Showing posts with label শাহাদুজ্জামান. Show all posts
Showing posts with label শাহাদুজ্জামান. Show all posts

Friday, April 24, 2015

ক্ষত যত ক্ষতি যত by শাহাদুজ্জামান

এই কথা প্রকাশ থাকুক যে এবারের পয়লা বৈশাখে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে শুধু নারীরা নন, লাঞ্ছিত হয়েছে এই দেশ, লাঞ্ছিত হয়েছে পুরুষ প্রজাতি। মনে পড়ছে, ২০০০ সালে নতুন শতাব্দী উদ্যাপনের সেই রাতে এমন এক ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলাম, লিখেছিলেন আরও অনেকে, বন্ধুবর চিত্রকর ঢালী আল মামুন এঁকেছিল মর্মস্পর্শী এক পেইন্টিং। কিন্তু শিল্পীর তুলি, লেখকের কলম আর কতটুকু ঠেকাতে পারে পতন? এবার সে ঘটনা ঘটেছে আরও বহুগুণ মাত্রায়। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না বহিরাগত, তারা কি একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্য? এসব তর্ক চলছে। তবে একটা বিষয় তর্কাতীত যে যারা ব্যাপারটা ঘটিয়েছে তারা সবাই পুরুষ। এক বিশেষ ধরনের পুরুষ। বিষয় নেহাত শ্লীলতা, অশ্লীলতার নয়, বিষয় আরও গভীর।
সমাজবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন কম্পিটেন্সি’ বলে। এই ধারণায় ঠিক যৌন আচরণ অর্থে নয়, বৃহত্তর অর্থে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সুস্থ আচরণের ক্ষমতাকে বোঝানো হয়। বলা হয়, যেভাবে অক্ষরজ্ঞান শিখতে হয়, কম্পিউটার শিখতে হয় সেভাবে, কোনো বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে মোকাবিলারও একটা শিক্ষা আছে। সে শিক্ষা পরোক্ষভাবে পরিবার থেকে আসে, পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া রুচিবোধ, নীতিবোধ থেকে আসে, আসে ধর্মবোধ থেকেও। অনেক ক্ষেত্রে এই বিষয়ের ওপর প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও তা অর্জন করার ব্যবস্থা করা হয়। যেসব পুরুষের কোনো সূত্র থেকেই সেই শিক্ষাটা আসে না, তারা পরিণত হয় প্রবৃত্তিসর্বস্ব, লিঙ্গসর্বস্ব এক একটা বেকুব জন্তুতে। পয়লা বৈশাখে টিএসসির মোড়ে জড়ো হয়েছিল তেমন কিছু বেকুব জন্তু। নানা ভিড়ভাট্টায় এই সব জন্তু যে চোরাগোপ্তা থাকে, তা সুবিদিত। জন্তুরা সচরাচর ভীত থাকে, আড়ালে থাকে কিন্তু এবারের পয়লা বৈশাখের ঘটনায় যা অভিনব তা হচ্ছে সেই সব বীভৎস জীব তাদের গুহা থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে বাদ্য বাজিয়ে, বিপুল জনসমাগমে তাদের পশুত্বের প্রদর্শনী করেছে।
এ ঘটনা আমাদের আরও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়। এই যে এরা প্রায় ঘণ্টাজুড়ে জনসমক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে যেতে পারল, সেই পারার সাহস এবং আস্থার উৎসটা কোথায়? সাহসের উৎস কি এই বিশ্বাস যে জনসমক্ষে যত বর্বরতাই ঘটুক সাধারণ মানুষ তাতে বাধা দিতে আসবে না? তার প্রমাণ তো আছে কিছুকাল আগে ঘটে যাওয়া অভিজিৎ হত্যার সময়েই। সাধারণ মানুষ শুধু নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও থাকবে নিষ্ক্রিয়, এই আস্থাও কি ছিল তাদের? যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা যদি এলাকায় বহিরাগত হয়ে থাকে তাহলে এসব বিশ্বাস, আস্থা তাদের এমন ঘৃণ্য কাজ করার সাহস জোগানোর কথা।
