Wednesday, January 7, 2026

ট্রাম্পের নানা চেষ্টার পরও সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কোন্নয়ন না হওয়ার কারণ কী by ফাহমিদা আক্তার

২০২৫ সাল বিদায় নিতে যাচ্ছে। বছরজুড়েই বিশ্বে নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। চলতি বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বছরজুড়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টি স্থবির থেকেছে। বছরজুড়ে সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা কেমন ছিল, তা ফিরে দেখা যাক।

‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায় সৌদি আরব’—এমন একটি কথাই হয়তো সম্প্রতি সৌদি যুবরাজের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তা হয়নি। গত নভেম্বর মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হোয়াইট হাউস সফরে গেলে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চুক্তিও হয়।

তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রসঙ্গ এলে মোহাম্মদ বিন সালমান বলে দেন, তিনি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত হওয়াটা দেখতে চান। চলতি বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে সৌদি আরবকে বারবারই এমন অনড় অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করাটা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করার পর সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা নিয়ে আশা তৈরি হয়।

সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কোনো সমস্যার সমাধানের প্রশ্ন এলে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। চলতি বছরও এ দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দেখা গেছে। বিশেষ করে ট্রাম্পকে চেষ্টা চালাতে দেখা গেছে। আর সৌদি আরব বারবারই অনড় অবস্থান দেখিয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সাংবাদিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক জাসিম আল–আজ্জাবি লিখেছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে শান্তভাবে চালানো প্রচেষ্টা, প্রতীকী পদক্ষেপ ও উচ্চপর্যায়ের কূটনীতির পরও সৌদি আরব ও ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক এখনো এগোয়নি। সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্থবির ও স্পষ্ট সত্য, তা হলো রিয়াদ চায় শান্তির বিনিময়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। কিন্তু ইসরায়েল তা দিতে রাজি নয়, আর ওয়াশিংটন নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য বারবার লক্ষ্য বদলাচ্ছে।’

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ফিলিস্তিনিরা অন্য জায়গায় পুনর্বাসিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং সেখানকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন করবে। ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের পরদিনই সৌদি আরব জানিয়ে দেয়, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে না।

এরপর ট্রাম্প গত মে মাসে সৌদি আরব সফরে যান। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে উপসাগরীয় অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে যে গুরুত্বপূর্ণ, তা তাঁর এ সফরের মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়। বলা চলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর ছিল। যদিও এর আগে এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যে যোগ দিতে রোম সফরে গিয়েছিলেন। তবে সেটি পূর্বনির্ধারিত সফর ছিল না।

আরেকটি উল্লেখজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদেও প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবকে বেছে নিয়েছিলেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক সময়ের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রম। দেশটির আধুনিককালের প্রেসিডেন্টরা প্রথম বিদেশ সফরের জন্য সাধারণত যুক্তরাজ্য, কানাডা ও মেক্সিকোকে বেছে নেন।

গত জুলাই মাসে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন হওয়া না হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। ওই সময় ফ্রান্সের সঙ্গে মিলে জাতিসংঘের একটি উদ্যোগে অংশ নিয়েছিল সৌদি আরব। ওই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েল–ফিলিস্তিন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক আলোচনা আবার শুরু করা।

ওই আলোচনায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সৌদি আরবের অবস্থান শুধু কথার কথা নয়; বরং কৌশলগত। ইসরায়েল অনবরত গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ চালিয়ে যেতে থাকলে সৌদি আরবের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে।

এর মধ্যেই গত নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে সামরিক অস্ত্র চুক্তি, পারমাণবিক সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

ওই বৈঠকে যুবরাজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি বিনিয়োগ ৬০ হাজার কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ কোটি ডলার করা হচ্ছে। সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

ওই সময় সৌদি আরবকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেন ট্রাম্প। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ১৯টি দেশকে এ ধরনের মর্যাদা দিয়েছে।

সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা বারবারই ব্যর্থ

সৌদি আরব প্রথমবার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনার কথা বলেছিল ২০০২ সালে। তৎকালীন সৌদি যুবরাজ আবদুল্লাহ প্রস্তাব দেন, ইসরায়েল যদি ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে দখল করা অঞ্চলগুলো থেকে সরে আসে, তাহলে পুরো আরব বিশ্ব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারে।

বাদশা আবদুল্লাহর এ পরিকল্পনাকে বলা হয় আরব শান্তি উদ্যোগ। আরব লিগ এ প্রস্তাবকে সমর্থন করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আরব দেশগুলোর শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে।

অনেকে আশা করেছিলেন, এ প্রস্তাব ইসরায়েলকে অসলো চুক্তির আওতায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। তবে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

এ উদ্যোগকে পরবর্তী সময়ে আরব লিগের ২০০৭ ও ২০১৭ সালের সম্মেলনেও সমর্থন জানানো হয় এবং ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর উত্তরাধিকারী মাহমুদ আব্বাসের মতো ফিলিস্তিনি নেতারাও এর সমর্থনে ছিলেন। তবে ইসরায়েল তখনো তা প্রত্যাখ্যান করে।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদে আব্রাহাম চুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন। বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে।

পরবর্তী সময়ে মরক্কো ও সুদানও এতে যোগ দেয়। আব্রাহাম চুক্তি ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে দূতাবাস খোলার সুযোগ দেয় এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি নিশ্চিত করে।

ফিলিস্তিনিরা এসব চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে আরব বিশ্ব থেকে এ নিয়ে বড় পরিসরে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর কোনোটি আরব লিগ থেকে বহিষ্কৃতও হয়নি।

ইরানও তখন আব্রাহাম চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছিল। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছিলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসলামি ও আরব বিশ্ব, এ অঞ্চলের দেশগুলো এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা যা করেছে, তা অসম্মানের। অবশ্যই তাদের নীতি কাজ করবে না।’

সবাই ধারণা করছিল, আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি সৌদি আরবই হবে আব্রাহাম চুক্তির পরবর্তী সদস্য। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্তও মনে হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এ চুক্তিতে সৌদি আরব শিগগিরই যোগদান করবে।

ওই সময় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতিদিন চুক্তির আরও কাছাকাছি আসছি।’ এটি শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ‘সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক চুক্তি’ হতে পারে বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তবে ওই বছরের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে সব আলোচনা থেমে যায়।

ট্রাম্পের নীতি বদল

ট্রাম্প চলতি বছরের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সৌদি–ইসরায়েল সম্পর্কোন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিতে থাকেন। একটা পর্যায়ে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা মত দেন, ট্রাম্পের আচরণে মনে হচ্ছে তিনি ইসরায়েলকে উপেক্ষা করে হলেও সৌদি আরবকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

গত অক্টোবর মাসে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করেন সৌদি আরব ‘খুব শিগগির’ আব্রাহাম চুক্তিতে শামিল হবে। পরের মাসে তিনি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে হোয়াইট হাউসে সাড়ম্বরে অভ্যর্থনাও জানান। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রশাসনে কোনো বিদেশি নেতাকে এটাই সবচেয়ে জমকালো অভ্যর্থনা জানানো।

