Friday, February 28, 2014

সাকিব, ক্রিকেট ও অন্যান্য

বাংলাদেশের ক্রিকেট দল
বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের অবস্থা বেশ ছন্নছাড়া। ২৬ ফেব্রুয়ারিতে যখন তারা নামছে ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে, তখনই বিসিবির ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন বিপিএলে ম্যাচ পাতানো বিষয়ে, যাঁর একজন অভিযুক্ত মোহাম্মদ আশরাফুল। এরই মধ্যে সাকিব আল হাসান ক্যামেরার সামনে অনভিপ্রেত আচরণ করে শাস্তি পেয়েছেন, তিন ম্যাচের জন্য তিনি খেলতে পারবেন না। জরিমানাও হয়েছে। তামিম ইকবালের ঘাড়ে ব্যথা। এশিয়া কাপের দল ঘোষণার আগে অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলা হয়নি, এই অভিযোগ প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে তুলেছেন মুশফিকুর রহিম। সে জন্য তাঁকে জবাবদিহি করতে হয়েছে, সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মাশরাফিকে অধিনায়ক করা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, এই নিয়ে মাশরাফি পর্যন্ত বিব্রত, সে খবর আমরা পড়েছি সংবাদপত্রে। তার পরও আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি। ক্রিকেটের জয় আমাদের মরা গাঙে জোয়ার এনে দিতে পারে। পুরো জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ভারতের বিরুদ্ধে খেলার দিনে সেই আশাতেই তাকিয়ে ছিলাম। বাংলাদেশ টসে জিতে ফিল্ডিং নিলে কী হতো, সেই হিসাব আমরা কষছি। হেরে গেলে সব সময়ই নানা কথা মনে হয়, ইশ্, একটুর জন্য, ওই ক্যাচটা যদি মিস না হতো, ওই মারটা যদি ছক্কা হয়ে যেত। কিন্তু খেলার ফল তাতে পাল্টায় না। ভারত হয়তো যোগ্যতর দল হিসেবেই জিতেছে, তবু আমরা বলব, আমাদের সাকিব-তামিম থাকলে দেখিয়ে দিতাম। বা শিশির যেহেতু বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছিল, আগে ফিল্ডিং পেলেই জিতে যেতাম। আমরা যারা ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নই, যাঁরা কেবলই সমর্থক, হয়তো অন্ধ সমর্থক এবং না-বুঝ ও নাছোড়-সমর্থক, তাঁরা তো কত কথাই বলব। এসবে তেমন গুরুত্ব না দিলেও চলবে। শুধু আমরা বলব, আমরা এই দেশটাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি আমাদের ক্রিকেটারদের, ক্রিকেট দলকে। হারো আর জেতো, আমরা তোমাদের পাশে আছি, সঙ্গে আছি।
যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না, মা। এখানেই হয়তো সাকিব আল হাসানদের কাছে আমরা আরেকটু সংযত আচরণ আশা করি। এখানেই হয়তো আশরাফুলদের কাছ থেকে আমরা এত বড় বিচ্যুতি আশা করি না। আমার নিজের ধারণা, আমরা বাংলাদেশের পুরুষেরা সাফল্য নিতে পারি না। আপনারা প্রায়ই ইস্পাতের বিজ্ঞাপনে শুনবেন একটা কথা, ‘বুয়েট পরীক্ষিত!’ ইস্পাতের দুই ধরনের পরীক্ষা করা হয়। একটা হলো, ইস্পাত টেনশন বা টান কতখানি সহ্য করতে পারে। আরেকটা হলো, স্ট্রেস বা চাপ কতখানি সইতে পারে। একটা পর্যায়ে গিয়ে লোহা ছিঁড়ে যায়, বা ভেঙে যায়। বাংলাদেশে সাফল্যের তেমন কোনো উদাহরণ নেই বললেই চলে। এই দেশে খুব কম মানুষই আছেন, যাঁদের স্বীকৃতি বা সাফল্য আন্তর্জাতিক মানের। কাজেই আমাদের মধ্যে কেউ একটু সফল হলেই হয় আমরা টেনশনে ছিঁড়ে যাই, নয়তো স্ট্রেসে ভেঙে পড়ি। পুরো জাতি উন্নত না হলে সেখান থেকে উন্নততর মানুষ কম পাওয়া যাবে। একটা বিশাল হিমালয় রেঞ্জ আছে বলেই একটা এভারেস্ট আছে। এভারেস্ট একা একা বড় হতে পারে না। সাকিব আল হাসানের কথা ধরুন। অল্প বয়স। মাগুরা থেকে এসেছেন। এই বয়সে কী খ্যাতি! কী টাকাপয়সা! তাঁকে যে কাউন্সেলিং করবে, কে আছে। আমাদের সিস্টেমেই তো কাউন্সেলিং ব্যাপারটা নেই। তাঁর ওপরে চাপটা কী ভাবুন। তিনি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় এক দিনের খেলায় যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, বোঝাই যাচ্ছিল, তিনি চাপমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ওইটা কাজে লেগে গেলেই হয়ে যেত। কোনো দিন হয়, কোনো দিন হয় না। আপনি ঠেকিয়ে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লু হতে পারেন, স্লিপে ক্যাচ দিতে পারেন। তখন মনে হবে, মারলেই তো হতো। খেলাটা কঠিন। তার চেয়েও কঠিন মাথা ঠান্ডা রাখা।
আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদেরও দেখি, মাথা আউলা হয়ে যায়। কী সব দুর্নীতি করেন। একটা কিছু সম্মান পেলেই নিজেকে দেশের চেয়েও বড় ভাবতে শুরু করি অনেক সময়। আর ওই অল্পবয়সী ছেলেগুলোর ওপরে কী চাপ! তবু সাকিব যা করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়, সেটা আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে। সাকিব আমাদের সবচেয়ে গৌরবের ধন বলেই তাঁর কাছে আমরা আদর্শ আচার-ব্যবহারও আশা করি। ভুলত্রুটি নিয়েই মানুষ। অমন যে মহাত্মা গান্ধী, তাঁর জীবনেও কত কাহিনি। মানুষি দুর্বলতা আমাদের সবার আছে। তবু ওটাও সত্য, ‘একটুখানি ভুলের তরে অনেক বিপদ ঘটে, ভুল করেছে যারা সবাই ভুক্তভোগী বটে।’ সাকিব নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। ফেসবুকে দেখলাম, তিনি তাঁর অগণিত ভক্তের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এশিয়া কাপে সাকিবের কথা আমাদের বারবার মনে পড়বে। তামিমের কথা মনে পড়বে। বিশেষ করে, গত এশিয়া কাপের ফাইনালে দুই রানে হেরে যাওয়ার পরে সাকিব আল হাসানের কাঁধে মুশফিকের মাথা, সাকিবের সিক্ত চোখ চিকচিক করছে, সেই দৃশ্য পুরো দেশকে আবেগাক্রান্ত করে তুলেছিল। দুই বছর আগে ১৬ মার্চ শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সাকিব-তামিম-মুশফিক-নাসির টেন্ডুলকারের শততম শতকের দিনে বাংলাদেশের মানুষকে উদ্বেলিত করেছিলেন এক অনন্যসাধারণ বিজয় উপহার দিয়ে। আর ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ১৭ মার্চ সাকিব-তামিম-মুশফিক ভারতের উৎসবের সাজানো বাসরে পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। ক্রিকেট মানসিক খেলাও। জয়ই কেবল জয় এনে দেয়। আমরা একটুর জন্য জিততে জিততেও হেরে গেছি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ম্যাচগুলো। ভারতের বিরুদ্ধে তার পরও ছেলেরা মাথা উঁচু করে নেমেছিল,
এবং সমানে সমানে লড়ে গেছে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে খেলাটা নিয়ে কিন্তু ভয় আছে। বাংলাদেশ যেমন বড় টুর্নামেন্টে বড় দলকে হারিয়ে দিয়ে মাশরাফির বিখ্যাত সংলাপ ‘ধরায়া দিবানে’কে বাস্তবায়িত করে, তেমনি আয়ারল্যান্ড কিংবা আফগানিস্তানও তো বড় দলকে হারাতে পারে। কাজেই আমি বাংলাদেশের সমর্থকদের বলব, জয়-পরাজয়ে আমাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, দলের সঙ্গে থাকতে হবে। আর ক্রিকেটারদের বলব, জয়ের জন্যই নামতে হবে। এর নাম জিগীষা। জয়ের ক্ষুধা। কীভাবে খেলতে হবে না হবে, ব্যাট আগে করতে হবে নাকি বোলিং—এগুলো একেবারেই টিমের নিজস্ব ব্যাপার, এসব ব্যাপার নিয়ে আমরা কোনো কথাই বলব না। আমরা বলব, আমাদের ক্রিকেট দল খুব একটা খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কেবল জয়ই পারে দলটাকে আবার চাঙা করতে। অসুস্থতার কারণে সাকিব খেলতে পারেননি, সাকিবকে ছাড়াই নিউজিল্যান্ডকে বাংলাওয়াশ করা গিয়েছিল। তামিমও ওই সিরিজে শেষ ম্যাচটা খেলেননি। কাজেই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের খেলোয়াড়েরা যেন তাঁদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেন, এই হলো আমাদের প্রার্থনা। আমাদের তরুণ খেলোয়াড়েরা দারুণ খেলছেন; তাঁরা প্রমাণ করবেন, তাঁরাও পারেন। পরের খেলা থেকে সাকিব ফিরে আসবেন। তিনি জাত খেলোয়াড়, তিনি নিশ্চয়ই এই ছন্দচ্যুতিটা সামলে নিতে পারবেন। জয়টা আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে চাঙা করার জন্যও এই মুহূর্তে দরকার। নানা কারণে বর্তমান সময়টাকে বেশ একটা ধূসর বলে মনে হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত একটা বছরে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হয়নি, পরিবহন খাতে অমেয় ক্ষতি হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, বিদেশি ক্রেতারা এখনো আস্থা পাচ্ছে না এই দেশের ওপরে।
মানুষের মনে ফুর্তির ভাবটা নেই। ক্রিকেটের জয় কেবল ক্রিকেটকে উদ্বুদ্ধ করবে না, দেশের সব মানুষকেও পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। সেটা আমাদের এখন ভীষণ দরকার। তাই বলে ক্রিকেটারদের ওপরে প্রত্যাশার বাড়তি কোনো চাপও দিতে চাই না। যে কাজ আমরা অন্য ক্ষেত্রে পারি না, রাজনীতিবিদেরা পারেন না সুন্দরতম সুশাসন দিতে, সমাজ বা রাষ্ট্র পারে না দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ দিতে, সর্বক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের এগিয়ে চলার পথটাকে নির্বিঘ্ন রাখতে, কেবল একটা ক্ষেত্র—ক্রিকেট—সেখানে আমরা সব সময় ভালো করব, তা-ও হয় না। আমাদের যদি ভালো করতে হয়, জাতীয় জীবনের সব দিক থেকেই ভালো করতে পারতে হবে। তবে এই জাতি নিয়ে আমাদের আশা মরে না। দেশের ৯৮ ভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। ২০ বছর পরে এই দেশের প্রত্যেক কৃষক, প্রত্যেক শ্রমিক হবেন শিক্ষিত। এখনই প্রতিবছর ১০ লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে যান, ২০ বছর পরে চার কোটি মানুষ বিদেশে থাকবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে দেশকে ভাসিয়ে দেবেন। পুঁজি তত দিনে গড়ে উঠে নিজের স্বার্থে নিজেকে পাহারা দেবে, আইনশৃঙ্খলা সুশাসন নিশ্চিত করতে চাইবে। সেই বাংলাদেশ হবে সব দিক থেকে একটা আলোকিত বাংলাদেশ। তখন আমরা সবকিছুতে ভালো করব, শিক্ষায়-দীক্ষায়, বিজ্ঞানে, কলায়, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে ও নানা ধরনের খেলায়। এবং অবশ্যই ক্রিকেটে। ক্রিকেটই তো আমাদের বড় জয়ের আশায় উদ্বুদ্ধ করেছিল সবার আগে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো মানুষটি

