Monday, June 28, 2010

পাঁচ বছরের মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে ব্রিটিশ সেনাদের পুরোপুরি সরিয়ে নিতে চান। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। গত শুক্রবার কানাডার টরন্টোয় সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। জি-৮ ও জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে ডেভিড ক্যামেরন সেখানে রয়েছেন।
আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে এটাই যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম পরিষ্কার আভাস। ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে সব সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘আমি তো তা-ই চাই, এতে কোনো ভুল হবে না। আরও পাঁচ বছর সেখানে আমরা থাকতে চাই না। সেখানে আমরা এর মধ্যে নয় বছর কাটিয়েছি।’
ক্যামেরন বলেন, ‘আমরা কাজে নেমে পড়তে চাই, যাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে। আমরা চাই, পুরোপুরি না হলেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক, যাতে আফগানরা নিজেরাই দেশ চালাতে পারে। এতে ব্রিটিশ সেনারা দেশে ফিরে যেতে পারবে।’ তবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সেনা প্রত্যাহারে কঠোরভাবে সময়সীমা অনুসরণে তিনি ইচ্ছুক নন।
এর আগে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডেভিড ক্যামেরন আভাস দেন, ২০১৫ সালের মধ্যে তিনি ব্রিটিশ সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে।
ক্যামেরন ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিয়াম ফক্স এরই মধ্যে এটি পরিষ্কার করেছেন যে আফগানিস্তানে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ধীর অগ্রগতিতে তাঁরা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে, স্থানীয় নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে তেমন অগ্রগতি নেই। তারা এখনও এককভাবে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে সক্ষম হননি।

জ্যাকসনের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা

প্রয়াত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক কনরাড মারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁর বাবা জোসেফ জ্যাকসন। জ্যাকসনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে গত শুক্রবার তিনি এ মামলা করেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালতে দায়ের করা মামলায় চিকিৎসক মারের বিরুদ্ধে জ্যাকসনকে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছে। মারের বিরুদ্ধে জরুরি মেডিকেল সার্ভিসকে খবর দিতে দেরি করা ও পরে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ারও অভিযোগ আনা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, জ্যাকসন অসুস্থ হওয়ার পরের সব ঘটনার সঠিক বর্ণনাও দেননি চিকিৎসক মারে। তিনি শুধু জানান, জ্যাকসনের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চিকিৎসকদের খবর দেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, প্রপোফল উচ্চমাত্রার চেতনানাশক ওষুধ। এটি হাসপাতালে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাড়িতে কারও চিকিৎসার জন্য এই ওষুধের ব্যবহার একেবারেই অস্বাভাবিক।
কনরাড মারের আইনজীবীরা অবশ্য বরাবরের মতোই মারেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁরা বলেন, ‘মারে এমন কিছু করেননি যাতে পপতারকা জ্যাকসনের মৃত্যু হতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, আদালতেই প্রমাণ হবে তিনি নির্দোষ।’
জ্যাকসনের ব্যবহূত জিনিস নিলামে
জ্যাকসনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে অনুষ্ঠিত নিলামে তাঁর একটি জ্যাকেট বিক্রি হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারে। নিলামকারীরা ধারণা করেছিলেন, এর দাম আট হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে এই পপতারকার দেওয়া একটি অটোগ্রাফ ২১ হাজার, এমটিভি মুনম্যান অ্যাওয়ার্ডের ভিডিওচিত্র ‘স্ক্রিম’ ৪৩ হাজার ৭৫০ ও তাঁর স্বাক্ষরিত একটি সাদা হ্যাট ৫৬ হাজার ২৫০ ডলারে বিক্রি হয়। জুলিয়েন অকশন হাউস নামের একটি প্রতিষ্ঠান এ নিলামের আয়োজন করে।

নতুন সংবিধান নিয়েকিরগিজস্তানে আজ গণভোট

জাতিগত দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত কিরগিজস্তানে আজ রোববার গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন সংবিধানকে জনগণ গ্রহণ করবে না বর্জন করবে, তা জানার জন্য এ গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। গণভোটে যাতে সবাই অংশ নিতে পারে, সে জন্য গতকাল শনিবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওশ থেকে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়েছে। এ মাসের প্রথম দিকে এই ওশ শহরেই কিরগিজ ও উজবেকদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গায় কমপক্ষে ২৬৪ জন নিহত হয়।
কিরগিজস্তানের উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাকতিবেক আলিমবেকভ গতকাল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে কারফিউ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ওশ শহরের বাসিন্দারা কারফিউ আরও কিছুদিন বহাল রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু গণভোটের পর সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, সেটা দেখার জন্যই তাঁরা সেখান থেকে কারফিউ তুলে নিচ্ছেন। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন রাখা হবে।
ভোট দেওয়ার ব্যাপারে ওশ শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। শহরের একজন বাসিন্দা বলেন, জনজীবন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শহরে যা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে তিনি মনে করছেন। আরেক বাসিন্দা জানান, তিনি ভোট দিতে যাবেন না। কারণ তাঁর মতে শহরের অবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
কিরগিজস্তানের নতুন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমানো হয়েছে। এতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। গণভোটে এ সংবিধান পাস হলে কিরগিজস্তান হবে মধ্য এশিয়ার প্রথম সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান রোজা ওতুনবায়েভা জনগণকে নতুন সংবিধানের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিরগিজ কর্মকর্তারা বলছেন, গণভোটে সংবিধানটি পাস হলে আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশে একটি স্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এই গণভোট ভণ্ডুলের জন্যই সাবেক সরকারের ইন্ধনে সম্প্রতি দেশে জাতিগত দাঙ্গা হয় বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এ গণভোটের সমালোচনা করেছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এ সময়ে গণভোট অনুষ্ঠান সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, খুব জটিল একটা সময়ে এ ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ (ওএসসিই) কিরগিজস্তানের গণভোট পর্যবেক্ষণের জন্য ৩০০ পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিরাপত্তার কারণে বাতিল করে দিয়েছে।

নতুন নেতা নির্বাচন করবে উ. কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নতুন নেতা নির্বাচন করবে। এ লক্ষ্যে সেপ্টেম্বরে দলের প্রতিনিধিদের সভা ডাকা হয়েছে। গতকাল শনিবার উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা নর্থ কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি সূত্রে এ কথা জানা যায়।
বার্তা সংস্থাটি জানায়, ওই সভায় দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নির্বাচন করা হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সভায় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল জং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কিম জং উনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেন। প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার (ডব্লিউপিকে) এটি হবে এ ধরনের তৃতীয় সভা। ১৯৪৮ সালে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
দলের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দলের উন্নয়নে আমরা এখন পবিত্র বিপ্লব ঘটানোর কাজে নিয়োজিত। আমরা এর সামরিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়াতে চাই। এ দেশকে একটি সমৃদ্ধ ও ক্ষমতাশালী সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়তে চাই।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ সভার বিরাট রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। এর মাধ্যমে কিম জং উনের মর্যাদা বাড়বে।
ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি: উত্তর কোরিয়াকে ‘ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন কর্মকাণ্ড’ থেকে বিরত থাকার জন্য হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হুঁশিয়ারি এমন একসময় দেওয়া হলো, যখন পিয়ংইয়ং নতুন বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, উত্তর কোরিয়া তার পশ্চিম উপকূলে জাহাজ চলাচলের ওপর নয় দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আগে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা করা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফিলিপ ক্রাউলি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া আরেক দফা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাক—এটা আমরা কোনোভাবেই চাই না।

মৃতদের সংঘ!

মৃত মানুষেরাও নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য সংগঠন করেছেন! খবরটা একটু অবিশ্বাস্য শোনালেও এ ধরনের একটি সংগঠনের খবর মিলেছে ভারতের উত্তর প্রদেশে। মৃত ৪৭০ ব্যক্তি গড়ে তুলেছেন এই সংগঠন। তবে আসলে তাঁরা কেউ কিন্তু মৃত নন। উত্তর প্রদেশের সরকারি খাতায় ভুলবশত তাঁদের মৃত বলে দেখানো হয়েছে। তাই এসব মৃত ব্যক্তি তাঁদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘মৃতক সংঘ’।
৩০ জুন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই মৃতক সংঘ পালন করতে যাচ্ছে ‘পুনর্জন্ম দিবস’। আর এ দিনেই রাজ্য সরকারের কাছে তুলে ধরবেন তাঁদের বিভিন্ন দাবির কথা।
প্রসঙ্গত, এই মৃতক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা লাল বিহারীকে ১৯৭৬ সাল থেকে সরকারের খাতায় মৃত দেখানো হচ্ছে।

মুম্বাই হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন পাকিস্তানি জিম্বাবুয়েতে আটক

মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত এক সন্দেহভাজনসহ দুই পাকিস্তানি নাগরিককে আটক করেছে জিম্বাবুয়ের পুলিশ। সন্দেহভাজন ৩৩ বছর বয়সী ইমরান মুহাম্মদ ও তাঁর সহযোগী সড়ক পথে জিম্বাবুয়ে থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার চেষ্টা করছিল। জিম্বাবুয়ের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা হেরাল্ড গতকাল শনিবার এ তথ্য জানায়।
পুলিশের মুখপাত্র ওয়েনে বুজিজেনা জানান, ২০ জুন কেনিয়ার ভুয়া পাসপোর্ট দেখিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবেশের চেষ্টাকালে তাঁদের আটক করা হয়। তাঁদের ব্যাপারে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁদের প্রবেশের প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুজিজেনা জানান, পূর্ণ তদন্তের পরই এ বিষয়ে জানা সম্ভব হবে।
বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

