Wednesday, December 16, 2015

‘ইসলাম, মুসলিমকে দোষারোপ করবেন না’

রাজনীতিবিদদের সতর্ক করলেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পাকিস্তানি মালালা ইউসুফজাই। যেসব রাজনীতিবিদ ইসলামের সমালোচনা করছেন এবং বলছেন যে, ইসলাম সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করছে তিনি তাদের বিরুদ্ধে ওই সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। মালালা বলেন, একটি বিষয় আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। তাহলো আপনি ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে যত বেশি কথা বলবেন তত বেশি সন্ত্রাসী সৃষ্টি হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মিরর। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধের কথা বলেন। এরপর থেকে নিজ দেশ, নিজ দল, ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেট দল, বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। এমনকি বৃটেনে কমপক্ষে আড়াই লাখ মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুক্তরাজ্যে যাতে প্রবেশ করতে দেয়া না হয় সে আবেদন সম্বলিত একটি স্বারকে স্বাক্ষর করেছে। এ নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে তখন মুখ খুললেন মালালা। তিনি বললেন, নিজেকে আমি নারীবাদী, একজন মুসলিম ও ব্রামি ভাবি এবং তাতেই আমি গর্ব অনুভব করি। উল্লেখ্য বার্মিংহামকে কখনো কখনো ব্রামি বলে উচ্চারণ করা হয়। মালালা বলেন, রাজনীতিবিদরা কি বলছেন, মিডিয়া কি বলছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে তাদের অবশ্যই সতর্ক হওয়া উচিত। যদি আপনার উদ্দেশ্য হয় সন্ত্রাস বন্ধ করা তাহলে পুরো মুসলিম জাতিকে দোষারোপ করবেন না। কারণ, এটা করে সন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে না। এতে আরও সন্ত্রাসী সৃষ্টি হবে।
২০১২ সালে পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালেবানরা মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে মালালাকে। তারপর বিস্ময়করভাবে তিনি বেঁচে ওঠেন। তাকে চিকিৎসা দেয়া হয় বার্মিংহামে। শিক্ষা বিস্তারে তিনি একজন আন্তর্জাতিক দূতে পরিণত হয়েছেন। বৃটেনের চ্যানেল ফোর নিউজের দ্য প্রাইড অব বৃটেন বিজয়ী মালালা বড় একটি সাক্ষাতকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি মনে করি আমি একজন ব্রামি। একজন ব্রামি হতে পেরে আমি গর্বিত। যুক্তরাজ্যের মানুষ আমাকে যে সমর্থন, ভালবাসা দিয়েছেন, আমার জন্য তাদের যে আশীর্বাদ তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার জীবনে যা ঘটে গেছে তা ভয়াবহ। যুক্তরাজ্যের মানুষের ভালবাসা আমাকে শক্তিশালী করেছে। তা এখনও অব্যাহত আছে। এ জন্যই এখনো আমি শিক্ষার প্রচার চালাতে পারছি। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি ইসলাম সমতার ধর্ম।

ডিভোর্স এমন যন্ত্রণা ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়

২০১৫ কেমন গেল?
জীবনের সবচেয়ে খারাপ বছরগুলোর মধ্যে একটা। এক একটা বছর দারুণ যায়। এক একটা বছর যায় খুব খারাপ। এটা খুব খারাপগুলোর উপরের দিকে।
চরম নৈরাশ্যজনক বলছেন?
একটা জিনিস নৈরাশ্যজনক তখনই হয়, যখন সেই অভিজ্ঞতার কাছে আপনি হার স্বীকার করে নেন। আমার অভিধানে বাজে অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই। কী জানেন, ব্যর্থতা তখনই ব্যর্থতা যদি আপনি সেটা থেকে কিছু না শিখে বার হন। এ বছর স্তূপীকৃত ব্যর্থতার মধ্যে আমি অনেক কিছু শিখেছি। শেখার কোনও বয়স নেই। ইউ নেভার স্টপ লার্নিং। আঁতুড়ঘর থেকে সমাধি পর্যন্ত শিখতে শিখতে যেতে পারেন।
কী কী শিখলেন যদি বলেন?
বললাম তো জীবনের কঠিনতম বছরগুলোর মধ্যে একটা... ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আরও কত কিছু সম্পর্কে শেখাল। জীবনে এমন নানা কিছু ঘটা শুরু হয়, যা আমি কনট্রোল করতে পারিনি। থিংস জাস্ট কেপ্ট অন হ্যাপেনিং। আমি পরে একলা বসে তার কারণগুলো বার করার চেষ্টা করেছি। কেন এমন হল? জীবনে এ বছর বসে আমি নিজেকে রিঅ্যাসেস করেছি। আত্মসমীক্ষা করেছি, যে-ডিরেকশনে আমি যাচ্ছি সেটা কি ঠিক? না আমার রুট বদলানো দরকার?
পেশাদার জীবনেও তো ব্যর্থতা। সম্প্রতি করাচি নির্বাচনে হারলেন।
খুব টাফ ইয়ার। আমাদের পার্টি পাকিস্তান তহরিক-ই-ইনসাফ-এর সাইজটা আসলে এ বছর এত দ্রুত বেড়ে গিয়েছে যে, সর্বত্র ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। তা থেকে নানা প্রবলেম। আবার আমরা প্রধান বিরোধী দল হয়ে যাওয়ায় বাকি পার্টিগুলো ঈর্ষাকতর হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে একজোট  হয়ে গিয়েছে। নওয়াজের বিরুদ্ধে সেই ধর্নার পর থেকে গোটা রাজনৈতিক সিস্টেমটা যেন আমাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে।
ক্রিকেটজীবনে লোকে বলত, আপনার কিলার ইন্সটিংক্ট মুগ্ধ করার মতো। রাজনৈতিক জীবনে সেটা কিন্তু নিখোঁজ! নইলে নওয়াজ শরিফ যখন ওঁর বাসভবনের সামনে আপনার লাগাতার ধর্নায় বিধ্বস্ত, তখন হঠাৎ ধর্না তুলে নিলেন কেন?
আরে, এই আইডিয়াটা কোথা থেকে পেলেন যে আমরা নওয়াজকে ধর্নার মাধ্যমে ছুড়ে ফেলতে চেয়েছিলাম! একেবারেই না। আমরা এবং আরও একুশটা রাজনৈতিক দল মিলে যেটা বলেছিলাম, তা হল,  ২০১৩-র সাধারণ নির্বাচনে সর্বাত্মক রিগিং হয়েছে। মনে রাখবেন, শুধু আমরা বলছিলাম না। এতগুলো পার্টি বলছিল। আমরা বলেছিলাম, নওয়াজ তুমি জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করো। আর কমিশন যখন তদন্ত করবে তখন গদি ছাড়ো। ও তো জুডিশিয়াল কমিশন পরে করল। সেটা যদি আগে করে নিত, ধর্নাটাই হয় না।
কিন্তু নওয়াজ তো তখন যথেষ্ট চাপে ছিলেন?
ওই চাপটা শুধু ধর্নার জন্য ছিল না। সেই সময় ওর রক্ষক পুলিশ একটা শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রায় গুলি চালিয়ে একশো জনকে আহত করে। তার মধ্যে সতেরোজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। কারণ, ওদের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয়েছিল। এটা তো সবাই জানে যে, নওয়াজ হল পাকিস্তানের সবচেয়ে করাপ্ট পলিটিশিয়ান। যে আগের নির্বাচনে স্রেফ জোচ্চুরি করে জিতেছে।
রবিচন্দ্রন অশ্বিন সে দিন বলছিলেন, ‘‘আমি ইমরান খানের দারুণ ভক্ত। টিভিতে কোথাও উনি কিছু বলছেন দেখলেই আমি ঝপ করে বসে পড়ি।’’ অশ্বিন কে বা কী আপনি জানেন?
(ঘাড় নাড়িয়ে) সত্যি বলতে কী, ইন্ডিয়া দূরে থাক, আমি পাকিস্তান টিমেরও সবার নাম জানি না। পাকিস্তান-ইংল্যান্ড ম্যাচে কোথায় কী হচ্ছিল, ভাল ভাবে খবর রাখতে পারিনি। টুকটাক যা শুনি। আমি যত দূর জানি, ইন্ডিয়া-সাউথ আফ্রিকা সিরিজে দু’টিমের যে একমাত্র ফাস্ট বোলার সে-ই তিনটে টেস্ট খেলেনি। মডার্ন ক্রিকেট সম্পর্কে আমার কেমন একটা অবসাদ জন্মেছে যে এটা মিডিওকারদের আখড়া।
আমার কাছে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেট হল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ টেস্ট ম্যাচ। ওটাই সেরা প্লেয়ার বাছার মাপকাঠি। চ্যালেঞ্জ যদি না থাকে, আমি শ্রেষ্ঠত্ব মাপব কী করে?
কাম অন, আপনি বলতে চান, টিভি দেখে কখনও মনে হয় না, ইস্ আমার জীবনে যদি আইপিএল থাকত?
একেবারেই না। আইপিএল মিস করেছি বলে এতটুকুও মনে করি না। কী হত, কয়েকটা ছক্কা মারিয়ের দেখা পেতাম, যারা আসল পরীক্ষায় পড়লে বেশির ভাগই মিডিওকার টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ধরা পড়ত।
আপনার টেস্ট অভিষেক ১৯৭১ সালে। কিন্তু টিমে পাকাপাকি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ছয় বছর। রাজনীতিতে এ বার আপনার কুড়ি বছর পূর্ণ হবে। অথচ সাফল্য এখনও ধরা দিল না। ক্রিকেটের তুলনায় রাজনীতি বড় বেশি সময় নিচ্ছে না?
দু’টোর মধ্যে তুলনা চলে না। রাজনীতি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ কারণ আমি একেবারে আউটসাইডার, যে বাইরে থেকে উড়ে এসে এত দিনকার শাসন ব্যবস্থাকে, সিস্টেমকে, তার নর্মকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। পাকিস্তানের চরমভাবাপন্ন পার্টি, লেফট উইং পার্টি, রাইট উইং পার্টি — সবাই গিয়ে একটা জায়গায় আমাদের বিরুদ্ধে এক। পিটিআই যদি এসে ওদের এত দিনকার মৌরসিপাট্টাকে সুনামির মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই মুহূর্তে আমরাই দেশের একমাত্র ফেডারেল পার্টি। বাকিরা সব স্থানীয় পার্টিতে পর্যবসিত। আমরা এখন পাকিস্তানে একটা প্রদেশ চালাই, যেটা সম্পূর্ণ পিটিআই শাসিত। পাকিস্তানের যে কোনও সাধারণ মানুষের মত নিন। সে বলবে, ওটাই সবচেয়ে সুশাসিত প্রদেশ। যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি হয়েছে। গ্রোথ রেট বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ভাল।
লিডার হিসেবে এত বিখ্যাত। কিন্তু আপনার মুখে ক্রমাগত রাজনীতির কথা শুনে মনে হচ্ছে, এখন আর লিডার নন, পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ।
সেটা হয়তো কোনও দিন হতে পারব না। কারণ, প্রোটোটাইপ পলিটিশিয়ান আমি নই। তা ছাড়া আমি মনে করি, একজন নেতাও সার্থক রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারেন। সার্থক রাজনীতিবিদ মানে কেরিয়ার পলিটিশিয়ান নয়। সার্থক নেতা। যার সংজ্ঞা আমার কাছে, এমন কেউ যার নির্দিষ্ট ভিশন আছে। ভিশনের পিছনে ছোটার বন্য সাহস আছে। যিনি সেই আপাত অসম্ভবের পিছনে ছোটার সময় নিজের কথা ভাবেন না। যিনি বিভিন্ন মানুষকে অনুপ্রাণিত করে সেই আদর্শের পিছনে ছোটার জন্য এক পতাকার তলায় দাঁড় করাতে পারেন। যেমন আপনাদের দেশে গাঁধী। আমাদের দেশে কয়েদ-ই-আজম। ও দিকে ম্যান্ডেলা। কী অসাধারণ এক একজন মানুষ! কী বড় বড় সব ভিশন নিয়ে ওঁরা লড়াই করেছেন! এঁরা সত্যিকারের লিডার, কখনও পেশাদার রাজনীতিবিদ নন।
রাজনীতিতে এঁরা আপনার রোল মডেল বোঝা গেল। কিন্তু আপনার নিজের ভিশন কী?
আমার ভিশন এমন এক পাকিস্তান যা অনেক মানবিক। যেখানে সিভিল সোসাইটি হবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে পুরো ঝোঁকটাই থাকবে, মানুষটার অবস্থানের উন্নতিতে। আপনার শুনে মনে হতে পারে, এবং হয়তো সত্যি তাই যে, লক্ষ্যটা এখনও আইডিয়াল। তবে একে আমি তাড়া করছি এবং ইমিডিয়েট চ্যালেঞ্জ হল যে প্রদেশে আমরা ক্ষমতায়, সেখানে এগুলোকে সার্থক রূপ দেওয়া। ওখানে যদি শোকেস করতে পারি তা হলে নিশ্চয়ই মানুষের সংশয় কমবে। আর আমি এটা করেই ছাড়ব।
কথাগুলো শুনে বেশ মজা লাগছে। বিরানব্বই বিশ্বকাপের সময় আমায় দেওয়া একটা ইন্টারভিউতে আপনি বলেছিলেন, জীবনে কখনও রাজনীতিতে যোগ দেবেন না, আর বিয়ে-থা করবেন না।
তেইশ বছর আগের কথা বলছেন আপনি! কত লম্বা সময়! তখন আমার পক্ষে বোঝাই সম্ভব হয়নি, জীবন কী বিচিত্র বাঁক নিয়ে আপনাকে অদ্ভুত অদ্ভুত মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে! আপনি এক রকমভাবে জীবন কাটাবেন ঠিক করেছেন, এ বার হঠাৎ একটা স্রোতে সেটা পুরো উল্টো দিকে ঘুরে গেল। আমাদের কোরানে বলে, মানুষ একরকম প্ল্যানিং করে। আল্লা আর এক রকম করেন। যে কোনও একটা প্ল্যান কাজ করে।
সঞ্জয় মঞ্জরেকর সে দিন বলছিলেন, আপনার মতো উদারতা তিনি ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে দেখেননি। নব্বইয়ের নিউজিল্যান্ড সফরে সঞ্জয় রান না পাওয়ার পর আপনি নাকি ইংল্যান্ডে দেখা হওয়া মাত্র পরম স্নেহে বলেছিলেন, ‘‘সঞ্জয় এটা কী করলে! তোমার উপর আমার এত আশা। কেন হ্যাডলিকে এত ব্যাকফুটে খেলছিলে? পরের বার এই ভুল কোরো না।’’ সঞ্জয় আজও আপনার উৎসাহদানের কথা ভুলতে পারেন না। ভারত-পাক সিরিজে নিরপেক্ষ আম্পায়ার প্রচলনের পেছনেও আপনি।
কিন্তু এই যে আপনার সৎ-প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে ভাবমূর্তি, সেটাই তো আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে রেহাম খান এপিসোডে। আপনার বিবাহবিচ্ছিন্ন দ্বিতীয় স্ত্রী অনেক কথা বলেছেন আপনার সম্পর্কে...
কী বলব আমি! এ ব্যাপারটা এত দুঃখজনক।
দিল্লির জনপ্রিয় ইংরেজি চ্যানেলের মুখ্য সম্পাদক বলেছিলেন, রেহামের কোনও লোক নাকি ওঁদের ফোন করে বলেছে ইংল্যান্ডে প্রতিনিধি পাঠাতে। রেহাম আপনার সম্পর্কে বিস্ফোরক ইন্টারভিউ দেবেন। তবে মোটা টাকা পেমেন্ট করতে হবে।
ইন্ডিয়ান চ্যানেলকে বলেছে?
হ্যাঁ...
ইট ইজ ভেরি স্যাড। আমি এটা নিয়ে কথাই বলতে চাই না। এত যন্ত্রণাকাতর আমার কাছে এই বিচ্ছেদ অভিজ্ঞতা। ভেরি পেনফুল।
কিছু মনে করবেন না। আমার ধারণা ছিল, আপনাকে বিধ্বস্ত দেখব। কিন্তু দিল্লিতে এ বার দেখার পর মনে হল, সব কিছুই নর্ম্যাল রয়েছে।
বাইরে থেকে হয়তো মনে হচ্ছে। ডিভোর্স এমন গভীর যন্ত্রণা যে, ভেতরটা কেটে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। আমি খুবই কাবু হয়ে পড়েছিলাম। আই ওয়াজ রিয়েলি ডিপ্রেসড।
তারপর আত্মরক্ষা করলেন কী করে?
আমি আসলে এমন একজন মানুষ যার জীবন প্রতিনিয়ত ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে চলেছে। কখনও সে উপরে গেছে। কখনও নীচে পড়েছে। আমি জানি জীবনে এই রকম দুর্যোগের মধ্যে কী করে ফাইটব্যাক করতে হয়। সে ভাবেই সামলে ওঠার চেষ্টা করছি।
কী ভাবে লড়াই করতে হয় এমন দুর্যোগের সঙ্গে? এবিপি পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করুন না।
প্রথমত, যে করে হোক নিজেকে শতযন্ত্রণা থেকেও টেনে তুলতে হবে। বলতে হবে, নিজের জন্য আমায় বাঁচতে হবে। আমার সামনে এখনও জীবন পড়ে রয়েছে।
দুই: নিজেকে একেবারেই করুণা করবেন না। প্রশ্ন তুলবেন না, কেন আমার এমন হল?
তিন: বিশ্লেষণ করুন, কেন এটা ঘটল? কী কী ভুল আপনি করেছেন?
চার: নিজেকে বলুন, এটা মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তো নিশ্চয়ই। কিন্তু একদিক থেকে উপকারীও, আমাকে
জীবন সম্পর্কে আরও শিক্ষিত করে বিদায় নিল।