এবিএম মূসা
‘ভালো ছিলাম। প্রেসক্লাবে আড্ডা দিতাম। ঘুরে বেড়াতাম। মাঝেমধ্যে প্রথম আলোয় কলাম লিখতাম। সকাল থেকেই ফোনে লোকজন বলত, চমৎকার লেখা হয়েছে। আমরা তো এ রকম লেখাই চাই। সরকারের সমালোচনা করলে ফোন বেশি আসত। সেটা খালেদার সরকার হোক কিংবা হাসিনার।’ শেখ হাসিনার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে একটি প্রশ্ন করেছিলেন মূসা ভাই। এর পর থেকে মোসাহেবরা তাঁর বিরুদ্ধে কান ভারী করতে থাকল। এটাও সমস্যা নয়। সমস্যা নাকি শুরু হলো টক শোর কারণে। এ জন্য অনেকখানি আমি দায়ী। আমি নাকি সর্বনাশ করেছি। গভীর রাতে চ্যানেল আইয়ের শোতে এসে মূসা ভাই প্রথমেই বলতেন, ‘আজ কী জিজ্ঞেস করবি? তোর এখানে এলেই কী যেন হয়ে যায়। সব সত্য কথা, শক্ত কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়।’ এভাবে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতেন প্রতিদিন। অসংখ্য স্মৃতি মূসা ভাইয়ের সঙ্গে। কেউ কেউ বলেন, টেলিভিশন লাইসেন্স পাননি বলে তিনি সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। নিশ্চিত করে বলতে পারি, এটা সত্য নয়। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি।
তাঁর সাফ জবাব, রাত জেগে যাঁরা অনুষ্ঠান দেখতে টিভির সামনে বসেন, তাঁরা দলনিরপেক্ষ আলোচনা চান। আমি কী পেলাম বা পেলাম না তাতে কী যায়-আসে। তা ছাড়া আমার কোনো আফসোস নেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা যেহেতু আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেননি, তখন আমি কী করব। আমি তো বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ছিলাম। টক শোতে সরাসরি বলতেন তিনি আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন। আলোচনায় কখনো মনে হতো না তিনি কোন দলভুক্ত। অথবা কোনো দুর্বলতা রয়েছে বিশেষ দলের প্রতি। মূসা ভাই আসলে এক জীবন্ত ডিকশনারি। ৫০ বছর আগের কোনো ঘটনা বা কোনো ব্যক্তির নাম ভুল হতো না তাঁর আলোচনায়। শরীরটা ভালো নেই। আমার ওপর রাগ দেখিয়ে আলোচনার টেবিলে বসে যখন ঘটনার বিবরণ দিতেন, তখন মনে হতো তরতাজা কোনো ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন। হাজার শরীর খারাপ হলেও মধ্যরাতের টক শো মিস করতেন না। মূসা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক প্রায় ৪২ বছর। সব সময় তাঁর কাছ থেকে আদর-ভালোবাসা পেয়েছি। ভালো রিপোর্ট ছাপা হলে প্রশংসা করতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। ইদানীং এটা অনুপস্থিত। সবাই রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে চান রক্তের গ্রুপ ‘এ’ না ‘বি’। কিন্তু মূসা ভাই খারাপ হলে মুখের ওপর বলে দিতেন বা দেন। বিশ্বকাপ ফুটবল কভার করে ঢাকায় ফিরেছি। প্রেসক্লাবে দেখা। প্রথম বাক্য, ‘ওয়েলডান। তুই তো স্পোর্টস রিপোর্টার না। তুই কেন ইতালি গেলি?’ আবার নিজেই বললেন, ‘ইত্তেফাকে খেলা যেখানে সিঙ্গেল কলাম ছাপা হতো এই এক মাস দেখলাম প্রধান শিরোনাম। সারওয়ার আছে তো (বার্তা সম্পাদক গোলাম সারওয়ার) এ জন্যই বোধ করি। ভালো হয়েছে।’ কোক খাচ্ছিলেন। আমাকেও খেতে বললেন। মূসা ভাইয়ের মুখে শোনা একটি ঘটনা উল্লেখ করে লেখাটির যবনিকা টানব। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন নিয়ে তুমুল বিতর্ক। অবরোধ আর হরতালে কাবু ৫৪ হাজার বর্গমাইল। কোনো সমঝোতা হচ্ছে না সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে। ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক যুদ্ধও হয়ে গেল বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে। ভারত সংবিধান রক্ষার পক্ষে মরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র চায় সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন। সমঝোতা হলো না। শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার তা-ই হলো। একপেশে নির্বাচন পেলাম আমরা। বিএনপির গায়ে কলঙ্ক লেগেছিল ১৫ ফেব্রুয়ারির তামাশার নির্বাচন করে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করে আওয়ামী লীগও কলঙ্কিত হলো। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন মূসা ভাইয়ের কাছে একটি প্রস্তাব এল। প্রস্তাবটি নিয়ে এসে একজন মন্ত্রী বললেন, ‘মূসা ভাই, আপনি তো সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সবাই আপনাকে মান্য করে। আপনার কথার মূল্য দেয়। এক কাজ করেন না, আপনি সমঝোতার একটি উদ্যোগ নেন না।’ মূসা ভাই হতবাক। কী বলছেন মন্ত্রী। যে সরকারের লোকজন তাঁর ওপর বিরক্ত। প্রকাশ্যে বক্তৃতা-বিবৃতিতে কড়া সমালোচনা করছেন। এর মধ্যে দূতিয়ালির প্রস্তাব। মন্ত্রী বললেন, ‘আমরা কয়েকজন বসেছিলাম।
প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে একটি সমঝোতা করা যায় কি না। তখনই আপনার নাম এসেছে।’ মূসা ভাই প্রশ্ন করলেন, ‘ঠিক করে বলছিস তো? উদ্যোগ নিলাম। পরে দেখা গেল কেউ শুনল না, তখন আমি ফালতু বনে যাব।’ মন্ত্রী বললেন, ‘না, সবই ঠিক আছে।’ মূসা ভাই প্রেসিডেন্ট দপ্তরে ফোন করে সময় নিলেন। এক শনিবারে দেখা করলেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে। প্রেসিডেন্ট খালেদা জিয়াকে ডাকতে রাজি হলেন বঙ্গভবনে। বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে মূসা ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে এই উদ্যোগের কথা বললেন। মির্জা রাজি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানাবেন। দুই ঘণ্টার মধ্যে জানালেন। তাঁদের আপত্তি নেই। খালেদা জিয়া ১৮-দলীয় জোট নেতাদের নিয়ে গেলেন বঙ্গভবনে। প্রধানমন্ত্রীও সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে প্রেসিডেন্টের চা-চক্রে যোগ দিয়েছিলেন। বরফ কিছু গলেনি। সে অন্য এক বিতর্ক। কেন সমঝোতা হয়নি, এ নিয়ে নানা কথাই চাউর হয়ে গেছে। যেভাবে জাতিসংঘ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর দূতিয়ালি ব্যর্থ হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের উদ্যোগও সেভাবেই ব্যর্থ হয়ে যায়। মূসা ভাই আমাকে অফিসে এসে এ ঘটনা বলেছিলেন। মূসা ভাই এখন টক শোতে আসেন না। শরীরটা বড্ড খারাপ। হাসপাতালে শুয়ে আছেন। দেখা করতে গিয়েছিলাম। শুরুতেই একহাত নিলেন। বললেন, ‘তুই এখনো টক শোতে যাচ্ছিস দেখে অবাক হই। এখন তো টক শোর আবেদন কমে গেছে।’ আবার নিজেই বললেন, ‘কিরে, কারে কারে নিষিদ্ধ করলি। আমি কী করি, সেটা আমি জানি। তোকে বললাম আর কি। আমার মনে হয় আর টক শোতে যাওয়া হবে না।’ তাঁর চোখ ছলছল করছে। বললাম, ‘অবশ্যই যাবেন।’ তিনি বললেন, ‘সান্ত্বনা দিচ্ছিস। আমার জন্য দোয়া করিস।’ নীরবে বসে আছি কয়েক মিনিট। মূসা ভাইয়ের শেষ কথা, ‘সত্য না বলতে পারলে টক শোতে যাবি না।’ যা-ই হোক, মূসা ভাইয়ের জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। সেই সঙ্গে কামনা করছি তিনি আবার ফিরে আসবেন টিভির পর্দায়। শোনাবেন তাঁর জীবনের অনেক অজানা কাহিনি। স্বপ্ন দেখাবেন ভবিষ্যতের।
মতিউর রহমান চৌধুরী: সম্পাদক, দৈনিক মানবজমিন।

মাতৃভাষায় জুমার খুতবা

মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর কুবার মসজিদে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করা হয়। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই ইমামতি করেন। এদিন জুমার নামাজের আগে তিনি দুটি খুতবা প্রদান করেন। তখন থেকেই শুক্রবারে জুমার নামাজের জামাতের আগে দুটি খুতবা প্রদানের প্রথা প্রচলিত হয়। নবী করিম (সা.)-এর সময় ইসলাম আরব উপদ্বীপেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাদের মাতৃভাষা ছিল আরবি। খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করে। ফলে এসব অঞ্চলে আরবি ভাষা দ্রুত বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছিল। তাই স্বভাবতই জুমার নামাজের খুতবা আরবিতে প্রদান করা হতো। আরবি ‘খুতবা’ শব্দের অর্থ বক্তব্য, উপদেশ, বক্তৃতা বা ভাষণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকে খুলাফায়ে রাশেদিন, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগে মুসলিম জাহানে আরবি ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় জুমার মূল খুতবা প্রদানের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। নবী করিম (সা.)-এর পরবর্তীকালে ইসলাম আরব সীমানা পেরিয়ে অনারব অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করলেও আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় জুমার খুতবা প্রদান হয়নি। মহানবী (সা.)-এর মাতৃভাষা ছিল আরবি, তাঁর শ্রোতাদের ভাষাও ছিল আরবি।
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘নবী করিম (সা.) জুমার নামাজের আগে দুটো খুতবা দিতেন। একটা শেষ করে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বসতেন, তারপর দ্বিতীয় অংশটি দিতেন। খুতবার মাঝে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে মানুষকে উপদেশ দিয়ে বোঝাতেন। (মুসলিম, কিতাবুল জুমা)। ঈদের খুতবায় তিনি সমসাময়িক বিষয়াদিতে করণীয় দায়িত্ব সম্বন্ধে সবাইকে সজাগ করতেন। আর্থিক কোরবানি করতে অনুপ্রাণিত করতেন। মুসলমানদের অনুসৃত প্রধান ধর্মগ্রন্থের ভাষা আরবি, যে ভাষায় পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাই ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম নামাজসহ অত্যাবশ্যকীয় ইবাদত-বন্দেগিতে মুসলমানেরা আরবি ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। জুমার নামাজের আগে খুতবা পাঠ নামাজেরই বিশেষ অংশ। তাই এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী আলেম-উলামাদের ইজমা বা ঐকমত্য হয়েছেন যে মূল খুতবা আরবিতেই পাঠ করতে হবে। তবে খুতবা পাঠের আগে প্রত্যেক মুসলিম উম্মাহ নিজ নিজ দেশে মাতৃভাষায় মূল বক্তব্যটুকু বলে দিলে সবাই খুতবার সারমর্মের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হতে পারবে। খতিব সাহেব জুমার খুতবা দুটির প্রতিটি আরবি ভাষায় পেশ করার পর মিম্বরে দণ্ডায়মান অবস্থায় স্থানীয় মাতৃভাষায় এর অনুবাদ পেশ করতে পারেন। আরবি ভাষার বিপরীতে সাধারণ জনগণের মাতৃভাষায় জুমার খুতবা প্রদানের বৈধতায় বর্তমান যুগের আলেমদের মতৈক্য রয়েছে।
মাতৃভাষায় জুমার খুতবার আগে সমাজে প্রচলিত অন্যায়-অবিচার, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদকাসক্তি, মজুতদারি, কালোবাজারি, মুনাফাখোরি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, বোমাবাজি, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং দুর্লঙ্ঘ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অথবা গরিব-মিসকিন, অনাথ আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত পাড়া-প্রতিবেশী, অভুক্ত অনাহারী ও আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে সামর্থ্যবানদের সহযোগিতার দিকনির্দেশনা প্রদান করা দরকার। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, পরিবার পরিকল্পনায়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ও অর্থনৈতিক যাবতীয় বৈষম্য বা বেকারত্ব দূরীকরণে আত্মকর্মসংস্থানের বাস্তব কোনো রূপরেখা, কর্মপদ্ধতি, সতর্কবাণী বা কোনো আভাস-ইঙ্গিত জুমার খুতবার আগে সাধারণ আলোচনায় স্থান দিতে হবে। সমাজে বিশ্বমানবতার ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, মৈত্রী, আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠামূলক উদারনৈতিক উপদেশ ইমাম-খতিবদের সাপ্তাহিক বক্তব্যে বা ভাষণে থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়। মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকার পবিত্র কোরআনের অমোঘ নির্দেশ বাস্তবায়নে দেশের তিন লাখ মসজিদের ইমাম-খতিবকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
তাঁদের মূল কাজ ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ও নীতি-বিধান কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতিসহকারে মানুষের মধ্যে জুমার নামাজের আগে মূল খুতবায় অথবা খুতবার আগে বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় শ্রোতাদের বোধগম্য বয়ান তুলে ধরা ও যুগোপযোগী কথাবার্তা বলা। সমাজে যখন যে সমস্যা প্রকটতর দেখা দেবে, জুমার খুতবায় ইমাম ও খতিব সাহেব তা থেকে মানুষকে উদ্ধারের সঠিক পথ দেখাবেন। একজন ইমাম বা খতিব তখনই সমাজের জন্য কল্যাণকর হবেন, যখন সব বিষয়ের ওপর তাঁর স্বচ্ছ ধারণা যেমন- বিজ্ঞান, কম্পিউটার, ইন্টারনেট এসব আধুনিক বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান রাখবেন। যুবসমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়রোধে সাপ্তাহিক জুমার খুতবায় ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণীর সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আদর্শ জাতি গঠনে ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। সমাজে ন্যায়নীতি, আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় মসজিদের ইমাম-খতিবদের একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাই সমকালীন প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যুগোপযোগী বিষয়ে তাদের গভীরভাবে অধ্যয়ন, চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করে মাতৃভাষায় জুমার খুতবার সারমর্ম প্রদানে তাঁদের বাস্তবসম্মত কার্যকরী বক্তব্য উপস্থাপন
করা অত্যাবশ্যক।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

