Wednesday, August 29, 2018

বর্বরতার শিকার নারীর আর্তনাদ by শুভ্র দেব

বর্বর, নির্মম, অমানবিক। মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে যৌন নির্যাতন করে রক্তাক্ত করেছে চার দুর্বৃত্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ওই নারীকে ফেলে রেখে যায় তারা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) কাতরাচ্ছেন তিনি।  চিকিৎসকরা তাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গণধর্ষণের শিকার এই নারীর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। নিম্নাঙ্গে অপারেশন করে ৪-৫টি সেলাই দেয়া হয়েছে। শারীরিক দুর্বলতা আর ব্যথার কারণে তিনি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছেন না। সেরে উঠতে আরো অনেক সময় লাগবে। সোমবার সকালে ঢামেক হাসপাতালের সামনে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় এক নারীকে।
খবর পেয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা এগিয়ে যান। তার শরীর থেকে তখন প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। নিরাপত্তাকর্মীরা একটি চাদর ও গেঞ্জি পরিয়ে তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করেন। ধর্ষিতা নারীর বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, তার বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সাকুয়ায়। ৭-৮ দিন আগে চাকরির উদ্দেশ্যে লঞ্চে করে তিনি ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে সুলতানা নামের এক সৎ বোনের বাসায় ওঠেন। সুলতানা খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িত সে কথা জানতেন না ধর্ষিতা নারী। কিছুদিন থাকার পর সুলতানার খারাপ কাজে লিপ্ত থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। এমনকি তাকেও খারাপ কাজে লাগানোর জন্য চেষ্টা চালায়। ঘটনার দিন রাতে সুলতানা তাকে তুলে দেয় চার পুরুষের কাছে। সেখান থেকে তিন পুুরুষ তার ওপর বর্বর নির্যাতন চালায়। অমানবিক নির্যাতনে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। রক্তক্ষরণের কারণে সে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে ধর্ষকরা তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় একটি গাড়িতে তুলে ঢামেক হাসপাতালের সামনে ফেলে রেখে যায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ইনচার্জ ডা. বিলকিস বেগম বলেন, প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এমন অবস্থায় তাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার কারণে অস্ত্রোপচার করে কয়েকটি সেলাই দিয়েছি। তার শরীরে প্রচুর ব্যথা থাকায় প্রথম থেকে আমরা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি। তিনি বলেন, আমরা তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু সে তেমন কিছু বলতে পারেনি। শুধু বলেছে, তার শরীরে ব্যথা করছে ও মাথা ঘুরাচ্ছে। তাই তাকে আবার ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ২৫ বছর বয়সী ওই নারী ছোটবেলা থেকেই মানসিক রোগে ভুগছেন। তার বাবাও শারীরিকভাবে অসুস্থ। বেশ কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়া গিয়ে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে সুবিধা করতে পারেননি। দেশে এসে আবার কৃষি কাজ করে সংসার চালাতেন। ৫-৬ বছর আগে মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারীকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাকালে সেখানেই পরিচয় হয় রফিক নামের এক যুবকের সঙ্গে। পরিচয়ের সূত্র ধরে সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক থেকে তাদের দুজনের মধ্যে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে রফিক তাকে বিভিন্ন সময় টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে। এরই মধ্যে তাদের ঘরে একটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়।
এরপর থেকে ওই নারী সন্তানকে নিয়ে এক ভাই ও মা-বাবার সংসারেই থাকতেন। স্বামী চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে আরো বেশি দুর্বল হয়ে পড়েন। অভাবের সংসারে কিছু অর্থের যোগান দিতে কাজকর্মের জন্য খোঁজখবর নিতেন। আর সেই কাজের উদ্দেশ্যই তিনি ঢাকা চলে আসেন। তবে ঢাকায় এসে সুলতানা নামের যে নারীর বাসায় তিনি উঠেছেন তাকে তার পরিবারের কেউ চিনে না। এদিকে ধর্ষিতা এই নারীকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ। ধর্ষিতা নারীর কাছ থেকে একেকবার একের স্থানের কথা বের হয়ে আসছে। অসুস্থ থাকার কারণে তার কাছ থেকে সঠিক স্থান চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
এমনকি সুলতানা নামের ওই নারীর বাসা শনাক্ত না করায় আসামিকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ঘটনার আশপাশে পুলিশের ওয়ারী থানা, বংশাল থানা, পল্টন থানা রয়েছে। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ফেলে রাখার কারণে সেটি শাহবাগ থানার আওতাধীন। এ বিষয়ে মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস বলেন, ঘটনার পরপর আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এটা পল্টন থানার আওতধীন নয়। আর শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাফর আলী বিশ্বাস মানবজমিনকে বলেন, ঘটনাস্থল এখনো চিহ্নিত হয়নি। তাই কোনো থানা এখনও পুরোপুরো দায়িত্ব নিতে পারছে না। ধর্ষিতা ওই নারী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ওই নারীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। খোঁজখবর নিয়েছি। তার বাবা-মা ঢাকায় আসছেন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র বৃটেনের সমর্থন, মিয়ানমারের পাশে চীন

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চালানো নৃশংস সেনা অভিযানের বিষয়ে জাতিসংঘের দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বলেছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের তীব্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন তাতে নতুন সংযোজন। এতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতার অভিযোগ আরো দৃঢ় হয়েছে। ওদিকে তদন্ত প্রতিবেদনকে সাধুবাদ জানিয়ে বৃটেন মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের কোনো ছাড় না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের অব্যাহত চাপের মুখেও মিয়ানমারের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে চীন। জাতিসংঘের তদন্তে যখন বলা হচ্ছে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে, তখন চীন উল্টো সুর ধরেছে। তারা বলেছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে তা সংকট সমাধানে সহায়ক হবে না।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে মঙ্গলবার বিবৃতি দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিবৃতিতে জাতিসংঘের দেয়া প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানায় যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, আসলেই রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করার পরই যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে।এর আগে সোমবার জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের চালানো নির্যাতনের জন্য গণহত্যার অভিযোগে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টার্গেটেড অবরোধ দেয়া এবং সন্দেহভাজনদের বিচারের ব্যবস্থা করা অথবা তাদেরকে হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মুখোমুখি করার জন্য ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে। এর প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিয়ানমার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে চীনের। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও কর্মকর্তারা দাবি করে, তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে। আর মিয়ানমারের এ দাবির প্রতি সমর্থন রয়েছে চীনের। এর আগেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব আটকে দেয় চীন ও রাশিয়া। জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনের বিষয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিংয়ের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান। তিনি মঙ্গলবার নিয়মিত ব্রিফিং করছিলেন। এ সময় তিনি বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও জাতিগত দিক থেকে অতি জটিল।
তাই আমি মনে করি এ বিষয়ে একতরফা সমালোচনা অথবা চাপ প্রয়োগ করা সমস্যা সমাধানে প্রকৃতপক্ষে কোনো সহায়ক হবে না।
এদিকে, রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের কোনো ছাড় না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বৃটেন। দেশটি বলেছে, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। আর মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেয়া যাবে না। বৃটেনের এশিয়া অঞ্চল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন। তিনি জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রশংসা করে বলেন, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে উত্থাপনের বিষয়ে তার দেশ অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করবে।
উল্লেখ্য, এক বছর আগে মিয়ানমারের সেনাদের নৃশংস দমন-পীড়নে রাখাইন থেকে কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। তারা এখনো বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন। এ পর্যন্ত তাদের ফেরত নেয়া নিয়ে অনেক দেন-দরবার হয়েছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে চীনের ওই মুখপাত্র বলেন, এরই মধ্যে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। একটি চুক্তি হয়েছে দু’বছরের মধ্যে স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন নিয়ে। হুয়া চুনিং বলেন, আলোচনা ও শলাপরামর্শের মাধ্যমে রাখাইনের এই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে নিয়ে যথাযথ গঠনমূলক ভূমিকা অবলম্বন করা।

