Thursday, January 16, 2020

শর্করা বেশি খাওয়ার আগে ভাবুন by তাহমিনা সুলতানা

আমাদের সারা দিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম উপাদান হচ্ছে শর্করা। ভাত তার প্রধান মাধ্যম। যত কিছুই খাই না কেন ভাত না খেলে ঠিক তৃপ্তি আসে না। একদিন অথবা এক বেলা ভাত না খাবার কথা আমরা চিন্তাই করতে পারি না। প্রতিদিন দুই বেলা, কখনো কখনো তিন বেলাই ভাত খাওয়া হয়।
আবার অনেকেই পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডউইচ ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারেন না। কোল্ড ড্রিংকস পানের কারণে তো পানি পানের প্রয়োজনীয়তা অনেক সময়ই আমরা ভুলে যাই। ভাত, পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডউইচ, কোল্ড ড্রিংকস সবকিছুই শর্করা খাবারের একেক রূপ। অতিরিক্ত শর্করা খাবারের ফলে আমাদের শরীরে কত সমস্যা হচ্ছে তার কিছুই আমরা জানি না।
অতিরিক্ত শর্করা খাবারের জন্য আমাদের শরীরে রক্তশূন্যতা হতে পারে, তা কি আমরা জানি? নিশ্চয়ই খুব অবাক হচ্ছেন। আপনার খাবারে হয়তো আয়রনের ঘাটতি নেই। কিন্তু আপনার খাবার শর্করা দিয়ে ভরপুর। শর্করা জাতীয় খাবারে উচ্চমাত্রায় ফসফেট ও ফাইটিক অ্যাসিড থাকে। শর্করা খাওয়ার পরে খাদ্যনালিতে গিয়ে খাবারে থাকা আয়রনের সঙ্গে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আয়রন ফসফেট এবং ফাইটেট তৈরি করে, যা পানিতে অদ্রবণীয়। এই আয়রন ফসফেট ও ফাইটেট খাদ্যনালি থেকে শোষিত হয়ে রক্তে যেতে পারে না।
আপনি হয়তো আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাচ্ছেন কিংবা আয়রন ঘাটতির জন্য ওষুধ খাচ্ছেন। কিন্তু আপনার খাবারের আয়রন কতটুকু রক্তে যাচ্ছে তা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আপনার খাদ্যতালিকায় শর্করার পরিমাণ কতটুকু বা আপনার খাদ্যাভ্যাস কেমন? কিছু পাওয়া না গেলেও বাংলার মাঠেঘাটে কচুশাক কিন্তু পাওয়াই যায়। এক গামলা ভাত কচুশাক দিয়ে খেয়ে ফেললাম। ভাবলাম আহ! কত আয়রন খেলাম। কিন্তু বুঝতেই পারলাম না, শুধু ভাতের জন্য আমাদের খাবারের আয়রন শোষণ হয়ে রক্তে যেতে পারছে না।
আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য জরুরি উপাদান। প্রয়োজনীয় পরিমাণ আয়রন না থাকলে হিমোগ্লোবিন তৈরি বাধাপ্রাপ্ত হবে। ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেবে। আমাদের দেশের মেয়েদের রক্তশূন্যতা বেশি। একে তো খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা তার ওপর যদি প্রতি মাসে ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, বাচ্চাকে দুগ্ধপান ইত্যাদি কারণে শরীর থেকে আয়রন বের হয়ে যায়, তাহলে রক্তশূন্যতা হতে বাধ্য। তাই শুধু আয়রন ট্যাবলেট বা আয়রনযুক্ত খাবার খেলেই হবে না। সঙ্গে খাবারের শর্করার পরিমাণও পরিমিত রাখতে হবে, যাতে শর্করা আয়রনকে শোষণ করে নিতে না পারে।
>>>লেখক: আবাসিক চিকিৎসক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)

শিল্ড গার্ল':হংকং বিক্ষোভের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন যে নারী