অনেকের মনে হয় জেমিমার আপনার প্রতি ভালবাসাটা অনেক জেনুইন। কলকাতায় কাউকে কাউকে দেখছি যাঁদের মনে হচ্ছে ওই যে আপনার বিয়ের দিন ট্যুইটার থেকে জেমিমা এতদিন ব্যবহার করা ‘খান’ পদবিটা সরিয়ে নিলেন, সেটা খুব রোম্যান্টিক।
আমি আর এ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে চাই না গৌতম। ইট ইজ টু পার্সোনাল (যথেষ্ট আবেগপ্রবণ দেখাতে শুরু করেছে তাঁকে)।
ওকে। অন্য প্রসঙ্গে আসি। তিন বছর বাদে জীবনে কোথায় দেখছেন নিজেকে?
নো আইডিয়া। ভবিষ্যৎ কে জানে? আর জানতে পারে না বলেই জীবন এত চমকপ্রদ। সব কিছু আগাম জানা থাকলে বোরিং হয়ে যেত।
বেশ পুরনো একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম আ হিডনিস্ট অ্যান্ড আই লিভ ইন দ্য প্রেজেন্ট।’ এটা কি সেই সব সময় বর্তমানে থাকতে চাওয়া?
আমি মনে করি না আমি হিডনিস্ট বলে। হিডনিস্ট হল সেই লোকটা যে বর্তমানে থাকে। জীবনের শখ-আহ্লাদগুলো পুরোমাত্রায় মিটিয়ে বাবুগিরি করে। এটা ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির প্রতীক। আমি মোটেও জাগতিক সুখের জন্য জীবন কাটাই না। আমি বাঁচি অ্যাচিভমেন্টের জন্য।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন ভারতে এখন পাকিস্তান নিয়ে কেমন অস্থির অবস্থা। আমির, শাহরুখের মতো জনপ্রিয় হিরোরাও চার পাশের অস্থিরতা দেখে মন্তব্য করলেই লোকে বলছে, দেশে অত যখন প্রবলেম, যাও পাকিস্তানে গিয়ে থাকো।
আমি ঠিক এটাই কাল বলছিলাম নরেন্দ্র মোদীকে। যে আমাদের কী এমন বড় সমস্যা, সমাধান করা যাবে না? এর চেয়ে অনেক বড় বড় সমস্যা নিয়ে পৃথিবীতে প্রতিবেশী দেশরা আপস করে নিয়েছে। আমরা যদি কখনও ক্ষমতায় আসি, আমার ভিশন হল দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ট্রেড চালু হলেই কোটি কোটি টাকা ঠিক উঠে আসবে। বিলিয়নস নয়, ট্রিলিয়নস অব ডলারস। তখন সর্বস্তরের মানুষ উপকৃত হবে। ইমিডিয়েটলি দু’দেশে ব্যবসা চালু করা দরকার। শান্তি দরকার। তা হলেই এই সব অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ কমে আসবে। মনে রাখতে হবে কিছু স্বার্থান্বেষী লোক তাতেও ঝামেলা পাকাতে চেষ্টা করবে। এমন লোক দু’দেশেই রয়েছে। তাদের চাপের কাছে দমে গেলে চলবে না। দু’একটা গুলি চললে বা বিস্ফোরণ হলেই শান্তি প্রক্রিয়া থামিয়ে দিলে চলবে না। যারা এগুলো করছে, তারা তো ঠিক এটাই চাইছে যে তাদের উৎপাতে উদ্যোগটা থেমে যাক।
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কমন অভিযোগ হল সীমান্তের ওপারের পারফর্মারেরা বলিউডে স্বাগত হন। কিন্তু আমাদের এখান থেকে কাউকে পাকিস্তানে আমন্ত্রণ জানানো হয় না।
জানি না কেন এমন হচ্ছে। আমি তো এককালে ওখানে অনেককে ডেকেছি প্রোগ্রাম করার জন্য। রেখা গিয়েছে। বিনোদ খন্না গিয়েছে। আমির গিয়েছে।
শুনছিলাম আপনি ‘আপ’ পার্টির খুব ভক্ত। তা হলে তো মোদীর সঙ্গে দেখা না করে এবার দিল্লিতে কেজরিওয়ালের সঙ্গে বৈঠক করা উচিত ছিল।
এটা ঠিকই ‘আপ’-এর আদর্শ আমার ভাল লাগে। আপ-এর আদর্শ আর আমাদের পার্টির স্লোগান একই— দুর্নীতি হটাও এবং শাসন ব্যবস্থার উন্নতি করো। আপনি যে সরকারেই রাজ করুন না কেন, তাকে তো মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। কেজরিওয়ালের সঙ্গে দেখা করতে পারলে ভাল হত। অবশ্য আমার সঙ্গে নীতীশ কুমারের দেখা হল। ‘আপ’-এর লক্ষ্য হল সিভিল সোসাইটি থেকে মানুষের জন্য সচেতনতা তৈরি। এটাই তো দরকার। আমাদের দু’দেশের নাগরিকেরাই জানে না তাদের কত সংবিধানসম্মত অধিকার আছে। আর এরা যত জানবে না, তত দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের সুবিধে। তত উত্থান হবে ডিক্টেটরদের।
পাক সাংবাদিকদের মুখে শুনছিলাম নওয়াজ শরিফ আপনাকে নিছক অপছন্দ নয়, মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন। প্রধান বিরোধী পার্টির এক নম্বরের সঙ্গে সদ্ভাব না থাকারই কথা। কিন্তু এত ঘৃণা কেন?
ঘৃণার কারণ হল নওয়াজের লুঠেরা চরিত্রটা আমি মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছি। জারদারি... সে...
আপনি তো আগে বলতেন জারদারি করাপ্ট?
দুটোই। ওদের সংসারটা হল দুর্নীতিগ্রস্তদের কোয়ালিশন। তার মধ্যে অবশ্য একটা তফাত আছে। জারদারি নিজে তোলা তোলে।
বিদেশে বিশাল ব্যাঙ্ক ব্যালান্স করে ফেলেছে। যেখান থেকে পারে, টাকা মারে। কিন্তু নওয়াজ আরও ক্ষতিকারক। কারণ ও নিজের করাপশনে গণতন্ত্রের এক একটা পিলারকেও প্রভাবিত করে দিয়েছে। আর্মি চিফ-কে ও কিনতে
চেষ্টা করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বাড়িতে ব্রিফকেসে লাখ লাখ টাকা ভরে পাঠিয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে উৎকোচ দিয়েছে। এর পর দেশে সুস্থ নির্বাচন হবে কী করে? ও তো সবাইকে কিনে নিচ্ছে। মিডিয়াকে অবধি...

