Wednesday, May 16, 2018

মিয়ানমারকে আগলে রাখছে চীন? যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সফর শেষ করে ফিরে যাওয়ার পর রোহিঙ্গা ইস্যুতে এ নিয়ে পরিষদে প্রথম বৈঠক হলো সোমবার।
সংবাদ সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, বৈঠকে জাতিসংঘে মার্কিন দূত নিকি হেলি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে কিছু সদস্য দেশের জন্য মিয়ানমারের ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
নিকি হেলিকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টরস জানাচ্ছে, "কাউন্সিলের (নিরাপত্তা) কিছু সদস্যের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য কিছু করা সম্ভব হচ্ছেনা।"
"এমনকী সাম্প্রতিক সফরের সময় কোনো কোনো প্রতিনিধি কাউন্সিলের ঐক্য নষ্ট করেছেন, কাউন্সিল যে বার্তা মিয়ানমারকে দিতে চেয়েছিল, তা দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে।"
রয়টরস জানাচ্ছে, সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ না করলেও মার্কিন দূত যে চীনেরই সমালোচনা করেছেন তা স্পষ্ট ছিল।
কারণ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে থেকে ব্রিটেন যে বিবৃতির খসড়া প্রস্তাব করেছিল, চীনের চাপে তাতে অনেক পরিবর্তন করতে হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, ব্রিটেনের তৈরি প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কথা বলা হয়েছিল, যেটা চাপের কারণে বাদ দিতে হয়েছে।
ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল একটি বিবৃতিতে শেষ পর্যন্ত ঐক্যমত্য হয়।
মার্কিন দূত নিকি হেলিকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানিয়েছে, "রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা জরুরী হয়ে পড়েছে। সমাধানে মিয়ানমার যাতে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা আমাদের কাছে রয়েছে।"
এএফপি বলছে, মুখে না বললেও, নিকি হেলি মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
জানা গেছে জাতিসংঘে চীনের দূত মা ঝাওশু মার্কিন দূতের সমালোচনার জবাবে বলেন - পরিস্থিতি আরো জটিল না করে, নিরাপত্তা পরিষদের উচিৎ বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারকে দ্বিপাক্ষিক-ভাবে সমস্যার সমাধান উৎসাহিত করা।
কূটনীতিকদের সূত্রে সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের ওপর নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে আলোচনায় রাশিয়াও চীনের সমর্থনে কথা বলেছে।
এ মাসের গোঁড়ার দিকে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদলের মিয়ানমার সফরের সময় জাতিসংঘে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত বিবিসিকে বলেছিলেন - সফরকারী কূটনীতিকরা মিস সুচি এবং মিয়ানমারের সেনা প্রধানকে 'স্পষ্ট করে বলেছেন' রাখাইনে নির্যাতন, হত্যা এবং ধর্ষণের ঘটনাগুলোর 'বিশ্বাসযোগ্য' তদন্ত না করলে আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিসি) বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থা রয়টরসের একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ এবং হত্যার ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের সেনা-কর্মকর্তাদের আইসিসিতে বিচার হলে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা যায়।
তবে নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য- চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের কারণে সে পথে এগুনো কতটা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদালতে রুদ্ধদ্বার বৈঠক
নিরাপত্তা পরিষদে মতদ্বৈধতা স্বত্বেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণের জন্য অভিযুক্তদের তদন্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আদালতের প্রধান কৌঁসুলি ফাতু বেনসওদা এই তদন্তের জন্য বিচারকদের কাছে অনুমতি চেয়েছেন।
এ ব্যাপারে আদালতের তিনজন বিচারক গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বক্তব্য জানতে চেয়ে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, এই তদন্ত হবে কিনা সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অপরাধ আদালতের বিচারকরা জুনের ২০ তারিখ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসবেন।

৩০টি লাশ পড়ে আছে মর্গে জুটছে না হিমাগার, কবর by রুদ্র মিজান

লাশগুলো পড়ে আছে। একটি দুটি না, ৩০টি বেওয়ারিশ লাশ। দুই-এক দিন না। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে লাশ। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মর্গে পর্যাপ্ত ফ্রিজার না থাকায় সাধারণভাবে এসব লাশ রাখা হয়েছে। জটিলতার কারণে এসব লাশের কবরও দেয়া যাচ্ছে না।
ঢামেক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই হাসপাতালের মর্গে বাড়ছে অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা। গত দুই সপ্তাহে ৩০টি বেওয়ারিশ লাশ জমা হয়েছে মর্গে। মর্গের ময়নাতদন্তের কাজ সম্পন্ন হলেও দাফন করা হচ্ছেনা। লাশগুলোতে পচন ধরেছে। মেডিসিন দিয়ে দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পেতে চেষ্টা করলেও দিন-দিন দুর্গন্ধ বাড়ছেই। গতকাল দুপুরে মর্গে গিয়ে দেখা গেছে, লাশকাটা ঘরে পড়ে আছে এসব অপরিচিত লাশ। কর্তব্যরতরা দুর্গন্ধের মধ্যেই কাজ করছেন। সব লাশ হিমাগারের ফ্রিজে রাখার কথা থাকলেও তা স্ট্রেচারের স্তূপে রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের পাঁচটি ফ্রিজের তিনটিই নষ্ট। সচল থাকা দুটি ফ্রিজে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে ২০টি লাশ। এ অবস্থায় বারবার আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেও লাশগুলো কবরস্থ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কর্তব্যরত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, বেওয়ারিশ এসব লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু কবরস্থানের ঠিকাদার লাশ নিচ্ছেন না। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন এখন লাশ নেয়া সম্ভব না। এখানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কিছু করার নেই জানিয়ে মাহমুদুর হাসান বলেন, তবে আমরা চেষ্টা করছি বসিলা কবরস্থানে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। কবে নাগাদ এসব লাশ দাফন করা সম্ভব হবে তা জানাতে পারেননি তিনি।
জানা গেছে, রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে ১৬ একর জায়গা রয়েছে। সেখানে দুই একর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, ব্যক্তি পর্যায়ে রিজার্ভ রয়েছে ছয় একর, বাকি আট একরই বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য। প্রতিদিনই জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হতো। কবরস্থান পরিচালনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুসারে প্রতি মাসে তিন শতাধিক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে এই কবরস্থানে। গত আট মাসে দুই হাজার আটশ’ লাশ দাফন করা হয়েছে সেখানে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ যাবত জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হচ্ছে না। জুরাইন কবরস্থানের ঠিকাদার শাহাদাত হোসেন জানান, দুই সপ্তাহ যাবত বৃষ্টির কারণে লাশ দাফন করা হয়নি। কবরের মাটি খুঁড়লেই হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এ অবস্থায় লাশ দাফন করা সম্ভব না বলে জানান তিনি। যদিও স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই লাশ দাফন হচ্ছে কিন্তু বেওয়ারিশ লাশের ক্ষেত্রেই বৃষ্টি-পানির অজুহাত দেখাচ্ছেন ঠিকাদার। এ বিষয়ে
জানতে চাইলে অন্যান্য লাশ দাফনের বিষয়টি স্বীকার করে ঠিকাদার শাহাদাত হোসেন বলেন, বেওয়ারিশ লাশ যে স্থানে দাফন করা হয় সেই জায়গায় মাটির নিচে পানি জমে আছে।
সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি লাশ দাফনের ক্ষেত্রে সহস্রাধিক টাকা ব্যয় হয় মৃত ব্যক্তির স্বজনদের। কবরস্থানের শ্রমিক, ইমাম ও কবরস্থানের ঠিকাদারকে দিতে হয় এই টাকা। কিন্তু বেওয়ারিশ লাশ দাফনের ক্ষেত্রে কোনো টাকা পান না কবরস্থানের ঠিকাদার। সূত্রমতে, মূলত এই কারণেই বেওয়ারিশ লাশ দাফন করতে চান না কবরস্থানের ঠিকাদার। এ বিষয়ে ঠিকাদার শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রতিটি লাশ দাফনের ক্ষেত্রে ৩৬০ টাকা পর্যন্ত নেন তিনি। বেওয়ারিশ লাশের ক্ষেত্রে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কোনো টাকা দেয় না। তারা তা আশাও করেন না। এটি মানবিক কাজ বলেই মনে করেন তিনি। শাহাদাত বলেন, বেওয়ারিশ লাশ শুধু জুরাইনে দাফন করতে চাচ্ছে আঞ্জুমান। বসিলায় বেওয়ারিশ লাশ দাফনের জন্য কবরস্থান রয়েছে। সেখানে দাফন করলেই সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু গাড়ির তেল খরচসহ টাকা বাঁচাতে তারা বসিলায় যেতে চান না। জুরাইনে বেওয়ারিশ লাশ দাফনে আগ্রহী তারা। যদিও আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কর্র্তৃপক্ষ জানান, দ্রুত লাশ দাফনের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা। জুরাইনের ঠিকাদার লাশ না নেয়ার কারণে বসিলা কবরস্থানে দাফনের বিষয়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন।

নবীগঞ্জে লন্ডন প্রবাসীর স্ত্রী ও মা খুন, আটক ৪ by এম এ বাছিত

নবীগঞ্জে বসতঘরেই খুন হলেন লন্ডন প্রবাসীর স্ত্রী গৃহবধূ রুমি বেগম (২২) ও শাশুড়ি মালা বেগম (৫০)। রোববার রাত ১১টায় উপজেলার কুর্শি ইউনিয়নের সাদুল্লাপুর গ্রামে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটে। এনিয়ে এলাকায় তোলপাড় চলছে। খবর পেয়ে গতকাল সকালে হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই বাড়ি ঘিরে তদন্ত করেন। আলোচিত ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মম খুনের ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। নিহত গৃহবধূর ব্যবহৃত হাতঘড়ির সূত্র ধরে ঘটনার ক্লু উদঘাটনের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছার দাবি করেছে পুলিশ। এছাড়াও খুনিদের পায়ের ছাপসহ বিভিন্ন আলামত শনাক্ত করেছে পুলিশের স্পেশাল ফোর্স। গতকাল দুপুরে র‌্যাবের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। দ্রুত রহস্য উদঘাটনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে নিহতদের মরদেহে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত রয়েছে। পুলিশ নিহতদের লাশ উদ্ধার করে হবিগঞ্জ মর্গে প্রেরণ করেছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তালেব মিয়া (১৮), শুভ মিয়া (৩০), আব্দুস সালাম (৬০) ও তার পুত্র শেবুল মিয়া (৩০)কে আটক করেছে পুলিশ। দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, উপজেলার কুর্শি ইউনিয়নের সাদুল্লাপুর গ্রামের রাজা মিয়ার পুত্র আকলাক চৌধুরী ওরফে গুলজার দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। গত প্রায় ২ বছর আগে একই গ্রামের কুয়েত প্রবাসী সুজন চৌধুরীর কন্যা রুমি বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর থেকে তার বাড়িতে শুধু মা মালা বেগম ও স্ত্রী রুমি বেগম থাকতেন। দিনের বেলায়ও ঘরের সকল গেইটে তালা লাগানো থাকতো। রোববার রাত ১১টার দিকে হঠাৎ গ্রামের লোকজন আর্তচিৎকার শুনতে পান। লোকজন এসে দেখতে পান লন্ডন প্রবাসী আকলাক  চৌধুরী ওরফে গুলজার মিয়ার বাড়ির আঙ্গিনায় তার স্ত্রী রুমি বেগমের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। স্থানীয় লোকজন ওই বাড়ির ভেতরে গিয়ে তার শাশুড়ি মালা বেগমের ক্ষত-বিক্ষত নিথর দেহ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। এসময় কর্তব্যরত চিকিৎসক পুত্রবধূ ও শাশুড়ি মালা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। নবীগঞ্জ থানা পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে লাশ দু’টির সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে। লাশের একাধিক স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত গৃহবধূ রুমি বেগমের বড় ভাই পল্লী চিকিৎসক নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই তিনি তার বোনের বাড়ির লোকজনের খোঁজখবর রাখতেন। গতকাল রাতে বোন রুমি মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জানায় চোখে আঘাত পেয়েছে ওষুধ দেয়ার জন্য। পরে বোনের পাশের বাড়ির জনৈক তালেব মিয়ার মাধ্যমে রাত ১০টার দিকে বোনের জন্য ওষুধ  দেই। এরপর রাত ১১টার দিকে নির্মম এ ঘটনার খবর পাই। নিহত গৃহবধূর প্রতিবেশী মামাতো ভাই ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলী আহমেদ মুসা বলেন, চিৎকার শুনে তার বাড়িতে গিয়ে দু’জনের নিথর দেহ দেখতে পাই। এ সময় ঘরের একটি টেবিলে ৪টি চায়ের কাপও ছিল। ঘটনাস্থল থেকে এক জোড়া জুতা ও ১টি ঘড়ি উদ্ধার হয়েছে। তিনি দ্রুত এই নারকীয় খুনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করেন। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের ধারণা, হত্যাকারীরা ঘটনার পূর্বেই বাড়িতে অবস্থান করে চা-চক্রে মিলিত হয়। নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূ ও শাশুড়ি নিহত হলেও ঘরের কোনো মালামাল লুট হয়নি। পূর্ব পরিচিতরা পরিকল্পিতভাবে বউ-শাশুড়িকে হত্যা করেছে মর্মে মুখরোচক আলোচনা চলছে। গ্রামবাসী নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। সুরতহাল রিপোর্টের সময় নিহতের শরীরে স্বর্ণের চেইন ও আংটি ছিল বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এনিয়ে নবীগঞ্জ থানার ওসি এসএম আতাউর রহমান বলেন, ঘটনার পরপরই বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। আটককৃতদের কাছ থেকে তথ্য উদঘাটন ও শিগগিরই অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এ রিপোর্ট লেখার সময় মামলার প্রস্তুতি চলছে মর্মে খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও নিহত গৃহবধূর স্বামী যুক্তরাজ্য প্রবাসী গুলজার মিয়া দেশের উদ্দেশে রওয়ানা করেছেন। তিনি দেশে আসার পর মালা বেগম ও গৃহবধূ রুমি বেগমের লাশ দাফন করার কথা জানিয়েছে নিহতদের পরিবারের লোকজন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

শুধু রমজান এলেই তোড়জোড়!

