রশাসনিক কাজে। শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে এখানেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। নির্বাচিত আইনানুগ ভিসিকে বল প্রয়োগে হলেও তাড়াবেনই। আমার এক সহকর্মী আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে নাকি শুনেছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কেউ বলেছেন- বিনা কারণে সরকারের পক্ষে একজন নির্বাচিত ভিসিকে সরানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ভিসিকে স্বেচ্ছায় সরে যেতে হবে। এই সিগনাল পেয়েই নাকি তারা নানাভাবে উপাচার্যকে বিরক্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন। আমি অবশ্য এ ধারণা সত্য বলে মানতে চাই না। শিক্ষকরা নিশ্চয়ই এতটা নষ্ট হয়ে যাননি।
তবে ক্যাম্পাসে এখন যা ঘটছে, তা ঘটতে দেয়া যায় না। দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো দুষ্টগ্রহ স্বেচ্ছাচারিতার এমন বাজে দৃষ্টান্ত তৈরি করলে তা সার্বিক পরিবেশকে সংকটাপন্ন করে তুলবে। তা শিক্ষা ও গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশকে করে তুলবে কণ্টকাকীর্ণ। তাই ক্যাম্পাস পরিবার তো বটেই, দেশের সব সচেতন মানুষকে সরব হতে হবে অরাজকতা থেকে ক্যাম্পাসকে মুক্ত রাখতে। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্রণী হতে হবে। কোনো পক্ষের স্বেচ্ছাচারিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ভূলুণ্ঠিত হোক, জ্ঞানচর্চার পুণ্যভূমি ভাগাড়ে পরিণত হোক- তা কেউ চাইবে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীর ফোনালাপের শেষ কথা দিয়ে শেষ করি। বললেন, আপনারা ভিসিকে অফিস কক্ষে অবরোধ করে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। এতে প্রভাবিত হয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকেও অবরুদ্ধ করা হয়েছিল। আপনারা রেজিস্ট্রারকে অবরুদ্ধ করেছেন- আমরা হয়তো এ থেকে দীক্ষা নেব। আপনারা ভিসিকে বিরক্ত করার জন্য ভিসি ভবনের পাশে অবস্থান নিয়ে মাইক বাজিয়েছেন। আমরা হয়তো প্রাণিত হয়ে ডিসকো গানের আয়োজন করব। অত্যন্ত শিল্পিত প্রতিবাদ হিসেবে ভিসি সপরিবারে আপনাদের সঙ্গে রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন। আমরা হয়তো ভিসিকে চার দেয়ালের বাইরে বেরুতে দেব না। আপনারা তো সব অপশনই কাজে লাগালেন। এরপর বাকি রইল গায়ে হাত দেয়া। দয়া করে ওটি করবেন না। আমরা এতটা নিতে পারব না, যা দেখছি তাতে এখনই তো আত্মপরিচয় লুকোতে হয়। তখন কী করব!
আমি থ হয়ে গেলাম। বন্ধুর এতসব কথা নিতে পারলাম না। নিজেকে লুকোতে চাইলাম। তাই চরম অভদ্রের মতো আচমকা কেটে দিলাম টেলিফোনের লাইন।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

