Monday, September 8, 2014

মধ্যপ্রাচ্যের আজ এ কী হলো? by ইউরি আভনেরি

জাতীয় সংঘাতগুলো মূলত যুক্তিনির্ভর। অঞ্চল নিয়েই তাদের চিন্তা। সমঝোতার মাধ্যমে এর মীমাংসা সম্ভব। ধর্মীয় সংঘাত অযৌক্তিক। সব পক্ষই যখন পরম সত্যে বিশ্বাসী, তখন তাদের চোখে অন্য সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অবিশ্বাসী, একমাত্র সত্য ঈশ্বরের শত্রু।
শুদ্ধ বিশ্বাসীদের মধ্যে সমঝোতা হয় না। কারণ তারা মনে করে, তারা ঈশ্বরের জন্য লড়ছে এবং তাদের হুকুম আসছে সরাসরি স্বর্গ থেকে। ক্রুসেডাররা ‘ঈশ্বর চাহেন’ ধ্বনি তুলে মুসলিম ও ইহুদিদের কচুকাটা করেছে। ‘আল্লাহ মহান’ রব তুলে উন্মত্ত মুসলিমরা কল্লা কাটে শত্রুদের।
জায়নবাদী আন্দোলনের জনকেরা সবাই ছিলেন সেক্যুলার ইহুদি ও ঘোষিত নাস্তিক। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে জায়নবাদী প্রচেষ্টা ধর্মজাত গোঁড়ামিমুক্ত ছিল। এখনো জঙ্গি জায়নবাদীরা ‘ইহুদি জনগণের জাতীয় রাষ্ট্রের’ কথাই বলে, ‘ইহুদি ধর্মরাষ্ট্রের’ কথা বলে না।
জায়নবাদী জাতীয়তাবাদী আগ্রাসন আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কঠিন বাধার মুখে পড়ে। প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে প্রায় সব আরব নেতা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান। এই আরব প্রতিরোধের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অল্প সময়ের জন্য ফিলিস্তিনের জাতীয় প্রতিরোধ জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি হাজ আমিন আল-হুসেনির নেতৃত্বে চললেও ধর্মীয় জোরে নয়, জেরুজালেমের সবচেয়ে অভিজাত বংশের নেতা হিসেবেই তিনি এটা করেছিলেন।
আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও সর্বদাই সেক্যুলার ছিল। এর স্বনামধন্য নেতাদের বেশির ভাগই ছিলেন খ্রিষ্টান। যে নিখিল আরব বাথ পার্টি সিরিয়া ও ইরাক শাসন করত, তাদের প্রতিষ্ঠাতারাও ছিলেন খ্রিষ্টান।
সে সময়ের আরব জনতার মহান নেতা, গামাল আবদ-আল-নাসের আচার-আচরণে মুসলিম হলেও ধর্মকর্ম করতেন না। ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত ব্যক্তিগত জীবনে নিষ্ঠাবান মুসলিম হলেও তাঁর নেতৃত্বে পিএলও বেশ কজন খ্রিষ্টান নেতাসহ পুরোপুরি সেক্যুলারই ছিল। তিনি প্রায়ই জেরুজালেমের মসজিদ ও গির্জা দখলমুক্ত করার কথা বলতেন। তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন ফিলিস্তিন ছিল গণতান্ত্রিক ও বিশেষণমুক্ত।
তাহলে কেন মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলো উগ্র ধর্মবাদী পথে বদলে গেল? ধর্মযাজিকা থেকে ইতিহাসবিদ হওয়া কারেন আর্মস্ট্রং মনে করাচ্ছেন, তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্ম ঘিরে একই সঙ্গে এমনটা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানরা ডানপন্থী ইহুদি শক্তির যোগসাজশে রাজনীতিতে জোরদার প্রভাব ফেলছে। মুসলিম দুনিয়াজুড়েও মৌলবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে। আর ইসরায়েলে ইহুদি মৌলবাদ বড় থেকে আরও বড় আকারে জাতির ত্রাতার ভূমিকায় নেমেছে। যখন প্রায় সব ধর্মে এবং বহু দেশে একই ঘটনা ঘটছে, তখন তার নিশ্চয়ই গড়পড়তা কারণ আছে। সেটা কী? কী সেই যুগলক্ষণ?
মুসলিম দেশগুলোতে উদার, সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ দেউলিয়া হয়ে সৃষ্টি করেছে আধ্যাত্মিক শূন্যতা, অর্থনৈতিক অধঃপতন এবং জাতীয় লাঞ্ছনা। নাসেরের জ্যোতির্ময় আশাবাদ হোসনি মোবারকের বন্ধ্যাত্বে পর্যবসিত হয়েছে। বাগদাদ ও দামেস্কের বাথপন্থী শাসকেরা আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থ। আলজেরিয়া ও তুরস্কের সামরিক সংস্কারকেরা ভালো কিছু দিতে পারেননি। ইরানের জাতীয়তাবাদী নেতা মোহাম্মেদ মোসাদ্দেককে উচ্ছেদ করে তেলগ্রাসী পশ্চিমা শক্তি ক্ষমতায় বসিয়েছিল রেজা শাহকে। সেই হতভাগাও দাবি মেটানোর অযোগ্য।
আর এই পুরোটা সময়জুড়ে আরবরা ভোগ করেছে ইসরায়েলের অত্যাচার। বাইরে থেকে রোপণ করা এই তুচ্ছ রাষ্ট্রটি দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে তাদের চোখের সামনে। বারবার আরবরা এর হাতে নাস্তানাবুদ হয়েছে।