আর তারা যদি ক্যাম্পাসের ভেতরেরই হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে সেই সাহসের জোরটা তো হওয়ার কথা আরও বেশি। কিংবা ব্যাপারটা কি এমন যে কোনো এক গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই পাশবিকতা ঘটিয়েছে পয়লা বৈশাখের প্রেরণাকে ধ্বংস করার জন্য? সেটা অসম্ভব নয়, কারণ বৈশাখী মেলায় বোমা ফাটিয়ে মানুষ হত্যার মতো বীভৎস নৃশংসতার মাধ্যমে এমন চেষ্টা অতীতে হয়েছে। আমরা এও লক্ষ করছি যে দেশের ভেতর একটা সাংস্কৃতিক মেরুকরণ চলছে কিছুকাল। মেয়েরা তাদের পোশাক, আচরণ ইত্যাদি দিয়ে পুরুষদের বর্বর আচরণে প্ররোচিত করে—এমন কুযুক্তি দেওয়ার মানুষও এ দেশে কম নেই। ফলে নারীর ওপর এই আক্রমণ একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা পৌঁছানোর উদ্যোগও হতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। লিঙ্গ রাজনীতি কী করে আরও বৃহত্তর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।
মনস্তাত্ত্বিকেরা এও দেখিয়েছেন সংঘবদ্ধভাবে নারীর ওপর পুরুষের এই ধরনের আক্রমণের পেছনে যৌন তৃপ্তি নয়, বরং আছে শক্তি প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা। একজনকে দুর্বল অবস্থানে কোণঠাসা করে এ ধরনের শক্তি প্রদর্শনের ভেতর আছে সীমাহীন দেউলিয়াপনা, কাঙালপনা, হীনম্মন্যতা। ভাবনার ব্যাপার এই যে আমাদের এই সমাজ, পরিবার এমন হীন দেউলিয়া, জঘন্য পুরুষদের বেড়ে উঠতে সুযোগ দিয়েছে আর সেই সঙ্গে বেদনার এই যে, আমাদের রাষ্ট্র এই জন্তু পুরুষদের হাত থেকে নারীদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
কিন্তু পয়লা বৈশাখের এই বর্বরতা এই অনুষ্ঠানের প্রেরণাকে বন্ধ করবে, নারীদের শঙ্কাহীন চলাচলকে রুদ্ধ করবে—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বৈশাখী মেলায় বোমা বিস্ফোরণও মানুষের ঢলকে কিছুমাত্র কমায়নি। লিঙ্গান্ধ জান্তব পুরুষদের হাত থেকে বিপন্ন নারীকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে মানবিক পুরুষই। লেখিকা পুরবী বসু তাঁর এক লেখায় প্রত্যাশা করেছেন যে তরুণ তাঁর পাঞ্জাবিতে ঢেকে দিয়েছেন নারীর অপমান, সেই পাঞ্জাবি হয়ে উঠুক অন্তহীন। সেই সঙ্গে আমি বরং সেই সমাজ প্রত্যাশা করব, যেখানে কোনো পুরুষ রক্ষাকর্তার পাঞ্জাবির মুখাপেক্ষী না হয়ে নারী নিজেই তার আত্মমর্যাদা রক্ষা করার অধিকারী হবে। পয়লা বৈশাখের ঐতিহ্য আমাদের সবার। সবাই মিলে এর মোকাবিলা করতে হবে আমাদের।
সেই কত কাল আগে বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন, ‘পুরুষেরা, যাহারা নানা প্রকার দুষ্টামি করে বা করিতে সক্ষম, তাহারা দিব্য স্বাধীনতা ভোগ করে, আর নিরীহ কোমলাঙ্গী অবলারা বন্দী থাকে। অশিক্ষিত, অমার্জিত রুচি পুরুষেরা বিনা শৃঙ্খলে থাকিবার উপযুক্ত নহে। আপনারা কিরূপে তাহাদিগকে মুক্তি দিয়া নিশ্চিন্ত থাকেন?’
এই অশিক্ষিত, অমার্জিত রুচি পুরুষদের অতিসত্বর বন্দী করবার গণদাবির প্রতি জানাই নিরঙ্কুশ সমর্থন।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