মিডিয়াও?
নামকরণই তো হয়ে গিয়েছে লেফাফা জার্নালিস্ট। লেফাফায় করে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশের জন্য টাকা পাঠানো হয়।
পাক মিডিয়া সম্পর্কে বরাবর আপনি খুব তিক্ত। বিশ্বকাপ জেতার পর আপনার আশেপাশে ভারতীয় রিপোর্টারের সংখ্যা পাকিস্তানি সাংবাদিকের চেয়ে বেশি ছিল। মনে করতে পারেন?
এত দিন আগের কথা মনে করতে পারছি না।     
তখন পাকি সাংবাদিকদের আপনি বলতেন শেয়াল। যারা সাফল্যে ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে থাকে। আর আপনি হারছেন দেখলে লোকালয়ে কাম়ড়াতে ফেরে।
না, রাজনৈতিক সাংবাদিকরা সে রকম আমি বলব না। পাকিস্তানি প্রেসের চরিত্র এখন অনেক বদলেছে। ওরা খুব ভাইব্রান্ট। কেউ কেউ
পে রোলে আছে ঠিকই, কিন্তু গরিষ্ঠ অংশটা এখন নিয়মিতভাবে কেচ্ছাকেলেঙ্কারি ফাঁস করছে।
খুব বলিষ্ঠ। মিডিয়া নিয়ে সার্বিকভাবে আমার কোনও অভিযোগ থাকতে পারে না।
নিজের দেশেই দু’-তিনবার আপনার উপর আক্রমণের চেষ্টা হয়েছে। তাও নাকি আপনি যথেষ্ট সংখ্যক দেহরক্ষী নিয়ে ঘোরেন না। এত হাই স্টেক গেমে নিশ্ছিদ্র থাকতে না-চাওয়ার কারণ কী? রাজনীতি তো হিরোইজম হতে পারে না?
মৃত্যু তো একদিন আসবেই। আমি মনে করি যে দিন যাওয়ার যেতে হবে। কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। আই অ্যাম নট স্কেয়ার্ড অ্যাট অল। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকার কোনও ব্যাপারই নেই। পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের মধ্যে একমাত্র আমায় দেখবেন, নির্ভয়ে যখন তখন জনতার কাছে চলে যেতে। বিস্ফোরণে মৃত্যু যদি কপালে লেখা থাকে, আপনি খণ্ডাবেন কী করে! আবার ঈশ্বর যদি চান, চরম অসহায়তায়ও উনিই আপনাকে সুস্থ করে তুলবেন। নির্বাচনের আগের দিন তো আমি মরেই যাচ্ছিলাম। তিরিশ ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্ম থেকে পড়ে যাই।
ওই ভাবে পড়ে কেউ বেঁচে ফিরে আসতে পারে?
সে তো বলা হয়, আপনাকে রক্ষা করেছিল বুলেট প্রুফ জ্যাকেটের মোটা আস্তরণটা।
কোনও কিছুই বাঁচানোর মতো ছিল না। আমার মাথায় কনকাশন হয়ে যায়। সারা শরীরে সেলাই। বুকের হাড় ভাঙা। পাঁজরার দু’টো হাড় ভাঙা। সেখান থেকে তিন মাসে সুস্থ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ালাম। নতুন জীবনই পেলাম বলা যায়।
(ইমরান এ বার উসখুস করতে শুরু করেছেন। তাঁর দিল্লি-ইসলামাবাদ চার্টার্ড ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে। তাও বিমানবন্দরের পথে দিল্লির বিখ্যাত কুতুব সাহিব দরগা ঘুরে এয়ারপোর্টে ছুটবেন। বললাম, জাস্ট শেষ করছি।)
এগারো বছর আগে সৌরভের টিম যখন পাকিস্তান সফরে এসেছিল, আপনি অনেক আশাপ্রকাশ করেছিলেন যে, দু’দেশের সম্পর্ক দারুণ মজবুত করে দেবে এই সফর। কোথায় কী, উল্টে এমন অশান্তি যে এ বার তো সিরিজটাই হল না...
সম্পর্ক ভাল করতে হলে দু’দেশ থেকেই একটা জিনিস চাই, তা হল ডিটারমিনেশন। দু’দেশের নেতৃত্বকেই কঠোর হয়ে এগোতে হবে যে, খুচখাচ যাই ঘটুক সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা শান্তি আনব। সীমান্তে একবার গুলি চলল, তো নেতৃত্ব তাতে বিচলিত হয়ে গেল। এ ভাবে হবে না। হিংসাত্মক ঘটনা থাকবেই। তাকে পাত্তা দিলে মাথায় চড়ে বসবে।
ইমরান, আগে দু’দেশের খচখচানি একটা জিনিস নিয়েই ছিল — কাশ্মীর। এখন আরও একটা বিষয় তাতে যোগ হয়েছে — দাউদ ইব্রাহিম। পাকিস্তান যতক্ষণ না দাউদকে প্রত্যর্পণ করব বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ততক্ষণ ভারতে অন্তত বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হবে না।
সে সবই স্বাভাবিক ভাবে হবে। আগে জোরদার মৈত্রী তৈরি হোক। তারপর এগুলোর সমাধান আপনাআপনি হয়ে যাবে।
মানতে পারছি না। দাউদ এখানে খুব স্পর্শকাতর কাঁটা। কাল ‘আজ তক’য়ে আপনার ইন্টারভিউ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। যেখানে আপনি বলছেন, দাউদ পাকিস্তানে কি না, তাই নাকি আপনি জানেন না!
সত্যি আমি জানি না। আচ্ছা, আমায় বলুন তো দাউদ যদি পাকিস্তানে থেকেও থাকে, ও কি রাস্তায় আনন্দ করে হাঁটাহাটি করবে?
এটা পুরো পেশাদার রাজনীতিবিদের মতো কথা হল।
কেন, এটা কি বিশ্বাস হচ্ছে না যে, আমি জানি না! আমায় বলুন তো, দাউদের খবরটা পাব কোথা থেকে?
খুব সহজ। আপনার একুশ বছরের সহকর্মী মিয়াঁদাদকে ফোন করে। দাউদ তো সম্পর্কে মিয়াঁদাদের বেয়াই...
বাহ্, কী ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া!
দাউদ যদি থেকেও থাকে আমাদের দেশে নিশ্চয়ই আত্মগোপন করে রয়েছে। জাভেদকে আমি ফোন করলে ও কি বলে দেবে, হ্যাঁ রে ও তো এখানে লুকিয়ে রয়েছে।
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হুদা ও সাখাওয়াত

নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচনের সময় সেনা মোতায়েন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা ও নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন। তারা পদত্যাগের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। এমন তথ্য উঠে এসেছে সাখাওয়াত হোসেনের লেখা ‘নির্বাচন কমিশনে পাঁচ বছর’ শীর্ষক বইয়ে।  তিনি তাঁর বইয়ের ‘নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা নির্বাচন’ নামক অধ্যায়ে এসব কথা তুলে ধরেন। সাখাওয়াত হোসেন লিখেন, জুমার নামাজের পর বেলা প্রায় ৩টায় আমার অফিসে প্রনিক (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) আসলেন। তিনি বললেন যে, তিনি কারও কাছে কোনো সদুত্তর পাননি। পরিষ্কার করে কেউ কিছু বলছে না। আমরা নিশ্চিত হলাম, যে কারণেই হোক সরকার নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে আমাদের চাহিদা মতো সেনাবাহিনী দিচ্ছে না। আমরা দুজনেই আলোচনা করেছিলাম আমাদের করণীয় কী হতে পারে। মাত্র একদিন পর ভোটগ্রহণ করার কথা। এদিকে নিশ্চিত খবর পাচ্ছিলাম যে, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং বন্দরের কোনো এক প্রার্থীর পক্ষে বেশ কিছু ভোট কেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা রয়েছে। অপরদিকে চার দিন আগে শহরের মধ্যে এক মন্দিরে কে বা কারা প্রতিমা ভেঙেছে। যে কারণে সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এক্ষণে সেনাবাহিনী না পাওয়া যাওয়ার খবর কিছু মিডিয়া মারফত প্রচারও হয়ে গিয়েছিল। প্রসঙ্গত, ওই নির্বাচনের প্রায় সপ্তাহখানেক আগ হতেই বেসরকারি চ্যানেলগুলো নারায়ণগঞ্জে অস্থায়ী স্টুডিও বসিয়েছিল।
সাখাওয়াত আরও লিখেন, আমরা অফিসেই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিলাম। দুটি খোলা পথ নিয়ে আলোচনা করছিলাম। একটি ছিল এ অবস্থাতেই নির্বাচন করা যদি কোনো ধরনের নিরাপত্তা বিঘিœত হয় তবে সম্পূর্ণ নির্বাচন বন্ধ করা, যা সহজতর হতো না। দ্বিতীয়টি পথ ছিল সম্পূর্ণ পরিস্থিতি মিডিয়াকে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন স্থগিত করে আমাদের দুজনেরই পদত্যাগ করা। তেমনটা করলে ওই সময়ে বিরোধী দলের সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিরাট ইস্যু যোগ হতো; তা হতো সরকারের জন্য বড় ধাক্কা। তবে এটা সত্য নির্বাচন স্থগিতের মতো সিদ্ধান্ত হলে আমাদের সামনে পদত্যাগই একমাত্র পথ ছিল। আমরা দুজন এ ব্যাপারে এক প্রকার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছিলাম। ইতিমধ্যে অনেকটা অবাক করে সচিব ড. মোহাম্মদ সাদেক এসে উপস্থিত হলেন। তিনি জানালে যে, টিভির স্ক্রিনের মাধ্যমে অফিসে আমাদের উপস্থিতি জেনে স্বউদ্যোগেই এসেছেন। আমরা অবশ্য সচিবকে খবর দেইনি। যাই হোক, আমরা তার উপস্থিতিকে স্বাগত জানালে তিনি বিনীতভাবে বলেছিলেন, আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা পুনর্বিবেচনা করতে। তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার আপনাদের সিদ্ধান্তের ওপরে আমার বিনীত অনুরোধ আরেকবার ভেবে দেখবেন। আপনাদের পদত্যাগের খবর রটলেই রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি হবে।’ আমি বলেছিলাম যে, আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা রয়েছে? সঙ্গে বললাম যে, সেনাবাহিনী পাওয়া যাচ্ছে না সে খবর নারায়ণগঞ্জে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শামীম ওসমান বলেছিলেন যে, তিনি এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। তিনি যেকোনো অবস্থায় নির্বাচন করবেন। এ পরিস্থিতিতে অন্য প্রধান দুই প্রার্থীর একজন নির্বাচনে থাকবেন না বলে প্রথম থেকেই আমার ধারণা ছিল। কাজেই অপর মূল প্রার্থীর মনোভাব জানলে আমাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত যথার্থ হবে কি না ভাববার সুযোগ পাবো।

"যেকোনো মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পারে"

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক প্রধান ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান টানাপড়েন থেকে যেকোনো মুহূর্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পারে। তিনি বর্তমান বিস্ফারণোন্মুখ পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য এ মুহূর্তে খাদের কিনারে রয়েছে।
তিনি ইরানের টেলিভশনের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এখন বিশাল বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত। এ ধরনের বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে আঞ্চলিক সামরিক অভিযান যা এরইমধ্যে কয়েকটি দেশে হয়েছে। এ অঞ্চল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে।”
সিরিয়ার আকাশে রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে যখন প্রচণ্ড সামরিক উত্তেজনা চলছে তখন ইরানের এ শীর্ষ কর্মকর্তা এ কথা বললেন।
এরইমধ্যে ইরাকে সেনা পাঠিয়ে তুরস্ক আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় দু দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য ইরান প্রস্তাব দিয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হুমকির কথা উল্লেখ করে মোহসেন রেজায়ি আরো বলেন, “এটি এমন একটি বিপদ যা আঞ্চলিক প্রতিটি দেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। যদি সবাই যুদ্ধ বন্ধ করতে চায় তাহলে তাদেরকে এ হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে বিশেষ করে উত্তেজনার এ আগুন নেভাতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমেরিকা উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল বা দায়েশকে বাঁচাতে ব্যস্ত; তারা এ টানাপড়েনের অবসান ঘটাতে চায় না। বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বাড়াতে চায় এবং ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক তারা এ অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে।’’

আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিতে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে নওয়াজ শরীফকে

বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের (বিহারি) ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সহায়তা করতে পারেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। পাকিস্তানের সাবেক জিয়াউল হক সরকার রাবিতা ফাউন্ডেশন গঠনের পর আটকে পড়া পাকিস্তানিদের পুনর্বাসনের জন্য জমি দান করেছিলেন নওয়াজ শরীফ। তখন তিনি ছিলেন পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। জেনারেল জিয়াউল হক আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে ভীষণ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ফাঁসি দেয়ার পর সব আশা উবে যায়। কারণ, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিতে কোন আগ্রহই দেখায় নি পরবর্তী সরকারগুলো। অনলাইন সৌদি গেজেটে এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন ড. আলী আল ঘামাদি। এতে তিনি আশা প্রকাশ করেন এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। তিনি পুরনো সেই উদ্যোগ নতুন করে নিয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তিনি লিখেছেন, নওয়াজ শরীফ যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের ক্ষমতায় এলেন তখন মুসলিম ওয়াল্ড লীগ (রাবিতা) নতুন করে কাজ শুরু করবে এমন আশা জেগে উঠেছিল। তিনি প্রদত্ত সম্পত্তির বিষয়টি পুনর্জাগরণ করতে ও তা নিয়ে কাজ করতে তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। তখন নওয়াজ শরীফ আটকে পড়া পাকিস্তানিদের জন্য কিছু বাড়ি নির্মাণ করান ও সেইসব বাড়িতে পুনর্বাসন করেন ফেরত যাওয়া কিছু বিহারি পরিবারকে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া থামিয়ে দেন তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ, যিনি নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করে পরে প্রেসিডেন্ট হন।
ড. আলী আল ঘামাদি লিখেছেন, বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিরা আশায় বুক বেঁধে আছেন যে, একদিন তাদেরকে ফেরত নেবে পাকিস্তান। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছেন পাকিস্তানের পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছিল। তাহলো সাবেক সেনা শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের সময়ে। মক্কাভিত্তিক মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ (রাবিতা)র সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেয়ার জন্য তিনি গঠন করেন রাবিতা এনডোমেন্ট। ওই সময় রাবিতার মহাসচিব ছিলেন ড. আবদুল্লাহ ওমর নাসিফ। এই কার্যক্রমের অধীনে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ থেকে। তাদেরকে পুনর্বাসন করতে জমি দিতে চেয়েছিলেন তখনকার পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। নওয়াজ শরীফ পরে প্রধানমন্ত্রী হয়ে এ উদ্যোগ এগিয়ে নেন। তার কাছ থেকে পারভেজ মোশাররফ ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার পর পাকিস্তানের কোন অংশ বা সরকার বা রাবিতা এ সমস্যা সমাধানে আর এগিয়ে আসে নি। বিহারি ক্যাম্পগুলোতে এসব মানুষের অবস্থা শোচনীয় হলেও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক তহবিল থেকেও তারা কোন সহায়তা পায় না। এখন তারা দু’একটা দাতব্য সংস্থা থেকে কিছু সহায়তা পায়। পাকিস্তান ভিত্তিক কিছু এনজিও ও কিছু ব্যক্তি তাদেরকে সহায়তা করে থাকে। এর মধ্যে কিছু বাংলাদেশীও আছেন। তবে তাদের খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য যতটা প্রয়োজন এই সহায়তা তার তুলনায় অপ্রতুল। ড. আলী আল ঘামাদি লিখেছেন, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, পাকিস্তান সরকারের উচিত আটকে পড়া পাকিস্তানিদের মানবিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ সমস্যা সমাধানে অবশ্যই দায়িত্ব কাঁধে নেয়া। তা নাহলে এ সমস্যা পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ও ইতিহাসের জন্য একটি কলঙ্ক হয়ে থাকবে। আমি নওয়াজ শরীফের প্রতি আবেদন জানাই, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দফায় যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই উদ্যোগ আবার শুরু করুন।

চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ by ওমর ফারুক

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ব্যাপক মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে কলেজ কর্তৃপক্ষের আয়োজনে বিজয় দিবসের আলোচনাসভায় বহিরাগত ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা প্রবেশ করে হামলা চালালে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। পুলিশের সামনে ছাত্রলীগ ক্যাডার টিনুর নেতৃত্বে একদল ক্যাডার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এসময় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রতিহতের চেষ্টা করে। এ পর্যায়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১২ টায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অন্তত ৪০ ছাত্রকে আটক করেছে।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, আজ সকাল ১০ টা থেকে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ক্যাম্পাসে বিজয় দিবসের আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। বেলা ১২ টার দিকে স্থানীয় যুবলীগ ক্যাডার টিনুর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী যুবলীগ-ছাত্রলীগের ব্যানারে কলেজের প্রধান গেটে অবস্থান নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করে। এসময় তারা উস্কানিমূলক শ্লোগান দিতে থাকে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তারা গেইট টপকিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে সাধারণ ছাত্ররা তাদের প্রতিহত করে। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। খবর পেয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ এসে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়।
এসময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের শতাধিক ক্যাডার হলে প্রবেশ করে সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। পরে পুলিশ হল তল্লাশী করে অন্তত ৪০ জনকে আটক করেছে।
চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল আজিজ নয়া দিগন্তকে বলেন, আটককৃতদের যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিরাপরাধদের ছেড়ে দেয়া হবে।
বেলা ৪টা নাগাদ পরিস্থিতি শান্ত হয়।

স্বপ্নের বিজয় দিবস ২০২০ by গোলাম মাওলা রনি

২০১৫ সালের বিজয় দিবসটি হয়তো বিগত দিনগুলোর মতোই গতানুগতিক হবে। একদল লোক বলবেন- তারাই সবকিছু করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বিজয় কেবল আমাদেরই শ্রমলব্ধ ফসল- এমনতর কথা বলা শেষ হওয়ার সাথে সাথে অন্য দল হৈ-হুল্লোড় করে উঠবেন এবং বলবেন- বিজয়ে ওদের কোনো কৃতিত্ব নেই। ওরা তো শুধু গলাবাজি করেছে এবং সুবিধাজনক স্থানে থেকে আরাম আয়েশ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ করেছি আমরা। অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে লড়েছি। শত্রুর হাতে বন্দী হয়েছি- তাদের গুলি, বোমা গ্রেনেডে হারিয়েছি আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধব এবং সহযোদ্ধাদের। নিজেরা যেমন আহত হয়েছি, তেমনি মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে শত্রুসেনাদের শিকারে পরিণত হয়েছিল পরিবারের আপনজনেরা। হারিয়েছি পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী এবং কন্যা। পরিবারের তরুণী ও কিশোরীরা নিগ্রহের শিকার হতে হতে কেউ কেউ তো মারাই গেল, অপমানে কেউবা করল আত্মহত্যা। যারা বেঁচে রইল তারা বীরাঙ্গনা হিসেবে সমাজসংসারের করুণার পাত্রী হয়ে একটি দুর্বিষহ জীবন বেছে নিলো। কাজেই আমাদের সামনে যারা মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় এবং স্বাধীনতা নিয়ে গলাবাজি করে তাদের কাছে প্রশ্ন- তোমরা কোন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলে এবং কয়টা শত্রুসৈন্য ও রাজাকারের মুখোমুখি হয়েছিল? তোমরা কি খালি হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে যুদ্ধ করেছিলে, নাকি অস্ত্রশস্ত্র কিছু ছিল? তোমাদের পরিবারের কেউ কি শত্রুসৈন্য কিংবা তাদের সহযোগীদের দ্বারা হতাহত কিংবা নিগ্রহের শিকার হয়েছিল- যদি উত্তর হয় হ্যাঁ, তবে বলো তাদের নাম কী? আর উত্তর যদি হয় না, তবে বলো- সত্যি করে বলো, আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাদের মরহুম বাবা-মায়ের নামে শপথ করে বলো, মহান মুক্তিযুদ্ধের দুর্বিষহ নয়টি মাস কোথায় ছিলে এবং বিজয়ের এই দিনে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটিতে কোথায় ছিলে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দু’টি পক্ষ গত ৪০ বছর ধরে যেমন উপরিউক্ত কথাবার্তা বলে আসছেন, তেমনি একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সমর্থন ও সহযোগিতা তো করেইনি বরং বিরোধিতা করেছে। তবে এ কথা সত্য, দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনেপ্রাণে শত্রুসেনাদের ঘৃণা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন করতেন। অন্য দিকে, শত্রুসেনাদের সাহায্যকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সক্রিয় লোকজনের সংখ্যা, সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি বিত্ত-বৈভব মুক্তিযোদ্ধাদের তুলনায় তাদের জনসমর্থন ছিল খুবই সীমিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন কিছু নিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন, তদ্রুপ স্বাধীন বাংলাদেশেও নিরপেক্ষ মানুষের অভাব নেই। ফলে আমাদের বিজয় দিবস নিয়ে ২০১৫ সালেও চার শ্রেণীর মানুষের চার ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সরাসরি সম্মুখসমরে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা, দেশে-বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং আরাম-আয়েশে থাকা কথিত মুক্তিযোদ্ধা, নিরাপদ ব্যক্তিরা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা যেভাবে বিভক্তি সৃষ্টি করে আসছে, তা যেন আগামী দিনে না হয় সে জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের একজন যুবক হিসেবে মনে করি, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যারা ১৯৭১ সালের পর জন্মেছেন, তারা সবাই বাংলাদেশকে ভালোবাসেন অন্তরের অন্তস্তল থেকে। তারা কোনো অবস্থাতেই দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বিজয় দিবস নিয়ে কোনো বিতর্ক, দোষারোপ কিংবা বিভক্তি দেখতে চান না। তারা চান প্রতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দের বার্তা। মহান বিজয় দিবসের আনন্দ সবার মাঝে সর্বজনীনভাবে বিলিয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই কতগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। আমার মতে, নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যথানিয়মে আগামী পাঁচটি বছর প্রতিপালিত হলে আমরা ২০২০ সালে একটি সফল, সম্ভাবনাময় এবং স্বপ্নের বিজয় দিবস পালন করতে পারব-
এক. চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করার জন্য বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং এবং দেং জিয়াও পিং যেভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সফল করেছিলেন, তদ্রুপ আমাদের দরকার একটি যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্য, ধর্মীয় রীতিনীতি, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এবং বিনোদনকে মাথায় রেখে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রূপরেখা প্রণীত হবে যাতে ১৬ কোটি মানুষ নির্দ্বিধায় দেশ-মাতৃকাকে ভালোবাসতে পারে। দেশকে অন্তর থেকে যারা ভালোবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে পারবেন না, তাদের কাছে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের কোনো মূল্য নেই।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সফল করার জন্য যুদ্ধকালীন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময়কার গান, কবিতা, গল্প, নাটক, যাত্রাপালা, কথিকা ইত্যাদি যেমন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস-শক্তি জোগাত, তেমনি জনসাধারণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলত। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা যখন সেই সুরলহরী এবং কথামালা শুনি, তখন নিজের অজান্তে কখন যে একাত্তরের রণাঙ্গনে চলে যাই, তা টেরই পাই না। কাজেই আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বিজয় নিয়ে যত দিন পর্যন্ত জনপ্রিয় সুরসঙ্গীত, কাব্য, গীতিনাট্য, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি রচিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত বিজয় উৎসবকে সর্বজনীন করা যাবে না।
সরকারি মদদপুষ্ট কবি-সাহিত্যিক কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মীদের টাকা-পয়সা এবং উৎকোচ দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্ভব নয়। এ জন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কৌশল রপ্ত করতে হবে। ভারত, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া, কিউ বা, ভেনিজুয়েলা প্রভৃতি রাষ্ট্রের সফল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ইতিহাস জানতে হবে এবং তারা যেভাবে ও যাদের মাধ্যমে বিপ্লবের সূচনা করেছিল সেভাবে আমাদেরও শুরু করতে হবে। মানুষ যখন বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব এবং কীর্তিগাথা হৃদয়ে ধারণ করতে পারবে, তখন বাংলাদেশের পতাকা, মাটি, বাতাস, আলো, পানি, বনবনানী, পাখপাখালি এবং শষ্যক্ষেত্র মনমস্তিষ্কে দেশপ্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করবে।
দুই. বিজয়ের আনন্দ সর্বজনীন করার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপটি হলো অর্থনৈতিক বিজয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ধনী হওয়া কিংবা যেকোনোভাবে টাকা উপার্জনকে অর্থনৈতিক বিজয় বলা যায় না। রাষ্ট্র যখন তার ব্যয় নির্বাহের জন্য স্বাধীন, সার্বভৌম আর স্বাবলম্বী হবে তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিজয় সূচিত হবে। এ ক্ষেত্রে জনমতের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে কিংবা অন্যান্য দেশ সন্দেহের চোখে দেখে, এ রূপ কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করে রাষ্ট্র কোনো দিন প্রশংসিত হতে পারবে না। অন্য দিকে, জনগণ যখন তার কর্ম, আয়, রোজগার এবং জীবনযাপন সম্পর্কে মোটামুটি সন্তুষ্ট থাকবে তখন থেকে অথনৈতিক বিজয় সূচিত হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ও ব্যবস্থা রাষ্ট্র এবং এ দেশের জনগণের জন্য মোটেই সম্মানজনক এবং আনন্দদায়ক নয়। আমাদের জাতীয় আয়ের বিরাট অংশই ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম, অত্যাচার, চুরি, লুণ্ঠন, রাহাজানি, দখল, মিথ্যাচার ও অবিচার দ্বারা অর্জিত, কালো টাকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কালো টাকার মালিকপক্ষ, এই টাকার জোগানদাতা এবং সংরক্ষণকারী- সবাই এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশে অমানবিক ও অনৈতিক জীবনযাপন করে। এই শ্রেণীর লোকেরা উন্মত্ত হয়ে উল্লাস করতে পারে কিন্তু বিজয়ীর বেশে আনন্দ করতে পারে না। তারা সবসময় গভীর আতঙ্ক নিয়ে একটি সর্বনাশের আশঙ্কায় দিন যাপন করে।
দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনের দ্বিতীয় সমস্যা হলো অনৈতিক বিলিবণ্টন এবং নিয়মবহির্ভূত প্রতিযোগিতা। ক্ষমতাবানেরা সবসময় যোগ্য ও মেধাবী লোকদের বঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিজেরাই ভোগ করে থাকে। ব্যক্তি খাতের মেধাবী ও উদ্যমীরা এই অবস্থায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। যোগ্যরা অযোগ্যদের দিয়ে শাসিত এবং প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হন। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। দেশের তৃতীয় সমস্যা হলো অসম্মানজনক পেশা এবং অমর্যাদাকর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আয় উপার্জন। দেশের প্রায় সোয়া কোটি লোক বিভিন্ন দেশে মানবেতর পরিবেশে খাটছে। দেশের প্রায় পঞ্চাশ লাখ শ্রমিক মানবেতর পরিবেশে বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করছে। কুলি, মজুর, রিকশাচালক, ড্রাইভার হেলপার, মিস্ত্রিসহ আরো প্রায় এক কোটি লোক কাজ করতে গিয়ে কর্মপরিবেশের অভাবে প্রায় প্রতিদিনই বঞ্চিত, অপমানিত ও ধিকৃত হচ্ছে। সুতরাং তিন কোটি শ্রমজীবী মানুষের ১২ কোটি হাত-পা দ্বারা অর্জিত টাকা পয়সার প্রতি পরতে লুকায়িত থাকে সীমাহীন বেদনা, অপমান আর কষ্ট। সেই অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে কেবল শয়তান অথবা নির্বোধই উল্লাস করতে পারে।
পৃথিবীর অনুকরণীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের পেশা, কর্মপরিবেশ এবং আয় উপার্জন সম্মানজনক করার কাজে সফলতা অর্জনের পরপরই অর্থনৈতিক বিজয় লাভ করেছে। মরুর বুকে ছাগল চরানোর রাখাল, কোনো বেদুইন কিংবা দুর্জনের সেবাদাসী হওয়া এবং ফুটপাথে বসা দর্জির চেয়ে কম মূল্যে জামা কাপড় সেলাইয়ের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করে অর্থনৈতিক বিজয় অর্জন অসম্ভব।
তিন. সামাজিক শৃঙ্খল ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠী বিজয় উৎসব পালন করতে পারে না। আমাদের দেশে বর্তমান সামাজিক শৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন আজ বুমেরাং হয়ে গেছে। ক্ষমতাধরদের মদদে আজ দুর্বৃত্ত, লম্পট, অসৎ প্রকৃতির অশিক্ষিতরা সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ছোটরা বড়দের অপমান করছে। শিক্ষিতজনেরা অশিক্ষিতদের দুয়ারে ধরণা দিতে বাধ্য হচ্ছে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। সৎলোকেরা মাথা নিচু করে চলছে এবং অসৎরা বীরদর্পে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সৎকর্ম করতেও লোকজন ভয় পাচ্ছে। অন্য দিকে, মন্দ কর্মের জন্য পুরস্কার নিশ্চিত হওয়ায় দিবালোকে যত্রতত্র এর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। নারী-পুরুষ ভেদাভেদ কেবল জেন্ডার বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। অরুচিকর পোশাক পরিধান এবং মন্দ কর্মে নারী-পুরুষ একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে সমাজকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক শৃঙ্খলার প্রথম অধিক্ষেত্র হলো পরিবার। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পরিবার প্রথা এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। সামাজিক রীতিনীতি নেই বললেই চলে। কাউকে সালাম জানানো, মুরব্বিদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন, জ্ঞানী-গুণী এবং পদস্থদের সম্মান ও নেতাদের সমীহ করার সৌজন্য আজ আর অবশিষ্ট নেই। ধর্মীয় রীতিনীতি, সম্প্রীতি, বিশ্বাস, পারস্পরিক আস্থা ইত্যাদি উঠে গেছে। মারামারি, হানাহানি, কলহবিবাদ, অপরকে দোষ দেয়া এবং হেয় করার প্রবৃত্তি আমাদের সমাজকে অক্টোপাসের মতো গ্রাস করেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং সুশীলসমাজ আজ প্রায় অবলুপ্ত। অন্য দিকে, একজন মানুষ যে ব্যক্তিগতভাবে ভালো হবেন এবং ভালো থাকবেন সেই সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বারগুলো ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের সামাজিক জীবনে শুরু হয়েছে ঘোর অমানিশার এক কঠিন কালো রাত- যা অতিক্রম না করে বিজয়ের আনন্দ উপভোগ অসম্ভব।
সামাজিক সম্প্রীতির চমৎকার উদাহরণ গড়ে তুলেছে উন্নত বিশ্ব। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, ভুটান ও ইরান স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রথার মাধ্যমে প্রতিটি জনপদে অনুসরণযোগ্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং আনুকূল্যে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবেই আমাদের বিজয় দিবসের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে।