মাটির নিচে অন্য এক ভুবন by ইশরাক পারভীন খুশি

প্রথমবারের মতো প্লেনে চড়ছি। রানওয়েতে প্লেনের দৌড়ান আর তারপর ভোঁ করে উড়বার সময় কানে ভীষণ ধাপা লাগা। বাকিটা সময় দীর্ঘ ক্লান্তিকর ও একঘেঁয়েমি। আকাশের এত উঁচুতে উঠেও মনে হয় ড্রইং রুমেই বসে আছি। তবে উচ্চ আর মধ্যবিত্তের ড্রইং রুম বলা যেতে পারে। ইকনোমিক ক্লাস, চাপা চাপা সারি সারি সিট, সামনের সিটের পেছনে ছোট টিভি স্ক্রিন যেখানে হিন্দি ইংরেজি মুভি, গেম, গান শোনা ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। হেড ফোন, ঠান্ডায় উষ্ণতা পেতে রয়েছে কম্বল। আকাশের ওপরে রাত-দিন প্রায় একরকম। কারণ, চারপাশ বন্ধ। দিনে ইচ্ছে করলে জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখা যায়। মনে হবে, মেঘের ওপর ভাসছি। নিচে মহাসাগর অথবা পর্বতমালা, বন-জঙ্গল। হঠাৎ দু-একবার ঝাঁকুনি ছাড়া সবটাই নির্ভেজাল বদ্ধ ঘরে বসে ঝিমুনি। ট্রেনে চড়লে মায়ের কোলের যে দোলটা লাগে তাতে দুচোখের পাতা খুলে রাখা দায়। কিন্ত প্লেনে এক ফোঁটা ঘুমও আসেনি। যাহোক একদিকে প্রিয়জন ফেলে আসা অন্যদিকে প্রিয়জনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলাম পুরো সময়। একসময় হিথ্রো পার হলাম। প্রাণ ভোমরা আমাকে সাদর সম্ভাষণ করে বাড়ি অভিমুখী হলো। জীবনে নতুন চমক শুরু সেখান থেকেই।
বিলাতে গিয়ে প্রথম চমক আমার কাছে পাতাল রেল। লন্ডনের আন্ডার গ্রাউন্ডে টিউব ইস্টিশন। মাটির নিচে সে এক অন্য ভুবন। ঝকঝকে তকতকে হাজার রঙের মেলা। মাটির এত এত নিচে যেন রূপকথার এক নগরী। চলন্ত সিঁড়ি নিচে নামতেই থাকে নামতেই থাকে তারপর এ-গলি, সে-গলি ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে কত কিছুর পশরা যে চোখে পড়বে তার ইয়ত্তা নেই।
কেউ হয়তো গিটার নিয়ে আপন মনে গান করছে। সামনে গিটারের ঢাকনাটা খোলা যাতে ভালোলাগলে ভালোবেসে দুচার পয়সা ছড়িয়ে দিতে পারি। কেউ হয়তো ধুমধাড়াক্কা গান ছেড়ে ধুমধাড়াক্কা ডিস্কো ড্যান্স করছে, কেউ করুণ সুরে বাজাচ্ছে ভায়োলিন। এসব তাদের রুজি রোজগারের ধান্ধা। মন চাইলে পয়সা দিতে হবে না হয় বিনে পয়সায় গানটা চলতি পথে একটু শুনে কৃপণতা দেখিয়ে চলে যাওয়া যায় তাতে কেউ বাদ সাধবে না।
ছড়ানো ছিটানো নানান বার্গার আর কফি শপ। হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে খেয়ে নেয়া যায় পছন্দসই। বার্গার কিং, ম্যকডোনাল্ড, কেএফসি থেকে শুরু করে স্টারবাক্স, কোস্টা কতই না কফি শপ। কফির গন্ধে মনটা নেচে উঠে। এক কাপ কফি না কিনে ট্রেনের উঠতে মন সায় দেয়না। তারপর শপিং করতে চাই? জামাকাপড় জুতো, সাজসজ্জা, অলঙ্কার এমনকি বইয়ের দোকানও আছে ঝলমলে সাজে সজ্জিত। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এত এত পাতাল রেল এত অলিগলি তারপরও প্রথমবারের জন্য হলেও পথ হারানোর ভয় নেই। আমার মতো কুয়োর ব্যাঙ যে কিনা ঢাকা শহরে একা একটা নতুন জায়গা খুঁজে পেতে অক্ষম সে-ও প্রথমদিনেই লন্ডনের ম্যাপ বুঝে গেল। এ-পর্যন্ত যে শহরেই ঘুরেছি লন্ডনের মতো রাস্তার ম্যাপ দেখিনি। এত সুন্দর আর সহজ করে আঁকিবুকি পাতাল রেল ম্যাপে আঁকা। চোখের সামনে যেন পুরো শহর দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে ধরা দেয়। আর তা নতুন যে কোন আগন্তুককে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। যাহোক ঐ প্রথম পাতাল রেলে চড়ে হোয়াইট চ্যাপেল নামক স্থানে এলাম নতুন জীবনের দিশা পেতে।
এক কামরায় সংসার। বাড়িটিতে তিনটি ফুল ফ্যমিলি ও একটি হাফ ফ্যমিলি মিলেমিশে ভাগাভাগি। একটি বাথরুম ও একটি রান্নাঘর যা সবার জন্য। রান্না ঘরও একটি। সবাইকে সমানভাবে সময় ভাগ করা আছে। সকলের সুবিধা মতো নির্দিষ্ট করা সময়ে এগুলো ব্যবহার করতে হয়। ঠিক করা আছে বাথরুম পরিষ্কার করার দায়িত্ব কার কবে? একটা যৌথ পরিবারের মধ্য সবার নিজস্ব ব্যক্তিগত জীবন। সবাই সবাইকে সহযোগিতা করে ও মিলেমিশে থাকে অথচ একে অন্যের বিষয়ে নাক গলায় না। আমরা সবাই ছিলাম বাংলাদেশি কিন্তু বিলেতি কায়দায় সভ্য।
হোয়াইট চ্যাপেল বাঙালিদের আখড়া। যথারীতি বাঙালি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। বাংলাদেশি সবজি মাছ সবকিছুর পশরা বসে ইস্টিশনের সামনেই। এক পাউন্ডেই পাওয়া যায় শুকনো গোছের এক পেয়ালা সবজি। যা যা খেতে মন চায় তার সবই আছে সে বাজারে। হাতের চুড়ি, গলার মালা, কানের দুল থেকে হিজাব, ওড়না কিছুই বাদ নেই। অবাক হয়েছি চানাচুর মুড়ি মাখা পাওয়া যায় দেখে। চারপাশে বাংলাদেশিরা গিজগিজ করছে। অবশ্য হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় সিলেটী বেশি। বাংলাদেশি দোকানপাটও আছে বিস্তর।
লন্ডন শহরের অন্য এলাকার থেকে এ এলাকার যে পার্থক্য চোখে পড়বে তাহলো এখানে বাংলাদেশিরা থাকে বেশি বলে বাংলায় কথা বলা, বাংলা দোকানপাট যেমন রয়েছে তেমনি কিছু এলাকা বাংলাদেশি কায়দায় নোংরাও রয়েছে। এইটুকুতেই মনে হবে হ্যাঁ বাংলাদেশেই আছি, মায়ের কোল থেকে বেশি দূরে যাইনি।
রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই, কিন্তু সবাই নিয়ম মেনে যেখানে যতটুকু থামা দরকার থামছে। রাস্তার মোড়ে ল্যম্পপোস্টের মতো যে খাম্বা দাঁড়িয়ে সেখানে আছে একটা বাটন। সে বাটনে চাপ দিয়ে দাঁড়ানো মানে আমি রাস্তা পার হব, আমাকে যেতে দাও। সময়মতো বাস, গাড়ি সব দাঁড়িয়ে স্যালুট দিয়ে তোমাকে বলবে মহাশয় এ-পথ এবার তোমার, পার হও। মজার বিষয় লন্ডন শহরে মন কেড়েছে একটি বিষয়ের জন্য। তাহলো ল্যামúোস্টগুলোতে দুটো করে ফুল গাছের ঝাকা ঝুলে আছে। আর রাস্তার মাঝে ও পাশের ফুটপাতের কোথাও কোথাও যেন ফুলদানি বানিয়ে তাতে ফুল গাছের সারি দিয়ে তোরা বানিয়ে রেখেছে। দেখলে মনে হবে, একি রাস্তা নাকি আমার বাগান বাড়ি? গোটা শহরই যেন বাড়ির মতো সজ্জা নিয়ে তোমাকে আগলে রেখেছে।