মিসরে চার হাজার লোকের সন্ত্রাসবিরোধী বিক্ষোভে এল বারাদি

মিসরের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মোহাম্মদ এল বারাদি গত শুক্রবার সন্ত্রাসবিরোধী এক বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় অনুষ্ঠিত এ বিক্ষোভে সাধারণ মানুষসহ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রায় চার হাজার মানুষ অংশ নেয়।
৬৮ বছর বয়সী জাতিসংঘের সাবেক পরমাণু পরিদর্শক এল বারাদি আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছানোর পর সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে অভিনন্দন জানায়। খালেদ মোহাম্মদ সাঈদ নামের একজন মিসরীয় নাগরিকের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে তিনি সেখানে যান। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য, পুলিশের পিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ বিক্ষোভের মাধ্যমে এল বারাদি এই মাসে দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে এলেন। এ মাসের শুরুতে তিনি সপরিবারে এক সমাবেশে হাজির হন।

পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে ডিপিজে: জরিপ

জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ কাউন্সিলর পরিষদে (হাউস অব কাউন্সিলরস) সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপান (ডিপিজে)। ১১ জুলাই এই নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক জরিপে প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ায় এ ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার প্রকাশিত কয়েকটি জরিপেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ করা যায়।
২৪২ আসনের কাউন্সিলর পরিষদে পিপলস নিউ পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে ডিপিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আগামী মাসে কাউন্সিলর পরিষদের ১২১টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আশাহি শিম্বুন ও ইয়োমিউরি শিম্বুনের জরিপে দেখা যায়, ডিপিজে ৫০টি আসনে জয় পেতে পারে।
দ্য নিক্কেইয়ের জরিপ অনুযায়ী, ডিপিজে ৫৪ এবং প্রধান বিরোধী দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৪০টির মতো আসন পেতে পারে।
গত ৮ জুন ক্ষমতা গ্রহণের সময় প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের পক্ষে ৬০ শতাংশ জনসমর্থন ছিল। কিন্তু গতকালের কয়েকটি জরিপে দেখা গেছে, তা ২০ শতাংশে নেমে আসে। দেশটির ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরানোর ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান নিতে না পারায় তাঁর সমর্থন কমে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওই ঘাঁটি সরানোর ব্যাপারে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন কানের পূর্বসূরি ইউকিয়ো হাতোইয়ামা

রোগীর যন্ত্রণাহীন মৃত্যুকে বৈধতা দিল জার্মান আদালত

মৃত্যু পথযাত্রী গুরুতর অসুস্থ কোনো ব্যক্তির ইচ্ছায় যদি তাঁর জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতি (লাইফ সাপোর্ট) বা আনুষঙ্গিক উপাদান সরিয়ে নেওয়া হয় তবে তা অপরাধের মধ্যে পড়বে না। একটি মামলার আপিল শুনানিতে জার্মানির সর্বোচ্চ আদালত ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিস এ আদেশ দেন।
৭০ বছর বয়সী এক মা গুরুতর অসুস্থ হলে তাঁর মেয়ে আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী খাবার সরবরাহকারী নল সরিয়ে নেন। এতে ২০০২ সালে বৃদ্ধা মা গাঢ় আচ্ছন্নতা বা কোমায় চলে যান। এ ঘটনার পর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবার খাবার সরবরাহ নল স্থাপন করেন। এর দুই সপ্তাহ পরে হূদযন্ত্র দুর্বল হয়ে মৃত্যু হয় বৃদ্ধার।
পরে এ নিয়ে মামলা হলে নিম্ন আদালত মেয়েটির আইনজীবীকে নয় মাসের জন্য আইন পেশা থেকে স্থগিত করেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আইনজীবী উচ্চ আদালতে আপিল করেন। উচ্চ আদালত দণ্ড থেকে আইনজীবীকে বেকসুর খালাস দেন।
উল্লেখ্য, এর আগে ওই বৃদ্ধা নিজ থেকেই কৃত্রিমভাবে বেঁচে থাকতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

ট্রেনের গায়ে ছবি আঁকায়

সিঙ্গাপুরে ট্রেনের গায়ে ছবি আঁকার দায়ে সুইজারল্যান্ডের একজন চিত্রশিল্পীকে পাঁচ মাসের জেল ও তিনটি বেত্রাঘাতের শাস্তি দিয়েছেন সে দেশের একটি আদালত।
ওলিবার ফ্রিকার নামের ৩২ বছর বয়স্ক ওই সুইস নাগরিক পেশায় একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী। তিনি ট্রেনের গায়ে স্প্রে যন্ত্রের সাহায্যে ছবি আঁকার কথা স্বীকার করেছেন। বিচারক তাঁর ওই কাজকে দেশের নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁকে ওই শাস্তি প্রদান করেন।
সিঙ্গাপুরে প্রচলিত এই বেত্রাঘাতের শাস্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সমালোচনা রয়েছে। সাধারণত শক্ত ও মোটা লাঠির সাহায্যে পিঠে আঘাত করে এ শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। এতে প্রায়ই পিঠে দাগ পড়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ জন্য এই শাস্তিকে বর্বরোচিত কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ছবি আঁকার আট দিনের মাথায় গত ২৫ মে ফ্রিকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারক সি কি উন তাঁর রায়ে বলেন, ফ্রিকার সিঙ্গাপুরে সংঘটিত অপরাধমূলক কাজের শাস্তি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। জেনেশুনে তিনি ওই কাজ করেছেন। এ জন্য তাঁকে ওই শাস্তি দেওয়া হলো। একই কাজের জন্য সিঙ্গাপুরের পুলিশ একজন ব্রিটিশ নাগরিককে খুঁজছে।

বিদেশি জাহাজটির অস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য পরীক্ষা করা হবে কলকাতায়

পশ্চিমবঙ্গে আটক হওয়া বিদেশি মালবাহী জাহাজ ‘এমভি এজিয়ান গ্লোরি’তে আনা অস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য পরীক্ষার জন্য এটিকে কলকাতা বন্দরে আনা হচ্ছে। গত শুক্রবার জাহাজটি ভারতের নৌবাহিনী নিজেদের জলসীমায় আটক করে। গতকাল শনিবার পুলিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনকে রায়চকের হোটেল র্যাডিসনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের মহানির্দেশক ভুপিন্দর সিং গতকাল সাংবাদিকদের জানান, জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহাজে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদের নথিপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে জাহাজটিকে কলকাতা বন্দরে এনে এর পণ্য পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সূত্রমতে, ওই জাহাজে রয়েছে স্মোক বোমা, রকেট লঞ্চার, মর্টার, বিমান বিধ্বংসী কামান ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্র।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এজিয়ান গ্লোরি নামের মালবাহী জাহাজে পাকিস্তানের জন্য আসা অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ জনৈক মেজর খলিলুল্লা খানের নামে এলেও এর সপক্ষে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি জাহাজের স্থানীয় ক্লিয়ারিং এজেন্ট। জাহাজের অস্ত্রশস্ত্র তদন্তে দিল্লি থেকেও আসছে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল।
ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রাথমিক তদন্তের পর ধারণা করছেন, জাহাজটির অস্ত্র জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সূত্র জানায়, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়া থেকে জাহাজটি আসে। এতে রয়েছে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানের সেনাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদসহ অন্যান্য মালামাল। এসব অস্ত্র বাংলাদেশ, নেপাল এবং পাকিস্তানে নামার কথা। জাহাজটি যথারীতি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে শান্তিরক্ষী বাহিনীর মালামাল খালাস করে কলকাতার উদ্দেশে আসছিল। কলকাতা বন্দরে নেপালের মালামাল খালাস করার কথা ছিল। নেপালের মালামালের কাগজপত্রও পাওয়া গেছে। এরপর জাহাজটির পাকিস্তানের করাচি বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কলকাতা বন্দরকে না জানিয়ে জাহাজটি পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্রসীমায় ঢুকে পড়লে জাহাজটি আটক করা হয়। পরে এতে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ জাহাজটি আটক করে নিয়ে আসে ডায়মন্ড হারবারের অদূরে কালীচরণপুরে। জাহাজের ক্যাপ্টেন বলেছেন, জাহাজে আনা অস্ত্র করাচি নামবে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জন্য এসব আনা হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণমুদ্রা নিলামে বিক্রি হয়েছে

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণমুদ্রা নিলামে ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। ৫২ সেন্টিমিটার ব্যাসের এ মুদ্রাটির ওজন ১০০ কেজি।
অরো ডিরেক্ট নামে একজন স্প্যানিশ ব্যবসায়ী মুদ্রাটি কিনে নেন। ২০০৭ সালে কানাডায় নিখাদ সোনা দিয়ে মুদ্রাটি তৈরি হয়। পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণমুদ্রা হিসেবে এটি গিনেজ রেকর্ডবুকে স্থান পায়। মুদ্রাটির এক পিঠে ব্রিটেনের দ্বিতীয় রানি এলিজাবেথের প্রতিকৃতি এবং অপর পিঠে কানাডার জাতীয় প্রতীক মেপলগাছের পাতা রয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান আয়ুর ভন ওয়েলসবাহ মুদ্রাটির প্রকৃত মালিক ছিল। গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়।