সারাবছরই অস্থিতিশীল থাকে ভোগ্যপণ্যের বাজার। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মনগড়া দামে পণ্য বিক্রি করে ব্যবসায়ীরা। আছে ভেজালের ভয়। তবুও নড়েচড়ে না প্রশাসন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও নেয় না কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। তবে রমজান এলেই দেখা যায় এসব সংস্থাগুলোর তোড়জোড়।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারো রমজানকে ঘিরে বৃহস্পতিবার থেকে বাজার মনিটরিং শুরু করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। একটু-আধটু নড়ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও। যা নিয়ে স্বস্তির পাশাপাশি প্রশ্ন সৃষ্টি করছে চট্টগ্রাম নগরবাসীর মনে।
নগরবাসীর প্রশ্ন, শুধুমাত্র রমজান এলেই কি পণ্যের মূল্য বাড়ে। ভেজাল হয়। ওজনে কারচুপি হয়। বছরের বাকি সময় কি সবকিছু ঠিক থাকে। থাকে না। তাহলে শুধু রমজান এলেই কেন প্রশাসনের তোড়জোড় বাড়ে।
নগরবাসীর ভাষ্য, বছরের বাকি সময়ও তো বাজারে কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ক্রেতার পকেট কাটে ব্যবসায়ীরা। ভেজাল, ওজনেও কারচুপি করে। তখন তো কোনো নড়াচড়া দেখা যায় না। তখন প্রশাসন যায় কোথায়।
কয়েকজন ক্রেতা জানান, বছরের বিভিন্ন সময়ে চাল ও পিয়াজের বাজার অস্থির ছিল। তার স্থায়িত্ব ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। কাঁচাবাজারও সবসময় বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কোনো পণ্যের দাম আজ ১০ টাকা বাড়লে কাল ৫ টাকা কমানো হয়েছে। আবার একই পণ্য বাজারভেদে দামও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। বহাদ্দারহাটে এক রকম তো চকবাজারে অন্যরকম। আবার বিভিন্ন মৌসুমেও দাম বাড়ানোর হিড়িক ছিল। মুসলিমদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবগুলো যেমন মহরম, শবেবরাত, শবে মেরাজে মুরগি-ডিমসহ কিছু কিছু পণ্যের দাম বেড়েছিল অস্বাভাবিক হারে। আবার হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজার সময়েও বেড়ে যায় কিছু পণ্যের দাম। ওই সময়গুলোতেও চুপ ছিল বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর বলেন, সারা বছরই বাজার মনিটরিং করা হয়। কিন্তু রমজানের বিষয়টি ভিন্ন এবং একটু এক্সক্লুসিভ। রমজান এলে দেখা যায়, পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং এটাকে পুঁজি করে পণ্যের মূল্যও বাড়িয়ে দেয় অনেকে। পিয়াজ, রসুনসহ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি ছোলা, ডাল, চিনি, তেলসহ যেসব খাদ্যপণ্যের চাহিদা তৈরি হয় সেগুলোর দাম রমজান এলেই বেড়ে যায়। তাই রমজানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে সেজন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। পুরো রমজান মাসজুড়ে চলবে। তার মানে এই না, সারা বছর খবর থাকে না। প্রতি মাসে জেলা প্রশাসন বাজার মনিটরিং কমিটির সভা করে। সেখানে ব্যবসায়ীরা থাকেন। বাজারের বিভিন্ন পণ্যের তালিকা সরবরাহ করা হয় মিটিংয়ে। যদি দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়েও কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বা ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে তখন কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া হয়।
তিনি বলেন, নগরীতে ১৯টি কাঁচাবাজার আছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতায়। কয়েকটি মার্কেটও আছে। আবার এসব বাজার ও মার্কেটের বিভিন্ন কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য আছে সংস্থাটির বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কমিটি। আছেন দুইজন ম্যাজিস্ট্রেটও (নির্বাহী ও স্পেশাল)। অথচ বাজারগুলো নিয়মিত মনিটরিং হয় না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কমিটির সভাপতি এস এম এরশাদ উল্লাহ বলেন, সারাবছর বাজার মনিটরিং হয় না, এটা ঠিক। তবে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। হয়তো সেটারও ধারাবাহিকতা থাকে না। এর কারণ আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটরা উচ্ছেদ কার্যক্রমগুলোতে বেশি সময় দিয়ে থাকেন। রাস্তা, নালা, ফুটপাথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তৈরি সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে, বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রমে কিন্তু আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটগণ সারাবছরই ব্যস্ত থাকেন। এইজন্য বাজার মনিটরিংটা কিছু কম হয়। তবে রমজানে কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গত ৬ই মে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে পণ্যমূল্যের তালিকা টাঙিয়ে রাখার জন্য।
শুধু রমজানে কেন চাইলে তো সারাবছই পণ্যমূল্যের তালিকা টাঙানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন। এমন মন্তব্যে তিনি বলেন, এবার যে বৈঠকে আমরা সেটাই স্পষ্ট করে বলেছি, সারাবছরই যেন তালিকা টাঙানো হয়। আশা করছি, ধারাবাহিকতা থাকবে। আমাদেরও ইচ্ছে, রমজানের পরেও মনিটরিং অব্যাহত থাকবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে আছে সরকারি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণও। বাজারের বিভিন্ন অসঙ্গতিগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু তা খুব একটা দেখা যায়নি বছরজুড়ে।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের সহকারী পরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাশ বলেন, আমাদের প্রধান কাজই হলো অভিযান পরিচালনা করা। চট্টগ্রাম শহর এবং জেলায় প্রতি মাসে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫টি অভিযান পরিচালনা করে থাকি। পরিচালিত অভিযানে খাদ্যে ভেজাল, পণ্যের মূল্য বেশি নেয়া, ওজনে কারচুপি সংক্রান্ত বিষয়গুলোই দেখা হয়। এর বাইরে কারো কোনো অভিযোগ থাকলে সে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখে থাকি। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে লোকবল সংকট বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে তিনজন এবং জেলা কার্যালয়ে মাত্র একজন অফিসার আছেন। আমাদেরকে দাপ্তরিক কাজও করতে হয়। সীমিত লোকবল সত্ত্বেও সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে আমরা অভিযানগুলো পরিচালনা করে থাকি।
আগামী রমজানকে ঘিরে গৃহীত কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা বলেন, রমজান উপলক্ষে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা আছে আমাদের উপর। এমনকি বন্ধের দিনেও। তাই রমজানে শনিবারেও অভিযান পরিচালনা করবো।
ভোক্তাদের নিয়ে কাজ করে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ক্যাব)। বাজার সংক্রান্ত জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বৈঠকেও অংশ নেন সংস্থাটির প্রতিনিধিরা। কিন্তু সেখানে যে খুব একটা প্রভাব রাখতে পারেন তা নয়। 
এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আমরা সব সময় বলি সারাবছরই যেন বাজার মনিটরিং করা হয়। সেটা সংশ্লিষ্টরা শুনতে চান না। ব্যবসায়ীদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি, হয়তো সে কারণে ভোক্তাদের কথা কানে যায় না।
নাজের হোসাইন বলেন, বছরের কোনো না কোনো সময়ে কিছু কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। যেমন গত বছর পিয়াজের দাম এক নাগাড়ে অনেকদিন বেশি ছিল। চালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখেছি। সবজির বাজারেও লম্বা সংকট ছিল। সংকট হলেই দাম বেড়ে যায়। সংকট কি আসলে থাকে নাকি তৈরি করা হয়। সংকট তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের কাছে এমন বার্তা দেন, দাম আরো বেড়ে যাবে। তাড়াতাড়ি স্টক করেন। এসব বলেই দাম বাড়ানোর ফন্দি আঁটে। ওই জায়গাটা দেখা উচিত সারাবছরই। বছরে বিভিন্ন সময়ে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়। বিভিন্ন মৌসুমে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা হয়। যেমন পূজার সময় কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। শবে কদর, শবেবরাত, রমজানসহ বিভিন্ন মৌসুমেও দাম বাড়ানো হয়। যদিও ওই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করা হয়।

এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শ্রম আইন বাস্তবায়নের আহ্বান

কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মান উন্নয়ন হলেও, ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সবক্ষেত্রে শ্রম আইন বাস্তবায়ন জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের মান উন্নয়নের কাজগুলোও করে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আইএলও’র ১৫টি সনদ কার্যকর করা জরুরি। গতকাল গুলশানের একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এলডিসির এসডিজি বাস্তবায়নে মানসম্মত শ্রম অধিকার সংক্রান্ত এক সেমিনারে বক্তারা এ আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিপিডির অতিরিক্ত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আগে আমরা শ্রম অধিকার নিয়ে খুব একটা কাজ করিনি। তবে আমরা অল্প সময়ে যা করেছি তা অনেক দেশের চেয়ে অনেক ভালো। তিনি বলেন, কারখানার মালিক ও পরিদর্শকের মধ্যে ঘুষ বাণিজ্য হয়। পরিদর্শক অনেক সময় ভাবেন, মালিক অনেক ক্ষমতাবান তার বিরুদ্ধে যাওয়ার দরকার নেই। আবার মালিক পক্ষ ভাবেন পরিদর্শককে কিছু টাকা দিলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে সংশোধন হওয়ার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। এ ছাড়া দেশের ৭০ শতাংশ ট্রেড ইউনিয়নই কার্যকর নয় বলেও জানান তিনি।
সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমরা এমন একটা অর্থনীতিতে যেন না যাই যেখানে শিল্পখাতে ভালো শ্রম আইন পালিত হচ্ছে অথচ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে পালিত হচ্ছে না। তবে বৈশ্বিক এজেন্ডাই যে পালন করতে হবে এমন নয়, এসডিজি অর্জনে আমাদের লক্ষ্য আমরাই নির্ধারণ করে নিতে পারি। এক্ষেত্রে শ্রম আইন ও শ্রমমান নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এমডিজির ধারাবাহিকতায় এসডিজি বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু আমাদের গতি আরো বাড়াতে হবে। সমপ্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়লেও প্রকৃত আয় কমেছে। এর মানে হলো মানসম্মত কাজের সুযোগ কমে গেছে। এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে এ বিষয়টিতে নজর দেয়া জরুরি।
আইএলও’র বাংলাদেশ অফিসের নির্বাহী পরিচালক গগন রাজবান্ড্রি বলেন, শ্রম আইন ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। তবে এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। শ্রমিদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের আরো কাজ করতে হবে।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষের বক্তারা বলেন, শ্রম আইন বাস্তবায়নে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের দিকেও নজর দেয়া দরকার। শ্রম মান উন্নয়নে যে সাফল্য এসেছে তা বিদেশিদেরকেও জানাতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে শ্রম মান উন্নয়নের কাজগুলোও করে যেতে হবে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, ২০১৭ সালের পর ডিউটি ও কোটামুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তবে সুযোগ রয়েছে এসডিজি বাস্তবায়ন করে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের মতো এসডিজি প্লাসের সুবিধা নিতে। এসডিজি প্লাসের সুযোগ পেতে হলে শ্রমের মান, শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা, কর্মের পরিবেশসহ বেশ কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। সরকার অনেকগুলো কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। শুধু মানলে হবে না বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে নন ফরমাল শ্রমিক আউটসোর্সিংসহ অনেক বিষয় নীতিমালায় আনতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমরা মোটেই চিন্তিত নই। আমরা অ্যাকর্ড’র ৯০ শতাংশ শর্ত পূরণ করেছি। অন্যান্য শর্ত পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আমার মনে হয় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর পৌঁছে যাবে। তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিবর্তন করতে পারবো। কিন্তু পোশাক খাতে ৪৪ লাখ শ্রমিক রয়েছে, তাদের কথা ভাবতে হবে। তারা তো দ্রুত অন্য কাজ শিখতে পারবে না। বিজিএমইএ’র সভাপতি বলেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা যথেষ্ট কাজ করেছি। সেফটি ইস্যুতে আমরা পিছিয়ে আছি এটা ঠিক না। রানা প্লাজার পর দেশে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, চুরি বা খোয়া যাওয়া সমস্যা থাকার পরও বর্তমানে আমরা সব ফ্যাক্টরির দরজা খোলা রাখি। যে কেউ ইচ্ছে করলে পর্যবেক্ষণে আসতে পারেন। তাহলে কেন বলবো সেফটি ইস্যুতে আমরা পিছিয়ে আছি? নেতিবাচক প্রচারণাটা ঘর থেকেই শুরু হয়। আমরা যা করিনি তা বলতে বলছি না, কিন্তু যা করেছি তা স্বীকার করুন।

