Saturday, July 16, 2016

কাশ্মীর তুলনামূলক শান্ত

শঙ্কা ছিল, তাই গতকাল শুক্রবার কাশ্মীর উপত্যকার সব জেলাতেই কারফিউ জারি করা হয়। তবে শঙ্কা পুরোপুরি সত্য না হলেও সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়নি। গতকাল দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম জেলার ইয়ারিপোড়া পুলিশ স্টেশনে হামলা হয়েছে। সেখানে গ্রেনেড হামলা ও গুলিতে একজন পুলিশ সদস্য নিহত ও পাঁচ পুলিশ আহত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। তবে অন্যসব এলাকা গতকাল তুলনামূলক শান্ত ছিল। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া হিংসাত্মক ঘটনায় নিহত ব্যক্তির মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭-এ।
উপত্যকায় সাধারণত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরপরই বিক্ষোভ শুরু হয়ে থাকে। গত বৃহস্পতিবার সীমান্তপার থেকে হিজবুল নেতা সৈয়দ সালাউদ্দিন আরও হিংসার হুঁশিয়ারি শুনিয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকারও শুক্রবার কাশ্মীর নিয়ে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক ডেকেছিল। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল উপত্যকায় নতুন করে হিংসা ছড়াতে পারে। গুজব যাতে না ছড়ানো যায় সে জন্য ইন্টারনেট ও মুঠোফোন পরিষেবা এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে সরকারি অফিস ও স্কুল কলেজ। নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশ ছিল সংযমী হওয়ার। অতিরিক্ত বাহিনীও পাঠানো হয়েছে।
বুধবার থেকেই উপত্যকা মোটামুটি শান্ত। প্রশাসন তবু কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ। এর একটি কারণ, হুরিয়ত নেতাদের হরতালের ডাক। দ্বিতীয় কারণ, পাকিস্তান থেকে অব্যাহত উসকানি।  পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে কাশ্মীর নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। ঠিক হয়েছে, কাশ্মীরের জনগণের ওপর ‘অমানবিক অত্যাচারের’ প্রতিবাদে ১৯ জুলাই ‘কালা দিবস’ পালন করা হবে। নিহত হিজবুল নেতা বুরহান ওয়ানিকে ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদ’ আখ্যা দেওয়া হয়।

আসেম সম্মেলনে নিস হামলার ছায়া

মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে এশিয়া ও ইউরোপের নেতাদের অংশগ্রহণে গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে আসেম সম্মেলন। প্রথম দিনের আলোচনায় ফ্রান্সের নিস শহরে সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রায় একক অধিকারের দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায় বেইজিংয়ের প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আসেম সম্মেলনের এবার ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বৈশ্বিক বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন থেকে শুরু করে বাণিজ্য এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের সুযোগ বাড়াতে এ সম্মেলনের গুরুত্ব রয়েছে। সন্ত্রাস দমনের প্রসঙ্গটি নিয়েও এবারের সম্মেলনে আলোচনার কথা রয়েছে।
নিসে গত বৃহস্পতিবারের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাস দমন প্রসঙ্গের গুরুত্ব নতুন করে স্পষ্ট হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ এ হামলাকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিয়েছেন। আসেম নেতারা এক বিবৃতিতে এ ধরনের ‘জঘন্য ও কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলার’ নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিস্তারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করেন।  জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গতকাল আসেম সম্মেলনের এক ফাঁকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধ মীমাংসার জন্য আইনসম্মত আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে।