নকশায় প্রিন্স চার্লসের হস্তক্ষেপ অপ্রত্যাশিত ও অযাচিত

যুক্তরাজ্যের একটি বড় নির্মাণ প্রকল্পের নকশায় যুবরাজ প্রিন্স চার্লসের হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন লন্ডন হাইকোর্ট। চার্লসের আপত্তির কারণে পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হবে না—এ আশঙ্কায় প্রকল্পের কাতারি অংশীদার কাতারি দিয়ার (কিউডি) পরিকল্পনার আবেদন প্রত্যাহার করে নিলে ব্রিটিশ উদ্যোক্তা ‘সিপিসি গ্রুপ’ মামলা ঠুকে দিয়েছিল।
গত শুক্রবার দেওয়া ওই রায়ে আদালত বলেছেন, প্রিন্স চার্লসের হস্তক্ষেপ ‘অপ্রত্যাশিত ও অযাচিত’।
বিচারক জেফ্রি ভস রায়ে বলেন, কাতারের সরকারি আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিউডি আবেদন প্রত্যাহার করে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে বটে, কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না এবং যুবরাজের হস্তক্ষেপের কারণে তারা খুবই নাজুক অবস্থায় পড়েছিল। তবে লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন এটির অনুমোদন না দেওয়ার জন্য স্থানীয় ওয়েস্টমিনস্টার নগর পরিষদের ওপর তাঁর প্রভাব খাটাতেন কাতারি দিয়ারের এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই বলে মত দেন তিনি।
চার্লসের আপত্তির কারণ, প্রকল্পটির নকশা খুব হাল ফ্যাশনের, যা তাঁর পছন্দ নয়। তিনি আরেকটু ঐতিহ্যবাহী কিছু আশা করেছিলেন।
লন্ডনের সবচেয়ে দামি এলাকাগুলোর একটিতে অবস্থিত টেমস তীরবর্তী চেলসি ব্যারাক ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি। ২০০৮ সালে মন্ত্রণালয় ১২ দশমিক আট একরের এ সম্পত্তি সাড়ে ৯৯ কোটি পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়। ওই জায়গায় প্রায় ৬০০ বাড়ি, বিপণিবিতান, খেলাধুলার সুবিধাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তোলার কথা ছিল।
‘সিপিসি গ্রুপ’ বলেছে, কিউডি এ প্রকল্পের চুক্তি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ায় তাদের ছয় কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে। আদালত কাতারি দিয়ারকে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করলেও প্রতিষ্ঠানটিকে সিপিসির দাবি করা ক্ষতিপূরণে কোনো নির্দেশ দেননি। আর্থিক ক্ষতির দিকটি তদন্তের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে বলে আদালত জানিয়েছেন।
ব্যয়বহুল এ প্রকল্পের একটি আধুনিক নকশা করেছিলেন স্থপতি লর্ড রিচার্ড রজার্স। কিন্তু এ নকশার ব্যাপারে অসম্মতি জানান প্রিন্স চার্লস। তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কাতারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন। চার্লস তাঁকে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘নকশাটি দেখে তাঁর হূদয় ভেঙে গেছে।’ আধুনিক এ নকশার পরিবর্তে তিনি ব্রিটেনের স্থাপত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নকশায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন।
আদালতের এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রিন্স চার্লসের মুখপাত্র প্যাডি হেভারসন বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে প্রিন্স চার্লসের। তিনি তা উৎসাহের সঙ্গেই করেন। কারণ এসব নিয়ে তাঁর উদ্বেগ রয়েছে। আর তিনি যাদের পরামর্শ দেবেন, তাদেরও অধিকার আছে তা শুনবে কি না, সেটা ঠিক করার।’
আদালতের এ রায়কে রজার্স ও অন্য স্থপতিদের জন্য একটি বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা অভিযোগ করে আসছেন, পরিকল্পনা-প্রক্রিয়ায় প্রিন্স চার্লসের প্রভাব খুবই বেশি এবং এ ধরনের ব্যাপারে তাঁর হস্তক্ষেপ সাংবিধানিক কর্তৃত্বের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা

শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৮ সম্মেলনের শুরুতেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপায় নিয়ে সৃষ্ট মতপার্থক্য দূর করার চেষ্টা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। এ ছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে আর্থিক ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে অভিন্ন ক্ষেত্র সৃষ্টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
কানাডায় গত শুক্রবার শুরু হওয়া শিল্পোন্নত দেশগুলোর সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নেতারা এ দুটি বিষয় নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁরা নিজেদের আর্থিক ঘাটতি পূরণ করে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
উন্নয়নশীল বিশ্বের মা ও শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলো ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এ ঘোষণায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে এ প্রতিশ্রুতির কড়া সমালোচনা করেছে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা।
জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বলেছেন, ঘাটতি পূরণ করে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার এ আর্থিক ঘাটতি তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভাজনকে প্রতিনিধিত্ব করে না।
শুক্রবারের আলোচনা শেষে মেরকেল সাংবাদিকদের বলেন, ইউরোপ ও জি-৮-এর সদস্যরাষ্ট্রগুলো ঋণ কমিয়ে আনা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলেছি, আমাদের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি দরকার এবং প্রবৃদ্ধি ও কৌশলী ব্যয় সংকোচনের মধ্যে অসংগতি থাকা উচিত নয়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। জার্মানির টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবে বিরোধিতা করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঘাটতি কমানোর প্রস্তাবকে প্রেসিডেন্ট ওবামা মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। ওবামা স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার বলেন, ‘আমরা বিশ্বকে সেই দিনের দিকে নিয়ে যেতে চাই, যেদিন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রসূতিকালীন মা ও শিশু মারা যাবে না। এ লক্ষ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলো “মুসকোকা পদক্ষেপ” নামের ৫০০ কোটি ডলারের একটি তহবিল গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে।’
দারিদ্র্যবিরোধী কর্মসূচির কর্মীরা জি-৮-এর সদস্যভুক্ত দেশগুলোর এ প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করেছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের পক্ষে মার্ক ফ্রেইড বলেছেন, শিল্পোন্নত দেশগুলো নতুন করে এ সহায়তার ঘোষণার মধ্য দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে তাদের আগের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার ব্যর্থতাকে আড়াল করতে চাইছে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বনেতারা তাঁদের ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
২০০৫ সালে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত জি-৮ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা ২০১০ সাল নাগাদ তাঁদের উন্নয়ন-সহায়তা পাঁচ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি পূরণে এখন পর্যন্ত দুই হাজার কোটি ডলার ঘাটতি রয়েছে।
নতুন প্রতিশ্রুত তহবিলের মধ্যে কানাডা একাই ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন দেবে ১৫০ কোটি ডলার।
জি-৮ সম্মেলনে গতকাল শনিবার আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল। এতে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসার কথা।
জি-৮ ও জি-২০ সম্মেলন উপলক্ষে উন্নত, উন্নয়নশীল ও উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর অনেক নেতাই এখন কানাডায় অবস্থান করছেন।

রনের ‘হ্যাটট্রিক’ এবং ইনিয়েস্তা

ব্রাজিলের বিপক্ষের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে মেলাতে পারেন প্রথম ম্যাচের রোনালদোর সঙ্গে। আইভরিকোস্টের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের মতো পরশুও পুরো ম্যাচে বলার মতো কিছু করেননি। তার পরও যতটুকু করেছেন, তাতেই ছাপিয়ে গেছেন অন্যদের, অন্যদের অবস্থা যে ছিল আরও হতাশাজনক! আবারও তাই ম্যাচ-সেরা ‘রন’। মাঝে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ-সেরা হয়েছিলেন দুর্দান্ত খেলেই। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের তিনটিতেই সেরা হলেন পর্তুগাল অধিনায়ক, ম্যান অব দ্য ম্যাচের হ্যাটট্রিক!
রোনালদো যেমন পর্তুগালের প্রাণভোমরা, ঠিক ততটা না হলেও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা স্পেনের গেমপ্ল্যানের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বকাপের আগে সম্ভাব্য গোল্ডেন বল বিজয়ীদের মাঝে ছিল তাঁর নামও। কিন্তু আগের দুই ম্যাচে তিনি ছিলেন হতাশার আরেক নাম। বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনজুরি বাঁধিয়েছিলেন। সেই ইনজুরি কাটিয়ে প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন, তবে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। স্পেন কোচ তাই মাঠ থেকে উঠিয়েও নিয়েছিলেন তাঁকে। ওই ম্যাচেই বাঁধিয়ে ফেলেন আরেক দফা ইনজুরি, হন্ডুরাসের বিপক্ষে ম্যাচটা দেখতে হয় বেঞ্চে বসেই। তাঁর জায়গায় সুযোগ পেয়ে দুর্দান্ত খেললেন জেসাস নাভাস। তবুও নাভাস নয়, ইনজুরি কাটিয়ে ফেলা ইনিয়েস্তার ওপরই পরশু ভরসা রেখেছিলেন দেল বস্ক। শুরুতে আবারও একটু নিষ্প্রভ ছিলেন, কিন্তু আস্তে আস্তে নিজেকে ফিরে পান। সেই চমৎকার সব পাস, চোখ-ধাঁধানো স্কিল। দলের জয় নিশ্চিত করা দ্বিতীয় গোলটিও করেছেন বক্সের ভেতর থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে। কোচের আস্থার প্রতিদান দিলেন ‘ডন আন্দ্রেস’ ম্যাচ-সেরা হয়ে।
প্রস্তুতি ম্যাচেই হাত ভেঙে দিদিয়ের দ্রগবার বিশ্বকাপটাই হয়ে গিয়েছিল অনিশ্চিত। প্রথম ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন পুরোপুরি সুস্থ না হয়েই। ব্রাজিলের বিপক্ষে পরের ম্যাচে খেলেছেন পুরো সময়ই, একটি গোলও পেয়েছেন। তবে ইনজুরির জন্যই হয়তো বিচ্ছিন্ন কিছু মুহূর্ত ছাড়া দুটো ম্যাচের একটিতেও সেই বিধ্বংসী দ্রগবাকে দেখা যায়নি। দেখা গেল পরশু। না, স্কোরশিটে দু-তিনবার নাম তুলতে পারেননি। তবে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে দ্রগবাকে দেখা গেছে দ্রগবারূপে। তাঁকে সামলাতে হিমশিম খেয়েছে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স, তাঁর শট বারে লাগার পর ফিরতি বলে হেডে গোল পেয়ে গেছেন রোমারিক। গোল না পেয়েও তাই সেরা দ্রগবা।
নোয়েল ভ্যালাদারেসকে সতীর্থরা ডাকেন ‘দ্য সিক্রেট’, তাঁর লাজুক স্বভাবের জন্য। এই লাজুক ছেলেটিই মাঠে নামলে হয়ে যান অন্য রকম, হন্ডুরাসের গোলপোস্টে আস্থার মূর্ত প্রতীক। ২৮ বছর পর হন্ডুরাসের বিশ্বকাপে আসায় বড় একটা ভূমিকা ছিল নোয়েলের, কনকাকাফ অঞ্চলের বাছাই পর্বে হন্ডুরাস এবার সবচেয়ে কম গোল খেয়েছিল তাঁর বীরত্বেই। পরশু সুইজারল্যান্ডের একের পর এক আক্রমণ ফিরিয়ে দলকে এনে দিলেন এই বিশ্বকাপের একমাত্র পয়েন্ট, হলেন ম্যাচ-সেরা।