ওই সময় ট্রাম্প সৌদি যুবরাজকে হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় মঞ্চ দক্ষিণ লনে অভ্যর্থনা জানান। অভ্যর্থনার সময়ে সেখানে ঘোড়ায় বসা ইউনিফর্মধারী সেনাদের পতাকা বহন করতে দেখা গেছে। একই সময়ে হোয়াইট হাউসের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে একঝাঁক যুদ্ধবিমান।

ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া এফ-৩৫ সিরিজের জঙ্গিবিমানগুলো সৌদি আরবের কাছে বিক্রি করা হবে। এসব যুদ্ধবিমান বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো শর্ত থাকবে না। সৌদির কাছে বিক্রির জন্য এফ-৩৫-এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ইসরায়েলের কাছে এই সিরিজের যেসব বিমান রয়েছে, সেগুলোর মতো হবে।

ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, উভয় দেশ সেরা সামরিক সরঞ্জাম পাবে। কারণ, দুটি দেশই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমানভাবে ঘনিষ্ঠ। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে। এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনায় বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত দেন, সাময়িকভাবে হলেও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেওয়া থেকে সরে যেতে পারে।

এ ছাড়া গত মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে ট্রাম্প সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেলেও ইসরায়েলে যাননি।

সামনে কী

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৭ নভেম্বর ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ওই পরিকল্পনায় গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনী পাঠানোর কথা রয়েছে; যার মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, কাতার, আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের সেনা থাকতে পারেন। কিন্তু ইসরায়েল এখনো নিয়মিতভাবে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে চলেছে এবং পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান বাড়িয়ে চলেছে।

সাংবাদিক জসিম আল–আজ্জাবি মনে করেন, ভবিষ্যতে বেশ কিছু বিষয় দেখার আছে। মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, সৌদি–ইসরায়েল সম্পর্কোন্নয়নে কোনো সম্ভাব্য অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো পশ্চিম তীরের বসতি, বিশেষ করে ই১ করিডর নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান পরিবর্তন হবে কি না, তা।

আজ্জাবি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি পারমাণবিক চুক্তির শর্তের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে এটি কি পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণকে সীমিত করবে, নাকি সৌদি আরবের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মুহূর্তে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথ স্থবির। দুপক্ষের আগ্রহের অভাবে যে এমন স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তা নয়; বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দর-কষাকষি বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ, রিয়াদ চায় বাস্তব পদক্ষেপ, প্রতীকী কিছু নয়।

অন্যদিকে ইসরায়েল নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। আর ওয়াশিংটন কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দোলাচলে পড়ে বারবার লক্ষ্য বদলাচ্ছে। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত এই ফাঁকগুলো বন্ধ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা কেবল একটি ভ্রমের মতোই থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটর, দ্য গার্ডিয়ান, এএফপি,

ওভাল অফিসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ওভাল অফিসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্য যেভাবে ২০২৬ সালেই সংঘাত থেকে বেরোতে পারে by সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান

গত বছরটি মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এ সময়ে একের পর এক সামরিক উত্তেজনা পুরো অঞ্চলকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিয়েছে।

গাজা থেকে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত সংঘাতগুলো গভীর কৌশলগত উদ্বেগ সামনে এনেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধগুলো অস্থির ভূরাজনৈতিক পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করেছে।

গত বছর পুরো অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে। গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ধ্বংসযজ্ঞ নজিরবিহীন মানবিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে চরম বিভাজন তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানি ও হিজবুল্লাহর অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে। লেবাননেও একই ধরনের অভিযান ছড়িয়ে পড়েছে। এতে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে ইসরায়েলি হামলা আরেকটি ফ্রন্ট যুক্ত করেছে। ফলে সংঘাতের মানচিত্র আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গত সেপ্টেম্বর। ওই সময় ইসরায়েল কাতারে হামলা চালায়। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি সেখানে অবস্থিত।

হামলার পর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, দোহায় আলোচনায় থাকা হামাস নেতাদের লক্ষ্য করেই তাঁরা হামলাটি চালিয়েছেন, কিন্তু হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কাতার একে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানায়। আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।

এ ঘটনাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আবারও ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার প্রতি সমর্থন জানান।

ইসরায়েলের কট্টর জায়নবাদীদের সমর্থিত এই ধারণা অনুযায়ী দখলকৃত পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন ও জর্ডান গ্রেটার ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত। এর সঙ্গে সিরিয়া, মিসর, ইরাক ও সৌদি আরবের কিছু অংশও ধরা হয়।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ওয়াশিংটন একে ‘সীমিত’ ও প্রতিরোধমূলক অভিযান বলে দাবি করে। কিন্তু ইরানের প্রতিক্রিয়া অনেককেই বিস্মিত করে। ইরান ইসরায়েলের শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানি হামলার প্রভাব স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহু ভবন ধ্বংস করেছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি পরিকল্পনার আওতায় গাজাকে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের হাত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের অধীন দেওয়া হয়। ওই পরিকল্পনার সমর্থকদের মতে, নতুন করে সশস্ত্র তৎপরতা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। এতে দখলকৃত জনগোষ্ঠীর ওপর বাইরের তত্ত্বাবধানকে কার্যত বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্কের ২০০৭ সালের এক স্বীকারোক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেছিলেন, ২০০১ সালে পেন্টাগন একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। তিনি সেই পরিকল্পনার কথা জেনেছিলেন। সেখানে পাঁচ বছরে সাতটি দেশ আক্রমণের কথা ছিল। প্রথমে ইরাক, এরপর সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান এবং শেষে ইরান।

ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের ইরান হামলাকে ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ বললেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল ভয়াবহ। ওয়াশিংটন এখন এমন শক্তির কাতারে পড়েছে, যারা সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে চেঙ্গিস খান ও সাদ্দাম হোসেনের মতো নাম। ইরানের সভ্যতাগত স্মৃতি থেকে এ দাগ মুছে যাবে না। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধরে ইরানি জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিক নীতিকে প্রভাবিত করবে।

যদি ২০২৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অপরিবর্তিত থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধ, অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেবে। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অঞ্চলে আরও জড়িয়ে পড়বে, যেখান থেকে ইতিমধ্যেই সরে আসার চেষ্টা করেছে প্রতিটি প্রশাসন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে চিহ্নিত অগ্রাধিকারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম গোলার্ধ, চীন, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। ফলে ইরানে হামলা ছিল অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই একটি কৌশলগত ব্যর্থতা।

যত দিন তেল আবিব গ্রেটার ইসরায়েল ধারণা অনুসরণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সামরিক সংঘাত চলবে, তত দিন স্থায়ী শান্তির আশা ক্ষীণ।

ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস গভীর। পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কাঠামোও ভঙ্গুর।

এ অবস্থায় কিছু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বিষয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সক্রিয় হতে হবে। আট দশকের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান ছাড়া কোনো আঞ্চলিক কাঠামো টেকসই হবে না।

দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের জুনে ইরান হুমকি দেয়, আবার হামলা হলে তারা ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে দেবে। একই বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও ইরান ও লেবাননকে ধ্বংস করার হুমকি দেন। এ পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের প্রভাব ব্যবহার করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে পারে এবং করা উচিত। এতে সামরিক উত্তেজনা কমানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলের আটটি দেশকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা কাঠামোর দিকে এগোতে হবে। এতে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও পূর্বানুমেয় সংলাপ গড়ে উঠবে।

চতুর্থত, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থাকে শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। এতে তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের দেশগুলো যুক্ত হতে পারে।

সবশেষে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে স্থবির কূটনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন আলোচনায় ফিরতে হবে। এতে একটি টেকসই পারমাণবিক চুক্তি সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ, সহযোগিতার ক্ষেত্র এবং দীর্ঘদিনের বিরোধগুলো নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে।

গত এক বছর দেখিয়ে দিয়েছে একতরফা সিদ্ধান্ত, সামরিক কৌশল ও চরমপন্থী আদর্শ কতটা বিপজ্জনক। জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমন্বিত সংলাপ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের পক্ষে সংঘাতের চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।

* সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং রিসার্চ কলাবরেটর ও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সাবেক প্রধান।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেহরানে সাধারণ ইরানিদের বিক্ষোভ
ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তেহরানে সাধারণ ইরানিদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: এএফপি

নিকোলাস মাদুরো: বাসচালক থেকে লৌহমুষ্টি শাসক

এএফপির বিশ্লেষণঃ ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো নিজেকে সাধারণ মানুষের বিনয়ী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাস্তবে তিনি লৌহমুষ্টি শাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র চাপের মুখেও ৬৩ বছর বয়সী এই সাবেক বাসচালক প্রায় প্রতিদিনের জনসভায় টেকনো সঙ্গীতে নাচতেন, যা সরাসরি সম্প্রচারিত হতো। সেখানে তিনি ইংরেজিতে বারবার স্লোগান দিতেন- ‘নো ওয়ার, ইয়েস পিস!’

কিন্তু বহু ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে মাদুরো কখনোই শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে ধরা দেননি। তার শাসনামলে সাত মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে অভিবাসনে গেছে। অভিযোগ রয়েছে নির্বিচার গ্রেপ্তার, সাজানো বিচার, নির্যাতন ও সেন্সরশিপের। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে টানা চার বছর অতিমুদ্রাস্ফীতি এবং এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে ৮০ ভাগ পতনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখতে মাদুরো ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক অল্প কিছু মিত্রের ওপর। বিশেষত চীন, কিউবা ও রাশিয়া, পাশাপাশি দেশের সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা ও আধাসামরিক বাহিনীর ওপর।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে তার বিতর্কিত বিজয়ের পর যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তা দমনে ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, ২৮ জন মারা যায় এবং প্রায় ২০০ জন আহত হন। এই সহিংসতা তার আগের দমনপীড়নের ধারাবাহিকতা। ২০১৪, ২০১৭ ও ২০১৯ সালেও একই রকম অভিযান চালানো হয়।

‘প্রথম যোদ্ধা’
উঁচু দেহ, ঘন গোঁফ ও পেছনে আচড়ানো পাকা চুল এমন চেহারার মাদুরো প্রথম ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে এবং দাবি করেন যে তিনি দু’বার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ হিসেবে সমালোচিত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার তৃতীয় দফার শপথ সম্পন্ন হয় যা পূর্ণ হলে তিনি ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকতেন। এটা হতো তার বিপ্লবী নায়ক হুগো শাভেজের চেয়েও বেশি। শাভেজ ১৪ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে মাদুরো ছিলেন সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তিন মাস আগে নিজ উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই বেছে নিয়েছিলেন শাভেজ। কিন্তু শাভেজের মতো বক্তৃতা ও ব্যক্তিত্বের জৌলুস মাদুরোর ছিল না, যা শাসক দল পিএসইউভির ভেতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি অল্প ব্যবধানে জিতেছিলেন। এরপর তিনি একের পর এক সঙ্কট সামাল দেন- যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, আবার তেলের দামের পতনে দেশের প্রধান আয়ের উৎস হারানো-  সবকিছুর মাঝেও তিনি টিকে থাকেন।

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ সংসদীয় স্পিকার হুয়ান গুইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তার সমান্তরাল সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচন শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশ ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র বিরোধী নেতা এডমনদো গনজালেজ উরুতিয়াকে প্রকৃত নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। সবসময়ই তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। তাকে তিনি ডাকেন ‘প্রথম যোদ্ধা’ ও ‘সিলিতা’ নামে। পেশায় সাবেক সরকারি কৌঁসুলি ফ্লোরেস ছিলেন সংসদ সদস্য ও পরে জাতীয় পরিষদের স্পিকার । পর্দার আড়ালে মাদুরো শাসনে তিনি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভোররাতের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরোর সঙ্গে তাকেও আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে।

‘মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান’
রাজধানী কারাকাসজুড়ে সর্বত্র টাঙানো মাদুরোর বিশাল পোস্টার ও দেয়ালচিত্র। নিজেকে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন- নিজেকে বলেন বেসবলপ্রেমী, সালসা নাচের ভক্ত  এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রায়ই নাচতে দেখা যেত তাকে, পাশে স্ত্রীকে নিয়ে। কারাকাসে জন্ম নেয়া মাদুরো নিজেকে একইসঙ্গে ঘোষিত মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান বলে দাবি করেন। কৈশোরে তিনি একটি রক ব্যান্ডেও গিটার বাজাতেন। ধারণা করা হয়, ইংরেজিতে ইচ্ছে করেই তিনি ভুল বলেন- যাতে উচ্চবিত্ত মনে না হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে নানা ধরনের বাস্তব ও কল্পিত হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৮ সালে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা ব্যর্থ হলেও কয়েকজন সেনা আহত হন। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় এড়াতে তিনি শাভেজের আমলের মার্কিনবিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এগিয়ে নেন। বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে তাকে উৎখাতের চক্রান্তে অভিযুক্ত করেন। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার দাবি করতে করতে তিনি দেশের রাজনৈতিক বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দেন। যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, বিচারহীন আটক ও বিরোধীদের দমন ছিল নিয়মিত। তার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও দক্ষ প্রমাণিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচন আয়োজনের চুক্তিতে রাজি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করাতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তীতে তিনি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ভেনেজুয়েলার ক্লান্ত জনগণের দৈনন্দিন জীবনে মাদুরো ছিলেন প্রায় সর্বব্যাপী চরিত্র নিয়মিত টেলিভিশনে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তৃতা দিতে দেখা যেত তাকে।
এমনকি কার্টুন চরিত্র হিসেবেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন- ‘সুপার-বিগোতে’ বা ‘সুপার-মোচ’ নামে এক কেপ পরা সুপারহিরো, যে নাকি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

mzamin

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত পাল্টে দিল মধ্যপ্রাচ্যের হিসাব–নিকাশ by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

