Sunday, May 19, 2013

সংক্ষিপ্তবিশ্বসংবাদ

আরেকজন আক্রান্ত
সৌদি আরবে সার্সজাতীয় মারাত্মক ভাইরাসে আরেকজন আক্রান্ত হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল শনিবার জানিয়েছে। ওই ভাইরাসে সেখানে ইতিমধ্যে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বুধবার জানায়, সৌদি আরবে হাসপাতালে আসা রোগী থেকে দুই স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে এনসিওভি নামের ওই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গোটা বিশ্বে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এএফপি।
জঙ্গির গুলিতে?
ইয়েমেনের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কর্নেল আবদুল্লাহ আল-রাবাকি আততায়ীর হামলায় গত শুক্রবার নিহত হয়েছেন। হাদ্রামাওত প্রদেশের মুকাল্লা শহরে বন্দুকধারীরা আল-রাবাকিকে ছয়বার গুলি করে পালিয়ে যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলেন, আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা আল-রাবাকিকে হত্যার ব্যাপারে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল। রয়টার্স।
সমলিঙ্গ বিয়ে বৈধ
বিশ্বের চতুর্দশ রাষ্ট্র হিসেবে সমলিঙ্গের বিয়েকে বৈধতা দিল ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ গতকাল শনিবার এ-সংক্রান্ত বিলে স্বাক্ষর করেছেন। এই আইন নিয়ে ফ্রান্সে কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। ডানপন্থী বিরোধী দলের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও আইনটি পাস হয়েছে।

সুদীপ্ত সেনের নিরাপত্তা নিয়ে বিজেপির সংশয় by অমর সাহা

সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেনের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ শাখা বিজেপি। রাজ্য বিজেপির সভাপতি রাহুল সিনহা বৃহস্পতিবার কলকাতায় সাংবাদিকদের বলেন, সুদীপ্ত সেন মুখ খুললে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অনেকেই ফেঁসে যেতে পারেন, তাই তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে বিজেপি মনে করে। বিজেপি চায় সুদীপ্তর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁকে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভির আওতায় রাখা হোক। রাহুল সিনহা বলেন, ইতিমধ্যে তাদের দলের এই উদ্বেগের কথা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল এবং সারদা কাণ্ড নিয়ে গঠিত বিচারপতি শ্যামল সেন কমিশনে জানানো হয়েছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি কলকাতা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সুদীপ্ত সেন জীবিত থাকলে এই সরকার জীবিত থাকবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সুদীপ্তর বাঁচা-মরার ওপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের স্থায়িত্ব।’ রাহুল সিনহা বলেন, সুদীপ্ত সেন সিবিআইয়ের কাছে লেখা চিঠিতে প্রকারান্তরে সরকারি দলের বেশ কজন নেতা, মন্ত্রী এবং সাংসদকে সারদা গোষ্ঠীর পতনের জন্য দায়ী করে গেছেন। সিবিআই তদন্তেরও দাবি করেছে। অথচ বুধবার তিনি একেবারে উল্টে গিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে হলফনামা দিয়ে বলেছেন, সিবিআইর তদন্তের প্রয়োজন নেই। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে সারদা কর্ণধারের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল। প্রসঙ্গত, সারদা কাণ্ড নিয়ে সিবিআই তদন্তের দাবি উঠলেও তাতে কর্ণপাত করছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তারা রাজ্য পুলিশ দিয়ে তদন্ত করছে। সিবিআই তদন্তের দাবিতে ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টে তিনটি পৃথক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত ৬০

যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৬০ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মেট্রো নর্থ ট্রেন কর্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবার দিনের ব্যস্ত সময়ে তাদের একটি ট্রেন নিউইয়র্ক থেকে কানেটিকাটের নিউ হ্যাভেনে যাচ্ছিল। ব্রিজপোর্ট শহরে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে এটি লাইনচ্যুত হয়। কানেটিকাটের গভর্নর ড্যান ম্যালয় জানান, সংঘর্ষে একটি ট্রেনের সামনের অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গভর্নর ম্যালয় বলেন, সংঘর্ষের ঘটনাটি নিছকই দুর্ঘটনা। এর কারণ হিসেবে ভিন্ন কিছু ভাবা ঠিক হবে না। নিউইয়র্কগামী ট্রেনের একজন যাত্রী বলেন, ‘ট্রেনে হঠাৎ বড় ধরনের একটা ঝাঁকুনি লাগে। এরপর আমরা ধোঁয়া দেখতে পাই।’ নিউইয়র্ক পোস্ট-এর খবরে বলা হয়েছে, মেরামতের আওতায় থাকা রেললাইনের একটি অংশে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

মোশাররফের রিমান্ড আরও ১৪ দিন বাড়ল

সর্বোচ্চ আদালতের ৬০ জন বিচারপতিকে গৃহবন্দী করা সংক্রান্ত মামলায় পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের বিচার বিভাগীয় রিমান্ড ১৪ দিন বাড়ানো হয়েছে।গতকাল শনিবার ইসলামাবাদের সন্ত্রাস দমনবিষয়ক বিশেষ আদালত (এটিসি) রিমান্ডের মেয়াদ বাড়ানোর এ আদেশ দেন। এদিকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মোশাররফের আইনজীবী ইলিয়াস সিদ্দিকি আদালতকে জানান, মামলার বাদী আইনজীবী চৌধুরী মোহাম্মদ আসলাম ঘুম্মান অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি আদালতকে লিখিত নোটিশ দেননি।

সিআইয়ের ‘মস্কো প্রধানের’ নাম ফাঁস

রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সার্ভিস (এফএসবি) গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের কথিত মস্কো কার্যালয় প্রধানের নাম ফাঁস করে দিয়েছে। কূটনৈতিক বিধিবিধান ভেঙে এভাবে গোয়েন্দা কর্মকর্তার নাম ফাঁসের ঘটনা বিরল। গত সপ্তাহে মস্কোতে একজন কথিত মার্কিন গুপ্তচরকে গ্রেপ্তারের পর এ ঘটনা ঘটল। গত সপ্তাহে মস্কো রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সদস্য সংগ্রহের সময় রায়ান ফগল নামের এক মার্কিন গুপ্তচরকে গ্রেপ্তার করার খবর জানায়। এফএসবির প্রতিবেদনে সিআইয়ের ‘মস্কো প্রধানের’ পুরো নাম দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি এখনো এই পদে কর্মরত আছেন কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া যায়নি। গোয়েন্দা সংস্থাটির একটি সূত্র জানায়, ২০১১ সালে তারা সিআইয়ের মস্কো প্রধানকে সতর্ক করে বলেছিল, তারা রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সদস্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করলে তা ‘উসকানিমূলক’ পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হবে। এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে মস্কোয় মার্কিন দূতাবাসে কাজ করা আরেক কথিত সিআইএ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর তিনি গত জানুয়ারিতে মস্কো ছেড়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জেনিফার সাকি জানান, তিনি এফএসবির ওই প্রতিবেদন এখনো দেখেননি। এ ছাড়া ফগল রাশিয়া ছেড়েছেন কি না, সে বিষয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

উ. কোরিয়া থেকে ফিরেছেন জাপানি শীর্ষ কর্মকর্তা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সহযোগী উত্তর কোরিয়ায় আলোচিত সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন। তবে সফরের উদ্দেশ্য ও উত্তর কোরীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে মুখ খোলেননি তিনি। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী ইসায়ো লিজিমা চীনের রাজধানী বেইজিং হয়ে গতকাল শনিবার দেশে ফেরেন। জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান এনএইচকের দেওয়া খবর অনুযায়ী, বেইজিংয়ে থামার পর সেখানে সাংবাদিকেরা লিজিমাকে তাঁর পিয়ংইয়ং সফরের বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।’ লিজিমা জাপানে পৌঁছানোর আগে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, তিনি দেশে ফিরে মুখ্য সচিব ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুখপাত্র ইয়োশিহিদে সুগার কাছে সফরের বিস্তারিত বিবরণ দেবেন। উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করার পর দেশটির সঙ্গে প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শীতলতম পর্যায়ে। লিজিমার পিয়ংইয়ং সফরকে অনেকে জাপানের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছেন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে গত বৃহস্পতিবার লিজিমাকে দেশটির আলংকারিক রাষ্ট্রপ্রধান কিম ইয়ং নামের সঙ্গে আলাপ করতে দেখা গেছে। তবে তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু জানানো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র লিজিমার পিয়ংইয়ং সফরে বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

নারী অধিকার বিল তোলার পরই আলোচনাবন্ধ

আফগানিস্তানে নারী অধিকারের পক্ষে একটি বিল পার্লামেন্টে তোলার পর তুমুল হট্টগোলের মুখে এ নিয়ে আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার অনুমোদনের জন্য বিলটি পার্লামেন্টে তোলা হলে এর বিপক্ষের এমপিদের হট্টগোলের মুখে ১৫ মিনিটের মাথায় স্পিকার বিতর্ক বন্ধ করে দেন। রক্ষণশীল পার্লামেন্ট সদস্যরা ওই প্রস্তাবিত আইনকে শরিয়া পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করে তা বাতিল করার দাবি জানান। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ২০০৯ সালে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও জোর করে বিয়ে দেওয়া বন্ধ করার বিষয়ে একটি আইন জারি করেন। তবে আইনটি এখনো পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়নি। বিদ্যমান আইনে ইতিমধ্যে কয়েক শ লোকের কারাদণ্ড হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে যুক্তিতর্ক শুরু হওয়ার পর এমপিদের মধ্যে রক্ষণশীল নেতারা কঠোর ভাষায় হামিদ কারজাইয়ের সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ, এই আইনে স্বাক্ষর করে কারজাই শরিয়া আইনের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। তবে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান আইনটি বলবৎ থাকবে বলে জানা গেছে। আলোচিত আইনে বলা হয়েছে, আফগান পুরুষেরা স্ত্রীদের সঙ্গে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সংসর্গ করতে পারবেন না। রক্ষণশীল নেতাদের দাবি, আইনটি সংশোধন করে, স্ত্রীকে ‘ধর্ষণ’ করার জন্য স্বামীদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না মর্মে বিধান রাখতে হবে। আইনটি পার্লামেন্টে পাস করানো নিয়ে আফগানিস্তানের নারী অধিকারকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আইনটি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করতে অনেকে তা পার্লামেন্টে পাস করানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, পার্লামেন্টের অনুমোদনের মাধ্যমে পোক্ত না হলে ভবিষ্যতে এটি বাতিল হতে পারে। অন্য পক্ষের নারী অধিকারকর্মীরা আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, আইনটি নিয়ে পার্লামেন্টে তুমুল বিতর্ক হতে পারে। এতে বিদ্যমান আইনটি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।  বিলটি পার্লামেন্টে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম এমপি ফাওজিয়া কুফি। তিনি দুই বছর আগে তালেবানের হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান।

