Sunday, October 20, 2024

নারীর পেটে আটকে থাকা কাঁচি ১২ বছর পর বের করলেন চিকিৎসকেরা

ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের সিকিম রাজ্যে। ২০১২ সালে ওই নারীর যখন অ্যাপেন্ডিক্স অস্ত্রোপচার হয়েছিল, সেই সময় চিকিৎসকদের ভুলে তার পেটের ভিতরেই রয়ে যায় সার্জিকাল কাঁচি। তারপর থেকেই পেটে যন্ত্রণা হত। কিন্তু হাজারো চিকিৎসকের কাছে গিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। বিভিন্ন চিকিৎসক নানা ধরনের ওষুধ দিতেন, তাতে কয়েকদিন ব্যথা কমলেও, তা আবার ফিরে আসত। সম্প্রতি চলতি মাসে এক চিকিৎসক এক্স-রে করিয়ে দেখেন যে, পেটের ভিতরে কাঁচি! রোগীর স্বামী জানিয়েছেন, ২০১২ সালে গ্যাংটকের এক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়েছিল তার স্ত্রীর। অস্ত্রোপচার করে অ্যাপেনডিস্ক শরীর থেকে বাদ দেওয়ার পরে যন্ত্রণা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। উল্টে ব্যথা আরও বৃদ্ধি পায়। গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্ত্রীকে নিয়ে একাধিক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছেন। তাদের পরামর্শ নিয়েছেন। কিন্তু যন্ত্রণার উপশম হয়নি। শেষে গত ৮ অক্টোবর গ্যাংটকের ওই হাসপাতালেই স্ত্রীকে  আবার নিয়ে যাওয়া হয়। এক্স-রে করানো হয়  তলপেটের। তখনই ধরা পড়ে বিষয়টি। পরিবারের দাবি, এতগুলি বছর ধরে চিকিৎসকেরা কেউই বিষয়টি ধরতে পারেননি। কেউ ভিটামিনের ওষুধ দিয়েছিলেন। কেউ গ্যাস্টিক সমস্যার জন্য ওষুধ দিয়েছিলেন। কিন্তু কী কারণে সমস্যা হচ্ছে, তা কেউই ধরতে পারেননি। এর পর নামচিতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তার বায়োপসি করানো হয়। সেখানেই বিষয়টি সন্দেহজনক ঠেকে চিকিৎসকদের। বর্তমানে ওই নারীর অবস্থা স্থিতিশীল বলেই জানা গিয়েছে। তবে ১২ বছর আগে চিকিৎসকের এমন গাফিলতিতে চরম ক্ষোভ ছড়িয়েছে। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

উনি তো কিছুই বলে গেলেন না... by মতিউর রহমান চৌধুরী

ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেন নি এই নিয়ে বিতর্ক এখনো জারি রয়েছে। হয়তো অনেক দিন থাকবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় একাধিকবার দাবি করেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেননি। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান মিডিয়ার সামনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের খবর জানিয়েছিলেন।

প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রী যদি পদত্যাগ করে থাকেন তাহলে সেটা গেল কোথায়? কারও কাছে এই প্রশ্নের জবাব নেই। তিন সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছি। খোঁজ নিয়েছি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও। যেখানটায় প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র থাকার কথা। কোথাও নেই। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের মুখোমুখি হলাম। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন।

শেখ হাসিনার জমানায় বঙ্গভবন ছিল আমার জন্য নিষিদ্ধ। স্যার, আপনি কেমন আছেন? ভাই, আপনি আমাকে স্যার বলবেন না। আমরা তো দু’জনই একসঙ্গে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। আমি পাবনায় আর আপনি ঢাকায়। বাংলার বাণীতে দু’জনই কাজ করেছি। পুরনো স্মৃতি স্মরণ করে আবেগ জায়গা করে নিলো অনেকক্ষণ। স্বাভাবিক হতেই প্রশ্ন করলাম আপনার কাছে কি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্রটা আছে? আমি শুনেছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু আমার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। বহু চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হয়েছি। তিনি হয়তো সময় পাননি। ৫ই আগস্ট সকাল সাড়ে দশটায় বঙ্গভবনে ফোন এলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে। বলা হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন মহামান্য প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। এটা শুনেই প্রস্তুতি শুরু হলো বঙ্গভবনে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফোন এলো তিনি আসছেন না।

প্রেসিডেন্ট বললেন, চারদিকে অস্থিরতার খবর। কী হতে যাচ্ছে জানি না। আমি তো গুজবের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারি না। তাই সামরিক সচিব জেনারেল আদিলকে বললাম খোঁজ নিতে। তার কাছেও কোনো খবর নেই। আমরা অপেক্ষা করছি। টেলিভিশনের স্ক্রলও দেখছি। কোথাও কোনো খবর নেই। এক পর্যায়ে শুনলাম, তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আমাকে কিছুই বলে গেলেন না। যা সত্য তাই আপনাকে বললাম। যাই হোক, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার যখন বঙ্গভবনে এলেন তখন জানার চেষ্টা করেছি প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন কি না? একই জবাব। শুনেছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। মনে হয় সে সময় পাননি জানানোর। সব কিছু যখন নিয়ন্ত্রণে এলো তখন একদিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এলেন পদত্যাগপত্রের কপি সংগ্রহ করতে। তাকে বললাম, আমিও খুঁজছি। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট বললেন, এ নিয়ে আর বিতর্কের কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী চলে গেছেন এটাই সত্য। তারপরও কখনো যাতে এ প্রশ্ন না উঠে সে জন্য সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়েছি।

প্রেসিডেন্টের পাঠানো রেফারেন্সের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ৮ই আগস্ট এ সম্পর্কে তাদের মতামত দেন। এতে বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে এবং নির্বাহী কার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলীকে শপথবাক্য পাঠ করাতে পারবেন বলে আপিল বিভাগ মতামত দেন।

এর আগে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি অবস্থান করছেন। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ভারত সরকার তাকে ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট দিয়েছে। তা দিয়ে তিনি অন্য কোনো দেশে যেতে পারবেন। যদিও তার রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাকে নিরাপত্তাজনিত কারণে আশ্রয় দিতে রাজি হচ্ছে না। কাতার ও সৌদি আরব আগেই অপারগতা জানিয়েছে। শুরুতে বেলারুশের কথা বলা হয়েছিল। কি কারণে সেটা হয়নি তা এখনো অজানা।

হাসিনাকে যে কথা বলতে দেয়া হয়নি
পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছিলেন- দীর্ঘ নয়, অল্প সময় কথা বলবেন তিনি। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি এবং সেনাপ্রধানের অনাগ্রহে সে সুযোগ পাননি শেখ হাসিনা। তখন তাকে বলা হয়, চারদিকে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। সবাই মারমুখো। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা গণভবনে পৌঁছে যেতে পারে। তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাকে সে সুযোগ দেয়া যাবে না। হাসিনা বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। বক্তৃতার একটি খসড়া তৈরি করেছিলেন তিনি। নানা সূত্রে জানা যায়, এতে তিনি বলতে চেয়েছিলেন- তার ইচ্ছায় নয়, বলপূর্বক তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। কারা এবং কোন বিদেশি শক্তি তার সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছে এটাও তিনি দেশবাসীকে জানাতে চেয়েছিলেন। তাঁর শাসনকালে দেশের কি কি উন্নয়ন হয়েছে তারও বয়ান ছিল। সকাল থেকে দুপুর, এ সময় নানাভাবে দরকষাকষিও চলছিল। বারবার ফোন আসছিল নয়াদিল্লি থেকে। বলা হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঢাকার তরফে দিল্লিকে বলা হয়েছিল- তারা যেন বিমান পাঠিয়ে হাসিনাকে নিয়ে যান। সে অনুরোধে সাড়া দেয়নি দিল্লি। এরপর বাংলাদেশের স্ব-উদ্যোগে বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০ বিমানে তাকে দিল্লি পাঠানো হয়। হাসিনাকে বহনকারী বিমানে আরও দু’জন ছিলেন। তার ছোটবোন শেখ রেহানা ও নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

উনি তো কিছুই বলে গেলেন না...

কে হচ্ছেন হামাসের পরবর্তী প্রধান?

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যুর পর কে তার উত্তরসূরী নির্বাচিত হবেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। তিনি নিহত হওয়ার পর স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য খালেদ মেশালের কথা উঠেছিল। বর্তমানে তিনিই সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও জানা গেছে। তবে হামাসের দুই কর্মকর্তা বিবিসি’কে জানিয়েছে সিওয়ারের উত্তরসূরি বাছাই করতে দ্রুতই আলোচনা শুরু করবে তারা। এক্ষেত্রে তারা হামাসের এক শীর্ষ কর্মকর্তার নাম জানিয়েছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, সিনওয়ারের উত্তরসূরী হিসেবে সম্ভাব্য তালিকার শীর্ষে রয়েছেন তার ডেপুুটি খলিল আল-হাইয়া। তিনি গাজার বাইরে দায়িত্বরত হামাসের একজন শীর্ষ নেতা।

আল-হাইয়া বর্তমানে কাতারে রয়েছেন। তিনি হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় একজন প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে সংগঠনটির প্রতিনিধিত্ব করছেন। গাজা পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও যোগাযোগ রয়েছে সিনওয়ারের এই সম্ভাব্য উত্তরসূরীর।
তেহরানে হামাসের সাবেক প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা করার মাত্র দুই মাস পর আবারও উত্তরসূরী নির্বাচন করতে যাচ্ছে হামাস। কেননা গত বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকেও হত্যা করেছে ইসরাইল। সিনওয়ার ইসরাইলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার ছিলেন।

হামাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিনওয়ারকে ৭ অক্টোবরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, সিনওয়ারের নিয়োগ ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি সাহসী বার্তা ছিল। গত জুলাই থেকে যুদ্ধবিরতি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, সিনওয়ারের নেতৃত্ব যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বাধা ছিল।

সিনওয়ারকে হত্যা করা সত্ত্বেও, হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি গ্রহণ এবং ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তির জন্য আন্দোলনের শর্ত এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। হামাস গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, দীর্ঘ শত্রুতার অবসান, মানবিক সাহায্য হস্তান্তর এবং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অঞ্চলের পুনর্গঠনের দাবি অব্যাহত রেখেছে। যে শর্তগুলো ইসরাইল স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের জোরালো দাবি হচ্ছে হামাসকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

হামাসকে অস্ত্র ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণের ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যে আহ্বান রয়েছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে আন্দোলনের কর্মকর্তা তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘হামাসের পক্ষে আত্মসমর্পণ করা অসম্ভব।’ তিনি বলেছেন, আমরা আমাদের জনগণের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি। আমরা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ মেনে নেব না। শেষ বুলেট এবং শেষ সৈনিক বেঁচে থাকা পর্যন্ত ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, আমাদের নেতা সিনওয়ারও এমনটি করেছিলেন।

সিনওয়ারের হত্যাকাণ্ড কয়েক দশকের মধ্যে সংগঠনের জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির একটি। তবে হামাসের জন্য নেতৃত্ব হারানো এটিই প্রথম নয়। ১৯৯০ এর দশক থেকে ধারাবাহিকভাবে হামাসের নেতৃত্ব হারানোর ইতিহাস রয়েছে। যদিও ইসরাইল হামাসের বেশিরভাগ নেতা এবং প্রতিষ্ঠাতাকে হত্যা করতে সফল হয়েছে, কিন্তু আন্দোলনটি নতুন নেতৃত্ব খুঁজে বের করতে বেশি সময় নেয়নি।

এই সংকটের মধ্যে, গাজায় বন্দী থাকা ইসরাইলি জিম্মিদের ভাগ্য এবং তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য কে দায়ী হবে সে সম্পর্কে প্রশ্নগুলো আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভাই মোহাম্মদ সিনওয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি হামাসের অবশিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং গাজা আন্দোলনের ভবিষ্যত গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে মনে করা হয়।

mzamin

গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ বিমান হামলা, নারী ও শিশুসহ নিহত ৭৩

গাজার উত্তরাঞ্চলের ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। এতে অঞ্চলটির বেইত লাহিয়া নামক এলাকায় কমপক্ষে ৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী এবং শিশুও রয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, শনিবার গভীর রাতে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে ইসরাইল। এতে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছে এখনও বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। ইসরাইলের ক্রমাগত হামলার কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। তবে ইসরাইল এই হতাহতের সংখ্যা অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, আমরা হতাহতের রিপোর্ট পর্যালোচনা করেছি। হামাস নিয়ন্ত্রিত কর্তৃপক্ষ যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে তা ‘অতিরিক্ত’ এবং ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তথ্যের সঙ্গে তা অসঙ্গতিপূর্ণ। গত বৃহস্পতিবার হামাসের শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যা করার পর গাজার উত্তরাঞ্চলে এই ভয়াবহ হামলা চালালো ইসরাইল।

হামাস নিয়ন্ত্রিত একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বেইত লাহিয়া একটি জনবহুল এলাকা। লোকজনের ভিড় লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। যেখানে অনেক নারী এবং শিশুরা ছিল। এতে ওই গণমাধ্যমটিও ৭৩ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। তবে বিবিসি স্বাধীনভাবে হতাহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরাইলের বিমান হামলায় একটি আবাসিক এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে ইসরাইলের দাবি তারা হামাসকে লক্ষ্য করে গোলা বর্ষণ করেছে। ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) বিবিসি’কে বলেছে, তারা হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে এবং বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যা করা দরকার সম্ভাব্য সবই করেছে। তাদের দাবি হামাস নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো হতাহতের ‘অতিরিক্ত’ সংখ্যা উল্লেখ করছে। এর আগের অনেক ঘটনার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে বলে দাবি ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর।

উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৪২ হাজার ৫১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯০ হাজারের বেশি মানুষ। এসব হতাহতের বেশির ভাগই নারী এবং শিশু। এছাড়া গাজার এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গাজা উপত্যকার হাজার হাজার শিশু। লাখ লাখ শিশু তাদের নিয়মিত পড়াশুনা থেকে ছিটকে পড়েছে।

mzamin

এমন করে কি টিকতে পারে কেউ? by ইমরান আলী

জুলাইয়ের শেষ দিক। রোজ সহকর্মীদের অসংখ্য ফোন সংবাদ, তথ্য দিতে। প্রতিবার রিসিভ করার আগে আশা করি যেন-খারাপ খবর না পাই। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। হয় সংঘর্ষের তথ্য, নয়তো মৃত্যুর। কথা বলতে বলতেই শুনতে পাই পুলিশের সাউন্ডগ্রেনেডের শব্দ। মাঝে মাঝে সহকর্মীকে পরামর্শ দেই, সাবধানে থাকেন। ও প্রান্তেও একই উদ্বেগ। বলেন, চোখের সামনে এমন দৃশ্য নিতে পারছি না আর। এই দৃশ্য আসলে কেউই কি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে? পারে না। তবে পেরেছিল এক পক্ষ। যারা দেশ চালাচ্ছিল। ভেবেছিল সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে। গুলি আছে, বন্দুক আছে। প্রশাসন হাতের মুঠোয়। অতএব কার এতো ‘দুঃসাহস’ সব ডিঙ্গিয়ে সরকারের অবস্থান নড়বড়ে করে দেবে? তাই তারা বেমালুম ভুলে বসে থাকলো, এভাবে যে চলতে পারে না।

ক্ষমতার মোহে মানুষ অন্ধ হয়। তবে এ অন্ধ আবার ভিন্ন ধাঁচের। ভাবে নিজে যেহেতু দেখছে না তাই কেউই টের পাচ্ছে না। দিনের পর পর দিন মিথ্যা বলে গেল। সত্য প্রচার রোধে বন্ধ হলো ইন্টারনেট সাথে আবার যানবাহনও। ‘সন্ত্রাসীদের আগুনে ডেটা সেন্টার পুড়ে’ যাওয়ার গল্পও ফাঁদা হলো।

এরপর আবার বন্ধের স্বীকারোক্তি দিয়ে বলা হলো-জাতীয় ও নাগরিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। দেশ যখন ডিজিটালি স্মার্ট করার চেষ্টা করছেন বলে প্রচার চলছে তখন কিনা তথ্য প্রবাহ, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল তারাই। আবার এই ব্যাখ্যাও দেয়া হলো- গুজব রোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করেছে। গুজব ঠেকাতে এসব অফ-অনের খেলা চলতে থাকলো।

ওদিকে মন্ত্রী মহাশয় নিজেই সবার কানেকশন বন্ধ করে একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিতে থাকলেন। গুজব প্রতিরোধে মানুষকে সঠিক তথ্য জানাতে তিনি নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। পুরো দেশের ‘সঠিক’ খবর প্রচারের দায়িত্ব নিলেন তিনি একাই! এই অধিকার তাকে দিল কে? জবাবদিহিহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আসলে এমনই হয়। যাচ্ছে তাই করা যায়। টুটি চেপে ধরা যায়।

ছাত্রলীগকে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে নামিয়ে দিলেন আরেক মন্ত্রী। অবশ্য তিনি নিজেই এখন পলাতক। বিস্ময় নিয়ে দেশের মানুষ ভেবেছে-কীভাবে সম্ভব নিজ দেশের সন্তানের বিরুদ্ধে আরেক সন্তানকে নামানো, গুলি চালানো! ক্ষমতায় টিকে থাকার লোভে কতোটা একগুঁয়ে হলে এমনটা হতে পারে!