২০২৫ সালের ১৩ জুন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার সূচনা করে। এদিন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী শুরু হওয়া ভয়াবহ সংঘাত শুধু দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতাকে নয়; পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো এ ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনটিতে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপট, ক্ষয়ক্ষতি, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

বিদায়ী ২০২৫ সালের জুনকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেরা আর সাধারণ কোনো মাস হিসেবে দেখেন না। এ মাসেরই মাঝামাঝি (১৩ জুন) প্রথমবারের মতো ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ভূখণ্ডে সরাসরি, প্রকাশ্য এবং পূর্ণমাত্রার সামরিক আঘাত হানে। এতদিন যে সংঘাত ছিল ছায়ার আড়ালে, প্রক্সির মাধ্যমে কিংবা ‘অস্বীকারের’ পর্দার ভেতরে—সেটিই হঠাৎ রূপ নেয় প্রকাশ্য যুদ্ধে।

মাত্র ১২ দিনের এ সংঘর্ষে কোনো দেশ দখল হয়নি, কোনো সরকারেরও পতন ঘটেনি। কিন্তু এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ধারণা ও আগাম হামলার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরির পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে এ সংঘাত এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে; যার প্রভাব টের পাওয়া যাবে আরও বহু বছর। এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

সংঘর্ষ শুরুর আগে কয়েক মাস ধরেই ইরান–ইসরায়েল সম্পর্ক ছিল অস্বাভাবিক রকমের উত্তপ্ত। গাজা যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া তখনো অঞ্চলজুড়ে। লেবাননের সীমান্তে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের নিয়মিত গোলাবিনিময়, সিরিয়ায় ইরান–সমর্থিত লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের বিমান হামলা—সব মিলিয়ে একধরনের নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা চলছিল।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই বলছিল, তারা আর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘রেড লাইন’ (চূড়ান্ত সীমা) পার হতে দেবে না। তেহরানও জোর দিয়ে বলছিল, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং তারা যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত।

এ সময়েই ইরানের ভেতরের বাস্তবতা ছিল দ্বন্দ্ব–সংঘাতপূর্ণ। একদিকে দেশটি অর্থনৈতিক চাপ, পানির সংকট, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক অসন্তোষে জর্জরিত। অন্যদিকে, বিদেশি হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় বয়ানে বারবার ‘প্রতিরোধ’ ও ‘জাতীয় মর্যাদা’র কথা উচ্চারিত হচ্ছিল। এ দ্বৈত বাস্তবতার ভেতরই দেশটি ঢুকে পড়ে এক অনিবার্য সংঘর্ষের দিকে।

আকাশ ‘ফেটে পড়ে’

১৩ জুন ভোররাত। ইরানের বহু শহরে তখনো নিস্তব্ধতা। হঠাৎ করেই আকাশে শব্দ—ড্রোনের গুঞ্জন, এরপর একের পর এক বিস্ফোরণ। কয়েক মিনিটে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন হামলা নয়; এটি একটি সমন্বিত, পরিকল্পিত আঘাত।

ইসরায়েল তাদের এ আগ্রাসনের নাম দেয়, ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’। লক্ষ্যবস্তু ছিল, ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থাপনাগুলো—নাথাঞ্জ ও ফোরদোর পারমাণবিক কেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি, গবেষণাগার এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার আবাসন। আঘাত ছিল দ্রুত, নিখুঁত ও ভয় ধরানো।

ইসরায়েলের তথাকথিত যুক্তি ছিল স্পষ্ট, এটি আগাম ‘আত্মরক্ষা’। তাদের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। হুমকি ঠেকাতে এ হামলা চালিয়েছে তারা।

কিন্তু এ দাবি সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বলছিল, ইরান তখনো অস্ত্র তৈরির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, ভবিষ্যতের আশঙ্কা কি এ হামলার বৈধতা দিতে পারে?

তেহরানের জবাব: নীরবতা নয়, প্রতিশোধ

ইসরায়েলি হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ইরান নীরব থাকবে না। প্রথমে আসে রাজনৈতিক ভাষ্য। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় থেকে বলা হয়, এ হামলা ‘জবাবহীন থাকবে না।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও বলেন, ইরান আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে।

এরপর আসে বাস্তব জবাব। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুটে যায় ইসরায়েলের দিকে। সতর্কতা সাইরেন বাজে তেল আবিব, হাইফা ও আশপাশের এলাকায়। মানুষ ছুটতে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্রে। এ পাল্টা হামলায় ইসরায়েলে নিহত হন ২৮ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সামরিক অবকাঠামোর অংশবিশেষ।

এটি ছিল ইরানের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা—তারা আঘাত সইবে, কিন্তু একতরফা নয়। শুরু হয় ১২ দিনের এক সংঘর্ষ; যাকে অনেক বিশ্লেষক বলেন ‘নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ’। কোনো পক্ষই সর্বশক্তি প্রয়োগ করেনি, কিন্তু প্রতিদিন ছিল উত্তেজনা চরমে।

ইরানে নিহত হন অন্তত ৯৭৪ জন। তাঁদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সদস্য, বিজ্ঞানী ও বেসামরিক নাগরিকও ছিলেন। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শহরগুলোর ওপর চাপ বাড়ে, হাসপাতালগুলোতে ভিড়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়।

ইসরায়েলেও এ হামলার অভিঘাত ছিল অপ্রত্যাশিতভাবে বড়। দেশটির অভ্যন্তরে অনেকেই স্বীকার করেন, ১২ দিনে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি গত দুই বছরে হামাস বা হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষের মোট ক্ষতির চেয়েও বেশি ছিল।

এ সংঘর্ষ দেখিয়ে দেয়—দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের এ যুগে ভৌগোলিক দূরত্ব আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রাথমিক ক্ষতি

ইসরায়েলি হামলার মূল লক্ষ্য ছিল, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। নাথাঞ্জ ও ফোরদো কেন্দ্রগুলোতে আঘাত পাওয়া অবকাঠামোর মধ্যে ছিল সমন্বিত পরীক্ষাগার, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইউনিট এবং গবেষণাকেন্দ্র। হামলার প্রাথমিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তাৎক্ষণিক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে স্থগিত হয়নি।

তবে বিজ্ঞানীরা মন্তব্য করেছেন, এমন হামলা ইরানের গবেষকদের মধ্যে ধ্বংসাত্মক হামলা ঠেকানোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রেরণা জুগিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখন আরও গোপন ও সুরক্ষিত হয়ে গেছে এবং তা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুনভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

ইসরায়েলের সামরিক সীমাবদ্ধতা

সংঘাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জোর দিয়ে বলেছিল, তারা ইরানের ‘মূল প্রাণকেন্দ্র’ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকেরা দেখছেন, বাস্তবতা ভিন্ন। ইসরায়েলের বিমান হামলা যথেষ্ট প্রভাব ফেললেও, এটি সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক ছিল না। ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ও পারমাণবিক কর্মীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেকটাই বাঁচানো গেছে।

