Thursday, September 12, 2019

নগ্ন কেটি প্রাইস

পুরো নগ্ন কেটি প্রাইস। না, তার শরীরে একটি সুতাও ছিল না তখন। শুধু মাথায় ছিল একটি হ্যাট। তা দিয়ে এবং কৌশল অবলম্বন করে আড়াল করেছেন শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো। তা সত্ত্বেও প্রকাশ করেছেন শরীরকে। তাতে সম্প্রতি তার বক্ষযুগল স্ফীতকরণ, সজীবকরণ ও মুখাবয়বকে কম বয়সী দেখানোর জন্য যে কসমেটিক সার্জারি করিয়েছেন, তার অনেকটাই প্রকাশিত হয়েছে। কেটি প্রাইস ইংলিশ মডেল, গায়িকা, লেখিকা, ব্যবসায়ী। তিনি নগ্ন পোজ দেয়ার ক্ষেত্রেই যে বেশি পরিচিত এমন নয়। একই রকমভাবে বয়ফ্রেন্ডও ঘন ঘন পরিবর্তন করেন। খেলনা পুতুলের মতো তার চেয়ে কম বয়সী যুবককে বিছানায় শিকারে পরিণত করেন কয়েকদিন। এরপর আরেকজনকে শিকার করেন। এবারও তাই ঘটেছে। এ খবর দিয়েছে বৃটেনের ট্যাবলয়েড একটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ। তাতে কেটি প্রাইসের ওইসব নগ্ন ছবির বেশকিছু প্রকাশিত হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাবেক এই গ্লামার মডেল তুরস্কে ছুটি কাটাতে গিয়ে পুরোপুরি নগ্ন হয়েছেন। তার শরীরে কসমেটিক সার্জারি করাতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার পাউন্ড। একটি সুইমিং পুলের পাশে তিনি তার সেই শরীরকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ সময় কখনো তার মাথায় ছিল একটি হ্যাট। কখনো পেটের ওপর। কখনো বক্ষযুগলের ওপর। এ ছাড়া তার শরীরে পোশাক বা কাপড় বলতে কোনো কিছুই ছিল না।

এমনি বেশ কিছু ছবি তুলেছেন তিনি। এবড়ো-থেবড়ো এবং ময়লাযুক্ত দেয়ালের পাশে তিনি বিভিন্ন ভঙ্গিতে পোজ দিয়েছেন। একটি ছবিতে তাকে দেখা যায় তার চুল ময়লাযুক্ত মেঝেতে বিছিয়ে দিয়ে তিনি শুয়ে আছেন। আর ওই হ্যাটটি রাখা তার পেটের ওপর। কিন্তু শোয়ার সেই ভঙ্গিটি স্বাভাবিক নয়। দু’হাতে এ সময় বক্ষযুগলকে আগলে ধরে আছেন। মাথায় হ্যাট পরে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলেছেন তিনি। একটি ছবিতে দু’পা দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছেন। আর ওই হ্যাটটিই তার গোপন অঙ্গগুলোকে রক্ষা করেছে। কেটি প্রাইস এসব করেছেন নতুন ক্যালেন্ডারের জন্য।

তবে এবার তার সঙ্গে রয়েছেন নতুন বয়ফ্রেন্ড চার্লস ড্রুরি। এর কয়েকদিন আগে ফেলে দিয়েছেন সাবেক বয়ফ্রেন্ড ক্রিস বয়সনকে। এই ক্রিস বয়সনকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রতি থাইল্যান্ডে তিনি নগ্ন উদ্দামতায় মেতেছিলেন। তার কাছ থেকে প্রেম চুষে নিয়েছেন। এখন আর তাকে ভাল লাগে না। তিনি নতুন প্রেমিক বেছে নিয়েছেন। কেটি প্রাইসের প্রেমে মেতে উঠতে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন নতুন প্রেমিক চার্লস ড্রুরি। তিনি একটি বিল্ডিং ফার্মের ইলেকট্রিশিয়ান। কেটি প্রাইসকে সময় দিতে হবে তার সাসেক্সের ম্যানসনে এ জন্য তিনি কাজ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছেন, কেটি প্রাইস ও তার সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেরন চার্লস। তিনি চেয়েছেন মডেলিং করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে। আর এই কাজটি পেয়ে তিনি ভীষণভাবে উদ্বেলিত। সম্প্রতি তাকে সঙ্গে করে তুরস্কে নিয়ে গিয়েছিলেন কেটি প্রাইস। সেখান থেকে ফিরে কাজে যোগ দেয়ার কথা ছিল চার্লসের। কিন্তু তিনি কাজে ফেরেন নি। তার বসকে এসএমএসে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর কাজ করবেন না।

আলোচনায় ধর্মপ্রচারক টিভি তারকা জাকির নায়েক by ম্যাক্স ওয়ালডেন

জাকির নায়েক একজন ভারতীয় ইসলাম প্রচারক। তার আবাসস্থল অবশ্য এখন মালয়েশিয়া। ওয়াশিংটন পোস্ট তাকে ‘টেলিভিশনকেন্দ্রিক ধর্মপ্রচারের রক স্টার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে তিনি আবার পলাতকও। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে তিনি নিজ দেশ ভারতের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে পলাতক। ওই সময় বাংলাদেশে ঘটে যায় এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা। পরে জানা যায়, হামলাকারীদের কেউ কেউ জাকির নায়েকের ভিডিও থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। জাকির নায়েক সালাফি ইসলামের সমর্থক।
তার অনেক বক্তব্যই উস্কানিমূলক। তিনি দাবি করেছিলেন যে, প্রত্যেক মুসলিমেরই সন্ত্রাসী হওয়া উচিত। এমনও বলেছিলেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মঘাতী বোমা হামলা অযৌক্তিক কিছু নয়। ধর্মত্যাগীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রার্থনালয় প্রতিষ্ঠা করতে দেয়া উচিত নয় মর্মেও তিনি বক্তব্য দিয়েছিলেন।
তার টেলিভিশন চ্যানেলের নাম ‘পিস টিভি’। এটি এখন ভারত, বাংলাদেশ ও ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলার পর শ্রীলংকায় নিষিদ্ধ। শ্রীলংকা হামলার অভিযুক্ত মাস্টারমাইন্ড জাহরান হাশিম নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে তিনি নিজের অনুসারীদের আহ্বান জানান তারা যেন জাকির নায়েকের জন্য কিছু করেন। ২০১৬ সালে ভারতের সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী আইনের অধীনে জাকির নায়েকের ‘ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ নিষিদ্ধ করা হয়। অভিযোগ ছিল, ওই প্রতিষ্ঠান ‘ওসামা বিন লাদেনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার’ করছে। তাকে এ বছর অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়।
এশিয়ার অনেক দেশ জাকির নায়েককে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখলেও, মালয়েশিয়ায় তিনি লাল গালিচা অভ্যর্থনা পেয়েছেন। সেখানে তাকে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে তিনি যেখানেই বক্তৃতা দিতে গেছেন, লাখ লাখ মানুষ সেখানে সমবেত হয়েছে।
আগস্টের শুরুতে কেলান্তান অঙ্গরাজ্যে এমনই এক বক্তৃতা প্রদানের সময়, জাকির নায়েক মালয়েশিয়ার সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে চীনা-মালয়েশিয়ানদের তিনি ‘অতিথি’ হিসেবে সম্বোধন করেন, যারা কিনা দেশটিতে উনিশ শতকের শুরু থেকে বসবাস করে আসছে। বর্তমানে চীনা মালয়েশিয়ানদের সংখ্যা মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক সংগঠন ও আইনপ্রণেতারা জাকির নায়েককে ভারতে ফিরে যেতে বলে আসছে। তখন জাকির নায়েক তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তারা এখানে জন্মাননি। যদি আপনারা নয়া অতিথিদের চলে যেতে বলেন, তাহলে পুরনো অতিথিদেরও চলে যেতে বলুন।’ শুধু চীনা মালয়েশিয়ানরা নয়, হিন্দু ভারতীয় মালয়েশিয়ানদের নিয়েও তিনি কথা বলেন। তার ভাষ্য, ভারতে মুসলিমরা যেই অধিকার পায়, তার চেয়ে ১০০ গুণ বেশি অধিকার মালয়েশিয়ায় হিন্দু নাগরিকরা ভোগ করে। তার ভাষ্য, ‘তারা এতটাই বেশি অধিকার ভোগ করে যে, তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করে; মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে নয়।’ তবে জাকির নায়েক বলছেন, তার এই বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিক ও পর্যবেক্ষকরা ব্যাপকভাবে জাকির নায়েকের সমালোচনা করেছেন। তাকে ফেরত পাঠানোর দাবিতে এক পিটিশনে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ সই করেছে। মালয়েশিয়ার পুলিশ পরবর্তীতে তাকে প্রকাশ্যে বক্তৃতা প্রদান থেকে নিষিদ্ধ করেছে। পুলিশের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ও জাতিগত সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
শাসক জোট পাকাতান হারাতানের অনেক নেতা মত দেন যে, জাকির নায়েককে ফেরত পাঠানো উচিত। মালয়েশিয়ার ২৬ বছর বয়সী যুব মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের মালয়েশিয়ান ইউনাইটেড ইন্ডিজেনাস পার্টির যুব শাখার প্রধান সৈয়দ সাদিকও প্রথমে সেই কথাই বলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের চীনা ও ভারতীয় ভাই-বোনদের ওপর আক্রমণ মানে সকল মালয়েশিয়ানদের ওপরই আক্রমণ। আমার সহ-নাগরিকরা আমাদের অতিথি, এমনটা ভাবতেও হাস্যকর লাগে। তারা আমাদের পরিবার। যথেষ্ট হয়েছে।’
তবে এক সপ্তাহ পর সাদিক কিছুটা মত পরিবর্তন করেন। জাকির নায়েককে বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি টুইট করেন, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আসুন সব ভুলে সামনে এগিয়ে যাই। তিনি আরো বলেন, ‘মালয়েশিয়া একটি বহুজাতির ও ধর্মের দেশ। চরমপন্থার চেয়েও মধ্যপন্থা হলো আমাদের পথ। আমাদের ঐক্যই আমাদের শক্তি।’
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সাদিকের মতও গোটা মন্ত্রিসভার সাদৃশ্য। প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরও বলেন, জাকির নায়েক দেশে ফিরলে তাকে হত্যা করা হতে পারে। তার ভাষ্য, ‘তিনি আজকে এখানে আছেন। কিন্তু যদি অন্য কোনো দেশ তাকে নিতে চায়, আমরা স্বাগত জানাবো।’
ওদিকে মাহাথিরের প্রতি লেখা এক খোলা চিঠিতে ভারতীয়-মালয়েশিয়ান কলামিস্ট রবিন্দর সিং লিখেছেন, ‘জাকির নায়েক আজ মালয়েশিয়ান ভারতীয় ও চীনাদের যে আক্রমণ করে কথা বললো, তা আপনারই অন্ধ সিদ্ধান্তের সরাসরি ফল। আপনি কোনো অবস্থাতেই তাকে ফেরত পাঠাবেন না।’
এদিকে দিল্লিতে গত সপ্তাহে ইন্টারপোলের সেক্রেটারি জেনারেল জুর্গেন স্টক সফর করলে, ভারতীয় কর্মকর্তারা তাকে অনুরোধ করেন জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হোক। তবে জাকির সম্প্রতি বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাকে চায়। কিন্তু মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী চান না আমার প্রতি কোনো অবিচার হোক।’ ১০ই আগস্ট কেলান্তানিজ অঙ্গরাজ্যের কোতা বাহরুতে ১ লাখ মানুষের এক সমাবেশে তিনি বলেন, সারাবিশ্বের মুসলমানদের স্বার্থ দেখছেন মাহাথির।
গত সপ্তাহে মালয়েশিয়া তুরস্কের এক পরিবারকে জোর করে ফেরত পাঠিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। তারা বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন। অনেক সমালোচকই তখন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জাকির নায়েককে রেখে দেয়ার তুলনা করেন।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৬০ হাজার আশ্রয় প্রত্যাশী ও শরণার্থী বসবাস করেন। এরা জাকিরের মতন স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা ভোগ করেন না। তবে এই দ্বিচারী ভূমিকার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন মাহাথির।
অনেকে মনে করেন, মালয়েশিয়ায় জাকির নায়েকের উপস্থিতির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর পরোক্ষ সমর্থন ‘প্যাক্ট অব হোপ’-এর পরিপন্থী। এই চুক্তি মোতাবেকই সরকার প্রগতিশীল মূল্যবোধ ও বহুত্ববাদের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এই চুক্তিই ছিল তাদের ম্যান্ডেট, যার ভিত্তিতে তারা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এর মধ্য দিয়ে উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক ইসলামের শক্তিও টের পাওয়া যায়। এই ‘নতুন মালয়েশিয়া’র নববেগবান গণতন্ত্রেও মালায়-আধিপত্যবাদী বিদ্যমান ব্যবস্থাই টিকে রইলো।
(এই নিবন্ধ লো ইন্টারপ্রেটার থেকে নেয়া হয়েছে।)

যে গল্পের শেষ নেই by সুজয় মহাজন

অনন্ত, মানে কোনো শেষ নেই। শিল্পপতি হুমায়ুন জহীরের হাত ধরে জন্ম নেওয়া অনন্ত গ্রুপের ব্যবসারও যেন শেষ নেই, শেষ নেই স্বপ্নেরও। সম্প্রতি এক দুপুরে প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে আজকের অবস্থানে উঠে আসা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের নানা গল্প শোনান চেয়ারম্যান কামরুন নাহার জহীর। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা বড় হলে তাতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। যত দিন সুযোগ আছে, তত দিন আমরা দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগটি করে যেতে চাই। তা ছাড়া আমার স্বামীর স্বপ্ন ছিল তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠানটি একসময় দেশের সেরা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। আমি ও আমার ছেলেরা মিলে সেই স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাচ্ছি।’

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসার প্রয়োজনে একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে অনন্ত গ্রুপ। প্রতিটি উদ্যোগই ব্যবসাসফল। ১৯৯১ সালে মাত্র ৫০০ কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কর্মিসংখ্যা ২৮ হাজার। এর ২৫ হাজারই শ্রমিক। গ্রুপের লক্ষ্য, ২০২৪ সালের মধ্যে কর্মীর সংখ্যা ৮০ হাজারে উন্নীত করা। আর এককভাবে ১০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করা।