আইএস যদি ‘খিলাফত’ হারায়

কিছুদিন ধরে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম সানন্দে খবর দিচ্ছে, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ‘খিলাফত’ বা ইসলামি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমা দ্রুত ছোট হয়ে আসছে। সাধারণভাবে এটা আনন্দের ব্যাপারই বটে, তবে নির্মল আনন্দের নয়। কেন নয়? সে কথায় পরে আসছি। আইএসের স্বঘোষিত রাষ্ট্রটি ছোট হয়ে আসছে বললে ঠিক বোঝা যায় না তার আকারটা কত বড়। অবশ্য এ বিষয়ে নানা সূত্রের ভাষ্য নানা রকম। কেউ বলেন, ২০১৪ সালের জুন মাসে আইএস যখন ঘোষণা করে যে তারা ইরাক ও সিরিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এক নতুন খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে, তখন তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মোট আয়তন ছিল গ্রেট ব্রিটেনের আয়তনের সমান; কেউ বলেন, তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আয়তনের সমান। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, খলিফা আল-বাগদাদির ‘খিলাফত’ রাষ্ট্রের আয়তন ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার, মানে বেলজিয়ামের আয়তনের সমান। আবার দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিন লিখেছে, ‘খিলাফত’-এর আয়তন ৩৫ হাজার বর্গমাইল বা জর্ডানের আয়তনের সমান। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনফরমেশন হ্যান্ডলিং সার্ভিসেস’ (আইএইচএস) নামের এক সংস্থাও বলে ৩৫ হাজার বর্গমাইল।
এই ৩৫ হাজার বর্গমাইল আয়তনের স্বঘোষিত রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় ঘটে ইরাকের উত্তর-পশ্চিম অংশের চারটি প্রদেশ আনবার, সালাহ্উদ্দিন, কিরকুক ও নিনেভা এবং সিরিয়ার রাকা, দির এল জুর, হাসাকা, আলেপ্পো, পালমিরা অঞ্চল নিয়ে। আইএস এসব অঞ্চলে ইরাক ও সিরিয়ার মাঝখানের সীমান্ত তুলে দেয়। রাস্তাঘাট, বন্দর, বিমানঘাঁটি, তেলক্ষেত্র ও তেল পরিশোধনকেন্দ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন, ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীপথে নৌচলাচল ইত্যাদি সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ তারা নিয়ে নেয়। তারা যুদ্ধে ভেঙে পড়া সরকারি সেবা–ব্যবস্থাগুলো আবার চালু করে, বিচারালয় খোলে, কারাগার সংস্কার করে, হাটবাজার বসায়, বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট মেরামত করে, বাস্তুহারা দরিদ্র লোকজনের জন্য লঙ্গরখানা খোলে, এমনকি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। তারা ইরাক ও সিরিয়ার সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর সঙ্গে চোরাই পথে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে মাত্র ৩০ মাইল পশ্চিমের শহর ফালুজায় তারা তাদের খিলাফতের পতাকা ওড়ায়, সেই ফালুজা থেকে উত্তর-পশ্চিমে সিরিয়ার রাকা-আলেপ্পো পর্যন্ত তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। রাকা ও আলেপ্পো তুরস্কের সীমান্তবর্তী। ওই পথে তারা বিপুল পরিমাণ তেল চোরাই পথে বিক্রি করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ভাষ্য অনুযায়ী,
আইএস চোরাই পথে তেল বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। অধিকৃত এলাকাগুলোর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা কর আদায় করে। সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের অর্থনীতি বিষয়ের গবেষক ও অর্থনীতিবিদ লোরেত্তা নাপোলিওনি রাশিয়ার আরটি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরাকে মোট উৎপাদিত গমের ৪০ শতাংশ উৎপন্ন হয় আইএসের অধিকৃত এলাকায়। তারা এই গম বিক্রি করে ইরাক সরকারের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে। এ ছাড়া তারা ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান ও তুরস্কের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর চোরাচালানি কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জাম বিক্রি ইত্যাদি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে। তারা তাদের প্রায় ৩০ হাজার যোদ্ধাকে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়, তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনার অর্থেরও জোগান দেয়। এসব বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আইএস এক নতুন ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর পত্তন ঘটাতে সক্ষম হয়, যেটাকে গোটা পৃথিবী রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দিলেও তা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রেরই বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। ৩৫ হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ডটি তাদের ‘সেফ হেভেন’, তাদের রাজস্বের প্রধান উৎস, নিরাপদ প্রশিক্ষণক্ষেত্র এবং বৈশ্বিক জিহাদ পরিচালনার কেন্দ্রভূমি। সাড়ে তিন লাখ সদস্যবিশিষ্ট ইরাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আইএসের মাত্র হাজার তিরিশেক যোদ্ধার সামরিক সাফল্য ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। ২০১৪ সালের জুন ‘খিলাফত’ ঘোষণার পরও প্রায় ছয় মাস ধরে তারা ইরাক ও সিরিরায় নতুন নতুন এলাকা নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে তারা এলাকা হারাতে শুরু করে। ইনফরমেশন হ্যান্ডলিং সার্ভিসেস নামের সংস্থাটির হিসাবে আইএস গত ১৮ মাসে প্রায় এক-চতুর্থাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সিরিয়ায় তারা হারিয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হাসাকা; আলেপ্পোর মনজিব শহরও তারা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস নামের যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীজোটের কাছে হারাতে বসেছে। ইরাকে তারা হারিয়েছে কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা। চার মাসের প্রবল যুদ্ধের পর তারা ইরাকি সরকারি বাহিনীর কাছে হারিয়েছে রামাদি। তার আগে হারিয়েছে তিকরিত। আর গত ২৬ জুন তারা হারিয়েছে ফালুজা শহর ও তার আশপাশের এলাকা। ফালুজার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য তারা ইরাকি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল যুদ্ধে লিপ্ত ছিল প্রায় পাঁচ সপ্তাহ। এই যুদ্ধে তাদের এক হাজার যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছে, ইরাকি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে আরও হাজার খানেক। নিউজউইক পত্রিকা বলছে, ফালুজার যুদ্ধে আইএস এমন প্রবল মার খেয়েছে যে তাদের অনেক যোদ্ধা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে গেছে বিভিন্ন দিকে। ফালুজা শহরে ইরাকের রাষ্ট্রীয় পতাকা ওড়ানোর পর ইরাকের প্রতিরক্ষামন্ত্রী উল্লাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, তাঁরা অচিরেই মসুল শহরও আইএসের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করবেন। মসুল ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রায় ৬০ মাইল উত্তরের মসুল ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। ২০১৪ সালে আইএস ইরাকি সরকারি বাহিনীকে পরাজিত করে মসুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার পরই তাদের ‘খিলাফত’ রাষ্ট্রের পত্তন ঘোষণা করেছিল। মসুলকে তারা বলে ইরাকে তাদের রাজধানী।
এটা হারালে ইরাকের অবশিষ্ট অধিকৃত অঞ্চলে তাদের পতন ভীষণ ত্বরান্বিত হবে। মসুলের লড়াই ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ১২ জুনের নিউজউইক-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকি সরকারি বাহিনী মুসলের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে গত মঙ্গলবার আইএস-অধিকৃত এমন একটা গ্রাম দখল করে নিয়েছে, যেটার সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব বিরাট। ওই গ্রাম নিয়ন্ত্রণে আসার ফলে ইরাকি সরকারি বাহিনী টাইগ্রিস নদীর তীর ধরে ভিন্ন এক দিক থেকে মসুল শহরের ওপর আক্রমণ চালাতে পারবে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, আইএসের ‘খিলাফত’ রাষ্ট্রের ফিজিক্যাল এক্সিস্ট্যান্স বা ভৌত অস্তিত্ব গুরুতর হুমকির মুখে। ইরাকে সরকারি বাহিনী আগের সমস্ত দুর্বলতা দৃশ্যত কাটিয়ে উঠেছে, উপরন্তু তাদের পেছনে রয়েছে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের সামগ্রিক মদদ, তারা এখন আইএস যোদ্ধাদের পাল্টা মার দিতে কোমর বেঁধে নেমেছে। তাদের পাশাপাশি আছে শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী। আর সিরিয়ায় রুশ-ইরানি মদদপুষ্ট বাশার আল-আসাদের সরকারি