বাড়ছে খুন খারাবি, দিনে ১২ হত্যাকাণ্ড by রুদ্র মিজান

বাড়ছে সহিংসতা। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটছে খুনখারাবি। সামাজিক-পারিবারিক কারণেই বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়াও অর্থ, সম্পত্তি, আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসেবে সারা দেশে প্রতিদিন ১১ থেকে ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে শিশুরাও। গত জুলাই মাসে দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৫৫টি। এর মধ্যে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই এলাকায় এ মাসে ৭৫টি। দ্বিতীয় চট্টগ্রাম। সেখানে ৬১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। খুলনায় ৪৫টি। তার আগে জুন মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৩৯টি। সবেচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। জুন মাসে ঢাকায় ৭৫টি। তারপর ঘটেছে চট্টগ্রামে। সেখানে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৫২টি। ওই মাসে রংপুরে ৩৭টি এবং ময়মনসিংহেও ৩৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এভাবেই দিন দিন বাড়ছে খুনখারাবি। বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ২৯১টি। ক্রমান্বয়ে তা বেড়ে জুলাই মাসে দাঁড়িয়েছে ৩৫৫টিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক সংকট, অসঙ্গতি, নৈতিকতার অবক্ষয়, অর্থ ও ক্ষমতার মোহের কারণেই ঘটছে হত্যাকাণ্ড। এজন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, কোনো সভ্য দেশে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ ঘটতে পারে না। অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাকে কোরআনে ‘সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা’ করা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জঘন্য অপরাধ বাড়তে থাকবে যদি দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হয়। সেইসঙ্গে মানবিকতা ও নৈতিকতার চর্চা অত্যন্ত জরুরি। মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগাতে হবে। এজন্য অভিভাবক, শিক্ষকসহ সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
গত ২৪শে আগস্ট যশোরে কল্পনা নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়েছে। নিহত কল্পনা স্বামী পরিত্যক্তা ছিলেন। যশোর উপশহর রজনীগন্ধ্যা তেল পাম্পের পেছনে দুই মেয়েকে নিয়ে একটি বাড়িতে থাকতেন। তার সাবেক স্বামীর নাম কাজী পলাশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, রাত ৮টার দিকে পরকীয়ার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
মাত্র ২০ টাকার জন্যও জীবন দিতে হয়েছে রাজশাহীর এক যুবককে। ধারের বিশ টাকা শোধ না করার কারণে শাহীন হোসেন (৩০) নামের ওই যুবককে মারধর করে প্রতিপক্ষ। গত ২৫শে আগস্ট সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
যৌতুকের জন্যও ঘটছে হত্যাকাণ্ড। গত ২৪শে আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল চৌধুরীবাড়ির শান্তিনগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আলোর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, ঘুড়ির নাটাই দিয়ে পিটিয়ে গৃহবধূ আলোকে হত্যা করা হয়েছে। পাঁচ বছর আগে জনির সঙ্গে বিয়ে হয় আলোর। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের জন্য আলোকে মারধর করতো জনি। জনির দাবি ছিল ২ লাখ টাকা। এ ঘটনায় ঘাতক স্বামী জনিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
দেশের বিভিন্নস্থানে প্রায়ই হচ্ছে আধিপত্যের লড়াই। গত ১৮ই আগস্ট খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলি করে তিন ইউপিডিএফ কর্মীসহ ছয় জনকে হত্যা করা হয়।
এভাবে প্রায়ই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। ১৯শে আগস্ট ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ সংলগ্ন বিএড কলেজের একটি পানির ড্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪ মাস বয়সী শিশুর লাশ। ২০শে আগস্ট কক্সবাজার শহরে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন শাহাবুদ্দিন (৩২) নামে এক যুবক। কক্সবাজার পৌরসভার দক্ষিণ রুমালিয়ার ছড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ২১শে আগস্ট চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জায়গাজমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। নিজ ভাইয়ের ছেলের ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই প্রাণ দিতে হয় মো. আবদুর রাজ্জাক (৪৫) নামের ওই ব্যক্তিকে। রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ মো. আহসানুল কাদের ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, নিহত রাজ্জাক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। মূলত জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
ঈদের পোশাককে কেন্দ্র করে ঘটেছে হত্যাকাণ্ড। ১৯শে আগস্ট স্বামী মহির উদ্দিনের হাতে নিহত হয়েছেন গুলসানারা নামে এক গৃহবধূ। ঘটনাটি ঘটেছে মেহেরপুর শহরের ক্যাশবপাড়ায়। মেহেরপুর সদর থানার ওসি (তদন্ত) মেহেদি হাসান জানান, ঈদের পোশাক কেনা নিয়ে দু’জনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। ঘটনার একপর্যায়ে মহির উত্তেজিত হয়ে স্ত্রীর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে টান দিলে গুলসানারা মারা যান বলে জানান ওসি।
গত ১৭ই আগস্ট রাজধানীর গোলাপবাগের একটি বাসা থেকে জোছনা বেগম নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়। একই বাসা থেকে আহত অবস্থায় তার স্বামী এবং অচেতন অবস্থায় দুই মেয়েকে উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও ওই পরিবারের স্বজনরা জানিয়েছেন, স্বামীর পরকীয়া প্রেম ছিল। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে কলহ চলছিল। এই কলহের জের ধরেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে নিহতের স্বজন ও পুলিশ জানিয়েছে। গত ২৬শে আগস্ট রাজধানীর ডেমরায় স্বামী-স্ত্রীকে অচেতন করে হত্যা করেছে ডাকাতরা। এরকম নানা কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের ৪০ ভাগ ঘটে পারিবারিক কলহের কারণে।

হাসিনা-মোদি তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক হচ্ছে নেপালে by মিজানুর রহমান