পোশাক ব্যবসার বাইরে ব্যাংক, বিমার সঙ্গেও জড়িত এ প্রতিষ্ঠান। নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছে আবাসন ব্যবসা। ২৬ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন কামরুন নাহার জহীর। ১৯৯৩ সালে আততায়ীর হাতে স্বামী হুমায়ুন জহীর নিহত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছিলেন। এর আগে শিক্ষকতা করতেন। শিক্ষকতার প্রতি ঝোঁক দেখে প্রয়াত স্বামী হুমায়ুন জহীরের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা মহিলা কলেজ। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা ভাইস প্রিন্সিপাল। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু তাঁকে শিক্ষকতা পেশা থেকে ব্যবসায়ী করে তোলে। একদিকে ব্যবসা সামলেছেন, অন্যদিকে সংসার। দুই মেয়ে, দুই ছেলে তাঁর। বর্তমানে দুই ছেলেই মায়ের সঙ্গে ব্যবসার হাল ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে বড় ছেলে শরীফ জহীর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। আর ছোট ছেলে আসিফ জহীর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।

কামরুন নাহার জহীরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল তাঁর গুলশানের বাসভবনে, এক দুপুরে। অনন্ত নামকরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালীর অনন্তপুর গ্রামে। আর অনন্ত অর্থ, যার কোনো শেষ নেই। নিজ গ্রামের নামের প্রথম অংশের সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়াত স্বামী প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন অনন্ত গ্রুপ। তাঁর (হুমায়ুন জহীর) স্বপ্ন ছিল অনন্তের পথচলা কখনো থামবে না। সেই স্বপ্নকে ধারণ করে ক্রমশ বড় হচ্ছে অনন্তের ব্যবসা।

২০০৯ সালে কোম্পানির রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৫ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক মিলিয়ে কাজ করতেন সাত হাজার মানুষ। ২০১৮ সাল শেষে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় বেড়ে হয়েছে ৩০ কোটি ডলার বা ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল শেষে এ আয় ৩৫ কোটি ডলার বা ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা তাঁদের। এরই মধ্যে সেরা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের কাছ থেকে সাতবার জাতীয় রপ্তানি পদকও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর ব্যবসায় অসামান্য অবদানের জন্য এ বছর ডেইলি স্টার-ডিএইচএল অ্যাওয়ার্ডে ‘ব্যবসায় অসাধারণ নারী’ হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন কামরুন নাহার জহীর।

অনন্ত গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারকের একটি। আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় স্যুট তৈরির কারখানাটি তাদের। আদমজী ইপিজেডে রয়েছে স্যুট তৈরির আলাদা দুটি কারখানা।।

কামরুন নাহার জহীর জানান, ১৯৯১ সালে এলিফ্যান্ট রোডের নিজস্ব ভবনে যাত্রা শুরু হয়েছিল অনন্ত অ্যাপারেলসের। বর্তমানে সেটি স্থানান্তর করা হয়েছে আদমজী ইপিজেডে। এর বাইরে গাজীপুর, কাঁচপুর ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে কারখানা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তৈরি পোশাকের মধ্যে সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি স্যুট, জিনস, সোয়েটার,নারীর অন্তর্বাস তৈরি ও রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি।

শুরুতে অনন্ত টয় ও অনন্ত পেপার মিল নামে প্রতিষ্ঠানটির দুটি আলাদা কারখানা থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। কামরুন নাহার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে সন্তানদের দায়িত্ব, অন্যদিকে ব্যবসা—দুটোই তিনি শক্ত হাতে সামলেছেন। যে বছর স্বামী মারা যান, তখন সবার বড় মেয়ের বয়স ছিল ২০ বছর, দ্বিতীয় মেয়ের ১৯, এরপরই ছেলে, বয়স ১৬। আর সবচেয়ে ছোট ছেলের বয়স ছিল ৯ বছর। সে সময় ব্যবসার হাল ধরার পাশাপাশি সন্তানদের পড়ালেখা করানো ছিল প্রধান লক্ষ্য। সব সময় পাশে থেকেছেন বাবা-ভাই। এ কারণে বড় ধরনের কোনো প্রতিকূল অবস্থায় কখনো পড়তে হয়নি। কামরুন নাহার জানান, ব্যবসার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কখনো এক দিনের জন্যও ব্যাংকের ঋণখেলাপি হয়নি তাঁর প্রতিষ্ঠান।

দুই ছেলেই ব্যবসার হাল ধরেছেন। তবে ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন মায়ের পরামর্শে। কামরুন নাহারের কাছে প্রশ্ন ছিল, এখন তো সন্তানেরা হাল ধরেছেন। অবসর কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘অনন্তের যাত্রার শেষ বলে কিছু নেই, সেখানে আমার অবসরের ইচ্ছাও নেই।’ প্রতিষ্ঠানটিকে আরও অনেক বড় করতে চান তিনি। সত্যিই তো, অনন্তের পথেই হাঁটছে অনন্ত গ্রুপ।
নিজের কার্যালয়ে কাজ করছেন অনন্ত গ্রুপের চেয়ারম্যান কামরুন নাহার জহীর। ছবি: এবং বাণিজ্য

গ্যাং কালচারের ভয়াল বিস্তার: সাইবার পেট্রলিং শুরু, পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কতা by শুভ্র দেব

প্রতিপক্ষ গ্রুপকে প্রকাশ্যে হুমকি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপের নানা তৎপরতা। দলে নতুন সদস্য সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতা। এলাকা নিয়ন্ত্রণের জন্য আধিপত্য বিস্তার। মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট। ছিনতাই-ইভটিজিং তাদের রুটিন কাজ। পান থেকে চুন খসলেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো। আর খুন-খারাবির ঘটনাতো ঘটছে অহরহ। সাম্প্রতিক সময়ে এভাবেই সারা দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। একই নীতি-স্টাইলে সারা দেশে অন্তত সহাস্রাধিক গ্যাং তৎপরতা চালাচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি থাকা সত্তেও তারা বেপরোয়া। সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। পুলিশ ও র‌্যাবের নিয়মিত ধরপাকড়েও তাদের দমানো যাচ্ছে না। এতে করে এই দুই বাহিনীর পক্ষ থেকে সারাদেশে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ধরপাকড়ের পাশাপাশি শুরু করা হয়েছে সাইবার পেট্রলিং।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, কিশোর বয়সী ছেলেরা নানা অপরাধে জড়িয়ে বিপদগামী হয়ে যাচ্ছে। অভিযান চালিয়ে অনেক কিশোর অপরাধীকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্কুল-কলেজের শিক্ষক, অভিভাবকদের কাছে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা ভবিষ্যতের জন্য একটা হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আজকে যারা গ্যাং কালচার গড়ে তোলে ছোট ছোট অপরাধ করছে। তাদের বড় অপরাধের হাতেখড়ি এখানেই হচ্ছে। ছোট ছোট অপরাধ করে তারা সাহস বৃদ্ধি করছে। তাই এখনই গ্যাং কালচারকে রুখতে হবে।
র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়স চৌদ্দ থেকে বিশের কোটায়। এদের অনেকেই স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেনি। ইউরোপীয় কালচারের আদলে তাদের চলাফেরা। গ্রুপের বেশিরভাগ সদস্য নিত্য-নতুন মডেলের স্পোর্টস বাইক ব্যবহার করেন। মোটা সাইলেন্সরারের ভো ভো শব্দ আর বেপরোয়া গতিতে ছুটে বেড়ায়। মুলত ফেসবুক, ভাইভার, হোয়াটসঅ্যাপ এ তাদের গ্রুপ চ্যাটিং হয়। গ্রুপের নেতা বিভিন্ন নির্দেশনা চ্যাটের মাধ্যমেই জানিয়ে দেন। এমনকি অন্যান্য অপরাধের তথ্যও আদান প্রদান করা হয় এসব মাধ্যমে। তারা আড্ডা জমায় বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের যাওয়া আসার রাস্তায়। রাতের বেলা ফাঁকা রাস্তায় লুটে নেয় পথচারি-রিকশা যাত্রীদের সবকিছু। এছাড়া মাদক ব্যবসা করে যে আয় হয় তা দিয়েই তারা গ্রুপের খরচ চালায়। এসব কিশোর গ্যাংদের সাহস জোগান কথিত রাজনৈতিক বড় ভাইরা। যার কারণে অনেক সময় পুলিশ-র‌্যাব তাদের সম্পর্কে অবগত থাকার পরেও কিছু করার থাকে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর অপরাধীরা। গত আট মাসে চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধীদের হাতে খুন হয়েছেন আরো ৬ জন। গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের কারণে নগরের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে অন্তত ২৫টি।

রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে কিশোররা প্রকাশ্যেই জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতি সংঘাত ও হানাহানিতে। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসপারকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যার ঘটনার পর নগর দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর অপরাধীদের নিয়ে নড়েচড়ে বসেছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ সময় পাড়ায়-পাড়ায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকাও করা হয়েছিল। কিশোরদের আড্ডায় নিয়মিত হানা দিয়েছিল পুলিশ। পুলিশের তথ্যমতে, নগরীতে অন্তত ৩০০ কিশোর গ্যাং চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরীতে কিশোর অপরাধীদের সন্ধানে নেমেছে র‌্যাব। পাশাপাশি সক্রিয় পুলিশও।
৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের দশম শ্রেনির ছাত্র মহসিনকে হত্যা করে আতঙ্ক গ্রুপের সদস্যরা। গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে এবং এক তরুণীকে নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়। ২৯ শে জুন হাজারীবাগ এলাকায় ১৫ বছর বয়সী ইয়াছিন আরফাত ও ৭ জুলাই গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলের নবম শ্রেনীর ছাত্র শাওন খুন হয়। পরে র‌্যাব বংশাল, তাতীবাজার, শাঁখারীবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ ও সূত্রাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ৫৮ জনকে আটক করে। ২০১৮ সালের পহেলা মার্চ পুরাণ ঢাকার শাঁখারী বাজারের শনি মন্দিরের সামনে হলি উৎসবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় রওনক নামের এক কিশোরকে। এ ঘটনায়ও কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের ৬ জানুয়ারি উত্তরার ডিসকো বয়েজ  ও নাইন স্টার গ্রুপের দ্বন্ধে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল এন্ড কলেজের  নবম শ্রেনীর ছাত্র আদনান কবির।

এদিকে রোববার ঢাকা, চাঁদপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় নবনিযুক্ত পুলিশ সুপারদের ব্রিফিংকালে কিশোর গ্যাং কালচার যাতে গড়ে না উঠে সেজন্য তৎপর থাকার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেছেন, গ্যাং কালচারের নামে শিশু-কিশোররা সমাজে নানা ধরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই দেশের কোথাও যেন কিশোর ‘গ্যাং কালচার’ গড়ে উঠতে না পারে সে ক্ষেত্রে জেলার পুলিশ সুপাররা তৎপর থাকতে হবে। পুলিশের সদরদপ্তরের এআইজি সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম রোধে কাজ করছে পুলিশ। এ বিষয়ে জোড়ালো পদক্ষেপ নিতে পুলিশের সকল ইউনিটকে নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি। আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যেগ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের নামে যে সকল কিশোররা নানা অপরাধে জড়িত হচ্ছে তাদের অনেককেই ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। যারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক শাহারিয়া আফরিন মানবজমিনকে বলেন, একটা মানুষ যত ছোট বয়সে অপরাধ শুরু করবে সে তত বড় অপরাধী হবে। আর কোনো কিশোর যদি অপরাধ করার পর তাকে শাস্তির আওতায় আনা না হয় বা পরিবার যদি জোড়ালো পদক্ষেপ না নেয় তবে ওই কিশোর আরও  অপরাধ করার জন্য মোটিভেশন পায়। তিনি বলেন, একটা কিশোর বয়সী ছেলে যদি রাত ১০টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকে তবে আমরা ধরে নিতেই পারি সে কত গুরুত্বপূর্ণ কাজে এত রাত পর্যন্ত বাইরে ছিল। তাই পরিবারের সঙ্গে কিশোরদের বন্ধনটা শক্তিশালী করতে হবে। সে কতটুকু সামাজিক, ধর্মীয় কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। টিভিতে, ইউটিউবে সে কি দেখছে সেদিকে নজরদারি থাকতে হবে। এছাড়া শিশু আইন যেটি করা হয়েছে সেটার প্রয়োগ করতে হবে। আমরা ওই আইনের তেমন কোনো প্রয়োগ দেখি না। এর বাইরে কমিউনিটি পুলিশিং ও ভলান্টিয়ার ক্লাবগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে পাড়া মহল্লায় গড়ে উঠা কিশোর গ্যাং গুলোকে শনাক্ত করা যাবে। কারণ পুলিশ বড় অপরাধীদের পেছনে দৌঁড়াবে নাকি কিশোরদের পেছনে ছুটে বেড়াবে।

সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম মানবজমিনকে বলেন, আকাশ সংস্কৃতি ও বয়সের কারণে কিশোররা গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। কারণ আমাদের পর্যাপ্ত খেলাধুলা বা সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ কম। তাই কিশোর বয়সী ছেলেরা অনেক সময় অলস সময় কাটায়। তখন তারা অনলাইনে মজে যায়। আর সেখান থেকেই তারা গ্যাং কালচার আয়ত্ত করছে। যে সকল পরিবারের অভিভাবকরা ব্যস্ততার জন্য সন্তানকে ঠিকমত সময় দিচ্ছেন না। সে কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, তার একাডেমিক রেজাল্ট ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে  সেদিকে খেয়াল রাখছেন না ওই পরিবারের সন্তানেরা গ্যাং কালচারে সম্পৃক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, কিশোরদের এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য মা বাবাকেই সচেতন হতে হবে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্ণেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, আমাদের গোয়েন্দা তথ্য মতেই আমরা জানতে পেরেছি কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। এর পরে এমন ১৮টি গ্রুপের সদস্যদের ধরে সংশোধনাগারে পাঠিয়েছি। এর পর থেকে ওইসব গ্রুপের তৎপরতা কিছুটা কমেছে। নতুন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে না। বরং এক একটি গ্রুপের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আমরা সাইবার নজরদারি শুরু করেছি। অনলাইনে তারা কি করছে, তাদের গতিবিধি নজরদারি করছি।  তিনি বলেন, গ্যাং কালচারটা সামাজিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে ধরে সংশোধনাগারে পাঠানোর কাজ করতে পারবে।

