Tuesday, March 10, 2026

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান: সিএনএনকে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য ইরান সরকার প্রস্তুত বলে দাবি করেছেন দেশটির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যেতে চায়, যাতে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সংঘাত থেকে সরে আসতে রাজি করানোর চেষ্টা চালায়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা কামাল খারাজি সোমবার তেহরানে বসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। তিনি এই মুহূর্তে কূটনৈতিকভাবে এই সংকট সমাধানের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। বলেছেন, এই যুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক সংকটের মাধ্যমেই শেষ হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধের দশম দিনে ইরান সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

কামাল খারাজি সিএনএনকে বলেন, ‘আমি কূটনীতির আর কোনো সুযোগ দেখি না। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যদের প্রতারিত করেছেন এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন না। দুই দফা সমঝোতা আলোচনার সময় আমাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা যখন আলোচনায় যুক্ত ছিলাম, তখনই তারা আমাদের ওপর আঘাত হেনেছে।’

ইরানের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না অর্থনৈতিক চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অন্য দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের নিশ্চয়তার জন্য হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।’ তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত হলো, যুদ্ধ বন্ধ করতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

কামাল খারাজি বলেন, ‘এই যুদ্ধ অন্যদের ওপর ব্যাপক চাপ–অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি-সংকট ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে এবং এটা চলতে থাকবে। যুদ্ধ চলতে থাকলে চাপের মাত্রা আরও বাড়বে। তখন অন্যদের হস্তক্ষেপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে আবাসিক ভবন এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরও বারবার হামলার শিকার হয়েছে।

ইরানের এসব হামলায় বিশ্ব জ্বালানি-বাণিজ্যের দুর্বলতাগুলো সামনে এসেছে, যার মধ্যে অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি পরিবহন পথসহ অন্যান্য দুর্বলতা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সোমবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের পকেট ও শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের পরিসংখ্যান বলছে, চলমান এই সংঘাতের ফলে বিশ্বের আনুমানিক ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ১৯৫৬-৫৭ সালের সুয়েজ খাল সংকটের সময়ের রেকর্ডের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ।

এই যুদ্ধে কেবল অঞ্চলটি থেকে তেল সরবরাহই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং এটি জ্বালানি বাজারের আপৎকালীন বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা বা স্পেয়ার ক্যাপাসিটিকেও কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। এই সক্ষমতা সাধারণত জ্বালানি বাজারে বড় কোনো ধাক্কা সামলাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজনের সময় ঠিক কত দ্রুত অতিরিক্ত তেল উৎপাদন শুরু করা সম্ভব, তা এই সক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা হয়।

ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন মুখপাত্র রোববার জানিয়েছেন, তেহরান এই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও ‘কৌশলগত স্বার্থের’ ওপর হামলা চালাতে তাদের সামরিক সক্ষমতার ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে।

এদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এটার স্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ইরানের সামরিক বাহিনী ও সর্বোচ্চ নেতৃত্ব আগামী দিনগুলোতে একই মনোভাব নিয়ে এগোবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে খারাজি বলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’

খারাজি আরও বলেন, ‘দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার নেতৃত্ব দেওয়া ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতার দায়িত্ব। তাই প্রয়াত আয়াতুল্লাহ খামেনি এত দিন যেভাবে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, নতুন নেতাও তা একইভাবে পালন করবেন।’

গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পিতার উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনির নিয়োগ তাঁর কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’।

এ প্রসঙ্গে খারাজি বলেন, ‘এটি তাঁর (ট্রাম্পের) বিষয় নয়।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা কামাল খারাজি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা কামাল খারাজি। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ইরানের তেলক্ষেত্রে হামলার পর ইসরায়েলের ওপর সত্যিই কি ক্ষুব্ধ হলো হোয়াইট হাউস

ইরানের তেল সংরক্ষণাগারে ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম বড় কোনো মতবিরোধের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। দুই দেশ মিলে ইরানে আগ্রাসন চালাচ্ছে।

মার্কিন নিউজ পোর্টাল ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার পর ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলকে চরম বিস্ময়সূচক (ডব্লিউটিএফ) বার্তা পাঠিয়েছে।

কী ঘটেছিল

ইসরায়েল দাবি করেছে, ওই তেল স্থাপনাগুলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হামলার আগে তারা ওয়াশিংটনকে বিষয়টি জানিয়েছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হামলার ব্যাপকতা তাঁদের কল্পনার বাইরে ছিল।

মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এত বড় হামলা দেখে অবাক হয়েছি। আমরা মনে করি না, এটি ভালো কোনো বুদ্ধি ছিল।’

ইসরায়েলি একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন থেকে আসা বার্তার মূল সুর ছিল চরম বিরক্তি ও বিস্ময়।

ভয়াবহ দৃশ্য ও পরিবেশ বিপর্যয়

তেহরান ও এর আশপাশের তিনটি তেল ডিপো ও একটি শোধনাগারে হামলার ফলে সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শহরজুড়ে আকাশছোঁয়া আগুন এবং বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় সবকিছু ঢেকে গেছে। সড়ক দিয়ে তেলের ‘আগুনের নদী’ বয়ে যেতে দেখা গেছে।

তেহরানের আকাশ থেকে তেল ও কালিতে মিশে যাওয়া ‘কালো বৃষ্টি’ ঝরছে।
‘অ্যাসিড বৃষ্টি’–এর আশঙ্কায় মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা

এই হামলার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
প্রথমত, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম আগে থেকেই বাড়তি ছিল। এই হামলার পর প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৭ দশমিক ৯৭ ডলারে ঠেকেছে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ২২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন মনে করছে, এই হামলা কৌশলগত একটা ভুল হতে পারে। এর কারণ জনমত। তেল স্থাপনায় হামলার ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা বর্তমান সরকার পরিবর্তনের পক্ষে ছিল, তারা এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।

জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, প্রেসিডেন্ট এই হামলা পছন্দ করেননি। তিনি তেল রক্ষা করতে চান, পোড়াতে নয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা মনে পড়ে যায়।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি

ইরান সতর্ক করে দিয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের তেলের ওপর হামলা হলে তারা পাল্টা একই ধরনের ব্যবস্থা নেবে। ইরানের সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা চাইলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে নিয়ে যেতে পারেন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরবের একটি বড় শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল, যার ফলে সেখানকার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ওই স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। অবশ্য সেখানে ইরান চালায়নি বলে দাবি করেছে।

তেহরানে হামলার পর বিস্ফোরণের দৃশ্য। তেহরান, ইরান। ৭ মার্চ ২০২৬
তেহরানে হামলার পর বিস্ফোরণের দৃশ্য। তেহরান, ইরান। ৭ মার্চ ২০২৬ ছবি: এএফপি