হংকংয়ে একটি বিতর্কিত প্রত্যর্পণ বা বন্দী ফেরত পাঠানোর বিলের বিরুদ্ধে চলা বিশালাকার বিক্ষোভের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন তিনি।
গণবিক্ষোভের মুখে হংকং সরকার ওই প্রত্যর্পণ বিল স্থগিত করেছিল।
কিন্তু "শিল্ড গার্ল" নামে পরিচিতি পাওয়া এই তরুণী বিবিসিকে বলেন যে বিলটির অনির্দিষ্টকালীন স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও তিনি তার লড়াই চালিয়ে যাবেন। কারণ তাদের দাবি বিলের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বাতিল করা।
যখন অন্ধকার বাড়তে থাকে, তখন বিক্ষোভ সমাবেশে মানুষের সংখ্যা কমতে থাকে। কিন্তু একমাত্র এই তরুণী দাঙ্গা পুলিশের ঢালের সারির সামনে অটলভাবে বসে ধ্যান করতে থাকেন ।
এভাবেই রাতারাতি হংকং বিক্ষোভের একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন এই নারী। যা নিয়ে আলোচনার স্রোত বয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে।
টুইটারে একজন পর্যবেক্ষক লিখেছেন, "নিষ্ঠুরতার মুখে সাহসিকতা"। সুন্দর।"
হংকংয়ের আইরিশ সাংবাদিক আইরিন ম্যাক নিকোলাস লিখেছেন, "তারুণ্যের সরলতা এবং কর্তৃপক্ষের দাঙ্গা ঢাল"।
এই তরুণীর নাম হয়ে যায় "শিল্ড গার্ল"।
এমনকি চীনের ভিন্নমতাবলম্বী শীর্ষ শিল্পী বুদিউকাও- শিল্ড গার্ল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ছবি এঁকেছেন।
মেয়েটির আসল নাম ল্যাম কা লো। ২৬ বছর বয়সী এই তরুণী নিজে থেকেই অ্যাডমিরালটি জেলায় আসেন। এই জেলাতেই হংকংয়ের সব সরকারি দফতর অবস্থিত।
ল্যাম্ব কা লো সেখানে পৌঁছান মঙ্গলবার রাতে, অর্থাৎ সিভিল হিউম্যান রাইটস ফ্রন্ট আয়োজিত একটি সমাবেশের কয়েক ঘণ্টা আগে।
ওই স্থানে তার সঙ্গে ছিল শত শত বিক্ষোভকারী, কিন্তু আরও বেশি সংখ্যক পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে পুরো সমাবেশ ঘেরাও করে রাখে।
হংকংয়ের বিক্ষোভের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন ২৬ বছর বয়সী এই তরুণী।
পুলিশ কর্মকর্তাদের লাইনের কাছাকাছি দাঁড়ানোর সাহস কারো ছিল না।
তবে পুলিশকে ভয় পাননি মিস কা লো। তবে তিনি আশঙ্কায় ছিলেন যে অন্যান্য প্রতিবাদকারীরা আহত হতে পারে।
এমন এক থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে তিনি ওম মন্ত্র পড়ে ধ্যান করতে থাকেন।
এ ব্যাপারে মিস কা লো বলেন, "আমি শুধুমাত্র একটি ইতিবাচক আবেশ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যাপারে উদ্ধত হয়ে উঠছিল। সেই মুহূর্তে, আমি শুধু চেয়েছি প্রতিবাদকারীরা যেন আমার পাশে বসেন এবং কারও প্রতি যেন তারা উদ্ধত না হন।"
তবে কা লো কখনই এই আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি হতে চাননি।
"আমি কারও মনোযোগের কেন্দ্র হতে চাই না," কা লো বলেন। "কিন্তু যদি মানুষ আমাকে পুলিশের সামনে বসতে দেখে, আমি আশা করি সেটা তাদেরকে সাহসী হতে এবং নিজেদের প্রকাশ করতে সাহায্য করবে।"