টিপুর স্বপ্ন ও ‘অসহিষ্ণু’ ভারত

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে টিপু সুলতানের জন্মজয়ন্তী পালন নিয়ে যখন বিতর্ক-বিরোধ ও সংঘর্ষ চলছে, ঠিক সে সময়টাতে চট্টগ্রামের একটি মিলনায়তনে বসে টিপুর স্বপ্ন নাটকটি দেখলাম। ব্যাপারটি কাকতালীয় কি না জানি না, তবে এটি যে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি প্রযোজনা, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পশ্চিমবঙ্গের নাট্যদল ‘প্রাচ্য’ এই নাটক নিয়ে এসেছিল বাংলাদেশে। খ্যাতিমান নাট্যকার ও অভিনেতা গিরিশ কার্নাডের লেখা নাটকটির বাংলা রূপান্তর মঞ্চস্থ করেছে তারা এ দেশের দর্শকদের সামনে। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে মহীশুরের অধিপতি ছিলেন টিপু সুলতান। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন তিনি আজীবন। ইংরেজদের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই ‘জাতীয় বীর’ আখ্যা দিয়ে তাঁর জন্মজয়ন্তী পালন করার উদ্যোগ নিয়েছিল কর্ণাটক রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল কংক্রেস। কিন্তু টিপু একজন মুসলিম শাসক, তাঁর রাজত্বকালে হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন তিনি—এ ধরনের কিছু বিতর্ক তুলে ওই রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি ও কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলগুলো এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। বিরোধিতা শুধু বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এমনই সহিংসতার রূপ নিয়েছিল যে দশ জনেরও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটেছে সেখানে। শেষ পর্যন্ত টিপুর জন্মদিন পালন করা যাবে কি না, এই বিতর্ক হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশে পরে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা গেছে টিপু সুলতানের জন্মদিনের উৎসব। একজন বিজেপি নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মৃত্যুর ২১৬ বছর পর কেন আচমকা কংগ্রেসের টিপুকে মনে পড়ল?’ আপাতদৃষ্টিতে এ প্রশ্নকে যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস এমনই এক বিষয়, যা বর্তমানের কোনো প্রসঙ্গের হাত ধরে অতীত থেকে ফিরে আসে।
যেমন ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নাম, তাঁর অন্তর্ধান–রহস্য নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা এখনো প্রাসঙ্গিক। প্রকৃত ইতিহাস জানার আগ্রহ ও কৌতূহল মানুষের মনে জাগরূক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। চিন্তাশীল ও অগ্রসর মানুষেরা বর্তমানের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য অতীত খুঁড়ে প্রকৃত সত্যকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন চিরকাল। সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে তাদের জোটসঙ্গী উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলগুলো ভিন্ন সম্প্রদায় ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর যেভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে, তাতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাবিদার ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি রীতিমতো প্রশ্নের সম্মুখীন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি না করার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যাপারে তাঁর অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট নয় বলেই প্রশ্রয় পাচ্ছে কট্টরপন্থীরা। গত সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের উত্তর প্রদেশের দাদরি গ্রামে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার গুজব রটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ইখলাক নামের এক ব্যক্তিকে। এই ঘটনায় প্রথম দিকে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেও একপর্যায়ে ক্ষোভে-প্রতিবাদে ফেটে পড়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। এর কয়েক দিন আগে ৩০ আগস্ট সাহিত্য আকােদমি পুরস্কারজয়ী যুক্তিবাদী লেখক এস এম কুলবার্গ খুন হয়েছেন তাঁর নিজের বাড়ির কাছে। গত দুই বছরে আরও দুজন যুক্তিবাদী লেখক গোবিন্দ পানসার ও নরেন্দ্র দাভোলকরকে খুন করেছে কট্টরপন্থীরা। খুনখারাবির ঘটনায় উগ্রপন্থীরা দল ও গোষ্ঠীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করছে না বটে, কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে শিবসেনাসহ সংঘ পরিবার যে ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে, তাতে সহিংস ঘটনায় কারা জড়িত, কাদের মদদ আছে, তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
গজলশিল্পী গুলাম আলী পাকিস্তানের নাগরিক হলেও ভারতে তিনি লাখ লাখ শ্রোতার কাছে আদৃত। এমনকি সেখানকার শিল্পীদের কাছেও তিনি আদর্শ। সেই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে মুম্বাইতে অনুষ্ঠান করতে দেয়নি শিবসেনা। সুর ও শিল্প যে সম্প্রদায়ের বিভক্তি, সীমানার গণ্ডি মানে না, এই ধর্মান্ধদের তা কে বোঝাবে? এসব অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন ভারতের শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা। জওহরলাল নেহরুর নাতনি বিশিষ্ট লেখিকা নয়নতারা সেহগাল ভিন্নমতের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে তাঁর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর পথ অনুসরণ করেন ভারতের বিভিন্ন ভাষার আরও অন্তত ৪১ জন লেখক। শাহরুখ খান, আমির খানের মতো ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নায়কেরাও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। আমির খান তাঁর স্ত্রীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে হুমকির মুখে পড়েছেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁদের দেশ (ভারত) ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কি না, এ কথা ভাবতে বলেছিলেন তাঁর স্ত্রী কিরণ রাও। এতে কট্টরপন্থীরা খেপে গেছে, তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যেতেও বলেছে। অথচ লাখ লাখ ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত মানুষটি কী বেদনায়, কী অভিমানে উদ্বেগের কথাটি প্রকাশ্যে বলতে বাধ্য হয়েছেন তা তারা ভেরে দেখল না। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেওয়া ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশেও যুক্তিবাদী লেখক, ব্লগারদের হত্যা, মুক্তবুদ্ধির মানুষদের হত্যার হুমকি, খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে হত্যার চেষ্টা, বিদেশি নাগরিক হত্যা, যাত্রাপালায় বোমা হামলাসহ বেশ কিছু ঘটনা যেন ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিরই প্রতিচ্ছবি। নাটকের বিষয়বস্তু একই, শুধু দুই দেশের কুশীলব ভিন্ন। ভারতের ‘সনাতন সংস্থা’ আর বাংলাদেশের ‘জেএমবির’ উদ্দেশ্য, আদর্শ ও চরিত্র তো একই। ভারতে হিন্দুত্ব রক্ষার নামে আর বাংলাদেশে ইসলাম রক্ষার নামে একই কায়দায় মধ্য যুগ ফিরিয়ে আনতে চায় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো। মুক্তচিন্তার বিকাশকে ধ্বংস করার জন্য ধর্মকে হাতিয়ার করার এই অপচেষ্টা চলছে যুগের পর যুগ। কিন্তু এ কথা তো সত্য হত্যা-আক্রমণ-হুমকি কোনো কিছুই বিশ্বের কোথাও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। বন্ধ রাখতে পারেনি ইতিহাসের অনুসন্ধান।
টিপু সুলতান জাতীয় বীর, তাঁর বীরত্বের ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরা হোক, তাঁর নামে মহীশুরের একটি বিমানবন্দরের নামকরণ করা হোক—ইত্যাদি প্রস্তাব দিয়ে হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন নাট্যকার-অভিনেতা গিরিশ কার্নাড। কিন্তু দমে যাননি তিনি। টিপুর স্বপ্ন নামে নাটক লিখে তিনি বলেছেন, ইংরেজদের ফরমায়েশি লেখকের ইতিহাসে টিপু সুলতানের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় না। তাঁকে হিন্দু ও খ্রিষ্টানবিদ্বেষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে ব্রিটিশরা। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো টিপুর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক ভারত। টিপু সুলতান সম্পর্কে যে কথা বলেছেন গিরিশ কার্নাড, সে কথারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনি দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শৌভিক মুখোপাধ্যায়ের বয়ানেও। তিনি বলছেন, ‘টিপুকে নিয়ে যাবতীয় গবেষণার মূল উৎস হলো সে আমলে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের রিপোর্ট। শত্রুর (টিপু) সম্বন্ধে তাঁরা যে খুব একটা ভালো কথা বলবেন না, তা তো বলাই বাহুল্য।’ টিপুর স্বপ্ন নাটকটি খুবই হৃদয়স্পর্শী। যুদ্ধে একবার ইংরেজদের পরাজিত ও বিতাড়িত করেছিলেন মহীশুর থেকে। কিন্তু পরেরবার নিজের মন্ত্রী, সেনাপতি, আমির, ওমরাহদের বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁর পরাজয় ঘনিয়ে এল। ইংরেজরা হত্যা করল তাঁকে। বাংলায় রূপান্তরিত নাটকের শেষ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে কবি তুষার রায়ের কবিতা উচ্চারিত হচ্ছে টিপু সুলতানের মুখে, ‘বিদায় বন্ধুগণ, গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে/এই শিখার রুমাল নাড়া নিভে গেলে/ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কি না।’ ইতিহাস-বিকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রকৃত সত্যের উন্মোচনে একজন সৃজনশীল মানুষ কত বড় ভূমিকা রাখতে পারেন, এ নাটক তার একটি উদাহরণ হয়ে রইল। সত্যের সন্ধান ও শুভ মানবিকতা যে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার উদ্যত তলোয়ারের চেয়েও ধারালো হয়ে উঠতে পারে টিপুর স্বপ্ন দেখে সে কথাই মনে হচ্ছিল আমাদের। ভারতের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক তৎপরতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে লেখক-শিল্পীসহ উদার মানবতাবাদীদের অবস্থান আমাদের জন্য শিক্ষার বিষয় হতে পারে। কেননা, প্রায় একই রকম সময় ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরাও।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