কাজী শাহেদ আহমেদের জীবনের মোড়ক উন্মোচন by ড. রফিকুল ইসলাম

কাজী শাহেদ আহমেদের আত্মকথা ‘জীবনের শিলালিপি’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবের আমন্ত্রণপত্রের শুরুতে তিনি লিখেছেন, ‘জেনে খুশি হবেন যে, অবশেষে আমার জীবনীর মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে।’ ‘জীবনের শিলালিপি’ গ্রন্থের আর ‘জীবনীর মোড়ক’ উন্মোচন কথার অর্থ অভিন্ন না হলেও দুটির মধ্যে নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। কাজী শাহেদ আহমেদ গত তিন দশকের ওপর সময়কাল ধরে নিজেকে যেভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করেছেন এবং তা লিপিবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন তার সবটুকু না হলেও অনেকটাই ‘জীবনের শিলালিপি’ গ্রন্থে খোদাই করে দিয়েছেন। কাজটা সহজ ছিল না। কারণ যখন একজন কর্মবীর তার জীবনের অভিজ্ঞতা সমাজের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেন বস্তুতপক্ষে তখন তিনি তার পরিচিত পরিবেশের কাঠগড়ায় নিজেকে দাঁড় করান এবং অলিখিত সব প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন।
একজন মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেন এবং স্বাভাবিক জীবনে তিনি শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্যকে অতিক্রম করে যান বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। সেই দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি থেকে গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে একজন তার জীবন কথা তুলে ধরেন। এ কাজে জীবনের কোন অভিজ্ঞতাকে তিনি তুলে ধরবেন, কতটা বাদ দেবেন সেটা নির্ভর করে জীবনস্মৃতি রচয়িতা মানুষটির শিক্ষাদীক্ষা, রুচি ও সাহসের ওপর। পাশ্চাত্যে একজন শিল্পী, সাহিত্যিক বা দার্শনিক অবলীলায় তার জীবনের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে পারেন, যা পাঠক সহজভাবে গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রাচ্যে বিশেষত আমাদের দেশের সমাজ মানুষের জীবনের অনেক অভিজ্ঞতাকেই প্রকাশ্যে গ্রহণ করতে পারে না। এমন একটা অবস্থায় কাজী শাহেদ আহমেদ তার জীবন স্মৃতিতে শুধু জীবনীর মোড়ক উন্মোচন করেননি, জীবনের আবরণকেও পাঠকের কাছে অনেকটা অপসারণ করেছেন। বিশ শতকের চল্লিশ দশক থেকে শুরু করে একুশ শতকে সূচনাকাল পর্যন্ত ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে যাপিত জীবনের যে চিত্র কাজী শাহেদ আহমেদ এ গ্রন্থে চলচ্চিত্রের মতো তুলে ধরেছেন তা কেবল একজন ব্যক্তির কথাই নয়, একটি পরিবর্তনশীল সময়ের কথাও বটে। এ ক্রান্তিকালের ব্যক্তি ও সমষ্টিগত অভিজ্ঞতাকে কাজী শাহেদ আহমেদ অকপটে বর্ণনা করে গেছেন। বর্ণিত হয়েছে তার পূর্বপুরুষ, শৈশব, শিক্ষাজীবন, সামরিক জীবন বিশেষত একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানে বাঙালি সামরিক অফিসারদের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের বন্দি শিবিরে আটক যুদ্ধবন্দিদের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তাদের ভাগ্যে যা জুটেছিল সেটাও ছিল অনাকাক্সিক্ষত। সামরিক বাহিনী ছেড়ে দেওয়ার পর কাজী শাহেদ আহমেদের স্বাধীন কর্মজীবন বিশেষত নির্মাণ ও ব্যবসা প্রয়াসের পাশাপাশি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক জীবন এবং শিল্পপতিরূপে আত্মপ্রকাশ চমকপ্রদ বললে অত্যুক্তি করা হবে না। কাজী শাহেদ আহমেদের এই দ্বিতীয় জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতাকে তিনি সহজ ও সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন।
পারিবারিক জীবনে কাজী শাহেদ আহমেদ স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে এক অনাবিল আনন্দময় জীবনযাপন করেছেন। যেমনটি তিনি করেছিলেন তার পিতামাতা ও ভাইবোনদের সঙ্গে। এ নিবিড় পারিবারিক বন্ধন তাকে সর্বদা অনুপ্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছে। আর তিনি এক প্রয়াসে এক সফল কর্মময় জীবন গড়ে তুলেছেন, তবে তার উদ্ভাবনী শক্তি এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবিকই বিস্ময়কর। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে এমন কিছু সংযোজন করেছেন যা অভিনব। উদাহরণস্বরূপ বিদ্যুতের কংক্রিট পোল, জৈবিক চা বাগান এবং সংবাদপত্র জগতে দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ আর আধুনিক উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি আর লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উল্লেখ যথেষ্ট।
কাজী শাহেদ আহমেদের মতো একজন সফল ব্যক্তি যখন তার কর্মময় জীবনের কথা সহজ-সরলভাবে তুলে ধরেন কিংবা পরিণত বয়সে একজন উপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তখন তার জীবনের রহস্য সমাজের কাছে পরিস্ফুট হয়ে ওঠাটা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সেই প্রয়োজন মিটিয়েছে কাজী শাহেদ আহমেদ নিজেই তার ‘জীবনের শিলালিপি’ গ্রন্থের মাধ্যমে। এ গ্রন্থটি প্রকাশের আগে লেখক তার ঘনিষ্ঠ চারজনকে দিয়ে পরিশীলিত করে নিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু যারা কাজী শাহেদ আহমেদের ‘জীবনের শিলালিপি’ প্রকাশনার আগে পরীক্ষা করে তাদের সতর্ক রায় দিয়েছেন তারা যে কাজী শাহেদ আহমেদের চেয়ে সাহসী নন সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবুও ওই পরীক্ষকদের সেন্সরশিপ মেনে নিয়ে কাজী শাহেদ আহমেদ যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন তার তুলনা এ সময় আমাদের সমাজেও বিশেষ পাওয়া যাবে না। ‘জীবনের শিলালিপি’ শুধু কাজী শাহেদ আহমেদের নয়, আমাদের দেশের মানুষের জীবনের এক অস্থির সময়ের প্রতিলিপিও বটে।
জীবনের শিলালিপী ।। লেখক কাজী শাহেদ আহমেদ ।। প্রচ্ছদ এ.জি আরিফ ।। প্রকাশক আগামী প্রকাশনী

খেয়াল গানের আধুনিক রূপকার নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গ by মোবারক হোসেন খান