এই তো স্পেন

গ্যালারি ভরছে না। ফাঁকা পড়ে থাকছে আসন। পরশু ৫২ হাজার ধারণক্ষমতার লফটাস ভার্সফেল্ড স্টেডিয়ামে দর্শক হলো ঠিক ১০ হাজার কম।
মনও ভরছে না। ফুটবল খেলাটার আনন্দ হেরে গেছে সাফল্যতৃষ্ণার কাছে। কোনো দলের কাছেই ভালো খেলাটা গুরুত্ব পাচ্ছে না, যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে যেনতেনভাবে পরাজয় এড়ানো। সমর্থকেরাও আনন্দ করতে ভুলে গেছে। প্রথম দিকে শীতের কবলে পড়ে ব্রাজিলের সাম্বা ঢেউ তুলতে পারল না, মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু এখন অতটা শীত নেই, তবু সাম্বা লুকিয়ে থাকবে কেন?
আসলে সাফল্যতৃষিত ফুটবল-দুনিয়ায় দল-সমর্থকের মনোজগৎ একই তারে বাঁধা পড়ে গেছে। দল সাফল্য, প্রত্যাশা আর পরাজয়ের ভয়ে থাকে ভীত। আর সমর্থকেরাও তাদের হয়ে গ্যালারিতে ইস্ট নাম জপে। চারদিকে তাকিয়ে স্পেনের খয়েরি-লাল-হলুদ পতাকা কম দেখা গেল না। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি উড়ল চিলির লাল পতাকা। যেমন করে তারা হাওয়ায় উড়ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার সম্ভাবনার আনন্দে। কোনোমতে ড্র করলেই দ্বিতীয় রাউন্ড। লাল পতাকাই উড়ল বারবার। ‘চিলি’ ‘চিলি’ বলে চিৎকার করল তারাই। ভয় তরাসে ‘এল মাতাদোর’দের হাতের ভয়ার্ত পতাকাগুলো উড়ল লুকিয়ে চুরিয়ে। ২৪ মিনিটে ডেভিড ভিয়ার দুর্দান্ত এক বুদ্ধিদীপ্ত গোলে স্পেন এগিয়ে যাওয়ার পরও। ৩৭ মিনিটে মার্কো এস্ত্রাদা ফার্নান্দো তোরেসকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে চিলিকে বানিয়ে দিলেন ১০ জনের দল। মুহূর্তেই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলে স্পেনকে ২-০ গোলে এগিয়ে দিলেন ম্যাচের সেরা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। এই প্রথম স্পেনের লাল-হলুদ জাগল, মনে হলো ক্যামোফ্লেজ থেকে বেরিয়ে এল ‘এল মাতাদোর’রা। মুখ খুলল তাদের শীতনিদ্রার গুহার। তবু স্বতঃস্ফূর্ত নয়। তবু ইতিউতি তাকানো সতর্ক প্রতিক্রিয়া।
এমনটা হবেই বা না কেন? রক্ষণের সামান্য ভুলে বিরতির পর ২ মিনিট না যেতেই তো একটা গোল ফিরিয়ে দিল চিলি, লাতিন আমেরিকার ‘এল মাতাদোর’। তবে কি ১০ জনের দল নিয়েই তারা স্বপ্ন ভেঙে দেবে ইউরো চ্যাম্পিয়নদের? প্রথম ৩৭ মিনিটের চিলি যেমন দুর্দান্ত, দুর্বিনীত ভঙ্গিতে চেপে ধরেছিল স্পেনকে, তাতে সেই শঙ্কাটা জেগেছিল। মাঝমাঠে জাভির ভুল পাসগুলো ধরে যেভাবে তারা পাল্টা আক্রমণে উঠছিল লাল রুমাল দেখা ষাঁড়ের মতো, স্পেন শিবিরের ওপর ভয়ের একটা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। এরপর স্পেন তূণ থেকে বের করল তাদের মূল তীরটিকে। পাসিং ফুটবল। নিজেদের মধ্যে অসংখ্য ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ গড়ে বল দেওয়া-নেওয়া করলেন জাভির সঙ্গে ইনিয়েস্তা, বুসকেটের সঙ্গে তোরেসের বদলি ফ্যাব্রিগাস কিংবা রামোস। শেষ ১৫ মিনিট স্পেন বলই ধরতে দিল না চিলিকে। চিলির আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা চিৎকার করে যান, ভুভুজেলার আওয়াজে তা হারিয়ে যায়। যেমন করে অবশেষে স্পেনের পাসিং ফুটবল আর সময়ে সময়ে জ্বলে ওঠা নৈপুণ্যের ঝলকে হারিয়ে গেল চিলির ড্র অথবা জয়ের সম্ভাবনা।
স্পেনের স্বপ্ন ভাঙতে পারেনি চিলি। এখন উল্টো একটি দুঃস্বপ্নই তাদের দিকে ধেয়ে এল। আগামীকাল জোহানেসবার্গের এলিস পার্কে শেষ ষোলোতে তাদের পরীক্ষা হবে ব্রাজিলের বিপক্ষে। হয়তো এবারের বিশ্বকাপের শেষ পরীক্ষা। বিয়েলসা মুখ ভার করে এলেন সংবাদ সম্মেলনে।
স্পেন খুশি দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে। তারা আনন্দিত ব্রাজিলকে এড়াতে পেরে। কিন্তু স্পেনের খেলোয়াড়েরা খুশি হতে পারছে না নিজেদের খেলায়। মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে জাভি হার্নান্দেজ বলে গেলেন, ‘আমরা মোটেই ভালো খেলতে পারিনি। এখন সামনে পর্তুগাল, ঠিক মুদ্রা নিক্ষেপের মতো এপিঠ অথবা ওপিঠ বলার মতো অবস্থা।’ ম্যান অব দ্য ম্যাচ ইনিয়েস্তার কণ্ঠেও অস্বস্তি, ‘আমাদের অনেক লড়াই করে জিততে হলো। তবু ভালো যে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলাম। এখন পর্তুগালের সঙ্গে আমাদের লড়াইটা জীবন-মৃত্যুর।’
স্পেন কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক ভাবুক টাইপের লোক। ভাবতে ভাবতেই এলেন মিক্সড জোনে। কাঠের প্যাসেজে বাধা পেয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন, শেষ পর্যন্ত সামলে নিলেন। যেমন করে অন্তত দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত নিজেদের সামলে রাখলেন ভিয়া-জাভি-ইনিয়েস্তারা। কিন্তু পর্তুগাল যে ব্রাজিলের চেয়ে কম বড় বাধা নয়! তা ছাড়া গত দুটি বিশ্বকাপেই স্পেনের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ‘আমরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি। পর্তুগাল কঠিন প্রতিপক্ষ, তবু সামনে এগোনোর প্রত্যাশায় আছি’—আত্মবিশ্বাসের কথা বললেন বটে বস্ক, তবুও কণ্ঠের কোন তারে যেন আত্মবিশ্বাসের অভাব।