বাহিনী, সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস নামে জোটবদ্ধ আমেরিকা-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, কুর্দি বাহিনী—সব মিলিয়ে রণাঙ্গনে এখন আইএসের চোখে সরষে ফুল দেখার মতো অবস্থা। ইতিমধ্যে তাদের যোদ্ধার সংখ্যা অনেক কমে এসেছে; গত ফেব্রুয়ারিতে রামাদির লড়াইয়ে পরাজিত হওয়ার পর তাদের মোট যোদ্ধার সংখ্যা ১৯ হাজারে নেমেছিল বলে কিছু সূত্রে বলা হয়েছিল। তার পরের ছয় মাসে তারা আরও অনেক যোদ্ধা হারিয়েছে; সর্বশেষ ফালুজা পতনের পর তাদের সংখ্যা এখন মোট ১২ হাজারে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধে প্রাণ হারানো ও আটক হওয়ার ফলেই যে শুধু যোদ্ধার সংখ্যা কমছে তা নয়, অনেকে নাকি পালিয়েও যাচ্ছে, বিশেষত বিদেশি যোদ্ধারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। আইএস নেতৃত্ব নিজেরাও তাদের খিলাফতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জটা অনুভব করছে—এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর অভিজ্ঞ রিপোর্টার জবি ওয়ারিক ১২ জুলাই এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, আইএসের নেতৃত্ব বিভিন্ন পাবলিক মেসেজে স্বীকার করছে যে তাদের খিলাফত সংকুচিত হয়ে আসছে। এ জন্য তারা নিজেদের জিহাদি সৈনিকদের মনে মনে প্রস্তুত করছে। ওয়ারিক লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে আইএসের সঙ্গে আছেন এমন এক ব্যক্তি ইন্টারনেট-ভিত্তিক এক অডিও সার্ভিসে পশ্চিমা এক সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা যখন দেখছি ইরাক ও সিরিয়ায় আমাদের মূল ঘাঁটিগুলো আক্রান্ত, তখন আমরা আমাদের কিছু কমান্ড–ব্যবস্থা, মিডিয়া ও সম্পদ স্ট্রাকচার অন্যান্য দেশে স্থানান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছি। প্রতিদিন বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলছে যে তারা আমাদের খিলাফতে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে চায়। কিন্তু আমরা তাদের বলছি, তোমরা তোমাদের দেশেই থাকো, সেখানেই কিছু করার জন্য আমাদের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকো।’ লন্ডনের দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, আইএস নেতৃত্ব ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জিহাদিদের উদ্দেশে লিখছে, ‘হেই, ডোন্ট কাম টু সিরিয়া অ্যানি মোর। ডু অ্যান অ্যাটাক অ্যাট হোম।’ আইএস খিলাফত হারালে আমাদের আপাতত আনন্দিত হওয়ার সুযোগ ঘটবে না—এ কথা বলেছি এই লেখার একদম শুরুতেই।
‘খিলাফত’ পতনের কত রকমের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, তার কিছু আলামত ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ফালুজা হারানোর এক সপ্তাহ না পেরোতেই আইএস ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে বাগদাদে। ঢাকার হামলাও সম্ভবত একই প্রতিক্রিয়ার অংশ। রমজান মাসজুড়ে অন্তত ১০টি দেশে হামলা চালিয়ে ৫ হাজার ২০০ মানুষকে হতাহত করেছে বলে তারা নিজেরাই দাবি করেছে। রমজান মাসে বিশেষ হামলা চালানোর বৈশ্বিক নির্দেশনা তারা দিয়েছিল প্রায় ছয় মাস ধরে ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক এলাকা হারানোর প্রতিক্রিয়ায়। ‘খিলাফত’ বা সেফ হেভেন সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেললে আইএসের বিদেশি যোদ্ধারা, যারা মোট যোদ্ধাসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে হামলা চালাবে। আইএসের ‘খিলাফত’ রাষ্ট্রটি অনেকটা ভিমরুলের চাকের মতো, ওটা ভেঙে গেলে সব ভিমরুল ছড়িয়ে পড়বে দিকে দিকে। বাংলাদেশের বেশি জঙ্গি হয়তো সিরিয়া-ইরাকে যায়নি। কিন্তু এ দেশের ভেতরেই তাদের সংখ্যা কত, তা আমরা জানি না। যেসব তরুণ নিখোঁজ রয়েছেন এবং জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত আছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাঁরা যদি আসলেই জঙ্গি হয়ে থাকেন, তাহলে দেশের ভেতরেই তাঁরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশঙ্কা প্রকাশ করলেন, আরও জঙ্গি হামলা হতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু আশঙ্কা দূর করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, সরকার কি তা নিচ্ছে? কিংবা নেবে বলে কি রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
mashiul.alam@gmail.com