ফলে ইসরায়েলের জন্য সামরিক সাফল্য থাকলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত জয় সীমিতই। ইসরায়েলি নেতৃত্বও বুঝতে পেরেছে, সরাসরি আক্রমণে স্বল্পকালীন প্রভাব পড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি ইরানকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

এদিকে ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল। হোয়াইট হাউস ঘোষণা করেছিল, তারা ইসরায়েলের ‘সুরক্ষার অধিকার’ সমর্থন করে। কিন্তু জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র এ সংঘাতে সরাসরি অংশ নেয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ইরানের কূটনৈতিক মনোভাবকে আরও কঠোর করেছে। তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ‘আমাদের আঞ্চলিক স্বাধিকার রক্ষার বিকল্প নেই। তবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে আগ্রহী নই।’

আঞ্চলিক শক্তির নজর

এ সংঘাত শুধু ইরান–ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও কাতার—গুরুত্বপূর্ণ সব আঞ্চলিক শক্তি সংকটের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিল।

সৌদি মন্ত্রিপরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষাই আমাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু প্রতিটি আঞ্চলিক শক্তি নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখবে।’

এমন অবস্থানের কারণে ওই সংঘাতের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়। কোনো আঞ্চলিক শক্তিই সংঘাতে সরাসরি অংশ নেয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ, হুমকি ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতা চলছিল জোরেশোরে।

আন্তর্জাতিক আইন ও আগাম হামলার বিতর্ক

বিশ্ববাসীর নজর তখন আন্তর্জাতিক আইনের দিকে। ইসরায়েলের ‘আগাম হামলা’র নীতি কি বৈধ? এ প্রশ্নে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা (আইএইএ) ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জড়িয়ে পড়ে বিতর্কে।

আইনি বিশ্লেষকেরা ব্যাখ্যা করেন, আন্তর্জাতিক আইন স্বীকার করে, যেকোনো দেশ আত্মরক্ষার অধিকার রাখে। কিন্তু সেই অধিকার সীমিত ও প্রমাণিত। তাত্ক্ষণিক হুমকি ছাড়া আগাম হামলা চালানো যাবে না।

বিশ্বের বহু দেশ এ পরিস্থিতিতে দুপক্ষেরই সমালোচনা করেছে। বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নাইজেরিয়ার মতো দেশ বলেছে, আগাম হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ভেঙে দিয়েছে।

এই বিতর্ক শুধু আইনগত নয়, নৈতিকও। কতটা সম্ভাব্য হুমকি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য, আর কতটা কৌশলগত আগ্রাসন—এ এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সংঘাতের মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

ইরান–ইসরায়েল সংঘাত মাত্র ১২ দিনের হলেও এর মানবিক ক্ষতি ছিল ভয়াবহ। ইরানে নিহত ৯৭৪ জনের মধ্যে ২৩০টিই ছিল শিশু। আহত হন বহু মানুষ। হাসপাতালগুলোতে তীব্র চাপ তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়।

ইসরায়েলে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম—২৮ জন। কিন্তু আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও অবকাঠামোগত ক্ষতি বিপুল। তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহন নেটওয়ার্ক আংশিকভাবে নষ্ট হয়।

এমন সংখ্যার আড়ালে, দুই দেশেই মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়। বন্ধ হয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুলগুলো। আন্তর্জাতিক সাহায্য ও মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমও হয়ে পড়ে সীমিত।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে বলতে হয়, চির বৈরী ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত শেষ হলেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরেনি। ওই সংঘাত শুধু ধ্বংস ডেকে আনল না, উভয় দেশের মধ্যে দূরত্ব ও শত্রুতা আরও বাড়াল, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার প্রশ্নকে জটিল করল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এখন তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনে গভীর মনোনিবেশ করবে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে আরও গোপন ও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেবে।

আঞ্চলিক শক্তিগুলোও তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করবে। সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত—সবাই যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তার ও কূটনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করতে প্রস্তুত থাকবে।

{তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, আল–জাজিরা, মিডল ইস্ট আই ও দ্য জেরুজালেম পোস্ট}

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওয়েবসাইট

প্রত্যাখ্যান করি আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি by মিশেল এলনার

৩রা জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস কনফারেন্সটি আমি শুনেছি বুকের ভেতর টান নিয়ে। একজন ভেনেজুয়েলান বংশোদ্ভূত আমেরিকান হিসেবে আমি যা শুনলাম, তা ছিল একেবারে পরিষ্কার। আর সেই পরিষ্কার কথাগুলো ছিল শীতল, ভীতিকর। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বললেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘দেশটি চালাবে’ যতক্ষণ না তাদের মতে ‘নিরাপদ’ ও ‘বিবেচনাপ্রসূত’ একটি উত্তরণ ঘটে। তিনি বললেন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার কথা, তাকে একটি মার্কিন সামরিক জাহাজে তোলার কথা, ভেনেজুয়েলাকে অস্থায়ীভাবে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কথা এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে এনে শিল্প আবার ‘গড়ে তোলার’ কথা। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কথা ওঠাতেই তিনি এমন একটি বাক্য বললেন, যা সবার জন্যই উদ্বেগজনক হওয়া উচিত: ‘তারা বোঝে এটি আমাদের গোলার্ধ।’

ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে এই কথাগুলো একটি দীর্ঘ, বেদনাদায়ক ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
চলুন, পরিষ্কার করে বলি প্রেসিডেন্ট যেসব দাবি করেছেন, সেগুলো কী। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার আছে একটি বৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা বিদেশি প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে মার্কিন ফৌজদারি আইনের আওতায় আটক করার। যুক্তরাষ্ট্র একটি সার্বভৌম দেশকে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যান্ডেট ছাড়াই পরিচালনা করতে পারে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ওয়াশিংটনে বসে ঠিক করা যেতে পারে। তেল সম্পদ ও ‘পুনর্গঠন’-এর নিয়ন্ত্রণ হস্তক্ষেপের স্বাভাবিক ফল। এগুলোর কোনোটি করতে কংগ্রেসের অনুমোদন বা আসন্ন কোনো হুমকি প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
এ ধরনের ভাষা আমরা আগেও শুনেছি। ইরাকে প্রথমে ‘সীমিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘অস্থায়ী প্রশাসন’-এর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হয়ে উঠেছিল বছরের পর বছর দখলদারিত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ দখল, আর পেছনে রেখে যাওয়া ধ্বংস ও অস্থিতিশীলতা। স্টেওয়ার্ডশিপের নামে যা শুরু হয়েছিল, তা পরিণত হয়েছিল আধিপত্যে। এখন ভেনেজুয়েলাকে নিয়েও একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘অস্থায়ী প্রশাসন’- শেষে হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্থায়ী বিপর্যয়।