পোশাক শিল্প রক্ষায় এগিয়ে আসুন by ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে বিশেষ করে দুটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভয়াবহ ও ভীতিকর চক্রের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে- আগামী জাতীয় নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হলে তা সরকার, জনগণ ও সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত হবে কি-না কিংবা আদৌ নির্বাচন হবে কি-না, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বড় ধরনের অঘটন অবশ্যম্ভাবী, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক অবস্থাকে হুমকির দিকে নিয়ে যাবে। সব রাজনৈতিক দলের স্মরণ রাখা উচিত, প্রকৃতি অনির্দিষ্টকালের জন্য শূন্যস্থান খালি রাখে না। কখনও কখনও প্রকৃতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি বড় অশনি সংকেত দৃশ্যমান। দ্বিতীয় অন্য যে ভীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে সেটি হল, পোশাক শিল্পে কর্মরত নর-নারী, যারা একসময় অজপাড়াগাঁয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিল এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শহরে এসে পোশাক শিল্পের বদৌলতে কর্মে যোগ দিয়ে স্বাধীনভাবে একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিল, তাদের কর্ম হারানোর আশংকা। উল্লেখ্য, দেশের প্রায় ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের মধ্যে ৩০ লাখেরও বেশি গ্রাম থেকে আসা শিক্ষাহীন, অনভিজ্ঞ অবলা নারী। তাজরিন গার্মেন্ট ও সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ শ্রমিকদের আবারও কর্মহীন হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী ওইসব দুর্ঘটনার উদ্ধার কাজ এবং বিকৃত লাশের ছবি সরাসরি টেলিভিশনের পর্দায় এবং পত্রিকায় প্রকাশ করা। বিশ্বের প্রধান প্রধান মিডিয়া যেমন- আল জাজিরা, বিবিসি, সিএনএনসহ সব মিডিয়া এ চিত্রগুলো সারাবিশ্বে সম্প্র্রচার করেছে। এসব বিকৃত লাশের ছবি দেখে উন্নত বিশ্বের খুচরা ক্রেতাদের মাঝে বাংলাদেশ সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ক্রয়ের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অনীহা লক্ষণীয়। এছাড়াও একটি চক্র বিশ্বের জনগোষ্ঠীর কাছে এমন একটা বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, বাংলাদেশের পোশাকে গরিবের রক্তের দাগ আছে, যা বাংলাদেশের অনেক অর্জনকে বিলীন করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা অনেক বেশি মাত্রার মর্মান্তিক ছিল। মৃতের সংখ্যা ছিল ৬ হাজারের বেশি। কিন্তু সেদেশের সরকার অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সব এলাকা সেনাবাহিনী কর্তৃক ঘেরাও করে ওই এলাকায় টেলিভিশন, পত্রিকার সাংবাদিক বা জনগণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্বের কোথাও কেউ ওই দুর্ঘটনার উদ্ধারকাজ এবং কোনো বিকৃত লাশের ছবি দেখার সুযোগ পায়নি। বাংলাদেশ সরকারেরও জাতীয় স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু দলীয় রাজনীতির কাছে রাষ্ট্রের এ বৃহত্তর স্বার্থ ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বরং উল্টো প্রতিদিন একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, সংবাদ কর্মী এমন সব মন্তব্য করেছেন, যা থেকে বোঝা গেছে বিষয়টি সম্পর্কে তাদের সম্যক জ্ঞান অনুপস্থিত। ২০০৫ সালে পবিত্র হজের সময় মক্কায় একটি ১২ তলা ভবন ধসে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু সে দেশের সরকার কোনো লাশের ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করেনি। এছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে বিভেদ-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ খাতের শ্রমিকদের বেকার বা কর্মহীন হওয়া থেকে কিভাবে রক্ষা করা যায়, তার একটি ন্যায়সঙ্গত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সবার কর্তব্য এবং এ নিয়ে সব ধরনের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য জরুরিভাবে বন্ধ হওয়া উচিত।
শ্রমিক অধিকার ও তাদের সুযোগ-সুবিধা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে কারখানার ভবন বিল্ডিং কোড অনুযায়ী মানসম্মত হতে হবে। অগ্নি দুর্ঘটনার আশংকা হ্রাস করার প্রয়াস নিতে হবে। এসব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা খুব বেশি দুরূহ কিছু নয়- প্রয়োজন শুধু স্বচ্ছতা, আন্তরিকতা এবং যুগোপযোগী আইন করে দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নেয়া এবং বিশ্ববাসীকে তা জানিয়ে দেয়া। শ্রমিকদের নিরাপদ আবাসন, পরিবেশ, চিকিৎসা এবং তাদের সন্তানদের বিনা খরচে শিক্ষার সুযোগ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী রেশনিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। সেই সঙ্গে শ্রমিকদেরও কর্মদক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