প্রতিটি নতুন যুদ্ধের পর মুসলিম জনতা নিজেদেরই জিজ্ঞাসা করেছে: ‘কী ভুল ছিল আমাদের?’ জাতীয়তাবাদ যদি শান্তি ও যুদ্ধ দুইখানেই ব্যর্থ হয়, যদি পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র দুই-ই অর্থনৈতিক ভরসা দিতে অক্ষম হয়, ইউরোপীয় মানবতাবাদ ও সোভিয়েত সাম্যবাদ কেউই যদি ওই আধ্যাত্মিক শূন্যতা ভরাতে না পারে, তাহলে কোথায় মিলবে সমাধান? জনতার গভীর থেকে বাজ পড়ার শব্দে উত্তর আসে: ‘ইসলামই দেবে উত্তর’।
যুক্তি বলে, ইসরায়েলিদের কাছে উত্তরটা হবে এর উল্টো: ইহুদি মৌলবাদ। সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেই শুধু নয়, প্রাযুক্তিক ও আণবিক শক্তিতেও ইসরায়েল তুখোড়। তার পরও ধর্মগর্বী মৌলবাদ উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মিলে আজ ইসরায়েল চালাচ্ছে।
চলতি গাজা যুদ্ধের সময় এক ইসরায়েলি কমান্ডার সেনাদের একটা নির্দেশ দেন, তা অনেককেই সচকিত করেছে। তিনি তাঁর অফিসারদের ‘ইসরায়েলের ঈশ্বরের’ নামে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন। তাঁর কাছে এটা ধর্মযুদ্ধ, আর কিছু নয়। সরকারিভাবে এই যুদ্ধে ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য হলো সীমান্ত রক্ষা এবং হামাসের রকেট ছোড়া বন্ধ করা। কিন্তু ওই কর্নেলের লক্ষ্য সেটা নয়। তিনি তাঁর সেনাদের জীবন দিতে বলেছেন ইসরায়েলের ঈশ্বরের সম্মান রক্ষার জন্য।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখন কিপ্পাহ পরা (রক্ষণশীল ইহুদিদের মাথার খুলি–ঢাকা ছোট টুপি) গোঁড়া সৈন্যে ভরে গেছে। এরা সামরিক-ধর্মীয় বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে বাকিদেরও তাদের পথে টেনে আনে। দুঃখের বিষয়, ওই কর্নেল নিন্দিত হওয়ার বদলে তুমুলভাবে নন্দিত হন।
ইহুদিবাদী-ধর্মীয় দল এবং এর মৌলবাদী পুরোহিতেরা, বহুদিন থেকেই সেনাবাহিনীর অফিসার সারিতে অনুপ্রবেশ চালিয়ে আসছে। যেসব অফিসার ফিলিস্তিনি ভূমিতে ঔপনিবেশিক দখলদারদের মতো চলতে রাজি নয়, তাদের এরা পাঠিয়ে দেয় হাই-টেক উদ্যোক্তা হতে; আর তাদের শূন্যস্থান পূরণ করে জঙ্গি মনোভাবের অফিসাররা।
এসব ঘটনায় আমার নজর আইসিসের দিকে চলে যায়। সম্প্রতি এর নাম বদলে সাদামাটাভাবে ইসলামিক স্টেট করা হয়েছে। এর অর্থ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের তৈরি করা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র আর রইল না। তারা সেখানে একটি মাত্র ইসলামি রাষ্ট্র চায়, যার মধ্যে থাকবে সব আরব এলাকা ও ফিলিস্তিন (ইসরায়েলও অন্তর্ভুক্ত)।
এটা নতুন ভয়াবহ ঘটনা। মুসলিম দুনিয়ায় অনেক ইসলামি দল আছে—তুরস্কের শাসক দল, মিসরের ব্রাদারহুড ও ফিলিস্তিনের হামাস। এদের সংগ্রাম নিজ নিজ রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমিত। ক্ষমতায় গিয়ে নিজ দেশ শাসন করাই তাদের লক্ষ্য। এমনকি ওসামা বিন লাদেনও চাইতেন তাঁর সৌদি মাতৃভূমির নিয়ন্ত্রণ।
আইসিস এদের মতো নয়। এরা পশ্চিমাদের তৈরি করা সব মুসলিম রাষ্ট্রের ধ্বংস চায়। ভয়ংকর বর্বরতাকে তারা ধর্মীয় উচ্চতায় তুলতে চায়, তারা চায় সমগ্র মুসলিম জাহানের দখল এবং তার পরে সমগ্র বিশ্ব।
মাত্র কয়েক হাজার যোদ্ধা নিয়ে এমন অভিলাষ উদ্ভট শোনালেও ইতিমধ্যে সিরিয়া ও ইরাকের একটা অংশ তাদের দখলে। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার মুসলিম বাসনাকেও তারা উসকে দিয়েছে। নাৎসি আন্দোলনও ঠিক এভাবেই শুরু হয়েছিল—সেই অসন্তোষ, সেই প্রতিশোেধর স্পৃহা এবং গরিব ও লাঞ্ছিতদের সেভাবেই দলে টানা। সব আরব রাষ্ট্রের হুমকি হয়ে উঠতে এদের হয়তো কয়েক বছর লাগবে। তারা ইসরায়েলকেও চ্যালেঞ্জ জানাবে। এর গতি বজায় থাকলে আসাদ সরকার অচিরেই উচ্ছেদ হবে এবং আইসিস পৌঁছে যাবে ইসরায়েলি সীমান্তে।
উত্তরে এ রকম বিপদ ঘনিয়ে আসার সময় গাজায় দেশপ্রেমিক-ইসলামি খুদে শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অর্থহীন। আরব জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে, বিশেষত ফিলিস্তিনের সঙ্গে—পিএলও ও হামাস উভয়ের সঙ্গেই— শান্তি কায়েমের জন্য ইসরায়েলের হাতে সময়ও খুব কম। কিন্তু এটা আমাদের করতেই হবে। কারণ, এর বিকল্প হবে আরও ভয়াবহ।