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। ২৫ ঘণ্টার সফরে কাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেপাল যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য কাঠমান্ডুর বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান। কিন্তু সেখানে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। তাহলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক। চলতি বছরের শেষদিকে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ওই নির্বাচনের আগে সম্ভবত ঢাকা-দিল্লি শীর্ষ পর্যায়ে এটাই হতে যাচ্ছে শেষ বৈঠক। কূটনৈতিক অঙ্গনে বলাবলি আছে- ওই বৈঠকের গ্রীন সিগন্যাল পাওয়ার পরই ঢাকার তরফে প্রধানমন্ত্রীর কাঠমান্ডু সফর চূড়ান্ত করা হয়। অবশ্য সফরটি নিয়ে এখনও সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। আজ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করতে যাচ্ছেন।
তবে দু’দিন আগে (২৭শে আগস্ট) সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস সফর বিষয়ে একটি রিপোর্ট করেছে। তাতে বিমসটেক সম্মেলন এবং আয়োজক রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেখানে রহস্যজনকভাবে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠকের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। কাল বিকালে বৈঠকটি হচ্ছে- এটি নিশ্চিত করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি সফরের সময় ক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামসও তা-ই বলছেন। তার ভাষ্য হলো ‘বৈঠক হবে লেইট আফটারনুনে। আমি তাই জানি। বিস্তারিত ঢাকাই ভালো বলতে পারবে।’ কিন্তু সেই বৈঠকে কী থাকছে? টকিং পয়েন্টস তো তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে জানার চেষ্টা করা হলে এক কর্মকর্তা বলেন- আমি জানি, আপনিও জানেন, ঢাকা-দিল্লি বৈঠক টকিং পয়েন্টস ধরে হয় না। এর বাইরেও কথা হয়। সেখানে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
আর সেই বৈঠক যদি হয় শীর্ষ নেতৃত্বের, দুই প্রধানমন্ত্রীর, তা হলো নিশ্চিতভাবেই সেখানে অনেক বিষয় আসবে, যা টকিং পয়েন্টস-এ থাকবে না। আগে বৈঠক হোক, তারপর বলা যাবে তারা কী নিয়ে কথা বললেন। অন্য এক কর্মকর্তা বলেন- টকিং পয়েন্টস তৈরি হয় গৎবাঁধা ফরমেটে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন বৈঠকে বসেন তখন সেগুলো গৌণ হয়ে যায়। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হলে তো টকিং পয়েন্টস এর কোনো পাত্তাই থাকে না। আলোচনা ভিন্নমাত্রা পায়! ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, টকিং পয়েন্টস এ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব বিষয়ই কম-বেশি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিস্তা, রোহিঙ্গা, সীমান্ত সমস্যা, নিরাপত্তা বাণিজ্য সব বিষয়ই থাকছে। তবে কোনো কিছুতেই বিশেষ ফোকাস রাখা হয়নি। ভারতের তরফে আসাম ইস্যু আসতে পারে বলে সংবাদ মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। ঢাকার ওই কর্মকর্তা বলেন-আমরা যে ধারণা পেয়েছি তাতে বিষয়টি উঠবে বলে মনে হয় না।  দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়? দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের বিষয়ে জানতে বৈঠক শেষ হওয়ার পর মিডিয়া ব্রিফিং পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে!
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক আসন্ন বৈঠক বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবেই দুই নেতার মধ্যে বৈঠক হবে। গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতন সফরে মোদির সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল। সেখানে তিস্তা ছাড়া দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়েই আলোচনা হয়েছিল। ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন বিমসটেক’-এর চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন অংশ নিতে গত ৪ঠা আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে বিশেষ আমন্ত্রণ জানান নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। তার আমন্ত্রণে শেখ হাসিনা কাঠমান্ডু যাচ্ছেন। ওই সম্মেলনে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা এবং থাই প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চান-ওচারেরও যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। ওদিকে হাসিনা-মোদি বৈঠক নিয়ে কলকাতার বহুল প্রচারিত আনন্দবাজার পত্রিকাও রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টে বলা হয়- শেষ মুহূর্তে কোনো পরিবর্তন না হলে কাঠমান্ডুতে আরও একবার মুখোমুখি হতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উভয়ের বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার কথা। বাংলাদেশের ভোটের আগে বৈঠকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিভিন্ন ইস্যুতে কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে আঞ্চলিক রাজনীতি।
ভারতে আসামের চলতি এনআরসি বিতর্কের আঁচ ঢাকাতেও পড়েছে। যদিও ভারতের তরফে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ভোটের মুখে ঢাকার স্পর্শকাতরতার দিকটি অবশ্যই দিল্লি বিবেচনায় রাখছে। ভারতের তরফ থেকে এমন কিছু করা হবে না, যাতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। সূত্রের বরাতে আনন্দবাজার লিখেছে- আসন্ন বৈঠকটিতে এবার খোদ মোদি এনআরসি নিয়ে কথা বলবেন শেখ হাসিনার সঙ্গে। তাঁকে আশ্বস্ত করা হবে। পাশাপাশি মোদি এ কথাও জানাবেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য ঢাকাকে দোয়ারে দোয়ারে ঘুরতে হবে না। নয়া দিল্লি বিষয়টি নিয়ে সর্বতোভাবে ঢাকার পাশে রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ভারতের পরবর্তী সাহায্য পাঠানোর বিষয়টি ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ নিয়েও বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হবে বলে কলকাতার ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিমসটেক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির বিস্তারিত: বাসস জানিয়েছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামিট অব দ্য বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) ৪র্থ সম্মেলনে যোগ দিতে দুইদিনের সরকারি সফরে আগামী বৃহস্পতিবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু যাচ্ছেন। কাঠমান্ডুর হোটেল সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ৭টি আঞ্চলিক দেশের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এই শীর্ষ সম্মেলন শুরু হবে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে একটি সেতুবন্ধ তৈরি করা।
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবে। সেদিনই নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বিমানটির নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে। নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী ঈশ্বর পোখারেল এবং নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশরাফি বিনতে শামস বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। অভ্যর্থনা পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রীকে সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহকারে হোটেল সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজায় নিয়ে যাওয়া হবে। নেপাল সফরকালে প্রধানমন্ত্রী সেখানেই অবস্থান করবেন। সফরের প্রথমদিনই প্রধানমন্ত্রী নেপালের রাষ্ট্রপতির বাসভবন শিতল নিবাসে দেশের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবি ভাণ্ডারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সেখানে নেপালের রাষ্ট্রপতির দেয়া মধ্যাহ্ন ভোজেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকালে প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজা হোটেলে অনুষ্ঠেয় ৪র্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেবেন।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজের উন্নয়নের বিষয়ে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার দেশগুলোর নেতৃবৃন্দের অলোচনার মূল বিষয়বস্তু হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান ও নেপালের নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে তাদের তিন বাহিনীর সম্মিলিত সামরিক অনুশীলন এবং একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়েও মতবিনিময় করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ স্থানীয় হায়াৎ রিজেন্সি হোটেলে তাঁদের সম্মানে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি আয়োজিত নৈশভোজেও যোগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার অপরাহ্নে দেশে ফিরবেন। এই উপ-আঞ্চলিক সংস্থাটি ১৯৯৭ সালের ৬ই জুন ব্যাংকক ঘোষণার মধ্যদিয়ে গঠিত হয়। এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ৫টি দক্ষিণ এশিয়ার। এগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং অন্য দু’টি দেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ড। প্রাথমিকভাবে ৪টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে একটি অর্থনৈতিক জোট গঠিত হয়েছিল। যার সংক্ষিপ্ত নাম ছিল ‘বিআইএসটি-ইসি’ (বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন)। ১৯৯৭ সালের ২২শে ডিসেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে একটি বিশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এই জোটে মিয়ানমারের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এর নতুন নামকরণ হয় ‘বিআইএমএসটি-ইসি’ (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা অ্যান্ড থাইল্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন)।
৬ষ্ঠ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে (ফেব্রুয়ারি-২০০৪, থাইল্যান্ড) নেপাল এবং ভুটান অন্তর্ভুক্ত হলে জোটের নতুন নামকরণ হয় ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)।’ এই ধরনের একটি জোট গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে- বিশ্বায়নের আগ্রাসন মোকাবিলা করে আঞ্চলিক সম্পদ এবং ভৌগোলিক সুবিধাদি কাজে লাগিয়ে সকলের স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।

চলন্ত বাস থেকে ফেলে হত্যা: প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে লোমহর্ষক বর্ণনা