জুলাই শেষ হতে থাকে। পরিস্থিতি দিনকে দিন কঠিনতর হয়। দেশ-বিদেশ থেকে আত্মীয় স্বজন ফোন করেন। খবর জানতে চান। ‘আজ একটা ছাত্র বা জনতা গুলিতে মারা যাননি’ এমন খবর চেয়ে বসেন। কিন্তু সে সুখবর দেয়া যায় না। সত্য প্রচার বন্ধে সব রাস্তা বন্ধ করলেও দিন শেষে খবর পাওয়া যায় ঠিকই। লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাসপাতালে নিতেও কিনা বাঁধা দেয়া হয়। কতোটা অমানবিক হতে পারে মানুষ, রাষ্ট্রের চালকেরা।

দূর-দূরান্ত থেকে ফোনে প্রশ্ন করে মানুষ-আচ্ছা টিভিতে তো কোনো খবর পাচ্ছি না। সবকিছু স্বাভাবিক হয়েছি কি? কিন্তু তাতো নয়। বন্ধ হয়নি গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ডগ্রেনেড, হত্যার খেলা। রাতারাতি টিভি থেকে সরে গেল সব খবর। চলতে থাকলো ঘুরে ফিরে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। নাটক, সিনেমা। লাশের কথা ভুলে, তথ্য চাপা দিয়ে এমনও কি হতে পারে! এমন করে কি রাষ্ট্র চলে?

বিদ্যুৎ বন্ধ রিচার্জের অভাবে। সকাল থেকে খা খা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়েছেন সাধারণ মানুষ। দশ-পনের ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরেছেন ঘরে। এমন করেই মানুষকে ‘টাইট’ দিতে চেয়েছিল সাবেক সরকার। বিরোধীদলগুলোর উপর নিপীড়নতো চালিয়েছে বছরের পর বছর। গুম-খুন, আয়নাঘর, কণ্ঠরোধ, মত প্রকাশে বাধা, অবিচার এর সবই যেন ছিল তাদের রুটিন কাজ।

কিন্তু এভাবে জুলুম করে যে টেকা যায় না, ইতিহাস মেনে নেয় না সেটা তারা আঁচ করেনি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে।

৪ আগস্ট দিনভর কাওরান বাজারে যে দৃশ্য দেখেছি তা ভাবলে এখনো শরীর শিউরে ওঠে। এমন দৃশ্য দেখা গেছে সারা দেশেই। পুলিশের সাথে ছাত্রলীগ অ্যাকশানে নেমেছে মাঠে। ছাত্র-জনতাকে দেখলেই দৌড়ে গেছে একসাথে মারতে। পুলিশের হাতে রাইফেল, বন্দুক। ছাত্রলীগের হাতে রামদা, লাঠি, হকিস্টিক। এর আগে চলেছে ঢালাও ধরপাকড়। থানার সামনে স্বজনদের আহাজারি। বিনা দোষে আটক করা হয়েছে সাধারণ মানুষের সন্তানদের। বাদ যায়নি শিশু থেকে প্রতিবন্ধীও।

দুনিয়া একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরেকদিকে। অবশ্য তার পাশে ছিল প্রতিবেশী আরেক বন্ধু। বন্ধুকে টিকিয়ে রাখতে কলকাঠি সেখান থেকেও কম নাড়া হয়নি এমনটাও বলাবলি আছে।

অবশেষে ৫ আগস্ট হাসিনা পালালেন। ততোদিনে ঝরেছে সহস্রাধিক তাজা প্রাণ।

সবারই মনে রাখা দরকার, ৫ আগস্ট থেকে শিক্ষা নেয়া কতটা জরুরি। এখানে ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই মুখ্য নয়। শান্তি-শৃঙ্খলা, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, সবার জন্য সমসুযোগ নিশ্চিত এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করাই রাজনীতিবিদদের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা ভুলে যাই সবকিছু। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে জেঁকে বসি জনগণের ঘাড়ে। আশা করি এমনটা না হোক আর। বিশ্বাস করতে চাই-এই দেশ নতুন করে আবার গড়ে উঠবে। সংস্কার আর নির্বাচন শেষে যে দল বা যারাই ক্ষমতায় আসুক তারা জনগণের প্রকৃত সেবক হবেন। ইতিহাস মনে রাখবেন।

mzamin

ইসরায়েলি সেনারা যেভাবে সিনওয়ারের সন্ধান পেয়েছিল

ইয়াহিয়া ইব্রাহিম হাসান সিনওয়ার ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি নেতা এবং রাজনীতিবিদ। স্বাধীনতাকামী এই নেতাকে নিয়ে ধারণা করা হচ্ছিল, দীর্ঘ সময় মাটির নিচে হামাসের তৈরি সুড়ঙ্গের মধ্যে একদল দেহরক্ষী এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের ‘মানবঢাল’ বানিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

তবে মৃত্যুর আগে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার মুখে মাত্র তিনজন সঙ্গীকে নিয়ে একটি ভবনের কক্ষে প্রবেশ করলেও শেষ মুহূর্তে তিনি ছিলেন একা। সিনওয়ারের অবস্থান শনাক্তকারী ড্রোনের ক্যামেরায় এই নেতাকে হত্যার আগের মুহূর্তের ভিডিও এমন তথ্যই প্রকাশ করেছে।

বলা হয়ে থাকে, গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালানোর মূল কারিগর বলে মনে করা হয় সিনওয়ারকে। গত জুলাইয়ে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়া হত্যার শিকার হলে ৬১ বছর বয়সী সিনওয়ারকে হামাসের সামগ্রিক নেতা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ নিশ্চিত করেন, বুধবার সেনারা সিনওয়ারকে হত্যা করেছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফও বলছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামাসের শীর্ষ নেতাদের অবস্থান শনাক্তের পর ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ গাজায় অভিযান চালায়। আইডিএফের ৮২৮ ব্রিগেডের সেনারা সেখানে তিনজনের অবস্থান শনাক্ত এবং তাদের হত্যা করা হলে ডিএনএ পরীক্ষা করে তাদের মধ্যে একজনকে সিনওয়ার বলে নিশ্চিত করা হয়।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, তাদের ৮২৮তম ব্রিগেডের একটি ইউনিট বুধবার রাফার তাল আল-সুলতান এলাকায় টহল দিচ্ছিল। ওই সময় সেখানকার একটি ভবনে অভিযান চালানো হলে ওই ভবনে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়। ওই তিনজনের মধ্যে একজনের সঙ্গে হামাস নেতা সিনওয়ারের শারীরিক গঠনের মিল পান ইসরায়েলি সেনারা। পরে সেই মৃতদেহের আঙুলের একটি অংশ পরীক্ষার জন্য ইসরায়েলে পাঠানো হয়। আরও পরে ওই এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হামলায় প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন থেকে মৃতদেহগুলো বের করে ইসরায়েলে নিয়ে যায় অভিযান পরিচালনাকারী সদস্যরা। ইসরায়েলেই ডিএনএ পরীক্ষা করে এবং ড্রোনের ভিডিও ও কয়েকটি গ্রাফিতি ছবির সাহায্যে সিনওয়ারের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

আইডিএফের মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি এ নিয়ে জানান, ওই ভবনে যে সিনওয়ার আছেন, সেটি তাদের বাহিনী নিশ্চিতভাবে জানত না। তাদের অভিযান শুরু হলে তিনজন বন্দুকধারীকে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে দৌড়াতে দেখেছে সেনারা। একবার গুলি চালানো হলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান ও সিনওয়ার একা ভবনের একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর একটি ড্রোন দিয়ে তার অবস্থান শনাক্ত করে তাকে হত্যা করা হয়।

হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার। ছবি : সংগৃহীত
হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার। ছবি : সংগৃহীত



গাজা যুদ্ধ কি দ্রুতই শেষ হচ্ছে?

গত বছরের ৭ অক্টোবর, যখন গাজার হামাস একটি নজিরবিহীন হামলা চালায়, তখন ইয়াহিয়া সিনওয়ারের নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তিনি ছিলেন হামাসের কৌশলগত মাথা, যিনি সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ১৭ অক্টোবর, ইসরায়েলের হামলায় তার মৃত্যু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন মোড় নিয়ে এসেছে।

সিনওয়ারের হত্যাকে ইসরায়েল একটি কৌশলগত বিজয় মনে করছে এখনো পর্যন্ত। তবে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, হামাসের মতো সংগঠনের ক্ষেত্রে একটি নেতার মৃত্যু সাধারণত তাদের কার্যক্রমকে রুদ্ধ করে না। হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইয়াসিন হত্যার পরও সংগঠনটি পুনরুদ্ধার হয়ে তাদের সক্ষমতা জানান দিয়েছে। তাই হামাস প্রধানের অনুপস্থিতি যদিও সংগঠনের জন্য একটি শূন্যতা সৃষ্টি করবে, কিন্তু এটি হামাসের আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না মনে করা হচ্ছে অতীত ইতিহাসের শিক্ষা থেকে।

অপরদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়, যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। তারা মনে করে, সিনওয়ারের মৃত্যু হামাসের দুর্বলতা সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে গাজার পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা বাড়াবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ যুদ্ধের অবসান হওয়া খুবই কঠিন, কারণ হামাসের আদর্শ এবং তাদের যোদ্ধাদের প্রতিশ্রুতি এখনো অটুট রয়েছে।

সিনওয়ারের মৃত্যুর পর হামাসের সম্ভাব্য কৌশল পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু সংগঠনটি যে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত, তা স্পষ্ট। হামাসের যোদ্ধারা তাদের নিজেদের ইতিহাস, পরিবার এবং আত্মীয়স্বজন হারানোর পর এখন আর কিছু হারানোর নেই। এ পরিস্থিতিতে, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধের অবসানের চেষ্টা করা হলেও, হামাস তাদের দাবি ও অবস্থানে দৃঢ় থাকতে পারে।

গাজার পরিস্থিতি এখন ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইসরায়েলের হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং যুদ্ধের অঙ্গীকার নিয়ে যোদ্ধাদের মধ্যে এক ধরনের ঘৃণা ও প্রতিশোধের জাগরণ রয়েছে। এ অবস্থা শুধু গাজা নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গঠনে এক নতুন ধারা তৈরি করতে পারে।

হিজবুল্লাহ ও ইরানের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তাদের সামরিক শক্তি এখনো পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি এবং সংকটের এ সময়ে তাদের অনুপ্রবেশ সংঘাতকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।

মোটের ওপর, ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মৃত্যু গাজার পরিস্থিতিকে জটিল করেছে, কিন্তু এটি হামাসের সংগ্রামকে শেষ করতে সক্ষম হবে না। ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে যে আদর্শ এবং সংগ্রামের ইতিহাস বিদ্যমান, তা তাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করবে। ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের আশা থাকা সত্ত্বেও, সংঘাতের সমাপ্তি এখনো দূরবর্তী বলেই মনে হচ্ছে।

ছবি : রয়টার্স

ইরানের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হাজির রাশিয়া

যুদ্ধের ঘণ্টা বাজাল ইরান। চির শত্রু দেশ ইসরায়েল এখনো মুখের লড়াই চালাচ্ছে। তবে যে কোনো সময় ইরানে হামলা চালাতে পারে তেলআবিব। প্রতিশোধমূলক এ হামলার আশঙ্কার মধ্যেই এবার সাগরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন শুরু করল ইরান।

ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়ে ইতোমধ্যে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা দেখিয়েছে তেহরান। এবার নৌপথেও শক্তি দেখিয়ে তেলআবিবকে সতর্ক বার্তা দিতে চাইছে ইরান।

গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে ইরানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। নিজেদের যুদ্ধজাহাজ নিয়ে বন্ধুর এ নৌমহড়ায় যোগ দিয়েছে মস্কো। শনিবার ভারত মহাসাগরে শুরু হওয়া এই মহড়ায় রাশিয়ার পাশাপাশি অংশ নিয়েছে ওমানও। এছাড়া আরও ৯টি দেশ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় আছে। সে তালিকায় এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের নামও।

এই নৌমহড়ার নাম দেওয়া হয়েছে আইম্যাক্স-২০২৪। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, এই অঞ্চলে সম্মিলিত নিরাপত্তা, বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রসার এবং শান্তি, বন্ধুত্ব এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষায় সদিচ্ছা ও সক্ষমতা প্রদর্শনই এ মহড়ার লক্ষ্য।

এমন এক সময় এ মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য তেতে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোয় ইরানও রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে সখ্যতা বাড়িয়েছে। 

ইরানের সঙ্গে যৌথ নৌমহড়ার অংশ নিচ্ছে রাশিয়া। ছবি : সংগৃহীত

ফিলিস্তিনকে সৌদি আরবের হাতে তুলে দেবে যুক্তরাষ্ট্র?