এ যেন এক জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি

হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার ঘটনায় ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২৮ ব্যক্তির মৃত্যু ও ৩২ জনের আহত হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে, যা এমনই অভাবনীয়। বিগত কয়েক বছরের জঙ্গি হামলায় ব্লগার, লেখক, প্রকাশক এবং ভিন্ন জীবনপ্রণালিতে বিশ্বাসী কিছু ব্যক্তির প্রাণহানির পাশাপাশি গত ছয় মাসে অন্তত পাঁচজন ভিন্নধর্মাবলম্বী ব্যক্তি নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আক্রমণের শিকার হয়েও প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। এসব অপরাধের দায়ে এখনো কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি, তাদের মদদদাতাদেরও খুঁজে বের করা হয়নি। ফাহিম ও মুকুল নামক দুজন সন্দেহভাজন জঙ্গি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যায় জঙ্গি সম্পৃক্ততার অজুহাতে সারা দেশে পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযানে ১৩ হাজারের মতো ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারপর পুলিশের সোর্স মুছার বিরুদ্ধে মিতু হত্যার অভিযোগ উঠেছে এবং তাঁর গ্রেপ্তার নিয়ে একধরনের লুকোচুরি খেলা চলছে। সর্বশেষ দুই অভিযুক্ত হত্যাকারী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। মিতু হত্যার হুকুমদাতার পরিচয় নিয়েও এখন একধরনের ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজানোর চেষ্টা চলছে। তনু হত্যাকাণ্ড নিয়েও চলছে একধরনের নাটক।
এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের ক্ষেত্রে অপারগতা ও নানা রহস্য আইন প্রয়োগকারীদের সম্পর্কে জনমনে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নাগরিকদের আস্থাহীনতা রাষ্ট্রের অকার্যকরতার লক্ষণ। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ২ জুলাইয়ের ভাষণে এসবের পেছনে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অভিযোগ তুলেছেন। আমাদের আশঙ্কা, এমন দুর্বলতার সুযোগে কিছু বিপথগামী তরুণ জঙ্গি তৎপরতায় সংগঠিত হচ্ছেন। জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হবে। নইলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, এমনকি আমাদের সবার ভবিষ্যৎ চরম ঝুঁকিতে পড়বে। জঙ্গিবাদ দমন করতে হলে ধর্মীয় উগ্রপন্থার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বিবেচনা শক্তি কাজে লাগানো। প্রথমত, স্বীকার করতে হবে যে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ একটি জাতীয় সমস্যা, কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সমস্যা নয়। জঙ্গিবাদ মানবতার শত্রু। অঙ্কুরেই এর মূলোৎপাটন করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সে জন্য বিরাজমান রাজনৈতিক বিরোধের মীমাংসা করতে হবে, কারণ জঙ্গিরা আমাদের অনৈক্য-কলহের সুযোগ নিচ্ছে।
প্রয়োজন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একত্র হয়ে সংলাপে বসা এবং এ ব্যাপারে একটি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত, শুধু বল প্রয়োগ করে জঙ্গি সমস্যার সমাধান হবে না। যুক্তরাষ্ট্র তার ‘ওয়ার অন টেরর’ কর্মসূচির মাধ্যমে বহু কোটি ডলার ব্যয় করেও এ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে হলে সুচিন্তিত কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা জঙ্গিদের দমন করতে চাই, না রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করতে চাই। জঙ্গি নির্মূলের নামে সরকারবিরোধীদের দমন করতে গেলে তা বুমেরাং হতে পারে। রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের চেষ্টা করলে সত্যিকারের অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে। পুলিশের ভাষ্যমতেই সাম্প্রতিক গণগ্রেপ্তারে যে ১৩ হাজারের মতো ব্যক্তি আটক হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৯৪ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে, যদিও গুলশানের হত্যাযজ্ঞের খলনায়কদের কাউকেই এ অভিযানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকিদের অনেকেই বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থক বলে দাবি করেছেন। কিন্তু অনেকের ধারণা, আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই নিরপরাধ, তাঁদের অনেককেই গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের শিকার হতে হয়েছে অথবা আগের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অভিযোগ আছে, সরকার গত আড়াই বছরে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির বিরুদ্ধে ২০ হাজারেরও বেশি মামলা রুজু করেছে, যাতে নামে-বেনামে আসামির সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৫ মে ২০১৬)।
এসব মামলায় বিরোধী দলের অনেক নিরপরাধ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারও কারও জীবন-জীবিকা ধ্বংস হয়েছে। শঙ্কার বিষয় হলো, নানা হয়রানির শিকার এসব ক্ষুব্ধ ব্যক্তির কেউ কেউ জঙ্গিদের প্ররোচনায় আকৃষ্ট হয়ে উগ্রপন্থায় যোগ দিতে পারে। হয়রানিমূলক মামলা ও গ্রেপ্তারের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষোভ ও ক্রোধের ফলে বিএনপি-জামায়াতের নেতা–কর্মীদের অন্তত কিছু অংশকে উগ্র সহিংস পন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না, তাও ভেবে দেখা দরকার। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের ও রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার কার্যকর পন্থা হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। ইতিহাসের শিক্ষা হলো যে যেসব সমাজে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল হয় না, সেখানে দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি বিরাজ করে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে অশান্তির বীজ আমাদের সমাজে বপন করা হয়েছে, সম্ভবত তার একটা বিষফল আজকের সহিংস উগ্রবাদের বিস্তার। যে সমাজে যুক্তিবাদীরা চুপ হয়ে যায়, সেখানে উগ্রবাদীরা তাদের স্থান দখল করে নেয়। গত বছর আমরা কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সামাজিক দায়বদ্ধতাবোধের ভিত্তিতে সহিংসতার অবসান, রাজনৈতিক সমঝোতা ও কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলাম।
কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় আমরা হয়েছিলাম চরম আক্রোশ ও আক্রমণের শিকার। আমরা সবাই জানি, গণতান্ত্রিক অধিকারহীনতা উগ্রবাদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়। অনৈতিকতার পরিণতি অশুভ। পাকিস্তানের ইতিহাস তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। ধর্ম ও জাতীয় সংহতির ধুয়া তুলে বাঙালিদের বঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে জন্মলগ্ন থেকে যে অনৈতিক খেলার শুরু হয়েছিল তা পাকিস্তানকে শুধু ভাঙেইনি, একটি উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। আমাদের রাজনীতিবিদেরাও ক্ষমতার মোহে যেসব অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়েছেন, তার মাশুল আজ আমরা দিচ্ছি। পরিশেষে, হলি আর্টিজান বেকারির সাম্প্রতিক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড আমাদের জন্য যেন একটি জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি। জাতি হিসেবে আমরা যদি আজ জেগে না উঠি এবং সম্মিলিতভাবে জঙ্গিবাদের কারণ চিহ্নিত করে তা দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিই, তাহলে আমরাও এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হব। এমনি এক চরম বিপর্যয়ের হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আশা করি আমাদের নেতারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন বরিস জনসন, বিশ্বব্যাপী তোলপাড়