আন্তর্জাতিক আইনে এই প্রেস কনফারেন্সে বর্ণিত কোনো কিছুই বৈধ নয়। জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের হুমকি বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও নিষিদ্ধ। রাজনৈতিক ফলাফল চাপিয়ে দিতে ও নাগরিক ভোগান্তি তৈরি করতে যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়- তা সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। ‘একটি দেশ চালানোর’ অধিকার ঘোষণা করা মানে দখলদারিত্বের ভাষায় কথা বলা-  যতই শব্দটা এড়িয়ে যাওয়া হোক।

মার্কিন আইনের ক্ষেত্রেও দাবিগুলো সমানভাবে উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কোনো অনুমোদন নেই, কোনো ঘোষণা নেই, এমন কিছুই নেই যা একজন নির্বাহীর হাতে ক্ষমতা দেয় বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করতে বা কোনো দেশ পরিচালনা করতে। একে ‘আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ’ বলা মানেই তা বৈধ হয়ে যায় না। ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করেনি, কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির সতর্কতাও দেয়নি- যা বৈধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। দেশটির বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের কোনো বৈধ ভিত্তি নেই- না মার্কিন আইন অনুযায়ী, না আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে।
কিন্তু আইন বা নজিরের বাইরেও রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি: এই আগ্রাসনের খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার বোঝা সমানভাবে পড়ে না- তা গিয়ে আঘাত করে নারীদের, শিশুদের, বৃদ্ধদের, গরিবদের ওপর। এর মানে হলো ওষুধ ও খাবারের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ভাঙন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহারের বৃদ্ধি, আর অবরুদ্ধ জীবনে প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াই। এর সঙ্গে যোগ হয় সেইসব মৃত্যু- যা অনিবার্য নয়, প্রাকৃতিকও নয়, বরং বিদ্যুৎ, পরিবহন, চিকিৎসা বা ওষুধের নাগাল ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে ঘটে। প্রতিটি উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে এবং বেসামরিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে- যেগুলোকে পরবর্তীতে ‘পার্শ্বক্ষয়’ বলা হয়, যদিও এসব ছিল আগে থেকেই অনুমেয় ও এড়ানো সম্ভব।
এটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে সেই অন্তর্নিহিত ধারণাটি যে, ভেনেজুয়েলাবাসীরা অপমান ও বলপ্রয়োগের মুখে নিশ্চুপ ও অনুগত থাকবে। এই ধারণাটি ভুল। যখন এটি ভেঙে পড়বে- যা অবশ্যম্ভাবী, তখন মূল্য দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় রক্তপাতের মাধ্যমে। যখন একটি দেশকে ‘উত্তরণ সমস্যা’ বা ‘প্রশাসনিক সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়- তখন মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। জীবনগুলোকে হিসাবের খাতায় গ্রহণযোগ্য ক্ষতিতে পরিণত করা হয়। আর যে সহিংসতা পরে আসে, তাকে বলা হয় ‘দুঃখজনক পরিণতি’- অথচ সেটিই ছিল ঔদ্ধত্য ও জবরদস্তির পূর্বনির্ধারিত ফল।

একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যখন একটি দেশকে এমনভাবে বলতে শুনি- ‘পরিচালনা করা, স্থিতিশীল করা, আর শৃঙ্খলায় এলে হস্তান্তর করা’-  তা আঘাত করে। অপমানিত করে এবং ক্রুদ্ধ করে।
হ্যাঁ- ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ নয়। কখনোই ছিল না। সরকার, অর্থনীতি, নেতৃত্ব, ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই আছে গভীর বিভাজন। কেউ নিজেকে চাভিস্তা হিসেবে চিহ্নিত করে, কেউ কঠোর বিরোধী, কেউ ক্লান্ত ও বিমুখ- এবং হ্যাঁ, কেউ কেউ হয়তো উদযাপন করছে, ভেবে যে অবশেষে পরিবর্তন আসতে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন দখলদারিত্বকে আমন্ত্রণ জানায় না।
লাতিন আমেরিকা এই যুক্তি আগেও দেখেছে। চিলিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে ‘অচলাবস্থা’ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হুমকির অজুহাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের যুক্তি বানানো হয়েছিল- যার শেষ হয়েছিল গণতন্ত্রে নয়, বরং স্বৈরশাসন, দমনপীড়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ট্রমায়।
বাস্তবে, অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী- যারা সরকারের বিরোধী- তারাও এই মুহূর্তটিকে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা জানে বোমা, নিষেধাজ্ঞা ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া ‘উত্তরণ’ গণতন্ত্র আনে না; বরং গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা- নিখুঁত অবস্থান নয়। আপনি মাদুরোকে অপছন্দ করতেই পারেন, তবুও মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে পারেন। আপনি পরিবর্তন চাইতে পারেন, তবুও বিদেশি আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। আপনি রাগান্বিত, ক্লান্ত বা আশাবাদী হতে পারেন,  তবুও বলতে পারেন: অন্য দেশের শাসনের অধীনে থাকতে চাই না।

ভেনেজুয়েলা এমন এক দেশ, যেখানে কমিউনাল কাউন্সিল, শ্রমিক সংগঠন, পাড়াভিত্তিক কমিটি ও সামাজিক আন্দোলনগুলো তৈরি হয়েছে চাপের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক শিক্ষা এসেছে না থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক থেকে- এসেছে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে। এখন ভেনেজুয়েলাবাসীরা লুকিয়ে নেই, বরং ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। কারণ তারা ধরণটি চিনে ফেলে। তারা জানে ‘উত্তরণ’ ও ‘অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ কথাগুলোর পর সাধারণত কী আসে। এবং তারা সবসময় যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে: ভয়কে রূপ দিচ্ছে সামষ্টিক কর্মে।
এই প্রেস কনফারেন্স শুধু ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে ছিল না, বরং ছিল এই প্রশ্ন নিয়ে: সাম্রাজ্য কি আবার প্রকাশ্যে বলতে পারে- অন্য দেশগুলোকে শাসনের অধিকার তার আছে এবং আশা করতে পারে বিশ্ব চুপ থাকবে?
যদি এটি টিকে যায় তাহলে বার্তাটি নির্মম:
সার্বভৌমত্ব শর্তসাপেক্ষ, সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘গ্রহণযোগ্য’, আর গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল সাম্রাজ্যিক অনুমতিতে।
একজন ভেনেজুয়েলান-আমেরিকান হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করি।
আমি প্রত্যাখ্যান করি- আমার করের টাকা দিয়ে আমার মাতৃভূমিকে অপমানিত করার নীতি। আমি প্রত্যাখ্যান করি- যুদ্ধ ও জবরদস্তিকে ‘ভেনেজুয়েলাবাসীর কল্যাণ’ বলে চালানোর মিথ্যা। এবং আমি নীরব থাকতে রাজি নই, যখন একটি প্রিয় দেশকে মানুষের সমাজ হিসেবে নয়, বরং মার্কিন স্বার্থের কাঁচামাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোনো মার্কিন কর্মকর্তা, কোনো করপোরেট বোর্ড, বা এমন কোনো প্রেসিডেন্টের হাতে নয়, যে মনে করে পুরো গোলার্ধ তার অধীনস্ত।
ভবিষ্যৎ কেবল ভেনেজুয়েলাবাসীর।