৪০ বছর পর শেষ আটে উরুগুয়ে

গোলবন্যার একটা মৌসুম কাটাচ্ছেন লুইস সুয়ারেজ। ক্লাব আর জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ৬১ ম্যাচে ৫৫ গোল তাঁর। উরুগুয়ের এই স্ট্রাইকারের জোড়া গোলে কাল দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ গোলে হারাল বিশ্বকাপের প্রথম চ্যাম্পিয়নরা। প্রথম দল হিসেবে নাম লেখাল কোয়ার্টার ফাইনালে। ১৯৭০ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম সেরা আটে জায়গা করে নিল দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের আট মিনিটেই গোল খেয়ে বসে দক্ষিণ কোরিয়া। ভুলটা তাদেরই। বক্সের বাঁ প্রান্ত থেকে ডিয়েগো ফোরলানের ক্রস খুঁজে নিয়েছিল ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা সুয়ারেজকে। কোনাকুনি শটে বল জালে পাঠান তিনি। ৪ ডিফেন্ডার আর গোলরক্ষক ছিলেন নীরব দর্শক।
দ্বিতীয়ার্ধে দারুণভাবে ফিরে আসে কোরিয়া। প্রথম ২০ মিনিট মুহুর্মুহু আক্রমণে উরুগুয়ে রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল তারা। এরই ফসল ৬৮ মিনিটে লি চুং-ইয়ংয়ের গোল। ফ্রি-কিক থেকে বক্সের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা লির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল বল। টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে দলকে সমতায় ফেরান এই ফরোয়ার্ড।
২০০২ বিশ্বকাপের স্মৃতি চকিতে ফিরে এসেছিল ২০১০-এ। সেবার দ্বিতীয় রাউন্ডে এভাবেই পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফিরে এসেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। আন জং-হানের গোল্ডেন গোল ইতালিকে দেশে পাঠিয়ে যৌথ আয়োজকদের তুলে নিয়ে গিয়েছিল শেষ আটে।
কিন্তু এবার আর ২০০২ হলো না। হবে কী করে, উরুগুয়ে যে এবার ফুটবলের মানচিত্রে আবারও তাদের গৌরব ফিরিয়ে আনার পণ করেছে। দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দেশটি সমান বার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজকও তারা। ব্রাজিল প্রথম শিরোপা জেতার আগেই নিজেদের শোকেসে দু দুটো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের ট্রফি জমা করে ফেলেছিল এই উরুগুয়েই।
সেই গৌরব, সেই অহংবোধ যেন ফিরে এল পোর্ট এলিজাবেথে। উরুগুয়ের ফুটবল-দেবতা যেন ফিরে এলেন সুয়ারেজের মধ্যে। ডান কর্নার থেকে উড়ে আসা বল কাঁধে ছুঁয়ে মাটিতে নামালেন। এরপর ডান পায়ের শটে গোলমুখে দাঁড়িয়ে থাকা জটলার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বাঁক খেয়ে ঢুকে গেল জালে। এর আগে ডান পাশের পোস্টে লেগেছিল। কিন্তু এটি গোল না হলে সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসই হয়তো অসন্তুষ্ট হতেন। টুর্নামেন্টে নিজের তৃতীয় গোলটি পেয়ে গেলেন আয়াক্সের এই স্ট্রাইকার। যেভাবে খেলছেন, দলবদলের বাজারে সুয়ারেজকে নিয়ে না কাড়াকাড়ি পড়ে যায়!
পার্ক জি-সুংয়ের দল তখনো হার মানেনি। ৮৬ মিনিটে লি ডং-গুকের জোরালো শট উরুগুয়ের গোলরক্ষক মুসলেরার হাত থেকে ফসকে গোলের দিকেই যাচ্ছিল। গোলমুখের একদম সামনে থেকে বল ক্লিয়ার করেন এই ডিফেন্ডার। কোরীয়দের ভাগ্যটাই আসলে খারাপ। ম্যাচের ৪ মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারত তারা। পার্ক চু-ইয়াংয়ের ফ্রি-কিক গিয়ে লেগেছিল বাঁয়ের পোস্টে!
নেলসন ম্যান্ডেলা বে স্টেডিয়ামের ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর দক্ষিণ কোরিয়ার কান্না মিশে একাকার। আর তিনি, ২০০২ বিশ্বকাপে সেই অবিস্মরণীয় গোল্ডেন গোলের নায়ক আন জং-হান শূন্যে দুবার ঘুষি ছুড়লেন নিষ্ফল আক্রোশে। মাঠে যে নামাই হলো না তাঁর!
ম্যাচ শেষে কোচ হু জুং-মু পিঠই চাপড়ে দিলেন শিষ্যদের, ‘আমার ছেলেরা কখনোই হাল ছাড়েনি। তারা লড়াই করে গেছে। প্রতিটি চ্যালেঞ্জ আমরা সানন্দে বরণ করেছি। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, আমরা সত্যিকারের কোরীয়। আমরাও কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে চেয়েছিলাম। অনেক সুযোগও পেয়েছি। উরুগুয়ের সৌভাগ্য, ওরা বেশি গোল করল, যে সৌভাগ্যটা আমাদের হয়নি।’
উরুগুয়েতে শুরু হয়ে গেছে উৎসব। কোচ অস্কার তাবারেজ কথা দিয়েছেন, এই উৎসব আরও দীর্ঘায়িত করতে প্রাণপণ চেষ্টাই করবে তাঁর দল।

‘মেসি’র সামনে ইংল্যান্ড!

কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে পাওয়ার কথা ছিল না ইংল্যান্ডের। কিন্তু গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের বাজে পারফরম্যান্স এলোমেলো করে দিল সব! গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে ইংল্যান্ড। এ কারণেই দ্বিতীয় রাউন্ডের বাধা পেরোতে পারলে কোয়ার্টার ফাইনালেই আর্জেন্টিনা আর লিওনেল মেসির সামনে পড়তে হবে ফ্যাবিও ক্যাপেলোর দলকে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হলে আজ আরেক মেসিকে পেছনে ফেলে আসতে হবে ইংল্যান্ডকেও!
ভাবছেন এই আরেকজন মেসি আবার কে? গ্রুপ রানার্সআপ হওয়ায় দ্বিতীয় রাউন্ডে জার্মানিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছেন রুনি-টেরিরা। আর এই জার্মানিতেই আছেন আরেক মেসি—মেসুত ওজিল! মেসি যেমন এই অল্প বয়সেই আর্জেন্টিনার আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, ওজিলও তা-ই। জার্মানির দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের স্বপ্ন এখন তাঁকে ঘিরেই।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে অবশ্য সে রকমটা ছিল না। দলের আর পাঁচজন সদস্যের মতোই দক্ষিণ আফ্রিকায় পা রেখেছেন ওজিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত খেলে নজর কেড়ে নিয়েছেন সবার। এরপর তাঁর বাঁ পায়ের এক গোলেই ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট পায় জার্মানি।
এর পর থেকেই জার্মানিতে ওজিলকে নিয়ে মাতামাতি শুরু। পশ্চিম জার্মানির হয়ে ১৯৮০ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা সাবেক তারকা হর্স্ট রুবেচস বলেছেন, ‘আমরা রুনির প্রশংসা করি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা মেসির বেলায়ও তা-ই। কিন্তু আমাদেরই তো একজন মেসি আছে! আমাদের মেসি মেসুত ওজিল।’
তুর্কি বাবা-মায়ের সন্তান ওজিলের জন্ম গেলসেনকিরচেনে। বছর দেড়েক আগেই জার্মানি দলে অভিষেক হয়েছে তাঁর। তুরস্ক দলেও খেলতে পারতেন ওজিল। এবং তাতে আন্তর্জাতিক অভিষেকটা আরও আগেই হতো ২১ বছর বয়সী ওজিলের। কিন্তু জন্মভূমির জার্সি গায়েই খেলতে চেয়েছিলেন এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার।
এতে জার্মানিরও একটা অপূর্ণতা পূরণ হলো। জার্মানিকে ১৯৯০ বিশ্বকাপ এবং ১৯৯৬-এর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানো টমাস হাসলারের বিদায়ের পর থেকেই তাঁর একজন বিকল্প খুঁজছিল জার্মানরা। আর এই বিশ্বকাপ শুরুর আগে কথা হচ্ছিল—চোটের কারণে ছিটকে পড়া মাইকেল বালাকের অভাব পূরণ করবে কে?
জার্মানি দুটিরই সমাধান পেয়ে গেছে ওজিলে। আর ওজিল তাঁর চোখে দেখছেন শুধুই বিশ্বকাপ, ‘আমাদের স্বপ্ন বিশ্বকাপ জেতা, এ কারণেই এখানে এসেছি আমরা। বিশ্বকাপ জয় নিয়েই ভাবছি আমি।’ ইংল্যান্ডেরও ওই একই স্বপ্ন—৪৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিততে চান ওয়েইন রুনি-জন টেরিরা। ওজিল, মানে জার্মানির মেসির স্বপ্ন ভেঙেই সেই স্বপ্ন অর্জন করতে হবে ইংলিশদের।