স্বৈরশাসক ভিদেলারমৃত্যু

আর্জেন্টিনার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় ‘ডার্টি ওয়ারের’ সময়কার স্বৈরশাসক হোর্হে ভিদেলা (৮৭) গত শুক্রবার কারাগারে মারা গেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তিনি রাজধানী বুয়েনস এইরেসের মার্কাস পাজ কারাগারে দণ্ড ভোগ করছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই ভিদেলার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। জেলখানার চিকিৎসক তাঁর প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, গত শুক্রবার সকালে ভিদেলাকে কারাগারের শৌচাগারে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে বিচার বিভাগ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনার শাসন ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল ভিদেলা বামপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। দেশটির ইতিহাসে তা ‘ডার্টি ওয়ার’ নামে পরিচিত। ওই অভিযানে অপহূত ও গুম হন প্রায় ৩০ হাজার বামপন্থী সাংবাদিক, ছাত্র ও গেরিলা বাহিনীর সদস্য। গোপন কারাগারে তাঁদের নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। ভিদেলা ১৯৮১ সালে ক্ষমতা ছাড়েন। ২০০৬ সালে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের জন্য দায়ী সামরিক কর্মকর্তাদের নতুন করে বিচার শুরু হয়। ভিদেলার বিরুদ্ধে ৩১ জন বন্দীকে গুমের আদেশ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১০ সালে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর ২০১২ সালে অনেক নারী বন্দীর সদ্যোজাত সন্তান গুমের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে ৫০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।  ভিদেলা কখনোই তাঁর বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ স্বীকার করেননি। কৃতকর্মের জন্য তিনি কোনো অনুশোচনায় ভুগতেন না বলেও জানা যায়। স্থানীয় একজন সাংবাদিককে তিনি কারাগারে বলেন, সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নাশকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মূল্য হিসেবে কারাবন্দীদের গোপনে সরিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল। কারণ, সাত-আট হাজার বন্দীকে ফায়ারিং স্কোয়াড বা আদালতে তোলা সম্ভব ছিল না।

ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তদুর্ভাগ্যজনক

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাহিনীকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যায়িত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসি বলেছেন, এর ফলে বাশারবাহিনীর সাহস বেড়ে যাবে এবং দেশটির জনগণের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে। জেনারেল ডেম্পসি বলেন, সিরিয়ায় মস্কোর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত ‘অসময়োচিত ও দুর্ভাগ্যজনক’। তিনি এমন সময় এই মন্তব্য করলেন, যখন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁদের কাছে সিরিয়ায় বাশারবাহিনীর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন। ওবামা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অভিযোগ সত্যি হলে তা সিরিয়ায় হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘চূড়ান্ত’ নির্ধারক হতে পারে। এই মুহূর্তে বাশারের হাতে গোনা কয়েকটি মিত্র দেশের মধ্যে একটি হলো রাশিয়া। দীর্ঘদিন ধরেই বাশারবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করছে দেশটি। শত শত কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় মস্কো থেকে হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমানসহ নানা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাচ্ছে সিরিয়া। এর অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মস্কো সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করলেও তাতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হবে না। প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান হলে জাহাজবিধ্বংসী আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করতে পারবে দেশটি। প্রসঙ্গত, সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিকল্প হচ্ছে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া। এদিকে সিরিয়ায় সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতিসংঘের সহায়তাবিষয়ক কর্মকর্তাদের একটি অনুরোধ বিবেচনা করছে নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর শুক্রবার জানিয়েছে, সহিংসতার কারণে সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা ১৫ লাখে পৌঁছেছে। ইউএনএইচসিআর বলছে, সিরিয়ার বেশির ভাগ শরণার্থী প্রতিবেশী দেশ জর্ডান, ইরাক, লেবানন ও তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। এত বেশিসংখ্যক শরণার্থীকে সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশগুলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জ্যেষ্ঠ একজন কূটনীতিক বলেন, সিরীয় শরণার্থীদের সহায়তা দেওয়ার যে প্রস্তাবের কথা বলা হচ্ছে, তাতে বিভিন্ন দেশের সীমান্তে যাওয়ার অনুমতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বগুড়ায় অনুমোদন ছাড়াই চার শতাধিক ভবন by আনোয়ার পারভেজ

নীতিমালা লঙ্ঘন করে বগুড়ায় অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে চার শতাধিক ভবন। এর মধ্যে তিন শতাধিক ছয়তলা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পৌরসভার অনুমোদনের তোয়াক্কা করেননি ভবনের মালিকেরা। আর বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পৌরসভার পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংস্থার বিধি মানার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
অনুমোদনহীন কয়েক শ ভবনমালিকের বিরুদ্ধে নোটিশ পাঠিয়েছে বগুড়া পৌরসভা। পরিবেশ অধিদপ্তরও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু এর পরও থেমে নেই শহরে অনুমোদনহীন বহুতল ভবন নির্মাণ। বগুড়া পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ রাশেদ সামাদ প্রথম আলোকে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এবং পৌরসভার অনুমোদনহীন এসব বহুতল ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও শহরবাসীর প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আবাসিক এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হলে ভবনের সামনে ন্যূনতম ৩০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা থাকতে হবে। বগুড়ায় গড়ে ওঠা অধিকাংশ ভবনের সামনে ওই পরিমাণ রাস্তা নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও বুয়েটের জরিপ অনুযায়ী বগুড়া শহরকে ভূমিকম্পনপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনুমোদন না নিয়ে অপরিকল্পিত ও দায়সারা নকশায় যেনতেন উপকরণ দিয়ে শহরে এসব বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। এতে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে বহু প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’
পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ ও আইন শাখা সূত্রে জানা গেছে, শহরজুড়ে প্রায় চারশ অবৈধ বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রায় তিনশ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পৌরসভা থেকে দ্বিতল বা তিনতলা পর্যন্ত নকশার অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। আর ১০০ ভবনের ছয়তলা পর্যন্ত অনুমোদন নিয়ে ১০-১২ তলা পর্যন্ত করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জ্বলেশ্বরীতলা নূর মসজিদ সড়কে দোতলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে তিন বছর আগে ছয়তলাবিশিষ্ট আমিন কমপ্লেক্স নামে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির মালিক নূর আমীন বলেন, ছয়তলা করার পরপরই নকশা অনুমোদনের জন্য পৌরসভায় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা অনুমোদন দেয়নি। পাশের গলিতে অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হচ্ছে এনজে টাওয়ার ও হাফিজা টাওয়ার নামে আটতলাবিশিষ্ট দুটি ভবন। পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ দুটি ভবনের মালিক ছয়তলা পর্যন্ত অনুমোদন নিয়েছেন। এনজে টাওয়ারের মালিক নিতিশ রঞ্জন কর্মকার আটতলার অনুমোদন না নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, নির্মাণ আটতলার অনুমোদন নেওয়ার জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। মালতিনগর, রহমাননগর, চকসূত্রাপুর, খান্দার ও সেউজগাড়ি এলাকায় বেশ কিছু বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই।
পৌরসভার আইন শাখা জানিয়েছে, ২০১০ সালের মাঝামাঝি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত এ রকম দুই শতাধিক অবৈধ ভবনমালিকের বিরুদ্ধে পৌরসভা থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের আরও হাজার খানেক অভিযোগ এসেছে শহরের সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে।
পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম বলেন, অনুমোদনহীন ভবন ছাড়াও শহরে অর্ধশতাধিক পুরোনো সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন রয়েছে। এসব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিমেন্টের বদলে চুন-সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে। পৌরসভাকে না জানিয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনও এখন বহুতল করা হচ্ছে। বিশেষ করে শহরের নিউমার্কেটের আশপাশে বেশ কয়েকটি পুরোনো ভবন অনুমোদন ছাড়াই বহুতল করা হচ্ছে। এ কারণে যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকছে। পৌরসভার মেয়র এ কে এম মাহবুবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অবৈধ ভবনমালিকদের কাছে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রায়ই নোটিশ পাঠানো হলেও খুব কমই সাড়া পাওয়া যায়। আবার ভবনমালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য প্রশাসন ও পুলিশকে অনুরোধ করা হলেও তাতে খুব একটা সহযোগিতা পাওয়া যায় না। জেলা প্রশাসক (বর্তমানে ঢাকায় বদলি হয়েছেন) সারোয়ার মাহমুদ বলেন, অবৈধ ভবনমালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পৌর মেয়র প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে পাননি, এমনটা সঠিক নয়। পৌরসভা থেকে এ ধরনের সহযোগিতা চাওয়া হলে অবশ্যই দেওয়া হতো। আর সরকারি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থাকলে তা গণপূর্ত বিভাগ ও স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের (এলজিইডি) জানার কথা।
তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল গোফফার জানান, বগুড়া শহরের কোনো সরকারি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ থেকে থাকলে সেটা তাঁর জানা থাকত। পৌরসভা চিঠি দিয়ে জানালে সে ব্যাপারে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
বগুড়া ফায়ার সার্ভিস ও ডিফেন্স স্টেশনের সহকারী স্টেশন কর্মকর্তা দেওয়ান সোহেল রানা জানান, পৌরসভার নথিতে ছয়তলার অধিক ভবনের সংখ্যা বেশি হলেও মাত্র ৩০ থেকে ৩৫টি ভবনমালিক ফায়ার সার্ভিস থেকে অনুমোদন নিয়েছেন। দুর্ঘটনা ও দুর্যোগকালীন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার জন্য বেশির ভাগ বহুতল ভবনের সামনে প্রশস্ত রাস্তা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের পরিচালক আলী রেজা মজিদ বলেন, শহরজুড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদিত মাত্র ২০-২৫টি বহুতল ভবন রয়েছে। অনুমোদনহীন আরও অন্তত ৪০ জন ভবনমালিককে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রামে আবাসিক ভবনে সাত পোশাক কারখানা by একরামুল হক