ফিলিস্তিনে যে পাশবিকতা চলছে ৭০ বছর ধরে

ফিলিস্তিন জবরদখল করে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ৭০তম বার্ষিকীতে বায়তুল মোকাদ্দাসে পাতানো হয় মার্কিন দূতাবাস খোলার উৎসব। ওদিকে মাতৃভূমিতে ফেরার ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রত ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরতা চালাতে গাজা সীমান্তে মোতায়েন করা হয় হাজার হাজার ইহুদিবাদী সেনা।
এসব সেনা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর। সর্বশেষ পাওয়া হিসাব মতে, সোমবারের পাশবিকতায় শহীদ হয়েছেন ৫৯ ফিলিস্তিনি; আহত হয়েছেন আরো ২,৭৭১ জন।  যুদ্ধের সময় ছাড়া একদিনে ইসরাইলি হামলায় এত বেশি ফিলিস্তিনির হতাহত হওয়ার ঘটনা বিরল।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমাদের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যে অপরাধযজ্ঞ চালাচ্ছে তার যেন কোনো শেষ নেই বরং দিন দিন তার মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিরা প্রতি বছর ১৫ মে মাতৃভূমি হারানোর বার্ষিকীতে ‘নাকাবা’ বা বিপর্যয় দিবস পালন করেন। ইহুদিবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালের এই দিনে অন্তত ৮ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সেই ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে ইহুদিবাদী সেনারা
নাকাবা দিবসে ফিলিস্তিনিরা যে শুধু তাদের মাতৃভূমি হারিয়েছেন তা নয় সেইসঙ্গে গত ৭০ বছরে তারা যত রকম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন তার সবকিছুর সূত্রপাত হয়েছিল এই দিনে। আর ফিলিস্তিনি জাতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মানবতার শত্রু  ইসরাইল নামক রাষ্ট্র।
৬৭৫টিরও বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহর ধ্বংস করে ইহুদি উপশহর নির্মাণ, ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়ন, ফিলিস্তিনের জাতীয় পরিচিতিগুলো মুছে ফেলা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আরবি নামগুলো বাতিল করে হিব্রু ভাষায় নতুন নামকরণ করা ছিল ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ইহুদিবাদীদের কিছু ন্যক্কারজনক কাজ।
নাকাবা দিবসে ফিলিস্তিনিরা স্মরণ করেন তাদের হাজার হাজার স্বদেশি নারী, পুরুষ ও শিশুকে যারা গত ৭০ বছরে দখলদার সেনাদের পাশবিক হামলায় শাহাদাতবরণ করেছেন। গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছেন ফিলিস্তিনি নারী
নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদিবাদীরা যেসব ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে সেগুলোর মধ্যে ‘কুফার কাসেম’ ও ‘দেইর ইয়াসিনের’ নাম উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৬ সালের ২৯ অক্টোবর জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত কুফার কাসেম গ্রামে হানা দিয়ে ইসরাইলি সেনারা ৬ নারী ও ২৩ শিশুসহ ৪৮ ফিলিস্তিনিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এর আগে ১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল ইহুদিবাদীদের দু’টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী দেইর ইয়াসিন গ্রামে গণহত্যা চালায়।  এতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩৬০ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। 
এ ধরনের গণহত্যা যে গত ৭০ বছর ধরে অব্যাহতভাবে চলে এসেছে তার প্রমাণ গতকালের (সোমবার) গাজা গণহত্যা।
চলতি বছরের নাকাবা দিবসে ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে তেল আবিব থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের ঘটনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে প্রমাণ করেছেন, ফিলিস্তিনি জাতি কোনো ধরনের আলোচনা বা সংলাপ চালিয়ে তাদের হারানো অধিকার ফিরে পাবে না বরং একমাত্র সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনই হচ্ছে তাদের মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।

সাপ আতঙ্ক; করণীয় কী?

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাপ উদ্ধারের ঘটনা সবাইকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
সবশেষ রোববার বগুড়ার একটি অফিস কক্ষ থেকে প্রায় পাঁচ শতাধিক সাপের বাচ্চা উদ্ধার হয়। এর আগে ভোলার একটি কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের মেঝে থেকে শত শত বিষধর সাপ বের হওয়ার ঘটনায় কর্তৃপক্ষ ক্লিনিকটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।
এছাড়া নওগাঁর রাণীনগরে আড়াই শতাধিক এবং কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ছোট আলমপুরে এক বাসা থেকে অন্তত এক ডজন বিষধর গোখরা সাপের বাচ্চা উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবারই স্থানীয়রা এই সাপগুলোকে পিটিয়ে অথবা পুড়িয়ে মেরে ফেলে।
সাপ প্রকৃতি ও পরিবেশের একটা অংশ হলেও এই প্রাণীটিকে নির্বিচারে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান।
তিনি জানান, বৃষ্টির মৌসুমে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। এসময় সাপের আবাসস্থল ডুবে যাওয়ার কারণে তারা ডিম পাড়তে শুকনো ও উঁচু ভূমিতে আসে। এছাড়া বিষধর গোখরা এবং কেউটে সাপের মূল খাবার ইঁদুর হওয়ায় তারা লোকালয়ের আশেপাশে বাসা বাঁধে।
গ্রামে রান্নাঘর এবং গোলাঘরে ইঁদুরের উপদ্রব হওয়ায়, সাপের বিচারণও সেখানে বেশি থাকে।
তবে প্রতিবার এভাবে সাপ মেরে ফেলায় জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাপ মারা গেলে ইঁদুরকে প্রাকৃতিকভাবে দমন করা কঠিন হয়ে পড়বে। যার বিরূপ প্রভাব পড়বে ফসলে।
এছাড়া মেডিকেল গবেষণায় সাপের বিষ খুবই মূল্যবান ও প্রয়োাজনীয় একটি উপাদান হওয়ায় এ প্রাণীটি সংরক্ষণের মাধ্যমে তার সুবিধা কাজে লাগানোর কথাও জানান তিনি।
এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের করণীয় কী?
এমন প্রশ্নের উত্তরে বন সংরক্ষক মোহাম্মদ জাহিদুল কবির জানান, কোন বাড়িতে সাপ পাওয়া গেলে সেটিকে না মেরে বন বিভাগকে খবর দিতে হবে।
এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে তুলতে প্রতিটি উপজেলায় লিফলেট বিতরণ ও মসজিদে মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানান তিনি।
এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে তিনি আহ্বান জানান। জাহিদুল কবির বলেন, "বাংলাদেশের মাত্র ৫ শতাংশ সাপ বিষধর হয়ে থাকে এবং এই বিষধর সাপগুলো সাধারণত শান্ত স্বভাবের হয়। তাই আতঙ্কিত হয়ে সাপের অযৌক্তিক হত্যা বন্ধ করতে হবে।"
সাপুড়ের পরামর্শ
সাপের দংশন থেকে বাঁচতে এই বর্ষার মৌসুমে সবাইকে সাবধানে চলার পরামর্শ দিয়েছেন সাভারের বেদেপল্লীর একজন সাপুড়ে রমজান আহমেদ। তিনি বাড়িঘর এবং আঙ্গিনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও শুষ্ক রাখার পাশাপাশি রাতের বেলা অন্ধকারে চলাচল না করার পরামর্শ দেন।
সাপ সংরক্ষণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় সাপের খামার তৈরির পাশাপাশি এদের না মেরে আশেপাশের সাপুড়েদের খবর দেয়ার কথাও তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালির্ফোনিয়াভিত্তিক পিএলএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজেস সাময়িকীতে ২০১০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে ১শ মানুষ বিষধর সাপের দংশনের শিকার হন। তবে এতে মারা যাওয়ার ঘটনা প্রায় নেই বললেই চলে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ এসব অঞ্চলগুলোয় সাপের উপদ্রব বেশি। মে, জুন ও জুলাই এই তিন মাসে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সকাল ও সন্ধ্যায় সাপে বেশি কামড়ায় বলে গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন।
সুত্র: বিবিসি বাংলা

ইরান নিয়ে যুদ্ধ কি আসন্ন?

ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর, ইরান সেখানকার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করে। সমর্থন জোগায় ইরাকি রাজনৈতিক দলগুলোকে। আরব বসন্ত যখন শুরু হলো, তখনও সিরিয়া ও ইয়েমেনে যোদ্ধা পাঠালো ইরান। সেখানকার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিল। সিরিয়ায় যখন বছরের পর বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে, ইরান সেখানে সুযোগ বুঝে নিজস্ব সামরিক অবকাঠামো বানিয়ে নিল। ২০১৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে যেই প্রস্তাব দিলেন, সেটি ছিল দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। পারমাণবিক প্রকল্প বন্ধ করার বিনিময়ে কঠোর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের সুযোগ।
কিন্তু এখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, ইসরাইল ও সুন্নি আরব শাসকেরা পাশার দান পালটে দিতে চান। গেল সপ্তাহে ট্রাম্প ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ইরানের ওপর পুনরায় মার্কিন অবরোধ আরোপ করেছেন। এমনকি ইরানকে আরও শাস্তি দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন তিনি।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইরানের ‘ক্ষমতা পরিবর্তনে’র আলোচনা ফের জমে উঠেছে। ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ইরানকে ‘শয়তানের অক্ষে’র অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেবারের পর থেকে ইরানে ক্ষমতা পরিবর্তনের গুঞ্জন এখনের মতো জোরালো কখনোই হয়নি।
পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নাক গলানো কমেনি বলে মনে করেন ট্রাম্প ও তার মিত্ররা। কিন্তু চুক্তি অকার্যকর করেও ইরানকে বিরত রাখা যাবে কিনা, তা মোটেই স্পষ্ট নয়। মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস এক সংবাদ বিশ্লেষণীতে এসব বলেছেন। ইরানের রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর এক নেটওয়ার্ক, যেটি ইরানের স্বার্থ রক্ষা করে। ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে সরে গেলেও, ইরান-সমর্থিত রাজনৈতিক দলগুলো লেবানন ও ইরাকের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লড়ছে। ইয়েমেনে ইরান-অনুগত বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নিত্য ব্যালিস্টিক মিশাইল নিক্ষেপ করছে। একসময় যেই দেশটিকে বুশ বলেছিলেন ‘শয়তানের অক্ষ’, সেই ইরান এখন গড়ে তুলেছে ‘প্রতিরোধের অক্ষ।’ ইরাক থেকে শুরু করে সিরিয়া ও লেবানন জুড়ে এই অক্ষের বিস্তার। ইরানি বাহিনী বা দেশটির সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন কার্যত ইসরাইল ও সৌদি আরবের দোরগোড়ায় অবস্থান করছে। এই দুই দেশই মূলত ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জোট গড়ে উঠেছে। দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন ঐক্যবদ্ধ। এই দেশগুলো হয়তো এই মুহূর্তে ইরানের শক্তিমত্তাকে চ্যালেঞ্জ করতে যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সামর্থ্য সীমিত।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দ্বিধান্বিত যুক্তরাষ্ট্র। সিরিয়ায় কিছু সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি চান সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’র বিরুদ্ধে লড়াইরত প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে।
অপরদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক বছরে অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনতে শ’ শ’ কোটি ডলার খরচ করেছে। কিন্তু এসব অস্ত্র কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ব্যাপারে দেশগুলোর সক্ষমতা এখনও প্রমাণসিদ্ধ নয়। যেমন, ইয়েমেনে ইরান-অনুগত বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইকে এই আরব দেশগুলো এত জটিল করে ফেলেছে যে তারা সেখান থেকে না পারছে সরে আসতে, না পারছে আক্রমণ চালিয়ে যেতে। অপরদিকে অর্থ সহায়তা নির্ভর কূটনীতির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফলে লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে এই আরব দেশগুলোর প্রভাব বেশ সীমিত। অথচ, নানা ধরণের সৃজনশীল উপায় অবলম্বন করে বহু কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। এসব সম্পর্ক বজায় রাখতে বিপুল অংকের সামরিক ব্যয় প্রয়োজন হচ্ছে না দেশটির।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউটের বিশ্লেষক রান্ডা ¯ি¬ম বলেন, ‘শুধু টাকা দিয়েই নেটওয়ার্ক গড়া যায় না। আদর্শ ও নিজ লোকবল যুক্ত করতে ইরানের সদিচ্ছাও এখানে বড় বিষয়। সৌদিদের কাছে এই সরঞ্জাম নেই।’
বাকি থাকে খালি ইসরাইল। দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আছে। তবে আরব দেশগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্যে মিত্রতা তৈরি করার সামর্থ্য দেশটির সীমিত। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলের আচরণের কারণে দেশটি এখনও এই অঞ্চলে ঘৃণিত। ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর উত্তেজনা তুঙ্গে উঠার সর্বশেষ ঘটনা ঘটে বৃহস্পতিবার। ওইদিন সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানি বাহিনী প্রথমবারের মতো ইসরাইলের দিকে একগুচ্ছ রকেট ছুড়ে। প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান সিরিয়ার বিভিন্ন ইরানি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান বা ইসরাইল কেউই পুরোমাত্রার যুদ্ধ চায় না। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ খুব দ্রুতই পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে যেতে পারে। তবে সামগ্রিক যুদ্ধের সম্ভাবনা ঝুঁকি এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রধান ক্লিফ কাপচ্যান বলেন, ‘আমরা হয়তো আগামী একমাস বা তারও কিছু সময়ের জন্য ঠিকই থাকবো। তবে কাঠামোগতভাবে আমাদের বড় ধরণের সমস্যা আছে। ইরান চায় সিরিয়ায় সামরিক স্থাপনা তৈরি করতে। আর ইসরাইল তীব্রভাবে তা হতে দিতে চায় না। এটি হলো গুরুতর কোনো দীর্ঘমেয়াদী সংকটের পূর্বচিত্র।’
সিরিয়া, ইরাক, লেবানন সহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রায়ান সি ক্রোকারও এই উদ্বেগের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত যত সংঘাত দেখেছি, তার চেয়ে অনেক বড় লড়াইয়ের সত্যিকার সম্ভাবনা রয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে ইসরাইল। এ থেকে কি ভালো কিছু আসবে? মোটেই নয়।’
ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি ও বহুমুখী আক্রমণ হলে ইরানকে হয়তো আত্মরক্ষায় বেগ পেতে হবে। শিয়া-নেতৃত্বাধীন দেশটি মূলত সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যপ্রাচ্যে জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু। ১৯৭৯ সালে বিপ্লবী ইসলামি সরকার ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা একঘরে। পশ্চিমা সমরাস্ত্র পাওয়ার কোনো উপায় দেশটির নেই। আর অর্থনীতি দুর্বল হওয়ায়, দেশটির প্রতিপক্ষরা গতানুগতিক অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে অনেক এগিয়ে।
ইরান জানে গতানুগতিক অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে গোটা অঞ্চলজুড়ে আধা-রাষ্ট্রীয় কিছু সংগঠন তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছে ইরান। এসব সংগঠন মূলত ইরানের মতোই শিয়া ধর্মাবলম্বী।
এই কৌশলের আদর্শ নমুনা ছিল হিজবুল্লাহ। আশির দশকের শুরুর দিকে লেবাননে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিলেন ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা। হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের মাধ্যমে আক্রমণের উপায় তৈরি করে নিয়েছে ইরান। এছাড়া পরবর্তীতে লেবাননের রাজনীতিতেও ইরানের প্রভাব তৈরি হয় হিজবুল্লাহর মাধ্যমে। এখন হিজবুল্লাহ নিজেই স্বগুণে একটি আঞ্চলিক শক্তি।
বৈরুতের লেবানিজ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক বাসেল এফ সালুখ বলেন, ‘ইরানকে আমরা যতটা শক্তিশালী মনে করি ততটা তারা নয়। দেশটির অর্থনীতি বেশ দুর্বল। চারপাশ থেকে ঘিরে থাকা একটি দেশ। ফলে নিজেকে রক্ষা করতে হলে ক্ষমতা প্রসারিত করতে হয় দেশটির। এই কৌশল খুব ভালো কাজে দিয়েছে। তাই একই কৌশল তারা বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োগ করছে।’
ইরানের ক্ষমতার আরেকটি উপাদান হলো পারমাণবিক বোমা নির্মাণে দেশটির আকাঙ্খা ও সামর্থ্য। তবে ইরান সবসময়ই পারমাণবিক বোমা নির্মাণের দাবি অস্বীকার করেছে। ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী, ইরান কখনই পারমাণবিক বোমা নির্মাণ বা নির্মাণ করার আকাঙ্খা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আমেরিকা চুক্তি থেকে সরে গেলেও ইরান চুক্তি মেনে চলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্তই করেছে।
গতানুগতিক যুদ্ধ হলে ইরানকে তার আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের নেটওয়ার্ক রক্ষা করতে পারবে না। তবে তারা প্রতিপক্ষের চরম ক্ষতি করতে পারবে।
উদাহরণস্বরূপ, ইরান সরাসরি হিজবুল্লাহর মাধ্যমে ইসরাইলে আক্রমণ করতে পারবে। ধারণা করা হয়, হিজবুল্লাহর হাতে এক লাখেরও বেশি মিসাইল ও রকেট রয়েছে। এদের বেশিরভাগই ইসরাইলের বড় বড় শহর ও সংবেদনশীল অবকাঠামোয় হামলা চালাতে সক্ষম। অপরদিকে ইয়েমেনে ইরান অনুগত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবকে খুবই ব্যয়বহুল এক যুদ্ধে বেধে ফেলেছে। তার ওপর সৌদি আরবের বড় শহরগুলো এখন মিসাইল হামলার ঝুঁকিতে। এসব আধা-রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোকে সামরিক পন্থায় পরাজিত করা কঠিন। এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে হলো দেশগুলোকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা। আর এই অস্থিতিশীলতাকেই ইরান নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত বাধার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো সিরিয়া। তবে দুই পক্ষই বলছে যুদ্ধ তারা চায় না। পরিস্থিতি যাতে আরও অবনতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষই দৃশ্যত কাজ করছে। যেমন, সিরিয়ায় ইসরাইল যতবার হামলা করেছে, ততবারই শুধু সমরাস্ত্রকে টার্গেট করেছে, মানুষকে নয়। কারণ, ইসরাইলের আশঙ্কা বেশি মানুষ এসব হামলায় মারা গেলে ইরান পালটা জবাব দিতে চাপ বোধ করবে। ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত সীমিত। বৃহস্পতিবার ইরান যেসব রকেট হামলা চালিয়েছে সেগুলোর টার্গেট ছিল ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা, কোনো বেসামরিক শহর নয়।
ইরানের প্রভাব হ্রাস করতে যেসব প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, সেসব দেশটি কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা স্পষ্ট নয়। ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকে চান যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলেও পারমাণবিক চুক্তি বহাল থাকুক। তবে কেউ কেউ চান সংঘাত। গত সপ্তাহে ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর উপ-প্রধান হোসেন সালামি বলেন, ‘এসব শত্রুকে মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো প্রতিরোধ, কূটনীতি নয়। চুক্তি থেকে প্রস্থান বা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ হলো আমাদের দেশকে অসাড় করার অজুহাত।’