সেই মেহরীন পেলো নতুন ঠিকানা by মরিয়ম চম্পা

বাথরুমে কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটিকে দত্তক পেতে মাস কয়েক আগে শুরু হয় চতুর্মুখী লড়াই। এদের তালিকায় ছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদসহ নানা পেশার মানুষ। গত ১৪ই মে দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ঢাকা শিশু হাসপাতালের কমন বাথরুমের ভেতর থেকে ৭-৮ দিন বয়সী নবজাতক উদ্ধার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে তাকে   ১৬ই মে দুপুরে আজিমপুরের ছোটমনি নিবাসের কর্মকর্তাদের কাছে তুলে দেয়া হয়। ছোটমনি নিবাসে তার নাম রাখা হয় মেহরীন। সেখানকার শিশুদের দত্তক নিতে আগ্রহী দম্পতিরা পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। মেহরীনকে পেতে ইতোমধ্যে ঢাকার একটি পারিবারিক আদালতে আগ্রহীরা সমাজসেবা অধিদপ্ততের মহাপরিচালক ও ছোট সোনামনি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালককে বিবাদী করে গত ২০শে জুন পৃথক পৃথক আবেদন জমা দেন। বর্তমানে আদালতের মাধ্যমে মেহরীনকে ধানমন্ডির একটি নিঃসন্তান দম্পতির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিশু মেহরীনের বর্তমান বয়স প্রায় ৫ মাস। এ বিষয়ে ছোটমনি নিবাসের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট জুবলি বেগম রানু বলেন, শিশু হাসপাতালে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু মেহরীন এখন পরিবারে চলে গেছে। গত ২৯শে জুলাই ধানমন্ডির এক নিঃসন্তান দম্পতি তাকে আদালতের মাধ্যমে দত্তক নেন। দত্তক নেয়া দম্পত্তি তাদের পরিচয় গোপন রেখেছেন। কারণ এর সঙ্গে তাদের এবং শিশুটির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। ওই দম্পতি আদালতের অর্ডায় নিয়ে আসলে তখন আমরা শিশুটিকে তাদের কাছে দিয়ে দেই। এখানে আমরা সব শিশুকে একই নজরে দেখি। প্রতিবন্ধী, সুস্থ-অসুস্থ, সুন্দর-অসুন্দর সব শিশুই আমাদের কাছে সমান। এবং সমান যত্ন করি। কাজেই শিশু মেহরীন আমাদের কাছে বিশেষ কেউ না। আদালত থেকে সর্বমোট ৮টি সমন পেয়েছিলাম আমরা। উক্ত দম্পত্তি এই ৮ জনের বাহিরের আবেদনকারী। আদালত পরিবারটিকে যোগ্য মনে করেছে বিধায় তাদের কাছে শিশুটির পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব হস্তান্তর করেছে। রুটিন অনুযায়ী ছোটমনি নিবাসের পক্ষ থেকে আমরা শিশু মেহরীনের খোঁজ খবর রাখছি। 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবির বলেন, ছোটমনি নিবাসের কোনো শিশুকে দত্তক পেতে পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী উক্ত পরিবারকে নিশ্চয়তা দিতে হয় যে তিনি শিশুটির দায়িত্ব পালনে সক্ষম বা উপযুক্ত। তখন আদালতের রায় যদি অনুকুলে থাকে তাহলে উপতত্ত্বাবধায়ক সেই ব্যবস্থা করে দিবে। এটা হলো নিয়ম। শিশুটিকে ধানমন্ডির একটি ভালো পরিবার দত্তক নিয়েছে। সে এখন ভালো আছে। সমস্ত বিধি বিধান মেনে আদালতের রায় অনুযায়ী তাকে দেয়া হয়েছে। তার মতো আরো অনেক শিশুই আছে যাকে একাধিক পরিবার দত্তক নিতে চায়। কিন্তু বিধি বিধান অনুযায়ী যদি সমস্ত নিয়ম পূরণ করা না হয় তাহলে আমরা দত্তক দেই না। কারণ এটি একটি স্পর্শকাতর ব্যাপার।

তিনি বলেন, দত্তক দেয়ার পরও শিশুটির সঙ্গে ছোটমনির বন্ধনটি যেন একেবারে ছিন্ন না হয় এ বিষয়ে রুটিন মাফিক খোঁজ খবর রাখা হয়।

কাশ্মীর সংকট: 'ভূস্বর্গ' থেকে 'মৃত্যু উপত্যকা' এবং নারীরা আবার হুমকির মুখে? by মালবী গুপ্ত

একথা সত্য যে স্বর্গের কোন ভাগাভাগি হয় না। যদিও তার দখলদারি নিয়ে দেবতা ও দানবদের মধ্যে লড়াই বেঁধেছে বারবার। এবং দেবতাদের কাছে বারম্বার পরাজিত হওয়ায় দানবদের স্বর্গবাসের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে গেছে।
তবে নাগালের বাইরে বলেই বোধহয় স্বর্গলোক নিয়ে মানুষ তত মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এই ধরাধামেই যদি কোন জায়গা স্বর্গের মত মনে হওয়ায় সে 'ভূস্বর্গ'র আখ্যা পেয়ে যায়?
ঠিক যেমনটা সপ্তদশ শতাব্দীতে কাশ্মীর পেয়েছিল তার অসামান্য প্রাকৃতিক শোভায় অভিভূত মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে। তাহলে যে সেই 'ভূস্বর্গ'র দাবিদার হতে অনেকেই হাতের আস্তিন গোটাবে, তাতে আর আশ্চর্য কি?
কিন্তু কে জানত যে সেই 'ভূস্বর্গ কাশ্মীর'ই একদিন 'মৃত্যু উপত্যকা' হয়ে উঠবে। কে জানত গত কয়েক দশক ধরে সংঘাত দীর্ণ সেই ভূস্বর্গেই নারী ও কিশোরীরা সেনা, আধা সেনাবাহিনী এবং জঙ্গিদের দ্বারা ধর্ষণসহ নানা অত্যাচারের শিকার হয়ে উঠবেন।
এবং কে জানত যে, একেবারে সরকারি সিলমোহর লাগিয়েই সেখানকার মেয়েদের মৌলিক অধিকারগুলিও অচিরেই কেড়ে নেওয়া হবে?
নারীদের প্রতিবাদ: বিশেষ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের বিক্ষোভ
ইতিহাস হাতড়াতে গিয়ে দেখছি - মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া ছুঁয়ে থাকা ভারতীয় উপমহাদেশে জম্মু -কাশ্মীরের যে ভৌগোলিক অবস্থান, তাতে প্রাচীন থেকে মধ্য যুগ - ক্রমান্বয়ে হিন্দু, মুঘল, আফগান, শিখ, ডোগরা রাজা বাদশাহদের শাসনে ছিল সে। ফলে সেই উপত্যকায় হিন্দু-বৌদ্ধ-শৈব হয়ে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইসলাম ধর্মও এসে মিশেছে। এবং মনে হয় যুগ যুগ ধরেই সেই নানা ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরা অন্তর্লীন ছিল উপত্যকাবাসীর জীবন চর্যাতেও ।
কিন্তু ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা সংঘাতের মধ্যে দিয়ে দেশভাগ, ভারতের স্বাধীনতা অর্জন এবং পাকিস্তানের জন্ম হয়, তার মধ্যেই যেন এই উপত্যকায় এক অনিঃশেষ দ্বন্দ্ব - সংঘাতের বীজ লুকিয়ে ছিল। কারণ জম্মু-কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রাজা হরি সিং স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত কেন তিনি ভারতের সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের সংযুক্তি মেনে নিয়েছিলেন?
কিন্তু একটি মুসলমান প্রধান প্রদেশ, একটি হিন্দু প্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে আদৌ অন্তর্ভুক্তি চায় কি না, এবং তাতে তাদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-আর্থ-সামাজিক জীবনে সমস্যা হতে পারে কি না, রাজ্যবাসীর কাছে তা জানতে চাননি হরি সিং।
যে ঐতিহাসিক, ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে দেশের একমাত্র মুসলমান প্রধান রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তি, তাতে হয়তো একটা 'সেফগার্ড'এর প্রয়োজন ছিল। যা সংবিধানের অস্থায়ী ৩৭০ ধারা তাকে দেয়। এবং সেই ধারায় প্রায় ৭০ বছর ধরে রাজ্যটি 'স্পেশাল স্টেটাস'র বিশেষ সুবিধাও পেয়ে এসেছে।
কিন্তু আশ্চর্য, রাজ্যের সেই নিজস্ব সংবিধানই কাশ্মীরি মহিলাদের নানা মৌলিক অধিকার হরণ করে নেয়।
সেই সংবিধানের ৩৫এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপত্যকায় সকলেরই যে 'পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট সার্টিফিকেট' বা পিআরসি থাকা উচিত, তা বাতিল হয়ে যায় যদি কোন কাশ্মীরি মেয়ে পিআরসি নেই এমন পুরুষকে বিয়ে করে।
তখন পিআরসি হোল্ডার'র সমস্ত সুযোগ থেকেই সে বঞ্চিত হয়। সরকারি স্কুল-কলেজে পড়া, কোন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্কলারশিপ, সরকারি অনুদান কিম্বা সরকারি চাকরি পাওয়ার অধিকার সে হারায়।
সেখানে সম্পত্তি কেনা বেচা, এমনকি পারিবারিক বিষয় সম্পত্তির অধিকার থেকেও মেয়েটি বঞ্চিত হয়। তার অধিকার থাকে না নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও।
অথচ কোন কাশ্মীরি পুরুষ অন্য রাজ্যের বা দেশের কোন মহিলাকে বিয়ে করলেও তার স্টেটাসের কোনই পরিবর্তন হয় না। উপরন্তু তার স্ত্রী কাশ্মীরের 'পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট'র মর্যাদা পেয়ে যায়।
তাই হঠাৎ জম্মু-কাশ্মীর থেকে সেই ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা তুলে নেওয়ায়, ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী কাগজে কলমে অন্তত সমস্ত নারী-পুরুষের সমানাধিকার সেখানেও এবার প্রযোজ্য হবে। সরকারের এই পদক্ষেপে জম্মু-কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ আদৌ উজ্জ্বল হবে, নাকি কাশ্মীরিদের জীবন আরও দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, তা এখনই বলা কঠিন।
কিন্তু যেসব কাশ্মীরি মহিলারা তাঁদের জীবনে এই ঘোর বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ওই অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বারবার, তাঁরা অন্তত এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
তবে কাশ্মীরি মেয়েদের জীবনের সুরক্ষা নিয়ে একটা আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
কারণ, ৩৭০ বাতিল হতে না হতেই বিজেপির নেতা, মন্ত্রীরা যেভাবে উঠে পড়ে 'ফর্সা কাশ্মীরি মেয়ে'দের বউ করে আনার ব্যাপারে অকাশ্মীরিদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তা শুধু অশালীন ও অরুচিকরই নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনকও বটে।
বিজেপি ল'মেকার বিক্রম সাইনি তো তাঁর দলের মুসলমান কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন যে, এখন তাঁরা কাশ্মীরে গিয়ে 'ফেয়ার স্কিনড কাশ্মীরি গার্লস' বিয়ে করে আনতে পারেন।
আসলে যে ঘোর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের চিরকালই পণ্য হিসেবে দেখে এসেছে, তারই জেরে হঠাৎ ভূস্বর্গের নারীদের পাওয়া আয়াসসাধ্য মনে হচ্ছে দেশের বহু পুরুষেরই। তারা যেন খেই হারিয়ে ফেলছেন।
তাই তাঁদের ওই 'ফেয়ার স্কিন্ড গার্লস' পাওয়ার লোভের কাছে বিশেষ করে দরিদ্র কাশ্মীরি মেয়েদের নিরাপত্তা কতটা অটুট থাকবে, তা নিয়ে একটা আশঙ্কা জাগছেই। কারণ বিশ্বে কন্যাশিশু ও নারী পাচারে ভারতের স্থান কিন্তু বেশ ওপরের দিকেই।
তাছাড়া ভারতের সংবিধান নারী পুরুষের সমান অধিকার দিলেও অন্যান্য রাজ্যের বেশিরভাগ মেয়েদের মতো কাশ্মীরি মেয়েরাও যে তার নাগাল পাবে না, তাতে সন্দেহ নেই।
তাই সেখানকার হাজার হাজার 'হাফ উইডো', যাঁদের স্বামী নিখোঁজ, সন্তান নিখোঁজ, তাঁদের হদিশ না পেলে, গণকবরে পরিচয়হীন যারা শুয়ে আছেন, তাঁদের পরিচয় না জানালে, সেনাবাহিনীর হাতে অত্যাচারিত ও নিহতদের সেই হাজার হাজার মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যাদের মনের ক্ষত শুকবে কি করে?
গত কয়েক দশক ধরে ধর্ষণ ও গণধর্ষণে অপরাধীদের শাস্তি না দিলে কাশ্মীর ভূখণ্ডের ওপর হয়তো জাতীয় পতাকা ওড়ানো যাবে। কিন্তু কাশ্মীরি নারী-হৃদয়ের এক ইঞ্চি জায়গাও দেশের শাসকরা পাবেন না। এবং জঙ্গিদের সমর্থনে নয়, ভারত সরকারের বিরুদ্ধেই তাঁদের হাতেও হয়তো তখন পাথর উঠে আসবে।
কাশ্মীরি নারীর প্রতিক্রিয়া: ভারত সরকারের বিরুদ্ধেই তাঁদের হাতেও পাথর উঠে আসছে।

আফগানিস্তানে কেনো এতো দীর্ঘ যুদ্ধ হচ্ছে?