দুই সতীর্থ আজ প্রতিপক্ষ

খুব বেশি দিন হয়নি, রাফায়েল মার্কেজকে ডিয়েগো ম্যারাডোনা বলেছিলেন ‘বিশ্বসেরা ডিফেন্ডার’। ম্যারাডোনার বিশ্বসেরার আজ বড় একটা পরীক্ষা ম্যারাডোনার দলের বিপক্ষেই। মার্কেজকে আজ সামলাতে হবে মেসি-হিগুয়েইন-তেভেজদের। সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা নেবেন অবশ্যই লিওনেল মেসি। কারণটা সবারই জানা, তবুও আরেকবার শুনুন মার্কেজের মুখেই, ‘ওর (মেসি) কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া কঠিন। ও ভীষণ দ্রুত, চোখের পলকে অবস্থান বদলে ফেলে।’
মেসির শক্তির দিকটা যেমন মার্কেজ জানেন, তেমনই দুর্বলতা কিছু থেকে থাকলে সেটিও জানার কথা মার্কেজের। তেমনই মার্কেজের শক্তি-দুর্বলতাও ভালোভাবে জানার কথা মেসির। কম তো আর হয়নি, গত সাত বছর একসঙ্গে খেলছেন তাঁরা বার্সেলোনায়। দুজনের নাড়ি-নক্ষত্রও তাই জানা থাকার কথা দুজনের। এই বিশ্বকাপটা এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত কেটেছে দুজনেরই। মেসি যেমন দলের মূল চালিকাশক্তি, মার্কেজ তেমনি রক্ষণ সামলে হানা দেন প্রতিপক্ষের সীমানাতেও। একটা দিক থেকে অবশ্য এগিয়ে রাখা যায় মার্কেজকে, ডিফেন্ডার হয়েও পেয়েছেন গোল। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাঁর গোলেই সমতা ফিরিয়েছিল মেক্সিকো। তবে মার্কেজ আবার ম্যাচ-সেরা হননি একবারও, কিন্তু গোল না পেয়েও মেসি ম্যাচ-সেরা হয়েছেন একবার। আজ দুজনের লড়াইটা জমবে পজিশনের কারণেও। এই বিশ্বকাপে মার্কেজ খেলছেন তিন ডিফেন্ডারের একটু সামনে, ওই জায়গা দিয়েই আক্রমণটা বেশি করেন মেসি।
গত বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিলেন দুজন। ওই ম্যাচ নিয়ে দুজনের অনুভূতিটা দুই রকম। মার্কেজের গোলে ৫ মিনিটেই এগিয়ে গিয়েছিল মেক্সিকো। কিন্তু ধরে রাখতে পারেনি, অতিরিক্ত সময়ে হেরে নিজের সাফল্য মিলিয়ে গিয়েছিল দলের ব্যর্থতায়। ১৯তম জন্মদিনে মেসি মাঠে নেমেছিলেন ৭৯ মিনিটে। বেশি কিছু করতে পারেননি, তবে দলের সাফল্যে মাঠ ছেড়েছিলেন মাথা উঁচু করেই। আজকের ম্যাচ কী রেখেছে দুজনের জন্য?

ইংল্যান্ডের কাছে ক্ষমা চাইলেন বেকেনবাওয়ার

ফুটবল দুনিয়ায় এমনিতেই জার্মান কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার অনেক বড় ব্যক্তিত্ব। বড় হূদয়ের বেকেনবাওয়ার নিজের মহত্ত্বটাকে আরেক ধাপ বাড়িয়ে নিলেন ইংল্যান্ডের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে!
হ্যাঁ, ইংলিশদের কাছে সরাসরি ক্ষমাই চাইলেন বেকেনবাওয়ার। তিনি বুঝতে পেরেছেন, ও রকম কড়া ভাষায় ইংলিশদের সমালোচনা করাটা ঠিক হয়নি। একবার নয়, বিশ্বকাপ শুরুর পর দুই দফায় ইংলিশদের সমালোচনা করেছিলেন জার্মান কিংবদন্তি।
প্রথমবার বলেছিলেন, এই ইংলিশরা নাকি আদ্যিকালের ‘কিক অ্যান্ড রান’ ফুটবল খেলে। কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলোকেও দিয়েছিলেন এক ঘা। দ্বিতীয়বার স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে জিতে রুনি-টেরিরা গ্রুপ ‘সি’তে রানারআপ হওয়ার পর বলেছিলেন, ইংলিশরা গাধার মতো ফুটবল খেলে রানারআপ হয়েছে। ইংল্যান্ড-জার্মানির সে কারণেই দেখা হয়ে যাচ্ছে দ্বিতীয় রাউন্ডে।
আজ জার্মানি-ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে নিজের বলা কথার জন্য অনুশোচনা হচ্ছে ‘কাইজার’-এর। সে কারণেই ক্ষমা চাওয়া। শুধু ক্ষমাই নয়, বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেকেনবাওয়ার বলছেন, ইংলিশ ফুটবল খুবই পছন্দ তাঁর, ‘বিশ্বকাপের আগে আমিও ভেবেছিলাম, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ভালো খেলবে, হয়তো শিরোপাও জিতবে।’ কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচে ইংলিশদের খেলা মন কাড়তে পারেনি কাইজারের, ‘দল হিসেবে তারা ভালো, দলে একজন বড় মাপের কোচও আছেন। কিন্তু প্রথম দুটি ম্যাচ দেখে আমি খুবই হতাশ হয়েছি। সত্যি বলছি, রাগ-টাগ নয়, হতাশই হয়েছিলাম খুব।’ ইংল্যান্ডের সমালোচনাটাও নাকি সেই হতাশা থেকেই, ‘সম্ভবত হতাশার কারণেই ও রকম প্রতিক্রিয়া (ইংল্যান্ডের সমালোচনা) দেখিয়েছি আমি। তবে এ জন্য আমি ক্ষমা চাইছি। কারণ, ইংল্যান্ড এবং ইংলিশ ফুটবল—দুটোই আমার খুব পছন্দের। ইংলিশদের স্টাইলের অনেক বড় ভক্ত আমি।’ হতাশা থেকে বেরিয়ে তাঁর বরং এখন ধারণা, ‘আমার তো মনে হচ্ছে, দারুণ এক ম্যাচই হবে এটা (জার্মানি-ইংল্যান্ড)।’

সাবেকদের কথার লড়াই

দু দলের দ্বৈরথ বহু পুরোনো। বার্লিনে ১৯৩০ সালের ৩-৩ গোলের ড্র দিয়ে যার শুরু। সেই থেকে ২৭ বার মুখোমুখি হয়েছে জার্মানি-ইংল্যান্ড। এএফপি।
বিশ্বকাপে চারবার। ১টি করে জয় দু দলেরই, বাকি ২টি ম্যাচ হয়েছে ড্র। এর মধ্যে দুটি ম্যাচের ফল আবার নির্ধারিত হয়েছে অতিরিক্ত সময়ে, একটির নিষ্পত্তি টাইব্রেকারে। জার্মানি-ইংল্যান্ড দ্বৈরথকে তাই স্নায়ুক্ষয়ীই বলতে হবে। আজ দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেইনে হতে যাচ্ছে এই দুই দলের দ্বৈরথের আরেকটি সংস্করণ। এমন একটি লড়াইয়ের আগে যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই হবে, উত্তেজনায় টগবগিয়ে ফুটবে দুটি দেশই, এটাই তো স্বাভাবিক।
হচ্ছেও তাই। দু দেশের সাবেক ফুটবলাররা নেমে গেছেন কথার লড়াইয়ে। চেষ্টা করছেন কথার মারপ্যাঁচে প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার। এই লড়াইয়ে জার্মানির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। আর ইংল্যান্ড শিবিরে আছেন তাদের সাবেক তারকা স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার।
এবার কেন যেন ইংল্যান্ডকে শুরু থেকেই খুঁচিয়ে যাচ্ছেন বেকেনবাওয়ার। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচে ইংলিশদের পারফরম্যান্স দেখে জার্মানির চুয়াত্তরের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক বলেছিলেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে, ইংল্যান্ড প্রাগৈতিহাসিক ফুটবলে ফিরে গেছে। আর এখন নিজের দেশকে উদ্দীপ্ত করতে বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডের এই দলটিকে আপনি সমীহ করতে পারেন, কিন্তু ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ, বিশ্বকাপের প্রথম দুটি ম্যাচে খুবই বাজে অবস্থা ছিল তাদের।’
বেকেনবাওয়ারের এই সব কথার জবাবটাও ভালোই দিয়েছেন শিয়ারার। জার্মানির রক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন তিনি, ‘এটা ঠিক যে জার্মানি দলটা সুসংগঠিত, পোডলস্কি ও মিরোস্লাভ ক্লোসা-সমৃদ্ধ ভালো একটি আক্রমণভাগ আছে ওদের। কিন্তু জোয়াকিম লোর দলের রক্ষণটা নড়বড়েই। আমার বিশ্বাস, আমরা এর সুবিধাটা নিতে পারি।’
শিয়ারার খোঁচা দিয়েছেন জার্মানির রক্ষণ নিয়ে। ‘কাইজার’ এ নিয়ে আর কিছু বলেননি। বেকেনবাওয়ারের আসলে বলতে হয়নি। ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের বেহাল অবস্থার কথা টেনে শিয়ারারকে এর জবাব দিয়ে দিয়েছেন ১৯৭০ বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়া ম্যাচে গোল করা উয়ি সিলার, ‘ইংল্যান্ড আসলে সতেজ নয়। এর বড় উদাহরণ তো (ওয়েইন) রুনি। অনেকেই ভেবেছিল, এই টুর্নামেন্টের সেরা আকর্ষণ হবে সে। কিন্তু সে কিছুই তো করতে পারেনি!’
মাইকেল বালাক বুঝতেই পারছেন না, ইংলিশরা কেন জার্মানিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে, ‘ইংল্যান্ড এমন কোনো শক্তিশালী দল নয় যে ওদের ভয় পেতে হবে। জার্মানিতে অনেকেই বিস্মিত যে ইংল্যান্ড আমাদের বড় শত্রু মনে করে। আমরা ঠিক বুঝতে পারি না, এটা কেন করে তারা। সম্ভবত ১৯৬৬ বিশ্বকাপের সেই গোলটির কারণেই!’
ইংল্যান্ডের সাবেক কোচ কেভিন কিগান এত হিসেব-নিকেশে যাননি বা যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি। ২০০০ সালে জার্মানির কাছে ইংল্যান্ড ০-১ গোলে হেরে যাওয়ার পর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া কিগান সরাসরিই বলে দিয়েছেন, এ ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতবে।