Monday, March 30, 2015

বর্তমান বাংলাদেশ ও বিসর্গতে দুঃখ by শাহাদুজ্জামান

ছোটবেলার বর্ণমালা বইয়ে পড়েছিলাম, বিসর্গতে দুঃখ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টের পেয়েছি জীবনসাগরে সুখ ভেলামাত্র, বাকিটুকু দুঃখই। ফলে মেনে নিয়েছি বিসর্গতে দুঃখই সই। একপর্যায়ে একটা পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছি বিসর্গতে দুঃখ নামে। সে বইটিকে বলা যেতে পারে বড়দের বর্ণমালা। প্রয়াত লেখক শহিদুল জহির বইটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একে বলেছিলেন মেটাফিকশন। কোনো কোনো বিপ্লবী মানসিকতার পাঠক অবশ্য প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছিলেন: এ বইতে ক্রোধ নেই, বিদ্রোহ নেই, আছে কেবল দুঃখের পাঁচালী। তাঁদের আবেগ বুঝতে পারি। তাঁরা মানুষের যাবতীয় চেতনা ছাপিয়ে কেবল বিপ্লবী চেতনার দিকেই মন দিতে চান। কিন্তু জীবনে কোনো কোনো সময় আসে, যখন মনের ভেতর ঝেঁপে আসে দুঃখ। তখন বুদ্ধের বাণীই অমোঘ মনে হয়, ‘জগৎ দুঃখময়’। বছর দশেক আগে জীবন, সমাজ, রাজনীতির নানা পাকচক্রে মনের ভেতর তেমন এক দুঃখের বাষ্প জমে উঠেছিল। বিসর্গতে দুঃখ বইটিতে ওই সময়ের সেই ক্রান্তি, দ্বিধা, বেদনাকেই উদ্যাপন করেছিলাম। এই মুহূর্তে নতুন করে ঠিক তেমনিভাবেই মনের ভেতর জেঁকে বসেছে দুঃখ। চারদিকের রক্ত, রিরংসা, ভয়ের গুমোট বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মনের ক্রোধ ছাপিয়ে ধেয়ে আসছে দুঃখ। মনে হচ্ছে বহুদিনের, বহুজনের ভুলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে একটা জটিল জটাজালের মধ্যে আটকে গেছে দেশ। এই জট খুলতে সবকিছু নিয়ে আগাপাছতলা ঝেড়ে ভাবার দরকার। আলোচিত দার্শনিক স্লাভোই ঝিঝেক সম্প্রতি যেমন বলেছেন, ‘ডোন্ট অ্যাক্ট, জাস্ট থিঙ্ক।’ আজকের লেজেগোবরে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা খেপে গিয়েই ‘শুধু ভেবো না, কাজ করো’—এই বাজারচলতি কথার বিরোধিতা করে তিনি বলেছেন, গভীর চিন্তাহীন কাজ করার চেয়ে বরং বসে ভাবো, কোথায় তারটা ছিঁড়েছে। বাংলাদেশের অবস্থা দেখে ঝিঝেকের উপদেশ মানতে ইচ্ছা হয়। মনে হয় ধ্যানমগ্ন হয়ে বুঝে নেওয়া দরকার, কোথায় আমাদের তারটা ছিঁড়ে গেছে। এটুকু বোঝা যায় যে আমাদের গণতন্ত্রের তারটা ছিঁড়েছে অনেকটাই। ‘গণতন্ত্র’ এখন তারকা শব্দ। এ নিয়ে গণমাধ্যমে নানাজনের মত শুনি। ব্যাপার যে খুব খোলাসা হয়, তা নয়। রম্যলেখক শিবরাম চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে। তিনি একবার লিখেছিলেন, ‘জীবন একটি বুঝিবার বিষয় কিন্তু বুঝিল সে কে?’ এই পরিস্থিতিতে একজন হাস্যরসের লেখককে স্মরণ করাটা বোধ হয় সমীচীন নয়। কিন্তু একবার কোনো এক এসকিমো কবির কবিতা পড়েছিলাম, ‘ধু ধু তুষারে আমার স্লেজ গেল ভেঙে, মন তুমি হাসো কেন?’ দুর্দশা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন হাসি একটা প্রতিরক্ষা, ঘুরে দাঁড়ানোর অস্ত্রও হতে পারে। তাই গভীর বেদনায় হাসিও পায়। মনে হয়, ‘গণতন্ত্র একটি বুঝিবার বিষয় কিন্তু বুঝিল সে কে?’
একদিন এক বিশিষ্ট টিভি টক শো বক্তাকে বলতে শুনলাম, ‘আমরা যদি পশ্চিমে তৈরি যন্ত্র কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারি, তাহলে পশ্চিমে জন্ম নেওয়া গণতন্ত্র কেন ব্যবহার করতে পারব না?’ দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। পশ্চিমা একটা ‘টেকনোলজি’ চর্চা আর পশ্চিমা একটা ‘আইডিয়োলজি’ চর্চা কি একই ব্যাপার? পশ্চিমের প্রতি আমাদের এই অকুণ্ঠ আনুগত্য তো বহুকালের। আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ কী, সেটা জানার জন্য দেখি পশ্চিমের এক দেশের রাষ্ট্রদূতের নাকেমুখে মাইক্রোফোন ধরে আছেন সংবাদ শিকারিরা। তারপর দেখি প্রাচীন সম্রাট যেমন জনতার ভেতর মোহর বিলাতেন, তেমন ভঙ্গিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাণী দেন পশ্চিমা রাষ্ট্রদূত। শ্রোতৃমণ্ডলীর আপাদমস্তক চুইয়ে পড়ে হীনম্মন্যতা। গণতন্ত্র নিয়ে পরাক্রমশালী আমেরিকার অনেক বড়াই। রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাট নামে নিজেদের মধ্যে খানিকটা পার্থক্য জিইয়ে রেখে গণতন্ত্রের যে পুতুলখেলা তারা খেলে, তার নমুনা তো পৃথিবী দেখে আসছে অবিরাম। সেদিন একটা স্যাটায়ার পোস্টার দেখছিলাম অনলাইনে, লেখা: ‘আমেরিকার সঙ্গে বেশি গোলমাল কোরো না, তাহলে ওরা তোমাদের দেশে গণতন্ত্র এনে দেবে।’ কৌতুকটার ইঙ্গিত স্পষ্ট। গণতন্ত্র এনে দেওয়ার নামে ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তানকে আমেরিকা যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, তাতে তাদের গণতন্ত্র এনে দেওয়ার মহান ব্রতকে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ব্রিটেনে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এদের বহু শতাব্দীর গণতন্ত্রচর্চার গর্ব থাকলেও কোনো জনমতের তোয়াক্কা না করে সরকার এক ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাড়িয়ে দিয়েছে তিন গুণ। এর বিরুদ্ধে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনকে দমানো হয়েছে জোরালো পুলিশি তৎপরতায়। চীন তো গণতন্ত্রের দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রমাণ করেছে, বহুদলীয় গণতন্ত্র ছাড়াই পৃথিবীর অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠা যায়।