দি আউটলুক থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
ইউরি আভনেরি: ইসরায়েলের শান্তিবাদী আন্দোলন গুশ সালোমের নেতা, সাবেক সাংসদ এবং লেখক।

আত্মহত্যা ও গণমাধ্যমের দায় by সাইফুল সামিন

১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে ৪ সেপ্টেম্বর জেনেভা থেকে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যা করছেন। বছরে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা আট লাখ। আত্মহত্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত চার বছরে দিনে গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। আত্মঘাতীদের বড় অংশের বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে।

ডব্লিউএইচওর জেনেভা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আত্মহত্যা নিয়ে গণমাধ্যমগুলো বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করায় অনেকে সেখান থেকে উৎসাহিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। সংবাদমাধ্যমের প্রচারের সঙ্গে আত্মহত্যার হার কম-বেশি হওয়ার কার্যকারণ সম্পর্কের দিকটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্তত অর্ধশতাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে আত্মহত্যার প্রচার, নাটকীয় বা রং মেশানো বিবরণ, চাঞ্চল্যকর শিরোনাম, স্পর্শকাতর ছবি-ভিডিওর ব্যবহার মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আত্মঘাতী ব্যক্তির স্বজনদের
আহাজারি অনেকের কাছে ভুল বার্তা দেয়। তাঁরা আত্মহত্যাকে মনোযোগ আকর্ষণ বা নিকটজনকে আঘাত দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার উপায় বলে বিবেচনা করেন। গণমাধ্যমে আত্মহত্যার কারণগুলোকে অতিসাধারণীকরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয় পরীক্ষায় ফেল, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রভৃতি কারণে ব্যক্তি আত্মঘাতী হয়েছেন। অথচ আত্মহত্যা কোনো একক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়। ব্যক্তির আত্মহত্যার মানসিক ও অন্যান্য কারণ কখনোই গণমাধ্যমে উঠে আসে না।
ইদানীং পরীক্ষায় ফেল, ইভ টিজিং, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহের জের ধরে আত্মহত্যার খবর অহরহ আমাদের গণমাধ্যমে আসছে। আপাতদৃষ্টিতে এই প্রতিবেদনগুলোকে নির্দোষ মনে হয়। কিন্তু শেষ বিচারে তা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে। কারণ, এই প্রতিবেদনগুলো শিখিয়ে দিচ্ছে—পরীক্ষায় ফেল বা ইভ টিজিংয়ের গ্লানি থেকে মুক্তির মোক্ষম উপায় আত্মহত্যা। কিংবা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া স্বামীকে শায়েস্তা করার সহজ পথ সন্তানসহ স্ত্রীর আত্মহত্যা। গণমাধ্যম থেকে মানুষ আত্মহত্যার প্লট খুঁজে নেয়, অনুকরণ করে। প্রচারিত প্রতিবেদন পাঠক-শ্রোতা-দর্শক আত্মহত্যার কারণ, স্থান, পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে যান। কোনো ব্যক্তির জীবনে একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে, তাঁরা আত্মহত্যার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আগ্রহী হন।
হলিউড তারকা মেরিলিন মনরো ১৯৬২ সালের আগস্টে আত্মহত্যা করেন। এ খবর গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। এর পরের মাসেই দেশটিতে আত্মহত্যার হার ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০০১ ও ২০০৪ সালে অস্ট্রিয়ায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, কোনো তারকার আত্মহত্যার খবর যে মাসে পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে, সে মাসে আত্মহত্যা কিংবা আত্মহননের চেষ্টা বেড়েছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, টেলিভিশনে প্রচারিত আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের কারণে জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যার হার ১০ দিনে বেড়ে গেছে। আবার গবেষণায় এমনও দেখা গেছে, গণমাধ্যমে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রচারের ধরনে পরিবর্তন আত্মহননের হার কমাতে সাহায্য করে। ১৯৭০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত না হওয়ায় ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার কমে গেছে। ২০০৩ সালের অক্টোবরে সাংবাদিক ইয়ান ম্যাকলিয়ড ও অ্যান্ড্রু ডাফি তাঁদের গবেষণাধর্মী নিবন্ধে উল্লেখ করেন, প্রকৃতপক্ষেই গণমাধ্যমের সচেতন প্রতিবেদন বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ প্রচার-সংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালা রয়েছে। জাপানের গণমাধ্যমে তারকা বা বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব না হলে আত্মহত্যাকারীর নাম ও আত্মহত্যার কারণ উল্লেখ করা হয় না। নরওয়ের গণমাধ্যমে কখনোই ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি উল্লেখ করা হয় না। ডেনমার্কে জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হলে ‘আত্মহত্যা’ বা ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ শব্দ পরিহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির ৩৬টি দৈনিকের মধ্যে মাত্র তিনটিতে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তুরস্কের গণমাধ্যমে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে কোনো ধরনের ভিডিও, ছবি ও গ্রাফিকস প্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে বিবিসির নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর বাইরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক, অলাভজনক ও বেসরকারি সংস্থা গণমাধ্যমে আত্মহত্যার প্রতিবেদন প্রচারের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করেছে।
আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের (আইএএসপি) নির্দেশনায় অতিরঞ্জন, কারণ সাধারণীকরণ, স্থান-পদ্ধতির হুবহু বিবরণ, চাঞ্চল্যকর ভাষা, সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে উপস্থাপন, গুরুত্ব দিয়ে প্রচার, ফলাও প্রচার পরিহার করতে বলা হয়েছে। সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে শিরোনাম, ছবি-ভিডিও ব্যবহার ও তারকাদের আত্মহত্যার খবর পরিবেশনে। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের মতামত উপস্থাপন, সচেতনতা সৃষ্টি, সাহায্য-প্রাপ্তির তথ্য, শোকাহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং খোদ সংবাদকর্মীদের ওপর আত্মহত্যার সংবাদের প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার সুপারিশে আত্মহত্যার প্রতিবেদন সাদামাটাভাবে উপস্থাপন, ধারাবাহিক প্রচার পরিহার, আত্মঘাতী ব্যক্তির নাম গোপন বা ছদ্মনাম ব্যবহার, ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্ক স্থাপন করতে সংবাদকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে ‘আত্মহত্যা’ শব্দ ব্যবহার, গ্রাফিকস ব্যবহার, কারণ চিহ্নিতকরণ, চিরকুট প্রকাশ, স্বজনের আহাজারি ও শেষকৃত্যর বিবরণ, আত্মহত্যাকে সফল বা ব্যর্থ বলা, মহামারি হিসেবে উপস্থাপন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও ফিচার পরিহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার মহান ব্রতের অংশীদার গণমাধ্যম। সংগত কারণেই আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা কাম্য। গণমাধ্যমের একটু অসতর্কতা, দায়িত্বহীনতায় সমাজে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। নিভে যেতে পারে কোনো মূল্যবান জীবনপ্রদীপ। তখন সেটাকে ‘আত্মহত্যা’ না বলে ‘হত্যা’ বললেও ভুল হবে না।
সাইফুল সামিন: সাংবাদিক।
saiful.samin@yahoo.com