‘যবন’ মানে গ্রিস জাতি। অভিধানে যবনের অর্থ নির্ধারিত হয়ে আছে দীর্ঘকাল থেকে। যবন যদি গ্রিস জাতির নাম হয়, তাহলেও তো অন্য কোনো জাতিকে সে নামে ডাকার অবকাশ নেই। যদি ডাকা হয় তাহলে তাতে হীনম্মন্যতারই কেবল পরিচয় বহন করে। রামপ্রসাদ রায় রচিত ‘সঙ্গীত জিজ্ঞাসা’ সঙ্গীত-গ্রন্থখানা পড়ে এ ধরনের একটা বিভ্রান্তিকর তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রিস জাতিকে মুসলিম জাতিতে পরিণত করে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে যেন তিনি অস্বীকার করতে চেয়েছেন। ‘হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীতে যবন-সংস্কৃতির প্রভাব’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এককালে যবন বলিতে একমাত্র গ্রিকদিগকেই বুঝাইত। সঙ্গীতে যবন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যবন শব্দটি সংকীর্ণ অর্থে প্রধানত মুসলমান সম্প্রদায়কেই বুঝায়।’ এটাকে অনায়াসে সত্যের অপলাপ বলে আখ্যায়িত করা যায়। কেননা, মুসলমানদের আগমন ভারতবর্ষে না ঘটলে রাগসঙ্গীতের আবির্ভাবই ঘটত না। যে জাতি রাগসঙ্গীত সৃষ্টি করে সমগ্র ভারতবর্ষের সঙ্গীতকে আকণ্ঠ সমৃদ্ধ করেছে তাদের সংকীর্ণ অভিধায় অভিহিত করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে, তা কিছুতেই স্বীকার করা যায় না। এ কথা অবশ্য সত্য, ভারতবর্ষের সঙ্গীতে মিসর, গ্রিস, আরব, পারস্য প্রভৃতি দেশের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে আমীর খসরুর রাগসঙ্গীত সৃষ্টির পর, তার আগে নয়। রামপ্রসাদ রায় সে কথা নিজেই স্বীকার করে লিখেছেন, “... যেসব ব্যক্তির অবদান ভারতীয় সঙ্গীতের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করিয়াছে তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য নাম হইল অসামান্য শ্র“তিধর, সঙ্গীত স্রষ্টা আমীর খসরু। তিন প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় সঙ্গীতের সহিত পারস্য দেশীয় সঙ্গীতের সুসামঞ্জস্য সংমিশ্রণ করে ভারতীয় সঙ্গীত ধারাকে মাধুর্যমণ্ডিত করিবার কাজে পথপ্রদর্শক। বর্তমানের হিন্দুস্তানি সঙ্গীতপদ্ধতি আমীর খসরুর নিকট সীমাহীন ঋণে আবদ্ধ। ভারতীয় ধ্র“পদ গানের সহিত পারস্য দেশের গজল গানের সংমিশ্রণ ঘটাইয়া ‘খেয়াল’ গান প্রবর্তনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাহারই।” খেয়াল গান ও খেয়াল গানের প্রকৃত রূপকারের কথা বলতে গিয়েই অত কথার অবতারণা। তার আগে খেয়াল গানের কিছু কথা। ফার্সি ভাষায় ‘খেয়াল’ অর্থ ‘কল্পনা’। নানাবিধ তান-বিস্তার ইত্যাদির দ্বারা বিভিন্ন তালে রাগ গানকে বলা হয় খেয়াল। বলা যায় সুরের ‘বিহার’ খেয়াল গানের মূল বৈশিষ্ট্য। খেয়াল গানের বিষয়বস্তু প্রধানত শৃঙ্গার রসাত্মক, তবে সঙ্গীতের শিল্প-সৌন্দর্যের মাধ্যমে এর প্রকাশ। আমীর খসরু খেয়ালের আবিষ্কর্তা। তবে তিনি সৃষ্টি করেন ‘ছোট খেয়াল’ (Slow kheyal)। এ প্রকার খেয়ালের গতি চপল। রচনা খুব সংক্ষিপ্ত। স্থায়ী ও অন্তরাতে এ গান সীমাবদ্ধ। স্থায়ী ও অন্তরা দুটিই দু’চরণে রচিত হয়। পরবর্তীকালে জৌনপুরের সুলতান হুসেন শাহ্ শর্কী আরেক ধরনের খেয়াল প্রচলন করেন, যার নাম ‘বড় খেয়াল’ (ঝষড়ি শযবুধষ)। এ ধরনের খেয়ালের গতি বিলম্বিত। চাল গম্ভীর। মন্থরগতিতে এর বিস্তার। এ গানের রচনাপদ্ধতি ছোট খেয়ালের মতোই। স্থায়ী ও অন্তরার মাধ্যমেই এ খেয়াল পরিবেশিত হয়। অষ্টাদশ শতকে মোগল-সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র আমলে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ নিয়ামত খাঁ এ খেয়াল গান নবরূপে সমৃদ্ধ করেন। ফলে খেয়ালের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। তিনি খেয়ালে বিভিন্ন ধরনের বিস্তার, বোলতান ইত্যাদি সংযোজন করে নতুনরূপে খেয়ালের গান করতেন। খেয়াল গানকে প্রচলিত করার নেপথ্য কাহিনী হিসেবে প্রচলিত আছে যে, নিয়ামত খাঁ ছিলেন মূলত বীণাবাদক। তিনি মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহর দরবারে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মোগল দরবারের প্রথামাফিক গায়কদের সঙ্গে অনুসঙ্গ যন্ত্রী হিসেবে বীণা বাজাতেন। শিল্পী হিসেবে এ কাজটা তার মনঃপূত ছিল না। তিনি এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সঙ্গীতের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং রাজদরবার থেকে ছুটি নিয়ে ‘খেয়াল’ গানের সাধনায় একনিষ্ঠভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি দুটি কাওয়াল বালককে তার গবেষণালব্ধ খেয়াল গানে পারদর্শী করে তোলেন। বালকদ্বয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেয়াল পরিবেশন করে বিশেষ সুনাম অর্জন করে। তাদের সুখ্যাতির কথা অচিরেই মোগল দরবারে পৌঁছে। মোগল সম্রাট বালক-শিল্পীদ্বয়কে দরবারে খেয়াল পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। নতুন পদ্ধতিতে পরিবেশিত খেয়াল গান শুনে সম্রাট অভিভূত হয়ে পড়েন এবং বালক দু’জনকে রাজদরবারে নিয়োগ করেন। অনতিকালের মধ্যেই তিনি জানতে পারলেন, বালক দুটির গুরু নিয়ামত খাঁ। তার কাছে তালিম নিয়েই বালকদ্বয় সুখ্যাতি অর্জন করেছে। নিয়ামত খাঁ নতুন পদ্ধতির এ খেয়াল গানের উদ্ভাবক। তিনি নিয়ামত খাঁকে আমন্ত্রণ করে এনে রাজদরবারে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ গদান করেন। নিয়ামত খাঁ সম্রাটের আহ্বানে রাজদরবারে যোগ দেন। সঙ্গীত-প্রেমিক সম্রাট নেয়ামত খাঁর নতুন রীতির খেয়াল গান শুনে এত মুগ্ধ হন যে, তাকে ‘শাহ’ উপাদিতে ভূষিত করেন। বিশিষ্ট সঙ্গীত শাস্ত্রকার ও গোস্বামী লিখেছেন, তানসেন ও মিশ্রী সিং (নবাৎ খাঁ) ছাড়া এর আগে আরও কোনো সঙ্গীতজ্ঞ এ দুর্লভ উপাধিতে ভূষিত হননি। নিয়ামত খাঁর শিষ্য কাওয়াল বালকের দু’জনের পরিচয় সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ড. করুণাময় গোস্বামী লিখেছেন, পূর্বে প্রচলিত মত এই যে, কাওয়াল বালকদ্বয় গোলাম রসুল ও মিঞা জানী। গোলাম রসুল (১৭০০-১৭৭০) ছিলেন দিকপাল খেয়ালগুণী। লখনৌয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। ... গোলাম রসুলের পুত্র টপ্পা গানের প্রচলয়িতা গোলাম নবী ওরফে শৌরী মিঞা। ... অপর কাওয়াল বালক বলে কথিত মিঞা জানীও গোলাম রসুলের সমকালে লখনৌয়ে বিখ্যাত খেয়ালগুণীরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু কাওয়াল বালকদ্বয় যে গোলাম রসুল ও মিঞা জানী নন এ কথাই বর্তমানে অধিকতর গৃহীত। সেই বালকদের শনাক্ত করা হয় বাহাদুর ও দুলহে বলে। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে বাহাদুর-দুলহে বিশিষ্ট খেয়াল গায়করূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং তারা একটি খেয়াল গীতিধারা সৃষ্টিতে সক্ষম হন বলে জানা যায়। খেয়াল গানের আধুনিক রূপায়ণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় নিয়ামত খাঁর সঙ্গীত জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়। নিয়ামত খাঁ ছিলেন তানসেনের কন্যাবংশীয় একজন সুবিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। খেয়াল গানের অসামান্য রূপান্তরের কৃতিত্বের জন্য মোগল-সম্রাট মুহাম্মদ শাহ্ তাকে ‘সদারঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বীণাবাদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করার ফলে তিনি বীণাবাদনে পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরে তিনি খেয়াল গানের আমূল পরিবর্তন সাধন করে খেয়াল গানের আধুনিক রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। খেয়াল গানের সঙ্গে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সদারঙ্গের খেয়াল আজও সদারঙ্গের খেয়াল নামেই পরিচিত। খেয়াল এখনও নতুনত্ব-সন্ধানী সঙ্গীতরীতি, শুধু ক্লাসিক বা পুরাতনরীতি সর্বস্ব নয়। সদারঙ্গ মোগল-সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আনুমানিক ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম-সময়ের তথ্য তার রচিত একটি গানে পাওয়া যায় : আবন কহ গয়ে অগম ভঈলওয়া উনকো, ভুজ ফরকত হৈ অঁখি মোরীবাঈ। সগুন বিচারো রেখোরে বখনা বেগ মিলনবা হোয় সদারঙ্গীলে ‘আলমগীর’ সাঈ॥ নিয়ামত খাঁ বা ন্যামৎ খাঁর পিতার নাম লাল খাঁ সানী। তার পিতামহের নাম খুশহাল খাঁ। খুশহাল খাঁ বিলাস খাঁর জামাতা। বংশপরম্পরায় তারা সঙ্গীতজ্ঞ। সদারঙ্গ দিল্লির মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র রাজত্বকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সদারঙ্গ ছিলেন একজন কুশলী বীণকার, গায়ক ও গীতিকার। তিনি একদিকে যেমন অজস্র খেয়াল রচনা করেছেন, তেমনি আবার বহু ধ্র“পদ ও ধামারও রচনা করেছেন। সদারঙ্গ রচিত ধ্র“পদ, ধামার ও খেয়ালগুলো কাব্যের দিক দিয়ে খুবই রসোত্তীর্ণ ছিল। তার রচিত গানের মধ্যে ধামার ও খেয়াল গানের আধিক্যই বেশি। তিনি সরগম ও তেলানা দিয়েও ধ্র“পদাঙ্গের গান রচনা করেছেন। তবে খেয়াল গানের আধুনিক রচয়িতা ও প্রবর্তক হিসেবেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ। তার রচিত খেয়াল সম্পর্কে বলা চলে, ‘বিলাস স্রোতে ভাসমান বাদশাহ্রা যখন চটুলতার সঙ্গে মিশ্রিত করে এমন এক অপরূপ বস্তু সৃষ্টি করলেন, যা তরলতাকে দ্রবীভূত করে অন্তত ক্ষণিকের জন্যও জীবন সম্বন্ধে একটা মূল্যবোধ এনে দিতে সমর্থ হয়েছিল। সেই অপরূপ বস্তু হল কলাবন্তী খেয়াল। বাদশাহ্ মুহম্মদ শাহ্র দরবারে নিয়ামত খাঁ নামে তিনি রবাবী ও বীণকার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘সদারঙ্গ’ নামে খেয়াল রচনা করেন। মাঝখানে তিনি দরবার ছেড়ে চলে যান এবং খেয়াল গানে পারদর্শিতা লাভ করেন। দু’জন কাওয়াল বালককে তালিম দিয়ে খেয়াল গানে নতুনত্ব এনে জনপ্রিয় করেন এবং সম্রাট মুহম্মদ শাহ্কে খেয়াল গানে মুগ্ধ করে আবার রাজদরবারে ফিরে আসেন। সম্রাট তাকে ‘শাহ সদারঙ্গ’ সম্মানে ভূষিত করেন। সদারঙ্গের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলেই কণ্ঠসঙ্গীতে খেয়ালের স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সদারঙ্গ খেয়াল গানে যুগান্তর এনে দিয়েছিলেন। তিনি খেয়াল গানের স্থায়ী ও অন্তরার মধ্যে প্রতি গানে এক একটি বিশেষ ভাবকে কেন্দ্র করেছেন। ফলে সে গান হয়ে উঠেছে মোহনীয়। সহজ মানবিক-প্রেম, নায়ক-নায়িকার ভাব অবলম্বন করেই তিনি গান রচনা করেছেন। তিনি গানে এনেছেন সংক্ষিপ্ত ও সহজ ঋতু বর্ণনা, মানসিক গুণবর্ণনা, কোথাও একটুখানি জীবনচিত্র, আবার কোথাও ভক্তি ভাব। বাণী গানের সুরকে কোথাও ভারাক্রান্ত করেনি। সদারঙ্গ খেয়ালকে শুধু বিশিষ্ট রূপদানই করেননি, এমন একটি ভাষা ও কার্যকরী রীতি সৃষ্টি করেছেন যার দরুন আজও অভিজাত খেয়াল-সদারঙ্গী খেয়াল এ দুই দিক থেকে বিশিষ্ট। সদারঙ্গের খেয়ালে ভাষা খেয়াল-আঙ্গিকের বিশিষ্ট ফর্মরূপে ব্যবহৃত। পরবর্তী খেয়াল রচয়িতারা এ বিশিষ্ট ফর্মেই গান রচনা করেছেন। তিনি ব্রজভাষা, লখনৌর ভাষা ও পাঞ্জাবি ভাষাতে দক্ষ ছিলেন বলে তার কবিতায় এ ভাষা ইচ্ছামতেি ব্যবহার করতে তার কিছুমাত্র অসুবিধা হতো না। হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে যেসব দিকপাল, সঙ্গীতজ্ঞ নিজের উদ্ভাবিত রীতিপদ্ধতি সংযোজন ঘটিয়ে সঙ্গীতের উৎকর্ষ সাধন করে গেছেন তাদের মধ্যে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গ অন্যতম। খেয়াল রীতির গান উদ্ভাবন করেও কয়েক শতাব্দী আগে আমীর খসরু ও হুসেন শাহ্ শর্কী যে কাজ অসমাপ্ত রেখে গিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রূপদান করে সদারঙ্গ তাকে যুগ-যুগান্তরের অমূল্য সম্পদে পরিণত করে দিয়ে গেছেন। খেয়াল গানের বিকাশের ক্ষেত্রে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে। সদারঙ্গ রচিত খেয়াল গানে সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার কারণ হয়তো, তিনি মুহম্মদ শাহ্র দরবারের সঙ্গীতজ্ঞ এবং বাদশাহ্র প্রিয়পাত্র হওয়ার নিদর্শনস্বরূপ তার রচনায় মুহম্মদ শাহ্র নাম উল্লেখ করেছেন। নিয়ামত খাঁ তার রচিত গানে ভণিতা হিসেবে ‘সদারঙ্গীলে’ ব্যবহার করতেন। সদারঙ্গ ধ্র“পদ, ধামার ও খেয়াল গান রচনা ছাড়াও বীণাবাদ্যের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিলেন এবং এতে কণ্ঠসঙ্গীতের অনুরূপ আলাপচারীর প্রবর্তন করেছিলেন। সদারঙ্গের বহুমুখী অবদান সঙ্গীত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। সর্বোপরি খেয়ালের আধুনিক গীত রূপের উদ্ভাবন ও তার প্রতিষ্ঠার মাঝেই সদারঙ্গের সর্বোচ্চ সঙ্গীতগৌরব নিহিত।