তালেবানদের সাথে চলা শান্তি আলোচনা একতরফা ভাবেই বাতিল করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও তখন দু'পক্ষই একটি সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ছিলো।
কিন্তু আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র কেনো যুদ্ধ করছে এবং এটি এতো দীর্ঘায়িত হলো।

সেপ্টেম্বর ১১ হামলা

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলায় আমেরিকাতে নিহত হয়েছিলো প্রায় তিন হাজার মানুষ।
আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকেই এজন্য দায়ী করা হয়।
তালেবান ইসলামি উগ্র গোষ্ঠী যারা আফগানিস্তান শাসন করছিলো ও বিন লাদেনকে সুরক্ষা দিচ্ছিলো।
তারা তাকে হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালো।
৯/১১ এর এক মাস পরে আফগানিস্তানে বিমান হামলা শুরু করলো যুক্তরাষ্ট্র।
আরও দেশ যোগ দিলো সেই যুদ্ধে এবং দ্রুতই ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলো তালেবান।
কিন্তু তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। বরং তারা ফিরে এসেছে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগান সরকারের পতন ঠেকাতে এবং তালেবানদের রক্তক্ষয়ী হামলায় ঠেকাতে লড়াই করছে।

ওসামা বিন লাদেন

প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বিমান হামলার ঘোষণা দেন ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর।
তিনি বলেছিলেন, "এ মিশন হলো আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা এবং তালেবানদের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত করা"।
শুরুতেই তালেবানদের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিলো।
এছাড়া আল কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবিরেও আঘাত হানা হয়।
এরপর ১৮ বছর চলে গেলো। যুক্তরাষ্ট্রের মিশন সফল হয়েছে কি-না তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই।
বরং তালেবান আবারো আফগান সরকারের অংশ হতে পারে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের আলোচনা সফল হয়।
তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ প্রথমে নিয়েছিলো ১৯৯৬ সালে এবং পরে দু বছরের মধ্যে পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তারা উগ্র ইসলামি পন্থা অনুসরণ করে এবং প্রকাশ্যে শাস্তি কার্যকরের পদ্ধতি চালু করে।
যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর দু মাসের মধ্যে তাদের পতন হয় ও তাদের যোদ্ধারা অনেকেই পাকিস্তানে চলে যান।
২০০৪ সালে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকার ক্ষমতা নেয়। যদিও পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় তালেবানদের ব্যাপক সমর্থন ছিলো।
তারা মাদক পাচার, খনি নিয়ন্ত্রণ ও কর আদায় করে শত মিলিয়ন ডলার আয় করে।
যেহেতু তালেবান একের পর এক আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছিলো তাই আন্তর্জাতিক বাহিনী আফগান বাহিনীর সাথে তালেবানের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করতে থাকে।
২০১৪ সালে ন্যাটোর আন্তর্জাতিক বাহিনী তাদের মিশন সমাপ্ত করে তালেবানদের সাথে লড়াইয়ে দায়িত্ব আফগান বাহিনীকে দেয়।
কিন্তু সেটিই তালেবানকে সুযোগ করে দেয় এবং তারা বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে এবং সরকারি বাহিনী ও বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে হামলা করতে থাকে।
গত বছর আফগানিস্তানের ৭০ ভাগ এলাকায় তালেবান সক্রিয় বলে জানতে পারে বিবিসি।

তালেবান কোথা থেকে এলো

যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আগে থেকেই প্রায় বিশ বছর যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে আফগানিস্তান।
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আর্মি দেশটির কমিউনিস্ট সরকারকে সহায়তার জন্য আগ্রাসন চালায়। '৮৯ সালে সোভিয়েতরা চলে যায় কিন্তু গৃহযুদ্ধ অব্যাহত থাকে। আর এ নৈরাজ্যের মধ্যেই তৈরি হয় তালেবান, পশতু ভাষায় যার অর্থ ছাত্র।
তারা প্রথমে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় অবস্থান তৈরি করে এবং ১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান নেয়।
গৃহযুদ্ধে অতিষ্ঠ আফগানদের তখন তারা দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা উন্নত করার অঙ্গীকার করেছিলো।
প্রধানত সৌদি অর্থায়নে তারা ধর্মীয় স্কুল গুলোতে সরব হয়ে উঠে।
চালু করে নিজস্ব শরীয়া আইন। কার্যকর করে শাস্তির নিষ্ঠুর পদ্ধতি।
টেলিভিশন, সিনেমা সঙ্গীত নিষিদ্ধ হয়। পুরুষদের দাড়ি রাখা আর নারীদের বুরকা পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়।

যুদ্ধ কেনো দীর্ঘতর হলো?

এর কারণ অনেক।
তবে আফগান সরকার ও বাহিনীর সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘসময়ের জন্য সৈন্য রাখতে অন্য দেশগুলোর অনিচ্ছার সুযোগে, আবারো শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায় তালেবান।
গত ১৮ বছরে তালেবান ব্যাকফুটেই ছিলো।
কিন্তু ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন ও এক লাখ সৈন্য আফগানিস্তান ছেড়ে যায়।
এটা আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেয়।
যখন আন্তর্জাতিক বাহিনী লড়াই থেকে সরে গেলো আর আফগান বাহিনী দায়িত্ব পেলো, তখন তালেবানের জন্য কাজ আরও সহজ হয়ে গেলো।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দায়ুদ আজামীর মতে যুদ্ধ এখনো চলার কারণ:

১. হামলার রাজনৈতিক অস্পষ্টতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
২. শান্তি আলোচনা চলার সময়েও তালেবানরা তাদের শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে
৩. ইসলামি জঙ্গিদের সহিংসতা বেড়ে যাওয়া
৪. পাকিস্তানের ভূমিকা

কিভাবে তালেবান এখনো শক্তিশালী থাকতে পারলো?

তারা বছরে দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো অর্থ আয় করেছে। এর বড় অংশই মাদক থেকে। আফগানিস্তান বিশ্বের বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশ। যার বেশির ভাগই ব্যবহৃত হয় হেরোইন তৈরিতে।
নিজের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর আদায়ের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ আয় করেছে তারা। আর খনি, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবসা তো রয়েছেই।
পাকিস্তান ও ইরান তাদের অর্থায়নের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কিন্তু ওই অঞ্চলের কিছু ব্যক্তি তালেবানকে সহায়তা করেছে বলেই মনে করা হয়।

কতটা মূল্য নিয়েছে এ যুদ্ধ?

এর উত্তর - সর্বোচ্চ।
কত আফগান সৈন্য মারা গেছে তার হিসেব নেই।
আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বলেছেন ২০১৪ সাল থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৫ হাজার সদস্য নিহত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাহিনীর সাড়ে তিন হাজার সেনা মারা গেছে যার মধ্যে আমেরিকান ২ হাজার ৩০০।
আফগান বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি আরও ব্যাপক। চলতি বছরের এক রিপোর্টে জাতিসংঘ বলছে, ৩২ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইন্সটিটিউট বলছে ৪২ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে।
তাদের হিসেবে ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব ২০০১ সাল থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তৃতীয় প্রেসিডেন্ট যিনি এখন বিষয়টি দেখছেন।
২০২০ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনিও এখন সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে আনতে চাইছেন।
কান্দাহারে মার্কিন সৈন্যের অবস্থানের কাছে একটি শিশু

প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকতো না -সংসদে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না, প্রতিহিংসার রাজনীতিতে  বিশ্বাসীও নয়। সেটা বিশ্বাস করলে এদেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকতো না। তিনি বলেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যার অন্যতম কাজ ও দায়িত্ব হচ্ছে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজের সমন্বয় করা। মন্ত্রীদের কাজের তদারকি করা। জনগণ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। বুধবার সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের লিখিত জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি সরকারের সময় তাদের হাতে আওয়ামী লীগ যে পরিমাণ হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে তা আর কেউ হয়নি। এদেশে জঙ্গি সৃষ্টি, অগ্নিসন্ত্রাস, বোমা হামলা, মানি লন্ডারিং, এতিমের টাকা আত্মসাৎসহ হেন অপকর্ম নেই যে খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে এবং তার দলের নেতারা করেননি। এর আগে রুমিন ফারাহানার প্রশ্ন ছিল- দেশে বর্তমানে মানুষ হত্যা হতে মশা মারা পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রয়োজন হয়। এমন প্রশ্নের তীব্র সমালোচনা করে লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি (রুমিন) একটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অসংসদীয় ও অবান্তর প্রশ্ন এনেছেন। তিনি মানুষ হত্যা আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন। সংসদ সদস্যের নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেই কি প্রশ্নকারী খুশি হতেন? তিনি বলেন, রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতন। এই যন্ত্রের বিভিন্ন কলকব্জা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করে, তখনই রাষ্ট্র ভালো থাকে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র ভালোভাবে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানের অকার্যকর হওয়ার কথা উনি (রুমিন) বলছেন। অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ তো বিএনপিই সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতো রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, সিদ্ধান্ত দিতেন তার পুত্র হাওয়া ভবন থেকে। মন্ত্রী-সচিবরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। যিনি তার জীবনটাই উৎসর্গ করেছিলেন এদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। তার মেয়ে হিসেবে জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। তিনি সেটাই প্রতিপালনের চেষ্টা করেন। সেজন্য দিনরাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সকল প্রতিষ্ঠানকে আরো সক্রিয় রাখার জন্য সদা-সর্বদা সচেষ্ট থাকি।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা এবং জনগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকে বাংলদেশ বিশ্বে একটা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বসেরার জায়গায় দখল করেছে। এসব আপনা আপনি হয়নি।

সকলের পরিশ্রমে হয়েছে। প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না। সংসদ নেতা বলেন, প্রশ্নকর্তা বিএনপি এমপির দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খুনিদের সহায়তায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিহিংসার বলি হয়ে জেলখানায় নির্মমভাবে নিহত হন জাতীয় চার নেতা। জিয়াউর রহমানই তো এ দেশে হত্যা, ক্যু’র অপরাজনীতি শুরু করেন। সশস্ত্র বাহিনীর শত শত অফিসার, সৈনিককে হত্যা করে। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করে। একটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেয় এই মেজর জিয়া। তাই বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যের মুখে মানুষ মারার বিষয়টি অবলিলায় চলে আসে। এটাই তো তাদের দলীয় আদর্শ। আর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া যে তার (জিয়া) চেয়েও এক কাঠি সরেস- সে প্রমাণ তিনি করেছেন। শেখ হাসিনা বলেন, প্রশ্নকর্তার নেত্রী খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলের ৫ বছরে আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকেসহ আওয়ামী লীগের পুরো নেতৃত্বকে নিঃশেষ করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মদদে খুনের নেশায় মত্ত হয়েছিল তার দল বিএনপি। তিনি বলেন, দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ২০১৪ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কথা। প্রশ্নকারী বিএনপির এমপির দল বিএনপি নারী ও শিশুসহ ৫০০ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে।

নির্মমভাবে হত্যা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২৪ সদস্যকে। ৫৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৩ হাজার যানবাহন, ২৯টি রেল, ৯টি লঞ্চ এবং ৭০টি সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। অসংখ্য বৃক্ষ নিধনসহ গবাদি পশু আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। তাদের অগ্নিসন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু ও মহিলারাও। গণফোরামের সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যখন আমাকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে এবং আমি যখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি, তখন আমি মনে করি মানুষের ভালোমন্দ দেখা আমার দায়িত্ব। খালেদা জিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। বেলা ১২টা পর্যন্ত তো ঘুমাই না। বলতে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমাই। বাকি সময় দেশের কোথায় কী হচ্ছে খোঁজ রাখার চেষ্টা করি এবং তার সমাধান করি। তবে সবকিছু আমাকেই দেখতে হবে তা নয়। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৩রা আগস্ট পর্যন্ত সরকার ১ লাখ ৫৭ হাজার এসএস-ওয়ান কম্ব কিটসহ মোট ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২শ’ ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণ কিট আমদানি করেছি। গত ৬ই আগস্ট থেকে বিদেশ হতে কাঁচামাল এনে দেশেই ডেঙ্গু রোগের কিট তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার কিট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণ কিট ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশবাসীকে ডেঙ্গু রোগ মোকাবিলায় নিজ নিজ এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সারাবিশ্বে বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় ১২৭টি দেশে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ ও প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিকিৎসা গাইড লাইন রয়েছে। এই গাইড লাইনের ভিত্তিতে ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে। তারা স্থানীয় চিকিৎসক এবং নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসার জন্য দেশের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে আওয়ামী লীগ ৬৪ জেলায় মনিটরিং টিম গঠন করেছে। এ মনিটরিং টিম জেলা পর্যায়ে জনসতেনতা সৃষ্টি, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে উৎসাহিত করা, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিতকল্পে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ১৭ই মার্চ ২০২০ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিব বর্ষ’-এর আয়োজন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য। নিজের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, দেশের জন্য কী করতে পারলাম সেটাই আমার কাছে মূল লক্ষ্য। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, যেকোনো চুক্তি সম্পাদনের সময় বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই খসড়া প্রস্তুত ও চূড়ান্ত করা হয়। তিস্তাসহ অন্যান্য সকল অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। এ চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এসব বিষয় ভারতের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে অদ্যাবধি চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশ সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্যে সরকারের সহযোগিতায় তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ভারত সফরের সময়ে আমি তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যা সমাধানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করি। তিনি সমাধানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। আগামী মাসে ভারত সফরের সময়েও আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করব। আশা করা যায়, এ ব্যাপারে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রুমানা আলীর প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা জানান, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের চাপে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চূক্তিসমূহ স্বাক্ষর করলেও তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট গড়িমসি করে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী পরিচিতি যাচাইয়ের জন্য মিয়ানমারের কাছে আমরা এ যাবৎ ৩ দফায় ৫৫ হাজার ৫১১ জন রোহিঙ্গার তথ্য প্রদান করেছি। তিনি জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষাপূর্ব বিভিন্ন দফায় এ সকল রোহিঙ্গার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে। তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আমরা দুই দফা প্রস্তুতি নিই। প্রথমবার গত বছরের ১৫ নভেম্বর এবং দ্বিতীয়বার চলতি বছরের ২২শে আগস্ট আরেক দফা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়। কিন্তু যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে সম্মত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। কারণ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। তবে আশা করা যায়, বাংলাদেশের অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শিগগিরই রাখাইন রাজ্যে সহায়ক তৈরি করবে এবং দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া শুরু করবে।

নিজ ভূমে নির্যাতিত পরভূমে আশা-নিরাশার দোলাচলে রোহিঙ্গারা: প্রতিশ্রুতির আখ্যান by হান্নাহ বিছ