শান্তিপূর্ণ বনাম সহিংস আন্দোলন by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে এখন এ কথা স্পষ্ট যে বর্তমান সরকার বিএনপি বা ২০-দলীয় জোটের সঙ্গে কোনো সংলাপ করতে আগ্রহী নয়। নানা কৌশলে আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে চায়। বিএনপি নির্বাচন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে। বিএনপির নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য শুনে মনে হয়, তাঁরা আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান। এ ছাড়া বিএনপির আর বিকল্প কিছু নেই। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বড় নেতারা বারবার বলেছেন, ‘তাঁরা বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন প্রশ্নে কোনো সংলাপে আগ্রহী নন।’ আওয়ামী লীগের এই অবস্থান গণতন্ত্রমনা ব্যক্তি ও বিদেশি বন্ধুরা কীভাবে নেবেন জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা এগুলোকে থোড়াই কেয়ার করেন। ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনেক নেতাই বলেছিলেন, ‘এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। কিছুদিন পরেই সব দলের অংশগ্রহণে আবার নির্বাচন হবে।’ (সূত্র: বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি, বেতার) মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই এখন এই বক্তব্য প্রকাশ্যে ও মিডিয়ায় অস্বীকার করছেন। কোনো গবেষক নভেম্বর-ডিসেম্বরের (২০১৩) পত্রপত্রিকা ও টিভির ‘খবর’ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাদের এই বক্তব্যের একটা সংকলন প্রকাশ করে এই মিথ্যাচারের জবাব দিতে পারেন। বিএনপিও এ কাজ করতে পারে।