‘যবন’ মানে গ্রিস জাতি। অভিধানে যবনের অর্থ নির্ধারিত হয়ে আছে দীর্ঘকাল থেকে। যবন যদি গ্রিস জাতির নাম হয়, তাহলেও তো অন্য কোনো জাতিকে সে নামে ডাকার অবকাশ নেই। যদি ডাকা হয় তাহলে তাতে হীনম্মন্যতারই কেবল পরিচয় বহন করে। রামপ্রসাদ রায় রচিত ‘সঙ্গীত জিজ্ঞাসা’ সঙ্গীত-গ্রন্থখানা পড়ে এ ধরনের একটা বিভ্রান্তিকর তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রিস জাতিকে মুসলিম জাতিতে পরিণত করে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে যেন তিনি অস্বীকার করতে চেয়েছেন। ‘হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীতে যবন-সংস্কৃতির প্রভাব’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এককালে যবন বলিতে একমাত্র গ্রিকদিগকেই বুঝাইত। সঙ্গীতে যবন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যবন শব্দটি সংকীর্ণ অর্থে প্রধানত মুসলমান সম্প্রদায়কেই বুঝায়।’ এটাকে অনায়াসে সত্যের অপলাপ বলে আখ্যায়িত করা যায়। কেননা, মুসলমানদের আগমন ভারতবর্ষে না ঘটলে রাগসঙ্গীতের আবির্ভাবই ঘটত না। যে জাতি রাগসঙ্গীত সৃষ্টি করে সমগ্র ভারতবর্ষের সঙ্গীতকে আকণ্ঠ সমৃদ্ধ করেছে তাদের সংকীর্ণ অভিধায় অভিহিত করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে, তা কিছুতেই স্বীকার করা যায় না। এ কথা অবশ্য সত্য, ভারতবর্ষের সঙ্গীতে মিসর, গ্রিস, আরব, পারস্য প্রভৃতি দেশের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে আমীর খসরুর রাগসঙ্গীত সৃষ্টির পর, তার আগে নয়। রামপ্রসাদ রায় সে কথা নিজেই স্বীকার করে লিখেছেন, “... যেসব ব্যক্তির অবদান ভারতীয় সঙ্গীতের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করিয়াছে তাহাদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য নাম হইল অসামান্য শ্র“তিধর, সঙ্গীত স্রষ্টা আমীর খসরু। তিন প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় সঙ্গীতের সহিত পারস্য দেশীয় সঙ্গীতের সুসামঞ্জস্য সংমিশ্রণ করে ভারতীয় সঙ্গীত ধারাকে মাধুর্যমণ্ডিত করিবার কাজে পথপ্রদর্শক। বর্তমানের হিন্দুস্তানি সঙ্গীতপদ্ধতি আমীর খসরুর নিকট সীমাহীন ঋণে আবদ্ধ। ভারতীয় ধ্র“পদ গানের সহিত পারস্য দেশের গজল গানের সংমিশ্রণ ঘটাইয়া ‘খেয়াল’ গান প্রবর্তনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাহারই।”
<a href='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/ck.php?n=acd94d5f' target='_blank'><img src='http://platinum.ritsads.com/ads/server/adserve/www/delivery/avw.php?zoneid=780&n=acd94d5f' border='0' alt='' /></a>
খেয়াল গান ও খেয়াল গানের প্রকৃত রূপকারের কথা বলতে গিয়েই অত কথার অবতারণা। তার আগে খেয়াল গানের কিছু কথা। ফার্সি ভাষায় ‘খেয়াল’ অর্থ ‘কল্পনা’। নানাবিধ তান-বিস্তার ইত্যাদির দ্বারা বিভিন্ন তালে রাগ গানকে বলা হয় খেয়াল। বলা যায় সুরের ‘বিহার’ খেয়াল গানের মূল বৈশিষ্ট্য। খেয়াল গানের বিষয়বস্তু প্রধানত শৃঙ্গার রসাত্মক, তবে সঙ্গীতের শিল্প-সৌন্দর্যের মাধ্যমে এর প্রকাশ। আমীর খসরু খেয়ালের আবিষ্কর্তা। তবে তিনি সৃষ্টি করেন ‘ছোট খেয়াল’ (Slow kheyal)। এ প্রকার খেয়ালের গতি চপল। রচনা খুব সংক্ষিপ্ত। স্থায়ী ও অন্তরাতে এ গান সীমাবদ্ধ। স্থায়ী ও অন্তরা দুটিই দু’চরণে রচিত হয়। পরবর্তীকালে জৌনপুরের সুলতান হুসেন শাহ্ শর্কী আরেক ধরনের খেয়াল প্রচলন করেন, যার নাম ‘বড় খেয়াল’ (ঝষড়ি শযবুধষ)। এ ধরনের খেয়ালের গতি বিলম্বিত। চাল গম্ভীর। মন্থরগতিতে এর বিস্তার। এ গানের রচনাপদ্ধতি ছোট খেয়ালের মতোই। স্থায়ী ও অন্তরার মাধ্যমেই এ খেয়াল পরিবেশিত হয়। অষ্টাদশ শতকে মোগল-সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র আমলে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ নিয়ামত খাঁ এ খেয়াল গান নবরূপে সমৃদ্ধ করেন। ফলে খেয়ালের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। তিনি খেয়ালে বিভিন্ন ধরনের বিস্তার, বোলতান ইত্যাদি সংযোজন করে নতুনরূপে খেয়ালের গান করতেন।খেয়াল গানকে প্রচলিত করার নেপথ্য কাহিনী হিসেবে প্রচলিত আছে যে, নিয়ামত খাঁ ছিলেন মূলত বীণাবাদক। তিনি মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহর দরবারে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মোগল দরবারের প্রথামাফিক গায়কদের সঙ্গে অনুসঙ্গ যন্ত্রী হিসেবে বীণা বাজাতেন। শিল্পী হিসেবে এ কাজটা তার মনঃপূত ছিল না। তিনি এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সঙ্গীতের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং রাজদরবার থেকে ছুটি নিয়ে ‘খেয়াল’ গানের সাধনায় একনিষ্ঠভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি দুটি কাওয়াল বালককে তার গবেষণালব্ধ খেয়াল গানে পারদর্শী করে তোলেন। বালকদ্বয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেয়াল পরিবেশন করে বিশেষ সুনাম অর্জন করে।তাদের সুখ্যাতির কথা অচিরেই মোগল দরবারে পৌঁছে। মোগল সম্রাট বালক-শিল্পীদ্বয়কে দরবারে খেয়াল পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। নতুন পদ্ধতিতে পরিবেশিত খেয়াল গান শুনে সম্রাট অভিভূত হয়ে পড়েন এবং বালক দু’জনকে রাজদরবারে নিয়োগ করেন। অনতিকালের মধ্যেই তিনি জানতে পারলেন, বালক দুটির গুরু নিয়ামত খাঁ। তার কাছে তালিম নিয়েই বালকদ্বয় সুখ্যাতি অর্জন করেছে। নিয়ামত খাঁ নতুন পদ্ধতির এ খেয়াল গানের উদ্ভাবক। তিনি নিয়ামত খাঁকে আমন্ত্রণ করে এনে রাজদরবারে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ গদান করেন। নিয়ামত খাঁ সম্রাটের আহ্বানে রাজদরবারে যোগ দেন। সঙ্গীত-প্রেমিক সম্রাট নেয়ামত খাঁর নতুন রীতির খেয়াল গান শুনে এত মুগ্ধ হন যে, তাকে ‘শাহ’ উপাদিতে ভূষিত করেন। বিশিষ্ট সঙ্গীত শাস্ত্রকার ও গোস্বামী লিখেছেন, তানসেন ও মিশ্রী সিং (নবাৎ খাঁ) ছাড়া এর আগে আরও কোনো সঙ্গীতজ্ঞ এ দুর্লভ উপাধিতে ভূষিত হননি।নিয়ামত খাঁর শিষ্য কাওয়াল বালকের দু’জনের পরিচয় সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ড. করুণাময় গোস্বামী লিখেছেন, পূর্বে প্রচলিত মত এই যে, কাওয়াল বালকদ্বয় গোলাম রসুল ও মিঞা জানী। গোলাম রসুল (১৭০০-১৭৭০) ছিলেন দিকপাল খেয়ালগুণী। লখনৌয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। ... গোলাম রসুলের পুত্র টপ্পা গানের প্রচলয়িতা গোলাম নবী ওরফে শৌরী মিঞা। ... অপর কাওয়াল বালক বলে কথিত মিঞা জানীও গোলাম রসুলের সমকালে লখনৌয়ে বিখ্যাত খেয়ালগুণীরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু কাওয়াল বালকদ্বয় যে গোলাম রসুল ও মিঞা জানী নন এ কথাই বর্তমানে অধিকতর গৃহীত। সেই বালকদের শনাক্ত করা হয় বাহাদুর ও দুলহে বলে। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে বাহাদুর-দুলহে বিশিষ্ট খেয়াল গায়করূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং তারা একটি খেয়াল গীতিধারা সৃষ্টিতে সক্ষম হন বলে জানা যায়।খেয়াল গানের আধুনিক রূপায়ণের মধ্য দিয়েই শুরু হয় নিয়ামত খাঁর সঙ্গীত জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়।নিয়ামত খাঁ ছিলেন তানসেনের কন্যাবংশীয় একজন সুবিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। খেয়াল গানের অসামান্য রূপান্তরের কৃতিত্বের জন্য মোগল-সম্রাট মুহাম্মদ শাহ্ তাকে ‘সদারঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বীণাবাদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করার ফলে তিনি বীণাবাদনে পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরে তিনি খেয়াল গানের আমূল পরিবর্তন সাধন করে খেয়াল গানের আধুনিক রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।খেয়াল গানের সঙ্গে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সদারঙ্গের খেয়াল আজও সদারঙ্গের খেয়াল নামেই পরিচিত। খেয়াল এখনও নতুনত্ব-সন্ধানী সঙ্গীতরীতি, শুধু ক্লাসিক বা পুরাতনরীতি সর্বস্ব নয়।সদারঙ্গ মোগল-সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে আনুমানিক ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম-সময়ের তথ্য তার রচিত একটি গানে পাওয়া যায় :আবন কহ গয়ে অগম ভঈলওয়াউনকো, ভুজ ফরকত হৈ অঁখি মোরীবাঈ।সগুন বিচারো রেখোরে বখনাবেগ মিলনবা হোয় সদারঙ্গীলে ‘আলমগীর’ সাঈ॥নিয়ামত খাঁ বা ন্যামৎ খাঁর পিতার নাম লাল খাঁ সানী। তার পিতামহের নাম খুশহাল খাঁ। খুশহাল খাঁ বিলাস খাঁর জামাতা। বংশপরম্পরায় তারা সঙ্গীতজ্ঞ। সদারঙ্গ দিল্লির মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র রাজত্বকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সদারঙ্গ ছিলেন একজন কুশলী বীণকার, গায়ক ও গীতিকার। তিনি একদিকে যেমন অজস্র খেয়াল রচনা করেছেন, তেমনি আবার বহু ধ্র“পদ ও ধামারও রচনা করেছেন। সদারঙ্গ রচিত ধ্র“পদ, ধামার ও খেয়ালগুলো কাব্যের দিক দিয়ে খুবই রসোত্তীর্ণ ছিল। তার রচিত গানের মধ্যে ধামার ও খেয়াল গানের আধিক্যই বেশি। তিনি সরগম ও তেলানা দিয়েও ধ্র“পদাঙ্গের গান রচনা করেছেন। তবে খেয়াল গানের আধুনিক রচয়িতা ও প্রবর্তক হিসেবেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ। তার রচিত খেয়াল সম্পর্কে বলা চলে, ‘বিলাস স্রোতে ভাসমান বাদশাহ্রা যখন চটুলতার সঙ্গে মিশ্রিত করে এমন এক অপরূপ বস্তু সৃষ্টি করলেন, যা তরলতাকে দ্রবীভূত করে অন্তত ক্ষণিকের জন্যও জীবন সম্বন্ধে একটা মূল্যবোধ এনে দিতে সমর্থ হয়েছিল। সেই অপরূপ বস্তু হল কলাবন্তী খেয়াল।বাদশাহ্ মুহম্মদ শাহ্র দরবারে নিয়ামত খাঁ নামে তিনি রবাবী ও বীণকার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘সদারঙ্গ’ নামে খেয়াল রচনা করেন। মাঝখানে তিনি দরবার ছেড়ে চলে যান এবং খেয়াল গানে পারদর্শিতা লাভ করেন। দু’জন কাওয়াল বালককে তালিম দিয়ে খেয়াল গানে নতুনত্ব এনে জনপ্রিয় করেন এবং সম্রাট মুহম্মদ শাহ্কে খেয়াল গানে মুগ্ধ করে আবার রাজদরবারে ফিরে আসেন। সম্রাট তাকে ‘শাহ সদারঙ্গ’ সম্মানে ভূষিত করেন। সদারঙ্গের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলেই কণ্ঠসঙ্গীতে খেয়ালের স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।সদারঙ্গ খেয়াল গানে যুগান্তর এনে দিয়েছিলেন। তিনি খেয়াল গানের স্থায়ী ও অন্তরার মধ্যে প্রতি গানে এক একটি বিশেষ ভাবকে কেন্দ্র করেছেন। ফলে সে গান হয়ে উঠেছে মোহনীয়। সহজ মানবিক-প্রেম, নায়ক-নায়িকার ভাব অবলম্বন করেই তিনি গান রচনা করেছেন। তিনি গানে এনেছেন সংক্ষিপ্ত ও সহজ ঋতু বর্ণনা, মানসিক গুণবর্ণনা, কোথাও একটুখানি জীবনচিত্র, আবার কোথাও ভক্তি ভাব। বাণী গানের সুরকে কোথাও ভারাক্রান্ত করেনি। সদারঙ্গ খেয়ালকে শুধু বিশিষ্ট রূপদানই করেননি, এমন একটি ভাষা ও কার্যকরী রীতি সৃষ্টি করেছেন যার দরুন আজও অভিজাত খেয়াল-সদারঙ্গী খেয়াল এ দুই দিক থেকে বিশিষ্ট। সদারঙ্গের খেয়ালে ভাষা খেয়াল-আঙ্গিকের বিশিষ্ট ফর্মরূপে ব্যবহৃত। পরবর্তী খেয়াল রচয়িতারা এ বিশিষ্ট ফর্মেই গান রচনা করেছেন। তিনি ব্রজভাষা, লখনৌর ভাষা ও পাঞ্জাবি ভাষাতে দক্ষ ছিলেন বলে তার কবিতায় এ ভাষা ইচ্ছামতেি ব্যবহার করতে তার কিছুমাত্র অসুবিধা হতো না।হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে যেসব দিকপাল, সঙ্গীতজ্ঞ নিজের উদ্ভাবিত রীতিপদ্ধতি সংযোজন ঘটিয়ে সঙ্গীতের উৎকর্ষ সাধন করে গেছেন তাদের মধ্যে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গ অন্যতম। খেয়াল রীতির গান উদ্ভাবন করেও কয়েক শতাব্দী আগে আমীর খসরু ও হুসেন শাহ্ শর্কী যে কাজ অসমাপ্ত রেখে গিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রূপদান করে সদারঙ্গ তাকে যুগ-যুগান্তরের অমূল্য সম্পদে পরিণত করে দিয়ে গেছেন। খেয়াল গানের বিকাশের ক্ষেত্রে নিয়ামত খাঁ সদারঙ্গের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে।সদারঙ্গ রচিত খেয়াল গানে সম্রাট মুহম্মদ শাহ্র নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার কারণ হয়তো, তিনি মুহম্মদ শাহ্র দরবারের সঙ্গীতজ্ঞ এবং বাদশাহ্র প্রিয়পাত্র হওয়ার নিদর্শনস্বরূপ তার রচনায় মুহম্মদ শাহ্র নাম উল্লেখ করেছেন। নিয়ামত খাঁ তার রচিত গানে ভণিতা হিসেবে ‘সদারঙ্গীলে’ ব্যবহার করতেন।সদারঙ্গ ধ্র“পদ, ধামার ও খেয়াল গান রচনা ছাড়াও বীণাবাদ্যের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিলেন এবং এতে কণ্ঠসঙ্গীতের অনুরূপ আলাপচারীর প্রবর্তন করেছিলেন।সদারঙ্গের বহুমুখী অবদান সঙ্গীত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। সর্বোপরি খেয়ালের আধুনিক গীত রূপের উদ্ভাবন ও তার প্রতিষ্ঠার মাঝেই সদারঙ্গের সর্বোচ্চ সঙ্গীতগৌরব নিহিত। - See more at: http://www.jugantor.com/literature-magazine/2014/02/28/73229#sthash.y2Shbdcy.dpuf

