Showing posts with label পোশাকশিল্প. Show all posts
Showing posts with label পোশাকশিল্প. Show all posts

Saturday, June 21, 2025

সুঁই-সুতার জীবনযুদ্ধ by সোহেল রানা

ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত আশুলিয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রমে নিজেদের এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। তাদের জীবন-জীবিকা মিশে আছে সুঁই-সুতা আর কাপড়ের বুননে। যা কেবল পোশাক নয়, বুনছে তাদের স্বপ্ন আর টিকে থাকার গল্প। এখানকার শ্রমিকদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসী। গ্রামীণ জীবনের টানাপড়েন আর অভাব তাদের ঠেলে দিয়েছে এই শিল্পনগরীতে। একটি ভালো জীবনের আশায়, নিজেদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তারা বেছে নিয়েছেন কঠিন পথ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারখানার নির্দিষ্ট ছন্দে চলে তাদের জীবন। কখনো ওভারটাইমের চাপ, কখনো উৎপাদন লক্ষ্য পূরণের তাড়া। সবকিছু ছাপিয়ে তারা অবিচল থাকেন নিজেদের কাজে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ এবং পরিশ্রম নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে এটাই একমাত্র আয়ের উৎস। একজন শ্রমিক সাধারণত মাসে ৮-১২ হাজার টাকা আয় করেন। যা দিয়ে তাদের নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ মেটানোর পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে থাকা পরিবারের কাছেও কিছু টাকা পাঠাতে হয়। অল্প টাকায় জীবনযাপন করা তাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারখানার আশপাশে গড়ে ওঠা স্বল্প ভাড়ার খুপড়ি ঘরে তাদের বসবাস। একটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় অনেককে। যেখানে আলোর স্বল্পতা, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং পয়ঃনিষ্কাশনের সমস্যা নিত্যদিনের চিত্র। স্বাস্থ্যসেবা তাদের জন্য এক বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে কাজ করা, মেশিনের শব্দের মধ্যে থাকা এবং রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শে আসার কারণে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, মেরুদণ্ডের ব্যথা এবং চোখের সমস্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ খুব কম শ্রমিকেরই হয়। জরুরি প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালের লম্বা লাইন বা উচ্চমূল্যের বেসরকারি চিকিৎসা তাদের নাগালের বাইরে।

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়া তাদের সন্তানদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা। অনেক শ্রমিকের সন্তানরা তাদের সঙ্গে আশুলিয়াতেই থাকে। কিন্তু বাবা-মায়ের সীমিত আয়ে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া তাদের জন্য বিলাসিতা। কেউ কেউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ পেলেও উচ্চশিক্ষা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে দারিদ্র্যের চক্রাবর্ত চলতে থাকে। গার্মেন্টস শিল্পের এ শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। মজুরি বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশের উন্নতি, ওভারটাইম ভাতা এবং ছুটির দাবি নিয়ে তাদের আন্দোলন প্রায়শই সহিংস রূপ নেয়। অনেক সময় এই আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়, যা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। তবে, এই সংগ্রামের মাধ্যমেই শ্রমিকরা একত্রিত হতে শিখেছেন এবং নিজেদের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন।

আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের জীবন গল্প বলে অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ আর টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছার। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে এখনো অনেক পথ বাকি। তাদের কাজের ন্যায্য স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসম্মত আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তাদের জীবন-জীবিকার মান আরও উন্নত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।

আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ:
আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (ঘএঙ) নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। যদিও চ্যালেঞ্জের শেষ নেই, তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তাদের অবস্থার উন্নতিতে সাহায্য করছে।

সরকারি উদ্যোগ-
সরকার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বেশ কিছু আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে। শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩) শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সরকার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যা পর্যায়ক্রমে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা তাদের আর্থিক সচ্ছলতায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে।
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন। এ ছাড়াও, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ঘঝউঅ) গঠন করেছে। এই কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে, যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে এবং উন্নত বেতনের পথ সুগম করে।

বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা-
বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা (ঘএঙ) আশুলিয়ার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সংস্থাগুলো মূলত কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করে-
শ্রমিক অধিকার ও সচেতনতা বৃদ্ধি: অনেক ঘএঙ শ্রমিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তারা কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবের মতো বিষয়গুলো নিয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং তাদের প্রতিবাদ করার জন্য সংগঠিত হতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি সহায়তা: কিছু ঘএঙ বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করে, যেখানে শ্রমিকরা স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ পান। তারা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের মধ্যে পুষ্টি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করে।
শিক্ষা ও শিশু যত্নের সুযোগ: শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য কিছু ঘএঙ স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে। এ ছাড়াও, কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করে, যা শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ এবং মায়েদের কাজ করার সুযোগ করে দেয়।

আবাসন ও স্যানিটেশন: কিছু ঘএঙ শ্রমিকদের জন্য উন্নত আবাসন এবং স্যানিটেশন সুবিধার উন্নয়নে কাজ করে, যদিও এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই শিল্পাঞ্চল কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ জীবন মানবজমিনকে জানান, শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরেও তাদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্বাস্থ্যসেবার নামে লোক দেখানো মেডিকেল টিম নিয়ে চলছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া, লাখ লাখ শ্রমিকের জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা নেই। ফলে শিশু সন্তানদেরকে ঘরে রেখেই কারখানায় ছুটতে হয় মা-বাবাকে। এতে যেমন নিরাপত্তাহীনতায় থাকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের শিশুরা, তেমনি বিভিন্ন সময় তারা অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার হয়। 

mzamin

Wednesday, May 7, 2025

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন: মার্কিন শুল্কনীতিতে হুমকির মুখে পোশাক খাত

বাংলাদেশের জন্য এ বছরটি সবদিক থেকেই বেশ কঠিন একটি বছর। গত গ্রীষ্মে অর্থনৈতিক ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যে বিক্ষোভকারীরা একজন অত্যাচারী শাসককে উৎখাত করেছে। এরপর দেশটি এক অস্থিতিশীল পর্বে উপনীত হয়। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে মাসখানেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যা দেশটির অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ খবর। জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ওপর নির্ভর করে  বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এমন শুল্কনীতির বিষয়ে বিশ্ব জুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হলে আপাতত বাংলাদেশসহ বহু দেশের ওপর আরোপিত শুল্ক স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই শুল্ক পুনরায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাতে দুশ্চিন্তায় আছেন বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা। কেননা, এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবন পরিচালনা করছে দেশটির লাখ লাখ শ্রমিক। গত পাঁচ বছর যাবৎ পোশাক কারখানাতে সেলাইয়ের কাজ করে পরিবার চালাচ্ছেন মুর্শিদা আখতার নামের ২৫ বছর বয়সী এক নারী। তার বাড়ি দেশের উত্তরাঞ্চলে। বর্তমানে তিনি ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারে বসবাস করেন। সমপ্রতি তিনি এবং তার আরও ২০০ সহকর্মী (এদের ৭০ শতাংশই নারী) সাভারের ৪এ ইয়ার্ন ডায়িং নামের একটি পোশাক কারখানাতে কাজ শুরু করেছেন। মুর্শিদা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন তিনি। যদিও নতুন চাকরি পেয়ে তিনি এখন কিছুটা স্বস্তিতে আছেন। বর্তমানে চাকরি থেকে তিনি প্রতি মাসে ১৫৬ ডলার (প্রায় ১৯ হাজার টাকা) পাওয়ার আশা করছেন। পূর্বেকার চাকরির তুলনায় এখানের বেতন সামান্য বেশি। পাশাপাশি আগের কর্মস্থলের চেয়ে এখানে যাতায়াত ও কর্মপরিবেশ কিছুটা উন্নত। তবে তার আশঙ্কা হচ্ছে কারখানায় কাজের অর্ডার কমে যেতে পারে। তিনি বলেছেন, অর্ডার কমে গেলে কাজও কমে যাবে। এতে তার আয়-রোজগারে প্রভাব ফেলবে। ১৭ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। যেটি যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের আকারের একটি ব-দ্বীপ।

১৯৭০-এর দশকে এক রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। তবে ১৯৮০-এর দশকে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেয় তৈরি পোশাক খাত। এই খাতে নারী শ্রমিকদের বিশেষ অবদানের কারণে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক দেশগুলোর মধ্যে প্রধান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। দেশটিতে বর্তমানে এই খাতে শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যাদের একজন মুর্শিদা আখতার। সম্ভবত তার ছেলে ও স্বামীর মতো আরও পাঁচগুণ মানুষ তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল।  চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। তার এ ধরনের শুল্ক পরিকল্পনায় যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে তাতে বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি (পোশাক খাত)  ভেঙে যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুল্ক স্থগিত করার আগে তাকে একটি চিঠি লেখেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে তিনি ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করার অনুরোধ জানান। ড. ইউনূস প্রতিশ্রুতি দেন যে, তার দেশ আরও বেশি মার্কিন তুলা ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করবে। এক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বাৎসরিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তবে বিষয়টি এত সহজ নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকিকে ‘ক্ষমতার বাজে চর্চা’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। মাহমুদ বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশকের ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধির পর যখন দেশটি মন্দার মুখে পড়েছে এবং এক প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, ঠিক তখনই এই হুমকি এসেছে। ২০২৪ সালে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির ফলে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা শেখ হাসিনার সরকারের অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী লৌহহস্তে বাংলাদেশকে শাসন করেছিলেন। পরে গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে তার পতন হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে কিছুটা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়।  ৯ মাস পার হলেও এখনো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় আছে বাংলাদেশ। দেশটির রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ৮৫ শতাংশই হচ্ছে তৈরি পোশাক। এই পণ্য সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। স্থগিত আদেশ শেষ হওয়ার পর যদি ট্রাম্প ৩৭ শতাংশ শুল্ক নাও আরোপ করেন, তবুও বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। যা তিনি পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জন্য আরোপ করে রেখেছেন। ১০ শতাংশ শুল্কের এমন একটি পর্যায় যা সহ্য করা কঠিন এবং যা থেকে লভ্যাংশ খুব কম আসে। কেননা, পোশাক খাতে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে চীনের পাশাপাশি ভারত, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কার অবস্থান বেশ শক্ত। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিযোগিতাও রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন পশ্চিমা দেশের উদার গণতন্ত্রের সমর্থকদের কাছে আশার প্রতীক হিসেবে দেখা দেয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বাগত জানান সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে খুশি হতে পারেনি ভারত। হাসিনার আকস্মিক পতনে বেশ হতাশ হয়েছে দেশটি। হাসিনার আমলে আর্থিক খাতে ব্যাপক লুণ্ঠনের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে তৎপরতা চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথম বছর প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেলেও তা ২০২৬ সালের মধ্যে স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ সেই আশায় গুড়েবালি হয়েছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের পরবর্তী দুই বছরের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের সংকেত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ঢাকাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, আমরা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)- ভর্তুকি হ্রাস করে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির চাপে রয়েছি। ভবিষ্যতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর চাপ বৃদ্ধি করবে। যা হবে এই খাতের জন্য মারাত্মক আঘাত। এর আগে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এতে ১১০০ জনের বেশি শ্রমিকের প্রাণহানি হয়। ওই ভয়াবহ প্রাণহানির পর পশ্চিমা অংশীদারসহ স্থানীয়রাও বাংলাদেশের এই খাতের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। তবে প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে পরবর্তীতে শিল্প খাতটি ঘুরে দাঁড়ায়। সাভারের যে জায়গাটিতে রানা প্লাজার বিল্ডিংটি ছিল তা এখনো খালি পড়ে আছে। স্থানটি বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশের শিল্প খাতটি এখন আরও সংগঠিত এবং একীভূত হয়েছে। পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমলেও রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ২৩০টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এগুলোর প্রতিটি ‘লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’(এলইইডি) কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মানদণ্ড অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত। এলইইডি সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যায় এখন বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