আমাদের রাজনীতিতে মিথ্যাচার, কথা বলে তা ফিরিয়ে নেওয়া, কথা অস্বীকার করা, ভুল স্বীকার না করা—এগুলো কোনো ‘অন্যায়’ বলে বিবেচিত হয় না। রাজনীতিবিদেরা নিজেরাই একটা ধারণা তৈরি করেছেন, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ এ কথার কোনো অর্থ হয় না। একমাত্র সুবিধাবাদী ও স্বার্থপর রাজনীতিকেরাই এমন কথা বলতে পারেন। যাঁরা এ কথাটি বলেন, বুঝতে হবে, তাঁরা আদর্শের রাজনীতি করেন না, ধান্দার রাজনীতি করেন। কাজেই ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ এখন যে আগের কথা অস্বীকার করছে, তা আমাদের রাজনীতিতে নতুন নয়। দেশের পরিস্থিতি এখন আন্দোলনের অনুকূলে নয়, এটা আওয়ামী লীগের নেতারা বুঝতে পেরেছেন বলে আগের কথা অস্বীকার করছেন। এটাও তাঁদের একটা কৌশল।
বিএনপির অবশ্য উচিত শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দেওয়া। কারণ শেখ হাসিনা সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিকে সরাসরি মাঠে নামার সুযোগ করে দিয়েছেন। সরকার চাইলে সংলাপের নামে এক-দুই বছর সময়ক্ষেপণ করতে পারত। দেশে ও বিদেশে এমন একটা ধারণা দিতে পারত যে সরকার নির্বাচন নিয়ে সংলাপ করছে। দেশে তো বটেই, বিদেশেও বিভিন্ন বন্ধু সরকার বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। শেখ হাসিনা সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিদেশে বন্ধু সরকারগুলোর কাছেও এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, ‘তাঁর সরকার সংলাপে আগ্রহী নয়, তাঁরা বিএনপিকে মাঠে মোকাবিলা করতেই আগ্রহী।’
এখন বিএনপি কী করবে? তাদের দলের পক্ষ থেকে বারবার আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সরকার বলেছে, ‘বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকার বাধা দেবে না। তবে সহিংস আন্দোলন হলে সরকার জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’ বিএনপি কী ধরনের আন্দোলন করার চিন্তা করছে, তা আমরা জানি না। আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে তা আমরা জানতে পারব। আমরা আশা করতে চাই, বিএনপি বা ২০-দলীয় জোট শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করবে। সহিংস, ধ্বংসাত্মক বা জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন বিএনপি করবে না এবং জোটের মধ্যে কেউ করলে তার দায়িত্বও বিএনপি নেবে না।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলেও সরকারের এজেন্টরা বোমাবাজি করতে পারে, গাড়ি পোড়াতে পারে, সম্পত্তি ধ্বংস করতে পারে। এগুলো যে বিএনপি বা জামায়াতই করছে, তা প্রমাণ করা যাবে কীভাবে? সরকারই এ রকম ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে বিএনপি বা ২০-দলীয় জোটের প্রথম কাতারের নেতাদের সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেপ্তার করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। লোকের কাছেও তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। গত আন্দোলনের সময় সরকার যদি গাড়িতে আগুন লাগানোর অভিযোগে সেলিমা রহমানকে গ্রেপ্তার করতে পারে, তাহলে বিএনপির সব নেতাকেই গ্রেপ্তার করা যায়। সরকারের যে এ রকম নীলনকশা নেই, তা কে নিশ্চিত বলতে পারেন? এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তাব, বোমাবাজি, গাড়িতে বা বাসে আগুন দেওয়া, সম্পত্তি ধ্বংস করার কাজে যারা যুক্ত থাকবে, প্রথমত, তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। কারণ, প্রধানত তারাই প্রকৃত অপরাধী। অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা ও শাস্তি দেওয়াই হলো আইন। বাস্তবে দেখা যায়, সরকার তাদের গ্রেপ্তার না করে ‘পরিকল্পনাকারী’, ‘অর্থ জোগানদাতা’ অভিযোগে বিএনপির নেতাদের গ্রেপ্তার করে।
এ ব্যাপারে বিএনপি কী কৌশল অবলম্বন করবে জানি না। তাঁরা কী ধরনের আন্দোলন করতে চায় বা আন্দোলন করার শক্তিই বা তাদের কতটুকু আছে, তা–ও জানি না। সময়ই সব বলে দেবে আমাদের। নাগরিক সমাজ এখনো অন্ধকারে। তবে বিএনপি যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই করতে চায়, সরকার তা ‘শান্তিপূর্ণ’ থাকতে দেবে না বলে অনেকের আশঙ্কা। আন্দোলন যদি শান্তিপূর্ণই হয়, তাহলে সরকার বা আওয়ামী লীগ ঝাঁপিয়ে পড়বে কার ওপর? বিএনপির নেতাদের গ্রেপ্তার করার উপলক্ষই বা কী হবে? আন্দোলন দমন করবেই বা কোন অজুহাতে? বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করবে আর সরকার বসে বসে সে দৃশ্য দেখবে, এটা কি বাস্তবসম্মত? তা ছাড়া তাদের নেত্রী শেখ হাসিনা তো বলেই দিয়েছেন, ‘মাঠে দেখা হবে।’ শেখ হাসিনা তো কর্মীদের এ কথা বলেন, ‘গ্যালারিতে দেখা হবে।’ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলে আওয়ামী লীগের মাঠে নামার কোনো সুযোগ হবে না।
আমরা আশা করি, বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই করবে। আওয়ামী লীগকে মাঠে নামতে হবে না। গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতে পারবে। এমনকি বাড়িতে বসে টিভিতেও দেখতে পারবে। তবে এই আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করা যেত। শেখ হাসিনার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও দম্ভের কারণে বিএনপি মাঠে নামার সুযোগ পেয়ে গেল।
বিএনপি একদিকে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অপর দিকে আদালত বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা সচল করছেন। বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাসহ ৪১ জন নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও ত্রাস সৃষ্টির মামলায় বিচার শুরু হয়েছে। এ নিয়ে এ ধরনের পাঁচটি মামলায় প্রায় ২০০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এগুলো ছাড়াও আরও অন্তত ৭০টি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর) পাঠক লক্ষ করুন, অভিযোগগুলো কী? ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ। নিঃসন্দেহে এগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আদালতের বিজ্ঞ বিচারকেরা তাঁদের জ্ঞান বিবেচনামতো আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হলে নিশ্চয় যথাযথ শাস্তি দেবেন।
এই মামলাগুলো বিএনপির নেতারা কীভাবে মোকাবিলা করবেন জানি না। এই মামলা থেকে শাস্তি এড়ানোর কোনো পথ আছে কি না, তা আইনজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। যেসব অভিযোগে মামলাগুলো দেওয়া হয়েছে, ঘটনাগুলো তো ঘটেছে। এটা তো মিথ্যা নয়। এখন কে সেই ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটাই হলো প্রশ্ন। বিএনপি এখন আন্দোলন করলে আবার একই ঘটনা ঘটবে না, তা কে বলতে পারে? আবার একই ঘটনা ঘটলে এবার নতুন ২০০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া সহজ হবে।
এগুলো আমাদের দূষিত রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে তার দলের নেতা-কর্মীদের সাত হাজার মামলা তুলে নিতে পারে। দল ক্ষমতায় থাকলে নেতা-কর্মীদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। এ ব্যাপারে আদালতও নিশ্চুপ। মিডিয়াও যে এর বিরুদ্ধে খুব সোচ্চার হয়েছিল এমন দাবি করা যাবে না।
বিএনপির সামনে এখন দুটি পথ: ১. আন্দোলন করা ও আগের মামলাগুলোর কারণে নেতাদের কারাদণ্ড মেনে নেওয়া, ২. আন্দোলন না করা ও মামলাগুলো নিষ্ক্রিয় করা।
অনেকের ধারণা, এই রাজনৈতিক মামলাগুলোর বিচার হলে বিএনপির প্রথম সারির অনেক নেতাই কারাদণ্ড এড়াতে পারবেন না। অগ্নিসংযোগ বা ত্রাস সৃষ্টিতে নেতারা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিক বা না নিক। বিচারে নেতাদের কারাদণ্ড হবে বলে অনেকের আশঙ্কা। আন্দোলনের সময় বিএনপির নেতাদের কারাদণ্ড দেওয়ার জন্যই এই মামলাগুলো দেওয়া হয়েছে। এটা বোঝার জন্য বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। বিএনপি যদি মাঠে নেমে আন্দোলন না করে, শুধু টিভির সামনে হুমকি দিতে থাকে, তাহলে এই মামলাগুলোর গতি শ্ল­থ হয়ে যেতে পারে। জানি না বিএনপি কোনটি বেছে নেবে।
আমরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কথা বলছি। সাধারণ ভোটারদের কথা বলছি না। তাঁরা যে গত সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, তার কী হবে? বিএনপি ও আওয়ামী লীগের লাঠালাঠির জন্য তাঁদেরও কি আরও পাঁচ বছর ভোটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে? ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে আবার প্রমাণিত হয়েছে যে সাধারণ মানুষ (ভোটার) রাজনীতিতে কোনো ফ্যাক্টর নয়। বড় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থই প্রধান ইস্যু। তারাই ‘জনগণের’ নামে ও ‘রাজনীতির’ নামে লুটপাট করে চলেছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কবে হবে জানি না। আদৌ কি হবে?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