ফজল আমার আত্মার আত্মীয় by আল মাহমুদ

ফজলের মৃত্যু আমার বুকে একটি আঘাতজনিত ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। মনে হচ্ছে আমার বুকের পাঁজর ভেঙে গেছে। আমি বেদনাহত ভারাক্রান্ত। তার সঙ্গে কত স্মৃতি। আমরা কাছাকাছি বয়সের। আমাদের চেয়ে একটু বড় ছিলেন শামসুর রাহমান, তারপর ফজল, আমি ও শহীদ কাদরী। আমাদের আড্ডা হতো বিউটি বোর্ডিংয়ে। সেখানে কবিরা আসতেন। আসতেন সাংস্কৃতিক জগতের মানুষেরা। আসতেন লেখক এবং বোদ্ধা পাঠকেরা। আড্ডা চলত দীর্ঘ সময় ধরে। ফজল ছিলেন সে আড্ডার প্রাণ।
ফজল যখন পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন তখনও সে অফিসে আমাদের আড্ডা হতো। দৈনিক বাংলার উল্টোদিকে হারুন এন্টারপ্রাইজ তো ছিল আমাদের প্রাণভূমি। প্রায় দুপুরে আমাদের খাওয়া হতো। ফজলই ডাক পাঠাতেন। ফজল নেই সেসব স্মৃতি এখন চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমাদের সবাইকে এক দিন চলে যেতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু ফজলের এই চলে যাওয়াটাকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। তিনি আমার চেয়ে সবল ছিলেন। তার বড় কোনো অসুখের কথা কখনও শুনিনি। হঠাৎ ব্রেনস্ট্রোক তারপর অল্পদিনের মধ্যেই মৃত্যু- এ সত্যিই যেন এক অসম্ভব ঘটনা, যা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
ফজল ছিল আমাদের আত্মার আত্মীয়। তার মৃত্যু আমাকে আত্মাহীন আত্মীয়হীন করেছে। অনেক দিন হৃদয়ে এমন তীব্র বেদনাবোধ করিনি। ফজলের লিরিকধর্মী কবিতার বই হে নীল সমুদ্র হে বৃক্ষ সবুজ-এর শেষে বইটি নিয়ে আমার একটি ছোট্ট লেখা ছাপা হয়েছিল। লেখাটিতে আমি লিখেছিলাম-
একজন কবি নিজেকে আবিষ্কার করেন অকস্মাৎ দৈবভাবে। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে ফেটে বেরোয় এমন একটা আঙ্গিকরীতি, যাতে হৃদয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ফজল শাহাবুদ্দীনের বর্তমান ক্ষুদ্র কবিতার বই হে নীল সমুদ্র হে বক্ষ সবুজ পাঠ করে আমার মনে হল এ এক আশ্চর্য স্ফুরণ, কবি হৃদয়ের এক সময়োচিত আবিষ্কার কিংবা আন্তরিক উৎসার। ফজলের কবিতা যে এমন আধ্যাত্মিক বিষয়ের সঙ্গে লগ্ন হবে তা কবিতার পাঠক হিসেবে আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমি ফজল শাহাবুদ্দীনকে এক নির্বিরোধ গভীর প্রেমের কবি হিসেবেই জেনে এসেছি এমনকি প্রকৃতির কবি হিসেবেও। এখন দেখছি তার কবিতায় আছে অন্য এক গূঢ় রহস্য, যা আমাদের কবিতার জন্য একান্ত দরকার। আকস্মিক চিত্রকল্প বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুভব যে এমন দীর্ঘস্থায়ী কল্পনাসঞ্চারী হতে পারে কবির এই টুকরো কবিতাগুলো আস্বাদন না করলে আমি হয়তো সে সম্বন্ধে অজ্ঞই থেকে যেতাম। এ দিক দিয়ে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন অনেকেরই চোখ খুলে দিতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি।
তার এই ক্ষুদ্র কবিতাগুলোতে রয়েছে এক ধরনের গভীর ভাবব্যঞ্জনা, যা পাঠককে একজন দ্রষ্টার দার্শনিক উপলব্ধির কাছে নিয়ে যায়। যেন কাম প্রেম ও প্রকৃতির পর্দাকে ভেদ করতে গিয়ে কবি অন্য এক সত্যকে উদঘাটন করে দিচ্ছেন। যার নাম দিতে পারি আমরা আস্থা বা বিশ্বাস।
ফজলের কবিতার এই মোড় পরিবর্তন সামগ্রিক বিচারে আধুনিক বাংলা কবিতারই অনাস্বাদিত এক দিগন্তে উপনীত হওয়া। এ অভিজ্ঞতা সমকালীন কবি মাত্রকেই প্রভাবিত করবে। অন্তত আমি তো অভিভূত হয়েছি।
আমার স্মৃতি আর আগের মতো কাজ করে না। আমি ফজলের কবিতা নিয়ে অনেক কিছু লিখতে পারতাম কিন্তু বয়স আমাকে নিরুৎসাহিত করল তাই বাধ্য হয়ে পুরনো লেখার উদ্ধৃতি দিতে হল।
কবি খ্যাতি নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব আমাদের মধ্যে ছিল না, তবে একটু প্রতিযোগিতা একটু ঈর্ষা তো ছিলই কিন্তু তা কখনও আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারেনি। মাঝে মধ্যে মান-অভিমান হতো তবে তা সাময়িক। ক্ষণিক পরেই সে মেঘ কেটে যেত। ফজলের মতো বন্ধু বৎসল মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। আমি নিজেও আড্ডা পছন্দ করি কিন্তু ফজলের মতো আড্ডাপ্রিয় মানুষ এ সমাজে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমি ফজলকে ভালোবাসতাম তার হৃদয় খোলা আচরণের জন্য। তার পছন্দ অপছন্দকে সে ঢেকে রাখতে পারত না এতে করে অনেকেই তার ওপর রাগ হতো কিন্তু আমরা যারা তাকে চিনেছি তারা তার হৃদয়কে বুঝতাম আর বুঝতাম বলেই তার কথায় কখনও কিছু মনে করতাম না।
ফজলের এবারের অসুস্থতার সংবাদটি আমি জানতে পারি কবি শাহীন রেজার কাছ থেকে। সে আমার এবং ফজলের দুজনেরই খুব প্রিয় পাত্র। শুনে খুব খারাপ লেগেছিল। শাহীনকে বলেছিলাম আমি ফজলকে দেখতে যাব। কিন্তু আমিওতো শারীরিকভাবে সুস্থ নই, তাই যেতে পারিনি। ৪ ফেব্র“য়ারি ফজলের জন্মদিনে শাহীন এসেছিল সঙ্গে কামরুজ্জামান, কিন্তু সেদিন আমার শরীর ছিল ভয়ানক রকম খারাপ। বিছানা থেকেই উঠতে পারছিলাম না। ওরা আমার অবস্থা দেখে আমাকে না নিয়েই ফিরে গেল। আজ খুব আফসোস হচ্ছে। যদি সেদিন শরীরটা বেশি রকম খারাপ না হতো তাহলে ফজলকে অন্তত শেষ দেখাটা দেখতে পারতাম।
আগেই বলেছি ফজল চলে গিয়ে আমাকে আরও একা করে দিয়ে গেলেন। ফজলের মৃত্যুতে শুধু আমারই ক্ষতি হল না, ক্ষতি হল বাংলার কবিতারও। ফজল তার লেখার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকুন অনন্তকাল।