বর্ণবাদী মন্তব্য আর বিশ্ব নেতাদের নিয়ে বেফাঁস কথাবার্তা
বলে সমালোচিত হয়েছিলেন ব্রেক্সিট আন্দোলনের নেতা
বরিস জনসন। তিনিই এখন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী -এএফপি
ব্রিটেনের ইতিহাসের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর দুনিয়ার সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন তেরেসা মে। কিন্তু নিজে শপথ নেয়ার পরেই ব্রেক্সিটের বাঁশিওয়ালা ও বিতর্কিত টরি নেতা বরিস জনসনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সবার দৃষ্টিকে বরিসের দিকে ঠেলে দিলেন তিনি। তেরেসা বন্দনায় ব্যস্ত হওয়ার বদলে এখন বরিস বধের মন্ত্র জপতে শুরু করেছে বিশ্বের ডাকাবুকো রাজনীতিকরা ও প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলো। ব্রিটেনের প্রধান কূটনীতিক হিসেবে বরিস জনসনের এই পদায়ন মানতে পারেনি মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন। বরিসের বিতর্কিত উক্তিগুলোকে একত্রিত করে বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গণমাধ্যমটি। তাদের দাবি, প্রবল সমকামিতাবিরোধী এই নেতা সমলিঙ্গের বিয়েকে অভিহিত করেন ‘কুকুর সঙ্গম’ হিসেবে। এদিকে ভিনদেশীদের প্রতি তার রয়েছে নাক সিটকানোর রীতি। বিদেশীদের ‘কালো সন্তান’ ও ‘নরখাদক’ প্রভৃতি বিশেষণে অভিহিত করতেন বরিস। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা,
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সম্পর্কেও তিনি কটু কথা বলতে অভ্যস্ত দাবি করেছে প্রতিবেদনটি। তারা বলছে, হিলারিকে ‘মানসিক হাসপাতালের একজন ধর্ষকামী রোগী’ হিসেবে মনে করেন বরিস। দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত নিজের বিভিন্ন লেখায় কঙ্গো ও নামিবিয়ার নাগরিকদের ‘তরমুজের মতো হাসি সর্বস্ব এবং কুৎসিত মানুষ’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। এছাড়াও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনকে হ্যারি পটার সিনেমার ভৃত্যের চরিত্র ‘ডবি’ বলে অভিহিত করেছেন এই বর্ণবাদী নেতা। ২০১৫ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সঙ্গে ছাগলের অশালীন সম্পর্ক নিয়ে কবিতাও লিখেছেন তিনি। এমনকি জাপানে ভ্রমণে গিয়ে স্কুলছাত্রদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে- এমনটাই দাবি করেছে প্রতিবেদনটি। এদিকে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে ব্রিটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ‘জাতিকে বিভাজনকারী ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছে বরিস জনসনকে। প্রতিবেদনটি আরও বলছে, ‘ব্রেক্সিট গণভোটে জয়ের পর সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের জায়গায় নিজেকে অভিষিক্ত করার পরিকল্পনা করছিলেন বরিস। কিন্তু শেষ মুহূর্তের দলাদলিতে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তবে দুই সপ্তাহের মাথায় আবারও দেশটির সর্বোচ্চ কূটনীতিকের পদ দখল করলেন তিনি।’ তার এই প্রত্যাবর্তনের জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেকে দায়ী করছে পত্রিকাটি। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট জানায়, ‘নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় পদে নিয়োগ দিয়ে রাজনৈতিক সক্ষমতা বাড়ালেন তেরেসা, তবে দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিলেন তিনি।’
অন্যদিকে ব্রেক্সিটের ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া ব্রিটেনকে আবারও একসুতায় গাঁথার কাণ্ডারি হিসেবে ধরা হচ্ছিল নতুন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেকে। কিন্তু ব্রেক্সিটের বাঁশিওয়ালা সাবেক লন্ডন মেয়র বরিস জনসনকে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শুরুতেই বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন তিনি। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ব্রেক্সিটপন্থী নেতা হিসেবে বরিস জনসন আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর ছিলেন, এখন ব্রিটেনের প্রধান কূটনীতিক হিসেবে তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য ক্ষতির কারণ হবেন।’ এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও মন্তব্যের তুবড়ি ফুটছে। বরিস জনসন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ পাওয়ার পর টুইটারে নিজের মতামত লিখে বিস্ময় প্রকাশ করেন সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিলথ। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এটি একটি রসিকতা। কিন্তু আমি আতংকিত যে এটি আসলে কোনো রসিকতা নয়। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।’ অস্ট্রেলিয়ার পত্রিকা দ্য টাইমসে বরিসকে বলা হয়েছে ‘অনুচিত কর্মপ্রবণ ব্যক্তি’। তবে জনসনের সঙ্গে নমুন করে কাজ করার সুযোগ আছে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার ডুমার আন্তর্জাতিকবিষয়ক প্রধান আলেক্সি পুশকভ। তিনি বলেন, ‘জনসনের পূর্বসূরি ফিলিপ হ্যামন্ড রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছিল, আশা করি জনসন তেমনটা করবেন না।’ অন্যদিকে জার্মানির পত্রিকাগুলোতে ‘বিতর্কিত রাজনীতিক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে তাকে।