(মিশেল এলনার, কোডপিঙ্ক-এর লাতিন আমেরিকা ক্যাম্পেইনের সমন্বয়কারী। তিনি ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং প্যারিসের লা সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় (প্যারিস-৪) থেকে ভাষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকের পর তিনি কারাকাস ও প্যারিসের অফিস থেকে একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তি কর্মসূচিতে কাজ করেন এবং আবেদনকারীদের মূল্যায়ন ও নির্বাচন করার কাজে হাইতি, কিউবা, গাম্বিয়া ও অন্যান্য দেশে পাঠানো হয় তাকে। তার এ লেখাটি অনলাইন ভেনেজুয়েলা এনালাইসিস থেকে অনুবাদ)

mzamin

ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে by জেরেমি বোয়েন

বিবিসির বিশ্লেষণঃ ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এর আগে কখনও দেখা যায়নি এমন শক্তভাবে দেখালেন যে, নিজের ইচ্ছাশক্তির উপর তার বিশ্বাস। তার এ বিশ্বাস ভরসা পায় নগ্ন মার্কিন সামরিক শক্তির পেছনে। তার নির্দেশেই এখন মাদুরো কারাগারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে তারা এখন ভেনেজুয়েলা চালাবে।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অবস্থিত নিজের ক্লাব ও বাসভবনে এক ব্যতিক্রমী সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে। তিনি বলেন, যতদিন না আমরা একটি নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিবেচিত রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে পারি, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। ট্রাম্প বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ কথা বলেছেন। তিনি নাকি বলেছেন, আপনাদের যেটা দরকার আমরা সেটাই করব। তিনি যথেষ্ট ভদ্রতা প্রদর্শন করেছেন এ সময়। কারণ, তার সামনে আসলে কোনো বিকল্প নেই।

ট্রাম্প খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনায় যাননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘প্রয়োজনে (ভেনেজুয়েলায়) স্থলবাহিনী পাঠাতে আমরা ভয় পাই না।’ কিন্তু তিনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, দূর থেকে ভেনেজুয়েলা শাসন করা সম্ভব? মার-এ-লাগোতে রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ তাকে ঘিরে যে প্রশস্তি শোনা গেল- সেটা কি লাতিন আমেরিকার অন্য নেতাদের ভীতসন্ত্রস্ত্র করে আজ্ঞাবহ করতে যথেষ্ট হবে? শোনার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল, তিনি তা-ই বিশ্বাস করেন। কিন্তু প্রমাণ বলছে, এ পথ সহজ হবে না।

থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ গত অক্টোবরে সতর্ক করেছিল, মাদুরোর পতন ভেনেজুয়েলায় সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে। একই মাসে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা যুদ্ধাভ্যাসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছিলেন, মাদুরো পতনের পর কী হতে পারে। তাদের উপসংহার ছিল, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে সহিংস বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা।

নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণ ও কারাবন্দি করা আমেরিকান সামরিক শক্তির অসাধারণ প্রদর্শন। যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বহর জড়ো করে বিন্দুমাত্র প্রাণহানি ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন করেছে। মাদুরো জনগণের রায় উপেক্ষা করে নিজের নির্বাচনী পরাজয় বাতিল করেছেন এবং নিঃসন্দেহে তার বিদায় ভেনেজুয়েলার বহু নাগরিককে স্বস্তি দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের অভিঘাত ভেনেজুয়েলার সীমানা পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হবে। মার-এ-লাগোর সংবাদ সম্মেলনের আবহ ছিল বিজয়োৎসবের মতো- যেন এক নিখুঁত সামরিক অভিযানের সাফল্য উদ্যাপন ছিল সেটা।

কিন্তু সামরিক অভিযান কেবল প্রথম ধাপ। রাজনৈতিক অনুসরণ পর্বই নির্ধারণ করে এর সাফল্য বা ব্যর্থতা। গত ৩০ বছরে সামরিক শক্তি দিয়ে ‘রেজিম-চেঞ্জ’ করার আমেরিকার রেকর্ড ভয়াবহ। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর দেশটি রক্তাক্ত বিপর্যয়ে নিমজ্জিত হয়। আফগানিস্তানে দুই দশকের ‘রাষ্ট্রগঠন’ প্রচেষ্টা ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়ে।

লাতিন আমেরিকায় অতীতের হস্তক্ষেপের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা- একইভাবে অশুভ। ট্রাম্প এবার মনরো ডকট্রিনের নতুন নাম দিলেন- ‘ডনরো ডকট্রিন’। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর সেই ঘোষণা, যাতে পশ্চিম গোলার্ধে অন্য শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা ছিল। ট্রাম্প বলেন, মনরো ডকট্রিন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা এখন সেটা অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছি। আমাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অধীনে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকান কর্তৃত্ব আর কখনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। তিনি আরও বলেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে নিজের পশ্চাৎদেশ সামলাতে হবে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, মেক্সিকো নিয়েও কিছু একটা করতে হবে।

কিউবাও নিঃসন্দেহে এই তালিকায় আছে, যেখানে ভূমিকা রাখছেন কিউবান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত রুবিও। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৯৯৪ সালে আমি হাইতিতে ছিলাম- যখন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২৫ হাজার সেনা ও দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠান। সেদিন কোনো গুলি না ছোঁড়ায় শাসন ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ভালো ভবিষ্যৎ আসে নি- গত ৩০ বছর প্রায় অবিরাম দুর্দশায় কেটেছে হাইতির মানুষের। আজ দেশটি সশস্ত্র গ্যাং দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক ব্যর্থ রাষ্ট্র সেটি।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ‘মহান’ করার কথা বলেছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের কথা বলেননি। তিনি নোবেলজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেশ পরিচালনার পক্ষে নন বলে স্পষ্ট জানান। তিনি বলেন- তার পক্ষে নেতা হওয়া খুব কঠিন। তার সমর্থন নেই, সম্মান নেই। তিনি উল্লেখই করেননি এডমুন্দো গনজালেসের নাম, যাকে অনেকে মনে করেন ২০২৪ সালের নির্বাচনের প্রকৃত বিজয়ী। বরং আপাতত যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে। মাদুরোকে সরাতে যে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বা সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তা হয়তো কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে। তবে হুগো শাভেজের গড়া শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট  আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সহজে রাজি হবে, সে সম্ভাবনা কম।
শাসনের সঙ্গে যুক্ত সামরিক ও বেসামরিক গোষ্ঠীগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের ধনী করেছে, এ সুবিধা তারা হারাতে চাইবে না।