এন খু ইয়া, মিয়ানমার-প্রত্যাবাসন কেন্দ্রের মরচে পড়া কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশটা শূন্য। কেউ নেই ওপাশে। প্রত্যাবাসীদের আগমন প্রতীক্ষায় তৃষিত নয়নে চেয়ে আছে ওটা।ইউনিফর্ম পরা অফিসাররা মুখে হাসি নিয়েই ট্রেলারের ওধারে অলস সময় কাটাচ্ছেন। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলিমদের এখানে এসেই ছবি তোলার জন্য লাইনে দাঁড়াবার কথা, পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার কথা। ওদের স্বাগত জানানোর জন্যই ডেস্কের পেছনে অফিসারদের প্রতীক্ষা।
নিরাপত্তারক্ষীরা হাতে দণ্ডের মতো কিছু একটা নিয়ে অপেক্ষা করছে। দেখে মনে হচ্ছে এই নির্জন সীমান্ত যেন কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। খাঁ-খাঁ করা প্রান্তরে অতিথির আগমনে মুখ গোমড়া করে থাকা কোনো মেজবানের হাতে কলম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যের মিলটা ঠিক গোচরে আসে না।
এন খু ইয়া নামের এই প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে একটি জিনিসের বড়ই অভাব প্রকট হচ্ছে। আর তা হচ্ছে স্বয়ং রোহিঙ্গারা।
দুই বছর আগের এমনই এক রোববারে মিয়ানমার থেকে ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। জাতিগত গণহত্যার শিকার এই রোহিঙ্গাদের নিয়ে দুই দেশের সরকারই বলছেন যে সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের মিয়ানমারে শিগগিরই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। সময়ের সঙ্গে বারবার এই প্রতিশ্রুতি কেবলই ভেঙেছে। লক্ষাধিক তো দূরের কথা, হাজারের হিসেবেও রোহিঙ্গারা ফেরত যায়নি।
২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম কিস্তির ১,২০০ জন ফিরে যাবার কথা। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজটা করা সম্ভব হয়নি। শতাব্দীর সবচেয়ে ঘৃণ্য জাতিগত হামলার শিকার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায়।
২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দুই দেশের মধ্যে সুরক্ষিত, স্বপ্রণোদিত প্রত্যাবাসন নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতির কথাবার্তা চলে। নতুন নতুন তারিখ দেয়া হয়। একটির দেখাও মেলেনি।
গত ২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার মিয়ানমার সরকার ৩,৪৫০ জন রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করার কথা বলে। এরপরও সীমান্তের ওপারে কারোর টিকির দেখা মেলেনি।
প্রত্যাবাসনের এই গল্পকে টিকিয়ে রাখা দুই দেশের রাজনীতির জন্যই খুবই ফলপ্রসূ।
জাতিসংঘের প্রস্তাবমতে মিয়ানমারের ওপর গণহত্যার অভিযোগ আনা উচিত, যার সূচনা হয়েছিল ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে। তবে মিয়ানমার নিজেদের ওপর থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন করার দুর্নাম হটাতে বদ্ধপরিকর।
এমনিতেই বাংলাদেশ তার অধিক জনসংখ্যা ও দারিদ্র্য নিয়ে ধুকছে। দেশটি তার জনগণকে ক্রমাগত আশ্বাস দিচ্ছে যে উদ্বাস্তুদের দিকে অপর্যাপ্ত রসদ বণ্টন করে দেয়া হচ্ছে না।
তবে এন খু ইয়ার রোহিঙ্গাবিহীন দালানগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় প্রত্যাবাসনের এই আশ্বাস কতটা ফাঁপা ছিল। জায়গাটা এমনই চুপচাপ যে একটি কুকুরও নির্বিঘ্নে চারপাশে হেঁটে গন্ধ শুঁকে যেতে পারে।
এমনকি ওয়াচ টাওয়ার থেকেও নজর রাখবার জন্য কোনো সৈনিক মোতায়েন করা নেই। দেখার কেউ নেই।
প্রত্যাবাসনের অঙ্গীকার। ব্যর্থতা। পুনঃব্যর্থতা।
বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফিরে যাবার এই ব্যর্থতা কিন্তু আগেরবারে সংঘটিত ঘটনাগুলোরই পুনঃদৃশ্যায়ন। প্রথমে মিয়ানমার প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুরু করার জন্য একটি তারিখ দেয়। তবে স্বল্পসংখ্যক অংশের বরাতেই তা জোটে, যারা প্রত্যাবাসী হবার উপযুক্ত। মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র বাংলাদেশও মিয়ানমারের এই পন্থাকে সমর্থন জানায়।
‘আমি বেশ ইতিবাচক,’ বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.কে.আবদুল মোমেন। আগস্টের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি আরো জানান, ‘আশা করছি এই মাসেই প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবো।’
কিন্তু বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেয়া লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরামর্শ করার বেশি সুযোগ-সময় পায়নি। পাঁচটি বাস এবং দুটো ট্রাক অপেক্ষা করছিল প্রত্যাবাসীদের জন্য। একজন রোহিঙ্গাকেও সেখানে দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংঘগুলো এবার সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নিলো। জানা গেল, যেসব রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় নয়, বরং এখনও ভীত হয়ে এদেশে অবস্থান করছে, তাদের নামও প্রত্যাবাসীদের তালিকায় রয়েছে।
রাধিকা কুমারাস্বামী বৃহস্পতিবার বলেন, রোহিঙ্গাদের এখন ফেরত যাবার মতো মনমানসিকতা নেই। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হিংস্র আক্রমণ নিয়ে প্রমাণ সংগ্রহের মিশনে তিনি জাতিসংঘের একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে কাজ করছেন।
‘উত্তর রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত কিছু ছবি দেখেছি। এখানেই গ্রামগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছিল। একটি গাছেরও দেখা নেই,’ নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।
মিয়ানমারের কাছে এখন একটি চমৎকার ছুতো এসে গেল। তারা এই বলে বিস্ময় দাবি করতে পারে যে রোহিঙ্গারা নিজ থেকেই ফেরত আসছে না।
‘প্রত্যাবাসন কেন শুরু হচ্ছে না, তা বুঝতে পারছি না,’ বলেন রাখাইন রাজ্যের মুখপাত্র উ উইন মিন্ট। এই অঞ্চলটিকেই রোহিঙ্গারা নিজেদের ‘ঘর’ বলত। মিন্ট আরো বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে সবকিছু তৈরিই আছে।’
এমন দৃশ্যের অবতারণা এর আগেও অনেকবার হয়েছে। ফলাফল শূন্য।
মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী উইন মিয়াত আয়ে নভেম্বর মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন যে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে। প্রথম কিস্তিতে এন খু ইয়া প্রত্যাবাসন কেন্দ্র হয়ে ২,১৬৫ জন রোহিঙ্গা এবং পরবর্তী কিস্তিতে ৫,০০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়া হবে।
‘নাগরিকত্বের জন্য তারা আবেদন করতে পারবে। যেখান থেকে তারা এসেছে, সেখানেই তারা বসবাস শুরু করতে পারবে। থাকার জন্য যদি বাড়িঘর না থাকে, তবে নিজেদের এলাকার চারপাশে তারা থাকতে পারবে।’
সরকারপক্ষ থেকে আসা এসব কথা এখন কেবলই ফাঁকা বুলি হয়ে বাতাসে ভাসছে।
মিয়ানমারের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের দেয়া হিসাবমতে জানা যায়, ২০১৮ সালের মে মাস থেকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত কেবল ১৮৫জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত এসেছে। এমনকি ছোট্ট এই সংখ্যাটিরও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই। এদের মধ্যে ৯২ জনকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নৌকায় করে পালাবার সময় ধরে ফেলেছে। বাকি ৬২ জন মিয়ানমার জেল থেকে মাত্র ছাড়া পেয়েছে।
সরকারের মতে, প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ৩১ জন “নিজেরাই সাধ করে” মিয়ানমারে ফেরত গেছে।
সংখ্যা এত কম কেন, প্রশ্ন উঠলে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যুদ্ধরত রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে আসা ত্রাণের প্রতি দোষারোপ করে। এসব কিছুর জন্যই নাকি রোহিঙ্গারা আর দেশে ফিরতে চাচ্ছে না।
‘ক্যাম্পে অবস্থানরত মুসলমান আতঙ্কবাদীরা বোঝাচ্ছে যে এখন ফেরত যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ না। মানুষ তাই সাহসও পাচ্ছে না,’ বলেন উ সোয়ে অউং। রাখাইন রাজ্যের মংদোতে অবস্থিত একটি সাধারণ প্রশাসনিক দপ্তরের প্রধান তিনি। অউং আরো বলেন, ‘এখন ফিরে আসাটা পুরোপুরি নিরাপদ।’
দেশের জন্য মন কাঁদে, কিন্তু মনে জেঁকে আছে ভয়
রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাবার জন্য লাল গালিচা নিয়ে অপেক্ষা করার কথাটি এসেছে স্বয়ং অং সান সু চির মুখ থেকে।
‘তিনি এখন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত, যারা কিছু কারণে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন,’ বলেছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। উইন মিয়াত আয়ে আরো বলেন, ‘ফিরে না আসার কোনো কারণ নেই।’
দেশে ফিরলে কী অপেক্ষা করছে, তা ভাবতে থাকা সন্ত্রস্ত রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাভাবিক। যে কারণে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে এবং ছাড়ার আগে-পরে কী কী ঘটেছে, তা নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট একদল রোহিঙ্গা বিদ্রোহী পুলিশ ফাঁড়ি ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করে বসে। এর কিছু সময় পরই সংখ্যালঘু মুসলমানদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়তে শুরু করল। গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ডের ফলে বেসামাল হয়ে গেল রোহিঙ্গারা। বৌদ্ধ মতাবলম্বীরাও রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে এই শোণিত উপাখ্যানে যোগ দিলো।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (যেসব ডাক্তার দেশ, কাল, পাত্র, সীমানা ভুলে মানবেতর সেবায় এগিয়ে যান) তাদের একটি কথনে বলেন যে হত্যাকাণ্ড শুরু হবার একমাসে অন্তত ৬,৭০০ রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
মিয়ানমার সরকার তাদের এই যজ্ঞকে ‘নির্মূল অভিযান’ আখ্যায়িত করে বলেছে যে শুধু বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করতেই এই আক্রমণ করা হয়েছে। আক্রমণের কয়েক সপ্তাহ আগে সেনাবাহিনীর বিরাট বহর মোতায়েন করা হয়েছে এবং এরপরের দিন থেকে কপ্টার থেকে গ্রামবাসীর ওপর রকেট নিক্ষেপ করা হয়। জাতিগত হামলার এই পরিকল্পনা দেখে বোঝা যায় যে অনেক আগে থেকেই এই পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। বিদ্রোহীদের আক্রমণ শুধু প্রভাবক হিসেবেই কাজ করেছে।
বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানবপাচার রয়েছে, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। মেয়েদের ধরে ধরে পতিতালয়ে পাঠানো কিংবা ছেলেদের দাস বানানো হয় এই অঞ্চলগুলোতে। ক্যাম্পে গরমের মৌসুম এলে মল ও কাদামাটি মিলে নানা রোগজীবাণু ছড়াতে শুরু করে। ভূমিধস একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। উন্মত্ত হাতির কবলে পড়েও প্রাণ হারিয়েছে অনেক রোহিঙ্গা। এখানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কারণ সামান্যই।
তবুও অনেকের কাছে মিয়ানমারের অবস্থা এর চেয়েও খারাপ। তাদের ওপর এতবড় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, এটা দেশের সরকার অকপটে অস্বীকার করে যাচ্ছে। সে দেশে ফেরত যাবার মতো কোনো ভরসা তাদের নেই।
‘যারা আমাদের পরিবার-পরিজনদের এভাবে মেরে ফেলেছে, তাদের কী করে বিশ্বাস করি?’ তুলাতলী গ্রামের একটি পরিবারের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হবার পর কেবল একমাত্র জীবিত আছেন রমজান আলী। তার মুখেই কথাগুলো শোনা গেল।
উত্তর রাখাইনের ওপর এই হত্যাযজ্ঞ চলবার পর কিছু রোহিঙ্গা সেখানে বন্দি হয়ে আছে। তাদের চাকরি, শিক্ষা, সাধারণ সুযোগ-সুবিধা, সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। জুন মাস থেকেই এই অঞ্চলের মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
রোহিঙ্গা পুরুষদের মাঝে কারাবাসের হারটা একটু বেশিই। এদের মাঝে আবার অনেকেই সন্ত্রাসবাদীদের তালিকাভুক্ত। তাদের মধ্য থেকেই জেল থেকে মুক্তি পাওয়া কিছু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসীর ভূমিকায় অভিনয় করে, যদিও এরা আদৌ মিয়ানমার ত্যাগই করেনি।
‘ঘরের কথা খুব মনে পড়ে। কিন্তু পরিবার খুন হয়ে যেতে পারে, এমন একটা জায়গায় আমি আর যেতে চাই না,’ বলেন বাংলাদেশের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা সাইফুল ইসলাম।
ছাইভস্মের ওপর গড়ে তোলা হয়েছে সেনাবাহিনীর ঘাঁটি
মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া যেকোনো রোহিঙ্গাই এখন আমূল বদলে যাওয়া একটি চিত্র দেখতে পাবে।
উত্তর রাখাইনের নোনতা জলাভূমি ধরে এগিয়ে গেলেই নীরবতা টের পাওয়া যাবে। একটা সময় এখানে দশ লাখের মতো রোহিঙ্গা বসবাস করত। অধিকাংশই এখন আর নেই। পুড়ে যাওয়া মসজিদ কিংবা বৃদ্ধের লাঠির মতো ন্যুব্জ হয়ে থাকা খুঁটির অংশ এখন সেটারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। একটা সময় এখানে মানুষ থাকত।
রাখাইনকে বদলে দেবার জন্য সরকার এখন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছে। গড়ে উঠছে নতুন নতুন শক্তিকেন্দ্র, সরকারি দালানকোঠা। বিশেষভাবে বলতে গেলে, সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষীদের ঘাঁটিও গড়ে উঠছে এখানে।
তবে নতুন নতুন স্থাপনাগুলো গড়ে উঠছে জাতিগত নির্মূলের শিকার হওয়া রোহিঙ্গা বসবাসের ছাইভস্মের ওপরেই।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট তাদের আন্তর্জাতিক সাইবার পলিসি সেন্টার থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু ছবি প্রাপ্ত হয়েছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ২০১৭ সালের হত্যাযজ্ঞের পর অন্তত ৬০টি রোহিঙ্গা লোকালয় ভূপাতিত করা হয়েছে। গবেষণায় আরো দেখা যায়, রোহিঙ্গা গ্রাম নির্মূলকরণ প্রক্রিয়া এই বছরও বলবৎ রয়েছে।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কখনো খোলাসা করে বলেনি ফেরত আসা এই রোহিঙ্গারা কোথায় থাকবে। যদিও তাদের বুলিতে প্রত্যাবাসী রোহিঙ্গা পরিবারের জন্য বসতি স্থাপনের কথা বলা হচ্ছে।
মধ্য রাখাইন প্রদেশের অন্তত ১২০,০০০ রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে ২০১২ সালের কোন্দল থেকেই অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ মতাবলম্বীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিনিয়ে নিয়েছে এবং তাদের ঘরও ধ্বংস করে ফেলেছে।
পরিবর্তিত এই রাখাইন রাজ্যের দিকে তাকালে দেখা যায় মুসলমানদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে সেখানে প্যাগোডা নির্মাণ করা হচ্ছে। এই কাজগুলো পাচ্ছে সেনাবাহিনীর মদত পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোই। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো সেনাবাহিনীর ক্ষমতাই প্রকটভাবে দৃশ্যমান।
আগস্টের ৫ তারিখে জাতিসংঘ থেকে পাওয়া প্রমাণাদি থেকে বলা হয়, সেনাবাহিনীর মদত পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে বা তাদের অনুমোদন প্রাপ্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা এমনভাবে রাখাইনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে যেন এখানে কখনো রোহিঙ্গা ছিলই না।
খারাপ কিছু দেখব না
জাতিসংঘ বলছে যেখানে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নেই, সেখানে কোনো উদ্বাস্তু ফেরত যাবার প্রশ্নই আসে না। যদি জোর করে তাদের পাঠাবার ব্যবস্থা করা হয়, সেটা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।
তবে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাবার জন্য রাখাইনের দৃশ্যপট আসলেই পরিবর্তন হয়েছে, সেটা প্রমাণ ও নিশ্চিত করবার চেষ্টা মিয়ানমার সরকার করছে না বললেই চলে।
রোহিঙ্গাদের জবানবন্দি ও মানবাধিকার সংঘগুলোর তদন্তের সূত্রানুযায়ী একথা বিদিত যে দেশটির রক্ষীবাহিনী নির্বিচারে ধর্ষণ ও পলায়নরত শিশুদের দিকেও গুলিবর্ষণ করেছে। দেশটির সরকার এই কথাটি মেনে নিতে নারাজ। তাদের মতে, রক্ষীবাহিনী কোনো অন্যায় কাজ করেনি।
‘একজন নিরীহ মুসলমানকেও হত্যা করা হয়নি,’ বলেন সু অং। তিনি মংদো পৌরসভার একজন কর্মকর্তা। হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ত থাকার কথা অং সান সু চি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। অপরদিকে, জাতিসংঘের নিয়োগকৃত তদন্ত অফিসাররা বলছেন মানবতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য এই অপরাধ সংগঠনের জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের বিচারের আওতায় আনা উচিত।
মিয়ানমার তাদের ঘর হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে অবস্থানরত এই রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসীর আখ্যা দেয়া হয়েছে।
প্রত্যাবাসনের জন্য এগিয়ে আসাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা আসলেই মিয়ানমার থেকে এসেছে। পেছনে জ্বলন্ত বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
এ ছাড়াও বিতর্কিতভাবে আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে। যারা ফেরত আসতে চায়, তাদের পরিচয়পত্র গ্রহণ করতে হবে। এই পরিচয়পত্রে তাদের ভূমিহীনতার কথাটি যে অনুমোদিত হয়ে যাবে, সেটা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিয়ানমার সরকার এমনকি ‘রোহিঙ্গা’ নামটিও মেনে নিতে নারাজ। বদলে, যারা ফিরে আসছে, তাদেরকে বাঙালি বলে পরিচিতি প্রদান করা হবে। বলা হবে যে, এরা বাংলাদেশ থেকে আসা বিদেশি অনধিকার প্রবেশকারী। রাখাইন থেকে আগত কোনো জাতিগত গোষ্ঠী নয়।
‘আমরা রোহিঙ্গা,’ ফিসফিসিয়ে বলেন অশীতিপর বৃদ্ধ আবদুল কাদির। উত্তর রাখাইনের একটি গ্রাম্য মসজিদের ইমাম তিনি। হত্যাযজ্ঞ শুরু হবার সময় পালাতে পারেননি। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আরো বলেন, ‘মিয়ানমারে আর কেউ এখন রোহিঙ্গাদের কথা বলে না। কেউ না।’
‘রোহিঙ্গা বলতে কিছু নেই,’ বলেন এন খু ইয়া প্রত্যাবর্তন কেন্দ্রের অভিবাসন কার্যালয়ের ডেপুটি হেড কিয়াও কিয়াও খাইন। ‘বিদেশিরা কেন এই কথাটা বলে?’
সীমান্তের ওপারে
মিয়ানমার সরকারের ভাষ্যমতে ঘটনাটি পাওয়া যায় এভাবে: রোহিঙ্গারা নিজেদের বাড়িঘর নিজেরাই পুড়িয়ে ফেলেছে আন্তর্জাতিক সমবেদনা ও আনুকূল্য লাভ করার জন্য। বাংলাদেশে মুসলমান দেশগুলো থেকে পাঠানো রসদের ওপর হামলে পড়ার জন্য তারা এই নাটক সাজিয়েছে।
মিয়ানমার সরকার এমনকি বাংলাদেশের ওপরও অভিযোগ এনেছে। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের আদৌ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ইচ্ছা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
‘হয়ত তারা চায় রোহিঙ্গারা ওখানেই থাকুক,’ বলেন উ কিয়াও সেইন, এন খু ইয়া ক্যাম্পের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
সত্যটা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আতিথেয়তা প্রদর্শনে বাংলাদেশ কোনো কমতি রাখেনি। গত কয়েক যুগে কেউ এভাবে সীমান্তের ওপারের একটি দেশ থেকে পালিয়ে আসা মানুষের ঢল দেখেনি। তবে এবার বাংলাদেশেরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে।
বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ঘূর্ণিঝড় কবলিত একটি বেলাভূমির দিকে পাঠানোর হুমকি দিচ্ছে। বাংলাদেশ বিরাট এই রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু হিসেবে মানতে চাইছে না। এই কথাটি জুড়ে দিলে ওদের চিরকাল নির্বাসনে থাকার অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে।
ফলে, ক্যাম্পের বাইরে পড়াশোনা কিংবা কাজ করবার কোনো আইনত অধিকার রোহিঙ্গাদের নেই। মুসলমান আতঙ্কবাদীরা ক্যাম্প মসজিদের চারপাশে টহল দেয়। বিদ্রোহের মাঝেই মুক্তি মিলবে, এই আশ্বাস দেয়।
এখানে একটা জিনিসেরই কোনো অভাব নেই। তা হচ্ছে নিরাশা।
‘আমার বাচ্চারা চিরকাল কি এখানেই পড়ে থাকবে? এরকম একটা জীবনই কি ওদেরকে দেব আমি?’ প্রশ্ন করেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক দলনেতা জনাব ইসলাম।