শেখ হাসিনা-মোদি-মমতা বসছেন, চোখ থাকছে তিস্তায়!

বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির একটি যৌথ আলোকচিত্র গণমাধ্যমে যে বিশেষ জায়গা করে নেবে তা এখন নিশ্চিত। আর সেখানে সবাইকে ছাপিয়ে যেতে পারে তিস্তা। আগামী ২৫শে মে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী কলকতায় যাচ্ছেন। একই দিনে কলকতায় থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
দি হিন্দু, ইন্ডিয়া টুডেসহ অনেক ভারতীয় পত্রিকা ইদানীং শেখ হাসিনা-মোদির প্রস্তাবিত শীর্ষ বৈঠকের খবর ও বিশ্লেষণ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপছে, তারাই গুরুত্বের সঙ্গে তিস্তা বিষয়েও খবর দিচ্ছেন। এমনকি আগে দেখা যায়নি, এবারে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, তারা স্মরণ করছেন যে, নরেন্দ্র মোদি এর আগে বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের চলতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিস্তাচুক্তি হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত বছরের ভারত সফরে মোদি ওই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
গত ৮ই মে দি হিন্দুতে মিজ গীতা মোহন  লিখেছেন, ‘একটি সূত্র এমনকি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, চুক্তি সই হওয়াটাই বড়, পানির পরিমাণ কী হবে সেটা নয়। ওই সূত্রটি মোদির দেয়া প্রতিশ্রতির বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল। তারা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে মা ঘামাতে চায় না। ‘তিস্তা ইজ অ্যা ম্যাটার অব মাইন্ডসেট’ (তিস্তা একটি মনমানসিকতার বিষয়), বাংলাদেশেরই কেউ একজন ওই মন্তব্য করে বলেছেন, তিস্তা আগামী নির্বাচনে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে।’
অন্যদিকে দি হিন্দুর ওই প্রতিবেদন আরো বলেছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জেরবার শেখ হাসিনা সরকারকে এখন যদি আসাম থেকে ‘বাংলাদেশি’ উদ্বাস্তু গ্রহণ করতে হয়, তাহলে সেটা শেখ হাসিনার সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়াতে পারে। এরকম একটি সংবেদনশীল ইস্যু বাংলাদেশের ভোটের পরে ডিল করতে হবে। ভারতীয় বিদ্রোহ দমনসহ নানা বিষয়ে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে যতো সুবিধা পেয়েছে সেটা শেখ হাসিনার নির্বাচনী বছরে কড়ায়গণ্ডায় ফিরিয়ে দেওয়ারই এটা সময়। হিন্দু আরো লিখেছে, বাংলাদেশ আশা করে যে, ভারত এটা বিবেচনায় নেবে যে, বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি ক্ষমতায় এলে কী হবে। একটি উচ্চ পর্যায়ের সূত্র বলেছে, এতদিনের যা অর্জন সবটাই গুবলেট হবে আর পাকিস্তানিরা আবারও অভয়ারণ্য গড়ার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশে চীনের বর্ধিষ্ণ প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশ অবশ্য এটা স্পষ্ট করেছে যে, তারা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডে যোগ দিয়েছে দেশের স্বার্থে, কিন্তু তারা ভারতের জন্য কোনো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে- এমন কিছুতে তারা যাবে না।
অন্যদিকে ইন্ডিয়া টুডেতেও ওই একই মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এতে লেখা হয়েছে, ‘মোদি যদি চীনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী কেন পারবেন না। দেশের স্বার্থে মোদি চীন গেছেন। বাংলাদেশের স্বার্থে শেখ হাসিনা চীন গেছেন। দি হিন্দুর ভাষ্যকার লিখেছেন, বাংলাদেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করে যে, পরস্পরের পাশে থাকাতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার এবং প্রতিবেশী রাজনীতিতে একটি ‘টিনা’ (দেয়ার ইজ নো অল্টারনেটিভ) ফ্যাক্টর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে ভারতের দরকার।’’
নয়া আশাবাদ: গতকল মিরেনিয়ান মপোটডট ইনের খবর অনুযায়ী শেখ হাসিনা-মোদি প্রস্তাবিত আকর্ষিক শীর্ষ বৈঠককে কেন্দ্র করে তিস্তাচুক্তি নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা আশাবাদী যে, নরেন্দ্র মোদি যে কলকাতায় দ্বিপক্ষীয় সভায় বসতে রাজি হয়েছেন, তাতেই একটা বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। সুতরাং তিন নেতা-নেত্রীর সম্ভাব্য যৌথ আলোকচিত্র শান্তিনিকেতনে শুধুই বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের খবর হিসেবে ছাপা হওয়ার মধ্যেই যে সীমিত থাকছে না, তা প্রকারান্তরে পরিষ্কার করেছে ভারতীয় ওয়েবসাইট মিলেনিয়ান পোস্ট।
আগামী ২৫শে মে কলকাতায় শেখ হাসিনা ও মোদির মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ বকেয়া দ্বিপক্ষীয়’ ইস্যু নিয়ে বৈঠক হবে। বৈঠকটির স্থান নির্বাচন করা হয়েছে বিশ্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য ঐতিহাসিক শান্তিনিকেতনে। ২৫শে মে দুই প্রধানমন্ত্রী দুই কারণে হাজির হচ্ছেন। তবে কুশলী কূটনীতির কারণে দুটি আলাদা উপলক্ষ এখন চাপা পড়ে যাবে, সাইডলাইনের শীর্ষ বৈঠকে। শেখ হাসিনা ২৫শে মে উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ ভবন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক সেদিনটিতেই শান্তিনিকেতনের সমাবর্তনে উপস্থিত থাকবেন, শান্তিনিকেতনের উপাচার্য হিসেবে।
বাংলাদেশের অর্থায়নে শান্তিনিকেতন চত্বরে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ ভবন। সেই ভবন উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী। ২৫শে মে সকালে শেখ হাসিনা পৌঁছাবেন এবং পরদিন সন্ধ্যায় কলকাতা ত্যাগ করবেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জোরদারে তাগিদ দেবে ঢাকা: জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক কাল

প্রায় ৪ মাস বিরতির পর কাল জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের দ্বিতীয় বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। ঢাকায় হবে সেই বৈঠক। বৈঠকে যোগ দিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল আজ বাংলাদেশে পৌঁছবে। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতেই পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হবেন তারা। গত বছরের নভেম্বরে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। চুক্তি সইয়ের পর প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখনো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এ অবস্থায় আজকের বৈঠকটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বৈঠক সংশ্লিষ্টরা এটা নিশ্চিত করেই বলছেন যে, কালকের বৈঠকে বাংলাদেশের মূল ফোকাসে থাকছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জোরদার করা। এ নিয়ে ঢাকার তরফে জোর তাগিদ থাকছে। তাছাড়া রাখাইনের আগস্ট পরবর্তী নৃশংসতার অভিযোগে সেখানকার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির বিষয়টিও বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট আলোচিত। যদিও মিয়ানমার সরকার বরাবরই তাদের নিরাপত্তা  বাহিনীর অভিযুক্ত লোকজনকে জবাবদিহিতে আনার প্রসঙ্গটি এড়িয়ে চলছে। ঢাকার বৈঠকে প্রত্যাবাসন চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার বিষয়টি যেমন আসবে তেমনি রাখাইনে নৃশংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারেরও তাগিদ দেয়া হবে। যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যায়। এ বিষয়ে জেডব্লিউজি’র দায়িত্বশীল এক সদস্য বলেন- ‘প্রত্যাবাসনের জন্য যেসব কাজ করা দরকার, বাংলাদেশ চুক্তি সইয়ের পর থেকে সেগুলো করেছে। সর্বশেষ ইউএনএইচসিআরকে যুক্ত করা হয়েছে। মিয়ানমারকে তালিকা দেয়া হয়েছে। আবার বর্ষাকে সামনে রেখে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপই নিচ্ছে বাংলাদেশ। এখনো রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সহায়ক পরিবেশ ফিরিয়ে, প্রত্যাবাসন টেকসই করার দায়িত্ব মিয়ানমারের। ঢাকার বৈঠকে মিয়ানমারকে তাদের সেই দায়িত্বের কথা স্মরণ করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুততর এবং জোরদার করার কথাই বলা হবে। অন্য এক কর্মকর্তা বলেন- রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানো শুরুর জন্য ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারকে আট হাজারের বেশি লোকের তালিকা দেয়ার পর দেশটি তিন মাস ধরে সাত ধাপে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৮৭৮ জনকে গ্রহণে সম্মতি দিয়েছে। সীমান্তের ওপারে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর পরিবেশ হয়েছে কিনা, সেটাও নিশ্চিত নয়। এমন এক পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা মতে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) আজকের বৈঠকটি হচ্ছে। তাছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে রোহিঙ্গা নির্যাতনের তদন্তের বিষয়টি আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটেও কালকের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ঘুরে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরজমিন দেখার পর গত সোমবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। তবে সেখানেও কোন রেজুলেশনের বিষয়ে একমত হতে পারেননি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য গত বছরের ২৩শে নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি সই করে। ওই চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর থেকে পরের কয়েক মাস এবং গত বছরের ২৫শে আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়। সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর ৮৭ হাজার এবং ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্টের পর থেকে ৬ লাখ ৯২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। সংখ্যায় কম হলে এখনো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। ২৩শে নভেম্বর সই হওয়া চুক্তির ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তত্ত্বাবধানের জন্য পরের মাসে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের নেতৃত্বে জেডব্লিউজি গঠন করা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের নেপিডোতে জেডব্লিউজির প্রথম বৈঠক হয়। আর প্রত্যাবাসনের কাজে সহায়তার জন্য জানুয়ারি এবং এপ্রিলে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সঙ্গে দুটি আলাদা সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ। গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের সময় প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের কাছে ৮ হাজার ৩২ জনের তালিকা পাঠায় বাংলাদেশ। দফায় দফায় ওই তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের পর এক হাজারের কম ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে। তবে কখন কীভাবে তাদের গ্রহণ করতে চায় বা আদৌ গ্রহণ করতে চায় কি-না সেটি না স্পষ্ট করেই তালিকায় অসম্পূর্ণ তথ্য থাকার ধুয়া তুলে বাংলাদেশের সমালোচনায় মুখর রয়েছে বর্মী কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাতেও বাংলাদেশ বসে নেই। শরণার্থী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে- তালিকা যাচাই-বাছাই’র পাশাপাশি প্রত্যাবাসন কেন্দ্রসহ অন্যান্য কাজও এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে নৌপথে প্রত্যাবাসনের জন্য টেকনাফের কেরনতলীতে একটি কেন্দ্র নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া স্থলপথে প্রত্যাবাসনের জন্য বান্দরবানের গুমদুমে জমি অধিগ্রহণসহ প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। কালকের বৈঠকে আরেক দফা একটি (নতুন) তালিকা হস্তান্তরের প্রস্তুতি রয়েছে ঢাকার।