সেনাপ্রধান থাকাকালে নিয়ম লঙ্ঘন করেন ভি কে সিং

ভি কে সিং
ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমানে মোদি সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভি কে সিং সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনের সময় নিয়ম লঙ্ঘন এবং সামরিক আদালতে প্রভাব খাটিয়েছেন। এভাবে তিনি জ্যেষ্ঠ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে হয়রানি করেছেন। গত শুক্রবার ভারতের আর্মড ফোর্সেস ট্রাইব্যুনাল (এএফটি) এ কথা বলেছেন। খবর এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার। দার্জিলিংয়ের ‘সুকনা ল্যান্ড কেলেঙ্কারি’র অভিযোগে সামরিক আদালতে শাস্তি পাওয়া ৩৩ কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল পি কে রাথকে খালাসও দেন ওই ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে জরিমানা ও তাঁকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। রাথ সামরিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এএফটিতে আপিল করেছিলেন।
২০০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে সুকনা সামরিক স্টেশনসংলগ্ন চুমটা চা-বাগানের ৭১ একর জমি একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্রে’ সহায়তা করার অভিযোগ উঠে রাথসহ আট সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে ওই জমি দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে সেনা কর্মকর্তারা নিরাপত্তা বিবেচনা ও মূল্যবোধ পুরোপুরি লঙ্ঘন করেছেন। এই অভিযোগে ২০১১ সালে সামরিক আদালত চাকরিতে রাথের জ্যেষ্ঠতা দুই বছরের জন্য স্থগিত করেন, ১৫ বছরের পেনশন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন ও তিরস্কার করেন। ঘটনায় জড়িত থাকায় তৎকালীন সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল আভাদেশ প্রকাশকেও চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করেন সামরিক আদালত। 
শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ জন্য আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিচারপতি সুনীল হালিকে প্রধান করে গঠিত দুই সদস্যের এএফটি গত শুক্রবার বলেন, ওই রায়ের ফলে রাথ হয়রানির শিকার হয়েছেন ও তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। ক্ষতিপূরণ না দিলে বিচারের নামে তাঁর সঙ্গে তামাশা করা হবে। পরে আদালত সেনা কর্মকর্তা হিসেবে রাথের যাবতীয় আর্থিক সুবিধা ১২ শতাংশ লাভসহ পরিশোধের নির্দেশ দেন এবং সেনাবাহিনীকে এক লাখ রুপি জরিমানা করেন। এএফটির কাছে করা আবেদনে রাথ বলেন, ভি কে সিং ওই বিষয়টিতে ‘অন্যায্য মাত্রায় গুরুত্ব’ দিয়েছিলেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রকাশের বিরুদ্ধে ভি কে সিংয়ের ‘সাংঘাতিক আক্রোশ’ ছিল। জেনারেল সিং মনে করতেন, তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছিল, তাতে অন্যায্য অবস্থান নিয়েছিলেন প্রকাশ।

মুরসির বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ

মোহাম্মদ মুরসি
মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল শনিবার একজন সরকারি কৌঁসুলি এ অভিযোগ আনেন। অভিযোগে বলা হয়, মুরসি ও তাঁর সহযোগী মুসলিম ব্রাদারহুডের কয়েকজন নেতা কাতারে রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য পাচার করে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিলেন। খবর রয়টার্সের।
মিসরের নিরাপত্তা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে দেশটি কাতার সরকার ও সে দেশের আল-জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে মুরসির তথ্য পাচারের ব্যাপারে তদন্ত চালিয়েছে। ২০১৩ সালে তখনকার সেনাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

ভারতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মত

ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার শাখা গঠনের ঘোষণায় এ অঞ্চলের সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সচকিত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটির প্রধান আয়মান আল-জওয়াহিরির ঘোষণা হালকা করে দেখছেন না কেউই। তবে ভারতে ঘাঁটি গেড়ে বসার কাজটা আল-কায়েদার জন্য অতটা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন স্থানীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে (আইবি) দীর্ঘদিন কাজ করা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ভারতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোক থাকতে পারে, যারা সমস্যা তৈরির চেষ্টা করবে। তবে দেশটি কখনোই তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ দেবে না। ওই কর্মকর্তা মনে করছেন, নানা কারণেই কোনো বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারতে শিকড় গাড়তে পারবে না। অন্তত সামাজিক বিভাজন খুব বড় হয়ে না ওঠা পর্যন্ত এমন কিছু দেখা যাবে না। ভারতে ইসলামি উদারপন্থার বিকাশ নিয়ে কাজ করে ‘ইসলামিক ফোরাম ফর দ্য প্রমোশন অব মডারেট থট’। সংগঠনটির মতে, ভারতীয় মুসলমানেরা শান্তিপ্রিয়। তারা আল-কায়েদার মতাদর্শকে সমর্থন করে না। তার পরও চরমপন্থা ও ধর্মকে এক করে না দেখার বিষয়ে ইসলামের সতর্কবাণীগুলো তুলে ধরতে জুমার নামাজের বয়ানকে কাজে লাগানো উচিত বলে মনে করেন সংগঠনটির মহাসচিব এ ফজলুর রহমান। ভারতের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করছেন, জাওয়াহিরি যে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে উপমহাদেশে শাখা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, তার উদ্দেশ্য একটাই: আইএসের উত্থানে চাপে পড়া আল-কায়েদার সদস্যদের মনোবলকে চাঙা করা।
একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার মতে, আফগানিস্তানে আরবনিয়ন্ত্রিত আল-কায়েদা ও পশতুভিত্তিক তালেবানের সংস্কৃতিগত পার্থক্য সুস্পষ্ট। আল-কায়েদা সেখানে তালেবানের কাছে কোণঠাসা। প্রতিবেশী পাকিস্তানেও তাই। সেখানে লস্কর-ই-তাইয়েবা (এলইটি) ও পাকিস্তানি তালেবানের উত্থানে আল-কায়েদা আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। ভারতেও তাদের একই সমস্যায় পড়তে হবে। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে আল-উলেমা ও ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের (আইএম) মতো দেশীয় চরমপন্থী গ্রুপের অভাব নেই। তারা আল-কায়েদার দ্বারা দ্বিতীয় শ্রেণির জিহাদি হিসেবে বিবেচিত হতে কখনোই চাইবে না।’ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক প্রধান পি কে হর্মিস থারাকানের মতে, ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি চরমপন্থীদের জন্য আরেকটা প্রতিবন্ধকতা। আশির দশকে ভারতের জিডিপি যখন পাকিস্তানের চেয়ে কম ছিল, তখন কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার চরমপন্থাও কমতে শুরু করেছে। তবে শিক্ষিত তরুণদের একটা অংশের সন্ত্রাসবাদে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি একটা বড় উদ্বেগ বলে স্বীকার করেন থারাকান। ‘পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইএসআই দায়ী’: পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া দেশগুলোর তালিকায় রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল। এই বিশ্লেষক বলেন, পাকিস্তানের ঘরোয়া রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে দেশটির সেনাবাহিনীই ভারতে আল-কায়েদার সর্বশেষ অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে।