আমাদের আসবাব ছিল রাশি রাশি বই by বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

আমার মধ্যবিত্ত শিক্ষক পিতা আমাদের জন্য উপহার দিয়েছিলেন রাশি রাশি বই। আসবাবহীন গৃহে আমাদের আসবাব ছিল বই ও পত্রিকা। আমরা ভাইবোনেরা, বাইরে থেকে গৃহে ফিরলে হুমড়ি খেয়ে পড়তাম বইয়ের ওপর। বইয়ের মধ্যে জীবন যাপন করার দরুন বই-ই আমাদের সম্বল এই বোধ আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। বই ছাড়া থাকতে পারি না, বইহীন ঘরে ঢুকলে অস্বস্তি হয়। আমার ছাতাছত্র শেষ পর্যন্ত বই। বড় হয়েছি এমন এক শহরে যা-কিনা গ্রামের মৌচাক। দুটো রাস্তা পার হলেই গ্রামের বসতে পৌঁছানো যায়, আর বসতের চারপাশ ঘিরে একই নদীর তিন লহর ভূকৈলাশের রাজবাড়ির দিকে নদীর নাম সুগন্ধা, স্টিমার স্টেশনের দিকে নাম বিষখালি, আর শহর ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে গেলে ধানসিঁড়ি। আমাদের সূর্যোদয় হতো নদীর মধ্যে রোদ দেখে, আর সূর্যাস্ত হতো নদীর মধ্যে রঙের গুঞ্জরণ শুনে। বৃষ্টির দিন অফুরন্ত বৃষ্টির মধ্যে নৌকাগুলো কোথায় কোথায় চলে যেত, আর শীতের দিন অবারিত কুয়াশার মধ্যে স্টিমার আসার সিটি শুনে আমরা দৌঁড়াতাম জেটির দিকে। আমাদের ঝালকাঠি ছেড়ে যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু কোথাও যাওয়ার তাড়া আমাদের মধ্যে তাড়াহুড়োর তরপানি তৈরি করত। যেন কোথাও যেতে হবে অফুরন্ত, অনন্ত, অকল্পনীয়র দিকে।
বই এবং নিসর্গ শাদা পিরহানের তরঙ্গের মতো আমাকে ডাক দিত, আমি বইয়ের মধ্যে পথ হারাতাম, আমি নিসর্গের মধ্যে পথ হারাতাম নিজের ঠিকানার খোঁজে। এভাবেই বইয়ের মধ্য দিয়ে নিসর্গে প্রবেশ করেছি আর নিসর্গের মধ্য দিয়ে বইয়ে ফিরে এসেছি। দুই ভুবন হাত ধরাধরি করে আমাদের ঘিরে রেখেছে। নিসর্গ কিংবা বই শেষ পর্যন্ত শান্তি নয়; এই বোধের ধাক্কা কয়েকটি ঘটনার দরুন নিদারুণভাবে আমাকে সজাগ করেছে।
আমার কৈশোর কেটেছে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সময়কালের মধ্যে। আমাদের বাড়িতে দুধ সরবরাহ যিনি করতেন তার পুত্র আজিজ ভাই শহরের ঈর্ষার পাত্র। দীর্ঘদেহী, উজ্জ্বল ছাত্র, পড়া ও ফুটবলে অগ্রগণ্য আজিজ ভাই ভোট শহরে পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আর আমাকে করেছিলেন গ্রন্থাগারিক। দুটো কেরোসিন কাঠের শেলফ ভর্তি বই, একটি পড়ো টিনের বাড়ির পেছন দিকে। পড়োবাড়ির উঠোনে আমরা জাম্বুরা দিয়ে বল খেলতাম আর মধ্যে মধ্যে বই পড়তাম। সংগ্রহের মধ্যে গল্পের বই ছিল : রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্র, আর ছিল ছোট ছোট পুস্তিকা রাজনীতি ও অর্থনীতির। মধ্যে মধ্যে আজিজ ভাই আসতেন জেলা শহর বরিশাল থেকে, আমাদের ডেকে নিয়ে গল্প করতেন। জোর গলায় বলতেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মৃত্যু হবে। ব্রিটিশরা আমাদের দেশকে শাসন ও শোষণ করেছে। আমাদের মান সম্মান নষ্ট করেছে। আমাদের তাই স্বাধীন হতে হবে এবং গড়তে হবে সমাজতন্ত্রী ভবিষ্যৎ। সমাজতন্ত্র শব্দটা বুঝতাম না, ছোটদের অর্থনীতির বই খুলে তিনি বোঝাতেন, আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতো, সন্ধ্যার অন্ধকারে হারিকেন লণ্ঠন জ্বেলে আমরা কয়েকজন আজিজ ভাইয়ের হাত ধরে ভবিষ্যৎ সমাজতন্ত্রের দিকে পা ফেলে ফেলে এগোতাম।
এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, মহাযুদ্ধ, একপক্ষে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, সোভিয়েত রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন, অন্যপক্ষে জার্মানি আর জাপান। জাপান নাকি সমুদ্র পেরিয়ে যে কোনো দিন বরিশাল মুলুকে এসে যাবে। তালগাছগুলোর আগা কেটে কেটে কামান বানানো হল। থানার সামনের মাঠে জেলেদের নৌকা ধরে ধরে এনে গেরেফতার করা হল হোগলা বন পর্যন্ত। জাপানিদের নৌকা ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। আজিজ ভাইয়ের সমাজতন্ত্র পাঠ আর মহাযুদ্ধের পদধ্বনির মধ্যে চালের দাম বাড়তে শুরু করে, বাজার থেকে উধাও হয়, আব্বা শূন্য হাতে চালের আড়ত থেকে একদিন ফিরে আসেন। আগামীকাল ভাত খাওয়া হবে না। এই অবস্থার মধ্যে আমাদের রক্ষা করেন আজিজ ভাইয়ের বাবা, দু’ডোলা চাল দিয়ে যান। এর মধ্যে একদিন সকালবেলা হৈ চৈ শুনে ঘুম ভাঙে, টিন ছাওয়া বারান্দায় এসে দেখি আজিজ ভাইকে কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে যাচ্ছে। দৌড়ে আসি থানায়, লোকজনের ভিড়, আজিজ ভাই বিষণ্ন মুখে বসে আছেন দেয়ালে ঠেস দিয়ে। আমাকে দেখে হাসলেন। পরে আব্বার কাছে শুনি আজিজ ভাই সোসালিস্ট পার্টি করেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি কয়েক জনের সঙ্গে মিলে টেলিগ্রাফের তার কেটেছেন ইংরেজের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় বাধা দেয়ার জন্য। আজিজ ভাইকে জেলা শহরে চালান করা হয়। তার দুধওয়ালা বাবা, আব্বাকে ধরে কাঁদতে লাগলেন, ছেলেকে যেভাবেই হোক ছাড়িয়ে আনতে হবে মাস্টার সাব।
এক সপ্তা পরে জেলা সদর থেকে এক লোক এলেন গোয়েন্দা বিভাগ থেকে। তার মুখটা আমার পছন্দ হল না। তিনি আমাকে জেরা শুরু করলেন পাঠাগার আন্দোলন সম্বন্ধে। পাঠাগারের সদস্যদের তালিকা আমার কাছ থেকে নিলেন। সদস্যদের বয়স জিজ্ঞেস করলেন, বাবাদের জীবিকা জানতে চাইলেন। তিনি আমার সঙ্গে পাঠাগারে এসে বাক্সবন্দি করলেন বইগুলো আর জেলা সদরে চালান দিলেন। লাইব্রেরি বন্ধ হল। আমাদের ‘বাজে’ বইপড়া শেষ হল। স্কুল বন্ধ, কাগজের অভাব; আমার দিন কাটে হোগলার বনে ঘুরে, লাশকাটা সড়কে ঝাউগাছের শনশন শুনে, আর রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র পড়ে। ছিন্নপত্রের নদী বিদীর্ণ করে, হোগলার বনের মধ্যে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা বিদীর্ণ করে, সুগন্ধা-বিষখালি-ধানসিঁড়ির লহর বিদীর্ণ করে আজিজ ভাইয়ের মুখটা মনে হয়, লাশকাটা ঘরে শুয়ে। চারদিকে ঝাউ আর ধান ক্ষেতের শনশন। আর কিছু নেই, কোথাও কিছু নেই।
আস্তে আস্তে টের পাই ছোট্ট এই শহরটার সাধারণ মানুষ মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা এবং সোসালিস্ট পার্টির মধ্যে বিভক্ত। অধিকাংশ মুসলমান মুসলিম লীগে, অধিকাংশ হিন্দু হিন্দু মহাসভায়, অধিকাংশ হিন্দু এবং ছিটেফোঁটা মুসলমান কংগ্রেসে এবং জনাদুই হিন্দু মুসলমান সোসালিস্ট পার্টির অনুরক্ত। চাপা একটা রেষারেষি আছে, মধ্যে মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। দেশটার ভবিষ্যৎ কোথায় বুঝি না। বুঝি কোনো একদিন দেশটা স্বাধীন হবে। স্বাধীন হলে আমি কোথায় যুক্ত হব, এই চিন্তাটা কুয়াশার মতো কখনও কখনও দেখা দেয়, যাদের বই পড়ি রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী তাদের বইয়ের মানুষগুলো সংসারে আছে বুঝি, কিন্তু হাত দিয়ে ছুঁতে পারি না, দূরেই থেকে যায়। এর মধ্যে একদিন একটা বই হাতে এলো, মলাট ছেঁড়া, লেখকের নাম নেই, কেবল বইটার নাম আছে পদ্মা নদীর মাঝি। বইটা পড়ে আচ্ছন্ন হই, কদিন নদীর পাড়ে পাড়ে ঘুরি। যুদ্ধের তাণ্ডবে নৌকা উধাও, নৌকাহীন নদীতে আমি খুঁজি ইলিশ মাছধরা জেলেদের। মানচিত্রে পদ্মা খুঁজে পাই, ঝালকাঠি থেকে পদ্মা বহুদূর। একটা জীবনের মধ্যে প্রবেশ করি, যে জীবনটা মনে হয় চেনাজানা। রবীন্দ্রনাথ পড়তে ভালো লাগে, কিন্তু বইয়ের রবীন্দ্রনাথের আবহাওয়া আমার চারপাশে টের পাই না। তবু জেদি মাছির মতো রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরীর শব্দের মধ্যে ঘুরতে থাকি। শব্দের সঙ্গে শব্দ মিলে শব্দের যে বুনন হয় তার তুলনা হয় না। আমার খিদে বাড়ে, শব্দের খিদে।
মানুষ কিভাবে মুসলমান হয়? কিংবা হিন্দু? মানুষ কিভাবে মুসলিম লীগার হয়? কিংবা কংগ্রেসী হয়? কিংবা সোসালিস্ট হয়? মানুষ এসব হওয়ার মধ্য দিয়ে কিভাবে পরস্পরকে ভালোবাসে? কিংবা ঘৃণা করে? কিংবা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে? এসব প্রশ্নের মধ্যে আমি যখন রক্তাক্ত হচ্ছি, মহাযুদ্ধ থেকে উত্থিত রক্তের গন্ধে যখন চারপাশ সমাচ্ছন্ন, তখন স্কুল লাইব্রেরি থেকে আব্বার সৌজন্য একটা বই হাতে আসে। মোটাসোটা বই, টলস্টয়ের যুদ্ধ ও শান্তি, বাংলা বইয়ের পাশাপাশি, এই বইটি আমি এক মাস ধরে পড়ি। অসংখ্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে কাহিনীর বুনন, একটা অপ্রতিরোধ্য গতিতে চরিত্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে আবর্তিত, প্রতিটি চরিত্রের একটা প্রতি-চরিত্র আছে, ভালো ও মন্দের সঙ্গে, শুভ ও অশুভের সঙ্গে সবাই লিপ্ত, আমিও লিপ্ত হই অর্থের নিয়তির মধ্যে। আমি বুঝতে শুরু করি সাহিত্য মানে অর্থের মধ্যে প্রবেশ করা। এই ঘোরের মধ্যে যখন আমার বসবাস শুরু তখন, হঠাৎ একদিন, ঠিক করি; আমি লেখক হব। ছোট শহরটা একটা মহাদেশ হয়, সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত হয়, আমি তার মধ্যে হাঁটতে শুরু করি। ধুলাবালির মধ্যে, কাদামাটির মধ্যে আমি হাঁটতে থাকি, সে হাঁটার শেষ নেই। আমি সাহিত্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হাঁটছি, কোথাও পৌঁছব বলে।