মহান বিজয় দিবস

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়। আজ আমাদের সেই মহান বিজয় দিবস। যে অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফলে এই বিজয় সম্ভব হয়েছিল, আমরা তাঁদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। এই দিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আরও স্মরণ করি জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে। পৃথিবীর অনেক দেশ বিনা রক্তপাতে ঔপনিবেশিক পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া। তাই প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদ্যাপনের সময় আমাদের অগণিত শহীদের কথাই স্মরণে আসে সবকিছুর আগে। মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগের অনুভূতিই আমাদের প্রগাঢ়তম অনুভূতি। তবে এই দিবসগুলো আমাদের কিছু আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। স্বাধীনতার জন্য আমাদের আত্মত্যাগের পেছনে যে স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার কতটা আমরা বাস্তবায়িত করতে পেরেছি? মুক্তিযুদ্ধের মূল স্বপ্ন ছিল স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও রীতিনীতি কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি?
কতটা গণতান্ত্রিক হয়েছে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়াগুলো? রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকর্মে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যকার পারস্পরিক আচরণে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কতটা বিকশিত হয়েছে? আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমান অধিকার কি নিশ্চিত হয়েছে? সমাজে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল স্বাধীনতার চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি সাধিত হয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করতে গেলে এসব আত্মজিজ্ঞাসা অত্যন্ত জরুরি। গত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে অনেক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রশংসনীয় উন্নতি ঘটেছে, দারিদ্র্য অনেক কমেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। একাত্তরের মতো গোটা জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন সত্য হতে পারে, লাঘব হতে পারে শহীদদের রক্তের ঋণ।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি। বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন। বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. বসু বলেন, চলতি অর্থবছর থেকে ২০১৬’র জুন মাসের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ৬.৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। আগামী অর্থবছরে তা ৬.৭ শতাংশ হতে পারে। এমনকি বাংলাদেশ যদি তাদের কিছু অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ইস্যু এবং জঙ্গিবাদ কার্যকরভাবে ও সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারে তাহলে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তিনি আরও বলেন, অনেক দেশে রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে। কাজেই বাংলাদেশ এক্ষেত্রে আলাদা নয়। কিন্তু এসব সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দিয়ে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ গত বছর জুড়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার ভুক্তভোগী। একই বছর সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে প্রচারণা শুরু করেছে সহিংস জঙ্গিরা। ৪ জন ধর্মনিরপেক্ষ লেখক ও একজন প্রকাশককে হত্যা করেছে তারা। হত্যা করেছে বাংলাদেশে কর্মরত দুই বিদেশিকে। একজন জাপানি, অপরজন ইতালিয়ান। নিহত একজন ব্লগার ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। আইএস দুই বিদেশি কর্মীকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু দেশে তাদের অস্তিত্বের বিষয়টি অস্বীকার করেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অনেক দেশে রাজনৈতিক জঙ্গিবাদ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মি. কৌশিক বসু এ বিষয়টিকে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের উচিত বিষয়টিকে খতিয়ে দেখা। কেননা, এটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তিনি অবকাঠামোর নানাখাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের পরামর্শ দেন। বিশেষ করে জ্বালানি, বন্দর ও যোগাযোগ খাতের ওপর জোর দেন তিনি। কেননা, এটা বাংলাদেশের বর্তমান ২৫০০ কোটি ডলারের তৈরী পোশাক রপ্তানিকে বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে। বর্তমানে বাংলাদেশ অবকাঠামো খাতে ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করে। দেশটির উন্নয়ন অংশীদারদের মতে এ খাতে ব্যয় করা উচিত ১২০০ কোটি ডলার। ব্যবসার ব্যয় কমাতে মি. বসু আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রণেরও পরামর্শ দেন।
স্থিতিশীল অর্থনীতির প্রধান দুই চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার জন্য প্রধান দুইটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু। প্রথমটি হচ্ছে অবকাঠামোগত সমস্যা। অন্যটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। গতকাল তিন দিনের সফর শেষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই চ্যালেঞ্জের কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এ সময় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্টিন রামা, ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পালসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ড. কৌশিক বসু বলেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। আরও এগিয়ে যাবে। পোশাক শিল্প কারখানা ঘুরে দেখেছি। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানোন্নত হয়েছে বেশকিছু কারখানার। তবে সব যে উন্নত তা বলবো না। যে সব কারখানার উন্নয়ন হয়েছে সেগুলো অনুকরণীয়। অনুন্নত কারখানা দেশের উন্নত কারখানাকে অনুসরণ করতে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা বলে মনে করেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আরও স্থিতিশীলতা দরকার। এর জন্য সরকারের পাশাপাশি দেশের মানুষকেও ভাবতে হবে। পদ্মা সেতু সংক্রান্ত এক প্রশ্নোত্তরে ড. কৌশিক বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প হাতে নেয়ায় বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ পেয়েছে। এখন থেকে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ অংশীদারের ভিত্তিতে কাজ করতে পারবে। দেশের অর্থনীতি বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষকদের বৈপরীত্যের প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কৌশিক বসু বলেন, সমালোচনা হওয়া ভালো। কিন্তু আন্দাজে না করে পরিসংখ্যান দেখে বলা উচিত। যানজটও উন্নয়নে বাধা বলে মনে করেন তিনি। অর্থপাচার ও দুর্নীতি বিষয়ে কৌশিক বলেন, অর্থপাচার ও  দুর্নীতি থামানো কঠিন। পৃথিবীর অনেক জায়গায় হচ্ছে। তবে সরকারকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
কৌশিক বসু বলেন, গত ৫ বছর ধরে ৬ শতাংশের ওপর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এই প্রবৃদ্ধিতে ধনী-গরিব সবারই অবদান আছে। কৌশিক বসু বলেন, দেড় দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পেরেছে। তিনি বলেন, একটি দেশের সরকার দরিদ্র মানুষের কাছে যদি খাবার পৌঁছাতে যায় তবে সেখানে অনেক গ্যাপ থেকে যায়; অনেক খাবারের অপচয় হয়। সেখানে খাবার না দিয়ে যদি গরিব ও প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে টাকা পৌঁছানো যায় অর্থাৎ মানুষগুলোকে আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় তবে অনেক লাভ হয়। কারণ তাদের হাতে যখন টাকা থাকবে তখন তাদের নিজস্ব পছন্দ প্রাধান্য পাবে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তারা পছন্দমত জায়গায় তা ব্যয় করতে পারবে। আর তাদের চাহিদা মেটাতে অনেক নতুন নতুন বেসরকারি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ঠিক এ সময়টাতেই সেদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে গরিব ও প্রান্তিক মানুষগুলোকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে সম্পৃক্ত করতে বেশকিছু কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক গরিব মানুষকে আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে; যা উল্লেখ করার মতো। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও মোবাইল ব্যাংকিং। এগুলোর কারণে মানুষের টাকার ব্যবহার বেড়েছে ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ড. কৌশিক বসু বলেন, দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসা বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় অর্জন। বাংলাদেশই শিখিয়েছে দরিদ্রতা, প্রতিবন্ধকতার পরও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ঝুঁকি নিয়ে কিভাবে কার্যক্রম শুরু করতে হয়। এসব বিষয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুসরণীয় উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি শিক্ষণীয় কিভাবে তারা দারিদ্র্য দূর করছে এবং মানুষকে আর্থিক খাতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি পুরোপুরি প্রস্তুত ‘টেক অফ’ করার জন্য। খুব কম দেশই রয়েছে যাদের অর্থনীতি এভাবে উঠতে পারে।
কৌশিক বসু বলেন, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুসমন্বয় ছাড়া এটির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবে সমন্বিত উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ এমনকি অতিক্রমও করেছে। ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও বড় মাপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথে পা বাড়াতে বাংলাদেশ প্রস্তুত উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের প্রধান এ অর্থনীতিবিদ তা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সুসমন্বয়ের পরামর্শ দেন। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মনে করেন, গরিব মানুষের কথা চিন্তা করে বিশ্বব্যাংক উন্নয়নের সমবণ্টনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জরুরি। অর্থনীতির উদীয়মান তারকা, বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কও নতুন মাত্রা পাবে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে আর্থিক বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের বিচক্ষণতার প্রশংসা করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বিগত ১০ বছর ধরেই ৬-এর ঘরে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি এবার ৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছবে। আতিউর রহমান বলেন, কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়া নয়, বিশ্বমন্দার নেতিবাচক প্রভাব থেকেও মুক্ত থেকেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতাকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন অতিমাত্রায় জরুরি বলেও জানান তিনি। ড. আতিউর রহমান বলেন, বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ একটি চমকপ্রদ জায়গা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশিরা এখানে সস্তা শ্রমে উৎপাদনমুখী খাত, অবকাঠামোগত খাত, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে। তিনি বলেন, যারা টাকা নিয়ে ফেরত দেয়ার অভ্যাস নেই তাদের জন্য সুদের হার কমানো হবে না।