বেসামরিক মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিয়েছে সরকার, এছাড়াও দেশটিতে রয়েছে অপরাধচক্র ও কলম্বিয়ান গেরিলারা, যারা আশ্রয়ের বিনিময়ে মাদুরোকে সমর্থন দিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের বিশ্বদৃষ্টিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। তিনি খোলাখুলি অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি লোভের কথা বলেন। এমনকি ইউক্রেনের সম্পদ বিনিময়ে সামরিক সহায়তার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে আগে। তিনি ভেনেজুয়েলার বিপুল খনিজসম্পদ ও জাতীয়করণকৃত তেলশিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে আগ্রহী। ট্রাম্প বলেন, আমরা মাটির নিচ থেকে বিপুল সম্পদ তুলব, যা যাবে ভেনেজুয়েলার মানুষের কাছে, বাইরে থাকা ভেনেজুয়েলানদের কাছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবে।

এতে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। কারণ সেখানেও ট্রাম্পের আগ্রহ রয়েছে। মাদুরোকে আটক করার অভিযান আরেকটি বড় আঘাত আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণায়। ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, তিনি অপছন্দের আইন উপেক্ষা করতে দ্বিধা করেন না। ইউরোপীয় মিত্ররা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারসহ এখন এমন ভাষা খুঁজছেন যাতে আন্তর্জাতিক আইনকে সমর্থন জানান, আবার একইসঙ্গে মাদুরো অভিযানের নিন্দাও না করেন- যদিও এটি জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি- এটি কেবল এক ‘মাদকসম্রাট’ গ্রেপ্তারের আইনগত সহায়তা। কিন্তু ট্রাম্পের স্পষ্ট ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্র এখন দেশটির তেলশিল্পসহ পুরো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এই যুক্তিকে দুর্বল করে।
মাদুরোকে আটক করার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি কারাকাসে চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চীন এই পদক্ষেপের নিন্দা জানায়। তারা বলে, মার্কিন আধিপত্যমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করছে। তবে একইসঙ্গে এই নজিরকে চীন হয়তো নিজের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবেও দেখবে। তাইওয়ানকে তারা ‘বিদ্রোহী প্রদেশ’ মনে করে এবং পুনর্মিলনকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছে। এ কারণেই মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্রেট সহ-সভাপতি মার্ক ওয়ার্নার সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিদেশি নেতাকে গ্রেপ্তারের অধিকার দাবি করে তাহলে চীন কেন তাইওয়ানের নেতাদের বিরুদ্ধে একই দাবি তুলতে পারবে না? পুতিন কেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে অপহরণের যুক্তি দাঁড় করাবেন না? এই সীমা একবার ভাঙা হলে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী নিয়ম ভেঙে পড়তে শুরু করবে এবং প্রথম সুযোগ নেবে কর্তৃত্ববাদী শাসনগুলো।

ডনাল্ড ট্রাম্প যেন বিশ্বাস করেন, নিয়ম তিনিই বানান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা প্রযোজ্য, অন্যদের জন্য তা নয়। কিন্তু বাস্তব বিশ্বের শক্তির রাজনীতিতে তা এভাবে চলে না। ২০২৬ সালের শুরুতেই তার পদক্ষেপ আরেকটি অস্থির বছরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

mzamin

২৩ লাখ টাকার হার গিলে ফেলল চোর

নিউজিল্যান্ডে একটি গহনার দোকান থেকে অভিনব কায়দায় চুরি করার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযোগ, তিনি প্রায় ৩৩ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার বা প্রায় ১৯ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩ লাখ ২২ হাজার ১১৭ টাকা) মূল্যের একটি ফ্যাবার্জে পেনডেন্ট গিলে ফেলেন। এখন সেই প্রমাণ উদ্ধারের জন্য প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

৩২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়নি। গত ২৮ নভেম্বর অকল্যান্ডের পার্ট্রিজ জুয়েলার্স নামের একটি দোকান থেকে একটি অলংকৃত ফ্যাবার্জে ‘অক্টোপাস পেনডেন্ট’ গিলে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) পুলিশ জানায়, এখনো চুরির সেই পেনডেন্ট উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এক বিবৃতিতে ইন্সপেক্টর গ্রে অ্যান্ডারসন বলেন, গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্তের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো পেনডেন্টের কোনো খোঁজ মেলেনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, চুরির ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দোকানের ভেতর থেকে ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ২৯ নভেম্বর তিনি অকল্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির হন। তবে চুরির অভিযোগে তখনো তিনি দোষ স্বীকার বা অস্বীকারের কোনো বক্তব্য দেননি।

চুরি হওয়া বলে দাবি করা পেনডেন্টটি ১৯৮৩ সালের জনপ্রিয় জেমস বন্ড চলচ্চিত্র অক্টোপাসি থেকে অনুপ্রাণিত একটি সীমিত সংস্করণের ফ্যাবার্জে ডিম আকৃতির অলংকার। ছবিটির কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল চোরাচালানের ঘটনা।

দোকানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, এ ধরনের মাত্র ৫০টি পেনডেন্ট তৈরি করা হয়েছে। সোনার তৈরি এই অলংকারে সবুজ এনামেল ব্যবহার করা হয়েছে এবং এতে বসানো রয়েছে ১৮৩টি হীরা ও দুটি নীলা। পেনডেন্টটির উচ্চতা প্রায় ৮ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার এবং এটি একটি স্ট্যান্ডের ওপর স্থাপন করা থাকে।

বর্ণনায় আরও বলা হয়, ডিমটি খুললে ভেতরে দেখা যায় ১৮ ক্যারেট হলুদ সোনায় তৈরি একটি অক্টোপাস, যার শুঁড়ের অংশে সাদা হীরা এবং চোখে কালো হীরা বসানো। এটি অক্টোপাসি চলচ্চিত্রের মূল প্রতিপক্ষের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবেই নকশা করা।

পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি হেফাজতে থাকায় তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তাদের দায়িত্ব রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। সময় এবং হজমপ্রক্রিয়াই ঠিক করে দেবে, এই ঘটনায় আরেকটি ‘অক্টোপাস সারপ্রাইজ’ সামনে আসে কি না। 

পুরোনো ছবি
পুরোনো ছবি

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলকে ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দখলদারদেরকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওই তথ্য দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ। এতে বলা হয়েছে, ব্রাউন ইউনিভার্সিটিস ওয়াটসন স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এন্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ১০ বিলিয়ন বা তার বেশি অর্থ নিরাপত্তা সহায়তার জন্য ব্যয় করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে গাজা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান ডনাল্ড ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহে হামাস ও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে পরোক্ষ আলোচনা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় সাড়া দেয় হামাস।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া ইসরাইল গাজায় তাদের অভিযান পরিচালনা করতে পারতো না। বলা হয়েছে, বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীনে ইসরাইলের জন্য ভবিষ্যতে কয়েক বিলিয়ন ডলার তহবিল বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রথম বছরেই ১৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। তখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় ছিলেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু সামরিক সহায়তা ইতিমধ্যেই সরবরাহ করা হয়েছে বাকিগুলো আগামী বছর সরবরাহ করা হবে। ওয়াশিংটন ভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিলো। তবে কিছু ইসরাইলপন্থি গোষ্ঠী ইনস্টিটিউটটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইসরাইল বিরোধী বলে অভিযুক্ত করেছে।
https://mzamin.com/uploads/news/main/183572_Lima-3.webp