পাদটীকা: রোহিঙ্গাদের কেউই চায় না, এমনকি তাদের মাতৃভূমিও নয়।
মিয়ানমারের এন খু ইয়া থেকে স নাং এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধি মাইকেল শেউইর্টয মিলে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।
[লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেয়া]

লাল লতিকা হট্টিটি পাখির অদ্ভুত গল্প

লাল লতিকা হট্টিটি; ইংরেজি নাম Red Wattled Lapwing । বৈজ্ঞানিক নাম Vanellus duvaucelli, এটি Perciformes বর্গের পাখি। বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জলাশয়ের উপকূলভাগের একদল ছোট আকারের পাখি।

এক সময় বাংলাদেশের জলাশয়ের পাশে লাল লতিকা হট্টিটির অবাধ বিচরণ আর খাবার খুঁজে বেড়ানোর দৃশ্য ছিল অতি পরিচিত। বিভিন্ন প্রতিকূলতায় সেই দৃশ্য এখন আর সহজে নজরে পড়ে না। তবে পাখিটি একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। হারিয়ে যায়নি মুগ্ধতা ছড়ানো সেই বিচরণ-দৃশ্যও।

হট্টিটি অত্যন্ত চালাক পাখি। লাল লতিকা, ধূসর আর সাদা রঙের পালক এবং হলুদ রঙের লম্বা পায়ের পাখিগুলো দেখতেও খুব সুন্দর। পাখিটির দেহের তুলনায় পা দুটো অত্যধিক লম্বা। পায়ের আঙুলের বিশেষ গড়নের কারণে ওরা গাছের ডালে বসতে পারে না। ডাকে ‘হট-টি-টি হট-টি-টি’ স্বরে। ওরা বাসা বাঁধা ও ডিম দেওয়ার সময় এক রকম, আনন্দে এক রকম, বাচ্চাদের দিকনির্দেশনা দিতে এক রকম এবং সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে ভিন্ন রকম শব্দে ডাকে। অন্য কোনো পাখির ক্ষেত্রে এমনটা একেবারেই বিরল।

পাখিটি বাসা বাঁধে খোলা মাঠ, চষা ক্ষেত, ছোট ঘাস বা বিভিন্ন রকম ছোট উদ্ভিদ-গুল্মের ওপর। নিজের বাসা তৈরিতে এক সপ্তাহ সময় নেয় এই পাখিটি। ছোট মাটির ঢেলা, শামুকের খোল, ইটের টুকরো, পুরনো দালানের পলেস্তারার টুকরো, শুকনো সুপারি, মাটির হাঁড়ি-কলসির চাড়া ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বাসাটি হয় বেশ আগোছালো।

খাদ্যতালিকায় রয়েছে কীটপতঙ্গ, কৃমিকীট ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী ক্ষুদ্র প্রাণী। বীজ ও ছত্রাক, ব্যাঙ ও ব্যাঙাচিও খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

হট্টিটির লম্বা পা নিয়ে একটি জনপ্রিয় গল্প আছে, সৃষ্টির শুরুতে হট্টিটি পাখির গর্ব ছিল যে সে স্বর্গ, আকাশ আর পৃথিবীর ভার বহন করতে পারে। আর তা অন্য পাখিদের কাছে সে সব সময় বলে বেড়াত। এতে পাখিরা বিরক্ত হয়ে একদিন সবাই মিলে বিধাতার কাছে নালিশ করল। নালিশ শুনে বিধাতা হট্টিটি পাখিকে অভিশাপ দিলেন, হট্টিটিকে পায়ের ওপর আকাশের ভার বহন করতে হবে।

এ জন্যই হট্টিটির দেহের তুলনায় পা বেশি লম্বা। আর মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার ভয়ে পাখিটি পা দুটি আকাশপানে তুলে শয়ন করে। বাস্তবে কখনো হট্টিটি পাখিকে আকাশের দিকে পা উঁচু করে থাকতে দেখা যায়নি।

এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়ছে by আলভিতে নিংথুজাম

গত দুই দশকে চীন, সিঙ্গাপুর ও ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পর ইসরাইল এখন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া (বিশেষ করে ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড) ও পূর্ব এশিয়ায় (জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) উপস্থিতি জোরদার করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উভয়পক্ষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে রিয়েলপলিটিক ও কৌশলগত স্বার্থ। এসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কটিকে দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ দেয়া ইসরাইলের লক্ষ্য।

ফিলিস্তিন প্রশ্নটি এশিয়ার অনেক দেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে আছে। আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকার পরও জুলাইয়ের শুরুতে একটি ইন্দোনেশিয় বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের ইসরাইল সফর এই অঞ্চলের সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্রটির ক্রমবর্ধমান অন্তরঙ্গ সম্পর্কের প্রমাণ। ফিলিস্তিনীদের উপর ইসরাইলের নির্যাতন নিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো কয়েকটি দেশে কিছু বিক্ষোভ হলেও এশিয়ার এই অংশের অন্য দেশগুলো ছিলো তুলনামূলক নীরব। এতে এশিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে সাহসী হয়েছে ইসরাইল।

চলতি বছর জুলাইয়ের মাঝামাঝি ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিন দক্ষিণ কোরিয়া সফরে গিয়ে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সফরটি অর্থনৈতিক প্রকৃতির হলেও ইসরাইলী প্রেসিডেন্ট তার দেশের তৈরি ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়াকে পরিচিত করার সুযোগ ছাড়েননি।

এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফরের মধ্যে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রোদ্রিগো দুতার্তের ইসরাইল সফর রয়েছে। সফরগুলো যেসব আলোচনা ও চুক্তি হয় সেগুলোর সামরিক উপাদানগুলো ব্যাপক মনযোগ আকৃষ্ট করেছে। এতে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে পছন্দসই অস্ত্রের উৎস হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ইসরাইল।

গত কয়েক বছরে ইসরাইল ও দক্ষিণপূর্ব/পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সামরিক সম্পর্কটি খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিগত ছয় বছর ধরে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা রফতানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য এই অঞ্চল। ২০১৮ সালে ইসরাইল যে ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র রফতানি করে তার ৪৬% কেনে এশিয়ার দেশগুলো। ইসরাইল শুধু বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ অস্ত্র রফতানিকারকই নয় ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তার অস্ত্রের শীর্ষ তিন আমদানিকারকের মধ্যে ভিয়েতনামের নাম রয়েছে। বাকি দুটি হলো আজারবাইজান ও ভারত। অস্ত্র গবেষণা কর্মসূচির তহবিল যোগানের জন্য ইসরাইলের অস্ত্র বিক্রি করা প্রয়োজন। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা আয় তো রয়েছেই।

ইসরাইলী অস্ত্র তার নিজের ব্যবহার করার সুযোগ সীমিত। ফলে বাজার খুঁজতে গিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া লোভনীয় ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসরাইলের তৈরি আইটেমগুলোর মধ্যে এয়ারক্রাফট ও সংশ্লিষ্ট সিস্টেমগুলোর আপগ্রেড, মিসাইল ও এন্টি মিসাইল সিস্টেম, সীমান্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম, আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, গোয়েন্দা যন্ত্রপাতি ও সামরিক এভিয়েশনের উপাদান। ২০১৮ সালে ইরাইলের প্রতিরক্ষা রফতানির মধ্যে মিসাইল ও মিসাইল প্রতিরক্ষা সিস্টেম  ছিলো ২৪%, ড্রোন ও রাডার সিস্টেম ১৫%, ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ১৪% এবং যোগাযোগ ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম ৬%।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন ও দেশীয়করণ কর্মসূচি, ভূখণ্ডগত বিরোধ, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থীদের উত্থান, ইত্যাদি ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে ওই অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। তাছাড়া এসব দেশের সামরিক সরঞ্জাম পুরনো হয়ে যাওয়ায় তারা বিকল্প ও উন্নত ব্যবস্থা খুঁজছে। ফলে ইসরাইলী প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সামর্থ্য বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের মনযোগ কেড়ে নিয়েছে।

ইসরাইলের অস্ত্র রফতানি নীতির সঙ্গে কোন শর্ত জুড়ে দেয়া হয় না। তাই উপরে উল্লেখিত দেশগুলোর কয়েকটি প্রকাশ্যেই ইসরাইলী অস্ত্রের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ১৯৫০’র দশকের শুরু থেকেই ইসরাইল এই নীতি অনুসরণ করে আসছে। দেশটি তার পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে অস্ত্র রফতানি ও সামরিক সহায়তা কর্মসূচিকে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে যেসব দেশে মানবাধিকার নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে সেখানেও অস্ত্র রফতানিতে পিছ পা হয় না ইসরাইল। এক্ষেত্রে মিয়ানমার ও ফিলিপাইনের উদাহরণ দেয়া যায়।