বানরের রুটি ভাগাভাগি চলছে। সাজানো গোছানো ফিলিস্তিনের ভেতর জোর করে আরেকটি রাষ্ট্র পয়দা করে বিশ্বের মোড়লরা। এখন সেই রাষ্ট্র দানব হয়ে গিলে খাচ্ছে ফিলিস্তিনকে। সাত দশকের বেশি সময় আগে একবার ষড়যন্ত্র করা হয়। এখন ফিলিস্তিনকে নিয়ে নতুন আরেক ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার আন্দোলনকে চাপা দিয়ে ভূখণ্ডটি সৌদি আরবের হাতে তুলে দিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

স্বাধীন দেশেই পরাধীন হওয়া ফিলিস্তিনিরা দশকের পর দশক অধিকার আদায়ের লড়াই চালাচ্ছে। সেই সশস্ত্র লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন। তবে বুধবার এই সংগঠনের মাথা ইয়াহহিয়া সিনাওয়ারকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা দেওয়ার পরিবর্তে বরং সৌদি আরবের হাতে তুলে দিলে ভূখণ্ডটি ইসরায়েলের অধীনস্ত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্টের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সেই কূটচালের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনের প্রধান সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর স্বপ্ন দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বিস্তারিত পরিকল্পনাও পেশ করেছেন। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে লাভের পুরো গুড় খাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ফিলিস্তিন নিয়ে মোটেও মাথাব্যথা নেই সৌদি আরবের। তবে মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিলিস্তিনকে সৌদি আরবের হাতে তুলে দেওয়া হবে। রিয়াদের কর্মকর্তারা, অস্ত্রের ঝনঝনানিতে মধ্যপ্রাচ্য শাসন করতে চায়। এজন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালার পাশাপাশি ফিলিস্তিনকে বলি দিতেও আপত্তি নেই রিয়াদের কর্মকর্তাদের। অথচ সেই সৌদির হাতেই ফিলিস্তিনকে তুলে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

পশ্চিম তীরের নেতৃত্বের ওপর আগে থেকেই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে গাজাকে নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হচ্ছে তেল আবিবের। তাই দীর্ঘদিন ধরে গাজা সংস্কারের বিভিন্ন পরিকল্পনা পেশ করে আসছেন নেতানিয়াহু। তাদের সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা তৃতীয় কোনো দেশের কাছে গাজাকে তুলে দেওয়া হতে পারে। সিনওয়ারের মৃত্যু সে দরজাই এখন খুলে দিয়েছে।

মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সিংহের মতো একা লড়ে গেছেন সিনওয়ার। তার নিঃসঙ্গ মৃত্যু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনকে দুর্বল করেনি। বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, তারা দুর্বল হবে না। আঘাত হানবে নতুন উদ্যমে। কেননা রক্তে স্বাধীনতার নেশা লাগলে আগুনও শীতল হয়ে যায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতার লোভে গাজাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেও বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে প্রতিধ্বনি হবে ফ্রি প্যালেস্টাইন।

ফিলিস্তিন ভূখণ্ড। ছবি : সংগৃহীত

হাসিনার সরকারের পতন ভারত হজম করতে পারেনি: বদরুদ্দীন উমর

ভারত শেখ হাসিনা সরকারের পতন এখন পর্যন্ত হজম করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন লেখক-গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, এর কারণ ভারতের সঙ্গে তার প্রত্যেক প্রতিবেশীর সম্পর্ক খারাপ। শুধু বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব ছিল। ভারত বাংলাদেশকে আশ্রিত রাজ্যের মতো বিবেচনা করত। সেই আশ্রিত রাজ্য হাত ফঁসকে গেছে।

‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান: জনগণের হাতে ক্ষমতা চাই, জনগণের সরকার–সংবিধান–রাষ্ট্র চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে বদরুদ্দীন উমর এ কথা বলেন। আজ শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এই সভার আয়োজন করে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে ‘ক্ষমতায় রাখার জন্য যা দরকার’ ভারত তা করেছে বলে মন্তব্য করেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে ভারত অস্বস্তিতে আছে। তারা চেষ্টা করেছিল হাসিনাকে অন্য জায়গায় দেওয়ার জন্য। অন্য দেশ আশ্রয় না দেওয়ায় ভারতই রাখল।

বদরুদ্দীন উমর বলেন, আওয়ামী লীগের সব সংগঠন ধসে গেছে। কেউ যদি মনে করে যে আওয়ামী লীগ আবার ফিরে আসবে..., সেটা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ যেভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল, এখন আওয়ামী লীগও সেভাবে শেষ হয়ে গেছে।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান ছিল বায়ান্ন সাল থেকে এখন পর্যন্ত সংঘটিত অভ্যুত্থানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক, গভীর ও আক্রমণাত্মক বলে উল্লেখ করেন বদরুদ্দীন উমর। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে জনগণের ওপর এমন অত্যাচার, নির্যাতন করেছে, যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল, কিন্তু বিক্ষোভের সুযোগ ছিল না।
দ্বিতীয় স্বাধীনতার বিষয়টি আজগুবি

গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা পরিবর্তনকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলা হচ্ছে উল্লেখ করে বদরুদ্দীন উমর বলেন, এটা একটা আজগুবি ব্যাপার। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি হলো, স্বাধীন হলাম আমরা। সেই অর্থে তো এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা নয়। এই গণ–অভ্যুত্থানের ফলে তো এখানে নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি।’

অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পলায়নের পর সারা দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙা এবং তাঁর বাড়িতে (ধানমন্ডি ৩২) আগুন দেওয়া নিয়েও কথা বলেছেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের সাম্প্রতিক একটি লেখার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘তিনি (মাহফুজ আনাম) এক প্রবন্ধে বলেছেন, শেখ হাসিনার অপশাসনের সঙ্গে শেখ মুজিবকে জড়ানো ঠিক হবে না। শেখ মুজিবকে জড়িয়েছে কে? শেখ মুজিবকে জড়িয়েছে তাঁর মেয়ে। সব কিছুর সঙ্গে সে মুজিবকে জড়িয়েছে। শেখ মুজিবকে জড়িয়ে প্রোপাগান্ডা করেছে।’ বদরুদ্দীন উমরের মতে, এর ফলে বিক্ষোভ হয়েছে এবং এই বিক্ষোভ যে কেবল শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে হয়েছে তা নয়, শেখ মুজিবের বিরুদ্ধেও হয়েছে।

৭ মার্চ, ১৫ আগস্টসহ সম্প্রতি যেসব দিবস বাতিল করা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়েছে বলেও মনে করেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্ট কেন ছুটি থাকবে? ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, আব্রাহাম লিংকনকে খুন করেছে, ছুটি আছে? এই দিবসে কর্মসূচি করতে পারে, কিন্তু জাতীয় দিবস হিসেবে ছুটি কেন?
মুজিব কিসের জাতির পিতা?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা বলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, এ দেশের জনগণ দুবার তাঁর (মুজিব) বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে হত্যা করার পর একজন লোকও তাঁর পক্ষে রাস্তায় আসেনি।

স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরে শেখ মুজিব কী করলেন, যাঁর জন্য মানুষ এটা করল, তা হিসাব করতে হবে উল্লেখ করে বদরুদ্দীন উমর বলেন, তাঁর আসল পরিচয় পাওয়া যায় যখন ক্ষমতায় আসেন। তখন এই দেশের জনগণকে তিনি কী দিয়েছেন? তারপর গত ৫ আগস্ট সারা দেশের জনগণ শেখ মুজিবের মূর্তি ভেঙে ফেলল। তাঁর বাড়িতে আগুন দিল। এটা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে একটা রায়।
ইউনূস সরকার উড়ে এসে জুড়ে বসেনি

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার উড়ে এসে জুড়ে বসেনি বলে মনে করেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হওয়ার পর একটা শূন্যতার সৃষ্টি হলো। এই শূন্যতা পূরণ করা দরকার ছিল। ছাত্র ও অন্যরা মিলে যদি এই সরকার দাঁড় না করাত, একমাত্র বিকল্প ছিল সামরিক সরকার। যারা এই সরকারের বিরুদ্ধে এখন বলছেন, তাঁরা কি বলবেন এর চেয়ে সামরিক সরকার ভালো ছিল?

বিদ্যমান সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন সংবিধান করার পক্ষে বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, এমন একটা সংবিধান করতে হবে যা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতা আছে উল্লেখ করে বদরুদ্দীন উমর বলেন, শেখ হাসিনা যে শ্রেণির ওপর দাঁড়িয়ে রাজত্ব করেছে, সেই শ্রেণি আছে এখনো, উৎখাত হয়নি। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সেই শ্রেণির রাজনৈতিক দল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বদরুদ্দীন উমর বলেন, বর্তমান সরকার এমন কিছু করতে পারবে না, যাতে দেশের মানুষের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচিত হলেও সব সমস্যার সমাধান করে দেবে না। বিএনপি আগে ক্ষমতায় ছিল, দেখেছি তারা কী করেছে। প্রকৃত বৈষম্যহীন সমাজ শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়া সম্ভব নয়।’

এই সরকার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে পারছে না উল্লেখ করে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হচ্ছে রেশনিং পদ্ধতি চালু করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের চেষ্টাকে ‘পাগলামি’ বলে উল্লেখ করেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যে গুণ্ডামির রাজনীতি করেছে, তা বন্ধ করতে হবে।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিমসহ দলটির নেতা সজীব রায়, ভুলন ভৌমিক ও কাজী ইকবাল, মাইকেল চাকমা প্রমুখ।

লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর
লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর। ফাইল ছবি

শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া নিয়ে ভারত যা ভাবছে by শুভজ্যোতি ঘোষ

প্রায় আড়াই মাস হতে চলল, বাংলাদেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা একটি সামরিক উড়োজাহাজে চেপে দিল্লিতে অবতরণ করেছিলেন। তার পর থেকে তাঁকে আর এক মুহূর্তের জন্যও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর কোনো ছবি দেখা যায়নি। নানা কথিত ফোনালাপের অডিও ফাঁস হলেও সেগুলো যে তাঁরই কণ্ঠস্বর, এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভারতে এসে নামার পর থেকে তিনি যেন কার্যত হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন!

শেখ হাসিনা (বা তাঁর সঙ্গে আসা ছোট বোন শেখ রেহানা) দিল্লিতে নামার পর থেকে কীভাবে আছেন, কোথায় আছেন, তা নিয়ে ভারত সরকারের মুখপাত্র, মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকেরা আজ পর্যন্ত একটি কথাও বলেননি; কোনো সংবাদ সম্মেলনে নয়, কোনো সাক্ষাৎকারেও নয়।

তবে ভারত সরকার গত বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ও পরোক্ষে এটুকু শুধু জানিয়েছে যে শেখ হাসিনা এখনো ভারতেই অবস্থান করছেন। গত সপ্তাহে বিবিসি বাংলা জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার আমিরাত বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে যাওয়ার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ফলে সেটুকু অন্তত এখন ভারত সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।

শেখ হাসিনার এই দেশে থাকা নিয়ে ভারত সরকার সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখতে সফল হয়েছে, এটা যেমন ঠিক, তাঁকে কত দিন ভারতে রাখতে হবে, সে ব্যাপারে দিল্লি কিন্তু এখনো পুরোপুরি অন্ধকারে।

দিল্লির সাউথ ব্লকের শীর্ষস্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তার ধারণা, বেশ লম্বা সময়ের জন্যই (ইট’স গোয়িং টু বি আ লং হল) শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকতে দিতে হবে। এ বাস্তবতার জন্যই সরকার এখন ক্রমে প্রস্তুত হচ্ছে।

তাহলে ভারত অতীতে যেভাবে তিব্বতি ধর্মগুরু দালাই লামা বা আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর স্ত্রী-সন্তানদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে বিবিসি বাংলা দিল্লিতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। তার ভিত্তিতে যে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, তা মোটামুটি এ রকম:

প্রথমত, ভারতের চোখে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা হলেন একজন ‘গেস্ট, বাট আন্ডার কমপালশন’! অর্থাৎ তিনি রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত অতিথি, যাঁকে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে ভারতে চলে আসতে হয়েছে। নিজ দেশে তাঁর নিরাপত্তা বা সুরক্ষা বিপন্ন হয়ে উঠেছিল বলেই তিনি ভারতে এসেছেন, এটাও ভারত খুব ভালো করেই জানে। এখন এই ‘অতিথি’র স্ট্যাটাসেই তাঁকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই দেশে রেখে দেওয়া যেতে পারে—ভারতের তাতে কোনো অসুবিধা নেই। দেশের পুরোনো বন্ধু ও অতিথি হিসেবে তিনি সব প্রাপ্য সম্মানই পাবেন।

দ্বিতীয়ত, পরে পরিস্থিতি অন্য রকম হলে অন্য কিছু ভাবা যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ভারতের নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি নিজেও রাজনৈতিক আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) জন্য কোনো আবেদন করেননি। কিন্তু যদি সত্যিই পরে সে রকম কোনো প্রস্তাব আসে, ভারত সরকার জানে, এ ব্যাপারে দেশের সব দলই একমত হবে এবং শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা কোনো সমস্যাই হবে না। কিন্তু এখনই আগ বাড়িয়ে এ রকম কোনো পদক্ষেপ দিল্লি নিতে চাইছে না। ফলে এককথায় বলতে গেলে আপাতত ভারত শেখ হাসিনাকে ‘আতিথেয়তা’ দিতে চাইছে, ‘আশ্রয়’ নয়।

বৃহস্পতিবার দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘আপনারা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে অবস্থান নিয়ে জানেন...তাঁকে এখানে খুব স্বল্প সময়ের নোটিশে চলে আসতে হয়েছিল প্রধানত সুরক্ষার কারণে। তিনি এখনো সেভাবেই আছেন।’

এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে রণধীর জয়সোয়াল এটুকু অন্তত প্রকারান্তরে জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনা এখনো ভারতেই অবস্থান করছেন। তবে এরপরও শেখ হাসিনাকে নিয়ে বহু প্রশ্নের জবাব এখনো অজানাই রয়ে গেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, গত আড়াই মাসে শেখ হাসিনার গতিবিধি নিয়ে ঠিক কতটুকু নিশ্চিতভাবে জানা গেছে, আর কোনগুলো নেহাতই জল্পনা বা গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে? বিবিসি বাংলার নিজস্ব অনুসন্ধান বলছে:

১) গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত শেখ হাসিনা আগাগোড়া ভারতেই ছিলেন, ভারতেই রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে বা আমিরাতের আজমান শহরে পাড়ি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না; তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার জন্য তিনি বিমানেও চাপেননি। বিমানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে তাঁকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে, এ খবরও সম্পূর্ণ অসত্য।

২) ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে এসে নামলেও পরবর্তী দু–তিন দিনের মধ্যেই তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এটাও নিশ্চিত। হিন্ডন মূলত ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটি। সেখানে একজন ভিভিআইপি অতিথির লম্বা সময়ের জন্য থাকার কোনো সুব্যবস্থা নেই। কাজেই শেখ হাসিনাকে সেখানে থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রথম সুযোগেই।

৩) শেখ হাসিনা যাতে প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো দেশে সফর করতে পারেন, এ জন্য ভারত সরকার তাঁকে ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ (টিডি) দিয়েছে—এ মর্মেও সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। ভারত সরকার কিন্তু ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছে, বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার, কিছুই করেনি। ফলে শেখ হাসিনা ভারতের কাছ থেকে টিডি পেয়েছেন, এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

৪) শেখ হাসিনা এখনো ভারতেই আছেন, সরকার এটা নিশ্চিত করলেও তিনি রাজধানী দিল্লিতেই আছেন কি না, সেটা কিন্তু নিশ্চিত নয়। শেখ হাসিনা ঠিক কোথায় থাকতে পারেন, তা নিয়ে দুরকম জল্পনা শোনা যাচ্ছে—ক) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দিল্লিতে কর্মরত মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের বাসভবনে তাঁর সঙ্গেই শেখ হাসিনাকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে; আর খ) দিল্লির কাছে উত্তর প্রদেশের মিরাট বা হরিয়ানার মানেসরে একটি আধা সামরিক বাহিনীর অতিথিনিবাস বা ‘সেফ হাউসে’ তিনি থাকছেন।

বিবিসি বাংলা আভাস পেয়েছে, এর মধ্যে প্রথমটির কোনো ভিত্তি নেই, কিন্তু দ্বিতীয় জল্পনাটি সত্যি হলেও হতে পারে।

৫) শেখ হাসিনাকে গত আড়াই মাসের মধ্যে দিল্লির বিখ্যাত লোদি গার্ডেনে প্রাতর্ভ্রমণ করতেও দেখা যায়নি। তিনি রাজধানীর কোনো সুপারস্টোরে কেনাকাটাও করতে যাননি। এগুলো শতভাগ গুজব। এসব দাবির সপক্ষে কেউ কোনো ছবিও দেখাতে পারেনি, কেউ তাঁকে ওসব জায়গায় নিজের চোখে দেখেছেন—এমন দাবি নিয়েও এগিয়ে আসেননি।

৬) শেখ হাসিনাকে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে খুবই ‘নিরাপদ’ কোনো জায়গায় রাখা হয়েছে, তিনি ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াতে পারছেন না—এটা যেমন ঠিক, তাঁকে ‘গৃহবন্দী’ রাখা হয়েছে বলাটাও কিন্তু সমীচীন নয়। প্রমাণ হিসেবে বলা চলে, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ফোনের অ্যাকসেস ঠিকই বহাল আছে, যুক্তরাষ্ট্র বা দিল্লিতে অবস্থানরত নিজের ছেলেমেয়ের সঙ্গেও তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ আছে। এমনকি দলের যে নেতা-কর্মীদের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ছিল, তাঁরাও অনেকেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন এবং কথাবার্তাও বলেছেন।

৭) তবে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে ভারতে আসতে হয়েছে, তারপর যেকোনো অতিথিকেই কিছু ‘ডিব্রিফিং সেশন’–এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এখন তাঁর কাছ থেকে ভারত কী (ডুজ অ্যান্ড ডোন্টস) প্রত্যাশা করছে, তার কোনটা বলা উচিত বা কোনটা বলা উচিত নয় বলে মনে করছে, এসব সেশনে ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁকে সে ব্যাপারে ব্রিফ করেছেন এবং তাঁর কাছ থেকেও ‘নোটস’ নিয়েছেন—বিবিসি এটাও নিশ্চিতভাবেই জানতে পেরেছে।

তবে এত কিছু ছাপিয়ে দিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত দুর্গাপূজার প্রাঙ্গণে বাঙালিদের আড্ডায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ছিল, শেখ হাসিনা কি এবারে ইলিশের ভরা মৌসুমে বাংলাদেশের ইলিশ খেতে পেলেন? তাঁকে নিয়ে অন্য অনেক প্রশ্নের মতো এটার উত্তরও রহস্যে মোড়াই থেকে গেছে!
‘বিন বুলায়ে মেহমান’

হিন্দি ভাষায় একটা কথা আছে, ‘বিন বুলায়ে মেহমান’,  মানে যে অতিথি বিনা আমন্ত্রণেই আপনার ঘরে এসে পৌঁছে যান।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম সারির এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে বাস্তবিকই হয়তো ‘বিন বুলায়ে’ দিল্লিতে চলে আসতে হয়েছে, কিন্তু তিনি যে আমাদের মেহমান, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই!’