শ্রীমঙ্গলে চায়ের প্রথম নিলাম: এক কেজি চা পাতা ১১ হাজার টাকা

শ্রীমঙ্গলে আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্রে  প্রথমদিনেই প্রথম নিলাম ডাকে ৫০ গুণ বেশি দামে প্রতি কেজি ১১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ‘গোল্ডেন ব্রোকেন ওনেন্স পিকো’ বা ‘জিবিওপি’নামে বিশেষ প্রকারের এই চায়ের প্রতি কেজির নিলাম-বাজার মূল্য ছিল ২২০ টাকা। এর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এমএম ইস্পাহানি।
শ্রীমঙ্গলের চা নিলামে সজ্জিত করে রাখা বিভিন্ন গ্রেডের চা সোমবার সকাল সাড়ে আটটায় শ্রীমঙ্গল অকটন সেন্টারের সর্ব প্রথম নিলাম ডাকে ওঠে ইস্পাহানির এই জিপিওপি গ্রেডের চা। ‘বিট’ (দর হাঁকানো) করে এই চায়ের দাম এক লাফে পৌঁছে যায় কেজি প্রতি ১০ হাজারে। সঙ্গে সঙ্গে এমএম ইস্পাহানি কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মির্জা সালমান ইস্পাহানি হাত উঁচু করে ১১ হাজার দাম হাঁকেন। এই মূল্যের উপর আর কোনো বায়ার ডাক না দেয়ায় কেজি প্রতি ১১ হাজারে কিনে নেয় এমএম ইস্পাহানি।
ইস্পাহানি সূত্র জানায়, বিশেষ প্রকারের এই চা একেকটি বস্তায় ৫৫ কেজি করে চা থাকে। ৫৫ কেজি বস্তার পুরো ১০ হাজার বস্তাই কিনে নেয় ইস্পাহানি। তারাই এই চায়ের উৎপাদক এবং তারাই এই চায়ের ক্রেতা।  জানতে চাইলে ইস্পাহানি কোম্পানির জেরিন চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. সেলিম রেজা বলেন, শ্রীমঙ্গলের অকশন হাউজের প্রথম অকশনে প্রথম ডাকটি হলো আমাদের কোম্পানির জিবিওপি গ্রেডের এই চা। চায়ের ইতিহাসের স্মৃতি হয়ে থাকতেই মূলত: আমাদের চেয়ারম্যান স্যার এই দামে চা কিনে নিয়েছেন।  ইস্পাহানির ‘গোল্ডেন ব্রোকেন ওনেন্স পিকো’ বা ‘জিবিওপি’ গ্রেডের এই চায়ের ফ্লেভার (ঘ্রাণ) এবং টেস্টে (স্বাদ) দু’টিই চমৎকার। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এক চা বলে জানান জেরিন চা বাগানের টি-প্ল্যান্টার মো. সেলিম রেজা। এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় সিলেটবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত এ কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আর মুস্তাহিদুর রহমান পিএসসি নিলামডাকের উদ্বোধন করেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে এমএম ইস্পাহানি চা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মির্জা সালমান ইস্পাহানি, ফিনলে টি’র চিফ অপারেটিং অফিসার এএম শামসুল মহিত চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন ।
শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত টি প্ল্যান্টার অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিপিটিএবি) উদ্যোগে এ কার্যক্রম চলছে। নিলামের শুরুতেই ইস্পাহানির জেরিন চা বাগানের প্রতি কেজি ১১ হাজার টাকা দরে কিনে নেন ইস্পাহানি চা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মির্জা সালমান ইস্পাহানি। এই দরে ২২০নং লটে ৫৮৪ কেজি ৫শ’ গ্রাম চা কিনে নেন তিনি। দুপুর ১টা নাগাদ পৌনে ৫ লাখ কেজি চা পাতা প্রায় ১২ কোটি টাকায় বিক্রি হয়। চা নিলাম কার্যক্রমে ন্যাশনাল ব্রোকার্স, পূর্ববাংলা ব্রোকার্স, কেএস ব্রোকার্স, প্রোডিউস ব্রোকার্স, প্রোগ্রেসিভ ব্রোকার্স, ইউনিটি ব্রোকার্স এবং প্লান্টার ব্রোকার্স অংশ নেয়।  দুপুর ২টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তর থেকে শ্রীমঙ্গল নিলাম কার্যক্রমের অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

সিলেটে নিখোঁজের ৩ দিন পর জব্বারের লাশ উদ্ধার

ফজরের নামাজের পর হাঁটতে বের হয়েছিলেন সিলেটের শেখঘাটের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার। আর বাসায় ফিরেননি তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। গতকাল দুপুরে সিলেটের টুকেরবাজারের সুরমা নদীতে মিললো জব্বারের লাশ। মৃতদেহ স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় জেলেরা লাশ দেখে তীরে নিয়ে আসেন। লাশ উদ্ধারের পর মাতম চলছে জব্বারের বাড়িতে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, খুন করে সুরমায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে জব্বারের লাশ। নগরীর শেখঘাট পয়েন্টের কাছেই আব্দুল জব্বারের বাসা। কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক তিনি। দুই ছেলেই বসবাস করেন প্রবাসে। সম্পত্তির কারণেই আব্দুল জব্বারকে খুন করা হতে পারে এমন ধারণা এলাকাবাসীরও। সিলেট নগরীর শেখঘাটের জিতু মিয়ার পয়েন্টের কাছে মঈনুন্নেছা স্কুল রুটের সওদাগরটুলা এলাকার শুভেচ্ছা ৬৭ নম্বর বাসার বাসিন্দা আব্দুল জব্বার। মরহুম ডা. সাজিদ আলী বড় ভুঁইয়ার ছেলে তিনি। শেখঘাটে ব্রিজ করার সময় তাদের জমি সরকার থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এতে করে টাকাও পান আব্দুল জব্বারের পরিবার। জমি অধিগ্রহণের পর তারা রাস্তা লাগোয়া স্থানে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। ৮-১০টি দোকান রয়েছে তাদের। ওসব দোকান ছাড়াও রয়েছে প্রচুর সম্পত্তি। আব্দুল জব্বার খুব সাদাসিধে জীবনের অধিকারী ছিলেন। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায় করতেন। সবার সঙ্গে সখ্যতা ছিল। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- রোববার প্রতিদিনের মতো ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে আসেন আব্দুল জব্বার। তিনি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ থেকে বেরিয়ে বাসায় ঢোকার চেষ্টা করেন। ওই সময় তার সঙ্গে মুসল্লিরা ছিলেন। কিন্তু বাসার দুটি প্রধান গেট বন্ধ থাকার কারণে তিনি ভেতরে ঢুকতে পারেননি। এরপর হাঁটতে বের হন। প্রায় সময় তিনি কাজীরবাজার সেতুর ওপর হাঁটাহাঁটি করতেন। আবার কখনো কখনো রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতেন। তবে, ১৫ মিনিট হাঁটার পর তিনি বাসায় ফিরতেন। রোববার সকালে একা একা হাঁটতে বের হয়ে নিখোঁজ হন আব্দুল জব্বার। পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা ঘুম থেকে উঠে দেখেন জব্বার নেই। তার খোঁজ করেন শেখঘাট পয়েন্টে। কিন্তু পাওয়া যায়নি। এরপর পরিচিত আত্মীয়-স্বজনের বাসায়ও তার খোঁজ করা হয়। কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি। কোথাও না পেয়ে এ ঘটনায় তার বড় ভাই মো. আব্দুর রাজ্জাক কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি জিডি (নং ৮৭৮, ১৩ই মে ২০১৮) করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, আব্দুল জব্বার প্রতিদিনের মতো ফজরের নামাজ পড়তে বের হন। পরে দীর্ঘ সময় ধরে বাসায় না ফেরায় স্বজনরা আত্মীয়দের বাসায় খোঁজ নেন। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ আব্দুল জব্বারের খোঁজ পাওয়া গেলে ০১৭৪৬-০৪৭২২১ এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানিয়েছেন তার স্বজনরা। আব্দুল জব্বার বড় ভুইয়ার খোঁজ চালায় পুলিশও। কিন্তু পাওয়া যায়নি। এদিকে, গতকাল দুপুরে শহরতলীর টুকেরবাজারে সুরমা নদীতে আব্দুল জব্বার বড় ভুইয়ার লাশ ভেসে যেতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। তারা লাশটি তীরে ভিড়িয়ে আনেন। খবর পেয়ে সিলেটের জালালাবাদ থানা পুলিশ সেখানে যায়। লাশ ভেসে যাওয়ার খবর শুনে শেখঘাট থেকে টুকেরবাজারে যান আব্দুল জব্বারের স্বজনরা। তারা গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। শেখঘাট এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন জানান, আমরা গিয়ে লাশ শনাক্ত করি। লাশ তেমন বিকৃত হয়নি। পুরোপুরি চেনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের জানা মতে তার সঙ্গে কারো শত্রুতা নেই। কেউ তাকে খুন করতে পারে সেটি আমরা কল্পনা করতে পারছি না। সিলেটের জালালাবাদ থানার ওসি জানিয়েছেন, তারা লাশ উদ্ধারের সময় সুরতহাল রিপোর্ট করেছেন। এ সময় তারা লাশের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাননি। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি হত্যা না অন্য কিছু পরিষ্কার হবে বলে জানান তিনি। এদিকে, লাশ উদ্ধারের পর আব্দুল জব্বারের বাড়িতে মাতম চলছে। পিতা নিখোঁজের খবর পেয়ে তার বড় ছেলে আজমান সাউথ আফ্রিকা থেকে দেশের পথে রয়েছেন।

খুলনায় নির্বাচনের নতুন মডেল: এটাই ভোট by রাশিদুল ইসলাম, রোকনুজ্জামান পিয়াস ও আবদুল আলীম