বর্তমান সংসদ পোশাক শিল্প শ্রমিক ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠন করার উদ্দেশ্যে Apparel Workers Welfare Act-2013 আইন করেছে এবং Apparel Workers Welfare Scheme-2013 নামে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর মাধ্যমে ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠন করে নিুোক্ত ব্যবস্থাদি নেয়া গেলে একদিকে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তাদের জীবিকা নির্বাহ সহজতর হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক শিল্পে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠন করা হবে। ওই কারখানা সময় সময় তাদের অবস্থান বোর্ডকে পেশ করবে। বোর্ড আইনের ধারা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার রাখবে। হতে পারে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট বা এর অধিক সদস্য নিয়ে একটি বোর্ড। বিজিএমইএ/বিকেএমইএ’র প্রতিনিধি প্রয়োজনীয় শ্রমিক প্রতিনিধি শ্রম মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন করে মোট দুজন (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), সুশীল সমাজের বিজ্ঞ তিনজন, বিশিষ্ট দুজন ইঞ্জিনিয়ার (একজন ইলেকট্রিক্যাল এবং অন্যজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার), শিপিং এজেন্ট, কনটেইনার অপারেটর, ফ্রেইড ফরোয়ার্ডার, জাহাজ মালিক, ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (মেম্বার পদের নিচে নয়) প্রতিনিধি নিয়ে উপরোক্ত বোর্ডটি গঠন করা যেতে পারে। ওই বোর্ডে সুশীল সমাজের সদস্য থেকে একজন চেয়ারম্যান, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ থেকে দুজন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাকি সদস্যরা বোর্ডের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। উপরোক্ত বোর্ড একজন যোগ্য প্রধান কর্মকর্তা (সিইও) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে, যারা দৈনন্দিন কাজের তদারকি করবেন। এ কাজগুলো করার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে- যা নতুন আইনের ধারা অনুযায়ী শিল্পের ঋণপত্র থেকে একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যাংক কর্তন করে বোর্ডে জমা দেবে এবং এ শিল্পের মাধ্যমে যারা বেনিফিশিয়ারি, তাদের ওপর বোর্ড ন্যায্য হারে কর ধার্য করবে। যেমন- পোশাক শিল্পে আমদানি-রফতানির কারণে শিপিং এজেন্ট, বার্থ অপারেটর, ফ্রেইড ফরোয়ার্ডার, জাহাজ মালিক, ব্যাংক, বীমা ও বন্দর কর্তৃপক্ষ এ শিল্পের কারণে অধিক মাত্রায় ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করছে এবং সে কারণে তাদের ওপর বাধ্যতামূলক কর ধার্য করা যেতে পারে। এছাড়াও সরকার ঋণপত্রের FOB থেকে যে ০.৮০ শতাংশ source tax হিসেবে কর্তন করে- সেখান থেকে ০.৪০ শতাংশ শ্রমিক ওয়েলফেয়ারের জন্য বোর্ডে জমা দেবে। এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশ এবং বড় বড় ক্রেতা আর্থিক সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসার সম্ভাবনাও আছে- যদি আমরা তাদের কাছে যথাযথ প্রস্তাবনা ও যুক্তি তুলে ধরতে পারি।
উপরোক্ত অর্থ আদায় করা হলে তাতে পোশাক শিল্পের প্রত্যেক শ্রমিকের আবাসন, হাসপাতাল, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং তাদের সন্তানদের জন্য স্কুল তৈরি করা অতি সহজে সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে শ্রমিকরা বিনামূল্যে এ সুযোগ ভোগ করবে। সরকার বিভিন্ন এলাকায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরের কিছুটা বাইরে) খাসজমি বা ভূমি অধিগ্রহণ করে বিনামূল্যে জায়গার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, চট্টগ্রাম বন্দরের ডক শ্রমিকদের জন্য যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল। পোশাক শিল্পের বিনিময়ে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে এবং এ শিল্পে ৪০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এ কারণে প্রত্যেক পোশাক শ্রমিকের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যে কোনো কল্যাণমুখী সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক। এ ব্যবস্থাগুলো নেয়া হলে শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহের খরচ বহুলাংশে কমে যাবে।
যুগোপযোগী পোশাক কারখানা নির্মাণের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের প্রান্তে ‘অর্থনৈতিক জোন’ (কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়) করে বিভিন্ন গার্মেন্ট মালিককে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেয়ার ব্যবস্থা অতি দ্রুততার সঙ্গে করা দরকার। এ শিল্প নির্মাণে যৌক্তিক সুদে ব্যাংক কর্তৃক দীর্ঘমেয়াদি প্রজেক্ট ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা নিলে অতি দ্রুততার সঙ্গে বিশ্বমানের কারখানা গড়ে উঠবে অথবা সেখানে বিল্ডিং তৈরি করে ভাড়া পদ্ধতিও গ্রহণ করা যেতে পারে, যেমনটি ইপিজেডে করা হয়েছে। শহর অঞ্চল থেকে শিল্পগুলো বাইরে চলে গেলে একদিকে যানজট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে, অন্যদিকে শহরের পরিবেশ বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে। সমাজের সচেতন নাগরিক, বিজিএমইএ/ বিকেএমইএ ও এফবিসিসিআইকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপরোক্ত সুপারিশের আলোকে বা আরও কোনো উন্নত পদক্ষেপ নিলে তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে।
পরিশেষে সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে, পোশাক শিল্পে ধস নামলে শুধু এ শিল্পের ৪০ লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী নয়, বরং ব্যাংক, বীমাসহ সর্বত্র এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা সামাল দেয়ার ক্ষমতা কারও থাকবে না। গার্মেন্ট মালিকরা হয়তো অন্য কোনো ব্যবসা বা অন্য দেশে নতুন কিছু করার উদ্যোগ নিতে সক্ষম হবেন। কিন্তু অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ শিল্পের গরিব অসহায় শ্রমিকরা। এ পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতকে রক্ষা এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখতে যথাযথ সহযোগিতা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী : সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন

শিশু গৃহদাসী আদুরী ও নিলুফাদের ঠিকানা ঢাকা মহানগরের ডাস্টবিন by মহিউদ্দিন আহমদ

শিশু গৃহদাসী আদুরীর খবর কয়েক দিন ধরে পত্র-পত্রিকা এবং কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে। আর আমার মনে পড়ছে, ১২-১৩ বছর আগের আরেক শিশু গৃহদাসী, একই বয়সের নিলুফার কথা। নিলুফাকে মেরে নিউমার্কেটের পাশের ডাস্টবিনে ফেলে রেখে গিয়েছিল এক গৃহকর্তা। শীতের ভোরে এই দৃশ্যটি দেখে ফেলেছিল ফুটপাতের এক চা দোকানদার। নিলুফার সচিত্র খবরও তখন প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক ভোরের কাগজে। নিলুফার মৃত্যুর খবর শুনে তার মাও ছুটে এসেছিলেন ময়মনসিংহের দূরের কোনো এক গ্রাম থেকে। নিলুফার লাশ গ্রামে নিয়ে দাফন করার সামর্থ্য ছিল না তার মায়ের। তিনি তখন বলেছিলেন, নিলুফার লাশ গ্রামে নিয়ে দাফনের ব্যবস্থাই যদি করতে পারবেন, তাহলে এই শিশুটিকে এত দূরের ঢাকা শহরে, নিষ্ঠুর পরিবেশে বাসায় কাজ করতে কেন পাঠাবেন? নিলুফার মায়ের এমন আর্তনাদে সাড়া দিয়ে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম নিলুফার মা এবং তার লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল। নিলুফার গৃহকর্তা বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে পরিচিত একজন জীবনানন্দ গবেষকের ভাই ছিল, বলেছিলেন ভোরের কাগজের তখনকার বার্তা সম্পাদক অমিত হাবিব। খবরটি পড়ে তখন আমার কাকরাইলের বাসার কাছে, ভোরের কাগজ অফিসে গিয়েছিলাম; শিশুটির মাকে পৌঁছে দেয়ার জন্য দুই হাজার টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু টাকাগুলো নিলুফার মায়ের কাছে পৌঁছেনি, টাকাগুলো কয়েক মাস পর আমার কাছে ফেরত এসেছিল।
আমাদের বাসাবাড়িগুলোতে চার লাখ একুশ হাজার গৃহকর্মী কাজ করছে বলে কয়েক দিন আগে একটি খবরে পড়েছিলাম। এদের বেশির ভাগই শিশু, এবং মেয়েশিশু; এদের ন্যূনতম অধিকারও নেই। বাসার সবার আগে তাকে ঘুম থেকে উঠতে হয়, বাসার সবার পরে তাকে ঘুমাতে যেতে হয়। তার শ্রমঘণ্টা প্রায়ই আঠার-উনিশ এবং কখনও কখনও শুধু পেটে-ভাতে। মা-বাবা, ভাইবোন- কারও সঙ্গে তার কদাচিৎ যোগাযোগ থাকে বা তাকে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়। পরিবারের ছোট শিশুটিসহ প্রায় প্রত্যেকটি লোক তাকে অবজ্ঞা করে, ঘৃণা করে, মারধর করে।
শিশু গৃহদাসী আদুরীর চেহারা গত শনিবার বেলা ২টায় চ্যানেল আইয়ের খবরে দেখছিলাম, তার ছোট্ট অনাহারক্লিষ্ট শরীরের কোনো অঙ্গ বাকি নেই যেখানে ক্ষত, দগদগে দাগ ছিল না। এমন নিষ্ঠুর আচরণ যখন তার ওপর চালানো হচ্ছিল, তখন গৃহকর্ত্রী এবং প্রধান নির্যাতনকারী নওরীন আক্তার নদী ছাড়াও তো ওই বাসায় আরও লোকজন ছিল। কিন্তু তাকে যখন নির্যাতন করা হচ্ছিল দিনের পর দিন, বার বার, বাসার আর কেউই তো বাধা দেয়নি। আদুরী এখনও বেঁচে আছে, হয়তো বেঁচেও যাবে কিন্তু বাঁচতে পারেনি নিলুফা। আদুরীকে দেখতে গত শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদও গিয়েছিলেন। তিনি মনে হচ্ছে দয়াশীল একজন মানুষ। আদুরীর জন্য কিছু ফল-মূলও নিয়ে গিয়েছিলেন, টেলিভিশন এবং পত্র-পত্রিকার খবরে দেখলাম।