ফলে ভারতের জন্য শেখ হাসিনার ‘মেহমানদারি’ বা আতিথেয়তায় ঘাটতি রাখারও কোনো অবকাশ নেই।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অজয় বিসারিয়াও মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকতে দেওয়াটা দিল্লির জন্য স্পর্শকাতর দ্বিধার (ডেলিকেট ডিলেমা) বিষয় হতে পারে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দেশে রাখা ছাড়া ভারতের সামনে দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই।

এ দেশের কূটনৈতিক মহলের বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকেরাও প্রায় সবাই একমত, এই সংকটের মুহূর্তে শেখ হাসিনার পাশে ভারতকে দাঁড়াতেই হবে। কারণ, তা না করলে আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়া বা প্রতিবেশী কোনো দেশের কোনো নেতাই ভারতের বন্ধুত্বে ভরসা রাখতে পারবেন না।

আর সেই পুরোনো বন্ধুত্বের মর্যাদা দেওয়ার সবচেয়ে সম্মানজনক রাস্তা হলো, শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় অতিথির সম্মান দিয়ে যত দিন দরকার, তত দিন ভারতেই রেখে দেওয়া।

দিল্লির থিঙ্কট্যাংক আইডিএসএর জ্যেষ্ঠ ফেলো স্মৃতি পট্টনায়ক মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালে শেখ হাসিনা যখন সপরিবার ভারতে আশ্রয় পেয়েছিলেন, তখনো কিন্তু কৌশলে তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়নি; বরং পরিচয় গোপন রেখে তাঁকে রাষ্ট্র একজন অতিথি হিসেবেই রেখেছিল।

সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেই ঘটনার প্রায় অর্ধশতাব্দী বাদে আজকের নরেন্দ্র মোদি সরকারও ঠিক একই রকম পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর যেভাবে ছদ্মপরিচয়ে ও গণমাধ্যমের নজর এড়িয়ে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দিল্লিতে রাখা সম্ভব হয়েছিল, আজকের যুগে তা সম্ভব নয় সংগত কারণেই!

কিন্তু আতিথেয়তার চরিত্র বদলালেও সেটা কিন্তু আজও আতিথেয়তাই থাকছে, আর অতিথি হিসেবে তাঁকে রেখে দেওয়াটাই এই কূটনৈতিক সমস্যার আপাতত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান বলেই দিল্লি মনে করছে।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি যে ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সরকারের মধ্যে সম্পর্কে অস্বস্তির উপাদান হয়ে উঠতে পারে, এটা অবশ্য বহু পর্যবেক্ষকই মানেন।

যেমন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির লেখক-গবেষক অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, ‘ভারতেই যদি শেখ হাসিনা থেকে যান, তাহলে সেটা হয়তো দুদেশের সম্পর্কে ডিল-ব্রেকার হবে না, কিন্তু দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিকে তা জটিল তো করবেই!’

‘যাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অভ্যুত্থান হলো, তিনিই যদি ভারতে আশ্রয় পান, তাহলে সেটা দুই দেশের সম্পর্কে অবশ্যই অস্বস্তি বয়ে আনবে এবং সেই লক্ষণ আমরা এর মধ্যে দেখতেও পাচ্ছি,’ বলছিলেন ড. পালিওয়াল।

এই জটিল পরিস্থিতিতে ভারত যদি ঘটা করে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে যায়, তাতে অবশ্যই আরও কূটনৈতিক জলঘোলা হবে।

দিল্লি মনে করছে, তার চেয়ে বরং ভালো হবে শেখ হাসিনা এখন ‘যেভাবে আছেন, সেভাবেই থাকুন’, মানে সেটা দেশের অতিথির স্ট্যাটাসে এবং অবশ্যই যত দিন দরকার।
রাজনৈতিক আশ্রয়ের ভালো–মন্দ

এত কিছুর পরও হয়তো আগামী দিনে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার কথা ভারতকে বিবেচনা করতে হতে পারে।

অতীতে যেমন তিব্বতের দালাই লামা, মালদ্বীপের মোহাম্মদ নাশিদ কিংবা আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর মতো বিদেশি নেতাদের অনেককেই ভারত রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে।

নাজিবুল্লাহ নিজে অবশ্য আশ্রয় পেয়েও ভারতে আসতে পারেননি, কিন্তু তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা দিল্লিতে বহু বছর কাটিয়েছিলেন।

হাই প্রোফাইল কোনো বিদেশি নেতা-নেত্রীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হলে সেটা সাধারণত পার্লামেন্টে ঘোষণা করা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়; যদিও তা বাধ্যতামূলক কিছু নয়।

দালাই লামার ক্ষেত্রে যেমন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৫৯ সালে নিজেই পার্লামেন্টে সে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন, আর নাজিবুল্লাহর পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার কথা কয়েক বছর পরে পার্লামেন্টে জানান আই কে গুজরাল।

শেখ হাসিনা প্রথম দফায় (১৯৭৫-৮১) যখন ভারতে ছিলেন, তখন সেটা অবশ্য কাগজে-কলমে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ ছিল না। ফলে পার্লামেন্টে তা জানানোরও প্রশ্ন ওঠেনি।

তবে তখন শেখ হাসিনা ছিলেন শুধুই প্রয়াত শেখ মুজিবের কন্যা; আর এখন তিনি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে যিনি প্রায় ২১ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন।

ফলে এ রকম একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে যদি খুব দীর্ঘ সময় ভারতে রাখার প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে একটা পর্যায়ে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে হতে পারে বলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করছেন।

শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা খুব বড় সুবিধা হলো, ভারতে কোনো রাজনৈতিক দলই সম্ভবত এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করবে না। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও বিরোধী দল কংগ্রেস উভয় দলের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক দারুণ। নরেন্দ্র মোদি কিংবা গান্ধী পরিবারের সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী—তাঁদের সবার সঙ্গেই শেখ হাসিনার একটা নিজস্ব ‘ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন’ (পারসোনাল কেমিস্ট্রি) গড়ে উঠেছে।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) সাউথ এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদ্বাজ বলছিলেন, ‘মনে রাখতে হবে, দালাই লামাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও কিন্তু বিরোধিতা করেছিলেন ভারতের কমিউনিস্টরা, যাঁরা তখন চীনের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব এলে ভারতের সব দলই যে তা স্বাগত জানাবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ, তিনি যে পরীক্ষিত ভারত-বন্ধু, এটা নিয়ে গোটা দেশেই একটা ‘ব্রড কনসেনসাস’ (সার্বিক ঐকমত্য) আছে।’

শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো, তিনি এই স্বীকৃতি পেলে তাঁকে ‘প্রত্যর্পণ’ করার বা বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার যেকোনো অনুরোধ শুধু সেই যুক্তিতেই ফেরানো যাবে।

অর্থাৎ ভারত যাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, তিনি নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন—এ আশঙ্কা থেকেই সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে; কাজেই তাঁকে বিচারের জন্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

আবার এতে অসুবিধার দিকটা হলো, শেখ হাসিনা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেলে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও অবধারিতভাবে তিক্ত হবে। বাংলাদেশে একটা শ্রেণির মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবও হয়তো ইন্ধন পাবে।

যেহেতু বর্তমান বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ ও ‘স্টেক’ শত শত কোটি টাকার, তাই দিল্লি সেই ঝুঁকি আগ বাড়িয়ে নেবে কি না, সেটাও দেখার বিষয়!
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং এরপর

এই পটভূমিতেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ১৭ অক্টোবর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ারা জারি করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারও জানিয়েছে, তারা এই নির্দেশ বাস্তবায়নে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।

যদি নির্ধারিত এক মাসের মধ্যে এই পরোয়ানা কার্যকর করতে হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, খুব শিগগির বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে লিখিত দাবিও জানানো হবে।

এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারত সরকার অবশ্য সেদিনই (১৭ অক্টোবর) কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল শুধু বলেছেন, ‘আমরাও এসব প্রতিবেদন দেখেছি, কিন্তু এগুলো নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই।’

তবে এর আগেই দিল্লিতে বহু সাবেক কূটনীতিবিদ ও বিশ্লেষক বিবিসিকে বলেছেন, তাঁরা নিশ্চিত যে দুই দেশের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধও আসে, ভারত কোনোমতেই তা মেনে নেবে না এবং দরকারে হাজারটা যুক্তি দিয়ে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করবে! তাঁরা মনে করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়াটাই প্রত্যর্পণের অনুরোধ নাকচ করার একমাত্র রাস্তা নয়, এটার জন্য আরও নানা উপায় আছে।

অন্যভাবে বললে, শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবেই ভারতে রেখে দিয়েও সেই অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

এ কারণেই দিল্লিতে পর্যবেক্ষকেরা অনেকেই মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে কৌশলগতভাবে কোন পরিচয়ে বা কোন স্ট্যাটাসে রাখা হলো, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারত তাঁকে দীর্ঘ সময়ের জন্য রেখে দিতে প্রস্তুত।

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশের কথায়, ‘উনি গেস্ট হিসেবে থাকলেন, নাকি অ্যাসাইলাম পেলেন, সেটা কোনো বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দিয়ে ভারতেই রাখা হচ্ছে কি না। ইংরেজিতে যেমন বলে না, আ রোজ ইজ আ রোজ! মানে গোলাপকে যে নামেই ডাকো, সে গোলাপই থাকে; ঠিক তেমনি শেখ হাসিনা ভারতের অ্যাসাইলাম পান বা গেস্ট হিসেবে থাকুন, তাতে কিছু আসে–যায় না। তিনি ভারতের চোখে শেখ হাসিনাই থাকবেন।’

ভারতে শেখ হাসিনার এই দফার অভাবিত অবস্থান নিয়ে এটাই বোধ হয় সবচেয়ে বড় সত্যি!

 শেখ হাসিনার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তোলা।
শেখ হাসিনার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তোলা। এএফপি ফাইল ছবি

সরজমিন: ৩ হাসপাতাল- ভোগান্তির পুরনো চিত্রই by সুদীপ অধিকারী

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রোগী ভোগান্তি কমলেও এখন আবারো রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রোগী পরিবহনে হাসপাতালের বেড, ট্রলি, হুইল চেয়ার এমনকি এম্বুলেন্স- এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের ম্যানেজ না করে পাওয়া যায় না। ইমার্জেন্সি ও বহির্বিভাগের ওটিতেও বখরা দেয়া লাগে রোগীর স্বজনদের। এসব হাসপাতালের চিকিৎসককে দেখাতে একমাসের সিরিয়ালও টাকার বিনিময়ে মিলে যায় ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে।

গতকাল সকালে সরজমিন রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের সামনে হুইল চেয়ার নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দশ থেকে পনেরো জন মধ্য বয়সী নারী-পুরুষ। এম্বুলেন্স, সিএনজি কিংবা রিকশায় চেপে যে রোগীই আসছেন, তাদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন তারা। রোগী তাদের হুইল চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ইমার্জেন্সিতে। সেখান থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আবারো তাকে নিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে। একদম হাসাপাতালের  বেডে পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার বেডের রোগীকে ট্রলিতে করে নিয়ে আসছেন বাইরের পার্ক করা গাড়ি পর্যন্ত। কেউ আবার রোগীকে ট্রলিতে উঠিয়ে ঠেলতে ঠেলতে চলন্ত গাড়ি পার করে নিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালের সামনের মেইন রাস্তা পার করে বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে। আর হুইল চেয়ারে বসিয়ে রোগীকে হাসপাতালের বাইরে বা পাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চিত্র যেন ভাত-মাছ। তবে টাকা ছাড়া রোগী পরিবহনের এসব ট্রলি-হুইল চেয়ারের শিকলে বাঁধা তালা খোলে না কেউ। তাই টাকার বিনিময়েই গতকাল নিজের অসুস্থ মাকে রিকশা থেকে নামিয়ে হুইল চেয়ারে বসাতে বাধ্য হন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে আগেও এসেছি। এখানে টাকা ছাড়া কিছুই মেলে না। আমার মা অসুস্থ। এখন তাকে যে ইমার্জেন্সিতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো, কোনো ট্রলি, হুইল চেয়ার নেই। যেগুলো আছে তা দখল করে রেখেছে কিছু মহিলা। তাদের টাকা না দিলে এগুলো পাওয়া যায় না। আব্দুল ওয়াহাব নামে আরেক রোগীর স্বজন বলেন, এই হাসপাতালে যা খুশি তাই হচ্ছে। কিছু মানুষ যারা হাসপাতালের কেউ না, তারা সকল রোগীকে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের টাকা না দিয়ে কেউ কোনো রোগী হাসপাতালে ঢোকাতেও পারে না, বেরও করতে পারে না। সাইফুল নামে এক রোগী বলেন, শুধু হুইল চেয়ার-ট্রলি নয় এই হাসপাতালের ঘাটে ঘাটে টাকা দেয়া লাগে। তিনি বলেন, বাসার বাথরুমের সামনে পড়ে গিয়ে আমার কপাল কেটে যায়। পরিবারের লোকজন আমাকে এই হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে আসে। গাড়ি থেকে নেমে ইমার্জেন্সি পর্যন্ত যেতে হুইল চেয়ারে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এজন্য ২শ’ টাকা দেয়া লাগে খালাকে। এরপর ডাক্তার দেখে ইমার্জেন্সি ওটিতে যেতে বলেন। সেখানে গেলে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে আমার ভাবীকে বলা হয়, এসব ওষুধ আনতে হবে। কিন্তু সেসব ওষুধ আনার আগেই আমার ক্ষত স্থানে সেলাই করে ব্যান্ডেজ করা হয়ে যায়। এরপর ওটিতে থাকা লোকজন আমার ভাবীকে বলেন, ওষুধ লাগবে না। আমরা কাজ করে দিয়েছি। এখন আমাদের ২ হাজার টাকা বকশিশ দেন। পরে ১২শ’ টাকায় রফাদফা হয়। ড্রেসিং করাতে আসলেও এখানে বকশিশ দিতে হয়। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আপনাকে বেশকিছু টেস্ট করাতে বলা হবে। এর মধ্যে হাতে গোনা টেস্ট এখানে করানো হবে। আর বড় বড় টেস্টগুলো করাতে ডাক্তার হাসপাতালের সামনের পপুলারে যেতে বলে। সেখানে টেস্ট করাতে গেলেও আবার ডাক্তারের নাম বলতে হয়। এর মানে ওই টেস্ট বাবদ এখানকার ডাক্তার পার্সেন্টেজ পান। গতকাল সকালে হাসপাতালটিতে দায়িত্বরত আনসার সদস্য আ. লতিফ বলেন, এইসব ট্রলি-হুইল চেয়ার হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণ করে না। যারা এইগুলো দখল করে আছেন তারাই এইগুলো ব্যবহার করে টাকা ইনকাম করছেন।