বিজেপিকে রুখতে রাষ্ট্রপতির দ্বারে এএপি

দিল্লিতে ‘পেছনের দরজা দিয়ে’ বিজেপির সরকার গঠনের উদ্যোগ রুখতে আম আদমি পার্টি (এএপি) রাষ্ট্রপতির শরণাপন্ন হলো। এএপি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল গতকাল শনিবার রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করে বলেন, অনৈতিক উপায়ে সরকার গঠনের এ আরজিতে তিনি যেন অনুমতি না দেন। কেজরিওয়াল বলেছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও বিজেপিকে সরকার গড়তে দিলে সেটা হবে গণতন্ত্রের হত্যা। তারা টাকা দিয়ে দল ভাঙানোর খেলা শুরু করবে। বিজেপির সাবেক সভাপতি রাজনাথ সিং এএপির এ অভিযোগের জবাবে বলেছেন, সরকার গড়তে তাঁদের অনৈতিক পথ ধরতে হয় না। উপরাজ্যপাল তাঁদের ডাকলে তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন কী করবেন। দিল্লিতে সরকার গঠনের এ উদ্যোগ নিয়েছেন উপরাজ্যপাল নাজিব জং। গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতিকে পাঠানো এক প্রস্তাবে তিনি বলেন, সরকার গঠনের জন্য বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজেপিকে ডাকার অনুমতি দেওয়া হোক। তাঁর বক্তব্য, নতুন করে নির্বাচনের ঘোষণার আগে দেখা দরকার, গরিষ্ঠ দল সরকার গঠনে আগ্রহী কি না। গত বছরের ডিসেম্বরে ভোটের পর কোনো দলই গরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী একক গরিষ্ঠ দল হিসেবে উপরাজ্যপাল বিজেপিকে আমন্ত্রণ জানান। বিজেপি চিঠি দিয়ে জানায়, তাদের পক্ষে সরকার গড়া সম্ভব নয়, যেহেতু তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। বিজেপি রাজি না হওয়ায় কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে এএপি সরকার গঠন করে।
কিন্তু ৪৯ দিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল পদত্যাগ করায় বিধানসভা জিইয়ে রেখে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে (রাজধানী হওয়ায় দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসনের মেয়াদ এক বছরের। অন্যত্র ছয় মাসের) সরকার গড়ার এটা শেষ চেষ্টা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, স্থায়ী সরকার গঠনের সম্ভাবনা না থাকলে অগত্যা আবার ভোট। উপরাজ্যপালের এ প্রচেষ্টার পেছনে অন্য একটা তাগিদও রয়েছে। দিল্লিতে ভোট গ্রহণের দাবিতে এএপির পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলায় আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় সরকারকে জানাতে হবে দিল্লি নিয়ে তাদের ভাবনা কী। সেই শুনানির আগে উপরাজ্যপালের এ উদ্যোগ, যাতে কেন্দ্রীয় সরকারকে আদালতে ভৎ৴সনা সইতে না হয়। বিজেপি কী করবে তা এখনো ঠিক নয়। সরকার গড়া নিয়ে দল বিভক্ত। দলের রাজ্য নেতাদের অধিকাংশ সরকার গড়তে আগ্রহী। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা অন্য দল ভাঙিয়ে সরকার গড়া পছন্দ করছেন না। বিজেপির তিন বিধায়ক লোকসভা ভোটে জিতলেও এখনো তাঁরা বিধানসভার সদস্যপদ ত্যাগ করেননি। ছয় মাসের মধ্যে তাঁদের কোনো একটি পদ ছাড়তে হবে। প্রশ্ন, লোকসভার সদস্য হয়ে তাঁরা কি বিধানসভার আস্থাভোটে অংশ নেবেন? কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন তা করতে রাজি নন। তাঁরা আস্থাভোটে অংশ নিলেও কংগ্রেস বা এএপির ঘর না ভাঙালে বিজেপি সরকার গড়তে পারবে না। সরকার গঠন না হলে চলতি বছরের শেষে চার রাজ্যের বিধানসভার সঙ্গেই দিল্লির ভোট হয়ে যেতে পারে।