mzamin

Tuesday, April 29, 2025

নানা বিপত্তির মাঝেও বাড়ছে পোশাক রপ্তানি

পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষে কারখানা বন্ধসহ নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও নানা বিপত্তির মাঝেও নতুন ও পুরাতন অর্থাৎ প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপের বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়কালে ৯ মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৮৪ শতাংশ বেড়ে ৩০.২৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা মূল অবদান রেখেছে। এ সময়ে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪৯.৮২ শতাংশই হয়েছে ইইউতে। এ সময়ে ইইউ থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১৫.০৭ বিলিয়ন ডলার, আগের গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৩১ শতাংশ বেশি। জুলাই-মার্চ সময়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে এর চেয়েও বেশি ১৭.২৩ শতাংশ। এ সময় দেশটিতে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি ছিল ৫.৭৪ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাজ্য ও কানাডায় রপ্তানি হয়েছে যথাক্রমে ৩.৩৬ বিলিয়ন ও ৯৬৩.৮৫ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কানাডায় রপ্তানিতে ১৫.৬৬ শতাংশ ও যুক্তরাজ্যে ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সূত্র জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হয়। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। এর মধ্যে গাজীপুর ও ঢাকার সাভারে শ্রমিক অসন্তোষের বেশ কয়েকদিন অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে; উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান এ খাতের কর্মকাণ্ড।
জানা গেছে, শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধ, অর্ডার বাতিল হওয়া, কারখানার মালিক পলাতক, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপসহ নানা সংকটেও পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। এর কারণ পুরনো বাজারগুলো পোশাক রপ্তানি বাড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। অপ্রচলিত বাজারেও পোশাক রপ্তানি দিন দিন বাড়ছে। রপ্তানি বাড়ায় খুশি এ খাতের রপ্তানিকারকরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্যনীতি অর্থাৎ ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কার শেষ পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে চিন্তিত সবাই।
২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে। ২০২৪ সালের ৯ মাস (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ২.০৬ শতাংশ নেতিবাচক (ঋণাত্মক) প্রবৃদ্ধি ছিল। বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রপ্তানি বাড়ায় শেষ পর্যন্ত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকরা ৩৬৯ কোটি ৩৩ লাখ (৩.৬৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে এই বাজারে ২৬৯ কোটি ৫৮ লাখ (২.৬৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।
প্রকাশিত ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে ইইউ’র কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬০৯ কোটি ৮২ লাখ (১৬.০৯ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৮১ শতাংশ বেশি। ইইউতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। চীন সবার শীর্ষে। তৃতীয় তুরস্ক।
এদিকে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মতো আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশ থেকে। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২২ সালে এই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। পরে নেতিবাচক ধারা চলে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে বছরের শেষ দিকে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি দিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি (৭.৩৪ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যা ছিল ২০২৩ সালের তুলনায় ০.৭৫ শতাংশ বেশি।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল বাংলাদেশে; যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের কাছ থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিতের নির্দেশনা আসতে শুরু করে। পাল্টা শুল্ক তিন মাস স্থগিতের পর অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লম্ফন দিয়ে শুরু হয়েছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এই দুই মাসে ১৫০ কোটি (১.৫০ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যা গত বছরের এই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরপরও রপ্তানি আয় বাড়ায় আমরা খুশি। ২০২৫ সালটা ভালোই শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে রীতিমতো বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে ঝড় তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এটার পরিণতি কী হবে, তা আমরা পরিষ্কার কিছুই বুঝতে পারছি না।
এদিকে অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও ৬.৬৬ শতাংশ বেড়েছে। জুলাই-মার্চ এ ৯ মাস সময়কালে অপ্রচলিত বাজারে ৫.১২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা মোট রপ্তানির ১৬.৯৩ শতাংশ। এর মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উল্লেখযোগ্য। জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৯৬০.৪৫ মিলিয়ন ডলার, অস্ট্রেলিয়ায় ৬৫৩.৬৪ মিলিয়ন ডলার ও ভারতে ৫৩৫.১৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক। এ সময়কালে রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), নিউজিল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি কমেছে।
ইভিটেক্স ড্রেস শাট লিমিটেড পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী বলেন, বড় ধরনের অস্থিরতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি বাড়া আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে। এই বাজারগুলো আরও ভালোভাবে দখলের একটা সুযোগ এসেছে। এই সুযোগটাই এখন আমাদের সবাই মিলে কাজে লাগাতে হবে।

mzamin

Saturday, April 12, 2025

উদ্বেগ কাটেনি, সমাধানে জোর by এম এম মাসুদ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর উদ্বিগ্ন ছিল সরকার ও রপ্তানিকারকরা। তবে পাল্টা শুল্ক বা রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ আরোপ তিন মাসের জন্য স্থগিতের ঘোষণায় স্বস্তি ফিরেছে। যেসব দেশ সমঝোতার চেষ্টা করেছে তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণার ঈঙ্গিত দিয়েছে ট্র্যাম্প প্রসাশন। পাশাপাশি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের শেয়ারবাজার। অবশ্য বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য স্বস্তি ফিরলেও আতঙ্ক কাটেনি। কারণ এই তিন মাস ন্যূনতম ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বহাল থাকায় একধরনের অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।

রপ্তানিকারক এবং বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার স্থায়ীভাবে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে তিন মাস সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। এ ছাড়া বর্তমানের বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ককে কীভাবে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা যায়, তার কৌশল নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুল্ক-অশুল্ক বাধার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এসব দূর করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ ৯০ দিনের বিরতি চেয়ে গত সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে চিঠি দেন ড. ইউনূস। অন্যদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ পণ্য আমদানিতে শুল্ক সুবিধা চেয়ে বাণিজ্য প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারকে আলাদা চিঠি দিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। পরে ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের অনুরোধে সাড়া দেয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই বিরতি বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময়। আপাতত তিন মাসের জন্য একটা স্বস্তি পাওয়া গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন যাতে বাংলাদেশের ওপর আবার বাড়তি শুল্ক আরোপ না করে, সে জন্য সরকারকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে। আবার চীন নতুন করে আরও বাড়তি শুল্কের মুখে পড়ায় আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারে।
পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, আগামী ৯০ দিনের বিরতিতে তারা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে উদ্বেগ থেকেই গেছে। কারণ ট্রাম্প ঘোষিত শুল্ক ৯০ দিন পর কার্যকর হলে বাংলাদেশের ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক শিল্প সংকটে পড়বে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারকদের ৫৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক গুনতে হবে।

আশঙ্কা: চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বহাল থাকায় চীন ইউরোপে সস্তা কাপড়ে বাজার সয়লাব করে দিতে পারে। এটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য আরেকটি সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য বেশি রপ্তানি করে সেগুলোর গড় শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ যোগ হয়ে আপাতত শুল্কহার ২৫ শতাংশ হবে। দেশভিত্তিক ৩৭ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যে মোট শুল্কহার ৫২ শতাংশে দাঁড়াতো। এরমধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ বাড়তি শুল্ক স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায়। বাংলাদেশ সময় চেয়েছে তিন মাস।

তৎপর ঢাকা: চীন ছাড়া নতুন আরোপ করা পাল্টা শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই সময়ে দেশগুলোর পণ্যে পাল্টা শুল্ক ন্যূনতম ১০ শতাংশ কার্যকর হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক তিন মাস স্থগিত করায় পরবর্তী করণীয় নিয়ে তৎপর হয়েছে ঢাকা। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হবে। শুল্ক স্থগিত করায় আলোচনার সময় আরও পাচ্ছি। সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে তাই নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাণিজ্যে ঘাটতি কমানোর নানা পদক্ষেপ নিতে পারবো।
শুল্ক স্থগিত করার অনুরোধ রাখায় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মার্কিন প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট মেনশন করে অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘৯০ দিনের শুল্ক স্থগিত করতে আমরা যে অনুরোধ করেছিলাম, তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়ায় প্রেসিডেন্ট আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বাণিজ্য এজেন্ডাকে সমর্থন জানাতে আমরা আপনার প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবো।’

চীন থেকে রপ্তানি সরবে: ওদিকে অন্যান্য দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আপাতত স্থগিত করলেও চীনের প্রায় সব পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১৪৫ শতাংশ করেন ডনাল্ড ট্রাম্প। আগের দিন চীনের পণ্যে শুল্ক ১২৫ শতাংশ করার কথা বললেও বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস জানায়, এটা প্রায় সব পণ্যে হবে ১৪৫ শতাংশ। দেশটির ওপর এই শুল্ক ইতিমধ্যে কার্যকরও হয়েছে।

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিকারকরা মনে করেছেন, এই শুল্ক শেষ পর্যন্ত বহাল থাকলে চীন থেকে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সরবে। এতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১২৫ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীনের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কেননা, চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো পণ্যের দাম আগের চেয়ে দ্বিগুণ। ফলে চীন থেকে রপ্তানি এখন আর লাভজনক হবে না। ভিয়েতনামে আগেই চীনা উদ্যোক্তারা বড় বিনিয়োগ করে ফেলেছেন। সেখানে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কম। ফলে চীনের  বিনিয়োগ টানার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে।

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসাবে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখন থেকে ২ ডলারের একটি কটন টি-শার্ট চীন থেকে আমদানি হলে মোট শুল্ক দিতে হবে ২.৮৩ ডলার। ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ থেকে একই টি-শার্ট রপ্তানি হলে শুল্ক দিতে হবে ০.৫৩ ডলার।

বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, উচ্চ শুল্কের কারণে চীনের ক্রয়াদেশ সরবে। কারখানাও স্থানান্তরিত হবে। চীনের হারানো ব্যবসা নিতে বাংলাদেশকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

পুরস্কৃত করবেন ট্রাম্প: বিশ্বের অনেক দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমঝোতার চেষ্টা করেছে গত কয়েকদিনে। হোয়াইট হাউসের তরফে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যেসব দেশ প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেনি তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউস বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রতি একটি কঠোর বার্তা পাঠিয়ে বলেছে, প্রতিশোধ নিতে যাবেন না, তাহলে আপনাকেও পুরস্কৃত করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পরিপালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার নির্ধারিত এ সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। যাতে মার্কিন প্রশাসন বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ককে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজি হয়। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে। আলাদা যোগাযোগ করতে হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে। তিনিও মনে করেন, চীনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আসারও অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি: গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। এ হার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারলেওটেক্সার তথ্য বলছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাসে প্রধান রপ্তানিকারক দেশ চীনের রপ্তানি বেড়েছে ৯ শতাংশেরও কম। ভিয়েতনামের বেড়েছে ১১ শতাংশ। ভারতের বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। পাকিস্তানের পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ হারে। তবে রপ্তানি আয়ের অঙ্কে চীন ও ভিয়েতনামের চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭৭ কোটি ডলার। ভিয়েতনামের ২৬৩ কোটি ডলারের মতো। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১৫০ কোটি ডলার। ভারত ও পাকিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯৬ কোটি ডলার ও ৩৬ কোটি ডলার। গত কয়েক মাসের রপ্তানি প্রবণতা বলছে, চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে রপ্তানি পরিমাণের ব্যবধান কমছে। এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রপ্তানিকারকরা।

উল্লেখ্য, গত ২রা এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশসহ বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ই এপ্রিল। ডনাল্ড ট্রাম্প কার্যকরের দিনে তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপ স্থগিত করেন। তবে ২রা এপ্রিলের ঘোষণায় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব পণ্যের ওপর সব দেশের জন্য ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়, যা ৫ই এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়ে গেছে।

mzamin

Sunday, April 6, 2025

মার্কিন শুল্ক: শঙ্কায় মালিক শ্রমিকরা

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এ ঘোষণায় বিশ্ব জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আগামী ৯ই এপ্রিলের মধ্যে ট্রেড ব্যালান্স না করলে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য মার্কিন আমদানিকারকদের ৩৭ শতাংশ শুল্ক গুনতে হবে। এতদিন এ শুল্কের পরিমাণ ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। নতুন আরোপিত এ শুল্কহার     বাস্তবায়ন হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সামগ্রিক অর্থনীতি। তাই সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুল্ক কমানো ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতিতে শ্রমঘন বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মালিক-শ্রমিকরা। ঢাকার অদূরে টঙ্গী, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর ও শিল্প এলাকায় মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও শঙ্কা লক্ষ্য করা গেছে। ঈদের ছুটিতে বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও সরজমিন ঘুরে গার্মেন্টস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সহ অন্য খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো শুল্ক ঘোষণার পরপরই সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, মার্কিন সরকার যে ভাষায় কথা বলছে, আমাদেরও সে ভাষায় উত্তর দিতে হবে। যেমন তারা ট্রেড ব্যালান্সের কথা বলছে। আমেরিকায় তুলার বাজার আছে, ভোজ্য তেল, গম, বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্যসহ বাংলাদেশের বাজারে চাহিদা আছে এমন পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করার সুযোগ করে দিতে হবে। এতে বাংলাদেশের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে বাণিজ্য সমন্বয় প্রক্রিয়ায় অনেকদূর এগিয়েছে। আমাদেরও বিলম্ব না করে সরকারি উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে।

বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেছেন, মার্কিন সরকার বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর ৩৭ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটা আমাদের কাছে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো মনে হয়েছে। এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হলো আমাদের সরকার ধীরে ধীরে তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডিউটি কমিয়ে দিতে পারে। এটা করলে আমাদের ক্ষতি নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আমদানির চেয়ে রপ্তানি অনেক বেশি। তাই যতটুকু আমদানি হচ্ছে সেখানে সরকার যদি ডিউটি কমিয়েও দেয় এর প্রভাব খুব একটা হবে না। এটা একটা সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন হাতেম।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম বলেন, আমেরিকা থেকে আমাদের রপ্তানি আয় মোট আয়ের এক-পঞ্চমাংশ হলেও একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে অনেক বেশি কৌশলী হতে হবে বাংলাদেশকে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে কূটনৈতিক চ্যানেলে তৎপরতা চালাতে হবে। সরকারের উচিত- কূটনৈতিক চ্যানেলে সঠিক তথ্য তাদের সামনে তুলে ধরা। সরকারকে শুল্কনীতি পুনর্বিবেচনা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন শুল্ক প্রত্যাহারে রাজি করানোর আহ্বান জানান। তা না হলে, আমাদের পোশাক খাত ভয়াবহ সংকটে পড়বে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ির কারণে নতুন বাজার তৈরির দিকেও মনোযোগী হবেন রপ্তানিকারকরা।

শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক কমানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি ও জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ অবদান রাখে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি কর্মরত।

দেশের একজন গার্মেন্টস রপ্তানিকারক ও বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম জানান, তার প্রতিষ্ঠানটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে পোশাক সরবরাহ করে থাকে। এখানে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কর্মী কাজ করেন। হঠাৎ শুল্ক আরোপের ফলে অনেক অর্ডার (ক্রয়াদেশ) বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক মূল্য সুবিধা হারাতে পারে। বাংলাদেশকে এখন কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা বাড়ানো।

বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি এবং রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে। ভারত ও পাকিস্তানে কম শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) জানুয়ারি পর্যন্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে পোশাক রপ্তানিতে চীনের দাপট একচেটিয়া। চীনের হিস্যা ২১ শতাংশ। বাংলাদেশের হিস্যা ৯ শতাংশের কিছু বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ ১০ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। চতুর্থ অবস্থানে ইন্দোনেশিয়া এবং পঞ্চম ভারত। শীর্ষ দশের বাকি ৫ দেশ যথাক্রমে মেক্সিকো, হুন্ডুরাস, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৭২০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা ওই বছরের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ। অন্যান্য পণ্য মিলে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানি হয় ৮৫০ কোটি ডলারের পণ্য।

উদ্বেগ গার্মেন্ট পল্লীতে
শ্রমঘন বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মালিক-শ্রমিকরা। ঈদের ছুটিতে বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও মালিক-শ্রমিক উভয়ের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। টঙ্গীর একটি মাঝারি মানের কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করি। এই শুল্ক কার্যকর হলে আমাদের উৎপাদন খরচ অনুযায়ী মার্কেট ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিদেশি ক্রেতারা তখন হয় চীন বা ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকবে, নয়তো অর্ডারই কমিয়ে দেবে।

টঙ্গী ব্রিজ এলাকায় কথা হয় শ্রমিক রুবিনা আক্তারের সঙ্গে। টঙ্গীর একটি কারখানায় সহকারী অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, কারখানায় কাজ করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালাই। যদি অর্ডার কমে যায় আর কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কীভাবে সংসার চালাবো? খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
গাজীপুর বোর্ড বাজার এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক আরিয়ান রমজান বলেন, ঈদের আগে আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। ঈদের পর চাকরির জন্য চেষ্টা করবো ভাবছি। কিন্তু সব জায়গায় এখন আলোচনা হচ্ছে ট্রাম্পের এই শুল্ক নিয়ে। গার্মেন্টস শিল্প আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এর সুযোগ সুবিধা বজায় রাখতে সরকারকে সচেষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে।

একেএস গার্মেন্টস মালিক কাসেম বলেন, এ শুল্ক আরোপের ফলে আপাতত কোনো সমস্যা না হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অর্ডার কম আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে বেশি দামে পোশাক ক্রয় করতে হবে। ফলে তারা কম পণ্য কিনবে। গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের আইন বিষয়ক সম্পাদক একেএম মিন্টু মনে করেন বাংলাদেশ সরকারকে শুল্ক কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

রাইজিং গ্রুপের জিএম তৌহিদের মতে, শুল্ক যেহেতু ১৫ শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশ হয়েছে তার প্রভাব তো অবশ্যই পড়বে।

mzamin

Friday, April 4, 2025

দুঃসংবাদ by এম এম মাসুদ ও সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এই ঘোষণা দেশের জন্য রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের দুঃসংবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা। তাদের মতে, এতে শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। দেশ নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক। এতে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশি পোশাকের দাম বাড়বে এবং দেশটির বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ক্রেতারা বিকল্প দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন, ফলে রপ্তানি আদেশ হ্রাস পেতে পারে, যা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমে গেলে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং মার্কিন শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এতদিন দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মারাত্মকভাবে আঘাত হানবে কারণ নতুন করের হার বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সব আইটেমের জন্য ইমপ্লিকেবল হবে। নতুন করের হারে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। ফলস্বরূপ, আমেরিকান ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং তারা ভোক্তাদের আইটেমগুলোর জন্য কম ব্যয় করবে। অন্যদিকে, নতুন শুল্কের হার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। ফলে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে দেবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই প্রভাব পড়বে আমেরিকার অর্থনীতিতে চাহিদা কমার কারণে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে যে, পরোক্ষ শুল্ক হিসাবের ভিত্তিগুলো যথাযথ কিনা। পাশাপাশি, সরকার ইতিমধ্যে যে সংস্কারগুলো করেছে, সেগুলো তুলে ধরা জরুরি। জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে এক্সপোর্ট সাবসিডি কমিয়েছে এবং সরকার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করা উচিত সরকারের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদেরও সম্মিলিতভাবে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এনিয়ে তিনি বলেন, এই বাড়তি শুল্ক সরবরাহকারীরা নয়, ক্রেতারা পরিশোধ করবে এই বিষয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দরকার। তিনি বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-কে একটি যৌথ নীতি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতার কারণে নিজ উদ্যোগে পণ্যের দাম কমিয়ে এই বাড়তি শুল্কের চাপ নিজের ওপর না নেন। যদি কেউ এই কৌশল না মানে, তাহলে তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও রাখা উচিত।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কমবেই- এই ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্ট রপ্তানি ইউএসের বাজারে বড় ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি আছে। ইউএসের বাজারে রপ্তানি কমে যাবে, তা তো প্রেডিক্ট করতেই পারি। সেখানে অন্যান্য পণ্যও রপ্তানি করি, লেদার, ওষুধ ইত্যাদি, সেখানেও ধাক্কা খেতে পারি।

বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেছেন, মার্কিন সরকার বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটা আমাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। তিনি বলেন, ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে এটা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং সামগ্রিক রপ্তানি কমে যেতে পারে কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের সবচেয়ে একক বড় বাজার। এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হলো আমাদের সরকার ধীরে ধীরে তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডিউটি কমিয়ে দিতে পারে। এটা করলে আমাদের ক্ষতি নেই কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আমদানির চেয়ে রপ্তানি অনেক বেশি। তাই যতটুকু আমদানি হচ্ছে সেখানে সরকার যদি ডিউটি কমিয়েও দেয় এর প্রভাব খুব একটা হবে না। এটা একটা সমাধান হতে পারে, বলে মনে করেন হাতেম।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, যে ট্যারিফ বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটা আমাদের ওপর হওয়ার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির এভারেজ ডিউটি ১৫.২ শতাংশ। আমেরিকাতে কিন্তু পণ্যের আইটেম অনুযায়ী ডিউটি কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্ল্যাট ১২.৫ শতাংশ। আমেরিকায় পলেস্টার পোশাকে একরকম, নিটে একরকম, উলে একরকম, ট্রাউজারে একরকম। একেকটায় একেক রকম ডিউটি। কিন্তু গড়ে সেখানে ১৫.২ শতাংশ। তিনি বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, যন্ত্রপাতি এবং পোশাক শিল্পের জন্য যেসব পণ্য আমদানি করি তার অধিকাংশ শুল্কমুক্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ শতাংশ। ডিউটি বাড়ানোর প্রভাব তো পড়বেই। হয়তো টোটাল টার্নওভার কমে যাবে যুক্তরাষ্ট্রে। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করে। সেখানে ১০ শতাংশ আমদানি হয়তো কমে যাবে। ফলে আমাদের ওপর এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার হলো আমেরিকা।

শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক কমানো সম্ভব হবে।

বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি বড় হুমকি। ভারত ও চীনের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার বেশি হওয়ায় তারা এই নতুন কাঠামো থেকে সুবিধা পাবে। সরকারকে শুল্কনীতি পুনর্বিবেচনা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন শুল্ক প্রত্যাহারে রাজি করানোর আহ্বান জানান। তা না হলে, আমাদের পোশাক খাত ভয়াবহ সংকটে পড়বে, সতর্ক করেন রকিবুল আলম চৌধুরী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে, বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫.৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা আগের বছরে ছিল ৭.২৮ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি ১.৫ শতাংশ কমে ২.২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৬.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসছে, তা সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এখন দেখতে হবে, বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ওপর ঠিক কী হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বিষয়টি হলো ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়ার শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হবে, সে কারণে হয়তো আরএমজি শিল্প অতটা আক্রান্ত হবে না, এমন ধারণা কেউ কেউ করছেন।

দেখা যাচ্ছে, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর শুল্ক আমাদের চেয়ে কম। এই ফাঁকে ভারত হয়তো লাভবান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন ভোক্তারা এমনিতেই কিনবে কম; এর জেরে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।? আরেকটি সুবিধা হলো, বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কম দামের পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, চীন বা এমনকি ভারত এখন উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে। ফলে তারা যতটা আক্রান্ত হবে, বাংলাদেশ ততটা হবে না বলেই ধরে নেয়া যায়।     

তারপরও অনেকে বলছেন, বাংলাদেশের উচিত মার্কিন পণ্যের শুল্ক কমানো, সেটা হলে আমাদের পণ্যে মার্কিন শুল্ক কমে যাবে। বাংলাদেশের উচিত, মার্কিন পণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্কের হার ৭৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রধান ৫টি রপ্তানি পণ্য: বোনা পুরুষদের স্যুট: ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ১.৯ বিলিয়ন ডলার। বোনা মহিলাদের স্যুট: একই বছরে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ১.০৯ বিলিয়ন ডলার। বোনা পুরুষদের শার্ট: ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ৭০৫ মিলিয়ন ডলার। বোনা পোশাক: ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৩০% ছিল বোনা পোশাক, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। বোনা টেক্সটাইল পণ্য: বাংলাদেশের রপ্তানির একটি অংশ বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্য নিয়ে গঠিত, যা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এই পণ্যগুলোর মধ্যে প্রধানত তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির শীর্ষে রয়েছে।

বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ঘোষণার দিনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ অভিহিত করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ডনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ তালিকা প্রকাশ করেন। যেখানে ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ, পাকিস্তানের পণ্যের ওপর ২৯ শতাংশ চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৩৪ শতাংশ, মিয়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ, লাওসের পণ্যে ৪৮ শতাংশ এবং মাদাগাস্কারের পণ্যের ওপর ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ, ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪ শতাংশ, তাইওয়ানের পণ্যে ৩২ শতাংশ, জাপানের পণ্যে ২৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ২৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডের পণ্যে ৩১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২ শতাংশ, মালয়েশিয়ার পণ্যে ২৪ শতাংশ, কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের পণ্যে ১০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০ শতাংশ, ব্রাজিলের পণ্যে ১০ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের পণ্যে ১০ শতাংশ, ইসরাইলের পণ্যে ১৭ শতাংশ, ফিলিপাইনের পণ্যে ১৭ শতাংশ, চিলির পণ্যে ১০ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ, তুরস্কের পণ্যে ১০ শতাংশ, কলম্বিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে।

mzamin

ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কি পিছিয়ে পড়বে by শুভংকর কর্মকার

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। কারণ, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসবে। এত দিন দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ১৮ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির কী হবে, সেটি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও বাজারটিতে পোশাক রপ্তানিকারক প্রায় সব দেশের ওপর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বসেছে। শীর্ষ দশ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে শুধু মেক্সিকোর ওপর নতুন এই শুল্ক আরোপ হয়নি।

ফলে পাল্টা শুল্কে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কতটা নেতিবাচক পড়বে, সেটি নিয়ে এখনো পরিষ্কার নন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা। তাঁরা বলছেন, নতুন করে শুল্ক আরোপে কম বা বেশি প্রভাব পড়বে। তার বড় কারণ হলো, শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে। এর ফলে পণ্যের চাহিদা কমবে। এসব প্রভাব পর্যালোচনার পর যত দ্রুত সম্ভব সরকারি পর্যায়ে পাল্টা শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা শুরু করতে হবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়ে পাল্টা শুল্কের চাপ কমাতে হবে। না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়বে।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকেরা ৭ হাজার ৯২৬ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই বাজারে শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে—চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, মেক্সিকো, হন্ডুরাস, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ কোরিয়া।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৃতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক। গত বছর (২০২৪ সাল) বাংলাদেশ ৭৩৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। গত বছর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া প্রতি বর্গমিটার পোশাকের দাম ছিল ৩ দশমিক ১০ ডলার।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাল্টা শুল্কে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। তবে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্ভাবনাও আছে। বাংলাদেশের উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানো। যেহেতু খুব বেশি পণ্য দেশটি থেকে আসে না, সেহেতু খুব বেশি ক্ষতি হবে না। বরং পাল্টা শুল্ক কমলে তৈরি পোশাকসহ অন্য পণ্যের রপ্তানি বাড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি করে পোশাক তৈরি করছি আমরা। সেই পোশাকের বড় অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য তাদের দেশে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের পদক্ষেপ নিতে পারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।’

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বরাবরই শীর্ষে রয়েছে চীন। গত বছর এই বাজারে চীন ১ হাজার ৬৫১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদে চীনা পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেন। পাল্টা ব্যবসা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক বসায় চীন। উভয় দেশের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমতে থাকে। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। এখন আবার ৩৪ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এতে করে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি আরেক দফা কমার শঙ্কা রয়েছে।

ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। গত বছর ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে ভিয়েতনাম। এই রপ্তানি ২০২৩ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। ভিয়েতনামের ওপর চীন ও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পাল্টা শুল্ক বসিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, ৪৬ শতাংশ। ফলে গত কয়েক বছর দেশটির তৈরি পোশাক রপ্তানি যে গতিতে বাড়ছিল সেটি শ্লথ হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চতুর্থ সর্বোচ্চ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে ভারত। গত বছর ৪৬৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে দেশটি। তাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের ওপর ২৬ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসিয়েছেন। যেহেতু প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কম বসেছে এবং দেশটির সরকার তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে সেহেতু ভারতে ক্রয়াদেশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পঞ্চম শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ইন্দোনেশিয়ার ওপর ৩২ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছর ইন্দোনেশিয়া ৪২৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া হন্ডুরাসের ওপর ১০ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ওপর ৪৯, পাকিস্তানের ওপর ২৯ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ১৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মেক্সিকোর ওপর এখন পাল্টা শুল্ক আরোপ না করা হলেও গত ফেব্রুয়ারিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক বসায় ট্রাম্প প্রশাসন। তার মানে শীর্ষ দশ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক কেউই স্বস্তিতে নেই।

জানতে চাইলে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাল্টা শুল্ক আরোপ করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ধস নামবে, সেটি এখনই মনে করছি না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই নীতি টেকসই হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। কারণ, বাড়তি শুল্কের চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়বে। ফলে তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাল্টা শুল্কের চাপে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের প্রথমেই পোশাকের দাম কমানোর ওপর চাপ দিতে পারে। এখন যে ক্রয়াদেশ আছে, সেগুলোর দামও কমাতে বলতে পারে ক্রেতারা। ফলে সম্মিলিতভাবে সেই চাপ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকারের উচিত বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা করে কৌশল নির্ধারণ করা।’

পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকেরা।
পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকেরা। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Friday, December 13, 2024

পোশাক খাতে অস্থিরতা থামছেই না

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধে সরকার ও মালিকপক্ষ থেকে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও অস্থিরতা থামছেই না। মাসের পর মাস চেষ্টার পরও কেন থামানো যাচ্ছে না বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান এই খাতে শ্রমিক অসন্তোষ? অনেকে বলছেন, পরিকল্পিতভাবে পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করতে কাজ করছে শ্রমিকদের পাশাপাশি কিছু কারখানা মালিকও। বেশকিছু মালিক ব্যবসা করলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে গড়িমসি করছেন। আবার ঝুট ব্যবসা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাঝেও রয়েছে কোন্দল। ফলে অস্থিরতা লেগেই আছে।

সূত্র মতে সরকার পরিবর্তনের পর আগস্টের শেষ দিকে সাভার ও আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পে শুরু হয় শ্রমিক অসন্তোষ। এরপর দফায় দফায় বৈঠকে বসে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ নানাপক্ষ। বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যাংক থেকেও দেয়া হয়েছে বিশেষ ঋণ সুবিধা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেনে নেয়া হয়েছে শ্রমিকদের ১৮ দফা। তারপরও মেলেনি সুফল। বিজয়ের মাসেও শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পোশাক কারখানা।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল ইসলাম আমিন বলেন, কম মজুরি হওয়ায় শ্রমিকরা অতি কষ্টে জীবনযাপন করছেন। ফলে তাদের বেতন বাড়ানো দরকার।

পোশাক মালিকদের মতে, বিগত সরকারের সময়েও প্রায় ৪ হাজার কারখানার মধ্যে দুয়েকটি কারখানায় সবসময়ই সমস্যা ছিল, কিন্তু শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করেনি। এখন সমস্যা সৃষ্টি করে বা সামান্য সমস্যা হলেই একটি পক্ষ শ্রমিকদের মহাসড়কে নিয়ে যায়। একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, বিগত সরকারের আমলে সুবিধা পাওয়াদের একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যেকোনো একটি বা দুটি কারখানায় সমস্যা দেখা দিলেই শ্রমিকদের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, অভ্যন্তরীণভাবেই মিটমাট সম্ভব এমন ঘটনাকেও বড় ইস্যু বানানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের সঙ্গে শুধু শ্রমিকরা জড়িত নয়। এর পেছনে অনেক ইন্ধনদাতা আছে। শ্রমিক অসন্তোষের সঙ্গে বহিরাগতরা জড়িত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, পোশাক খাতে অধিকাংশ শ্রমিকই নিরীহ। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে হাতে গোনা কিছু শ্রমিক। এদের মধ্যে কিছু দুষ্কৃতিকারী, কিছু এনজিও’র লোক এই নিরীহ শ্রমিকদের অপকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলের হয়ে শ্রমিকদের একটি পক্ষ পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করছে।

এদিকে সাধারণত পোশাক খাতে যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, পোশাক মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে যে সমন্বয় থাকা জরুরি ছিল, তা নেই বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকটি কারখানার মালিক।

এদিকে সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের যৌক্তিক সমাধান করা হবে।

দুইদিনে ১৯ কারখানা বন্ধ ঘোষণা: ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় বৃহস্পতিবারও শ্রমিকেরা নানা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন। সরকার ঘোষিত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি ৯ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে তারা বার্ষিক মজুরি ১৫ শতাংশ ও ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বৃহস্পতিবার আরও ৮টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার বন্ধ করা হয় ১১টি কারখানা। দুইদিনে মোট ১৯টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে।

সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান: আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের টানা কর্মবিরতিতে আবারো অশান্ত হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা এড়াতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ (১) ধারায় ৬টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আরও ৮টিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। এদিকে যেকোনো ধরনের সহিংসতা  রোধে পুরো যৌথবাহিনী সতর্ক অবস্থানের পাশাপাশি টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরিসহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে সাঁজোয়া যান ও জল কামান।

সূত্র মতে, বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নাসা গ্রুপ, ট্রাউজার লাইন ও আল মুসলিম। সাধারণ ছুটিতে থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিউ এইজ গার্মেন্টস, নিউ এইজ অ্যাপারেলস, মেডলার অ্যাপারেলা এবং ব্যান্ডো ডিজাইন। এ ছাড়া, শ্রমিকরা কারখানায় এলেও কাজ না করে বেরিয়ে গেছে এমন কারখানার মধ্যে রয়েছে- নিট এশিয়া লিমিটেড, নেক্সট কালেকশন লিমিটেড, ডেকো ডিজাইন লিমিটেড, শারমিন ফ্যাশন, শারমিন অ্যাপারেলস, ইথিকাল গার্মেন্টস, আগামী ফ্যাশন, ক্রসওয়্যার, ফ্যাশন ফোরাম এবং মুন রেডিওয়্যার লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি কারখানা।

নিউ এইজ গ্রুপের একটি কারখানার নারী শ্রমিক বলেন, গত শনিবার থেকেই সমস্যা হচ্ছিল। আজ মুঠোফোনে বার্তা পেয়েছেন কারখানা সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করলেও অন্তত ২৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখে শ্রমিকরা শুরু করেন কর্মবিরতি। হাজিরা নিশ্চিত করে বিভিন্ন কারখানায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা অবস্থান করে তারা বেরিয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে নিউ এইজের তিনটা কারখানা, বান্দু ডিজাইন, মেডলার  অ্যাপারেলস ও শারমিন গ্রুপের কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও চলমান অস্থিরতার কারণে নাসা গ্রুপের একাধিক কারখানাসহ ছয়টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় চলতি বেতনে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাৎসরিক বেতন ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি, প্রতি মাসে অর্জিত ছুটির টাকা পরিশোধ, ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে কর্মবিরতিসহ আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা।

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিকরা ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করলেও, কর্মবিরতি পালন ছাড়া কোনো বিশৃঙ্খলা করছেন না। সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

mzamin

Saturday, December 7, 2024

সংকটের মধ্যেও স্বস্তি পোশাকশিল্পে

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। সাম্প্রতিক সময়ে এই শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষে কারখানা বন্ধসহ নানা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এই অস্থিরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে এসব অস্থিরতার ধকল অনেকটা কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে দেশের রপ্তানি খাত। এর ফলে বাড়ছে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ থেকে শুধু নভেম্বর মাসে ৩৩০ কোটি ৬১ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় ৪৭ কোটি ডলার বেশি। আগের বছরের নভেম্বর মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়ে ছিল ২৮৪ কোটি ৪০ ডলার। মাস হিসাবে চলতি বছরের নভেম্বরে এই রপ্তানি বেড়েছে ১৬.২৫ শতাংশ। তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য খাতের রপ্তানিও গত নভেম্বরে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।

ইপিবি’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ মাসে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানির ৮১ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) তৈরি পোশাক থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৬১১ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৪৩৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। এক্ষেত্রে আগের বছরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছে বেড়েছে ১২.৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু নভেম্বরেই ১৭৪ কোটি ডলারের নিট পোশাক রপ্তানি হয়। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে গত মাসে ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৫৭ কোটি ডলারের। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ।
ইপিবি বলছে, গত পাঁচ মাসে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৩৫৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পণ্য। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানিতে রপ্তানি হয়েছে ২১০ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পণ্য। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি দেশ।