শেরে বাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পাশেই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। এই হাসপতালের অভ্যন্তরেও রোগী পরিবহনে রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকের সদস্যরাই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্যাথলজি, ক্যাথ ল্যাবসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে টাকার বিনিময়ে আনা-নেয়ার কাজ করে। আর ইমার্জেন্সিতে কয়েকটি ট্রলি রাখা হয়েছে, যা কিনা শুধু গাড়ি থেকে নামিয়ে ইমারজেন্সি পর্যন্ত নেয়া যায়। বাকি কাজ টাকার বিনিময়েই করতে হয়। আর এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের টাকা না দিলে হাসপাতালের বেড পর্যন্ত পাওয়া যায় না। সজীব নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালের সামনে থেকে বোঝা যায় না এর ভিতরে কতো দুর্নীতি চলে। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে আমি আমার বাবাকে নিয়ে এই হাসপাতালে রয়েছি। প্রথমদিন রাতে যখন আমি আমার বাবাকে নিয়ে এখানে আসি, তখন ইমার্জেন্সি থেকে সিসিইউতে পাঠানো হয়। সেখানে গেলে বেশকিছু ওষুধ আনতে বলে নার্স। আবার বেডে দেয়ার পর যেই টেস্ট দেয়া হয়েছে তার মধ্যে দুইটা বড় টেস্ট পপুলার থেকে করাতে বলা হয়। হাসপাতাল থেকে নাকি করানো যায় না। পপুলার ডায়াগনস্টিকে টাকা জমা দিলেই তাদের লোক এসে হাসপাতাল থেকে টেস্ট করিয়ে দিয়ে যান। তিনি বলেন, সাধারণত হৃদরোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীরই স্টেন্ট বা ‘রিং’ পরাতে হয়। এনজিওগ্রাম করিয়ে চিকিৎসকরা বলেন, একবারে রিং পরিয়ে নিতে। এই জন্য পস্তুতি রাখতে বলা হয় রোগীর স্বজনদের। স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারলেও যে রিং স্থাপন করা হয়, সেটির গুণ-মান সম্পর্কে রোগী বা তার স্বজনের জানার কোনো সুযোগ থাকে না। চিকিৎসকরা যেটা ভালো বলেন সেটাই আমরা বিশ্বাস করে নিই। এখানে এক বিশাল সিন্ডিকেট আছে। তাদের এম্বুলেন্স ছাড়া বাইরের কেউ রোগী পরিবহন করতে পারে না। তারা যেই ভাড়া নির্ধারণ করে দেন তা দিয়েই যেতে হয়। গতকাল দুপুরে হৃদরোগ হাসপাতালে এই প্রতিবেদককে সাদা গেঞ্জি পরা এক লোককে দেখিয়ে তিনি বলেন, ওই যে লোকটাকে দেখছেন তিনিই সব এম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণ করেন। মাঝ থেকে তিনি কমিশন খান। কর্তব্যরত আনসার সদস্য জিয়াউলও তাকে দালাল হিসাবে আখ্যায়িত করেন।

এদিকে একই এলাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বা পঙ্গু হাসপাতালেরও অবস্থা একই। সেখানেই রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। গতকাল সরজমিন দেখা যায়, ইয়াসমিন নামে এক রোগীর স্বজন তার রোগীকে বহনের জন্য জরুরি বিভাগের সামনে হন্যে হয়ে ট্রলির খোঁজ করছেন। খালি ট্রলি নিয়ে ওয়ার্ডবয়, খালারা যাতায়াত করলেও তাকে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন অজুহাত। ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো কাজ না হওয়ায় সহপাঠীকে কোলে নিয়েই ছুটে যান জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কাছে। তিনি বলেন, একেক জন ট্রলি নিয়ে চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমি আমার রোগী নামাবো কেউ দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে সরকারি হাসপাতালের রোগী বহনের এইসব ট্রলি যেন তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি। একই সময়ে হাসপাতালটি থেকে ছাড় পাওয়া রোগীকে এম্বুলেন্সে তুলে দেয়ার চিত্র দেখিয়ে তিনি বলেন, ওই দেখেন কীভাবে টাকা নিচ্ছে এই ট্রলি খাটিয়ে। চাঁদপুরের মতলব থেকে গতকাল হাসপাতলটির বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা মোতালেব নামে এক রোগী বলেন, এটা সরকারি হাসপাতাল না, এখানে শুধু টাকার খেলা। যেখানে যাবেন সেখানেই টাকা। তিনি বলেন, একটা দুর্ঘটনায় আমার হাতের শিরা কেটে যায়। স্থানীয় সদর হাসপাতাল থেকে হাতে সেলাই দিয়ে বলা হয় বাকি চিকিৎসা পঙ্গুতে। এখানে আসার পর কয়েক দিন ঘুরে একমাস পরের সিরিয়াল পাই। পরে রফিক স্যারের (পঙ্গু’র চিকিৎসক) এটেন্ডেন্টকে ৫শ’ টাকা ঘুষ দিয়ে দশদিন পরের ডেট নিই। তিনি বলেন, ডাক্তার সামান্য দুই দফা চিকিৎসা দিয়েছেন। তাতেই ২৯ হাজার টাকা চলে গেছে। এখনো মূল চিকিৎসা পড়েই আছে। দুইদিন পরে আবার আসতে বলেছে। কিন্তু ঢাকায় থাকার মতো যায়গা নেই তাই বহির্বিভাগের সামনেই মাদুর বিছিয়ে এই দু’দিন স্বামী-স্ত্রী থাকবো।

এ বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান বলেছেন, আমরা কখনোই চাই না আমাদের রোগী পরিবহনে বা হাসপাতালে আগত রোগীরা ভোগান্তির শিকার হোক। আমরা এইসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। অফিসিয়ালি ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এরপরও কিছু লোক আমাদের চোখের আড়ালে কিছু কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। আমরা এদের বিরুদ্ধে অতিসত্বর যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।

mzamin

এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে পুলিশের রাঘববোয়ালরা: সাবেক ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১২৬ মামলা

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলি করে মানুষ হত্যার দায়ে পুলিশের সাবেক আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যায়ের ১৮৪ কর্মকর্তা ও সদস্যের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম, ডিএমপি’র সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার, সাবেক ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা প্রধান হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধেই এখন পর্যন্ত ১২৬টি মামলা হয়েছে। তবে গত ৫ই আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর থেকে এদের কারোরই আর বাংলাদেশের মাটিতে দেখা যায়নি। এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের ভ্যানগার্ডখ্যাত পুলিশের এই রাঘববোয়ালরা।

পুলিশ সূত্র বলছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৭টি, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমারের বিরুদ্ধে ২৯টি,  সাবেক ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা প্রধান ও ডিএমপি’র সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুনের বিরুদ্ধে ৪৯ ও এসবি’র সাবেক প্রধান মনিরুলের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়াও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে হয়েছে ৪১টি, আরেক সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের বিরুদ্ধে ৩টি, ডিএমপি’র সাবেক কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে ১টি, সিআইডি’র মোহাম্মদ আলী মিয়ার বিরুদ্ধে ২টি, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে ৫টি, পুলিশ সদর দপ্তরের বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত আইজি লুৎফুল কবীরের বিরুদ্ধে ১টি, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে ২টি, পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি জামিল আহমেদের বিরুদ্ধে ১টি, ডিএমপি’র সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার খন্দকার মহিদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ২টি, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেনের বিরুদ্ধে ১টি, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২টি, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান (অতিরিক্ত কমিশনার) মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৫টি, সাবেক ডিআইজি রিপন সরদারের বিরুদ্ধে ১টি, খালিদ হাসানের বিরুদ্ধে ১টি, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দারের বিরুদ্ধে ৫টি, ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ৮টি, ডিবি’র এসআই অমিতাভ দর্জির বিরুদ্ধে ৪টি মামলা হয়েছে। এসব পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে সাবেক আইজিপি শহীদুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল কাফীসহ বেশ কয়েকজন আটক হওয়ার পর বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তবে মামলা হওয়া কর্মকর্তার বেশির ভাগই রয়েছেন আত্মগোপনে। যাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কেউ বিপুল টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী দেশের কাঁটাতার অতিক্রম করেছেন, কেউ আবার বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছেড়েছেন।

সম্প্রতি প্রচারিত হওয়া ডিবি হারুনের একটি সাক্ষাৎকারে ধারণা করা যায় বর্তমানে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তা। তিনি দাবি করেছেন- তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরও তিনি চাকরিতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। তবে জীবনের মায়ায় তিনি চাকরিতে যোগ না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। তার স্ত্রী ও দুই সন্তান সেখানকার নাগরিক। সেখানে তার বাড়ি-গাড়ি সব রয়েছে। তাই আপাতত সেখানেই থাকবেন তিনি। এদিকে সাবেক এসবি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামের ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থানের প্রমাণ মিলেছে। সম্প্রতি তিনি নয়াদিল্লির কানঘট প্লেসের একটি গ্রোসারি স্টোর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করছেন এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তবে এক সাক্ষাৎকারে তার দাবি- তিনি দেশেই আছেন। জীবনের নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে ফিরছেন না। ডিএমপি’র আরেক দাপুটে সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারও গত ১০ই সেপ্টেম্বর লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন। তাকে সহায়তাকারী পাচারকারীদের এ সংক্রান্ত কয়েকটি কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন পাটগ্রাম ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পঙ্কজ কুমার মদন নামে এক ব্যক্তিকে পাটগ্রাম শহর থেকে ১০ই সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে আটক করে স্থানীয় জনসাধারণ। পরে তাকে পাটগ্রাম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এর আগে একইদিন বিকালে দহগ্রামের ডাঙ্গাপাড়া ওলেরপাড় এলাকার ওসমান গণির ছেলে পাচারকারী শুভ (৩০) রংপুরে টাকা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে। এই সময় স্থানীয় বিএনপি’র কয়েকজন নেতা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাটগ্রামের বিএনপি’র কয়েকজন নেতার সঙ্গে শুভর ব্যাপারে কথা বলেন। ওই সময় শুভও সেই মোবাইলে কথা বলেন। কথা বলার একপর্যায়ে শুভ বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকারকে দহগ্রাম সীমান্ত পথ দিয়ে ভারতে পার করে দেয়া হয়। এ সময় ব্র্যাক ব্যাংকের পঙ্কজ ও দহগ্রামের আকছেদুল, মমিন, লম্বা শাহীন, ফারুক, রাজীব, শামীম ও মকছেদুলের সহায়তায় বিপ্লবকে পার করা হয়। জলঢাকা মীরগঞ্জের মিঠু, নিশাদ, রুবেল বিপ্লবকে পাটগ্রামে আনতে সহায়তা করে। সীমান্ত পার করার সময় তার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেয়া হয়।’

এদিকে ডিএমপি’র সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানও ভারতে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে। ভারতের টুরিজম স্পট গোয়া’র একটি হোটেলে তাকে এবং যুবলীগের সাবেক নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটকে দেখা গেছে। এ ছাড়াও গত ১৮ই সেপ্টেম্বর বিমানবন্দর ব্যবহার করে সিডনি পালিয়ে গিয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মীর রেজাউর আলম। এর আগে গত ৪ঠা মে রাতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। বিমানবন্দরের সিসিটিভির ফুটেজে তার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, পুলিশের যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই বিদেশে অবৈধভাবে অর্থপাচার করে বিপুল বিত্ত-বৈভব গড়ে তুলেছেন। এরমধ্যে সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিপুল পরিমাণ অর্থ সিঙ্গাপুরে সাবেক এক জাসদ ছাত্রলীগ নেতার হেফাজতে রয়েছে। হারুন অর রশিদ টাকার পাহাড় গড়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। হারুনের স্ত্রী ডিবি লটারির মাধ্যমে আমেরিকা যাওয়ার কারণে তিনি বেশির ভাগ অর্থ আমেরিকায় পাঠিয়েছেন। সাবেক ডিআইজি ইমাম হোসেনের থাইল্যান্ডে ব্যবসা রয়েছে। এ ছাড়া মনিরুজ্জামান ও বাতেনসহ অন্যরাও মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছেন।

এসব বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য পুলিশ বদ্ধপরিকর। আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন যে, যারা অপরাধী তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে এবং অপরাধী পুলিশ সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া, যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়াও পুলিশের যে সকল সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

mzamin


আওয়ামী লীগকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস: ১০ বছরের সাজা খাটছে কিশোর

‘আওয়ামী লীগ’ শব্দ নিয়ে ‘তিরিশ বছরের পরের গল্প শিরোনামে’ বাবা-ছেলের কথোপকথনের কৌতুক ফেসবুকে পোস্ট করার অভিযোগ করেন দলটির এক স্থানীয় নেতা। ২০১৭ সালের ২৭শে মে। তখন আব্দুল মুকিত রাজু ১৭ বছর বয়সের কিশোর। এ অভিযোগের পরদিন আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় রাজশাহীর পবা থানায় মামলা হয়। এ মামলায় ২০২২ সালের ২৪শে জানুয়ারি তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. জিয়াউর রহমান। স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সাইদুর রহমান বাদল আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় ২০১৭ সালের ২৮মে রাজশাহীর পবা থানায় মুকিতের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন। বাদীর অভিযোগ ছিল, আসামি নিজের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ব্যঙ্গ করেছেন। মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান মুকিত। পরে জামিনে মুক্ত হন। তবে ২০২২ সালে রায় হওয়ার পর থেকে এখনো তিনি কারাগারে আছেন।

মুকিত কোরআনের হাফেজ। জেলে অবস্থানকালে সেখান থেকে ফাজিল (স্নাতক) ও কামিল (স্নাতকোত্তর) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন। গত ৩রা অক্টোবর তার কামিল পরীক্ষার ফল বের হয়েছে। তিনি জিপিএ-৩.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। মুকিত রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর গ্রামের মো. রিয়াজুল ইসলামের ছেলে। তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তার আইনজীবী এডভোকেট হাসানুল বান্না সোহাগ জানান, ফেসবুকে আওয়ামী লীগ নিয়ে একটি গল্প লেখা স্ক্রিনশটের অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। হাইকোর্ট জামিন দিলেও চেম্বার আদালত তা স্থগিত করে। যা নজিরবিহীন। হাফেজ মুকিত একজন ফ্যাসিবাদ পতনের স্বপ্নদ্রষ্টা। ফ্যাসিবাদের পতনের পরও কেনো তাকে কারাগারে থাকতে হবে। তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে।

মুকিতের দিনমজুর বাবা আক্ষেপ করে বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পরে অনেকের মুক্তি হলেও আমার ছেলের মুক্তি হচ্ছে না।
মুকিতের আরেক আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘মুকিতের ১০ বছরের সাজা হওয়ার পর এটি নিয়ে ওই সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এই রায়ের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০২৩ সালের ১২ই জানুয়ারি তিনি জামিনও পান। কিন্তু ওই বছরের ২০শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মামলা স্টে করে দেন। চলতি বছরের ৩ই জানুয়ারি আপিল বিভাগ সেই স্টে বহাল রাখেন এবং আপিল নিষ্পত্তি করতে বলেন। কিন্তু পরে আপিল নিষ্পত্তি না করেই গত ২রা সেপ্টেম্বর ফের তার জামিন দেয়া হয়। তবে আপিল বিভাগ ফের তার সেই জামিন বাতিল করেন। ফলে এখনো তিনি কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
তার মা আশরাফুন্নেছা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের মিথ্যা মামলায় ছেলের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ফ্যাসিবাদী সরকার পালিয়েছে। তবে আমার ছেলে এখনো জেলে। মিথ্যা মামলা থেকে আমার ছেলে যেন দ্রুত মুক্তি পায়, তার জন্য এই সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি সিফাত আলম বলেন, তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যখন মামলা দেয়া হয় তখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী তার বয়স বিবেচনায় মামলা শিশুকোর্টের হলেও তাকে সাইবার ট্রাইব্যুনালে নেয়া হয়। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারকে খুশি করতে এ রায় দেয়া হয়।

mzamin

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ: সংস্কার, নির্বাচন নিয়ে আলোচনা

রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ফের সংলাপ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিকাল ৩টা থেকে এই সংলাপ শুরু হয়। মূলত নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারে জোর এবং রোডম্য্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে দলগুলো। সংলাপে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারেও সরকারকে পরামর্শ দেয়া হলে তা ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাসহ দলগুলো পৃথক পৃথকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া সরকারকে আরও বেশি কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয় দলগুলোর পক্ষ থেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব পরামর্শ ও প্রস্তাবগুলো ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে। বলেছেন, সংস্কার শেষে যতদ্রুত সম্ভব একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

প্রথমে গণফোরামের সঙ্গে সংলাপে বসেন ড. ইউনূস। বিকাল ৩টায় শুরু হয়। শেষ হয় সাড়ে ৩টার দিকে। গণফোরামের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সংলাপ শেষে বেরিয়ে যমুনার সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে গণফোরামের সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বলেন, বৈঠকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারসহ বেশ কিছু ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার সেটা ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে সংবিধান, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন কথা বলেছেন বলে জানান দলটির সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসীন মন্টু। তিনি বলেন, সংলাপে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জোর দিয়েছি। সিন্ডিকেটকে অবশ্যই ভাঙতে হবে। মোস্তফা মহসীন বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও তাদের বিদেশি এজেন্টরা বাংলাদেশটাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, তাদের থেকে উদ্ধারের জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। গণফোরাম অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চায় জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে একমত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এ সরকার জনগণের সরকার। এ সরকারকে রক্ষার স্বার্থে, অর্থাৎ আমাদের নিজেদের রক্ষার স্বার্থে আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে।

মন্টু বলেন, আমরা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করবো। জনগণের জন্য দরজা খোলা আছে বলে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন। নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে মোস্তফা মহসীন বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন করতে হবে। এটার জন্য সার্চ কমিটি বা কিছু করার প্রয়োজন আছে, ভালো লোক নিয়োগ দেয়ার দরকার আছে। যাতে অতীতের মতো কোনো সমস্যা না হয়। রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা কোনো তারিখ উল্লেখ করিনি। বলেছি, সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার জন্য। আটটি দিবস বাতিল করা হয়েছে- এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে মোস্তফা মহসীন বলেন, জাতীয় দিবস ছাড়া কোনো দিবসই রাখা উচিত নয়। এই সংলাপে গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলটির সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মহসীন মন্টু, কো-চেয়ারম্যান এস এম আলতাফ হোসেন, সুব্রত চৌধুরী, সদস্য সচিব মিজানুর রহমান, সদস্য এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক, মহিউদ্দিন আবদুল কাদের, মোশতাক আহমেদ ও সুরাইয়া বেগম।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি কর্ণেল অলির: গণফোরামের পর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সঙ্গে সংলাপ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। বিকাল সাড়ে ৩টায় এলডিপি’র প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সংলাপে অংশ নেন। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- এলডিপি’র মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুল আলম তালুকদার। সংলাপে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাসহ নতুন করে ২৩ দফা প্রস্তাব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। একইসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মতো আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার করে ফাঁসি দেয়ারও দাবি জানিয়েছেন অলি আহমদ। বিকাল ৪টায় যমুনার অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে অলি আহমদ বলেন, দুই দফা সংলাপের প্রথমবারে ১০৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। দ্বিতীয় দফায় এবার আরো ২৩টি প্রস্তাব দিয়েছি। এসব প্রস্তাব কাউকে সুবিধা দেয়ার জন্য নয়, কাউকে জেল থেকে মুক্ত করার জন্য নয়, দেশের জনগণের জন্য দিয়েছি। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সুন্দর প্রশাসন চালানোর জন্য, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য, নিত্যপণ্যের বাজার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে।

জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি মানুষ যুদ্ধ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা পুলিশসহ প্রশাসনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে, জনগণের সঙ্গে মুখোমুখি করে দিয়েছে, দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে, আমাদের হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে হতাহত করেছে।

অলি আহমদ বলেন, আমরা মনে করি, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তখন আমরা তাদের নিষিদ্ধ করেছিলাম। তাহলে আজকে কী কারণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে না? আমরা আবার বলেছি, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তারা ১৮ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই।

ওদিকে ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে সংলাপ করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে না দেয়ার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়। সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, সরকারকে সতর্ক করেছি যে, আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বলেছি, এখনো ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রেতাত্মা প্রশাসনে ঘাপটি মেরে বসে আছে-তাদের অতিদ্রুত অপসারণ করুন। পাশাপাশি প্রশাসনকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে বলেছি। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি- প্রশাসনে বিশেষ একটি ক্যাডার সার্ভিস রয়েছে, তাদের নিয়োগ আমরা বাতিল করতে বলেছি। মোস্তফা জামাল হায়দার ছাড়াও সংলাপে বাংলাদেশ এলডিপি’র মহাসচিব ও ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, জমিয়াতে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান লায়ন মোহাম্মদ ফারুক রহমান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন পারভেজ, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান এডভোকেট মাওলানা আব্দুর রকিব, ইসলামিক পার্টির মহাসচিব এডভোকেট আবুল কাশেম, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটন, নয়া গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি এম এ মান্নান উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ’র সঙ্গে সংলাপ করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সংলাপ শেষে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, না-কি নিষিদ্ধ করা হবে- সেটা মুখ্য না। একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। আওয়ামী লীগকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ হবে, না কি হাইকোর্ট থেকে কোনো আদেশের মাধ্যমে হবে- সেটি পরের ব্যাপার। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটা শুরু হওয়া উচিত।
পার্থ বলেন, আমি বলেছি, আপনার এমন কোনো সংস্কার হাতে নেয়া ঠিক হবে না যেটা গণতান্ত্রিক সরকারের নেয়া উচিত। আপনাদের সংস্কারগুলো নির্বাচনমুখী সংস্কার হলে ভালো হবে। বাকি প্রস্তাব থাকতেই পারে, যেগুলো হয়তো পরবর্তী সরকার করবে। মনে রাখতে হবে, এটা জনগণের সরকার। কিন্তু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনো সরকার না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ৩টি অবৈধ নির্বাচন করেছিল, সেই বিষয়ে কোনো স্টেপ নেয়া যায় কিনা আমরা সেই ব্যাপারে বলেছি। দ্রব্যমূল্যের দাম অলরেডি মানুষের নাগালে বাইরে চলে গেছে। আওয়ামী লীগের আমলে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থগুলো যেন ফেরত আনা হয়, সে বিষয় প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছি।

ওদিকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ করে নির্বাচনী রোডম্যাপ (পথনকশা) প্রকাশ করতে আহ্বান জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট। একইসঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করারও অনুরোধ জানিয়েছেন জোটের নেতারা। প্রধান উপদেষ্টার কাছে জোটের পক্ষ থেকে ২৩টি লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রস্তাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপি’র চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান। সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান, গণদলের চেয়ারম্যান এ টি এম গোলাম মাওলা চৌধুরী, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান এম এন শাওন সাদিকী, এনডিপি’র চেয়ারম্যান কারী আবু তাহের প্রমুখ।

লেবার পার্টি: বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সংলাপে রাষ্ট্র সংস্কারে স্বল্প মেয়াদে ১৮ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সংলাপ শেষে দলটির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা বলেছি, যত সংস্কার করুন না কেন, সবার আগে সংস্কার করতে হবে উপদেষ্টা পরিষদের। এ পরিষদের হাতেগোনা কয়েকজনের সফলতা ছাড়া বাকি সবাই ব্যর্থ। তাই ব্যর্থদের দ্রুত অপসারণ করতে হবে। মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের নেতৃত্বে সংলাপে লেবার পার্টির মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম ও প্রেস সচিব শফিকুল আলম অংশ নেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জাসদ, ন্যাশনাল  ডেমোক্রেটিভ মুভমেন্ট, জাতীয় গণফ্রন্ট ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সঙ্গেও সংলাপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। বাংলাদেশ জাসদের পক্ষে দলটির সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এটি ছিল প্রধান উপদেষ্টার চতুর্থ দফা সংলাপ। সবশেষ গত ৫ই অক্টোবর সংলাপ হয়েছিল।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেয় ৯টি রাজনৈতিক দল। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম। এরপর সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বৈঠকের বিষয়ে বলেন, দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন ও সংস্কার নিয়েই বেশি কথা হয়েছে। আওয়ামী লীগের গণহত্যা ও বিচার নিয়ে কথা হয়েছে। ১৪ দলসহ অন্য শরীক যারা আওয়ামী লীগের হাত শক্তিশালী করেছে এবং গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন তারা। স্যার (ড. মুহাম্মদ ইউনূস)  দ্রব্যমূল্য কমানোর বিষয়ে বলেছেন।

তিনি আরও বলেন, খুব দ্রুতই নির্বাচনের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। এতে ৬ সদস্য থাকার কথা। বিধিমালা অনুযায়ী যা যা করার দরকার তা করা হবে। এরসঙ্গে সমান্তরালে সংস্কারগুলোর বিষয়ে কাজ করা হবে। সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। নির্বাচনী কার্যক্রম আছে। যেমন ভোটার তালিকা হালনাগাদ। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচিত কমিশনাররা এসে এসব ঠিক করবেন। এটা অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেই হবে। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ অবস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান অব্যাহত থাকবে। সার্চ কমিটি বিদ্যমান আইনে হবে।

মাহফুজ আলম বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়ে কথা এসেছে। তাদের রাজনীতি কীভাবে সীমিত করা যায়, গত তিন পার্লামেন্ট কীভাবে অবৈধ ঘোষণা করা যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যারা গত ৩ নির্বাচনে অবৈধভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা তৈরি করবে এবং এই বাধা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটা অচিরেই দেখতে পারবেন। আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলকে নিষিদ্ধ করা কিংবা জাতীয় পার্টিকে আর আমরা ডাকছি না। সরকার একা সিদ্ধান্ত নেবে না। সবগুলো দলের মতামতের ভিত্তিতেই নিষিদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।  

আওয়ামী লীগ নেতাদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ৫ থেকে ৮ই আগস্ট দেশে কোনো সরকার ছিল না। আবার এক সপ্তাহ পুলিশ প্রশাসন ছিল না। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল পালানো ঠেকানোর, অ্যারেস্ট করার। এখনো তাই আছে এবং তদন্তও হবে। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর ও আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

mzamin

রংবাজ থেকে হ্যামিলনের মুভিওয়ালা by শায়ের খান

আমার জীবনের প্রথম দেখা মুভি রাজ্জাক-কবরীর রংবাজ। তখন আমি অনেক ছোটো। বড় ভাইয়ের বন্ধু কায়সার ভাই লুকিয়ে একা হলে গিয়ে মুভি দেখে। পরে এসে আমাদের কাহিনী বলে। এবারের কাহিনী ভয়াবহ। রাজ্জাক আর জসিম একসঙ্গে দোকানিকে ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগ্রেট দিতে বলেছে। অর্ডারটা রাজ্জাক আগে দিয়েছে। এলাকার মাস্তান বলে জসিমকে দোকানি আগে দিয়েছে। বেধেছে ক্যাচাল। রাজ্জাক বলে, আমি আগে। জসিম বলে, আমি আগে। লেগে গেল ঢিসুম ঢুসুম। শুরু হলো মুভি- রংবাজ। বিষয়টা আম্মাকে বলি। আম্মা বলেন আব্বাকে। আর আব্বা আমাদের সবার ‘রংবাজ’ দেখার ব্যবস্থা করেন। সিনেমা হলে গিয়ে দেখি কায়সার ভাইয়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমার ইংরেজি মুভি দেখার হাতেখড়ি বড় ভাইয়ের কাছে। বড় ভাই তখন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে ক্লাস টেনে পড়ে। ক্যাডেটে ইংরেজিতে কথা বলতে হয়, চামচ কাঁটাচামচ দিয়ে খেতে হয়, সপ্তাহে ইংরেজি মুভি দেখতে হয়। ভ্যাকেশনে বাসায় এসে ভাই আমাকে ইংরেজি মুভির সঙ্গী করতে চাইলে বললাম, আমি তো ইংরেজি অতটা ভালো বুঝি না। ভাই বললো, বোঝা লাগবে না। মুভি দেখলেই সব বুঝবি। মুভি দেখার পর  তাজ্জব। সবই বুঝেছি।  বড় ভাই মিটিমিটি হেসে বলে, কিরে, বলি নাই, বুঝে যাবি? স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯০ দশক পর্যন্ত ঢাকার মুভি ছিল রূপকথার গল্পের মতো।

ঢাকার মানুষের তখন বিনোদনের দু’চারটা জায়গা ছিল।  ফুটবল, মুভি, পার্ক আর চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। ঢাকায় বাংলা ও ইংলিশ দুই মুভিই চলতো। ইংলিশ মুভি’র জন্য আলাদা স্পেশাল হল ছিল। মধুমিতা, অভিসার আর গুলিস্তান হলের পেটের ভেতরের নাজ হলে চলতো জনপ্রিয় আর অস্কার পাওয়া সব হলিউড মুভি - টু উইমেন, সানফ্লাওয়ার, হোয়্যার ঈগলস ডেয়ার, দ্য ডার্টি ডজেন, ম্যাকেনা’স গোল্ড, রেড সান, রোমান হলিডে, আওয়ার ম্যান ফ্লিন্ট, জেসি’জ গার্লসসহ শত শত মুভি। কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে রিকশাওয়ালা বা কথিত ‘লুঙ্গি পাট্টি’ও ইংলিশ মুভি দেখতো। মুভির খোলামেলা সীনে ফ্রন্ট স্টল থেকে হুইসেল চিৎকার শোনা যেতো বেশি। কিন্তু সেটাই কি চূড়ান্ত? মনে হয় না। উদাহরণ দেই। অস্কার পাওয়া ‘টু উইমেন’ ছবি চলছে অভিসারে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের পাশে ধর্ষিতা সোফিয়া লরেন তার ছোট্ট মেয়ের জন্য এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু খাবার হবে? মহিলা বুকের কাপড় ছিঁড়ে স্তন উন্মুক্ত করে চিৎকার করে বললেন, আমার বাচ্চার জন্যই খাবার নেই, তোমার মেয়েকে দেবো কীভাবে? কোনো হুইসেল-চিৎকার নেই। সব চুপ। শুধু আহা, ইশশ-জাতীয় কষ্টের কমেন্টস আসছে। তবে কী রিকশাওয়ালারা ইংলিশ বুঝতো? না, বুঝতো না। তাদের ছিল বাংলাদেশি রক্ষণশীল মূল্যবোধ। বাংলা মুভির ছিল দুই ভাগ- সামাজিক ও বাণিজ্যিক। মধ্যবিত্ত ও রুচিশীল পরিবারের পছন্দ ছিল সামাজিক ছবি। আর এই ছবিগুলোই বেশি মুক্তি পেতো।