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার ২০ নম্বর সড়কে পাঁচতলা ভবনটি বানানো হয়েছিল আবাসিক কাজে ব্যবহারের জন্য। এই ভবন এখন পোশাক কারখানার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পলেস্তারা খসে পড়ছে আগ্রাবাদের জীর্ণশীর্ণ এই ভবনের। দেখা যাচ্ছে বিমের রডগুলোও। সেখানে রয়েছে সাতটি পোশাক কারখানা। প্রতিদিন কাজ করেন সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক। লোডশেডিংয়ের সময় একসঙ্গে আটটি জেনারেটরও চালু থাকে। একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আবুল কাশেম জানালেন, টাকার জন্য ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন।সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত ও সিলগালা করার কাজ শুরু করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ১৩টি ভবন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ পেয়ে সিডিএ ৭ মে আগ্রাবাদের এই ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা দেয়। ইতিমধ্যে ভবনটি থেকে কারখানা সরানোর জন্য মালিকদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে সিডিএ সূত্র জানিয়েছে।চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য মো. জাহাঙ্গীর আলম ওই ভবন থেকে পোশাক কারখানা এই মুহূর্তে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘একটি আবাসিক ভবনে কী করে এভাবে শিল্প কারখানার কাজ চলে?’সিডিএর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা জানান, ভবনটি নকশা অনুযায়ী সেখানে সাকল্যে ২০টি পরিবারের সর্বোচ্চ ১৬০ জন সদস্য এবং তাঁদের ব্যবহূত আসবাবপত্রের ভার নিতে পারবে। এখন এই ভবনে ১৬০ জনের পরিবর্তে সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। এ ছাড়া আসবাবপত্রের চেয়ে পোশাক কারখানার আরও ২৫ থেকে ৩০ গুণ বেশি যন্ত্রপাতির ভারও ভবনটিকে নিতে হচ্ছে। সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুর হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ভবনটিতে আটটি জেনারেটর রয়েছে, যা লোডশেডিংয়ের সময় একসঙ্গে চালু থাকে। চালু থাকা জেনারেটরের কম্পনে ভবনের ভারের পরিমাণ আরও ৩০ গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ একটি আবাসিক ভবনকে শিল্প কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৫ থেকে ৬০ গুণ বেশি ওজনের ভার নিতে হয়। এতে ওই ভবন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।সিডিএর উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সরোয়ারউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে সাভারের রানা প্লাজার পরিণতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই চুয়েটের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁদের সুপারিশের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’ভবনটিতে রিদম নামের একটি পোশাক কারখানার অবস্থান। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কারখানার ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার পর অনেক শ্রমিক চাকরি ছেড়ে চলে গেছে। কেবল আমার কারখানা থেকেই চলে গেছে শতাধিক শ্রমিক। তবে ভবনটির ব্যাপারে চুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের সুপারিশ পাওয়ার পর আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’ভবনটিতে লিংক ওয়্যার লিমিটেড নামের আরেকটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক রতন দাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাড়ির মালিক তো ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন না। তবে সিডিএর প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রকৌশলীদের চূড়ান্ত মতামতের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’ভবনটির মালিক হোসেন আহমেদ বলেন, ‘বাইরে থেকে দেখলে আমার ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। ভেতরে গেলে দেখবেন এটি মজবুত। ১৯৮৮-৮৯ সালে ভবনটি নির্মিত হয়।’হোসেন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমার ভবনের দোতলা থেকে ওপরের দিকে কোনো জেনারেটর নেই। আটটি জেনারেটর নিচতলায়। এতে জেনারেটরের কম্পন থেকে আমার ভবন মুক্ত রয়েছে।’সিডিএর প্রকৌশলীরা ভবনের মালিকের বক্তব্যকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। প্রকৌশলীরা জানান, জেনারেটর ভবনের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, চালু করা হলে কম্পনের সৃষ্টি হবে।

বিজিএমইএর ব্যাখ্যা

‘সবকিছুই পোশাকমালিকদের জন্য’ শিরোনামে গত শনিবার প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা দিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সমিতি (বিজিএমইএ)। বিজিএমইএর মহাসচিব এহসান উল ফাত্তাহর পাঠানো ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রতিবেদনে ব্যবহূত গ্রাফিকসে রপ্তানিমুখী পোশাক খাত মোট আয়ের ওপর দশমিক ৮০ শতাংশ হারে কর দেয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, রপ্তানি করা পণ্যের রপ্তানিমূল্যের (এফওবি) ওপর দশমিক ৮০ শতাংশ হারে উৎসে কর দেওয়া হয়। বিজিএমইএর দাবি, পোশাকশিল্পে নিট মুনাফা গড়ে রপ্তানিমূল্যের ২ শতাংশ। সেই বিবেচনায় এ খাতটি মোট মুনাফার ওপর ৪০ শতাংশ হারে আয়কর দেয়।
এ ছাড়া গ্রাফিকসে আরও দেখানো হয়েছে, অন্য শিল্প খাতে আয়করের পরিমাণ ৪২ শতাংশ। বিজিএমইএর দাবি, অন্য শিল্প খাতে আয়করের পরিমাণ সাড়ে ৩৭ শতাংশ, যা মোট আয় বা মুনাফার ওপর প্রযোজ্য।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়েলসেন কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সমীক্ষাকে উদ্ধৃত করে বিজিএমইএ বলেছে, পোশাকশিল্প খাতের রপ্তানিমূল্যের ওপর দশমিক ৬ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনে গত অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে মোট এক হাজার ২২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে তৈরি পোশাকপ্রতিষ্ঠান থেকে এনবিআর কর বাবদ পেয়েছে মাত্র ৮৮৬ কোটি টাকা।
পোশাকশিল্পের নগদ সহায়তা প্রসঙ্গে বিজিএমইএ ব্যাখায় বলেছে, প্রকৃতপক্ষে নগদ সহায়তা পোশাকশিল্প পায় না। দেশীয় বস্ত্র ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানি করলে শুধু এ সুবিধা ভোগ করা সম্ভব এবং তা শুধু বস্ত্রশিল্প পেয়ে থাকে। এটি বস্ত্রশিল্পকে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়। বন্ড সুবিধাকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যনিরপেক্ষ একটি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে যেকোনো দেশে রপ্তানি খাতকে করের বোঝা থেকে মুক্ত করতে এ ব্যবস্থা থাকে বলে মত দিয়েছে বিজিএমইএ।
৭ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ বলছে, এটি প্যাকিং ক্রেডিট। আনুষঙ্গিক উপকরণ (এক্সেসরিজ) ক্রয় এবং কার্যকরী মূলধন সংস্থানের জন্য রপ্তানি ঋণপত্রের বিপরীতে এ সুবিধা দেওয়া হয়। তবে সব রপ্তানিকারক এ সুবিধা পান না। ব্যাংক থেকে ১৮-২০ শতাংশ সুদে অন্যদের মতো পোশাকশিল্প মালিকদেরও মেয়াদি ঋণ নিতে হয়।
বিজিএমইএ বলেছে, প্রকাশিত সংবাদে সব তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে জনমনে এমন মত সৃষ্টি হয় যে, পোশাকশিল্প শুধু বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছে এবং বাংলাদেশে কোনো ধরনের অবদান রাখছে না। সমিতি বলেছে, বিপুল কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প খাত অন্যান্য শিল্প এবং সেবা খাত সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে, যার তথ্য এ প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।
প্রতিবেদকের বক্তব্য: গ্রাফিকসের ভুলটি অসতর্কতার জন্য হয়েছে। যদিও প্রতিবেদনে তথ্যটি সঠিকভাবেই উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মত রয়েছে। বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলামের বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যেই এ খাতের অবদানের কথা বলা আছে। প্রতিবেদনের অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যথাযথ সরকারি দপ্তর থেকে সংগ্রহ করে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