আইএসের শীর্ষ কমান্ডার ওমর শিশানি নিহত

ইসলামিক স্টেটের (আইএস) শীর্ষ কমান্ডার ওমর আল-শিশানি নিহত হয়েছেন। জঙ্গি সংগঠনটির কথিত বার্তা সংস্থা আমাক এজেন্সি তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। সম্প্রতি ইরাকের দক্ষিণ মসুলের শহর শিরকাতে একটি হামলায় শিশানি মারা যান বলে ওই সাইটে জানানো হয়েছে। তবে এ বছর মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন জানিয়েছিল, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এক মার্কিন বিমান হামলায় শিশানি মারা যান।
বৃহস্পতিবার বিবিসি জানায়, ওমর শিশানির মৃত্যুর চার মাস পর এ খবর প্রকাশ করল আমাক। যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত শীর্ষ জঙ্গিদের একজন ওমর। আবু ওমর আল-শিশানির আসল নাম তারখান বাতিরাশভিলি। তবে ওমর দ্য চেচেন নামেই তিনি অধিক পরিচিত ছিলেন। আইএসপ্রধান আবু বকর আল-বাগদাদির ঘনিষ্ঠ সামরিক পরামর্শক হিসেবে ওমরের খ্যাতি রয়েছে। পেন্টাগনের কাছে তিনি আইএসের যুদ্ধমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তার ব্যাপারে তথ্য দিতে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। তাকে আইএসের যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করে আসছিল পেন্টাগন। ৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট সিরিয়ার আল-শাদানি শহরের কাছে বিমান হামলা চালায়। ওমর এসময় নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হলেও দেশটির সরকার তখনই ওমরকে নিহত ঘোষণা করতে নারাজ ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, একটি গাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। ধারণা করা হয়, ওই গাড়িতে ওমর ছিলেন।