ঘরেই বিরোধী নেত্রী শিনজোর স্ত্রী

জাপানের একসময়কার জনপ্রিয় রেডিও ডিস্ক জকি আকি আবের এখন দেশটির প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী। ফার্স্ট লেডি আকির জীবনদর্শন হচ্ছে ‘মনের কথা প্রকাশ করতে পারে না যে নারী, হতাশা নিয়েই তাকে জীবন করতে হয় ফেরি।’ আকি ফার্স্টলেডি হওয়ার প্রথম স্বাদ পেয়েছেন ২০০৬ সালে। সেবার শিনজো আবে প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে আকি যেন স্বামীর সরকারি ঘরে বিরোধী দলীয় নেত্রী। কী ঘরে কী বাইরে, কোনো বিষয়ে মতের মিল না হলে খোলাখুলি কথা বলতে পছন্দ করেন আকি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী স্বামীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও তিনি কড়া সমালোচনা করেন যদি তার কাছে সিদ্ধান্তটা অযৌক্তিক, অ-ন্যায়সঙ্গত, অর্থহীন লাগে। স্বামীর কড়া সমালোচনা শুধু যে ঘরে বসেই করেন তা নয়। দরকার পড়লে ফলাও করে মিডিয়ার কাছেও মুখ খুলতে কোনো সাত-পাঁচ ভাবেন না আকি। ধরুন, পুনরায় পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র চালু করতে চাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে।
আকি মুখ ফুটে বলেই ফেললেন, এটা করা ঠিক হবে না। শিনজোর সরকার এক লাফেই কর বাড়াচ্ছে, প্রতিবাদী আকি মুখ বন্ধ করে বসে থাকার পাত্রী নন। ফুটফাট এই নীতির বিপক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন, তাও আবার মিডিয়ার সামনে। ২০১১ সালের সুনামিতে টোহোকু উপকূলের সমুদ্র-প্রাচীর ধ্বংস হয়ে যায়। এ জন্য শিনজোর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি পরিকল্পনা করছে, ওরকমই আরেকটা বড়সড় প্রাচীর তৈরি করবে তারা। ঠোঁটকাটা আকি বলে বসলেন, ‘ব্যাড আইডিয়া।’ এইসব কারণে আকি আবেকে বলা হয়, ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। জাপানের বিরোধী দলের নেতারাও বোধহয় শিনজো আবের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এত বড় অবস্থান নিতে পারেন না যা শিনজোর বউ হয়েও করে দেখান আকি। বিরোধী দলের প্রতিবাদের ভাষা আকির বিরোধীকণ্ঠের কাছে যেন ক্ষীণসুর। জাপানের ইতিহাসে এ রকম ফার্স্টলেডি কখনও দেখা যায়নি। বউমা আকিকে দেখে একটু অবাকই হন শাশুড়ি ইয়োকো আবে। বউমার মতো তিনি কখনও জনসম্মুখে বলিষ্ঠ কণ্ঠে নিজের মত তুলে ধরতে পারেননি। অথচ তার বাবা নোবোসাকি কিশি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৭-১৯৬০)। স্বামী শিনটারো আবে ছিলেন পররাস্ট্রমন্ত্রী (১৯৮২-১৯৮৬)।

সারদা কেলেংকারিতে মমতার পদত্যাগ দাবি

পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত সারদা আর্থিক কেলেংকারির তদন্তে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে মুখোমুখি বসতে চান তারই এক সময়কার স্নেহভাজন সংসদ সদস্য ও সাংবাদিক কুনাল ঘোষ। শনিবার সকালে আদালতে কুনাল ঘোষ বলেন, ‘জামিন চাই না, সিবিআই হেফাজতে থাকতে চাই। ষড়যন্ত্র খুঁজে বের করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে মুখোমুখি বসতে চাই।’ এদিকে কুনাল ঘোষের এ বক্তব্যের পর কংগ্রেস, বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে মমতার পদত্যাগ ও সিপিএম ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে। সারদা আর্থিক কেলেংকারিতে মমতা ব্যানার্জির নাম জড়ানোতে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেস দাবি করেছে, তদন্তে ‘স্বচ্ছ’ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে মমতার সরে দাঁড়ানো উচিত। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছেন, ‘মমতা ব্যানার্জি রেলমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে রেলের সঙ্গে সারদার চুক্তি হয়েছিল। উনি সারদা গোষ্ঠীর মালিক সুদীপ্ত সেনকে চিনতেন।
রেলের ক্ষমতা ব্যবহার করে উনি সুদীপ্ত সেনকে সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন। সিবিআই তাকে জেরা করুক। আর আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যদি সততা ও স্বচ্ছতার প্রতীক হন, তাহলে পদত্যাগ করুন। সিবিআই যতক্ষণ না তাকে ক্লিনচিট দিচ্ছে, ততক্ষণ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকেও দূরে থাকা উচিত।’ এ ঘটনায় কংগ্রেসের মতো বিজেপিও মমতার পদত্যাগ দাবি করেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা বলেন, ‘হাওলা কেলেংকারিতে নাম ওঠায় সব পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন লালকৃষ্ণ আদভানি। নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার পর ফের তিনি পদে যোগ দেন। মমতা ব্যানার্জিরও পদ ছাড়া উচিত।’ তবে বামফ্রন্ট মমতার সরাসরি পদত্যাগ দাবি না করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেছে। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘২০১২ সালে উত্তরবঙ্গের ডেলোতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সুদীপ্ত সেনের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে সংসদ সদস্য কুনাল ঘোষ আর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির এক নেতা উপস্থিত ছিলেন। ডেলোতে কী কথা হয়েছিল, রাজ্যবাসী জানতে চায়। কার কথায় সুদীপ্ত সেন ভবানীপুরের ক্লাবগুলোতে টাকা দিয়েছিলেন, রাজ্যবাসী তা-ও জানতে চায়।’ শনিবার সারদাকাণ্ডে ধৃত কুনাল ঘোষকে ১০ দিনের হেফাজতে নেয়ার আবেদন জানাল সিবিআই।

কাশ্মীরে ৬০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ বন্যা

ভারতের জম্মু-কাশ্মীর অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ১৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই বন্যায় তিন দিন থেকে এখন পর্যন্ত কয়েকশ’ মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া।স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীও সর্বোচ্চ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। পালবামা এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলাকালে বন্যার পানির তীব্র সে াতের কারণে নয় সেনা সদস্যকে বহনকারী একটি নৌকা ডুবে যায়। পরে অবশ্য তাদের উদ্ধার করা হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে শ্রীনগরে ছুটে গেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া, শ্রীনগরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন রাজনাথ।