সোনা ছিনতাই, দুই পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর ১০২ ভরি সোনা ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য ও এক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুই পুলিশ সদস্যের বাসা থেকে ৩৮ ভরি এবং ছিনতাইকারীর বাসা থেকে ৫২ ভরি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া এএসআই মিজানুর রহমান বর্তমানে  কোতোয়ালি থানার এনায়েত বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়োজিত রয়েছেন। অন্যদিকে কনস্টেবল খান-এ আলমও একই ফাঁড়িতে রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। ঘটনা জানাজানি হলে পুলিশ বিভাগ সোমবার রাতে তাদের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এই ঘটনা জানাজানি হলে কোতোয়ালি থানায় ভিড় করেন ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া ব্যবসায়ীর পরিবার, লোকজন ও সাংবাদিকরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দুইজন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। বলেছে, অপর এক ছিনতাইকারীর সহযোগিতায় এমন অপকর্ম ঘটিয়েছে। আল-আমীন নামের ওই ছিনতাইকারীকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ১০২ ভরি সোনার মধ্যে দুই পুলিশ সদস্যের বাসা  থেকে ৩৮ ভরি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ছিনতাইকারীর বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৫২ ভরি সোনা।
জানতে চাই?লে এ বিষয়ে মানবজমিনের সঙ্গে কথা হয় নগরীর কোতোয়ালি থানার ওসি জসিম উদ্দীনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইপিজেড এলাকার ছিনতাইকারী আল- আমীনকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে জানতে পারি এই ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য রয়েছে। পরে ঘটনা খতিয়ে দেখে সত্যতা পেয়ে তাদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করি। গ্রেপ্তারের পর ওইসব সোনা নিজেরা ভাগাভাগি করে রেখেছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে।
কিভাবে পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয় জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, গত সোমবার ইপিজেড এলাকা থেকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় ছিনতাইকারী আল- আমিনকে। সে জানায়, এই কাজে ওই দুই পুলিশ সদস্য জড়িত রয়েছে। এরপর গত সোমবার রাতে কৌশলে তাদের থানায় ডেকে পাঠানো হয়। একপর্যায়ে ঘটনার দায় স্বীকার করে তারা।
পরে সবার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ইপিজেড এলাকার একটি গলির আল-আমিনের বাসা থেকে চারটি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। ওজন ৫২ ভরি। অন্যদিকে লালখান বাজারে ছিল এএসআই মিজানুর রহমানের বাসা। তার বাড়ির আলমারিতে পাওয়া যায় ২৬ ভরি ওজনের সোনার বার। সহযোগী কনস্টেবল চকবাজারের খান এ আলমের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ১২ ভরি  সোনা।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ী দোলন বিশ্বাসের পরিবার অভিযোগ করেন, ছিনতাই হওয়া সোনার মধ্যে ১২ ভরির কোন খোঁজ নেই। তারা সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। ৯০ ভরি সোনা মাত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ইফতেখার নামের আরেক ছিনতাইকারীকে গত নভেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল জলিল মণ্ডল বলেন, আইন সবার জন্য সমান। পুলিশ পরিচয়ে তারা ছিনতাই করে যে অপকর্ম করেছে তা সত্যিই নিন্দনীয়। এ জন্য তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আদালতে সন্ধ্যার মধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকি সোনা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কথা হয় হাজারী লেইনের সোনা ব্যবসায়ী দোলন বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত ২১শে সেপ্টেম্বরের ঘটনা এটি। আমি ঢাকায় যাওয়ার পথে তারা আমাকে তুলে নিয়ে শহরের লাভ লেইনে নিয়ে আসে। এরপর সব ছিনতাই করে বলে কি করতে পারবি কর।
তিনি আরও বলেন, আমি ঘটনার পরপরই থানায় মামলা দায়ের করি। পুলিশকে বলেছিলাম যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের হাতে ওয়্যারলেস ছিলো। ওরা আমাকে ডিবি বলে নিয়ে যায়।

অভিবাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন মার্কিনিরা by ইব্রাহীম চৌধুরী

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস-ভীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন মার্কিনিরা। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত তাঁরা। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এ দেশে আসা প্রায় দুই কোটি অবৈধ অভিবাসীর ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারে। চলমান অভিবাসন-প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দরজা ক্রমশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের অধিকাংশই হিস্পানিক। নানা কৌশলে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া এসব হিস্পানিক অভিবাসীকে নিয়ে অভিযোগের কোনো অন্ত নেই। স্বল্প মজুরির কাজকর্ম এখন তাঁদের দখলে। সাধারণ মার্কিনিদের মতে, এসব অভিবাসীর কারণেই মজুরির বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। হিস্পানিক অবৈধরা লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালায়, এতে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অপরাধ জগতে জড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্যেও হিস্পানিক অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে এখন সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে অভিবাসনের যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে।
২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী কাজের জন্য মুসলমান অভিবাসীদের প্রতি সন্দেহ জোরালো হয়ে ওঠে। গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত লোকজনের অভিবাসী এবং মুসলমান পরিচয়টি আলোচনায় চলে আসে। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়াতে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত মুসলিম দম্পতির অভিবাসন পরিচয় নিয়ে মার্কিন মিডিয়া এখনো সরগরম।
যুক্তরাষ্ট্রের লোকজন এখন নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গে অভিবাসন নীতিকে জড়িয়ে চিন্তা করছেন। এর প্রভাব পড়েছে রাজনীতিতে। রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই বলেছিলেন, হিস্পানিকরা জাত অপরাধী, এদের প্রবেশ ঠেকাতে হবে। তিনি মেক্সিকো সীমান্তে বেষ্টনী দেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় হত্যাকাণ্ডের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলমানদের জন্য অভিবাসন সাময়িকভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এসব অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে অভিবাসন নিয়ে চলমান চিন্তার প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও প্রকাশ্যে এসব বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলা হচ্ছে , ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য মার্কিন অভিবাসন চেতনারপরিপন্থী।
টেক্সাসের বেকার ইনস্টিটিউটের রাজনীতিবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ মার্ক জোন্স বলেছেন, মার্কিনিদের বেশির ভাগ মানুষের চলমান চিন্তাধারার কথাটি বেরিয়ে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্রের গত কয়েক দশকের জরিপে দেখা গেছে, এ দেশের অধিকাংশ মানুষই ছিল অভিবাসনের পক্ষে। এমনকি রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও অভিবাসনের প্রতি সহায়ক ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। রিপাবলিকান দলের ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসার স্বার্থে বাইরে থেকে অদক্ষ শ্রমিক আনার পক্ষে ছিল। এ গ্রুপটিকে তাদের ব্যবসার জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য নানা ধরনের ভিসায় দক্ষ-অদক্ষ কর্মী বাইরের দেশ থেকে আনার জন্য সব সময় সক্রিয় দেখা যেত। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট দলটি অভিবাসনবান্ধব হিসেবে পরিচিত। অভিবাসী ভোটারদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য, পারিবারিক অভিবাসনকে সহজ করাসহ অবৈধদের বৈধতা দেওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাট দলের তৎপরতা সব সময়ই ছিল ইতিবাচক।
গত ৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকা থেকে অভিবাসন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য মতে, ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ অভিবাসী ছিল ৮৪ শতাংশ। এখন এ সংখ্যা ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে। অভিবাসনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অশ্বেতাঙ্গরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। আমেরিকার আধুনিক অভিবাসন জোয়ারে গত ৫০ বছরে ছয় কোটি মানুষের আগমন ঘটেছে। অভিবাসনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরে আমেরিকায় আরও ১০ কোটিরও বেশি মানুষের আগমন ঘটবে বলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি অফ ল-এর পরিচালক মুজাফফর চিশতী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম-বর্ণের মিশ্র অভিবাসন গত ৫০ বছরে বদলে গেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল পূর্বসূরিদের হাত ধরে ইউরোপ থেকে আমেরিকায় ব্যাপক পারিবারিক অভিবাসন ঘটবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক উত্থান ঘটলে ইউরোপের লোকজনের আমেরিকায় আসায় ভাটা পড়ে। পারিবারিক অভিবাসনে এখন এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ অভিবাসীর আগমন ঘটে থাকে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা লোকজনের সংখ্যাও বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। ছাত্র ভিসায় আসা বা সাময়িক কাজের জন্য আসা লোকজনের থেকে যাওয়া একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শেষ স্টেশনের পথে সাতপুরা

এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সাতপুরা রেলপথ ছিল ভারতের দীর্ঘতম ন্যারো-গেজ লাইন। এই পথের ঐতিহ্যবাহী ন্যারো-গেজ ট্রেনটি বন্ধ হতে চলেছে। স্মৃতিজাগানিয়া এ ট্রেন নিয়ে বিবিসি অনলাইনে লিখেছেন দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থানকারী প্রখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালি
ভারতে একসময় শতাধিক ন্যারো-গেজ রেলপথ ছিল। এগুলোতে চলা রেলগাড়িকে ‘টয় ট্রেন’ বা খেলনা ট্রেনও বলেন কেউ কেউ। মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর স্টেশনে ব্রডগেজ লাইনের ট্রেনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আড়াই ফুট গেজের ওপর সাতপুরা ইঞ্জিনটিকে খেলনার মতোই মনে হতো।
কিন্তু ভারতে এই ন্যারো-গেজ লাইনটি স্থাপনের উদ্দেশ্যটা ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ। যাঁরা এর সুফল পেয়েছেন, তাঁদের কাছে এই ট্রেন মোটেও খেলনা গাড়ি ছিল না। ১৮৭৪ সালের মহাদুর্ভিক্ষের সময় মধ্য ভারতের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো জরুরি ছিল। এ কারণেই ব্রিটিশ সরকার সাতপুরা রেলওয়ে চালু করে। এর আগে ওই প্রত্যন্ত এলাকায় যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত ধীর গতির মহিষের গাড়িই ছিল একমাত্র বাহন।
এখন আর দুর্ভিক্ষ নেই। সাতপুরা অঞ্চলে আধুনিক রাস্তাঘাটও নির্মিত হয়েছে। তাই ৪০ কিলোমিটার গতিবেগের ন্যারো-গেজ ট্রেন চালু রাখার প্রয়োজনও কমেছে। তবে এই রেলগাড়িতে এখনো প্রচুর যাত্রী হয়। ট্রেনের ভেতরে, খোলা দরজায়, এমনকি ছাদেও গিজগিজ করে মানুষ। কারণ—ভাড়া কম আর প্রতি স্টেশনেই ট্রেন থামে। তা ছাড়া বাসে চড়ার চেয়ে অনেকে এই পুরোনো ট্রেনেই স্বস্তি ও নিরাপদ বোধ করেন।
সাতপুরার ছোট ট্রেনটি বন্ধ হলে এর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে। যেমন নানা রকমের খাবার। ট্রেনেই খাওয়া হয়, আর রান্না হয় প্ল্যাটফর্মে। এই যুগের যাত্রীরা তো আগে থেকে রান্না করা খাবার আর নানা ব্র্যান্ডের স্ন্যাক্সই বেশি পছন্দ করেন, যেগুলোর প্যাকেট পরিবেশবান্ধব নয়। কিন্তু এই ‘খেলনা গাড়ি’ যখন বারগি স্টেশনে থামে, যাত্রীরা ছুটে গিয়ে কিনে আনেন হরি সিং ঠাকুরের বিখ্যাত গরম-গরম সমুচা। আরও পরে শিকারা স্টেশনে পাওয়া যায় লক্ষ্মী চাঁদ খাণ্ডেলওয়ালের দোকানের লোভনীয় মিষ্টি।
সব মিলিয়ে বহু ভারতীয়ের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই রেলপথ। আঁকাবাঁকা পথে ট্রেনটি যখন এগিয়ে যায়, চারপাশের অরণ্যের অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা দেখার সুযোগ মেলে যাত্রীদের। হয়তো এখন ব্রডগেজ লাইন তৈরির জন্য ধ্বংস করা হবে সেখানকার পাহাড়ি সৌন্দর্য। আর দ্রুতগতির সব ট্রেন নিশ্চয়ই প্রতি স্টেশনে থামবে না, তা স্থানীয় লোকজনের যতই প্রয়োজন থাকুক।
প্রিয় এই ট্রেনের আসন্ন বিদায়ের খবর শুনে রেলকর্মীরাও অখুশি। নয়নপুর জংশনের স্টেশনমাস্টার বলছিলেন, ‘এত ব্যস্ত একটা রেলপথ কেন বন্ধ করে দিতে হবে?’ দিনে এখনো তাঁকে প্রায় ২০টি ট্রেন সামলাতে হয়।
তবে কর্তৃপক্ষ আশা করছেন, ঐতিহ্য ধরে রাখার স্বার্থে ছোট্ট একটু অংশে হলেও ন্যারো-গেজ ট্রেন চালু রাখা যাবে।
(কিছুটা সংক্ষেপিত)