ধ্যান এবং রাগ

‌একটি বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্যেও কা লো'র এতোটা শান্ত থাকার পেছনের মূল শক্তি হল তার ধ্যানের অনুশীলন।
কা লো, ব্যক্তিগতভাবে একজন ভ্রমণ পিপাসু। এর মধ্যে তিনি এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন।
চার বছর আগে নেপালে সফরে গিয়ে তিনি ধ্যানের দিকে ধাবিত হন - যখন দেশটি একটি মারাত্মক ভূমিকম্পের কারণে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল।
মিস কা লো বলছের যে তিনি স্বভাবত একজন আবেগ প্রবণ মানুষ, কিন্তু ধ্যান তাকে তার অনুভূতির প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হতে এবং মনের শান্তি অর্জনে সহায়তা করেছে।
২০১৪ সালে ৭৯ দিনের আমব্রেলা মুভমেন্টের প্রতিটা দিন তিনি রাস্তায় কাটিয়েছেন।
তবে বুধবার বিকেলে হংকং পুলিশ কর্মকর্তা ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেটার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
তিনি বলেন, "আমি দেখেছি মানুষে মানুষে কতো ঘৃণা কাজ করছে। কারণ পুলিশ কিছু ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করেছিল। বুধবারের ওই সহিংতার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না কা লো ল্যাম।"
তার মতে "আমরা শুধুই মানুষ। যাদের অনুভূতি আছে।"
তিনি বলেন, প্রতিবাদ আন্দোলনে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচ্ছিন্ন করা ঠিক নয়। আমি বিশ্বাস করি যে অহিংসা হচ্ছে প্রতিবাদকারীদের লক্ষ্য অর্জনের প্রধান উপায়।"
"সহিংসতা কিছু সমাধান করে না।"

আন্দোলন অব্যাহত

হংকং-এ কয়েক দশকের মধ্যে সবচাইতে সহিংস প্রতিবাদের মুখে শনিবার বেইজিং সমর্থিত হংকং এর প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম বহিঃ-সমর্পণ আইন স্থগিত করতে বাধ্য হন।
তবে কবে নাগাদ নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে, আইনটি সংস্কার করা হবে- সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।
তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, আইনটি রদ না করা পর্যন্ত তারা তাদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে।
ওই আইন মোতাবেক, বিচারের জন্য হংকং এর অপরাধীদের চীনের মূল ভূখণ্ডে পাঠানোর বিধান করা হয়েছিল।
একে কোন সফলতা হিসাবে দেখছেন না মিস কা লো।
তিনি চান এই বিল যেন প্রত্যাহার করা হয়, বুধবারের সহিংসতাকে যেন দাঙ্গা হিসাবে শ্রেণীকরণ করা না হয় না, এবং যেসব বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের যেন মুক্ত দেয়া হয়।
তিনি তার সহ-প্রতিবাদকারীদের প্রতি এই বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মিস কা লো বলেন, "আপনারা আপনাদের বন্ধুবান্ধব-পরিবারের সদস্যদের সাথে আসুন। আমাদের সঙ্গে যোগ দিন। দলে দলে আসুন। নিজেকে নিজের মতো প্রকাশ করুন। আমি ধ্যানের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এটিই একমাত্র উপায়। প্রত্যেকে চাইলে আরও সৃজনশীল এবং অর্থপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে পারে।"
একজন প্রতিবাদকারী হংকং এর আইন পরিষদের বাইরে দাঙ্গা পুলিশের সামনে অবস্থান নেন।