ঠিকাদারের টাকায় মেয়র নির্বাচন! by শরিফুল হাসান ও আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রাজশাহীর মেয়র পদপ্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামানের নির্বাচনী খরচের একটি বড় অংশই আসবে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে। ওই ঠিকাদার গত পাঁচ বছরে সিটি করপোরেশনের বড় দুটি উন্নয়নকাজ পেয়েছেন।আর বিএনপির নেতা মোসাদ্দেক হোসেন তাঁর নির্বাচনী খরচের ১০ লাখ টাকা নিচ্ছেন সাত ব্যক্তির কাছ থেকে। তাঁরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এই টাকা দিচ্ছেন বলে দাবি করেছেন মোসাদ্দেক।১২ মে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেওয়া হলফনামায় নির্বাচনী খরচ ও আয়ের উৎস থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। কোত্থেকে এই টাকা আসবে, কারা এই টাকা দেবেন, কীভাবে প্রার্থী খরচ করবেন—সবই হলফনামায় দেওয়া হয়েছে। আমরা জনগণকে এসব তথ্য জানাব।’মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদ্য সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান তাঁর নির্বাচনী খরচের সম্ভাব্য আয় হিসেবে যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিন লাখ টাকা আসবে তাঁর নিজের আয় থেকে। আর শামসুজ্জামান নামের একজন ঠিকাদার তাঁকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দেবেন ১২ লাখ টাকা। সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরের নিউমার্কেটের পাশে দারুচিনি ও নগর ভবনের পাশে স্বপ্নচূড়া নামে আটতলা করে দুটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছিলেন এই ঠিকাদার। সিটি করপোরেশনের জমিতে ভবন দুটির নির্মাণকাজ চলছে। মেয়র পদপ্রার্থী খায়রুজ্জামানকে টাকা দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঠিকাদার শামসুজ্জামান বলেন, ‘লিটন (খায়রুজ্জামান) ভাইয়ের নির্বাচনের জন্য আমি ১২ লাখ টাকা দিচ্ছি, এটা সত্য। আর এই টাকা পুরোটাই আমার বৈধ আয়ের টাকা।’
একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে নির্বাচনের টাকা নেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খায়রুজ্জামান বলেন, ঠিকাদার শামসুজ্জামান একই সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। তিনি দলের একজন বড় দাতাও। দলের বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি আর্থিক সহায়তা দেন। তারই অংশ হিসেবে স্বেচ্ছায় উৎসাহী হয়ে তিনি নির্বাচনী খরচের জন্য ১২ লাখ টাকা দিচ্ছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন, নির্বাচনের জন্য ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। কারণ, মেয়র নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে ওই ঠিকাদারের কাছে তাঁকে জিম্মি থাকতে হবে। বিভিন্ন সুবিধা দিতে হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন নির্বাচনী খরচের জন্য সম্ভাব্য যে আয় দেখিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে, এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিজের এবং স্ত্রীর ভাইয়ের কাছ থেকে নিচ্ছেন তিন লাখ টাকা। আত্মীয়স্বজনের বাইরে বিরাজ হোসেন, মুরাদুজ্জামান ও মিজানুর রহমান দুই লাখ করে ছয় লাখ এবং আহমেদুজ্জামান ইকবাল, আজিজা আক্তার, ফিরোজ রেজা খান ও জগলুর কবির দুই লাখ করে টাকা দিচ্ছেন।
স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এই সাতজন কেন টাকা দিচ্ছেন—জানতে চাইলে মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনের বাইরে যাঁরা আমাকে টাকা দিচ্ছেন, তাঁরা আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো সম্পর্ক নেই।’
খায়রুজ্জামান তাঁর নির্বাচনী খরচের মধ্যে ৬৫ হাজার পোস্টারের জন্য এক লাখ ১০ হাজার টাকা, চারটি নির্বাচনী ক্যাম্প বানাতে এক লাখ ৩২ হাজার টাকা, কেন্দ্রীয় ক্যাম্পে অফিস খরচে এক লাখ ৮৩ হাজার টাকা, যাতায়াত খরচ এক লাখ ৯০ হাজার টাকা, ঘরোয়া বৈঠকে ৬৫ হাজার টাকা, লিফলেটে ৬৫ হাজার টাকা, হ্যান্ডবিলে ৯৫ হাজার টাকা, ব্যানারে ৩৫ হাজার টাকা, ডিজিটাল ব্যানারে ৫৬ হাজার টাকা, পথসভায় ১২ হাজার, মাইকিংয়ে এক লাখ পাঁচ হাজার, পোর্ট্রেটে ১০ হাজার, প্রতীকের জন্য ৮০ হাজার, অফিস অ্যাপায়নে এক লাখ ২৭ হাজার, কর্মীদের জন্য ৫১ হাজার ও অন্যান্য খাতে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করবেন।
মোসাদ্দেক হোসেন তাঁর নির্বাচনী খরচের মধ্যে ৯০ হাজার পোস্টারের জন্য এক লাখ ৯৫ হাজার ৭০০ টাকা খরচ করবেন। চারটি নির্বাচনী অফিসের জন্য ৮২ হাজার, কেন্দ্রীয় অফিসের জন্য ৮৮ হাজার, যাতায়াত হিসেবে ৭৫ হাজার, সভার জন্য ৪০ হাজার, লিফলেটের জন্য দুই লাখ, হ্যান্ডবিল এক লাখ ৪০ হাজার, স্টিকারে দুই লাখ ১৫ হাজার, ব্যানারে ৪৬ হাজার ৫০০, ডিজিটাল ব্যানারে ১৯ হাজার ২০০, পথসভায় ৩০ হাজার, মাইকিংয়ে ৮৮ হাজার ২০০, পোর্ট্রেটে ৩৫ হাজার, প্রতীকে ৩০ হাজার, আপ্যায়নে ২১ হাজার ও বিবিধ খাতে ৫০ হাজার টাকা খরচ করবেন। তবে কর্মীদের জন্য তিনি কোনো টাকা খরচ করবেন না। তাঁরা স্বেচ্ছায় কাজ করবেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।Untitled-45আলোচিত এই দুই মেয়র পদপ্রার্থীর বাইরে বিএনপির রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক তাঁর নির্বাচনী খরচের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা নিজের ব্যবসা থেকে, ভাইয়ের কাছ থেকে দুই লাখ ও স্ত্রীর কাছ থেকে পাঁঁচ লাখ টাকা পাবেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া তিন লাখ টাকা তিনি মিজানুর রহমান নামের একজনের কাছ থেকে ধার হিসেবে নেবেন।জামায়াতের প্রার্থী রাজশাহী মহানগর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি নির্বাচনী খরচের আয়ের মধ্যে নিজের আয় থেকে নেবেন চার লাখ টাকা। এ ছাড়া স্ত্রীর কাছ থেকে এক লাখ, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ৫০ হাজার, স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে দেওয়া ৫০ হাজার এবং এক লাখ টাকা ধার করবেন।স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান নিজের আয় থেকে খরচ করবেন এক লাখ টাকা। মামাতো ভাই দেবেন দুই লাখ টাকা। এ ছাড়া তাঁর মা জমি বিক্রি করে তিন লাখ ও ভাই দুই লাখ টাকা দেবেন। চার লাখ টাকা ধার নেবেন তিনি। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাজিমউদ্দিন নামের একজন তাঁকে এক লাখ ও প্রকৌশলী এম এ মুনায়েম এক লাখ টাকা দিচ্ছেন। এর বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে আরও তিন লাখ টাকা পাবেন তিনি।স্বতন্ত্র আরেক প্রার্থী মোজাম্মেল আলী নিজের আয় থেকে চার লাখ ৮৩ হাজার টাকা খরচ করবেন। এ ছাড়া তাঁর দুই ভাই তাঁকে চার লাখ করে আট লাখ এবং স্ত্রী দুই লাখ টাকা দেবেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান নিয়েই আলোচনা

তত্ত্বাবধায়ক নয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন করার কথা পুনরুল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন। গতকাল রোববার দুপুরে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফ এসব কথা বলেন। ১৫ মে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বর্ধিত সভায় গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তগুলো জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান থাকছেন—আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের ওই সভায় এ বিষয়ে আলোচনার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে এলেও বিষয়টি এড়িয়ে যান আশরাফ। তিনি বলেন, ‘আমরা তো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার কথা বলেছি। এখানে তো কোনো ব্যক্তির নাম নেই। আমরা তো কারও নাম বলিনি।’ এসব বিষয় চূড়ান্ত করতে বিরোধী দলকে সংসদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। এর বিরোধিতা করে এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করার দাবিতে আন্দোলন করছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তা না হলে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ার করে আসছে। সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ইতিমধ্যে বিরোধী দলকে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। সংসদে এসে তিনি তাদের দাবি পেশ করার কথা বলেছেন। ‘সংসদে গিয়ে আমরা কোনো ফর্মুলা পেশ করব না। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটা সরকার বাতিল করে দেবে’—বিরোধী দলের এমন অবস্থানের বিষয়ে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘তাদের প্রস্তাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে আলোচনা হবে। এই আলোচনা ভোটাভুটির মাধ্যমে বাতিল করা হবে, সেটা তো বলা হয়নি।’
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শর্তহীন সংলাপে রাজি হয়েছেন। তা হলে সরকারের পক্ষ থেকে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি সাড়া মিলছে না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফ বলেন, ‘একবার তিনি বললেন, তলে তলে আলোচনা হয় না। আমাদের আলোচনার আহ্বানকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি আলটিমেটাম দিয়ে আমাদের সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। তাঁর কোনো প্রস্তাব দেওয়ার আগে নিকট অতীতে কী হয়েছে, সেটা মনে রাখতে হবে।’
সৈয়দ আশরাফ বলেন, আওয়ামী লীগ মনে করে, বর্তমান সংবিধানের আওতায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই করা সম্ভব। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা ২০০৭-০৮ সালের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে কোনো অসাংবিধানিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সর্বশেষ বর্ধিত সভায় বিএনপি-জামায়াত জোটের হত্যা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা নিয়ে শঙ্কা by রাহীদ এজাজ