বাবার সঙ্গে ভোট দিয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে। কেন্দ্রের বাইরে লাইন। ব্যালট পেপার শেষ। আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে, বাড়ি চলে যান- সবচেয়ে কমন ডায়ালগ। জাল ভোটের রীতিমতো উৎসব। বাধা দেয়নি কেউ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহায়ক ভূমিকায়।
এমনই এক অভূতপূর্ব  ভোটের সাক্ষী হলো খুলনা। গায়েবি ভোটের নয়া মডেলও বলা চলে। হানাহানি নেই, রক্তপাত নেই। ভোটের আগে থেকেই নানা গুজব ছিল মুখে মুখে। সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন প্রার্থী এবং ভোটাররা। নির্বাচনের দিন গুজব আর শঙ্কারই বাস্তবচিত্র দেখা গেল ভোটে। দখল আর অনিয়মের কারণে তিন কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত রাখলেও বাকি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে অন্তত ১৫০ কেন্দ্র দখল করে একতরফা নৌকা প্রতীকে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ করেছে বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের আগে খুলনার নির্বাচন অনেকটা অগ্নিপরীক্ষা ছিল নির্বাচন কমিশনের জন্য। নির্বাচন শেষে গতকাল গণমাধ্যমের সামনে আসেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। কমিশন সচিব নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অন্তত এ নির্বাচনটি শতভাগ সুষ্ঠু করে কমিশন বিরোধী পক্ষের আস্থা অর্জন করতে পারতো। এখন তাদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে খুলনার নির্বাচনে দৃষ্টি ছিল সারা দেশের। নির্বাচনের ফলের চেয়ে নির্বাচন কেমন হবে এটি নিয়ে উৎসাহ ছিল বেশি। দিনের শেষে নির্বাচনের ফল দেখে হতাশ হয়েছেন অনেকে।
নানা অভিযোগে কারণে ২৪নং ওয়ার্ডের ২০২নং ইকবাল নগর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, ৩১নং ওয়ার্ডের ২৭৭নং লবণচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একই ওয়ার্ডের ২৭৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়  কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয় বলে জানান রিটার্নিং অফিসার মো. ইউনুচ আলী। এদিকে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন দুপুরের পরই আমরা রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দিয়েছি ৬৯টি কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকায় সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। শতাধিক কেন্দ্রে   ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতির আরেকটি নমুনা জাতি দেখতে পেল। অপরদিকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক দাবি করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিুপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।
সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে নগরীর জিলা স্কুল কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্ট আলী আকবরকে মারধর করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বিকুর সমর্থকরা। পরে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া একই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বিকুর ছোট ভাই কাজী বেলায়েত হোসেন নতুনবাজার হাজী আবু হানিফ কেরাতুল কোরআন নূরানী মাদরাসা কেন্দ্রে ধানের শীষের কোনো এজেন্ট ঢুকতে দেননি। খুলনা জিলা স্কুল কেন্দ্রের আটটি বুথেও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ধানের শীষের কোনো এজেন্টকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এসব কারণে ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট বাতিলের লিখিত আবেদন করেছেন কাউন্সিলর প্রার্থী মো. মাহবুব কায়সার। মঙ্গলবার ভোটের দিন দুপুরে কেসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুস আলীর কাছে বিএনপি সমর্থিত এই কাউন্সিলর প্রার্থী অভিযোগ দাখিল করেন। ৩টার দিকে নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে কেন্দ্র দখল করে নেয় বলে স্থানীয়রা জানান। এরপর তারা ব্যালট পেপার ছিনিয়ে সিল মেরে বাক্স ভরে। এ ঘটনায় সাড়ে তিনটার দিকে ভোটগ্রহণ সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ২০৫ নম্বর ভোটকেন্দ্র সোনাপোতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের ভোটকক্ষে বসে সিগারেট খেতে দেখা যায়।
এ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধায় তারা ফিরে যায়। কিছু সময় পরে তারা এসে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়। ঢাকা থেকে আসা একটি জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিককে ২৪নং ওয়ার্ড নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা জালভোট দিতে অনুরোধ জানান। খালিশপুর থানার ১১নং ওয়ার্ডে জামিয়াহ তৈয়্যেবাহ নূরানী তালিমুল কোরআন মাদরাসা কেন্দ্র থেকে সহোদর সিরাজকে কুপিয়ে আহত এবং আলমকে মারধর করা হয়। তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই কেন্দ্রে দুপুর ২টার দিকে নৌকা প্রতীকের লোকজন প্রকাশ্যে সিল মারে। এ ছাড়া এ ওয়ার্ডে জামিয়া ইসলামিয়া আশরাফুল উলুম বয়স্ক মাদরাসা কেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী জামান মোল্লা জেলিনের এজেন্ট আসাদ ও হাবিবকে সকালেই কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। বেলা ২টা থেকে নৌকা প্রতীকের ব্যাজ পরিহিত ভোটার ছাড়া অন্য কোনো ভোটারকে নগরীর ১১নং ওয়ার্ডের প্লাটিনাম মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। তারা কেন্দ্রে ঢুকে এক একজন ৪/৫টি করে ভোট দিয়ে বের হয়ে এসেছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে।
১০নং ওয়ার্ডের বঙ্গবাসী ও মওলানা ভাসানী স্কুল কেন্দ্রটি দুপুরের পর থেকে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা ধানের শীষের প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারে বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ডি আলী ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-২৩৭ নম্বর কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় অভিযোগ করেন বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হাসান মেহেদি রেজভী ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাজেদা খাততুন। তারা বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ব্যালটে সিল মেরে তা বাক্সে ফেলছে। অনেক ভোটার এসে বিমুখ হয়ে ফিরে গেছেন।’
কাউন্সিলর প্রার্থী হাসান মেহদী রিজভী অভিযোগ করে বলেন, ‘ভোটারদের ভোট দিতে দেয়া হচ্ছে না। আমাদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে আওয়ামী প্রার্থীর লোকের নৌকায় সিল দিচ্ছে।’ একই অভিযোগ করে সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর প্রার্থী মাজেদা খাতুন বলেন, ‘অভিযোগ করায় আমাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। ভোট কারচুপি হচ্ছে। তা নিয়ে আমাদের কোনো কথাও বলতে দেয়া হচ্ছে না।’
নগরীর বেলা ১১টার সময় ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সময় রূপসা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫নং বুথের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা উজ্বল কুমার পাল একটি কেন্দ্রে জাল ভোট দিতে বাধা দেয়ার পর তাকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকরা হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ ৫/৭ জন লোক এসে ব্যালট পেপার কেড়ে নেয়। পরে তারা নৌকায় সিল মারতে গেলে আমি তাতে বাধা দিয়েছি। এমনকি আমি সিল মারা ব্যালট পেপারগুলো বক্সে ভরতে দেইনি।’ তারা আমার নাম পরিচয় জেনে গেছে। ভোট শেষ হলে দেখে নেবে বলেছে। আপনাদের মিডিয়ার ভাইদের কাছে সাহায্য সহযোগিতা চাই।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে থাকা একশ’ ব্যালট পেপার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। যার সিরিয়াল নং ০০৪৫৮৪০১ থেকে ০০৪৫৮৫০১ পর্যন্ত। সেগুলো সিল মেরে বাক্সে দিতে দেইনি। আমি তাদের বাধা দিলে তারা আমাকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।’ এই ঘটনার পর এই কেন্দ্রটিতে ভোটগ্রহণ কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। পরে আবারও ভোট গ্রহণ করা হয়। পাশেই আরো একটি কেন্দ্রে জালভোট দেয়ার প্রমাণ পাওয়ার পর সেটিও দুই ঘণ্টা ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।
নগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের হাজী আবদুল মালেক ইসলামিয়া কলেজে জাল ভোট দেয়ার সময় দু’জনকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু আটকদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের এসআই বোরহান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, অসহায়। আপনাদেরই ভাই ব্রাদার। নাম বলে দিলে এখানে অনেক সমস্যা হবে। এ সময় নির্বাচনী দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেট সে কেন্দ্রে গেলেও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি তিনি।
বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত সমন্বয়ক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আটকদের ছেড়ে দেয়া হবে। এ জন্যই তাদের তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। এদিকে জাল ভোট দেয়ার সময় সোনাডাঙ্গা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু গণমাধ্যম সেখানে পৌঁছার আগেই তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এদিকে আবদুল মালেক ইসলামিয়া কলেজ কেন্দ্রের কয়েকটি গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যারা ভোট দিতে আসছেন তাদেরও ফেরত দেয়া হয়েছে ব্যালটের অভাবে।
৩১নং ওয়ার্ডের লবণচরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের পাশাপাশি প্রিজাইডিং অফিসারদেরও বের করে দেয় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের সমর্থকরা। তারা বুথের ভেতরে ঢুকে যখন সিল মারছিল তখন প্রিজাইডিং অফিসাররা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
২০নং ওয়ার্ডে এইচআরএইচ প্রিন্স আগাখান উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভোটারদের বের করে দিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মারে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
৪নং ওয়ার্ডে দেয়ানা উত্তরপাড়া কেন্দ্রে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা এবং বিএনপি কর্মী মিশুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৯নং ওয়ার্ড ইসলামাবাদ ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টকে মারধর করে প্রশাসনের সামনেই বের করে দেয় সরকার সমর্থকরা। পাইওনিয়ার স্কুল ভোটকেন্দ্র থেকেও প্রশাসনের সামনেই বের করে দেয়া হয়েছে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের। গল্ডামারি লায়ন্স স্কুল ও নিরালয় স্কুল কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের এজেন্টকে প্রশাসনের সামনে মারধর করে বের করে দেয়া হয়।
দুপুর দেড়টার দিকে কেএমপির সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত এলাকা ১৪নং ওয়ার্ডের পুলিশ লাইন স্কুল কেন্দ্রে পুলিশ বেষ্টিত অবস্থায় একযোগে প্রকাশ্যে নৌকা ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতীকে ছিল মারতে দেখা যায় বলে বিএনপির প্রার্থীরা অভিযোগ করেন। এ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মাহবুবুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন- এ কেন্দ্রে প্রতিটি বুথ থেকে একশ’টির মতো ব্যালটে সন্ত্রাসীরা সিল মারে।
বেলা ৩টার দিকে নগরীর ১৬নং ওয়ার্ডের নূর নগর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কেন্দ্র দখল করে নেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা নির্ধারিত সময় শেষ হ্‌ওয়ার পরেও নৌকা প্রতীকে সিল মারতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। খবর পেয়ে র‌্যাবের একটি টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তারা পালিয়ে যায়। এর আগে সকালে এসব কেন্দ্রে কোনো এজেন্টকে ঢুকতে দেয়নি। এমনকি অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টদের এ কেন্দ্র ছাড়াও আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মন্নুজান স্কুল কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সকাল ৯টা থেকে ৯নং ওয়ার্ডের বৈকালী ইউসেফ স্কুল কেন্দ্র দখল করে নেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
তিনটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত: কেসিসি নির্বাচনে জোরপূর্বক ব্যালটে সিল মারার কারণে দুটি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। এগুলো হলো- ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র (পুরুষ) ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ও লবণচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। দুপুর ১২টার দিকে ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের (পুরুষ) ভোট স্থগিত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। আর বেলা ২টার দিকে অপর কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়।
ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট শুরুর পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই কেন্দ্রে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক জোর করে ঢুকে পড়েন। তারা কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুথে ঢুকে ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মেরে ভোট বাক্স ভরতে থাকে। এই ঘটনার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা খলিলুর রহমান কেন্দ্রে ভোট স্থগিতের ঘোষণা দেন।
কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুধের ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট কাকলী খান ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী জাকিয়া সুলতানার এজেন্ট সাজেদা খাতুন বলেন, ওই যুবকদের সবার শার্টে নৌকা প্রতীকের ব্যাজ লাগানো ছিল। তারা এসেই অন্য প্রার্থীদের এজেন্টদের বের হয়ে যেতে বলেন। এরপর ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকা প্রতীকে এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর ঠেলাগাড়ি ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের গ্লাস প্রতীকে ভোট দিয়ে তা বাক্সে ভরেন।
এ সময় প্রিজাইডিং কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, তিনি পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেছে কি না, সেটা তার জানা নেই।
প্রিজাইডিং কর্মকর্তার পাশেই ছিলেন ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা। তার পোশাকে নামের কোনো ব্যাজ ছিল না। ব্যাজ কোথাও পড়ে গেছে জানিয়ে নিজের নাম নয়ন মিয়া বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেন্দ্র যে দখল হয়েছে, এমন তথ্য তাদের কাছে ছিল না।
এরপর দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্রে আসেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে। সব ব্যালট পেপার জব্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কাউকে মারধর করা হলে সেটা পুলিশের ব্যাপার।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ‘ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়’ কেন্দ্রে একদল যুবক ঢুকে ব্যালটে সিল মারতে থাকেন। তারা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলের নির্বাচনী প্রতীকে টিফিন ক্যারিয়ারে সিল মারতে থাকেন। এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ১ হাজার ৬৯১ জন। প্রায় আধা ঘণ্টা তারা ব্যালটে সিল মারেন। এরপর পুলিশ এলে তারা চলে যান।
ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আলীম হোসেন বলেন, দুর্বৃত্তরা ব্যালটে সিল মারলেও তা বাক্সে ভরতে পারেনি। পরে দুটার দিকে কেন্দ্র স্থগিত করা হয়। এদিকে দুপুরে আমরা ৩১ নং ওয়ার্ডের শিশুমেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গেলে দেখা যায় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থী এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলকে। সে সাংবাদিকদের দেখে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে বাইরে আসলে জানা যায়, সাংবাদিকদের বহনকারী মাইক্রোবাসের চালককে শাসিয়ে যায় রাসেলের ক্যাডাররা। তারা বলে- রাসেল ভাই ছালাম দিয়েছে, আপনারা দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যান।