মেয়েটিকে ঠেকাতে পারেনি কোনো অস্ত্র

নাঈমা জেহরি
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করতে মুখিয়ে ছিল এক দল সশস্ত্র ব্যক্তি। মেয়েরা যেন স্কুলে ঢুকতে না পারে, এ জন্য অস্ত্র হাতে স্কুল ঘিরে রাখত তারা। সেই অস্ত্রের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছেন পাকিস্তানের নাঈমা জেহরি। সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সেই নারীর সংগ্রামমুখর জীবনের গল্প উঠে এসেছে বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে।
নাঈমা জেহরি এখন পাকিস্তানের কোয়েটা শহরের সরদার বাহাদুর খান নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে ভয়ে ভয়ে। এখনো সেসব দিনের কথা মনে পড়লে শিরদাঁড়ায় ভয়ের হিমস্রোত বয়ে যায়।’
পাকিস্তানের অস্থিতিশীল প্রদেশ বেলুচিস্তানে খুজদার জেলার আদিবাসী গ্রাম জেহরি জামশারে বেড়ে ওঠেন নাঈমা। তাঁর ভাষ্যমতে, সে সময় অনাচার চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। বালুচ পুরুষদের অপহরণ ও হত্যার খবরে ভরে থাকত পত্রিকা। শঙ্কা, কুসংস্কার আর অস্ত্রে ভরপুর সে জীবনে প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকত বেঁচে থাকার আকুতি।
পাকিস্তানের দরিদ্রতম প্রদেশ বেলুচিস্তান। বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের সাক্ষী প্রদেশটি। প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামগুলোয় টিকে থাকাই দায়। তবে অন্যদের চেয়ে নারীদের দুর্দশা মাত্রাতিরিক্ত ছিল বলে জানান নাঈমা। তিনি বলেন, ‘আমার শৈশবের পুরোটা জুড়েই ছিল দারিদ্র্য। আমরা সাত ভাইবোন। বাবা আমাদের ফেলে আরেকজনকে বিয়ে করেন। আমার মা পড়ালেখা জানতেন না। কাজেই অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হতো। শিক্ষা তখন এতটাই বিলাসবহুল ছিল যে তা বহন করার সামর্থ্য আমাদের ছিল না।’
নাঈমার জীবনে শিক্ষা ছিল যুদ্ধের শামিল। সরকারি এক বিনা মূল্যের প্রাথমিক স্কুলে পড়ালেখায় হাতেখড়ি হয় তাঁর, ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই পড়েন তিনি। এরপর বন্ধ হয়ে যায় স্কুলটি। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্কুলটি সন্ত্রাসীদের কবজায় ছিল। স্থানীয় গোত্রপ্রধানের মদদপুষ্ট অপরাধীরা স্কুলের সামনে বেড়া তুলে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধের ব্যবস্থা করেছিল। বেলুচিস্তানে সে সময় এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়।
নাঈমা বলেন, ‘সারাক্ষণ স্কুলের গেট আটকে দাঁড়িয়ে থাকত ছয় থেকে আটজন সশস্ত্র প্রহরী। ছোটবেলায় ওই গেট পার হয়ে যাওয়ার কথা এখনো মনে আছে। লোকগুলোকে দেখলেই গা শিউরে উঠত। সব সময় মনে হতো, এই বুঝি ওরা গুলি ছুড়ল। সালোয়ার–কামিজ পরা লোকগুলোর মুখ ঢাকা থাকত মাফলারে, কেবল চোখ দুটোই দেখা যেত তাদের।’
মেয়েদের স্কুলে যেতে দিয়ো না
সশস্ত্র লোকগুলো কখনো স্কুলের ভেতরে ঢুকত না, মেয়েদের হুমকি দিত না। নাঈমা বলেন, ওই বেড়াগুলো দুটি কাজ করত। মেয়েদের পড়ালেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। আর গোত্রপ্রধানের সশস্ত্র লোকজন গা ঢাকা দেওয়ার জন্য স্কুল ক্যাম্পাসটি অবাধে ব্যবহার করতে পারত। মুখ ফুটে না বলেও বুঝিয়ে দিত, মেয়েদের স্কুলে যেতে দিয়ো না।
এই এক বেড়ার কত যে প্রভাব ছিল গ্রামটিতে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সরকারি শিক্ষকেরা এমন পরিস্থিতিতে পড়াতে আসার সাহস পেতেন না। নাঈমাসহ আরও কয়েকজন মেয়েকে পাশের গ্রামের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এটি ছিল কেবলই আনুষ্ঠানিকতা। মেয়েদের স্কুলে পাঠালে বিনা মূল্যে রান্নার তেল পাওয়া যাবে, এটিই ছিল মেয়েদের স্কুলে ভর্তির প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ওই এলাকার মেয়েদের শিক্ষায় সম্পৃক্ত করতে বিনা মূল্যে খাদ্যদ্রব্য বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছিল। মেয়ের মা–বাবারাও এই সুযোগ নিতে মেয়েদের নিয়মিত স্কুল পাঠাতেন। মেয়েরা হাজিরা খাতায় নাম লিখিয়েই বাড়ি চলে আসত।