পোশাক খাতে কর্মপরিবেশের মানোন্নয়নে বাংলাদেশের ধীরগতির পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র অস্বস্তি বোধ করছে। আবার টিকফা চুক্তি সইয়ে সরকারের অনাগ্রহ শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রশ্নের মুখে রেখেছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের অবাধ বাজার-সুবিধা (জিএসপি) অব্যাহত থাকাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল রোববার প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ওবামা প্রশাসন কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশকে এমন আভাস দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে চিঠি দিয়েছে দি আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (এএফএল-সিআইও)। এএফএল-সিআইও ২০০৭ সালে বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা বাতিলের দাবিতে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরেও (ইউএসটিআর) পিটিশন দাখিল করেছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য শর্ত পূরণের তাগিদ দিয়ে গত ডিসেম্বরে বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদেরকে চিঠি দেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রন কার্ক। গত মার্চে বাংলাদেশ ওয়াশিংটনে জিএসপি-বিষয়ক শুনানিতে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। এরপর এমন আভাস আসছিল যে শর্ত সাপেক্ষে জিএসপি-সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। কিন্তু সাভারে ভবনধসে হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যুর পর এই আবহ পুরো বদলে যায়।
এই সময়ে এসে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা সইয়ের বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে। কার্যত জিএসপির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার রূপরেখা চুক্তির (টিকফা) সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও এটি সই হলে জিএসপি অব্যাহত রাখাটা নিশ্চিত হবে বলে একটি মহল মনে করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেন। গত এপ্রিলে টিকফার ব্যাপারে একটি সারসংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রী সই করেন। জিএসপির ব্যাপারে আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। তার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিতে টিকফা সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে সূত্র জানায়। কিন্তু ১৩ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত তা ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফলে আপাতত চুক্তিটি সই হচ্ছে না বলে ধরে নেওয়া হয়।
তবে সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, জিএসপি-সুবিধা অব্যাহত রাখার সঙ্গে টিকফা সইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এটা ঠিক, শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষা ও শ্রমমানের যে বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলো টিকফার ধারায় সন্নিবেশিত আছে। সাত ধারার টিকফা চুক্তির প্রারম্ভিক এই শর্ত নিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সূত্রমতে, ওই শর্তের ওপর গুরুত্ব দিয়ে টিকফা চুক্তি সই না করা যুক্তরাষ্ট্রকে এ বার্তাই দেবে যে, শ্রমমানের উন্নতির বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতা নেই। তা ছাড়া আইএলও সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শ্রমমানের উন্নতির বিষয়ে সময়ক্ষেপণের সুযোগ নিলে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের গতকাল রোববার তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, টিকফা সইয়ের ব্যাপারে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন লাগবে। চুক্তিটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন না হলে সই হবে না। কবে টিকফা মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হবে কিংবা বর্তমান সরকারের মেয়াদে আদৌ হবে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রী কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।
কাদের-মজীনা বৈঠক: ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা গতকাল দুপুরে বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদেরের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী এই প্রতিবেদককে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের আসন্ন ঢাকা সফরের বিষয়ে তাঁদের আলোচনা হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা অব্যাহত রাখা ও টিকফা চুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে তাঁরা কথা বলেছেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের জিএসপি বিষয়ে গত শনিবার ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিওর মাধ্যমে আলাপ (ভিডিও কনফারেন্স) করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। তিনি এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে তাঁর সরকারের কর্মকর্তাদের মনোভাব বুঝতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়ে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদেরও ধারণা দিয়েছেন। প্রায় এক ঘণ্টার আলাপচারিতায় মজীনা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ইতিবাচক মনোভাব পাননি বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে।
জিএসপি কেন জরুরি: জিএসপি বাতিলের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়, তা জিএসপি-সুবিধা পায় না। তাই এই সুবিধা বাতিল হলে ভাবমূর্তির জন্য সংকট তৈরি হবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে জিএসপি-সুবিধা পায় বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাতিল করলে এবং তা দেখে ইইউ একই পথে হাঁটলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গত ২৮ মার্চ ওয়াশিংটনে ইউএসটিআরের শুনানিতে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) গঠনের পর এখন পর্যন্ত কোনো দেশের জিএসপি বাতিলের ঘটনা ঘটেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরের সময় জিএসপি-সুবিধা অব্যাহত রাখতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে অনুরোধ জানান। কেরি এই অনুরোধ রাখার আশ্বাস দিয়েছেন।
জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিএসপির ব্যাপারে ইউএসটিআরের সিদ্ধান্ত এখনো জানতে পারিনি। তবে সার্বিকভাবে শ্রমমান ও কর্মপরিবেশের যে বিষয়গুলোতে তাদের উদ্বেগ ছিল, তা নিয়ে শুনানি-পরবর্তী ১৯টি প্রশ্নের উত্তরে সরকারের অবস্থান খুব স্পষ্ট করেই জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সাভারের ভবনধসের পর সরকার শ্রম আইন সংশোধনসহ আইএলওর সহযোগিতায় ত্রিপক্ষীয় অংশীদারির ঘোষণা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপের আলোকে জিএসপির ব্যাপারে আমরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আশা করছি।

ঢাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’

বিরোধী দলকে আপাতত আর রাজপথে দাঁড়াতে দেবে না সরকার। আগামী এক মাস কোনো সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল রোববার এ ঘোষণা দিলেও কার্যত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচির পর রাজধানীতে আর কোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করতে দেয়নি সরকার। এমনকি মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির ওপরও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা চলছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় মানববন্ধন কর্মসূচি আর করতে দিচ্ছে না পুলিশ।বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকার দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল করা সরকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান বলেন, সরকার সংবিধানবিরোধী ও স্বৈরাচারী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত জরুরি অবস্থার শামিল বলে মনে করেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘তবে আমি মনে করি, সরকার জরুরি অবস্থা জারি করার মতো কোনো বোকামি করবে না।’সভা-সমাবেশ বন্ধ করে দেওয়া প্রসঙ্গে সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গতকালই দুই রকম ব্যাখ্যা এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল সকালে বলেছেন, যেসব দল অনুমতি নিয়ে সমাবেশ দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয় এবং জনসাধারণের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও জ্বালাও-পোড়াও করে, তাদের আগামী এক মাস সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ নিষেধাজ্ঞা শুধু রাজধানী ঢাকার জন্য এবং এটা সব দলের ওপর কার্যকর হবে।
আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে এক মাস সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এ দুটি যুক্তিকেই খারিজ করে দিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী রফিক-উল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কেউ নাশকতা চালাচ্ছে বা কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো—এ অজুহাতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না। কেউ জ্বালাও-পোড়াও বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালালে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। আর অতীতে এর চেয়েও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। কখনো সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়নি।
সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জনশৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’
১৩ মে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট। ওই দিন অনুমতি না পেয়ে তা পিছিয়ে ১৫ মে করা হয়। পরিবর্তিত তারিখেও অনুমতি না পেয়ে ওই দিন সকালে সংবাদ সম্মেলন করে ১৯ মে দেশব্যাপী হরতাল ডাকে ১৮ দল। পরে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সে হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়।
পুলিশ অনুমতি বাতিল করায় গত ১৭ মে মৎস্য ভবন চত্বরে তরিকত ফেডারেশনের মহাসমাবেশ কর্মসূচি কর্মসূচি স্থগিত করে। সর্বশেষ বামপন্থী চারটি দল—জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ ও জাতীয় গণফ্রন্টকে গত শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করতে দেয়নি পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির কর্মসূচি বন্ধ করার কৌশল হিসেবে সরকার সব দলের সভা-সমাবেশের ওপর এক মাসের এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কারণ এক মাস পার হলে, এর কিছুদিন পর শুরু হবে রমজান মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের আগ পর্যন্ত বিএনপির পক্ষে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
৯ আগস্ট ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ। আর ২৮ অক্টোবর থেকে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মধ্য আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন
প্রথম আলোর মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল মিরসরাই উপজেলার দ্বিতীয় থানা হিসেবে বারইয়ারহাটের জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সভা-সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে আরও বেশি আছে বিএনপির। কিন্তু তাদের সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এমনকি তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনেও সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এর কারণ কী?’ জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা সমাবেশের অনুমতি নিয়ে সমাবেশকে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন, জনসাধারণের ওপর অত্যাচার করেন, নির্যাতন করেন, গাড়ি পোড়ান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র নষ্ট করেন, দোকান লুট করেন, তাঁদের যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আমরা সমাবেশ করার অধিকার স্বীকার করা সত্ত্বেও আগামী এক মাস পর্যন্ত কোনো সমাবেশ কোনো দলকেই করতে দেব না।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের স্পষ্টীকরণ
গতকাল রাত ১১টায় ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের স্পষ্টীকরণ’ শিরোনামে সরকারি তথ্য বিবরণী দিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ‘আজ মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানা উদ্বোধনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের স্পষ্টীকরণের লক্ষ্যে জানানো যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী পরিস্থিতিতে যদি কোনো রাজনৈতিক দল এমন কোনো কর্মসূচি দেয় যাতে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা নাশকতার আশঙ্কা থাকে বা সেরূপ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার স্বার্থে সেসব দলের সভা-সমাবেশের কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেবে না সরকার।’ তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, ‘সাধারণ সমাবেশ করার ব্যাপারে কোনো আপত্তি নেই। এটা কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং জনগণের জানমাল রক্ষার্থে পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।’
বিভিন্ন দলের নিন্দা
আগামী এক মাস সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। গতকাল রোববার পৃথক বিবৃতিতে দলগুলো সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী’ আচরণ বলে মন্তব্য করেছে।
গতকাল গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে মিছিল-সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে ২৮ মে সচিবালয় ঘেরাও ও ২৩ মে মিরপুরে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
গণসংহতি আন্দোলনের এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, সরকার তার অপশাসন-দুর্নীতি-লুটপাট ঢাকতে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন কর্মসূচি চাপা দিতে সভা-সমাবেশের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ ছাড়া সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রশক্তি।