আর আরব বসন্তের পর গণতন্ত্রের চেহারা হয়ে উঠেছে আরও গোলমেলে। সিরিয়ায় গণতন্ত্র আনতে গিয়ে তা পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুপুরীতে। মিসরে স্থিতাবস্থা আনতে গিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে বল প্রয়োগ করে সরাতে হয়েছে সামরিক বাহিনীকে। আবার অন্যদিকে, যেখানে সূত্রপাত ঘটেছিল আরব বসন্তের, সেই তিউনিসিয়ায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার প্রথম শুরু হয়েছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পার্লামেন্ট। এশিয়ায় ভারত দীর্ঘদিন বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চার মধ্য দিয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলেও পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র চর্চা না করেই একধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ গণতন্ত্রের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া। কথা হচ্ছে গণতন্ত্রের কোনো একক চেহারা নেই। যে পশ্চিমা ‘নাগরিক’ ধারণা এবং ভোটাধিকারভিত্তিক গণতন্ত্রের মডেল সারা পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য বলে চালু করা হয়, তাকে বহু আগেই চ্যালেঞ্জ করেছেন পোস্ট কলোনিয়াল, সাব-অলটার্ন তাত্ত্বিকেরা। তাঁরা তর্ক তুলেছেন উত্তর ঔপনিবেশিক দেশগুলোর সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির ভেতরের চেহারা থেকে। পশ্চিমের অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগতে পারে, কিন্তু ফর্মুলাটা বের করতে হবে আমাদেরই। গণতন্ত্রের থাকতে পারে একটা দেশজ রূপ। ফলে পশ্চিম থেকে কম্পিউটার এনে আমরা যেভাবে চালাতে শুরু করেছি, সেভাবে গণতন্ত্রের ধারণা এনেও চালানো যাবে বা যাওয়া উচিত, সেটা তেমন কোনো কাজের ধারণা নয়।
তাহলে প্রশ্ন আসবে আমাদের দেশের গণতন্ত্রের চেহারাটা কেমন হবে? ইংরেজিতে একটা অভিব্যক্তি আছে, ‘এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’। আলাপ যা নিয়েই করি না কেন, ঘরের ভেতর প্রকাণ্ড হাতিটাকে নিয়ে আগে কথা বলতে হবে। আমাদের জন্য সেই হাতিটা হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’। সোজা কথা এই যে বাংলাদেশ নামে যে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী নিয়ে আমরা কথা বলছি, তার জন্ম হয়েছে একটা মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কথাটা নিয়ে বিস্তর যথেচ্ছাচার হয়েছে, এমনকি আজকাল ‘চেতনাবাজ’ নামে একটা শব্দও শুনতে পাই। কিন্তু এসব ধোঁয়াশা সরিয়ে কেন একটা রাষ্ট্রের অংশ থাকা সত্ত্বেও একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে আরেকটা নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে হলো, সেটা বোঝা রকেট-বিদ্যা বোঝার মতো কঠিন কোনো কাজ নয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধ নামের হাতিটার সঙ্গে মোকাবিলা না করে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিষয়ে কোনো মীমাংসা সম্ভব বলে মনে হয় না। কোনো তত্ত্ব, কোনো পশ্চিমা দূত এই মীমাংসা দিতে পারবেন এমন ভাবারও কোনো কারণ দেখি না।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর একই সঙ্গে কী করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের উভয় শক্তিরই স্বার্থ, অধিকার রক্ষা করে গণতন্ত্র চর্চা হতে পারে, সেটা ঠিক বোধগম্য নয়। অথচ বহুকাল ধরে সেই জোড়াতালির রাষ্ট্রই চলছে। দেখা যাচ্ছে পুরো রাষ্ট্র সংকটের একটা নতুন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে, ঠিক যখন থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের একটা আইনগত জবাবদিহির ভেতর আনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এখন তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা আরও জটিল হয়ে গেছে, কারণ এত দিনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা আর একা নয়। নানা ঘটনাচক্রে, নানা রাজনৈতিক, সামাজিক পটপরিবর্তনে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে তাদের অনেক সহযোগীর। নানা স্বার্থে সেই সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর ধর্মীয় চেতনার বিতর্ক, যুক্ত হয়েছে নতুন নানা আন্তর্জাতিক শর্ত। ফলে ব্যাপারটা হয়েছে আরও ঘোলাটে।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া একটা দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একটা শক্তি কোনো আইনগত জবাবদিহির ভেতর না এসে, তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা না চেয়ে অবিরাম বিত্তবৈভবে কেবলই শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকবে, কেবলই তাদের প্রভাববলয় বাড়তে থাকবে, এমন একটা নৈতিক বিভ্রান্তি নিয়ে দেশ কী করেই বা এগোতে পারে? এ বিভ্রান্তি চূড়ান্তভাবে দূর করা না পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন—সব ভাবনাই মুখ থুবড়ে থাকবে বলেই মনে হয়। কিন্তু কী করে এই বিভক্তি দূর করে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলই হবে মুক্তিযুদ্ধের নিরঙ্কুশ পক্ষের শক্তি, তার উত্তর বোধ করি সহজ নয়।
নানা কূটতর্ক, ইতিহাস বিকৃতি, ষড়যন্ত্র, ফায়দা লোটার সংস্কৃতি মিলিয়ে ব্যাপার আরও জট পাকিয়ে গেছে। এই জটের সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। ফলে আমরা স্পষ্ট চূড়ান্ত একটা ক্রান্তির সময় অতিক্রম করছি। এই ক্রান্তি অতিক্রমে আমাদের হয়তো আরও মূল্য দিতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটার মৌল চরিত্র আমরা কেমন দেখতে চাই, আমাদের সবাইকেই বোধ হয় এ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে এবং যার যার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। হয়তো আরও অনেক দিন আমাদের জপতে হবে বিসর্গতে দুঃখ। তার পরও দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে মঙ্গল আলোক, তবে তা-ই হোক।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