নাসার বিজ্ঞানীদের মতো আমাদের ছিল একঝাঁক তীক্ষ্ণধার পরিচালক- জহির রায়হান, এহতেশাম, মুস্তাফিজুর রহমান, খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, আজিজুর রহমান বুলি, শেখ নজরুল ইসলাম, মিতা, এমএ. সামাদ, এসএম. শফি, এ. জে. মিন্টুসহ শত শত। শুক্রবার মুক্তি পেতো নতুন মুভি। হলগুলোর সামনে দর্শক আর টিকিট ব্ল্যাকারদের ‘অই ডিসি ডিসি- রিয়াল রিয়াল’ হাঁকডাক জানান দিতো- এলাহী কারবার ঘটছে এখানে। সিনেমা হলে হলে ছেয়ে গেছিল বাংলাদেশ। যেখানে সিগারেট, সেখানেই ম্যাচ। যেখানে বার্গার, সেখানেই সফ্‌ট ড্রিঙ্কস। এদেশে ব্যবসা করতে আসা চীনারা এটা ভালো জানতো। তারা সিনেমা হলের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলো চীনা রেস্তরাঁ। ঢাকার প্রথম চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ‘চু চিন চৌ’ বসে গেল গুলিস্তান হলের সঙ্গে। বলাকা হলের দোতলায় ‘ইফা’ আর তিনতলায় ‘বাং চিং’ আসন গাড়লো। মধুমিতা হলে বসে গেল ‘টাই টুং’। চীনারা ব্যবসা জানে। মজা বেশীদিন থাকে না। অভিনেত্রী শাবানা ছিলেন মধ্যবিত্তের আদর্শ লক্ষ্মী মেয়ে। তাকে একদিন পরিচালক সাগরের পানিতে কোমর ভিজিয়ে নাচিয়ে গাইয়ে দিলেন, ‘ও দরিয়ার পানি, তোর মতলব জানি’। কেঁপে উঠলো দর্শক। চিটাগাংয়ের যাত্রা মঞ্চ থেকে উড়ে এলেন অভিনেত্রী অঞ্জু ঘোষ। উপুড় করা কলসীর উপর পা রেখে সুডৌল শরীর বাঁকিয়ে গেয়ে উঠলেন, ‘চাকভুম চাকভুম চাঁদনী রাতে, কিছু বলবো তোমায় চোখের ভাষায়’। দর্শকের চোখের তারা নেচে উঠলো। আস্তে আস্তে মুভির ভাষা আর নাম পাল্টাতে লাগলো। যেখানে বাংলা ছবির নাম ছিলো- আবার তোরা মানুষ হ, মনের মতো বৌ, জীবন থেকে নেয়া, সূর্য কন্যা, সেখানে নাম হতে লাগলো- নরম গরম, গরম মশলা, রসের বাইদানী। রুচিশীল মধ্যবিত্ত হল ছাড়লো।

যেখানে হলিউডের গ্রেগরি পেক, অ্যান্থনি কুইন, ডেভিড নিভেন, সোফিয়া লরেন, অড্রে হেপবার্ন, এলিজাবেথ টেইলরদের ইংলিশ মুভি আসতো, সেখানে আসতে লাগলো নাম না জানা সব ইংলিশ মুভি। এসব মুভির সঙ্গে জুড়ে দেয়া থাকতো অশ্লীল দৃশ্য। এর নাম ‘কাটপিস’। কাটপিসের ঢেউ লাগলো বাংলা ছবিতেও। বানানো হতে লাগলো অশ্লীল বাংলা ছবিও। রুচিশীল সব দর্শক হল থেকে সরে গেল। বিপদে পড়লো হল মালিকেরা। বছরের পর বছর লস গুনতে লাগলো। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে লাগলো- সিনেমা হলগুলো ভেঙে মার্কেট বানানো হচ্ছে। দেশের মুভি ইন্ডাস্ট্রির জন্য শুরু হলো অশনি সংকেত। ‘অশনি সংকেত’ একটা মুভিরও নাম। সত্যজিতের। প্রধান দুই চরিত্রের একজন ছিলেন আমাদের ববিতা। এক জোড়া রানিং শু দরকার। জুতোর দোকান সব ঘুরে দেখছি। এলিফ্যান্ট রোডের মল্লিকা সিনেমা হলের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালাম। মল্লিকা হল এখন আর হল নেই। বহুতল মার্কেট হয়ে গেছে। ঢুকলাম। শখের জুতোটা পেয়েও গেলাম।  হাঁটছি আর ভাবছি, একসময় স্কুল কলেজ ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে হলে ঢুকতাম, এখন হল ভাঙা মার্কেট থেকে দৌড়ের জুতা নিয়ে বের হচ্ছি। সময় কি উল্টে গেছে? না, সময় উল্টায় না, মানুষ উল্টায়। জাতি পেয়েছে এক নতুন দেশের ঠিকানা। এই নতুন দেশেই আবার তৈরি হবে উন্নত সব মুভি। আমরা এমন সব মুভি বানাবো যেগুলোর জন্য হল ভেঙে বানানো মার্কেটগুলোয় সিনেমা হল গড়ে উঠবে। হলিউড থেকে আর মুভি আনতে হবে না, আমাদের মুভিই হলিউড রিমেক করবে। ১৮ কোটির দেশে ১৮ জন বিশ্বখ্যাত সুপারস্টার আর ১৮ দুগুণে ৩৬ জন অস্কার স্ট্যান্ডার্ডের নির্মাতা বের করাটা তুড়ির বিষয়। মুভি’র রিসেট বাটন পুশ করা হয়ে গেছে। একটু অপেক্ষা করতে হবে শুধু।

লেখক-নাট্যকার-ফিল্মমেকার

mzamin

৩ দিনের ডেডলাইন চিকিৎসকদের, দাবি পূরণ না হলে ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ডেডলাইন বেঁধে দিলেন আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকরা। কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করার ঘটনায় এখন ১০ দফা দাবি নিয়ে আমরণ অনশন করছেন জুনিয়র ডাক্তাররা।

আন্দোলনের পরবর্তী রূপরেখা স্থির করতে সিনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকের পর জুনিয়র চিকিৎসক দেবাশিস হালদার জানান, শনিবার সোদপুর থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিল করা হবে। রোববার ধর্মতলার মঞ্চে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন তারা। ওই মহাসমাবেশে জুনিয়র ও সিনিয়র চিকিৎসকদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রত্যেককে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়েছে। সোমবার রাজ্যের প্রত্যেকটি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে বিক্ষোভে শামিল হবেন চিকিৎসকরা। সোমবার পর্যন্ত রাজ্য সরকারকে ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে আলোচনায় বসতে হবে। মেনে নিতে হবে ১০ দফা দাবি। অন্যথায় মঙ্গলবার সর্বাঙ্গীণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। জুনিয়রদের পাশাপাশি তাতে সামিল হবেন সিনিয়র চিকিৎসকরাও। দাবি না মানলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বৃহত্তর করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।

দেবাশিস আরও বলেন, ‘ধর্মঘটের ফলে কোনও রোগীর কিছু হলে তার দায়ভার বর্তাবে রাজ্যের ওপর। কারণ, আমরা দিনের পর দিন ধৈর্য ধরেছি। সরকার কোনো সদিচ্ছা দেখায়নি।’

হাসপাতালের নিরাপত্তাসহ ১০ দফা দাবিতে ১৪ দিন ধরে অনশন চলছে। চিকিৎসক অর্ণব মুখোপাধ্যায়, চিকিৎসক স্নিগ্ধা হাজরা ও সায়ন্তনী ঘোষ হাজরা ১৪ দিন ধরে অনশনে রয়েছেন। এবার আর রাজ্য প্রশাসন নয়, সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যেই ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন তারা।

গত ৮ আগস্ট নাইট শিফট ছিল আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের। পরদিন সেমিনার হল থেকে তার দেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ, ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে তরুণী চিকিৎসককে। এই ঘটনার পর থেকে সুবিচার ও নিরাপত্তাসহ একাধিক দাবিতে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন ৮ জন জুনিয়র চিকিৎসক।

mzamin

বিশ্বে ১.১ বিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধায় দিনে মৃত্যু ২১ হাজার -জাতিসংঘের রিপোর্ট

বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি শিশু। অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (ওপিএইচআই)-এর সাথে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি হাইলাইট করেছে যে যুদ্ধরত দেশগুলোতে দারিদ্র্যের হার তিনগুণ বেশি ছিল, যেহেতু ২০২৩ সালটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাত দেখেছিল।

ওপিএইচআই ও ইউএনডিপি ২০১০ সাল থেকে তাদের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক প্রকাশ করেছে, সেখানে ১১২টি দেশের ৬.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার রিপোর্ট তুলে ধরা হয়েছে। পর্যাপ্ত আবাসন, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, রান্নার জ্বালানি, পুষ্টি ও স্কুলে উপস্থিতির অভাবের মতো সূচকগুলোকে মাথায় রেখে  এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ভারত রয়েছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোকের দেশ হিসেবে, যার ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার ২৩৪ মিলিয়নকে প্রভাবিত করেছে। এর পরে রয়েছে পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। পাঁচটি দেশ মিলিয়ে ১.১ বিলিয়ন দরিদ্র মানুষের প্রায় অর্ধেক।

ইউএনডিপি কর্মকর্তা আচিম স্টেইনার বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাত তীব্র হয়েছে এবং বহুগুণ বেড়েছে। হতাহতের সংখ্যা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কয়েক মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা জীবন ও জীবিকায় ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সূচকটি দেখিয়েছে, প্রায় ৫৮৪ মিলিয়ন শিশু, অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী শিশুদের ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের (১৩ দশমিক ৫ শতাংশ) তুলনায় দ্বিগুণ। যুদ্ধরত দেশগুলোতে শিশু মৃত্যুহার ৮ শতাংশ, যেখানে শান্তিতে থাকা দেশগুলোতে এ হার ১ দশমিক ১ শতাংশ। এই রিপোর্টে সংঘর্ষপূর্ণ অঞ্চলের দারিদ্র নিয়ে সমীক্ষার উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষ, বিপর্যয় ও আরও কিছু কারণে ১১.৭০ কোটি মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছেন।’

ইউএনডিপি দফতরের ডিরেক্টর পেড্রো কনসেইসাও বলেন, ‘সামরিক সংঘর্ষের নিরিখে এমপিআই সূচক এই প্রথম তৈরি করা হয়েছে। যা বলছে, সংঘর্ষের সঙ্গে সমান তালে দারিদ্র কীভাবে বেড়েছে।’

অক্সফামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ক্ষুধায় প্রতিদিন ৭ থেকে ২১ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে।

খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অক্সফামের এমিলি ফার বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর দ্বারা অনাহার একটি প্রাণঘাতী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। খাদ্য সংকট মূলত তৈরি করা হয়। গাজার প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষ - যেখানে বর্তমানে প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তার ৮৩ শতাংশ তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সুদানে এক মিলিয়নের তিন-চতুর্থাংশ অনাহারে রয়েছে কারণ খাদ্যের উপর যুদ্ধের বিধ্বংসী প্রভাব প্রজন্মের জন্য অব্যাহত থাকার শঙ্কা রয়েছে।’

অক্সফাম সতর্ক করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘শূন্য ক্ষুধা’ এর বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে।

সূত্র:আলজাজিরা

mzamin

‘র’-এর সাবেক কর্মকর্তা বিকাশ যাদব যেভাবে পান্নুনকে হত্যা পরিকল্পনা সাজান

যুক্তরাষ্ট্রে শিখ নেতা গুরপাতওয়ান্ট সিং পান্নুন হত্যার ব্যর্থ ষড়যন্ত্রে জড়িত বিকাশ যাদব ভারত সরকারের কোনো কর্মকর্তা নন। বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তিনি ভারত সরকারের রিসার্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) সাবেক একজন কর্মকর্তা। দিল্লিতে একটি অপহরণ ও হত্যাচেষ্টায় জড়িত থাকায় গত বছর তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটররা খালিস্তানপন্থি পান্নুনকে হত্যাচেষ্টায় সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন বিকাশ যাদবকে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) ওয়ান্টেড লিস্টে তার নাম আছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, দিল্লির উত্তর-পশ্চিমের রোহিনী থেকে একজন ব্যবসায়ীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিকাশ যাদবকে গত বছর ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। তারপর এ বছর মার্চে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। একমাস পরে জামিনে মুক্তি পান বিকাশ। পশ্চিম এশিয়ার অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ওই ব্যবসায়ীর।

তিনি পুলিশকে বলেছেন, মুক্তি পাওয়ার পর গত বছর নভেম্বরে বিকাশ যাদবের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি এ সময় ওই ব্যবসায়ীকে জানান যে, তিনি ভারত সরকারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে তারা শিগগিরই তাদের মোবাইল নম্বর শেয়ার করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাঝে মাঝেই কাজ ও বন্ধুদের সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইতেন বিকাশ। তিনি ওই ব্যবসায়ীকে আরও বলেন, তিনি সরকারের ছদ্মবেশী একজন এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তবে তার কাজ এবং অফিসের বিষয়ে কোনো তথ্য কখনো শেয়ার করেননি। ১১ই ডিসেম্বর বিকাশ যাদব তাকে ফোন করেন এবং বলেন, কিছু ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে চান। এ জন্য তিনি লোধি রোডে যেতে বলেন ব্যবসায়ীকে। বিকাশ যাদব সঙ্গে আরও একজন ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। ওই ব্যবসায়ী বলেন, এরপর তারা জোরপূর্বক তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ডিফেন্স কলোনিতে। এ সময় তাকে বিকাশ বলেন যে, তাকে হত্যা করার জন্য গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে তিনি চুক্তি করেছেন। এ সময় বিকাশের সহযোগী ওই ব্যবসায়ীর মাথায় আঘাত করে এবং তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণের চেইন ও আংটি নিয়ে নেয়। তারা ওই ব্যবসায়ীর ক্যাফেতে যায় এবং সেখান থেকে সব টাকাপয়সা নিয়ে নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা তাকে রাস্তার পাশে ফেলে যায়।

এ বিষয়ে কারো কাছে অভিযোগ করলে করুণ পরিণতি ভোগ করার হুমকি দেয়। দ্রুতই ওই ব্যবসায়ী পুলিশে যান। সেখানে এফআইআর করেন। ১৮ই ডিসেম্বর বিকাশ ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বিকাশের সহযোগী পুলিশকে জানায়, বিকাশ যাদবের ষড়যন্ত্রে তিনি যুক্ত হয়েছেন। কারণ, পুরনো যানবাহনের ব্যবসায় তিনি বড় রকম লোকসান খেয়েছেন। বিকাশ যাদব তাকে বলেছেন, তার পিতা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সে (বিএসএফ) চাকরি করতেন। অন্যদিকে বিকাশ যাদব বলেন, ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাতের দিনেই পুরো অপরাধের পরিকল্পনা করে ফেলেন। মার্চে দিল্লি পুলিশ মামলা করে। এপ্রিলে জামিন পান বিকাশ। যদিও বিকাশ ২২শে মার্চ অন্তর্বর্তী জামিন পায়, কিন্তু এপ্রিলে নিয়মিত জামিন পেয়ে যায়।

তিনটি চার্জের মুখোমুখি বিকাশ যাদব। তা হলো- একজন হিটম্যান ভাড়া করা ষড়যন্ত্র, হত্যার জন্য ভাড়া করার ষড়যন্ত্র এবং অর্থ পাচার। বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক কোর্টে ফেডারেল সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট তার ও তার সহযোগী নিখিল গুপ্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করা হয়। এই অভিযোগ অনুযায়ী, পান্নুনকে হত্যা মিশনের মাস্টারমাইন্ড বিকাশ যাদব। তিনি অর্থের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করতে নিখিল গুপ্তকে নিয়োগ করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ছদ্মবেশী এজেন্টের জালে চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রেপ্তার করা হয় নিখিল গুপ্তকে। জুনে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হয়। এর আগে নিখিল গুপ্তের বিরুদ্ধে একই রকম বর্ণনা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ডকুমেন্টে। কিন্তু প্রথমবারের মতো বিকাশ গুপ্তের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছর ৬ই মে পান্নুনকে হত্যা পরিকল্পনা শুরু হয়। ওই সময় একটি এনক্রিপ্টেড অ্যাপে নিখিল গুপ্তকে একটি বার্তা পাঠান বিকাশ যাদব। তাতে তিনি লিখেছেন- আমি বিকাশ। আমার নাম আমান হিসেবে সেভ করে রাখুন।