পানিবন্দী বরগুনার এক লাখ পরিবার

ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে বিপর্যস্ত বরগুনা। তার ওপর নতুন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় এক লাখ পরিবার তিন দিন ধরে পানিবন্দী। এসব পরিবারের সদস্যদের হাতে কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই। ঘূর্ণিঝড়ে বেশির ভাগ পরিবারের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।গতকাল শনিবার বরগুনা সদর ও তালতলী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে পানিবন্দী এসব পরিবারের সদস্যদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ চোখে পড়ে। সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক বলেন, এই উপজেলায় ৩০-৩৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট উপজেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাথরঘাটা উপজেলায় ৫০-৫২ হাজার, বেতাগী উপজেলায় ১৫ হাজার এবং বামনায় প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় আছে। কিন্তু পানিবন্দী এসব মানুষের জন্য সাহায্যের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল।দুপুরে সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের আমতলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক শ বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রামের ষাটোর্ধ্ব জাহানারা বেগম ঘরে জবুথবু হয়ে বসে আছেন। হাঁটুপানি ভেঙে তাঁর ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের চালা ও বেড়ার কিছু অংশ নেই। ঘরের মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কাঁথা-কাপড় ভেজা। জাহানারা বলেন, ‘রাইতে একটু ঘুমামু, হেই অবস্থা নাই। ঘরে চাউল নাই, আর রানমু হেই জাগাটুও নাই। সব পানিতে তলাইয়্যা আছে। চাইর দিন ধইর‌্যা মানষের চিড়া-মুড়ি খাইয়্যা ঘরের সবাই দিন কাটাইতে আছি।’সদরের কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের কোটবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক শ পরিবার পানিবন্দী। সদরের খাজুরতলা গ্রামের বাসিন্দা খোকন হাওলাদার বলেন, ‘চাইর দিন ধইর‌্যা ঘরে কোনো রান্ধন-বাড়ন অয় না। কোমর পানি ভাইঙ্গা রাস্তায় ওঠা লাগে। ঘর গ্যাছে, এহন পানি মোগো আরেক বিপদ ডাইক্যা আনছে।’ কোটবাড়িয়া গ্রামের আবদুর বারেক বলেন, ‘চাইরদিন ধইর‌্যা ঘর দিয়া বাইর অইতে পারি না।’
সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের গাজী মাহমুদ, গর্জনবুনিয়া, আগা পদ্মা, গোড়া পদ্মা ও আজগরকাঠি, বালিয়াতলী ইউনিয়নের পাতাকাটা, পালের বালিয়াতলী ও ছোট তালতলী, গৌরিচন্না ইউনিয়নের খাজুরতলা, লাকুরতলা, ছোট বদরখালী, বেতবুনিয়া ও বাইশতবক গ্রামে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা যায়। নলটোনা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সফিকুজ্জামান জানান, তাঁর ইউনিয়নের দুই শতাধিক ঘর সম্পূর্ণ এবং দেড় হাজারের বেশি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ সকালে তালতলী ও আমতলী উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা যায়। তালতলীর প্রকল্প কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই দুই উপজেলার পানিবন্দীদের তালিকা নেই। তবে এই দুই উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার ৬০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের মধ্যে অনেক পরিবার পানিবন্দী রয়েছে।
তালতলীর লাউপাড়া গ্রামের হালিমন বেগমের সম্বল বলতে ছিল ছোট্ট একটা ঘর। স্বামী আবদুল মালেক পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তিন মেয়ের মধ্যে ছোটটি তালতলী কলেজের ছাত্রী। বাকি দুজনের বিয়ে হলেও থাকেন মায়ের কাছে। হালিমন লাউপাড়া বাজারে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান করে সংসার চালান। গত বছর ধারদেনা ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ছোট্ট একটি টিনের ঘর তোলেন। মহাসেনের আঘাতে ঘরটি দুমড়েমুচড়ে গেছে। দোকানও শেষ। ঘরের ভিটিতে খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন হালিমন ও তাঁর পরিবার।
হালিমন বলেন, ‘ঋণ কইর‌্যা ঘর তুলছিলাম। কিন্তু সেই সম্বলটুকু শ্যাষ অইয়্যা গ্যালো। এহন ক্যামনে লোনের কিস্তি দিমু, আর কী দিয়া ঘর তুলমু কইতে পারি না।’ তালতলীর ছোট আমখোলার আলকাস মিয়া বলেন, ‘জমির ফসলাদি সব শ্যাস। এহনও ঘরের মধ্যে পানি। তিনদিন ধইর‌্যা কোনো দানা-পানি মোহে দেতে পারি নায়।’
তালতলী উপজেলার লাউপাড়া, বড় ও ছোট আমখোলা লালুপাড়া, মেনিপাড়া, চামোপাড়া, আগাপাড়া, নিদ্রা, সখিনা, তেঁতুলবাড়িয়া, জয়ালভাঙাসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী। সোনাকাটা ইউপি চেয়ারম্যান ইউনুস ফরাজি জানান, এই ইউনিয়নে ৩২৯ ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং এক হাজার ৬৬০টি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের মেনিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। জেলা ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির উপপরিচালক হাফিজ আহামঞ্চদ বলেন, জেলার বেশ কিছু এলাকা এখনো পানির নিচে। অনেক পরিবার মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। তবে কী পরিমাণ পরিবার পানিবন্দী, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

আটকের ৯ ঘণ্টা পর বিএনপির ৪৮ নেতা-কর্মী ছাড়া পেলেন

কারা ফটক থেকে বিএনপির ৫৩ নেতা-কর্মীকে গতকাল শনিবার আটকের প্রায় নয় ঘণ্টা পর ৪৮ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-১ থেকে ৩৫ জন ও পার্ট-২ থেকে বিএনপির ১৮ জন নেতা-কর্মী জামিনে মুক্তি পান। বের হওয়ার পরপরই উভয় কারাগারের ফটক থেকে তাঁদের আটক করে পুলিশ। গতকাল রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আটক হওয়া ৫৩ জনের মধ্যে ৪৮ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোন পাঁচজন আটক রয়েছেন, তা জানা যায়নি। এর আগে সন্ধ্যায় নেতা-কর্মীদের নতুন করে আটকের কারণ জানতে চাইলে মাসুদুর রহমান বলেছিলেন, সম্প্রতি যেসব ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয়েছে, তাতে তাঁদের কারও বিরুদ্ধে কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করে কেউ নির্দোষ প্রমাণিত হলে ছেড়ে দেওয়া হবে। একইভাবে জামিনে মুক্তির পর কারা ফটক থেকে ৮ মে যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন ও ১৬ মে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া জামিনে মুক্ত যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লা ১৬ মে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পরপরই তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এভাবে কারা ফটক থেকে দলীয় নেতাদের আটক করে বিভিন্ন মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকার আইনকানুন মানছে না। বিরোধী দলকে দমন করতে তারা হামলা-মামলা বেছে নিয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, বিএনপির ওই ৫৩ জন নেতা-কর্মীর জামিনের কাগজপত্র আদালত থেকে গত শুক্রবার কারাগারে পৌঁছায়। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে গতকাল বেলা দুইটার দিকে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর কারা ফটক থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাঁদের আটক করে নিয়ে যায়। কারাগারের পার্ট-১ থেকে আটক হওয়া বিএনপির নেতা-কর্মীরা হলেন আবু তাহের, বিল্লাল হোসেন, মো. বশিরুল, মেহেদী হাসান, মো. শাহজাহান, তোজাম্মেল হক, মো. কাশেম মজুমদার, আশরাফুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান, আবদুল কাদির জিলানী, আজগর আলী, মো. এশাখুল, মো. নাসির উদ্দিন, ইমরুল কায়েস, জিয়াউল হক, জুলফিকার আলী ভূঁইয়া, আসাদুজ্জামান, আনোয়ার হোসেন, ওমর ফারুক প্রমুখ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এর কারাধ্যক্ষ মো. নেছার আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
কারাগার-২-এর উপকারাধ্যক্ষ মো. মাসুম জানান, সেখান থেকে গতকাল দুপুরে একই মামলায় আদালত থেকে জামিন পাওয়া বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৮ জন নেতা-কর্মীকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর ফটক থেকে ডিবির সদস্যরা তাঁদের আটক করে নিয়ে যান। গত ১১ মার্চ বিএনপির সমাবেশের দিন ভাঙচুর, বোমা বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে এই ৫৩ জনসহ মোট ১৫৬ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