‘আমাদের কষ্ট হবে ভেবে ভোটটা ওরাই দিয়ে দিয়েছে’ by রোকনুজ্জামান পিয়াস

বেলা তখন সাড়ে ১১টা। খুলনা নগরীর রূপসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল গেটের সামনে বিশাল জটলা। রয়েছে বিজিবি-পুলিশের বহর, কড়া পাহারা। এরইমধ্যে একজন হম্ভিতম্ভি করে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে তারই পরিবারের দুই সদস্য। ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ জানালেন। একইসঙ্গে ব্যঙ্গ করে বললেন, আমাদের কষ্ট হবে ভেবে ভোটটা ওরাই দিয়ে দিয়েছে। সব ব্যালট পেপার শেষ। এ সময় সেখানে ছুটে আসলেন নৌকা প্রতীকের ব্যাচ পরা বেশ কয়েকজন। সাংবাদিকদের সামনেই তাকে শাসালেন। তাদের হুমকিতে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান লোকটি। এরপর মূল গেটের জটলা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় মহিলা ভোট কেন্দ্রের পাশে একটি গাছের নিচেই বসে আছেন এক বৃদ্ধা। নাম আম্বিয়া। ভোটার নম্বর ৪৭২। ভোট দিতে না পেরে হা-হুতাশ করছেন।
তিনি বললেন, আমি ভোট দিতে আসলাম। কিন্তু ওরা বলছে, আমাকে ভোট দেয়া লাগবে না। আমার ভোট নাকি ওরা দিয়ে দিয়েছে। স্লিপ নিয়ে বসে থাকা হাসিনারও একই বক্তব্য। কেন্দ্রের সামনে জড়ো হওয়া বেশ কয়েকজন বলেন, পুলিশের সহযোগিতায় একদল যুবক ব্যালট পেপার ছিনতাই করেছে। পুলিশই ভোট না দিয়ে আমাদের চলে যেতে বলেছে। গতকাল খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের এ চিত্র ৩০ নং ওয়ার্ডের ২৬৫ নং কেন্দ্রে। শুধু এই কেন্দ্রেই নয়, পাশেই অবস্থিত রূপসা উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্রও একই দেখা গেছে।  কোথাও কোথাও প্রিজাইডিং অফিসারের সামনেই জাল ভোটের মহোৎসব চলেছে। প্রায় সবক’টি কেন্দ্রেই পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে সাধারণ ভোটাররা। রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থিত ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা যায়, ভোটাররা ভোট দিতে এসেছেন, কিন্তু ব্যালট পেপার নেই। অনেকেই তাই বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেন্দ্রের ৪টি মহিলা বুথে ২ নং কক্ষে একজন মহিলা পোলিং অফিসার বসা। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ প্রার্থীর কোন এজেন্টই নেই। টেবিল ফাঁকা। নেই কোনো ব্যালট পেপার। পোলিং অফিসার রাশেদা আক্তার জানালেন, তার বুথের তিনশ’ ভোটই কাস্ট হয়ে গেছে ভোট শুরু হওয়ার মাত্র তিনঘণ্টায়। এই অল্প সময়ে কীভাবে এতো ভোটার ভোট দিলো, জানতে চাইলে বলেন, ভোটাররা একসঙ্গে এসে দিয়ে গেছে। এরপর তিনি আর কথা না বলে বাইরে বেরিয়ে যান। কেন্দ্রের আরো তিনটি বুথেও একই অবস্থা। বুথের পোলিং অফিসার ও প্রার্থীর এজেন্টরা তখন অনেকটাই হতভম্ব। দেখে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই তাদের ওপর দিয়ে সিডর বয়ে গেছে। তবে কেউ মুখ খুলছেন না।
অবশেষে মুখ   খুললেন, পারভীন নামে এক পোলিং এজেন্ট। তিনি বললেন, আধাঘণ্টা আগে এখানে একদল যুবক প্রবেশ করে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়েছে। তারা নৌকা প্রতীকে সমানে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে চলে গেছে। তখনও এই চারটি বুথের সামনে অপেক্ষা করছেন অনেকে। এই চারটি বুথে ভোটার সংখ্যা ১৩৬০টি। এই কেন্দ্রের সামনেই অবস্থিত রূপসা উচ্চ বিদ্যালয়। এখানে ভোটার সংখ্যা ১৬৭৩। এই কেন্দ্রে জাল ভোটের খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি আসার পরই সেখানে হট্টগোল বেধে যায়। এরপর সেখানে হাজির হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। পুলিশ জাল ভোট দেয়া যুবকদের বের করে আনে। এ সময় এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, এতো দেরি করলে হয়? সাংবাদিকরা চলে আসার আগেই কাজ শেষ করতে পারতো। এ সময় তিনি নৌকার ব্যাচ পরা এক ব্যক্তিকে আপাতত যুবকদের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য বলেন। এদিকে ওই ভোট কেন্দ্রের দোতলায় ১ নং কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, পোলিং অফিসার মোশাররফ হোসেন দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেন, সকাল থেকে সুষ্ঠুভাবেই ভোট গ্রহণ চলছিলো। কিন্তু সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ করেই ১৫-২০ জন যুবক ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়। এরপর হুমকি-ধামকি দেয়। তারা নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে থাকেন। ওই কেন্দ্রের আরেকটি কক্ষের পোলিং অফিসার জানান, তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসেছিলো। এদিকে ওই কেন্দ্র থেকে চলে আসার সময় দেখা যায় আরো কয়েকজন যুবক প্রবেশ করছে। তাদের পেছন পেছন গিয়ে দেখা যায়, তারা একজন পোলিং এজেন্টের কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে ভোট দিচ্ছেন। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর ৩১ নং ওয়ার্ডের দিকে যেতেই একদল নারী-পুরুষ ঘিরে ধরেন। জানান, তারা ধানের শীষ ও বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট।
তাদের অভিযোগ, ১৭৯ নং কেন্দ্রের সবগুলো বুথ থেকে তাদের বের করে দেয়া হয়েছে। এরপর সেখানে বহিরাগতরা প্রবেশ করে নৌকা ও আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রতীকে সিল মারছে। এ সময় সেখান থেকে যাচ্ছিলো দুই গাড়ি বিজিবি। পোলিং এজেন্টরা তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বিষয়টি দেখতে বললেও, বিজিবি সদস্যরা মুচকি হাসি দিয়ে চলে যান। একই ওয়ার্ডের লবণচরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বাইরে পুলিশের জটলা। বিদ্যালয়ের ভেতরে যেতেই অনেক ভোটারের বিক্ষিপ্ত ঘুরাফেরা দেখা যায়। একজন নারী ভোটার জানান, তিনি ভোট দিতে এসেছেন কিন্তু পুলিশ তাকে কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। দেখা যায়, প্রত্যেক কক্ষের সামনে একজন করে পুলিশ। আর ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে জাল ভোটের মহোৎসব। সেখানে বেশ কয়েকজন নারী জাল ভোট দিচ্ছিলেন।
ছবি তুলতে গেলেই তারা সরে পড়েন। এরপর দোতলায় পুরুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। পোলিং অফিসারের সামনে দেখা যায়, নৌকা প্রতীকে সিল মারা বেশ কয়েকটি ব্যালট পেপার। তার সামনেই ছিলেন, প্রিজাইডিং অফিসার রুকুনুজ্জামান। এ সময় সাংবাদিকদের দেখে তিনি সরে পড়ার চেষ্টা করেন। পরে সাংবাদিকদের জেরার মুখে পড়েন তিনি। একই সময় সেখানে যান প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী ঢাকা থেকে আগত নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব আবদুল বাতেন। তিনি ব্যালটগুলো দেখে বলেন, এভাবে কেন? গুছিয়ে রাখেন। এরপর পোলিং অফিসার সেগুলো গুছিয়ে রাখেন।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আবদুল বাতেন। সেখান থেকে রূপসা ব্রিজের নিচেই যেতেই বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আসলাম হোসেন ও তার লোকজন ঘিরে ধরেন। বলেন, পুরাতন কমিশনারের কার্যালয়ে অবস্থিত কেন্দ্রে তাদের সব এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি সেখানে অবস্থান করলে, ধাওয়া দেয় নৌকার সমর্থকরা। পরে যুবলীগ-ছাত্রলীগের লোকজন তার বাড়িতে হামলা করে। তার বৃদ্ধ পিতা ও ছোট ভাইকে মারধর করে। বৃদ্ধ পিতাকে লাথি মারে। হাজী আবদুল মালেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে যেতে ফয়সাল নামে এক ভোটার পথরোধ করেন। তিনি বলেন, আমি একজন ভোটার। ভোট দিয়ে আসলাম। কিন্তু তারা আগে থেকেই বেশ কিছু ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখছে। কেউ ভোট দিতে গেলে তাদের হাতে ১০টি করে ব্যালট ধরিয়ে দিচ্ছে বাক্সে ঢুকানোর জন্য। পুলিশ পাহারায় এগুলো হচ্ছে বলে জানান। ওই বিদ্যালয়ে পৌঁছানো মাত্রই সাংবাদিক আসছে বলে আগেই সতর্ক করে দেয়া হয় ভেতরে। এরপর দেখা যায়, কোন ভোটার নেই। প্রত্যেক কক্ষে ১০-১৫ জন যুবক নীরবে বসে আছে। বাইরে ভোট দিতে না পারা অনেকে জানান, বসে থাকা ওই যুবকরাই জাল ভোট দিতে বাধ্য করছে। আবার অনেককে সামনেই ভোট দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই কেন্দ্রের ভোট অত্যন্ত সুষ্ঠু বলে দাবি করেন প্রিজাইডিং অফিসার মহিতোষ পাল ও ঢাকা থেকে আসা পুলিশ কর্মকর্তা রাশেদ। এছাড়া পার্শ্ববর্তী শিশু বিদ্যালয় নামে আরেকটি কেন্দ্রেও জাল ভোটের মহোৎসব হয়েছে।
এদিকে ভোট শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারের উপস্থিতি খুবই কম। বুথে দেখা গেছে, ৩ ঘণ্টায় মাত্র ২০-৩০টি মতো ভোট কাস্ট হতে। যেখানে ভোটারের সংখ্যা ৪০০-৪৫০। এছাড়া বেশিরভাগ কেন্দ্রেই বিএনপির পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগ এসেছে, নগরীর ১৫, ২২, ২৫, ২৬, ২৯, ৩০ এবং ৩১ নং ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র থেকে।

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে এখনও যেসব বাধা

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। তবে তার কারামুক্তিতে এখনও কিছু বাধা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
বুধবার সকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সভাপতির কক্ষের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। 
আপিল বিভাগের রায়ের পর খালেদা জিয়ার মুক্তিতে আর কোনও বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে-মওদুদ আহমদ বলেন, ‘কিছুটা বাধা আছে। কারণ সরকার নানা কৌশলে চেষ্টা করবে, তার মুক্তি বিলম্বিত করতে। নিচের (বিচারিক) আদালতের কতগুলো মামলায় তাকে আসামি দেখানো হয়েছে। সে মামলাগুলোতে তার জন্য আমাদের জামিন নিতে হবে। সেই জামিন নিতে যতটুকু সময় লাগে, সেই সময়টুকু পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আমরা খুব চেষ্টা করব খুব দ্রুত গতিতে...।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপিল বিভাগ যেহেতু তার (খালেদা জিয়ার) জামিন বহাল রেখে দিয়েছেন, এখন নিম্ন আদালতে জামিন পেতে আর খুব বেশি অসুবিধা হবে না। সুতরাং আমরা চেষ্টা করবো খুব শিগগির ওই মামলাগুলোতে উনার জামিন নিতে। কারণ, আমাদের তো একটা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো সম্পন্ন করতে হবে। সুতরাং সেই জামিনগুলো পাওয়ার পরে খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন এবং খুব শিগগির ফিরে আসবেন।’ এ ধরনের সাতটি মামলা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এর আগে বুধবার সকালে হাইকোর্টের জামিন স্থগিতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আপিল খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটির হাইকোর্টের আপিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলেছেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এই সময়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি সম্ভব কিনা জানতে চাইলে মওদুদ বলেন, ‘শুনানি শুরু হলে তখন বোঝা যাবে। শুনানির জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। তখন বোঝা যাবে, কতদিন লাগবে। এটা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব না।’
এর আগে গত ৮ ও ৯ মে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের করা আপিল আবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
প্রসঙ্গত,গত ১২ মার্চ দুদকের আবেদনের শুনানি নিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। পাশাপাশি এ মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা কেন বৃদ্ধি করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।
পরে ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ আগামী ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। একইসঙ্গে এই আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের অনুমতি দেন আদালত। আর আপিল আবেদনের সারসংক্ষেপ পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে দুদককে নির্দেশ দেন। এছাড়া ৮ মে ওই আপিল আবেদনের ওপর শুনানির তারিখ ধার্য করেন।
প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত অস্থায়ী পঞ্চম বিশেষ জজ আদালত। রায় ঘোষণার পরপরই তাকে ওই দিন বিকালে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি এখন সেখানেই আছেন। ওই রায়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। একইসঙ্গে এ মামলার অপর আসামি তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ বাকি পাঁচজনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা জরিমানাও করা হয়।

মুক্তি পেলেন মালয়েশিয়ার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার

মালয়েশিয়ান রাজনীতিক ও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ফলে তিনি আবারও রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন। এক সময়ের সম্ভাবনাময় এই নেতাকে সমকামিতা ও দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বুধবার রাজকীয় ক্ষমার বিষয়ে আলোচনার পর তাকে মুক্ত ঘোষণা করে ক্ষমা প্রশ্নে গঠিত কমিটি।
মালয়েশিয়ার রাজা ইয়াং দি পারতুয়ান এগংয়ের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, আনোয়ারের মুক্তি নিয়ে চলমান প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট রাজা। 
বিরোধী জোটের নেতৃত্ব নেওয়ার সময় মাহাথির চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন, জোট ক্ষমতায় এলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। তবে এর দুই বছরের মধ্যে আনোয়ার ইব্রাহিমের মুক্তি নিশ্চিত করে তার কাছে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন তিনি। শপথ নিয়ে মাহাথিরও বলেছিলেন, দ্রুতই আনোয়ারের মুক্তি নিশ্চিত করবেন তিনি।
গত ৯ মে বুধবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা বারিসন ন্যাসিওনাল সরকারকে হারিয়ে জয়লাভ করে চার দলের নতুন জোট। হাসপাতালের বেডে শুয়ে পাঠানো এক বিবৃতিতে আনোয়ার ইব্রাহিম তার পিপলস জাস্টিস পার্টি-পিকেআর সদস্যদের মাহাথিরের সরকারকে ‘শক্তিশালী ও স্থিতিশীল’ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
মাহাথির ক্ষমতাসীন জোটের নেতা আর আনোয়ার জোটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জেতা দল পিকেআর’র নেতা। এই দুজন প্রথমে বন্ধু, তারপর শত্রু ও পরে জোটের মিত্র হয়েছেন। তাদের এমন পরিবর্তনশীল সম্পর্কই গত তিন দশক ধরে মালয়েশিয়ার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি জোটের ভবিষ্যৎও এই দুজনের সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করছে।
আনোয়ার ইব্রাহিম ও মাহাথির মোহাম্মদ একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। কিন্তু মতপার্থক্যের জেরে ১৯৯৮ সালে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে আনোয়ার ইব্রাহিমকে সরিয়ে দেন মাহাথির। এরপর কথিত সমকামিতার অভিযোগে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের ধারাবাহিকতায় সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে হটাতে তারা আবার মিত্রে পরিণত হন। সূত্র: বিবিসি।