জানা গেছে, দেশের তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে চলেছে অস্থিরতা। এখনো এই অস্থিরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন দাবিতে এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরে চলছে শ্রমিক অসন্তোষ ও কর্মবিরতি। এসব সমস্যার পরও রপ্তানির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে পোশাক খাত।

পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ গত ১৯শে অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অন্তত ৪০ কোটি ডলারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

ইপিবি’র ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, জুলাই-আগস্টে ব্যবসা-বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য এখন অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, পণ্য বহুমুখীকরণ নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নীতি সহায়তা ও ব্যবসার কিছু ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে বিভিন্ন খাতের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভালো করছে। এ নিয়ে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের মধ্যেও শ্রমিক-মালিকরা উৎপাদন চালু রেখেছেন। মূলত তাদের কঠোর পরিশ্রমে রপ্তানিতে ভালো ফল এসেছে। তা ছাড়া এখন রপ্তানির ‘পিক সিজন’। সামনে খ্রিষ্টানদের বড়দিনসহ বিভিন্ন উৎসব রয়েছে। এ ছাড়া বিগত সময়ের ক্রয়াদেশগুলোও এ সময় সম্পন্ন হয়েছে। এ সব কারণে রপ্তানি বেড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। শিল্প এলাকায় যৌথবাহিনী মোতায়েন থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব উদ্যোগ রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। যদিও কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন হয়েছে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরপরও রপ্তানি আয় বাড়ায় আমরা খুশি। তবে আমাদের অর্ডার কিন্তু কমছে। জানি না আগামী মাসগুলোতে কী হবে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের হিসাবে জুলাই মাসের মধ্যে এক সপ্তাহেই পোশাক শিল্পে ক্ষতি হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের উপরে। আর ব্যাংক বন্ধ থাকায় তো রপ্তানির উপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা না থাকলে আমাদের রপ্তানি আরও বাড়তো।

রিজার্ভ বাড়ছে: রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ায় রিজার্ভও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ১লা হাজার ১১৩ কোটি ৭৩ লাখ (১১.১৪ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স এসেছে দেশে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬.৪৪ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ১৮.৭৩ বিলিয়ন ডলার। ‘গ্রস’ হিসাবে ছিল ২৪.৪৫ বিলিয়ন ডলার। এক সপ্তাহ আগে ২০শে নভেম্বর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৮.৫০ বিলিয়ন ডলার। ‘গ্রস’ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৪.২৭ বিলিয়ন ডলার। দুই সপ্তাহ আগে ১৪ই নভেম্বর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ১৮.৪৪ বিলিয়ন ডলার। ‘গ্রস’ হিসাবে ছিল ২৪.১৭ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহের ব্যবধানে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়েছে ২৩ কোটি ডলার। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ৩০ কোটি ডলার।

mzamin


Monday, November 25, 2024

ট্রেড ইউনিয়ন করার শর্ত শিথিলসহ ১১ দফার বাস্তবায়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশে শ্রম অধিকার সংক্রান্ত ১১ দফার দ্রুত বাস্তবায়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র। এসব দফা বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধাও (জিএসপি) পাওয়া যাবে। রোববার ঢাকায় সচিবালয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি সফররত কেলি এম ফে রদ্রিগেজের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এমন আশাবাদের কথা শোনান বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। এ সময় বাণিজ্যসচিব মোহাং সেলিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, আমরা কতো দ্রুত শ্রম অধিকারের এই ১১ দফা বাস্তবায়ন করতে পারি, সেটা নিয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে। এগুলো করতে পারলে আমরা অবশ্যই জিএসপি সুবিধা পাব। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলটি আলোচনায় ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের বিষয়ে জোর দেয়। এসব অধিকার এখনো আছে, তবে বিপরীতে রয়েছে নানা শর্ত। যুক্তরাষ্ট্র চায় শর্তগুলো শিথিল করা হোক। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব দফা বাস্তবায়নে প্রতিনিধিদলকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের একটি দল বাংলাদেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি কর্মপরিকল্পনা জানিয়ে যায়। ওই কর্মপরিকল্পনায় মোটাদাগে ১১টি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। এর প্রথমটিই হচ্ছে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, শ্রমিক ও শ্রম অধিকারকর্মীদের যারা নিপীড়ন করেন ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালান, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এরপরই রয়েছে শ্রমিকনেতা ও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কাজ করে, এমন কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা। এ ছাড়া রয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো যে মানের অধিকার ভোগ করে, সে অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রম আইন ও বিদ্যমান শ্রমবিধি সংশোধন।

আরও যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোর (ইপিজেড) শ্রমিকেরা যাতে পুরোদমে ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারেন, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আইনের ৩৪ নম্বর ধারা সংশোধন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় (এসইজেড) সেটির প্রয়োগ এবং সেখানকার শ্রমিকেরা যাতে সংগঠিত হতে পারেন ও সম্মিলিতভাবে দর-কষাকষিতে সক্ষম হন, তা নিশ্চিত করা; ট্রেড ইউনিয়ন করার আবেদনের প্রক্রিয়া ৫৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা; শ্রম অধিদপ্তরের মাধ্যমে তার বিদ্যমান অনলাইন নিবন্ধন পোর্টালে অপেক্ষমাণ থাকা সব আবেদনের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ; বার্ষিক বাজেটের মাধ্যমে শ্রম পরিদর্শক নিয়োগ ও এজন্য তহবিল বরাদ্দ দেয়া; আরও শ্রম পরিদর্শকের পদ অনুমোদন এবং নিবন্ধন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার অভ্যাস বন্ধ করা ইত্যাদি।

বাণিজ্য সচিব বলেন, এসব বিষয়ে প্রধানত কাজ করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শ্রমিকের জীবনযাপন, মানোন্নয়ন ও ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম করার জন্য এগুলো করা হচ্ছে। আমরা সবাই এক লাইনেই কাজ করছি। আমরা আমাদের দিক থেকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে তাগিদ দিয়েছি। তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। তারা আমাদের শ্রমিকদের অধিকার ও ন্যূনতম মজুরিসহ অন্যান্য বিষয়ে নজর দিতে বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে হয়, এ বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব বলেন, কথা বলেছি। জিএসপি সুবিধা থাকলে এটা দিতে হতো না। বলেছি, জিএসপি সুবিধায় আমরা থাকতে চাই। শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্য রপ্তানির যে সুবিধা আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পাচ্ছি, সেটা আমরা সব জায়গায় চাচ্ছি। তাদেরও বলেছি। কিন্তু তারা সেই লাইনে কোনো কথা বলেননি।

mzamin

Wednesday, November 13, 2024

গাজীপুরের টিএন্ডজেড অ্যাপারেলস: শতকোটি টাকা পড়েছিল ব্যাংকে তিন মাসের বেতন বকেয়া by ইকবাল আহমদ সরকার

গাজীপুরের বহুল আলোচিত রপ্তানিকারক পোশাক কারখানা টিএন্ডজেড অ্যাপারেলস গ্রিন কারখানা। অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত কারখানা। তাদের শত কোটি টাকা বছরের পর বছর পড়েছিল ব্যাংকে। সেই টাকার কোন সুদ নেননি মালিকপক্ষ। কিন্তু এখন সেই কোম্পানি টানা তিন মাস ধরে শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছেন না। শুধু তাই নয়, বকেয়া বিলের কারণে কারখানার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকরা এ কারণে সাম্প্রতিককালের রেকর্ড ভেঙে টানা তিনদিন অবরোধ করে অচল করে মহাসড়ক। মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সমঝোতা হয়েছে সরকারিভাবে ঋণ নিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে। এরপরও ঠিক কবে নাগাদ কারখানাটি খোলা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও মালিকপক্ষ বলছেন দু’একদিনের মধ্যেই খোলার আশা করা হচ্ছে।

কি কারণে এমন অবস্থার তৈরি হলো? এ নিয়ে টিএন্ডজেড গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. হেদায়েতুল হকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।  হেদায়েতুল হক জানান, তাদের কারখানায় আগে সাড়ে সাত হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ছিল। এখন রয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। তাদের কারখানাটি ইকো ফ্রেন্ডলি কারখানা। গ্রিন প্রজেক্ট। অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত কোম্পানি। খুব ভালো চলছিলো।

কোম্পানির একশ’ পঞ্চাশ কোটি টাকা তিন বছর পড়েছিল ব্যাংকে। কোম্পানির আগের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন শামীম অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন বিধায় ব্যাংক থেকে কোনো ইন্টারেস্ট নেননি। অথচ আমাদের ক্রাইসিস পিরিয়ডের ব্যাংক কোনো কারণে ব্যাক টু ব্যাক এলসি বন্ধ করে দিলো। গত জুলাই মাস থেকে সংকট চরমে উঠেছে। তখন থেকেই এত বড় প্রতিষ্ঠানটি পড়ে গেল। এ ছাড়াও ওনার কিছু আত্মীয়স্বজন কারখানা ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। কারখানার মালিক শাহাদাত হোসেনের বাবা মারা যাওয়ার পর এবং তার ছেলে অপহরণ হওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর ২০১৪ সাল থেকে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে মদিনায় শিফট করেন। সেখানেই বসবাস করছেন। তবে সেখানে থেকেই আবার দেশে এসে মাসের পর মাস থেকে তিনি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগ সামলাচ্ছেন। তিনি বিদেশে থাকার সময়ে কারখানার ম্যানেজমেন্ট মূলত দেখাশোনা করেছেন তার কতিপয় আত্মীয়স্বজন।

কারখানা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা অসাধু প্রকৃতির ওইসব আত্মীয়স্বজন মাসে যেখানে ১০ কোটি টাকা শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ হওয়ার কথা, সেখানে কৌশলে ১৫-২০ কোটি টাকা বেতন পরিশোধ দেখিয়ে ক্ষতির দিকে নিয়ে গেছে। ওনার ছেলেকে যখন অপহরণ করা হয়েছিল, তখন বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি তার ছেলেকে উদ্ধার করেন। এ কারণে মূলত দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে গিয়ে বসবাস করছেন। হয়তো আবার শিগগিরই ফিরে আসবেন। মার্কেটিংসহ কারখানার নানা কাজের হাল ধরবেন তিনি। কারখানার বর্তমান এমডি শাহাদাত হোসেন শামীম কারখানাটি ভালোবাসতেন বলেই কারখানার ভেতরেই উনার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন ও মায়ের কবর দিয়েছেন। কারখানা এলাকায় নিজেদের অর্থে বিশাল আয়তনের মসজিদ ও মাদ্রাসা করেছেন। স্থানীয় লোকজনও কারখানা মালিকের মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, এখানে মা-বাবার কবর দেয়ার এবং আগে ভালোভাবে কারখানা চলেছে বলে জানান।

কারখানার চেয়ারম্যান আরও জানান, ২০০৭ সালে কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এ প্রজেক্টটির আনুমানিক মূল্য ১৪শ’ কোটি টাকা। এই কারখানাটির ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩.৩৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। করোনা পরিস্থিতি, ইউক্রেন- রাশিয়া যুদ্ধ ও দেশীয় নানা কারণসহ ব্যাংকের একটি চক্রান্তের শিকার হয়ে কারখানাটি বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছে। গত জুলাই মাস থেকে সংকট চরম আকারে দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত সাপোর্ট পাওয়া যায় নি। কারখানার রিস্ক ফান্ড ছিল ২০ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে সেটাও পাওয়া যায় নি। ৬৫ কোটি টাকার বাড়ির দলিল দিয়েও লোন পাননি। এখানে কোনো চক্রান্ত হয়েছে। যেসব কারণে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যায়ে শ্রম সচিবসহ সরকারের আন্তরিকতায় বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করে কারখানাটি আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি জানান, বিল বকেয়া পড়ায় এই মুহূর্তে কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আশা করছি, দু-একদিনের মধ্যেই হয়তো গ্যাস বিদ্যুৎ সংযোগ হবে। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। আশা করা যাচ্ছে, দু-একদিনের মধ্যে কারখানা চালু করা সম্ভব হবে। টিএন্ডজেড গ্রুপের মালিক দু’জন। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা বর্তমানে সৌদি আরবে বসবাসরত শাহাদাত হোসেন শামীম ও ঢাকার বাসিন্দা মো. হেদায়েতুল হক। 

mzamin

পোশাক খাত: সুখবরের বিপরীতে শঙ্কা

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষে কারখানা বন্ধসহ নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। গত অক্টোবর মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। গত আগস্ট মাসের শেষে শুরু হওয়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে পোশাক রপ্তানি নিয়ে বড় শঙ্কা  তৈরি হয়েছিল, যা এখনো চলমান। তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের রপ্তানি আয়ে বড় সুখবর এসেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, অক্টোবর মাসে এ খাত ৩৩০ কোটি ডলার মূল্যের রপ্তানি করেছে, আগের অর্থবছরের একই মাসের রপ্তানি আয় ছিল ২৬৮ কোটি ডলারের। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২২.৮ শতাংশ।