Friday, October 17, 2014

ভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র ও বিস্মৃত ১৯৭১ by শাহাদুজ্জামান

যৌন নির্যাতন, মূলত নারী ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের রেওয়াজ পুরোনো। মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ধর্ষণের সঙ্গে যৌন আনন্দের সম্পর্ক নেই, আছে ক্ষমতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুর্বলের ওপর ক্ষমতা প্রদর্শনের উপায় হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহার হয়ে এসেছে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে। বিশ্বযুদ্ধে তো বটেই, পরবর্তীকালে পৃথিবীর নানা আঞ্চলিক যুদ্ধ, স্থানীয় সশস্ত্র সংঘাতে ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিস্তর প্রমাণ আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা নারী ধর্ষণকে কীভাবে যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তা বহুলভাবে আলোচিত। পররর্তীকালে বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, সুদান প্রভৃতি এলাকার সশস্ত্র সংঘাতের সময়ও ধর্ষণ হয়ে উঠেছিল এক মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র।
সম্প্রতি লন্ডনে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ধর্ষণ বন্ধের ডাক দিয়ে ব্রিটিশ সরকার একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, ওই সম্মেলনে পৃথিবীর নানা দেশের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। অথচ যুদ্ধে ধর্ষণ বাংলাদেশে নেহাত কোনো অতীতের বিষয় নয়, এটা এই মুহূর্তেরও জীবন্ত এক প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে যুদ্ধে ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া চলছে এই মুহূর্তে, অপরাধীদের সাজা হচ্ছে। কোনো কোনো সূত্রমতে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে যতসংখ্যক নারী ধর্ষিত হয়েছেন, তা ওপরে উল্লেখিত সব দেশের সংঘাতময় সময়ে ঘটিত ধর্ষণের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। কিন্তু বাংলাদশের সেই অভিজ্ঞতা শোনার কথা সম্মেলনের আয়োজনকারীদের মনে পড়েনি। মাঝে পৃথিবীর গণহত্যাবিষয়ক কিছু একাডেমিক বই দেখছিলাম, যেগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রদের পাঠ্য। যেমন মার্টিন শয়ের লেখা ওয়ার অ্যান্ড জেনোসাইড: অর্গানাইজড কিলিং ইন মডার্ন সোসাইটি, ডোনাল্ড ব্লকসহ্যাম ও ডির্ক মোজেসের লেখা দি অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব জেনোসাইড স্টাডিজ বা অ্যাডাম জোনসের জেনোসাইড: আ কমপ্রিহেনসিভ ইন্ট্রোডাকশন। এই বইগুলোয় নানা গণহত্যার কেস স্টাডি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোথাও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার কোনো উল্লেখ নেই। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যতম গণহত্যাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঘটেছে বলেই দাবি রয়েছে।
ব্যাপার হচ্ছে, যুদ্ধবিষয়ক আন্তর্জাতিক একাডেমিক বা অ্যাকটিভিস্ট আলোচনার ভেতর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো উপস্থিতি নেই। ব্যাপারটা খুব আশ্চর্যের কিছু না। কারণ, খোদ বাংলাদেশেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টিকে বিতর্কিত করার যে উৎসব, তাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন এ ব্যাপারে তাদের আগ্রহ যে হারিয়ে ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে একটা জনপদের যৌথ স্মৃতিকে তো আর রাবার দিয়ে ঘষে মুছে ফেলা যায় না। তা নানাভাবে অঙ্কুরিত হতে থাকে। লন্ডনের সেই সম্মেলনেও স্বল্পসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশকে এই সম্মেলনে অন্তর্ভুক্ত না করার প্রতিবাদে মুখে কালো টেপ বেঁধে সম্মেলন চত্বরে প্রতিবাদ করেছেন। দ্য কনভারসেশন (২১ জুলাই, ২০১৪) পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নয়নিকা মুখার্জি, যিনি পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা করেছেন বাংলাদেশের যুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারী ও যুদ্ধশিশুদের ওপর।
নয়নিকা তাঁর লেখায় একটা বিশেষ ব্যাপারে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, যুদ্ধের পর পর ধর্ষিত নারীদের ব্যাপারে বাংলাদেশে যে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল, তা পৃথিবীর আর কোনো দেশের যুদ্ধের ক্ষেত্রে ঘটেনি। যেমন প্রথমত, স্বাধীনতার পরপরই এই ধর্ষিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব দেওয়া হয়েছিল। সেই নারীদের জীবনে এই খেতাবের প্রভাব কী হয়েছিল, সেটা নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে, কিন্তু এটা ছিল তাঁদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির একটা আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। পৃথিবীর আর কোনো দেশে যুদ্ধে ধর্ষিত নারীদের এমন রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, এই নারীদের জীবন ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গর্ভপাত’কে তখন আইনসিদ্ধ করা হয়েছিল বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালের সেই সময়টায় সারা পৃথিবীতেই তখনো গর্ভপাত একটি বিতর্কিত বিষয়। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশের নারীরা তখন গর্ভপাতের অধিকারের জন্য আন্দোলন করছেন। জোরপূর্বক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন হয়েছে সবেমাত্র ১৯৯০ সালে। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি বিরল উদাহরণ স্থাপন করেছিল। তৃতীয়ত, যেসব যুদ্ধশিশু ইতিমধ্যে জন্ম নিয়েছিল, তাদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পালক হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
সবশেষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ধর্ষিত নারীদের নার্সিং, কুটির শিল্প ইত্যাদি নানা পেশায় পুনর্বাসন করা হয়েছিল। যুদ্ধে লাঞ্ছিত নারীদের নিয়ে এমন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের উদাহরণ আর কোথাও নেই। অবশ্য মধ্য সত্তরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য প্রসঙ্গের মতো বীরাঙ্গনা বিষয়টিও আড়ালে চলে যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার বীরঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নয়নিকা মুখার্জি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধে ধর্ষিত নারীদের নিয়ে বাংলাদেশের এই অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা পৃথিবীর সংঘাতপূর্ণ সব দেশ, যেখানে ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারত। অথচ বাংলাদেশের এসব অর্জনকে আন্তর্জাতিক জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনায় যুক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেই।
নয়নিকার অন্যান্য লেখা থেকে এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানতে পারি, আমেরিকা নিবাসী জগদ্বিখ্যাত বাঙালি সমাজতাত্ত্বিক গায়ত্রী স্পিভাক, ১৯৭২ সালে তাঁর মাকেসহ বাংলাদেশে এসেছিলেন যুদ্ধে ধর্ষিত নারীদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে কাজ করতে এবং গায়ত্রীর সংগ্রহে রয়েছে সেসব নারীর দুর্লভ ফটোগ্রাফ, যা হতে পারত গবেষণার দুর্লভ উপাত্ত। অথচ সেগুলো রয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। নয়নিকার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্মটি ‘দ্য স্পেকট্রাল ওন্ড: সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড পাবলিক মেমোরি অ্যান্ড দ্য বাংলাদেশ ওয়ার অব নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান’ নামে প্রকাশিত হবে অচিরেই।
অনুতাপের ব্যাপার হচ্ছে, জ্ঞানকাণ্ডের নিয়ম মেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর পদ্ধতিগতভাবে গভীর গবেষণাভিত্তিক চিন্তাশীল কাজের উদাহরণ এ দেশে দুর্লভ। ইদানীং আবার দেখা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও তার পূর্বাপর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের শখের ইতিহাসচর্চা। সেসব প্রত্যক্ষদর্শী বই লিখে এমন দাবি করছেন, যেন ইতিহাসের আসল সত্য এত দিন তাঁরা তাঁদের আস্তিনের নিচে গুটিয়ে রেখেছিলেন। বলা বহুল্য, স্মৃতিচারণা আর ইতিহাসচর্চা এক ব্যাপার নয়। প্রত্যক্ষদর্শীরাই সঠিক ইতিহাস জানেন, এই সূত্র মানলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সৈনিকেরাই হয়ে উঠতেন মহাযুদ্ধের প্রধান ইতিহাসবেত্তা। তথ্য নিজ থেকে ইতিহাস নয়। সঠিক পরম্পরা আর পরিপ্রেক্ষিতে সেই তথ্যকে স্থাপন করতে পারাই ইতিহাস।
স্মরণ রাখা দরকার যে স্মৃতি ব্যাপারটা অনেকটা সৈকতে ঘুরে বেড়ানো শিশুর মতো, সে বিশাল সৈকত থেকে সেই ঝিনুকটাই তুলে নেয়, যা তার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়। যিনি স্মৃতিচারণা করছেন, আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যে ইতিহাসের বিশাল সৈকত থেকে কোন তথ্য তিনি তুলে আনছেন। আমাদের এ–ও লক্ষ করতে হবে, কোন চিন্তা কাঠামোর কারণে ওই বিশেষ তথ্যগুলো তাঁর কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে ভিনদেশি যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের বেলায়ও কথাটা প্রযোজ্য। নয়নিকা মুখার্জির মতো সবাই যে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার জন্য বই লিখছেন, তা নয়। এই গৌরবকে ভুলুণ্ঠিত করতেও গ্রন্থ রচিত হচ্ছে। যেমন ডেড রেকনিং: মেমোরিজ অব দ্য নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান বাংলাদেশ ওয়ার নামে বই লিখে শর্মিলা বোস প্রমাণ করতে চেয়েছেন, বাংলাদেশে তেমন কোনো গণহত্যাই হয়নি। কিংবা এ দেশের যুদ্ধশিশু প্রসঙ্গকে পুঁজি করে অন্য এক দেশের স্বার্থ আর বাজারকে মাথায় রেখে মৃত্যুঞ্জয় দেবরাত বানিয়েছেন চিলড্রেন অব দ্য ওয়ার নামে মুক্তিযুদ্ধের এক উদ্ভট চলচ্চিত্র।
উত্তর ঔপনিবেশিক পৃথিবীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটা ঘটনা, এই ঘটনা নিয়ে যদি দেশের ভেতর শুধু আবেগ আর স্বার্থতাড়িত হয়ে অপেশাদার, আনাড়ি ইতিহাসচর্চা চলে, তাহলে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক উভয় অঙ্গনেই তা ক্রমেই একটা বিস্মৃত ঘটনাতেই পর্যবসিত হবে। তখন ফাটা ডিমে তা দিয়ে আর কাজ হবে না।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yaoo.com