নাঈমা বলেন, শিক্ষকেরাও ভয়ে থাকতেন। তাঁদের মধ্যেও দুর্নীতি ঢুকে যাওয়ায় কেউ কিছু বলতেন না। বেলুচিস্তানে কেবল কাগজে-কলমে অস্তিত্ব নিয়ে টিকে ছিল অনেক স্কুল। স্কুলগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো, তাঁরা নিয়মিত বেতনও পেতেন। তবে আক্ষরিক অর্থে সেখানে কোনো পড়ালেখা হতো না। স্কুলগুলো ছিল অকেজো।
এর মধ্যে বেলুচিস্তানে আনুষঙ্গিক সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক বছরের মধ্যে নাঈমার আপন দুই মামাকে অপহরণের পর খুন করা হয়। একদম হুট করেই গায়েব হয়ে যান দুজন। কয়েক মাস পরে গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নাঈমার পরিবার একদম ভেঙে পড়ে। তাজা দুটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার দুর্বিষহ স্মৃতি ভুলতে অনেক সময় লেগে যায় তাঁদের।
তবে এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে নতুন করে উদ্যমী হন নাঈমা। মাধ্যমিক পর্যায় শেষ করে পড়াশোনায় বিরতি দিতে বাধ্য হন তিনি। তবে এর কারণে নিজের শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটতে দেননি। তাঁর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। গ্রামবাসীর চাপে পড়ে মেয়েদের সুশিক্ষিত করতে এগিয়ে আসার সাহসও তাঁরা পাননি। মেয়েদের পড়ালেখা বলতে মাদ্রাসায় যাওয়ার চল ছিল তখন।
নাঈমা বলেন, মেয়েদের ঘিরে যে নিয়মকানুনের বেড়াজাল তুলে দেওয়া হয়েছিল, তাতেও ছিল ভণ্ডামি। মেয়েরা ঘর ছেড়ে স্কুলে গিয়ে পড়ালেখা করতে পারবে না। অথচ যখন পুরুষদের সাহায্য করতে মাঠে কাজ করার প্রসঙ্গ আসে, তখন কোনো নিয়ম নেই। মেয়েরা ঘরে বসে সেলাইয়ের কাজ করে। অথচ তাঁদের পারিশ্রমিক তুলে দেওয়া হয় পুরুষের হাতে।
ঘরে বসেই পড়ালেখা চালিয়ে যান নাঈমা। ব্যক্তিগত প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষায় অংশ নেন। উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ভাইদের বিরোধিতায় কিছুদিনের জন্য থমকে যেতে বাধ্য হন তিনি। তবে মামাদের মৃত্যু তাঁকে থেমে যেতে দেয়নি। গণমাধ্যমের নীরবতা তাঁকে আরও ব্যথিত করে। নাঈমা প্রশ্ন তোলেন, ‘বালুচরা কি মানুষ না? তাঁদের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? এমন উপেক্ষা মেনে নেওয়া যায় না।’ গণমাধ্যমের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা তাঁকে সাংবাদিকতার প্রতি আকৃষ্ট করে।
নিজ অঞ্চলের মানুষের গল্প তুলে ধরা
কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বেলুচিস্তান নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে না। এই বিশেষ অনুমতি মেলাও কঠিন। এ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে পাকিস্তানের মূলধারার গণমাধ্যমকেও হাজারো ঝক্কি পোহাতে হয়।
নাঈমা বলেন, বেলুচিস্তানের একমাত্র নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর পেয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। ভাইয়েরা তাঁকে সমর্থন না দিলেও এক মামার সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। এক বছরের পড়ার খরচও দেন ওই মামা। এরপর অর্থের জোগান ফুরিয়ে গেলেও ইউএস এইডের অর্থায়নে বৃত্তির অবদান করেন তিনি। মার্কিন সরকারের সহায়তায় পড়ালেখা নিয়ে এখন আর কোনো চিন্তা নেই তাঁর।
নাঈমা এখন স্বপ্ন দেখেন সাংবাদিক হওয়ার, বেলুচিস্তানের মানুষের দুর্বিষহ জীবনের গল্প সবার সামনে তুলে ধরার। নির্ভীক নাঈমা আজীবন সত্যের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।