দুতার্তে সফরের সময় তার সেনাবাহিনীকে গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ প্রতিরক্ষা আইটেমগুলো শুধু ইসরাইলের কাছ থেকে কেনার নির্দেশ দেন। মিয়ানমারের সঙ্গেও ইসরাইল গোপনে অস্ত্র ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করা হয়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইং ইসরাইল সফর করেন। অতি সম্প্রতি, গত জুনে মিয়ানমারের সেনা প্রতিনিধি দলকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করতে দেখা গেছে। যদিও দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ রাখার দাবি করে আসছে তেল আবিব। ইসরাইল অতীতে যেভাবে গোপনে অস্ত্র ব্যবসা করেছে তার আলোকে মিয়ানমারের সঙ্গেও তারা একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

অস্ত্র ব্যবসার বাইরে সন্ত্রাস দমন সহযোগিতা ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে ইসরাইল। চলতি বছরের জুলাইয়ে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রথমবারের মতো ফিলিপাইনের সেনাদলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সন্ত্রাসদমন নিয়ে দুই দেশের একই মনোভাব থাকায় ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা বাড়তে থাকবে।

পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে, জাপানের সঙ্গে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিভাবে এগোয় তা দেখার বিষয়। ২০১৪ সালের মে মাসে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর টোকিও সফরের সময় দ্বিপক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। যদিও এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নি কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে জাপান যদি ইসরাইলের বড় প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয় তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। নিয়মিত অস্ত্রবাণিজ্য ও যৌথভাবে সমরাস্ত্র উন্নয়নের কাজটি শুরু করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে এমনটি হবে না। দেশটি এরই মধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্পর্ক জোরদার করেছে। তবে গত জুনের শেষ দিকে জাপানি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জেনারেল কোজি ইয়ামাজাকির ইসরাইল সফর দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে অংশীদারিত্ব সৃষ্টির প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।

এসব এশিয় রাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে সামরিক সম্পর্কে অগ্রগতি হওয়ার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, উন্নত প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অনুসন্ধান, এবং দক্ষিণপূর্ব/পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কিছু চাহিদা পূরণে ইসরাইলের ইচ্ছার কারণে তাদের মধ্যে সহযোগিতা বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা যোগাযোগকে উৎসাহিত করে যাবে ইসরাইল সরকার। এতে এক সময় দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে।

ইসরাইল এ পর্যন্ত যা অর্জন করেছে তাতে বলতে হয় যে, নেতানিয়াহুর ‘পিভোট টু এশিয়া’ নীতি কিছু ফল দিতে শুরু করেছে। ইসরাইল নৈপূন্যের সঙ্গে এই অঞ্চলে তার পররাষ্ট্রনীতি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাবে।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইল সফরকালে প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিনের সঙ্গে সাক্ষাত করেন মিয়ানমারের সেনা প্রধান মিন অং লাইং

নেপাল কি যুক্তরাষ্ট্রের চীন কৌশলের ঘুঁটি? by ডিং গং

অ্যাঙ্গো-নেপাল যুদ্ধের (১৮১৪-১৬, এতে নেপাল হেরে গিয়েছিল) ফলে নেপালের দক্ষিণ দিকের বিপুল পরিমাণ ভূমি ব্রিটিশদের কাছে ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
ভারত দখল করার পরই ব্রিটেন ধীরে ধীরে নেপালে তার উচ্চাভিলাষ সম্প্রসারণ করতে থাকে। ব্রিটেনের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য ছিল চীনের তিব্বতে যাওয়ার পথ পাওয়া এবং এর মাধ্যমে রাশিয়ার আগে ভূমিটি দখল করে নেয়া।
তবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তিব্বত আক্রমণ করতে গিয়ে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। কিং রাজবংশের (১৬৪৪-১৯১১) কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন, হিমালয়ের ভূ-প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ও ব্রিটিশ জাতীয় শক্তির পতনের কারণে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা তিব্বত দখল করতে ব্যর্থ হয়।
১৯১৮ সালে শেষ হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে ব্রিটেনকে ছাপিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ১৯২৩ সালে নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি সই হয়, নেপালকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ব্রিটেন।
ইতিহাসে নেপালের কৌশলগত অবস্থান দেখা যায়। বর্তমানে এটি চীনের কারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, নেপালের নিকট প্রতিবেশী চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।
এর মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে (ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ) নেপালের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান হারে জোর দেয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত উপসহকারী মন্ত্রী ডেভিড জে র‌্যাঞ্জ ১৪ মে কাঠমান্ডুতে বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি থেকে নেপাল উপকৃত হবে। এই স্ট্র্যাটেজি অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে, যুক্তরাষ্ট্র ও নেপাল উভয়ের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এখনকার দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে চীনকে টার্গেট করে বা চীনকে দমন করার উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করছে না। বরং দাবি করছে, যে এটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালক। কিন্তু এই বক্তব্য অবাস্তব বলে মনে হয়। এই কৌশলের একমাত্র ফলাফল হতে পারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা বাড়ানো।
নেপাল কি এটাই চায়? দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের মাঝে থাকা নেপালের জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র অবগত। কিন্তু নেপালের প্রয়োজনের আলোকে যুক্তরাষ্ট্র তার নীতি নির্ধারণ করছে না।
ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনা করলে বলতে হবে, নেপালের প্রয়োজন পরাশক্তিগুলোর মধ্যে আরো বেশি ভারসাম্য, এই পার্বত্য দেশটির উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে অনুকূল বহিরাগত রাজনৈতিক পরিবেশ। কিন্তু বর্তমানের দ্রুত বিশ্বায়নের মধ্যে সীমিত শক্তি দিয়ে নেপালের পক্ষে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এ ধরনের ভারসাম্য বিধান করা কঠিন হবে। দেশটি তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনটিই গ্রহণ করতে পারে।
নেপালের জনমত সাধারণভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পুনঃনির্বাচন নিয়ে ইতিবাচক। তারা আশা করছে, মোদির নীতি অব্যাহত থাকতে পারে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে নেপালে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, চীনের সাথে সম্পর্ক ক্রমাগত উন্নয়ন। উভয়টিই নেপালের জন্য কল্যাণকর।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের উন্নয়নের ফলে অন্য কোনো শক্তিকে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় কৌশলগত ব্যবস্থায় ঘুঁটি হিসেবে নেপালকে ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
চীনের উন্নয়ন নেপালকে কল্যাণের অংশীদার করেছে। চীনা প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ দেশটির জন্য নজিরবিহীন সুযোগ নিয়ে এসেছে আশপাশের ও বিশ্বের সাথে একে সংযুক্ত করার মাধ্যমে। নেপাল এখন আর বদ্ধ ও গরিব দেশ থাকবে না, বরং পূর্ব, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াকে সংযুক্তকারী কেন্দ্রে পরিণত হবে।
গত ২০০ বছর ধরে ব্রিটশ উপনিবেশবাদীরা নেপালের দিকে চলছে, তাদের পরবর্তী টার্গেট চীনের তিব্বত। কিন্তু ৫০০ বছর ধরে চলা পাশ্চাত্যের সম্প্রসারণ এখন চিরদিনের মতো অবসান হতে শুরু করেছে। সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ প্রতিবেশ সৃষ্টির চীনা নীতি নেপাল ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জনগণকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের এরা সুযোগ দেবে।

তরুণীর ২ হাজার বছরের পুরোনো কবরে ‘স্মার্টফোন’

রাশিয়ার দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো কবর থেকে পাওয়া গেল একটি ‘স্মার্টফোন’। রাশিয়ার বৃহত্তম বিদ্যুৎকেন্দ্রের জলাধারের নিচে এক তরুণীর পুরোনো কবরে সন্ধান পাওয়া গেছে এই ‘স্মার্টফোন’–এর।
রাশিয়ার সায়ানো-শুশেনস্কায়া বাঁধের কাছের আলা জলাধার থেকে পানি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পানি সরতেই সন্ধান মেলে কয়েকটি প্রাচীন কবরের। তবে এত পুরোনো কবরে কীভাবে একটি স্মার্টফোন পাওয়া গেল, তার উত্তর মেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, কবরটি ২ হাজার ১৩৭ বছর আগে জিওনগু শাসন আমলের এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত হুন তরুণীর। ওই তরুণী দক্ষিণ রাশিয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে থাকতেন। কবরগুলো খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের।
২ হাজার ১৩৭ বছর আগে এক সমাধিতে মিলল ‘স্মার্টফোন’। ছবি: টুইটার
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, কবরটি নাতাশা নামের কোনো এক ধনী পরিবারের সন্তানের। আইফোনের মতো দেখতে বস্তুটি আদতে তাঁর পোশাকে সেটে রাখা হয়েছিল। ‘স্মার্টফোন’টি কালো রত্ন-পাথরের খচিত। দামি পাথরগুলো সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক ড. পাভেল লিওস বলেন, ‘নাতাশার কবরটি হুনু-যুগের (জিওনগু)। সেখানে “আইফোন” পাওয়ায় ব্যাপারটি এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ড. লিওস আরও বলেন, ওই কবরের হাড়গোড়ের সঙ্গে বেল্ট ছিল। বেল্টটি চীনের উজহু মুদ্রায় সজ্জিত ছিল। আর সে কারণে এটি কোনো সময়ের, তা জানতে সুবিধা হয়েছে।
রাশিয়ার বৃহত্তম বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছের জলাধারের নিচে এক তরুণীর সমাধিতে পাওয়া গেছে একটি ‘স্মার্টফোন’। ছবি: টুইটার
রাশিয়ার আলাতে নেক্রোপলিসের কাছে বাঁধের উজানের এই জলাধারে পুরোনো কবরটি সন্ধান মিলেছে পানির ৫৬ ফুট নিচে। সেখানে আশপাশে ১১০টি কবরের সন্ধান মিলেছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, ৩২টি কবরের সন্ধান মিলেছে।
রাশিয়া সেন্ট পিটার্সবার্গ ইনস্টিটিউট অব ম্যাটেরিয়াল হিস্ট্রি কালচারের ড. মেরিনা কিউলুনোভাস্কায়া বলেন, ‘এটি চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা। আমরা অবিশ্বাস্য রকম ভাগ্যবান, কারণ ধনী হুন যাযাবরদের প্রাচীন কবরগুলো পেয়েছি। আর বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কবরগুলোয় ডাকাতেরা হানা দেয়নি।’
প্রাচীনকালে স্বর্ণ, হীরাসহ দামি বস্তু দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হতো। আর এ জন্য চোর-ডাকাতেরা কবরগুলো খুঁড়ে রত্ন চুরি করে পালিয়ে যেত। >>>তথ্যসূত্র: দ্য সান
‘স্মার্টফোন’টির পেছনে দামি রত্ন ছিল। ছবি: টুইটার

নমোফোবিয়া : ফোন হারানো চার্জ ফুরানোর ভয় যখন একটা রোগ by আহমেদ দীন রুমি

মোবাইল ফোন বুঁদ করে ফেলেছে আধুনিক প্রজন্মকে
মোবাইল ফোন আমাদের আধুনিক জীবনকে অনেকাংশেই সহজ করে দিয়েছে। অনেক বড় সমাধান থেকে অতি তুচ্ছ প্রয়োজনের জন্যেও হাতের মোবাইলের উপর ঝুঁকে পড়ে অনেকেই। তার ওপর নতুন মাত্রা যোগ করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। সুবিধার চূড়ান্ত দেবার মাধ্যমে এই যে নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে, তা জন্ম দিচ্ছে এক নতুন ধরনের সমস্যার। নমোফোবিয়া, ফোন হারানোর উৎকণ্ঠা কিংবা চার্জ ফুরিয়ে যাবার ভয়।

নমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে ইংরেজি কয়েকটি শব্দের মিশ্রণে। Nomophobia = No + Mobile + Phone + Phobia। নমোফোবিয়াকে প্রথম সংজ্ঞায়ন করে যুক্তরাজ্যের গবেষণা সংগঠন YouGov। সাদামাটাভাবে বললে ফোবিয়া হলো অযৌক্তিক ভয় বা অকারণ উৎকণ্ঠা। আর নমোফোবিয়া বলতে বোঝায় মোবাইলবিহীন থাকার ভয়। সিগনাল কিংবা ব্যাটারিজনিত কারণে মোবাইলের সাথে সংযোগ ছিন্ন হতে পারে, ক্ষণিকের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে; প্রভৃতি কারণে প্রিয়াবিরহের মতো মোবাইলপ্রেমিকের ভেতরে যে উৎকণ্ঠা, তাই নমোফোবিয়া। ২০০৮ সালে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে মোবাইল ব্যবহারকারীদের মধ্যে শতকরা ৫৩ জন এই সমস্যায় আক্রান্ত। অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী তাদের ফোন বন্ধ করেন না। গবেষণায় আরো দেখা গেছে এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

ভ্রমণে কিংবা বাসায়—প্রায়ই এই ধরনের মানসিক বিভ্রান্তির দেখা মেলে। মনোবিজ্ঞানীরা একে “লো-ব্যাটারি অ্যাংজাইটি” বলে চেনেন। মানুষের জীবন দিনকে-দিন বিভিন্ন প্রযুক্তিতে ঘিরে ফেলছে। মানুষের কাজ করে দিচ্ছে নতুন নতুন ডিভাইস। সরাসরি কথা, সামাজিক যোগাযোগ, জিপিএস, গাড়ির সেবা, খাবারের অর্ডার, গেইম, ভিডিও বিনোদন, ব্যাংকিং, ক্যালেন্ডার, ক্যালকুলেটর, পরিবারের ছবি প্রভৃতি এখন কেবলমাত্র একটি ছোট্ট যন্ত্রের মাধ্যমেই সম্ভব—সেলফোন।

জীবন যাপনের সুবিধার জন্যই মানুষ ক্রমশ এনালগ ছেড়ে ডিজিটাল পৃথিবীতে প্রবেশ করছে। সকল ধরনের কাজে সরাসরি নিজেকে না জড়িয়ে ঝুঁকছে অনলাইন সুবিধার প্রতি। আর তাই, অল্প সময়ের জন্য ব্যাটারিতে চার্জ না থাকা কিংবা কোনো কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ভয়ের উদ্রেক করে। হারিয়ে ফেলা কিংবা একা হয়ে যাবার ভয়।