অনেক বছর ধরেই একটি প্রশ্ন আমাকে বিচলিত এবং আলোড়িত করে চলেছে। ঢাকার পল্লবীর যে বাসায় আদুরী মাসের পর মাস নির্যাতিত হয়েছে, এই এলাকার জন্য তো নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আছেন, আমাদের এই গণতন্ত্রের দেশে। ওই এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হচ্ছেন কামাল মজুমদার। তিনি কিন্তু আদুরীর কোনো খোঁজখবর রাখেননি, আদুরীকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যাননি। আদুরীর খোঁজখবর নিচ্ছেন না আদুরীর পটুয়াখালী জেলার জৈনকাঠি গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বা চেয়ারম্যান; উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বা ওই এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। আচ্ছা, এসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কি কোনোই দায়িত্ব নেই এসব মানুষের জন্য? আদুরী হয়তো কোনো ভোটার নয়, কিন্তু তার মা শাফিয়া বেগম তো একজন ভোটার।
আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এমনসব নিষ্ঠুর, নির্দয় ঘটনাতেও এতটুকু নড়াচড়া করেন না। তবে মনে পড়ে, শেখ হাসিনার আগের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম এমন নির্যাতিত শিশুদের দেখতে ছুটে যেতেন। তখন গিয়েছিলেন মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম; আর এবার গেলেন পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ। আমার মনে পড়ছে আমাদের একজন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীও আছেন। তার নাম মেহের আফরোজ চুমকি। শিশু ও মহিলাদের কল্যাণ, ভালোমন্দ দেখার জন্য এই প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু তার ‘দিল’ও এতটুকু গলেনি; তিনিও তো শিশু আদুরীকে দেখতে যেতে পারতেন। তার বাবা গাজীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ ময়েজ উদ্দিন আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। এখন আক্রান্ত হচ্ছে কতসব শিশু আততায়ীর হাতে!
কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শিশু আদুরীর খোঁজখবর নেননি, খোঁজখবর নেননি মেহের আফরোজ চুমকিও।
খোঁজখবর নেননি কোনোদিনও এবং এখনও নিচ্ছেন না আমাদের ‘সিভিল সোসাইটি’র কেউ। আমাদের কতসব শিশুসাহিত্যিক আছেন। কিন্তু এতসব নির্যাতনের কাহিনী পড়েও কোনো শিশুসাহিত্যিক একটা লেখা লিখেছেন? তারা তাদের কোনো বক্তৃতায় এসব শিশুর কথা কি উল্লেখ করেছেন বা কোনো বিবৃতি দিয়েছেন? এমন কিছুই মনে পড়ছে না। আমাদের ‘সিভিল সোসাইটি’র সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বা আমাদের শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান মোস্তফা মনোয়ার বা পরিচালক, কেউ কোনোদিন এ ক্ষেত্রে কিছু করেছেন, কেউ কি বলতে পারবেন?
কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম চিত্র নায়িকা মৌসুমী, জাদু শিল্পী জুয়েল আইচ এবং ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ‘ইউনিসেফ’-এর শুভেচ্ছা দূত নির্বাচিত হয়েছেন। ‘ইউনিসেফ’ তো শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। এই তিন শুভেচ্ছা রাষ্ট্রদূতেরও তো কোনো নড়া-চড়া দেখছি না। বস্তুত আমাদের ‘পাবলিক লাইফ’-এর একজন মাত্র বিশিষ্টজন, চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে ১৭-১৮ বছর ধরে কোনো ক্লান্তি ছাড়া আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশের আর কেউ এমন কল্যাণমূলক কোনো কাজে এতটুকু সময় কি দিচ্ছেন? অথচ আমাদের দেশের এতসব বৃহৎ বৃহৎ লোকের এমন অনীহা এবং উদাসীনতার বিপরীতে পশ্চিমা দুনিয়ার সিনেমা, টেলিভিশন এবং খেলাধুলার ‘স্টার’রা শিশু ও প্রবীণদের জন্য কিছু সময় দিয়ে থাকেন। পাশের দেশ ভারতের শচীন টেন্ডুলকার এবং সৌরভ গাঙ্গুলীকেও এমন কাজে আগ্রহী দেখেছি।
খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন ফার্মগেটের এক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম। আট-দশ বছর আগে শিশু গৃহদাসীদের ওপর আমার একটি লেখা পড়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’-এ, চিকিৎসাধীন শিশুদের জন্য কাপড়- চোপড় এবং চকলেট-লজেন্স নিয়ে। দুই-তিন বছর তিনি এমন করেছেন। কিন্তু এখন আর তাকে পাচ্ছি না। শুনেছি তিনি ফার্মগেট থেকে রথখোলায় কোনো এক ফার্মেসিতে আছেন। তার রথখোলার বাসার টেলিফোনে তাকে পাচ্ছি না।
ফার্মগেটের স্টার হার্ডওয়্যারের দোকানটি থেকে ঠিকানা নিয়ে রথখোলায় লোক পাঠিয়েছিলাম, খুঁজে পাওয়া যায়নি। আরেকজন এমন লোক দেখেছিলাম, নিউইয়র্কে আমাদের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত ড. এম এ মোমেন। তিনিও এক ঈদের আগে তার এক সফরকালে আমার একটি লেখা পড়ে শিশুদের জন্য কিছু কাপড়- চোপড়, উপহার সামগ্রী নিয়ে ‘ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’-এ গিয়েছিলেন।
১৯৭৫-৭৬ এ আমাদের জেনেভার দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলাম, তখনকার একটি স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারি না, কোনোদিন ভুলতে পারবও না। পাশের দেশ ইতালিতে কয়েক বছরের একটি শিশু কয়েক ফুট গভীর গর্তে পড়ে যায়। সারা ইউরোপের মিডিয়া শিশুটির উদ্ধার কাজকে গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রচার করতে থাকে। তখন ইতালির প্রেসিডেন্ট গিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে। তিনি তখন বলেছিলেন, মানুষকে চাঁদে পাঠিয়ে ফিরিয়েও আনা হচ্ছে কিন্তু একটি শিশুকে গর্ত থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। কী লজ্জা, কী ব্যর্থতা!
গত পনের বছরে আমি অন্তত দশটি কলাম লিখি এ শিশু গৃহদাসীদের ওপর। কিছুই ইতিবাচক করতে পারিনি। কারও কোনো দৃষ্টি আকর্ষণও করতে পারিনি। তবে এ যুগান্তর পত্রিকায় আট-দশ বছর আগে আমার এমন একটি লেখা পড়ে কবি শামসুর রাহমান কয়েক দিন পর আমাকে সমর্থন জানিয়ে যুগান্তরে একটি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। আর উপরে উল্লিখিত দুজন- জনাব মফিজুল ইসলাম এবং ড. মোমেন, এর বাইরে আমি কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি। শিশু অধিকার নিয়ে আমাদের এ দেশে অনেকগুলো এনজিও কাজ করছে। তবে বাস্তবে এরা একেকজন দোকানদার, সওদাগর। নিলুফার ক্ষেত্রেও এদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি, এখন আদুরীর ক্ষেত্রেও দেখছি না। তবুও আমার দুর্বল কণ্ঠে বলতেই থাকব, চিৎকার করতেই থাকব, দুর্বল হাতে লিখতেই থাকব- এই শিশু গৃহদাসীদের ওপর একটুু রহম করুন।
মহিউদ্দিন আহমদ : সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; কলাম লেখক