২০২৩ সালের জুনে তারা একজন হিটম্যান ভাড়া করেন। চুক্তি হয় পান্নুনকে হত্যা করলে এক লাখ ডলার দেয়া হবে। তবে কোর্টের ডকুমেন্টে পান্নুনের নাম বলা হয়নি। এই চুক্তিতে বিকাশ যাদবের একজন সহযোগীর মাধ্যমে ১৫ হাজার ডলার আগাম দেয়ার মাধ্যমে বিকাশ যাদব ও নিখিল গুপ্ত সব আয়োজন করেন। কিন্তু তারা যে হিটম্যানকে ভাড়া করেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ছদ্মবেশী এজেন্ট। তার জালে ধরা পড়ে যান তারা। 

mzamin

কমালার প্রচারণায় নামছেন ওবামা দম্পতি

দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রে এবার সবচেয়ে কঠিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অন্য নির্বাচনগুলোতে কোনো না কোনো প্রার্থীর পাল্লা ভারী দেখা গেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস এবং রিপাবলিকান ডনাল্ড ট্রাম্পের লড়াই চলছে সমান তালে। কেউ ঠাহর করতে পারছেন না কে জিততে পারেন। এমন পরিস্থিতিকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ইভেন-স্টিভেন’ পরিস্থিতি। এখন পর্যন্ত জরিপগুলো এমনই পূর্বাভাস দিচ্ছে। এমন এক অবস্থায় ডেমোক্রেটদের মধ্য থেকে রাজনৈতিক ক্যারিশমা আছেন এমন নেতাদের ব্যবহার করার আশা করছেন কমালা হ্যারিস। তার মধ্যে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, মিশেল ওবামা। গত রোববার তিনটি জনমত জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, নভেম্বরের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে প্রাধান্য আছে কমালা হ্যারিসের। এনবিসি নিউজের সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে জনমত জরিপে বর্তমানে ‘ডেডলকড’ অবস্থায় আছেন ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান প্রার্থী। তাদের দু’জনের জন্যই জনসমর্থন শতকরা ৪৮ ভাগ করে। এবিসি নিউজ/ইপসোস সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, শতকরা ৫০ ভাগ সমর্থন পেয়েছেন কমালা হ্যারিস। অন্যদিকে ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন শতকরা ৪৮ ভাগ ভোটার। অর্থাৎ খুব সামান্য শতকরা মাত্র ২ ভাগ ভোটে এগিয়ে আছেন কমালা। অন্যদিকে সিবিএস নিউজ/ইউগভ জরিপে দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুই প্রার্থীর। এর মধ্যে কমালা হ্যারিসকে সমর্থন করেছেন শতকরা ৫১ ভাগ ভোটার। ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন শতকরা ৪৮ ভাগ ভোটার।

এ অবস্থায় কমালা হ্যারিসকে রাজনৈতিক বৈতরণী পার হতে সহায়তা করছেন ওবামা দম্পতি। আগামী সপ্তাহে তারা মাঠে নামবেন। এখনও ডেমোক্রেটদের যেসব ভোটব্যাংক আছে, সেখানে তাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা। এ ছাড়া সুইং স্টেটগুলোতে তারা নতুন জাগরণ আনতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ওবামা ম্যাজিকে নতুন সকালের স্বপ্ন দেখছেন ডেমোক্রেটরা। ২৬শে অক্টোবর মিশিগানে কমালা হ্যারিসের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যাবে সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামাকে। অন্যদিকে আগামী বৃহস্পতিবার কমালার সঙ্গে জর্জিয়াতে দেখা যাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। অন্য রাজ্যগুলোতেও সফরে যাবেন ওবামা। ডেমোক্রেটদের কাছে জনমত জরিপ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সব গোত্রের সব নারীর মধ্যে এগিয়ে আছেন কমালা তবুও তিনি পুরুষদের কাছ থেকে, বিশেষ করে হিস্প্যানিক ও আফ্রিকান-আমেরিকানদের বড় রকমের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা  করছেন। ২০০৮ এবং ২০১২ সালে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের কাছ থেকে যে সমর্থন ট্রাম্প পেয়েছিলেন, কমালা হ্যারিসকে সেই রকম সমর্থন না দেখানোর জন্য সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি একজন নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমালাকে ভোট দেয়ার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া তিনি এক্সে কমালার পক্ষে পোস্ট দিয়েছেন। তাতে  লিখেছেন, কমালা হ্যারিস জনগণের জন্য তার জীবনে লড়াই করেছেন। তিনি আপনাদের জন্য লড়াই করছেন। তিনি একজন অমায়িক মানুষ। তাই তাকে ভোট দেয়ার জন্য আমি গর্বিত। তার মতো দয়ালু মানুষকে আমাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রয়োজন। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামার প্রচারণায় শক্তিধর একজন সমর্থক ছিলেন কমালা হ্যারিস।

mzamin

কোচদের হাসি কেন বিদায় বেলায় বিষাদে রূপ নেয়! by ইশতিয়াক পারভেজ

প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ফিল সিমন্স প্রবেশ করলেন, মুখে চওড়া হাসি। সবাইকে জানালেন অভিনন্দনও। চোখে-মুখে বাংলাদেশ দল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। ৫ মাসের চুক্তি তার সঙ্গে, সফল হলে হয়তো মেয়াদ বাড়তে পারে। প্রশ্নটা এখানেই কতটা সফল হবেন তিনি! নাকি বাংলাদেশ ক্রিকেটে আগের ১৬ কোচের মতোই হবে তার পরিণতি। যে চওড়া হাসি নিয়ে এসেছেন বিদায় বেলা তা রূপ নেবে বিষাদে! তবে টাইগার ক্রিকেটে কোচদের পরিণতি সিমন্সের ভালোভাবেই জানা। তাই নিজের শুরুর আগেই জানিয়ে দিলেন বাইরে নজর দিতে চান না। তার সব মনোযোগ থাকবে ক্রিকেট ঘিরেই। কিন্তু এমন কথা তো বলেছিলেন রাসেল ডমিঙ্গো, চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, স্টিভ রোডসও। কিন্তু কারো বিদায় সুখকর হয়নি। সবশেষ হাথুরুর পরিণতি তো আরো ভয়ঙ্কর! দুই দফা বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন আর দুইবারই বিদায় নিয়েছেন অপমানিত হয়ে। এবার তো লঙ্কান কোচ আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে। শুধু কি তাই! কতটা ক্ষোভ আর অভিমান বিদায় নেয়া কোচদের মধ্যে জমা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথমবার টি-টোয়েন্টি সিরিজ জেতে যুক্তরাষ্ট্র। ২৫ বছর আগে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে বড় চমক দেখিয়েছিল বাংলাদেশও। কিন্তু এর পর বাংলাদেশের অর্জনটা খুব ভালো হয়নি। টাইগারদের সাবেক আর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কোচ স্টুয়ার্ট ল বলেই ফেললেন, দুই যুগেও  নাকি টাইগাররা এগোয়নি। কেন শেষটা শুরুর মতো হয় না কোচদের সঙ্গে! এ নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নয়া পরিচালক ও দেশের অভিজ্ঞ কোচ নাজমুল আবেদিন ফাহিম বলেন, ‘আমি তো বিসিবির ভেতরে খুব বেশি ছিলাম না। তাই আসল কারণগুলো হয়তো সেইভাবে বলতে পারবো না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ভালো কোচ বলতে আমরা বুঝি যারা জয় এনে দেবে। রেজাল্ট আসবে, আর সেটি না হলেই দূরত্ব বাড়ে।’

১৯৯০-এ জাতীয় দলের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন মুদাসসর নজর। মাঝে কেটে গেছে ৩৪ বছর। এর মধ্যে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে আরো ১৫ জন দায়িত্ব নেন। যেখানে হাথুরুসিংহে দুই দফায় ছিলেন দায়িত্বে। শেষ পর্যন্ত কেউ এখনো কোচ হিসেবে হাসিমুখে বিদায় নিতে পারেননি। আর বিসিবি’রও শেষ হয়নি ভালো কোচ খোঁজা। আসলে কেমন কোচ চায় বিসিবি! তার চেয়ে বড় প্রশ্ন ভালো কোচের ব্যাখ্যাটাই বা কী! শুধু তাই নয়, কোচ এসেছেন কোচ গেছেন কিন্তু টাইগার ক্রিকেটের কোনো উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে স্টুয়ার্ট ল বলছেন, গত ২৫ বছরে কোনো উন্নতি হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘হয়তো এখন বসে ভাবার সময় যে, আমরা যেভাবে করছি, তা কাজে লাগছে না। আমরা এগোইনি, হয়তো ভিন্ন কিছু করা দরকার। এসব আলোচনা বর্তমান বোর্ড করে না, কিন্তু তাদের খেলাটির সবদিকেই চোখ রাখতে হবে।’ অন্যদিকে ভালো কোচ কেমন হবে আর কেন কোনো কোচই সফলতা পাচ্ছেন না তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল আবেদিন ফাহিম বলেন, ‘ভালো বলতে আমরা বুঝি যে রেজাল্ট দেবে। আমার মনে হয় তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে প্রতিযোগিতা দেখে আসেন সেটি আমরা দেশে দিতে পারিনি। আমাদের ক্রিকেটে কোন প্রতিযোগিতা নেই, সেটির অভাবটা বেশ বড় হয় কোচদের কাছে যে কারণে তাদের কাছেও একটি শূন্যতা তৈরি হয়। যে কারণে এখনো আমরা পিছিয়ে।’
শুধু কি তাই! কোচদের বিষাদের বিদায় কি সফলতা না পাওয়ার ক্ষেত্রেই তৈরি হয়! এ নিয়ে ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের বাংলাদেশের প্রতিনিধি আতিফ আজম বলেন, ‘দেখেন যে কোচ আসে সবার কাছেই আমাদের বড় প্রত্যাশা থাকে। যতো দিন যায়  প্রত্যাশা ততো বড় হতে থাকে। যখন সেটি হয় না তখনই তৈরি হয় জটিলতা। আরেকটি বিষয় হলো কোচরা সফল হয় না কারণ তাদের কাজের সুযোগটাও এক সময় কমে আসে। আপনি যদি স্টিভ রোডসের কথা বলেন, সে কিন্তু একটা পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল। তাকে সেটি করতে না দিয়ে বের করে দেয়া হয়। এখানে আমাদের তো ভুল আছেই।’
কোচদের নিয়ে বাংলাদেশে যা হচ্ছে তার কারণে এখন বিদেশি ভালো কোচ পাওয়াও কষ্টের। বড় মানের কোচরা তো আসতেই চান না। ফিল সিমন্স হয়তো সব জেনেই এসেছেন যে কারণে প্রথম দিনই বলে দিলেন বাইরে নয়, ক্রিকেটেই তার মনোযোগ। তিনি বলেন, ‘বাইরে কী হচ্ছে তা নিয়ে মাথা না ঘামানো এবং ক্রিকেটে মনোযোগ রাখা আমাদের দায়িত্ব। আমি সেটাই নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, যা আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তা হলো প্রস্তুতি। সোমবার শুরু হতে যাওয়া ম্যাচেই আমাদের সব মনোযোগ।’

mzamin

নেতানিয়াহুর বাসভবনে হিজবুল্লাহর হামলা

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবনে ড্রোন হামলা করেছে হিজবুল্লাহ। দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, লেবানন থেকে ছোড়া ড্রোন আঘাত করে তেল আবিবের উত্তরে সিসারিয়া এলাকায় অবস্থিত নেতানিয়াহুর বাসভবনে। মুখপাত্র এ কথা জানিয়ে বলেছেন, হামলার সময় নেতানিয়াহু বা তার পরিবারের কেউ ওই বাড়িতে ছিলেন না। ফলে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে বাড়িটির কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

ওদিকে গাজার জাবালিয়া ও মাঘাজি শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি সেনারা নৃশংস হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে কমপক্ষে ৪৪ জনকে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮০ জন। আগের মতোই ইসরাইলি সেনারা কোনো বাদবিচার ছাড়াই গাজার উত্তরাঞ্চলে আল আওদা এবং কামাল আদওয়ান হাসপাতালকে টার্গেট করে হামলা করছে। পর পর হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়ে ও পরবর্তীতে ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পরও হাল ছেড়ে দিতে নারাজ হামাস। তারা আরও শক্তি সঞ্চয় করে ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। জানিয়ে দিয়েছে গাজায় আগ্রাসন বন্ধ না করা পর্যন্ত তাদের হাতে জিম্মিদের মুক্তি দেবে না। পাশাপাশি ইসরাইলি সেনাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে। ইসরাইলের হাতে বন্দি সব ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিতে হবে। এরই মধ্যে ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর হামাসের হাল কে ধরবেন তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। তবে যোদ্ধা এই গোষ্ঠীটি জানিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে গাজার বাইরে থেকে কাউকে এর প্রধান নিযুক্ত করা হবে।

গত বছর ৭ই অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের রকেট হামলার পর এ পর্যন্ত ইসরাইলি নৃশংসতায় গাজায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪২,৫০০ ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন ৯৯,৫৪৬ জন। গাজা এবং সর্বশেষ লেবাননে ইসরাইল নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে। তাদের কাছে কোনো মানবতা কাজ করছে না। শিশু, অন্তঃসত্ত্বা, নারী, বৃদ্ধ, হাসপাতালের রোগী- কাউকে ছাড় দিচ্ছে না তারা। অনলাইন আল জাজিরা বলেছে, জাবালিয়ার পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে ইসরাইলি সেনারা। তারা গাজার উত্তরাঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এ অবস্থা চলছে তৃতীয় সপ্তাহ। ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালে ইসরাইলিদের বোমা হামলায় জেনারেটর ধ্বংস হয়েছে। এতে আইসিইউতে ভর্তি থাকা দু’জন রোগী নিহত হয়েছেন। ওই এলাকায় আবাসিক ভবনগুলোতে তীব্র বোমা হামলা চালাচ্ছে ইসরাইলিরা। প্রাণভয়ে শত শত মানুষ সেখান থেকে পালাচ্ছিলেন। ইসরাইলি সেনাদের মুখোমুখি লড়াই করছে লেবাননের হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা ইসরাইলের উত্তরে হাইফাতে অবস্থিত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে রকেট হামলা করেছে। দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরাইলের হামলার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ওদিকে ইসরাইলের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বাসভবনে ড্রোন হামলাকে ইসরাইলের নিরাপত্তায় গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যে ইরানে হামলা চালানোর প্রস্তুতির কথা আগেই জানিয়েছে ইসরাইল। তবে সেক্ষেত্রে ইসরাইলকে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। যদি ইসরাইল ইরানে, বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করে তাহলে এই যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। এর প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যেরর উত্তেজনা হ্রাস করা ও অন্যান্য ইস্যু নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা জার্মান চ্যান্সেলর শুলজের। জো বাইডেন, ফ্রান্স ও বৃটিশ নেতাদের সঙ্গে বার্লিনে মিটিং করার পর শুক্রবার রাতে ইস্তাম্বুল পৌঁছেন।

এখানে উল্লেখ্য, গাজা যুদ্ধের একজন তুখোড় সমালোচক এরদোগান। তিনি ইসরাইলকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদেরকে সমর্থন দেয়ায় কড়া সমালোচনা করেছেন পশ্চিমাদের। বার্লিনও ইসরাইলের শক্তিশালী সমর্থক। তারাও ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। তবে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দখলদার কোনো শক্তির আত্মরক্ষার অধিকার থাকে না। ওদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ নিতে ইসরাইল কিভাবে এবং কখন ইরানে হামলা জানাবে- তা যারা জানেন, তারা সবাই জবাবদিহিতায় আসবেন বলে সতর্ক করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  

mzamin