চট্টগ্রাম আকবর শাহ থানার কালিরহাট এলাকায় সিটি গেইটের অদূরে গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কারখানার সামনে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে চাকায় পিষ্ট করে রেজাউল করিম রনি (৩২)কে হত্যার ঘটনা ঘটে সোমবার বিকালে।
এ নিয়ে স্থানীয় লোকজন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। এতে প্রায় আধাঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় সড়কের দুই পাশে যানজট। তবে আকবর শাহ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসের চালক ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নেয়।
বিক্ষোভকারীদের দাবি- বাসচালক ও তার সহকারী অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে রনিকে মারধর করে চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করে। তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আকবর শাহ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জসিম উদ্দিন বলছেন- রনিকে ধাক্কা মেরে ফেলে হত্যার কোনো তথ্য তারা পাননি। এ ব্যাপারে লিখিত কোনো অভিযোগ রনির পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো করা হয়নি। অভিযোগ পেলে হত্যা মামলা করা হবে।
থানা পুলিশের এমন গা-ছাড়া ভাবে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে অভিযুক্ত বাসের চালক ও তার সহকারী। বাসটিও পড়ে রয়েছে ঘটনাস্থলে। তবে স্থানীয়দের বিক্ষোভের কারণ খুঁজতে গিয়ে মঙ্গলবার সকালে বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। এরমধ্যে পাওয়া গেছে রনির বন্ধু ও বাসটির প্রত্যক্ষদর্শী এক যাত্রীর মুখে রনি হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা।
রনির ঘনিষ্ঠ বন্ধু মো. সাইদুর রহমান মারুফ মঙ্গলবার সকালে জানান, রনি সোমবার বিকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী থেকে ৪নং বাস যোগে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। বাস থেকে ফোন করে সে জানায়, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বাসচালক ও সহকারী তার সঙ্গে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে। তাকে মারধর করেছে। তাকে সাহায্য করতে যেন চট্টগ্রাম সিটি গেট এলাকায় আসা হয়। এভাবে আরও কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে সে। কিন্তু বন্ধুরা সেখানে পৌঁছানোর আগেই বাসটি সিটি গেট এলাকা ছেড়ে কালিরহাট এলাকার গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কারখানার সামনে এসে পৌঁছায়। এসময় চালক ও সহকারী তাকে মারধর করে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তার ওপর গাড়ি চালিয়ে দেয়।
সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামুসল হুদা খোকন গুরুতর আহত অবস্থায় রনিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই রনির মৃত্যু ঘটে। 
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে খোকন জানান, বেলা আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে সিটি গেট সংলগ্ন কালিরহাট এলাকায় সড়কের পাশে একজনকে পড়ে থাকতে দেখি। কাছে গিয়ে দেখি লোকটির হাত ও মাথায় রক্ত। তাকে দ্রুত তুলে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটি মারা যায়। পরে জানতে পারি লোকটির নাম রেজাউল করিম রনি। কালিরহাট এলাকাতেই তার বাড়ি।
কালিরহাটের বাসিন্দা মো. ফরিদও ওই বাসের যাত্রী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মঙ্গলবার দুপুরের দিকে তিনি বলেন, ভাটিয়ারি থেকে চার নম্বর বাসে (চট্টমেট্রো জ ১১-১৮০৩) কালিরহাটে আসছিলাম আমরা। ঈদুল আজহা উপলক্ষে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছিল বাসের কন্ট্রাক্টর। এ নিয়ে চালক, কন্ট্রাক্টর ও তাদের আরেক সহকারীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয় রনির। একপর্যায়ে তারা রনিকে মারধর করে। পরে রনি গাড়িতে থাকা অবস্থায় তার এক বন্ধুকে ফোন করে মারধরের কথা জানায়। বন্ধুদের তিনি সিটি গেইট এলাকায় আসতে বলেন। কিন্তু বাসটি সিটি গেইট ছাড়িয়ে যাওয়ার পর গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কারখানার সামনে রনিকে মেরে চলন্ত অবস্থায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এতে রনি সড়কের ওপর গড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে চালক তার ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দিলে চাকায় পিষ্ট হয় সে। পরে বাস থামিয়ে চালক ও সহকারীরা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে বন্ধুরা ছুটে এসে বাসটি জব্দ করে। ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে। বাসের চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তারের জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ঘটনার এই বিবরণ আকবর শাহ থানার পুলিশের কাছেও দিয়েছেন বলে জানান মো. ফরিদ।   
নগরীর আকবর শাহ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, রনির মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। অভিযোগ উঠেছে গাড়ির চালক ও সহকারী তাকে মেরে গাড়ি থেকে ফেলে দিয়েছে। তবে এখনো এ ব্যাপারে তার পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে হত্যা মামলা নেয়া হবে।
তবে ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে বাসের ভেতরে চালক ও তার সহকারীর সঙ্গে রনির কথা কাটাকাটি হয়েছে একজন প্রত্যক্ষদর্শী এমন কথা জানিয়েছেন বলে স্বীকার করেন ওসি। আর ঘটনার পরপরই বাসটি রেখে চালক ও সহকারী পালিয়ে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, রেজাউল করিম রনি সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের গুল আহমদ জুট মিলস এলাকার ওয়ালীউল্লাহর পুত্র। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। মা, বাবা ও দুই বোন আমেরিকায় থাকেন। চট্টগ্রাম মহানগরীর কাট্টলী লতিফপুরে আড়াই বছরের একমাত্র শিশু শাবা ও স্ত্রী নিয়ে নিজস্ব ভবনে থাকতেন রনি। সোমবার বিকালে ভাটিয়ারি থেকে ওই বাড়িতে ফিরছিলেন রনি।
রনির স্বজনরা জানান, আর মাত্র ১৯ দিন পর স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় পাড়ি জমানোর কথা রনির। সেখানে গিয়ে মা-বাবা ও বোনদের সঙ্গে থাকার কথা। ভিসাও হয়ে যায় তার। কিন্তু ঘাতক বাসচালক ও সহকারীর বর্বরতার কারণে তার আর আমেরিকায় যাওয়া হলো না।
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক সারওয়ার হাসান জামিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২১শে জুলাই রাতে ঢাকা যাওয়ার পথে হানিফ পরিবহনের বাসে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত চট্টগ্রামের সন্তান পায়েলকে ভাটেরচর সেতুর নিচে ফেলে হত্যার ঘটনা ভুলতে না ভুলতে কালিরহাটে রনিকে ফেলে দিয়ে হত্যা করল অসভ্য বাসচালক ও তার সহকারী। এটা খুবই মর্মান্তিক। এসব ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।

টেক্সাস সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রধানের প্রশ্ন: কেন এত বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকছে?

বিপদসঙ্কুল মেক্সিকো-টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় প্রবেশে বাংলাদেশি তরুণরা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। গত বছরের  তুলনায় এই পথ ব্যবহারের প্রবণতা অন্তত তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশিরা। মেক্সিকান সীমান্তে কর্মরত মার্কিন নিরাপত্তা ও অভিবাসী কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, গত বছর এই রুটে ১৮১ জন বাংলাদেশি আটক হয়েছিলেন। এবারে সেটা বেড়ে ৫৪১-এ উন্নীত হয়েছে। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। অথচ ২০১৬ সালে মাত্র ১ জন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৭শে আগস্ট টেক্সাসের ব্রেইটবার্ট ডট কমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এত বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি আমেরিকায় প্রবেশে ছুটে আসছে।
টেক্সাসের ব্রেইটবার্ট সীমান্তের প্রধান পেট্রল এজেন্ট জ্যাসন ডি. আওয়েন্স ব্রেইটবার্ট ডট কমকে বলেছেন, আমাদের এলাকায় যারা আসছে, আপনি কেবল সংখ্যার দিকে নয়, কোথা থেকে তারা আসছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কী তাদের পরিচয়, কোথা থেকে আসছে, সেটা জানাটা হুমকি মোকাবিলার জন্য দরকারি। লারেদো সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রধান প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনি যখন দেখেন যে, বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে আসছে, তখন মনে রাখতে হবে, দেশটির সঙ্গে অতীতে সন্ত্রাসবাদের একটা যোগসূত্র ছিল। আর এরা কিনা এখন সেই দেশটি থেকেই আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে বেআইনিভাবে প্রবেশ করতে তারা কেন আসছে? কী তাদের উদ্দেশ্য? তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায়? কি তাদের লক্ষ্য?
২৭ ব্রেইটবার্ট ডট কমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৫৪১ বাংলাদেশি দালালদের হাতে ২৭,০০০ ডলার করে তুলে দিয়েছেন। সর্বশেষ গত শুক্রবার ৫ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন। টেক্সাসের লারেদো সীমান্তের কাছাকাছি একটি স্থান দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা চালান।
উল্লেখ্য, গত মে মাসে মার্কিন ডিজটাল ম্যাগাজিন ওয়াশিংটন এক্সামিনারের সাংবাদিক অ্যানা গিয়ারিটেলি- একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টের বরাতে মানবজমিনে খবর ছাপা হয়েছিল যে, ওই সীমান্তপথে ঢুকতে গিয়ে ২০১৮ সালে ২৩০ জন গ্রেপ্তার হয়েছন। গত ১৭ই মে টেক্সাসের লারেদোর মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বলেছে, দক্ষিণ লারেদোর রিও গ্রান্দি নদী পাড়ি দেয়ার সময় ইউএস বর্ডার পেট্রল এজেন্টস আরো ৮ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা অবৈধভাবে নদী পাড়ি দিয়েছিল। এই ৮ জনকে নিয়ে শুধু এই একটি সীমান্তেই ধরা পড়া বাংলাদেশির সংখ্যা ২৩০-এ পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ঝুঁঁকিপূর্ণ জেনেও আমেরিকায় যেতে বাংলাদেশিরা মরিয়া হয়ে পড়েছেন। গত ১শ দিনে ৩শ জনের বেশি বাংলাদেশি ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। প্রতিদিন আট ঘণ্টার ব্যবধানে একজন বাংলাদেশি এই রুটে ঢুকতে ছুটে এসেছেন।
২৭শে আগস্টে প্রকাশিত ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, ‘লারেদো দিয়ে বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ চেষ্টা বেড়েই চলছে। তবে সব থেকে লক্ষণীয় ৮ মাস সময়ে ২৫১ জন বাংলাদেশি যেখানে গ্রেপ্তার হয়, সেখানে মাত্র ৫ সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সংখ্যাটা ৪শতে উন্নীত হতে দেখা যায়। ৩রা আগস্টের পূর্ববর্তী কয়েক সপ্তাহে প্রায় ১শ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হন। এমনকি শুধু আগস্টেই প্রায় ৪০ বাংলাদেশি আটক হন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তারা নদীপথে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। রিও গ্রান্দি নদীটি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-মধ্য কোলোরাডো থেকে উৎসারিত হয়ে গালফ অব মেক্সিকোতে প্রবাহিত হয়েছে। নিউ মেক্সিকো এবং টেক্সাসের যে সীমান্ত নদী দ্বারা বিভক্ত সেখান থেকেই বিদেশি অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। গত ১৮ই এপ্রিল এক্সামিনারে প্রকাশ হওয়া রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশীজ পেয়িং ড্রাগ কার্টেল আপ টু ২৭,০০০ ডলার টু বি স্মাগলড ইনটু দি ইউএস।’ এতে বলা হয়, প্রত্যেক বাংলাদেশি মাথাপিছু ২৭ হাজার ডলার পাচারকারীদের পরিশোধ করেছে। ২৩০ জনের খরচ পড়ে ৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই টাকা লাতিন আমেরিকান কুখ্যাত ড্রাগ কার্টেলদের হাতে পড়েছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মার্কিন সীমান্তের রিও গ্রান্দি নদী পাড়ি দেয়ার সময় প্রত্যেকে ধরা পড়েছেন।
লারেদো সেক্টর অ্যাসিসট্যান্ট চিফ পেট্রল এজন্ট গ্যাব্রিয়েল অ্যাকোস্তা বলেছেন, অন্যান্য সীমান্তের তুলনায় এই সীমান্তে সর্বাধিক সংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছেন। মি. অ্যাকোস্তা বলেন, এটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমাদের এজেন্টরা প্রায় দৈনিক ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করছেন। আর অবৈধভাবে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে, সেটা কেবল তাদেরকে গ্রেপ্তারের পরেই নির্ধারণ করা সম্ভব।’
এক্সামিনার রিপোর্ট বলেছিল, চলতি আর্থিক বছরে লারেদোর এজেন্টরা ১৮৩ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ থেকে বোঝা যায়, গত মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ৪৭ বাংলাদেশি অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড়জন বাংলাদেশি অবৈধভাবে এই সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন। একজন মার্কিন মুখপাত্র এক্সামিনারকে বলেছিলেন, এশিয়া থেকে সাড়ে আট হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ২০১৭ সালে যত অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করেছেন, তাদের ৬০ ভাগই লারেদোকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। মি. গ্যাব্রিয়েল অ্যাকোস্তা এক্সামিনারকে বলেছেন, বাংলাদেশিরা শুধু একক চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা চালায় তা নয়, তাদের পেছনে আছে ড্রাগ কার্টেল। এশিয়া থেকে তারাই ঘাটে ঘাটে থাকে এবং তাদেরকে এ পর্যন্ত নিয়ে আসে। এশিয়া থেকে তাদের প্রথমে আনা হয় দক্ষিণ আমেরিকায়। এরপর সেখান থেকে বিভিন্ন পরিবহনে তাদের মধ্য আমেরিকার নানা স্থান ঘুরিয়ে আনা হয় মেক্সিকোতে। মানবপাচারকারী চক্রই তাদের নিয়ে আসে। এই ব্যক্তিরা (বাংলাদেশি) নিজেরা কিন্তু জানে না যুক্তরাষ্ট্র নামের দেশে কোন সীমান্ত দিয়ে তারা ঢুকবে। ২০১৭ সালে লারেদো থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ২৫ হাজার ৪৬০ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