ব্যাটারি যখন শেষ
আধুনিক যামানার ভৌতিক সিনেমাগুলোতেও দেখা যায়, সেলফোনের ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ার মানে একটা খারাপ কিছু ঘটতে চলছে। ব্যক্তিকে একা করে ফেলা ক্লাসিক হররগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৯৬০ সালের Psycho, ১৯৭৪ সালের The Texas Chain Saw Massacre, ১৯৮০ সালের The Shining এমনকি গত ২০১৭ সালের Get Out প্রায় একইভাবে ফুটিয়ে তুলেছে বিষয়টা। মোবাইল না থাকার দরুণ সৃষ্ট এই নিঃসঙ্গতায় ভীতি।

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তির ওপরেই মূলত আমরা দৈনন্দিন জীবনে ভরসা করে থাকি। ১৯৭০ সালের দিকে ইংরেজ রসায়নবিদ স্টেনলি হুইটিংহাম এর আবিষ্কার করেন। তিনি তখন Exxon Corporation-এ গবেষণায় মগ্ন। তবে লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারির আগমন ছিল রীতিমতো বিপ্লবের মতো। লিথিয়াম-আয়ন এবং লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারির মধ্যেকার পার্থক্য ইলেক্ট্রোলাইটের ব্যবহারে।

লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারিতে কঠিন পলিমার ইলেক্ট্রোলাইট ব্যবহার করা হয়। যেমনটা polyacrylonitrile এবং এনোডে প্লাস্টিকজাতীয় পদার্থ। অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়নে জৈব দ্রবণে ইলেক্ট্রোলাইট হিসাবে ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম লবণ। ফলে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তাড়াতাড়ি অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়তে পারে।

আধুনিক যামানায় সেলফোনপ্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে ব্যাটারিপ্রস্তুতি। ব্যাটারি প্রস্তুতকারীরা মনোযোগী অধিক ধারণ ক্ষমতা আনতে। কিন্তু যখনই তারা ব্যাটারির সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, সেলফোন প্রস্তুতকারীরা সাথে সাথেই বের করছে নতুন কোনো ফিচার, যা পাওয়ার কমাবে। এভাবে সেলফোনের ফিচারগুলো ব্যাটারির পাওয়ার নামিয়ে আনে, আর প্রস্তুতকারীরা যোগ করে।

মোবাইল কোম্পানিগুলো ক্রেতার এই উদ্বেগকে ব্যবহার করছে বেশ ভালোভাবেই। চার্জ দেবার জন্য ওয়্যারলেস সুবিধাসহ নতুন সেলফোন আসছে আজকাল। Qi Standard (উচ্চারণ. চি স্ট্যান্ডার্ড) পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আরোহী পদ্ধতিতে চার সে.মি. দূরত্ব পর্যন্ত চার্জ দেওয়া সম্ভব।

চি পদ্ধতিটা মূলত তড়িৎচৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কাজ করে। সেলফোন কোম্পানিগুলো এই বিশেষত্বকে খুব দ্রুত ক্রেতার চাহিদার সাথে মানিয়ে নিচ্ছে। এই সুবিধাহীন পুরানা ধাঁচের মোবাইলগুলোর জন্য এডাপ্টরের মাধ্যমে পোর্টে সংযোগ দেওয়া যায়। এমনিতেই তারের মাধ্যমে চার্জ দেওয়ার চেয়ে ওয়্যারলেস চার্জ সময়বহুল। আর যদি এডাপ্টার ব্যবহার করা হয়, তবে তো কথাই নেই।

দ্য এন্ড্রয়েড পাই অপারেটিং সিস্টেম ব্যাটারি লো হয়ে গেলে ব্যবহারকারীকে নোটিফিকেশন পাঠায়। উপরের কোনায় চার্জের শতকরা প্রদর্শন তো আছেই। আইফোন এক্স তাদের ফোনের ব্যাটারি আইকন থেকে আইকন সরিয়ে ফেলেছে। দেখতে হলে যেতে হবে কন্ট্রোল সেন্টার। সে যা-ই হোক, উভয় ক্ষেত্রেই চার্জ ফুরিয়ে আসতে গেলে নোটিফিকেশন আসে, লো পাওয়ার মুডে চালানোর জন্য; যাতে কম চার্জ ফুরায়।

কাজ হোক আর না হোক, ব্যাটারির সক্ষমতা ক্রেতাকে ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যবসার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর কাছে এটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টোপে পরিণত হয়েছে।

নমোফোবিয়ার লক্ষণ
বছর দশেক আগেও হয়তো কেউ প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে বলত, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। কিন্তু হাল আমলে সেই স্থান দখল করেছে সেলফোন। মনোবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য মতে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকেই ধরে নিতে হবে নমোফোবিয়ার লক্ষণ—
১) রাতে ঘুম ভেঙে যদি প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর সেলফোন চেক করতে হয়।
২) দুপুরে কিংবা রাতে খাবার সময়েও যদি মোবাইল প্রাধান্য পায়।
৩) ব্যাটারি ফুরিয়ে যেতে চাইলে যদি চার্জে দেবার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়ে।
৪) ফোনে সিগনাল না থাকলে যদি মনে হয়, জীবন থেকে বাইরে।
৫) যত ব্যস্ততাই থাক, যদি ফোনের জবাব দেবার জন্য ভেতর থেকে তাড়না আসে।
৬) ওয়াশরুমে পর্যন্ত ফোন হাতে করে নিয়ে যাবার অভ্যাস গড়ে উঠলে।
৭) এই আর্টিকেল পড়ার মধ্যে বেশ ক’বার যদি ফোন চেক করে ফেলা হয়।

নমোফোবিয়ার ক্ষতি
বেশিরভাগ সমস্যাই মনস্তাত্ত্বিক। তবে এর ফলাফল সদূরপ্রসারী। ব্যক্তিগত জীবন থেকে সামাজিক জীবনে বাধাগ্রস্ত হতে পারে তুচ্ছ এক অভ্যাসের কারণে। ক্রমানুসারে উল্লেখ করলে—
১) যেহেতু উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়, সেহেতু রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে ব্যক্তির নিজের কাজের দিকে মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে উৎপাদন ক্ষমতায় কমে যায়।
২) সময়ের দারুণ অপচয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একসাথে বহু কাজ করার মানে কোনো কাজই না করা। হাতে মোবাইল নিয়ে অন্য কাজ করতে চাওয়াটা অন্য অর্থে সময় নষ্টের নামান্তর।

৩) ঘুমের প্যাটার্ন বিঘ্নিত করে। ফোন থেকে নীল আলো চোখে পড়া ঘুমের জন্য ক্ষতিকর। এর কারণে মেলাটোনিন হরমোনের ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, মেলাটোনিন হরমোন ঘুমের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দায়ী।
৪) লাগাতার ফোনের সাথে লেগে থাকা চর্মরোগ, এলার্জি কিংবা নানা ধরনের রোগের জন্ম দিতে পারে।
৫) সর্বোপরি বন্ধু ও পরিবারের সাথে বিদ্যমান সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। বন্ধু বা পরিজনের সাথে কথা বলার সময় ঘন ঘন মোবাইলের নোটিফিকেশন চেক করা নিশ্চই ভালো দেখায় না। এই অভ্যাস কর্মক্ষেত্রে ও ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ ক্ষতিকর।

উপায় ও প্রতিকার
সব সমস্যারই সমাধান থাকে। নমোফোবিয়ার সমাধানও গবেষকদের ধারণায় বেরিয়ে এসেছে। তবে তা পুরোটাই নির্ভর করে ব্যক্তির অভ্যাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ওপর—
১) ঘুমের আগে মোবাইল বন্ধ করে ঘুমানো, যেন নিদ্রা বিঘ্নিত না হয়।
২) নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণে আনা। সবরকম অ্যাপ থেকে সব ধরনের নোটিফিকেশন বিরক্তিকর।

৩) অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ্লিকেশনগুলো ডিলিট করে দেওয়া।
৪) মোবাইল না, সময় দেখার জন্য ঘড়ি ব্যবহারের অভ্যাস করা।
৫) নিজের জন্য ফোন-ফ্রি জোন তৈরি করা। কাজের সময় ফোন দূরে সরিয়ে রাখা।
৬) বন্ধু ও পরিবারের সাথে বেশি সময় ব্যয় করা। ফোনের সাথে সীমিত ও হিসাব করে সময় দেওয়া।

জীবন যাপনে আধুনিকায়ন মানুষকে সমাজবিমুখ করে দিয়েছে। নির্ভরশীল করে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর। আর তাই হাতের সেলফোনটা কেবল সেলফোন হয়ে নেই, পরিণত হয়েছে সবথেকে মূল্যবান সঙ্গী হিসাবে। মোবাইল হারানোর যে উদ্বেগ, তার পেছনের মনস্তত্ত্ব মূলত এটাই। আর তাই আগামী প্রজন্ম নমোফোবিয়া থেকে কিভাবে বের হবে কিংবা আদতে বের হতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা।

ভারতে কোম্পানির গুদামে গাড়ির পাহাড়

২১ বছরের মধ্যে ভারতের গাড়িশিল্পের অবস্থা এখন সবচেয়ে খারাপ। আগস্টে গাড়ি বিক্রির পরিসংখ্যান দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই শিল্পের অবস্থা কতটা খারাপ। সোসাইটি অব ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার সম্প্রতি এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। ২১ বছরের মধ্যে গত আগস্ট মাসে গাড়ি বিক্রি হয়েছে সবচেয়ে কম। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সূত্রে এই খবর পাওয়া গেছে।

সোসাইটি অব ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী যাত্রীবাহী গাড়ির বিক্রি সবচেয়ে বেশি কমেছে। ২০১৮ সালের আগস্টে যত যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রি হয়েছিল, এবার তার চেয়ে ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম বিক্রি হয়েছে। ২০১৮ সালের আগস্টে ২ লাখ ৮৭ হাজার ১৯৮টি যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রি হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্টে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫২৪টি গাড়ি। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় প্রায় বিক্রি প্রায় অর্ধেক কমেছে।

অন্যদিকে ইউটিলিটি ভেহিকলের বিক্রি গত বছরের আগস্টের তুলনায় ২২ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ১৪ হাজার ১৯৬, গত বছরের আগস্টে যেখানে বিক্রি হয়েছিল ১৯ লাখ ৪৭ হাজার ৩০৪টি গাড়ি। স্কুটার ও মোটরসাইকেলের বিক্রি কমেছে ২২ শতাংশ, মপেডের বিক্রি কমেছে ২১ শতাংশ। সব মিলিয়ে হিসাব করলে দাঁড়ায়, গত বছর আগস্টে যেখানে সব ধরনের গাড়ি বিক্রি হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৭০ হাজার ৪০১টি, সেখানে চলতি বছরের আগস্টে গাড়ি বিক্রির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭ লাখ ৩২ হাজার ৪০।

টাটা মোটরস, হুন্ডাই মোটরস, টয়োটা কির্লোস্কর, হন্ডা কারস ও মাহিন্দ্রার মতো সব বড় গাড়ি কোম্পানির একই অবস্থা। যত দিন যাচ্ছে, নাভিশ্বাস উঠছে গাড়িশিল্পের। আর্থিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় এসব গাড়ি কোম্পানির অবস্থা দিনের পর দিন কেবল খারাপই হচ্ছে। প্রতিটি গাড়ি কোম্পানির গুদামে অবিক্রীত গাড়ির পাহাড় হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে ভারতের গাড়ি কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটছে। মারুতি-সুজুকির তিন হাজার অস্থায়ী কর্মীকে এরই মধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে। এমনকি মারুতি-সুজুকি দুই দিন সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এরপর অশোক লেল্যান্ডও চেন্নাইয়ের কারখানায় টানা পাঁচ কর্মদিবস কর্মহীন দিবস ঘোষণা করেছে বলে কোম্পানির কর্মীদের সূত্রে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। যদিও অশোক লেল্যান্ড এই খবরের সত্যতা অস্বীকার করেছে। রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী টয়োটা ও হুন্ডাই মোটরসও কর্মী কাটছাঁটের পথে হাঁটতে পারে।

স্বচ্ছ পোশাকে ফুটে উঠল সুপার মডেল কেট মসের শরীর

সুপার মডেল কেট মস (৪৫)। বয়স তার ৫০ ছুই ছুই করলেও এখনও আবেদন ধরে রেখেছেন। এখনও মাতিয়ে দিতে পারেন চারদিক। কোনো অনুষ্ঠানে তিনি হাজির হবেন তো, অনুষ্ঠানের আভিজাত্য বেড়ে যায়। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে তারায় তারায় ভরা এক অনুষ্ঠানে বৃটিশ এই মডেলকে সম্মানীত করা হয়েছে। ফ্যাশন মিডিয়া এওয়ার্ডে তিনি সম্মানীত হয়েছেন স্টাইল আইকন হিসেবে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল তার উপস্থিতি। বিশেষ করে তার পোশাকের ধরন। তিনি একটি কালো লং-স্লিভ গাউন পরে উপস্থিত হন অনুষ্ঠানে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেই গাউনটি ছিল স্বচ্ছ। এর নিচে তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। অবাক হওয়ার বিষয় হলো গাউনের নিচে কোনো অন্তর্বাস বা দ্বিতীয় কোনো কাপড় ব্যবহার করেননি। ফলে তার বক্ষযুগল স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে তার ভিতর দিয়ে। এভাবে পোশাক পরা আর না পরা এক সমান। এমন দৃশ্যের ছবি লুফে নিয়েছে পশ্চিমা মিডিয়া। বিশেষ করে বৃটিশ মিডিয়া কেট মসের ওই ছবিতে সয়লাব। নিজের শরীর এভাবে অনাবৃত করে দেয়ায় কে কি ভাবছেন তাতে যেন কিছু এসে যায় না- এমনই ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন কেট মস। তাকে দেখা গেছে মাথা উঁচু করে হাঁটছেন। বক্তব্য দিচ্ছেন। লজ্জা বলতে কোনো বালাই-ই নেই। কেট মস পশ্চিমা দুনিয়ার সুপার মডেল। তিনি মডেলিং করেছেন মেসিকা জুয়েলারির। যুক্তরাষ্ট্রের রকার সুজি কুট্রোর (৬৯) কাছ থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। কেট মসের সাম্প্রতিক একাউন্ট বলছে, তিনি এখনও এই মডেলিং জগতের সবচেয়ে বেশি আয় করেন এমন তারকাদের অন্যতম। গত বছর তিনি আয় করেছেন ৯০ লাখ পাউন্ড। আয়ের দিক থেকে তিনি বৃটিশ মডেলদের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে রয়েছেন ২৭ বছর বয়সী কারা ডেলেভিঙ্গে। তিনি এখন বৃটেনে সর্বোচ্চ আয়ের সুপারমডেলদের শীর্ষে অবস্থান করছেন। তিনি আয় করেছেন ২ কোটি ১৫ লাখ পাউন্ড।