‘দোহাই আপা সর্বনাশ হয়ে যাবে’ by আলী রাবাত তারেক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে একটা দিকনির্দেশনা দিতে পারেন এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে।

ও আদুরী...!! by মাজেদুল নয়ন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) মেঝেতে বসে আছেন সাফিয়া বেগম।

রায় ফাঁস ট্রাইব্যুনালের স্বীকার

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার চূড়ান্ত রায়ের খসড়া কপির কিছু অংশ কোন না কোনভাবে ফাঁস হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার।

ইস্পাহানীর নেতৃত্বেই ছাত্রলীগ ক্যাডাররা লুট করে ব্র্যাক ব্যাংকের কোটি টাকা by ওয়েছ খছরু

সুনামগঞ্জ শহরের দুর্ধর্ষ অপরাধী ও ছাত্রলীগ ক্যাডার হাসানুজ্জামান ইস্পাহানীর নেতৃত্বে সিলেট শহরের একটি পেশাদার ছিনতাই চক্র লুটে নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের কোটি টাকা।

প্রধানমন্ত্রী কি আদুরীর কপালেও স্নেহের চুম্বন আঁকবেন? by জিনিয়া জাহিদ

কঙ্কালের মতো ভাগাড়ে পড়ে ছিল আদুরী নামের হাড্ডিসার একটি শিশু। মহানুভব পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে উদ্ধার হয়ে ছোট্ট শিশুটির ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালে।

রিপোর্টার, তোমার সীমান্ত কোথায়? by তুষার আবদুল্লাহ

রিপোর্টারের কাজের সীমানায় কাঁটাতার তোলা হয়নি। খবরের যারা ভোক্তা সেই পাঠক, শ্রোতা, দর্শকের জন্য রিপোর্টার যে কোনো উপায়েই হোক খবর তুলে নিয়ে আসবেন।

এভাবে কি বিচার হয়? by জাকিয়া আহমেদ

যাদের হাতে এ রায় প্রথম দেখা গেছে তারাই এর সঙ্গে জড়িত বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম।

ভারতে গর্ভ ভাড়া শিল্পে রূপ নিচ্ছে

ভারতের গর্ভ ভাড়া (সারোগেসি) বাণিজ্যিক রূপ লাভ করেছে। দিনকে দিনকে মুনাফা অর্জনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে সারোগেসি।

উত্তরাধিকারের হাতে বাঁচবে কি লালুর রাজনীতি?