এদিকে বকেয়া বেতনের দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। এতে বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গত দুই দিনে ৪৪টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, গুটিকয়েক অযোগ্য মালিকের জন্য মাশুল গুনতে হচ্ছে পুরো তৈরি পোশাক শিল্পকে। আর অসন্তোষ নিরসনে ভাঙচুরকারী শ্রমিকদের সঙ্গে ইন্ধনদাতাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় ব্যবসায়ীরা।
ইপিবি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রশাসক আনোয়ার হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শ্রমিক অসন্তোষ থাকলেও অক্টোবর মাসে পোশাক খাতে রপ্তানি বেড়েছে। পোশাক খাতে রপ্তানি গত বছরের তুলনায় এবার অক্টোবরে ৬০০ মিলিয়ন এবং গত চার মাসে (জুলাই থেকে অক্টোবর) ১.৩ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

ইপিবি’র তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিকতায় টানা দ্বিতীয় মাসে পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে বাংলাদেশ। আগের বছরের অক্টোবরের তুলনায় গত অক্টোবরে শুধু পোশাক খাতের ওপর ভর করে রপ্তানি আয় ২০.৬ শতাংশ বেড়েছে। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক-অস্থিরতায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া সত্ত্বেও এমন অগ্রগতি হয়েছে।
ইপিবি’র তথ্যমতে, অক্টোবরের রপ্তানি আয়ে নিট পোশাক রপ্তানি আয় ১৮৬ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫০ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে আয় বেড়েছে ২৪.৬ শতাংশ। আর ওভেন পোশাকের রপ্তানি হয়েছে ১৪৪ কোটি ডলার, আগের বছরের অক্টোবরের ১২০ কোটি ডলারের চেয়ে তা বেড়েছে ২০.৫৪ শতাংশ।
জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর আগস্টের শেষ দিকে সাভার ও আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পে শুরু হয় শ্রমিক অসন্তোষ। এরপর দফায় দফায় বৈঠকে বসে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ নানা পক্ষ। বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যাংক থেকেও দেয়া হয়েছে বিশেষ ঋণ সুবিধা।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেনে নেয়া হয়েছে শ্রমিকদের ১৮ দফা। তারপরও মেলেনি সুফল। নভেম্বরে এসেও তাই শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পোশাক কারখানা। মাসের পর মাস চেষ্টার পরও কেন থামানো যাচ্ছে না দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের এ অস্থিরতা?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সৃষ্ট সংঘাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এরই ধারাবাহিকতা ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। এ সময় গাজীপুর ও ঢাকার সাভারে শ্রমিক অসন্তোষের বেশ কয়েকদিন অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে, রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। হুমকির মুখে পড়ে তৈরি পোশাক শিল্প। সেই শ্রমিক অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। এখনো অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবারও গাজীপুরে বকেয়া বেতনের দাবিতে টিঅ্যান্ডজেড অ্যাপারেলস গ্রুপের পাঁচটি কারখানার পোশাক শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এমন পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পমালিকদের কপালে ভাঁজ পড়ে। ফলে আবারো শ্রমিক অস্থিরতার আশঙ্কা করছেন তারা।
বিজিএমইএ গত ১৯শে অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অন্তত ৪০ কোটি ডলারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) হিসাবে টাকার অঙ্কে ওই অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

আন্দোলনরত শ্রমিকরা বলেন, গত এপ্রিল মাস থেকে কারখানা বন্ধ ছিল। পরে কারখানা খুললেও দুই মাসের বেতন না দিয়ে কর্তৃপক্ষ টালবাহানা শুরু করে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বারবার বেতন পরিশোধের তারিখ দিলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেনি। বারবার সময় দেয়ার পরও বেতন পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রমিকরা এখন আর কারও কথা আর বিশ্বাস করে না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে রোববার সকালে লাঠিসোটা হাতে কিছু বহিরাগত যোগ দিয়েছে। শ্রমিকদের অবরোধের জায়গার উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল ইসলাম আমিন বলেন, কম মজুরি হওয়ায় শ্রমিকরা অতি কষ্টে জীবনযাপন করছেন। তবে অনেক গার্মেন্টস মালিক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা না দিয়ে পুঁজির বড় অংশ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে পুরো শ্রম খাতে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, শ্রমিকদের আমরা একাধিকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, আমাদের অফিসে এসে বসো। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা, মহাসড়ক ছাড়বে না। ফলে এ এলাকার গত দুদিনে ৪৪টি কারখানা ছুটি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক খাতে বিশৃঙ্খলা থামছেই না। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পোশাক খাতে অস্থিরতা লেগেই আছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে পোশাক খাত চরম সংকটে পড়বে। কাজেই পোশাক খাতের অস্থিরতা নিরসনে আশু পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। তা না হলে একদিকে যেমন বিদেশি বিনিয়োগ বিঘ্নিত হবে, অন্যদিকে পোশাক খাতের ক্রেতারাও মুখ ফিরিয়ে অন্য দেশে চলে যাবে।

অস্থিরতার মধ্যেও রপ্তানি আয় বাড়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরপরও রপ্তানি আয় বাড়ায় আমরা খুশি। তবে আমাদের অর্ডার কিন্তু কমছে। জানি না আগামী মাসগুলোতে কী হবে। বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। আমাদের হিসাবে জুলাই মাসের মধ্যে এক সপ্তাহেই পোশাক শিল্পে ক্ষতি হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের উপরে। আর ব্যাংক বন্ধ থাকায় তো রপ্তানির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই অস্থিরতা-অনিশ্চতা না থাকলে রপ্তানি আরও বাড়তো বলে মনে করেন তিনি।

mzamin

Friday, October 11, 2024

তৈরি পোশাক রপ্তানি: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২৪ সালের প্রথম আট মাস জানুয়ারি-আগস্টে বাজারটিতে বাংলাদেশসহ শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিকারক দেশেরই রপ্তানি কমেছে। তবে অন্যদের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি অনেক বেশি কমেছে।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সব মিলিয়ে ৫ হাজার ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ১১ শতাংশ কম।

অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মোট ৪৭১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। গত বছর একই সময়ে দেশটিতে ৭২৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। বর্তমানে এই বাজারে বাংলাদেশ তৃতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক। তৈরি পোশাকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা এখন ৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। তাদের দখলে রয়েছে পোশাকের ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ বাজার হিস্যা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ১ হাজার ৬৯ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে দেশটি, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ কম।

মার্কিন বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক ভিয়েতনাম। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পাঁচ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে ভিয়েতনামই দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তারা আলোচ্য জানুয়ারি–আগস্ট আট মাসে ৯৫৬ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের ৯৬৬ কোটি ডলারের রপ্তানির চেয়ে ১ শতাংশ কম।

অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে চতুর্থ ও পঞ্চম শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক যথাক্রমে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিও কমেছে। গত জানুয়ারি–আগস্ট সময়ে ভারত রপ্তানি করেছে ৩২১ কোটি ডলারের পোশাক। তাদের রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। তাদের রপ্তানির পরিমাণ ২৬৮ কোটি ডলার।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। যুক্তরাষ্ট্রে গত ১০ বছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। ২০১৩ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৬৫ কোটি ডলার। ওই বছরের এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর দেশটিতে পোশাক রপ্তানি কমে যায়। তবে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আবার অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বাড়তি শুল্ক থেকে বাঁচতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। মাঝে করোনার ধাক্কার পর ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রেকর্ড ৯৭২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আবার রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ বছরের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, বন্যা ও শ্রম অসন্তোষের কারণে টানা তিন মাস পোশাক খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ে আশাবাদী পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি নিত্যপণ্য নয় এমন পণ্যের বিক্রি কমেছিল। তার প্রভাবে আমাদের রপ্তানি কমেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা কিছুটা শঙ্কার মধ্যে আছে। তবে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে আমরা দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াব।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ে আশাবাদী। তাঁর মাধ্যমে আমরা যদি দেশটি থেকে কোনো ধরনের শুল্কসুবিধা নিতে পারি, তাহলে আমাদের রপ্তানি বাড়বে।’

তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকেরা
তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকেরা। ফাইল ছবি

Monday, October 7, 2024

আশুলিয়ায় শ্রমিক ছাঁটাই করে কারখানা বন্ধ

আশুলিয়ায় বিনা নোটিশে ফ্যাশনইট কোম্পানি লিমিটেড কারখানার ৬৩ শ্রমিককে ছাঁটাই করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ। গতকাল সকালে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার হামীদুল্যাহ ম্যানশনে অবস্থিত ‘ফ্যাশনইট কোম্পানী লিমিটেড’ কারখানার দেয়ালে ছবিসহ শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের তালিকা টাঙিয়ে দেয়া হয়। এ সময় কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণারও একটি নোটিশ টানানো হয়।

শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, শনিবার রাতেও সোয়েটার কারখানাটিতে প্রায় ১২শ’ শ্রমিক কাজ করেছে। তখনো কেউ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি জানতো না। সকালে কারখানায় এসে ৬৩ শ্রমিকের ছবিসহ ছাঁটাই এবং কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের বন্ধের নোটিশ দেখতে পাই। বরখাস্তকৃত শ্রমিক শাকিল হোসেন বলেন, আমরা কখনো কোনো শ্রমিক আন্দোলনে যাইনি। তারপরও কর্তৃপক্ষ আমাদের অন্যায়ভাবে ছাঁটাইসহ কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে ৬৩ জন শ্রমিকের ছবিসহ তালিকা টানিয়ে দিয়েছে। অপর এক নোটিশে কারখানার সকল শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে চলমান সহিংসতা, বেআইনি ধর্মঘট ও বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার স্বার্থে রোববার থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ থাকবে। শ্রমিকদের বেতন ভাতাদি রকেট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সোমবার পরিষোধ করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে কারখানার প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আব্দুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত কারখানাটিতে কাজ চলেছে। কিন্তু তখনো কোনো শ্রমিক কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি জানতো না। সকালে কারখানায় কাজে যোগদান করতে এসে মূল ফটকে বন্ধের নোটিশ দেখে অবাক হয়ে যায়। তবে ৬৩ জন শ্রমিককে কী কারণে ছাঁটাই করা হয়েছে তা নোটিশে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে সকালে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায় শ্রমিকদের ওপর বহিরাগতদের হামলার প্রতিবাদে কারাখানা ভাঙচুরসহ এক কর্মকর্তাকে মারধর করেছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানায়, প্রতিদিনের মতো সকালে শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় কাজে যোগ দেয় শ্রমিকরা। প্রায় একঘণ্টা পর বহিরাগতদের হামলায় নাজমুল হোসেন নামে এক শ্রমিক আহত হওয়ার খবর পেয়ে হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে কর্মবিরতি পালন শুরু করে শ্রমিকরা। এ সময় কর্মকর্তারা শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে ফেরানোর চেষ্টা করলে উত্তেজিত শ্রমিকরা এক কর্মকর্তাকে মারধর করে এবং কারখানায় ভাঙচুর করে। এর আগে টানা শ্রমিক অসন্তোষের পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। শ্রমিকরা সকালে স্বতস্ফূর্তভাবে কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগদান করায় কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছে। সকালে কয়েকটি দাবিতে আল-মুসলিম অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা এক কর্মকর্তাকে মারধরসহ কারখানায় ভাঙচুর চালালে কারাখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জামগড়া এলাকার ফ্যাশনইট কোম্পানি লিমিটেড কারখানার ৬৩ শ্রমিককে ছাঁটাই করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে শ্রম আইন-২০০৬ এর ১৩ (১) ধারা অনুযায়ী ৫টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ৪টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সদস্যদের টহল  অব্যাহত রয়েছে।