Monday, December 24, 2012

চিরকুট- ইয়ার্কির সংস্কৃতি by শাহাদুজ্জামান

সম্প্রতি একটি ভুয়া টেলিফোন কলের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেনে এক নার্সের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সে দেশে বেশ তোলপাড় চলছে। দেশের নানা খবরের চাপে আন্তর্জাতিক এসব খবরের প্রতি মনোযোগ হয়তো আমাদের খুব বেশিক্ষণ থাকে না। তবু এ খবরটি নানা দিক থেকে তাৎপর্যের দাবি রাখে।

Sunday, November 11, 2012

চিরকুট- আলেপ্পোর কবি by শাহাদুজ্জামান

সিরিয়ার আলেপ্পো শহর জ্বলছে। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর, যার কথা শেক্সপিয়ার উল্লেখ করেছিলেন তাঁর নাটকে, যা ছিল একসময় ইতিহাসখ্যাত সিল্ক রুটের অন্যতম একটি বন্দর, সেটি এখন বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত। অথচ মাত্র বছর খানেক আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে দেখেছি এই শহরকে।

Saturday, October 13, 2012

চিরকুট- সংখ্যাগরিষ্ঠের দেমাগ by শাহাদুজ্জামান

সেই গানটির কথা স্মরণ করি। পশ্চিমবঙ্গের গায়ক শ্যামল মিত্রের গাওয়া, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানটি তুমুল জনপ্রিয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়, ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি।’ স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহ্বান ছিল সেই গানে।

Friday, July 13, 2012

চিরকুট-একাকী মানুষ by শাহাদুজ্জামান

পৃথিবীতে একাকী মানুষের সংখ্যা বেড়ে এখন স্মরণাতীতকালের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে, এমনটাই জানাচ্ছে ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সাম্প্রতিক একটি সংখ্যা। ‘একাকী’ বলতে একাকী বসবাসকারী মানুষ। একটি বাড়িতে একজন মাত্র মানুষ—এই পরিস্থিতি, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশেরই এখন স্বাভাবিক চিত্র।

Friday, June 22, 2012

চিরকুট-পাতালপুরীর মন্ত্র by শাহাদুজ্জামান

কপার ধাতুটির নাম জানি অনেকেই কিন্তু ধাতুটি কী কাজে লাগে, জানি না হয়তো। জানি না আমাদের শহরকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে আছে যে বৈদ্যুতিক তার, আমাদের ঘরে যে নানা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম—এর সবকিছুর ভেতরেই গোপনে রয়েছে কপারের কারুকাজ।

Wednesday, June 20, 2012

চিরকুট-কলম্বাসের ডায়েরি by শাহাদুজ্জামান

এই অক্টোবর মাসে আমেরিকা ‘কলম্বাস দিবস’ পালন করে থাকে। কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর আমেরিকার ভূখণ্ডে পা রেখেছিলেন। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের বিজয়োৎসব পালন করে তারা। কিন্তু সবাই এদিনে উৎসব করে না, কেউ কেউ করে পরিতাপ।

Monday, June 18, 2012

চিরকুট-গো যোগ এষণা by শাহাদুজ্জামান

১ অক্টোবর এই কলামে ‘বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তাতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করুণ দশার কথা উল্লেখ করেছিলাম। বিশেষ করে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্বল গবেষণাচর্চার কথা লিখেছিলাম। খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই লক্ষ করি, সেদিন

Friday, June 15, 2012

চিরকুট-বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় by শাহাদুজ্জামান

এ মাসে ২০১০ সালের বিশ্বের সেরা ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঘোষণা করেছে ‘টাইম ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং’ কর্তৃপক্ষ। নানা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতিবছর এই সংস্থাটি পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে থাকে।