আপসহীন সু চি এখন বাস্তববাদী -রয়টার্সের বিশ্লেষণ

মিয়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চি সম্প্রতি একটি বেতার অনুষ্ঠানে সাবেক জান্তাপ্রধান থান শোয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলছিলেন। থান শোয়ে সম্পর্কে সু চির বিনম্রতায় শ্রোতারা হয়তো বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, এই থান শোয়েই ১৫ বছর ধরে গৃহবন্দী রেখেছিলেন গণতন্ত্রকামী সু চিকে।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, একসময়ের প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভালোই বোঝাপড়া হয়েছে সু চির। মিয়ানমারে গত ৮ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে এ রকম ইঙ্গিত মিলেছে বেশ কয়েকবার। গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন নেত্রী এখন একজন বাস্তববাদী রাজনীতিকে রূপান্তরিত হয়েছেন। একসময় যাদের কঠোর নিন্দা করতেন, তাদের সঙ্গেই এখন রাজনৈতিক জোট গড়ার জন্য তৈরি তিনি।
সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করলে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। থান শোয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সু চি বলেছেন, ‘আমাদের এখন আরও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যই কাজ করা উচিত—আগে কেন এটা করিনি, সেটা ভাবলে চলবে না।’
থান শোয়ের সেনাবাহিনী শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চিকে যখন ইয়াঙ্গুনের বাড়িতে বছরের পর বছর আটকে রেখেছিল। সেই সু চি ৭০ বছর বয়সে নির্বাচনে জয়ের পর সেনাসমর্থিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এবং সেনাপ্রধান মিন অং লাইংয়ের সঙ্গে ‘আন্তরিকতাপূর্ণ’ বৈঠক করেছেন।
মিয়ানমারে জাতিসংঘের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক রিচার্ড হর্সি বলেন, ব্যাপারটা হলো, পথের বাধা দূর হয়ে যাচ্ছে। সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে উঠছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে এটা স্পষ্ট যে এককালের অনমনীয় ও আপসহীন সু চি এখন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ হওয়ার পথে এগোচ্ছেন। কারণ, ২০১১ সালে আধা বেসামরিক শাসন শুরু হলেও মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কার্যত অটুট রয়েছে।  সেনাবাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন সু চি। বিশ্লেষকেরা বলেন, ১৯৯০ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই তাঁর এই সতর্কতা।

কেজরিওয়ালের অফিসে সিবিআই হানা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতে কেন্দ্রের সঙ্গে দিল্লি সরকারের দ্বন্দ্ব এক নতুন মোড় নিল সিবিআই হানাকে কেন্দ্র করে। মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল সরাসরি আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। সংসদও উত্তাল হলো। বিজেপি ও সরকার ঘটনার সাফাই দিয়ে বলল, প্রধানমন্ত্রীকে কটু কথা বলার জন্য কেজরিওয়ালের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
আজ মঙ্গলবার ভোর হতে না হতেই সিবিআইয়ের একটি দল দিল্লি সরকারের সচিবালয়ে রাজ্যের প্রধান সচিবের অফিসে হানা দেয়। সচিবালয় সিল করে দেওয়া হয় যাতে মুখ্যমন্ত্রীও ওই সময়ে ঢুকতে না পারেন। খবর পেয়েই কেজরিওয়াল টুইট করে সিবিআই হানার কথা জানিয়ে দেন। টুইটে তিনি মোদিকে ‘কাপুরুষ ও মানসিক বিকারগ্রস্ত ’ বলে আখ্যা দেন। বলেন, মোদি রাজনৈতিক মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে কাপুরুষের মতো আচরণ করছেন। এটা নিছকই রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা।
সিবিআই হানা দেয় প্রধান সচিব রাজেন্দ্র কুমারের অফিসে। অভিযোগ, একটি কম্পিউটার সংস্থাকে তিনি গত কয়েক বছর ধরে অন্যায় সুবিধে পাইয়ে অসৎ উপায়ে প্রচুর অর্থ রোজগার করেছেন। সিবিআইয়ের দাবি, তাঁর অফিস ও বাড়ি থেকে সাড়ে ১৫ লাখ টাকা নগদ ও তিন লাখ টাকার বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করেছে। তারা জানায়, সারা দেশে মোট ১৪টি স্থানে তারা এই অভিযান চালিয়েছে।
সিবিআই ও সরকারের দাবি উড়িয়ে দিয়ে কেজরিওয়াল বলেছেন, তাঁকে না জানিয়ে তাঁর সচিবের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালানো বেমানান। সরকার তাঁকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেনি। ঔদ্ধত্য ছাড়া এ আর কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুই​ট করেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর অফিস সিল করে দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। আমি হতবাক।’
বেলা ১১টার দিকে সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়া মাত্র তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধীরা সরকারকে কোণঠাসা করে। জবাবে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, সিবিআই একজন অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, সরকারের বিরুদ্ধে নয়। তা ছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে তল্লাশি চালানো হয়নি। অভিযোগও বেশ পুরোনো, আগের সরকারের আমলের। বিজেপি নেতারা বরং কেজরিওয়ালের সমালোচনা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করায় তাঁর ক্ষমা চাওয়া উচিত।
এক বছর আগে দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কেন্দ্রের সঙ্গে কেজরিওয়ালের খিটমিট লেগেই আছে। অফিসার নিয়োগ থেকে শুরু করে পুলিশি নির্দেশ, সর্বত্রই তিনি বাধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। রাজধানী হওয়ার সুবাদে দিল্লি পূর্ণ রাজ্য নয়। দিল্লির পুলিশ ও জমির অধিকারও কেন্দ্রের। সেই কারণে গত এক বছর ধরে কেজরিওয়ালের সঙ্গে কেন্দ্রের সংঘাত লেগেই রয়েছে। আজকের ঘটনা সেই সংঘাতেরই ধারাবাহিকতা। যাঁর অফিস ও বাড়িতে সিবিআই তল্লাশি চালায়, সেই রাজেন্দ্র কুমারের নিযুক্তিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। পছন্দের সেই অফিসারের বিরুদ্ধে তল্লাশিকে কেজরিওয়াল তাই কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে মনে করছেন।

ফিলিস্তিনি শিবিরে ইসরাইলি অভিযান : ২ যুবককে হত্যা

ফিলিস্তিনের রামাল্লার কাছে একটি শরণার্থী শিবিরে গ্রেফতার অভিযান চালানোর সময় দুই ফিলিস্তিনিকে গুলি হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো চারজন। আজ বুধবার ভোর রাতে এ অভিযান চালানো হয়। আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ইসরাইলি সেনারা রাতভর পশ্চিমতীরের কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরে অভিযান চালায়। এ সময় তারা আহমদ জাহাজা (২১) ও হেকমত হামদান (২৯) নামের দুই ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা করে।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানায়, ইসরাইলি সেনারা স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অভিযান চালালে ফিলিস্তিনি যুবকদের সাথে সংঘর্ষ বাধে। অপরদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র দুই ফিলিস্তিনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানায়, তালিকাভুক্ত ফিলিস্তিনিদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরে অভিযান চালানোর সময় হামদান ইসরাইলি সেনাদের উপর গাড়ি তুলে দেয়ার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করা হয়। এ সময় আরো তিন ফিলিস্তিনি আহত হন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে জাহাজার মৃত্যুর ব্যাপারে কিছুই জানাননি তিনি। এদিকে প্রাথমিক রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, ওই দুই ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করা হত্যা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাদের হাতে ১২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

কিশোরদের কেন টানছে আইএস?

ব্রিটেনের এই তিন কিশোরী আইএসে যোগ
দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ছবি: এএফপি
অস্ট্রেলিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে ১৫ বছরের এক কিশোর। গত মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত খবরে জানা গেছে, অস্ট্রিয়ায় দুই কিশোরী বাড়ি থেকে পালিয়ে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গি দলে যোগ দিতে যায়। তাদের একজনকে পালানোর চেষ্টার অপরাধে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। আরেকজন সংঘর্ষে নিহত হয়।
এসব ঘটনা চমকে ওঠার মতো। প্রশ্ন জাগে, যে বয়সে কিশোর-কিশোরীদের হেসেখেলে জীবন কাটানোর কথা, নতুন স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সে কেন তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছে? কেন অবলীলায় মেরে ফেলছে মানুষ? কেনইবা মেতে উঠছে ধ্বংসের খেলায়?
বিশ্বজুড়ে গবেষণা ও জরিপে দেখা যাচ্ছে, উগ্রবাদী দলে কিশোর-কিশোরীদের যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের এক জরিপে জানা যায়, ২০১৩-১৪ সালের তুলনায় ২০১৪-২০১৫ সালে কিশোর-কিশোরীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রবণতা দ্বিগুণ হয়েছে। এ সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩১৫ জন কিশোর-কিশোরী।
যুক্তরাষ্ট্রের জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ শার্লি উইন্টার বলেন, আইএস জঙ্গি দলে কিশোর-কিশোরীদের যোগ দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। আইএস টানছে কিশোর-কিশোরীদের। তাদের হাতছানি তারা উপেক্ষা করতে পারছে না। আইএসের প্রধান লক্ষ্য ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের দলের সদস্য করা।
জার্মান ইনস্টিটিউট অন র‍্যাডিকালাইজেশন অ্যান্ড ডির‍্যাডিকালাইজেশন স্টাডিজের (জিআইআরডিএস) পরিচালক ড্যানিয়েল কোয়েলার বলেন, আইএস কিশোর-কিশোরীদের সহজেই প্রভাবিত করতে পারে। তাদের দলে নিয়ে আসাটাও আইএসের জন্য লাভজনক। কিশোরদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হামলা বা অভিযান চালানো কঠিন হলেও আদর্শ ছড়াতে বা দলের প্রচার বাড়াতে তাদের কাজে লাগানো সহজ। কিশোর-কিশোরীরা অনেক বেশি অনুগত থাকে। এ ছাড়া তারা নিহত হলেও দলে খুব বেশি প্রভাব পড়ে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইএস অনলাইনের মাধ্যমেই কিশোর-কিশোরীদের দলে টানার কাজটি করে থাকে। কোয়েলার বলেন, সদস্য বাড়াতে ইন্টারনেট আইএসের অন্যতম অস্ত্র। প্রতিদিন ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইএস ৩০ থেকে ৪০টি ভিডিও ছাড়ে। বিভিন্ন ভাষায় এগুলো প্রচার হতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারেও আইএসের নেটওয়ার্ক বিশাল। টুইটারে আইএসের ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেখানে তাদের ভাবাদর্শ প্রচার হয়। আইএসে যোগ দেওয়ার পথও বাতলে দেওয়া হয়। মূলত কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক এসব যোগাযোগের মাধ্যমেই আইএসের ভাবাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হয়। প্রভাবিত হয়। বলা যেতে পারে, এরা আইএসের ফাঁদে পা দেয়।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী উইন্টার বলেন, আইএস নিজেদের ভাবমূর্তি এমনভাবে তুলে ধরে যেন তারা একটা বড় শক্তি। চাইলে আইএস পৃথিবীটা উল্টোপাল্টা করে দিতে পারে। এ ব্যাপারটিই টানে কিশোর-কিশোরীদের। প্রচলিত সমাজের ধ্যানধারণা নিয়ে কিশোর-কিশোরীরা হতাশ থাকে। তাই নতুন কিছু তাদের টানে। তারা ভাবতে শুরু করে আইএস বদলে দিতে পারে সব। আইএসের নেটওয়ার্ক অনেক বিশাল। তারা অনেক বেশি জোটবদ্ধ। কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় বন্ধুদের মাধ্যমেও প্রভাবিত হয়ে থাকে।
কোয়েলার বলেন, কিশোর-কিশোরীরা ভুল নিয়ে বেশি কিছু ভাবতে চায় না। তারা নতুনের পূজারি। সাধারণত বয়সের কারণে সহিংসতা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড তাদের বেশি আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, টিভিতে সহিংসতার দৃশ্য শিশু, কিশোরদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। আইএস সেই সহিংসতাকে জিহাদ হিসেবে পরিচিত করে। এতে কিশোর-কিশোরীরা অনেকটা রোমাঞ্চের টানেই সেদিকে ঝোঁকে।
উইন্টার বলেন, দুর্বল অবস্থায় মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে, তেমনি সমাজ ও সংস্কার নিয়ে হতাশ কিশোর-কিশোরীরাও একসময় আইএসকে সমাধান হিসেবে ভাবতে থাকে। এ ক্ষেত্রে পরিবার বা সামাজিক অবস্থা কিশোর-কিশোরীদের ওপর প্রভাব ফেলে। বিবিসি অনলাইন অবলম্বনে