বারিধারা থেকে বেইলি রোড: যা হলো ড. কামালের বাসায় by সালমান তারেক শাকিল

মঙ্গলবার (২৮ আগস্ট) রাত পৌনে দশটায় খানিকটা হট্টগোলের মধ্য দিয়েই ভাঙলো ছয় জ্যেষ্ঠ নেতার পৌনে দুই ঘণ্টার বৈঠক। রাজধানীর বেইলি রোডে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসার নিচ তলার ড্রইংরুমে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। পুরো বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। বরাবরের মতোই এবারও আলোচনা শেষে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল। এসময় পাশে ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর সভাপতি আসম আবদুর রব, বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। তবে বৈঠকে থাকলেও সাংবাদিকেদের সামনে ঘোষণার সময় ছিলেন না নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর তিন দলীয় যুক্তফ্রন্টের দুই নেতা জানালেন, ড. কামাল ও বি চৌধুরী যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হওয়ার পর একটি সাব-কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। সাংবাদিকদের সামনে এসে এই সাব-কমিটির বিষয়ে কথাও বলেন বি চৌধুরী। কমিটিতে যাদের নাম উচ্চারিত হয়েছে, তারা হলেন- মোস্তফা মহসীন মন্টু, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, আবদুল মালেক রতন ও জাহিদুর রহমান। শেষ নামটি যুক্ত হওয়ার পর ড. কামাল প্রশ্ন তোলেন, ‘কে এই জাহিদ?’ সেসময় জাহিদকে নাগরিক ঐক্যের নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন মাহমুদুর রহমান মান্না। আর তখনই ড. কামাল বলে ওঠেন, ‘এমন নেতার নাম দিলে তো আরও দশ জনের নাম যোগ করতে হবে। তখন শুরু হয় হট্টগোল। নেতারা উঠে-বসেন। সিনিয়র নেতারা চলে আসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে। একদিকে ড. কামাল হোসেনকে পাশে রেখে বি চৌধুরী বলছিলেন, জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে তারা দুজন একমত হয়েছেন। অন্যদিকে পাশ থেকে আরেকজন নেতা বললেন, ‘কিছুই হবে না।’ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথার বলার এক ফাঁকেই গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে বেরিয়ে যান মাহমুদুর রহমান মান্না। ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। যুক্তফ্রন্টের একনেতা হতাশা ভরা কণ্ঠেই বললেন, ‘কিছুই হচ্ছে না।’ বি চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শেষ করার পরই সুলতান মুনসুর আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘২২ সেপ্টেম্বর সমাবেশে, সবাই থাকবেন।’ সঙ্গে-সঙ্গেই বিরোধিতা করেন বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘এসব বিষয়ে কোনও আলাপই হয়নি।’
মঙ্গলবার ড. কামাল হোসেনের বাসার বৈঠক নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা ছিল ব্যাপক। বিকাল থেকে বেইলি রোডের ছায়া সুনিবিড় বাসভবনে আসতে থাকেন গণমাধ্যমকর্মীরা। কথা ছিল সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে বৈঠক। সময় ঘনিয়ে এলেও বৈঠকের সম্ভাব্য ব্যক্তিরা এসে তখনো পৌঁছুননি ঘটনাস্থলে। খবর পাওয়া গেলো বারিধারার কূটনৈতিক জোনে সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরীর বাসায় বৈঠকে বসেছেন তিন দলীয় যুক্তফ্রন্ট। উদ্দেশ্যে, ড. কামাল হোসেনকে দেওয়া প্রস্তাব চূড়ান্ত করা। বিকাল ৫টা থেকে শুরু হওয়া ওই বৈঠক শেষ হতে প্রায় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা বাজে। এরপরই যুক্তফ্রন্টভুক্ত বিকল্প ধারা, নাগরিক ঐক্য ও জেএসডি নেতারা আসেন ড. কামালের বাসায়। ঘড়িতে তখন রাত ৮টা। এরপর সৌজন্য কথাবার্তা শেষে প্রথমেই বক্তব্য দেন ড. কামাল হোসেন। পরিস্থিতির ওপর বক্তব্য দেওয়ার পর বি চৌধুরীও আলোচনা করেন।
ড. কামালকে জেএসডি-এর আসম আবদুর রব বলেন, ‘আপনি আর দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।’ তার বক্তব্যে বি চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনকে একসঙ্গে চলার জন্য জোরালো আহ্বান ছিল। এক পর্যায়ে ড. কামালকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আপনি আর দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এখন থেকে নির্বাচন পর্যন্ত দেশের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।’
বি চৌধুরী ও ড. কামালের উদ্দেশ্যে আসম রব আরও বলেন, ‘আমরা জাতীয় ঐক্যমতের সরকার গঠন করতে চাই। আপনারা দুজন সামনে আগায়া যান। আমরা সঙ্গে থাকব। আপনারা মিনিমাম কর্মসূচি দিলে শেখ হাসিনার সরকার পালাবার জায়গা পাবে না।’
সরকারের সমালোচনা করে রব বৈঠকে বলেন, ‘দলীয় সরকার জাতি, সংবিধান শেষ করে দিয়েছে, এমনকি বঙ্গবন্ধুকে শেষ করেছে এই দলীয় সরকার।’
বি চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনকে উদ্দেশ্য করে আসম রব বলেন, ‘আপনারা সজ্জন ব্যক্তি। আপনারা দুজন ঠিক করুন, মাঠে নামবেন কিনা, আপনারা একসঙ্গে দাঁড়ালে আমরা যাব। আমরা বলছি, জাতির প্রয়োজনে আপনাদের দুজনকে লাগবে। আপনারা দুজন আগাবেন কিনা, বলেন। আন্দোলন করে স্বৈরাচার হটাতে হবে। ঐক্যের জন্য এটাই প্রথম শর্ত।’
আলোচনার একপর্যায়ে রব বলেন, ‘কোয়ালিশন সরকার বিএনপি গ্রহণ করবে কিনা?’ এ কথার জবাবে পাল্টা প্রশ্ন করে মেজর (অব.) মান্নান বলেন, ‘এক স্বৈরাচারকে বাদ দিয়ে আরেক স্বৈরাচারকে আনবো কিনা?’
বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান আলোচনার শেষ দিকে এসে বিএনপির ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রস্তবনায় থাকা ‘রাষ্ট্র ক্ষমতার গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য’ প্রসঙ্গে মান্নান বলেন, ‘বিএনপি ভারসাম্যের পক্ষে না, এটা আবেগ দিয়ে করেছে। আজকে আমরা যে সংগ্রাম করছি, বিএনপির সময় একশগুণ বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমরা এক স্বৈরাচারকে বাদ দিয়ে আরেক স্বৈরাচারকে আনবো কিনা?’
আবদুল মান্নানের বক্তব্যের জবাবে আসম রব বলেন, ‘কোয়ালিশন সরকার বিএনপি গ্রহণ করবে কিনা?’
এসময় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘নেতৃত্ব এক হবে না, যৌথ নেতৃত্ব হবে। বিএনপির অনেক দাবির সঙ্গে অন্যদের দাবির মধ্যে মিল আছে।’
জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরও বলেন, ‘সরকার গঠন করতে পারলে মন্ত্রণালয় ৫/৫ ভাগ হবে প্রয়োজনে। রাষ্ট্রপতি পদটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। মোটকথা আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কৃষক শ্রমিকের পক্ষে। তাদের স্বার্থটা কিন্তু দেখতে হবে।’
বৈঠকে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা ক্ষমতার ভারসাম্য চাই। সংসদে কেউ মেজরিটি অর্জন করলেই ভারসাম্য হয়ে যায় না।’ এসময় তিনি মালয়েশিয়াসহ দুয়েকটি রাষ্ট্রের কথা উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা দেন। শেষদিকে তিনি বলেন, ‘আমরা ভারসাম্য নিষ্পত্তি করার বিষয়ে চিন্তা করব নাকি ঐক্য দরকার?’
এক পর্যায়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এদেশে আইনের শাসন দেখতে চাই। বড় দল কেউ আসতে চাইলে ওয়েলকাম। আগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’
পৌনে দুই ঘণ্টার বৈঠকে কয়েক দফায় বিএনপির ১০ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন অনেকে। বৈঠক শুরুর আগে যে দুয়েকজন নেতা ১০ দফা প্রস্তাবের বিষয় অস্বীকার করেছেন, তারাই বৈঠকে ১০ প্রস্তাবের ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলেছেন।
বৈঠকের পরে এ প্রসঙ্গে বি চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপির প্রস্তাব সম্পর্কে কোনও আলোচনাই হয়নি।’
বৈঠকে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে সাত দফা ও গণফোরামের পক্ষ থেকে সাত দফা উপস্থাপিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ঐক্যের কাবিন চূড়ান্তে বৈঠক: ঐক্যপ্রক্রিয়ায় একমত ড. কামাল বি. চৌধুরী, সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচি

রাজধানীর বেইলী রোডে ড. কামাল হোসেনের বাড়িতে
কয়েকটি দলের নেতাদের বৈঠক ছবি: নাসির উদ্দিন
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যুক্ত ফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
গত রাতে ড. কামাল হোসেনের বেইলী রোডের বাসায় এ বৈঠক হয়। বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা করেন নেতারা। বৈঠকে আলোচনার ভিত্তিতে অধ্যাপক বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়া পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া কর্মসূচি প্রণয়নে ৪ সদস্যের একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর নাগরিক সমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বৈঠক শেষে বি. চৌধুরী বলেন, আমাদের যৌথ নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। ড. কামাল বলেন, জাতীয় ঐক্য গড়তে সবার সহযোগিতা লাগবে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ যাতে হয় সেজন্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ঐক্য প্রক্রিয়ার আন্দোলন শুরু হবে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারে গিয়ে আমরা অজ্ঞাবহ হবো না। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে জামায়াতকে বাদ দিয়ে তাদের আসতে হবে।
বৈঠকে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে সাতটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ১. জাতির এই ক্রাান্তিলগ্নে জাতীয় স্বার্থে  জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য স্বাধীনতাবিরোধী দল ব্যাতিরেকে সকল সমমনা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলসমূহের ঐক্য জরুরি। ২. বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সভা-সমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ৩.  আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা-বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ৪. নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা। ৫. রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করার জন্য সংসদ ও সরকারের ভারসাম্য নিশ্চিতকরণ। ৬. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বে রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা ও নির্বাচনের পূর্বে সংসদ ভেঙ্গে দেওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রিসভা বাতিল ঘোষণা। ৭. এই মূহুর্তে থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো দলের কর্মীকে গ্রেপ্তার করা যাবে না এবং তফসিল ঘোষণার পূর্বে সকল ছাত্র-ছাত্রী ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে।
বৈঠকে বিকল্প ধারা বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ.স.ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর অব. আবদুল মান্নান, যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী, জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ গণফোরাম নেতারা অংশ নেন।
জাতীয় নির্বাচনের আগে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়তে বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছেন যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতারা। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৯শে আগস্ট বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর অব. আবদুল মান্নানের বাসায় বৈঠক করেন যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতারা। এ বৈঠকে আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা অংশ নেন। ওই বৈঠকেই যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে গণফোরামের ঐক্যের সিদ্ধান্ত হয়। এ ঐক্যকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে রূপ দিতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে অন্য রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করারও সিদ্ধান্ত হয়। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গতকালের বৈঠকটি হয়।
এর আগে ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নেতারা জানিয়েছিলেন আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দেয়া হবে। এর আগে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে ঐক্য প্রক্রিয়ার রূপরেখা তুলে ধরা হবে। ২২শে সেপ্টেম্বর সমাবেশের বিষয়টি এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে। সার্বিক প্রক্রিয়া পরিকল্পনামতো হলে এ দিনের সমাবেশ থেকেই বৃহৎ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ঐক্যের ঘোষণা আসতে পারে। যদিও যুক্তফ্রন্ট এবং গণফোরামের বাইরে অন্য দলগুলোর মধ্যে কারা ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছেন তা পরিষ্কার হয়নি। জাতীয় ঐক্যের উদ্যোক্তাসূত্র বলছে, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারেন। তবে ২০ দলীয় জোটও আলাদাভাবে সক্রিয় থাকবে। দলগুলোকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে কাজ করছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সূত্র বলছে, ঐক্যের বিষয়ে তিনি বিএনপি’র নেতৃত্বের সঙ্গেও আলোচনা করছেন।
ঐক্যের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য চূড়ান্ত হলে একটি লিখিত সমঝোতা ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের আগেই রূপ পেতে পারে বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের। ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়ে উদ্যোক্তারা কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। ওই দলগুলোও জাতীয় ঐক্যে অনেকটা সম্মতি দিয়েছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনায় থাকা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এখনও জোটে যাওয়ার বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেননি। তাকেও জোটে রাখতে নেতাদের আগ্রহ রয়েছে। যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের নেতারা ঐক্য প্রক্রিয়া শুরুর মধ্যেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও জোট শরিক বাড়ানোর আলোচনা শুরু করেছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেছেন। কয়েকটি দলের নেতার সঙ্গে তার টেলিফোন আলাপও হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আলাদা রাজনৈতিক জোট গঠনের কথা বলে আসছেন। তিনি বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচন করবে। আর বিএনপি না এলে আলাদা জোট করে তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেবেন।