উত্তরা ফ্ল্যাট প্রকল্প এগোচ্ছে না by অরূপ দত্ত

উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো না করায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজকে ২৮ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে। প্রাপ্ত কাজের ৪৫ শতাংশ তিন মাসের মধ্যে করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ১৫ মাসে করেছে মাত্র ৪ শতাংশ কাজ।প্রকল্পের ‘এ’ ব্লকে এক হাজার ২৫০ বর্গফুট আয়তনের ছয় হাজার ৬৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করার কথা। এর বড় অংশের কাজের ঠিকাদার নিযুক্ত হয়েছে সরকারি দলের সাংসদ (রাজশাহী-৪) এনামুল হকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এনা প্রপার্টিজ। এ কাজের আরেকটি অংশের ঠিকাদারি পেয়েছেন সরকারি দলের আরেক সাংসদ (ঢাকা-৩) ও রিহ্যাবের সভাপতি নসরুল হামিদের প্রতিষ্ঠান হামিদ কনস্ট্রাকশন ও বিল্ডিং ফর ফিউচার (বিএফএল)। বিএফএলের মালিক তানভীরুল হক রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি। তাঁরা তাঁদের মোট কাজের ১৬ শতাংশ শেষ করেছেন। তাই আপাতত তাঁদের নোটিশ দেওয়া হয়নি।এই প্রকল্পের ছয় হাজার ৬৩৬টি ফ্ল্যাট লটারি করে সাধারণ মানুষকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাঁদের সবাইকে জামানতের তিন লাখ এবং প্রথম কিস্তির ছয় লাখ ৭১ হাজার মিলিয়ে মোট নয় লাখ ৭১ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। কিস্তির টাকা পরিশোধের শেষ সময় ৩১ মে। এসব ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ২০১৪ সালের মধ্যে, আর বরাদ্দপ্রাপ্তদের বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ২০১৬ সালের মধ্যে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনা-ডুঙ্গা এ এইচ কনস্ট্রাকশন ফার্ম উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘এ’ ব্লকে রাজউক অংশে ১০টি লটে ২০টি ১৬ তলা ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের সঙ্গে চুক্তি করে ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর। ২০১২ সালের ৭ মার্চের মধ্যে এ কাজের ৪৫ শতাংশ শেষ করার কথা। কিন্তু এরপর আরও ১৪ মাস পার হয়েছে। এখন মাঠে কাজ বন্ধ আছে বলে রাজউকের নথিতে উল্লেখ আছে। এ কাজে কাগজে-কলমে এনা প্রপার্টিজের সঙ্গে আছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান ডুঙ্গা এ এইচ কনস্ট্রাকশন ফার্ম।
এনা প্রপার্টিজের সঙ্গে কোরিয়ার অপর একটি প্রতিষ্ঠান ডিডিজে যৌথভাবে ‘এনা-ডিডিজে কনস্ট্রাকশন ফার্ম’ নামের এই প্রকল্পে আরও পাঁচটি লটে ১০টি ভবন তৈরির কাজ নিয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের নয় মাস চলে গেলেও প্রায় কোনো কাজই হয়নি। রাজউকের নথিতে দেখা যায়, এখানে দরপত্র অনুযায়ী কাজের হালনাগাদ অগ্রগতি হওয়ার কথা ৩৩ শতাংশ। অথচ হয়েছে শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশ।
রাজউক সূত্র জানায়, চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজের বিষয়ে মৌখিক ও লিখিতভাবে কয়েক দফা তাগিদ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী তাদের মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, মালামাল ও কারিগরি জনবল নিয়োজিত করার কথাও বলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। এ অবস্থায় রাজউক চুক্তিপত্রের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুশাসন চাইলে মন্ত্রণালয় চুক্তি বাতিলের ক্ষমতা সম্পূর্ণ রাজউকের হাতে ছেড়ে দেয়।
প্রকল্পের আরেকটি লটে দুটি ১৬ তলা ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পায় এনাম ট্রেডার্স নামের অপর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় এক বছর আগে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (নোয়া) দেওয়া হয়। চুক্তিপত্র অনুযায়ী, তাদের কাজের আনুপাতিক অগ্রগতি ৩৩ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। তারা ছয় মাসেরও বেশি সময় মাঠপর্যায়ে কাজ বন্ধ রেখেছে। রাজউক কাজ চালুর তাগিদপত্র দিলে সম্প্রতি কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের অগগ্রতির বিষয়ে রাজউকের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এ পর্যন্ত চারটি, প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি চারটি এবং রাজউক চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ৩৬টি সভা হয়েছে। প্রতি সভাতেই কাজের অগ্রগতি বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করা হয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিটি লট কাজের জন্য আলাদা চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে চিঠিগুলোর উপসংহার একই রকম। একটি চিঠিতে বলা হয়, কর্মসূচি অনুযায়ী ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৩ মে পর্যন্ত ১৮৯ দিনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে মোট ৪৮৫টি ‘সার্ভিস পাইল কাস্টিং’ করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ২৭টি করেছে। এ ছাড়া ২১ এপ্রিল থেকে কাজ পুরো বন্ধ আছে। এসবই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের প্রতি অবহেলা, উদাসীনতা ও অপারগতার বহিঃপ্রকাশ।
রাজউকের চিঠিতে আরও বলা হয়, পত্র জারির দিন থেকে ২৮ দিনের মধ্যে আগের পিছিয়ে পড়া ৪৫৮টি (৪৮৫-২৭) পাইল ছাড়াও আরও ৭০টি পাইল মিলিয়ে মোট ৫২৮টি পাইল কাস্টিং করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে বা অনুমতি ছাড়া কাজ বন্ধ রাখলে চুক্তিপত্রের শর্ত লঙ্ঘিত হবে। তা এই লটের কাজের চুক্তিপত্র বাতিলের চূড়ান্ত নোটিশ হিসেবে গণ্য হবে।
রাজউকের চেয়ারম্যান মো. নূরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় রাজউক। তাই বেঁধে দেওয়া সময়ের বিষয়ে রাজউকের অবস্থান স্থির রাখা হবে। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী কাজের ন্যূনতম অংশও শেষ না করায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ক্রেতারা। এ ছাড়া নির্মাণ খরচেও এর প্রভাব পড়বে। তাই রাজউক ঠিকাদার কোম্পানিকে বারবার সতর্ক করেছে। এখন আবার চিঠি দিয়েছে।
এনা-ডিডিজে কনস্ট্রাকশন ফার্ম তাদের ১৭ ও ২০ নম্বর লটের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন থাকায় কাজ করতে অপারগতা জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ এপ্রিল ঠিকাদার তাঁদের জামানতের টাকাও ফেরত চেয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে এনা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংসদ এনামুল হক এখনো রাজউকের চিঠি দেখেননি বলে জানান। চিঠির বিষয়গুলো তাঁর কাছে তুলে ধরলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, নানা সমস্যার কারণে কাজ ধীরগতিতে চললেও এখন কাজ চলছে। জমি বুঝে পেতে দেরি হয়েছে। প্রকল্প এলাকার আটটি ইউনিটে বৈদ্যুতিক খুঁটি এখনো সরানো হয়নি।
বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুধু দুটি লটে বৈদ্যুতিক খুঁটি রয়েছে। আমরা ঠিকাদারি কোম্পানিকে বলেছি, এই দুটি লট (চারটি ভবন) বাদ রেখে অন্য ভবনগুলোর কাজ চালিয়ে যেতে। কিন্তু তারা বাকি ভবনগুলোতেও যথাসময়ে কাজ করেনি।’
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারা অনুযায়ী, সরকারের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং থাকার যোগ্য হবেন না। তার পরও এনামুল হকের মালিকানাধীন এনা প্রপার্টিজ রাজউকের ৪০টি ভবন তৈরির কাজ নিয়েছে। আর সাংসদ নসরুল হামিদের প্রতিষ্ঠান পায় ১৬টি ভবন নির্মাণের কাজ।
‘আইন ভেঙে সরকারের সাথে বাণিজ্য’ করায় এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাংসদ এনামুল হকের বিরুদ্ধে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছিল। এনা প্রপার্টিজ লিমিটেড ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মধ্যে বহুতল সিটি সেন্টার নির্মাণের চুক্তিতে এই সাংসদ নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন।
পাইল বানানোর কাজও শেষ হয়নি: গতকাল শনিবার সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে কাজ চলছে খুবই ধীরগতিতে। কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যাও কম। পাইল বানানোর কাজ এখনো শেষই হয়নি। কিছু শ্রমিক ব্যস্ত ইট ভাঙার কাজে। অনেক দিন পড়ে থাকা রডে মরচে ধরে গেছে। কোথাও কোথাও ঢালাই মেশিন পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। ১০০ একর আয়তনের পুরো প্রকল্পের বেশির ভাগ অংশ এখনো শুধুই ধু ধু মাঠ।
রাজউকের দায়িত্বশীল একজন প্রকৌশলী জানান, এখন দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ করার কথা। অথচ কাজ করছে মাত্র ৩০০-র মতো শ্রমিক।
এলাকা ঘুরে এবং দায়িত্বরত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পে রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের মিলে মোট ৭৯টি ভবনের একটিরও চূড়ান্ত পাইলিং শেষ হয়নি। কোনো কোনো লটে টেস্ট পাইলিং কাজ শেষ হলেও সার্ভিস পাইলিংয়ের কাজ ধরাই হয়নি। আটটি লটে এখন পর্যন্ত কাজ শুরুই করা যায়নি।
গতকাল কাজ চলছিল ২১ ও ২২ নম্বর লটের কাজ। এ দুটি এনা-ডুঙ্গার অধীনে। এগুলোর টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ শুরুর পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৬ ও ১৭ নম্বর লটেও এই ঠিকাদারের শ্রমিকেরা কাজ করছেন।
এনা-ডিডিজের ৩৮ নম্বর লটে পাইলিং আর ৩৯ নম্বর লটে পাইল বানানোর কাজ চলছে। এনা-ডুঙ্গার অধীন ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের প্রকৌশলী খন্দকার ওবায়দুল হক জানান, টেস্ট পাইলিংয়ের পর এখন কিছু কিছু লটে সার্ভিস পাইলিংয়ের কাজ চলছে। শেষ করার চেষ্টা হচ্ছে দ্রুত।
ভবন নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শেষ না হলেও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের অনেকেই আসছেন প্রকল্প এলাকায়। কালও এসেছিল এক চাকরিজীবী দম্পতি। বললেন, অনেক আশা নিয়ে তাঁরা এসেছেন। কিন্তু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি দেখে তাঁরা থমকে গেছেন। নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন কি না, তাঁরা সন্দিহান।