mzamin

Sunday, October 6, 2024

আশুলিয়ায় শ্রমিকদের ওপর বহিরাগতদের হামলা

আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন দাবি আদায়ে গত কয়েকদিনের টানা শ্রমিক বিক্ষোভের পর বিজিএমইএ, সরকার ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৮ দফা দাবি মেনে নেয়ায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছেন তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানাগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি শিল্প এলাকায় সেনা টহলও অব্যাহত রয়েছে। এদিকে দুপুরের পর আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার ডংলিয়ান ফ্যাশন লিমিটেড নামক চায়না মালিকানাধীন কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে কর্মবিরতি পালন করলে কারখানার স্টোর ম্যানেজার কনকের নেতৃত্বে কারখানাটিতে সাব-কন্ট্রাকে কাজ করা স্থানীয় সন্ত্রাসী অনিক বহিরাগত লোকজন নিয়ে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। লোহার রড, স্টিলের পাইপ, কাঠ এবং বাঁশের লাঠি দিয়ে শ্রমিকদের বেধড়ক পেটানো হলে কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক শ্রমিক আহত হয়। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে হামলাকারী কনকসহ ১৭ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কারখানাটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানাটির এক শ্রমিক জানান, কিছুদিন আগে শ্রমিকদের দাবির মুখে নানা অনিয়মের অভিযোগে কারখানার এইচআর ম্যানেজার রফিকুল ইসলামসহ চার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মধ্যে থেকে ৮৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেন। অপর এক শ্রমিক জানান, কারখানার শ্রমিকরা যাতে দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে না পারে এজন্য কারখানা কর্তৃপক্ষ এক হাজার টাকা হাজিরায় বহিরাগত তিন শত লোক নিয়োগ করেছে। তারা সাদা এবং কালো গেঞ্জি পরে প্রতিদিন কারখানার ভেতরে এবং বাইরে পাহারা দেয়। এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষ চাকরিচ্যুত করা চার কর্মকর্তাকে আবারো চাকরিতে পুনর্বহাল করলে শ্রমিকরা এর প্রতিবাদ করায় কনক, অনিক ও রফিকের নেতৃত্বে বহিরাগত লোক দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়।

কারখানাটির সিকিউরিটি অফিসার আতিয়ার রহমান বলেন, কোম্পানি নিরাপত্তার জন্য হাজিরা ভিত্তিতে বহিরাগত লোক রেখেছিল। শ্রমিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বাকবিতণ্ডা হলে বহিরাগত লোকজন শ্রমিকদের ওপর হামলা চালালে অনেকেই আহত হয়। পরবর্তীতে কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্টোর ম্যানেজার কনক ও সাব-কন্ট্রাকে কাজ করানো অনিক এলাকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে মিলে কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের কাছে শ্রমিকরা অসহায়। কথায় কথায় তারা শ্রমিকদের মারধরসহ ছাঁটাইয়ের হুমকি দিয়ে থাকে। কারখানার শ্রমিকরা যাতে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে না পারে সেজন্য টাকা দিয়ে সন্ত্রাসী ভাড়া করে কারখানার ভেতরে ও বাইরে পাহারা বসিয়েছে। সেই ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরাই শ্রমিকদের ওপর হামলা করেছে। অন্যদিকে আশুলিয়ার জিরাবো পুকুরপাড় এলাকায় লুসাকা গ্রুপের শ্রমিকরা সকালে কারখানায় প্রবেশ করে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে কর্মবিরতী পালন করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করলে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। একই এলাকার তাহারাত কম্পোজিট লিমিটেড কারখানায় গত বৃহস্পতিবার ১০ দফা দাবি আদায়ে শ্রমিকদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গতকাল থেকে শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩ (১) ধারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া নরসিংহপুর ইথিক্যাল গার্মেন্টস, জামগড়া এলাকার পলমল গ্রুপের আয়েশা ক্লথিং ও ইয়ারপুর এলাকার আঞ্জুমান গার্মেন্টসও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ইউসুফ মার্কেট এলাকার জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশের এএসপি আনোয়ার হোসেন বলেন, ডংলিয়ান ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই ও চাকরিচ্যুত চার কর্মকর্তাকে পুনর্বহালের বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডার ঘটনায় বহিরাগতরা শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করে। এ ঘটনায় আমরা ১৭ জনকে আটক করে যৌথ বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছি। বর্তমানে কারখানাটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহীনুর কবির বলেন, দু/একটি কারখানায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সকাল থেকে কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৩ (১) ধারায় ২৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ, শিল্প পুলিশ, এপিবিএন, আর্মড পুলিশ, বিজিবিসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন কারখানায় অবস্থানের পাশাপাশি টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

Friday, October 4, 2024

শ্রমিক অসন্তোষের নেপথ্যে

দেশের উৎপাদনমুখী বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ থামছে না। পোশাক খাতে হামলা ও ভাঙচুরের কারণে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। দাবি মেনেও হচ্ছে না স্থিতিশীল। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিও। অচল হয়ে পড়েছে অনেক কারখানা। ফলে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অনেকেই জেলে। কেউ কেউ পলাতক। বেতন দিতে পারছে না অনেক কারখানার মালিকপক্ষ। যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক ব্যবসার ওপর। এতে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না হলে সামনে দুর্ভোগে পড়তে হবে বলেও শঙ্কা তাদের। এ ছাড়া সুদ ব্যয়ের সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। সময়মতো ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে অনেকেই খেলাপি হয়ে পড়ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। এ সময় পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কারখানায় অসন্তোষ চলছে (এসব কারখানার সাবেক সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজনই মালিক)। এতে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। নতুন অর্ডার দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন তারা। এ শিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি খাত এবং অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। এ খাতকে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল হতে দেয়া উচিত নয়। অবিলম্বে এর অবসান হওয়া উচিত।

জানা গেছে, সরকার পতনের পর থেকে সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও গ্রেপ্তার করেছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের। অনেকেই পলাতক রয়েছে। এতে বেতন বন্ধ হয়েছে অনেক কারখানায়।

আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেশের সবচেয়ে সমালোচিত এস আলম গ্রুপ। গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তিনি দেশের বাইরে আছেন। সাদ মুসা গ্রুপের মুহাম্মদ মোহসিন। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ব্যাংক মালিকদের নেতা নজরুল ইসলাম মজুমদার। এ ছাড়া আরও অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী কর্ণধার পলাতক ও জেলে আছেন।

কারখানা মালিকরা বলছেন, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আমদানিকারক দেশগুলোতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়বেন রপ্তানিকারকরা। শুধু তাই নয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে ব্যবসায়ীরা কারখানা বন্ধ করে দেয়ায় শ্রমিকরাও চাকরি হারাতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও অপরাধীদের দমনে যথাযথ পদক্ষেপের অভাব দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, কোনো পক্ষের ইন্ধনে শিল্পে এই অরাজকতা চলছে। যৌথ বাহিনী শিল্প সচল রাখার বিষযে যে সহযোগিতা করছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট। কারখানায় অরাজকতা সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য যৌথ বাহিনীকে অনুরোধ জানান তারা। পোশাক শিল্পে সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করার জন্য যৌথ বাহিনীকে পোশাক শিল্প পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিজিএমইএ এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল্লাহ হিল রাকিব।

বিজিএমইএ সূত্র জানায়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলের ‘নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা’ এবং ‘প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেয়ার চেষ্টার কারণেই অশান্ত তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। বিক্ষোভ করেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। পোশাক শিল্পাঞ্চল নবীনগর, চন্দ্রা, বাইপাইল, আবদুল্লাপুর, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ ৩০ কিলোমিটার যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হস্তক্ষেপে এসব অঞ্চলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ব্যবসায়ী, মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সরকারের নানামুখী উদ্যোগের পরও শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ঝুটসহ কারখানা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কিছু কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৎপরতা, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা, বাইরের ইন্ধনসহ বিভিন্ন কারণে পোশাক কারখানাগুলোর অস্থিরতা বন্ধ হচ্ছে না।

এদিকে বর্তমান সরকার মনে করছে গুজব ছড়িয়ে গার্মেন্টসে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জড়িতদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪শে সেপ্টেম্বর পোশাক শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ানোসহ শ্রমিকদের ১৮টি দাবি মেনে নেয় মালিকপক্ষ। শিল্পাঞ্চলে ফিরে আসে কর্মচাঞ্চল্য। এরপর সব পোশাক কারখানা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে গত সপ্তাহে সহিংসতা ও অস্থিরতার তীব্রতা কিছুটা কমলেও এ সপ্তাহে আবারো আন্দোলন শুরু করেছে শ্রমিকরা। আবারো শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হওয়ায় এর পেছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে।
মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে পোশাক খাতের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে কথা বলেন বিএনপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় দেশের তৈরি পোশাক খাতে যে অস্থিরতা চলছে, তাকে ‘পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগী মালিকদের পরিকল্পিত চক্রান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন রিজভী।

ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারকদের একজন উদ্যোক্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বাজারে পণ্য সরবরাহ করা খুবই কঠিন হবে।
কোকোলা ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মো. মহসিন বলেন, শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণে আমাদের উৎপাদন ১০-১২ দিনের জন্য বন্ধ ছিল। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে আমরা সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবো না।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসর্‌স এসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক বলেন, ৫ই আগস্টের পর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে অস্থিরতা দেখা দিলেও আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করেছি। শিল্প ও অর্থনীতির স্বার্থে সরকারের উচিত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, তা না হলে রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলেও জানান তিনি। একজন রপ্তানিকারক দাবি করেন, যদি নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয় তাহলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পণ্য রপ্তানি করতে সমস্যায় পড়তে হবে। বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা আমাদের ওপর আস্থা হারাবে। তাই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের এখনই সময়।

একজন কারখানা মালিক বলেন, অনেক কারখানায় সাবেক সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন মালিক। সেখানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে বেতন পরিশোধ হয়নি। আবার কিছু কারখানায় ব্যবসায় ভালো যাচ্ছিল না গত এক বছর ধরেই। ২/৩ মাস বকেয়া পড়ে গেছে। এ থেকেই এবারের আন্দোলনের সূত্রপাত।
তিনি বলেন, এতদিন গাজীপুর-আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ বা এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ মূল ভূমিকা রাখতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়ায় এক মাস ধরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তবে আশা করছি দ্রুতই তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে শুরু করবে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, কিছু কারখানায় বেতন ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা আছে, সেটা বিজিএমইএ দেখছে। এর বাইরে নানা কারণ দেখিয়ে কিছু সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে শ্রমিকদের চেয়ে বাইরের লোকজন বেশি সম্পৃক্ত বলে মনে হচ্ছে। 

mzamin

আশুলিয়ায় কঠোর নিরাপত্তায় কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা

আশুলিয়ায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগ দিয়েছেন তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। কারখানাগুলোর নিরাপত্তায় শিল্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে ৩১টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। আশুলিয়ার কাঠগড়া, জিরাবো, পুকুরপাড়, নরসিংহপুর ও জামগড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি কারখানার সামনেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এর আগে সকালে শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশের পর কাজে যোগ দিয়েছেন অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা। তবে শিল্পকারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, বহিরাগত হামলা, অযৌক্তিক দাবি, কর্মবিরতিসহ চলমান সহিংসতা, বে-আইনি ধর্মঘট, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ২৪টি কারখানায় অনির্দিষ্টাকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছে কর্র্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা কাজ না করে কর্মবিরতি পালন করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বেশকিছু কারখানার মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিশ টাঙ্গানো হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা কারখানাগুলো হলো- জহরচান্দা এলাকার রাতুল গ্রুপ, আল্পস অ্যাপারেলস লিমিটেড, জিরাবো পুকুরপাড় এলাকার তাহারাত ফ্যাশন, দূর্গাপুর এলাকার ফ্যাশন ডট কম লিমিটেড, বুড়িপাড়া এলাকার ইথিক্যাল গার্মেন্টস লিমিটেড, কাঠগড়া এলাকার ডুকাটি অ্যাপারেলস লিমিটেড, আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড, এআর জিন্স  প্রোডিউসার লিমিটেড, জিহান গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, এআর ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেড, ফিউচার ক্লোথিং লিমিটেড, এফজিএস ডেনিমওয়্যার লিমিটেড, আঞ্জুমান গার্মেন্টস।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সকল শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণের সদয় অবগতির জন্য জানানো হয়, বর্তমানে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের গার্মেন্টস শিল্পকারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, বহিরাগত হামলা, অযৌক্তিক দাবি, কর্মবিরতিসহ চলমান সহিংসতা, বে-আইনি ধর্মঘট, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি একইসঙ্গে শিল্পাঞ্চলে সার্বিক আতঙ্কজনক অবস্থার কারণে কারখানা পরিচালনা করার অনকূল পরিবেশ না থাকায় এবং কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণের জান-মাল ও সার্বিক নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ধারা ১৩ (১) মোতাবেক অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ থাকবে।