হারিকেনের আলোটা টিমটিম করে জ্বলছিল। সেই আগুনেই জ্বলে উঠবে হাজার আলোর তারাবাতি, এমনই আশা ছিল তাদের। তাই সব রকম ব্যবস্থা ছিল। দাঁড়িয়েছিল একটা বাজিভর্তি গাড়িও। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সেই গাড়িকে যেন নিঃশব্দে চালিয়ে নিয়ে চলে গেল। কারণ নিভে গিয়েছে সেই হারিকেন। অর্থাৎ আরজেডির প্রধান ভরসা লালুপ্রসাদ যাদব দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ততক্ষণে তাকে কারাগারে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। লালু সব সময়ই ওয়ান-ম্যান শো। তার কারিশমাতেই সব সময় ভোট বৈতরণী পেরিয়েছে তার দল। তাই কখনোই দ্বিতীয় কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নেতা তৈরি হয়নি লালুর দলে। ফলে, তার জেলযাত্রা দলের ক্ষেত্রে এক বিশাল ধাক্কা,
বিশেষত যখন লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। তার অনুপস্থিতি একদিকে তৈরি করছে নেতৃত্বের শূন্যতা, অন্যদিকে উঁকি মারছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনা। সেক্ষেত্রে লোকসভা ভোটের ঠিক আগে কী করে নীতিশের বিহারে আরজেডি ঘর গোছাবে তা নিয়ে বেশ জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে ভাঙলেও মচকাচ্ছেন না আরজেডি নেতৃত্ব। ১৯৯৭ সালে জেলযাত্রার আগে যেভাবে আচমকা স্ত্রী রাবড়ি দেবীকে মুখ্যমন্ত্রী করে গিয়েছিলেন লালু, এবারও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটল। রাবড়ি দেবী এদিন রাতে বলেছেন, যেভাবে সোনিয়া গান্ধী পুত্র রাহুলকে সঙ্গে নিয়ে দল চালাচ্ছেন, আমিও আমার ছেলে তেজস্বীকে নিয়ে একইভাবে দল চালাব।’ এ যে লালুরই কষে দেয়া অংক, তা নিয়ে বিশেষ দ্বিমত নেই রাজনৈতিক মহলেও। কারণ লালু চাইছেন, তার জায়গায় স্বচ্ছ ভাবমূর্তি নিয়ে উঠে আসুক তার ছেলে আর পরের বিধানসভায় সেই ভাবমূর্তিকে কাজে লাগাক দল। হিসাব মতো লালু এখন ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ শীর্ষ আদালতের নির্দেশে দোষীরা জেল থেকে লড়তে পারবেন না। এই মেঘের আড়ালেও তাই রুপালি রেখা দেখছে তার দল। প্রভুনাথ সিংয়ের দাবি, ‘যত বার লালুপ্রসাদ জেলে গিয়েছেন, ততবারই দল লাভবান হয়েছে। ১৯৭৭ সালে লালু জেল থেকে ফিরে এসে লোকসভায় জেতেন। বিহারেও তিনি তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছিলেন জেল থেকে ফিরে আসার পরই। তাই আমরা চাই উনি জেলে যান, ফিরে এসে উনিই ফের বসবেন রাজ্যের মসনদে!’ এ কথায় যদিও চমকেছেন দলীয় অনেক সমর্থকই।
তবে আরজেডিকে ভাবাচ্ছে অন্য একটা বিষয়, তা হলো এবার কংগ্রেস কোন পথে হাঁটবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আরজেডি নেতা বললেন, ‘এই মুহূর্তে নীতিশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো জায়গায় আর থাকছেন না লালু। ফলে কংগ্রেস স্বাভাবিকভাবেই এখন নীতিশকে পাশে পেতে চাইবে।’ ১৭ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে জেডিইউ এখন কংগ্রেসের দিকেই ঝুঁকে। আর দুঃসময়ে কংগ্রেস এখন কেনই বা আরজেডির পাশে থাকবে, আসছে সে প্রশ্নও। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, কংগ্রেস এখন সব রাজ্যেই লাভজনক জোটসঙ্গী খুঁজছে। জনমত সমীক্ষা যতই বলুক না কেন, আরজেডির আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফল করার সম্ভাবনা রয়েছে, কংগ্রেস কিন্তু মনে করছে নীতিশেরই পাল্লা ভারি। এতদিন সরাসরি দু’পক্ষ কেউ কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু লালুর দোষী সাব্যস্ত হওয়া সে বিষয়টাকেও অনেকটা সহজ করে দিল। তাই আরজেডি মনে করছে, কংগ্রেস এখন নতুন বন্ধুতেই বেশি আগ্রহী হবে। হাত গুটিয়ে বসে নেই বিজেপিও। আরজেডি ভোটের ভিত্তি ছিল যাদব ও মুসলিম ভোট। সেই যাদব ভোট, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯ শতাংশ। সেই ভোট টানার চেষ্টা বিহারে সঙ্গিহীন বিজেপির। আর জেডিইউর সহজ অংক। তারা কংগ্রেসের সঙ্গে যাক বা একলা চলুক, তাদের লক্ষ্য এখন ১৭ শতাংশ মুসলিম ভোট।