শহিদুল আলমের মুক্তি চাইলেন টিউলিপ

সাংবাদিক শহিদুল আলমকে মুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তার ভাগনি ও বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। বলেছেন, তার খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের নেতৃত্বাধীন সরকার  শহিদুল আলমকে আটক করেছে। এটা গভীর উদ্বেগের এবং অবিলম্বে এর ইতি ঘটা উচিত। লন্ডনের অনলাইন দ্য টাইমস পত্রিকা এ খবর জানিয়েছে। ‘এমপি আর্জেজ আন্ট টু রিলিজ বাংলাদেশ ফটোগ্রাফার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। টিউলিপ সিদ্দিক বৃটেনে হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ট কিলবার্ন আসনে বিরোধী লেবার দলের এমপি। শহিদুল আলম বৃটেনে নিয়মিত প্রদর্শনী করেন। ওই রিপোর্টে তাকে একজন ফটোসাংবাদিক ও আর্টিস্ট হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে তার সঙ্গে যোগ হলেন টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি বলেছেন, নিজের নাগরিকদের প্রতি ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অবশ্যই বাংলাদেশকে সমুন্নত রাখতে হবে। আমি আশা করবো যে দেশটিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হয় তাদের কাছে কড়াভাবে এই বার্তাটি পৌঁছে দেবে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়- আমি এমনটা আশা করি।
এ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, আর্টিস্টস, লেখক, বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী সবাই শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি করেছেন। টিউলিপ সিদ্দিকের আগে এ সপ্তাহে তার মুক্তি দাবি করেছেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেন। তিনি শহিদুল আলমের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছেন। এ ছাড়া তার মুক্তি দাবি করেছেন স্যার রিচার্ড ব্রানসন, শ্যারন স্টোন, রিচার্ড কার্টিজ, আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুটু সহ অনেক জগৎবিখ্যাত ব্যক্তি।
উল্লেখ্য, গত ৫ই আগস্ট ৬৩ বছর বয়সী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ।
আল জাজিরা টেলিভিশনকে ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার পর তার বাসভবনে অভিযান চালায় ৩০ জনের বেশি নিরাপত্তা কর্মকর্তা। সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অধীনে। এ আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অতিশয় কঠোর (ড্রাকোনিয়ান) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শহিদুল আলম অভিযোগ করেছেন, আটক করে তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। শহিদুল আলমের রয়েছে বৃটেনে বসবাসের অনুমতি। তিনি সেখানে প্রদর্শনী করেছেন টেটে মডার্ন, হোয়াইটচ্যাপেল গ্যালারি, নিউ ইয়র্কের মোমা, প্যারিসের পোম্পিডোউতে।

কেউ যেন সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াতে না পারে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কেউ যেন ছড়াতে না পারে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় প্রতিটি মানুষ যেন তার নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে সে ব্যবস্থাই করতে চাইছে সরকার। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী মহোৎসব উপলক্ষে শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
২০০৪ সালে ২১শে আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামলে গ্রেনেড হামলার ঘটনার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে গ্রেনেড মারা হয় যুদ্ধের ময়দানে।
সেই গ্রেনেড মারা হয়েছিল তখনকার যারা ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের সম্পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এমন কোনো হিন্দুবাড়ি ছিল না যেখানে আক্রমণ না করেছে। তারা কোনোকিছুই বাদ দেয়নি। তারা সকলের উপরেই আক্রমণ চালিয়েছে। বিশেষ করে হিন্দুদের উপর বেশি করে অত্যাচার করেছে। ঠিক একই ভাবে ৯২ সালে বাবরি মসজিদে যখন হামলা হয় তখনও এখানে হিন্দুদের উপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছিল সেই কথাও তুলে ধরেন। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মাদক-অস্ত্র’ এগুলো যেন একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর আমরা প্রচেষ্টা চালিয়েছি, এই দেশে শান্তি যেন বজায় থাকে। সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ অর্থ্যাৎ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যেন ছড়াতে না পারে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যেন বাংলাদেশ গড়ে ওঠে। আর প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষ তার ধর্ম যেন স্বাধীনভাবে উদযাপন করতে পারে এবং একটা সুন্দর পরিবেশে যেন এই ধর্ম পালন করতে পারে। প্রতিবছরই পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা সবসময় এটাই চেষ্টা করি, সেটা হিন্দু ধর্ম হোক, খ্রিস্টান ধর্ম হোক, বৌদ্ধ ধর্ম হোক বা আমাদের ইসলাম ধর্ম হোক; প্রত্যেকটা উৎসব যেন একটা আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হোক। কারণ আমাদের স্লোগানই হচ্ছে- ধর্ম যার যার উৎসব সবার এবং এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের সব থেকে সৌন্দর্য। প্রত্যেকটি ধর্মীয় উৎসবে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলেই কিন্তু এক হয়ে উদযাপন করে, এই এরকম সুন্দর একটা পরিবেশ আমরা বাংলাদেশে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। শেখ হাসিনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এই দেশেরই মানুষ। এই দেশেরই সন্তান। এই দেশ আপনাদের। মহান মুক্তিযুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। শহীদের রক্ত তো কোনো বাধা মানেনি। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে খ্রিস্টান, কে বৌদ্ধ, সেটা দেখেনি। সেই রক্ত একাকার হয়ে গেছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এই দেশ স্বাধীন করেছি।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষ এক হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কাজেই এই দেশ সকল ধর্মের মানুষের জন্য। এখানে সুন্দরভাবে বসবাস করা, প্রত্যেকেরই আর্থ-সামাজিক উন্নতি, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সব ধর্মের মানুষ এখানে আত্মসম্মান ও সমান অধিকার নিয়ে বাঁচবে। সরকার সেই পরিস্থিতি বজায় রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এছাড়াও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অর্পিত সম্পত্তি বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরকার আন্তরিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ক্ষমতাসীন সরকার মসজিদভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থার পাশাপাশি মন্দিরভিত্তিক শিশু শিক্ষার ব্যবস্থাও করছে সেই দিকটিও তুলে ধরেন তিনি।

বলুন তো তার বয়স কত?

ছবির এই যুবতীর বয়স কত একবার ভাবুন তো! ১৮ বছর? ২০ বছর? না। এর কোনোটাই নয়। তার বয়স ৪৩ বছর। এ বয়সের পুরুষ বা নারীদের মুখাবয়ব বলে দেয় বয়স। কিন্তু তাওয়ানের ডিজাইনার লুর হসু’র তা হয় নি। তিনি যেন ১৮ তেই ধরে রেখেছেন বয়স। তাই ইন্সটাগ্রামে তার ভক্তের সংখ্যা ৭ লাখের বেশি। কিভাবে লুর হসু নামের এই নারী বয়সকে ধরে রেখেছেন ১৮ বছরের ফ্রেমে! এর মূলে রয়েছে কঠোরভাবে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও ত্বকের যত্ন নেয়া। এগুলোর মাধ্যমেই তিনি এখনও যেকোনো যুবতীকে টেক্কা দিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াতে পারেন। তাইওয়ানের ফ্রাইডে ম্যাগাজিনকে তিনি একটি সাক্ষাতকার দিয়েছেন।
তাতে তিনি বলেছেন, তিনি ব্যবহার করেন এসকে-টু এবং লা প্রেইরি’র মতো প্রিয় সব ব্রান্ডের কসমেটিক্স। আর রোদে খুব বেশি সময় কাটান না। কারণ, তিনি মনে করেন রোদে গেলে ত্বক শুকিয়ে যায়। দ্রুততার সঙ্গে তাতে ত্বকের ওপর ভাজ ফেলেতে পারে। তাই যদি কখনো রোদে বের হতেই হয় তিনি তার আগে সব সময় ব্যবহার করেন সান ক্রিম। ত্বকের যত্নে ব্যবহার করেন ভিটামিন- সি এবং কোলাজেন । লুর হসু’র প্রতিটি দিন শুরু হয় এককাপ ব্লাক কফি দিয়ে। তিনি মনে করেন এতে তার ত্বক জেগে ওঠে। তবে ওই কফির সঙ্গে কোনো চিনি ব্যবহার করেন না। তিনি ভেজিটারিয়ান। খান প্রচুর পরিমাণে ফল ও শাকসবজি, যাতে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ফাইবার ও প্রোটিন। একই সঙ্গে তিনি চিনিযুক্ত খাবার ও গ্রিজযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলেন। এর সঙ্গে নিয়মিত করেন ব্যায়াম।
এর আগে একবার তিনি বলেছিলেন, দিনের বেলায় তিনি ,শুধু পানি পান করেন। ফ্রাইডে ম্যাগাজিনকে ২০১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, যখন ত্বকে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে তখন আপনাকে বয়স বেড়ে যাওয়া বা বলিরেখা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু থাকে না। তার এ কথাটি শুনতে খুব বাজে মনে হতে পারে। কিন্তু লুর হসু’র ক্ষেত্রে এটাই সত্য হয়েছে।