ভিসা জটিলতা কাটছেই না মুস্তাফিজের

ভিসা জটিলতা কাটছেই না মুস্তাফিজুর রহমানের। ওদিকে ইংল্যান্ডের কাউন্টি দল সাসেক্স এই বাঁ-হাতি পেসারের জন্য অপেক্ষা করছে। আর ঢাকায় মুস্তাফিজ অপেক্ষা করছেন ভিসার জন্য। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তার ভিসা হয়নি। ফলে অপেক্ষা বাড়ল তার। রোববার ভিসা পেলে ওইদিনই বা সোমবার ইংল্যান্ডে উড়াল দেবেন মুস্তাফিজ। সেক্ষেত্রে ২১ জুলাই সাসেক্সের ম্যাচে খেলার সম্ভাবনা থাকবে তার। আইপিএল শেষে ইনজুরিতে পড়া মুস্তাফিজ এখন পুরোপুরি সুস্থ।
ভিসা না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে ইংল্যান্ডে যাওয়া হয়নি তার। ধারণা করা হয়েছিল, ১৫ জুলাই সাসেক্সের হয়ে প্রথম ম্যাচটি খেলবেন মুস্তাফিজ। কাউন্টিতে ২ আগস্টের পর শুরু হবে নকআউট পর্বের ম্যাচ। টি ২০ ও ওয়ানডে মিলিয়ে সাসেক্সের জার্সিতে কমপক্ষে সাতটি ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের এই পেস সেনসেশনের। সাত ম্যাচের মধ্যে তিনটি টি ২০ ও চারটি ওয়ানডে। নকআউট পর্বে উঠলে ম্যাচের সংখ্যা আরও বাড়বে। এদিকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ছুটি শেষ হচ্ছে ২০ জুলাই। এরপর শুরু হবে ফিটনেস ক্যাম্প। ছুটি শেষ হতে এখনও কয়েকদিন বাকি। তাই শেষদিকে পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাচ্ছেন আরেক পেসার আল-আমিন হোসেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টায় তার রওনা হওয়ার কথা। এছাড়া যেসব ক্রিকেটার ঢাকায় রয়েছেন তারা মিরপুরে ফিটনেস জিম ও হালকা অনুশীলন করছেন।

জঙ্গি আতংকে ঈদ ছিল নিরানন্দ

*ঈদ কোথায় উদযাপন করেছেন?
**এবারের ঈদে ঢাকাতেই ছিলাম। আগে থেকেই ঈদ উদযাপন নিয়ে নানা পরিকল্পনা মাথায় ছিল। ছেলেকে নিয়ে বেশ আনন্দ করব বলে ভেবেছি। কিন্তু সেটি আর হল কই। সব পরিকল্পনাই মাটি হয়ে গেছে। গুলশানের ঘটনার পর থেকে পরিবারের সবাই আতংকের মধ্যে ছিলাম। জঙ্গি আতংকে ঈদ ছিল নিরানন্দ। তাই সবাই মিলে বাসায় টিভি দেখে আর আড্ডা দিয়ে ঈদ উদযাপন করেছি। তবে ঈদের পরের দিন কাছের আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তবে সেটাও বেশ অল্প সময়ের জন্য।
*ঈদের দিনটি কেমন কেটেছিল?
**প্রতি ঈদেই আমি নিজ হাতে রান্না করি। ঈদ উপলক্ষে সবাইকে রান্না করে খাওয়ানোর মধ্যে অন্যরকম এক আনন্দ আছে। এটা আমি হাতছাড়া করতে চাই না। এবারের ঈদে নানারকম সেমাই, পায়েস, বিরিয়ানি, মাংস, মাছ ও কয়েক পদের ভর্তা রান্না করেছি। মূলত রান্নাবান্না নিয়েই ঈদের দিন কেটে গেছে।
*বেড়াতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না?
**অবশ্যই ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, জঙ্গি আতংকে সব গরমিল হয়ে গেছে। ঈদে বেড়াতে না গেলেও অনেক আত্মীয়-স্বজন আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি চুটিয়ে আড্ডা দিয়েছি। ঈদের ছুটিটা যেন আড্ডা দিয়েই কাটিয়ে দিলাম।
*অভিনয়ে ফিরছেন কবে?
**ঈদের আগে পুরো রমজান মাসই নাটকের শুটিং নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। বিশ্রাম নেয়ার কোনো সুযোগ হয়নি। তাই ঈদের পর একটু বেশি সময় নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি। তবে ইতিমধ্যে নতুন নাটকের প্রস্তাব নিয়ে নির্মাতাদের ফোন আসা শুরু করেছে। এখনই নতুন নাটকে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছি না। আর কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে শিগগিরই অভিনয়ে ফিরব। কারণ গতকাল থেকে আগামী মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত নাটকের শিডিউল আগেই দিয়ে রেখেছি।
*নতুন কোনো ছবি নিয়ে কথা হচ্ছে কি?
**নতুন ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব প্রায়ই আসে। কিন্তু মনঃপূত না হওয়ায় সেগুলোতে অভিনয় করা হয় না। কারণ ‘মনপুরা’র পর ছবির গল্পের ওপর আলাদা নজর দিতে হচ্ছে। ছবির ক্ষেত্রে আমার ওপর দর্শকদের অন্যরকম প্রত্যাশা জন্মেছে। তাই যেনতেন গল্পে অভিনয় করে সেই প্রত্যাশা নষ্ট করতে চাই না। অনিন্দ্য মামুন