চট্টগ্রামে পদদলনে ১১ নারীর মৃত্যু: শাহজাহানের বিরুদ্ধে মামলা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইফতারসামগ্রী নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১১ নারীর মৃত্যুর ঘটনায় কেএসআরএম-এর মালিক মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে নিহত হাছিনা আক্তারের স্বামী মোহাম্মদ ইসলাম বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় মামলাটি করেন। তাদের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নে। সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের শিল্প প্রতিষ্ঠান কবির স্টিল রিরোলিং মিলস লিমিটেডের (এমডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহানকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া ইফতারসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানের সমপৃক্ত অজ্ঞাত পরিচয় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়। তদন্তসাপেক্ষে এ মামলায় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেএসআরএম-এর চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম গাটিয়াডেঙ্গা গ্রামের হাঙ্গরমুখ  এলাকায়। বাড়ির পাশে কাদেরীয়া মঈনুল উলুম দাখিল মাদরাসার মাঠে সোমবার সকালে ইফতারসামগ্রী বিতরণের আয়োজন করে কেএসআরএম গ্রুপ।
যেখানে উপস্থিত ছিলেন শাহজাহান নিজেও। সেখান থেকে করুণ মৃত্যুর শিকার ৯ নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেয়ার পথে মারা যান আরো দুই নারী। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার পর চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা জানিয়েছিলেন, ১০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার মাঠে ২০ হাজারেরও বেশি লোক জড়ো হন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। ভিড়ের মধ্যে প্রচণ্ড গরমে হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে নারীদের মৃত্যু হয়েছে।
তবে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে এসব নারীর মৃত্যুর কথা কেএসআরএম প্রথমে স্বীকার করলেও পরে সোমবার রাতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে প্রচণ্ড গরমে হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি তোলা হয়। এবং নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়।
এর আগে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত টিম গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। ফলে তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন করেন কেএসআরএম।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, কেএসআরএমের গাফিলতির বিষয়টি সপষ্ট। কারণ তারা ইফতারসামগ্রী বিতরণের আয়োজনের বিষয়টি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও জানাননি। আমাকেও জানাননি। পুলিশকে আগে থেকে বলা হয়েছে কি না সেটা এসপি সাহেব জানেন।
তবে আমি যেটা জানতে পেরেছি, পুলিশ ঘটনার পর থানা থেকে মুভ করেছিল। ঘটনার আগে সেখানে কতজন পুলিশ ছিল সেটাও তদন্তে উঠে আসবে। ঘটনাটি কি হিটস্ট্রোক নাকি পদদলন সেটাও তদন্তে বের হবে।
তিনি বলেন, ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান করা হয়েছে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাশহুদুল কবীরকে। কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোবারক হোসেনকে।
এ ছাড়া কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ন কবির, সাতকানিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হাসান মোল্লা এবং সাতকানিয়া নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তারকে।
মাশহুদুল বলেন, কমিটির সদস্যদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। বৈঠকে বসে তদন্তের কর্মপরিধি নির্ধারণ করবো আমরা। এরপর মাঠের তদন্ত শুরু করবো।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) নূরে আলম মিনা বলেন, ঘটনার খবর শুনে তিনি দ্রুত সেখানে যান। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, প্রচণ্ড ভিড় এবং ভ্যাপসা গরমের মধ্যে পদদলন, হিটস্ট্রোক এবং শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে কেএসআরএম’র বিতরণ ব্যবস্থায় অবহেলার প্রমাণ পেয়েছি আমরা।
তিনি বলেন, এক সপ্তাহ ধরে তারা বিভিন্ন মসজিদের মাইকে ইফতারসামগ্রী বিতরণের প্রচার করেছিল। এর ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া এলাকা থেকেও লোকজন জড়ো হয়েছিলেন। অথচ বিষয়টি তারা উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশকে লিখিতভাবে অবহিত করেনি।
তিনি জানান, ২০-২৫ হাজার লোক সমাগমের জন্য অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ পুলিশ দরকার। আগে থেকে অবহিত না করায় সেখানে আমাদের টিম ছিল না। তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী যারা ছিলেন তারাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। কারণ মাঠের গেটটা এতই সংকীর্ণ ছিল যে সেখানে এত লোক প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রে জাল ভোটের গ্রুপ by আব্দুল আলীম

এ এক অন্য রকম ভোট। স্থায়ীভাবে ভোটকেন্দ্র দখল না করলেও নগরীজুড়ে ছিল আতঙ্ক। নগরজুড়ে সব কেন্দ্রেই ছিল সরকারদলীয় প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের লোকজনের আধিপত্য। ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি গ্রুপ জাল ভোট দেয়ার মিশনে নামে। ভোটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জাল ভোট দেয়া চালিয়ে যায় নিশ্চিন্তে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সঙ্গে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক বের হলেই কেন্দ্র দখলে নিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে সিল মেরে বাক্স ভরে সটকে পড়ে তারা। তারা সকাল ৮টা থাকে ১০টা পর্যন্ত প্রথমে রেকি করে কয়েকটি কেন্দ্রে। বিএনপি সমর্থিত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সমর্থকদের দুর্বল অবস্থান ও সাংবাদিকদের মুভমেন্ট দেখে ১০টার পর শুরু করে জাল ভোট দেয়ার মিশন। ১০টার দিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী তালকুদার আবদুল খালেক প্রবেশ করেন ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূর নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এ সময় সাংবাদিক ও কিছু পর্যবেক্ষকও প্রবেশ করেন তাঁর সঙ্গে। কেন্দ্র পরিদর্শন করে বের হয়ে এলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে সাংবাদিকরাও বের হয়ে আসেন। এমন সময় নগর যুবলীগ নেতা জাকির ও কানা রানার নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি গ্রুপ আচমকা প্রবেশ করে ভোটকেন্দ্রের ভেতর। প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইং অফিসার ও ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দিয়ে শুরু করেন জালভোট প্রদান। ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সামনে থাকা সব ব্যালট পেপারের বান্ডিলে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে মুহূর্তের মধ্যে কেন্দ্র ত্যাগ করে। খবর পেয়ে মিডিয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসতে আসতে সটকে পড়ে তারা। চলে যায় পরবর্তী কেন্দ্রে। একইভাবে প্রতিটি কেন্দ্রে তালুকদার আবদুল খালেক ভেতরে অবস্থান কালে জালভোট গ্রুপ কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান নেয়। খালেক ও সাংবাদিক-পর্যবেক্ষকরা বের হয়ে যাওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই একযোগে প্রবেশ করে মুহূর্তেই সব ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে সটকে পড়ে তারা।
সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এই জালভোট গ্রুপ বিনা বাধায় জালভোট প্রদান করছে। মুহূতেই স্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা এলে কেন্দ্র শান্ত দেখে চলে যাচ্ছেন। ৪নং ওয়ার্ডের দেয়ানা উত্তর পাড়া ভোট কেন্দ্রে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা করে তালুকদার আবদুল খালেকের সমর্থকরা। কেন্দ্রে প্রবেশ করে জাল ভোট দিয়ে সরে পড়ে তারা। দুপুর ২টার দিকে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেখপাড়া বিদ্যুৎ স্কুল কেন্দ্রে যান তালুকদার আবদুল খালেক। সেখান থেকে তিনি বের হয়ে এলে তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের বহর কেন্দ্রে প্রবেশ করে জাল ভোট দেয়া শুরু করে। একইভাবে তারা জাল ভোট দেয় ওই ওয়ার্ডের হাতেম আলী স্কুল কেন্দ্র, ইসলামাবাদ ভোটকেন্দ্র, পাইওনিয়ার স্কুল ভোটকেন্দ্র, গন্ডামারি লায়ন্স স্কুল ও নিরালয় স্কুল কেন্দ্র থেকেও। এসব কেন্দ্রের বিএনপির পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে অবস্থানরত প্রশাসনের সামনেই মারধর করে বের করে দিয়ে জাল ভোট দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে টহল পুলিশ ও সাংবাদিকরা আসার আগেই কেটে পড়ে।
২০নং ওয়ার্ডের এইচ আর এইচ প্রিন্স আগাখান উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা নৌকা মার্কায় সিল মারে। ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে দারুল উলুম সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে হঠাৎ প্রবেশ করে জালভোট দেয়া শুরু করে আবদুল খালেকের লোকজন। লবণচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও তারা পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে সিল মারে। ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে জোর করে ব্যালটে সিল মারে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এই কেন্দ্রে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক জোর করে প্রবেশ করে কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুথে জালভোট দিয়ে বাক্স ভরে সটকে পড়ে। এ বুথের ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট কাকলী খান মানবজমিনকে বলেন, জাল ভোট দেয়া যুবকদের সবার জামায় নৌকা প্রতীকের ব্যাজ লাগানো ছিল। তারা এসেই ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দিয়ে ও প্রিজাইডিং অফিসারকে তার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখে সিল মারা শুরু করে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, তিনি পুলিশের সহযোগিতা চাইলে তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার রুমের পাশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা নয়ন মিয়া বলেন, কেন্দ্র দখল করে সিল মারার মতো কোনো তথ্য আমি পাইনি। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার রুমে কখন তালা মেরেছে আমি জানি না। আমি প্রস্রাব করতে গেছিলাম। ফিরে এসে স্যারকে রুমে পেয়েছি। দুপুর   ১২টার দিকে কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী মানবজমিনকে বলেন, জালভোট দেয়ার অভিযোগ পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছি। সব ব্যালট পেপার ও বাক্স জব্দ করেছি। কোনো এজেন্ট প্রবেশ করতে না দেয়ার অভিযোগ আসেনি। এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ডি আলী ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপির চিহ্নিত ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয় সরকার দলের প্রার্থীর লোকজন। সকাল সাড়ে ১১টার পর নগরীর রূপসা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাঁচটি বুথে প্রবেশ করে সিল মারে। এদিকে ৩১ নম্বর আবদুল মালেক ইসলামীয়া কলেজ কেন্দ্রে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক দল যুবক প্রবেশ করে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর প্রার্থী খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেলের নির্বাচনী প্রতীকে সিল মারতে থাকে। প্রায় আধা ঘণ্টা তারা ব্যালটে সিল মেরে চলে যায়। এ সময় খুলনা সোনাডাঙ্গা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুম্মান আহমেদকে পুলিশ হাতেনাতে ধরার পরও বের করে দেয়া হয়। অন্য দুইজনকে ঘণ্টা খানেক আটকে রাখে। সাংবাদিকরা চলে গেলে তাদেরও ছেড়ে দেয়া হয়। তবে আটকদের নাম জানতে চাইলে দায়িত্বরত পুলিশের এসআই বোরহান মিয়া বলেন, আমি অসহায়। আপনাদেরই ভাই ব্রাদার। নাম বলে দিলে এখানে অনেক সমস্যা হবে। এ সময় নির্বাচনী দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে কেন্দ্রে দেখা গেলেও মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, আপনারা আপনাদের কাজ করেন। আমি কিছু বলব না। সিল মেরে যাওয়ার পর এই কেন্দ্রে প্রচুর পরিমাণে ভোটাররা ভোট দিতে আসেন। তবে ব্যালট পেপার না থাকায় প্রায় সকলকেই ভোট না দিয়ে ফেরত যেতে হয়। একই রকম পরিস্থিতি নগরীর শেরেবাংলা রোড সোনা স্কুল কেন্দ্রে। সেখানেও দুপুর দেড়টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সব ব্যালট পেপার। এই কেন্দ্রের বাইরে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের চেয়ার টেবিল ভাঙচুর করা হয়। তবে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আলীম হোসেন বলেন, কিছু দুর্বৃত্ত ব্যালটে সিল মারলেও তা বাক্সে ভরতে পারেনি। পরে দুপুর দুটার দিকে কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। ওয়ার্ডের লবণচরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও পোলিং এজেন্টদের পাশাপাশি প্রিজাইডিং অফিসারদের বের করে দিয়ে সিল মারে নৌকার সমর্থকরা।

ইসরাইলি বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া

ইসরাইলি সেনাদের নৃশংস হামলায় কমপক্ষে ৬০ জন নিহত হওয়ার পর ক্ষোভে ফুঁসছে পুরো ফিলিস্তিন। ইসরাইলের নৃশংসতার প্রতিবাদে নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা বিরাজ করছে গাজায়। গতকাল সেখানে নিহতদের দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়। ইসরাইলের এই হত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ব। সহিংসতার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছে কুয়েত। এতে তীব্র ক্ষোভ ও সমবেদনা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু কুয়েতের উদ্যোগকে জাতিসংঘে আটকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মঘেরিনি ও বৃটেন উভয় পক্ষকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিক্রিয়া দিয়েছে জার্মানিও। তারা বলেছে, আত্মরক্ষার অধিকার আছে ইসরাইলের। কিন্তু সেটা হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নৃশংস হামলার কড়া নিন্দা প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের ‘গণহত্যা’র দায় যুক্তরাষ্ট্রের। এমন কথা বলেছে তুরস্ক। তারা প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে। সবচেয়ে কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা এসেছে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাইকমিশনার জায়েদ রাদ আল হোসেনের পক্ষ থেকে। তিনি এতগুলো মানুষ হত্যায় হতাশা প্রকাশ করে নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন, ইসরাইলের সরাসরি গুলিতে এত মানুষ মরেছেন। আহত হয়েছেন কয়েক শত। অন্যদিকে ইসরাইলে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে দক্ষিণ আফ্রিকাও। তারা ইসরাইলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে । বলেছে, ইসরাইলের সর্বশেষ এই হামলা বৈষম্যমূলক ও ভয়াবহ প্রকৃতির। মঙ্গলবার ছিল ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘নাকবা’ বা ধ্বংসযজ্ঞ দিবসের ৭০তম বার্ষিকী। ১৯৪৮ সালে ইসরাইলকে সৃষ্টি করার পর এদিন হাজার হাজার মানুষকে পালাতে হয়েছিল। এর একদিন আগে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমে তার দূতাবাস উদ্বোধন করেছে। এ নিয়ে বিশ্বজোড়া ক্ষোভ ও বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের কারো কথায় কান না দিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কোনো প্রেসিডেন্টের পথ অনুসরণ না করে, পররাষ্ট্রনীতির তোয়াক্কা না করে, একতরফাভাবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে গত ডিসেম্বরে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ঘোষণা দেন তেলআবিবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সেখানে স্থানান্তর করবেন। সেই কথামতো সোমবার দূতাবাস স্থানান্তর কর হয়। এ দুটি ইস্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ফিলিস্তিনিরা। কারণ, তারা পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যে স্বীকৃতি ইসরাইলকে দিয়েছে তাতে ফিলিস্তিনিরা মনে করছেন, পুরো জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে থাকবে আর তাতে সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবারের সহিংসতা নিয়ে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত হওয়া ছাড়াও ওইদিন কমপক্ষে ২৭০০ মানুষ আহত হয়েছে। ২০১৪ সালে গাজায় যে যুদ্ধ করে ইসরাইলিরা তারপর এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার দিন। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উল্টো দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, গাজার ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। হামাস চায় ইসরাইলকে ধ্বংস করতে। কিন্তু তার এ দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। তারা এই হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলেছে জাতিসংঘ। এর ফলে মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে তুরস্ক। সোমবার তুরস্ক সরকারের এক মুখপাত্র এ কথা বলেছেন। তুরস্কের আহ্বানে ৫৭ সদস্যের এই সংগঠনের বৈঠক ডাকা হয়েছে শুক্রবার। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরানোকে কেন্দ্র করে ও গাজা সহিংসতায় সবচেয়ে কড়া সমালোচনাকারী দেশ তুরস্ক। গাজায় সোমবার যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তাদের জন্য তুরস্কে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান ইসরাইলকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।