অন্যদের ওপর দায় চাপালেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা

পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায় চাপালেন সরকার, বিদেশি ক্রেতা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) ওপর। শ্রমিকদের কোনো কথাই তাঁরা শুনলেন না। গতকাল শনিবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আয়োজিত গণশুনানিতে তাঁরা এসেই বক্তব্য দিয়ে চলে যান। জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত গণশুনানিতে বিজিএমইএ-বিকেএমইএর প্রতিনিধিরা ছাড়াও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বিদেশি ক্রেতা, শ্রমিক সংগঠন ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-এর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। শ্রমিকদের কথা না শুনে চলে যাওয়ায় সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভানেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ‘মালিক শ্রেণী এতই শক্তিশালী যে, তাঁরা কথা বলে চলে গেছেন। আইএলওর (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) ডিরেক্টর, ক্রেতারা সবাই বসে আছেন, কিন্তু তাঁরা নেই। কেউ তাঁদের ধরে রাখার ক্ষমতা রাখেন না। মালিকেরা এত মার্ডার করেছেন, কোনো দিন শুনেছেন তাঁদের বিচার হয়েছে?’ গণশুনানির প্রথম পর্বে বিজিএমইএর প্রতিনিধি রিয়াজ বিন মাহমুদ বলেন, তাঁদের কমিটির মূল স্লোগান হচ্ছে ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ কমপ্লায়েন্ট কারখানা গড়ে তোলা। তাঁর ভাষায় হাজারো ‘শ্রমিক ভাই’ রানা প্লাজায় নিহত হয়েছেন। তিনি দোষারোপের সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নন। তবে তাঁর মতে, ইচ্ছে করলেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোকে ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর্থিক বিষয়টি ভেবে দেখতে হচ্ছে। ঢাকার আশপাশে জমির এত দাম যে ‘প্রজেক্ট ভায়াবেল’ হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিক শোষণ, অনিরাপদ কাজের পরিবেশ নিয়ে যে অভিযোগ ওঠে, তার দায় বিদেশি ক্রেতাদের ওপরও বর্তায়। তাঁরা এক সেন্ট, দুই সেন্টের জন্য দর-কষাকষি করেন।
শুনানিতে বিকেএমইএর প্রতিনিধি মো. হাতেম বলেন, ভাড়া ভবনে যে কারখানা আছে, সেগুলো ঠিকভাবে তৈরি কি না, সেটা তাঁদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স দেওয়ার সময় সব বিষয় ভালোভাবে খতিয়ে দেখে সনদ দিতে পারে। তাঁদের অনেকেরই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা’। হঠাৎ  করে তাঁদের পক্ষে ঢাকার বাইরে কারখানা স্থাপন করা কঠিন। একতলা বা দোতলা ভবনের ওপর কারখানা করা যাবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ফোরামে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা-ও বাস্তবতাবর্জিত। কারণ, জায়গার স্বল্পতা আছে। তিনি আরও বলেন, সবাই কাজের পরিবেশের কথা বলেন, শ্রমিকদের বাড়ির পরিবেশ কেমন সেটাও দেখা দরকার। এনজিওগুলো এ দায়িত্ব নিতে পারে।
বিজিএমইএ-বিকেএইএর প্রতিনিধিরা নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিদেশি ক্রেতাদেরও মনোযোগী হওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে সায় দিয়েছেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইস্রাফিল আলম। শুনানি চলাকালে তিনি একাধিকবার রিয়াজ-বিন-মাহমুদের কথার প্রশংসা করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ক্রেতাদের প্রতিনিধি এইচএ্যান্ডএম-এর ডেভিড শ্যাডম্যানের কাছে বারবার জানতে চান, তাঁরা দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারেন কি না। একপর্যায়ে ডেভিড বলেন, তাঁরা শ্রমিকদের স্বার্থ মাথায় রেখে চুক্তি করেন। এ দেশের ২১৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাঁরা পোশাক নেন। তিনি পাঁচ হাজার কারখানার দায়িত্ব নিতে পারবেন না।
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা বলেন, বাংলাদেশে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিতেই হবে। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা শ্রম আইনের সংশোধনীর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সংশোধনীতে যেন ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সভাপতিকে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, জিএসপি-সুবিধা পাওয়ার জন্য যে শর্ত রয়েছে, বাংলাদেশ কি সেই শর্তগুলো মেনে চলছে? রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব কারখানায় যা ঘটেছে, তার চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, আগুন লাগলে শ্রমিকেরা যেন বেরিয়ে যেতে পারেন, তাঁদের মাথার ওপর যেন ভবন ধসে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের ১০০ ভাগ কারখানাকেই কমপ্লায়েন্ট হতে হবে।
শুনানিতে আরও বক্তব্য দেন শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম, কর্মজীবী নারীর সভাপতি শিরীন আখতার প্রমুখ। এতে উপস্থিত ২০টিরও বেশি শ্রমিক সংগঠনের নেতা ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দাবি করেছেন। সংসদীয় কমিটি ইউএসএআইডির অর্থায়নে এই শুনানি করে। শুনানি থেকে পাওয়া সুপারিশ তারা পাঠিয়ে দেবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে।

পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত করার তাগিদ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশের উন্নয়ন দ্রুততর করার অনুরোধ জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। এ লক্ষ্যে তিনি কারখানার অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন-প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দ্রুততর করতে বলেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধন-প্রক্রিয়াও দ্রুত শেষ করার অনুরোধ জানান।গতকাল শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব অনুরোধ জানান।এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন দীপু মনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুরোধ রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস দিয়েছেন জন কেরি।মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট ও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাব, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি ও তাদের সাম্প্রতিক ঢাকা অবরোধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গগুলো এসেছে।বৈঠকে রানা প্লাজাধসে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান জন কেরি। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা শ্রমিক, শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমমানের উন্নতিতে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে সহায়তা করবে। আমরা জানি, এ ব্যাপারে আপনারা কঠোর পরিশ্রম করছেন এবং ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন।’
শ্রমিকদের অধিকার এবং কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অঙ্গীকারের বিভিন্ন দিক জন কেরির কাছে তুলে ধরেন দীপু মনি। তিনি জানান, সংসদের আগামী অধিবেশনে সংশোধিত শ্রম আইন উত্থাপন করা হচ্ছে।
দীপু মনি যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা বাড়াতে জন কেরির কাছে অনুরোধ জানান। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ অনুরোধ রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে আগ্রহী। এ লক্ষ্যেই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারপদ্ধতি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দীপু মনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে ’৭১-এর গণহত্যার বিচার হচ্ছে। এ সময় জন কেরি বলেন, এ বিচার গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে অবাধ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
দেশজুড়ে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব ও হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির বিষয়ে জানান দীপু মনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের সহিংসতা ও মধ্যযুগীয় দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

সহিংসতায় বিনিয়োগ ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন-তখন হরতালের কারণে বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগসংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সফর বাতিল হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সাভারে ভবনধস বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্যই নতুন সংকট তৈরি করেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দেশের ভাবমূর্তির সংকট কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া সহজ কোনো বিকল্প নেই।গতকাল শনিবার রাজধানীতে বিদেশি চেম্বারগুলোর সংবাদ সম্মেলনে এই অভিমত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ-জার্মান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।চেম্বারগুলোর যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, হরতালের নামে রাজনৈতিক সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগকে বিঘ্নিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।জার্মান রাষ্ট্রদূত আলব্রেখট কনজে বলেন, সাভারে ভবনধসের পর বাংলাদেশ নিয়ে ইউরোপে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ভাবমূর্তির সংকট কাটাতে বাংলাদেশকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় উৎ পাদিত পণ্য ইউরোপের ক্রেতারা কেনেন না। তিনি বলেন, ‘বন্ধু হিসেবে আমরা বাংলাদেশের অগ্রগতি দেখতে চাই, থমকে যাওয়া নয়। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হলে একধরনের যন্ত্রণা তৈরি হবে। তাই আসুন, কথা ছেড়ে পরিস্থিতির উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করি।’রাজনৈতিক অচলাবস্থায় হতাশা প্রকাশ করে এই রাষ্ট্রদূত বলেন, আড়াই মাস ধরে কোনো প্রতিনিধিদল জার্মানি থেকে বাংলাদেশে আসেনি। জার্মানির প্রধান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পিত একটি সফরও বাতিল হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত কারেল রিখটার বলেন, সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাভারে ভবনধস—বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সময়টা বেশ কঠিন। বিশেষ করে ভবনধসের পর বাংলাদেশকে ইউরোপ কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা সমন্বয়ের জন্য নেদারল্যান্ডসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার নেদারল্যান্ডস সরকার বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখ ইউরো (এক ইউরো = প্রায় ১০০ টাকা) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে রিখটারও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ উদ্বেগজনক হারে কমছে। বিনিয়োগকারীদের সফর ঘন ঘন বাতিল হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে যেভাবে বাংলাদেশকে তুলে ধরা হচ্ছে, তাতে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ-সহায়ক দেশ নয়। জার্মানির একটি সাপ্তাহিকীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজ করছে।’ রিখটার বলেন, ‘তবে কাউকে দোষারোপের জন্য আমরা এখানে আসিনি। পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পণ্য কিনতে তৈরি আছে ইউরোপের দেশগুলো।’
নরডিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আরিল্ড ক্লোকেরহগ বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অন্য গন্তব্য খুঁজতে শুরু করবেন অনেকে।’
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি হিরোইউকি ওয়াতাবে বলেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা বাড়াতে চাই। তবে দুঃখজনক হলো, বর্তমান সহিংসতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ সফরে নিরুৎ সাহিত করছে। যদি সহিংস পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তবে আমরা ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নিতে বাধ্য হব। সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারা আমাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করুন।’
জার্মান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাখাওয়াত আবু খায়ের বলেন, দুই বছর ধরে বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থান চোখে পড়ছে। দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যেখানে নারী, সেখানে এরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কী অবস্থায় পড়বেন, সেটি গভীরভাবে ভাবার আছে। তিনি বলেন, ‘হরতালের কারণে মার্চে মাত্র ১৩টি কর্মদিবস পেয়েছি। বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হচ্ছে। কাজেই হরতাল ও সহিংসতার পথ ছেড়ে আসতে বিরোধী দলকে অনুরোধ জানাই। অচলাবস্থার নিরসন করতে সরকার ও বিরোধী দলকে অনুরোধ জানাই। আপনারা সংলাপে বসুন, দেশকে অভিশাপের হাত থেকে বাঁচান। মধ্যস্থতার জন্য বাইরের কারও প্রয়োজন নেই।’
মৌলবাদের উত্থান কেন হয়েছে—জানতে চাইলে সাখাওয়াত আবু খায়ের বলেন, এক পক্ষ ক্ষমতায় থাকতে চায়, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় যেতে চায়। আর তাদের কারণেই মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এমন একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতা আর ধর্মীয় গোঁড়ামির উত্থান আমাদের জন্য উদ্বেগ তৈরি করে। দেশে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তা রাজনীতিবিদদের সমাধান করা উচিত।’
ডাচ-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শাহজাদা হামিদ বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক দেশে মৌলবাদের উত্থান উদ্বেগের। তিনি বলেন, ‘অব্যাহত হরতাল-সহিংসতা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বর্তমান বিরোধ রাজনীতিবিদদেরই সমাধান করতে দেওয়া উচিত।’
ফ্রান্স-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হুমায়ন রশীদ বলেন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদেরা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করলে বিদেশিরা এখানে অনেক বেশি পরিমাণে বিনিয়োগে উৎ সাহিত হবেন। স্থিতিশীলতা না থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য পরিকল্পিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ অন্য গন্তব্যে চলে যাবে।
অবশ্য জার্মান রাষ্ট্রদূত ও নেদারল্যান্ডসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাশা, জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকা সফরের কারণে পরিস্থিতির উন্নয়নে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো খুব শিগগির সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে পাবে।