মূল ফাটাফাটি শুরু হবে এখন

দখলে থাকা পিঁড়িগুলো অনেকেরই সরে গেল। গেল তো গেল, একেবারে ধরাশায়ী করে দিয়ে গেল বহুকাল ধরে পিঁড়িতে বসে থাকা দামি দলের অনেককেই। এ ক্ষেত্রে এবারের বিশ্বকাপের শুরুর পর্বের সবচেয়ে বড় ক্যাজুয়ালটি ফ্রান্স আর ইতালি। একেবারে ভরাডুবি! বেচারারা কী খেলতে গিয়ে যে কী খেলল, দারুণ কিছু করে দেখাতে গিয়ে যে কী দেখাল, বোঝাই গেল না।
এ ব্যাপারে একজন বললেন, ‘ওভার কনফিডেন্সই ডুবিয়েছে।’ কেউ আবার বললেন, ‘আন্ডারডগ ভাবা দলগুলো যে মোটেও আর আন্ডারডগ নেই, বরং বিগত দিনগুলোতে চর্চা করে করে যে বিশাল সিংহ হয়ে গেছে, তাও বোধহয় ভাবেনি কেউ। দলগুলো তো বটেই, সমর্থকেরাও টের পায়নি।’
অনেকে বলছেন, বড় বড় ক্লাবে বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলে মিডিয়ার বদৌলতে ‘স্টার’ বনে যায়। তখন এই টাইটেলের ভারিত্বে আসমানে উড়াল দেওয়ার মতো অবস্থা হয়। বিশ্বকাপে এসে তাই খেই হারিয়ে দলকে হাবুডুবুতে ফেলা ছাড়া উপায় থাকেনি। ষোলোতে উঠতে না পারা এই বড়দের নিয়ে আমার নিজের অবশ্য অন্য আরেকটি দিকের কথা মনে আসে। আর তা হলো, ছোটখাটো দলেরও অনেকে এদের ‘ক্লাব-কলিগ’। একসঙ্গে খেলে। অতএব পরস্পরের ধরন বা টেকনিকগুলো জানা থাকে। কে কোথায় দুর্বল, তাও জেনে যায়। অতএব এই দশা। এই সমানে-সমান হয়ে যাওয়ায় আসলে বড়-ছোট, নামী-দামির মধ্যে কোনো ভেদাভেদ চোখে পড়লই না। তো, বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম পর্বের ঘোরটা এসব উঠতি-পড়তি দেখার মধ্য দিয়ে কেটে গেল। এখন আর গ্রুপগুলোর অন্তর্ভুক্ত প্রতিযোগীদের সবার সঙ্গে সবার শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ নেই। কমতে কমতে ষোলোতে এসে ঠেকল। বলতে গেলে, আসলে মূল ফাটাফাটি-ছাঁটাছাঁটিটা শুরু হবে এখন। যারা নিজেদের বড় বলে প্রমাণ দিয়ে ষোলোতে পা রাখল, তাদের এখন শুধু শক্তিধর বা খেলায় দারুণ পারঙ্গম হলেই যে চলবে তা নয়। এখন কোন প্রতিপক্ষের সঙ্গে কেমন খেলতে হবে, কোন টেকনিকে—সেসব নিয়ে নানা প্ল্যান, ছক আর বুদ্ধি খাটানোর বুদ্ধিতে নামতে হবে আটে থাকার জন্য। নক-আউটের খেলা। হারলেই আউট। তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। ‘হারাধনের দশটি ছেলে’র মতো দশায় পড়তে হবে। একে একে বিদায়ী ঘণ্টা বাজবে আট দলের।
ইতিমধ্যেই সমর্থকদের মধ্যে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে গেছে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে। হেরে বিদায় নেওয়া দলগুলোর সমর্থকেরা এখন বিপদে আছে। প্রিয় দল নেই। তা হলে কাকে সাপোর্ট দেবে? এ ব্যাপারে আমার ধারণা, যেসব দলের কাছে হেরে বা ড্র করে পছন্দের দলটিকে ‘হারু-পাট্টি’র দলে শামিল হতে হয়েছে, তাদের সমর্থন দেবে না তারা। অন্তত প্রকাশ্যে।
যা-ই হোক, বহু কাঙ্ক্ষিত দুই দল—ব্রাজিল আর পর্তুগালের খেলাটি কাল রাতে দেখলাম। তবে পুরোটা নয়। আমাদের বিদ্যুৎ শেষ পাঁচ মিনিট দেখতে দেয়নি। অতএব খেলা শেষে অন্য এলাকায় পুরোটা দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল, তাদের কাছে টেলিফোনে জেনেছিলাম ফলাফল। এবং যা ভেবেছিলাম খেলা দেখে, তাই হয়েছে। অর্থাৎ ড্র। তাও আবার গোলশূন্য।
খেলা দেখেই মনে হচ্ছিল, ‘এই তবে এবারের ব্রাজিল?’ আসলে আগের মতো ধার নেই যেন। পর্তুগালের কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে মনে হয় ড্র করারই আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। পর্তুগাল তাদের স্বাভাবিক খেলাই খেলেছে বলা যায়। তবে আমার ধারণা, ব্রাজিল হয়তো ভালো খেলবে পরবর্তী ধাপে। অনেকটা সহজ প্রতিপক্ষ তাদের সামনে। চিলির সঙ্গে খেলবে। চিলিকে তাই বলে ছোট করে দেখলে খবর হয়ে যাবে। কারণ ষোলোতে ওঠায় তারা দারুণ উজ্জীবিত। স্পেনের সঙ্গে শেষ খেলায় হেরেছে বটে, কিন্তু শুরুর দিন থেকে সব খেলায় এক ধরনের ছন্দময় মান বজায় রেখে খেলেছে।
ব্রাজিলের সমর্থকেরা আশাবাদী। তাদের হিসাব-নিকাশে গতকালের খেলায় দলটি খুবই নাজুক ছিল কাকা লাল কার্ড খেয়ে বাইরে থাকায়। তা ছাড়া রবিনহোকেও খেলানো হয়নি। ফুটবলবোদ্ধাদের ধারণা, পরবর্তী পর্বের জন্য তৈরি করতেই এ খেলায় বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে বেশ কজনকে।
এদিকে রেফারিদের হলুদ কার্ড দেখানোর বাতিকটা যেন আরও বেশি বেশি ভর করছে। এই পর্বেই এমন, পরবর্তী খেলাগুলোতে তো আরও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, তখন কী হবে! ব্রাজিল আর পর্তুগালের খেলার দিন তো মনে হলো, রেফারি পাগলা হয়ে গিয়েছিল। একনাগাড়ে পকেট থেকে হলুদ কার্ড বের করছিল আর দেখাচ্ছিল। তা দেখে বিরক্ত হয়ে আমার এক বন্ধু বললেন, ‘ঘন ঘন হলুদ কার্ড দেখাইবার ইচ্ছা যখন, তখন পকেটে হাত ঢুকাইয়া কষ্ট কইরা বারে বারে বাইর করনের দরকার কী? আর কার্ডই বা পকেটে রাখনের দরকার কী? হাতের তালুতে হলুদ মাখাইয়া রাখলেই হয়!’ কথাটা মন্দ বলেননি। আমি খুব মজা পেয়েছি।
তাঁর কথা শুনে আমি বলেছি, মনে হয়, ওটা রেফারিদের খেলা! খেলোয়াড়দের নিয়ে খেলছে আর কী!