Monday, June 11, 2012

চিরকুট-টেলিভিশন ও মনন by শাহাদুজ্জামান

‘টিভি আমাকে বেশ জ্ঞানী করে তোলে, কারণ যখন এ ঘরে সবাই টিভি দেখতে বসে, আমি তখন বাধ্য হয়ে আমার পড়ার ঘরে একটা বই নিয়ে বসি।’ এমনটা লিখেছিলেন একজন পশ্চিমা লেখক। সাধারণভাবে জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে টিভির সম্পর্ক ক্ষীণ। টিভি মাধ্যমটির সাফল্য প্রধানত বিনোদন এবং তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে।

Saturday, June 9, 2012

চিরকুট-তাহেরের বিচার by শাহাদুজ্জামান

তখন একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। আমার সঙ্গে কাজ করত নৃবিজ্ঞানে স্নাতক এক তরুণ। আমরা অফিসের একই বাসে বাড়ি ফিরতাম। তরুণটি যে স্টপেজে নামত, সেখানে ফুটপাতে শীত-বর্ষায় প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকতেন তার মা। তরুণটি বাস থেকে নামলে একটি রিকশা নিয়ে একসঙ্গে বাড়ি ফিরতেন তাঁরা।

Friday, June 8, 2012

চিরকুট-মুদ্রারাক্ষস by শাহাদুজ্জামান

কাপড়ে ঢাকা একটি ছবি। মঞ্চের অভিনেতা বলছেন, ‘এ কাপড়ের নিচে কিছু অশ্লীল ছবি আছে।’ একপর্যায়ে কাপড় সরালে দেখা গেল, সেখানে সাঁটা আছে টাকার কিছু নোট। যত দূর মনে পড়ে, বাদল সরকারের এবং ইন্দ্রজিৎ নাটকের দৃশ্য এটি।

Tuesday, June 5, 2012

চিরকুট-দেয়ালশিল্প by শাহাদুজ্জামান

দেয়ালকে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়ার উদাহরণ প্রাচীন। মানুষের আদিম শিল্প গুহাচিত্র আঁকা হয়েছিল গুহার দেয়ালেই। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান নগরেও নানা রকম দেয়াললিখন ও দেয়ালচিত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জার্মান নািস বাহিনী ইহুদি-বিদ্বেষ ছড়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে দেয়াললিখন।

Sunday, June 3, 2012

চিরকুট-সারমেয় সমাচার by শাহাদুজ্জামান

‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে...’ বিখ্যাত সেই কবিতাটি পড়েছিলাম ছোটবেলায়। মর্মার্থ এই যে, কুকুর ইতর প্রাণী, সে মানুষকে কামড়াতে পারে, তাই বলে কুকুরকে কামড়ানো মানুষের শোভা পায় না ইত্যাদি। নিজের করুণ জীবনের কথা বলতে গিয়ে বাস্তব এবং সাহিত্যের চরিত্রকে বলতে শুনেছি ‘কুকুরের মতো বেঁচে আছি’।

Friday, June 1, 2012

চিরকুট-ফুটবলের ফায়দা by শাহাদুজ্জামান

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলে আমার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিকে জেগে উঠতে দেখি। একটি বল নিয়ে কতিপয় মানুষের লড়াই দেখার জন্য শিশুদের মতো উদ্বেল হয়ে উঠি। দেখি পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষেরাও আমার মতো শিশু হয়ে উঠেছে। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার বুড়ো খোকা ভেঁপু বাজায়, রংবেরঙের কাপড় পরে নাচে।

Wednesday, May 30, 2012

চিরকুট-ভরসা by শাহাদুজ্জামান

পর্তুগিজ লেখক জোসে সারামাগোর ব্লাইন্ডনেস উপন্যাসে দেখতে পাই, একটি শহরে অন্ধত্বের এক অভিনব মহামারি লেগেছে। একজন অন্ধ হওয়ার পর তার ছোঁয়ায় এক এক করে শহরের সবাই অন্ধ হয়ে যেতে থাকে। সারা শহরে কেবল অন্ধ মানুষ।

Sunday, May 27, 2012

চিরকুট-এ শহর প্রান্ত by শাহাদুজ্জামান

এস্কিমোরা শুধু বরফের ঘর ইগলুই বানায় না, কবিতাও লেখে। একটি এস্কিমো কবিতা পড়েছিলাম এ রকম, ‘ধু ধু তুষার প্রান্তরে আমার স্লেজ গেল ভেঙে/মন তুমি হাস কেন?’ একজন এস্কিমোর জন্য দিগন্তব্যাপী তুষারপথে স্লেজ ভেঙে যাওয়ার চেয়ে বড় অসহায়ত্ব আর কী হতে পারে?

Thursday, May 24, 2012

চিরকুট-একটি ঐতিহাসিক জীবাণু by শাহাদুজ্জামান

একটি ঐতিহাসিক জীবাণুর গল্প হোক এবার। ১৮৩২ সালে ইউরোপের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে এক ব্যাপক কলেরা মহামারি দেখা দিয়েছিল। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, সেই মহামারির জীবাণুটি তার যাত্রা শুরু করেছিল আমাদের এই বাংলাদেশ থেকে।