জিরাবো পুকুরপাড় এলাকার রাইজিং গ্রুপের অ্যাকটিভ কম্পোজিট লিমিটেড কারখানার জেনারেল ম্যানেজার মো. মাহমুদ খালেদ বলেন, সকালে আমাদের কারখানার শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় প্রবেশ করে কাজে যোগদান করেছে। আমরা বিজিএমইএ ও সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রমিকদের সকল দাবি মেনে নেয়ায় কোনো ধরনের অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী লুসাকা গ্রুপের কারখানাসহ অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা এসে আমাদের গেটে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের ছেড়ে দিতে হয়। কারখানাটিতে কাজ করা একজন নারী শ্রমিক বলেন, আমরা কাজ করতে চাই বলেই কারখানায় আসি। কিন্তু কারখানায় কাজের পরিবেশ না থাকলে মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিবে বলে শুনেছি। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে আমরা কী করে খাবো। আমরা চাই সরকার যেন এ বিষয়ে দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহীনুর কবির জানান, শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, এপিবিএনসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে না ঘটে সেজন্য কঠোর নজরদারি ও টহল অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বেশকিছু কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে এবং কিছু কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

mzamin

Thursday, October 3, 2024

তিন দিন পর সচল আশুলিয়া মহাসড়ক

সাভারের আশুলিয়ায় সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে গত সোমবার থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত টানা ৫৪ ঘণ্টা নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন বার্ডস গ্রুপের শ্রমিকরা। গতকাল দুপুর ১টার দিকে যৌথবাহিনীর আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বিক্ষুব্ধ  শ্রমিকরা। এর আগে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দফায় দফায় অবরোধকারী শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করেন। পরে দুপুর ১টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কারখানা মালিককে আটক করে পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিলে শ্রমিকরা রাস্তা ছেড়ে কারখানার সামনে অবস্থান নেয়। সোমবার সকাল ৯টার দিকে পাওনাদী পরিশোধের দাবিতে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কটি অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে শ্রমিকরা। এই অবরোধের কারণে পার্শ্ববর্তী বাইপাইল আব্দুল্লাহপুর সড়ক ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছিলো। যানজটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিল ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক ও বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, বার্ডস গ্রুপের মালিককে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনরত শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর সড়কটি যান চলাচল শুরু হয়েছে। অবরোধকারী শ্রমিকরা জানায়, আমরা টানা ৫৪ ঘণ্টা ধরে সড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছি পাওনা পরিশোধের জন্য। কিন্তু কোনো পক্ষই আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। বুধবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয় বার্ডস গ্রুপের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যানজটের কারণে তাকে কারখানায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। রাস্তা ফাঁকা করতে হবে। এমন খবরে আমরা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করেছি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার লে-অফ করা বার্ডস গ্রুপের শ্রমিকদের সার্ভিস বেনেফিট ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার দিন ধার্য করা ছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ কোনো ধরনের পাওনাদী পরিশোধ না করে শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এমনকি তিন মাস সময় চেয়ে কারখানার গেটে একটি নোটিশও সাঁটিয়ে দেন। সকল শ্রমিক পাওনাদী পাওয়ার আশায় সকালে কারখানায় গেলে নোটিশে আরও তিন মাস সময় চাওয়ার বিষয়টি দেখতে পায় শ্রমিকরা। এ সময় উত্তেজিত হয়ে সকল শ্রমিক নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বুড়িরবাজার রোড এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। অবরোধের টানা ৫৪ ঘণ্টা পর মালিককে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে সড়ক ছেড়ে দেয় শ্রমিকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্ডস গ্রুপের এক শ্রমিক বলেন, আমাদের চুক্তির দিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিশ্বাসযোগ্য লোকজন ছিলেন। কিন্তু সেই চুক্তিও ভঙ্গ করেছে মালিকপক্ষ। ফলে আমরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমাদের অনেক শ্রমিক চাকরি না পেয়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। তারা বকেয়া পাওনাদীর জন্য গ্রাম থেকে আশুলিয়ায় এসেছেন। কিন্তু এখানে থাকা খাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় আমরা গত দুইদিন খেয়ে না খেয়ে রাস্তায় অবস্থান করি। এদিকে টানা তিন দিন পর নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক, বাইপাইল, আব্দুল্লাহপুর সড়ক ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজটে আটকে থাকা হাজার হাজার যানবাহন সীমিত আকারে চলাচল শুরু করেছে। বিকাল নাগাদ যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে? আসবে বলে জানিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগ। সকালে বাইপাইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অবরোধের কারণে পার্শ্ববর্তী বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও যানজট সৃষ্টি হয়েছে। সবমিলিয়ে ৩ সড়কে প্রায় ৩০ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়েছে। যানজটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক ও বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক। এসব সড়কে বেশির ভাগই মালবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ব্যাংক ও স্বল্প সংখ্যক যাত্রীবাহী বাস রয়েছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানায়, চুক্তিমতো শ্রমিকদের বেতনের টাকা পরিশোধ করলেও ৩০শে সেপ্টেম্বর সার্ভিস বেনেফিটসহ ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে আরও তিন মাস সময় চেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটি। নির্ধারিত টাকা পরিশোধ না করায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এদিকে শ্রমিকদের টাকা পরিশোধ না করলেও শ্রমিক নেতাদের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা উৎকোচ হিসেবে প্রদান করে কারখানা কর্তৃপক্ষ।   অবরোধকারী শ্রমিকরা আরও জানায়, কারখানা কর্তৃপক্ষ আমাদের পাওনা পরিশোধের তারিখ দিয়ে সেই তারিখ আবার পরিবর্তন করে ৩ মাস সময় বর্ধিত করেছে। এরইমধ্যে মালিক পক্ষের লোকজন কারখানার বিভিন্ন মেশিনারিজ ও ঝুটসহ মূল্যবান মালামাল বিক্রি করে দিয়েছে। এখনো কোটি কোটি টাকার মেশিন ভেতরে রয়ে গেছে। সেখানে আমাদের পাওনা মাত্র ২৬ কোটি টাকা। আমাদের বেতন পরিশোধের নির্দিষ্ট তারিখ দেয়ায় আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আশুলিয়ায় এসেছিলাম। এখানে আমাদের থাকা-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় রোদে পুড়ে এবং বৃষ্টিতে ভিজে মহাসড়কেই অবস্থান করেছি। অনেকেই ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে এখানে এসেছি। শ্রমিক শহিদুল ইসলাম বলেন, একজন লোকের জন্য আমরা ছয়-সাত হাজার শ্রমিক তিন দিন ধরে রাস্তায়। সড়ক অবরোধের কারণে গাড়ি বন্ধ থাকায় আটকে পড়া পরিবহনে থাকা কাঁচামালসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা রাস্তা অবরোধ করে রাখতে চাই না। অবিলম্বে বার্ডস গ্রুপের মালিক মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করে আমাদের পাওনা পরিশোধ করা হোক। ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. শাহীনুর কবির বলেন, পুলিশ বিজিবি, র?্যাব ও সেনাবাহিনীর চেষ্টায় সড়কটিতে যান চলাচল শুরু হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ট্রাফিক পুলিশ কাজ শুরু করছে। কিছু সংখ্যক কারখানা ব্যতীত সকল কারখার উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। 
mzamin

Wednesday, September 25, 2024

শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়া হয়েছে জানিয়ে তাদেরকে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এরপর কেউ বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে সরকার তা বরদাশত করবে না। গতকাল সচিবালয়ে সরকার, বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে তিনি এসব কথা বলেন। আসিফ মাহমুদ বলেন, আপনাদের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেয়া হয়েছে। আর যেই দাবিগুলো শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে মেনে নেয়া যায়, সেই দাবিগুলো মেনে নেবো খুব দ্রুতই। আপনাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, দেশের শিল্পকে বাঁচানোর জন্য দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য যে নতুন বাংলাদেশ আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছি, তাকে সমুন্নত রাখা এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনারা স্ব স্ব কর্মস্থলে ফিরে যাবেন।

শ্রম উপদেষ্টা বলেন, মালিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষ এবং সরকার পক্ষের মধ্যে বারবার আলোচনা হচ্ছে, দীর্ঘ এক মাস ধরে আলোচনা, দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে যে মূল দাবি ১৮টা, আমরা আইডেন্টিফাই করেছি। সেই ১৮ দাবির বিষয়ে মালিক পক্ষ এবং শ্রমিক পক্ষ মিলে একটা সমাধানে পৌঁছানো গেছে। এই দাবিগুলো সমাধানের দিকে আমরা আগাবো। যেগুলো সমাধান সম্ভব, সেগুলো আজকে ইমিডিয়েটলি সমাধান করে দিয়েছি এবং যেগুলো দুই পক্ষের বৈঠকের মধ্যে সমাধান হবে, সেগুলো শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে হবে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকবে।

বুধবার থেকে সব কারখানা চালু রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের শিল্পকারখানা যাতে বাঁচে, শিল্প যাতে হাতছাড়া না হয়, সেজন্য শ্রমিক, মালিক, সরকার- সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো। শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা কর্মস্থলে ফিরে যাবেন। যদি শিল্প না বাঁচে তাহলে শ্রমিকও বাঁচবে না, সরকারেরও প্রয়োজন হবে না এবং মালিকও বাঁচবে না। আমাদের শিল্পকে বাঁচাতে হবে, আমাদের শিল্প যাতে হাতে থাকে-সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মালিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন খুব দ্রুত পরিশোধ করার ব্যবস্থা নেবেন।

আসিফ মাহমুদ সতর্ক করে বলেন, আগামীকাল (বুধবার) থেকে এই দাবিগুলো মেনে নেয়ার প্রেক্ষিতে যদি কোনো পক্ষ বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করে, সেটা যদি কোনো মালিক পক্ষ বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ প্রকাশ করে এবং সদিচ্ছার অভাব থাকে এবং শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যদি বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং যেহেতু সবগুলো দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সব পক্ষকে আমরা বসাতে পেরেছি। সরকার কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা আর বরদাশত করবে না। সেটার ব্যাপারে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ একটা আলোচনার পর আমরা একটা সমঝোতায় পৌঁছেছি। এখন এই সমঝোতা স্মারকে আমার মালিকপক্ষ স্বাক্ষর করেছে, আমার শ্রমিক ভাই-বোন স্বাক্ষর করেছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনো অবস্থাতেই নিজেদের হাতে নিবেন না। আগামীকাল (বুধবার) থেকে আশা করবো, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন শিল্প এলাকায় না হয়। যদি আগামীকাল থেকে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, এর জন্য আপনারা যারা স্বাক্ষর করেছেন-আপনারাই এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী হবেন। সেই সময় আপনারা পিছপা হতে পারবেন না।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আপনাদের মনে করতে হবে-এই শিল্প আমাদের সব কিছু দিয়ে যাচ্ছে। শুধু আপনাদের না, দেশবাসীকেও দিয়ে যাচ্ছে-এটাও আমাদের মনে করতে হবে। শুধু দেড় কোটি মানুষ নয়, পুরো বাংলাদেশ এর উপর নির্ভরশীল। সুতরাং এটা খেয়াল রাখতে হবে। আপনাদের আজকের অঙ্গীকার রাখতে হবে; তাহলে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না। এর পরেও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে সেই জন্য আমাদের অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে হবে, যা কারও জন্যই কাম্য নয়।