ইউক্রেন পূর্ব-পশ্চিমের যুদ্ধ ময়দান নয় : যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন

ইউক্রেন পূর্ব ও পশ্চিমের যুদ্ধ ময়দান নয় বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে এ মন্তব্য করেছেন কেরি। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের বিবদমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগের সঙ্গে আলোচনা করেন জন কেরি। এ সময় তিনি এ কথা বলেন। আলোচনায় কেরি ইউক্রেনের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংঘাত ও বিতর্ককে খালি মাঠে গোল খেলা নয় বলে মন্তব্য করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে বৈঠকের পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ দেশ ভাগের আশংকা থাকায় ইউক্রেনের ভূ-খণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। কারণ রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় এমন আশংকা করা হচ্ছে। এ দুই কূটনীতির বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এটি জয়-পরাজয়ের কোনো বিষয় নয়। এটি পূর্ব বনাম পশ্চিমের কোনো যুদ্ধও নয়।’ ‘এটি ইউক্রেনের জনগণ ও সেদেশের নাগরিকদের তাদের ভবিষ্যত বেছে নেয়ার বিষয়।’ হেগ সম গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এটি এমন একটি দেশ যার রাশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, তিনি দ্রুত কিয়েভ সফরের পরিকল্পনা করছেন।
আইসিসি’তে ইয়ানুকোভিচের বিচার
ইউক্রেনের পলাতক প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে ‘মারাত্মক অপরাধের’ অভিযোগে বিচার করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পাঠানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে পার্লামেন্ট। মঙ্গলবার প্রস্তাবটি পার্লামেন্টে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। গত নভেম্বর থেকে ইউক্রেনে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ চলেছে। গত সপ্তাহে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে পাল্টাপাল্টি সংঘাতে অন্তত একশ জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ দাবি করে পলাতক ইয়ানুকোভিচকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে প্রস্তাবনায়।
দাঙ্গা পুলিশ বিলুপ্ত
ইউক্রেনে গত কয়েক মাসের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের হতাহতের ঘটনায় দায়ী করে দেশটির দাঙ্গা পুলিশ বাহিনীকে ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। পুলিশ অভিজাত ইউনিটি ‘বেরকুত’ ভেঙে দেয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন ইউক্রেনের অস্থায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরসেন আভাকোভ। বৃহস্পতিবার আজ এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে ব্রিফিং করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গণহত্যার জন্য পুলিশ ক্ষমাপ্রার্থী
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে তাদের সহকর্মীদের হাতে কেউ প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ বা মার খেয়েছেন। কিয়েভের সাম্প্রতিক সেই হিংসার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে পুলিশ। পশ্চিম ইউক্রেনের এলভিভ শহরে দেখা যায় সেই বিরল দৃশ্য। রাজধানী থেকে দায়িত্ব সেরে ফেরার পরে বারকুট পুলিশ (ইউক্রেনের বিশেষ পুলিশ বাহিনী) ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থকদের মুখোমুখি হন। তাদের দেখেই প্রতিবাদীরা ‘শেম’ ‘শেম’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন। অফিসাররা তাদের শান্ত করেন। বলেন, তারা সরাসরি হত্যা করেননি। তবু এসেছেন ক্ষমা চাইতে। এএফপি, আলজাজিরা।

এবার সিন্ধুরত্নে বিস্ফোরণ!

ফের ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবমেরিনে দুর্ঘটনা। সিন্ধুরক্ষকের পর এবার বিস্ফোরণ সিন্ধুরত্ন। মুম্বাই উপকূলে আইএনএস সিন্ধুরত্ন নামের সাবমেরিনটিতে ছোটখাটো বিস্ফোরণ হয় বলে খবর। তারপরেই সাবমেরিনটি থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। মুম্বাই উপকূলের ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে ভেসে ওঠে ডুবোজাহাজটি।
ধোঁয়ায় জ্ঞান হারান পাঁচজন নাবিক। তাদের হেলিকপ্টারে নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে আইএনএস সিন্ধুরতেœ কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। মেরামতের পর ডুবোজাহাজটিকে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছিল। গত বছর আগস্টেই মুম্বাই বন্দরে বিস্ফোরণের ফলে ডুবে যায় নৌবাহিনীর ডুবোজাহাজ সিন্ধুরক্ষক। মারা যান ১৮ জন নাবিক।

পালিয়ে গেলেন ইংলাক

সরকার বিরোধীদের ওপর উন্মুক্ত গুলির শব্দে বিচলিত থাইল্যান্ড। বুধবার বিরোধীদের লক্ষ্য করে রাস্তায় সহিংসতা, গুলি চালানো হয়েছে। চার মাসের এই সহিংসতায় দেশটিতে ২২ জন মারা গেছে। আহত হয়েছে কয়েকশ’। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা রাজধানী ব্যাংককে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ করে উত্তর থাইল্যান্ডে পালিয়ে গেছেন। বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ করে থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই এর উত্তর সিটিতে ইংলাক হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে গেছেন। এটি তার দলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা সেখানে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত অবস্থান করার কথা ভাবছেন। পুলিশ জানিয়েছে,
অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা বুধবার ব্যাংককের তিনটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করেছে। তবে এতে কেউ আহত হয়নি। পুলিশের মুখপাত্র অনুচা রোমায়ান বলেছেন, কোন অংশে গুলি চালানো হয়েছে আমরা তা জানি না। বন্দুকধারীদের লক্ষ্য ছিল আতংক ছড়ানো। এদিকে বর্ধিত মূল্যে চাল কেনার দুর্নীতির ব্যাপারে আজ বৃহস্পতিবার ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে শুনানিতে উপস্থিত হতে বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তবে ইংলাক হাজির না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্যানেলে উপস্থিত হওয়া নিয়ে এখনও কিছু ভাবিনি। তার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে প্রধানমন্ত্রী থেকে অপসারণ এবং রাজনীতিতে ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে।
‘আমার সন্তানই যেন হয় নিষ্ঠুরতার শেষ দৃষ্টান্ত’
পরিস্থিতি অনেকটা কয়েক মাস আগের বাংলাদেশের মতো। থাইল্যান্ডেও সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে নির্বিচার হামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমনকি শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। এ পর্যন্ত মারা গেছে কমপক্ষে তিনটি শিশু। তায়াকম ইয়োস উবন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘সবার কাছে আমি হাত জোড় করে বলছি, এসব বন্ধ করুন, আমার সন্তানই যেন হয় এমন নিষ্ঠুরতার শেষ দৃষ্টান্ত, থাইল্যান্ডের মাটিতে এমন যেন আর না ঘটে।’ ৩৩ বছর বয়সি তায়াকমের দুটি সন্তান মারা গেছে গ্রেনেড হামলায়? ৪ আর ৫ বছরের দুটি শিশু। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনে অংশ নিতে যায়নি, সরকার সমর্থকদের মিছিলেও ছিল না তারা। খালার সঙ্গে ব্যাংককের একটি মলে গিয়েছিল খাওয়া-দাওয়া করতে।

গুপ্তধনে ধনী

ছোটবেলায় গুপ্তধনের গল্প কে না পড়েছি। পড়তে পড়তে ভেবেছি, আহা যদি আমিও মাটি খুঁড়ে পেয়ে যেতাম রাশি রাশি সোনার মুদ্রা। হয়ে যেতাম রাতারাতি ধনী! কিন্তু গল্প নয়, বাস্তবেই রাশি রাশি স্বর্ণমুদ্রা খুঁজে পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক দম্পতি। আর সেই গুপ্তধন ছিল তাদেরই অধিকারে থাকা জমিতে। ২০১৩ সালে পাওয়া ওই সোনার মুদ্রাগুলোর বর্তমান মূল্য আনুমানিক ১ কোটি মার্কিন ডলার। ১৮৪৭ থেকে ১৮৯৪ সালের মধ্যে তৈরি ১৪২৭টি সোনার মুদ্রা যা কখনও ব্যবহৃত হয়নি এবং একদম নতুন অবস্থায় রয়েছে। অজ্ঞাতনামা ওই দম্পতি ২০১৩ সালের এপ্রিলে হাঁটতে গিয়ে একটি গাছের নিচে ধাবত পাত্রের ভেতর মুদ্রাগুলোর খোঁজ পান।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই সম্ভবত মাটির নিচ থেকে পাওয়া সর্ববৃহৎ গুপ্তধন। ওই দম্পতি ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করেন। স্বর্ণশিকারিদের কাছে ক্যালিফোর্নিয়া সোনাররাজ্য বলে পরিচিত। স্বর্ণমুদ্রাগুলো ওই দম্পতি তাদের অধিকারে থাকা একটি জমিতে খুঁজে পান। তবে কে এই মুদ্রাগুলো পুঁতে রেখে চলে গেছে তা সত্যিই রহস্যজনক। মুদ্রাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর আনুমানিক সাম্প্রতিক মূল্য ২৭ হাজার মার্কিন ডলার হলেও কিছু কিছু বিরল মুদ্রা রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির আনুমানিকমূল্য ধরা হয়েছে ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ওই দম্পতি আমাজনের মাধ্যমে মুদ্রাগুলো বিক্রির পরিকল্পনা করছেন। বিবিসি।