অঁরির সঙ্গে কেউ কথা বলত না

ফ্রান্সের এই দলটার সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। ১২১ ম্যাচ খেলেছেন, খেলে ফেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ। এই অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তো, সাম্প্রতিক ফরাসি ‘দুর্যোগ’-এর ব্যাপারে থিয়েরি অঁরির সঙ্গেই আলোচনা করলেন প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অভিজ্ঞতার মর্যাদা পেলেন। কিন্তু অভিজ্ঞ হিসেবে সামান্য মর্যাদা তো দূরে থাক, বিশ্বকাপ দলে নাকি এই অঁরিকে একঘরে হয়েই কাটাতে হয়েছে দিন! বিশ্বকাপে মাঠে ও মাঠের বাইরে শোচনীয় সময় কাটানো ফ্রান্সের বিতর্কিত ঘটনাপ্রবাহে নতুন তথ্য যোগ করে কথাগুলো ফরাসি একটি টেলিভিশনকে বলেছেন অঁরি।
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচের দুটিতে হেরে ও একটিতে ড্র করে দেশে ফিরেছে ফ্রান্স। দেশে ফেরার আগে কোচকে কুৎসিত গালি দিয়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন নিকোলাস আনেলকা। আনেলকার বহিষ্কারের প্রতিবাদে খেলোয়াড় ধর্মঘট করে অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন প্যাট্রিস এভরা। সবকিছু বলে দিচ্ছিল, দলের মধ্যে ভাঙন পরিষ্কার।
তবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের খেলোয়াড় অঁরি বলছেন, দলে ভাঙন ছিল কি না, তিনি জানেন না। তবে তিনি কারও কাছ থেকে কোনো সম্মান পেতেন না, তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতেন না, ‘এই দলে আমি হয়তো বড় ভাই হতে পারতাম। কিন্তু সেটা হতে পারিনি। নিজেকে একঘরে মনে হতো; কে আমাকে একঘরে বানিয়েছিল, সেটা ব্যাপার না। তবে ওরা আমার সঙ্গে কথাই বলত না। অথচ এর আগে আমার সঙ্গে সবাই কথা বলত। তখন তো আমি নেতৃত্বে ছিলাম।’
নিজের কষ্টটাকে চেপেও অঁরি বলছেন, এত সব বিতর্কের কিছুই হতো না, যদি দল ভালো খেলত। মাঠের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না বলেই ভেতরের গল্পগুলো এত বেশি ছড়িয়েছে, ‘আমি মনে করি না, আনেলকার ঘটনাই সব শুরু করেছে। ভেতরে অবশ্যই কিছু অসুস্থতা ছিল। তবে এটাও ঠিক যে আমি কোনো গন্ডগোল দেখিনি। আমি দেখিনি, কেউ কাউকে চাপ দিচ্ছে। আসলে এই বিপর্যয়টা হয়েছে আমরা ভালো খেলিনি বলেই। যখন একটা দল জেতে, তখন সবই চলতে পারে। কিন্তু যখনই তারা হারতে থাকে, তখন গল্পও তৈরি হতে থাকে।’
অঁরি হয়তো ‘গল্প’ বলে ব্যাপারগুলোকে এড়িয়ে যেতে চাইবেন। কিন্তু ভেতরের ঘটনা জানতে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। এই সব বিতর্কেই অধিনায়কত্ব হারানো এভরা আগেই কথা দিয়েছিলেন, সময় হলে সব খুলে বলবেন।
তবে এভরার সময় নাকি এখনো হয়নি। এভরা শুধু জানাচ্ছেন, একটা সরকারি তদন্ত শুরু হচ্ছে ফ্রান্স দলের এই সব কাণ্ডকারখানা খতিয়ে দেখতে। সেখানে খেলোয়াড়েরা সবাই সবকিছু বলবেন, ‘মন্ত্রণালয় একটা তদন্ত শুরু করছে। সেখানে খেলোয়াড়দের শুনানি হবে। সবাই যার যার অভিজ্ঞতার কথা বলবে এবং সত্যি কথাই বলবে। তবে আমি মনে করি, ফরাসি জনগণের কাছে এই যন্ত্রণার কথা বলার সময় এখনো আসেনি। কাউকেই এখন আক্রমণ করা যাবে না। কী হয়েছিল, এটা খুলে বলার মতো অবস্থায় এখন কেউ নেই। ক্ষতটা এখনো দগদগ করছে এবং প্রত্যেকেই যন্ত্রণার মধ্যে আছি।’
সবাই যন্ত্রণার মধ্যে থাকলে, যন্ত্রণার কারণটা কে!

লড়াই হবে সমানে সমান

জার্মানি আর ইংল্যান্ড দ্বিতীয় রাউন্ডেই মুখোমুখি হচ্ছে দেখে অনেকেই হতাশ। এই দুই সেরা দলের একটিকে যে আজই বিদায় নিতে হবে। তবে আমি ইতিবাচক দিকই দেখছি। এটি বিশ্বকাপের উত্তেজনায় বাড়তি রং চড়াচ্ছে।
ইংল্যান্ড এবারের আসরের অন্যতম ফেবারিট। গ্রুপ পর্বে প্রথম দুই ম্যাচে ওদের খেলা যদিও মন ভরায়নি, তৃতীয় ম্যাচে ওরা ওদের সম্ভাবনার আভাসটুকু ঠিকই দিয়েছে। জার্মানিও শক্তিশালী দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আমরা তো দেখিয়েই দিয়েছি, যেকোনো দলকে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আছে। ইংল্যান্ড নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে দুটো পয়েন্ট হারাবে আশা করেনি। আর জার্মানিও নিশ্চয়ই ভাবেনি, ওরা হেরে যাবে সার্বিয়ার বিপক্ষে। এটাই তো ফুটবল! এ কারণেই আমার মনে হয়, আজকের ম্যাচে লড়াই হবে সমানে সমান।
রক্ষণে দুটো দলই শক্তিশালী। রক্ষণভাগে ইংল্যান্ডের নেতা জন টেরির মতো অভিজ্ঞ একজন। একইভাবে জার্মানির আছে ফিলিপ লাম; ও তো অধিনায়কই। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠে আছে ব্যারি, জেরার্ড আর ল্যাম্পার্ডের মতো খেলোয়াড়। প্রতিপক্ষের রক্ষণের জন্য যারা হুমকি।
শোয়েনস্টাইগার, বোয়েটাং আর ওজিলের ফিটনেস নিয়ে জার্মানি শিবিরে একটু দুশ্চিন্তা আছে। বয়সে তরুণ হলেও ওজিল তার সৃষ্টিশীলতা আর প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভার কারণে এরই মধ্যে দলের ভরসা হয়ে উঠেছে। আক্রমণভাগে ক্লোসা-পোডলস্কির ক্ষমতা আছে ইংল্যান্ডের রক্ষণজট খুলে ফেলার। তবে ইংলিশদেরও আক্রমণভাগে আছে ওয়েইন রুনি। আজও তারা সেরা খেলাটাই খেলবে বলে আমার ধারণা। দুই দলের কৌশলই আঁচ করে নিতে পারছি। জার্মানি বলের দখল বেশি রাখবে। আর ইংল্যান্ড বল চালাচালি করবে অনেক দ্রুত। গোলের সুযোগ অবশ্য তৈরি হবে তুলনামূলক কম।
ইংল্যান্ড ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে থাকলে ম্যাচটা টাইব্রেকে গড়ানোর আগেই জেতার চেষ্টা করবে। ইতিহাস বলছে, জার্মানি-ইংল্যান্ড ম্যাচ প্রায়ই ড্রতে শেষ হয়। এরপর ফল নির্ধারণ করতে পেনাল্টি শ্যুট-আউট শুরু হলে জার্মানিই জেতে। ১৯৯০ বিশ্বকাপে আমরা এটি দেখেছি, ১৯৯৬ ইউরোতেও দেখেছি। এবং খুব সম্ভবত ২০১০ বিশ্বকাপেও দেখব!
ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচের ফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, আর্জেন্টিনা-মেক্সিকো তুলনামূলক সহজ। অবশ্য দুটো দলের রক্ষণ এমন, ফলাফল যে কাউকে চমকেও দিতে পারে। মেক্সিকো খুবই সাবলীল, বল পাসিং ওদের খুবই ভালো। সুযোগ তৈরিতে সিদ্ধহস্ত কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে খুব একটা সফল নয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে জেতা ম্যাচটিতে চোট পেয়েছিল ওদের স্ট্রাইকার কার্লোস ভেলা। আজ ওর ফেরার কথা। এতে মেক্সিকো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। মেক্সিকো দলটায় নেতা আছে তিনজন। রক্ষণের নেতা মার্কেজের কাঁধে আজ বাড়তি দায়িত্ব ভালো করার।
বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনাকে খোঁড়াতে দেখে অনেকেই অনেক কথা বলেছে। কিন্তু এই বিশ্বকাপে ওরাই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পতাকা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে অগ্রবর্তী অশ্বারোহী যোদ্ধার মতো। লিওনেল মেসির মতো ক্ষণজন্মা এক প্রতিভা আছে ওদের। ও দলে থাকলে শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত আর্জেন্টিনা হারবে না। হিগুয়েইনের মধ্যে ওরা আরেকটি বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ড পেয়ে গেছে। এর সঙ্গে তেভেজ-আগুয়েরোদের যোগ করুন। মাথায় রাখুন ওদের বেঞ্চে বসে থাকা ফরোয়ার্ডদেরও, যাদের বিশ্বের যেকোনো দল সানন্দে বরণ করে নিত।
আমার মাথায় সবচেয়ে মজার যে তথ্যটি ঘুরছে, এত এত তারকা ফরোয়ার্ড থাকার পরও কিন্তু নাইজেরিয়ার বিপক্ষে একমাত্র গোলটি করেছিল একজন ডিফেন্ডার—গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জ। গ্রিসের বিপক্ষেও প্রথম গোলটি এসেছিল আরেক ডিফেন্ডার ডেমিকেলিসের পায়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ওদের প্রথম গোলটি আবার আত্মঘাতী।
আর্জেন্টিনা আজ শুরু থেকেই আক্রমণ চালাবে। একই সঙ্গে মেক্সিকোও কিন্তু খেলার জন্য যথেষ্ট জায়গা পাবে। মেক্সিকো যদি হুট করে প্রথম গোলটি করে বসে, আর্জেন্টিনা কীভাবে সামাল দেয়, সেটি দেখার জন্য বসে রইলাম। ম্যাচটায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে আর্জেন্টিনা হারবে, সেটি কল্পনা করাও এখন কঠিন।

ইতিহাসের হাতছানি দেখছে ঘানা

১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন, ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগাল—এত দিন বিশ্বকাপে আফ্রিকার সেরা সাফল্য ছিল এই দুটি দেশের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা। কাল তাদের পাশে লেখা হলো ঘানার নাম। গত বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে এসেই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল ঘানা। সেই সাফল্য ছাড়িয়ে এবার জায়গা করে নিয়েছে শেষ আটে।
দ্বিতীয় রাউন্ডে কাল যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ২-১ গোলে জয় ছিনিয়ে নিল ঘানা। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই দারুণ এক শটে জয়সূচক গোলটি এনে দেন আসামোয়া জিয়ান।
৪ মিনিটে ঘানাকে এগিয়ে নেন কেভিন প্রিন্স বোয়েটাং। ৬১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোলটা ফিরিয়ে দেন আগের ম্যাচের নায়ক ল্যানডন ডনোভান। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না যুক্তরাষ্ট্রের। এই লড়াইয়ে ঘানাই হাসল শেষ হাসি। এখন উরুগুয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় ঘানা।